মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন
আধুনিক সমাজে একজন মুসলিম সন্তানের জন্য শুধু সাধারণ শিক্ষায় পারদর্শী হওয়াই যথেষ্ট নয়, বরং তার অন্তরে ইসলামের মৌলিক শিক্ষা ও দ্বীনের চেতনা সঞ্চার হওয়া অপরিহার্য। কারণ স্কুলের শিক্ষার মাধ্যমে সে হয়তো দুনিয়াবি জ্ঞান অর্জন করবে, কিন্তু দ্বীনি শিক্ষার মাধ্যমে তার অন্তর আল্লাহর প্রতি ঈমান, রাসূল ﷺ-এর প্রতি ভালোবাসা, আর আখিরাতের প্রস্তুতি সম্পর্কে সচেতন হবে। তাই অভিভাবক হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে সন্তানকে আধুনিক শিক্ষার পাশাপাশি ইসলামের প্রাথমিক অনুশাসন শেখানো।
শিশু বয়সে অর্জিত শিক্ষা দীর্ঘজীবন পর্যন্ত মনে গেঁথে থাকে। তাই এই বয়সেই যদি তাকে সঠিক আকিদা, সালাত, শিষ্টাচার ও পর্দার ধারণা শেখানো যায়, তবে সে বড় হয়ে একজন আদর্শ মুসলিম এবং দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠবে। আজকের শিশুই আগামী দিনের পরিবারপ্রধান, সমাজের নেতা কিংবা রাষ্ট্রের কর্ণধার। যদি তার ভেতরে দ্বীনের মৌলিক ভিত্তি মজবুত হয়, তবে দুনিয়ার শিক্ষা তাকে পথভ্রষ্ট না করে বরং দ্বীনকে সঠিকভাবে ধারণ করার শক্তি দেবে।
একজন স্কুলগামী মুসলিম বালকের জন্য দ্বীনের যে বিষয়গুলো অপরিহার্য জ্ঞান হিসেবে শিখতে হবে, তা আমরা ধাপে ধাপে আলোচনা করছি।
এর মধ্যে প্রথমেই আসছে— আকিদার মৌলিক বিষয়, যাতে সে আল্লাহর একত্ব, নবুওয়াত, আখিরাত ও ঈমানের ছয়টি স্তম্ভ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা লাভ করে। দ্বিতীয়ত— সালাতের সাধারণ নিয়ম, কারণ সালাত দ্বীনের স্তম্ভ এবং প্রতিদিনকার অপরিহার্য ইবাদত। তৃতীয়ত— পর্দার প্রাথমিক ধারণা, যাতে সে ছোটবেলা থেকেই শালীনতা ও দৃষ্টি সংযমে অভ্যস্ত হয়।
এর পাশাপাশি আরও কিছু মৌলিক বিষয় রয়েছে, যা প্রত্যেক মুসলিম শিশুর জানা জরুরি। যেমন:
১. আকিদার মৌলিক জ্ঞান অর্জন
২. পবিত্রতার মৌলিক জ্ঞান অর্জন
৩. কুরআন শিক্ষা করা
৪. সালাতের সাধারণ নিয়ম শিক্ষা করা
৫. পর্দার প্রাথমিক ধারণা নেওয়া
৬. সাধারণ আচরণ ও আখলাকের শিক্ষা (অভিভাবক, শিক্ষক, বন্ধু ও সমাজের প্রতি দায়িত্ব)
৭. দু’আ ও যিকিরের মৌলিক দিকগুলো শেখা
৮. হালাল-হারামের প্রাথমিক জ্ঞান অর্জন করা
১. আকিদার মৌলিক জ্ঞান অর্জন
শিশুদের আকিদার মৌলিক জ্ঞান অর্জন করা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়, কারণ আকিদা দ্বীনের মূলভিত্তি। ছোটবেলা থেকেই যদি শিশু বুঝতে পারে আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয়, সবকিছুর মালিক, আর নবী ﷺ হচ্ছেন সর্বশেষ রাসূল, তবে তার ঈমান দৃঢ় হবে। আখিরাত, ফেরেশতা, বারজাখ ও কিয়ামতের বিষয়ে প্রাথমিক ধারণা থাকলে সে জীবনের উদ্দেশ্য সঠিকভাবে বুঝতে পারবে। আকিদার জ্ঞান শিশুকে কুসংস্কার, ভ্রান্ত বিশ্বাস ও গোমরাহি থেকে রক্ষা করে। এতে তার হৃদয়ে তাকওয়া জন্মায় এবং আমলগুলো সঠিক পথে পরিচালিত হয়। তাই দুনিয়াবি শিক্ষার পাশাপাশি আকিদার মৌলিক শিক্ষা দেওয়া প্রতিটি অভিভাবকের প্রথম দায়িত্ব। নিচে আকিদার কিছু মৌলিক বিষয় প্রশ্ন উত্তরের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো-
১. তোমার রব (رَبٌّ) কে?
আমার ও সমগ্র বিশ্বের রব আল্লাহ। কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন-
ٱلۡحَمۡدُ لِلَّهِ رَبِّ ٱلۡعَـٰلَمِينَ
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি সমগ্র বিশ্বের রব। সুরা ফাতিহা : ১
২: রব (رَبٌّ) অর্থ কি?
“রব” (رَبّ) শব্দটি আরবি। এর মূল অর্থ হলো—
সৃষ্টি করা, পরিপূর্ণ করা, পরিপালন করা, পরিচর্যা করা ও লালন পালন করা। যিনি সব কিছুর সৃষ্টিকর্তা, মালিক, নিয়ন্ত্রক, পরিচর্যাকারী ও হিদায়াত দানকারী।
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
قُلْ أَغَيْرَ اللَّهِ أَبْغِي رَبًّا وَهُوَ رَبُّ كُلِّ شَيْءٍ
বলুন, আমি কি আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে রব বানাবো? অথচ তিনিই সব কিছুর রব।” সুরা আনআম : ১৬৪
৩: আল্লাহ (اللّٰه) অর্থ কি?
আল্লাহ (اللّٰه) শব্দটি ইসলামের সবচেয়ে মহিমান্বিত নাম। আল্লাহ মানে হল— যাবতীয় ইবাদত, আনুগত্য ও উপাসনার যোগ্য একমাত্র সত্য সত্তা। কুরআনের ভাষায়-
وَإِلَـٰهُكُمْ إِلَـٰهٌۭ وَٰحِدٌۭ ۖ لَّآ إِلَـٰهَ إِلَّا هُوَ ٱلرَّحْمَـٰنُ ٱلرَّحِيمُ
তোমাদের উপাস্য একমাত্র উপাস্য। তিনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। তিনি পরম করুণাময়, পরম দয়ালু।” সুরা বাকারা : ১৬৩
৪: আল্লাহ কোথায় আছন?
আমার প্রভু আল্লাহ উর্ধ্বে, আরশের উপরে আছেন। মহান আল্লাহ নিজের সম্পর্কে বলেন,
اَلرَّحۡمٰنُ عَلَی الۡعَرۡشِ اسۡتَوٰی
পরম করুণাময় আরশের ওপর সমুন্নত। সুরা ত্বহা : ৫
আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আরও বলেন-
الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ وَمَا بَيْنَهُمَا فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ
যিনি আসমান জমিন ও এতদুভয়ের অন্তবর্র্তী সবকিছু ছয়দিনে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর আরশে সমুন্নত হয়েছেন। সুরা ফুরকান : ৫৯
কুরআন ও সহিহ হাদিস থেকে এ কথা সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় আল্লাহ তায়ালা আরশে সমুন্নত। তিনি স্বভাবগত ভাবে সব জায়গায় বিরাজমান নন, বরং তার ক্ষমতা, রাজত্ব, পরিচালনা, নিয়ন্ত্রণ, জ্ঞান, দৃষ্টি ইত্যাদি সর্বত্র ও সব কিছুতে বিরাজমান। এমনকি গভির সমুদ্রের ক্ষুত্র প্রানি, জমিনের গভিরের ছোট পোকা তার দৃষ্টি ও জ্ঞানের বাহিরে নয়।
৫. আল্লাহর আকার আছে কি?
আল্লাহ রব্বুল আলামীন এর আকার বা নিরাকার সাব্যস্ত করা জায়েয নাই। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-
لَیۡسَ کَمِثۡلِہٖ شَیۡءٌ ۚ وَہُوَ السَّمِیۡعُ الۡبَصِیۡرُ
কোন কিছুই তাঁর সদৃশ নয়, তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা। সুরা শুয়ারা : ১১
এই আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করেছেন, সৃষ্টি জগতের কোন সৃষ্টির সদৃশ তিনি নন। কাজেই আল্লাহ তায়ালার আকার আছে বললে যে আকৃতিতে কল্পনা করবেন তাই ভুল। যেহেতু, কুরআন ও সহিহ হাদিসে আল্লাহ তাঁর নিজস্ব সত্তার হাত, পা, মুখ, দৃষ্টিশক্তি, শ্রবণ শক্তি, তাঁর সন্তুষ্টি ও ক্রোধ-ইত্যাদি উল্লেখ করা হয়েছে। আমরা তা বিশ্বাস করি কিন্তু তার ধরন জানিনা। মুমিনগণ কিয়ামাতের দিন তাকে দেখতে পাবে। তাই নিরাকার বলাটা তো একেবারেই অযৌক্তিক। সুরা কিয়ামা : ২২-২৩
কুরআন ও সহিহ হাদিসের বর্ণনাতে দেখা যায় আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এর চেহারা, হাত, পা, চক্ষু, যাত বা সত্তা, সুরাত আছে। এই ধারনা থেকে অনেক মনে করেন আল্লাহর আকার আছে। মানুষ তার কল্পনা শক্তি দ্বারা জাগতিক বিশ্বের বাহিরে কোন আকার কল্পনা করতে পারে না। তাই তারা আল্লাহকে যে কোন সৃষ্টির আকারে সাব্যস্থ করে কল্পনা করে যা মূলত কুফরি।
৬. আল্লাহ আমদেরকে কেন সৃষ্টি করেছেন?
আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন-
وَمَا خَلَقۡتُ الۡجِنَّ وَالۡاِنۡسَ اِلَّا لِیَعۡبُدُوۡنِ
আর জিন ও মানুষকে কেবল এজন্যই সৃষ্টি করেছি যে তারা আমার ইবাদাত করবে। সুরা জারিয়াত : ৫৬
আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আরও বলেন-
৭. আল্লাহর নিকট সবচেয়ে বড় পাপ কোন্টি?
উত্তর : আল্লাহর নিকট সবচেয়ে বড় পাপ হলে- শিরক। অর্থাত তার প্রভুত্তে, ইবাদতে ও গুনে কাউকে তার সমকক্ষ দাড় করার।
৮. ইবাদত অর্থ কি?
যে সকল কাজের কারণে আল্লাহ আমাদের ভালোবাসে বা সন্ত্বষ্ট হন তাই ইবাদত। যেমন- সালাত, সিয়াম, হজ, জাকাত, দান সদগা, জিকির, পর্দা করা, মানুষের সাথে ভালো ব্যবহার করা, উপকার করা ইত্যাদি।
৯. আমরা কার ইবাদত করব?
আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন-
وَٱعۡبُدُواْ ٱللَّهَ وَلَا تُشۡرِكُواْ بِهِۦ شَيۡٔٗاۖ
আর তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর এবং তাঁর সাথে কাউকে শরীক করো না। সুরা নিসা : ৩৬
১০. বান্দার প্রথম ফরজ কাজ কোনটি?
বান্দার প্রথম ফরজ কাজ হলো- আল্লাহ, তার ফিরিশতা, তার নাজিল করা কিতাব, তার রাসুল, শেষ দিবস ও তাকদিরের ভালো-মন্দের ওপর ঈমান আনা।
১১ তোমান দ্বীন কি?
আমার দ্বীন হচ্ছে, ইসলাম। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَمَن يَبۡتَغِ غَيۡرَ ٱلۡإِسۡلَٰمِ دِينٗا فَلَن يُقۡبَلَ مِنۡهُ وَهُوَ فِي ٱلۡأٓخِرَةِ مِنَ ٱلۡخَٰسِرِينَ ٨٥
“যে ব্যক্তি ইসলাম ছাড়া অন্য কোন দ্বীন তালাশ করে, কস্মিনকালেও তা তার পক্ষ থেকে গ্রহণ করা হবে না এবং আখেরাতে সে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে। সুরা আল ইমরান : ৮৫
১২. সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবি কে?
সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবি হলো- মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।
১৩. ইসলাম ব্যতিত অন্য কোন হক বা সত্য ধর্ম আছে কি?
না, ইসলাম ছাড়া অন্য কোন সত্য দ্বীন নাই। ইসলাম আল্লাহ মতোনিত একমাত্র পরিপূর্ণ দ্বীন। মহান আল্লাহ বলেন,
ٱلۡيَوۡمَ أَكۡمَلۡتُ لَكُمۡ دِينَكُمۡ وَأَتۡمَمۡتُ عَلَيۡكُمۡ نِعۡمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ ٱلۡإِسۡلَٰمَ دِينٗاۚ
আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম, তোমাদের প্রতি আমার নে’মতসমূহ সম্পূর্ণ করলাম এবং তোমাদের জন্য ইসলামকে দ্বীন হিসাবে পছন্দ করলাম। সুরা মায়েদাহ : ৩
১৪. ঈমানের পুরস্কার কি?
ঈমানের পুরস্কার জান্নাত। মহান আল্লাহ বলেন-
وَبَشِّرِ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَعَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ اَنَّ لَہُمۡ جَنّٰتٍ تَجۡرِیۡ مِنۡ تَحۡتِہَا الۡاَنۡہٰرُ ؕ
অর্থ : যারা ঈমান এনেছে এবং নেক কাজ করেছে তুমি তাদেরকে সুসংবাদ দাও যে, তাদের জন্য রয়েছে জান্নাতসমূহ, যার তলদেশ দিয়ে প্রবাহিত হবে নদীসমূহ। সুরা বাকারা : ২৫
১৫. কাফিরের আলম ওজন করা হবে না
আল্লাহ তায়ালা-
اُولٰٓئِکَ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا بِاٰیٰتِ رَبِّہِمۡ وَلِقَآئِہٖ فَحَبِطَتۡ اَعۡمَالُہُمۡ فَلَا نُقِیۡمُ لَہُمۡ یَوۡمَ الۡقِیٰمَۃِ وَزۡنًا
তারাই সেসব লোক, যারা তাদের রবের আয়াতসমূহ এবং তাঁর সাথে সাক্ষাতকে অস্বীকার করেছে। ফলে তাদের সকল আমল নিষ্ফল হয়ে গেছে। সুতরাং আমি তাদের জন্য কিয়ামতের দিন কোন ওজনের ব্যবস্থা রাখব না’। সুরা কাহাব : ১০৫
১৬. ইহসান কাকে বলে?
রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ইহসান হলো-
«أَنْ تَعْبُدَ اللَّهَ كَأَنَّكَ تَرَاهُ فَإِنْ لَمْ تَكُنْ تَرَاهُ فَإِنَّهُ يَرَاكَ
এমনভাবে আল্লাহর ইবাদত করা, যেন তুমি তাঁকে দেখছ। যদি তুমি তাঁকে দেখতে সক্ষম না হও, তাহলে মনে করবে, তিনি তোমাকে দেখছেন। সহিহ মুসলিম : ৮
১৭. নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডল এবং এতদুভয়ের মধ্যবর্তী সব কিছুর পরিচালক কে?
আল্লাহ তায়ালাই নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডল এবং এতদুভয়ের মধ্যবর্তী সব বস্তুর পরিচালক।
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
یُدَبِّرُ الۡاَمۡرَ مِنَ السَّمَآءِ اِلَی الۡاَرۡضِ ثُمَّ یَعۡرُجُ اِلَیۡہِ فِیۡ یَوۡمٍ کَانَ مِقۡدَارُہٗۤ اَلۡفَ سَنَۃٍ مِّمَّا تَعُدُّوۡنَ
তিনি আসমান থেকে যমীন পর্যন্ত সকল কার্য পরিচালনা করেন। তারপর তা একদিন তাঁর কাছেই উঠবে। যেদিনের পরিমাণ হবে তোমাদের গণনায় হাজার বছর। সুরা সিজদা : ৫
১৮. নবি, রাসূল, অলি-আওলিয়ারা কি গায়েবের খবর জানেন?
মহান আল্লাহ বলেন-
﴿وَلَوۡ كُنتُ أَعۡلَمُ ٱلۡغَيۡبَ لَٱسۡتَكۡثَرۡتُ مِنَ ٱلۡخَيۡرِ وَمَا مَسَّنِيَ ٱلسُّوٓءُۚ
“আর আমি যদি গায়বের কথা জানতাম, তাহলে বহু কল্যাণ অর্জন করে নিতে পারতাম এবং কোনো অকল্যাণ আমাকে স্পর্শ করতে পারত না। সুরা আরআফ : ১৮৮
আমাদের প্রিয় রাসুল ﷺ যেখানে গায়েব জানেন সেখানে অন্য নবি, রাসূল, অলি-আওলিয়ারাদের বিষয়টি আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
১৯. আল্লাহর অলি হতে কি কি গুন থাকা প্রয়োজন?
অলি আওলিয়া সম্পর্কে আমাদের সমাজে ভ্রান্ত ধারনা প্রচলিত আছে যে যিনি আল্লাহ অলি ব বন্ধু হবে তিনি অলৌকিক ক্ষমতার দেখান বা তার মাধ্যমে শত শথ অলৌকিক ঘটনা প্রকাশ পায়। তদের ও ধারনা মিথ্যা ও কুফরির সামিল। কেননা অলৌকিক ক্ষমতার মালিক শুধি আল্লাহ। মহান আল্লাহর মতে দুটি গুনা কোন মানুষের মাঝে থাকলে তিনিই আল্লাহ অলি বা বন্ধু। আল্লাহ তায়ারা বলেন-
اَلَاۤ اِنَّ اَوْلِیَآءَ اللّٰهِ لَا خَوْفٌ عَلَیْهِمْ وَ لَا هُمْ یَحْزَنُوْنَ ﴿ۚۖ۶۲﴾ الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا وَ كَانُوْا یَتَّقُوْنَ ﴿ؕ۶۳﴾
জেনে রাখ, আল্লাহর বন্ধুদের (অলিয়াদের) কোনো ভয় নেই এবং তারা দুঃখিতও হবে না। তারা হলো, যারা ঈমান এনেছে এবং তাকওয়া অবলম্বন করেছে। সুরা ইউনুস : : ৬২-৬৩
২০. পৃথিবীতে কি আল্লাহকে দেখা সম্ভব?
না, পৃথিবীতে বসে আল্লাহকে দেখা সম্ভব নয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন-
لَا تُدۡرِکُہُ الۡاَبۡصَارُ ۫ وَہُوَ یُدۡرِکُ الۡاَبۡصَارَ ۚ وَہُوَ اللَّطِیۡفُ الۡخَبِیۡرُ
কোন মানব-দৃষ্টি তাঁকে দেখতে পারেনা, অথচ তিনি সকল কিছুই দেখতে পান এবং তিনি অতীব সূক্ষ্মদর্শী এবং সর্ব বিষয়ে ওয়াকিফহাল। সুরা আনআম : ১০৩
২১. মুমিনগণ পরকালে কি আল্লাহকে দেখতে পারবে?
হ্যাঁ, মুমিনগণ জান্নাতে তাঁদের প্রতিপালককে দেখতে পাবেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন-
وَ لٰكِنْ كَذَّبَ وَ تَوَلّٰی ﴿ۙ۳۲﴾ ثُمَّ ذَهَبَ اِلٰۤی اَهْلِہٖ یَتَمَطّٰی ﴿ؕ۳۳﴾
সেদিন অনেক মুখমণ্ডল উজ্জ্বল হবে। তারা তাদের পালনকর্তার দিকে তাকিয়ে থাকবে। সুর কিয়ামাহ : ২২-২৩
২২. ঈমানের রুকন বা স্তম্ভ কতটি?
ঈমানের রুকন বা স্তম্ভ ছয়টি। যথা-
কুরআনুল কারীমের আয়াত ও সহিহ হাদিস পর্যালোচনা করে আলিমগণ হাদিসে জিবরাঈলে বর্ণিত ছয়টি বিষয় কে ঈমানের মূল ভিত্তি উল্লেখ করেছেন। যথা-
(১) আল্লাহর প্রতি ঈমান,
(২) ফেরেশতাগণের প্রতি ঈমান,
(৩) আল্লাহর কিতাবসমূহের প্রতি ঈমান,
(৪) রাসূলগণের প্রতি ঈমান,
(৫) পরকাল বা আখিরাতের প্রতি ঈমান এবং
(৬) তাকদীর বা পূর্বনিয়তির প্রতি ঈমান।
২৩. তাওহীদ কয় প্রকার ও কি কি?
তাওহীদ বা আল্লাহর একত্ববাদ তিন প্রকার। যথা
১. ইবাদতের ক্ষেত্রে আল্লাহর একত্ববাদ : এর অর্থ হচ্ছে, আমাদেরকে এমর্মে অকাট্য বিশ্বাস পোষণ করতে হবে যে, একমাত্র আল্লাহই এককভাবে ইবাদত পাওয়ার যোগ্য, এতে তাঁর কোনো অংশীদার নেই। আল্লাহ তা‘আলা বলেন-
وَمَآ أُمِرُوٓاْ إِلَّا لِيَعۡبُدُواْ ٱللَّهَ مُخۡلِصِينَ لَهُ ٱلدِّينَ حُنَفَآءَ
“তাদেরকে কেবলমাত্র এই নির্দেশ করা হয়েছে যে, তারা খাঁটি বিশ্বাসের সহিত এবং একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদত করবে। সুরা বাইয়েনাহ : ৫
২. রুবুবিয়াত তথা প্রতিপালনের ক্ষেত্রে আল্লাহর একত্ববাদ: অর্থাৎ আমাদেরকে এই অকাট্য বিশ্বাস পোষণ করতে হবে যে, একমাত্র আল্লাহই সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা, রিযিক্বদাতা এবং পরিচালক; এক্ষেত্রে তার কোনো অংশীদার নেই এবং নেই কোনো সহযোগীও। মহান আল্লাহ বলেন,
هَلۡ مِنۡ خَٰلِقٍ غَيۡرُ ٱللَّهِ يَرۡزُقُكُم مِّنَ ٱلسَّمَآءِ وَٱلۡأَرۡضِۚ لَآ إِلَٰهَ إِلَّا هُوَۖ فَأَنَّىٰ تُؤۡفَكُونَ
আল্লাহ ব্যতীত এমন কোন স্রষ্টা আছে কি, যে তোমাদেরকে আসমান ও যমীন থেকে রিযিক্ব দান করে? তিনি ব্যতীত সত্য কোন উপাস্য নেই। অতএব, তোমরা কিভাবে (তাঁর তাওহীদ থেকে) ফিরে যাচ্ছ?” সুরা ফাতির : ৩
৩. আল্লাহর সুন্দরতম নামসমূহ এবং গুণাবলীর ক্ষেত্রে একত্ববাদ : অর্থাৎ এই বিশ্বাস করতে হবে যে, মহান আল্লাহর সুন্দরতম নামসমূহ এবং পরিপূর্ণ গুণাবলী রয়েছে, যেগুলি কুরআনুল কারীম ও সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। মহান আল্লাহ বলেন-
وَلِلَّهِ ٱلۡأَسۡمَآءُ ٱلۡحُسۡنَىٰ فَٱدۡعُوهُ بِهَاۖ
আর আল্লাহর রয়েছে সুন্দরতম নামসমূহ। অতএব, সেগুলির মাধ্যমেই তাঁকে ডাকো সুরা আরাফ : ১৮০ এই নামসমূহ এবং গুণাবলীতে কোনোরূপ পরিবর্তন-পরিবর্ধন করা যাবে না এবং এগুলির কল্পিত কোনো আকৃতি যেমন স্থির করা যাবে না, তেমনি কোনো সৃষ্টির সাথে সেগুলির কোনোরূপ সাদৃশ্য বিধানও করা চলবে না। আমাদেরকে আরো বিশ্বাস করতে হবে যে, মহান আল্লাহর মত আর কেউ নেই। আল্লাহ বলেন,
لَيۡسَ كَمِثۡلِهِۦ شَيۡءٞۖ وَهُوَ ٱلسَّمِيعُ ٱلۡبَصِيرُ
কোন কিছুই তাঁর অনুরূপ নয়। তিনি সর্বশ্রোতা এবং সর্বদ্রষ্টা” (শূরা ১১)।
২৪. শির্ক কত প্রকার ও কি কি?
শির্ক দুই প্রকার। যথা-
১. বড় শিরক।
২. ছোট শিরক।
১. শিরকে আকবার বা বড় শিরক
বান্দা যখন একমাত্র আল্লাহর অধিকার বা হককে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকে নিবেদন করবে তখন শিরকে আকবর হবে। অর্থাৎ তার রুবুবিয়াতের কোনো অংশ, অথবা তার উলুহিয়াতের কোনো অংশ, অথবা তার নাম ও গুণাবলির কোনো অংশকে তিনি ব্যতীত কাউকে নিবেদন করবে।
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-
وَالَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا وَکَذَّبُوۡا بِاٰیٰتِنَا فَاُولٰٓئِکَ لَہُمۡ عَذَابٌ مُّہِیۡنٌ
আর যারা কুফরী করে এবং আমার আয়াতসমূহকে অস্বীকার করে, তাদের জন্যেই রয়েছে অপমানজনক আযাব। সুরা হজ : ৫৭
২. শিরকে আসগার বা ছোট শিরক
আল্লাহ তা’আলার উদ্দেশ্যে বাস্তবায়ন কৃত আমল মানুষকে দেখানোর জন্য করাতে যে শিরক হয় তাকে ছোট শিরক বা রিয়া বলা হয়। শিরকে আসগার। শিরকে আসগার মানুষকে ইসলাম থেকে বের করে দেয় না। তবে এটি আমলকে নষ্ট করে দেয়। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-
فَمَنۡ کَانَ یَرۡجُوۡا لِقَآءَ رَبِّهٖ فَلۡیَعۡمَلۡ عَمَلًا صَالِحًا وَّ لَا یُشۡرِکۡ بِعِبَادَۃِ رَبِّهٖۤ اَحَدًا
সুতরাং যে তার রবের সাক্ষাৎ কামনা করে, সে যেন সৎকর্ম করে এবং তার রবের ইবাদাতে কাউকে শরীক না করে। সূরা আল কাহফ : ১১০
২৫. কুফরী কত প্রকার ও কি কি?
কুফরী দুই প্রকার। যথা-
১. বড় কুফরী :
২. ছোট কুফরী :
১. বড় কুফরী : যে কুফরি মানুষকে দ্বীন থেকে বের করে দেয়। যেমন-
আল্লাহ, তাঁর রাসূল এবং তাঁর মনোনীত ধর্ম ইসলামকে গালি দেওয়া বা অস্বীকার করা। ইসলামের রুকনসমূহ বা আল্লাহ কর্তৃক ফজরকৃত বিধানকে অস্বীকার করলে বড় কুফরি হবে। মহান আল্লাহ বলেন-
وَ لَئِنْ سَاَلْتَهُمْ لَیَقُوْلُنَّ اِنَّمَا کُنَّا نَخُوْضُ وَ نَلْعَبُ ؕ قُلْ اَ بِاللّٰهِ وَ اٰیٰتِہٖ وَ رَسُوْلِہٖ کُنْتُمْ تَسْتَہْزِءُوْنَ ﴿۶۵﴾ لَا تَعْتَذِرُوْا قَدْ كَفَرْتُمْ بَعْدَ اِیْمَانِکُمْ ؕ اِنْ نَّعْفُ عَنْ طَآئِفَۃٍ مِّنْکُمْ نُعَذِّبْ طَآئِفَۃًۢ بِاَنَّهُمْ كَانُوْا مُجْرِمِیْنَ ﴿۶۶﴾
আর যদি তুমি তাদেরকে প্রশ্ন কর, অবশ্যই তারা বলবে, ‘আমরা আলাপচারিতা ও খেল-তামাশা করছিলাম। বল, ‘আল্লাহ, তাঁর আয়াতসমূহ ও তাঁর রাসূলের সাথে তোমরা বিদ্রূপ করছিলে’? তোমরা ওযর পেশ করো না। তোমরা তোমাদের ঈমানের পর অবশ্যই কুফরী করেছ। যদি আমি তোমাদের থেকে একটি দলকে ক্ষমা করে দেই, তবে অপর দলকে আযাব দেব। কারণ, তারা হচ্ছে অপরাধী। সুরা তাওবা : ৬৫-৬৬
২. ছোট কুফরী : আল্লাহর নেয়ামত অস্বীকার করা অথবা কোনো মুসলিম ব্যক্তির সাথে অন্যায়ভাবে কলহ-বিবাদ ও মারামারি করা বা হত্যা করা।
আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
سِبَابُ الْمُسْلِمِ فُسُوقٌ وَقِتَالُهُ كُفْرٌ
মুসলিমকে গালি দেয়া ফাসিকী এবং তাকে হত্যা করা কুফুরী। সহিহ বুখারি : ৬০৪৪
২৬. আখেরাতে সুপারিশ প্রাপ্তির শর্ত কি?
আখেরাতে সুপারিশ প্রাপ্তির দুটি শর্ত। যথা-
১. ঈমারদান :
২. আল্লাহ অনুমতি :
১. ঈমারদান : সুপারিশ প্রাপ্তির প্রাথমিক যোগ্যতা হলো তাকে ইমানদার হতে হবে। দুনিয়াতে যারা প্রকাশ্য শিরক ও কুফরীর গুনাহে লিপ্ত ছিল এবং এর উপর মৃত্যুবরণ করেছেন, কিয়ামত দিবসে তারা সুপরিশ থেকে বঞ্চিত হবেন। তাদের জন্য কোন প্রকারের সুপারিসের অনুমতি প্রদান করা হবে না। তাদের সম্পর্কে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-
إِنَّ ٱلَّذِينَ كَفَرُواْ مِنۡ أَهۡلِ ٱلۡكِتَـٰبِ وَٱلۡمُشۡرِكِينَ فِى نَارِ جَهَنَّمَ خَـٰلِدِينَ فِيہَآ
আহলে কিতাবের মধ্যে যারা কাফের এবং মুশরিক, তারা জাহান্নামের আগুনে স্থায়ী ভাবে থাকবে। তারাই সৃষ্টির অধম। সূরা বায়্যিনাহ : ৬
এ থেকে বুঝা গেল, কাফির এবং মুশরিকদের জন্য কোন সুপারিশকারী নাই।
২. আল্লাহর অনুমতি : আখিরাতের সেই ভয়াবহ বিপদের মুহূর্তে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনর অনুমতি ব্যতীত কেউ সুপারিশ করতে পারবে না। তিনি যাকে ইচ্ছা সুপারিশের অনুমতি দেবেন। ইহা সম্পূর্ণরূপে তার ইচ্ছাধীন। শ্রেষ্ঠতম পয়গম্বর এবং কোন নিকটতম ফেরেশতাও এই পৃথিবী ও আকাশের মালিকের দরবারে বিনা অনুমতিতে একটি শব্দও উচ্চারণ করার সাহস রাখে না।আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-
قُل لِّلَّهِ ٱلشَّفَـٰعَةُ جَمِيعً۬اۖ لَّهُ ۥ مُلۡكُ ٱلسَّمَـٰوَٲتِ وَٱلۡأَرۡضِۖ ثُمَّ إِلَيۡهِ تُرۡجَعُونَ (٤٤)
বলো, সুপারিশ সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর ইচ্ছাধীন। আসমান ও যমীনের বাদশাহীর মালিক তিনিই৷ তোমাদেরকে তারই দিকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে৷ সূরা যুমার : ৪৪
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আরও বলেন-
مَا فِى ٱلسَّمَـٰوَٲتِ وَمَا فِى ٱلۡأَرۡضِۗ مَن ذَا ٱلَّذِى يَشۡفَعُ عِندَهُ ۥۤ إِلَّا بِإِذۡنِهِۦۚ
অর্থ: পৃথিবী ও আকাশে যা কিছু আছে সবই তার৷ কে আছে তাঁর অনুমতি ছাড়া তাঁর কাছে সুপারিশ করবে? সূরা বাক্বারা : ২৫৫
২৭. কারা আল্লাহ অনুমতি প্রদান সাপেক্ষে সুপারিশ করতে পারবে
ঈমান ও আল্লাহর অনুমতি প্রদানে পর আল্লাহ কিছু বান্দা অন্য বান্দাদের সুপারিশ করতে পারবে। সহিহ হাদিসের মাধ্যমে জানা যায়, বিশ্বনবি মুহাম্মদ ﷺ প্রথম সুপারিশের অনুমতি পাবেন।
আবূ হুরাইরাহ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-
أَنَا سَيِّدُ وَلَدِ آدَمَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَأَوَّلُ مَنْ يَنْشَقُّ عَنْهُ الْقَبْرُ وَأَوَّلُ شَافِعٍ وَأَوَّلُ مُشَفَّعٍ
আমি কিয়ামতের দিন আদম সন্তানদের সরদার হব এবং আমিই প্রথম ব্যক্তি যার কবর খুলে যাবে এবং আমিই প্রথম সুপারিশকারী ও প্রথম সুপারিশ গৃহীত ব্যক্তি। সহিহ মুসলিম : ২২৭৮, সুনানে আবু দাউদ : ৪৬৭০
রসূলুল্লাহ এর পর অন্যান্য নবী রাসুলগণ, শহিদগণ, আল্লাহর প্রিয় বান্দাগণ, কুরআন ও সিয়াম মুমিনদের জন্য সুপারিশের অনুমতি পাবেন
আবূ উমামাহ আল বাহিলী (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রসুলুল্লাহ ﷺ কে বলতে শুনেছি তোমরা কুরআন পাঠ কর। কারণ কিয়ামতের দিন তার পাঠকারীর জন্য সে সুপারিশকারী হিসেবে আসবে। তোমরা দুটি উজ্জ্বল সুরাহ অর্থাৎ সুরাহ আল বাকারাহ এবং সুরাহ্ আল ইমরান পড়। কিয়ামতের দিন এ দুটি সূরা এমনভাবে আসবে যেন তা দু খণ্ড মেঘ অথবা দু’টি ছায়াদানকারী অথবা দুই ঝাক উড়ন্ত পাখি যা তার পাঠকারীর পক্ষ হয়ে কথা বলবে। আর তোমরা সূরা বাকারাহ পাঠ কর। এ সূরাটিকে গ্রহণ করা বারাকাতের কাজ এবং পরিত্যাগ করা পরিতাপের কাজ। আর বাতিলের অনুসারীগণ এর মোকাবেলা করতে পারে না। সহিহ মুসলিম : ৮০৪
নিমরান ইবনু উতবাহ আয-যামারী (রহ.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা কতক ইয়াতীম উম্মুদ দারদা (রা.) এর কাছে প্রবেশ করলাম। তিনি আমাদের বললেন, তোমরা সুসংবাদ গ্রহণ করো। কেননা আমি আবূ দারদা (রাঃ) কে বলতে শুনেছি, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন শহিদ তার পরিবারের সত্তরজনের জন্য সুপারিশ করবে এবং তার সুপারিশ কবুল করা হবে। আবু দাউদ : ২৫২২
২৮. ইবাদত কবূল হওয়ার শর্ত কয়টি ও কি কি?
ইবাদত কবূল হওয়ার শর্ত দু’টি। যথা-
১. আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ইবাদত করা
২. সুন্নাহ সম্মত পদ্ধতি করতে হবে
১. আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ইবাদত করা : ইবাদত একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হওয়া। মহান আল্লাহ বলেন,
وَمَآ أُمِرُوٓاْ إِلَّا لِيَعۡبُدُواْ ٱللَّهَ مُخۡلِصِينَ لَهُ ٱلدِّينَ حُنَفَآءَ
তাদেরকে কেবলমাত্র এই নির্দেশ করা হয়েছে যে, তারা খাঁটি বিশ্বাসের সাথে এবং একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদত করবে” (বাইয়্যেনাহ ৫)।
২. সুন্নাহ সম্মত পদ্ধতি করতে হবে : রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রদর্শিত পদ্ধতিত বা সুন্নাহ সম্মতভাবে করতে হবে। মহান আল্লাহ বলেন-
مَنۡ یُّطِعِ الرَّسُوۡلَ فَقَدۡ اَطَاعَ اللّٰہَ ۚ وَمَنۡ تَوَلّٰی فَمَاۤ اَرۡسَلۡنٰکَ عَلَیۡہِمۡ حَفِیۡظًا ؕ
যে রাসূলের আনুগত্য করল, সে আল্লাহরই আনুগত্য করল। আর যে বিমুখ হল, তবে আমি তোমাকে তাদের উপর তত্ত্বাবধায়ক করে প্রেরণ করিনি। সুনা নিসা : ৮০
রাসূল ﷺ প্রতি খুতবায় বলতেন-
«فَإِنَّ خَيْرَ الْحَدِيثِ كِتَابُ اللَّهِ، وَخَيْرَ الْهَدْيِ هَدْيُ مُحَمَّدٍ صلى الله عليه وسلم وَشَرَّ الْأُمُورِ مُحْدَثَاتُهَا، وَكُلُّ مُحْدَثَةٍ بِدْعَةٌ»
অর্থ: “নিশ্চয় সর্বোত্তম কথা আল্লাহর কিতাব এবং সর্বোত্তম পথনির্দেশ মুহাম্মদ ﷺ-এর পথনির্দেশ। আর নিকৃষ্টতম কাজ হলো দ্বীনে নতুন উদ্ভাবন, আর প্রতিটি নতুন উদ্ভাবনই বিদআত। সহিহ মুসলিম : ৮৬৭, সুনানে দাউদ : ৪৬০৭, সুনানে আন-নাসায়ি : ১৫৭৮, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪৫
২৯। গণক বা জ্যোতিষীগণ কি অদৃশ্যের খবর রাখেন?
না, গণক বা জ্যোতিষীগণ অদৃশ্যের খবর রাখেন না। অদৃশ্যে জ্ঞানের একমাত্র মালিক মহান আল্লাহ তায়ালা। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-
*عَٰلِمُ ٱلْغَيْبِ فَلَا يُظْهِرُ عَلَىٰ غَيْبِهِۦٓ أَحَدًا *
তিনি অদৃশ্যের জ্ঞানী, আর তিনি তাঁর অদৃশ্যের জ্ঞান কারো কাছে প্রকাশ করেন না। সুরা জিন : ২৬
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-
قُلۡ لَّا یَعۡلَمُ مَنۡ فِی السَّمٰوٰتِ وَالۡاَرۡضِ الۡغَیۡبَ اِلَّا اللّٰہُ ؕ وَمَا یَشۡعُرُوۡنَ اَیَّانَ یُبۡعَثُوۡنَ
বল, ‘আল্লাহ ছাড়া আসমানসমূহে ও যমীনে যারা আছে তারা গায়েব জানে না। আর কখন তাদেরকে পুনরুত্থিত করা হবে তা তারা অনুভব করতে পারে না’। সুরা নামল : ৬৫
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-
فَلَمَّا قَضَیۡنَا عَلَیۡہِ الۡمَوۡتَ مَا دَلَّہُمۡ عَلٰی مَوۡتِہٖۤ اِلَّا دَآبَّۃُ الۡاَرۡضِ تَاۡکُلُ مِنۡسَاَتَہٗ ۚ فَلَمَّا خَرَّ تَبَیَّنَتِ الۡجِنُّ اَنۡ لَّوۡ کَانُوۡا یَعۡلَمُوۡنَ الۡغَیۡبَ مَا لَبِثُوۡا فِی الۡعَذَابِ الۡمُہِیۡنِ ؕ
তারপর যখন আমি সুলাইমানের মৃত্যুর ফয়সালা করলাম তখন মাটির পোকা জিনদেরকে তার মৃত্যু সম্পর্কে অবহিত করল, যা তার লাঠি খাচ্ছিল। অতঃপর যখন সে পড়ে গেল তখন জিনরা বুঝতে পারল যে, তারা যদি গায়েব জানত তাহলে তারা লাঞ্ছনাদায়ক আযাবে থাকত না। সুরা সাবা : ১৪
আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, যে ব্যাক্তি ঋতুবতী স্ত্রীর সাথে সহবাস করলো অথবা স্ত্রীর মলদ্বারে সঙ্গম করলো অথবা গণকের নিকট গেলো এবং সে যা বললো তা বিশ্বাস করলো, সে অবশ্যই মুহাম্মাদ ﷺ এর উপর নাযিলকৃত জিনিসের বিরুদ্ধাচরণ করলো। সুনানে ইবনে মাজাহ : ৬৩৯, সুনানে তিরমিজি : ১৩৫, সুনানে আবূ দাঊদ ৩৯০৪,
কুরআন সুন্নাহর আলোকে বলা যায়- আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কারো কাছে গায়ের প্রকাশ করেন না, কোন নবী রাসূলও গায়েব জানে না, এমনকি কোন জিনও গায়েব জানে না। তাহলে গণক বা জ্যোতিষী অদৃশ্যের খবর রাখেন এমন বিশ্বাসের ভিত্তিতে তাদের নিকট অদৃশ্যের খবর জানতে চাওয়া নিসন্দেহে শির্ক পর্যায়ের কবিরা গুনাহ।
৩০. ঈসা আলাইহিস সালাম কি মৃত্যুবরণ করেছেন?
না, ঈসা আলাইহিস সালাম মৃত্যুবরণ করেন নাই। তাকে উপরে উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন-
وَّ قَوْلِهِمْ اِنَّا قَتَلْنَا الْمَسِیْحَ عِیْسَی ابْنَ مَرْیَمَ رَسُوْلَ اللّٰهِ ۚ وَ مَا قَتَلُوْهُ وَ مَا صَلَبُوْهُ وَ لٰكِنْ شُبِّهَ لَهُمْ ؕ وَ اِنَّ الَّذِیْنَ اخْتَلَفُوْا فِیْهِ لَفِیْ شَکٍّ مِّنْهُ ؕ مَا لَهُمْ بِہٖ مِنْ عِلْمٍ اِلَّا اتِّبَاعَ الظَّنِّ ۚ وَ مَا قَتَلُوْهُ یَقِیْنًۢا ﴿۱۵۷﴾ۙ بَلْ رَّفَعَهُ اللّٰهُ اِلَیْهِ ؕ وَ كَانَ اللّٰهُ عَزِیْزًا حَكِیْمًا ﴿۱۵۸﴾
এবং তাদের এ কথার কারণে যে, ‘আমরা আল্লাহর রাসূল মারইয়াম পুত্র ঈসা মাসীহকে হত্যা করেছি’। অথচ তারা তাকে হত্যা করেনি এবং তাকে শূলেও চড়ায়নি। বরং তাদেরকে ধাঁধায় ফেলা হয়েছিল। আর নিশ্চয় যারা তাতে মতবিরোধ করেছিল, অবশ্যই তারা তার ব্যাপারে সন্দেহের মধ্যে ছিল। ধারণার অনুসরণ ছাড়া এ ব্যাপারে তাদের কোন জ্ঞান নেই। আর এটা নিশ্চিত যে, তারা তাকে হত্যা করেনি। বরং আল্লাহ তাঁর কাছে তাকে তুলে নিয়েছেন এবং আল্লাহ মহা পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। সুরা নিসা : ১৫৭-১৫৮
মহান আল্লাহ আরওভ বলেন-
اِذۡ قَالَ اللّٰہُ یٰعِیۡسٰۤی اِنِّیۡ مُتَوَفِّیۡکَ وَرَافِعُکَ اِلَیَّ وَمُطَہِّرُکَ مِنَ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا
স্মরণ কর, যখন আল্লাহ বললেন, ‘হে ঈসা, নিশ্চয় আমি তোমাকে পরিগ্রহণ করব, তোমাকে আমার দিকে উঠিয়ে নেব এবং কাফিরদের থেকে তোমাকে পবিত্র করব। সুরা আল ইমরান : ৩৩
এ আয়াতগুলোই প্রমাণ করে যে ঈসা আলাইহিস সালাম মৃত্যুবরণ করেন নাই; বরং আল্লাহ তাঁকে জীবিত অবস্থায় আসমানে উঠিয়ে নিয়েছেন।
৩১. খিযির কি এখনো জীবিত?
নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম পৃথিবীতে প্রেরিত হওয়ার আগেই খিযির মারা গেছেন। কারণ, আল্লাহ তা‘আলা এরশাদ করেন,
وَمَا جَعَلۡنَا لِبَشَرٖ مِّن قَبۡلِكَ ٱلۡخُلۡدَۖ أَفَإِيْن مِّتَّ فَهُمُ ٱلۡخَٰلِدُونَ
আপনার পূর্বে কোন মানুষকে আমি অনন্ত জীবন দান করিনি। সুতরাং আপনার মৃত্যু হলে তারা কি চিরঞ্জীব হবে? সুরা আম্বিয়া : ৩৪