মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন
ইবাদত ও জীবনের ভারসাম্য ইসলামী জীবনদর্শনে বিনোদন বা মানসিক শান্তি লাভের বিষয়টিকে কখনওই উপেক্ষিত করা হয়নি, বরং এটিকে ইবাদত এবং জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখা হয়েছে। মুমিনদের জীবন কেবল কঠোর ইবাদত ও দায়িত্ব পালনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং বৈধ ও অর্থবহ বিনোদনের মাধ্যমে তারা মনকে সতেজ করে এবং ইবাদতে নতুন শক্তি সঞ্চার করে। বিনোদনের ইসলামী ধারণা হলো, যা ব্যক্তিকে আল্লাহর আনুগত্য থেকে দূরে সরিয়ে না দেয়, বরং সেই আনুগত্যে আরও উৎসাহী করে তোলে। কুরআন ও হাদীস স্পষ্টভাবে দেখায় যে, আল্লাহর রাসূল ﷺ এবং তাঁর সাহাবীগণ (রাঃ) এমনভাবে জীবন যাপন করতেন, যেখানে দ্বীন ও দুনিয়ার কাজের মধ্যে সুন্দর ভারসাম্য ছিল। হাসি-ঠাট্টা, খেলাধুলা, প্রকৃতির চিন্তা-ভাবনা এবং দাম্পত্য জীবনের আনন্দ সবকিছুই এই বিনোদনের অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই বিষয়ে ইসলামের মূলনীতি হচ্ছে, প্রতিটি কাজ, এমনকি বিনোদনও, যদি সঠিক নিয়তে করা হয়, তবে তা ইবাদতে পরিণত হতে পারে। একজন মুমিন যখন বিনোদনের মাধ্যমে তার শরীর ও মনকে বিশ্রাম দেয়, তখন তার উদ্দেশ্য থাকে পরবর্তী ইবাদতগুলো আরও মনোযোগ ও শক্তি দিয়ে পালন করা। এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, বিনোদন শুধুমাত্র সময় কাটানোর মাধ্যম নয়, বরং এটি জীবনের ক্লান্তি দূর করে এবং পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্ক সুদৃঢ় করার এক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। আমরা পরবর্তী অংশে কুরআন ও হাদীসের আলোকে মুমিনের জীবনের বিনোদনের গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো (যেমন- আল্লাহর সৃষ্টি নিয়ে চিন্তা, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো, শরীরচর্চা, বই পড়া, নাশিদ, ভ্রমণ, বাচ্চাদের সাথে খেলা এবং দাম্পত্য জীবনের আনন্দ) সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করব। এসব বিষয়ের মধ্য দিয়ে আমরা দেখব কিভাবে মুমিনের প্রতিটি বৈধ আনন্দও আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের পথ হতে পারে।
আল্লাহর সৃষ্টি নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করা বিনোদনের মাঝে ইবাদত
পরিবারের সাথে সময় কাটানো:
শারীরিক খেলাধুলা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিনোদন।
বিনোদন হিসেবে বই পড়া
নাশিদ বা ইসলামিক গান
মাঝে মাঝে পরিবারের সবাই নিয়ে বাইরে যাওয়া
বাচ্চাদের সাথে খেলা
বৈবাহিক সম্পর্কে মাধ্যমে বিনোদন
জীবন্ত প্রাণীর প্রতিনিধিত্বকারী পুতুল ও খেলনা
নবী ﷺ–এর জীবনের হাস্যরস, আনন্দ ও বিনোদন
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর পারিবারিক জীবনে বিনোদন
আল্লাহর সৃষ্টি নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করা বিনোদনের মাঝে ইবাদত
কুরআনুল কারীমে আল্লাহ তা’আলা তাঁর সৃষ্টি নিয়ে চিন্তা-ভাবনাকে ইবাদতের এক বিশেষ মর্যাদা দিয়েছেন। এটি কেবল জ্ঞানীদের বৈশিষ্ট্যই নয়, বরং এটি মানসিক প্রশান্তি ও ঈমান বৃদ্ধির অন্যতম সেরা উপায়। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
اِنَّ فِیْ خَلْقِ السَّمٰوٰتِ وَ الْاَرْضِ وَ اخْتِلَافِ الَّیْلِ وَ النَّهَارِ لَاٰیٰتٍ لِّاُولِی الْاَلْبَابِ ﴿۱۹۰﴾ۚۙ الَّذِیْنَ یَذْکُرُوْنَ اللّٰهَ قِیٰمًا وَّ قُعُوْدًا وَّ عَلٰی جُنُوْبِهِمْ وَ یَتَفَكَرُوْنَ فِیْ خَلْقِ السَّمٰوٰتِ وَ الْاَرْضِ ۚ رَبَّنَا مَا خَلَقْتَ هٰذَا بَاطِلًا ۚ سُبْحٰنَكَ فَقِنَا عَذَابَ النَّارِ ﴿۱۹۱﴾
নিশ্চয়ই আসমান ও যমীন সৃষ্টিতে এবং রাত ও দিনের পরিবর্তনে জ্ঞানীদের জন্য নিদর্শন রয়েছে। যারা আল্লাহকে স্মরণ করে দাঁড়িয়ে, বসে ও কাত হয়ে এবং আসমানসমূহ ও যমীনের সৃষ্টি সম্পর্কে চিন্তা করে। (বলে) ‘হে আমাদের রব, তুমি এসব অনর্থক সৃষ্টি করনি। তুমি পবিত্র মহান। সুতরাং তুমি আমাদেরকে আগুনের আযাব থেকে রক্ষা কর’। সূরা আল ইমরান : ১৯০-১৯১
এই সৃষ্টিগুলো নিছক কোনো দুর্ঘটনা নয়। একজন সাধারণ মানুষ এগুলোকে কেবল বিনোদনের বস্তু হিসেবে দেখতে পারে, কিন্তু একজন জ্ঞানী ব্যক্তি যখন প্রকৃতির মাঝে (যেমন পার্কে বা সমুদ্র সৈকতে) হাঁটেন, তিনি এর পেছনের কারিগরকে খোঁজার চেষ্টা করেন। তিনি এই বিশাল সৃষ্টিজগতের শৃঙ্খলা দেখে বুঝতে পারেন, এর পেছনে একজন মহান স্রষ্টা অবশ্যই আছেন।
এ আয়াতে আল্লাহ সেই জ্ঞানীদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করেছেন। তারা কীভাবে প্রকৃতির এই বিনোদনকে ইবাদতে পরিণত করেন?
মানুষ আল্লাহর স্মরণ থেকে উদাসীন থাকেন না। তারা যখন প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করেন (দাঁড়িয়ে, বসে বা শুয়ে—অর্থাৎ সর্বাবস্থায়), তাদের অন্তর আল্লাহর স্মরণে মগ্ন থাকে। তারা শুধু দেখেন না, বরং গভীরভাবে চিন্তা করেন। তারা যখন একটি প্রাণী সংরক্ষণাগার পরিদর্শন করেন বা প্রকৃতির উপর ডকুমেন্টারি দেখেন, তখন তারা ভাবেন—কীভাবে আল্লাহ এই প্রাণীকে সৃষ্টি করলেন? কীভাবে এই গ্রহ-নক্ষত্র একটি নির্দিষ্ট নিয়মে চলছে?
এই গভীর চিন্তা-ভাবনা তাদেরকে একটি চূড়ান্ত উপলব্ধিতে পৌঁছে দেয়। তারা চিৎকার করে বলে ওঠেন-
رَبَّنَا مَا خَلَقْتَ هٰذَا بَاطِلًا ۚ
“হে আমাদের রব, আপনি এটি উদ্দেশ্যহীনভাবেসৃষ্টি করেননি।”
অর্থাৎ, এই মহাবিশ্বের প্রতিটি সৃষ্টির পেছনে একটি সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য আছে। যখন একজন মুমিন এই সত্যটি উপলব্ধি করেন, তখন আল্লাহর প্রতি তার ভালোবাসা ও সম্মান বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। তিনি বুঝতে পারেন যে, এই জীবন অর্থহীন নয়। এই উপলব্ধির ফলে তার অন্তরে আল্লাহর ভয় জাগ্রত হয় এবং তিনি শেষ পরিণতির কথা চিন্তা করে আল্লাহর কাছে জাহান্নাম থেকে মুক্তি কামনা করেন।
সুতরাং, এই আয়াত দুটি আমাদের শেখায় যে, আল্লাহর সৃষ্টি নিয়ে চিন্তা করা বা প্রকৃতির মাঝে সময় কাটানো নিছক বিনোদন নয়, এটি একটি গভীর ইবাদত যা ঈমানকে শক্তিশালী করে এবং মানুষকে তার রবের নিকটবর্তী করে।
পরিবারের সাথে সময় কাটানো:
দুনিয়া ও আখিরাতে এর চেয়ে বড় কোনো পুরস্কার ও আনন্দের উৎস নেই, যা নিজের পরিবারের সাথে হাসি-খুশি ও মজার সময় কাটানোর মধ্যে পাওয়া যায়। আমাদের নবী মুহাম্মাদ (ﷺ) ছিলেন একজন আদর্শ পারিবারিক মানুষ এবং এ বিষয়ে তাঁর উৎসাহ অনেক হাদিসেই পাওয়া যায়। নবী (ﷺ) কেবল একজন আধ্যাত্মিক নেতা ছিলেন না, বরং একজন দায়িত্বশীল স্বামী ও পিতাও ছিলেন। তিনি তাঁর পরিবারের সাথে খেলাধুলা ও কৌতুক করতেন। শিশুরা তাঁকে গল্প বলত এবং তিনি তাদের সাথে খেলে ও হেসে তাদের আনন্দ দিতেন। পরিবারের সদস্যদের সাথে গুণগত সময় কাটানো এবং একসাথে মজা করা পরিবারকে দৃঢ় ও ঘনিষ্ঠ রাখার মূল চাবিকাঠি। এর মাধ্যমে একে অপরের প্রতি গভীর আস্থা ও ভালোবাসা তৈরি হয়, যা পরিবারে শান্তি নিয়ে আসে। প্রকৃত মুসলিমরা তাদের ঘরের ভেতরেই শান্তি ও আনন্দ খুঁজে পান; বাইরের বিনোদনের জন্য পরিবার থেকে দূরে পালিয়ে যাওয়ার দরকার হয় না।
দুর্ভাগ্যবশত, আধুনিক যুগে এই পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হয়ে গেছে। এখন একই ছাদের নিচে থেকেও পরিবারের সদস্যরা কার্যত বিচ্ছিন্ন জীবনযাপন করেন। এমনকি তারা একসাথে খাবারও ভাগ করে নেন না। যদি আমরা আমাদের পারিবারিক ঐক্য ও শান্তি ফিরিয়ে আনতে চাই, তবে নবী (ﷺ)-এর দেখানো পথে ‘পারিবারিক সময়’ কাটানোর এই ধারণাটিকে আবার জোরেশোরে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। পরিবারের প্রতি যত্নবান হওয়া এবং আনন্দের মাধ্যমে বন্ধন তৈরি করাই হলো একটি সুখী ও শান্তিময় মুসলিম সমাজের ভিত্তি। নিচে এ সম্পর্কিত কিছু হাদিস উল্লেখ করা হলো :
ক. পরিবারের সাথে আনন্দ করা ;
আবদুল্লাহ ইবনু আমর ইবনুল আস থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী ﷺ বলেছেন-
كُلُّ شَيْءٍ لَيْسَ مِنْ ذِكْرِ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ فَهُوَ لَهْوٌ وَلَعِبٌ إِلَّا أَرْبَعَةً: مِلاَعَبَتُهُ الرَّجُلَ امْرَأَتَهُ، وَتَأْدِيبُهُ فَرَسَهُ، وَمَشْيُهُ بَيْنَ الْغَرَضَيْنِ، وَتَعْلِيمُهُ السِّبَاحَةَ
আল্লাহ তায়ালার জিকির ছাড়া প্রত্যেকটি জিনিসই নিরর্থক বা খেল-তামাশা, তবে চারটি কাজ ব্যতীত, পুরুষের তার স্ত্রীর সাথে আনন্দ করা, ঘোড়াকে প্রশিক্ষণ দেওয়া, তীর নিক্ষেপ করা, এবং তাকে সাঁতার শিক্ষা দেওয়া। সুনানে নাসায়ী : ৩৫৭৬, মুসনাদে আহমাদ : ১৭৩২৫, তাবারানী : ১৮৯৯৬
খ. পরিবারের জন্য খরচ করা :
আবূ মাসঊদ (রাযি.) হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
إِذَا أَنْفَقَ الرَّجُلُ عَلَى أَهْلِهِ يَحْتَسِبُهَا فَهُوَ لَهُ صَدَقَةٌ
মানুষ স্বীয় পরিবার-পরিজনের জন্য পুণ্যের আশায় যখন ব্যয় করে তখন সেটা তার জন্য সাদাকা হয়ে যায়। সহিহ বুখারি : ৫৫, ৪০০৬, ৫৩৫১, সহিহ মুসলিম : ১০০২
সাদ ইবনু আবূ ওয়াক্কাস (রাযি.) হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
إِنَّكَ لَنْ تُنْفِقَ نَفَقَةً تَبْتَغِي بِهَا وَجْهَ اللَّهِ إِلَّا أُجِرْتَ عَلَيْهَا حَتَّى مَا تَجْعَلُ فِي فَمِ امْرَأَتِكَ
তুমি আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের উদ্দেশে যা-ই ব্যয় কর না কেন, তোমাকে তার প্রতিদান নিশ্চিতরূপে প্রদান করা হবে। এমনকি তুমি তোমার স্ত্রীর মুখে যা তুলে দাও, তারও।’ সহিহ বুখারি : ৫৬, ১২৯৫, ২৭৪২, ২৭৪৪, ৩৯৩৬, ৪৪০৯, ৫৩৫৪, ৫৬৫৯, ৫৬৬৮, ৬৩৭৩, ৬৭৩৩, সহিহ মুসলিম : ১৬২৮, আহমাদ : ১৫৪৬।
গ. পরিবারের সাথে আমোদ-প্রমোদ করা
আয়িশাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি এক সফরে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে ছিলেন। তিনি বলেন, আমি তাঁর সাথে দৌড় প্রতিযোগিতা করে তাঁর আগে চলে গেলাম। অতঃপর আমি মোটা হয়ে যাওয়ার পর তাঁর সাথে আবারো দৌড় প্রতিযোগিতা করলাম, এবার তিনি আমাকে পিছে ফেলে দিলেন বিজয়ী হলেন। তিনি বলেনঃ এ বিজয় সেই বিজয়ের বদলা। সুনানে আবু দাউদ : ২৫৭৮, আহমাদ : ২৫৬৭৭
জাবির ইবনু ’আবদুল্লাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার আমরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে এক যুদ্ধে ছিলাম। যুদ্ধ শেষে ফেরার পথে যখন আমরা মদিনার নিকটবর্তী হলাম, আমি আমার ধীর গতি উটকে দ্রুত হাঁকালাম। একটু পরেই এক আরোহী আমার পিছনে এসে মিলিত হলেন এবং তাঁর লাঠি দ্বারা আমার উটটিকে খোঁচা দিলেন। এতে আমার উটটি সর্বোৎকৃষ্ট উটেরমত চলতে লাগল যেমনভাবে উৎকৃষ্ট উটকে তোমরা চলতে দেখ। মুখ ফিরিয়ে দেখলাম যে, তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমি সদ্য বিয়ে করেছি।
তিনি বললেন, বিয়ে করেছ? বললাম, জি-হ্যাঁ। তিনি বললেন, কুমারী না পূর্ব-বিবাহিতা? আমি বললাম, বরং পূর্ব-বিবাহিতা। তিনি বললেন, কুমারী করলে না কেন? তুমি তার সঙ্গে আমোদ-প্রমোদ করতে আর সেও তোমার সঙ্গে আমোদ-প্রমোদ করত। রাবী বলেন, এরপর আমরা মদিনায় পৌঁছে নিজ নিজ গৃহে) প্রবেশ করতে উদ্যত হলাম, তখন তিনি বললেন, অপেক্ষা কর, সকলে রাতে অর্থাৎ সন্ধ্যায় প্রবেশ করবে, যাতে এলোকেশী নারী চিরুনি করে নিতে পারে এবং অনুপস্থিত স্বামীর স্ত্রী ক্ষুর ব্যবহার করে নিতে পারে। সহিহ বুখারি : ২০৯৭, ২৩০৯, ২৯৬৭, ৪০৫২, ৫০৭৯, ৫০৮০, ৫২৪৫, ৫২৪৭, ৫৩৬৭, ৬৩৮৭ সহিহ মুসলিম : ৭১৫, মিশকাত : ৩০৮৮, সুনানে আবূ দাঊদ : ২০৪৮, সুনানে নাসায়ী : ৩২১৯, সুনানে তিরমিযী : ১১০০, দারিমী : ২২৬২, ইরওয়া : ১৭৮৫, সহীহ আল জামি : ৪২৩৩।
এই ঘটনাটি প্রকাশ করে যে, নবী ﷺ–এর পারিবারিক জীবন ছিল প্রেম, হাসি ও বন্ধুত্বে ভরপুর।
শারীরিক খেলাধুলা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিনোদন।
শারীরিক খেলাধুলা ইসলামের দৃষ্টিতে অত্যন্ত প্রস্তাবিত ও গুরুত্বপূর্ণ বিনোদন। নবী মুহাম্মাদ ﷺ নিজেও দৌড়, ঘোড়দৌড়, কুস্তি, সাঁতার এবং তীরন্দাজিতে অংশ নিতে উৎসাহিত করতেন। শারীরিক সক্ষমতা বজায় রাখা এবং আত্মরক্ষা ও ধর্ম রক্ষায় প্রস্তুত থাকার জন্য খেলাধুলা জরুরি। ইসলাম স্বাস্থ্য রক্ষায় জোর দিলেও এটি করতে হবে সংযমের সাথে। অলসতা ও অতিরিক্ত খাওয়া নিষিদ্ধ হলেও, খেলাধুলায় আগ্রহী নয় এমন কাউকে জোর করা উচিত নয়। আল্লাহ মানুষকে ভিন্ন ভিন্ন আগ্রহ দিয়ে সৃষ্টি করেছেন, কেউ খেলাধুলা ভালোবাসে, কেউ বা পড়ালেখা, দুটোই গ্রহণযোগ্য, যতক্ষণ না মানুষ তার দেহের যত্ন নেয়।
মুসলিম পিতামাতাদের মনে রাখতে হবে যে, প্রতিটি সন্তানের আগ্রহ ভিন্ন। তাদের ইচ্ছাকে সম্মান করা এবং সে অনুযায়ী সঠিক পথে পরিচালিত করা জরুরি। আগ্রহ নেই এমন কিছুতে জোর করলে সন্তানের মানসিক স্বাস্থ্য ও পিতামাতার সাথে তাদের সম্পর্কের ক্ষতি হতে পারে। তাই পারিবারিক সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ রাখতে এবং সন্তানের সুস্থ বিকাশে তাদের আগ্রহকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
ইসলাম মানুষের দ্বীনি ও দুনিয়াবি উভয় জীবনের কল্যাণ নিশ্চিত করে। শারীরিক সুস্থতা ও শক্তিমত্তা এই কল্যাণের একটি অপরিহার্য অংশ। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একটি গুরুত্বপূর্ণ উক্তি এই বিষয়ে মুসলিমদের উৎসাহিত করে।
আবু হুরাইরাহ্ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ শক্তিধর ঈমানদার দুর্বল ঈমানদারের তুলনায় আল্লাহর নিকট উত্তম ও অতীব পছন্দনীয়। তবে প্রত্যেকের মধ্যেই কল্যাণ নিহিত আছে, যাতে তোমার উপকার রয়েছে তা অর্জনে তুমি আগ্রহী হও এবং আল্লাহর কাছে সাহায্য কামনা কর। তুমি অক্ষম হয়ে যেও না। এমন বলো না যে, যদি আমি এমন এমন করতাম তবে এমন হত না। বরং এ কথা বলে যে, আল্লাহ তা’আলা যা নির্দিষ্ট করেছেন এবং যা চেয়েছেন তাই করেছেন। কেননাلَوْ (যদি) শব্দটি শাইতানের (শয়তানের) কর্মের দুয়ার খুলে দেয়। সহিহ মুসলিম : ২৬৬৪
এই হাদিসটি স্পষ্ট করে যে, মুমিনের শক্তি কেবল ঈমানী বা জ্ঞানগত নয়, বরং শারীরিক শক্তিও এর অন্তর্ভুক্ত, যা ইসলামে কাম্য।শারীরিক শক্তির প্রয়োজনীয়তাশরীরের শক্তিমত্তা, সুস্থতা এবং নিরাপত্তা বান্দাকে আল্লাহর ইবাদত পালনে সাহায্য করে। নামায, রোযা, হজ্জ, জিহাদ—এই সকল ইবাদত পালনের জন্য শারীরিক সক্ষমতা একান্ত জরুরি। দুর্বল বা অসুস্থ শরীর অনেক নেকীর কাজ থেকে পিছিয়ে দিতে পারে। শারীরিক শক্তি মজলুমকে সাহায্য করতে, শত্রুর মোকাবিলা করতে এবং পরিবার ও সমাজের প্রতি দায়িত্ব পালনেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহ তাআলা যখন তালূতকে রাজা নিযুক্ত করেছিলেন, তখন তাঁর গুণাবলীর মধ্যে জ্ঞান ও শারীরিক শক্তি উভয়ের কথা উল্লেখ করে বলেছেন-
আর তাদেরকে তাদের নবী বলল, নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের জন্য তালূতকে রাজারূপে পাঠিয়েছেন। তারা বলল, ‘আমাদের উপর কীভাবে তার রাজত্ব হবে, অথচ আমরা তার চেয়ে রাজত্বের অধিক হকদার? আর তাকে সম্পদের প্রাচুর্যও দেয়া হয়নি’। সে বলল, ‘নিশ্চয় আল্লাহ তাকে তোমাদের উপর মনোনীত করেছেন এবং তাকে জ্ঞানে ও দেহে অনেক বাড়িয়ে দিয়েছেন। আর আল্লাহ যাকে চান, তাকে তাঁর রাজত্ব দেন। সূরা বাকারা : ২৪৭
কারণ, রাজত্বের পূর্ণতা ও সুষ্ঠু পরিচালনার জন্য প্রজ্ঞা ও তা বাস্তবায়নের দৈহিক শক্তি দুটোই আবশ্যক।
১. শরীয়তসম্মত শরীরচর্চার
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আধুনিককালের মতো প্রচলিত কোনো ‘শরীরচর্চা’ বা ব্যায়ামাগারে অংশ নেননি, তবে তিনি এবং সাহাবীগণ শারীরিক শক্তি ও সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য কিছু কাজকে উৎসাহিত ও অনুমোদন করেছেন। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবীদের শরীরচর্চার ধরনরা ভিন্ন ছিল। তারা যে সকল কাজের মাধ্যমে শারীরিক সক্ষমতা অর্জন করতেন, সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
ক. কুস্তিতে খেলায় অংশ গ্রহন করা :
আবূ জা’ফার ইবনু মুহাম্মাদ ইবনু আলী ইবনু রুকানাহ (রহঃ) থেকে তার পিতার সূত্রে বর্ণিত। এই রুকানাহ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে মল্লযুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলেন এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে মল্লযুদ্ধে ভূপাতিত করেন। রুকানাহ (রাঃ) বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছিঃ আমাদের ও মুশরিকদের মাঝে পার্থক্য হলো, টুপির উপর পাগড়ি পরিধান করা। সুনানে আবু দাউদ : ৪০৭৮
খ. দৌড় প্রতিযোগিতা করা :
আয়িশাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে কোন ভ্রমণে বের হলাম, সে সময় আমি অল্প বয়সী ও শারীরিক গঠনের দিক দিয়েও পাতলা ছিলাম, তখনো মোটা তাজা হইনি। তিনি সাহাবীদেরকে বললেন: তোমরা সামনের দিকে অগ্রসর হও। তারা যখন সামনের দিকে অগ্রসর হল, তখন তিনি আমাকে বললেন: “এসো আমরা দৌড় প্রতিযোগিতা করি, অত:পর আমি তাঁর সাথে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হলাম ও আমি তার উপর বিজয় লাভ করলাম। তিনি সে দিন আমাকে কিছুই বললেন না। যখন আমি শারীরিক দিক দিয়ে মোটা হলাম ও ভারী হলাম, ও তাঁর সাথে কোন এক সফরে বের হলাম। তিনি সাহাবীদেরকে বললেন: তোমরা সামনের দিকে অগ্রসর হও। তারা যখন সামনে অগ্রসর হল: তখন তিনি আমাকে বললেন: এসো আমরা দৌড় প্রতিযোগিতা করি, এবারের প্রতিযোগিতায় তিনি আমার আগে চলে গিয়ে হাসতে হাসতে বললেন: আজকের জয় সেই দিনের প্রতিশোধ”। মুসনাদ আহমাদ : ২৬২৭৭, সুনানে নাসায়ি : ৮৯৩৮. ইমাম বায়হাকি : ৮৬২৫
এ হাদিসের আলোক বুঝায় ইসলমি শরীয়তের সীমারেখার মাঝে থেকে শারীরিক খেলাধুলা মাধ্যমে বিনোদন। করা যায় বিষয়টি এক অনু্চ্ছদে বুঝিয়ে বল।
গ. তীরন্দাজি বা তীর নিক্ষেপ :
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَاَعِدُّوۡا لَہُمۡ مَّا اسۡتَطَعۡتُمۡ مِّنۡ قُوَّۃٍ وَّمِنۡ رِّبَاطِ الۡخَیۡلِ تُرۡہِبُوۡنَ بِہٖ عَدُوَّ اللّٰہِ وَعَدُوَّکُمۡ وَاٰخَرِیۡنَ مِنۡ دُوۡنِہِمۡ ۚ لَا تَعۡلَمُوۡنَہُمۡ ۚ اَللّٰہُ یَعۡلَمُہُمۡ ؕ وَمَا تُنۡفِقُوۡا مِنۡ شَیۡءٍ فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ یُوَفَّ اِلَیۡکُمۡ وَاَنۡتُمۡ لَا تُظۡلَمُوۡنَ
আর তাদের মুকাবিলার জন্য তোমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী শক্তি ও অশ্ব বাহিনী প্রস্তুত কর, তা দ্বারা তোমরা ভয় দেখাবে আল্লাহর শত্রু ও তোমাদের শত্রুদেরকে এবং এরা ছাড়া অন্যদেরকেও, যাদেরকে তোমরা জান না, আল্লাহ তাদেরকে জানেন। আর তোমরা যা আল্লাহর রাস্তায় খরচ কর, তা তোমাদেরকে পরিপূর্ণ দেয়া হবে, আর তোমাদেরকে যুলম করা হবে না। সুরা আনফাল : ৬০
সালামাহ ইবনু আকওয়া‘ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আসলাম গোত্রের একদল লোকের কাছ দিয়ে অতিক্রম করছিলেন। এ সময় তারা তীরন্দাজীর প্রতিযোগিতা করছিল। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে বনী ইসমাঈল! তোমরা তীরন্দাজী করে দাও। কেননা তোমাদের পূর্বপুরুষ তীরন্দাজ ছিলেন। সুতরাং তোমরাও তীরন্দাজী করে যাও আর আমি অমুক গোত্রের লোকদের সঙ্গে আছি। রাবী বলেন, তাদের এক পক্ষ হাত চালনা হতে বিরত হয়ে গেল। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমাদের কী হল, তোমরা যে তীরন্দাজী করছ না? তখন তারা বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা কিভাবে তীর ছুঁড়তে পারি, অথচ আপনি তো তাদের সঙ্গে রয়েছেন। তখন তিনি বললেন, তোমরা তীর ছুঁড়তে থাক, আমি তোমাদের সবার সঙ্গেই আছি। সহিহ বুখারি : ৩৩৭৩, সহিহ বুখারি : ২৮৯৯, ৩৩৭৩, ৩৫০৭
উকবা ইবনু আমির (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
مَنْ عَلِمَ الرَّمْىَ ثُمَّ تَرَكَهُ فَلَيْسَ مِنَّا أَوْ قَدْ عَصَى
ব্যক্তি তীর পরিচালনা শিখলো তারপর তার চর্চা ছেড়ে দিল সে আমাদের কেউ না অথবা তিনি বলেছেন, সে পাপ করলো। সহিহ মুসলিম : ১৯১৯
ঘ. সাঁতার কাঁটা :
যদিও নবী (সা.)র নিজের সাঁতার কাটার কোনো কর্ম বর্ণিত নেই, তবে তিনি সাঁতার শেখাকে খেল-তামাশার বাইরে এক উপকারী কাজ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
আবদুল্লাহ ইবনু আমর ইবনুল আস থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী ﷺ বলেছেন, আল্লাহ তায়ালার জিকির ছাড়া প্রত্যেকটি জিনিসই নিরর্থক বা খেল-তামাশা, তবে চারটি কাজ ব্যতীত, পুরুষের তার স্ত্রীর সাথে আনন্দ করা, ঘোড়াকে প্রশিক্ষণ দেওয়া, তীর নিক্ষেপ করা, এবং তাকে সাঁতার শিক্ষা দেওয়া। সুনানে নাসায়ী : ৩৫৭৬, মুসনাদে আহমাদ : ১৭৩২৫, তাবারানী : ১৮৯৯৬
ঙ, ঘোড়ায় পড়া ও ঘোড়দৌড় :
আবদুল্লাহ্ ইবনু ‘উমার (রাযি.) হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুদ্ধের জন্যে তৈরি ঘোড়াকে ‘হাফ্য়া’ (নামক স্থান) হতে ‘সানিয়াতুল ওয়াদা’ পর্যন্ত দৌড় প্রতিযোগিতা করিয়েছিলেন। আর যে ঘোড়া যুদ্ধের জন্যে তৈরি নয়, সে ঘোড়াকে ‘সানিয়া’ হতে যুরাইক গোত্রের মাসজিদ পর্যন্ত দৌঁড় প্রতিযোগিতা করিয়েছিলেন। আর এই প্রতিযোগিতায় ‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘উমার (রাযি.) অগ্রগামী ছিলেন। সহিহ বুখারি : ৪২০, ২৮৬৮, ২৮৬৯, ২৮৭০, ৭৩৩৬, সহহি মুসলিম : ১৮৭০, আহমাদ ৪৪৮৭
উপরোক্ত হাদিসসমূহের আলোকে ইসলামি শরিয়তের সীমারেখার মধ্যে থেকে শারীরিক খেলাধুলার মাধ্যমে বিনোদন গ্রহণের বৈধতা। আল্লাহর জিকির ব্যতীত অন্য সবকিছুই খেল-তামাশা হিসেবে গণ্য হলেও, নবী ﷺ চারটি কাজকে এর ব্যতিক্রম বলেছেন, যার মধ্যে তিনটি কাজই শারীরিক দক্ষতা ও শক্তির সাথে সম্পর্কিত, ঘোড়াকে প্রশিক্ষণ দেওয়া, তীর নিক্ষেপ করা, এবং সাঁতার শিক্ষা দেওয়া। এই হাদিস ইঙ্গিত দেয় যে, যে খেলাধুলা বা কাজ শক্তি সঞ্চয়, প্রতিরক্ষা, সামরিক প্রস্তুতি, বা জীবনের অপরিহার্য দক্ষতা অর্জনে সহায়ক, তা কেবল নিরর্থক নয়, বরং প্রশংসনীয়। এটি প্রমাণ করে ইসলাম শারীরিক সক্ষমতা বজায় রাখার গুরুত্ব দেয়। বিনোদন হিসেবে শারীরিক প্রতিযোগিতা বা খেলাধুলা ইসলামিক জীবনযাত্রার অংশ হতে পারে, যতক্ষণ না তা শরিয়তের মৌলিক সীমা (যেমন: জুয়া, অপ্রয়োজনীয় সময় নষ্ট, ফরজ ইবাদত থেকে গাফেল হওয়া বা নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা) লঙ্ঘন করে। এক কথায় বলা যায়, ইসলামি শরিয়ত শারীরিক সুস্থতা, দক্ষতা বৃদ্ধি, এবং স্বাস্থ্যকর বিনোদনের জন্য সহায়ক খেলাধুলাকে উৎসাহিত করে।
২. শরীরচর্চা করার ক্ষেত্রে কিছু বিধান :
ইসলাম শরীরচর্চা, দৌড়, সাঁতার, কুস্তি, তীরন্দাজি, ঘোড়দৌড় ইত্যাদি খেলাকে উৎসাহ দিয়েছে, কিন্তু তা যেন ইবাদতের মনোভাব ও শরীয়তসম্মত সীমার মধ্যে থাকেভ। নিচে এ সম্পর্কে কুরআন ও হাদীসের আলোকে আলোচনা করে হলো :
ক. শরীরচর্চা নেকীর নিয়ত করতে হবে:
শরীরচর্চার উদ্দেশ্য যেন হয় ইবাদতের শক্তি অর্জন করার নিয়তে হয়। এ শরীরচর্চা কারনে আমি সুস্থ থেকে ইবাদতে বেশি মনোযোগী হতে পারব। ইসলাম কাজের নিয়তের উপর গুরুত্ব দিয়েছে।
অতএব, মুসলিম যখন শরীরচর্চা করে, ইবাদতের শক্তি অর্জন করা (যেমন সালাত, সিয়াম, জিহাদ, হজ, দাওয়াহ ইত্যাদি)। নিজের ও পরিবারের দায়িত্ব পালন করার মতো সক্ষম হওয়া। মজলুম ও দুর্বলকে সাহায্য করার মতো শক্তি অর্জন করা।
আল্লাহ বলেন:
وَاَعِدُّوۡا لَہُمۡ مَّا اسۡتَطَعۡتُمۡ مِّنۡ قُوَّۃٍ وَّمِنۡ رِّبَاطِ الۡخَیۡلِ تُرۡہِبُوۡنَ بِہٖ عَدُوَّ اللّٰہِ وَعَدُوَّکُمۡ وَاٰخَرِیۡنَ مِنۡ دُوۡنِہِمۡ ۚ لَا تَعۡلَمُوۡنَہُمۡ ۚ اَللّٰہُ یَعۡلَمُہُمۡ ؕ
আর তাদের মুকাবিলার জন্য তোমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী শক্তি ও অশ্ব বাহিনী প্রস্তুত কর, তা দ্বারা তোমরা ভয় দেখাবে আল্লাহর শত্রু ও তোমাদের শত্রুদেরকে এবং এরা ছাড়া অন্যদেরকেও, যাদেরকে তোমরা জান না, আল্লাহ তাদেরকে জানেন। সূরা আনফাল : ৬০
শরীরচর্চা ইবাদতের উদ্দেশ্যে করলে তা নিজেই নেকী হয়ে যায়।
খ . শরীয়তের সাথে সাংঘর্ষিক কিছু না ঘটানো
শরীরচর্চা বৈধ, তবে তা হারাম উপাদানমুক্ত হতে হবে। নিচে কিছু এ সম্পর্কিত কিছু বিধান উল্লেখ করা হলো-
* মুখে চপেটাঘাত করা বা মারধর করা যাবে না। সহিহ মুসলিম : ২৬১২
* শরীয়ত সম্মত পোশাক পরিধান করেতে হবে। সূরা মু’মিনূন : ৫-৬, সুনানে আবু দাউদ : ৪০১৭
* জুয়া বা বাজি ধরে কোন খেলাধুলায় অংশগ্রনহণ করা যাবে না। সূরা মায়িদা : ৯০
* অশালীন আচরণ বা নত হওয়া (সিজদার মতো) হওয়া যাবে না। সহিহ মুসলিম : ৫৩৮৬
গ. কর্তব্য থেকে বিরত না থাকা
খেলাধুলা বা ব্যায়াম যেন আল্লাহর আনুগত্য ও দায়িত্ব থেকে বিক্ষিপ্ত না করে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
رِجَالٌ ۙ لَّا تُلۡہِیۡہِمۡ تِجَارَۃٌ وَّلَا بَیۡعٌ عَنۡ ذِکۡرِ اللّٰہِ وَاِقَامِ الصَّلٰوۃِ وَاِیۡتَآءِ الزَّکٰوۃِ ۪ۙ یَخَافُوۡنَ یَوۡمًا تَتَقَلَّبُ فِیۡہِ الۡقُلُوۡبُ وَالۡاَبۡصَارُ ٭ۙ
সেসব লোক, যাদেরকে ব্যবসা-বাণিজ্য ও ক্রয়-বিক্রয় আল্লাহর যিক্র, সালাত কায়েম করা ও যাকাত প্রদান করা থেকে বিরত রাখে না। তারা সেদিনকে ভয় করে, যেদিন অন্তর ও দৃষ্টিসমূহ উল্টে যাবে। সূরা নূর : ৩৭
ঘ. সময় বা অর্থ কোনটিই অপচয় করা যাবে না
ইসলাম অপচয় কঠোরভাবে নিষেধ করেছে এমন কি যদি বৈধ কাজেও হয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
یٰبَنِیۡۤ اٰدَمَ خُذُوۡا زِیۡنَتَکُمۡ عِنۡدَ کُلِّ مَسۡجِدٍ وَّکُلُوۡا وَاشۡرَبُوۡا وَلَا تُسۡرِفُوۡا ۚ اِنَّہٗ لَا یُحِبُّ الۡمُسۡرِفِیۡنَ
হে আদম সন্তান! প্রত্যেক সালাতের সময় সুন্দর পোশাক পরিচ্ছদ গ্রহণ কর, আর খাও এবং পান কর। তবে অপব্যয় ও অমিতাচার করবেনা, নিশ্চয়ই আল্লাহ অপব্যয়কারীদের ভালবাসেননা। সূরা আরাফ : ৩১
ইসলাম খেলাধুলাকে নিষিদ্ধ করেনি, বরং আল্লাহর পথে শক্তিশালী হওয়ার উপায় হিসেবে প্রশংসা করেছে। কিন্তু এর সাথে যদি গুনাহ, অপচয়, অহংকার বা দায়িত্বহীনতা জড়িয়ে পড়ে, তবে সেটি আর বিনোদন নয়, বরং গাফিলতির পথ হয়ে যায়। তাই খেলাধুলায় বিপুল অর্থ ব্যয়, বিলাসবহুল জিম, দেহ প্রদর্শনী, বা অপ্রয়োজনীয় সাজসজ্জা—এসব ইসলাম অনুমোদন করে না। বরং পরিমিত ব্যয় ও উদ্দেশ্যমূলক শরীরচর্চাই প্রশংসনীয়।
৩. পেশাদার ক্রীড়া প্রতিযোগিতা”-
পেশাদার ক্রীড়া প্রতিযোগিতা বলতে সেই ধরনের খেলাধুলাকে বোঝায় যেখানে অংশগ্রহণকারীরা (খেলোয়াড় বা দল) খেলাকে কেবল বিনোদন বা শখের মাধ্যম হিসেবে না দেখে, বরং এটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ পেশা বা জীবিকা হিসেবে গ্রহণ করে এবং এর মাধ্যমে পারিশ্রমিক ও আর্থিক সুবিধা লাভ করে। আধুনিক বিশ্বে, এটি একটি বিশাল শিল্পে পরিণত হয়েছে, যা কোটি কোটি ডলারের বাণিজ্য, স্পন্সরশিপ, মিডিয়া স্বত্ব এবং বিশ্বজুড়ে অসংখ্য দর্শকের অংশগ্রহণে পরিচালিত হয়। এই প্রতিযোগিতাগুলি সাধারণত সর্বোচ্চ স্তরের শারীরিক দক্ষতা, কৌশল এবং পারফরম্যান্সের মানদণ্ড তুলে ধরে। যদিও খেলাধুলা হিসেবে এটি শারীরিক সুস্থতা ও বিনোদনের মাধ্যম হতে পারে, তবে পেশাদার স্তরে পৌঁছানোর পর এর সাথে যে বাণিজ্যিকীকরণ, বিপুল পরিমাণ সময় ব্যয় এবং সামাজিক-মনস্তাত্ত্বিক দিক যুক্ত হয়, তা অনেক সময় ইসলামিক জীবনদর্শনের মূলনীতি ও নৈতিকতার সাথে সাংঘর্ষিক হয়ে ওঠে, যে কারণে বহু আলেম এর অতি আসক্তি বা মনোযোগ থেকে বিরত থাকতে পরামর্শ দেন। নিচে এ সম্পর্কি তিনটি কার উল্লেখ করা হলো :
ক. সময় নষ্ট:
এতে কোনো সন্দেহ নেই যে যে কোনো পেশাদার খেলার ভক্তরা তারা দেখতে পারে এমন প্রতিটি ম্যাচ দেখে তাদের জীবনের অনেক ঘন্টা নষ্ট করে। এটি আল্লাহ তায়ালা এবং অন্য লোকেদের প্রতি তাদের কর্তব্যে অবহেলা করে। এই ধরনের লোকেরা প্রায়শই একটি ইসলামিক অনুষ্ঠানের চেয়ে একটি ম্যাচ দেখতে পছন্দ করে, যা একজন মুমিনের মনোভাব নয়।
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَ الْعَصْرِ ۙ﴿۱﴾ اِنَّ الْاِنْسَانَ لَفِیْ خُسْرٍ ۙ﴿۲﴾ اِلَّا الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا وَ عَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ وَ تَوَاصَوْا بِالْحَقِّ ۬ۙ وَ تَوَاصَوْا بِالصَّبْرِ ﴿۳﴾
সময়ের শপথ! নিশ্চয়ই মানুষ ক্ষতির মধ্যে, তবে তারা নয়, যারা ঈমান এনেছে ও সৎকাজ করেছে।”
সূরা আসর : ১–৩
আল্লাহ তাআলা সময়ের কসম খেয়েছেন কারণ সময়ই মানুষের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। যে ব্যক্তি সময় নষ্ট করে অকারণে, সে প্রকৃত অর্থে ক্ষতির মধ্যে আছে। অতএব ঘণ্টার পর ঘণ্টা শুধু খেলা দেখা, তাতে কোনো উপকার বা দীনী কল্যাণ না থাকলে। এটি “লাহও” (অর্থহীন ব্যস্ততা)-এর অন্তর্ভুক্ত।
আবূ বারযা আল-আসলামী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কোন বান্দার পদদ্বয় (কিয়ামত দিবসে) এতটুকুও সরবে না, তাকে এ কয়টি বিষয় সম্পর্কে যে পর্যন্ত জিজ্ঞাসাবাদ না করা হবে? কিভাবে তার জীবনকালকে অতিবাহিত করেছে; তার অর্জিত জ্ঞান অনুযায়ী কি আমল করেছে; কোথা হতে তার ধন-সম্পদ উপার্জন করেছে ও কোন কোন খাতে ব্যয় করেছে এবং কি কি কাজে তার শরীর বিনাশ করেছে। সুনানে তিরমিজি : ২৪১৭
অর্থাৎ সময় নষ্ট করা শুধু দুনিয়ার ক্ষতি নয়, বরং আখিরাতেও জবাবদিহির কারণ।
খ. জ্ঞানের অপচয়:
ক্রীড়া ভক্তরা তাদের প্রিয় দলগুলির অনেক খেলোয়াড়ের নাম এবং জীবন কাহিনী জানতে আগ্রহী হয়, তবুও এই অকেজো তথ্য নিয়ে তাদের ব্যস্ততার কারণে—যা তাদের এই জগতেও উপকার করবে না, পরকালের কথা তো বাদই দিন, এই ধরনের লোকেরা ইসলামিক জ্ঞান সম্পর্কে অজ্ঞ থাকে। এটি সম্পূর্ণভাবে অগ্রহণযোগ্য এবং হারাম।
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
قُلْ هَلْ يَسْتَوِي الَّذِينَ يَعْلَمُونَ وَالَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ
“বলুন, যারা জানে ও যারা জানে না, তারা কি সমান?”
সূরা আজ-যুমার (৩৯:৯)
ইসলাম সেই জ্ঞানকে সম্মান দিয়েছে যা মানুষকে আল্লাহর পরিচয়, নিজের দায়িত্ব ও পরকাল সম্পর্কে সচেতন করে। কিন্তু যে জ্ঞান কেবল অপকারজনক বা অর্থহীন বিনোদনের বিষয়। যেমন- খেলোয়াড়দের নাম, পরিসংখ্যান বা ক্লাবের খবর তা কোনো কল্যাণ বয়ে আনে না।
যায়দ ইবনু আরকাম (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি তোমাদের নিকট তেমনই বলব যেমনটি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলতেন-
হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকট পানাহ চাই অপারগতা, অলসতা, ভীরুতা, বখিলতা, বার্ধক্যতা এবং কবরের শাস্তি থেকে। হে আল্লাহ! আপনি আমার অন্তরে পরহেযগারিতা দান করুন এবং একে সংশোধন করে দিন। আপনি একমাত্র সর্বোত্তম সংশোধনকারী এবং আপনিই একমাত্র তার মালিক ও আশ্রয়স্থল। হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকট পানাহ চাই এমন ইলম হতে যা কোন উপকারে আসবে না ও এমন অন্তঃকরণ থেকে যা আল্লাহর ভয়ে ভীত হয় না; এমন আত্মা থেকে যা কক্ষনও তৃপ্ত হয় না। আর এমন দু’আ থেকে যা কবুল হয় না। সহিহ মুসলিম : ২৭২২
অতএব, ক্রীড়া জগতের নিছক তথ্য মুখস্থ করা বা তাতে মগ্ন থাকা, এটি সেই “অকল্যাণকর জ্ঞান”-এর অন্তর্ভুক্ত, যেটি নবী ﷺ নিজে আশ্রয় প্রার্থনা করেছেন।
গ. নায়ক পূজা
পেশাদার খেলার কিছু ভক্ত তাদের প্রিয় খেলোয়াড়দের প্রশংসায় বাড়াবাড়ি করতে শুরু করে এবং তারা তাদের নকল করার এবং শ্রদ্ধার চেষ্টা করে। এটি নায়ক পূজার দিকে পরিচালিত করে, যার মধ্যে ইসলামের নায়কদের এবং এমনকি নবী ﷺ-এর চেয়েও ক্রীড়া খেলোয়াড়ের (সাধারণত অবিশ্বাসীদের) প্রতি বেশি শ্রদ্ধা পোষণ করা হয় এবং এই কারণে অনেক পাপ সংঘটিত হয়। এই ধরনের লোকেরা নবী ﷺ-কে অনুকরণ করার চেয়ে তাদের প্রিয় ক্রীড়া খেলোয়াড়দের অনুকরণ করতে বেশি পছন্দ করবে, যা চরম অসম্মান এবং কুফরের পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। অথচ ভালোবাসা ও অনুসরণের একমাত্র দাবিদান আমদের প্রিয় রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
قُلۡ اِنۡ کُنۡتُمۡ تُحِبُّوۡنَ اللّٰہَ فَاتَّبِعُوۡنِیۡ یُحۡبِبۡکُمُ اللّٰہُ وَیَغۡفِرۡ لَکُمۡ ذُنُوۡبَکُمۡ ؕ وَاللّٰہُ غَفُوۡرٌ رَّحِیۡمٌ
বল, ‘যদি তোমরা আল্লাহকে ভালবাস, তাহলে আমার অনুসরণ কর, আল্লাহ তোমাদেরকে ভালবাসবেন এবং তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করে দেবেন। আর আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু’।
যখন কেউ কোনো খেলোয়াড় বা সেলিব্রিটিকে এমন ভালোবাসে, যে তার জীবনযাপন, স্টাইল, কথা, এমনকি চিন্তাও অনুকরণ করতে থাকে, তখন সেটি শরীয়তের দৃষ্টিতে হারাম কাজ হবে।
ইবনু উমার (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
مَنْ تَشَبَّهَ بِقَوْمٍ فَهُوَ مِنْهُمْ
যে ব্যক্তি বিজাতির সাদৃশ্য অবলম্বন করে, সে তাদের দলভুক্ত গণ্য হবে। সুনানে আবু দাউদ : ৪০৩১
অর্থাৎ মুসলিম যদি অবিশ্বাসী বা নাস্তিক খেলোয়াড়দের স্টাইল, পোশাক, কথাবার্তা বা আচরণ অনুকরণ করে, তাহলে সে তাদের পথেই চলেছে, যা ঈমানের জন্য ভয়াবহ হুমকি।
বিনোদন হিসেবে বই পড়া
বই পড়া মানব জীবনের এক মহৎ অভ্যাস। এটি শুধু জ্ঞানার্জনের মাধ্যম নয়, বরং মননশীল বিনোদনেরও এক উত্তম রূপ। ইসলামের দৃষ্টিতে এমন বিনোদনই প্রশংসনীয়, যা মানুষকে আল্লাহর স্মরণ থেকে বিমুখ না করে বরং জ্ঞান, চিন্তা ও আত্মসমালোচনার দিকে আহ্বান জানায়। যে কোনো কিছু যা মুসলিমদের উপকার করে এবং তাদের আল্লাহর কাছাকাছি নিয়ে আসে, অথবা বিজ্ঞানের কোনো দিক থেকে তাদের উপকার করে, তা ইসলামে প্রস্তাবিত, যতক্ষণ এটি নিষিদ্ধ বিষয়বস্তু থেকে মুক্ত থাকে। কুরআন এমন গল্পে পূর্ণ যাতে অনেক শিক্ষা রয়েছে। আল্লাহ তায়ালা আমাদের অবহিত করেছেন-
لَقَدۡ کَانَ فِیۡ قَصَصِہِمۡ عِبۡرَۃٌ لِّاُولِی الۡاَلۡبَابِ ؕ مَا کَانَ حَدِیۡثًا یُّفۡتَرٰی وَلٰکِنۡ تَصۡدِیۡقَ الَّذِیۡ بَیۡنَ یَدَیۡہِ وَتَفۡصِیۡلَ کُلِّ شَیۡءٍ وَّہُدًی وَّرَحۡمَۃً لِّقَوۡمٍ یُّؤۡمِنُوۡنَ
তাদের এ কাহিনীগুলোতে অবশ্যই বুদ্ধিমানদের জন্য রয়েছে শিক্ষা, এটা কোন বানানো গল্প নয়, বরং তাদের পূর্ববর্তী কিতাবের সত্যায়নকারী এবং প্রতিটি বিষয়ের বিস্তারিত বিবরণ। আর হিদায়াত ও রহমত ঐ কওমের জন্য যারা ঈমান আনে। সুনা ইউসুফ : ১১১
এই আয়াত থেকে, আমরা বুঝতে পারি যে ইসলামের গল্পগুলি কেবল ঐতিহাসিক মূল্যের জন্য শেখা উচিত নয়, বরং তাদের শিক্ষার জন্য বিশ্লেষণ করা উচিত। আমরা এই আয়াত থেকে আরও অনুমান করতে পারি যে যে কোনো গল্প যা থেকে একজন ব্যক্তি উপকার পেতে পারে।
আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলিমের উপর ফারয। অপাত্রে জ্ঞান দানকারী শুকরের গলায় মণিমুক্তা ও সোনার হার পরানো ব্যাক্তির সমতুল্য। সুনানে ইবনু মাজাহ : ২২৪, মিশকাত : ২১৮
সুতরাং, যে বই পড়া মানুষকে জ্ঞান, চরিত্র, নৈতিকতা, ইতিহাস, সভ্যতা, বিজ্ঞান, সমাজ ও আত্মোন্নয়নের পথে চালিত করে, তা ইসলামে প্রশংসনীয়। এটি এমন এক বিনোদন, যা মনকে বিশ্রাম দেয়, চিন্তাকে সমৃদ্ধ করে এবং আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে।
অবশ্য ইসলামে “বিনোদন” বলতে শুধু হাসি-আনন্দ নয়, বরং ক্লান্ত মনকে সতেজ করে পুনরায় কল্যাণের পথে ফিরিয়ে নেওয়াই উদ্দেশ্য। বই পড়া ঠিক তেমনই এক প্রশান্তিকর বিনোদন। একজন মুসলিম যখন কুরআনের তাফসির, নবীর জীবনী, সাহাবিদের ঘটনা, বা নৈতিক গল্প পড়ে—তখন তার হৃদয় প্রশান্ত হয়, ঈমান বৃদ্ধি পায়, এবং মন কল্যাণের দিকে ধাবিত হয়।
কুরআনের কাহিনী পাঠ করা ও শিক্ষা গ্রহণ করা :
আমরা যে জ্ঞান (কুরআনের) অর্জন করি, তার মহত্ত্ব আমাদের সাধারণ ভাবনার চেয়েও বহু গুণে বেশি। এর প্রধান কারণ হলো, এই জ্ঞান কোনো সাধারণ গ্রন্থ থেকে আসেনি, বরং এটি এমন একটি অলৌকিক মু’জিযা যা আল্লাহ তাআলা তাঁর নবী মুহাম্মাদ (ﷺ)-কে আরব জাতির কাছে প্রেরণ করেছেন।
কুরআনের জ্ঞান অর্জন করা মানে শুধুমাত্র ধর্মীয় বিধান জানা নয়, বরং আল্লাহর সেই চিরন্তন মু’জিযা ও অলংকারপূর্ণ জ্ঞান অর্জন করা, যা মানবজাতির সেরা সাহিত্যিকদেরও হতভম্ব করে দিয়েছে। এই জ্ঞানের মহত্ত্ব সীমাহীন, কারণ এর উৎস এবং এর সাহিত্যিক শ্রেষ্ঠত্ব উভয়ই মানুষের কল্পনার ঊর্ধ্বে। এটি আমাদের চিন্তা ও মননশীলতার সর্বোচ্চ বিকাশের পথ দেখায়। কুরআন মাজিদ তার অলৌকিক সাহিত্যমান, শব্দচয়ন এবং অর্থ সঞ্চালনের মাধ্যমে আরবের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিকদের অক্ষম প্রমাণ করেছে। এই গ্রন্থের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো নবী-রাসূলদের কাহিনি। কুরআনি এই গল্পগুলো কখনোই কেবল বিনোদন বা সময় কাটানোর জন্য নয়; বরং এর প্রধান লক্ষ্য হলো সত্যের পথে দাওয়াত দেওয়া এবং মুমিনদের দীক্ষাদান করা। এই কাহিনিগুলো শুধু ঐতিহাসিক ঘটনাবলি নয়, বরং এগুলি হলো উপদেশ, অনুপ্রেরণা এবং ঈমানকে মজবুত করার এক শক্তিশালী উৎস। নবী-রাসূলদের কাহিনি বার বার উল্লেখ করার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা মূলত মানবজাতিকে কতগুলো মৌলিক শিক্ষা প্রদান করে।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন:
لَقَدۡ کَانَ فِیۡ قَصَصِہِمۡ عِبۡرَۃٌ لِّاُولِی الۡاَلۡبَابِ ؕ مَا کَانَ حَدِیۡثًا یُّفۡتَرٰی وَلٰکِنۡ تَصۡدِیۡقَ الَّذِیۡ بَیۡنَ یَدَیۡہِ وَتَفۡصِیۡلَ کُلِّ شَیۡءٍ وَّہُدًی وَّرَحۡمَۃً لِّقَوۡمٍ یُّؤۡمِنُوۡنَ
তাদের এ কাহিনীগুলোতে অবশ্যই বুদ্ধিমানদের জন্য রয়েছে শিক্ষা, এটা কোন বানানো গল্প নয়, বরং তাদের পূর্ববর্তী কিতাবের সত্যায়নকারী এবং প্রতিটি বিষয়ের বিস্তারিত বিবরণ। আর হিদায়াত ও রহমত ঐ কওমের জন্য যারা ঈমান আনে।
নোট : কুরআনের গল্পগুলো নিছক অতীত ইতিহাস নয়, বরং গভীর উপদেশ সমৃদ্ধ। এই কাহিনিগুলো আমাদেরকে অতীত উম্মতদের সফলতা ও ব্যর্থতার কারণগুলো বিশ্লেষণ করতে শেখায়। যারা বুদ্ধিমান তারা কেবল গল্প শুনেই ক্ষান্ত হয় না, বরং তা থেকে জীবনের জন্য কার্যকর শিক্ষা গ্রহণ করে। নবিদের জীবন থেকে আমরা জানতে পারি, কীভাবে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ধৈর্য ধরতে হয়, কীভাবে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখতে হয় এবং কীভাবে সমাজের কুসংস্কার ও শিরকের বিরুদ্ধে একাকী সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হয়। এই শিক্ষাই মুমিনদের চলার পথের পাথেয়।
কুরআনের এ কাহিনীগুলো মুমিনের অন্তরের বিশ্বাসকে আরও মজবুত করে। কুরআনে কারিমের এ মর্মে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন-
وَکُلًّا نَّقُصُّ عَلَیۡکَ مِنۡ اَنۡۢبَآءِ الرُّسُلِ مَا نُثَبِّتُ بِہٖ فُؤَادَکَ ۚ وَجَآءَکَ فِیۡ ہٰذِہِ الۡحَقُّ وَمَوۡعِظَۃٌ وَّذِکۡرٰی لِلۡمُؤۡمِنِیۡنَ
আর রাসূলদের এসকল সংবাদ আমি তোমার কাছে বর্ণনা করছি যার দ্বারা আমি তোমার মনকে স্থির করি আর এতে তোমার কাছে এসেছে সত্য এবং মুমিনদের জন্য উপদেশ ও স্মরণ। সূরা হূদ : ১২০
নোট : নবি মুহাম্মাদ (ﷺ) যখন দাওয়াতের কঠিন সময়ে ছিলেন, তখন আল্লাহ তাআলা পূর্ববর্তী নবিদের কষ্টের কাহিনি তাঁকে শুনিয়েছেন। এর উদ্দেশ্য ছিল নবিজির (ﷺ) অন্তরকে মজবুত করা তিনি যখন জানতেন যে, নূহ (আঃ) প্রায় হাজার বছর দাওয়াত দিয়েও সামান্য মানুষ পেয়েছেন, বা ইবরাহীম (আঃ) আগুনে নিক্ষিপ্ত হয়েছেন, তখন তাঁর নিজের দুঃখ-কষ্ট সহনীয় মনে হতো। এই আয়াতটি প্রমাণ করে যে, নবিদের কাহিনি ঈমানদারদের মানসিক শক্তি ও ধৈর্য বাড়াতে সরাসরি ভূমিকা রাখে।
এ কাহিনীগুলো তুলে ধরার অন্যতম লক্ষ হলো বান্দার মনে চিন্তার উদ্রেক ঘটায়। যে চিন্তার মাধ্যমে সে ইহকাল ও পরকালে সফল্য অর্জন করবে। তাই আল্লাহ নবিদের কাহিনীগুলো বার বার তুলে ধরার কারন সম্পর্কে বলেন-
ۚ فَاقۡصُصِ الۡقَصَصَ لَعَلَّہُمۡ یَتَفَکَّرُوۡنَ
তুমি কাহিনী বর্ণনা করে শোনাতে থাক, হয়তো তারা এটা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করবে। সূরা আরাফ : ১৭৬
নোট: এই আয়াতটি স্পষ্ট করে যে, নবিদের কাহিনি বর্ণনার চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো পাঠকের মধ্যে গভীর চিন্তার উদ্রেক করা। চিন্তা (তাফাক্কুর) হলো ইবাদতের অন্যতম উচ্চ স্তর। মুমিনরা যেন কাহিনির মাধ্যমে আল্লাহর ক্ষমতা, তাঁর দয়া, তাঁর শাস্তি এবং তাঁর সৃষ্টির রহস্য নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে। এই চিন্তা মানুষকে আল্লাহর একত্ববাদের প্রতি আরও দৃঢ়ভাবে বিশ্বাসী করে তোলে এবং তাকে সঠিক পথে চলতে উৎসাহিত করে।
কাহিনী থেকে শিক্ষা নেওয়ার অন্যতম করান হলে, এ কাহিনীতের যার সাথে তার কর্মের কারনে যে আজাব-গজর বা শান্তির ফয়সালা করা হয়েছে। ভবিষ্যতে বন্দার কর্মের কারনে ঠিক তেমন ফয়সালা করা হবে। এ কারনে আল্লাহ বলেছেন, নবিদের কাহিনিতে কোনো মিথ্যা বা বানোয়াটের লেশ নেই। তিনি ইরশাদ করেন-
اَللّٰہُ لَاۤ اِلٰہَ اِلَّا ہُوَ ؕ لَیَجۡمَعَنَّکُمۡ اِلٰی یَوۡمِ الۡقِیٰمَۃِ لَا رَیۡبَ فِیۡہِ ؕ وَمَنۡ اَصۡدَقُ مِنَ اللّٰہِ حَدِیۡثًا
আল্লাহ, তিনি ছাড়া কোন (সত্য) ইলাহ নেই। অবশ্যই তিনি তোমাদেরকে একত্র করবেন কিয়ামতের দিনে। এতে কোন সন্দেহ নেই। আর কথায় আল্লাহর চেয়ে অধিক সত্যবাদী কে? সূরা নিসা : ৮৭
নোট: কুরআনে বর্ণিত প্রতিটি কাহিনি নিঃসন্দেহে সত্য। এই কাহিনিগুলো মানুষের তৈরি কিংবদন্তি বা উপকথা নয়, বরং স্বয়ং আল্লাহ তাআলা কর্তৃক বর্ণিত সত্য ঘটনা। অন্যান্য গ্রন্থের বা মানুষের গল্পের মাঝে ভুল বা মিথ্যা মিশ্রিত থাকতে পারে, কিন্তু আল্লাহর বাণীতে কোনো ভুল বা মিথ্যা নেই। এই সত্যতা কুরআনের কাহিনিগুলোকে ঐতিহাসিক গুরুত্বের ঊর্ধ্বে এক ঐশী নির্ভরযোগ্যতা দেয়, যা মুমিনদের মনে এর শিক্ষা ও উপদেশের প্রতি গভীর বিশ্বাস জন্মায়।
অতএব, ইসলামি দৃষ্টিতে বই পড়া এমন এক প্রশংসনীয় বিনোদন, যা জ্ঞান বৃদ্ধি করে, আত্মাকে শুদ্ধ করে এবং চিন্তাকে নির্মল করে। এটি সময়ের সর্বোত্তম ব্যবহার, যা ইবাদতের প্রস্তুতি হিসেবেও গণ্য হতে পারে, যদি উদ্দেশ্য হয় আল্লাহর সন্তুষ্টি ও জ্ঞানের প্রসার।
পাঠযোগ্য ও বর্জনীয় গ্রন্থ সম্পর্কে ধারণা :
ইসলাম একটি ভারসাম্যপূর্ণ জীবনব্যবস্থা এবং এটি তার অনুসারীদের কেবল ইবাদত-বন্দেগীতে সীমাবদ্ধ না রেখে জ্ঞান অর্জন ও সুস্থ বিনোদনেও উৎসাহিত করে। বই পড়া এই দু’টিরই অন্যতম প্রধান মাধ্যম। তবে একজন মুসলিমকে অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে, বিনোদন বা জ্ঞানার্জন যাই হোক না কেন, তা যেন আল্লাহর দেওয়া সীমারেখার মধ্যে থাকে।
ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে, উপকারী বই হলো সেই জ্ঞানভাণ্ডার যা পাঠককে আল্লাহর কাছাকাছি নিয়ে যায়, তার নৈতিকতা ও চরিত্র গঠনে সহায়তা করে, ইতিহাস ও বিজ্ঞান সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান দেয়, অথবা জীবনের সঠিক দিকনির্দেশনা দেয়। নবী-সাহাবীদের জীবনী, সিরাত গ্রন্থ, নৈতিকতা বিষয়ক বই এবং সমাজ ও ফিকহ সম্পর্কিত রচনাগুলো এই শ্রেণিতে সর্বাগ্রে স্থান পায়।
এর বিপরীতে, এমন সব ক্ষতিকর বই সম্পূর্ণরূপে বর্জনীয় যা সরাসরি ঈমান বা নৈতিকতার ওপর আঘাত হানে। এর মধ্যে রয়েছে কুফরি, নাস্তিকতাবাদী ও ইসলাম-বিদ্বেষী রচনা; যৌন উত্তেজক ও অশ্লীল সাহিত্য; ভিত্তিহীন পৌরাণিক গল্প বা শিরক মিশ্রিত উপন্যাস। একইভাবে, বিদ’আতি বা ভ্রান্ত ফিরকার প্রচারমূলক এবং জ্যোতিষশাস্ত্র ও ভাগ্য গণনার বইগুলোও পরিত্যাজ্য। একজন মুসলিমের দায়িত্ব হলো, ক্ষতিকরকে এড়িয়ে কল্যাণকর জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে তার জীবনকে উন্নত করা। নিচে বুঝার জন্য বইয়ের একটি তালিকা করে দিলাম।
বিনোদন হিসেবে উপকারি বই-
১. জীবনী এবং সিরাত গ্রন্থ
২. ভ্রমন কাহিনী সম্পর্কিত বই
৩. বিজ্ঞান ও আবিস্কার সম্পর্কিত বই
৪. সত্যকাহিনী নির্ভর বই
৫. নবী ও সাহাবিদের জীবনীভিত্তিক বই
৬. নৈতিকতা ও চরিত্র গঠনমূলক বই
৭. পরিবার ও সামাজিক সম্পর্ক বিষয়ক ফিকহ
৮. ইতিহাস ও সভ্যতা বিষয়ক বই
৯. ইসলামি চিন্তাধারা ও দাওয়াতমূলক বই
১০. ভৌগলিক জ্ঞান সম্পর্কি বই
১১. কবিতা, সাহিত্য ও প্রজ্ঞামূলক রচনা (ইসলামসম্মত)
বিনোদন হিসেবে অপকারি বই-
১. কুফরি ও নাস্তিকতাবাদী বই,
২. বিদ‘আতিদের লিখিত বই,
৩. জাদু ও ভাগ্যবিশ্বাসমূলক বই,
৪. দুনিয়ামুখী ও ভোগবাদী বই,
৫. বিবাহপূর্ব প্রেম সম্পর্কিত উপন্যাস
৬. যৌন উত্তেযোগ বা অশ্লীল বই
৭. ভিত্তিহীন কল্পকাহিনী
৮. পূনানিক গ্রন্থের বস্তপড়া গল্প
৯. পাশ্চাত্যের শিরক মিশ্রিত উপন্যাস
১০. ইসলাম-বিদ্বেষী ও ধর্মদ্রোহী (Atheistic) রচনা
১১. ভ্রান্ত ও বাতিল ফিরকার প্রচারমূলক বই
১২. জ্যোতিষশাস্ত্র, ভাগ্য গণনা ও কুসংস্কার ভিত্তিক বই
১৩. অতিরিক্ত হিংসা, সন্ত্রাস ও উগ্রবাদ প্রচারকারী বই