মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন
ঈদে মীলাদুন্নবী বা নবী ﷺ-এর জম্ম উৎসব
আমাদের সমাজের বিশার একটা জনগোষ্ঠী রাসূলুল্লাহ ﷺ এর জম্ম দিন কে সব ঈদের শ্রেষ্ঠ ঈদ হিসবে পালন করে। যার নাম রেখেছে ঈদে মীলাদুন্নবী। বিদআতীদের নিকট সবচেয়ে বড় ঈদ এবং বড় উৎসবের দিন হলো এই দিন। তারা মহা ধুমধামে বিশাল শোভা যাত্রা এবং বিভিন্ন ভক্তিপূর্ণ গান ও আনন্দ-ফূর্তির মাধ্যমে আয়োজন করে থাকে। আর রাসূল রাসূলুল্লাহ ﷺ এর নামে মিথ্যা কাহিনী বর্ণনার জন্য এই দিন তারা তথাকথিত সীরাত মাহফিলের আয়োজন করে। আজকাল তারা ঈদে মীলাদুন্নবী বা রাসূলুল্লাহ ﷺ এর জ্ম্ম উৎসব পালন কে ফরজ বলেও উল্লেখ করছে।
১। ঈদে মীলাদুন্নবী কি?
ঈদে মিলাদুন্নবী (مَوْلِدُ النَبِيِّ): হল আরবি তিনটি শব্দের সম্মিলিত রূপ। ঈদ, মিলাদ ও নবী এই তিনটি শব্দ নিয়ে এটি গঠিত। আভিধানিক অর্থে ঈদ অর্থ খুশি, মিলাদ অর্থ জন্ম, নবী অর্থ বার্তাবাহক। পারিভাষিক অর্থে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর দুনিয়াতে আবির্ভাবের আনন্দকে ঈদে মিলাদুন্নবী বলা হয়। কাজেই ‘‘মীলাদুন্নবী’’ বলতে শুধুমাত্র রাসূলুল্লাহ্ ﷺ এর জন্মদিনকে বিশেষ পদ্ধতিতে উদযাপন করাকেই বোঝান হয়। জন্মদিনকে উদযাপন বা পালন বা জন্ম উপলক্ষে কিছু অনুষ্ঠান করাই মীলাদুন্নবী হিসেবে মুসলিম সমাজে বিশেষভাবে পরিচিত।
২. রাসূলুল্লাহ ﷺ এর জন্মের সঠিক তারিখ কেউ জাননা।
রাসূলুল্লাহ ﷺ এর জন্ম তারিখ সম্পর্কে অনেকগুলো অভিমত পাওয়া যায়। রাসূলুল্লাহ ﷺ এর জন্মের বছর ও বার নিয়ে তেমন কোন মতভেদ না থাকলেওে, জম্মের তারিখ ও মাস নির্দিষ্ট করা নিয়ে অধিকাংশ মুহাদ্দিস ইতিহাসবিদ, তাফসির কারক, মুফাস্সির, রাসূলুল্লাহ ﷺ এর জম্ম তারিখ নিয়ে মতভেদ করেছেন। এ মতানৈক্যের যৌক্তিক কারণও রয়েছে।
* কারো জানা ছিল না যে, এ (রাসূলুল্লাহ ﷺ) নবজাতক ভবিষ্যতে বড় কিছু হবে? অন্য নবজাতকের জন্মকে যেভাবে নেয়া হত তার জন্মকেও সেভাবে নেয়া হয়েছে। এ জন্য পরিবারের কারো পক্ষে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর জন্ম তারিখ নির্দিষ্টভাবে নিশ্চিত করে রাখা হয়নি।
* রাসূলুল্লাহ ﷺ এর জম্মের পূর্বেই তাহার পিতা মারা জান। মাতা ও ছয় বছর পর মারা যান। কাজেই জম্ম তারিখ মনে রাখার মত আপন আর কেই ছিল না।
* একশত বছর আগের কথা ভাবুন! কত জন মানুষ সঠিকভাবে জম্ম তারিখ জানে? এবার একটু ১৪০০ বছর আগে কথা কল্পনায় নিয়ে আসুন, দেখবেন জম্ম তারিখ মনে রাখা বা লিখে রাখা কতটা অসম্ভব ছিল।
* সবচেয়ে সঠিক ও নির্ভর যোগ্য উৎস হল, কুরআন ও হাদিস। অথচ সেখানে জম্মের দিন সোমবার দিন ছাড়া আর কিছু সহিহ সূত্রে বর্ণিত হয় নি।
৩. এই দিনে খুসিতে যে সব বিনোদন করা হয়
ক. এ দিনে বিশাল বিশাল শোভাযাত্রায় আয়োজন করা হয়। এবং বিভিন্ন ধরনের প্লেকার্ড, পোষ্টার, ফেস্টুন দিয়ে শোভাযাত্রায় সৌন্দর্য বৃদ্ধি করা হয়। যা মুলত অপচয় ছাড়া আর কিছু নয়। এটা অনেকটা শিয়াদের তাজিয়া মিশিলের অনুকরনে করা হয়ে থাকে।
খ. এ উপলক্ষে মিলাদ মাহফিলেন আয়োজন করে থাকে যার কোন শরিয়তের ভিত্তি নেই। এবং উক্ত অনুষ্ঠানে এমন কিছু কবিতা আবৃতি করা হয়, যাতে রাসূল ﷺ এর ব্যাপারে এমন বাড়াবাড়ি রয়েছে, যা আল্লাহ ছাড়া অন্যের কাছে দু’আ করা এবং আশ্রয় প্রার্থনা করা পর্যন্ত নিয়ে যায়।
গ. তৃতিয় ঈদ মনে করে খাওয়া দওয়ার আয়োজন করে থাকে, যা মুসলেমদের অন্য দুই ঈদের সম পর্যায় নিয়ে যায়। এবং আয়োজোকদের কাছ থেকে এও শুনতে পাোওয়া যায়, ‘ঈদে মীলাদুন্নবী’ সকল ঈদের শ্রেষ্ঠ ঈদ।
ঘ. কোন কোন সূফীদের দেখা যায় দলবদ্ধভাবে গান-বাজনা করে, ঢোল বাজায় এবং তাদের বানানো বিদআতী নিয়মে বিভিন্ন জিকির-আজকার করে। কখনও কখনও নারী-পুরুষ একত্রিত হয়ে এসমস্ত কাজে অংশ নিয়ে থাকে। যার কারণে অনেক সময় অশালীন কাজকর্ম সংঘটিত হওয়ার সংবাদও শুনা যায়।
ঙ, ইদানিং দেখা যাচ্ছে শোভাযাত্রায় শেষে এ উপলক্ষে বিশাল সমাবেশের আয়োজন করে থাকে।
চ. অনেকে আবার জলসার আয়োজন করে থাকে, যেখানে তাদের করা পদ্ধতিতে অনুষ্ঠাণ সাজান হয়ে থাকে।
৪. ইসলামে ঈদ হল দুটি যথা: ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা তৃতীয় কোন ঈদ নেই।
আনাস (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী ﷺ মাদীনায় আগমন করার পর তাদের দু’টি দিন ছিল। এ দিন দু’টিতে তারা খেলাধুলা ও আমোদ-প্রমোদ করত। তিনি ﷺ জিজ্ঞেস করলেন, এ দু’টি দিন কি? তারা বলল ইসলামের পূর্বে জাহিলিয়্যাতের সময় এ দিন দু’টিতে আমরা খেলাধুলা করতাম। রসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, এ দু’দিনের পরিবর্তে আল্লাহ তা’আলা তোমাদের জন্য আরো উত্তম দু’টি দিন দান করেছেন। এর একটি হলো ঈদুল আযহার দিন ও অপরটি ঈদুল ফিতরের দিন। সুনানে আবূ দাঊদ ১১৩৪, মিশকাত : ১৪৩৯, আহমাদ : ১৩৬২২, মুসতাদরাক লিল হাকিম : ১০৯১
ইসলামে ঈদ শুধু দু’ টি এ বিষয়টি শুধু সহিহ হাদীস দ্বারাই প্রমাণিত নয়, তা রবং ইজমায়ে উম্মত দ্বারাও প্রতিষ্ঠিত। যদি কেউ ইসলামে তৃতীয় আরেকটি ঈদের প্রচলন করে তবে তা কখনো গ্রহণযোগ্য হবে না। বরং তা দ্বীনের মধ্যে একটা বেদআত ও বিকৃতি বলেই গণ্য হবে। ১২ই রবিউল আউয়ালে ঈদে-মীলাদ উদযাপন করা শরীয়ত বিরোধী কাজ। এ ধরণের কাজ হতে যেমন নিজেদের বাঁচাতে হবে তেমনি অন্যকে বিরত রাখার চেষ্টা করতে হবে।
২. শবে বরাতের বিনোদন
শবে বরাত নামটির সাথে আমরা সকলেই পরিচিত। এই দিন সরকরি ছুটির দিন বলে সকল নাগরিকই জানে এটি একটি ইসলমি দিবস। আমরাও দেখে থাকি এই রাতে প্রতিটি মসজিদে বিভিন্ন আয়োজনের মাধ্যমে রাতটি অতিবাহিত করে। আবার কিছু লোককে দেখা যায় তারা এ রাতের বিশেষ ইবাদতকে বিদআত হবে। আলোচনা সমালোচায় এক পর্যায় শবে বরাত বা মধ্য শাবানের রজনীর এই আমলকে মুরুব্বিদের দোহাই ও সমাজে প্রচলিত বলে দাবি করে থাকে। কিন্তু বাস্তবতা হলোঃ শবে বরাত বা মধ্য শাবানের রজনীর আমল, বিশেষ নামায পড়া, সিয়াম রাখা, মিলাদ পড়া, মিষ্টি মিঠায় বিলি করা, আলোক সজ্জা করা ইত্যাদি ইসলামি শরীআতে একটা নব আবিস্কার বিষয়। এই ধরনের কোন আমল বা অনুষ্ঠান রাসূলুল্লাহ ﷺ এর যুগে কিংবা সাহাবাগণের যুগে ছিল না। পরবর্তীতে আব্বাসীয় খেলাফতের একজন শিয়া মতাদর্শী মন্ত্রী মুহাম্মাদ বিন আলী বিন খলফ এ দিনকে বিশেষ ঈদ বা অনুষ্ঠান হিসেবে পালন করা, মিষ্টি মিঠায় বিলি করা শুরু করেন এবং ৪৪৮ হিজরীতে এক ব্যক্তি বায়তুল মুকাদ্দস মসজিদে বিশেষ নামাযের আয়োজন করেন। আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া
প্রতি বছর হিজরি সালের শাবান মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত রাত্রে মুসলিম উম্মাহ কিছু বিদআতী এই রাতকে সৌভাগ্যের রজনী হিসেবে পালন করে বহু মনগড়া আমল করে থাকে।
১. শবে বরাত রাতে বিতআতি আমল
এই রাতের আমল সম্পর্কে কুরআন সুন্নাহে কোন দিক নির্দেশনা নাই। তারপরও কিছু মানুষ এই রাতে নফল নিয়তে কিছু সালাত আদায় করে থাকে। এই রাতের বিদআতের নামে যে আমল করে সে সম্পরকএ নিচে আলোচনা করা হলো :
ক. রাতে বিশেষ নিয়মে সালাত আদায়
বিদআতিগণ রাতে ইবাদত উপলক্ষে বিশেষ নিয়মে সালাত আদায়ের পদ্ধতি আবিস্কার করেছে।
খ. দিনে সিয়াম পালন
উপমহাদেশে শবে বরাত উপলক্ষে মধ্য শাবানের রাতে সালাত আদায় ও দিনে সিয়াম পালন করাকে ইসলামি বিধান হিসেবে ধরে নেওয়া হয়। এখনও এই আমলটি গুরুত্বসহকারে করা হয়। বিশেষ করে দেওবন্দী অনুসরাণী ও সুন্নী নাম ধারি বিদআতিগণ এই আলম চালু রেখেছেন। অবশ্য দুই একজন ব্যতিক্রমও আছে।
গ. এই রাতে ইসলামি বিষয় আলোচনা ও জিকির করাঃ
এই রাতের নির্দিষ্ট সালাত ছেড়ে দিলেও এশা সালাতের পর ইসলামি বিষয় আলোচনা ও জিকিরের মাহফিল কায়েম করে থাকেন। অনেক মসজিদে আলোচনা করার পর আবার নির্দিষ্ট সংখ্যক (দশ বার রাকাত) সালাত আদায় করার সময় প্রদান করেন। এরপর লম্বা একটি সম্মিলিত মুনাজানের মাধ্যমে শেষ করেন। কোন কোন মসজিদে আরার আলোচনা শেষ করে ব্যক্তিগত আমল জিকির, সালাত, তিলওয়াত করার সময় প্রদান করে। ফজর সালাতের পর সম্মিলিত মুনাজানের মাধ্যমে শেষ করেন। ইসলামি আলোচনা, সালাত, তিলওয়াত, জিকির এবং সম্মিলিত মুনাজান কোনটিই বিদআত নয়। কিন্তু শুধু এই রাতটিক খাস মনে করে সময়ে সাথে নির্দষ্ট করার জন্য বিদআত পরিনত হবে।
ঘ. এই রাতে সম্মিলিতভাবে কবর জিয়ারত করা
অনেক এই রাতে কবর জিয়ারতকে জরুরী মনে করে থাকে। অনেক সময় পূর্নিমার এ রাতে কবরস্থানে শত শত লোক দেখা যায়।
১. শবে বরাত রাতে অনৈতিক বিনোধন
ক. হালুয়া-রুটি খাওয়াঃ
শবে বরাত উপলক্ষ্যে আমাদের সমাজে হালুয়া রুটি তৈরি বেশ প্রচলন আছে। এই বিদআতি কর্মকান্ডের জন্য দায়ী জাল হাদিস। এই কথাগুলিকে জাল হাদিস বলতেও ঘৃনা হয়। অথচ যুগ যুগ ধরে অন্ধ ও অজ্ঞ মুসলীমদের মাঝে হাদিস হিসাবে প্রচলিত। এমনই একটি জাল হাদিস হলো-
আল্লাহর রাসূল (সা.) বলেছেন, শবে বরাতে হালুয়া-রুটি বানালে আরশের নিচে ছায়া পাবে। হাদিসের নামে জালিয়াতী, অস্টম পরিচ্ছেদ, পৃষ্ঠা-৫৪৯, হাদিসের নামে ভিতিহীন কথা, হাদিস নম্বর : ৫১২
মুহাক্কিক আলেমদের মনে ঐ নির্দষ্ট দিনে জাল হাদিসের উপর ভিত্তি করে, মিথ্যা নেকীর উদ্দেশ্য হালুয়া রুটি বানান সম্পূর্ণ বিদআতি কাজ।
খ. এই রাতে বিশেষ মীলাদ মাহফিলের আয়োজন করা
শবে বরাতের রাতে মসজিদে এশার সালাত পর মিলাদ একটি রেওয়াজে পরিনত হয়েছে। আর ৩০/৩৫ বছর ঢাকা আছি অনেক মসজিদে সালাত আদায় করা সৌভাগ্য হয়েছে। মাজার পুজারী বিদআতী ইমাম নয়, ঢাকার অনেক নামিদামি মসজিদের ইমামকে ঢাক-ঢোল পিটিয়ে শবে বরাতের মিলাদে জিলাপি কেনার জন্য চাঁদা আদায় করতে দেখেছি। এই রাতকে সামনে রেখে ঘরে ঘরে গিয়ে মিলাদের জিলপি কেনার টাকা তোলা হয়। বলূত তো এটা কার সুন্নাহ?
রাসূলুল্লাহ ﷺ ও তার সাহাবীগন কি এইভাবে মিলাদের আয়োজন করেছেন। আমাদের চার মাযহাবের কোন ইমান কি এমন আমল করতে বলেছে। শবে বরাত উপলক্ষ্যে মসজিদ ছাড়াও বিদআতিদের খানকাহ ও দরগায়সমূহে বিশাল আয়োজনে মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয়। মিলাদ শেষে চলে মিষ্টি খওয়ার ধুম। চলতে থাকে বিদআতী পন্থায় গরম জিকিরের মজলিশ। এ সব কাজ দ্বীনের মধ্যে বিদআত ছাড়া কিছু নয়।
গ. মসজিদে সম্মিলিতভাবে খাওয়ার আয়োজন করাঃ
চাকুরির সুবাধে চট্রগ্রামের বিভিন্ন মসজিদে বিভিন্ন কর্মকান্ড দেখান সৌভাগ্য হয়েছে। এ সব মসজিদে, এ রাতে বিদআতীগণ মিলাদ উপলক্ষে রান্না করা খাবার (পায়েশ, ভাত-গোশতের তরকারী, হালূয়া-রুটি) জমা করে। এশার সালাতের পর সম্মিলিতভাবে মিলাদের আয়োজন করে এবং মীলাদ শেষে সকলে মিলে ঐ জমা করা খাদ্য খায়। মনে হবে, কোন একটি অনুষ্ঠানের খাওয়া দাওয়া চলছে। এই কাজকে তারা ইসলামি কাজ মনে করে নেকীর জন্য করছে অথচ এর কোন দলীল প্রমান কুরআন সুন্নাহতে নেই। এই ভাবে খেতে অসুবিধা নেই কিন্তু নির্দষ্ট দিনে নেকী আশায় আমল করলে তা রাসূলুল্লাহ ﷺ থেকে প্রমানিত হতে হবে নতুবা বিদআত হবে।
ঘ. এই রাতে আলোক সজ্জা করা এবং আতশবাজী করা :
আমাদের সমাজে সাধারণ বিহাহের আয়োজনে, আনন্দ উত্সবে বা কোন খুসির কারনে আলোক সজ্জা করা হয়। আতশবাজী ফুটান হয়। এই দুটি কাজই সময় ও অর্থের অপব্যয় করে থাকে। ইসলামি শরীয়তের দৃষ্টিতে এ দুটি কাজই হারাম। মহান আল্লাহ বলেন-
اِنَّ الۡمُبَذِّرِیۡنَ کَانُوۡۤا اِخۡوَانَ الشَّیٰطِیۡنِ ؕ وَکَانَ الشَّیۡطٰنُ لِرَبِّہٖ کَفُوۡرًا
নিশ্চয় অপব্যয়কারীরা শয়তানের ভাই। আর শয়তান তার রবের প্রতি খুবই অকৃতজ্ঞ। সুরা ইসরা : ২৭
ইবাদাত মনে করে শবে বরাতকে কেন্দ্র করে আতশবাজি ও আলোকসজ্জা করা বিদআত। সুতারং এই কাজটি হারাম হওয়া পাশাপাশি বিদআতও বটে। তাই এ রাত উপলক্ষ্যে রাস্তা-ঘাট, ঘর-বাড়ি, মসজিদ, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি আলোকসজ্জা করা যাবে না। এ কাজ শরীয়তসম্মত নয়। ইতিহাসে উল্লেখ করা হয়েছে যে, আলোক সজ্জা হচ্ছে গ্রীক ধর্মের একটি প্রথা। সেখান থেকে পর্যায়ক্রমে হিন্দু ধর্মের প্রথা হিসেবে রূপ লাভ করে যা শেষ পর্যন্ত দেয়ালীপূজা নামে মশহুর হয়। আলোক সজ্জা সেখান থেকে পর্যায়ক্রমে মুসলমানগণের মধ্যে প্রবেশ করে। যা আমাদের দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত নয়। প্রকৃতপক্ষে আতশবাজিও হিন্দু ধর্মের একটি প্রথা। এসব কাজের মাধ্যমে একদিকে লক্ষ লক্ষ টাকা শুধু অপচয় করা হয় না বরং এগুলো অগ্নি পুজকদের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ।
৩. আশুরার দিন আনন্দ–উৎসব করা
ইসলামি শরীয়তের কিছু পর্ব বা দিবস আছে, যা মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কতৃর্ক নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। এই সকল দিনে সুন্নাহ মোতাবেগ আমল করলে বহু নেকি পাওয়া যায়। এমনি একটা দিবসের নাম আশুরা। হিজরী সনের প্রথম মাস মহররমের দশ তারিখ আশুরা নামে পরিচিত। অনারবদের অধিকাংশের নিকট আশুরা মানে মহররমের দশ তারিখ। মহররম মাসের দশ তারিখকে নির্দিষ্ট করে বলা হয় ‘আশুরায়ে মহররম’। কিছু বিশেষ কারণে এ দিনটি আল্লাহর কাছে খুব প্রিয়, তাই তিনি এ দিনে রোজা পালন ও নফল ইবাদত করায় সওয়াব প্রদান করে থাকেন বহুগুণে।
১. আশুরার সিয়ামের পটভূমি সম্পর্কিত হাদিস-
আবূ মূসা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আশূরার দিনকে ইয়াহুদীগণ ঈদ মনে করত। নাবী ﷺ বললেন, তোমরাও এ দিনে সিয়াম পালন কর। সহিহ বুখারি : ২০০৫
ইবনু ‘আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ ﷺ মাদীনায় গমন করার পর দেখলেন ইয়াহূদীরা ‘আশূরার দিন সিয়াম রাখে। রসূলুল্লাহ ﷺ তাদের জিজ্ঞেস করলেন, এ দিনটার বৈশিষ্ট্য কি যে, তোমরা সিয়াম রাখো? তারা বলল, এটা একটি গুরুত্ববহ দিন। এ দিনে আল্লাহ তা‘আলা মূসা (আ.) ও তাঁর জাতিকে মুক্তি দিয়েছেন। আর ফিরাউন ও তার জাতিকে (সমুদ্রে) ডুবিয়েছেন। মূসা (আ.) শুকরিয়া হিসেবে এ দিন সিয়াম রেখেছেন। অতএব তাঁর অনুসরণে আমরাও রাখি। এ কথা শুনে রসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, দীনের দিক দিয়ে আমরা মূসার বেশী নিকটে আর তার তরফ থেকে শুকরিয়া আদায়ের ব্যাপারে তোমাদের চেয়ে আমরা বেশী হকদার। বস্তুত ‘আশূরার দিন রসূলুল্লাহ ﷺ নিজেও সিয়াম রেখেছেন অন্যদেরকেও রাখার হুকুম দিয়েছেন। সহিহ বুখারি : ২০০৪, সহহি মুসলিম : ১১৩০, সুনানে ইবনু মাজাহ : ১৭৩৪, মিশকাত : ২০৬৭, আহমাদ ৩১১২
২. আশুরার দিনের সিয়ামের ফজিলতঃ
হুরায়রাহ্ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, রমযানের সিয়ামের পর সর্বোত্তম সওম হচ্ছে আল্লাহর মাস মুহাররমের সওম এবং ফারয (ফরয) সালাতের পর সর্বোত্তম সালাত হচ্ছে রাতের সালাত। সহিহ মুসলিম : ১১৬৩, সুনানে আবূ দাঊদ : ২৪২৯, সুনানে তিরমিযী : ৪৩৮, সুনানে নাসায়ী : ১৬১৩, মিশকাত : ২০৩৯
আবূ কাতাদাহ আল-আনসারী (রা.) হতে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) ‘আরাফাহর দিনে সওম সম্বন্ধে জিজ্ঞাসিত হয়ে বললেন-এর দ্বারা বিগত ও আগত এক বছরের গুনাহ মোচন হয়। আশুরাহর দিনের সিয়াম পালন সম্বন্ধে জিজ্ঞাসিত হয়ে বললেন-বিগত এক বছরের পাপ মোচন হয়। সোমবারের দিনে সওম পালন সম্বন্ধে জিজ্ঞাসিত হয়ে বললেন, এটা সেদিন যেদিন আমি জন্মেছি এবং নুবুওয়াত লাভ করেছি আর আমার উপর (কুরআন) অবতীর্ণ হয়েছে।” সহিহ মুসলিম : ১১৬২, সুনানে তিরমিযী : ৬৭৬, সুনানে নাসায়ী : ২৩৮২, সুনানে আবু দাউদ : ২৪২৫, সুনানে ইবনু মাজাহ : ১৭১৩, আহমাদ : ২২০২৪
আব্দুল্লাহ ইবনু ’আব্বাস (রাযি.) বলেন, নবী ﷺ যখন নিজে আশূরার দিন সওম রাখলেন এবং আমাদেরকেও এ সওম পালনের নির্দেশ দেন, তখন লোকেরা বললো, হে আল্লাহর রাসূল! ইয়াহূদী ও খৃস্টানরা এ দিনটিকে সম্মান করে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেনঃ আগামী বছর এলে আমরা নবম দিন সওম পালন করবো। কিন্তু আগামী বছর না আসতেই রাসূলুল্লাহ ইন্তেকাল করেন। আবূ দাউদ : ২৪৪৫, আহমাদ : ২১০৭, ২৬৩৯, সুনানে দারেমী : ১৭৫৯
৩. বিদআত ফির্কার উদযাপন
উপরে সহিহ হাদিসগোলোর মধ্যমে আশুরার পটভূমি সিয়ামের ফজিলত সম্পর্কে জানতে পারি। কিন্তু সিয়াম পালনের বাহিরে দুটি ফির্কা এ দিবসে ভিন্ন ভিন্ন শরীয়ত বিরোধা কার্যক্রম পরিচালনা করে। এ বাতিল ফির্কা হলো-
ক. ব্রেলভী বা রেজভী ফির্কা
খ. শিয়া ফির্কার
৪. ব্রেলভী বা রেজভী ফির্কা উদযাপন :
আমাদের উপমহাদেরশ যারা পীর, মুরিদী ও মাজার কেন্দ্রিক আমলে বিশ্বাসি, সাধারনত তারাই ব্রেলভী বা রেজভী ফির্কা লোক। মূলত মাজার কেন্দ্রিক আমলে বিশ্বাসিগণই হল উপমহাদেশে বিদআতি আমলের পাওয়ার হাউজ। অথচ তারা তাদের নিজেদের নাম রেখেছে সুন্নি মুসলিম। এ সকল সুন্নি নামধারি বিদআতি মুসলিম জনসাধারণের দিকে তাকালে আপনি দেখবেন যে, তারা এ আশুরাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ধরনের কাজ-কর্মে লিপ্ত হয়ে পড়ে। এবং এ কাজগুলো তারা আশুরার আমল মনে করেই করে থাকে। যেমন-
*আশুরার রাত্রি জাগরণ করে ইবাদাত করে
* বিভিন্ন প্রকার উন্নত খাবারের ব্যবস্থা করে
* ওয়াজ মাহফিল ও আলোচনা সভা করে
* মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করে
* কেউ কেউ পশু জবেহ
* কেউ কেউ শীয়দের অনুকরণে ইমাম হুসাইন (রা.) এর শাহাদাতের স্মরনে প্রতিকৃতি বানায়
* অনেকে শোক প্রকাশের জন্য শীয়াদের মত তাযিয়া মিছিল বের করে
কষ্টের ব্যাপার হল, এগুলো বিভ্রান্ত শিয়া ও রাফেজীদের কাজ হলেও দুঃখজনক ভাবে এই বিদআতগুলি আজ সুন্নী নামের কিছু মুসলিম ভাইদের মাঝে ছড়িয়ে পড়েছে।
৫. শিয়া ফির্কার কর্মকান্ড
শীয়া সম্প্রদায়ের লোকদের এই দিনটি খুবই পবিত্র মনে করে। তাদের বিশ্বাস আশুরার দিনে তাদের প্রান প্রিয় ইমাম হুসাইন রাদিয়াল্লাহ আনহু (শীয়াগন তাদের ইমাম (আ.) কে বলে) এই দিনে কারবালাতে যুদ্ধ করে শহীদ হন। তারা এ সম্পর্কে এমন সব উদ্ভট আকিদা রাখেন যার সমর্থনে কুরআন বা সহিহ হাদিসের কোন প্রমাণ নেই।
৬. কারবালার ঘটনার সাথে আশুরার সম্পর্ক কি?
কারবালায় ইমাম হুসাইন (রা.) শাহাদাত বরনের সাথে আশুরার কোন সম্পর্ক নেই। আমরা হাদিসের আলোকে যে আশুরার করা বলেছি উহা রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওফাতের আগের ঘটনা। তিনি নিজে আশুরার ফজিলত ও গুরুত্ব সাহাবিদের সামনে তুলে ধরেছেন। মুছা আলাইহিস সালামে বিজয়ের শুকরিয়া স্বরুপ সিয়াম পালন করেছে। যেমন হাদিসে এসেছে,
ইবনু আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ ﷺ মাদীনায় গমন করার পর দেখলেন ইয়াহূদীরা ‘আশূরার দিন সিয়াম রাখে। রসূলুল্লাহ ﷺ তাদের জিজ্ঞেস করলেন, এ দিনটার বৈশিষ্ট্য কি যে, তোমরা সিয়াম রাখো? তারা বলল, এটা একটি গুরুত্ববহ দিন। এ দিনে আল্লাহ তা‘আলা মূসা (আ.) ও তাঁর জাতিকে মুক্তি দিয়েছেন। আর ফিরাউন ও তার জাতিকে (সমুদ্রে) ডুবিয়েছেন। মূসা (আ.) শুকরিয়া হিসেবে এ দিন সিয়াম রেখেছেন। অতএব তাঁর অনুসরণে আমরাও রাখি। এ কথা শুনে রসূলুল্লাহ ﷺ বললেনঃ দীনের দিক দিয়ে আমরা মূসার বেশী নিকটে আর তার তরফ থেকে শুকরিয়া আদায়ের ব্যাপারে তোমাদের চেয়ে আমরা বেশী হকদার। বস্তুত ‘আশূরার দিন রসূলুল্লাহ ﷺ নিজেও সিয়াম রেখেছেন অন্যদেরকেও রাখার হুকুম দিয়েছেন। সহিহ বুখারী : ২০০৪, সহিহ মুসলিম : ১১৩০, ইবনু মাজাহ : ১৭৩৪, মিশকাত : ২০৬৭, আহমাদ : ৩১১২
অপর পক্ষ, শিয়ারা যে আশুরা কথা গুরুত্ব দিয়ে বলে থাকে তা এক নয়। রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর ইন্তেকালের প্রায় পঞ্চাশ বছর পর হিজরী ৬১ সালে কারবালার ময়দানে জান্নাতী যুবকদের নেতা, রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রিয় নাতী সাইয়েদুনা হুসাইন (রা.) শাহাদাত বরণ করেন। ইসলামের ইতিহাসে মুসলিম উম্মাহর জন্য এটা একটা হৃদয় বিদারক ঘটনা। ঘটনাক্রমে এ মর্মান্তিক ইতিহাস এ আশুরার দিনে সংঘঠিত হয়েছিল। এটি ছিল উম্মতের ওপর নেমে আসা সবচে বড় বিপদগুলোর একটি।
উপরের আলোচনার মাধ্যমে আশা করি আশুরা সম্পর্কে একটা ষ্পষ্ট ধারনা হয়েছে যে হাদিসে বর্ণিত আশুরা আর শিয়াদের উদযাপিত আশুর মাঝে কোন প্রকারের সম্পর্ক না্ই
৭. এ বিবস উপলক্ষে শিয়াদের বিদআত
ক. আশুরার দিনে মাতম করাঃ
উপরের আলোচনার মাধ্যমে জানতে পেরেছি, বর্তমানে আশুরার দিনে হুসাইন (রা.) এর নামে যে অনুষ্ঠান, মাতম, বুক ও গাল থাপড়ানো, উচ্চ স্বরে ক্রন্দন এবং বিলাপ করে থাকে তার কোনো ভিত্তি নেই।
খ. শাহাদতে হুসাইনের শোক পালনের উদ্দেশ্যে সিয়াম পালন করাঃ
হাদিসের আলোকো সুন্নাহ সম্মত সিয়াম পালনের কথা বলা হয়েছে। আমরা দেখেছি আশুরার সিয়াম একটি সুন্নাহ সম্মত ইবাদাত। কিন্তু শীয়া ও সুফি তরিকার অনুসরিগণ হুসাইন (রা.) শোক পালনের উদ্দেশ্যেই বিভিন্ন শরীয়ত বিরোধী কাজে লিপ্ত থাকে এবং এর পাশাপাশি তারা শাহাদতে হুসাইনের শোক পালনের উদ্দেশ্যে ছিয়াম পালন করে থাকে, যা সম্পূর্ণরূপে সহিহ হাদিস বিরোধী এবং স্পষ্ট বিদ‘আত।
গ. ১০ই মুহাররমকে আনন্দ উৎসবে পরিণত করাঃ
শীয়াদের একটি দল হুসাইন (রা.) এর শাহাদতের শোক স্বরূপ শোক দিবস পালন করে। পক্ষান্তরে একটি গোষ্ঠী রাফেযীদের বিরোধিতা করার লক্ষ্যে এ দিনটিকে আনন্দ উৎসবে পরিণত করে।
ঘ. তাযিয়া মিছিল বাহির করাঃ
তাযিয়া অর্থ বিপদে সান্ত্বনা দেওয়া। যেটা বর্তমানে শাহাদাতে হোসাইনের শোক মিছিলে রূপ নিয়েছে। অথচ ইসলামে কারো মৃত্যুতে তিন দিনের অধিক শোক পালন করা নিষেধ। অথচ শিয়ারা প্রতি বছর শাতাদা বার্ষিকতে ও তাযিয়া মিলিল বের কর। মিডিয়ার কারনে তাযিয়া মিসিলের ব্যাপক প্রচার প্রসার ঘটেছে বিধায এখন সকলে মনে করে, আশুরা তাযিয়া মিসিল।
ঙ. ১০ই মুহাররমে চোখে সুরমা লাগানোঃ
অনেকেই আশুরার দিন বা ১০ই মুহাররমে বিশেষ ফযীলতের আশায় চোখে সুরমা লাগিয়ে থাকে; যা সুস্পষ্ট বিদ‘আত।
চ. তাবেঈ ইয়াযীদ বিন মুয়াবিয়াকে ‘মালঊন’ বা অভিশপ্ত বলে গালি দেওয়াঃ
ইয়াযীদ বিন মুয়াবিয়াকে ‘মালঊন’ বা অভিশপ্ত বলে গালি দেওয়া আদৌ ঠিক নয়। বরং সকল মুসলমানের ন্যায় তার মাগফেরাতের জন্য দো‘আ করা উচিত। কেননা মানুষ হিসাবে তার কিছু ভুল-ত্রুটি থাকলেও কারবালার মর্মান্তিক ঘটনার জন্য তিনি দায়ী নন। এজন্য মূলতঃ দায়ী বিশ্বাসঘাতক কূফাবাসী ও নিষ্ঠুর গভর্ণর ওবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদ। কেননা ইয়াযীদ কেবল হুসাইন (রা.)-এর আনুগত্য চেয়েছিলেন, তাঁর খুন চাননি। হুসাইন (রা.) সে আনুগত্য দিতেও প্রস্ত্তত ছিলেন। ইয়াযীদ স্বীয় পিতার অছিয়ত অনুযায়ী হুসাইনকে সর্বদা সম্মান করেছেন এবং তখনও করতেন। হুসাইন (রা.)-এর ছিন্ন মস্তক ইয়াযীদের সামনে রাখা হলে তিনি কেঁদে বলে ওঠেন, ‘ওবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদের উপর আল্লাহ লা‘নত করুন। আল্লাহর কসম! যদি হুসাইনের সাথে ওর রক্তের সম্পর্ক থাকত, তাহলে সে কিছুতেই তাঁকে হত্যা করত না। তিনি আরো বলেন, হুসাইনের খুন ছাড়াও আমি ইরাকীদেরকে আমার আনুগত্যে রাযী করাতে পারতাম। (ইবনু তায়মিয়া, মুখতাছার মিনহাজুস সুন্নাহ, ১/৩৫০; আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ ৮/১৭৩; আশূরায়ে মুহাররম ও আমাদের করণীয়, পৃঃ ৭-১০।
৪. মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা
আমাদের সমাজে ‘মিলাদ মাহফিল’ একটি ব্যাপক প্রচলিত ধর্মীয় অনুষ্ঠান, মসজিদের ইমাম সাহেব সালাত শেষে প্রায়ই ঘোষণা করে থাকেন, দোয়া বাদ মিলাদ আছে। সাধারণ মানুষের মনে এই ধারণা বদ্ধমূল যে, যেহেতু এটি মসজিদে অনুষ্ঠিত হয় এবং ধর্মীয় ব্যক্তিত্বরা এর নেতৃত্ব দেন, তাই এটি নিছন্দেহে একটি বৈধ ইবাদত বা কল্যাণের মাধ্যম। এই কারণে, অনেকেই প্রশ্ন তোলেন যে, এত প্রচলিত একটি প্রথাকে ‘বিদআত’ বলা কি সঠিক?
মিলাদ বিদআত কেন?
১. মিলাদ রাসুল ﷺ, সাহাবী, তাবেই, তাবে-তাবেইন দের যুগ পর্যন্ত ছিলইনা।
২. মিলাদ একটা ইবাদত মনে করা হয় যার পক্ষে রাসুল ﷺ থেকে কোন নির্দেশনা নেই।
৩. মিলাদ আমল হিসাবে আদায় করা হয় এবং এর পদ্ধতিও আবিস্কার করা হয়েছে। প্রত্যেক আদায়কারী এর মাধ্যমে সওয়াব আশা করে থাকে। কাজেই এটা বিদআত।
৪. রাসুল ﷺ তাঁর জন্মের শুকরিয়া হিসেবে সোমবার ব্যক্তিগত সিয়াম পালন করতেন। রাসুল ﷺ সোমবার সিয়াম পালন করতেন সেটা তাঁর নিজের কৃতজ্ঞতা বোধ আল্লাহর প্রতি। আজকে যারা মিলাদুন নবীর কথা বলে তারা কিন্তু প্রতি সপ্তাহে সোমবারের কথা কিছুই বলে না। ভন্ডামি করে এই সোমবারের উদাহরণ পেশ করে বাত্সরিক মিলাদ করে থাকে।
৫. মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয় বিন্ন উপলক্ষে, যেমন- নতুন ঘর তৈরি বা গৃহে প্রবেশ, দোকান বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের উদ্বোধন, বিয়ে বা মৃত্যুবার্ষিকী, চল্লিশা, ঈদে মিলাদুন্নবী উপলক্ষে। ইসলামে এই ধরনের পার্থিব বা ব্যক্তিগত সাফল্যের জন্য বিশেষ কোনো সম্মিলিত ইবাদত অনুষ্ঠানের নিয়ম নেই। নো সুনির্দিষ্ট উপলক্ষ বা দিনে ইবাদতকে আবদ্ধ করে ফেলা বিতআত।
৬. সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, এই অনুষ্ঠানটিকে একটি স্বতন্ত্র ইবাদত হিসেবে গণ্য করা। অথচ ইবাদত হতে হলে তার পদ্ধতি, সময় ও কারণ অবশ্যই আল্লাহর রাসূল (ﷺ) কর্তৃক অনুমোদিত হতে হবে।
নোট : গত কয়েক দশক আগেও হয়তো এই বিষয়টি সাধারণ মানুষের কাছে বোঝানো কঠিন ছিল। কিন্তু বর্তমানে ইসলামিক জ্ঞান সহজলভ্য হওয়ায়, আলিম সমাজ এবং সচেতন মুসলিমরা বুঝতে পারছেন যে সমাজে প্রচলিত এই মিলাদ মাহফিলের পদ্ধতিটি একটি বিদআত, যা পরিহার করা ইসলামের সঠিক পথে থাকার জন্য অপরিহার্য। এটি কোনো ব্যক্তির সম্মান বা ভালোবাসা নিয়ে প্রশ্ন নয়, বরং ইবাদতের ক্ষেত্রে রাসূল (ﷺ)-এর দেখানো পথ অনুসরণ করার বিষয়।
এ বিদআতটি কেন বিনোদনে মাঝে উপস্থাপন করলাম?
মিলাদ মাহফিলের আয়োজন একটি ধর্মীয় প্রথা হিসেবে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হলেও, এটিকে বিনোদনের প্রসঙ্গে নিয়ে আসার মূল কারণ এর আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি এবং মিষ্টি বিতরণের সামাজিক দিক। ইবাদত এবং বিনোদন, এই দুটি বিষয়ের মধ্যেকার সূক্ষ্ম পার্থক্যটি মিষ্টি বিতরণের মাধ্যমে লুপ্ত হয়ে যায়।
ইসলামে ফরজ বা নফল ইবাদত, যেমন সালাত বা রোজা পালনের পর আনুষ্ঠানিকভাবে মিষ্টি বিতরণ বা ভোজের আয়োজন করা হয় না। ইবাদত পালনের উদ্দেশ্য সরাসরি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা, যেখানে বিনোদন হলো মনস্তাত্ত্বিক আনন্দ বা উল্লাস। সমাজে মিষ্টি বিতরণের প্রচলন মূলত পার্থিব আনন্দ সংবাদ—যেমন: কোনো পরীক্ষায় সফলতা, নতুন চাকরি লাভ, বা পারিবারিক শুভ বিবাহের মতো ঘটনাকে কেন্দ্র করে। যখন মিলাদ মাহফিলের মতো একটি অনুষ্ঠান শেষে ব্যাপক হারে মিষ্টি বিতরণ করা হয়, তখন এই পুরো অনুষ্ঠানটি একটি খুশির উপলক্ষ বা সামাজিক উৎসবের মেজাজ লাভ করে।
এই অনুষ্ঠানের মূল ধার্মিকতার চেয়ে শিশুদের এবং অনেক সাধারণ মানুষের কাছে এর প্রধান আকর্ষণ হয়ে ওঠে এই মিষ্টি। পাড়া-মহল্লার শিশু-কিশোরেরা এই মাহফিলের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে, কারণ তারা জানে যে শেষে লাইন ধরে মজা করে মিষ্টি বা তাবারুক নিতে পারবে। তাদের কাছে এটি এক ধরনের ‘প্রাইজ মানি’ বা ‘ঈদ বোনাস’-এর মতো। তাই, তাদের কাছে মিলাদ মাহফিলের আধ্যাত্মিক বা ধর্মীয় গুরুত্বের চেয়ে মিষ্টি সংগ্রহ এবং সেই উপলক্ষ্যে একত্রিত হওয়ার সামাজিক আনন্দ বা উল্লাস অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে।
এভাবেই, বিদআতের মাধ্যমে সৃষ্ট এই অনুষ্ঠানটি ধর্মীয় মোড়কের আড়ালে সমাজে একটি সামাজিক বিনোদনমূলক রেওয়াজ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এই কারণে, আপনি এটিকে অনৈতিক বা বিদআতি বিনোদনের তালিকায় উপস্থাপন করেছেন, কারণ এর কার্যকারণ এবং ফলাফল একে নিছক ইবাদতের চেয়ে ‘বিনোদন’ বা ‘উৎসব’ হিসেবেই বেশি প্রতিষ্ঠিত করেছে।
৫. ফাতিহা–ই-ইয়াজদাহাম
রড় পীর খ্যাত আব্দুল কাদের জিলানী (রহ.) হিজরী ৫৬১ সালের ১১ রবিউস সানী ৯১ বছর বয়সে পরলোক গমন করেন। তার কিছু অনুসারি প্রতি বছর অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তার ওফাতের দিন পালন করে থাকেন। তার মৃত্যু বার্ষিকী ফাতিহা–ই-ইয়াজদাহাম হিসেবে পরিচিত। ফাতিহা ও ইয়াজদাহম দুটি ফার্সি শব্দ। ফাতিহা অর্থ দোয়া, আর ইয়াজদাহম অর্থ এগারো। ফাতিহা-ই-ইয়াজদাহম’ বলতে এগারো-এর ফাতিহা বা দোয়াকে বুঝায়। এক কথায় রবিউস সানি মাসের ১১ তারিখের ইছালে সওয়াবের মাহফিলকে ‘ফাতিহা-ই-ইয়াজদাহম’ বলে। ফার্সি ভাষার প্রভাবে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, ইরান, বৃহৎ রাশিয়ার মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চল, ইরাক প্রভৃতি স্থানে ‘ফাতিহা-ই-ইয়াজদাহম’ অর্থাৎ এগারো-এর ফাতিহা নামে উদ্যাপিত হয়। এই দিনটি উৎযাপন করা যে বিদআতে তাতে কোন সন্দেহ নেই। কারন ইসলামে কোন জন্ম মৃত্যু বার্ষিকী পালন করা হারাম কাজ।
আব্দুল কাদের জিলানী (রহ.) হলেন ধর্মে অন্যতম প্রধান আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ত্ব। তিনি ইসলামের অন্যতম প্রচারক হিসাবে সুবিদিত। আব্দুল কাদের জিলানী (রহ.) কে ‘বড়পীর’ হিসাবে মুসলিম বিশ্বে সমধিক পরিচিত। তিনি ০১ রমজান ৪৭১ হিজরিতে ইরাকের বাগদাদ নগরের অন্তর্গত জিলান শহরে জন্ম গ্রহণ করেন। জিলানের অধিবাসি হিসাবে তিনি জিলানী নামে নামে পরিচিতি লাভ করে। তাকে সম্মান প্রদানের জন্য আবু মোহাম্মাদ মুহিউদ্দিন নামে উপাধি প্রদান করা হয়। তার পিতার নাম আবু সালেহ মুছা জঙ্গী এবং মাতার নাম উম্মুল খায়ের ফাতেমা। জীবনি লেখকদের মতে তার মাতা হাসান ইবনে আলী (রা.) এর বংশধর।
ফাতিহা-ই-ইয়াজদাহাম উপলক্ষে বিদআতি কার্যক্রম
১. বিশেষ ধর্মীয় সভার আয়োজন
দিনটিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পালন করতে বিশেষ মাহফিল বা ওরশ-এর আয়োজন করা হয়। এই মাহফিলে আব্দুল কাদের জিলানী (রহ.)-এর জীবন নিয়ে আলোচনা করা হয়, তবে এর প্রধান উদ্দেশ্য থাকে দিনটিকে একটি উৎসব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। বিশেষত মাজারে (তাঁর কবরের কাছে) অনুসারীরা ভিড় করে। অনেকে কবরের চারপাশ তাওয়াফ করে, কবরে সিজদা করে বা কবরে ফুলের চাদর দেয়—যা স্পষ্টতই শিরক-এর অন্তর্ভুক্ত।
২. বিশেষ খাদ্য ও পানীয় বিতরণ
এই দিনে ব্যাপকভাবে শিরনি (মিষ্টান্ন), তাবারুক (খাবার) তৈরি করা ও বিতরণ করা হয়। এই বিশেষ খাবারকে কেন্দ্র করে একটি ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা তৈরি হয় যে, এই দিনে এই কাজটি করতেই হবে। এটি ঈদ বা অন্য কোনো সুন্নাহসম্মত দিনে খাবার বিতরণের মতো স্বাভাবিক দান নয়, বরং একটি বিদআতি প্রথার অংশ। অনেক অঞ্চলে ফাতিহা-ই-ইয়াজদাহামের সাথে নির্দিষ্ট কিছু খাবার বা রেসিপি জড়িয়ে দেওয়া হয়, যা ইসলামে কোনো নির্দিষ্ট দিবসের জন্য নির্ধারিত নয়।
৩. আলোকসজ্জা ও অলংকরণ
ওরশ বা মাহফিলের স্থান, মাজার এবং কখনো কখনো ঘরবাড়িও আলোকসজ্জা করা হয়। এই ধরনের আলোকসজ্জা উৎসবের আমেজ তৈরি করে, যা শুধুমাত্র ইসলামে অনুমোদিত দুটি ঈদ বা সুন্নাহসম্মত উপলক্ষে (যেমন: বিবাহ) করা যেতে পারে। পীর বা বুজুর্গের সম্মানার্থে বিভিন্ন ধরনের রঙিন ব্যানার, ফেস্টুন, এবং ঝালর দিয়ে স্থানটিকে সাজানো হয়, যা ধর্মীয় অনুষ্ঠানের অংশ নয়।
৪. সাওয়াবের ভুল ধারণা
‘ইছালে সওয়াব’ (সওয়াব পৌঁছানো) করার উদ্দেশ্যে সম্মিলিতভাবে দোয়া ও ফাতেহা পাঠ করা হয়। যদিও এককভাবে কারো জন্য দোয়া করা বৈধ, কিন্তু এই দিনটিতে বাধ্যতামূলকভাবে একটি বিশেষ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সওয়াব পৌঁছানোর প্রথা প্রতিষ্ঠা করা বিদআত। অনেক ক্ষেত্রে বিশেষ সওয়াব অর্জনের জন্য নির্দিষ্ট কিছু পুস্তক বা প্রবন্ধ পাঠ করা হয়, যা রাসূল (ﷺ) বা সাহাবীদের (রা.) যুগে প্রচলিত ছিল না।
উপসংহার : আব্দুল কাদের জিলানী (রহ.) নিঃসন্দেহে একজন মহান বুজুর্গ ও আলিম ছিলেন। কিন্তু তাঁর প্রতি সম্মান জানাতে গিয়ে তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী উদযাপন করা বা কোনো বিশেষ ধর্মীয় উৎসব পালন করা ইসলামে অনুমোদিত নয়। যেহেতু ইসলামে মৃত্যুবার্ষিকী পালন করা হারাম (যেহেতু এর কোনো ভিত্তি কুরআন-সুন্নাহতে নেই), তাই এর সাথে যুক্ত হওয়া সকল আনুষ্ঠানিকতাই বিদআত বা শিরক-এর পর্যায়ে পড়ে। মুসলিমদের উচিত, কোনো ব্যক্তি বা দিবসের প্রতি সম্মান জানাতে গিয়ে শরীয়ত বিরোধী কা
৬. পীরের মাজারে উরশ উৎযাপন
১. উরশ কোন ভাষার শব্দ?
উরশ (ﻋُﺮﺱ) একটি আরবি শব্দ। উরশ শব্দের আভিধানিক অর্থ বিবাহ বা বিবাহ অনুষ্ঠান, বাসর রাত বা বর ও কনের প্রথম মিলন, ওয়ালীমা বা প্রীতিভোজ। এককভাবে উরুশ (ﻋَﺮُﻭﺱ) শব্দ দ্বারা বর ও কনে উভয়কেই বোঝানো হয়।
২. উরশ শব্দের প্রচলিত পরিভাষা
সাধারণ মুসলিম সমাজে এবং বিশেষ করে সুফিবাদের অনুসারীদের মধ্যে ‘উরশ’ শব্দটি একটি বিশেষ অর্থে ব্যবহৃত করে। সুফি সাধকগণ তাদের পীর বা বুজুর্গ ব্যক্তির মৃত্যুবার্ষিকী বা ওফাত দিবস উপলক্ষে আয়োজিত বার্ষিক অনুষ্ঠান বা মাহফিলকে পারিভাষিক অর্থে ‘উরশ’ বলা হয়।
উরশের মূল আভিধানিক অর্থ (বিবাহ বা মিলন) থেকে ধারণা নেওয়া হয়েছে। সুফি মতবাদে বিশ্বাস করা হয় যে, একজন নেককার বুজুর্গ ব্যক্তির মৃত্যু তাঁর প্রিয়তমের (আল্লাহর) সাথে মহামিলন বা মিলন রাত্রি। তাই তাঁদের মৃত্যুদিবসকে ‘ইয়াওমুল উরস’ (মিলনের দিন) বা সংক্ষেপে ‘উরশ’ নামে অভিহিত করা হয়।
৩. উরশ উপলক্ষ ভক্তগন যে সকর কাজ করে থাকে
১. মাজারে তাওয়াকরে, কোন কোন ক্ষেত্র সিজদা করে
২. নারী পুরুষ একত্র মিলিত হয়ে হু হু হু জিকির করে
৩. মাজারের মানত কালেকশন করে
৪. মানতকৃত গরু, মহিষ, ছাগর জবেন কবে।
৫. ভক্তদের জন্য খাবার বিতরণ করে
৬. রাতে গাজা বা নেষার আশর বসে।
৭. মাযারকে ঘিরে বাতি প্রজ্বলন করে ও চাদর চড়ায়।
৮. কবর পাকা করে, কবরের উপর গম্বুজ নির্মান করে।
৪. এ কাজগুলো জঘন্য পাপাচার কেন?
পীরের মাজারে ‘উরশ’ উদযাপনকে কেন্দ্র করে ভক্তরা যে কার্যকলাপগুলো করে, তার সাথে ইসলামের মৌলিক শিক্ষার ন্যূনতম সম্পর্কও পরিলক্ষিত হয় না; বরং এই কার্যকলাপগুলো ইসলামের নীতির (তাওহীদ) সম্পূর্ণ পরিপন্থী এবং ঘোর বিদআত (ধর্মীয় নব-উদ্ভাবন) ও শিরক-এর শামিল। উরশের নামে ভক্তদের কার্যকলাপের প্রতিটি ধাপই শরীয়তের সীমালঙ্ঘন করে।
মাজারে তাওয়াফ করা এবং কিছু ক্ষেত্রে সিজদা করা স্পষ্টত শিরক, যা একমাত্র আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট ইবাদতকে সৃষ্টির প্রতি নিবেদন করে। এই ধরনের কাজ ইসলাম থেকে ব্যক্তিকে বের করে দেয়। একইভাবে, কবর পাকা করা এবং সেগুলোর উপর গম্বুজ বা স্থাপত্য নির্মাণ করা রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কর্তৃক কঠোরভাবে নিষিদ্ধ; এর উদ্দেশ্য হলো কবরের প্রতি অতিভক্তি প্রদর্শন করে এটিকে পূজা বা উৎসবের কেন্দ্রে পরিণত করা। উরশ উপলক্ষে মানত (নযর) কালেকশন করা এবং সেই মানতকৃত পশু যবেহ করাও শিরক, কারণ মানত একটি ইবাদত যা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নামে করা হারাম। এছাড়া, মাজার প্রাঙ্গণে নারী-পুরুষের একত্র মিলিত হয়ে ‘হু হু হু’ ধ্বনিতে জিকির করা, যা কথিত আধ্যাত্মিকতার নামে ব্যভিচার ও ফিতনার পথ উন্মুক্ত করে এবং ইসলামের পর্দার বিধান লঙ্ঘন করে। রাতের আঁধারে গাজা বা নেশার আসর বসানো গুরুতর নৈতিক অপরাধ ও হারাম কাজ, যা ধর্মীয় অনুষ্ঠানের নামে চরম পাপাচারকে প্রশ্রয় দেয়। সর্বশেষে, মাযারকে ঘিরে বাতি প্রজ্বলন ও চাদর চড়ানোর প্রথাটি হলো কুসংস্কার ও অপচয়, যা অগ্নি উপাসকদের রীতির অনুকরণ এবং মুসলিমদের ধন-সম্পদ নষ্ট করার নামান্তর। সামগ্রিকভাবে, উরশ উদযাপনের এই আটটি কাজই ইসলামের মৌলিক আকিদা ও নৈতিক মূল্যবোধকে ধ্বংস করে দেয়।
পহেলা বৈশাখ বা নববর্ষ
আধুনিক মিডিয়ার প্রচারের কারনে বাংলা নববর্ষ উদযাপনে নতুন মাত্রা পেয়েছে। এই দিন উপলক্ষে বাঙ্গালীরা নতুন জামাকাপড় পড়ে রাস্তায় বাহির হয়। বিশেষ খাবারের ব্যবস্থাও থাকে। অনেক স্থানে ইলিশ মাছ দিয়ে পান্তা ভাত খাওয়ার ব্যবস্থা থাকে। বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বাংলা নববর্ষ উদযাপন করা হলেও নিম্মের অনুষ্ঠানগুলি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। যেমন-
১. ঢাকায় রমনার বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণঃ
বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা শহরের রমনার বটমূলে পহেলা বৈশাখ সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে ছায়ানটের শিল্পীরা সম্মিলত কন্ঠে গান গেয়ে নতুন বছরকে স্বাগতম জানায়। শত শত নারী পুরুষ এই অনুষ্ঠানে যোগদান করে। এখান থেকে একাধারে দুপুর পর্যান্ত নানা ধরনের গান গাওয়া হয়।
২. নববর্ষ উপলক্ষে মঙ্গল শোভাযাত্রা করা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে পহেলা বৈশাখের সকালে একটি শোভাযাত্রা বের করে। এই শোভাযাত্রাটি শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে পুনরায় চারুকলা ইনস্টিটিউটে এসে শেষ হয়।
৩. নববর্ষে বাংলার ব্যবসায়ীদের হালখাতাঃ
বছরের প্রথম দিন বা নববর্ষে বাংলার ব্যবসায়ীগণ তাদের দেনা-পাওনার হিসাব সমন্বয় করে এদিন হিসাবের নতুন খাতা খোলেন। এই হালখাতার দিন খদ্দেরগণও চেষ্টা করে কিছু বাকি টাকা পরিশোধের। উপলক্ষে ব্যবসায়ীরা তাদের খদ্দেরদের মিস্টিমুখ করান।
৪. হিন্দুদের বা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পুজাঃ
পহেলা বৈশাখের সকালে সনাতন ধর্মাবলম্বী বা হিন্দু ধর্মের দোকানী ও ব্যবসায়ীরা পুজা দান করেন। হিন্দুদের দাবী করে থাকে যে লক্ষী হলো, বিত্তের দেবী। তাই তারা পহেলা বৈশাখের নববর্ষে লক্ষ্মীর পূজা করে থাকেন। তারা এই দিন লক্ষীর নিকট দাবি করে যে, তাদের সারা বছর যেন ব্যবসা ভাল যায়।
৬ নববর্ষ উপলক্ষে গ্রাম অঞ্চলে বৈশাখী মেলার আয়োজন করা
গ্রাম অঞ্চলের লোকেরা খোলা মাঠে বৈশাখী মেলার আয়োজন করে। মেলাতে থাকে নানা রকম কুঠির শিল্পজাত সামগ্রীর বিপণন থাকে। নানারকম পিঠা পুলির আয়োজন করে থাকে। এই দিনের একটি পুরনো সংস্কৃতি হলো গ্রামীণ ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আয়োজন। এর মধ্যে থাকে নৌকাবাইচ, লাঠি খেলা কিংবা কুস্তির। এমন কোন জেলা নাই যেখানে পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে মেলার আয়োজন করা হয়না।
ববর্ষের সাথে ইসলামের বিরোধ কোথায়?
১. সব অনষ্ঠানই সরাসরি সনাতন ধর্মের আদলে করাঃ
আধুনিক নববর্ষের প্রধান আকর্ষন হলো, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে আয়োজিত বর্ণিল শোভাযাত্রা। এই শোভাযাত্রায় বাঘ, হাতি, কুমির পেঁচাসহ বহু জীবজন্তুর মূর্তি বা প্রতিকৃতি প্রদর্ষণ করা হয়। এই শোভাযাত্রার প্রচলন কারীগণ দাবি করে থাকে, এই জীবজন্তুর মূর্তি মাধ্যমে মানুষের মঙ্গল কামনা করা হয়। এই জন্য তারা এর নাম দিয়েছেন মঙ্গল শোভাযাত্রা। আমাদের প্রতিবেশী হিন্দুভাইদেরও দেখি নিজেদের মঙ্গল কামন করে তারা গাছ, পাথর, সাপ, সিংহ, মহিষ, ময়ুর, গাভী, নদীর পুঁজা করে থাকে।
২. ইসলাম বিরোধী আকিদা ধারণ করে
নববর্ষ উপলক্ষে প্রচার কর হয় যে, নতুন বছরের সাথে মানুষের কল্যাণের সম্পর্ক, নতুন বছর নতুন কল্যাণ বয়ে আনে, দূরীভূত হয় পুরোনো কষ্ট ও ব্যর্থতার গ্লানি। এই ধরনের কোন তত্ত্ব কথায় সাথে ইসলামের কোন সম্পর্ক নাই। এই কথা বিশ্বাস করলে ইসলাম বিরোধী আকিদা হিসাবে চিহৃত হবে।
ইসলাম ধর্মের বিশ্বাস আমাদের সকল প্রকার শুভ অশুভের মালিক এক মাত্র মহান আল্লাহ। কিন্তু নববর্ষে
প্রচার করে থাকে এ বছর মা দূর্গা গজে বা হাতিতে চড়ে এসছেন তাই এ বছর ফসল ভাল হবে। তাছাড়া নববর্ষকে আহবান করা হয় এই বলে যে, “এসো হে বৈশাখ”। এই ধরনের কোন আপেক্ষিত বন্তুকে আহবান করা নিষেধ।৷ কারন এর দ্বারা মাখলুকের নিকট কল্যাণ কামনা করা হয়৷ অথচ কল্যানের মালিক একমাত্র আল্লাহ তা’লা।
مَّا أَصَابَكَ مِنْ حَسَنَةٍ فَمِنَ اللّهِ وَمَا أَصَابَكَ مِن سَيِّئَةٍ فَمِن نَّفْسِكَ
আপনার যে কল্যাণ হয়, তা হয় আল্লাহর পক্ষ থেকে আর আপনার যে অকল্যাণ হয়, সেটা হয় আপনার নিজের কারণে। সুরা নিসা : ৭৯
৩. গান বাজনা মাধ্যমে নববর্ষ উদযাপন করা
নববর্ষে ঢাক ঢোল পিটিয়ে, নেচে-গেয়ে শোভাযাত্রায় অংশ গ্রহন করা হয়। প্রথম কর্মসুচি হলো, সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে ছায়ানটের শিল্পীরা সম্মিলত কন্ঠে গান গেয়ে নতুন বছরকে স্বাগতম জানায়। শত শত নারী পুরুষ এই অনুষ্ঠানে যোগদান করে। এখান থেকে একাধারে দুপুর পর্যান্ত নানা ধরনের গান গাওয়া হয়। অথচ ইসলামি শরীয়তে এই ধরনের গান বাজনা হারাম করা হয়েছে।
৪. নবর্ষের মাধ্যামে বিজাতির অনুসরণ করা হয়
আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনাতে এসে দেখেন, মদীনাহবাসীরা নির্দিষ্ট দু’টি দিনে খেলাধুলা ও আনন্দ করে থাকে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন,এ দু’টি দিন কিসের? সকলেই বললো, জাহিলী যুগে আমরা এ দু’ দিন খেলাধুলা করতাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, মহান আল্লাহ তোমাদের এ দু’ দিনের পরিবর্তে উত্তম দু’টি দিন দান করেছেন। তা হলো, ঈদুল আযহা ও ঈদুল ফিত্বরের দিন। সুনানে আবু দাউদ : ১১৩৪
এই হাদিসের ব্যাখ্যায় অধিকাংশ হাদিস বিশারত লিখেছেন, মদীনাবাসী যে দুটি দিবস উদযাপন করত তা ছিল তাদের নববর্ষ। হাদিসের আলোকে বুঝা যায়, নববর্ষের বিকল্প হিসাবে আল্লাহ আমাদের দুটি উত্তম দিবসের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। অথচ আমরা আল্লাহ প্রদত্ত দিবস বাদ দিয়ে মনগড়া দিবস পালন করছি। ইদানিং পহেলা বৈশাখ উদযাপনকে দুই ঈদের বিকল্প হিসাবে দাঁড় করানো হয়।
৫. নারী ও পুরুষের অবাধ মেলামেশাঃ
শয়তানের হাতিয়ার হল নগ্নতা, অশ্লীলতা, ব্যভিচারপূর্ণ অনুষ্ঠান। এই কাজটি সে আনজান দিয়ে থাকে নারী, পুরুষের অবাধ মেলামেশার মাধ্যমে। নববর্ষ মানে আনন্দ। এই আনন্দ হলো, সর্বস্থরের নারী পুরুষ একত্র হয়ে নগ্নতা, অশ্লিলত, বেহায়া পনার মাধ্যমে নিজকে প্রদর্শণ করান। নারী, পুরুষের অবাধ মেলামেশা আমাদের সমাজে এমনভাবে ছড়িয়ে আছে, মনে করা হয় এই বেপর্দা, বেহায়াপনা, অশ্লীলতা, আমাদের দেশীয় আমাদের দেশীয় সংস্কৃতির অংশ। আমাদের দেশীয় সংস্কৃতির অনেক ভাল দিক আছে। সামাজিক শিষ্টাচার, সৌহার্দ্য, জনকল্যাণ, মানবপ্রেম ইত্যাদি। কিন্তু দুঃখের বিষয হলো, এসব বাদ দিয়ে আমাদের দেশীয় সংস্কৃতির নামে যুবক যুবতীদেরকে অবাধ মেলামেশা ও বেহায়াপনার সুযোগ করে দিয়ে অশ্লীলতার প্রসার ঘটাচ্ছি। আমরা এক বারের জন্যও চিন্তা করি না যে এই নববর্ষ উপলক্ষ্যে এক বারের জন্যও যদি আমাদের কিশোর-কিশোরী ও যুবক-যুবতীরা অশ্লীলতায় মাঝে নিপতিত হয়, তবে তাদের আর বের করা সম্ভব হবে না। তারা ক্রমান্বয়ে আরো বেশি পাপ ও অপরাধের মধ্যে নিপতিত হতে থাকবে।
মনে রাখবেন ব্যভিচার করা হয় শুধু বিশেষ অংগের দ্বারা। বাস্তবতা হলো, ব্যভিচার হতে পারে বিভিন্ন অঙ্গের দ্বারা। আমাদের ইসলামি শরীয়তে এ সম্পর্কে সুষ্পষ্ট বিধান রয়েছে। পাপাচারের প্রথার উৎস হলো, নারী ও পুরুষের অবাধ মেলামেশা। এই জন্য বিষয়টি খুবই ইসালাম খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-
وَقَرْنَ فِى بُيُوتِكُنَّ وَلَا تَبَرَّجْنَ تَبَرُّجَ ٱلْجَٰهِلِيَّةِ ٱلْأُولَىٰۖ وَ
আর তোমরা নিজ গৃহে অবস্থান করবে এবং প্রাক-জাহেলী যুগের মত সৌন্দর্য প্রদর্শন করো না। সুরা আহজাব : ৩৩
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-
يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّبِىُّ قُل لِّأَزْوَٰجِكَ وَبَنَاتِكَ وَنِسَآءِ ٱلْمُؤْمِنِينَ يُدْنِينَ عَلَيْهِنَّ مِن جَلَٰبِيبِهِنَّۚ ذَٰلِكَ أَدْنَىٰٓ أَن يُعْرَفْنَ فَلَا يُؤْذَيْنَۗ وَكَانَ ٱللَّهُ غَفُورًا رَّحِيمًا
হে নাবী! তুমি তোমার স্ত্রীদেরকে, কন্যাদেরকে ও মু’মিনা নারীদেরকে বলঃ তারা যেন তাদের চাদরের কিয়দংশ নিজেদের উপর টেনে দেয়। এতে তাদের চেনা সহজতর হবে, ফলে তাদেরকে উত্যক্ত করা হবেনা। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। সুরা আহজাব : ৫৯
৬. সময় ও অর্থ অপচয়কারীঃ
নববর্ষ উপলক্ষে যে কোন সময় ওঅর্থ অপচয় করা সঠিক কাজ হবে না। এই দিবস উদযাপনের জন্য প্রধানত চারটি স্থান সময় ওঅর্থ অপচয় করে থাকে।
ক. খাবারের পেছনে
খ. পোশাকের পেছনে
গ. বিভিন্ন অনিষ্ঠান আয়োজনের পেছনে
ঘ. শোভাযাত্রার আয়োজনের পেছনে
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-
يَٰبَنِىٓ ءَادَمَ خُذُوا۟ زِينَتَكُمْ عِندَ كُلِّ مَسْجِدٍ وَكُلُوا۟ وَٱشْرَبُوا۟ وَلَا تُسْرِفُوٓا۟ۚ إِنَّهُۥ لَا يُحِبُّ ٱلْمُسْرِفِينَ
হে আদাম সন্তান! প্রত্যেক সলাতের সময় তোমরা সাজসজ্জা গ্রহণ কর, আর খাও, পান কর কিন্তু অপচয় করো না, অবশ্যই তিনি অপচয়কারীদেরকে পছন্দ করেন না। সুরা আরাফ : ৩১
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-
وَلَا تُسْرِفُوٓا۟ۚ إِنَّهُۥ لَا يُحِبُّ ٱلْمُسْرِفِينَ
অপচয় করো না, নিশ্চয় তিনি অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না। সুরা আনাম : ১৪১
৭. মুখোস এবং উল্কি আঁকা একটি ইসলামি বিরোধী সংস্কৃতিঃ
নববর্ষ উপলক্ষে হাজার হাজার যুবগ যুবতী তাদের গালে, কপালে, হাতে উল্কি আঁকাছে। তারা এ সব খুবই মজা করে আকঁছে। কিন্তু এই কাজ যে ইসলামি বিরোধী তারা হয়তো তা জানে না। মানুষের শরীরে উল্কি আঁকা হাদিসে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। নিম্মে এ সম্পর্কে কয়েকটি সহিহ হাদিস বর্ণনা করা হল-
আওন ইবনু আবূ জুহাইফাহ রহ. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আমার পিতাকে বলতে শুনেছি-
إِنَّ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم نَهَى عَنْ ثَمَنِ الدَّمِ، وَثَمَنِ الْكَلْبِ، وَآكِلِ الرِّبَا وَمُوكِلِهِ، وَالْوَاشِمَةِ وَالْمُسْتَوْشِمَةِ.
নবী ﷺ রক্তের মূল্য ও কুকুরের মূল্য নিতে নিষেধ করেছেন। আর তিনি সুদ গ্রহীতা, সুদ দাতা, উল্কি অঙ্কনকারী উল্কি গ্রহণকারী নারীদের উপর লানত করেছেন। সহিহ বুখারি : ৫৯৪৫