রিয়া বা ছোট শিরকের পরিনাম ও চেনায় উপায়

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

কুরআন ও বিভিন্ন হাদিসে রিয়াকে শিরকে আসগর বা ছোট শিরক এবং শিরকে খাফি বা লুকায়িত শিরক বলা হয়েছে। শিরকে আসগর বা ছোট শিরক বলতে এমন কাজ ও কথাকে বুঝানো হয়, যা তাতে লিপ্ত ব্যক্তিকে ইসলামের গণ্ডি থেকে সম্পূর্ণরূপে বের করে দেবে না বটে, তবে তা মাঝে মাঝে সগিরা গুনাহের গন্ডি ছাড়িয়ে কবিরা গুনাহ অপেক্ষাও জঘন্য মনে হবে। সবচেয়ে ভয়ানা হলো- এই গুনাহ থেকে সামান্য কারনে শিরকে আকবর হয়ে যেতে পারে।

আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,

يَا عَائِشَةُ إِيَّاكِ وَمُحَقَّرَاتِ الأَعْمَالِ فَإِنَّ لَهَا مِنَ اللَّهِ طَالِبًا ‏‏

 হে আয়েশা! ক্ষুদ্র গুনাহ থেকেও সাবধান হও। কারণ সেগুলোর জন্যও আল্লাহর নিকট জবাবদিহি করতে হবে। (সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪২৪৩, আহমাদ : ২৩৮৯৪, সুনানে দারেমী : ২৭২৬, সহীহাহ ৫১৩।

আনাস (রা.) থেকে বলেন, তোমরা এমন সব কাজ করে থাক, যা তোমাদের দৃষ্টিতে চুল থেকেও চিকন। কিন্তু নবি ﷺ এর সময়ে আমরা এগুলোকে ধ্বংসকারী মনে করতাম। সহিহ বুখারি : ৬৪৯২

আবু সাঈদ (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন যে, লোক দেখানোর জন্য আমল করে আল্লাহ তার এই রিয়াকে প্রকাশ করে দেন। যে ব্যক্তি যশ লাভের জন্য আমল করে আল্লাহ তাআলা মানুষের সামনে তা প্রকাশ করে দেন।  ইবনু মাজাহ : ৪২০৬

(১) ছোট শিরক বান্দার আমল বাতিল করে দেয়ঃ

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا لَا تُبۡطِلُوۡا صَدَقٰتِکُمۡ بِالۡمَنِّ وَالۡاَذٰی ۙ کَالَّذِیۡ یُنۡفِقُ مَالَہٗ رِئَآءَ النَّاسِ وَلَا یُؤۡمِنُ بِاللّٰہِ وَالۡیَوۡمِ الۡاٰخِرِ ؕ فَمَثَلُہٗ کَمَثَلِ صَفۡوَانٍ عَلَیۡہِ تُرَابٌ فَاَصَابَہٗ وَابِلٌ فَتَرَکَہٗ صَلۡدًا ؕ لَا یَقۡدِرُوۡنَ عَلٰی شَیۡءٍ مِّمَّا کَسَبُوۡا ؕ وَاللّٰہُ لَا یَہۡدِی الۡقَوۡمَ الۡکٰفِرِیۡنَ

হে মুমিনগণ, তোমরা খোঁটা ও কষ্ট দেয়ার মাধ্যমে তোমাদের সদাকা বাতিল করো না। সে ব্যক্তির মত, যে তার সম্পদ ব্যয় করে লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে এবং বিশ্বাস করে না আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি। অতএব তার উপমা এমন একটি মসৃণ পাথর, যার উপর রয়েছে মাটি। অতঃপর তাতে প্রবল বৃষ্টি পড়ল, ফলে তাকে একেবারে পরিষ্কার করে ফেলল। তারা যা অর্জন করেছে তার মাধ্যমে তারা কোন কিছু করার ক্ষমতা রাখে না। আর আল্লাহ কাফির জাতিকে হিদায়াত দেন না। সুরা বাকারা : ২৬৪

মাহমুদ ইবনে লাবিদ (রা.) বর্ণিত হাদিসে রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

إِنَّ أَخْوَفَ مَا أَخَافُ عَلَيْكُمْ الشِّرْكُ الأَصْغَرُ قَالُوا وَمَا الشِّرْكُ الأَصْغَرُ يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ الرِّيَاءُ يَقُولُ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ لَهُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ إِذَا جُزِيَ النَّاسُ بِأَعْمَالِهِمْ اذْهَبُوا إِلَى الَّذِينَ كُنْتُمْ تُرَاءُونَ فِي الدُّنْيَا فَانْظُرُوا هَلْ تَجِدُونَ عِنْدَهُمْ جَزَاءً

আমি তোমাদের উপর যা ভয় করি তার মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর হচ্ছে শির্কে আসগর (ছোট শির্ক)। তারা বলল, হে আল্লাহর রাসূল! শির্কে আসগর কি? তিনি বললেন, রিয়া আল্লাহ তায়ালা কিয়ামতের দিন তাদেরকে (রিয়াকারীদের) বলবেন, যখন মানুষকে তাদের আমলের বিনিময় দেয়া হবে, তোমরা তাদের কাছে যাও যাদেরকে তোমরা দুনিয়াতে দেখাতে। দেখ, তাদের কাছে কোন প্রতিদান পাও কিনা? সহিহ হাদিসে কুদসি : ০৭ হাদিস বিডি, মুসনাদে আহমদ, পঞ্চম খণ্ড, হাদিস নম্বর- ৪২৮-৪২৯; হাইসামী, মাজমাউয যাওয়াইদ : ১০২, হাদিসের মান সহিহ

আবু উমামা বাহিলী (রাঃ) থেকে বর্ণিত-

جَاءَ رَجُلٌ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَقَالَ: أَرَأَيْتَ رَجُلًا غَزَا يَلْتَمِسُ الْأَجْرَ وَالذِّكْرَ، مَالَهُ؟ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى

اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا شَيْءَ لَهُ» فَأَعَادَهَا ثَلَاثَ مَرَّاتٍ، يَقُولُ لَهُ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا شَيْءَ لَهُ» ثُمَّ قَالَ: «إِنَّ اللَّهَ لَا يَقْبَلُ مِنَ الْعَمَلِ إِلَّا مَا كَانَ لَهُ خَالِصًا، وَابْتُغِيَ بِهِ وَجْهُهُ»

এক ব্যক্তি রাসুলূল্লাহ ﷺ এর কাছে এসে বললেনঃ ঐ ব্যক্তি সম্বন্ধে আপনি কি বলেন, যে ব্যক্তি সওয়াব এবং সুনামের জন্য জিহাদ করে, তার জন্য কি রয়েছে? রাসুলূল্লাহ ﷺ বললেনঃ তার জন্য কিছুই নেই। সে ব্যক্তি তা তিনবার পুনরাবৃত্তি করলেন। রাসুলূল্লাহ ﷺ তাকে (একটি কথাই) বললেন, তার জন্য কিছুই নেই। তারপর তিনি ﷺ বললেন, আল্লাহ্‌ তা‘আলা তাঁর জন্য কৃত খাঁটি আমল ব্যতীত, যা দ্বারা আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টি ছাড়া আর কিছুই উদ্দেশ্য না হয়, আর কিছুই কবুল করেন না। সুনানে আন-নাসায়ী: ৩১৪০, সুনানে বাইহাকি: ৪৩৪৮

(২) ছোট শিরক শয়তানের সাথিঃ

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَالَّذِیۡنَ یُنۡفِقُوۡنَ اَمۡوَالَہُمۡ رِئَآءَ النَّاسِ وَلَا یُؤۡمِنُوۡنَ بِاللّٰہِ وَلَا بِالۡیَوۡمِ الۡاٰخِرِ ؕ وَمَنۡ یَّکُنِ الشَّیۡطٰنُ لَہٗ قَرِیۡنًا فَسَآءَ قَرِیۡنًا

আর যারা নিজ ধন-সম্পদ লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে ব্যয় করে এবং ঈমান আনে না আল্লাহর প্রতি এবং না শেষ দিনের প্রতি। আর শয়তান যার সঙ্গী হয়, সঙ্গী হিসেবে কতইনা নিকৃষ্ট সে! সুরা নিসা : ৩৮

(৩) ছোট শিরককারীর আমলের জন্য তাকে আপমান করা হবেঃ

সালামাহ (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি জুনদুবকে বলতে শুনেছি নবী ﷺ বলেন। তিনি ছাড়া আমি অন্য কাউকে ’নবী ﷺ বলেন’ এমন বলতে শুনিনি। আমি তাঁর নিকট গেলাম এবং তাঁকে বলতে শুনলাম। নবী ﷺ বলেছেন-

مَنْ سَمَّعَ سَمَّعَ اللهُ بِهِ وَمَنْ يُرَائِي يُرَائِي اللهُ بِهِ

যে ব্যাক্তি লোক শোনানো ইবাদত করে আল্লাহ তা’আলা এর বিনিময়ে লোক শোনানো দিবেন। আর যে ব্যাক্তি লোক-দেখানো ইবাদত করবে আল্লাহ এর বিনিময়ে “লোক দেখানো দিবেন। সহিহ বুখারি : ৬৪৯৯, ৭১৫২, সহিহ মুসলিম :  ২৯৮৬

আবূ সাঈদ (রা.) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

مَنْ يُرَائِي يُرَائِي اللَّهُ بِهِ وَمَنْ يُسَمِّعْ يُسَمِّعِ اللَّهُ بِهِ

যে লোক মানুষকে দেখানোর উদ্দেশ্যে আমল করবে, আল্লাহ তায়ালাও তাকে তাই দেখাবেন এবং সুনাম-সুখ্যাতির অন্বেষণের উদ্দেশ্যে যে লোক আমল করবে, আল্লাহ তায়ালাও তার আমল প্রচার করে দেবেন। সুনানে তিরমিজি : ২৩৮১, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪২০৬

(৪) ছোট শিরক দাজ্জালের ফিতনা থেকেও ভয়ানকঃ

আবু সাঈদ খুদরী (রা.) বর্ণনা করেন—

خَرَجَ عَلَيْنَا رَسُوْلُ اللهِ صلى الله عليه وسلم، وَنَحْنُ نَتَذَاكَرُ الْـمَسِيْحَ الدَّجَّالَ، فَقَالَ: أَلاَ أُخْبِرُكُمْ بِمَا هُوَ أَخْوَفُ عَلَيْكُمْ عِنْدِيْ مِنَ الْـمَسِيْحِ الدَّجَّالِ؟ قُلْنَا: بَلَى، قَالَ: الشِّـرْكُ الْـخَفِيُّ؛ أَنْ يَقُوْمَ الرَّجُلُ يُصَلِّيْ، فَيُزَيِّنُ صَلاَتَهُ لِمَا يَرَى مِنْ نَظَرِ الرَّجُلِ

রাসুল ﷺ আমাদের নিকট আসলেন যখন আমরা দাজ্জাল সম্পর্কে আলোচনা করছিলাম। তিনি বললেন, আমি কি তোমাদেরকে এমন বস্তু সম্পর্কে সংবাদ দেবো, যা তোমাদের জন্য দাজ্জালের চেয়েও অধিক ভয়ঙ্কর। আমরা বললাম, হ্যাঁ, অবশ্যই। তিনি বললেন, গোপন শিরক (রিয়া)। যেমন, কোনো ব্যক্তি নামাজ পড়ছিলো, অতঃপর কেউ তাকে দেখছে বলে সে নামাজকে খুব সুন্দর করে পড়তে শুরু করলো”। সুনানে ইবনু মাজাহ: ৪২০৪, আহমাদ : ১০৮৫৯, মিশকাত : ৫৩৩৩ 

(৫) ছোট শিরক সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর দুঃচিস্তাঃ

শাদ্দাদ ইবনে আওস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

إِنَّ أَخْوَفَ مَا أَتَخَوَّفُ عَلَى أُمَّتِي الإِشْرَاكُ بِاللَّهِ أَمَا إِنِّي لَسْتُ أَقُولُ يَعْبُدُونَ شَمْسًا وَلاَ قَمَرًا وَلاَ وَثَنًا وَلَكِنْ أَعْمَالاً لِغَيْرِ اللَّهِ وَشَهْوَةً خَفِيَّةً

আমি আমার উম্মাতের জন্য যেসব বিষয়ের ভয় করি তার মধ্যে অধিক আশংকাজনক হচ্ছে আল্লাহর সঙ্গে শিরক করা। অবশ্য আমি এ কথা বলছি না যে, তারা সূর্য, চন্দ্র বা প্রতিমার পূজা করবে, বরং আল্লাহ ব্যতীত অপরের সন্তুষ্টির জন্য কাজ করা এবং গোপন পাপাচার। সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪২০৫, মসনদে আহমাদ : ১৬৬৭১, ১৬৬৯০

শিরকে আসগার বা ছোট শিরক চেনায় উপায়ঃ

(১) যে সব শিরককে কুরআন ও সুন্নায় ছোট শিরক বলা হয়েছে, যতক্ষণ না সেগুলো বড় শিরকের পর্যায়ে পৌঁছে সেগুলো শিরকে আসগার বা ছোট শিরক বলে বিবেচিত হবে।

(২) আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করা যায় এমন কাজ যদি বান্দা কোন মানুষের প্রশংসা লাভের ইচ্ছায় করে তবে সেই আমল শিরকে আসগার বা ছোট শিরক  বলে বিবেচিত হবে।

(৩) আল্লাহর রুবুবিয়াতের সমপরিমাণ মর্যাদা না হওয়া পর্যান্ত শিরকে আসগার বা ছোট শিরক বলে বিবেচিত হবে। (সমপরিমাণ মর্যাদা দিলে বড় শিরক হবে)।

(৪) আমলটি শুরু হয়েছে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্য ছিল কিন্তু পরে তাতে রিয়া প্রবেশ করেছে। আমলকারী যদি উক্ত রিয়াকে প্রত্যাখ্যান করে এবং তাকে প্রতিহত করতে থাকে, তবে কোন ক্ষতি নেই কিন্তু সে যদি রিয়া চালিয়ে যায় এবং তাতেই সন্তুষ্ট থাকে, তাহলে তার আমলটি ছোট শিরক বলে বিবেচিত হবে।

ছোট শিরক সময়ের সাথে সম্পৃক্ত থাকে

মুমিন বান্দা মহান আল্লাহ সন্ত্বষ্টির জন্য আমল করবে এটাই সাভাবিক। কিন্তু তার আমল করা সময় তার কুপ্রবৃত্তি বার বার দুয়িয়ার লোভ দেখিয়ে গাইরুল্লাহর জন্য ইবাদত করতে উদভূদ্ধ করে থাকে। সে যখনই আমল করার নিয়ত করে, তখনই তাকে ধোকা দেয়। আবার কখনো শুরুতে ধোকা দিতে ব্যর্থ হলে আমলের মাঝে বা শেষেও ধোকা দিতে চেষ্টা করে। এ সকল বিষয় বিবেচনা করে বলা যায় ছোট শিরক সাধারনত তিনটি সময়ের সাথে সম্পৃক্ত থেকে সম্পাদিত হয়।

(১) আমল শুরু করার পূর্বে ছোট শিরক

(২) আমল শুরু করার মাঝে ছোট শিরক

(৩) আমল শেষ করার পর ছোট শিরক

(১) আমল শুরু করার পূর্বে ছোট শিরক

কোন আমল শুরু করার পূর্বে মানুষের প্রশংসা লাভের ইচ্ছা করে এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করার কোন ইচ্ছাই তার নেই, তবে সে মুনাফিক। কারন সকলে জানবে, সে আল্লাহর সন্তষ্টি অর্জন করছে অথচ সে গাইরুল্লারকে সন্তষ্টি করছে। নবী ﷺ এর জামানায় মুমিনেরা বিপুল উৎসাহ আগ্রহ নিয়ে মসজিদে আসতো, জামায়াতের সময়ের পূর্বেই মসজিদে পৌঁছে যেতো এবং নামায শেষ হবার পরও মসজিদে বসে থাকতো। কোন ব্যক্তি নিয়মিত নামায না পড়ে মুসলমানদের দলের অন্তরভুক্ত হতে পারতো। তাই বড় বড় কট্টর মুনাফিকদেরও সে যুগে পাঁচ ওয়াক্ত মসজিদে হাযিরা দিতে হতো। অপর পক্ষে মুনাফিকেরা অনিচ্ছায় স্বত্বেও নেহাত দায়ে ঠেকে লোক দেখাতে মসজিদে আসত। এই মুনাফিকরা আল্লাহর এবং তার রসুলের (সা:) সাথে ধোঁকাবাজি করছে এবং নিছক লোক দেখাবার জন্য সালাত আদায় করছে। আমল  শুরু পূর্বেই লোক দেখাবার পাক্কা নিয়ত। মহান আল্লাহ তায়ালান বলেন:

 إِنَّ ٱلۡمُنَـٰفِقِينَ يُخَـٰدِعُونَ ٱللَّهَ وَهُوَ خَـٰدِعُهُمۡ وَإِذَا قَامُوٓاْ إِلَى ٱلصَّلَوٰةِ قَامُواْ كُسَالَىٰ يُرَآءُونَ ٱلنَّاسَ وَلَا يَذۡكُرُونَ ٱللَّهَ إِلَّا قَلِيلاً۬ (١٤٢)

এই মুনাফিকরা আল্লাহর সাথে ধোঁকাবাজি করছে৷ অথচ আল্লাহই তাদেরকে ধোঁকার মধ্যে ফেলে রেখে দিয়েছেন৷ তারা যখন নামাযের জন্য ওঠে, আড়মোড়া ভাংতে ভাংতে শৈথিল্য সহকারে নিছক লোক দেখাবার জন্য ওঠে এবং আল্লাহকে খুব কমই স্মরণ করে৷ সুরা নিসা : ১৪২

(২) আমল শুরু করার মাঝে ছোট শিরক

ইবাদাত করাকালীন বা চলাকালীন মধ্যবর্তী সময়ে অন্য কেউ তা দেখে ফেললে বা অবহিত হয়ে গেলে তাতে আনন্দিত ও উল্লাসিত হয়ে লোক দেখানোর জন্য ইবাদাতকে আরো সুন্দর করার চেষ্টা করলে আমল মাঝে রিয়া প্রবেশ করে। আমল শুরুর প্রাথমিক নিয়ত ভাল ছিল কিন্তু আমলের মাঝেই লোক দেখানোর (রিয়া) ইচ্ছা পোষন করে। আমলকারী যদি উক্ত রিয়াকে প্রত্যাখ্যান করে এবং তাকে প্রতিহত করতে থাকে, তবে কোন ক্ষতি নেই কিন্তু সে যদি রিয়া চালিয়ে যায় এবং তাতেই সন্তুষ্ট থাকে, তাহলে তার আমলটি বাতিল হয়ে যাবে। কারন সে পরবর্তীতে তার আমল লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে করতে শুরু করেছে।

আবূ যার (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন-

قِيلَ لِرَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم أَرَأَيْتَ الرَّجُلَ يَعْمَلُ الْعَمَلَ مِنَ الْخَيْرِ وَيَحْمَدُهُ النَّاسُ عَلَيْهِ قَالَ ‏ “‏ تِلْكَ عَاجِلُ بُشْرَى الْمُؤْمِنِ

রসূলুল্লাহ ﷺ এর সমীপে আবেদন করা হলো, ঐ লোক সম্পর্কে আপনার কি মতামত, যে সৎ আমল করে এবং মানুষেরা তার গুণ বর্ণনা করে? তিনি বললেন, এটা তো ঈমানদার ব্যক্তির জন্য আগাম সুসংবাদ। সহিহ মুসলিম : ২৬৪২, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪২২৫, আহমাদ : ২০৮৭২, ২০৯৬৬

এখানে তিনটি সুরত আছে:

খ। আমল শুরু মাঝে রিয়া আসলে আমলকারী যদি উক্ত রিয়াকে প্রত্যাখ্যান করলে আমল বাতিল হবে না।

কোন ব্যক্তি একনিষ্ঠভাবে একমাত্র আল্লাহ্‌র নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে কুরবানীর জন্য গরু ক্রয় করল। এমতাবস্থায় গরুর প্রতি নজর দিয়ে সে ভাবল খুব রড় গরু লোকে ভাল বলবে আবার মাংশও বেশী পাব অর্থাৎ তার অন্তরে রিয়ার উদ্রেক হলো। সাথে সাথে সে তার অন্তর থেকে এই কুমন্ত্রণা ও কুমনোভাব দূর করার যথাসাধ্য চেষ্টা করল। এবং এক মাত্র আল্লাহর সন্ত্বষ্টির জন্য কুরবানী  সম্পন্ন করল, তাহলে এই রিয়া তার ‘আমালে কোন প্রভাব ফেলবে না এবং আল্লাহ চাহেতো তার এই  কুরবানী বাতিল হবে না।

খ। আমল শুরু মাঝে রিয়া আসলে আমলকারী যদি উক্ত রিয়াকে প্রত্যাখ্যান না করলে আমল বাতিল হবে।

যদি সে ব্যক্তি তার অন্তরের এই কুমন্ত্রণা দূর করার এবং ‘আমালকে রিয়ামুক্ত করার চেষ্টা না করে, বরং রিয়া তথা লোক দেখানোর উদ্দেশ্য অন্তরে পোষণ করেই আমাল সম্পন্ন করে থাকে, তাহলে তার এই ‘আমাল সম্পূর্ণ বাতিল ও বিনষ্ট হয়ে যাবে। নিছুক লোক দেখাবার জন্য সে যেসব কাজ করে সেগুলো সুস্পষ্টভাবে একথাই প্রকাশ করে যে, সৃষ্টিকেই সে আল্লাহ মনে করে এবং তার কাছ থেকেই নিজের কাজের প্রতিদান চায়। আল্লাহর কাছ থেকে সে প্রতিদানের আশা করে না। একদিন সমস্ত কাজের হিসেব-নিকেশ করা হবে এবং প্রতিদান দেয়া হবে, একথাও সে বিশ্বাস করে না।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا لَا تُبۡطِلُوۡا صَدَقٰتِکُمۡ بِالۡمَنِّ وَالۡاَذٰی ۙ کَالَّذِیۡ یُنۡفِقُ مَالَہٗ رِئَآءَ النَّاسِ وَلَا یُؤۡمِنُ بِاللّٰہِ وَالۡیَوۡمِ الۡاٰخِرِ ؕ فَمَثَلُہٗ کَمَثَلِ صَفۡوَانٍ عَلَیۡہِ تُرَابٌ فَاَصَابَہٗ وَابِلٌ فَتَرَکَہٗ صَلۡدًا ؕ لَا یَقۡدِرُوۡنَ عَلٰی شَیۡءٍ مِّمَّا کَسَبُوۡا ؕ وَاللّٰہُ لَا یَہۡدِی الۡقَوۡمَ الۡکٰفِرِیۡنَ

হে মুমিনগণ, তোমরা খোঁটা ও কষ্ট দেয়ার মাধ্যমে তোমাদের সদাকা বাতিল করো না। সে ব্যক্তির মত, যে তার সম্পদ ব্যয় করে লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে এবং বিশ্বাস করে না আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি। অতএব তার উপমা এমন একটি মসৃণ পাথর, যার উপর রয়েছে মাটি। অতঃপর তাতে প্রবল বৃষ্টি পড়ল, ফলে তাকে একেবারে পরিষ্কার করে ফেলল। তারা যা অর্জন করেছে তার মাধ্যমে তারা কোন কিছু করার ক্ষমতা রাখে না। আর আল্লাহ কাফির জাতিকে হিদায়াত দেন না। সুরা বাকারা : ২৬৪

আল্লাহ এই উপমায় প্রবল বর্ষণ বলতে বান্দা নিয়ত আর মাটির দ্বারা তার দান খয়রাতকে বুঝানো হয়েছে। প্রবল বর্ষণের ফলে সমস্ত মাটি ধুয়ে গেলো অর্থাৎ লোক দেখাবার জন্য সমস্ত আমল নষ্ট হয়ে গেল। 

গ। উভয় অংশের আলাদা আলাদা নেকি/গুনাহ থাকবে।

আমলটি শুরু হয়েছে আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টির উদ্দেশে কিন্তু পরে তাতে রিয়া প্রবেশ করেছে। এ অবস্থায় ‘আমালটির  যদি এমন হয় যে, তার এক অংশ অপর অংশের উপর নির্ভরশীল নয় বরং তার প্রতিটি অংশ পৃথক পৃথক ও স্বয়ংসম্পূর্ণ, তাহলে সেই আমাল সে অংশটুকু রিয়া মিশ্রিত হবে, শুধুমাত্র সে অংশটুকু বাত্বিল হয়ে যাবে, তবে তার সম্পূর্ণ ‘আমাল বাত্বিল হবে না। যেমন-

কোন ব্যক্তি একমাত্র মহান আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে কিছু  টাকা মসজিদে দান করার নিয়তে বাড়ি থেকে মসজিদে জুমার সালাতে হাজির হল। মসজিদে এসে কিছু টাকা দানও করল, ইতোমধ্যে ইমাম সাহেবের খুতবা শুনে অনেক মুসল্লী দান করা শুরু করলো। অনেক মুসল্লীকে ইমাম সাহেব বাহবা দিচ্ছে এবং তার প্রশংসা করছে। তখন সে আরো বেশি বাহবা ও প্রশংসা কুড়ানোর উদ্দেশ্যে বা লোক দেখানোর জন্য আবার দান করল। এমতাবস্থায় তার দানকৃত প্রথম টাকা আল্লাহ্‌র নিকট গৃহীত হবে এবং পরবর্তীতে দানকৃত টাকা রিয়ার কারনে আল্লাহ্‌র নিকট বাতিল ও প্রত্যাখ্যাত বলে গণ্য হবে।

(৩) আমল শেষ করার পর ছোট শিরক

শিরকে আসগার বা ছোট শিরকের সাধারনত ইচ্ছা, সংকল্প ও নিয়্যাতের দ্বারা  সঙ্গটিত হয়। আমল শেষ করার পর ইচ্ছা, সংকল্প বা নিয়্যাত করার আর কোন বাধ্যবাধকতা থাকে না। তাই আমল শেষ করার পর রিয়া অনুভুত হওয়া শয়তানের ওয়াসওয়াসা মাত্র এতে আমলকারীর আমলেন উপর কোন প্রভাব পরবেনা। আল্লাহ্‌র জন্যে পূর্ণ নিষ্ঠা ও ইখলাসের সাথে কোন আমাল আরম্ভ ও সম্পন্ন করার পর অন্তরে রিয়ার উদ্ভব হওয়া আর না হওয়া সমান কথা। যেমন-

অনেক সময় লোকজনের মুখে নিজের আমাল সম্পর্কে প্রশংসা শুনে নীরবে আত্মতৃপ্তি ও গর্ববোধ হয়। যদিও এটা রিয়া কিন্তু এ জাতীয় রিয়া, সম্পাদিত সেই আমালের কোন ক্ষতি করতে পারবেনা এবং এর দ্বারা আমল বাতিল বা বিনষ্ট হবে না। কেননা তা আমল সম্পন্ন হওয়ার পর প্রকাশ পেয়েছে। এ সম্পর্কে একটি হাদিস হলো-

আবূ হুরাইরা (রা.) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন-

رَجُلٌ يَا رَسُولَ اللَّهِ الرَّجُلُ يَعْمَلُ الْعَمَلَ فَيُسِرُّهُ فَإِذَا اطُّلِعَ عَلَيْهِ أَعْجَبَهُ ذَلِكَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏”‏ لَهُ أَجْرَانِ أَجْرُ السِّرِّ وَأَجْرُ الْعَلاَنِيَةِ ‏”

এক ব্যক্তি বলল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! কোন লোক খুবই গোপনে কোন আমল করে কিন্তু অন্যরা তা জেনে ফেললে তাতেও তার আনন্দ লাগে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, তার জন্য দ্বিগুণ সাওয়াব, একটি গোপনে আমল করার জন্য এবং অপরটি প্রকাশ হয়ে পড়ার জন্য। সুনানে তিরমিজি : ২৩৮৪, সুনানে  ইবনু মাজাহ : ৪২২৬ মান জঈফ।

প্রশংসা শুনে আত্মতৃপ্তি ও গর্ববোধ করা করা ঠিক নয় বরং ইহার পরিবর্তে মহান আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা উচিৎ কারন তিনিই তো আমাকে আমল করার সুযোগ দিয়েছেন।

ছোট শিরক সম্পর্কে যে দুটি বিষয় জানা দরকারঃ

(১) গোপন আমল প্রকাশ পেলেও রিয়া হবে নাঃ

আবূ যার (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন-

قِيلَ لِرَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم أَرَأَيْتَ الرَّجُلَ يَعْمَلُ الْعَمَلَ مِنَ الْخَيْرِ وَيَحْمَدُهُ النَّاسُ عَلَيْهِ قَالَ ‏ “‏ تِلْكَ عَاجِلُ بُشْرَى الْمُؤْمِنِ

রসূলুল্লাহ ﷺ এর সমীপে আবেদন করা হলো, ঐ লোক সম্পর্কে আপনার কি মতামত, যে সৎ আমল করে এবং মানুষেরা তার গুণ বর্ণনা করে? তিনি বললেন, এটা তো ঈমানদার ব্যক্তির জন্য আগাম সুসংবাদ। সহিহ মুসলিম : ২৬৪২, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪২২৫, আহমাদ : ২০৮৭২, ২০৯৬৬

আবূ হুরাইরা (রা.) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন-

رَجُلٌ يَا رَسُولَ اللَّهِ الرَّجُلُ يَعْمَلُ الْعَمَلَ فَيُسِرُّهُ فَإِذَا اطُّلِعَ عَلَيْهِ أَعْجَبَهُ ذَلِكَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏”‏ لَهُ أَجْرَانِ أَجْرُ السِّرِّ وَأَجْرُ الْعَلاَنِيَةِ ‏”

এক ব্যক্তি বলল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! কোন লোক খুবই গোপনে কোন আমল করে কিন্তু অন্যরা তা জেনে ফেললে তাতেও তার আনন্দ লাগে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, তার জন্য দ্বিগুণ সাওয়াব, একটি গোপনে আমল করার জন্য এবং অপরটি প্রকাশ হয়ে পড়ার জন্য। সুনানে তিরমিজি : ২৩৮৪, সুনানে  ইবনু মাজাহ : ৪২২৬ মান জঈফ।

আবদুল্লাহ্ ইবন ’আমর (রা.) মহানবী ﷺ জিজ্ঞাসা করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাকে জিহাদ ও যুদ্ধ সম্বন্ধে বলুন, এর কোনটি আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য? তিনি বলেন, হে আবদু্ল্লাহ ইবন ’আমর! যদি তুমি ধৈর্যের সাথে আল্লাহ নিকট হতে পুণ্য লাভের আশায় যুদ্ধ কর তবে আল্লাহ্ তোমাকে গর্বিত ও লোক দেখানোরূপে চিহিৃত করবেন। হে আবদুল্লাহ্ ইবন ’আমর! তুমি যে অবস্থায় যুদ্ধ কর বা মারা যাও তোমাকে সে অবস্থায় তোমার নিয়্যাত অনুযায়ী আল্লাহ্ উত্থিত করবেন। সুনানে আবু দাউদ : ২৫১১

(২) সমালোচনার ভয়ে নেক আমল ছেড়ে দেওয়া যাবে নাঃ

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

يَـٰٓأَيُّہَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ مَن يَرۡتَدَّ مِنكُمۡ عَن دِينِهِۦ فَسَوۡفَ يَأۡتِى ٱللَّهُ بِقَوۡمٍ۬ يُحِبُّہُمۡ وَيُحِبُّونَهُ ۥۤ أَذِلَّةٍ عَلَى ٱلۡمُؤۡمِنِينَ أَعِزَّةٍ عَلَى ٱلۡكَـٰفِرِينَ يُجَـٰهِدُونَ فِى سَبِيلِ ٱللَّهِ وَلَا يَخَافُونَ لَوۡمَةَ لَآٮِٕمٍ۬‌ۚ ذَٲلِكَ فَضۡلُ ٱللَّهِ يُؤۡتِيهِ مَن يَشَآءُ‌ۚ وَٱللَّهُ وَٲسِعٌ عَلِيمٌ (٥٤)

হে মুমিনগণ! তোমাদের মধ্য হতে যে ব্যক্তি স্বীয় ধর্ম হতে বিচ্যুত হবে, আল্লাহ সত্ত্বরই এমন এক সম্প্রদায় সৃষ্টি করবেন যাদেরকে আল্লাহ ভালবাসবেন এবং তারাও আল্লাহকে ভালবাসবে, তারা মুসলিমদের প্রতি মেহেরবান থাকবে, কাফিরদের প্রতি কঠোর হবে, তারা আল্লাহর পথে জিহাদ করবে আর তারা কোন নিন্দুকের নিন্দার পরওয়া করবেনা। এটা আল্লাহর অনুগ্রহ, তা তিনি যাকে ইচ্ছা প্রদান করেন; বস্তুতঃ আল্লাহ প্রাচুর্য দানকারী, মহাজ্ঞানী। সুরা মায়েদা : ৫৪

আবূ মাস’ঊদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন সাদকার আয়াত অবতীর্ণ হল তখন আমরা পারিশ্রমিকের বিনিময়ে বোঝা বহন করতাম। এক ব্যাক্তি এসে প্রচুর মাল সাদকা করলো। তারা (মুনাফিকরা) বলতে লাগল, এ ব্যাক্তি লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে দান করেছে, আর এক ব্যাক্তি এসে সা’ পরিমাণ দান করলে তারা বললো, আল্লাহ তো এ ব্যাক্তির এক সা’ থেকে অমুখাপেক্ষী। এ প্রসংগে অবতীর্ণ হয়, (আল্লাহ বলেন)-

اَلَّذِیۡنَ یَلۡمِزُوۡنَ الۡمُطَّوِّعِیۡنَ مِنَ الۡمُؤۡمِنِیۡنَ فِی الصَّدَقٰتِ وَالَّذِیۡنَ لَا یَجِدُوۡنَ اِلَّا جُہۡدَہُمۡ فَیَسۡخَرُوۡنَ مِنۡہُمۡ ؕ سَخِرَ اللّٰہُ مِنۡہُمۡ ۫ وَلَہُمۡ عَذَابٌ اَلِیۡمٌ

যারা দোষারোপ করে সদাকার ব্যাপারে মুমিনদের মধ্য থেকে স্বেচ্ছাদানকারীদেরকে এবং তাদেরকে যারা তাদের পরিশ্রম ছাড়া কিছুই পায় না। অতঃপর তারা তাদেরকে নিয়ে উপহাস করে, আল্লাহও তাদেরকে নিয়ে উপহাস করেন এবং তাদের জন্যই রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক আযাব, তাওবা-৭৯। সহিহ বুখারি : ১৪১৫

