মতবিরোধ প্রতিরোধে বারটি করণীয় আমল : তৃতীয় পর্ব

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

মতবিরোধ থেকে মুক্তি জন্য আমাদের করণীয় হল-

১। মহান আল্লাহ নির্দেশ মেনে ঐক্য বজায় রাখতে হবে

২। মতবিরোধের মাধ্যমে ফির্কার সৃষ্টি না করে জামাত বন্ধ থাকতে হবে

৩। মতবিরোধ নিরসনে আল্লাহর কিতাব ও রাসুলের হাদিসের দিকে প্রত্যর্পণ কর

৪। মতবিরোধ নিরসনে আমিরের আনুগত্য করতে হবে-

৫। জাল ও যঈফ বর্ণনাগুলো পরিহার করাঃ

৬। ফিকহি ক্ষেত্রে মুজতাহিদ আলেমদের মত প্রশস্ততা দেখান

৭। আকিদার ক্ষেত্র কুরআন সুন্নাহর সঠিক দলিলের অনুসরণ করা

৮। বিদআত পরিহার করে সুন্নাহর অনুসরণ করা

৯। কোন ব্যক্তিকে ভুলের ঊর্ধ্বে মনে না করা

১০। মাযহাবের নামে আলাদা আলাদা পরিচয় না দেয়া-

১১। তরিকার নামে আলাদা আলাদা পরিচয় না দেওয়া

১২। সর্বক্ষেত্রে নিজের দল ও মতকে প্রাধান্য না দেয়া-

এখানে শেষের চারটি আলোচিত হলো :

৯। কোন ব্যক্তিকে ভুলের ঊর্ধ্বে মনে না করা

আমাদের পূর্বসূরী বহু আলেম হকের উপর থেকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে ইসলামে খেদমত করেছেন। তাদের ইমান, আমল ও ইলমের জন্য আজও আমরা তাদের স্মরণ করি। তাদের মাঝে যে বেশী ইলম অর্জন করেছে এবং যে বেশী মহানবী মুহম্মাদ ﷺ এর অনুসরণ করেছে সেই আমাদের নিকট বেশী প্রিয়। তাদের প্রতি আমাদের ভালবাসা ও অনুসরণের মাপকাঠি হল তাদের কুরআন সুন্নার অনুসরণ। এই মাপকাঠিতে তারা আমাদের অনুসরণীয় ব্যক্তি কিন্তু তাদের কেউ আমাদের একমাত্র অনুসরণীয় নয়। আমাদের একমাত্র অনুসরণ ব্যক্তি হল রাসূলুল্লাহ ﷺ। তিনিই একমাত্র অনুকরনী এবং অনুসরণীয়। ইবাদাত কোন পদ্ধতিতে একমাত্র অনুকরনী মাপকাঠি হল আমাদের নবি মুহাম্মাদ ﷺ। শুধু ইবাদত নয় দুনিয়াবী বিধি বিধানেও তিনি অনুকরনীয়। মুসলীম মানে আত্মসমর্থণকারী। অর্থাৎ আমরা আল্লাহ ও তার রসূল ﷺ এর ফায়সালার সামনে আত্মসমর্থণকারী। আল্লাহর রসূল ﷺ এর ফায়সালার সামনে মুমিনের আর কোনো স্বাধীনতা থাকে না। মহান আল্লাহ রব্বুল আলামিন ‌ইরশাদ করেন

 وَمَا كَانَ لِمُؤۡمِنٖ وَلَا مُؤۡمِنَةٍ إِذَا قَضَى ٱللَّهُ وَرَسُولُهُۥٓ أَمۡرًا أَن يَكُونَ لَهُمُ ٱلۡخِيَرَةُ مِنۡ أَمۡرِهِمۡۗ وَمَن يَعۡصِ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُۥ فَقَدۡ ضَلَّ ضَلَٰلٗا مُّبِينٗا

অর্থঃ যখন আল্লাহ ও তাঁর রসূল কোনো বিষয়ের ফায়সালা দিয়ে দেন তখন কোনো মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীর সেই ব্যাপারে নিজে ফায়সালা করার কোনো অধিকার নেই৷ আর যে কেউ আল্লাহ ও তাঁর রসুলের নাফরমানি করে সে সুস্পষ্ট গোমরাহীতে লিপ্ত হয়৷ সূরা আহযাব : ৩৬

ইসলামি ইবাদত ও বিধি বিধানে একক কোন মানুষের তাকলীদ করতে হলে শুধু নবি মুহাম্মাদ ﷺ এর তাকলীদ করতে হবে। কারণ পৃথিবীতে কেহই ভুলেন ঊর্ধ্বে নয়। মুহাম্মাদ ﷺ বলেন, তোমরা প্রত্যেকেই ভুল কর। ইসলামি ইবাদত ও বিধি বিধানে মুহাম্মাদ ﷺ ছাড়া কেহই শতভাগ সঠিক নয়। ইসলামের দৃষ্টিতে, কোনো মানুষই ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। কেবলমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালাই সম্পূর্ণ নির্ভুল। তবে ইসলামে রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষভাবে সুরক্ষিত (মাসুম) করা হয়েছে, যার ফলে তিনি নবুয়তের বিষয়ে ভুলের ঊর্ধ্বে।

১. আল্লাহ তাআলা ভুলের ঊর্ধ্বে :

আল্লাহ তাআলা বলেন:

قَالَ عِلۡمُہَا عِنۡدَ رَبِّیۡ فِیۡ کِتٰبٍ ۚ  لَا یَضِلُّ رَبِّیۡ وَلَا یَنۡسَی ۫

মূসা বলল, ‘এর জ্ঞান আমার রবের নিকট কিতাবে আছে। আমার রব বিভ্রান্ত হন না এবং ভুলেও যান না’। সুরা ত্বহা : ৫২

২. রাসুলুল্লাহ -এর মাসুম হওয়া-

রাসুলুল্লাহ ﷺ নবুয়ত এবং ধর্মীয় বিষয়ে আল্লাহর পক্ষ থেকে সুরক্ষিত। তিনি কোনো ভুল নির্দেশ দেননি বা কুরআন ও সুন্নাহর ক্ষেত্রে কোনো ত্রুটি ঘটাননি।

আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَمَا يَنطِقُ عَنِ ٱلۡهَوَىٰٓ  إِنۡ هُوَ إِلَّا وَحۡىٌ۬ يُوحَىٰ

“তিনি (রাসুল) তাঁর ইচ্ছা অনুযায়ী কথা বলেন না। এটি কেবল একটি ওহি যা তাঁর কাছে নাজিল করা হয়। সূরা নাজম : ৩-৪

৩. সাহাবা, আলেম ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের ক্ষেত্রে ভুলের সম্ভাবনা-

সাহাবায়ে কেরাম (রা.) এবং বড় বড় আলেমরাও ভুল করতে পারেন। তাদের ভুলের কারণে তারা ইসলাম থেকে বের হয়ে যান না, তবে তাদের বক্তব্য বা মতামত যাচাই করা উচিত কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে। এই সম্পর্কে ইমাম মালিক (রহ.)-এর এই উক্তিটি অত্যন্ত প্রসিদ্ধ এবং ইসলামি জ্ঞানচর্চায় বহুল ব্যবহৃত। এটি মূলত ইবনে আবদুল বার (রহ.) এর বই “জামি’ বায়ানিল ইলমি ওয়া ফাদলিহি”-তে উল্লিখিত হয়েছে। উক্তিটির আরবি ভাষ্য হলো-

“ما من أحدٍ إلا ويؤخذُ من قولِهِ ويترك، إلا النبي ﷺ.”

“কোনো ব্যক্তির কথা গ্রহণও করা হয় এবং বর্জনও করা হয়, কেবল নবি ﷺ ছাড়া।”

এটি ইমাম মালিক (রহ.)-এর ইসলামি আইনের মূলনীতির প্রতি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করে, যেখানে কুরআন ও সুন্নাহর গুরুত্ব সর্বোচ্চ।

৪. রাসুলুল্লাহ ছাড়া কোনো মানুষই ভুলের ঊর্ধ্বে নন-

যে কেউ ভুল করতে পারে, তবে ইসলাম তার ভুল স্বীকার করার এবং সংশোধনের ওপর জোর দেয়। আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

كُلُّ ابْنِ آدَمَ خَطَّاءٌ وَخَيْرُ الْخَطَّائِينَ التَّوَّابُونَ

“প্রত্যেক আদম সন্তানই ভুল করে, আর সর্বোত্তম ভুলকারী হলো তারা যারা তওবা করে। সুনানে তিরমিজি : ২৪৯৯

৫. কাউকে ভুলের ঊর্ধ্বে মনে করা বিপজ্জনক

কাউকে ভুলের ঊর্ধ্বে মনে করা শিরকের দিকে নিয়ে যেতে পারে, কারণ আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে নিখুঁত মনে করা হয়। যদি কাউকে ভুলের ঊর্ধ্বে হয় তবে সমাজে বিভ্রান্তি ও অন্ধ অনুসরণ সৃষ্টি হয়। মানুষ তখন মিথ্যা ও সত্যের মধ্যে পার্থক্য করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলা হয়।  একক কোনো ব্যক্তিকে ভুলের ঊর্ধ্বে মনে করা যাবে না। এতে হক সত্য খুঁজে পাওয়া যাবে না। যদি এমনটি হয় তবে একে কেন্দ্র করে সমাজে নতুন নতুন ফির্কার সৃষ্ট হবে। ফির্কা সৃষ্টি পাশাপাশি আরও একটা মহা বিপদ আছে। যদি কেউ কোনো ব্যক্তিকে ভুলের ঊর্ধ্বে মনে না করে, তাহলে সে তার সকল আদেশ নিষধ মানার মাধ্যমে মহান আল্লাহর সমক্ষ করা হবে। এবং এর মাধ্যমে সে শিরকি কাজে লিপ্ত হবে, যা তাকে ইসলাম ও মুসলিম থেকে খারিজ করে দিবে। যেমন- আল্লাহ তাআলা বলেন-

اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَابًا مِنْ دُونِ اللَّهِ

অর্থ: তারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে নিজেদের উলামা ও দরবেশদেরকে নিজেদের খোদায় পরিণত করেছেন৷ সুরা তওবা  : ৩১

ইসলামের খেদমত করেছেন এমন  অনেক জ্ঞানী ব্যক্তি আছে। যারা যুগে যুগে ইসলাম প্রচার ও প্রসারে অবদান রেখেছেন। তারা আমাদের নিকট অনুসরণীয় কিন্তু একমাত্র অনুসরণীয় নয়। এমন কিছু আলেমদের নাম উল্লেখ করব যারা যুগে যুগে মুসলিম ও ইসলাম ধর্মকে প্রচার ও প্রসার করছে। তারা স্বমহিমায় ভাক্মর কিন্তু তাদের নামে কোন ফির্কার সৃষ্ট করেনি। তাদের অধিকাংশের নাম কোন ফির্কাও নেই। কিছু অতি উৎসাহী ভক্ত তাদের মৃত্যুর বহু পরে তাদের কারো কারো নামে ফির্কার জম্ম দিয়েছে। আবার অনেক পথভ্রষ্ট আলেন নিজেও ফির্কার জম্ম দেন।

আমাদের দায়িত্ব হল-

১. আমরা তাদের অনুসরণ করব, তাদের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ নিব কিন্তু তাদের নামের কোন ফির্কার জন্ম দিব না। তাহলে উম্মত কখনো বিভক্ত হবে না।

২. কুরআন ও সুন্নাহর প্রতি দৃঢ়ভাবে অবিচল থাকা। তাদের কোন কথা কাজ কুরআন সুন্নাহর বিপরীত পেলে, তাদের প্রতি সম্মান দেখিয়ে কুরআন সুন্নাহ অনুসরণ করা।

৩. তাদেরকে ভুলের ঊর্ধ্বে মনে করা যাবে না। তাদের প্রতিটি বক্তব্য বা মতামত সম্ভব হলে, যাচাই করে গ্রহণ করা।

৪. আমাদের অন্যতম দায়িত্ব হলো- কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে সত্য-মিথ্যার যাচাই করা এবং যে কোনো ভুল সংশোধনের জন্য প্রয়াস চালানো।

উপরের কাজগুলো সঠিকভাবে করতে পারলে সমাজে বিভক্তির পরিবর্তে ঐক্যের সৃষ্ট হবে। মানুষ ইসলামি শরীয়ার অনুশাসনে ফিরে আসবে।

১০। মাযহাবের নামে আলাদা আলাদা পরিচয় না দেয়া-

যে সকল মহান মুহাদ্দিস আলেমদের নামে আমাদের সমাজে চারটি মাযহার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তাদের জীবনে আলোচনা করে দেখতে পাই, তারা ইসলামের এক এক জন নক্ষত্র তুল্য ইমাম ও মুজতাহিদ ছিল। তারা নিজেরা নিজের নামে কোন মাযহার প্রতিষ্ঠা করে যান নি। তারা যে সময় জম্ম গ্রহণ করেন তখন ছিল ইসলামের স্বর্ণ যুগ। প্রতিষ্ঠিত চার ইমামের সময় কাল ছিল নিম্মরুপঃ

আবু হানীফা (রহঃ) জম্ম ৮০ হিজরী এবং মৃত্যু ১৫০ হিজরী

ইমাম মালেক (রহঃ) জম্ম  ৯৩ হিজরী এবং মৃত্যু ১৭৯ হিজরী

ইমাম শাফিয়ী  (রহঃ) জম্ম  ১৫০ হিজরী এবং মৃত্যু  ২০৪ হিজরী

আহমদ বিন হাম্বাল (রহঃ) জম্ম  ১৬৪ হিজরী এবং মৃত্যু ২৪১ হিজরী

ইমামদের জীবনী গবেষণা করে দেখা যায় একমাত্র আহমদ বিন হাম্বাল (রহঃ) ব্যতীত বাকি তিন তাবে-তাবেয়ী ছিলেন। তাদের তিনজনের মৃত্যু তাবে তাবেয়ীদের যুগ অর্থাৎ ২২০ হিরজীর পূর্বে। ইসলামি চিন্তাবিদগণ মনে করেন তাবে-তাবেয়ী হওয়ার যোগ্যতা ১৭৪ হিজরিতে শেষ হয়ে যায়। যদিও এই মহান চার মুজতাহীন আলেমের নাম চারটি মাযহাব সমাজে প্রচলিত কিন্তু ইতিহাস বলে মাযহার সৃষ্টিতে তাদের কোন ভূমিকা নেই। হয়ত তারা তাদের জীবনে এক মুহূর্তের জন্য এমন কল্পনা করেনি যে, তাদের নামে এই পৃথিবীতে মাযহাব সৃষ্টি করা হবে। মাযহার সৃষ্ট করা তো দূরের কথা মাযহাব কি তাও তারা জানতেন না। মাযহাবের নামে পরিচয় দেওয়া, যেমন “আমি হানাফি,” “আমি শাফেয়ি,” বা “আমি মালিকি,” যদি তা ইসলামের ঐক্যের চেতনা থেকে বিচ্যুত হয়ে আত্মগৌরব, বিদ্বেষ বা বিভাজনের কারণ হয়ে ওঠে, তবে এর কিছু কুফল দেখা যায়। নিচে এই কুফলগুলো বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:

১. মুসলিম উম্মাহর মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টি

মাযহাবের নামে পরিচিতি অনেক সময় মুসলিমদের মধ্যে বিভাজনের জন্ম দেয়। একে অপরকে ভুল বা ত্রুটিপূর্ণ মনে করার মানসিকতা গড়ে ওঠে। ইসলাম একমাত্র পরিচয় হওয়ার পরিবর্তে মাযহাবকে বড় করে দেখা হয়। ফলে উম্মার মাঝে বিভক্তির সৃষ্ট হয় ও ঐক্য নষ্ট হয়। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

أَلاَ لاَ يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةٍ إِلاَّ كَانَ ثَالِثَهُمَا الشَّيْطَانُ عَلَيْكُمْ بِالْجَمَاعَةِ وَإِيَّاكُمْ وَالْفُرْقَةَ فَإِنَّ الشَّيْطَانَ مَعَ الْوَاحِدِ وَهُوَ مِنَ الاِثْنَيْنِ أَبْعَدُ مَنْ أَرَادَ بُحْبُوحَةَ الْجَنَّةِ فَلْيَلْزَمِ الْجَمَاعَةَ مَنْ سَرَّتْهُ حَسَنَتُهُ وَسَاءَتْهُ سَيِّئَتُهُ فَذَلِكَ الْمُؤْمِنُ

সাবধান! কোন পুরুষ কোন মহিলার সাথে নির্জনে মিলিত হলে সেখানে অবশ্যই তৃতীয়জন হিসাবে শাইতান অবস্থান করে। তোমরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে বসবাস কর। বিচ্ছিন্নতা হতে সাবধান থেকো। কেননা, শাইতান বিচ্ছিন্নজনের সাথে থাকে এবং সে দুজন হতে অনেক দূরে অবস্থা করে। যে লোক জান্নাতের মধ্যে সবচাইতে উত্তম জায়গার ইচ্ছা পোষণ করে সে যেন ঐক্যবদ্ধ হয়ে থাকে (মুসলিম সমাজে)। যার সৎ আমল তাকে আনন্দিত করে এবং বদ্‌ আমল কষ্ট দেয় সেই হলো প্রকৃত ঈমানদার। সুনানে তিরমিজি : ২১৬৫

২. উম্মাহর ঐক্য বিনষ্ট

ইসলাম সকল মুসলমানকে একত্রে “উম্মাহ” হিসেবে পরিচিত করে। মাযহাবের নামে দলবাজি উম্মাহর ঐক্য বিনষ্ট করে এবং শত্রুরা এই বিভাজন কাজে লাগায়।

আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেন-

وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا ۚ

তোমরা সবাই আল্লাহর রশি দৃঢ়ভাবে ধারণ করো এবং বিচ্ছিন্ন হয়ো না। সুরা আলে ইমরান : ১০৩

এই সম্পর্কে হাদিসে এসেছে-

إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْجَمَاعَةَ وَيَكْرَهُ الْفُرْقَةَ.” عَنْ أَبِي الدَّرْدَاءِ رضي الله عنه، أَنَّ النَّبِيَّ ﷺ قَالَ

আবু দারদা (রা.) হতে বর্ণিত, নবি করিম (সা.) বলেছেন, “আল্লাহ ঐক্যকে পছন্দ করেন এবং বিভেদকে অপছন্দ করেন। মুসনাদ আহমদ : ২১৭২১

৩. কুরআন ও সুন্নাহ থেকে দূরে থাকা

মাযহাবের প্রতি অন্ধ আনুগত্য কুরআন ও সুন্নাহর প্রকৃত নির্দেশনা অনুসরণ থেকে মানুষকে দূরে সরিয়ে নিতে পারে। প্রায়শই লোকেরা মাযহাবের মতবাদকে চূড়ান্ত মনে করে, যা ইসলামের শাশ্বত মূলনীতির বিপরীত।

৪. আত্মগৌরব ও বিদ্বেষ সৃষ্টি

“আমার মাযহাব সঠিক, তোমার মাযহাব ভুল” এই ধরনের মানসিকতা গড়ে ওঠে। একে অপরের প্রতি বিদ্বেষপূর্ণ আচরণ এবং অহংকার প্রদর্শন দেখা যায়।

৫. জ্ঞানচর্চায় সংকীর্ণতা

মাযহাবের নামে পরিচিতি অনেক সময় একজন ব্যক্তির জ্ঞানচর্চাকে সীমাবদ্ধ করে। অন্যান্য মাযহাবের বিশ্লেষণ বা যুক্তি গ্রহণ করার মানসিকতা কমে যায়।

৬. ইসলামের সরলতার ক্ষতি

ইসলাম একটি সহজ-সরল ধর্ম, যা মানুষকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করে। মাযহাবকে কেন্দ্র করে কঠোরতা বা অহেতুক বিতর্ক সাধারণ মানুষের মধ্যে ইসলাম সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা সৃষ্টি করতে পারে।

আমাদের করণীয়-

মাযহাবের আলেমদের অনুসরণ করা দোষের কিছু নাই। কেননা এই সকল ইমামগণ কুরআন ও সুন্নাহর প্রতি অগ্রাধিকার দিয়ে কঠিন কঠিন সমস্যার সমাধান দিয়েছেন। কুরআন সুন্নাহতে আছে, আর তারা এর বিপরীত কথা বলেছেন তা চিন্তাতীত ভাবনা। তারপরও তারা ভুলের ঊর্ধ্বে নন এবং তারা সকল বিষয়ের সকল হাদিসও জানতেন না বিধায় তাদের কোনো গবেষণা কুরআন সুন্নাহর বিপরীত হতেও পাবে। এই সকল ক্ষেত্রে তাদের তাদের প্রতি সম্মান রেখে কুরআন সুন্নাহ অনুসরণ করা জরুরি। এই সবের প্রতি খেয়াল রেখে, ইসলামের মৌলিক শিক্ষার প্রতি দৃঢ় থাকা এবং মাযহাবকে কুরআন-সুন্নাহর আলোকে যাচাই করা। মাযহাবের প্রতি ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি: মাযহাবের ফিকহগত দিকগুলো অধ্যয়ন করা, তবে তা মুসলিম ঐক্যের ক্ষতি না করে। মাযহাবের পার্থক্য ভুলে মুসলিম উম্মাহর বৃহত্তর স্বার্থে ঐক্য বজায় রাখা। সকল মাযহাবের ফিকহ অধ্যয়ন করা এবং মতভেদ নিয়ে অহেতুক বিতর্ক এড়ানো। সর্বোপরি মাযহাবের নামে পরিচয় দেওয়া যদি ইসলামের সার্বজনীন ঐক্যের ক্ষতি করে, তবে তা ইসলামের মৌলিক উদ্দেশ্যের বিপরীত। একজন মুসলমানের প্রধান পরিচয় হওয়া উচিত “আমি মুসলিম” এবং কুরআন ও সুন্নাহর প্রতি অবিচল থাকা। তাহলেই আমরা মতবিরোধ থেকে বেঁচে থাকতে পারব। আল্লাহু আলাম।।

১১। তরিকার নামে আলাদা আলাদা পরিচয় না দেওয়া

সুফিবাদ বা বৈরাগ্যবাদ যাকে মহান আল্লাহ আল কুরআনে “রুহবানিয়াত” বলে উল্লেখ করছেন। মহান আল্লাহ কুরআনে এরশাদ করেন,

 ثُمَّ قَفَّيۡنَا عَلَىٰٓ ءَاثَـٰرِهِم بِرُسُلِنَا وَقَفَّيۡنَا بِعِيسَى ٱبۡنِ مَرۡيَمَ وَءَاتَيۡنَـٰهُ ٱلۡإِنجِيلَ وَجَعَلۡنَا فِى قُلُوبِ ٱلَّذِينَ ٱتَّبَعُوهُ رَأۡفَةً۬ وَرَحۡمَةً۬ وَرَهۡبَانِيَّةً ٱبۡتَدَعُوهَا مَا كَتَبۡنَـٰهَا عَلَيۡهِمۡ إِلَّا ٱبۡتِغَآءَ رِضۡوَٲنِ ٱللَّهِ فَمَا رَعَوۡهَا حَقَّ رِعَايَتِهَا‌ۖ فَـَٔاتَيۡنَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ مِنۡہُمۡ أَجۡرَهُمۡ‌ۖ وَكَثِيرٌ۬ مِّنۡہُمۡ فَـٰسِقُونَ

অর্থঃ তাদের পর আমি একের পর এক আমার রসূলগণকে পাঠিয়েছি৷ তাদের সবার শেষে মারয়ামের পুত্র ঈসাকে পাঠিয়েছি, তাকে ইনজীল দিয়েছি এবং তার অনুসারীদের মনে দয়া ও করুণার সৃষ্টি করেছি৷ আর বৈরাগ্যবাদ তো তারা নিজেরাই উদ্ভাবন করে নিয়েছে৷ আমি ওটা তাদের ওপর চাপিয়ে দেইনি৷ আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় তারা নিজেরাই এ বিদয়াত বানিয়ে নিয়েছে৷  তারপর সেটি যেভাবে মেনে চলা দরকার, সেভাবে মেনেও চলেনি ৷ তাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছিল, তাদের প্রতিদান আমি দিয়েছি৷ তবে তাদের অধিকাংশই পাপী৷ সুরা হাদিদ : ২৭

উক্ত আয়াতে মহান আল্লাহ রুহবানিয়াত’ বা বৈরাগ্যবাদ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন খ্রিষ্টানগণ (ঈসা আলাইহিস সালাম এর অনুসারী) নিজেরাই আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় উদ্ভাবন করে নিয়েছে রুহবানিয়াত’ বা বৈরাগ্যবাদ। কারো জুলুম নির্যাতনের ভয়ে, দুনিয়ার ফিতনার ভয়ে, নিজের প্রবৃত্তির দুর্বলতার ভয়ে বা অন্য কোন ভয়ের কারণে দুনিয়াত্যাগী হয়ে যাওয়া এবং দুনিয়ার জীবন থেকে পালিয়ে বন-জংগলে বা পাহাড়ে আশ্রয় নেয়া কিংবা নির্জন নিভৃতে কোন স্থানে বসে থাকা হল রুহবানিয়াত’ বা বৈরাগ্যবাদ। তাই বলা যায় ইসলাম ধর্ম প্রবর্তনের আগেই এ পৃথিবীতে সুফিবাদ ছিল। আর আস্তে আস্তে ইসলামের ভিতর ঢুকে পড়েছে। এই মতবাদ প্রথমে পারস্য এবং পরবর্তীকালে ভারতীয় সভ্যতার অনিবার্য প্রভাব পড়েছিল। এই দুই অঞ্চলের সুফিবাদে বিভিন্ন আকিদা আমল ইসলামের নামে সফিবাদে ঢুকে পরে। যার ফলে সুফিরা ইসলামি বিশ্বাস থেকে বহু দুরে সরে যায়। তাই সুফিবাদের বিরুদ্ধে অনেক মুজতাহিদ আলেম ওলেমাগন সংস্কার আন্দোলন গড়ে তোলে। আলেম ওলামাদের এ সংস্কার আন্দোলনের মাধ্যমে আরবের অধিকাংশ দেশে সুফিবাদ প্রতিরোধ করা সম্ভব হলেও সিরিয়া ও ইরানে (পারস্যে) প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়নি। আর উপমহাদেশে রাজনৈতিক কারণে সুফিদের প্রাধান্য বেশী থেকে যায় যা আজও বিদ্যমান। তাই বলা যায় আমাদের দেশে সুফিবাদের অগ্রগতি ও বিস্তার রোধ করা সম্ভব হয়নি। তবে সুফিবাদ নিয়ে বির্তকও কম নেই। এসব সত্ত্বেও বাংলার জনসমাজে প্রায় হাজার বছর ধরে মতবাদটি দারুণ জনপ্রিয় ও গ্রহণীয়। গ্রামে গজ্ঞে আজও এ  মতবাদে বিশ্বাসীদের মিথ্যা এবং ইসলাম বিরোধী কল্পকাহিনির মাধ্যমে সাধারণ অজ্ঞ লোকদের বিমোহিদ করে ধোঁকা দিচ্ছে। আজও বাঙালি মুসলমানদের মনের গভীরে সুফি-দরবেশদের চিন্তাধারার প্রভাব বিস্তার করে আছে।ইতিহাস গবেষণা করে জানা যায় এই সুফিবাদী দর্শন তিনটি উত্স থেকে ইসলামের মধ্যে প্রবেশ করে।

১। দক্ষিণ এশীয় হিন্দু, বৌদ্ধ এবং শিখদের থেকে

২। খ্রিষ্টানদের নিকট থেকে

৩। মধ্যপ্রাচ্য থেকে

 সহজেই অনুমেয় সুফিদের সাথে ইসলামের সাথে মিলের চেয়ে অমিলই বেশী। যেখানে ইসলামের একটি মৌলিক বিধান অমান্য করলে কাফির হতে হয় সেখানে সুফিদের আকিদ ও আমলের বিস্তার পার্থক্য। এই কারণে অনেক মুহাক্কিদ আলেম সুফিদের কাফির বলার সাথে সাথে বলেছেন এটা ইসলামের নামে শিয়াদের মত আরেকটি মতবাদ। শিয়াগন বাদি করে থাকে তারা সঠিক ও সুন্নি থেকে আলাদা অপর পক্ষে সুফিগণ তো সুন্নি বাদি করেই বসে আছে। মূল ধারার ইসলামের সাথে এদের বিরোধ আর বিভক্তি চরম। কেননা, এদের আকিদা আমল কোনটিই ইসলামের মৌলীক শিক্ষার সাথে সামযস্যশীল নয়। কিছু সুফি গোষ্ঠী এবং ব্যক্তির মধ্যে এমন কিছু ভ্রান্ত আকিদা ও কর্মপ্রণালী দেখা যায়, যা কুরআন ও সুন্নাহর সাথে সাংঘর্ষিক। নিচে কিছু ভ্রান্ত আকিদা উল্লেখ করা হলো-

১. আল্লাহ ও বান্দার মধ্যে সম্পূর্ণ একত্বের ধারণা (ওহদাতুল ওজুদ)

২. রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর নূরের সৃষ্টি, তিনি আল্লাহর নূর থেকে সৃষ্ট, যা মানবীয় সৃষ্টির বিপরীত।

৩. পীর বা মুরশিদের প্রতি অতিরিক্ত আনুগত্য

৪. মাজার পূজা ও ওসিলা হিসেবে মৃতদের আহ্বান করে

৫. জাহেরি (বাহ্যিক) ইবাদতকে তুচ্ছজ্ঞান করে

৬. আল্লাহর সাথে সরাসরি সম্পর্ক দাবি করে।

৭. নাচ-গান ও বাদ্যযন্ত্রের মাধ্যমে ইবাদত করা

৮. আধ্যাত্মিক শক্তির দাবি করে

৯. তাওয়াক্কুলের নামে কর্মবিমুখ থাকে

১০. মিথ্যা ধ্যান-গমনের মাধ্যম থাকা।

এ রকম শত শত ভ্রান্ত মিথ্যা মনগড়া আকিদা বিশ্বাস ও আমলের উপর সুফিবাদ দাঁড়িয়ে আছে। তাদের সাথে ইসলাম ও মুসলিমদের বিরোধ ও বিভক্তি একটি সাধারণ ব্যাপার। সুফিদের অন্যতম একটি বৈশিষ্ট্য হলো- তাদের প্রায় শতভাগই অজ্ঞ শরিয়াত সম্পর্কে কোন জ্ঞানই নাই। তারা শুনা কথার অনুসরণ করে থাকে। যদি সুফিদের এই সকল ভ্রান্ত আকিদা কুরআন ও সুন্নাহর স্পষ্ট দলিলের মাধ্যমে শিক্ষা প্রদান করা যায়, তবে আশা করা যায় ফিরে আসবে। মুসলমানদের উচিত এ ধরনের ভুল ধারণা ধরিয়ে দিয়ে প্রকৃত ইসলামের ছায়াতলে ফিরিয়া আনা। যদি তাদের কুরআন ও রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাহর পথে আনা সম্ভব হয় তবে সুফিদের সাথে ইসলামের বিভক্তি কমে যাবে।

রসুলুল্লাহ ﷺ যুগ থেকে ইসলাম যতই দুরে যাচ্ছে ইসলামে কুরআন ও সহিহ হাদিসের পরিবর্তে সুফিবাদের ধ্যানধারণা এবং বিজাতীয়দের আমল আখলাক মুসলিমদের মাঝে প্রসার লাভ করে। বিজাতির নোংরা রীতি-নীতির জালে আটকা পড়ে ইসলাম তার স্বকীয়তা হারিয়ে ফেলেছে। আর হাজার হাজার শিরকি আকিদা ও বিদআতী রীতি-নীতির ইসলামে ঢুকে পড়েছে। সমাজের অজ্ঞ লোকেরা এর বিষাক্ত থাবায় ঈমান হারাচ্ছে। এভাবে মানুষ সরল পথ ছেড়ে বাঁকা পথ ধরছে। একক তরিকা বাদ দিয়া হাজারও তরিকা তালাশ করছে। যার মূলে ইসলামে বিভিন্ন ফির্কার সৃষ্টি হয়েছে। ইসলাম ধর্মে ঐক্য ঠিক রাখতে হলে এই সকল তরিকা পরিত্যাগ করে ইসলামের সহজ ও সরল পথ অনুসরণ করতে হবে।।

১২। সর্বক্ষেত্রে নিজের দল ও মতকে প্রাধান্য না দেয়া-

মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি হল সর্বক্ষেত্রে নিজের নিজের দল ও মতকে প্রাধান্য দেয়া। মানুষের মাঝে মতভেদ হওয়া একটি স্বাভাবিক বিষয় হলে, যখন মতভেদের বিষয়ে নিজের মতামতকে প্রাধান্য প্রদান করা হয় তখনই মতবিরোধ হয়। যার ফলে দ্বীনে মাঝে ফির্কা সৃষ্টি হয়ে দ্বীন টুকরা হয়ে যায়। পৃথিবীতে মুশরিকগণ আল্লাহর দ্বীনকে টুকরা টুকরা করেছিল বলে কুরআনে উল্লেখ আছে।  আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেন-

وَلَا تَكُونُوا مِنَ الْمُشْرِكِينَ ..مِنَ الَّذِينَ فَرَّقُوا دِينَهُمْ وَكَانُوا شِيَعًا كُلُّ حِزْبٍ بِمَا لَدَيْهِمْ فَرِحُونَ

অর্থঃ তোমরা ঐ মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না, যারা দ্বীনকে টুকরা টুকরা করে ফেলেছে এবং যারা দলে দলে বিভক্ত হয়েছে, প্রত্যেক দল তাদের কাছে যা ছিল তাই নিয়েই খুশি। সূরা রূম : ৩১-৩২।

এখান একটি কঠিন কথা বলা হয়েছে যে দ্বীন বিভক্ত করে তারা অখুশি ছিল না বরং তারা নিজেদের দল নিজেই সন্তুষ্ট ছিল। এটা একটা মুশরিক নীতি যে নিজের দল নিয়ে সন্তুষ্ট থাকবে অর্থাৎ নিজ দলকেই প্রাধান্য দিবে। সর্বক্ষেত্রে নিজের দল ও মতকে প্রাধান্য না দেওয়া অন্যতম কারণ কুরআন সুন্নাহর দলিলেকে প্রাধান্য প্রদান না করে নিজের প্রবৃ‌ত্তিকে প্রাধান্য প্রদান করে। দলিল প্রদানের উপর নিজের প্রবৃত্তিকে প্রাধান্য প্রদানকে কুরআন বলা হয়েছে নিজের প্রবৃত্তিকে ইলাহ বানিয়ে নিয়েছে। এই সম্পর্ক আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেন-

اَفَرَءَیۡتَ مَنِ اتَّخَذَ اِلٰـہَہٗ ہَوٰىہُ وَاَضَلَّہُ اللّٰہُ عَلٰی عِلۡمٍ وَّخَتَمَ عَلٰی سَمۡعِہٖ وَقَلۡبِہٖ وَجَعَلَ عَلٰی بَصَرِہٖ غِشٰوَۃً ؕ فَمَنۡ یَّہۡدِیۡہِ مِنۡۢ بَعۡدِ اللّٰہِ ؕ اَفَلَا تَذَکَّرُوۡنَ

তবে তুমি কি তাকে লক্ষ্য করেছ, যে তার প্রবৃত্তিকে আপন ইলাহ বানিয়ে নিয়েছে? তার কাছে জ্ঞান আসার পর আল্লাহ তাকে পথভ্রষ্ট করেছেন এবং তিনি তার কান ও অন্তরে মোহর মেরে দিয়েছেন। আর তার চোখের উপর স্থাপন করেছেন আবরণ। অতএব আল্লাহর পর কে তাকে হিদায়াত করবে? তারপরও কি তোমরা উপদেশ গ্রহণ করবে না? সুরা জাসিয়া : ২৩

ইসলামের সৌন্দর্য হলো সর্বক্ষেত্রে নিজের দল ও মতের উপর ইসলামের বিধিবিধান (ঈমান, হালাল, হারাম, ফরজ হুকুম) কে প্রাধান্য প্রদান করা। শুধু তাই নয়, নিজের উপর নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সকল মুমিন মুসলিম ভাইকেও প্রাধান্য দিতে হবে। নিজের হাদিসগুলো লক্ষ করুন-

আনাস (রাযি.) হতে বর্ণিত। নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-

لا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى يُحِبَّ لأَخِيهِ مَا يُحِبُّ لِنَفْسِهِ

তোমাদের কেউ প্রকৃত মু‘মিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে তার ভাইয়ের জন্য সেটাই পছন্দ করবে, যা তার নিজের জন্য পছন্দ করে। সহিহ বুখারি : ১৩, সহিহ মুসলিম : ৪৫

আলী (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

لاَ يُؤْمِنُ عَبْدٌ حَتَّى يُؤْمِنَ بِأَرْبَعٍ بِاللَّهِ وَحْدَهُ لاَ شَرِيكَ لَهُ وَأَنِّي رَسُولُ اللَّهِ وَبِالْبَعْثِ بَعْدَ الْمَوْتِ وَالْقَدَرِ

 কোন বান্দাহ চারটি বিষয়ের উপর ঈমান না আনা পর্যন্ত মুমিন হবে না। একমাত্র আল্লাহ্‌র উপর ঈমান আনবে, যাঁর কোন শারীক নেই, নিশ্চয় আমি আল্লাহ্‌র রাসূল, মৃত্যুর পর পুনরুত্থান এবং তাকদির ভালোমন্দে। সুনানে ইবনে মাজাহ : ৮১, সুনানে তিরমিযজি : ২১৪৫, মিশকাত : ১০৪

আনাস (রাযি.) হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-

لاَ يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى أَكُونَ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِنْ وَالِدِهِ وَوَلَدِهِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ.

তোমাদের কেউ প্রকৃত মু’মিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার নিকট তার পিতা, তার সন্তান ও সব মানুষের অপেক্ষা অধিক প্রিয়পাত্র হই। সহিহ বুখারি : ১৫, সহিহ মুসলিম : ৪৪

যখন সর্বক্ষেত্রে নিজের দল ও মতকে প্রাধান্য না নিয়ে কুরআন, সুন্নাহ, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, মুমিন ও অন্যকে দলকে প্রাধান্য দিব তখন মতভেদ, মতভেদই থেকে যাবে। মতভেদ, কখনই মতবিরোধে রূপ নিবে না। কাজেই মতবিরোধ দূর করার অন্যতম হাতিয়ার হলো- নিজের দল ও মতকে প্রাধান্য না দেওয়া।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *