নিষিদ্ধ বিনোদনের স্বরূপ
মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন
বিনোদন মানুষের জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হলেও, যখন তা আল্লাহ্র নির্ধারিত সীমারেখা অতিক্রম করে তখন তা আর নির্মল থাকে না; বরং তা ধ্বংস ও বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বইটির এই অধ্যায়ে এমন কিছু বিনোদনের আলোচনা করা হয়েছে যা ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে নিষিদ্ধ, কিন্তু আধুনিক সমাজ ও সংস্কৃতির প্রভাবে যা ক্রমশ স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে।
আধুনিক যুগের ঝলমলে বিনোদন ব্যবস্থা একদিকে যেমন মনকে সাময়িক তৃপ্তি দেয়, অন্যদিকে তা নৈতিক ও আধ্যাত্মিক অধঃপতনকে ত্বরান্বিত করে। যেমন- অবৈধ প্রেম, অশ্লীল সিনেমা ও মিডিয়া, বেপর্দা পোশাক, বিপরীত লিঙ্গের সাথে অবাধ মেলামেশা, অশালীন নাচ-গান, ডেটিং, যৌন উত্তেজক বই ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনুপযুক্ত কার্যকলাপ একজন ব্যক্তিকে পাপের পথে ঠেলে দেয়। এসব কার্যকলাপ আপাতদৃষ্টিতে নির্দোষ মনে হলেও, এগুলি ধীরে ধীরে মানুষের অন্তরকে কলুষিত করে, লজ্জা ও শালীনতাবোধ নষ্ট করে দেয় এবং সর্বশেষে তাকে জিনা-ব্যভিচারের মতো মহাপাপের দিকে টেনে নিয়ে যায়।
দুঃখজনক হলেও সত্য, মুসলিম সমাজের একাংশও নিজস্ব সংস্কৃতির নামে এমন কিছু কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হচ্ছে যা ইসলামের মূল শিক্ষার পরিপন্থী। এ অধ্যয় বিতর্কিত প্রথা ও উৎসবগুলির দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে, যা ধর্মের নামে বা ঐতিহ্য হিসেবে পালিত হয় কিন্তু কুরআন ও সুন্নাহর সঠিক ভিত্তি নেই। ঈদে মীলাদুন্নবী, শবে বরাত, আশুরার দিন আনন্দ-উৎসব, মিলাদ মাহফিল, ফাতিহা-ই-ইয়াজদাহাম, পীরের মাজারে উরস, এমনকি নববর্ষের মতো উৎসবগুলিতে গান-বাজনা, বেপর্দা মেলামেশা ও বাড়াবাড়ির মাধ্যমে অনৈসলামিক বিনোদনের অনুপ্রবেশ ঘটেছে। বিবাহ, আকিকা, এমনকি মৃত্যু পরবর্তী কুলখানি ও চল্লিশার মতো পারিবারিক ও সামাজিক অনুষ্ঠানও আজকাল অনৈতিক গান-নাচ ও বেপর্দার বেড়াজালে জড়িয়ে পড়ছে, যা মুসলিম সমাজের সরলতা ও পবিত্রতাকে নষ্ট করছে।
অন্যদিকে, বিশ্বায়নের এই যুগে পশ্চিমা ও অমুসলিম সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণের প্রবণতা মুসলিম যুবসমাজকে তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও ধর্মীয় ঐতিহ্য থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। এই ভয়াবহ অনুকরণ প্রিয়তার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। পোশাক, স্টাইল, সংগীত ও নৃত্য সংস্কৃতিতে পাশ্চাত্য অনুকরণ, সিনেমা, নাটক ও খেলাধুলায় অমুসলিমদের অন্ধ অনুসরণ, এবং পশ্চিমা উৎসবকেন্দ্রিক বাণিজ্যিক বিনোদনে গা ভাসিয়ে দেওয়া—এগুলি প্রমাণ করে যে মুসলিমরা নিজেদের স্বকীয়তা ও গৌরব ভুলে গিয়ে অন্যদের অনুকরণে মত্ত হচ্ছে। এই অনুকরণ শেষ পর্যন্ত ধর্মীয় বিশ্বাস ও মূল্যবোধের উপর আঘাত হানে।
সবশেষে, “আধুনিক ডিজিটাল ডিভাইজ” এর প্রভাবে বিনোদনের জগত যে নতুন মোড় নিয়েছে, তা সংক্ষিপ্তভাবে হলেও আলোচনার দাবি রাখে। স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা বিনোদনকে হাতের মুঠোয় এনে দিলেও, এর অপব্যবহার সমাজের নৈতিক কাঠামোকে চরমভাবে দুর্বল করছে। এই লেখার মূল উদ্দেশ্য হলো মুসলিম সমাজকে সেইসব নিষিদ্ধ বিনোদনের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে সচেতন করা এবং তাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহ্র সন্তুষ্টি ও নির্দেশনার আলোকে পবিত্রতা ও শালীনতা বজায় রাখার গুরুত্ব তুলে ধরা।
যে বিনোদন জিনা, ব্যভিচার ও অশ্লীলতা দিকে ধাবিত করে
১. অবৈধ প্রেম ও ভালোবাসা
২. অশ্লীল সিনেমা ও মিডিয়া দেখা
৩. বেপর্দা ও উত্তেজক পোশাক পরা বা দেখা
৪. বিপরীত লিঙ্গের সাথে একান্তে মেলামেশা
৫. অশালীন বা উত্তেজক নাচ-গান ও সঙ্গীত শোনা
৬. অবাধে ডেটিং বা নৈশপার্টিতে অংশ নেওয়া
৭. যৌন উত্তেজক বই, পত্রিকা ও উপন্যাস পাঠ করা
৮. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনুপযুক্ত পোস্ট ও ভিডিও দেখা
৯. যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ কৌতুক, নাটিকা ও টিকটক ভিডিও দেখা বা তৈরি করা
১০. বিপরীত লিঙ্গের সাথে অপ্রয়োজনীয় চ্যাটিং, মেসেজিং ও অনলাইন বন্ধুত্ব
অবৈধ প্রেম ও ভালোবাসা
প্রেম আল্লাহ প্রদত্ত একটি স্বাভাবিক অনুভূতি। মানুষ পরস্পরের প্রতি আকৃষ্ট হয়, মমতা জন্মে এটা প্রকৃতিগত। কিন্তু যখন এই অনুভূতি শরীয়তের নির্ধারিত সীমারেখা অতিক্রম করে, তখন সেটাই হয় অবৈধ প্রেম বা হারাম ভালোবাসা। ইসলামের দৃষ্টিতে এমন সম্পর্ক, যা বিবাহবন্ধনের বাইরে ঘটে এবং পুরুষ-নারীর মাঝে গোপন ঘনিষ্ঠতা বা যোগাযোগ সৃষ্টি করে, তা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
অবৈধ প্রেমের বাস্তব চিত্র
বর্তমান সমাজে “ভালোবাসা দিবস”, “বয়ফ্রেন্ড–গার্লফ্রেন্ড” সংস্কৃতি, “চ্যাটিং”, “ডেটিং” ইত্যাদি নাম দিয়ে এমন এক অশ্লীল প্রবণতা ছড়িয়ে পড়েছে যা সরাসরি জিনা ও ব্যভিচারের দিকে নিয়ে যায়। আল্লাহ তাআলা মানুষকে যে পরিমিত লজ্জাবোধ ও পরিশুদ্ধতা দিয়েছেন, এসব সংস্কৃতি তা ধ্বংস করে দিচ্ছে। প্রাথমিকভাবে কথাবার্তা, মেসেজ, বা চোখের দৃষ্টি থেকে শুরু হয়ে এক সময় তা দেহগত পাপের দিকে গড়ায়। ইসলামের দৃষ্টিতে অবৈধ প্রেম হারাম। কুরআনে আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবে বলেন—
وَلَا تَقۡرَبُوا الزِّنٰۤی اِنَّہٗ کَانَ فَاحِشَۃً ؕ وَسَآءَ سَبِیۡلًا
আর তোমরা ব্যভিচারের কাছে যেয়ো না, নিশ্চয় তা অশ্লীল কাজ ও মন্দ পথ। সূরা ইসরা : ৩২
এ আয়াত শুধু ব্যভিচার নিষিদ্ধ করেনি, বরং এর কাছেও না যেতে সতর্ক করেছে অর্থাৎ, এমন সব উপাদান ও আচরণ থেকে দূরে থাকা যা ব্যভিচারের দিকে ধাবিত করে। অবৈধ প্রেম, গোপন সাক্ষাৎ, ফোন বা সামাজিক মাধ্যমে অন্তরঙ্গ বার্তা, এগুলোই সেই “কাছাকাছি যাওয়ার” রূপ।
আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ নিশ্চয়ই আল্লাহ তা’আলা বানী আদমের জন্য যিনার একটা অংশ নির্ধারিত রেখেছেন। সে তাতে অবশ্যই জড়িত হবে। চোখের যিনা হলো দেখা, জিহবার যিনা হলো কথা বলা, কুপ্রবৃত্তি কামনা ও খাহেশ সৃষ্টি করা এবং যৌনাঙ্গ তা সত্য অথবা মিথ্যা প্রমাণ করে। সহিহ বুখরির : ৬২৪৩, সহিহ মুসলিম : ২৬৫৭, আহমাদ : ৮২২২
অতএব, প্রেমের নামে বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকর্ষণ, চ্যাটিং, দেখা করা, অনুভূতি ভাগাভাগি করা, এগুলোও “জিনার ভূমিকা” পালন করে। শয়তান কখনও সরাসরি জিনায় প্ররোচিত করে না। সে শুরু করে “সহানুভূতি”, “বন্ধুত্ব”, “আন্তরিকতা” দিয়ে। ধীরে ধীরে সে হৃদয়ে হারাম ভালোবাসার আগুন জ্বালিয়ে দেয়। এক সময় মানুষ নিজের নফসের দাসে পরিণত হয়।
উসামাহ ইবনু যায়দ (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, পুরুষের জন্য স্ত্রীজাতি অপেক্ষা অধিক ক্ষতিকর কোন ফিতনা আমি রেখে গেলাম না। সহিহ বুখারি : ৫০৯৬, সহিহ মুসলিম : ২৭৪০
এই কারণেই ইসলামে প্রেমের সম্পর্ক কেবল বৈধ হয় বিবাহের মাধ্যমে। বিবাহই ভালোবাসাকে পরিশুদ্ধ ও ইবাদতে রূপ দেয়। অপর পক্ষে অবৈধ প্রেম শুধু দীন নয়, দুনিয়াও ধ্বংস করে। এটি মানসিক অস্থিরতা, হৃদয়ভঙ্গ, অবিশ্বাস, পারিবারিক অশান্তি ও লজ্জাহীনতা সৃষ্টি করে। সমাজে ব্যভিচার, অবৈধ সন্তান, তালাকের হার বৃদ্ধি সবকিছুর মূলে এই হারাম সম্পর্ক। ইসলাম প্রেমকে নিষিদ্ধ করেনি, বরং শরয়ী পথে পরিচালিত করেছে। বৈধ উপায়ে বিবাহের মাধ্যমে ভালোবাসা প্রকাশ করা উত্তম ও বরকতময়। অবৈধ প্রেম থেকে বিরত থাকা ইমানের নিদর্শন। যে যুবক-যুবতী আল্লাহর ভয় ও লজ্জাবোধে নিজের দৃষ্টি ও হৃদয় সংযত রাখে, তার জন্য জান্নাতের সুখবর রয়েছে।
২. অশ্লীল সিনেমা ও মিডিয়া দেখা
বর্তমান সময়ে বিনোদনের নামে অশ্লীলতা সবচেয়ে ব্যাপকভাবে ছড়াচ্ছে সিনেমা, নাটক, সিরিজ, ইউটিউব ভিডিও ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে। এগুলো বাহ্যত “বিনোদন” মনে হলেও বাস্তবে এগুলোর অনেকাংশ মুসলিম সমাজে নগ্নতা, জিনা, ব্যভিচার, মাদক, হত্যা, নাস্তিকতা ও ধর্মবিমুখতার প্রচারক হিসেবে কাজ করছে। টিভি সিরিজ, প্রেমভিত্তিক সিনেমা, ওয়েব সিরিজ—এগুলো যুবসমাজের হৃদয়ে জাহেলিয়াতের আগুন জ্বালিয়ে দিচ্ছে। আল্লাহ তাআলা বলেন—
اِنَّ الَّذِیۡنَ یُحِبُّوۡنَ اَنۡ تَشِیۡعَ الۡفَاحِشَۃُ فِی الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا لَہُمۡ عَذَابٌ اَلِیۡمٌ ۙ فِی الدُّنۡیَا وَالۡاٰخِرَۃِ ؕ وَاللّٰہُ یَعۡلَمُ وَاَنۡتُمۡ لَا تَعۡلَمُوۡنَ
নিশ্চয় যারা এটা পছন্দ করে যে, মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়ুক, তাদের জন্য দুনিয়া ও আখেরাতে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক আযাব। আর আল্লাহ জানেন এবং তোমরা জান না। সূরা নূর: ১৯
এই আয়াত অশ্লীলতা প্রচারকারীদের কঠোরভাবে সতর্ক করেছে। আজকের সিনেমা ও মিডিয়া আসলে এই অশ্লীলতাই সমাজে ছড়িয়ে দিচ্ছে—চোখ, কান ও হৃদয়ের মাধ্যমে। দর্শকও সেই পাপের অংশীদার হয়, কারণ সে তা দেখা ও উপভোগের মাধ্যমে মন্দ কাজকে সমর্থন করছে। আল্লাহ তা’আলা স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন-
“তোমরা সৎকর্ম ও আল্লাহভীতিতে একে অন্যের সহযোগিতা করো। তবে পাপ ও সীমালঙ্ঘনের ব্যাপারে একে অন্যের সহায়তা করো না। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ শাস্তি প্রদানে কঠোর।” সূরা মায়েদা : ২
আবু হুরাইরাহ্ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে লোক সঠিক পথের দিকে ডাকে তার জন্য সে পথের অনুসারীদের প্রতিদানের সমান প্রতিদান রয়েছে। এতে তাদের প্রতিদান হতে সামান্য ঘাটতি হবে না। আর যে লোক বিভ্রান্তির দিকে ডাকে তার উপর সে রাস্তার অনুসারীদের পাপের অনুরূপ পাপ বর্তাবে। এতে তাদের পাপরাশি সামান্য হালকা হবে না। সহিহ বুখারি : ২৬৭৪
অতএব, যারা অশ্লীল ভিডিও নির্মাণ করে বা সেগুলো দেখা-শোনায় অংশ নেয়, উভয়ই পাপে জড়িত।
চোখের হিফাজত ও নফসের প্রশান্তি
চোখ হলো হৃদয়ের দরজা। অশ্লীল দৃশ্য দেখলে হৃদয় কলুষিত হয়, নামাজে মনোযোগ হারিয়ে যায়, কুরআন পাঠে তৃপ্তি থাকে না, এমনকি আল্লাহর ভয়ও হারিয়ে যায়।
আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ নিশ্চয়ই আল্লাহ তা’আলা বানী আদমের জন্য যিনার একটা অংশ নির্ধারিত রেখেছেন। সে তাতে অবশ্যই জড়িত হবে। চোখের যিনা হলো দেখা, জিহবার যিনা হলো কথা বলা, কুপ্রবৃত্তি কামনা ও খাহেশ সৃষ্টি করা এবং যৌনাঙ্গ তা সত্য অথবা মিথ্যা প্রমাণ করে। সহিহ বুখরির : ৬২৪৩, সহিহ মুসলিম : ২৬৫৭, আহমাদ : ৮২২২
এ কারণেই ইসলামে “অশ্লীল দৃশ্য দেখা” সরাসরি জিনার পথে নিয়ে যায়।
অশ্লীল সিনেমা মানুষকে বাস্তব জীবন থেকে দূরে সরিয়ে কল্পনার দুনিয়ায় বন্দী করে রাখে। এতে পরিবারে অবিশ্বাস, বৈবাহিক অসন্তোষ, মানসিক অবসাদ, এমনকি পর্নোগ্রাফির আসক্তি সৃষ্টি হয়। বিশ্বজুড়ে অসংখ্য মুসলিম যুবক-যুবতী এই অশ্লীল মিডিয়ার কারণে নামাজ, লজ্জা ও ইমান হারাচ্ছে। মুমিনের উচিত নিজের চোখ ও কানের পাহারাদার হওয়া।
উমামাহ (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসূল ﷺ বলেছেন, “যে ব্যক্তি কোনো নারীকে দেখে, অতঃপর আল্লাহকে ভয় করে (পুনরায় না দেখার জন্য) দৃষ্টি ফিরিয়ে নেয়, আল্লাহ্ তাকে এমন ইমান দান করেন, যার মিষ্টতা সে তার হৃদয়ে অনুভব করে।” সহিহুল জামে : ৫০৯০, তাবারানী : ৭৮১৯, মুসনাদ আহমাদ : ২৩০২৪,
অতএব, বিনোদনের নামে হারাম দেখার পরিবর্তে মুসলিমদের উচিত হালাল বিকল্প গ্রহণ করা—ইসলামী প্রামাণ্যচিত্র, শিক্ষামূলক কন্টেন্ট, কুরআন–সিরাহ বিষয়ক নাটক ইত্যাদি। এতে মনও প্রশান্ত হয়, ঈমানও বাড়ে। ইসলামে দৃষ্টি সংযত রাখতে কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে—
قُلۡ لِّلۡمُؤۡمِنِیۡنَ یَغُضُّوۡا مِنۡ اَبۡصَارِہِمۡ وَیَحۡفَظُوۡا فُرُوۡجَہُمۡ ؕ ذٰلِکَ اَزۡکٰی لَہُمۡ ؕ اِنَّ اللّٰہَ خَبِیۡرٌۢ بِمَا یَصۡنَعُوۡنَ
মুমিন পুরুষদেরকে বল, তারা তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখবে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাযত করবে। এটাই তাদের জন্য অধিক পবিত্র। নিশ্চয় তারা যা করে সে সম্পর্কে আল্লাহ সম্যক অবহিত। সূরা নূর : ৩০
অশ্লীল মিডিয়া সরাসরি এই নির্দেশনার লঙ্ঘন ঘটায়। দীর্ঘসময় ধরে এই ধরনের দৃশ্য দেখতে থাকলে মানুষের মন পাপের প্রতি সংবেদনশীলতা হারিয়ে ফেলে। ফলে তার কাছে বেপর্দা, অবৈধ সম্পর্ক বা অশালীন আচরণ স্বাভাবিক মনে হতে থাকে, যা তাকে বাস্তব জীবনে সেই কাজগুলো করতে উৎসাহিত করে। মিডিয়াতে দেখানো অবৈধ সম্পর্ককে ‘রোমান্টিক’ বা ‘স্বাভাবিক’ হিসেবে উপস্থাপন করার কারণে দর্শক বাস্তবেও এমন সম্পর্কের দিকে ঝুঁকে পড়ে, যা ব্যভিচারের পথকে সুগম করে।
বেপর্দা ও উত্তেজক পোশাক পরিধান করা
আল্লাহ তাআলা মানুষকে বস্ত্র দান করেছেন লজ্জাস্থান ঢাকার ও সৌন্দর্য রক্ষার জন্য, প্রদর্শনের নয়। আজকের বিশ্বে পোশাক হয়ে উঠেছে ফ্যাশনের প্রতিযোগিতা ও দৃষ্টি আকর্ষণের মাধ্যম। পুরুষ ও নারীরা উত্তেজক, আঁটসাঁট, আধা-উন্মুক্ত ও স্বচ্ছ পোশাক পরে নিজেদেরকে “আধুনিকতা”র নামে প্রদর্শন করছে। অথচ ইসলামের দৃষ্টিতে এমন পোশাক শুধু গুনাহ নয়, বরং সমাজে অশ্লীলতার প্রসারের অন্যতম মাধ্যম।
বেপর্দা ও উত্তেজক পোশাক পরিধান করা বা তা প্রদর্শন করা উভয়ই ইসলামে নিষিদ্ধ এবং অশ্লীলতা ও যিনার দিকে ধাবিত করার শক্তিশালী কারণ। পর্দা হলো নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য তাদের সম্মান, পবিত্রতা এবং সমাজের শান্তি রক্ষার একটি ব্যবস্থা। নারীদের জন্য উত্তেজক ও আকর্ষণীয় পোশাক পরা, সৌন্দর্য প্রদর্শন করা বা অপ্রয়োজনে ঘর থেকে বাইরে বের হওয়া সরাসরি আল্লাহর নির্দেশনার লঙ্ঘন কর। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন-
وَقَرۡنَ فِیۡ بُیُوۡتِکُنَّ وَلَا تَبَرَّجۡنَ تَبَرُّجَ الۡجَاہِلِیَّۃِ الۡاُوۡلٰی
আর তোমরা নিজ গৃহে অবস্থান করবে এবং প্রাক-জাহেলী যুগের মত সৌন্দর্য প্রদর্শন করো না। সূরা আহযাব : ৩৩
আল্লাহ তাআলা বলেন—
يَا بَنِي آدَمَ قَدْ أَنزَلْنَا عَلَيْكُمْ لِبَاسًا يُوَارِي سَوْآتِكُمْ وَرِيشًا وَلِبَاسُ التَّقْوَىٰ ذَٰلِكَ خَيْرٌ ۚ
হে আদম সন্তানগণ! আমি তোমাদের জন্য এমন পোশাক দান করেছি যা তোমাদের লজ্জাস্থান ঢেকে রাখে ও শোভা বৃদ্ধি করে আর তাকওয়ার পোশাকই সর্বোত্তম। সূরা আরাফ: ২৬
নারীদের জন্য পর্দার নির্দেশ
কুরআনে নারীদেরকে স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছে—
وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا… وَلْيَضْرِبْنَ بِخُمُرِهِنَّ عَلَىٰ جُيُوبِهِنَّ
“তারা যেন তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে, তবে যা অনিচ্ছাকৃতভাবে প্রকাশ পায় তা ছাড়া; এবং তারা যেন তাদের ওড়না বুকের উপর ফেলে রাখে। সূরা নূর: ৩১
এছাড়া আরেক আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন—
يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ قُلْ لِأَزْوَاجِكَ وَبَنَاتِكَ وَنِسَاءِ الْمُؤْمِنِينَ يُدْنِينَ عَلَيْهِنَّ مِن جَلَابِيبِهِنَّ ۚ ذَٰلِكَ أَدْنَىٰ أَن يُعْرَفْنَ فَلَا يُؤْذَيْنَ
“হে নবী! আপনার স্ত্রীগণ, কন্যাগণ এবং মুমিন নারীদের বলুন যেন তারা নিজেদের চাদর দ্বারা নিজেদের আবৃত করে নেয়। এতে তারা চেনা যাবে এবং কষ্ট পাবে না।” সূরা আহযাব: ৫৯
অতএব, উত্তেজক বা অর্ধনগ্ন পোশাক ইসলামী বিধানের পরিপন্থী। পর্দাহীন পোশাক পুরুষদের মধ্যে কামনা জাগায় এবং নারীর মর্যাদা নষ্ট করে।
আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, দু প্রকার লোক জাহান্নামী হবে। আমি তাদেরকে দেখিনি। এক প্রকার ঐ সব লোক যাদের কাছে গরুর লেজের ন্যায় ছড়ি থাকবে। তারা এর দ্বারা লোকেদের পিটাবে। দ্বিতীয় প্রকার ঐ শ্রেণীর মহিলা, যারা কাপড় পরিহিতা কিন্তু উলঙ্গ প্রায়, মানুষকে আকৃষ্টকারিণী ও স্বয়ং বিচ্যুত। যাদের মাথার খোপা বুখতী উটের পিঠের উঁচু কুজোর ন্যায়। তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে না এবং জান্নাতের গন্ধও পাবে না। অথচ জান্নাতের সুগন্ধি অনেক দূর থেকে পাওয়া যায়। সহিহ মুসলিম : ২১২৮
এই হাদিসে স্পষ্ট বোঝা যায়, বেপর্দা ও আকর্ষণীয় পোশাক শুধু গুনাহ নয়; বরং এটি এমন এক অপরাধ যা জান্নাত থেকে বঞ্চিত করতে পারে।
পুরুষদের ক্ষেত্রেও দায়িত্ব
অনেকে মনে করে পর্দা শুধু নারীদের বিষয়। কিন্তু ইসলাম পুরুষকেও দৃষ্টি ও পোশাকের শালীনতার নির্দেশ দিয়েছে।
জারহাদ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন আর তখন তার উরু খোলা অবস্থায় ছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেনঃ তোমার উরু ঢেকে রাখ, কেননা এটাও আভরণীয় অঙ্গ। “পুরুষ যেন উরুর নিচের অংশ প্রকাশ না করে।
সুনানে তিরমিজি : ২৭৯৮
এছাড়া পুরুষদেরও হারাম নারীদের দিকে দৃষ্টি নামানোর নির্দেশ দিয়েছেন—
قُل لِّلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ
“মুমিন পুরুষদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে। সূরা নূর: ৩০
বেপর্দা পোশাক সমাজে অশ্লীলতার দরজা খুলে দেয়, বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক বাড়ায়, পারিবারিক অশান্তি সৃষ্টি করে, এমনকি ধর্ষণ ও যৌন অপরাধের হার বাড়ায়। এ কারণেই ইসলাম লজ্জাশীলতাকে ঈমানের অঙ্গ ঘোষণা করেছে। অতএব, পরিশুদ্ধ সমাজের জন্য প্রত্যেক মুমিনের উচিত লজ্জা ও পর্দাকে জীবনের অলংকার হিসেবে ধারণ করা এবং বেপর্দা ও উত্তেজক পোশাক পরিধান না করা।
৪. বিপরীত লিঙ্গের সাথে একান্তে মেলামেশা
বিপরীত লিঙ্গের সাথে নির্জনে বা একান্তে মেলামেশা করাকে ইসলামী পরিভাষায় খালওয়াত বলা হয় এবং এটি সম্পূর্ণরূপে হারাম। এটি যিনা ও অশ্লীলতার দিকে ধাবিত হওয়ার সবচেয়ে কার্যকর ধাপগুলির মধ্যে একটি। একান্ত সাক্ষাৎ করাকে জিনার প্রবেশদ্বার বলা হয়ে থাকে। মানুষের নফস দুর্বল, আর শয়তান তার সুযোগসন্ধানী শত্রু। যখন কোনো নারী ও পুরুষ একান্তে থাকে, তখন তাদের মাঝে তৃতীয় হিসেবে শয়তান উপস্থিত হয় এবং ধীরে ধীরে তাদের হৃদয়ে পাপের আকর্ষণ জাগিয়ে তোলে। তাই ইসলাম একান্ত মেলামেশা (খলওয়াহ) সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছে।
ইবনু উমার (রাঃ) হতে নবি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-
সাবধান! কোন পুরুষ কোন মহিলার সাথে নির্জনে মিলিত হলে সেখানে অবশ্যই তৃতীয়জন হিসাবে শাইতান অবস্থান করে (এবং পাপাচারে প্ররোচনা দেয়)। তোমরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে বসবাস কর। বিচ্ছিন্নতা হতে সাবধান থেকো। কেননা, শাইতান বিচ্ছিন্নজনের সাথে থাকে এবং সে দুজন হতে অনেক দূরে অবস্থান করে। যে লোক জান্নাতের মধ্যে সবচাইতে উত্তম জায়গার ইচ্ছা পোষণ করে সে যেন ঐক্যবদ্ধ হয়ে থাকে (মুসলিম সমাজে)। যার সৎ আমল তাকে আনন্দিত করে এবং বদ্ আমল কষ্ট দেয় সেই হলো প্রকৃত ঈমানদার। সুনানে তিরমিজি : ২১৬৫
নির্জন পরিবেশে যখন কেউ শয়তানের প্ররোচনায় পড়ে, তখন তার পক্ষে নৈতিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা কঠিন হয়ে যায়। একান্তে মেলামেশা শারীরিক প্রলোভন সৃষ্টির সবচেয়ে শক্তিশালী পরিস্থিতি তৈরি করে। কথা বলা, স্পর্শ করা, বা আবেগ বিনিময়— ইত্যাদি সহজেই যিনার পথে নিয়ে যায়। এমনকি যদি আপাতদৃষ্টিতে কোনো খারাপ উদ্দেশ্য না-ও থাকে, তবুও শয়তান ধীরে ধীরে তাদের মনে কুচিন্তা ও কামনার বীজ বপন করে। তাই ইসলাম সকল ধরনের সন্দেহ ও পাপের পথকে গোড়াতেই বন্ধ করে দিতে চেয়েছে। নির্জনতা দূর করার মাধ্যমে ব্যভিচারের মূল কারণটিই দূর করা হয় এবং সমাজকে অনৈতিকতা থেকে রক্ষা করা হয়। নবী ﷺ জানতেন, যতই পবিত্র উদ্দেশ্য থাকুক না কেন, একান্ত পরিবেশে নফসের প্রবৃত্তি জেগে উঠতে পারে, যা পাপের দিকে ধাবিত করে। কুরআনে আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবে বলেন—
وَلَا تَقۡرَبُوا الزِّنٰۤی اِنَّہٗ کَانَ فَاحِشَۃً ؕ وَسَآءَ سَبِیۡلًا
আর তোমরা ব্যভিচারের কাছে যেয়ো না, নিশ্চয় তা অশ্লীল কাজ ও মন্দ পথ। সূরা ইসরা : ৩২
এই আয়াতে আল্লাহ শুধুমাত্র জিনা নিষিদ্ধ করেননি, বরং বলেছেন “কাছেও যেও না”। একান্ত সাক্ষাৎ, ফোনে আলাদা কথা বলা, বন্ধুত্বের নামে চ্যাটিং করা, এগুলোই “জিনার কাছাকাছি যাওয়া”-এর আধুনিক রূপ। আধুনিক প্রেক্ষাপটে নারী পুরুষ অফিস, বিশ্ববিদ্যালয় ও সোশ্যাল মিডিয়ায় এক সাথে কাজ করে।
তারা বিভিন্ন কারনে একসাথে থাকতে বাধ্য হচ্ছে। যেনম-
• অফিসে গোপন মিটিং,
• বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রকল্প কাজের নামে একান্ত সময়,
• কফিশপে বন্ধুত্বপূর্ণ সাক্ষাৎ,
• কিংবা অনলাইনে প্রাইভেট ভিডিও কল ও মেসেজ বিনিময়।
এসবই “খলওয়াহ”-এর অন্তর্ভুক্ত, যদিও তা ভার্চুয়াল মাধ্যমেই ঘটে। ইসলামিক ফিকহে এরূপ অবস্থাকে বলা হয় অনলাইন একান্ততা, যা একইভাবে নিষিদ্ধ।
এভাবে একান্তে অনলাইনে বার বার কথা বলার কারনে তাদের অন্তরে হারাম আকর্ষণ সৃষ্টি হয়। আস্তে আস্তে লজ্জা ও আল্লাহভীতি দূরে সরে যায়। ফলে তাদের বিবাহিত জীবনে অবিশ্বাস ও দাম্পত্য কলহ জন্মায়। অসংখ্য যুবক–যুবতী “বন্ধুত্ব” থেকে শুরু করে “জিনা” পর্যন্ত গড়িয়ে পড়ে কেবল একান্ত মেলামেশার কারণে। ইসলাম পুরুষ–নারীর মধ্যে সম্পূর্ণ দেয়াল টানেনি, বরং শরয়ী শিষ্টাচারের সীমানা নির্ধারণ করেছে। প্রয়োজনে নারী–পুরুষ কথা বলতে পারে, কিন্তু শালীনতা ও প্রয়োজনীয়তার সীমার মধ্যে। আল্লাহ তাআলা বলেন—
یٰنِسَآءَ النَّبِیِّ لَسۡتُنَّ کَاَحَدٍ مِّنَ النِّسَآءِ اِنِ اتَّقَیۡتُنَّ فَلَا تَخۡضَعۡنَ بِالۡقَوۡلِ فَیَطۡمَعَ الَّذِیۡ فِیۡ قَلۡبِہٖ مَرَضٌ وَّقُلۡنَ قَوۡلًا مَّعۡرُوۡفًا ۚ
হে নবী-পত্নিগণ, তোমরা অন্য কোন নারীর মত নও। যদি তোমরা তাকওয়া অবলম্বন কর, তবে (পরপুরুষের সাথে) কোমল কণ্ঠে কথা বলো না, তাহলে যার অন্তরে ব্যাধি রয়েছে সে প্রলুব্ধ হয়। আর তোমরা ন্যায়সঙ্গত কথা বলবে। সূরা আল-আহযাব: ৩২
৫. অশালীন বা উত্তেজক নাচ-গান ও সঙ্গীত শোনা
যে সমস্ত গান, নাচ বা সঙ্গীতে অশ্লীল, যৌন উত্তেজক বা অবৈধ প্রেম ও কামনা-বাসনার প্রচার থাকে, তা ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে হারাম। এটি মানুষের মনকে সরাসরি অশ্লীলতার দিকে নিয়ে যায়।
ইসলাম সঙ্গীতকে সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেনি, তবে যে গান বা সঙ্গীত যৌন আকাঙ্ক্ষা জাগায়, হারামের দিকে প্ররোচিত করে, বা নারীদের বেপর্দা ও অশালীন চিত্র প্রদর্শন করে, তা নিষিদ্ধ। এ ধরনের গান শ্রবণের যিনা ঘটায় এবং মানুষের মনে কামভাব জাগিয়ে তোলে। গানের কথা বা সুর যখন অবৈধ সম্পর্ক, মদ্যপান বা বেপরোয়া জীবনযাপনকে উৎসাহিত করে, তখন শ্রোতা সেই পাপের প্রতি মানসিক আকর্ষণ অনুভব করে। বিশেষ করে নাচ ও উদ্দীপক সঙ্গীত, যা নারী-পুরুষের মিশ্র জমায়েতে পরিবেশন করা হয়, তা সরাসরি বেপর্দা ও শারীরিক অশ্লীলতার দিকে ধাবিত করে। অবৈধ গানের কারনে আল্লাহ দুনিয়াতেই শান্তি প্রদান করবেন।
আবদুর রহমান ইবনু গানাম আশ’আরী (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমার নিকট আবূ আমির কিংবা আবূ মালিক আশ’আরী বর্ণনা করেছেন। আল্লাহর কসম! তিনি আমার কাছে মিথ্যে কথা বলেননি। তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছেনঃ আমার উম্মাতের মধ্যে অবশ্যই এমন কতগুলো দলের সৃষ্টি হবে, যারা ব্যভিচার, রেশমী কাপড়, মদ ও বাদ্যযন্ত্রকে হালাল জ্ঞান করবে। তেমনি এমন অনেক দল হবে, যারা পাহাড়ের ধারে বসবাস করবে, বিকাল বেলায় যখন তারা পশুপাল নিয়ে ফিরবে তখন তাদের নিকট কোন অভাব নিয়ে ফকীর আসলে তারা বলবে, আগামী দিন সকালে তুমি আমাদের নিকট এসো। এদিকে রাতের অন্ধকারেই আল্লাহ তাদের ধ্বংস করে দেবেন। পর্বতটি ধ্বসিয়ে দেবেন, আর বাকী লোকদেরকে তিনি কিয়ামতের দিন পর্যন্ত বানর ও শূকর বানিয়ে রাখবেন। সহিহ বুখারি : ৫৫৯০
এ হাদিস ইঙ্গিত করে যে এই দুটি বিষয় একে অপরের সাথে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত এবং সমাজকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়। অশ্লীল গান ও নাচ মানুষের লজ্জা ও তাক্বওয়া (আল্লাহভীতি) কমিয়ে দেয়, ফলে পাপের কাজ করা তাদের জন্য সহজ হয়ে যায়।
৬. অবাধে ডেটিং বা নৈশপার্টিতে অংশ নেওয়া
অবাধে ডেটিং বা নৈশপার্টিতে অংশগ্রহণ করা ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে হারাম এবং যিনার দিকে ধাবিত হওয়ার একটি মারাত্মক পথ। ডেটিং বা নৈশপার্টি হলো এমন সামাজিক মিলনক্ষেত্র যেখানে নারী-পুরুষের মধ্যে শরীয়ত-বহির্ভূত অবাধ মেলামেশা ঘটে। সাধারণত এসব পরিবেশে বেপর্দা, নেশা (যেমন মদ) এবং উত্তেজক নাচ-গান ও বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার থাকে। এই তিনটি উপাদানই ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ এবং এগুলো মানুষকে নৈতিকতা ও আল্লাহর ভয় থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। অবাধ মেলামেশার কারণে পুরুষ ও নারীর মধ্যে দৈহিক আকর্ষণ দ্রুত বৃদ্ধি পায়। বিশেষ করে নৈশপার্টির মতো অন্ধকার ও উদ্দাম পরিবেশে, যেখানে মানুষ নিজেদেরকে ধর্মীয় ও সামাজিক বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্ত মনে করে, সেখানে যিনা বা ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা বহুগুণ বেড়ে যায়। ডেটিং সম্পর্কগুলো শুরু হয় সাধারণ আলাপচারিতা দিয়ে, কিন্তু এটি অনিবার্যভাবে শারীরিক সান্নিধ্যের দিকে এগোয়। কুরআনে আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবে বলেন—
وَلَا تَقۡرَبُوا الزِّنٰۤی اِنَّہٗ کَانَ فَاحِشَۃً ؕ وَسَآءَ سَبِیۡلًا
আর তোমরা ব্যভিচারের কাছে যেয়ো না, নিশ্চয় তা অশ্লীল কাজ ও মন্দ পথ। সূরা ইসরা : ৩২
তাই ডেটিং বা নৈশপার্টিতে অংশ নেওয়া ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। এটি মুসলিম সমাজে অশ্লীলতা ও যৌন নৈরাজ্য বিস্তারে সরাসরি ভূমিকা রাখে।
ইবনু উমার (রাঃ) হতে নবি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, সাবধান! কোন পুরুষ কোন মহিলার সাথে নির্জনে মিলিত হলে সেখানে অবশ্যই তৃতীয়জন হিসাবে শাইতান অবস্থান করে। সুনানে তিরমিজি : ২১৬৫ আংশিক হাদিস।
৭. যৌন উত্তেজক বই, পত্রিকা ও উপন্যাস পাঠ করা
যৌন উত্তেজক (পর্নোগ্রাফিক) বই, পত্রিকা বা উপন্যাস পাঠ করা মানসিক ও চিন্তার যিনা ঘটায় এবং ব্যক্তিকে অশ্লীলতার প্রতি আসক্ত করে তোলে। যদিও এটি সরাসরি শারীরিক যিনা নয়, কিন্তু এই ধরনের সাহিত্য পাঠ মানুষের চিন্তা ও কল্পনার জগৎকে কলুষিত করে। আল্লাহ্ তাআলা মানুষকে দৃষ্টি ও চিন্তাকে সংযত রাখতে নির্দেশ দিয়েছেন। যখন কেউ এই ধরনের বই পড়ে, তখন তার মনে অবৈধ ও বিকৃত যৌন কামনা তৈরি হয়, যা তাকে বাস্তবে সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য প্ররোচিত করে। এটি মনের মধ্যে এমন এক আসক্তি সৃষ্টি করে যে ব্যক্তি আর স্বাভাবিক ও বৈধ সম্পর্কে সন্তুষ্ট থাকতে পারে না। এই ধরনের পাঠ তার লজ্জা ও আল্লাহভীতিকে (তাকওয়া) দুর্বল করে দেয়। যে মন সর্বদা অবৈধ কামনায় নিমজ্জিত থাকে, সে ধীরে ধীরে শারীরিক ব্যভিচারের দিকে অগ্রসর হয়। এছাড়া, এই মাধ্যমগুলো অবৈধ সম্পর্ক বা বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্ককে গৌরবময় বা স্বাভাবিক হিসেবে উপস্থাপন করে, যা পাঠকের নৈতিক মানদণ্ডকে নষ্ট করে দেয় এবং তাকে যিনার দিকে ধাবিত করে।
এ কারণে যৌন উত্তেজক বই, উপন্যাস বা পত্রিকা, রোমান্টিক গল্পের বই যেখানে নেক্কারজনক আচরণ বা প্রেমের নামে অশ্লীলতা প্রচার করা হয়, যা পড়ার মাধ্যমে মানুষ মনের মধ্যে কামনার আগুন জ্বালায় তা পড়া হারাম। এটি সরাসরি জিনার পথকে উন্মুক্ত করে।
আবু হুরাইরাহ্ (রাযিঃ) এর সানাদে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, আদম সন্তানের উপর ব্যভিচারের যে অংশ লিখিত রয়েছে তা অবশ্যই সে, প্রাপ্ত হবে। নিঃসন্দেহে দু’চোখের ব্যভিচার হলো তাকানো, দু’কানের ব্যভিচার হলো শোনা, জিহ্বার ব্যভিচার হলো কথোপকথন করা, হাতের ব্যভিচার হলো শক্ত করে ধরা, পায়ের ব্যভিচার হলো হেঁটে যাওয়া, হৃদয়ের ব্যভিচার হচ্ছে কামনা-বাসনা করা। আর লজ্জাস্থান তা সত্যায়িত করে বা মিথ্যা সাব্যস্ত করে। সহিহ মুসলিম : ২৬৫৭
৮. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনুপযুক্ত পোস্ট ও ভিডিও দেখা
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে (যেমন: ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, ইউটিইব) অনুপযুক্ত বা অশ্লীল পোস্ট এবং ভিডিও দেখা হলো চোখ ও কানের যিনা, যা আধুনিক যুগে অশ্লীলতা বিস্তারের অন্যতম প্রধান কারণ।
এই প্ল্যাটফর্মগুলোতে প্রায়শই বেপর্দা নারীর ছবি, উত্তেজক নাচ বা অশ্লীল ইঙ্গিতপূর্ণ বিষয়বস্তু প্রদর্শিত হয়। এইগুলো দেখা সরাসরি দৃষ্টি সংযত রাখার ইসলামী নীতির লঙ্ঘন। অনুপযুক্ত ভিডিও বা ছবি দেখার মাধ্যমে মানুষ মানসিক উত্তেজনা অনুভব করে এবং ধীরে ধীরে পাপের প্রতি তার লজ্জা (হায়া) চলে যায়। বারবার এই ধরনের দৃশ্য দেখতে থাকলে, তার কাছে অবৈধ বা অশ্লীল কাজগুলো স্বাভাবিক মনে হতে শুরু করে। এটি তাকে বাস্তবেও এমন আচরণ করতে বা এমন পরিবেশে যেতে উৎসাহিত করে, যেখানে সে এই দৃশ্যের অনুরূপ অভিজ্ঞতা পেতে পারে। এগুলো অনৈতিক ব্যবহার করলে সরাসরি জিনা ও ব্যভিচারের দিকে পরিচালিত করে। যুবক-যুবতী ছবি, ভিডিও বা পোস্টের মাধ্যমে দৃষ্টি আকর্ষণ ও কামনা বৃদ্ধি করে।
বুরাইদাহ (রাযিঃ) হতে মারফু’ হিসেবে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ হে ’আলী! বারবার (অননুমোদিত জিনিসের প্রতি) তাকাবে না। তোমার প্রথম দৃষ্টি জায়িয (ও ক্ষমাযোগ্য) হলেও পরের দৃষ্টি (ক্ষমাযোগ্য) নয়। সুনান তিরমিজি : ২৭৭৭, সুনানে আবু দাউদ ২১৪৯
অশ্লীল ভিডিও বা পোস্ট দেখা মানে চোখের জিনার অংশীদার হওয়া। কুরআনও সতর্ক করেছেন—
قُل لِّلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ
মুমিন পুরুষদের বলো, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে। সূরা নূর : ৩০
তাই এই পোস্টগুলোর লাইক ও শেয়ারের মাধ্যমে ব্যক্তি অশ্লীলতার প্রচারে অংশ নেয়, যা কোরআনের নির্দেশনার বিপরীত। আল্লাহ্ তাআলা এমন লোকদের জন্য কঠিন শাস্তির হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, যারা মুমিনদের মাঝে অশ্লীলতা ছড়িয়ে দিতে চায়। সুতরাং, এই অনুপযুক্ত কনটেন্টগুলো দেখা হলো ব্যভিচারের পথে শয়তানের প্রথম ফাঁদ।
৯. যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ কৌতুক, নাটিকা ও টিকটক ভিডিও দেখা বা তৈরি করা
যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ কৌতুক, নাটিকা বা টিকটক ভিডিও তৈরি করা বা উপভোগ করা হলো যিনার পথে কথার ব্যবহার এবং অশ্লীলতাকে জনপ্রিয় করার মাধ্যম।
এ ধরনের কৌতুক বা ভিডিওতে সরাসরি অশ্লীলতা না থাকলেও, সেগুলোতে এমন ইঙ্গিতপূর্ণ ভাষা, অঙ্গভঙ্গি ও বিষয়বস্তু ব্যবহার করা হয় যা মানুষের মনে যৌন চিন্তা জাগিয়ে তোলে। ইসলামে কথা ও রসিকতায় শালীনতা বজায় রাখা আবশ্যক। এই ইঙ্গিতপূর্ণ কনটেন্টগুলো একদিকে যেমন কথার যিনা ঘটায়, তেমনি অন্যদিকে তা সমাজে লজ্জাহীনতাকে সাধারণ বিষয়ে পরিণত করে। বিশেষ করে টিকটক বা নাটিকার মতো মাধ্যমগুলোতে নারী ও পুরুষের বেপর্দাভাবে অভিনয় করা, অপ্রয়োজনীয় শারীরিক নৈকট্য দেখানো এবং উত্তেজক ভঙ্গিমা প্রদর্শন করার মাধ্যমে দর্শক অবাধে মেলামেশা ও অশ্লীলতার প্রতি উৎসাহিত হয়। যখন সমাজের মানুষ অশ্লীল ইঙ্গিতের প্রতি হাসে ও উপভোগ করে, তখন তাদের হৃদয়ে পাপের প্রতি ঘৃণা কমে যায় এবং তারা ধীরে ধীরে গুরুতর অশ্লীল কাজের দিকে ধাবিত হয়। এই কনটেন্টগুলো ক্ষতিকর মানসিক আসক্তি তৈরি করে, যা বাস্তবে সুস্থ সামাজিক সম্পর্ক ও পবিত্র বিবাহিত জীবন গঠনের পথে বাধা সৃষ্টি করে।
১০. বিপরীত লিঙ্গের সাথে অপ্রয়োজনীয় চ্যাটিং, মেসেজিং ও অনলাইন বন্ধুত্ব
বিপরীত লিঙ্গের সাথে অপ্রয়োজনীয় চ্যাটিং, মেসেজিং বা অনলাইন বন্ধুত্ব হলো কথার যিনা এবং এটি অবৈধ সম্পর্কের দিকে নিয়ে যাওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
অনলাইনে চ্যাট বা মেসেজিংয়ের মাধ্যমে শুরু হওয়া সম্পর্কগুলো খুব দ্রুত গভীর ও আবেগপূর্ণ হয়ে ওঠে, কারণ সেখানে সরাসরি সাক্ষাতের সামাজিক বাধা থাকে না। প্রথমদিকে এটি হয়তো সাধারণ কথা দিয়ে শুরু হয়, কিন্তু শয়তানের প্ররোচনায় ধীরে ধীরে তা অশোভন, আবেগপূর্ণ এবং যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ আলাপে পরিণত হয়। ইসলাম নারীদেরকে প্রয়োজন ছাড়া কোমল কণ্ঠে কথা বলতে নিষেধ করেছেন। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন-
یٰنِسَآءَ النَّبِیِّ لَسۡتُنَّ کَاَحَدٍ مِّنَ النِّسَآءِ اِنِ اتَّقَیۡتُنَّ فَلَا تَخۡضَعۡنَ بِالۡقَوۡلِ فَیَطۡمَعَ الَّذِیۡ فِیۡ قَلۡبِہٖ مَرَضٌ وَّقُلۡنَ قَوۡلًا مَّعۡرُوۡفًا ۚ
হে নবী-পত্নিগণ, তোমরা অন্য কোন নারীর মত নও। যদি তোমরা তাকওয়া অবলম্বন কর, তবে (পরপুরুষের সাথে) কোমল কণ্ঠে কথা বলো না, তাহলে যার অন্তরে ব্যাধি রয়েছে সে প্রলুব্ধ হয়। আর তোমরা ন্যায়সঙ্গত কথা বলবে। সূরা আহযাব :৩২
অনলাইনে চ্যাটিংয়ে এই নিষেধাজ্ঞা আরও গুরুতরভাবে লঙ্ঘিত হয়। এই ধরনের সম্পর্ক হৃদয়ের যিনা ঘটায় এবং চ্যাটিংকারীরা বাস্তবে দেখা-সাক্ষাৎ (খালওয়াত) এবং অবশেষে ব্যভিচারের দিকে ধাবিত হয়। অনলাইন বন্ধুত্ব অবৈধ প্রেমের ক্ষেত্র তৈরি করে, যা একজন মুসলিমকে তার বৈধ সঙ্গীর প্রতি আগ্রহ কমাতে এবং ধর্মীয় নৈতিকতা হারাতে সাহায্য করে। অপ্রয়োজনীয় চ্যাটিং মানুষের সময়ের অপচয় এবং চিন্তাকে কুলষিত করার মাধ্যমে সমাজে ফিতনা সৃষ্টি করে।