উবাদাহ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, আমরা রসূলুল্লাহ ﷺ এর হাতে বাইআত হলাম এ মর্মে যে, আমরা শুনবো ও মানবো, সংকটের সময় ও স্বাচ্ছন্দ্যের সময়, খুশীর অবস্থায় ও অপছন্দের অবস্থায় এবং আমাদের উপর অন্যদেরকে প্রাধান্য দিলেও। আর এ মর্মে যে, আমরা যোগ্য ব্যক্তির নেতৃত্ব বরণ করে নিতে কোনরূপ কোন্দল করবো না। আর এ মর্মে যে, আমরা যেখানেই থাকবো হক কথা বলব। আল্লাহর ব্যাপারে কোন নিন্দুকের নিন্দার ভয় করবো না। সহিহ মুসলিম : ১৭০৯

আবূ সাঈদ আল-খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ ভাষণ দিতে দাঁড়ালেন এবং তাঁর ভাষণে বলেন, সাবধান! মানুষের ভয় যেন কোন ব্যক্তিকে সজ্ঞানে সত্য কথা বলতে বিরত না রাখে। রাবী বলেন আবূ সাঈদ (রা.) কেঁদে দিলেন এবং বললেন, আল্লাহর শপথ! আমরা বহু কিছু লক্ষ্য করেছি কিন্তু বলতে ভয় পাচ্ছি। সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪০০৭, সুনানে তিরমিযী : ২১৯১, সহীহাহ : ১৬৮

মুমিনের অন্যতাম বৈশিষ্ট হলো, মহান আল্লাহর আনুগত্য ও হুকুম পালনের ক্ষেত্রে কোন কোন নিন্দুকের নিন্দার ভয় বা পরোয়া করবে না। আমাদের সমাজে অনেক মুসলিম আছে যারা আল্লাহর হুকুম মত জীবন চালাত চায় কিন্তু নিন্দুকের নিন্দা ও তিরস্কারের মোকাবেলা করার মত ক্ষমতা নেই বলে তারা আমল ছেড়ে দেয়। অনেক যুবক আছে তারা দাড়ি রাখতে চায় কিন্তু নিন্দুকের নিন্দার ভয়ে দাড়ি রাখছে না।

বিশ্বাসের দ্বারা ছোট শিরক

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

ছোট শিরক শ্রেণী বিভাগ আলোচনায় চারটি ভাগে বিভক্ত করেছিলাম। এখানে সেই চারটি শ্রেণীর ছোট শিরককে ধারাবাহিকভাবে আলোচনা করছি। চার প্রকারের ছোট শিরক হলো-

(১) বিশ্বাসের দ্বারা ছোট শিরক

(২) কথার দ্বারা ছোট শিরক

(৩) কর্মের দ্বারা ছোট শিরক

(৪) ইবাদতের ছোট শিরক বা রিয়া

বিশ্বাসের দ্বারা ছোট শিরক

১। কোন ব্যক্তি বা বস্তুত আচার আচরণে কল্যান অকল্যায় রয়েছে বলে বিশ্বাস করাঃ

মহান আল্লাহকে কল্যান অকল্যান একমাত্র মালিক বিশ্বাস করেও যদি কেউ কোন ব্যক্তি বা বস্তু আচার আচরণে বা দর্শণে কল্যান অকল্যান আছে মনে করে, তবে তা ছোট শিরক হবে। আল্লাহতে বিশ্বাসি কোন বান্দা কোন ব্যক্তি বা বস্তুর আচার আচরণে বা দর্শণে কল্যান অকল্যান কথা চিন্তা করতে পারে না। ব্যক্তি, বস্তু, প্রানী বা পাখি দর্শণেই অমঙ্গল বিশ্বাস করা কিংবা তাদের কোনরূপ আচরণ, ডাক, শব্দ বা ধ্বনির শ্রবণকে অকল্যান বিশ্বাস করা ছোট শিরকের পর্যায় পড়বে। যুগ যুগ ধরেই জাতীয় কুলক্ষণবোধ বিশ্বাস আমাদের সমাজে প্রচলিত আছে। মূসা (আ.) কে তার সম্প্রদায় অমঙ্গল হিসাবে বিশ্বাস করত। মহান আল্লাহ বলেন-

فَاِذَا جَآءَتۡہُمُ الۡحَسَنَۃُ قَالُوۡا لَنَا ہٰذِہٖ ۚ وَاِنۡ تُصِبۡہُمۡ سَیِّئَۃٌ یَّطَّیَّرُوۡا بِمُوۡسٰی وَمَنۡ مَّعَہٗ ؕ اَلَاۤ اِنَّمَا طٰٓئِرُہُمۡ عِنۡدَ اللّٰہِ وَلٰکِنَّ اَکۡثَرَہُمۡ لَا یَعۡلَمُوۡنَ

অতঃপর যখন তাদের কাছে কল্যাণ আসত, তখন তারা বলত, ‘এটা আমাদের জন্য।’ আর যখন তাদের কাছে অকল্যাণ পৌঁছত তখন তারা মূসা ও তার সঙ্গীদেরকে অশুভলক্ষণে মনে করত। তাদের কল্যাণ-অকল্যাণ তো আল্লাহর কাছে। কিন্তু তাদের অধিকাংশ জানে না। সুরা আরাফ : ১৩১

সামূদ জাতিও তাদের নবীকে অমঙ্গল মনে করত। এই সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন-

) قَالُواْ ٱطَّيَّرۡنَا بِكَ وَبِمَن مَّعَكَ‌ۚ قَالَ طَـٰٓٮِٕرُكُمۡ عِندَ ٱللَّهِ‌ۖ بَلۡ أَنتُمۡ قَوۡمٌ۬ تُفۡتَنُونَ

তারা বলল, আমরা তো তোমাদেরকে ও তোমার সাথীদেরকে অমঙ্গলের নিদর্শন হিসেবে পেয়েছি৷ সালেহ জবাব দিল, “তোমাদের মঙ্গল অমঙ্গলের উৎস তো আল্লাহর হাতে নিবদ্ধ, আসলে তোমাদের পরীক্ষা করা হচ্ছে৷ সুরা নমল : ৪৭

পূর্বের নবি রাসূলগন অমঙ্গল মনে করার আগেকটি প্রমান হলো। মহান আল্লাহ আরও বলেন-

قَالُوْا إِنَّا تَطَيَّرْنَا بِكُمْ، لَئِنْ لَمْ تَنْتَهُوْا لَنَرْجُمَنَّكُمْ وَلَيَمَسَّنَّكُمْ مِنَّا عَذَابٌ أَلِيْمٌ، قَالُوْا طَائِرُكُمْ مَعَكُمْ، أَئِنْ ذُكِّرْتُمْ، بَلْ أَنْتُمْ قَوْمٌ مُسْرِفُوْنَ

তারা বলল, ‘আমরা তো তোমাদেরকে অমঙ্গলের কারণ মনে করি। তোমরা যদি বিরত না হও তাহলে আমরা অবশ্যই তোমাদেরকে পাথর মেরে হত্যা করব এবং আমাদের পক্ষ থেকে তোমাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক আযাব স্পর্শ করবে’। সুরা ইয়াসিন : ১৮

অথচ সকল কল্যান আসে আল্লাহর পক্ষ থেকে আর অকল্যান হল আমাদের খারাপ কাজের ফল। মহান আল্লাহ বলেন-

أَيۡنَمَا تَكُونُواْ يُدۡرِككُّمُ ٱلۡمَوۡتُ وَلَوۡ كُنتُمۡ فِى بُرُوجٍ۬ مُّشَيَّدَةٍ۬‌ۗ وَإِن تُصِبۡهُمۡ حَسَنَةٌ۬ يَقُولُواْ هَـٰذِهِۦ مِنۡ عِندِ ٱللَّهِ‌ۖ وَإِن تُصِبۡهُمۡ سَيِّئَةٌ۬ يَقُولُواْ هَـٰذِهِۦ مِنۡ عِندِكَ‌ۚ قُلۡ كُلٌّ۬ مِّنۡ عِندِ ٱللَّهِ‌ۖ فَمَالِ هَـٰٓؤُلَآءِ ٱلۡقَوۡمِ لَا يَكَادُونَ يَفۡقَهُونَ حَدِيثً۬ا

আর মৃত্যু, সে তোমরা যেখানেই থাকো না কেন সেখানে তোমাদের লাগাল পাবেই, তোমরা কোন মজবুত প্রসাদে অবস্থান করলেও৷ যদি তাদের কোন কল্যাণ হয় তাহলে তারা বলে, এতো আল্লাহর পক্ষ থেকে হয়েছে৷ আর কোন ক্ষতি হলে বলে, এটা হয়েছে তোমার বদৌলতে৷ বলে দাও, সবকিছুই হয় আল্লাহর পক্ষ থেকে৷ লোকদের কী হয়েছে, কোন কথাই তারা বোঝে না৷ সুরা নিসা : ৭৮

সাধারণ মানুষ যে পশু, পাখি ও বস্তুতে কল্যায় অকল্যান মনে করি সে সম্পর্কে হাদিসে সঠিক দিক নির্দেশন দিয়ে বলা হয়েছে, কোন কিছুতেই মঙ্গল অমঙ্গল নাই।

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

لاَ عَدْو‘ى وَلاَ طِيَرَةَ وَلاَ هَامَةَ وَلاَ صَفَرَ وَفِرَّ مِنَ الْمَجْذُومِ كَمَا تَفِرُّ مِنْ الأَسَدِ.

রোগের কোন সংক্রমণ নেই, কুলক্ষণ বলে কিছু নেই, পেঁচা অশুভের লক্ষণ নয়, সফর মাসের কোন অশুভ নেই। কুষ্ঠ রোগী থেকে দূরে থাক, যেভাবে তুমি বাঘ থেকে দূরে থাক। সহিহ বুখারি : ৫৭০৭,

আবু হুরাইরাহ্ (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন-

لاَ عَدْوَى وَلاَ طِيَرَةَ وَلاَ هَامَةَ وَلاَ صَفَرَ وَلاَ نَوْءَ وَلاَ غُوْلَ، فَقَالَ أَعْرَابِيٌّ: يَا رَسُوْلَ اللهِ! فَمَا بَالُ الإِبِلِ تَكُوْنُ فِيْ الرَّمْلِ كَأَنَّهَا الظِّبَاءُ، فَيَجِيْءُ الْبَعِيْرُ الأَجْرَبُ فَيَدْخُلُ فِيْهَا، فَيُجْرِبُهَا كُلَّهَا، قَالَ: فَمَنْ أَعْدَى الْأَوَّلَ؟

ছোঁয়াচে রোগ বলতে কিছুই নেই। কুলক্ষণ বলতেই তা একান্ত অমূলক। হুতোম পেঁচা, সফর মাস, রাশি-তারকা অথবা পথ ভুলানো ভূত কারোর কোন ক্ষতি করতে পারে না। তখন এক গ্রাম্য ব্যক্তি বললো, হে আল্লাহ্’র রাসূল! কখনো এমন হয় যে, মরুভূমির মধ্যে শায়িত কিছু উট। দেখতে যেমন হরিণ। অতঃপর দেখা যাচ্ছে, চর্ম রোগী একটি উট এসে এগুলোর সাথে মিশে গেলো। তাতে করে সবগুলো উট চর্ম রোগী হয়ে গেলো। তখন রাসূল (সা.) বললেন: বলো তো: প্রথমটির চর্ম রোগ কোথা থেকে এসেছে? সহিহ বুখারি : ৫৭১৭, ৫৭৭০, ৫৭৭৩, সহিহ মুসলিম : ২২২০

আব্দুল্লাহ্ বিন্ মাসঊদ (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন:

الطِّيَرَةُ شِرْكٌ ـ ثَلاَثًا ـ وَمَا مِنَّا إِلاَّ … وَلَكِنَّ اللهَ يُذْهِبُهُ بِالتَّوَكُّلِ

কোনো বস্তুকে কুলক্ষণ মনে করা শিরক, কোনো বন্তুকে কুলক্ষণ ভাবা শিরক। একথা তিনি তিনবার বললেন। আমাদের কারো মনে কিছু জাগা স্বাভাবিক, কিন্তু আল্লাহর উপর ভরসা করলে তিনি তা দূর করে দিবেন। সুনানে আবু দাউদ : ৩৯১০, সুনানে তিরমিজি : ১৬১৪, সুনানে ইবনু মাজাহ :  ৩৬০৪,  ইবনু হিববান : ১৪২৭

আমাদের বিশ্বাস করতে হবে কোন ব্যক্তি, বস্তু, প্রানী বা পাখি আল্লাহর কল্যায় অকল্যানে ভাগ বসাতে পারে না। তিনিই একমাত্র যাবতীয় কল্যান ও অকল্যানের মালিক। তাই শরীয়ত সম্মত সব কাজ তারই উপর ভরসা করেই শুরু করে দিতে হবে। যদি কোন ব্যক্তি বা বস্তুর কুৎসিত রূপ দেখে অথবা কোন অরুচিকর বাক্য শুনে সে কাজ বন্ধ করে দেই তবে নিজের অজান্তেই শির্কে লিপ্ত হয়ে যাব।

মুয়াবিয়া বিন হাকাম্ সুলামী (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি রাসূল (সা.) কে জিজ্ঞাসা করেছিলাম-

وَمِنَّا رِجَالٌ يَتَطَيَّرُوْنَ، قَالَ: ذَاكَ شَيْءٌ يَجِدُوْنَهُ فِيْ صُدُوْرِهِمْ، فَلاَ يَصُدَّنَّهُمْ

আমাদের অনেকেই কোন না কোন কিছু দেখে বা শুনে কুলক্ষণ বোধ করেন। তখন রাসূল (সা.) বললেন: এটি হচ্ছে মনের ওয়াস্ওয়াসা। অতএব তারা যেন এ কারণে কোন কাজ বন্ধ না করে। সহিহ মুসলিম : ৫৩৭

আনাস্ (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন:

لاَ طِيَرَةَ، وَالطِّيَرَةُ عَلَى مَنْ تَطَيَّرَ، وَإِنْ يَكُ فِيْ شَيْءٍ فَفِيْ الدَّارِ وَالْفَرَسِ وَالْـمَرْأَةِ

শরীয়তের দৃষ্টিতে কুলক্ষণ বলতে কিছুই নেই। তবে অলক্ষণ শাস্তি সরূপ ওর পক্ষে হতে পারে যে শরীয়ত বিরোধীভাবে কোন বস্ত্ত বা ব্যক্তিকে অলক্ষুনে ভাবলো। শরীয়তের দৃষ্টিতে সত্যিকারার্থে যদি কোন বস্ত্তর মাঝে অকল্যাণ নিহিত থাকতো তা হলে ঘর-বাড়ি, গাড়ি-ঘোড়া ও স্ত্রীমহিলাদের মধ্যে তা থাকা যুক্তিসঙ্গত ছিলো’’। ইবনু হিববান : ৬০৯০

২। চাঁদ ও তারাকাজীকে শুভ অশুভ বিশ্বাস করা

অমুসলিমগণ তারকারাজীর পুজা করে। তারা তারকারাজীকে শুভ অশুভ বিশ্বাসও করে। যদি তাদের মত কোন মুসলিম তারকারাজীর পুজা করে তবে শিরকে আকবর হবে এবং সে ইসলাম থেকে বাহির হয়ে যাবে। কেননা, সে আল্লাহ ক্ষমতার সাথে তারকারাজীকে সম্পৃক্ত করেছে। যুগে যুগে এই শিরকি বিশ্বাস ও পুজা চলে আসছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় মুসলিমগন তারকারাজীর পুজা না করলেও মুশরিকদের দেখাদেখি ইহাকে শুভ অশুভ বিশ্বাসও করে যা মুলত শিরকে আসগর। যেহেতু আদম সন্তান তারকারাজী ব্যাপারে পুর্ব থেকেই শির্কে পতিত হয়ে আসছে, তাই আল্লাহ কুরআনে তারকারাজী ক্ষমতা, কাজ ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আমাদের জানিয়ে দিয়েছেন। কুরআনে তারকারাজী তিনটি বৈশিষ্ট্য ব্যতীত অন্য আর কোনো ক্ষমতা বা গুণাবলী আছে জানা যায় না।

(১) আকাশের সোভা বর্ধনের জন্য তারকারাজীকে সৃষ্টি করা হয়েছে।  মহান আল্লাহ বলেন:

وَلَقَدۡ زَيَّنَّا ٱلسَّمَآءَ ٱلدُّنۡيَا بِمَصَٰبِيحَ

‘আমরা দুনিয়ার আকাশকে সুশোভিত করেছি প্রদীপমালা দিয়ে’’। সূরা মুলক : ৫

(২) শয়তানের প্রতি নিক্ষেপ করার জন্য মহান আল্লাহ বলেন:

وَجَعَلۡنَٰهَا رُجُومٗا لِّلشَّيَٰطِينِۖ 

‘আর আমরা তা শয়তানদের প্রতি নিক্ষেপ করার জন্য প্রস্তুত রেখেছি’’। সূরা মুলক : ৫

 (৩) দিক নির্ণয়ের সাহায্য করি হিসাবে। মহান আল্লাহ বলেন-

وَعَلَٰمَٰتٖۚ وَبِٱلنَّجۡمِ هُمۡ يَهۡتَدُونَ 

আর পথ-নির্দেশক চি‎হ্নসমূহ, আরা তারকার মাধ্যমে তারা পথ পায়। সুরা নাহল :১৬

তারকারাজীকে শুভ অশুভ বিশ্বাস করা যাবে না। এই সম্পর্ক হাদিসে দিক নির্দশনা এসেছে।

যায়দ ইবনু খালিদ জুহানী (রা.) হতে বর্ণিত যে, তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল ﷺ রাতে বৃষ্টি হবার পর হুদায়বিয়াতে আমাদের নিয়ে ফজরের সালাত আদায় করলেন। সালাত শেষ করে তিনি লোকদের দিকে ফিরে বললেন, তোমরা কি জান, তোমাদের পরাক্রমশালী ও মহিমাময় প্রতিপালক কি বলেছেন? তাঁরা বললেন, আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলই বেশি জানেন। আল্লাহর রাসূল ﷺ বললেন, (রব) বলেন, আমার বান্দাদের মধ্য কেউ আমার প্রতি মু’মিন হয়ে গেল এবং কেউ কাফির। যে বলেছে, আল্লাহর করুণা ও রহমতে আমরা বৃষ্টি লাভ করেছি, সে হল আমার প্রতি বিশ্বাসী এবং নক্ষত্রের প্রতি অবিশ্বাসী। আর যে বলেছে, অমুক অমুক নক্ষত্রের প্রভাবে আমাদের উপর বৃষ্টিপাত হয়েছে, সে আমার প্রতি অবিশ্বাসী হয়েছে এবং নক্ষত্রের প্রতি বিশ্বাসী হয়েছে। সহিহ বুখারি ৮৪৬, ১০৩৮, ৪১৪৭, সহিহ মুসলিম : ৭১,

তারকারাজী মহান আল্লাহ এক বিশ্বয়কর সৃষ্টি ছাড়া আর কিছুই নয়। বিশ্বয়কর সৃষ্টি দেখে সৃষ্টিকর্তা মনে করা অজ্ঞ আদম সন্তারের খুব পুরান অভ্যাস। কাজেই তারকারাজী ব্যাপারটিও এর ব্যাতিক্রম হয়নি। তারকারাজী মানুষের ভাগ্য বা অন্য কোন ব্যাপারে বিশেষ কোন ক্ষমতা রাখে বিশ্বাস করা শিরক। আমাদের উপমহাদেশে অনেক হিন্দুদের চাঁদের প্রতি এই রূপ ধারনা করেত দেখা যায়। তারা চাঁদের তারিখ অনুযায়ী শুভ অশুভ বিশ্বাস করে নিশিপালন ও উপবাস করে থাকে। এই শুভ অশুভ উপর ভিত্তি করে তারা বিভিন্ন শুভ কাজ আরম্ভ করে থাকে। তাদের দেখা দেখি উপমহাদেশের অনেক অজ্ঞ মুসলিমও শুভ অশুভ দিন তারিখ দেখ কাজকর্ম করে থাকে যা ছোট শিরকের আওতাভূক্ত।

৩। অসীলা বলতে পীর ধরা বিশ্বাস করা

অসীলা সম্পর্কে কুরআনের সূরা মায়েদায় ৩৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন,

يَـٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ ٱتَّقُواْ ٱللَّهَ وَٱبۡتَغُوٓاْ إِلَيۡهِ ٱلۡوَسِيلَةَ وَجَـٰهِدُواْ فِى سَبِيلِهِۦ لَعَلَّڪُمۡ تُفۡلِحُونَ  

হে ঈমানদারগণ ! আল্লাহকে ভয় করো, তাঁর দরবারে নৈকট্যলাভের উপায় (অসীলা) অনুসন্ধান করো এবং তার পথে প্রচেষ্টা ও সাধনা করো, সম্ভবত তোমরা সফলকাম হতে পারবে৷ সুরা মায়েদা : ৩৫

সুফিবাদী অনেক আলেমকে এই আয়াতের ‘অসীলা’ শব্দের অর্থ করে পরিস্কার ভাবে বলেছেন, আল্লাহ  ‘অসীলা’ অনুসন্ধান করতে বলেছেন অর্থাৎ পীর ধরতে বলেছেন। অথচ এই আয়াতের ‘অসীলা’ সম্পর্কে ইবনে আব্বাস, আতা, মুজাহিদ (রহ.) এর মত হল আল্লাহ তা‘আলার নৈকট্য লাভ করা। কাতাদাহ বলেন, অসীলা’ শব্দের অর্থ পছন্দনীয় কাজের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা। আর এটাই হচ্ছে সাহাবিদের মত। কাজেই এমন আমল অনুসন্ধান করতে হবে যার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা যায়। অসীলা সম্পর্কে কুরআনে আল্লাহ আরো বলেন,

 قُلِ ٱدۡعُواْ ٱلَّذِينَ زَعَمۡتُم مِّن دُونِهِۦ فَلَا يَمۡلِكُونَ كَشۡفَ ٱلضُّرِّ عَنكُمۡ وَلَا تَحۡوِيلاً (٥٦)أُوْلَـٰٓٮِٕكَ ٱلَّذِينَ يَدۡعُونَ يَبۡتَغُونَ إِلَىٰ رَبِّهِمُ ٱلۡوَسِيلَةَ أَيُّہُمۡ أَقۡرَبُ وَيَرۡجُونَ رَحۡمَتَهُ ۥ وَيَخَافُونَ عَذَابَهُ ۥۤ‌ۚ إِنَّ عَذَابَ رَبِّكَ كَانَ مَحۡذُورً۬ا (٥٧)

এরা যাদেরকে ডাকে তারা তো নিজেরাই নিজেদের রবের নৈকট্যলাভের উপায় ‘ অসীলা’ খুঁজে বেড়াচ্ছে যে, কে তাঁর নিকটতর হয়ে যাবে এবং এরা তাঁর রহমতের প্রত্যাশী এবং তাঁর শাস্তির ভয়ে ভীত। আসলে তোমার রবের শাস্তি ভয় করার মতো৷ সুরা বণী ঈসরাইল : ৫৬-৫৭

অলী, আউলিয়া, নবী, রাসুল অথবা ফেরেশতা কারোই তোমাদের প্রার্থনা শুনার এবং তোমাদের সাহায্য করার ক্ষমতা নেই। তোমরা নিজেদের প্রয়োজন পূর্ণ করার জন্য তাদেরকে অসিয়ায় পরিণত করছো কিন্তু তাদের অবস্থা এই যে, তারা নিজেরাই আল্লাহর রহমতের প্রত্যাশী, তার আযাবের ভয়ে ভীত এবং তার বেশী বেশী নিকটবর্তী হবার জন্য অসিলা ও উপায় খুঁজে বেড়াচ্ছে।

ইবনে কাছীর (রহ.) এর মতে ‘অসীলা’ শব্দটির অর্থ হল, আল্লাহর আনুগত্যের মাধ্যমে তাঁর নৈকট্য লাভ করা।

আল্লাহর নৈকট্য লাভের প্রধান মাধ্যম হল, ইবাদাতের মাধ্যমে আল্লাহর আনুগত্যের করা। তাই খাটি ইবাদত ব্যতিত আল্লাহ তা‘আলার নৈকট্য লাভের আশা করা যায় না। আর খাটি ইবাদাতের করতে হলে আল্লাহর কিতাব এবং নবী (সাল্ল.) এর সুন্নাহর বাহিরে কোন আমল করা যাবে না। তাই প্রথমত ইবাদাত হবে এক মাত্র আল্লাহর জন্য এবং তরিকা হবে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহ মোতাবেগ।  মহান আল্লাহ বলেন-

وَمَآ أُمِرُوٓاْ إِلَّا لِيَعۡبُدُواْ ٱللَّهَ مُخۡلِصِينَ لَهُ ٱلدِّينَ حُنَفَآءَ وَيُقِيمُواْ ٱلصَّلَوٰةَ وَيُؤۡتُواْ ٱلزَّكَوٰةَ‌ۚ وَذَٲلِكَ دِينُ ٱلۡقَيِّمَةِ (٥) 

তাদেরকে তো এ ছাড়া আর কোন হুকুম দেয়া হয়নি যে, তারা নিজেদের দীনকে একমাত্র আল্লাহর জন্য নির্ধারিত করে একনিষ্ঠভাবে তাঁর ইবাদাত করবে, নামায কায়েম করবে ও যাকাত দেবে, এটিই যথার্থ সত্য ও সঠিক দীন৷ সূরা বাইয়্যেনাহ : ৫

আল্লাহ তা‘আলা বলেন-

 ٱتَّبِعُواْ مَآ أُنزِلَ إِلَيۡكُم مِّن رَّبِّكُمۡ وَلَا تَتَّبِعُواْ مِن دُونِهِۦۤ أَوۡلِيَآءَ‌ۗ قَلِيلاً۬ مَّا تَذَكَّرُونَ (٣)

হে মানব সমাজ! তোমাদের রবের পক্ষ থেকে তোমাদের ওপর যা কিছু নাযিল করা হয়েছে তার অনুসরণ করো এবং নিজেদের রবকে বাদ দিয়ে অন্য অভিভাবকদের (আওলিয়াদের) অনুসরণ করো না৷ কিন্তু তোমরা খুব কমই উপদেশ মেনে থাকো৷ (সুরা আরাফ ৭:৩)।

আমাদের সমাজে অনেক আলম আছে যারা অসীলা বলতে পীর বুঝান না, তারা অসীলা বলতে শুধু দুয়ার ক্ষেত্রে অসীলা বুঝে থাকেন। দুয়া যেহেতু ইবাদাত এবং যার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য হাসিল হয়। তাই দুয়াও অসীলান অন্যতম মাধ্যম।

 আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন তাঁর সুন্দর সুন্দর নাম এবং উন্নত গুণাবলীর মাধ্যমে তার নিকট দুয়া করার। (সুরা আরাফ ৭:১৮০)। বান্দার কৃত নেক আমলেন অসীলা দিয়ে দুয়া করা।  (বুখারীর বর্ণনায় বনী ইসরাইলে তিন লোকের গুহা থেকে মুক্তি লাভ)।  কোনো জীবিত উপস্থিত সৎ লোকের নিকট এসে দুয়া চাওয়া। (সহীহ বুখারীতে বর্ণিত, উমর ইবনে খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু এর যামানায় যখন অনাবৃষ্টির সময় তিনি আব্বাস ইবন আব্দুল মুত্তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহু এর অসীলায় বৃষ্টি চাইতেন)। আল্লাহ তা‘আলা নাম,  নেক আমল, জীবিত উপস্থিত লোক এই তিনটি বৈধ অসীলা দিয়ে দুয়া করা।

শরিয়তের দৃষ্টিতে অবৈধ অসীলা হলো, সেই সকল অসীলা যার কোন দলিল কুরআন বা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীসে নেই, এমনকি সাহাবি (রা.), তাবেঈ বা তাবে-তাবেঈনদের আমলেও পাওয়া যায় না। যেমন, মৃত অলী, পীর, আওলীয়া, নেকবান্দা, নবী এবং রাসূলগণের অসীলা দিয়ে আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য দুয়া করা।

যেমন: কেউ বলল,  হে আল্লাহ! তোমার নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অসীলায় বা তোমার নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সত্তার অসীলায় আমাকে ক্ষমা কর, আমাকে অনুগ্রহ কর এবং জান্নাতে প্রবেশ করাও। এ প্রকার দো‘আ শিরক নয় বরং বিদ‘আত।

এ প্রকার দো‘আ যদি নবী ﷺ ব্যতীত অন্য কারো নিকট করে তবে তা ছোট শিরক হবে, কিন্তু এতে সে দ্বীন থেকে সে বের হয়ে যাবে না। যেমন কেউ বলল: হে আল্লাহ আব্বাস বা আব্দুল কাদীরের সত্তার অসীলায় মাপ কর।

অপরদিকে আল্লাহ তা‘আলার ন্যায় কোনো সৃষ্টিকে ডাকা, যেমন কেউ বলল: হে আল্লাহর রাসূল! ﷺ আমার বিপদ দূর করে দিন, বা আমার ঋণ পরিশোধ করে দিন, অথবা আমার রোগ ভাল করে দিন। এটি অসীলা নয় বরং এটি বড় শিরক, তাতে সে ইসলাম থেকে বের হয়ে যাবে, কারণ আগেই বলা হয়েছেঅ দুয়া একটি ইবাদত, আর কোনো ইবাদত আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো জন্য করা সকল আলেমের ঐক্য মনে শিরক।

কথার দ্বারা ছোট শিরক

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

১। আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে শপথ করা

 আল্লাহ্ ছাড়া অন্যের নামে শপথ করা ছোট শিরক। যেমন পিতার নামে, মূর্তির নামে, কাবার নামে, আমানতের নামে বা আরো অন্যান্য বস্ত্তর নামে শপথ করা।

আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী ﷺ বলেছেন-

مَنْ كَانَ حَالِفًا فَلْيَحْلِفْ بِاللهِ أَوْ لِيَصْمُت

কারও হলফ করতে হলে সে যেন আল্লাহর নামেই হলফ করে, নতুবা চুপ করে থাকে। সহহি বুখারি : ২৬৭৯, ৩৮৩৬, ৬১০৮, ৬৬৪৬, ৬৬৪৮

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

ا تَحْلِفُوا بِآبَائِكُمْ، وَلَا بِأُمَّهَاتِكُمْ، وَلَا بِالْأَنْدَادِ، وَلَا تَحْلِفُوا إِلَّا بِاللَّهِ، وَلَا تَحْلِفُوا بِاللَّهِ إِلَّا وَأَنْتُمْ صَادِقُونَ

তোমরা নিজেদের পিতা-মাতা কিংবা দেবদেবীর নামে শপথ করবে না। তোমরা শুধুমাত্র আল্লাহর নামে শপথ করবে। আর তোমরা আল্লাহর নামে কেবল সে বিষয়েই শপথ করবে যে বিষয়ে তোমরা সত্যবাদী। আবু দাউদ : ৩২৪৮, সুনানে নাসায়ী : ২৭৯৬

সা’দ ইবনু উবাইদা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, ইবনু উমার (রাঃ) একজন লোককে বলতে শুনলেন, না, কাবার শপথ! ইবনু উমার (রাঃ) বললেন, আল্লাহ তা’আলার নাম ব্যতীত অন্য কিছুর নামে শপথ করা যাবে না। কেননা রাসূলুল্লাহ ﷺকে আমি বলতে শুনেছিঃ আল্লাহ তা’আলার নাম ব্যতীত অন্য কিছুর নামে যে লোক শপথ করল সে যেন কুফরী করল অথবা শিরক করল। সুনানে তিরমিজি : ১৫৩৫, সহিহাহ : ২০৪২

আবদুল্লাহ্ ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। একবার রাসূলুল্লাহ্ ﷺ ’উমার ইবনু খাত্তাব (রাঃ)-কে বাহনে চলা অবস্থায় পেলেন যখন তিনি তাঁর পিতার নামে কসম করছিলেন। তিনি বললেনঃ সাবধান! আল্লাহ্ তোমাদেরকে তোমাদের বাপ-দাদার নামে কসম করতে নিষেধ করেছেন। কেউ কসম করতে চাইলে সে যেন আল্লাহর নামে কসম করে, নইলে যেন চুপ থাকে। সহিহ বুখরি : ৬৬৪৬, সহিহ মুসলিম : ১৪৪৬, সুনানে তিরমিজি : ১৫৩৩, ১৫৩৮, ১৫৩৫, সুনানে নাসায়ী ৩৭৬৬, ৩৭৬৭, সুনানে আবূ দাউদ : ৩২৪৯

২। কথার মধ্যে ‘যদি’ ব্যবহার করা

ইবনে ইসহাক বলেন, আব্দুল্লাহ বিন জুবাইর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাঁর পিতা জুবাইর রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণনা করেছেন যে, জুবাইর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, উহুদের দিন আমি নিজেকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাথে দেখলাম। যখন আমাদের ভয় প্রচন্ড আকার ধারণ করল, তখন আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে নিদ্রা দ্বারা আচ্ছাদিত করলেন। আমাদের প্রত্যেকের থুতনী তার বক্ষদেশের সাথে লেগে যাচ্ছিল। জুবাইর বলেন, আল্লাহর শপথ! ঐ অবস্থায় আমি স্বপ্নের মতই মু’তিব বিন কুশাইরকে বলতে শুনলাম, এ ব্যাপারে যদি আমাদের করণীয় কিছু থাকতো, তাহলে আমরা এখানে নিহত হতামনা। তার নিকট থেকে শুনে আমি কথাটি মুখস্থ করে ফেললাম। মু’তিবের ঐ কথাকে কেন্দ্র করেই আল্লাহর এই বাণী নাযিল হয়-

لُونَ لَوۡ كَانَ لَنَا مِنَ ٱلۡأَمۡرِ شَىۡءٌ۬ مَّا قُتِلۡنَا هَـٰهُنَا‌ۗ قُل لَّوۡ كُنتُمۡ فِى بُيُوتِكُمۡ لَبَرَزَ ٱلَّذِينَ كُتِبَ عَلَيۡهِمُ ٱلۡقَتۡلُ إِلَىٰ مَضَاجِعِهِمۡ‌ۖ وَلِيَبۡتَلِىَ ٱللَّهُ مَا فِى صُدُورِڪُمۡ وَلِيُمَحِّصَ مَا فِى قُلُوبِكُمۡ‌ۗ وَٱللَّهُ عَلِيمُۢ بِذَاتِ ٱلصُّدُورِ (١٥٤) 

তারা বলে, যদি এ বিষয়ে আমাদের কোন অধিকার থাকতো তাহলে এখানে আমরা নিহত হতামনা। তুমি বল, যদি তোমরা তোমাদের গৃহের মধ্যেও থাকতে তবুও যাদের প্রতি মৃত্যু বিধিবদ্ধ হয়েছে তারা নিশ্চয়ই স্বীয় মৃত্যু স্থানে এসে উপস্থিত হত; তোমাদের অন্তরের মধ্যে যা আছে, আল্লাহ তা পরীক্ষা করে থাকেন; এবং আল্লাহ মনের অন্তর্নিহিত ভাব জ্ঞাত আছেন। সুরা আল ইমরান : ১৫৪। তাওহীদ পন্থীদের নয়নমণি,  শাইখ আব্দুর রাহমান বিন হাসান বিন মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহাব (রহঃ)

যদি সাধারন অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সকল কর্মে ব্যবহৃত হয। অতীতে কোন ক্ষতির কারনে বিষণ্ণতা বা হতাশা দুর করার জন্য যদি শব্দটি বলা হয়। বর্তমান ও ভবিষ্যৎ কর্মের শর্তের কারনে যদি ব্যবাহারে কোন অসুবিধা নাই। কিন্তু অতীত ক্ষতির কারনে বিষণ্ণগ্রস্ত হয়ে কিংবা অতীতে সংঘটিত কোন দুর্ঘটনার জন্য আফসোস করে এবং তাকদীরের প্রতি বিরক্তি প্রকাশ করে যদি শব্দটি ব্যবহার করা নিষিদ্ধ। যেমন কেউ বলল, আমি যদি এমন করতাম তাহলে এমন হত, এমন না করলে এমন হতনা, সেখানে না গেলে আমি দুর্ঘটনার কবলে পড়তাম না ইত্যাদি। এ ধরণের কথা বলা সম্পূর্ণ হারাম। আল্লাহ্ তাআলা বলেন-

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا لَا تَکُوۡنُوۡا کَالَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا وَقَالُوۡا لِاِخۡوَانِہِمۡ اِذَا ضَرَبُوۡا فِی الۡاَرۡضِ اَوۡ کَانُوۡا غُزًّی لَّوۡ کَانُوۡا عِنۡدَنَا مَا مَاتُوۡا وَمَا قُتِلُوۡا ۚ لِیَجۡعَلَ اللّٰہُ ذٰلِکَ حَسۡرَۃً فِیۡ قُلُوۡبِہِمۡ ؕ وَاللّٰہُ یُحۡیٖ وَیُمِیۡتُ ؕ وَاللّٰہُ بِمَا تَعۡمَلُوۡنَ بَصِیۡرٌ

হে মুমিনগণ, তোমরা তাদের মত হয়ো না, যারা কুফরী করেছে এবং তাদের ভাইদেরকে বলেছে, যখন তারা যমীনে সফরে বের হয়েছিল অথবা তারা ছিল যোদ্ধা। যদি তারা আমাদের কাছে থাকত, তবে তারা মারা যেত না এবং তাদেরকে হত্যা করা হত না’। যাতে আল্লাহ তা তাদের অন্তরে আক্ষেপে পরিণত করেন এবং আল্লাহ জীবন দান করেন ও মৃত্যু দেন। আর তোমরা যা কর আল্লাহ সে বিষয়ে সম্যক দ্রষ্টা। সূরা আল ইমরান : ১৫৬

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

اَلَّذِیۡنَ قَالُوۡا لِاِخۡوَانِہِمۡ وَقَعَدُوۡا لَوۡ اَطَاعُوۡنَا مَا قُتِلُوۡا ؕ قُلۡ فَادۡرَءُوۡا عَنۡ اَنۡفُسِکُمُ الۡمَوۡتَ اِنۡ کُنۡتُمۡ صٰدِقِیۡنَ

যারা তাদের ভাইদেরকে বলেছিল এবং বসেছিল, ‘যদি তারা আমাদের অনুকরণ করত, তারা নিহত হত না’। বল, ‘তাহলে তোমরা তোমাদের নিজ থেকে মৃত্যুকে দূরে সরাও যদি তোমরা সত্যবাদী হও’। সুরা আল ইমরান : ১৬৮

অতীত কালের ঘটে যাওয়ার ঘটনাকে যদি দ্বারা প্রশ্নবিদ্ধ করাতে আল্লাহ আয়াত নাজির করে সতর্ক করলেন। তাকদিরে বিশ্বাস করা ফরজ। অতীতের ঘটনা যা ঘটেছে তা তাকদিরে এভাবেই লিখিত আছে। কাজেই এর সাথে যদি জড়িত করে প্রশ্ন করা তাকদিরকেউ অস্বীকার করার নামান্তর। তাছাড়া আমারা ইচ্ছা করতে পারি বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য অতীতের ইচ্ছা করা কোন ক্ষমতা আমাদের নাই। আমাদের বর্তমান ও ভবিষ্যতের করার অধিকার থাকলেও ইচ্ছা বাস্তবায়ন করা আমাদের হাত নাই। ইহা সম্পূর্ণ আল্লাহর হাতে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَمَا تَشَآءُوۡنَ اِلَّاۤ اَنۡ یَّشَآءَ اللّٰہُ رَبُّ الۡعٰلَمِیۡنَ

আর তোমরা ইচ্ছা করতে পার না, যদি না সৃষ্টিকুলের রব আল্লাহ ইচ্ছা করেন। সুরা তাকবির : ২৯

কাজেই অতীত কালের বিপদ, হতাশা, কষ্টকে যদি দ্বারা প্রশ্নবিদ্ধ করার অর্থ ভাগ্যকে অস্বীকার করা ও আল্লাহর নিয়ন্ত্রণের বাইরেও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমাতকে বিশ্বাস করা। এই সম্পর্কে যদি ব্যবহার করা হাদিসেও নিষদ্ধ করা হয়েছে।

আবু হুরাইরাহ্ (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেনঃ শক্তিধর ঈমানদার দুর্বল ঈমানদারের তুলনায় আল্লাহর নিকট উত্তম ও অতীব পছন্দনীয়। তবে প্রত্যেকের মধ্যেই কল্যাণ নিহিত আছে, যাতে তোমার উপকার রয়েছে তা অর্জনে তুমি আগ্রহী হও এবং আল্লাহর কাছে সাহায্য কামনা কর। তুমি অক্ষম হয়ে যেও না। এমন বলো না যে, যদি আমি এমন এমন করতাম তবে এমন হত না। বরং এ কথা বলে যে, আল্লাহ তা’আলা যা নির্দিষ্ট করেছেন এবং যা চেয়েছেন তাই করেছেন। কেননাلَوْ (যদি) শব্দটি শাইতানের (শয়তানের) কর্মের দুয়ার খুলে দেয়।  সহহি মুসলিম : ২৬৬৪

০৩। মহাকালেকে গালি দেওয়া

মহাকাল বলতে দিবারাত্রির আবর্তন-বিবর্তনকে বুঝানো হয়েছে। রাত্রি উপনীত হলে অন্ধকার ছেয়ে যায়। আর দিন প্রকাশ পেতেই সমস্ত জিনিস উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। এই দিবারাত্রি অতিবাহিত হওয়ার নামই হল কাল, যুগ বা সময়। যা আল্লাহর কুদরত ও কারিগরি ক্ষমতা প্রমাণ করে। অন্ধকার যুগে আরবরা যখন কঠিন বিপদে পড়ত তখই মহকাল বা সময়কে গালি দিত। তারা ভাবত মহাকালই তাদের বিপদের কারন। মহাকালকে গালি প্রদানকারীর হুকুমের দুটি পর্যায়, হয়ত সে আল্লাহকে গালি দিচ্ছে অথবা আল্লাহর সাথে মহাকালকে শরীক করছে। যদি কেউ মনে করে মহাকাল এবং আল্লাহ যৌথভাবে বিপদ সংঘটিত করেন তাহলে শিরকে আকবর হয়ে যাবে এবং সে মুশরিক হয়ে যাবে আর যদি স্বীকার করে যে, আল্লাহই এককভাবে তা সংঘটিত করেছেন তারপরও ঐ সংঘটিত কাজকে গালি দিল, প্রকৃতপক্ষে সে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনকেই গালি দিল। তখন তার দ্বারা কবিরা গুরাহ।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَقَالُوۡا مَا ہِیَ اِلَّا حَیَاتُنَا الدُّنۡیَا نَمُوۡتُ وَنَحۡیَا وَمَا یُہۡلِکُنَاۤ اِلَّا الدَّہۡرُ ۚ وَمَا لَہُمۡ بِذٰلِکَ مِنۡ عِلۡمٍ ۚ اِنۡ ہُمۡ اِلَّا یَظُنُّوۡنَ

আর তারা বলে, ‘দুনিয়ার জীবনই আমাদের একমাত্র জীবন। আমরা মরি ও বাঁচি এখানেই। আর মহাকাল-ই কেবল আমাদেরকে ধ্বংস করে।’ বস্তুত এ বিষয়ে তাদের কোন জ্ঞান নেই। তারা শুধু ধারণাই করে। সুরা জাসিয়া : ২৪

আবূ হুরায়রাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

اللهُ عَزَّ وَجَلَّ يُؤْذِيْنِي ابْنُ آدَمَ يَسُبُّ الدَّهْرَ وَأَنَا الدَّهْرُ بِيَدِي الْأَمْرُ أُقَلِّبُ اللَّيْلَ وَالنَّهَارَ.

আল্লাহ তায়ালা বলেন, আদাম সন্তান আমাকে কষ্ট দিয়ে থাকে, তারা যুগ বা কালকে গালি দেয়, অথচ আমিই জামানা অর্থাৎ যুগ বা কাল। আমার হাতেই ক্ষমতা, দিন-রাত্রির পরিবর্তন আমিই করে থাকি। সহিহ বুখারি : ৪৮২৬, ৮১৬১, সহিহ মুসলিম : ২২৪৬, সুনানে আবূ দাঊদ : ৫২৭৪, আহমাদ : ৭২৪৫

আবূ হুরাইরাহ্‌ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ ﷺ কে আমি বলতে শুনেছি, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন, আদাম সন্তান সময় ও কালকে গালি-গালাজ করে, অথচ আমিই সময়, আমার হাতেই রাত্রি ও দিবস। সহিহ মুসলিম : ৫৭৫৫

মহান আল্লাহর একচ্চন্ন ক্ষমতা বিশ্বাস করা পরও যদি কেউ মনে মনে এই বিশ্বাস রাখে যে অনেক ঘটনার পেছনে মহাকালেরও ভুমিকা আছে। তবে সে ছোট শিরক করল।

০৪। মহাকালে মত বাতাসকে অকল্যান মনে করে গালি দেওয়া

বাতাসকে গালি দেয়া ছোট শির্ক। কারণ, যে ব্যক্তি বাতাসকে গালি দেয় সে অবশ্যই এ কথা বিশ্বাস করে যে, বাতাস এককভাবে কারোর কোন লাভ বা ক্ষতি করতে পারে। বাতাসকে গালি দেয়ার কোন মানে হয় না।

উবাই বিন্ কা’ব (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন:

لاَ تَسُبُّوْا الرِّيْحَ، فَإِذَا رَأَيْتُمْ مَا تَكْرَهُوْنَ ؛ فَقُوْلُوْا: اللَّهُمَّ! إِنَّا نَسْأَلُكَ مِنْ خَيْرِ هَذِهِ الرِّيْحِ وَخَيْرِ مَا فِيْهَا، وَخَيْرِ مَا أُمِرَتْ بِهِ، وَنَعُوْذُ بِكَ مِنْ شَرِّ هَذِهِ الرِّيْحِ، وَشَرِّ مَا فِيْهَا، وَشَرِّ مَا أُمِرَتْ بِهِ

বাতাসকে তোমরা গালি দিও না। অপছন্দনীয় কোন কিছু দেখতে পেলে তোমরা এই দুআ পড়বে, “হে আল্লাহ! আমরা আপনার নিকট আকাঙ্ক্ষা করি এ বাতাসের কল্যাণ, এর মধ্যে যে কল্যাণ নিহিত আছে তা এবং সে যে বিষয়ে আদেশ প্রাপ্ত হয়েছে তার কল্যাণ। আমরা এ বাতাসের অকল্যাণ হতে তোমার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করি, এর মধ্যে নিহিত ক্ষতি হতে এবং সে যে বিষয়ে আদেশ প্রাপ্ত হয়েছে তার অকল্যাণ হতে”। সুনানে তিরমিজি : ২২৫২, মিশকাত : ১৫১৮, সহীহাহ : ২৭৫৬, সুনানে নাসায়ী : ৯৩৩-৯৩৬

 আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে বলতে শুনেছিঃ

الرِّيحُ مِنْ رَوْحِ اللَّهِ قَالَ سَلَمَةُ: فَرَوْحُ اللَّهِ تَأْتِي بِالرَّحْمَةِ، وَتَأْتِي بِالْعَذَابِ، فَإِذَا رَأَيْتُمُوهَا فَلَا تَسُبُّوهَا، وَسَلُوا اللَّهَ خَيْرَهَا، وَاسْتَعِيذُوا بِاللَّهِ مِنْ شَرِّهَا

বায়ু আল্লাহর অন্যতম রহমত। তা কখনো শান্তি বয়ে আনে আবার কখনো আযাব নিয়ে আসে। সুতরাং বাতাস প্রবাহিত হতে দেখলে তোমরা তাকে গালাগলি দিবে না, বরং আল্লাহর নিকট এর কল্যাণ চাইবে এবং তার খারাবী থেকে আল্লাহর নিকট মুক্তি প্রার্থনা করবে। আবু দাউদ : ৫০৯৭, সুনানে নাসায়ী : ৯২৯, ৯৩১, ৯৩২

আব্দুল্লাহ্ বিন্ ’আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: নবী (সা.) ইরশাদ করেন-

لاَ تَلْعَنِ الرِّيْحَ ؛ فَإِنَّهَا مَأْمُوْرَةٌ، وَإِنَّهُ مَنْ لَعَنَ شَيْئًا لَيْسَ لَهُ بِأَهْلٍ رَجَعَتِ اللَّعْنَةُ عَلَيْهِ

‘বাতাসকে অভিশাপ দিওনা। কারণ, সে আল্লাহ্ তা’আলার পক্ষ থেকে আদিষ্ট। আর যে ব্যক্তি অভিশাপের অনুপযুক্ত বস্ত্তকে অভিশাপ দেয় সে অভিশাপ পুনরায় তার উপরই ফিরে আসে’’। সুনানে তিরমিজি : ১৯৭৮, সুনানে আবু দাউদ : ৪৯০৮, ইবনু হিব্বান : ১৯৮৮

০৫। আল্লাহ্ তায়ালা এবং তুমি না চাইলে কাজটা হতোনা এমন বলার শির্ক

আল্লাহ তায়ালা এবং তুমি না চাইলে কাজটা হতো না এ জাতীয় কথা বলা ছোট শির্ক। কেননা এখানে তাব বিশ্বাস যাই থাকুক না কেন এই কথার মাধ্যমে সে মহান আল্লাহকে বান্দার সাথে সম্পৃক্ত করেছে। কথায় বোঝা যায় তিনি আল্লাহতে বিশ্বাসি সাথে শিরক ও করেছেন।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَمَا یُؤۡمِنُ اَکۡثَرُہُمۡ بِاللّٰہِ اِلَّا وَہُمۡ مُّشۡرِکُوۡنَ

তাদের অধিকাংশ আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস করে, তবে (ইবাদাতে) শিরক করা অবস্থায়। সুরা ইউসুফ : ১০৬

ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,

إِذَا حَلَفَ أَحَدُكُمْ فَلاَ يَقُلْ مَا شَاءَ اللَّهُ وَشِئْتَ ‏.‏ وَلَكِنْ لِيَقُلْ مَا شَاءَ اللَّهُ ثُمَّ شِئْت‏

তোমাদের কেউ যেন শপথ করা কালে এভাবে না বলে, ’’আল্লাহ যা চান এবং তুমি যা ইচ্ছা করো’’। বরং সে যেন বলে, ’’আল্লাহ্ যা ইচ্ছা করেন, এরপর তুমি যা ইচ্ছা করছো’’। ইবনে মাজাহ : ২১১৭, সহীহাহ ১৩৬, ১৩৯, ১০৯৩।

আব্দুল্লাহ্ বিন আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন-

قَالَ رَجُلٌ لِلنَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم: مَا شَاءَ اللهُ وَشِئْتَ، فَقَالَ: أَجَعَلْتَنِيْ لِلَّهِ نِدًّا؟ بَلْ مَا شَاءَ اللهُ وَحْدهُ

জনৈক ব্যক্তি নবী (সা.) কে উদ্দেশ্য করে বললেন, আল্লাহ্ তা’আলা এবং আপনি চেয়েছেন বলে কাজটি হয়েছে। নতুবা হতো না। তখন নবী (সা.) বললেন, তুমি কি আমাকে আল্লাহ তা’আলার শরীক বানাচ্ছো? এমন কথা কখনো বলবে না। বরং বলবে, একমাত্র আল্লাহ তা’আলাই চেয়েছেন বলে কাজটি হয়েছে। নতুবা হতো না। আদাবুল মুফরাদ : ৭৮৩, মুসনাদে আহমাদ : ২১৪, ২২৪, ২৮৩, ৩৪৭ , তাবারানি :  ১৩০০৫, ১৩০০৬

হুযাইফাহ্ ইবনুল ইয়ামান (রাঃ) থেকে বর্ণিত। এক মুসলিম ব্যক্তি স্বপ্ন দেখে যে, আহলে কিতাবের এক ব্যক্তির সাথে তার সাক্ষাত হলে সে বললো, তোমরা কতই না উত্তম জাতি, যদি তোমরা শিরক না করতে। তোমরা বলে থাকো, ’’আল্লাহ যা ইচ্ছা করেন এবং মুহাম্মাদ যা ইচ্ছা করেন’’। অতঃপর সে স্বপ্নের কথাটি রাসূলুল্লাহ ﷺ এর নিকট বর্ণনা করলো। তিনি বলেন আল্লাহর শপথ! শোনো, আমি তো তোমাদের এরূপ কিছু বলতে শিখাইনি। তোমরা বলবে, ’’আল্লাহ যা ইচ্ছা করেন, এরপর রসূলুল্লাহ ﷺ যা চান’’।  ইবনু মাজাহ্ : ২১১৮

নুষের মুখে এ জাতীয় আরো অনেক বাক্য প্রচলিত রয়েছে। যেমন: ‘‘আল্লাহ্ এবং আপনি না থাকলে আমার অনেক সমস্যা হয়ে যেতো’’। ‘‘আমার জন্য শুধু আল্লাহ্ এবং আপনিই রয়েছেন’’। ‘‘আমি আল্লাহ্ এবং আপনার উপর নির্ভরশীল’’। ‘‘এটি আল্লাহ্ এবং আপনার পক্ষ হতে’’। ‘‘এটি আল্লাহ্ এবং আপনার বরকতেই হয়েছে’’। ‘‘আমার জন্য আকাশে আছেন আল্লাহ্ এবং জমিনে আছেন আপনি’’। উপরে আল্লাহ বার নিচে আপনি ইল্লা। আল্লাহর সাথে ইল্লা লাগে। এই ধরণের সকল প্রকার কথাই ছোট শিরকের অন্তর্গত।

৬। ঝাড়-ফুঁকের মাধ্যমে কুফরি কথা ব্যবহার করা

চোখ লাগা, জাদু, মানসিক ও শারীরিক অসুখ বিসুখ দূরীকরণে জন্য ঝাড় ফুঁক ফলপ্রসূ। নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে যেমন ঝাড় ফুঁক করেছেন, তেমনি তিনি ঝাড়-ফুঁক নিয়েছেন। আবার অনেক সময় রোগীর গায়ে ফুঁ দিয়েছেন এবং রোগীর গায়ে হাত দিয়ে স্পর্শসহ বা স্পর্শ ছাড়াই আয়াত বা মাসনূন দু‘আ পড়েছেন।  ঝাড় -ফুঁকের মাধ্যে শরীয়াত পরিপন্থী কোনো কিছু না থাকলে তা বৈধ।

আওফ ইবনু মালিক আশজাই (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন-

كُنَّا نَرْقِي فِي الْجَاهِلِيَّةِ فَقُلْنَا يَا رَسُولَ اللَّهِ كَيْفَ تَرَى فِي ذَلِكَ فَقَالَ ‏ “‏ اعْرِضُوا عَلَىَّ رُقَاكُمْ لاَ بَأْسَ بِالرُّقَى مَا لَمْ يَكُنْ فِيهِ شِرْكٌ ‏

আমরা জাহিলী যুগে মন্ত্র দিয়ে ঝাড়ফুঁক করতাম। এ জন্যে আমরা রসূলুল্লাহ ﷺ এর নিকট আবেদন করলাম, হে আল্লাহর রসূল! এক্ষেত্রে আপনার মতামত কি? তিনি বললেন, তোমাদের মন্ত্রগুলো আমার নিকট উপস্থাপন করো, ঝাড়ফুঁকে কোন দোষ নেই, যদি তাতে কোন শিরক (জাতীয় কথা) না থাকে। সহিহ মুসলীম : ২০০

আয়িশাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম অসুস্থ হয়ে পড়তেন তখন তিনি আশ্রয় প্রার্থনার দুই সূরা (ফালাক ও নাস) পাঠ করে নিজ দেহে ফুঁক দিতেন এবং স্বীয় হাত দ্বারা শরীর মাসাহ করতেন। এরপর যখন মৃত্যু-রোগে আক্রান্ত হলেন, তখন আমি আশ্রয় প্রার্থনার সূরা দু’টি দিয়ে তাঁর শরীরে ফুঁ দিতাম, যা দিয়ে তিনি ফুঁ দিতেন। আর আমি তাঁর হাত দ্বারা তাঁর শরীর মাসাহ করিয়ে দিতাম। সহিহ বুখারি ৪৪৩৯, ৫০১৬, ৫৭৩৫, ৫৭৫১, সহিহ মুসলিম : ২১৯২

মুহাম্মাদ ইবনু ইউসুফ ইবনু সাবিত ইবনু কায়িস ইবনু সাম্মাস (রহঃ) থেকে তার পিতা ও দাদার সূত্রে বর্ণিত। একদা রাসূলুল্লাহ ﷺ সাবিত ইবনু কায়িস (রাঃ)-এর নিকট গেলেন। আহমাদ বলেন, তিনি তখন অসুস্থ ছিলেন। তিনি বলেনঃ হে মানুষের রব! সাবিত ইবনু কায়িস ইবনু সাম্মাসের রোগ দূর করে দিন। অতঃপর তিনি বাতহান নামক উপত্যকার কিছু ধূলামাটি নিয়ে একটি পাত্র রাখলেন এবং পানিতে মিশিয়ে তার দেহে ঢেলে দিলেন। আবু দাউদ : ৩৮৮৫

আবূ সাঈদ (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী ﷺ -এর একদল সাহাবী কোন এক সফরে যাত্রা করেন। তারা এক আরব গোত্রে পৌঁছে তাদের মেহমান হতে চাইলেন। কিন্তু তারা তাদের মেহমানদারী করতে অস্বীকার করল। সে গোত্রের সরদার বিচ্ছু দ্বারা দংশিত হল। লোকেরা তার (আরোগ্যের) জন্য সব ধরনের চেষ্টা করল। কিন্তু কিছুতেই কোন উপকার হল না। তখন তাদের কেউ বলল, এ কাফেলা যারা এখানে অবতরণ করেছে তাদের কাছে তোমরা গেলে ভাল হত। সম্ভবত, তাদের কারো কাছে কিছু থাকতে পারে। ওরা তাদের নিকট গেল এবং বলল, হে যাত্রীদল! আমাদের সরদারকে বিচ্ছু দংশন করেছে, আমরা সব রকমের চেষ্টা করেছি, কিন্তু কিছুতেই উপকার হচ্ছে না। তোমাদের কারো কাছে কিছু আছে কি? তাদের (সাহাবীদের) একজন বললেন, হ্যাঁ, আল্লাহর কসম আমি ঝাড়-ফুঁক করতে পারি। আমরা তোমাদের মেহমানদারী কামনা করেছিলাম, কিন্তু তোমরা আমাদের জন্য মেহমানদারী করনি। কাজেই আমি তোমাদের ঝাড়-ফুঁক করব না, যে পর্যন্ত না তোমরা আমাদের জন্য পারিশ্রমিক নির্ধারণ কর। তখন তারা এক পাল বকরীর শর্তে তাদের সাথে চুক্তিবদ্ধ হল। তারপর তিনি গিয়ে (الْحَمْدُ للهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ) ‘‘আলহামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামীন’’ (সূরা ফাতিহা) পড়ে তার উপর ফুঁ দিতে লাগলেন। ফলে সে (এমনভাবে নিরাময় হল) যেন বন্ধন হতে মুক্ত হল এবং সে এমনভাবে চলতে ফিরতে লাগল যেন তার কোন কষ্টই ছিল না। (বর্ণনাকারী বলেন,) তারপর তারা তাদের স্বীকৃত পারিশ্রমিক পুরোপুরি দিয়ে দিল। সাহাবীদের কেউ কেউ বলেন, এগুলো বণ্টন কর। কিন্তু যিনি ঝাড়-ফুঁক করেছিলেন তিনি বললেন এটা করব না, যে পর্যন্ত না আমরা নবী ﷺ -এর নিকট গিয়ে তাঁকে এই ঘটনা জানাই এবং লক্ষ্য করি তিনি আমাদের কী নির্দেশ দেন। তারা আল্লাহর রাসূল ﷺ -এর কাছে এসে ঘটনা বর্ণনা করলেন। তিনি [নবী ﷺ ] বলেন, তুমি কিভাবে জানলে যে, সূরা ফাতিহা একটি দু‘আ? তারপর বলেন, তোমরা ঠিকই করেছ। বণ্টন কর এবং তোমাদের সাথে আমার জন্যও একটা অংশ রাখ। এ বলে নবী ﷺ হাসলেন। শো’বা (রহ.) বলেন, আমার নিকট আবূ বিশর (রহ.) বর্ণনা করেছেন যে, আমি মুতাওয়াক্কিল (রহ.) হতে এ হাদীস শুনেছি। সহিহ বুখারি : ২২৭৬, ৫০০৭, ৫৭৩৬, ৫৭৪৯, সহিহ মুসলিম : ২২০১,

সহিহ হাদিসের আলোকে জানা যায়, ঝাড়-ফুঁকের জন্য পবিত্র কুরআনের আয়াতুল কুরসী, সূরা ফালাক্ব, সূরা নাস, সূরা এখলাছ, সূরা কাফেরূন, সূরা বাক্বারা ও বাক্বারার শেষ দুই আয়াত পড়া ফলপ্রসূ। ঝাড়-ফুঁক শরীয়াত সম্মত হলেও অনেক সময় প্রয়োগকারী ও ব্যবহার কারির প্রয়োগ ও ব্যবহারের জন্য শিরক হয়। যদি কেউ ঝাড়-ফুঁক করার সময়  শির্কী ও কুফরী শব্দ ব্যবহারের করে, এমন শব্দের মাধ্যমে ঝাড়-ফুঁক করে যার অর্থ বোধগম্য নয় বা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নামে মাধ্যমে ঝাড়-ফুঁক করা ছোট শিরকের অন্তরভূক্ত হবে। কিন্তু ঝাড়-ফুঁক নিজস্ব কোনো প্রভাব এবং ক্ষমতা আছে এ কথা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করলে শিরকে আকবর হবে। নিজের জন্য নিজের ঝাড়-ফুঁক সবচেয়ে বেশী উপকারী। অথচ মানুষ ঝাড়-ফুঁক জন্য অন্যের দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়ায়। এই সুযোগে অনেক খপ্পরে পড়ে ঈমান, আমল নষ্ট করছে। সেই সাথে মিথ্যা লাভের আসায় নিজেস্ব অর্থের অপচয় করে। জ্যোতিষ, গনক ও জাদুকরগন সাধারনত কুফরি বাক্য দ্বরা ঝাড়-ফুঁক করে থাকে যা মুলত শিরক। এদের পরিত্যাগ করা জরুরী।

৭। নিজেদের কার্যকলাপে আনন্দিত হওয়া এবং নিজের প্রশংসা শুনতে চাওয়া

নিজেদের প্রশংসা শুনতে সবার ভাল লাগে। সবাই মনে করবে লোকটি বড়ই মুত্তাকী, পরহেজগার, দ্বীনদার, সাধু, দীনের খাদেম, শরীয়াতের সাহায্যকারী, সংস্কারক, উত্তম চরিত্রের অধিকারি। নিজেদের নামের শেষে নিজে অথবা চামচা দিয়ে বিভিন্ন প্রশংসা সুচক শব্দ বা বাক্য ব্যাবহার করে মনে হয় পৃথিবীতে শুধু খেদমত বা ইবাদতের জন্যই প্রেরিত হয়েছেন। এমনও প্রশংসা পেতে চায় যা সে করেনি। মহান আল্লাহ বলেন, 

 لَا تَحۡسَبَنَّ ٱلَّذِينَ يَفۡرَحُونَ بِمَآ أَتَواْ وَّيُحِبُّونَ أَن يُحۡمَدُواْ بِمَا لَمۡ يَفۡعَلُواْ فَلَا تَحۡسَبَنَّہُم بِمَفَازَةٍ۬ مِّنَ ٱلۡعَذَابِ‌ۖ وَلَهُمۡ عَذَابٌ أَلِيمٌ۬

যারা নিজেদের কার্যকলাপে আনন্দিত এবং যে কাজ যথার্থই তারা নিজেরা করেনি সে জন্য প্রশংশা পেতে চায়, তাদেরকে তোমরা আযাব থেকে সংরক্ষিত মনে করো না। আসলে তাদের জন্য যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি তৈরী রয়েছে৷ সুরা আল ইমরান : ১৮৮

৮। আল্লাহকে ঈম্বর, তার বাণীকে ঐশীবাণী, তার গ্রন্থেকে ঐশীগ্রন্থ, তার জ্ঞানকে ঐশীজ্ঞান বলা

হিন্দুরা আল্লাহকে ঈশ্বর সম্বোধন করে। ঈশ্বর শব্দটি পুরুষবাচক। এর স্ত্রীবাচক শব্দ হচ্ছে, ঈশ্বরী। এভাবে ভগবানের স্ত্রীবাচক ভগবতী ও দেবতার স্ত্রীবাচক দেবী। ঐশীবাণী অর্থ- ঈশ্বরের বাণী, ঐশীজ্ঞান অর্থ- ঈশ্বর প্রদত্ত জ্ঞান আর ঐশ্বরিক অর্থ- ঈশ্বর সম্বন্ধীয়। কুরআনের বাণী বোঝাতে আমরা ঐশীবাণী শব্দটা ব্যবহার করি। এভাবে কুরআনে জ্ঞান বোঝাতে ঐশীজ্ঞান লিখি। হিন্দুশাস্ত্র মতে ঈশ্বর থেকে আগত বাণীকে ঐশী বাণী বল হয়ে থাকে। তাই ঐশীবাণী, ঐশীজ্ঞান ও ঐশ্বরিক- এই শব্দগুলো লিখলে বা বললে শিরিক হতে পারে। কেননা ‘আল্লাহ’ শব্দটি ক্লীবলিঙ্গ। এর কোন পুরুষ বা স্ত্রীবাচক শব্দ নাই। আল্লাহ বলেন-

لَمۡ یَلِدۡ ۬ۙ  وَلَمۡ یُوۡلَدۡ ۙ

তাঁর কোন সন্তান নেই এবং তিনিও কারও সন্তান নন। সুরা ইখলাস : ৩

সুতারং আল্লাহ এবং ঈশ্বর এক নয়। তাহলে কী করে আল্লাহর বাণী বা ওহী তথা কুরআন ঈশ্বরের বাণী হতে পারে? আর আল্লাহ প্রদত্ত শক্তি কী করে ঐশী শক্তি হতে পারে? অনেকে অন্য ধর্মের প্রতি বেশী উদারতা দেখাতে গিয়ে এরূপ শব্দ ব্যবহার করে থাকেন। অথচ মহান আল্লাহর সুন্দর সুন্দর নাম রয়েছে। এই ধরনের নামে (ঈম্বর) তাকে না ডেকে, তার দেওয়া সুন্দর সুন্দর নামে ডাকতে বলা হয়েছে। আল্লাহ ইরশাদ করেন-

وَلِلّٰہِ الۡاَسۡمَآءُ الۡحُسۡنٰی فَادۡعُوۡہُ بِہَا ۪ وَذَرُوا الَّذِیۡنَ یُلۡحِدُوۡنَ فِیۡۤ اَسۡمَآئِہٖ ؕ سَیُجۡزَوۡنَ مَا کَانُوۡا یَعۡمَلُوۡنَ

আর আল্লাহর জন্যই রয়েছে সুন্দরতম নামসমূহ। সুতরাং তোমরা তাঁকে সেসব নামেই ডাক। আর তাদেরকে বর্জন কর যারা তাঁর নামে বিকৃতি ঘটায়। তারা যা করত অচিরেই তাদেরকে তার প্রতিফল দেয়া হবে। সুরা আরাফ : ১৮০

এই আয়াত বলা হয়েছে যার তার নামের বিকৃতি ঘটাবে তাদের অচিরেই প্রতিফল দিবেন। অর্থাত কঠিন শাস্তির মুখোমুখি হবে হবে। তাই কোন প্রকার শিরকি নাম আল্লাহ নামের বিপরীতে ব্যবহার করা কত বড় মারাত্বক অন্যায়। হয়তো অনেক মুসলিম না জেনে ভাষার প্রতি উদারতা দেখাতে গিয়ে না বুঝে এমনটি করে থাকতে পাবে। কিন্তু মনে রাখতে হবে বিধর্মীদের ইসলামে বিরোধী কর্মকান্ডে কোন উদারত নয় বরং বিধর্মীদের ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের বিপরীত আমল করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَلَن تَرْضَىٰ عَنكَ ٱلْيَهُودُ وَلَا ٱلنَّصَٰرَىٰ حَتَّىٰ تَتَّبِعَ مِلَّتَهُمْۗ

আর ইয়াহূদী ও নাসারারা কখনো তোমার প্রতি সন্তুষ্ট হবে না, যতক্ষণ না তুমি তাদের মিল্লাতের অনুসরণ কর। সুরা বাকারা : ১২০

ইবনু উমার (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

مَنْ تَشَبَّهَ بِقَوْمٍ فَهُوَ مِنْهُمْ

যে ব্যক্তি বিজাতির সাদৃশ্য অবলম্বন করে, সে তাদের দলভুক্ত গণ্য হবে। সুনানে আবু দাউদ : ৪০৩১

আমর ইবনু শু‘আইব রহ. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

لَيْسَ مِنَّا مَنْ تَشَبَّهَ بِغَيْرِنَا لاَ تَشَبَّهُوا بِالْيَهُودِ وَلاَ بِالنَّصَارَى فَإِنَّ تَسْلِيمَ الْيَهُودِ الإِشَارَةُ بِالأَصَابِعِ وَتَسْلِيمَ النَّصَارَى الإِشَارَةُ بِالأَكُفِّ ‏

বিজাতির অনুকরণকারী ব্যক্তি আমাদের দলভুক্ত নয়। তোমরা ইয়াহূদী-নাসারাদের অনুকরণ করো না। কেননা ইয়াহূদীগণ আঙ্গুলের ইশারায় এবং নাসারাগণ হাতের ইশারায় সালাম দেয়। সুনানে তিরমিজ : ২৬৯৫

৯। একথা বলা যে, ‘মানুষের ভুল আছে শয়তানের ভুল নেই

মহান আল্লাহই একমাত্র ভুলের উর্ধ্বে। এ ছাড়া তিনি যাকে যখন ভুলের উর্ধ্বে রাকবেন তিনিও ভুলের উর্ধ্বে। মহান আল্লাহ যাকে প্রতারণ বলেছেন সে কি করে ভুরের উর্ধ্বে হয়। শয়তানের জন্মই তার কৃত ভুল থেকে। শয়তান কোন শুদ্ধ কর্ম করতে পারে না। ভুল তার আজীবন ধর্ম। মানুষের ভুল কখনো কখনো হয়। কিন্তু শয়তানের ভুল সদা সর্বদা। শয়তায় প্রথম যে ভুল করেছে তা হলো মহান আল্লাহর নির্দশ অমান্য করে। ভুল না করে সে যদি আল্লাহর নির্দশ মান্য করত হবে সফলকাম হত। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَاِذۡ قُلۡنَا لِلۡمَلٰٓئِکَۃِ اسۡجُدُوۡا لِاٰدَمَ فَسَجَدُوۡۤا اِلَّاۤ اِبۡلِیۡسَ ؕ اَبٰی وَاسۡتَکۡبَرَ ٭۫ وَکَانَ مِنَ الۡکٰفِرِیۡنَ

আর যখন আমি ফেরেশতাদেরকে বললাম, ‘তোমরা আদমকে সিজদা কর’। তখন তারা সিজদা করল, ইবলীস ছাড়া। সে অস্বীকার করল এবং অহঙ্কার করল। আর সে হল কাফিরদের অন্তর্ভুক্ত। সুরা বাকারা : ৩৪

শয়তানতো ভুলের মাঝেই আছে। ভুল থেকেই তার জন্ম। শয়তানের কর্মকান্ড দেখলেই বুঝবেন সে কি করে ভুলের উর্ধ্বে হয়। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡۤا اِنَّمَا الۡخَمۡرُ وَالۡمَیۡسِرُ وَالۡاَنۡصَابُ وَالۡاَزۡلَامُ رِجۡسٌ مِّنۡ عَمَلِ الشَّیۡطٰنِ فَاجۡتَنِبُوۡہُ لَعَلَّکُمۡ تُفۡلِحُوۡنَ

হে মুমিনগণ, নিশ্চয় মদ, জুয়া, প্রতিমা-বেদী ও ভাগ্যনির্ধারক তীরসমূহ তো নাপাক শয়তানের কর্ম। সুতরাং তোমরা তা পরিহার কর, যাতে তোমরা সফলকাম হও। সুরা মায়েদা : ৯০

আল্লাহ প্রদত্ত সরল পথে ছেড়ে যে পাপাচারের পথ বেছে নেয় তার থেকে আর কেউ বিভ্রান্ত পথের পথিক হতে পারেনা। শয়তায় মদ, জুয়া, প্রতিমা-বেদী ও ভাগ্যনির্ধারক তীরসমূহ তার কর্ম হিসাবে নিয়ে বড় ভুল পথে রয়েছে। তাহলে একজন মুসলমান কি করে এ কথা বলতে পারে যে, শয়তানের ভুল নাই। এ ধরনের উক্তি মূলত ইসলাম সম্পর্কে একেবারেই অজ্ঞতার প্রমাণ বহন করে। তাই এ ধরনের কথা একেবারেই অবান্তর ও বিভ্রান্তিকর।

১০। প্রলয়ংকারি ঝড়ের প্রচণ্ডতাকে তাণ্ডবলীলা বলা

লীলা অর্থ ক্রীড়া, প্রমোদ, যৌন কেলী। যা দেবতার কার্যকলাপের সঙ্গে সম্পৃক্ত। যেমন কৃষ্ণের লীলা। আবার লীলা শব্দের পূর্বে তাণ্ডব যোগ করে হয় তাণ্ডবলীলা। তাণ্ডব অর্থ নৃত্য। তাহলে তাণ্ডবলীলা অর্থ দাঁড়ায় দেবতার প্রমোদ নৃত্য। প্রচণ্ড বেগে প্রবাহিত বঝড়ের ধ্বংস বা ক্ষয়ক্ষতিকে আমরা কিভাবে দেবতার প্রমোদ নৃত্য বলে স্বীকৃতি দিতে পারি? প্রাণ বিনাশী এ অবস্থাকে আমরা তাণ্ডব বলতে পারি না। ঝড়, জলোচ্ছ্বাস, ভূমিকম্প, ভূমিধস, পাথর বর্ষণ ইত্যাদি তো আল্লাহর পক্ষ হতে গযব আকারে আসে। মহান আল্লাহ বলেন-

اِنَّاۤ اَرۡسَلۡنَا عَلَیۡہِمۡ حَاصِبًا اِلَّاۤ اٰلَ لُوۡطٍ ؕ  نَجَّیۡنٰہُمۡ بِسَحَرٍ ۙ

নিশ্চয় আমি তাদের উপর কংকর-ঝড় পাঠিয়েছিলাম, তবে লূত পরিবারের উপর নয়। আমি তাদেরকে শেষ রাতে নাজাত দিয়েছিলাম। সুরা কামার : ৩৪

মহান আল্লাহ বলেন-

فَکُلًّا اَخَذۡنَا بِذَنۡۢبِہٖ ۚ فَمِنۡہُمۡ مَّنۡ اَرۡسَلۡنَا عَلَیۡہِ حَاصِبًا ۚ وَمِنۡہُمۡ مَّنۡ اَخَذَتۡہُ الصَّیۡحَۃُ ۚ وَمِنۡہُمۡ مَّنۡ خَسَفۡنَا بِہِ الۡاَرۡضَ ۚ وَمِنۡہُمۡ مَّنۡ اَغۡرَقۡنَا ۚ وَمَا کَانَ اللّٰہُ لِیَظۡلِمَہُمۡ وَلٰکِنۡ کَانُوۡۤا اَنۡفُسَہُمۡ یَظۡلِمُوۡنَ

তাদের প্রত্যেককেই তাদের অপরাধের জন্য শাস্তি দিয়েছিলাম; তাদের কারও প্রতি প্রেরণ করেছি প্রস্তরসহ প্রচন্ড ঝটিকা, তাদের কেহকে আঘাত করেছিল মহানাদ, কেহকে আমি প্রোথিত করেছিলাম ভূ-গর্ভে এবং কেহকে করেছিলাম নিমজ্জিত। আল্লাহ তাদের প্রতি কোন যুল্‌ম করেননি; তারা নিজেরাই নিজেদের প্রতি যুল্‌ম করেছিল। সুরা আনকাবুত : ৪০

কুরআনে বহু স্থানে বলা হয়েছে, ঝড়, জলোচ্ছ্বাস, ভূমিকম্প, ভূমিধস, পাথর বর্ষণ ইত্যাদি আল্লাহর পক্ষ হতে গযব। এই গযবকে তাণ্ডবলীলা বা দেবতার প্রমোদ নৃত্য বলে কিভাবে উপহাস করা হয়। ইহা মহান আল্লাহকে মর্যাদাকে ছোট করা হয়। যা শিরক থেকেও জঘন্য অপরাধ। তাছাড়া হাদিসে এসেছে আল্লাহ যাকার কল্যাণ চান তাকে তাড়াতাড়ি দুনিয়াতে তাকে বিপদে নিক্ষেপ করেন।

আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

إِنَّ عِظَمَ الْجَزَاءِ مَعَ عِظَمِ الْبَلاَءِ وَإِنَّ اللَّهَ إِذَا أَحَبَّ قَوْمًا ابْتَلاَهُمْ فَمَنْ رَضِيَ فَلَهُ الرِّضَا وَمَنْ سَخِطَ فَلَهُ السَّخَطُ ‏”‏ ‏.‏ قَالَ أَبُو عِيسَى هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ غَرِيبٌ مِنْ هَذَا الْوَجْهِ

আল্লাহ তা’আলা যখন তার কোন বান্দার কল্যাণ সাধন করতে চান তখন তাড়াতাড়ি দুনিয়াতে তাকে বিপদে নিক্ষেপ করেন। আর যখন তিনি তার কোন বান্দার অকল্যাণ সাধন করতে চান তখন তাকে তার অপরাধের শাস্তি প্রদান হতে বিরত থাকেন। তারপর কিয়ামতের দিন তিনি তাকে পুরাপুরি শাস্তি দেন। সুনানে তিরমিজি : ২৩৯৬, মিশকাত : ১৫৬৫, সহিহাহ : ১২২০

১১। মুমূর্য ব্যক্তিকে সম্পর্কে বলা হয়, সে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে

মৃত্যুর সংবাদ পরিবেশন করার সময় বলে থাকি অমুকে কিছু দিন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়তে লড়তে আজকে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন। এমন কথা বলা একেবারেই ঠিক নয়। কেননা, জন্ম ও মৃত্যু আল্লাহর হাতে। মৃত্যুকে মোকাবিলা করা যায় না, মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা বা কুস্তি কোনটাই চলে না। রোগ আল্লাহ দেন, চিকিৎসা জ্ঞানও তারই দান। তিনি ইচ্ছা করলে নিরাময় করবেন, ইচ্ছা করলে আমৃত্যু ভোগাবেন। তিনি যাকে চান মৃত্যু দে যাকে চায় হায়াত দেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

تُوۡلِجُ الَّیۡلَ فِی النَّہَارِ وَتُوۡلِجُ النَّہَارَ فِی الَّیۡلِ ۫ وَتُخۡرِجُ الۡحَیَّ مِنَ الۡمَیِّتِ وَتُخۡرِجُ الۡمَیِّتَ مِنَ الۡحَیِّ ۫ وَتَرۡزُقُ مَنۡ تَشَآءُ بِغَیۡرِ حِسَابٍ

‘আপনি রাতকে দিনের মধ্যে প্রবেশ করান এবং দিনকে রাতের মধ্যে প্রবেশ করান। আর মৃত থেকে জীবিতকে বের করেন এবং জীবিত থেকে মৃতকে বের করেন। আর যাকে চান বিনা হিসাবে রিয্ক দান করেন’। সুরা আর ইমরান : ২৭

আল্লাহ কোন ক্ষতি করতে চাইলে কেউই আর উপকার করতে পারবে না। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

ؕ قُلۡ فَمَنۡ یَّمۡلِکُ لَکُمۡ مِّنَ اللّٰہِ شَیۡئًا اِنۡ اَرَادَ بِکُمۡ ضَرًّا اَوۡ اَرَادَ بِکُمۡ نَفۡعًا ؕ بَلۡ کَانَ اللّٰہُ بِمَا تَعۡمَلُوۡنَ خَبِیۡرًا

বল, ‘আল্লাহ যদি তোমাদের কোন ক্ষতি করতে চান কিংবা কোন উপকার করতে চান, তবে কে আল্লাহর মোকাবিলায় তোমাদের জন্য কোন কিছুর মালিক হবে’? বরং তোমরা যে আমল কর আল্লাহ সে বিষয়ে সম্যক অবহিত। সুরা ফাতাহ : ১১

কাজেই মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ার কথা বলে প্রকারান্তরে আমরা আল্লাহর শক্তির মুকাবিলায় মানুষকে দাঁড় করাচ্ছি। কেউ কেউ হয়তো বলবেন, ‘মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা’ এ কথা দ্বারা কঠিনভারে দীর্য দিন রোগাক্রান্ত হওয়া বুঝাতে বলা হয়ে থাক। আপনি যে ভাবেই বলেন না কেন, আল্লাহ সাথে শিরক হয় এমন কথা কোনভাবেই বলা যাবে না। আমার আপনার অন্তরের খবর আল্লাহ রাখেন, সি বিচার হবে আখেরাতে কিন্তু যে কথা দ্বার শিরক প্রকাশ পায় তা বুঝতে আখেরাত পর্যন্ত অপেক্ষার দরকার নাই।

১২। লক্ষ্মী মা, লক্ষ্মী ছেলে ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করা

অনেক মুসলিম পরিবারে লক্ষ্মী মা, লক্ষ্মী ছেলে, লক্ষ্মী সোনা, লক্ষ্মী মেয়ে এমন সম্বোধন শোনা যায়। মুসলমানদের লেখনীতেও অনেক সময় এরুপ লক্ষণীয়। এমন বলার সরাসরি ইসরাম বিরোধী। লক্ষ্মী হিন্দুদের দেবীর নাম। হিন্দুরা এমন সম্বোধন করতে পারে। কিন্তু মুসলমানদের এরূপ সম্বোধন করা মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়। এতে করে তাদের ধর্মের সাথে সম্পৃক্ততা বুঝায় ও হিন্দু সংস্কৃতির প্রতি আত্মসমর্পন করা হয়। হিন্দুধর্ম মতে, লক্ষ্মী হলেন বিষ্ণুপত্নী। তিনি ধন সম্পদ ও সৌভাগ্যের অধিষ্ঠাত্রী দেবী। তার সুনজরে যারা আছেন তারা সৎ, শান্ত, সুবোধ ও ধনবান। আর যাদের উপর লক্ষ্মীর সুনজর নেই অথবা লক্ষ্মী যাদের ছেড়ে চলে গেছেন তারা হন হতভাগা, দুষ্ট, দরিদ্র এবং অশান্ত। এ হচ্ছে হিন্দু শাস্ত্রীয় বিশ্বাস; এবার বলুন এদের শাস্ত্রীয় বিশ্বাসে বিশ্বাসী হয়ে আমরা অর্থাৎ মুসলমানরা কি লক্ষ্মীকে দেবতা মেনে তার নাম সব সময় জপ করতে পারি? লক্ষ্মী নাম কি আমরা উপমায় আনতে পারি? যদি আনি তাহলে আমাদের ঈমান থাকছে কোথায়?

হিন্দুরা লক্ষ্মীর পূজা করেন। মুসলমানরা লক্ষ্মী পূজা করেন না। একজন মুসলমানের স্ত্রী অবশ্যই মুসলমান, মুসলমান স্বামী-স্ত্রীর সন্তানও মুসলমান। তাই যদি হয় তাহলে তাদের ছেলে-মেয়ে কেমন করে লক্ষ্মী ছেলে আর লক্ষ্মী মেয়ে হয়? মুসলমানের ছেলেমেয়েরা কেমন করে মা- বাবাকে লক্ষ্মী মা, লক্ষ্মী বাবা বলতে পারে? পরিবারের পারস্পরিক সম্বোধনের ভাষা যদি এই হয়, তাহলে তাদের ছেলে-মেয়ে কেমন করে হবে রাসূল এর আদর্শের অনুসারী? যেখানে লক্ষ্মী সেখানে হিন্দুধর্ম, সেই সংস্কৃতি, সেই কৃষ্টি, সেই ধর্মেই আমেজ ও মেজাজ থাকবেই। যেখানে লক্ষ্মী থাকে সেথায় আল্লাহর রহমত তো বর্ষণ হতে পারে না।

লক্ষ্মীর জায়গায় লক্ষ্মী আছেন এবং থাকবেনও তাদের জন্য যাদের কাছে তিনি পূজিত। আমরা কেন তাকে নিয়ে টানাটানি করি? তিনি তো আমাদের নন। আমাদের ছেলে-মেয়েদের জীবন ও চরিত্র আর তকদীরকে সুন্দর, বরকতময়, পবিত্র ও রহমতের বারিধারায় সিক্ত করার মতো সর্ব শক্তিমান আল্লাহ যখন আছেন, তখন কেন বিষ্ণুর শ্রী লক্ষ্মীর শরণাপন্ন হই? লক্ষ্মী তো নিজেই স্বাধীন নন, তিনি অন্যের স্ত্রী, তিনি কতটুকু আমাদের দিতে পারেন?

তাই এ জাতীয় সম্বোধন, লেখনীতে এ জাতীয় উপমার ব্যবহার মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। অজানাবশত যারা এরূপ ব্যবহার করেছেন, মহান আল্লাহ তাদের ক্ষমা করবেন ইনআল্লাহ। কিন্তু এ বিষয়ে বিস্তারিত জানার পরও যারা হিন্দু সংস্কৃতির অন্ধপ্রীতি বা নিজেকে আরো সংস্কৃতবাণ হবার জন্য এরূপ শব্দের ব্যবহার করে থাকেন, তারা প্রকৃত পক্ষে কপাল পোড়া। ঈমান নামক মহা মূল্যবান সম্পদ তাদের নসিবে থাকতে পারে না। প্রচলিত ভুল-ভ্রান্তি সংশোধন, পৃ-৩৪১, ড. খ শ আব্দুর রাজ্জাক

১৩। কাউকে প্রশংসায় গর্ববোধে ‘সূর্য সন্তান’, ‘শতাব্দির সূর্য সন্তান’ বলা

মরা সাধারণত জানি যে, সূর্য একটি গ্রহ। কিন্তু হিন্দুশাস্ত্র অনুযায়ী সূর্যও একটি দেবতা। এ দেবতার তিন পুত্র সন্তান; শনি, যম ও  কর্ণ। সূর্যের তিন মেয়ে, যমুনা, তপতী ও বিদ্যুৎ। মুসলমানদের মধ্যে যারা গর্ব করে সূর্য সন্তান বলে দাবি করেন বা যারা অন্যদের সূর্য সন্তান বলে পরিচয় দেন, তাদের দাবি বা পরিচয়ে সূর্য দেবতাকে নিশ্চয় স্মরণ করেন। অযোধ্যায় পৌরাণিক রাজ বংশের সদস্যরা নিজেদেরকে সূর্য বংশীয় বলে দাবি করতেন। আমাদের ‘সূর্য সন্তান’রা কি সেই বংশের সন্তান? মুসলমানরা কি জেনে শুনে নিজেদেরকে সূর্য দেবতার সন্তান বা সূর্যকন্যা পরিচয় দিতে পারেন? ‘অগ্নিপুরুষ’ আর ‘অগ্নি কন্যাও’ অনুরূপ একটি ভুয়া ও অপসংস্কৃতিমূলক দাবি।

সূর্য আল্লাহর সৃষ্টি একটি গ্রহ মাত্র। সৃষ্টির কল্যাণে এর সৃষ্টি। এর বংশ বিস্তারের নিজস্ব কোন ক্ষমতা নেই। সূর্যের স্ত্রী-পুত্র পরিবার কিছুই নেই। সূর্যকে দেবতা জ্ঞান করা অর্থহীন অযৌক্তিক। কোন মুসলিম সন্তান নিজেকে কখনো সূর্যের সন্তান বলে দাবি করতে পারে না। এটি কবীরাহ গুনাহ।

বর্তমান হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মত আরবের জাহেলী যুগের মানুষেরা সূর্যকে দেবতা মানত। তার উপাসনা করত। ইসলাম এসে এসব কর্মকাণ্ড শিরক হিসেবে ঘোষণা করে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছেন। আর বর্তমান সভ্যতার চরম উৎকর্ষের যুগে বসবাস করে আমরা সেই অসভ্য জাহেলী যুগের কর্মকাণ্ডকে লালন করতে গর্ববোধ করছি? ভুল-ভ্রান্তি সংশোধন, পৃ-৩৪২, ড. খ শ আব্দুর রাজ্জাক

১৪। আল্লাহর কুদরতি হাত, কুদরতি পা, কুদরতি মুখ কুদরতি চোখ ইত্যাদি বলা

কুরআনের বহু আয়াতে মহান আল্লাহ হাত, পা, চোখ, মুখ ইত্যাদির কথা ষ্পষ্টভাবে বলা হয়েছে। কোথাও আল্লাহর কুদরতি হাত, কুদরতি পা, কুদরতি মুখ কুদরতি চোখ ইত্যাদি বলা হয় নাই। সহিহ হাদিসেও মহান আল্লাহ হাত, পা, চোখ, মুখ ইত্যাদির কথা বলা হয়েছে। কোথাও আল্লাহর কুদরতি হাত, কুদরতি পা, কুদরতি মুখ কুদরতি চোখ ইত্যাদি বলে উল্লেখ করা নাই।

নিচের আয়াতগুলি লক্ষ করুন, মহান আল্লাহ নিজে তার হাত, পা, মুখের কথা উল্লেখ করছেন। তিনি সরাসরি বলেছেন, কোথাও কুদরত শব্দ ব্যবহার করেন নাই।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

قَالَ یٰۤاِبۡلِیۡسُ مَا مَنَعَکَ اَنۡ تَسۡجُدَ لِمَا خَلَقۡتُ بِیَدَیَّ ؕ اَسۡتَکۡبَرۡتَ اَمۡ کُنۡتَ مِنَ الۡعَالِیۡنَ

তিনি বললেন, হে ইবলীস, আমার দু’হাতে আমি যাকে সৃষ্টি করেছি তার প্রতি সিজদাবনত হতে কিসে তোমাকে বাধা দিল? তুমি কি অহঙ্কার করলে, না তুমি অধিকতর উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন?

সুরা সোয়াদ : ৭৫

আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেন-

وُجُوهٌ۬ يَوۡمَٮِٕذٍ۬ نَّاضِرَةٌ إِلَىٰ رَبِّہَا نَاظِرَةٌ۬ 

সেদিন কোন কোন মুখমন্ডল উজ্জ্বল হবে। তারা তাদের রবের দিকে তাকিয়ে থাকবে।

সুরা কিয়ামা : ২২-২৩

আল্লাহ্‌ রব্বুল আলামিন বলেন-

 يَوۡمَ يُكۡشَفُ عَن سَاقٍ۬ وَيُدۡعَوۡنَ إِلَى ٱلسُّجُودِ فَلَا يَسۡتَطِيعُونَ 

সে দিন (আল্লাহর) পায়ের গোছা উন্মোচন করা হবে। আর তাদেরকে সিজদা করার জন্য আহবান জানানো হবে, কিন্তু তারা সক্ষম হবে না। সুরা কালাম : ৪২

কুরআন ও সহিহ হাদিসের বর্ণনাতে দেখা যায় আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এর চেহারা, হাত, পা, চক্ষু, যাত বা সত্তা, সুরাত আছে। এই ধারনা থেকে অনেক মনে করেন আল্লাহর আকার আছে। মানুষ তার কল্পনা শক্তি দ্বারা জাগতিক বিশ্বের বাহিরে কোন আকার কল্পনা করতে পারে না। তাই তারা আল্লাহকে যে কোন সৃষ্টির আকারে সাব্যস্থ করে কল্পনা করে যা মূলত কুফরি। কেননা মহান আল্লাহর ঘোষণা, মহা বিশ্বের কোন কিছুই আমার সদৃশ নয়। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

فَاطِرُ السَّمٰوٰتِ وَالۡاَرۡضِ ؕ جَعَلَ لَکُمۡ مِّنۡ اَنۡفُسِکُمۡ اَزۡوَاجًا وَّمِنَ الۡاَنۡعَامِ اَزۡوَاجًا ۚ یَذۡرَؤُکُمۡ فِیۡہِ ؕ لَیۡسَ کَمِثۡلِہٖ شَیۡءٌ ۚ وَہُوَ السَّمِیۡعُ الۡبَصِیۡرُ

তিনি আসমানসমূহ ও যমীনের স্রষ্টা। তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকে জোড়া বানিয়েছেন এবং চতুষ্পদ জন্তু থেকেও জোড়া বানিয়েছেন, তিনি তোমাদেরকে ছড়িয়ে দিয়েছেন। কোন কিছুই তাঁর সদৃশ নয়, তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা। সুরা শুয়ারা : ১১

এই আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করেছেন, সৃষ্টি জগতের কোন সৃষ্টির সদৃশ তিনি নন। কাজেই আল্লাহ তায়ালার আকার আছে বললে যে আকৃতিতে কল্পনা করবেন তাই ভুল। যেহেতু, কুরআন ও সহিহ হাদিসে আল্লাহ তাঁর নিজস্ব সত্তার হাত, পা, মুখ, দৃষ্টিশক্তি, শ্রবণ শক্তি, তাঁর সন্তুষ্টি ও ক্রোধ-ইত্যাদি উল্লেখ করা হয়েছে। মুমিনগণ কিয়ামাতের দিন তাকে দেখতে পাবে। কাজেই তার সত্তার সাথে কুদরত লাগিয়ে বর্ণনা করা সঠিক নয়।

কর্মের দ্বারা ছোট শিরক

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

১. আল্লাহ ব্যতীত অন্য কিছুর উদ্দেশ্যে মান্নত

অনেক মুসলিমের বিশ্বাস মানতে ফলে উপকার হয়। যাদের মানত সম্পর্কে জ্ঞান নাই তারাই এর উপর ভুল বিশ্বাসের আলোকে আমাল করে থাকে। যে আমল করা নিজের উপর ওয়াজিব ছিল না, এমন কোন আমল নিজের উপর ওয়াজিব করে নেয়াকে মানত বলে। মানত শর্তযুক্তও হতে পারে আবার শর্ত মুক্তও হতে পারে। মান্নত করতে রাসূলুল্লাহ ﷺ নিষেধ করেছেন। এই জন্য মানত করা মাকরুহ।

আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন-

نَهَى النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم عَنْ النَّذْرِ وَقَالَ إِنَّهُ لاَ يَرُدُّ شَيْئًا وَإِنَّمَا يُسْتَخْرَجُ بِهِ مِنْ الْبَخِيلِ

নাবী ﷺ মানত করতে নিষেধ করেছেন। এই মর্মে তিনি বলেন, মানত কোন জিনিসকে দূর করতে পারে না। এ দ্বারা শুধুমাত্র কৃপণের মাল খরচ হয়। সহিহ বুখারি হাদিস : ৬৬০৮, ৬৬৯২, ৬৬৯৩, সহিহ মুসলিম : ১৬৩৯

আমরা অনেকে মনে করি মান্নত করলে বিপদ আপদ দুর হবে, উদ্দেশ্য সিদ্ধ হবে, কল্যান লাভ হবে, এটা সওয়াবের কাজ, আল্লাহ খুশী হবেন ইত্যাদি। কিন্তু আসলে ব্যাপারটা তা নয়। মানত  কোন মতেই সওয়াবের কাজ নয়। আল্লাহর রাসূল ﷺ যা করতে নিষেধ করেছেন তাতে আল্লাহ খুশী হবেন না। এবং এতে কোনো সওয়াবও হয় না। তাই আমাদের উচিত হবে কোনো অবস্থায় মানত না করা। অবশ্য মানত করে ফেললে তা পালন করতেই হবে। মান্নত করলে অবশ্যই তা পূরন করতে হবে। মান্নত পূরণ করা একটি ইবাদত। মানত করতে হবে শুধুমাত্র আল্লাহ তাআলার জন্য এবং পূরণ করতে হবে তারই সন্তুষ্টি অর্জনের নিয়তে। মানত করা সওয়াব না হলেও তা আদায় করা অশব্যই ওয়াজিব ও সওয়াবের কাজ।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

ثُمَّ لۡيَقۡضُواْ تَفَثَهُمۡ وَلۡيُوفُواْ نُذُورَهُمۡ وَلۡيَطَّوَّفُواْ بِٱلۡبَيۡتِ ٱلۡعَتِيقِ

অতঃপর তারা যেন তাদের অপরিচ্ছন্নতা দূর করে এবং তাদের মানত পূর্ণ করে ও তাওয়াফ করে প্রাচীন গৃহের। সূরা হজ্জ্ব : ২৯

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

يُوفُونَ بِٱلنَّذۡرِ وَيَخَافُونَ يَوۡمً۬ا كَانَ شَرُّهُ ۥ مُسۡتَطِيرً۬ا

তারা মানত পূর্ণ করে এবং সেদিনকে ভয় করে যার অকল্যাণ হবে সুবিস্তৃত। সূরা ইনসান : ৭

অসৎ কাজের মানত আদায় করা জায়েয নেই।

আয়িশাহ (রাঃ) সূত্রে নবী ﷺ হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেন-

مَنْ نَذَرَ أَنْ يُطِيعَ اللهَ فَلْيُطِعْهُ وَمَنْ نَذَرَ أَنْ يَعْصِيَهُ فَلاَ يَعْصِهِ

যে ব্যক্তি এরূপ মানত করে যে, সে আল্লাহর আনুগত্য করবে, সে যেন তাঁর আনুগত্য করে। আর যে মানত করে, সে আল্লাহর নাফরমানী করবে, সে যেন তাঁর নাফরমানী না করে। সহিহ বুখারি ৬৬৯৬, ৬৭০০

আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে নাবী ﷺ এক বৃদ্ধ ব্যাক্তিকে তাঁর দুই ছেলের উপর ভর করে হেটে যেতে দেখে বললেন, তাঁর কি হয়েছে? তাঁরা বললেন, তিনি পায়ে হেটে হজ করার মানত করেছে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, লোকটি নিজেকে কষ্ট দিক আল্লাহ তা’আলার এর কোন প্রয়োজন নেই। তাই তিনি তাঁকে সওয়ার হয়ে চলার জন্য আদেশ করলেন। (সহিহ বুখারি হাদিস ১৮৬৫

আল্লাহ নিকট ইবাদতের নিমিত্তে মানত করা মাকরুহ পর্যায়ের জায়েয হলে তা পুরন করা ওয়াজিব। একটুকু ঠিকই আছে কিন্ত মানত যখন গাইরুল্লাহ বা কোনো পীর, অলী, আওলীয়া, বুযুর্গ, নবী রাসূলদের নামে করা হবে তখন তা ছোট শিরক হয়ে যাবে। শুধু গাইরুল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য মানত করা শিরকে আকবর। আর যদি মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ঐ সকল লোকদের সুপারিশের জন্য বা কোন না কোন ভাবে উপকার পাবার জন্য করে থাকে তবে তা ছোট শিরক হবে।

মহান আল্লাহ তায়ালান বলেন-

 وَعَلَى ٱلَّذِينَ هَادُواْ حَرَّمۡنَا ڪُلَّ ذِى ظُفُرٍ۬‌ۖ وَمِنَ ٱلۡبَقَرِ وَٱلۡغَنَمِ حَرَّمۡنَا عَلَيۡهِمۡ شُحُومَهُمَآ إِلَّا مَا حَمَلَتۡ ظُهُورُهُمَآ أَوِ ٱلۡحَوَايَآ أَوۡ مَا ٱخۡتَلَطَ بِعَظۡمٍ۬‌ۚ ذَٲلِكَ جَزَيۡنَـٰهُم بِبَغۡيِہِمۡ‌ۖ وَإِنَّا لَصَـٰدِقُونَ

আর আল্লাহ যে সব শস্য ও পশু সৃষ্টি করেছেন, তারা (মুশরিকরা) ওর একটি অংশ আল্লাহর জন্য নির্ধারণ করে থাকে। অতঃপর নিজেদের ধারণা মতে তারা বলে যে, এই অংশ আল্লাহর জন্য এবং এই অংশ আমাদের শরীকদের জন্য। কিন্তু যা তাদের শরীকদের জন্য নির্ধারিত হয়ে থাকে, তাতো আল্লাহর দিকে পৌঁছেনা, পক্ষান্তরে যা আল্লাহর জন্য নির্ধারণ করা হয়েছিল তা তাদের শরীকদের কাছে পৌঁছে থাকে। এই লোকদের ফাইসালা ও বন্টন নীতি কতই না নিকৃষ্ট! সুরা আনাম : ১৩৬

মানতকারী যদি এ বিশ্বাস রাখে যে, অলী ভাল মন্দ করার ক্ষমতা রাখেন না। তার দোয়া বা নেক নজর পাওয়ার নিয়তও করে না। কিংবা শাফাআত বা অসীলাও আমার উদ্দেশ্য নয়। শুধু এতটুকু ভাবে যে, তিনি আল্লাহর অলী, তাকে সম্মান করা সওয়াবের কাজ এ জন্য আমি মাজারে মান্নত করি। তাহলেও ছোট শিরক হবে। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হল, এখন মুসলমানেরা শুধু মৃত পীর, অলী, আওলীয়া, বুযুর্গ, নবী রাসূলদের নামে মান্নত করে তৃপ্ত নয়, বরং তাদের মাজারের কচ্ছপ, কুমির, মাছের নামেও মান্নত করে থাকে। কতবড় নিকৃষ্ট শিরকের দিকে আমাদের জাতি ধাবিত হচ্ছে।

২। দুয়ার জন্য কোন সৃষ্টিজীবকে মাধ্যম ধরা

দোয়ার জন্য কোন সৃষ্টিজীবকে মাধ্যম করার প্রয়োজন নেই। আল্লাহ্‌ তাআলা বলেন :

وَإِذَا سَأَلَكَ عِبَادِى عَنِّى فَإِنِّى قَرِيبٌ‌ۖ أُجِيبُ دَعۡوَةَ ٱلدَّاعِ إِذَا دَعَانِ‌ۖ فَلۡيَسۡتَجِيبُواْ لِى وَلۡيُؤۡمِنُواْ بِى لَعَلَّهُمۡ يَرۡشُدُونَ

আর হে নবী! আমার বান্দা যদি তোমার কাছে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে, তাহলে তাদেরকে বলে দাও, আমি তাদের কাছেই আছি ৷ যে আমাকে ডাকে আমি তার ডাক শুনি এবং জবাব দেই, কাজেই তাদের আমার আহবানে সাড়া দেয়া এবং আমার ওপর ঈমান আনা উচিত একথা তুমি তাদের শুনিয়ে দাও, হয়তো সত্য-সরল পথের সন্ধান পাবে ৷ সুরা বাকারা : ১৮৬

আল্লাহ তাআলা আমাদের এতো কাছে অবস্থান করর যে, কোন প্রকার মাধ্যমে ও সুপারিশ ছাড়াই  নিজেই সরাসরি সবসময় আমাদের আবেদন নিবেদন শুনেন। কাজেই আমাদের উচিৎ মুর্খতার বেড়াজাল ছিঁড়ে ফেলা। আল্লাহ তাআলার আহবানে সাড়া দিয়ে তার দিকে ফিরে যেতে হবে এবং তারই বন্দেগী ও আনুগত্য করতে হবে। সরাসরি সবসময় তারই নিকট চাইব কেননা কোনো কিছু চাওয়ার নিয়ম তো আল্লাহ্‌ তাআলাই ভাল জানেন। যেমনটি কুরআনে বলা হয়েছ

وَقَالَ رَبُّكُمُ ٱدۡعُونِيٓ أَسۡتَجِبۡ لَكُمۡۚ

এবং তোমাদের রব বলেছেন আমার কাছে চাও, আমিই দিব। সুরা গাফির : ৪০

সুতরাং বান্দা তার রবের কাছেই চাইবে। অন্য কারো অছিলায় চাওয়া মুলত আল্লাহর একচ্ছত্র অধিকার কে খর্ব করে। তেমনি অন্যকেও এ কাজে জড়িয়ে ফেলা হয়, সে জন্য এটি শির্কেই নামান্তর। সরাসরি গাউরুল্লাহ নিকট দুয়ার মাধ্যামে চাওয়া শিরকে আকবর কিন্তু যদি দুয়া কবুলের আশায় মাধ্যম ধরা বা কারো সুপারিশ লাভের আশায় মাধ্যম ধরা শির্ক আসগর।

৩। গাইরুল্লাহ নামে পশু জবেহ করা

পশুকে যবেহ একটি ইবাদাত। ইবাদাতের জন্য অবশ্য আল্লাহর হুকুম এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহর অনুসরন করতে হবে। এই জন্য আল্লাহ পশুকে যবেহ করার নীতিমালা ঘোষনা করছেন। গাইরুল্লাহর নামে পশু জবেহ করল শিরক হবে কেননা আল্লাহ নিজের নামে কুরবানী করার হুকুম দিয়েছেন। যে সকল লোক আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে পশু জবেহ করে তারা মুশরিক। তাই মুমিনের ফরজ দায়িত্ব হল আল্লাহর নামে জবেহ করা যার কোন শরিক নাই। এ কথাই আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেছেন,  (فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ) তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে সালাত আদায় কর ও পশু কোরবানি কর। সুরা কাওসার : ২

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

قُلۡ إِنَّ صَلَاتِى وَنُسُكِى وَمَحۡيَاىَ وَمَمَاتِى لِلَّهِ رَبِّ ٱلۡعَـٰلَمِينَ

বলো, আমার নামায, আমার ইবাদাতের সমস্ত অনুষ্ঠান (কুরবানী), আমার জীবন ও মৃত্যু সবকিছু আল্লাহ রব্বুল আলামীনের জন্য। সুরা আনআম : ১৬২

যা কিছু আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে জবেহ করা হয় তা যে হারাম এ ব্যাপারে মুসলিমদের ঐক্যমত প্রতিষ্ঠিত। তাই পশু জবেহ দেওযার ক্ষেত্রে আল্লাহর বিধান না মেনে অন্যদের আনুগত্য করে জবেহ করলে শিরক হবে। যে ব্যক্তি আল্লাহ ব্যতীত অন্যের নামে পশু জবেহ করে সে শয়তানের আনুগত্য করল এবং মুশরিক হল। তার দলিল নিম্মের আয়াত। আল্লাহ তাআলা বলেন:

 وَلَا تَأۡڪُلُواْ مِمَّا لَمۡ يُذۡكَرِ ٱسۡمُ ٱللَّهِ عَلَيۡهِ وَإِنَّهُ ۥ لَفِسۡقٌ۬‌ۗ وَإِنَّ ٱلشَّيَـٰطِينَ لَيُوحُونَ إِلَىٰٓ أَوۡلِيَآٮِٕهِمۡ لِيُجَـٰدِلُوكُمۡ‌ۖ وَإِنۡ أَطَعۡتُمُوهُمۡ إِنَّكُمۡ لَمُشۡرِكُونَ

 আর যে পশুকে আল্লাহর নামে যবেই করা হয়নি তার গোশ্ খেয়ো না৷ এটা অবশ্যি মহাপাপ৷ শয়তানরা তাদের ঝগড়া করতে পারে৷  কিন্তু যদি তোমরা তাদের আনুগত্য করো তাহলে অবশ্যি তোমরা মুশরিক হবে৷ সুরা আনআম : ১২১

এখানে আল্লাহ তাআলা অন্য ধর্মের লোকদের বিধান অনুযায়ী চলা এবং তাদের আনুগত্য করিকে মুশরিক বলেছেন। কারন জীবনের সর্ব ক্ষেত্রে শুধু আল্লাহর আনুগত্য কায়েম করার নামই তাওহীদ। অপর পক্ষে জবেহর সময় যে পশুর ওপর আল্লাহর নাম নেয়া হয়েছে তার গোশ্‌ত খাও হালাল করা হয়েছে৷ আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

 فَكُلُواْ مِمَّا ذُكِرَ ٱسۡمُ ٱللَّهِ عَلَيۡهِ إِن كُنتُم بِـَٔايَـٰتِهِۦ مُؤۡمِنِينَ

এখন যদি তোমরা আল্লাহর আয়াতসমূহ বিশ্বাস করে থাকো, তাহলে যে পশুর ওপর আল্লাহর নাম নেয়া হয়েছে তার গোশ্ খাও৷ সুরা আনআম : ১১৮

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

إِنَّمَا حَرَّمَ عَلَيۡڪُمُ ٱلۡمَيۡتَةَ وَٱلدَّمَ وَلَحۡمَ ٱلۡخِنزِيرِ وَمَآ أُهِلَّ بِهِۦ لِغَيۡرِ ٱللَّهِ‌ۖ

আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমাদের ওপর যদি কোন নিষেধাজ্ঞা থেকে থাকে তাহলে তা হচ্ছে এই যে, মৃতদেহ খেয়ো না, রক্ত ও শূকরের গোশত থেকে দূরে থাকো। আর এমন কোন জিনিস খেয়ো না যার ওপর আল্লাহ ছাড়া আর কারোর নাম নেয়া হয়েছে। সুরা বাকারা : ১৭৩

৪। মাজার, মুর্তি, দে্তার উদ্দেশ্যে কোন কিছু পেশ করা

মুসলিমের প্রতিটি কাজই ইবাদাত। আর ইবাদাতের মুল উদ্দেশ্য হল মহান আল্লাহর সন্তষ্টি অর্জন। মাজার, মুর্তি, দেবতার পুজা করা শিরকে আকবর তাতে কোন সন্দেহ নাই কিন্তু তাদের পুজা না করে ভালো কর্ম মনের করে কিছু পেশ করা হয় তবে তা ছোট শিরকের অন্তর্ভুক্ত হবে। এর মাধ্যম গাইরুল্লাহ ইবাদতে সহযোগীতা করা হয়। কোন অবস্থায়ই মাজার, মুর্তি, দেতার উদ্দেশ্যে কোন কিছু পেশ করা যাবে না। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

حُرِّمَتۡ عَلَيۡكُمُ ٱلۡمَيۡتَةُ وَٱلدَّمُ وَلَحۡمُ ٱلۡخِنزِيرِ وَمَآ أُهِلَّ لِغَيۡرِ ٱللَّهِ بِهِۦ وَٱلۡمُنۡخَنِقَةُ وَٱلۡمَوۡقُوذَةُ وَٱلۡمُتَرَدِّيَةُ وَٱلنَّطِيحَةُ وَمَآ أَكَلَ ٱلسَّبُعُ إِلَّا مَا ذَكَّيۡتُمۡ وَمَا ذُبِحَ عَلَى ٱلنُّصُبِ وَأَن تَسۡتَقۡسِمُواْ بِٱلۡأَزۡلَـٰمِ

তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে মৃত প্রাণী, রক্ত ও শূকরের গোশত এবং যা আল্লাহ ভিন্ন কারো নামে যবেহ করা হয়েছে; গলা চিপে মারা জন্তু, প্রহারে মরা জন্তু, উঁচু থেকে পড়ে মরা জন্তু অন্য প্রাণীর শিঙের আঘাতে মরা জন্তু এবং যে জন্তুকে হিংস্র প্রাণী খেয়েছে, তবে যা তোমরা যবেহ করে নিয়েছ তা ছাড়া, আর যা মূর্তি পূঁজার বেদিতে বলি দেয়া হয়েছে সুরা মায়েদা : ৩

তারিক বিন শিহাব হতে বর্ণিত হাদীছে রাসূল ﷺ বলেন, এক ব্যক্তি একটি মাছির কারণে জান্নাতে প্রবেশ করেছে। আর এক ব্যক্তি একটি মাছির কারণে জাহান্নামে গিয়েছে। সাহাবীগণ বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এটি কিভাবে হলো? তিনি বললেনঃ দু’জন লোক এমন একটি গোত্রের নিকট দিয়ে যাচ্ছিল, যাদের একটি মূর্তি ছিল। উক্ত মূর্তির জন্য কোন কিছু উৎসর্গ না করে কেউ সে স্থান অতিক্রম করতে পারতোনা। উক্ত কওমের লোকেরা দু’জনের একজনকে বললো, ‘মূর্তির জন্য তুমি কিছু কুরবানী করো’। সে বললো, কুরবানী দেয়ার মত আমার কিছুই নেই। তারা বলল, অন্ততঃ একটি মাছি হলেও কুরবানী দিয়ে যাও’। অতঃপর সে একটা মাছি মূর্তির জন্য কুরবানী দিল। তারা লোকটির পথ ছেড়ে দিল। এর ফলে সে জাহান্নামে গেল। অপর ব্যক্তিকে তারা বললো, মূর্তিকে তুমিও কিছু কুরবানী করো। সে বললঃ একমাত্র আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও নৈকট্য লাভের জন্য আমি কারো জন্য কুরবানী দেইনা। এর ফলে তারা তার গর্দান উড়িয়ে দিল। এতে সে জান্নাতে প্রবেশ করল’’। বায়হাকি, শু‘আবুল ঈমান : ৭৩৪৩, ইবনু আবী শায়বাহ : ৩৩০৩৮, ইমাম আহমাদ, আয-যুহুদ, প্রথম খণ্ড, পৃ-১৫;

আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন গাছ বা অন্য কিছুর উদ্দেশ্যে কোন কিছু পেশ করা শিরকের অন্তরভুক্ত। যে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো নামে পশু উৎসর্গ বা জবেহ করবে তার ব্যাপারে কঠোর শাস্তির কথা হাদিসে এসেছে,

আবু তোফায়েল থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি আলী ইবনে আবি তালেব (রা.) এর কাছে উপস্থিত ছিলাম। এক ব্যক্তি তার কাছে এসে বলল, নবী কারীম স. গোপনে আপনাকে কি বলেছিলেন?’ বর্ণনাকারী বলেন, আলী (রা.) এ কথা শুনে রেগে গেলেন এবং বললেন, নবী কারীম স. মানুষের কাছে গোপন রেখে আমার কাছে একান্তে কিছু বলেননি। তবে তিনি আমাকে চারটি কথা বলেছেন। বর্ণনাকারী বলেন, এরপর লোকটি বলল, ‘হে আমিরুল মোমিনীন! সে চারটি কথা কি ? তিনি বললেন-

১. যে ব্যক্তি তার পিতামাতাকে অভিশাপ দেয় আল্লাহ তাকে অভিশাপ দেন।

২. যে ব্যক্তি আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো নামে পশু জবেহ করে আল্লাহ তার উপর লানত করেন।

৩. ঐ ব্যক্তির উপর আল্লাহ লানত করেন যে ব্যক্তি কোন বেদআতীকে প্রশ্রয় দেয়।

৪. যে ব্যক্তি জমির সীমানা পরিবর্তন করে আল্লাহ তাকে লা’নত করেন। সহিহ মুসলিম, শরহে নবভী

৫। কোন ব্যক্তি বা বস্তুর মাধ্যমে তাবার্রুক বা বরকত হাসিল করা

কোন ব্যক্তি বা বস্তুর মাধ্যমে তাবার্রুক বা বরকত হাসিল করা কখন জায়েয আবার কখন নাজায়েয শিরক। ইসলামি শরিয়তে যে সকল কোন ব্যক্তি বা বস্তুর মাধ্যমে তাবার্রুক বা বরকত  হাসিল করার কথা বলা হয়েছে শুধু সে গুল থেকেই বরকত হাসিল করা যাবে। ইসলামি শরিয়তে নেই এমন ব্যক্তি বা বস্তুর মাধ্যমে তাবার্রুক বা বরকত  হাসিল করা অনেক সময় হরাম আবার অনেক সময় শিরক। বিষয়টি সম্পর্কে পরিস্কার ধারনার জন্য উভয়টি সম্পর্কে জানা দরকার।

জায়েয তাবার্রুক বা বরকতঃ

(১) ব্যক্তি হিসেবে রসূলুল্লাহ থেকে বরকত হাসিলঃ

আনাস (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন-

لَقَدْ رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وَالْحَلاَّقُ يَحْلِقُهُ وَأَطَافَ بِهِ أَصْحَابُهُ فَمَا يُرِيدُونَ أَنْ تَقَعَ شَعْرَةٌ إِلاَّ فِي يَدِ رَجُلٍ ‏.‏

আমি দেখেছি নাপিত রসূলুল্লাহ ﷺ এর চুল ছাটছে আর সাহাবীরা তার চতুস্পার্শ ঘিরে রেখেছেন। তারা চাইতেন যে, কোন চুল যেন মাটিতে না পড়ে তা যেন কারো না কারো হাতে পড়ে। সহিহ মুসলিম ২৩২৫

আবূ জুহাইফা (রা.) বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূল ﷺ কে একটি লাল বর্ণের একটি তাবূতে দেখেছি, আমি আরো দেখেছি বেলাল (রা.) কে, তিনি তাঁর ওযূর পানি নিয়ে আসলেন, অতঃপর আমি দেখলাম লোকজন তাঁর ওযূর পানি নেওয়ার জন্য প্রতিযোগিতা করছে এবং তারা তা (শরীরে) মেখে নিচ্ছেন। রাবী বলেন, “তারপর বিলাল (রা.) একটি বর্ষা নিয়ে আসেন, অতঃপর তিনি তা গেড়ে দেন, তারপর রাসূল ﷺ এক জোড়া লাল বর্ণের শেরওয়ানী পরিধান করে বের হয়ে আসেন এবং সেটাকে (বর্ষা) সামনে রেখে সালাত আদায় করেন। আর মানুষ ও চতুষ্পদপ্রাণী সেটির সামনে দিয়ে চলাচল করছিল। সহিহ বুখারি : ৩৭৬, সহিহ মুসলিম : ৫০৩, সহিহ ইবনে হিব্বান : ১২৬৫, সুনানে আবূ দাঊদ : ৬৮৮

সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমানিত রসূলুল্লাহ ﷺ এর অজুর পানি, থুথু, ঘাম, চুল, পোশাক দ্বারা সাহবিগণ (রা.) বরকত হাদিসর করতেন। এখন যদি কেউ ভাবেন তাহলে তো আমাদের পীর, বুজুর্গ, আকাবিরদের থুথু, ক্বফ, ঘাম, পোশাক ইত্যাদি দ্বারা বরকত হাসিল করা যাবে কারন তারা নবীদের ওয়ারিস। তা হলে মহা ভুল করবেন কারন এটা শুধু রাসূল ﷺ জন্য খাস ছিল। তা না হলে আমাদের পীরের পীর, বুজুর্গদের বুজুর্গ, অলীদির অলী আবু বক্কর (রা.), ওমর (রা:), আলী (রা:), ওসমানসহ (রা:) কোন সাহাবির থুথু,  ঘাম, পোশাক থেকে কেউ বরকত লাভ করছেন বলে জানা যায় না। তাছাড়া আমরা যাকে তার বাহিজ্জিক আমল আখলাক দেখে আল্লাহর অলী মনে করছি। মহান আল্লাহর কাছে সে অলী না ও হতে পারে। 

অপর পক্ষে সকলের জন্য খাদ্য হিসাবে যাইতুনের তৈল, দুধ, মধু ও যমযমের পানি, আজও বরকতময়। মসজিদে হারাম, মসজিদে নবী, মসজিদে আকসা, এমনকি পৃথিবীর সকল মসজিদসমুহ আজও বরকত হাসিলের কেন্দ্রবিন্দু। আল্লাহর জিকির কারি বা নেককারদের সোহবত বরকতময় তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

(২) খাদ্যা হিসাবে বরকত আছেঃ

মহান আল্লাহ বলেন-

ثُمَّ کُلِیۡ مِنۡ کُلِّ الثَّمَرٰتِ فَاسۡلُکِیۡ سُبُلَ رَبِّکِ ذُلُلًا ؕ یَخۡرُجُ مِنۡۢ بُطُوۡنِہَا شَرَابٌ مُّخۡتَلِفٌ اَلۡوَانُہٗ فِیۡہِ شِفَآءٌ لِّلنَّاسِ ؕ اِنَّ فِیۡ ذٰلِکَ لَاٰیَۃً لِّقَوۡمٍ یَّتَفَکَّرُوۡنَ

অতঃপর তুমি (মৌমাছি) প্রত্যেক ফল থেকে আহার কর এবং তুমি তোমার রবের সহজ পথে চল। তার (মৌমাছি) পেট থেকে এমন পানীয় (মধু) বের হয়, যার রং ভিন্ন ভিন্ন, যাতে রয়েছে মানুষের জন্য রোগ নিরাময়। নিশ্চয় এতে নিদর্শন রয়েছে সে কওমের জন্য, যারা চিন্তা করে। সুরা নাহল : ৬৯

যাইদ ইবনু আসলাম (রহ.) হতে তার পিতার সূত্রে বর্ণিত আছে, উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, তোমরা (যাইতুনের) তেল খাও এবং তা শরীরে মালিশ কর। কেননা এটা বারকাত ও প্রাচুর্যময় গাছের তেল। সুনানে তিরমিজি : ১৮৫১, সুনানে  ইবনু মাজাহ : ১৩১৯

আয়েশা (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ এর নিকট দুধ আনা হলে তিনি বলতেন, এক অথবা দু’ বরকত। ইবনে মাজাহ : ৩৩২১

আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি রাসুলুল্লাহ ﷺ কে বলতে শুনেছেন, কালো জিরা ’সাম’ ব্যতীত সকল রোগের ঔষধ। ইবনু শিহাব বলেছেন, আর ’সাম’ অর্থ হল মৃত্যু। সহিহ বুখারি : ৫৬৮৮

তাই খাদ্য হিসেবে যাইতুন, মধু, দুধ ও কালোজিরা যে বরকত মত তাতে কোন  সন্দেহ নাই। বর্তমানে বিজ্ঞানাগারে পরীক্ষা নিরিক্ষার মাধ্যমে যে সকল হালাল খাদ্যে উপকার আছে তা গ্রহনেও কোন বাধা নাই।

(৩) স্থান হিসবে তিন সমজিদঃ

আবূ সাঈদ আল-খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, তিনটি মসজিদ ছাড়া অন্য কোথাও (নেকির আশায়) সফর করা যায় না। এ মসজিদগুলো হল, মাসজিদুল হারাম, আমার এই মসজিদ এবং মাসজিদুল আকসা। সহিহ বুখারি : ১১৮৯, সহিহ মুসলিম : ১৩৯১, সুনানে নাসায়ী ৭০০, সুনানে  আবূ দাঊদ ২০৩৩, ইবনু মাজাহ : ১৪০৯

 (৪) শিরকি তাবার্রুক

সহিহ হাদসি দ্বারা প্রমানিত আরাফাত, মিনা ও মুজদালিফায় বরকতময় ও দুয়া কবুলের স্থান। পৃথিবীর সকল মসজিদসমুহ অন্য সকল স্থান থেকে উত্তম বলা হয়েছে। কিন্ত যদি কেউ ররকত হাসিলের জন্য হেরাগুহা, জাবারে শুর, জাবালে রহমত, শোহাদায়ে ওহুদের কবর জিয়ারত করে করে কাজটি ছোট শিরক হবে। কেননা বরকত দানের মালিক আল্লাহ। আল্লাহ বা তার রাসূলুল্লাহ ﷺ এই সকল স্থানে বরকত হাসিলের কথা বলেন নাই। বরকত হাসিল করা যা কোন সাহাবি রাসূলুল্লাহ ﷺ এর জীবন দসায় বা ওফাতের পর এখান আসেন নাই। যদি বরকত হাসিলের জন্য ক্বাবা ঘরের গিলাফ, কোন মসজিদ বা মাজারের দেয়াল, মাটি, জানালা, দরজা ইত্যাদি চুমু খাওয়া ছোট শিরকের অন্তর্ভূকক্ত। তাছাড়া রাসূলুল্লাহ ﷺ এই সব বস্তু দ্বারা বরকত হাসিল কে মুর্তি পুজার সাথে তুলানা করছেন।

আবূ ওয়াক্বিদ আল লায়সী (রা.) হতে বর্ণিত। যখন রাসূলুল্লাহ ﷺ হুনায়নের যুদ্ধে বের হলেন, তখন তিনি মুশরিকদের এমন এক গাছের নিকট দিয়ে গমন করলেন, যাতে তারা নিজেদের অস্ত্রসমূহ ঝুলিয়ে রাখত। উক্ত গাছটিকে ’যাতু আনওয়াত’ বলা হত। এটা দেখে কোন কোন নতুন মুসলিমরা বলল, হে আল্লাহর রাসূল! ঐ সমস্ত মুশরিকদের মতো আমাদের জন্যও একটি ’যাতু আনওয়াত’ ধার্য করে দিন। তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, ’সুবহানাল্লহ। তোমাদের এ দাবীটি পূর্ববর্তী লোকদের রীতি নীতি ছাড়া আর কিছু্‌ই নয়, যার হাতে আমার জীবন তার কসম করে বলছি, তোমরা এমন কথাই বলেছো যা বনী ইসরাইল মূসা (আ.) কে বলেছিল, হে মূসা, মুশরিকদের যেমন মা’বুদ আছে আমাদের জন্য তেমন মা’বুদ বানিয়ে দাও। মুসা আলাইহিস সালাম বললেন, তোমরা মূর্খের মতো কথা বার্তা বলছ, (আরাফ-১৩৮। তোমরা অবশ্যই তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের রীতি নীতিই অবলম্বন করছো। সুনানে তিরমিজি : ২১৮০, মিশকাত : ৫৪০৮, মুসনাদে আহমাদ : ২১৯৪৭, সহিহ ইবনু হিব্বান : ৬৭০২, তবারানী :৩২১৮।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

َّقَدۡ رَضِىَ ٱللَّهُ عَنِ ٱلۡمُؤۡمِنِينَ إِذۡ يُبَايِعُونَكَ تَحۡتَ ٱلشَّجَرَةِ فَعَلِمَ مَا فِى قُلُوبِہِمۡ فَأَنزَلَ ٱلسَّكِينَةَ عَلَيۡہِمۡ وَأَثَـٰبَهُمۡ فَتۡحً۬ا قَرِيبً۬ا  

 আল্লাহ মু’মিনদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন যখন তারা গাছের নিচে তোমরা কাছে বাইয়াত করছিলো৷  তিনি তাদের মনের অবস্থা জানতেন৷ তাই তিনি তাদের ওপর প্রশান্তি নাযিল করেছেন, পুরস্কার স্বরূপ তাদেরকে আশু বিজয় দান করেছেন৷  সুরা ফাতহা : ১৮

যে গাছর নীচে এ বাইয়াত অনুষ্ঠিত হয়েছিলো সে গাছির কোন আলাদা মর্জাদা সহাবাগন দেন নাই।  সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে এসেছে, ইবনে সা’দে হযরত সাঈদ ইবনুল মুসাইয়েবের। তিনি বলেন, আমার পিতা বাইয়াতে রিদওয়ান শরীক ছিলেন। তিনি আমাকে বলেছেন পরের বছর আমরা যখন উমরাতুল কাযার জন্য গিয়েছিলাম তখন গাছটি হারিয়ে ফেলেছিলাম। অনুসন্ধান করেও তার কোন হদিস করতে পারিনি। হযরত উমর ( রা) তাঁর খিলাফত কালে যখন হুদাইবিয়া অতিক্রম করেন তখন জিজ্ঞেস করেন, যে গাছটি নিজে বাইয়াত হয়েছিলো তা কোথায়৷ কেউ বলে, অমুক গাছটি এবং কেউ বলেন অমুকটি। তখন হযরত উমর (রা:) বলেন, এ কষ্ট বাদ দাও, এর কোন প্রয়োজন নেই।

সময় হিসাবে: সাহাবিগন রাসূল ﷺ এর মৃত্যুর পর কখন তার জম্ম বা মৃত্যু বার্ষিকি পালন করেনি। ঈদে মিলাদন্নবী নাম করন করেনি। তেমনি ভাবে মিরাজের রাত্রি, অহুদ দিবস, বদর দিবস, হিজরত দিবস পালন করে নি। অথচ তাদের কাছে সময় এবং সুযোগ ছিল। তারা আমাদের চেয়ে দ্বীণ ভাল বুঝতেন। সুতারং সাহাবিগন যা করেনি তাতে কোন বরকত হতে পারে না বরং তা বিদাত বা শিরকি আলাম হবে।

৬। সমজে প্রচলিত নানান সামজিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে শিরক

সমজে প্রচলিত নানান সামজিক অনুষ্ঠান যা ইসলাম অনুমোধন করেনি, তা ইসলামি আদতে পালন করে উত্তম বা নেকির কাজ মনে করা হারাম। এই হারাম কাজটি যখন গইরুল্লাহর ইবাদত করা পর্যায় পৌছে যাবে, তখন আর হারাম থাকবে না, তখন কাজটি শিরক হবে। যেমন-

মৃত্যু ব্যক্তির লাসের উপর ফুল দেওয়া, বিভিন্ন বেদিবতে ফুল দেওয়া, তার সমানে নিরবতা পালন করা। কোন কিছুর সম্মান প্রদর্শের জন্য খালি পায়ে হাটা বাধ্য করে নেওয়া। নববর্ষে বিভিন্ন জীব জন্তুর প্রতিকৃতি বহন করে তাকে শুভ-অশুর প্রতিক বলে বিশ্বাস করা বা প্রচার করা। অথচ আল্লাহ সাবধান বাণী উচ্চারণ করে আমাদেরকে বলেন-

وَمَن يَبْتَغِ غَيْرَ الإِسْلاَمِ دِيناً فَلَن يُقْبَلَ مِنْهُ وَهُوَ فِي الآخِرَةِ مِنَ الْخَاسِرِينَ

 যে ব্যক্তি ইসলাম ছাড়া অন্য কিছুকে দীন হিসাবে অনুসন্ধান করবে, তার নিকট থেকে তা কবুল করা হবেনা। আর আখেরাতে সে ক্ষতি গ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে। সুরা আল ইমরান : ৮৫

৭। জোতিষবিদ বা গণকের কাছে গমন করা

পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে, বড় সাইন বোর্ড টাঙিয়ে ও পাখি দিয়েও ভাগ্য নির্ধারণের মিথ্যা অপচেষ্টা চলে। একটু লক্ষ করলেই শহরের রাস্তাঘাটে এ বিষয়টি নজরে পড়বে। অনেক মানুষ ভবিষ্যতের ভালো মন্দ জানার জন্য বা ভাগ্য গণনা করতে জোতিষবিদ ও গণকের কাছে গমন করে। তাদের যদি এ বিশ্বাস থাকর যে, তারা গায়েবী বিষয়ে জ্ঞানের অধিকারী তবে তারা কুফরিতে লিপ্ত হল যার অর্থ হচ্ছে তারা কাফির হয়ে গেল। নবী ﷺ এর কয়েকজন সহধর্মিনী হতে বর্ণিত আছ। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

«مَنْ أَتَى عَرَّافًا فَسَأَلَهُ عَنْ شَيْءٍ، لَمْ تُقْبَلْ لَهُ صَلَاةٌ أَرْبَعِينَ لَيْلَةً»

যে ব্যক্তি গণকের কাছে যাবে এবং তাকে কোনো কিছু জিজ্ঞেস করবে অতঃপর তাকে কিছু জিজ্ঞেস করবে সে ব্যক্তির চল্লিশ দিনের সালাত কবুল হবে না’’। সহিহ মুসলিম : ২২৩০

আবু হুরাইরাহ রাদিয়াল্লাহ থেকে বর্ণিত আছে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

مَنْ أَتَى كَاهِنًا فَصَدَّقَهُ بِمَا يَقُولُ، فَقَدْ كَفَرَ بِمَا أُنْزِلَ عَلَى مُحَمَّدٍ

যে জ্যোতিষের কাছে যাবে এবং তাদের কথা বিশ্বাস করলো সে নবী ﷺ এর উপরে নাযিলকৃত বিষয়ে কুফরি করলো’’। সুনানে আবু দাউদ : ৩৯০৪

আবূ মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন-

نَهَى رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم عَنْ ثَمَنِ الْكَلْبِ وَمَهْرِ الْبَغِيِّ وَحُلْوَانِ الْكَاهِنِ

কুকুরের বিক্রয় মূল্য, বেশ্যার পারিশ্রমিক এবং গণকের উপঢৌকনকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিষিদ্ধ করেছেন। সুনানে তিরমিজি : ২০৭১, সুনানে ইবনু মাজাহ : ২১৫৯)।

আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

«مَنْ أَتَى كَاهِنًا فَصَدَّقَهُ بِمَا يَقُولُ أَوْ أَتَى امْرَأَتَهُ حَائِضًا أَو أَتَى امْرَأَته من دُبُرِهَا فَقَدْ بَرِئَ مِمَّا أُنْزِلَ عَلَى مُحَمَّدٍ

যে ব্যক্তি কোন জ্যোতিষের কাছে যায় এবং সে যা কিছু বলে তা বিশ্বাস করে অথবা যে ব্যক্তি ঋতুমতী অবস্থায় নিজের স্ত্রীর সাথে সঙ্গম করে কিংবা যে ব্যক্তি স্ত্রীর পিছন দ্বার দিয়ে সহবাস করে, সে ঐ জিনিস হতে সম্পর্কহীন হয়ে গেল, যা মুহাম্মাদ ﷺ এর ওপর অবতীর্ণ করা হয়েছে। সুনানে আবূ দাঊদ : ৩৯০৪, সুনানে ইবনু মাজাহ ৬৩৯, মিশকাত : ৪৫৯৯,  আহমাদ ৯৫৩৬, সহিহাহ : ২৬৫০, সহীহ আত্ তারগীব ওয়াত্ তারহীব ৩০৪৪।

ইকরিমাহ (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আবূ হুরাইরাহ (রা.) কে বলতে শুনেছি, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, আল্লাহ্ তা’আলা যখন আকাশে কোন ফায়সালা করেন তখন মালায়িকাহ আল্লাহর নির্দেশের প্রতি অতি নম্রভাবে তাদের ডানা ঝাড়তে থাকে; যেন মসৃণ পাথরের উপর শিকলের আওয়াজ। যখন তাদের মনের ভয়-ভীতি দূর হয় তারা (একে অপরকে) জিজ্ঞেস করে, তোমাদের প্রতিপালক কী বলেছেন? তারা বলেন, তিনি যা বলেছেন, সত্যই বলেছেন। তিনি মহান উচ্চ। যে সময়ে লুকোচুরিকারী (শায়ত্বন) তা শোনে, আর লুকোচুরিকারী এরূপ একের ওপর এক। সুফ্ইয়ান তাঁর হাত উপরে উঠিয়ে আঙ্গুলগুলো ফাঁক করে দেখান। তারপর শায়ত্বন কথাগুলো শুনে নেয় এবং প্রথমজন তার নিচের জনকে এবং সে তার নিচের জনকে জানিয়ে দেয়। এমনিভাবে এ খবর দুনিয়ার জাদুকর ও জ্যোতিষের কাছে পৌঁছে দেয়। কোন কোন সময় কথা পৌঁছানোর আগে তার উপর অগ্নিশিখা নিক্ষিপ্ত হয় আবার অগ্নিশিখা নিক্ষিপ্ত হওয়ার আগে সে কথা পৌঁছিয়ে দেয় এবং এর সাথে শত মিথ্যা মিশিয়ে বলে। এরপর লোকেরা বলাবলি করে সে কি অমুক দিন অমুক অমুক কথা আমাদের বলেনি? এবং সেই কথা যা আসমান থেকে শুনে এসেছে তার জন্য সব কথা সত্য বলে মনে করে। সহিহ বুখারি : ৪৮০০

গনক, জ্যোতিষ এবং এ ধরনের কাজের সাথে জড়িতরা কাফির। কেননা তারা গায়েবী বিষয়ে জ্ঞানের দাবী করে অথচ গায়েবী বিষয় একমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা‘আলাই পরিজ্ঞাত। অন্য কেউই গায়েব জানে না। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

 قُل لَّا يَعۡلَمُ مَن فِي ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضِ ٱلۡغَيۡبَ إِلَّا ٱللَّهُۚ 

আপনি বলুন, একমাত্র আল্লাহ ব্যতীত আসমান ও যমীনের কেউ অদৃশ্যের সংবাদ জানেন না। সুরা নামল : ৬৫

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আরও বলেন-

 قُل لَّآ أَقُولُ لَكُمۡ عِندِي خَزَآئِنُ ٱللَّهِ وَلَآ أَعۡلَمُ ٱلۡغَيۡبَ وَلَآ أَقُولُ لَكُمۡ إِنِّي مَلَكٌۖ إِنۡ أَتَّبِعُ إِلَّا مَا يُوحَىٰٓ إِلَيَّۚ قُلۡ هَلۡ يَسۡتَوِي ٱلۡأَعۡمَىٰ وَٱلۡبَصِيرُۚ أَفَلَا تَتَفَكَّرُونَ

বল, আমি বলছি না যে, আমার কাছে আল্লাহর ভাণ্ডারসমূহ রয়েছে, আমি গায়েবও জানি না। আমি তোমাদের এ কথাও বলছি না যে , আমি একজন ফেরেশতা। আমি অনুসরণ করি শুধু তাই যা আমার কাছে ওহী হয়ে আসে। সূরা আনাআম : ৫০

৮। যাদুকরের নিকট গমন করা

বর্তমানে সমাজে মানুষ যাদুকে একটি শিল্প হিসাবে গণ্য করছে। ইহার চর্চাকারীদের উৎসাহিত করার জন্য তারা নানান প্রতিযোগিতার এবং পুরস্কার প্রদান ব্যবস্থা করছে। জ্ঞানের অভাবে অনেক মুমলিম ইহাদের ব্যাপারে ঢিলামি ও শৈথিল্য প্রদর্শন করছে। বরং যাদুকে অনেকেই গর্বের বিষয় মনে করে, ইহা শিক্ষা গ্রহনের জন্য সময় ও অর্থ খরচ করে থাকে। ইসলামের সঠিক জ্ঞানের অভাবে অনেকে যাদুকরদের প্রদর্শিনে হাজির হয়ে থাকে। যাদুকরগন ও হাজার হাজার দর্শকদের চিত্তবিনোদ করে জিবীকা নির্বাহ করে থাকে। যাদুতে বিশ্বাস করা যেহেতু শিরকি আকিদা তাই এই আক্বীদার ব্যাপারে গাফিলতি ও শৈথিল্য প্রদর্শন করা যাবে না।  

যাদু একটি স্পষ্ট শয়তানী কাজ। যাদু বিদ্যা আয়ত্ব করেত হলে অধিকাংশ ক্ষেতে শিরকি কাজের সাহায্য নিতে হয়। দুরাত্মা এবং অপবিত্র শয়তানদের পছন্দনীয় কাজের মাধ্যমে তাদের নৈকট্য হাসিল করতে হয়। আল্লাহর নৈকট্য হাসিল করাই মুমিনদের এক মাত্র কাজ। যাদু শিক্ষার প্রধান কাজই হল, দুরাত্মা এবং অপবিত্র শয়তানদের নৈকট্য হাসিল করা যা শিরকি কাজ। এই শিরকি যাদুর সত্যি সত্যি অস্তিত্ব রয়েছে যার প্রমান কুরআন ও সহিহ হাসিদের সুস্পষ্ট বর্ননা (সূরা বাকারা- ১০২)। সুরা ফালাক এবং সুরা নাসের শানে নুযুলে বলা হয়েছে, সপ্তম হিজরীতে ইহুদিরা যখন মদীনায় রসূলুল্লাহ ﷺ এর উপর যাদু করেছিল এবং তার প্রভাবে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন তখন এ সূরা দুটি নাযিল

আয়িশা (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী ﷺ এত এত দিন এমন অবস্থায় অতিবাহিত করছিলেন যে, তাঁর খেয়াল হতো যেন তিনি তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে মিলিত হয়েছেন, অথচ তিনি মিলিত হননি। ’আয়িশাহ বলেন, অতঃপর তিনি আমাকে বললেন, হে ’আয়িশাহ! আমি যে ব্যাপারে জানতে চেয়েছিলাম, সে বিষয়ে আল্লাহ আমাকে জানিয়ে দিয়েছেন। (আমি স্বপ্নে দেখলাম) আমার কাছে দু’জন লোক আসল। একজন বসলো আমার পায়ের কাছে এবং আরেকজন মাথার কাছে। পায়ের কাছে বসা ব্যক্তি মাথার কাছে বসা ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করলঃ এ ব্যক্তির অবস্থা কী? সে বললঃ তাঁকে যাদু করা হয়েছে। সে আবার জিজ্ঞেস করলঃ তাঁকে কে যাদু করেছে? সে বললঃ লাবীদ ইবনু আ’সাম। সে আবার জিজ্ঞেস করল, কিসের মধ্যে? সে বলল, নর খেজুর গাছের খোসার ভিতরে তাঁর চিরুনীর এক টুকরা ও আঁচড়ানো চুল ঢুকিয়ে দিয়ে ’যারওয়ান’ কূপের মধ্যে একটা পাথরের নীচে রেখেছে। এরপর নবী ﷺ গিয়ে দেখে বললেন, এ সেই কূপ যা আমাকে স্বপ্নে দেখানো হয়েছে। সেখানের খেজুর গাছের মাথাগুলো যেন শয়তানের মাথা এবং সে কূপের পানি যেন মেহদী ভেজা পানি। এরপর নবী ﷺ এর হুকুমে তা কূপ থেকে বের করা হলো। ’আয়িশাহ বলেন, তখন আমি বললাম। হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কেন অর্থাৎ এটি প্রকাশ করলেন না? নবী ﷺ বললেন, আল্লাহ তো আমাকে আরোগ্য করে দিয়েছেন, আর আমি মানুষের নিকট কারো দুষ্কর্ম ছড়িয়ে দেয়া পছন্দ করি না। আয়িশা (রাঃ) বলেনঃ লাবীদ্ ইবনু আ’সাম ছিল ইয়াহূদীদের মিত্র বনূ যুরায়কের এক ব্যক্তি। সহিহ বুখারি : ৬০৬৩

বলা যায় যাদু আমাদের নবী ﷺ এর উপর প্রভাব বিস্তার করেছিল। এই যাদু মানুষের মনের উপর, দেহের উপর আছর করে। ফলে সে কখনো অসুস্থ হয়ে পড়ে এমন কি কখনো নিহতও হয়। যাদু দ্বারা স্বামী স্ত্রীর মাঝে বিচ্ছেদ সৃষ্টি করা যায়। তবে বিশ্বাস করতে হবে, যাদুর এই আছর ও আল্লাহ তাআলার পার্থিব ও তাক্বদীরে নির্ধারিত হুকুম ও অনুমতি ক্রমেই হয়ে থাকে। যেহেতু অনেকে যাদুর নিজস্ব ক্ষমতা আছে মনে করে। যাদুর নিজস্ব ক্ষমতা আছে এই কথা মনে প্রানে বিশ্বাস করলে শিরকে আকবর হবে। তবে আল্লাহ উপর বিশ্বাস থাকা সত্ত্বেও জাদুকরের নিকট গমন তার তদবির গ্রহণ করা শিরকে আসগর।

কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছে-

وَمَا ڪَفَرَ سُلَيۡمَـٰنُ وَلَـٰكِنَّ ٱلشَّيَـٰطِينَ كَفَرُواْ يُعَلِّمُونَ ٱلنَّاسَ ٱلسِّحۡرَ وَمَآ أُنزِلَ عَلَى ٱلۡمَلَڪَيۡنِ بِبَابِلَ هَـٰرُوتَ وَمَـٰرُوتَ‌ۚ وَمَا يُعَلِّمَانِ مِنۡ أَحَدٍ حَتَّىٰ يَقُولَآ إِنَّمَا نَحۡنُ فِتۡنَةٌ۬ فَلَا تَكۡفُرۡ‌ۖ فَيَتَعَلَّمُونَ مِنۡهُمَا مَا يُفَرِّقُونَ بِهِۦ بَيۡنَ ٱلۡمَرۡءِ وَزَوۡجِهِۦ‌ۚ وَمَا هُم بِضَآرِّينَ بِهِۦ مِنۡ أَحَدٍ إِلَّا بِإِذۡنِ ٱللَّهِ‌ۚ وَيَتَعَلَّمُونَ مَا يَضُرُّهُمۡ وَلَا يَنفَعُهُمۡ‌ۚ وَلَقَدۡ عَلِمُواْ لَمَنِ ٱشۡتَرَٮٰهُ مَا لَهُ ۥ فِى ٱلۡأَخِرَةِ مِنۡ خَلَـٰقٍ۬‌ۚ وَلَبِئۡسَ مَا شَرَوۡاْ بِهِۦۤ أَنفُسَهُمۡ‌ۚ لَوۡ ڪَانُواْ يَعۡلَمُونَ  

আর তারা অনুসরণ করেছে, যা শয়তানরা সুলাইমানের রাজত্বে পাঠ করত। আর সুলাইমান কুফরী করেনি; বরং শয়তানরা কুফরী করেছে। তারা মানুষকে যাদু শেখাত এবং (তারা অনুসরণ করেছে) যা নাযিল করা হয়েছিল বাবেলের দুই ফেরেশতা হারূত ও মারূতের উপর। আর তারা কাউকে শেখাত না যে পর্যন্ত না বলত যে, ‘আমরা তো পরীক্ষা, সুতরাং তোমরা কুফরী করো না। এরপরও তারা এদের কাছ থেকে শিখত, যার মাধ্যমে তারা পুরুষ ও তার স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটাত। অথচ তারা তার মাধ্যমে কারো কোন ক্ষতি করতে পারত না আল্লাহর অনুমতি ছাড়া। আর তারা শিখত যা তাদের ক্ষতি করত, তাদের উপকার করত না এবং তারা অবশ্যই জানত যে, যে ব্যক্তি তা ক্রয় করবে, আখিরাতে তার কোন অংশ থাকবে না। আর তা নিশ্চিতরূপে কতই-না মন্দ, যার বিনিময়ে তারা নিজদেরকে বিক্রয় করেছে। যদি তারা জানত। সূরা বাকারা : ১০২   

উক্ত আয়াতে বলা হইয়াছে, যাদু শয়তানদের শিখানো বস্তু যা হাসিল করা কুফরি কাজ। এতে গায়েবী এলেমের প্রতি বিশ্বাস জম্মে ও অদৃশ্য বিষয়ে নগদ ফলাফলের আশা করা হয়, যা আল্লাহর সাথে শিরক  করার সমতুল্য।

৯। তাবীজ লটকানো, রিং, তাগা পরিধান করা, হাতে লোহা বা রাবারের আংটা লাগানো, সুতা, পুঁতির মালা বা অনুরূপ বস্তু ব্যবহার করা

ঈসা ইবনু আবদুর রাহমান ইবনু আবূ লাইলা (রহঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমি আবদুল্লাহ ইবনু উকাইম আবূ মা’বাদ আল-জুহানীর অসুস্থ অবস্থায় তাকে দেখতে গেলাম। তিনি বিষাক্ত ফোঁড়ায় আক্রান্ত ছিলেন। আমি বললাম, কিছু  ঝুলিয়ে রাখছেন না কেন? তিনি বললেন, মৃত্যু তো এর চেয়েও নিকটে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

مَنْ تَعَلَّقَ شَيْئًا وُكِلَ إِلَيْهِ

যে লোক কোনকিছু ঝুলিয়ে রাখে তাকে তার উপরই সোপর্দ করা হয়। সুনানে তিরমিজি : ২০৭২ মান সহিহ

আবূ বাশীর আল-আনসারী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, কোন এক সফরে তিনি আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সঙ্গে ছিলেন। রাবী ‘আবদুল্লাহ্‌ বলেন, আমার মনে হয়, তিনি (আবূ বাশীর আনসারী) বলেছেন যে, মানুষ শয্যায় ছিল। তখন আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একজন সংবাদ বহনকারী পাঠালেন যে, কোন উটের গলায় যেন ধনুকের রশির মালা কিংবা মালা না ঝুলে, আর ঝুললে তা যেন কেটে ফেলা হয়। সহিহ বুখারি : ৩০০৫

নোটঃ  জাহেলী যুগে কুসংস্কারের কারণে উটের গলায় মালা লটকানো হতো যাতে উট বদ নজর থেকে রক্ষা পায়। আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এই ভ্রান্ত ধারণা ও রসম উৎখাতের ব্যবস্থা করেন।

আব্দুল্লাহ (রা.) এর স্ত্রী যাইনাব (রাঃ) আব্দুল্লাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি-

إِنَّ الرُّقَى، وَالتَّمَائِمَ، وَالتِّوَلَةَ شِرْكٌ قَالَتْ

যাদু, তাবীজ ও অবৈধ, প্রেম ঘটানোর মন্ত্র শির্ক-এর অন্তর্ভুক্ত। সুনানে আবু দাউদ : ৩৮৮৩ আংশিক

টিকা : এখানে যে ঝাড়ফুঁক করাকে শিরক বলা হয়েছে, তা দ্বারা শির্কী কালামের মাধ্যমে ঝাড়ফুঁক উদ্দেশ্য। তবে ঝাড়ফুঁক যদি আল্লাহর কালাম, আল্লাহর সিফাত বা সহীহ হাদীছে বর্ণিত কোন বাক্যের মাধ্যমে হয়, তাতে কোন অসুবিধা নেই। কারন সহিহ হাদিস দ্বারা ঝাড়ফুঁক করাকে শরিয়ত সম্মত বলা হয়েছে।

উকবা বিন আমের রা. হতে একটি ‘‘মারফু’’ হাদীসে বর্ণিত আছে, যে ব্যক্তি তাবিজ ঝুলায় আল্লাহ যেন তার আশা পূরণ না করেন। যে ব্যক্তি কড়ি, শঙ্খ বা শামুক ঝুলায় তাকে যেন আল্লাহ রক্ষা না করেন।’’ অপর একটি বর্ণনায় আছে, যে ব্যক্তি তাবিজ ঝুলালো সে শিরক করলো। সিলসিলায়ে সহীহা : ৮০৯, মুসনাদে আহমাদ : ৪/১৫৬, কিতাবুত তাওহীদ, সপ্তম অধ্যায়, মুহাম্মদ বিন আব্দুল ওহহাব রহ.

উকবা বিন আমের আল-জোহানি রাদিআল্লাহু আনহু বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমতে একদল লোক উপস্থিত হল। তিনি দলটির নয়জনকে বায়আত করলেন একজনকে করলেন না। তারা বলল, হে আল্লাহর রাসূল! নয়জনকে বায়আত করলেন একজনকে করলেন না? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: তার সাথে তাবিজ রয়েছে। অতঃপর তিনি স্বহস্তে তা ছিড়ে ফেললেন এবং তাকে বায়আত করলেন, আর বললেন, যে ব্যক্তি তাবিজ ব্যবহার করল সে শিরক করল। সহিহ মুসনাদে আহমদ, হাকেম হাদিসের মান সহিহ।

নিম্ম লিখিত কারনে তাবিজ-কবজ নাই-

ক। যে কালামের ভাষা বুঝা যায়না তা দ্বারা তাবিজ-কবজ করা হয়।

খ। সংখ্যা সম্ভলিত তাবিজ-কবজ জায়েজ নাই কারন ইহা অনেকটা জ্যেতিষীদের রাশি এবং ভাগ্য গনণার মত। তাছাড়া ইহার আবিস্কারক হল গ্রীসরা যা পরে আরবদের মাঝে প্রসার লাভকরে। ইসলামের মুল উত্স কুরআন হাদিসে এর অস্তিস্থ খুজেও পাবে না।

গ। শির্ক যুক্ত কালাম বা আল্লাহ ছাড়া অন্যের আশ্রায় খোজা। যেমন: ইয়া ফিরাউন, ইয়া হামান, ইয়া কিতমির (জিনের সর্দার) ইত্যাদি লিখে তাবিজ দেওয়া হয়।

ঘ। নকসা সম্ভলিত তাবিজ দেয়া  হয়। যেমন- নবী সা. এর জুতার নকসা, আলি (রা.) তলোযারের নকসা, কাবার নকসা ইত্যাদি।

ঙ। যদি কেউ এ বিশ্বাস করে যে, তাবিজ-কবজ বা ঝাড়-ফুকের নিজস্ব ক্ষমতা আছে তবে শিরকে আকবর হবে।

এই সব কারনে সালাফিগণ সকল প্রকারের তাবিজ-কবজের ব্যবহার কে ছোট শিরক মনে করে। কিন্তু ইহার উপর তাওয়াক্কুল করা কে বড় শির্ক মনে করে, যা কোন ব্যক্তি কে ইসলাম থেকে বের করে দেয়। 

১০ বরকত লাভের আশায় মাজারে ধূপকাঠি, আগরবাতি ও মোমবাতি জ্বালানো  

সুফিগন মাজারে যে সকল বিদআত করে থাকে তার মধ্যে অন্যতম হল- মাজারে ধূপকাঠি, আগরবাতি ও মোমবাতি জ্বালানো ও চাদর চড়ান। এ ধরনের বিদাআতি কাজ ইসলামের প্রাথমিক যুগে ছিলনা। এ সকল কাজ সমাজে মুশরিক বা অগ্নি পুজকদের মাঝে প্রচলিত। আস্তে আস্তে কাল ক্রমে মুশরিকদের নিকট থেকেই মুসলিমদের মাঝে প্রবেশ করে, আজ যা মুসলিদের বিশেষ একটা অংশ ইবাদাত মনে করে পালন করে থাকে। তাদের ধারনা মাজারে ধূপকাঠি, আগরবাতি ও মোমবাতি জ্বালালে মাজারে শায়িত ব্যক্তি খুসি হবে এবং তারা বরকত লাভ করবে। প্রথমত গাইরুল্লাহকে খুসি করার জন্য তারা এই বিদআতি কর্মটি শিরকে পরিনত করল। দ্বিতীয়ত বরকত দানের একমাত্র আল্লাহ অথচ তার এই গুনের মধ্যে সুফিরা তাদের অলীকে সম্পৃক্ত করে শিরক করল। তৃতীয়ত মৃত্যুর পর দুনিয়ার সাথে মৃত ব্যক্তির সকল প্রকারের সম্পর্কি বিচ্ছিন্ন হয় যায়। অথচ সুফিরা মনে করেন তাদের অলীগণ মরে না। তারা তাদের কবরে জীবিত। এক কথায় বলা যায় মাজারে ধূপকাঠি, আগরবাতি ও মোমবাতি জ্বালানোর মাধ্যামে মাজার পুজারীগণ উপরের তিনটি শিরকে লিপ্ত হয়।

ইবনু আব্বাস (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন-

لَعَنَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ زَائِرَاتِ الْقُبُورِ، وَالْمُتَّخِذِينَ عَلَيْهَا الْمَسَاجِدَ وَالسُّرُجَ

রাসূলুল্লাহ ﷺ কবর যিয়ারাতকারী মহিলাদের অভিসম্পাত করেছেন। যারা কবরের উপর মাসজিদ নির্মাণ করে এবং কবরে বাতি জ্বালায় তাদেরকেও অভিসম্পাত করেছেন। সুনানে আবু দাউদ : ৩২৩৬, সুনানে তিরমিজি : ৩২০, সুনান নাসায়ী : ১১৮, মিশকাত : ৮৪০ মান জইফ।

উক্ত হাদিসে সুষ্পষ্ট রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন- কবরে বাতি প্রজ্জ্বলনকারীর উপর আল্লাহ তায়ালার অভিশম্পাত করেছেন।  

১১।  নিজেকে মালিকুল আমলাক (রাজাধিরাজ) উপাধিতে ভুষিত করা

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

قُلِ اللّٰہُمَّ مٰلِکَ الۡمُلۡکِ تُؤۡتِی الۡمُلۡکَ مَنۡ تَشَآءُ وَتَنۡزِعُ الۡمُلۡکَ مِمَّنۡ تَشَآءُ ۫ وَتُعِزُّ مَنۡ تَشَآءُ وَتُذِلُّ مَنۡ تَشَآءُ ؕ بِیَدِکَ الۡخَیۡرُ ؕ اِنَّکَ عَلٰی کُلِّ شَیۡءٍ قَدِیۡرٌ

বল, ‘হে আল্লাহ, রাজত্বের মালিক, আপনি যাকে চান রাজত্ব দান করেন, আর যার থেকে চান রাজত্ব কেড়ে নেন এবং আপনি যাকে চান সম্মান দান করেন। আর যাকে চান অপমানিত করেন, আপনার হাতেই কল্যাণ। নিশ্চয় আপনি সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান’। সুরা আল ইমরান : ২৬

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

اِنَّ الۡاَرۡضَ لِلّٰہِ ۟ۙ یُوۡرِثُہَا مَنۡ یَّشَآءُ مِنۡ عِبَادِہٖ ؕ وَالۡعَاقِبَۃُ لِلۡمُتَّقِیۡنَ

এই পৃথিবীর সার্বভৌম মালিক আল্লাহ, তিনি তাঁর বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা উহার উত্তরাধিকারী করেন, শুভ পরিণাম ও শেষ সাফল্য লাভ হয় আল্লাহভীরুদের জন্য। সুরা আরাফ : ১২৮

আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

أَخْنَى الأَسْمَاءِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ عِنْدَ اللَّهِ رَجُلٌ تَسَمَّى مَلِكَ الأَمْلاَكِ ‏

আল্লাহ তাআলার নিকট কিয়ামত দিবসে এ ব্যাক্তির নাম সব চাইতে ঘৃণিত, যে তার নাম ধারণ করেছে মালিকাল আমলাক (مَلِكَ الأَمْلاَكِ) বা রাজাধিরাজ। সহিহ বুখারি : ৬২০৫

এমনই কিছু শব্দ যা উপাধি বা নাম হিসাবে আমাদের দেশে ব্যবহার করা হয়। যেমন-

শাহ জাহান, শাহান শাহ, কাজিউল কুজাত, হাকিমুল হুক্কাম,  হাকিমুল হাকিম। একই অর্থবহন করে এমন বাংলা নামও আছে। যেনম- রাজাধিরাজ, মহারাজ, জগতের বাদশাহ, বিচারকদের বিচারক, শাসকদের শাসক ইত্যাদি। প্রকৃত পক্ষ মহান আল্লাহই হলেন, রাজাধিরাজ। কিয়ামের দিন মহান আল্লাহ নিজেকে রাজাধিরাজ ঘোষণা করবেন।

আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলতেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,

يَقْبِضُ اللَّهُ الأَرْضَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَيَطْوِي السَّمَاءَ بِيَمِينِهِ ثُمَّ يَقُولُ أَنَا الْمَلِكُ أَيْنَ مُلُوكُ الأَرْضِ ‏

 আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন যমীন ও আসমানকে গুটিয়ে তাঁর ডান হাতে মুষ্টিবদ্ধ করে বলবেন, আমিই রাজাধিরাজ, পৃথিবীর রাজা-বাদশারা (আজ) কোথায়? সহহি বুখারী : ৪৮১২, ৭৩৮২, ৭৪১৩; মুসলিম : ২৭৮৭, ইবনে মাজাহ : ১৯২

যে নামগুলো রাখলে মহান আল্লাহ খান নাম এসে যায়, সেই নামে রাখার যাবে না। যে নামগুলো সরাসির আল্লাহর গুনের সাথে সরাসরি  সম্পৃক্ত তা রাখল শিরকি কাজ হবে।

১২। ক্ষমা পাওয়ার আশায় গাইরুল্লাহ নিকট তাওবা করা

মহান আল্লাহ তাওবা করার হুকুম দান করেছে। নবী রাসুল সকলেই মহান আল্লাহর নিকট তাওবা করেছেন। আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কাছে তাওবা করা শিরকি কাজ। হিন্দুরা মুর্তির সামনে ঠাকুরের কাছে পাপ মোচনের জন্য ধর্না দেয়। খৃষ্টারগন তাদের নির্বাচিত ফাদারের কাছে পাপের কথা বলে পাপ মোচন করে। মুসলিমগন ও তাদের দেখাদেখি আজ কাল পীরের হাতে হাত দিয়া তাওবা করছেন। অথচ তাওবা হল অনুতপ্ত হয়ে একমাত্র আল্লহর দরবারে কান্না কাটি করা। যদি হিন্দু ও খৃণ্টানদের মত আকিদা রাখি আল্লাহ মাধ্যম (ফাদার বা ঠাকুর) ছাড়া তাওবা কবুল করেন না। তবে তো মুশরিকি আকিদা পোষশ করা হল। অথচ কুরআনে আল্লাহ বারবার ঘোষনা করছেন আল্লাহর নিকট তাওবা কর, তিনিই তাওবা কবুল কারি। তিনি ছাড়া তওবা কবুল করার আর কেউ নাই। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

 وَٱلَّذِينَ إِذَا فَعَلُواْ فَـٰحِشَةً أَوۡ ظَلَمُوٓاْ أَنفُسَہُمۡ ذَكَرُواْ ٱللَّهَ فَٱسۡتَغۡفَرُواْ لِذُنُوبِهِمۡ وَمَن يَغۡفِرُ ٱلذُّنُوبَ إِلَّا ٱللَّهُ وَلَمۡ يُصِرُّواْ عَلَىٰ مَا فَعَلُواْ وَهُمۡ يَعۡلَمُونَ

আর যারা কখনো কোন অশ্লীল কাজ করে ফেললে অথবা কোন গোনাহের কাজ করে নিজেদের ওপর জুলুম করে বসলে আবার সংগে সংগে আল্লাহর কথা স্মরণ হয়ে তাঁর কাছে নিজেদের গোনাহ খাতার জন্য মাফ চায়। কারণ আল্লাহ ছাড়া আর কে গোনাহ মাফ করতে পারেন এবং জেনে বুঝে নিজেদের কৃতকর্মের ওপর জোর দেয় না। সুরা আল ইমরান : ১৩৫

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَهُوَ ٱلَّذِى يَقۡبَلُ ٱلتَّوۡبَةَ عَنۡ عِبَادِهِۦ وَيَعۡفُواْ عَنِ ٱلسَّيِّـَٔاتِ وَيَعۡلَمُ مَا تَفۡعَلُونَ

 তিনিই সেই মহান সত্তা যিনি তার বান্দাদের তওবা কবুল করেন এবং মন্দ কাজসমূহ ক্ষমা করেন৷ অথচ তোমাদের সব কাজকর্ম সম্পর্কে তার জানা আছে৷ সুরা শুরা : ২৫

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَتُوبُوٓاْ إِلَى ٱللَّهِ جَمِيعًا أَيُّهَ ٱلۡمُؤۡمِنُونَ لَعَلَّكُمۡ تُفۡلِحُونَ

হে মু’মিনগণ! তোমরা সবাই মিলে আল্লাহর কাছে তাওবা করো, আশা করা যায় তোমরা সফলকাম হবে৷ সুরা নুর ২৪:৩১

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَمَا لَنَا لَا نُؤۡمِنُ بِٱللَّهِ وَمَا جَآءَنَا مِنَ ٱلۡحَقِّ وَنَطۡمَعُ أَن يُدۡخِلَنَا رَبُّنَا مَعَ ٱلۡقَوۡمِ ٱلصَّـٰلِحِينَ

তবে কি তারা আল্লাহর কাছে তাওবা করবে না এবং মাফ চাইবে না? আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল ও করুণাময়৷ সুরা মায়েদা : ৭৪

যারা আজ ঠাকুর, ফাদার, পুরহীদদের নিকট তাওবা করে গুনা মাফের ফরিয়াদ করছে। তাদের এই শিরকি কাজের জন্য তাদের তাওবা কবুল হবে না। এবং কাল কিয়ামতের কঠিন ময়দানে তাদের তাওবা করার সুযোগই দেওয়া হবে না, তাওবা কবুল করা তো অনেক দুরের কথা। তাদের সম্পর্কে কুরআনের কিছু আয়ত দেওয়া হল। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

ذَلِكُمْ بِأَنَّكُمُ اتَّخَذْتُمْ آيَاتِ اللَّهِ هُزُوًا وَغَرَّتْكُمُ الْحَيَاةُ الدُّنْيَا فَالْيَوْمَ لَا يُخْرَجُونَ مِنْهَا وَلَا هُمْ يُسْتَعْتَبُونَ

তোমাদের এই পরিণাম এ জন্য যে, তোমরা আল্লাহর আয়াতসমূহকে ঠাট্টা-বিদ্রূপের বিষয়ে পরিণত করেছিলে এবং দুনিয়ার জীবন তোমাদের ধোকায় ফেলে দিয়েছিলো৷ তাই আজ এদেরকে দোযখ থেকেও বের করা হবে না কিংবা একথাও বলা হবে না যে, তাওবা চেয়ে আল্লাহকে সন্তুষ্ট করো৷  সুরা জাসিয়াহ : ৩৫

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

 وَيَوۡمَ نَبۡعَثُ مِن كُلِّ أُمَّةٍ۬ شَهِيدً۬ا ثُمَّ لَا يُؤۡذَنُ لِلَّذِينَ ڪَفَرُواْ وَلَا هُمۡ يُسۡتَعۡتَبُونَ (٨٤)

যেদিন আমি উম্মতের মধ্য থেকে একজন করে সাক্ষী দাঁড় করাবো, তারপর কাফেরদের যুক্তি-প্রমাণ ও সাফাই পেশ করার সুযোগও দেয়া হবে না৷ আর তাদের কাছে তাওবা ইসতিগফারেরও দাবী জানানো হবে না৷ সুরা নাহল : ৮৪

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

 فَيَوۡمَٮِٕذٍ۬ لَّا يَنفَعُ ٱلَّذِينَ ظَلَمُواْ مَعۡذِرَتُهُمۡ وَلَا هُمۡ يُسۡتَعۡتَبُونَ (٥٧)

কাজেই সেদিন জালেমদের কোন ওজর- আপত্তি কাজে লাগবে না এবং তাদেরকে তাওবা করতে বলা হবে না৷ (সুরা রুম ৩০:৫৭)।

কাজেই সময় থাকতে মহান আল্লাহর নিকট খালেছ তাওবা করে পর কালের জন্য প্রস্তত হতে হবে। কারন পরকালে কোন প্রকার তাওবার সুযোগও নাই। যিনি কবুল করবেন সেই আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কাছে তাওবা করা কতটুকু যৌক্তিক কাজ হবে?

১৩  কফিনে ফুল দেয়া বা পুষ্পস্তবক অর্পণ করা

বর্তমানে আমাদের ঢাকা শহরে কোন কবি, সাহিত্যিক, লেখক, শিক্ষক, এমপি, মিনিষ্টার বা বিখ্যাত নামকরা কেউ মারাগেলে তার প্রতি শ্রদ্ধা অর্ঘ্য অর্পণের উদ্দেশে শহীদ মিনার বা তার কর্মস্থলে রাখা হয়। তার নিকট প্রিয়জন বা শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিগন তার কফিনে ফুল দেন। তারা ফুল দিয়ে মৃত ব্যক্তির প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসর অর্ঘ্য অর্পণ করেন থাকেন, তবে তারা সকলে মৃত ব্যক্তির কল্যাণের উদ্দেশ্যে বা সওয়াব পাঠানোর নিয়তে করেন কিনা তা ষ্পষ্ট নয়। কারন ইসলামি শরীয়তে মৃত্যুর জন্য কিছু করতে হল তা অবশ্যই আল্লাহর হুকুম ও রাসূলুল্লাহ ﷺ দেখান পথে করতে হবে। যদি কাজটি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য করা না হয় বা লোক দেখানোর জন্য হয় অথবা আল্লাহর রাসূল কর্তৃক কাজটি অনুমোদিত না হয়, তাহলে এ কাজ আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না।

 আয়িশাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন-

مَنْ أَحْدَثَ فِيْ أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ فِيْهِ فَهُوَ رَدٌّ

যদি কেউ আমাদের এই দ্বীনে নতুন কিছু উদ্ভাবন করে যা তাতে নেই, তা প্রত্যাখ্যাত। সহিহ বুখারি ২৬৯৭, সহিহ মুসলিম : ১৭১৮, সুনানে আবূ দাঊদ : ৪৬০৬

তবে এ আমল যে মুসলামানদের নয় সে ব্যাপারটি সুষ্পষ্ট। মৃত্যুর পর ফুল দিয়ে, বাতি জ্বালীয়ে শ্রদ্ধা অর্ঘ্য অর্পণ করার রেওয়াজ অধিকাংশ পাশ্চাত্যের মানুষ করে থাকে, যারা কঠোর ইসলাম ও মুসলিম বিরোধী। আর আমরা আমদের সঠিক ও সহিহ আমলকে বাদ দিয়ে ইসলাম ও মুসলিম বিরোধী শক্তির অনুকরণে মৃত ব্যক্তির প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার অর্ঘ্য অর্পণের উদ্দেশে এমনটি করে থাকি যা হারাম। যদি সৃষ্টিকে খুসি করার ইচ্ছা থেকে তার প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার অর্ঘ্য অর্পণ করা হয় তবে তা ছোট শিরক। কিন্তু যদি কর্মকে ইবাদতের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হবে তখন আর ছোট শিরক থাকবে না বড় শিরকে পরিনত করবে। 

১৪ মাযার বা কবর যেখানে শিরকি কাজ হয় সেখান কার খাদেম হওয়া ও শিরকি কাজ।

আমাদের উপমহাদেশে অনেককে মাযার বা কবর যেখানে শিরকি কাজ হয় সেখান খাদেম হিসাবে কাজ করে। তাদের এই কাজ শিরকি কাজে সহায়তা ছাড়া কিছুই নয়। যে শিরক করতে সহায়তা করে সে মুলত শিরকি কাজ করে। কাজেই মাযার বা কবর যেখানে শিরকি কাজ হয় সেখান কার খাদেম হওয়া ও শিরকি কাজ। এমনকি আল্লাহ নিজের ঘর কাবাকে ও শিরক  বিদাআত থেকে পবিত্র রাখতে বলেছেন। আর যেখানটি (মাজার) তৈরি করা হয়েছে শুধুই শিরক করার জন্য তার খেদমত কতটুকু যুক্তি যুক্ত। মহান আল্লাহ বলেন,

وَاِذۡ جَعَلۡنَا الۡبَیۡتَ مَثَابَۃً لِّلنَّاسِ وَاَمۡنًا ؕ وَاتَّخِذُوۡا مِنۡ مَّقَامِ اِبۡرٰہٖمَ مُصَلًّی ؕ وَعَہِدۡنَاۤ اِلٰۤی اِبۡرٰہٖمَ وَاِسۡمٰعِیۡلَ اَنۡ طَہِّرَا بَیۡتِیَ لِلطَّآئِفِیۡنَ وَالۡعٰکِفِیۡنَ وَالرُّکَّعِ السُّجُوۡدِ

আর স্মরণ কর, যখন আমি কাবাকে মানুষের জন্য মিলনকেন্দ্র ও নিরাপদ স্থান বানালাম এবং ‘তোমরা মাকামে ইবরাহীমকে সালাতের স্থানরূপে গ্রহণ কর’। আর আমি ইবরাহীম ও ইসমাঈলকে দায়িত্ব দিয়েছিলাম যে, ‘তোমরা আমার গৃহকে তাওয়াফকারী, ‘ইতিকাফকারী ও রুকূকারী-সিজদাকারীদের জন্য পবিত্র কর’। সুরা বাকারা : ১২৫

উক্ত আয়াতে আল্লাহ ইব্রাহীম (আ.) ও ইসমাঈল (আ.) কে কাবা ঘর পাক পবিত্র রাখার নির্দেষ দিয়েছন। এর অর্থ কেবলমাত্র ময়লা-আবর্জনা থেকে পাক-পবিত্র রাখা নয়। আল্লাহর ঘরের আসল পবিত্রতা হল শিরক থেকে পবিত্র রাখা এবং সেখানে আল্লাহর ছাড়া আর কারোর নাম উচ্চারিত হবে না। যে ব্যক্তি আল্লাহর ঘরে বসে আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে মালিক, প্রভু, মাবুদ, অভাব পূরণকারী ও ফরিয়াদ শ্রবনকারী হিসেবে ডাকে, সে আসলে তাকে নাপাক ও অপবিত্র করে দিয়েছে।

১৫ কল্যাণ লাভের আশায় কবরকে অতিরিক্ত ভক্তি করা

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَاتَّخَذُوۡا مِنۡ دُوۡنِہٖۤ اٰلِہَۃً لَّا یَخۡلُقُوۡنَ شَیۡئًا وَّہُمۡ یُخۡلَقُوۡنَ وَلَا یَمۡلِکُوۡنَ لِاَنۡفُسِہِمۡ ضَرًّا وَّلَا نَفۡعًا وَّلَا یَمۡلِکُوۡنَ مَوۡتًا وَّلَا حَیٰوۃً وَّلَا نُشُوۡرًا

আর তারা আল্লাহ ছাড়া অনেক ইলাহ গ্রহণ করেছে, যারা কিছুই সৃষ্টি করতে পারে না, বরং তাদেরকেই সৃষ্টি করা হয়েছে; তারা নিজদের কোন কল্যাণ ও অকল্যাণ করার ক্ষমতা রাখে না এবং মৃত্যু, জীবন ও পুনরুত্থান করতেও সক্ষম হয় না।সুরা ফুরকান : ৩

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

مَاۤ اَصَابَکَ مِنۡ حَسَنَۃٍ فَمِنَ اللّٰہِ ۫ وَمَاۤ اَصَابَکَ مِنۡ سَیِّئَۃٍ فَمِنۡ نَّفۡسِکَ ؕ

তোমার কাছে যে কল্যাণ পৌঁছে তা আল্লাহর পক্ষ থেকে, আর যে অকল্যাণ তোমার কাছে পৌঁছে তা তোমার নিজের পক্ষ থেকে। সুরা নিসা : ৭৯

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَ اِنۡ یَّمۡسَسۡكَ اللّٰهُ بِضُرٍّ فَلَا كَاشِفَ لَهٗۤ اِلَّا هُوَ ؕ وَ اِنۡ یَّمۡسَسۡكَ بِخَیۡرٍ فَهُوَ عَلٰی كُلِّ شَیۡءٍ قَدِیۡرٌ

আর যদি আল্লাহ তোমাকে কোন দুর্দশা দ্বারা স্পর্শ করেন, তবে তিনি ছাড়া তা দূরকারী কেউ নেই। আর যদি কোন কল্যাণ দ্বারা স্পর্শ করেন তবে তিনিই তো সব কিছুর উপর ক্ষম তাবার্রুক ন। সুরা আনাম : ১৭

আমাদের বিশ্বাস সকল প্রকারের কল্যাণ, বরকত, উপকার মহান আল্লাহর পক্ষে থেকে আসে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَاِنۡ یَّمۡسَسۡکَ اللّٰہُ بِضُرٍّ فَلَا کَاشِفَ لَہٗۤ اِلَّا ہُوَ ۚ وَاِنۡ یُّرِدۡکَ بِخَیۡرٍ فَلَا رَآدَّ لِفَضۡلِہٖ ؕ یُصِیۡبُ بِہٖ مَنۡ یَّشَآءُ مِنۡ عِبَادِہٖ ؕ وَہُوَ الۡغَفُوۡرُ الرَّحِیۡمُ

আর আল্লাহ যদি তোমাকে কোন ক্ষতি পৌঁছান, তবে তিনি ছাড়া তা দূর করার কেউ নেই। আর তিনি যদি তোমার কল্যাণ চান, তবে তাঁর অনুগ্রহের কোন প্রতিরোধকারী নেই। তিনি তার বান্দাদের যাকে ইচ্ছা তাকে তা দেন। আর তিনি পরম ক্ষমাশীল, অতি দয়ালু’। সুরা ইউনুস : ১০৭

উপমহাদেশে কবরের প্রতি ভক্তি অনেক পুরান। আমাদের পূর্ব পুরুষ হিন্দু ছিল, মূর্তি পুজার প্রতি তাদের বড় ঝোঁক ছিল। অনেকে হিন্দু থেকে কালের আবর্তে মুসলিম হয়েছে ঠিকই কিন্তু জ্ঞানের স্বল্পতার কারণে কবরকে মূর্তির মত পূজা শুরু করে। তাই তারা কল্যাণ লাভের আশায় কবরকে অতিরিক্ত ভক্তি করে এবং মাজারকে পূজনীয় মনে করে তার প্রতি অকৃত্রিম ভালবাসা প্রদর্শন করে থাকে যা মুলাত একটি শিরকি কর্ম। আল্লাহর পরিবর্তে মাজারে থেকে বরকত লাভের আশায় এর উপর মশারি, ও শামিয়ানা টাঙ্গিয়ে থাকে। যখনই কোনো মাজার ভক্ত মাজারে যায় তখন তারা হিন্দুদের মত হাত মুখে ও কপালে লাগায়। কবরকে তারা এতই বরকত মনে করে যে কবরের গায় তারা হাত লাগায় এবং পেট ও পিঠ ঠেকায় এবং অনেকেই কবরকে চুম্বন করে। বুজুর্গের মাজার বা কাবর স্থান থেকে ফিরে আসর সময় কবরের দিকে মুখ করে বেরিয়ে আসা। তাদের এই অতিরিক্ত ভক্তি করাকে হিন্দুদের মূর্তি ভক্তির চেয়ে সামান্য টুকুও কম নয়। তাদের মাজার আর হিন্দুদের মূর্তির পার্থক্য হল তাদের বুজুর্গ মাটির নিচে আর হিন্দুদের মূর্তি মাটির উপরে। কাজেই যদি কেউ মূর্তি ভক্তি দেখে থাকেন তাকে আর মাজার ভক্তি দেখার দরকার নেই। তার যার মাধ্যমে মঙ্গল কামনা করে এই মঙ্গলের  মালিক স্বংয় আল্লাহ আমার প্রিয় কেও এই মঙ্গল অমঙ্গলের মালিক করা হয় নাই। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

قُلۡ اِنِّیۡ لَاۤ اَمۡلِکُ لَکُمۡ ضَرًّا وَّلَا رَشَدًا

(হে নবি) বল, আমি তোমাদের মঙ্গল-অমঙ্গলের মালিক নই। সুরা জ্বিন : ২১

১৬ আল্লাহ তায়ালার অসন্তুষ্টির মাধ্যমে কোন মানুষের সন্তুষ্টি কামনা করা

ইচছা করে আল্লাহর তায়ালার অসন্তুষ্টির মাধ্যমে কোন মানুষের সন্তুষ্টি কামনা করা কুফরি কাজ।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

ذَٰلِكَ بِأَنَّهُمُ ٱتَّبَعُوا۟ مَآ أَسْخَطَ ٱللَّهَ وَكَرِهُوا۟ رِضْوَٰنَهُۥ فَأَحْبَطَ أَعْمَٰلَهُمْ

এটা এজন্য যে, তারা সেই কাজ করেছে যাতে আল্লাহ অসন্তুষ্ট হন এবং তাঁর সন্তুষ্টিকে তারা অপছন্দ করেছে। তাই তিনি তাদের কর্ম নিষ্ফল করে দিয়েছেন। সুরা মুহাম্মাদ ৪৭:২৮

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ لَا تَتَوَلَّوْا۟ قَوْمًا غَضِبَ ٱللَّهُ عَلَيْهِمْ قَدْ يَئِسُوا۟ مِنَ ٱلْءَاخِرَةِ كَمَا يَئِسَ ٱلْكُفَّارُ مِنْ أَصْحَٰبِ ٱلْقُبُورِ

হে ঈমানদারগণ, তোমরা সেই সম্প্রদায়ের সাথে বন্ধুত্ব করো না, যাদের প্রতি আল্লাহ অসন্তুষ্ট। তারা তো আখিরাত সম্পর্কে নিরাশ হয়ে পড়েছে, যেমনিভাবে কাফিররা কবরবাসীদের সম্পর্কে নিরাশ হয়েছে। সুরা মুমতাহীনা : ১৩

জনৈক মাদীনাবাসী থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, কোন এক সময় উম্মুল মুমিনীন আয়শা (রা.) কে মুয়াবিয়া (রা.) লিখে পাঠান, আমাকে লিখিতভাবে কিছু উপদেশ দিন, তবে তা যেন দীর্ঘ না হয়। তিনি (বর্ণনাকারী) বলেন, আয়শা (রা.) মুয়াবিয়া (রা.) কে লিখলেন,  আপনাকে সালাম। তারপর এই যে, আমি রাসূলুল্লাহ কে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি আকাঙ্খা করে তা মানুষের অসন্তুষ্টি হলেও, মানুষের দুঃখ-কষ্ট হতে বাঁচানোর জন্য আল্লাহ তায়ালাই তার জন্য যথেষ্ট হয়ে যান। আর যে ব্যক্তি মানুষের সন্তুষ্টি আশা করে আল্লাহ তায়ালাকে অসন্তুষ্ট করে হলেও, আল্লাহ তায়ালা তাকে মানুষের দায়িত্বে ছেড়ে দেন। আপনাকে আবারো সালাম। সুনানে তিরমিজি : ২৪১৪)

সাধারণ মহান আল্লাহর ক্ষমতা, ইবাদতের মাঝে অংশ বসালে শিরক হয়। আল্লাহর তায়ালার অসন্তুষ্টির মাধ্যমে কোন মানুষের সন্তুষ্টি কামনা করা শুধু আল্লাহর অংশ বা সমকক্ষ করে নাই। বরং তার চেয়ে নিজে স্থানকে দিয়েছেন আল্লাহকে। নাউজুবিল্লাহ

১৭। কদমবুছির করা

একজন মুসলমানের সাথে অন্যে মুসরমানের দেখা হলে সালাম (আস-সালামু আলাইকুম বলা)  দেওয়া একটি সার্বজনিন সুন্নত। আবার যাকে সালাস দেওয়া হবে তার পক্ষ থেকে উত্তর প্রদান করাও ইসলামী সুন্নাত। মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর মতনিত প্রিয় বান্দা, শ্রেষ্ঠতম রাসুল ও হাবীব, যাকে ভালবাসা আর আল্লাহকে ভালবাসা একই কথা এবং আল্লাহর কাছে নাজাতের অন্যতম ওসীলা। (ইমরান-৩১)। সেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুয়তী জীবনের প্রতিদিন অগণিত সাহাবী তাঁর দরবারে এসেছেন। সেই সকল সাহাবি (রা.) ছিলেন, মানব ইতিহাসের অতুলনীয় অনুসারি, যারা নিজের জীবন থেকেও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বেশি ভালবেসেছেন, ভক্তি করেছেন ও সম্মান প্রদর্শন করেছেন। এই মহান দরবারের মহান ভক্তবৃন্দ কেউই কোনদিন কদমবুছি করলেন না। সবাই এসে সালাম দিয়ে দরবারে বসছেন। সালাম দিয়ে দরবার ত্যাগ করছেন। কখনো হয়ত মোসাফাহা হচ্ছে।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারে নবুয়তী জিন্দেগিতে তার লক্ষাধিক সাহাবীর কেউ কেউ দুই একবার এসেছেন। কেউ কেউ সহাস্রাধিকবার এসেছেন। এই দীর্ঘ নবুয়তী জিন্দেগিতে শুধুমাত্র তিন চার জন্য নবাগত, দরবারের সুন্নাতের সাথে অপরিচিত মানুষ পায়ে চুমু খেয়েছেন বলে কোনো কোনো হাদীসে জানা যায়। সেই বর্ণনাগুলি প্রায় সবই যয়ীফ বা দুর্বল ও অনির্ভরযোগ্য। এ সকল ঘটনায় কোনো সুপরিচিত সাহাবী তাঁর পদচুম্বন করেননি, করেছেন নতুন ইসলাম গ্রহণ করতে আসা কয়েকজন বেদুঈন বা ইহুদি, যারা দরবারে থাকেনি বা দরবারের আদব ও সুন্নাত জানত না। আবু বকর, উমর, উসমান, আলী, ফাতেমা, বেলাল (রা) ও তাঁদের মতো অগণিত প্রথম কাতারের শত শত সাহাবী প্রত্যেকে দীর্ঘ ২৩ বৎসরে হাজার হাজার বার তাঁর দরবারে প্রবেশ করেছেন। কিন্তু কেউ কখনো একবারও তাঁর কদমবুছি করেন নি বা কদম মুবারকে চুমু খাননি। এমনকি কদম মুবারকে হাত রেখে সেই হাতের উপরও চুমু খাননি। এহইয়াউস সুনান, পঞ্চম অধ্যায়, পৃ-৩৮৬ খন্দোকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গির রহ,


কিন্তু আমাদের দেশের ভন্ডপীরে দরবারের কথা ভাবুর। পীর সাহেব বসে আছেন অগণিত ভক্ত এসে সালাম করছেন, মুসাফাহা করছেন, এরপর হাতে বা পায়ে চুমুখাচ্ছেন আর সাথে কিছু সেলামি দিচ্ছেন। যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারেন সম্পুর্ণ ভিন্ন সুন্নত বিরোধী।

আবার অনেকে বাবা মা, শ্বশুর শাশুড়ী, উস্তাদকে সম্মান প্রদর্শনের জন্য কদমবুছি করে থাকেন। এটা জায়েয হবার ভিত্তি খুবই দুর্বল। একেতো সুন্নত বিরোধী বিদআত তারপর একাজটি সম্মানের ক্ষেত্রে অতিরঞ্জিত করা যা শিরকের আহ্বায়ক। সর্বসিদ্ধান্ত মাসআলা হল, সম্মানে অতিরঞ্জিত করা হল, শিরকের আহ্বায়ক। আর শিরকের আহ্বায়ক হারাম। ইহা অনেক সময় সিজদার সাথে সামঞ্জস্যমান হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। সিজদার সাথে সামঞ্জস্য হলে যে শিরক তাতে কোন সন্ধেহ নাই। তাইতো বর্তমানে দেখা যায় অনেক মাযারে পীরের কদমবুছি না করে সরাসরি সিজদা করছে।

ইবাদতের ছোট শিরক বা রিয়া

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

১। লোক দেখান সালাত আদায় করা

আমাদের দেশে অধিকাংশ লোকই সালাত আদায় করে না। বৃদ্ধ অবস্থায় সালাত শুরু করে, তখন আর কুরআন সহিহ করে পড়ার সময় থাকে না। আবার অনেকের যখন বয়স বাড়ে, ছেলে মেয়েদের বিবাহ দেওয়ার সময় হয়, তখন চক্ষু লজ্জার ভয়ে দাড়ি রাখে পাশাপাশি সালাত শুরু করে। অনেকটা সমাজের ভয়ে কে কি বলে, এর জন্য সালাত শুরু। এভাবে সমাজ ও লোক চক্ষু ভয়ে সালাত আদায় করা মুনাফিকের লক্ষন, পাশাপাশি ছোট শিরকেও বটে। মুনাফিকরা শৈথিল্য সহকারে সালাতে আসত কারন তাদের উদ্দেশ্য ছিল রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তার সাহাবিদের (রাদি.) সালাতে হাজির দেখান। ঠিক যেভাবে মুমিনদের মুনাফিকেরা ধোকা দিত। আজকের সমাজের সমাজ রক্ষার সালাত ও ঠিক তেমনি ভাবে আল্লাহকে ধোকা দিচ্ছে আর তারা নিজেরা নিজেদের ধোকা দিচ্ছে।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

اِنَّ الۡمُنٰفِقِیۡنَ یُخٰدِعُوۡنَ اللّٰہَ وَہُوَ خَادِعُہُمۡ ۚ  وَاِذَا قَامُوۡۤا اِلَی الصَّلٰوۃِ قَامُوۡا کُسَالٰی ۙ  یُرَآءُوۡنَ النَّاسَ وَلَا یَذۡکُرُوۡنَ اللّٰہَ اِلَّا قَلِیۡلًا ۫ۙ

নিশ্চয় মুনাফিকরা আল্লাহকে ধোঁকা দেয়। আর তিনি তাদেরকে ধোঁকায় ফেলেন। আর যখন তারা সালাতে দাঁড়ায় তখন অলসভাবে দাঁড়ায়, তারা লোকদেরকে দেখায় এবং তারা আল্লাহকে কমই স্মরণ করে। আন নিসা : ১৪২

আলা ইবনু আবদুর রহমান (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, তিনি একদিন আনাস ইবনু মালিক (রাযিঃ) এর বসরাস্থ বাড়ীতে গেলেন। আর বাড়ীটি মসজিদের পাশেই অবস্থিত ছিল। তিনি (আলা ইবনু আবদুর রহমান) তখন সবেমাত্র যুহরের সালাত আদায় করছেন। আলা ইবনু ’আবদুর রহমান বলেনঃ আমরা তার (আনাস ইবনু মালিকের) কাছে গেলে তিনি আমাদেরকে জিজ্ঞেস করলেনঃ তোমরা কি আসরের সালাত আদায় করছ? আমরা জবাবে তাকে বললাম, আমরা এই মাত্র যুহরের সালাত আদায় করে আসলাম। এ কথা শুনে তিনি বললেনঃ যাও আসরের সালাত আদায় করে আসো। এরপর আমরা গিয়ে আসরের সালাত আদায় করে তার কাছে ফিরে আসলে তিনি বললেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি। তিনি বলেছেনঃ ঐ সালাত হলো মুনাফিকের সালাত যে বসে বসে সূর্যের প্রতি তাকাতে থাকে আর যখন তা অস্তপ্রায় হয়ে যায় তখন উঠে গিয়ে চারবার ঠোকর মেরে আসে। এভাবে সে আল্লাহকে কমই স্মরণ করতে পারে। সহিহ মুসলিম : ৬২২, সুনানে তিরমিযী: ১৬০, নাসায়ী : ৫১১

কোন ব্যক্তি একনিষ্ঠভাবে একমাত্র আল্লাহ্‌র নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে নামায পড়তে শুরু করল। এমতাবস্থায় নামাযের মধ্যেই সে দেখল, তাকে অন্য কেউ লক্ষ করছে তাই সে তার সালাতে রুকনগুলি ধীরস্থিরভাবে আদায় করল। সিজদা রুকুতে সময় বেশী লাগাল। যদিও এতে আল্লাহ্‌র সাথে অন্য কাউকে অংশীদার বা সমান করা উদ্দেশ্য না হয়ে থাকে তথাপি এ জাতীয় সালাত হলো ছোট শিরকের অন্তর্ভুক্ত। এ ধরনের সালাত আল্লাহ্‌র নিকট আদৌ গ্রহণযোগ্য নয়। কোন মু’মিন ব্যক্তি এরূপ সালাত করতে পারে না।

আবূ সাঈদ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী ﷺ কে বলতে শুনেছি, আমাদের প্রতিপালক যখন তাঁর পায়ের গোড়ালির জ্যোতি বিকীর্ণ করবেন, তখন ঈমানদার নারী ও পুরুষ সবাই তাঁকে সিজদা করবে। কিন্তু যারা দুনিয়াতে লোক দেখানো ও প্রচারের জন্য সিজদা করত, তারা কেবল অবশিষ্ট থাকবে। তারা সিজদা করতে চাইলে তাদের পিঠ একখণ্ড কাঠফলকের মত শক্ত হয়ে যাবে। সহিহ বুখারি : ৪৯১৯

মনে রাখতে হবে, সালাতের মধ্যে অন্য চিন্তা এসে যাওয়া এক কথা আর অন্যকে দেখিয়ে সালাত আদা্য় ভিন্ন কথা। প্রথম অবস্থাটি মানবিক দুর্বলতার স্বাভাবিক দাবি আর অপরটি ইচ্ছাকৃত রিয়া।সালা্তে মনোনিবেশই ইহার ক্ষতিপূরণ। কিন্তু সালাত শুরু থেকে সালাম ফেরা পর্যন্ত একবারের জন্যও মনোনিবেশ না এলে কিন্তু সালাত সঠিকভাবে আদায় হয়েছে বলা যাবে না। তবে অন্যকে দেখিয়ে সালাত আদা্য় করলে সালাত সম্পুর্ন বাতিল হয়ে যাবে কারন এটা ছোট শিরকে । 

এভাবে নামাজের রুকু সিজদাহ মত কোন ব্যক্তি বা বস্তুর সামনে বিনম্রভাবে দাঁড়ানো ছোট শিরক। সওয়াবের আশায় একমাত্র আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো জন্য এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ ইবাদাতগুলো ব্যয় করা শিরক। কাজেই সালাত হেফাজতের জন্য কেবল আল্লাহর সামনে অনুগত বান্দারমত দাড়াতে হবে।

মহান আল্লাহ তায়ালান বলেন:

 حَـٰفِظُواْ عَلَى ٱلصَّلَوَٲتِ وَٱلصَّلَوٰةِ ٱلۡوُسۡطَىٰ وَقُومُواْ لِلَّهِ قَـٰنِتِينَ

তোমাদের নামাযগুলো সংরক্ষণ করো, বিশেষ করে এমন নামায যাতে নামাযের সমস্ত গুণের সমন্বয় ঘটেছে।  আল্লাহর সামনে এমনভাবে দাঁড়াও যেমন অনুগত সেবকরা দাঁড়ায়। সুরা বাকারা : ২৩৮

২। লোক দেখান বা লোক চক্ষুল লজ্জায় সিয়াম পালন করা

আমাদের সমাজে অনেক মুসলিম আছে যারা ইসলাম সচেতন নয়। ইসলামি কোন ইবাদাতের সাথে সম্পৃক্ত থাকে না। এমন কি নিয়মিত সালাতও আদায় করে না। কিন্তু রমজান মাসের পরিবেশ পরিস্থিতির করানে সিয়াম রাখতে বাধ্য হয়। তারা আল্লাহ রাব্বুল আলামীনর হুকুম থেকে সমাজ ও সমাজের মানুষেই বেশী ভয় পায়। এই ভাবে লোক দেখানো বা লজ্জার কারনে নিয়াম রাখা কবিরা গুনাহ। আমাদের সকল ইবদতের এক মাত্র উদ্দেশ্য হলো আল্লাহ। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সিয়ামের মাধ্যমে আমাদের তাকওয়া (আল্লাহ ভীতি) অর্জন করতে বলেছেন। আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেনঃ

 يَـٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ كُتِبَ عَلَيۡڪُمُ ٱلصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى ٱلَّذِينَ مِن قَبۡلِڪُمۡ لَعَلَّكُمۡ تَتَّقُونَ 

হে ইমানদারগন, তোমাদের উপর সিয়াম ফরয করা হয়েছে, যেভাবে ফরয করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর। যাতে তোমরা তাকওয়া অবলম্বন কর। সূরা বাকারা : ১৮৩

সিয়ামের উদ্দেশ্যই হলো তাকওয়া। এখান আমারা যদি আল্লাহ ভয় না করে সমাজ ও সমাজের মানুষেই ভয়ে সিয়াম পালন করি, তবে রিয়া ছাড়া কি হবে?

৩।  হজ্জ্বের ক্ষেত্রে যে সব ছোট শিরকে পতিত হওয়ার সম্ভাবনা: 

হজ্জ্বের এমন একটি ইবাদাত যেখানে ছোট শিরকে পতিত হোওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশী। সালাতের মত আমাদের দেশে অধিকাংশ লোকই সমাজ ও লোক চক্ষু ভয়ে হজ্জ্ব পালন করে। আল্লাহর রহমতে বান্দা যখন হজ্জ্ব করার যোগ্যতা অর্জন করে। অর্থাৎ যখন টাকা পয়সার মালিক হয়, তখন সে কার্পন্য করতে থাকে। মনে হয় এটাই সমাজের রীতি। কিন্তু সমাজ ও লোক চক্ষু ভয়ে, সে অনেকটা বাধ্য হয়েই হজ্জ্বে গমন করে। বলুন এটা কি ছোট শিরকে নয়? তার প্রমান, হজ্জ্ব পালন করার পরও তাহার মুখে দাড়ি উঠেনি, সালাতে গর হাজির, অন্যান্য ইবাদাতের কথা না হয় বাদই দিলাম।

আর এক শ্রেণীর লোকের হজ্জ্ব করার উদ্দেশ্য হল নামের পিছনে আলহাজ্ব লাগাবে। যদি আলহাজ্ব লাগানোর ইচ্ছায় হজ্জ্ব হয় তবে ছোট শিরকে হবে, এতে কোন সন্ধেহে নাই।

আবার অনেকের হজ্জ্ব করার উদ্দেশ্য হল ব্যবসা করা। হজ্জ্ব করবে সাথে সাথে স্বর্ন নিয়ে দেশে ফিরবে। এতে হজ্জ্ব ও হল আবার লাভও হল। বেশ তো একই সাথে দু্‌ই কাজ। কাজ দুটিই হল কিন্তু ছোট শিরক হল নেকি পাবেন না। এসব আলম আল্লাহ প্রত্যাখ্যান করেন।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি লোকর নিকট ন্যায় পরায়ন সাজার জন্য বা স্বনামধন্য হবার জন্য হজ্জ্ব পারন করল সে শিরক করল। (মুসনাদে আহম্মদ)।

দেখবেন অনেক বিধর্মী পৃথিবীতে আনাচে কানাছে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এটা তারা জানা বা দেখার নেষা থেকেই করছে। কেউ তাদের বাধ্য করছেনা। ঠিক কোন মুসলিম যদি  জানা বা দেখার নেষা থেকে হজ্জ্বে গমন করে তা হলে এটাও ছোট শিরক হবে।

লোক দেখান আল্লাহর ছাড়া অন্যের সন্তষ্টির জন্য জাকাত বা দান ছদগা করা

শুধু লোক দেখাবার জন্য সে যেসব জাকাত বা দান ছদগা করা হয়। সেগুলো সুস্পষ্টভাবে একথাই প্রকাশ করে যে, সৃষ্টিকেই সে স্রষ্টা মনে করে এবং তার কাছ থেকেই নিজের দানের প্রতিদান চায়। আল্লাহর কাছ থেকে সে প্রতিদানের আশা করে না। একদিন সমস্ত কাজের হিসেব-নিকেশ করা হবে এবং প্রতিদান দেয়া হবে, একথাও সে বিশ্বাস করে না। প্রবল বর্ষণে যেমন পাথরের উপরের মাটি ধুয়ে পরিস্কার করে দেয়, লোক দেখান আল্লাহর ছাড়া অন্যের সন্তষ্টির জন্য জাকাত বা দান ছদগা ও নেকিহীন পরিছন্ন দান হিসাবে পরিগনিত হয়। তার এই দান অপচয় ছাড়া আর কিছুই নয়। যে ব্যক্তি আল্লাহর দেয়া নেয়ামতকে তাঁর পথে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য ব্যয় করার পরিবর্তে মানুষের সন্তুষ্টি লাভের জন্য ব্যয় করে অথবা আল্লাহর পথে কিছু অর্থ ব্যয় করলে ব্যয় করার সাথে কষ্টও দিয়ে থাকে, সে আসলে অকৃতজ্ঞ এবং আল্লাহর অনুগ্রহ বিস্মৃত বান্দা। আর সে নিজেই যখন আল্লাহর সন্তুষ্টি চায় না তখন তাকে অযথা নিজের সন্তুষ্টির পথ দেখাবার আল্লাহর কোন প্রয়োজন নেই। তাই তো মহান আল্লাহ বলেন,

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَالَّذِیۡنَ یُنۡفِقُوۡنَ اَمۡوَالَہُمۡ رِئَآءَ النَّاسِ وَلَا یُؤۡمِنُوۡنَ بِاللّٰہِ وَلَا بِالۡیَوۡمِ الۡاٰخِرِ ؕ وَمَنۡ یَّکُنِ الشَّیۡطٰنُ لَہٗ قَرِیۡنًا فَسَآءَ قَرِیۡنًا

এবং যারা লোকদের দেখানোর জন্য স্বীয় ধন সম্পদ ব্যয় করে এবং আল্লাহর প্রতি ও আখিরাতের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেনা, আর যাদের সহচর শাইতান। সে নিকৃষ্ট সঙ্গীই বটে। সুরা নিসা : ৩৮

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا لَا تُبۡطِلُوۡا صَدَقٰتِکُمۡ بِالۡمَنِّ وَالۡاَذٰی ۙ کَالَّذِیۡ یُنۡفِقُ مَالَہٗ رِئَآءَ النَّاسِ وَلَا یُؤۡمِنُ بِاللّٰہِ وَالۡیَوۡمِ الۡاٰخِرِ ؕ فَمَثَلُہٗ کَمَثَلِ صَفۡوَانٍ عَلَیۡہِ تُرَابٌ فَاَصَابَہٗ وَابِلٌ فَتَرَکَہٗ صَلۡدًا ؕ لَا یَقۡدِرُوۡنَ عَلٰی شَیۡءٍ مِّمَّا کَسَبُوۡا ؕ وَاللّٰہُ لَا یَہۡدِی الۡقَوۡمَ الۡکٰفِرِیۡنَ

হে মুমিনগণ, তোমরা খোঁটা ও কষ্ট দেয়ার মাধ্যমে তোমাদের সদাকা বাতিল করো না। সে ব্যক্তির মত, যে তার সম্পদ ব্যয় করে লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে এবং বিশ্বাস করে না আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি। অতএব তার উপমা এমন একটি মসৃণ পাথর, যার উপর রয়েছে মাটি। অতঃপর তাতে প্রবল বৃষ্টি পড়ল, ফলে তাকে একেবারে পরিষ্কার করে ফেলল। তারা যা অর্জন করেছে তার মাধ্যমে তারা কোন কিছু করার ক্ষমতা রাখে না। আর আল্লাহ কাফির জাতিকে হিদায়াত দেন না। সুরা রাকারা : ২৬৪

কাউকে খুশী করা, কারো প্রশংসা বা বাহ বাহ কুড়ানোর জন্য অনেকেই জাকাত দেন/দান করে থাকে। ইসলামের দৃষ্টিতে ছাওয়াবের নিয়তে যে কোনো ভাল কাজ করা ইবাদতেরই অংশ। আর ইবাদত পাওয়ার একমাত্র যোগ্য সত্তাই হচ্ছেন, মহান  রাব্বুল আলামীন। যে জন্য যে সকল ভাল কাজের সামান্য হলেও লোক দেখান বা প্রশংসা কুড়ানোর আশা বিদ্যমান থাকে, তা মূলত বাতিল। লোক দেখানো  অর্থ ব্যয় না করে, আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করার জন্যই অর্থ ব্যয় করলে আল্লাহ তাকে পুরাপুরি প্রতিদান দিবেন।

মহান আল্লাহ তায়ালান বলেন:

۞ لَّيۡسَ عَلَيۡكَ هُدَٮٰهُمۡ وَلَـٰڪِنَّ ٱللَّهَ يَهۡدِى مَن يَشَآءُ‌ۗ وَمَا تُنفِقُواْ مِنۡ خَيۡرٍ۬ فَلِأَنفُسِڪُمۡ‌ۚ وَمَا تُنفِقُونَ إِلَّا ٱبۡتِغَآءَ وَجۡهِ ٱللَّهِ‌ۚ وَمَا تُنفِقُواْ مِنۡ خَيۡرٍ۬ يُوَفَّ إِلَيۡڪُمۡ وَأَنتُمۡ لَا تُظۡلَمُونَ (٢٧٢)

অর্থ: মানুষকে হিদায়াত দান করার দায়িত্ব তোমাদের ওপর অর্পিত হয়নি ৷ আল্লাহ যাকে চান তাকে হিদায়াত দান করেন ৷ তোমরা যে ধন-সম্পদ দান –খয়রাত করো, তা তোমাদের নিজেদের জন্য ভালো ৷ তোমরা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করার জন্যই তো অর্থ ব্যয় করে থাকো ৷ কাজেই দান-খয়রাত করে তোমরা যা কিছু অর্থ ব্যয় করবে , তার পুরোপুরি প্রতিদান দেয়া হবে এবং এ ক্ষেত্রে কোন ক্রমেই তোমাদের প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত করা হবে না। সুরা বাকারা : ২৭২

লোক দেখান অনিচ্ছাকৃত দান মুনাফিকের লক্ষন। মুনাফিকেরা আল্লাহর সন্তষ্টির জন্য দান করত না। মনে গহিনে দানের প্রতিরোধ স্পস্ট তারপরও দান কারন লোক দেখান (রিয়া)। আল্লাহ কাছে তাদের দেয়া সম্পদ গৃহীত হবে না। মহান আল্লাহ তায়ালান বলেন,

 وَمَا مَنَعَهُمۡ أَن تُقۡبَلَ مِنۡہُمۡ نَفَقَـٰتُهُمۡ إِلَّآ أَنَّهُمۡ ڪَفَرُواْ بِٱللَّهِ وَبِرَسُولِهِۦ وَلَا يَأۡتُونَ ٱلصَّلَوٰةَ إِلَّا وَهُمۡ ڪُسَالَىٰ وَلَا يُنفِقُونَ إِلَّا وَهُمۡ كَـٰرِهُونَ (٥٤)

অর্থ: তাদের দেয়া সম্পদ গৃহীত না হবার এ ছাড়া আর কোন কারন নেই যে, তারা আল্লাহ ও তার রসূলের সাথে কুফরী করেছে, নামাযের জন্য যখন আসে আড়মোড় ভাংতে ভাংতে আসে এবং আল্লাহর পথে খরচ করলে তা করে অনিচ্ছাকৃতভাবে।( সুরা তাওবা- ৯:৫৪)।

মহান আল্লাহ তায়ালান বলেন:

 وَٱلَّذِينَ يُنفِقُونَ أَمۡوَٲلَهُمۡ رِئَآءَ ٱلنَّاسِ وَلَا يُؤۡمِنُونَ بِٱللَّهِ وَلَا بِٱلۡيَوۡمِ ٱلۡأَخِرِ‌ۗ وَمَن يَكُنِ ٱلشَّيۡطَـٰنُ لَهُ ۥ قَرِينً۬ا فَسَآءَ قَرِينً۬ا (٣٨)

অর্থ: আর আল্লাহ তাদেরকেও অপছন্দ করেন, যারা নিজেদের ধন-সম্পদ কেবল মাত্র লোকদেরকে দেখাবার জন্য ব্যয় করে এবং আসলে না আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখে আর না আখেরাতের দিনের প্রতি৷ সত্য বলতে কি, শয়তান যার সাথী হয়েছে তার ভাগ্যে বড় খারাপ সাথীই জুটেছে৷ (সুরা নিসা ৪:৩৮)।

৫। কোরবানি ক্ষেত্রে যে সব ছোট শিরকে পতিত হওয়ার সম্ভাবনা: 

শুধুই প্রশংসা বা বাহ বাহ কুড়ানোর জন্য হাটের সবচেয়ে বড় গরুটা আমার চাই দাম যা লাগে সমস্যা নাই। দাম বেশী হলেও সমস্যা নাই, মানুষতো প্রশংসা করল বা বাহ বাহ দিন তাতেই বা কম কিসে। অথবা শুধুই মাংশ খাওয়ার ইচ্ছা। এটা একটা প্রমাণিত কথা যে, পশু উৎসর্গ করে জবেহ করা ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত, যা আল্লাহ্‌ ব্যতীত অন্য কারো উদ্দেশ্যে করা শিরক।

আল্লাহ্‌ তাআলা বলেন-

قُلْ إِنَّ صَلاَتِيْ وَنُسُكِيْ وَمَحْيَايَا وَمَمَاتِيْ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِيْنَ لاَ شَرِيْكَ لَهُ وَبِذَلِكَ أُمِرْتُ وَأَنَا أَوَّلُ الْمُسْلِمِيْنَ

বল, নিশ্চয় আমার নামায, আমার কুরবানী, আমার জীবন, আমার মৃত্যু, জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহ্‌র জন্য নিবেদিত। তাঁর কোন শরীক নেই, আর আমি এর প্রতি আদিষ্ট হয়েছি এবং আমিই প্রথম মুসলমান। সুরা আন আম ১৬২-১৬৩

আল্লাহ্‌ তাআলা আরো বলেন-

إِنَّا أَعْطَيْنَاكَ الْكَوْثَرَ فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ

অর্থ: আমি অবশ্যই তোমাকে (হাউজে) কাওসার দান করেছি, সুতরাং তুমি তোমার রবের উদ্দেশ্যে নামায আদায় কর এবং কুরবানী কর। সুরা আল কাওছার : ১ ও ২।

৬।  আল্লাহর সন্তুষ্টি ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশে জ্ঞান অর্জন করা

আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন-

قُلْ هَلْ يَسْتَوِي الَّذِينَ يَعْلَمُونَ وَالَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ

বল, যারা জানে এবং যারা জানে না তারা কি সমান? সুরা যুমার : ৯

আল্লাহ তাআলা আরও বলেন,

إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ*

আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে জ্ঞানীরাই তাঁকে ভয় করে থাকে। সুরা ফাতির : ২৮

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ مِنكُمۡ وَٱلَّذِينَ أُوتُواْ ٱلۡعِلۡمَ دَرَجَـٰتٍ۬‌ۚ وَٱللَّهُ بِمَا تَعۡمَلُونَ خَبِيرٌ۬

তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং আল্লাহ যাদেরকে জ্ঞান দান করেছেন তাদেরকে উচ্চমর্যাদায় উন্নীত করবেন। তোমরা যা কর আল্লাহ সে সম্পর্কে পূর্ণ অবহিত। সুরা মুজাদালাহ : ১১

মুয়াবিয়া (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, “আল্লাহ যার মঙ্গল চান, তাকেই দ্বীনী জ্ঞান দান করেন। সহিহ বুখারি : ৭১, ৩১১৬, ৩৬৪১, ৭৩১২, ৭৪৬০, সহিহ মুসলিম : ১০৩৭

অতএব দ্বীনি ইলম অর্জন করা সবার জন্য খুবই জরুরি ও উপকারি। ইহার ফজিলত ও উপকার বলার অপেক্ষা রাখে না। কখন কখন দ্বীনি ইলম অর্জন করা ফরজে আইন হয়ে যায়। যেমন, আমলকারি যে আমল করবে, সে সম্পর্কে ইলম অর্জন ফরজে আইন। ইলম অর্জন ইবাদাত তাই গাইরুল্লার উদ্দেশ্যে ইলম করা ছোট শির্ক বা কবিরা গুনাহ। শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই ইলম অর্জন করতে হবে। পার্থিব কোনো উদ্দেশ্যে তা অর্জন করা যাবে না।

আবূ হুরাইরাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন-

مَنْ تَعَلَّمَ عِلْمًا مِمَّا يُبْتَغَى بِهِ وَجْهُ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ لَا يَتَعَلَّمُهُ إِلَّا لِيُصِيبَ بِهِ عَرَضًا مِنَ الدُّنْيَا، لَمْ يَجِدْ عَرْفَ الْجَنَّةِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ يَعْنِي رِيحَهَا

যে ইল্মের দ্বারা আল্লাহর সন্তুষ্টি অন্বেষণ করা যায়, কোন লোক যদি দুনিয়াবী স্বার্থ লাভের জন্য তা শিক্ষা করে, তবে সে ক্বিয়ামাতের দিন জান্নাতের সুগন্ধি পাবে না। সুনানে আবু দাউদ : ৩৬৬৪, সুনানে ইবনে মাজাহ : ২৫২

জাবির বিন আবদ (রা.) থেকে নবী ﷺ বলেন, তোমরা আলিমদের উপর বহাদুরি প্রকাশের জন্য, নির্বোধদের সৎ ঝগড়া করার জন্য এবং জনসভার বড়ত্ব প্রকাশ করার জন্য ধর্ম জ্ঞান শিক্ষার জন্য। যে ব্যক্তি এরূপ করবে, তার জন্য রয়েছে আগুন আর আগুন। সুনানে ইবনে মাজাজ : ২৫৪, সহিহ তারগীব : ১০২, আলবানী সহিহ বলেছেন

কাব ইবনু মালিক (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ কে বলতে শুনেছি, যে লোক আলিমদের সাথে তর্ক বাহাস করা অথবা জাহিল-মূর্খদের সাথে বাকবিতণ্ডা করার জন্য এবং মানুষকে নিজের দিকে আকৃষ্ট করার উদ্দেশে ইলম অধ্যয়ন করেছে, আল্লাহ তায়ালা তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন। সুনানে তিরমিজি : ২৬৫৪, মিশকাত : ২২৫

অতএব দ্বীনি ইলম অর্জন করা সবার জন্য খুবই জরুরি ও উপকারি। ইহার ফজিরত ও উপকার বলার অপেক্ষা রাখে না। কখন কখন দ্বীনি ইলম অর্জন করা ফরজে আইন হয়ে যায়। যেমন, আমলকারি যে আমল করবে, সে সম্পর্কে ইলম অর্জন ফরজে আইন। ইলম অর্জন ইবাদাত তাই গাইরুল্লার  উদ্দেশ্যে ইলম করা শিরক। শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই ইলম অর্জন করতে হবে। পার্থিব কোনো উদ্দেশ্যে তা অর্জন করা যাবে না। অনেক টাকা পয়সা আয় করার জন্য ইলম অর্জন করে থাকে। আবার কেউ দুনিয়ার সুনাম সুখ্যাতি পাওয়ার আসায় ইলম অর্জন করে। সে ভাবে লোকে তাকে জ্ঞানি মনে করে সম্মান করবে। আলেম বলে সম্ভোধন করবে। কেই যদি এমনি ভাবে নিয়ত করে যে, আমি ইলম অর্জন করলে লোকে তাকে আলেম বলবে, ক্বারি বলবে, হাফিজ বলবে তবে তা শিরক হবে। পার্থিব সুনাম-সুখ্যাতির উদ্দেশ্যে দ্বীনী ইলম অর্জন করা হলে তার পরিণাম হবে অত্যন্ত ভয়াবহ। হাদীস শরীফে এসেছে যে, জাহান্নামে সর্বপ্রথম নিক্ষিপ্ত তিন ব্যক্তির একজন হবে ঐ আলিম, যে লোকের কাছে আলিম হিসেবে পরিচিতি পাওয়ার জন্য ইলম চর্চা করেছে।

লোক দেখান বিদআতী পদ্ধতিতে জিকির করাঃ 

জিকিরের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য ও সান্বিধ্য লাভ হয়। জিকির একটি ইবাদাত। আর এই নফল ইবাদাতটি করার জন্য স্বয়ং আল্লাহ তাআলা মুসলিম ব্যক্তিকে সকাল বিকাল জিকির করার আদেশ দিয়েছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

 يَـٰٓأَيُّہَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ ٱذۡكُرُواْ ٱللَّهَ ذِكۡرً۬ا كَثِيرً۬ا  وَسَبِّحُوهُ بُكۡرَةً۬ وَأَصِيلاً

মুমিনগণ তোমরা আল্লাহকে অধিক পরিমাণে স্মরণ কর। এবং সকাল বিকাল আল্লাহর পবিত্রতা বর্ণনা কর। সূরা আহযাব : ৪১-৪২

 নিশ্চয়ই রসূলুল্লাহ ﷺ আল্লাহর এই আদেশ পালন করছেন। সাহাবাদের (বা.) নিজ হাতে শিক্ষাদান করেছেন এবং তারা ও জিকির করেছেন। কাজেই তাদের ইবাদতের পদ্ধতির বাহিরে নতুন কোন পদ্ধতি আবিস্কার করলে বিদআত হবে। আল্লাহ তাকে স্মরন করার পদ্ধতি বর্নণা করে বলেন-

 وَٱذۡكُر رَّبَّكَ فِى نَفۡسِكَ تَضَرُّعً۬ا وَخِيفَةً۬ وَدُونَ ٱلۡجَهۡرِ مِنَ ٱلۡقَوۡلِ بِٱلۡغُدُوِّ وَٱلۡأَصَالِ وَلَا تَكُن مِّنَ ٱلۡغَـٰفِلِينَ

হে নবী! তোমার রবকে স্মারণ করো সকাল সাঁঝে মনে মনে কান্নাজড়িত স্বরে ও ভীতি বিহ্বল চিত্তে এবং অনুচ্চ কণ্ঠে৷ তুমি তাদের অন্তরভুক্ত হয়ো না যারা গাফলতির মধ্যে ডুবে আছে৷ সুরা আরাফ : ২০৫

আবূ মূসা আল আশআরী (রা.) থেকে বর্নিত। তিনি বলেনঃ একবার নাবী ﷺ একটি গিরিপথ দিয়ে অথবা বর্ণনাকারী বলেন, একটি চুড়া হয়ে যাচ্ছিলেন, তখন এক ব্যাক্তি এর উগরে উঠে জোরে বলল, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ ওয়াল্লাহু আকবার। আবূ মূসা বলেন, তখন রাসুল ﷺ তার খচ্চরে আরোহী ছিলেন। তখন নাবী ﷺ বললেন, তোমরা তো কোন বধির কিংবা কোন অনুপস্থিত কাউকে ডাকছো না। অতঃপর তিনি বললেন, হে আবূ মূসা অথবা বললেন, হে আবদুল্লাহ আমি কি তোমাকে জান্নাতের ধনাগারের একটি বাক্য বাতলে দেব না? আমি বললাম, হ্যাঁ, বাতলে দিন। তিনি বললেন, তা হল ‘লা হাওলা ওয়ালা কুওয়্যাতা ইল্লাবিল্লাহ’। সহিহ বুখারী : ৬৪০৯, সহিহ মুসলিম : ৬৬১৮ ইফাঃ

লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে সশব্দে জিকির করা যে রিয়া বা ছোট শিরক তাতে কেউ সন্দেহ করে না। এমনকি সশব্দে জিকির করার পক্ষে যারা মত দিয়েছেন তারাও ইহাকে রিয়া বা ছোট শিরক বলে বিশ্বাস করে। তাছাড়া মনে মনে সবিনয় ও সশংকচিত্তে অনুচ্চস্বরে আল্লাহর জিকির করাতো মহান আল্লাহর নির্দেশ।

আল্লাহর স্মরনের পরিবর্তে গায়রুল্লাহকে স্মরন করলে শিরক হবে। শয়তান অনেক সময় মানুষকে গায়রুল্লার জিকির করতে উদ্বুদ্ধ করে থাকে। তখন তারা পীর, অলী, গাউস. কুতুর, জ্বীন,ভুত ইত্যাদির জিকির করে থাকে যা মুলত শিরকে আকবর। যারা হক পন্থিপীর দাবি করে, তারাও মুরিদদের পীরের ধ্যান করার আদেশ  দেন। আর শতভাগ ভন্ডরা বলে, জিকিরের সময় মনে করতে হবে আমার পীরের ক্বলব হতে যিকিরের তাছির, ফায়েজ, তাওয়াজ্জুহ সরাসরি আমার ক্বলবে প্রবেশ করছে। জিকির করব আল্লাহর আর ধ্যান করব পীরের আর ফায়েজও আসবে পীর থেকে এ কেমন অবিচার।

অনেক শিরক পন্থিপীর জিকিরের সুন্নাহ বিরোধী পদ্দিতি দিয়ে বলে থাকেন। এই পদ্দতিতে জিকির করতে পারলে অল্প দিনের মধ্যেই জিকিরের হালত পয়দা হবে। ক্বলবের মাকাম ও রং স্পষ্ট দেখা যাবে। শরীরকে হালকা মনে হবে। যিকিরের মাধ্যমেই আধ্যাত্মিকভাবে মক্কা-মদিনা, আরশ, কুরসী, লৌহ মাহফুজ, জান্নাত প্রভৃতি বিষয়াবলী দেখতে পারবেন। আধ্যাত্মিক শক্তি বৃদ্ধি পেলে অদৃশ্য জগতে ভ্রমণও করতে পারবেন। অর্থাৎ এলমে গাইবের অধিকারী হবেন।

কিন্তু দুঃথের বিষয় হল এমন হালত আমাদের অনুসরনীয় রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও হয়নি। কোন সাহাবি এমনটি দাবি করছেন বলে কেউ প্রমান করতে পারবে না। তাহলে নিশ্চয় ইহা আলাদা তরিকা বা পথ। শিরকি পথ। ইহা ইসলামের কোন পথ নয়।

মানিক গজ্ঞের এক পীর তার অনেকগুলি লিখিত বই আছে। তার প্রতিটি বইয়ের শেষে তৃতীয় সবকের সাছিরে লিখেছেন, এই সবকের তাসিরে ছত্রিশ কোটি পশমের গোড়া গিয়ে আল্লাহর জিকির বাহির হবে। এবং কোন কোন সময় হালত এরকম হবে, দেখবেন, নাভী হতে দেহের উপরের অংশ কোটি কোটি মাইল উর্ধ্বে উঠে গিয়েছে। নাভির নিচের অংশ টুকু জমিনে পড়ে আছে। এ আবার কেমন হালত যা কোন নবী, রাসুল, সাহাবি কারোই হয়নি। যা কুরআনে নেই, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও বলে নাই, সাহাবিগন ও জানেন না, তা কি করে ইসলাম হয়?  আর যদি কেউ,  জিকিরের মাধ্যমে নামাযে বা অন্য কোনো ইবাদতে বিঘ্ন ঘটায়, কোনো ব্যক্তির বিশ্রামে সমস্যা করে, আওয়াজ বড় করে অর্থাৎ  চিৎকার করে বা মাইক ব্যবহার করে জিকির তবে তা সুন্নাহ বিরোধী হবে। এমন কি যে সকল জিকিরে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সময় ও সংখ্যা নির্ধারন করন নাই, সে সকল জিকিরে সময় ও সংখ্যা নির্ধারন করা সুন্নাহ বিরোধী।

 সুকণ্ঠে কুরআন তেলাওয়াত ক্ষেতে যে সব ছোট শিরকে পতিত হওয়ার সম্ভাবনা:

কুরআন তেলাওয়াত করা নফল ইবাদাত হলেও আল্লাহ তা‘আলা কুরআন শিক্ষা করা ফরয করে দিয়েছেন। প্রত্যেক মুসলিমকে কুরআন পড়া জানতে হবে। সহিহ শুদ্ধ ভাবে কুরআন তেলাওয়াত না জানলে গুরিত্বপূর্ণ আমল সালাত পরিপূর্ন হবে না। তাই যে ব্যক্তি নিজেকে মুসলিম হিসাবে দাবী করবে তাকে অবশ্যই কুরআন শিক্ষা করতে হবে। কুরআন শিক্ষা করা এতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যে, আল্লাহ তা‘আলা সর্ব প্রথম কুরআনের যে আয়াতটি নাজিল করেন তাতে কুরআন পড়ার নির্দেষ দান করেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

 ٱقۡرَأۡ بِٱسۡمِ رَبِّكَ ٱلَّذِي خَلَقَ

পড় তোমার রবের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন। সূরা আলাক : ০১

কুরআন শিক্ষায় কোন প্রকার অবহেলা করা যাবে না। উম্মাতকে কুরআন শিক্ষার নির্দেশ দিয়ে ইবন মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, তোমরা কুরআন শিক্ষা কর এবং তিলাওয়াত কর। মুসান্নাফ ইবন আবী শাইবাহ : ৮৫৭২

কুরআন তেলাওয়াত করাকে আল্লাহ ব্যবসায়ের সাথে তুলনা করা হচ্ছে। মানুষ ব্যবসার জন্য নিজের অর্থ, শ্রম, ও মেধা নিয়োগ করে কিছু মুনাফা অর্জন করার জন্য। কিন্তু তার ব্যবসায় লাভ এবং ক্ষতি দুটিরই সম্ভাবনা থাকে। কুরআন তেলাওয়াত এমন ব্যবসা যেখানে লাভ ছাড়া কোন প্রকার ক্ষতির আশংকা নেই। কুরআন তিলাওয়াত আল্লাহর সাথে একটি লাভজনক ব্যবসা। । এ বিষয়ে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

إِنَّ ٱلَّذِينَ يَتۡلُونَ كِتَـٰبَ ٱللَّهِ وَأَقَامُواْ ٱلصَّلَوٰةَ وَأَنفَقُواْ مِمَّا رَزَقۡنَـٰهُمۡ سِرًّ۬ا وَعَلَانِيَةً۬ يَرۡجُونَ تِجَـٰرَةً۬ لَّن تَبُورَ (٢٩) لِيُوَفِّيَهُمۡ أُجُورَهُمۡ وَيَزِيدَهُم مِّن فَضۡلِهِۚۦۤ إِنَّهُ ۥ غَفُورٌ۬ شَڪُورٌ۬ (٣٠) 

যারা আল্লাহর কিতাব পাঠ করে, সালাত কায়েম করে, আমার দেয়া রিজিক থেকে গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যয় করে, তারাই আশা করতে পারে এমন ব্যবসার যা কখনো ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। কারণ আল্লাহ তাদের কর্মের পূর্ণ প্রতিদান দেবেন এবং নিজ অনুগ্রহে আরো অধিক দান করবেন। তিনি ক্ষমাশীল ও দয়াবান। (সূরা ফাতির ৩৫:২৯-৩০]

যে কুরআন শিখা থেকে  থেকে বিমুখ হয়ে থাকল, সে কতইনা দুর্ভাগা! আলকুরআনে এসেছে,

 وَمَنۡ أَعۡرَضَ عَن ذِڪۡرِى فَإِنَّ لَهُ ۥ مَعِيشَةً۬ ضَنكً۬ا وَنَحۡشُرُهُ ۥ يَوۡمَ ٱلۡقِيَـٰمَةِ أَعۡمَىٰ (١٢٤) قَالَ رَبِّ لِمَ حَشَرۡتَنِىٓ أَعۡمَىٰ وَقَدۡ كُنتُ بَصِيرً۬ا (١٢٥) قَالَ كَذَٲلِكَ أَتَتۡكَ ءَايَـٰتُنَا فَنَسِيتَہَا‌ۖ وَكَذَٲلِكَ ٱلۡيَوۡمَ تُنسَىٰ (١٢٦

অর্থ: আর যে আমার যিকর (কুরআন) থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে,  নিশচয় তার জীবন যাপন হবে  সংকুচিত এবং আমি কিয়ামতের দিন তাকে অন্ধ অবস্থয় উঠাবো। সে বলবে, হে আমার রব, কেন আপনি আমাকে অন্ধ অবস্থায় উঠালেন?  অথচ আমিতো ছিলাম দৃষ্টিশক্তিসম্পন্নণ?  তিনি বলবেন, অনুরুপভাবে তোমার নিকট আমার আয়াতসমূহ এসেছিল, অত:পর তুমি তা ভুলে গিয়েছিলে এবং সেভাবেই আজ তোমাকে ভুলে যাওয়া হল। (সূরা ত্বহা ২০:১২৪-১২৬)।

 যে ব্যবসায় লাভ বেশী সেই ব্যবসায় লোকশান হলে ক্ষতির পরিমান ও বেশী হয়। কুরআন তেলাওয়াত যদি আল্লাহর সন্ত্বষ্টির জন্য না হয়ে অন্য কারনে হয়ে থাকে তবেতো ক্ষতি ছাড়া লাভ হবে না। যে ব্যক্তি শুধু দুনিয়াবাসিকে শুনানোর জন্য কুরআন তেলাওয়াত করল, সে ছোট শিরক করল। কুরআন তেলাওয়াত  ইবাদাত আর গাইরুল্লার জন্য ইবাদাত শিরক। অনেকের আবার কুরআন তেলাওয়াত খুবই সুমধুর। সবাই তাদের কুরআন তেলাওয়াত শুনেন আর প্রশংসা করে। প্রশংসা শুনে শ্রতাদের খুসি করার জন্য তেলাওয়াত করে। শ্রতাদের খুসি করার জন্য তেলাওয়াত নিশ্চই শিরক হবে। ইদনিং বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে কুরআন তেলাওয়াত প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। কেউ যদি নিজের সুনাম সুখ্যাতি অর্জনের জন্য তেলাওয়াত করে তবে তাও শিরক হবে।

আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেনঃ তোমরা জুবুল হুযন’ হতে আল্লাহ তা’আলার নিকটে আশ্রয় প্রার্থনা কর। তারা প্রশ্ন করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! জুব্বুল হুযন কি? তিনি বললেনঃ তা জাহান্নামের মধ্যকার একটি উপত্যকা, যা থেকে স্বয়ং জাহান্নামও দৈনিক শতবার আশ্রয় প্রার্থনা করে। প্রশ্ন করা হল, হে আল্লাহর রাসূল! তাতে কে প্রবেশ করবে? তিনি বললেনঃ যেসব কুরআন পাঠক লোক দেখানো আমল করে। তিরমিজি : ২৩৮৩  ইবনু মাজাহ : ২৫৬

১০। দুনিয়া লাভের আশায় কুরআন শিক্ষা করা বা শিক্ষা প্রদান করা

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَاٰمِنُوۡا بِمَاۤ اَنۡزَلۡتُ مُصَدِّقًا لِّمَا مَعَکُمۡ وَلَا تَکُوۡنُوۡۤا اَوَّلَ کَافِرٍۭ بِہٖ ۪ وَلَا تَشۡتَرُوۡا بِاٰیٰتِیۡ ثَمَنًا قَلِیۡلًا ۫ وَّاِیَّایَ فَاتَّقُوۡنِ

আর তোমাদের সাথে যা আছে তার সত্যায়নকারীস্বরূপ আমি যা নাযিল করেছি তার প্রতি তোমরা ঈমান আন এবং তোমরা তা প্রথম অস্বীকারকারী হয়ো না। আর তোমরা আমার আয়াতসমূহ সামান্যমূল্যে বিক্রি করো না এবং কেবল আমাকেই ভয় কর। সুরা বাকারা : ৪১

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

أَمْ تَسْـَٔلُهُمْ أَجْرًا فَهُم مِّن مَّغْرَمٍ مُّثْقَلُونَ

তুমি কি তাদের কাছে পারিশ্রমিক চাচ্ছ? ফলে তারা ঋণের কারণে ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ছে। (সুরা কালাম ৬৮:৪৬)

উবাই বিন কাব (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি এক ব্যাক্তিকে কুরআন শিক্ষা দিলে সে আমাকে একটি ধনুক উপহার দেয়। আমি তা রাসুলুল্লাহ ﷺ এর নিকট উল্লেখ করলে তিনি বলেন, তুমি এটি গ্রহণ করলে (জানবে যে), তুমি জাহান্নামের একটি ধনুক গ্রহণ করেছ। অতএব আমি তা ফেরত দিলাম। ইবনে মাজাহ : ২১৫৮

ইমরান ইবনু হুসাইন (রা.) থেকে বর্ণিত, একদা তিনি জনৈক কুরআন তিলাওয়াতকারীর পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। লোকটি তখন কুরআন পাঠ করতে করতে (মানুষের নিকট) ভিক্ষা করছিল। তিনি “ইন্না লিল্লাহি ওয়াইন্না ইলাইহি রাজি ঊন’ পাঠ করে বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ কে বলতে শুনেছি, কুরআন তিলাওয়াতকারী ব্যক্তি যেন এর দ্বারা শুধু আল্লাহ তায়ালার নিকট প্রার্থনা করে। কেননা অচিরেই এমন এক সম্প্রদায়ের আবির্ভাব ঘটবে যারা কুরআন পাঠের মাধ্যমে মানুষের নিকট ভিক্ষা করবে। সুনানে ইবনে : ২৯১৭

যারা মাদ্রাসা নিজেদে পেশা হিসাবে শিক্ষাকতা করান তাদের ইহা ছাড়া অন্য কোন পেশা নাই তারা হাদিয়া বা বেতন হিসাবে টাকা নিতে পারবে। কুরআন শিক্ষা দিয়ে বেতন নেয়া জায়েয কিনা এ ব্যাপারে ফতোয়া বিষয়ক স্থায়ী কমিটিকে জিজ্ঞেস করা হলে তাঁরা জবাব দেন যে, হ্যাঁ, আলেমগণের দুইটি মতের মধ্যে বিশুদ্ধ মত হচ্ছে- কুরআন শিক্ষা দিয়ে বেতন নেয়া জায়েয। দলিল হচ্ছে- নবী ﷺ এর বাণীর ব্যাপকতা “তোমরা যে কাজের জন্য পারিশ্রমিক গ্রহণ কর এর মধ্যে আল্লাহর কিতাব সবচেয়ে উপযুক্ত। সহিহ বুখারী ও সহিহ মুসলিম] এছাড়া যেহেতু এর প্রয়োজন রয়েছে। আল্লাহই উত্তম তাওফিকদাতা। আমাদের নবী মুহাম্মদ এর প্রতি আল্লাহর রহমত বর্ষিত হোক। আল্লাহই ভাল জানেন। http://islamqa.info/bn/20100)

১১লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে জিহাদ

আবূ মূসা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ কে প্রশ্ন করা হল, এক লোক বীরত্ব দেখানোর উদ্দেশ্যে যুদ্ধে লিপ্ত হয়, এক লোক গোত্রীয় মর্যাদা রক্ষার উদ্দেশ্যে যুদ্ধ করে এবং এক লোক মানুষকে দেখানোর জন্য যুদ্ধ করে এদের মধ্যে কোন ব্যক্তি আল্লাহ্ তা’আলার পথে তিনি বললেন, আল্লাহ্ তা’আলার বাণীকে সমুন্নত করার উদ্দেশ্যে যে ব্যক্তি যুদ্ধ করে শুধুমাত্র সেই আল্লাহর পথে (জিহাদ)। সুনানে তিরমিজি : ১৬৪৬ সুনানে মাজাহ : ২৭৮৩

হযরত আবু মুসা আশ’আরী (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলে আকরাম সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করা হলোঃ এক ব্যক্তি শৌর্য-বীর্য প্রদর্শনের জন্য, এক ব্যক্তি আত্মগৌরব ও বংশীয় মর্যাদার জন্য এবং অপর এক ব্যক্তি লোক দেখানের জন্য লড়াই করে। এদের মধ্যে কে আল্লাহর পথে জিহাদ করে? রাসূলে আকরাম সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ যে ব্যক্তি কেবল আল্লাহর কালেমাকে বুলন্দ করার জন্য লড়াই করে সে-ই আল্লাহর পথে রয়েছে। (বুখারী, মুসলিম ও রিয়াযুস স্ব-লিহীন)।

হযরত আবু বাকরাহ নুফাই’ ইবনে হারিস সাকাফী (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলে আকরাম সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যখন দু’জন মুসলমান তরবারী কোষমুক্ত করে পরস্পর লড়াইয়ে লিপ্ত হয়, তখন হত্যাকারী ও নিহত ব্যক্তি উভয়েই জাহান্নামের যোগ্য হয়ে যায়। আমি নিবেদন করলামঃ হে আল্লাহর রাসূল! হত্যাকারীর জাহান্নামের হকদার হওয়াটাতো বুঝলাম; কিন্তু নিহত ব্যক্তির জাহান্নামী হওয়ার কারণটা কী? রাসূলে আকরাম সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ কারণটা হলো এই যে, সেও তো  তার প্রতিপক্ষকে হত্যা করতে চেয়েছিল। (বুখারী, মুসলিম ও রিয়াযুস স্ব-লিহীন)।

এক ব্যক্তি  কাছে এসে বললেন, ঐ ব্যক্তি সম্মন্ধে কি বলেন, যে ব্যক্তি সোওয়াব ও সুনামের জন্য জিহাদ করে, তার জন্য কি রয়েছে? বললেন, তার জন্য কিছুই নেই। সে ব্যক্তি তিন বার পূণরাবৃত্তি করল। তিন বার একই উত্তর দিলেন। তারপর তিনি বললেন, আল্লাহ তায়ালা তার জন্য কৃত আমল ব্যতিত, যা দ্বারা আল্লাহ সন্তুষ্টি ছাড়া আর কিছুই উদ্দেশ্য না হয়, আর কিছুই কবুল করেন না। (সুনানে নাসাঈ : ৩১৪২)

১২ নিজের বদ আমল নিয়ে আনন্দিত হওয়া বা প্রশংসা শুনতে চাওয়া

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

 لَا تَحۡسَبَنَّ ٱلَّذِينَ يَفۡرَحُونَ بِمَآ أَتَواْ وَّيُحِبُّونَ أَن يُحۡمَدُواْ بِمَا لَمۡ يَفۡعَلُواْ فَلَا تَحۡسَبَنَّہُم بِمَفَازَةٍ۬ مِّنَ ٱلۡعَذَابِ‌ۖ وَلَهُمۡ عَذَابٌ أَلِيمٌ۬

যারা তাদের কৃতকর্মের প্রতি খুশী হয় এবং যা তারা করেনি তা নিয়ে প্রশংসিত হতে পছন্দ করে, তুমি তাদেরকে আযাব থেকে মুক্ত মনে করো না। আর তাদের জন্যই রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক আযাব। সুরা আল ইমরান : ১৮৮

আবূ সাঈদ খুদরী (রা.) থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ ﷺ এর যুগে তিনি যখন যুদ্ধে বের হতেন তখন কিছু সংখ্যক মুনাফিক ঘরে বসে থাকত এবং রসূলুল্লাহ ﷺ বেরিয়ে যাওয়ার পর বসে থাকতে পারায় আনন্দ প্রকাশ করত। এরপর রসূলুল্লাহ ফিরে আসলে তাঁর কাছে শপথ করে ওজর পেশ করত এবং যে কাজ করেনি সে কাজের জন্য প্রশংসিত হতে পছন্দ করত। তখন এ আয়াত অবতীর্ণ হলো-

 لَا تَحۡسَبَنَّ ٱلَّذِينَ يَفۡرَحُونَ بِمَآ أَتَواْ وَّيُحِبُّونَ أَن يُحۡمَدُواْ بِمَا لَمۡ يَفۡعَلُواْ فَلَا تَحۡسَبَنَّہُم بِمَفَازَةٍ۬ مِّنَ ٱلۡعَذَابِ‌ۖ وَلَهُمۡ عَذَابٌ أَلِيمٌ۬ *

যারা তাদের কৃতকর্মের প্রতি খুশী হয় এবং যা তারা করেনি তা নিয়ে প্রশংসিত হতে পছন্দ করে, তুমি তাদেরকে আযাব থেকে মুক্ত মনে করো না। আর তাদের জন্যই রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক আযাব, আল ইমরান-১৮৮। সহিহ বুখারি : ৪৫৬৭, সহিহ মুসলিম : ২৭৭৭)

নিজেদের প্রশংসা শুনতে সবার ভাল লাগে, তাও যদি আবার অন্যায় কাজ করে। ভালো কাজ করে প্রশংশা শুনতে চাওয়া রিয়ার মত গুনাহ হয়। নিজের বদ আমল নিয়ে আনন্দিত হওয়া বা প্রশংসা শুনতে চাওয়া জঘন্য কবিরা গুনাহ।

রিয়া থেকে মুক্তির উপায়

১।  সম্মান, সুনাম, সুখ্যাতি লাভের ইচ্ছা্ মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি, ইহা অন্তর থেকে বের করতে হবে।

২। কোন আমল শুরু করার আগেই বার বার অন্তরের নিয়ত পরিশোধিত করা। রিয়ার ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করা।

৩।  আমল করার সময় রিয়া আসাই মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। খুব কম লোকই আছে যাদের রিয়া আসেনা।  কাজেই রিয়া আসার সাথে সাথে নিয়ত সহিহ করতে হবে। যত বারই অন্তরে রিয়া আসবে ততবারই নিয়ত সহিহ করতে হবে। আমর না ছেড়ে  সহীহ নিয়ত অন্তরে উপস্থিত করে আমল করে যেতে হবে।

৪। যে ইবাদত প্রকাশ্যে করার বিধান (নামাজ, সালাত, সাওম, হজ্জ্ব, জাকাত, দ্বীন প্রচার, জিহাদ ইত্যাদি) তাতো প্রকাশ্যে করতে হবে। এ ছাড়া অন্যান্য ইবাদত যেমন: নফল সালাত, দান সদকা, তাহাজ্জুদ, নফল সাওম, মানুষের উপকার ইত্যাদি গোপনে করার চেষ্টা করতে হবে।

৫।     শিরক থেকে  বাচার জন্য রাসুলুল্লাহ (সাঃ) শেখানো একটা দুয়া আছে, কেউ যদি প্রতিদিন সকাল বিকাল একবার করে পড়েন, তাহলে আশা করা যায় আল্লাহ তাকে শিরক থেকে হেফাজত করবেন।

দুয়াটি হচ্ছে:

اللَّهُمَّ  إِنِّي أَعُوذُ بِكَ أَنْ أُشْرِكَ بِكَ وَأَنَا أَعْلَمُ، وَأَسْتَغْفِرُكَلِمَا لاَ أَعْلَمُ

উচ্চারণঃ আল্লা-হুম্মা ইন্নী আ’উযুবিকা আন উশরিকা বিকা ওয়া আনা আ’লাম, ওয়া আস-তাগফিরুকা লিমা লা আ’লাম।

অনুবাদঃ হে আল্লাহ! আমার জানা অবস্থায় তোমার সাথে শিরক করা থেকে তোমার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি। আর আমার অজানা অবস্থায় কোনো শিরক হয়ে গেলে ক্ষমা প্রার্থনা করছি।

(আহমাদ ৪/৪০৩, হাদীসটি সহীহ, সহীহ আল-জামে ৩/২৩৩; হিসনুল মুসলিমঃ পৃষ্ঠা ২৪৬)।

উপরের আমলগুলি অভ্যাসে পরিণত করতে পারলে আশা করা যায় মহান আল্লাহ ধীরে ধীরে আমাদের ইবাদত রিয়া মুক্ত করে দিবেন। ইনশাআল্লাহ। আমিন। সুম্মা আমিন।

ফারওয়াহ ইবনু নাওফাল (রা.) হতে তার পিতার সূত্র থেকে বর্ণিত, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নাওফাল (রা.)-কে বলেনঃ তুমি “কুল ইয়া আয়্যুহাল কাফিরূন” সূরাটি পড়ে ঘুমাবে। কেননা তা শিরক হতে মুক্তকারী। সুনানে আবু দাউদ: ৫০৫৫