মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন
অন্যের প্রতি হিংসা-বিদ্বেষ ও শত্রুতা সৃষ্টি করবে না
বিনোদনের মাধ্যমে সমাজের মধ্যে বা ব্যক্তিগত পর্যায়ে কোনো প্রকার হিংসা-বিদ্বেষ, শত্রুতা বা বৈরিতা সৃষ্টি করা ইসলামে সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ। অনেক প্রতিযোগিতামূলক খেলাধুলা বা বিনোদনে জেতার জন্য বা প্রতিপক্ষকে হারাতে গিয়ে এমন মনোভাব তৈরি হতে পারে যা সুস্থ সম্পর্কের জন্য ক্ষতিকর। ইসলামী বিনোদন অবশ্যই সুস্থ প্রতিযোগিতা ও ভ্রাতৃত্ববোধের জন্ম দেবে, যা সমাজে সৌহার্দ্য বৃদ্ধি করে। যদি কোনো খেলা বা বিনোদন এমন হয় যা দুই দলের মধ্যে বা দুই ব্যক্তির মধ্যে অপ্রয়োজনীয় ঝগড়া, বিদ্বেষ বা প্রতিশোধের মনোভাব তৈরি করে, তবে সেই বিনোদন পরিহার করতে হবে। একজন মুসলিমের হৃদয়ে তার ভাইয়ের প্রতি ভালোবাসা ও কল্যাণ কামনা থাকবে। বিনোদনকে এমনভাবে ডিজাইন ও পরিচালনা করতে হবে যাতে অংশগ্রহণকারীরা বিজয় ও পরাজয় উভয়কেই স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে শেখে এবং খেলা শেষে পারস্পরিক সম্মান ও বন্ধুত্ব বজায় থাকে। এই নীতিটি সমাজের সংহতি ও মুসলিমদের মধ্যে ঐক্যের বন্ধনকে মজবুত করতে সাহায্য করে।
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
اِنَّمَا الۡمُؤۡمِنُوۡنَ اِخۡوَۃٌ فَاَصۡلِحُوۡا بَیۡنَ اَخَوَیۡکُمۡ وَاتَّقُوا اللّٰہَ لَعَلَّکُمۡ تُرۡحَمُوۡنَ
নিশ্চয় মুমিনরা পরস্পর ভাই ভাই। কাজেই তোমরা তোমাদের ভাইদের মধ্যে আপোষ- মীমাংসা করে দাও। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, আশা করা যায় তোমরা অনুগ্রহপ্রাপ্ত হবে। সূরা হুজুরাত : ১০
মুসলমানদের মধ্যে শত্রুতা নয়, ভ্রাতৃত্ববোধ থাকা উচিত। বিনোদন এমন হওয়া উচিত যা এই ভ্রাতৃত্বকে শক্তিশালী করে, বিভক্ত নয়।
হিংসা ও বিদ্বেষে ভরা হৃদয় জান্নাতে প্রবেশে বাধা হতে পারে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَنَزَعۡنَا مَا فِیۡ صُدُوۡرِہِمۡ مِّنۡ غِلٍّ اِخۡوَانًا عَلٰی سُرُرٍ مُّتَقٰبِلِیۡنَ
আর আমি তাদের অন্তর থেকে হিংসা বিদ্বেষ বের করে ফেলব, তারা সেখানে ভাই ভাই হয়ে আসনে মুখোমুখি বসবে। সূরা হিজর : ৪৭
জান্নাতবাসীদের হৃদয়ে কোনো হিংসা বা বিদ্বেষ থাকবে না। ইসলামী বিনোদন এমন হতে হবে, যা মানুষের হৃদয়কে কলুষমুক্ত রাখে।
আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ হিংসা বা পরশ্রীকাতরতা নেক আমলসমূহ খেয়ে ফেলে, যেমন আগুন জ্বালানী কাঠ খেয়ে ফেলে। দান-খায়রাত গুনাহসমূহ বিলীন করে দেয়, যেমন পানি আগুনকে বিলীন করে (নিভিয়ে) দেয়। সালাত মুমিনের নূর (আলো) এবং সিয়াম জাহান্নাম থেকে আত্মরক্ষার ঢাল। সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪২১০, সুনানে আবু দাউদ : ৪৯০৩
আনাস (রাযি.) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তোমাদের কেউ প্রকৃত মু‘মিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে তার ভাইয়ের জন্য সেটাই পছন্দ করবে, যা তার নিজের জন্য পছন্দ করে। সহিহ বুখারি : ১৩, সহিহ মুসলিম : ৪৫, আহমাদ : ১২৮০১, ১৩৮৭৫
বিনোদন জগতের এমন কিছু ক্ষেত্র আছে যা মানুষের মধ্যে হিংসা-বিদ্বেষ ও শত্রুতা সৃষ্টি করতে পারে। এর মধ্যে প্রধান কয়েকটি নিচে উল্লেখ করা হলো:
১. সামাজিক মাধ্যম
সামাজিক মাধ্যমকে যদিও মূলত বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে দেখা হয়, এটি মানুষের মধ্যে হিংসা-বিদ্বেষ ও ঈর্ষা সৃষ্টিতে বড় ভূমিকা রাখে।
ক. সামাজিক তুলনা ও ঈর্ষা
মানুষ যখন দেখে যে তার বন্ধু বা পরিচিতজন ছুটি কাটানোর, দামি জিনিস কেনার বা সফলতার ছবি ও ভিডিও পোস্ট করছে, তখন তাদের মনে ঈর্ষা তৈরি হয়। এতে নিজের জীবনকে তাদের থেকে কম গুরুত্বপূর্ণ বা ব্যর্থ মনে হতে পারে, যা বিদ্বেষের জন্ম দেয়।
খ. সম্পর্কের ক্ষেত্রে ঈর্ষা
কোনো সঙ্গী যখন তার ভালোবাসার মানুষটির সামাজিক মাধ্যমে অন্য কারোর সাথে ঘনিষ্ঠতা বা যোগাযোগ দেখে, তখন তাদের মধ্যে রোমান্টিক ঈর্ষা তৈরি হতে পারে, যা সম্পর্কের মধ্যে শত্রুতা ও অবিশ্বাসের জন্ম দেয়।
গ. অনলাইন ট্রোলিং ও রাগ
সামাজিক মাধ্যমে নাম গোপন রেখে বা অন্যভাবে অনেকে খারাপ মন্তব্য, অপমানজনক কথা বা উস্কানিমূলক পোস্ট করে। এর ফলে মানুষের মধ্যে দ্রুত রাগ ছড়িয়ে পড়ে এবং তা বিদ্বেষমূলক আক্রমণ বা শত্রুতা সৃষ্টি করে।
২. প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক খেলাধুলা
আমরা বনাম তারা” মানসিকতা
খেলাধুলায় তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং বিভিন্ন দলের মধ্যে ভাগ হয়ে যাওয়ার (যেমন—দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দলের সমর্থক) কারণে মানুষের মধ্যে “আমরা বনাম তারা” নামক একটি মানসিকতা তৈরি হয়। এর ফলে অন্য দলের প্রতি বিদ্বেষ ও শত্রুতা তৈরি হয়।
খ. খেলোয়াড় বা গেমিং সংস্থার প্রতিদ্বন্দ্বিতা
ফুটবল বা ক্রিকেট খেলায় যখন খেলোয়াড়রা একে অপরের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিযোগিতা করে, তখন হারলে বা কেউ ভালো খেললে হিংসা তৈরি হতে পারে। অনেক সময় দুটি ক্লাব বা সংস্থা বা কোম্পানির মাঝে তাদের ভক্তদের মধ্যেও তীব্র শত্রুতা দেখা যায়।
৩. রিয়ালিটি শো বা টক-শোতে
ক. পরিকল্পিত সংঘাত ও ষড়যন্ত্র
এই শো-গুলিতে প্রায়শই প্রতিযোগীরা একে অপরের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে বা ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করে। দর্শকরা এই সংঘাত দেখে তাদের পছন্দের প্রতিযোগীর প্রতি সমর্থন এবং অন্যদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করতে শুরু করে।
খ. বিজয় ও জনপ্রিয়তা নিয়ে ঈর্ষা
যখন কোনো একজন প্রতিযোগী অত্যন্ত দ্রুত খ্যাতি, জনপ্রিয়তা বা পুরস্কার পেয়ে যায়, তখন অন্য প্রতিযোগীরা বা দর্শকরা তাদের প্রতি হিংসা বা ঈর্ষান্বিত হতে পারে।
শরীরের বা মনের কোনো ক্ষতি করবে না
ইসলামী বিনোদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো এটি অংশগ্রহণকারীর শরীর বা মনের কোনো প্রকার ক্ষতি করবে না। ইসলামে নিজের ক্ষতি করা (আত্ম-ক্ষতি) কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। বিনোদনের নামে যদি এমন কোনো ঝুঁকিপূর্ণ খেলা বা কার্যকলাপ করা হয়, যা গুরুতর শারীরিক আঘাত বা স্থায়ী অক্ষমতা সৃষ্টি করতে পারে, তবে তা বৈধ হতে পারে না। একইভাবে, মানসিক স্বাস্থ্যের জন্যও বিনোদন ক্ষতিকারক হওয়া উচিত নয়। উদাহরণস্বরূপ, অত্যধিক চাপ সৃষ্টিকারী বা আসক্তি তৈরি করা বিনোদনমূলক কার্যকলাপ, যা স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ব্যাঘাত ঘটায় এবং মানসিক অসুস্থতার দিকে নিয়ে যায়, তা বর্জনীয়। বিনোদন এমন হওয়া উচিত যা শরীর ও মনকে সতেজ করে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং মানসিক শান্তি প্রদান করে। সুস্থ খেলাধুলা যেমন সাঁতার, দৌড়ানো বা উপকারী ভ্রমণ শরীরকে সুস্থ রাখে। তাই, একজন মুসলিম সর্বদা এমন বিনোদন বেছে নেবে যা তার সামগ্রিক স্বাস্থ্য ও কল্যাণে ইতিবাচক অবদান রাখে।
আল্লাহ তায়াল বলেন-
وَاَنۡفِقُوۡا فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ وَلَا تُلۡقُوۡا بِاَیۡدِیۡکُمۡ اِلَی التَّہۡلُکَۃِ
আর তোমরা আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় কর এবং নিজ হাতে নিজদেরকে ধ্বংসে নিক্ষেপ করো না। সূরা বাকারা : ১৯৫
আত্ম-ক্ষতি বা নিজের শরীর ও মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি অবহেলা করা ইসলামে নিষিদ্ধ। এমন কোনো বিনোদন যা শরীরকে ক্লান্ত করে, বিপজ্জনক স্টান্টে বাধ্য করে বা মানসিক চাপ সৃষ্টি করে, তা এই আয়াতের পরিপন্থী।
আল্লাহ তায়াল বলেন-
وَلَا تَقۡتُلُوۡۤا اَنۡفُسَکُمۡ ؕ اِنَّ اللّٰہَ کَانَ بِکُمۡ رَحِیۡمًا
তোমরা নিজেদেরকে হত্যা করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি দয়ালু। সূরা নিসা : ২৯
যে কোনো কাজ, খেলা বা বিনোদন যা নিজের জীবনের ক্ষতি বা ঝুঁকি সৃষ্টি করে, তা ইসলামীভাবে নিষিদ্ধ। ঝুঁকিপূর্ণ বিনোদন যেমন আত্মহত্যাসদৃশ স্টান্ট, প্রাণঘাতী খেলাধুলা বা মানসিক ক্ষতিকর আসক্তি ইসলামের দৃষ্টিতে হারাম।
ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ক্ষতি করাও যাবে না, ক্ষতি সহাও যাবে না। সুনানে ইবন মাজাহ : ২৩৪১, আহমাদ : ২৮৬২
শরীর, মন, সম্পদ বা সমাজের কোনো অংশে ক্ষতি সৃষ্টি করা ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। বিপজ্জনক বিনোদন বা মানসিক ক্ষতির কারণ বিনোদন এ নীতির পরিপন্থী।
আবদুল্লাহ ইবনু ‘আমর ইবনুল ‘আস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেনঃ হে ‘আবদুল্লাহ! আমি এ সংবাদ পেয়েছি যে, তুমি প্রতিদিন সওম পালন কর এবং সারা রাত সালাত আদায় করে থাক। আমি বললাম, ঠিক (শুনেছেন) হে আল্লাহর রাসূল! তিনি বললেনঃ এরূপ করবে না (বরং মাঝে মাঝে) সওম পালন কর আবার ছেড়েও দাও। (রাতে) সালাত আদায় কর আবার ঘুমাও। কেননা তোমার উপর তোমার শরীরের হাক্ব রয়েছে, তোমার চোখের হাক্ব রয়েছে, তোমার উপর তোমার স্ত্রীর হাক্ব আছে, তোমার মেহমানের হাক্ব আছে। তোমার জন্য যথেষ্ট যে, তুমি প্রত্যেক মাসে তিন দিন সওম পালন কর। কেননা নেক ‘আমলের বদলে তোমার জন্য রয়েছে দশগুণ নেকী। এভাবে সারা বছরের সওম হয়ে যায়। আমি (বললাম) আমি এর চেয়েও কঠোর ‘আমল করতে সক্ষম। তখন আমাকে আরও কঠিন ‘আমলের অনুমতি দেয়া হল। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমি আরো বেশি শক্তি রাখি। তিনি বললেনঃ তবে আল্লাহর নবী দাঊদ (আঃ)-এর সওম পালন কর, এর হতে বেশি করতে যেয়ো না। আমি জিজ্ঞেস করলাম, আল্লাহর নবী দাঊদ (আঃ)-এর সওম কেমন? তিনি বললেনঃ অর্ধেক বছর। রাবী বলেন, ‘আবদুল্লাহ (রাঃ) বৃদ্ধ বয়সে বলতেন, আহা! আমি যদি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রদত্ত রুখসত (সহজতর বিধান) কবূল করে নিতাম! সহিহ বুখারি : ১৯৭৫, সহিহ মুসলিম : ১১৫৯, আহমাদ : ৬৭৭৩
বিনোদনের শারীরিক খেলাধুলা ক্ষতির কিছু উদাহরণ
শারীরিক খেলাধুলা সাধারণত শরীরের জন্য খুবই উপকারী। তবে, কিছু খেলাধুলা অতিরিক্ত, ভুল পদ্ধতিতে, বা অসতর্কভাবে খেললে তা শরীর ও মনের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। বিশেষ করে প্রতিযোগিতামূলক ক্রীড়া এবং কিছু বিপজ্জনক খেলা ক্ষতির কারণ হতে পারে। যেমন-
১. ফুটবল, কাবাডি, রাগবি
ক্ষতির ধরণ: এই খেলায় খেলোয়াড়দের মধ্যে উচ্চ শারীরিক সংঘাত ঘটে, যার ফলে ঘন ঘন কনকাশন বা মস্তিষ্কে আঘাতের ঝুঁকি থাকে। এছাড়া হাড় ভাঙা, লিগামেন্ট ছেঁড়া এবং দীর্ঘমেয়াদী নিউরোলজিক্যাল সমস্যা হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
২. বক্সিং বা মুষ্টিযুদ্ধ
বক্সিং বা মুষ্টিযুদ্ধের প্রধান উদ্দেশ্যই হলো প্রতিপক্ষকে আঘাত করা। ঘন ঘন মাথায় আঘাতের কারণে ব্রেন ড্যামেজ, দীর্ঘমেয়াদী নিউরোলজিক্যাল রোগ (যেমন- ক্রনিক ট্রমাটিক এনসেফালোপ্যাথি), দৃষ্টিশক্তির সমস্যা, এবং মস্তিষ্কের কার্যকারিতা কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
৩. মার্শাল আর্টস
মার্শাল আর্টস এর কারনে অনেক সময় চরম শারীরিক আঘাত, জয়েন্ট এবং হাড়ের গুরুতর আঘাত, ঘাড় ও মেরুদণ্ডের আঘাত এবং কনকাশন এর উচ্চ ঝুঁকি থাকে।
৪. জিমন্যাস্টিকস
জিমন্যাস্টিকস প্রশিক্ষনের জন্য অল্প বয়স থেকে কঠোর প্রশিক্ষণ এবং শরীরের উপর অতিরিক্ত চাপের কারণে ঘন ঘন অতিরিক্ত ব্যবহারের আঘাতের ফলে স্ট্রেস ফ্র্যাকচার, জয়েন্টের দীর্ঘমেয়াদী সমস্যা বিশেষ করে হাঁটু, গোড়ালি, মেরুদণ্ড এবং বৃদ্ধির (সমস্যা দেখা যায়। এছাড়া মানসিক চাপ ও খাওয়ার সমস্যা হতে পারে।
৫. ম্যারাথন বা এন্ডুরেন্স রেস
ম্যারাথন রেস এর কারনে অনেক সময় শরীরের উপর চরম চাপের কারণে ক্লান্তিজনিত ফ্র্যাকচার, কিডনির ক্ষতি, ডিহাইড্রেশন এবং হৃৎপিণ্ডের উপর অত্যধিক চাপ সৃষ্টি হতে পারে। অতিরিক্ত প্রশিক্ষণ মানসিক অবসাদ ঘটাতে পারে।
৬. ঘোড়দৌড়/অশ্বারোহণ
ঘোড়দৌড়ের সময় ঘোড়া থেকে পড়ে যাওয়া বা ঘোড়ার দ্বারা চাপা পড়ার কারণে গুরুতর আঘাত, মাথায় আঘাত, মেরুদণ্ড এবং পেলভিসের ফ্র্যাকচারের ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি থাকে, যা স্থায়ী অক্ষমতা বা মৃত্যুর কারণ হতে পারে।
৭. ভারোত্তোলন
ভারোত্তোলন সময় ভুল কৌশল বা অতিরিক্ত ওজনের কারণে পেশীর মোচ, টেন্ডন ছিঁড়ে যাওয়া, এবং পিঠের নিচের অংশে গুরুতর আঘাত লাগার ঝুঁকি থাকে। এর অতিরিক্ত চাপ হৃদপিণ্ডের জন্যও ক্ষতিকর হতে পারে।
৮. দীর্ঘমেয়াদী প্রতিযোগিতামূলক খেলা
দীর্ঘমেয়াদী প্রতিযোগিতামূলক খেলার কারণে পায়ের গাঁটে (বিশেষত হাঁটু এবং গোড়ালি) লিগামেন্ট ইনজুরি, টেন্ডন সমস্যা এবং ঘন ঘন কনকাশন (হেড করার কারণে) এর ঝুঁকি থাকে। অতিরিক্ত চাপের কারণে মানসিক অবসাদও আসতে পারে।
৯. অতিরিক্ত শারীরিক প্রশিক্ষণ বা ‘ওভার-ট্রেনিং’ :
অতিরিক্ত প্রশিক্ষণের কারণে শারীরিক অবসাদ, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া, হরমোনের ভারসাম্যহীনতা, দীর্ঘমেয়াদী ক্লান্তি এবং খেলার প্রতি মানসিক আগ্রহ হারিয়ে ফেলার মতো সমস্যা দেখা দেয়।
বিনোদনের মানসিক ক্ষতির কিছু উদাহরণ
বিনোদনের অনেক ধরনই আছে, তবে কিছু বিনোদন বা গেম অতিরিক্ত বা ভুলভাবে ব্যবহার করলে মানসিক ক্ষতি হতে পারে। যেমন-
১. অতিরিক্ত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার
অতিরিক্ত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার ফলে অন্যের সঙ্গে নিজের জীবনের তুলনা করার প্রবণতা থেকে হীনমন্যতা, উদ্বেগ ও হতাশা বৃদ্ধি, সাইবার বুলিংয়ের শিকার হওয়া। ঘুমের সমস্যা, শারীরিক কার্যকলাপ কমে যাওয়া। বাস্তব জীবনের সামাজিক যোগাযোগ কমে যাওয়া, মনোযোগের ক্ষমতা হ্রাস।
২. টেলিভিশন বা সিনেমা অতিরিক্ত সময় কাটানো
টেলিভিশন বা সিনেমা অতিরিক্ত সময় কাটানো ফলে দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার কারণে স্থূলতা, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, চোখের সমস্যা। অলসতা, বাস্তব জীবন থেকে বিচ্ছিন্নতা, প্রোডাক্টিভিটি কমে যাওয়া।
৩. ‘ডেটিং’ বা ‘চ্যাটিং’ অ্যাপে অতিরিক্ত ও যাচাইবিহীন সময় কাটানো
‘ডেটিং’ বা ‘চ্যাটিং’ অ্যাপে অতিরিক্ত ও যাচাইবিহীন সময় কাটানো কারণে মানসিক প্রতারণা, ‘ক্যাফিশিং’ এর শিকার হওয়া, একাকীত্ব বৃদ্ধি, হতাশা। অনলাইনে হয়রানির শিকার হওয়া, ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস হওয়া, এবং কখনও কখনও বাস্তব জীবনে নিরাপত্তার ঝুঁকি তৈরি হওয়া।
৪. অতিরিক্ত ভিডিও গেম বা অনলাইন গেমিং
অতিরিক্ত গেমিং এর কারনে গেমিং আসক্তি, উদ্বেগ, হতাশা, মেজাজ খিটখিটে হওয়া, মনোযোগের অভাব।
৫. জুয়া বা বাজির খেলা
জুয়া বা বাজির খেলা কারনে বিশাল আর্থিক ক্ষতি হয়। সম্পদ হারিয়ে অনেক ঋণের বোঝার বহন করে।
বিনোদনে কোনো প্রকার জাদুর উপস্থিতি থাকবে না
ইসলামী বিনোদনে সকল প্রকার জাদু বা কুসংস্কারের উপস্থিতি কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। জাদু একটি গুরুতর পাপ এবং এটি শিরকের দিকেও নিয়ে যেতে পারে। বিনোদনমূলক কার্যক্রমে যদি এমন কোনো উপাদান থাকে যেখানে জাদু বা তন্ত্রমন্ত্রের মাধ্যমে কোনো অতিপ্রাকৃত ক্ষমতা প্রদর্শন করা হয় বা সেগুলোর প্রতি বিশ্বাস স্থাপনকে উৎসাহিত করা হয়, তবে তা সম্পূর্ণরূপে বর্জন করতে হবে। এর মধ্যে এমন খেলা বা প্রদর্শনীও অন্তর্ভুক্ত যা অলৌকিক ক্ষমতার ভান করে বা সাধারণ মানুষকে প্রতারিত করার জন্য ডিজাইন করা হয়েছে। যদিও কিছু আপাতদৃষ্টিতে ‘জাদু’ কেবল হাতের কৌশল বা বিভ্রম হতে পারে, তবুও তা যদি মানুষকে ভুল ধারণা দেয় বা কুসংস্কারকে উৎসাহিত করে, তবে তা পরিহার করা উচিত। একজন মুসলিমের বিশ্বাস কেবল আল্লাহর ক্ষমতার ওপর থাকবে। এই নীতিটি নিশ্চিত করে যে মুসলিমরা বিনোদনের মাধ্যমে কোনো প্রকার মিথ্যা, প্রতারণা বা শিরকের ফাঁদে না পড়ে এবং তাদের আকিদাকে সকল প্রকার কুসংস্কার থেকে মুক্ত রাখে।
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
আর তারা অনুসরণ করেছে, যা শয়তানরা সুলাইমানের রাজত্বে পাঠ করত। আর সুলাইমান কুফরী করেনি; বরং শয়তানরা কুফরী করেছে। তারা মানুষকে যাদু শেখাত এবং (তারা অনুসরণ করেছে) যা নাযিল করা হয়েছিল বাবেলের দুই ফেরেশতা হারূত ও মারূতের উপর। আর তারা কাউকে শেখাত না যে পর্যন্ত না বলত যে, ‘আমরা তো পরীক্ষা, সুতরাং তোমরা কুফরী করো না। এরপরও তারা এদের কাছ থেকে শিখত, যার মাধ্যমে তারা পুরুষ ও তার স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটাত। অথচ তারা তার মাধ্যমে কারো কোন ক্ষতি করতে পারত না আল্লাহর অনুমতি ছাড়া। আর তারা শিখত যা তাদের ক্ষতি করত, তাদের উপকার করত না এবং তারা অবশ্যই জানত যে, যে ব্যক্তি তা ক্রয় করবে, আখিরাতে তার কোন অংশ থাকবে না। আর তা নিশ্চিতরূপে কতই-না মন্দ, যার বিনিময়ে তারা নিজদেরকে বিক্রয় করেছে। যদি তারা জানত। সুরা বাকারা : ১০
যাদু হলো শয়তানি কুফরি কাজ, যা সুলাইমান (আ.) করেননি। হারূত ও মারূতকে পরীক্ষা হিসেবে পাঠানো হয়েছিল, কিন্তু মানুষ স্বেচ্ছায় জেনে-বুঝে যাদু শিখেছে। এই যাদু সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের বিচ্ছেদ ঘটিয়ে। তবে, আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কোনো ক্ষতিই হতে পারে না। এই কুফরি কাজের ফলে যাদু চর্চাকারী আখিরাতে তার সমস্ত কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হবে, যা তার নিজেদের জন্য সবচেয়ে বড় ক্ষতি। এ থেকে বুঝা যায় যাদু শয়তানি কাজ। কাজেউ বিনোদনে যাদুর থাকা হারাম।
জুনদুব (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জাদুকরের শার্’ঈ শাস্তি হলো তাকে তরবারি দিয়ে হত্যা করা। মিশকাত : ৩৫৫১, সুনানে তিরমিযী : ১৪৬০
আবূ হুরায়রা (রাঃ) সূত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, তোমরা সাতটি ধ্বংসকারী বস্তু থেকে বেঁচে থাক। তারা বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! সেগুলো কি? তিনি বললেন, আল্লাহর সাথে শরীক করা, জাদু, যথার্থ কারণ ব্যতিরেকে কাউকে হত্যা করা, যা আল্লাহ হারাম করেছেন, সুদ খাওয়া, ইয়াতীমের মাল ভক্ষণ করা, জিহাদের ময়দান থেকে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করা সাধ্বী বিশ্বাসী সরলমনা রমনাদের প্রতি অপবাদ আরোপ করা। সহিহ বুখারি : ২৭৬৬, ২৭৬৭, ৫৭৬৪, ৬৮৫৭, মুসলিম ৮৯, নাসায়ী ৩৬৭১, আবূ দাউদ ২৮৭৪
আমর ইবন আলী (রহঃ) … আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি গিরা দিয়ে তাতে ফুঁক দেয়, সে যাদু করলো, আর যে যাদু করলো, সে মুশরিক হলো। আর যে ব্যক্তি গলায় কিছু ঝুলায়, তাকে সেই জিনিসের উপর ন্যস্ত করা হয়। সুনানে নাসায়ি : ৪০৮০
বিনোদনে জাদুর ব্যবহার :
বিনোদন বা মনোরঞ্জনের ক্ষেত্রে “যাদু” বলতে সাধারণত বোঝায় হাতের কৌশল বিভ্রম বা ভ্রম সৃষ্টি, মানসিক কৌশল এবং বড় ধরনের চমকপ্রদ প্রদর্শনী, যা দর্শকদের মুগ্ধ করে। এই ধরনের যাদু কোনো অতিপ্রাকৃতিক ক্ষমতা নয় বরং সুকৌশলী অভিনয়, পদার্থবিদ্যা, মনস্তত্ত্ব এবং দ্রুত হাত চালানোর দক্ষতা।
বিনোদনমূলক জাদুর ব্যবহারের কয়েকটি উদাহরণ নিচে দেওয়া হলো:
১. স্টেজ ম্যাজিক
কোনো মানুষকে দ্বিখণ্ডিত করা, মানুষকে উধাও করে দেওয়া বা আবার ফিরিয়ে আনা, কোনো গাড়ি বা প্রাণীকে মঞ্চে এনে বা উধাও করে দেওয়া, বা শূন্যে ভাসিয়ে দেওয়া। বড় শো, থিয়েটার বা লাস ভেগাসের মতো জায়গায় বড় আকারে দর্শকদের বিনোদন দেওয়ার জন্য এটি ব্যবহৃত হয়।
২. ক্লোজ-আপ ম্যাজিক বা মাইক্রো ম্যাজিক :
তাস বা কার্ডের কৌশল, মুদ্রা উধাও করা বা এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে আসা, অথবা ছোট কোনো বস্তুকে চোখের পলকে পরিবর্তন করে দেওয়া। ছোট গ্রুপে বা ব্যক্তিগতভাবে দর্শকদের কাছাকাছি এসে, কখনও কখনও তাদের হাতেই কৌশলগুলো দেখানো হয়। এটি ইন্টারেক্টিভ বিনোদনের জন্য খুব জনপ্রিয়।
৩. মেন্টালিজম বা মনস্তাত্ত্বিক কৌশল
দর্শকের মন থেকে কোনো সংখ্যা বা চিন্তা অনুমান করা, ভবিষ্যতে কী ঘটবে তা আগে থেকে বলে দেওয়া, অথবা মানসিক প্রভাব খাটিয়ে দর্শকের কোনো কাজকে প্রভাবিত করা। এটি মনস্তত্ত্ব, ভুল দিকনির্দেশনা এবং সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে দর্শকদের মনে হয় যে যেন যাদুকর সত্যিই তাদের মন পড়তে পারেন।
৪. এস্কেপ আর্ট বা মুক্তি পাওয়ার কৌশল
হাতকড়া, শিকল বা জলপূর্ণ ট্যাঙ্কে আবদ্ধ হয়ে সেখান থেকে অবিশ্বাস্য দ্রুততায় নিজেকে মুক্ত করা। এটি দর্শকদের মধ্যে উত্তেজনা ও রোমাঞ্চ তৈরি করে এবং যাদুকরের সাহস ও দক্ষতার প্রমাণ দেয়।
৫. চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন শো-তে
বিভিন্ন টেলিভিশন শো-তে বা জাদুকরের বিশেষ শো জাদুকররা তাদের নতুন এবং চমকপ্রদ কৌশল প্রদর্শন করে। জাদুকরের জীবন, প্রতিদ্বন্দ্বিতা, বা অলৌকিক ঘটনা দেখানোর মাধ্যমে দর্শকদের বিনোদন দেওয়া।
৬. স্ট্রিট ম্যাজিক
রাস্তায় পথচারীদের সামনে হঠাৎ করে ছোটখাটো কিন্তু চমকপ্রদ যাদু দেখানো, যেমন কোনো বস্তু হাওয়ায় ভাসিয়ে দেওয়া বা অবিশ্বাস্য উপায়ে তাস বের করে আনা। সাধারণ মানুষকে তাৎক্ষণিক আনন্দ দিতে এবং তাদের প্রতিক্রিয়া ধারণ করতে এই ধরণের জাদু ব্যবহৃত হয়।
বিনোদনমূলক কৌশল বনাম কুফরি জাদু এবং শিরকের ঝুঁকি
আমি উপরে জাদুর উদাহরন প্রদান করলাম তা সত্যি কারের জাদু নয় এগুলো মানুষ আনন্দ প্রদানে জন্য কৌলম করে দেখান হয়। মানব সমাজে বহুকাল ধরে বিনোদনমূলক জাদু বা ম্যাজিক প্রচলিত আছে, যা মূলত দ্রুত হাতের কৌশল, চাক্ষুষ বিভ্রম এবং মনস্তাত্ত্বিক কৌশলের সমন্বয়ে দর্শকদের আনন্দ ও বিস্ময় প্রদান করে। এই কৌশলগুলি নিছক পারফরম্যান্স আর্ট এবং এর সঙ্গে কোনো অতিপ্রাকৃত বা অলৌকিক ক্ষমতার যোগ নেই।
আধুনিক বিশ্বে জাদুকররা দক্ষতার সাথে এই কৌশলগুলি প্রদর্শন করেন, যা মোটেও কুফরি বা ইসলামে নিষিদ্ধ নয়। তবে সমস্যাটি দেখা দেয় তখন, যখন সাধারণ দর্শক বা অনুরাগীরা এই প্রদর্শিত কৌশলগুলিকে অতিমানবীয় বা ঐশ্বরিক ক্ষমতা বলে ভুল করে এবং জাদুকরকে সৃষ্টিকর্তার ক্ষমতার অংশীদার মনে করে। এমন ধারণা পোষণ করা সরাসরি ইসলামের সবচেয়ে বড় আল্লাহর সাথে অংশীদার (শিরক) সাব্যস্ত হবে। অন্যদিকে, ইসলামি ধর্মগ্রন্থ কোরআন ও সহীহ হাদিসে যে জাদুর কথা বলা হয়েছে, যেমন—মূসা (আ.)-এর সঙ্গে জাদুকরদের মুকাবিলা বা নবীজীকে (সা.) যাদু করার ঘটনা, তা কোনো কৌশল বা চোখের ভ্রম ছিল না; বরং তা ছিল বাস্তবে ক্ষতিকারক প্রভাব সৃষ্টিকারী এক নিন্দনীয় কাজ। ইসলামী শরীয়তে এই ধরনের জাদু, যা শয়তানের সাহায্য বা কুফরির মাধ্যমে করা হয়, তা নিঃসন্দেহে স্পষ্ট কুফরি ও মারাত্মক পাপ হিসেবে গণ্য।
সুতরাং, আমাদের মনে রাখা উচিত, বিনোদনের জাদু শুধুমাত্র কৌশল, একে অলৌকিক ভাবা শিরক; আর কোরআন-হাদিসের জাদু সত্যই ক্ষতিকারক ও কুফরি কাজ। উভয় ক্ষেত্রেই মুমিনদের সচেতন থাকা আবশ্যক।
বিনোদনে দুনিয়া-কেন্দ্রিক আসক্তি সৃষ্টি করা যাবে না
ইসলামী বিনোদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ আদর্শ হলো এটি যেন মুসলিমকে দুনিয়া-কেন্দ্রিক বা ভোগবাদী জীবনধারার প্রতি অতিরিক্ত আসক্ত করে না তোলে। বিনোদনের মূল উদ্দেশ্য হলো মনকে সাময়িক সতেজতা দেওয়া, যাতে ইবাদত ও পরকালের প্রস্তুতিতে নতুন উদ্যম লাভ করা যায়। কিন্তু যদি কোনো বিনোদন—যেমন বিলাস-বহুল জীবনযাপন দেখানো সিনেমা, অতিরিক্ত সম্পদ অর্জনের প্রতি উৎসাহী খেলাধুলা, বা ভোগবাদকে মহিমান্বিত করা অনুষ্ঠান—মানুষের মনে এমন মানসিকতা তৈরি করে যে দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী আরাম-আয়েশই জীবনের প্রধান লক্ষ্য, তবে তা ইসলামে বৈধ হতে পারে না। এই নীতিটি মানুষের মধ্যে ‘যূহদ’ (পৃথিবীর প্রতি অনাসক্তি) এবং ‘আখেরাত-মুখিতা’ (পরকাল-কেন্দ্রিকতা)-এর চেতনা বজায় রাখতে সাহায্য করে। বিনোদনে অতিরিক্ত মত্ততা ব্যক্তিকে দুনিয়ার মোহে ফেলে দেয়, যা আল্লাহর স্মরণ এবং সৎ কাজ থেকে গাফেল করে। তাই একজন মুসলিমের উচিত এমন বিনোদন বেছে নেওয়া যা তাকে বস্তুবাদী আসক্তি থেকে দূরে রাখে এবং তার অন্তরকে পরকালের চিন্তায় স্থির রাখে। বিনোদন হবে ক্ষণিকের বিশ্রাম, চিরস্থায়ী ঠিকানা বা লক্ষ্য নয়। এই ভারসাম্য রক্ষা করাই ইসলামী বিনোদনের মূল দর্শন।
আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন-
ؕ وَمَا الۡحَیٰوۃُ الدُّنۡیَاۤ اِلَّا مَتَاعُ الۡغُرُوۡرِ
আর দুনিয়ার জীবন শুধু ধোঁকার সামগ্রী। সুরা আল ইমরান : ১৮৫
অর্থাৎ দুনিয়ার আনন্দ, খেলা, ভোগ—সবই ক্ষণস্থায়ী। যদি এগুলো মানুষকে পরকাল থেকে গাফেল করে তোলে, তবে তা প্রতারণামূলক ভোগে পরিণত হয়।
আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন-
ؕ وَمَا الۡحَیٰوۃُ الدُّنۡیَاۤ اِلَّا مَتَاعُ الۡغُرُوۡرِ
আর দুনিয়ার জীবনটা তো ধোকার সামগ্রী ছাড়া আর কিছুই নয়। সুরা হাদিন : ২০
এই আয়াত স্পষ্টভাবে দেখায়, মানুষ যখন বিনোদন বা ভোগবাদে আসক্ত হয়, তখন তা তাকে আখিরাত থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।
আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন-
وَلَا تَمُدَّنَّ عَیۡنَیۡکَ اِلٰی مَا مَتَّعۡنَا بِہٖۤ اَزۡوَاجًا مِّنۡہُمۡ زَہۡرَۃَ الۡحَیٰوۃِ الدُّنۡیَا ۬ۙ لِنَفۡتِنَہُمۡ فِیۡہِ ؕ وَرِزۡقُ رَبِّکَ خَیۡرٌ وَّاَبۡقٰی
আর তুমি কখনো প্রসারিত করো না তোমার দু’চোখ সে সবের প্রতি, যা আমি তাদের বিভিন্ন শ্রেণীকে দুনিয়ার জীবনের জাঁক-জমকস্বরূপ উপভোগের উপকরণ হিসেবে দিয়েছি। যাতে আমি সে বিষয়ে তাদেরকে পরীক্ষা করে নিতে পারি। আর তোমার রবের প্রদত্ত রিয্ক সর্বোৎকৃষ্ট ও অধিকতর স্থায়ী। সুরা ত্বহা : ১৩১
সাহল ইবনে সাদ আস-সাইদী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নিকট উপস্থিত হয়ে বললো, হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে এমন একটি কাজের কথা বলে দিন যা আমি করলে আল্লাহ আমাকে ভালোবাসবেন এবং লোকেরাও আমাকে ভালোবাসবেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তুমি দুনিয়ার প্রতি অনাসক্তি অবলন্বন করো। তাহলে আল্লাহ তোমাকে ভালোবাসবেন। মানুষের নিকট যা আছে, তুমি তার প্রতি অনাসক্ত হয়ে যাও, তাহলে তারাও তোমাকে ভালোবাসবে। সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪১০২, সহীহাহ ৯৪৪
বর্তমান বিনোদন মানেই দুনিয়া-কেন্দ্রিক আসক্তি
বিনোদন এবং দুনিয়া-কেন্দ্রিক আসক্তি সৃষ্টি এই ধারণাটি বর্তমানে চুড়ান্ত পর্যায় আছ। কয়েক দশক আগে আজকের মতো সোশ্যাল মিডিয়া না থাকলেও তখনও বিনোদন বাণিজ্যিক স্বার্থে পরিচালিত হতো। বর্তমান বিনোদন মানুষের মধ্যে পার্থিব জিনিসের প্রতি আসক্তি সৃষ্টি করছে। নিচে এ সম্পর্কে কিছু উদাহরণ দেওয়া হলো:
১. সিনেমা এবং সিরিজের থিম ও মার্কেটিং
সিনেমা, টিভি শো ও স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মগুলোর মূল লক্ষ্য হলো বিশাল অঙ্কের মুনাফা অর্জন। তাই তাদের চিত্রনাট্য এবং মার্কেটিং কৌশল এমনভাবে তৈরি হয়, যা দর্শকদের ভোগবাদ, রোমান্স, এবং প্রতিশোধের মতো দুনিয়া-কেন্দ্রিক আবেগগুলিতে আকৃষ্ট করে। সিনেমা বা সিরিজে নায়ক-নায়িকার জীবনে ক্ষমতা, প্রেম, সম্পদ এবং চরম ব্যক্তিগত স্বাধীনতা অর্জনকে চূড়ান্ত সাফল্য হিসেবে দেখানো হয়। দর্শকরা অবচেতনভাবে সেই জীবনধারাকেই আদর্শ বলে মনে করে এবং বাস্তব জীবনেও একই ধরনের ভোগ এবং আকাঙ্ক্ষার পিছনে ছুটতে শুরু করে।
২. রেডিও এবং টেলিভিশন বিজ্ঞাপন
টেলিভিশন ও রেডিওর প্রসার ঘটলে তা বিজ্ঞাপনদাতাদের জন্য এক বিশাল সুযোগ এনে দেয়। বিজ্ঞাপনগুলো “আদর্শ পরিবার” এবং “সফল জীবন”-এর এমন ছবি তৈরি করত, যেখানে নতুন গাড়ি, রেফ্রিজারেটর, ওয়াশিং মেশিন এবং অন্যান্য ইলেকট্রনিক গ্যাজেট থাকা আবশ্যিক ছিল।
এই বিনোদনমূলক মাধ্যমগুলি একটি ধারণা প্রতিষ্ঠিত করেছিল যে, সত্যিকারের সুখ বা সামাজিক সম্মান পেতে হলে এই পণ্যগুলো কিনতেই হবে। এর ফলে মানুষের মধ্যে ক্রমাগত নতুন ভোগ্যপণ্য কেনার তাগিদ এবং সামাজিক মান-মর্যাদ বাড়ানোর জন্য বস্তুর প্রতি আসক্তি জন্মাত।
৩. গানের তারকাদের সংস্কৃতি
এই মিউজিক আইডলরা কেবল গান গেয়েই নয়, বরং তাদের প্রকাশিত রেকর্ড, বিশেষ পোশাকের লাইন, এবং ফ্যান ক্লাবগুলোর মাধ্যমে বিশাল বাণিজ্য তৈরি করত। ভক্তরা তাদের প্রিয় তারকার স্টাইল, চুল এবং জীবনযাত্রা অন্ধভাবে অনুকরণ করত। এটি কেবল গানের প্রতি অনুরাগ ছিল না, বরং তারকার ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, জনপ্রিয়তা এবং জাগতিক সাফল্যকে জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য হিসেবে দেখার প্রবণতা তৈরি করত।
৪. থিম পার্ক এবং অবকাশযাপন সংস্কৃতি
থিম পার্কগুলো ছিল পরিবার-কেন্দ্রিক বিনোদনের একটি নতুন এবং অত্যন্ত বাণিজ্যিক রূপ। টিকিট, খাদ্য, পানীয় এবং স্যুভেনিয়ার বিক্রি ছিল এর প্রধান ব্যবসায়িক মডেল।
এই সংস্কৃতি মাধ্যমে মানুষক বুঝান হয়, সত্যিকারের পারিবারিক আনন্দ এবং সুখ পেতে হলে অর্থ খরচ করে বিশেষ স্থানে (যেমন—থিম পার্কে বা দামী অবকাশ যাপনে) যেতে হবে। এর মাধ্যমে মানুষের মধ্যে বাধ্যতামূলকভাবে অর্থ ব্যয় করে বিনোদন কেনার এবং পারিবারিক স্মৃতিকে কেবল ভ্রমণের ওপর নির্ভরশীল করার দুনিয়া-কেন্দ্রিক আসক্তি জন্মাত।
৫. সেলেব্রিটি এবং ইনফ্লুয়েন্সার সংস্কৃতি
বিনোদন জগতের তারকারা এবং সোশ্যাল মিডিয়ার ইনফ্লুয়েন্সাররা হলেন একেকটি বড় ব্র্যান্ডের বিজ্ঞাপনদাতা। তাদের জনপ্রিয়তা মূলত পণ্যের প্রচার এবং লক্ষ লক্ষ টাকার চুক্তির উপর নির্ভরশীল। তাদের জীবনধারা ও স্টাইল কোটি কোটি টাকা আয়ের উৎস।
৬. মিউজিক এবং ড্যান্স পার্টির বাণিজ্যিকীকরণ
বড় বড় মিউজিক কনসার্ট, ডান্স পার্টি এবং ডিজে নাইট হলো টিকিট বিক্রয়, পৃষ্ঠপোষকতা ও পানীয় বিক্রির মাধ্যমে অর্থ উপার্জনের বিশাল প্ল্যাটফর্ম। এখানে শিল্পীর পারিশ্রমিক এবং ইভেন্টের লাভই মুখ্য।
এই ইভেন্টগুলিতে মূলত উচ্চস্বরে সঙ্গীত, উদ্দাম নৃত্য, এবং ক্ষণস্থায়ী উত্তেজনা সৃষ্টি করা হয়। এই ধরনের আসক্তি মানুষকে দীর্ঘমেয়াদী নৈতিকতা বা আধ্যাত্মিক মূল্যবোধের পরিবর্তে শুধুমাত্র শারীরিক আনন্দ ও ক্ষণিকের উদ্দীপনা খোঁজার দিকে ঠেলে দেয়।
৭. গেমিং এবং ই-স্পোর্টস ইন্ডাস্ট্রি
গেমিং ইন্ডাস্ট্রি এখন ট্রিলিয়ন ডলারের ব্যবসা। গেম বিক্রি, ইন-গেম পারচেজ (যেমন- স্কিন, অস্ত্র, বুস্টার) এবং ই-স্পোর্টস টুর্নামেন্টের পুরস্কারের অর্থ এটিকে পুরোপুরি বাণিজ্যিক করে তুলেছে।
গেমিং আসক্তি একটি সুপরিচিত সমস্যা। এখানে ভার্চুয়াল জগতের কৃতিত্ব, র্যাঙ্কিং, এবং পুরস্কারের প্রতি তীব্র মনোযোগ দেওয়া হয়। খেলোয়াড়রা বাস্তব জীবনের দায়িত্ব ও কর্তব্য উপেক্ষা করে গেমে সময় ও অর্থ ব্যয় করে। এটি ভার্চুয়াল জগতের সাফল্যের প্রতি আসক্তি সৃষ্টি করে, যা তাদের জাগতিক লক্ষ্যগুলো ছাড়া অন্য কোনো বৃহত্তর উদ্দেশ্যের প্রতি মনোযোগ দিতে বাধা দেয়।
৮. ফ্যাশন উইক এবং বিউটি পেজেন্ট (সৌন্দর্য প্রতিযোগিতা)
ফ্যাশন শো ও সৌন্দর্য প্রতিযোগিতাগুলি হলো বস্ত্র, কসমেটিকস এবং বিলাসবহুল ব্র্যান্ডগুলির প্রচারের মূল মাধ্যম। এই ইভেন্টগুলো কর্পোরেট বিজ্ঞাপন ও পণ্যের প্রচারে কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করে। এই ইভেন্টগুলোর মাধ্যমে শারীরিক সৌন্দর্য এবং বাহ্যিক প্রদর্শনকে চরম মূল্য দেওয়া হয়। এটি সমাজের মধ্যে কৃত্রিমভাবে তৈরি হওয়া অভাববোধ সৃষ্টি করে। এর ফলে মানুষের মধ্যে শরীর-কেন্দ্রিক অহংকার এবং বস্তুবাদী সৌন্দর্যের পিছনে অবিরাম ছোটার আসক্তি জন্মায়, যা অভ্যন্তরীণ বা আধ্যাত্মিক বিকাশের পথে বাধা সৃষ্টি করে।
উপসংহার : এই উদাহরণগুলো স্পষ্ট করে যে, আজকের বিনোদন মাধ্যমগুলো মূলত অর্থ ও ব্যবসার স্বার্থে পরিচালিত। বিনোদনের মূল লক্ষ্য আর নিছক মানসিক আরাম বা স্বাস্থ্যকর অবসর নয়, বরং দর্শকদের মধ্যে ভোগ, প্রদর্শনী, এবং খ্যাতি অর্জনের দুনিয়া-কেন্দ্রিক আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি করা, যাতে তারা পণ্যের ভোক্তা হিসেবে টিকে থাকে।
বিনোদন যেন মুসলিমকে কাফিররাষ্ট্রে যেতে বাধ্য না করে
ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে, বিনোদনের জন্য কোনো মুসলিমকে এমন খেলাধুলা বা কার্যক্রমে অংশ নেওয়া উচিত নয়, যা তাকে বিধর্মী (কাফির) রাষ্ট্রে যেতে বাধ্য করে। এর মূল কারণ হলো, কাফির রাষ্ট্রে ভ্রমণের ফলে একজন মুসলিমের জন্য বহু ফিতনা এবং অনিষ্টতায় জড়িয়ে পড়ার প্রবল আশঙ্কা থাকে।
এই ধরনের সফরে যে বিপদগুলো তৈরি হতে পারে তার মধ্যে অন্যতম হলো:
১. অতিরিক্ত মেলামেশা:
কাফিরদের জীবনধারা ও সংস্কৃতির সাথে মাত্রাতিরিক্ত মেলামেশা এবং তাদের প্রভাবাধীন থাকা।
২. হারাম কাজে জড়িয়ে পড়া:
এমন অনেক প্রকার হারাম কাজের মাঝ দিয়ে অতিক্রম করা, যা মুসলিম রাষ্ট্রে সাধারণত সুরক্ষিত থাকে। ৩. আক্বিদার ওপর কুপ্রভাব:
এই পরিবেশ একজন মুসলিমের অন্তরে চরমভাবে খারাপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে এবং তার ঈমান ও আক্বিদা-বিশ্বাসের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
এ কারণে, ফিকাহ বিশেষজ্ঞ উলামায়ে কিরাম শুধুমাত্র জরুরি প্রয়োজন বা ইসলামের বৃহত্তর স্বার্থে সীমিত পরিসরে কাফির রাষ্ট্রে ভ্রমণের অনুমতি দিয়েছেন। এই অনুমতির ক্ষেত্রগুলো অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট এবং প্রয়োজনের দ্বারা নির্ধারিত:
১. চিকিৎসার প্রয়োজন: এমন দুরারোগ্য ব্যাধির চিকিৎসা, যা কোনো মুসলিম রাষ্ট্রে সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে, একজন মুসলিমের জীবন রক্ষার মতো মৌলিক প্রয়োজনের তাগিদে এই সফর অনুমোদিত। তবে শর্ত হলো, বিশেষজ্ঞ মুসলিম ডাক্তার বা নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নিশ্চিত হতে হবে যে, সেই রোগের অত্যাধুনিক ও কার্যকর চিকিৎসা পদ্ধতি অন্য কোনো মুসলিম রাষ্ট্রে সত্যিই অপ্রাপ্য।
২. অপরিহার্য ব্যবসা:
মুসলিম রাষ্ট্রের নাগরিকদের জন্য প্রয়োজনীয় এমন ব্যবসার খাতিরে সফর, যা অন্য কোথাও সম্ভব নয়। এই অনুমতি কেবল সেই সকল ব্যবসায়ী বা প্রতিনিধিদের জন্য, যাদের পণ্য বা সেবা মুসলিম সমাজের জন্য অপরিহার্য এবং তা আমদানি বা সরবরাহের জন্য কাফির রাষ্ট্রে যাওয়া অনিবার্য। এক্ষেত্রে সফরকারীকে কেবল ব্যবসায়িক লেনদেনের মধ্যে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে, বিলাসীতা বা অনর্থক বিনোদনে সময় ব্যয় করা চলবে না, এবং নৈতিক ও দ্বীনি বিষয়ে আপসহীন থাকতে হবে।
৩. অত্যন্ত প্রয়োজনীয় জ্ঞানার্জন:
এমন জ্ঞান বা দক্ষতার জন্য শিক্ষা সফর, যা মুসলিমদের জন্য অপরিহার্য কিন্তু মুসলিম রাষ্ট্রে যার ব্যবস্থা নেই। এই জ্ঞান অবশ্যই এমন হতে হবে যা মুসলিম উম্মাহর উন্নতি, প্রতিরক্ষা বা অগ্রগতির জন্য অত্যাবশ্যক, যেমন— উচ্চতর চিকিৎসা বিজ্ঞান, সামরিক প্রযুক্তি বা বিশেষ প্রকৌশল। তবে শর্ত হলো, শিক্ষার্থীকে অবশ্যই দ্বীনি জ্ঞান ও আক্বিদায় সুদৃঢ় হতে হবে, যাতে সে সেখানকার ফিতনায় প্রভাবিত না হয়।
৪. দাওয়াত ও ইসলাম প্রচার:
আল্লাহর দ্বীনের দিকে দাওয়াত দেওয়া এবং ইসলামের প্রচার-প্রসারের মহৎ উদ্দেশ্যে সফর। এই কাজ সকল মুসলিমের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে এর অনুমতি কেবল সেই দাঈদের (প্রচারক) জন্য যারা ইসলামের জ্ঞান, চরিত্র এবং দাওয়াতের পদ্ধতিতে অত্যন্ত দক্ষ ও অভিজ্ঞ। দাঈকে অবশ্যই সকল ফিতনা থেকে নিজেকে রক্ষা করার ক্ষমতা রাখতে হবে এবং তার ব্যক্তিগত জীবনযাপন ইসলামের আদর্শের প্রতিফলন ঘটাতে হবে। তার লক্ষ্য হবে অমুসলিমদের কাছে ইসলামের সৌন্দর্য তুলে ধরা এবং মুসলিমদের ঈমানকে মজবুত করা, নিছক ভ্রমণ বা অন্য কোনো পার্থিব লাভ নয়।
হাদিসের আলোকে বিনোদনের আরও কয়েকটি নীতিমালা
১. আল্লাহর নাফরমানী হয় না এমন ক্রীড়া-কৌতুক করার অবকাশ প্রদান
আয়িশ (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবূ বকর (রা.) আমার নিকট আসলেন। এ সময় আমার কাছে আনসার সম্প্রদায়ের দু’টি মেয়ে গান গাচ্ছিল। আনসারগণ বু’আস যুদ্ধের সময় এ গানটি গেয়েছিল। আয়িশাহ (রাযিঃ) বলেন, তারা অবশ্য (পেশাগত) গায়িকা ছিল না। আবূ বকর (রাযিঃ) বললেন, একি? রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে আবূ বকর প্রত্যেক জাতির জন্য উৎসবের ব্যবস্থা আছে। আর এটা হচ্ছে আমাদের উৎসবের দিন। সহিহ মুসলিম : ৮৯২
ইসলামে সুস্থ, পরিচ্ছন্ন এবং অশ্লীলতামুক্ত বিনোদন সম্পূর্ণ অনুমোদিত। এটি ইসলামের উদারতা ও মানবিক প্রকৃতির পরিচায়ক। যে ক্রীড়া-কৌতুক আল্লাহর কোনো আদেশ বা নিষেধ লঙ্ঘন করে না, তা করতে ইসলামে সুস্পষ্ট অবকাশ দেওয়া হয়েছে। নবী মুহাম্মাদ (ﷺ) উৎসবের দিনে (ঈদের দিনে) সাহাবীর আপত্তি সত্ত্বেও মেয়েদের গাওয়া নির্দোষ দেশাত্মবোধক গানকে অনুমোদন দিয়েছেন। এর মাধ্যমে তিনি এই নীতি প্রতিষ্ঠা করেন যে, আনন্দ প্রকাশের জন্য এমন মাধ্যম গ্রহণ করা যেতে পারে, যা পাপমুক্ত এবং সমাজের জন্য ক্ষতিকর নয়।
এই নীতিমালা আধুনিক জীবনে খুবই প্রাসঙ্গিক। জীবনের ক্লান্তি দূর করে মনকে সতেজ করার জন্য বিনোদন অপরিহার্য। শর্ত হলো, সেই বিনোদন অবশ্যই সীমার মধ্যে থাকতে হবে। এতে যেন কোনোভাবে অশ্লীলতা, মিথ্যাচার, অন্যের অধিকার হরণ বা সময়ের অপচয় না হয়। পরিচ্ছন্ন বিনোদন মানসিক প্রশান্তি দেয়, পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় করে এবং ইবাদতের জন্য নতুন উদ্যম সৃষ্টি করে। মোটকথা, ইসলাম একটি ভারসাম্যপূর্ণ জীবনধারাকে সমর্থন করে, যেখানে কঠোরতা ও বিনোদন উভয়েরই স্থান রয়েছে।
২. বিনোদনে ভয় দেখান যাবে না
আব্দুর রাহমান ইবনু আবূ লাইলাহ (রহঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমাকে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবীগণ হাদীস বর্ণনা করেছেন যে, একদা তারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে সফরে ছিলেন। তাদের এক ব্যক্তি ঘুমিয়ে পড়লে তাদের মধ্যকার কেউ গিয়ে (মজার ছলে) তার সঙ্গের রশি নিয়ে আসলো। তাতে সে ভয় পেয়ে গেলো। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, কোনো মুসলিমের জন্য অন্য মুসলিমকে ভয় দেখানো বৈধ নয়। সুনানে আবু দাউদ : ৫০০৪
এই হাদীসটি পরিষ্কারভাবে প্রমাণ করে যে, রসিকতা বা কৌতুকের ছলেও অন্য কোনো মুসলিমকে ভয় দেখানো বা আতঙ্কিত করা ইসলামে সম্পূর্ণরূপে অবৈধ (হারাম)। সামান্য একটি রশি বা জিনিস লুকিয়ে ফেলায় যদি কোনো ব্যক্তি সাময়িকভাবেও ভয় পায় বা অস্থির হয়ে ওঠে, তবে নবী (ﷺ) তা কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো, সাহাবীর উদ্দেশ্য ছিল নিছক মজা করা, কিন্তু এর ফলাফল ছিল অপরজনের ভয় পাওয়া। ইসলাম বিনোদনের ক্ষেত্রে শুধু উদ্দেশ্যকেই নয়, বরং তার প্রভাব ও ফলাফলকেও গুরুত্ব দেয়। যে কৌতুক অন্যের মনে সামান্য হলেও কষ্ট, আতঙ্ক বা উদ্বেগ সৃষ্টি করে, তা বৈধ বিনোদন হতে পারে না।
এই হাদীসটি শিক্ষা দেয় যে, বিনোদন হতে হবে নির্মল এবং নিরাপদ। এমন কোনো কাজ বা কৌতুক, যা দ্বারা মুসলিম ভাইয়ের মনে এক মুহূর্তের জন্যেও ভয় বা আঘাত আসে, তা ইসলামে জায়েয নয়। এটি মুসলিম সমাজের পারস্পরিক আস্থা ও সম্মান রক্ষার একটি মৌলিক বিধান।
৩. বিনোদনে মজার ছলে মিথ্যা বলা যাবে না
আবূ হুরাইরা (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন-
قَالُوا يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّكَ تُدَاعِبُنَا . قَالَ “ إِنِّي لاَ أَقُولُ إِلاَّ حَقًّا ”
(সাহাবিগণ) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল ﷺ আপনি তো আমাদের সাথে কৌতুকও করে থাকেন। তিনি বললেন আমি শুধু সত্য কথাই বলে থাকি। সুনানে তিরমিজি : ১৯৯০, সিলসিলা সহিহাহ : ১৭২৬, মুখতাসার শামাইল ; ২০২। হাদিসটি সুনানে তিরমিজি থেকে সংকলন করা হয়েছে।
বাহয ইবনু হাকীম (রহঃ) হতে পর্যায়ক্রমে তার বাবা ও দাদার সূত্রে বর্ণিত আছে, তার দাদা বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আমি বলতে শুনেছি. সেই লোক ধ্বংস হোক যে মানুষদের হাসানোর উদ্দেশ্যে কথা বলতে গিয়ে মিথ্যা বলে। সে নিপাত যাক, সে নিপাত যাক। সুনানে তিরমিজি : ২৩১৫
রাসূল ﷺ কৌতুক বা রসিকতা করাকে সরাসরি অস্বীকার করেননি, বরং তিনি এর একটি সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। এই সীমা হলো- কৌতুক বা রসিকতার সময়ও মিথ্যা বলা যাবে না। এর অর্থ হলো, নির্মল হাসি-ঠাট্টা বৈধ, কিন্তু মিথ্যা বা বানানো গল্প দ্বারা মানুষকে হাসানো বা মজা করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
নবী (ﷺ) ছিলেন সর্বকালের সেরা সত্যবাদী (আস-সাদিক)। তাঁর জীবনধারা থেকে এটি জানা যায় যে, তিনি তাঁর সাহাবীদের সাথে মজা করতেন, কিন্তু তাঁর কৌতুক সব সময়ই সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল।
এই হাদীসদুটি আমাদের শিক্ষা দেয় যে, বিনোদন হতে হবে নিষ্কলুষ ও সত্যভিত্তিক। রসিকতা করার সময়ও একজন মুসলিমকে অবশ্যই সত্যের পথ আঁকড়ে ধরে থাকতে হবে, কারণ মিথ্যা কৌতুকের ছলেই হোক বা গুরুতর ব্যাপারেই হোক, ইসলামে একটি মৌলিকভাবে নিষিদ্ধ কাজ। একজন মুসলিম তার স্বভাবজাত সত্যবাদিতাকে কোনো অবস্থাতেই বিসর্জন দিতে পারে না।