মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন
নিম্নে মতবিরোধের কারণ সমূহ উল্লেখ করছি।
১. আকীদার ক্ষেত্রে মতবিরোধ থেকে ভিন্ন ভিন্ন ফির্কার সৃষ্টি।
২. ফিকহি ক্ষেত্রে মুজতাহিদ আলেমদের মতভেদ।
৩. আকীদা ও ফিকহি মতভেদে সাহাবিগণের পদ্ধতি পরিত্যাগ।
৪. জম্ম থেকে তাওহীদ সম্পর্কে জ্ঞানের অপ্রতুলতা।
৫. মুসলিমদের সমালোচনায় ইসলামি আদব লঙ্ঘন।
৬. নিজের মতামতকে নির্ভুল মনে করা।
৭. ব্যক্তি কেন্দ্রিক অতিভক্তি।
৮. সত্য প্রকাশের পরও শুধু জেদ ও বিদ্বেষের কারণে মতভেদ করা।
৯. সুফিবাদের উত্থানের সাথে বিদআতে কারণে মতবিরোধ প্রকট আকার ধারণ করে।
১০. মাজার কেন্দ্রিক আমল আবিষ্কারের ফলে উম্মতে মতবিরোধের সৃষ্টি হয়।
এখানে শেষের ৪ টি কারণ আলোচিত হলো :
৭। ব্যক্তি কেন্দ্রিক অতিভক্তি
যুগে যুগে বহু মনীষী ইসলাম প্রচার ও প্রসারে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছেন। তাদের ত্যাগ ও খেদমত ইসলাম আজ এমন পর্যায় উপনীত হয়েছে। আবার এর বিপরীতে অনেক কাজ্জার আছে যারা ইসলামের নাম নিয়ে ব্যাপক শির্ক এ বিদআতের প্রসার ঘটিয়েছেন। এই উভয় শ্রেণির লোকের মৃত্যুর পর তাকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে নানান ফির্কা। যে ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে ফির্কা বা তরিকার সৃষ্টি হয় তাকে নিয়ে তার ভক্তরা তৈরি করে নানান আজগোবি গল্প কাহিনী এবং তার নামে চালিয়ে দেয় হাজার হাজার মিথ্যা কেরামতি। যাদের ইসলাম, শির্ক এবং বিদআত সম্পর্কে ন্যূনতম জ্ঞান নেই সেই সকল সরল মনা মানুষগুলি এই বানান আজগুবি গল্প শুনে তার খাটি ভক্ত হয়ে যায়।
যাদের কেন্দ্র করে ফির্কা বা তরিকা বা মাযহাব সৃষ্টি হয় তারা অনেক ক্ষেত্রে এ সম্পর্কে কিছুই জানেনা। এমনকি তাদের মৃত্যুর শত শত বছর পরে তাদের নামে ফির্কা বা তরিকা বা মাযহাব সুষ্টি হয়েছে। আবার এমন অনেক মিথ্যাবাদী লোকও আছে যারা তাদের নিজের জীবন দশায় অনেক বাতিল ফির্কা সৃষ্ট করে গেছেন। কয়েকটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যাবে।
ইসলামের শুরুর দিকে আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা কে শীয়া ফির্কা, ওয়াছিল ইবনে আতা (মৃত ১৩১ হি.) মুতাজিলা ফির্কা এবং সীসওয়াহ কাদেরীয়া ফির্কার প্রতিষ্ঠা করেন। এই সকল কাজ্জাবদের প্রায় একক প্রচেষ্ঠায় এই ফির্কাগুলি প্রতিষ্ঠা লাভ করে। (ইসলামি আকিদাও ভ্রান্ত মতবাদ)
মহান চার মুজতাহিদ আলেমের নামে মাযহাব সৃষ্টি :
মহামতি চার ইমামের নামে মূর্তি সৃষ্টি করা হয়েছে অথচ তারা এ সম্পর্কে কিছুই জানেনা। তাদের নামে মাযহাব সৃষ্ট করা হয়েছে তাদের মৃত্যুর পর। একটু আলোচনা করলেই ব্যাপারটি স্পষ্ট হয়ে যাবে।
নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওফাতের পর সাহাবিদের মাঝে ফিকহি বিষয় মতভেদ ছিল কিন্তু উম্মতের ঐক্য নষ্ট হয় এমন কোনো কাজ করেনি। মহান চার খলিফায়ে মুসলমানদের ওফাতের পর ইসলাম ও মুসলিমদের উপর যেমন জুলুম চলছিল, ঠিক তেমনিভাবে কুরআন হাদিস এর চর্চাও চলছিল। সম্মানিত চার ইমাম নিজ নিজ সময়ে স্ব স্ব এলাকায় বড় আলিম হিসেবে খ্যাত ছিলেন। ফলে লোকজন তাঁদেরকে জরুরি মাসআলা-মাসাইল জিজ্ঞাসা করতো। তাঁরাও ফয়সালা দিতেন। ইমামগণের ইস্তেকালের পর তাঁদের ভক্তরা তাঁদের মতামত ও নীতি প্রচার প্রসার করেন। এমনকি গ্রন্থ আকারে প্রকাশ করতে থাকেন। এক ইমামের ভক্তরা অন্য ইমামের ভক্তদের সাথে তর্ক-বাহাস করতে থাকেন। এভাবে বিভিন্ন দলে এবং এলাকা কেন্দ্রীক ইমাম ও মুহাদ্দিসদের অনুসরণ শুরু হয়।
কুফা শহর কে কেন্দ্র করে ইমাম আবু হানিফার অনুসরণ চলতে থাকে। মদিনা শহরকে কে কেন্দ্র করে ইমাম মালিক এর অনুসরণ চলতে থাকে। বাগদাদকে কেন্দ্র করে ইমাম আহম্মদ ইবনে হাম্বল এর অনুসরণ চলতে থাকে। মিশর কে কেন্দ্র করে ইমাম শাফেঈ এর অনুসরণ চলতে থাকে। এভাবে ইমাম সুফিয়ান ছাওরীর, ইমাম লাইছ ইবন সা’দ, ইমাম মুবারক, ইমাম আওযাইসহ প্রায় ১১/১২ জন মুজতাহিদ আলেমের নামে ১১/১২ টি মাযহাবের সৃষ্টি হয়। কিন্তু মজার ব্যাপর হল, এই সকল ইমামদের কেউই মাযহার সৃষ্টি করে নাই এমন কি সৃষ্টি করতেও বলেন নাই। তারা সকলে একনিষ্টভাবে কুরআন ও হাদিসের অনুসারি ছিলেন এবং সমসাময়িক জটিল ব্যপারে ইজতিহাদ করতেন। তাদের ব্যাখ্যা বিশ্লষণের কারনে সমসাময়িক আলেম ও সাধারণ লোকদের মাঝে তাদের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে, যার প্রভাব পরবর্তী প্রজম্মের পর প্রজম্মের চলেত থাকে। মুসলিমগণ নবুয়ত থেকে যত দূরে যেতে থাকে, তাদের নিকট থেকে কুরআন হাদিস এর চর্চাও কমতে থাকে। আস্তে আস্তে তারা কুরআন হাদিস বিমুখ হতে থাকে এবং আলেমদের ব্যাখ্যা নির্ভর হয়ে পড়ে। ফলে কুরআন হাদিসের ব্যবহারিক পতন ঘটতে শুরু করে। এরই পটভূমিতে মুসলিমদের মাঝে ফির্কাবন্দী হয়ে বিভিন্নজন বিভিন্ন মুজতাহিদ আলেমকে একমাত্র অনুসরণীয় ভাবতে থাকে। যার যার অনুসারী ইমামের নামে মাযহাব এর সৃষ্ট করে তারই অনুসরণ করতে থাকে। রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে শাসকবর্গও এতে জড়িত হয়ে পড়েন। এভাবে কালক্রমে ধীর ধীর প্রচলিত চার মাযহাবের রূপ ধারণ করেছে। ৩১৭ হিজরি আগ পর্যন্ত কোনো ব্যক্তি নিজেকে হানাফী, শাফেয়ী ইত্যাদি বলতেন না বরং স্ব স্ব অনুসরণীয় আলেমদের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে কোরআন ও হাদিসের ব্যাখ্যা করতেন। পরবর্তীতে প্রত্যেকেই নিজের জন্য পৃথক পৃথক দলীয় নাম নির্ধারিত করে নিতেন এবং নিজ অনুসরণীয় আলেমদের নির্দেশ খুঁজে বের না করা পর্যন্ত কোরআন ও হাদিসের ব্যবস্থা মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানাতেন। সুতরাং মতভেদ দৃঢ়তর হল, মাযহাবের সূত্রপাত হল।
মাযহাবের মহাব্যাধি মুসলমানগণের জাতীয় জীবনে প্রবেশ করায় ইসলামের ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন। ৩১৭ হিজরিতে একটি আয়াতের অন্তর্ভুক্ত মাকামে মাহমুদের ব্যাখ্যা নিয়ে বাগদাদে হাম্বলী ও অপর তিন মাযহাবের অনুসারীগণের মধ্যে সংগ্রাম শুরু হয়, এই সংগ্রামে সৈন্য বাহিনী ও জনসাধারণও যোগ দেয় এবং শত সহস্র লোক হতাহত হয়। ৩২৩ হিজরিতে হাম্বলী ও শাফেয়ীদের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়ে ৭ বছর পর্যন্ত চলে।
উপমহাদেশের সর্বজন শ্রদ্ধেয় আলিম, ভারতবর্ষের বিখ্যাত হাদীস শাস্ত্রবিদ ও হানাফীদের শিক্ষাগুরু যাকে হানাফীরা ভারতবর্ষের ‘ইমাম বুখারী’ বলে থাকেন সেই শাহ আলিউল্লাহ মুহাদ্দিস দেহেলভী (রহ) বলেছেন। তোমরা জেনে রাখ যে ৪০০ হিজরির আগে লোকেরা কোন একটি বিশেষ মাযহাবের উপর জমে ছিল না। (হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ পৃষ্ঠা নম্বর ১২৫)।
ইসলামি আকীদা ও ভ্রান্ত মতবাদ (কওমি মাদ্রাসার নিসাবভুক্ত) গ্রন্থের ৪৪৯ পৃষ্ঠায় মাওলানা মুহাম্মাদ হেমায়েত উদ্দিন লিখেন হিজরি চতুর্থ শতাব্দী পর্যন্ত চার মাযহার ছাড়া অন্য মাযহাবের অনুসরণ করা হত। কিন্তু অন্যান্য মুজাহিদের মাযহাবগুলো এরূপে সংরক্ষিত হয়নি, যার ফলে সেগুলো অনেক দীর্ঘ সময় পর্যন্ত সংকলিত অবস্থায় বিদ্যমান থাকবে নি। ফলে চতুর্থ শতাব্দীর পর চার মাযহাব ব্যতীত অন্য কোন মাযহাব অবশিষ্ট থাকেনি। আল্লাহর রহমতে এই মাযহাব চতুষ্টয়ে তাকলীদে শাখসি সীমাবদ্ধ হয়ে যায়। অর্থাৎ ৪০০ হিজরির আগে নিজেকে হানাফী, শাফেয়ী বা মালেকী বলে পরিচয় দিতো না। আর চারশো হিজরির অনেক আগে ইমামরা ইন্তেকাল করেন।
আমাদের সমাজে চারটি অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তাদের জীবনে আলোচনা করে দেখতে পাই, তারা ইসলামের এক এক জন নক্ষত্র তুল্য ইমাম ও মুজতাহিদ ছিল। প্রতিষ্ঠিত চার ইমামের সময় কাল ছিল নিম্মরুপঃ
আবু হানীফা (রহঃ) জম্ম ৮০ হিজরী এবং মৃত্যু ১৫০ হিজরী
ইমাম মালেক (রহঃ) জম্ম ৯৩ হিজরী এবং মৃত্যু ১৭৯ হিজরী
ইমাম শাফিয়ী (রহঃ) জম্ম ১৫০ হিজরী এবং মৃত্যু ২০৪ হিজরী
আহমদ বিন হাম্বাল (রহঃ) জম্ম ১৬৪ হিজরী এবং মৃত্যু ২৪১ হিজরী
অপর পক্ষে বিশিষ্ট হানাফী বিদ্বান শাহ ওলিউল্লাহ দেহেলভী (রহ) এর কথা যদি মেনে নেওয়া হয় যে, ৪০০ হিজরির আগে কোনো মাযহাব ছিল না, এবং ৪০০ হিজরির পরে মানুষেরা মাযহাব সৃষ্টি করেছে। তার মানে এটা দাঁড়ায় যে আবু হানীফার ইন্তেকালের ২৫০ বছর পর হানাফী মাযহাব সৃষ্টি হয়েছে। ইমাম মালেকের ইন্তেকালের ২২১ বছর পর মালেকী মাযহাব সৃষ্টি হয়েছে। ইমাম শাফেরীর ইন্তেকালের ১৯৬ বছর পরে শাফেয়ী মাযহাব এবং ইমাম আহমাদের ইন্তেকালের ১৫৯ বছর পর হাম্বলী মাযহাব সৃষ্টি হয়েছে। তাহলে আমরা কি করে বলি যে, চার ইমামের যে কোন একজনকেই মানতে হবে। সর্ব বিষয়ে এক মাযহাবের মাসআলা মতেই চলতে হবে। অন্য কোর ইমামের অনুসরণ করা যাবেনা। মহান ইমাম যাদের নামে আমরা মাযহাব রচনা করেছি, তারাও এই নাম গুলো দেয়নি। মুসলমানদের মধ্যে প্রচলিত চারটি মাযহাব, দল বা ফির্কাহ ইসলামের কোনো নিয়ম বা বিধান মেনে তৈরি করা হয়নি। কারণ ইসলাম ধর্মে কোনো দলবাজি বা ফির্কাবন্দী নেই। মুসলমানদের বিভক্ত হওয়া থেকে এবং ধর্মে নানা মতের সৃষ্টি করা থেকে কঠোরভাবে সাবধান করা হয়েছে, (সূরা আনাম ৬:১৫৯)। এই মাযহাবগুলো রসুল (সাঃ) এবং সাহাবাদের (রা) সময় সৃষ্টি হয়নি। এমনকি ইমামগণের সময়ও হয়নি।
৮০৯ হিজরিতে কাবার ইব্রাহিমী মুসাল্লাতে দাঁড়াই ইমামতি নিয়ে ১০/১১টি মাজহাবি দলের মধ্যে ভয়াবহ সংঘর্ষ বাঁধে। তাহাতে বহু মুসলমান হতাহত হয়। জাহল বাদশা ফারহা ইবনে বয়কুফ সংঘর্ষ মিটাবার উদ্দেশ্যে বিবাদরত দলগুলির মধ্যে হতে চারটি দলকে কাবার চার পার্শ্বে খাড়া করিয়া দিলেন। অন্যান্য দল এই চার মাযহাবের মধ্যে মিশিয়া গেল। ফলে কাবাঘরের চার কোণে চার মাযহাবের চারখানা ভিন্ন ভিন্ন মুসাল্লাহ তৈরি হইল। প্রতি ওয়াক্তে চার মাজহাবের চার ইমাম চার মুসাল্লায় দাঁড়িয়ে পর্যায়ক্রমে নামাজ আদায় করিতে থাকেন। এই নিয়ম প্রায় ৫০০ বছর পর্যন্ত চালু থাকে। তখন থেকে এক আল্লাহর দ্বীন এবং মুসলিম জাতির প্রতিষ্ঠা কেন্দ্র চার ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ল। অর্থাৎ সত্য ধর্মকে চারটি মাযহাবে বিভক্ত করে নবীর দ্বীনে বিপর্যয় ঘটান হল।
যার ফলে চার মাযহাবের অনুসারীগণ চার ইমামের পেছনে ভিন্ন-ভিন্নভাবে জামাতে নামাজ আদায় করেছেন। হানাফী মাযহাবের অনুসারীগণ হানাফী অনুসারীগণ হানাফী মাযহাবের ইমামের পেছনে, মালেকী মাযহাবের অনুসারীগণ মালেকী মাযহাবের ইমামের পেছনে, এভাবে অপর দুটি মাযহাবের অনুসারীগণও তাঁদের স্ব-স্ব মাযহাবের ইমামের পেছনে নামাজ আদায় করতেন। এই ঘটনার সাড়ে পাঁচশত বৎসর পর সৌদী আরবের বাদশাহ আব্দুল আযীয আল সউদের রাজত্বকালে ১৩৪৩ হিজরিতে বাদশা সাউদ ইবনে আবদুল আযীয তাঁর সশস্ত্র বাহিনী নিয়ে উমরার উদ্দেশ্যে মক্কা শরীফ প্রবেশ করেন। তিনি তখন তিনি হারাম শরিফে সকল মুসল্লিকে একই ইমামের পেছনে একই সাথে জামায়াতে নামাজ আদায়ের নির্দেশ জারি করেন। কাবার হেরেম হতে এ জঘন্য বিদ’আত রহিত করেন। কাবার হেরেম থেকে মূল উৎপাটিত হলেও পৃথিবীর প্রায় সব মুসলিম প্রধান দেশে এই মাযহাবগত বিভক্তি এখনও প্রকটভাবে বিদ্যমান।
ইমরান ইবনু হুসাইন (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
خَيْرُ أُمَّتِي قَرْنِي ثُمَّ الَّذِينَ يَلُونَهُمْ ثُمَّ الَّذِينَ يَلُونَهُمْ ”. قَالَ عِمْرَانُ فَلاَ أَدْرِي أَذَكَرَ بَعْدَ قَرْنِهِ قَرْنَيْنِ أَوْ ثَلاَثًا ” ثُمَّ إِنَّ بَعْدَكُمْ قَوْمًا يَشْهَدُونَ وَلاَ يُسْتَشْهَدُونَ، وَيَخُونُونَ وَلاَ يُؤْتَمَنُونَ، وَيَنْذُرُونَ وَلاَ يَفُونَ، وَيَظْهَرُ فِيهِمُ السِّمَنُ
আমার উম্মাতের সর্বশ্রেষ্ঠ যুগ আমার যুগ। অতঃপর তৎপরবর্তী যুগ। অতঃপর তৎপরবর্তী যুগ। ‘ইমরান (রাঃ) বলেন, তিনি তাঁর যুগের পর দু’যুগ অথবা তিন যুগ বলেছেন তা আমার স্মরণ নেই। অতঃপর এমন লোকের আগমন ঘটবে যারা সাক্ষ্য প্রদানে আগ্রহী হবে অথচ তাদের নিকট সাক্ষ্য চাওয়া হবে না। বিশ্বাস ভঙ্গের কারণে তাদেরকে কেউ বিশ্বাস করবে না। তারা মানত করবে কিন্তু তা পূরণ করবে না। তারা হবে চর্বিওয়ালা মোটাসোটা। সহিহ বুখারী : ৩৬৫০, ৬৪২৮
এই তিনটি যুগ যেহেতু শ্রেষ্ঠ এবং তাদের মাঝেও মতভেদ ছিল কিন্তু তারা মাযহাব সৃষ্টি করেননি। তাদের পরে অনেক মুহাদ্দিস বহু সহিহ হাদিস সংকলন করেছেন, কিন্তু তাদের নামে মাযহাব তৈরি করতে বলেনি। অথচ চার নাম মহান মুজতাহিদ আলেম ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে তাদেরই নামে মাযহাব সৃষ্টি করা হল।
৮। সত্য প্রকাশের পরও শুধু জেদ ও বিদ্বেষের কারণে মতভেদ করা:
আমরা হয়ত অনেক সময় অনুমান করে বলে থাকি কালের আবর্তে মানুষেরা আন্দাজ ও অনুমানের ভিত্তিতে নিজ নিজ ধর্মে সৃষ্টি করেছে। মহান আল্লাহ কিন্তু কুরআনে সঠিক কথা বলে দিয়েছেন যে, পরিপূর্ণ তাওহীদের আলোকেই মানুষ ধর্ম সূচনা করে আদম আলাইহিস সালামের মাধ্যমে। কারণ মহান আল্লাহ সর্বপ্রথম তাকে সৃষ্টি করেছিলেন তাকে প্রকৃত সত্যের জ্ঞান দান করেছিলেন এবং তাকে সঠিক তাওহীদের জ্ঞান দিয়েছিলেন। তারপর থেকে দীর্ঘকাল পর্যন্ত বনী আদম সঠিক পথের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। তখন তারা একটি উম্মাত ও একই দলভুক্ত ছিল। কালের আবর্তে তারা তাওহীদ ভুলে যায় এবং আন্দাজ ও অনুমানের ভিত্তিতে তারা নতুন নতুন পথ ও পদ্ধতি উদ্ভাবন করতে থাকে। তাদের আবার সঠিক তাওহীদের জ্ঞান দান করে ইহকাল ও পরকালের অনিষ্টকারিতা থেকে মুক্তিদানের লক্ষ্যে মহান আল্লাহ নবি পাঠাতে শুধু করেন। মানুষের সামনে তাদের হারানো সত্যপথ সুষ্পষ্ট করে তুলে ধরে তাদেরকে পুনরায় একই উম্মাতের অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করেন। কিন্তু হতভাগ্য আদম সন্তান সত্য ও সঠিক বুঝান পরও শুধু জেদ ও বিদ্বেষের কারণে সত্য কে অস্বীকার করে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা নবি পাঠানোর উদ্দেশ্য হল, তাওহীদের সত্য প্রকাশ করা। কিন্তু মহন আল্লাহর আয়াত বলছে সত্য প্রকাশ করার পরও তারা শুধু জেদ এবং বিদ্বেষের বসিভুত হয়ে মতভেদ করে থাকে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন-
كَانَ النَّاسُ أُمَّةً وَاحِدَةً فَبَعَثَ اللّهُ النَّبِيِّينَ مُبَشِّرِينَ وَمُنذِرِينَ وَأَنزَلَ مَعَهُمُ الْكِتَابَ بِالْحَقِّ لِيَحْكُمَ بَيْنَ النَّاسِ فِيمَا اخْتَلَفُواْ فِيهِ وَمَا اخْتَلَفَ فِيهِ إِلاَّ الَّذِينَ أُوتُوهُ مِن بَعْدِ مَا جَاءتْهُمُ الْبَيِّنَاتُ بَغْيًا بَيْنَهُمْ فَهَدَى اللّهُ الَّذِينَ آمَنُواْ لِمَا اخْتَلَفُواْ فِيهِ مِنَ الْحَقِّ بِإِذْنِهِ وَاللّهُ يَهْدِي مَن يَشَاء إِلَى صِرَاطٍ مُّسْتَقِيمٍ*
অর্থঃ সকল মানুষ একই জাতি সত্তার অন্তর্ভুক্ত ছিল। অতঃপর আল্লাহ তা’আলা পয়গম্বর পাঠালেন সুসংবাদদাতা ও ভীতি প্রদর্শনকরী হিসাবে। আর তাঁদের সাথে অবতীর্ণ করলেন সত্য কিতাব, যাতে মানুষের মাঝে বিতর্কমূলক বিষয়ে মীমাংসা করতে পারেন। বস্তুত কিতাবের ব্যাপারে অন্য কেউ মতভেদ করেনি; কিন্তু পরিষ্কার নির্দেশ এসে যাবার পর নিজেদের পারস্পরিক জেদবশত, তারাই করেছে, যারা কিতাব প্রাপ্ত হয়েছিল। অতঃপর আল্লাহ ঈমানদারদেরকে হেদায়েত করেছেন সেই সত্য বিষয়ে, যে ব্যাপারে তারা মতভেদ লিপ্ত হয়েছিল। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা, সরল পথ বাতলে দেন। সুরা বাকারা : ২১৩
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআলা আরও বলেন
إِنَّ الدِّينَ عِندَ اللّهِ الإِسْلاَمُ وَمَا اخْتَلَفَ الَّذِينَ أُوْتُواْ الْكِتَابَ إِلاَّ مِن بَعْدِ مَا جَاءهُمُ الْعِلْمُ بَغْيًا بَيْنَهُمْ*
অর্থঃ নিঃসন্দেহে আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য দ্বীন একমাত্র ইসলাম। এবং যাদের প্রতি কিতাব দেয়া হয়েছে তাদের নিকট প্রকৃত জ্ঞান আসার পরও ওরা মতবিরোধে লিপ্ত হয়েছে, শুধুমাত্র পরস্পর বিদ্বেষবশত। সুরা আল ইমরান ৩:১৯
৯। সুফিবাদের উত্থানের সাথে বিদআতে কারণে মতবিরোধ প্রকট আকার ধারণ করে
ভারত উপমহাদেশে পীরের আস্তানা বা খানকা মাধ্যমে শির্ক প্রচারের পাশাপাশি ইসলামও প্রচার লাভ করে। কিন্তু এই সকল আস্তানা বা এলাকা অনেক হিন্দু মুসলিম বানালেও খাটি মুসলিম বানাতে পারে নাই। বরং বানিয়োছে মুশরিক মুসলিম। এই সকল আস্তানা বা খানকা পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন কোন না কোন সুফি তরিকার লোক। তাই এদের আমলের শিরকের পাশাপাশি আকিদার শির্ক ও পরিরক্ষিত হয়। আমাদের উপমহাদেশের সুফিগণ প্রচুর শির্ক আকিদা প্রষোণ করে। এ আলোচনার শুরু যে দশটি ভ্রান্ত আকিদা আলোচনা করা হয়েছে তার সবগুলিই সুফিদের মাঝে বিরাজমান। এই ভ্রান্ত আকিদাগুলি তারা আস্তানা বা খানকা আশ্রয় করেই প্রচার করে। তাই তো অনেক জ্ঞানী মনে করেন, ইসলাম মন্দিরে বা গির্জায় যত টুকু অসম্মান হয়েছে তার চেয়ে বেশী অসম্মান হয়েছে এই আস্তানা বা খানকা। এর সত্যতা ও পাওয়া যায় এখানকার আচার আচরণ লক্ষ করলে। এই সকল আস্তানা বা খানকায় পীরের মৃত্যু বার্ষিকী কে কেন্দ্র করে দুটি ঊরশ করা। কোন কোন পীরের আস্তানায় পুরুষ ও মহিলা সহাবস্থান করে নাচ, গান, জুয়া ও মদের আসর বসায়। তারা পীরের মৃত্যুর পর তার কবর পাকা করা সেখানে গম্বুজ তৈরি করে থাকে। পীরের কবরের নিকট ঊরশ উপলক্ষ্যে সিরনি, মিষ্ট, গরু, ছাগল, সবজি ইত্যাদি মান্নত করে। এমনকি সেখানে নিয়মিত শির্ক মিশ্রিত মারেফাতি গানের আয়োজন করা হয়। এই সকল মাজারের খানকায় প্রায়ই বড় বড় আওয়াজে হু হু হু হু শব্দে আল্লাহকে ডাকে এবং তাদের পীরের ধ্যান করে। কোনো পীরের কবরকে সিজদার স্থান বানিয়েছে। তাদের বিদআতি কাজ কর্মের উপর ভিত্তি করে তারা তাদের মধ্যেও বিভক্তি সৃষ্টি করেছেন।
সত্যিকারের মুসলিম যখনই এই সকল শির্ক ও বিদআতি কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করে তখনই উম্মতের মাঝে বিভক্তির বিষ বপন হয়। সুফিদের উত্থানের ফলে শিরক ও বিদআতি আমলেরও উত্থান ঘটে। সুফিদের বিভিন্ন তরিকা আছে। এক এক তরিকার লেবাস বা পোশাক এক এক ধরনের। তাঁর আমলের মাঝেও পার্থক্য দেখা যায়। তাদের এই ভিন্নতার জন্য তাদের মাঝেও শত শত তরিকা বা ফির্কা বিদ্যমান। তাদের মাঝের এই ফির্কাবাজিও ইসলামকে টুকরা টুকরা করে ছেড়েছে। অনেক মুসলিম তাদের এ সকল শির্ক ও বিদআতি আমল ইলমের সাহায্য প্রত্যাখান করে। ফলে বিদআতিদের সাথে সাধারণ জ্ঞান সম্পন্ন লোকদের বিবাধ বাধে। এভাবে সুফিগন প্রকৃত আলেমদের নিকট থেকে দুরা সরে যায় আর সুফিবাদী ফির্কার উৎপত্তি হয়। মূলত বিদআতের ভিন্নতার কারণে তাদের তরিকাও ভিন্ন। নিম্ন তাদের কিছু তরিকা সম্পর্কে আলোচনা করা হলো-
(১) বিভিন্ন সুফিদের নামে তরিকা সৃষ্টি
বিদআতি আমলের উপর ভিত্তি করে পৃথিবীতে আজ হাজার হাজার তরিকা বিদ্যমান। এই তরিকার নামে ইসলাম ধর্মকে টুকরা টিকরা করে ছেড়েছে। এক এক তরিকার আমল এক এক প্রকারের তাদের আকিদাগত মতবিরোধের সাথে আকিদাগত ভ্রান্তি আছে। ইলমুল কালামের ক্ষেত্রে আশরারি ও মাতুরিদি মতবাদ নামে ফির্কা সৃষ্টি হয়েছে, ইলমে ফিকহের ক্ষেত্রে হানাফি, মালেকি, শাফেঈ ও হাম্বলি মাজহাব নামে ফির্কা সৃষ্টি হয়েছে, ঠিক এলমে তাসাউফের ক্ষেত্রেও সুফিদের ভিন্ন ভিন্ন রীতি পদ্ধতি রয়েছে এটাকেই বলা হয় তরিকা। এলমে ফিকহের ক্ষেত্রে যেমন প্রসিদ্ধ চার মাজহাবের ইমামদের নামানুসারেই মাজহাবের নামকরণ করা হয়েছে, তেমনি এলমে তাসাউফের তরিকাগুলোকেও বিশেষ সুফিসাধকদের নাম দ্বারা নামকরণ করা হয়েছে।
নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর বিচরণ স্থান মক্কা মনীনায় কোন যুগেই সুফিদের প্রভাব ছিল না এবং আজও নেই। সুফিদের নামে সুফিবাদ বর্তমান সমাজে চালু আছে তাদের উৎপত্তি ও উৎকর্ষ লাভ করে পারস্যে (ইরান)। সেখানকার প্রখ্যাত সুফি দরবেশ, কবি-সাহিত্যিক এবং দার্শনিকগণ নানা শাস্ত্র, কাব্য ও ব্যাখ্যা-পুস্তক রচনা করে এই দর্শনকে সাধারণের নিকট জনপ্রিয় করে তোলেন। কালক্রমে বিখ্যাত সুফিদের অবলম্বন করে নানা তরিকা গড়ে ওঠে। স্থান ও কাল অনুযায়ী অসংখ্য সুফী তরিকা আত্ম প্রকাশ করার কারণে এর সঠিক সংখ্যা নির্ধারণ করা কঠিন। চরমোনাই পীর সৈয়দ মোঃ ফজলুল করীম সাহেব ভেদে মারেফত বা ইয়াদে খোদা কিতাবে ১২৬ তরিকা থাকার কথা বলেছেন। আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশে অসংখ্য সুফী তরিকা আত্মপ্রকাশ করেছে। তার মধ্যে নিম্নের কয়েকটি তরিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রায়ই সুফী তরিকার পীর ও মুরীদদের মুখে এ সমস্ত তরিকার নাম উচ্চারণ করতে শুনা যায়। এ সমস্ত তরিকা হচ্ছে-
ক। কাদেরিয়া তরিকা, খ. চিশতিয়া তরিকা, গ। মাইজভান্ডারিয়া তরিকা, গ। মুজাদ্দিদিয়া তরিকা, ঙ। নকশবন্দিয়া তরিকা এবং চ। সুহ্রাওয়ার্দিয়া তরিকা।
এই সকল তরিকা যাদের নামের তাদের সাথে সম্পৃক্ত, তারা তারা এই তরিকা প্রতিষ্ঠিত করতে কতটুকু দায়ী ছিলেন তা সঠিকভাবে নিরূপণ করা কঠিন। তবে অধিকাংশ সুফিগণই তরিকা সৃষ্টির জন্য যে সকল উপদান দরকার তা সরবরাহ করে গিয়েছেন। শুধু বড় পীর ক্ষেত আব্দুল কাদের জিলানী রাহিমাহুল্লাহ কোন তরিকা সৃষ্টি করেনি বলে জানা যায়। তার মৃত্যুর পর তার ভক্তরাই তার নামে কাদেরীয়া তরিকা প্রতিষ্ঠাতা করেছেন।
ক। কাদেরিয়া তরিকা :
আব্দুল কাদের জিলানী হলেন ইসলাম ধর্মে অন্যতম প্রধান আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব। তিনি ইসলামের অন্যতম প্রচারক হিসেবে সুবিদিত। হজরত আব্দুল কাদের জিলানী রাহিমাহুল্লাহ ‘বড়পীর’ হিসাবে মুসলিম বিশ্বে সমধিক পরিচিত। তিনি ০১ রমজান ৪৭১ হিজরিতে ইরাকের বাগদাদ নগরের অন্তর্গত জিলান শহরে জন্ম গ্রহণ করেন। হিজরি ৫৬১ সালের ১১ রবিউসসানী আব্দুল কাদের জিলানী রাহিমাহুল্লাহ পরলোক গমন করেন। বিদাআতি মুসলিমগণ প্রতি বছর অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তার মৃত্যু দিবস পালন করে যার নাম দিয়েছে ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহাম। তার নামে সবচেয়ে বেশি শির্ক মিশ্রিত কল্প কাহিনী সমাজে প্রচলিত আছে। তার নামেই কাদেরিয়া বাহিনী প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
খ। চিশতিয়া তরিকাঃ
মইনুদ্দিন চিশতী হলেন চিশতীয় ধারার ভারতীয় উপমহাদেশের সবচেয়ে বিখ্যাত সুফি সাধক। তিনি গরিবে ‘নেওয়াজ’ নামেও পরিচিত। ১১৩৮ ইংরেজিতে (৫৩৭ হিজরী) মধ্য এশিয়ায় খোরাসানের অন্তর্গত সিস্তান রাজ্যের সানজার নামক গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
তিনি বোখারা থেকে নিশাপুরে আসেন। সেখানে চিস্তিয়া তরিকার অপর প্রসিদ্ধ ছুফি সাধক খাজা উসমান হারুনীর নিকট মুরীদ হন। তার সেবায় ২০ বছর একাগ্রভাবে নিয়োজিত ছিলেন। পরে উসমান হারুনী তাকে খেলাফত বা ছুফি প্রতিনিধিত্ব প্রদান করেন। মঈনুদ্দীন চিশতী ৬৩৩ হিজরির ৫ রজব দিবাগত রাত অর্থাৎ ৬ রজব সূর্যোদয়ের সময় ইন্তেকাল করেন। ভারতের আজমীরে তাকে দাফন করা হয় এবং এ আজমিরে হজরত খাজা মঈনুদ্দিন চিশতি এর মাজার অবস্থিত। মোগল সম্রাট আকবর তার মাজার শরিফ বেষ্টনী করে একটি সুরম্য সমাধিসৌধ নির্মাণ করে দেন। ৯৭৮ হিজরিতে বাদশাহ আকবর খাজা সাহেবের মাজার সংলগ্ন স্থানে একটি মসজিদ নির্মাণ করেন। মসজিদটি সাদা ও লাল মর্মর পাথরে নির্মিত। প্রতিবছর ১লা রজব হতে ৬ রজব পর্যন্ত আজমিরে তার সমাধিস্থলে উরস অনুষ্ঠিত হয়। আজমীর শরীফ কালক্রমে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষের দর্শনীয় স্থানে পরিণত হয়েছে। হিন্দু, মুসলিম, শিখ, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান সকলে এখানে আসেন দর্শক হিসেবে। কিছু অজ্ঞ পীর পন্থী মুসলীম এখানে আসে তাদের মনের আশা পূরণ করতে। তারা মনে করে আজমীর হল শ্রেষ্ঠ রুহানী রাজধানী এবং ফয়েজ বরকত হাসিলের মারকাজ অথচ এসব কারণে তারা ইসলাম ও মুসলিম থেকে খারিজ হয়ে যায়। ভারতবর্ষে শিরক ও পৌত্তলিক জাহিলিয়াতের অন্ধকারের সাথে তারা মিলেমিশে শির্ক কাজ করে ইসলামের নামে। তারা মুসলিম দাবি করে কিন্তু ইসলামের নামে বিদআতও করে থাকে। মইনুদ্দিন চিশতী নামে চিশতিয়া তরিকা সমাজে প্রচলিত আছে এবং তরিকা প্রতিষ্ঠা করার পিছনে তার সরাসরি ভূমিকা লক্ষণীয়।
গ। মাইজভান্ডারিয়া তরিকা :
মাইজভান্ডারি দরবার শরীফের প্রতিষ্ঠাতা শাহসূফী সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভান্ডারীর। কথিত আছে, তার পূর্বপুরুষ সৈয়দ হামিদ উদ্দীন গৌড়ি ১৫৭৫ সালে ইসলাম প্রচার মানুষে চট্টগ্রামে আগমন করেন। এবং পটিয়া থানার কাঞ্চননগরে বসতি স্থাপন করেন। তার এক পুত্র সন্তান সৈয়দ আবদুল কাদের ফটিকছড়ি থানার আজিম নগরে ইমামতির দায়িত্ব নিয়ে বসতি স্থাপন করেন। তার প্রপৌত্র মওলানা সৈয়দ মতি উল্লাহর পবিত্র ঔরসে শাহসুফি সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভান্ডারি ১৮২৬ খ্রিষ্টাব্দ চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি থানার মাইজভান্ডার শরীফ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভান্ডারি ৭৯ বছর বয়সে ১৯০৬ খ্রিষ্টাব্দে মারা যান। প্রতি বছর ৮, ৯ ও ১০ মাঘ তার ওফাত দিবস উপলক্ষ্যে ৩ দিনব্যাপী ওরস শরীফ অনুষ্ঠিত হয়। এতে দেশবিদেশের লক্ষ-লক্ষ মাইজভান্ডারিয়া তরিকার ভক্তের সমাগম ঘটে। এই ভণ্ড কাজ্জাব নিজেই মাইজভান্ডারিয়া তরিকা তরিকা প্রতিষ্ঠা করে হাজার হাজার ধর্মপ্রাণ মুসলিমদের ঈমান নষ্ট করে চলছে।
ঘ। মুজাদ্দিদিয়া তরিকা :
মুজাদ্দিদে আলফে সানির পুর নাম ছিল, শাইখ আহমেদ আল ফারুকি সিরহিন্দি। তাকে অনেক একজন ইসলামি পণ্ডিত হিসাবেও চিনে। তিনি ফিকহের ক্ষেত্র হানাফি মাযহার অনুসরণ করতেন এবং তরিকার ক্ষেত্র নকশবন্দি সুফি তরিকার অনুসারী করতেন। তাকে মুজাদ্দিদে আলফে সানি বলা হয় যার অর্থ “দ্বিতীয় সহস্রাব্দের সংস্কারক”। মুঘল সম্রাট আকবরের সময় ইসলাম বিরোধী কর্মকাণ্ডের বিরোধীতার জন্য তিনি অধিক পরিচিত। মুজাদ্দিদে আলফে সানি ১৫৬১ সাল মোতাবেক ৯৭১ হিজরির জন্ম গ্রহণ করেন এবং ১৬২৪ সালে মারা যান। মৃত্যু কালে তার বয়স হয়েছিল ৬০ বছর। ভারতের সিরহিন্দে তার মাজার অবস্থিত। তিনি নকশবন্দি তরিকার অনুসারী হলেও পরে তার নামেই মুজাদ্দিদিয়া তরিকা প্রতিষ্ঠা করা হয়।
ঙ। নকশবন্দিয়া তরিকা :
শেখ বাহাউদ্দিন মোহাম্মদ নকশবন্দী (রঃ) বোখারার সন্নিকটে কাসরে আরেফান নামক স্থানে ৭১৮ হিজরি সনের মহররম মাসে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম ছিল হজরত জালানুদ্দীন।
শেখ বাহাউদ্দিন মোহাম্মদ নকশবন্দী ৭৯১ হিজরিতে ৭৩ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। তার মাজার কাসবে আরেফানে অবস্থিত। তাকেই নকশবন্দী তরিকার প্রতিষ্ঠানা মনে করা হয়।
চ। সুহ্রাওয়ার্দিয়া তরিকা :
সাধক শিহাবুদ্দীন সোহরাওয়ার্দী ১১৪৫ সালে তার জন্ম হয়। তার জম্ম নিয়ে অনেক ধরনের বিভ্রান্তিমূলক তথ্য পাওয়া যায়। তিনি মোসেলের নিকটবর্তী ইরবিলে হিজরি ৬০৮ সালে তিনি জন্মগ্রহণ করেন এবং হিজরি ৬৮১ সালে ৫৩ বছর বয়সে দামেস্কে ইন্তেকাল করেন। কারো কারো মতে, তার জীবনকাল ঈসায়ী ১২১১ হতে ১২৮২ সাল পর্যন্ত। বাংলা ভাষায় সুফীতত্ত্বের ওপর প্রচুর বই-পুস্তক প্রকাশিত হয়েছে এবং তরিকতের আলোচনায় সোহরাওয়ার্দীয়া তরিকার বর্ণনাও স্থান পেয়েছে। কথিত আছে এই বিখ্যাত সাধক শিহাবুদ্দীন সোহরাওয়ার্দী ১২৩৪ সালে তার মৃত্যু হয় তবে এর সত্য যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তার নামেই সুহ্রাওয়ার্দিয়া তরিকা প্রতিষ্ঠা করা হয়।
যে সকল তরিকাসমূহ উল্লেখ করা হল এ ধরনের কিছু ইসলামে নেই, অথবা এর কাছাকাছিও কিছু নেই। এই ধরনের তরিকা সৃষ্টি করা ইসলাম পরিপন্থি কাজ। কাল কিয়ামতের দিনে অবশ্যই মহান আল্লাহ নিকট জবার দিহি করতে হবে। কুরআন হাদিসের ভাষ্যানুযায়ী এক দল বাদে সকলেই ভ্রান্ত দল হিসেবে চিহ্নিত হবে। হাদীস যেখানে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলছেন, “ইহুদিরা একাত্তর ফিরকাহ’য় বিভক্ত হয়েছে এবং খ্রিস্টানেরা হয়েছে বাহাত্তর ফিরকায়। আমার উম্মাহ বিভক্ত হবে তিহাত্তর ফিরকা হবে। আর এদের প্রত্যেকটি হবে জাহান্নামি একটি ব্যতীত। জানতে চাওয়া হল, “তারা কারা, হে আল্লাহর রাসূল?” এবং তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “আমার উম্মাহর একটি দল সত্যের অনুসরণ করতে থাকবে এবং বিজয়ী হবে, এবং তাদের যারা অভিশাপ দেয় কিংবা বিরোধিতা করে তারা সেই দলটির কোন ক্ষতি করতে পারবে না, যতক্ষণ না আল্লাহর ফরমান নাজিল হয়। মনে রাখতে হবে ‘সত্য’ আছে কুরআন এবং সহিহ হাদীস অনুসরণের মধ্যে। এটাই আল্লাহর পথ, এবং সরল পথ। মহান আল্লাহ বলেন,
وَكَذَٲلِكَ أَوۡحَيۡنَآ إِلَيۡكَ رُوحً۬ا مِّنۡ أَمۡرِنَاۚ مَا كُنتَ تَدۡرِى مَا ٱلۡكِتَـٰبُ وَلَا ٱلۡإِيمَـٰنُ وَلَـٰكِن جَعَلۡنَـٰهُ نُورً۬ا نَّہۡدِى بِهِۦ مَن نَّشَآءُ مِنۡ عِبَادِنَاۚ وَإِنَّكَ لَتَہۡدِىٓ إِلَىٰ صِرَٲطٍ۬ مُّسۡتَقِيمٍ۬ (٥٢) صِرَٲطِ ٱللَّهِ ٱلَّذِى لَهُ ۥ مَا فِى ٱلسَّمَـٰوَٲتِ وَمَا فِى ٱلۡأَرۡضِۗ أَلَآ إِلَى ٱللَّهِ تَصِيرُ ٱلۡأُمُورُ (٥٣)
অর্থঃ এভাবেই আমি আপনার প্রতি ওহি প্রেরণ করেছি, কুরআন আমার নির্দেশ। আপনিতো আদৌ জানতে না কিতাব কি এবং ঈমানই বা কি। কিন্তু সেই কুরআনকে আমি একটি আলো বানিয়ে দিয়েছি যা দিয়ে আমি আমার বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা পথ দেখিয়ে থাকি৷ নিশ্চয়ই আপনি এর সাহায্যে সরল সঠিক পথ প্রদর্শন করে থাকেন। সেই আল্লাহর পথ যিনি, যা কিছু আছে আসমানে ও যা কিছু আছে জমিনে তার মালিক। জেনে রাখ, যাবতীয় বিষয় সেই আল্লাহর সমীপে প্রত্যাবর্তন করে। (সুরা আশ-শুরা ৪২:৫১-৫৩)।
আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর যুগ থেকে ইসলাম যতই দুরে যাচ্ছে কুরআন ও সহিহ হাদিসের পরিবর্তে ততই সুফিবাদের ধ্যানধারণা এবং বিজাতীয়দের আমল আখলাক মুসলিমদের মাঝে প্রসার লাভ করে। বিজাতির নোংরা রীতি-নীতির জালে আটকা পড়ে ইসলাম তার স্বকীয়তা হারিয়ে ফেলেছে। আর হাজার হাজার শিরকি আকিদা ও বিদআতী রীতি-নীতির ইসলামে ঢুকে পড়েছে। সমাজের অজ্ঞ লোকেরা এর বিষাক্ত থাবায় ঈমান হারাচ্ছে। এভাবে মানুষ সরল পথ ছেড়ে বাঁকা পথ ধরছে। একক তরিকা বাদ দিয়া হাজারও তরিকা তালাশ করছে।
১০। মাজার কেন্দ্রিক আমল আবিষ্কারের ফলে উম্মতে মতবিরোধের সৃষ্টি হয়
মাজার কেন্দ্রিক আমল কে কেন্দ্র করেও ইসলাম আজ হাজার হাজার ফির্কাবন্দী। ইসলামে মাজার বা করব কেন্দ্রিক কোনো আমলের স্থান নেই। তাই যখনই কোন মুসলিম মাজারকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন অনুষ্ঠান করে এবং ইহাকে ইসলামি শরীয়তের আমল বলে দাবি করে তখন মূল ধারার কুরআন সুন্নাহ আলেমদের সাথে মতবিরোধ বাধে। অধিকাংশ মাজার পন্থীদের আকিদা ভ্রান্ত তাই তাদের নিজেদের মাঝেও বিভিন্ন ফির্কায় বিভক্ত। তারা মনে করে তাদের কল্পিত অলি, আওলিয়া, পীর কবরে আমাদের মতই জীবিত আছেন। তারা মানুষের ভালো মন্দ করার ক্ষমতা রাখেন। তারা মরার পরও বিপদে আপদে সাহায্য করতে পারে এমনকি মরার পর তাদের ক্ষমতা আরও বৃদ্ধি পায়। তাই তারা তাদের পীর বা অলি আওলিয়াদের আহ্বান করে এবং তাদের কবরের নিকট গিয়ে কোন কিছু বিপদে থেকে উদ্ধার কামনা করে। তোদের পীরদের মাঝে আবার যারা গাউস, কুতুব, আবদাল, নকিব ইত্যাদি উপাধি পেয়েছেন তারা আরও বেশি হাজত পুরা করতে পারে। এই জন্য তারা তাদের অলি-আওলিয়া ও তরিকার মাশায়েখদের কবর পাকা করে, কবরের উপর গম্বুজ নির্মাণ, তাতে বাতি জ্বালানো, কবর ও মাজার জিয়ারত করার উপর বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করে থাকে। সেখানে তারা তাদের আহ্বান করে জরুরত পুরা করার জন্য দোয়া করে। অথচ দোয়া বা ফরিয়াদ শুধু আল্লাহর জন্যই খাস।
এভাবে তারা কবর কে মাজার (দর্শনীয় স্থান) এ পরিণত করে। আর হাজার হাজার ভক্ত তাদের ফরিয়াদ নিয়ে মাজারে শায়িত ব্যক্তির নিকট ফরিয়াদ জানাতে আসে। হিন্দুরা যেমন সিজদা দ্বারা তাদের দেবীকে খুসি করে ঠিক তেমনি অনেকে মাজার ভক্ত মুসলীম মাজারে সিজদা করে তার দ্বারা শায়িত ব্যক্তিকে খুশি করে তার সুপারিশের মাধ্যমে আল্লাহ সন্তুষ্টি কামনা করে যা তাদের হিন্দু বা মুশরিক বানিয়ে দিয়েছে। যে মুসলীম এদের মুশরিক ভাবতে পারবে না, সে তাদেরই সমর্থক হবে। এভাবে মাজার কেন্দ্রিক তারা উরশ এর আয়োজন করে, মাজার কে কাবার মত তাওয়াফ করে। মাজার কেন্দ্রিক কিছু আমল আছে যা সরাসরি কুরআন হাদিসর বিপরীত। এখান থেকেই সত্যপন্থি মুসলিমদের সাথে তাদের বিরোধ বা বিভক্তির সূত্রপাত হয়।
ক। প্রথম উদাহরণ :
আবূ হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-
قَاتَلَ اللَّهُ الْيَهُودَ اتَّخَذُوا قُبُورَ أَنْبِيَائِهِمْ مَسَاجِدَ
আল্লাহ তা’য়ালা ইয়াহূদীদের ধ্বংস করুন। তারা তাদের নবিদের কবরকে মসজিদে পরিণত করেছেন। সহিহ বুখারি : ৪৩৭
আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত যে, উম্মে হাবীবা ও উম্মে সালমা (রা.) হাবশায় তাঁদের দেখা একটি গির্জার কথা বলেছিলেন, যাতে বেশ কিছু মূর্তি ছিল। তাঁরা উভয়ে বিষয়টি নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট বর্ণনা করলেন। তিনি ইরশাদ করলেন-
إِنَّ أُولَئِكَ إِذَا كَانَ فِيهِمُ الرَّجُلُ الصَّالِحُ فَمَاتَ بَنَوْا عَلَى قَبْرِهِ مَسْجِدًا، وَصَوَّرُوا فِيهِ تِلْكَ الصُّوَرَ، فَأُولَئِكَ شِرَارُ الْخَلْقِ عِنْدَ اللَّهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ
তাদের অবস্থা ছিল এমন যে, কোন সৎ লোক মারা গেলে তারা তার কবরের উপর মসজিদ বানাতো। আর তার ভিতরে ঐ লোকের মূর্তি তৈরি করে রাখতো। কিয়ামতের দিন তারাই আল্লাহর কাছে সবচাইতে নিকৃষ্ট সৃষ্টি বলে গণ্য হবে। সহিহ বুখারি : ৪২৭
নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখানে মসজিদকে কেন্দ্র করে মসজিদ তৈরি করতে নিষেধ করেছেন। সেখানে বিদআতিগণ মসজিদকে কেন্দ্র করে মাজার তৈরি করে সত্যিকারের মুসলিমদের সাথে বিরোধে লিপ্ত হয়ে আতঙ্ক তৈরি করছে।
খ। দ্বিতীয় উদরাহরণ-
আবূ হুরাইরাহ (রাযি.) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
لَا تَجْعَلُوا بُيُوتَكُمْ قُبُورًا، وَلَا تَجْعَلُوا قَبْرِي عِيدًا، وَصَلُّوا عَلَيَّ فَإِنَّ صَلَاتَكُمْ تَبْلُغُنِي حَيْثُ كُنْتُمْ
তোমরা তোমাদের ঘরগুলোকে কবরস্থানে পরিণত করো না এবং আমার কবরকে উৎসবের স্থানে পরিণত করো না। তোমরা আমার উপর দোয়া পাঠ করো। তোমরা যেখানেই থাকো না কেন তোমাদের দরুদ আমার কাছে পৌঁছানো হবে। সুনানে আবু দাউদ : ২০৪২
এই হাদিসে কবরকে উৎসবের স্থানে পরিণত নিষধ করা হয়েছে, তারপরও পীরভক্ত মানুষ এই কাজ করে নেকীর আশায় করে থাকে। তারা ইসলাম বিরোধী কাজ করে মহান আল্লাহ স্বন্তষ্টির আশায় মাজারে উরস করে থাকে।
গ। তৃতীয় উদরাহরণ-
ইবন আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন-
لَعَنَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم زَائِرَاتِ الْقُبُورِ وَالْمُتَّخِذِينَ عَلَيْهَا الْمَسَاجِدَ وَالسُّرُجَ
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবর জিয়ারতকারিণী মহিলাদের উপর লা’নত করেছেন। আর যারা কবরের উপর মসজিদ বানায় এবং বাতি জ্বালায়, তাদের উপরও তিনি অভিসম্পাত করেছেন। সুনানে আবু দাউদ : ৩২৩৬ হাদিসের মান জঈফ
আবদুল্লাহ ইবনু ’আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন-
لَعَنَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ زَائِرَاتِ الْقُبُورِ وَالْمُتَّخِذِينَ عَلَيْهَا الْمَسَاجِدَ وَالسُّرُجَ. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد وَالتِّرْمِذِيّ وَالنَّسَائِيّ
রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অভিসম্পাত করেছেন ঐ সকল স্ত্রী লোককে যারা (ঘন ঘন) কবর জিয়ারত করতে যায় এবং ঐ সব লোককেও অভিশাপ দিয়েছেন যারা কবরের উপর মাসজিদ নির্মাণ করে বা তাতে বাতি জ্বালায়। মিশকাত : ৭৪০, সুনানে তিরমিজি : ৩২০, সুনানে নাসায়ী : ২০৪৩ হাদিসের মান জঈফ
উক্ত হাদিসে সুষ্পষ্ট বলা হয়েছে যে রাসূলুল্লাহ ﷺ কবরে বাতি প্রজ্জ্বলনকারীর উপর আল্লাহ তায়ালার অভিশম্পাত বর্ষিত হয়। অথচ মাজার ভক্ত লোকের এই কাজর করে সত্যপন্থি মুসলিমদের সাথে বিরোধে লিপ্ত হবে। নতুন বিদআতি ফির্কার জম্ম দিচ্ছে।
মাজার কেন্দ্রিক এই শির্ক ও বিদআতি আমলের সাথে ইসলামে কোনো সম্পর্ক নেই। যারাই এই ধরনের বিদআতি আমলের সাথে জড়িত তাদের সাথে সঠিক পথের অনুসারীদের সংঘর্ষ অনিবার্য। এ সকল বিদআতী আমলের কারণে কবর পূজারি এবং মাজার ব্যবসাই নামে নতুন একটি ফির্কার সৃষ্টি হয়, যারা নিজেরা বিভ্রান্ত এবং সাথে সাথে অন্যদের বিভ্রান্ত করে তাদের ফির্কা ভারি করে।