মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন
নাশিদ বা ইসলামিক গান
বর্তমানে সাধারণ গান বা সঙ্গীত এতটাই জনপ্রিয় যে, মুসলমানদের জন্য এর একটি ইসলামি বিকল্প থাকা অত্যন্ত জরুরি। গান মানুষের মনের ওপর শক্তিশালী প্রভাব ফেলার ক্ষমতা আছে। তাই আমাদের উচিত এমন নাশিদ বা গান শোনা, যা আমাদের একজন ভালো মুসলিম হতে উৎসাহ জোগায় এবং ইসলামি শিক্ষা ও নৈতিকতা ছড়িয়ে দেয়। অশ্লীল বা খারাপ বার্তা প্রচার করে এমন আধুনিক গান শোনা থেকে আমাদের বিরত থাকা দরকার।
আলহামদুলিল্লাহ, এখন নাশিদ শিল্প অনেক উন্নতি লাভ করেছে। তবে একটি সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে, অনেক গায়ক তাদের নাশিদে বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করছেন। ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করে গান শোনা হারাম। তাই আমাদের পরামর্শ হলো:
১. বাদ্যযন্ত্র ছাড়া তৈরি নাশিদ বা গজল শোনাকে অগ্রাধিকার দিন।
২. যে নাশিদগুলি নিশ্চিতভাবে অনুমোদিত এবং ইসলামের সীমার মধ্যে থাকে, সেগুলিতেই মনোযোগ দিন। ৩. শিশুদের ছোটবেলা থেকেই ভালো নাশিদ শোনার অভ্যাস করানো উচিত। এর ফলে তারা শৈশব থেকেই ইসলামি মূল্যবোধের প্রতি আকৃষ্ট হবে এবং সঠিকভাবে আমলকারী মুসলিম হিসেবে গড়ে উঠতে উৎসাহিত হবে।
সুস্থ ও নিরাপদ বিনোদনের জন্য ইসলামি গান বা নাশিদ একটি চমৎকার মাধ্যম, তবে এটি অবশ্যই শরিয়তের নিয়ম মেনে বাদ্যযন্ত্র মুক্ত হওয়া বাঞ্ছনীয়।
১. গান গাওয়ার সময় দফ বা একপাশ খোলা ঢোল ব্যবহারের অনুমতির
আয়িশা (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার নিকট এলেন তখন আমার নিকট দু’টি মেয়ে বু‘আস যুদ্ধ সংক্রান্ত গান গাইছিল। তিনি বিছানায় শুয়ে পড়লেন এবং চেহারা অন্যদিকে ফিরিয়ে রাখলেন। এ সময় আবূ বকর (রা.) এসে আমাকে ধমক দিয়ে বললেন, শয়তানী বাদ্যযন্ত্র (দফ) বাজান হচ্ছে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নিকট! তখন আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর দিকে মুখ ফিরিয়ে বললেন, তাদের ছেড়ে দাও। অতঃপর তিনি যখন অন্য দিকে ফিরলেন তখন আমি তাদের ইঙ্গিত করলাম আর তারা বেরিয়ে গেল। সহিহ বুখারি : ৯৪৯, ৯৫২, ২৯০৬, ৩৫২৯, ৩৯৩১, সহিহ মুসলিম : ৮৯২
আয়িশা (রা.) হতে বর্ণিত। আবূ বকর (রা.) তাঁর নিকট এলেন। এ সময় মিনার দিবসগুলোর (জিলহজ মাসের ১১, ১২, এবং ১৩ তম দিন) এক দিবসে তাঁর নিকট দু’টি মেয়ে দফ বাজাচ্ছিল, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর চাদর আবৃত অবস্থায় ছিলেন। তখন আবূ বকর (রাযি.) মেয়ে দু’টিকে ধমক দিলেন। অতঃপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুখমণ্ডল হতে কাপড় সরিয়ে নিয়ে বললেন, হে আবূ বকর! ওদের বাধা দিও না। কেননা, এসব ‘ঈদের দিন। আর সে দিনগুলো ছিল মিনার দিন। সহিহ বুখারি : ৯৮৭
রুবায়ই বিনতু মু‘আওয়িয (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, আমার বাসর রাতের পরদিন সকালে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার নিকট এলেন এবং তুমি (খালিদ ইবনু যাকওয়ান) যেমন আমার কাছে বসে আছ ঠিক সেভাবে আমার পাশে আমার বিছানায় এসে বসলেন। তখন কয়েকজন ছোট বালিকা দুফ বাজিয়ে বদরে নিহত শহীদ পিতাদের প্রশংসা গীতি আবৃত্তি করছিল। শেষে একটি বালিকা বলে উঠল, আমাদের মাঝে এমন একজন নবী আছেন, যিনি জানেন, আগামীকল্য কী হবে। তখন নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এমন কথা বলবে না, বরং আগে যা বলেছিলে তাই বল। সহিহ বুখারি : ৪০০১, ৫১৪৭
নোট : একমুখ খোলা অপর প্রান্তে চামড়া লাগানো তবলাকে দফ বলা হয়, বিবাহ ও ‘ঈদের দিন আনন্দ প্রকাশের জন্য তা বাজিয়ে নাবালিকা মেয়েদের আপত্তিকর কথা বিবর্জিত গীত গাওয়া নিঃসন্দেহে বৈধ।
২. সফরের সময় গান গাওয়া
আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক সফরে ছিলেন। তাঁর আনজাশা নামে এক গোলাম ছিল। সে হুদী গান গেয়ে উটগুলো হাঁকিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। তিনি তাকে বললেনঃ হে আনজাশা! তুমি ধীরে উট হাঁকাও, যেহেতু তুমি কাঁচপাত্র তুল্যদের (আরোহী) উট হাঁকিয়ে যাচ্ছ। আবূ কিলাবাহ বর্ণনা করেন, কাঁচপাত্র সদৃশ শব্দ দ্বারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীলোকদেরকে বুঝিয়েছেন। সহিহ বুখারি : ২২১০, ৬২১১
সালামা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে খায়বারের পথে রওয়ানা হলাম। তখন তাদের এক ব্যক্তি বলল, হে আমির! তোমরা আমাদেরকে উট চালনার কিছু গান শোনাও। সে তাদেরকে তা গেয়ে শোনাল। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, চালকটি কে? তারা বলল, আমির। তিনি বললেন আল্লাহ্ তাকে রহম করুন। সহিহ বুখারি : ৬৮৯১ আংশিক
সফরে উট চালনার জন্য সাহাবীগন রাঃ নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সামনে গান গেয়েছেন। কাজেই হাদিসে বর্ণিত পরিবেশ ও পরিস্থিতি হলে গান গাওয়া যাবে। এ ক্ষেত্র আমাদের দেশের কর্মজীবি বা মাঝি মাল্লাগণ বাদ্যযন্ত্র, শির্কি ও অশ্লীল কথা বিহীন যে গান গায় তার সাথে তুলনা করা যেতে পারে।
ইসলামে গান ও বাদ্যযন্ত্রের বিধান
সুফি নামধারী অনেক মুসলিম গান ও বাদ্যযন্ত্রকে ইসলামি শরীয়তের অংশ মনে করে থাকে। তারা বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করে গান গায়। তারা জিকির করার সময়ও বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করে। এমনকি তারা গানের জন্য আসর বসায়। অনেক মুরিদ গানকে ইসলামি শরীয়তের অংশ মনে করে গানের জলসা বা মাহফিল দেয়ার মানত করে। অথচ ইসলাম এগুলোকে সুস্পষ্টভাবে হারাম বলে ঘোষণা করেছে।
১. বাদ্যযন্ত্রসহ গান হারাম :
আল্লাহ তায়ারা বলেন-
اَفَمِنْ هٰذَا الْحَدِیْثِ تَعْجَبُوْنَ ﴿ۙ۵۹﴾ وَ تَضْحَکُوْنَ وَ لَا تَبْکُوْنَ ﴿ۙ۶۰﴾ وَ اَنْتُمْ سٰمِدُوْنَ ﴿۶۱﴾
তাহলে কি এসব কথা শুনেই তোমরা বিস্ময় প্রকাশ করছো? হাসছো কিন্তু কাঁদছো না? অথচ তোমরা সঙ্গীত বা গান-বাজনা করছো? সূরা নাজম : ৫৯-৬১
আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন-
وَمِنَ النَّاسِ مَنۡ یَّشۡتَرِیۡ لَہۡوَ الۡحَدِیۡثِ لِیُضِلَّ عَنۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ بِغَیۡرِ عِلۡمٍ ٭ۖ وَّیَتَّخِذَہَا ہُزُوًا ؕ اُولٰٓئِکَ لَہُمۡ عَذَابٌ مُّہِیۡنٌ
আর মানুষের মধ্য থেকে কেউ কেউ না জেনে আল্লাহর পথ থেকে মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য বেহুদা কথা (গান) খরিদ করে, আর তারা ঐগুলোকে হাসি-ঠাট্টা হিসেবে গ্রহণ করে; তাদের জন্য রয়েছে লাঞ্ছনাকর আযাব। সুরা লোকমান : ৬
আবূ উমামা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, গায়িকা বিক্রয় কর না, ক্রয়ও কর না এবং তাদেরকে গানের প্রশিক্ষণও দিও না। এদের ব্যবসায়ের মধ্যে কোনরকম কল্যাণ নেই এবং এদের বিনিময় মূল্য হারাম। এই আয়াত এ ধরণের লোকদের বিরুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছে-
وَمِنَ النَّاسِ مَنۡ یَّشۡتَرِیۡ لَہۡوَ الۡحَدِیۡثِ لِیُضِلَّ عَنۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ بِغَیۡرِ عِلۡمٍ ٭ۖ وَّیَتَّخِذَہَا ہُزُوًا ؕ اُولٰٓئِکَ لَہُمۡ عَذَابٌ مُّہِیۡنٌ
মানুষের মধ্যে কিছু এমন ধরণের লোকও আছে, যে মন ভুলানো কথা ক্রয় করে আনে, যেন আল্লাহ তা’আলার পথ হতে লোকদেরকে তাদের অজান্তেই বিভ্রান্ত করতে পারে এবং আল্লাহ্ তা’আলার পথকে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করে। এই ধরণের লোকদের জন্য আছে কঠিন ও অপমানজনক শাস্তি। সূরা লোকমান : ৬। সুনানে তিরমিজি : ১২৮২, সহিহাহ : ২৯২২
আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন-
وَاسۡتَفۡزِزۡ مَنِ اسۡتَطَعۡتَ مِنۡہُمۡ بِصَوۡتِکَ وَاَجۡلِبۡ عَلَیۡہِمۡ بِخَیۡلِکَ وَرَجِلِکَ وَشَارِکۡہُمۡ فِی الۡاَمۡوَالِ وَالۡاَوۡلَادِ وَعِدۡہُمۡ ؕ وَمَا یَعِدُہُمُ الشَّیۡطٰنُ اِلَّا غُرُوۡرًا
তোমার কণ্ঠ (গান) দিয়ে তাদের মধ্যে যাকে পারো প্ররোচিত কর, তাদের উপর ঝাপিয়ে পড় তোমার অশ্বারোহী ও পদাতিক বাহিনী নিয়ে এবং তাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে অংশীদার হও এবং তাদেরকে ওয়াদা দাও’। আর শয়তান প্রতারণা ছাড়া তাদেরকে কোন ওয়াদাই দেয় না। সুরা ইসরা : ৬৪
মুআবিয়া (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত, আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাতম করা, মূর্তি বা ছবি, হিংস্র জন্তুর চামড়া, নগ্নতা ও পর্দাহীনতা, গান, শোনা ও রেশমকে (পুরুষের) নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন। হাদিস সম্ভার : ২৩০৬, আহমাদ : ১৬৯৩৫, ত্বাবারানী : ১৬২৪০-১৬২৪১, সহীহুল জামে : ৬৯১৪
২. গানে বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার হারাম :
আব্দুল্লাহ বিন আমর (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত, আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘‘অবশ্যই আল্লাহ আমার উম্মতের জন্য মদ, জুয়া, ঢোল-তবলা এবং বীণা জাতীয় বাদ্যযন্ত্রকে হারাম করেছেন।’’ হাদিস সম্ভার ২৩১০, আহমাদ : ৬৫৪৭, সিলসিলাহ সহীহাহ : ১৭০৮
আবদুর রহমান ইবনু গানাম আশ’আরী (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমার নিকট আবূ আমির কিংবা আবূ মালিক আশ’আরী বর্ণনা করেছেন। আল্লাহর কসম! তিনি আমার কাছে মিথ্যে কথা বলেননি। তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছেন, আমার উম্মাতের মধ্যে অবশ্যই এমন কতগুলো দলের সৃষ্টি হবে, যারা ব্যভিচার, রেশমী কাপড়, মদ ও বাদ্যযন্ত্রকে হালাল জ্ঞান করবে। তেমনি এমন অনেক দল হবে, যারা পাহাড়ের ধারে বসবাস করবে, বিকাল বেলায় যখন তারা পশুপাল নিয়ে ফিরবে তখন তাদের নিকট কোন অভাব নিয়ে ফকীর আসলে তারা বলবে, আগামী দিন সকালে তুমি আমাদের নিকট এসো। এদিকে রাতের অন্ধকারেই আল্লাহ তাদের ধ্বংস করে দেবেন। পর্বতটি ধ্বসিয়ে দেবেন, আর বাকী লোকদেরকে তিনি কিয়ামতের দিন পর্যন্ত বানর ও শূকর বানিয়ে রাখবেন। সহিহ বুখারি : ৫৫৯০
৩. গায়িকা দ্বারা ব্যবসা করা হারাম :
আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুকুর বিক্রির মূল্য ও গান গায়িকাদের উপার্জন গ্রহণ করতে নিষেধ করেছেন। মিশকাত : ২৭৭৯, শারহুস সুন্নাহ : ২৯৩৮, সহীহাহ : ৩২৭৫। আলবানী (রহ.) হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।
৪. শিরকি কথামালা দ্বারা গান গাওয়া যাবে না :
মুআওব্বিয কন্যা রুবাই (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি সকালে আমার ঘরে এলেন। আমার কাছে তুমি (খালিদ ইবনু যাকওয়ান) যেভাবে বসে আছ, তিনি আমার বিছানায় ঠিক সেভাবে বসলেন। আমাদের বালিকারা এমন সময়ে দফ বাজিয়ে বদরের যুদ্ধের শহীদ হওয়া আমার বাপ-দাদার শোকগাথা গাইছিলো। তাদের কোন একজন গাইতে গাইতে বলল, “আমাদের মাঝে একজন নবী আছেন। আগামী কাল কি হবে তা তিনি জানেন।” তিনি (রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাকে বললেনঃ “এরূপ বলা হতে বিরত থাক, বরং তাই বল এতক্ষণ যা বলতেছিলে। সুনানে তিরমিযী ১০৯০, সুনানে আবূ দাউদ : ৪৯২২
৫. গানের শান্তি দুনিয়াতে
বর্তমানে গান ও বাদ্যযন্ত্রের বিশাল বাজার তৈরী হয়েছে যাতে কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হচ্ছে।
মনে রাখতে হবে, এর সকল উপার্জন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাদিস অনুযায়ী সম্পূর্ণভাবে হারাম।
আবূ মালেক আল-আশআরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমার উম্মাতের কতক লোক মদের ভিন্নতর নামকরণ করে তা পান করবে। (তাদের পাপসক্ত অবস্থায়) তাদের সামনে বাদ্যবাজনা চলবে এবং গায়িকা নারীরা গীত পরিবেশন করবে। আল্লাহ তা’আলা এদেরকে মাটির নিচে ধ্বসিয়ে দিবেন এবং তাদের কতককে বানর ও শূকরে রূপান্তরিত করবেন। সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪০২০, সুনানে আবূ দাউদ : ৩৬৮৮, আহমাদ : ২২৩৯৩, মিশকাত : ৪২৯২, সহীহাহ : ১৩৮-১৩৯
৬. কুরআন হাদিসের আলোকে গান বাজনা সম্পর্কে সিদ্ধান্তসমূহ :
* বেহুদা কথা, অবান্তর কথা, বাজে কথা, অর্থহীন কথা ইত্যাদি দ্বারা কোন প্রকান গান গাওয়া যাবে না। সুরা লোকমান : ৬
* বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করে কোন প্রকার গান গাওয়া বা কবিতা আবৃতি করা যাবে না। সহিহ বুখারি : ৫৫৯০
* বাদ্যযন্ত্র না থাকলেও যে গানের মদ ও জুয়ার আসর বসবে, সে আসবে গান গাওয়া হারাম। সহিহ বুখারি : ৫৫৯০
*যে গানের আসরে নারীরা পর্দাহীনভাবে থাকে এবং নগ্নতা প্রকাশ করে সে সকল গানের আসরে যাওয়া ও আয়োজনে সাহায্য করা জায়েয নেই। আহমাদ : ১৬৯৩৫, ত্বাবারানী : ১৬২৪০-১৬২৪১, সহীহুল জামে : ৬৯১৪
* যারা বাদ্যযন্ত্রের মাধ্যমে গান গায় তাদের গানের আয়োজন করা বা তাদের মাধ্যমে ব্যবসা করা হারাম। সুনানে তিরমিযী : ১২৮২, সহীহাহ : ২৯২২
*-দফ বাজিয়ে গানের মাধ্যমে যুদ্ধ অভিজান ও যোদ্ধাদের বিরত্বগাথা বর্ণনা করা যায়। সহিহ বুখারি : ৪০০১, ৫১৪৭
* ঈদের দিনে ছোট মেয়েদের গান গেয়ে ও দফ বাজিয়ে আনন্দ প্রকাশ করতে পারে। সহিহ বুখারি : ৯৮৭
* যে সকল বালিকা পেশাদার গায়িকা নয় তারা দফ বাজিয়ে গান করতে পাবে। সহিহ বুখারি : ৯৫০, মুসলিম : ৮৯২
* বিবাহের অনুষ্ঠানে দফ বাজিয়ে গান করা যাবে। সহিহ বুখারী : ৪০০১
* শির্কি কথামালা দ্বারা গান গাওয়া যাবেনা। সুনানে তিরমিযী ১০৯০, সুনানে আবূ দাউদ : ৪৯২২
* কর্মজীবি বা মাঝি মাল্লাগণ বাদ্যযন্ত্র, শির্কি ও অশ্লীল কথা বিহীন গান গাইতে পারে। সহিহ বুখারী : ৬৮৯১
* আমাদের সমাজে প্রচলীত নবী তত্ত্ব, মুর্শীদি, জারী, কাওয়ালী, পল্লীগীতি, ভাওয়ালী, ভক্তিমূলক এ সকল গান ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে গাওয়া বা শোনা হারাম ও কবীরা গোনাহের অন্তর্ভূক্ত কারন ইহা গাওয়া সময় বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করে।
* বাজনা বা বাদ্যযন্ত্র ব্যতীত আল্লাহ তায়ালার গুনাবলী বিষয়ে হামদ, না’ত, কাসীদা, গজল ইত্যাদি পাঠ করা ও শোনা জায়েয রয়েছে। কিন্তু ইহাতে শির্ক ও বেহুদা কথামালা থাকলে গাওয়া বা শোনা হারাম ও কবীরা গোনাহ।
*আমাদের সমাজে প্রচলীত হামদ, না’ত, কাসীদা, গজল ইত্যাদি প্রচুর শির্কি কথামালায় ঠাসা। কাজেই যাচাই বাচাই করে গাইতে ও শুনতে হবে। বিশেষ করে নাতে রাসূলের (সাঃ) গাওয়া সময় প্রায়ই সীমা লঙ্গন হয়ে তাকে।
* গানের আসরে যদি উদ্দাম ও উশৃংখলার গান-বাজনা, অশ্লীস কথা, অশ্লীস নাচ, নগ্ন নর্তকী, ফাহেসা গায়িকা, নির্লজ্জ পুরুষ, বেপর্তা নারী, প্রফেশনাল নারী গায়িকা, প্রেম বিরহের বিবরণ সম্বলিত গানের কথা, নারী পুরূষের অবাধ মেলামেসার সুযোগ, বেহায়াপনা, উলঙ্গপনা, মদ, জুয়া ই্ত্যাদির তবে তা হারার ও কবিরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত।
* আমাদের দেশে প্রচলিত আধুনিক গান বা সিনেমাতে ব্যবহৃত গান শুনা, গাওয় বা দেখা হামার। কানর ইহাতে বিবাহের পূর্বে হারাম প্রেমকে উত্সাহ প্রদান করে।
৭. সেন্টার, দোকান, ব্যায়ামাগার, খেলাধুলার স্থানে বাদ্যযন্ত্র থাকলে তার বিধান
ইসলামি শরীয়তে, অধিকাংশ আলেম ও ফকীহর মতে, প্রচলিত বাদ্যযন্ত্র (যেমন: তবলা, হারমোনিয়াম, গিটার, বাঁশি ইত্যাদি) এবং গান-বাজনা যা মানুষকে আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল করে, তা হারাম। রাসুলুল্লাহ (সা.) স্পষ্ট করে বলেছেন, যে, এক সময় তাঁর উম্মতের মধ্যে কিছু লোক আসবে যারা ব্যভিচার, মদ ও বাদ্যযন্ত্রকে হালাল মনে করবে। এতে বাদ্যযন্ত্রের হারাম হওয়ার বিষয়টি প্রমাণিত হয়। হাদিস সম্ভার ২৩১০, আহমাদ : ৬৫৪৭, সিলসিলাহ সহীহাহ : ১৭০৮
যে সকল স্থানে (সেন্টার, দোকান, খেলার মাঠ ইত্যাদি) প্রকাশ্যে বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করা হয়, গান-বাজনা চলে, সেই স্থানগুলি একটি হারাম কাজের পরিবেশ তৈরি করে। ইসলামে শুধু হারাম কাজ করা থেকেই নয়, বরং হারাম কাজের পরিবেশে নিজে উপস্থিত থাকা, তার অংশ হওয়া বা তাকে সমর্থন করা থেকেও বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এমন পরিবেশে কাজ করা বা কেনাকাটা করার দ্বারা ঐ হারাম কাজকে পরোক্ষভাবে সমর্থন বা প্রশ্রয় দেওয়া হতে পারে বলে গণ্য করা হয়। বিশেষত, যদি সেই ব্যবসা বা কাজের উপার্জন বাদ্যযন্ত্র ও গান-বাজনার কারণে আরও আকর্ষণীয় হয় বা লোক সমাগম বৃদ্ধি পায়।
যদি কোনো দোকান বা সেন্টারে বাদ্যযন্ত্র বাজানো হয়, তবে সেখানে ক্রয়-বিক্রয় বা কর্ম সম্পাদন করা জায়েয নয় কারণ হলো-
* সেখানে অবস্থান করলে মানুষ আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল হতে পারে।
* হারাম কাজের প্রতি ঘৃণা জন্ম নেওয়ার পরিবর্তে সহনশীলতা আসতে পারে।
* এরূপ কাজে জড়িত হওয়া বা সেই পরিবেশকে অর্থ দিয়ে সমৃদ্ধ করা (যেমন কেনাকাটার মাধ্যমে) পরোক্ষভাবে সেই হারাম কাজকে উৎসাহিত করা বোঝায়।
যেহেতু ইসলামে বাদ্যযন্ত্র এবং এর অনর্থক ব্যবহারকে হারাম বা কঠোরভাবে অপছন্দনীয় মনে করা হয়, তাই যে কোনো স্থানে (বাজার, কর্মক্ষেত্র, বিনোদন কেন্দ্র) এর প্রকাশ্য উপস্থিতি থাকলে, সেই স্থানকে পরিহার করাই একজন মুমিনের জন্য উত্তম ও নিরাপদ। তবে যদি কাজ বা কেনাকাটার প্রয়োজন খুব তীব্র হয় এবং অন্য কোনো উপায় না থাকে, তখন দ্রুত কাজটি সম্পন্ন করে সেই পরিবেশ থেকে সরে আসা উচিত।
মাঝে মাঝে পরিবারের সবাই নিয়ে বাইরে যাওয়া
ইসলাম নারীর মর্যাদা ও ইজ্জত রক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। এই সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ইসলাম নারীদের জন্য কিছু বিশেষ বিধান দিয়েছে, যার মূলনীতি হলো—বিশেষ প্রয়োজন বা আবশ্যকীয় কারণ ছাড়া নারীরা নিজেদের ঘরে অবস্থান করবে। আল্লাহ তাআলা বলেছেন-
وَقَرۡنَ فِیۡ بُیُوۡتِکُنَّ وَلَا تَبَرَّجۡنَ تَبَرُّجَ الۡجَاہِلِیَّۃِ الۡاُوۡلٰی
আর তোমরা নিজ গৃহে অবস্থান করবে এবং প্রাক-জাহেলী যুগের মত সৌন্দর্য প্রদর্শন করো না।
সূরা আহযাব, আয়াত: ৩৩
এর অর্থ এই নয় যে, নারীরা সম্পূর্ণরূপে গৃহবন্দী থাকবে। বরং ইসলাম নারীকে সম্মানজনক ও নিরাপদ উপায়ে প্রয়োজনীয় কাজ ও বৈধ বিনোদনের জন্য ঘর থেকে বের হওয়ার অনুমতি দিয়েছে।
ইবনে উমর (রাঃ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন যে, “যদি তোমাদের কারো কাছে তার স্ত্রী মসজিদে যাওয়ার অনুমতি চায় তাহলে তাকে বাধা দিও না। সহিহ বুখারি: ৮২৭, সহিহ মুসলিম : ৪৪২
জাবির ইবন আবদুল্লাহ (রাঃ) বলেন, “আমার খালার তালাক হয়ে গেলে তিনি তাঁর খেজুর গাছের ফল সংগ্রহ করতে বের হলেন। তখন এক ব্যক্তি তাঁকে বাহিরে আসার জন্য ধমক দিল। তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে এসে বিষয়টি জানালেন। নবী ﷺ বললেন, ‘অবশ্যই তুমি তোমার খেজুর পাড়বে; হতে পারে তুমি তা থেকে সদকা করবে বা কোনো ভালো কাজে ব্যবহার করবে।’”
সহিহ মুসলিম : ১৪৮৩
পরিবারের সদস্যদের নিয়ে মাঝে মাঝে বাইরে খাওয়াও শরীয়তসম্মতভাবে অনুমোদিত একটি বৈধ বিনোদন এবং প্রয়োজনীয় কাজ হতে পারে। এই বিনোদন একঘেয়েমি কাটাতে, পরিবারের বন্ধন সুদৃঢ় করতে এবং মানসিক প্রফুল্লতা অর্জনে সহায়ক। এটি কেবল ঘরের মধ্যে বন্দীদশা থেকে মুক্তি নয়, বরং ইসলাম অনুমোদিত একটি প্রয়োজনও বটে, যা নারীর স্বাস্থ্য ও প্রফুল্লতা নিশ্চিত করে।
তবে, এই বৈধ প্রয়োজন মেটাতে বাইরে যাওয়ার সময় ইসলাম নির্ধারিত সকল নিয়ম-নীতি অবশ্যই মেনে চলতে হবে। এর মধ্যে প্রধান হলো:
১. পূর্ণ পর্দা রক্ষা : নারীদেরকে অবশ্যই পরিপূর্ণভাবে পর্দার সাথে ঘর থেকে বের হতে হবে। চেহারা ও সতর আবৃত করা অপরিহার্য।
২. সাজসজ্জা ও সুগন্ধি পরিহার: গায়রে-মাহরাম পুরুষের মনোযোগ আকর্ষণ করে এমন কোনো সাজসজ্জা বা সুগন্ধি ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
আব্দুল্লাহর স্ত্রী যয়নব (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে বলেছেন: “তোমাদের কেউ যদি মসজিদে আসতে চায় তাহলে সে যেন সুগন্ধি না মাখে। সহিহ মুসলিম : ৪৪৩
৩. নিরাপদ স্থান নির্বাচন: এমন রেস্টুরেন্ট বা স্থান নির্বাচন করতে হবে যেখানে বেগানা পুরুষদের সাথে অপ্রয়োজনীয় সংমিশ্রণ বা ভিড় এড়িয়ে চলা সম্ভব হয় এবং নারীরা স্বাচ্ছন্দ্যে থাকতে পারে।
৪. বেশি বেশি বের হওয়া পরিহার: কোনো প্রয়োজন বা বৈধ বিনোদন ছাড়া কেবল অযথা বেশি বেশি বাইরে যাওয়া উচিত নয়, যেমনটা প্রশ্নে উল্লেখ করা হয়েছে। বাইরে যাওয়া কেবল প্রয়োজন বা অনুমোদিত বিনোদনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা উচিত।
৫. মাহরামের উপস্থিতি: দূরত্বের ক্ষেত্রে অবশ্যই মাহরাম (নিকটাত্মীয় পুরুষ, যার সাথে বিবাহ হারাম) সাথে থাকতে হবে এবং স্থানীয় পর্যায়েও রাস্তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
ইবনু আব্বাস (রাঃ) সূত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, কোন পুরুষ যেন অপর মহিলার সঙ্গে নিভৃতে অবস্থান না করে, কোন স্ত্রীলোক যেন কোন মাহরাম সঙ্গী ছাড়া সফর না করে। এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! অমুক যুদ্ধের জন্য আমার নাম লেখা হয়েছে। কিন্তু আমার স্ত্রী হাজ্জযাত্রী। তখন আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘তবে যাও তোমার স্ত্রীর সঙ্গে হাজ্জ কর। সহিহ বুখারি : ৩০০৬, সহিহ মুসলিম : ১৩৪০
৬. গাইরে মাহরামের সাথে যাওয়া হারাম :
ইবনু উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, সাবধান! কোন পুরুষ কোন মহিলার সাথে নির্জনে মিলিত হলে সেখানে অবশ্যই তৃতীয়জন হিসাবে শাইতান অবস্থান করে। তোমরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে বসবাস কর। বিচ্ছিন্নতা হতে সাবধান থেকো। কেননা, শাইতান বিচ্ছিন্নজনের সাথে থাকে এবং সে দুজন হতে অনেক দূরে অবস্থান করে। যে লোক জান্নাতের মধ্যে সবচাইতে উত্তম জায়গার ইচ্ছা পোষণ করে সে যেন ঐক্যবদ্ধ হয়ে থাকে। যার সৎ আমল তাকে আনন্দিত করে এবং বদ্ আমল কষ্ট দেয় সেই হলো প্রকৃত ঈমানদার। সুনানে তিরমিজি : ২১৬৫
সুতরাং, ইসলাম নারীকে ঘর থেকে বের হতে নিষেধ করে না, বরং নিরাপদ ও সম্মানজনক উপায়ে বৈধ কাজ ও বিনোদনের অনুমতি দেয়। যখন পরিবারের সকলে মিলে বাইরে খেতে যাওয়া হয়, যদি তা শরীয়তের নিয়ম-কানুন মেনে হয় এবং হারাম কোনো কিছু থেকে মুক্ত থাকে, তবে এতে কোনো অসুবিধা নেই। এটি পরিবারের প্রতি খেয়াল রাখার এবং বৈধভাবে জীবন উপভোগ করার একটি সুন্দর মাধ্যম। আল্লাহ আমাদের সকলকে পুত-পবিত্রতা, আত্মসংরক্ষণ এবং উত্তম দ্বীনদারি অর্জনের তৌফিক দিন।
বাচ্চাদের সাথে খেলা
শিশুরা হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে দেওয়া এক অমূল্য নিয়ামত, যারা মানবজীবনে নির্মল আনন্দ ও প্রশান্তি বয়ে আনে। তাদের নিষ্পাপ হাসি, কৌতুহলপূর্ণ চোখ আর মিষ্টি আচরণ প্রতিটি ঘরকে আলো ঝলমলে করে তোলে। ইসলামে এই শিশুদের প্রতি কোমলতা, ভালোবাসা ও তাদের সাথে সময় কাটানোর গুরুত্ব অপরিসীম। বস্তুত, শিশুদের সাথে সময় কাটানো, তাদের খেলাধুলায় অংশ নেওয়া—এগুলো নিছক বিনোদন নয়, বরং তা একটি মহৎ ইবাদত এবং মানসিক শান্তি লাভের উপায়। এই প্রসঙ্গে, যারা শিশুদের প্রতি বিরূপ মনোভাব পোষণ করে বা তাদের সহ্য করতে পারে না, তাদের আচরণ অত্যন্ত দুঃখজনক এবং ইসলামের মৌলিক শিক্ষার পরিপন্থী। বিশেষ করে মসজিদসমূহে যদি কোনো শিশু আঘাতপ্রাপ্ত হয় বা দুর্ব্যবহারের শিকার হয়, তবে তা ঐ শিশুদের মনে মসজিদ ও ইসলাম সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা সৃষ্টি করে, যা মোটেও কাম্য নয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জীবনচরিত থেকে আমরা দেখতে পাই, তিনি শিশুদের সাথে কেমন চমৎকারভাবে মিশেছেন এবং তাদের প্রতি সীমাহীন দয়া দেখিয়েছেন।হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন সালাতে ইমামতি করছিলেন, তখন তাঁর প্রিয় নাতি হাসান বা হুসাইন (রা.) তাঁর পিঠে চড়ে বসতেন। তিনি তাড়াহুড়া করে তাদের নামিয়ে না দিয়ে সিজদা দীর্ঘ করতেন।
এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, শিশুদের প্রতি খেয়াল রাখা বা তাদের সাথে খেলাধূলা করা ইবাদতের মতো গুরুত্বপূর্ণ সময়েও অনুমোদিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শুধু খেলাই করেননি, বরং শিশুদের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশে উৎসাহিত করেছেন।
শিশুদের সাথে সময় কাটানো, খেলাধুলা করা এবং তাদের প্রতি ভালোবাসা প্রদর্শন করা ইসলামের একটি সুন্দর শিক্ষা। এটি একদিকে যেমন তাদের অধিকার, তেমনি এটি আমাদের হৃদয়ের জন্য শান্তি ও সওয়াবের মাধ্যম। শিশুদের প্রতি দয়াশীল হওয়া সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর আদর্শ এবং প্রতিটি মুসলিমের জীবনে এটি প্রতিফলিত হওয়া জরুরি। এ সম্পর্কে নিচের হাদিসগুলো প্রতিধান যোগ্য।
আবু বকরাহ (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদের ইমামতি করছিলেন, এসময় হাসান বা হুসাইন (রাঃ) তাঁর পিঠে উঠে বসত। তখন তিনি সিজদা দীর্ঘ করতেন। সাহাবিরা বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল! আজ আপনি সিজদা অনেক দীর্ঘ করেছেন।’ তিনি বললেন, ‘আমার ছেলে আমার পিঠে চড়ে বসেছিল, আমি চাইলাম না তাড়াহুড়া করে তাকে নামিয়ে দিই।’” সুনানে নাসায়ী, হাদীস ; ১১৪১. ,আহমদ : ১৭৩২১
আবু কাতাদা (রাঃ) বর্ণনা করেন, “আমি দেখেছি নবী ﷺ সালাতে ইমামতি করছিলেন এবং তিনি তাঁর নাতনি উমামাহ বিনতে আবুল আস (রাঃ)-কে কোলে নিয়েছিলেন। তিনি যখন সিজদায় যেতেন, তখন তাঁকে নামিয়ে রাখতেন; আর দাঁড়ালে তাঁকে আবার কোলে তুলে নিতেন।” সহিহ মুসলিম : ১১০৯
আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদা হাসান ইবনু ’আলীকে চুম্বন করেন। সে সময় তাঁর নিকট আকরা’ ইবনু হাবিস তামীমী উপবিষ্ট ছিলেন। আকরা’ ইবনু হাবিস বললেনঃ আমার দশটি পুত্র আছে, আমি তাদের কাউকেই কোন দিন চুম্বন দেইনি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর পানে তাকালেন, অতঃপর বললেনঃ যে দয়া করে না, সে দয়া পায় না। সহিহ বুখারি : ৫৯৯৭, সহিহ মুসলিম : ২৩১৮, আহমাদ : ৭২৯৩
বৈবাহিক সম্পর্কে মাধ্যমে বিনোদন
মানুষের জীবনের অন্যতম প্রধান ও স্বাভাবিক প্রবৃত্তি হলো বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকর্ষণ। এই আকর্ষণ মানুষের সৃষ্টিগত বৈশিষ্ট্য, যা আল্লাহ তাআলা নিজেই মানবজাতির মধ্যে স্থাপন করেছেন।
আল্লাহ বলেন—
زُیِّنَ لِلنَّاسِ حُبُّ الشَّہَوٰتِ مِنَ النِّسَآءِ وَالۡبَنِیۡنَ وَالۡقَنَاطِیۡرِ الۡمُقَنۡطَرَۃِ مِنَ الذَّہَبِ وَالۡفِضَّۃِ وَالۡخَیۡلِ الۡمُسَوَّمَۃِ وَالۡاَنۡعَامِ وَالۡحَرۡثِ ؕ
মানুষের জন্য সুশোভিত করা হয়েছে প্রবৃত্তির ভালবাসা- নারী, সন্তানাদি, রাশি রাশি সোনা-রূপা, চিহ্নত ঘোড়া, গবাদি পশু ও শস্যক্ষেত। সূরা আল ইমরান: ১৪
ইসলাম এই প্রাকৃতিক চাহিদাকে অস্বীকার করেনি, বরং শরীয়তসিদ্ধ ও সম্মানজনক পথ নির্ধারণ করেছে—আর তা হলো বিবাহ। ইসলাম যৌন সম্পর্ককে কেবল আনন্দের মাধ্যম নয়, বরং একটি ইবাদত হিসেবে বিবেচনা করেছে, যা মানবসমাজে পবিত্রতা, ভালোবাসা ও স্থিতিশীলতা এনে দেয়।
১. বিবাহ আনন্দ ও ভালোবাসার পবিত্র বন্ধন
০৬৬. ’আবদুল্লাহ্ ইবনু মাস’ঊদ (রাঃ) বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে আমরা কতক যুবক ছিলাম; আর আমাদের কোন কিছু ছিল না। এই হালতে আমাদেরকে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, হে যুব সম্প্রদায় [1]! তোমাদের মধ্যে যারা বিয়ে করার সামর্থ্য রাখে, তারা যেন বিয়ে করে। কেননা, বিয়ে তার দৃষ্টিকে সংযত রাখে এবং লজ্জাস্থান হিফাযত করে এবং যার বিয়ে করার সামর্থ্য নেই, সে যেন সওম পালন করে। কেননা, সওম তার যৌনতাকে দমন করবে। সহিহ বুখারি : ৫০৬৬, সহিহ মুসলিম : ১৪০০
বিবাহ কেবল দায়িত্ব নয়, এটি মানসিক প্রশান্তি, পারস্পরিক ভালোবাসা, এবং বিনোদনেরও উৎস।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَمِنْ آيَاتِهِ أَنْ خَلَقَ لَكُمْ مِنْ أَنْفُسِكُمْ أَزْوَاجًا لِتَسْكُنُوا إِلَيْهَا وَجَعَلَ بَيْنَكُمْ مَوَدَّةً وَرَحْمَةً
“তাঁর নিদর্শনসমূহের মধ্যে একটি হলো—তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকেই সঙ্গিনী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের মাধ্যমে প্রশান্তি পাও; এবং তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন।” সূরা আর-রূম : ২১
২. বৈবাহিক জীবন প্রশান্তি দেয়
আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَمِنۡ اٰیٰتِہٖۤ اَنۡ خَلَقَ لَکُمۡ مِّنۡ اَنۡفُسِکُمۡ اَزۡوَاجًا لِّتَسۡکُنُوۡۤا اِلَیۡہَا وَجَعَلَ بَیۡنَکُمۡ مَّوَدَّۃً وَّرَحۡمَۃً ؕ اِنَّ فِیۡ ذٰلِکَ لَاٰیٰتٍ لِّقَوۡمٍ یَّتَفَکَّرُوۡنَ
আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের থেকেই স্ত্রীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি পাও। আর তিনি তোমাদের মধ্যে ভালবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। নিশ্চয় এর মধ্যে নিদর্শনাবলী রয়েছে সে কওমের জন্য, যারা চিন্তা করে। সুরা রূম : ২১
৩. বৈধ আমোদ-স্ফূর্তি ও ক্রীড়া-কৌতুক
জাবির ইবনু আবদুল্লা (রা.) থেকে বর্ণিত যে, আবদুল্লাহ (রা.) মৃত্যু বরণ করলেন এবং নয়টি কন্যা রেখে গেলেন। পরে আমি (জাবির) এক বিধবা মহিলাকে বিয়ে করলাম। তখন রসূলুল্লাহ ﷺ আমাকে বললেন, হে জাবির! তুমি বিয়ে করেছো? আমি বললামঃ হ্যাঁ। তিনি (ﷺ) বললেন, তা কুমারী না বিধবা? আমি বললাম, বরং বিধবা হে আল্লাহর রসূল! তিনি (ﷺ) বললেন, তবে তা কোন তরুণী (কুমারী) কেন নয় যে, তুমি তার সঙ্গে আমোদ-স্ফূর্তি করবে, সেও তোমার সাথে ক্রীড়া-কৌতুক করবে কিংবা তিনি (ﷺ) বলেছিলেন, তুমি তার সঙ্গে হাস্য-রস করতে, সেও তোমার সঙ্গে হাস্য-রস করত। জাবির (রাযিঃ) বলেন, আমি তাকে বললাম, (আমার পিতা) আবদুল্লাহ নয়টি (কিংবা সাতটি) মেয়ে রেখে মৃত্যুবরণ করেছেন এবং আমি তাদের মাঝে তাদের মতো একজনকে নিয়ে আসা অপছন্দ করলাম। তাই আমি এমন একটি মহিলাকে নিয়ে আসা পছন্দ করলাম যে তাদের দেখাশুনা করবে এবং তাদের শুধরে দিবে ও গড়ে তুলবে। তিনি (ﷺ) বললেন, তবে আল্লাহ তোমাকে বারাকাত দান করুন। তিনি আমাকে (এ ধরনের) কোন উত্তম কথা বললেন। আবূ রবী (রহঃ) এর রিওয়ায়াতে রয়েছে- “তুমি তার সঙ্গে আমোদ-স্ফূর্তি করবে ও তার সঙ্গে হাস্যরস করবে, সেও তোমার সঙ্গে হাস্য রস করবে। সহিহ মুসলিম : ৭১৫, ১৪৬৬
৪. বৈবাহিক আনন্দও ইবাদত
আবূ যার (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কিছু সংখ্যক সাহাবী তার কাছে এসে বললেন, হে আল্লাহর রসূল! ধন সম্পদের মালিকেরা তো সব সাওয়াব নিয়ে নিচ্ছে। কেননা আমরা যেভাবে সালাত আদায় করি তারাও সেভাবে আদায় করে। আমরা যেভাবে সিয়াম (পালন করি তারাও সেভাবে সিয়াম পালন করে। কিন্তু তারা তাদের অতিরিক্ত সম্পদ দান করে সাওয়াব লাভ করছে অথচ আমাদের পক্ষে তা সম্ভব হচ্ছে না। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ আল্লাহ তা’আলা কি তোমাদেরকে এমন অনেক কিছু দান করেননি যা সাদাকা করে তোমরা সাওয়াব পেতে পার? আর তা হলো প্রত্যেক তাসবীহ (সুবহা-নাল্লহ) একটি সাদাকা, প্রত্যেক তাকবীর (আল্লহু আকবার) একটি সাদাকা, প্রত্যেক তাহমীদ (আলহামদু লিল্লাহ) বলা একটি সাদাকা, প্রত্যেক ’লা-ইলা-হা ইল্লাল্লহ’ বলা একটি সাদাকা, প্রত্যেক ভাল কাজের আদেশ দেয়া এবং মন্দ কাজ করতে দেখলে নিষেধ করা ও বাধা দেয়া একটি সাদাকা্। এমনকি তোমাদের শরীরের অংশে সাদাকা রয়েছে। অর্থাৎ আপন স্ত্রীর সাথে সহবাস করাও একটি সাদাকা। সাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রসূল! আমাদের কেউ তার কাম প্রবৃত্তিকে চরিতার্থ করবে বৈধ পথে আর এতেও কি তার সাওয়াব হবে? তিনি বললেন, তোমরা বল দেখি, যদি তোমাদের কেউ হারাম পথে নিজের চাহিদা মেটাত বা যিনা করত তাহলে কি তার গুনাহ হত না? অনুরূপভাবে যখন সে হালাল বা বৈধ পথে কামাচার করবে তাতে তার সাওয়াব হবে। সহিহ মুসলিম : ১০০৬
অতএব, বৈবাহিক সম্পর্কের মধ্যে বিনোদন, প্রেম, ও শারীরিক আনন্দও একপ্রকার ইবাদত, যদি তা আল্লাহর সীমারেখার মধ্যে হয়।
বৈবাহিক জীবনে আনন্দের প্রভাব
বৈবাহিক সম্পর্কের সুখ-শান্তি একজন মুসলিমের মানসিক প্রশান্তির প্রধান উৎস।
আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রাযিঃ) এর সূত্রে বর্ণিত যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, দুনিয়া উপভোগের উপকরণ এবং দুনিয়ার উত্তম উপভোগ্য উপকরণ পুণ্যবতী নারী। সহিহ মুসলিম : ১৪৬৭
একজন সুখী স্বামী বা স্ত্রী সমাজে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে; তারা সন্তানদের সঠিকভাবে গড়ে তুলতে পারে, সমাজে দয়া ও ভারসাম্য ছড়িয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে, দাম্পত্য জীবনে অসন্তোষ অনেক সময় মানসিক চাপ, অশান্তি ও পাপাচারের দিকে ধাবিত করে।
উপসংহার : ইসলাম বিবাহের মাধ্যমে মানবীয় আকাঙ্ক্ষাকে পবিত্রতা দিয়েছে। বিবাহিত জীবনে আনন্দ, রোমান্স ও বিনোদন কেবল অনুমোদিতই নয়, বরং উৎসাহিত করা হয়েছে। বিবাহকে ভালোবাসা ও বিনোদনের কেন্দ্র বানানো, পারস্পরিক সম্মান ও আদব বজায় রাখা, নবী ﷺ এর আদর্শ অনুযায়ী হাসিখুশি, আনন্দময়, ঈমানদার দাম্পত্য জীবন গঠন করা।
আয়িশাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
“خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لِأَهْلِهِ، وَأَنَا خَيْرُكُمْ لِأَهْلِي”
“তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি, যে তার পরিবারের জন্য সর্বোত্তম আচরণ করে। আমি তোমাদের মধ্যে পরিবারের জন্য সর্বোত্তম। সুনানে তিরমিজি: ৩৮৯৫, সহীহাহ : ২৮৫
জীবন্ত প্রাণীর প্রতিনিধিত্বকারী পুতুল ও খেলনা
সলামী শরীয়তে জীবন্ত প্রাণীর আকৃতি তৈরি করা বা চিত্রাঙ্কনের ওপর সাধারণভাবে কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এর মূল কারণ হলো আল্লাহর সৃষ্টির অনুকরণ থেকে বিরত থাকা এবং এর মাধ্যমে শিরকের পথ বন্ধ করা। কিন্তু এই সাধারণ বিধির ক্ষেত্রে শিশুদের খেলনা পুতুল ব্যতিক্রম কিনা, এই বিষয়ে ইসলামী ফিকহ ও হাদীস বিশারদদের মধ্যে বিস্তারিত আলোচনা ও মতভেদ রয়েছে। মুজতাহিদ আলেমগণ এই বিষয়ে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জীবন ও সাহাবীদের আমল সম্পর্কিত একাধিক সহীহ হাদীসের সমন্বয় ঘটিয়েছেন। একটি হাদীস যেখানে ছবিযুক্ত বালিশ ব্যবহারের কঠোরতা নির্দেশ করে, সেখানে অন্য হাদীসগুলো নবী (সা.)-এর ঘরে শিশুদের খেলার পুতুলের উপস্থিতিকে অনুমোদন করে। সংখ্যাগরিষ্ঠ আলেমগণ এই ব্যতিক্রমকে শিশুদের মানসিক বিকাশ এবং প্রশিক্ষণের জন্য একটি বিশেষ ছাড় হিসেবে দেখেন। পরবর্তী অংশে, এই সংশ্লিষ্ট হাদীসগুলোর আলোকে পুতুল ও খেলনা ব্যবহারের বৈধতা এবং এর ওপর বিভিন্ন ইসলামী স্কলারের ফতোয়া বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হবে।
প্রথসে সহিহ হাদিসগুলো লক্ষ করি। তাহলো ফতওয়াটি বুঝতে সহজ হবে। হাদসিগুল হলো :
উম্মুল মু’মিনীন ‘আয়িশাহ (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বর্ণনা করেন যে, তিনি একটি ছবিওয়ালা বালিশ ক্রয় করেন। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা দেখতে পেয়ে দরজায় দাঁড়িয়ে গেলেন, ভিতরে প্রবেশ করলেন না। আমি তাঁর চেহারায় অসন্তুষ্টি ভাব দেখতে পেলাম। তখন বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের কাছে তওবা করছি। আমি কী অপরাধ করেছি? তখন আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এ বালিশের কী ব্যাপার? ‘আয়িশাহ (রাযি.) বলেন, আমি বললাম, আমি এটি আপনার জন্য ক্রয় করেছি, যাতে আপনি টেক লাগিয়ে বসতে পারেন। তখন আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এই ছবি তৈরীকারীদের কিয়ামতের দিন শাস্তি দেয়া হবে। তাদের বলা হবে, তোমরা যা তৈরী করেছিলে, তা জীবিত কর। তিনি আরো বলেন, যে ঘরে এ সব ছবি থাকে, সে ঘরে (রহমতের) ফেরেশতাগণ প্রবেশ করেন না। সহিহ বুখারি : ২১০৫, ৩২২৪, ৫১৮১, ৫৯৫৭, ৫৯৬১, ৭৫৫৭, সহহি মুসলিম : ২১০৭, আহমাদ : ২৬১৪৯
আবূ ত্বলহা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
لاَ تَدْخُلُ الْمَلاَئِكَةُ بَيْتًا فِيهِ كَلْبٌ وَلاَ تَصَاوِيرُ
যে ঘরে কুকুর বা জীবজন্তুর ছবি (তাসাবীর) থাকে, ফেরেশতারা সেখানে প্রবেশ করেন না। সহিহ বুখারি : ৫৯৪৯, সহিহ মুসলিম : ২১০৬
আয়িশাহ্ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন-
تَأْتِينِي صَوَاحِبِي فَكُنَّ يَنْقَمِعْنَ مِنْ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَالَتْ فَكَانَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يُسَرِّبُهُنَّ إِلَىَّ
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সামনেই আমি পুতুল বানিয়ে খেলতাম। আমার বান্ধবীরাও আমার সাথে খেলা করত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘরে প্রবেশ করলে তারা দৌড়ে পালাত। তখন তিনি তাদের ডেকে আমার কাছে পাঠিয়ে দিতেন এবং তারা আমার সঙ্গে খেলত। সহিহ বুখারি : ৬১৩০, সহিহ মুসলিম : ২৪৪০ আহমাদ : ২৬০২০
আয়েশা (রাঃ) বর্ণনা করেন। “আল্লাহর রাসূল ﷺ তাবুক বা খায়বার অভিযান থেকে ফিরে এলেন (বর্ণনাকারী নিশ্চিত নন কোনটি)। আমার একটি ঘরে একটি পর্দা ছিল। বাতাস এসে পর্দাটি একপাশে সরিয়ে দেয়, এবং সেখানে আমার কিছু পুতুল দেখা যায়।
নবী ﷺ জিজ্ঞাসা করলেন: ‘হে আয়েশা! এগুলো কী?’
আমি বললাম: ‘আমার পুতুল।’
তিনি একটি পুতুল ঘোড়ার দিকে তাকিয়ে বললেন: ‘আমি এটার মাঝখানে কী দেখছি?’
আমি বললাম: ‘এটি একটি ঘোড়া।’
তিনি বললেন: ‘এর উপর কী আছে?’
আমি বললাম: ‘দুটি ডানা।’
তিনি বললেন: ‘ডানাযুক্ত ঘোড়া?’
আমি বললাম: ‘আপনি কি শোনেননি যে সুলাইমান (আঃ)-এরও ডানাযুক্ত ঘোড়া ছিল?’
তিনি তখন এমনভাবে হেসে উঠলেন যে আমি তাঁর মাড়ির দাঁত দেখতে পেলাম।” সুনানে আবু দাউদ : ৪৯৩২
আয়িশাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত আছে যে, তার সাত বছর বয়সে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বিবাহ করেন। তাকে নয় বছর* বয়সে তার ঘরে বধুবেশে নেয়া হয় এবং তার সঙ্গে তার খেলার পুতুলগুলোও ছিল। তাঁর আঠারো বছর বয়সে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইন্তিকাল করেন। সহিহ মুসলিম : ১৪২২
রুবায়্যি বিনতু মুআব্বিয (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ‘আশূরার সকালে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আনসারদের সকল পল্লীতে এ নির্দেশ দিলেনঃ যে ব্যক্তি সওম পালন করেনি সে যেন দিনের বাকি অংশ না খেয়ে থাকে, আর যার সওম অবস্থায় সকাল হয়েছে, সে যেন সওম পূর্ণ করে। তিনি (রুবায়্যি‘) (রাযি.) বলেন, পরবর্তীতে আমরা ঐ দিন সওম পালন করতাম এবং আমাদের শিশুদের সওম পালন করাতাম। আমরা তাদের জন্য পশমের খেলনা তৈরি করে দিতাম। তাদের কেউ খাবারের জন্য কাঁদলে তাকে ঐ খেলনা দিয়ে ভুলিয়ে রাখতাম। আর এভাবেই ইফতারের সময় হয়ে যেত। সহিহ বুখারি : ১৯৬০, সহিহ মুসলিম : ১১৩৬
হাদিসগুলোর আলোকে একটি ফতওয়া :
জীবন্ত প্রাণীর প্রতিনিধিত্বকারী পুতুল ও খেলনা সম্পর্কে ইসলামী ফিকহের অবস্থান মূলত উপরের সহীহ হাদীসগুলোর ব্যাখ্যার ওপর নির্ভরশীল, যার ফলে আলেমদের মধ্যে মতভেদ থাকলেও সংখ্যাগরিষ্ঠ আলেমের ফতোয়া শিশুদের খেলনার ক্ষেত্রে শিথিলতা বা অনুমোদনের পক্ষে।
১. জমহূর ফুকাহা (অধিকাংশ আলেম) এর ফতোয়া: বৈধতা
ইমাম আন-নাবাবী, ইমাম ইবন হাজার আসকালানী, ইমাম ইবনে কুদামা এবং সমসাময়িক আলেমদের মধ্যে শাইখ মুহাম্মাদ ইবনে সালেহ আল-উসাইমীন ও ড. ইউসুফ আল-কারযাভী সহ অনেকেই মনে করেন যে শিশুদের খেলার পুতুল ও খেলনা জায়েয এবং এটি জীবন্ত প্রাণীর ভাস্কর্য বা ছবি তৈরির সাধারণ নিষেধাজ্ঞার আওতামুক্ত।
তাঁদের দলীল ও যুক্তি:
আয়েশা (রাঃ)-এর হাদীস: সহীহ বুখারী এবং মুসলিমের হাদীস। সহিহ বুখারী : ৬১৩০, সহিহ মুসলিম: ২৪৪০
প্রমাণ করে যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর উপস্থিতিতেই আয়েশা (রাঃ) পুতুল নিয়ে খেলতেন এবং তিনি তা অনুমোদন করেছিলেন। এমনকি তাবুক বা খাইবারের অভিযানের পর ডানাযুক্ত ঘোড়ার পুতুল দেখেও তিনি হেসেছিলেন, কিন্তু তা নিষেধ করেননি। সুনানে আবূ দাউদ: ৪৯৩২
সংখ্যাগরিষ্ঠ আলেম এটিকে শিশুদের জন্য, বিশেষত মেয়েদের, বিশেষ ছাড় হিসেবে গণ্য করেন। এর উদ্দেশ্য হলো খেলার মাধ্যমে তাদের মধ্যে মাতৃস্নেহ এবং সন্তান প্রতিপালনের প্রশিক্ষণ দেওয়া। তাঁদের মতে, মূর্তি বা ছবি নিষিদ্ধ হওয়ার কারণ হলো সেগুলোকে সম্মান দেখানো বা উপাসনার মাধ্যমে শিরকের দিকে নিয়ে যাওয়া। কিন্তু খেলনা পুতুলকে সাধারণত সম্মান করা হয় না বা উপাসনার উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয় না; এগুলি খেলার সামগ্রী মাত্র।
২. কঠোর ফতোয়া : সাধারণভাবে হারাম
কিছু আলেম, প্রধানত নিষেধাজ্ঞার সাধারণ হাদীসগুলোর ওপর জোর দিয়ে, সব ধরনের প্রাণীর আকৃতিযুক্ত পুতুলকে সাধারণভাবে হারাম বা কমপক্ষে পরিহারযোগ্য (উত্তম) বলে মনে করেন।
তাঁদের দলীল ও যুক্তি:
তাঁরা ছবিযুক্ত বালিশ সম্পর্কিত হাদীসকে সাধারণ বিধান হিসেবে দেখেন যে, যে ঘরে ছবি বা প্রাণীর আকৃতি থাকে, সেখানে রহমতের ফেরেশতা প্রবেশ করেন না।
শাইখ ইবনে বায (রহ.) সহ কেউ কেউ মনে করেন যে, এটি বিতর্কের বিষয় হওয়ায় এবং নিষেধাজ্ঞার সাধারণ হাদীসগুলো কঠোর হওয়ায় সন্দেহ থেকে বাঁচার জন্য (যেমন রাসূল ﷺ বলেছেন: “যে ব্যক্তি সন্দেহপূর্ণ বিষয়ে পতিত হল, সে হারামে পতিত হল”) এসব খেলনা থেকে বিরত থাকাই উত্তম।
শাইখ ইবনে উসাইমীনের দৃষ্টিভঙ্গি
সমসাময়িক প্রখ্যাত আলেম শাইখ মুহাম্মাদ ইবনে সালেহ আল-উসাইমীন (রহ.) শিশুদের খেলনার বৈধতা প্রদান করেছেন, তবে তিনি উপদেশ দিয়েছেন যে, সম্ভব হলে খেলনাগুলোর বৈশিষ্ট্য সরল রাখা বা অসম্পূর্ণ রাখা ভালো, যাতে তা বাস্তবের সাথে অপ্রয়োজনীয় সাদৃশ্য এড়িয়ে যায়। এই মতটিই জমহূর ফুকাহাদের মতের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
ফাইনাল ফতওয়া : শিশুদের খেলাধুলার জন্য ব্যবহৃত জীবন্ত প্রাণীর পুতুল ও খেলনা শরীয়তসম্মতভাবে বৈধ বলে গণ্য হয়, তবে তা যেন প্রদর্শনী বা সম্মানের বস্তু হিসেবে ব্যবহৃত না হয়।