বিনোদনে ইসলামিক দৃষ্টিভঙ্গি ও অবসর

বিনোদনে ইসলামিক দৃষ্টিভঙ্গি ও অবসর

লেখক : মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

মানুষ আল্লাহ তায়ালার সৃষ্ট শ্রেষ্ঠ জীব। তাকে আল্লাহ এমনভাবে সৃষ্টি করেছেন যে, জন্মলগ্ন থেকেই তার জীবনের প্রতিটি ধাপে কোনো না কোনো কাজে নিয়োজিত থাকতে হয়। কেউ ছাত্র হিসেবে লেখাপড়ার দায়িত্ব পালন করে, কেউ শিক্ষক হিসেবে জ্ঞান বিতরণের কাজে নিয়োজিত থাকে, কেউ কৃষক হয়ে ফসল ফলায়, কেউ ব্যবসায়ী হয়ে বাণিজ্য পরিচালনা করে, আবার কেউ সরকারি বা বেসরকারি চাকুরিজীবী হিসেবে অফিসে দায়িত্ব পালন করে। এমনকি একজন গৃহিণীও ঘরের সমস্ত কাজকর্ম, সন্তান পালন, খাবার তৈরি ও সংসারের ভার সামলে নিজের দায়িত্ব পালন করে থাকে। অর্থাৎ পৃথিবীতে এমন কোনো মানুষ নেই, যে একেবারে কর্মহীনভাবে জীবন যাপন করতে পারে। আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বলেন-

لَقَدۡ خَلَقۡنَا الۡاِنۡسَانَ فِیۡ کَبَدٍ ؕ

অবশ্যই আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি ক্লেশের মধ্যে। সূরা বালাদ : ৪

এই আয়াতের মাধ্যমে স্পষ্ট হয় যে, মানুষ পরিশ্রম ও কর্মের মাধ্যমেই জীবন পরিচালনা করে। তবে আল্লাহ তায়ালা মানুষকে এমনভাবে সৃষ্টি করেছেন যে, তার শরীর ও মন দুটোই বিশ্রামের প্রয়োজন অনুভব করে। তাই সারাদিনের কর্মযজ্ঞের পর মানুষ কিছু সময় বিশ্রাম নেয়, যাকে আমরা বলি অবসর সময়

মুমিনের অবসর

জীবন হলো কর্ম ও বিশ্রামের সমন্বয়। আধুনিক কর্মনীতি অনুযায়ী একজন মানুষ সাধারণত দিনে আট ঘণ্টা কাজ করে। বাকিটা সময় ঘুম, খাওয়া, পরিবারের দায়িত্ব পালন এবং সামান্য কিছু সময় অবসর হিসেবে থাকে। এই অবসর সময়েই মানুষ বিনোদন খোঁজে—কখনও বই পড়ে, কখনও পরিবারের সাথে সময় কাটায়, কখনও ভ্রমণে যায়, আবার কেউ কেউ সঙ্গীত, খেলাধুলা, সিনেমা দেখা, কিংবা সামাজিক মাধ্যমে সময় ব্যয় করে। সাধারণভাবে অবসর বলতে বোঝায় কাজের বাইরে ফাঁকা সময় যে সময় মানুষ বিশ্রাম নেয় বা বিনোদন করে। কিন্তু একজন মুমিন বান্দার জীবনে “অবসর” বলতে একেবারে কর্মহীন বা উদ্দেশ্যহীন সময় বোঝানো যায় না। কারণ, একজন মুমিন জানে, তার প্রতিটি মুহূর্তই আল্লাহর কাছে হিসাবযোগ্য। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

فَإِذَا فَرَغْتَ فَانصَبْ وَإِلَى رَبِّكَ فَارْغَبْ

“অতএব, যখন তুমি এক কাজ শেষ করো, তখন অন্য কাজে মনোনিবেশ করো। আর তোমার রবের প্রতিই আকাঙ্ক্ষা রাখো। সূরা ইনশিরাহ :৭-৮

অর্থাৎ একজন মুমিনের জীবন কখনোই শূন্য বা উদ্দেশ্যহীন হয় না। সে এক ইবাদত শেষ করলে অন্য ইবাদতে প্রবেশ করে, এক দায়িত্ব শেষ করলে অন্য দায়িত্বে মনোনিবেশ করে।

সাধারণ অর্থে অবসর বলতে মানুষ সাধারণত সেই সময়কে বোঝে, যখন সে কোনো ধরনের কাজ বা দায়িত্ব পালনে ব্যস্ত থাকে না, অর্থাৎ কর্মহীনতা ও দায়িত্বমুক্তির একটি অবকাশ। কিন্তু এই অর্থে যদি অবসরের ধারণা গ্রহণ করা হয়, তবে একজন মুসলিমের জীবনধারায় ‘অবসর’ নামক কোনো বিষয়ের অস্তিত্ব থাকা কার্যত অসম্ভব, যার প্রতি সে যত্নবান হতে পারে বা যাকে সে শুধু কর্মহীনতায় অতিবাহিত করতে পারে। কারণ, একজন নিষ্ঠাবান মুসলিমের জীবনকর্মের একটি মুহূর্তও দায়িত্ব বা লক্ষ্যহীনভাবে অতিক্রান্ত হওয়ার সুযোগ থাকে না। তার জীবনের প্রতিটি ক্ষণই কোনো না কোনো গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য পালনে নিবেদিত। একজন মুসলিমকে দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করেত হয়। সালাতের বাহিরে তাকে প্রতি নিয়ত জীবিকা নির্বাহের চেষ্টা করতে হয়। তাছাড়া তার পরিবারের হক, আত্মীয় স্বজনদের হক, প্রতিবেশীর হক, সামাজিক দায়বদ্ধতার হক ইত্যাদি আদায় করতে হয়। আর যদি দৈবক্রমে এই ধরনের কোন দায়িত্বই সম্পাদনের প্রয়োজন না হয়, তবুও একজন মুসলিমের জীবনে সুন্নাত বা নফল (ঐচ্ছিক ইবাদত) কাজের কোনো সীমারেখা নেই, যা তাকে আল্লাহর নৈকট্য লাভে সহায়ক। একজন মুসলিম যদি শরিয়তে বর্ণিত সমস্ত সুন্নাত তার জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রতিফলিত করতে চায়, তবে সেই সুন্নাত ও নফল আমলের আধিক্য এত বেশি যে, তার এই ইচ্ছা বাস্তবায়ন করাই জীবনব্যাপী এক বিশাল কর্মযজ্ঞে পরিণত হয়।

অতএব, এই ব্যাপক কর্মপরিধি ও ইবাদতের অবিচ্ছিন্ন ধারার প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন জাগে, একজন মুসলিমের জীবনে প্রকৃত অর্থে ‘অবসর সময়’ কোথায়? ইসলামী জীবনদর্শনে ‘অবসর’ শব্দটির অর্থকে তাই ভিন্নভাবে সংজ্ঞায়িত করতে হয়। মুসলিমের জীবনে অবসর মানে দায়িত্বমুক্তির সময় নয়, বরং এক দায়িত্ব থেকে অন্য দায়িত্বে স্থানান্তরের মুহূর্ত। এটি একটি ইবাদত থেকে অন্য ইবাদতে রূপান্তরের সময়। যখন সে দৈহিক কোনো কাজ থেকে মুক্তি পায়, তখন সে মানসিক, আত্মিক অথবা জ্ঞানগত ইবাদতে মনোনিবেশ করে।

বিনোদনের ইসলামিক দৃষ্টিভঙ্গি

উপরের আলোচনাতে এ কতা ষ্পষ্ট যে মুমিনের জীবন কোন অবসর নাই। অবসর নাই মানেই তার কোন বিনোদন নাই। ইসলামিক দৃষ্টিভঙ্গি বিনোদনের পরিধি ও সঙ্গা আলাদা। কঠোর পরিশ্রমের পর বিশ্রাম নেওয়াও আল্লাহর হক আদায় ও পরবর্তী ইবাদতের জন্য শক্তি সঞ্চয়ের নিয়তে ইবাদতে পরিণত হতে পারে। এমনকি, হালাল উপায়ে বিনোদন বা বিশ্রামও যদি সওয়াবের নিয়তে করা হয়, তবে তাও অর্থহীন থাকে না।

অর্থাত মুমিনে বিনোদন ও ইবাদত। যখন মুমিন হবে তখনই ভিন্ন আঙ্গিতে ভিন্ন পন্থায় কুরআন সুন্নাহর অনুসরের ইবাদতে লিপ্ত হবে। আল্লাহ বলেন-

فَاِذَا فَرَغۡتَ فَانۡصَبۡ ۙ

অতএব যখনই তুমি অবসর পাবে, তখনই কঠোর ইবাদাতে রত হও। সুরা ইনশারাহ : ৭

এই আয়াতের ব্যাখ্যায় মুমিনের জীবনদর্শনের গভীর দিকটি উন্মোচিত হয়। এই আয়াতটি কঠোরভাবে উপদেশ দেয় যে, মুমিন ব্যক্তি এক কাজ শেষ করার পর যেন কোনো প্রকার আলস্যে গা ভাসিয়ে না দিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজে নিজেকে নিয়োজিত করে।

দুনিয়াবি কাজ থেকে অবসর পেলে যেন আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগিতে আত্মনিয়োগ করা হয়। অর্থাৎ, জীবিকা নির্বাহের চেষ্টা শেষ হলে তাহাজ্জুদ, কুরআন তিলাওয়াত, বা যিকিরে মনোনিবেশ করা। মুমিনের কাছে কঠোর পরিশ্রমের পর যে বিশ্রাম (হালাল বিনোদন, ঘুম, পরিবারের সাথে সময় কাটানো) আসে, তা পরবর্তী ইবাদতের জন্য শক্তি সঞ্চয়ের নিয়তে করা হলে তা-ও এক প্রকারের ইবাদতে পরিণত হয়। কারণ, শরীর ও মনকে চাঙ্গা না রাখলে সঠিকভাবে ইবাদত করা সম্ভব নয়। রাসূল (সাঃ)-এর জীবনযাপন এর উজ্জ্বল প্রমাণ, যেখানে তিনি বিশ্রাম ও হালাল বিনোদনের মাধ্যমে ইবাদতের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতেন। সুতরাং, মুমিনের জীবনে “অবসর” বলতে অর্থহীনভাবে বা উদ্দেশ্যহীনভাবে সময় নষ্ট করা বোঝায় না, বরং এর অর্থ এক প্রকারের ‘ট্রানজিশনাল পিরিয়ড’ বা এক ইবাদত থেকে অন্য ইবাদতে যাওয়ার বিরতি। এই বিরতির সময় হালাল বিনোদন বা বিশ্রামও যদি সওয়াবের নিয়তে করা হয়, তবে তা আল্লাহর কাছে অর্থহীন থাকে না, বরং ইবাদতেরই ভিন্ন এক আঙ্গিক হয়ে দাঁড়ায়। মুমিনের জীবন তাই বিনোদনের নামে প্রবৃত্তির অনুসরণ না করে, কুরআন ও সুন্নাহর নির্দেশনা অনুযায়ী ভিন্ন পন্থায় ইবাদতে লিপ্ত থাকে।

ইসলামী জীবনবোধের মূল কথা হলো, একজন মুসলিম তো সর্বদা মনেপ্রাণে এই প্রত্যাশা লালন করবে এবং ঐকান্তিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবে যে, তার জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত যেন আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় হয়, তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের পথে নিবেদিত হয়। এই জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য স্বয়ং আল্লাহ তাআলা কুরআনে কারিমে অত্যন্ত সুস্পষ্ট ভাষায় ইরশাদ করেছেন-

وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ

আর আমি জিন ও মানবকে কেবল আমার ইবাদত করার জন্যই সৃষ্টি করেছি। কুরআন ৫১: ৫৬

এই আয়াতের আলোকে বোঝা যায়, মানব সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্যই হলো ইবাদত। আর ইবাদত শুধু আনুষ্ঠানিক সালাত, সিয়াম বা হজের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একজন মুসলিমের দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি বৈধ কাজ, যদি আল্লাহর নির্দেশিত পথে এবং তাঁর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে করা হয়, তবে তা ইবাদতে গণ্য হয়।

মুমিনের অবসর সময়ও তার ঈমানের আলোয় পরিচালিত হয়। সে অবসরে এমন কাজ করে, যা হয় ইবাদতের অংশ, নয়তো ইবাদতের সহায়ক। ইবাদাহ মানে হলো—

আল্লাহর দাসত্ব স্বীকার করে তাঁর সন্তুষ্টির জন্য কাজ করা। একজন মুমিনের জীবনের প্রতিটি কাজই ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে যদি তা আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে করা হয়। এ উদ্দেশ্যে সাধনে এবং প্রতিটি কাজ কুরআন সুন্নাহ সীমারেখার মধ্যে রাখতে আমরা নিচে তিনটি নিয়ম মেনে চলব। যথা-

* আমরা পৃথিবীতে আল্লাহর দাস হিসেবে তার সন্তুষ্টির কাজ করব।  

* তিনি যা হালাল করেছেন, তা করব।

* তিনি যা হারাম করেছেন, তা থেকে দূরে থাকব।

এই দাসত্ব বা আল্লাহর ইচ্ছার কাছে আত্মসমর্পণ করার নামই হলো ইসলাম। আমাদের জীবনের মূল উদ্দেশ্য পূরণের জন্য সারাদিন কেবল আনুষ্ঠানিক ইবাদতে (সালাত, সিয়াম) মগ্ন থাকার প্রয়োজন নেই। বরং, যখন আমরা আল্লাহর দেওয়া শরীয়তের (সীমা বা বিধান) মধ্যে থেকে, আল্লাহকে খুশি করার উদ্দেশ্য নিয়ে আমাদের দৈনন্দিন পার্থিব কাজগুলো করি, তখন সেই কাজগুলোও ইবাদতে পরিণত হয়। যেমন-

১. পরিবারকে খাওয়ানোর জন্য চাকরি বা ব্যবসা করা ইবাদত:

হালাল উপায়ে জীবিকা অর্জন করা এবং এর মাধ্যমে পরিবার-পরিজনের মৌলিক প্রয়োজন মেটানো ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। যখন একজন মুমিন এই কাজের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করে এবং রাসূল ﷺ-এর নির্দেশিত পথে সততার সাথে ব্যবসা বা চাকরি করে, তখন তার এই কঠোর পরিশ্রম একটি মহৎ ইবাদতের মর্যাদা লাভ করে। এটি শুধু পার্থিব কাজ থাকে না, বরং আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত দায়িত্ব পালন হিসেবে গণ্য হয়।

কাব ইবনু উজরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী ﷺ- এর নিকট দিয়ে এক ব্যক্তি গমন করলো। রাসূলুল্লাহ ﷺএর সাহাবাগণ তার কর্মস্পৃহা ও শক্তি দেখে বললেন, “”হে আল্লাহর রাসূল! যদি এই কর্মতৎপরতা আল্লাহর রাস্তায় (জিহাদে) হতো! তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন-

যদি সে তার ছোট সন্তানদের জন্য চেষ্টা করতে বের হয়, তবে সে আল্লাহর পথে আছে। আর যদি সে বার্ধক্যে উপনীত বাবা-মায়ের জন্য চেষ্টা করতে বের হয়, তবে সে আল্লাহর পথে আছে। যদি সে নিজেকে (হারাম থেকে) পবিত্র রাখার জন্য চেষ্টা করে, তবে সে আল্লাহর পথে আছে। আর যদি সে লোক-দেখানো ও অহংকার করার জন্য বের হয়, তবে সে শয়তানের পথে আছে। আল-মুজামুল কাবীর, তাবারানী : ৭১৬৬. সহীহ ইবনে হিব্বান : ৪৩৬৪

২. পরিশ্রমের পর শরীরকে সুস্থ রাখার জন্য ঘুমানো ইবাদত:

 আল্লাহ আমাদের শরীরকে একটি আমানত হিসেবে দিয়েছেন। দিনের কাজের শেষে পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও ঘুম দিয়ে শরীরকে সতেজ রাখা এই আমানতের হক আদায়ের অন্তর্ভুক্ত। ঘুমানোর আগে যদি আল্লাহর নাম নেওয়া হয় এবং এই নিয়ত করা হয় যে, এর মাধ্যমে শক্তি সঞ্চয় করে পরের দিন আরও মনোযোগের সাথে ইবাদত ও দায়িত্ব পালন করা হবে, তবে এই ঘুমও ইবাদতে পরিণত হয়। সুস্থতা ইবাদতের পূর্বশর্ত।

আবূ জুহাইফাহ (রাঃ)-এর পিতা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সালমান ও আবূ দারদা (রাঃ)-এর মধ্যে ভ্রাতৃ বন্ধন স্থাপন করেন। এরপর একদিন সালমান আবূ দারদা-এর সঙ্গে দেখা করতে গেলেন। তখন তিনি উম্মু দারদা (রাঃ)-কে নিম্নমানের পোশাকে দেখতে পেলেন। তিনি তাঁকে জিজ্ঞেস করলেনঃ তোমার কী হয়েছে? তিনি বললেনঃ তোমার ভাই আবূ দারদার দুনিয়াতে কিছুর দরকার নেই। ইতোমধ্যে আবূ দারদা এলেন। অতঃপর তার জন্য খাবার তৈরি করে তাঁকে বললেন, আপনি খেয়ে নিন, আমি তো সিয়াম পালন করছি।’ তিনি বললেনঃ আপনি যতক্ষণ না খাবেন ততক্ষণ আমিও খাব না। তখন তিনিও খেলেন। তারপর যখন রাত হলো, তখন আবূ দারদা সালাতে দাঁড়ালেন। তখন সালমান তাঁকে বললেনঃ আপনি ঘুমিয়ে পড়ুন। তিনি শুয়ে পড়লেন। কিছুক্ষণ পরে আবার উঠে দাঁড়ালে, তিনি বললেনঃ (আরও) ঘুমান। অবশেষে যখন রাত শেষ হয়ে এল, তখন সালমান বললেনঃ এখন উঠুন এবং তারা উভয়েই সালাত আদায় করলেন। তারপর সালমান বললেনঃ তোমার উপর তোমার রবের হক আছে, (তেমনি) তোমার উপর তোমার হক আছে এবং তোমার স্ত্রীরও তোমার উপর হক আছে। সুতরাং তুমি প্রত্যেক হকদারের দাবী আদায় করবে। তারপর তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে এসে, তাঁর কাছে তার কথা উল্লেখ করলেনঃ তিনি বললেন, সালমান ঠিকই বলেছে। সহিহ বুখারি : ৬১৩৯

৩. আল্লাহর নেয়ামত হিসেবে হালাল খাদ্য গ্রহণ করে শুকরিয়া আদায় করা ইবাদত:

হালাল খাবার গ্রহণ করা এবং প্রতিটি লোকমার জন্য আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। খাবার গ্রহণের আগে ‘বিসমিল্লাহ’ বলা এবং শেষে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলে আল্লাহর শোকর আদায় করা—এই পুরো প্রক্রিয়াটিই ইবাদতের অংশ। এর মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতকে স্বীকার করে এবং এর সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করে, যা তার রুহানিয়াতকে আরও শক্তিশালী করে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

یٰۤاَیُّہَا النَّاسُ کُلُوۡا مِمَّا فِی الۡاَرۡضِ حَلٰلًا طَیِّبًا ۫ۖ وَّلَا تَتَّبِعُوۡا خُطُوٰتِ الشَّیۡطٰنِ ؕ اِنَّہٗ لَکُمۡ عَدُوٌّ مُّبِیۡنٌ

হে মানুষ, যমীনে যা রয়েছে, তা থেকে হালাল পবিত্র বস্তু আহার কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য সুস্পষ্ট শত্রু। সুরা বাকারা : ১৬৮

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَاِذۡ تَاَذَّنَ رَبُّکُمۡ لَئِنۡ شَکَرۡتُمۡ لَاَزِیۡدَنَّکُمۡ وَلَئِنۡ کَفَرۡتُمۡ اِنَّ عَذَابِیۡ لَشَدِیۡدٌ

আর যখন তোমাদের রব ঘোষণা দিলেন, ‘যদি তোমরা শুকরিয়া আদায় কর, তবে আমি অবশ্যই তোমাদের বাড়িয়ে দেব, আর যদি তোমরা অকৃতজ্ঞ হও, নিশ্চয় আমার আযাব বড় কঠিন’। সুরা ইবরাহিত : ৭

৪. মানুষের সেবা করা ও উপকার করা:

মানুষের প্রতি সহানুভূতি ও দয়া প্রদর্শন করা এবং তাদের বিপদাপদে সাহায্য করা ইসলামের অন্যতম মৌলিক শিক্ষা। শারীরিক, আর্থিক বা মানসিক যে কোনো উপায়ে একজন মুমিনের কষ্ট দূর করা বা তার প্রয়োজন মেটানো একটি উচ্চ মর্যাদার ইবাদত। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

 ؕ وَمَنۡ اَحۡیَاہَا فَکَاَنَّمَاۤ اَحۡیَا النَّاسَ جَمِیۡعًا ؕ

وَلَقَدۡ جَآءَتۡہُمۡ رُسُلُنَا بِالۡبَیِّنٰتِ ۫ ثُمَّ اِنَّ کَثِیۡرًا مِّنۡہُمۡ بَعۡدَ ذٰلِکَ فِی الۡاَرۡضِ لَمُسۡرِفُوۡ

আর যে ব্যক্তি কোন ব্যক্তিকে রক্ষা করল, তাহলে সে যেন সমস্ত মানুষকে রক্ষা করল। সুরা মায়িদা : ৩২

আবদুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, মুসলিম মুসলিমের ভাই। সে তার উপর জুলুম করবে না এবং তাকে যালিমের হাতে সোপর্দ করবে না। যে কেউ তার ভাইয়ের অভাব পূরণ করবে,আল্লাহ তার অভাব পূরণ করবেন।যে কেউ তার মুসলিম ভাইয়ের বিপদ দুর করবে, আল্লাহ তা’আলা কিয়ামতের দিন তার বিপদসমূহ দূর করবেন। যে ব্যক্তি কোন মুসলিমের দোষ ঢেকে রাখবে, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার দোষ ঢেকে রাখবেন। সহিহ বুখারি : ২৪৪২, ৬৯৫১

৫. জ্ঞান অর্জন ও শিক্ষাদান:

দ্বীনী জ্ঞান (কুরআন-সুন্নাহর জ্ঞান) এবং উপকারী দুনিয়াবি জ্ঞান (যা মানুষের কল্যাণে আসে) অর্জন করা উভয়ই মুমিনের জন্য আবশ্যক। জ্ঞান অর্জন যদি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে হয় এবং তা মানবকল্যাণে ব্যবহৃত হয়, তবে তা ইবাদত। এই জ্ঞান অন্যকে শিক্ষাদান করা বা সৎকাজে উৎসাহিত করাও সাদকায়ে জারিয়া বা চলমান সওয়াব হিসেবে পরিগণিত হয়।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

ہَلۡ یَسۡتَوِی الَّذِیۡنَ یَعۡلَمُوۡنَ وَالَّذِیۡنَ لَا یَعۡلَمُوۡنَ ؕ  اِنَّمَا یَتَذَکَّرُ اُولُوا الۡاَلۡبَابِ 

‘যারা জানে আর যারা জানে না তারা কি সমান?’ বিবেকবান লোকেরাই কেবল উপদেশ গ্রহণ করে। সূরা যুমার : ৯

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

«وَمَنْ سَلَكَ طَرِيقًا يَلْتَمِسُ فِيهِ عِلْمًا، سَهَّلَ اللَّهُ لَهُ بِهِ طَرِيقًا إِلَى الجَنَّةِ

যে ব্যক্তি জ্ঞান অন্বেষণের পথে বের হয়, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতের পথ সহজ করে দেন।সহিহ মুসলিম : ২৬৯৯

৬. পারিবারিক ও সামাজিক দায়িত্ব পালন:

পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করা, জীবনসঙ্গী ও সন্তানদের প্রতি দয়া ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা এবং আত্মীয়-স্বজনের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখা (সিলাতুর রাহিম) সর্বোচ্চ ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত। এসব দায়িত্বকে আল্লাহর আদেশ মনে করে পালন করলে প্রতিটি আচরণ ইবাদতের খাতায় লিপিবদ্ধ হয়। সামাজিক দায়িত্ব হিসেবে প্রতিবেশীর হক আদায় করা এবং সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করাও ইবাদত।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا قُوۡۤا اَنۡفُسَکُمۡ وَاَہۡلِیۡکُمۡ نَارً

হে ঈমানদারগণ, তোমরা নিজেদেরকে ও তোমাদের পরিবার-পরিজনকে আগুন হতে বাঁচাও। সুরা তাহরিম : ৬

‘আবদুল্লাহ ইবনু উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল। কাজেই প্রত্যেকেই নিজ অধীনস্থদের বিষয়ে জিজ্ঞাসার সম্মুখীন হবে। যেমন- জনগণের শাসক তাদের দায়িত্বশীল, কাজেই সে তাদের বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। একজন পুরুষ তার পরিবার পরিজনদের দায়িত্বশীল, কাজেই সে তাদের বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। স্ত্রী স্বামীর ঘরের এবং তার সন্তানের দায়িত্বশীল, কাজেই সে তাদের বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। আর ক্রীতদাস আপন মনিবের সম্পদের রক্ষণাবেক্ষণকারী। কাজেই সে বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। শোন! তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল। কাজেই প্রত্যেকেই আপন অধীনস্থদের বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। সহিহ বুখারি : ২৫৫৪

৭. সময়মতো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যরক্ষা

শরীয়তের নির্দেশিত পথে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, যেমন – অজু করা, গোসল করা এবং ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা ইবাদতের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।

আবূ মালিক আল আশ’আরী (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ পবিত্রতা হল ঈমানের অর্ধেক অংশ। আলহামদু লিল্লাহ’ মিযানের পরিমাপকে পরিপূর্ণ করে দিবে এবং “সুবহানাল্লাহ ওয়াল হামদুলিল্লা-হ” আসমান ও জমিনের মধ্যবর্তী স্থানকে পরিপূর্ণ করে দিবে। সালাত’ হচ্ছে একটি উজ্জ্বল জ্যোতি। সাদাকা হচ্ছে দলীল। ধৈর্য হচ্ছে জ্যোতির্ময়। আর “আল কুরআন’ হবে তোমার পক্ষে অথবা বিপক্ষে প্রমাণ স্বরূপ। বস্তুতঃ সকল মানুষই প্রত্যেক ভোরে নিজেকে আমলের বিনিময়ে বিক্রি করে। তার আমল দ্বারা সে নিজেকে (আল্লাহর আযাব থেকে) মুক্ত করে অথবা সে তার নিজের ধ্বংস সাধন করে। সহিহ মুসলিম : ২২৩

পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অঙ্গ, এই বিশ্বাসে সুস্থ থাকার জন্য প্রচেষ্টা করাও ইবাদত, কারণ সুস্থ শরীর ইবাদত পালনে এবং দ্বীনের খেদমতে আরও বেশি সক্ষমতা যোগায়। অসুস্থতা থেকে নিজেকে রক্ষা করার চেষ্টা আল্লাহর আমানতের প্রতি যত্নশীল হওয়ারই নামান্তর।

হালাল উপায়ে বিনোদনও ইবাদত

আল্লাহর দেওয়া সীমারেখার মধ্যে থেকে মনকে সতেজ করার জন্য এবং ইবাদতের প্রতি আগ্রহ ধরে রাখার জন্য বৈধ বিনোদন করা ইবাদত হতে পারে। যেমন: পরিবারকে সময় দেওয়া, বৈধ খেলাধুলা করা বা প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করা। যদি এর মাধ্যমে আল্লাহর দেওয়া দেহকে সতেজ রেখে পরবর্তী ইবাদতের জন্য শক্তি সঞ্চয়ের নিয়ত থাকে, তবে এই সতেজতা অর্জনের প্রক্রিয়াটিও ইবাদতে পরিণত হয়।

আয়িশাহ (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ একদা আমি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে আমার ঘরের দরজায় দেখলাম। তখন হাবশার লোকেরা মসজিদে (বর্শা দ্বারা) খেলা করছিল। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর চাদর দিয়ে আমাকে আড়াল করে রাখছিলেন। আমি ওদের খেলা অবলোকন করছিলাম। সহিহ বুখারি : ৪৫৪, ৪৫৫, ৯৫০, ৯৮৮, ২৯০৬, ৩৫২৯, ৩৯৩১, ৫১৯০, ৫২৩৬

মুসলিমের জীবন হলো এক নিরবচ্ছিন্ন ইবাদতের ধারা, এক দায়িত্ব থেকে অন্য দায়িত্বের সেতু। এখানে আলস্য বা উদ্দেশ্যহীন কর্মহীনতার কোনো স্থান নেই। সময়কে অর্থহীন করার অর্থ হলো সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত হওয়া। আর এই বিচ্যুতিই মানুষকে আত্মিক, জ্ঞানগত এবং প্রবৃত্তিগত অকর্মণ্যতার দিকে ঠেলে দেয়, যা বর্তমান সময়ের কর্মবিমুখতার প্রধান কারণ। একজন প্রকৃত মুসলিম তার জীবনের প্রতিটি ‘অবসর’ সময়কেও আল্লাহর ইবাদত ও দ্বীনের খেদমতে ব্যয় করে, ফলে তার জীবনে ‘অবসর’ কেবল সময়ের সার্থক ব্যবহারেরই নামান্তর। এভাবে, ইসলামী জীবনব্যবস্থা একজন মুসলিমকে প্রতিটি মুহূর্তে কর্মোদ্দীপক ও উদ্দেশ্যমুখী রাখে, তাকে অর্থহীনতার হাত থেকে রক্ষা করে এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষণকে আল্লাহর পথে কাজে লাগানোর প্রেরণা যোগায়। এটাই মুসলিম জীবনে অবসর সময়ের প্রকৃত তাৎপর্য।

তবে এর মানে এই নয় যে মুমিন কখনো অবসর বা বিশ্রাম নেয় না। বরং ইসলাম মানুষকে ভারসাম্যপূর্ণ জীবনযাপনের শিক্ষা দেয়। তাই কাজের পর কিছু সময় বিশ্রাম নেওয়া, মনকে সতেজ রাখা, শরীরকে শক্তিশালী করা, এসবই মুমিনের জীবনের অংশ। তবে এই “অবসর” সময়ও সে আল্লাহর সীমার মধ্যে কাটায়, তাই তার অবসর কখনোই অর্থহীন নয়। মুমিন যখন তার অবসর কুনআন ও সুন্নাহ সীমরেখার মাধ্যমে ব্যয় করে তবে নিশ্চিত রূপে ইবাদত হবে। মুমিনের প্রতিটি মুহুর্ত দাবি। তাই মুমিনের অবসর, বিনোদন, উপভোগ, আমদ-প্রমদ সব কিছুই  আল্লাহ সীমারেখার মধ্য হওয়া জরুরি। কেননা তার প্রতি মুহুর্ত হিসেব প্রদানে জন্য লেখা হচ্ছে। বলা যায়, মুমিনের জীবন উপভোগ, চিত্তবিনোদন বা বৈচিত্র্যের চেয়ে অনেক বেশি কিছু। প্রকৃতপক্ষে, আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَمَا خَلَقْنَا السَّمَاءَ وَالْأَرْضَ وَمَا بَيْنَهُمَا لَاعِبِينَ

আর আমি আকাশ ও পৃথিবী এবং যা তাদের মধ্যে আছে তা খেল-তামাশার ছলে সৃষ্টি করিনি। কুরআন : ১৬

মুমিন ও কাফিরের অবসরের সময়ের পার্থক্য

একজন মুমিন ব্যক্তি তার সময়কে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ব্যবহার করে। তার জীবনের প্রতিটি কাজের উদ্দেশ্য হয় আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। ফলে তার অবসর সময়ও খুব সীমিত হয়ে যায়। কর্মঘণ্টার পর অবসর সময় পেলেও সে চায় সেই সময়কে ইবাদত, কুরআন তিলাওয়াত, জিকির, ইসলামি জ্ঞান অর্জন, পরিবারের হক আদায় বা সমাজসেবার মাধ্যমে কাজে লাগাতে।

অন্যদিকে একজন অবিশ্বাসী বা বিধর্মী তার অবসর সময়কে শুধুমাত্র দুনিয়াবি আনন্দ-উল্লাসে ব্যয় করে। সে সিনেমা, গান, নাচ, ক্লাব, ক্যাসিনো বা অন্যান্য হারাম বিনোদনে লিপ্ত হয়ে পড়ে। কারণ তার কাছে জীবনের লক্ষ্য হলো শুধুই ভোগ-বিলাস।

১. মুমিন ও কাফিরের অবসর সময়ের ব্যবহারের পার্থক্য

ইসলামী জীবনদর্শনে একজন মুমিন (বিশ্বাসী) এবং একজন কাফিরের (অবিশ্বাসী/বিধর্মী) জীবনবোধ, উদ্দেশ্য এবং সময় ব্যবহারের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য বিদ্যমান। অবসর সময়ের ব্যবহার এই পার্থক্যকে বিশেষভাবে প্রতিফলিত করে। মুমিনের জীবন আবর্তিত হয় আল্লাহর সন্তুষ্টি ও পরকালের সফলতাকে কেন্দ্র করে, যেখানে কাফিরের জীবনের লক্ষ্য সাধারণত হয় ক্ষণস্থায়ী দুনিয়াবি ভোগ-বিলাস।

ক্ষেত্রমুসলিমের বিনোদন (হালালের পথে)কাফিরের বিনোদন (হারামের পথে)
মূল ভিত্তিশরীয়তের সীমারেখা ও আল্লাহর সন্তুষ্টি। ইবাদতের জন্য শক্তি সঞ্চয় করা।ভোগবাদিতা ও প্রবৃত্তির অনুসরণ। নৈতিক বা ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা নেই।
উদ্দেশ্য-১মুমিনের জীবনের মূল লক্ষ্য হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং পরকালীন জীবনের (আখিরাত) জন্য প্রস্তুতি নেওয়া।কাফিরের কাছে জীবন হলো একবারই পাওয়া, তাই জীবনের লক্ষ্য হলো শুধুই ভোগ-বিলাস এবং দুনিয়াবি আনন্দ-উল্লাসকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া।
উদ্দেশ্য-২দেহ ও মনের সতেজতা, ইবাদতের জন্য শক্তি সঞ্চয়, পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় করা এবং গুনাহ থেকে দূরে থাকা।তাৎক্ষণিক আনন্দ ও আত্ম-সন্তুষ্টি। প্রায়শই মানসিক ও শারীরিক ক্ষতির দিকে ধাবিত করে।
সময়ের ধারণামুমিন সময়কে আল্লাহর দেওয়া আমানত মনে করে এবং প্রতিটি মুহূর্তকে পুণ্যময় কাজে লাগানোর চেষ্টা করে। তার কাছে অবসর সময়ও ইবাদতের একটি অংশ।কাফির বা অবিশ্বাসীর কাছে সময় কেবলই ক্লান্তি বা কাজ থেকে মুক্তি পাওয়ার মাধ্যম। এই সময়ে তারা কোনো দায়বদ্ধতা বা জবাবদিহিতা অনুভব করে না।
সাধারণ রূপপরিবার নিয়ে হালাল স্থানে ভ্রমণ, শরীর চর্চা/খেলাধুলা (হালাল নিয়মে), হালাল আড্ডা, ইসলামী জ্ঞান অর্জন (বই পড়া), প্রকৃতির মাঝে সময় কাটানো, জিকির-তিলাওয়াত ও চিন্তন-মনন।সঙ্গীত (হারাম উপাদানযুক্ত), মদ্যপান, জুয়া, অশ্লীলতা, নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা, মাদকের ব্যবহার, কুরুচিপূর্ণ প্রদর্শনী।
ফলাফলমানসিক শান্তি লাভ, ইমান বৃদ্ধি এবং আখিরাতের প্রতি মনোযোগ ধরে রাখা।পাপের পথে ধাবিত হওয়া, সামাজিক বিশৃঙ্খলা, মানসিক অস্থিরতা ও আসক্তি।

২. অবসর সময়ের ব্যবহার ও কার্যকলাপ

মুমিন ব্যক্তি তার অবসর সময়কে এমন কাজে নিয়োজিত করে যা তার আত্মার খোরাক জোগায় এবং পরকালে উপকারে আসে। কর্মঘণ্টার পর অবসর সময় পেলেও সে সেই সময়কে ফলপ্রসূ ও ভারসাম্যপূর্ণ কাজে লাগানোর চেষ্টা করে।

মুমিনের অবসর কার্যকলাপ (হালাল বিনোদন ও ফলপ্রসূ কাজ)কাফিরের অবসর কার্যকলাপ (হারাম ও ভোগবাদী বিনোদন)
আধ্যাত্মিক উন্নয়ন: কুরআন তিলাওয়াত, আল্লাহর জিকির, নফল ইবাদত বা ধর্মীয় জ্ঞান অর্জন করা।ভোগবাদী আনন্দ: সিনেমা, গান, নাচ, নাইট ক্লাব, ক্যাসিনো বা অন্যান্য হারাম বিনোদনে লিপ্ত হওয়া।
ব্যক্তিগত ও পারিবারিক হক আদায়: পরিবারের হক আদায় করা, স্ত্রী-সন্তানদের সময় দেওয়া, তাদের সাথে ফলপ্রসূ খেলাধুলা করা। এটিও মুমিনের জন্য ইবাদত।অবাধ্যতা ও পাপ: মদ, জুয়া, অশ্লীলতা, নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা বা নৈতিকতাহীন কাজে সময় নষ্ট করা।
সৃজনশীলতা ও সমাজসেবা: ইসলামি সাহিত্য চর্চা, সমাজসেবা, অভাবীকে সাহায্য করা, জনকল্যাণমূলক কাজে সময় দেওয়া, বা হালাল শখ পূরণ করা।সময় ও সম্পদের অপচয়: অর্থহীন বা ক্ষতিকর গেমিং, চরম বিলাসবহুল জীবনযাপন এবং সম্পদ ও মূল্যবান সময়ের চূড়ান্ত অপচয় করা।
শারীরিক সুস্থতা: হালাল উপায়ে শরীরচর্চা করা, যা তাকে ইবাদতের জন্য শক্তিশালী করে তোলে।স্বাস্থ্যের ক্ষতি: এমন কাজ করা যা শরীরের জন্য ক্ষতিকর, যেমন নেশা বা অতিরিক্ত অনিরাপদ অভ্যাস।

৩. ইসলামি বিধিবিধানের পার্থক্য

ক্ষেত্রমুসলিমের বিনোদন (হালালের পথে)কাফিরের বিনোদন (হারামের পথে)
 বিধিবিধানমুমিন শরীয়তের সীমান থেকে অবসর কাটায় বিধান সে হারাম বিষয় থেকে দূরে থাকতে বলে।কাফিরের হারাম হালাল বিধানের বাধ্যবাধকরা নাই। তাই সে অশ্লীলভাবে অবসর কাটায়।  
বিনোদনের পদ্ধতিপরিবার নিয়ে ঘুরতে যাওয়া, বন্ধুদের সাথে হালাল আড্ডা, শরীর চর্চা বা খেলাধুলা, ইসলামী বই পড়া জিকির, তিলাওয়াত ও চিন্তা-মননে নিজেকে প্রশান্ত করা, প্রকৃতির মাঝে সময় কাটানো ইত্যাদিমাদকদ্রব্য ও নেশা সেবন, জুয়া ও বাজি ধরা, অশ্লীল চলচ্চিত্র ও পর্ণোগ্রাফি দেখা, কুরুচিপূর্ণ বা হারাম গান ও বাদ্যযন্ত্র শোনা, নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা, মিথ্যা ও বানোয়াট গল্প বা হাসি-ঠাট্টা, অশালীন পোশাক পরিধান ও প্রদর্শনী, সময় নষ্ট করা হয় এমন অনর্থক খেলাধুলা, জাদুটোনা ও ভাগ্য গণনা: ভাগ্য গণনাকারী ইত্যাদি।
ফলাফলঅবসর শেষে মুমিনের মনে আসে মানসিক শান্তি ও আত্মতৃপ্তি, কারণ সে জানে যে এই সময়টি সে আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে ব্যয় করেছে। তার অবসর জীবন তাকে কর্ম ও ইবাদতের জন্য আরও বেশি সতেজ ও প্রস্তুত করে তোলে।  কাফিরের অবসর সময় তাকে হয়তো ক্ষণিকের উত্তেজনা বা শারীরিক আনন্দ দেয়, কিন্তু এর ফলস্বরূপ প্রায়শই তার মনে শূন্যতা, একঘেয়েমি, মানসিক অশান্তি এবং পাপের গ্লানি থেকে যায়।

মুমিনের অবসর হলো আল্লাহর পথে চলার জন্য একটি ‘বিশ্রাম ও রিচার্জ’ প্রক্রিয়া, যেখানে মুমিনের প্রতিটি হালাল কাজও নেকিতে পরিণত হয়। আর কাফিরের অবসর হলো শুধুমাত্র দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী লোভ ও জৈবিক চাহিদা পূরণের মাধ্যম, যা তাকে পরকালীন জীবনের সফলতা থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। মুমিন তার সময়কে ‘ইনভেস্ট’ করে, আর কাফির তার সময়কে ‘খরচ’ করে।

ইবাদত ও বিনোদনে ভারসাম্য রক্ষা

ইসলামী জীবনদর্শনে মানুষের সামগ্রিক কল্যাণকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তা’আলা মানুষকে ফেরেশতাদের মতো কেবল একমুখী ইবাদত বা নিরবচ্ছিন্ন উপাসনার জন্য সৃষ্টি করেননি। বরং তিনি আমাদের শারীরিক ও মানসিক উভয় ধরনের চাহিদা দিয়েই পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। এই চাহিদাসমূহের মধ্যে আছে বিশ্রাম, আত্মতৃপ্তি এবং চিত্তবিনোদনের প্রয়োজন। মানুষের এই সহজাত প্রবৃত্তি উপেক্ষা করে যদি আমরা নিরবচ্ছিন্নভাবে কেবল ইবাদত-বন্দেগি ও গম্ভীর কাজে ডুবে থাকি, তবে এর ফলস্বরূপ আমাদের শারীরিক ও মানসিক শক্তির দ্রুত ক্ষয় ঘটবে। একঘেয়েমি চলে আসবে, যা দীর্ঘমেয়াদী ইবাদত চালিয়ে যেতে কষ্টকর করে তুলবে। এর ফলে একসময় মানসিক হতাশা, অসুস্থতা বা ইবাদতে অনীহা দেখা দিতে পারে।

ইসলাম মানুষের প্রকৃতির এই দিকটিকে পুরোপুরি স্বীকার করে। এ কারণেই প্রিয় নবী মুহাম্মাদ ﷺ স্বয়ং নিরবচ্ছিন্নভাবে কেবল ইবাদত করতে নিষেধ করেছেন এবং জীবনের সকল ক্ষেত্রে ভারসাম্য বজায় রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। তাঁর জীবনাচারই মুমিনদের জন্য উত্তম আদর্শ। এই ভারসাম্য রক্ষার নীতির সমর্থনে একটি গুরুত্বপূর্ণ হাদিস হলো-

আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, একদা তিন ব্যক্তি নাবী ﷺ এর ‘ইবাদাতের অবস্থা জানার জন্য তাঁর স্ত্রীগণের নিকট এলে। নাবী ﷺ এর ইবাদাতের খবর শুনে তারা যেন তাঁর ইবাদাতকে কম মনে করলেন এবং পরস্পর আলাপ করলেন: নাবী ﷺ এর সঙ্গে আমাদের তুলনা কোথায়, আল্লাহ তা‘আলা তাঁর আগের-পরের (গোটা জীবনের) সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দিয়েছেন। অতঃপর তাদের একজন বললেন, আমি কিন্তু সারা রাত সলাত আদায় করবো। দ্বিতীয়জন বললেন, আমি দিনে সিয়াম পালন করবো, আর কখনো তা ত্যাগ করব না। তৃতীয়জন বললেন, আমি নারী থেকে দূরে থাকব, কখনো বিয়ে করবো না। তাদের পারস্পরিক আলাপ-আলোচনার সময় নবী ﷺ এসে পড়লেন এবং বললেন, তোমরা কী ধরনের কথাবর্তা বলছিলে? আল্লাহ্‌র কসম! আমি আল্লাহ্‌কে তোমাদের চেয়ে বেশী ভয় করি, তোমাদের চেয়ে বেশী পরহেয করি। কিন্তু এরপরও আমি কোন দিন সিয়াম পালন করি আবার কোন দিন সিয়াম পালন করা ছেড়ে দেই। রাতে সলাত আদায় করি আবার ঘুমিয়েও থাকে। আমি বিয়েও করি। সুতরাং এটাই আমার সুন্নাত (পথ), যে ব্যক্তি আমার পথ থেকে বিমূখ হবে সে আমার (উম্মাতের) মধ্যে গণ হবে না। সহিহ বুখারী : ৫০৬৩, সহিহ মুসলিম ১৪০১

এই হাদিসটি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, ইসলামে কঠোরতা বা সন্ন্যাসবাদের কোনো স্থান নেই। রাসূল ﷺ নিজে আল্লাহর সর্বাধিক ভয়কারী হওয়া সত্ত্বেও মধ্যপন্থা অবলম্বন করেছেন। তিনি তাঁর উম্মতকেও জীবনের বিভিন্ন দিকের দাবি পূরণ করতে উৎসাহিত করেছেন—একদিকে যেমন আল্লাহর হক (ইবাদত), অন্যদিকে তেমনি নিজের হক (বিশ্রাম, ঘুম) এবং পরিবারের হক (বিয়ে ও সামাজিক জীবন) আদায় করতে শিখিয়েছেন। অতিরিক্ত কঠোরতার মাধ্যমে ভারসাম্য নষ্ট করার প্রবণতাকে তিনি তাঁর পথ থেকে বিমুখতা হিসেবে গণ্য করেছেন।

তাই, একজন বুদ্ধিমান মুমিন তাঁর জীবনে এই ভারসাম্যকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেন। তিনি জানেন যে, শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তি নিয়ে ইবাদত করলে তাতে মনোযোগ আসে না এবং ইবাদতের মূল উদ্দেশ্য (আল্লাহর সাথে নৈকট্য স্থাপন) ব্যাহত হয়। তাই তিনি আল্লাহর অনুমোদিত উপায়ে মাঝে মাঝে বিরতি নেন ও বিনোদন করেন। এই বিরতি বা বিনোদনকে ইসলামী পরিভাষায় ‘মুরাওয়াহাতুন নাফস’ (আত্মার প্রশান্তি) বলা যেতে পারে। হালাল বিনোদন মুমিনের শক্তি সঞ্চয়ের মাধ্যম, যা তাকে সতেজ করে পুনরায় দ্বীনী ও দুনিয়াবী দায়িত্ব পালনে মনোনিবেশ করতে সাহায্য করে।

এই বিনোদনের অর্থ এই নয় যে তা ইবাদতের সময়কে বা দায়িত্বকে নষ্ট করবে, বরং তা এমন হওয়া চাই যা শরীয়তের সীমারেখা মেনে চলে এবং মুমিনকে আরও উদ্যমের সাথে আল্লাহমুখী করে তোলে। পরিবারের সাথে সময় কাটানো, খেলাধুলা, বৈধ ভ্রমণ, বা কোনো সুস্থ বিনোদনমূলক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ—এ সবই ক্লান্তি দূর করে মনকে সতেজ করার মাধ্যম। যখন একজন মুমিন এই বিশ্রাম ও বিনোদনের উদ্দেশ্য আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং পরবর্তীতে আরও উদ্যমের সাথে ইবাদত ও দায়িত্ব পালনের নিয়ত করে, তখন এই বিরতিও নেক আমল হিসেবে গণ্য হতে পারে। এভাবে, ইবাদত ও বিনোদনের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করে একজন মুমিন একটি সুস্থ, সফল এবং সন্তোষজনক জীবন অতিবাহিত করতে পারে, যা ইহকাল ও পরকাল উভয় ক্ষেত্রেই কল্যাণ বয়ে আনে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *