মুসলিমদের অনৈতিক বিনোদন : দ্বিতীয় কিস্তি

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

শেষ রমজানের দিন রাতে আতশবাজি, গান-বাজনা

শেষ রমজানের দিন মানুষ ঈদের আহব শুনতে পায়। ঈদের জন্য তাদর যেন আর দেরী সইছে না। তাই ঈদের চাঁদ দেখার সাথে সাতের রাতে আতশবাজি, গান-বাজনা শুরু করে দেয়। ইহা কোন অবস্থায় মুসলিমদের সংস্কৃতি নয়। রমজানের শেষ রাতে আতশবাজি, গান-বাজনা বা রাতভর আড্ডা আয়োজন করা ইসলামের দৃষ্টিতে শুধু হারামই নয়, এটি পবিত্র মাসের মাহাত্ম্য এবং ইবাদতের মূল উদ্দেশ্যের সাথে সাংঘর্ষিক। এই ধরনের কাজ কুরআন ও হাদিসের সুস্পষ্ট নির্দেশের লঙ্ঘন।

১. আতশবাজি ও অপচয়

রমজানের শেষ রাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো লাইলাতুল কদর ও ইতিকাফের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা। এই সময়ে আতশবাজি ফোটানো বা এ ধরনের অপচয়মূলক কাজ ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

 وَلَا تُسْرِفُوٓا۟ۚ إِنَّهُۥ لَا يُحِبُّ ٱلْمُسْرِفِينَ

অপচয় করো না, নিশ্চয় তিনি অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না। সুরা আনাম : ১৪১

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

إِنَّ ٱلْمُبَذِّرِينَ كَانُوٓا۟ إِخْوَٰنَ ٱلشَّيَٰطِينِۖ وَكَانَ ٱلشَّيْطَٰنُ لِرَبِّهِۦ كَفُورًا

অপব্যয়কারীরা শয়তানদের ভাই। আর শয়তান তার প্রভুর প্রতি বড়ই অকৃতজ্ঞ।  সুরা বনীইরাঈল : ২৭

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَٱلَّذِينَ إِذَآ أَنفَقُوا۟ لَمْ يُسْرِفُوا۟ وَلَمْ يَقْتُرُوا۟ وَكَانَ بَيْنَ ذَٰلِكَ قَوَامًا

আর যখন তারা ব্যয় করে তখন অপব্যয় করে না, আর কৃপণতাও করে না। এ দুয়ের মধ্যবর্তী পন্থা গ্রহণ করে। সুরা ফুরকান ২৫:৬৭

আতশবাজি বাজি ফোটানো সম্পদের অপচয় এবং একই সাথে পরিবেশ দূষণ ও জনগণের কষ্টের কারণ। তাছাড়া আতশবাজির বিকট শব্দ মুসল্লিদের ইবাদত এবং সাধারণ মানুষের ঘুম ও শান্তি নষ্ট করে, যা ইসলামে অন্যের ক্ষতি করাকে হারাম ঘোষণা করেছে।

২. গান-বাজনা ও অনর্থক কাজ

রমজানের শেষ রাতগুলোতে গান-বাজনা বাদ্যযন্ত্রের আয়োজন করা শরীয়তে নিষিদ্ধ। এ সম্পর্কে পূর্বে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।  

৩. রাতভর আড্ডা ও ইবাদত থেকে গাফেলতি

রমজানের শেষ রাতে বিনোদনের নামে এসব হারাম কাজে লিপ্ত হওয়া রাসূল ﷺ-এর সুন্নাহকে অবজ্ঞা করা এবং বরকতময় রাতকে নষ্ট করার শামিল।

সাঈদ ইবন আওস আল-আনসারী তাঁর পিতার সূত্রে বর্ণনা করেছেন যে, নবী ﷺ বলেছেন, “যখন ঈদুল ফিতরের দিন হয়, তখন ফেরেশতাগণ রাস্তার মুখে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করে, ‘হে মুসলিমগণ! তোমরা তোমাদের পরম দয়ালু প্রতিপালকের দিকে যাও, যিনি প্রচুর পুরস্কার দান করেন এবং মহাপাপ ক্ষমা করেন।’ যখন তারা ঈদগাহে পৌঁছে যায়, তখন আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে আমার ফেরেশতারা! আমি তোমাদের সাক্ষী রাখছি যে, আমি আমার বান্দাদের ক্ষমা করে দিয়েছি। তারা রোযা রেখেছে, সালাত কায়েম করেছে, তাই আজ তোমরা ফিরে যাও, তোমাদের সব পাপ ক্ষমা করা হলো, এবং তাদের পাপগুলোকে সওয়াবে রূপান্তরিত করা হয়েছে। সিলসিলাতুল আহাদিস আস-সাহীহাহ : ১৮৮১, শুয়াবুল ঈমান : ৩৬৪৮,

তাই এ রাতে প্রতিটি মুসলিমের চিন্তা করা উচিত আমি কি মহান আল্লাহ ক্ষমার তালিকায় আছি।

৯. বিবাহ বা আকিকায় গান-নাচ ও বেপর্দা অনুষ্ঠান করা

বিবাহ বা আকিকার অনুষ্ঠানে গান, নাচ, ড্যান্স পার্টি এবং বেপর্দা আয়োজন করা ইসলামের দৃষ্টিতে হারাম। এই ধরনের কার্যকলাপ ইসলামের মৌলিক নৈতিকতা, শালীনতা এবং শরীয়তের বিধানের সরাসরি লঙ্ঘন। কুরআন ও হাদিস মুসলিমদেরকে এসব অননুমোদিত বিনোদন থেকে দূরে থাকতে কঠোরভাবে নির্দেশ দিয়েছে।

১. অশ্লীল গান, নাচ ও ড্যান্স পার্টির বিধান

গান-বাজনা, বিশেষ করে অশ্লীল কথা ও বাদ্যযন্ত্রের সাথে নাচ ও ড্যান্স পার্টির আয়োজন করা ইসলামে নিষিদ্ধ। এ সম্পর্কে পূর্বে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।  

২. বেপর্দা ও নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা

এই ধরনের অনুষ্ঠানে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা, বেপর্দা এবং অঙ্গভঙ্গি সহকারে নাচ-গানের আয়োজন ইসলামের কঠোর পর্দার বিধানের পরিপন্থী। এ সম্পর্কেও পূর্বে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।  

অতএব, মুসলিমদের উচিত বিবাহ ও আকিকার মতো পবিত্র ও বরকতময় অনুষ্ঠানগুলো কুরআন ও সুন্নাহের আলোকে শালীনভাবে পালন করা এবং সকল প্রকার হারাম কার্যকলাপ, যেমন গান, নাচ ও বেপর্দা থেকে দূরে থাকা।

১১. মৃত্যু পরবর্তী কুলখানি, চল্লিশা ও বছর পূর্তির উত্জাপন করা

মৃত্যুর পর শোকাহত পরিবার কর্তৃক মৃত ব্যক্তির জন্য কুলখানি, চল্লিশা, বা বছর পূর্তির মতো বিশেষ উপলক্ষে সম্মিলিত ভোজ ও অনুষ্ঠানের আয়োজন করা ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে হারাম। এই প্রথাগুলো ভারতীয় উপমহাদেশের সমাজে গভীরভাবে প্রচলিত হলেও, কুরআন ও সহীহ হাদিসে এর কোনো ভিত্তি নেই। বরং এগুলো ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ বিদআত (ধর্মীয় নব-উদ্ভাবন) এবং ক্ষেত্রবিশেষে জাহেলিয়াতের রীতির অন্তর্ভুক্ত।

১. এ কাজ বিদআত ও সীমালঙ্ঘন:

কুলখানি, চল্লিশা ও বছর পূর্তির মূল সমস্যা হলো, এটিকে সওয়াবের কাজ বা মৃত ব্যক্তির মুক্তির উপায় মনে করা। অথচ ইবাদত বা সওয়াবের কাজ হতে হলে তার নির্দিষ্ট পদ্ধতি, সময় ও কারণ অবশ্যই আল্লাহর রাসূল (ﷺ) কর্তৃক অনুমোদিত হতে হবে।

রাসূল (ﷺ), সাহাবায়ে কিরাম (রা.) বা তাবেঈনদের যুগে মৃত্যুর পর নির্দিষ্ট দিনে (তৃতীয় দিন, চল্লিশতম দিন বা বছর পূর্তিতে) সম্মিলিতভাবে কোরআন খতম বা ভোজের আয়োজন করে সওয়াব পৌঁছানোর কোনো প্রমাণ নেই। এটি একটি আবিষ্কৃত রীতি, যা স্পষ্টত বিদআতের শামিল।

আয়িশা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, ‘কেউ আমাদের এ শরী‘আতে নাই এমন কিছুর অনুপ্রবেশ ঘটালে তা প্রত্যাখ্যাত।

সহিহ বুখারি : ২৬৯৭, সহিহ মুসলিম : ১৭১৮, আহমাদ : ২৬০৯২

ইসলামে মৃত্যুতে শোক প্রকাশের সর্বোচ্চ সীমা হলো তিন দিন। এর বেশি আনুষ্ঠানিক শোক পালন করা মাকরুহ বা অপছন্দনীয়। চল্লিশা বা বছর পূর্তির আয়োজন এই শোকের সীমা লঙ্ঘন করে এবং দুঃখকে দীর্ঘায়িত করে।

২. সম্মিলিত ভোজের আয়োজন সুন্নাহ বিরোধী কাজ

মৃতের পরিবার কর্তৃক ভোজের আয়োজন করা শরীয়তে বৈধ নয়, বরং এটি জাহেলী যুগের প্রথা হিসেবে চিহ্নিত। এই উপলক্ষে ব্যাপক লোক সমাগম করে খাবারের আয়োজন করা মূলত মৃতের পরিবারকে অতিরিক্ত আর্থিক ও মানসিক চাপে ফেলে দেয়। রাসূল ﷺ-এর সুন্নাহ হলো, প্রতিবেশীরা বা আত্মীয়-স্বজনরা শোকাহত পরিবারের জন্য খাবার রান্না করে পাঠাবে, যেন তারা খাবারের চিন্তা থেকে মুক্ত হয়ে শোক পালন ও ইবাদতে মনোনিবেশ করতে পারে। এ কাজ সরাসরি হাদিসের বিরোধিতা।

জারীর ইবনু ’আবদুল্লাহ্ আল-বাজালী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, মৃতের বাড়িতে ভীড় জমানো ও খাদ্য প্রস্তুত করা বিলাপের অন্তর্ভুক্ত মনে করতাম। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৬১২

 এই হাদিস থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, মৃত ব্যক্তির জন্য ভোজের আয়োজন করা সাহাবাদের কাছে নিন্দনীয় ছিল।

উপসংহারে : কুলখানি, চল্লিশা বা বছর পূর্তির মতো অনুষ্ঠানগুলো মৃত ব্যক্তিকে কোনো উপকার করে না, বরং জীবিতদের উপর চাপ সৃষ্টি করে এবং ইবাদতের নামে বিদআতে লিপ্ত করে। মুসলিমদের কর্তব্য হলো, এসব হারাম প্রথা সম্পূর্ণরূপে পরিহার করে সহীহ সুন্নাহ মোতাবেক জীবনযাপন করা।

অমুসলিমদের ধর্মীয় বা সংস্কৃতিগত অনুকরণে বিনোদন

১. অমুসলিমদের অনুসরণে দিবস ও বছর পালন

২. অমুসলিম সংস্কৃতির পোশাক ও স্টাইল অনুকরণ

৩. সংগীত ও নৃত্য সংস্কৃতিতে পাশ্চাত্য অনুকরণ

৪. সিনেমা, নাটক ও বিনোদন মাধ্যমের অনুকরণ

৫. খেলাধুলায় অমুসলিম অনুকরণ

৬. পশ্চিমা উৎসবকেন্দ্রিক বাণিজ্যিক বিনোদন

৭. অবিশ্বাসীদের উৎসব উদযাপন

ইসলামী বিনোদনের ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি হলো, এটি অমুসলিমদের ধর্মীয় বা সংস্কৃতিগত বিশেষ চিহ্নের অনুকরণ (তাশাব্বুহ) করবে না। এই অনুকরণ বলতে এমন কোনো পোশাক, আচার-আচরণ, উৎসব বা প্রতীক ব্যবহার করা বোঝায় যা বিশেষভাবে কোনো অমুসলিম ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রতীক।

উদাহরণস্বরূপ, অমুসলিমদের নিজস্ব ধর্মীয় উৎসবের সাথে সম্পর্কিত কোনো বিশেষ ধরনের খেলা বা অনুষ্ঠান আয়োজন করা বা তাদের ধর্মীয় পোশাক পরিধান করা ইসলামী বিনোদনে বৈধ নয়। একজন মুসলিমের নিজস্ব একটি স্বতন্ত্র পরিচয় এবং জীবনধারা রয়েছে, যা ইসলামের মৌলিক নীতি ও মূল্যবোধ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। বিনোদনের মাধ্যমে সেই স্বতন্ত্রতাকে বিসর্জন দেওয়া বা অন্য সংস্কৃতিতে বিলীন হওয়ার প্রবণতা তৈরি করা উচিত নয়। তবে, সাধারণ মানবীয় সংস্কৃতি বা যা সকল জাতির মধ্যে প্রচলিত এবং যা শরিয়তের সাথে সাংঘর্ষিক নয়, সেই ধরনের সুস্থ বিনোদন গ্রহণে কোনো বাধা নেই। এই নীতিটি মুসলিমদের তাদের আত্ম-পরিচয় ও ধর্মীয় সীমানার প্রতি সচেতন থাকতে সাহায্য করে।

মুসলিমদের জন্য স্বতন্ত্র পথ নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন_

وَلَنۡ تَرۡضٰی عَنۡکَ الۡیَہُوۡدُ وَلَا النَّصٰرٰی حَتّٰی تَتَّبِعَ مِلَّتَہُمۡ 

আর ইয়াহূদী ও নাসারারা কখনো তোমার প্রতি সন্তুষ্ট হবে না, যতক্ষণ না তুমি তাদের মিল্লাতের অনুসরণ কর। সূরা বাকারা : ১২০

এই আয়াত মুসলিমদের সতর্ক করছে যেন তারা অমুসলিমদের ধর্মীয় বা সংস্কৃতিক ধারা অনুসরণ না করে। তাদের সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে তাদের আচার-আচরণ বা উৎসব অনুকরণ করা ঈমানের জন্য হুমকিস্বরূপ।

মুসলিমদের জন্য স্বতন্ত্র পরিচয় আছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَمَنۡ یَّبۡتَغِ غَیۡرَ الۡاِسۡلَامِ دِیۡنًا فَلَنۡ یُّقۡبَلَ مِنۡہُ ۚ وَہُوَ فِی الۡاٰخِرَۃِ مِنَ الۡخٰسِرِیۡنَ

আর যে ইসলাম ছাড়া অন্য কোন দীন চায় তবে তার কাছ থেকে তা কখনো গ্রহণ করা হবে না এবং সে আখিরাতে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে। সূরা আল ইমরান : ৮৫

এই আয়াতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ইসলামের বিকল্প কোনো জীবনধারা গ্রহণযোগ্য নয়। তাই বিনোদন বা সংস্কৃতিতেও মুসলিমকে ইসলাম-সম্মত নীতি বজায় রাখতে হবে।

ইবনু উমার (রাঃ) সূত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, তোমরা মুশরিকদের উল্টো করবে- দাড়ি লম্বা রাখবে, গোঁফ ছোট করবে।

ইবনু ’উমার (রাঃ) যখন হাজ্জ বা ’উমরাহ করতেন, তখন তিনি তাঁর দাড়ি মুষ্টি করে ধরতেন এবং মুষ্টির বাইরে যতটুকু বেশি থাকত, তা কেটে ফেলতেন। সহিহ মুসলিম : ৫৮৯২, ৫৮৯৩, সহিহ মুসলিম : ২৫৯, আহমাদ : ৪৬৫৪

রাসূল ﷺ দাড়ি রাখার এবং গোঁফ ছাঁটার নির্দেশ দিয়েছিলেন এই বলে, “মুশরিকদের বিপরীত হও।”

অর্থাৎ, ইসলাম মুসলিমদের জন্য একটি আলাদা, স্বতন্ত্র চেহারা ও সংস্কৃতি বজায় রাখতে চায়।

অমুসলিমদের উৎসবে অংশগ্রহণ থেকে বারণ :

আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনাতে এসে দেখেন, মদীনাহবাসীরা নির্দিষ্ট দু’টি দিনে খেলাধুলা ও আনন্দ করে থাকে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করলেনঃ এ দু’টি দিন কিসের? সকলেই বললো, জাহিলী যুগে আমরা এ দু’ দিন খেলাধুলা করতাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, মহান আল্লাহ তোমাদের এ দু’ দিনের পরিবর্তে উত্তম দু’টি দিন দান করেছেন। তা হলো, ঈদুল আযহা ও ঈদুল ফিত্বরের দিন। সুনানে আবু দাউদ : ১১৩৪, সুনানে নাসায়ি : ১৫৫৫

রাসূল ﷺ নিজে অমুসলিমদের উৎসব বা বিনোদনকে বাতিল করে মুসলিমদের জন্য ইসলামসম্মত বিকল্প নির্ধারণ করেছেন। তাই বিনোদনের ক্ষেত্রেও মুসলিমের স্বকীয়তা বজায় রাখতে হবে।

অমুসলিমদের ধর্মীয় বা সংস্কৃতিগত যে অনুকরণ করছে, তার কিছু উদারহন তুলে ধরছি। যেমন-

আজকের যুগে মুসলিম সমাজের বহু অংশ বিনোদনের নামে অমুসলিমদের ধর্মীয় বা সংস্কৃতিগত বিশেষ চিহ্ন ও রীতির অনুকরণ করছে— যা ইসলামী পরিচয়ের জন্য গুরুতর হুমকি। নিচে কিছু বাস্তব উদাহরণ তুলে ধরা হলো, যাতে এই তাশাব্বুহ (অমুসলিম অনুকরণ) স্পষ্টভাবে বোঝা যায়।

১. অমুসলিমদের অনুসরণে দিবস ও বছর পালন

প্রথমেই বলি, অমুসলিমদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক “বিশেষ দিন” বা “বছর” অনুকরণে মুসলিম সমাজের বিনোদনমূলক প্রবণতা বর্তমানে ব্যাপক। ইসলাম মুসলিমদের নিজস্ব উৎসব ও পরিচয় নির্ধারণ করেছে। তাদের প্রদান উত্সব হলো, ঈদুল ফিতর, ঈদুল আজহা ও জুমার দিন। এর বাইরে অন্য কোনো “ধর্মীয় আনন্দ দিবস” ইসলাম স্বীকৃতি দেয়নি। কিন্তু বর্তমানে মুসলিম সমাজে অমুসলিমদের বিশেষ দিন ও বছর উদযাপন ক্রমে বিনোদনের অংশ হয়ে উঠছে। নিচে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ দেওয়া হলো-

ক. ক্রিসমাস ডে (২৫ ডিসেম্বর)

ক্রিসমাস ডে বা বড়দিন হলো খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব। তারা এই দিনটিকে নবী ঈসা (আ.)-এর জন্মদিন হিসেবে পালন করেন। তবে খ্রিস্টান ধর্মবিশ্বাসের মূল নীতি অনুসারে, এটি “ঈশ্বরের পুত্র” (গডের পুত্র) ধারণার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত, যা ইসলামের মূল বিশ্বাস অর্থাৎ তাওহীদ (একত্ববাদ) এর সম্পূর্ণ বিরোধী।

দুঃখের বিষয় হলো, বর্তমানে অনেক মুসলিম অধ্যুষিত এলাকা এবং প্রতিষ্ঠানেও এই উৎসবের বিভিন্ন অংশ বিনোদন হিসেবে ঢুকে পড়েছে। অনেকে ক্রিসমাস ট্রি সাজান, শিশুরা সান্তা ক্লজের পোশাক পরে, এবং উপহার বিনিময়ের (গিফট এক্সচেঞ্জ) আয়োজন করেন। অফিস, স্কুল বা বিভিন্ন সামাজিক আড্ডায় “ক্রিসমাস পার্টি”র আয়োজন করা হয়।

ইসলামী চিন্তাবিদদের মতে, এই ধরনের কাজকে “তাশাব্বুহ বিল-কুফফার” (অমুসলিমদের সাদৃশ্য অবলম্বন) হিসেবে দেখা হয়। তাদের একটি অংশের মতে, একটি ভিন্ন ধর্মের ধর্মীয় উৎসবকে এভাবে পালন বা অনুকরণ করা মুসলিমদের নিজস্ব ধর্মীয় পরিচয় ও বিশ্বাসকে দুর্বল করে দেয়।

ইবনু উমার (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি বিজাতির সাদৃশ্য অবলম্বন করে, সে তাদের দলভুক্ত গণ্য হবে। সুনানে আবু দাউদ : ৪০৩১, আহমাদ : ৫১০৪

খ. ভ্যালেন্টাইন ডে (১৪ ফেব্রুয়ারি)

ভ্যালেন্টাইন ডে বা তথাকথিত “প্রেমিক-প্রেমিকার ভালোবাসা দিবস” মূলত খ্রিস্টান পুরোহিত “সেন্ট ভ্যালেন্টাইন”-এর নামে উদযাপিত একটি পৌত্তলিক ঐতিহ্যের অংশ। এই দিনটি আজ মুসলিম সমাজে ব্যাপক হারে ছড়িয়ে পড়েছে এবং বিনোদনের এক জনপ্রিয় মাধ্যম হয়ে উঠেছে।

বিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয়, এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই উপলক্ষে নানা ধরনের আয়োজন দেখা যায়, যেমন- “লাল গোলাপ দিবস,” “লাভ কনসার্ট” এবং “কাপল নাইট”।

এটি কেবল অমুসলিমদের উৎসবের অনুকরণই নয়, বরং এর মাধ্যমে সমাজে অশ্লীলতা, অবৈধ সম্পর্ক এবং নৈতিক বিশৃঙ্খলা বা ফিতনার জন্ম হচ্ছে বলে কঠোরভাবে সমালোচনা করা হয়। এই উৎসব তরুণ-তরুণীদেরকে ইসলামী বিবাহের পবিত্র বন্ধনের বাইরে গিয়ে অবাধ সম্পর্কের দিকে উৎসাহিত করে, যা ইসলামী নৈতিকতা ও সামাজিক শৃঙ্খলার জন্য চরম ক্ষতিকর।

গ. হ্যালোইন উৎসব (৩১ অক্টোবর)

হ্যালোইন উৎসবের মূল শিকড় হলো কেল্টিক পৌত্তলিকদের একটি প্রাচীন ঐতিহ্য, যেখানে মৃত আত্মাদের ভয় দেখানো বা তাদের তাড়ানোর জন্য এই উৎসব পালন করা হতো। পরে এটি খ্রিস্টান সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। আজকাল মুসলিম সমাজেও এই উৎসব বিনোদনের নামে ঢুকে পড়েছে। মুখোশ পরে “হরর পার্টি” আয়োজন করা হচ্ছে। শিশুরা “ট্রিক অর ট্রিট” খেলায় অংশ নিচ্ছে এবং অনেক স্কুল বা সামাজিক প্রতিষ্ঠানে হ্যালোইন সাজসজ্জা প্রতিযোগিতা বা ইভেন্ট দেখা যায়।

একটি পৌত্তলিক ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন ঐতিহ্যকে বিনোদনের নামে অনুসরণ করা মুসলিমদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় পরিচয়ের জন্য অমর্যাদাকর। এই ধরনের “ভৌতিক” সাজসজ্জা এবং আচার-আচরণ গ্রহণ করাকে “তাশাব্বুহ” বা অমুসলিমদের অনুকরণ হিসেবে দেখা হয়, যা ইসলামী মূল্যবোধের সঙ্গে বেমানান। এটি শিরক ও কুফরী বিশ্বাসের উপর প্রতিষ্ঠিত উৎসব; তাই মুসলিমদের জন্য এতে অংশ নেওয়া বা অনুকরণ করা হারাম।

ঘ. নিউ ইয়ার পার্টি (৩১ ডিসেম্বর রাত)

৩১শে ডিসেম্বর রাতে যে “নিউ ইয়ার পার্টি” উদযাপন করা হয়, তা গ্রেগরীয়ান ক্যালেন্ডারের ওপর ভিত্তি করে পাশ্চাত্য সংস্কৃতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিনোদনমূলক উৎসব। এটি এখন মুসলিমদের মধ্যেও সবচেয়ে জনপ্রিয় বিনোদনের একটি উৎসবে পরিণত হয়েছে। এই রাতে ব্যাপক আতশবাজি, আলোকসজ্জা, ডান্স পার্টি, কাউন্টডাউন অনুষ্ঠান, মদ্যপান ও গান-বাজনার আসর ইত্যাদি আয়োজন করা হয়।

ইসলামী পন্ডিতদের মতে এটিকে অমুসলিমদের উৎসব হিসেবে দেখেন এবং মনে করেন যে এই উপলক্ষে বিশেষ বিনোদনে অংশ নেওয়া তাদের সংস্কৃতির অনুকরণ। এছাড়া, এই রাতের আয়োজনগুলিতে প্রায়শই মদ্যপান, অশ্লীল নাচ-গান এবং নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা দেখা যায়, যা ইসলামী নৈতিকতা ও শালীনতার সীমা লঙ্ঘন করে। এই ধরনের “আনন্দের দিন” উদযাপন করাকে ধর্মীয় সীমালঙ্ঘন এবং নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য থেকে সরে যাওয়া হিসেবে গণ্য করা হয়।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

قُلۡ یٰۤاَہۡلَ الۡکِتٰبِ لَا تَغۡلُوۡا فِیۡ دِیۡنِکُمۡ غَیۡرَ الۡحَقِّ وَلَا تَتَّبِعُوۡۤا اَہۡوَآءَ قَوۡمٍ قَدۡ ضَلُّوۡا مِنۡ قَبۡلُ وَاَضَلُّوۡا کَثِیۡرًا وَّضَلُّوۡا عَنۡ سَوَآءِ السَّبِیۡلِ 

বল, ‘হে কিতাবীরা, সত্য ছাড়া তোমরা তোমাদের ধর্মের ব্যাপারে সীমালঙ্ঘন করো না এবং এমন কওমের প্রবৃত্তির অনুসরণ করো না, যারা পূর্বে পথভ্রষ্ট হয়েছে, আর অনেককে পথভ্রষ্ট করেছে এবং সোজা পথ বিচ্যুত হয়েছে। সূরা মায়িদা : ৭৭

ঙ. মাদার্স-ডে, ফাদার্স-ডে ,উইমেনস-ডে ইত্যাদি

এসব দিন পশ্চিমা সমাজে নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের স্মরণে বা মানবিক মূল্যবোধ প্রচারের নামে চালু হয়েছে। আজ মুসলিম সমাজেও তা বিনোদন ও সামাজিক প্রচারণার অংশ হয়ে গেছে।

ইসলামে পিতা-মাতা বা নারীকে সম্মান করা কোনো একদিনের দায়িত্ব নয়, বরং আজীবন ইবাদতস্বরূপ দায়িত্ব। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَقَضٰی رَبُّکَ اَلَّا تَعۡبُدُوۡۤا اِلَّاۤ اِیَّاہُ وَبِالۡوَالِدَیۡنِ اِحۡسَانًا ؕ اِمَّا یَبۡلُغَنَّ عِنۡدَکَ الۡکِبَرَ اَحَدُہُمَاۤ اَوۡ کِلٰہُمَا فَلَا تَقُلۡ لَّہُمَاۤ اُفٍّ وَّلَا تَنۡہَرۡہُمَا وَقُلۡ لَّہُمَا قَوۡلًا کَرِیۡمًا

আর তোমার রব আদেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তাঁকে ছাড়া অন্য কারো ইবাদাত করবে না এবং পিতা-মাতার সাথে সদাচরণ করবে। তাদের একজন অথবা উভয়েই যদি তোমার নিকট বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাদেরকে ‘উফ’ বলো না এবং তাদেরকে ধমক দিও না। আর তাদের সাথে সম্মানজনক কথা বল। সূরা ইসরা : ২৩

অতএব, একদিনের নামে বাকি সময় অবহেলা করা ইসলামী চেতনার পরিপন্থী।

চ. বসন্ত উৎসব, পয়লা বৈশাখ, হোলি ইত্যাদি

অনেক মুসলিম সমাজে বসন্ত উৎসব, পয়লা বৈশাখ (নববর্ষ) এবং হোলির মতো অনুষ্ঠানগুলো, যা মূলত হিন্দু ধর্মীয় বা সংস্কৃতিগত ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত, সেগুলোকে “সংস্কৃতি” বা “বিনোদন” হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। মুসলিম সমাজের কিছু মানুষ রঙ খেলা, বাদ্যযন্ত্র সহকারে গান ও নাচসহ এই উৎসবগুলিতে অংশ নেয়। এই দিনগুলোতে কিছু মুসলিম নারী রঙিন, হালকা বা অশালীন পোশাক পরেন এবং নারী-পুরুষের মধ্যে অবাধ মেলামেশা বা নাচ-গানে অংশ নেন।

ইসলামী আলেমদের মতে এই ধরনের উৎসব উদযাপনকে ধর্মীয় সীমালঙ্ঘন এবং অমুসলিমদের কাছে “সাংস্কৃতিক আত্মসমর্পণ” হিসেবে দেখেন। তাদের যুক্তি হলো, যেহেতু ইসলামে কেবল দুটি ঈদ উৎসব হিসেবে নির্ধারিত, তাই অন্য ধর্মের উৎসব পালন করা মুসলিমদের নিজস্ব ধর্মীয় স্বকীয়তা ও মূল্যবোধকে দুর্বল করে দেয়। এই উৎসবগুলোর কিছু অনুষঙ্গ (যেমন—রঙ খেলা বা অবাধ মেলামেশা) ইসলামী শালীনতা ও নৈতিকতার নীতি লঙ্ঘন করে বলেও মনে করা হয়।

ছ. “আন্তর্জাতিক দিবস” বা “বিশ্ব দিবস” কেন্দ্রিক বিনোদন সংস্কৃতি

আধুনিক যুগে, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক দিবস, যেমন— “ইন্টারন্যাশনাল মিউজিক ডে,” “ওয়ার্ল্ড ড্যান্স ডে,” “ফ্যাশন উইক,” বা “এন্টারটেইনমেন্ট অ্যাওয়ার্ড ডে” মুসলিম সমাজে বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। এই দিবসগুলো মূলত অমুসলিম বা পশ্চিমা বিনোদন সংস্কৃতির অংশ। এই দিবসগুলো সাধারণত মিডিয়া এবং সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং এর মূল উদ্দেশ্য হলো, ভোগবাদকে উৎসাহ দেওয়া। শরীরী সৌন্দর্য, প্রদর্শনী ও ফ্যাশনের প্রতিযোগিতা তৈরি করা। ব্যক্তিগত খ্যাতি (সেলিব্রিটি কালচার) অর্জনে উৎসাহিত করা।

ইসলামী শরীয়ত মনে করেন, এই ধরনের বিনোদন ও সংস্কৃতির মূল বিষয়বস্তু (যেমন—অতিরিক্ত প্রদর্শনী, খ্যাতি বা অর্থকে প্রাধান্য দেওয়া) ইসলামী মূল্যবোধ ও নৈতিকতার সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। এই দিবসগুলোর মাধ্যমে মুসলিম সমাজে অশালীনতা ও আত্ম-প্রচারের প্রবণতা বাড়ে বলে মনে করা হয়।

জ. জন্মদিনের মোমবাতি নিভানো এবং “হ্যাপি বার্থডে” উদযাপন:

জন্মদিনের কেক কেটে মোমবাতি ফুঁ দিয়ে নিভানো এবং “হ্যাপি বার্থডে টু ইউ” গান গেয়ে উদযাপন করা। যদিও এটি আধুনিক সময়ে প্রায় বৈশ্বিক প্রথায় পরিণত হয়েছে, ইসলামী পন্ডিতদের মতে, এই প্রথাটিকে অমুসলিম (প্রধানত পাশ্চাত্য সংস্কৃতি থেকে আগত) রীতিনীতি হিসেবে দেখেন। এইসব উৎসব “বিনোদন বা আনন্দের দিন” হিসেবে পালন করা হচ্ছে। যদিও এসব উৎসবের শিকড় স্পষ্টভাবে ধর্মীয়—খ্রিস্টান, হিন্দু বা পৌত্তলিক ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত।

ইসলামী পণ্ডিতদের মতে, এই প্রথাটি মূলত অমুসলিম (প্রধানত পাশ্চাত্য সংস্কৃতি থেকে আগত) রীতিনীতি হিসেবে বিবেচিত। তাদের যুক্তি হলো, যেহেতু ইসলামে এই ধরনের কোনো উৎসব বা উদযাপন নেই, তাই এটি অমুসলিমদের বিনোদন ও আনন্দের দিনের অনুকরণ। কিছু ব্যাখ্যাকার মনে করেন, মোমবাতি নিভিয়ে উদযাপনের এই ঐতিহ্যটি প্রাচীন পৌত্তলিক বিশ্বাস থেকে এসেছে। তাই, এই ধরনের “বিনোদন বা আনন্দের দিন” পালন করাকে মুসলিমদের জন্য ধর্মীয় স্বকীয়তা বজায় রাখার ক্ষেত্রে পরিহার করা উচিত।

২. অমুসলিম সংস্কৃতির পোশাক ও স্টাইল অনুকরণ

বর্তমানে মুসলিম যুবক-যুবতীদের মধ্যে বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান, নাটক, ফ্যাশন শো এবং সোশ্যাল মিডিয়া ভিডিওতে অমুসলিম বা প্রধানত পশ্চিমা পোশাক ও জীবনযাত্রার স্টাইল অনুকরণের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এটি কেবল পোশাক নয়, বরং একটি নির্দিষ্ট জীবনধারার প্রকাশ।

নারীদের মধ্যে ওয়েস্টার্ন পোশাকের প্রতি আকর্ষণ দেখা যাচ্ছে। পশ্চিমা ধাঁচের স্কিন-টাইট (শরীরের সাথে এঁটে থাকা) পোশাক পরিধান করা হচ্ছে, যা ইসলামী শালীনতার নীতির (আয়াতে বর্ণিত পর্দার মূলনীতি) সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এমনকি হিজাব পরিধান করেও এমনভাবে ফ্যাশন করা হচ্ছে, যা হিজাবের মূল উদ্দেশ্য, অর্থাৎ শালীনতা রক্ষা করা, থেকে সরে এসে তা নিজেই একটি অশালীন ফ্যাশনের মাধ্যমে পরিণত হচ্ছে।

এই ধরনের পোশাক ও স্টাইল অনুকরণের সমালোচকরা মনে করেন, এগুলি মূলত পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রতীক, যা ভোগবাদ, শরীর প্রদর্শনী এবং ক্ষণস্থায়ী ফ্যাশনের প্রতি আসক্তি বাড়ায়।

ইসলামী চিন্তাবিদদের মতে, মুসলিমদের নিজস্ব একটি স্বকীয়তা ও শালীনতার পোশাকবিধি রয়েছে, যা এ ধরনের অমুসলিম সাংস্কৃতিক প্রতীকের অনুকরণ থেকে বিরত থাকার নির্দেশনা দেয়।

ইবনু ’উমার (রাঃ) সূত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, তোমরা মুশরিকদের উল্টো করবে- দাড়ি লম্বা রাখবে, গোঁফ ছোট করবে। সহিহ বুখারি : ৫৮৯২

৩. সংগীত ও নৃত্য সংস্কৃতিতে পাশ্চাত্য অনুকরণ

মুসলিম সমাজের বিনোদন জগতে বর্তমানে পশ্চিমা ধাঁচের সংগীত ও নৃত্যের প্রভাব ব্যাপকভাবে পরিলক্ষিত হচ্ছে। বিনোদনের নামে নানা ধরনের আয়োজন হচ্ছে, যেমন—র‍্যাপ, পপ, এবং রক মিউজিক কনসার্ট, ডান্স পার্টি, ডিজে নাইট এবং মিউজিক্যাল রিয়্যালিটি শো।

এইসব মাধ্যম সরাসরি পশ্চিমা সংস্কৃতি থেকে অনুপ্রাণিত এবং মুসলিম সমাজে বিনোদনের একটি প্রধান অংশ হয়ে উঠেছে। সমালোচকরা মনে করেন, এই ধরনের বিনোদন কেবল অমুসলিম সংস্কৃতির অনুকরণই নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রেই তা ইসলামী নৈতিকতার জন্য ক্ষতিকর।

অতএব, এই ধরনের পাশ্চাত্য-অনুপ্রাণিত সংগীত ও নৃত্য সংস্কৃতিকে অনেকে কেবল বিনোদন হিসেবে দেখেন না, বরং এটিকে মুসলিম সমাজে নৈতিক অবক্ষয় এবং ধর্মীয় সীমালঙ্ঘনের একটি বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেন। এই ধরনের সংস্কৃতি অনুকরণের মাধ্যমে মুসলিম সমাজের নিজস্ব বিনোদনমূলক ঐতিহ্যগুলো (যেমন—সাংস্কৃতিক গজল বা হামদ-নাত) ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَمِنَ النَّاسِ مَنۡ یَّشۡتَرِیۡ لَہۡوَ الۡحَدِیۡثِ لِیُضِلَّ عَنۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ بِغَیۡرِ عِلۡمٍ وَّیَتَّخِذَہَا ہُزُوًا ؕ اُولٰٓئِکَ لَہُمۡ عَذَابٌ مُّہِیۡنٌ

আর মানুষের মধ্য থেকে কেউ কেউ না জেনে আল্লাহর পথ থেকে মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য বেহুদা কথা খরিদ করে, আর তারা ঐগুলোকে হাসি-ঠাট্টা হিসেবে গ্রহণ করে; তাদের জন্য রয়েছে লাঞ্ছনাকর আযাব। সুরা লোকমান : ৬

৪. সিনেমা, নাটক ও বিনোদন মাধ্যমের অনুকরণ

পাশ্চাত্য বিনোদন মাধ্যমের জনপ্রিয় ধাঁচ বা ফরম্যাট অনুকরণ করে মুসলিম দেশগুলোতেও এখন বিভিন্ন ধরণের অনুষ্ঠান তৈরি হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে, রোমান্টিক নাটক ও সিনেমা, নানা ধরনের “রিয়্যালিটি শো”, “বিউটি পেজেন্ট” (সৌন্দর্য প্রতিযোগিতা), এবং বিভিন্ন “টক শো”।

এই অনুষ্ঠানগুলোর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো:

নাটক, সিনেমা ও টক শোতে পুরুষ-নারীর অবাধ মেলামেশা এবং হাস্যরস সৃষ্টি করা হয়, যা ইসলামী সামাজিক রীতিনীতি ও শালীনতার শিক্ষার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সৌন্দর্য প্রতিযোগিতাগুলো মূলত শারীরিক সৌন্দর্যকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়, যা ইসলামে নিষিদ্ধ তাব্বারুজ (অতিরিক্ত প্রদর্শন) এবং নারীদের কেবল ভোগের সামগ্রী হিসেবে উপস্থাপনের ধারণাকে উৎসাহিত করে।

এই অনুষ্ঠানগুলোর নির্মাণশৈলী এবং বিষয়বস্তু অমুসলিম সংস্কৃতি থেকে সরাসরি ধার করা, এবং এগুলি ইসলামী বিনোদনের মূলনীতি যেমন—শিক্ষা, নৈতিকতা ও শালীনতা—থেকে অনেক দূরে সরে এসেছে।

আবদুর রহমান ইবনু গানাম আশ’আরী (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমার নিকট আবূ আমির কিংবা আবূ মালিক আশ’আরী বর্ণনা করেছেন। আল্লাহর কসম! তিনি আমার কাছে মিথ্যে কথা বলেননি। তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছেনঃ আমার উম্মাতের মধ্যে অবশ্যই এমন কতগুলো দলের সৃষ্টি হবে, যারা ব্যভিচার, রেশমী কাপড়, মদ ও বাদ্যযন্ত্রকে হালাল জ্ঞান করবে। তেমনি এমন অনেক দল হবে, যারা পাহাড়ের ধারে বসবাস করবে, বিকাল বেলায় যখন তারা পশুপাল নিয়ে ফিরবে তখন তাদের নিকট কোন অভাব নিয়ে ফকীর আসলে তারা বলবে, আগামী দিন সকালে তুমি আমাদের নিকট এসো। এদিকে রাতের অন্ধকারেই আল্লাহ তাদের ধ্বংস করে দেবেন। পর্বতটি ধ্বসিয়ে দেবেন, আর বাকী লোকদেরকে তিনি কিয়ামতের দিন পর্যন্ত বানর ও শূকর বানিয়ে রাখবেন। সহিহ বুখারি : ৫৫৯০

৫. খেলাধুলায় অমুসলিম অনুকরণ

খেলাধুলা যদিও সাধারণভাবে বিনোদনের একটি সুস্থ মাধ্যম, তবে এই ক্ষেত্রেও কিছু অমুসলিম সাংস্কৃতিক প্রতীক বা রীতির অনুকরণ মুসলিম সমাজে প্রবেশ করেছে বলে সমালোচনা রয়েছে।

কিছু মুসলিম খেলোয়াড় বা সমর্থক অমুসলিমদের ধর্মীয় প্রতীক, যেমন—ক্রস চিহ্ন বা লোগোতে অ-ইসলামী ধর্মীয় প্রতীক ব্যবহার করে। এমনকি কিছু ক্রীড়া সামগ্রী বা পোশাকের নকশাও বিতর্কিত প্রতীক বহন করে।  অনেক সময় অমুসলিমদের ধর্মীয় উৎসবের সঙ্গে মিলিয়ে বিভিন্ন টুর্নামেন্ট বা প্রতিযোগিতা আয়োজন করা হয়। যেমন—ক্রিসমাস কাপ বা ভ্যালেন্টাইন ক্রিকেট ম্যাচ। এই ধরনের প্রতিযোগিতা একটি অমুসলিম উৎসবকে বিশেষ সম্মান বা গুরুত্ব দেয়, যা মুসলিমদের উৎসবের স্বকীয়তা নষ্ট করে।

এই ধরনের অনুকরণ খেলার মতো একটি সুস্থ বিনোদনকেও ইসলামী সীমার বাইরে ঠেলে দেয়। এটি মুসলিম যুবকদের মধ্যে অমুসলিমদের ধর্মীয় প্রতীকের প্রতি স্বাভাবিকতা তৈরি করে এবং ধর্মীয় সংবেদনশীলতা হ্রাস করে, যা চূড়ান্তভাবে তাদের “তাশাব্বুহ বিল-কুফফার” (অমুসলিমদের সাদৃশ্য অবলম্বন)-এর দিকে ধাবিত করে।

৬. পশ্চিমা উৎসবকেন্দ্রিক বাণিজ্যিক বিনোদন

বর্তমানে মুসলিম সমাজে পশ্চিমা সংস্কৃতি দ্বারা প্রভাবিত বেশ কিছু উৎসবকেন্দ্রিক বাণিজ্যিক বিনোদনমূলক আয়োজন ব্যাপকতা লাভ করেছে। এই আয়োজনগুলো মূলত ভোগবাদী সংস্কৃতি এবং পশ্চিমা উৎসবের অনুকরণকে উৎসাহিত করে। এর মধ্যে রয়েছে ভ্যালেন্টাইন ডে উপলক্ষে বিশেষ সেল, হ্যালোইন মেকআপ প্রতিযোগিতা বা পার্টি, নিউ ইয়ার পার্টি এবং ক্রিসমাস উপলক্ষে সান্তা ক্লজ গিফট এক্সচেঞ্জ।

এই ধরনের প্রতিটি উৎসবই অমুসলিমদের নিজস্ব ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত। যেমন—সান্তা ক্লজ খ্রিস্টানদের ক্রিসমাস উৎসবের প্রতীক, হ্যালোইন ইউরোপীয় পৌত্তলিক ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত, এবং ভ্যালেন্টাইন ডে খ্রিস্টান ধর্মীয় কাহিনি ও পশ্চিমা প্রেমের ধারণার সঙ্গে যুক্ত। এই দিনগুলো উদযাপন করা ইসলামী শরিয়তের ব্যাখ্যায় ‘তাশাব্বুহ’ (সাদৃশ্য অবলম্বন)-এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে এই উৎসবগুলোর প্রচার মুসলিমদের নিজস্ব ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক স্বকীয়তাকে দুর্বল করে। মুসলিম সমাজে ইসলামী মূল্যবোধ অনুযায়ী নির্ধারিত ঈদ ছাড়া অন্য কোনো উৎসবকে এভাবে গুরুত্ব দেওয়া উচিত নয় বলে সমালোচকরা মনে করেন। এই আয়োজনগুলো মূলত তরুণ সমাজকে পশ্চিমা ভোগবাদী জীবনের দিকে আকৃষ্ট করে, যা ধর্মীয় নৈতিকতার বিপরীত।

৭. অবিশ্বাসীদের উৎসব উদযাপন

আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে উদযাপন, ইবাদত এবং আনন্দের জন্য দুটি পবিত্র দিন দিয়েছেন। এইগুলি হলো ঈদুল আজহা এবং ঈদুল ফিতর।

আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদ্বীনায় পৌঁছে দেখতে পান যে, সেখানকার অধিবাসীরা দুইটি দিন (নায়মূক ও মেহেরজান) খেলাধূলা ও আনন্দ-উৎসব করে থাকে। তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞাসা করেন, এই দুইটি দিন কিসের? তারা বলেন, জাহেলী যুগে আমরা এই দুই দিন খেলাধূলা ও উৎসব করতাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আল্লাহ তায়ালা তোমাদেরকে এই দুই দিনের পরিবর্তে অন্য দুইটি উত্তম দিন দান করেছেন এবং তা হল: কোরবানীর ঈদ এবং রোযার ঈদ। সুনানে আবু দাউদ : ১১৩৪, সুনানে নাসয়ি : ১১৫৫

এটি স্পষ্ট যে নবী তাদেরকে তাদের খেলাধুলা এবং উদযাপন চালিয়ে যেতে অনুমতি দেননি কারণ এটি মদীনার পৌত্তলিক আরবদের একটি প্রথা ছিল। পরিবর্তে, তিনি তাদের বললেন: “আল্লাহ সেগুলি প্রতিস্থাপন করেছেন,” যার অর্থ হলো তোমাদেরকে যা প্রতিস্থাপিত হয়েছে তা ছেড়ে দিতে হবে এবং যা প্রতিস্থাপন করেছে তা গ্রহণ করতে হবে।

নবী তাঁর সাহাবীদের সেই দিনগুলিতে উদযাপন ও খেলাধুলা করতে অনুমতি দেননি কারণ এটি অন্য একটি ধর্মের অংশ ছিল। এই বিধানটি ধর্মীয় পটভূমিযুক্ত সমস্ত ছুটির উদযাপনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, যার মধ্যে ক্রিসমাস, দিওয়ালি, ইস্টার এবং হ্যালোইন অন্তর্ভুক্ত। এই ধরনের কোনো ছুটির উদযাপনে যোগ দেওয়া অনুমোদিত নয়, এমনকি যদি এটি তার ধর্মীয় তাৎপর্য হারিয়ে ফেলে থাকে। কারণ এর শিকড় শিরকের মধ্যে নিহিত, এবং মুসলিম হিসেবে আমরা শিরককে মহিমান্বিত করতে পারি না। এ সম্পর্কে পূর্ব বর্ণনা করা হয়েছে বিধান আলোচনা সমাপ্ত কররাম।

অপর পক্ষে মুশরিক বা হিন্দুদের পূজাতে অংশগ্রহণ করাও হারাম। অধিকাংশ ইসলামী পণ্ডিত (আলেম ও ফকীহ) এই ব্যাপারে একমত। এর কয়েকটি প্রধান কারণ হলো:

ইসলামে আল্লাহ্‌র সাথে কাউকে শরিক করা বা অন্য কারো ইবাদত করাকে শিরক বলা হয়, যা সবচেয়ে বড় পাপ এবং ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ (যদি তওবা না করা হয়)। পূজাতে অংশ নেওয়াকে পরোক্ষভাবে সেই শিরকের প্রতি সমর্থন জানানো বা তাতে সন্তুষ্টি প্রকাশ করা বলে গণ্য করা হয়।

পূজার মতো বিশেষ ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করাকে বিধর্মীদের সাথে সাদৃশ্য অবলম্বনের শামিল মনে করা হয়। খলিফা উমর (রা.) মুশরিকদের উৎসবের দিন তাদের উপাসনালয়ে প্রবেশ করতে নিষেধ করেছেন।

ইসলাম অমুসলিমদের সাথে মানবিক সম্পর্ক, ন্যায়সঙ্গত আচরণ ও সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখতে উৎসাহিত করে। তাদের ব্যক্তিগত অনুষ্ঠানে (যেমন: বিয়ে, মেজবান বা বিপদে সাহায্য) অংশগ্রহণ করা বা সাধারণ সৌজন্যমূলক ব্যবহার করা যেতে পারে, যদি সেখানে কোনো হারাম কাজ বা ধর্মীয় প্রতীক বহনকারী আচার না থাকে। একজন মুসলমানের জন্য অন্য কোনো ধর্মের উপাসনা ও ধর্মীয় আচারে অংশগ্রহণ করা ইসলামী শরীয়ত অনুযায়ী জায়েয নয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *