মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন
ছোট শিরক শ্রেণী বিভাগ আলোচনায় চারটি ভাগে বিভক্ত করেছিলাম। এখানে সেই চারটি শ্রেণীর ছোট শিরককে ধারাবাহিকভাবে আলোচনা করছি। চার প্রকারের ছোট শিরক হলো-
(১) বিশ্বাসের দ্বারা ছোট শিরক
(২) কথার দ্বারা ছোট শিরক
(৩) কর্মের দ্বারা ছোট শিরক
(৪) ইবাদতের ছোট শিরক বা রিয়া
বিশ্বাসের দ্বারা ছোট শিরক
১। কোন ব্যক্তি বা বস্তুত আচার আচরণে কল্যান অকল্যায় রয়েছে বলে বিশ্বাস করাঃ
মহান আল্লাহকে কল্যান অকল্যান একমাত্র মালিক বিশ্বাস করেও যদি কেউ কোন ব্যক্তি বা বস্তু আচার আচরণে বা দর্শণে কল্যান অকল্যান আছে মনে করে, তবে তা ছোট শিরক হবে। আল্লাহতে বিশ্বাসি কোন বান্দা কোন ব্যক্তি বা বস্তুর আচার আচরণে বা দর্শণে কল্যান অকল্যান কথা চিন্তা করতে পারে না। ব্যক্তি, বস্তু, প্রানী বা পাখি দর্শণেই অমঙ্গল বিশ্বাস করা কিংবা তাদের কোনরূপ আচরণ, ডাক, শব্দ বা ধ্বনির শ্রবণকে অকল্যান বিশ্বাস করা ছোট শিরকের পর্যায় পড়বে। যুগ যুগ ধরেই জাতীয় কুলক্ষণবোধ বিশ্বাস আমাদের সমাজে প্রচলিত আছে। মূসা (আ.) কে তার সম্প্রদায় অমঙ্গল হিসাবে বিশ্বাস করত। মহান আল্লাহ বলেন-
فَاِذَا جَآءَتۡہُمُ الۡحَسَنَۃُ قَالُوۡا لَنَا ہٰذِہٖ ۚ وَاِنۡ تُصِبۡہُمۡ سَیِّئَۃٌ یَّطَّیَّرُوۡا بِمُوۡسٰی وَمَنۡ مَّعَہٗ ؕ اَلَاۤ اِنَّمَا طٰٓئِرُہُمۡ عِنۡدَ اللّٰہِ وَلٰکِنَّ اَکۡثَرَہُمۡ لَا یَعۡلَمُوۡنَ
অতঃপর যখন তাদের কাছে কল্যাণ আসত, তখন তারা বলত, ‘এটা আমাদের জন্য।’ আর যখন তাদের কাছে অকল্যাণ পৌঁছত তখন তারা মূসা ও তার সঙ্গীদেরকে অশুভলক্ষণে মনে করত। তাদের কল্যাণ-অকল্যাণ তো আল্লাহর কাছে। কিন্তু তাদের অধিকাংশ জানে না। সুরা আরাফ : ১৩১
সামূদ জাতিও তাদের নবীকে অমঙ্গল মনে করত। এই সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
) قَالُواْ ٱطَّيَّرۡنَا بِكَ وَبِمَن مَّعَكَۚ قَالَ طَـٰٓٮِٕرُكُمۡ عِندَ ٱللَّهِۖ بَلۡ أَنتُمۡ قَوۡمٌ۬ تُفۡتَنُونَ
