মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন
একজন মুসলিমের প্রতিটি কাজই ইবাদত, যদি তা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ অনুযায়ী হয়। দুর্ভাগ্যবশত, সদ্য ভূমিষ্ঠ সন্তানের ক্ষেত্রে করণীয় সম্পর্কে অনেকেই উদাসীন এবং বিধর্মীদের রীতি অনুসরণ করে। অথচ, সহিহ হাদিসে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। একজন মুসলিম হিসেবে আমাদের কর্তব্য হলো এ সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান অর্জন করা এবং তা বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করা। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ আমল, যার মাধ্যমে আমরা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারি এবং আমাদের সন্তানকে ইসলামের পথে গড়ে তুলতে পারি।
চিকিৎসা বিজ্ঞানের আলোকেন করণীয় :
একটি শিশু পৃথিবীতে আসার পর তার প্রথম কয়েক মিনিটের যত্নের ওপর তার সুস্থ জীবন অনেকাংশে নির্ভর করে। চিকিৎসা বিজ্ঞান অনুযায়ী, সদ্য ভূমিষ্ঠ নবজাতকের জন্য কিছু জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া আবশ্যক, যা তার জীবনকে সুরক্ষিত করে।
১. শ্বাসনালী পরিষ্কার রাখা:
জন্মের পরপরই নবজাতকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজন হলো ভালোভাবে শ্বাস নেওয়া। মায়ের গর্ভে থাকা অবস্থায় শিশুর মুখ ও নাকে এক ধরনের পিচ্ছিল পদার্থ (মিউকোনিয়াম) জমে থাকে। এই পদার্থ দ্রুত পরিষ্কার করা জরুরি, যাতে শিশু সহজে শ্বাস নিতে পারে। এটি পরিষ্কার করার জন্য পরিষ্কার ও নরম কাপড় বা আঙুল ব্যবহার করা যেতে পারে। শিশুকে উল্টো করে ধরে ঝাঁকানো বা পিঠে জোরে থাপ্পড় দেওয়া উচিত নয়, কারণ এতে শিশুর ক্ষতি হতে পারে।
২. শরীর শুকনো ও উষ্ণ রাখা:
নবজাতকের শরীর দ্রুত ঠান্ডা হয়ে যায়। তাই জন্মের পরপরই একটি পরিষ্কার, জীবাণুমুক্ত ও নরম কাপড় দিয়ে তার পুরো শরীর ভালোভাবে মুছে দিতে হবে। এই সময়ে শিশুকে গোসল করানো যাবে না, কারণ এতে তার শরীর অতিরিক্ত ঠান্ডা হয়ে যাবে। শরীর মোছার পর শিশুকে নতুন ও শুকনো কাপড়ে মুড়ে মায়ের ত্বকের সংস্পর্শে রাখা খুবই উপকারী। এতে শিশু উষ্ণ থাকে এবং মায়ের হৃদস্পন্দন অনুভব করে নিরাপদ বোধ করে, যা তার মানসিক বিকাশেও সহায়তা করে।
৩. অপরিচ্ছন্নতা দূর করা: নবজাতকের গোসল
নবজাতক শিশুকে জন্মের পরপরই গোসল করানো উচিত নয়। এর প্রধান কারণ হলো ‘ভারনিক্স কেসিওসা’ (vernix caseosa) নামক একটি সাদা, মোমের মতো পাতলা আবরণ, যা শিশুর ত্বককে ঢেকে রাখে। এই ভারনিক্স কেসিওসা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি শুধু শিশুর ত্বককে শুষ্ক হওয়া থেকে রক্ষা করে না, বরং এটি একটি প্রাকৃতিক সুরক্ষা স্তর হিসেবে কাজ করে। এতে অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল এবং অ্যান্টি-ফাঙ্গাল উপাদান থাকে, যা শিশুকে বিভিন্ন ধরনের জীবাণু সংক্রমণ থেকে রক্ষা করে। এটি শিশুর শরীরের তাপমাত্রা স্থিতিশীল রাখতেও সহায়তা করে। চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এই প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে নষ্ট করা উচিত নয়। তাই জন্মের ২৪ ঘণ্টা পর যখন শিশুর শরীর ও পরিবেশের সাথে কিছুটা মানিয়ে নেয়, তখন ধীরে ধীরে গোসল করানো যেতে পারে। এই সময় পর্যন্ত শুধুমাত্র শুকনো, পরিষ্কার কাপড় দিয়ে শিশুর শরীর আলতো করে মুছে দেওয়াই যথেষ্ট। এটি শিশুকে সুস্থ ও সুরক্ষিত রাখতে সাহায্য করে।
৪. নবজাতকের নাভির যত্ন
নবজাতকের নাভির যত্ন নেওয়া অত্যন্ত জরুরি, কারণ এটি সংক্রমণের একটি সম্ভাব্য প্রবেশপথ। জন্মের পর পরই যখন নাড়ি কাটা হয়, তখন নাভির অবশিষ্ট অংশটুকু সঠিকভাবে যত্ন না নিলে সেখানে জীবাণু সংক্রমণ হতে পারে, যা শিশুর জন্য মারাত্মক ঝুঁকির কারণ। নাভির সঠিক যত্ন নেওয়ার জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিচে দেওয়া হলো:
ক. শুষ্ক ও পরিষ্কার রাখা:
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো নাভিকে সবসময় শুকনো ও পরিষ্কার রাখা। নাভিতে কোনো ধরনের ময়লা বা ভেজা ভাব যেন না থাকে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
খ. তেল বা পাউডার ব্যবহার না করা:
নাভির ওপর কোনো ধরনের তেল, পাউডার বা অ্যান্টিসেপটিক লোশন ব্যবহার করা উচিত নয়। এতে নাভি আরও ভেজা হতে পারে এবং সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
গ. খোলা রাখা:
নাভিকে বাতাস লাগতে দেওয়া ভালো। ডায়াপার পরানোর সময় খেয়াল রাখতে হবে যেন ডায়াপার নাভির ওপর না আসে। প্রয়োজনে ডায়াপারের উপরের অংশটি ভাঁজ করে দিতে হবে।
ঘ. স্বাভাবিকভাবে পড়ে যেতে দেওয়া:
নাভি সাধারণত এক থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে নিজে থেকেই শুকিয়ে ঝরে পড়ে যায়। এই প্রক্রিয়াটিকে দ্রুত করার জন্য কোনো ধরনের জোর করা বা টানাটানি করা যাবে না।
ঙ. চিকিৎসকের পরামর্শ:
যদি নাভিতে কোনো অস্বাভাবিকতা, যেমন লালচে ভাব, ফোলা, পুঁজ বা দুর্গন্ধ দেখা যায়, তাহলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
এই সহজ নিয়মগুলো মেনে চললে নবজাতকের নাভি দ্রুত ও নিরাপদে শুকিয়ে যাবে, এবং সে সংক্রমণের ঝুঁকি থেকে মুক্ত থাকবে।
৫. মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানো
জন্মের পর সদ্য ভূমিষ্ঠ সন্তানের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং উপকারী কাজ হলো তাকে মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানো। বিশেষ করে, জন্মের প্রথম এক ঘণ্টার মধ্যেই শিশুকে দুধ পান করানো উচিত। এই সময়ের মধ্যে মায়ের বুক থেকে যে প্রথম দুধ বের হয়, তাকে কলোস্ট্রাম (Colostrum) বলা হয়।
কলোস্ট্রামের গুরুত্ব:
ক. প্রাকৃতিক টিকা: কলোস্ট্রামে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টিবডি এবং পুষ্টি উপাদান থাকে। এই উপাদানগুলো নবজাতকের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলে এবং তাকে বিভিন্ন ধরনের রোগ ও সংক্রমণ থেকে রক্ষা করে। একে শিশুর প্রথম প্রাকৃতিক টিকাও বলা যায়।
খ. হজম সহজ: কলোস্ট্রাম হালকা ও সহজে হজমযোগ্য, যা নবজাতকের পরিপাকতন্ত্রের জন্য উপযুক্ত। এটি শিশুর হজম প্রক্রিয়া শুরু করতে সাহায্য করে।
গ. গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি: এতে ভিটামিন, মিনারেল এবং প্রোটিনসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান থাকে, যা শিশুর দ্রুত শারীরিক বিকাশে সহায়তা করে।
শিশুকে নিয়মিত বুকের দুধ খাওয়ালে মা ও শিশু উভয়ের মধ্যে এক গভীর মানসিক বন্ধন তৈরি হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) নবজাতককে জন্মের প্রথম ৬ মাস শুধুমাত্র বুকের দুধ খাওয়ানোর সুপারিশ করে। এটি শিশুর সুস্বাস্থ্য এবং সুস্থ ভবিষ্যতের জন্য অপরিহার্য।
৬. টিকা ও চিকিৎসা সেবা
সদ্য ভূমিষ্ঠ নবজাতকের সুস্থ জীবন নিশ্চিত করতে জন্মের পরপরই কিছু গুরুত্বপূর্ণ টিকা ও স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো হয়। এগুলোর উদ্দেশ্য হলো শিশুকে সম্ভাব্য রোগ থেকে রক্ষা করা এবং তার শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া। শিশুকে জন্মের প্রথম ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কিছু গুরুত্বপূর্ণ টিকা দেওয়া হয়। যেমন- বিসিজি (BCG): এই টিকা যক্ষ্মা রোগের বিরুদ্ধে সুরক্ষা প্রদান করে। এরপর শিশুর বয়স বাড়ার সাথে সাথে তার রোগ প্রতিরোধের জন্য বিভিন্ন টিকা প্রদান করা হয়।
চিকিৎসা পরীক্ষা:
টিকা প্রদানের পাশাপাশি চিকিৎসক শিশুর সার্বিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা করান উচিত। যেমন-
ক. হিয়ারিং স্ক্রিনিং টেস্ট (Hearing Screening Test): শিশুর শ্রবণশক্তি স্বাভাবিক আছে কি না, তা পরীক্ষা করার জন্য জন্মের অল্প কিছুদিনের মধ্যেই এই পরীক্ষা করা হয়।
খ. জন্মকালীন ওজন ও উচ্চতা নির্ণয়: শিশুর সুস্থতার একটি প্রাথমিক সূচক হলো তার জন্মকালীন ওজন ও উচ্চতা। এ দুটি পরিমাপ করে চিকিৎসক শিশুর স্বাস্থ্য সম্পর্কে ধারণা পান।
গ. শ্বাস-প্রশ্বাস ও হৃদস্পন্দন : শিশুর শ্বাস-প্রশ্বাস ও হৃদস্পন্দনের হার স্বাভাবিক আছে কি না, তা পরীক্ষা করা হয়।
ঘ. ত্বকের রঙ ও রিফ্লেক্স : ত্বকের রঙ দেখে শিশুর শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা অনুমান করা হয়। এছাড়াও, শিশুর জন্মগত রিফ্লেক্সগুলো (যেমন: গ্রাসপিং রিফ্লেক্স) পরীক্ষা করা হয়।
এই পরীক্ষাগুলো নিশ্চিত করে যে শিশু সুস্থ আছে এবং তার কোনো বিশেষ চিকিৎসার প্রয়োজন নেই। এই পদক্ষেপগুলো শিশুর জীবনের প্রথম ধাপেই তার জন্য একটি নিরাপদ ও সুস্থ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করে।
৭. মায়ের কোলে রাখা ও ভালোবাসা দেওয়া
চিকিৎসা বিজ্ঞান এবং মনস্তত্ত্ব—উভয়ই একমত যে সদ্য ভূমিষ্ঠ শিশুর জন্য মায়ের কোলে থাকা এবং ভালোবাসা পাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি কেবল শারীরিক উষ্ণতা এবং নিরাপত্তার জন্য নয়, বরং শিশুর মানসিক ও আবেগিক বিকাশেও এর অপরিসীম ভূমিকা রয়েছে।
ক. মায়ের গায়ের গন্ধ ও বুকের উষ্ণতা:
নবজাতক শিশু মায়ের গায়ের গন্ধে সবচেয়ে বেশি শান্তি ও নিরাপত্তা অনুভব করে। এটি তার পরিচিত পরিবেশ এবং নিরাপদ আশ্রয়ের অনুভূতি তৈরি করে, যা তার স্ট্রেস কমাতে সাহায্য করে। মায়ের বুকের উষ্ণতা শিশুর শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক রাখতেও সহায়তা করে। এই ঘনিষ্ঠ শারীরিক সংস্পর্শকে ‘ক্যাঙ্গারু মাদার কেয়ার’ (Kangaroo Mother Care) বলা হয়, যা অপরিণত শিশুদের জন্যও অত্যন্ত কার্যকর।
খ. মানসিক ও আবেগিক বন্ধন:
মা-বাবার ভালোবাসা, কোমল আচরণ, এবং স্পর্শ শিশুর মস্তিষ্কের সঠিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যখন শিশু মা-বাবার কাছ থেকে ভালোবাসা ও মনোযোগ পায়, তখন তার মধ্যে বিশ্বাস এবং নিরাপত্তার অনুভূতি গড়ে ওঠে। এই প্রাথমিক বন্ধন শিশুর ভবিষ্যৎ সম্পর্কের ভিত্তি স্থাপন করে এবং তাকে আবেগিকভাবে স্থিতিশীল করে তোলে। নিয়মিত কোলে নেওয়া, আলতো করে আদর করা, এবং শান্ত কণ্ঠে কথা বলা শিশুর মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য খুবই উপকারী।
সুতরাং, সদ্য ভূমিষ্ঠ শিশুকে কেবল শারীরিক যত্ন দিলেই হবে না, বরং তাকে পর্যাপ্ত ভালোবাসা ও মানসিক সহায়তাও দিতে হবে। এটি শিশুর সুস্থ ও সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য একটি অপরিহার্য ধাপ।
ইসলামি শরীয়তের আলোকেন করণীয় :
১. কন্যা সন্তানের জন্য মন খারাপ করা যাবে নাঃ
এখন অবশ্য জাহেলি যুগের মত কবর দেয়া হয় না, তবে ইসলামি জ্ঞান যাদের কম তারা মন খারাপ করে থাকে। মহান আল্লাহ বলেন,
وَإِذَا بُشِّرَ أَحَدُهُم بِٱلْأُنثَىٰ ظَلَّ وَجْهُهُۥ مُسْوَدًّا وَهُوَ كَظِيمٌ
আর যখন তাদের কাউকে কন্যা সন্তানের সুসংবাদ দেয়া হয়; তখন তার চেহারা কালো হয়ে যায়। আর সে থাকে দুঃখ ভারাক্রান্ত। (সুরা নহল ১৬:৫৮)
মহান আল্লাহ আরও বলেন,
لِلّٰہِ مُلۡکُ السَّمٰوٰتِ وَالۡاَرۡضِ ؕ یَخۡلُقُ مَا یَشَآءُ ؕ یَہَبُ لِمَنۡ یَّشَآءُ اِنَاثًا وَّیَہَبُ لِمَنۡ یَّشَآءُ الذُّکُوۡرَ ۙ
আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর সার্বভৌমত্ব আল্লাহরই। তিনি যা ইচ্ছা তা’ই সৃষ্টি করেন। তিনি যাকে ইচ্ছা কন্যা সন্তান এবং যাকে ইচ্ছা পুত্র সন্তান দান করেন। (সুরা আশ শুরা ৪২:৪৯)
ত্র বা কন্যা সন্তান জন্মদান সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর ইচ্ছাধীন, এতে স্বামী বা স্ত্রীর কোনো হাত নেই। তাই এ নিয়ে কাউকে দোষারোপ না করে আল্লাহর সিদ্ধান্তকে মেনে নেওয়া উচিত। আল্লাহ হয়তো এর মধ্যে কল্যাণ রেখেছেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) বহু হাদিসে কন্যা সন্তানের প্রতিপালনের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছেন। তাই যদি কন্যা সন্তানের কারণে আমরা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারি, তবে কন্যা সন্তানই আমাদের জন্য সর্বোত্তম।
আয়িশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
مَنِ ابْتُلِيَ بِشَيْءٍ مِنَ الْبَنَاتِ فَصَبَرَ عَلَيْهِنَّ كُنَّ لَهُ حِجَابًا مِنَ النَّارِ ” . قَالَ أَبُو عِيسَى هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ
যে ব্যক্তি তার কন্যা সন্তানদের জন্য কোনরকম পরীক্ষার সম্মুখীন হয় এবং সে তাদের ব্যাপারে ধৈর্য ধরলে, তা তার জন্য জাহান্নাম ঢাল হবে। সুনানে তিরমিজি : ১৯১৩
উকবা ইবনে ’আমের (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ কে বলতে শুনেছি, কারো তিনটি কন্যা সন্তান থাকলে এবং সে তাদের ব্যাপারে ধৈর্য ধারণ করলে, যথাসাধ্য তাদের পানাহার করালে ও পোশাক-আশাক দিলে, তারা কিয়ামতের দিন তার জন্য জাহান্নাম থেকে অন্তরায় হবে। সুনানে ইবনে মাজাহ : ৩৬৬৯, আহমাদ : ১৬৯৫০, সহীহাহ : ৩৯৪
এই সকল হাদিসের আলোকে বুঝা যায় সঠিকভাবে কন্যা সন্তান লালন পালন করে, দ্বীনের উপর রাখতে পারলে আখেরাত নাজাতের অসিলা হয়ে যাবে
২. সন্তান জম্মের জন্য মহান আল্লাহ শুকরিয়া আদায় করাঃ
এই পৃথিবীতে কত মানুষ আছে যারা শত চেষ্টা করেও সন্তানের পিতা মাতা হতে পারেন নাই। অথচ মহান আল্লাহ তার নিজ অনুগ্রহে আপনাকে একট সন্তান দান করেছেন। তাই সন্তান ভূমিষ্ঠ হলে আল্লাহর প্রসংশা করা, তার শুকরিয়া আদায় করা ও সন্তানের জন্য দো‘আ করা খুবই জরুরী। মহান আল্লাহ বলেন,
وَاِذۡ تَاَذَّنَ رَبُّکُمۡ لَئِنۡ شَکَرۡتُمۡ لَاَزِیۡدَنَّکُمۡ وَلَئِنۡ کَفَرۡتُمۡ اِنَّ عَذَابِیۡ لَشَدِیۡدٌ
আর যখন তোমাদের রব ঘোষণা দিলেন, ‘যদি তোমরা শুকরিয়া আদায় কর, তবে আমি অবশ্যই তোমাদের বাড়িয়ে দেব, আর যদি তোমরা অকৃতজ্ঞ হও, নিশ্চয় আমার আযাব বড় কঠিন’। সুরা ইবরাহিম ১৪:৭
বৃদ্ধ বয়সে মহান আল্লাহ যখন ইবরাহীম (আঃ) কে ইসমাঈল (আঃ) ও ইসহাক (আঃ) দান করেন খনিত তিনি মহান আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করেছিলেন। তিনি যে ভাষায় মহান আল্লাহ শুকরিয়া করেছিলেন পবিত্র কুরআনে তা তুলে ধরা হয়েছ। ইবরাহীম (আঃ) দুআ ছিল। মহান আল্লাহ বলেন-
﴿ٱلۡحَمۡدُ لِلَّهِ ٱلَّذِي وَهَبَ لِي عَلَى ٱلۡكِبَرِ إِسۡمَٰعِيلَ وَإِسۡحَٰقَۚ إِنَّ رَبِّي لَسَمِيعُ ٱلدُّعَآءِ ٣٩ رَبِّ ٱجۡعَلۡنِي مُقِيمَ ٱلصَّلَوٰةِ وَمِن ذُرِّيَّتِيۚ رَبَّنَا وَتَقَبَّلۡ دُعَآءِ
সকল প্রশংসা আল্লাহর, যিনি বৃদ্ধ বয়সে আমাকে ইসমাঈল ও ইসহাককে দান করেছেন। নিশ্চয় আমার রব দো‘আ শ্রবণকারী। হে আমার রব, আমাকে সালাত কায়েমকারী বানান এবং আমার বংশধরদের মধ্য থেকেও, হে আমাদের রব! আর আমার দোআ কবুল করুন। সূরা ইবরাহিম ১৪:৩৯-৪১
সন্তান-সন্ততি বান্দার প্রতি আল্লাহর উপহার। কারণ, সুসন্তান জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সম্পদ। সন্তানকে মানবজীবনের সৌন্দর্য ও রূপ বলা হয়েছে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন-
اَلۡمَالُ وَالۡبَنُوۡنَ زِیۡنَۃُ الۡحَیٰوۃِ الدُّنۡیَا ۚ وَالۡبٰقِیٰتُ الصّٰلِحٰتُ خَیۡرٌ عِنۡدَ رَبِّکَ ثَوَابًا وَّخَیۡرٌ اَمَلًا
সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দুনিয়ার জীবনের শোভা। আর স্থায়ী সৎকাজ তোমার রবের নিকট প্রতিদানে উত্তম এবং প্রত্যাশাতেও উত্তম। সুরা কাহাব : ৪৬
৩. সদ্য ভূমিষ্ঠ সন্তানের জন্য প্রথম করণীয় কাজ কানে আজান প্রদানঃ
উবাইদুল্লাহ ইবনু আবূ রাফি (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন,
رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَذَّنَ فِي أُذُنِ الْحَسَنِ بْنِ عَلِيٍّ حِينَ وَلَدَتْهُ فَاطِمَةُ بِالصَّلَاةِ
ফাতিমাহ (রাঃ) যখন আলী (রাঃ)-এর পুত্র হাসান (রাঃ)-কে প্রসব করলেন, তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ তার কানে সালাতের আযান ন্যায় আযান দিয়েছিলেন। (সুনানে আবু দাউদ : ৫১০৫, সুনানে তিরমিজি ১৫১৪)
৪. ডান কানে আযান এবং বাম কানে ইকামত দেয়া সুন্নাহ সম্মত আমল নয়ঃ
এই সম্পর্কিত একটি জাল হাদিসটি হলোঃ
مَنْ وُلِدَ لَهُ وَلَدٌ فَأَذَّنَ في أُذُنِهِ الْيُمْنَى وَأَقَامَ في أُذُنِهِ الْيُسْرَى لَمْ تَضُرَّهُ أُمُّ الصِّبْيَانِ
যদি কারো সন্তান জন্মগ্রহণ করে এবং সে তার ডান কানে আজান এবং বাম কানে ইকামত দেয় তবে উম্মুস সিবইয়ান’ (জিন) তার ক্ষতি করবে না।’’ ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর রাহিমাহুল্লাহ এই হাদীসটিকে জাল বলেছেন। হাদিসের নামে জালিয়াতী, অস্টম পরিচ্ছেদ, পৃষ্ঠা নম্বর-৬৫২
যে ব্যাক্তির কোন সন্তান ভূমিষ্ঠ হবে, অতঃপর তার ডান কানে আজন এবং বাম কানে ইকামত দেয়া হবে, বাচ্চাঁদের মা (শয়তান) তার কোন অনিষ্ঠ করতে পারবে না। মুসনাদ আবূ ইয়ালা, চতুর্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা-১৬০২। শায়খ নাসির উদ্দীন আলবানী (রহ.) বলেন জাল বলেছেন। সিলসিলা আহাদিস আস জঈফা, হাদিস নম্বর ৩২১
৫. তাহনীক করা
ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায় তাহনিক (تَحْنِيكِ) হলো, একজন প্রকৃত ধার্মিক ব্যক্তির দ্বারা খেজুর বা মিষ্টি জাতীয় কিছু চিবিয়ে নবজাতক শিশুর মুখে দেয়া। একটি নবজাতক শিশুর মুখের তালুতে মধু, মিষ্টি রস বা চাপা খেজুর দিয়ে মালিশ করার একটি ইসলামিক অনুষ্ঠানের নামকে তাহনিক বলা হয়।
আবূ মূসা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমার একটি পুত্র সন্তান জন্ম গ্রহণ করলে আমি তাকে নিয়ে নবী ﷺ এর কাছে গেলাম। তিনি তার নাম রাখলেন ইবরাহীম। তারপর খেজুর চিবিয়ে তার মুখে দিলেন এবং তার জন্য বরকতের দুআ করে আমার কাছে ফিরিয়ে দিলেন। সে ছিল আবূ মূসার বড় সন্তান। (সহিহ বুখারি ৫৪৬৭)
আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। যে, নবী ﷺ একটি শিশুকে নিজের কোলে উঠিয়ে নিলেন। তারপর তাকে তাহনীক করালেন। শিশুটি তাঁর কোলে প্রসাব করে দিল। তখন তিনি পানি আনতে বললেন এবং তা (প্রস্রাবের জায়গায়) ঢেলে দিলেন। সহিহ বুখারী : ৬০০২, সহিহ মুসলিম : ৫৪৯
আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, উম্মু সুলাইম (রা.) যখন একটি সন্তান প্রসব করলেন তখন আমাকে জানালেন, হে আনাস! শিশুটিকে দেখ, যেন সে কিছু না খায়, যতক্ষণ না তুমি একে নবী ﷺ এর নিকট নিয়ে যাও, তিনি এর তাহনীক করবেন। আমি তাকে নিয়ে গেলাম। দেখলাম, তিনি একটি বাগানে আছেন, আর তাঁর পরনে হুরাইসিয়া নামের চাদর আছে। তিনি যে উটে করে মাক্কাহ বিজয়ের দিনে অভিযানে গিয়েছিলেন তার পিঠে ছিলেন। সহিহ বুখারী ৫৮২৪, সহিহ মুসলিম ২১১৯
আসমা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, তখন তাঁর পেটে ছিলেন আবদুল্লাহ্ ইবনু যুবায়ের, তিনি বলেন, আমি এমন সময় হিজরত করি যখন আমি আসন্ন প্রসবা। আমি মদিনায় এসে কুবা’তে অবতরণ করি। এ কুবায়ই আমি পুত্র সন্তানটি প্রসব করি। এরপর আমি তাকে নিয়ে নবী ﷺ এর কাছে এসে তাঁর কোলে দিলাম। তিনি একটি খেজুর আনালেন এবং তা চিবিয়ে তার মুখে থুথু দিলেন। কাজেই সর্বপ্রথম যে বস্তুটি আবদুল্লাহর পেটে গেল তা হল নবী ﷺ এর থুথু। নবী ﷺ সামান্য চিবানো খেজুর নবজাতকের মুখের ভিতরের তালুর অংশে লাগিয়ে দিলেন। এরপর তার জন্য দু’আ করলেন এবং বরকত চাইলেন। তিনি হলেন প্রথম নবজাতক সন্তান যিনি হিজরতের পর মুসলিম পরিবারে জন্মলাভ করেন। সহিহ বুখারি : ৩৯০৮
নোট : আমাদের সমাজে একটি ভুল প্রচলন যার জন্য সন্তানের ক্ষতির পাশাপাশি ইসলামের ও দুর্নাম হয়। অনেকে তাহনিক বলতে সম্পূর্ণ একটব খেজুর চাবিয়ে নবজাকতে মুখে প্রদান করা বুঝে থাকে থাকে। আপনিই বলুন যে বাচ্ছা এখনও তরল খেতে পারেনা সে কি করে শক্ত খাবার খাবে। তাহনিক করার উদ্দেশ্য হলো, খাবারের পথ খুলে দেয়া ও বরকত লাভ। এই জন্য খেজুর চিবান লালা বা রস তার মুখের তাতুলে আলতভাবে দিয়ে দেয়া। অনেক ডাক্তারও বিষয়টি না জানার কারনে তাহনিক করাকে নিরুত্সাহিত করে থাকে। ডাক্তার কেন? একজন সাধারণ লোকও নবজাতকের মুখে একটি আস্ত খেতুর দিতে সম্মত হবে না। অথচ সঠিক পদ্ধতিতে তাহনিক করা সুন্নাহর পাশাপাশি বিজ্ঞান সম্মত কাজ। তাহনীক মুখের পেশীর ব্যায়ামও করে এবং মুখের মধ্যে রক্ত সঞ্চালনে সাহায্য করে। এটি শিশুকে মায়ের দুধ চুষতে ও খেতে সক্ষম হতে সাহায্য করতে পারে। এমন কি যে সকল নবজাতক শিশু হাইপোগ্লাইসেমিয়া (রক্তের গ্লুকোজ কম) নিয়ে জম্ম গ্রহন করে তাদের জন্য তাহনিক প্রতিরোধক হিসাবে কাজ করে বলে কৃতিত্ব দেওয়া হয়।
৬. সন্তার জন্মের সুসংবাদ সবাই জানিয়ে দেওয়া
সন্তান ভূমিষ্ঠের সুসংবাদ প্রিয়জনদের জানানো নবীদের সুন্নত। আবার সংবাদ জানার পর মা–বাবাকে মোবারকবাদ দেওয়া এবং খুশি প্রকাশ করাও সওয়াবের কাজ। পবিত্র কোরআনে এরশাদ হয়েছে,
یٰزَکَرِیَّاۤ اِنَّا نُبَشِّرُکَ بِغُلٰمِۣ اسۡمُہٗ یَحۡیٰی ۙ لَمۡ نَجۡعَلۡ لَّہٗ مِنۡ قَبۡلُ سَمِیًّا
‘হে যাকারিয়্যা, আমি তোমাকে একটি পুত্র সন্তানের সুসংবাদ দিচ্ছি, তার নাম ইয়াহইয়া। ইতিপূর্বে কাউকে আমি এ নাম দেইনি’। সূরা মারইয়াম ১৯:৭
এই ভাবে সন্তান জম্মের আগে ইবরাহিম (আ.) কে সুসংবাদ প্রদান করা হয়। মহান আল্লাহ বলেন,
فَاَوۡجَسَ مِنۡہُمۡ خِیۡفَۃً ؕ قَالُوۡا لَا تَخَفۡ ؕ وَبَشَّرُوۡہُ بِغُلٰمٍ عَلِیۡمٍ
এতে তাদের সম্পর্কে সে মনে মনে ভীত হল। তারা বলল, ‘ভয় পেয়োনা, তারা তাকে এক বিদ্বান পুত্র সন্তানের সুসংবাদ দিল’। সুরা জারিয়াত ৫১:২৮
সন্তান মহান আল্লাহর দেওয়া সেরা নেয়ামত। বাবা মার জন্য দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি। কারণ দুনিয়াতে চেষ্টা করলে অনেক কিছুই পাওয়া যায় কিন্তু চাইলে সন্তান পাওয়া সম্ভব নয়। উপরের দুটি আয়াতেও মহান আল্লাহ সন্তান প্রদানকে সুসংবাদ বলে ঘোষনা করা হয়ে। কাজেই সন্তান জম্মের সাথে সাথেই আত্মীয় স্বজন বন্ধু বান্ধব সবাইকে জানিয়ে দেওয়া উচিত।
এর অর্থ, মাতৃগর্ভে বাচ্চার গজানো চুল, তা মানুষ হোক অথবা জীব-জন্তু।
৭. সপ্তম দিনে আকিকার করা
সামুরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, সকল শিশুই তার আকীকার সাথে দায়বদ্ধ (বন্ধক) অবস্থায় থাকে। জনুগ্রহণ করার সপ্তম দিনে তার পক্ষে যবেহ করতে হবে, তার নাম রাখতে হবে এবং তার মাথা নেড়া করতে হবে। সুনানে তিরমিজি : ১৫২২, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৩১৬৫
২. আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, (জন্মের) সপ্তম দিনে রাসূলুল্লাহ ﷺ হাসান ও হুসাইনের আকীকা দিয়েছেন, তাঁদের নাম রেখেছেন এবং তাঁদের মাথা থেকে কষ্ট (চুল) দূর করেছেন। বাইহাকী : ১৯০৫৫; সহীহ ইবন হিব্বান : ৫৩১১
আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হাসান ও হুসাইনের (জন্মের) সপ্তম দিন রাসূলুল্লাহ ﷺ দু’টি ছাগল দিয়ে আকীকা দেন এবং তার মাথার কষ্ট দূর করার নির্দেশ দেন। আর তিনি বলেন, ‘তাঁর (আল্লাহর) নামে জবাই করো এবং বলো, বিসমিল্লাহি ওয়াল্লাহু আকবার, হে আল্লাহ, আপনার কাছে অমুকের জন্য এ আকীকা। বাইহাকী : ১৯৭৭২, মুসনাদ আবী ইয়ালা : ৪৫২১
৮. সপ্তম দিনে সম্বব না হলে দ্বিতীয় বা তৃতীয় সপ্তম দিনে দিলেও যথেষ্ট হবেঃ
সস্তম দিন ছাড়া অন্য কোন দিন সম্পর্কে কোন সহিহ হাদিস পাওয়া যায় না। এই সম্পর্ক একটি দুর্বল হাদিসে উম্মে কুরজ এবং আবু কুরজের সূত্রে, বর্ণিত, তারা বলেন, আব্দুর রহমান বিন আবী বাকর বংশের জনৈকা মহিলা মানত করে যে, আব্দুর রহমানের স্ত্রী যদি বাচ্চা প্রসব করে, তাহলে আমরা উঁট যবাই করব। এ কথা শ্রবণ করে আয়েশা (রা.) বলেন, না। বরং সুন্নাত বা উত্তম হচ্ছে ছেলের পক্ষ হতে দু’টি ছাগল আর মেয়ের পক্ষ হতে একটি ছাগল আকিকা দেয়া। হাড় গোটা রেখে অঙ্গের জোড় ছাড়িয়ে আলাদা করবে। তার মাংস খাওরা হবে ও সাদকা করা যাবে। কিন্তু ঐ কর্ম গুলো হতে হবে সাত দিনে, সাত দিনে-না পারলে ১৪ দিনে, ১৪ দিনে না পারলে ২১ দিনে। মুহাদ্দিস হাকিম নিশাপুরী (৪০৫ হিঃ), মুস্তাদরাক আল হাকিম
ইমাম তিরমিযী (রহ.) ১৫২২ নম্বর হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেন, এ হাদীস মোতাবিক অভিজ্ঞ আলিমগণ আমল করেছেন। তারা মনে করেন শিশু জন্মগ্রহণ করার সপ্তম দিনে তার পক্ষে আকীকা করাটা মুস্তাহাব, সপ্তম দিনে অক্ষম হলে চৌদ্দতম দিনে এবং সেই তারিখেও অক্ষম হলে একুশতম দিনে। তারা আরো বলেন, যে ধরনের বকরী কুরবানীর জন্য বৈধ সেই ধরনের বকরী আকীকার জন্যও বৈধ।
৯. সপ্তম দিনে নব জাতকের মাথা মুন্ডন করে হবে
সামুরা ইবন জুনদুব (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, প্রত্যেক শিশু তার ’আকীকার বিনিময়ে (আল্লাহর নিকট) বন্ধকস্বরূপ থাকে। কাজেই সপ্তম দিনে তার পক্ষ হতে কুরবানী করবে এবং তার মাথা মুন্ডন করে নাম রাখবে। সুনানে ইবনে মাজাহ : ৩১৬৫, সুনানে আবূ দাউদ : ২৮৩৮
আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, (জন্মের) সপ্তম দিনে রাসূলুল্লাহ ﷺ হাসান ও হুসাইনের আকীকা দিয়েছেন, তাঁদের নাম রেখেছেন এবং তাঁদের মাথা থেকে কষ্ট (চুল) দূর করেছেন। (বাইহাকী : ১৯০৫৫; সহীহ ইবন হিব্বান : ৫৩১১)
আমর ইবনু শুআইব (রাহঃ) হতে পর্যায়ক্রমে তার বাবা ও তার দাদার সূত্রে বর্ণিত আছে যে, নবী ﷺ শিশুর জন্মের সপ্তম দিনে তার নাম রাখতে, মাথা মুণ্ডন করতে এবং আকীকা করতে আদেশ করেছেন। সুনানে তিরমিজি : ২৮৩২ ১৫২৮
১০. শিশু জন্মের সপ্তম দিনে চুল কেটে সমপরিমান রুপার মুদ্রা দান করা
আলী ইবনু আবী তালিব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, একটি বকরী দ্বারা রাসূলুল্লাহ ﷺ হাসানের আকীকা করেন এবং বলেনঃ হে ফাতিমা! তার মাথা নেড়া করে দাও এবং তার চুলের ওজনের অনুরূপ রূপা দান কর। তদানুযায়ী আমি তার চুল ওজন করলাম এবং তার ওজন এক দিরহাম বা তার কাছাকাছি হয়। সুনানে তিরমিজি : ১৫১৯
আবূ রাফি (রা.) হতে বর্ণিত, ফাতিমা (রা.) যখন হাসান (রা.) কে জন্ম দিলেন তখন নবী ﷺ কে বললেন, হে আল্লাহর রসূল! আমার ছেলের মাথার চুল কি রক্ত দ্বারা মালিশ করে দিবো না? তিনি বললেন, না বরং তার চুল মুড়িয়ে ফেলো এবং উক্ত চুল ওজন করে সমপরিমাণ রৌপ্য মুদ্রা সাদাকা কর আহলুস সুফফাবাসীদের উপর। তুহফাতুল আহওয়াযী ৪র্থ খন্ড, হাদিস : ১৫১৯
১১. সপ্তম দিনই সন্তানের নাম রাখা
সামুরা ইবন জুনদুব (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, প্রত্যেক শিশু তার ’আকীকার বিনিময়ে (আল্লাহর নিকট) বন্ধকস্বরূপ থাকে। কাজেই সপ্তম দিনে তার পক্ষ হতে কুরবানী করবে এবং তার মাথা মুন্ডন করে নাম রাখবে। সুনানে ইবনে মাজাহ : ৩১৬৫, সুনানে আবূ দাউদ : ২৮৩৮
আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, (জন্মের) সপ্তম দিনে রাসূলুল্লাহ ﷺ হাসান ও হুসাইনের আকীকা দিয়েছেন, তাঁদের নাম রেখেছেন এবং তাঁদের মাথা থেকে কষ্ট (চুল) দূর করেছেন। বাইহাকী : ১৯০৫৫; সহীহ ইবন হিব্বান : ৫৩১১
আমর ইবনু শুআইব (রাহঃ) হতে পর্যায়ক্রমে তার বাবা ও তার দাদার সূত্রে বর্ণিত আছে যে, নবী ﷺ শিশুর জন্মের সপ্তম দিনে তার নাম রাখতে, মাথা মুণ্ডন করতে এবং আকীকা করতে আদেশ করেছেন। (সুনানে তিরমিজি : ২৮৩২ ১৫২৮
ক. উত্তম নাম আব্দুল্লাহ, আব্দুর রহমান, ইবরাহিম
আবদুল্লাহ ইবনু উমার (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, আল্লাহ তাআলার নিকট তোমাদের নামসমূহের মধ্যে সবচেয়ে উত্তম নাম আবদুল্লাহ এবং আবদুর রহমান। সুনানে তিরমিযী : ২৮৩৩, ইবনু মাজাহ : ৩৭২৮, সিলসিলাতুস সহীহাহ : ১০৪০
আবূ মূসা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমার একটি পুত্র সন্তান জন্ম গ্রহণ করলে আমি তাকে নিয়ে নবী ﷺ এর কাছে গেলাম। তিনি তার নাম রাখলেন ইবরাহীম। তারপর খেজুর চিবিয়ে তার মুখে দিলেন এবং তার জন্য বরকতের দুআ করে আমার কাছে ফিরিয়ে দিলেন। সে ছিল আবূ মূসার বড় সন্তান। সহিহ বুখারি : ৫৪৬৭, ৬১৯৮
খ. আল্লাহ তাআলার নিকট সবচেয়ে ঘৃণিত নামঃ
আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, আল্লাহ তাআলার নিকট কিয়ামত দিবসে এ ব্যাক্তির নাম সব চাইতে ঘৃণিত, যে তার নাম ধারণ করেছে মালিকাল আমলাক বা রাজাধিরাজ। (সহিহ বুখারি ৬২০৫)
এমনই কিছু শব্দ যা উপাধি বা নাম হিসাবে আমাদের দেশে ব্যবহার করা হয়। যেমন- শাহ জাহান, শাহান শাহ, কাজিউল কুজাত, হাকিমুল হুক্কাম, হাকিমুল হাকিম। একই অর্থবহন করে এমন বাংলা নামও আছে। যেনম- রাজাধিরাজ, মহারাজ, জগতের বাদশাহ, বিচারকদের বিচারক, শাসকদের শাসক ইত্যাদি। প্রকৃত পক্ষ মহান আল্লাহই হলেন, রাজাধিরাজ। কিয়ামের দিন মহান আল্লাহ নিজেকে রাজাধিরাজ ঘোষণা করবেন।
১২. পুরুষ ও মহিলা উভয়ের খতনা কার
আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, ইব্রাহীম (আঃ) আশি বছর বয়সের পর ’কাদূম’ নামক স্থানে নিজেই নিজের খাতনা করেন। সহিহ বুখারি : ৬২৯৮
আবূ হুরাইরাহ (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, পাঁচ প্রকার কাজ ফিতরাতের (স্বভাব ধর্মের) অন্তর্গত। (১) নাভীর নীচের লোম কেটে ফেলা, (২) খৎনাহ্ করা, (৩) গোঁফ কাটা, (৪) বগলের চুল উপড়িয়ে ফেলা এবং (৫) নখ কাটা। সহিহ বুখারি : ৫৮৮৯, ৫৮৯১, সহিহ মুসলিম : ২৫৭, ইবনে মাজাহ : ২৯২, তিরমিযী : ২৭৫৬, নাসায়ী : ৫২২৫; আবূ দাঊদ : ৪১৯৮
উম্মু আতীয়া নামক জনৈকা আনসারী থেকে বর্ণিত যে, মদীনাতে একজন মহিলা মেয়েদের খাতনা করতো। তখন নবী ﷺ তাকে বলেন, তুমি মেয়েদের লিংগাংগ্র বেশী গভীর করে কাটবে না। কেননা, এটা মেয়েদের শরীরের এমন একটা অংশ, যা পুরুষদের কাছে খুবই প্রিয়। সুনানে আবু দাউদ : ৫১৮১ ইফা.
সা’ঈদ ইবনু যুবায়র (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ইবনু আব্বাস (রা.) কে জিজ্ঞেস করা হলো যে, নবী ﷺ এর ওফাতের সময় আপনি বয়সে কার মত ছিলেন? তিনি বললেনঃ আমি তখন খাতনাকৃত ছিলাম। সহিহ বুখারি : ৬৩০০
সাঈদ ইবনু যুবায়র আরও বলেন, তাদের নিয়ম ছিল যে, সাবালক না হওয়া পর্যন্ত তারা খাতনা করতেন না। সহিহ বুখারি : ৬২৯৯