কথার দ্বারা ছোট শিরক

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

১। আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে শপথ করা

 আল্লাহ্ ছাড়া অন্যের নামে শপথ করা ছোট শিরক। যেমন পিতার নামে, মূর্তির নামে, কাবার নামে, আমানতের নামে বা আরো অন্যান্য বস্ত্তর নামে শপথ করা।

আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী ﷺ বলেছেন-

مَنْ كَانَ حَالِفًا فَلْيَحْلِفْ بِاللهِ أَوْ لِيَصْمُت

কারও হলফ করতে হলে সে যেন আল্লাহর নামেই হলফ করে, নতুবা চুপ করে থাকে। সহহি বুখারি : ২৬৭৯, ৩৮৩৬, ৬১০৮, ৬৬৪৬, ৬৬৪৮

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

ا تَحْلِفُوا بِآبَائِكُمْ، وَلَا بِأُمَّهَاتِكُمْ، وَلَا بِالْأَنْدَادِ، وَلَا تَحْلِفُوا إِلَّا بِاللَّهِ، وَلَا تَحْلِفُوا بِاللَّهِ إِلَّا وَأَنْتُمْ صَادِقُونَ

তোমরা নিজেদের পিতা-মাতা কিংবা দেবদেবীর নামে শপথ করবে না। তোমরা শুধুমাত্র আল্লাহর নামে শপথ করবে। আর তোমরা আল্লাহর নামে কেবল সে বিষয়েই শপথ করবে যে বিষয়ে তোমরা সত্যবাদী। আবু দাউদ : ৩২৪৮, সুনানে নাসায়ী : ২৭৯৬

সা’দ ইবনু উবাইদা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, ইবনু উমার (রাঃ) একজন লোককে বলতে শুনলেন, না, কাবার শপথ! ইবনু উমার (রাঃ) বললেন, আল্লাহ তা’আলার নাম ব্যতীত অন্য কিছুর নামে শপথ করা যাবে না। কেননা রাসূলুল্লাহ ﷺকে আমি বলতে শুনেছিঃ আল্লাহ তা’আলার নাম ব্যতীত অন্য কিছুর নামে যে লোক শপথ করল সে যেন কুফরী করল অথবা শিরক করল। সুনানে তিরমিজি : ১৫৩৫, সহিহাহ : ২০৪২

আবদুল্লাহ্ ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। একবার রাসূলুল্লাহ্ ﷺ ’উমার ইবনু খাত্তাব (রাঃ)-কে বাহনে চলা অবস্থায় পেলেন যখন তিনি তাঁর পিতার নামে কসম করছিলেন। তিনি বললেনঃ সাবধান! আল্লাহ্ তোমাদেরকে তোমাদের বাপ-দাদার নামে কসম করতে নিষেধ করেছেন। কেউ কসম করতে চাইলে সে যেন আল্লাহর নামে কসম করে, নইলে যেন চুপ থাকে। সহিহ বুখরি : ৬৬৪৬, সহিহ মুসলিম : ১৪৪৬, সুনানে তিরমিজি : ১৫৩৩, ১৫৩৮, ১৫৩৫, সুনানে নাসায়ী ৩৭৬৬, ৩৭৬৭, সুনানে আবূ দাউদ : ৩২৪৯

২। কথার মধ্যে ‘যদি’ ব্যবহার করা

ইবনে ইসহাক বলেন, আব্দুল্লাহ বিন জুবাইর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাঁর পিতা জুবাইর রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণনা করেছেন যে, জুবাইর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, উহুদের দিন আমি নিজেকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাথে দেখলাম। যখন আমাদের ভয় প্রচন্ড আকার ধারণ করল, তখন আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে নিদ্রা দ্বারা আচ্ছাদিত করলেন। আমাদের প্রত্যেকের থুতনী তার বক্ষদেশের সাথে লেগে যাচ্ছিল। জুবাইর বলেন, আল্লাহর শপথ! ঐ অবস্থায় আমি স্বপ্নের মতই মু’তিব বিন কুশাইরকে বলতে শুনলাম, এ ব্যাপারে যদি আমাদের করণীয় কিছু থাকতো, তাহলে আমরা এখানে নিহত হতামনা। তার নিকট থেকে শুনে আমি কথাটি মুখস্থ করে ফেললাম। মু’তিবের ঐ কথাকে কেন্দ্র করেই আল্লাহর এই বাণী নাযিল হয়-

لُونَ لَوۡ كَانَ لَنَا مِنَ ٱلۡأَمۡرِ شَىۡءٌ۬ مَّا قُتِلۡنَا هَـٰهُنَا‌ۗ قُل لَّوۡ كُنتُمۡ فِى بُيُوتِكُمۡ لَبَرَزَ ٱلَّذِينَ كُتِبَ عَلَيۡهِمُ ٱلۡقَتۡلُ إِلَىٰ مَضَاجِعِهِمۡ‌ۖ وَلِيَبۡتَلِىَ ٱللَّهُ مَا فِى صُدُورِڪُمۡ وَلِيُمَحِّصَ مَا فِى قُلُوبِكُمۡ‌ۗ وَٱللَّهُ عَلِيمُۢ بِذَاتِ ٱلصُّدُورِ (١٥٤) 

তারা বলে, যদি এ বিষয়ে আমাদের কোন অধিকার থাকতো তাহলে এখানে আমরা নিহত হতামনা। তুমি বল, যদি তোমরা তোমাদের গৃহের মধ্যেও থাকতে তবুও যাদের প্রতি মৃত্যু বিধিবদ্ধ হয়েছে তারা নিশ্চয়ই স্বীয় মৃত্যু স্থানে এসে উপস্থিত হত; তোমাদের অন্তরের মধ্যে যা আছে, আল্লাহ তা পরীক্ষা করে থাকেন; এবং আল্লাহ মনের অন্তর্নিহিত ভাব জ্ঞাত আছেন। সুরা আল ইমরান : ১৫৪। তাওহীদ পন্থীদের নয়নমণি,  শাইখ আব্দুর রাহমান বিন হাসান বিন মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহাব (রহঃ)

যদি সাধারন অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সকল কর্মে ব্যবহৃত হয। অতীতে কোন ক্ষতির কারনে বিষণ্ণতা বা হতাশা দুর করার জন্য যদি শব্দটি বলা হয়। বর্তমান ও ভবিষ্যৎ কর্মের শর্তের কারনে যদি ব্যবাহারে কোন অসুবিধা নাই। কিন্তু অতীত ক্ষতির কারনে বিষণ্ণগ্রস্ত হয়ে কিংবা অতীতে সংঘটিত কোন দুর্ঘটনার জন্য আফসোস করে এবং তাকদীরের প্রতি বিরক্তি প্রকাশ করে যদি শব্দটি ব্যবহার করা নিষিদ্ধ। যেমন কেউ বলল, আমি যদি এমন করতাম তাহলে এমন হত, এমন না করলে এমন হতনা, সেখানে না গেলে আমি দুর্ঘটনার কবলে পড়তাম না ইত্যাদি। এ ধরণের কথা বলা সম্পূর্ণ হারাম। আল্লাহ্ তাআলা বলেন-

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا لَا تَکُوۡنُوۡا کَالَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا وَقَالُوۡا لِاِخۡوَانِہِمۡ اِذَا ضَرَبُوۡا فِی الۡاَرۡضِ اَوۡ کَانُوۡا غُزًّی لَّوۡ کَانُوۡا عِنۡدَنَا مَا مَاتُوۡا وَمَا قُتِلُوۡا ۚ لِیَجۡعَلَ اللّٰہُ ذٰلِکَ حَسۡرَۃً فِیۡ قُلُوۡبِہِمۡ ؕ وَاللّٰہُ یُحۡیٖ وَیُمِیۡتُ ؕ وَاللّٰہُ بِمَا تَعۡمَلُوۡنَ بَصِیۡرٌ

হে মুমিনগণ, তোমরা তাদের মত হয়ো না, যারা কুফরী করেছে এবং তাদের ভাইদেরকে বলেছে, যখন তারা যমীনে সফরে বের হয়েছিল অথবা তারা ছিল যোদ্ধা। যদি তারা আমাদের কাছে থাকত, তবে তারা মারা যেত না এবং তাদেরকে হত্যা করা হত না’। যাতে আল্লাহ তা তাদের অন্তরে আক্ষেপে পরিণত করেন এবং আল্লাহ জীবন দান করেন ও মৃত্যু দেন। আর তোমরা যা কর আল্লাহ সে বিষয়ে সম্যক দ্রষ্টা। সূরা আল ইমরান : ১৫৬

