মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন
সৃষ্টির শুরুতে সব মানুষ তাওহীদপন্থী ছিল। কালক্রমে মানুষ শয়তানের প্রতারণা ও কুপ্রবৃত্তির কারণে আল্লাহকে ভুলে গিয়ে আস্তে আস্তে স্রষ্টার সমকক্ষ বহু স্রষ্টা কল্পনা করে সৃষ্ট করে নিয়েছে। কুরআন ও হাদিসের আলোকে বুঝা যায়, প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে শিরক শুরু হয় নুহ (আ.) এর মৃত্যুর পর তার অনুসারি কিছু সত লোকের মুর্তি বানিয়ে পুজা করার মাধ্যমে। সেই যে আনুষ্ঠানিক শিরক করা শুরু তা আজও চলছ। যুগে যুগে অসংখ্যা নবি রাসূর তাওহীদের দাওয়াত প্রদান করলেও শিরক উতখাত হয় নাই। ইসলামের আবির্ভাবের ফলে তাওহীদপন্থী লোকদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে সত্য কিন্তু পৃথিবীতে থেকে শিরকি সমুলে উতখাত হয় নি। বর্তমানে ইয়াহুদি, নাসারা ও মুশরিকদের মত বহু মুসলিম নামধারী আকন্ঠ শিবকে নিমজ্জিত। শিরকের এই ক্রম ধারা সম্পর্কে নিচে কিছুটা আলোক পাত করা হলো-
১. আদম (আ.) এর পরবর্তি সময়ের অবস্থাঃ
আদম (আ.) এর জীবদ্দশায় তার বংশধরদের ধর্মবিশ্বাসে কোনো প্রকার শিরক বা কুফরের সংমিশ্রণ ছিলো না। তারা সবাই একত্ববাদের (তাওহিদ) অনুসারী ছিলেন। শিরকি কাজ তারা কখন করেন নি। তারা পরিপূর্ণ ভাবে ইসলামের অনুসারী ছিল। তাই আদম (আ.) এর শরিয়তের অধিকাংশ আদেশ নিষেধ ছিলো বৈষয়িক বিষয়ে। কারণ পৃথিবীকে নতুন করে আবাদ করতে এবং এটিকে বাসযোগ্য করতে গার্হস্থ্য বিষয়ের প্রয়োজনই ছিলো বেশি। এ কারণে আদম (আ.) এর বংশধরদের মাঝে ধর্ম নিয়ে তেমন কোনো সমস্যার সৃষ্টি হয়নি। এ বিষয়ে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-
كَانَ ٱلنَّاسُ أُمَّةً۬ وَٲحِدَةً۬ فَبَعَثَ ٱللَّهُ ٱلنَّبِيِّـۧنَ مُبَشِّرِينَ وَمُنذِرِينَ وَأَنزَلَ مَعَهُمُ ٱلۡكِتَـٰبَ بِٱلۡحَقِّ لِيَحۡكُمَ بَيۡنَ ٱلنَّاسِ فِيمَا ٱخۡتَلَفُواْ فِيهِۚ وَمَا ٱخۡتَلَفَ فِيهِ إِلَّا ٱلَّذِينَ أُوتُوهُ مِنۢ بَعۡدِ مَا جَآءَتۡهُمُ ٱلۡبَيِّنَـٰتُ بَغۡيَۢا بَيۡنَهُمۡۖ فَهَدَى ٱللَّهُ ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ لِمَا ٱخۡتَلَفُواْ فِيهِ مِنَ ٱلۡحَقِّ بِإِذۡنِهِۦۗ وَٱللَّهُ يَهۡدِى مَن يَشَآءُ إِلَىٰ صِرَٲطٍ۬ مُّسۡتَقِيمٍ (٢١٣)
প্রথমে সব মানুষ একই পথের অনুসারী ছিল। তখন আল্লাহ নবী পাঠান। তারা ছিলেন সত্য সঠিক পথের অনুসারীদের জন্য সুসংবাদদাতা এবং অসত্য ও বেঠিক পথ অবলন্বনের পরিণতির ব্যাপারে ভীতি প্রদর্শনকারী। আর তাদের সাথে সত্য কিতাব পাঠান, যাতে সত্য সম্পর্কে তাদের মধ্যে যে মতভেদ দেখা দিয়েছিল তার মীমাংসা করা যায়। মতভেদ তারাই করেছিল যাদেরকে সত্যের জ্ঞান দান করা হয়েছিল। তারা সুস্পষ্ট পথনির্দেশ লাভ করার পরও কেবলমাত্র পরস্পরের ওপর বাড়াবাড়ি করতে চাচ্ছিল বলেই সত্য পরিহার করে বিভিন্ন পথ উদ্ভাবন করে। কাজেই যারা নবীদের ওপর ঈমান এনেছে তাদেরকে আল্লাহ নিজের ইচ্ছাক্রমে সেই সত্যের পথ দিয়েছেন, যে ব্যাপারে লোকেরা মতবিরোধ করেছিল। আল্লাহ যাকে চান সত্য সঠিক পথ দেখিয়ে দেন। (সুরা বাকারা ২:২১৩)।
আদম (আ.) হতে নূহ (আ.) পর্যন্ত সকল মানুষই একত্ববাদে বিশ্বাসী ছিলেন। আদম ও নূহ এর মধ্যে দশটি শতাব্দী সকলেই ইসলামের উপর অধিষ্ঠিত ছিল। এরপর নূহ (আ.) এর কওম দ্বারাই প্রথম শিরক শুরু হয়। তাদের সময়ের প্রসিদ্ধ ও সম্মানিত ব্যক্তিদের স্মরণার্থে তাদেরই প্রতিকৃতি বা মূর্তি স্থাপন করে। প্রথমতঃ এগুলোকে তারা এমনিতেই তৈরী করেছিল। তারা এগুলোকে সম্মানও দেখাত না, পূজাও করত না। তাদের সাধু সজ্জনদের মূর্তি বা প্রতিকৃতি বানায়ে এ সব সাধুজনদের নামেই তারা এগুলোর নামকরণ করেছিল। কিছুদিন পর শুরু হয় এগুলোর প্রতি মাত্রাতিরিক্ত সম্মান প্রদর্শন, যার অনিবার্য পরিণতিতে কিছুদিনের মধ্যে এগুলো পূজার বস্তুতে পরিণত হয়। মৃত ধার্মিক মুসলমানদের শ্রদ্ধা ও প্রশংসায় অতিরঞ্জন হতেই শিরকের সূত্রপাত হয়। মানুষ তাদেরকে অতিরিক্ত ভালোবাসত, তাই তারা তাদেরকে মূর্তির আকার দিয়ে আল্লাহ্ তাআলার সাথে সাথে তাদেরও পূজা করত এবং তাদের নিকট প্রার্থনা করত। সুতরাং মানুষ কেন ভাবল যে, তাদেরকে আল্লাহ্ তাআলার ইবাদতের সাথে সাথে এই সমস্ত ধর্মনিষ্ঠ লোকদের পূজা করতে হবে?
এ বিষয়ে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-
وَقَالُواْ لَا تَذَرُنَّ ءَالِهَتَكُمۡ وَلَا تَذَرُنَّ وَدّٗا وَلَا سُوَاعٗا وَلَا يَغُوثَ وَيَعُوقَ وَنَسۡرٗا
তারা বলেছে, তোমরা নিজেদের দেব–দেবীদের কোন অবস্থায় পরিত্যাগ করো না৷ আর ওয়াদ, সুওয়া’আ, ইয়াগুস, ইয়াউক এবং নাসরকেও পরিত্যাগ করো না। সুরা নুহ : ২৩
সহিহ হাদিসে এসেছে,-
ইবনু আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যে প্রতিমার পূজা নূহ (আ.) এর জাতির মাঝে প্রচলিত ছিল, পরবর্তী সময়ে আরবদের মাঝেও তার পূজা প্রচলিত হয়েছিল। ওয়াদ ’দুমাতুল জান্দাল’ নামক স্থানে অবস্থিত কালব গোত্রের একটি দেবমূর্তি, সূওয়া’আ হল হুযাইল গোত্রের একটি দেবমূর্তি এবং ইয়াগুস ছিল মুরাদ গোত্রের, অবশ্য পরে তা গাতীফ গোত্রের হয়ে যায়। এর আস্তানা ছিল কওমে সাবার নিকটে ’জাওফ’ নামক স্থানে। ইয়াউক ছিল হামাদান গোত্রের দেবমূর্তি, নাসর ছিল যুলকালা গোত্রের হিমযায় শাখারদের মূর্তি। নূহ (আ.) এর জাতির কতিপয় নেক লোকের নাম নাসর ছিল। তারা মারা গেলে, শয়তান তাদের জাতির লোকদের হৃদয়ে এই কথা ঢুকিয়ে দিল যে, তারা যেখানে বসে মজলিস করত, সেখানে তোমরা কিছু মূর্তি স্থাপন কর এবং ঐ সকল নেক লোকের নামানুসারেই এগুলোর নামকরণ কর। সুতরাং তারা তাই করল, কিন্তু তখনও ঐসব মূর্তির পূজা করা হত না। তবে মূর্তি স্থাপনকারী লোকগুলো মারা গেলে এবং মূর্তিগুলো সম্পর্কে সত্যিকারের জ্ঞান বিলুপ্ত হলে লোকজন তাদের পূজা করতে শুরু করে দেয়। সহিহ বুখারি : ৪৯২০
সুরা নূহের এই আয়াতের ব্যাখ্যায় তাফসিরে তাফহিমুল কুরআনে বলা হয়:
নূহের কওমের উপাস্যদের দেবীদের মধ্য থেকে এখানে সেসব দেব-দেবীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে পরবর্তীকালে মক্কাবাসীরা যাদের পূজা করতে শুরু করেছিল এবং ইসলামের প্রাথমিক যুগে আরবের বিভিন্ন স্থানে তাদের মন্দির ও বর্তমান ছিল। এটা অসম্ভব নয় যে, মহা প্লাবনে যেসব লোক রক্ষা পেয়েছিল পরবর্তী বংশধরগণ তাদের মুখ থেকে নূহ (আ.) এর জাতির প্রাচীন উপাস্য দেব-দেবীদের নাম শুনেছিল এবং পরে তাদের বংশধরদের নতুন করে জাহেলিয়াত ছড়িয়ে পড়লে তারা সেসব -দেব-দেবীর প্রতিমা তৈরী করে তাদের পূজা অর্চন শুরু করেছিল।
ওয়াদ্দঃ ‘ওয়াদ্দ’ ছিল ‘কুদাআ’ গোত্রের ‘বনী কালব ইবনে দবরা’ শাখার উপাস্য দেবতা। ‘দামাতুল জানদাল’ নামক স্থানে তারা এর বেদী নির্মাণ করে রেখেছিল। আরবের প্রাচীন শিলা লিপিতে তার নাম ‘ওয়াদ্দম আবাম’(ওয়াদ্দ বাপু) উল্লেখিত আছে। কালবীর মতে তার মূর্তি ছিল এক বিশালদেহী পুরুষের আকৃতিতে নির্মিত। কুরাইশরাও তাকে উপাস্য দেবতা হিসেবে মানতো। তাদের কাছে এর নাম ছিল ‘উদ্দ’। তার নামানুসারে ইতিহাসে ‘আবদে উদ্দ’ নামে এক ব্যক্তির উল্লেখ দেখা যায়।
সুওয়াঃ ‘সুওয়া’ ছিল হুযাইল গোত্রের দেবী। তার মুর্তি ছিল নারীর আকৃতিতে তৈরী। ইয়াম্বুর সন্নিকটেস্থ রুহাত নামক স্থানে তার মন্দির ছিল।
ইয়াগুসঃ ‘ইয়াগুস’ ছিল তায় গোত্রের আনউম শাখায় এবং মাযহিজ গোত্রের কোন কোন শাখার উপাস্য দেবতা। ‘মাযহিজে’র শাখা গোত্রের লোকেরা ইয়ামান ও হিজাযের মধ্যবর্তী জুরাশ নামক স্থানে তার সিংহাকৃতির মূর্তি স্থাপন করে রেখেছিল। কুরাইশ গোত্রেরাও কোন কোন লোকের নাম আবদে ইয়াগুস ছিল বলে দেখা যায়।
ইয়াউকঃ ‘ইয়াউক’ ইয়ামানের হামদান অঞ্চলের অধিবাসী হামদান গোত্রের খাওয়ান শাখার উপাস্য দেবতা ছিল এর মূর্তি ছিল ঘোড়ার আকৃতির।
নাসরঃ ‘নাসর’ ছিল হিমইয়ার অঞ্চলের হিমইয়র গোত্রের আলে যুল-কুলা শাখার দেবতা। বালখা নামক স্থানে তার মূর্তি ছিল। এ মূর্তির আকৃতি ছিল শকুনের মত। সাবার প্রাচীন শিলালিপিতে এর নাম উল্লেখিত হয়েছে নাসূর। এর মন্দিরকে লোকেরা বায়তে নাসূর বা নাসূরের ঘর এবং এর পূজারীদের আহলে নাসূর বা নাসূরের পূজারী বলতো। প্রাচীন মন্দিরসমূহের যে ধ্বংসাবশেষ আরব এবং তার সন্নিহিত অঞ্চলসমূহে পাওয়া যায় সেসব মন্দিরের অনেকগুলোর দরজায় শকুনের চিত্র খোদিত দেখা যায়।
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-
مَا تَعۡبُدُونَ مِن دُونِهِۦۤ إِلَّآ أَسۡمَآءً۬ سَمَّيۡتُمُوهَآ أَنتُمۡ وَءَابَآؤُڪُم مَّآ أَنزَلَ ٱللَّهُ بِہَا مِن سُلۡطَـٰنٍۚ إِنِ ٱلۡحُكۡمُ إِلَّا لِلَّهِۚ أَمَرَ أَلَّا تَعۡبُدُوٓاْ إِلَّآ إِيَّاهُۚ ذَٲلِكَ ٱلدِّينُ ٱلۡقَيِّمُ وَلَـٰكِنَّ أَڪۡثَرَ ٱلنَّاسِ لَا يَعۡلَمُونَ (٤٠)
তাকে বাদ দিয়ে তোমরা যাদের বন্দেগী করছো তারা শুধুমাত্র কতকগুলো নাম ছাড়া আর কিছুই নয়, যে নামগুলো তোমরা ও তোমাদের পিতৃ–পুরুষরা রেখেছো, আল্লাহ এগুলোর পক্ষে কোন প্রমাণ পাঠাননি৷ শাসন কর্তৃত্ব আল্লাহ ছাড়া আর কারোর নেই৷ তাঁর হুকুম– তোমরা তাঁর ছাড়া আর কারোর বন্দেগী করবে না৷ এটিই সরল সঠিক জীবন পদ্ধতি, কিন্তু অধিকাংশ লোক জানে না৷ সুরা ইউসুফ : ৪০
আল্লাহর একত্ববাদকে অপসারণ করার কুট কৌশর হিসাবে শয়তায় মুর্তিকে ব্যাবহার করেছিল। এবং পৃথিবীতে শিরকের সুচনা হয়ে ছিল। এই মূর্তির মাধ্যমে, এ বিষয়টি এখানে পরিষ্কারভাবে ফুটে উঠেছে। সুতরাং শিরক হচ্ছে মূর্তি অপসংস্কৃতিরই ফসল। মূর্তি যে নামেই হোক, যে উদ্দেশ্যেই হোক তা জঘন্য শিরকেরই অংশ। কোনো বিখ্যাত ব্যক্তির ধরে রাখা প্রভৃতি যে কোনো উপলক্ষেই মূর্তি হোক না কেন, এটি জাজ্বল্য শিরক। ইসলাম মূর্তি সংস্কৃতির সাথে কখনো আপোষ করেনি। (ড. প্রশ্নোত্তরে তাওহীদ, ড. ইব্রাহীম ইবন সালেহ আল-খুদ্বায়রী)।
মূর্তিপুজকরা আল্লাহ্র পরিবর্তে কিছু সৃষ্টিকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করে। তারা আল্লাহ্র সাথে সাথে তাদেরও পূজা করে, তাদের নিকট প্রার্থনা করে, তাদের উপর প্রত্যাশা রাখে, তাদেরকে ভয় করে, তাদের জন্য উৎসর্গ করে ও বলিদান দেয়, অতঃপর তারা দাবি করে যে, এই সমস্ত অলীদের উপাসনা করলে তারা তাদেরকে আল্লাহ্ তাআলার সান্নিধ্যে এনে দেবে। তারা তাদের এবং আল্লাহ্ তাআলার মাঝে সুপারিশকারীর কাজ করবে।
আল্লাহ্ তাআলা বলছেন।
إِنَّآ أَنزَلۡنَآ إِلَيۡكَ ٱلۡڪِتَـٰبَ بِٱلۡحَقِّ فَٱعۡبُدِ ٱللَّهَ مُخۡلِصً۬ا لَّهُ ٱلدِّينَ (٢) أَلَا لِلَّهِ ٱلدِّينُ ٱلۡخَالِصُۚ وَٱلَّذِينَ ٱتَّخَذُواْ مِن دُونِهِۦۤ أَوۡلِيَآءَ مَا نَعۡبُدُهُمۡ إِلَّا لِيُقَرِّبُونَآ إِلَى ٱللَّهِ زُلۡفَىٰٓ إِنَّ ٱللَّهَ يَحۡكُمُ بَيۡنَهُمۡ فِى مَا هُمۡ فِيهِ يَخۡتَلِفُونَۗ إِنَّ ٱللَّهَ لَا يَهۡدِى مَنۡ هُوَ كَـٰذِبٌ۬ ڪَفَّارٌ۬ (٣)
আমি এই কিতাব তোমার উপর অবতীর্ণ করেছি সত্যতা সহকারে, সুতরাং তুমি আল্লাহ্র ইবাদত করো তাঁর আনুগত্যে বিশুদ্ধচিত্ত হয়ে। নিশ্চয়ই দ্বিন, ইবাদত ও আনুগত্য কেবল আল্লাহ্র জন্য। কিন্তু যারা আল্লাহ ব্যতীত অন্যদেরকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করে, (তারা বলে 🙂 আমরা তো এদের এজন্যই পূজা করি যে, এরা আমাদেরকে আল্লাহ্র সান্নিধ্যে এনে দেবে। তারা যে বিষয়ে নিজেদের মধ্যে মতভেদ করেছে আল্লাহ্ তাআলা তার ফায়সালা করে দেবেন। যারা মিথ্যাবাদী ও কাফির, আল্লাহ্ তাআলা তাদেরকে সৎপথ প্রদর্শন করেন না। সুরা যুমার : ২–৩
২। ইব্রাহীম (আ.) এর পূর্ব পুরুষগনের মধ্যে মূর্তিপূজার প্রচলন ছিল।
ইব্রাহীম (আ.) এর পূর্ব পুরুষগন মূর্তিপূজারি ছিলেন। ইব্রাহীম (আ.) নবুয়ত লাভ করার পর শিরক ও তাওহীদের বিষয় নিয়ে তাঁর নিজের পরিবার ও সম্প্রদদায়ের সাথে সংঘাত শুরু হয়েছিল। কারণ তার পিতা আজর এবং তার সম্প্রদদায়ের লোকজন মূর্তি পূজারি ছিলেন। এই জন্য ইব্রাহীম (আ.) কে মূর্তি পূজার মত শির্কারীদের মোকাবেলা করতে হয়। মুশরিকদের সাথে সংঘাতের কারণে তাকে নিজের বাপ, পরিবার, জাতি ও দেশ সবকিছু ত্যাগ করে সিরিয়া, ফিলিস্তিন এবং হিজাযে প্রবাসীর জীবন যাপন করতে হয়েছিল। তাই আল্লাহ বার বার কুরআন মজীদ বিভিন্ন জায়গায় বলেছেন, ইব্রাহীম (আ.) যে দ্বীন নিয়ে এসেছিলেন তা ছিল একেবারে তাওহীদপূর্ণ নির্ভেজাল দ্বীন। আর মুহাম্মাদ ﷺও সেই একই দ্বীন নিয়ে এসেছেন। ইব্রাহীম আলাইহিস সালামের পূর্ব পুরুষগন মুশরিক ছিলেন আর তিনি ছিলেন একনিষ্ট মুসলিম। এটাই সত্য ইতিহাস যার প্রমান কুরআনের এই আয়াত। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-
مَا كَانَ إِبۡرَٲهِيمُ يَہُودِيًّ۬ا وَلَا نَصۡرَانِيًّ۬ا وَلَـٰكِن كَانَ حَنِيفً۬ا مُّسۡلِمً۬ا وَمَا كَانَ مِنَ ٱلۡمُشۡرِكِينَ (٦٧) إِنَّ أَوۡلَى ٱلنَّاسِ بِإِبۡرَٲهِيمَ لَلَّذِينَ ٱتَّبَعُوهُ وَهَـٰذَا ٱلنَّبِىُّ وَٱلَّذِينَ ءَامَنُواْۗ وَٱللَّهُ وَلِىُّ ٱلۡمُؤۡمِنِينَ (٦٨)
ইবরাহীম ইহুদী ছিল না, খৃস্টানও ছিল না বরং সে তো ছিল একজন একনিষ্ঠ মুসলিম এবং সে কখনো মুশরিকদের অন্তরভুক্ত ছিল না ৷ ইবরাহীমের যারা অনুসরণ করেছে তারাই তার সাথে ঘনিষ্ঠতম সম্পর্ক রাখার অধিকারী। আর এখন এই নবী এবং এর ওপর যারা ঈমান এনেছে তারাই এই সম্পর্ক রাখার বেশী অধিকারী৷ আল্লাহ কেবল তাদেরই সমর্থক ও সাহায্যকারী যারা ঈমান এনেছে৷ সুরা আল ইমরান : ৬৭–৬৮
আরবের লোকেরা বিশেষভাবে কুরাইশরা নিজেদেরকে ইব্রাহীম (আ.) এর অনুসারী মনে করতো। আর তারা দাবি করত ইব্রাহীম (আ.) এর ধর্মের উপর তারাই টিকে আছে। মূর্তি পূজাকে তারা ইব্রাহীম আলাইহিস সালামের আনিত ধর্ম মনে করত। অথচ তিনি মূর্তি পূজারি মুশরিক ছিলেন না।আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-
وَٱتۡلُ عَلَيۡهِمۡ نَبَأَ إِبۡرَٲهِيمَ (٦٩) إِذۡ قَالَ لِأَبِيهِ وَقَوۡمِهِۦ مَا تَعۡبُدُونَ (٧٠) قَالُواْ نَعۡبُدُ أَصۡنَامً۬ا فَنَظَلُّ لَهَا عَـٰكِفِينَ (٧١) قَالَ هَلۡ يَسۡمَعُونَكُمۡ إِذۡ تَدۡعُونَ (٧٢) أَوۡ يَنفَعُونَكُمۡ أَوۡ يَضُرُّونَ (٧٣) قَالُواْ بَلۡ وَجَدۡنَآ ءَابَآءَنَا كَذَٲلِكَ يَفۡعَلُونَ(٧٤)قَالَ أَفَرَءَيۡتُم مَّا كُنتُمۡ تَعۡبُدُونَ (٧٥) أَنتُمۡ وَءَابَآؤُڪُمُ ٱلۡأَقۡدَمُونَ (٧٦)
আর তাদেরকে ইবরাহীমের কাহিনী শুনিয়ে দাও। যখন সে তার বাপ ও তার সম্প্রদায়কে জিজ্ঞেস করেছিল, তোমরা কিসের পূজা করো? তারা বলল, আমরা কতিপয় মূর্তির পূজা করি। এবং তাদের সেবায় আমরা নিমগ্ন থাকি৷ সে জিজ্ঞেস করলো, তোমরা যখন তাদেরকে ডাকো তখন কি তারা তোমাদের কথা শোনে? অথবা তোমাদের কি কিছু উপকার বা ক্ষতি করে? তারা জবাব দিল। না, বরং আমরা নিজেদের বাপ–দাদাকে এমনটিই করতে দেখেছি৷ এ কথায় ইবরাহীম বললো, কখনো কি তোমরা (চোখ মেলে), সেই জিনিসগুলো দেখেছো যাদের বন্দেগী তোমরা এবং তোমাদের অতীত পূর্বপুরুষেরা করতে অভ্যস্ত? সুরা আশ শুয়ারা : ৬৯-৭৬
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আরও ইরশাদ করেন-
وَإِبۡرَٲهِيمَ إِذۡ قَالَ لِقَوۡمِهِ ٱعۡبُدُواْ ٱللَّهَ وَٱتَّقُوهُۖ ذَٲلِڪُمۡ خَيۡرٌ۬ لَّكُمۡ إِن ڪُنتُمۡ تَعۡلَمُونَ (١٦) إِنَّمَا تَعۡبُدُونَ مِن دُونِ ٱللَّهِ أَوۡثَـٰنً۬ا وَتَخۡلُقُونَ إِفۡكًاۚ إِنَّ ٱلَّذِينَ تَعۡبُدُونَ مِن دُونِ ٱللَّهِ لَا يَمۡلِكُونَ لَكُمۡ رِزۡقً۬ا فَٱبۡتَغُواْ عِندَ ٱللَّهِ ٱلرِّزۡقَ وَٱعۡبُدُوهُ وَٱشۡكُرُواْ لَهُ ۥۤۖ إِلَيۡهِ تُرۡجَعُونَ (١٧)
আর ইবরাহীমকে পাঠাই, যখন সে তার সম্প্রদায়কে বলে, আল্লাহর বন্দেগী করো এবং তাঁকে ভয় করো৷ এটা তোমাদের জন্য ভালো যদি তোমরা জানো৷ তোমরা আল্লাহকে বাদ দিয়ে যাদেরকে পূজা করছো তারাতো নিছক মূর্তি আর তোমরা একটি মিথ্যা তৈরি করছো৷ আসলে আল্লাহকে বাদ দিয়ে যাদেরকে তোমরা পূজা করো। তারা তোমাদের কোন রিযিকও দেবার ক্ষমতা রাখে না, আল্লাহর কাছে রিযিক চাও, তাঁরই বন্দেগী করো এবং তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো, তারই দিকে তোমাদের ফিরে যেতে হবে৷ সুরা আকাবুত : ১৬–১৭
ইব্রাহীম (আ.) মূর্তি পূজারি পূর্বপূরুষদের শিরকি কাজ থেকে তার সন্তানদেরকে বাচানোর জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-
وَإِذۡ قَالَ إِبۡرَٲهِيمُ رَبِّ ٱجۡعَلۡ هَـٰذَا ٱلۡبَلَدَ ءَامِنً۬ا وَٱجۡنُبۡنِى وَبَنِىَّ أَن نَّعۡبُدَ ٱلۡأَصۡنَامَ (٣٥)
স্মরণ কর সেই সময়ের কথা যখন ইবরাহীম দোয়া করছিল, হে আমার রব! এ শহরকে নিরাপত্তার শহরে পরিণত করো এবং আমার ও আমার সন্তানদেরকে মূর্তিপূজা থেকে বাঁচাও৷ সুরা ইব্রাহীম : ৩৫
উপরের আলোচনা তেকে একথা স্পষ্ট যে, ইব্রাহীম (আ.) এর পূর্ব পুরুষগনের মধ্যে মূর্তিপূজার প্রচলন ছিল।
৩। বনী ইসরাঈল গো–বৎস পূজার মাধ্যমে তাদের মধ্যে পুজার সুচনা করে।
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-
قَالَ مُوسَىٰ لِقَوۡمِهِ ٱسۡتَعِينُواْ بِٱللَّهِ وَٱصۡبِرُوٓاْۖ إِنَّ ٱلۡأَرۡضَ لِلَّهِ يُورِثُهَا مَن يَشَآءُ مِنۡ عِبَادِهِۦۖ وَٱلۡعَـٰقِبَةُ لِلۡمُتَّقِينَ
অর্থ: বনী ইসরাঈলকে আমি সাগর পার করে দিয়েছি৷ তারপর তারা চলতে চলতে এমন একটি জাতির কাছে উপস্থিত হলো যারা নিজেদের কতিপয় মূর্তির পূজায় লিপ্ত ছিল। বনী ইসরাঈল বলতে লাগলো, হে মূসা! এদের মাবূদের মত আমাদের জন্যো একটা মাবূদ বানিয়ে দাও। মূসা বললো, তোমরা বড়ই অজ্ঞের মত কথা বলছো৷ (সুরা আরাফ ৭:১৩৮)
মহান আল্লাহ্ তাআলা বলছেন,
وَإِذۡ وَٲعَدۡنَا مُوسَىٰٓ أَرۡبَعِينَ لَيۡلَةً۬ ثُمَّ ٱتَّخَذۡتُمُ ٱلۡعِجۡلَ مِنۢ بَعۡدِهِۦ وَأَنتُمۡ ظَـٰلِمُونَ
(স্মরণ কর) যখন মূসার জন্য চল্লিশ রাত্রি নির্ধারিত করেছিলাম, তখন তার প্রস্থানের পর তোমরা গো–বৎসকে (উপাস্যরূপে) গ্রহণ করেছিলে, বাস্তবে তোমরা ছিলে অনাচারী। (বাকারা–২:৫১)।
ফিরআউন-সম্প্রদায়ের কবল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর বানী-ইস্রাঈলেরা ‘সীনা’ (সিনাই) নামক উপদ্বীপে পৌঁছে ছিল। সেখানে মহান আল্লাহ মূসা (আঃ)-কে তাওরাত দেওয়ার লক্ষ্যে চল্লিশ রাতের জন্য ত্বূর পাহাড়ে ডেকেছিলেন। মূসা (আ.) এর যাওয়ার পর বানী-ইস্রাঈলেরা সামেরীর চক্রান্তে গো-বৎস পূজা শুরু করে দিয়েছিল। মুসা (আ.) গো-বৎস পূজার কারণ জানতে চাইলে। বানী-ইস্রাঈলেরা উত্তর দিল (কুরআসের ভাষায়)।
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-
قَالُواْ مَآ أَخۡلَفۡنَا مَوۡعِدَكَ بِمَلۡكِنَا وَلَـٰكِنَّا حُمِّلۡنَآ أَوۡزَارً۬ا مِّن زِينَةِ ٱلۡقَوۡمِ فَقَذَفۡنَـٰهَا فَكَذَٲلِكَ أَلۡقَى ٱلسَّامِرِىُّ
ওরা বলল, ‘আমরা তোমার সাথে কৃত অঙ্গীকার স্বেচ্ছায় ভঙ্গ করিনি বরং আমাদেরকে সম্প্রদায়ের অলঙ্কারের ভার বহন করতে দেওয়া হয়েছিল, পরে আমরা তা আগুনে নিক্ষেপ করেছিলাম; অতঃপর সামেরীও ঐরূপ নিক্ষেপ করেছিল। সুরা ত্বহা : ৮৭
সেই সময়ের মিসরের রীতি অনুযায়ী নারী পুরুষেরা সকলে ভারী গহনা পরত। এবং তা তাদের মরুচারী জীবনের জন্য বোঝায় পরিণত হয়েছিল, অবশ্য অনেক তাফসির কারক এ অজুহাতকে ইসরাঈলিদের বাহানা বলছেন। তাছাড়া তাফসিরে ইবনে কাসিরের মতে, এই অলংকারগুল বনী ইসরাঈলেরা ঈদের বাহানায় কিবতিদের কাছ থেকে ধার করে ছিল। অলংকারগুলো তাদের ফেরত দেয়া কর্তব্য ছিলো। তাই হারুন (আ.) সকল কে তাদের দোষ মুক্তির জন্য অলংকারগুলোকে মাটির গভির গর্তে ফেরার নির্দেষ দেন। এ সময় সামেরী মুষ্টি বদ্ধকরে এসে হারুন (আ.) বলে, আপনি যদি আল্লাহর কাছে আমার মনোবাঞ্চনা পুরন করার জন্য দোয়া করেন তবেই আমি হাতের বস্তু নিক্ষেপ করব। সামেলির কুট কৌশল হারুন (আ.) বুঝতে পারেনি এবং তার জন্য দোয়া করলেন। সে তার হাতে রাখা মাটি নিক্ষেপ করল যা সে সংগ্রহ করে ছিল, জিব্রাঈল (আ.) এর ঘোড়ার পায়ের নিচ থেকে। সামেরি মাটি নিক্ষেপ করার সাথে সাথে তার মনোবাঞ্চনা মত একটি গো-বৎস রূপি মুর্তি তৈরি হয়। সামেরী ছিল একজন ফিতনাবাজ ব্যক্তি। সে ভালোভাবে ভেবেচিন্তে ধোকা ও প্রতারণার একটি বিরাট পরিকল্পনা তৈরী করেছিল। সে কেবল একটি সোনার বাছুর তৈরী করে নি বরং কোন কৌশলে তার মধ্যে থেকে হামবা রব সৃষ্টি করে দেয়। সমগ্র ইসরাঈলিদের জাতির অজ্ঞ ও নির্বোধ লোকদের প্রতারিত করল।
বনী ইসরাঈলদের বুঝাল যে, মুসা বহু দিন হলো ইসরাঈলীদের ত্যাগ করে তূর পর্বতে গেছেন। সেখানে মুসা মিথ্যাই ঘুরে বেড়াচ্ছেন উপাস্যের সন্ধানে। তার সত্যিকারের উপাস্য আছে এখানে সোনার তৈরী গো-বৎসে। এরূপই একটি ভাষণ দিয়েছিলো সামিরী ও তার অনুসারীরা। কিন্তু তাদের এই প্ররোচনাকে অনেকেই মেনে নেন। তারা সর্বশক্তিমান অল্লাহ্র বিভিন্ন ক্ষমতার সাক্ষী, তবুও তারা সেই সর্বশক্তিমানের এবাদত ত্যাগ করে মূর্তি পূঁজাতে অধিক আগ্রহী হল। এবং তাদের আল্লাহ্ সামিরীর দ্বারা মূর্তি পূঁজার দিকে প্রলোভিত করেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-
فَأَخۡرَجَ لَهُمۡ عِجۡلاً۬ جَسَدً۬ا لَّهُ ۥ خُوَارٌ۬ فَقَالُواْ هَـٰذَآ إِلَـٰهُڪُمۡ وَإِلَـٰهُ مُوسَىٰ فَنَسِىَ
এবং আমরা স্রেফ সেগুলো ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিলাম৷ তারপর এভাবে সামেরীও কিছু ছুঁড়ে ফেললো এবং তাদের একটি বাছুরের মূর্তি বানিয়ে নিয়ে এলো, যার মধ্যে থেকে গরুর মতো আওয়াজ বের হতো৷ লোকেরা বলে উঠলো, “এ–ই তোমাদের ইলাহ এবং মূসারও ইলাহ, মূসা একে ভুলে গিয়েছে”৷ সুরা ত্বহা : ৮৮
যারা সামেরীর ফিতনায় জড়িয়ে পড়েছিল এটি ছিল তাদের ওজর। তাদের বক্তব্য ছিল, আমরা অলংকার ছুঁড়ে দিয়েছিলাম। বাছুর তৈরী করার নিয়ত আমাদের ছিল না বা তা দিয়ে কি করা হবে তাও আমাদের জানা ছিল না। এরপর যা কিছু ঘটেছে তা আসলে এমন ব্যাপারই ছিল যে, সেগুলো দেখে আমরা স্বতস্ফূর্তভাবে শিরকে লিপ্ত হয়ে গেছি। আর এই স্বতস্ফূর্তভাবে শিরকে লিপ্ত হওয়া মহা অন্যায়। মূসা (আ.) গো-বৎস পূজায় নেতৃত্ব দানকারী হঠকারী লোকদের মৃত্যুদন্ড দিলেন। যেমন আল্লাহ বলেন, ‘আর যখন মূসা তার সম্প্রদায়কে বলল,
وَإِذۡ قَالَ مُوسَىٰ لِقَوۡمِهِۦ يَـٰقَوۡمِ إِنَّكُمۡ ظَلَمۡتُمۡ أَنفُسَڪُم بِٱتِّخَاذِكُمُ ٱلۡعِجۡلَ فَتُوبُوٓاْ إِلَىٰ بَارِٮِٕكُمۡ فَٱقۡتُلُوٓاْ أَنفُسَكُمۡ ذَٲلِكُمۡ خَيۡرٌ۬ لَّكُمۡ عِندَ بَارِٮِٕكُمۡ فَتَابَ عَلَيۡكُمۡۚ إِنَّهُ ۥ هُوَ ٱلتَّوَّابُ ٱلرَّحِيمُ (٥٤)
হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা গো–বৎসকে উপাস্য নির্ধারণ করে নিজেদের উপরে যুলুম করেছ। অতএব এখন তোমাদের প্রভুর নিকটে তওবা কর এবং নিজেদেরকে পরস্পরে হত্যা কর। এটাই তোমাদের জন্য তোমাদের স্রষ্টার নিকটে কল্যাণকর। সুরা বাকারা : ৫৪
এভাবে তাদের কিছু লোককে হত্যা করা হয়, কিছু লোক ক্ষমাপ্রাপ্ত হয়। আল্লাহ্ তাদের শুধু মাত্র এক আল্লাহ্র উপাসনা আদেশ দান করেছেন। কিন্তু ইহুদীরা সেই আদেশকে অমান্য করে গোবৎসের হাম্বা রবের প্রতি অধিক মনোযোগী হয়। এ কথা তাদের চিন্তায় আসে নাই যে গোবৎসের পূঁজা একটি প্রতারণা মাত্র। গো বৎসের এই মূর্তি ভালো বা মন্দ করার কোনও ক্ষমতাই রাখে না। আল্লাহ্ হচ্ছেন সমস্ত বিশ্বভূবনের পালনকর্তা, রক্ষাকর্তা। যার দয়া ও করুণা অপরসীম, যার ক্রোধ ভয়াবহ। মানুষ কতই না বাস্তববাদী যে, মহান আল্লাহর মহিমার কত বৃহৎ বৃহৎ নিদর্শনাবলী দেখা সত্ত্বেও এবং তাঁর নবী (মূসা এবং হারুন (আ.)) তাদের মাঝে বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও গোবৎসকে নিজেদের উপাস্য মনে করে নিলো। বর্তমানে মুসলমানরাও শির্কী আক্বীদা-বিশ্বাস ও কার্যকলাপে লিপ্ত রয়েছে। কিন্তু তারা মনে মনে ভাবে, মুসলিম মুশরিক কিভাবে হয়? এই মুসলিম মুশরিকরা শিরককে কেবল পাথরের মূর্তি পূজার সাথে নির্দিষ্ট করে দিয়েছে। তারাই নাকি শুধু মুশরিক। অথচ এই নামমাত্র মুসলিম কবরের গম্বুজের সাথে তাই করে, যা প্রতিমা-পূজারী নিজের মূর্তির সাথে করে থাকে।
৪। আরবে মূর্তিপূজার সুচনা:
প্রাক ইসলামিক যৃগে আরবের মানুষেরা এক আল্লহতে বিশ্বাস করত কিন্তু তারা বিভিন্ন দেবদেবীর মুর্তির পুজা করত। বিশেষ করে মক্কার চারপাশের সবাই মুর্তিপুজা লিপ্ত ছিল। তারা আল্লাহ কে সৃষ্টিকর্তা হিসাবে বিশ্বাস করার পরও মূর্তিপূজার লিপ্ত থাকার কারণ হিসাবে তারা বলত, এই মূর্তিপূজার সাহায্যে তারা আল্লাহর নিকটবর্তী হবে অর্থাৎ এরা আল্লাহর নিকট সুপারিশ করবে।আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-
أَلَا لِلَّهِ ٱلدِّينُ ٱلۡخَالِصُۚ وَٱلَّذِينَ ٱتَّخَذُواْ مِن دُونِهِۦۤ أَوۡلِيَآءَ مَا نَعۡبُدُهُمۡ إِلَّا لِيُقَرِّبُونَآ إِلَى ٱللَّهِ زُلۡفَىٰٓ إِنَّ ٱللَّهَ يَحۡكُمُ بَيۡنَهُمۡ فِى مَا هُمۡ فِيهِ يَخۡتَلِفُونَۗ إِنَّ ٱللَّهَ لَا يَهۡدِى مَنۡ هُوَ كَـٰذِبٌ۬ ڪَفَّارٌ۬
সাবধান! একনিষ্ঠ ইবাদাত কেবল আল্লাহরই প্রাপ্য৷ যারা তাঁকে ছাড়া অন্যদেরকে অভিভাবক বানিয়ে রেখেছে (আর নিজেদের এ কাজের কারণ হিসেবে বলে যে,) আমরা তো তাদের ইবাদাত করি শুধু এই কারণে যে, সে আমাদেরকে আল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দেবে (সুপারিশ করবে)৷ আল্লাহ নিশ্চিতভাবেই তাদের মধ্যকার সে সব বিষয়ের ফায়সালা করে দেবেন যা নিয়ে তারা মতভেদ করছিলো৷ আল্লাহ এমন ব্যক্তিকে হিদায়াত দান করেন না, যে মিথ্যাবাদী ও হক অস্বীকারকারী৷ (সুরা জুমার– ৩৯:০৩)।
মহান আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন:
وَيَعۡبُدُونَ مِن دُونِ ٱللَّهِ مَا لَا يَضُرُّهُمۡ وَلَا يَنفَعُهُمۡ وَيَقُولُونَ هَـٰٓؤُلَآءِ شُفَعَـٰٓؤُنَا عِندَ ٱللَّهِۚ قُلۡ أَتُنَبِّـُٔونَ ٱللَّهَ بِمَا لَا يَعۡلَمُ فِى ٱلسَّمَـٰوَٲتِ وَلَا فِى ٱلۡأَرۡضِۚ سُبۡحَـٰنَهُ ۥ وَتَعَـٰلَىٰ عَمَّا يُشۡرِكُونَ
আর তারা আল্লাহ্র পরিবর্তে এমন বস্তুসমূহের উপাসনা করে যারা তাদের কোনো অপকার করতে পারে না এবং উপকারও করতে পারে না, আর তারা বলে : এরা তো আল্লাহ্র নিকট আমাদের সুপারিশকারী। তুমি বলে দাও : তোমরা কি আল্লাহ্কে আকাশমণ্ডলি ও পৃথিবীর এমন কিছু সংবাদ দিচ্ছ যা তিনি অবগত নন ? আল্লাহ্ তাদের মুশরিকি কার্যকলাপ হতে অনেক উর্ধ্বে”। সূরা ইউসুফ : ১৮
এই দুটি আয়াতে আল্লাহ্ তাআলা আমাদেরকে জানিয়ে দেন যে, মূর্তিপুজকরা আল্লাহর পরিবর্তে কিছু সৃষ্টিকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করে। তারা আল্লাহ্র সাথে সাথে তাদেরও পূজা করে, তাদের নিকট প্রার্থনা করে, তাদের উপর প্রত্যাশা রাখে, তাদেরকে ভয় করে, তাদের জন্য উৎসর্গ করে ও বলিদান দেয়, অতঃপর তারা দাবি করে যে, এই সমস্ত ওয়ালিদের উপাসনা করলে তারা তাদেরকে আল্লাহ্ তাআলার সান্নিধ্যে এনে দেবে। তারা তাদের এবং আল্লাহ্ তাআলার মাঝে সুপারিশকারীর কাজ করবে।
তারা নবী ইব্রাহিম (আ.) ও ইসমাইল (আ.) এর আনিত ধর্মে বা মিল্লাত বিশ্বাস করত, এবং কা’বার তাওয়াফ করা, হজ্জ করা, হাজিদের পানব পান করান, ইবাদতের অংশ মনে করত। বিপদে মহান আল্লাহর সাহায্য কামনা করত। কিন্তু কালের পরিক্রমায়ে তারা ইব্রাহিম (আ.) ও ইসমাইল (আ.) এর মূল শিক্ষা বা আকীদা ভুলে যায়। তাদের প্রবর্তিত কিছু প্রথা বিকৃত রূপে তারা পালন করত। ইব্রাহিম (আ.) ও ইসমাইল (আ.) এর মৃত্যুর আনুমানিক ৫০০ বছর পরে আরবদের ( বাণী ইসমাইল) মাঝে শিরক এবং মূর্তিপূজার শুরু করে। খুযাই গোত্রের আমর ইবন লুহাই আল খুযাই এর হাত ধরে। ইবন কাসীর এর বর্ণনা অনুসারে, আমর ইবন লুহাই সিরিয়াতে গিয়ে আমালিক গোত্রের সামাজিক, সামরিক এবং অর্থনৈতিক অবস্থা এবং সভ্যতা দেখে মুগ্ধ হয়। এবং তাদের থেকে মুর্তিপুজার ধর্ম আরবে আমদানি করার সিদ্ধান্ত নেয়। সিরিয়া থেকে আমর ইবন লুহাই আমালিকদের থেকে হুবাল নামের মূর্তি নিয়ে এসে কা’বায় স্হাপন করে।মক্কার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দেবতাদের অন্যতম ছিলেন এই হুবাল। কাবায় তাঁর একটি মূর্তি পূজা করা হত। কাবা তাঁর প্রতি উৎসর্গিত ছিল। মক্কার আরব্য পুরাণে তিন প্রধান দেবী ছিলেন লাত, উজ্জা ও মানাত। এঁদের প্রত্যেকের নিজস্ব ক্ষেত্র ছিল এবং তাইফের কাছে মূর্তি সহ মন্দিরও ছিল।
আল-লাত: আরবরা “আল’লাত” মৃত্যু বা পরকালের এর দেবী বিশ্বাস করত । আল লা’ত কুরায়শদের প্রধানতম দেবী ছিলো এবং তাইফ অঞ্চলে এর মন্দির ছিলো ।
আল-উজ্জা: ‘আল-উজ্জা বা সর্বশক্তিময়ী’ ছিলেন আরবের উর্বরতার দেবী। যুদ্ধে রক্ষা ও জয়ের জন্য তাঁর কাছে প্রার্থনা করা হত। এই দেবীকে পরিত্রাণকারী বা সাহায্যকারীও বিশ্বাস করত।
মনাত: ছিলেন ভাগ্যের। মনাতের একটি মূর্তি মদিনা ও মক্কার মাঝে কাদাদের আল-মুশাল্লালের কাছে সমুদ্রতীরে নির্মিত হয়েছিল। বানু আউস ও বানু খাজরাজ এবং মক্কা ও মদিনা সহ উক্ত অঞ্চলের কাছাকাছি অবস্থিত এলাকার সবাই মনাতকে শ্রদ্ধা জানাত এবং নিজেদের শিশু সন্তান বলি দিত। (সূত্র: ইন্টারনেট, উইকিপিয়া)।
আয়িশা (রা.) হতে বর্ণিত যে, উম্মু হাবীবা ও উম্মু সালামা (রা.) হাবশায় তাঁদের দেখা একটা গির্জার কথা বলেছিলেন, যাতে বেশ কিছু মূর্তি ছিল। তাঁরা উভয়ে বিষয়টি নবী ﷺ এর নিকট বর্ণনা করলেন। তিনি ইরশাদ করলেনঃ তাদের অবস্থা ছিল এমন যে, কোন সৎ লোক মারা গেলে তারা তার কবরের উপর মাসজিদ বানাতো। আর তার ভিতরে ঐ লোকের মূর্তি তৈরি করে রাখতো। কিয়ামত দিবসে তারাই আল্লাহর নিকট সবচাইতে নিকৃষ্ট সৃষ্টজীব বলে পরিগণিত হবে। সহিহ বুখারি : ৪২৭, সহিহ মুসলিম : ৫২৮,