সফরের বিধি বিধান

সফরের বিধি বিধান

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

সফর বলতে আমরা বুঝি নিজের পরিবার ও জন্মভূমী ত্যাগ করে অন্য কোন অঞ্চলে গমন করা। সফর বিভিন্ন উদ্দেশ্যে হতে পারে। সাধারণত সফর দুনিয়াবী কারনে হয় থাকে তবে বহু মুসলিম দ্বীনের কারনেও সফর করে থাকে। কোন মুসলিমের সফর যখন দ্বীনের উদ্দেশ্যে হবে তখন তার সফর ইবাদাত হিসাবে গন্য হবে। হজ্জ মুলটি একটি বিশাল সফরের নাম। বিশ্বের প্রতিটি দেশ থেকে আল্লাহ পাগল সামর্থবান মুনিন হজ্জের জন্য সফর করে। যদিও সফর একটি কঠিন ও কষ্ট সাধ্য কাজ। ইসলামি শরীয়তে সফর একটি গুরুত্ব পূর্ণ বিষয়। কেননা মুমিন মুসলিককে প্রতিটি মুহুর্তেই মহান আল্লাহকে স্মরন রেখে তার হুকুম মনে চলতে হয়। তাকে সার্বক্ষনই  কোন না কোন ইবাদের মাধ্যমে মহান আল্লাহকে খুসি করতে হয়। সফর একটি কঠিন ও কষ্ট সাধ্য কাজ বিধায় মহান আল্লাহ মানুষের প্রতি দয়া দেখিয়ে তার হুকুম আদায়ে জন্য একটু সিথিলতা প্রদান করছেন। তার প্রদানকৃত সিথিলতা গ্রহন করাও ফরজ করে দিয়েছেন। কাজেই প্রতিটি মুসলিমের জন্য সফর সংক্রান্ত বিধী বিধান জানা ফরজ। হজ্জ যেহেতু একটি বড়, কঠিন, কষ্ট সাধ্য কাজ তাই এই সময় মহান আল্লাহ বিধান মেনে আমল করা ফরজ। কিন্তু অনেক মুসলিম অজ্ঞতার কারনে সফরের বিধান সঠিক পালন করতে পারে না।

অনেক কারনে মানুষ সফর করে। প্রতি সফরের বিধান একই। হজ্জের সফর আর ব্যক্তিগত কারনে সফরের বিধানে কোন পার্থক্য নাই। যদিও সফর করা আগের দিনের তুলনায় অনেক কষ্ট এবং সময় কম লাগে।  আধুনিক এই যান্ত্রিক যুগে সফর বা ভ্রমণ মানুষের নিত্ত নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাড়িয়েছে। আগে এক দেশ থেকে অন্য দেশে সফর করা কল্পনাতীত ছিল কিন্তু এখন পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত এক নিমিসেই পাড়ি দিচ্ছে। মানুষ যেমন আল্লাহ হুকুমে হজ্জের জন্য সফর করে ঠিক তেমনি নিজের  প্রয়োজনে সফর করে থাকে। আবার কেউ আল্লাহর নিদর্শন প্রত্যক্ষ করার জন্য প্রতিনিয়তই ভ্রমণ করে থাকে। বিভিন্ন স্থান দর্শনে অনেক জ্ঞানার্জন করা যায়। পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে আল্লাহর বিভিন্ন সৃষ্টিজীব, প্রকৃতি, নদী-নালা দেখার মাধ্যমে মুমিন বান্দাগণ আল্লাহর অপূর্ব সৃষ্টি সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনার সূযোগ পায়। বিশেষ করে আল্লাহর দয়া, ক্ষমতা সর্ম্পকে জানতে পারে। এতে তাদের ঈমান বৃদ্ধি পায়। মহান আল্লাহ বলেনঃ

أَوَلَمْ يَسِيرُوا فِي الْأَرْضِ فَيَنظُرُوا كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الَّذِينَ مِن قَبْلِهِمْ كَانُوا أَشَدَّ مِنْهُمْ قُوَّةً وَأَثَارُوا الْأَرْضَ وَعَمَرُوهَا أَكْثَرَ مِمَّا عَمَرُوهَا وَجَاءتْهُمْ رُسُلُهُم بِالْبَيِّنَاتِ فَمَا كَانَ اللَّهُ لِيَظْلِمَهُمْ وَلَكِن كَانُوا أَنفُسَهُمْ يَظْلِمُونَ

অর্থঃ তারা কি পৃথিবীতে ভ্রমণ করে না? অতঃপর দেখে না যে, তাদের পূর্ববর্তীদের পরিণাম কি কি হয়েছে? তারা তাদের চাইতে শক্তিশালী ছিল, তারা যমীন চাষ করত এবং তাদের চাইতে বেশী আবাদ করত। তাদের কাছে তাদের রসূলগণ সুস্পষ্ট নির্দেশ নিয়ে এসেছিল। বস্তুতঃ আল্লাহ তাদের প্রতি জুলুমকারী ছিলেন না। কিন্তু তারা নিজেরাই নিজেদের প্রতি জুলুম করেছিল। [ সুরা রূম ৩০:৯ ]

মহান আল্লাহ আরও বলেনঃ

قَدْ خَلَتْ مِن قَبْلِكُمْ سُنَنٌ فَسِيرُواْ فِي الأَرْضِ فَانْظُرُواْ كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الْمُكَذَّبِينَ

অর্থঃ তোমাদের আগে অতীত হয়েছে অনেক ধরনের জীবনাচরণ। তোমরা পৃথিবীতে ভ্রমণ কর এবং দেখ যারা মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে তাদের পরিণতি কি হয়েছে। (সুরা ইমরান ৩:১৩৭)

মহান আল্লাহ এমনিভাবে বিভিন্ন জাতির ধ্বংসাবশেষ ও মিথ্যাবাদীদের অবস্থা দেখার জন্য আন‘আম (১১), ইউসুফ (১০৯), নাহল (৩৬), হাজ্জ (৪৬), নামল (৬৯), আনকাবূত (২০), ফাতির (৪৪), গাফির (২১) এবং মুহাম্মাদ (১০) -এ নির্দেষ দিয়েছেন।

সফর বা ভ্রমণের প্রকারভেদঃ

সফর বা ভ্রমণকে কুরআন-হাদীছের আলোকে পাঁচ ভাগে ভাগ করা যায়।

* হারাম বা নিষিদ্ধ সফর

* মাকরূহ বা অপসন্দনীয় সফর

* মুবাহ বা জায়েয সফর

* মুস্তাহাব বা পসন্দনীয় সফর

* ওয়াজিব বা আবশ্যকীয় সফর

হারাম বা নিষিদ্ধ সফরঃ  

ইসলাম বিরোধিতা বা নিষিদ্ধ কাজ সম্পন্ন করার জন্য সফর করা হারাম। কাজেই, হারাম কাজের উদ্দেশ্যে সফর করা হয় তাহলে সে সফরের হুকুমও হারাম হবে। যেমন, সমাজে ইসলাম বিরোধী উরসের জন্য সফর করা, মাজারের মানত পুরা কারার জন্য সফর করা। গান বাজনা, মেলা, আড়ং, পহেলা বৈশাখ, হিন্দুদের পুজা, ঝগড়া-বিবাদ, যে কোন পাপ কাজ ইত্যাদির জন্য সফর করা হারাম।

এমনকি যেখানে মহামারী আরম্ভ হয়েছে এমন স্থান থেকে সফর করাও নিষেধ। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যদি তোমরা শুনতে পাও (কোন স্থানে মহামারী আক্রান্ত হয়েছে) তাহ’লে সেখানে যেয়ো না। আর তোমরা যেখানে আছ সেখানে আক্রান্ত হ’লে সেখান থেকে বের হয়ো না’। (বুখারী ৫৭২৮-৩০, মুসলিম ২১৮-১৯;  মিশকাত ১৫৪৮)।

এছাড়া কোন মহিলার মাহরাম ছাড়া সফর করা। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, মহিলারা মাহরাম (যার সঙ্গে বিবাহ নিষিদ্ধ) ব্যতীত অন্য কারো সাথে সফর করবে না। মাহরাম কাছে নেই এমতাবস্থায় কোন মহিলার নিকট কোন পুরুষ গমন করতে পারবে না’। (বুখারী ১৮৬২; মুসলিম ১৩৪১)।

মাকরূহ বা অপসন্দনীয় সফরঃ এটা হ’ল ইসলামী পদ্ধতি ছাড়া অন্য পদ্ধতিতে সফর করা। যেমনঃ একাকী রাতে সফর করা, তিন জনের অধিক হ’লে কাউকে আমীর নিযুক্ত না করে সফর করা।

ইবনে ওমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যদি লোকেরা একা সফরে কি ক্ষতি আছে তা জানত, যা আমি জানি, তবে কোন আরোহী রাতে একাকী সফর করত না’। ( সহিহ বুখারী ২৯৯৮)।

মুবাহ বা বৈধ সফরঃ  দুনিয়ার হালাল কোন কাজের প্রয়োজনে বা শখের বসে বিভিন্ন স্থানে সফর বা ভ্রমণ করা। কাজেই, কোন জায়েয কাজের উদ্দেশ্যে সফর করা হয় তবে উক্ত সফরও জায়েয বলে গণ্য হবে। যেমন, যারা ব্যবসা করে জীবন যাপন করে তারা ব্যবসার প্রয়োজনে সফর করে। চাকুরী জীবি চাকুরির জন্য সফর করে। কেউ শিক্ষা গ্রহনের জন্য সফর করে। কেউ শুধুই বিনোদনের জন্য সফর করে। আবার কেউ দর্শনীয় স্থান দেখার জন্য সফর করে। এই ধরনের সফর বৈধ সফর।

মুস্তাহাব বা পসন্দনীয় সফরঃ আত্মীয় স্বজনের সাথে দেখা করা জন্য সফর করা। অসুস্থ মানুষের সাথে সাক্ষাতের জন্য সফর করা। ফরজ ইলমের অতিরিক্ত দ্বীন শিক্ষার জন্য সফর করা। কোন মানুষকে সাহায্য করা জন্য সফর করা। উপদেশ গ্রহণের জন্য, পূর্ববর্তী জাতিসমূহের ধ্বংসাবশেষ ও তাদের স্মৃতিসমূহ দেখার জন্য সফর করা মুস্তাহাব। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ

أَوَلَمْ يَسِيرُوا فِي الْأَرْضِ فَيَنظُرُوا كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الَّذِينَ مِن قَبْلِهِمْ وَكَانُوا أَشَدَّ مِنْهُمْ قُوَّةً

অর্থঃ তারা কি পৃথিবীতে ভ্রমণ করে না? করলে দেখত তাদের পূর্ববর্তীদের কি পরিণাম হয়েছে। অথচ তারা তাদের অপেক্ষা অধিকতর শক্তিশালী ছিল। (সুরা ফাতির ৩৫:৪৪)।

ইহা ছাড়া মসজিদে হারাম, মসজিদে নববী ও মসজিদে আক্বছার উদ্দেশ্যে ভ্রমণ করা মুস্তাহার কারন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, মসজিদুল হারাম, মসজিদুর নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এবং মসজিদুল আক্বছা (বাইতুল মাক্বদিস) তিনটি মসজিদ ব্যতীত অন্য কোন মসজিদের উদ্দেশ্যে সফর করা যাবে না। (সহিহ বুখারী ১১৮৯; সহিহ মুসলিম ‘হজ্জ অধ্যায়’) ।

ওয়াজিব বা অবশ্যিক সফরঃ সফর যদি কোন ইবাদাতের উদ্দেশ্যে শুরু করা হয় তবে উক্ত সফরও ইবাদাত বলে গণ্য হবে। আর এই সফর যখন আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কোন আদেশকে বাস্তবায়নের জন্য সফর করা। যেমন, হজ্জের জন্য মক্কা সফর করা এবং মুসলিম রাষ্ট্রনায়ক যুদ্ধের আদেশ দিলে যুদ্ধের জন্য সফর করা ইত্যাদি। যেমনঃ মহান আল্লাহ বলেন,

وَأَذِّن فِي النَّاسِ بِالْحَجِّ يَأْتُوكَ رِجَالًا وَعَلَى كُلِّ ضَامِرٍ يَأْتِينَ مِن كُلِّ فَجٍّ عَمِيقٍ

অর্থঃ এবং মানুষের মধ্যে হজ্বের জন্যে ঘোষণা প্রচার কর। তারা তোমার কাছে আসবে পায়ে হেঁটে এবং সর্বপ্রকার কৃশকায় উটের পিঠে সওয়ার হয়ে দূর-দূরান্ত থেকে।(সুরা হজ্জ ২২:২৭)।

ফরয ইলম অর্জন করার জন্য যে কোন স্থানে ভ্রমণ করা। সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, কোন ব্যক্তি জ্ঞানার্জনের জন্য কোন পথ অবলম্বন করলে, আল্লাহ এই অসীলায় তার জন্য জান্নাতের একটি পথ সুগম করে দেন’। (ইবনু মাজাহ-২২৩, তিরমিযী-২৬৪৬, মিশকাত-২১২, ছহীহুল জামি ৬২৯৮, ৬৫৭৭)।

ইমাম ইবনুল ক্বাইয়িম (৬৯১-৭৫১ হিঃ) বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সফরসমূহ চার ধরনের ছিল। হিজরতের জন্য সফর, জিহাদের জন্য সফর, আর এটাই বেশী ছিল, ওমরাহ-এর জন্য এবং

 হজ্জের জন্য সফর।

 ইসলামে অন্যান্য বিধানের ন্যায় সফরের সময় পালনীয় সুন্দর নিয়ম-কানূন রয়েছে। আজ মুসলিম সমাজের অধিকাংশ ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞ, তারা সফরের নির্দেষ ও নিয়ম-কানুন সম্পর্কে জানেনা বললেই চলে। মুসলমানের সকল কাজ ইবাদত এবং ভ্রমণও তার বাইরে নয়। প্রত্যেক মুসলিমকে যেহেতু মহান আল্লাহ এক মাত্র তার ইবাদতের জন্য সৃষ্ট করেছেন, (৫১:৫৬)। কাজেই তার প্রতিটি পদক্ষেপেই মহান আল্লাহ হুকুম জেনে নিতে হবে। যদি কোন মুসলিম প্রতি মুহুর্তে মহান আল্লাহ হুকুম ও তার হাবিব মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নির্দেশিত পথে অতিবাহিত করে তবে তার প্রতি মুহুর্তেই ইবাদত হিসাবে পরিগনিত হবে। তাই ইসলাম ভ্রমণের জন্য নির্দিষ্ট সীমারেখা ও নিয়ম-কানূন নির্ধারণ করে দিয়েছে। রাসূল (ছাঃ) মাদানী জীবনের ১০ বছরের মধ্যে ৭৮১ দিনের অধিক অর্থাৎ দু’বছরের বেশী সময় যুদ্ধের ময়দানে (সফরে) অতিবাহিত করেছেন। এই অবস্থায় ইসলামের বহু বিধি-বিধান জারী হয়েছে। [মুহাম্মদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব, সীরাতুর রাসূল (ছাঃ)]।

সফরের সময় কিছু গুরুত্বপূর্ণ করণীয় কাজঃ

যদি কেউ ইবাদাতের উদ্দেশ্যে সফর করে তবে তাকে সালত, সিয়ামের বিধানের পাশাপাশি নিম্নের বিষয়সমূহের প্রতি গুরুত্বারোপ করা আবশ্যকঃ

* ইবদতের জন্য সফর হলে নিয়্যাতকে বিশুদ্ধ করতে হবেঃ

* সফরে ফরজ হুকুবে অবহেলা না করা

* সৎ কাজের আদেশ প্রদান অসৎ কাজের নিষেধ করা

* সফরে অন্য সাথীদের কষ্টের কারন না হওয়া

* সাথীদের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে হবে

* গীবত ও অযথা কথা থেকে জবান হিফাজত করা

* একাকী সফর না করা

* সফর সংশ্লিষ্ট দোয়াগুলো যথাসময় পাঠ করা

ইবদতের জন্য সফর হলে নিয়্যাতকে বিশুদ্ধ করতে হবেঃ

আমারা জানি যে কোন কাজের ফলাফল আল্লাহ তার নিয়তের উপরই দিয়ে থাকেন। কাজেই আমদের সফর সর্বাবস্থায় আল্লাহ পাকের নৈকট্য লাভের এবং সৎ উদ্দেশ্যে হতে হবে। মহান আল্লাহ পাকের নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্য সফর করলে, আমাদের যাবতীয় শ্রম ও টাকা পয়সা খরচ শুধু আমাদের নেকী বৃদ্ধি করা হবে না, আমাদের  গুনাহসমূহও ক্ষমা করা হবে এবং মর্যাদা সুউচ্চ হবে।

আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ যে ব্যাক্তি নেক কাজের ইচ্ছা করে অথচ সস্পাদন করে নি, তার জন্য একটি সাওয়াব লেখা হয়। আর যে ইচ্ছা করার পর কার্যত সস্পাদন করে, তবে তার ক্ষেত্রে দশ থেকে সাতশ, গুন পর্যন্ত সাওয়াব লেখা হয়। পক্ষান্তরে যে কোন মন্দ কাজের ইচ্ছা করে আর তা না করে তবে কোন গুনাহ লেখা হয় না। আর তা করলে (একটি) গুনাহ লেখা হয়। (সহিহ মুসলিম ২৩৭)

আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেনঃ আল্লাহ তা’আলা বলেছেনঃ আমার বান্দা যখন কোন সৎকর্মের সংকল্প গ্রহণ করে অথচ এখনও তা সম্পাদন করে নি তখন আমি তার জন্য একটি সাওয়াব লিখি; আর যদি কার্যত সম্পাদন করে তবে দশ থেকে সাতশ- গুন পর্যন্ত সাওয়াব লিখি। পক্ষান্তরে যদি অসৎ কর্মের ইচ্ছা করে অথচ এখনো সম্পাদন করে নি তবে এর জন্য কিছুই লিখি না। আর তা কার্যে পরিণত করলে একটি মাত্র পাপ লিখি। (সহিহ মুসলিম ২৩৫)

সফরে ফরজ হুকুবে অবহেলা না করাঃ

সফর একটি কষ্টসাধ্য কাজ। সফল কালে সময়ের অভাবে সঠিকভাবে সালাত করা অনেকের পক্ষ সম্বব হয়ে উঠে না। যাদের ঈমান দুর্বল তারাতো সফরের সালাত ছেড়েই দেয়। সফরে যতই কষ্ট হোকনা কেন কোন অবস্থায়ই ফরজ হুকুবে অবহেলা করা যাবে না। সফরের সময় অনেক মহিলা পর্দার ব্যাপারে গুরত্ব প্রদান করে না। অথচ পর্দা করা প্রতিটি প্রাপ্ত বয়স্ক নর নারীর জন্য ফরজ। শুধু সালাত আর পর্দা নয় সফরের প্রতিটি ফরজই যথাযথভাবে আদায় করা উচিৎ।

সফরের সালাতগুলো কসর করে যথাযথ আদায় করতেই হবে। কোন অজুহাতে সালাত কাজা করা যাবে না।

সৎ কাজের আদেশ প্রদান অসৎ কাজের নিষেধ করাঃ

সফর দীর্ঘ ও সময় সাপেক্ষ হলে সাধ্য মত সৎকাজের নির্দেশ দেয়া আর অসৎকাজ থেকে নিষেধ করা উচিৎ। যদি সফর সঙ্গী বেশী থাকে তবে নিজেদের মাঝেও এই কাজ করা যায়। যেমন, হজ্জের সফরে দীর্ঘ দিন ধরে বহু সাথীকে একই সাথে সফর করতে হয়। এই সুযোগে সাধ্যমত সৎকাজের নির্দেশ ও অসৎকাজর নিষেধ করা। তাছাড়া চলাচলে পথেও সাধ্যমত এই কাজটি চালিয়ে যেতে হবে।

আবূ সা‘ঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, একবার নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তোমরা রাস্তায় বসা থেকে বিরত থাকো। তারা বললঃ হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের রাস্তায় বসা ব্যতীত গত্যন্তর নেই, আমরা সেখানে কথাবার্তা বলি। তখন তিনি বললেন, যদি তোমাদের রাস্তায় মজলিস করা ব্যতীত উপায় না থাকে, তবে তোমরা রাস্তার হক আদায় করবে। তারা বলল, হে আল্লাহর রাসূল! রাস্তার হক কী? তিনি বললেন, তা হলো চক্ষু অবনত রাখা, কাউকে কষ্ট দেয়া থেকে বিরত থাকা। সালামের জবাব দেয়া এবং সৎকাজের নির্দেশ দেয়া আর অসৎকাজ থেকে নিষেধ করা। (সহিহ বুখরি ৬২২৯ তাওহীদ)

সফরে অন্য সাথীদের কষ্টের কারন না হওয়াঃ

সফরের বিভিন্ন মন মানুষিকতার লোক থাকে। কেউ রাগি, কেউ স্বর্থপর, কেউ বদমেজাজি, কেউ খিটখিটে স্বভাবের আবার অনেক ভালো স্বভাবের ও আছে। একজন খারাপ সফর সঙ্গি সকলের কষ্টের কারণ হতে পারে। কাজেই সবার করা চিন্তা করে অন্তত এতটুকু ভাবা যে, আমি যেন অন্য সাথীদের কোন কষ্টের কারন না হই। তাই সফরের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সবসময় হাঁসিমুখে থাকতে হবে। নিচের উদারতা পরিচয় দিন। সকল সাথীদের খুশী রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করুন। প্রত্যকে এমনটি ভাবলে সফর খুবই সাফল্য মন্ডিত হবে।

আবূ সিরমা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে লোক অন্য কারো ক্ষতিসাধন করে, আল্লাহ তা’আলা তা দিয়েই তার ক্ষতিসাধন করেন। যে লোক অন্যকে কষ্ট দেয়, আল্লাহ তা’আলা তাকে কষ্টের মধ্যে ফেলেন।(সুনানে তিরমিজ ১৯৪০, ইবনে মাজাহ ২৩৪২)

আবূ সিরমা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ যে ব্যক্তি অন্যের ক্ষতি করবে, আল্লাহ তার ক্ষতি করবেন এবং যে ব্যক্তি অন্যকে কষ্ট দিবে আল্লাহ তাকে কষ্ট দিবেন।(ইবনে মাজাহ ২৩৪২)

সাথীদের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে হবেঃ

সফরের সময় থাকা খাওয়া সঠিকভাবে সম্পন্ন হয় না, বিধায় অনেকের মেজাজ খারাপ থাকে। এই সময় যদি সকলেই ধৈর্যহীন হয়ে যায়, তবে পাপাচারে লিপ্ত হওয়া সম্ভাবনা থাকে। সবাই যদি সাথীদের প্রতি সহানুভূতিশীল থাকে তবে সফর সুন্দর হবে। এই জন্য সফরে বের হওয়ার পূর্বে কিছু বেশী টাকা এবং পর্যাপ্ত সফর সম্বল নিয়ে নেয়া উচিৎ। কারণ, হঠাৎ তার প্রয়োজন হতে পারে অথবা অবস্থার পরিবর্তন হতে পারে এবং নিজ প্রয়োজনে এবং মুসলিম ভাইদের প্রয়োজনে ব্যয় করা যায়। যদি সফর সঙ্গীদের সহানুভূতি দেখান তবে দেখবের তারাও আপনাকে সহানুভূতি দেখাবে। সফর সঙ্গীদের পক্ষ হতে আপনার সাথে কোন রকম দুর্ব্যবহার করা হয় বা আপনার মতের উল্টো কাজ হয়, তাহলে তাতে ধৈর্য ধারণ করা এবং ভাল পন্থায় তার সমাধান করার চেষ্টা করুন। এরফলে, আপনি তাদের মাঝে মান সম্মান নিয়ে চলতে পারেন এবং তাদের মন জয় করতে সক্ষম হবেন। এ সম্পর্কিত কয়েকটি হাদিস উল্লেখ করছি।

হজ্জরত আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা আমরা কোনো সফরে নবী (সা.)-এর সঙ্গে ছিলাম। এমন সময় জনৈক ব্যক্তি সওয়ারিতে আরোহণ করে আগমন করল। অতঃপর সে তার দৃষ্টি ডানে-বামে ফেরানো শুরু করল। তা দেখে রাসুল (সা.) বলেন, ‘যার নিকট অতিরিক্ত বাহন আছে, যার নেই তার জন্য যেন নিয়ে আসে, আর যার নিকট নিজের পাথেয়ের অতিরিক্ত রয়েছে, যার নেই তার জন্য যেন নিয়ে আসে।’ (সহিহ মুসলিম ১৭২৮)

নু‘মান ইবনু বাশীর (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ পারস্পরিক দয়া, ভালবাসা ও সহানুভূতি প্রদর্শনে তুমি মু’মিনদের একটি দেহের মত দেখবে। যখন শরীরের একটি অঙ্গ রোগে আক্রান্ত হয়, তখন শরীরের সকল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ রাত জাগে এবং জ্বরে অংশ নেয়। (সহিহ বুখারি ৬০১১)

জারীর ইবনু ‘আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে (সৃষ্টির প্রতি) দয়া করে না, (আল্লাহর পক্ষ থেকে) তার প্রতি দয়া করা হয় না। (সহিহ বুখারি ৬০১৩)

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদা হাসান ইবনু ‘আলীকে চুম্বন করেন। সে সময় তাঁর নিকট আকরা‘ ইবনু হাবিস তামীমী উপবিষ্ট ছিলেন। আকরা‘ ইবনু হাবিস বললেনঃ আমার দশটি পুত্র আছে, আমি তাদের কাউকেই কোন দিন চুম্বন দেইনি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর পানে তাকালেন, অতঃপর বললেনঃ যে দয়া করে না, সে দয়া পায় না। (সহিহ বুখারি ৫৯৯৭)

রাইরাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ প্রসঙ্গে বলেছেন, এবং (রাস্তার হক হলো পথ হারাকে) পথ দেখানো। (আবু দাউদ ৪৮১৬)

গীবত ও অযথা কথা থেকে জবান হিফাজত করাঃ

দীর্ঘ সফরে অনেক সময় যানবাহনে অসল সময় কাটাতে হয়। আর কখন কখন বাহনের অপেক্ষায় যাত্রা বিরত করতে হয়। এই সময় সফরের হক আদায় না করে, অনেকেই বেহুদা কথায় লিপ্ত হয়ে থাকে। যার ফলে যা করার ছিলনা তা করে, যা বলার ছিলনা তাই বলে। অর্থাৎ গীবতে লিপ্ত হয়। গীবত সম্পর্কে জ্ঞান কম থাকার কারনে সফরের অসল সময় গীবতেই কেটে যায়। তাই সফরে গীবত ও অযথা কথা থেকে জবান হিফাজত করতে হবে। গীবত বা অযথা কথা বলে বলে ইসলামি শরীয়তে যে কোন একটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করা যেতে পার। আর সফর সঙ্গীদের মধ্যে যদি কোন আলেম থাকে তবে তার নিকট থেকে জ্ঞান অর্জন করা চেষ্টা করি আর নিজে আলেম হলে অন্যদের সঠিক ইসলামি জ্ঞান দিতে চেষ্টা করি।

আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত; তিনি বলেন; আরবদের একে অন্যকে সফরের সময় সেবা (খেদমত) করত। আবূ বকর ও উমর (রাঃ)- এর সাথে এক ব্যক্তি ছিল যিনি তাদের খেদমত করত। তারা উভয়ে ঘুমিয়েছিল। অতঃপর তারা জাগ্রত হলেন। (কিন্তু খাদেম) তাদের জন্য খাবার প্রস্তুত করেনি (বরং সে ঘুমিয়েছিল) তাদের একজন অন্যকে বলছিল, এ (খাদেম) তোমাদের নবীর ঘুমের সাদৃশ্যতা অবলম্বন করেছে (অন্য এক রিওয়ায়াতে আছে, তোমাদের গৃহের ঘুমের সাথে সাদৃশ্যতা রেখেছে)। অতঃপর তারা তাকে (খাদেমকে) জাগিয়ে দিয়ে বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর নিকট গিয়ে তাঁকে বল, যে আবূ বাকার ও উমার (রাঃ) আপনাকে সালাম জানিয়েছেন এবং আপনার কাছে তরকারী (অর্থাৎ খাবার) চেয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, তাদের সালাম জানাবে এবং বলবে যে, তারা উভয়েই খাবার গ্রহণ করেছে। (এ কথা শুনে) তারা ঘাবড়িয়ে গেলেন এবং (উভয়েই) নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর নিকট এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা আপনার নিকট খাদেমকে খাবার চেয়ে পাঠিয়েছিলাম। আপনি বলেছেন যে, আমরা খাবার খেয়েছি। তো আমরা কী দিয়ে খাবার খেলাম? রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, তোমাদের ভাইয়ের গোশ্‌ত দিয়ে। আল্লাহর শপথ! আমি তার গোশ্‌ত তোমাদের নখের মধ্যে দেখছি। তারা [আবূ বাকার ও উমার (রাঃ)] বললেন, আমাদের ক্ষমা করুন। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, সে তোমাদের ক্ষমা করবে। (আস সহীহাহ-২৬০৮)

একাকী সফর না করাঃ

সফরকালীন সময়ে একাকী না গিয়ে তিনজন বা তার বেশি সফরসঙ্গী থাকা উত্তম। কেননা, একাকী সফর করতে সহিহ হাদিসে নিরুত্সাহিত করা হয়েছে। 

আমর ইবনু শুআইব (রহঃ) হতে পর্যায়ক্রমে তার পিতা ও দাদার সূত্রে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ একা ভ্রমণকারী এক শাইতান, দুইজন ভ্রমণকারী দুই শাইতান এবং তিনজন ভ্রমণকারী একটি জামা’আত। (সুনানে তিরমিজি : ১৬৭৪)।

‘আমর ইবনু শু‘আইব (রাঃ) থেকে পর্যায়ক্রমে তার পিতা ও তার দাদার সূত্রে বর্ণিত। তিনি (দাদা) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ একাকী সফরকারী হচ্ছে একটি শয়তান, আর একত্রে দু’ জন সফরকারী দু’টি শয়তান। তবে একত্রে তিনজন সফরকারীই হচ্ছে প্রকৃত কাফেলা। (আবু দাউদ ২৬০৭)

ইবনু ‘উমার (রাঃ) সূত্রে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যদি লোকেরা একা সফরে কী ক্ষতি আছে তা জানত, যা আমি জানি, তবে কোন আরোহী রাতে একাকী সফর করত না। (সহিহ বুখারি  ২৯৯৮ তাওহীদ)

সফর সংশ্লিষ্ট দোয়াগুলো যথাসময় পাঠ করাঃ

সফরের শুরু থেকে সফর শেষ করা পর্যান্ত বহু মাসনুন দোয়া সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমানিত। সফর শুরুর আগে এই সকল দোয়া মুখন্ত করা চেষ্টা করি। অতপর, যখন সফর শুরু হবে এই মাসনুন দোয়া যথাস্থানে যথাসময় পাঠ করা চেষ্টা করি। মাসনুন দোয়াগুলি অর্থ বুঝে পাঠ করলে আরো ভাল হয়। আমি কি করছি আর কি বলছি তা যদি নিজেই না যানি তাহলে ভারী অন্যায় হবে।

ক। বাড়ি থেকে বের হওয়ার দোয়াঃ

আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যখন কোনো ব্যক্তি তার ঘর থেকে বের হওয়ার সময় বলবেঃ

«بِسْمِ اللَّهِ، تَوَكَّلْتُ عَلَى اللَّهِ، وَلَاَ حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلاَّ بِاللَّهِ».

(বিসমিল্লাহি তাওয়াক্কালতু আলাল্লাহ, ওয়ালা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ)

অর্থঃ আল্লাহর নামে, আল্লাহর উপর ভরসা করে (বের হচ্ছি)। আল্লাহ ছাড়া কোন উপায় ও শক্তি নাই।

তখন তাকে বলা হয়, তুমি হেদায়াত প্রাপ্ত হয়েছো, রক্ষা পেয়েছো ও নিরাপত্তা লাভ করেছো। সুতরাং শয়তানরা তার থেকে দূর হয়ে যায় এবং অন্য এক শয়তান বলে, তুমি ঐ ব্যক্তিকে কি করতে পারবে যাকে পথ দেখানো হয়েছে, নিরাপত্তা দেয়া হয়েছে এবং রক্ষা করা হয়েছে। (সুনানে আবু দাউদ ৫০৯৫)

** উম্মু সালামাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, যখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘর হতে বাইরে রাওয়ানা হতেন তখন বলতেন,

 «اللّٰـهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ أَنْ أَضِلَّ، أَوْ أُضَلَّ، أَوْ أَزِلَّ، أَوْ أُزَلَّ، أَوْ أَظْلِمَ، أَوْ أُظْلَمَ، أَوْ أَجْهَلَ، أَوْ يُجْهَلَ عَلَيَّ».

 (আল্লাহুম্মা ইন্নী আঊযু বিকা আন আদ্বিল্লা, আও উদ্বাল্লা, আও আযিল্লা, আও উযাল্লা, আও আযলিমা, আও উযলামা, আও আজহালা, আও ইয়ুজহালা আলাইয়্যা)

অর্থঃ হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকট আশ্রয় চাই যেন নিজেকে বা অন্যকে পথভ্রষ্ট না করি, অথবা অন্যের দ্বারা পথভ্রষ্ট না হই; আমার নিজের বা অন্যের পদস্খলন না করি, অথবা আমায় যেন পদস্খলন করানো না হয়; আমি যেন নিজের বা অন্যের উপর যুলম না করি অথবা আমার প্রতি যুলম না করা হয়; আমি যেন নিজে মুর্খতা না করি, অথবা আমার উপর মূর্খতা করা না হয়। (সুনানে তিরমিজ ৩৪২৭)

খ। সফরে বের হলে যে দোয়া পড়তে হয়ঃ

আবুয যুবাইর (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। ‘আলী-আযদী (রাঃ) তাকে জানিয়েছেন, ইবনু ‘উমার তাকে শিক্ষা দিয়েছেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সফরে বের হওয়ার সময় উটের পিঠে সোজা হয়ে বসে তিনবার ‘আল্লাহু আকবার’ বলে এ আয়াত পড়তেনঃ

سُبْحَانَ الَّذِي سَخَّرَ لَنَا هَذَا، وَمَا كُنَّا لَهُ مُقْرِنِينَ، وَإِنَّا إِلَى رَبِّنَا لَمُنْقَلِبُونَ

অর্থঃ ‘‘মহান পবিত্র তিনি, যিনি একে আমাদের অনুগত বানিয়েছেন, তা না হলে একে বশ করতে ‘আমরা সক্ষম ছিলাম না। নিশ্চয়ই আমাদেরকে আমাদের রবের নিকট ফিরে যেতে হবে।’’[সূরা আয-যুখরুফঃ আয়াত ১৩-১৪] অতঃপর এ দু‘আ পাঠ করতেনঃ

اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ فِي سَفَرِنَا هَذَا الْبِرَّ وَالتَّقْوَى، وَمِنِ الْعَمَلِ مَا تَرْضَى، اللَّهُمَّ هَوِّنْ عَلَيْنَا سَفَرَنَا هَذَا، اللَّهُمَّ اطْوِ لَنَا الْبُعْدَ، اللَّهُمَّ أَنْتَ الصَّاحِبُ فِي السَّفَرِ، وَالْخَلِيفَةُ فِي الْأَهْلِ وَالْمَالِ

তিনি যখন ফিরে আসতেন, এ দু‘আই পাঠ করতেন, শুধু এটুকু বাড়িয়ে বলতেনঃ

 آيِبُونَ تَائِبُونَ عَابِدُونَ لِرَبِّنَا حَامِدُونَ

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সেনাবাহিনী কোনো উঁচু স্থানে উঠার সময় ‘আল্লাহু আকবার’ বলতেন এবং নীচে নামার সময় সুবহানাল্লাহ বলতেন। অতঃপর এভাবেই (শুকরিয়া) সালাতে নির্ধারণ হয়। (আবু দাউদ ২৫৯৯)

** আলী ইবনু রবী‘আহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি দেখলাম, ‘আলী (রাঃ)-এর কাছে আরোহণের একটি পশু আনা হলে তিনি এর পা-দানিতে পা রাখতেই বললেন, ‘বিসমিল্লাহ’ এবং এর পিঠে চড়ে সোজা হয়ে বসে বললেন, আল-হামদুলিল্লাহ।’’ অতঃপর তিনি এ আয়াত পড়লেন,‘‘মহান পবিত্র তিনি, যিনি একে আমাদের অনুগত বানিয়েছেন, তা না হলে একে বশ করতে ‘আমরা সক্ষম ছিলাম না। নিশ্চয়ই আমাদেরকে আমাদের রবের নিকট ফিরে যেতে হবে।’’[সূরা আয-যুখরুকঃ আয়াত ১৩-১৪] পুনরায় তিনি তিনবার ‘আলহামদু লিল্লাহ’ এবং তিনবার ‘আল্লাহু আকবার’ বললেন। অতঃপর বললেন, ‘‘(হে আল্লাহ!) আপনার পবিত্রতা ঘোষণা করছি, আমিই আমার উপর যুলুম করেছি, আপনি আমাকে ক্ষমা করুন, আপনি ছাড়া কেউই গুনাহ ক্ষমা করতে পারে না।’’ অতঃপর তিনি হেসে দিলেন।

তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, হে আমীরুল মু‘মিনীন! আপনি কেন হাসলেন? তিনি বললেন, আমি যেরূপ করলাম, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কেও এরূপ করতে দেখেছি। তিনি তখন হেসেছিলেন তখন আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি হাসলেন কেন? তিনি বললেনঃ নিশ্চয়ই তোমার প্রতিপালক তাঁর বান্দার উপর সন্তুষ্ট হন যখন সে বলেঃ ‘‘(হে আমার রব!) আপনি আমার গুনাহ ক্ষমা করুন।’’ আর বান্দা তো জানে যে, আমি (আল্লাহ) ছাড়া কেউই গুনাহ ক্ষমা করতে পারে না। (আবু দাউদ ২৬০২)

*** বাহন হোঁচট খেলে পড়বে,

রেখে (بِسْمِ الله) বিসমিল্লাহ (আল্লাহর নামে) পাঠ করবে। (আবু দাউদ ৪৯৮)

সফরের সময় উঁচু নিচু অতিক্রমকালে পাঠ করবেঃ

সফরের সময় উঁচু জায়গায় উঠার সময় তাকবীর পাঠ করবে এবং কোন নীচু জায়গায় অবতরণের সময় তাসবীহ পাঠ করবেন।

জাবির ইবনু ‘আবদুল্লাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা যখন কোন উঁচু স্থানে আরোহণ করতাম, তখন তাকবীর তাকবীর (اَللهُ أَكْبَرُ – আল্লাহু আকবার) ধ্বনি উচ্চারণ করতাম আর যখন কোন উপত্যকায় অবতরণ করতাম, সে সময় তাসবীহ (سُبْحَانَ اللهِ সুবহানাল্লাহ) বলতাম। (সহিহ বুখারি ২৯৯৩)

সফরে কোন স্থানে যাত্রা বিরতীতে পাঠ করবেঃ

খাওলা বিনতে হাকীম (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তোমাদের কেউ কোন গন্তব্যে পৌঁছে যদি এই দোয়া পড়েঃ ‘‘আউযু বিকালিমাতিল্লাহিত তাম্মাতি মিন শাররি মা খালাক’’

أَعُوْذُ بِكَلِمَاتِ اللَّهِ التَّامَّاتِ مِنْ شَرِّ مَا خَلَقَ

[আউযু বিকালিমাতিল্লাহিত্ তা-ম্মা-তি মিন শার্‌রি মা খলাক্বা]

অর্থঃ আমি আল্লাহ পাকের কল্যাণকর বাক্যাবলীর উসীলায় তিনি যা সৃষ্টি করেছেন তার অনিষ্ট থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।

তাহলে সে স্থান থেকে বিদায় হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত কোন কিছু তার ক্ষতি করতে পারবে না। (সহিহ মুসলিম ২৭০৮, সুনানে ইবনে মাজাহ ৩৫৪৭, তিরমিযী ৩৪৩৭)।

ঙ। ঘরে প্রবেশের দোয়াঃ

আবূ মালিক আল-আশ‘আরী (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যখন কেউ নিজ ঘরে প্রবেশ কররে তখন সে যেন বলে,

«بِسْمِ اللَّهِ وَلَجْنَا، وَبِسْمِ اللَّهِ خَرَجْنَا، وَعَلَى اللَّهِ رَبِّنَا تَوَكَّلْنَا»

(বিসমিল্লাহি ওয়ালাজনা, ওয়াবিস্‌মিল্লাহি খারাজনা, ওয়া আলাল্লাহি রাব্বিনা তাওয়াক্কালনা)

অর্থঃ আল্লাহ্‌র নামে আমরা প্রবেশ করলাম, আল্লাহ্‌র নামেই আমরা বের হলাম এবং আমাদের রব আল্লাহ্‌র উপরই আমরা ভরসা করলাম”। অতঃপর সে যেন তার পরিবারের লোকদের সালাম দেয়। (সুনানে আবু দাউদ ৫০৯৬)

হজ্জের সফরে জন্য বিশেষভাবে কিছু করণীয় কাজ

হজ্জের সফরে জন্য বিশেষভাবে কিছু করণীয় কাজ

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

নিয়ত করা পর প্রথম কাজ কার মাধ্যমে হজ্জ করবেনঃ

সাধারণত কারো উপর হজ্জ ফরজ হলে তিনি হজ্জে যাওয়া নিয়ত করেন। নিয়ত করা পর প্রথম কাজ হলো, আপনিভাবে হজ্জের গমন করে মক্কার নগরীতে পৌছাবেন। আপনি নিজে ইচ্ছা করেই হজ্জের যেতে পারবেন না। আপনাকে যে কোন হজ্জ এজেন্সির মাধ্যমে হজ্জে যেতে হবে। বাংলাদেশ থেকে হজ্জে যেতে হলে দুই ধরনের মাধ্যম আছে। এই দুটির যে কোন একটি মাধ্যমকে আপনি বেচে নিতে পারেন। এই দুটি মাধ্যম হলো, সরকারী ব্যবস্থাপনায় এবং প্রাইভেট হজ্জ-এজেন্সির।  আপনি এই ব্যাপারে যারা আগে হজ্জ করেছেন তাদের সাথে পরামর্শ করে সিন্ধান্ত নিন। এখানে আমি দুটি এজেন্সি সম্পর্কে একটু ধারনা দিলাম।

ক। সরকারী ব্যবস্থাপনায় হজ্জঃ

সরকারী ব্যবস্থাপনায় অল্প সংখ্যক লোক হজ্জে গমন করেন। এই ধরুন, মোট হজ্জ যাত্রীর মাত্র ৫% লোক সরকারি ব্যস্থাপনায় যায়। সরকারী ব্যবস্থাপনার আওতায় দুটি ক্যাটাগরি রয়েছে সবুজ ও নীল। এ দুটোর যে কোনো একটার আওতাভুক্ত হয়ে হজ্জের সফর সম্পন্ন করতে পারেন। সবুজ ক্যাটাগরির হাজিদের জন্য মক্কা-মদিনায় প্রায় আধা কিলোমিটার এবং নীল ক্যাটাগরির হাজিদের জন্য এক কিলোমিটার বা তার থেকেও বেশি দূরত্বে বাসা বরাদ্দ করা হয়। দুটি পদ্ধতিতেই প্রাক-নিবন্ধন করতে হবে। কেননা হজ্জে গমন করার ক্ষেত্রে পৃথিবীর সকল দেশের একটি নির্দিষ্ট কোটা আছে। কোন দেশ কত জন হাজি পাঠাতে পারবে সৌদি হজ্জ কর্তৃপক্ষ আগে থেকেই ঐ দেশেকে জানিয় দেয় এবং সেই কোটা অনুসারে ঐ দেশে ঠিক করে কারা কারা হজ্জে গমন করবে। বাংলাদের ইচ্ছা করলেই বেশী হাজি প্রেরণ করেত পারবেনা। কেনানা এই সফরে যারা মক্কা মদীনা থাকবেন তাদের থাকা, খাওয়া, টয়লেট, বাথরুমসহ সকল প্রকারের জরুরী সেবা প্রদান সাপেক্ষে লোক নেয়া হয়। ধারন ক্ষমতার বেশী লোক গমন করলে এই সকল জরুরী থেকে বঞ্চিত হবে। বর্তমান বাংলাদেশর যে পরিমান কোটা থাকে, তার থেকেও অনেক বেশী লোক হজ্জে গমন করতে চায়। কাজেই আমাদের দেশে যত লোক হজ্জে গমন করতে চায়, তাদের সবাইকে হজ্জে যেতে দেয়া হয় না। এই জন্য বাংলাদের হজ্জ মন্ত্রনালয় পক্ষে থেকে যারা হজ্জে যেতে চায় তাদের একটি প্রাক-নিবন্ধন  পদ্ধতি চালু করেছে। যারা হজ্জ যাবেন তাদের সবাইকে এই তালিকাভু্ক্ত হতে হবে। এই তালিকা থেকে সিরিয়াল অনুসারে হজ্জে পাঠান হয়।

সরকারি ব্যবস্থাপনায় হজে গমনেচ্ছুগণ ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার (ইউডিসি), জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, ইসলামিক ফাউন্ডেশন অফিস ও ঢাকা হজ্জ অফিস হতে প্রাক-নিবন্ধনের ডাটা এন্ট্রি সম্পন্ন করে ভাউচার গ্রহণ করতে হয় এবং ব্যাংকে টাকা পরিশোধের পর ব্যাংক থে‌কে সিরিয়াল নম্বরসহ প্রাক-নিবন্ধন সনদ পাওয়া যাবে।

আপনি ইচ্ছা করলেই নিবন্ধ করতে পারবে না। এই জন্য ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রনালয় বছরের একটি নির্দষ্ট সময় ঘোষনা করে যে আগামি এত তারিখ থেকে এত তারিখের মধ্যে এত সালে হজ্জের জন্য নিবন্ধ করেত হবে ঐ তারিখ মতই আপনাকে নিবন্ধ করতে হবে। যদি আপনার সিরিয়াল অনেক পরে আসে আর আপনি চলিত বছর হজ্জে গমন করতে না পারেন তবে আপনার সিরিয়াল নষ্ট হবে না আপনি পরের বছরেও এই সিরিয়াল অনুসারে আগে হজ্জ করার সুযোগ পাবেন।

আপনার সিরিয়াল আসলে ধর্ম-মন্ত্রণালয়ের বেঁধে দেয়া সময় ও নিয়ম অনুযায়ী টাকা জমা দিন। ধর্ম-মন্ত্রণালয় কর্তৃক সরবরাহকৃত ফরম পূরণ করে যে কোনো অনুমোদিত ব্যাংকে টাকা জমা দিয়ে প্রদত্ব রসিদ নিয়ে জেলা প্রশাসকের অফিসে রিপোর্ট করুন। টাকা জমা দেয়ার রসিদ ও অন্যান্য কাগজ পত্র রাখতে হবে যত্ন সহকারে ও তা দেখিয়ে অফিস থেকে বলে দেওয়া সময়ে উপস্থিত হয়ে বিমানের টিকিট ও পিলগ্রিম পাস সংগ্রহ করতে হবে হজ্জ ক্যাম্প থেকে। আপনার জমা দেয়া টাকা যে সব খাতে ব্যয় করা হয় তা হল নিম্নরূপঃ

১. বিমান ভাড়া। ২. এম্বারকেশন ফি। ৩. ভ্রমণ কর। ৪. ইনস্যুরেন্স ও সারচার্জ (ব্যাজ কার্ড, পুস্তিকা, কবজি-বেল্ট, আই,টি সার্ভিস, পিলগ্রিম পাস ইত্যাদি) ৬. মুয়াল্লিম – সৌদি আরবের হজ্জ কনট্রাক্টার ফি ৭. মক্কা ও মদিনা শরীফের বাড়ি ভাড়া ৮. সৌদি আরবে অবস্থানকালীন খাওয়া-দাওয়া ও কোরবানি খরচ যা হাজিদেরকে বাংলাদেশেই ফিরিয়ে দেয়া হয়।

সরকারী ব্যবস্থাপনায় হজ্জ করতে গেলে সুবিধা হলো, আপনার সকল দায়িত্ব হজ্জ বিষায়ক মন্ত্রনালয় বহন করে আপনি যে কেটাগোরিত টাকা জমা দেবেন আশা করা যায় সেই সুযোগ সুবিধাই পাবেন। বিগত বছরগুলোর আলোকে বলা যায়, সরকারী ব্যবস্থাপনায় হজ্জযাত্রী মক্কা মদীনায় মোটামোটি কাছাকাছি রাখে। অপর পক্ষে সৌদি আরবে অবস্থানকালীন খাওয়া-দাওয়া খরচ যা হাজিদেরকে বাংলাদেশেই ফিরিয়ে দেয়া হয় যাব ফলে খুব সহজে বাংলাদেশী হোটেল থেকে চাহিদামত খাবার খাওয়া যায়। যে পরিমান টাকা দেয় তা দিয়ে খাবার খেতে কোনই সমস্যা হয় না।

সরকারী ব্যবস্থাপনায় হজ্জ করতে গেলে অসুবিধা হলো, আপনি যদি একটু চালি না হন তবে বেশ ঝামালায় পড়তে হবে। কেননা অনেক সময় মুয়াল্লিম বা হজ্জের গাইড পাবেন না। তাই নিজের হজ্জের সকল কাজ নিজেকেই করতে হতে পারে। অনেক সময় থাকার রুমটিও নিজেকে খুজে নিতে হয়। যদিও সরকার আপনার জন্য মুয়াল্লিম বা হজ্জের গাইড রেখেছেন। খাবার যেহেতু বাইরে থেকে খেতে হয় তাই একটু বাড়তি কষ্ট করতে হয়। কেননা প্রাইভেট হজ্জ-এজেন্সির মধ্যমে গেলে ওরা আপনার খাবার রুমে পৌছে দেয়।  

খ। বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় হজ্জঃ 

বাংলাদেশে শতকরা ৯৫ ভাগ লোক বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় হজ্জে গমন করে। আমাদের দেশে ব্যবসা করার জন্য বিভিন্ন ব্যক্তি সরকার থেকে অনুমতি নিয়ে বিভিন্ন ট্রাভেল এজেন্সি মাধ্যমে মুসলিমদের হজ্জে পাঠিয়ে থাকে। এই সকল ট্রাভেল এজেন্সিগুলোকে সরকারই হজ্জে পাঠানোর লাইসেন্স প্রদান করে থাকে। যে সকল ট্রাভেল এজেন্সিদের এই লাইসেন্স আছে সেই সকল ট্রাভেল এজেন্সি হজ্জের জন্য লোক পাঠাতে পারেন। আর এই পদ্ধতিকেই বেসরকারি হজ্জ ব্যবস্থাপনা বলা হয়। আমরা অনেকেই দেখে থাকবো নিজ নিজ এলাকাই বা পার্শ্ববর্তী এলাকায় এমন অনেক লোক আছে যাদেরকে মোয়াল্লেম বলা হয়ে থাকে, যারা আপনাকে হজ্জে নিয়ে যাবার জন্য চেষ্টা করতে থাকে এরাই সাধারনত বেসরকারি ব্যবস্থাপনার মোয়াল্লেম। কারন সাধারনত সরকারি ব্যবস্থাপনার কোন মোয়াল্লেম এই কাজ করে থাকেন না। বেসরকারি হজ্জ ব্যবস্থাপনায় একটা সুবিধা হচ্ছে আপনি নিশ্চিত সহকারে একজন মোয়াল্লেম বা গাইড পাবেন। আর সেইটা আপনার পরিচিত মোয়াল্লেমটিই হোক বা আপনার কাফেলার অন্য কোন মোয়াল্লেমই হোক। এই ছাড়া দ্বিতীয় কোন সুবিধা পাবার আশা মোটেও করবেন না। কারন বেশি আশা করলে সেই আশা অনুযায়ি ভরসা না পাইলে বেশি কষ্ট পাবার সম্ভাবনা থাকে। আপনার থাকার জায়গা হবে দুই রকম। 

প্রথমতো, হয় আপনি মক্কাই যেই জায়গায় প্রথমে উঠবেন সেই জায়গায় শেষ পর্যন্ত থেকে যাবেন। এমন ক্ষেত্রে আপনার থাকার জায়গাটি হবে নিম্ন মানের। যা আপনার সাথে প্রতারনা করা হবে। কারন আপনার কাছে তারাতো টাকা কম নেয় নাই যে, এমন পরিবেশে রাখবে। তারা টাকা ঠিকই নিয়েছে শুধু মাত্র প্রফিট বেশি করার জন্য নিম্নমানের হোটেল বা বাসাতে রাখবে।

দ্বিতীয়তো, আপনি মক্কাই যে জায়গায় প্রথমে উঠবেন মদিনা থেকে আসার পর তা পরিবর্তন হবে। এই পদ্ধতিকে বলা হয় ফেতরা। এই ক্ষেত্রে আপনি প্রথম টার্মে হারাম শরিফের কাছে অবস্থান করলে দ্বিতীয় টার্মে আপনাকে দূরে নিয়ে চলে যাবে। এতটাই দুরে যে হারাম শরিফে এসে নামাজ পড়াটাই হয়তো আপনার হবে না; সহজ্জ কোন ব্যবস্থা না থাকাই। আর প্রথম দিকে নিম্ন পরিবেশে থাকলে পারের দিকে একটু ভাল হটেলে নিবে, অথবা প্রথম দিকে একটু ভাল হটেলে থাকলে পরের টার্মে নিম্ন মানের হটেলে নিবে।

খাবারের মান হবে নিম্ন মানের। আপনাকে যে খাবার দেওয়ার কথা সেই ধরনের খাবার আপনি পাবেন না। হাজীদের কি খাবার পরিবেশন করা হবে তার মেনু অনেক আগেই প্রস্তুত হয়ে থাকে যা আপনি হয়তো জানতেই পারবেন না আপনাদের মেনুতে কি কি খাবার আছে। কারন বেসরকারি মোয়াল্লেম গুলো আপনাকে এই ব্যপারে কিছুই জানাবেনা। বেসরকারি ব্যবস্থাপনার অসুবিধা, সহজ্জ ভাষাই বলতে গেলে বলতে হয় মোয়াল্লেমদের কথার সাথে কাজের কোন মিল নাই।

বেসরকার ব্যবস্থাপনায় হজ্জে যেতে তাদের সম্পর্কে জানুনঃ

আমাদের দেশের অধিকাংশ হজ্জ এজেন্সিগুলো তাদের দেয়া সুযোগ সুবিধার কথা ঠিকমত রাখেন না। কাজেই বেসরকারি হজ্জ এজোন্সির মাধ্যম হজ্জে গমন করতে চাইলে আপনানে ঐ হজ্জ এজোন্সি সম্পর্ক আগে ধারনা নিতে হবে। এই জন্য আপনার আত্মীয়-স্বজন বা বন্ধু-বান্ধব যারা আগে হজ্জে গমন করেছেন তাদের পরামর্শ নিবেন। মনে রাখবেন বেসরকারি হজ্জ এজোন্সির ও হাজিদের বিভন্ন ক্যাটাগরি আছে। আপনার শক্তি-সামর্থ্য অনুযায়ী ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন। যে সব এজেন্সির সুনাম, দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও সরকারের অনুমোদন রয়েছে সে গুলোর মধ্যে কোনো একটি তালাশ করে বের করুন। তবে নিম্মের বিষয়গুলো ভালো কর জেনেনিনঃ

ক। এজেন্সিকে কত টাকার দিতে হবেঃ

বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় হজ্জে যেতে চাইলে প্রথমে আপনি জেনে নিবেন, এজেন্সিকে কত টাকার দিতে হবে। তবে আপনি টাকা কম-বেশির ভিত্তিতে নয়, প্যাকেজের সুবিধাদি দেখে, শুনে, বুঝে চুক্তি করবেন। বিমানভাড়া, বাসাভাড়া, হজ্জেরর সময় মিনায় তাঁবুতে বা অন্য কোন স্থানে থাকা না–থাকা, কুরবানি, ফিতরা ইত্যাদি আগে থেকে জেনে নিতে হবে।

খ। কত দিনের প্যাকেজঃ

হজ্জে গমন করলে আপনাকে কতদিন কোথায় রাখবে, মক্কায় কত দিন, মদীনায় কত দিন, সৌদি আরবে অবস্থানের মেয়াদ কত দিন, এই সকল স্থান আপনাকে কি কি সুযোগ সুবিধা দিন প্রশ্ন করে যেনে নিবেন।


গ। মক্কা মদীনার বাসস্থানঃ

মক্কা-মদিনার যত দিন থাকবেন এই দিনগুলিতে আপনাকে কোন ধরনের বাসায় রাখবে? মসজিদে হারমা থেকে আপনাকে কত দুরে রাখা হবে? এই সকল বিষয় ষ্পষ্টভাবে জেনে নিবেন।  কারন অনেকে কাছে রাখার কথা বলে ঠিকই কিন্তু হজ্জে গমনের পর আর কথামত স্থানে রাখে না।

ঘ। খাবারঃ

অনেক হজ্জ এজোন্সি আপনাকে দৈনিক তিন বেলা খাবার দিবে না। সকালের নাস্তা অনেক হজ্জ এজোন্সি দেয় না। অনেক সময় হাজ্জিগণ ফরজ সালাত থেকে আসতে দেরী করে বিধায় সকলকে এক সাথে খাবার পৌছাতে ঝামেলা হয় বিধায হজ্জ এজোন্সি এই সিন্ধান্ত নেয়। কাজেই আপানি হজ্জ এজোন্সি জিজ্ঞাসা করুন যে, সৌদি আরবে পৌঁছে তিন বেলা খাবার দেওয়া হবে কি না? যদি না দেয় তবে খাবারের বিকল্প ব্যবস্থা কী? তা জানতে হবে। মিনায় বা আরাফাতের ময়দানে অনেক হজ্জ এজোন্সি খাবার সঠিকভাবে পৌছাতে পারে না। এই বিষয়গুলো জিজ্ঞাসা করে ক্লিয়ার করে নিবেন।

ঙ। কুরবানিঃ

বাংলাদেশে প্রায় শতভাগ হাজ্জিই তামাত্তু হজ্জ করে থাকন। তাই আমাদের সবার উপর কুরবানি করা ওয়াজিব হয় থাকে। প্রথম পছন্দ হলো, নিজে হাজির থেকে কুরবানী করা। কিন্তু অধিকাংশের পক্ষে সম্বব হয় না। দ্বিতীয় অপসন হলো, প্রতারণা এড়াতে ইসলামি উন্নয়ন ব্যাংক বা আইডিবির কুপন কিনে দেওয়া ভালো। কিন্তু অনেক ভাই মোয়াল্লেম এর মাধ্যমে কুরবানী প্রদান করে, প্রতারণার শিকার হয়। তাই বিষয়টি আগে পরিস্কার করে নিবেন যে, কুরবানির টাকা কি হজ্জের প্যাকের অন্তরভূক্ত ? নাকি কুরবানির টাকা নিজেকে দিতে হবে।?


চ। হজ্জের সময় ফিতরা করেঃ

সরকার ঘোষিত হজ্জ প্যাকেজের চেয়ে কম টাকায় হজ্জে গেলে প্রতারিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। অনেক হজ্জ এজোন্সি সরকার নির্ধারিত টাকার চেয়ে কম নেয়। কম টাকা নেয়ার প্রধান কারন তারা মক্কার কম টাকায় বাড়িভাড়া করে। হামার থেকে থাকার স্থান যত দুরে তার ভাড়াও কম। তাই অনেক হজ্জ এজোন্সি হাজিদের প্রথম দিকে মক্কা নিয়ে যায় এবং কাবার খুবই নিকটে রাখে। হজ্জের ১০/১২ দিন আগে মদীনা নিয়ে যায়। হজ্জের দিন ঘনিয়ে এলে, আবার মক্কার ফিরিয়ে নিয়ে আসে। হজ্জের সকল কার্যক্রম শেষ করার পর কাবা থেকে ৪০/৫০ মাইল দুর রাখে। এভাবে মক্কার থাকার স্থান একবার কাবার নিকটে, আবার একবার কাবার দুরে থাকে। এমন কি এই কাজটি তারা একাধিকবারও করে থাকে। এই স্থানান্তর করা কে ফিতরা বলে। কাজেই হজ্জ এজোন্সি সাথে কথা বলার সময় জেনেনিন আপনাকে ফিতরা করাবে কিনা। ফিতরা করালে আগে না পরে।

ছ। হজ্জের দিনগুলোঃ

হজ্জের দিনগুলো হল ৮ জিলহজ্জ থেকে ১৩ হজ্জ। এই ৬ দিন হাজ্জিগন মিনা, আরাফা ও মিজদালিফায় কাটায়। এই সময় হজ্জ এজোন্সিগগুলো ইচ্ছা থাকা সত্বেও আপনার চাহিদামত সুযোগ সুবিধা দিতে পারে না। টয়লেট, বাথরুমের থাকার স্থানের পাশাপাশী খাবারের ও সংকট থাকে কারন এই সকল স্থানে রান্না করার কোন সিস্টেম নাই। এই সময় অবিজ্ঞ হজ্জ এজোন্সি ছাড়া অনেকেই খাবার সঠিক সময় প্রদান করতে পারেনা। এ বিষয়টিও আপনি আলোচনায় অন্তরভুক্ত করে নিতে পারেন। কোন কারনে সমস্যা হলে আপনার সবর করা সহজ্জ হবে।

হজ্জ এজোন্সির নিবন্ধ আছে কিনা যাচাই করুনঃ

ইন্টার নেট সার্স দিলেই আপনি জানতে পারবেন হজ্জ এজোন্সির সরকারি নিবন্ধ আছে কিনা। সরকারি নিবন্ধ নাই এমন কোন হজ্জ এজোন্সি কে কখনও টাকা দিবেন না। খরচের হিসাব এবং কী-কী সুবিধা আপনি তাদের কাছ থেকে পাবেন, এ ব্যাপারে মৌখিক নয়, বরং লিখিত চুক্তি করুন। অতীত অভিজ্ঞতা থেকে বলা যায়, চুক্তি করেন আর যাই করেন না কেন, হাতেগোনা কিছু এজেন্সি ছাড়া বাকি সকলের কর্তৃক ঘোষিত সুযোগ সুবিধা থেকে আপনি খুব করুণভাবে বঞ্চিত হবেন।

ভাল মুয়াল্লিম আছে কিনা?

হজ্জের জন্য আমার নিকটি এই বিষয়টি উপরের প্রত্যকটি বিষয় থেকে গুরুত্বপূর্ণ। আমি হজ্জে গমনের পর থাকা খাওয়া একটু কষ্ট হলেও মেনে নেয়া যায় কিন্তু এত কষ্টের পরও যদি শুনতে পান হজ্জের অনেক আমলই সঠিকভাবে করা হয় নাই। যদি একজন সহিহ আকিদার আলেমের সাথে হজ্জ করতে পারেন তবে আপনার হজ্জটি মাবরুর হওয়ার সম্ভাবনা শতভাগ। অপর পক্ষে একজন বিদআতি মুয়াল্লিমের সাথে হজ্জ করলে আপনার আমলটি ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার সম্ভাবনাও শতভাগ। হজ্জ এজেন্সীর মালিক কেমন? এটি আপনাকে জানতে হবে। কেননা, তিনি তার মতাদর্শী আলেমকেই মুয়াল্লিম হিসাবে নিয়োগ বিবেন। কাজেই হজ্জ এজেন্সী পছন্দ করার ক্ষেত্র মালিকের আকিদা বিশ্বাস সম্পর্ক আগে ভালভাবে জেনে নিন। তিনি যদি সহিহ আকিদায বিশ্বাসি হন তবে তিনি সহিহ আকিদার মুয়াল্লিমই নিয়োগ দিবেন। আর সহিহ আকিদার মুয়াল্লিম মানে আপনার হজ্জে সঠিকভাবে সম্পন্না করা পথে। এর পাশাপাশি আপনার চেষ্টা থাকবে,  সহিহ আকিদার হক্কানি আলেম বা নেককার ও অভিজ্ঞ ব্যক্তির সফর-সঙ্গী হওয়া। এরফলে আপনার হজ্জ ও উমরা পালনসহ সহজ্জ হবে। বিশেষ করে ভুলভ্রান্তি থেকে বেঁচে-থাকা সম্ভব হবে বলে আশা করা যায়।

প্রাক নিবন্ধের পর কাজঃ

প্রাক নিবন্ধের করেছেন যার অর্থ হচ্ছে আপনি এখান হজ্জে যাওযার জন্য সম্পূর্ণভাবে প্রস্তত। এখন আর কোন কাজ আধাআধা করা যাবে। সকল প্রয়োজনীয় কার পাকাপাকি করে করতে হবে। কোন কাজে কোন প্রকার সিথিলতা প্রদর্শণ করা যাবে না। প্রাক নিবন্ধের পর নিম্মের কাজগুলো খুবই গুরুত্ব দিয়ে করেত হবে।

পাসপোর্ট তৈরি করাঃ

রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে আপনার পাসপোর্ট একটি গুরুত্বপূর্ন দলিলঃ। জাতীয় পরিচয়পত্রের মতো পাসপোর্টও প্রমাণ করে যে আপনি বাংলাদেশের নাগরিক। দেশে মধ্যে জাতীয় পরিচয় পত্রই যথেষ্ট কিন্তু বিদেশে পাসপোর্টে ছাড়া চলবে না। কাজেই হজ্জে যাইতে চাইলে আপনাকে অবশ্য পাসপোর্ট লাগবে। এটি হজ্জে যাওয়ার জন্য আপনার অপরিহার্য অনুষঙ্গ। আবেদন ফরম করতে নিম্মর ধাপের কাজগুলো করতে হবে।

ক. আবেদন ফরস সংগ্রহঃ

পাসপোর্ট করতে চাইলে প্রথমে আপনাকে আবেদন ফরস সংগ্রহ করতে হবে। পাসপোর্ট অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়, আঞ্চলিক কার্যালয়, বিভাগীয় কার্যালয় এবং জেলা কার্যালয় থেকে সংগ্রহ করা যায়। তাছাড়া ইন্টারনেট থেকেও আবেদন ফরম ডাউনলোড করে প্রিন্ট করা যায়।

খ. ব্যাংকে টাকা জমা দেয়াঃ

ফরম পূরণের আগেই টাকা জমা দিতে হবে কারণ অনলাইনে আবেদন ফরমে ঐ ব্যাংকের রিসিট নম্বর এবং ফি জমা দেয়ার তারিখ সংযুক্ত করতে হবে। ব্যাংকে পাসপোর্ট ফি জমা দেয়ার জন্য আপনাকে সশরীরে ব্যাংকে যেতে হবে। বাংলাদেশের পাসপোর্ট অফিস কর্তৃক নির্ধারিত ব্যাংকের শাখাতে আপনি পাসপোর্টের ফি জমা দিতে পারবেন। যেসব ব্যাংকে টাকা জমা দিতে পারবেন সেগুলো হলোঃ সোনালী ব্যাংক, ঢাকা ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া, প্রিমিয়ার ব্যাংক, ওয়ান ব্যাংক ও ট্রাস্ট ব্যাংক। রেগুলার পাসপোর্ট সাধারণত এক মাসের মধ্যে পাওয়া যায়। এর জন্য ফি একটু কম আর ইমার্জেন্সি বা আর্জেন্ট পাসপোর্ট পাওয়া যায় ৭/১০ দিনের মধ্যে। এর জন্য ফি প্রায় দ্বিগুন।

গ. ফরম পূরণঃ

আবেদন ফরস সংগ্রহ এবং ব্যাংকে টাকা জমা করার পর নিজে আথবা আপনার আত্মীয়-স্বজন বা বন্ধু-বান্ধবদের মাধ্যমে ফিলাপ করে নিবেন। এখন ঘরে বসেই অনলাইনে পাসপোর্টের আবেদন ফরম পূরণ করা যায়। তাই আর ফরমের জন্য লম্বা লাইনে দাঁড়ানোর প্রয়োজন হয় না আর দালালের খপ্পরে পরতে হয় না। তাই অনলাইনে আবেদন ফরম পূরণ করাই বুদ্ধিমানের কাজ। তবে মনে রাখবেন, আপনার অনলাইনে সাবমিট করা ফরমের তথ্য ১৫ দিন ডাটাবেজে সংরক্ষিত থাকবে। তাই অবশ্যই অনলাইনে ফরম পূরণের ১৫ দিনের মধ্যে তা পাসপোর্ট অফিসে জমা দিতে যেতে হবে।

ঘ. ফরম জমা দেয়ার পূর্ববর্তী কাজ

এবার আপনাকে পূরণকৃত ফরমটি পাসপোর্ট অফিসে জমা দিতে হবে। তার আগে ফরম গোছাতে হবে। এই জন্য প্রথমে আপনার পূরণ করা অংশ ছাড়াও কিছু স্থানে আপনার স্বাক্ষর দিতে বলা আছে সেখানে আপনার স্বাক্ষর দিন এবং ফরমের সাথে জমা দানের জন্য নিম্মর সকল কাগজপত্র রেডি করতে হবে।

১. সত্যায়িত চার কপি রঙিন পাসপোর্ট সাইজ ছবি (৫৫×৪৫ মি.মি.)।  ছবি অবশ্যই সদ্য তোলা হতে হবে এবং সাদা পোশাক, টুপি ও সানগ্লাস পরে ছবি তোলা যাবে না।

২. জাতীয় পরিচয়পত্র অথবা জন্ম সনদপত্রের সত্যায়িত ফটোকপি লাগবে।

৩. চেয়ারম্যান/ ওয়ার্ড কমিশনার প্রদত্ত সনদ/ ভোটার আইডি কার্ড (জাতীয় পরিচয়পত্রের বিকল্পস্বরূপ) এবং বিদ্যুৎ/গ্যাস/পানির বিল/ বাড়ির দলিলের ফটোকপি ইত্যাদি।

৪. বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীর ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান প্রদত্ত প্রত্যয়নপত্র/ পরিচয়পত্র।

৫. ছাত্র/ছাত্রীদের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান প্রদত্ত প্রত্যয়ন পত্র/ পরিচয়পত্র দাখিল করতে হবে।

৬. অফিসিয়াল পাসপোর্টের ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক জিও (GO)/ এনওসি(NOC) দাখিল করতে হবে।

৭. ব্যাংকের টাকা জমা দেয়ার রশিদটি

ঙ. ফরম জমাদান

ফরম জমা দেয়ার নির্ধারিত দিন পাসপোর্ট অফিসে খুব সকাল সকাল যাওয়াই উত্তম কারণ অনেক ভীড় হয়ে থাকে। সরাসরি আপনার ফরম সাথে নিয়ে উপস্থিত সেনা সদস্যকে জানান আজ আপনার ছবি তোলার দিন নির্ধারিত আছে। তিনি আপনাকে দেখিয়ে দিবে কোথায় ফরম সহ আপনাকে যেতে হবে। অবশ্যই সাদা পোশাক পরবেন না, ফরমাল পোশাক পরিধান করে যাবেন। সেদিন আপনার ছবি তোলা, আঙ্গুলের ছাপ বা ফিঙ্গারপ্রিন্ট নেয়া ইত্যাদি কাজ করা হবে। তার মধ্যে একটি হচ্ছে পুলিশ ভেরিফিকেশন। যদি আপনার স্থায়ী আর বর্তমান ঠিকানা আলাদা হয়, তবে দুই জায়গাতেই পুলিশ ভেরিফিকেশান হয়ে থাকে।

চ. পাসপোর্ট সংগ্রহঃ

প্রোসেসিং চলার মাঝেই আপনার কাজ হয়ে গেলে মোবাইলে একটি মেসেজ আসবে বাংলাদেশ পাসপোর্ট অফিস থেকে। এটি আপনার পাসপোর্ট বুঝে নেয়ার তারিখ। আপনি নির্ধারিত সময়ে গিয়ে পাসপোর্টটি বুঝে নিয়ে আসুন। পাসপোর্ট সংগ্রহের পর আপনার পাসপোর্ট ভেরিফাইড হয়েছে কি না অন লাইলে যাচাই করুন।

আর্থিক প্রস্ততিঃ

ইবাদতের কবুলের প্রথম ও প্রধান শর্ত হলো, হালাল পন্থায় উপার্জন। সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমানিত যে, হারাম উপর্জনের অর্থে হজ্জ করতে গেলে তা আল্লাহর কাছে কবুল করবেন না। হারাম উপার্চজিত টাকায় হজ্জে গিয়ে ‘লাববাইক’ বললে আল্লাহ তার লাববাইক প্রত্যাখ্যান করেবেন।

আবূ হুরাইরাহ্‌ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, হে লোক সকল! আল্লাহ তা’আলা পবিত্র। তিনি পবিত্র জিনিস ব্যতীত কিছু ক্ববূল করেন না। আল্লাহ তাঁর রাসূলদেরকে যেসব বিষয়ের হুকুম দিয়েছেন, মু’মিনদেরকেও সেসব বিষয়ের হুকুম দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, “হে রাসূলগণ! তোমরা পবিত্র বস্তু হতে আহার কর এবং সৎকাজ কর। তোমরা যা কর সে সম্বন্ধে আমি সবিশেষ অবগত”। (সূরা মুমিনূন-৫১)। তিনি আরো বলেন, “হে মুমিনগণ! তোমাদেরকে আমি যে রিযিক্ব দিয়েছি তা হতে পবিত্র বস্তু আহার কর”।(সূরা বাক্বারা-১৭২)। বর্ণনাকারী বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক ব্যক্তির কথা উল্লেখ করলেন, দীর্ঘ সফরের ক্লান্তিতে যার মাথার চুল বিক্ষিপ্ত, অবিন্যস্ত এবং সারা শরীর ধূলি মলিন। সে আসমানের দিকে হাত দরায করে বলে, হে আমার প্রভু! হে আমার প্রতিপালক! অথচ তার খাদ্য ও পানীয় হারাম, তার পোশাক হারাম, তার জীবন জীবিকাও হারাম। এমতাবস্থায় তার দু’আ কিভাবে ক্ববূল হতে পারে। (তিরমিজি ২৯৮৯)

এই কারনে হজ্জে গমন করার নিয়ত করেছেন তো রিজকের প্রতি লক্ষ রাখুন। হালাল রুজি-রোজগারের মাধ্যমে নিজের ও পরিজনের প্রয়োজন মেটানো ও সম্পূর্ণ হালাল রিজিক-সম্পদ থেকে পাই-পাই করে একত্রিত করা। যদি হালাল রিজিক উপার্জন করে হজে যাওয়ার মতো টাকা জোগাড় করতে না পারেন তবে আপনার ওপর হজ্জ ফরজ হবে না। হজে আপনাকে যেতেই হবে, কথা এ রকম নয়। বরং পরিবারের জরুরি প্রয়োজন মিটিয়ে হজ্জে যাওয়ার খরচা হাতে আসলে তবেই কেবল হজ্জ ফরজ হয়। তাই কখনো হারাম পয়সায় হজ্জ করার পরিকল্পনা করবেন না। যদি এমন হয় যে আপনার সমগ্র সম্পদই হারাম, তাহলে আপনি তাওবা করুন। হারাম পথ বর্জন করে হালাল পথে সম্পদ উপার্জন শুরু করুন। আর কোনো দিন হারাম পথে যাবেন না বলে প্রতিজ্ঞা করুন। এক পর্যায়ে যখন প্রয়োজনীয় হালাল পয়সা জোগাড় হবে কেবল তখনই হজ্জ করার নিয়ত করুন।

হালাল পন্থায় উপার্জিত অর্থ দ্বারাই হজ্জে গমনের জন্য আপনি নিবন্ধ করবেন। আপনার কষ্টে অর্জিত হালাল টাকা সব সময় আপনার হাতে রাখতে হবে এবং হজ্জ এজেন্সীর চুক্তি মাফিক পরিশোধ করুন। যদি মনে করে থাকেন, হজ্জের দেরী আছে কাজেই টাকাটা একটু খাটিয়ে রাখি তা হলে আপনার প্রয়োজন টাকা নাও পেতে পারেন। হজ্জের টাকার গচ্ছিত থাকলে কোন প্রকার চিস্তা থাকবেনা। ব্যবসায় খাটালে বা ধার দিলে হজ্জের সময়ের দিকে খেয়াল রাখুন। অনেক সময় হজ্জ এজেন্সী এক সাথে টাকা নেয়। তাই আপনি টাকাগুলো গচ্ছিত না রাখলে পেরেশানিতে পড়তে পারেন। আর যখন হজ্জ এজেন্সীকে টাকা দিবেন তখন পাকা রসিদ ব্যতীত টাকার দিবেন না। কেবল বিশ্বাসের উপর টাকা দিয়ে এর আগে অনেক হজ্জযাত্রী প্রতারিত হয়েছেন।

হজ্জ এজেন্সির টাকা পরিশোধের পরও আপনার নিকট অতিরিক্ত ৩০/৪০ হাজার রাখতে হবে। সমর্থ থাকলে আরও বেশী টাকা সঙ্গে নিয়ে যাবেন। হজ্জের সফরের সময় এই টাকার অর্ধেটা রিয়াল এর মাধ্যমে পরিবর্তন করে নিবেন। প্রয়োজনে মক্কা ও মদীনাতেও টাকা পরিবর্তন করে রিয়াল করা যায়। এই টাকার আপনি আপনার প্রয়োজনের সময় ব্যয় করতে পারবেন। যেমন, কোনো ভুলের কারণে ক্ষতিপূরণ হিসেবে দম ওয়াজিব হয়ে গেলে হাদি কিনতে টাকা লাগবে, সহযাত্রী হাজিদের আপ্যায়ন করতে টাকার লাগবে, কোন অভাবী হাজিদেরকে সাহায্য করতে টাকা লাগবে, দেশে কারো জন্য যদি কিছু হাদিয়া তোহপা কিনতে টাকার প্রয়োজন হবে। কোন কারনে ক্ষুধা-পিপাসা পেলে কার্পণ্য না করে প্রয়োজনীয় খাবার গ্রহণ করতেও টাকা লাগবে।

হজ্জ সম্পর্কিত জ্ঞান অর্জনঃ

হজ্জ মহান আল্লাহ নির্দেশিত একটি ফরজ ইবাদাত। আল্লাহ প্রদত্ত প্রতিটি ইবাতেরই সুনির্দিষ্ট কিছু নিয়ম পদ্ধতি থাকে। এই নিয়ম পদ্ধতিগুলিও মহান আল্লাহ প্রদত্ত। আল্লাহ প্রদত্ত ও রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দেখান পদ্ধতিতেই হজ্জের আমল করতে হয়। এই সুনির্দিষ্ট নিয়ম পদ্ধতি বাহিরে কোন আমল করলে হজ্জ হবে না। বরং মনগড়া নতুন ইবাতদের মধ্য বিদআদের সম্পৃক্ততা থাকে বিধায় রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকল মনগড় আমল প্রত্যাখাত করতে বলেছেন। কাজেই হজ্জে গমনের পূর্বে আপনাকে হজ্জ সম্পর্কিত জ্ঞান অর্জন করতে হবে। তিনটি পদ্ধতিতে জ্ঞান অর্জন করতে পারেন।

ক। অন্যদের জিজ্ঞাসা করেঃ

কোন বিষয় নিজে না জানলে অন্যকে জিজ্ঞাসা করে জানার মধ্যে কোন লজ্জা নাই। ইসলমি শরীয়তের ক্ষেত্র এই কাজটি ফরজ। অর্থাৎ কোন আমল সম্পর্কে জ্ঞান না থাকলে সেই বিষয় জ্ঞান অর্জন করা ফরজ। মহান আল্লাহ বলেন,

** فَاسْأَلُواْ أَهْلَ الذِّكْرِ إِن كُنتُمْ لاَ تَعْلَمُونَ

অর্থঃ অতএব জ্ঞানীদেরকে জিজ্ঞেস কর, যদি তোমাদের জানা না থাকে। (সুরা নাহল ১৬:৪৩)

যে সকল মুসলিমভাই আগে হজ্জ করেছেন তাদের নিকট থেকে বাস্তব জ্ঞান অর্জন করা যায়। তারা হজ্জে গমনের সময় কি কি সমস্যায় পতিত হয়েছেন। তাদের থাকা খাওয়া সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা যায়। তারাই বলতে পারবেন, কি ভাবে ইবাদাত করলে হজ্জের মৌসুমটি কাজে লাগান যাবে। মক্কা, মদীনা, মিনা, আরাফা ও মুজদালিফায় কি কি আমল, কখন কিভাবে আদায় করা যায়। কোন কাজটি হজ্জের জন্য ফরজ, কোন কাজটি হজ্জের জন্য ওয়াজিব, কোন কাজটি হজ্জের সুন্নাহ এই সকল বিষয় তাদের নিকট থেকে হজ্জে গমনের আগেই জেনে নিতে হবে। এমনকি কোন কাজটি করলে হজ্জ বাতিল হয়ে যাবে বা কোন কাজটি করলে কাফ্ফারা হিসাবে দম দিতে হবে। এই সকল বিষয় হজ্জে অভিজ্ঞ মুসলিম ভাইদের নিকট থেকে শিখতে হবে। তাছাড়া নিজ মহল্লাহ সমজিদের ইমাম যদি শিক্ষতি আলেম হয় তবে তার নিকটও প্রশ্ন করে হজ্জের বিভন্ন মাসয়ালা মাসায়েল শিখে নেয়া যায়।

খ। সরাসরি হজ্জ সংক্রান্ত বই পড়েঃ

যারা মোটামুটি শিক্ষিত তাদের জন্য এই কাজটি খুবই সহজ্জ। কেননা বর্তমানে হজ্জের উপর বহু গ্রন্থ লেখা হয়েছে। যে কোন বইয়ের দোকানে গেলেই ইচ্ছামত ভালো ভালো আলেমদের গ্রন্থ ক্রয় করে পড়া যায়। তবে গ্রন্থ ক্রয়ের আগে একটু খোজ খবর নিতে হবে। বাজারে ফাজায়েলে হজ্জের মত সহিহ, জাল ও যঈফ মিশ্রিত গ্রন্থও আছে। যাদের এ্যান্ডোয়েড মোবাইল আছে তারা একটু খোজখবর নিয়ে সঠিক হজ্জ সংক্রান্ত এ্যাপ ডাউনলোড করতে পারেন। আবার বিভিন্ন ওয়েব সাইডে বহু বিশুদ্ধ হজ্জ সংক্রান্ত গ্রন্থ আছে।  এই সকল বই ডাউনলোড করেও পড়তে পারেন। মোট কথা হজ্জের প্রাক নিবন্ধ করে আর বসে থাকবেন না। সারাদিন কাজের ফাঁকে ফাঁকে হজ্জ সংক্রান্ত বই পড়েতে থাকবেন। দেখবেন কয়েক মাসের মধ্যেই আপনি হজ্জের প্রায় সকল নিয়ম কানুন আয়ত্য করতে পেরেছেন।

মন্তব্যঃ হজ্জের উপর অনেক প্রচলিত বই আছে যা গতানুগাতিভাবে লেখা। এই সকল বই না পড়াই ভালো। বই পড়ার আগে বাচাই করুন কোন কোন আলেমের লেখা বই বড়বেন। যে সকল বইয়ে কুরআন সু্ন্নাহ দলিল প্রমানসহ লিখেছেন, পড়ার ক্ষেত্রে তাদের বই অগ্রাধিকার দিবেন। 

গ। হজ্জ প্রশিক্ষনে অংশ গ্রহন করেঃ

বর্তমানে অনেক বিজ্ঞ আলেম মহান আল্লাহকে খুসি করার জন্য হজ্জ প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা করছেন। তারা ৩/৭ দিন ব্যাপি প্রশিক্ষন দিয়ে থাকেন। অনকে আবার প্রতি শুক্রবার প্রশিক্ষন দিয়ে থাকেন। তারা হজ্জের কার্যক্রম হাতে কলমে শিক্ষা দিয়ে থাকেন। এই সকল প্রশিক্ষনে অংশগ্রহন করলে আশা করা যায় হজ্জ সম্পর্কে ভাল একটি আইডিয়া হবে যাবে। অনেক সময় স্থানীয় মসজিদের ইমামগনও নিজ উদ্দেগ্যে হজ্জযাত্রীদের জন্য প্রশিক্ষনের আয়োজন করে থাকে। এই সকল প্রশিক্ষন অংশ গ্রহন করে হজ্জ সম্পর্কিত জ্ঞান অর্জন করা উচিত।

ইহাছাড়া, সরকারি ব্যবস্থাপনায় হজ্জযাত্রীদের জন্য ইসলামিক ফাউন্ডেশনের আঞ্চলিক কার্যালয়সমূহে সুবিধা মত সময়ে প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়। দ্বিতীয় পর্যায়ে হজ্জ যাত্রার ৩ দিন পূর্বে হজ্জ ক্যাম্পে অবস্থানের সময় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। বেসরকারি হজ্জ এজেন্সিগুলোর কোনো-কোনোটা ব্যক্তিগত উদ্যোগে সৌদি আরব গমনের পূর্বেই একদিন ব্যাপী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে থাকে। এসব প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে মনোযোগের সাথে অংশগ্রহণ করা উচিৎ।

স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাঃ

হজ্জের মৌসুমে প্রতিটি জেলায় সিভিল সার্জনের নেতৃত্বে মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়। সিটি কর্পোরেশন এলাকাতেও বিশেষ বিশেষ হাসপালকে এই বোর্ড গঠনের দায়িত্ব দিয়ে থাকেন। এই মেডিকেল বোর্ডের মাধ্যমেই সরকার বিনামূল্যে স্বাস্থ্য পরীক্ষার ব্যবস্থা করে থাকেন। স্বাস্থ্য পরীক্ষার পাশাপাশি এই বোর্ড কর্তৃক মেনিনজাইটিস প্রতিরোধক টিকা প্রদান করে থাকেন। এই টিক নেয়া প্রত্যেক হজ্জযাত্রীর জন্য বাধ্যতামূলক। কেননা এই টিকা ছাড়া মেডিকেল সার্টিফিকেটের প্রদান করা হয় না। স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও টিকা নিয়ে এ বোর্ড থেকে আপনাকে মেডিকেল সার্টিফিকেট সংগ্রহ করতে হবে। জেলা পর্যায়ে এ কাজটি সম্পূর্ণ করা সম্ভব না হলে পরবর্তীতে ঢাকায় হজ্জ ক্যাম্পে এসে সম্পূর্ণ করবেন। এই মেডিকেল সার্টিফিকেট ব্যতীত হজ্জে যাওয়া সম্ভব হবে না।

পুলিশের ছাড়পত্রঃ

সরকারী ব্যবস্থাপনার হোক আর বেসরকারী ব্যবস্থাপনায় কোন সকল প্রকারের হাজিদের জন্য পুলিশের ছাড়পত্র লাগবে। পুলিশ ছাড়পত্র না পেলে আপনাকে ইমিগ্রেশন পুলিশ দেশ ত্যাগ করতে দিবে না। কেননা, বিচাধীন কোন  আসামিকে হজ্জের জন্য ছাড়পত্র প্রদান করা হয় না। এই লক্ষে হজ্জ কর্তৃপক্ষ জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের নিকট ছাড়পত্রের জন্য হজ্জযাত্রীদের তালিকা প্রেরণ করেন। পুলিশ কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় কার্যক্রম সেরে হজ্জ কর্তৃপক্ষকে ছাড়পত্র সরবরাহের ব্যবস্থা গ্রহন করে থাকেন।

হজ্জযাত্রা করার পূর্বে করণীয়

হজ্জ ক্যাম্পে আসাঃ

সরকারী ব্যবস্থাপনায় হজ্জ গমনের ক্ষেত্রে হজ্জ অফিস বা যথাযথ কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করে আপনার ফ্লাইট সিডিউল জেনে নিন। কবে কখন হজ্জ ক্যাম্পে আসতে হবে জেনে সেভাবে নিজেকে প্রস্তত রাখু্ন। বেসরকারী ব্যবস্থাপনায় হজ্জ গমনের ক্ষেত্রে একটু সহজ্জ। আপনি যে লোকের মাধ্যমে হজ্জের যাবতিয় কার্যক্রম সম্পন্ন করেছেন তার সাথে সার্বক্ষনিক যোগাযোগ রাখবেন। তিনি যে দিন যেভাবে আপনাকে হজ্জ ক্যাম্প আসতে বলবেন ঠিক সেভাবেই আসবেন।

দেনা পাওনা পরিশোধ করাঃ

মহান আল্লাহই জানেন সফর থেকে ফিরে আসতে পারব কিনা। এই জন্য সফরের আগে সকল প্রকারের দেয়া পাওনা পরিশোধ করে দেয়া। পাওনা পরিশোধের পর যদি সফরের খরচ চালানোর মত টাকা পয়সা না থাকে তবে তার উপর হজ্জ ফরজ নয়। কাজেই হজ্জে যাওয়ার আগেই আপনাকে পাওনা পরিশোধ করে দিতে হবে।  তবে আপনি যদি বড়ো ব্যবসায়ী হন, ঋণ করা যার নিত্যদিনের অভ্যাস বা প্রয়োজন, তাহলে আপনার গোটা ঋণের ব্যাপারে একটা আলাদা অসিয়ত নামা তৈরি করুন। আপনার ওয়ারিশ বা উত্তরাধিকার যারা হবেন তাদেরকে এ বিষয়ে দায়িত্ব অর্পণ করে যান।

আবূ উমামা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে আমি তাঁর বিদায় হাজ্জের বক্তৃতায় বলতে শুনেছিঃ ধার করা বস্তু ফেরত দিতে হবে, যামিনদার পাওনা পরিশোধকরার দায় বহন করবে এবং ঋণ পরিশোধ করতে হবে। (সুনানে তিরমিজ ১২৬৫, ইবনু মাজাহ ২৩৯৮)

আবূ হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ ঋণ পরিশোধ করার ক্ষেত্রে সক্ষম ব্যক্তির টালবাহানা করা অন্যায়। তোমাদের কারো পাওনা পরিশোধকরার জন্য ঋণগ্রস্থ ব্যক্তি কোন সক্ষম ব্যক্তির উপর দায়িত্ব দিলে তা অনুমোদন করা উচিত।(সুনানে তিরমিজ ১২৬৫, ইবনু মাজাহ ২৪০৩)

মন্তব্যঃ হজ্জের সফরের সব কিছু করা হয়েছে, এখন আর হজ্জের সফর বাতিল করা সম্বব নয়। আবার পাওনা পরিশোধের মত সম্পদও নেই। এই ক্ষেত্রে হজ্জে যাওয়ার আগে দেনা-পাওনা বিষয়ে একটি অসিয়তনামা লিখে যেতে হবে এবং উক্ত অসিয়তনামায় একজনকে সাক্ষী হিসেবে রাখতে হবে।

আমানত থাকলে তা পৌছে দিতে হবেঃ

আপনার কাছে কেউ কোনো জিনিস আমানত রেখে থাকলে তা মালিকের কাছে পৌঁছিয়ে দিতে হবে। যে কোন কারনে আপনার সফর দেরী হতে পারে, সফরে মারা যেতে পারেন তাই আমানতকারীদের সকল প্রকার আমানাত বুঝিতে দিতে হবে।

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কেউ তোমার কাছে আমানাত রাখলে তা তাকে ফেরত দাও। যে ব্যক্তি তোমার সাথে খিয়ানাত করেছে তুমি তার সাথে খিয়ানাত করো না। (আবু দাউদ ৩৫৩৫, তিরমিজি ১২৬৪)

আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, মুনাফিকের আলামত তিনটি, কথা বলতে গেলে মিথ্যা বলে, আমানত রাখলে খিয়ানত করে, আর ওয়াদা করলে তা ভঙ্গ করে। (সহিহ বুখারি ২৬৮২)

দ্বীন ও দুনিয়ার সম্পর্কে অসিয়াত করাঃ

হজ্জে যাওয়ার আগে দ্বীন ও দুনিয়ার সম্পর্কে অসিয়াত করে সফরে যাওয়া একটি মুস্তাহাব আমল। আপনার অনুপস্থিতে আপনার সম্পদ, ব্যবসা, জমিজমা, টাকা পয়সা কিভাবে খরচ করবে তার জন্য আপনার ছেলে, মেয়ে এবং অধিনাস্ত কর্মচারীদের ভালো করে উপদেশ দিয়ে বুঝিয়ে যায়। শুধু দুনিয়ার ব্যাপারে নয় দ্বীন সম্পর্কেও ছেলে-সন্তান, পরিবার পরিজনকে তাকওয়া পরহেজগারির ব্যাপারে বুঝান এবং তাদের মেনে চলতে অসিয়ত করুন। তারা যেন আপনার অনুপস্থিতিতে আরো বেশি একাগ্রতা নিয়ে দ্বীন-ধর্ম মেনে চলতে পারে এবং কোনো প্রকার পাপ কর্মের ধারে কাছেও না যায়। খারাপ লোকদের সাথে না মিলামিসা না করে। সালাত আদায়ের ব্যাপারে সতেষ্ট থাকে।

সাবার কাছ থেকে বিদায় নিতে হবেঃ

হজ্জে সফরের আগে পাড়া-প্রতিবেশী, বন্ধু-বান্ধব, পরিবার-পরিজন, আলেম-ওলামা ও আত্মীয় স্বজনদের কাছ থেকে বলে-কয়ে বিদায় নেয়া মুস্তাহাব। যাদের কাছ থেকে বিদায় নিবে তাদের নিকট সফর আরাম দায়ক হওয়ার জন্য দোয়া চাবেন। তাদেরও উচিত আপনার সফরের সাফাল্য কামনা করে দোয়া করা।

আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বিদায় দিয়ে বলেন, আমি তোমাকে আল্লাহর আমানতে সোপর্দ করলাম, যাঁর নিকট সোপর্দকৃত জিনিস ধ্বংস হয় না। (ইবনে মাজাহ ২৮২৫)

প্রয়োজনীয় কাজগপত্র একত্র করাঃ

যে সকল কাগজপত্র এত দিন আপনি অনেক কষ্ট বা শ্রম করে সংগ্রহ কবছেন হজ্জে গমনের পূর্বে এই সকল প্রয়োজনীয় কাজগপত্র একত্র করে একটি ছোট ব্যাগে রাখুন। কমপক্ষে নিম্মের কাগজপত্রগুলি ব্যাগে করে সবসময় সঙ্গে রাখাবেন।

ক। আপনার পাসপোর্ট

খ। মেডিকের সার্টিফিকেট

গ। বিমানের টিকেট (যদি পেয়ে থাকেন)

ঘ। কিছু সৌদি মুদ্রা/রিয়াল (সাথে বাংলাদেশী টাকা)

ঙ। টাকা জমা দানের রশীদ 

ব্যক্তিগত জিনিসপত্রঃ

সফরের সময় আপনার ব্যক্তিগত প্রয়োজনে অনেক কিছু নিতে হবে। আপনি প্রতিদিন যে সকল জিনিসপত্র ব্যবহার করেন তা আপনাকে সঙ্গে করে নিত হবে। একজন মানুষের অনেক কিছুই লাগে। আপনার প্রয়োজনি সবকিছুই আপনি নিতে পারবেনা। তবে যা না হলে আপনার চলতে খুবই কষ্ট হবে তা কিন্তু নিতেই হবে। এই হিসেবে নিম্ম লিখিত ব্যক্তিগত জিনিসপত্র আপনার সাথে নিতে হবে।

১. কাগজপত্রের ব্যাগ। (পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, টিকিট, ডকুমেন্ট ইত্যাদি)

২. পুরুষের জন্য ইহরামের কাপড় (কমপক্ষে ২ সেট)

৩. নারীদের জন্য ইহরামের কাপড় নাই তবে ঢিলেঢালা সিলাই যুক্ত ফরমাল পোশাক (৪ সেট)

৪. কমপক্ষে ০২ জোড়া ফিতাওয়ালা নরমাল স্যান্ডেল

৫. গামছা/তোয়ালে, লুঙ্গী, গেঞ্জী, পায়জামা, পাঞ্জাবী, সার্ট ইত্যাদি নিতে হবে (কমপক্ষে ২ সেট)

৬. সাবান, টুথপেস্ট, ব্রাশ, মিশওয়াক, নেইল কাটার, সুঁই-সুতা, নোটবুক, কলম ইত্যাদি নিতে হবে

৭. থালা, বাটি, গ্লাস ইত্যাদি

৮. একটি এ্যান্ডোয়েট মোবাইল ফোন নিতে হবে

৯. নরমাল মোবাইল ফোন হলে হজ্জ সংক্রান্ত বই বা কিছু ইসলিম বই নেয়া জেতে পারে

১০. প্রয়োজনীয় ঔষধ পত্র (ব্যবস্থাপত্রসহ) এবং অন্তত দুইটি চশমা নিতে হবে (যাদের আইভিষণ আছে)

১১. নারীদের জন্য বোরখা নিতে হবে (০২ টি)

১২. মালপত্র নেওয়ার জন্য একটি ব্যাগ (এজেন্সী দিবে) এবং অন্য একটি ছোট হাত ব্যাগ নিতে হবে

১৩. ইহরাম পরার কাজে ব্যবহারের জন্য প্রয়োজন হলে কটি বন্ধনী (বেল্ট)

১৪. কোমর বন্দী বেল্ট  পাসপোর্ট ও টাকা পয়সা সাথে রাখার জন্য

১৫. একটি টুকরা পরিত্র মাটির চাকা (প্রয়োজনে তাইয়ামুম করা জন্য)

১৬· বাংলাদেশি টাকা (দেশে ফেরার পর বিমানবন্দর থেকে বাড়ি ফেরার জন্য)

মন্তব্যঃ ইহার বাহিরে আপনার কোন জিনিস থাকলে সংযোগ করতে পারেন। আবার যদি মনে করেন এখান থেকে কোন জিনিস বাদ দিবেন দিতে পারেন। জিনিসের সংখ্যাও কমবেশী করেত পারেন। এটা একটা ধারনা মাত্র।

হজের সময় যেসব পরিহার করবেন

১. টিনের ট্রাঙ্ক, ভারী স্যুটকেস, ভারী কম্বল ও পানির বালতি ইত্যাদি সাথে নেওয়া ঠিক হবে না।

২. ক্যাসেট অথবা সিডি সঙ্গে নিবেন না। কারণ, এর জন্য ইমিগ্রেশন চেক করতে পারে।

৩. পচনশীল অথবা গলে যেতে পারে এমন খাবার নিবেন না। যেমন- ফল, চকলেট, দুধ ইত্যাদি।

৪. পুরুষরা সিগারেট, স্বর্ণের আংটি, স্বর্ণের চেইন (সবই হারাম) সঙ্গে নিবেন না।

৫. মহিলারা ভারী অলঙ্কার সঙ্গে নিবেন না।

৬. শরীরে তাবিজ, কবজ ও ফিতা ইত্যাদি বাঁধা থাকলে তা খুলে ফেলে শির্ক মুক্ত হয়ে যান। কারণ শির্ক ইবাদত কবুল হওয়ার অন্তরায়!

৭. সঙ্গে ক্যামেরা, ভিডিও ক্যামেরা সাথে না নেওয়া ভালো। কারণ, এতে আপনার ইবাদতের মনসংযোগ নষ্ট হবে।

৮. নখ কাটার মেশিন, সুই-সুতা, কেঁচি, চাকু ইত্যাদি সব সময় মেইন বড় লাগেজে রাখবেন।

হজ্জের জন্য সফর শুরু

হজ্জের সফরের আপনার রুট হবে। বাড়ি থেকে প্রথমে ঢাকার আশকোনা হজ্জ ক্যাম্পে আসবেন। এখানে ৩/৪ দিন থাকার পর শাহজালাল এয়ার পোর্ট হয়ে জেদ্দা বিমান বন্দন সৌদি আবর জেতে হবে। বর্তমান সিলেট ও বন্দর নগরী চট্রগাম থেকেও সরাসরি হজ্জ ফ্লাইট চালু করা হয়েছে। তাই সকল হাজ্জিকে এখন আর ঢাকা আসতে হবে না। জেদ্দা থেকে অধিকাংশ হাজিকে মক্কা নিয়ে যাওয়া হয়। আবার কিছু হাজিকে সরাসরি মক্কা না এনে, মদীনা হয়ে মক্কা আনা হয়।

ঢাকায় হজ্জ ক্যাম্পে করণীয়ঃ

হজ্জ অফিস সাথে যোগাযোগ রাখবের। তারা আপনাকে একটি অনুমতিপত্রে পাঠাবে যাতে হজ্জ ক্যাম্পে হাজির হওয়ার নির্ধারিত তারিখ থাকবে। তাদের দেয়া তারিখ মোতাবেগ সকাল ১০টার মধ্যে হজ্জ ক্যাম্পে গিয়ে রিপোর্ট করবেন। বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় হজ্জযাত্রীগন এজেন্সির পরামর্শ অনুযায়ী হজ্জ ক্যাম্পে হাজির হবেন। এখানে সাধারনত তিন দিন থাকতে হয়। কিন্তু ফ্লাইট সিডিউলের কারনে অনেক সময় কমবেশী হবে পারে। আবরা যাদের বাসা ঢাকা শহরে তারা এক দিন আগে আসলেও হয়। তবে এ সম্পর্ক এজেন্সির সাথে কথা বলে নিতে হবে। কেননা অনেক এখান এসেই হজ্জের প্রয়োজনীয় বিষয় ব্রীফ করে থাকে। অনেক সময় হজ্জ ক্যাম্পে দুই একদিন  আগেপিছে আসতে হয়। এই সংবাদ হজ্জ এজেন্সি বা হজ্জ অফিসের আপনাকে জানিয়ে দিবে। হজ্জ ক্যাম্পে রিপোর্ট করার সময় সরকারী ব্যবস্থাপনার হাজি হোক আর বেসরকারি হাজ্জি হোক সবাই পূর্বের দেয়া পরামর্শ মোতাবেগ কাগজপত্র এ ব্যক্তিগত জিনিসপত্র নিয়ে আসবের। তবে হজ্জ অফিস বা হজ্জ এজেন্সি যদি অতিরিক্ত কোন কিছু আনতে বলে তার প্রতিও খেয়ার রাখবেন। সবসময় এজেন্সির পরামর্শ অনুযায়ী জিনিসপত্র সঙ্গে আনতে হবে।

হজ্জ ক্যাম্প ডরমিটরিতে শুধুমাত্র হজ্জযাত্রীদের অনুমতি দেয়া হয়। তাই আত্মীয় স্বজন সাথে আনা উচিৎ নয়। তবে নীচ তলায় আত্মীয় স্বজনগণ তাদের হজ্জযাত্রীকে নানাবিধ দাপ্তরিক কাজে সহায়তা দিতে পারেন। হজ্জ ক্যাম্পে পান খাওয়া বা ধূমপান করা নিষিদ্ধ। প্রয়োজনীয় খাবার সরবরাহের জন্য রয়েছে ৩ টি ক্যান্টিন যা খোলা থাকে রাত দিন ২৪ ঘণ্টা। তাই বাইরে থেকে খাবার নিয়ে আসার কোনো প্রয়োজন নেই। টিকিট, পিলগ্রিম পাস, বৈদেশিক মুদ্রা ও অন্যান্য কাগজপত্র খুবই যত্নের সহিত সংরক্ষণ করবেন। এ গুলো হারিয়ে গেলে হজে যাওয়া সম্ভব হবে না। মালামাল বহনের জন্য যে লাগেজ বহন করবেন তার গায়ে নাম, পিলগ্রিম পাস নং ও ঠিকানা লিখে নেবেন। যদি দেখেন, আপনি কোন জিনিস আনতে ভুলে গেছেন অবথা আপনার কোন জিনিক কম আনা হয়েছে হজ্জ ক্যাম্পের নিচ থেকে এই জিনিসগুলো কিনে নিতে পাবেন। যারা প্রয়োজনীর জিনিস যোগাড় করেত পারেন নাই তারাও এখান থেকে প্রয়োজনীয় জিনির সংগ্রহ করতে পারেন।

এখানে আসার পর আপনার পাসপোর্টের ফটোকপি নিয়ে একটি সৌদি আবরের সিম ফ্রিদেন আপনি সিমটি সংগ্রহ করে একটিভেট করার সিস্টেম জেনে নিন। আর আপনার সিমের নাম্বারটি নিজের আত্মিয় স্বজনদের জানিয়ে দিবেন। যাতে করে আপনি সৌদি আরবে কোন কারনে যোগাযোগ করতে না পারলে তারাই  আপনার সাথে যোগাযোগ করে নিতে পারে।   

সফর শুরুর আগে একজন আমির নির্বাচন করাঃ

সফরে সকলে মিলে একজনকে আমির নির্ধারণ করা মুস্তাহাব। এতে করে যে কোন বিষয়ে সহজে সিদ্ধান্তে পৌঁছা যায়, এবং ঐক্য সুদৃঢ় হয়।

১. আবূ সাঈদ আল-খুদরী (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তিন ব্যক্তি একত্রে সফর কলে তারা যেন নিজেদের মধ্য থেকে একজনকে আমীর বানায়।(আবু দাইদ ২৬০৮)

২. আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তিন ব্যক্তি একত্রে সফর করলে তারা যেন তাদের একজনকে আমীর নিযুক্ত করে। নাফি‘ (রহঃ) আবূ সালামাহকে বললেন, তাহলে আপনি আমাদের নেতা। (আবু দাইদ ২৬০৯)

হজ্জ ক্যাম্প থেকে প্রস্থানঃ

আপনি আগেই জেনেছেন আপনার ফ্লাইট কবে এবং কখন। সেই অনুসারে আপনি আগে থেকেই হজ্জ ক্যাম্প হাজির আছেন। নির্ধারিত তারিখে আপনার মুয়াল্লিম আপনাকে নিয়ে কমপক্ষে চার ঘন্টা আগে বিমান বন্দের মধ্যে ঢুকে যাবে। কেননা, আপনাকে বিভিন্ন নিয়মের মধ্য দিয়ে যেতে হব আর এতে কিছু সময়ও লাগবে। বিমান বন্দরের উদ্দেশ্যে বের হওয়ার আগে প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র এবং আপনার ব্যাগ নিয়েছেন কিনা দেখে নিন। যেমন, ছোট ব্যাগ যাতে পাসপোর্ট, ভ্রমণ সংক্রান্ত কাগজপত্র, ভিসা ইত্যাদি রাখা এবং লাগেজ বা বড় ব্যাগ যাতে সব প্রয়োজনীয় জিনিস পত্র। এরপর মোয়াল্লিমের কথা মত সবকিছু নিয়ে হজ্জ ক্যাম্প থেকে নির্দিষ্ট বাসে করে বিমান বন্দের দিকে জেতে হবে। আপনার ভ্রমন সম্পর্কে কিছু তথ্যঃ

হতেপর্যন্তদূরত্ব (আনুমানিক)সময় (আনুমানিক)
ঢাকা বিমানবন্দরজেদ্দা বিমানবন্দর৩২৫৩ মাইল/৫২৩৪ কি.মি৬-৭ ঘণ্টা (বিমানে)
জেদ্দা বিমান বন্দরমক্কা৫৫ মাইল/৯০ কি.মি১-২ ঘণ্টা (বাসে)
জেদ্দা বিমানবন্দরমদীনা২৮০ মাইল/৪৫০ কি.মি৬-৭ ঘণ্টা (বাসে)
মক্কামদীনা৩০৫ মাইল/৪৯০ কি.মি৭-৮ ঘণ্টা (বাসে)
মক্কাআরাফা১৪ মাইল/২২ কি.মি
মক্কামিনা৫ মাইল/৮কি.মি১-২ ঘণ্টা (বাসে)
মিনাআরাফা৯ মাইল/১৪ কি.মি২-৩ ঘণ্টা (বাসে)
আরাফামুযদালিফা৮ মাইল/১৩ কি.মি২-৩ ঘণ্টা (বাসে)
মুযদালিফামিনা১.৬ মাইল/২.৫ কি.মি১-২ ঘণ্টা (বাসে)
ভ্রমণের রুটভারত, আরব সাগর, মাস্কট/দুবাই হয়ে সৌদি আরব।
সময়ের ব্যবধানতিন ঘণ্টা (ঢাকায় সকাল ৯টা, মক্কায় তখন সকাল ৬টা)
সৌদি ফোন কোড+৯৬৬XXXXXXXX (আমাদের যেমন +৮৮০XXXXXX)

বিমান বন্দরে করণীয়ঃ

বিমানে উঠার আগে বিমান বন্দরে কিছু ফর্মালিটি অনুসরণ করতে হয়। বিষয়গুলি শুধু হজ্জের জন্য প্রযোজ্য নয়, সকল নতুন যাত্রী যারা বিমানে প্রথম ভ্রমন করছেন তাদের সকলের জন্যই প্রযোজ্য। যারা হজ্জে গমন করেন তাদের অধিকাংশই প্রথম বিমানে ভ্রমন। বিমান ভ্রমন সম্পর্ক অনেকের সাধারণও নাই। তাই বিষয়টি একটু আলোকপাত করছি।

বিমান বন্দরে চেক ইনঃ

বিমান বন্দর টার্মিনালে ঢোকার পর আপনাকে প্রথমেই চেক ইন করতে যেতে হবে। এখান প্রথম ধাপে আপনাকে একটি মেটাল ডিটেকটর মেসিনের মধ্য দিয়া যেতে হবে। আর আপনার সকল লাগেজ বা ব্যাগগুলো একটি স্কান মেসিনের মাধ্যমে স্কান করা হবে। এই স্কানের উদ্দেশ্য হলো, আপনার কাছে বা আপনার লাগেজের মধ্য কোন প্রকার বিপদজনক বস্তু নাই।

লাগেজ মজাদানঃ

আপনার বড় ব্যাগ যাতে আপনি আপনার সকল জিনিস রেখেছেন তা আপনার সাথে রাখতে পারবেন না। এই বড় ব্যাগটি জমা দিতে হবে। আপনার ফ্লাইট খুলে দেয়ার পরই আপনি এটা করতে পারবেন। টার্মিনালের মনিটর এবং বোর্ডের দিকে খেয়াল রাখুন। আপনাকে আপনার টিকেট, পরিচয়পত্র, ভ্রমণ সংক্রান্ত কাগজপত্র দেখাতে হবে। এখানে আপনি আপনার লাগেজ জমা দেবেন। চেক ইন অফিসার আপনাকে বোর্ডিং পাস এবং লাগেজের জন্য একটি কার্ড দেবেন। আপনি বডিং পাশ ও লাগেস কার্ড যত্ম করে রাখবেন হারালে বীপদ আছে। বডিং পাশের সাহায্যে আপনি ডিপার্চার লাউঞ্জে (যেখান থেকে বিমান উঠান হবে) ঢুকতে পারবেন। আর লাগেস কার্ডের সাহায্য আপনি জেদ্দায় নিজের লাগেজ বা ব্যাগ খুজে পাবেন।

ইমিগ্রেশন পুলিক কর্তৃক চেকঃ

আপনি যেহেতু দেশের বাইরে যাচ্ছেন তাই আপনাকে ইমিগ্রেশন তথ্য চেক করা হবে। আপনিকি বৈধভাবে না অবৈধভাবে যাচ্ছে তা চেক করাই ইমিগ্রেশন অফিসারের কাজ। ইমিগ্রেশন অফিসারের চেক করার পূর্বে ভ্রমন সংক্রান্ত এক পৃষ্ঠার একটি ফরম ফিরাপ করতে হবে। ফরম ফিলাপ করে লা্‌ইলে দাড়ান এক একজন করে তার নিকট যেতে হবে। আপনাকে সবরকম ডকুমেন্ট দেখাতে হবে এখানে। পাসপোর্ট, ভিসা, ভ্রমণ সংক্রান্ত তথ্য ইত্যাদি। ইমিগ্রেশন পুলিম আপনার আঙ্গুলের ছাপ ও চোখের আইরিস নিবেন। সবকিছু ঠিক থাকলে আপনাকে ফ্লাইটের জন্য অপেক্ষা করেত হবে। আর যদি কোনকিছু সন্দেহজ্জনক মনে হলে তারা আপনার ফ্লাইট বাতিল করতে পারে। এখানে বিভিন্ন ধরনের দোকান আছে আপনি ইচ্ছামত সময় কাটাতে থাকুন আর খেয়াল রাখুন কখন আপনার ডাক আসে। আপনার ফ্লাইটেন রুট, নম্বর  এবং কত নম্বর গেট দিয়ে বডিংএ ঢুকবেন তা কয়েকবার মাইকিং করে জানিয়ে দিবে। এই সকল তথ্য আবার টিবির মত স্কিনেও দেখান হয়। যা হোক চোককান খোলা রাখুন।

বোর্ডিং

বোর্ডিং কার্ড দেখে আপনাকে এবার ডিপার্চার লাউঞ্জে (যেখান থেকে বিমান উঠান হবে) ঢোকান হবে। আপনার বডিং পাশের একটি অংশ কেটে রাখা হবে। এখানে আবার আপনাকে এবং আপনার ছোট ব্যাগ যা আপনি সাথে রেখেছেন তা স্কান করা হবে। আগে চেক থেকে এখানে আরও একটু কড়াকড়ি চেক করা হবে। যদি আপনার নিকট পানিজাতীয় কিছু, টুথপেষ্ট, ছুরি, কেচি, নেইল কাটার, সুই ইত্যাদি থাকে তবে তা আর নিতে দেয়া হবে না। এখানে রেখে দেয়া হবে। আপনার ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন, জ্যাকেট, ল্যাপটপ নিতে দিবে। তবে এই সকল বস্তু বাইরে রেখে আপনাকে চেক করা হবে। সবকিছু ঠিক থাকলে সিকিউরিটি অফিসার আপনার হ্যান্ডব্যাগ এবং বোর্ডিং পাসে স্ট্যাম্প দেবেন।

বিমানে উঠার পরঃ

ডিপার্চার লাউঞ্জে অপেক্ষা করতে থাকুন। কিছু সময় পরই আপনাদের বলা হবে বিমান রেডি আপনারা আসুন। সাধারনত বিমান এনে ডিপার্চার লাউঞ্জে সাথে লাগিয় দেয়া হয়। ডিপার্চার লাউঞ্জের গেটি খুলেই বিমান উঠা যায়। কিন্তু বিমান যদি ডিপার্চার লাউঞ্জ থেকে দুরে থাকে তবে বাসে করে যেয়ে উঠতে হয়। বিমান উঠার পর আপনার সবগুলো ঝামেলার কাজই শেষ। এখন আর কোন চিন্তা নেই। আপনার সীটে বসে পড়ুন। বোর্ডিং পাসে সীট নাম্বার দেয়া থাকে। অনেক ছোট এয়ারলাইন্সে হয়ত সীট নাম্বার নাও দেয়া থাকতে পারে। সেক্ষেত্রে আপনি যেকোন সীটে বসতে পারেন। তবে মহিলা এবং বৃদ্ধদের জন্য সীট আছে কিনা খেয়াল করবেন। সব যাত্রীরা প্রবেশ করলে প্লেনের দরজা বন্ধ করে দেওয়া হবে। প্লেন টেক-অফ করার আগে কিছু সতর্কতা মূলক নির্দেশনা দেয়া হবে। দুশ্চিন্তা করবেন না। টেক-অফ করতে কিছুটা সময় লাগতে পারে, শব্দও বাড়তে পারে। এধরণের শব্দ হয় সীট বেল্ট এলার্ম বা স্মোকিং এলার্ম হিসেবে। সীটবেল্ট সিগন্যাল যখন দেখা যাবে তখন দাঁড়ানো যাবে না। প্লেন যখন একটি নির্দিষ্ট উচ্চতায় উঠে যাবে তখন এই সিগন্যাল বন্ধ করে দেয়া হবে। এরপর আপনি ফ্রেশ হতে উঠতে পারবেন বা খাবার খেতে যেতে পারবেন। বিমানের ভিতরে আপনাকে হালকা খাবার দেয়া হবে। বিমানের ভিতরে জরুরী প্রয়োজনে টয়লেট আছে কিন্তু পানির পরিবর্তে টিসু পেপার ব্যবহার করতে হবে। বিমান উঠার আগেই অজু করে নিবেন। কিন্তু অজু ভেঙ্গে গেলে তাইয়্যামুম করে নিতে হবে। কোন কিছু বুঝতে সমস্যা হলে আপনার মুয়াল্লিমকে বলুন। বিমানের ভিতরে অনুমানের ভিত্তিতে কোন কাজ করবেন না। যা জানুন তাই করুন।।।

ল্যান্ড করার পরঃ

আস্তে আস্তে বিমান জেদ্দার দিকে এগিয় যাবে। বিমান অপতরনের সময় আপনি টের পাবেন যে বিমান নিচের দিকে যাচ্ছে। বিমানের চাকা রানওয়ে স্পর্শ করলে শব্দ বাড়তে থাকে আর গতি ধীর হতে থাকে। বিমান অনেক সময় ল্যান্ড করা পরও টার্মিনালে যেতে সময় নয়। কেননা জেদ্দা বিশার বিমান বন্দর। বিমান থামার সাথেই দাঁড়িয়ে যাবেন না। আপনাকে সিট বেল্ট খোলার নির্দেশনা দেওয়ার আগ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

কোন তথ্যের জন্য তথ্যকেন্দ্র রয়েছে। তারা আপনাকে সহযোগিতা করবেন।

জেদ্দা বিমান বন্দরে বিমান থেকে বিশ্রাম কক্ষে গিয়ে অপেক্ষা করুন। ইমিগ্রেশন অফিসে আপনাকে আপনার পাসপোর্ট দেখাতে বলবেন। এখানেও আপনার আঙ্গুলে ছাপ ও আইরিস নেয়া হবে। বিমান বন্দরে যে বিশ্রাম কক্ষ হতে বহির্গমন বিভাগে গিয়ে পিলগ্রিম পাসে সিলমোহর লাগাতে হবে। এখানে আপনাকে লাইন বেঁধে বসতে হবে। পিলগ্রিম পাসে সিল লাগানো সম্পূর্ণ হলে আপনার ব্যাগ সংগ্রহ করবেন। ব্যাগ মেশিনে স্ক্যান করিয়ে মূল বিল্ডিং থেকে বের হয়ে যাবেন। বের হওয়ার গেটেই ট্রান্সপোর্ট কর্তৃপক্ষ আপনার কাছ থেকে ব্যাগ নিয়ে নেবে যা আপনি জায়গা মতো পেয়ে যাবেন।

একটু সামনে এগোলে কিছু অফিসার দেখতে পাবেন। তারা আপনার পিলগ্রিম পাসে বাসের টিকিট লাগিয়ে দেবে। কোনো একটি টিকিট অব্যবহৃত থেকে গেলে তার পয়সা দেশে আসার সময় ফেরত পাবেন যা জেদ্দা বিমান বন্দর থেকে সংগ্রহ করে নিতে হবে।

বাংলাদেশের পতাকা টানানো জায়গায় গিয়ে পাসপোর্টে মুয়াল্লিমের স্টিকার লাগাবেন। এরপর বাসে ওঠার জন্য লাইন ধরে দাঁড়াবেন। আপনার মাল-সামানা গাড়িতে ওঠানো হল কি-না সে ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে নিন। বাসে ওঠার পর ড্রাইভার হজ্জ যাত্রীদের পিলগ্রিম পাস (পাসপোর্ট) নিয়ে নেবেন, এবং মক্কায় পৌঁছে হজ্জ কন্ট্রাক্টর কাছে সেগুলো হস্তান্তর করবেন।

মক্কায় পৌছে করণীয়ঃ

জেদ্দা থেকে গাড়ি সরাসরি মক্কা যাবে। বাস থেকে নেমে প্রথমে নিজের মাল-সামানা সংগ্রহ করে নেবেন। মাল-সামানা নিয়ে সরকার অথবা এজেন্সির ভাড়া-করা বাসায় আপনার জন্য নির্দিষ্ট করেদেয়া কক্ষে গিয়ে উঠবেন। প্রথমে মক্কায় এসে থাকলে গোসল করে খাওয়া দাওয়া সেরে সামান্য বিশ্রাম নিয়ে উমরা আদায়ের প্রস্ত্ততি নিন। সরকারি ব্যবস্থাপনার আওতাধীন হলে আপনার ফ্ল্যাটে অথবা আপনার নাগালের মধ্যে কোনো আলেম আছেন কিনা তা জেনে নিন। আলেম না পেলে হজ্জ উমরা বিষয়ে যাকে বেশি জ্ঞানসম্পন্ন মনে হবে তার নেতৃত্বে উমরা করার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হবেন। যাওয়ার পথে কিছু জিনিসকে আলামত হিসাবে নির্ধারণ করবেন যাতে হারিয়ে গেলে সহজেই আপনার বাসা খুজে বের করতে পারেন। আলেম অথবা নেতা নির্ধারণের সময় হকপন্থী কিনা, তা ভালো করে যাচাই করে নেবেন। অন্যথায় আপনার উমরা নষ্ট হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে।

মক্কায় পৌঁছার পর মুয়াল্লিম অফিস থেকে দেয়া বেল্ট সবসময় সঙ্গে রাখবেন। এ বেল্টে মুয়াল্লিম অফিসের নম্বর লেখা আছে, যা আপনি হারিয়ে গেলে কাজে লাগবে। ঘর হতে বাইরে যাওয়ার সময় বেশি টাকা পয়সা সঙ্গে রাখবেন না। কেননা ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে যেতে পারে অথবা পকেটমারের পালায় পড়তে পারেন। আর সবসময় দলবদ্ধ হয়ে চলার চেষ্টা করবেন। একা কখনো ঘরের বাইরে যাবেন না যতক্ষণ না আপনার বাসার লোকেশন ভালভাবে আয়ত্ব করতে না পারেন।

রোদের মধ্যে বাইরে বেশি ঘোরা-ফেরা করবেন না। প্রচুর ফলের রস ও পানি পান করবেন। প্রয়োজনে লবণ মিশিয়ে পান করবেন। অনেকেই একের পর এক উমরা করে অসুস্থ হয়ে পড়েন। এ ধরনের কাজ থেকে বিরত থাকবেন। শারীরিক অসুস্থতা অনুভব করলে বাংলাদেশ হজ্জ মিশনের ডাক্তার অথবা সৌদি সরকার কর্তৃক স্থাপিত চিকিৎসাকেন্দ্রসমূহে গিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাপত্র ও ওষুধ সংগ্রহ করবেন। এ ব্যাপারে কোন অলসতা করা উচিৎ হবে না। কেননা হজ্জের কার্যক্রম অসুস্থ শরীর নিয়ে সম্পন্ন করা খুবই কঠিন। হজ্জ এজেন্সি বা মুয়াল্লিমের সাথে কোনো সমস্যা দেখা দিলে আলোচনার মাধ্যমে ঠান্ডা মাথায় সমাধানের চেষ্টা করবেন। বাংলাদেশ হজ্জ মিশনের কর্মকর্তাদের সাহায্যও নিতে পারেন, যদি প্রয়োজন মনে করেন।

কিছু যোগাযোগের ঠিকানা জেনে রাখুনঃ

১। ঢাকা বাংলাদেশ হজ্জ অফিস

ঠিকানা: হজ্জ অফিস, আশকোনা, এয়ারপোর্ট, ঢাকা।

ফোন: ডিরেক্টর (৮৯৫৮৪৬২), সহকারী হজ্জ অফিসার (৭৯১২৩৯১), স্বাস্থ্য (৭৯১২১৩২)

আইটি হেল্প: ৭৯১২১২৫, ০১৯২৯৯৯৪৫৫৫

২। জেদ্দায় বাংলাদেশি দূতাবাস

যোগাযোগের ঠিকানা: গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের কনস্যুলেট জেনারেল

পিও বক্স-৩১০৮৫, জেদ্দাহ ২১৪৯৭, সৌদি আরব।

অবস্থান: ৩ কিলোমিটার, পুরাতন মক্কা রোডের কাছে (মিতশুবিশি কার অফিসের পেছনে) নাজলাহ, পশ্চিম জেদ্দা, সৌদি আরব।

ফোন: ৬৮৭ ৮৪৬৫ (পিএবিএক্স)

৩। জেদ্দায় বাংলাদেশ হজ্জ মিশন

লোকেশন: জেদ্দা ইর্ন্টারনেশনাল এয়ারপোর্ট (বাংলাদেশ প্লাজার নিকটবর্তী)।

ফোন: +৯৬৬-২-৬৮৭৬৯০৮। ফ্যাক্স:০০-৯৬৬-২-৬৮৮১৭৮০।

আইটি হেল্প: +৯৬৬৫৬২৬৬৩৪৬৭।

ই-মেইল: jeddah@hajj.gov.bd

৪। মক্কায় বাংলাদেশ হজ্জ মিশন

লোকেশন: ইবরাহীম খলীল রোড, মিসফালাহ মার্কেট ও গ্রিনল্যান্ড পার্কের সামনে।

ফোন: +৯৬৬-২-৫৪১৩৯৮০,৫৪১৩৯৮১। ফ্যাক্স:০০-৯৬৬-২-৫৪১৩৯৮২

আইটি হেল্প: +৯৬৬৫৬২৬৫৪৬৬৪।

ই-মেইল: makkah@hajj.gov.bd

৫। মদীনায় বাংলাদেশ হজ্জ মিশন:

লোকেশন: কিং ফাহাদ রোড জংশন ও এয়ারপোর্ট।

ফোন: +৯৬৬-০৪-৮৬৬৭২২০।

আইটি হেল্প: +৯৬৬৫৬২৬৫৪৩৭৬।

ই-মেইল: madinah@hajj.gov.bd

৬। মিনায় বাংলাদেশ হজ্জ মিশন:

লোকেশন: ২৫/০৬২ সু-কুল আরব রোড ৬২, ৫৬, জাওয়হারাত রোডের সামান্তরালে।

সফরের চারটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান: প্রথম কিস্তি

সালাতের কসর করা

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

সফরের কষ্টের কথা বিবেচনা করে ইসলাম সফর বা ভ্রমণকারীর জন্য ইসলামী বিধানে কিছুটা রুখসত বা ছাড় দিয়েছে। সালাত মহান আল্লাহ এমন এক আদেশ যাকে কোন অবস্থায়ই পরিত্যাগ করা যাবে না, তাই সে সফরে থাকুক আর বাড়িতে থাকুন। কিন্তু মহান আল্লাহ সফরের সময় সালাতের ব্যাপারে আমাদের প্রতি কিছুটা সহনশীলতা প্রদর্শণ করেছেন। ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হওয়া সত্বেও সফর বা ভ্রমণকরীর জন্য চার রাকআত বিশিষ্ট সালাতকে কসর করে বা কমিয়ে দুই রাকআত করেছেন। শুধু সালাত নয় সফরে আরও কয়েকটি হুকুমের ব্যাপারে মহান আল্লাহ কিছুটা ছাড় বা রুখসত প্রদান করেছেন। সফরে থাকা কালিন সময়ে সফরকারিকে মুসাফির বলা হয়। মুসাফির ব্যক্তি সব সময় চারটি রুখসত বা ছাড়ের অধিকারী হবে। সে চারটি রুখসত হলঃ

১। সালাতকে কসর করে আদায়

২। সালাতকে জমা করা।

৩। সফরে তিন দিন ও তিন রাত্রি পর্যন্ত মোজার উপর মাসেহ করা

৪। সফর অবস্থায় রমযানের সিয়াম ভঙ্গ করা

সালাতের কসর করাঃ

কসর একটি আরবি শব্দ যার অর্থ হলো কম করা, কমানো। কোন মুসলিম যখন সফরে থাকে তখন তিনি চার রাকআত বিশিষ্ট সালাতকে কসর করে বা কমিয়ে দুই রাকআত আদায় করে। সালাত কমিয়ে আদায় করাকেই সালাতে কসর বলা হয়। পূর্বেই উল্লেখ করেছি, যে ব্যক্তি ভ্রমণ বা সফর করে তাকে সফররত অবস্থায় মুসাফির বলে। আবার যখন নিজ বাড়ী বা বাসভবনে চলে আসে তখন শরিয়তের পরিভাষায় তাকে বলে মুকিম। মুকিম অর্থ হল, নিজ বাসস্থানে অবস্থানকারী। অর্থাৎ শুধু মুসাফির ব্যক্তিই সালাতের কসর আদায় করবে। মুকিম কখনও সালাতের কসর আদায় করবে না। মহান আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ

 وَإِذَا ضَرَبۡتُمۡ فِى ٱلۡأَرۡضِ فَلَيۡسَ عَلَيۡكُمۡ جُنَاحٌ أَن تَقۡصُرُواْ مِنَ ٱلصَّلَوٰةِ إِنۡ خِفۡتُمۡ أَن يَفۡتِنَكُمُ ٱلَّذِينَ كَفَرُوٓاْ‌ۚ إِنَّ ٱلۡكَـٰفِرِينَ كَانُواْ لَكُمۡ عَدُوًّ۬ا مُّبِينً۬ا (١٠١) 

অর্থঃ আর যখন তোমরা সফরে বের হও তখন নামায সংক্ষেপ করে নিলে কোন ক্ষতি নেই৷ (বিশেষ করে) যখন তোমাদের আশংকা হয় যে, কাফেররা তোমাদেরকে কষ্ট দেবে৷ কারণ তারা প্রকাশ্য তোমাদের শত্রুতা করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে৷  (সুরা নিসা ৪:১০১)।

উক্ত আয়াতে মহান আল্লাহ তায়ালা সফরত অবস্থায় সালাত কসর করতে বলেছেন। আয়াতটি সরল অনুবাদ দেখলে মনে হয় কসর কেবল যুদ্ধাবস্থার  আদায় করেত হবে শান্তির অবস্থায় নয়। এই সরল অনুবাদ করে ‘যাহেরী’ ও ‘খারেজী’ ফিকাহর অনুসারীরা বলে থাকে কসর কেবল যুদ্ধাবস্থার জন্য আর শান্তির অবস্থায় যে সফর করা হয় তাতে কসর করা কুরআন বিরোধী। কিন্তু নির্ভরযোগ্য রেওয়ায়াতের মাধ্যমে হাদীস থেকে প্রমাণিত হয়েছে যে, হযরত উমর (রা) এই একই সন্দেহটি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে সামনে পেশ করলে তিনি এর জবাবে বলেন আল্লাহ পক্ষ থেকে সাদাকা বলেছে। হাদিসটি হলঃ

ইয়ালা ইবনু উমায়্যা (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি উমর ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) কে বললাম, (আল্লাহ তা’আলা বলেছেন) “যদি তোমরা ভয় পাও যে, কাফিররা তোমাদেরকে কষ্ট দেবে, তরে সালাত সংক্ষেপ করে পড়াতে কোন দোষ নেই” কিন্তু এখন তো লোকেরা নিরাপদ। উমর (রাঃ) বললেন, বিষয়টি আমাকেও বিস্মিত করেছে, যা তোমাকে বিস্মিত করেছিল। তারপর আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে এ সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিলাম ও এর জবাবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন, এটি আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে তোমাদের প্রতি একটি সাদাকা। তোমরা তাঁর সাদাকাটি গ্রহণ কর। (সহিহ মুসলিম হাদিস ১৪৪৬ ইসলামি ফাউন্ডেশন)।

ইয়া‘লা ইবনু উমাইয়্যাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ‘উমারের কাছে নিবেদন করলাম, আল্লাহ তা‘আলার বাণী হলো, ‘‘তোমরা সলাত কম আদায় করো, অর্থাৎ ক্বসর করো, যদি অমুসলিমরা তোমাদেরকে বিপদে ফেলবে বলে আশংকা করো’’- (সূরাহ্ আন্ নিসা ৪: ১০১)। এখন তো লোকেরা নিরাপদ। তাহলে ক্বসরের সালাত আদায়ের প্রয়োজনটা কি? ‘উমার (রাঃ) বললেন, তুমি এ ব্যাপারে যেমন বিস্মিত হচ্ছো, আমিও এরূপ আশ্চর্য হয়েছিলাম। তাই রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে ব্যাপারটি সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিলাম। তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সলাতে কসর করাটা আল্লাহর একটা সাদাকা বা দান, যা তিনি তোমাদেরকে দান করেছেন। অতএব তোমরা তাঁর এ দান গ্রহণ করো। (মিসকাত ১৩৩৫ থেকে নেয়া, আরও আছে সহীহ মুসলিম ৬৮৬, আবূ দাঊদ ১১৯৯, আত্ তিরমিযী ৩০৩৪, নাসায়ী ১৪৩৩, ইবনু মাজাহ্ ১০৬৫, আহমাদ ১৭৪, দারিমী ১৫৪৬, ইবনু খুযায়মাহ্ ৯৪৫, ইবনু হিব্বান ২৭৩৯, সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ৫৩৭৯, শারহুস্ সুন্নাহ্ ১০২৪)।

হারিসা ইবনু ওয়াহব (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিরাপদ অবস্থায় আমাদেরকে নিয়ে মিনায় দু’ রাকা’আত সালাত আদায় করেন। (সহীহ বুখারী – ১০২২ ইসলামি ফাউন্ডেশন)

মহানবী (সাঃ) প্রত্যেক সফরেই কসর করে নামায পড়েছেন এবং কোন নির্ভরযোগ্য রেওয়ায়াত দ্বারা এ কথা প্রমাণিত নেই যে, তিনি কোন সফরে নামায পূর্ণ করে পড়েছেন। হযরত আব্দুল্লাহ বিন উমার (রাঃ) বলেন, ‘আমি নবী (সাঃ), আবূ বাক্‌র, উমার ও উসমান (রাঃ)-এর সাথে সফরে থেকেছি। কিন্তু কখনো দেখি নি যে, তাঁরা ২ রাকআতের বেশী নামায পড়েছেন।’ ( মিশকাত ১৩৩৮, বুখারী ১১০২, মুসলিম ৬৮৯, সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ৫৫০৭, আবূ দাঊদ ১২২৩)

আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে মদিনা থেকে মক্কার দিকে রওনা দিলাম। সেই সফরে তিনি মদিনায় ফিরে আসা পর্যন্ত দু’ রাক’আত দু’ রাক’আত করে সালাত আদায় করেন। বর্ণনাকারী বলেন, আমি জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি মক্কায় কতদিন ছিলেন? তিনি বললেন দশ দিন।(সহিহ মুসলিম হাদিস ১৪৫৯ ইসলামি ফাউন্ডেশন)।

মন্তব্যঃ এই সকল সফর ছিল স্বাভাবিক, কোন যুদ্ধের জন্য সফর ছিল না। তাই সাধারনত যে কোন মুসাফিরই সালাতের কসর করতে পারবে যদি সে সফরের শর্থের মাঝে থাকে।

সফরের দুরত্ব কতটুকু?

আল্লাহ্‌ তা’আলা নির্দিষ্টভাবে সফরের কোন দুরত্ব নির্ধারণ করেননি। অনুরূপভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকেও সফরের দুরত্ব নির্ধারণের ব্যাপারে নির্দিষ্ট কোন নির্দেশনা পাওয়া যায় না। কুরআন সুন্নাহে নির্দিষ্ট কোন নির্দেশনা না পাওয়ার কারনে মুজতাহীদ আলেমদের মাঝে এ সম্পর্কে বিশাল মতভেদ আছে। উলামাগণের মাঝে অনেক মত পার্থক্য রয়েছে। ইবনুল মুনযির ও অন্যান্যদের বর্ণনায় প্রায় ২০টি মত রয়েছে।

তবে আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাদীনায় যুহরের সালাত চার রাক্‘আত আদায় করেছেন। তবে যুল হুলায়ফায় ‘আসরের সলাত দু’ রাক্‘আত আদায় করেছেন। (মিসকাত ১৩৩৩, সহীহ  বুখারী ১৫৪৭, মুসলিম ৬৯০, নাসায়ী ৪৭৭, আহমাদ ১২৯৩৪, ইবনু হিব্বান ২৭৪৭, ইরওয়া ৫৭০, আবূ দাঊদ ১২০২।

এই হাদিসের আলোকে ইমাম নাবাবী (রহঃ) বলেন, ক্বসরের সর্বনিম্ন সীমা হলো ৩ মাইল। তিনি দলিল পেশ করেছেন এই সহিহ হাদিস থেকে। হাফিয আসক্বালানী (রহঃ) বলেনঃ এ বিষয়ে এটাই অধিক বিশুদ্ধ হাদীস।

আর যারা এ মতের বিরোধী তারা বলেন যে, আলোচ্য হাদীস দ্বারা ক্বসর শুরু উদ্দেশ্য, সফরের শেষ গন্তব্য নয়। অর্থাৎ যখন সে দীর্ঘ সফরের ইচ্ছা করবে এবং তিন মাইল দূরত্বে পৌঁছার পর থেকে সে কসর করবে। যেমন হাদিসের অর্থের দিকে লক্ষ করলে দেখা যায় নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাদীনায় চার রাকআত সলাত আদায় করলেন এবং যুল হুলায়ফায় দু’ রাকআত সলাত আদায় করলেন। অর্থাৎ সফর শুরু করে তিন মাইল অথবা তিন ফারসাখ পরিমাণ দূরত্বে গেলেই সালাত কসর করতে হবে।

সহিহ মুসলিমে এসেছেঃ আবূ বাকর ইবনু আবূ শায়বা ও মুহাম্মাদ ইবনু বাশশার (রহঃ) … ইয়াহিয়া ইবনু ইযায়ীদ আল হুনাঈ (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) এর নিকট সালাত কসর করা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন, রাসুলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন সফরের উদ্দেশ্যে তিন মাইল অথবা (রাবী শুবার সন্দেহ) তিনি তিন ফারসাখ পথ অতিক্রম করতেন, তখন দু’রাকআত পড়তেন।(সহিহ মুসলিম হাদিস নম্বর ১৪৫৬ ইসলামি ফাউন্ডেশন)।

সহিহ মুসলিমে আরও এসেছেঃ যুহায়র ইবনু নুফায়র (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি শুরাহবিল ইবনুল সিম্‌ত (রহঃ) এর সঙ্গে একটি গ্রামের দিকে রওনা দিলাম, যা সতের বা আঠার মাইলের মাথায় অবস্থিত। তারপর তিনি দু’ রাক’আত সালাত পড়লেন। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন, আমি উমর (রাঃ) কে দেখেছি, তিনি যুল হুলায়ফায় দু’ রাক’আত পড়েছেন। এ বিষয়ে তাঁকে আমি জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে যেরূপ করতে দেখেছি, সেরূপই করছি। (সহিহ মুসলিম হাদিস নম্বর ১৪৫৭ ইসলামি ফাউন্ডেশন)।

ইমাম শাফি‘ঈ রাহিমাহুল্লাহ, ইমাম মালিকরাহিমাহুল্লাহ, ইমাম আহমাদ রাহিমাহুল্লাহ ও অন্যান্য ফিকহবিদের মত, পূর্ণ একদিন সফরের দূরত্বের কমে সলাত ক্বসর করা যাবে না। আর তা হলো চার বারদ, আর চার বারদ হলো ১৬ ফারসাখ অর্থাৎ ৪৮ মাইল বা ৮০ কিলোমিটার। কারণ এক বারদ হলো চার ফারসাখ, আর এক ফারসাখ সমান তিন মাইল। (মিসকাতের সফর অধ্যায়)

কোন কোন মুজতাহীদ ৮০ কিলোমিটার এর মত নির্ধিষ্ট পরিমাণ দুরত্ব উল্লেখ না করে বলেছেনঃ সমাজে প্রচলিত রীতিনীতিতে বা দেশীয় প্রথায় যাকে সফর বলা হয় তাতেই নামায কসর করবে। যদিও তা ৮০ কিলোমিটার না হয়। আর মানুষ যদি তাকে সফর না বলে, তবে তা সফর নয়, যদিও তা ১০০ কিলোমিটার হয়। এটাই শায়খুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়া রাহিমাহুল্লাহ এর মত। (ফাতাওয়া আরকানুল ইসলাম)।

মন্তব্যঃ প্রচলিত রীতিনীতিতে মতভেদ দেখা দিলে ইমামদের যে কোন একটি মত গ্রহণ করলেও কোন অসুবিধা নেই। কেননা ইমামগণ সবাই মুজতাহিদ বা গবেষক। এক্ষেত্রে কোন দোষ হবে না ইনশাআল্লাহ্‌। কিন্তু বর্তমানে মানুষের প্রচলিত রীতিনীতি যেহেতু সুনির্দিষ্ট তাই ইহা গ্রহণ করাই অধিক সঠিক। (ফাতাওয়া আরকানুল ইসলাম)।

সফরে কত দিন পর্যান্ত কসর সালাত আদায় করা যাবে?

মুসাফির যখন সফরের গন্তব্যে পৌঁছে যাবে, তখন কতদিন অবস্থান করলে সে সালাত কসর করবে এ ব্যাপারে অনেক মতপার্থক্য রয়েছে। সাহাবিদের যুগ থেকেই এ ব্যাপারে মতভেদ পরিলক্ষিত হয়। যার ফরে আমরা হাদিসের মধ্যও দিনের সংখ্যা নিয়ে পার্থক্য দেখতে পাই। তাই যখন কোন মুজতাহীদ হাদিসের আলোকে বায় প্রদান করেন, তখন তিনি যেটা অধিক সঠিক মনে করছেন তার উপর রায় প্রদান করেন। অন্য মুজতাহীদ হয়ত অন্য হাদিসকে প্রাধান্য দিয়েছেন। তাই সাহিবী নয় মুজতাহীদ আলেমদের মাঝেও দিনের সংখ্যা নিয়ে মতদেভ আছে। প্রথমে এ সম্পর্কে কয়েকটি হাদিস লক্ষ করিঃ

১. ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার সফরে উনিশ দিন পর্যন্ত অবস্থান করেন এবং সালাত কসর করেন। কাজেই (কোথাও) আমরা উনিশ দিনের সফরে থাকলে কসর করি এবং এর চাইতে বেশী হলে পুরোপুরি সালাত আদায় করি। (সহীহ বুখারী  ১০১৯ ইসলামি ফাউন্ডেশন)

২. আবদুল্লাহ ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক ভ্রমণে গিয়ে ঊনিশ দিন অবস্থান করেন। এ সময় তিনি দু’ রাক্‘আত করে ফরয সালাত আদায় করেন। ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) বলেন, আমরাও মক্কা মাদীনার মধ্যে কোথাও গেলে সেখানে ঊনিশ দিন অবস্থান করলে, আমরা দু’ রাক্‘আত করে সলাত আদায় করতাম। এর চেয়ে বেশী দিন অবস্থান করলে চার রাক্‘আত করে সলাত ক্বায়িম করতাম। (মিসকাত ১৩৩৭ হাদিসের মান সহিহ। আত্ তিরমিযী ৫৪৯, ইবনু মাজাহ্ ১০৭৫)

৩. আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে মক্কা থেকে মদিনায় গমণ করি, আমরা মদিনা ফিরে আসা পর্যন্ত তিনি দু’রাকা’আত, দু’রাকা’আত সালাত আদায় করেছেন। (রাবী বলেন) আমি (আনাস (রাঃ) কে বললাম, আপনারা মক্কায় কত দিন ছিলেন তিনি বললেন, আমরা সেখানে দশ দিন ছিলাম (সহীহ বুখারী ১০২০ এবং সহিহ মুসলিম ১৪৫৯, ইসলামি ফাউন্ডেশনের প্রকাশনায়)

এক বছরের হাদিস, ছয় মাসের হাদিস

উপরের হাদিসগুলিতে ১৯ দিন, ১০দিন, ছয়মাস ও একবছর দেখতে পাই। আসলে সবগুরি হাদিসই সঠিক। উম্মাতের মাঝে এ সম্পর্কি ভুল বুঝাবুঝি দুর করার জন্য এক এক মুজতাহীদ আলেম এক একটি মতামত প্রদান করেছেন। তাদের মধ্য থেকে প্রসিদ্ধ চারটি মতামত বা রায় তুলে ধরছি।

প্রথম মতামতঃ শাফি‘ঈ ও মালিকী রাহিমাহুল্লাহ এর মতামত হলো, যখন চার দিনের অতিরিক্ত অবস্থান করবে তখন সলাত পূর্ণ করবে।

দ্বিতীয় মতামতঃ আবূ হানীফাহ রাহিমাহুল্লাহ এর মতামত হলো, যখন ১৫ দিনের বেশী অবস্থান করবে, তখন পূর্ণ সলাত আদায় করবে।

তৃতীয় মতামতঃ ইমাম আহমাদ ও দাঊদ রাহিমাহুল্লাহ এর মতামত অনুযায়ী যখন চার দিনের অধিক অবস্থান করবে তখন পূর্ণ সলাত আদায় করবে।

চতুর্থ মতামতঃ ইসহাক্ব ইবনু রাহওয়াইয়াহ্ রাহিমাহুল্লাহ এর মতামত অনুযায়ী যখন ১৯ দিনের অধিক অবস্থান করবে তখন পূর্ণ সলাত আদায় করবে।

ইমাম শাফি‘ঈ ও মালিক রাহিমাহুল্লাহ এর মতে সলাত কসরের সীমা হলো গন্তব্যে প্রবেশ এবং গন্তব্য থেকে বের হওয়ার দিন ব্যতীত তিন দিন। ইমাম আবূ হানীফাহ্ (রহঃ)-এর নিকট ১৪ দিন, ইমাম আহমাদ (রহঃ)-এর নিকট ৪ দিন, ইসহাক (রহঃ)-এর নিকট ১৯ দিন। মির্‘আত প্রণেতা বলেনঃ আমার নিকট অগ্রগণ্য বা প্রাধান্য মত হলো ইমাম আহমাদ (রহঃ)-এর মত। (মিসাতের সফর অধ্যায়ের টিকা থেকে নেয়া হয়েছে)।

মন্তব্যঃ উপরের মতামত গুলি সবই হাদিসের আলোকে প্রদান করা হয়েছে। কোন মুজতাহীদ আলেমই হাদিসের বাহিরে কিয়াস করেনি। প্রচলিত রীতিনীতিতে মতভেদ দেখা দিলে ইমামদের যে কোন একটি মত গ্রহণ করলেও কোন অসুবিধা নেই। কাজেই এটা ঠিক, ওটা ভুল এমন বলে বলে উম্মতের মাঝে ঐক্য নষ্ট করা হারাম।

সফরের সময় সুন্নাত ও নফল পড়ার বিধানঃ

ঈসা ইবনু হাফস ইবনু আসিম ইবনু উমর ইবনুল খাত্তাব তাঁর পিতা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, মক্কার রাস্তায় আমি ইবনু উমরের সহচর হলাম। তিনি আমাদের যুহরের সালাত দু’ রাক’আত পড়ালেন। এরপর তিনি সামনে অগ্রসর হলেন, আমরাও তাঁর সঙ্গে অগ্রসর হলাম। তারপর তিনি তাঁর মনযিলে এসে বসলেন এবং আমরাও তাঁর সঙ্গে বসলাম। এরপর যে স্থানে তিনি সালাত আদায় করেছিলেন, সে স্থানের প্রতি দৃষ্টি পড়লে তিনি দেখলেন, কিছু লোক দাঁড়ানো। তিনি বললেন, তারা সেখানে কি করছে? আমি বললাম, তারা নফল সালাত আদায় করছে তিনি বললেন, আমি যদি নফল আদায় করতাম তাহলে আমি আমার সালাত (ফরয) কেই পূর্ণ করতাম।

হে ভ্রাতুষ্পুত্র! আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে সফরে থেকেছি। কিন্তু ইন্তেকালের পূর্ব পর্যন্ত তিনি দু’ রাক’আতের অতিরিক্ত আদায় করেননি। আমি আবূ বকর (রাঃ) এর সঙ্গেও থেকেছি, তিনিও তাঁর ইন্তেকালের পূর্ব পর্যন্ত দু’ রাক’আতের অতিরিক্ত আদায় করেননি। আমি উমর (রা) এর সঙ্গেও ছিলাম। তিনিও ইন্তেকালের পূর্ব পর্যন্ত দু’ রাক’আতের অতিরিক্ত পড়েননি। আমি উসমান (রাঃ) এরও সঙ্গে ছিলাম। তিনিও ইন্তেকালের পূর্ব পর্যন্ত দু’ রাক’আতের অতিরিক্ত আদায় করেননি। আর আল্লাহ তাআ’লা বলেছেন, “নিশ্চয়ই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মধ্যে রয়েছে তোমাদের জন্য উত্তম আদর্শ। (সহিহ মুসলিম হাদিস ১৪৫২ ইসলামি ফাউন্ডেশন)।

হাফস ইবনু ‘আসিম (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার মক্কা-মাদীনার পথে ‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘উমারের সাথে থাকার আমার সৌভাগ্য ঘটেছে। (যুহরের সলাতের সময় হলে) তিনি আমাদেরকে দু’ রাক্‘আত সলাত (জামা‘আতে) আদায় করালেন। এখান থেকে তাঁবুতে ফিরে গিয়ে তিনি দেখলেন, লোকেরা দাঁড়িয়ে আছে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, লোকেরা এটা কি করছে? আমি বললাম, তারা নফল সলাত আদায় করছে। তিনি বললেন, আমাকে যদি নফল সলাতই আদায় করতে হয়, তাহলে ফরয সলাতই তো পরিপূর্ণভাবে আদায় করা বেশী ভাল ছিল। কিন্তু যখন সহজ্জ করার জন্য ফরয সালাত কসর আদায়ের হুকুম হয়েছে, তখন তো নফল সলাত ছেড়ে দেয়াই উত্তম। আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে থাকার সৌভাগ্যও পেয়েছি। তিনি সফরের অবস্থায় দু’ রাক্‘আতের বেশী (ফরয) সলাত আদায় করতেন না। আবূ বাকর, ‘উমার, ‘উসমান (রাঃ)-এর সাথে চলারও সুযোগ আমার হয়েছে। তারাও এভাবে দু’ রাক্‘আতের বেশী আদায় করতেন না। (মিসকাত ১৩৩৮, সহীহ বুখারী ১১০২, সহিহ মুসলিম ৬৮৯, সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ৫৫০৭, আবূ দাঊদ ১২২৩।

অবশ্য সাধারণ নফল, তাহাজ্জুদ, চাশত, তাহিয়্যাতুল মাসজিদ প্রভৃতি নামায সফরে পড়া চলে। যেমনঃ ফরয নামাযের আগে-পরেও নফলের নিয়তে নামায পড়া দূষণীয় নয়।

মক্কা বিজয়ের দিন উম্মেহানীর ঘরে তিনি চাশতের নামায পড়েছেন। উম্মে হানী (রাঃ) ব্যতিত অন্য কেউ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সালাতুয যুহা (পূর্বাহ্ন এর সালাত) আদায় করতে দেখেছেন বলে আমাদের জানাননি।

উম্মে হানী (রাঃ) বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা বিজয়ের দিন তাঁর ঘরে গোসল করার পর আট রাকা’আত সালাত আদায় করেছেন। আমি তাঁকে এর চাইতে সংক্ষিপ্ত কোন সালাত আদায় করতে দেখিনি, তবে তিনি রুকূ’ ও সিজদা পূর্ণভাবে আদায় করেছিলেন। লায়স (রহঃ) আমির ইবনু রাবীআ’ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে রাতের বেলা বাহনের পিঠে বাহনের গতিমুখী হয়ে নফল সালাত আদায় করতে দেখেছেন। (সহিহ বুখারী ১০৪০ ইফাঃ)।

 এ ছাড়া তিনি সফরে উটের পিঠে নফল ও বিতের নামায পড়তেন। 

আমীর ইবনু রাবী’আ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে দেখেছি, তিনি সাওয়ারীর উপর উপবিষ্ট অবস্থায় মাথা দিয়ে ইশারা করে সে দিকেই সালাত আদায় করতেন যে দিকে সাওয়ারী ফিরত। কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফরয সালাতে এরূপ করতেন না। সালিম (রহঃ) থেকে বর্ণিত, আবদুল্লাহ (রাঃ) সফরকালে রাতের বেলায় সাওয়ারীর উপর থাকা অবস্থায় সালাত আদায় করতেন, কোন্ দিকে তাঁর মুখ রয়েছে সে দিকে লক্ষ্য করতেন না এবং ইবনু উমর (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাওয়ারীর উপর নফল সালাত আদায় করেছেন, সাওয়ারী যে দিকে মুখ ফিরিয়েছে সেদিকেই এবং তার বিত্‌র ও আদায় করেছেন। কিন্তু সাওয়রীর উপর ফরয সালাত আদায় করতেন না। (সহিহ বুখারী ১০৩৫ ইফাঃ)।

জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাওয়ার থাকাবস্থায় কিবলা ছাড়া অন্য দিকে মুখ করে নফল সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করেছেন।(সহিহ বুখারী ১০৩২ ইফাঃ)।

মন্তব্যঃ অনেক আলেম বলে থাকের সফর অবস্থায় নফল সুন্নাহ সালাত ছেড়ে দিবে শুধে ফজরের দুই রাকআত সুন্নাহ ব্যাতিত। সফর অবস্থায় যদি কোথাও হোটেলে বা বাড়িতে অবস্থান করে তার কোন প্রকার সফরের ক্লান্তি না তাকে তবে সে নফল সুন্নাহ সালাত আদায় করতে পারে।

সফর শুরুর পর কত দুর পর মুসাফিরের হুকুম হয়ঃ

আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে মদিনায় যুহরের সালাত চার রাকা’আত আদায় করেছি এবং যুল-হুলাইফায় আসরের সালাত দু’রাকা’আত আদায় করেছি। (সহীহ বুখারী ১০২৮ ও সহিহ মুসলিম ১৪৫৫ ইসলামি ফাউন্ডেশন সহিহ আবু দাউদ ১০৮৫, তিরমিজী হাদিস নম্বরঃ ৫৪৬)

যুহায়র ইবনু হারব (রহঃ) ও মুহাম্মাদ ইবনে বাশশার রহঃ যুহায়র ইবনু নুফায়র (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি শুরাহবিল ইবনুল সিম্‌ত (রহঃ) এর সঙ্গে একটি গ্রামের দিকে রওনা দিলাম, যা সতের বা আঠার মাইলের মাথায় অবস্থিত। তারপর তিনি দু’ রাক’আত সালাত পড়লেন। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন, আমি উমর (রাঃ) কে দেখেছি, তিনি যুল হুলায়ফায় দু’ রাক’আত পড়েছেন। এ বিষয়ে তাঁকে আমি জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে যেরূপ করতে দেখেছি, সেরূপই করছি। (সহিহ মুসলিম ১৪৫৭ ইফাঃ)।

ইয়াহিয়া ইবনু ইযায়ীদ আল হুনাঈ (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) এর নিকট সালাত কসর করা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন, রাসুলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন সফরের উদ্দেশ্যে তিন মাইল অথবা (রাবী শুবার সন্দেহ) তিনি তিন ফারসাখ পথ অতিক্রম করতেন, তখন দু’রাকআত পড়তেন। (সহিহ মুসলিম হাদিস নম্বর ১৪৫৬ ইসলামি ফাউন্ডেশন)।

মন্তব্যঃ সফল শুরু করার পর নিজ এলাকা ত্যাগ করার সাথে সাথেই সফরকারির উপর মুসাফিরের হুকুম কার্যকর হবে। হাদিসের আলোকে বুঝা যায়  নিজ এলাকা ত্যাগ প্রায় তিন মাইল বা ছয় কিলোমিটারের মত দুরে গেলেই সালাত কসর করতে পারবে।

মিনায় সালাত কসর করাঃ

ক। হজ্জের সময় প্রথম দফায় মিনায় সালাত কসর করাঃ

প্রথম দফায় ইহরাম বাঁধার পর হাজিগণ মিনার দিকে রওয়ানা হয়ে যাওয়াই হলো সুন্নাত তরিকা। সূর্য ঢলার পূর্বে হোক আর পরে হোক ৮ জিলহজ্জ মিনায় পৌছাইতে চেষ্টা করা। মিনায় পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা অর্থাৎ ৮ জিলহজ্জ ‘জোহর, আসর, মাগরিব, ইশা এবং ৯ জিলহজ্জ সকালের ফজর নামাজসহ এ পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা মোস্তাহাব। মিনায় থাকাকালীন সময়ে মক্কার অবস্থানকারী বা বহিরাগত সকলকে প্রত্যেক নামাজ সুন্নাত মোতাবেক পড়ার নিয়ম হলো, প্রত্যেক ওয়াক্ত (জোহর, আসর ও ইশা) নামাজ উহার নির্দিষ্ট সময়ে কসর পড়া। মাগরিব ও ফজর নামাজ ব্যতিত, কেননা এ দুই নামাজে কসর নেই।

দলিলঃ

১. ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম মিনায় যুহর ও ফজরের নামায (অর্থাৎ যুহর হতে পরবর্তী ফজর পর্যন্ত পাঁচ ওয়াক্তের নামায) আদায় করলেন। তারপর ভোরেই আরাফাতের দিকে যাত্রা শুরু করেন। (সুনানে তিরমিজি ৮৮০, হাদিসের মান সহিহ)

২. ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, আমাদের নিয়ে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মিনায় যুহর, আসর, মাগরিব, এশা ও ফজরের নামায আদায় করলেন, তারপর ভোরে যাত্রা শুরু করেন আরাফাতের দিকে। (সুনানে তিরমিজি ৮৭৯ হাদিসের মান সহিহ)

খ। দ্বিতীয় দফায় মিনায় সালাত কসর করার যৌক্তিকতাঃ

দ্বিতীয় দফায় ১০ জিলহজ্জ সকালের ফজর সালাত আদায় করে মুজদালিফা থেকে আবার মিনায় আসা হয়। এ সময় একটাকা ৪/৫ দিন মিনায় অবস্থান করা ওয়াজিব। এই সময়ও সালাতের কসর আদায় করেত হবে। তবে অনেকে পূর্ণ সালাতও আদায় করে থাকে। তাদেরও দলিল আছে। দুটি দলিল পাশাপাশি রেখে তুলনা করলে মিনার সকল সালাত কসরই হবে বলে মনে হবে। সে যা হোক আপনি অধিক যৌক্তিক ও হাদিস সম্মত কসরই আদায় করবেন তবে যদি কেউ কোন দলিলের আলোকে এখানে সালাত কসর না করে তবে তাকে ভতসনা করা যাবে না। তার সাথে বিবাদে জড়ান যাবে না।

দলিলঃ

১. আবদুল্লাহ ইব্‌নু ‘উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম মিনায় দু’রাক’আত সালাত আদায় করেছেন এবং আবূ বকর, ‘উমর (রাঃ) -ও। আর ‘উসমান (রাঃ) তাঁর খিলাফতের প্রথম ভাগেও দু’রাক’আত আদায় করেছেন। (সহিহ বুখারি ১৬৫৫)

২. হারিসা ইব্‌নু ওয়াহব খুযা’য় (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের নিয়ে মিনাতে দু’ রাক’আত সালাত আদায় করেছেন। এ সময় আমরা আগের তুলনায় সংখ্যায় বেশি ছিলাম এবং অতি নিরাপদে ছিলাম। (সহিহ বুখারি ১৬৫৬)

৩. হারিসা ইবনু ওয়াহব (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, পূর্ণ নিরাপত্তা বজায় থাকা অবস্থায় আমি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাথে সর্বাধিক সংখ্যক লোকসহ মিনায় (চার রাক’আত ফরযের স্থলে) দুই রাক’আত নামায আদায় করেছি। (তিরমিজ ৮৮২, আবূ দাউদ ১৭১৪)

৪. হারিছা ইব্‌ন ওয়াহ্‌ব খুযায়ী (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, আমি একদা নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাথে মিনায় দু’রাকআত সালাত আদায় করলাম অথচ মানুষ তখন অধিক নিরাপদ ছিল। (নাসাঈ ১৪৪৫)

গ। মিনায় মতভেদ করে পুর্ণ সালাত আদায়ঃ

১. আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি (মিনায়) নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে দু’ রাক’আত সালাত আদায় করেছি। আবূ বকর (রাঃ)-এর সাথে দু’ রাক’আত এবং ‘উমর (রাঃ)-এর সাথেও দু’ রাক’আত আদায় করেছি। এরপর তোমাদের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে [অর্থাৎ ‘উসমান (রাঃ)-এর সময় থেকে চার রাক’আত সালাত আদায় করা শুরু হয়েছে] হায়! যদি চার রাক’আতের পরিবর্তে মকবূল দু’ রাক’আতেই আমর ভাগ্যে জুটত! (সহিহ বুখারী ১৫৫৪ ইফাঃ)

২. আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, আমি (মিনায়) নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাথে দু’ রাক’আত সালাত আদায় করেছি। আবূ বকর এর সাথে দু’ রাক’আত এবং ‘উমর-এর সাথেও দু’ রাক’আত আদায় করেছি। এরপর তোমাদের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে (অর্থাৎ ‘উসমান (রাঃ) -এর সময় হতে চার রাক’আত সালাত আদায় করা শুরু হয়েছে) আহা! যদি চার রাক’আতের পরিবর্তে মকবূল দু’ রাক’আতই আমার ভাগ্যে জুটত! (সহিহ বুখারি ১৬৫৭)

৩. উসমান (রাঃ) এই চার রাকআত পুরো আদায় করার বিরোধীতা করে আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাঃ)। সহিহ বুখারীতে এসেছেঃ

ইবরাহীম (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আবদুর রহমান ইবনু ইয়াযীদ (রহঃ) কে বলতে শুনেছি, উসমান ইবনু আফফান (রাঃ) আমাদেরকে নিয়ে মিনায় চার রাকা’আত সালাত আদায় করেছেন। তারপর এ সম্পর্কে আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাঃ) কে বলা হল, তিনি প্রথমে ‘ইন্না লিল্লাহ্’ পড়লেন। এবপর বললেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে মিনায় দু’ রাকা’আত পড়েছি, আবূ বকর (রাঃ) এর সঙ্গে মিনায় দু’রাকা’আত পড়েছি এবং উমর ইবনু খাত্তাব (রাঃ) এর সঙ্গে মিনায় দু’রাকা’আত পড়েছি। কতই না ভাল হতো যদি চার রাকা’আতের পরিবর্তে দু’রাকা’আত মাকবূল সালাত হতো। (সহীহ বুখারী ১০২৩ ইসলামি ফাউন্ডেশন)

মন্তব্যঃ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কাবাসী ও অন্যান্য স্থানের অধিবাসীদের নিয়ে মিনা, আরাফা ও মুযদালিফায় কসর নামাজ পড়েছিলেন। মক্কাবাসীদের সম্পূর্ণ নামাজ পড়তে নির্দেশ দেন নাই। চার রাকআত বিশিষ্ট ফরয নামাযগুলো দু’রাকআত করে পড়তে হবে। সে নামাযগুলো হলো যুহর, আসর ও এশা। হজ্জের সময় মিনা, আরাফা ও মুয্দালিফায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কার ভিতরের ও বাইরের সকল লোককে নিয়ে এ সালাতগুলো কসর করে পড়েছিলেন, এটা সুন্নাত। এ ক্ষেত্রে তিনি মুকীম বা মুসাফিরের মধ্যে কোন পার্থক্য করেননি। অর্থাৎ মক্কার লোকদেরকেও চার রাকআত করে পড়তে বলেননি। (ফাতাওয়া ইবনে তাইমিয়া ও ফাতাওয়া ইবনে বায)

তবে মনে রাখতে হবে যে, ফজর ও মাগরিবের ফরয নামায অর্থাৎ দুই এবং তিন রাকআত বিশিষ্ট নামায কখনো কসর হয় না। মিনাতে প্রত্যেক সালাত ওয়াক্ত মত আদায় করবেন, জমা করবেন না। অর্থাৎ যুহর-আসর একত্রে এবং মাগরিব-এশা একত্রে পড়বেন না। এমনকি মুসাফির হলেও না। (প্রশ্নোত্তরে হজ্জ ও উমরা, অধ্যাপক মোঃ নূরুল ইসলাম)

কাজেই সুন্নাহ দ্বারা প্রমানিত মিনায় সালাত চার নয় দুই বাকআতই আদায় করা উত্তম। কিন্তু কেউ পূর্ণ সালাত আদায় করলে তাদের গবেষণার উপর ছেড়ে দিতে হবে। তাদের সামনে সহিহ হাদিসগুলি তুলে ধরে বুঝাতে হবে। এ নিয়ে ফতোয়াবাজী করে উম্মতের ঐক্য নষ্ট করা যাবেনা। কারন আমাদের অনুকরনী তৃতীয় খলীফা ওসমান (রাঃ) শেষের দিকে পূর্ণ সালাত আদায় করেছেন বলে প্রমানিত যদিও আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাঃ) তার বিরোধীতা করেছেন।

সফরের চারটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান: দ্বিতীয় কিস্তি

সালাত জমা করার বিধান

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

সফরের কষ্টের কথা বিবেচনা করে ইসলাম সফর বা ভ্রমণকারীর জন্য ইসলামী বিধানে কিছুটা রুখসত বা ছাড় দিয়েছে। সালাত মহান আল্লাহ এমন এক আদেশ যাকে কোন অবস্থায়ই পরিত্যাগ করা যাবে না, তাই সে সফরে থাকুক আর বাড়িতে থাকুন। কিন্তু মহান আল্লাহ সফরের সময় সালাতের ব্যাপারে আমাদের প্রতি কিছুটা সহনশীলতা প্রদর্শণ করেছেন। ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হওয়া সত্বেও সফর বা ভ্রমণকরীর জন্য চার রাকআত বিশিষ্ট সালাতকে কসর করে বা কমিয়ে দুই রাকআত করেছেন। শুধু সালাত নয় সফরে আরও কয়েকটি হুকুমের ব্যাপারে মহান আল্লাহ কিছুটা ছাড় বা রুখসত প্রদান করেছেন। সফরে থাকা কালিন সময়ে সফরকারিকে মুসাফির বলা হয়। মুসাফির ব্যক্তি সব সময় চারটি রুখসত বা ছাড়ের অধিকারী হবে। সে চারটি রুখসত হলঃ

১। সালাতকে কসর করে আদায়

২। সালাতকে জমা করা।

৩। সফরে তিন দিন ও তিন রাত্রি পর্যন্ত মোজার উপর মাসেহ করা

৪। সফর অবস্থায় রমযানের সিয়াম ভঙ্গ করা

সালাত জমা করাঃ

সালাত জমা করার অর্থ হল দুই ওয়াক্তের সালাত কে একত্রে আদায় করা। অর্থাৎ যুহর ও আসরের এবং মাগরিব ও ইশার সালাত একত্রে আদায় করা। মুসল্লী আসরের সালাত এগিয়ে এনে যোহরের সময়ে প্রথম যোহর তারপর আসর আদায় করবে। অথবা যোহরকে এমনভাবে দেরী করা যে যোহরের ওয়াক্ত শেষ হয়ে যাবে, তারপর আসরের ওয়াক্ত আসলে প্রথমে যোহর আদায় করে তারপর আসরের সালাত আদায় করা। অনুরূপভাবে মাগরিব ও ইশার ক্ষেত্রেও যোহর ও আসরের মত আদায় করা। অর্থাৎ মাগরিবের সময়ে ইশাকে এগিয়ে এনে প্রথমে মাগরিব তারপর ইশার সালাত আদায় করবে। অথবা মাগরিবকে এমনভাবে পিছিয়ে দিবে যে মাগরিবের সময় শেষ হয়ে যাবে, তারপর ইশার ওয়াক্ত হলে সেখানে প্রথমে মাগরিব আদায় করে তারপর ইশার সালাত আদায় করে নিবে।

আরাফা ও মুজদালিফায় সালাত জমা করাঃ

হাজিরা আরাফাতের ময়দানের জোহর ও আসরের একত্রে আদায় করে। আবার মুজদালীফায় মাগরিব ও ইশার সালাত একত্রে আদায় করে। তবে ফজরের সাথে কোন সালাত একত্র জমা করা যাবে না, ঠিক তেমনি মাগরিবের সাথে আসরের সালাত ও জমা করা যাবে না।

ইব্‌নু উমর (রাঃ) ইমামের সাথে সালাত আদায় করতে না পারলে উভয় সালাত একত্রে আদায় করতেন।

যে বছর হাজ্জাজ ইব্‌নু ইউসুফ ইব্‌নু যুবাইরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন, সে বছর তিনি ‘আবদুল্লাহ (রাঃ) কে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আরাফার দিনে উকূফের সময় আমরা কিরূপে কাজ করব? সালিম (রহঃ) বললেন, আপনি যদি সুন্নাতের অনুসরণ করতে চান তাহলে ‘আরাফার দিনে দুপুরে সালাত আদায় করবেন। ‘আবদুল্লাহ ইব্‌নু ‘উমর (রাঃ) বলেন, সালিম ঠিক বলেছে। সুন্নাত মুতাবিক সাহাবীগণ যুহর ও ‘আসর এক সাথেই আদায় করতেন। (বর্ণনাকারী বলেন) আমি সালিমকে জিজ্ঞেস করলাম, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও কি এরূপ করেছেন? তিনি বললেন, এ ব্যাপারে তোমরা কি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নাত ব্যতীত অন্য কারো অনুসরণ করবে? (সহিহ বুখারি ১৬৬২

ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন দ্রুত সফর করতেন, তখন মাগরিব ও ইশা একত্রে আদায় করতেন। ইবরাহীম ইবনু তাহমান (রহঃ) … ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, সফরে দ্রুত চলার সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুহর ও আসরের সালাত একত্রে আদায় করতেন আর মাগরিব ইশা একত্রে আদায় করতেন। আর হুসাইন (রহঃ)

আনাস ইবনু মলিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সফরকালে মাগরিব ও ইশার সালাত একত্রে আদায় করতেন এবং আলী ইবনু মুবারকও হারব (রহঃ) আনাস (রাঃ) থেকে হাদীস বর্ণনায় হুসাইন (রহঃ) এর অনুসরণ করেছেন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একত্রে আদায় করেছেন। (সহীহ বুখারী ১০৪২ ইফাঃ)।

আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে দেখেছি যখন সফরে তাঁকে দ্রুত পথ অতিক্রম করতে হত, তখন মাগরিবের সালাত এত বিলম্বিত করতেন যে মাগরিব ও ইশা একত্রে আদায় করতেন। সালিম (রহঃ) বলেন, আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাঃ) ও দ্রুত সফরকালে অনুরূপ করতেন। তখন ইকামতের পর মাগরিব তিন রাকা’আত আদায় করতেন এবং সালাম ফিরাতেন। তারপর অল্প সময় অপেক্ষা করেই ইশা-এর ইকামাত দিয়ে তা দু’রাকা’আত আদায় করে সালাম ফিরাতেন। এ দু’য়ের মাঝে কোন নফল সালাত আদায় করতেন না এবং ইশার পরেও না। অবশেষে মধ্যরাতে (তাহাজ্জুদের জন্য) উঠতেন। (সহীহ বুখারী ১০৪৩ ইফাঃ)

আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সফরে এ দু’সালাত একত্রে আদায় করতেন অর্থাৎ মাগরিব ও ইশা। (সহিহ বুখারী  ১০৪৪ ইফাঃ)।

আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সূর্য ঢলে পড়ার আগে সফর শুরু করলে আসরের ওয়াক্ত পর্যন্ত, যুহর বিলম্বিত করতেন এবং উভয় সালাত একত্রে আদায় করতেন। আর (সফর শুরু করার আগেই) সূর্য ঢলে গেলে যুহর আদায় করে নিতেন। এরপর (সফরের উদ্দেশ্যে) আরোহণ করতেন। (সহীহ বুখারী  ১০৪৫ ও ১০৪৬ ইফাঃ)।

যুদ্ধের সময় দুই সালাত একত্রে আদায়ঃ

সাঈদ ইবনু যুবায়র (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, ইবনু আব্বাস (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাবুকের যুদ্ধে সফরকালে যুহর ও আসর এবং মাগরিব ইশা একত্রে আদায় করেন। সাঈদ বলেন, আমি ইবনু আব্বাস (রাঃ) কে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, তাঁকে তা করতে কিসে উদ্বুদ্ধ করেছিল? তিনি বলেন, তাঁর উদ্দেশ্য তার উম্মাতকে কষ্টে না ফেলা। (সহিহ মুসলিম ১৫০৩ ইফাঃ)

মু’আয ইবনু জাবাল (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাবুকের যুদ্ধের সময় যোহর ও আসর এবং মাগরিব ও ইশার সালাত একত্রে আদায় করেন। তিনি বলেন, আমি জিজ্ঞাসা করলাম, তার এইরূপ করার কারণ কি? তিনি বলেন, তাঁর উদ্দেশ্য ছিল, তাঁর উম্মাতকে কষ্ট না দেওয়া। (সহিহ মুসলিম ১৫০৫ ইফাঃ)

উপরের হাদিস দ্বারা বুঝা যায় বিভিন্ন কারনে সালাত জমা করা যায়। তবে সালাত জমা করা অন্যতম কারন হিসাবে সফরকে ধরা হলেও একমাত্র কারন নয়। মুসফির যে কারনে সালাত কসর করে ঠিক সেই কারনে সালাত জমা করা বৈধ। হাদিসের আলোকে দেখতে পাই যে কোন সংকটের কারনে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সালাত জমা করেছেন। যেমনঃ তিনি যুদ্ধের সময় দুই সালাত একত্রে আদায় করছেন। বৃষ্টির কারণে যদি মসজিদে যেতে কষ্ট হয়, তবে দু’নামাযকে একত্রিত করা যাবে। ঠিক তেমনি ভাবে, শীতকালে যদি কঠিন ঠান্ডা বাতাস প্রবাহিত হয় এবং সে কারণে মসজিদে যাওয়া কষ্টকর হয় তবে দু’নামাযকে একত্রিত করবে। নিজের মূল্যবান সম্পদের ক্ষতি বা নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশংকা থাকে তবে দু’নামাযকে একত্রিত করবে। এছাড়া এ ধরণের আরো কোন কঠিন সমস্যার সম্মুখিন হলে দু’নামাযকে একত্রিত করবে।

এমন কি মুকিম অবস্থায়ও যে কেউ চাইলে সালাত জমা করতে পারে। যেমনঃ

ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সফর অথবা ভয়-ভীতি ছাড়াই মদিনায় যুহর ও আসরের সালাত একত্রে আদায় করেছেন। আবূ যুবায়র (রহঃ) বলেন, আমি সাঈদকে জিজ্ঞাসা করলাম কেন এইরুপ করলেন? তিনি বললেন, তুমি যেমন আমাকে জিজ্ঞাসা করেছ, আমিও তেমনি ইবনু আব্বাসকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম। তখন তিনি বললেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উদ্দেশ্য ছিল, তার উম্মাতেরকাউকে কষ্ট না দেওয়া। (সহিহ মুসলিম ১৫০২ ইফাঃ)

মন্তব্যঃ মুকিম অবস্থায় সংকট ছাড়া কেউ সালাত জমা করার ব্যাপারে মতামত দেননি। শাইখ মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-উসাইমীন রাহিমাহুল্লাহ বলেন, মানুষ যখনই দু’নামাযকে একত্রিত না করলে সমস্যা বা সংকটের সম্মুখিন হবে তখনই একত্রিত করণ তার জন্য বৈধ হয়ে যাবে। আর সমস্যা না হলে একত্রিত করবে না। কিন্তু যেহেতু সফর মানেই সমস্যা ও সংকট তাই মুসাফিরের জন্য দু’নামাযকে একত্রিত করা জায়েয। চাই তার সফর চলমান হোক বা কোন স্থানে অবস্থান করুক। তবে সফর চলমান থাকলে একত্রিত করা উত্তম। আর সফরে গিয়ে কোন গৃহে বা হোটেলে অবস্থান করলে একত্রিত না করাই উত্তম। কিন্তু মুসাফির যদি এমন শহরে অবস্থান করে যেখানে নামায জামাআতের সাথে অনুষ্ঠিত হয়, তখন জামাআতের সাথে নামায আদায় করা ওয়াজিব। ঐ সময় নামায কসরও করবে না একত্রিতও করবে না। কিন্তু জামাআত ছুটে গেলে কসর করবে একত্রিত করবে না। অবশ্য একত্রিত করা জরূরী হয়ে পড়লে করতে পারে। (ফাতাওয়া আরকানুল ইসলাম)

আলেমগণ দু’সালাত একত্রে আদায় বা জমা করার ব্যাপারে মতভেদ করেছেন। এমই কিছু ইজতিহাদ ধর্মী কথা উল্লেখ করছিঃ

১. অধিকাংশ আলেম যেমন মালেকী, শাফেয়ী, হাম্বলীগণ এ মত পোষণ করেছেন যে, সফরের কারণে যোহর এবং আসর অনুরূপভাবে মাগরিব ও ইশার সালাতকে একত্রে আদায় করা জায়েয। (আশ-শারহুল কাবীর, ১/৩৬৮; মুগনিল মুহতাজ, ১/৫২৯, কাশশাফুল কিনা‘, ২/৫)

২. হানাফী আলেমগণ বলেন, আরাফা ও মুযদালিফা ব্যতীত দু’ ফরয সালাতকে একত্র করে আদায় করা যাবে না। তবে আকৃতিগতভাবে একত্রিত করা যাবে, আর তা হচ্ছে যোহরকে তার শেষ সময় পর্যন্ত দেরী করে আদায় করা তারপর আসরকে তার প্রথম ওয়াক্তে আদায় করা। (আদ-দুররুল মুখতার ওয়া হাশিয়া ইবন আবেদীন, ১/৩৮১]

৩. শাফে‘ঈ ও হাম্বলীদের নিকট যদি দ্বিতীয় সালাতকে এগিয়ে নিয়ে এসে প্রথম ওয়াক্তে দু’সালাতকে একত্রে পড়ে তবে সেখানে দ্বিতীয় সালাতকে আদায় করার নিয়্যত প্রথম সালাত আদায়ের সময়েই থাকতে হবে। অবশ্য যদি প্রথম সালাতকে দেরী করে দ্বিতীয় সালাতের সময়ে নিয়ে যায় তখন প্রথম সালাত আদায়ের সময় দ্বিতীয় সালাতকে একত্রিত করার নিয়্যত লাগবে না। সে হিসেবে যদি প্রথম সালাত আদায় করার সময় দ্বিতীয় সালাতকে এগিয়ে নিয়ে আদায় করার নিয়্যত না করে তবে তার জমা বা একত্রিত করে আদায় করা শুদ্ধ হবে না। [রাওদাতুত তালেবীন, ১/৩৯৬; কাশশাফুল কিনা‘ ২/৮]

৪. মালেকী মাযহাবের আলেমগণের মতে, প্রথম সালাত আদায় করার সময়ে দ্বিতীয় সালাতকে তার সাথে জমা করার নিয়্যত করা ওয়াজিব কিন্তু শর্ত নয়। (আর তা দ্বিতীয় সালাতকে এগিয়ে নিয়ে আসা বা প্রথম সালাতকে দেরীতে আদায় করা উভয় ক্ষেত্রেই সমান) সুতরাং যদি কেউ প্রথম সালাত আদায়ের সময় দ্বিতীয় সালাতকে জমা নিয়্যত করা ছেড়ে দিল, তবে তাতে সালাত বাতিল হবে না। [হাশিয়াতুল আদাওয়ী (১/৩৩৫)]

৫. আর এক বর্ণনায় ইমাম আহমাদ, ইমাম মুযানী এবং ইবন তাইমিয়্যাহ বলেন, প্রথম সালাত আদায়ের সময় দ্বিতীয় সালাত তার সাথে একত্রিত করার নিয়্যতের বাধ্য-বাধকতা নেই। [আল-মুহাযযাব, (১/১৯৭); আল-ইনসাফ:২/৩৪১]

সফরের চারটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান: তৃতীয় কিস্তি

কাপড়ের তৈরী মোজার উপর মাসেহ করার বিধান

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

সফরের কষ্টের কথা বিবেচনা করে ইসলাম সফর বা ভ্রমণকারীর জন্য ইসলামী বিধানে কিছুটা রুখসত বা ছাড় দিয়েছে। সালাত মহান আল্লাহ এমন এক আদেশ যাকে কোন অবস্থায়ই পরিত্যাগ করা যাবে না, তাই সে সফরে থাকুক আর বাড়িতে থাকুন। কিন্তু মহান আল্লাহ সফরের সময় সালাতের ব্যাপারে আমাদের প্রতি কিছুটা সহনশীলতা প্রদর্শণ করেছেন। ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হওয়া সত্বেও সফর বা ভ্রমণকরীর জন্য চার রাকআত বিশিষ্ট সালাতকে কসর করে বা কমিয়ে দুই রাকআত করেছেন। শুধু সালাত নয় সফরে আরও কয়েকটি হুকুমের ব্যাপারে মহান আল্লাহ কিছুটা ছাড় বা রুখসত প্রদান করেছেন। সফরে থাকা কালিন সময়ে সফরকারিকে মুসাফির বলা হয়। মুসাফির ব্যক্তি সব সময় চারটি রুখসত বা ছাড়ের অধিকারী হবে। সে চারটি রুখসত হলঃ

১। সালাতকে কসর করে আদায়

২। সালাতকে জমা করা।

৩। সফরে তিন দিন ও তিন রাত্রি পর্যন্ত মোজার উপর মাসেহ করা

৪। সফর অবস্থায় রমযানের সিয়াম ভঙ্গ করা

কাপড়ের তৈরী মোজার উপর মাসেহ করার বিধান কি?

মোজার উপর মাসেহ করা সম্পর্রে কারো কোন দ্বিমত নেই। এ সম্পর্কে অসংখ্যা সহিহ হাদিস বিদ্যমান। প্রায় সত্তর জনের সাহাবা রাদিয়াল্লাহু আনহু মোজা মাসাহ সংক্রান্ত হাদীস বর্ণনা করেছেন। কসর সালাত ও তাইয়ামুমের মত মোজার উপর মাসেহ করার বিধান মহার আল্লাহর পক্ষ থেকে উম্মতে মুহাম্মাদির উপর জন্য বিশেষ এহসান।

আব্দুল্লাহ ইবন উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “আল্লাহ তা‘আলা পছন্দ করেন তাঁর দেওয়া সুবিধাদি গ্রহণ করা। যেমনিভাবে তিনি অপছন্দ করেন তাঁর শানে কোনো পাপ সংঘটন করা”।(ইবন খুযাইমাহ ৯৫০, ২০২৭)।

আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ ও ‘আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণিত, তারা বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “আল্লাহ তা‘আলা পছন্দ করেন তাঁর দেওয়া সুবিধাদি গ্রহণ করা। যেমনিভাবে তিনি পছন্দ করেন তাঁর দেওয়া ফরযগুলো পালন করা”। ( ইবন হিব্বান ৩৫৬৮)।

ঈদের দিনে রোজা রাখা হারাম কারন ঈদের দিন আল্লাহ আনন্দ করার হুকুম দিয়েছেন। তাই শরীয়তের বিধান জেনে  যখন যা সহজ্জ তার জন্য তাই করা উত্তম। অতএব, যে ব্যক্তি মোজা পরিধান করাবস্থায় রয়েছে এবং তার মোজায় মোজা মাসাহ’র শর্তগুলোও পাওয়া যাচ্ছে তার জন্য উচিত মোজা না খুলে মোজার উপর মাসাহ করা। কারণ, তাতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবীদের অনুসরণ ও অনুকরণ করা হবে।

এই সহজ্জ বিধান কে  সুন্নাহ সম্মতভাবে আদায় করতে গিয়ে একটি বিতর্ক চলছে তা হল মোজার ধরণ নিয়ে মুজা কি চামড়ার হবে, নাকি কাপড়ের হলেও চলবে।

চমাড়ার মোজার উপর মাসাহ করা নিয়ে কোন মতভেদ বা ইকতিলাব নেই। এ ব্যাপার সকল উম্মত একমত বা ইজমা হয়েছে। কাপড়ের মোজার উপর মাসাহ করা নিয়ে কোর মতভেদ বা ইকতিলাব আছে। তাই বিষয়টি নিয়ে দুই পক্ষের আলেমদের মতামত তুলে ধরব যাতে সহজে সঠিক মত গ্রহন করা সহজ্জ হয়।

যারা কাপড়ের মোজার উপর মাসাহ করাকে জায়েয মনে করে নাঃ

উপমহাদেশের প্রায় সকল হানফী মাযহাবের অনুসারী আলেমগন চমাড়ার মোজার উপর মাসাহ করা শরীয়ত সম্মত বললেও কাপড়ের মোজার উপর মাসাহ করাকে জায়েয মনে করে না। তাদের প্রায় সকল আলেমের ঐক্যমত হল :

“আমাদের দেশের প্রচলিত কাপড়ের মোজার উপর মাসেহ করা কিছুতেই জায়েজ নয়”

যেমন কওমী মাদ্রাদার আলের যারা হানাফি মাযহারভুক্ত তাদের কতৃর্ক প্রকাশিত মাসিক আল কাউসার পত্রিকার ১৮০৩ নম্বর প্রশ্ন ছিলঃ

প্রশ্নঃ এক খতীব সাহেবকে জুমআর বয়ানে বলতে শুনেছি যে, মোজার উপর মাসেহ বৈধ হওয়ার জন্য তা চামড়ার হওয়া জরুরি নয়। বরং আমাদের দেশে প্রচলিত সব ধরনের মোজার উপর মাসেহ করা জায়েয। চাই তা সুতার হোক বা পশমের হোক বা অন্য কোনো কিছুর হোক। জানতে চাই, তার এ কথা কতটুকু সঠিক? (মুহাম্মাদ মাহমুদ হাসান, ধানমণ্ডি, ঢাকা থেকে)

উত্তরঃ

খতীব সাহেবের ঐ কথা ঠিক নয়। চামড়ার মোজার উপর মাসেহ জায়েয আছে। কিন্তু চামড়া ছাড়া সুতা বা পশমের তৈরি যেসব মোজা সচরাচর পাওয়া যায় এর উপর মাসেহ সহীহ নয়। তবে সুতা বা পশমের মোজায় নিম্নোক্ত শর্তগুলো পাওয়া গেলে তার উপর মাসেহ জায়েয হবে। শর্তগুলো হচ্ছে :
ক) মোজা এমন মোটা ও পুরু হওয়া যে, জুতা ছাড়া শুধু মোজা পায়ে দিয়ে তিন মাইল পর্যন্ত হাঁটা যায়। এতে মোজা ফেটে যায় না এবং নষ্টও হয় না।

খ) পায়ের সাথে কোনো জিনিস দ্বারা বাঁধা ছাড়াই তা লেগে থাকে এবং তা পরিধান করে হাঁটা যায়। 
গ) মোজা এমন মোটা যে, তা পানি চোষে না এবং তা ভেদ করে পানি পা পর্যন্ত পৌঁছায় না।
ঘ) তা পরিধান করার পর মোজার উপর থেকে ভিতরের অংশ দেখা যায় না। সচরাচর ব্যবহৃত সুতা বা পশমের মোজায় যেহেতু এসব শর্ত পাওয়া যায় না তাই এর উপর মাসেহ জায়েয হবে না।

হানফী মাযহারের আরেক জন আলেম মুফতি লুৎফুর রহমান ফরায়েজী যিনি তালীমুল ইসলাম ইনষ্টিটিউট এন্ড রিসার্চ সেন্টার, ঢাকা এর পরিচালক। তিনি ও উক্ত শর্ত ৪ টি ঊল্লেখ করেন অতপর বলেন, সুতরাং পরিস্কার হয়ে গেল যে, আমাদের দেশের প্রচলিত কাপড়ের পাতলা মোজার উপর মাসাহ করা কিছুতেই জায়েজ নয়।

হানফী মাযহারের আরেক বিশ্ব বিখ্যাত আলেম মুফতি ত্বকি উসমানি। তিনি করাচি থেকে প্রকাশিত মাসিক ‘আল বালাগ’ এর জমাদিউল উলা ১৩৯৭ হি. সংখ্যায় ‘প্রচলিত মোজার উপর মসেহ’ শিরোনামে একটি লেখা প্রকাশ করেন।  যেখানে তিনিকাপড়ের মোজার উপর মাসাহ করাকে নাজায়েয বলেছেন। এবং যারা এর মাসাহ করার পক্ষে তাদের সমালোচনা করেছেন। বিশেষত জামায়াত ইসলামির প্রতিষ্ঠাতা জনাব মাওলানা মওদুদী রাহিমাহুল্লার সমালোচনা করেন যিনি কাপড়ের মোজার উপর মাসাহ করাকে জায়েয বলেছেন।

মন্তব্যঃ আর কোন রেফারেন্স দেয়ার দরকার নেই কারন উপমহাদেশের হানফী মাযহাবের অনুসারী আলেমগন কাপড়ের মোজার উপর মাসাহ করাকে জায়েয মনে করে না।  এ কথা বলে তাকে অভিযোগ করলে তিনি স্বীকার করেন ও এর সমর্থনে যুক্তি পেশ করেন।

যারা কাপড়ের মোজার উপর মাসাহ করাকে জায়েয মনে করেঃ

বর্তমানে সৌদি আরবের সকল আলেম যাদের আমরা সালাফি বলে চিনি। আমাদের দেশে যারা আহলে হাদিস নামে পরিচিত তারা সকলে কাপড়ের মোজার উপর মাসাহ করাকে জায়েয মনে করে থাকে। ইমাম ইবনে তাইমিয়া, ইবনে কাইয়েম এবং ইবনে হাজ্ম এই মতেরই অনুসারী। এরা সকলে “যে কোনো মোজার উপর মসেহ জায়েয বলে ফতোয়া দিয়েছেন। তাদের দলিলঃ হল এই হাদিস যা ইমাম তিরমিজী উল্লখ করেছেন। হাদিসটি হলঃ

 *وَعَنْهُ قَالَ تَوَضَّاَ النَّبِىِّ ﷺ وَمَسَحَ عَلَى الْجَوْرَبَيْنِ وَالنَّعْلَيْنِ. رَوَاهُ أَحْمَدُ وَالتِّرْمِذِيُّ وأَبُوْ دَاوٗدَ وَابْنُ مَاجَةَ*

অনুবাদঃ মুগীরা ইবনু শু‘বা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অজু করলেন এবং জুতার সাথে ‘জাওরাব’ ও পা’ দু’টোর উপরের দিকও মাসাহ করলেন। (আহমাদ, তিরমিযী, আবূ দাঊদ ও ইবনু মাজাহ্, ছাহীহ: আবূ দাঊদ ১৫৯, তিরমিযী ইঃ ফাঃ ৯৯, ইবনু মাজাহ্ ৫৫৯, ইরওয়া ১০১, মিশকাতুল মাসাবীহ/মিশকাত: ৫২৩; ইমাম আবূ ঈসা তিরমিযী বলেনঃ এই হাদিসটি হাসান ও সহীহ। একাধিক আলিমের অভিমত এই। হাদিসের মানঃ ছাহীহ)


হাদীছটির ব্যাখ্যা: جَوْرَبَيْنِ ‘জাওরাবায়ন’ শব্দটি جَوْرَبْ ‘জাওরাব’-এর দ্বিবচন। এর অর্থ কাপড়ের মোজা। বর্ণিত হাদীসে প্রমাণ হয় যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জাওরাবায়ন বা পায়ের ঢাকনীর উপর মাসাহ করেছেন। সেটা চাই পশমী হোক বা চুলের হোক। আর চামড়ার হোক বা পস্নাস্টিকের হোক। মোটা হোক বা পাতলা হোক সেটার উপর মাসাহ করা জায়িয আছে। জাওরাবায়ন জুতার ন্যায় যা জমিন হতে পাকে রক্ষা করে। সেটার উপর মাসাহ করা উত্তম। ইমাম ইবনু হাযম সেটা মোটা হওয়ার জন্য শর্ত করেছেন। অনেক সাহাবায়ি কিরাম এর ওপর ‘আমাল করেছেন। হাদীছটিকে ইমাম তিরমিযী  রহঃ ছহীহ বলেছেন।

প্রশ্নঃ এক ভাই জানতে চেয়েছেন ওজুর সময় মুজার ওপর পা মাসেহ করা জায়েজ কিনা? আমরা জানি আমাদের রাসূল (সা:) চামড়ার মুজার ওপর মাসাহ করতেনএখন প্রশ্ন হল নরমাল সব মুজার ওপর মাসেহ করা যাবে কি না? রেফারেন্স সহ জানালে উপকৃত হব।

উত্তরঃ মোজার উপর মাসেহ করা জায়েয় চাই তা চামড়ার তৈরি হোক বা সুতার তৈরী হোক। সাহাবীগণ অনেকেই কাপড়ের তৈরী মোজা পরিধান করতেন আর তার উপর মাসেহ করতেন।

উল্লেখ্য যে, আরবীতে চামড়ার তৈরী মোজাকে ‘খুফ’ আর সুতার তৈরী মোজাকে ‘জাওরাব’ বলা হয়। উভয় প্রকার মুজার উপর মাসেহ করা বৈধ।

চামড়ার মোজার উপর মাসেহ করা সর্ব সম্মতক্রমে বৈধ। তবে সুতার তেরী মোজার উপর মাসেহ করা বৈধ কি না- এ বিষয়ে দ্বিমত থাকলেও সঠিক মত হল, জায়েয।

*বিস্তারিত*
সাধারণভাবে সকল ধরণের জাওরাব (সুতার তৈরী মুজা) এর উপর মাসাহ বৈধ, এমনকি যদি তা খুব পাতলা হয় তবুও: এটাই ইবনু হাযম ও ইবনু তাইমিয়ার স্পষ্ট মাযহাব। আর এ মতকেই ইবনু উছাইমীন ও আল্লামা শানক্বীতী পছন্দ করেছেন।

[আল-মুহালস্না (২/৮৬), আল-মাসায়িলুল মারদিনিয়্যাহ (৫৮ পৃ.), মাজমূ’ আল-ফাতাওয়া (২১/১৮৪), আল-মুমতি’ (১/১৯০), আযওয়াউল বায়ান (২/১৮, ১৯), এখানে এ বিষয়ে মূল্যবান আলোচনা রয়েছে।] 
*এটাই অধিক প্রাধান্যপ্রাপ্ত মত।*

এখানে জাওরাবের উপর মাসাহ বৈধ মর্মে বর্ণিত শেষ দু‘টি অভিমতের প্রবক্তাগণ নিম্নোক্ত দলিল গুলোকে দলিল হিসাবে দাড় করান। যথাঃ

عَنِ الْمُغِيرَةِ بْنِ شُعْبَةَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ تَوَضَّأَ وَمَسَحَ عَلَى الْجَوْرَبَيْنِ، وَالنَّعْلَيْنِ

(১) মুগীরা বিন শোবা (রাঃ) বর্ণিত হাদীস: ‘নিশ্চয় রাসূল (ﷺ) একবার ওযূ করলেন এবং জাওরাব ও দু জুতার উপর মাসাহ করলেন। (এ হাদীসকে আলবানী সহীহ বলেছেন, আবূ দাউদ (১৫৯), তিরমিযী (৯৯), আহমাদ (৪/২৫২), এ ব্যাপারে বিস্তারিত ‘আল-ইরওয়া (১০১)-দ্রষ্টব্য।)

عَنِ الأزرق بن قيس قال رأيت أنس بن مالك أحدث فغسل وجهه ويديه ومسح برأسه ، ومسح على جوربين من صوف فقلت : أتمسح عليهما ؟ فقال : إنهما خفان ولكنهما من صوف

(২) আয়রাক্ব ইবনে কায়েস (রাঃ) থেকে বর্ণিত: তিনি বলেন, আমি আনাস ইবনে মালিককে লক্ষ্য করেছি, তিনি বায়ু নিঃসরণ হলে তাঁর চেহারা ও দুহাত ধৌত করতেন এবং পশমের তৈরি জাওরাবের উপর মাসাহ করতেন। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, আপনি কি জাওরাবের উপর মাসাহ করলেন? তিনি বললেন, এ দু’টি মোজা যা পশমের তৈরি। [এ হাদীসকে আহমাদ শাকির সহীহ বলেছেন; আলকূনী (১/১৮১) দাওলাবী প্রণীত।]

এখানে আনাস (রাঃ) খাফ বা মোজা চামড়ার তৈরি হওয়ার ব্যাপারে আম (ব্যাপক), সে কথা স্পষ্ট করেছেন। উল্লেখ্য যে, তিনি আরবী ভাষাবিদদের অন্যতম একজন সাহাবী ছিলেন।

(৩) জাওরাবের উপর মাসাহ করার হাদীস ১১ জন সাহাবী থেকে বর্ণিত হয়েছে। যাদের মধ্যে উমার তাঁর ছেলে আবদুল্লাহ বিন উমর, আলী, ইবনে মাসউদ আনাস প্রমুখ সাহাবী অন্যতম। তাদের সমসাময়িক কোন সাহাবী তাদের বিরোধিতা করেন নি। বরং, সকলে ঐকমত্য পোষণ করেছেন। পরবর্তীতে জমহুর উলামা পাতলা জাওরাবের উপর মাসাহ করতে নিষেধ করেছেন। কেননা তা দ্বারা ফরযের স্থান আচ্ছাদিত হয় না। অথচ এটা মাসাহ বৈধ হওয়ার জন্য শর্ত নয় যা ইতিপূর্বে আলোচনা হয়েছে।

বর্তমানে চামড়ার তেরী মোজার তুলনায় সুতার তৈরী মোজার প্রচলন বেশি। সেহেতু মোজার উপর মাসেহ করার জন্য চামড়ার তেরী হওয়ার শর্তারোপ করা ইসলাম প্রদত্ব প্রশস্ত বিধানকে সংকুচিত করে দেয়ার শামিল। (আল্লাহু আলাম)। (উত্তর দিয়েছেন শাইখ আব্দূল্লাহ হাদি)

শাইখ মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-উসাইমীন (রহঃ) প্রশ্ন করা হয়েছিল, পাতলা বা ছেঁড়া মোজাতে মাসেহ করার বিধান কি?

বিশুদ্ধ মত হচ্ছে, ছেঁড়া মোজা এবং বাইরে থেকে চামড়া দেখা যায় এমন পাতলা মোজার উপর মাসেহ করা জায়েয। যে অঙ্গের উপর মাসেহ হবে তাকে পরিপূর্ণরূপে ঢেকে রাখতে হবে এটা উদ্দেশ্য নয়। কেননা পা তো আর সতর নয়। মাসেহ করার উদ্দেশ্য হচ্ছে ওযুকারী ব্যক্তির উপর সহজ্জতা ও হাল্কা করা। অর্থাৎ- আমরা প্রত্যেক ওযুর সময় মোজা পরিধানকারীকে মোজা খুলে পা ধৌত করতে বাধ্য করব না। বরং বলব, এর উপর মাসেহ করাই আপনার জন্য যথেষ্ট। আর এই সহজ্জতার উদ্দেশ্যেই মোজার উপর মাসেহ শরীয়ত সম্মত করা হয়েছে। অতএব কোন পার্থক্য নেই চাই মোজা ছেঁড়া হোক বা ভাল হোক, পাতলা হোক বা মোটা হোক। (গ্রন্থের নামঃ ফাতাওয়া আরকানুল ইসলাম, বিভাগের নামঃ পবিত্রতা, ক্রমিন নং ১৪৫)।

সাইয়্যেদ আবুল আ‘লা মওদূদী রাহিমাহুল্লাহ

সাইয়্যেদ আবুল আ’লা মওদূদী রাহিমাহুল্লাহ হানাফি আলেম হয়েও মতামত দিয়েছেন, সব ধরনের মোজার উপর মসেহ করা চলে, তাই তা সুতি হোক কিংবা পশমি হোক রামপুর (ভারত) থেকে প্রকাশিত মাসিক যিন্দেগীর ১৯৬৭ সালের জানুয়ারি সংখ্যায় এ ব্যাপারে দ্বিমত প্রকাশ করা হলে তিনি আবার সুন্দর করে তার উত্তর প্রদান করেন যা রাসায়েল ও মাসায়েল ৬ষ্ঠ খন্ড “মোজার উপর মসেহ করার বিধান” শিরনামে উল্লখ করা হয়েছে নিম্ম তা হুবহু তুলে ধরা হলঃ

প্রশ্নঃ রাসায়েল ও মাসায়েল ২য় খণ্ডে এক প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে বলা হয়েছে, সকল ধরনের মোজার উপর মসেহ করা চলে, তাই তা সুতি হোক কিংবা পশমি হোক রামপুর (ভারত) থেকে প্রকাশিত মাসিক যিন্দেগীর ১৯৬৭ সালের জানুয়ারি সংখ্যায় এ ব্যাপারে দ্বিমত প্রকাশ করে বলা হয়েছে যে, সুতি হোক, পশমি হোক, পাতলা মোজার উপর মসেহ করা চলবেনা। কেননা পবিত্র কুরআন ও উৎকৃষ্ট মানের সহীহ হাদিসের দ্বারা প্রমাণিত বিধিকে দুর্বল হাদিসের ভিত্তিতে শিথিল করা যায়না। হযরত মুগীরা ইবনে শুবার যে হাদিসটি বুখারি ও মুসলিম উভয় গ্রন্থে উদ্ধৃত হয়েছে এবং যা অত্যন্ত সহীহ হাদিস, তাতে একমাত্র চামড়ার মোজার উপরে মসেহ করার অনুমতি দেয়া হয়েছে। কিন্তু তাঁর অপর যে হাদিসটিতে জাওরাইন (সুতি ও পশমি মোজা) শব্দটি সংযোজিত হয়েছে, হাদিস শাস্ত্রের ইমামগণ তাকে দুর্বল বলে রায় দিয়েছেন। 

বিভিন্ন উদ্ধৃতি দিয়ে এরূপ যুক্তিও উত্থাপন করা হয়েছে যে, ‘জওরাব’ ও চামড়ার তৈরি হয়ে থাকে বিধায় ‘জওরাব’ ও এক ধরনের খুফ্‌ (চামড়ার মোজা) সুতরাং হয় চামড়ার মোজার উপরই মসেহ জায়েয মেনে নিতে হবে, নচেত জাওরাব যদি চামড়ার না হয়, তবে তাকে এমন শর্ত আরোপ করতে হবে যাতে তা খুফ্‌ তথা চামড়ার মোজার স্থলাভিষিক্ত হতে পারে। অন্যথায় চামড়ার মোজা ছাড়া আর কোনো মোজার উপর মসেহ করা জায়েয হবে না।


যিন্দেগীর উক্ত সংখ্যায় যে বিতর্ক, প্রশ্ন ও আপত্তি তোলা হয়েছে, সে সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার জন্য তরজমানুল কুরআনে বিষয়টি নিয়ে পুনরায় আলোচনা আসা জরুরী হয়ে পড়েছে। যে কোনো মোজার উপর যে মসেহ করা চলে, সে সম্পর্কে প্রাচীন ইমামদের কোনো উক্তি থাকলে সেটাও তুলে দেয়ার অনুরোধ জানাচ্ছি।

জবাবঃ  চামড়ার মোজার উপর মসেহ জায়েয হওয়ার ব্যাপারে সুন্নি ইমামরা প্রায় সকলেই একমত। তবে জাওরাব তথা চামড়ার তৈরি নয় এমন মোজার উপর মসেহ করার জন্য ফেকাহবিদগণ কিছু শর্ত আরোপ করেছেন। যেমন তা মোটা হওয়া চাই, গাঢ় ও পুরু হওয়া চাই, পানি নিরোধক হওয়া চাই এবং তাতে জুতার সমপরিমাণ চামড়াযুক্ত থাকা চাই। তবে প্রাচীন ফেকাহবিদদের কেউ কেউ আবার সকল ধরনের মোজার উপর মসেহ করাকে জায়েয মনে করেন। ইমাম ইবনে তাইমিয়া, ইবনে কাইয়েম এবং ইবনে হাজ্‌ম এই মতেরই প্রবক্তা। ইমাম ইবনে তাইমিয়ার ফতোয়া গ্রন্থের দ্বিতীয় খণ্ডে সুতি হোক, পশমি হোক, চামড়াযুক্ত হোক বা না হোক- যে কোনো মোজার উপর মসেহ জায়েয বলে একটি ফতোয়া লিপিবদ্ধ রয়েছে। রসূল সা. চামড়ার তৈরি নয় এমন মোজার উপরও মসেহ করতেন এই মর্মে যেসব হাদিস বিভিন্ন হাদিসগ্রন্থে সংকলিত হয়েছে, সে সম্পর্কে ইবনে তাইমিয়া বলেনঃ

এই হাদিসগুলোর বক্তব্য হাদিসবেত্তাদের মানদণ্ডে সহীহ প্রমাণিত না হলেও স্বাভাবিক বিবেক বুদ্ধির দৃষ্টিতে এই বক্তব্য সঠিক। মাসাহের প্রয়োজন উভয় ক্ষেত্রেই সমান। উভয় ক্ষেত্রেই মাসাহের প্রয়োজন ও যৌক্তিকতা একই রকম। কাজেই এ দুটোর মধ্যে বৈষম্য করা সমমানের জিনিসকে অসম বলারই নামান্তর এবং সুবিচারের পরিপন্থী।

অনুরূপভাবে, চামড়া বেশি টেকসই হয়ে থাকে এবং তাতে পানি ঢোকে না এ যুক্তিও তাঁর মতে গুরুত্ববহ নয়। তিনি বরঞ্চ মনে করেন, সুতি বা পশমি মোজায় পানি শোষণ ও ভেতরে পানি প্রবেশ করা পবিত্রতার প্রয়োজনে অধিকতর অগ্রগণ্য এবং কর্তব্য। এসব মোজার পাতলা বা ঢিলে হওয়া অথবা বাঁধার প্রয়োজন না হওয়ায় তাঁর মতে অসুবিধার কিছু নেই।

আবু দাউদ শরিফের ব্যাখ্যা সম্বলিত গ্রন্থে মসেহ সংক্রান্ত হাদিসের পর্যালোচনা করতে গিয়ে হাফেয ইবনে কাইয়েমও এই অভিমতই ব্যক্ত করেছেন। এসব হাদিসের সনদ যে নির্ভরযোগ্য নয়, সে কথা তিনি স্বীকার করেছেন। তবে তার বিভিন্ন জবাবও দিয়েছেন। যেমন তিনি বলেছেন, সুতি ও পশমি মোজায় মসেহ বৈধ হওয়ার ব্যাপারটা শুধুমাত্র রসূল স.-এর প্রত্যক্ষ বক্তব্য বা আচরণ সম্বলিত হাদিসের উপর নির্ভরশীল নয়, বরং ১৩ জন সাহাবির কার্যধারা থেকেও তা সমর্থিত। ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল র. এই হাদিসগুলোকে দুর্বল আখ্যায়িত করা সত্বেও সুতি ও পশমি কাপড়ের মোজার উপর মসেহকে বৈধ বলে রায় দিয়ে সুবিচার ও ইনসাফের পরিচয় দিয়েছেন। সাহাবাদের কার্যধারা ও সুস্পষ্ট যৌক্তিকতার আলোকেই তিনি এরূপ রায় দিয়েছেন। আসলে ‘জাওরাবাইন’ তথা সুতি ও পশমি মোজা এবং ‘খুফ্‌ফাইন’ তথা চামড়ার মোজার এমন কোনো কার্যকর পার্থক্য নেই, যা শরিয়তের বিধানে পার্থক্য সুচিত করতে পারে। ইবনে কায়েম অনেক দীর্ঘ আলোচনা করেছেন। এতে তিনি সুতি ও পশমি মোজার উপর মাসাহের শর্তাবলীর সমালোচনা করেছেন এবং এ জাতীয় মোজার উপর মাসাহের বৈধতা সম্বলিত হাদিসগুলোতে সনদ ও যুক্তির বিচারে যে খুঁত ধরা হয়েছে, তা খণ্ডন করেছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি পরিহাসচ্ছলে একটা তীর্যক মন্তব্যও ছুড়ে দিয়েছেন যে, কোনো কোনো ফেকাহ শাস্ত্রবিদদের কাছে চামড়ার মোজার সাথে সুতি ও পশমির মোজাকেও মসেহযোগ্য ধরা গ্রহণযোগ্য হয়নি। অথচ এ ধরনের কোনো সংযোজন যখন তাদের ফেকাহ শাস্ত্রীয় মতামতের পক্ষে যায়, তখন সেটাকে তারা নি:সংকোচে গ্রহণ করেন।

“ইনসাফ ও ন্যায়বিচারের দাবি এই যে, আপনি নিজের পণ্য যে পাল্লা দিয়ে মাপেন, আপনার বিরুদ্ধবাদীর পণ্যও সেই পাল্লা দিয়েই মাপবেন। নেয়া ও দোয়ার পাল্লা আলাদা রাখবেন না।”

ইবনে হাজমও তদীয় গ্রন্থ মুহাল্লাতে বিশদ আলোচনা করে ও সকল হাদিস উদ্ধৃত করে প্রমাণ করে দেখিয়েছেন যে, পায়ে  চামড়া, সুমি, পশমি, বা অন্য কোনো কাপড়ের তৈরি যাই পরা হোক না কেন, তাতে মসেহ চলবে। এতো সব ইতিবাচক মতামত ও বক্তব্য বর্তমান থাকা অবস্থায় কেউ যদি পূর্ববর্ণিত ফকীহদের উল্লেখিত শর্তাবলী সম্পর্কে দ্বিমত পোষণ ও সর্বপ্রকারের মোজার উপর মসেহ করাকে বৈধ মনে করে, তবে তার বক্তব্য সহজে উড়িয়ে দেয়া যায় না।

এরপর আরো কয়েকটি কথা বলা সমীচীন মনে করছি। প্রথম কথা হলো, সুতি ও পশমি মোজার উপর মসেহ জায়েয এই মর্মে মুগীরা ইবনে শুবা রা. বর্ণিত হাদিসটি ইমাম তিরমিযী সহীহ ও উত্তম বলেছেন। এই হাদিসটিকে একই সাহাবি বর্ণিত চামড়ার মোজায় মসেহ সংক্রান্ত হাদিসের বিপরীত বলে অগ্রাহ্য করা যায়না। এতোটুকু বৈপরিত্য মেনে নেয়া যেতো যদি মাসাহের ঘটনা এক আধবার ঘটতো। ওযু করা ও পবিত্রতা অর্জন করা নিত্যনৈমিত্তিক কাজ। তাই উভয় ধরনের মোজায় মসেহ করার প্রয়োজনীয়তা স্বভাবতই একাধিকবার দেখা দেয়ার কথা। তাছাড়া হযরত মুগীরা দীর্ঘদিন যাবত রসূল সা.-এর সাথে থেকেছেন। তাই তার এই দু’ধরণের বর্ণনায় রসূল সা.-এর বিভিন্ন সময়কার কার্যধারার প্রতিফলন ঘটেছে ধরে নিতে অসুবিধে কোথায়? সুতি ও পশমি মোজার উপর মসেহ সম্পর্কে রসূল সা. -এর আরো বহু হাদিস বর্ণিত হয়েছে যা থেকে প্রমাণিত হয় যে, কোনো বিশেষ ধরনের মোজা নয় বরং যে কোনো ধরনের মোজার উপরই মসেহ জায়েয। তাই মসেহকে শুধুমাত্র চামড়ার মোজার সাথে নির্দিষ্ট করা এবং সুতি বা পশমির মোজা হলে তাকেও চামড়ার মোজা সদৃশ্য ঘন ও পুরু ইত্যাদি হওয়ার শর্তযুক্ত করার কোনো প্রয়োজন নেই।

কথাটা আরো একটু সহজ্জবোধ্য করার জন্য একটি উদাহরণ দিচ্ছি। সোনা ও রূপার যাকাতের সর্বনিম্ন পরিমাণ আলাদা আলাদা হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। তন্মোধ্যে রূপার নিসাব সম্বলিত হাদিস সবচেয়ে বিশুদ্ধ। কিন্তু সোনার নিসাব সংক্রান্ত হাদিস সনদের দিক দিয়ে অত্যন্ত দুর্বল। ছয়টি সহীহ হাদিস গ্রন্থের মধ্যে কেবলমাত্র আবু দাউদ শরিফে সোনার নিসাব ২০ দিনার উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু এই হাদিসের বর্ণনাকারীর বিশ্বস্ততা বিতর্কিত। তা সত্ত্বেও দুনিয়ার অধিকাংশ মুসলমান সোনা ও রূপার আলাদা আলাদা নিসাবই মেনে চলে। নিসাব সংক্রান্ত এই হাদিসকে গ্রহণ করলে নিসাবের চেয়ে কম পরিমাণে যাকাত থেকে অব্যাহতি মেলে, ঠিক যেমন মাসাহের হাদিস গ্রহণ করলে মসেহ করে পা ধোয়ার হাত থেকে অব্যাহতি পাওয়া যায়। নিসাবের প্রশ্নটা যাকাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইবাদাত সম্পাদনের সাথে জড়িত। এখন সোনার নিসাব সংক্রান্ত হাদিসটি যদি গ্রহণযোগ্য মনে করা হয়, তাহলে কুরআনের কঠোর সতর্কবাণী অনুযায়ী যাকাত না দিয়ে স্বর্ণের একটা তারও রাখা জাহান্নামে যাওয়ার কারণ হবে। আর যদি (একই কারণে অর্থাৎ হাদিসটি দুর্বল হলে অগ্রাহ্য করার কারণে) সোনাকে রূপার সমপর্যায়ের ধাতু ধরে নিয়ে সোনার নিসাব ও রূপার নিসাবের সমান মনে করা হয়, (যেমন সুতি ও পশমি মোজাকে চামড়ার মোজার সমপর্যায়ের ধরা হয়) তাহলে একতোলা সোনার উপরও যাকাত দেয়া বাধ্যতামূলক হবে। কিন্তু চামড়ার মোজা ও কাপড়ের মোজার উপর মসেহ করার অনুমতিকে যদি পৃথক পৃথক অনুমতি মেনে নেয়া হয় এবং একটির সাথে অন্যটিকে জড়িয়ে ফেলা না হয়, তাহলে মোজা মোটা বা পাতলা যাই হোক, বিধি অপরিবর্তিতই থাকবে। কোনো জিনিসের পুরু বা পাতলা হওয়াটা আপিক্ষিক গুণ বা অবস্থা মাত্র, মূল জিনিসের সাথে তার কোনো সম্পর্ক নেই। মোটা বা পাতলা যাই হোক চামড়া চামড়াই এবং পশম পশমই। আজকাল যে ধরনের পাতলা ও কোমল চামড়ার পায়তাবা পরে কেউ কেউ মসেহ করে থাকেন, সে মসেহ জায়েয হলে সুতি পশমি ও নাইলনের মোজায় মসেহ করা নাজায়েয কেন হবে?
আরবিতে খুফ্‌ ও (জাওরাব) বলতে যে মোজা বুঝায়, সেই উভয় মোজাই চামড়ার হয়ে থাকে- এ কথা ঠিক নয়। প্রচলিত আরবিতে খুফ্‌ বলতে চামড়ার মোজা এবং জাওরাব বলতে চামড়া ছাড়া অন্যান্য মোজা বুঝায়। তবে লিসানুল আরব, কামুস ও তাজুল আরুসে এই দুটো শব্দের আভিধানিক অর্থ বলা হয়েছে ‘পায়ের পোশাক।’ চামড়ার তৈরি না অন্য কিছুর তৈরি, এই দু’টি শব্দের আসল আভিধানিকদের কাছে কোনো ধরাবাধা ব্যাপার নয়। তাজুল আরুস এবং লিসানুল আরবে এ কথাও বলা হয়েছে যে, জাওরাব আসলে ফার্সী শব্দ ‘গোরব’-এর আরবি রূপ। আর ফার্সী আভিধানে গোরব অর্থ হলো পশম বা সুতার মোজা। আরবি ভাষায় খুফ্‌ শব্দ দ্বারা জাওরাব এবং জাওরাব দ্বারা খুফ্‌ বুঝানোও বিচিত্র নয়। ইমাম দুলাবী স্বীয় গ্রন্থ ‘আসমা ও কুনাতে’ হযরত আনাস সম্পর্কে একটি ঘটনার উল্লেখ করেছেন যে, তিনি স্বীয় পশমি মোজায় মসেহ করে বললেন “এ দুটো হচ্ছে পশমের তৈরি খুফ্‌”।’

এ থেকে বুঝা গেলো যে, পশমি মোজাকে হযরত আনাস একশ্রেণীর খুফই বলেছেন। তিনি এ কথা বলেননি যে, এটা খুফ তো নয়, তবে অত্যাধিক মোটা ও পুরু বলে এটা খুফেরই পর্যায়ভুক্ত এবং এ কারণেই তার উপর মসেহ বৈধ। [তরজমানুল কুরআন, ফেব্রুয়ারি ১৯৬৮]

মন্তব্যঃ উপমাদেশের হানাফি আলেমগন যে মতামত দিয়েছেন, যেমনঃ মোজামোটা ও পুরু হওয়া, মোজা পায়ে দিয়ে ৩/৪ মাইল পর্যন্ত হাঁটা যাবে, পায়ের সাথে লেগে থাকা, পানি চোষে না বা ভেদ করে পানি ঠোকে না ইত্যাদি। সঠিক কথা বলতে, এই ধরনের কোন শর্ত মোজার উপর মাসাহ করার জন্য আরোপ করা হয়নি। তবে হ্যা, সালাফদের অনেক মোজা মোটা হওয়ার কথা বলেছেন।

তিরমিজিতে মুগীরা ইবনু শু‘বা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হাদিসের ব্যাখ্যায় সুফইয়ান ছাওরী, ইবনু মুবারাক, শাফিঈ, আহমদ ও ইসহাক (রহঃ) ও এই অভিমত পোষণ করেন, তারা বলেনঃ কাপড়ের মোযা যদি মোটা হয় তাহলে পায়ে চপ্পল না থাকলেও তাতে মাসেহ করা যাবে। (ইসলামি ফাউন্ডেশন, তিরমিজী হাদিস ৯৯ এর ব্যাখ্যা)।

যেহেতু মুজার উপর হাদিসে কোন শর্ত আরোপ করেনি তাহলে আমরা কেন করব। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম যা করছেন তার অনুসরণই একমাত্র শ্রেষ্ঠ মানদন্ড। বর্তমান সময়ে লোকেরা কাপড়ের তৈরী মোজাই পরিধান করে থাকে। সুতরাং হাদীছে যেহেতু বিনা পার্থক্যে মোজার উপর মাসেহ করা বৈধ রাখা হয়েছে, তাই সকল প্রকার মোজার উপর মাসেহ করাই বৈধ। তা চামড়ার তৈরী হোক বা সুতার তৈরী হোক। পরিভাষায় যাকে মোজা বলা হয় তার উপরই মাসেহ করা বৈধ। ইসলাম মানুষের উপর সহজ্জ করতে উৎসাহ দিয়েছে এবং কঠোরতা করতে নিষেধ করা হয়েছে। সুতরাং দলিল বিহীন কোন কঠিন মাসআলা মানুষের চাপিয়ে দেয়া ঠিক নয়।

তার পরও একটা কথা থাকে। মাসায়েলের ক্ষেত্রে এ উম্মতের প্রশস্ততা আছে। একই বিষয় একাধিক মতামত থাকতে পারে। যার মতামত কুরআন সুন্নাহর অধিক নিকটবর্তী তাই সবার অনুসরণ করা উচিত। তবে অন্যমতকেও সম্মানের চোখে দেখা উচিত, কারন ইসলামি শরীয়তের মৌলিক বিষয়ে বাতিল ফির্কা ছাড়া কার মাঝে বিভেধ নেই। (সব বিষয় আল্লাহই ভাল জানেন)। আমিন।।।

সফরের চারটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান : চতুর্থ কিস্তি

সফরের সময় সিয়ামের বিধান

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

সফরের কষ্টের কথা বিবেচনা করে ইসলাম সফর বা ভ্রমণকারীর জন্য ইসলামী বিধানে কিছুটা রুখসত বা ছাড় দিয়েছে। সালাত মহান আল্লাহ এমন এক আদেশ যাকে কোন অবস্থায়ই পরিত্যাগ করা যাবে না, তাই সে সফরে থাকুক আর বাড়িতে থাকুন। কিন্তু মহান আল্লাহ সফরের সময় সালাতের ব্যাপারে আমাদের প্রতি কিছুটা সহনশীলতা প্রদর্শণ করেছেন। ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হওয়া সত্বেও সফর বা ভ্রমণকরীর জন্য চার রাকআত বিশিষ্ট সালাতকে কসর করে বা কমিয়ে দুই রাকআত করেছেন। শুধু সালাত নয় সফরে আরও কয়েকটি হুকুমের ব্যাপারে মহান আল্লাহ কিছুটা ছাড় বা রুখসত প্রদান করেছেন। সফরে থাকা কালিন সময়ে সফরকারিকে মুসাফির বলা হয়। মুসাফির ব্যক্তি সব সময় চারটি রুখসত বা ছাড়ের অধিকারী হবে। সে চারটি রুখসত হলঃ

১। সালাতকে কসর করে আদায়

২। সালাতকে জমা করা।

৩। সফরে তিন দিন ও তিন রাত্রি পর্যন্ত মোজার উপর মাসেহ করা

৪। সফর অবস্থায় রমযানের সিয়াম ভঙ্গ করা

সফরের সময় সিয়ামের বিধান

সিয়াম পালন করতে মহান আল্লাহ নির্দেশ প্রদান করছেন এবং কোন শরীয়ত সম্মত ওজর ছাড়া পরিত্যাগ করা যাবেনা। সিয়াম ত্যাগ করা হারাম এবং অস্বীকার কারি কাফির। রমজান মাস ব্যাপিয়া সিয়াম পালন করা ফরজ। কিন্তু মহান আল্লাহ তা‘আলা সিয়াম এই ফরজ হিসাব মুসাফিরের জন্য কিছুটা ছাড় দিয়েছেন। যে আয়াতে মহান আল্লাহ তা‘আলা সিয়াম ফরজ করেছেন সেই আয়াতেই তিনি মুসাফিরের জন্য সিয়াম পালনে ছাড় দিয়েছেন। আল্লাহ তা‘আলা সিয়াম পালন ও মুসাফিরের অবকাশ প্রদান করে সুরা বাকারায় এরশাদ করেন,

*شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِيَ أُنزِلَ فِيهِ الْقُرْآنُ هُدًى لِّلنَّاسِ وَبَيِّنَاتٍ مِّنَ الْهُدَى وَالْفُرْقَانِ فَمَن شَهِدَ مِنكُمُ الشَّهْرَ فَلْيَصُمْهُ وَمَن كَانَ مَرِيضًا أَوْ عَلَى سَفَرٍ فَعِدَّةٌ مِّنْ أَيَّامٍ أُخَرَ

অর্থঃ রমজান মাসই হল সে মাস, যাতে নাযিল করা হয়েছে কোরআন, যা মানুষের জন্য হেদায়েত এবং সত্যপথ যাত্রীদের জন্য সুষ্পষ্ট পথ নির্দেশ আর ন্যায় ও অন্যায়ের মাঝে পার্থক্য বিধানকারী। কাজেই তোমাদের মধ্যে যে লোক এ মাসটি পাবে, সে এ মাসের রোযা রাখবে। আর যে লোক অসুস্থ কিংবা মুসাফির অবস্থায় থাকবে সে অন্য দিনে গণনা পূরণ করবে। (সুরা বাকারা ২:১৮৫)।

সালাতের ব্যাপারে দেখেছি সফরের সময় মুসাফির সালাতের কসর করছে। সিয়ামের ব্যাপারে আল্লাহ তা‘আলা সিয়াম ভাঙ্গার অবকাশ প্রদাণ করছেন কিন্তু মুসাফির যখন মুকিম হবে তখন তার উপর ঐ সিয়ামের কাযা করা ওয়াজির হয়ে যায়। যেমনঃ মহান আল্লাহ বলেন,

أَيَّامًا مَّعْدُودَاتٍ فَمَن كَانَ مِنكُم مَّرِيضًا أَوْ عَلَى سَفَرٍ فَعِدَّةٌ مِّنْ أَيَّامٍ أُخَرَ وَعَلَى الَّذِينَ يُطِيقُونَهُ فِدْيَةٌ طَعَامُ مِسْكِينٍ فَمَن تَطَوَّعَ خَيْرًا فَهُوَ خَيْرٌ لَّهُ وَأَن تَصُومُواْ خَيْرٌ لَّكُمْ إِن كُنتُمْ تَعْلَمُونَ

অর্থঃ গণনার কয়েকটি দিনের জন্য অতঃপর তোমাদের মধ্যে যে, অসুখ থাকবে অথবা সফরে থাকবে, তার পক্ষে অন্য সময়ে সে রোজা পূরণ করে নিতে হবে। আর এটি যাদের জন্য অত্যন্ত কষ্ট দায়ক হয়, তারা এর পরিবর্তে একজন মিসকীনকে খাদ্যদান করবে। যে ব্যক্তি খুশীর সাথে সৎকর্ম করে, তা তার জন্য কল্যাণ কর হয়। আর যদি রোজা রাখ, তবে তোমাদের জন্যে বিশেষ কল্যাণকর, যদি তোমরা তা বুঝতে পার। (সুরা বাকারা ২:১৮৪)।

এই আয়াতে মহান আল্লাহ তায়ালা অসুস্থ ব্যক্তি, সফরে থাকা ব্যক্তি বা মুসাফির, হায়েজ-নেফাস আক্রান্ত নারী, গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী নারী, এবং দুর্ঘটনায় পতিত বা বিপদগ্রস্ত লোককে উদ্ধারকাজে নিয়োজিক ব্যক্তি উপর সিয়াম পালন করা সাময়িকভাবে স্থগিত রেখেছেন।

এই সকল ব্যক্তির যে সকল ওজরের কারনে সিয়াম পালন সাময়িক স্থগিত ছিল, তাদের সে সকল ওজর দুরিভূত হলে ঐ ভাঙ্গা বা বাদপড়া সিয়ামগুলি গননা করে পুনরায় আদায় করতে হবে। অর্থাৎ যখন অসুস্থ ব্যক্তি সুস্থ হবে, সফরে থাকা ব্যক্তি সফর শেষ কবরে অর্থাৎ মুসাফির ব্যক্তি মুকিম হবে, নারীগণ হায়েজ-নেফাস এর সময় অতিক্রান্ত করবে, গর্ভবতী নারী সস্তান প্রষব করবে এবং স্তন্যদানকারী নারীর সন্তান স্তন্য পানের সময় অতিক্রান্ত করবে তখন সে তার ভাঙ্গা সিয়ামগুলি আদায় করা ওয়াজিব।

মহান আল্লাহ কুরআনে স্পষ্ট ঘোষনার পর এ সম্পর্কে আর কোন সংশয় থাকার কথা নয়। তাই এ সম্পর্কিত বিধী বিধাণ জানার জন্য কিছু সহিহ হাদিস উল্লেখ করব।

সফরের সময় সিয়াম না থাকার নির্দেষঃ

ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, (মক্কা বিজয়ের বছর) রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাদীনাহ্ হতে মক্কার দিকে রওনা হলেন। (এ সফরে) তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সওম রেখেছেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যখন (মক্কা হতে দু’ মঞ্জীল দূরে) ‘উসফান’-এ (নামক ঐতিহাসিক স্থানে) পৌঁছলেন তখন পানি চেয়ে আনালেন। এরপর তা হাতে ধরে অনেক উঁচুতে উঠালেন। যাতে লোকেরা পানি দেখতে পায়। এরপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সিয়াম ভাঙলেন। এভাবে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মক্কায় পৌঁছলেন। এ সফর হয়েছিল রমাযান (রমজান) মাসে। ইবনু ‘আব্বাস বলতেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সফরে সিয়াম রেখেছেন, আবার ভেঙেছেন। অতএব যার খুশী সওম রাখবে (যদি কষ্ট না হয়)। আর যার ইচ্ছা রাখবে না। (সহিহ বুখারী ১৮২০, সহিহ মুসলিম ১১১৩, মিসকাত ২০২৩, আবূ দাঊদ ২৪০৪, নাসায়ী ২৩১৪, আহমাদ ২৬৫২, সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ৮১৬০, ইবনু হিব্বান ৩৫৬৬।

জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, মক্কা বিজয়ের বছর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমাযান (রমজান) মাসে (মাদীনাহ্ হতে) মক্কা অভিমুখে রওনা হলেন। তিনি (মক্কা মাদীনার মধ্যবর্তী স্থান ‘উসফানের কাছে) ‘‘কুরা-‘আল গমীম’’ পৌঁছা পর্যন্ত সওম রাখলেন। অন্যান্য লোকেরাও সওমে ছিলেন। (এখানে পৌঁছার পর) তিনি পেয়ালায় করে পানি চেয়ে আনলেন। পেয়ালাটিকে (হাতে উঠিয়ে এতো) উঁচুতে তুলে ধরলেন যে, মানুষেরা এর দিকে তাকাল। তারপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) পানি পান করলেন। এরপর কিছু লোক আরয করল যে, (এখনো) কিছু লোক সওম রেখেছে (অর্থাৎ- রসূলের অনুসরণে সওম ভাঙেনি)। (এ কথা শুনে) তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ এসব লোক পাক্কা গুনাহগার, এসব লোক পাক্কা গুনাহগার। (সহিহ মুসলিম ১১১৪, মিসকাত ২০২৭, সহীহ ইবনু খুযায়মাহ্ ২০১৯, সহীহ ইবনু হিববান ৩৫৪৯, সহীহ আত্ তারগীব ১০৫৩।

আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা (একবার) নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে তাঁর সফরসঙ্গী ছিলাম। আমাদের কেউ সায়িম ছিলেন। আবার কেউ সওম রাখেননি। আমরা এক মঞ্জীলে পৌঁছলাম। এ সময় খুব রোদ ছিল। (রোদের প্রখরতায়) সায়িম ব্যক্তিগণ (মাটিতে) ঘুরে পড়ল। যারা  সিয়ামরত ছিল না, ঠিক রইল। তারা তাঁবু বানাল, উটকে পানি পান করাল। (এ দৃশ্য দেখে) রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ সিয়াম না থাকা লোকজন আজ সাওয়াবের ময়দান জিতে নিলো। (সহিহ বুখারী ২৮৯০, সহিহ মুসলিম ১১১৯, মিসকাত ২০২২, নাসায়ী ২২৮৩, ইবনু আবী শায়বাহ্ ৮৯৬১, ইবনু খুযায়মাহ্ ২০৩৩, সহীহ আত্ তারগীব ১০৬১, সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ৮১৫৫, ইবনু হিববান ৩৫৫৯, সহীহ আল জামি‘ ৩৪৩৬।

জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার এক সফরে ছিলেন। এক স্থানে তিনি কিছু লোকের সমাগম ও এক ব্যক্তিকে দেখলেন। (রোদের তাপ থেকে রক্ষা করার জন্য) ওই লোকটির ওপর ছায়া দিয়ে রাখা হয়েছে। (এ দৃশ্য দেখে) তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) জিজ্ঞেস করলেন, ওখানে কী হয়েছে? লোকেরা বলল, এ ব্যক্তি সায়িম (দুর্বলতার কারণে পড়ে গেছে)। এ কথা শুনে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, সফর অবস্থায় সিয়াম রাখা নেক কাজ নয়। (সহিহ বুখারী ১৯৪৬, সহিহ মুসলিম ১১১৫, মিসকাত ২০২১, দারিমী ১৭৫০, সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ৮১৫৪)।

সফরের সময় সিয়াম রাখা ইচ্ছধীনঃ

নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর স্ত্রী আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, হামযা ইবনু ‘আমর আসলামী (রাঃ) অধিক সিয়াম পালনে অভ্যস্থ ছিলেন। তিনি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বললেন, আমি সফরেও কি সিয়াম পালন করতে পারি? তিনি বললেনঃ ইচ্ছা করলে তুমি সিয়াম পালন করতে পার, আবার ইচ্ছা করলে নাও করতে পার। (সহিহ বুখারী ১৮১৯, সহিহ মুসলিম ১১২১, তিরমিযী ৭১১, নাসায়ী ২৩০৬, ইবনু মাজাহ ১৬৬২, মিসকাত ২০১৯, আহমাদ ২৫৬০৭, ইবনু খুযায়মাহ্ ২০২৮, মু‘জামুল কাবীর লিত্ব ত্ববারানী ২৯৬৪, সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ৮১৫৬)।

হামযাহ্ ইবনু ‘আমর আল আসলামী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, হে আল্লাহর রসূল! সফর অবস্থায় আমি সওম পালনে সমর্থ। (না রাখলে) আমার কী কোন গুনাহ হবে? তিনি বললেন, এ ক্ষেত্রে আল্লাহ ‘আযযা ওয়াজাল্লা তোমাকে অবকাশ দিয়েছেন। যে ব্যক্তি এ অবকাশ গ্রহণ করবে, সে উত্তম কাজ করবে। আর যে ব্যক্তি সওম রাখা পছন্দ করবে (সে রাখবে), তার কোন গুনাহ হবে না। (মিসকাত ২০২৯, হাদিসের মান সহিহ; সহিহ মুসলিম ১১২১, নাসায়ী ২৩০৩, সহীহ ইবনু খুযায়মাহ্ ২০২৬, দারাকুত্বনী ২৩০১, সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ৮১৫৮, সহীহ ইবনু হিব্বান ৩৫৬৭, ইরওয়া ৯২৬, সহীহাহ্ ১৯২)।

আবূ সা‘ঈদ আল্ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, (একবার) আমরা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে যুদ্ধে রওনা হলাম। সে সময় রমাযান (রমজান) মাসের ষোল তারিখ অতিবাহিত হয়েছিল। (এ সময়) আমাদের কেউ সওম রেখেছে, আবার কেউ রাখেনি। সায়িমগণ সওমে না থাকা লোকদেরকে খারাপ জানেনি আবার সওমে না থাকা লোকজনও সায়িমগণকে খারাপ মনে করেনি।  (মিসকাত ২০২০ হাদিসের মান সহিহ, সহিহ মুসলিম ১১১৬, আহমাদ ১১৭০৫, সহীহ আত্ তারগীব ১০৬২)।

বাইতুল্লাহ নির্মাণ ও সংস্কারের ইতিহাস

বাইতুল্লাহ নির্মাণ ও সংস্কারের ইতিহাস

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

বাইতুল্লাহ হলো পৃথিবীতে মহান আল্লাহ তায়ালার অপূর্ব নিদর্শন। সৃষ্টির আদিকাল থেকেই আল্লাহ তায়ালা বাইতুল্লাহকে তাঁর মনোনীত বান্দাদের মিলনমেলা হিসেবে কবুল করেছেন। ভৌগোলিকভাবেই গোলাকার পৃথিবীর মধ্যস্থলে কাবার অবস্থান। বাইতুল্লাহকে কেন্দ্র করে ইসলামের রাজধানী হিসেবে মক্কা জগত বিখ্যাত এবং সুপরিচিত। পৃথিবীতে আল্লাহ তায়ালার ইবাদতের জন্য সর্ব প্রথম এই বাইতুল্লাহ নির্মাণ করা হয়। এই বাইতুল্লাহ কে উল্লেখ করে আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেনঃ

*إِنَّ أَوَّلَ بَيْتٍ وُضِعَ لِلنَّاسِ لَلَّذِي بِبَكَّةَ مُبَارَكًا وَهُدًى لِّلْعَالَمِينَ*

অর্থঃ নিঃসন্দেহে সর্ব প্রথম ঘর যা মানুষের জন্যে স্থাপন করা হয়েছে, যা মক্কায় অবস্থিত। যা বিশ্বাবাসির জন্য বরকতময় হেদায়েত। ( সুরা ইমরান ৩:৯৬)

বাইতুল্লাহ প্রথম নির্মান নিয়ে সমাজে অনেক কথা প্রচলিত আছে। এই সকল কথার উত্তর খুজে পাওয়া যায় তাফসিরে ইবনে কাসিরে। তাফসিরে ইবনে কাসিরে সুরা বাকারার ১২৫ আয়াতের ব্যাখ্যায় এক পর্যায় লিখেনঃ “বাইতুল্লাহ সর্বপ্রথম নির্মাতা কেউ কেউ বলেন যে, কাবা শরীফ ফেরেশতাগণ নির্মাণ করেছিলেন। কিন্তু এ কথাটি নির্ভরযোগ্য নয়। কেউ কেউ বলেন যে, হযরত আদম (আঃ) সর্বপ্রথম পাঁচটি পর্বত দ্বারা কাবা শরীফ নির্মাণ করেন। পর্বত পাঁচটি হচ্ছেঃ (১) হেরা, (২) তুরে সাইনা, (৩) ভূরে যীতা, (৪) জাবাল-ই-লেবানন এবং (৫) জুদী। কিন্তু একথাটিও সঠিক নয়। কেউ বলেন যে, হযরত শীষ (আঃ) সর্বপ্রথম নির্মাণ করেন। কিন্তু এটাও আহলে কিতাবের কথা।

হাদিসের নামে জালিয়াতি কিতাবে ডক্টর আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীল রাহিমাহুল্লাহ লিখেনঃ

আদম আলাইহিস সালাম বাইতুল্লাহ নির্মাণ করেছিলেন বলে প্রচলিত আছে। মূলত বিভিন্ন ঐতিহাসিক, মুফাস্সির বা আলিমের কথা এগুলো। এ বিষয়ক হাদীসগুলো দুর্বল সনদে বর্ণিত। কোনো কোনো মুহাদ্দিস এ বিষয়ক সকল বর্ণনাই অত্যন্ত যয়ীফ ও বাতিল বলে গণ্য করেছেন। আল্লামা ইবনু কাসীর বাইতুল্লাহ বিষয়ক আয়াতগুলো উল্লেখ করে বলেন, এ সকল আয়াতে আল্লাহ সুস্পষ্ট জানিয়েছেন যে, একমাত্র আল্লাহর ইবাদতের জন্য বিশ্বের সকল মানুষের জন্য নির্মিত সর্বপ্রথম বরকতময় ঘর বাইতুল্লাহকে ইবরাহীম আলাইহিস সালাম নির্মাণ করেন। এ স্থানটি সৃষ্টির শুরু থেকেই মহা সম্মানিত ছিল। আল্লাহ সে স্থান ওহীর মাধ্যমে তাঁর খলীলকে দেখিয়ে দেন। তিনি আরো বলেন, ‘‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে একটিও সহিহ হাদীস বর্ণিত হয়নি যে, ইবরাহীম আলাইহিস সালাম এর পূর্বে কাবা ঘর নির্মিত হয়েছিল…। এ বিষয়ক সকল বর্ণনা ইসরাঈলীয় রেওয়ায়াত। আমরা ইতোপূর্বে উল্লেখ করেছি যে, এগুলোকে সত্যও মনে করা যাবে না, মিথ্যাও বলা যাবে না। (আল-বিদায়া ১/১৬৩, তাফসীর ইবন কাসীর ১/১৭৩-১৭৪, ৩/২১৬, হাদিসের নামে জালিয়াতি)

সমাজে প্রচলিত মিথ্যা বা ঈজরাইলী বর্ণানাগুল নিম্মরুপঃ

প্রথম বর্ণনাঃ ফিরিস্তাগন কর্তৃক বাইতুল্লাহ নির্মাণ

সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম বর্ণিত হাদিস থেকে ‘বাইতুল মামুর’ সম্পর্কে জানা যায়। মিরাজ সম্পর্কে দীর্ঘ বর্ণনার এক পর্যায় নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, অতঃপর বায়তুল মামূরকে আমার সামনে প্রকাশ করা হল। আমি জিব্রাঈল আলাইহিস সালাম কে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, এটি বাইতুল মামূর। প্রতিদিন এখানে সত্তর হাজার ফেরেশতা সালাত আদায় করেন। এরা এখান হতে একবার বাহির হলে দ্বিতীয় বার ফিরে আসেন না। (সহিহ বুখারী ৩২০৭, সহিহ মুসলিম ৩০০ ও ৩০০৫)।

এই হাদিসের আদতে জালিয়াতগন ফিরিস্থাদের নামেও মিথ্যা রচনা করছেন। তাদের দাবী, পৃথিবীতে সর্বপ্রথম মহান আল্লাহ তায়ালার নির্দেশে ফেরেশতারা বাইতুল মামূর আদতে কাবাঘর নির্মাণ করেন। কাবা ঘরের ঠিক ওপরে ঊর্ধ্ব আকাশে ‘বাইতুল মামুরে’ ফেরেশতারা অনেক আগে থেকে তওয়াফ করে আসছিলেন। তাই আল্লাহ তায়ালা ফেরেশতাদের দ্বারা এই বাইতুল্লাহ নির্মাণ করো। যখন তাঁরা কাবা ঘর নির্মাণ করেন, তখন থেকেই আল্লাহ তায়ালা তাঁদের কাবাঘর তাওয়াফ করার নির্দেশ দেন।

দ্বিতীয় বর্ণনাঃ আদম আলাইহিস সালাম কর্তৃক নির্মাণ

সমাজে প্রচলিত আছেঃ আল্লাহ তায়ালা হজ্জরত আদম ও হাওয়াকে পৃথিবীতে পাঠিয়ে বলেন, ‘আমার জন্য একটি ঘর নির্মাণ করো। অতঃপর হজ্জরত আদম আলাইহিস সালাম জিব্রাইল আলাইহিস সালাম এর অঙ্কিত স্থানে খননকাজ শুরু করে দেন। আর হজ্জরত হাওয়া আলাইহিস সালাম সেই মাটি বহন করে নিয়ে যেতেন। একপর্যায়ে সেখানে পানির দেখা মিলল। হঠাৎ কে যেন ডাক দিয়ে বলল, ‘হে আদম! যথেষ্ট হয়েছে। ‘যখন তাঁরা এ ঘর নির্মাণ করেন তখন আল্লাহ তায়ালা তাঁদের এ ঘর তওয়াফ করার নির্দেশ দিলেন। এ সম্পর্কে আরও বর্ণিত আছে, হজ্জরত আদম আলাইহিস সালাম পাঁচটি পাহাড়ের পাথর দিয়ে কাবাগৃহ নির্মাণ করেছেন। ফিরিস্তগন এই পাথরগুলো সঞ্চয় করে দিতেন। আর পাহাড়গুল হলো, জাবালে হেরা, জুদি, লুবনান, সিনাই ও জাইতুন।

আদম আলাইহিস সালাম ও হাওয়া আলাইহিস সালাম এর পৃথিবীতে মিলন হলে তারা উভয়ে আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। আদম আলাইহিস সালাম আল্লাহর কাছে ইবাদতের জন্য একটি মসজিদ প্রার্থনা করেন। আল্লাহ তাদের দোয়া কবুল করেন এবং বাইতুল মামুরের আকৃতিতে পবিত্র কাবাঘর স্থাপন করেন। এখানে হজ্জরত আদম আলাইহিস সালাম সন্তুষ্টচিত্তে আল্লাহর ইবাদত করতে থাকেন। 

তাদের মতে, মানব সৃষ্টির বহু আগে মহান আল্লাহ তায়ালা কাবাঘর সৃষ্টি করেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বাইতুল্লাহর স্থানকে সমগ্র ভূপৃষ্ট থেকে দু’হাজার বছর আগে সৃষ্টি করেন এবং আদম আলাইহিস সালাম কাবাঘর আল্লাহর আদেশে পুনঃনির্মাণ করেন। এরপর বহুদিন অতিক্রম হলো। শত শত বছর অতিবাহিত হলো। আল্লাহর বান্দারা কাবাঘর জিয়ারত করতো, আল্লাহর কাছে হাজিরা দিতো এ কাবাঘরে সমবেত হয়ে। কাবাঘরে এসে মহান আল্লাহর পবিত্রতা ও অংশীদারহীনতা ঘোষণা দিত। এভাবে চলতে চলতে দিন গত হতে থাকলো। এরপর হজ্জরত শীষ আলাইহিস সালাম কাবাঘর পুনঃনির্মাণ করলেন। দিন দিন একত্ববাদীর সংখ্যা বাড়তে থাকলো।

তৃতীয় বর্ণনাঃ বাইতুল্লাহ বা কাবা কে কন্দ্রকরে পৃথিবী সৃষ্ট হয়ঃ

কথিত আছে, পৃথিবীতে ভূমির সৃষ্টি হয় বিশাল সাগরের মাঝে, এর মাঝে মক্কায় অবস্থিত কাবা ঘরের স্থলকে কেন্দ্র করেই। তাই, কাবার নিচের অংশটুকু অর্থাৎ কাবাঘরের জমিনটুকু হচ্ছে পৃথিবীর প্রথম মাটি। ধীরে ধীরে এর চারপাশ ভরাট হয়ে সৃষ্টি হয় একটি বিশাল মহাদেশের। পরে এক মহাদেশ থেকেই সৃষ্টি হয় সাত মহাদেশের। মাটিতে রূপান্তর হওয়ার আগে কাবা সাদা ফেনা আকারে ছিল। সে সময় পৃথিবীতে পানি ছাড়া কিছু ছিল না।

আল্লাহর আরশ ছিল পানির ওপর। মাটি বিছানোর পর জমিন নড়তে থাকে। হেলতে থাকে। এর জন্য মহান আল্লাহ পাহাড় সৃষ্টি করেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘তিনি পৃথিবীতে সুদৃঢ় পর্বত স্থাপন করেছেন, যাতে পৃথিবী তোমাদের নিয়ে আন্দোলিত না হয় (হেলে না যায়)।’ (সুরা নাহল, আয়াত : ১৫)। এভাবেই পবিত্র কাবার বরকতে পৃথিবী স্থির হয়ে যায়। ধীরে ধীরে এখানে মানবসভ্যতার গোড়াপত্তন হয়।

সৃষ্টির আদিকাল থেকেই আল্লাহ পবিত্র কাবা শরিফকে তার মনোনীত বান্দাদের মিলনমেলাস্থল হিসেবে কবুল করেছেন। দুনিয়া জুড়ে মুসলমানদের কিবলা এই কাবা শরিফ।

মন্তব্যঃ আমরা আগেই জেনেছি বাইতুল্লাহ নির্মাণ করেন ইব্রাহিম ও ইসমাইল আলাইহিস সালাম। আদম আলাইহিস সালামের প্রশ্ন আসে না। কিন্তু জালকারীগণ তাদের বর্ণনা সাথে কুরআন ও সহিহ হাদিসকে এমন ভাবে জুড়ে দেয় যে, সঠিক জ্ঞান না থাকলে ধরা কষ্টকর। আগের বর্ণায় সহিহ হাদিসের বর্ণিত বাইতুল মামুরকে সম্পৃক্ত করেছে। যাতে সাধারণ লোক ধোঁকা খায়।

চতুর্থ বর্ণনাঃ সনদবিহীন বর্ণনা সত্য মিথ্যা জানা যায় নাঃ

অনেক ঐতিহাসিকের মতে কা‘বাঘর ১২ (বারো) বার নির্মাণ পুনঃনির্মাণ ও সংস্কার করা হয়েছে। নিচে নির্মাতা, পুনঃনির্মাতা ও সংস্কারকের নাম উল্লেখ করা হলঃ

১. ফেরেশতা। ২. আদম। ৩. শীছ ইবন আদম। ৪. ইবরাহীম ও ইসমাঈল আ.। ৫. আমালেকা সম্প্রদায়। ৬. জুরহুম গোত্র। ৭. কুসাই ইবন কিলাব। ৮. কুরাইশ। ৯. আবদুল্লাহ ইবন যুবায়ের রা. (৬৫ হি.)। ১০. হাজ্জাজ ইবন ইউসুফ (৭৪ হি.)। ১১. সুলতান মারদান আল-উসমানী (১০৪০ হি.) এবং বাদশাহ ফাহদ ইবন আবদুল আজীজ (১৪১৭ হি.)। (ড. মুহাম্মদ ইলিয়াস আব্দুল গনী, তারীখু মাক্কাতিল মুকাররামা, মাতাবিউর রাশীদ, মদীনা মুনাওয়ারা।

মন্তব্যঃ প্রথম বর্ণানাগুলোর সনদ নাই কিন্তু সাত নম্বরের পরেরগুলোর ঐতিহাদিক সদন আছে। 

বাইতুল্লাহ ছবি

২। ইব্রাহিম ও ইসমাইল আলাইহিস সালাম কর্তৃক নির্মাণঃ

সবচেয়ে নিভর্রযোগ্য বর্ণনা মতে মহান আল্লাহর আদেশে ইব্রাহিম ও ইসমাইল আলাইহিস সালাম কাবাগৃহ নির্মাণ করেন। ইসমাইল আলাইহিস সালাম পাথর নিয়ে আসতেন এবং ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম নির্মাণ কাজ করতেন। ইব্রাহিম ও ইসমাইল আলাইহিস সালাম কর্তৃক নির্মাণ করার সুষ্পষ্ট প্রমান কুরআনুর কারিমে পাওয়া যায়। তাদের দুজনকে কাবাঘর নির্মানের জন্য নির্দেষ প্রদান করা হয়। সাথে সাথে এই ঘর নির্মানের কারন ব্যাখ্যা করে আল্লাহ বলেন,

وَإِذْ جَعَلْنَا الْبَيْتَ مَثَابَةً لِّلنَّاسِ وَأَمْناً وَاتَّخِذُواْ مِن مَّقَامِ إِبْرَاهِيمَ مُصَلًّى وَعَهِدْنَا إِلَى إِبْرَاهِيمَ وَإِسْمَاعِيلَ أَن طَهِّرَا بَيْتِيَ لِلطَّائِفِينَ وَالْعَاكِفِينَ وَالرُّكَّعِ السُّجُودِ

অর্থঃ যখন আমি কাবা গৃহকে মানুষের জন্যে সম্মেলন স্থল ও শান্তির আলয় করলাম, আর তোমরা ইব্রাহীমের দাঁড়ানোর জায়গাকে নামাযের জায়গা বানাও এবং আমি ইব্রাহীম ও ইসমাঈলকে আদেশ করলাম, তোমরা আমার গৃহকে তওয়াফকারী, অবস্থানকারী ও রুকু সেজদাকারীদের জন্য পবিত্র রাখ। ( সুরা বাকারা ২:১২৫ )

মন্তব্যঃ এই আয়াত আলোকে বলা যায়, বাইতুল্লাহ বা কাবাঘর নির্মানের প্রধান উদ্দেশ্যই হলো, সালাত আদায় ও হজ্জ করা তথা সকল মানুষের জন্যে সম্মেলন ও শান্তির স্থল হিসাবে তৈরি করা।

*** কাবা ঘর নির্মাণকালে ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম মহান আল্লাহ দরবানে দোয়া করেছিলেন, সেই কথাও পবিত্র কুরআন আল্লাহ উল্লেখ করছেন। তিনি এরশাদ করেন,

وَإِذۡ قَالَ إِبۡرَٲهِـۧمُ رَبِّ ٱجۡعَلۡ هَـٰذَا بَلَدًا ءَامِنً۬ا وَٱرۡزُقۡ أَهۡلَهُ ۥ مِنَ ٱلثَّمَرَٲتِ مَنۡ ءَامَنَ مِنۡہُم بِٱللَّهِ وَٱلۡيَوۡمِ ٱلۡأَخِرِ‌ۖ قَالَ وَمَن كَفَرَ فَأُمَتِّعُهُ ۥ قَلِيلاً۬ ثُمَّ أَضۡطَرُّهُ ۥۤ إِلَىٰ عَذَابِ ٱلنَّارِ‌ۖ وَبِئۡسَ ٱلۡمَصِيرُ (١٢٦) وَإِذۡ يَرۡفَعُ إِبۡرَٲهِـۧمُ ٱلۡقَوَاعِدَ مِنَ ٱلۡبَيۡتِ وَإِسۡمَـٰعِيلُ رَبَّنَا تَقَبَّلۡ مِنَّآ‌ۖ إِنَّكَ أَنتَ ٱلسَّمِيعُ ٱلۡعَلِيمُ (١٢٧) رَبَّنَا وَٱجۡعَلۡنَا مُسۡلِمَيۡنِ لَكَ وَمِن ذُرِّيَّتِنَآ أُمَّةً۬ مُّسۡلِمَةً۬ لَّكَ وَأَرِنَا مَنَاسِكَنَا وَتُبۡ عَلَيۡنَآ‌ۖ إِنَّكَ أَنتَ ٱلتَّوَّابُ ٱلرَّحِيمُ (١٢٨) رَبَّنَا وَٱبۡعَثۡ فِيهِمۡ رَسُولاً۬ مِّنۡہُمۡ يَتۡلُواْ عَلَيۡہِمۡ ءَايَـٰتِكَ وَيُعَلِّمُهُمُ ٱلۡكِتَـٰبَ وَٱلۡحِكۡمَةَ وَيُزَكِّيہِمۡ‌ۚ إِنَّكَ أَنتَ ٱلۡعَزِيزُ ٱلۡحَكِيمُ (١٢٩)

অর্থঃ স্মরণ করুন যখন ইব্রাহীম বলেছিলেনঃ

*হে আমার প্রতিপালক! একে নিরাপদ শহর করুন আর অধিবাসীদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাসী তাদেরকে ফলমূল হতে জীবিকা প্রদান করুন।

তিনি (আল্লাহ) বললেন, যে কেউ কুফরী করবে তাকেও কিছুকালের জন্য জীবনোপভোগ করতে দিব। অতপর তাকে জাহান্নামের শাস্তি ভোগ করতে বাধ্য করব এবং তা কত নিকৃষ্ট পরিণাম! স্মরন করুন, যখন ইব্রাহীম ও ইসমা’ঈল কা’বা ঘরের প্রাচীর তুলছিলেন তখন তারা বলেছিলেন,

*হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের এ কাজ কবুল করুন, নিশ্চয়ই আপনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞাতা।

*হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের উভয়কে আপনার একান্ত অনুগত করুন এবং আমাদের বংশধর হতে আপনার এক অনুগত উম্মাত করুন। আমাদেরকে ‘ইবাদাতের নিয়ম-পদ্ধতি দেখিয়ে দিন এবং আমাদের প্রতি ক্ষমাশীল হন, আপনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।

হে পরওয়ারদেগার! তাদের মধ্যে থেকেই তাদের নিকট একজন পয়গম্বর প্রেরণ করুণ যিনি তাদের কাছে তোমার আয়াতসমূহ তেলাওয়াত করবেন, তাদেরকে কিতাব ও হেকমত শিক্ষা দিবেন। এবং তাদের পবিত্র করবেন। নিশ্চয় তুমিই পরাক্রমশালী হেকমতওয়ালা। (আল-বাকারা ২:১২৬-১২৯)

**ইবাদতের পাশাপাশি বাইতুল্লাহ নির্মাণের উদ্দেশ্য হল, শির্কমু্ক্ত নির্ভেজাল একত্ববাদের প্রতিষ্ঠার করা। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ এরশাদ করেন,

وَإِذْ بَوَّأْنَا لِإِبْرَاهِيمَ مَكَانَ الْبَيْتِ أَن لَّا تُشْرِكْ بِي شَيْئًا وَطَهِّرْ بَيْتِيَ لِلطَّائِفِينَ وَالْقَائِمِينَ وَالرُّكَّعِ السُّجُودِ

অর্থঃ যখন আমি ইব্রাহীমকে বায়তুল্লাহর স্থান ঠিক করে দিয়েছিলাম যে, আমার সাথে কাউকে শরীক করো না এবং আমার গৃহকে পবিত্র রাখ তাওয়াফকারীদের জন্যে, নামাযে দন্ডায়মানদের জন্যে এবং রকু সেজদাকারীদের জন্যে। (সুরা হাজ্জ্ব ২২:২৬) 

৩। কাবা ধ্বংশের ব্যর্থ চেষ্টাঃ

আবরাহা সাবাহ হাবশী (তিনি নাজ্জাশী সম্রাট হাবশের পক্ষ হতে ইয়ামানের গভর্ণর ছিলেন) যখন দেখলেন যে, আরববাসীগণ ক্বাবা’হ গৃহে হজ্জব্রত পালন করছেন এবং একই উদ্দেশ্যে বিভিন্ন দেশ থেকে লোকজন সেখানে আগমন করছেন তখন সানআয় তিনি একটি বিরাট গীর্জা নির্মাণ করলেন এবং আরববাসীগণের হজ্জব্রতকে সেদিকে ফিরিয়ে আনার জন্য আহবান জানালেন। কিন্তু বনু কিনানাহ গোত্রের লোকজন যখন এ সংবাদ অবগত হলেন তখন তাঁরা এক রাত্রে গোপনে গীর্জায় প্রবেশ করে তার সামনের দিকে মলের প্রলেপন দিয়ে একদম নোংরা করে ফেললেন। এ ঘটনায় আবরাহা ভয়ানক ক্রোধান্বিত হন এবং প্রতিশোধ গ্রহণ কল্পে ক্বাবা’হ গৃহ ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে ষাট হাজার অস্ত্র সজ্জিত সৈন্যের এক বিশাল বাহিনীসহ মক্কা অভিমুখে অগ্রসর হন। তিনি নিজে একটি শক্তিশালী হস্তীপৃষ্ঠে আরোহণ করেন। সৈন্যদের নিকট মোট নয়টি অথবা তেরটি হস্তী ছিল। (আর-রাহীকুল মাখতূম, আল্লামা সফিউর রহমান মোবারকপুরী)

সুরা ফিলের সানে নুযুল থেকে পাই, বাদশা আবরাহা যখন কাবা ধ্বংস করার জন্য আসে তখন তার অগ্রবাহিনী তিহামার অধিবাসী ও কুরাইশদের উট, ছাগল, ভেড়া ইত্যাদি বহু পালিত পশু লুট করে নিয়ে যায়। এর মধ্যে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দাদা আবদুল মুত্তালিবেরও দু’শো উট ছিল। এরপর সে মক্কাবাসীদের কাছে নিজের একজন দূতকে পাঠায়। তার মাধ্যমে মক্কাবাসীদের কাছে এই মর্মে বাণী পাঠায়, আমি তোমাদের সাথে যুদ্ধ করতে আসিনি। আমি এসেছি শুধুমাত্র এই ঘরটি (কাবা) ভেঙ্গে মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে। যদি তোমরা যুদ্ধ না করো তাহলে তোমাদের প্রাণ ও ধন সম্পত্তির কোন ক্ষতি আমি করবো না। তাছাড়া তার এক দুতকেও মক্কাবাসীদের কাছে পাঠায়। মক্কাবাসীরা যদি তার সাথে কথা বলতে চায় তাহলে তাদের সরদারকে তার কাছে নিয়ে আসার নির্দেশ দেয়। আবদুল মুত্তালিব তখন ছিলেন মক্কার সবচেয়ে বড় সরদার। দূত তাঁর সাথে সাক্ষাত করে আবরাহার পয়গাম তাঁর কাছে পৌঁছিয়ে দেয়। তিনি বলে, আবরাহার সাথে যুদ্ধ করার শক্তি আমাদের নেই। এটা আল্লাহর ঘর তিনি চাইলে তাঁর ঘর রক্ষা করবেন। দূত বলে , আপনি আমার সাথে আবরাহার কাছে চলুন। তিনি সম্মত হন এবং দূতের সাথে আবরাহার কাছে যান। তিনি এতই সুশ্রী ও আকর্ষণীয় প্রতাপশালী ব্যক্তিত্ব ছিলেন যে আবরাহ তাকে দেখে অত্যন্ত প্রভাবিত হয়ে পড়ে এবং সিংহাসন থেকে নেমে এসে নিজে তাঁর কাছে বসে পড়ে। সে তাঁকে জিজ্ঞেস করে , আপনি কি চান? তিনি বলেন , আমার যে উটগুলো ধরে নেয়া হয়েছে সেগুলো আমাকে ফেরত দেয়া হোক। আবরাহা বলল, আপনাকে দেখে তো আমি বড়ই প্রভাবিত হয়েছিলাম। কিন্তু আপনি নিজের উটের দাবী জানাচ্ছেন, অথচ এই যে ঘরটা আপনার ও আপনার পূর্বপুরুষদের ধর্মের কেন্দ্র সে সম্পর্কে কিছুই বলছেন না, আপনার এ বক্তব্য আপনাকে আমার দৃষ্টিতে মর্যাদাহীন করে দিয়েছে। তিনি বলেন, আমি তো কেবল আমার উটের মালিক এবং সেগুলোর জন্য আপনার কাছে আবেদন জানাচ্ছি। আর এই ঘর! এর একজন রব, মালিক ও প্রভু আছেন । তিনি নিজেই এর হেফাজত করবেন। আবরাহা জবাব দেয়, তিনি একে আমার হাত থেকে রক্ষা করতে পারবে না। আবদুল মুত্তালিব বলেন, এ ব্যাপারে আপনি জানেন ও তিনি জানেন। একথা বলে তিনি সেখান থেকে উঠে পড়েন। আবরাহা তাঁকে তাঁর উটগুলো ফিরিয়ে দেয়।  আবরাহার সেনাদলের কাছ থেকে ফিরে এসে আবদুল মুত্তালিব কুরাইশদেরকে বলেন, নিজেদের পরিবার পরিজনদের নিয়ে পাহাড়ের ওপর চলে যাও , এভাবে তারা ব্যাপক গণহত্যার হাত থেকে রক্ষা পাবে। তারপর তিনি ও কুরাইশদের কয়েকজন সরদার হারম শরীফে হাযির হয়ে যান। তারা কাবার দরজার কড়া ধরে আল্লাহর কাছে এই বলে দোয়া করতে থাকেন যে, তিনি যেন তাঁর ঘর ও তাঁর কাদেমদের হেফাজত করেন। সে সময় কাবা ঘরে ৩৬০ টি মূর্তি ছিল। কিন্তু এই সংকটকালে তারা সবাই এই মূর্তিগুলোর কথা ভুলে যায়। তারা একমাত্র আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করার জন্য হাত ওঠায়। ইতিহাসের বইগুলোতে তাদের প্রার্থনা বাণী উদ্ধৃত হয়েছে তার মধ্যে এক আল্লাহ ছাড়া আর কারোর নাম পর্যন্ত পাওয়া যায় না। ইবনে হিশাম তাঁর সীরাত গ্রন্থে আবদুল মুত্তালিবের নিম্নোক্ত কবিতাসমূহ উদ্ধৃত করেছেন  

 “হে আল্লাহ! বান্দা নিজের ঘর রক্ষা করে তুমিও তোমার ঘর রক্ষা করো। আগামীকাল তাদের ক্রুশ ও তাদের কৌশল যেন তোমার কৌশলের ওপর বিজয় লাভ না করে। যদি তুমি ছেড়ে দিতে চাও তাদেরকে ও আমাদের কিবলাহকে তাহলে তাই করো যা তুমি চাও। সুহাইলী ‘রওযুল উনুফ’ গ্রন্থে এ প্রসংগে নিম্নোক্ত কবিতাও উদ্ধৃত করেছেন, ক্রুশের পরিজন ও তার পূজারীদের মোকাবিলায় আজ নিজের পরিজনদেরকে সাহায্য করো। আবদুল মুত্তালিব দোয়া করতে করতে যে , কবিতাটি পড়েছিলেন ইবনে জারীর সেটিও উদ্ধৃত করেছেন। সেটি হচ্ছেঃ

“হে আমার রব! তাদের মোকাবিলায়

তুমি ছাড়া কারো প্রতি আমার আশা নেই,

হে আমার রব! তাদের হাত থেকে

তোমার হারমের হেফাজত করো।

এই ঘরের শত্রু তোমার শত্রু,

তোমার জনপদ ধবংস করা থেকে

তাদের বিরত রাখো।”

এ দোয়া করার পর আবদুল মুত্তালিব ও তার সাথীরাও পাহাড়ে গিয়ে আশ্রয় নেন। পরে দিন আবরাহা মক্কায় প্রবশে করার জন্য এগিয়ে যায়। এ সময় ঝাঁকে ঝাকে পাখিরা ঠোঁটে ও পাঞ্জার পাথর কণা নিয়ে উড়ে আসে । তারা এ সেনাদলের ওপর পাথর বর্ষণ করতে থাকে। যার ওপর পাথর কণা পড়তো তার দেহ সংগে সংগে গলে যেতে থাকতো। (তাফসীরে ইবনে কাসির, মারেফুল কুরআন, তাফহীমুল কুরআন এর সুরা ফিলের তাফসির)

আর রাহীকুল মাখতূম এর বর্ণানায় এসেছেঃ আবরাহা ইয়ামান হতে অগ্রসর হয়ে মুগাম্মাস নামক স্থানে পৌঁছলেন এবং সেখানে তাঁর সৈন্যবাহিনীকে প্রস্তুত করে নিয়ে মক্কায় প্রবেশের জন্য অগ্রসর হলেন। তারপর যখন মুজদালেফা এবং মিনার মধ্যবর্তী স্থান ওয়াদিয়ে মুহাস্সারে পৌঁছলেন তখন তার হাতী মাটিতে বসে পড়ল। ক্বাবা’হ অভিমুখে অগ্রসর হওয়ার জন্য কোন ক্রমেই তাকে উঠানো সম্ভব হল না। অথচ উত্তর, দক্ষিণ কিংবা পূর্ব মুখে যাওয়ার জন্য উঠানোর চেষ্টা করলে তা তৎক্ষণাৎ উঠে দৌঁড়াতে শুরু করত। এমন সময়ে আল্লাহ তা‘আলা এক ঝাঁক ছোট ছোট পাখী প্রেরণ করলেন। সেই পাখীগুলো ঝাঁকে ঝাঁকে পাথরের ছোট ছোট টুকরো সৈন্যদের উপর নিক্ষেপ করতে লাগল। প্রত্যেকটি পাখি তিনটি করে পাথরের টুকরো বা কংকর নিয়ে আসত একটি ঠোঁটে এবং দুইটি দু’পায়ে। কংকরগুলোর আকার আয়তন ছিল ছোলার মতো। কিন্তু কংকরগুলো যার যে অঙ্গে লাগত সেই অঙ্গ ফেটে গিয়ে সেখান দিয়ে রক্ত প্রবাহিত হতে হতে সে মরে যেত।

এ কাঁকর দ্বারা সকলেই যে আঘাত প্রাপ্ত হয়েছিল তা নয়। কিন্তু এ অলৌকিক ঘটনায় সকলেই ভীষণভাবে আতংকিত হয়ে পড়ল এবং প্রাণভয়ে পলায়নের উদ্দেশ্যে যখন বেপরোয়াভাবে ছুটাছুটি শুরু করল তখন পদতলে পিষ্ট হয়ে অনেকেই প্রাণত্যাগ করল। কংকরাঘাতে ছিন্নভিন্ন এবং পদতলে পিষ্ট হয়ে পলকে বীরপুরুষগণ মৃত্যুর কবলে ঢলে পড়তে লাগল। এদিকে আবরাহার উপর আল্লাহ তা‘আলা এমন এক মুসিবত প্রেরণ করলেন যে তাঁর আঙ্গুল সমূহের জোড় খুলে গেল এবং সানা নামক স্থানে যেতে না যেতেই তিনি পাখির বাচ্চার মতো হয়ে পড়লেন। তারপর তাঁর বক্ষ-বিদীর্ণ হয়ে হৃদপিন্ড বেরিয়ে এল এবং তিনি মৃত্যু মুখে পতিত হলেন।

মক্কা অভিমুখে আবরাহার অগ্রাভিযানের সংবাদ অবগত হয়ে মক্কাবাসীগণ প্রাণভয়ে নানা দিকে বিক্ষিপ্ত অবস্থায় পলায়ন করে পাহাড়ের আড়ালে কিংবা পর্বত চূড়ায় আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন। তারপর যখন তাঁরা অবগত হলেন যে, আবরাহা এবং তাঁর বাহিনী সমূলে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে তখন তাঁরা স্বস্তির নিংশ্বাস ত্যাগ করে আপন আপন গৃহে প্রত্যাবর্তন করেন। অধিক সংখ্যক চরিতবেত্তাগণের অভিমত হচ্ছে এ ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর জন্মলাভের মাত্র ৫০ কিংবা ৫৫ দিন পূর্বে মুহাররম মাস। অত্র প্রেক্ষিতে এটা ধরে নেয়া যায় যে ঘটনাটি সংঘটিত হয়েছিল ৫৭১ খ্রীষ্টাব্দে ফ্রেব্রুয়ারী মাসের শেষ ভাগে কিংবা মার্চ মাসের প্রথম ভাগে। হস্তী বাহিনীর এ ঘটনা ছিল আগামী দিনের নাবী (সাঃ) এবং ক্বাবা’হ শরীফের জন্য আল্লাহর সিদ্ধান্ত ও সাহায্যের এক সুস্পষ্ট নিদর্শন। [আর-রাহীকুল মাখতূম, আল্লামা সফিউর রহমান মোবারকপুরী (রহঃ)]

৪। কুরাইশদের কাবাগৃহ নির্মাণঃ

খোজায়া গোত্রের পতনের পর মক্কার শাসনভার গ্রহণ করেন কুরাইশ বংশের প্রতিষ্ঠাতা কুসাই বিন কিলাব। কুরাইশরা ৫০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ৬৩১ খ্রিস্টাব্দে মক্কা বিজয় পর্যন্ত মক্কার শাসন ও কাবার রক্ষণাবেক্ষণ করে। তিনি তাওয়াফের জন্য কাবার আঙিনা চিত্রিত করেন, যা আজও বিদ্যমান। তিনিই কাবার ছায়ায় ‘দারুন নদওয়া’ বা পরামর্শ সভা প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর শাসনামলে কাবায় চূড়ান্তরূপে মূর্তি পূজা শুরু হয়।

ক্বাবা’হ গৃহ পুনঃ নির্মাণ এবং হজ্জরে আসওয়াদ সম্পর্কিত বর্ণনা আর রাহিকুল মাখতুমে এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) যখন পঁয়ত্রিশ বছরে পদার্পণ করেন তখন কুরাইশগণ ক্বাবা’হ গৃহের পুনঃনির্মাণ কাজ আরম্ভ করেন। কারণ, ক্বাবা’হ গৃহের স্থানটি চতুর্দিকে দেয়াল দ্বারা পরিবেষ্টিত অবস্থায় ছিল মাত্র। দেয়ালের উপর কোন ছাদ ছিল না। এ অবস্থার সুযোগ গ্রহণ করে কিছু সংখ্যক চোর এর মধ্যে প্রবেশ করে রক্ষিত বহু মূল্যবান সম্পদ এবং অলঙ্কারাদি চুরি করে নিয়ে যায়। ইসমাঈল (আঃ)-এর আমল হতেই এ ঘরের উচ্চতা ছিল ৯ হাত।

গৃহটি বহু পূর্বে নির্মিত হওয়ার কারণে দেয়ালগুলোতে ফাটল সৃষ্টি হয়ে যে কোন মুহূর্তে তা ভেঙ্গে পড়ার মতো অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল। তাছাড়া সেই বছরেই মক্কা প্লাবিত হয়ে যাওয়ার কারণে ক্বাবা’হমুখী জলধারা সৃষ্টি হয়েছিল। তাছাড়া প্রবাহিত হওয়ায় ক্বাবা’হগৃহের দেওয়ালের চরম অবনতি ঘটে এবং যে কোন মুহূর্তে তা ধ্বসে পড়ার আশঙ্কা ঘণীভূত হয়ে ওঠে। এমন এক নাজুক অবস্থার প্রেক্ষাপটে কুরাইশগণ সংকল্পবদ্ধ হলেন ক্বাবা’হ গৃহের স্থান ও মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখার উদ্দেশ্যে তা পুনঃনির্মাণের জন্য।

ক্বাবা’হ গৃহ নির্মাণের উদ্দেশ্যে সকল গোত্রের কুরাইশগণ একত্রিত হয়ে সম্মিলিতভাবে কতিপয় নীতি নির্ধারণ করে নিলেন। সেগুলো হচ্ছে যথাক্রমেঃ ক্বাবা’হ গৃহ নির্মাণ করতে গিয়ে শুধুমাত্র বৈধ অর্থ-সম্পদ (হালাল) ব্যবহার করা হবে। এতে বেশ্যাবৃত্তির মাধ্যমে উপার্জিত অর্থ, সুদের অর্থ এবং হক নষ্ট করে সংগৃহীত হয়েছে এমন কোন অর্থ নির্মাণ কাজে ব্যবহার করা চলবে না। এ সকল নীতির প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন করে নির্মাণ কাজ আরম্ভ করার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করা হল।

নতুন ইমারত তৈরির জন্য পুরাতন ইমারত ভেঙ্গে ফেলা প্রয়োজন। কিন্তু আল্লাহর ঘর ভেঙ্গে ফেলার কাজে হাত দিতে কারো সাহস হচ্ছে না, অবশেষে ওয়ালীদ বিন মুগীরাহ মাখযুমী সর্বপ্রথম ভাঙ্গার কাজে হাত দিলেন এবং অন্যেরা ভীত-সম্ভ্রন্ত চিত্তে তা প্রত্যক্ষ করতে থাকলেন। কিন্তু কিছু অংশ ভেঙ্গে ফেলার পরও যখন তাঁরা দেখলেন যে তাঁর উপর কোন বিপদ আপদ আসছে না তখন সকলেই ভাঙ্গার কাজে অংশ গ্রহণ করলেন। যখন ইবরাহীম (আঃ)-এর ভিত্তি পর্যন্ত ভেঙ্গে ফেলা হল তখন নির্মাণ কাজ শুরু হল। প্রত্যেক গোত্র যাতে নির্মাণ কাজে অংশ গ্রহণের সুযোগ লাভ করে তজ্জন্য কোন্ গোত্র কোন্ অংশ নির্মাণ করবেন পূর্বাহ্নেই তা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এ প্রেক্ষিতে প্রত্যেক গোত্রই ভিন্ন ভিন্নভাবে প্রস্তর সংগ্রহ করে রেখেছিলেন। বাকূম নামক একজন রুমীয় মিস্ত্রির তত্ত্বাবধানে নির্মাণ কাজ এগিয়ে চলছিল। নির্মাণ কাজ যখন কৃষ্ণ প্রস্তরের স্থান পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছল তখন নতুনভাবে এক সমস্যার সৃষ্টি হল। সমস্যাটি হল ‘হাজারে আসওয়াদ’ তথা ‘কৃষ্ণ প্রস্তর’টি স্থাপন করার মহা গৌরব অর্জন করবেন তা নিয়ে। এ ব্যাপারে ঝগড়া ও কথা কাটাকাটি চার বা পাঁচ দিন চললো।

সকলেই নিজে বা তাঁর গোত্র কৃষ্ণ প্রস্তরটি যথাস্থানে স্থাপন করার দাবীতে অনড়। সকলেরই এক কথা, এ কাজটি তাঁরাই করবেন। কেউই সামান্য ছাড় দিতেও তৈরি নন। সকলেরই একই কথা, একই জেদ। জেদ ক্রমান্বয়ে রূপান্তরিত হল রেষারেষিতে। রেষারেষির পরবর্তী পর্যায় হচ্ছে রক্তারক্তি। এ ব্যাপারে রক্তারক্তি করতেও তাঁরা পিছপা হবেন না। সকল গোত্রের মধ্যেই চলছে সাজ সাজ রব। শুরু হয়েছে অস্ত্রের মহড়া। একটু নরমপন্থীগণ সকলেই আতঙ্কিত কখন যে যুদ্ধ বেধে যায় কে তা জানে।

এমন বিভীষিকাময় এক অবস্থার প্রেক্ষাপটে বর্ষীয়ান নেতা আবু্ উমাইয়া মাখযূমী এ সমস্যা সমাধানের একটি সূত্র খুঁজে পেলেন। তিনি সকলকে লক্ষ্য করে প্রস্তাব করলেন যে, আগামী কাল সকালে যে ব্যক্তি সর্ব প্রথম মসজিদুল হারামে প্রবেশ করবেন তাঁর উপরেই এ বিবাদ মীমাংসার দায়িত্ব অর্পণ করা হোক। সকলেই এ প্রস্তাবের প্রতি সমর্থন জ্ঞাপন করলেন। আল্লাহর কী অপার মহিমা! দেখা গেল সকল আরববাসীর প্রিয়পাত্র ও শ্রদ্ধেয় আল-আমিনই সর্ব প্রথম মসজিদুল হারামে প্রবেশ করেছেন। নাবী কারীম (সাঃ)-এর এভাবে আসতে দেখে সকলেই চিৎকার করে বলে উঠলঃ

*هٰذَا الْأَمِيْنُ، رَضَيْنَاهُ، هٰذَا مُحَمَّدٌ،*

আমাদের বিশ্বাসী, আমরা সকলেই এর উপর সন্তুষ্ট, তিনিই মুহাম্মাদ (সাঃ)।

তারপর নাবী কারীম (সাঃ) যখন তাঁদের নিকটবর্তী হলেন তখন ব্যাপারটি সবিস্তারে তাঁর নিকট পেশ করা হল। তখন তিনি এক খানা চাদর চাইলেন। তাঁকে চাদর দেয়া হলে তিনি মেঝের উপর তা বিছিয়ে দিয়ে নিজের হাতে কৃষ্ণ প্রস্তরটি তার উপর স্থাপন করলেন এবং বিবাদমান গোত্রপতিগণকে আহবান জানিয়ে বললেন, ‘আপনারা সকলে চাদরের পার্শ্ব ধরে উত্তোলন করুন। তাঁরা তাই করলেন। চাদর যখন কৃষ্ণ প্রস্তর রাখার স্থানে পৌছল তখন তিনি স্বীয় মুবারক হস্তে কৃষ্ণ প্রস্তরটি উঠিয়ে যথাস্থানে রেখে দিলেন। এ মীমাংসা সকলেই হৃষ্টচিত্তে মেনে নিলেন। অত্যন্ত সহজ্জ, সুশৃঙ্খল এবং সঙ্গত পন্থায় জ্বলন্ত একটি সমস্যার সমাধান হয়ে গেল।

এ দিকে কুরাইশগণের নিকট বৈধ অর্থের ঘাটতি দেখা দিল। এ জন্যই উত্তর দিক হতে ক্বাবা’হ গৃহের দৈর্ঘ আনুমানিক ছয় হাত পর্যন্ত কমিয়ে দেয়া হল। এ অংশটুকুই ‘হিজর’ ‘হাতীম’ নামে প্রসিদ্ধ। এবার কুরাইশগণ ক্বাবা’হর দরজা ভূমি হতে বিশেষভাবে উঁচু করে দিলেন যেন এর মধ্য দিয়ে সেই ব্যক্তি প্রবেশ করতে পারে যাকে তাঁরা অনুমতি দেবেন। যখন দেয়ালগুলো পনের হাত উঁচু হল তখন গৃহের অভ্যন্তর ভাগে ছয়টি পিলার বা স্তম্ভ নির্মাণ করা হল এবং তার উপর ছাদ দেয়া হল। ক্বাবা’হ গৃহের নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হলে একটি চতুর্ভূজের রূপ ধারণ করল। বর্তমানে ক্বাবা’হ গৃহের উচ্চতা হচ্ছে পনের মিটার। কৃষ্ণ প্রস্তর বিশিষ্ট দেয়াল এবং তার সামনের দেয়াল অর্থাৎঃ দক্ষিণ ও উত্তর দিকের দেয়াল হচ্ছে দশ দশ মিটার। কৃষ্ণ প্রস্তর মাতাফের জায়গা হতে দেড় মিটার উচ্চতায় অবস্থিত। দরজা বিশিষ্ট দেয়াল এবং এর সাথে সামনের দেয়াল অর্থাৎ পূর্ব এবং পশ্চিম দিকের দেয়াল বার মিটার করে। দরজা রয়েছে মেঝে থেকে দু’মিটার উঁচুতে। দেয়ালের পাশেই চতুর্দিকে নীচু জায়গা এক বৃদ্ধিপ্রাপ্ত চেয়ার সমতুল্য অংশ দ্বারা পরিবেষ্টিত আছে যার উচ্চতা পঁচিশ সেন্টিমিটার এবং গড় প্রস্থ ত্রিশ সেন্টিমিটার। একে শাজে বওয়া (চলন্ত দুর্লভ) বলা হয়। এটাও হচ্ছে প্রকৃত পক্ষে বায়তুল্লাহর অংশ। কিন্তু কুরাইশগণ এটাও ছেড়ে দিয়েছিলেন। [আর-রাহীকুল মাখতূম, আল্লামা সফিউর রহমান মোবারকপুরী (রহঃ)]

৫৭০ খ্রিস্টাব্দে মক্কার শাসক হলেন আবদুল মুত্তালিব। তিনিই প্রথম কাবায় স্বর্ণখচিত লৌহদরজা নির্মাণ করেন। তাঁর শাসনামলে ইয়েমেনের বাদশাহ আবরাহা ‘সানা’য় প্রতিষ্ঠিত ‘কুলাইস গির্জাকে শ্রেষ্ঠ প্রমাণের জন্য কাবা থেকে হজ্জ স্থানান্তরের উদ্দেশ্যে কাবা ধ্বংস করার পরিকল্পনা করে বিরাট হস্তীবাহিনী পাঠায়। আল্লাহ তায়ালা তার সমুচিত জবাব দিয়ে দেন। যা পবিত্র কোরআনে সুরা ফিলে বিবৃত হয়েছে। রাসুল (সা.)-এর বয়স যখন ৩৫ বছর, তখন এক মহিলা কাবাগৃহে আগুন লাগিয়ে দেয়। এরপর বন্যার কারণে কাবার গিলাফ ও দেয়াল ধ্বংস হয়ে যায়। তখন সবার সম্মতিক্রমে কাবাগৃহ পুনর্নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়।

৫। আবদুল্লাহ ইবনে জুবাইর (রা.) এর নির্মাণঃ

ইয়াজিদ বিন মুয়াবিয়া এর শাসনামলে হুসাইন নামক এক ব্যক্তির মিনজানিক (আগুনের গোলা)  ব্যবহারের দরুন মতান্তরে হাজ্জাজ বিন ইউসুফের মিনজানিক হামলার কারণে কাবা শরিফ পুড়ে বিধ্বস্ত হয়ে যায়। ফলে তা পুনর্নির্মাণের তীব্র প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয় এবং আবদুল্লাহ ইবনে জুবায়ের (রাঃ) কাবা পুনর্নির্মাণ শুরু করেন। তিনি হাতিমে কাবাকে কাবার সাথে যুক্ত করে তার আদিরূপ ফিরিয়ে আনতে ইচ্ছুক ছিলেন। মুহাম্মদ সাঃ নিজেও তার জীবদ্দশায় এমন ইচ্ছা করেছিলেন তবে তা নতুন ইসলাম গ্রহণকারীরা সঠিকভাবে বুঝতে পারবে না ভেবে বাস্তবায়ন করেননি। হাদিসে এসেছেঃ

আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁকে বললেনঃ তুমি কি জান না! তোমার কওম যখন কা’বা ঘরের পুনর্নির্মান করেছিল তখন ইব্রাহীম (আ:) কর্তৃক কা’বা ঘরের মূল ভিত্তি হতে তা সঙ্কুচিত করেছিল। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কি একে ইবরাহীমী ভিত্তির উপর পুন:স্থাপন করবেন না? তিনি বললেনঃ যদি তোমার সম্প্রদায়ের যুগ কুফরীর নিকটবর্তী না হত তা হলে অবশ্য আমি তা করতাম। ‘আবদুল্লাহ (ইব্‌নু ‘উমর) (রা: ) বলেন, যদি ‘আয়েশা (রাঃ) নিশ্চিতরূপে তা আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হতে শুনে থাকেন, তাহলে আমার মনে হয় যে, বায়তুল্লাহ হাতীমের দিক দিয়ে সম্পূর্ণ ইবরাহিমী ভিত্তির উপর নির্মিত না হবার কারণেই আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) (তাওয়াফের সময়) হাতীম সংলগ্ন দু’টি কোণ স্পর্শ করতেন না। (সহিহ বুখারি ১৫৮৩)

‘আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁকে বলেনঃ হে ‘আয়েশা! যদি তোমার কওমের যুগ জাহিলিয়াতের নিকটবর্তী না হত তাহলে আমি কা’বা ঘর সম্পর্কে নির্দেশ দিতাম এবং তা ভেঙ্গে ফেলা হত। অত:পর বাদ দেয়া অংশটুকু আমি ঘরের অন্তর্ভুক্ত করে দিতাম এবং তা ভূমি বরাবর করে দিতাম ও পূর্ব-পশ্চিমে এর দু’টি দরজা করে দিতাম। এভাবে কা’বাকে ইব্রাহীম (আঃ) নির্মিত ভিত্তিতে সম্পন্ন করতাম। (বর্ণনাকারী বলেন), আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর এ উক্ত কা’বা ঘর ভাঙতে (‘আবদুল্লাহ) ইব্‌নু যুবাইর (রহঃ)-কে অনুপ্রাণিত করেছে। (রাবী) ইয়াযীদ বলেন, আমি আমি ইব্‌নু যুবাইর (রাঃ)-কে দেখেছি তিনি যখন কাবা ঘর ভেঙে তা পুনর্নির্মাণ করেন এবং বাদ দেয়া অংশটুকু (হাতীম) তার সাথে সংযোজিত করেন এবং ইব্রাহীম (আঃ)-এর নির্মিত ভিত্তির পাথরগুলো উটের কুঁজোর ন্যায় আমি দেখতে পেয়েছি। (রাবী) জারীর (রহঃ) বলেন, আমি তাকে (ইয়াযীদকে) বললাম, কোথায় সেই ভিত্তি মূলের স্থান? তিনি বললেন, এখনই আমি তোমাকে দেখিয়ে দিব। আমি তাঁর সাথে বাদ দেয়া দেয়াল বেষ্টনীতে (হাতীমে) প্রবেশ করলাম। তখন তিনি একটি স্থানের দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, এখানে। জরীর (রহঃ) বলেন, দেয়াল বেষ্টিত স্থানটুকু পরিমাপ করে দেখলাম ছয় হাত বা তার কাছাকাছি। (সহিহ বুখারি ১৫৮৪)

আসওয়াদ ইবনু ইয়াযীদ (রাহঃ) হতে বর্ণিত আছে, ইবনু যুবাইর (রাঃ) তাকে বললেন, তোমাকে উম্মুল মু’মিনীন আইশা (রাঃ) যে হাদীস বলেছেন, তা আমার নিকটে বর্ণনা কর। আসওয়াদ বলেন, তিনি আমাকে বলেছেন যে, তাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেনঃ যদি তোমার সম্প্রদায় জাহিলী যুগের এত নিকটে এবং ইসলাম গ্রহণের ক্ষেত্রে নবদীক্ষিত না হত তাহলে আমি কা’বা ঘরকে ভেঙ্গে (পুনঃনির্মাণ করে) এর দুটো দরজা বানাতাম। (সুনানে তিরমিজ ৮৭৫)

আবদুল্লাহ ইবনে জুবাইর (রাঃ) কর্তৃক সম্পূর্ণ পাথর দিয়ে নতুনভাবে কাবা নির্মাণ করা হয় এবং এতে প্রবেশ ও বের হওয়ার জন্য পূর্ব ও পশ্চিমে দুটি দরজা স্থাপন করা হয়। তাছাড়া অর্ধবৃত্তাআরা হাতিম কাবার সাথে যুক্ত করা হয়। হজ্জরে আসওয়াদকে রূপার ফ্রেমে বাধিয়ে কাবায় সংযুক্ত করা হয়। এই পবিত্র পাথরের দৈর্ঘ্য ৮ ইঞ্চি ও প্রস্থ ৭ ইঞ্চি। বর্তমানে এটি আট টুকরো। আগে হাজরে আসওয়াদ ছিল আস্ত একটি পাথর। হজ্জরত আবদুল্লাহ বিন জোবায়েরের শাসনামলে কাবা শরিফে আগুন লাগলে হাজরে আসওয়াদ কয়েক টুকরা হয়ে যায়। তাই তিনি ভাঙা টুকরাগুলো রুপার ফ্রেমে বাঁধিয়ে দেন। ফ্রেম সংস্করণের সময় চুনার ভেতর কয়েকটি টুকরা ঢুকে যায়। বর্তমানে হাজরে আসওয়াদের আটটি টুকরা দেখা যায়। বড় টুকরাটি খেজুরের সমান

তিনি কাবাকে তিনি পুরো ইব্রাহিমি কাঠামোতে ফিরিয়ে নিয়ে যান। গমন বহির্গমনের সুবিধার্থে তিনি ‘মাতাফে’র সঙ্গে মিশিয়ে দুটি দরজা নির্মাণ করে সর্বসাধারণের জন্য অবমুক্ত করে দেন। ছাদের ভারসাম্য রক্ষার্থে তিনি কাবার অভ্যন্তরে তিনটি কাঠের স্তম্ভ স্থাপন করেন এবং কাবার উচ্চতা আরো ১০ হাত বৃদ্ধি করে দেন। ইবনে আসিরের বর্ণনা মতে, এ ঘটনা ছিল ৬৫ হিজরিতে।

পুরাতন বাইতুল্লাহ কয়েকটি ছবি দিলামঃ

৬। হাজ্জাজ বিন ইউসুফের কাবা নির্মাণঃ

৭৪ হিজরিতে (৬৯৪ খৃষ্টাব্দে)  আবদুল মালিক বিন মারওয়ানের শাসনামলে হাজ্জাজ বিন ইউসুফ এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে আবদুল্লাহ বিন জুবাইর (রা.) কে শহীদ করেন। ইবনে জুবাইরের কাবা নির্মাণকে হাজ্জাজ আত্মচিন্তা প্রসূত জ্ঞান করে কাবাকে কুরাইশি কাঠামোতে ফিরিয়ে নিতে উৎসাহী হন। ইবনে মারওয়ানের সম্মতিক্রমে তিনি ইবনে জুবাইরের স্মৃতিচিহ্নকে ধুলায় ধূসরিত করে দেন। তিনি ইব্রাহিমি কাঠামো পরিবর্তন করে কাবাকে কুরাইশি ফ্রেমে বন্দি করেন। পরবর্তী সময়ে হজ্জরত আয়েশা (রা.)-এর হাদিস শুনে ইবনে মারওয়ান খুবই অনুতপ্ত হয়েছেন বলে জানা যায়। এরপর বাদশাহ হারুনুর রশিদ কাবাকে ইবনে জুবাইরের আদলে নির্মাণ করতে চাইলে ফেতনার আশঙ্কায় তৎকালীন আলেম সমাজ বিশেষত ইমাম মালেক (রহ.) তা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন।

এর পর থেকে নির্মাণের পরিবর্তে কাবা শরিফের সংস্কারকাজ অদ্যাবধি অব্যাহত রয়েছে। ৯১ (৭১০ খৃষ্টাব্দে) হিজরিতে উমাইয়া খলিফা ওয়ালিদ বিন আবদুল মালিক কাবাগৃহে ব্যাপক সংস্কার করেন।

৭। উসমানি খেলাফতকালে সংস্কারঃ

১০১৯ হিজরিতে (১৬১০ খৃষ্টাব্দে) কাবার দেয়াল বিদীর্ণ হয়ে গেলে বাদশাহ আহমদ খান তা সংস্কার করেন। ১০৩৯/১০৪০ হিজরি (১৬৩০ খ্রিস্টাব্দ) এক ভয়াবহ বন্যায় কাবার পশ্চিম দিকের দরজাটি ভেঙে পড়ে। এ ছাড়া কাবার দেয়ালে ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়। বাদশাহ মুরাদ খান পাশার অর্থায়নে কাবাগৃহে ব্যাপক সংস্কার আনা হয়। ১২৭৬ হিজরিতে (১৮৫৯ খৃষ্টাব্দে) বাদশাহ আবদুল মজিদ একটি ‘মিজাব’ (নালা) হাদিয়া দেন, যাতে ২৩ কেজি (প্রায়) স্বর্ণ ব্যবহার করা হয়েছিল।

৮। সৌদি রাজবংশের সংস্কারকাজঃ

১৩৬৩ হিজরিতে (১৯৪৪ খৃষ্টাব্দে) বাদশাহ আবদুল আজিজ কাবার দরজা পরিবর্তন করেন। ১৩৭৭ হিজরিতে (১৯৫৭ খৃষ্টাব্দে) বাদশাহ সৌদ কাবার ওপরের ছাদ ভেঙে পুনর্নির্মাণ ও নিচের ছাদ নবায়ন করেন। এমনকি দেয়ালগুলো নতুন করে মেরামত করেন। ১৩৯১ হিজরিতে (১৯৭১ খৃষ্টাব্দে) বাদশাহ ফয়সাল কাবার দরজায় সংস্কার আনেন। ১৩৯৯ হিজরিতে (১৯৭৯ খৃষ্টাব্দে) বাদশাহ খালেদ প্রায় ২৮০ কিলোগ্রাম স্বর্ণ ব্যবহার করে নতুন দরজা প্রতিস্থাপন করেন।

১৪১৬ হিজরিতে (১৯৯৫ খৃষ্টাব্দে) বাদশাহ ফাহদ কাবার বাইরের দেয়াল সংস্কার করেন। ১৪১৭ হিজরিতে (১৯৯৬খৃষ্টাব্দে) তিনি কাবাগৃহের ছাদ, খুঁটি, দেয়ালসহ সব কিছু সংস্কার করে নতুন ধাঁচে ঢেলে সাজান। তাঁর এ নির্মাণকাজকে কাবার সর্বশেষ নির্মাণ বা সর্বশেষ সংস্কার হিসেবে অভিহিত করা হয়। 

বর্তমান বাইতুল্লাহ এর ছবি

৯। বাইতুল্লাহর তাওয়াফ কি কখনও বন্ধছিল?

হ্যা, বিভিন্ন কারনে বাইতুল্লাহ বহুবার বন্ধ ছিল। ইসলামী ধর্ম আবির্ভাবের আগে এবং আবির্ভাবের পরে যুদ্ধ-বিগ্রহ, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা, মহামারির প্রাদুর্ভাব, বৈরী আবহাওয়াসহ নানা কারণে  বেশ কয়েক বার বাইতুল্লাহ বন্ধছিল। ইসলামের ইতিহাসে দেখাযায় নবম হিজরিতে হজ্জ ফরজ হওয়ার পর হজ্জ উমরা বন্ধ ছিল। যে যে সময় কাবা বন্ধছিল তার কিছু উদাহরণ তুলে ধরা হলো।

আবরাহার আক্রমণঃ

হস্তিবর্ষে আবরাহার আক্রমণের ফলে পবিত্র কাবা প্রাঙ্গণে হজ্জ ও তাওয়াফ বন্ধ থাকে। ৫৭০ খ্রিস্টাব্দের ভেতর ঘটনাটি ঘটেছে। এ বছরই রাসুল (সা.) জম্মগ্রহণ করেছিলেন। কাবা ধ্বংস করে মানুষকে ইয়েমেনে নিতে চেয়েছিল আবরাহা। কিন্তু আল্লাহ তাআলা কাবা রক্ষা করেছিলেন। এ সময়ও কাবায় তাওয়াফ কিছু সময়ের জন্য বন্ধ থাকে।

কাবা পুনর্নির্মাণঃ

এ ছাড়া নবুয়তের পাঁচ বছর আগে বৃষ্টি ও বন্যার কারণে কাবা ঘরের ব্যাপক ক্ষতি হয়। ফলে কোরাইশরা কাবা পুনর্নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয়। আর তখনো কাবায় তাওয়াফ বন্ধ থাকতে পারে। যেহেতু তাতে দীর্ঘ সময় লেগে ছিল। রাসুল (সা.)-এর মাধ্যমে হাজরে আসওয়াত স্থাপনের ঘটনা এ সময় ঘটেছিল।

হাজ্জাজ বিন ইউসুফের আক্রমণঃ

৭৩ হিজরি (৬৯৩ খ্রিস্টাব্দে) খলিফা আবদুল মালিক বিন মারওয়ানের নির্দেশনায় হাজ্জাজ বিন ইউসুফ কাবা অবরোধ করে। সেখানে আবদুল্লাহ বিন জুবাইর (রা.) আত্মগোপন করেছিলেন। খলিফার পক্ষে বাইআত না করে তিনি নিজেকে খলিফা হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন। এভাবে ৯ বছর অতিবাহিত হয়। এই সময়ে আক্রমণের কারণে কাবার বিভিন্ন দিক ধ্বংস হয় এবং নামাজ ও ওমরাহ বন্ধ থাকে। এমনকি আবদুল মালিক বিন মারওয়ান বিজয়ী হলে আবদুল্লাহ বিন জুবায়েরের নির্মিত অংশটুকুও ভেঙে ফেলা হয়। ফলে কাবা পুনর্নির্মাণের সময় নামাজ ও তাওয়াফ বন্ধ থাকে।

কারামিয়াদের আক্রমণঃ

শিয়াদের একটি দল হলো কারামিয়া। ইরাকের আব্বাসি শাসক ও মিসরে উবায়াদি শাসকদের দুর্বলতার সুযোগে আরব উপদ্বীপের পূর্ব প্রান্তে বাহরাইনে একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে। তাদের বিশ্বাস ছিল, ‘হজ্জ জাহেলি যুগের একটি নিদর্শন। হজ্জ মূর্তির উপাসনার মতো।’ তাই ইসলামের ফরজ বিধান হজ্জ বন্ধ করতে কারামিয়া শাসকরা তৎপর হয়ে ওঠে। মূলত ইসলামের ইতিহাসে হজ্জ ফরজ হওয়ার পর কারামিয়ারা সর্বপ্রথম কাবায় আক্রমণ করে হাজিদের হত্যা করে।

৩১৭ হিজরি (৯৩০ খ্রিস্টাব্দ) ছিল মুসলিমদের বেদনাদায়ক ইতিহাস। বাতিল ফেরকায় বিশ্বাসী বাহরাইনের শাসক আবু তাহের কারামিয়া নেতৃত্বাধীন সেনাবাহিনী সর্ববৃহৎ হাজিদের কাফেলায় আক্রমণ করে। অনেক নারী-পুরুষকে হত্যা করে এবং তাদের সম্পদ ছিনতাই করে। ইরাক ও সিরিয়া থেকে মক্কা আসার পথে তারা আতঙ্ক তৈরি করে। ফলে ৩১৭ হিজরি থেকে ৩২৭ হিজরি পর্যন্ত হজের কার্যক্রম বন্ধ ছিল। (তারিখুল ইসলাম, আজ জাহাবি, ২৩/৩৭৪)।

ক। মাশিরি নামক মহামারিঃ

৩৫৭ হিজরিতে (৯৬৮ খৃষ্টাব্দে) মক্কায় মাশিরি নামের একটি রোগ মহামারি আকারে দেখা দেয়। এ সময় হাজিদের বেশির ভাগ লোকই মৃত্যুবরণ করে। কেউ কেউ মক্কায় আসার পথে পিপাসায় কাতর হয়ে মারা যায়। আর অনেকে হজ্জ সম্পন্ন করে মারা যায়। (ইবনে কাসির, আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া : ১১/১৪৫)।

মুসলিক সংঘাতের কারনেঃ

৩৭২ হিজরিতে (৯৮২ খৃষ্টাব্দে) আব্বাসি খলিফা ও মিসরের উবাইদি শাসনের মধ্যে সংঘাত তৈরি হয়। ফলে ৩৭২ থেকে ৩৮০ হিজরি (৯৮২-৯৯০ খৃষ্টাব্দে) পর্যন্ত ইরাকের কেউ হজ্জ করতে পারেনি। (ইবনে তাগরি বারদ, আন নুজুম জাহেরা : ৪/২৪৬)

খ। প্রাকৃতি কারনে বিভিন্ন জাতী হজ্জ করতে পারে নাইঃ

৪১৭ হিজরিতে মিসর ও প্রাচ্যের কারো পক্ষে হজ্জ করা সম্ভব হয়নি। ৪২১ হিজরিতে ইরাক ছাড়া অন্যরা হজ্জ করতে পারেনি। ৪৩০ হিজরিতে ইরাক, খোরাসান, শাম ও মিসরের কেউ হজ্জ করতে পারেনি। কারণ এ সময় দোজলা নদীসহ অন্যান্য বড় নদীর পানি বরফ আবৃত হয়। ফলে চলাচল করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। (ইবনুল জাওজি, আল মুনতাজাম, ৯/১৬৬)।

নিরাপত্তাহীনতাঃ

৪৯২ হিজরিতে মুসলিম বিশ্বের শাসকদের মধ্যে বিভিন্ন অঞ্চল নিয়ে ব্যাপক সংঘাত দেখা দেয়। এতে মক্কায় গমনের পথ অনিরাপদ হয়ে পড়ে। ফিলিস্তিনের বাইতুল মুকাদ্দাস খ্রিস্টানদের দখলে যাওয়ার পাঁচ বছর আগে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল।

গ।মক্কায় ব্যাপক বন্যা কারনেঃ

১০৩৮ হিজরি ১৬২৯ খ্রিস্টাব্দে মক্কায় ব্যাপক বন্যা হয়। ফলে কাবার দেয়াল ভেঙে পড়ে। সুলতান চতুর্থ মুরাদের নির্দেশে কাবা পুনর্নির্মাণের সময় হজ্জ ও ওমরাহর কার্যক্রম বন্ধ থাকে। ঐতিহাসিকদের মতে, এটি ছিল কাবার সর্বশেষ নির্মাণ।

ফরাসিদের আক্রমণের কারনেঃ

১২১৩ হিজরিতে ফরাসিদের আক্রমণের ফলে নিরাপত্তা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। ফলে হজ্জও বন্ধ থাকে।

ঘ। কলেরা মহামারীর করানেঃ

১৮৩০ খ্রিস্টাব্দে ভারতে প্রকাশ পাওয়া কলেরায় আক্রান্ত হয়ে তিন-চতুর্থাংশ হাজি মারা যায়। এ ছাড়া আরো কিছু মহামারির প্রকাশ ঘটে। ফলে ১৮৩৭ থেকে ১৮৯২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত দীর্ঘদিন মক্কায় হাজিদের আগমন বন্ধ ছিল।

(তথ্যসূত্র : আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, দারাতুল মালিক আবদুল আজিজ, আনাদোলু নিউজ এজেন্সি, আল খালিজ অনলাইন ডটনেট)

ঙ। করোনা মহামারীর কারনেঃ

করোনা মহামারীর কারনে ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২০ সাল উমরা যাওয়া বন্ধ করে সৌদি হজ্জ কর্তৃপক্ষ। এই বছর আর্থাৎ ২০২০ সালে খুবই সিমিত পর্যায় হজ্জ পালন করা হয়ে। এই হজ্জে সৌদির সিলেক্টেড হাজ্জি ব্যাতিত বিশ্বের কোন দেশের হাজ্জি হজ্জে অংশ গ্রহন করতে পারে নাই। দীর্ঘ সাত মাস উমরা ও তাওয়াফ বন্ধ থাকার পর অক্টোবর ২০২০ সালে আবার বাইতুল্লাহ তাওয়াফের অনুমতি প্রদান করা হয়। 

১০। বাইতুল্লার অবকাঠামোঃ

সৌদি গেজেট মতে, কাবাগৃহের উচ্চতা পূর্ব দিক থেকে ১৪ মিটার। (অন্য একটি সূত্র মতে ১২.৮৪ মিটার)। পশ্চিম দিক থেকে ১২.১১ মিটার। উত্তর দিক থেকে ১১.২৮ মিটার। দক্ষিণ দিক থেকেও ১২.১১ মিটার। (সূত্র : সৌদি গেজেট, ৩ জানুয়ারি, ২০১০ ইং)

ভূমি থেকে কাবার দরজার উচ্চতা ২.৫ মিটার। দরজার দৈর্ঘ্য ৩.০৬ ও প্রস্থ ১.৬৮ মিটার। বর্তমান দরজা বাদশা খালেদের উপহার, যা নির্মাণে প্রায় ২৮০ কিলোগ্রাম স্বর্ণ ব্যবহার করা হয়েছে। এর সিলিংকে তিনটি কাঠের পিলার ধরে রেখেছে। প্রতিটি পিলারের ব্যাস ৪৪ সে.মি.। কাবা শরিফের ভেতরের দেয়ালগুলো সবুজ ভেলভেটের পর্দা দিয়ে আবৃত। এই পর্দাগুলো প্রতি তিন বছর অন্তর অন্তর পরিবর্তন করা হয়। এর ছাদে ১২৭ সে.মি. লম্বা ও ১০৪ সে.মি. প্রস্থের একটি ভেন্টিলেটর রয়েছে, যা দিয়ে ভেতরে সূর্যের আলো প্রবেশ করে। এটি একটি কাচ দিয়ে ঢাকা থাকে। প্রতিবছর দুবার কাবা শরিফের ভেতরটা ধৌত করার সময় এ কাচ খোলা হয়।

এক নজরে কাবাঘরের দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতাঃ

উচ্চতামুলতাযামের দিকে দৈর্ঘ্যহাতীমের দিকে দৈর্ঘ্যরুকনে ইয়ামানী ও হাতীমের মাঝখানের দৈর্ঘ্যহাজরে আসওয়াদ ও রুকনে ইয়ামানীর মাঝখানের দৈর্ঘ্য
১৪ মিটার১২.৮৪ মিটার১১.২৮ মিটার১২.১১ মিটার১১.৫২ মিটার

মসজিদ আল-হারাম

মসজিদ আল-হারাম

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

মসজিদ আলহারাম ইসলামের ধর্মের সবচেয়ে পবিত্র স্থান যা বাইতুল্লাহ কে ঘিরে অবস্থিত।  এই মসজিদটি বাইতুল্লাহ কে কেন্দ্র করে অবস্থিত বিধায় পৃথিবীর সবচেয়ে ফজিলতপূর্ণ মসজিত। মসজিদটি ভিতরের ও বাইরের সালাতের স্থান মিলে বর্তমান কাঠামো প্রায় ৩,৫৬,৮০০ বর্গমিটার (৮৮.২ একর) জুড়ে অবস্থিত। মসজিদ সার্বক্ষণিক খোলা থাকে। হজ্জের সময় এখানে উপস্থিত হওয়া মানুষের জমায়েত পৃথিবীর বৃহত্তম মানব সমাবেশের অন্যতম।

মসজিদ আল-হারাম

কেন এই মসজিদকে মসজিদে হারাম বলা হয়?

এই মসজিদের নাম কোন মানুষ রাখেন নাই। স্বয়ং মহান আল্লাহ তায়ালা এই মসজিদের নাম রেখেছেন। কুরআনের বহু আয়াতে এই মসজিদকে মসজিদে হারাম বলে উল্লেখ করছেন। এ সম্পর্কিত কয়েকটি আয়াত উল্লেখ করছি। মহান আল্লাহ এরশাদ করেন,

*فَوَلِّ وَجْهَكَ شَطْرَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ وَحَيْثُ مَا كُنتُمْ فَوَلُّواْ وُجُوِهَكُمْ شَطْرَهُ *

অর্থঃ অতএব তুমি সম্মানিত মসজিদের দিকে তোমার মুখমণ্ডল ফিরিয়ে নাও এবং তোমরা যেখানে আছ তোমাদের মুখ সেদিকেই প্রত্যাবর্তিত কর। (সূরা বাক্বারা ২:১৪৪)

মহান আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন,

*وَصَدٌّ عَن سَبِيلِ اللّهِ وَكُفْرٌ بِهِ وَالْمَسْجِدِ الْحَرَامِ وَإِخْرَاجُ أَهْلِهِ مِنْهُ أَكْبَرُ عِندَ اللّهِ *

অর্থঃ আর আল্লাহর পথে প্রতিবন্দ্বকতা সৃষ্টি করা এবং কুফরী করা, মসজিদে হারামের পথে বাধা দেয়া এবং সেখানকার অধিবাসীদেরকে বহিস্কার করা, আল্লাহর নিকট তার চেয়েও বড় পাপ। (সুরা বাকারা ২:২১৭)

মহান আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন,

وَمِنْ حَيْثُ خَرَجْتَ فَوَلِّ وَجْهَكَ شَطْرَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ وَحَيْثُ مَا كُنتُمْ فَوَلُّواْ وُجُوهَكُمْ شَطْرَهُ لِئَلاَّ يَكُونَ لِلنَّاسِ عَلَيْكُمْ حُجَّةٌ

অর্থঃ আর তোমরা যেখান থেকেই বেরিয়ে আস এবং যেখানেই অবস্থান কর, সেদিকেই মুখ ফেরাও, যাতে করে মানুষের জন্য তোমাদের সাথে ঝগড়া করার অবকাশ না থাকে।

মহান আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন,

*وَمِنْ حَيْثُ خَرَجْتَ فَوَلِّ وَجْهَكَ شَطْرَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ وَإِنَّهُ لَلْحَقُّ مِن رَّبِّكَ *

অর্থঃ আর যে স্থান থেকে তুমি বের হও, নিজের মুখ মসজিদে হারামের দিকে ফেরাও-নিঃসন ্দেহে এটাই হলো তোমার পালনকর্তার পক্ষ থেকে নির্ধারিত বাস্তব সত্য। ( সুরা বাকারা ২:১৪৯ )

মন্তব্যঃ ইহা ছাড়াও সরাসরি সুরা বাকারার-১৯৬, সুরা মায়েদা-২, আনফালের-৩৪, সুরা তওবার-৯ ও ১৯, সুরা বনী ইসরাইলের-১, সুরা হজ্জের-২৫ এবং সুরা ফাতহা-২৫ আয়াতে সরাসরি এই মসজিদকে মসজিদে হারাম বলে উল্লেখ করছেন।

একটি বিশ্লষনঃ

“মসজিদে হারাম” নামটিতে দুটি আরবি শব্দ আছে। একটি হলো, মসজিদ অপরটি হলো হারাম। মসজিদ শব্দটির উৎপত্তি আরবি (السجود) থেকে, যার আভিধানিক অর্থ শ্রদ্ধাভরে মাথা অবনত করা। অর্থৎ সিজদার করা। এই হিসাবে মসজিদ এর অর্থ হলে সিজদার স্থান। সাধারণভাবে, যে সব ইমারত বা স্থাপনায় মুসলমানেরা একত্র হয়ে প্রাত্যহিক পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করেন, তাকে মসজিদ বলে।

অপর পক্ষে হারাম শব্দের দুটি অর্থ আছে। ‘হারাম’ শব্দের একটি অর্থ হলো ‘নিষিদ্ধ’। আর একটি অর্থ হলো ‘সম্মানিত’। মসজিদে হারাম বলেত এখানে সম্মানিত মসজিদ বলা হয়েছে। মহান আল্লাহ তায়ালা কুরআনুল কারীমে হারাম শব্দের অর্থ পবিত্র বা সম্মানিত অর্থে ব্যবহার করেছেন।

মহান আল্লাহ বলেন,

 *الشَّهْرُ الْحَرَامُ بِالشَّهْرِ الْحَرَامِ وَالْحُرُمَاتُ قِصَاصٌ فَمَنِ اعْتَدَى عَلَيْكُمْ فَاعْتَدُواْ عَلَيْهِ بِمِثْلِ مَا اعْتَدَى عَلَيْكُمْ*

অর্থঃ সম্মানিত মাসই সম্মানিত মাসের বদলা। আর সম্মান রক্ষা করারও বদলা রয়েছে। বস্তুতঃ যারা তোমাদের উপর জবর দস্তি করেছে, তোমরা তাদের উপর জবরদস্তি কর, যেমন জবরদস্তি তারা করেছে তোমাদের উপর। (সুরা বাকারা ২:১৯৪)

মন্তব্যঃ এখান মহান আল্লাহ হারাম মাস বলতে সম্মাতি মাস বুঝিয়েছন।

‘হারাম’ শব্দের অপর একটি অর্থ হলো ‘নিষিদ্ধ’। আমাদের সমাজে এবং আরবি ভাষায় হারাম শব্দটি নিষিদ্ধ অর্থেই বেশী ব্যবহৃত হয়। পবিত্র কুরআনেও হারাম শব্দটি ‘নিষিদ্ধ’ অর্থে এসেছে। পবিত্র কুরআনে আয়াত বিদ্যমান। মহান আল্লাহ বলেন,

*يَسْأَلُونَكَ عَنِ الشَّهْرِ الْحَرَامِ قِتَالٍ فِيهِ قُلْ قِتَالٌ فِيهِ كَبِيرٌ*

অর্থঃ তারা তোমাকে নিষিদ্ধ (হারাম) মাস সম্পর্কে  জিজ্ঞেস করে। তাতে যুদ্ধ করা কেমন? বলে দাও এতে যুদ্ধ করা ভীষণ বড় পাপ। (সুরা বাকারা ২:২১৭)

এই হিসাবে আবার কেউ কেউ করেন মসজিদটি মক্কার হারাম এলাকায় অবস্থিত বিধায় এর নাম মসজিদে হারাম। মক্কার বাইতুল্লাহর আশপাশের এলাকাকে মহান আল্লাহ হারাম এলাকা ঘোষনা করেছেন। অর্থাৎ এই এলাকার বিশেষ কিছু কাজ করা হারাম কিন্তু পৃথিবীর অন্য এলাকায় তা হালাল। মুলত ইব্রাহীম আলাইহিস সালামের দোয়ার বরকতে মক্কার এই বিশেষ এলাকাকে হারাম করা হয়। মহান আল্লাহ বলেন,

(আর স্মরণ কর) যখন ইবরাহীম বলেছিলেন, হে আমার প্রতিপালক! এই শহরকে (মক্কাকে) নিরাপদ করুন এবং আমাকে ও আমার পুত্রগণকে প্রতিমা পূজা হতে দূরে রাখুন। হে আমার প্রতিপালক! এসব প্রতিমা বহু মানুষকে বিভ্রান্ত করেছে সুতরাং যে আমার অনুসরণ করবে সে আমার দলভুক্ত, কিন্তু কেউ আমার অবাধ্য হলে আপনিতো ক্ষমাশীল পরম দয়ালু। হে আমার প্রতিপালক! আমি আমার বংশধরদের কতককে নিয়ে বসবাস করালাম এই অনুর্বর উপত্যকায় আপনার পবিত্র গৃহের নিকট। হে আমাদের প্রতিপালক! এই জন্যে যে, তরা যেন সালাত কায়েম করে। সুতরাং আপনি কিছু লোকের অন্তর ওদের প্রতি অনুরাগী করে দিন এবং ফলাদি দ্বারা তাদের রিযিকের ব্যবস্থা করুন, যাতে তারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।” [সূরা ইবরাহীম ১২:৩৫-৩৭]

মহান আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন,

*وَلاَ تُقَاتِلُوهُمْ عِندَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ حَتَّى يُقَاتِلُوكُمْ فِيهِ فَإِن قَاتَلُوكُمْ فَاقْتُلُوهُمْ كَذَلِكَ جَزَاء الْكَافِرِينَ*

অর্থঃ আর তাদের সাথে লড়াই করো না মসজিদুল হারামের নিকটে যতক্ষণ না তারা তোমাদের সাথে সেখানে লড়াই করে। অবশ্য যদি তারা নিজেরাই তোমাদের সাথে লড়াই করে। তাহলে তাদেরকে হত্যা কর। এই হল কাফেরদের শাস্তি। (সুরা বাকারা ২:১৯১)]

মহান আল্লাহ ঘোষিত, এই হারাম এলাকাতে বিশেষ কিছু বিধান প্রযোজ্য। মহান আল্লাহ্‌ এই মসজিদকে সম্মানিত করেছেন, পাশাপাশি এর সীমানায় বিশেষ কিছু কাজ হারাম ঘোষিত। নিম্ম লিখিত কাজ মক্কার হারাম এলাকায় নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

১. হারাম এলাকায় রক্তপাত, মারামারি, যুদ্ধ-বিগ্রহ নিষিদ্ধ

১২. শিকারযোগ্য যে কোনো হালাল জানোয়ার হত্যা করা হারাম

৩. শিকারযোগ্য প্রাণী হত্যার জন্য অস্ত্র সরবরাহ কিংবা ইসারা করে দেখিয়ে দেয়ার দ্বারা সাহায্য করাও হারাম।

৪. গাছপালা, এমনকি ঘাসও কাটা যাবে না

৫. পড়ে যাওয়া জিনিস নেয়া যাবে না (শুধু এই উদ্দেশ্যে জায়েজঃ আসল মালিককে ফিরিয়ে দেয়া)

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহ তা‘আলা যখন তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে মক্কা বিজয় দান করলেন, তখন তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লোকদের মাঝে দাঁড়িয়ে আল্লাহর হামদ ও সানা (প্রশংসা) বর্ণনা করলেন। এরপর বললেন, আল্লাহ তা‘আলা মক্কা্য় (আবরাহার) হস্তি বাহিনীকে প্রবেশ করতে দেননি এবং তিনি তাঁর রাসূল ও মু’মিন বান্দাদেরকে মক্কার উপর আধিপত্য দান করেছেন। আমার আগে অন্য কারোর জন্য মক্কায় যুদ্ধ করা বৈধ ছিল না, তবে আমার পক্ষে দিনের সামান্য সময়ের জন্য বৈধ করা হয়েছিল, আর তা আমার পরেও কারোর জন্য বৈধ হবে না। কাজেই এখানকার শিকার তাড়ানো যাবে না, এখানকার গাছ কাটা ও উপড়ানো যাবে না, ঘোষণাকারী ব্যক্তি ব্যতীত এখানকার পড়ে থাকা জিনিস তুলে নেয়া যাবে না। যার কোন লোক এখানে নিহত হয় তবে দু’টির মধ্যে তার কাছে যা ভাল বলে বিবেচিত হয়, তা গ্রহণ করবে। ফিদ্ইয়া গ্রহণ অথবা কিসাস। ‘আব্বাস (রাঃ) বলেন, ইযখিরের অনুমতি দিন। কেননা, আমরা এগুলো আমাদের কবরের উপর এবং ঘরের কাজে ব্যবহার করে থাকি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ইযখির ব্যতীত (অর্থাৎ তা কাটা ও ব্যবহারের অনুমতি দেয়া হল)। তখন ইয়ামানবাসী আবূ শাহ (রাঃ) দাঁড়িয়ে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে লিখে দিন। তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমরা আবূ শাহকে লিখে দাও। (ওয়ালিদ ইবনু মুসলিম বলেন) আমি আওযায়ীকে জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে লিখে দিন তাঁর এ উক্তির অর্থ কী? তিনি বলেন, এ ভাষণ যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর কাছ হতে তিনি শুনেছেন, তা লিখে দিন। (সহিহ বুখারি ২৪৩৪)

হারাম এলাকা সীমানা কতটুকুঃ

ইমাম নববির মতে, এই হারাম এলাকার সিমান হলো, মদিনার দিকে মক্কার হারাম এলাকার সীমানা হচ্ছে মক্কা থেকে ৩ মাইল দূরে তানয়ীমের আগে বনি নিফার গোত্রের বাড়ি ঘরের কাছাকাছি। ইয়েমেনের দিকের সীমানা হচ্ছে- মক্কা থেকে ৭ মাইল দূরে আদাত লাবানের প্রান্তভাগ। তায়েফের দিকের সীমানা হচ্ছে, মক্কা থেকে ৭ মাইল দূরে আরাফা ময়দানের নামিরার নীচুভূমি। ইরাকের দিকের সীমানা হচ্ছে, মক্কা থেকে ৭ মাইল দূরে আল-মুকাত্তা নামক স্থানের পাহাড়ি পথ পর্যন্ত। আল জিয়িরানার দিকের সীমানা হচ্ছে, মক্কা থেকে ৯ মাইল দূরে আব্দুল্লাহ বিন খালেদ বংশের গিরিপথ। জেদ্দার দিকের সীমানা হচ্ছে, মক্কা থেকে ১০ মাইল দূরে ‘মুনকাতিউল আ’শাশ’ নামক স্থান পর্যন্ত। (আল-মাজমু (৭/৪৬৩) থেকে সমাপ্ত)

মসজিদ আলহারাম এর ফজিলত

১. জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ মাসজিদুল হারাম ব্যতীত অপরাপর মসজিদের সালাত অপেক্ষা আমার মসজিদের সালাত হাজার গুণ শ্রেষ্ঠ (ফাযীলাতপূর্ণ)। অন্যান্য মসজিদের সালাতের তুলনায় মাসজিদুল হারামের সালাত এক লক্ষ গুণ উত্তম (ফাযীলাতপূর্ণ)।(ইবনে মাজাহ ১৪০৬, আলবানী সহিহ বলেছেন)।

২. আবদুল্লাহ ইবন উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে বলতে শুনেছিঃ আমার মসজিদে সালাত আদায় করা আন্য মসজিদের এক হাজার সালাত হতে উত্তম, মাসজিদুল হারাম ব্যতীত। আবু আবদুর রহমান (রহঃ) বলেনঃ মুসা জুহানী (রহঃ) ব্যতীত অন্য কেউ নাফি’ (রহঃ) সূত্রে আবদুল্লাহ ইবন উমর (রাঃ) থেকে এই হাদিস রিওয়ায়ত করেছেন বলে আমার জানা নেই। ইবন জুরায়জ (রহঃ) ও অন্যান্য বর্ণনাকারীরা এ রিওয়ায়ত ভিন্ন সনদে বর্ণনা করেছেন। (সুনানে নাসাঈ ২৮৯৭)

৩. সা’দ ইবন ইবরাহীম (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ আবূ সালামা(রাঃ) বলেছেনঃ আমি এই হাদিস সম্পর্কে আমর (রাঃ) -কে জিজ্ঞাস করেছি, তিনি বলেছেন যে, আমি আবূ হুরায়রা (রাঃ) -কে বলতে শুনেছি যে, নবী করীম (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ আমার এ মসজিদে সালাত আদায় করা কাবা শরীফের মসজিদ ব্যতীত অন্যান্য মসজিদের তুলনায় এক হাজার গুণ বেশী মর্যাদা রাখে। (সুনানে নাসাঈ ২৮৯৯)

৪. আবূ হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, “তিন মসজিদ ব্যতীত অন্য কোন স্থানের প্রতি সফর করা হবে না; আমার এই মসজিদ (নববী), মসজিদে হারাম এবং মসজিদে আকসা।” (বুখারী ১১৮৯, মুসলিম ৩৪৫০)

৫. সালমান (রাঃ) থেকে বর্ণিত, বর্ণনাকারী ‘আবদুর রহমান বলেন, সালমান (রাঃ) কে বলা হলো, তোমাদের নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তোমাদেরকে সবকিছুই শিক্ষা দিয়েছেন, এমন কি পায়খানা করার নিয়মও। সালমান (রাঃ) বললেন, হ্যাঁ। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে নিষেধ করেছেন ক্বিবলাহমুখী হয়ে পেশাব-পায়খানা করতে, ডান হাতে শৌচ করতে, শৌচকার্যে আমাদের কারো তিনটি ঢিলার কম ব্যবহার করতে এবং গোবর অথবা হাড় দ্বারা শৌচ করতে। (সুনানে আবু দাউদ ০৭) 

৬. আবূ আইউব (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, তোমরা পায়খানায় গিয়ে ক্বিবলাহমুখী হয়ে পায়খানা-পেশাব করবে না, বরং পূর্ব অথবা পশ্চিমমুখী হয়ে বসবে। আবূ আইউব (রাঃ) বলেন, আমরা সিরিয়ায় গিয়ে দেখতে পেলাম, সেখানকার শৌচাগারগুলো ক্বিবলাহমুখী করে বানানো। সেজন্য উক্ত স্থানে আমরা একটু বেঁকে বসতাম এবং আল্লাহর নিকট ক্ষমা চাইতাম।(সুনানে আবু দাউদ ০৯) 

মসজিদুল আকসাই প্রথম নির্মত মসজিদকথাটি কতটুকু সত্য?

কথাটি মোটেই সত্যা নয়। কুনআন ও সহিহ হাদিস মতে কাবাই প্রথম ইবাদতের নিমিত্তে নির্মিত ঘর। তবে একথা বলা যায় মসজিদুল আকসাই প্রথম কিবলা। তবে মানব জাতীর ইবাদাতে জন্য নির্মিত প্রথম ঘর বাইতুল্লাহ। মহান আল্লাহ বলেন,

*إِنَّ أَوَّلَ بَيْتٍ وُضِعَ لِلنَّاسِ لَلَّذِي بِبَكَّةَ مُبَارَكًا وَهُدًى لِّلْعَالَمِينَ*

অর্থঃ নিঃসন্দেহে সর্ব প্রথম ঘর যা মানুষের জন্যে স্থাপন করা হয়েছে, যা মক্কায় অবস্থিত। যা বিশ্বাবাসির জন্য বরকতময় হেদায়েত। ( সুরা ইমরান ৩:৯৬)

আবূ যার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! পৃথিবীতে সর্বপ্রথম কোন মাসজিদ তৈরী করা হয়েছে? তিনি বললেন, মসজিদে হারাম। আমি বললাম, অতঃপর কোনটি? তিনি বললেন, মসজিদে আকসা। আমি বললাম, উভয় মসজিদের (তৈরীর) মাঝে কত ব্যবধান ছিল? তিনি বললেন, চল্লিশ বছর। অতঃপর তোমার যেখানেই সালাতের সময় হবে, সেখানেই সালাত আদায় করে নিবে। কেননা এর মধ্যে ফযীলত নিহিত রয়েছে। (সহিহ বুখারী ৩৩৬৬)

আবূ যার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! সর্বপ্রথম কোন্ মাসজিদটি নির্মাণ করা হয়েছে। তিনি বললেন, মসজিদে হারাম। আমি বললাম, অতঃপর কোনটি? তিনি বললেন, মসজিদে আকসা। আমি বললাম, এ দু’য়ের নির্মাণের মাঝখানে কত তফাৎ? তিনি বললেন, চল্লিশ বছরের। (অতঃপর তিনি বললেন,) যেখানেই তোমার সালাতের সময় হবে, সেখানেই তুমি সালাত আদায় করে নিবে। কারণ, পৃথিবীটাই তোমার জন্য মাসজিদ। (সহিহ বুখারী ৩৪২৫)

বাইতুল্লাহ নির্মাণের চল্লিশ বছর মসজিদুল আকসা নির্মত হয়। এই কথার দলিল একটি সহিহ হাদিস। ইবরাহীম (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, আমি রাস্তায় বসে আমার পিতার নিকট কুরআন পাঠ করতাম, যখন আমি সিজদার আয়াত পাঠ করলাম তিনি সিজদা করলেন, তখন আমি বললাম আব্বা! আপনি রাস্তায় সিজদা করছেন! তিনি বললেন, আমি আবূ যর (রাঃ)-কে বলতে শুনেছি যে, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, কোন মসজিদটি প্রথম নির্মিত হয়? তিনি বলেছিলেন, মসজিদুল হারাম। আমি বললাম, তারপর কোনটি ? তিনি বললেন, মসজিদুল আকসা। আমি বললাম, এতদুভয়ের মধ্যে ব্যবধান কত? তিনি বললেন, চল্লিশ বছর। আর যমীন তোমার জন্য মসজিদ (সিজদার স্থান)। অতএব, যেখানেই সালাতের স্থান হবে, সেখানেই সালাত আদায় করবে। (সুনানে নাসাঈ ৬৯০, হাদিসের মান সহহি)

বাইতুল্লাহ বিভিন্ন অংশের বর্ণনা : প্রথম কিস্তি

বাইতুল্লাহ বিভিন্ন অংশের বর্ণনা : প্রথম কিস্তি

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

হাজরে আসওয়াদঃ

‘হাজরে আসওয়াদ’ হলো, কাবাঘরের দেয়ালে বিশেষভাবে স্থাপনকৃত একটি পাথরের নাম। আরবি ‘হাজর’ শব্দের অর্থ পাথর আর ‘আসওয়াদ’ শব্দের অর্থ কালো। অর্থাৎ ‘হাজরে আসওয়াদ’ শব্দের অর্থ হলো, কালো পাথর। ‘হাজরে আসওয়াদ’ বেহেশতের মর্যাদাপূর্ণ একটি পাথর। হজ্জযাত্রীরা হজ্জ করতে গিয়ে এতে সরাসরি বা ইশারার মাধ্যমে চুম্বন দিয়ে থাকেন। এই কালো পাথরটি কাবাঘরের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে, ভুমি থেকে ১.১০ মিটার উচ্চতায় স্থাপিত। এই পাথটির দৈর্ঘ্যে ২৫ সেন্টিমিটার ও প্রস্থে ১৭ সেন্টিমিটার। পূর্বে হাজরে আসওয়াদ এক খণ্ড ছিল। কারামাতা সম্প্রদায় ৩১৯ (তিনশত উনিশ) হিজরীতে পাথরটি উঠিয়ে নিজদের অঞ্চলে নিয়ে যায়। সে সময় পাথরটি ভেঙে ৮ (আট) টুকরো হয়ে যায়। এ টুকরোগুলোর সবচে’ বড়টি খেজুরের মতো। টুকরোগুলো বর্তমানে অন্য আরেকটি পাথরে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে, যার চারপাশে দেয়া হয়েছে রুপার বর্ডার। তাই রুপার বর্ডারবিশিষ্ট পাথরটি চুম্বন নয় বরং তাতে স্থাপিত হাজরে আসওয়াদের টুকরোগুলো চুম্বন বা স্পর্শ করতে পারলেই কেবল হাজরে আসওয়াদ চুম্বন বা স্পর্শ করা হয়েছে বলে ধরা হবে।

হাজরে আসওয়াদের ঐতিহাসিক তথ্যঃ

ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম ও পুত্র ইসমাঈল আলাইহিস সালাম কাবার প্রাচীর তৈরি করতে করতে যখন রুকনের স্থানে পৌঁছান তখন ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম আল্লাহর নিবেদিত প্রাণপুত্র ইসমাঈলকে বলেনঃ “একটি সুন্দর পাথর খুঁজে নিয়ে এসো। পাথরখানা এখানে রাখবো। তাহলে মানুষের কাবা প্রদক্ষিণের চিহ্নের কাজ দেবে”। পুত্র ইসমাঈল আলাইহিস সালাম পিতাকে বলেনঃ “পিতা! আমি অত্যন্ত ক্লান্ত”। তিনি বলেনঃ “তবুও যাও”। তারপর পুত্র পাথরের সন্ধানে বের হলেন। এমন সময় জীবরাঈল আলাইহিস সালাম পাথরখানা নিয়ে আসেন (তারিখে মক্কা, ইবনে কাসীর)।

কাবা ঘর বহু ঘাত-প্রতিঘাতে ক্ষত-বিক্ষত হয়েছে। তার সাথে হাজরে আসওয়াদ ও স্থানচ্যুত হয়েছে। এই কালো পাথরের সাথে বিশ্বনাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি অ সাল্লাম এর সম্পর্ক জড়িত। পূর্বেই উল্লেখ করছি, ইসলামপূর্ব কোরাইশদের যুগে কাবা শরিফের গিলাফ যখন পুড়ে গিয়েছিল, তখন হাজরে আসওয়াদও পুড়ে গিয়েছিল। ফলে তার কৃষ্ণতা আরো বৃদ্ধি পায়। বিশ্বনাবীর নবুয়্যাত প্রাপ্তির কয়েক বছর আগে কাবা ঘরের নির্মাণ কাজ করার পর পাথরটি সস্থানে রাখার নিয়ে মক্কাবাসি বিভিন্ন গোত্রের মাঝে বিবাদের সৃষ্টি হয়। আমাদের প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর মাধ্যমে সমস্যার সমাধান হয় এবং তাদের দ্বন্দ্বের পরিসমাপ্তি ঘটে। হাজরে আসওয়াদ জান্নাতের পাথর। তাই পাথর ফেরেশতাদের স্পর্শও আদম, ইব্রাহীম, ইসমাঈল আলাইহিমুস সালাম এর স্পর্শ জড়িত আছে।

 ৬৪ হিজরিতে হজ্জরত আব্দুল্লাহ ইবনে জুবায়ের রাদিয়াল্লাহু আনহুর শাসনামলে কাবা ঘরে আগুন লাগলে হাজরে আসওয়াদটি ভেঙে একাধিক খণ্ড হয়ে যায়। কেউ কেউ বলেন এটি ৩ খণ্ডে বিভক্ত হয়ে যায়। পরে হজ্জরত আব্দুল্লাহ ইবনে জুবায়ের এটিকে রুপার ফ্রেমে বাধাই করে পুনরায় কাবা চত্বরে স্থাপন করেন।আর তিনিই সর্বপ্রথম হাজরে আসওয়াদকে রুপা দিয়ে বাঁধানোর সৌভাগ্য অর্জনকারী।

• ১৭৯ হিজরিতে আব্বাসীয় খলিফা হারুনুর রশিদ হাজরে আসওয়াদকে হীরা দিয়ে ছিদ্র করে রুপা দিয়ে ঢালাই করেন।

• ৩১৭ হিজরিতে কারামতিয়ারা হারাম শরিফে অতর্কিত আক্রমণ করে। এই শীয়া সম্প্রদায় কাবা ঘরে প্রচুর ভাংচুর ও লুন্ঠন চালায়। কাবা ঘরের বিভিন্ন জিনিসের সঙ্গে হাজরে আসওয়াদও লুণ্ঠন করে নিয়ে যায় তারা। সে সময় দীর্ঘ ২২ বছর কাবা ঘরে হাজরে আসওয়াদ ছিল না। ২২ বছর পর ৩৩৯ হিজরিতে কারামতি সম্প্রদায়ের কাছ থেকে পাথরটি উদ্ধার করা হয়। লুণ্ঠনের সময় পাথরটি ব্যাপক ক্ষতি ও টুকরো টুকরো হয়ে যায়। হাজরে আসওয়াদের ভাঙা অংশগুলোর মধ্যে এখনো কয়েকটি খন্ড নিখোঁজ রয়েছে। কেউ কেউ বলেন এখনো পাথরের ৮ খণ্ডাংশ নিখোঁজ রয়েছে। হাজরে আসওয়াদের ভাঙা অংশগুলো কাদামাটি, মোম, অম্বর ইত্যাদি দিয়ে অত্যাধুনিক ব্যবস্থাপনায় মেরামতপূর্বক বাধাই করে রাখা হয়েছে।

• ৪১৩ হিজরিতে এক নাস্তিক লৌহ শলাকা দ্বারা হাজরে আসওয়াদের ওপর হামলে পড়ে। ফলে তা ছিদ্র হয়ে যায়। এরপর বনি শায়বার কিছু লোক তার ভগ্নাংশগুলো একত্রিত করে কস্তুরী দ্বারা ধৌত করে তার টুকরোগুলো ফের জোড়া লাগিয়ে দেয়।

• ১৩৩১ হিজরিতে সুলতান মুহাম্মদ রাশাদ হাজরে আসওয়াদের চারপাশে রুপার একটি নতুন বেষ্টনী তৈরি করে দেন।

• ১৩৫১ হিজরির এপ্রিলের ১৮ তারিখে বাদশাহ আবদুল আজিজ বিশিষ্ট ব্যক্তি ও আলেম-ওলামাসহ কাবা শরিফে উপস্থিত হন এবং হাজরে আসওয়াদের অবস্থান সুদৃঢ় করার জন্য তাতে মেশকে আম্বরের মতো মূল্যবান পাথর সংযুক্ত করেন।

• ১৪১৭ হিজরিতে পবিত্র কাবাঘরের সঙ্গে হাজরে আসওয়াদেও বিশেষ রুপার দ্বারা নতুন বেষ্টনী স্থাপিত হয়। যখনই পাথরটিতে কোনো সমস্যা বা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া চিহ্ন দেখা যায় তখনই হারামাইন কর্তৃপক্ষ তা সংস্কার করে থাকেন।

হাজরে আসওয়াদ চুম্বনের ফজিলতঃ

ক। কিয়ামতের দিন চুম্বরকারীর পক্ষে স্বাক্ষ্য দিবেঃ

১. ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, হাজরে আসওয়াদ সম্পর্কে রাসূলূল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহর কসম, এটি কিয়ামতের দিন এভাবে উত্থিত হবে যে, এর দুটি চোখ থাকবে যা দ্বারা সে দেখবে। একটি যবান হবে যদ্বারা সে কথা বলবে সত্য হৃদয়ে যে ব্যক্তি এর ইস্তিলাম করে এ তার সম্পর্কে আল্লাহর কাছে স্বাক্ষ্য দিবে। (তিরমিজি ৯৬৪, মিশকাত ২৫৭৮ হাদিসের মান হাসান)

২. সাঈদ ইবনে জুবাইর (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ইবনে আব্বাস (রাঃ) কে বলতে শুনেছি, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কিয়ামতের দিন এই পাথরকে উপস্থিত করা হবে। তার দু‘টি চোখ থাকবে, তা দিয়ে সে দেখবে, যবান থাকবে তা দিয়ে সে কথা বলবে এবং সে এমন লোকের অনুকূলে সাক্ষ্য দিবে যে তাকে সত্যতার সাথে চুমা দিয়েছে। (ইবনে মাজাহ ৯৪৪, তিরমিযী ৯৬১, আহমাদ ২২১৬, মিশকাত ২৫৭৮)

খ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চুম্বন করেছেনঃ

১. ‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ আমি দেখেছি, রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মাক্কায় পৌঁছে যখন হাজারে আসওয়াদ চুম্বন করতেন, তখন তিনি সাত চক্করের মধ্যে তিন চক্কর দ্রুত পদক্ষেপে সমাধান করতেন। সহিহ মুসলিম ২৯৪০)

২. ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উটের পিঠে আরোহণ করে বায়তুল্লাহ তাওয়াফ করেন, যখনি তিনি হজ্জরে আসওয়াদের কাছে আসতেন তখনই কোন কিছুর দ্বারা তার দিকে ইশারা করতেন এবং তাকবীর বলতেন। ইবরাহীম ইবনু তাহমান (রহঃ) খালিদ হাযযা (রহঃ) থেকে হাদীস বর্ণনায় খালিদ ইবনু ‘আবদুল্লাহ (রহঃ) এর আনুসরন করেছেন। (সহিহ বুখারি ১৫১৭ ইফাঃ)

গ। এই পাথরটি জান্নাত থেকে এসেছেঃ

ইবনু ‘উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, হাজারে আসওয়াদ ও মাকামে ইব্রাহীম জান্নাতের ইয়াকূতসমূহের মধ্যে দু’টি ইয়াকূত। আল্লাহ এদের নূর (আলো) দূর করে দিয়েছেন। যদিও এ দু’টির নূর (আলো) আল্লাহ তা‘আলা দূর করে না দিতেন। তবে এরা পূর্ব ও পশ্চিম দিগন্তের মধ্যে যা আছে তাকে আলোকময় করে দিতো। (সুনানে তিরমিযী ৮৭৮, মিশকাত ২৫৭৯)

ঘ। গুনাহের কারনে পাথরটি কালো করে দেয়া হয়েছেঃ

১. ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ হাজারে আসাওয়াদ যখন জান্নাত হতে নাযিল হয়, তখন তা দুধের চেয়েও বেশি সাদা ছিল। অতঃপর আদাম সন্তানের গুনাহ একে কালো করে দেয়। ( মিশকাত ২৫৭৭, সহিহ ইবনু খুযায়মাহ্ ২৭৩৩, সহিহ আল জামি ৬৭৫৬, সহিহ আত্ তারগীব ১১৪৬)।

২. ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, হাজরে আসওয়াদ জান্নাত থেকে অবতীর্ন হয়েছিল তখন সেটি ছিল দুধ থেকেও শুভ্র। মানুষের গুণাহ খাতা এটিকে এমন কালো করে দিয়েছে। (তিরমিজ ৮৭৮,  মিশকাত ২৫৭৭)

ঙ। সকল বরকতের মালিক মহান আল্লাহঃ

১. আবদুল্লাহ ইবনু ‘উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, ‘উমর ইবনু খাত্তাব (রাঃ) হাজরে আসওয়াদকে লক্ষ্য করে বললেন, ওহে! আল্লাহর কসম, আমি নিশ্চিতরূপে জানি তুমি একটি পাথর, তুমি কারও কল্যাণ বা অকল্যাণ করতে পার না। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে তোমায় চুম্বন করতে না দেখলে আমি তোমাকে চুম্বন করতাম না। এরপর তিনি চুম্বন করলেন। পরে বললেন, আমাদের রমল করার উদ্দেশ্য কি ছিল? আমরা তো রমল করে মুশরিকদেরকে আমাদের শক্তি প্রদর্শন করেছিলাম। আল্লাহ এখন তাদের ধ্বংস করে দিয়েছেন। এরপর বললেন, যেহেতু এই (রমল) কাজটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম করেছেন, তাই তা পরিত্যাগ করা পছন্দ করি না।(সহিহ বুখারি ১৫১০ইফাঃ)

২. উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, তিনি হাজরে আসওয়াদের কাছে এসে তা চুম্বন করে বললেন, আমি অবশ্যই জানি যে, তুমি একখানা পাথর মাত্র, তুমি কারো কল্যাণ বা অকল্যাণ করতে পার না। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে তোমায় চুম্বন করতে না দেখলে কখনো আমি তোমাকে চুম্বন করতাম না। (সহিহ বুখারি ১৫০২ইফাঃ)

হাজরে আসওয়াদের কিছু বৈশিষ্ট্য

হাদিসের গ্রন্থগুলোতে হাজরে আসওয়াদের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে প্রচুর আলোচনা এসেছে। হজ্জের কার্যাবলীর মধ্যে হাজরে আসওয়াদের একটি সম্পর্ক রয়ছে। সহিহ হাদিসের আলোকে নিম্মে হাজরে আসওয়াদের কিছু বৈশিষ্ট্য তুলে ধরলাম।

ক। হাজারে আসওয়াদ থেকে তাওয়াফ শুরু করাঃ

১. ইবনু ‘উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হাজারে আসওয়াদ থেকে শুরু করে হাজারে আসওয়াদ পর্যন্ত তিন চক্কর দ্রুত পদক্ষেপে এবং চার চক্কর স্বাভাবিক গতিতে সম্পন্ন করেছেন। (সহিহ মুসলিম ২৯৪১)

২. জাবির ইবনু আবদুল্লাহ্ (রা) থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ্ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে দেখেছি, হাজরে আসওয়াদ হতে আরম্ভ করে হাজরে আসওয়াদ পর্যন্ত তাওয়াফে (চক্করে) তিনি রমল করেছেন। (মুয়াত্তা মালেক ৮০২ সহিহ মুসলিম ১২৬৩)

৩. ইবন আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাওয়াফের শুরুতে হাজারে আসওয়াদ চুম্বন করেন, অতঃপর আল্লাহু আকবার বলেন এবং তাওয়াফের তিন চক্করে রমল করেন। আর তাঁরা যখন রুকনে ইয়ামীনের নিকট পৌঁছতেন এবং কুরায়শদের দৃষ্টি সীমার বাইরে যেতেন, তখন হাঁটতেন। আবার তাঁরা যখন তাদের (মুশরিক) সম্মুখীন হতেন, তখন রমল করতেন। এতদ্দর্শনে কুরাইশগণ বলত, এরা তো হরিণের ন্যায়। ইবন আব্বাস (রাঃ) বলেন, অতঃপর এটা সুন্নাত হিসেবে পরিগণিত হয়। (আবু দাউদ ১৮৮৭)

খ। হাজারে আসওয়াদ তাওয়াফ শেষ করাঃ

সাত চক্কের মাধ্যমে তাওয়াফ শেষ করতে হয়। যেহেতু হাজারে আসওয়াদ থেকে তাওয়াফ শুরু করা হয় কাজেই সাত চক্কর শেষে হাজারে আসওয়াদ এসেই তাওয়াফ শেষ করতে হয়।

গ। সরাসরি বা ইশারায় হাজারে আসওয়াদকে চুম্বন করাঃ

১. ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উটের পিঠে (আরোহণ করে) বায়তুল্লাহ তাওয়াফ করেন, যখনই তিনি হজ্জরে আসওয়াদের কাছে আসতেন তখনই কোন কিছু দিয়ে তার প্রতি ইশারা করতেন। (সহিহ বুখারি ১৫১৬ ইফাঃ)

২. ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, বিদায় হাজ্জের সময় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উটের পিঠে আরোহণ করে তাওয়াফ করার সময় ছড়ির মাধ্যমে হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করেন। দারাওয়ার্দী (রহ.) হাদীস বর্ণনায় ইউনুস (রহ.)-এর অনুসরণ করে ইবনু আবিয যুহরী (রহ.) সূত্রে তার চাচা (যুহরী) (রহ.) হতে রিওয়ায়াত করেছেন। (সহিহ বুখারি ১৬০৭)

৩. ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বাহনে আরোহী হয়ে তাওয়াফ করেছেন, হাজরে আসওয়াদের কাছে পৌছে তিনি এর দিকে ইশারা করতেন। (তিরমিজ ৮৬৬, ইবনে মাজাহ ২৯৪৮)

বাইতুল্লাহ বিভিন্ন অংশের বর্ণনা : দ্বিতীয় কিস্তি

বাইতুল্লাহ বিভিন্ন অংশের বর্ণনা : দ্বিতীয় কিস্তি

হিজর বা হাতীম

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

হিজর বা হাতীম হচ্ছে, কাবার উত্তরদিকে অবস্থিত অর্ধেক বৃত্তাকার অংশ যার পরিমান প্রায় পাঁচ হাত। মক্কার কুরাইশগন কাবা নির্মাণের সময় অর্থাভাবের কারনে সম্পূর্ণ কাবা  নির্মাণ করতে ব্যর্থ হয়। এই অংশটুকু তারা ছেড়ে যায়। কাজেই কাবার উত্তর পার্শ্বের অর্ধ-বৃত্তাকার দেয়ালঘেরা স্থান যা পূর্বে কাবাঘরের অন্তর্ভুক্ত ছিল বর্তমান ছাদহীন ফাঁকা পড়ে আছে তাই হাতীম বা হিজর নামে পরিচিত। হাতীম শব্দের অর্থ ভগ্নাংশ আর হিজর’ শব্দের অর্থ ‘পরিত্যক্ত’ তবে হিজরের অর্থ পাথর স্থাপন করা হয়ে থাকে। যাহোক বর্তমান কাবার যে ভিত্তি আমরা দেখছি তা ইবরাহীম আলাইহিস সালামের ভিত্তির ওপর নির্মাণ হয় নাই। হাতীম বা হিজর ইবরাহীম আলাইহিস সালামের ভিত্তিতে কাবার ভীতরে ছিল। তাই যে এই স্থানে প্রবেশ করবে ও সালাত আদায় করবে তার জন্য কারায় প্রবেশ ও সালাত আদয়ে বলে বিবেচিত হবে।

কুরাইশগন অর্থাভাবের কারনে হাতীমের অংশ বাদ দেয়ঃ

১। আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে প্রশ্ন করলাম, (হাতীমের) দেয়াল কি বায়তুল্লাহর অন্তর্ভুক্ত, তিনি বললেনঃ হাঁ। আমি বললাম, তাহলে তারা বায়তুল্লাহর অন্তর্ভুক্ত করল না কেন? তিনি বললেনঃ তোমার গোত্রের (অর্থাৎ কুরাইশের কাবা নির্মাণের) সময় অর্থ নিঃশেষ হয়ে যায়। আমি বললাম, কাবার দরজা এত উঁচু হওয়ার কারণ কি? তিনি বললেনঃ তোমার কওম তা এ জন্য করেছে যে, তারা যাকে ইচ্ছা তাকে ঢুকতে দিবে এবং যাকে ইচ্ছা নিষেধ করবে। যদি তোমার কওমের যুগ জাহিলিয়্যাতের নিকটবর্তী না হত এবং আশঙ্কা না হত যে, তারা একে ভাল মনে করবে না, তা হলে আমি দেয়ালকে বায়তুল্লাহর অন্তর্ভুক্ত করে দিতাম এবং তার দরজা ভূমি বরাবর করে দিতাম। (সহিহ বুখারি ১৪৮৯ ইফাঃ)

নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইচ্ছা ছিল হাতীমকে কাবার অন্তর্ভুক্ত করাঃ

আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বললেনঃ তুমি কি জানো না! তোমার সম্প্রদায় যখন কাবা ঘরের পুনঃনির্মাণ করেছিল তখন ইব্‌রাহীম (আঃ) কর্তৃক কাবাঘরের মূল ভিত্তি থেকে তা সংকুচিত করেছিল। আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি কি একে ইবরাহীমী ভিত্তির উপর পুনঃস্থাপন করবেন না? তিনি বললেনঃ যদি তোমার সম্প্রদায়ের যুগ কুফরীর নিকটবর্তী না হত তা হলে অবশ্য আমি তা করতাম। ‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘উমর (রাঃ) বলেন, যদি ‘আয়িশা (রাঃ) নিশ্চিতরূপে তা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে শুনে থাকেন, তাহলে আমার মনে হয় যে, বায়তুল্লাহ হাতীমের দিক দিয়ে সম্পূর্ণ ইবরাহিমী ভিত্তির উপর নির্মিত না হওয়ার কারণেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (তওয়াফের সময়) হাতীম সংলগ্ন দু‘টি কোণ স্পর্শ করতেন না। (সহিহ বুখারি ১৪৮৮ ইফাঃ)

২। ইবন জুবাইর (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ আমি ‘আয়শা (রাঃ) কে বলতে শুনেছি, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেনঃ যদি কুফরের সাথে মানুষের যুগ নিকটবর্তী না হতো, আর আমার কাছে এমন সম্পদও নেই যা আমাকে শক্তি যোগায়, (আর তা যদি থাকতো,) তাহলে আমি হিজরের ২ আরও পাঁচ হাত এতে মিলাতাম এবং এর একটি দরজা রাখতাম, যা দিয়ে লোক প্রবেশ করতো। আর একটি দরজা রাখতাম, যা দিয়ে লোক বের হতো। (সুনানে নাসাঈ ২৯১৩)

হিজর কাবারই অংশঃ

১। আবদুল হামিদ ইবন জুবায়র (রহঃ) তার ফুফু সফিয়া বিনত শায়বা সূত্রে বলেছেন, আমাদের কাছ আয়েশা (রাঃ) বলেছেন যে, আমি বললামঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমি কি কা’বায় প্রবেশ করবো না? তিনি ইরশাদ করলেন, তুমি হিজারে প্রবেশ কর। কেননা, তা কাবারই অংশ। (সুনানে নাসঈ ২৯১৪)

২। আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ আমার ইচ্ছা হতো কাবায় প্রবেশ করে তাতে সালাত আদায় করতে। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার হাত ধরে আমাকে হিজরে প্রবেশ করিয়ে বললেনঃ যখন তুমি কাবায় প্রবেশ করতে ইচ্ছা করেছ, তখন এখানে সালাত আদায় কর, কেননা এটি কাবারই এক অংশ। কিন্তু তোমার গোত্র যখন একে নির্মাণ করে, তখন তাকে সংক্ষিপ্ত করেন।(সুনানে (সুনানে নাসঈ ২৯১৪৫, সুনানে তিরমিজি ৮৭৬)

৩। অন্য এক বর্ণনায় আয়েশা (রাঃ) বলেন, আমি বললাম, ‘হে আল্লাহর রসূল! কাবা ঘরে প্রবেশ করব না কি?’ তিনি বললেন, “তুমি হিজরে প্রবেশ কর। তা কাবা ঘরেরই অংশ।” (নাসাঈ ২৯১৪)

হিজরের বাইরে দিয়ে তওয়াফ করবেঃ

সহিহ হাদিসের আলোকে জানতে পারছি যে, হাতিম বা হিজর কাবারই অংশ। আমাদের জানা আছে, তাওয়াফ করতে হয় কাবার চার পাশে। কাবার ভিতর দিয়ে তাওয়াফ হবে না। কাজেই কাবা ঘরের তাওয়াফকারী অবশ্যই হিজরের বাইরে দিয়ে তওয়াফ করবে। ব্যাপকভাবে প্রচারিত ভুলেরই একটি হচ্ছে এটাকে ‘হিজর ইসমাঈল’ করে নামকরণ করা। এ নামকরণটি সঠিক নয়। কিছু মানুষ মনে করে, ইসমাঈল আলাইহিস সালাম অথবা অন্য অনেক নবীকে এখানে দাফন করা হয়েছে। এটি আরও জঘন্য ধারণা। (ড. আবদুল্লাহ দুমাইজী, আল-বালাদুল হারাম, ফাযাইল ওয়া আহকাম ৬৬)।


মন্তব্যঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে পরিমাণ স্থান বাইরে ছিল বলে নির্ধারণ করেছেন সেটুকুই কাবার অংশ। বর্তমানে উত্তর দিকের দেয়ালের ভেতরে যতটুকু স্থান ঢোকানো হয়েছে, তা সঠিক পরিমাণের চেয়ে অনেক বেশি। যে এখানে সালাত আদায় করতে চায়, তার উচিত হাদীসে বর্ণিত সঠিক স্থানটুকু তালাশ করে বের করা।