তাওহীদ ও শিরক

তাওহীদ ও শিরক

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

তাওহীদ (توحيد) শব্দটি আরবি। যার অর্থ একত্ববাদ। কোনো কিছুকে এক মনে করা, এক ঘোষণা করা বা “একত্ব স্বীকার করা”। ইসলামি পরিভাষায় “আল্লাহ তায়ালা যে সত্তা, তাঁর গুণাবলি, কাজ, অধিকার ও ইবাদতের ক্ষেত্রে তিনি এক ও অনন্য। এ বিশ্বাস করা ও সে অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করা। আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের একত্ববাদের পরিচয়ই হচ্ছে তাওহীদের মূল কথা। ঈমান হচ্ছে একজন মুসলিমের জন্য সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। তাওহীদ বা একত্ববাদ হচ্ছে এই ঈমানের মূল ভিত্তি।

তাওহীদের তিনটি শাখা বা প্রকারভেদ :

তাওহীদকে সহজভাবে বুঝানোর জন্য আলেমগণ এটিকে তিন ভাগে ভাগ করেছেন। যথা-

১. তাওহীদুর রুববিয়াহ বা প্রতিপালকে এককত্ত্ব

২. তাওহীদুর উলুহিয়াহ বা ইবাদতে একমাত্র মালিক

৩. তাওহীদুর আসমা ওয়াস সিফাত বা নির্ধারিত সত্ত্বাবাচক ও গুনবাচক নাম

১. তাওহীদুর রুববিয়াহ বা প্রতিপালক এককত্ত্ব :

আল্লাহকে তার কর্ম সমূহে একক হিসেবে মেনে নেওয়া। আল্লাহই একমাত্র সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা, পরিচালনাকারী ও জীবিকা প্রদানকারী। কেউই তার এই গুণে শরিক নয়। তিনিই আকাশ-জমিন সৃষ্টি করেছেন। তিনিই বৃষ্টি দেন, মৃত্যু ও জীবন দেন।

বান্দা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করবে এবং স্বীকৃতি দেবে যে, এককভাবে আল্লাহ তায়ালাই এ নিখিল বিশ্বের স্রষ্টা, মালিক এবং পালনকর্তা। তিনি সর্বজ্ঞ, সবকিছু পরিবেষ্টন ও নিয়ন্ত্রণকারী। রাজত্ব তাঁরই হাতে। সকল কিছুর উপর পূর্ণ ক্ষমতাবান। তিনিই একে পরিচালনা করতে কারো মুখাপেক্ষী নন। তার সমতুল্য কেউ নেই। তিনি পরিপূর্ণ জ্ঞানের অধিকারী। যিনি পরম দয়ালু ও মেহেরবান।

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-

اَللّٰہُ خَالِقُ کُلِّ شَیۡءٍ ۫ وَّہُوَ عَلٰی کُلِّ شَیۡءٍ وَّکِیۡلٌ

অর্থ : আল্লাহ সব কিছুর স্রষ্টা এবং তিনি সব কিছুর তত্ত্বাবধায়ক। সুরব যুমার : ৬২

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-

قُلۡ هُوَ ٱللَّهُ أَحَدٌ (١) ٱللَّهُ ٱلصَّمَدُ (٢) لَمۡ يَلِدۡ وَلَمۡ يُولَدۡ (٣) وَلَمۡ يَكُن لَّهُ ۥ ڪُفُوًا أَحَدٌ (٤)

অর্থ : বলুন, তিনি আল্লাহ, এক, আল্লাহ অমুখাপেক্ষী, তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং কেউ তাকে জন্ম দেয়নি এবং তার সমতুল্য কেউ নেই। সুরা ইখলাস : ১-৪

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-

ٱللَّهُ لَآ إِلَـٰهَ إِلَّا هُوَ ٱلۡحَىُّ ٱلۡقَيُّومُ‌ۚ لَا تَأۡخُذُهُ ۥ سِنَةٌ۬ وَلَا نَوۡمٌ۬‌ۚ لَّهُ ۥ مَا فِى ٱلسَّمَـٰوَٲتِ وَمَا فِى ٱلۡأَرۡضِ‌ۗ مَن ذَا ٱلَّذِى يَشۡفَعُ عِندَهُ ۥۤ إِلَّا بِإِذۡنِهِۦ‌ۚ يَعۡلَمُ مَا بَيۡنَ أَيۡدِيهِمۡ وَمَا خَلۡفَهُمۡ‌ۖ وَلَا يُحِيطُونَ بِشَىۡءٍ۬ مِّنۡ عِلۡمِهِۦۤ إِلَّا بِمَا شَآءَ‌ۚ وَسِعَ كُرۡسِيُّهُ ٱلسَّمَـٰوَٲتِ وَٱلۡأَرۡضَ‌ۖ وَلَا يَـُٔودُهُ ۥ حِفۡظُهُمَا‌ۚ وَهُوَ ٱلۡعَلِىُّ ٱلۡعَظِيم

অর্থ :  “আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন উপাস্য নেই, তিনি জীবিত, সবকিছুর ধারক। তাঁকে তন্দ্রাও স্পর্শ করতে পারে না এবং নিদ্রাও নয়। আসমান ও জমিনে যা কিছু রয়েছে, সবই তাঁর। কে আছ এমন, যে সুপারিশ করবে তাঁর কাছে তাঁর অনুমতি ছাড়া? দৃষ্টির সামনে কিংবা পিছনে যা কিছু রয়েছে সে সবই তিনি জানেন। তাঁর জ্ঞানসীমা থেকে তারা কোন কিছুকেই পরিবেষ্টিত করতে পারে না, কিন্তু যতটুকু তিনি ইচ্ছা করেন। তাঁর সিংহাসন সমস্ত আসমান ও জমিনকে পরিবেষ্টিত করে আছে। আর সেগুলোকে ধারণ করা তাঁর পক্ষে কঠিন নয়। তিনিই সর্বোচ্চ এবং সর্বাপেক্ষা মহান। সুরা বাকারা : ২৫৫

আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবি ﷺ বলেছেন, আল্লাহ্ তায়ালা ইরশাদ করেন, ’’বানী আদম আমার প্রতি মিথ্যারোপ করেছে; অথচ এরূপ করা তার জন্য সঠিক হয়নি। বানী আদম আমাকে গালি দিয়েছে; অথচ এমন করা তার জন্য উচিত হয়নি। আমার প্রতি মিথ্যারোপ করার অর্থ হচ্ছে এই যে, সে বলে, আল্লাহ্ আমাকে যে রকম প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন, তেমনি তিনি আমাকে দ্বিতীয়বার জীবিত করবেন না। অথচ তাকে আবার জীবিত করা অপেক্ষা প্রথমবার সৃষ্টি করা আমার জন্য সহজ ছিল না। আমাকে তার গালি দেয়ার অর্থ হল, সে বলে, আল্লাহ্ তায়ালা সন্তান গ্রহণ করেছেন; অথচ আমি একক, কারো মুখাপেক্ষী নই। আমি কাউকে জন্ম দেইনি, আমাকেও জন্ম দেয়া হয়নি এবং কেউ আমার সমকক্ষ নয়। সহিহ বুখারি : ৪৯৭৪, সুনানে নাসায়ি : ২০৭৮, সহিহ ইবনে হিব্বান ২৬৭।

২. তাওহীদুর উলুহিয়াহ বা ইবাদতে একমাত্র মালিক :

ইবাদতের ক্ষেত্রে আল্লাহকে একক নির্ধারণ করা। যেমন: সালাত, সাওম, হজ, জাকাত, মান্নত, জিহাদ, দাওয়াত, কুরআন তিলাওয়াত, জিকির, দান সদকা, দুআ, ভয়, আশা, সাহায্য প্রার্থনা, তাওয়াক্কুল, জবেহ ইত্যাদি। যাবতীয় ইবাদত আল্লাহর উদ্দেশ্যে করা কারণ এই উদ্দেশেই সকল নবি (আ:) প্রেরণ করা হইয়াছে এবং কিতাব নাজিল করা হইয়াছে।

সকল মুসলিম তাওহীদুর রুববিয়াহ স্বীকার করে। এমনকি মুশরিকগণও তাওহীদুর রুববিয়াহ স্বীকার করে। কিন্তু তাওহীদুল উলুহিয়াহ কে অধিকাংশ মানুষ অস্বীকার করে তাই আল্লাহ তায়ালা মানুষ জাতির নিকট বহু নবি রাসুল প্রেরণ করছেন। তারা এসে তাওহীদুর উলুহিয়াহ বা শুধু আল্লাহর ইবাদত শিক্ষা দিয়েছেন। অন্যদের উপসনা ত্যাগ করতে বলেছেন।

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-

وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ قَبْلِكَ مِنْ رَسُولٍ إِلَّا نُوحِي إِلَيْهِ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنَا فَاعْبُدُونِ

অর্থ : আপনার পূর্বে আমি যে রাসুল পাঠিয়েছি তাঁকে এ প্রত্যাদেশই প্রেরণ করেছি যে, আমি ব্যতীত অন্য কোন উপাস্য নেই। সুতরাং একমাত্র আমারই ইবাদত কর। সুরা আম্বিয়া : ২৫

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-

وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَسُولًا أَنِ اُعْبُدُوا اللَّهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُوتَ

অর্থ : আমি প্রত্যেক উম্মতের মধ্যেই রাসুল প্রেরণ করেছি এ মর্মে যে তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর এবং তাগুত থেকে দূরে থাক। সুরা নাহল : ৩৬

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-

وَمَنْ يَدْعُ مَعَ اللَّهِ إِلَهًا آَخَرَ لَا بُرْهَانَ لَهُ بِهِ فَإِنَّمَا حِسَابُهُ عِنْدَ رَبِّهِ إِنَّهُ لَا يُفْلِحُ الْكَافِرُونَ

অর্থ : আর যে কেউ আল্লাহর সাথে অন্য উপাস্যকে ডাকে, তার কাছে যার কোন সনদ নেই। তার হিসেব তার পালনকর্তার নিকট। নিশ্চয় কাফেররা সফলকাম হবে না। সুরব মুমিনুন : ১১৭

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-

أُوْلَـٰٓٮِٕكَ ٱلَّذِينَ يَدۡعُونَ يَبۡتَغُونَ إِلَىٰ رَبِّهِمُ ٱلۡوَسِيلَةَ أَيُّہُمۡ أَقۡرَبُ وَيَرۡجُونَ رَحۡمَتَهُ ۥ وَيَخَافُونَ عَذَابَهُ ۥۤ‌ۚ إِنَّ عَذَابَ رَبِّكَ كَانَ مَحۡذُورً۬ا

অর্থ : এরা যাদেরকে ডাকে তারা তো নিজেরাই নিজেদের রবের নৈকট্যলাভের উপায় খুঁজে বেড়াচ্ছে যে, কে তাঁর নিকটতর হয়ে যাবে এবং এরা তাঁর রহমতের প্রত্যাশী এবং তাঁর শাস্তির ভয়ে ভীত৷ আসলে তোমার রবের শাস্তি ভয় করার মতো। সুরা ইসরা : ৫৭

অতএব তাওহীদ আল ইবাদাত এর ব্যাপারে এক আল্লাহর অধিকার সংরক্ষণ করা তাওহীদের গুরুত্বপূর্ণ দিক। তিনি একাই ইবাদত পাওয়ার অধিকারী এবং তিনিই মানুষকে ইবাদাতের কল্যাণকর প্রতিদান দেওয়ার অধিকারী।

৩. তাওহীদুর আসমা ওয়াস সিফাত বা নির্ধারিত সত্ত্বাবাচক ও গুনবাচক নাম :

আল্লাহ তাঁর নাম ও গুণসমূহকে ঠিক ঐভাবে বিশ্বাস করা যেভাবে আল্লাহ নিজে এবং তার রাসুলুল্লাহ ﷺ বর্ণনা করেছেন। সেগুলোর কোন পরিবর্তন, অস্বীকৃতি, বিকৃতি, বিলুপ্তি, ধরন, ব্যাখ্যা, তুলনা, উপমা ও গঠন ছাড়াই সাব্যস্ত করা ও মেনে নেওয়া। চাই গুণগুলি আচরণগত হোক বা সত্ত্বাগত হোক। সূত্র: তাফসীরুল উসরিল আখির মিনাল কুরআনুল কারীম

তাওহীদে আসমা ওয়াস সিফাত  আল্লাহর মূলসত্বা ও গুণাবলিতে বিশ্বাস করা। আল্লাহকে সেই নামেই ডাকতে হবে যে নাম তিনি নিজের জন্য নির্ধারণ করেছেন। কোন নব উদ্ভাবিত নামে তাঁকে ডাকা যাবে না। আল্লাহর কোন গুণকে মানুষের কোন গুণের সাথে তুলনা করা যাবে না। আল্লাহর সিফাত সম্পর্কে আল কুরআনে বলা হয়েছে-

لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ وَهُوَ السَّمِيعُ البَصِي

অর্থ : কোন বস্তুই তাঁর সদৃশ নয়, তিনি সব শোনেন, সব দেখেন, সুরা শুরা-১১)

যদিও দেখা ও শোনা মানুষের জন্যও প্রযোজ্য। কিন্তু মানুষের দেখার জন্য চোখ, শোনার জন্য কানের প্রয়োজন হয়। কিন্তু আল্লাহর সত্তার জন্য এসব চোখ, কান নাক ইত্যাদির প্রয়োজন হয় না।

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-

وَلِلَّهِ ٱلۡأَسۡمَآءُ ٱلۡحُسۡنَىٰ فَٱدۡعُوهُ بِہَا‌ۖ وَذَرُواْ ٱلَّذِينَ يُلۡحِدُونَ فِىٓ أَسۡمَـٰٓٮِٕهِۦ‌ۚ سَيُجۡزَوۡنَ مَا كَانُواْ يَعۡمَلُونَ

অর্থ : সবচেয়ে সুন্দর নাম সমূহ আল্লাহর অধিকারভুক্ত। সুতরাং সেই নামেই তাঁকে ডাক। যারা তাঁর নামকে অবজ্ঞা করে সে সব লোককে বর্জন কর। তারা যা করে শীঘ্রই তার প্রতিশোধ নেয়া হবে। সুরা আরাফ : ১৮০

আল্লাহর সুন্দর নামসমূহের কিছু উদাহরণ হল: আর রহমান (দয়াবান), আর রহিম (দয়ালু), আস সামী (সর্বদ্রষ্টা), আল বাসির (সর্বশ্রোতা),আল আযিয(পরাক্রমশালী), আল হাকিম (প্রজ্ঞাময়), আল হালিম (সহনশীল), আর আলিম (সর্বজ্ঞ) আল আলীউল কাবির (সর্বোচ্চ), আল হাইউল (চিরঞ্জীব) আল কাইউম

আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহ আনহু বর্ণনা করেন যে, রাসুল ﷺ বলেন-

«إِنَّ لِلَّهِ تِسْعَةً وَتِسْعِينَ اسْمًا مِائَةً إِلَّا وَاحِدًا، مَنْ أَحْصَاهَا دَخَلَ الجَنَّةَ»

অর্থ : আল্লাহর নিরানব্বই নামটি নাম রয়েছে যে ব্যক্তি সেগুলোর যথাযথভাবে আয়ত্ত করতে সক্ষম হবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে’’। সহিহ বুখারি : ২৭৩৬, সহিহ মুসলিম : ২৬৭৭

শিরক (شِرۡکَ)

তাওহীদ সম্পর্কে সামান্য ধারনা পেলাম। তাওহীদের বিপরীত কর্ম হলে শিরক। তাওহীদকে পুরোপুরি বুঝতে হলে শিরকতে বুঝতে হবে। তাই খুবই সংক্ষেপে শিরক ও তার কুফল সম্পর্কে আলোচন করা হবে।

একটি আরবি শব্দ যার অর্থ অংশীদার সাব্যস্ত করা, দুই বা ততোধিক শরিকের সংমিশ্রণ। কাউকে অপরের অংশীদার বানানো। শাব্দিকভাবে এর দ্বারা এক বা একাধিক কোন কিছুকে সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব ও কর্তৃত্বের অংশীদার সাব্যস্ত করাকে বুঝায়।

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-

اَمۡ لَہُمۡ شِرۡکٌ فِی السَّمٰوٰتِ 

অর্থ : অথবা আসমানসমূহে তাদের কোন অংশীদারিত্ব আছে কি? সুরা আহকাব : ৪।

এই আয়াতে মহান আল্লাহর সৃষ্টির কর্তৃত্বে অংশীদার বুঝাতে শিরক শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। আর কখনও দু’জনের মাঝে কোনো বস্তু বণ্টন করা হলে, এক জনকে অন্য জনের শরীক বলা হয়।

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-

وَاَشۡرِکۡہُ فِیۡۤ اَمۡرِیۡ ۙ

অর্থ : এবং তাকে আমার কাজের অংশী করুন। সুরা ত্বহা : ৩২

এই আয়াতে মুসা (আ.) তার ভাই হারুন আ.) তার নবুয়তের অংশীদার বুঝাতে শিরক শব্দটি ব্যবহার করেছেন।

প্রকৃত পক্ষে, শিরক হলো আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকে উপাস্য হিসেবে নির্ধারিত করা বা তার উপাসনা করা। ইসলামের পরিভাষায় রব ও ইলাহ হিসেবে আল্লাহর সহিত আর কাউকে শরীক সাব্যস্ত করার নামই শিরক। যেমন- 

মূর্তি বা দেবতার পূজা করা, তার সামনে মাথানত করা। আল্লাহ ব্যতীত কারো নিকট দুআ করা, ফরিয়াদ করা, সাহায্য তলব করা, আশ্রয় প্রার্থনা করা। আল্লাহ ছাড়া অন্যের নিকট রোগ মুক্তির জন্য, বিপদ থেকে উদ্ধারের জন্য, সন্তান কামনায় জন্য নিবেদন পেশ করা।

শরীয়তের পরিভাষায় শির্ক :

আল্লাহর রুববিয়াহ (প্রতিপালকে) অথবা তার উলুহিয়াহ (ইবাদতে) অথবা আসমা ওয়াস সিফাতে (নির্ধারিত সত্ত্বাবাচক ও গুনবাচক নামে) অংশীদার বা সমকক্ষ নির্ধারণ করাকে শিরক বলে। প্রতিপালন, আইন, বিধান ও ইবাদতের ক্ষেত্রে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব ও একচ্ছত্র অধিকারে কাউকে শরীক করা বা অংশীদার বানানোই হচ্ছে শিরক।

এই সংজ্ঞা এভাবে ও দেয়া যায় যে, ‘‘এমন সব বিশ্বাস, কাজ, কথা ও অভ্যাসকে শির্ক বলা হয় যার দ্বারা বাহ্যত মহান আল্লাহর রুবুবিয়্যাত, উলুহিয়্যাত ও গুণাবলিতে অপর কারো অংশীদারিত্ব বা সমকক্ষতা প্রতীয়মান হয়।“ এক কথায় গাইরুল্লাহকে আল্লাহ তয়ালার রুবূবিয়্যাত, উলূহিয়্যাত ও গুণাবলীর বৈশিষ্ট্যে গায়রুল্লাহকে সমকক্ষ করাকে শির্ক বলা হয়।’ যেমন-

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-

قَالُواْ وَهُمۡ فِيهَا يَخۡتَصِمُونَ ٩٦ تَٱللَّهِ إِن كُنَّا لَفِي ضَلَٰلٖ مُّبِينٍ ٩٧ إِذۡ نُسَوِّيكُم بِرَبِّ ٱلۡعَٰلَمِينَ ٩٨

অর্থ : সেখানে (জাহান্নামে) পরস্পর ঝগড়া করতে গিয়ে তারা বলবে, আল্লাহর শপথ! আমরাতো স্পষ্ট বিভ্রান্তিতেই ছিলাম। যখন আমরা তোমাদেরকে সকল সৃষ্টির রবের সমকক্ষ বানাতাম’। সুরা শুরা : ৯৬-৯৮

এ আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, মুশরিকরা তাদের পাথর ও কাঠ ইত্যাদির মূর্তিসমূহকে আল্লাহ তায়ালার রুবূবিয়্যাত ও উলূহিয়্যাতের বৈশিষ্ট্যে সমকক্ষ বানিয়ে নেয়ার কারণেই বিভ্রান্তিতে পতিত হয়ে মুশরিক হয়েছিল। শির্ক যখন আল্লাহ তায়ালার রুবূবিয়্যাত, উলূহিয়্যাত ও গুণাবলীর বৈশিষ্ট্যের সাথে সম্পর্কিত।

শিরকের প্রকারভেদ :

উপরে শিরক সম্পর্কে একটা ধারনা পেয়েছি। শিরক এমন গুনাহ যা মুসলিমকে ইসলাম থেকে বাহির করে দেয়। কিন্তু কিছু শিরক এমন আছে যা করা কবিরা গুনাহ হলেও মুসলিমকে ইসলাম থেকে বের করে দেয় না। যেমন- গাইরুল্লাহর জন্য দান করা, লোক দেখান ইবাদাত করা, আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে শপথ করা, আল্লাহ ব্যতীত অন্য কিছুর উদ্দেশ্যে মান্নত করা, ব্যক্তি বা বস্তুরকে কল্যান অকল্যান ভাবা ইত্যাদি। এ থেকে ষ্পষ্ট যে শিরকেরও প্রকারভেদ আছে। সাধারণ শিরক দুই প্রকার। যথা-

ক. শিরকে আকবার বা বড় শিরক।

খ. শিরকে আসগার বা ছোট শিরক।

ক। শিরকে আকবার বা বড় শিরক

বান্দা যখন একমাত্র আল্লাহর অধিকার বা হককে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকে নিবেদন করবে তখন শিরকে আকবর হবে। অর্থাৎ তার রুবুবিয়াতের কোনো অংশ, অথবা তার উলুহিয়াতের কোনো অংশ, অথবা তার নাম ও গুণাবলির কোনো অংশকে তিনি ব্যতীত কাউকে নিবেদন করবে।

আল্লাহকে তার মখলুকের সঙ্গে তুলনা করা, অথবা আল্লাহর সাথে দ্বিতীয় কাউকে সৃষ্টিকর্তা, অথবা রিজিকদাতা, অথবা পরিকল্পনাকারী জ্ঞান করা। শিরকে আকবার যা একজন ঈমানদার মুসলিম কে মুসলিম মিল্লাত থেকে বহিষ্কার করে দেয়। বান্দার সমস্ত আমল নষ্ট করে দেয়। এ ধরনের শিরকে লিপ্ত ব্যক্তি যদি তওবা ছাড়া শিরকের উপরই মৃত্যুবরণ করে, তাহলে সে চিরস্থায়ী ভাবে জাহান্নামে অবস্থান করবে। যেমন-

আল্লাহ ব্যতীত কারো নিকট দুআ করা, ফরিয়াদ করা, সাহায্য তলব করা, আশ্রয় প্রার্থনা করা, হোক সে নবি, অথবা অলি, অথবা ফেরেশতা অথবা জিন, অথবা অন্য কোনো মখলুক। দেবদেবী বা মূর্তি পূজা করা, কবর-মাজারে সিজদা করা, গায়রুল্লাহ তথা আল্লাহ ছাড়া যে কোন ব্যক্তি, প্রাণী বা বস্তুর উদ্দেশ্যে কোন ইবাদত আদায় করা, গায়রুল্লাহর উদ্দেশে কুরবানি করা, মৃত ব্যক্তি কিংবা জ্বিন অথবা শয়তান  বা ফিরিশতাগণ কারো ক্ষতি বা উপকার করতে বলে বিশ্বাস করে তাদের নিকট সাহায্য চাওয়া। আল্লাহ ছাড়া কেউ প্রয়োজন ও চাহিদা পূর্ণ করতে পারে, সুস্থ বা অসুস্থ করতে পারে, বিপদ আপদ দূর করতে পারে বলে বিশ্বাস করা তাদের নিকট সাহায্য চাওয়া। বিশ্বাস করা যে, আল্লাহর সাথে কোনো সত্তা আছে যে সৃষ্টি করে, অথবা জীবিত করে, অথবা মৃত্যু দেয়, অথবা মালিকানার হকদার, অথবা এ জগতে কর্তৃত্বের অধিকারী। অথবা এরূপ বিশ্বাস করা যে, অমুক সত্তা আল্লাহর ন্যায় নিঃশর্ত আনুগত্যের হকদার, ফলে সে কোনো বস্তু হালাল ও হারাম করার ক্ষেত্রে তার ইচ্ছার আনুগত্য করে, যদিও তা রাসুলদের আনিত দীনের বিপরীত হয়। আল্লাহ ব্যতীত কারো জন্য জবেহ করা। আল্লাহর বিধানের ন্যায় বিধান রচনা করে মানুষের উপর চাপিয়ে দেওয়া এবং তা মেনে নিতে বাধ্য করা। কাফেরদের পক্ষ নেওয়া ও মুমিনদের বিরুদ্ধে তাদেরকে সাহায্য করা।

ক. শিরকে আকবার বা বড় শিরকের সাধারণত তিনটি মাধ্যমে সংঘটিত হয়। যথা-

১। আকিদা বা বিশ্বাসের মাধ্যমে শিরক

২। ইবাদাতের মাধ্যমে শিরক

৩। সমাজে প্রচলিত ইসলামি বিরোধী কাজের মাধ্যমে শিরক

খ। শিরকে আসগার বা ছোট শিরক

যে সব শিরককে কুরআন ও সুন্নায় ছোট শিরক বলা হয়েছে তাকে শিরকে আসগার বা ছোট শিরক বলে বিবেচনা করব। আল্লাহ তায়ালার উদ্দেশ্যে বাস্তবায়ন কৃত আমল মানুষকে দেখানোর জন্য সুন্দর করার নাম শিরকে আসগার। শিরকে আসগার মানুষকে ইসলাম থেকে বের করে দেয় না। তবে এটি আমলকে নষ্ট করে দেয়। কেননা উক্ত রিয়াকারী মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করাই তার উদ্দেশ্যে পরিণত করেছে। কখনও এমন কাজ বড় শিরকের পর্যায়ে পৌঁছতে পারে।

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-

فَمَنْ كَانَ يَرْجُوا لِقَاءَ رَبِّهِ فَلْيَعْمَلْ عَمَلاً صَالِحًا وَلاَ يُشْرِكْ بِعِبَادَةِ رَبِّهِ أَحَدًا

অর্থ : সুতরাং যে ব্যক্তি তার পালনকর্তার সাক্ষাৎ কামনা করে, সে যেন সৎকর্ম সম্পাদন করে এবং তার পালনকর্তার এবাদতে কাউকে শরীক না করে। সুরা কাহফ : ১১০

লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে ও প্রসিদ্ধি অর্জনের জন্য কোন আমল করা। লোকে প্রশংসা পাওয়ার জন্য সুন্দর ভাবে সালাত আদায় করা, সদকা করা। লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে সশব্দে যিকির করা, সুকণ্ঠে তেলাওয়াত করা। নিরাপত্তার জন্য পুঁতি, তাবিজ, তাগা ও কড়ি ইত্যাদি ঝুলিয়ে রাখা। গাইরুল্লাহর নামে কসম খাওয়া। কোনো মহান বস্তু বা ব্যক্তিকে অতিরিক্ত সম্মান দেওয়া যা আল্লাহর রুবুবিয়াতের সমান নয়। ব্যক্তি শুধু দুনিয়া অর্জনের জন্যে আজান দেয়, ইমামতি করে, শিক্ষকতা, কুরআন শিখে, শরয়ী জ্ঞান অর্জন করে, জিহাদ,  হজ করে। আবার অনেক সময় ফাহেসা কথায় দ্বারাও ছোট শিরক হয়। কিন্তু এই শিরক ইসলাম থেকে বের করে দেয় না।

হুযাইফাহ ইবনে ইয়ামান (রা.) থেকে বর্ণিত। এক মুসলিম ব্যক্তি স্বপ্ন দেখে যে, আহলে কিতাবের এক ব্যক্তির সাথে তার সাক্ষাৎ হলে সে বলল, তোমরা কতই না উত্তম জাতি, যদি তোমরা শিরক না করতে। তোমরা বলে থাকো, ’’আল্লাহ্ যা ইচ্ছা করেন এবং মুহাম্মাদ যা ইচ্ছা করেন’’। অতঃপর সে স্বপ্নের কথাটি রাসুলুল্লাহ ﷺ এর নিকট বর্ণনা করলো। তিনি বলেন-

أَمَا وَاللَّهِ إِنْ كُنْتُ لأَعْرِفُهَا لَكُمْ قُولُوا مَا شَاءَ اللَّهُ ثُمَّ شَاءَ مُحَمَّدٌ

অর্থ : আল্লাহর শপথ! শোনো, আমি তো তোমাদের এরূপ কিছু বলতে শিখানি। তোমরা বলবে, ’’আল্লাহ্ যা ইচ্ছা করেন, এরপর রাসুলুল্লাহ ﷺ যা চান’’। ইবনে মাজাহ : ২১১৮

এ হাদিসটি প্রমাণ করছে যে, ইসলামের প্রারম্ভিক আমলে রাসুলুল্লাহ ﷺ এর সাহাবিদের মাঝে ‘আল্লাহ ও মুহাম্মদ ﷺ যা চান’, এ-জাতীয় কথাবার্তা বলার প্রচলন ছিল। পরবর্তীতে এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে রাসুলুল্লাহ ﷺ তাঁদেরকে এমন কথা বলা থেকে বারণ করেন এবং এ ধরনের কথার বদলে নিম্নোক্ত কথা বলতে শিক্ষা দেন। তোমরা বল, আল্লাহ তায়ালা এককভাবে যা চান। যেমন-

ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

إِذَا حَلَفَ أَحَدُكُمْ فَلاَ يَقُلْ مَا شَاءَ اللَّهُ وَشِئْتَ ‏.‏ وَلَكِنْ لِيَقُلْ مَا شَاءَ اللَّهُ ثُمَّ شِئْتَ ‏ ‏

অর্থ : তোমাদের কেউ যেন শপথ করা কালে এভাবে না বলে, ’’আল্লাহ যা চান এবং তুমি যা ইচ্ছা করো’’। বরং সে যেন বলে, ’’আল্লাহ্ যা ইচ্ছা করেন, এরপর তুমি যা ইচ্ছা করছো। ইবনে মাজাহ : ২১১৭

 শিরকে আসগার’ এর কতিপয় উদাহরণ হলো- কোনো ব্যক্তির বলল, আমার চাকরিটি  না থাকিলে সংসারের কি যে হত। আজ বিপদে আপনিই আমাকে বাঁচিয়েছেন। পোষা কুকুরটি না হলে আজ রাতে আমার বাড়িতে চুরি হয়ে যেতো, ইত্যাদি ইত্যাদি।

তাওহীদ ও শিরকের মাঝে পার্থক্য :

বিষয়তাওহীদশিরক
সংজ্ঞাআল্লাহকে এক ও অদ্বিতীয় বলা ও মানাআল্লাহর সঙ্গে অন্য কাউকে শরিক করা
ইবাদতের অধিকারকেবল আল্লাহরআল্লাহ ছাড়া অন্যকেও দেওয়া
উদ্দেশ্যআল্লাহর সন্তুষ্টিআল্লাহর সাথে অন্যের সন্তুষ্টি অর্জন
ইবাদতের দৃষ্টিভঙ্গিশুধুই আল্লাহর উদ্দেশ্যে ইবাদতকাউকে ইবাদতের অংশীদার করা
ক্ষমতার বিশ্বাসআল্লাহর সব কিছুর ক্ষমতা আছেঅন্যেরও অলৌকিক ক্ষমতা আছে মনে করা
প্রভাবজান্নাতের পথে নিয়ে যায়জাহান্নামের পথে নিয়ে যায়
নবিদের দাওয়াতসব নবি তাওহীদের দাওয়াত দিয়েছেননবিরা শিরকের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ করেছেন
তাওবা না করলে পরিণতিক্ষমারযোগ্য, যদি ভুল হয়ক্ষমাহীন গুনাহ, যদি তাওবা ছাড়া মৃত্যু হয়
অন্তর ও আমলের প্রভাবএকনিষ্ঠতা, শান্তি, একাগ্রতাবিভ্রান্তি, ভয়ের মিশ্রতা
ফলাফলজান্নাতের সফলতাজাহান্নামের শাস্তি ও চিরস্থায়ী ব্যর্থতা

ঈমানের ফজিলত

ঈমানের ফজিলত

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

কুরআনের আলোক ঈমানদারের কিছু ফজিলত :

ঈমান ইসলামের মৌল ভিত্তি। এটি ছাড়া কোনো আমল, কোনো ইবাদত, কোনো নেক কাজই আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। কুরআনুল কারিমে বারবার ঈমান আনার প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে এবং ঈমানকে সফলতার প্রথম ও প্রধান শর্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কাজেই ঈমান আনা প্রতিটি মানুষের মুক্তির জন্য ফরজ। মহান আল্লাহ কুরআনে অসংখ্য আয়াতে ঈমানের পুরস্কার ও প্রতিশ্রুতির বর্ণনা করেছেন। নিম্নে তার কিছু নমুনা তুলে ধরা হলো-

(১) জান্নাতের অধিকারী হবে

মহান আল্লাহ বলেন-

وَبَشِّرِ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَعَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ اَنَّ لَہُمۡ جَنّٰتٍ تَجۡرِیۡ مِنۡ تَحۡتِہَا الۡاَنۡہٰرُ ؕ

অর্থ : যারা ঈমান এনেছে এবং নেক কাজ করেছে তুমি তাদেরকে সুসংবাদ দাও যে, তাদের জন্য রয়েছে জান্নাতসমূহ, যার তলদেশ দিয়ে প্রবাহিত হবে নদীসমূহ। সুরা বাকারা : ২৫

মহান আল্লাহ বলেন-

وَبَشِّرِ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَعَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ اَنَّ لَہُمۡ جَنّٰتٍ تَجۡرِیۡ مِنۡ تَحۡتِہَا الۡاَنۡہٰرُ

অর্থ : এবং যারা বিশ্বাস স্থাপন করেছে ও সৎ কার্যাবলী সম্পাদন করে থাকে তাদেরকে সুসংবাদ প্রদান কর যে, তাদের জন্য এমন জান্নাত রয়েছে যার তলদেশ দিয়ে নদীসমূহ প্রবাহিত হচ্ছে। সুরা বাকারা : ২৫

মহান আল্লাহ বলেন-

وَالَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَعَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ اُولٰٓئِکَ اَصۡحٰبُ الۡجَنَّۃِ ۚ  ہُمۡ فِیۡہَا خٰلِدُوۡنَ 

অর্থ : আর যারা ঈমান এনেছে এবং নেক আমল করেছে, তারা জান্নাতের অধিবাসী। তারা সেখানে হবে স্থায়ী। সুরা বাকারা : ৮২

মহান আল্লাহ বলেন-

اِنَّ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَعَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ کَانَتۡ لَہُمۡ جَنّٰتُ الۡفِرۡدَوۡسِ نُزُلًا ۙ

অর্থ : নিশ্চয় যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকাজ করেছে, তাদের মেহমানদারির জন্য রয়েছে জান্নাতুল ফেরদাউস। সুরা কাহফ : ১০৭

(২) আল্লাহর দয়া ও অনুগ্রহ লাভ করবে

মহান আল্লাহ বলেন-

فَاَمَّا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا بِاللّٰہِ وَاعۡتَصَمُوۡا بِہٖ فَسَیُدۡخِلُہُمۡ فِیۡ رَحۡمَۃٍ مِّنۡہُ وَفَضۡلٍ ۙ  وَّیَہۡدِیۡہِمۡ اِلَیۡہِ صِرَاطًا مُّسۡتَقِیۡمًا ؕ

অর্থ : অতঃপর যারা আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছে এবং তাকে আঁকড়ে ধরেছে তিনি অবশ্যই তাদেরকে তাঁর পক্ষ থেকে দয়া ও অনুগ্রহে প্রবেশ করাবেন এবং তাঁর দিকে সরল পথ দেখাবেন। সুরা নিসা : ১৭৫

(৩) দুনিয়ায় এবং আখিরাতে শান্তি ও প্রশান্তি পাবে

মহান আল্লাহ বলেন-

اَلَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَتَطۡمَئِنُّ قُلُوۡبُہُمۡ بِذِکۡرِ اللّٰہِ ؕ  اَلَا بِذِکۡرِ اللّٰہِ تَطۡمَئِنُّ الۡقُلُوۡبُ ؕ

অর্থ : যারা ঈমান আনে এবং আল্লাহর স্মরণে চিত্ত প্রশান্ত হয়; জেনে রেখ, আল্লাহর স্মরণেই চিত্ত প্রশান্ত হয়। সুরা রা’দ: ২৮

মহান আল্লাহ বলেন-

اَلَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَلَمۡ یَلۡبِسُوۡۤا اِیۡمَانَہُمۡ بِظُلۡمٍ اُولٰٓئِکَ لَہُمُ الۡاَمۡنُ وَہُمۡ مُّہۡتَدُوۡنَ 

অর্থ : যারা ঈমান এনেছে এবং নিজ ঈমানকে যুলমের সাথে সংমিশ্রণ করেনি, তাদের জন্যই নিরাপত্তা এবং তারাই হিদায়াত প্রাপ্ত। সুরা আনাম: ৮২

(৪) পাপের ক্ষমা এবং মহাপুরস্কার পাবে :

মহান আল্লাহ বলেন-

وَعَدَ اللّٰہُ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَعَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ ۙ لَہُمۡ مَّغۡفِرَۃٌ وَّاَجۡرٌ عَظِیۡمٌ

অর্থ : যারা ঈমান এনেছে এবং নেক কাজ করেছে আল্লাহ ওয়াদা দিয়েছেন, তাদের জন্য রয়েছে ক্ষমা ও মহাপুরস্কার। সুরা মায়েদাহ : ৯

মহান আল্লাহ বলেন-

وَالَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَہَاجَرُوۡا وَجٰہَدُوۡا فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ وَالَّذِیۡنَ اٰوَوۡا وَّنَصَرُوۡۤا اُولٰٓئِکَ ہُمُ الۡمُؤۡمِنُوۡنَ حَقًّا ؕ لَہُمۡ مَّغۡفِرَۃٌ وَّرِزۡقٌ کَرِیۡمٌ

অর্থ : আর যারা ঈমান এনেছে, হিজরত করেছে এবং আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে এবং যারা আশ্রয় দিয়েছে ও সাহায্য করেছে, তারাই প্রকৃত মুমিন, তাদের জন্য রয়েছে ক্ষমা ও সম্মানজনক রিজিক। সুরা আনফাল : ৭৪

(৫) দুনিয়ায় ও আখেরত মর্যাদাবান করবেন :

মহান আল্লাহ বলেন-

الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا مِنۡکُمۡ ۙ وَالَّذِیۡنَ اُوۡتُوا الۡعِلۡمَ دَرَجٰتٍ ؕ

অর্থ : তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং যাদেরকে জ্ঞান দান করা হয়েছে আল্লাহ তাদেরকে মর্যাদায় উন্নত করবেন। সুরা মুজাদালাহ : ১

(৬) আখিরাতে কোনো ভয় বা চিন্তিত হবে না

মহান আল্লাহ বলেন-

اِنَّ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَالَّذِیۡنَ ہَادُوۡا وَالنَّصٰرٰی وَالصّٰبِئِیۡنَ مَنۡ اٰمَنَ بِاللّٰہِ وَالۡیَوۡمِ الۡاٰخِرِ وَعَمِلَ صَالِحًا فَلَہُمۡ اَجۡرُہُمۡ عِنۡدَ رَبِّہِمۡ ۪ۚ وَلَا خَوۡفٌ عَلَیۡہِمۡ وَلَا ہُمۡ یَحۡزَنُوۡنَ

অর্থ : নিশ্চয়ই মুসলিম, ইয়াহুদী, খ্রিষ্টান এবং সাবেঈন সম্প্রদায়, (মাঝে) যারা আল্লাহর প্রতি ও কিয়ামাতের প্রতি বিশ্বাস রাখে এবং ভাল কাজ করে, তাদের জন্য তাদের রবের নিকট পুরস্কার রয়েছে, তাদের কোন প্রকার ভয় নেই এবং তারা চিন্তিতও হবেনা। সুরা বাকারা : ৬২

মহান আল্লাহ বলেন-

وَمَا نُرۡسِلُ الۡمُرۡسَلِیۡنَ اِلَّا مُبَشِّرِیۡنَ وَمُنۡذِرِیۡنَ ۚ فَمَنۡ اٰمَنَ وَاَصۡلَحَ فَلَا خَوۡفٌ عَلَیۡہِمۡ وَلَا ہُمۡ یَحۡزَنُوۡنَ

অর্থ : আর আমি রাসুলদেরকে কেবল সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী হিসেবে প্রেরণ করি। অতএব যারা ঈমান এনেছে ও শুধরে নিয়েছে, তাদের উপর কোন ভয় নেই এবং তারা চি‎‎ন্তিত হবে না। সুরা আনাম : ৪৮

মহান আল্লাহ বলেন-

اِنَّ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَعَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ وَاَقَامُوا الصَّلٰوۃَ وَاٰتَوُا الزَّکٰوۃَ لَہُمۡ اَجۡرُہُمۡ عِنۡدَ رَبِّہِمۡ ۚ وَلَا خَوۡفٌ عَلَیۡہِمۡ وَلَا ہُمۡ یَحۡزَنُوۡنَ

অর্থ : নিশ্চয় যারা ঈমান আনে ও নেক আমল করে এবং সালাত কায়েম করে, আর জাকাত প্রদান করে, তাদের জন্য রয়েছে তাদের রবের নিকট প্রতিদান। আর তাদের কোনো ভয় নেই এবং তারা চিন্তিতও হবে না। সুরা বাকারা  : ২৭৭

(৭) আল্লাহর রহমত লাভ করবে :

মহান আল্লাহ বলেন-

اِنَّ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَالَّذِیۡنَ ہَاجَرُوۡا وَجٰہَدُوۡا فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ ۙ اُولٰٓئِکَ یَرۡجُوۡنَ رَحۡمَتَ اللّٰہِ ؕ وَاللّٰہُ غَفُوۡرٌ رَّحِیۡمٌ

অর্থ : নিশ্চয় যারা ঈমান এনেছে ও যারা হিজরত করেছে এবং আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করেছে, তারা আল্লাহর রহমতের আশা করে। আর আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। সুরা বাকারা : ২১৮

(৮) মহান আল্লাহ নিকট সুউচ্চ মর্যাদা

মহান আল্লাহ বলেন-

وَمَنۡ یَّاۡتِہٖ مُؤۡمِنًا قَدۡ عَمِلَ الصّٰلِحٰتِ فَاُولٰٓئِکَ لَہُمُ الدَّرَجٰتُ الۡعُلٰی ۙ

অর্থ : আর যারা তাঁর নিকট আসবে মুমিন অবস্থায়, সৎকর্ম করে তাদের জন্যই রয়েছে সুউচ্চ মর্যাদা। সুরা ত্বাহা : ৭৫

(৯) আল্লাহর পক্ষ থেকে সুসংবাদ প্রাপ্ত হবে

মহান আল্লাহ বলেন

الَّذِينَ آمَنُوا وَكَانُوا يَتَّقُونَ (63) لَهُمُ الْبُشْرَىٰ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَفِي الْآخِرَةِ ۚ لَا تَبْدِيلَ لِكَلِمَاتِ اللَّهِ ۚ ذَٰلِكَ هُوَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ

যারা ঈমান এনেছে এবং তাকওয়া অবলম্বন করত। তাদের জন্যই সুসংবাদ দুনিয়াবী জীবনে এবং আখিরাতে। আল্লাহর বাণীসমূহের কোনো পরিবর্তন নেই। এটিই মহা সফলতা। সুরা ইউনুস : ৬৩-৬৪

(১০) মহান আল্লাহই তাদের অভিভাবক হবেন :

মহান আল্লাহ বলেন-

اَللّٰہُ وَلِیُّ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا ۙ  یُخۡرِجُہُمۡ مِّنَ الظُّلُمٰتِ اِلَی النُّوۡرِ ۬ؕ 

অর্থ : যারা ঈমান এনেছে আল্লাহ তাদের অভিভাবক, তিনি তাদেরকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনেন। সুরা বাকারা : ২৫৭

(১১)  ঈমান আনলে আল্লাহ নিরাপত্তা ও হেদায়েত দিবেন :

 আল্লাহ তায়ালা বলেন,

 ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ وَلَمۡ يَلۡبِسُوٓاْ إِيمَـٰنَهُم بِظُلۡمٍ أُوْلَـٰٓٮِٕكَ لَهُمُ ٱلۡأَمۡنُ وَهُم مُّهۡتَدُونَ

অর্থ : যারা ঈমান এনেছে এবং নিজ ঈমানকে যুলমের সাথে সংমিশ্রণ করেনি তাদের জন্যই নিরাপত্তা এবং তারাই হিদায়াত প্রাপ্ত।  সুরা আনাম : ৮২

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-

وَإِنَّ ٱللَّهَ لَهَادِ ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ إِلَىٰ صِرَٲطٍ۬ مُّسۡتَقِيمٍ۬

অর্থ : আর যারা ঈমান এনেছে, নিশ্চয় আল্লাহ তাদেরকে সরল পথ প্রদর্শনকারী। সুরা হজ : ৫৪

(১২) ঈমানদারকে সাহায্য ও রক্ষা করা আল্লাহর দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত :

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-

فَٱنتَقَمۡنَا مِنَ ٱلَّذِينَ أَجۡرَمُواْ‌ۖ وَكَانَ حَقًّا عَلَيۡنَا نَصۡرُ ٱلۡمُؤۡمِنِينَ

অর্থ : অতঃপর যারা অপরাধ করেছিল আমি তাদের থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করলাম। আর মুমিনদেরকে সাহায্য করা তো আমার কর্তব্য। সুরা রূম : ৪৭

আল্লাহ তায়ালা বলেন,

إِنَّ اللَّهَ يُدَافِعُ عَنِ الَّذِينَ آمَنُوا ۗ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ كُلَّ خَوَّانٍ كَفُورٍ

অর্থ : নিশ্চয় আল্লাহ মুমিনদেরকে রক্ষা করেন এবং কোন বিশ্বাসঘাতক, অকৃতজ্ঞকে পছন্দ করেন না, সুরা হজ : ৩৮

আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন,

وَٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ‌ۚ كَذَٲلِكَ حَقًّا عَلَيۡنَا نُنجِ ٱلۡمُؤۡمِنِينَ (١٠٣)

অর্থ : এবং যারা ঈমান এনেছে তাদেরকে রক্ষা করি৷ এটিই আমার রীতি৷ মুমিনদের রক্ষা করা আমার দায়িত্ব। সুরা ইউনুস : ১০৩

(১৩)  দুনিয়া আখেরাতে সফলকাম হবে :

আল্লাহ তায়ালা বলেন,

اَلَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَہَاجَرُوۡا وَجٰہَدُوۡا فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ بِاَمۡوَالِہِمۡ وَاَنۡفُسِہِمۡ ۙ اَعۡظَمُ دَرَجَۃً عِنۡدَ اللّٰہِ ؕ وَاُولٰٓئِکَ ہُمُ الۡفَآئِزُوۡنَ

অর্থ : যারা ঈমান এনেছে ও হিজরাত করেছে, আর নিজেদের ধন ও প্রাণ দ্বারা আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে তারা মর্যাদায় আল্লাহর কাছে অতি বড়, আর তারাই হচ্ছে পূর্ণ সফলকাম । সুর তাওবা : ২০

আল্লাহ তায়ালা বলেন,

قَدۡ أَفۡلَحَ ٱلۡمُؤۡمِنُونَ (١)

অর্থ : নিশ্চিতভাবে সফলকাম হয়েছে মুমিনগণ, সুরা মুমিনুন :১

(১৪) ঈমানদার মুমিন জন্য সম্মান ও মর্যাদা :

 :: আল্লাহ তায়ালা বলেন,

‌ۚ وَلِلَّهِ ٱلۡعِزَّةُ وَلِرَسُولِهِۦ وَلِلۡمُؤۡمِنِينَ

অর্থ : অথচ সম্মান ও মর্যাদা তো কেবল আল্লাহ, তাঁর রাসুল ও মুমিনদের জন্য। সুরা মুনাফিকুন : ৮

(১৫) পৃথিবীতে খিলাফত বা শাসনভার প্রদান করবেন :

আল্লাহ তায়ালা বলেন_

وَعَدَ ٱللَّهُ ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ مِنكُمۡ وَعَمِلُواْ ٱلصَّـٰلِحَـٰتِ لَيَسۡتَخۡلِفَنَّهُمۡ فِى ٱلۡأَرۡضِ ڪَمَا ٱسۡتَخۡلَفَ ٱلَّذِينَ مِن قَبۡلِهِمۡ وَلَيُمَكِّنَنَّ لَهُمۡ دِينَہُمُ ٱلَّذِى ٱرۡتَضَىٰ لَهُمۡ وَلَيُبَدِّلَنَّہُم مِّنۢ بَعۡدِ خَوۡفِهِمۡ أَمۡنً۬ا‌ۚ يَعۡبُدُونَنِى لَا يُشۡرِكُونَ بِى شَيۡـًٔ۬ا‌ۚ وَمَن ڪَفَرَ بَعۡدَ ذَٲلِكَ فَأُوْلَـٰٓٮِٕكَ هُمُ ٱلۡفَـٰسِقُونَ

অর্থ : আল্লাহ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তোমাদের মধ্য থেকে যারা ঈমান আনবে ও সৎ কাজ করবে তাদেরকে তিনি পৃথিবীতে ঠিক তেমনিভাবে খিলাফত দান করবেন যেমন তাদের পূর্বে অতিক্রান্ত লোকদেরকে দান করেছিলেন, তাদের জন্য তাদের দ্বীনকে মজবুত ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত করে দেবেন, যাকে আল্লাহ তাদের জন্য পছন্দ করেছেন এবং তাদের (বর্তমান) ভয়-ভীতির অবস্থাকে নিরাপত্তায় পরিবর্তিত করে দেবেন ৷ তারা শুধু আমার বন্দেগি করুক এবং আমার সাথে কাউকে যেন শরীক না করে৷ আর যারা এমন কুফরি করবে তারাই ফাসেক ৷ সুরা নুর : ৫৫

(১৬) ঈমান আনলে আল্লাহ উত্তম জীবন দান করবেন

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

مَنۡ عَمِلَ صَـٰلِحً۬ا مِّن ذَڪَرٍ أَوۡ أُنثَىٰ وَهُوَ مُؤۡمِنٌ۬ فَلَنُحۡيِيَنَّهُ ۥ حَيَوٰةً۬ طَيِّبَةً۬‌ۖ وَلَنَجۡزِيَنَّهُمۡ أَجۡرَهُم بِأَحۡسَنِ مَا ڪَانُواْ يَعۡمَلُونَ

অর্থ : পুরুষ বা নারী যে-ই সৎকাজ করবে, সে যদি মুমিন হয়, তাহলে তাকে আমি দুনিয়ায় পবিত্র-পরিচ্ছন্ন জীবন দান করবে এবং (আখেরাতে) তাদের প্রতিদান দেবো তাদের সর্বোত্তম কাজ অনুসারে। সুরা নাহল

 : ৯৭

(১৭) আকাশ ও পৃথিবীর বরকত সমূহের দুআর খুলে দিবেন :

আল্লাহ তায়ালা বলেন,

  وَلَوۡ أَنَّ أَهۡلَ ٱلۡقُرَىٰٓ ءَامَنُواْ وَٱتَّقَوۡاْ لَفَتَحۡنَا عَلَيۡہِم بَرَكَـٰتٍ۬ مِّنَ ٱلسَّمَآءِ وَٱلۡأَرۡضِ وَلَـٰكِن كَذَّبُواْ فَأَخَذۡنَـٰهُم بِمَا ڪَانُواْ يَكۡسِبُونَ

অর্থ : যদি জনপদের লোকেরা ঈমান আনতো এবং তাকওয়ার নীতি অবলম্বন করতো, তাহলে আমি তাদের জন্য আকাশ ও পৃথিবীর বরকত সমূহের দুআর খুলে দিতাম৷ কিন্তু তারা তো প্রত্যাখ্যান করেছে৷ কাজেই তারা যে অসৎকাজ করে যাচ্ছিলো তার জন্যে আমি তাদেরকে পাকড়াও করেছি৷ লাভ। সুরা আরাফ : ৯৬

(১৮) ঈমান বান্দার পূর্বেকৃত অপরাধসমূহ ক্ষমা করে দেয় :

আল্লাহ তায়ালা বলেন,

قُلْ لِلَّذِينَ كَفَرُوا إِنْ يَنْتَهُوا يُغْفَرْ لَهُمْ مَا قَدْ سَلَفَ وَإِنْ يَعُودُوا فَقَدْ مَضَتْ سُنَّةُ الْأَوَّلِينَ 

অর্থ : হে নবি আপনি অমুসলিমদের বলে দিন যে, তারা যদি বিরত হয়ে যায়, তাহলে পূর্বে সংঘটিত সব ক্ষমা করে দেয়া হবে। পক্ষান্তরে আবারও যদি তাই করে তাহলে পূর্ববর্তীদের পথ নির্ধারিত হয়ে গেছে।  আনফাল : ৩৮

কুরআনের আলোকে ঈমান না আনার শাস্তি :

ঈমান না আনার ফলে পৃথিবীতে এবং আখিরাতে মারাত্মক শাস্তি ও ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে। কুরআনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, যারা ঈমান আনবে না বা তার বিধান মেনে চলবে না, তাদের জন্য রয়েছে ভয়াবহ পরিণতি। এর ফলে সৃষ্ট যে ফলাফলগুলো কুরআনে উল্লেখ আছে, তা নিম্নে উল্লেখ করা হলো:

(১) কুফরির কারণ জাহান্নামে বাসিন্দা হবে :

মহান আল্লাহ বলেন-

وَالَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا وَکَذَّبُوۡا بِاٰیٰتِنَاۤ اُولٰٓئِکَ اَصۡحٰبُ النَّارِ ۚ  ہُمۡ فِیۡہَا خٰلِدُوۡنَ 

অর্থ : আর যারা কুফরি করেছে এবং আমার আয়াতসমূহকে অস্বীকার করেছে, তারাই আগুনের অধিবাসী। তারা সেখানে স্থায়ী হবে। বাকারা : ৩৯

মহান আল্লাহ বলেন-

وَالَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا وَکَذَّبُوۡا بِاٰیٰتِنَاۤ اُولٰٓئِکَ اَصۡحٰبُ الۡجَحِیۡمِ

অর্থ : আর যারা কুফরি করেছে এবং আমার আয়াতসমূহকে অস্বীকার করেছে, তারাই প্রজ্বলিত আগুনের অধিবাসী। সুরা মায়েদা : ১০

মহান আল্লাহ বলেন-

اِنَّ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا یُنۡفِقُوۡنَ اَمۡوَالَہُمۡ لِیَصُدُّوۡا عَنۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ ؕ  فَسَیُنۡفِقُوۡنَہَا ثُمَّ تَکُوۡنُ عَلَیۡہِمۡ حَسۡرَۃً ثُمَّ یُغۡلَبُوۡنَ ۬ؕ  وَالَّذِیۡنَ کَفَرُوۡۤا اِلٰی جَہَنَّمَ یُحۡشَرُوۡنَ ۙ

অর্থ : নিশ্চয় যারা কুফরি করেছে, তারা নিজেদের সম্পদসমূহ ব্যয় করে, আল্লাহর রাস্তা হতে বাধা প্রদান করার উদ্দেশ্যে। তারা তো তা ব্যয় করবে। অতঃপর এটি তাদের উপর আক্ষেপের কারণ হবে এরপর তারা পরাজিত হবে। আর যারা কুফরি করেছে তাদেরকে জাহান্নামে সমবেত করা হবে। সুরা আনফাল : ৩৬

(২) কুফরির কারণে পরকালে আজাব দেওয়া হবে :

মহান আল্লাহ বলেন-

وَاَمَّا الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا وَکَذَّبُوۡا بِاٰیٰتِنَا وَلِقَآیِٔ الۡاٰخِرَۃِ فَاُولٰٓئِکَ فِی الۡعَذَابِ مُحۡضَرُوۡنَ

অর্থ : আর যারা কুফরি করেছে এবং আমার আয়াত ও আখিরাতের সাক্ষাতকে অস্বীকার করেছে, তাদেরকে আযাবের মধ্যে উপস্থিত করা হবে। সুরা রুম : ১৬

মহান আল্লাহ বলেন-

اِنَّ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا وَمَاتُوۡا وَہُمۡ کُفَّارٌ فَلَنۡ یُّقۡبَلَ مِنۡ اَحَدِہِمۡ مِّلۡءُ الۡاَرۡضِ ذَہَبًا وَّلَوِ افۡتَدٰی بِہٖ ؕ  اُولٰٓئِکَ لَہُمۡ عَذَابٌ اَلِیۡمٌ وَّمَا لَہُمۡ مِّنۡ نّٰصِرِیۡنَ 

অর্থ : নিশ্চয় যারা কুফরি করেছে এবং কাফের অবস্থায় মারা গেছে, তাদের কারো কাছ থেকে জমিন ভরা স্বর্ণ বিনিময়স্বরূপ প্রদান করলেও গ্রহণ করা হবে না, তাদের জন্যই রয়েছে বেদনাদায়ক আজাব, আর তাদের জন্য কোন সাহায্যকারী নেই। সুরা আল ইমরান : ৯১

(৩) অস্বীকারী  ঈমান থেকে বঞ্চিত হবে-

মহান আল্লাহ বলেন-

اِنَّ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا سَوَآءٌ عَلَیۡہِمۡ ءَاَنۡذَرۡتَہُمۡ اَمۡ لَمۡ تُنۡذِرۡہُمۡ لَا یُؤۡمِنُوۡنَ

অর্থ : নিশ্চয়ই যারা অবিশ্বাস করছে তাদের জন্য উভয়ই সমান; তুমি তাদেরকে ভয় প্রদর্শন কর বা না কর, তারা ঈমান আনবেনা। সুরা বাকারা : ৬

(৪) জাহান্নামে আজাব শুধু বৃদ্ধি করা হবে

মহান আল্লাহ বলেন-

اَلَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا وَصَدُّوۡا عَنۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ زِدۡنٰہُمۡ عَذَابًا فَوۡقَ الۡعَذَابِ بِمَا کَانُوۡا یُفۡسِدُوۡنَ

অর্থ : যারা কুফরি করেছে ও আল্লাহর পথ হতে বাধা দিয়েছে, আমি তাদের শাস্তির উপর শাস্তি বৃদ্ধি করব। সুরা হিজর : ৮৮

(৫) আখিরাতে অস্বস্তি ও লাঞ্ছনাকর আজাব হবে :

মহান আল্লাহ বলেন-

تَلۡفَحُ وُجُوهَهُمُ ٱلنَّارُ وَهُمۡ فِيهَا كَٰلِحُونَ ١٠٤ أَلَمۡ تَكُنۡ ءَايَٰتِي تُتۡلَىٰ عَلَيۡكُمۡ فَكُنتُم بِهَا تُكَذِّبُونَ ١٠٥

অর্থ : আগুন তাদের মুখমণ্ডল দগ্ধ করবে, আর সেখানে তারা হবে বীভৎস চেহারাবিশিষ্ট। ‘আমার আয়াতসমূহ কি তোমাদের কাছে পাঠ করা হত না? তারপর তোমরা তা অস্বীকার করতে?’ মুমিনুন, : ১০৪-১০৫

মহান আল্লাহ বলেন-

ؕ وَالَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا لَہُمۡ شَرَابٌ مِّنۡ حَمِیۡمٍ وَّعَذَابٌ اَلِیۡمٌۢ بِمَا کَانُوۡا یَکۡفُرُوۡنَ

অর্থ : আর যারা কুফরি করেছে, তাদের জন্য রয়েছে উত্তপ্ত পানীয় এবং বেদনাদায়ক আজাব। এ কারণে যে তারা কুফরি করত। সুরা ইউনুস : ৪

মহান আল্লাহ বলেন-

اُولٰٓئِکَ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا بِرَبِّہِمۡ ۚ وَاُولٰٓئِکَ الۡاَغۡلٰلُ فِیۡۤ اَعۡنَاقِہِمۡ ۚ وَاُولٰٓئِکَ اَصۡحٰبُ النَّارِ ۚ ہُمۡ فِیۡہَا خٰلِدُوۡنَ

অর্থ : এরাই তারা, যারা তাদের রবের সাথে কুফরি করেছে, আর ওদের গলায় থাকবে শিকল এবং ওরা অগ্নিবাসী, তারা সেখানে স্থায়ী হবে। সুরা রাদ : ৫

(৬) আল্লাহর হিদায়াত বঞ্চিত বা চূড়ান্ত পথভ্রষ্ট

মহান আল্লাহ বলেন-

اِنَّ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا ثُمَّ کَفَرُوۡا ثُمَّ اٰمَنُوۡا ثُمَّ کَفَرُوۡا ثُمَّ ازۡدَادُوۡا کُفۡرًا لَّمۡ یَکُنِ اللّٰہُ لِیَغۡفِرَ لَہُمۡ وَلَا لِیَہۡدِیَہُمۡ سَبِیۡلًا ؕ

অর্থ : নিশ্চয় যারা ঈমান এনেছে তারপর কুফরি করেছে, আবার ঈমান এনেছে তারপর কুফরি করেছে, এরপর কুফরিকে বাড়িয়ে দিয়েছে, আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা করার নন এবং তাদেরকে পথ প্রদর্শন করার নন। সুরা নিসা : ১৩৭

মহান আল্লাহ বলেন-

اِنَّ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا وَصَدُّوۡا عَنۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ قَدۡ ضَلُّوۡا ضَلٰلًۢا بَعِیۡدًا

অর্থ : নিশ্চয় যারা কুফরি করেছে এবং আল্লাহর পথ থেকে বাধা দিয়েছে,তারা অবশ্যই চূড়ান্তভাবে পথভ্রষ্ট হয়েছে। সুরা নিসা : ১৬৭

(৭)  দুনিয়াতে সাহায্যকারী থেকে বঞ্চিত থাকবে-

মহান আল্লাহ বলেন-

فَاَمَّا الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا فَاُعَذِّبُہُمۡ عَذَابًا شَدِیۡدًا فِی الدُّنۡیَا وَالۡاٰخِرَۃِ ۫ وَمَا لَہُمۡ مِّنۡ نّٰصِرِیۡنَ

অর্থ : অতঃপর যারা কুফরি করেছে, আমি তাদেরকে কঠিন আজাব দেব দুনিয়া ও আখিরাতে, আর তাদের কোন সাহায্যকারী নেই। সুরা আল ইমরান : ৫৬

(৮) জাহান্নামের আগুনে দগ্ধ করবেন :

মহান আল্লাহ বলেন-

فَمِنۡہُمۡ مَّنۡ اٰمَنَ بِہٖ وَمِنۡہُمۡ مَّنۡ صَدَّ عَنۡہُ ؕ وَکَفٰی بِجَہَنَّمَ سَعِیۡرًا

অর্থ : অতঃপর তাদের অনেকে এর প্রতি ঈমান এনেছে এবং অনেকে এ থেকে বিরত থেকেছে। আর দগ্ধকারী হিসেবে জাহান্নামই যথেষ্ট। সুরা নিসা : ৫৫

(১০) আল্লাহর নিকট অভিশপ্ত হওয়া

মহান আল্লাহ বলেন-

وَلَمَّا جَآءَہُمۡ کِتٰبٌ مِّنۡ عِنۡدِ اللّٰہِ مُصَدِّقٌ لِّمَا مَعَہُمۡ ۙ وَکَانُوۡا مِنۡ قَبۡلُ یَسۡتَفۡتِحُوۡنَ عَلَی الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا ۚۖ فَلَمَّا جَآءَہُمۡ مَّا عَرَفُوۡا کَفَرُوۡا بِہٖ ۫ فَلَعۡنَۃُ اللّٰہِ عَلَی الۡکٰفِرِیۡنَ

অর্থ : আর যখন তাদের কাছে, তাদের সাথে যা আছে, আল্লাহর পক্ষ থেকে তার সত্যায়নকারী কিতাব এল, অথচ তারা পূর্বে কাফিরদের উপর বিজয় কামনা করত। সুতরাং যখন তাদের নিকট এল যা তারা চিনত, তখন তারা তা অস্বীকার করল। অতএব কাফিরদের উপর আল্লাহর লানত। সুরা বাকারা: ৮৯

(১১) ইহকাল ও পরকালে কঠিন শাস্তি কালে কোন সাহায্যকারী পাবে না :

মহান আল্লাহ বলেন-

فَاَمَّا الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا فَاُعَذِّبُہُمۡ عَذَابًا شَدِیۡدًا فِی الدُّنۡیَا وَالۡاٰخِرَۃِ ۫ وَمَا لَہُمۡ مِّنۡ نّٰصِرِیۡنَ

অর্থ : অতঃপর যারা কুফরি করেছে, আমি তাদেরকে কঠিন আজাব দেব দুনিয়া ও আখিরাতে, আর তাদের কোন সাহায্যকারী নেই। সুর আল ইমরান : ৫৬

(১২) পরকালে কোন কিছুর বিনিময়ে মুক্তি প্রদান করা হবে না:

মহান আল্লাহ বলেন-

اِنَّ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا وَمَاتُوۡا وَہُمۡ کُفَّارٌ فَلَنۡ یُّقۡبَلَ مِنۡ اَحَدِہِمۡ مِّلۡءُ الۡاَرۡضِ ذَہَبًا وَّلَوِ افۡتَدٰی بِہٖ ؕ  اُولٰٓئِکَ لَہُمۡ عَذَابٌ اَلِیۡمٌ وَّمَا لَہُمۡ مِّنۡ نّٰصِرِیۡنَ 

অর্থ : নিশ্চয়ই যারা অবিশ্বাস করেছে ও অবিশ্বাসী অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছে তাদের মুক্তির বিনিময়ে যদি পৃথিবী পূর্ণ স্বর্ণ দেয়া হয় তবুও কক্ষনো তা গ্রহণ করা হবেনা। ওদেরই জন্য যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি রয়েছে এবং ওদের জন্য কোনোই সাহায্যকারী নেই। সুরা আল ইমরান : ৯১

(১৩) কাফির চুড়ান্তভাবে পথভ্রষ্ট :

মহান আল্লাহ বলেন-

اِنَّ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا وَصَدُّوۡا عَنۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ قَدۡ ضَلُّوۡا ضَلٰلًۢا بَعِیۡدًا

অর্থ : নিশ্চয় যারা কুফরি করেছে এবং আল্লাহর পথ থেকে বাধা দিয়েছে,তারা অবশ্যই চূড়ান্তভাবে পথভ্রষ্ট হয়েছে। সুরা নিসা : ১৬৭

(১৪) কাফিরকে ক্ষমা করবেন না এবং হিদায়েতও দিবেন না :

মহান আল্লাহ বলেন-

اِنَّ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا وَظَلَمُوۡا لَمۡ یَکُنِ اللّٰہُ لِیَغۡفِرَ لَہُمۡ وَلَا لِیَہۡدِیَہُمۡ طَرِیۡقًا

অর্থ : নিশ্চয়ই যারা অবিশ্বাসী হয়েছে ও অত্যাচার করেছে, আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা করবেন না এবং তাদেরকে সুপথ প্রদর্শন করবেন না ।সুরা নিসা : ১৬৮

সহিহ হাদিসের আলোকে ঈমানের পুরস্কার ও প্রতিশ্রুতির বর্ণনা :

১. অন্তরে সরিষার দানা পরিমাণ ঈমান থাকলে সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে না :

আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন যে, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

 ‏ “‏ لاَ يَدْخُلُ النَّارَ أَحَدٌ فِي قَلْبِهِ مِثْقَالُ حَبَّةِ خَرْدَلٍ مِنْ إِيمَانٍ وَلاَ يَدْخُلُ الْجَنَّةَ أَحَدٌ فِي قَلْبِهِ مِثْقَالُ حَبَّةِ خَرْدَلٍ مِنْ كِبْرِيَاءَ ‏

অর্থ : যার অন্তরে সরিষার দানা পরিমাণ ঈমান থাকবে সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে না। আর যে ব্যক্তির অন্তরে সরিষার দানা পরিমাণ অহংকার থাকবে সেও জান্নাতে প্রবেশ করবে না। মুসলিম ৯১, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৫৯, সুনানে তিরমিজি : ১৯৯৮-৯৯, সুনানে আবু দাঊদ ৪০৯১, আহমাদ : ৩৭৭৯, ৩৯০৩, ৩৯৩৭, ৪২৯৮।

আবু সাঈদ খুদরী (রা.) হতে বর্ণিত। নবি ﷺ বলেছেন-

 ‏”‏ يَدْخُلُ أَهْلُ الْجَنَّةِ الْجَنَّةَ، وَأَهْلُ النَّارِ النَّارَ، ثُمَّ يَقُولُ اللَّهُ تَعَالَى أَخْرِجُوا مَنْ كَانَ فِي قَلْبِهِ مِثْقَالُ حَبَّةٍ مِنْ خَرْدَلٍ مِنْ إِيمَانٍ‏.‏ فَيُخْرَجُونَ مِنْهَا قَدِ اسْوَدُّوا فَيُلْقَوْنَ فِي نَهَرِ الْحَيَا ـ أَوِ الْحَيَاةِ، شَكَّ مَالِكٌ ـ فَيَنْبُتُونَ كَمَا تَنْبُتُ الْحِبَّةُ فِي جَانِبِ السَّيْلِ، أَلَمْ تَرَ أَنَّهَا تَخْرُجُ صَفْرَاءَ مُلْتَوِيَةً ‏”‏‏.‏ قَالَ وُهَيْبٌ حَدَّثَنَا عَمْرٌو ‏”‏ الْحَيَاةِ ‏”‏‏.‏ وَقَالَ ‏”‏ خَرْدَلٍ مِنْ خَيْرٍ

অর্থ : বেহেশতবাসীরা জান্নাতে এবং জাহান্নামীরা জাহান্নামে প্রবেশ করবে। অতঃপর আল্লাহ্ তায়ালা ফিরিশতাদের বলবেন, যার অন্তরে সরিষার দানা পরিমাণও ঈমান আছে, তাকে জাহান্নাম হতে বের করে আনো। তারপর তাদের জাহান্নাম হতে এমন অবস্থায় বের করা হবে যে, তারা (পুড়ে) কালো হয়ে গেছে। অতঃপর তাদের বৃষ্টিতে বা হায়াতের [বর্ণনাকারী মালিক (রহ.) শব্দ দু’টির কোনটি এ সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন] নদীতে নিক্ষেপ করা হবে। ফলে তারা সতেজ হয়ে উঠবে, যেমন নদীর তীরে ঘাসের বীজ গজিয়ে উঠে। তুমি কি দেখতে পাও না সেগুলো কেমন হলুদ বর্ণের হয় ও ঘন হয়ে গজায়? সহিহ বুখারি : ২২, ৬৫৬০, সহিহ মুসলিম : ৮৪।

আবু সাঈদ খুদরী (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! আমরা কিয়ামতের দিন আমাদের রবের দর্শন লাভ করব কি? তিনি বললেন, মেঘহীন আকাশে সূর্যকে দেখতে তোমাদের অসুবিধা হয় কি? আমরা বললাম, না। তিনি বললেন, সেদিন তোমাদের রবকে দেখতে তোমাদের কোনো অসুবিধা হবে না। এতটুকু ব্যতীত যতটুকু সূর্য দেখার সময় পেয়ে থাক। সেদিন একজন ঘোষণাকারী ঘোষণা করবেন, যারা যে জিনিসের ’ইবাদত করতে, তারা সে জিনিসের কাছে গমন কর। এরপর যারা ক্রুশ পূজারি ছিল, তারা যাবে তাদের ক্রুশের কাছে। মূর্তি পূজারিরা যাবে তাদের মূর্তির সঙ্গে। সকলেই তাদের উপাস্যের সঙ্গে যাবে। বাকী থাকবে একমাত্র আল্লাহর ’ইবাদতকারীরা। নেক্কার ও বদকার সকলেই এবং আহলে কিতাবের কতক লোকও থাকবে। অতঃপর জাহান্নামকে আনা হবে। সেটি তখন থাকবে মরীচিকার মত। ইহুদিদেরকে জিজ্ঞাসা করা হবে, তোমরা কীসের ’ইবাদত করতে? তারা উত্তর করবে, আমরা আল্লাহর পুত্র উজা্ইর  (আ.) এর ’ইবাদত করতাম।

তখন তাদেরকে বলা হবে, তোমরা মিথ্যা বলছ। কারণ আল্লাহর কোন স্ত্রীও নেই এবং নেই তাঁর কোন সন্তান। এখন তোমরা কী চাও? তারা বলবে, আমরা চাই, আমাদেরকে পানি পান করান। অতঃপর তাদেরকে বলা হবে, তোমরা পানি পান কর। এরপর তারা জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হতে থাকবে। তারপর নাসারাদেরকে বলা হবে, তোমরা কিসের ’ইবাদত করতে? তারা বলবে, আমরা আল্লাহর পুত্র মসিহের ’ইবাদত করতাম। তখন তাদেরকে বলা হবে, তোমরা মিথ্যা বলছ। আল্লাহর কোন স্ত্রীও ছিল না, সন্তানও ছিল না। এখন তোমরা কী চাও? তারা বলবে, আমাদের ইচ্ছা আপনি আমাদেরকে পানি পান করতে দিন। তাদেরকে উত্তর দেয়া হবে, তোমরা পান কর। তারপর তারা জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হতে থাকবে। অবশেষে বাকী থাকবে একমাত্র আল্লাহর ’ইবাদতকারীগণ। তাদের নেককার ও বদকার সকলেই। তাদেরকে লক্ষ্য করে বলা হবে, কোন জিনিস তোমাদেরকে আটকে রেখেছে? অথচ অন্যরা তো চলে গেছে। তারা বলবে, আমরা তো সেদিন তাদের থেকে আলাদা রয়েছি, যেদিন আজকের চেয়ে তাদের অধিক প্রয়োজন ছিল।

আমরা একজন ঘোষণাকারীর এ ঘোষণাটি দিতে শুনেছি যে, যারা যাদের ’ইবাদাত করত তারা যেন ওদের সঙ্গে যায়। আমরা অপেক্ষা করছি আমাদের রবের। নবি ﷺ বলেন, এরপর মহা ক্ষমতাশালী আল্লাহ্ তাদের কাছে আসবেন। এবার তিনি সে সুরতে আসবেন না, যেভাবে তাঁকে প্রথমে ঈমানদারগণ দেখেছিলেন। এসে তিনি ঘোষণা দেবেন- আমি তোমাদের রব, সবাই তখন বলে উঠবে আপনিই আমাদের প্রতিপালক। আর সেদিন নবিগণ ছাড়া তাঁর সঙ্গে কেউ কথা বলতে পারবে না। আল্লাহ্ তাদেরকে বলবেন, তোমাদের এবং তাঁর মাঝখানে পরিচয়ের জন্য কোন আলামত আছে কি? তারা বলবেন, পায়ের নলা। তখন পায়ের নলা খুলে দেয়া হবে।

এই দেখে ঈমানদারগণ সবাই সিজদায় পড়ে যাবে। বাকি থাকবে তারা, যারা লোক-দেখানো এবং লোক-শোনানো সিজদা করেছিল। তবে তারা সিজদার মনোভাব নিয়ে সিজদা করার জন্য যাবে, কিন্তু তাদের মেরুদন্ড একটি তক্তার মত শক্ত হয়ে যাবে। এমন সময় জাহান্নামের উপর পুল স্থাপন করা হবে। সাহাবিগণ বললেন, সে পুলটি কেমন হবে হে আল্লাহর রাসুল? তিনি বললেন, দুর্গম পিচ্ছিল স্থান। এর ওপর আংটা ও হুক থাকবে, শক্ত চওড়া উল্টো কাঁটা বিশিষ্ট হবে, যা নাজ্দ দেশের সাদান বৃক্ষের কাঁটার মত হবে। সে পুলের উপর দিয়ে ঈমানদারগণের কেউ পার হয়ে যাবে চোখের পলকের মতো, কেউ বিদ্যুতের মতো, কেউ বাতাসের মতো আবার কেউ দ্রুতগামী ঘোড়া ও সাওয়ারের মতো।

তবে মুক্তিপ্রাপ্তরা কেউ নিরাপদে চলে আসবেন, আবার কেউ জাহান্নামের আগুনে ক্ষতবিক্ষত হয়ে যাবে। একেবারে শেষে অতিক্রম করবে যে লোকটি, সে হেঁচড়িয়ে কোন ভাবে পার হয়ে আসবে। এখন তোমরা হকের বিষয়ে আমার চেয়ে অধিক কঠোর নও, যতটুকু সেদিন ঈমানদারগণ আল্লাহর সম্মুখে হয়ে থাকবে, যা তোমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে গেছে। যখন ঈমানদারগণ এ দৃশ্যটি দেখবে যে, তাদের ভাইদেরকে রেখে একমাত্র তারাই মুক্তি পেয়েছে, তখন তারা বলবে, হে আমাদের রব! আমাদের সেসব ভাই কোথায়, যারা আমাদের সঙ্গে সালাত আদায় করত, সওম পালন কত, নেক কাজ করত? তখন আল্লাহ্ তায়ালা তাদেরকে বলবেন, তোমরা যাও, যাদের অন্তরে এক দীনার পরিমাণ ঈমান পাবে, তাদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করে আন। আল্লাহ্ তাদের মুখমণ্ডল জাহান্নামের ওপর হারাম করে দিয়েছেন। এদের কেউ কেউ দু’পা ও দু’পায়ের নলার বেশি পর্যন্ত জাহান্নামের মধ্যে থাকবে।

তারা যাদেরকে চিনতে পারে, তাদেরকে বের করবে। তারপর এরা আবার ফিরে আসবে। আল্লাহ্ আবার তাদেরকে বলবেন, তোমরা যাও, যাদের অন্তরে অর্ধ দীনার পরিমাণ ঈমান পাবে, তাদেরকে বের করে নিয়ে আসবে। তারা গিয়ে তাদেরকেই বের করে নিয়ে আসবে, যাদেরকে তারা চিনতে পারবে। তারপর আবার ফিরে আসবে। আল্লাহ্ তাদেরকে আবার বলবেন, তোমরা যাও, যাদের অন্তরে অণু পরিমাণ ঈমান পাবে, তাদেরকে বের করে নিয়ে আসবে। তারা যাদেরকে চিনতে পারবে তাদেরকে বের করে নিয়ে আসবে। বর্ণনাকারী আবু সাঈদ খুদরী (রা.) বলেন, তোমরা যদি আমাকে বিশ্বাস না কর, তাহলে আল্লাহর এ বাণীটি পড়- ’’আল্লাহ অণু পরিমাণও জুলুম করেন না, আর কোন পুণ্য কাজ হলে তাকে তিনি দ্বিগুণ করেন’’। সুরা নিসা : ৪০। তারপর নবি ﷺ, ফিরিশতা ও মুমিনগণ সুপারিশ করবে। তখন মহাপরাক্রান্ত আল্লাহ্ বলবেন, এখন শুধু আমার শাফায়াত বাকী রয়েছে।

তিনি জাহান্নাম থেকে একমুষ্টি ভরে এমন কতগুলো কওমকে বের করবেন, যারা জ্বলে পুড়ে দগ্ধ হয়ে গেছে। তারপর তাদেরকে জান্নাতের সম্মুখে অবস্থিত ’হায়াত’ নামের নহরে ঢালা হবে। তারা সে নহরের দু’পার্শ্বে এমনভাবে উদ্‌গত হবে, যেমন পাথর এবং গাছের কিনারে বয়ে আনা আবর্জনায় বীজ থেকে তৃণ নির্গত হয়। দেখতে পাও তার মধ্যে সূর্যের আলোর অংশের গাছগুলো সাধারণত সবুজ হয়, ছায়ার অংশেরগুলো সাদা হয়। তারা সেখান থেকে মুক্তার দানার মত বের হবে। তাদের গর্দানে মোহর লাগানো হবে। জান্নাতে তারা যখন প্রবেশ করবে, তখন অন্যান্য জান্নাতবাসীরা বলবেন, এরা হলেন রাহমান কর্তৃক আজাদকৃত যাদেরকে আল্লাহ্ কোন নেক ’আমল কিংবা কল্যাণকর কাজ ব্যতীতই জান্নাতে দাখিল করেছেন। তখন তাদেরকে বলা হবে। তোমরা যা দেখেছ, সবই তো তোমাদের, এর সঙ্গে আরো সমপরিমাণ তোমাদেরকে দেয়া হলো। সহিহ বুখারি : ৭৪৩৯, সহিহ মুসলিম : ১৮৩, সুননে ইবনে মাজাহ : ৬০, সহিহাহ : ৩০৫৪, আহমাদ : ১১১২৭

২. ইমান আনয়ন করা সবচেয়ে উত্তম আমল :

أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ   سُئِلَ أَىُّ الْعَمَلِ أَفْضَلُ فَقَالَ ‏”‏ إِيمَانٌ بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ ‏”‏‏.‏ قِيلَ ثُمَّ مَاذَا قَالَ ‏”‏ الْجِهَادُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ ‏”‏‏.‏ قِيلَ ثُمَّ مَاذَا قَالَ ‏”‏ حَجٌّ مَبْرُورٌ ‏

অর্থ : আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসুল ﷺ কে জিজ্ঞেস করা হল, কোন আমলটি উত্তম?’ তিনি বললেন, ‘আল্লাহ্ ও তাঁর রাসুলের উপর বিশ্বাস স্থাপন করা। জিজ্ঞেস করা হলো, ‘অতঃপর কোনটি?’ তিনি বললেন, ‘আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করা।’ প্রশ্ন করা হল, ‘অতঃপর কোনটি?’ তিনি বললেন, ‘মাকবুল হাজ্জ সম্পাদন করা। সহিহ বুখারি : ২৬, ১৫১৯, সহিহ মুসলিম : ৮৩

৩. ঈমান গ্রহণ অতীতের গুনাহ ক্ষমা হয়ে যায় :

عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ، أَنَّ نَاسًا، مِنْ أَهْلِ الشِّرْكِ قَتَلُوا فَأَكْثَرُوا وَزَنَوْا فَأَكْثَرُوا ثُمَّ أَتَوْا مُحَمَّدًا صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ   فَقَالُوا إِنَّ الَّذِي تَقُولُ وَتَدْعُو لَحَسَنٌ وَلَوْ تُخْبِرُنَا أَنَّ لِمَا عَمِلْنَا كَفَّارَةً فَنَزَلَ ‏(‏ وَالَّذِينَ لاَ يَدْعُونَ مَعَ اللَّهِ إِلَهًا آخَرَ وَلاَ يَقْتُلُونَ النَّفْسَ الَّتِي حَرَّمَ اللَّهُ إِلاَّ بِالْحَقِّ وَلاَ يَزْنُونَ وَمَنْ يَفْعَلْ ذَلِكَ يَلْقَ أَثَامًا‏)‏ وَنَزَلَ ‏(‏ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَى أَنْفُسِهِمْ لاَ تَقْنَطُوا مِنْ رَحْمَةِ اللَّهِ‏)‏

অর্থ : ইবনে আব্বাস হতে বর্ণনা করেন যে, মুশরিকদের কিছু লোক যারা ব্যাপকভাবে হত্যা ও ব্যভিচারে লিপ্ত ছিল, তারা মুহাম্মাদ ﷺ এর দরবারে এসে জিজ্ঞেস করল, আপনি যে দীনের প্রতি মানুষদের আহ্বান জানাচ্ছেন, এতো অনেক উত্তম বিষয়। তবে আমাদের পূর্বকৃত গুনাহসমূহের প্রায়শ্চিত্ত সম্পর্কে আপনি যদি আমাদের নিশ্চিতভাবে কিছু অবহিত করতেন। তখন এ আয়াত নাজিল হয়ঃ “এবং যারা আল্লাহর সঙ্গে কোন ইলাহকে ডাকে না, আল্লাহ যার হত্যা নিষেধ করেছেন যথার্থ কারণ ব্যতিরেকে তাকে হত্যা করে না এবং ব্যভিচার করে না; যে এগুলো করে সে শাস্তি ভোগ করবে”- (সুরাহ্ আল ফুরকান ২৫ঃ ৬৮)। আরো নাজিল করেনঃ “হে আমার বান্দাগণ! তোমরা যারা নিজেদের প্রতি অবিচার করেছ আল্লাহর রহমত হতে নিরাশ হয়ো না”। সুরা জুমার : ৫৩। সহিহ মুসলিম : ১২২

ইবনে শামাসাহ আল মহরি (রহ.) বলেন, আমরা ’আমর ইবনে আস (রা.) কে মুমূর্ষু অবস্থায় তাকে দেখতে উপস্থিত হলাম। তখন তিনি দেয়ালের দিকে মুখ করে অনেকক্ষণ কাঁদছিলেন। তার পুত্র তাকে তার সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ ﷺ প্রদত্ত বিভিন্ন সুসংবাদের উল্লেখপূর্বক সান্ত্বনা দিচ্ছে যে, আব্বা রাসুলুল্লাহ ﷺ কি আপনাকে অমুক সুসংবাদ দেননি? রাসুলুল্লাহ ﷺ কি আপনাকে অমুক সুসংবাদ দেননি? রাবী বলেন, তখন তিনি পুত্রের দিকে মুখ ফিরালেন এবং বললেন, আমার সর্বোৎকৃষ্ট পাথেয় হচ্ছে “লা-ইলা-হা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ এ কালিমার সাক্ষ্য দেয়া।

আর আমি অতিক্রম করেছি আমার জীবনের তিনটি পর্যায়। এক সময় তো আমি এমন ছিলাম যে, রাসুলুল্লাহ ﷺ এর বিরুদ্ধাচরণে আমার চেয়ে কঠোরতর আর কেউই ছিল না। সে সময়ে রাসুলুল্লাহ ﷺ কে কবজায় পেয়ে হত্যা করা ছিল আমার সবচাইতে প্রিয় ভাবনা। যদি সে অবস্থায় আমার মৃত্যু হত তবে নিশ্চিত আমাকে জাহান্নামে যেতে হত।

এরপর আল্লাহ যখন আমার অন্তরে ইসলামের অনুরাগ সৃষ্টি করে দিলেন, তখন আমি রাসুলুল্লাহ ﷺ এর দরবারে উপস্থিত হয়ে অনুরোধ জানালাম যে, আপনার ডান হাত বাড়িয়ে দিন, আমি বাই’আত করতে চাই। রাসুলুল্লাহ ﷺ তার ডান হাত বাড়িয়ে দিলেন, তখন আমি আমার হাত টেনে নিলাম। রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন, আমর, কি ব্যাপার? বললাম, পূর্বে আমি শর্ত করে নিতে চাই। রাসুলুল্লাহ ﷺ জিজ্ঞেস করলেন, কি শর্ত করবে? আমি উত্তর করলাম, আল্লাহ যেন আমার সব গুনাহ মাফ করে দেন। রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন, ’আমর! তুমি কি জানো না যে, ইসলাম পূর্ববর্তী সকল অন্যায় মিটিয়ে দেয়। আর হিজরত পূর্ববর্তী সকল অন্যায় মিটিয়ে দেয়? আর হজ পূর্ববর্তী সকল অন্যায় মিটিয়ে দেয়? আমর বলেন, এ পর্যায়ে আমার অন্তরে রাসুলুল্লাহ ﷺ অপেক্ষা বেশি প্রিয় আর কেউ ছিল না। আমার চোখে তিনি অপেক্ষা মহান আর কেউ নেই। অপরিসীম শ্রদ্ধার কারণে আমি তার প্রতি চোখভরে তাকাতেও পারতাম না। আজ যদি আমাকে তার দৈহিক আকৃতির বর্ণনা করতে বলা হয় তবে আমার পক্ষে তা সম্ভব নয়। কারণ চোখ ভরে আমি কখনোই তার প্রতি তাকাতে পারিনি। ঐ অবস্থায় যদি আমার মৃত্যু হত তবে অবশ্যই আমি জান্নাতী হওয়ার আশাবাদী থাকতাম।

পরবর্তীকালে আমরা নানা বিষয়ের সাথে জড়িয়ে পড়েছি, তাই জানি না, এতে আমার অবস্থান কোথায়? সুতরাং আমি যখন মারা যাব, তখন যেন কোন বিলাপকারিণী অথবা আগুন সে জানাযার সাথে না থাকে। আমাকে যখন দাফন করবে তখন আমার উপর আস্তে আস্তে মাটি ফেলবে এবং দাফন সেরে একটি উট জবেহ করে তার মাংস বণ্টন করতে যে সময় লাগে ততক্ষণ আমার কবরের পাশে অবস্থান করবে। যেন তোমাদের উপস্থিতির কারণে আমি আতঙ্ক মুক্ত অবস্থায় থাকি ও চিন্তা করতে পারি যে, আমার প্রতিপালকের দূতের কি জবাব দিব। সহিহ মুসলিম : ১২১, সহিহ ইবনে খুযায়মাহ :২৫১৫, সহিহ আল জামি : ১৩২৯, সহিহ আত্ তারগিব : ১০৯৭, সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ১৮৯৯০

৪. ঈমান গ্রহণ অতীতের নেক আমল জমা থাকে :

عَنْ حَكِيمِ بْنِ حِزَامٍ، قَالَ قُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَشْيَاءَ كُنْتُ أَفْعَلُهَا فِي الْجَاهِلِيَّةِ – قَالَ هِشَامٌ يَعْنِي أَتَبَرَّرُ بِهَا – فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ   ‏ “‏ أَسْلَمْتَ عَلَى مَا أَسْلَفْتَ لَكَ مِنَ الْخَيْرِ ‏”‏ ‏.‏ قُلْتُ فَوَاللَّهِ لاَ أَدَعُ شَيْئًا صَنَعْتُهُ فِي الْجَاهِلِيَّةِ إِلاَّ فَعَلْتُ فِي الإِسْلاَمِ مِثْلَهُ

হাকিম ইবনে হিযাম (রা.) বলেন,  আমি রাসুলুল্লাহ ﷺ কে বললাম, ইয়া রাসুলুল্লাহ! জাহিলী যুগে যে সকল নেক কাজ করতাম আমি কি তার কোন প্রতিদান পাবো? রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন, তোমার সে সব নেক কাজের বিনিময়ে তুমি ইসলাম গ্রহণের সৌভাগ্য লাভ করেছ। আমি বললাম, আল্লাহর কসম! জাহিলী যুগে যে সব নেক কাজ আমি করেছি ইসলামি জিন্দেগীতেও আমি তা করে যাব। সহিহ মুসলিম : ১২৩

৫. ঈমানদার ব্যতীত কেউ জান্নাতে প্রবেশ করবে না :

আবু হুরায়রা (রা.) বলেন যে, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

“‏ لاَ تَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ حَتَّى تُؤْمِنُوا وَلاَ تُؤْمِنُوا حَتَّى تَحَابُّوا ‏.‏ أَوَلاَ أَدُلُّكُمْ عَلَى شَىْءٍ إِذَا فَعَلْتُمُوهُ تَحَابَبْتُمْ أَفْشُوا السَّلاَمَ بَيْنَكُمْ

অর্থ : ঈমানদার ছাড়া কেউই জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না, আর তোমরা ঈমানদার হতে পারবে না যতক্ষণ না একে অন্যকে ভালোবাসবে। আমি কি তোমাদের তা বলে দিব না, কি করলে তোমাদের মাঝে পারস্পরিক ভালোবাসার সৃষ্টি হবে? তা হলো, তোমরা পরস্পর বেশি সালাম বিনিময় করবে। সহিহ মুসলিম : ৫৪

আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত। উমর ইবনে খাত্তাব (রা.) বলেন-

قَالَ لَمَّا كَانَ يَوْمُ خَيْبَرَ أَقْبَلَ نَفَرٌ مِنْ صَحَابَةِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ   فَقَالُوا فُلاَنٌ شَهِيدٌ فُلاَنٌ شَهِيدٌ حَتَّى مَرُّوا عَلَى رَجُلٍ فَقَالُوا فُلاَنٌ شَهِيدٌ ‏.‏ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ   ‏”‏ كَلاَّ إِنِّي رَأَيْتُهُ فِي النَّارِ فِي بُرْدَةٍ غَلَّهَا أَوْ عَبَاءَةٍ ‏”‏ ‏.‏ ثُمَّ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ   ‏”‏ يَا ابْنَ الْخَطَّابِ اذْهَبْ فَنَادِ فِي النَّاسِ إِنَّهُ لاَ يَدْخُلُ الْجَنَّةَ إِلاَّ الْمُؤْمِنُونَ ‏”‏ ‏.‏ قَالَ فَخَرَجْتُ فَنَادَيْتُ ‏”‏ أَلاَ إِنَّهُ لاَ يَدْخُلُ الْجَنَّةَ إِلاَّ الْمُؤْمِنُونَ ‏

অর্থ : খাইবারে অমুক অমুক শহীদ হয়েছেন। অবশেষে এক ব্যক্তি প্রসঙ্গে তারা বললেন যে, সেও শহীদ হয়েছে। রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন, কখনই না। গনিমতের মাল থেকে চাঁদর আত্মসাৎ করার কারণে আমি তাকে জাহান্নামে দেখেছি। তারপর রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন, হে খাত্তাবের পুত্র! যাও লোকেদের মাঝে ঘোষণা করে দাও যে, জান্নাতে কেবলমাত্র প্রকৃত মুমিন ব্যক্তিরাই প্রবেশ করবে। উমর ইবনে খাত্তাব (রা.) বলেন, তারপর আমি বের হলাম এবং ঘোষণা করে দিলাম, “সাবধান! শুধুমাত্র প্রকৃত মুমিনরাই জান্নাতে প্রবেশ করবে। সহিহ মুসলিম : ১১৪

৬. আহলে কিতাব থেকে যারা ঈমান আনবে, তাদের দ্বিগুণ সওয়াব প্রদান করা হবে :

আবু মূসা আশআরী (রা.) থেকে বর্ণিত, নবি ﷺ বলেন-

‏ “‏ ثَلاَثَةٌ يُؤْتَوْنَ أَجْرَهُمْ مَرَّتَيْنِ الرَّجُلُ تَكُونُ لَهُ الأَمَةُ فَيُعَلِّمُهَا فَيُحْسِنُ تَعْلِيمَهَا، وَيُؤَدِّبُهَا فَيُحْسِنُ أَدَبَهَا، ثُمَّ يُعْتِقُهَا فَيَتَزَوَّجُهَا، فَلَهُ أَجْرَانِ، وَمُؤْمِنُ أَهْلِ الْكِتَابِ الَّذِي كَانَ مُؤْمِنًا، ثُمَّ آمَنَ بِالنَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ   فَلَهُ أَجْرَانِ، وَالْعَبْدُ الَّذِي يُؤَدِّي حَقَّ اللَّهِ وَيَنْصَحُ لِسَيِّدِهِ ‏”‏‏.‏ ثُمَّ قَالَ الشَّعْبِيُّ وَأَعْطَيْتُكَهَا بِغَيْرِ شَىْءٍ وَقَدْ كَانَ الرَّجُلُ يَرْحَلُ فِي أَهْوَنَ مِنْهَا إِلَى الْمَدِينَةِ‏.‏

অর্থ : তিন প্রকারের ব্যক্তিকে দ্বিগুণ সওয়াব প্রদান করা হবে। যে ব্যক্তির একটি বাদী আছে সে তাকে শিক্ষা দান করে, শিষ্টাচার শিক্ষা দেয় এবং তাকে উত্তমরূপে শিষ্টাচার দান করে। তারপর তাকে মুক্ত করে দিয়ে তাকে বিয়ে করে। সে ব্যক্তির জন্য দ্বিগুণ সওয়াব রয়েছে। আর আহলে কিতাবদের মধ্য থেকে মুমিন ব্যক্তি যে তার নবির উপর ঈমান এনেছিল। তারপর নবি ﷺ এর প্রতি ঈমান এনেছে। তাঁর জন্য দ্বিগুণ সওয়াব রয়েছে। যে গোলাম আল্লাহর হক যথাযথভাবে আদায় করে এবং স্বীয় মনিবের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করে। সহিহ বুখারি : ৩০১১, সহিহ মুসলিম : ১৫৪, সুনানে নাসায়ি ৩৩৪৪, সুনানে তিরমিজি : ১১১৬, দারিমী ২২৯০, সহিহ আল জামি : ৩০৭৩, সহিহ আত তারগিব :১৮৮২।

৭. দুনিয়াতে কোন মুসলিমের দোষ গোপন রাখলে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তার দোষ গোপন রাখবেন :

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

যে লোক কোন ঈমানদারের দুনিয়া থেকে কোন বিপদ দূর করে দিবে, আল্লাহ তায়ালা বিচার দিবসে তার থেকে বিপদ সরিয়ে দিবেন। যে লোক কোন দুস্থ লোকের অভাব দূর করবে, আল্লাহ তায়ালা দুনিয়া ও আখিরাতে তার দুরবস্থা দূর করবেন। যে লোক কোন মুসলিমের দোষ-ত্রুটি লুকিয়ে রাখবে আল্লাহ তায়ালা দুনিয়া ও আখিরাতে তার দোষ-ত্রুটি লুকিয়ে রাখবেন। বান্দা যতক্ষণ তার ভাই এর সহযোগিতায় আত্মনিয়োগ করে আল্লাহ ততক্ষণ তার সহযোগিতা করতে থাকেন। যে লোক জ্ঞানার্জনের জন্য রাস্তায় বের হয়, আল্লাহ এর বিনিময়ে তার জন্য জান্নাতের পথ সহজ করে দেন। যখন কোন সম্প্রদায় আল্লাহর গৃহসমূহের কোন একটি গৃহে একত্রিত হয়ে আল্লাহর কিতাব পাঠ করে এবং একে অপরের সাথে মিলে (কুরআন) অধ্যয়নে লিপ্ত থাকে তখন তাদের উপর শান্তিধারা অবতীর্ণ হয়। রহমত তাদেরকে আচ্ছন্ন করে ফেলে এবং ফেরেশতাগণ তাদেরকে পরিবেষ্টন করে রাখেন। আর আল্লাহ তায়ালা তার নিকটবর্তীদের (ফেরেশতাগণের) মধ্যে তাদের কথা আলোচনা করেন। আর যে লোককে আমলে পিছনে সরিয়ে দিবে তার বংশ (মর্যাদা) তাকে অগ্রসর করে দিবে না। সহিহ মুসলিম : ২৬৯৯

৮। ঈমানদারের নেক আমল বৃদ্ধি করা হলেও পাপ বৃদ্ধি করা হয় না :

আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসুল ﷺ ইরশাদ করেন-

إِذَا أَحْسَنَ أَحَدُكُمْ إِسْلاَمَهُ، فَكُلُّ حَسَنَةٍ يَعْمَلُهَا تُكْتَبُ لَهُ بِعَشْرِ أَمْثَالِهَا إِلَى سَبْعِمِائَةِ ضِعْفٍ، وَكُلُّ سَيِّئَةٍ يَعْمَلُهَا تُكْتَبُ لَهُ بِمِثْلِهَا

অর্থ : তোমাদের মধ্যে কেউ যখন উত্তমরূপে ইসলামের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকে তখন সে যে আমলে সালেহ করে তার প্রত্যেকটির বিনিময়ে সাতশ গুণ পর্যন্ত (পুণ্য) লেখা হয়। আর সে যে পাপ কাজ করে তার প্রত্যেকটির বিনিময়ে তার জন্য ঠিক ততটুকুই পাপ লেখা হয়। সহিহ বুখারি : ৪২, সহিহ মুসলিম : ১২৯, আহমাদ : ৮২১৭, সহিহ ইবনে হিব্বান : ২২৮, শুয়াবুল ঈমান : ৭০৪৬, সহিহ জামি : ২৮৭

ঈমান এবং ঈমানের মাপকাঠি

ঈমান এবং ঈমানের মাপকাঠি

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

ঈমান (الإيمان) কি?

ঈমান (الإيمان) ইসলামি পরিভাষায় একটি মৌলিক ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এটি একজন মুসলমানের জীবন ও আমলের ভিত্তি। ঈমান’ শব্দটি আরবি “أمن” ধাতু থেকে এসেছে, যার অর্থ নিরাপত্তা, বিশ্বাস, শান্তি। পরিভাষায় ঈমান অর্থ- মৌখিক স্বীকৃতি, অন্তরের বিশ্বাস এবং তদনুযায়ী কাজের নামই হচ্ছে ঈমান। মনেপ্রাণে আল্লাহ তায়ালার একত্ববাদের স্বীকৃতি দেয়া। ইবাদতের মাধ্যমে তাঁর আনুগত্য করা এবং শিরক ও মুশরিকদের সাথে সম্পর্কে ছিন্ন করা।

অর্থাৎ একজন ব্যক্তি আল্লাহর ও তাঁর রাসুলের ﷺ আনীত সকল বিষয়ের প্রতি অন্তর দিয়ে দৃঢ় বিশ্বাস রাখবে, তা মুখে বলবে এবং তার আচরণ ও কাজেও সে বিশ্বাসের প্রতিফলন ঘটাবে—এটাই ঈমান।

কুরআন ও হাদিস অনুযায়ী ঈমানের সংজ্ঞা:

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-

يَـٰٓأَيُّہَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ ءَامِنُواْ بِٱللَّهِ وَرَسُولِهِۦ وَٱلۡكِتَـٰبِ ٱلَّذِى نَزَّلَ عَلَىٰ رَسُولِهِۦ وَٱلۡڪِتَـٰبِ ٱلَّذِىٓ أَنزَلَ مِن قَبۡلُ‌ۚ وَمَن يَكۡفُرۡ بِٱللَّهِ وَمَلَـٰٓٮِٕكَتِهِۦ وَكُتُبِهِۦ وَرُسُلِهِۦ وَٱلۡيَوۡمِ ٱلۡأَخِرِ فَقَدۡ ضَلَّ ضَلَـٰلاَۢ بَعِيدًا (١٣٦)

অর্থ : হে ঈমানদারগণ! ঈমান আনো আল্লাহর প্রতি, তাঁর রাসুলের প্রতি, আল্লাহ তাঁর রসূলের ওপর যে কিতাব নাজিল করেছেন তার প্রতি এবং পূর্বে তিনি যে কিতাব নাজিল করেছেন তার প্রতি ৷ যে ব্যক্তি আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতাবর্গ, তাঁর কিতাবসমূহ, তাঁর রসূলগণ ও পরকালের প্রতি কুফরি করলো সে পথভ্রষ্ট হয়ে বহুদূর চলে গেলো। সুরা নিসা : ১৩৬

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আরও ইরশাদ করেন-

ءَامَنَ ٱلرَّسُولُ بِمَآ أُنزِلَ إِلَيۡهِ مِن رَّبِّهِۦ وَٱلۡمُؤۡمِنُونَ‌ۚ كُلٌّ ءَامَنَ بِٱللَّهِ وَمَلَـٰٓٮِٕكَتِهِۦ وَكُتُبِهِۦ وَرُسُلِهِۦ لَا نُفَرِّقُ بَيۡنَ أَحَدٍ۬ مِّن رُّسُلِهِۦ‌ۚ

রাসূল তাঁর প্রভুর নিকট থেকে তাঁর প্রতি যা অবতীর্ণ করা হয়েছে, তাতে ঈমান এনেছে এবং মুমিনগণও! এরা প্রত্যেকে আল্লাহতে, তাঁর ফিরিশতাগণে, তাঁর কিতাবে, তাঁর রাসুলদের বিশ্বাস স্থাপন করে। সুরা বাকারা : ২৮৫

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আরও ইরশাদ করেন-

وَلَكِنَّ الْبِرَّ مَنْ آَمَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآَخِرِ وَالْمَلَائِكَةِ وَالْكِتَابِ وَالنَّبِيِّينَ.

অর্থঃ বরং প্রকৃতপক্ষে সৎকাজ হলো- ঈমান আনবে আল্লাহর উপর, কেয়ামত দিবসের উপর, ফিরিশতাদের উপর, এবং সমস্ত নবি রাসুলগণের উপর। সুরা বাকারা : ১৭৭

ঈমান সম্পর্কে কয়েকটি সহিহ হাদিস  :

ইবন উমর (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল ﷺ ইরশাদ করেন-

“‏ بُنِيَ الإِسْلاَمُ عَلَى خَمْسٍ شَهَادَةِ أَنْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ، وَإِقَامِ الصَّلاَةِ، وَإِيتَاءِ الزَّكَاةِ، وَالْحَجِّ، وَصَوْمِ رَمَضَانَ ‏”‏‏

ইসলামের স্তম্ভ হচ্ছে পাঁচটি। (১) আল্লাহ্ ব্যতীত প্রকৃত কোন উপাস্য নেই এবং নিশ্চয়ই মুহাম্মাদ ﷺ আল্লাহর রাসূল-এ কথার সাক্ষ্য প্রদান করা। (২) সালাত কায়িম করা। (৩) জাকাত আদায় করা। (৪)  হাজ্জ সম্পাদন করা এবং (৫) রমজানের সিয়াম পালন করা।

সহিহ বুখারি : ৮, ৪৫১৪, সহিহ মুসলিম ১৬, সুনানে তিরমিজি ২৬০৯, সুনানে নাসায়ি ৫০০১, আহমাদ ৬০১৫, সহিহ ইবনে খুযায়মাহ্ ১৮৮০;

ইয়াহইয়া ইবনে ইয়ামার থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, বাসরার অধিবাসী মা’বাদ জুহাইনাহ প্রথম ব্যক্তি যে তাকদীর অস্বীকার করে। আমি ও হুমায়দ ইবনে ’আবদুর রহমান উভয়ে হজ অথবা উমরাহ’র উদ্দেশে রওয়ানা করলাম। আমরা বললাম, যদি আমরা এ সফরে রাসুলুল্লাহ ﷺ এর যে কোন সাহাবার সাক্ষাৎ পেয়ে যাই তাহলে ঐ সব লোক তাকদীর সম্বন্ধে যা কিছু বলে সে সম্পর্কে তাকে জিজ্ঞেস করব। সৌভাগ্যক্রমে আমরা আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) এর মসজিদে ঢুকার পথে পেয়ে গেলাম। আমি ও আমার সাখী তাকে এমনভাবে ঘিরে নিলাম যে, আমাদের একজন তার ডান এবং অপরজন তার বামে থাকলাম। আমি মনে করলাম আমার সঙ্গে আমাকেই কথা বলার সুযোগ দেবে। (কারণ আমি ছিলাম বাক পটু)। আমি বললাম, “হে আবু আবদুর রহমান। আমাদের এলাকায় এমন কিছু লোকের আবির্ভাব ঘটেছে, তারা একদিকে কুরআন পাঠ করে অপরদিকে জ্ঞানের অন্বেষণও করে। ইয়াহইয়া তাদের কিছু গুণাবলীর কথাও উল্লেখ করলেন। তাদের ধারণা (বক্তব্য) হচ্ছে, তাকদীর বলতে কিছু নেই এবং প্রত্যেক কাজ অকস্মাৎ সংঘটিত হয়।”

ইবনে উমর (রা.) বললেন, “যখন তুমি এদের সাথে সাক্ষাৎ করবে তখন তাদেরকে জানিয়ে দাও যে, তাদের সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই, আর আমার সাথেও তাদের কোন সম্পর্ক নেই। আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) আল্লাহর নামে শপথ করে বললেন, এদের কারো কাছে যদি উহুদ পাহাড় পরিমাণ স্বর্ণ থাকে এবং তা দান-খয়রাত করে দেয় তবে আল্লাহ তার এ দান গ্রহণ করবেন না যতক্ষণ পর্যন্ত সে তাকদীরের উপর ঈমান না আনবে। অতঃপর তিনি বললেন, আমার পিতা উমর ইবনে খাত্তাব (রা.) আমার কাছে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, একদা আমরা রাসুলুল্লাহ ﷺ এর নিকট উপস্থিত ছিলাম। এমন সময় এক ব্যক্তি আমাদের সামনে আবির্ভূত হলো। তার পরনের কাপড়-চোপড় ছিল ধবধবে সাদা এবং মাথার চুলগুলো ছিল মিশমিশে কালো। সফর করে আসার কোন চিহ্নও তার মধ্যে দেখা যায়নি। আমাদের কেউই তাকে চিনেও না।

অবশেষে সে নবি ﷺ এর সামনে বসলো। সে তার হাটুদ্বয় নবি ﷺ এর হাটুদ্বয়ের সাথে মিলিয়ে দিলো এবং দুই হাতের তালু তার (অথবা নিজের) উরুর উপর রাখলো এবং বলল, হে মুহাম্মাদ ﷺ! আমাকে ইসলাম সম্বন্ধে বলুন। রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন, ইসলাম হচ্ছে এই– তুমি সাক্ষ্য দিবে যে, আল্লাহ ছাড়া প্রকৃতপক্ষে কোন ইলাহ নেই, এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল, সালাত কায়িম করবে, জাকাত আদায় করবে, রমযানের সওম পালন করবে এবং যদি পথ অতিক্রম করার সামর্থ্য হয় তখন বাইতুল্লাহর হজ করবে। সে বললো, আপনি সত্যই বলেছেন। বর্ণনাকারী উমর (রা.) বলেন, আমরা তার কথা শুনে আশ্চার্যান্বিত হলাম। কেননা সে (অজ্ঞের ন্যায়) প্রশ্ন করছে আর (বিজ্ঞের ন্যায়) সমর্থন করছে।

এরপর সে বললো, আমাকে ঈমান সম্পর্কে বলুন। রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন, ঈমান এই যে, তুমি আল্লাহ, তার ফেরেশতাকুল, তার কিতাবসমূহ, তার প্রেরিত নবিগণ ও শেষ দিনের উপর ঈমান রাখবে এবং তুমি তাকদীর ও এর ভালো ও মন্দের প্রতিও ঈমান রাখবে। সে বললো, আপনি সত্যই বলেছেন।

এবার সে বললো, আমাকে ইহসান সম্পর্কে বলুন। রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন, ইহসান এই যে, তুমি এমনভাবে আল্লাহর ইবাদাত করবে যেন তাকে দেখছো, যদি তাকে না দেখো তাহলে তিনি তোমাকে দেখছেন বলে অনুভব করবে।

এবার সে জিজ্ঞেস করলো। আমাকে কিয়ামত সম্বন্ধে বলুন। রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন, এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসাকারীর চেয়ে জিজ্ঞাসিত ব্যক্তি বেশি কিছু জানে না। অতঃপর সে বলল, তাহলে আমাকে এর কিছু নিদর্শন বলুন। তিনি বললেন, দাসী তার মনিবকে প্রসব করবে এবং নগ্ন পদ, বস্ত্রহীন, দরিদ্র, বকরীর রাখালদের বড় দালান-কোঠা নির্মাণের প্রতিযোগিতায় গৰ্ব অহংকারে মত্ত দেখতে পাবে।

বর্ণনাকারী উমর (রা.) বলেন, এরপর লোকটি চলে গেলো। আমি বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলাম। তারপর রাসুলুল্লাহ ﷺ আমাকে বললেন, হে উমর! তুমি জান, এ প্রশ্নকারী কে? আমি আরজ করলাম, আল্লাহ ও তার রাসূলই অধিক জ্ঞাত আছেন। রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন, তিনি জিবরীল। তোমাদের কাছে তিনি তোমাদের দীন শিক্ষা দিতে এসেছিলেন। সহিহ মুসলিম : ৮, সুনানে তিরমিজি : ২৬১০, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৬৩, সুনানে নাসায়ি :  ৪৯৯০, ৪৬৯৫,  সুনানে আবু দাঊদ : ৪৬৯৫, আহমাদ : ১৮৫, ৩৬৯, ৩৭৬।

আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা আল্লাহর রাসূল ﷺ জনসমক্ষে উপবিষ্ট ছিলেন, এমন সময় তাঁর নিকট জনৈক ব্যক্তি এসে জিজ্ঞেস করলেন ‘ঈমান কী?’ তিনি বললেন, ‘ঈমান হল, আপনি বিশ্বাস রাখবেন আল্লাহর প্রতি, তাঁর ফিরিশতাদের প্রতি, (কিয়ামতের দিন) তাঁর সঙ্গে সাক্ষাতের প্রতি এবং তাঁর রাসুলগণের প্রতি। আপনি আরো বিশ্বাস রাখবেন পুনরুত্থানের প্রতি।’ তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘ইসলাম কী?’ তিনি বললেন, ‘ইসলাম হল, আপনি আল্লাহর ইবাদত করবেন এবং তাঁর সাথে অংশীদার স্থাপন করবেন না, সালাত প্রতিষ্ঠা করবেন, ফরজ জাকাত আদায় করবেন এবং রমাযান-এর সিয়াম ব্রত পালন করবেন।’ ঐ ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, ‘ইহসান কী?’ তিনি বললেন, ‘আপনি এমনভাবে আল্লাহর ‘ইবাদাত করবেন যেন আপনি তাঁকে দেখছেন, আর যদি আপনি তাঁকে দেখতে না পান তবে (মনে করবেন) তিনি আপনাকে দেখছেন।’ ঐ ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, ‘কিয়ামত কবে?’ তিনি বললেন, ‘এ ব্যাপারে যাকে জিজ্ঞেস করা হচ্ছে, তিনি জিজ্ঞেসকারী অপেক্ষা অধিক জ্ঞাত নন। তবে আমি আপনাকে কিয়ামতের আলামতসমূহ বলে দিচ্ছি, বাঁদি যখন তার প্রভুকে প্রসব করবে এবং উটের নগণ্য রাখালেরা যখন বড় বড় অট্টালিকা নির্মাণে প্রতিযোগিতা করবে। (কিয়ামতের জ্ঞান) সেই পাঁচটি জিনিসের অন্তর্ভুক্ত, যা আল্লাহ্ ব্যতীত কেউ জানে না।’ অতঃপর আল্লাহর রাসূল ﷺ এই আয়াতটি শেষ পর্যন্ত তিলাওয়াত করলেন-

اِنَّ اللّٰہَ عِنۡدَہٗ عِلۡمُ السَّاعَۃِ ۚ  وَیُنَزِّلُ الۡغَیۡثَ ۚ  وَیَعۡلَمُ مَا فِی الۡاَرۡحَامِ ؕ  وَمَا تَدۡرِیۡ نَفۡسٌ مَّاذَا تَکۡسِبُ غَدًا ؕ  وَمَا تَدۡرِیۡ نَفۡسٌۢ بِاَیِّ اَرۡضٍ تَمُوۡتُ ؕ  اِنَّ اللّٰہَ عَلِیۡمٌ خَبِیۡرٌ ٪

অর্থ : নিশ্চয় আল্লাহর নিকট কিয়ামতের জ্ঞান রয়েছে। আর তিনি বৃষ্টি বর্ষণ করেন এবং জরায়ূতে যা আছে, তা তিনি জানেন। আর কেউ জানে না আগামীকাল সে কী অর্জন করবে এবং কেউ জানে না কোন স্থানে সে মারা যাবে। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সম্যক অবহিত। সুরা লোকমান : ৩৪

এরপর ঐ ব্যক্তি চলে গেলে তিনি বললেন, ‘তোমরা তাকে ফিরিয়ে আন।’ তারা কিছুই দেখতে পাইল না। তখন তিনি বললেন, ‘ইনি জিবরীল (আ)। লোকদেরকে তাদের দ্বীন শেখাতে এসেছিলেন। সহিহ বুখারি : ৫০, সহিহ মুসলিম : ১০, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৬৪, ৪০৪৪; সহিহ ইবনে খুযায়মাহ : ২২৪৪, আহমাদ ৯৫০১, হাদিসটি সহিহ বুখারি থেকে সংকলন করা হয়েছে।

ঈমানের রুকন বা স্তম্ভ (أركان الإيمان) ছয়টি :

কুরআনুল কারীমের আয়াত ও সহিহ হাদিস পর্যালোচনা করে আলিমগণ হাদিসে জিবরাইলে বর্ণিত ছয়টি বিষয় কে ঈমানের মূল ভিত্তি উল্লেখ করেছেন। যথা-

(১) আল্লাহর প্রতি ঈমান,

(২) ফেরেশতাগণের প্রতি ঈমান, 

(৩) আল্লাহর কিতাবসমূহের প্রতি ঈমান, 

(৪) রাসুলগণের প্রতি ঈমান,

(৫) পরকাল বা আখিরাতের প্রতি ঈমান এবং

(৬) তাকদীর বা পূর্বনিয়তির প্রতি ঈমান।

(১) আল্লাহর ওপর ঈমান  (١ الإيمانُ باللهِ),

কী বিশ্বাস করতে হব- আল্লাহ একমাত্র উপাস্য (ইলাহ)। তিনি সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা, রিজিকদাতা ও শাসক। তাঁর কোনো শরীক নেই—না সত্তায়, না গুণে, না ইবাদতে। তিনি দৃষ্টিগোচর নন, কিন্তু সবকিছুই দেখেন ও জানেন। তিনি রাগ করেন, ভালোবাসেন, রহমত করেন এবং শাস্তি দেন।

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-

قُلۡ هُوَ ٱللَّهُ أَحَدٌ (١) ٱللَّهُ ٱلصَّمَدُ (٢) لَمۡ يَلِدۡ وَلَمۡ يُولَدۡ (٣) وَلَمۡ يَكُن لَّهُ ۥ ڪُفُوًا أَحَدٌ (٤)

অর্থ : বল, তিনিই আল্লাহ, এক-অদ্বিতীয়। আল্লাহ কারও মুখাপেক্ষী নন। তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং তাঁকেও জন্ম দেওয়া হয়নি। এবং তাঁর সমতুল্য কেহই নেই। সুরা ইখলাস : ১-৪

(২) ফেরেশতাগণের প্রতি ঈমান  ( الإيمانُ بالمَلَائِكَةِ),

বিশ্বাস করতে হবে, ফেরেশতারা আল্লাহর তৈরি করা আলো সদৃশ জীব। তারা খাওয়া-দাওয়া করে না, ঘুমায় না, অবাধ্য হয় না। তারা সার্বক্ষণিক আল্লাহর আদেশ পালন করে থাকে। কিছু কিছু ফিরিশতার কিছু নির্দিষ্ট দায়িত্ব আছে। জিবরা্ই (আ.) যুগে যুগে নবি রাসুলদের নিকট অহি আনয়নকারী।  মিকাঈল (আ.) আল্লাহ আদেশে রিজিক ও বৃষ্টি বণ্টন করে থাকেন। ইসরাফীল (আ.) আল্লাহর আদেশে কিয়ামতের পূর্বে শিঙ্গা ফুঁকবেন। আজরাইল (আ.) বা মালাকুল মউত আল্লাহ আদেশে তার সৃষ্টি জীবের জান কবজ করে থাকেন। ইহা ছাড়া মানুষের ডানে বামে আমল লেখক ফিরিশতা থাকেন। সামনে পিছে মানুষ হিফাজতের জন্য ফিরিশতা থাকেন।

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-

وَکَمۡ مِّنۡ مَّلَکٍ فِی السَّمٰوٰتِ لَا تُغۡنِیۡ شَفَاعَتُہُمۡ شَیۡئًا اِلَّا مِنۡۢ بَعۡدِ اَنۡ یَّاۡذَنَ اللّٰہُ لِمَنۡ یَّشَآءُ وَیَرۡضٰی

অর্থ : আর আসমানসমূহে অনেক ফেরেশতা রয়েছে, তাদের সুপারিশ কোনোই কাজে আসবে না। তবে আল্লাহ যাকে ইচ্ছা করেন এবং যার প্রতি তিনি সন্তুষ্ট, তার ব্যাপারে অনুমতি দেয়ার পর। সুরা কামার : ২৬

(৩) আল্লাহর কিতাবসমূহের প্রতি ঈমান  ( الإيمانُ بالكُتُبِ),

বিশ্বাস করতে হবে, আল্লাহ যুগে যুগে মানব জাতির হিদায়াতের জন্য কিতাব দিয়েছেন। ইহার মাঝে প্রধান কিতাব চারটি। যথা-

তাওরাত যা মূসা (আ.) এর উপর নাজিল হয়েছে।

জাবুর যা দাউদ (আ.) এর উপর নাজিল হয়েছে।

ইনজীল যা ঈসা (আ.) এর উপর নাজিল হয়েছে।

সর্বশেষ ও চূড়ান্ত কিতাব কুরআন যা  মুহাম্মদ ﷺ এর উপর নাজিল হয়েছে। কুরআন পূর্ববর্তী সব কিতাবকে বাতিল করে দিয়েছে এবং এটিই চিরকাল প্রযোজ্য।

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-

بِالۡبَیِّنٰتِ وَالزُّبُرِ ؕ وَاَنۡزَلۡنَاۤ اِلَیۡکَ الذِّکۡرَ لِتُبَیِّنَ لِلنَّاسِ مَا نُزِّلَ اِلَیۡہِمۡ وَلَعَلَّہُمۡ یَتَفَکَّرُوۡنَ

অর্থ : তাদের প্রেরণ করেছিলাম স্পষ্ট নিদর্শন ও গ্রন্থসহ এবং তোমার প্রতি কুরআন অবতীর্ণ করেছি মানুষকে স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দেয়ার জন্য, যা তাদের প্রতি অবতীর্ণ করা হয়েছিল, যাতে তারা চিন্তা ভাবনা করে। সুরা নাহল : ৪৪

(৪) রাসুলগণের প্রতি ঈমান (٤ الإيمانُ بالرُّسُلِ),

বিশ্বাস করতে হবে, আল্লাহ প্রতি জাতির জন্য একজন করে রাসুল পাঠিয়েছেন। তারা মানুষ নন, ফেরেশতা নন। সকল রাসুল তাওহীদের দাওয়াত দিয়েছেন। সর্বশেষ ও চূড়ান্ত সদস্য হলেন মুহাম্মদ ﷺ।  তাঁর পরে আর কোনো নবি আসবেন না।

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-

مَا کَانَ مُحَمَّدٌ اَبَاۤ اَحَدٍ مِّنۡ رِّجَالِکُمۡ وَلٰکِنۡ رَّسُوۡلَ اللّٰہِ وَخَاتَمَ النَّبِیّٖنَ ؕ  وَکَانَ اللّٰہُ بِکُلِّ شَیۡءٍ عَلِیۡمًا 

অর্থ : মুহাম্মাদ তোমাদের কোন পুরুষের পিতা নয়; তবে আল্লাহর রাসুল ও সর্বশেষ নবি। আর আল্লাহ সকল বিষয়ে সর্বজ্ঞ। সুরা আহযাব : ৪০

(৫) পরকাল বা আখিরাতের প্রতি ঈমান এবং ( الإيمانُ باليَوْمِ الآخِرِ)

বিশ্বাস করতে হবে, মৃত্যুর পর সবাইকে পুনরুত্থিত করা হবে। হাশর-মহাশর, হিসেব-নিকাশ, মীযান (আমলের পাল্লা), সিরাত, জান্নাত-জাহান্নাম এসব বাস্তব বিষয়। জান্নাত হবে মুমিনদের চিরস্থায়ী পুরস্কার। জাহান্নাম হবে কুফর ও গুনাহগারদের শাস্তির স্থান।

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-

وَّاَنَّ الَّذِیۡنَ لَا یُؤۡمِنُوۡنَ بِالۡاٰخِرَۃِ اَعۡتَدۡنَا لَہُمۡ عَذَابًا اَلِیۡمًا 

অর্থ : আর যারা আখিরাতে ঈমান রাখে না আমি তাদের জন্য প্রস্তুত করেছি যন্ত্রণাদায়ক আজাব। সুরা ইসরা : ১০

(৬) তাকদীর বা পূর্ব নিয়তির প্রতি ঈমান (٦ الإيمانُ بالقَدَرِ) ।

বিশ্বাস করতে হবে, সবকিছু আল্লাহর জ্ঞানে ও ইচ্ছায় ঘটে। যা হয়েছে, হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে হবে সবকিছু আল্লাহ জানেন। মানুষের ভালো-মন্দ, দুঃখ-সুখ—সব আল্লাহর হিকমত অনুযায়ী। মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা আছে, তবে আল্লাহর চূড়ান্ত ইচ্ছা ছাড়া কিছুই ঘটে না।

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-

إِنَّا كُلَّ شَيْءٍ خَلَقْنَاهُ بِقَدَرٍ.

অর্থ : আমি প্রত্যেক বস্তুকে পরিমিতরূপে সৃষ্টি করেছি। সুরা কামার : ৪৯

এই ছয়টি বিষয়ের প্রতি ঈমানই একটি মুসলিমের ঈমানের মূল ভিত্তি। এগুলোর প্রতি বিশ্বাস থাকা মানে হলো সে ইসলামের মূল ভিত্তিতে বিশ্বাসী।

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ

ঈমানের মাপকাঠি ও বৈশিষ্ট্য

আমাদের ঈমানের মাপকাঠি : 

আমাদের ঈমানের মাপকাঠি হবে সাহাবাদের (রা.) ঈমানের মত। সেই সময়কার মুশরিক ও মুনাফিকদের আল্লাহ সাহাবাদের (রা.) ঈমানের মত ঈমান আনার নির্দেশ দিয়েছেন। সাহাবাদের (রা.) ঈমান কে-ই ঈমানের মাপকাঠি নির্ধারণ করেছেন। যেমন-

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-

فَإِنۡ ءَامَنُواْ بِمِثۡلِ مَآ ءَامَنتُم بِهِۦ فَقَدِ ٱهۡتَدَواْ‌ۖ وَّإِن تَوَلَّوۡاْ فَإِنَّمَا هُمۡ فِى شِقَاقٍ۬‌ۖ فَسَيَكۡفِيڪَهُمُ ٱللَّهُ‌ۚ وَهُوَ ٱلسَّمِيعُ ٱلۡعَلِيمُ

অর্থ : তোমরা যেমনি ঈমান এনেছো তারাও যদি ঠিক তেমনিভাবে ঈমান আনে, তাহলে তারা হিদায়াতের ওপর প্রতিষ্ঠিত বলতে হবে ৷ আর যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়, তাহলে সোজা কথায় বলা যায়। (সুরা বাকারা : ১৩৭

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-

وَإِذَا قِيلَ لَهُمۡ ءَامِنُواْ كَمَآ ءَامَنَ ٱلنَّاسُ قَالُوٓاْ أَنُؤۡمِنُ كَمَآ ءَامَنَ ٱلسُّفَهَآءُ‌ۗ أَلَآ إِنَّهُمۡ هُمُ ٱلسُّفَهَآءُ وَلَـٰكِن لَّا يَعۡلَمُونَ

অর্থ : আর যখন তাদের বলা হয়েছে, অন্য লোকেরা যেভাবে ঈমান এনেছে তোমরাও সেভাবে ঈমান আনো  তখন তারা এ জবাবই দিয়েছে- আমরা কি ঈমান আনবো নির্বোধদের মতো? সাবধান !আসলে এরাই নির্বোধ, কিন্তু এরা জানে না ৷ সুরা বাকারা : ১৩

ঈমানদারের কিছু লক্ষন বা বৈশিষ্ট্য :

১. কুরআন তিলওয়াত ঈমানদারদের ঈমান বৃদ্ধিপায় করে :

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-

اِنَّمَا الۡمُؤۡمِنُوۡنَ الَّذِیۡنَ اِذَا ذُکِرَ اللّٰہُ وَجِلَتۡ قُلُوۡبُہُمۡ وَاِذَا تُلِیَتۡ عَلَیۡہِمۡ اٰیٰتُہٗ زَادَتۡہُمۡ اِیۡمَانًا وَّعَلٰی رَبِّہِمۡ یَتَوَکَّلُوۡنَ ۚۖ

মুমিন তো তারা, যাদের অন্তরসমূহ কেঁপে উঠে যখন আল্লাহকে স্মরণ করা হয়। আর যখন তাদের উপর তাঁর আয়াতসমূহ পাঠ করা হয় তখন তা তাদের ঈমান বৃদ্ধি করে এবং যারা তাদের রবের উপরই ভরসা করে। সুরা আনফাল : ০২

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-

وَإِذَا مَا أُنْزِلَتْ سُورَةٌ فَمِنْهُمْ مَنْ يَقُولُ أَيُّكُمْ زَادَتْهُ هَذِهِ إِيمَانًا فَأَمَّا الَّذِينَ آَمَنُوا فَزَادَتْهُمْ إِيمَانًا وَهُمْ يَسْتَبْشِرُونَ 

অর্থ : আর যখন কোন সুরা অবতীর্ণ করা হয় তখন কেহ কেহ বলে, তোমাদের মধ্যে এই সুরা কার ঈমান বৃদ্ধি করল? অবশ্যই যে সব লোক ঈমান এনেছে, এই সুরা তাদের ঈমানকে বর্ধিত করেছে এবং তারাই আনন্দ লাভ করছে। সুরা তাওবা : ১২৪

২. ঈমানদার নিজের জন্য যা পছন্দ করবে, তার ভাইদের জন্যও তা পছন্দ করবে।

عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ ـ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ   ـ قَالَ ‏ “‏ لاَ يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى يُحِبَّ لأَخِيهِ – أَوْ قَالَ لِجَارِهِ – مَا يُحِبُّ لِنَفْسِهِ ‏

অর্থ : আনাস (রা.) হতে বর্ণিত। নবি ﷺ বলেন, তোমাদের কেউ প্রকৃত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে তার ভাইয়ের জন্য সেটাই পছন্দ করবে, যা তার নিজের জন্য পছন্দ করে। সহিহ বুখারি : ১৩, সহিহ মুসলিম : ৪৫, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৬৬, সুনানে তিরমিজি ২৫১৫, সুনানে নাসায়ি ৫০১৬, ৫০১৭, ৫০৩৯; আহমাদ ১২৩৯০, ১২৭৩৪, সুনানে দারিমী ২৭৪০।

৩.  মুমিনের নিকট নিজ পিতা ও সন্তান থেকেও রাসুলুল্লাহ ﷺ বেশী প্রিয় : আনাস (রা.) হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসুল ﷺ বলেন-

 لاَ يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى أَكُونَ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِنْ وَالِدِهِ وَوَلَدِهِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ.

অর্থ : তোমাদের কেউ প্রকৃত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার নিকট তার পিতা, তার সন্তান ও সব মানুষের অপেক্ষা অধিক প্রিয়পাত্র হই। সহিহ বুখারি : ১৫, সহিহ মুসলিম : ৪৪, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৬৭, সুনানে নাসায়ি : ৫০১৩-১৪, আহমাদ : ১২৭৩৯, ১৩৪৯৯, সুনানে দারিমী : ২৭৪১।

আনাস (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

“‏ ثَلاَثٌ مَنْ كُنَّ فِيهِ وَجَدَ حَلاَوَةَ الإِيمَانِ مَنْ كَانَ اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِمَّا سِوَاهُمَا، وَمَنْ أَحَبَّ عَبْدًا لاَ يُحِبُّهُ إِلاَّ لِلَّهِ، وَمَنْ يَكْرَهُ أَنْ يَعُودَ فِي الْكُفْرِ بَعْدَ إِذْ أَنْقَذَهُ اللَّهُ، كَمَا يَكْرَهُ أَنْ يُلْقَى فِي

অর্থ : যে লোকের মধ্যে তিনটি গুণের সমাবেশ ঘটে, সে ঈমানের প্রকৃত স্বাদ পেয়েছে। (১) তার মধ্যে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের ভালোবাসা দুনিয়ার সকল কিছু হতে অধিক প্রিয়। (২) যে লোক একজন মানুষকে কেবলমাত্র আল্লাহর উদ্দেশেই ভালোবাসে। (৩) যে লোক কুফরি হতে নাজাতপ্রাপ্ত হয়ে ঈমান ও ইসলামের আলো গ্রহণ করার পর পুনরায় কুফরিতে ফিরে যাওয়াকে এত অপছন্দ করে যেমন আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়াকে অপছন্দ করে।  সহিহ বুখারি : ২১, সহিহ মুসলিম : ৪৩, নাসায়ি ৪৯৮৮, তিরমিজি ২৬২৪, ইবনে মাজাহ ৪০৩৩, আহমাদ ১২৭৬৫।

৪. ঈমানদার পরস্পর পরস্পরকে ভালোবাসবে :

আবু হুরায়রা (রা.) বলেন যে, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

لاَ تَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ حَتَّى تُؤْمِنُوا وَلاَ تُؤْمِنُوا حَتَّى تَحَابُّوا ‏.‏ أَوَلاَ أَدُلُّكُمْ عَلَى شَىْءٍ إِذَا فَعَلْتُمُوهُ تَحَابَبْتُمْ أَفْشُوا السَّلاَمَ بَيْنَكُمْ ‏”‏ ‏.

অর্থ : ঈমানদার ছাড়া কেউই জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না, আর তোমরা ঈমানদার হতে পারবে না যতক্ষণ না একে অন্যকে ভালোবাসবে। আমি কি তোমাদের তা বলে দিব না, কি করলে তোমাদের মাঝে পারস্পরিক ভালোবাসার সৃষ্টি হবে? তা হলো, তোমরা পরস্পর বেশি সালাম বিনিময় করবে। সহিহ মুসলিম : ৫৪, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৬৮, সুনানে তিরমিজি : ২৬৮৮, আহমাদ ৮৮৪১, ৯৪১৬।

আবু উমামাহ্ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

«مَنْ أَحَبَّ لِلَّهِ وَأَبْغَضَ لِلَّهِ وَأَعْطَى لِلَّهِ وَمَنَعَ لِلَّهِ فَقَدِ اسْتكْمل الْإِيمَان

যে ব্যক্তি আল্লাহর ওয়াস্তে কাউকে ভালোবাসে, আর আল্লাহর ওয়াস্তে কারও সাথে বিদ্বেষ পোষণ করে এবং আল্লাহর ওয়াস্তেই দান-খয়রাত করে, আবার আল্লাহর ওয়াস্তেই দান-খয়রাত থেকে বিরত থাকে। সে ঈমান পূর্ণ করেছে। সুনানে আবু দাঊদ : ৪৬৮১, মিশকাত : ২৯, সহিহুল জামি ;৫৯৬৫।

৫. কোন ঈমানদার অপর ঈমানদারকে গালি দিতে পারে না :

عَنْ زُبَيْدٍ قَالَ سَأَلْتُ أَبَا وَائِلٍ عَنِ الْمُرْجِئَةِ فَقَالَ حَدَّثَنِي عَبْدُ اللهِ أَنَّ النَّبِيَّ قَالَ سِبَابُ الْمُسْلِمِ فُسُوقٌ وَقِتَالُهُ كُفْرٌ.

অর্থ : জুবাইদ (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আবু ওয়াইল (রহ.) কে মুরজিয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম, তিনি বললেন, আবদুল্লাহ ইবন মাসঊদ আমার নিকট বলেছেন, নবি ﷺ বলেছেন-

سِبَابُ الْمُسْلِمِ فُسُوقٌ وَقِتَالُهُ كُفْرٌ.

মুসলিমকে গালি দেয়া ফাসিকী এবং তার সাথে লড়াই করা কুফরি। সহিহ বুখারি : ৪৮, সহিহ মুসলিম : ৬৪, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৬৯, সুনানে তিরমিজি : ১৯৮৩, ২৬৩৪-৩৫, সুনানে নাসায়ি : ৪১০৫-১৩।

৬. ঈমানদার লজ্জাশীল হবে :

আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত। নবি ﷺ বলেছেন-

 “‏ الإِيمَانُ بِضْعٌ وَسِتُّونَ شُعْبَةً، وَالْحَيَاءُ شُعْبَةٌ مِنَ الإِيمَانِ ‏”

অর্থ :, ঈমানের ষাটেরও অধিক শাখা আছে। আর লজ্জা হচ্ছে ঈমানের একটি শাখা। সহিহ বুখারি : ৯, সহিহ মুসলিম ৩৫, মিশকাত : ৫, সুনানে দারিমী : ৪৬৭৬, সুনানে নাসায়ি ৫০০৫, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৫৭, আহমাদ : ৯৩৬১, ইবনে হিব্বান : ১৬৬।

৭. ঈমানদার প্রতিবেশী ও মেহমানকে সম্মান প্রদর্শন করবে :

আবু হুরায়রাহ (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন-

‏ مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ فَلْيَقُلْ خَيْرًا أَوْ لِيَصْمُتْ وَمَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ فَلْيُكْرِمْ جَارَهُ وَمَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ فَلْيُكْرِمْ ضَيْفَهُ ‏

অর্থ যে লোক আল্লাহ তায়ালা ও আখিরাতের প্রতি বিশ্বাস রাখে, সে যেন তার অতিথির অভ্যর্থনা ও আদর-যত্ন করে। আর যে লোক আল্লাহ তায়ালা ও আখিরাতের ওপর বিশ্বাস রাখে সে যেন উত্তম কথা বলে অথবা নীরব থাকে। সুনানে তিরমিজি : ২৫০০, ইরওয়া : ২৫২৫, আবু দাঊদ : ৩৭৪৮, ৫১৫৪,  সহিহ ইবনে হিব্বান : ৫০৬, দারিমী : ২০৩৬, আস সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী : ১৭১০৬।

আবু শুরাইহ আদাবী (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমার দু’কান শুনেছে এবং দুই চক্ষু দেখেছে, যখন রাসুলুল্লাহ ﷺ কথা বলছিলেন। তিনি বলেছিলেন-

‏”‏ مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ فَلْيُكْرِمْ ضَيْفَهُ جَائِزَتَهُ ‏”‏ ‏.‏ قَالُوا وَمَا جَائِزَتُهُ يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ ‏”‏ يَوْمُهُ وَلَيْلَتُهُ وَالضِّيَافَةُ ثَلاَثَةُ أَيَّامٍ فَمَا كَانَ وَرَاءَ ذَلِكَ فَهُوَ صَدَقَةٌ عَلَيْهِ – وَقَالَ – مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ فَلْيَقُلْ خَيْرًا أَوْ لِيَصْمُتْ

অর্থ : যে ব্যক্তি আল্লাহ এবং পরকালে বিশ্বাস রাখে সে যেন ভালোভাবে নিজ মেহমানের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে। তখন সাহাবিগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! ভালোভাবে মানে কী? তখন তিনি বললেন, তাকে একদিন ও এক রাত্রি আপ্যায়ন করবে। আর (সাধারণভাবে) মেহমানদারির সময়কাল তিন দিন। এর চাইতে বেশি দিন মেহমানদারি করা তার জন্য সাদাকা স্বরূপ। তিনি আরো বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিনে বিশ্বাস রাখে, সে যেন উত্তম কথা বলে অথবা চুপ থাকে। সহিহ মুসলিম : ৪৮, ইবনে মাজাহ : ৩৬৭৫, সুনানে তিরমিজি : ১৯৬৭

৮. প্রথম ঈমান শিখবে অতঃপর কুরআন শিখবে :

عَنْ جُنْدُبِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ، قَالَ كُنَّا مَعَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ    ـ وَنَحْنُ فِتْيَانٌ حَزَاوِرَةٌ فَتَعَلَّمْنَا الإِيمَانَ قَبْلَ أَنْ نَتَعَلَّمَ الْقُرْآنَ ثُمَّ تَعَلَّمْنَا الْقُرْآنَ فَازْدَدْنَا بِهِ إِيمَانًا ‏”‏ ‏

অর্থ : জুনদুব ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা নবি ﷺ এর সাথে ছিলাম। আমরা ছিলাম শক্তিশালী এবং সক্ষম যুবক। আমরা কুরআন শেখার পূর্বে ঈমান শিখেছি, অতঃপর কুরআন শিখেছি এবং তার দ্বারা আমাদের ঈমান বেড়ে যায়। সুনানে ইবনে মাজাহ : ৬১

৯. ঈমান আনতে হবে শুধু ইসলাম ধর্মের উপর :

আবু হুরায়রাহ্ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

«وَالَّذِي نَفْسُ مُحَمَّدٍ بِيَدِهِ لَا يسمع بِي أحدق مِنْ هَذِهِ الْأُمَّةِ يَهُودِيٌّ وَلَا نَصْرَانِيٌّ ثُمَّ يَمُوتُ وَلَمْ يُؤْمِنْ بِالَّذِي أُرْسِلْتُ بِهِ إِلَّا كَانَ من أَصْحَاب النَّار»

অর্থ : যে প্রতিপালকের হাতে মুহাম্মাদের জীবন তাঁর কসম! এ উম্মাতের যে কেউই চাই ইহুদি হোক বা খ্রিষ্টান, আমার রিসালাত ও নুবূওয়্যাত মেনে না নিবে ও আমার প্রেরিত শারীয়াতের উপর ঈমান না এনেই মৃত্যুবরণ করবে, সে নিশ্চয়ই জাহান্নামি। সহিহ : মুসলিম ১৫৩, মিশকাত : ৯, আহমাদ ৮৬০৯, সহীহাহ ১৫৭, সহিহাহ আল জামি : ৭০৬৩।

১০. ঈমানদার মুসলিমের হাত ও মুখ থেকে অপর মুসলিম নিরাপদ থাকে :

আবু হুরায়রাহ্ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

«الْمُسْلِمُ مَنْ سَلِمَ الْمُسْلِمُونَ مِنْ لِسَانِهِ وَيَدِهِ وَالْمُؤْمِنُ مَنْ أَمِنَهُ النَّاسُ عَلَى دِمَائِهِمْ وَأَمْوَالِهِمْ»

যে ব্যক্তি মুসলিম যার হাত ও মুখ হতে অপর মুসলিম নিরাপদ থাকে। আর (প্রকৃত ও পরিপূর্ণ) মুমিন সে ব্যক্তি যার থেকে মানুষ নিজের জীবন ও সম্পদকে সম্পূর্ণ নিরাপদ বলে মনে করে। মিশকাত : ৩২,  সুনানে নাসায়ি : ৪৯৯৫, সহিহ জামি : ৬৭১০।

১১. ঈমানদার আমানতকারী ও ওয়াদা পুরনকাররী

وَعَنْ أَنَسٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَلَّمَا خَطَبَنَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِلَّا قَالَ: «لَا إِيمَانَ لِمَنْ لَا أَمَانَةَ لَهُ وَلَا دِينَ لِمَنْ لَا عَهْدَ لَهُ» . رَوَاهُ الْبَيْهَقِيُّ فِي شُعَبِ الْإِيمَانِ

আনাস (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ এরূপ খুতবা খুব কমই দিয়েছেন যাতে এ কথা বলেননি যে, যার আমানাতদারী নেই তার ঈমানও নেই এবং যার অঙ্গীকারের মূল্য নেই তার দ্বীনও নেই। মিশকাত : ৩৪, সহীহুত্ তারগিব : ৩০০৪, শু‘আবুল ঈমান ৪০৪৫।

১২. মুমিনকে পাপাচার পীড়া দেয় :

আবু উমামা (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, জনৈক লোক রাসুলুল্লাহ ﷺ কে জিজ্ঞেস করলো, হে আল্লাহর রাসুল! ঈমান কী? তিনি ﷺ বললেন-

«مَا الْإِيمَانُ قَالَ إِذَا سَرَّتْكَ حَسَنَتُكَ وَسَاءَتْكَ سَيِّئَتُكَ فَأَنْتَ مُؤْمِنٌ قَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ فَمَا الْإِثْمُ قَالَ إِذَا حَاكَ فِي نَفْسِكَ شَيْءٌ فَدَعْهُ»

যখন তোমাকে নেক (সৎ) কাজ আনন্দ দিবে ও খারাপ (অসৎ) কাজ পীড়া দিবে, তখন তুমি মুমিন। আবার সে লোকটি জিজ্ঞেস করলো, হে আল্লাহর রাসুল! খারাপ (অসৎ) কাজ কি? উত্তরে তিনি ﷺ বললেন, যখন কোন কাজ করতে তোমার মনে দ্বিধা ও সন্দেহের উদ্রেক করে (তখন মনে করবে এটা গুনাহের কাজ), তখন তা ছেড়ে দিবে। মিশকাত : ৪৪, আহমাদ ২১৬৬২, সহীহুত্ তারগিব ১৭৩৯।

১৩। পাপ কাজ করার সময় মানুষের ঈমান চলে যায় :

ইবনে আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহﷺ বলেছেন-

لاَ يَزْنِي الْعَبْدُ حِينَ يَزْنِي وَهُوَ مُؤْمِنٌ وَلاَ يَسْرِقُ حِينَ يَسْرِقُ وَهُوَ مُؤْمِنٌ وَلاَ يَشْرَبُ حِينَ يَشْرَبُ وَهُوَ مُؤْمِنٌ وَلاَ يَقْتُلُ وَهُوَ مُؤْمِنٌ

মুমিন থাকা অবস্থায় কোনো ব্যক্তি ব্যভিচারে লিপ্ত হয় না। মুমিন থাকা অবস্থায় কোন চোর চুরি করে না। মুমিন থাকা অবস্থায় কেউ মদ্য পান করে না। মুমিন থাকা অবস্থায় কেউ হত্যা করে না।

ইক্বরিমাহ (রহ.) বলেন, আমি ইবনে আব্বাস (রা.) কে জিজ্ঞেস করলাম, তার থেকে ইমান কিভাবে ছিনিয়ে নেয়া হয়? তিনি বললেন, এভাবে। আর অঙ্গুলিগুলো পরস্পর জড়ালেন, এরপর অঙ্গুলিগুলো বের করলেন। যদি সে তওবা করে তবে আগের অবস্থায় এভাবে ফিরে আসে। এ বলে অঙ্গুলিগুলো আবার পরস্পর জড়ালেন। সহিহ বুখারি : ৬৮০৯, মিশকাত : ৫৪

আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবি ﷺ বলেছেন, কোন ব্যভিচারী মুমিন অবস্থায় ব্যভিচার করে না এবং কোন মদ্যপায়ী মুমিন অবস্থায় মদ পান করে না। কোন চোর মুমিন অবস্থায় চুরি করে না। কোন লুটতরাজকারী মুমিন অবস্থায় এরূপ লুটতরাজ করে না যে, যখন সে লুটতরাজ করে তখন তার প্রতি লোকজন চোখ তুলে তাকিয়ে থাকে। সহিহ বুখারি : ২৪৭৫, সহিহ মুসলিম ৫৭, সুনানে আবু দাঊদ : ৪৬৮৯, সুনানে নাসায়ি : ৪৮৭০, সুনানে তিরমিজি : ২৬২৫, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৩৯৩৬, মিশকাত : ৫৩, সহিহাহ : ৩০০০

রাসুলুল্লাহ ﷺজম্ম এবং নাম

রাসুলুল্লাহ জম্ম এবং নাম

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

আল কুরআনের বাণী :

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-

وَاِذۡ قَالَ عِیۡسَی ابۡنُ مَرۡیَمَ یٰبَنِیۡۤ اِسۡرَآءِیۡلَ اِنِّیۡ رَسُوۡلُ اللّٰہِ اِلَیۡکُمۡ مُّصَدِّقًا لِّمَا بَیۡنَ یَدَیَّ مِنَ التَّوۡرٰىۃِ وَمُبَشِّرًۢا بِرَسُوۡلٍ یَّاۡتِیۡ مِنۡۢ بَعۡدِی اسۡمُہٗۤ اَحۡمَدُ ؕ فَلَمَّا جَآءَہُمۡ بِالۡبَیِّنٰتِ قَالُوۡا ہٰذَا سِحۡرٌ مُّبِیۡنٌ

অনুবাদ : আর যখন মারইয়াম পুত্র ঈসা বলেছিল, ‘হে বনী ইসরাঈল, নিশ্চয় আমি তোমাদের নিকট আল্লাহর রাসূল। আমার পূর্ববর্তী তাওরাতের সত্যায়নকারী এবং একজন রাসূলের সুসংবাদদাতা যিনি আমার পরে আসবেন, যার নাম আহমদ’। অতঃপর সে যখন সুস্পষ্ট নিদর্শনসমূহ নিয়ে আগমন করল, তখন তারা বলল, ‘এটাতো স্পষ্ট যাদু’। সুরা সফ : ০৬

হাদিস নম্বর-০১ :: রাসুলুল্লাহ ﷺ সোমবার জম্ম গ্রহণ করেন।

وَحَدَّثَنِي زُهَيْرُ بْنُ حَرْبٍ، حَدَّثَنَا عَبْدُ الرَّحْمَنِ بْنُ مَهْدِيٍّ، حَدَّثَنَا مَهْدِيُّ بْنُ مَيْمُونٍ، عَنْ غَيْلاَنَ، عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ مَعْبَدٍ الزِّمَّانِيِّ، عَنْ أَبِي قَتَادَةَ الأَنْصَارِيِّ، ر  صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَأَنَّرَسُولَ اللَّهِ  صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَسُئِلَ عَنْ صَوْمِ الاِثْنَيْنِ فَقَالَ ‏ “‏ فِيهِ وُلِدْتُ وَفِيهِ أُنْزِلَ عَلَىَّ ‏”‏ ‏

অনুবাদ : আবূ কতাদাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ ﷺ এর কাছে সোমবারের সওম সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, ঐদিন আমি জন্মলাভ করেছি এবং ঐদিন আমার উপর (কুরআন) নাযিল হয়েছে।

সহিহ মুসলিম : ১১৬২, সুনানে আবূ দাঊদ : ২৪২৬, মিশকাত : ২০৪৫, আহমাদ : ২২৫৫০, সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী : ৮৪৩৪, শুআবূল ঈমান : ১৩২৩। হাদিসটি সহিহ মুসলিম থেকে সংকলন করা হয়েছে।

হাদিস নম্বর -০২ :: রাসুলুল্লাহ এর জম্ম গ্রহণের বছর

حَدَّثَنَا أَحْمَدُ ابْنُ أَبِيْ رَجَاءٍ حَدَّثَنَا النَّضْرُ عَنْ هِشَامٍ عَنْ عِكْرِمَةَ عَنْ ابْنِ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا قَالَ أُنْزِلَ عَلَى رَسُوْلِ اللهِ  صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَوَهُوَ ابْنُ أَرْبَعِيْنَ فَمَكَثَ بِمَكَّةَ ثَلَاثَ عَشْرَةَ سَنَةً ثُمَّ أُمِرَ بِالْهِجْرَةِ فَهَاجَرَ إِلَى الْمَدِيْنَةِ فَمَكَثَ بِهَا عَشْرَ سِنِيْنَ ثُمَّ تُوُفِّيَ صلى الله عليه

অনুবাদ : ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর উপর যখন (ওহি) নজিল করা হয় তখন তাঁর বয়স ছিল চল্লিশ বছর। অতঃপর তিনি মক্কা্য় তের বছর অবস্থান করেন। অতঃপর তাঁকে হিজরত করার আদেশ দেয়া হয়। তিনি হিজরত করে মদিনা্য় চলে গেলেন এবং সেখানে দশ বছর অবস্থান করলেন, তারপর তাঁর মৃত্যু হয় ﷺ। সহিহ বখারি : ৩৮৫১, ৩৯০২, ৩৯০৩, ৪৪৬৫, ৪৯৭৯

নোট : সহিহ হাদিস নিশ্চিত করে যে রাসুলুল্লাহ ﷺ ৪০ বছর বয়সে নবুওয়ত লাভ করেন।  ঐতিহাসিকভাবে, নবুওয়ত লাভের সময় ৬১০ খ্রিস্টাব্দ বলে নির্ধারিত হয়েছে। যদি রাসুলুল্লাহ ﷺ এর বয়স তখন ৪০ বছর ধরা হয়, তবে হিসাব অনুযায়ী জন্ম সাল দাঁড়ায়—৬১০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ৪০ বছর বাদ দিলে ৫৭০ খ্রিস্টাব্দ হয়।  অর্থাৎ, রাসুলুল্লাহ ﷺ সম্ভবত ৫৭০ বা ৫৭১ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেছেন।

সঠিক সন নির্ধারিত না হলেও তিনি আমরে ফিল বা হাতির বছর জম্ম গ্রহণ করেন-

রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর জন্ম ‘হাতির বছর’ (عام الفيل) সংঘটিত হয়েছে। এ তথ্য সরাসরি সহিহ হাদিসে পাওয়া যায় না, তবে এটি বিশুদ্ধ ঐতিহাসিক ও সিরাহ গ্রন্থগুলোতে উল্লেখিত আছে। অনেক প্রাচীন ইসলামি ঐতিহাসিক, তাবেয়ি এবং মুহাদ্দিসগণ একমত হয়েছেন যে, রাসুলুল্লাহ ﷺ হাতির বছরে জন্মগ্রহণ করেন।

বিশিষ্ট ইসলামি জীবনীকার ইবন ইসহাক (মৃত্যু: ১৫১ হিজরি) তাঁর সিরাহ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন-

“وُلِدَ رَسُولُ اللَّهِ  صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَعَامَ الْفِيلِ، وَذَلِكَ مَا اتَّفَقَ عَلَيْهِ أَهْلُ السِّيَرِ وَالْمَغَازِي.”

অর্থ: রাসূলুল্লাহ ﷺ হাতির বছরে জন্মগ্রহণ করেছেন, এবং এটি সিরাহ ও মাগাজি (জিহাদ সম্পর্কিত ইতিহাস) বিশেষজ্ঞদের সর্বসম্মত মত। সিরাতু ইবন হিশাম, প্রথম খণ্ড, পৃ. ১৭৫-১৭৬

ইবন কাসির (মৃত্যু: ৭৭৪ হিজরি)  তার লিখিত ‘আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া’ গ্রন্থে বলেন-

“وُلِدَ رَسُولُ اللَّهِ  صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَفِي عَامِ الْفِيلِ وَهَذَا هُوَ الْمَشْهُورُ عِندَ الْجُمْهُورِ.”

অর্থ: রাসূলুল্লাহ ﷺ হাতির বছরে জন্মগ্রহণ করেছেন, এবং এটি সাধারণ মুসলিম ঐতিহাসিকদের প্রসিদ্ধ মতামত। আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃ. ২৬০

ইবন সা’দ (মৃত্যু: ২৩০ হিজরি)  তার ‘আত-তাবাকাতুল কুবরা’ গ্রন্থে বলেন-

“وُلِدَ رَسُولُ اللَّهِ  صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَفِي عَامِ الْفِيلِ بِمَكَّةَ.”

অর্থ: রাসূলুল্লাহ ﷺ মক্কায় হাতির বছরে জন্মগ্রহণ করেছেন।

আত-তাবাকাতুল কুবরা, ইবন সাদ, প্রথম খণ্ড, পৃ. ১০০

রাসূলুল্লাহ এর জন্ম গ্রহণের তারিখ :

রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সুনির্দিষ্ট জন্ম তারিখ সম্পর্কে কোনো সহিহ হাদিস পাওয়া যায় না। তবে ঐতিহাসিকগনের কাছে তারিখ সম্পর্কে ২০ এর অধিক মতামত পাওয়া যায়। রাসূলুল্লাহ ﷺ এর জম্ম তারিখ ১২ রবিউল আউয়াল বেশি প্রসিদ্ধ হলেও সমকালীন সিরাত প্রণেত শফিউর রহমান মোবারকপুরি ৯ রবিউল আউয়াল তারিখটিকে প্রাধান্য দিয়েছেন।

হাদিস নম্বর-০৩ :: রাসুলুল্লাহ অনেকগুলো নাম ছিল।

حَدَّثَنِيْ إِبْرَاهِيْمُ بْنُ الْمُنْذِرِ قَالَ حَدَّثَنِيْ مَعْنٌ عَنْ مَالِكٍ عَنْ ابْنِ شِهَابٍ عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ جُبَيْرِ بْنِ مُطْعِمٍ عَنْ أَبِيْهِ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ  صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَلِيْ خَمْسَةُ أَسْمَاءٍ أَنَا مُحَمَّدٌ وَأَحْمَدُ وَأَنَا الْمَاحِي الَّذِيْ يَمْحُوْ اللهُ بِي الْكُفْرَ وَأَنَا الْحَاشِرُ الَّذِيْ يُحْشَرُ النَّاسُ عَلَى قَدَمِيْ وَأَنَا الْعَاقِبُ>

অনুবাদ : জুবায়র ইবনু মুত‘ঈম (রা.) হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল ﷺ বলেন-

আমার পাঁচটি (প্রসিদ্ধ) নাম রয়েছে, আমি মুহাম্মাদ, আমি আহমাদ, আমি আল-মাহী আমার দ্বারা আল্লাহ কুফর ও শির্ককে নিশ্চিহ্ন করে দিবেন। আমি আল-হাশির আমার চারপাশে মানব জাতিকে একত্রিত করা হবে। আমি আল-আক্বিব (সর্বশেষে আগমনকারী)।

সহিহ বুখারি : ৩৫৩২, সহিহ মুসলিম : ২৩৫৪। হাদিসটি সহিহ বুখারি থেকে সংকলন করা হয়েছে।

হাদিস নম্বর-০৪ :: রাসুলুল্লাহ এর সুন্দর নামসমূহঅ

أَبُو الْيَمَانِ أَخْبَرَنَا شُعَيْبٌ عَنْ الزُّهْرِيِّ قَالَ أَخْبَرَنِيْ مُحَمَّدُ بْنُ جُبَيْرِ بْنِ مُطْعِمٍ عَنْ أَبِيْهِ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ سَمِعْتُ رَسُوْلَ اللهِ  صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَيَقُوْلُ إِنَّ لِيْ أَسْمَاءً أَنَا مُحَمَّدٌ وَأَنَا أَحْمَدُ وَأَنَا الْمَاحِي الَّذِيْ يَمْحُو اللهُ بِيَ الْكُفْرَ وَأَنَا الْحَاشِرُ الَّذِيْ يُحْشَرُ النَّاسُ عَلَى قَدَمِيْ وَأَنَا الْعَاقِبُ.

যুবায়র ইবনু মুত’ইম (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি যে, আমার অনেকগুলো নাম আছে। আমি মুহাম্মাদ, আমি আহমাদ এবং আমি মাহী। আমার দ্বারা আল্লাহ্ তা’আলা সমস্ত কুফরী দূর করবেন। আমি হাশির, আমার পেছনে সমস্ত মানুষকে একত্রিত করা হবে এবং আমি ’আকিব, সকলের শেষে আগমনকারী।

সহিহ বুখারি : ৪৮৯৬; সহিহ মুসলিম : ৬২৫২: মুসনাদে আহমাদ : ১৬৫৮০; মুসনাদে বাযযার : ৩৪১৩; তাবারানী : ১৫০৪; ইবনে হিব্বান : ৬৩১৩। হাদিসটি সহিহ বুখারি থেকে সংকলন করা হয়েছে।

হাদিস নম্বর-০৫ :: রাসুলুল্লাহ ইবরাহিম (আ.) এর দুআ, ঈসা (আঃ) এর সুসংবাদ, এবং তার মায়ের দেখা স্বপ্ন।

وَعَن العِرْباض بن ساريةَ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنَّهُ قَالَ: إِنِّي عِنْدَ اللَّهِ مَكْتُوبٌ: خَاتَمُ النَّبِيِّينَ وَإِنَّ آدَمَ لِمُنْجَدِلٌ فِي طِينَتِهِ وَسَأُخْبِرُكُمْ بِأَوَّلِ أَمْرِي دَعْوَةُ إِبْرَاهِيمَ وَبِشَارَةُ عِيسَى وَرُؤْيَا أُمِّي الَّتِي رَأَتْ حِينَ وَضَعَتْنِي وَقَدْ خَرَجَ لَهَا نُورٌ أَضَاءَ لَهَا مِنْهُ قُصُورُ الشَّامِ

অনুবাদ : ইরবাজ ইবনু সারিয়াহ (রা.) রাসূলুল্লাহ (সা.) হতে বর্ণনা করেন। তিনি (সা.) বলেছেন: আল্লাহ তা’আলার কাছে আমি তখনো ’খাতামুন্‌ নাবিয়্যিন’ হিসেবে লিপিবদ্ধ ছিলাম যখন আদম আলায়হিস সালাম ছিলেন মাটির খামিরায়। আমি তোমাদেরকে আরো বলছি যে, আমার নুবুওয়াতের প্রথম প্রকাশ হলো ইবরাহীম আলায়হিস সালাম -এর দু’আ এবং ঈসা আলায়হিস সালাম -এর ভবিষ্যদ্বাণী আর আমার মায়ের সরাসরি স্বপ্ন, যা তিনি আমাকে প্রসবকালে দেখেছিলেন যে, তাঁর সামনে একটি আলো উদ্ভাসিত হয়েছে, যার আলোতে তিনি সিরিয়ার রাজ প্রাসাদ পর্যন্ত দেখতে পান।

মিশকাত : ৫৭৫৯, মুসনাদ আহমাদ : ১৭১৯১, সিলসিলাতুস সহিহাহ : ৩৭৩, মুসান্নাফ আবদুর রাযযাক : ৯৭১৮, সহিহ ইবনু হিব্বান : ৬৪০৪, সুানানে দারিমী : ১৩, তবারানী : ১৫০৩৪। হাদিসের মান সহিহ। হাদিসটি মিশকাত থেকে সংকলন করা হয়েছে।

হাদিস নম্বর-০৬ :: রাসুলুল্লাহ এর জম্মের সময় সিরিয়ার রাজপ্রাসাদগুলোকে আলোকিত

حَدَّثَنَا يَحْيَى بْنُ بُكَيْرٍ، قَالَ: حَدَّثَنَا اللَّيْثُ بْنُ سَعْدٍ، عَنْ عُقَيْلٍ، عَنِ ابْنِ شِهَابٍ، عَنْ عُرْوَةَ بْنِ الزُّبَيْرِ، عَنْ أُمِّ سَلَمَةَ، قَالَتْ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: “رَأَتْ أُمِّي حِينَ وَضَعَتْنِي نُورًا خَرَجَ مِنْهَا أَضَاءَتْ لَهُ قُصُورُ الشَّامِ.”​

অনুবাদ : উম্মে সালামা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

“আমার মা যখন আমাকে জন্ম দিলেন, তখন তিনি এক নূর দেখতে পেলেন, যা সিরিয়ার রাজপ্রাসাদগুলোকে আলোকিত করেছিল।” মুসনাদ আহমাদ : ১৭৫৫০; সহিহ লিগাইরিহি

হাদিস নম্বর-০৭ :: রাসূলুল্লাহ মক্কায় জম্ম গ্রহন করেন ও মদিনায হিজরত করেন।

 ইবনু আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমা হতে বর্ণিত-

তিনি কা’ব আল আহবারকে জিজ্ঞেস করেছিলেন: তুমি তাওরাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর গুণাবলী কেমন পেয়েছ? কাব রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আমরা তাওরাতে পেয়েছি যে, মুহাম্মদ ইবনু আব্দুল্লাহ ﷺ মক্কায় জন্ম গ্রহণ করবেন, ত্ববাহ বা মদীনায় হিজরত করবেন, আর তাঁর রাজ্য শাম পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। আর অশ্লীলতার সাথে তাঁর কোন সম্পর্ক থাকবে না, তিনি হাটে-বাজারে শোরগোলকারীও হবেন না, তিনি মন্দ আচরণের প্রতিদানে মন্দ আচরণ করবেন না, বরং তিনি ক্ষমা ও মার্জনা করবেন। আর তাঁর উম্মত মহান আল্লাহ’র অধিক হামদ বর্ণনাকারী, তারা সুখে-দুঃখে সর্বাবস্থায় আল্লাহ’র প্রশংসা করবে, তারা অঙ্গসমূহ (ধুয়ে) ওযু করবে এবং প্রত্যেক উঁচু ভূমিতে (আরোহণ কালে) তাকবীর উচ্চারণ করবে। তারা ’ইযার’ বা তহবন্দ (এর নিম্নাংশ) পরিধান করবে তাদের (পায়ের গোছার) মাঝ বরাবর। তারা যেভাবে যুদ্ধে সারিবদ্ধ হবে, তারা তাদের সালাতেও তদ্রূপ সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়াবে। তাদের মসজিদসমূহে তাদের (তিলাওয়াত ও যিকিরের) আওয়াজ হবে মৌমাছির গুণগুণ আওয়াজের মত। আর তাদের আহ্বানকারীর আহ্বান (মুয়াযযিনের আযান) দূর আকাশে শোনা যাবে।

সুনানে আদ দারিমী : ০৮, ইবনু হিব্বান (রহ.) এ হাদীসের বর্ণনাকারী সম্পর্কে তার ‘আস সিক্বাত’ গ্রন্থে ইবনু আব্বাস থেকে তার যে বর্ণনা উল্লেখ করেছেন তা সঠিক হলে এর সনদ সহিহ।

রাসূলুল্লাহ ﷺপিতামাতা ও বংশ পরিচিতি

রাসূলুল্লাহ  পিতামাতা ও বংশ পরিচিতি

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

হাদিস নম্বর-০১ :: রাসূলুল্লাহ  কুরাইশ গোত্রে জম্ম গ্রহণ করেন।

 حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ مِهْرَانَ الرَّازِيُّ، وَمُحَمَّدُ بْنُ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ سَهْمٍ، جَمِيعًا عَنِ الْوَلِيدِ، – قَالَ ابْنُ مِهْرَانَ حَدَّثَنَا الْوَلِيدُ بْنُ مُسْلِمٍ، – حَدَّثَنَا الأَوْزَاعِيُّ، عَنْ أَبِي عَمَّارٍ، شَدَّادٍ أَنَّهُ سَمِعَ وَاثِلَةَ بْنَ الأَسْقَعِ، يَقُولُ سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ ‏ “‏ إِنَّ اللَّهَ اصْطَفَى كِنَانَةَ مِنْ وَلَدِ إِسْمَاعِيلَ وَاصْطَفَى قُرَيْشًا مِنْ كِنَانَةَ وَاصْطَفَى مِنْ قُرَيْشٍ بَنِي هَاشِمٍ وَاصْطَفَانِي مِنْ بَنِي هَاشِمٍ ‏”‏ 

অনুবাদ : আবু আম্মার শাদ্দাদ (রহ.) থেকে বর্ণিত, তিনি ওয়াসিলা ইবনুল আসকা (রা.) কে বলতে শুনেছেন, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ কে বলতে শুনেছি-

আল্লাহ তাআলা ইসমাঈল (আঃ) এর সন্তানদের মধ্য থেকে কিনানা গোত্রকে নির্বাচন করেছেন, কিনানা গোত্র থেকে কুরাইশ গোত্রকে নির্বাচন করেছেন, কুরাইশ গোত্র থেকে বনি হাশিমকে নির্বাচন করেছেন এবং বনি হাশিম থেকে আমাকে নির্বাচন করেছেন।

সহিহ মুসলিম : ২২৭৬, সহিহ বুখারি : ৩৩৫৭, সহিহ ইবনু হিব্বান : ৬২৪২, আবূ ইয়ালা : ৭৪৮৫, সিলসিলাতুস সহিহাহ : ৩০২। । হাদিসটি সহিহ মুসলিম থেকে সংকলন করা হয়েছে।

হাদিস নম্বর-০২ :: রাসূলুল্লাহ  কুরাইশ গোত্রে জম্ম গ্রহণ করেন।

حَدَّثَنَا عَلِيُّ بْنُ عَبْدِ اللهِ حَدَّثَنَا سُفْيَانُ حَدَّثَنَا عَمْرٌو حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ جُبَيْرِ بْنِ مُطْعِمٍ عَنْ أَبِيهِ كُنْتُ أَطْلُبُ بَعِيرًا لِي ح وحَدَّثَنَا مُسَدَّدٌ حَدَّثَنَا سُفْيَانُ عَنْ عَمْرٍو سَمِعَ مُحَمَّدَ بْنَ جُبَيْرٍ عَنْ أَبِيهِ جُبَيْرِ بْنِ مُطْعِمٍ قَالَ أَضْلَلْتُ بَعِيرًا لِي فَذَهَبْتُ أَطْلُبُهُ يَوْمَ عَرَفَةَ فَرَأَيْتُ النَّبِيَّ  صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَوَاقِفًا بِعَرَفَةَ فَقُلْتُ هَذَا وَاللهِ مِنْ الْحُمْسِ فَمَا شَأْنُهُ هَا هُنَا

অনুবাদ : জুবাইর ইবনু মুতয়িম (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আমার একটি উট হারিয়ে ‘আরাফার দিনে তা তালাশ করতে লাগলাম। তখন আমি রসুলুল্লাহ ﷺকে ‘আরাফায় উকূফ করতে দেখলাম এবং বললাম, আল্লাহর কসম! তিনি তো কুরায়শ বংশীয়। এখানে তিনি কী করছেন?

সহিহ বুখারি : ১৬৬৪, সহিহ মুসলিম : ১২২০

হাদিস নম্বর-০৩ :: কুরাইশগন নিজের হুমস বা কঠোর ধার্মিক বলে পরিচয় দিত

حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ عَبْدِ الأَعْلَى الصَّنْعَانِيُّ الْبَصْرِيُّ، حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ عَبْدِ الرَّحْمَنِ الطُّفَاوِيُّ، حَدَّثَنَا هِشَامُ بْنُ عُرْوَةَ، عَنْ أَبِيهِ، عَنْ عَائِشَةَ، قَالَتْ كَانَتْ قُرَيْشٌ وَمَنْ كَانَ عَلَى دِينِهَا وَهُمُ الْحُمْسُ يَقِفُونَ بِالْمُزْدَلِفَةِ يَقُولُونَ نَحْنُ قَطِينُ اللَّهِ ‏.‏ وَكَانَ مَنْ سِوَاهُمْ يَقِفُونَ بِعَرَفَةَ فَأَنْزَلَ اللَّهُ تَعَالَى ‏:‏ ‏(‏ثُمَّ أَفِيضُوا مِنْ حَيْثُ أَفَاضَ النَّاسُ

অনুবাদ : আয়িশা (রা.) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, কুরাইশ এবং তাদের ধর্মের যারা অনুসারী ছিল তাদেরকে হুমস বলা হত। তারা মুযদালফায় অবস্থান করত এবং বলত, আমরা আল্লাহর ঘরের অধিবাসী। তারা ব্যতীত অন্য লোকেরা আরাফাতে অবস্থান করত। আল্লাহ তাআলা এই বিষয়ে আয়াত অবতীর্ণ করেন-

ثُمَّ اَفِیۡضُوۡا مِنۡ حَیۡثُ اَفَاضَ النَّاسُ وَاسۡتَغۡفِرُوا اللّٰہَ ؕ اِنَّ اللّٰہَ غَفُوۡرٌ رَّحِیۡمٌ

অতঃপর তোমরা প্রত্যাবর্তন কর, যেখান থেকে মানুষেরা প্রত্যাবর্তন করে এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাও। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। সূরা বাকারা-১৯৯।

সুনানে তিরমিজি : ৮৮৪, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৩০১৮, ইবনে হিসাম খন্ড-১,পৃ-৫৭। হাদিসের মান সহিহ। হাদিসটি সুনানে তিরমিজি থেকে সংকলন করা হয়েছে। হুমস শব্দের অর্থ কঠোর ধার্মিক। কুরায়েশরা মূর্তিপূজা করত। সেই সাথে নিজেদেরকে ইবরাহীম (আঃ)-এর একান্ত অনুসারীর পাশাপাশি নিজেদের হুমস বলে দাবি করত।

হাদিস নম্বর-০৪ : রাসূলুল্লাহ তার জন্য নির্ধারিত যুগে আগমন করেন।

حَدَّثَنَا قُتَيْبَةُ بْنُ سَعِيْدٍ حَدَّثَنَا يَعْقُوْبُ بْنُ عَبْدِ الرَّحْمَنِ عَنْ عَمْرٍو عَنْ سَعِيْدٍ الْمَقْبُرِيِّ عَنْ أَبِيْ هُرَيْرَةَ أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ بُعِثْتُ مِنْ خَيْرِ قُرُونِ بَنِيْ آدَمَ قَرْنًا فَقَرْنًا حَتَّى كُنْتُ مِنْ الْقَرْنِ الَّذِيْ كُنْتُ فِيْهِ

অনুবাদ : আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-

“আমি বনি আদমের সর্বশ্রেষ্ঠ যুগ থেকে যুগে প্রেরিত হয়েছি (بُعِثْتُ)। এক যুগ থেকে আরেক যুগ অতিবাহিত হয়ে আমি সেই যুগেই এসেছি যে যুগ আমার জন্য নির্দিষ্ট ছিল।

সহিহ বুখারি : ৩৫৫৭, মিশকাত : ৫৭৩৯, মুসনাদে আহমাদ : ৮৮৪৪, শুআবুল ঈমান : ১৩৯২, আবু সিলসিলাতুস সহিহাহ : ৮০৯। হাদিসটি সহিহ বুখারি থেকে সংকলন করা হয়েছে।

রাসূলুল্লাহ এর পিতামাতার বর্ননা :

সহিহ হাদিসের মধ্যে এমন কোনো নির্দিষ্ট হাদিস পাওয়া কঠিন, যেখানে উভয়ের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। অধিকাংশ তথ্য সিরাহ ও ইতিহাসের গ্রন্থে পাওয়া যায়। সিরাহ ও ইতিহাস গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে রাসূল ﷺ-এর জন্মের আগেই তার পিতা মৃত্যুবরণ করেন এবং ছয় বছর বয়সে মারা যান।

ইবন ইসহাক (মৃত্যু: ১৫১ হিজরি) তার সিরাতু রাসূলিল্লাহ গ্রন্থে বলেন-

عَبْدُ اللَّهِ بْنُ عَبْدِ الْمُطَّلِبِ مَاتَ فِي مَدِينَةِ يَثْرِبَ وَهُوَ فِي طَرِيقِهِ إِلَى سُورِيَا، وَذَلِكَ قَبْلَ وِلَادَةِ رَسُولِ اللَّهِ  صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَوَقَدْ أُصِيبَ بِالْمَرَضِ هُنَاكَ

অনুবাদ : আবদুল্লাহ ইবনে আবদুল মুত্তালিব রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর জন্মের আগে সিরিয়া যাওয়ার পথে ইয়াসরিব (মদিনা) শহরে অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং সেখানেই মারা যান।

ইবন ইসহাক, সীরাতে ইবনে হিশাম, প্রথম খণ্ড, পৃ. ১৫৬, আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃ. ২৬০

ইবন কাসির (মৃত্যু: ৭৭৪ হিজরি)  “আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া” গ্রন্থে উল্লেখ করেন-

أَمِينَةُ أَخَذَتِ النَّبِيَّ ﷺ إِلَى الْمَدِينَةِ لِزِيَارَةِ أَقَارِبِهِ مِنْ جَانِبِ أَخْوَالِهِ، ثُمَّ فِي طَرِيقِ رُجُوعِهَا إِلَى مَكَّةَ تُوُفِّيَتْ فِي مَكَانٍ يُسَمَّى ٱلْأَبْوَاءَ، وَكَانَ عُمْرُ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ سِتَّ سِنِينَ۔

অনুবাদ : আমিনা রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে নিয়ে মদিনায় গিয়েছিলেন তাঁর নানা আত্মীয়দের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে। পরে মক্কায় ফেরার পথে আবওয়া নামক স্থানে তিনি মৃত্যুবরণ করেন, তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর বয়স ছিল ছয় বছর।

আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ইবন কাসির, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ২৬০, সিরাতু ইবন ইসহাক, ইবন হিশাম, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১৬৭, তাবাকাত আল-কুবরা, ইবন সা’দ, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৯৯

হাদিস নম্বর-০৫ : রাসূলুল্লাহ এর পিতার পরকালীন অবস্থান

حَدَّثَنَا أَبُو بَكْرِ بْنُ أَبِي شَيْبَةَ، حَدَّثَنَا عَفَّانُ، حَدَّثَنَا حَمَّادُ بْنُ سَلَمَةَ، عَنْ ثَابِتٍ، عَنْ أَنَسٍ، أَنَّ رَجُلاً، قَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَيْنَ أَبِي قَالَ ‏”‏ فِي النَّارِ ‏”‏ ‏.‏ فَلَمَّا قَفَّى دَعَاهُ فَقَالَ ‏”‏ إِنَّ أَبِي وَأَبَاكَ فِي النَّارِ ‏”

অনুবাদ : আনাস (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। জনৈক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ ﷺ কে জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রাসূল! আমার পিতা কোথায় আছেন (জান্নাতে না জাহান্নামে)? রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, জাহান্নামে। বর্ণনাকারী বলেন, লোকটি যখন চলে যেতে লাগল, তিনি ডাকলেন এবং বললেন, আমার পিতা এবং তোমার পিতা জাহান্নামে।

সহিহ মুসলিম : ২০৩, এই হাদিস থেকে বোঝা যায় যে, রাসূল ﷺ এর পিতা আবদুল্লাহ ইসলাম গ্রহণের আগেই মৃত্যুবরণ করেন।

হাদিস নম্বর-০৬ :: রসূলুল্লাহ এর পিতামাতার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা নিষিদ্ধ ছিল।

حَدَّثَنَا يَحْيَى بْنُ أَيُّوبَ، وَمُحَمَّدُ بْنُ عَبَّادٍ، – وَاللَّفْظُ لِيَحْيَى – قَالاَ حَدَّثَنَا مَرْوَانُ، بْنُ مُعَاوِيَةَ عَنْ يَزِيدَ، – يَعْنِي ابْنَ كَيْسَانَ – عَنْ أَبِي حَازِمٍ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ  صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ‏ “‏ اسْتَأْذَنْتُ رَبِّي أَنْ أَسْتَغْفِرَ لأُمِّي فَلَمْ يَأْذَنْ لِي وَاسْتَأْذَنْتُهُ أَنْ أَزُورَ قَبْرَهَا فَأَذِنَ لِي ‏”‏

অনুবাদ : আবূ হুরায়রাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন- আমি আমার প্রভুর নিকট আমার মায়ের জন্য ইস্তিগফার (ক্ষমা প্রার্থনা) করার অনুমতি চাইলে আমার প্রভু আমাকে অনুমতি দান করেননি। আর তার কবর যিয়ারাত করার অনুমতি চাইলে তিনি আমাকে অনুমতি দিলেন। সহিহ মুসলিম : ৯৭৬. মসনাদে আহমাদ : ৯৩৯৫ ইরওয়াহ : ৭৭২। হাদিসটি সহিহ মুসলিম থেকে সংকলন করা হয়েছে।

হাদিস নম্বর-০৭ :: রসূলুল্লাহ -এর মা-বাবার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা নিষিদ্ধ ছিল।

حَدَّثَنَا أَبُو بَكْرِ بْنُ أَبِي شَيْبَةَ حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ عُبَيْدٍ حَدَّثَنَا يَزِيدُ بْنُ كَيْسَانَ عَنْ أَبِي حَازِمٍ عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ زَارَ النَّبِيُّ  صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَقَبْرَ أُمِّهِ فَبَكَى وَأَبْكَى مَنْ حَوْلَهُ فَقَالَ اسْتَأْذَنْتُ رَبِّي فِي أَنْ أَسْتَغْفِرَ لَهَا فَلَمْ يَأْذَنْ لِي وَاسْتَأْذَنْتُ رَبِّي فِي أَنْ أَزُورَ قَبْرَهَا فَأَذِنَ لِي فَزُورُوا الْقُبُورَ فَإِنَّهَا تُذَكِّرُكُمْ الْمَ

অনুবাদ : আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর মায়ের কবর যিয়ারত করেন। তিনি কান্নাকাটি করেন এবং তাঁর সাথের লোকেদেরও কাঁদান। অতঃপর তিনি বলেন, আমি আমার রবের নিকট তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনার অনুমতি চাইলে তিনি আমাকে অনুমতি দেননি। আমি আমার রবের নিকট তার কবর যিয়ারতের অনুমতি চাইলে তিনি আমাকে অনুমতি দেন। অতএব তোমরা কবর যিয়ারত করো। কেননা তা তোমাদের মৃত্যু স্মরণ করিয়ে দেয়। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৫৭২, সুনানে নাসায়ি : ২০৩৪, সুনানে আবূ দাউদ : ৩২৩৪। হাদিসটি সুনানে ইবনে মাজাহ থেকে সংকলন করা হয়েছে।

নোট : রাসূল ﷺ এর পিতা আবদুল্লাহ রাসূল ﷺ-এর জন্মের আগেই ইন্তেকাল করেন। তিনি ইসলাম গ্রহণের সুযোগ পাননি এবং ইসলামের আকিদা অনুযায়ী, কুফর অবস্থায় মৃত্যু হলে জান্নাতে প্রবেশ করা সম্ভব নয়। রাসূল ﷺ এর জন্য তাঁর মা-বাবার জন্য দোয়া করা নিষিদ্ধ ছিল। এটি একটি স্পর্শকাতর বিষয়, তাই ইসলামি বিশ্বাসের আলোকে একে গ্রহণ করা জরুরি। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।

রাসূলুল্লাহ ﷺ প্রেরিত হওয়ার পূর্বে লোকেরা যে অজ্ঞতা ও বিভ্রান্তির মধ্যে নিমজ্জিত ছিল

হাদিস নম্বর-০৮ : রাসূলুল্লাহ জম্মের সময় মক্কার বাসি বিভিন্ন দেবদেবীর পুজা করত।

الْحُمَيْدِيُّ حَدَّثَنَا سُفْيَانُ عَنْ ابْنِ أَبِيْ نَجِيْحٍ عَنْ مُجَاهِدٍ عَنْ أَبِيْ مَعْمَرٍ عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ مَسْعُوْدٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ دَخَلَ النَّبِيُّ  صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَمَكَّةَ وَحَوْلَ الْبَيْتِ سِتُّوْنَ وَثَلَاثُ مِائَةِ نُصُبٍ فَجَعَلَ يَطْعُنُهَا بِعُوْدٍ فِيْ يَدِهِ وَيَقُوْلُ (جَاءَ الْحَقُّ وَزَهَقَ الْبَاطِلُ إِنَّ الْبَاطِلَ كَانَ زَهُوْقًا) جَاءَ الْحَقُّ وَمَا يُبْدِئُ الْبَاطِلُ وَمَا يُعِيْدُ.

অনুবাদ : আবদুল্লাহ্ ইবনু মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত-

রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মক্কা্য় (মক্কা বিজয়ের দিন) প্রবেশ করলেন, তখন কা’বা ঘরের চারপাশে তিনশ ষাটটি মূর্তি ছিল। তখন তিনি তাঁর হাতের ছড়ি দিয়ে এগুলোকে ঠোকা দিতে লাগলেন এবং বলতে থাকলেন-

وَقُلۡ جَآءَ الۡحَقُّ وَزَہَقَ الۡبَاطِلُ ؕ اِنَّ الۡبَاطِلَ کَانَ زَہُوۡقًا

আর বল, ‘হক এসেছে এবং বাতিল বিলুপ্ত হয়েছে। নিশ্চয় বাতিল বিলুপ্ত হওয়ারই ছিল’। (সূরা ইসরাঈল-৮১)।

সহিহ বুখারি : ৪৭২০, সহহি বুখারির এই হাদিস প্রমান করে এর জম্মের প্রাককালে মক্বাম মানুষ মূর্তি পূজক বা মুশরিক ছিল।

হাদিস নম্বর-০৯ : রাসূলুল্লাহ জম্মের সময় মক্কার মানত করত।

حَدَّثَنَا أَبُوْ الْيَمَانِ أَخْبَرَنَا شُعَيْبٌ عَنْ الزُّهْرِيِّ قَالَ سَمِعْتُ سَعِيْدَ بْنَ الْمُسَيَّبِ قَالَ الْبَحِيْرَةُ الَّتِيْ يُمْنَعُ دَرُّهَا لِلطَّوَاغِيْتِ وَلَا يَحْلُبُهَا أَحَدٌ مِنْ النَّاسِ وَالسَّائِبَةُ الَّتِيْ كَانُوْا يُسَيِّبُوْنَهَا ِلآلِهَتِهِمْ فَلَا يُحْمَلُ عَلَيْهَا شَيْءٌ قَالَ وَقَالَ أَبُوْ هُرَيْرَةَ قَالَ النَّبِيُّ  صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَرَأَيْتُ عَمْرَو بْنَ عَامِرِ بْنِ لُحَيٍّ الْخُزَاعِيَّ يَجُرُّ قُصْبَهُ فِي النَّارِ وَكَانَ أَوَّلَ مَنْ سَيَّبَ السَّوَائِبَ

অনুবাদ : যুহরী (রহ.) বলেন। আমি সা‘ঈদ ইবনু মুসাইয়্যাব (রহ.)-কে বলতে শুনেছি। তিনি বলেন, বাহীরাহ বলে দেবতার নামে উৎসর্গ করা উটনী যার দুধ আটকিয়ে রাখা হত এবং কোন লোক তার দুধ দোহন করত না। সা-য়িবাহ বলে ঐ পশুকে যাকে তারা ছেড়ে দিত দেবতার নামে। তাকে বোঝা বহন ইত্যাদি কোন কাজ কর্মে ব্যবহার করা হয় না। রাবী বলেন, আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) বলেছেন, রসুলুল্লাহ ﷺ বলেন, আমি আমর ইবনু ‘আমির খুয‘আহকে তার বহির্গত নাড়ি-ভুঁড়ি নিয়ে জাহান্নামের আগুনে চলাফেলা করতে দেখেছি। সেই প্রথম ব্যক্তি যে সায়্যিবাহ উৎসর্গ করার প্রথা প্রচলন করে।

সহিহ বুখারি : ৩৫২১, সহিহ মুসলিম : ২৮৫৬, আহমাদ ৭৭১৪। হাদিসটি সহিহ বুখারি থেকে সংকলন করা হয়েছে।

হাদিস নম্বর-১০ : রাসূলুল্লাহ জম্মের সময় মক্কার লোকেরা অজ্ঞতা ও বিভ্রান্তির মধ্যে নিমজ্জিত ছিল।

অয়াদ্বীন (রহ.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট এসে বলল, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমরা ছিলাম জাহিলী যুগের লোক এবং আমরা মূর্তিপূজক ছিলাম। আর আমরা আমাদের সন্তানদেরকে হত্যা করতাম। আমার একটি কন্যা ছিল। আমি যখনই তাকে ডাকতাম, তখনই সে আনন্দের সাথে আমার ডাকে সাড়া দিত। একদিন আমি তাকে ডাকলে সে আমার ডাকে সাড়া দিয়ে আমার পিছনে পিছনে চলতে লাগল। আমি চলতে লাগলাম যতক্ষণ না বাড়ির অদূরে একটি কূপের নিকট পৌঁছলাম। অতঃপর আমি তার হাত ধরে তাকে কূপে নিক্ষেপ করলাম। আমার বিশ্বাস, সবশেষে সে বলছিল: হে আব্বা! হে আব্বা। একথা শুনে রাসূলুল্লাহ ﷺ কাঁদতে লাগলেন, এমনকি তাঁর দু’চোখ থেকে অশ্রু প্রবাহিত হতে লাগল। এ কারণে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মজলিসে বসা এক ব্যক্তি সেই লোকটিকে বলল, তুমি রাসূলুল্লাহ ﷺকে দুঃখ দিয়েছো। তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ ঐ ব্যক্তিকে বললেন: ’থাম! কেননা, যা তাকে কষ্ট দিয়েছে, সে তো সে বিষয়েই জিজ্ঞেস করছে। অতঃপর তিনি সেই লোকটিকে বললেন: ’তোমার কথাগুলো আমাকে আবার শোনাও। ফলে সে লোকটি আবার (উল্লিখিত কাহিনীটি) বলতে লাগল। এ কাহিনী শুনে রাসূলুল্লাহ ﷺ (আবারও) কাঁদতে লাগলেন, এমনকি তাঁর দু’চোখ থেকে অশ্রু প্রবাহিত হয়ে তাঁর দাড়ির উপর পড়তে লাগল। অবশেষে তিনি তাকে বললেন, ’নিশ্চয়ই আল্লাহ জাহিলী যুগে কৃত (মন্দ) আমলসমূহ থেকে তাদেরকে অব্যহতি দিয়েছেন (অর্থাৎ সেসব পাপের জন্য তাদেরকে শাস্তি দেয়া হবে না)। অতএব তুমি নতুন করে আমল করা শুরু করো। সুনানে আদ দারিমী : ০২, হাদিসটি ইমাম দারিমী এককভাবে বর্ণনা করেছেন। সনদের রাবীগণ সিকাহ বা নির্ভরযোগ্য। তবে এটি মুরসাল হাদিস।

হাদিস নম্বর-১১ : সুলুল্লাহ  এর পূর্ব পুরুষ ইসমাইল (আ.) এর বিস্তারিত বর্ণনা।

সাঈদ ইবনু জুবাইর (রহ.) হতে বর্ণিত। ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) বলেন, নারী জাতি সর্বপ্রথম কোমরবন্দ বানানো শিখেছে ইসমাঈল (আঃ)-এর মায়ের নিকট থেকে। হাযেরা (আঃ) কোমরবন্দ লাগাতেন সারাহ (আঃ) থেকে নিজের মর্যাদা গোপন রাখার জন্য। অতঃপর ইবরাহীম (আঃ) হাযেরা (আঃ) এবং তাঁর শিশু ছেলে ইসমাঈল (আঃ)-কে সঙ্গে নিয়ে বের হলেন এ অবস্থায় যে, হাযেরা (আঃ) শিশুকে দুধ পান করাতেন। অবশেষে যেখানে কা’বার ঘর অবস্থিত, ইবরাহীম (আঃ) তাঁদের উভয়কে সেখানে নিয়ে এসে মসজিদের উঁচু অংশে যমযম কূপের উপরে অবস্থিত একটি বিরাট গাছের নীচে তাদেরকে রাখলেন। তখন মক্কা্য় না ছিল কোন মানুষ, না ছিল কোনরূপ পানির ব্যবস্থা। পরে তিনি তাদেরকে সেখানেই রেখে গেলেন। আর এছাড়া তিনি তাদের নিকট রেখে গেলেন একটি থলের মধ্যে কিছু খেজুর আর একটি মশকে কিছু পরিমাণ পানি। অতঃপর ইবরাহীম (আঃ) ফিরে চললেন। তখন ইসমাঈল (আঃ)-এর মা পিছু পিছু আসলেন এবং বলতে লাগলেন, হে ইবরাহীম! আপনি কোথায় চলে যাচ্ছেন? আমাদেরকে এমন এক ময়দানে রেখে যাচ্ছেন, যেখানে না আছে কোন সাহায্যকারী আর না আছে কোন ব্যবস্থা। তিনি এ কথা তাকে বারবার বললেন। কিন্তু ইবরাহীম (আঃ) তাঁর দিকে তাকালেন না। তখন হাযেরা (আঃ) তাঁকে বললেন, এর আদেশ কি আপনাকে আল্লাহ দিয়েছেন? তিনি বললেন, হাঁ। হাযেরা (আঃ) বললেন, তাহলে আল্লাহ আমাদেরকে ধ্বংস করবেন না। অতঃপর তিনি ফিরে আসলেন। আর ইবরাহীম (আঃ)-ও সামনে চললেন। চলতে চলতে যখন তিনি গিরিপথের বাঁকে পৌঁছলেন, যেখানে স্ত্রী ও সন্তান তাঁকে আর দেখতে পাচ্ছে না, তখন তিনি কা’বা ঘরের দিকে মুখ করে দাঁড়ালেন। অতঃপর তিনি দু’হাত তুলে এ দু’আ করলেন, আর বললেন, ’’হে আমার প্রতিপালক! আমি আমার পরিবারের কতককে আপনার সম্মানিত ঘরের নিকট এক অনুর্বর উপত্যকায় …… যাতে আপনার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে- (ইবরাহীম ৩৭)। আর ইসমাঈলের মা ইসমাঈলকে স্বীয় স্তন্যের দুধ পান করাতেন এবং নিজে ঐ মশক থেকে পানি পান করতেন। অবশেষে মশকে যা পানি ছিল তা ফুরিয়ে গেল। তিনি নিজে তৃষ্ণার্ত হলেন এবং তাঁর শিশু পুত্রটিও তৃষ্ণায় কাতর হয়ে পড়ল। তিনি শিশুটির দিকে দেখতে লাগলেন। তৃষ্ণায় তার বুক ধড়ফড় করছে অথবা রাবী বলেন, সে মাটিতে পড়ে ছটফট করছে। শিশু পুত্রের এ করুণ অবস্থার প্রতি তাকানো অসহনীয় হয়ে পড়ায় তিনি সরে গেলেন আর তাঁর অবস্থানের নিকটবর্তী পর্বত ’সাফা’-কে একমাত্র তাঁর নিকটতম পর্বত হিসাবে পেলেন। অতঃপর তিনি তার উপর উঠে দাঁড়ালেন এবং ময়দানের দিকে তাকালেন। এদিকে সেদিকে তাকিয়ে দেখলেন, কোথায়ও কাউকে দেখা যায় কিনা? কিন্তু তিনি কাউকে দেখতে পেলেন না। তখন ’সাফা’ পর্বত থেকে নেমে পড়লেন। এমন কি যখন তিনি নিচু ময়দান পর্যন্ত পৌঁছলেন, তখন তিনি তাঁর কামিজের এক প্রান্ত তুলে ধরে একজন ক্লান্ত-শ্রান্ত মানুষের মত ছুটে চললেন। অবশেষে ময়দান অতিক্রম করে ’মারওয়া’ পাহাড়ের নিকট এসে তার উপর উঠে দাঁড়ালেন। অতঃপর এদিকে সেদিকে তাকালেন, কাউকে দেখতে পান কিনা? কিন্তু কাউকেই দেখতে পেলেন না। এমনিভাবে সাতবার দৌড়াদৌড়ি করলেন।

ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) বলেন, রসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, এজন্যই মানুষ এ পর্বতদ্বয়ের মধ্যে সায়ী করে থাকে। অতঃপর তিনি যখন মারওয়া পাহাড়ে উঠলেন, তখন একটি শব্দ শুনতে পেলেন এবং তিনি নিজেকেই নিজে বললেন, একটু অপেক্ষা কর। তিনি মনোযোগ দিয়ে শুনলেন। তখন তিনি বললেন, তুমি তো তোমার শব্দ শুনিয়েছ। যদি তোমার নিকট কোন সাহায্যকারী থাকে। হঠাৎ যেখানে যমযম কূপ অবস্থিত সেখানে তিনি একজন ফেরেশতা দেখতে পেলেন। সেই ফেরেশতা আপন পায়ের গোড়ালি দ্বারা আঘাত করলেন অথবা তিনি বলেছেন, আপন ডানা দ্বারা আঘাত করলেন। ফলে পানি বের হতে লাগল। তখন হাযেরা (আঃ)-এর চারপাশে নিজ হাতে বাঁধ দিয়ে এক হাউজের মত করে দিলেন এবং হাতের কোষভরে তাঁর মশকটিতে পানি ভরতে লাগলেন। তখনো পানি উপচে উঠছিল। ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) বলেন, রসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, ইসমাঈলের মাকে আল্লাহ রহম করুন। যদি তিনি বাঁধ না দিয়ে যমযমকে এভাবে ছেড়ে দিতেন কিংবা বলেছেন, যদি কোষে ভরে পানি মশকে জমা না করতেন, তাহলে যমযম একটি কূপ না হয়ে একটি প্রবহমান ঝর্ণায় পরিণত হতো। রাবী বলেন, অতঃপর হাযেরা (আঃ) পানি পান করলেন, আর শিশু পুত্রকেও দুধ পান করালেন, তখন ফেরেশতা তাঁকে বললেন, আপনি ধ্বংসের কোন আশঙ্কা করবেন না। কেননা এখানেই আল্লাহর ঘর রয়েছে। এ শিশুটি এবং তাঁর পিতা দু’জনে মিলে এখানে ঘর নির্মাণ করবে এবং আল্লাহ তাঁর আপনজনকে কখনও ধ্বংস করেন না। ঐ সময় আল্লাহর ঘরের স্থানটি যমীন থেকে টিলার মত উঁচু ছিল। বন্যা আসার ফলে তার ডানে বামে ভেঙ্গে যাচ্ছিল। অতঃপর হাযেরা (আঃ) এভাবেই দিন যাপন করছিলেন। অবশেষে জুরহুম গোত্রের একদল লোক তাদের কাছ দিয়ে অতিক্রম করছিল। অথবা রাবী বলেন, জুরহুম পরিবারের কিছু লোক কাদা নামক উঁচু ভূমির পথ ধরে এদিকে আসছিল। তারা মক্কা্য় নীচু ভূমিতে অবতরণ করল এবং তারা দেখতে পেল একঝাঁক পাখি চক্রাকারে উড়ছে। তখন তারা বলল, নিশ্চয় এ পাখিগুলো পানির উপর উড়ছে। আমরা এ ময়দানের পথ হয়ে বহুবার অতিক্রম করেছি। কিন্তু এখানে কোন পানি ছিল না। তখন তারা একজন কি দু’জন লোক সেখানে পাঠালো। তারা সেখানে গিয়েই পানি দেখতে পেল। তারা সেখান থেকে ফিরে এসে সকলকে পানির সংবাদ দিল। সংবাদ শুনে সবাই সেদিকে অগ্রসর হল। রাবী বলেন, ইসমাঈল (আঃ)-এর মা পানির নিকট ছিলেন। তারা তাঁকে বলল, আমরা আপনার নিকটবর্তী স্থানে বসবাস করতে চাই। আপনি আমাদেরকে অনুমতি দিবেন কি? তিনি জবাব দিলেন, হ্যাঁ। তবে, এ পানির উপর তোমাদের কোন অধিকার থাকবে না। তারা হ্যাঁ, বলে তাদের মত প্রকাশ করল।

ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) বলেন, রসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, এ ঘটনা ইসমাঈলের মাকে একটি সুযোগ এনে দিল। আর তিনিও মানুষের সাহচর্য চেয়েছিলেন। অতঃপর তারা সেখানে বসতি স্থাপন করল এবং তাদের পরিবার-পরিজনের নিকটও সংবাদ পাঠাল। তারপর তারাও এসে তাদেরও সাথে বসবাস করতে লাগল। পরিশেষে সেখানে তাদেরও কয়েকটি পরিবারের বসতি স্থাপিত হল। আর ইসমাঈলও যৌবনে উপনীত হলেন এবং তাদের থেকে আরবী ভাষা শিখলেন। যৌবনে পৌঁছে তিনি তাদের নিকট অধিক আকর্ষণীয় ও প্রিয়পাত্র হয়ে উঠলেন। অতঃপর যখন তিনি পূর্ণ যৌবন লাভ করলেন, তখন তারা তাঁর সঙ্গে তাদেরই একটি মেয়েকে বিবাহ দিল। এরই মধ্যে ইসমাঈলের মা হাযেরা (আঃ) ইন্তিকাল করেন। ইসমাঈলের বিবাহের পর ইবরাহীম (আঃ) তাঁর পরিত্যক্ত পরিজনের অবস্থা দেখার জন্য এখানে আসলেন। কিন্তু তিনি ইসমাঈলকে পেলেন না। তিনি তাঁর স্ত্রীকে তাঁর সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করলেন। স্ত্রী বলল, তিনি আমাদের জীবিকার খোঁজে বেরিয়ে গেছেন। অতঃপর তিনি পুত্রবধূকে তাদের জীবন যাত্রা এবং অবস্থা সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করলেন। সে বলল, আমরা অতি দূরবস্থায়, অতি টানাটানি ও খুব কষ্টে আছি। সে ইবরাহীম (আঃ)-এর নিকট তাদের দুর্দশার অভিযোগ করল। তিনি বললেন, তোমার স্বামী বাড়ী আসলে, তাকে আমার সালাম জানিয়ে বলবে, সে যেন তার ঘরের দরজার চৌকাঠ বদলিয়ে নেয়। অতঃপর যখন ইসমাঈল বাড়ী আসলেন, তখন তিনি যেন কিছুটা আভাস পেলেন। তখন তিনি তাঁর স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের নিকট কেউ কি এসেছিল? স্ত্রী বলল, হাঁ। এমন এমন আকৃতির একজন বৃদ্ধ লোক এসেছিলেন এবং আমাকে আপনার সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করেছিলেন। আমি তাঁকে আপনার সংবাদ দিলাম। তিনি আমাকে আমাদের জীবন যাত্রা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন, আমি তাঁকে জানালাম, আমরা খুব কষ্ট ও অভাবে আছি। ইসমাঈল (আঃ) জিজ্ঞেস করলেন, তিনি কি তোমাকে কোন নাসীহাত করেছেন? স্ত্রী বলল, হাঁ। তিনি আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন, আমি যেন আপনাকে তাঁর সালাম পৌঁছাই এবং তিনি আরো বলেছেন, আপনি যেন আপনার ঘরের দরজার চৌকাঠ বদলিয়ে ফেলেন। ইসমাঈল (আঃ) বললেন, ইনি আমার পিতা। এ কথা দ্বারা তিনি আমাকে নির্দেশ দিয়ে গেছেন, আমি যেন তোমাকে পৃথক করে দেই। অতএব তুমি তোমার আপন জনদের নিকট চলে যাও। এ কথা বলে, ইসমাঈল (আঃ) তাকে তালাক দিয়ে দিলেন এবং ঐ লোকদের থেকে অন্য একটি মেয়েকে বিবাহ করলেন। অতঃপর ইবরাহীম (আঃ) এদের থেকে দূরে রইলেন, আল্লাহ যতদিন চাইলেন। অতঃপর তিনি আবার এদের দেখতে আসলেন। কিন্তু এবারও তিনি ইসমাঈল (আঃ)-এর দেখা পেলেন না। তিনি পুত্রবধূর নিকট উপস্থিত হলেন এবং তাঁকে ইসমাঈল (আঃ) সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। সে বলল, তিনি আমাদের খাবারের খোঁজে বেরিয়ে গেছেন। ইবরাহীম (আঃ) জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা কেমন আছ? তিনি তাদের জীবন যাপন ও অবস্থা জানতে চাইলেন। তখন সে বলল, আমরা ভাল এবং স্বচ্ছল অবস্থায় আছি। আর সে আল্লাহর প্রশংসাও করল। ইবরাহীম (আঃ) জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের প্রধান খাদ্য কী? সে বলল, গোশ্ত। তিনি আবার জানতে চাইলেন, তোমাদের পানীয় কী? সে বলল, পানি। ইবরাহীম (আঃ) দু’আ করলেন, হে আল্লাহ! তাদের গোশ্ত ও পানিতে বরকত দিন। রসুলুল্লাহ ﷺ বলেন, ঐ সময় তাদের সেখানে খাদ্যশস্য উৎপাদন হতো না। যদি হতো তাহলে ইবরাহীম (আঃ) সে বিষয়েও তাদের জন্য দু’আ করতেন। বর্ণনাকারী বলেন, মক্কা ছাড়া অন্য কোথাও কেউ শুধু গোশ্ত ও পানি দ্বারা জীবন ধারণ করতে পারে না। কেননা, শুধু গোশ্ত ও পানি জীবন যাপনের অনুকূল হতে পারে না।

ইবরাহীম (আঃ) বললেন, যখন তোমার স্বামী ফিরে আসবে, তখন তাঁকে সালাম বলবে, আর তাঁকে আমার পক্ষ থেকে হুকুম করবে যে, সে যেন তার ঘরের দরজার চৌকাঠ ঠিক রাখে। অতঃপর ইসমাঈল (আঃ) যখন ফিরে আসলেন, তখন তিনি বললেন, তোমাদের নিকট কেউ এসেছিলেন কি? সে বলল, হাঁ। একজন সুন্দর চেহারার বৃদ্ধ লোক এসেছিলেন এবং সে তাঁর প্রশংসা করল, তিনি আমাকে আপনার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করেছেন। আমি তাঁকে আপনার সংবাদ জানিয়েছি। অতঃপর তিনি আমার নিকট আমাদের জীবন যাপন সম্পর্কে জানতে চেয়েছেন। আমি তাঁকে জানিয়েছি যে, আমরা ভাল আছি। ইসমাঈল (আঃ) বললেন, তিনি কি তোমাকে আর কোন কিছুর জন্য আদেশ করেছেন? সে বলল, হাঁ। তিনি আপনার প্রতি সালাম জানিয়ে আপনাকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, আপনি যেন আপনার ঘরের চৌকাঠ ঠিক রাখেন। ইসমাঈল (আঃ) বললেন, ইনিই আমার পিতা। আর তুমি হলে আমার ঘরের দরজার চৌকাঠ। এ কথার দ্বারা তিনি আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন, আমি যেন তোমাকে স্ত্রী হিসাবে বহাল রাখি। অতঃপর ইবরাহীম (আঃ) এদের থেকে দূরে রইলেন, যদ্দিন আল্লাহ চাইলেন। অতঃপর তিনি আবার আসলেন। (দেখতে পেলেন) যমযম কূপের নিকটস্থ একটি বিরাট বৃক্ষের নীচে বসে ইসমাঈল (আঃ) তাঁর একটি তীর মেরামত করছেন। যখন তিনি তাঁর পিতাকে দেখতে পেলেন, তিনি দাঁড়িয়ে তাঁর দিকে এগিয়ে গেলেন। অতঃপর একজন বাপ-বেটার সঙ্গে, একজন বেটা-বাপের সঙ্গে সাক্ষাৎ হলে যেমন করে থাকে তাঁরা উভয়ে তাই করলেন। অতঃপর ইবরাহীম (আঃ) বললেন, হে ইসমাঈল! আল্লাহ আমাকে একটি কাজের নির্দেশ দিয়েছেন। ইসমাঈল (আঃ) বললেন, আপনার রব! আপনাকে যা আদেশ করেছেন, তা করুন। ইবরাহীম (&আ) বললেন, তুমি আমার সাহায্য করবে কি? ইসমাঈল (আঃ) বললেন, আমি আপনার সাহায্য করব। ইবরাহীম (আঃ) বললেন, আল্লাহ আমাকে এখানে একটি ঘর বানাতে নির্দেশ দিয়েছেন। এই বলে তিনি উঁচু টিলাটির দিকে ইশারা করলেন যে, এর চারপাশে ঘেরাও দিয়ে। তখনি তাঁরা উভয়ে কা’বা ঘরের দেয়াল তুলতে লেগে গেলেন। ইসমাঈল (আঃ) পাথর আনতেন, আর ইবরাহীম (আঃ) নির্মাণ করতেন। পরিশেষে যখন দেয়াল উঁচু হয়ে গেল, তখন ইসমাঈল (আঃ) (মাকামে ইবরাহীম নামে খ্যাত) পাথরটি আনলেন এবং ইবরাহীম (আঃ)-এর জন্য তা যথাস্থানে রাখলেন। ইবরাহীম (আঃ) তার উপর দাঁড়িয়ে নির্মাণ কাজ করতে লাগলেন। আর ইসমাঈল (আঃ) তাঁকে পাথর যোগান দিতে থাকেন। তখন তারা উভয়ে এ দু’আ করতে থাকলেন, হে আমাদে রব! আমাদের থেকে কবূল করুন। নিশ্চয়ই আপনি সব কিছু শুনেন ও জানেন। তাঁরা উভয়ে আবার কা’বা ঘর তৈরী করতে থাকেন এবং কা’বা ঘরের চারদিকে ঘুরে ঘুরে এ দু’আ করতে থাকেন। ’’হে আমাদের রব! আমাদের থেকে কবূল করে নিন। নিশ্চয়ই আপনি সব কিছু শুনেন ও জানেন। আল-বাকারা-১২৭। সহিহ বুখারি : ৩৩৬৪,  ২৩৬৮। হাদিসটি সহিহ বুখারি থেকে সংকলন করা হয়েছে।

রসুলুল্লাহ ﷺ এর বংশধারা মুহাম্মাদ বিন আব্দুল্লাহ বিন আব্দুল মুত্তালিব (শায়বাহ) বিন হাশিম (‘আমর) বিন আবদে মানাফ (মুগীরাহ) বিন কুসাই (যায়দ) বিন কিলাব বিন মুররাহ বিন কাব লুওয়াই বিন গালিব বিন ফিহর (তাঁর উপাধি ছিল কুরাইশ এবং এ সূত্রেই কুরাইশ বংশের উদ্ভব) বিন মালিক বিন নাযর (ক্বায়স) বিন কিনানাহ বিন খুযায়মাহ বিন মুদরিকাহ (আমির) বিন ইলিয়াস বিন মুযার বিন নিযার বিন মা’আদ্দ বিন আদনান বিন উদাদ বিন হামায়সা’ বিন সালামান বিন ‘আওস বিন বুয বিন ক্বামওয়াল বিন উবাই বিন ‘আউওয়াম বিন নাশিদ বিন হিযা বিন বালদাস বিন ইয়াদলাফ বিন ত্বাবিখ বিন যাহিম বিন নাহিশ বিন মাখী বিন ‘আইয বিন আ’বক্বার বিন উবাইদ বিন আদ-দু’আ বিন হামদান বিন সুনবর বিন ইয়াসরিবী বিন ইয়াহযুন বিন ইয়ালহান বিন আর’আওয়া বিন ‘আইয বিন দীশান বিন ‘আইসার বিন আফনাদ বিন আইহাম বিন মুক্বসির বিন নাহিস বিন যারিহ বিন সুমাই বিন মুযী বিন ‘আওযাহ বিন ‘ইরাম বিন ক্বাইদার বিন ইসামাঈল বিন ইবরাহীম (আঃ)। ইবনু হিশাম, খন্ড-১, পৃ-১-২; আর-রাহীকুল মাখতূম, ছফিউর রহমান মুবারকপুরী (রহ.) (মৃ ২০০৬খৃ:),