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

اَلَّذِیۡنَ قَالُوۡا لِاِخۡوَانِہِمۡ وَقَعَدُوۡا لَوۡ اَطَاعُوۡنَا مَا قُتِلُوۡا ؕ قُلۡ فَادۡرَءُوۡا عَنۡ اَنۡفُسِکُمُ الۡمَوۡتَ اِنۡ کُنۡتُمۡ صٰدِقِیۡنَ

যারা তাদের ভাইদেরকে বলেছিল এবং বসেছিল, ‘যদি তারা আমাদের অনুকরণ করত, তারা নিহত হত না’। বল, ‘তাহলে তোমরা তোমাদের নিজ থেকে মৃত্যুকে দূরে সরাও যদি তোমরা সত্যবাদী হও’। সুরা আল ইমরান : ১৬৮

অতীত কালের ঘটে যাওয়ার ঘটনাকে যদি দ্বারা প্রশ্নবিদ্ধ করাতে আল্লাহ আয়াত নাজির করে সতর্ক করলেন। তাকদিরে বিশ্বাস করা ফরজ। অতীতের ঘটনা যা ঘটেছে তা তাকদিরে এভাবেই লিখিত আছে। কাজেই এর সাথে যদি জড়িত করে প্রশ্ন করা তাকদিরকেউ অস্বীকার করার নামান্তর। তাছাড়া আমারা ইচ্ছা করতে পারি বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য অতীতের ইচ্ছা করা কোন ক্ষমতা আমাদের নাই। আমাদের বর্তমান ও ভবিষ্যতের করার অধিকার থাকলেও ইচ্ছা বাস্তবায়ন করা আমাদের হাত নাই। ইহা সম্পূর্ণ আল্লাহর হাতে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَمَا تَشَآءُوۡنَ اِلَّاۤ اَنۡ یَّشَآءَ اللّٰہُ رَبُّ الۡعٰلَمِیۡنَ

আর তোমরা ইচ্ছা করতে পার না, যদি না সৃষ্টিকুলের রব আল্লাহ ইচ্ছা করেন। সুরা তাকবির : ২৯

কাজেই অতীত কালের বিপদ, হতাশা, কষ্টকে যদি দ্বারা প্রশ্নবিদ্ধ করার অর্থ ভাগ্যকে অস্বীকার করা ও আল্লাহর নিয়ন্ত্রণের বাইরেও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমাতকে বিশ্বাস করা। এই সম্পর্কে যদি ব্যবহার করা হাদিসেও নিষদ্ধ করা হয়েছে।

আবু হুরাইরাহ্ (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেনঃ শক্তিধর ঈমানদার দুর্বল ঈমানদারের তুলনায় আল্লাহর নিকট উত্তম ও অতীব পছন্দনীয়। তবে প্রত্যেকের মধ্যেই কল্যাণ নিহিত আছে, যাতে তোমার উপকার রয়েছে তা অর্জনে তুমি আগ্রহী হও এবং আল্লাহর কাছে সাহায্য কামনা কর। তুমি অক্ষম হয়ে যেও না। এমন বলো না যে, যদি আমি এমন এমন করতাম তবে এমন হত না। বরং এ কথা বলে যে, আল্লাহ তা’আলা যা নির্দিষ্ট করেছেন এবং যা চেয়েছেন তাই করেছেন। কেননাلَوْ (যদি) শব্দটি শাইতানের (শয়তানের) কর্মের দুয়ার খুলে দেয়।  সহহি মুসলিম : ২৬৬৪

০৩। মহাকালেকে গালি দেওয়া

মহাকাল বলতে দিবারাত্রির আবর্তন-বিবর্তনকে বুঝানো হয়েছে। রাত্রি উপনীত হলে অন্ধকার ছেয়ে যায়। আর দিন প্রকাশ পেতেই সমস্ত জিনিস উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। এই দিবারাত্রি অতিবাহিত হওয়ার নামই হল কাল, যুগ বা সময়। যা আল্লাহর কুদরত ও কারিগরি ক্ষমতা প্রমাণ করে। অন্ধকার যুগে আরবরা যখন কঠিন বিপদে পড়ত তখই মহকাল বা সময়কে গালি দিত। তারা ভাবত মহাকালই তাদের বিপদের কারন। মহাকালকে গালি প্রদানকারীর হুকুমের দুটি পর্যায়, হয়ত সে আল্লাহকে গালি দিচ্ছে অথবা আল্লাহর সাথে মহাকালকে শরীক করছে। যদি কেউ মনে করে মহাকাল এবং আল্লাহ যৌথভাবে বিপদ সংঘটিত করেন তাহলে শিরকে আকবর হয়ে যাবে এবং সে মুশরিক হয়ে যাবে আর যদি স্বীকার করে যে, আল্লাহই এককভাবে তা সংঘটিত করেছেন তারপরও ঐ সংঘটিত কাজকে গালি দিল, প্রকৃতপক্ষে সে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনকেই গালি দিল। তখন তার দ্বারা কবিরা গুরাহ।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَقَالُوۡا مَا ہِیَ اِلَّا حَیَاتُنَا الدُّنۡیَا نَمُوۡتُ وَنَحۡیَا وَمَا یُہۡلِکُنَاۤ اِلَّا الدَّہۡرُ ۚ وَمَا لَہُمۡ بِذٰلِکَ مِنۡ عِلۡمٍ ۚ اِنۡ ہُمۡ اِلَّا یَظُنُّوۡنَ

আর তারা বলে, ‘দুনিয়ার জীবনই আমাদের একমাত্র জীবন। আমরা মরি ও বাঁচি এখানেই। আর মহাকাল-ই কেবল আমাদেরকে ধ্বংস করে।’ বস্তুত এ বিষয়ে তাদের কোন জ্ঞান নেই। তারা শুধু ধারণাই করে। সুরা জাসিয়া : ২৪

আবূ হুরায়রাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

اللهُ عَزَّ وَجَلَّ يُؤْذِيْنِي ابْنُ آدَمَ يَسُبُّ الدَّهْرَ وَأَنَا الدَّهْرُ بِيَدِي الْأَمْرُ أُقَلِّبُ اللَّيْلَ وَالنَّهَارَ.

আল্লাহ তায়ালা বলেন, আদাম সন্তান আমাকে কষ্ট দিয়ে থাকে, তারা যুগ বা কালকে গালি দেয়, অথচ আমিই জামানা অর্থাৎ যুগ বা কাল। আমার হাতেই ক্ষমতা, দিন-রাত্রির পরিবর্তন আমিই করে থাকি। সহিহ বুখারি : ৪৮২৬, ৮১৬১, সহিহ মুসলিম : ২২৪৬, সুনানে আবূ দাঊদ : ৫২৭৪, আহমাদ : ৭২৪৫

আবূ হুরাইরাহ্‌ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ ﷺ কে আমি বলতে শুনেছি, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন, আদাম সন্তান সময় ও কালকে গালি-গালাজ করে, অথচ আমিই সময়, আমার হাতেই রাত্রি ও দিবস। সহিহ মুসলিম : ৫৭৫৫

মহান আল্লাহর একচ্চন্ন ক্ষমতা বিশ্বাস করা পরও যদি কেউ মনে মনে এই বিশ্বাস রাখে যে অনেক ঘটনার পেছনে মহাকালেরও ভুমিকা আছে। তবে সে ছোট শিরক করল।

০৪। মহাকালে মত বাতাসকে অকল্যান মনে করে গালি দেওয়া

বাতাসকে গালি দেয়া ছোট শির্ক। কারণ, যে ব্যক্তি বাতাসকে গালি দেয় সে অবশ্যই এ কথা বিশ্বাস করে যে, বাতাস এককভাবে কারোর কোন লাভ বা ক্ষতি করতে পারে। বাতাসকে গালি দেয়ার কোন মানে হয় না।

উবাই বিন্ কা’ব (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন:

لاَ تَسُبُّوْا الرِّيْحَ، فَإِذَا رَأَيْتُمْ مَا تَكْرَهُوْنَ ؛ فَقُوْلُوْا: اللَّهُمَّ! إِنَّا نَسْأَلُكَ مِنْ خَيْرِ هَذِهِ الرِّيْحِ وَخَيْرِ مَا فِيْهَا، وَخَيْرِ مَا أُمِرَتْ بِهِ، وَنَعُوْذُ بِكَ مِنْ شَرِّ هَذِهِ الرِّيْحِ، وَشَرِّ مَا فِيْهَا، وَشَرِّ مَا أُمِرَتْ بِهِ

বাতাসকে তোমরা গালি দিও না। অপছন্দনীয় কোন কিছু দেখতে পেলে তোমরা এই দুআ পড়বে, “হে আল্লাহ! আমরা আপনার নিকট আকাঙ্ক্ষা করি এ বাতাসের কল্যাণ, এর মধ্যে যে কল্যাণ নিহিত আছে তা এবং সে যে বিষয়ে আদেশ প্রাপ্ত হয়েছে তার কল্যাণ। আমরা এ বাতাসের অকল্যাণ হতে তোমার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করি, এর মধ্যে নিহিত ক্ষতি হতে এবং সে যে বিষয়ে আদেশ প্রাপ্ত হয়েছে তার অকল্যাণ হতে”। সুনানে তিরমিজি : ২২৫২, মিশকাত : ১৫১৮, সহীহাহ : ২৭৫৬, সুনানে নাসায়ী : ৯৩৩-৯৩৬

 আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে বলতে শুনেছিঃ

الرِّيحُ مِنْ رَوْحِ اللَّهِ قَالَ سَلَمَةُ: فَرَوْحُ اللَّهِ تَأْتِي بِالرَّحْمَةِ، وَتَأْتِي بِالْعَذَابِ، فَإِذَا رَأَيْتُمُوهَا فَلَا تَسُبُّوهَا، وَسَلُوا اللَّهَ خَيْرَهَا، وَاسْتَعِيذُوا بِاللَّهِ مِنْ شَرِّهَا

বায়ু আল্লাহর অন্যতম রহমত। তা কখনো শান্তি বয়ে আনে আবার কখনো আযাব নিয়ে আসে। সুতরাং বাতাস প্রবাহিত হতে দেখলে তোমরা তাকে গালাগলি দিবে না, বরং আল্লাহর নিকট এর কল্যাণ চাইবে এবং তার খারাবী থেকে আল্লাহর নিকট মুক্তি প্রার্থনা করবে। আবু দাউদ : ৫০৯৭, সুনানে নাসায়ী : ৯২৯, ৯৩১, ৯৩২

আব্দুল্লাহ্ বিন্ ’আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: নবী (সা.) ইরশাদ করেন-

لاَ تَلْعَنِ الرِّيْحَ ؛ فَإِنَّهَا مَأْمُوْرَةٌ، وَإِنَّهُ مَنْ لَعَنَ شَيْئًا لَيْسَ لَهُ بِأَهْلٍ رَجَعَتِ اللَّعْنَةُ عَلَيْهِ

‘বাতাসকে অভিশাপ দিওনা। কারণ, সে আল্লাহ্ তা’আলার পক্ষ থেকে আদিষ্ট। আর যে ব্যক্তি অভিশাপের অনুপযুক্ত বস্ত্তকে অভিশাপ দেয় সে অভিশাপ পুনরায় তার উপরই ফিরে আসে’’। সুনানে তিরমিজি : ১৯৭৮, সুনানে আবু দাউদ : ৪৯০৮, ইবনু হিব্বান : ১৯৮৮

০৫। আল্লাহ্ তায়ালা এবং তুমি না চাইলে কাজটা হতোনা এমন বলার শির্ক

আল্লাহ তায়ালা এবং তুমি না চাইলে কাজটা হতো না এ জাতীয় কথা বলা ছোট শির্ক। কেননা এখানে তাব বিশ্বাস যাই থাকুক না কেন এই কথার মাধ্যমে সে মহান আল্লাহকে বান্দার সাথে সম্পৃক্ত করেছে। কথায় বোঝা যায় তিনি আল্লাহতে বিশ্বাসি সাথে শিরক ও করেছেন।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَمَا یُؤۡمِنُ اَکۡثَرُہُمۡ بِاللّٰہِ اِلَّا وَہُمۡ مُّشۡرِکُوۡنَ

তাদের অধিকাংশ আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস করে, তবে (ইবাদাতে) শিরক করা অবস্থায়। সুরা ইউসুফ : ১০৬

ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,

إِذَا حَلَفَ أَحَدُكُمْ فَلاَ يَقُلْ مَا شَاءَ اللَّهُ وَشِئْتَ ‏.‏ وَلَكِنْ لِيَقُلْ مَا شَاءَ اللَّهُ ثُمَّ شِئْت‏

তোমাদের কেউ যেন শপথ করা কালে এভাবে না বলে, ’’আল্লাহ যা চান এবং তুমি যা ইচ্ছা করো’’। বরং সে যেন বলে, ’’আল্লাহ্ যা ইচ্ছা করেন, এরপর তুমি যা ইচ্ছা করছো’’। ইবনে মাজাহ : ২১১৭, সহীহাহ ১৩৬, ১৩৯, ১০৯৩।

আব্দুল্লাহ্ বিন আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন-

قَالَ رَجُلٌ لِلنَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم: مَا شَاءَ اللهُ وَشِئْتَ، فَقَالَ: أَجَعَلْتَنِيْ لِلَّهِ نِدًّا؟ بَلْ مَا شَاءَ اللهُ وَحْدهُ

জনৈক ব্যক্তি নবী (সা.) কে উদ্দেশ্য করে বললেন, আল্লাহ্ তা’আলা এবং আপনি চেয়েছেন বলে কাজটি হয়েছে। নতুবা হতো না। তখন নবী (সা.) বললেন, তুমি কি আমাকে আল্লাহ তা’আলার শরীক বানাচ্ছো? এমন কথা কখনো বলবে না। বরং বলবে, একমাত্র আল্লাহ তা’আলাই চেয়েছেন বলে কাজটি হয়েছে। নতুবা হতো না। আদাবুল মুফরাদ : ৭৮৩, মুসনাদে আহমাদ : ২১৪, ২২৪, ২৮৩, ৩৪৭ , তাবারানি :  ১৩০০৫, ১৩০০৬

হুযাইফাহ্ ইবনুল ইয়ামান (রাঃ) থেকে বর্ণিত। এক মুসলিম ব্যক্তি স্বপ্ন দেখে যে, আহলে কিতাবের এক ব্যক্তির সাথে তার সাক্ষাত হলে সে বললো, তোমরা কতই না উত্তম জাতি, যদি তোমরা শিরক না করতে। তোমরা বলে থাকো, ’’আল্লাহ যা ইচ্ছা করেন এবং মুহাম্মাদ যা ইচ্ছা করেন’’। অতঃপর সে স্বপ্নের কথাটি রাসূলুল্লাহ ﷺ এর নিকট বর্ণনা করলো। তিনি বলেন আল্লাহর শপথ! শোনো, আমি তো তোমাদের এরূপ কিছু বলতে শিখাইনি। তোমরা বলবে, ’’আল্লাহ যা ইচ্ছা করেন, এরপর রসূলুল্লাহ ﷺ যা চান’’।  ইবনু মাজাহ্ : ২১১৮

নুষের মুখে এ জাতীয় আরো অনেক বাক্য প্রচলিত রয়েছে। যেমন: ‘‘আল্লাহ্ এবং আপনি না থাকলে আমার অনেক সমস্যা হয়ে যেতো’’। ‘‘আমার জন্য শুধু আল্লাহ্ এবং আপনিই রয়েছেন’’। ‘‘আমি আল্লাহ্ এবং আপনার উপর নির্ভরশীল’’। ‘‘এটি আল্লাহ্ এবং আপনার পক্ষ হতে’’। ‘‘এটি আল্লাহ্ এবং আপনার বরকতেই হয়েছে’’। ‘‘আমার জন্য আকাশে আছেন আল্লাহ্ এবং জমিনে আছেন আপনি’’। উপরে আল্লাহ বার নিচে আপনি ইল্লা। আল্লাহর সাথে ইল্লা লাগে। এই ধরণের সকল প্রকার কথাই ছোট শিরকের অন্তর্গত।

৬। ঝাড়-ফুঁকের মাধ্যমে কুফরি কথা ব্যবহার করা

চোখ লাগা, জাদু, মানসিক ও শারীরিক অসুখ বিসুখ দূরীকরণে জন্য ঝাড় ফুঁক ফলপ্রসূ। নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে যেমন ঝাড় ফুঁক করেছেন, তেমনি তিনি ঝাড়-ফুঁক নিয়েছেন। আবার অনেক সময় রোগীর গায়ে ফুঁ দিয়েছেন এবং রোগীর গায়ে হাত দিয়ে স্পর্শসহ বা স্পর্শ ছাড়াই আয়াত বা মাসনূন দু‘আ পড়েছেন।  ঝাড় -ফুঁকের মাধ্যে শরীয়াত পরিপন্থী কোনো কিছু না থাকলে তা বৈধ।

আওফ ইবনু মালিক আশজাই (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন-

كُنَّا نَرْقِي فِي الْجَاهِلِيَّةِ فَقُلْنَا يَا رَسُولَ اللَّهِ كَيْفَ تَرَى فِي ذَلِكَ فَقَالَ ‏ “‏ اعْرِضُوا عَلَىَّ رُقَاكُمْ لاَ بَأْسَ بِالرُّقَى مَا لَمْ يَكُنْ فِيهِ شِرْكٌ ‏

আমরা জাহিলী যুগে মন্ত্র দিয়ে ঝাড়ফুঁক করতাম। এ জন্যে আমরা রসূলুল্লাহ ﷺ এর নিকট আবেদন করলাম, হে আল্লাহর রসূল! এক্ষেত্রে আপনার মতামত কি? তিনি বললেন, তোমাদের মন্ত্রগুলো আমার নিকট উপস্থাপন করো, ঝাড়ফুঁকে কোন দোষ নেই, যদি তাতে কোন শিরক (জাতীয় কথা) না থাকে। সহিহ মুসলীম : ২০০

আয়িশাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম অসুস্থ হয়ে পড়তেন তখন তিনি আশ্রয় প্রার্থনার দুই সূরা (ফালাক ও নাস) পাঠ করে নিজ দেহে ফুঁক দিতেন এবং স্বীয় হাত দ্বারা শরীর মাসাহ করতেন। এরপর যখন মৃত্যু-রোগে আক্রান্ত হলেন, তখন আমি আশ্রয় প্রার্থনার সূরা দু’টি দিয়ে তাঁর শরীরে ফুঁ দিতাম, যা দিয়ে তিনি ফুঁ দিতেন। আর আমি তাঁর হাত দ্বারা তাঁর শরীর মাসাহ করিয়ে দিতাম। সহিহ বুখারি ৪৪৩৯, ৫০১৬, ৫৭৩৫, ৫৭৫১, সহিহ মুসলিম : ২১৯২

মুহাম্মাদ ইবনু ইউসুফ ইবনু সাবিত ইবনু কায়িস ইবনু সাম্মাস (রহঃ) থেকে তার পিতা ও দাদার সূত্রে বর্ণিত। একদা রাসূলুল্লাহ ﷺ সাবিত ইবনু কায়িস (রাঃ)-এর নিকট গেলেন। আহমাদ বলেন, তিনি তখন অসুস্থ ছিলেন। তিনি বলেনঃ হে মানুষের রব! সাবিত ইবনু কায়িস ইবনু সাম্মাসের রোগ দূর করে দিন। অতঃপর তিনি বাতহান নামক উপত্যকার কিছু ধূলামাটি নিয়ে একটি পাত্র রাখলেন এবং পানিতে মিশিয়ে তার দেহে ঢেলে দিলেন। আবু দাউদ : ৩৮৮৫

আবূ সাঈদ (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী ﷺ -এর একদল সাহাবী কোন এক সফরে যাত্রা করেন। তারা এক আরব গোত্রে পৌঁছে তাদের মেহমান হতে চাইলেন। কিন্তু তারা তাদের মেহমানদারী করতে অস্বীকার করল। সে গোত্রের সরদার বিচ্ছু দ্বারা দংশিত হল। লোকেরা তার (আরোগ্যের) জন্য সব ধরনের চেষ্টা করল। কিন্তু কিছুতেই কোন উপকার হল না। তখন তাদের কেউ বলল, এ কাফেলা যারা এখানে অবতরণ করেছে তাদের কাছে তোমরা গেলে ভাল হত। সম্ভবত, তাদের কারো কাছে কিছু থাকতে পারে। ওরা তাদের নিকট গেল এবং বলল, হে যাত্রীদল! আমাদের সরদারকে বিচ্ছু দংশন করেছে, আমরা সব রকমের চেষ্টা করেছি, কিন্তু কিছুতেই উপকার হচ্ছে না। তোমাদের কারো কাছে কিছু আছে কি? তাদের (সাহাবীদের) একজন বললেন, হ্যাঁ, আল্লাহর কসম আমি ঝাড়-ফুঁক করতে পারি। আমরা তোমাদের মেহমানদারী কামনা করেছিলাম, কিন্তু তোমরা আমাদের জন্য মেহমানদারী করনি। কাজেই আমি তোমাদের ঝাড়-ফুঁক করব না, যে পর্যন্ত না তোমরা আমাদের জন্য পারিশ্রমিক নির্ধারণ কর। তখন তারা এক পাল বকরীর শর্তে তাদের সাথে চুক্তিবদ্ধ হল। তারপর তিনি গিয়ে (الْحَمْدُ للهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ) ‘‘আলহামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামীন’’ (সূরা ফাতিহা) পড়ে তার উপর ফুঁ দিতে লাগলেন। ফলে সে (এমনভাবে নিরাময় হল) যেন বন্ধন হতে মুক্ত হল এবং সে এমনভাবে চলতে ফিরতে লাগল যেন তার কোন কষ্টই ছিল না। (বর্ণনাকারী বলেন,) তারপর তারা তাদের স্বীকৃত পারিশ্রমিক পুরোপুরি দিয়ে দিল। সাহাবীদের কেউ কেউ বলেন, এগুলো বণ্টন কর। কিন্তু যিনি ঝাড়-ফুঁক করেছিলেন তিনি বললেন এটা করব না, যে পর্যন্ত না আমরা নবী ﷺ -এর নিকট গিয়ে তাঁকে এই ঘটনা জানাই এবং লক্ষ্য করি তিনি আমাদের কী নির্দেশ দেন। তারা আল্লাহর রাসূল ﷺ -এর কাছে এসে ঘটনা বর্ণনা করলেন। তিনি [নবী ﷺ ] বলেন, তুমি কিভাবে জানলে যে, সূরা ফাতিহা একটি দু‘আ? তারপর বলেন, তোমরা ঠিকই করেছ। বণ্টন কর এবং তোমাদের সাথে আমার জন্যও একটা অংশ রাখ। এ বলে নবী ﷺ হাসলেন। শো’বা (রহ.) বলেন, আমার নিকট আবূ বিশর (রহ.) বর্ণনা করেছেন যে, আমি মুতাওয়াক্কিল (রহ.) হতে এ হাদীস শুনেছি। সহিহ বুখারি : ২২৭৬, ৫০০৭, ৫৭৩৬, ৫৭৪৯, সহিহ মুসলিম : ২২০১,

সহিহ হাদিসের আলোকে জানা যায়, ঝাড়-ফুঁকের জন্য পবিত্র কুরআনের আয়াতুল কুরসী, সূরা ফালাক্ব, সূরা নাস, সূরা এখলাছ, সূরা কাফেরূন, সূরা বাক্বারা ও বাক্বারার শেষ দুই আয়াত পড়া ফলপ্রসূ। ঝাড়-ফুঁক শরীয়াত সম্মত হলেও অনেক সময় প্রয়োগকারী ও ব্যবহার কারির প্রয়োগ ও ব্যবহারের জন্য শিরক হয়। যদি কেউ ঝাড়-ফুঁক করার সময়  শির্কী ও কুফরী শব্দ ব্যবহারের করে, এমন শব্দের মাধ্যমে ঝাড়-ফুঁক করে যার অর্থ বোধগম্য নয় বা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নামে মাধ্যমে ঝাড়-ফুঁক করা ছোট শিরকের অন্তরভূক্ত হবে। কিন্তু ঝাড়-ফুঁক নিজস্ব কোনো প্রভাব এবং ক্ষমতা আছে এ কথা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করলে শিরকে আকবর হবে। নিজের জন্য নিজের ঝাড়-ফুঁক সবচেয়ে বেশী উপকারী। অথচ মানুষ ঝাড়-ফুঁক জন্য অন্যের দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়ায়। এই সুযোগে অনেক খপ্পরে পড়ে ঈমান, আমল নষ্ট করছে। সেই সাথে মিথ্যা লাভের আসায় নিজেস্ব অর্থের অপচয় করে। জ্যোতিষ, গনক ও জাদুকরগন সাধারনত কুফরি বাক্য দ্বরা ঝাড়-ফুঁক করে থাকে যা মুলত শিরক। এদের পরিত্যাগ করা জরুরী।

৭। নিজেদের কার্যকলাপে আনন্দিত হওয়া এবং নিজের প্রশংসা শুনতে চাওয়া

নিজেদের প্রশংসা শুনতে সবার ভাল লাগে। সবাই মনে করবে লোকটি বড়ই মুত্তাকী, পরহেজগার, দ্বীনদার, সাধু, দীনের খাদেম, শরীয়াতের সাহায্যকারী, সংস্কারক, উত্তম চরিত্রের অধিকারি। নিজেদের নামের শেষে নিজে অথবা চামচা দিয়ে বিভিন্ন প্রশংসা সুচক শব্দ বা বাক্য ব্যাবহার করে মনে হয় পৃথিবীতে শুধু খেদমত বা ইবাদতের জন্যই প্রেরিত হয়েছেন। এমনও প্রশংসা পেতে চায় যা সে করেনি। মহান আল্লাহ বলেন, 

 لَا تَحۡسَبَنَّ ٱلَّذِينَ يَفۡرَحُونَ بِمَآ أَتَواْ وَّيُحِبُّونَ أَن يُحۡمَدُواْ بِمَا لَمۡ يَفۡعَلُواْ فَلَا تَحۡسَبَنَّہُم بِمَفَازَةٍ۬ مِّنَ ٱلۡعَذَابِ‌ۖ وَلَهُمۡ عَذَابٌ أَلِيمٌ۬

যারা নিজেদের কার্যকলাপে আনন্দিত এবং যে কাজ যথার্থই তারা নিজেরা করেনি সে জন্য প্রশংশা পেতে চায়, তাদেরকে তোমরা আযাব থেকে সংরক্ষিত মনে করো না। আসলে তাদের জন্য যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি তৈরী রয়েছে৷ সুরা আল ইমরান : ১৮৮

৮। আল্লাহকে ঈম্বর, তার বাণীকে ঐশীবাণী, তার গ্রন্থেকে ঐশীগ্রন্থ, তার জ্ঞানকে ঐশীজ্ঞান বলা

হিন্দুরা আল্লাহকে ঈশ্বর সম্বোধন করে। ঈশ্বর শব্দটি পুরুষবাচক। এর স্ত্রীবাচক শব্দ হচ্ছে, ঈশ্বরী। এভাবে ভগবানের স্ত্রীবাচক ভগবতী ও দেবতার স্ত্রীবাচক দেবী। ঐশীবাণী অর্থ- ঈশ্বরের বাণী, ঐশীজ্ঞান অর্থ- ঈশ্বর প্রদত্ত জ্ঞান আর ঐশ্বরিক অর্থ- ঈশ্বর সম্বন্ধীয়। কুরআনের বাণী বোঝাতে আমরা ঐশীবাণী শব্দটা ব্যবহার করি। এভাবে কুরআনে জ্ঞান বোঝাতে ঐশীজ্ঞান লিখি। হিন্দুশাস্ত্র মতে ঈশ্বর থেকে আগত বাণীকে ঐশী বাণী বল হয়ে থাকে। তাই ঐশীবাণী, ঐশীজ্ঞান ও ঐশ্বরিক- এই শব্দগুলো লিখলে বা বললে শিরিক হতে পারে। কেননা ‘আল্লাহ’ শব্দটি ক্লীবলিঙ্গ। এর কোন পুরুষ বা স্ত্রীবাচক শব্দ নাই। আল্লাহ বলেন-

لَمۡ یَلِدۡ ۬ۙ  وَلَمۡ یُوۡلَدۡ ۙ

তাঁর কোন সন্তান নেই এবং তিনিও কারও সন্তান নন। সুরা ইখলাস : ৩

সুতারং আল্লাহ এবং ঈশ্বর এক নয়। তাহলে কী করে আল্লাহর বাণী বা ওহী তথা কুরআন ঈশ্বরের বাণী হতে পারে? আর আল্লাহ প্রদত্ত শক্তি কী করে ঐশী শক্তি হতে পারে? অনেকে অন্য ধর্মের প্রতি বেশী উদারতা দেখাতে গিয়ে এরূপ শব্দ ব্যবহার করে থাকেন। অথচ মহান আল্লাহর সুন্দর সুন্দর নাম রয়েছে। এই ধরনের নামে (ঈম্বর) তাকে না ডেকে, তার দেওয়া সুন্দর সুন্দর নামে ডাকতে বলা হয়েছে। আল্লাহ ইরশাদ করেন-

وَلِلّٰہِ الۡاَسۡمَآءُ الۡحُسۡنٰی فَادۡعُوۡہُ بِہَا ۪ وَذَرُوا الَّذِیۡنَ یُلۡحِدُوۡنَ فِیۡۤ اَسۡمَآئِہٖ ؕ سَیُجۡزَوۡنَ مَا کَانُوۡا یَعۡمَلُوۡنَ

আর আল্লাহর জন্যই রয়েছে সুন্দরতম নামসমূহ। সুতরাং তোমরা তাঁকে সেসব নামেই ডাক। আর তাদেরকে বর্জন কর যারা তাঁর নামে বিকৃতি ঘটায়। তারা যা করত অচিরেই তাদেরকে তার প্রতিফল দেয়া হবে। সুরা আরাফ : ১৮০

এই আয়াত বলা হয়েছে যার তার নামের বিকৃতি ঘটাবে তাদের অচিরেই প্রতিফল দিবেন। অর্থাত কঠিন শাস্তির মুখোমুখি হবে হবে। তাই কোন প্রকার শিরকি নাম আল্লাহ নামের বিপরীতে ব্যবহার করা কত বড় মারাত্বক অন্যায়। হয়তো অনেক মুসলিম না জেনে ভাষার প্রতি উদারতা দেখাতে গিয়ে না বুঝে এমনটি করে থাকতে পাবে। কিন্তু মনে রাখতে হবে বিধর্মীদের ইসলামে বিরোধী কর্মকান্ডে কোন উদারত নয় বরং বিধর্মীদের ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের বিপরীত আমল করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَلَن تَرْضَىٰ عَنكَ ٱلْيَهُودُ وَلَا ٱلنَّصَٰرَىٰ حَتَّىٰ تَتَّبِعَ مِلَّتَهُمْۗ

আর ইয়াহূদী ও নাসারারা কখনো তোমার প্রতি সন্তুষ্ট হবে না, যতক্ষণ না তুমি তাদের মিল্লাতের অনুসরণ কর। সুরা বাকারা : ১২০

ইবনু উমার (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

مَنْ تَشَبَّهَ بِقَوْمٍ فَهُوَ مِنْهُمْ

যে ব্যক্তি বিজাতির সাদৃশ্য অবলম্বন করে, সে তাদের দলভুক্ত গণ্য হবে। সুনানে আবু দাউদ : ৪০৩১

আমর ইবনু শু‘আইব রহ. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

لَيْسَ مِنَّا مَنْ تَشَبَّهَ بِغَيْرِنَا لاَ تَشَبَّهُوا بِالْيَهُودِ وَلاَ بِالنَّصَارَى فَإِنَّ تَسْلِيمَ الْيَهُودِ الإِشَارَةُ بِالأَصَابِعِ وَتَسْلِيمَ النَّصَارَى الإِشَارَةُ بِالأَكُفِّ ‏

বিজাতির অনুকরণকারী ব্যক্তি আমাদের দলভুক্ত নয়। তোমরা ইয়াহূদী-নাসারাদের অনুকরণ করো না। কেননা ইয়াহূদীগণ আঙ্গুলের ইশারায় এবং নাসারাগণ হাতের ইশারায় সালাম দেয়। সুনানে তিরমিজ : ২৬৯৫

৯। একথা বলা যে, ‘মানুষের ভুল আছে শয়তানের ভুল নেই

মহান আল্লাহই একমাত্র ভুলের উর্ধ্বে। এ ছাড়া তিনি যাকে যখন ভুলের উর্ধ্বে রাকবেন তিনিও ভুলের উর্ধ্বে। মহান আল্লাহ যাকে প্রতারণ বলেছেন সে কি করে ভুরের উর্ধ্বে হয়। শয়তানের জন্মই তার কৃত ভুল থেকে। শয়তান কোন শুদ্ধ কর্ম করতে পারে না। ভুল তার আজীবন ধর্ম। মানুষের ভুল কখনো কখনো হয়। কিন্তু শয়তানের ভুল সদা সর্বদা। শয়তায় প্রথম যে ভুল করেছে তা হলো মহান আল্লাহর নির্দশ অমান্য করে। ভুল না করে সে যদি আল্লাহর নির্দশ মান্য করত হবে সফলকাম হত। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَاِذۡ قُلۡنَا لِلۡمَلٰٓئِکَۃِ اسۡجُدُوۡا لِاٰدَمَ فَسَجَدُوۡۤا اِلَّاۤ اِبۡلِیۡسَ ؕ اَبٰی وَاسۡتَکۡبَرَ ٭۫ وَکَانَ مِنَ الۡکٰفِرِیۡنَ

আর যখন আমি ফেরেশতাদেরকে বললাম, ‘তোমরা আদমকে সিজদা কর’। তখন তারা সিজদা করল, ইবলীস ছাড়া। সে অস্বীকার করল এবং অহঙ্কার করল। আর সে হল কাফিরদের অন্তর্ভুক্ত। সুরা বাকারা : ৩৪

শয়তানতো ভুলের মাঝেই আছে। ভুল থেকেই তার জন্ম। শয়তানের কর্মকান্ড দেখলেই বুঝবেন সে কি করে ভুলের উর্ধ্বে হয়। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡۤا اِنَّمَا الۡخَمۡرُ وَالۡمَیۡسِرُ وَالۡاَنۡصَابُ وَالۡاَزۡلَامُ رِجۡسٌ مِّنۡ عَمَلِ الشَّیۡطٰنِ فَاجۡتَنِبُوۡہُ لَعَلَّکُمۡ تُفۡلِحُوۡنَ

হে মুমিনগণ, নিশ্চয় মদ, জুয়া, প্রতিমা-বেদী ও ভাগ্যনির্ধারক তীরসমূহ তো নাপাক শয়তানের কর্ম। সুতরাং তোমরা তা পরিহার কর, যাতে তোমরা সফলকাম হও। সুরা মায়েদা : ৯০

আল্লাহ প্রদত্ত সরল পথে ছেড়ে যে পাপাচারের পথ বেছে নেয় তার থেকে আর কেউ বিভ্রান্ত পথের পথিক হতে পারেনা। শয়তায় মদ, জুয়া, প্রতিমা-বেদী ও ভাগ্যনির্ধারক তীরসমূহ তার কর্ম হিসাবে নিয়ে বড় ভুল পথে রয়েছে। তাহলে একজন মুসলমান কি করে এ কথা বলতে পারে যে, শয়তানের ভুল নাই। এ ধরনের উক্তি মূলত ইসলাম সম্পর্কে একেবারেই অজ্ঞতার প্রমাণ বহন করে। তাই এ ধরনের কথা একেবারেই অবান্তর ও বিভ্রান্তিকর।

১০। প্রলয়ংকারি ঝড়ের প্রচণ্ডতাকে তাণ্ডবলীলা বলা

লীলা অর্থ ক্রীড়া, প্রমোদ, যৌন কেলী। যা দেবতার কার্যকলাপের সঙ্গে সম্পৃক্ত। যেমন কৃষ্ণের লীলা। আবার লীলা শব্দের পূর্বে তাণ্ডব যোগ করে হয় তাণ্ডবলীলা। তাণ্ডব অর্থ নৃত্য। তাহলে তাণ্ডবলীলা অর্থ দাঁড়ায় দেবতার প্রমোদ নৃত্য। প্রচণ্ড বেগে প্রবাহিত বঝড়ের ধ্বংস বা ক্ষয়ক্ষতিকে আমরা কিভাবে দেবতার প্রমোদ নৃত্য বলে স্বীকৃতি দিতে পারি? প্রাণ বিনাশী এ অবস্থাকে আমরা তাণ্ডব বলতে পারি না। ঝড়, জলোচ্ছ্বাস, ভূমিকম্প, ভূমিধস, পাথর বর্ষণ ইত্যাদি তো আল্লাহর পক্ষ হতে গযব আকারে আসে। মহান আল্লাহ বলেন-

اِنَّاۤ اَرۡسَلۡنَا عَلَیۡہِمۡ حَاصِبًا اِلَّاۤ اٰلَ لُوۡطٍ ؕ  نَجَّیۡنٰہُمۡ بِسَحَرٍ ۙ

নিশ্চয় আমি তাদের উপর কংকর-ঝড় পাঠিয়েছিলাম, তবে লূত পরিবারের উপর নয়। আমি তাদেরকে শেষ রাতে নাজাত দিয়েছিলাম। সুরা কামার : ৩৪

মহান আল্লাহ বলেন-

فَکُلًّا اَخَذۡنَا بِذَنۡۢبِہٖ ۚ فَمِنۡہُمۡ مَّنۡ اَرۡسَلۡنَا عَلَیۡہِ حَاصِبًا ۚ وَمِنۡہُمۡ مَّنۡ اَخَذَتۡہُ الصَّیۡحَۃُ ۚ وَمِنۡہُمۡ مَّنۡ خَسَفۡنَا بِہِ الۡاَرۡضَ ۚ وَمِنۡہُمۡ مَّنۡ اَغۡرَقۡنَا ۚ وَمَا کَانَ اللّٰہُ لِیَظۡلِمَہُمۡ وَلٰکِنۡ کَانُوۡۤا اَنۡفُسَہُمۡ یَظۡلِمُوۡنَ

তাদের প্রত্যেককেই তাদের অপরাধের জন্য শাস্তি দিয়েছিলাম; তাদের কারও প্রতি প্রেরণ করেছি প্রস্তরসহ প্রচন্ড ঝটিকা, তাদের কেহকে আঘাত করেছিল মহানাদ, কেহকে আমি প্রোথিত করেছিলাম ভূ-গর্ভে এবং কেহকে করেছিলাম নিমজ্জিত। আল্লাহ তাদের প্রতি কোন যুল্‌ম করেননি; তারা নিজেরাই নিজেদের প্রতি যুল্‌ম করেছিল। সুরা আনকাবুত : ৪০

কুরআনে বহু স্থানে বলা হয়েছে, ঝড়, জলোচ্ছ্বাস, ভূমিকম্প, ভূমিধস, পাথর বর্ষণ ইত্যাদি আল্লাহর পক্ষ হতে গযব। এই গযবকে তাণ্ডবলীলা বা দেবতার প্রমোদ নৃত্য বলে কিভাবে উপহাস করা হয়। ইহা মহান আল্লাহকে মর্যাদাকে ছোট করা হয়। যা শিরক থেকেও জঘন্য অপরাধ। তাছাড়া হাদিসে এসেছে আল্লাহ যাকার কল্যাণ চান তাকে তাড়াতাড়ি দুনিয়াতে তাকে বিপদে নিক্ষেপ করেন।

আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

إِنَّ عِظَمَ الْجَزَاءِ مَعَ عِظَمِ الْبَلاَءِ وَإِنَّ اللَّهَ إِذَا أَحَبَّ قَوْمًا ابْتَلاَهُمْ فَمَنْ رَضِيَ فَلَهُ الرِّضَا وَمَنْ سَخِطَ فَلَهُ السَّخَطُ ‏”‏ ‏.‏ قَالَ أَبُو عِيسَى هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ غَرِيبٌ مِنْ هَذَا الْوَجْهِ

আল্লাহ তা’আলা যখন তার কোন বান্দার কল্যাণ সাধন করতে চান তখন তাড়াতাড়ি দুনিয়াতে তাকে বিপদে নিক্ষেপ করেন। আর যখন তিনি তার কোন বান্দার অকল্যাণ সাধন করতে চান তখন তাকে তার অপরাধের শাস্তি প্রদান হতে বিরত থাকেন। তারপর কিয়ামতের দিন তিনি তাকে পুরাপুরি শাস্তি দেন। সুনানে তিরমিজি : ২৩৯৬, মিশকাত : ১৫৬৫, সহিহাহ : ১২২০

১১। মুমূর্য ব্যক্তিকে সম্পর্কে বলা হয়, সে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে

মৃত্যুর সংবাদ পরিবেশন করার সময় বলে থাকি অমুকে কিছু দিন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়তে লড়তে আজকে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন। এমন কথা বলা একেবারেই ঠিক নয়। কেননা, জন্ম ও মৃত্যু আল্লাহর হাতে। মৃত্যুকে মোকাবিলা করা যায় না, মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা বা কুস্তি কোনটাই চলে না। রোগ আল্লাহ দেন, চিকিৎসা জ্ঞানও তারই দান। তিনি ইচ্ছা করলে নিরাময় করবেন, ইচ্ছা করলে আমৃত্যু ভোগাবেন। তিনি যাকে চান মৃত্যু দে যাকে চায় হায়াত দেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

تُوۡلِجُ الَّیۡلَ فِی النَّہَارِ وَتُوۡلِجُ النَّہَارَ فِی الَّیۡلِ ۫ وَتُخۡرِجُ الۡحَیَّ مِنَ الۡمَیِّتِ وَتُخۡرِجُ الۡمَیِّتَ مِنَ الۡحَیِّ ۫ وَتَرۡزُقُ مَنۡ تَشَآءُ بِغَیۡرِ حِسَابٍ

‘আপনি রাতকে দিনের মধ্যে প্রবেশ করান এবং দিনকে রাতের মধ্যে প্রবেশ করান। আর মৃত থেকে জীবিতকে বের করেন এবং জীবিত থেকে মৃতকে বের করেন। আর যাকে চান বিনা হিসাবে রিয্ক দান করেন’। সুরা আর ইমরান : ২৭

আল্লাহ কোন ক্ষতি করতে চাইলে কেউই আর উপকার করতে পারবে না। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

ؕ قُلۡ فَمَنۡ یَّمۡلِکُ لَکُمۡ مِّنَ اللّٰہِ شَیۡئًا اِنۡ اَرَادَ بِکُمۡ ضَرًّا اَوۡ اَرَادَ بِکُمۡ نَفۡعًا ؕ بَلۡ کَانَ اللّٰہُ بِمَا تَعۡمَلُوۡنَ خَبِیۡرًا

বল, ‘আল্লাহ যদি তোমাদের কোন ক্ষতি করতে চান কিংবা কোন উপকার করতে চান, তবে কে আল্লাহর মোকাবিলায় তোমাদের জন্য কোন কিছুর মালিক হবে’? বরং তোমরা যে আমল কর আল্লাহ সে বিষয়ে সম্যক অবহিত। সুরা ফাতাহ : ১১

কাজেই মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ার কথা বলে প্রকারান্তরে আমরা আল্লাহর শক্তির মুকাবিলায় মানুষকে দাঁড় করাচ্ছি। কেউ কেউ হয়তো বলবেন, ‘মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা’ এ কথা দ্বারা কঠিনভারে দীর্য দিন রোগাক্রান্ত হওয়া বুঝাতে বলা হয়ে থাক। আপনি যে ভাবেই বলেন না কেন, আল্লাহ সাথে শিরক হয় এমন কথা কোনভাবেই বলা যাবে না। আমার আপনার অন্তরের খবর আল্লাহ রাখেন, সি বিচার হবে আখেরাতে কিন্তু যে কথা দ্বার শিরক প্রকাশ পায় তা বুঝতে আখেরাত পর্যন্ত অপেক্ষার দরকার নাই।

১২। লক্ষ্মী মা, লক্ষ্মী ছেলে ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করা

অনেক মুসলিম পরিবারে লক্ষ্মী মা, লক্ষ্মী ছেলে, লক্ষ্মী সোনা, লক্ষ্মী মেয়ে এমন সম্বোধন শোনা যায়। মুসলমানদের লেখনীতেও অনেক সময় এরুপ লক্ষণীয়। এমন বলার সরাসরি ইসরাম বিরোধী। লক্ষ্মী হিন্দুদের দেবীর নাম। হিন্দুরা এমন সম্বোধন করতে পারে। কিন্তু মুসলমানদের এরূপ সম্বোধন করা মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়। এতে করে তাদের ধর্মের সাথে সম্পৃক্ততা বুঝায় ও হিন্দু সংস্কৃতির প্রতি আত্মসমর্পন করা হয়। হিন্দুধর্ম মতে, লক্ষ্মী হলেন বিষ্ণুপত্নী। তিনি ধন সম্পদ ও সৌভাগ্যের অধিষ্ঠাত্রী দেবী। তার সুনজরে যারা আছেন তারা সৎ, শান্ত, সুবোধ ও ধনবান। আর যাদের উপর লক্ষ্মীর সুনজর নেই অথবা লক্ষ্মী যাদের ছেড়ে চলে গেছেন তারা হন হতভাগা, দুষ্ট, দরিদ্র এবং অশান্ত। এ হচ্ছে হিন্দু শাস্ত্রীয় বিশ্বাস; এবার বলুন এদের শাস্ত্রীয় বিশ্বাসে বিশ্বাসী হয়ে আমরা অর্থাৎ মুসলমানরা কি লক্ষ্মীকে দেবতা মেনে তার নাম সব সময় জপ করতে পারি? লক্ষ্মী নাম কি আমরা উপমায় আনতে পারি? যদি আনি তাহলে আমাদের ঈমান থাকছে কোথায়?

হিন্দুরা লক্ষ্মীর পূজা করেন। মুসলমানরা লক্ষ্মী পূজা করেন না। একজন মুসলমানের স্ত্রী অবশ্যই মুসলমান, মুসলমান স্বামী-স্ত্রীর সন্তানও মুসলমান। তাই যদি হয় তাহলে তাদের ছেলে-মেয়ে কেমন করে লক্ষ্মী ছেলে আর লক্ষ্মী মেয়ে হয়? মুসলমানের ছেলেমেয়েরা কেমন করে মা- বাবাকে লক্ষ্মী মা, লক্ষ্মী বাবা বলতে পারে? পরিবারের পারস্পরিক সম্বোধনের ভাষা যদি এই হয়, তাহলে তাদের ছেলে-মেয়ে কেমন করে হবে রাসূল এর আদর্শের অনুসারী? যেখানে লক্ষ্মী সেখানে হিন্দুধর্ম, সেই সংস্কৃতি, সেই কৃষ্টি, সেই ধর্মেই আমেজ ও মেজাজ থাকবেই। যেখানে লক্ষ্মী থাকে সেথায় আল্লাহর রহমত তো বর্ষণ হতে পারে না।

লক্ষ্মীর জায়গায় লক্ষ্মী আছেন এবং থাকবেনও তাদের জন্য যাদের কাছে তিনি পূজিত। আমরা কেন তাকে নিয়ে টানাটানি করি? তিনি তো আমাদের নন। আমাদের ছেলে-মেয়েদের জীবন ও চরিত্র আর তকদীরকে সুন্দর, বরকতময়, পবিত্র ও রহমতের বারিধারায় সিক্ত করার মতো সর্ব শক্তিমান আল্লাহ যখন আছেন, তখন কেন বিষ্ণুর শ্রী লক্ষ্মীর শরণাপন্ন হই? লক্ষ্মী তো নিজেই স্বাধীন নন, তিনি অন্যের স্ত্রী, তিনি কতটুকু আমাদের দিতে পারেন?

তাই এ জাতীয় সম্বোধন, লেখনীতে এ জাতীয় উপমার ব্যবহার মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। অজানাবশত যারা এরূপ ব্যবহার করেছেন, মহান আল্লাহ তাদের ক্ষমা করবেন ইনআল্লাহ। কিন্তু এ বিষয়ে বিস্তারিত জানার পরও যারা হিন্দু সংস্কৃতির অন্ধপ্রীতি বা নিজেকে আরো সংস্কৃতবাণ হবার জন্য এরূপ শব্দের ব্যবহার করে থাকেন, তারা প্রকৃত পক্ষে কপাল পোড়া। ঈমান নামক মহা মূল্যবান সম্পদ তাদের নসিবে থাকতে পারে না। প্রচলিত ভুল-ভ্রান্তি সংশোধন, পৃ-৩৪১, ড. খ শ আব্দুর রাজ্জাক

১৩। কাউকে প্রশংসায় গর্ববোধে ‘সূর্য সন্তান’, ‘শতাব্দির সূর্য সন্তান’ বলা

মরা সাধারণত জানি যে, সূর্য একটি গ্রহ। কিন্তু হিন্দুশাস্ত্র অনুযায়ী সূর্যও একটি দেবতা। এ দেবতার তিন পুত্র সন্তান; শনি, যম ও  কর্ণ। সূর্যের তিন মেয়ে, যমুনা, তপতী ও বিদ্যুৎ। মুসলমানদের মধ্যে যারা গর্ব করে সূর্য সন্তান বলে দাবি করেন বা যারা অন্যদের সূর্য সন্তান বলে পরিচয় দেন, তাদের দাবি বা পরিচয়ে সূর্য দেবতাকে নিশ্চয় স্মরণ করেন। অযোধ্যায় পৌরাণিক রাজ বংশের সদস্যরা নিজেদেরকে সূর্য বংশীয় বলে দাবি করতেন। আমাদের ‘সূর্য সন্তান’রা কি সেই বংশের সন্তান? মুসলমানরা কি জেনে শুনে নিজেদেরকে সূর্য দেবতার সন্তান বা সূর্যকন্যা পরিচয় দিতে পারেন? ‘অগ্নিপুরুষ’ আর ‘অগ্নি কন্যাও’ অনুরূপ একটি ভুয়া ও অপসংস্কৃতিমূলক দাবি।

সূর্য আল্লাহর সৃষ্টি একটি গ্রহ মাত্র। সৃষ্টির কল্যাণে এর সৃষ্টি। এর বংশ বিস্তারের নিজস্ব কোন ক্ষমতা নেই। সূর্যের স্ত্রী-পুত্র পরিবার কিছুই নেই। সূর্যকে দেবতা জ্ঞান করা অর্থহীন অযৌক্তিক। কোন মুসলিম সন্তান নিজেকে কখনো সূর্যের সন্তান বলে দাবি করতে পারে না। এটি কবীরাহ গুনাহ।

বর্তমান হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মত আরবের জাহেলী যুগের মানুষেরা সূর্যকে দেবতা মানত। তার উপাসনা করত। ইসলাম এসে এসব কর্মকাণ্ড শিরক হিসেবে ঘোষণা করে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছেন। আর বর্তমান সভ্যতার চরম উৎকর্ষের যুগে বসবাস করে আমরা সেই অসভ্য জাহেলী যুগের কর্মকাণ্ডকে লালন করতে গর্ববোধ করছি? ভুল-ভ্রান্তি সংশোধন, পৃ-৩৪২, ড. খ শ আব্দুর রাজ্জাক

১৪। আল্লাহর কুদরতি হাত, কুদরতি পা, কুদরতি মুখ কুদরতি চোখ ইত্যাদি বলা

কুরআনের বহু আয়াতে মহান আল্লাহ হাত, পা, চোখ, মুখ ইত্যাদির কথা ষ্পষ্টভাবে বলা হয়েছে। কোথাও আল্লাহর কুদরতি হাত, কুদরতি পা, কুদরতি মুখ কুদরতি চোখ ইত্যাদি বলা হয় নাই। সহিহ হাদিসেও মহান আল্লাহ হাত, পা, চোখ, মুখ ইত্যাদির কথা বলা হয়েছে। কোথাও আল্লাহর কুদরতি হাত, কুদরতি পা, কুদরতি মুখ কুদরতি চোখ ইত্যাদি বলে উল্লেখ করা নাই।

নিচের আয়াতগুলি লক্ষ করুন, মহান আল্লাহ নিজে তার হাত, পা, মুখের কথা উল্লেখ করছেন। তিনি সরাসরি বলেছেন, কোথাও কুদরত শব্দ ব্যবহার করেন নাই।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

قَالَ یٰۤاِبۡلِیۡسُ مَا مَنَعَکَ اَنۡ تَسۡجُدَ لِمَا خَلَقۡتُ بِیَدَیَّ ؕ اَسۡتَکۡبَرۡتَ اَمۡ کُنۡتَ مِنَ الۡعَالِیۡنَ

তিনি বললেন, হে ইবলীস, আমার দু’হাতে আমি যাকে সৃষ্টি করেছি তার প্রতি সিজদাবনত হতে কিসে তোমাকে বাধা দিল? তুমি কি অহঙ্কার করলে, না তুমি অধিকতর উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন?

সুরা সোয়াদ : ৭৫

আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেন-

وُجُوهٌ۬ يَوۡمَٮِٕذٍ۬ نَّاضِرَةٌ إِلَىٰ رَبِّہَا نَاظِرَةٌ۬ 

সেদিন কোন কোন মুখমন্ডল উজ্জ্বল হবে। তারা তাদের রবের দিকে তাকিয়ে থাকবে।

সুরা কিয়ামা : ২২-২৩

আল্লাহ্‌ রব্বুল আলামিন বলেন-

 يَوۡمَ يُكۡشَفُ عَن سَاقٍ۬ وَيُدۡعَوۡنَ إِلَى ٱلسُّجُودِ فَلَا يَسۡتَطِيعُونَ 

সে দিন (আল্লাহর) পায়ের গোছা উন্মোচন করা হবে। আর তাদেরকে সিজদা করার জন্য আহবান জানানো হবে, কিন্তু তারা সক্ষম হবে না। সুরা কালাম : ৪২

কুরআন ও সহিহ হাদিসের বর্ণনাতে দেখা যায় আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এর চেহারা, হাত, পা, চক্ষু, যাত বা সত্তা, সুরাত আছে। এই ধারনা থেকে অনেক মনে করেন আল্লাহর আকার আছে। মানুষ তার কল্পনা শক্তি দ্বারা জাগতিক বিশ্বের বাহিরে কোন আকার কল্পনা করতে পারে না। তাই তারা আল্লাহকে যে কোন সৃষ্টির আকারে সাব্যস্থ করে কল্পনা করে যা মূলত কুফরি। কেননা মহান আল্লাহর ঘোষণা, মহা বিশ্বের কোন কিছুই আমার সদৃশ নয়। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

فَاطِرُ السَّمٰوٰتِ وَالۡاَرۡضِ ؕ جَعَلَ لَکُمۡ مِّنۡ اَنۡفُسِکُمۡ اَزۡوَاجًا وَّمِنَ الۡاَنۡعَامِ اَزۡوَاجًا ۚ یَذۡرَؤُکُمۡ فِیۡہِ ؕ لَیۡسَ کَمِثۡلِہٖ شَیۡءٌ ۚ وَہُوَ السَّمِیۡعُ الۡبَصِیۡرُ

তিনি আসমানসমূহ ও যমীনের স্রষ্টা। তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকে জোড়া বানিয়েছেন এবং চতুষ্পদ জন্তু থেকেও জোড়া বানিয়েছেন, তিনি তোমাদেরকে ছড়িয়ে দিয়েছেন। কোন কিছুই তাঁর সদৃশ নয়, তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা। সুরা শুয়ারা : ১১

এই আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করেছেন, সৃষ্টি জগতের কোন সৃষ্টির সদৃশ তিনি নন। কাজেই আল্লাহ তায়ালার আকার আছে বললে যে আকৃতিতে কল্পনা করবেন তাই ভুল। যেহেতু, কুরআন ও সহিহ হাদিসে আল্লাহ তাঁর নিজস্ব সত্তার হাত, পা, মুখ, দৃষ্টিশক্তি, শ্রবণ শক্তি, তাঁর সন্তুষ্টি ও ক্রোধ-ইত্যাদি উল্লেখ করা হয়েছে। মুমিনগণ কিয়ামাতের দিন তাকে দেখতে পাবে। কাজেই তার সত্তার সাথে কুদরত লাগিয়ে বর্ণনা করা সঠিক নয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *