তাওহীদ ও শিরক
মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন
তাওহীদ (توحيد) শব্দটি আরবি। যার অর্থ একত্ববাদ। কোনো কিছুকে এক মনে করা, এক ঘোষণা করা বা “একত্ব স্বীকার করা”। ইসলামি পরিভাষায় “আল্লাহ তায়ালা যে সত্তা, তাঁর গুণাবলি, কাজ, অধিকার ও ইবাদতের ক্ষেত্রে তিনি এক ও অনন্য। এ বিশ্বাস করা ও সে অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করা। আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের একত্ববাদের পরিচয়ই হচ্ছে তাওহীদের মূল কথা। ঈমান হচ্ছে একজন মুসলিমের জন্য সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। তাওহীদ বা একত্ববাদ হচ্ছে এই ঈমানের মূল ভিত্তি।
তাওহীদের তিনটি শাখা বা প্রকারভেদ :
তাওহীদকে সহজভাবে বুঝানোর জন্য আলেমগণ এটিকে তিন ভাগে ভাগ করেছেন। যথা-
১. তাওহীদুর রুববিয়াহ বা প্রতিপালকে এককত্ত্ব
২. তাওহীদুর উলুহিয়াহ বা ইবাদতে একমাত্র মালিক
৩. তাওহীদুর আসমা ওয়াস সিফাত বা নির্ধারিত সত্ত্বাবাচক ও গুনবাচক নাম
১. তাওহীদুর রুববিয়াহ বা প্রতিপালক এককত্ত্ব :
আল্লাহকে তার কর্ম সমূহে একক হিসেবে মেনে নেওয়া। আল্লাহই একমাত্র সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা, পরিচালনাকারী ও জীবিকা প্রদানকারী। কেউই তার এই গুণে শরিক নয়। তিনিই আকাশ-জমিন সৃষ্টি করেছেন। তিনিই বৃষ্টি দেন, মৃত্যু ও জীবন দেন।
বান্দা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করবে এবং স্বীকৃতি দেবে যে, এককভাবে আল্লাহ তায়ালাই এ নিখিল বিশ্বের স্রষ্টা, মালিক এবং পালনকর্তা। তিনি সর্বজ্ঞ, সবকিছু পরিবেষ্টন ও নিয়ন্ত্রণকারী। রাজত্ব তাঁরই হাতে। সকল কিছুর উপর পূর্ণ ক্ষমতাবান। তিনিই একে পরিচালনা করতে কারো মুখাপেক্ষী নন। তার সমতুল্য কেউ নেই। তিনি পরিপূর্ণ জ্ঞানের অধিকারী। যিনি পরম দয়ালু ও মেহেরবান।
আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-
اَللّٰہُ خَالِقُ کُلِّ شَیۡءٍ ۫ وَّہُوَ عَلٰی کُلِّ شَیۡءٍ وَّکِیۡلٌ
অর্থ : আল্লাহ সব কিছুর স্রষ্টা এবং তিনি সব কিছুর তত্ত্বাবধায়ক। সুরব যুমার : ৬২
আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-
قُلۡ هُوَ ٱللَّهُ أَحَدٌ (١) ٱللَّهُ ٱلصَّمَدُ (٢) لَمۡ يَلِدۡ وَلَمۡ يُولَدۡ (٣) وَلَمۡ يَكُن لَّهُ ۥ ڪُفُوًا أَحَدٌ (٤)
অর্থ : বলুন, তিনি আল্লাহ, এক, আল্লাহ অমুখাপেক্ষী, তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং কেউ তাকে জন্ম দেয়নি এবং তার সমতুল্য কেউ নেই। সুরা ইখলাস : ১-৪
আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-
ٱللَّهُ لَآ إِلَـٰهَ إِلَّا هُوَ ٱلۡحَىُّ ٱلۡقَيُّومُۚ لَا تَأۡخُذُهُ ۥ سِنَةٌ۬ وَلَا نَوۡمٌ۬ۚ لَّهُ ۥ مَا فِى ٱلسَّمَـٰوَٲتِ وَمَا فِى ٱلۡأَرۡضِۗ مَن ذَا ٱلَّذِى يَشۡفَعُ عِندَهُ ۥۤ إِلَّا بِإِذۡنِهِۦۚ يَعۡلَمُ مَا بَيۡنَ أَيۡدِيهِمۡ وَمَا خَلۡفَهُمۡۖ وَلَا يُحِيطُونَ بِشَىۡءٍ۬ مِّنۡ عِلۡمِهِۦۤ إِلَّا بِمَا شَآءَۚ وَسِعَ كُرۡسِيُّهُ ٱلسَّمَـٰوَٲتِ وَٱلۡأَرۡضَۖ وَلَا يَـُٔودُهُ ۥ حِفۡظُهُمَاۚ وَهُوَ ٱلۡعَلِىُّ ٱلۡعَظِيم
অর্থ : “আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন উপাস্য নেই, তিনি জীবিত, সবকিছুর ধারক। তাঁকে তন্দ্রাও স্পর্শ করতে পারে না এবং নিদ্রাও নয়। আসমান ও জমিনে যা কিছু রয়েছে, সবই তাঁর। কে আছ এমন, যে সুপারিশ করবে তাঁর কাছে তাঁর অনুমতি ছাড়া? দৃষ্টির সামনে কিংবা পিছনে যা কিছু রয়েছে সে সবই তিনি জানেন। তাঁর জ্ঞানসীমা থেকে তারা কোন কিছুকেই পরিবেষ্টিত করতে পারে না, কিন্তু যতটুকু তিনি ইচ্ছা করেন। তাঁর সিংহাসন সমস্ত আসমান ও জমিনকে পরিবেষ্টিত করে আছে। আর সেগুলোকে ধারণ করা তাঁর পক্ষে কঠিন নয়। তিনিই সর্বোচ্চ এবং সর্বাপেক্ষা মহান। সুরা বাকারা : ২৫৫
আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবি ﷺ বলেছেন, আল্লাহ্ তায়ালা ইরশাদ করেন, ’’বানী আদম আমার প্রতি মিথ্যারোপ করেছে; অথচ এরূপ করা তার জন্য সঠিক হয়নি। বানী আদম আমাকে গালি দিয়েছে; অথচ এমন করা তার জন্য উচিত হয়নি। আমার প্রতি মিথ্যারোপ করার অর্থ হচ্ছে এই যে, সে বলে, আল্লাহ্ আমাকে যে রকম প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন, তেমনি তিনি আমাকে দ্বিতীয়বার জীবিত করবেন না। অথচ তাকে আবার জীবিত করা অপেক্ষা প্রথমবার সৃষ্টি করা আমার জন্য সহজ ছিল না। আমাকে তার গালি দেয়ার অর্থ হল, সে বলে, আল্লাহ্ তায়ালা সন্তান গ্রহণ করেছেন; অথচ আমি একক, কারো মুখাপেক্ষী নই। আমি কাউকে জন্ম দেইনি, আমাকেও জন্ম দেয়া হয়নি এবং কেউ আমার সমকক্ষ নয়। সহিহ বুখারি : ৪৯৭৪, সুনানে নাসায়ি : ২০৭৮, সহিহ ইবনে হিব্বান ২৬৭।
২. তাওহীদুর উলুহিয়াহ বা ইবাদতে একমাত্র মালিক :
ইবাদতের ক্ষেত্রে আল্লাহকে একক নির্ধারণ করা। যেমন: সালাত, সাওম, হজ, জাকাত, মান্নত, জিহাদ, দাওয়াত, কুরআন তিলাওয়াত, জিকির, দান সদকা, দুআ, ভয়, আশা, সাহায্য প্রার্থনা, তাওয়াক্কুল, জবেহ ইত্যাদি। যাবতীয় ইবাদত আল্লাহর উদ্দেশ্যে করা কারণ এই উদ্দেশেই সকল নবি (আ:) প্রেরণ করা হইয়াছে এবং কিতাব নাজিল করা হইয়াছে।
সকল মুসলিম তাওহীদুর রুববিয়াহ স্বীকার করে। এমনকি মুশরিকগণও তাওহীদুর রুববিয়াহ স্বীকার করে। কিন্তু তাওহীদুল উলুহিয়াহ কে অধিকাংশ মানুষ অস্বীকার করে তাই আল্লাহ তায়ালা মানুষ জাতির নিকট বহু নবি রাসুল প্রেরণ করছেন। তারা এসে তাওহীদুর উলুহিয়াহ বা শুধু আল্লাহর ইবাদত শিক্ষা দিয়েছেন। অন্যদের উপসনা ত্যাগ করতে বলেছেন।
আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-
وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ قَبْلِكَ مِنْ رَسُولٍ إِلَّا نُوحِي إِلَيْهِ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنَا فَاعْبُدُونِ
অর্থ : আপনার পূর্বে আমি যে রাসুল পাঠিয়েছি তাঁকে এ প্রত্যাদেশই প্রেরণ করেছি যে, আমি ব্যতীত অন্য কোন উপাস্য নেই। সুতরাং একমাত্র আমারই ইবাদত কর। সুরা আম্বিয়া : ২৫
আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-
وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَسُولًا أَنِ اُعْبُدُوا اللَّهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُوتَ
অর্থ : আমি প্রত্যেক উম্মতের মধ্যেই রাসুল প্রেরণ করেছি এ মর্মে যে তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর এবং তাগুত থেকে দূরে থাক। সুরা নাহল : ৩৬
আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-
وَمَنْ يَدْعُ مَعَ اللَّهِ إِلَهًا آَخَرَ لَا بُرْهَانَ لَهُ بِهِ فَإِنَّمَا حِسَابُهُ عِنْدَ رَبِّهِ إِنَّهُ لَا يُفْلِحُ الْكَافِرُونَ
অর্থ : আর যে কেউ আল্লাহর সাথে অন্য উপাস্যকে ডাকে, তার কাছে যার কোন সনদ নেই। তার হিসেব তার পালনকর্তার নিকট। নিশ্চয় কাফেররা সফলকাম হবে না। সুরব মুমিনুন : ১১৭
আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-
أُوْلَـٰٓٮِٕكَ ٱلَّذِينَ يَدۡعُونَ يَبۡتَغُونَ إِلَىٰ رَبِّهِمُ ٱلۡوَسِيلَةَ أَيُّہُمۡ أَقۡرَبُ وَيَرۡجُونَ رَحۡمَتَهُ ۥ وَيَخَافُونَ عَذَابَهُ ۥۤۚ إِنَّ عَذَابَ رَبِّكَ كَانَ مَحۡذُورً۬ا
অর্থ : এরা যাদেরকে ডাকে তারা তো নিজেরাই নিজেদের রবের নৈকট্যলাভের উপায় খুঁজে বেড়াচ্ছে যে, কে তাঁর নিকটতর হয়ে যাবে এবং এরা তাঁর রহমতের প্রত্যাশী এবং তাঁর শাস্তির ভয়ে ভীত৷ আসলে তোমার রবের শাস্তি ভয় করার মতো। সুরা ইসরা : ৫৭
অতএব তাওহীদ আল ইবাদাত এর ব্যাপারে এক আল্লাহর অধিকার সংরক্ষণ করা তাওহীদের গুরুত্বপূর্ণ দিক। তিনি একাই ইবাদত পাওয়ার অধিকারী এবং তিনিই মানুষকে ইবাদাতের কল্যাণকর প্রতিদান দেওয়ার অধিকারী।
৩. তাওহীদুর আসমা ওয়াস সিফাত বা নির্ধারিত সত্ত্বাবাচক ও গুনবাচক নাম :
আল্লাহ তাঁর নাম ও গুণসমূহকে ঠিক ঐভাবে বিশ্বাস করা যেভাবে আল্লাহ নিজে এবং তার রাসুলুল্লাহ ﷺ বর্ণনা করেছেন। সেগুলোর কোন পরিবর্তন, অস্বীকৃতি, বিকৃতি, বিলুপ্তি, ধরন, ব্যাখ্যা, তুলনা, উপমা ও গঠন ছাড়াই সাব্যস্ত করা ও মেনে নেওয়া। চাই গুণগুলি আচরণগত হোক বা সত্ত্বাগত হোক। সূত্র: তাফসীরুল উসরিল আখির মিনাল কুরআনুল কারীম
তাওহীদে আসমা ওয়াস সিফাত আল্লাহর মূলসত্বা ও গুণাবলিতে বিশ্বাস করা। আল্লাহকে সেই নামেই ডাকতে হবে যে নাম তিনি নিজের জন্য নির্ধারণ করেছেন। কোন নব উদ্ভাবিত নামে তাঁকে ডাকা যাবে না। আল্লাহর কোন গুণকে মানুষের কোন গুণের সাথে তুলনা করা যাবে না। আল্লাহর সিফাত সম্পর্কে আল কুরআনে বলা হয়েছে-
لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ وَهُوَ السَّمِيعُ البَصِي
অর্থ : কোন বস্তুই তাঁর সদৃশ নয়, তিনি সব শোনেন, সব দেখেন, সুরা শুরা-১১)
যদিও দেখা ও শোনা মানুষের জন্যও প্রযোজ্য। কিন্তু মানুষের দেখার জন্য চোখ, শোনার জন্য কানের প্রয়োজন হয়। কিন্তু আল্লাহর সত্তার জন্য এসব চোখ, কান নাক ইত্যাদির প্রয়োজন হয় না।
আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-
وَلِلَّهِ ٱلۡأَسۡمَآءُ ٱلۡحُسۡنَىٰ فَٱدۡعُوهُ بِہَاۖ وَذَرُواْ ٱلَّذِينَ يُلۡحِدُونَ فِىٓ أَسۡمَـٰٓٮِٕهِۦۚ سَيُجۡزَوۡنَ مَا كَانُواْ يَعۡمَلُونَ
অর্থ : সবচেয়ে সুন্দর নাম সমূহ আল্লাহর অধিকারভুক্ত। সুতরাং সেই নামেই তাঁকে ডাক। যারা তাঁর নামকে অবজ্ঞা করে সে সব লোককে বর্জন কর। তারা যা করে শীঘ্রই তার প্রতিশোধ নেয়া হবে। সুরা আরাফ : ১৮০
আল্লাহর সুন্দর নামসমূহের কিছু উদাহরণ হল: আর রহমান (দয়াবান), আর রহিম (দয়ালু), আস সামী (সর্বদ্রষ্টা), আল বাসির (সর্বশ্রোতা),আল আযিয(পরাক্রমশালী), আল হাকিম (প্রজ্ঞাময়), আল হালিম (সহনশীল), আর আলিম (সর্বজ্ঞ) আল আলীউল কাবির (সর্বোচ্চ), আল হাইউল (চিরঞ্জীব) আল কাইউম
আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহ আনহু বর্ণনা করেন যে, রাসুল ﷺ বলেন-
«إِنَّ لِلَّهِ تِسْعَةً وَتِسْعِينَ اسْمًا مِائَةً إِلَّا وَاحِدًا، مَنْ أَحْصَاهَا دَخَلَ الجَنَّةَ»
অর্থ : আল্লাহর নিরানব্বই নামটি নাম রয়েছে যে ব্যক্তি সেগুলোর যথাযথভাবে আয়ত্ত করতে সক্ষম হবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে’’। সহিহ বুখারি : ২৭৩৬, সহিহ মুসলিম : ২৬৭৭
শিরক (شِرۡکَ)
তাওহীদ সম্পর্কে সামান্য ধারনা পেলাম। তাওহীদের বিপরীত কর্ম হলে শিরক। তাওহীদকে পুরোপুরি বুঝতে হলে শিরকতে বুঝতে হবে। তাই খুবই সংক্ষেপে শিরক ও তার কুফল সম্পর্কে আলোচন করা হবে।
একটি আরবি শব্দ যার অর্থ অংশীদার সাব্যস্ত করা, দুই বা ততোধিক শরিকের সংমিশ্রণ। কাউকে অপরের অংশীদার বানানো। শাব্দিকভাবে এর দ্বারা এক বা একাধিক কোন কিছুকে সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব ও কর্তৃত্বের অংশীদার সাব্যস্ত করাকে বুঝায়।
আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-
اَمۡ لَہُمۡ شِرۡکٌ فِی السَّمٰوٰتِ
অর্থ : অথবা আসমানসমূহে তাদের কোন অংশীদারিত্ব আছে কি? সুরা আহকাব : ৪।
এই আয়াতে মহান আল্লাহর সৃষ্টির কর্তৃত্বে অংশীদার বুঝাতে শিরক শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। আর কখনও দু’জনের মাঝে কোনো বস্তু বণ্টন করা হলে, এক জনকে অন্য জনের শরীক বলা হয়।
আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-
وَاَشۡرِکۡہُ فِیۡۤ اَمۡرِیۡ ۙ
অর্থ : এবং তাকে আমার কাজের অংশী করুন। সুরা ত্বহা : ৩২
এই আয়াতে মুসা (আ.) তার ভাই হারুন আ.) তার নবুয়তের অংশীদার বুঝাতে শিরক শব্দটি ব্যবহার করেছেন।
প্রকৃত পক্ষে, শিরক হলো আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকে উপাস্য হিসেবে নির্ধারিত করা বা তার উপাসনা করা। ইসলামের পরিভাষায় রব ও ইলাহ হিসেবে আল্লাহর সহিত আর কাউকে শরীক সাব্যস্ত করার নামই শিরক। যেমন-
মূর্তি বা দেবতার পূজা করা, তার সামনে মাথানত করা। আল্লাহ ব্যতীত কারো নিকট দুআ করা, ফরিয়াদ করা, সাহায্য তলব করা, আশ্রয় প্রার্থনা করা। আল্লাহ ছাড়া অন্যের নিকট রোগ মুক্তির জন্য, বিপদ থেকে উদ্ধারের জন্য, সন্তান কামনায় জন্য নিবেদন পেশ করা।
শরীয়তের পরিভাষায় শির্ক :
আল্লাহর রুববিয়াহ (প্রতিপালকে) অথবা তার উলুহিয়াহ (ইবাদতে) অথবা আসমা ওয়াস সিফাতে (নির্ধারিত সত্ত্বাবাচক ও গুনবাচক নামে) অংশীদার বা সমকক্ষ নির্ধারণ করাকে শিরক বলে। প্রতিপালন, আইন, বিধান ও ইবাদতের ক্ষেত্রে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব ও একচ্ছত্র অধিকারে কাউকে শরীক করা বা অংশীদার বানানোই হচ্ছে শিরক।
এই সংজ্ঞা এভাবে ও দেয়া যায় যে, ‘‘এমন সব বিশ্বাস, কাজ, কথা ও অভ্যাসকে শির্ক বলা হয় যার দ্বারা বাহ্যত মহান আল্লাহর রুবুবিয়্যাত, উলুহিয়্যাত ও গুণাবলিতে অপর কারো অংশীদারিত্ব বা সমকক্ষতা প্রতীয়মান হয়।“ এক কথায় গাইরুল্লাহকে আল্লাহ তয়ালার রুবূবিয়্যাত, উলূহিয়্যাত ও গুণাবলীর বৈশিষ্ট্যে গায়রুল্লাহকে সমকক্ষ করাকে শির্ক বলা হয়।’ যেমন-
আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-
قَالُواْ وَهُمۡ فِيهَا يَخۡتَصِمُونَ ٩٦ تَٱللَّهِ إِن كُنَّا لَفِي ضَلَٰلٖ مُّبِينٍ ٩٧ إِذۡ نُسَوِّيكُم بِرَبِّ ٱلۡعَٰلَمِينَ ٩٨
অর্থ : সেখানে (জাহান্নামে) পরস্পর ঝগড়া করতে গিয়ে তারা বলবে, আল্লাহর শপথ! আমরাতো স্পষ্ট বিভ্রান্তিতেই ছিলাম। যখন আমরা তোমাদেরকে সকল সৃষ্টির রবের সমকক্ষ বানাতাম’। সুরা শুরা : ৯৬-৯৮
এ আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, মুশরিকরা তাদের পাথর ও কাঠ ইত্যাদির মূর্তিসমূহকে আল্লাহ তায়ালার রুবূবিয়্যাত ও উলূহিয়্যাতের বৈশিষ্ট্যে সমকক্ষ বানিয়ে নেয়ার কারণেই বিভ্রান্তিতে পতিত হয়ে মুশরিক হয়েছিল। শির্ক যখন আল্লাহ তায়ালার রুবূবিয়্যাত, উলূহিয়্যাত ও গুণাবলীর বৈশিষ্ট্যের সাথে সম্পর্কিত।
শিরকের প্রকারভেদ :
উপরে শিরক সম্পর্কে একটা ধারনা পেয়েছি। শিরক এমন গুনাহ যা মুসলিমকে ইসলাম থেকে বাহির করে দেয়। কিন্তু কিছু শিরক এমন আছে যা করা কবিরা গুনাহ হলেও মুসলিমকে ইসলাম থেকে বের করে দেয় না। যেমন- গাইরুল্লাহর জন্য দান করা, লোক দেখান ইবাদাত করা, আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে শপথ করা, আল্লাহ ব্যতীত অন্য কিছুর উদ্দেশ্যে মান্নত করা, ব্যক্তি বা বস্তুরকে কল্যান অকল্যান ভাবা ইত্যাদি। এ থেকে ষ্পষ্ট যে শিরকেরও প্রকারভেদ আছে। সাধারণ শিরক দুই প্রকার। যথা-
ক. শিরকে আকবার বা বড় শিরক।
খ. শিরকে আসগার বা ছোট শিরক।
ক। শিরকে আকবার বা বড় শিরক
বান্দা যখন একমাত্র আল্লাহর অধিকার বা হককে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকে নিবেদন করবে তখন শিরকে আকবর হবে। অর্থাৎ তার রুবুবিয়াতের কোনো অংশ, অথবা তার উলুহিয়াতের কোনো অংশ, অথবা তার নাম ও গুণাবলির কোনো অংশকে তিনি ব্যতীত কাউকে নিবেদন করবে।
আল্লাহকে তার মখলুকের সঙ্গে তুলনা করা, অথবা আল্লাহর সাথে দ্বিতীয় কাউকে সৃষ্টিকর্তা, অথবা রিজিকদাতা, অথবা পরিকল্পনাকারী জ্ঞান করা। শিরকে আকবার যা একজন ঈমানদার মুসলিম কে মুসলিম মিল্লাত থেকে বহিষ্কার করে দেয়। বান্দার সমস্ত আমল নষ্ট করে দেয়। এ ধরনের শিরকে লিপ্ত ব্যক্তি যদি তওবা ছাড়া শিরকের উপরই মৃত্যুবরণ করে, তাহলে সে চিরস্থায়ী ভাবে জাহান্নামে অবস্থান করবে। যেমন-
আল্লাহ ব্যতীত কারো নিকট দুআ করা, ফরিয়াদ করা, সাহায্য তলব করা, আশ্রয় প্রার্থনা করা, হোক সে নবি, অথবা অলি, অথবা ফেরেশতা অথবা জিন, অথবা অন্য কোনো মখলুক। দেবদেবী বা মূর্তি পূজা করা, কবর-মাজারে সিজদা করা, গায়রুল্লাহ তথা আল্লাহ ছাড়া যে কোন ব্যক্তি, প্রাণী বা বস্তুর উদ্দেশ্যে কোন ইবাদত আদায় করা, গায়রুল্লাহর উদ্দেশে কুরবানি করা, মৃত ব্যক্তি কিংবা জ্বিন অথবা শয়তান বা ফিরিশতাগণ কারো ক্ষতি বা উপকার করতে বলে বিশ্বাস করে তাদের নিকট সাহায্য চাওয়া। আল্লাহ ছাড়া কেউ প্রয়োজন ও চাহিদা পূর্ণ করতে পারে, সুস্থ বা অসুস্থ করতে পারে, বিপদ আপদ দূর করতে পারে বলে বিশ্বাস করা তাদের নিকট সাহায্য চাওয়া। বিশ্বাস করা যে, আল্লাহর সাথে কোনো সত্তা আছে যে সৃষ্টি করে, অথবা জীবিত করে, অথবা মৃত্যু দেয়, অথবা মালিকানার হকদার, অথবা এ জগতে কর্তৃত্বের অধিকারী। অথবা এরূপ বিশ্বাস করা যে, অমুক সত্তা আল্লাহর ন্যায় নিঃশর্ত আনুগত্যের হকদার, ফলে সে কোনো বস্তু হালাল ও হারাম করার ক্ষেত্রে তার ইচ্ছার আনুগত্য করে, যদিও তা রাসুলদের আনিত দীনের বিপরীত হয়। আল্লাহ ব্যতীত কারো জন্য জবেহ করা। আল্লাহর বিধানের ন্যায় বিধান রচনা করে মানুষের উপর চাপিয়ে দেওয়া এবং তা মেনে নিতে বাধ্য করা। কাফেরদের পক্ষ নেওয়া ও মুমিনদের বিরুদ্ধে তাদেরকে সাহায্য করা।
ক. শিরকে আকবার বা বড় শিরকের সাধারণত তিনটি মাধ্যমে সংঘটিত হয়। যথা-
১। আকিদা বা বিশ্বাসের মাধ্যমে শিরক
২। ইবাদাতের মাধ্যমে শিরক
৩। সমাজে প্রচলিত ইসলামি বিরোধী কাজের মাধ্যমে শিরক
খ। শিরকে আসগার বা ছোট শিরক
যে সব শিরককে কুরআন ও সুন্নায় ছোট শিরক বলা হয়েছে তাকে শিরকে আসগার বা ছোট শিরক বলে বিবেচনা করব। আল্লাহ তায়ালার উদ্দেশ্যে বাস্তবায়ন কৃত আমল মানুষকে দেখানোর জন্য সুন্দর করার নাম শিরকে আসগার। শিরকে আসগার মানুষকে ইসলাম থেকে বের করে দেয় না। তবে এটি আমলকে নষ্ট করে দেয়। কেননা উক্ত রিয়াকারী মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করাই তার উদ্দেশ্যে পরিণত করেছে। কখনও এমন কাজ বড় শিরকের পর্যায়ে পৌঁছতে পারে।
আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-
فَمَنْ كَانَ يَرْجُوا لِقَاءَ رَبِّهِ فَلْيَعْمَلْ عَمَلاً صَالِحًا وَلاَ يُشْرِكْ بِعِبَادَةِ رَبِّهِ أَحَدًا
অর্থ : সুতরাং যে ব্যক্তি তার পালনকর্তার সাক্ষাৎ কামনা করে, সে যেন সৎকর্ম সম্পাদন করে এবং তার পালনকর্তার এবাদতে কাউকে শরীক না করে। সুরা কাহফ : ১১০
লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে ও প্রসিদ্ধি অর্জনের জন্য কোন আমল করা। লোকে প্রশংসা পাওয়ার জন্য সুন্দর ভাবে সালাত আদায় করা, সদকা করা। লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে সশব্দে যিকির করা, সুকণ্ঠে তেলাওয়াত করা। নিরাপত্তার জন্য পুঁতি, তাবিজ, তাগা ও কড়ি ইত্যাদি ঝুলিয়ে রাখা। গাইরুল্লাহর নামে কসম খাওয়া। কোনো মহান বস্তু বা ব্যক্তিকে অতিরিক্ত সম্মান দেওয়া যা আল্লাহর রুবুবিয়াতের সমান নয়। ব্যক্তি শুধু দুনিয়া অর্জনের জন্যে আজান দেয়, ইমামতি করে, শিক্ষকতা, কুরআন শিখে, শরয়ী জ্ঞান অর্জন করে, জিহাদ, হজ করে। আবার অনেক সময় ফাহেসা কথায় দ্বারাও ছোট শিরক হয়। কিন্তু এই শিরক ইসলাম থেকে বের করে দেয় না।
হুযাইফাহ ইবনে ইয়ামান (রা.) থেকে বর্ণিত। এক মুসলিম ব্যক্তি স্বপ্ন দেখে যে, আহলে কিতাবের এক ব্যক্তির সাথে তার সাক্ষাৎ হলে সে বলল, তোমরা কতই না উত্তম জাতি, যদি তোমরা শিরক না করতে। তোমরা বলে থাকো, ’’আল্লাহ্ যা ইচ্ছা করেন এবং মুহাম্মাদ যা ইচ্ছা করেন’’। অতঃপর সে স্বপ্নের কথাটি রাসুলুল্লাহ ﷺ এর নিকট বর্ণনা করলো। তিনি বলেন-
أَمَا وَاللَّهِ إِنْ كُنْتُ لأَعْرِفُهَا لَكُمْ قُولُوا مَا شَاءَ اللَّهُ ثُمَّ شَاءَ مُحَمَّدٌ
অর্থ : আল্লাহর শপথ! শোনো, আমি তো তোমাদের এরূপ কিছু বলতে শিখানি। তোমরা বলবে, ’’আল্লাহ্ যা ইচ্ছা করেন, এরপর রাসুলুল্লাহ ﷺ যা চান’’। ইবনে মাজাহ : ২১১৮
এ হাদিসটি প্রমাণ করছে যে, ইসলামের প্রারম্ভিক আমলে রাসুলুল্লাহ ﷺ এর সাহাবিদের মাঝে ‘আল্লাহ ও মুহাম্মদ ﷺ যা চান’, এ-জাতীয় কথাবার্তা বলার প্রচলন ছিল। পরবর্তীতে এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে রাসুলুল্লাহ ﷺ তাঁদেরকে এমন কথা বলা থেকে বারণ করেন এবং এ ধরনের কথার বদলে নিম্নোক্ত কথা বলতে শিক্ষা দেন। তোমরা বল, আল্লাহ তায়ালা এককভাবে যা চান। যেমন-
ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-
إِذَا حَلَفَ أَحَدُكُمْ فَلاَ يَقُلْ مَا شَاءَ اللَّهُ وَشِئْتَ . وَلَكِنْ لِيَقُلْ مَا شَاءَ اللَّهُ ثُمَّ شِئْتَ
অর্থ : তোমাদের কেউ যেন শপথ করা কালে এভাবে না বলে, ’’আল্লাহ যা চান এবং তুমি যা ইচ্ছা করো’’। বরং সে যেন বলে, ’’আল্লাহ্ যা ইচ্ছা করেন, এরপর তুমি যা ইচ্ছা করছো। ইবনে মাজাহ : ২১১৭
শিরকে আসগার’ এর কতিপয় উদাহরণ হলো- কোনো ব্যক্তির বলল, আমার চাকরিটি না থাকিলে সংসারের কি যে হত। আজ বিপদে আপনিই আমাকে বাঁচিয়েছেন। পোষা কুকুরটি না হলে আজ রাতে আমার বাড়িতে চুরি হয়ে যেতো, ইত্যাদি ইত্যাদি।
তাওহীদ ও শিরকের মাঝে পার্থক্য :
| বিষয় | তাওহীদ | শিরক |
| সংজ্ঞা | আল্লাহকে এক ও অদ্বিতীয় বলা ও মানা | আল্লাহর সঙ্গে অন্য কাউকে শরিক করা |
| ইবাদতের অধিকার | কেবল আল্লাহর | আল্লাহ ছাড়া অন্যকেও দেওয়া |
| উদ্দেশ্য | আল্লাহর সন্তুষ্টি | আল্লাহর সাথে অন্যের সন্তুষ্টি অর্জন |
| ইবাদতের দৃষ্টিভঙ্গি | শুধুই আল্লাহর উদ্দেশ্যে ইবাদত | কাউকে ইবাদতের অংশীদার করা |
| ক্ষমতার বিশ্বাস | আল্লাহর সব কিছুর ক্ষমতা আছে | অন্যেরও অলৌকিক ক্ষমতা আছে মনে করা |
| প্রভাব | জান্নাতের পথে নিয়ে যায় | জাহান্নামের পথে নিয়ে যায় |
| নবিদের দাওয়াত | সব নবি তাওহীদের দাওয়াত দিয়েছেন | নবিরা শিরকের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ করেছেন |
| তাওবা না করলে পরিণতি | ক্ষমারযোগ্য, যদি ভুল হয় | ক্ষমাহীন গুনাহ, যদি তাওবা ছাড়া মৃত্যু হয় |
| অন্তর ও আমলের প্রভাব | একনিষ্ঠতা, শান্তি, একাগ্রতা | বিভ্রান্তি, ভয়ের মিশ্রতা |
| ফলাফল | জান্নাতের সফলতা | জাহান্নামের শাস্তি ও চিরস্থায়ী ব্যর্থতা |