তারা বলল, আমরা তো তোমাদেরকে ও তোমার সাথীদেরকে অমঙ্গলের নিদর্শন হিসেবে পেয়েছি৷ সালেহ জবাব দিল, “তোমাদের মঙ্গল অমঙ্গলের উৎস তো আল্লাহর হাতে নিবদ্ধ, আসলে তোমাদের পরীক্ষা করা হচ্ছে৷ সুরা নমল : ৪৭
পূর্বের নবি রাসূলগন অমঙ্গল মনে করার আগেকটি প্রমান হলো। মহান আল্লাহ আরও বলেন-
قَالُوْا إِنَّا تَطَيَّرْنَا بِكُمْ، لَئِنْ لَمْ تَنْتَهُوْا لَنَرْجُمَنَّكُمْ وَلَيَمَسَّنَّكُمْ مِنَّا عَذَابٌ أَلِيْمٌ، قَالُوْا طَائِرُكُمْ مَعَكُمْ، أَئِنْ ذُكِّرْتُمْ، بَلْ أَنْتُمْ قَوْمٌ مُسْرِفُوْنَ
তারা বলল, ‘আমরা তো তোমাদেরকে অমঙ্গলের কারণ মনে করি। তোমরা যদি বিরত না হও তাহলে আমরা অবশ্যই তোমাদেরকে পাথর মেরে হত্যা করব এবং আমাদের পক্ষ থেকে তোমাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক আযাব স্পর্শ করবে’। সুরা ইয়াসিন : ১৮
অথচ সকল কল্যান আসে আল্লাহর পক্ষ থেকে আর অকল্যান হল আমাদের খারাপ কাজের ফল। মহান আল্লাহ বলেন-
أَيۡنَمَا تَكُونُواْ يُدۡرِككُّمُ ٱلۡمَوۡتُ وَلَوۡ كُنتُمۡ فِى بُرُوجٍ۬ مُّشَيَّدَةٍ۬ۗ وَإِن تُصِبۡهُمۡ حَسَنَةٌ۬ يَقُولُواْ هَـٰذِهِۦ مِنۡ عِندِ ٱللَّهِۖ وَإِن تُصِبۡهُمۡ سَيِّئَةٌ۬ يَقُولُواْ هَـٰذِهِۦ مِنۡ عِندِكَۚ قُلۡ كُلٌّ۬ مِّنۡ عِندِ ٱللَّهِۖ فَمَالِ هَـٰٓؤُلَآءِ ٱلۡقَوۡمِ لَا يَكَادُونَ يَفۡقَهُونَ حَدِيثً۬ا
আর মৃত্যু, সে তোমরা যেখানেই থাকো না কেন সেখানে তোমাদের লাগাল পাবেই, তোমরা কোন মজবুত প্রসাদে অবস্থান করলেও৷ যদি তাদের কোন কল্যাণ হয় তাহলে তারা বলে, এতো আল্লাহর পক্ষ থেকে হয়েছে৷ আর কোন ক্ষতি হলে বলে, এটা হয়েছে তোমার বদৌলতে৷ বলে দাও, সবকিছুই হয় আল্লাহর পক্ষ থেকে৷ লোকদের কী হয়েছে, কোন কথাই তারা বোঝে না৷ সুরা নিসা : ৭৮
সাধারণ মানুষ যে পশু, পাখি ও বস্তুতে কল্যায় অকল্যান মনে করি সে সম্পর্কে হাদিসে সঠিক দিক নির্দেশন দিয়ে বলা হয়েছে, কোন কিছুতেই মঙ্গল অমঙ্গল নাই।
আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-
لاَ عَدْو‘ى وَلاَ طِيَرَةَ وَلاَ هَامَةَ وَلاَ صَفَرَ وَفِرَّ مِنَ الْمَجْذُومِ كَمَا تَفِرُّ مِنْ الأَسَدِ.
রোগের কোন সংক্রমণ নেই, কুলক্ষণ বলে কিছু নেই, পেঁচা অশুভের লক্ষণ নয়, সফর মাসের কোন অশুভ নেই। কুষ্ঠ রোগী থেকে দূরে থাক, যেভাবে তুমি বাঘ থেকে দূরে থাক। সহিহ বুখারি : ৫৭০৭,
আবু হুরাইরাহ্ (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন-
لاَ عَدْوَى وَلاَ طِيَرَةَ وَلاَ هَامَةَ وَلاَ صَفَرَ وَلاَ نَوْءَ وَلاَ غُوْلَ، فَقَالَ أَعْرَابِيٌّ: يَا رَسُوْلَ اللهِ! فَمَا بَالُ الإِبِلِ تَكُوْنُ فِيْ الرَّمْلِ كَأَنَّهَا الظِّبَاءُ، فَيَجِيْءُ الْبَعِيْرُ الأَجْرَبُ فَيَدْخُلُ فِيْهَا، فَيُجْرِبُهَا كُلَّهَا، قَالَ: فَمَنْ أَعْدَى الْأَوَّلَ؟
ছোঁয়াচে রোগ বলতে কিছুই নেই। কুলক্ষণ বলতেই তা একান্ত অমূলক। হুতোম পেঁচা, সফর মাস, রাশি-তারকা অথবা পথ ভুলানো ভূত কারোর কোন ক্ষতি করতে পারে না। তখন এক গ্রাম্য ব্যক্তি বললো, হে আল্লাহ্’র রাসূল! কখনো এমন হয় যে, মরুভূমির মধ্যে শায়িত কিছু উট। দেখতে যেমন হরিণ। অতঃপর দেখা যাচ্ছে, চর্ম রোগী একটি উট এসে এগুলোর সাথে মিশে গেলো। তাতে করে সবগুলো উট চর্ম রোগী হয়ে গেলো। তখন রাসূল (সা.) বললেন: বলো তো: প্রথমটির চর্ম রোগ কোথা থেকে এসেছে? সহিহ বুখারি : ৫৭১৭, ৫৭৭০, ৫৭৭৩, সহিহ মুসলিম : ২২২০
আব্দুল্লাহ্ বিন্ মাসঊদ (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন:
الطِّيَرَةُ شِرْكٌ ـ ثَلاَثًا ـ وَمَا مِنَّا إِلاَّ … وَلَكِنَّ اللهَ يُذْهِبُهُ بِالتَّوَكُّلِ
কোনো বস্তুকে কুলক্ষণ মনে করা শিরক, কোনো বন্তুকে কুলক্ষণ ভাবা শিরক। একথা তিনি তিনবার বললেন। আমাদের কারো মনে কিছু জাগা স্বাভাবিক, কিন্তু আল্লাহর উপর ভরসা করলে তিনি তা দূর করে দিবেন। সুনানে আবু দাউদ : ৩৯১০, সুনানে তিরমিজি : ১৬১৪, সুনানে ইবনু মাজাহ : ৩৬০৪, ইবনু হিববান : ১৪২৭
আমাদের বিশ্বাস করতে হবে কোন ব্যক্তি, বস্তু, প্রানী বা পাখি আল্লাহর কল্যায় অকল্যানে ভাগ বসাতে পারে না। তিনিই একমাত্র যাবতীয় কল্যান ও অকল্যানের মালিক। তাই শরীয়ত সম্মত সব কাজ তারই উপর ভরসা করেই শুরু করে দিতে হবে। যদি কোন ব্যক্তি বা বস্তুর কুৎসিত রূপ দেখে অথবা কোন অরুচিকর বাক্য শুনে সে কাজ বন্ধ করে দেই তবে নিজের অজান্তেই শির্কে লিপ্ত হয়ে যাব।
মুয়াবিয়া বিন হাকাম্ সুলামী (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি রাসূল (সা.) কে জিজ্ঞাসা করেছিলাম-
وَمِنَّا رِجَالٌ يَتَطَيَّرُوْنَ، قَالَ: ذَاكَ شَيْءٌ يَجِدُوْنَهُ فِيْ صُدُوْرِهِمْ، فَلاَ يَصُدَّنَّهُمْ
আমাদের অনেকেই কোন না কোন কিছু দেখে বা শুনে কুলক্ষণ বোধ করেন। তখন রাসূল (সা.) বললেন: এটি হচ্ছে মনের ওয়াস্ওয়াসা। অতএব তারা যেন এ কারণে কোন কাজ বন্ধ না করে। সহিহ মুসলিম : ৫৩৭
আনাস্ (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন:
لاَ طِيَرَةَ، وَالطِّيَرَةُ عَلَى مَنْ تَطَيَّرَ، وَإِنْ يَكُ فِيْ شَيْءٍ فَفِيْ الدَّارِ وَالْفَرَسِ وَالْـمَرْأَةِ
শরীয়তের দৃষ্টিতে কুলক্ষণ বলতে কিছুই নেই। তবে অলক্ষণ শাস্তি সরূপ ওর পক্ষে হতে পারে যে শরীয়ত বিরোধীভাবে কোন বস্ত্ত বা ব্যক্তিকে অলক্ষুনে ভাবলো। শরীয়তের দৃষ্টিতে সত্যিকারার্থে যদি কোন বস্ত্তর মাঝে অকল্যাণ নিহিত থাকতো তা হলে ঘর-বাড়ি, গাড়ি-ঘোড়া ও স্ত্রীমহিলাদের মধ্যে তা থাকা যুক্তিসঙ্গত ছিলো’’। ইবনু হিববান : ৬০৯০
২। চাঁদ ও তারাকাজীকে শুভ অশুভ বিশ্বাস করা
অমুসলিমগণ তারকারাজীর পুজা করে। তারা তারকারাজীকে শুভ অশুভ বিশ্বাসও করে। যদি তাদের মত কোন মুসলিম তারকারাজীর পুজা করে তবে শিরকে আকবর হবে এবং সে ইসলাম থেকে বাহির হয়ে যাবে। কেননা, সে আল্লাহ ক্ষমতার সাথে তারকারাজীকে সম্পৃক্ত করেছে। যুগে যুগে এই শিরকি বিশ্বাস ও পুজা চলে আসছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় মুসলিমগন তারকারাজীর পুজা না করলেও মুশরিকদের দেখাদেখি ইহাকে শুভ অশুভ বিশ্বাসও করে যা মুলত শিরকে আসগর। যেহেতু আদম সন্তান তারকারাজী ব্যাপারে পুর্ব থেকেই শির্কে পতিত হয়ে আসছে, তাই আল্লাহ কুরআনে তারকারাজী ক্ষমতা, কাজ ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আমাদের জানিয়ে দিয়েছেন। কুরআনে তারকারাজী তিনটি বৈশিষ্ট্য ব্যতীত অন্য আর কোনো ক্ষমতা বা গুণাবলী আছে জানা যায় না।
(১) আকাশের সোভা বর্ধনের জন্য তারকারাজীকে সৃষ্টি করা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন:
وَلَقَدۡ زَيَّنَّا ٱلسَّمَآءَ ٱلدُّنۡيَا بِمَصَٰبِيحَ
‘আমরা দুনিয়ার আকাশকে সুশোভিত করেছি প্রদীপমালা দিয়ে’’। সূরা মুলক : ৫
(২) শয়তানের প্রতি নিক্ষেপ করার জন্য মহান আল্লাহ বলেন:
وَجَعَلۡنَٰهَا رُجُومٗا لِّلشَّيَٰطِينِۖ
‘আর আমরা তা শয়তানদের প্রতি নিক্ষেপ করার জন্য প্রস্তুত রেখেছি’’। সূরা মুলক : ৫
(৩) দিক নির্ণয়ের সাহায্য করি হিসাবে। মহান আল্লাহ বলেন-
وَعَلَٰمَٰتٖۚ وَبِٱلنَّجۡمِ هُمۡ يَهۡتَدُونَ
আর পথ-নির্দেশক চিহ্নসমূহ, আরা তারকার মাধ্যমে তারা পথ পায়। সুরা নাহল :১৬
তারকারাজীকে শুভ অশুভ বিশ্বাস করা যাবে না। এই সম্পর্ক হাদিসে দিক নির্দশনা এসেছে।
যায়দ ইবনু খালিদ জুহানী (রা.) হতে বর্ণিত যে, তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল ﷺ রাতে বৃষ্টি হবার পর হুদায়বিয়াতে আমাদের নিয়ে ফজরের সালাত আদায় করলেন। সালাত শেষ করে তিনি লোকদের দিকে ফিরে বললেন, তোমরা কি জান, তোমাদের পরাক্রমশালী ও মহিমাময় প্রতিপালক কি বলেছেন? তাঁরা বললেন, আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলই বেশি জানেন। আল্লাহর রাসূল ﷺ বললেন, (রব) বলেন, আমার বান্দাদের মধ্য কেউ আমার প্রতি মু’মিন হয়ে গেল এবং কেউ কাফির। যে বলেছে, আল্লাহর করুণা ও রহমতে আমরা বৃষ্টি লাভ করেছি, সে হল আমার প্রতি বিশ্বাসী এবং নক্ষত্রের প্রতি অবিশ্বাসী। আর যে বলেছে, অমুক অমুক নক্ষত্রের প্রভাবে আমাদের উপর বৃষ্টিপাত হয়েছে, সে আমার প্রতি অবিশ্বাসী হয়েছে এবং নক্ষত্রের প্রতি বিশ্বাসী হয়েছে। সহিহ বুখারি ৮৪৬, ১০৩৮, ৪১৪৭, সহিহ মুসলিম : ৭১,
তারকারাজী মহান আল্লাহ এক বিশ্বয়কর সৃষ্টি ছাড়া আর কিছুই নয়। বিশ্বয়কর সৃষ্টি দেখে সৃষ্টিকর্তা মনে করা অজ্ঞ আদম সন্তারের খুব পুরান অভ্যাস। কাজেই তারকারাজী ব্যাপারটিও এর ব্যাতিক্রম হয়নি। তারকারাজী মানুষের ভাগ্য বা অন্য কোন ব্যাপারে বিশেষ কোন ক্ষমতা রাখে বিশ্বাস করা শিরক। আমাদের উপমহাদেশে অনেক হিন্দুদের চাঁদের প্রতি এই রূপ ধারনা করেত দেখা যায়। তারা চাঁদের তারিখ অনুযায়ী শুভ অশুভ বিশ্বাস করে নিশিপালন ও উপবাস করে থাকে। এই শুভ অশুভ উপর ভিত্তি করে তারা বিভিন্ন শুভ কাজ আরম্ভ করে থাকে। তাদের দেখা দেখি উপমহাদেশের অনেক অজ্ঞ মুসলিমও শুভ অশুভ দিন তারিখ দেখ কাজকর্ম করে থাকে যা ছোট শিরকের আওতাভূক্ত।
৩। অসীলা বলতে পীর ধরা বিশ্বাস করা
অসীলা সম্পর্কে কুরআনের সূরা মায়েদায় ৩৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন,
يَـٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ ٱتَّقُواْ ٱللَّهَ وَٱبۡتَغُوٓاْ إِلَيۡهِ ٱلۡوَسِيلَةَ وَجَـٰهِدُواْ فِى سَبِيلِهِۦ لَعَلَّڪُمۡ تُفۡلِحُونَ
হে ঈমানদারগণ ! আল্লাহকে ভয় করো, তাঁর দরবারে নৈকট্যলাভের উপায় (অসীলা) অনুসন্ধান করো এবং তার পথে প্রচেষ্টা ও সাধনা করো, সম্ভবত তোমরা সফলকাম হতে পারবে৷ সুরা মায়েদা : ৩৫
সুফিবাদী অনেক আলেমকে এই আয়াতের ‘অসীলা’ শব্দের অর্থ করে পরিস্কার ভাবে বলেছেন, আল্লাহ ‘অসীলা’ অনুসন্ধান করতে বলেছেন অর্থাৎ পীর ধরতে বলেছেন। অথচ এই আয়াতের ‘অসীলা’ সম্পর্কে ইবনে আব্বাস, আতা, মুজাহিদ (রহ.) এর মত হল আল্লাহ তা‘আলার নৈকট্য লাভ করা। কাতাদাহ বলেন, অসীলা’ শব্দের অর্থ পছন্দনীয় কাজের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা। আর এটাই হচ্ছে সাহাবিদের মত। কাজেই এমন আমল অনুসন্ধান করতে হবে যার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা যায়। অসীলা সম্পর্কে কুরআনে আল্লাহ আরো বলেন,
قُلِ ٱدۡعُواْ ٱلَّذِينَ زَعَمۡتُم مِّن دُونِهِۦ فَلَا يَمۡلِكُونَ كَشۡفَ ٱلضُّرِّ عَنكُمۡ وَلَا تَحۡوِيلاً (٥٦)أُوْلَـٰٓٮِٕكَ ٱلَّذِينَ يَدۡعُونَ يَبۡتَغُونَ إِلَىٰ رَبِّهِمُ ٱلۡوَسِيلَةَ أَيُّہُمۡ أَقۡرَبُ وَيَرۡجُونَ رَحۡمَتَهُ ۥ وَيَخَافُونَ عَذَابَهُ ۥۤۚ إِنَّ عَذَابَ رَبِّكَ كَانَ مَحۡذُورً۬ا (٥٧)
এরা যাদেরকে ডাকে তারা তো নিজেরাই নিজেদের রবের নৈকট্যলাভের উপায় ‘ অসীলা’ খুঁজে বেড়াচ্ছে যে, কে তাঁর নিকটতর হয়ে যাবে এবং এরা তাঁর রহমতের প্রত্যাশী এবং তাঁর শাস্তির ভয়ে ভীত। আসলে তোমার রবের শাস্তি ভয় করার মতো৷ সুরা বণী ঈসরাইল : ৫৬-৫৭
অলী, আউলিয়া, নবী, রাসুল অথবা ফেরেশতা কারোই তোমাদের প্রার্থনা শুনার এবং তোমাদের সাহায্য করার ক্ষমতা নেই। তোমরা নিজেদের প্রয়োজন পূর্ণ করার জন্য তাদেরকে অসিয়ায় পরিণত করছো কিন্তু তাদের অবস্থা এই যে, তারা নিজেরাই আল্লাহর রহমতের প্রত্যাশী, তার আযাবের ভয়ে ভীত এবং তার বেশী বেশী নিকটবর্তী হবার জন্য অসিলা ও উপায় খুঁজে বেড়াচ্ছে।
ইবনে কাছীর (রহ.) এর মতে ‘অসীলা’ শব্দটির অর্থ হল, আল্লাহর আনুগত্যের মাধ্যমে তাঁর নৈকট্য লাভ করা।
আল্লাহর নৈকট্য লাভের প্রধান মাধ্যম হল, ইবাদাতের মাধ্যমে আল্লাহর আনুগত্যের করা। তাই খাটি ইবাদত ব্যতিত আল্লাহ তা‘আলার নৈকট্য লাভের আশা করা যায় না। আর খাটি ইবাদাতের করতে হলে আল্লাহর কিতাব এবং নবী (সাল্ল.) এর সুন্নাহর বাহিরে কোন আমল করা যাবে না। তাই প্রথমত ইবাদাত হবে এক মাত্র আল্লাহর জন্য এবং তরিকা হবে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহ মোতাবেগ। মহান আল্লাহ বলেন-
وَمَآ أُمِرُوٓاْ إِلَّا لِيَعۡبُدُواْ ٱللَّهَ مُخۡلِصِينَ لَهُ ٱلدِّينَ حُنَفَآءَ وَيُقِيمُواْ ٱلصَّلَوٰةَ وَيُؤۡتُواْ ٱلزَّكَوٰةَۚ وَذَٲلِكَ دِينُ ٱلۡقَيِّمَةِ (٥)
তাদেরকে তো এ ছাড়া আর কোন হুকুম দেয়া হয়নি যে, তারা নিজেদের দীনকে একমাত্র আল্লাহর জন্য নির্ধারিত করে একনিষ্ঠভাবে তাঁর ইবাদাত করবে, নামায কায়েম করবে ও যাকাত দেবে, এটিই যথার্থ সত্য ও সঠিক দীন৷ সূরা বাইয়্যেনাহ : ৫
আল্লাহ তা‘আলা বলেন-
ٱتَّبِعُواْ مَآ أُنزِلَ إِلَيۡكُم مِّن رَّبِّكُمۡ وَلَا تَتَّبِعُواْ مِن دُونِهِۦۤ أَوۡلِيَآءَۗ قَلِيلاً۬ مَّا تَذَكَّرُونَ (٣)
হে মানব সমাজ! তোমাদের রবের পক্ষ থেকে তোমাদের ওপর যা কিছু নাযিল করা হয়েছে তার অনুসরণ করো এবং নিজেদের রবকে বাদ দিয়ে অন্য অভিভাবকদের (আওলিয়াদের) অনুসরণ করো না৷ কিন্তু তোমরা খুব কমই উপদেশ মেনে থাকো৷ (সুরা আরাফ ৭:৩)।
আমাদের সমাজে অনেক আলম আছে যারা অসীলা বলতে পীর বুঝান না, তারা অসীলা বলতে শুধু দুয়ার ক্ষেত্রে অসীলা বুঝে থাকেন। দুয়া যেহেতু ইবাদাত এবং যার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য হাসিল হয়। তাই দুয়াও অসীলান অন্যতম মাধ্যম।
আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন তাঁর সুন্দর সুন্দর নাম এবং উন্নত গুণাবলীর মাধ্যমে তার নিকট দুয়া করার। (সুরা আরাফ ৭:১৮০)। বান্দার কৃত নেক আমলেন অসীলা দিয়ে দুয়া করা। (বুখারীর বর্ণনায় বনী ইসরাইলে তিন লোকের গুহা থেকে মুক্তি লাভ)। কোনো জীবিত উপস্থিত সৎ লোকের নিকট এসে দুয়া চাওয়া। (সহীহ বুখারীতে বর্ণিত, উমর ইবনে খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু এর যামানায় যখন অনাবৃষ্টির সময় তিনি আব্বাস ইবন আব্দুল মুত্তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহু এর অসীলায় বৃষ্টি চাইতেন)। আল্লাহ তা‘আলা নাম, নেক আমল, জীবিত উপস্থিত লোক এই তিনটি বৈধ অসীলা দিয়ে দুয়া করা।
শরিয়তের দৃষ্টিতে অবৈধ অসীলা হলো, সেই সকল অসীলা যার কোন দলিল কুরআন বা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীসে নেই, এমনকি সাহাবি (রা.), তাবেঈ বা তাবে-তাবেঈনদের আমলেও পাওয়া যায় না। যেমন, মৃত অলী, পীর, আওলীয়া, নেকবান্দা, নবী এবং রাসূলগণের অসীলা দিয়ে আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য দুয়া করা।
যেমন: কেউ বলল, হে আল্লাহ! তোমার নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অসীলায় বা তোমার নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সত্তার অসীলায় আমাকে ক্ষমা কর, আমাকে অনুগ্রহ কর এবং জান্নাতে প্রবেশ করাও। এ প্রকার দো‘আ শিরক নয় বরং বিদ‘আত।
এ প্রকার দো‘আ যদি নবী ﷺ ব্যতীত অন্য কারো নিকট করে তবে তা ছোট শিরক হবে, কিন্তু এতে সে দ্বীন থেকে সে বের হয়ে যাবে না। যেমন কেউ বলল: হে আল্লাহ আব্বাস বা আব্দুল কাদীরের সত্তার অসীলায় মাপ কর।
অপরদিকে আল্লাহ তা‘আলার ন্যায় কোনো সৃষ্টিকে ডাকা, যেমন কেউ বলল: হে আল্লাহর রাসূল! ﷺ আমার বিপদ দূর করে দিন, বা আমার ঋণ পরিশোধ করে দিন, অথবা আমার রোগ ভাল করে দিন। এটি অসীলা নয় বরং এটি বড় শিরক, তাতে সে ইসলাম থেকে বের হয়ে যাবে, কারণ আগেই বলা হয়েছেঅ দুয়া একটি ইবাদত, আর কোনো ইবাদত আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো জন্য করা সকল আলেমের ঐক্য মনে শিরক।