নবি ﷺ–এর জীবনের হাস্যরস, আনন্দ ও বিনোদন
মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন
ইসলাম একটি পরিপূর্ণ জীবনবিধান। এতে মানুষের আত্মা, মন, শরীর ও সমাজ—সবকিছুর সমন্বিত বিকাশের পথনির্দেশ রয়েছে। এই ধর্ম কেবল ইবাদত বা আধ্যাত্মিকতার ক্ষেত্রেই নয়, বরং জীবনের আনন্দ ও স্বাভাবিক বিনোদনকেও স্বীকৃতি দিয়েছে, যদি তা হয় আল্লাহর অনুমোদিত সীমার মধ্যে।
মানুষ প্রকৃতিগতভাবে হাসে, খেলে, বিশ্রাম নেয় এবং আনন্দ পায়। ইসলামের উদ্দেশ্য এ প্রাকৃতিক চাহিদাকে দমন করা নয়, বরং সুষমভাবে নিয়ন্ত্রণ করা। আর এ বিষয়ে সর্বশ্রেষ্ঠ আদর্শ হচ্ছেন মুহাম্মাদ ﷺ। তাঁর জীবন ছিল এক অনুপম ভারসাম্যের দৃষ্টান্ত—ইবাদতে গভীর, কিন্তু জীবনে প্রফুল্ল; রসিকতায় কোমল, কিন্তু কথায় কখনো মিথ্যা নয়। এই অধ্যায়ে আমরা দেখব, কেমন ছিলেন নবী ﷺ–এর হাস্যরস, আনন্দ, পারিবারিক বিনোদন, সাহাবিদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা, সামাজিক মেলামেশা, এবং এসবের মাধ্যমে তিনি উম্মতের জন্য কী শিক্ষা রেখে গেছেন।
১. নবী ﷺ–এর রসিকতা ও হাস্যরসের ধরন
নবী ﷺ মানুষ ছিলেন, ফেরেশতা নন। তাই তাঁর জীবনে হাসি, খুশি, মজা, কৌতুক সবই ছিল; তবে তা হতো সত্য, শালীনতা ও উদ্দেশ্যপূর্ণ আচরণের মধ্যে।
আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন-
قَالُوا يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّكَ تُدَاعِبُنَا . قَالَ “ إِنِّي لاَ أَقُولُ إِلاَّ حَقًّا
(সাহাবীগণ) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। আপনি তো আমাদের সাথে কৌতুকও করে থাকেন। তিনি বললেনঃ আমি শুধু সত্য কথাই বলে থাকি। সুনানে তিরমিজি :১৯৯০, সহীহাহ : ১৭২৬
এই হাদীসের মাধ্যমে নবী ﷺ–এর রসিকতার নীতি স্পষ্ট হয়—হাস্যরস থাকতে পারে, তবে মিথ্যা নয়। তিনি কখনো কারো অনুভূতিতে আঘাত করতেন না, কখনো অশালীন ভাষা ব্যবহার করতেন না। তাঁর হাসি ছিল শান্ত, তাঁর মজা ছিল স্নেহপূর্ণ।
আবদুল্লাহ ইবনুল হারিস ইবনু জাযয়ি (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চেয়ে বেশী মুচকি হাসি দিতে আমি আর কাউকে দেখিনি। সুনানে তিরমিজি : ৩৬৪১, মিশকাত : ৫৮২৯
২. নবী ﷺ–এর হাসি : আনন্দ, দাওয়াত ও দয়া
নবী ﷺ–এর হাসি ছিল এক ধরণের দাওয়াত। তা ছিল তাঁর সৌজন্য ও দয়ার প্রকাশ।
জারীর (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন-
مُنْذُ أَسْلَمْتُ وَلَا رَآنِيْ إِلَّا تَبَسَّمَ فِيْ وَجْهِي
আমি যখন ইসলাম গ্রহণ করেছি তখন থেকে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে তাঁর নিকট প্রবেশ করতে বাধা দেননি এবং যখনই তিনি আমার চেহারার দিকে তাকাতেন তখন তিনি মুচকি হাসতেন। সহিহ বুখারি : ৩০৩৫, ৩৮২২, ৬০৯০, সহিহ মুসলিম : ২৪৭৫
আবদুল্লাহ ইবনুল হারিস ইবনু জাযয়ি (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর চেয়ে বেশী মুচকি হাসি দিতে আমি আর কাউকে দেখিনি। সুনানে তিরমিজি : ৩৬৪১, মিশকাত : ৫৮২৯, মুসনাদে আহমাদ : ১৭৭৫০, শুআবূল ঈমান : ৮০৪৭,
এই আচরণ আমাদের শেখায়, মুমিনের হাসি উচিত শালীন ও হৃদয় প্রশান্তকারী, যা মন ভালো করে, কিন্তু বেহায়াপনা সৃষ্টি করে না।
৩. নবী ﷺ–এর কোমল রসিকতা
মুবারক ইবন ফাদালাহ (রহ.) বর্ণনা করেছেন। তিনি হাসান (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন-
: أَتَتْ عَجُوزٌ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ، فَقَالَتْ : يَا رَسُولَ اللَّهِ ، ادْعُ اللَّهَ أَنْ يُدْخِلَنِي الْجَنَّةَ ، فَقَالَ : ” يَا أُمَّ فُلانٍ ، إِنَّ الْجَنَّةَ لا تَدْخُلُهَا عَجُوزٌ ” ، قَالَ : فَوَلَّتْ تَبْكِي , فَقَالَ : ” أَخْبِرُوهَا أَنَّهَا لا تَدْخُلُهَا وَهِيَ عَجُوزٌ إِنَّ اللَّهَ تَعَالَى , يَقُولُ : إِنَّا أَنْشَأْنَاهُنَّ إِنْشَاءً
অর্থ : একজন বৃদ্ধা রাসুলুল্লাহ ﷺ এর কাছে এসে বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহর কাছে দোয়া করুন যেন তিনি আমাকে জান্নাতে প্রবেশ করান।
তিনি (ﷺ) বললেন, “হে অমুকের মা! জান্নাতে কোনো বৃদ্ধা প্রবেশ করবে না।“
(বর্ণনাকারী বলেন) তখন সে কাঁদতে কাঁদতে চলে গেল। এরপর রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন, “তাকে খবর দাও যে, সে বৃদ্ধ অবস্থায় জান্নাতে প্রবেশ করবে না।” “নিশ্চয়ই আল্লাহ তা’আলা বলেন-
‘আমি তাদেরকে বিশেষভাবে সৃষ্টি করেছি, তাদেরকে করেছি কুমারী, স্বামীদের প্রতি প্রেমময়ী ও সমবয়সী। সূরা ওয়াকিয়া : ৩৫-৩৭। সহিহ শামায়েলে তিরমিজি : ১৭৯, সিলসিলা সহিহাহ : ২৯৮৭; শারহুস সুন্নাহ : ৩৬০৬। হাদিসটি সহিহ শামায়েলে তিরমিজি থেকে সংকলন করা হয়েছে।
৪. নবী ﷺ–এর পারিবারিক বিনোদন
আয়িশা (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা আমি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে আমার ঘরের দরজায় দেখলাম। তখন হাবশার লোকেরা মসজিদে (বর্শা দ্বারা) খেলা করছিল। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর চাদর দিয়ে আমাকে আড়াল করে রাখছিলেন। আমি ওদের খেলা অবলোকন করছিলাম। সহিহ বুখারি : ৪৫৪, ৪৫৫, ৯৫০, ৯৮৮, ২৯০৬, ৩৫২৯, ৩৯৩১, ৫১৯০, ৫২৩৬
আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত। আবূ বকর (রা.) আইয়্যামে তাশরীকের দিনে আয়িশাহ (রাযিঃ) এর নিকট গিয়ে দেখেন যে, তার কাছে দুটি বালিকা গান করছে এবং দফ বাজাচ্ছে। আর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চাদর দিয়ে মাথা ঢাকা অবস্থায় ছিলেন। আবূ বকর (রাযিঃ) এটা দেখে বালিকাদ্বয়কে খুব শাসলেন বা ধমক দিলেন। তখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার চেহারা থেকে কাপড় সরিয়ে বলেন, হে আবূ বকর! এদেরকে ছেড়ে দাও। এ দিনগুলো হ’ল ঈদের দিন। আয়িশাহ (রাযিঃ) আরও বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে দেখেছি তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমাকে তার চাদর দ্বারা ঢেকে দিচ্ছেন, যখন আমি আবিসিনিয়ার যুবকদের (কৃষ্ণাঙ্গ) খেলার দৃশ্য অবলোকন করছিলাম। তখন আমি সবেমাত্র বালিকা। অতএব তোমরা অল্পবয়স্কা বালিকাদের সখের মূল্যায়ন কর। অল্পবয়স্ক বালিকারা অনেকক্ষণ আমোদ-ফুর্তিতে মেতে থাকে। সহিহ মুসলিম : ৮৯২, আহমাদ : ২৬৩৮৮
এটি ইসলামে শালীন বিনোদনের দৃষ্টান্ত। নবী ﷺ স্ত্রীকে বিনোদনের সুযোগ দিয়েছেন, তবে পরিমিতি বজায় রেখেছেন।
৫. সাহাবিদের সাথে নবী ﷺ–এর রসিকতা
আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, জনৈক ব্যক্তি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে সওয়ারী চাইল। তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন-
إِنَّا حَامِلُوكَ عَلَى وَلَدِ نَاقَةٍ قَالَ: وَمَا أَصْنَعُ بِوَلَدِ النَّاقَةِ؟ فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: وَهَلْ تَلِدُ الْإِبِلَ إِلَّا النُّوقُ
আমরা তো তোমাকে উটনীর বাচ্চার উপর সওয়ার করাব।’ তিনি বললেন, আমি উটনীর বাচ্চা দিয়ে কী করব?’ অতঃপর নবী (ﷺ) বললেন, ‘উটকে কি উটনী ছাড়া অন্য কেউ জন্ম দেয়? মিশকাত : ৪৮৮৬, সুনানে তিরমিযী : ১৯৯১, সুনানে আবু দাঊদ : ৪৯৯৮, সহীহুল জামি : ৭১২৮,
এটি ছিল বুদ্ধিদীপ্ত রসিকতা, যা হাস্যরসের সাথে চিন্তারও খোরাক দেয়।
৬. শিশুদের সঙ্গে রসিকতা
আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সবচেয়ে অধিক সদাচারী ছিলেন। আমার এক ভাই ছিল; ’তাকে আবূ ’উমায়র’ বলে ডাকা হতো। আমার ধারণা যে, সে তখন মায়ের দুধ খেতো না। যখনই সে তাঁর নিকট আসতো, তিনি বলতেন, হে আবূ উমায়র! কী করছে তোমার নুগায়র? সে নুগায়র পাখিটা নিয়ে খেলতো। আর প্রায়ই যখন সালাতের সময় হতো, আর তিনি আমাদের ঘরে থাকতেন, তখন তাঁর নীচে যে বিছানা থাকতো, একটু পানি ছিটিয়ে ঝেড়ে দেয়ার জন্য আমাদের আদেশ করতেন। তারপর তিনি সালাতের জন্য দাঁড়াতেন এবং আমরাও তাঁর পেছনে দাঁড়াতাম। আর তিনি আমাদের নিয়ে সালাত আদায় করতেন। সহিহ মুসলিম : ৬২০৩, সহিহ মুসলিম : ২১৫০
আনাস ইবন মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন-
রাসুলুল্লাহ ﷺ আমাদের কাছে আসতেন, এবং আমার এক ছোট ভাই ছিলেন, যার উপনাম ছিল আবু উমায়র। তার একটি ছোট পাখি ছিল, যার সাথে সে খেলা করত। একদিন সেই পাখিটি মারা গেল। রাসুলুল্লাহ ﷺ একদিন তার কাছে এলেন এবং তাকে বিষণ্ন দেখলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন: “এর কী হয়েছে? লোকেরা বলল: “তার পাখিটি মারা গেছে। তখন রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন, “হে আবু উমায়র! তোমার নুগাইর (ছোট পাখি) কী করল? সুনানে আবু দাউদ : ৪৯৬৯
৭. নবী ﷺ–এর সাহাবিদের সঙ্গে বন্ধুসুলভ সম্পর্ক
আনাস (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রায়ই আমাকে বলতেন-
“ يَا ذَا الأُذُنَيْنِ ” . قَالَ أَبُو أُسَامَةَ يَعْنِي يُمَازِحُهُ
হে দুই কানের অধিকারী। আবূ উসামাহ বলেন, অর্থাৎ তার সাথে তিনি (এ কথা বলে) রসিকতা করতেন। সুনানে তিরমিযী : ৩৮২৮
এ রসিকতায় ছিল না বিদ্রূপ, বরং ভালোবাসা।
৮. নবী ﷺ–এর হাস্যরস সাহাবিদের মন প্রশান্ত রাখত
আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, সাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)। আপনি তো আমাদের সাথে কৌতুকও করে থাকেন। তিনি বললেনঃ আমি শুধু সত্য কথাই বলে থাকি (এমনকি কৌতুকেও)। সুনানে তিরমিজি : ১৯৯০, সহীহাহ : ১৭২৬
৯. নবী ﷺ–এর হাস্যরস সামাজিক জীবনে
বদুল্লাহ ইবনুল হারিস ইবনু জাযয়ি (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চেয়ে বেশী মুচকি হাসি দিতে আমি আর কাউকে দেখিনি। সুনানে তিরমিজি : ৩৬৪১, মিশকাত : ৫৮২৯
তাঁর হাসি সমাজে ইতিবাচক প্রভাব ফেলত—ভীতি নয়, বরং প্রেমের পরিবেশ তৈরি করত।
১০. নবী ﷺ কখনো হাসি-ঠাট্টাকে জীবনের কেন্দ্র বানান নাই
আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ এমন কে আছে যে আমার নিকট হতে এ কথাগুলো গ্রহণ করবে এবং সে মুতাবিক নিজেও আমল করবে অথবা এমন কাউকে শিক্ষা দিবে যে অনুরূপ আমল করবে? আবূ হুরাইরা (রাঃ) বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)। আমি আছি। অতঃপর তিনি আমার হাত ধরলেন এবং গুনে গুনে এ পাঁচটি কথা বললেন-
তুমি হারাম সমুহ হতে বিরত থাকলে লোকদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা বড় আবিদ বলে গণ্য হবে; তোমার ভাগ্যে আল্লাহ তা’আলা যা নির্ধারিত করে রেখেছেন তাতে খুশি থাকলে লোকদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা স্বনির্ভর বলে গণ্য হবে; প্রতিবেশীর সাথে ভদ্র আচরণ করলে প্রকৃত মুমিন হতে পারবে; যা নিজের জন্য পছন্দ কর তা-ই অন্যের জন্যও পছন্দ করতে পারলে প্রকৃত মুসলিম হতে পারবে এবং অধিক হাসা থেকে বিরত থাক। কেননা অতিরিক্ত হাস্য-কৌতুক হৃদয়কে মৃতবৎ করে দেয়। সুনানে তিরমিজি : ২৩০৫, সহিহাহ : ৯৩০
১১. নবী ﷺ–এর দয়া ও ভালোবাসা
আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি দশটি বছর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খিদমত করেছি। কিন্তু তিনি কক্ষনো আমার প্রতি উহ্ শব্দটি করেননি। এ কথা জিজ্ঞেস করেননি, তুমি এ কাজ কেন করলে এবং কেন করলে না? সহিহ বুখারি : ৬০৩৮, সহিহ মুসলিম : ২৩০৯, আহমাদ : ১৩০২০
আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত। যাহির (ইবনে হিযাম আশজায়ী বদরী) নামে এক বেদুঈন প্রায়ই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে হাদিয়া দিত। যখন সে চলে যেতে উদ্যত হতো তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতেন, যাহির আমাদের পল্লিবন্ধু, আমরা তার শহুরে বন্ধু। সে কদাকার হলেও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে ভালোবাসতেন। একবার সে বেচাকেনা করছিল আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর অলক্ষ্যে পেছন দিক থেকে ধরে ফেললেন। তারপর সে বলল, কে? আমাকে ছেড়ে দাও! দৃষ্টিপাত করতেই সে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে দেখে তাঁর পিঠ আরো নৰী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বুকের সাথে মিলালো। এরপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এ গোলামটিকে কে ক্রয় করবে? যাহির বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে বিক্রি করে কেবল অচল মুদ্ৰাই পাবেন। এরপর তিনি বললেন, কিন্তু তুমি আল্লাহর নিকট অচল নও। অথবা তিনি বলেছেন, আল্লাহর নিকট তোমার উচ্চমর্যাদা রয়েছে।
সহিহ শামায়েলে তিরমিজি : ১৭৮, মুসনাদে আহমদ : ১২৬৬৯ সহীহ ইবনে হিব্বান : ৫৭৯০ বায়হাকী, : ২০৯৬১; শারহুস সুন্নাহ : ৩৬০৪; মুসনাদুল বাযযার : ৬৯২২।
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর পারিবারিক জীবনে বিনোদন
১. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার স্ত্রীদের প্রসংশা করতেন
খাদীজা (রা.)-এর ইন্তেকালের পরও রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর প্রশংসা করা অব্যাহত রাখেন এবং তাঁকে সব সময় স্মরণ করতেন। একবার আয়েশা (রা.) খাদীজা (রা.) সম্পর্কে কিছু বললে রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁকে বলেন, আল্লাহর কসম, আল্লাহ আমাকে তার চেয়ে উত্তম কোনো স্ত্রী দেননি। সে আমার ওপর ঈমান এনেছে যখন মানুষ আমাকে অস্বীকার করেছে; সে আমাকে সত্য বলে মেনে নিয়েছে যখন মানুষ আমাকে মিথ্যা বলেছে; সে আমাকে তার ধন-সম্পদ দিয়ে সাহায্য করেছে যখন মানুষ আমাকে বঞ্চিত করেছে; এবং আল্লাহ আমাকে তার মাধ্যমেই সন্তান দিয়েছেন, যখন অন্য কোনো স্ত্রীর মাধ্যমে দেননি। মুসনাদে আহমাদ : ২৪৮৬৪, আল-হাকিম, আল-মুস্তাদরাক : 6857
আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে আমি বলতে শুনেছি, ‘আয়িশাহ (রাঃ)-এর মর্যাদা নারীদের উপর এমন যেমন সারীদের মর্যাদা অন্যান্য খাদ্যদ্রব্যের উপর। সহিহ বুখারি : ৩৭৭০, ৪৫১৯, ৫৪২৮, সহিহ মুসলিম : ২৪৪৬, আহমাদ : ১৩৭৮৭
২. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীদের সাথে আবসর সময় কাটাতেন
আয়িশাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ’আসরের সালাত শেষ করতেন, তখন স্বীয় স্ত্রীদের মধ্য থেকে যে কোন একজনের নিকট গমন করতেন। একদিন তিনি স্ত্রী হাফসাহ (রাঃ)-এর কাছে গেলেন এবং সাধারণতঃ যে সময় কাটান তার চেয়ে বেশি সময় কাটালেন। সহিহ বুখারি : ৫২১৬
৩.. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীকে চুমু দিয়ে ঘরের বাহির বের হতেন
আয়িশাহ্ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর কোন এক স্ত্রীকে চুমো দিলেন, অতঃপর সালাত আদায়ের জন্য বের হলেন, কিন্তু অযু করলেন না। ’উরওয়াহ বলেনঃ আমি ’আয়িশাহ্ (রাঃ)-কে বললাম, ’সেই স্ত্রী আপনি নন কি? ফলে তিনি হেসে দিলেন। সুনানে আবু দাউদ : ১৭৯, সুনানে তিরমিজি : ৮৬, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৫০২
৪. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার স্ত্রীর চুল আচড়ে দিতেন
আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেনঃ আমি হায়েয অবস্থায় আল্লাহ্র রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর মাথা আঁচড়ে দিতাম। সহিহ বুখারি : ২৯৫, সহিহ মুসলিম : ৩০২
নবী সহধর্মিণী ‘আয়িশাহ্ (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে থাকাবস্থায় আমার দিকে মাথা বাড়িয়ে দিতেন আর আমি তা আঁচড়িয়ে দিতাম এবং তিনি যখন ই‘তিকাফে থাকতেন তখন (প্রাকৃতিক) প্রয়োজন ব্যতীত ঘরে প্রবেশ করতেন না। সহিহ বুখারি : ২০২৯, ২০৩৩, ২০৩৪, ২০৪১, ২০৪৫
৫. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার স্ত্রীর কাজে সহযোগিতা করতেন
আসওয়াদ (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ‘আয়িশাহ্ (রাযি.)-কে জিজ্ঞেস করলাম, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘরে থাকা অবস্থায় কী করতেন? তিনি বললেন, ঘরের কাজ-কর্মে ব্যস্ত থাকতেন। অর্থাৎ পরিবারবর্গের সহায়তা করতেন। আর সালাতের সময় হলে সালাতের জন্য চলে যেতেন। সহিহ বুখারি :৬৭৬, ৫৩৬৩, ৬০৩৯
উরওয়াহ বলেন, আয়েশা (রাঃ)-কে এক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করল, ’রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি ঘরে কাজ করতেন?’ তিনি বললেন, ’রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্যান্য মানুষের মত একজন মানুষ ছিলেন; স্বহস্তে কাপড় পরিষ্কার করতেন, দুধ দোহাতেন এবং নিজের খেদমত নিজেই করতেন। অন্যনা্য পুরুষরা যেমন নিজেদের বাড়ীতে কাজ করে, অনুরূপ তিনিও তাঁর কাপড়ে তালি লাগাতেন এবং জুতো সিলাই করতেন। হাদিস সম্ভার : ২৫৯০, আদাবুল মুফরাদ : ২১৫, সহীহুল জামে : ৯০৬৮
আয়েশা (রা.) বলেন: নবী ﷺ তাঁর জুতা মেরামত করতেন, কাপড় সেলাই করতেন এবং ঘরে কাজ করতেন, যেমন তোমাদের কেউ ঘরে কাজ করে।” মুসনাদ আহমাদ : ২৪৯০৩
৬. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার স্ত্রীর কোলে কুরাআন তিলওয়াত করতেন
আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেনঃ নবী (সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমার কোলে হেলান দিয়ে কুরআন তিলাওয়াত করতেন। আর তখন আমি হায়েযের অবস্থায় ছিলাম।
করেছেন এ সম্পর্কিত ০২ টি হাদিস দিন। সহিহ বুখারি : ২৯৭, সহিহ মুসলিম : ৩০১, সুনানে নাসায়ি : ২৭১, মুসনাদ আহমাদ : ২৪৩৮৪
৭. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীর সাথে একই পাত্রে গোসল করতেন
‘আয়িশাহ্ (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ আমি ও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একই পাত্র (কাদাহ) হতে (পানি নিয়ে) গোসল করতাম। সেই পাত্রকে ফারাক বলা হতো। সহিহ বুখারি : ২৫০, ২৬১, ২৬৩, ২৭৩, ২৯৯, ৫৯৫৬, ৭৩৩৯, সহিহ মুসলিম : ৩১৯, আহমাদ : ২৫৮৯৪
৮. স্ত্রী যেখানে মুখ লাগিয়ে পান করেছে, সেখানে মুখ লাগিয়ে পান করা
আয়িশাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ঋতুবতী অবস্থায় পানি পান করতাম এবং পরে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে অবশিষ্টটুকু প্রদান করলে আমি যেখানে মুখ লাগিয়ে পান করতাম তিনিও পাত্রের সে স্থানে মুখ লাগিয়ে পান করতেন। আবার আমি ঋতুবতী অবস্থায় হাড় খেয়ে তা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে দিলে আমি যেখানে মুখ লাগিয়েছিলাম তিনি সেখানে মুখ লাগিয়ে খেতেন। তবে যুহায়র কর্তৃক বর্ণিত হাদীসে “পান করার” উল্লেখ নেই। সহিহ মুসলিম : ৩০০
৯. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীর স্ত্রীর সাথে মজার ছলে কথা বলতেন
আয়েশা (রাঃ) যখন ছোট ছিলেন, তখন কাপড়ের তৈরি পুতুল নিয়ে খেলা করতেন। তার মধ্যে ০২ টি ঘোড়া ছিল, যার দু’টি ডানা ছিল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা দেখে বললেন, ’এটা কী?’ আয়েশা বললেন, ’ঘোড়া।’ তিনি বললেন,
فَرَسٌ لَهُ جَنَاحَانِ قَالَتْ أَمَا سَمِعْتَ أَنَّ لِسُلَيْمَانَ خَيْلاً لَهَا أَجْنِحَةٌ قَالَتْ فَضَحِكَ حَتّٰـى رَأَيْتُ نَوَاجِذَهُ
ঘোড়ার আবার দু’টি ডানা?’ আয়েশা বললেন, ’আপনি কি শুনেননি, সুলাইমান (নবী)র ডানা-ওয়ালা ঘোড়া ছিল?’ এ কথা শুনে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাসলেন এবং সে হাসিতে তাঁর চোয়ালের দাঁত দেখা গেল। হাদিস সম্ভার : ২৫৮৭, মিশকাত : ৩২৬৫, সুনানে আবু দাউদ : ৪৯৩২, সহীহ ইবনু হিব্বান : ৫৮৬৪, হাদিসটি হাদিস সম্ভার থেকে সংকলন করা হয়েছে।
১০. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীর সাথে হালকা ঠাট্টা-মশকরা করেতেন
আয়েশা (রাঃ) বলেন, একদা সাওদা বিনতে যামআ’ আমার সাথে দেখা করতে আমার বাসায় এলো। রাসূলুল্লাহু সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর ও আমার মাঝখানে বসে গেলেন। তাঁর ০২ টি পা আমার কোলে, আর ০২ টি পা সাওদার কোলে ছিল। আমি তার (সাওদার) জন্য ’খাযীরা’ (গোশ্ত ছোট ছোট করে কেটে তাতে আটা মিশিয়ে রান্না করা খাবার) তৈরী করলাম। অতঃপর তাকে খেতে বললে সে খেতে অস্বীকার করল। আমি বললাম, ’তুমি অবশ্যই খাবে, নচেৎ আমি তোমার মুখে তা লেপে দেব।’ সে অস্বীকার করলে আমি প্লেট থেকে সামান্য পরিমাণ নিয়ে তার মুখে লেপে দিলাম। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কোল থেকে স্বীয় পা সরিয়ে নিলেন, যাতে সে আমার কাছ থেকে বদলা নিতে পারে। অতঃপর আমি প্লেট থেকে আরো কিছু নিয়ে আমার মুখে লেপে নিলাম। তা দেখে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাসতে লাগলেন। ইত্যবসরে উমার (রাঃ) উপস্থিত হয়ে বলতে লাগলেন, ’হে আব্দুল্লাহ ইবনে উমার! হে আব্দুল্লাহ ইবনে উমার!’ তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে বললেন, তোমরা উঠে তোমাদের মুখ ধুয়ে নাও, আমার মনে হয় উমার প্রবেশ না করে ছাড়বে না। হাদিস সম্ভার : ২৫৮৮, নাসাঈ কুবরা : ৮৯১৭, সহীহাহ : ৩১৩১, হাদিসটি হাদিস সম্ভার থেকে সংকলন করা হয়েছে।
১১. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে সফর করতেন
আয়িশাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সফরের মনস্থ করলে স্ত্রীগণের মধ্যে কুরআর ব্যবস্থা করতেন। যার নাম আসত তিনি তাঁকে নিয়েই সফরে বের হতেন। এছাড়া প্রত্যেক স্ত্রীর জন্য একদিন এক রাত নির্দিষ্ট করে দিতেন। তবে সাওদা বিনতে যাম‘আহ (রাঃ) নিজের দিন ও রাত নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর স্ত্রী ‘আয়িশাহ (রাঃ)-কে দান করেছিলেন। এর মাধ্যমে তিনি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর সন্তুষ্টি কামনা করতেন। সহিহ বুখারি : ২৫৯৩, ২৬৩৭, ২৬৬১, ২৬৮৮, ২৮৭৯, ৪০২৫, ৪১৪১, ৪৬৯০, ৪৭৪৯, ৪৭৫০, ৪৭৫৭, ৫২১২, ৬৬৬২, ৬৬৭৯, ৭৩৬৯, ৭৩৭০,৭৫০০, ৭৫৪৫
১২. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীদের সাথে আনন্দ উপভোগ করতেন
উরওয়া (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি আয়িশা (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, একদিন হাবশীরা তাদের বর্শা নিয়ে খেলা করছিল। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে নিয়ে পর্দা করে তার পেছনে দাঁড় করিয়ে ছিলেন এবং আমি সেই খেলা দেখছিলাম। যতক্ষণ আমার ভাল লাগছিল ততক্ষণ আমি দেখছিলাম। এরপর আমি স্বেচ্ছায় সে স্থান ত্যাগ করলাম। সুতরাং তোমরা অনুমান করতে পার কোন্ বয়সের মেয়েরা আমোদ-প্রমোদ পছন্দ করে। সহিহ বুখারি : ৪৫৪, ৪৫৫, ৯৫০, ৯৮৮, ২৯০৬, ৩৫২৯, ৩৯৩১, ৫১৯০, ৫২৩৬
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা
আমর ইবনু ’আস (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে যাতুস্ সালাসিল যুদ্ধের সেনাপতি করে পাঠিয়ে ছিলেন। তিনি বলেন, আমি তাঁর নিকট উপস্থিত হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, মানুষের মধ্যে কে আপনার নিকট সবচেয়ে প্রিয়? তিনি বললেন, ’আয়িশাহ্। আমি বললাম, পুরুষদের মধ্যে কে? তিনি বললেন, তাঁর পিতা (আবূ বকর)। আমি জিজ্ঞেস করলাম, অতঃপর কোন লোকটি? তিনি বললেন, ’উমার ইবনু খাত্তাব অতঃপর আরো কয়েকজনের নাম করলেন। সহিহ বুখারি : ৩৬৬২, ৪৩৫৮, সহিহ মুসলিম : ২৩৮৪, আহমাদ : ১৭৮৫৭
১৩. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার স্ত্রীর কোলে মাথা রেখে ঘুমাতেন
আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেনঃ নবী (সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমার কোলে হেলান দিয়ে কুরআন তিলাওয়াত করতেন। আর তখন আমি হায়েযের অবস্থায় ছিলাম। সহিহ বুখারি : ২৯৭, সহিহ মুসলিম : ৩০১
১৪. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীর সাথে খেলা করেছেন
’আয়িশাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি এক সফরে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে ছিলেন। তিনি বলেন, আমি তাঁর সাথে দৌড় প্রতিযোগিতা করে তাঁর আগে চলে গেলাম। অতঃপর আমি মোটা হয়ে যাওয়ার পর তাঁর সাথে আবারো দৌড় প্রতিযোগিতা করলাম, এবার তিনি আমাকে পিছে ফেলে দিলেন বিজয়ী হলেন। তিনি বলেনঃ এ বিজয় সেই বিজয়ের বদলা। সুনানে আবু দাউদ : ২৫৭৮,
১৫. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীর অবর্তমানে তার বান্ধবিদের উপহার পাঠান
আয়িশাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কোন স্ত্রীর প্রতি এতটুকু ঈর্ষা করিনি যতটুকু খাদীজাহ (রাঃ)-এর প্রতি করেছি। কেননা, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে তাঁর কথা বারবার আলোচনা করতে শুনেছি, অথচ আমাকে বিবাহ করার আগেই তিনি ইন্তিকাল করেছিলেন। খাদীজাহ (রাঃ)-কে জান্নাতে মণি-মুক্তা খচিত একটি প্রাসাদের খোশ খবর দেয়ার জন্য আল্লাহ তা‘আলা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে আদেশ করেন। কোন দিন বকরী যবহ হলে খাদীজাহ (রাঃ)-এর বান্ধবীদের নিকট তাদের প্রত্যেকের দরকার মত গোশ্ত নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উপঢৌকন হিসেবে পাঠিয়ে দিতেন। সহিহ বুখারি : ৩৯১৬, ৩৮১৭, ৩৮১৮, ৫২২৯, ৬০০৪, ৭৪৮৪, সহিহ মুসলিম : ২৪৩৫, আহমাদ : ২৫৭১৬
১৬. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীর পছন্দের গুরুত্ব দিতেন
আয়েশা (রাঃ) বলেন, একদা হাবশীরা বর্শা-বল্লম নিয়ে মসজিদে খেলা করছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ’’হে হুমাইরা! তুমি কি ওদের খেলা দেখতে চাও?’’ আমি বললাম, ’হ্যাঁ।’ তখন তিনি দরজায় দাঁড়িয়ে গেলেন। আমি আমার থুত্নিকে তাঁর কাঁধের উপর রাখলাম এবং আমার চেহারাকে তাঁর গালের সাথে লাগিয়ে দাঁড়িয়ে গেলাম। (বেশ কিছুক্ষণ দেখার পর) তিনি বললেন, ’’যথেষ্ট হয়েছে, চল এবারে।’’ আমি বললাম, ’হে আল্লাহর রাসূল! তাড়াতাড়ি করবেন না।’ তাই তিনি আমার জন্য আবারও দাঁড়িয়ে গেলেন। অতঃপর আবার বললেন, ’’যথেষ্ট হয়েছে, চল এবারে।’’ আমি বললাম, ’হে আল্লাহর রাসূল! তাড়াতাড়ি করবেন না।’ আমার যে তাদের খেলা দেখার খুব শখ ছিল তা নয়, বরং আমি কেবল তাঁর অন্যান্য স্ত্রীদেরকে এ কথাটা জানিয়ে দিতে চাইছিলাম যে, আমার কাছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কতটা মর্যাদা ছিল এবং তাঁর কাছে আমার কতটা কদর ছিল। হাদিস সম্ভার : ২৫৮৪, নাসায়ি কুবরা : ৮৯৫১, মুসলিম : ২১০০-২১০৫ হাদিসটি হাদিস সম্ভার থেকে সংকলন করা হয়েছে।
১৭. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার স্ত্রীর জন্য উপহার কিনে দিতেন
আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার বাজারে গিয়েছিলেন এবং দুটি জুতা কিনলেন, অতঃপর তিনি সেগুলো সাওদা (রাঃ)-কে দিলেন।” মুসনাদে আহমাদ : ২৬৬৯৩
১৮. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার স্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতেন
আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অন্য কোন সহধর্মিণীর প্রতি এতটুকু অভিমান করিনি, যতটুকু খাদীজা (রা)-এর প্রতি করেছি। অথচ আমি তাকে দেখিনি। কিন্তু নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কথা অধিক সময় আলোচনা করতেন। কোন কোন সময় বকরী যবেহ করে মাংসের পরিমান বিবেচনায় হাড়-মাংসকে ছোট ছোট টুকরা করে হলেও খাদিজা (রাঃ) এর বান্ধবীদের ঘরে পৌঁছে দিতেন। আমি কোন সময় অভিমানের সুরে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতাম, (আপনার অবস্থা দৃষ্টে) মনে হয়, খাদীজা (রাঃ) ছাড়া পৃথিবীতে যেন আর কোন নারী নেই। প্রতি উত্তরে তিনি বলতেন, হ্যাঁ। তিনি এমন ছিলেন, তার গর্ভে আমার সন্তান জন্মেছিল।
সহিহ বুখারি : ৩৮১৮, ৫২২৯, ৬০০৪, ৭৪৮৪, সহিহ মুসলিম : ২৪৩৫, আহমাদ : ২৫৭১৬
নোট : মৃত্যুর পরও খাদীজা (রা)-এর প্রতি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কৃতজ্ঞতাবোধ জাগ্রত ছিল।
১৯. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীর কষ্টের সময় সান্তনা দিতেন
আয়িশা (রাঃ) বলেন, একদা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কারো জানাযা পড়ে বাকী’ (গোরস্থান) থেকে আমার নিকট এলেন। তখন আমার মাথায় ছিল যন্ত্রণা। আমি বলছিলাম, হায় আমার মাথা গেল! তিনি বললেন, বরং আমার মাথাও গেল! (হে আয়েশা!) তুমি যদি আমার পূর্বে মারা যাও এবং আমি তোমাকে গোসল দিই, কাফনাই, অতঃপর তোমার উপর জানাযা পড়ে তোমাকে দাফন করি, তাহলে এতে তোমার নোকসান আছে কি? ইবনে মাজাহ : ১৪৬৫, ইবনে হিব্বান : ৬৫৮৬, দারাকুত্বনী : ১৯২, বাইহাক্বী : ৬৯০৪, ইরওয়াহ : ৭০০