শিরকের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

সৃষ্টির শুরুতে সব মানুষ তাওহীদপন্থী ছিল। কালক্রমে মানুষ শয়তানের প্রতারণা ও কুপ্রবৃত্তির কারণে আল্লাহকে ভুলে গিয়ে আস্তে আস্তে স্রষ্টার সমকক্ষ বহু স্রষ্টা কল্পনা করে সৃষ্ট করে নিয়েছে। কুরআন ও হাদিসের আলোকে বুঝা যায়, প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে শিরক শুরু হয় নুহ (আ.) এর মৃত্যুর পর তার অনুসারি কিছু সত লোকের মুর্তি বানিয়ে পুজা করার মাধ্যমে। সেই যে আনুষ্ঠানিক শিরক করা শুরু তা আজও চলছ। যুগে যুগে অসংখ্যা নবি রাসূর তাওহীদের দাওয়াত প্রদান করলেও শিরক উতখাত হয় নাই। ইসলামের আবির্ভাবের ফলে তাওহীদপন্থী লোকদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে সত্য কিন্তু পৃথিবীতে থেকে শিরকি সমুলে উতখাত হয় নি। বর্তমানে ইয়াহুদি, নাসারা ও মুশরিকদের মত বহু মুসলিম নামধারী আকন্ঠ শিবকে নিমজ্জিত। শিরকের এই ক্রম ধারা সম্পর্কে নিচে কিছুটা আলোক পাত করা হলো-

১. আদম (.) এর পরবর্তি সময়ের অবস্থাঃ

আদম (আ.) এর জীবদ্দশায় তার বংশধরদের ধর্মবিশ্বাসে কোনো প্রকার শিরক বা কুফরের সংমিশ্রণ ছিলো না। তারা সবাই একত্ববাদের (তাওহিদ) অনুসারী ছিলেন। শিরকি কাজ তারা কখন করেন নি। তারা পরিপূর্ণ ভাবে ইসলামের অনুসারী ছিল। তাই আদম (আ.) এর শরিয়তের অধিকাংশ আদেশ নিষেধ ছিলো বৈষয়িক বিষয়ে। কারণ পৃথিবীকে নতুন করে আবাদ করতে এবং এটিকে বাসযোগ্য করতে গার্হস্থ্য বিষয়ের প্রয়োজনই ছিলো বেশি। এ কারণে আদম (আ.) এর বংশধরদের মাঝে ধর্ম নিয়ে তেমন কোনো সমস্যার সৃষ্টি হয়নি। এ বিষয়ে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

كَانَ ٱلنَّاسُ أُمَّةً۬ وَٲحِدَةً۬ فَبَعَثَ ٱللَّهُ ٱلنَّبِيِّـۧنَ مُبَشِّرِينَ وَمُنذِرِينَ وَأَنزَلَ مَعَهُمُ ٱلۡكِتَـٰبَ بِٱلۡحَقِّ لِيَحۡكُمَ بَيۡنَ ٱلنَّاسِ فِيمَا ٱخۡتَلَفُواْ فِيهِ‌ۚ وَمَا ٱخۡتَلَفَ فِيهِ إِلَّا ٱلَّذِينَ أُوتُوهُ مِنۢ بَعۡدِ مَا جَآءَتۡهُمُ ٱلۡبَيِّنَـٰتُ بَغۡيَۢا بَيۡنَهُمۡ‌ۖ فَهَدَى ٱللَّهُ ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ لِمَا ٱخۡتَلَفُواْ فِيهِ مِنَ ٱلۡحَقِّ بِإِذۡنِهِۦ‌ۗ وَٱللَّهُ يَهۡدِى مَن يَشَآءُ إِلَىٰ صِرَٲطٍ۬ مُّسۡتَقِيمٍ (٢١٣)         

প্রথমে সব মানুষ একই পথের অনুসারী ছিল তখন আল্লাহ নবী পাঠান তারা ছিলেন সত্য সঠিক পথের অনুসারীদের জন্য সুসংবাদদাতা এবং অসত্য বেঠিক পথ অবলন্বনের পরিণতির ব্যাপারে ভীতি প্রদর্শনকারী আর তাদের সাথে সত্য কিতাব পাঠান, যাতে সত্য সম্পর্কে তাদের মধ্যে যে মতভেদ দেখা দিয়েছিল তার মীমাংসা করা যায় মতভেদ তারাই করেছিল যাদেরকে সত্যের জ্ঞান দান করা হয়েছিল তারা সুস্পষ্ট পথনির্দেশ লাভ করার পরও কেবলমাত্র পরস্পরের ওপর বাড়াবাড়ি করতে চাচ্ছিল বলেই সত্য পরিহার করে বিভিন্ন পথ উদ্ভাবন করে কাজেই যারা নবীদের ওপর ঈমান এনেছে তাদেরকে আল্লাহ নিজের ইচ্ছাক্রমে সেই সত্যের পথ দিয়েছেন, যে ব্যাপারে লোকেরা মতবিরোধ করেছিল আল্লাহ যাকে চান সত্য সঠিক পথ দেখিয়ে দেন (সুরা বাকারা ২:২১৩)

আদম (আ.) হতে নূহ (আ.) পর্যন্ত সকল মানুষই একত্ববাদে বিশ্বাসী ছিলেন। আদম ও নূহ এর মধ্যে দশটি শতাব্দী সকলেই ইসলামের উপর অধিষ্ঠিত ছিল। এরপর নূহ (আ.) এর কওম দ্বারাই প্রথম শিরক শুরু হয়। তাদের সময়ের প্রসিদ্ধ ও সম্মানিত ব্যক্তিদের স্মরণার্থে তাদেরই প্রতিকৃতি বা মূর্তি স্থাপন করে। প্রথমতঃ এগুলোকে তারা এমনিতেই তৈরী করেছিল। তারা এগুলোকে সম্মানও দেখাত না, পূজাও করত না। তাদের সাধু সজ্জনদের মূর্তি বা প্রতিকৃতি বানায়ে এ সব সাধুজনদের নামেই তারা এগুলোর নামকরণ করেছিল। কিছুদিন পর শুরু হয় এগুলোর প্রতি মাত্রাতিরিক্ত সম্মান প্রদর্শন, যার অনিবার্য পরিণতিতে কিছুদিনের মধ্যে এগুলো পূজার বস্তুতে পরিণত হয়। মৃত ধার্মিক মুসলমানদের শ্রদ্ধা ও প্রশংসায় অতিরঞ্জন হতেই শিরকের সূত্রপাত হয়। মানুষ তাদেরকে অতিরিক্ত ভালোবাসত, তাই তারা তাদেরকে মূর্তির আকার দিয়ে আল্লাহ্‌ তাআলার সাথে সাথে তাদেরও পূজা করত এবং তাদের নিকট প্রার্থনা করত। সুতরাং মানুষ কেন ভাবল যে, তাদেরকে আল্লাহ্‌ তাআলার ইবাদতের সাথে সাথে এই সমস্ত ধর্মনিষ্ঠ লোকদের পূজা করতে হবে?

এ বিষয়ে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

 وَقَالُواْ لَا تَذَرُنَّ ءَالِهَتَكُمۡ وَلَا تَذَرُنَّ وَدّٗا وَلَا سُوَاعٗا وَلَا يَغُوثَ وَيَعُوقَ وَنَسۡرٗا

তারা বলেছে, তোমরা নিজেদের দেবদেবীদের কোন অবস্থায় পরিত্যাগ করো না৷ আর ওয়াদ, সুওয়া, ইয়াগুস, ইয়াউক এবং নাসরকেও পরিত্যাগ করো না  সুরা নুহ : ২৩

সহিহ হাদিসে এসেছে,-

ইবনু আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যে প্রতিমার পূজা নূহ (আ.) এর জাতির মাঝে প্রচলিত ছিল, পরবর্তী সময়ে আরবদের মাঝেও তার পূজা প্রচলিত হয়েছিল। ওয়াদ ’দুমাতুল জান্দাল’ নামক স্থানে অবস্থিত কালব গোত্রের একটি দেবমূর্তি, সূওয়া’আ হল হুযাইল গোত্রের একটি দেবমূর্তি এবং ইয়াগুস ছিল মুরাদ গোত্রের, অবশ্য পরে তা গাতীফ গোত্রের হয়ে যায়। এর আস্তানা ছিল কওমে সাবার নিকটে ’জাওফ’ নামক স্থানে। ইয়াউক ছিল হামাদান গোত্রের দেবমূর্তি, নাসর ছিল যুলকালা গোত্রের হিমযায় শাখারদের মূর্তি। নূহ (আ.) এর জাতির কতিপয় নেক লোকের নাম নাসর ছিল। তারা মারা গেলে, শয়তান তাদের জাতির লোকদের হৃদয়ে এই কথা ঢুকিয়ে দিল যে, তারা যেখানে বসে মজলিস করত, সেখানে তোমরা কিছু মূর্তি স্থাপন কর এবং ঐ সকল নেক লোকের নামানুসারেই এগুলোর নামকরণ কর। সুতরাং তারা তাই করল, কিন্তু তখনও ঐসব মূর্তির পূজা করা হত না। তবে মূর্তি স্থাপনকারী লোকগুলো মারা গেলে এবং মূর্তিগুলো সম্পর্কে সত্যিকারের জ্ঞান বিলুপ্ত হলে লোকজন তাদের পূজা করতে শুরু করে দেয়। সহিহ বুখারি : ৪৯২০

সুরা নূহের এই আয়াতের ব্যাখ্যায় তাফসিরে তাফহিমুল কুরআনে বলা হয়:

নূহের কওমের উপাস্যদের দেবীদের মধ্য থেকে এখানে সেসব দেব-দেবীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে পরবর্তীকালে মক্কাবাসীরা যাদের পূজা করতে শুরু করেছিল এবং ইসলামের প্রাথমিক যুগে আরবের বিভিন্ন স্থানে তাদের মন্দির ও বর্তমান ছিল। এটা অসম্ভব নয় যে, মহা প্লাবনে যেসব লোক রক্ষা পেয়েছিল পরবর্তী বংশধরগণ তাদের মুখ থেকে নূহ (আ.) এর জাতির প্রাচীন উপাস্য দেব-দেবীদের নাম শুনেছিল এবং পরে তাদের বংশধরদের নতুন করে জাহেলিয়াত ছড়িয়ে পড়লে তারা সেসব -দেব-দেবীর প্রতিমা তৈরী করে তাদের পূজা অর্চন শুরু করেছিল।

ওয়াদ্দঃ ‘ওয়াদ্দ’ ছিল ‘কুদাআ’ গোত্রের ‘বনী কালব ইবনে দবরা’ শাখার উপাস্য দেবতা। ‘দামাতুল জানদাল’ নামক স্থানে তারা এর বেদী নির্মাণ করে রেখেছিল। আরবের প্রাচীন শিলা লিপিতে তার নাম ‘ওয়াদ্দম আবাম’(ওয়াদ্দ বাপু) উল্লেখিত আছে। কালবীর মতে তার মূর্তি ছিল এক বিশালদেহী পুরুষের আকৃতিতে নির্মিত। কুরাইশরাও তাকে উপাস্য দেবতা হিসেবে মানতো। তাদের কাছে এর নাম ছিল ‘উদ্দ’। তার নামানুসারে ইতিহাসে ‘আবদে উদ্দ’ নামে এক ব্যক্তির উল্লেখ দেখা যায়।

সুওয়াঃ ‘সুওয়া’ ছিল হুযাইল গোত্রের দেবী। তার মুর্তি ছিল নারীর আকৃতিতে তৈরী। ইয়াম্বুর সন্নিকটেস্থ রুহাত নামক স্থানে তার মন্দির ছিল।

ইয়াগুসঃ ‘ইয়াগুস’ ছিল তায় গোত্রের আনউম শাখায় এবং মাযহিজ গোত্রের কোন কোন শাখার উপাস্য দেবতা। ‘মাযহিজে’র শাখা গোত্রের লোকেরা ইয়ামান ও হিজাযের মধ্যবর্তী জুরাশ নামক স্থানে তার সিংহাকৃতির মূর্তি স্থাপন করে রেখেছিল। কুরাইশ গোত্রেরাও কোন কোন লোকের নাম আবদে ইয়াগুস ছিল বলে দেখা যায়।

ইয়াউকঃ  ‘ইয়াউক’ ইয়ামানের হামদান অঞ্চলের অধিবাসী হামদান গোত্রের খাওয়ান শাখার উপাস্য দেবতা ছিল এর মূর্তি ছিল ঘোড়ার আকৃতির।

নাসরঃ  ‘নাসর’ ছিল হিমইয়ার অঞ্চলের হিমইয়র গোত্রের আলে যুল-কুলা শাখার দেবতা। বালখা নামক স্থানে তার মূর্তি ছিল। এ মূর্তির আকৃতি ছিল শকুনের মত। সাবার প্রাচীন শিলালিপিতে এর নাম উল্লেখিত হয়েছে নাসূর। এর মন্দিরকে লোকেরা বায়তে নাসূর বা নাসূরের ঘর এবং এর পূজারীদের আহলে নাসূর বা নাসূরের পূজারী বলতো। প্রাচীন মন্দিরসমূহের যে ধ্বংসাবশেষ আরব এবং তার সন্নিহিত অঞ্চলসমূহে পাওয়া যায় সেসব মন্দিরের অনেকগুলোর দরজায় শকুনের চিত্র খোদিত দেখা যায়।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

 مَا تَعۡبُدُونَ مِن دُونِهِۦۤ إِلَّآ أَسۡمَآءً۬ سَمَّيۡتُمُوهَآ أَنتُمۡ وَءَابَآؤُڪُم مَّآ أَنزَلَ ٱللَّهُ بِہَا مِن سُلۡطَـٰنٍ‌ۚ إِنِ ٱلۡحُكۡمُ إِلَّا لِلَّهِ‌ۚ أَمَرَ أَلَّا تَعۡبُدُوٓاْ إِلَّآ إِيَّاهُ‌ۚ ذَٲلِكَ ٱلدِّينُ ٱلۡقَيِّمُ وَلَـٰكِنَّ أَڪۡثَرَ ٱلنَّاسِ لَا يَعۡلَمُونَ (٤٠)

তাকে বাদ দিয়ে তোমরা যাদের বন্দেগী করছো তারা শুধুমাত্র কতকগুলো নাম ছাড়া আর কিছুই নয়, যে নামগুলো তোমরা ও তোমাদের পিতৃপুরুষরা রেখেছো, আল্লাহ এগুলোর পক্ষে কোন প্রমাণ পাঠাননি৷ শাসন কর্তৃত্ব আল্লাহ ছাড়া আর কারোর নেই৷ তাঁর হুকুমতোমরা তাঁর ছাড়া আর কারোর বন্দেগী করবে না৷ এটিই সরল সঠিক জীবন পদ্ধতি, কিন্তু অধিকাংশ লোক জানে না৷ সুরা ইউসুফ : ৪০

আল্লাহর একত্ববাদকে অপসারণ করার কুট কৌশর হিসাবে শয়তায় মুর্তিকে ব্যাবহার করেছিল। এবং পৃথিবীতে শিরকের সুচনা হয়ে ছিল। এই মূর্তির মাধ্যমে, এ বিষয়টি এখানে পরিষ্কারভাবে ফুটে উঠেছে। সুতরাং শিরক হচ্ছে মূর্তি অপসংস্কৃতিরই ফসল। মূর্তি যে নামেই হোক, যে উদ্দেশ্যেই হোক তা জঘন্য শিরকেরই অংশ। কোনো বিখ্যাত ব্যক্তির ধরে রাখা প্রভৃতি যে কোনো উপলক্ষেই মূর্তি হোক না কেন, এটি জাজ্বল্য শিরক। ইসলাম মূর্তি সংস্কৃতির সাথে কখনো আপোষ করেনি। (ড. প্রশ্নোত্তরে তাওহীদ, ড. ইব্রাহীম ইবন সালেহ আল-খুদ্বায়রী)।

মূর্তিপুজকরা আল্লাহ্‌র পরিবর্তে কিছু সৃষ্টিকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করে। তারা আল্লাহ্‌র সাথে সাথে তাদেরও পূজা করে, তাদের নিকট প্রার্থনা করে, তাদের উপর প্রত্যাশা রাখে, তাদেরকে ভয় করে, তাদের জন্য উৎসর্গ করে ও বলিদান দেয়, অতঃপর তারা দাবি করে যে, এই সমস্ত অলীদের উপাসনা করলে তারা তাদেরকে আল্লাহ্‌ তাআলার সান্নিধ্যে এনে দেবে। তারা তাদের এবং আল্লাহ্‌ তাআলার মাঝে সুপারিশকারীর কাজ করবে।

আল্লাহ্‌ তাআলা বলছেন।

 إِنَّآ أَنزَلۡنَآ إِلَيۡكَ ٱلۡڪِتَـٰبَ بِٱلۡحَقِّ فَٱعۡبُدِ ٱللَّهَ مُخۡلِصً۬ا لَّهُ ٱلدِّينَ (٢) أَلَا لِلَّهِ ٱلدِّينُ ٱلۡخَالِصُ‌ۚ وَٱلَّذِينَ ٱتَّخَذُواْ مِن دُونِهِۦۤ أَوۡلِيَآءَ مَا نَعۡبُدُهُمۡ إِلَّا لِيُقَرِّبُونَآ إِلَى ٱللَّهِ زُلۡفَىٰٓ إِنَّ ٱللَّهَ يَحۡكُمُ بَيۡنَهُمۡ فِى مَا هُمۡ فِيهِ يَخۡتَلِفُونَ‌ۗ إِنَّ ٱللَّهَ لَا يَهۡدِى مَنۡ هُوَ كَـٰذِبٌ۬ ڪَفَّارٌ۬ (٣) 

আমি এই কিতাব তোমার উপর অবতীর্ণ করেছি সত্যতা সহকারে, সুতরাং তুমি আল্লাহ্‌র ইবাদত করো তাঁর আনুগত্যে বিশুদ্ধচিত্ত হয়ে নিশ্চয়ই দ্বিন, ইবাদত ও আনুগত্য কেবল আল্লাহ্‌র জন্য কিন্তু যারা আল্লাহ ব্যতীত অন্যদেরকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করে, (তারা বলে 🙂 আমরা তো এদের এজন্যই পূজা করি যে, এরা আমাদেরকে আল্লাহ্‌র সান্নিধ্যে এনে দেবে তারা যে বিষয়ে নিজেদের মধ্যে মতভেদ করেছে আল্লাহ্‌ তাআলা তার ফায়সালা করে দেবেন যারা মিথ্যাবাদী ও কাফির, আল্লাহ্‌ তাআলা তাদেরকে সৎপথ প্রদর্শন করেন না সুরা যুমার :

২। ইব্রাহীম (আ.) এর পূর্ব পুরুষগনের মধ্যে মূর্তিপূজার প্রচলন ছিল 

ইব্রাহীম (আ.) এর পূর্ব পুরুষগন মূর্তিপূজারি ছিলেন। ইব্রাহীম (আ.) নবুয়ত লাভ করার পর শিরক ও তাওহীদের বিষয় নিয়ে তাঁর নিজের পরিবার ও সম্প্রদদায়ের সাথে সংঘাত শুরু হয়েছিল। কারণ তার পিতা আজর এবং তার সম্প্রদদায়ের লোকজন মূর্তি পূজারি ছিলেন। এই জন্য  ইব্রাহীম (আ.) কে মূর্তি পূজার মত শির্কারীদের মোকাবেলা করতে হয়। মুশরিকদের সাথে সংঘাতের কারণে তাকে নিজের বাপ, পরিবার, জাতি ও দেশ সবকিছু ত্যাগ করে সিরিয়া, ফিলিস্তিন এবং হিজাযে প্রবাসীর জীবন যাপন করতে হয়েছিল। তাই আল্লাহ বার বার কুরআন মজীদ বিভিন্ন জায়গায় বলেছেন, ইব্রাহীম (আ.) যে দ্বীন নিয়ে এসেছিলেন তা ছিল একেবারে তাওহীদপূর্ণ নির্ভেজাল দ্বীন। আর মুহাম্মাদ ﷺও সেই একই দ্বীন নিয়ে এসেছেন। ইব্রাহীম আলাইহিস সালামের পূর্ব পুরুষগন মুশরিক ছিলেন আর তিনি ছিলেন একনিষ্ট মুসলিম। এটাই সত্য ইতিহাস যার প্রমান কুরআনের এই আয়াত। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

مَا كَانَ إِبۡرَٲهِيمُ يَہُودِيًّ۬ا وَلَا نَصۡرَانِيًّ۬ا وَلَـٰكِن كَانَ حَنِيفً۬ا مُّسۡلِمً۬ا وَمَا كَانَ مِنَ ٱلۡمُشۡرِكِينَ (٦٧)  إِنَّ أَوۡلَى ٱلنَّاسِ بِإِبۡرَٲهِيمَ لَلَّذِينَ ٱتَّبَعُوهُ وَهَـٰذَا ٱلنَّبِىُّ وَٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ‌ۗ وَٱللَّهُ وَلِىُّ ٱلۡمُؤۡمِنِينَ (٦٨) 

ইবরাহীম ইহুদী ছিল না, খৃস্টানও ছিল না বরং সে তো ছিল একজন একনিষ্ঠ মুসলিম এবং সে কখনো মুশরিকদের অন্তরভুক্ত ছিল না ৷ ইবরাহীমের যারা অনুসরণ করেছে তারাই তার সাথে ঘনিষ্ঠতম সম্পর্ক রাখার অধিকারী আর এখন এই নবী এবং এর ওপর যারা ঈমান এনেছে তারাই এই সম্পর্ক রাখার বেশী অধিকারী৷ আল্লাহ কেবল তাদেরই সমর্থক ও সাহায্যকারী যারা ঈমান এনেছে৷ সুরা আল ইমরান : ৬৭৬৮

 আরবের লোকেরা বিশেষভাবে কুরাইশরা নিজেদেরকে ইব্রাহীম (আ.) এর অনুসারী মনে করতো। আর তারা দাবি করত ইব্রাহীম (আ.) এর ধর্মের উপর তারাই টিকে আছে। মূর্তি পূজাকে তারা ইব্রাহীম আলাইহিস সালামের আনিত ধর্ম মনে করত। অথচ তিনি মূর্তি পূজারি মুশরিক ছিলেন না।আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

 وَٱتۡلُ عَلَيۡهِمۡ نَبَأَ إِبۡرَٲهِيمَ (٦٩) إِذۡ قَالَ لِأَبِيهِ وَقَوۡمِهِۦ مَا تَعۡبُدُونَ (٧٠) قَالُواْ نَعۡبُدُ أَصۡنَامً۬ا فَنَظَلُّ لَهَا عَـٰكِفِينَ (٧١) قَالَ هَلۡ يَسۡمَعُونَكُمۡ إِذۡ تَدۡعُونَ (٧٢) أَوۡ يَنفَعُونَكُمۡ أَوۡ يَضُرُّونَ (٧٣) قَالُواْ بَلۡ وَجَدۡنَآ ءَابَآءَنَا كَذَٲلِكَ يَفۡعَلُونَ(٧٤)قَالَ أَفَرَءَيۡتُم مَّا كُنتُمۡ تَعۡبُدُونَ (٧٥) أَنتُمۡ وَءَابَآؤُڪُمُ ٱلۡأَقۡدَمُونَ (٧٦)

আর তাদেরকে ইবরাহীমের কাহিনী শুনিয়ে দাও যখন সে তার বাপ তার সম্প্রদায়কে জিজ্ঞেস করেছিল, তোমরা কিসের পূজা করো? তারা বলল, আমরা কতিপয় মূর্তির পূজা করি এবং তাদের সেবায় আমরা নিমগ্ন থাকি৷ সে জিজ্ঞেস করলো, তোমরা যখন তাদেরকে ডাকো তখন কি তারা তোমাদের কথা শোনে? অথবা তোমাদের কি কিছু উপকার বা ক্ষতি করে? তারা জবাব দিল না, বরং আমরা নিজেদের বাপদাদাকে এমনটিই করতে দেখেছি৷ কথায় ইবরাহীম বললো, কখনো কি তোমরা (চোখ মেলে), সেই জিনিসগুলো দেখেছো যাদের বন্দেগী তোমরা এবং তোমাদের অতীত পূর্বপুরুষেরা করতে অভ্যস্ত? সুরা আশ শুয়ারা : ৬৯-৭৬

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আরও ইরশাদ করেন-

 وَإِبۡرَٲهِيمَ إِذۡ قَالَ لِقَوۡمِهِ ٱعۡبُدُواْ ٱللَّهَ وَٱتَّقُوهُ‌ۖ ذَٲلِڪُمۡ خَيۡرٌ۬ لَّكُمۡ إِن ڪُنتُمۡ تَعۡلَمُونَ (١٦) إِنَّمَا تَعۡبُدُونَ مِن دُونِ ٱللَّهِ أَوۡثَـٰنً۬ا وَتَخۡلُقُونَ إِفۡكًا‌ۚ إِنَّ ٱلَّذِينَ تَعۡبُدُونَ مِن دُونِ ٱللَّهِ لَا يَمۡلِكُونَ لَكُمۡ رِزۡقً۬ا فَٱبۡتَغُواْ عِندَ ٱللَّهِ ٱلرِّزۡقَ وَٱعۡبُدُوهُ وَٱشۡكُرُواْ لَهُ ۥۤ‌ۖ إِلَيۡهِ تُرۡجَعُونَ (١٧)

আর ইবরাহীমকে পাঠাই, যখন সে তার সম্প্রদায়কে বলে, আল্লাহর বন্দেগী করো এবং তাঁকে ভয় করো৷ এটা তোমাদের জন্য ভালো যদি তোমরা জানো৷ তোমরা আল্লাহকে বাদ দিয়ে যাদেরকে পূজা করছো তারাতো নিছক মূর্তি আর তোমরা একটি মিথ্যা তৈরি করছো৷ আসলে আল্লাহকে বাদ দিয়ে যাদেরকে তোমরা পূজা করো তারা তোমাদের কোন রিযিকও দেবার ক্ষমতা রাখে না, আল্লাহর কাছে রিযিক চাও, তাঁরই বন্দেগী করো এবং তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো, তারই দিকে তোমাদের ফিরে যেতে হবে৷  সুরা আকাবুত : ১৬১৭

ইব্রাহীম (আ.) মূর্তি পূজারি পূর্বপূরুষদের শিরকি কাজ থেকে তার সন্তানদেরকে বাচানোর জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করেন।  আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

وَإِذۡ قَالَ إِبۡرَٲهِيمُ رَبِّ ٱجۡعَلۡ هَـٰذَا ٱلۡبَلَدَ ءَامِنً۬ا وَٱجۡنُبۡنِى وَبَنِىَّ أَن نَّعۡبُدَ ٱلۡأَصۡنَامَ (٣٥) 

স্মরণ কর সেই সময়ের কথা যখন ইবরাহীম দোয়া করছিল, হে আমার রব! শহরকে নিরাপত্তার শহরে পরিণত করো এবং আমার আমার সন্তানদেরকে মূর্তিপূজা থেকে বাঁচাও৷ সুরা ইব্রাহীম : ৩৫

উপরের আলোচনা তেকে একথা স্পষ্ট যে, ইব্রাহীম (আ.) এর পূর্ব পুরুষগনের মধ্যে মূর্তিপূজার প্রচলন ছিল।  

৩। বনী ইসরাঈল গোবৎস পূজার মাধ্যমে তাদের মধ্যে পুজার সুচনা করে

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

 قَالَ مُوسَىٰ لِقَوۡمِهِ ٱسۡتَعِينُواْ بِٱللَّهِ وَٱصۡبِرُوٓاْ‌ۖ إِنَّ ٱلۡأَرۡضَ لِلَّهِ يُورِثُهَا مَن يَشَآءُ مِنۡ عِبَادِهِۦ‌ۖ وَٱلۡعَـٰقِبَةُ لِلۡمُتَّقِينَ

অর্থ: বনী ইসরাঈলকে আমি সাগর পার করে দিয়েছি৷ তারপর তারা চলতে চলতে এমন একটি জাতির কাছে উপস্থিত হলো যারা নিজেদের কতিপয় মূর্তির পূজায় লিপ্ত ছিল বনী ইসরাঈল বলতে লাগলো, হে মূসা! এদের মাবূদের মত আমাদের জন্যো একটা মাবূদ বানিয়ে দাও মূসা বললো, তোমরা বড়ই অজ্ঞের মত কথা বলছো৷ (সুরা আরাফ ৭:১৩৮)

মহান আল্লাহ্‌ তাআলা বলছেন,

 وَإِذۡ وَٲعَدۡنَا مُوسَىٰٓ أَرۡبَعِينَ لَيۡلَةً۬ ثُمَّ ٱتَّخَذۡتُمُ ٱلۡعِجۡلَ مِنۢ بَعۡدِهِۦ وَأَنتُمۡ ظَـٰلِمُونَ  

(স্মরণ কর) যখন মূসার জন্য চল্লিশ রাত্রি নির্ধারিত করেছিলাম, তখন তার প্রস্থানের পর তোমরা গোবৎসকে (উপাস্যরূপে) গ্রহণ করেছিলে, বাস্তবে তোমরা ছিলে অনাচারী (বাকারা:৫১)

ফিরআউন-সম্প্রদায়ের কবল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর বানী-ইস্রাঈলেরা ‘সীনা’ (সিনাই) নামক উপদ্বীপে পৌঁছে ছিল। সেখানে মহান আল্লাহ মূসা (আঃ)-কে তাওরাত দেওয়ার লক্ষ্যে চল্লিশ রাতের জন্য ত্বূর পাহাড়ে ডেকেছিলেন। মূসা (আ.) এর যাওয়ার পর বানী-ইস্রাঈলেরা সামেরীর চক্রান্তে গো-বৎস পূজা শুরু করে দিয়েছিল। মুসা (আ.) গো-বৎস পূজার কারণ জানতে চাইলে। বানী-ইস্রাঈলেরা উত্তর দিল (কুরআসের ভাষায়)।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

 قَالُواْ مَآ أَخۡلَفۡنَا مَوۡعِدَكَ بِمَلۡكِنَا وَلَـٰكِنَّا حُمِّلۡنَآ أَوۡزَارً۬ا مِّن زِينَةِ ٱلۡقَوۡمِ فَقَذَفۡنَـٰهَا فَكَذَٲلِكَ أَلۡقَى ٱلسَّامِرِىُّ

ওরা বলল, ‘আমরা তোমার সাথে কৃত অঙ্গীকার স্বেচ্ছায় ভঙ্গ করিনি বরং আমাদেরকে সম্প্রদায়ের অলঙ্কারের ভার বহন করতে দেওয়া হয়েছিল, পরে আমরা তা আগুনে নিক্ষেপ করেছিলাম; অতঃপর সামেরীও ঐরূপ নিক্ষেপ করেছিল  সুরা ত্বহা : ৮৭

সেই সময়ের মিসরের রীতি অনুযায়ী নারী পুরুষেরা সকলে ভারী গহনা পরত। এবং তা তাদের মরুচারী জীবনের  জন্য বোঝায় পরিণত হয়েছিল, অবশ্য অনেক তাফসির কারক এ অজুহাতকে ইসরাঈলিদের বাহানা বলছেন। তাছাড়া তাফসিরে ইবনে কাসিরের মতে, এই অলংকারগুল বনী ইসরাঈলেরা ঈদের বাহানায় কিবতিদের কাছ থেকে ধার করে ছিল। অলংকারগুলো তাদের ফেরত দেয়া কর্তব্য ছিলো। তাই হারুন (আ.) সকল কে তাদের দোষ মুক্তির জন্য অলংকারগুলোকে মাটির গভির গর্তে ফেরার নির্দেষ দেন। এ সময় সামেরী মুষ্টি বদ্ধকরে এসে হারুন (আ.) বলে, আপনি যদি আল্লাহর কাছে আমার মনোবাঞ্চনা পুরন করার জন্য  দোয়া করেন তবেই আমি হাতের বস্তু নিক্ষেপ করব। সামেলির কুট কৌশল হারুন (আ.) বুঝতে পারেনি এবং তার জন্য দোয়া করলেন। সে তার হাতে রাখা মাটি নিক্ষেপ করল যা সে সংগ্রহ করে ছিল, জিব্রাঈল (আ.) এর ঘোড়ার পায়ের নিচ থেকে। সামেরি মাটি নিক্ষেপ করার সাথে সাথে তার মনোবাঞ্চনা মত একটি গো-বৎস রূপি মুর্তি  তৈরি হয়। সামেরী ছিল একজন ফিতনাবাজ ব্যক্তি। সে ভালোভাবে ভেবেচিন্তে ধোকা ও প্রতারণার একটি বিরাট পরিকল্পনা তৈরী করেছিল। সে কেবল একটি সোনার বাছুর তৈরী করে নি বরং কোন কৌশলে তার মধ্যে থেকে হামবা রব সৃষ্টি করে দেয়। সমগ্র ইসরাঈলিদের জাতির অজ্ঞ ও নির্বোধ লোকদের প্রতারিত করল।

বনী ইসরাঈলদের বুঝাল যে, মুসা বহু দিন হলো ইসরাঈলীদের ত্যাগ করে তূর পর্বতে গেছেন। সেখানে মুসা মিথ্যাই ঘুরে বেড়াচ্ছেন উপাস্যের সন্ধানে। তার সত্যিকারের উপাস্য আছে এখানে সোনার তৈরী গো-বৎসে। এরূপই একটি ভাষণ দিয়েছিলো সামিরী ও তার অনুসারীরা। কিন্তু তাদের এই প্ররোচনাকে অনেকেই মেনে নেন। তারা সর্বশক্তিমান অল্লাহ্‌র বিভিন্ন ক্ষমতার সাক্ষী, তবুও তারা সেই সর্বশক্তিমানের এবাদত ত্যাগ করে মূর্তি পূঁজাতে অধিক আগ্রহী হল। এবং তাদের আল্লাহ্‌ সামিরীর দ্বারা মূর্তি পূঁজার দিকে প্রলোভিত করেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

فَأَخۡرَجَ لَهُمۡ عِجۡلاً۬ جَسَدً۬ا لَّهُ ۥ خُوَارٌ۬ فَقَالُواْ هَـٰذَآ إِلَـٰهُڪُمۡ وَإِلَـٰهُ مُوسَىٰ فَنَسِىَ  

এবং আমরা স্রেফ সেগুলো ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিলাম৷ তারপর এভাবে সামেরীও কিছু ছুঁড়ে ফেললো এবং তাদের একটি বাছুরের মূর্তি বানিয়ে নিয়ে এলো, যার মধ্যে থেকে গরুর মতো আওয়াজ বের হতো৷ লোকেরা বলে উঠলো, “ই তোমাদের ইলাহ এবং মূসারও ইলাহ, মূসা একে ভুলে গিয়েছে সুরা ত্বহা : ৮৮

যারা সামেরীর ফিতনায় জড়িয়ে পড়েছিল এটি ছিল তাদের ওজর। তাদের বক্তব্য ছিল, আমরা অলংকার ছুঁড়ে দিয়েছিলাম। বাছুর তৈরী করার নিয়ত আমাদের ছিল না বা তা দিয়ে কি করা হবে তাও আমাদের জানা ছিল না। এরপর যা কিছু ঘটেছে তা আসলে এমন ব্যাপারই ছিল যে, সেগুলো দেখে আমরা স্বতস্ফূর্তভাবে শিরকে লিপ্ত হয়ে গেছি। আর এই স্বতস্ফূর্তভাবে শিরকে লিপ্ত হওয়া মহা অন্যায়। মূসা (আ.) গো-বৎস পূজায় নেতৃত্ব দানকারী হঠকারী লোকদের মৃত্যুদন্ড দিলেন। যেমন আল্লাহ বলেন, ‘আর যখন মূসা তার সম্প্রদায়কে বলল,

وَإِذۡ قَالَ مُوسَىٰ لِقَوۡمِهِۦ يَـٰقَوۡمِ إِنَّكُمۡ ظَلَمۡتُمۡ أَنفُسَڪُم بِٱتِّخَاذِكُمُ ٱلۡعِجۡلَ فَتُوبُوٓاْ إِلَىٰ بَارِٮِٕكُمۡ فَٱقۡتُلُوٓاْ أَنفُسَكُمۡ ذَٲلِكُمۡ خَيۡرٌ۬ لَّكُمۡ عِندَ بَارِٮِٕكُمۡ فَتَابَ عَلَيۡكُمۡ‌ۚ إِنَّهُ ۥ هُوَ ٱلتَّوَّابُ ٱلرَّحِيمُ (٥٤)

হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা গোবৎসকে উপাস্য নির্ধারণ করে নিজেদের উপরে যুলুম করেছ অতএব এখন তোমাদের প্রভুর নিকটে তওবা কর এবং নিজেদেরকে পরস্পরে হত্যা কর এটাই তোমাদের জন্য তোমাদের স্রষ্টার নিকটে কল্যাণকর। সুরা বাকারা :  ৫৪

এভাবে তাদের কিছু লোককে হত্যা করা হয়, কিছু লোক ক্ষমাপ্রাপ্ত হয়। আল্লাহ্‌ তাদের শুধু মাত্র এক আল্লাহ্‌র উপাসনা আদেশ দান করেছেন। কিন্তু ইহুদীরা সেই আদেশকে অমান্য করে গোবৎসের হাম্বা রবের প্রতি অধিক মনোযোগী হয়। এ কথা তাদের চিন্তায় আসে নাই যে গোবৎসের পূঁজা একটি প্রতারণা মাত্র। গো বৎসের এই মূর্তি ভালো বা মন্দ করার কোনও ক্ষমতাই রাখে না। আল্লাহ্‌ হচ্ছেন সমস্ত বিশ্বভূবনের পালনকর্তা, রক্ষাকর্তা। যার দয়া ও করুণা অপরসীম, যার ক্রোধ ভয়াবহ।  মানুষ কতই না বাস্তববাদী যে, মহান আল্লাহর মহিমার কত বৃহৎ বৃহৎ নিদর্শনাবলী দেখা সত্ত্বেও এবং তাঁর নবী (মূসা এবং হারুন (আ.)) তাদের মাঝে বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও গোবৎসকে নিজেদের উপাস্য মনে করে নিলো। বর্তমানে মুসলমানরাও শির্কী আক্বীদা-বিশ্বাস ও কার্যকলাপে লিপ্ত রয়েছে। কিন্তু তারা মনে মনে ভাবে, মুসলিম মুশরিক কিভাবে হয়? এই মুসলিম মুশরিকরা শিরককে কেবল পাথরের মূর্তি পূজার সাথে নির্দিষ্ট করে দিয়েছে। তারাই নাকি শুধু মুশরিক। অথচ এই নামমাত্র মুসলিম কবরের গম্বুজের সাথে তাই করে, যা প্রতিমা-পূজারী নিজের মূর্তির সাথে করে থাকে।

৪। আরবে মূর্তিপূজার সুচনা:

প্রাক ইসলামিক যৃগে আরবের মানুষেরা এক আল্লহতে বিশ্বাস করত কিন্তু তারা বিভিন্ন দেবদেবীর মুর্তির পুজা করত।  বিশেষ করে মক্কার চারপাশের সবাই মুর্তিপুজা লিপ্ত ছিল। তারা আল্লাহ কে সৃষ্টিকর্তা হিসাবে বিশ্বাস করার পরও মূর্তিপূজার লিপ্ত থাকার কারণ হিসাবে তারা বলত, এই মূর্তিপূজার সাহায্যে তারা আল্লাহর নিকটবর্তী হবে অর্থাৎ এরা আল্লাহর নিকট সুপারিশ করবে।আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

 أَلَا لِلَّهِ ٱلدِّينُ ٱلۡخَالِصُ‌ۚ وَٱلَّذِينَ ٱتَّخَذُواْ مِن دُونِهِۦۤ أَوۡلِيَآءَ مَا نَعۡبُدُهُمۡ إِلَّا لِيُقَرِّبُونَآ إِلَى ٱللَّهِ زُلۡفَىٰٓ إِنَّ ٱللَّهَ يَحۡكُمُ بَيۡنَهُمۡ فِى مَا هُمۡ فِيهِ يَخۡتَلِفُونَ‌ۗ إِنَّ ٱللَّهَ لَا يَهۡدِى مَنۡ هُوَ كَـٰذِبٌ۬ ڪَفَّارٌ۬

সাবধান! একনিষ্ঠ ইবাদাত কেবল আল্লাহরই প্রাপ্য৷  যারা তাঁকে ছাড়া অন্যদেরকে অভিভাবক বানিয়ে রেখেছে (আর নিজেদের কাজের কারণ হিসেবে বলে যে,) আমরা তো তাদের ইবাদাত করি শুধু এই কারণে যে, সে আমাদেরকে আল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দেবে (সুপারিশ করবে)  আল্লাহ নিশ্চিতভাবেই তাদের মধ্যকার সে সব বিষয়ের ফায়সালা করে দেবেন যা নিয়ে তারা মতভেদ করছিলো৷ আল্লাহ এমন ব্যক্তিকে হিদায়াত দান করেন না, যে মিথ্যাবাদী হক অস্বীকারকারী৷ (সুরা জুমার৩৯:০৩)

মহান আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন:

 وَيَعۡبُدُونَ مِن دُونِ ٱللَّهِ مَا لَا يَضُرُّهُمۡ وَلَا يَنفَعُهُمۡ وَيَقُولُونَ هَـٰٓؤُلَآءِ شُفَعَـٰٓؤُنَا عِندَ ٱللَّهِ‌ۚ قُلۡ أَتُنَبِّـُٔونَ ٱللَّهَ بِمَا لَا يَعۡلَمُ فِى ٱلسَّمَـٰوَٲتِ وَلَا فِى ٱلۡأَرۡضِ‌ۚ سُبۡحَـٰنَهُ ۥ وَتَعَـٰلَىٰ عَمَّا يُشۡرِكُونَ

আর তারা আল্লাহ্‌র পরিবর্তে এমন বস্তুসমূহের উপাসনা করে যারা তাদের কোনো অপকার করতে পারে না এবং উপকারও করতে পারে না, আর তারা বলে : এরা তো আল্লাহ্‌র নিকট আমাদের সুপারিশকারী তুমি বলে দাও : তোমরা কি আল্লাহ্‌কে আকাশমণ্ডলি ও পৃথিবীর এমন কিছু সংবাদ দিচ্ছ যা তিনি অবগত নন ? আল্লাহ্‌ তাদের মুশরিকি কার্যকলাপ হতে অনেক উর্ধ্বে  সূরা ইউসুফ : ১৮

 এই দুটি আয়াতে আল্লাহ্‌ তাআলা আমাদেরকে জানিয়ে দেন যে, মূর্তিপুজকরা আল্লাহর পরিবর্তে কিছু সৃষ্টিকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করে। তারা আল্লাহ্‌র সাথে সাথে তাদেরও পূজা করে, তাদের নিকট প্রার্থনা করে, তাদের উপর প্রত্যাশা রাখে, তাদেরকে ভয় করে, তাদের জন্য উৎসর্গ করে ও বলিদান দেয়, অতঃপর তারা দাবি করে যে, এই সমস্ত ওয়ালিদের উপাসনা করলে তারা তাদেরকে আল্লাহ্‌ তাআলার সান্নিধ্যে এনে দেবে। তারা তাদের এবং আল্লাহ্‌ তাআলার মাঝে সুপারিশকারীর কাজ করবে।

        তারা নবী ইব্রাহিম (আ.) ও ইসমাইল (আ.) এর আনিত ধর্মে বা মিল্লাত বিশ্বাস করত, এবং কা’বার তাওয়াফ করা, হজ্জ করা, হাজিদের পানব পান করান, ইবাদতের অংশ মনে করত। বিপদে মহান আল্লাহর সাহায্য কামনা করত। কিন্তু কালের পরিক্রমায়ে তারা ইব্রাহিম (আ.) ও ইসমাইল (আ.) এর মূল শিক্ষা বা আকীদা ভুলে যায়।  তাদের প্রবর্তিত কিছু প্রথা বিকৃত রূপে তারা পালন করত। ইব্রাহিম (আ.) ও ইসমাইল (আ.) এর মৃত্যুর আনুমানিক ৫০০ বছর পরে আরবদের ( বাণী ইসমাইল) মাঝে শিরক এবং মূর্তিপূজার শুরু করে। খুযাই গোত্রের আমর ইবন লুহাই আল খুযাই এর হাত ধরে। ইবন কাসীর এর বর্ণনা অনুসারে, আমর ইবন লুহাই সিরিয়াতে গিয়ে আমালিক গোত্রের সামাজিক, সামরিক এবং অর্থনৈতিক অবস্থা এবং সভ্যতা দেখে মুগ্ধ হয়। এবং তাদের থেকে মুর্তিপুজার ধর্ম আরবে আমদানি করার সিদ্ধান্ত নেয়। সিরিয়া থেকে আমর ইবন লুহাই আমালিকদের থেকে হুবাল নামের মূর্তি নিয়ে এসে কা’বায় স্হাপন করে।মক্কার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দেবতাদের অন্যতম ছিলেন এই হুবাল। কাবায় তাঁর একটি মূর্তি পূজা করা হত। কাবা তাঁর প্রতি উৎসর্গিত ছিল। মক্কার আরব্য পুরাণে তিন প্রধান দেবী ছিলেন লাতউজ্জা ও মানাত। এঁদের প্রত্যেকের নিজস্ব ক্ষেত্র ছিল এবং তাইফের কাছে মূর্তি সহ মন্দিরও ছিল।

আল-লাত:  আরবরা “আল’লাত” মৃত্যু বা পরকালের এর দেবী  বিশ্বাস করত । আল লা’ত কুরায়শদের প্রধানতম দেবী ছিলো এবং তাইফ অঞ্চলে এর মন্দির ছিলো ।

আল-উজ্জা:  ‘আল-উজ্জা বা সর্বশক্তিময়ী’ ছিলেন আরবের উর্বরতার দেবী। যুদ্ধে রক্ষা ও জয়ের জন্য তাঁর কাছে প্রার্থনা করা হত। এই দেবীকে পরিত্রাণকারী বা সাহায্যকারীও বিশ্বাস করত।

মনাত: ছিলেন ভাগ্যের। মনাতের একটি মূর্তি মদিনা ও মক্কার মাঝে কাদাদের আল-মুশাল্লালের কাছে সমুদ্রতীরে নির্মিত হয়েছিল। বানু আউস ও বানু খাজরাজ এবং মক্কা ও মদিনা সহ উক্ত অঞ্চলের কাছাকাছি অবস্থিত এলাকার সবাই মনাতকে শ্রদ্ধা জানাত এবং নিজেদের শিশু সন্তান বলি দিত। (সূত্র: ইন্টারনেট, উইকিপিয়া)।

আয়িশা (রা.) হতে বর্ণিত যে, উম্মু হাবীবা ও উম্মু সালামা (রা.) হাবশায় তাঁদের দেখা একটা গির্জার কথা বলেছিলেন, যাতে বেশ কিছু মূর্তি ছিল। তাঁরা উভয়ে বিষয়টি নবী ﷺ এর নিকট বর্ণনা করলেন। তিনি ইরশাদ করলেনঃ তাদের অবস্থা ছিল এমন যে, কোন সৎ লোক মারা গেলে তারা তার কবরের উপর মাসজিদ বানাতো। আর তার ভিতরে ঐ লোকের মূর্তি তৈরি করে রাখতো। কিয়ামত দিবসে তারাই আল্লাহর নিকট সবচাইতে নিকৃষ্ট সৃষ্টজীব বলে পরিগণিত হবে। সহিহ বুখারি : ৪২৭, সহিহ মুসলিম : ৫২৮,

সমাজে শিরক অনুপ্রবেশেন কারণসমুহ : প্রথম পর্ব (১-৯)

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

উপমহাদেশে অন্যান্য দেশে থেকে শিরকি আকিদা ও আমলের প্রচলিত একটু বেশী। আরবদের মাঝে শিরক ও বিদআতের পরিমাণ খুবই নগণ্য। এর কারণ ইসলাম সম্পর্কে তাদের জ্ঞানের গভীরতা এবং  আমাদের মাঝে শিরকি আমল বেশী হওয়ার কারন আমদের জ্ঞানের সল্পতা। এই কারনে আমাদের অনেক ইবাদত শিরক মিশ্রিত অথচ আমরা জানিনা। আরবা করিছি নেক আমল কিন্তু হচ্ছে শিরক। যেমন- ইবাদত মনে করে মাজারে পশু জবেহ করছি। অথচ হচ্ছে শিরক কাজ। আমাদের মাঝে শিরক অনুপ্রবেশের অন্যতম কারণ উপমহাদেশের অধিকাংশ মানুস সুফি দর্শনে বিশ্বাসি। দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দৌনোতা ও অনেকাংশে দায়ী। যারা ইসলামের প্রচার প্রসারে নিয়োজিত তাদের জ্ঞানের সল্পতা আছে যে কারণে তারা সঠিক দ্বীন প্রদান না করে শিরক মিশ্রিত কিচ্ছা কাহিনি প্রচার করে থাকে। কেউ আমরা সঠিক দ্বিনের খোজ খবরও নেই না, শুধু বাপ দাদার অন্ধ অনুসরণ করছি। কেউ আঙ্গুল দিয়ে সঠিকটি দেখিয়ে দিলে তাকে বেশী বুঝে বলে অপমান করছি। আধুনিক মিডিয়া সব সময় ইসলামের বিপক্ষে তারা শিরকি কাজ কর্ম এমন ভবে প্রচার করে মনে হবে এটাই সঠিক ইসলাম। অথচ কাজটি সম্পূর্ণ ইসলাম বিরোধী। তাছাড়া যার শ্বাসক শ্রেণি আমাদের সংস্কৃতি বলে অনেক সময় শিরকি কাজ করতে বাধ্য করে। এভাবে বিভিন্ন উপায়ে আমাদরে মাঝে শিরকি আকিদা ও আমলে ছেয়ে গেছে। এই পর্যায়ে আমাদের মাঝে শিরক অনুপ্রবেশের কয়েটি কারন উল্লেখ করছি।

১। ইসলাম সম্পর্কে জ্ঞানের অভাব:

শিরকের মুল কারণ এ সম্পর্কে অজ্ঞতা। বর্তমানে সমাজের অধিকাংশ মুসলিমের ইসলাম সম্পর্কে জ্ঞানের এতই অভাব যে, ইসলাম, ঈমান, কুফর, নিফাক, মুনাফেকি, ছোট শিরক, বড় শিরকসহ ইসলামের মৌলিক বিষয় সম্পর্কে কিছুই জানেনা। ইসলামের কৃষ্টি কালচার, বৈশিষ্ট্য ও ঐতিহ্য তো অনেক দুরের ব্যাপার। একজন মুসলিমের জন্য সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ও অধিক প্রয়োজনীয় দিক হল ঈমান আর ঈমানের মূল বিষয় হল তাওহীদ অপর পক্ষে তাওহীদের বিপরীত হল শিরক যা ঈমান ভঙ্গের মূল উপাদান। শিরক সম্পর্কে জ্ঞান না থাকলে, শিরক মুক্ত বিশুদ্ধ ‌আমল কল্পনা করা যায়না। হুদ (আ,) যখন আহক্বাফ বাসিদের আহবান করেছিলন। যখন তারা  নিজেদের অজ্ঞতার কারণে আজাব দাবি করেছিল।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

قَالَ اِنَّمَا الۡعِلۡمُ عِنۡدَ اللّٰہِ ۫ۖ وَاُبَلِّغُکُمۡ مَّاۤ اُرۡسِلۡتُ بِہٖ وَلٰکِنِّیۡۤ اَرٰىکُمۡ قَوۡمًا تَجۡہَلُوۡنَ

সে বলল, ‘এ জ্ঞান একমাত্র আল্লাহর কাছে। আর যা দিয়ে আমাকে পাঠানো হয়েছে, আমি তোমাদের কাছে তাই প্রচার করি, কিন্তু আমি দেখছি, তোমরা এক মূর্খ সম্প্রদায়’। সুরা আহকাফ : ২৩

 ইসলাম সম্পর্কে জ্ঞানের অভাবে শুধু শিরক করবে না আল্লাহর আযাব ও দাবি করতে পারে। এমনকি অসংখ্য অগণিত মুসলিমের অবস্থা এতই নাজুক, তারা কেবলই নামে মাত্র মুসলিম অথবা মুসলিম পরিবারে জন্ম গ্রহণ করছে বলে মুসলিম। শিরক কি তারা তা জানে না। শিরক ও তাওহীদের মধ্যে পার্থক্যও তারা নির্ধারণ করতে পারে না। একজন মুসলমানের জন্য শিরকের ব্যাপারে সুস্পষ্ট জ্ঞান রাখা এবং তা থেকে বেচে থাকা ঈমানি দায়িত্ব। ইসলাম সম্পর্কে জ্ঞানের অভাবে ঈমান থাকার পরও সে কুফরী করবে এবং সে ধ্বংশ হবে।আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

  وَمَنۡ یَّکۡفُرۡ بِالۡاِیۡمَانِ فَقَدۡ حَبِطَ عَمَلُہٗ ۫  وَہُوَ فِی الۡاٰخِرَۃِ مِنَ الۡخٰسِرِیۡنَ 

আর যে ঈমানের সাথে কুফরী করবে, অবশ্যই তার আমল বরবাদ হবে এবং সে আখিরাতে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত। সুরা মায়েদা : ৫

আমল এবং আখলাকের ক্ষেত্রে কিছু ত্রুটি বিচ্যুতি থাকলে, হয়ত তাতে কড়াকড়ি করা নাও হতে পারে। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা তাকে ক্ষমা করিবেন। কিন্তু শিরক মিশ্রিত কোন আমল থাকলে, তা কোনভাবেই মেনে নেয়া হবে না এবং তার যাবতীয় আমল, ও ইবাদত বন্দেগী সবই মূল্যহীন হয়ে পড়ে। এসবের কোন বিনিময় তাকে দেয়া হবে না।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

 وَلَقَدۡ أُوحِيَ إِلَيۡكَ وَإِلَى ٱلَّذِينَ مِن قَبۡلِكَ لَئِنۡ أَشۡرَكۡتَ لَيَحۡبَطَنَّ عَمَلُكَ وَلَتَكُونَنَّ مِنَ ٱلۡخَٰسِرِينَ

আর অবশ্যই তোমার কাছে এবং তোমার পূর্ববর্তীদের কাছে ওহী পাঠানো হয়েছে যে, তুমি শিরক করলে তোমার কর্ম নিষ্ফল হবেই। আর অবশ্যই তুমি ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে। সুরা জুমার : ৬৫

কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হল, বর্তমানে মুসলিমদের অধিকাংশ আমলই শিরক মিশ্রিত।  তারা নামে মাত্র মুসলিমদের কাতারে সামিল। বাস্তবে তাদের অবস্থা খুবই করুণ।

২। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সম্পর্কে জ্ঞানের অভাব

যে ব্যক্তি আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সম্পর্কে সত্যিকারে জ্ঞান রাখে না, সে কি করে, মহান আল্লাহর ক্ষমতা, মান-মর্যাদা, শ্রেষ্ঠত্ব, বড়ত্ব, মহত্ব ইত্যাদি সম্পর্কে অবগত হবে? আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞান না থাকায়, সে তার সমকক্ষ অনেক ইলাহ দাড় করায়। আল্লাহর সমকক্ষ স্থাপনের মাধ্যমে অন্তরে আল্লাহ রাব্বূল আলামীনের বড়ত্ব ও মহত্ব অবশিষ্ট থাকে না, ফলে সে শিরকে লিপ্ত হয়। অজ্ঞ লোকেরা কখনও আল্লাহ রাব্বূল আলামীনকে সম্মান ও মর্জাদা দেখাতে পারে না।আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

يَـٰٓأَيُّهَا ٱلنَّاسُ ضُرِبَ مَثَلٌ۬ فَٱسۡتَمِعُواْ لَهُ ۥۤ‌ۚ إِنَّ ٱلَّذِينَ تَدۡعُونَ مِن دُونِ ٱللَّهِ لَن يَخۡلُقُواْ ذُبَابً۬ا وَلَوِ ٱجۡتَمَعُواْ لَهُ ۥ‌ۖ وَإِن يَسۡلُبۡہُمُ ٱلذُّبَابُ شَيۡـًٔ۬ا لَّا يَسۡتَنقِذُوهُ مِنۡهُ‌ۚ ضَعُفَ ٱلطَّالِبُ وَٱلۡمَطۡلُوبُ (٧٣) مَا قَدَرُواْ ٱللَّهَ حَقَّ قَدۡرِهِۦۤ‌ۗ إِنَّ ٱللَّهَ لَقَوِىٌّ عَزِيزٌ (٧٤)

হে মানুষ, একটি উপমা পেশ করা হল, মনোযোগ দিয়ে তা শোন, তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে যাদেরকে ডাক তারা কখনো একটি মাছিও সৃষ্টি করতে পারবে না। যদিও তারা এ উদ্দেশ্যে একত্রিত হয়। আর যদি মাছি তাদের কাছ থেকে কিছু ছিনিয়ে নেয়, তারা তার কাছ থেকে তাও উদ্ধার করতে পারবে না। অন্বেষণকারী ও যার কাছে অন্বেষণ করা হয় উভয়েই দুর্বল। তারা আল্লাহকে যথাযথ মর্যাদা দেয় না। নিশ্চয় আল্লাহ মহাক্ষমতাবান, মহাপরাক্রমশালী। সূরা হজ্জ : ৭৩-৭৪

আল্লাহ রাব্বূল আলামীন আরো বলেন,

وَمَا قَدَرُوا اللّٰہَ حَقَّ قَدۡرِہٖ ٭ۖ وَالۡاَرۡضُ جَمِیۡعًا قَبۡضَتُہٗ یَوۡمَ الۡقِیٰمَۃِ وَالسَّمٰوٰتُ مَطۡوِیّٰتٌۢ بِیَمِیۡنِہٖ ؕ سُبۡحٰنَہٗ وَتَعٰلٰی عَمَّا یُشۡرِکُوۡنَ

আর তারা আল্লাহকে যথাযোগ্য মর্যাদা দেয়নি। অথচ কিয়ামতের দিন গোটা পৃথিবীই থাকবে তাঁর মুষ্টিতে এবং আকাশসমূহ তাঁর ডান হাতে ভাঁজ করা থাকবে। তিনি পবিত্র, তারা যাদেরকে শরীক করে তিনি তাদের ঊর্ধ্বে। সুরা জুমার : ৬৭

সূরা হজ্জ্ব অন্য আয়াতে আল্লাহ তার আযাবে একটু নমুনা তুলে ধরেন যাতে তাকে চিনে যথাযথ ভয় করে এবং শিরক কথা ও কাজ থেকে বিরত থাকে।

আল্লাহ রাব্বূল আলামীন আরো বলেন,

َـٰٓأَيُّهَا ٱلنَّاسُ ٱتَّقُواْ رَبَّڪُمۡ‌ۚ إِنَّ زَلۡزَلَةَ ٱلسَّاعَةِ شَىۡءٌ عَظِيمٌ۬ (١) يَوۡمَ تَرَوۡنَهَا تَذۡهَلُ ڪُلُّ مُرۡضِعَةٍ عَمَّآ أَرۡضَعَتۡ وَتَضَعُ ڪُلُّ ذَاتِ حَمۡلٍ حَمۡلَهَا وَتَرَى ٱلنَّاسَ سُكَـٰرَىٰ وَمَا هُم بِسُكَـٰرَىٰ وَلَـٰكِنَّ عَذَابَ ٱللَّهِ شَدِيدٌ۬ (٢)

 হে মানুষ, তোমরা তোমাদের রবকে ভয় কর। নিশ্চয় কিয়ামতের প্রকম্পন এক ভয়ঙ্কর ব্যাপার। যেদিন তোমরা তা দেখবে সেদিন প্রত্যেক স্তন্য দানকারিনী আপন দুগ্ধপোষ্য শিশুকে ভুলে যাবে এবং প্রত্যেক গর্ভধারিণী তার গর্ভপাত করে ফেলবে, তুমি দেখবে মানুষকে মাতাল সদৃশ, অথচ তারা মাতাল নয়। তবে আল্লাহর আযাবই কঠিন। সুরা হজ : ১-২

বল হয় একমাত্র আল্লাহর ক্ষশতা ও শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে জ্ঞানই শিরক থেকে বাচার প্রধান মাধ্যম। উদাহরন হিসাবে বলা যায় সাধারন পোশাকে সাধারন পবিবেশে একজন খ্যাতিমান লোককে কেউ সম্মান করবেনা। খ্যাতিমান লোকদের পরিচয় জানার পরই কদর শুরু হয়। যেমন শেখ সাদীর ‘পোশাকের গুনে’। তাই অতুলনীয় মহান আল্লাহ পরিচয় জানার পর তার সমকক্ষ দাড় করার সাহস কেউ পাবেনা। এবং আশা করা যায় শিরক থেকে মুক্ত থাকবে।কিন্তু যত দিন মানুষ তার সত্যিকার পরিচয় থেকে দুরে থাকবে তত দিনই সে তার সমকক্ষ হিসেবে অন্য ইলাহ দাড় করাবে।

৩। রাসূলুল্লাহ ﷺ সম্পর্কে অতিরঞ্জন বা বাড়াবাড়ি

রাসূল ﷺ সম্পর্কে অতিরঞ্জন বা বাড়াবাড়ির অর্থ হচ্ছে তাঁকে নবুওয়াত ও রিসালাতের উর্ধ্বে স্থান দেয়া। পৃথিবীতে রিসালাতের উর্ধ্বে কোন মানুষের মর্জাদা আছে বলে কেউ স্বীকার করবে না।কারণ এটাই পৃথিবীর সর্বচ্চো ডিগ্রি, সর্বচ্চো সম্মান, সর্বচ্চো মর্জাদা। রাসূলুল্লাহ ﷺ এর প্রসংশা করতে হবে সেই ভাবে, যে ভাবে আল্লাহ তাঁর রাসূল ﷺ এর প্রসংশা করেছেন। মহান আল্লাহ সৃষ্টিকর্তা  আর মুহাম্মাদ ﷺ  তার সর্বশ্রেষ্ট সৃস্টি। কজেই অতিরঞ্জন বা বাড়াবাড়ি করে স্রষ্টা ও সৃস্টি মধ্যে পার্থক্য না করাই বড় শিরক। এই জন্য ইসলামে বাড়াবাড়ি নিষধ করা হয়েছে।আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

يَـٰٓأَهۡلَ ٱلۡڪِتَـٰبِ لَا تَغۡلُواْ فِى دِينِڪُمۡ وَلَا تَقُولُواْ عَلَى ٱللَّهِ إِلَّا ٱلۡحَقَّ‌ۚ

হে কিতাবীগণ, তোমরা তোমাদের দীনের মধ্যে বাড়াবাড়ি করো না এবং আল্লাহর উপর সত্য ছাড়া অন্য কিছু বলো না। সুরা নিসা : ১৭১

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

قُلۡ یٰۤاَہۡلَ الۡکِتٰبِ لَا تَغۡلُوۡا فِیۡ دِیۡنِکُمۡ غَیۡرَ الۡحَقِّ وَلَا تَتَّبِعُوۡۤا اَہۡوَآءَ قَوۡمٍ قَدۡ ضَلُّوۡا مِنۡ قَبۡلُ وَاَضَلُّوۡا کَثِیۡرًا وَّضَلُّوۡا عَنۡ سَوَآءِ السَّبِیۡلِ 

বল, ‘হে কিতাবীরা, সত্য ছাড়া তোমরা তোমাদের ধর্মের ব্যাপারে সীমালঙ্ঘন করো না এবং এমন কওমের প্রবৃত্তির অনুসরণ করো না, যারা পূর্বে পথভ্রষ্ট হয়েছে, আর অনেককে পথভ্রষ্ট করেছে এবং সোজা পথ বিচ্যুত হয়েছে। সুরা মায়েদা : ৭৭

আল্লাহর রাসূল ﷺ কে শ্রদ্ধা করার অর্থ তার আদেশ নিষেধ মেনে চলা। তার আনিত দ্বীনের পরিপূর্ণ অনুসরন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ এর প্রসংশায় অতিরঞ্জন বা বাড়াবাড়ি মানুষকে পথভ্রষ্টতার দিকে ধাবিত করে। আল্লাহ রাব্বূল আলামীন তাকে অনেক অনেক সম্মান দান করে বলেন-

لَّقَدۡ كَانَ لَكُمۡ فِى رَسُولِ ٱللَّهِ أُسۡوَةٌ حَسَنَةٌ۬ لِّمَن كَانَ يَرۡجُواْ ٱللَّهَ وَٱلۡيَوۡمَ ٱلۡأَخِرَ وَذَكَرَ ٱللَّهَ كَثِيرً۬ا

আসলে তোমাদের জন্য আল্লাহর রসূলের মধ্যে ছিল একটি উত্তম আদর্শ এমন প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য যে আল্লাহ ও শেষ দিনের আকাঙ্ক্ষী এবং বেশী করে আল্লাহকে স্মরণ করে৷ সুরা আহযাব : ২১

তিনিই ﷺ একমাত্র ব্যক্তি যে আল্লাহ তা‘আলা কর্তৃক চারিত্রিক সার্টিফিকেট পেয়েছেন। আল্লাহ রাব্বূল আলামীন বলেন-

 وَإِنَّكَ لَعَلَىٰ خُلُقٍ عَظِيمٖ ٤ 

“আর নিশ্চয় আপনি মহান চরিত্রের উপর রয়েছেন। সুরা কলম :

আল্লাহর রাসূল ﷺ এর অনুসরণ করলেই আল্লাহ ভালোবাসবেন এবং গোনাহ মাফ করে দেবেন। আল্লাহ রাব্বূল আলামীন বলেন-

قُلۡ اِنۡ کُنۡتُمۡ تُحِبُّوۡنَ اللّٰہَ فَاتَّبِعُوۡنِیۡ یُحۡبِبۡکُمُ اللّٰہُ وَیَغۡفِرۡ لَکُمۡ ذُنُوۡبَکُمۡ ؕ وَاللّٰہُ غَفُوۡرٌ رَّحِیۡمٌ

বল, ‘যদি তোমরা আল্লাহকে ভালবাস, তাহলে আমার অনুসরণ কর, আল্লাহ তোমাদেরকে ভালবাসবেন এবং তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করে দেবেন। আর আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু’। আল ইমরান : ৩১

আল্লাহর রাসূল ﷺ এর আনুগত্য আল্লাহরই আনুগত্য। আল্লাহ রাব্বূল আলামীন বলেন-

مَّن يُطِعِ ٱلرَّسُولَ فَقَدۡ أَطَاعَ ٱللَّهَ‌ۖ وَمَن تَوَلَّىٰ فَمَآ أَرۡسَلۡنَـٰكَ عَلَيۡهِمۡ حَفِيظً۬ا (٨٠)

যে ব্যক্তি রসূলের আনুগত্য করলো সে আসলে আল্লাহরই আনুগত্য করলো৷ আর যে ব্যক্তি মুখ ফিরিয়ে নিলো, যাই হোক, তাদের ওপর তো আমি তোমাকে পাহারাদার বানিয়ে পাঠাইনি। সুরা নিসা : ৮০

আল্লাহ রব্বুল আলামীণ সার্টিফিকেট দিচ্ছেন নিসন্দেহে রসূলদের অন্তরভুক্ত, সরল-সোজা, পথ অবলম্বনকারী।আল্লাহ রাব্বূল আলামীন বলেন-

إِنَّكَ لَمِنَ ٱلۡمُرۡسَلِينَ (٣) عَلَىٰ صِرَٲطٍ۬ مُّسۡتَقِيمٍ۬ (٤)

তুমি নিসন্দেহে রসূলদের অন্তরভুক্ত, সরল-সোজা, পথ অবলম্বনকারী। সুরা ইয়াসিন : ২-৩

রাসুলুল্লাহ ﷺ আনুগত্য না করলে আমল ধ্বংস অনিবার্য।আল্লাহ রাব্বূল আলামীন বলেন-

يَـٰٓأَيُّہَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ أَطِيعُواْ ٱللَّهَ وَأَطِيعُواْ ٱلرَّسُولَ وَلَا تُبۡطِلُوٓاْ أَعۡمَـٰلَكُمۡ (٣٣)

হে মু’মিনগণ! তোমরা আল্লাহর আনুগত্য করো, রসূলের আনুগত্য করো এবং নিজেদের আমল ধ্বংস করো না। সুরা মুহম্মাদ : ৩৩

এ ছাড়াও মুহাম্মদ ﷺ কে সমস্ত বিশ্বজাহানের রহমত স্বরূপ তাকে প্রেরণ করা হইয়াছে। তিনি মাক্বামে মাহমূদের অধিকারী করেছেন। তিনি সমস্ত আদম জাতীর সর্দার বানিয়েছেন। তাকে আল্লাহর খলীল বা অন্তরঙ্গ বন্ধু হিসাবে গ্রহন করেছেন। তিনি আল্লাহর অনুমতি সাপেক্ষে হাশরের মাঠে মহান শাফাআতের অধিকারী। তিনি সর্ব প্রথম জান্নাতে প্রবেশকারী হিসাবে আল্লাহ মর্জাদা পেয়েছেন। তিনি সর্বাধিক মুত্তাক্বী ও পরহেজগারদের হিসাবে পরিগনিত। তিনি নবীকুল শিরোমণী। এত সম্মান ও মর্জাদা থাকা সত্বেও কিছু অতি পন্ডিত জ্ঞান পাপি তার সম্পর্কে বাড়াবাড়ি ও অতিরঞ্জিত করে বলে, দুনিয়া ও আখিরাত মুহাম্মদ ﷺ এর জন্যই সৃষ্টি করা হয়েছে। তিনি প্রকৃত গায়েব জানেন। তিনি সর্বত্র সর্বদা হাযির নাজির। তিনি মানুষ ছিলেন না। তিনি মরে নাই। তিনি নুরের তৈরি। তিনি উম্মী নবী ছিলেন না ইত্যাদি ইত্যাদি। এই সবগুলিই অতিরঞ্জিনের নামে কুরআন বিরোধী শিরকি কথা বার্তা। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার সুস্পষ্ট ভাষার ঘোষণাগুলী পড়লেই উপরের শিরকি কথার অসারতার প্রমান পাবেন।আল্লাহ রাব্বূল আলামীন বলেন-

وَمَا خَلَقۡتُ ٱلۡجِنَّ وَٱلۡإِنسَ إِلَّا لِيَعۡبُدُونِ (٥٦) 

 নিশ্চয়ই আমি জ্বিন ও মানুষকে সৃষ্টি করেছি একমাত্র আমার ইবাদতের জন্য।’ সূরা যারিয়াত : ৪১

আল্লাহ রাব্বূল আলামীন বলেন-

 وَإِنَّ لَنَا لَلۡأَخِرَةَ وَٱلۡأُولَىٰ (١٣) 

‘আর নিশ্চয়ই আখিরাত ও দুনিয়া আমারই জন্য।সূরা লাইল : ১৩

উপরের দুই আয়াতের মর্ম কথা হল: দুনিয়া ও আখিরাত মুহাম্মদ ﷺ এর জন্যই সৃষ্টি করা নি। তাছাড়া সহিহ কোন হাদিসে এরূপ বর্ননা পাওয়া যায় না।আল্লাহ রাব্বূল আলামীন বলেন-

 قُل لَّآ أَمۡلِكُ لِنَفۡسِى نَفۡعً۬ا وَلَا ضَرًّا إِلَّا مَا شَآءَ ٱللَّهُ‌ۚ وَلَوۡ كُنتُ أَعۡلَمُ ٱلۡغَيۡبَ لَٱسۡتَڪۡثَرۡتُ مِنَ ٱلۡخَيۡرِ وَمَا مَسَّنِىَ ٱلسُّوٓءُ‌ۚ إِنۡ أَنَا۟ إِلَّا نَذِيرٌ۬ وَبَشِيرٌ۬ لِّقَوۡمٍ۬ يُؤۡمِنُونَ (١٨٨) 

বল, ‘আমি আমার নিজের কোন উপকার ও ক্ষতির ক্ষমতা রাখি না, তবে আল্লাহ যা চান। আর আমি যদি গায়েব জানতাম তাহলে অধিক কল্যাণ লাভ করতাম এবং আমাকে কোন ক্ষতি স্পর্শ করত না। আমিতো একজন সতর্ককারী ও সুসংবাদদাতা এমন কওমের জন্য, যারা বিশ্বাস করে’। সুরা আরাফ : ১৮৮

উপরের আয়াতের মর্ম কথা হল: মুহাম্মদ ﷺ গায়েবের খবর জানেন না।মহান আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেন:

 وَلِلَّهِ ٱلۡمَشۡرِقُ وَٱلۡمَغۡرِبُ‌ۚ فَأَيۡنَمَا تُوَلُّواْ فَثَمَّ وَجۡهُ ٱللَّهِ‌ۚ إِنَّ ٱللَّهَ وَٲسِعٌ عَلِيمٌ۬ (١١٥)

পূর্ব এবং পশ্চিম আল্লাহ তায়ালারই। সুতরাং যেদিকেই মুখ ফিরাও, সেদিকেই রয়েছেন আল্লাহ তায়ালা। নিশ্চয় আল্লাহ তায়ালা সর্বব্যাপী সর্বজ্ঞাত। সূরা বাকারা : ১১৫

উপরের আয়াতের মর্ম কথা হল: মুহাম্মদ ﷺ নয়, আল্লাহই সর্বব্যাপী সর্বজ্ঞাত।আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন-

 إِنَّكَ مَيِّتٌ۬ وَإِنَّہُم مَّيِّتُونَ (٣٠) 

নিশ্চয়ই তুমিও মারা যাবে, এবং নিশ্চয়ই তারাও মারা যাবে। সুরা জুমার : ৩০

আল্লাহ্‌ সুবাহানাহুয়াতালা ইরশাদ করেন:

وَمَا جَعَلۡنَا لِبَشَرٍ۬ مِّن قَبۡلِكَ ٱلۡخُلۡدَ‌ۖ أَفَإِيْن مِّتَّ فَهُمُ ٱلۡخَـٰلِدُونَ (٣٤) كُلُّ نَفۡسٍ۬ ذَآٮِٕقَةُ ٱلۡمَوۡتِ‌ۗ وَنَبۡلُوكُم بِٱلشَّرِّ وَٱلۡخَيۡرِ فِتۡنَةً۬‌ۖ وَإِلَيۡنَا تُرۡجَعُونَ (٣٥)

আর তোমার পূর্বে কোন মানুষকে আমি স্থায়ী জীবন দান করিনি; সুতরাং তোমার মৃত্যু হলে তারা কি অনন্ত জীবনসম্পন্ন হয়ে থাকবে ? জীব মাত্রই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে; আমি তোমাদেরকে মন্দ ও ভাল দ্বারা বিশেষভাবে পরীক্ষা করি এবং আমারই নিকট তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে।   সুরা আম্বিয়া : ৩৪-৩৫

উপরের দুই আয়াতের মর্ম কথা হল: মানুষ মাত্রই মরণশীল এমন কি পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ নবী মুহম্মদ ﷺ ও এর উর্দ্ধে নন।সূরা কাহাফে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন-

قُلۡ اِنَّمَاۤ اَنَا بَشَرٌ مِّثۡلُکُمۡ یُوۡحٰۤی اِلَیَّ اَنَّمَاۤ اِلٰـہُکُمۡ اِلٰہٌ وَّاحِدٌ ۚ  فَمَنۡ کَانَ یَرۡجُوۡا لِقَآءَ رَبِّہٖ فَلۡیَعۡمَلۡ عَمَلًا صَالِحًا وَّلَا یُشۡرِکۡ بِعِبَادَۃِ رَبِّہٖۤ اَحَدًا

বল, ‘আমি তোমাদের মতই একজন মানুষ। আমার নিকট ওহী প্রেরণ করা হয় যে, তোমাদের ইলাহই এক ইলাহ। সুতরাং যে তার রবের সাক্ষাৎ কামনা করে, সে যেন সৎকর্ম করে এবং তার রবের ইবাদাতে কাউকে শরীক না করে’। সুরা কাহাফ : ১১০

উপরের আয়াতের মর্ম কথা হল: মুহাম্মদ ﷺ আমাদের মত এক জন মানুষ ছিলেন। মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন:

وَلَقَدۡ خَلَقۡنَا ٱلۡإِنسَـٰنَ مِن سُلَـٰلَةٍ۬ مِّن طِينٍ۬

 আমি মানুষকে তৈরী করেছি মাটির উপাদান থেকে। সুরা মুমিনুন : ১২

উপরের আয়াতের মর্ম কথা হল: মুহাম্মদ ﷺ মাটির উপাদান থেকে সৃষ্টি।আল্লাহ তায়ালা বলেছেন-

 فَ‍َٔامِنُواْ بِٱللَّهِ وَرَسُولِهِ ٱلنَّبِيِّ ٱلۡأُمِّيِّ ٱلَّذِي يُؤۡمِنُ بِٱللَّهِ وَكَلِمَٰتِهِۦ وَٱتَّبِعُوهُ لَعَلَّكُمۡ تَهۡتَدُونَ

কাজেই তোমরা ঈমান আন আল্লাহর প্রতি ও তাঁর রাসূল উম্মী নবীর প্রতি, যিনি আল্লাহ ও তাঁর বাণীসমূহে ঈমান রাখেন। আর তোমরা তার অনুসরণ কর, যাতে তোমরা হিদায়াতপ্রাপ্ত হও। সুরা আরাফ : ১৮৫

উপরের আয়াতের মর্ম কথা হল: মুহাম্মদ ﷺ কে উম্মী নবী বলেছেন এবং তার অনুসরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রাসুলুল্লাহ ﷺ সম্পর্কে সঠিক ও সু-ধারনা পোষন করা প্রত্যেকটি মুসলিমের দায়িত্ব। অতিরঞ্জর বাড়বাড়ি কখন ও শিরকি আকদার জম্ম দেয়।

আল্লাহ রাব্বূল আলামীন বলেন-

یٰۤاَہۡلَ الۡکِتٰبِ لَا تَغۡلُوۡا فِیۡ دِیۡنِکُمۡ وَلَا تَقُوۡلُوۡا عَلَی اللّٰہِ اِلَّا الۡحَقَّ ؕ  اِنَّمَا الۡمَسِیۡحُ عِیۡسَی ابۡنُ مَرۡیَمَ رَسُوۡلُ اللّٰہِ وَکَلِمَتُہٗ ۚ  اَلۡقٰہَاۤ اِلٰی مَرۡیَمَ وَرُوۡحٌ مِّنۡہُ ۫  فَاٰمِنُوۡا بِاللّٰہِ وَرُسُلِہٖ ۚ۟  وَلَا تَقُوۡلُوۡا ثَلٰثَۃٌ ؕ  اِنۡتَہُوۡا خَیۡرًا لَّکُمۡ ؕ  اِنَّمَا اللّٰہُ اِلٰہٌ وَّاحِدٌ ؕ  سُبۡحٰنَہٗۤ اَنۡ یَّکُوۡنَ لَہٗ وَلَدٌ ۘ  لَہٗ مَا فِی السَّمٰوٰتِ وَمَا فِی الۡاَرۡضِ ؕ  وَکَفٰی بِاللّٰہِ وَکِیۡلًا 

হে কিতাবীগণ, তোমরা তোমাদের দীনের মধ্যে বাড়াবাড়ি করো না এবং আল্লাহর উপর সত্য ছাড়া অন্য কিছু বলো না। মারইয়ামের পুত্র মাসীহ ঈসা কেবলমাত্র আল্লাহর রাসূল ও তাঁর কালিমা, যা তিনি প্রেরণ করেছিলেন মারইয়ামের প্রতি এবং তাঁর পক্ষ থেকে রূহ। সুতরাং তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলগণের প্রতি ঈমান আন এবং বলো না, (ইলাহ) তিন। তোমরা বিরত হও, তা তোমাদের জন্য উত্তম। আল্লাহই কেবল এক ইলাহ, তিনি পবিত্র মহান এ থেকে যে, তাঁর কোন সন্তান হবে। আসমানসূহে যা রয়েছে এবং যা রয়েছে যমীনে, তা আল্লাহরই। আর কর্মবিধায়ক হিসেবে আল্লাহই যথেষ্ট। সুরা নিসা : ১৭১

খ্রিষ্টানরা ঈসা (আ.) ও তাঁর মা মারিয়াম (আ.) কে ভক্তি-শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করতে করতে তাঁদেরকে রিসালাত ও বান্দার স্থান থেকে উপরে তুলে আল্লাহর আসনে বসিয়ে দিয়েছে এবং যথারীতি তাঁদের ইবাদত করছে। আলোচ্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা আহলে কিতাবদেরকে ধর্মীয় ব্যাপারে বাড়াবাড়ি ও অতিরঞ্জন করতে নিষেধ করেছেন। অনুরূপ রাসুলুল্লাহ ﷺ ও খ্রিষ্টানদের ধর্মীয় ব্যাপারে অতিরঞ্জন করা দেখে স্বীয় উম্মতকে এহেন ভয়াবহ মহামারীর কবল হতে রক্ষা করার জন্য পূর্ণ সতর্ক করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘‘তোমরা আমার প্রশংসা করতে গিয়ে এমন অতিরঞ্জন করবে না, যেমন খ্রিষ্টানরা ঈসা বিন মারয়্যামের ব্যাপারে করেছে। যেহেতু আমি আল্লাহর বান্দাই, সেহেতু তোমরা আমাকে আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রসূল বল। সহিহ বুখারি : আম্বিয়া অধ্যায়

মহান আল্লাহ্ তাঁর হাবীব রাসূল মুহাম্মদ ﷺ কে যে সীমাহীন উচ্চ মর্যাদা ও সম্মান দান করেছেন তা আল কুরআন এবং সহিহ হাদিসের পাতায় পাতায় সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত আছে। অতি ভক্তি প্রদর্শন করতে গিয়ে তাঁর মর্যাদা ও সম্মান বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে কুরআনুল কারীমের সুস্পষ্ট আয়াত ও ঘোষণাকে অস্বীকার করে, বিকৃত করে, ভ্রান্ত তাফসীর করে, জাল বানোয়াট মনগড়া কাহিনীর অবতারনা ককরে ইয়াহুদি খৃষ্টানদের মত সীমালঙ্ঘনকারী হওয়া কখনোই ঈমানের পরিচায়ক হতে পারে না। বরং আমাদের উচিত হবে আল্লাহ্ পাক তাঁর হাবীব রাসূল মুহাম্মদ ﷺ কে যে মর্জাদা দিয়েচেন তার ভিত্তিতে তাকে সম্মান প্রদর্শন করতে হবে।

৪। বাপ দাদার অন্ধ অনুসরণ:

আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) হাদীস বর্ণনা করতেন যে, নবী ﷺ ইরশাদ করেছেন-

مَا مِنْ مَوْلُودٍ إِلاَّ يُولَدُ عَلَى الْفِطْرَةِ فَأَبَوَاهُ يُهَوِّدَانِهِ أَوْ يُنَصِّرَانِهِ أَوْ يُمَجِّسَانِهِ كَمَا تُنْتَجُ الْبَهِيمَةُ بَهِيمَةً جَمْعَاءَ هَلْ تُحِسُّونَ فِيهَا مِنْ جَدْعَاءَ ثُمَّ يَقُولُ أَبُو هُرَيْرَةَ (فِطْرَةَ اللهِ الَّتِي فَطَرَ النَّاسَ عَلَيْهَا)

প্রতিটি নবজাতকই জন্ম লাভ করে ফিতরাতের (তাওহীদের) উপর। অতঃপর তার মা-বাপ তাকে ইয়াহূদী বা খ্রিস্টান বা অগ্নিপূজারী রূপে গড়ে তোলে। যেমন, চতুষ্পদ পশু নিখুঁত বাচ্চা জন্ম দেয়। তোমরা কি তাদের মধ্যে কোন কান কাটা দেখতে পাও? পরে আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) তিলাওয়াত করলেন-

فِطْرَتَ اللهِ الَّتِي فَطَرَ النَّاسَ عَلَيْهَا

আল্লাহর দেয়া ফিতরাতের অনুসরণ কর যে ফিতরাতের উপর তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন, সুরা রূম-৩০।

সহিহ বুখারি : ১৩৫৮, ১৩৫৯, ১৩৮৫, ৪৭৭৫, ৬৫৯৯, সহহি মুসলিম : ২৬৫৮, আহমাদ ৮১৮৫

শীশু জম্মগ্রহণের পর যে পরিবারে লালিত পালিত হয়, সেই পরিবারের আকিদা, বিশ্বাস, আমল ও সংষ্কৃতি ধারন করে বেড়ে উঠে। নবজাতকে পরিবারের মধ্যে শিরকি বিদআতের প্রচলন তাকলে সে তার বাপ দাদার অন্ধ অনুসরণ করে শিরক বিদআতে ডুবে নিমজ্জিত হবে। এই কি নিজের থেকে তারা কোন সংশোধনের চেষ্টা করে না। আবার কেউ তাদের শিরকি আমল পরিবর্তেন কথা বললে মেনেও নেয় না। এমনটি সমাজে অধিক প্রচলিত কোন শিরকি আমল সম্পর্কে যদি বলা হয়, আপনার আমলটি কুরআন সুন্নাহ সম্মত হচ্ছে না। তখন দাদার অন্ধ অনুসারি ঐ লোকই খোড়া যুক্তি দেখিয়ে বলবে, অমুক বড় হুজুর, অমুক মুফতি সাহেব, অমুক পির সাহেব কি আপনার থেক কম বুঝে? আপনি যতই কুরআন সুন্নাহর কথা বলেন না কেন? তার পরিস্কার উল্টা জবাব, আমাদের বাপ দাদারা যা করছে আমরা তাই করব। তারা কি ইসলাম কম বুঝেন? আপনি কি অমুকের চেয়ে, তমুকের চেয়ে ইসলাম বেশী বুঝেন ইত্যাদি ইত্যাদি। অথচ তাদের এই খোড়া যুক্তির পিছনে কোন দলিল নাই। তারা শুধুমাত্র আন্দাজের অনুসরণ কর এবং তোমরা শুধু অনুমান করে কথা বল।এদের সম্পর্কেই আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

سَیَقُوۡلُ الَّذِیۡنَ اَشۡرَکُوۡا لَوۡ شَآءَ اللّٰہُ مَاۤ اَشۡرَکۡنَا وَلَاۤ اٰبَآؤُنَا وَلَا حَرَّمۡنَا مِنۡ شَیۡءٍ ؕ کَذٰلِکَ کَذَّبَ الَّذِیۡنَ مِنۡ قَبۡلِہِمۡ حَتّٰی ذَاقُوۡا بَاۡسَنَا ؕ قُلۡ ہَلۡ عِنۡدَکُمۡ مِّنۡ عِلۡمٍ فَتُخۡرِجُوۡہُ لَنَا ؕ اِنۡ تَتَّبِعُوۡنَ اِلَّا الظَّنَّ وَاِنۡ اَنۡتُمۡ اِلَّا تَخۡرُصُوۡنَ

অচিরেই মুশরিকরা বলবে, ‘আল্লাহ যদি চাইতেন, আমরা শিরক করতাম না এবং আমাদের পিতৃপুরুষরাও না এবং আমরা কোন কিছু হারাম করতাম না’। এভাবেই তাদের পূর্ববর্তীরা মিথ্যারোপ করেছে, যে পর্যন্ত না তারা আমার আযাব আস্বাদন করেছে। বল, ‘তোমাদের কাছে কি কোন জ্ঞান আছে, যা তোমরা আমাদের জন্য প্রকাশ করবে? তোমরা তো শুধু ধারণার অনুসরণ করছ এবং তোমরা তো কেবল অনুমান করছ’। সুরা আনাম : ১৪৮

তাদের এই শিরকি কাজ থেকে যখন বিরত থাকার জন্য বলা হয়, তখন তারা বাপ দাদাগণ হিদায়েত প্রাপ্ত সঠিক পথে আছে দাবি করে, তাদেরই অনুসরণ করে। তাদের এই খোড়া অজুহাত পরকালে কোনই কাজে আসবে না। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

بَلۡ قَالُوۡۤا اِنَّا وَجَدۡنَاۤ اٰبَآءَنَا عَلٰۤی اُمَّۃٍ وَّاِنَّا عَلٰۤی اٰثٰرِہِمۡ مُّہۡتَدُوۡنَ

বরং তারা বলে, ‘আমরা নিশ্চয় আমাদের পিতৃপুরুষদেরকে এক মতাদর্শের উপর পেয়েছি, আর নিশ্চয় আমরা তাদের পদাঙ্ক অনুসরণে হিদায়াতপ্রাপ্ত হব। সুরা জুকরুক : ২২

কওমে সামুদও সালেহ (আ.) কে ঠিক একই কথা বলেছিল। আমরা আমাদের বাপ দাদাদের দেখান পথই সঠিক করে করি। আর তোমার সত্য দ্বীন সম্পর্কে আমরা সন্দেহ করি। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

قَالُوۡا یٰصٰلِحُ قَدۡ کُنۡتَ فِیۡنَا مَرۡجُوًّا قَبۡلَ ہٰذَاۤ اَتَنۡہٰنَاۤ اَنۡ نَّعۡبُدَ مَا یَعۡبُدُ اٰبَآؤُنَا وَاِنَّنَا لَفِیۡ شَکٍّ مِّمَّا تَدۡعُوۡنَاۤ اِلَیۡہِ مُرِیۡبٍ

তারা বলল, হে সালিহ! তুমিতো ইতোপূর্বে আমাদের মধ্যে আশা-ভরসা স্থল ছিলে। তুমি কি আমাদেরকে ঐ বস্তুর ইবাদাত করতে নিষেধ করছ যাদের ইবাদাত আমাদের পিতৃ-পুরুষেরা করে এসেছে? আর যে ধর্মের দিকে তুমি আমাদের ডাকছ, বস্তুতঃ আমরা তৎসম্বন্ধে গভীর সন্দেহের মধ্যে রয়েছি, যা আমাদেরকে দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ফেলে রেখেছে। সুরা হুদ : ৬২

এ সম্পর্কে জানতে আরও দেখুন- সুরা আরাফ : ২৮, সুরা হুদ : ৮৭ ও ১০৯, সুরা ইব্রাহীম : ১০, সুরা মায়েদা : ১০৪, সুরা বাকারা : ১৭০, সুরা আম্বিয়া : ৫৩ ও৫৪, সুরা ইউসুফ : ৪০, সুরা আরাফ : ৭০ ও ১৭৩, সুরা  সাবা : ৪৩, সুরা ইউনুস : ৭৮।

৫। ব্যক্তি কেন্দ্রিক অতিভক্তি বা আবেগ

উপমহাদেশে সাধারনত কোন এলাকায় ইসলাম প্রচারে কোন না কোন ব্যক্তির একক ভুমিকা থাকে।তার মৃত্যুর পর তাকে কেন্দ্র করে তৈরি হয় নানান আজগোবি গল্প কাহিনী, হাজারও কেরামতি। সরল মনের  মানুষগুলি এই বানান আজগোবি গল্প শুনে তার খাটি ভক্ত হয়ে যায়। আর তাকে দিয়ে শুরু হয় শিরকি খেলা। এমন কোন অলী পাওয়া যাবে না, যাকে নিয়ে বাড়াবাড়ি নেই, শিরকি আকিদা নেই বা শিরকি আমল নেই। কিন্তু আমাদের সমাজের এক শ্রেণীর আমাদের অবস্থা দেখুন, তারা এ থেকে ফায়দা নিচ্ছে। বিশেষ করে যারা ইমাম, চাকরির ভয়ে প্রতিবাদ করার পরিবর্তে ঐ সব কাজে সায় দিছ্ছে। ব্যতিক্রমি আলেমও আছে। ইয়াহুদিগণ তাদের রাহেব বা ধর্মগুরুদের কো ইলাহর স্থানে বসিয়েছিল। তারা যা হারাম হালাল করতে ইয়াহুদিগণ তা মেন নিত।  আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

اِتَّخَذُوۡۤا اَحۡبَارَہُمۡ وَرُہۡبَانَہُمۡ اَرۡبَابًا مِّنۡ دُوۡنِ اللّٰہِ وَالۡمَسِیۡحَ ابۡنَ مَرۡیَمَ ۚ وَمَاۤ اُمِرُوۡۤا اِلَّا لِیَعۡبُدُوۡۤا اِلٰـہًا وَّاحِدًا ۚ لَاۤ اِلٰہَ اِلَّا ہُوَ ؕ سُبۡحٰنَہٗ عَمَّا یُشۡرِکُوۡنَ

তারা আল্লাহকে ছেড়ে তাদের পন্ডিত ও সংসার-বিরাগীদের রব (ইলাহ) হিসেবে গ্রহণ করেছে এবং মারইয়ামপুত্র মাসীহকেও। অথচ তারা এক ইলাহের ইবাদত করার জন্যই আদিষ্ট হয়েছে, তিনি ছাড়া কোন (হক) ইলাহ নেই। তারা যে শরীক করে তিনি তা থেকে পবিত্র। সুরা তাওবা : ৩১

ব্যক্তি কেন্দ্রিক অতিভক্তি জনিত শিরকি আকিদা হল, আল্লাহর অলীরা মরে না। তারা মানুষের ভাল মন্দ করার ক্ষমতা রাখে। তারা গায়েব জানেন। তারা কবর থেকে ফয়েজ বরকত দান করে। এভাবে পূর্বের অলীদের সম্পর্কে তাদের ধারনাও অনেকটা শিরকি।

৬। সুফি দর্শণ গ্রহনের জন্য

বর্তমানে মুসলিমগণ যে সকল শিরক মিশ্রিত আকিদা ও আমলেন সাথে জড়িত তার অন্যতম কারণ হচ্ছে সুফীবাদের বিভ্রান্তি। এই পঁচা মতবাদের কারণেই মুসলিম জাতি শিরকের মধ্যে হাবুডুবু খাচ্ছে। আল্লাহর মনোনিত ইসলামের মূল বিশ্বাস তাওহীদ থেকে সরে গিয়ে সুফীবাদের বেড়াজালে আটকে পড়ে শিরকি কাজে লিপ্ত। এই মতবাদের কারণে হাজারও মানুষ আজ শিরককে ইবাদাত মনে করছে। হাজারও মানুষ ইবাদাতের জন্য কঠোর সাধনা করছে অথচ শিরক মিশ্রিত আকিদা ও আমলে জন্য পন্ডশ্রম হচ্ছে।সুফীদের রয়েছে বিভিন্ন তরীকা বা মাজহাব আছে।শুধু ভারতীয় উপমহাদেশেই অসংখ্য সুফী তরীকা আত্মপ্রকাশ করেছে। তার মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি তরীকা হলো-

১) কাদেরীয়া তরীকা ২) নকশবন্দীয়া তরীকা ৩) চিশতিয়া তরীকা ৪) মুজাদ্দেদীয়া তরীকা ৫) সোহরাওয়ার্দী তরীকা।

শুধু এই তরীকাগুলোই ভিন্ন ভিন্ন নয়, এদের আমল, জিকিরে বাক্য ও পদ্দতি ও ভিন্ন ভিন্ন। অনেক ক্ষেত্র আকিদা ও ভিন্ন ভিন্ন। অধিকাংশের মধ্যে সাধারন যে শিরকগুলি আকিদা প্রচলিত তাহা হলো-

আল্লাহতায়ালা কে নিরাকার মনে করা, আল্লাহতায়ালা কে সর্বত্র বিরাজমান মনে করা, রাসূলুল্লাহ ﷺ নুরের তৈরি, রাসূলুল্লাহ ﷺ আল্লাহতায়ালার মতই অদৃশ্যর জ্ঞান রাখেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ আল্লাহতায়ালার মতই হাজির ও নাজির, রাসূলুল্লাহ ﷺ আল্লাহতায়ালার মত মানুষের ভাল মন্দ করার ক্ষমতা রাখেন, অলি আওলিয়ারা কবরে জীবিত আছেন, অলি আওলিয়ারা মরার পর ও বিভিন্ন প্রকারে উপকার পেৌছায়, অলি আওলিয়ারা কবরে কাছ ফরিয়াদ করলে শুনতে পান, মাজারে ওরস করাকে ইবাদাত মনে করে, মাজারে মান্নত করে, মাজারে জবেহ করে, রাসূলুল্লাহ ﷺ ওফাত ও জম্ম দিন কে তৃতীয় ঈদ মনে করে, কবরে সিজদাহ করে, মাধ্যম ছাড়া আল্লাহ পর্যান্ত পৌছান যায় না, মিলাদ কিয়াম করে, রাসূলুল্লাহ ﷺ কবরে আমাদের মতই জীবিত আছেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ নুরের তৈরি, রাসূলুল্লাহ ﷺ কবর জিয়ারত ওয়াজিব বা এর কাছাকাছি মনে করা, রাসূলুল্লাহ ﷺ এর কবরের মাটি আরস কুরছি ও লওহে মাহফুজ তেকে শ্রেষ্ট  মনে করা, রাসূলুল্লাহ ﷺ স্বপনের মতই জীবিত অবস্থায় দেখা যায়,  অলিদের কাশফ হয় (কাশফ কে অলিদের নিজস্ব ক্ষমতা মনে করা), আল্লাহর নুর থেকে নবী সৃষ্টি,  রাসূলুল্লাহ ﷺ না হলে পৃথিবী সৃষ্টি হত না,  অলি আওলিয়াদের কিরামত ইচ্ছাধীন মনে করা, অলি আওলিয়াদের কবরের নিকট বরকতের জন্য দোয়া করা, অলি আওলিয়াদের কবরের নিকট গিয়ে কোন কিছু চাওয়া,  নবী বা অলি আওলিয়াদের স্মৃতি বিজড়িত স্থান থেকে বরকত লাভ করা, তাবিজ কবজে বিশ্বাসি, দোয়ায় মৃত নবী, পীর ও অলি আওলিয়াদের অছিলা দেওয়া, স্বন্পকে শরিয়তের দলিল মনে করেনা কিন্তু প্রমান হিসাবে ব্যবহার করে, কলবের তাওয়াজ্জু দানে বা নেক নজরে বিশ্বাসি, এলম সিনা থেকে সিনার মধ্যমে চলে আসছে, পীর ধরা ওয়াজিব মনে করে। পীর ও অলি আওলিয়াদের ছাড়া সংশোধন হয় না, অহেদাতুল অজুদে বিশ্বাসি, পীর বা শায়েকের ধ্যান করে, বিপদে পীর বা শায়েকদের আহবান করে, গাউস, কুতুব, আবদাল, নকিব ইত্যাদিতে বিশ্বাসি, সংশোধন জন্য যে কোন একটা তরিকা ধরতে হবে।আমাদের দেশে আটরশী, মাইজভান্ডারী, দেওয়ানবাগী, সুরেস্মরী, রাজারবাগীসহ অনেক পীর ও তাদের মুরিদগন উপরের আকিদাই পোষণ করে। তবে চরমোনাই, শর্শিনা ও ফুরফরার একাংশ উপরের আকিদা থেকে কিছুটা মুক্ত। এক কথায় বলা যায় যারাই পীর ধরবেন, তারাই শিরকি বিদআতে ডুববেন। উপমহাদেশে শিরকি বিস্তারে সুফিবাদ অনেকাংশেই দায়ি।

৭। মাধ্যম ধরার ভুল ব্যাখ্যা

অনেকেই আল্লাহকে পেতে মাধ্যম সাব্যস্ত করতে গিয়ে সীমালংঘন করেছে। মাধ্যমের ভুল ব্যাখ্যা করে হাজার হাজার মানুষকে পথভ্রষ্ট করছে। তাদের যুক্তি, মাধ্যম ছাড়া আল্লাহ পর্যান্ত পৌছান যাবেনা। পুল পারাপারের জন্য ধরনির দরকার, বড় বড় অফিসার বা মন্ত্রীদের কাছে সরাসরি যাওয়া যাবে না, পিএ বা সহকারির মাধ্যম দরকার। বিচরকের কাছে সরাসরি যাওয়া যাবে না, উকিল দরকার। ঠিক তেমনি ভাবে, রাসূল ﷺ এবং অন্যান্য নবী ও নেক্কার ব্যক্তিবর্গকে মাধ্যম না মানলে আল্লাহ তায়ালা তাদের কারো কোন আমল  কবুল করবেননা। যেহেতু রাসূল ﷺ এবং অন্যান্য নবী জীবিত নেই তাই কোন না কোন অলী বা নেক্কার ব্যক্তিবর্গকে মাধ্যম মানতে হবে।

তাদের এই যুক্তির অসারতা দেখুন, বড় বড় অফিসার বা মন্ত্রীবর্গ সাধারনত সকল মানূষ সম্পর্কে সমান জ্ঞান রাখে না। তাই তাদের জ্ঞান দান করার জন্য মাধ্যম দরকার। জ্ঞান সল্পতার জন্য সহকারি রাখেন, তারই মাধ্যমে যোগাযোগ করতে বলেন। আমার আল্লাহ কি জ্ঞানের কোন সল্পতা আছে? (নাউজুবিল্লাহ)। মনে করলে ঈমান থাকিনা। আল্লাহ আলেমুল গায়েব, তিনি আমেরিকার রাষ্ট্রপতিকে যেমন চেনেন, ঠিক তেমনি অজপাড়া গায়ের ভিক্ষুকটিকে চেনেন। ভাল করে ভাবেন, দুনিয়ার বিচারক ঘুস খায়, দর্নীতি পনায়ণ, স্বজন প্রীতি করে, সুপারিশ গ্রহন করে। আর এই সকল ফায়দা লোটার জন্য মাধ্যম দরকার হয়। আমার আল্লাহ কি ন্যয় পরায়ণ নয়? (নাউজুবিল্লাহ)। আল্লাহ কি সব বিচারকের চাইতে বড় বিচারকের নন? (সুরা তীন:৮)। তাহলে মাধ্যম কেন? বিচারক যদি ঘটনার সময় উপস্থিত থাকেন তবে উকিলে প্রয়োজন কিসের? এই সকল যুক্তি হল অজ্ঞ মানুষ ঠকানোর যুক্তি।

অথচ আল্লাহ তা’আলা পবিত্র কুরআনে বলেন: 

 وَإِذَا سَأَلَكَ عِبَادِى عَنِّى فَإِنِّى قَرِيبٌ‌ۖ أُجِيبُ دَعۡوَةَ ٱلدَّاعِ إِذَا دَعَانِ‌ۖ فَلۡيَسۡتَجِيبُواْ لِى وَلۡيُؤۡمِنُواْ بِى لَعَلَّهُمۡ يَرۡشُدُونَ

আর যখন আমার বান্দাগণ তোমাকে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবে, আমি তো নিশ্চয় নিকটবর্তী। আমি আহবানকারীর ডাকে সাড়া দেই, যখন সে আমাকে ডাকে। সুতরাং তারা যেন আমার ডাকে সাড়া দেয় এবং আমার প্রতি ঈমান আনে। আশা করা যায় তারা সঠিক পথে চলবে। সুরব বাকারা : ১৮৬

আল্লাহ তা’আলার এ বাণীর পরিবর্তে যারা যুক্তিদেয় তাদের বিশ্বাসের সংগতি কতটুকু? এ আয়াত ইঙ্গিত করছে যে, আল্লাহর কাছে পৌঁছার একমাত্র মাধ্যম হচ্ছে তার উপর সঠিকভাবে ঈমান আনা এবং তার প্রদর্শিত পথে ইবাদাত করা। এ দুটি ছাড়া আল্লাহ সন্তষ্টির আর তৃতিয় মাধ্যম নেই। অনেকে আবার নানন অজুহাত দেখিয়ে বলে অলীরা শুধু অসিলা মাত্র। কুরআনের সুরা মায়েদার ৩৫ নম্বর আয়াত উল্লখ করে বলেন স্বয়ং আল্লাহই অসিলা ধরতে বলেছেন। দেখুন আল্লাহ কি বলেন:

يَـٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ ٱتَّقُواْ ٱللَّهَ وَٱبۡتَغُوٓاْ إِلَيۡهِ ٱلۡوَسِيلَةَ وَجَـٰهِدُواْ فِى سَبِيلِهِۦ لَعَلَّڪُمۡ تُفۡلِحُونَ (٣٥):

হে মুমিনগণ, আল্লাহকে ভয় কর এবং তার নৈকট্যের (অসিলা) অনুসন্ধান কর, আর তার রাস্তায় জিহাদ কর, যাতে তোমরা সফল হও। সূরা মায়িদা : ৩৫ 

আল্লাহ তাআলা কুরআনে অসীলা শব্দের উল্লেখ করেছেন এবং তা দ্বারা পূর্ণ আনুগত্য করাকেই বুঝিয়েছেন কারণ এটা (অর্থাৎ আল্লাহ তার রাসূলের পূর্ণ আনুগত্যই) একমাত্র মাধ্যম যা তাঁর নৈকট্য দিতে পারে এবং তার রহমতের দরজা খুলতে জান্নাতে প্রবেশ করাতে সক্ষম

যারা নেককার বান্দাদেরকে অসীলা হিসাবে গ্রহন করে তাদেইর আল্লাহ তায়ালা পরিহাস করছেন কারণ তারা যে সকল নেককার বান্দাদেরকে অসীলা বানাচ্ছে তারা নিজেরাই অসীলা তথা আল্লাহর অনুগত্যের দ্বারা নৈকট্য হাসিলের অধিক মুখাপেক্ষীআল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন- 

اُولٰٓئِکَ الَّذِیۡنَ یَدۡعُوۡنَ یَبۡتَغُوۡنَ اِلٰی رَبِّہِمُ الۡوَسِیۡلَۃَ اَیُّہُمۡ اَقۡرَبُ وَیَرۡجُوۡنَ رَحۡمَتَہٗ وَیَخَافُوۡنَ عَذَابَہٗ ؕ اِنَّ عَذَابَ رَبِّکَ کَانَ مَحۡذُوۡرًا

তারা যাদেরকে ডাকে, তারা নিজেরাই তো তাদের রবের কাছে নৈকট্যের মাধ্যমে অনুসন্ধান করে যে, তাদের মধ্যে কে তাঁর নিকটতর? আর তারা তাঁর রহমতের আশা করে এবং তাঁর আযাবকে ভয় করে। নিশ্চয় তোমার রবের আযাব ভীতিকর। সূরা আল-ইসরা : ৫৭

অনেকে আবার আল্লাহর সাহায্য সহযোগিতা জন্য স্রষ্টা ও সৃষ্টির মাঝে মাধ্যম মানার চেষ্টা করে। কঠিন বিপদে পড়ে যখন কুল কিনারা পায় না, তখন অজ্ঞ শ্রেণীর মানুষ ছোটে মাজার পানে মাধ্যম ধরার খোজে। এ ব্যাপারটা আরও অত্যন্ত বিপজ্জনক বিষয়। পরিতাপের বিষয় যে, অনেক মুসলমানই এ সম্পর্কে পরিষ্কার কোন ধারণা রাখেনা। ফলে তারা সরাসরি শিরকি কাজে লিপ্ত হচ্ছে এবং আল্লাহর সাহায্য সহযোগিতা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। অথচ  আল্লাহ তায়ালা বলেন-

‌ۖ وَكَانَ حَقًّا عَلَيۡنَا نَصۡرُ ٱلۡمُؤۡمِنِينَ 

আর মু’মিনদের সাহায্য করা আমার দায়িত্ব। সূরা আর-রূম : ৪৭ 

আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন- 

 يَـٰٓأَيُّہَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ إِن تَنصُرُواْ ٱللَّهَ يَنصُرۡكُمۡ وَيُثَبِّتۡ أَقۡدَامَكُمۡ 

হে ঈমান গ্রহণকারীগণ, তোমরা আল্লাহকে সাহায্য করো তাহলে আল্লাহও তোমাদেরকে সাহায্য করবেন এবং তোমাদের পা সুদৃঢ় করে দিবেন৷ । সূরা মুহাম্মাদ : ৭

বড়ই পরিতাপের বিষয় যে, এ সমস্ত অজ্ঞ লোকেরা বিভিন্ন পীর বা অলীদের কে মাধ্যম হিসাবে গ্রহণ করেছে তাদের সত্তার উপর ভরসা করে নেক আমল করা থেকে বিরত থাকছে। অথচ যিনি সমস্ত মানব সন্তানের নেতা, সেই রাসূল ﷺ কে সম্বোধন করে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন-

قُل لَّآ أَمۡلِكُ لِنَفۡسِى نَفۡعً۬ا وَلَا ضَرًّا إِلَّا مَا شَآءَ ٱللَّهُ‌ۚ وَلَوۡ كُنتُ أَعۡلَمُ ٱلۡغَيۡبَ لَٱسۡتَڪۡثَرۡتُ مِنَ ٱلۡخَيۡرِ وَمَا مَسَّنِىَ ٱلسُّوٓءُ‌ۚ إِنۡ أَنَا۟ إِلَّا نَذِيرٌ۬ وَبَشِيرٌ۬ لِّقَوۡمٍ۬ يُؤۡمِنُونَ

হে মুহাম্মাদ ! তাদেরকে বলো, নিজের জন্য লাভ -ক্ষতির কোন ইখতিয়ার আমার নেই৷ একমাত্র আল্লাহই যা কিছু চান তাই হয়৷ আর যদি আমি গায়েবের খবর জানতাম, তাহলে নিজের জন্যে অনেক ফায়দা হাসিল করতে পারতাম এবং কখনো আমার কোন ক্ষতি হতো না৷ আমি তো যারা আমার কথা মেনে নেয় তাদের জন্য নিছক একজন সতর্ককারী ও সুসংবাদদাতা মাত্র৷  সূরা আরাফ : ১৮৮

সুতারং আল্লাহ নৈকট্য লভের প্রধান উপকরন হল ঈমান ও কুরআন সুন্নাহ ভিত্তিক নেক আমল। যদি মনে করে থাকি আত্মিয়তার সম্পর্ক তবে মারাত্ত্বক ভুল করবেন। একটু লক্ষ করুন, ইউসুফ (আ.) এর পিতা ইয়াকুব (আ.)। ইয়াকুব (আ.) এর পিতা ইছহাক (আ.)। ইছহাক (আ.) এর পিতা ইব্রাহীম (আ.)। এই চার জন সম্মানিত নবি একত্রে মিলে কি তাদের পূর্ব পুরুষ  ইব্রাহীম (আ.) এর পিতা আজর কে জান্নাতে নিতে পারবেন? নিশ্চয়ই না। আমাদের প্রিয় নবি ﷺ এর চাচা, আলীর (রা.) বাবা, ফাতিমার (রা.) শশুর, হাসান হোসেনের (রা.) দাদা, আবু তালিবকে, কি সকলে মিলেও জান্নাতের জন্য সুপারিশকরতে পারবেন? কঠিন প্রশ্ন, এবার একটু ভাবেন আপনার শয়েখ বা পীরের ক্ষমতা কত টুকু?

অনুরুপভাবে রাসূল ﷺ তাঁর কলিজার টুকরা কন্যাকে ফাতিমা (রা.) কে আমল করার জন্য আহবান করেছেন। আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন এ মর্মে আয়াত নাযিল হয়- “তোমার নিকটাত্মীয়বর্গকে সতর্ক করে দাও, সূরা আশ শুয়ারা-২১৪। তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ সাফা পর্বতের উপর দাঁড়িয়ে বললেন-

يَا فَاطِمَةَ بِنْتَ مُحَمَّدٍ يَا صَفِيَّةُ بِنْتَ عَبْدِ الْمُطَّلِبِ يَا بَنِي عَبْدِ الْمُطَّلِبِ لاَ أَمْلِكُ لَكُمْ مِنَ اللَّهِ شَيْئًا سَلُونِي مِنْ مَالِي مَا شِئْتُمْ

হে ফাতিমা বিনতু মুহাম্মাদ! হে সাফিয়্যাহ বিনতু আবদুল মুত্তালিব! হে আবদুল মুক্তালিবের বংশধর। আল্লাহর আযাব থেকে তোমাদেরকে রক্ষা করার আমার কোন ক্ষমতা নেই। তোমরা আমার কাছে আমার সম্পদের যা খুশি চাও। সহিহ মুসলিম : ২০৫

তবে হ্যা, ঈমান এনে কুরআন সুন্নাহ মোতাবেক জীবন যাপন করলেই আল্লাহ সন্তষ্টি পাওয়া যাবে। এরপর চলার পথে ভুলত্রুটি হওয়া সাভাবিক ব্যপার। এই পাপগুলি আল্লাহর একান্ত ইচ্ছা মাপ করা বা না করা। এখানেই সুপারিশ দরকার। তখই নবী রাসুলগন, কুরআন, সিয়াম, নেক বান্দাসহ অন্যান্যদের সুপারিশ গ্রহন করা হবে, যাদের কথা সহিহ হাদিস সমুহে উল্লেখ আছে।আল্লাহ তায়ালা বলেন- 

 قُلۡ هَلۡ نُنَبِّئُكُم بِٱلۡأَخۡسَرِينَ أَعۡمَـٰلاً (١٠٣) ٱلَّذِينَ ضَلَّ سَعۡيُہُمۡ فِى ٱلۡحَيَوٰةِ ٱلدُّنۡيَا وَهُمۡ يَحۡسَبُونَ أَنَّہُمۡ يُحۡسِنُونَ صُنۡعًا (١٠٤) أُوْلَـٰٓٮِٕكَ ٱلَّذِينَ كَفَرُواْ بِـَٔايَـٰتِ رَبِّهِمۡ وَلِقَآٮِٕهِۦ فَحَبِطَتۡ أَعۡمَـٰلُهُمۡ فَلَا نُقِيمُ لَهُمۡ يَوۡمَ ٱلۡقِيَـٰمَةِ وَزۡنً۬ا (١٠٥)

বল, আমি কি তোমাদেরকে এমন লোকদের কথা জানাব, যারা আমলের দিক থেকে সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্ত? দুনিয়ার জীবনে যাদের চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে গেছে, অথচ তারা মনে করছে যে, তারা ভাল কাজই করছে! তারাই সেসব লোক, যারা তাদের রবের আয়াতসমূহ এবং তাঁর সাথে সাক্ষাতকে অস্বীকার করেছে। ফলে তাদের সকল আমল নিষ্ফল হয়ে গেছে। সুতরাং আমি তাদের জন্য কিয়ামতের দিন কোন ওজনের ব্যবস্থা রাখব না। সূরা কাহফ : ১০৩-১০৫

৮। অজ্ঞ লোক কর্তৃক শিরক মিশ্রিত দ্বীন প্রচার:

উপমহাদেশে সাধারনত মুঘোলদের মাধ্যমে ইসলামের প্রসার ঘটে। যদিও তাদের আগে ছিটাফোটা ইসলাম বৃদ্ধমান ছিল। মুঘোলদের সময়ে সুফিদের মাধ্যমে ও দ্বীন প্রচার প্রসার লাভকরে সবচেয়ে বেশী। কিন্ত অধিকাংশ সুফিগন দ্বীন সম্পর্কে অজ্ঞ ছিল। সুফিদের দ্বীনের প্রতি খুবই মহব্বত ছিল ইবাদাত বন্দেগিতে তারা খুবই একনিষ্ঠ ছিল। ইবাদাতের জন্য কঠোর সাধনায় জীবন দানেও কুন্ঠাবোধ করতনা কিন্তু ধর্মীয় জ্ঞান বা ইলম কম থাকার কারণে সঠিকভাবে সুন্নাহ মাফিক ইবাদাতটি সম্পন্ন করতে পারতনা। সেই সময়কার সুফিদের প্রচারিত ইসলামে শিরকি কাজ দেখা যায়। তাদের আবিস্কৃত শিরকি ও বিদাতি আমল আজও মুসলিম সমাজে প্রচলিত আছে। ইবাদতের নামে গান করা, মাযার তৈরি করা, পীর বা অলীদের জম্ম ও মৃত্যু বার্ষিকিতে মাজারে ঊরশ পালন করা।

সৌদী আরবের বিশিষ্ট আলেমে দ্বীন মুহাম্মাদ ইবন সালেহ আল উসাইমীন (র.) জেদ্দায় এক সম্মেলনে বলেন, ইসলাম প্রচার কারি দায়ীদের ছয়টি গুন থাকতে হবে। যথা-

১।  আল্লাহ পথের দায়ীরা যে দিকে মানুষকে ডাকবে সে সম্পর্কে ইলম তথা জ্ঞান থাকা।

২।  দাওয়াতের ক্ষেত্রে ধৈর্যধারণ করতে হবে।

৩।  হিকমত বা প্রজ্ঞা।

৪।  দায়ীকে উত্তম চরিত্রে চরিত্রবান হতে হবে।

৫।  দায়ীকে জড়তা ও প্রতিবন্ধকতা পরিহার করা।

৬।  দায়ীর অন্তর বিরোধীদের প্রতি উদার হতে হবে।

এখানে তিনি দ্বীন প্রচারকারি আল্লাহ পথের দায়ীদের প্রথম গুন হল দ্বীন সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা। সকলেই জানে তথ্য, থাকলে আদান প্রদান করা যায়। প্রশ্নের উত্তর জানা থাকলে উত্তর দেওয়া যায়। আর অজানা তথ্য কিভাবে দিবে? ইসলামের মুল প্রতিপাদ্য বিষয় হল কুরআন হাদিসের জ্ঞান। একজন দায়ী কি প্রচার করবে তার সিলেভাস কি ইসলাম তা নির্ধানর করেছে।মহান আল্লাহ তায়ালা বলে

يَـٰٓأَيُّہَا ٱلرَّسُولُ بَلِّغۡ مَآ أُنزِلَ إِلَيۡكَ مِن رَّبِّكَ‌ۖ وَإِن لَّمۡ تَفۡعَلۡ فَمَا بَلَّغۡتَ رِسَالَتَهُ ۥ‌ۚ

হে রসূল! তোমার প্রতিপালকের নিকট থেকে যা তোমার প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে তা প্রচার কর, যদি না কর তাহলে তুমি তাঁর বার্তা পৌঁছানোর দায়িত্ব পালন করলে না। সূরা মায়িদা : ৬৭

মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন-

قُلۡ ہٰذِہٖ سَبِیۡلِیۡۤ اَدۡعُوۡۤا اِلَی اللّٰہِ ۟ؔ عَلٰی بَصِیۡرَۃٍ اَنَا وَمَنِ اتَّبَعَنِیۡ ؕ وَسُبۡحٰنَ اللّٰہِ وَمَاۤ اَنَا مِنَ الۡمُشۡرِکِیۡنَ

বল, ‘এটা আমার পথ। আমি জেনে-বুঝে আল্লাহর দিকে দাওয়াত দেই এবং যারা আমার অনুসরণ করেছে তারাও। আর আল্লাহ পবিত্র মহান এবং আমি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত নই’। সুরা ইউসুফ : ১০৮

কাজেই পৌছাতে হবে, ‘ওহী’ যা মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে নাজিল হয়েছে। আর এ দাওয়াতের দায়িত্ব পালনের জন্য প্রথম শর্ত হলো কুরআন হাদিসের সহিহ জ্ঞান থাকা। আমি যে কাজ করার বা বর্জন করার দাওয়াত দিচ্ছি তা সত্যিই ইসলামের নির্দেশ কিনা তা জানতে হবে। সাধারন বিবেক ও জ্ঞান দ্বারা সকল মানুষ বুঝতে পারে কোনটি ন্যায়, কোনটি অন্যায়, কোনটি ভাল কোনটি মন্দ। যেমন- অন্যের সম্পদ জোর করে দখল করা। কাউকে বিনা কারণে খুন করা। চুরি করা, ডাকাতি করা, মারামারি করা, নেশা জাতীয় দ্রব্য পান করা, মাদকা দ্রব্য গ্রহন করা অন্যায় কে না জানে। এরুপ অগণিত অন্যায় কাজকে অন্যায় বলে জানতে বেশি জ্ঞানের প্রয়োজন হয় না। অনুরূপভাবে মানুষকে বিপদে সাহায্য করা, সান্ত্বনা দেওয়া, অন্যের অধিকারে হস্থক্ষেপ না করা, সৃষ্টির সেবা করা, দরিদ্রকে দান করা, রাস্তা-ঘাট, স্কুল কলেজ নির্মান করা ইত্যাদি ভাল কাজ বলে সবাই বুঝি। কিন্তু ইসলামি ধর্মে এমন অনেক বিষয় রয়েছে যে সম্পর্কে স্পষ্ট জ্ঞান না থাকলে মানুষ কে সত্যিকার মুসলিম হিসাবে তৈরি করতে পারবনা। যেমন- তাওহীদের জ্ঞান, শিরকের জ্ঞান, আকিদার জ্ঞার, ফিকহের জ্ঞান ইত্যাদি। এ স্পষ্ট জ্ঞান হলো ওহীনির্ভর জ্ঞান বা কুরআন ও হাদিসের স্পষ্ট নির্দেশনা।

 আল্লাহ তায়ালা বলেন-

 قُلۡ إِنَّمَآ أُنذِرُڪُم بِٱلۡوَحۡىِ‌ۚ وَلَا يَسۡمَعُ ٱلصُّمُّ ٱلدُّعَآءَ إِذَا مَا يُنذَرُونَ

বল, ‘আমি তো কেবল ওহী দ্বারাই তোমাদেরকে সতর্ক করি’। কিন্তু যারা বধির তাদেরকে যখন সতর্ক করা হয়, তখন তারা সে আহবান শোনে না। সূরা আম্বিয়া : ৪৫

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

إِنۡ أَتَّبِعُ إِلَّا مَا يُوحَىٰٓ إِلَىَّ وَمَآ أَنَا۟ إِلَّا نَذِيرٌ۬ مُّبِينٌ۬

আমি তো কেবল সেই অহীর অনুসরণ করি যা আমার কাছে পাঠানো হয় এবং আমি সুস্পষ্ট সাবধানকারী ছাড়া আর কিছুই নই৷ সুরা আহকাফ : ৯

এ জন্য দাওয়াতের দায়িত্ব পালনকারীকে কুরআন ও হাদিসের আলোকে স্পষ্টরূপে জানতে হবে, তিনি যে কাজ করতে বা বর্জন করতে দাওয়াত দিচ্ছেন তার শরিয়তি বিধান কি? উক্ত কাজ পালন বা বর্জনের দাওয়াতের জন্য রাসূলুল্লাহ ﷺ এর শেখানো পদ্ধতি কি? কাজটি সৎকর্ম হলে তা ফরজ, ওয়াজিব, মুসতাহাব কোন পর্যায়ের তা সম্পর্কে স্পষ্ট কোরআন ও হাদিসের আলোকে জানতে হবে। ওহীর স্পষ্ট নির্দেশনা ব্যতীত সাধারণ ধারণা, আবেগ, আন্দাজ ইত্যাদির ভিত্তিতে কোনো কিছুকে হালাল বা হারাম বলতে কোরআনুল কারিমে নিষেধ করা হয়েছে। পরিস্কার জানিয়ে দিচ্ছে, হালাল ও হারাম করার অধিকার আল্লাহ ছাড়া আর কারো নেই ।মহান আল্লাহ ইরাশাদ করেন-

وَلَا تَقُولُواْ لِمَا تَصِفُ أَلۡسِنَتُڪُمُ ٱلۡكَذِبَ هَـٰذَا حَلَـٰلٌ۬ وَهَـٰذَا حَرَامٌ۬ لِّتَفۡتَرُواْ عَلَى ٱللَّهِ ٱلۡكَذِبَ‌ۚ إِنَّ ٱلَّذِينَ يَفۡتَرُونَ عَلَى ٱللَّهِ ٱلۡكَذِبَ لَا يُفۡلِحُونَ (١١٦)

আর তোমাদের জিহবা দ্বারা বানানো মিথ্যার উপর নির্ভর করে বলো না যে, এটা হালাল এবং এটা হারাম, আল্লাহর উপর মিথ্যা রটানোর জন্য। নিশ্চয় যারা আল্লাহর উপর মিথ্যা রটায়, তারা সফল হবে না। সূরা নাহল : ১১৬

দায়ী ও মুবাল্লিগকে অবশ্যই সর্বদা বেশি বেশি কোরআন ও হাদিস, তাফসির, ফিকাহ, ও অন্যান্য ইসলামি গ্রন্থ অধ্যায়ন করতে হবে। কোরআন-হাদিস বাদ দিয়ে শুধুমাত্র আলেমদের রচিত গ্রন্থদি পড়ে দীনকে জানার চেষ্টা করা কঠিন অন্যায় এবং কুরআন হাদিসের প্রতি  অবহেলা ও অবজ্ঞা প্রদর্শন। মহান আল্লাহ কুরআনকে  সকল মানুষের হেদায়েতরূপে প্রেরণ করেছেন। তিনি তা বুঝা সহজ করে দিয়েছেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ উম্মতের জন্য তাঁর মহান সুন্নাত ও হাদিস রেখে গিয়েছেন। এগুলির সার্বক্ষণিক অধ্যায়ন মুমিনের জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদত, শ্রেষ্ঠতম জিকির ও দাওয়াতের প্রধান হাতিয়ার।

বর্তমান বাস্তবতার দিকে লক্ষ্য করলে আমরা সহজেই দেখতে পাই, আমাদের দেশসহ সারা বিশ্বে যারা ইসলামের দাওয়াত দিচ্ছে তারা নিজেরাই ইসলাম সম্পর্কে ভীষন অজ্ঞ। জাহেল বা অজ্ঞ লোকেরা মনে করছে দিন প্রচার করছে অথচ তারাই দ্বীনের বারটা বাজাচ্ছে। বিশেষ করে আক্বীদার ক্ষেত্রে একেবারেই অজ্ঞ বা ভুল আকীদায় বিশ্বাসী মানুষের প্রচারিত দ্বীনে শিরকের মহা উত্সব থাকা স্বাভাবিক।

৯। শিরক মিশ্রিত দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান

শিরকের অন্যতম কারণ আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে নানা মুখি শিক্ষা ব্যবস্থা প্রচলিত এমন নানা মুখি শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠান পৃথিবীতে আর কোথাও আছে কিনা জানা নেই এখানে দশ থেকে পরেন মুখি শিক্ষা ব্যবস্থা থাকলেও মূলত চারটি মাধ্যমকে প্রধান করে দেখা হয় যথা

সাধারন শিক্ষা পদ্দতি

আলিয়া শিক্ষা পদ্দতি

কওমিয়া শিক্ষা পদ্দতি

ইংলিশ মিডিয়াম শিক্ষা পদ্দতি

সাধারন শিক্ষা পদ্দতি বলতে বুঝি স্কুল কলেজের গতানুগতিক শিক্ষা এ শিক্ষা পদ্দতির প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায় নাম মাত্র বাধ্যতামুলক ইসলামি শিক্ষা চালু থাকলেও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায় ইসলামি শিক্ষা নেই বাকি বিষয়গুলি শিরক কাজের যে ধানরা দেয়, তার প্রতিরোধের মত শিক্ষা এই বইয়ে নাই ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলিতে সাধরনত পাচাত্যের সিলেভাস অনুসরন করা হয় এখানে ধর্মিয় শিক্ষার কোন বালাই নেই, শিরক সম্পর্কে জ্ঞান দান তো অনেক দুরের কথা আলিয়া মাদ্রাসায় ইসলামি শিক্ষার পরিধি সাধারন স্কুল কলেজ থেকে একটু বেশী হলেও শিক্ষার মান তেমন ভাল না দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বলতে আমরা কওমি মাদ্রাসাকে বুঝে থাকি আলেম বলতেও সেখান থেকে পাশ করা কেউ বুঝে থাকি অবশ্য ইহার বাহিতে ভাল ভাল ইসলামিক স্কোয়ালার বাহির হচ্ছে এই সকল মাদ্রাস যেখান থেকে আলেম বাহির হয়, তাহাদের কি শিরক মিশ্রিত দ্বীন শেখান হয়? প্রথমে এই সকল মাদ্রাসার সিলেভাজগুলি একটু পর্যালোচনা করি তারা কি পড়ে মাওলানা হচ্ছেন, মুফতি হচ্ছেন, মুফাস্সিরে কুরআন হচ্ছেন

 প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণী পর্যান্ত পড়ান হয়-

ক। আল কুরআন : কুরআন সুন্দর করে পড়তে শেখান হয়।

খ। ফিকাহ : বেহেশতী জিওর পড়ান হয় ফিকাহে প্রাথমিক জ্ঞান অর্জনের জন্য।   

গ। উর্দূ : উর্দূ কায়দা ও উর্দূ পহেলী, উর্দূ দুসরী পড়ান হয়।

ঘ। ফার্সী : ফার্সী ব্যাকরণ ও ফার্সী পহেলী, ফার্সী সাহিত্য পড়ান হয়।

ষষ্ঠ (মিজান) থেকে দশম (শরহেজামী) জামাতে পর্যান্ত পড়ান হয় :

আল কুরআন :  কুআনের অর্থ, শানে নুযুল ও সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা, আরবী ব্যাকরণ এবং সম্বলিত কিতাব।
ফিকাহ :  মালাবুদ্দা মিনহু, মুখতাসারুল কুদুরী, নুরুল আনোয়ার, শরহুল বিকায়াহ, হেদায়া ইত্যাদি পড়ান হয়।  

উর্দূ : উর্দূ কি তেসরী ও উর্দূ সাহিত্য পড়ান হয়।

ফার্সী : হেকায়াতে লতীফ, মসনবী রুমি এবং গুলিস্তসহ ফার্সী সাহিত্য সম্বলিত কিতাব।

এখানে উল্লেখ যে, ইদানিং কিছু কিছু মাদ্রাসায় প্রাথমিক পর্যায় বাংলা ও ইংরেজি পড়ানোর চেষ্টা করছে। ষষ্ঠ (মিজান) থেকে আবার বাংলা ও ইংরেজি পড়ান সিলেভাসে রাখেনি।

এছাড়া ও স্নাতকোত্তর (দাওরায়ে হাদিস) শ্রেণীতে কুতুবুল সিত্তাহসহ অনেকগুলব হাদিস পড়ান হয়। তারপর পড়ান হয় আকীদার বিষয়, বিভিন্ন তাফসীর, উচ্চ পর্যায়ে উসুলে ফিকাহ, উচ্চ পর্যায়ে আরবী কাব্য সাহিত্যে ইত্যাদি।

সিলেভাজগুলি পর্যালোচনা করে অনেকগুলি প্রশ্ন জম্ম নিয়ছে যার কোন সদ উত্তর খুজে পাইনি

ক. মাতৃভাষা বাংলা হওয়া সত্বেও, বাংল বাদ দিয়ে উর্দূ এবং ফার্সী ব্যাকারণ, কবিতা, সাহিত্য সম্বলিত কিতাব পড়ানোর যুক্তিকতা কতটুকু?

খ। যদি উর্দূ এবং ফার্সী ভাষা শিক্ষা করি, তবে আধুনিক কালের আন্তরজাতীক ভাষা ইংরেজী শিখতে বাধা কোথায়?

উর্দূ এবং ফার্সী ব্যাকারণ, কবিতা, সাহিত্য সম্বলিত কিতাব না পড়িয়ে আধুনিক বিজ্ঞান, তথ্য প‌্রযুক্তি, ভূগোল, ইতিহাস, সমকালিন অর্থনীতি ইত্যাদি পড়ালে সমস্যা কোথায়?

ঘ। হাদিস থেকেই ফিকাহ তৈরি হয়, হাদিস সম্পর্কে যারা গভির জ্ঞানের অধিকারি তারাই কেবল ফিকাহ রচনা করতে পানের। পৃথিবীর কোন ফিকাহবিদ হাদিস গ্রন্থ লিখেছেন প্রমান পাওয়া যায় না। তাহলে প্রথম দশ বছরে শুধু ফিকাহ কেন?

আফগান ফেরত এক মুজাহীদ মাওলানা আব্দুল জব্বার যিনি কওমি মাদ্রাসার সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারি, দেশে ফিরে কোন কাজ করতে না পেরে বলেছিলেন, “আমি কর্মহীন ধর্ম শিখেছি আর সাধারন স্কুল কলেজে ধর্মহীন কর্ম শিখান হয়”

আমার উদ্দেশ্য ছিল আমদের দ্বীনি প্রতিষ্ঠান শিরক মিশ্রিত দ্বীন শেখান তার একটা ধারনা দেওয়া সরাসরি বললে হয়তো কেহই মানবে না তাই সামান্য পর্যালোচনাপ্রত্যেকটি কওমি মাদ্রাসায় “বেহেশতী জিওর” পড়ান হয়  যা মুলত ফিকাহের কিতাব কিন্তু এটি তাবিজেরও কিতার। যেহেতু এই তাবিজের কিতারটি মাদ্রাসায় পড়ান হয় তাহলে প্রশ্ন হল, তাবিজের হুকুম কি?

সৌদি আলেমদের লেখা, ‘আকীদার মানদণ্ডে তাবীজ’, ‘ইসলামের দৃষ্টিতে তাবিজ-কবচের বিধান’, ‘শারঈ মানদণ্ডে তাবীয-কবচ’ এবং ‘ঝাড়-ফুঁক ভ্রান্ত তাবিজ-কবচ’ ইত্যাদি পড়ে বুঝেছি ইহা ছোট শিরক আর এর উপর তাওয়াক্কুল করলে বড় শিরক।

কওমি মাদ্রাসার সিলেভাজ ভুক্ত কিতাব “ইসলামি আকিদা ও ভ্রান্ত মতবাদ” কিতাবে বলা হয়েছে, “কুরআনের আয়াত, আল্লাহ নাম ও মাসনুন দোয়া দ্বারা ঝাড়-ফুক জায়েজ। আর যা দ্বারা ঝাড়-ফুক জায়েজ তা দ্বারা তাবিজ-কবজ ব্যবহার করাও জায়েজ”। তাদের রেফারেন্স হল, আদ্বুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস (রা.) কর্তৃক অবুঝ বাচ্চাদের কুরআন দিয়ে তাবিজ লিখে দেওয়া। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা)।

কিন্তু এ ব্যাপারে দেওবন্দী ও সালাফি সকল আলেমই একমত যে, নিম্ম লিখিত কারণে তাবিজ-কবজ ঝাড়-ফুক জায়েজ নাই।

ক। যে কালামের ভাষা বুঝা যায়না তা দ্বারা কোন প্রকার তাবিজ-কবজ ঝাড়-ফুক জায়েজ নাই।

খ। সংখ্যা সম্ভলিত তাবিজ-কবজ জায়েজ নাই কারণ ইহা অনেকটা জ্যেতিষীদের রাশি এবং ভাগ্য গনণার মত। তাছাড়া ইহার আবিস্কারক হল গ্রীসরা যা পরে আরবদের মাঝে প্রসার লাভকরে। ইসলামের মুল উত্স কুরআন হাদিসে এর অস্তিস্থ খুজেও পাবে না।

গ। শিরক যুক্ত কালাম বা আল্লাহ ছাড়া অন্যের আশ্রায় খোজা। যেমন: ইয়া ফিরাউন, ইয়া হামান, ইয়া কিতমির (জিনের সর্দার) ইত্যাদি লিখে তাবিজ দেওয়া।

ঘ। নকসা সম্ভলিত তাবিজ। যেমন: নবী সা. এর জুতার নকসা, (আলির রাদি:) তলোযারের নকসা, কাবার নকসা ইত্যাদি।

ঙ। আরবী ছাড়া অন্য কোন ভাষায় তাবিজ কবজ প্রদান করা।

চ। যদি কেউ এ বিশ্বাস করে যে, তাবিজ-কবজ ঝাড়-ফুকের নিজস্ব ক্ষমতা আছে তবে শিরক এবং নাজায়েজ।

বেহেশতী জিওর” কিতারটির তৃতীয় বলিউমের নবম খন্ডে, অনেক তাবিজের উল্লেখ আছে, এখানে সংখ্যার তাবিজ আছে, নকসার তাবিজ আছে, এমন কালামের তাবিজ যার ভাষা বুঝা। তাহলে তো নিজেদের ফতোয়ায়ে নিজেরাই শিরক কাজ করছি।

ফার্সী যে সকল কবিতার বই পড়ান হয় তার মুলভিত্তি হল, সুফিবাদ। শাইখুল হাদিস আজিজুল হক সাহেব (র.) মসনবী রুমি বাংলায় অনুবাদ করছেন, সাধারন কোন লোক ইহা পড়লে বিভ্রান্ত হবেই। এখানে হোসাইন বিন মানসুর হাল্লাজের আল্লাহতে বিলীন হওয়ার কথা আছে। অহহেদাতুল অজুদের কথা আছে। এত মাত্র দুটি উদাহরন দিলাম, ঠিক এভাবে দ্বীনি প্রতিষ্ঠান শিরক মিশ্রিত দ্বীন শেখান হয়

সমাজে শিরক অনুপ্রবেশেন কারণসমুহ : দ্বিতীয় পর্ব (১০-১৪)

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

 ১০। শিরক মিশ্রিত দ্বীনি কিতাব প্রচার

বাংল ভাষায় দ্বীনি কিতার রচনার ক্ষেত্রে আমরা চরম অবহেলা লক্ষ করি। অনেক পরে যে সকল কিতাব লেখা হয় তাও আবার সঠিক ছিল না। একটু লক্ষ করলেই ব্যাপাটি ষ্পষ্ট হয়ে যাবে। ইসলাম পৃথিবীতে আগমন করে সপ্তম শতকের (৬২২ সালে) প্রথম দিকে। আর আমরা বাংলা ভাষাভাষি, বাংলায় কুরআন হাদিস পাই প্রায় এগার শত বছর পর ঊনিষ শতকে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, মাওলানা আমীরউদ্দিন বসুনিয়া ১৮০৮ সালে প্রথম আমপারার তরজমা প্রকাশ করেন। রাজেন্দ্রনাথ মিত্র কুরআনের অনুবাদ করেন ১৮৭৯ খ্রিষ্টাব্দের ১৯ মার্চ। তার অনুবাদ পূর্ণাঙ্গ ছিল না, কয়েক খণ্ড ছিল।  গিরিশচন্দ্র সেনের অনুবাদ প্রকাশিত হয় ১৮৮১ খ্রিষ্টাব্দে এবং সমাপ্ত হয় ১৮৮৬ খ্রিষ্টাব্দে। টাঙ্গাইলের করটিয়া থেকে মৌলভি নঈমুদ্দিন ১৮৮৩ সালে ‘আকবারে ইসলামিয়া’ নামে মাসিক পত্রিকার মাধ্যমে আল-কুরআনের অনুবাদ প্রকাশ করতে থাকেন এবং ১০ পারা পর্যন্ত অনুবাদ সমাপ্ত করে তিনি ইন্তেকাল করেন ১৯০৮ সালের ২৩ নভেম্বর। সর্বপ্রথম পূর্ণাঙ্গ বুখারির অণুবাদ করেন শাইখুল হাদিস আজিজুল হক সাহেব (র.)। তিনি ১৯৫৭ সালে অনুবাদের কাজ শুরু করেন ৩৫ বছর পর ১৯৯২ সালে হাদীসের ব্যাখ্যাও পেশ করেছেন পূর্ণাঙ্গ বুখারির। এর আগে আশির দশকেও খন্ড খন্ড প্রকাশ পেয়েছে। ইসলামি ফাইন্ডেশন প্রকাশ করে ১৯৯১ সালে। এভাবে সহিহ মুসলিম প্রকাশ হয় ১৯৯৯ সালে, আবু দাউদ হয় ১৯৯০ সালে। অবশ্য এর আগে আগে আশির দশকে তাফসিরে ইবনে কাসির, মারেফুল কুরআন ও তাফহিমুল কুরআনসহ বেশ কিছু তাফসির প্রকাশিত হয়।

ইসলাম আগমনের পর প্রায় এগার শত বছর পর্যান্ত ইসলাম ছিল শুধু মানুষের মুখে মুখে। শুনা কথা যদি বছরের পর বছর চলতে থাকে, তবে তার আসল নকল খুজে পাওযা ভার। কুরআনের অনুবাদ টুকু বাদ দিলে, সহিহ ইসলাম প্রকাশিত হয় আশির দশকে। তবে কিছু আলেম ছিলেন, যারা ইংরেজ আমল (১৭৫৭-১৯৪৭) নানা মুখি তত্পরতার মাধ্যমে সহিহ ইসলামের বানী প্রচার করছেন। কিন্তু তারা ইসলাম ধর্মের আকিদা আমল সম্পের্কে কোন বাংলায় কিতার প্রকাশ করেনি। ঠিক তখন মৌলভি মোঃ গোলাম রহমান ‘মকছুদুল মুমিনীন’ নামে একটি বই প্রকাশ করে, ইতোমধ্যে বইটির অর্ধশতাধিক সংস্করণ প্রকাশিত ও নিঃশেষিত হয়েছে। উপহার হিসেবে বিয়েতে পাওয়ায় কিংবা ক্রয় সুবাদে গ্রামাঞ্চলের অধিকাংশ অল্প শিক্ষিত মুসলিম দম্পতির ভাণ্ডারেই এই গ্রন্থটি সংরক্ষিত আছে। যারা নিয়মিত কোরআন অধ্যয়ন করে না, তারাও এটির অধ্যয়ন ও চর্চা করে থাকে। ব্যবহারিক ইসলামের অন্যতম প্রামাণিক সংকলন হিসেবে এটি তাদের কাছে গৃহীত। অথচ বর্তমান আলম সমাজ ‘মকছূদুল মুমিনীন’ বইটি সম্পর্কে বলেন, বইটি মোটেই নির্ভরযোগ্য নয়। এ বইটি ক্রয় করা যাবে না, পড়াও যাবে না। কারণ বইটি জাল, যঈফ, মিথ্যা ও বানোয়াট কাহিনীতে ভরপুর। শরিয়ত বিরোধী অনেক মাসায়েল আছে। আলেম সমাজ যদি সেই সময় কোন সহিহ কিতাব রচরা করত, তবে কি আমরা এই সকল ভুলে ভরা বই পড়ে বিভ্রান্ত হতাম। মৌলভি মোঃ গোলাম রহমান ‘মকছুদুল মুমিনীন’ লিখে হয়ত ভুল আমলের শিক্ষা দিয়েছেন কিন্তু আলেম সমাজ কি দিল? তাই আমরা ‘মকছূদুল মুমিনীন’ বইটি বর্জন করি, আর মৌলভি মোঃ গোলাম রহমানের জন্য দোয়া করি মহান আল্লাহ যেন তার ভুল ত্রুটি মাপ করে, তার চেষ্টাটুকু কবুল করেন। এভাবে নিয়ামুল কুরআন, তাসকেরাতুল আওলীয়া, তাসকেরাতুল আম্বিয়া, বিশ্ব নবী (গোলাম মস্তফা), বিষাদ সিন্ধুসহ (মীর মোসারফহোসেন) আরও কিছু বই প্রকাশিত হয় যা কুরআন ও সহিহ হাদিস ভিত্তিক ছিলা না। আবার আমাদের দেশে সহিহ হাদিস গ্রন্থগুলি অনুবাদের আগে ইমাম গাজ্জালী (রহ.) এর অনেক বই অনুবাদ হয়েছে। অধিকাংশের ধারনা ইমাম গাজ্জালী (রহ.) সকল লেখা শতভাগ বিশুদ্ধ। আসলে ব্যপারটি এমন নয়, উনি গ্রন্থ লেখার ক্ষেত্রে সহিহ জঈফ যাচাই বাচাই করেন নি। তাই ওনার লেখা বই থেকে হাদিস সম্ভলিত কোন কিছু গ্রহন করতে হলে তাহকিক (খোজ খবর) করে গ্রহন করতে হবে।

মুল কথা হল, আশির দশকের আগে কোন সহিহ কিতার বাংলায় প্রকাশ হয়নি। তাইতো, বর্তমানে যদি কাউকে শিরকি বা বিদাতি আমল করতে দেখেন, আর যদি বলেন আপনার আমলটি কিন্তু ভুল, সে অমনি রেগে গিয়ে বলবেন এতদিন তাহলে ভুল করলাম, বাপ দাদা সকলেই ভুল ছিল, অমুক হুজুর কি কম বুঝে, তুমি বাবা একটু আধটু ইলম নিয় বেশী ফটফট করছ। এখন নতুন ইসলাম দেখলাম, ইত্যাদি ইত্যাদি। শিরক বিস্তারে এই সকল ভুলে ভরা কিতাবের অনেক অবদান আছে।

১১।  শিরক মিশ্রিত কিচ্ছা কাহিনীর মাধ্যমে ওয়াজ নসিয়ত করা:

যুগ যুগ ধরে ইসলাম প্রচারের অন্যতম মাধ্যম হল ওয়াজ মাহফিলের আয়োজন। প্রতি বছর বিভিন্ন সংগঠন, সমিতি, ক্লাব, মসজিদ কমিটি, মদ্রাসা কমিটি এবং ব্যক্তি উদ্দ্যগেও বিভিন্ন সময় ওয়াজ মাহফিলের আয়োজন করা হয়। দেশের নামি দামি সুরেলা কন্ঠের অধিকারি বক্তাগন, সে সব মাহফিল মুল্যবান ওয়াজ করে থাকেন। তাদের ওয়াজের বিষয় বস্তু খুজে পাওয়া ভার। মাঠ গরম করার জন্য অনেক সময় কল্পিত গল্পের অবতারনা করে। তবে বিষয় বস্তু সম্বলিত আলোচনা আজ আর দুর্লভ নয়, যা আগের দিনে ভাবাও যেত না। এখনও প্রতিযোগিতা আছে কার কন্ঠ কত সুরেলা, কত মিষ্ট কন্ঠে শ্রতাদের মন জয় করতে পারে। শ্রতাদের দোষ কম নয়, তারাও চায় তাদের কে কত কাদাতে বা হাসাতে  পারে। শ্রতাদের মন জয় করতে গিয়ে অনেক সময় অনুমান ভিত্তিক মিথ্যা কথার প্রচার করে। আলেম হওয়া সত্বেও আল্লাহর বানী ভুলে যান।

মহান আল্লাহ বলেন-

فَاجۡتَنِبُوا الرِّجۡسَ مِنَ الۡاَوۡثَانِ وَاجۡتَنِبُوۡا قَوۡلَ الزُّوۡرِ ۙ

সুতরাং তোমরা বর্জন কর মূর্তি পূজার অপবিত্রতা এবং দূরে থাক মিথ্যা বলা হতে। সূরা হজ্জ : ৩০

মহান আল্লাহ বলেন-

وَلَا تَقۡفُ مَا لَیۡسَ لَکَ بِہٖ عِلۡمٌ ؕ اِنَّ السَّمۡعَ وَالۡبَصَرَ وَالۡفُؤَادَ کُلُّ اُولٰٓئِکَ کَانَ عَنۡہُ مَسۡـُٔوۡلًا

যে বিষয়ে তোমার কোন জ্ঞান নেই সেই বিষয়ে অনুমান দ্বারা পরিচালিত হয়োনা। কর্ণ, চক্ষু, হৃদয় – ওদের প্রত্যেকের নিকট কৈফিয়ত তলব করা হবে। সূরা ইসরা : ৩৬

মহান আল্লাহ বলেন

وَمَنۡ اَظۡلَمُ مِمَّنِ افۡتَرٰی عَلَی اللّٰہِ کَذِبًا ؕ  اُولٰٓئِکَ یُعۡرَضُوۡنَ عَلٰی رَبِّہِمۡ وَیَقُوۡلُ الۡاَشۡہَادُ ہٰۤؤُلَآءِ الَّذِیۡنَ کَذَبُوۡا عَلٰی رَبِّہِمۡ ۚ 

যারা আল্লাহর নামে মিথ্যা বানিয়ে বলে তাদের চেয়ে বড় জালেম কে হতে পারে? ওদেরকে ওদের প্রভুর সামনে হাজির করা হবে, আর সাক্ষীরা বলবে, “এরাই এদের প্রভুর নামে মিথ্যা। সুরা হুদ : ১৮

মহান আল্লাহ বলেন-

اِنَّمَا یَفۡتَرِی الۡکَذِبَ الَّذِیۡنَ لَا یُؤۡمِنُوۡنَ بِاٰیٰتِ اللّٰہِ ۚ وَاُولٰٓئِکَ ہُمُ الۡکٰذِبُوۡنَ

একমাত্র তারাই মিথ্যা রটায়, যারা আল্লাহর আয়াতসমূহে বিশ্বাস করে না। আর তারাই মিথ্যাবাদী। সূরা নাহাল : ১০৫

আল্লাহ এবং তার রাসূলের নামে যারা মিথ্যা রটায় তারা নিকৃষ্ট মাখলুক। তারা আল্লাহর নিদর্শনসমূহের ওপর বিশ্বাস রাখে না, তারা কাফের, তারা বদ্দীন, তারা মানুষের নিকট মিথ্যুক হিসেবে পরিচিত।

ইবনু আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

بَلِّغُوْا عَنِّيْ وَلَوْ آيَةً وَحَدِّثُوْا عَنْ بَنِيْ إِسْرَائِيْلَ وَلَا حَرَجَ وَمَنْ كَذَبَ عَلَيَّ مُتَعَمِّدًا فَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنْ النَّارِ

আমার কথা পৌঁছিয়ে দাও, তা যদি এক আয়াতও হয়। আর বনী ইসরাঈলের ঘটনাবলী বর্ণনা কর। এতে কোন দোষ নেই। কিন্তু যে কেউ ইচ্ছে করে আমার উপর মিথ্যারোপ করল, সে যেন জাহান্নামকেই তার ঠিকানা নির্দিষ্ট করে নিল। সহিহ বুখারি : ৩৪৬১, মিসকাত : ১৯৮)

আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

لاَ تَكْذِبُوا عَلَىَّ، فَإِنَّهُ مَنْ كَذَبَ عَلَىَّ فَلْيَلِجِ النَّارَ

তোমরা আমার উপর মিথ্যারোপ করো না। কারণ আমার উপর যে মিথ্যারোপ করবে সে জাহান্নামে যাবে। সহিহ বুখারি : ১০৬

আলী (রাঃ) বলেছেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, তোমরা আমার নামে মিথ্যা কথা রটিও না। যে ব্যক্তি আমার নামে মিথ্যা রটাবে, সে জাহান্নামে যাবে। মসনদে আহমাদ : ৬২৯, ৬৩০, ১০০০, ১০০১ হাদিসের মান সহিহ

সামুরাহ ইবনু জুনদুব (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন, যে ব্যাক্তি জ্ঞাতসারে আমার নামে মিথ্যা বর্ণনা করলো, সেও মিথ্যাবাদীদের একজন। সুনানে ইবনে মাজাহ : ৩৯

মুগীরাহ ইবনু শুবাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, আমার পক্ষ হতে যে লোক কোন হাদীস বর্ণনা করে অথচ সে জানে যে, তা মিথ্যা, সে মিথ্যাবাদীদের একজন। সুনানে তিরমিজি : ২৬৬২

আবার অলীদের নামে এমন সব মিথ্যা আজগোবি কিরামত তৈরি করে যা শিরকে আকবর। কয়েকটা উদাহরন দিলেই বুঝা যাবে এরা ইসলমের খাদেম না ধ্বংশ কারী। এক বক্তা নাম তার “তোফাজ্জল হোসেন ভৈরবী” এক মাহফিলে শ্রোতাদের বললেন, “আমি এমন পীরের মুরিদ হই না যিনি ভৈরব বসে চট্রগ্রামের খবর নিতে পারেন না”। পীরকে আলেমুল গাইবের অধিকারি করে দিলেন, যে গুনটি নবী ﷺ এর ও ছিলনা।

আব্দুল কাদীর জিলানীর সম্পর্কে ঐ বক্তা বললেন, “আব্দুল কাদীর জিলানীর বাবা মসজিদের ইমামতি করতেন। একদিন বাচ্চা ছেলে জিলানীকে নিয়ে মসজিদে গেলেন নামাজ পড়তে। বাচ্চা ছেলেকে মসজিদের বারান্দায় রেখে বাবা মসজিদের ভীতরে গেলেন। মুসুল্লিরা বাইরে এসে দেখলেন যে জুতাকে দু ‘ভাগ করে রাখা হয়েছে। মুসুল্লিরা রাগ করে বললেন, বাচ্চাটা কার? “আব্দুল কাদীর জিলানীর বাবা মসজিদের ভীতর থেকে এসে বললেন, আমার। বাবা ছেলেকে বললেন, তুমি কেন এমন করলে? আব্দুল কাদির বলল, বাবা আমি জান্নাতিদের জুতা একদিকে নিছি আর দোযখীদের জুতা আরেক দিকে নিছি।” (নাওযুবিল্লাহ)। আব্দুল কাদীর জিলানীর পাওযার কত যা, আল্লাহ কোন নবী রাসূলকে দেননি। এক বক্তা বললেন, মরার পর পীর সাহেব নকি কাফন চোরের হাত ধরে ফেললেন। এক অলীকে মরার পর গোসল দিতে গেলে, হাতের বৃদ্ধ আঙ্গুল ধরে ফেললেন। গোসলদার কারি বললেন, তুমি জীবিত, অলী বললেন তুমি জাননা, ‘আল্লাহ অলীরা মরে না’। এভাবে হাজার হাজার মিথ্যা কাহিনী রচনা করে মানুষকে শিরকি আকিদা শিখান হচ্ছে।

অনেক আধা আলেম যাদের জাল জঈফ সম্পর্কে জ্ঞান নেই, তারা যা শুনেছে, যা পড়েছে, যেখান থেকে হোক পড়েছে অথবা যা দেখেছে, কোন বাচ বিচার না করে সুন্দর কন্ঠে বর্ননা করছেন, বাহ্বা নিচ্ছেন। উদাহরনের জন্য কয়েকটার শিরোনাম দিলাম:

১. সাদ্দাদের বেহেস্তের কথা প্রায় বক্তার মুখে শুনি, কুরআন হাদিসে এর কোন ভিত্তি নেই, তবে আছে রজনীর কাহিনীতে।শাদ্দাদের বেহেশত বানানোর কিসসা একেবারেই অবাস্তব ও কাল্পনিক নির্ভরযোগ্য কোনো দলীল দ্বারা তা প্রমাণিত নয়। যারা এটি উল্লেখ করেছেন তারা ইসরাঈলী বর্ণনা থেকে তা এনেছেন। এজন্যই ইমাম ইবনে কাসীর ও আল্লামা ইবনে খালদুনসহ আরো অনেকেই এ কিসসাকে অবাস্তব বলেছেন।

 ২. নূহ (আ.) এর প্লাবন ও তাঁর কিশতির বিষয় কুরআন মাজীদের বিভিন্ন স্থানে বর্ণিত হয়েছে, যা কমবেশি সকলেরই জানা আছে। নুহ (আ.) এর নৌকায় মর ত্যগের কথা, প্লাবনে বুড়িকে রেখে যাওয়ার কথা। বানোয়াট কিসসা, এর কোনো ভিত্তি নেই। এমনিভাবে নূহ (আ.) এর প্লাবন কেন্দ্রিক আরেকটি ঘটনাও সমাজে প্রচলিত আছে। নূহ আলাইহিস সালামের প্লাবনের সময় যারা কিস্তিতে ছিল তারা নাকি প্লাবনে তাদের স্বজনদের হারানোর কারণে নূহ (আ.) কে হত্যার ষড়যন্ত্র করল। এটিও একটি বানোয়াট কিসসা এর কোনো ভিত্তি নেই।

৩. ইদ্রিস (আ.) বেহেশ্তে গিয়ে ফিরে না আসার কথাও একটি বানোয়াট কিসসা এর কোনো ভিত্তি নেই।

৪. কোনো কোনো বক্তাকে বলতে শোনা যায়, ইবরাহীম (আ.) যখন ইসমাঈল (আ.) কে কুরবানী করার জন্য নিয়ে যান, তখন তাকে এবং তার মা’কে দাওয়াত খাওয়া বা বেড়াতে যাওয়ার কথা বলেন।মিথ্যা কথা ইবরাহীম আলাইহিস সালামের নামে বানান হয়েছে।

অনেক বক্তাকে বলেন, ইবরাহীম (আ.) কে যখন আগুনে নিক্ষেপ করা হচ্ছিল, তখন জিবরীল (আ.) এসে বললেন, আপনাকে কি আমি কোনো সাহায্য করতে পারি? তিনি বললেন, আপনার কাছে আমার কোনো সাহায্যের প্রয়োজন নেই। তখন জিবরীল (আ.) বললেন, তাহলে আপনি আপনার রবের কাছে প্রার্থনা করুন। তখন ইবরাহীম (আ.) বললেন, যিনি আমার অবস্থা জানেন তাঁর কাছে আমার প্রার্থনা করার প্রয়োজন নেই। তাঁর জানাটাই আমার জন্য যথেষ্ট।এটি একটি ভিত্তিহীন কাহিনী

৫. অনেক বক্তার মুখে শোনা যায়, আসহাবে কাহফের কুকুর, সুলাইমান আ.-এর পিঁপড়া, সালেহ আ.-এর উটনী, ইসমাঈল আ.-এর দুম্বা জান্নাতে প্রবেশ করবে। কেউ কেউ এর সাথে আরো যুক্ত করে বলে,  মূসা আ: এর গাভী, বিলকিসের হুদহুদ পাখি, উযায়ের আ.-এর গাধা, ইউনুস আ.-এর মাছ ইত্যাদিও জান্নাতে প্রবেশ করবে। কেউ এটিকে এভাবে বলে, দশটি প্রাণী জান্নাতে প্রবেশ করবে।  আসহাবে কাহফের কুকুর, সুলাইমান আ.-এর পিঁপড়া…। সবই ভিত্তিহীন বর্নণা।

৬. অনেক বক্তাকে বলেন, বিদায় হজ্বে ‘ইয়াওমে আরাফা’ ও ‘ইয়াওমুন নাহর’-এর খুতবার শেষে রাসূলে কারীম ﷺ বলেছিলেন, “উপস্থিত ব্যক্তিরা যেন অনুপস্থিত ব্যক্তিদের কাছে (কথাগুলো) পৌঁছে দেয়”। ব্যস, এটা শোনা মাত্রই নাকি সাহাবীগণ যার ঘোড়ার মুখ যেদিকে করা ছিল তিনি দ্বীন প্রচারে সেদিকেই ছুটে গিয়েছেন। এটি বাস্তবসম্মত নয় এবং এমনটি ঘটা সম্ভবও নয়। কেননা উকূফে আরাফা এবং কুরবানীর পর হজ্বের অনেক কাজ বাকি থাকে। সেগুলো বাদ দিয়ে সকলে কীভাবে চলে যাবেন?

৭. একবার মূসা (আ.)-এর পেটব্যথা হল। মূসা (আ.) পেটব্যথার কথা আল্লাহকে বললে আল্লাহ বললেন, অমুক গাছের পাতা খাও। তিনি তা খেলেন এবং সুস্থ হয়ে গেলেন। পরবর্তীতে আবার মূসা (আ.)-এর পেটব্যাথা হলে তিনি আল্লাহ্র হুকুম ছাড়াই সেই গাছের পাতা খেলেন, কিন্তু এবার আর ব্যথা ভাল হল না। তখন আল্লাহ বললেন, গাছের পাতার কোনো ক্ষমতা নেই। এটি একটি ভিত্তিহীন বাক্য।

৮.     অনেক বক্তাকেই বলতে শোনা যায়, ‘একবার আবু বকর রা. আল্লাহর রাস্তায় দান করতে করতে সবকিছু দান করে দিলেন।এমন কি চট পরিহিত অবস্থায় নবীজীর কাছে আগমন করলেন। তখন জিবরীল (আ.) এসে বললেন, আপনার অনুকরণে আজ সকল ফেরেশতা চট পরিধান করেছে!! (নাউযুবিল্লাহ)। মিথ্যা বর্নণা। 

এমনকি একদিন জিব্রাইল (আ.) মানুষের আকৃতিতে আবু বকর (রা:) নিকট এসে জিজ্ঞাসা করলেন, বলুন তো জিবরীল এখন কোথায় আছেন? সিদ্দীকে আকবর রা. মুরাকাবার মাধ্যমে জিবরীল আ. কে খুঁজতে লাগলেন। আসমান-যমীনে কোথাও না পেয়ে তিনি বললেন, আপনিই জিবরীল! (নাউযুবিল্লাহ)।

৯. এভাবে উয়ায়েস কুরুনির দাত ভাঙ্গা, জুব্বা দান, মিরাজের রাত্রে আরশে জুতা না খোলা, আত্তাহিয়াতু লাভ করা, শত শত জাল কথা বক্তারা বলে যাচ্ছেন। আর অজ্ঞ লোকেরা না বুঝ, আলহাম দুলিল্লাহ, সুবহান আল্লাহ বলে গিলে খাচ্ছেন। 

এই সব মতলববাজ বক্তারা সুন্দর দরদী কণ্ঠ দিয়ে মিথ্যা হাদিস, নবীদের নামে মিথ্যা রটনা, অলীদের নামে কিচ্ছা কাহিনী ও কিরামতি শুনিয়ে মানুষকে কাঁদান।

এখানে আরো লক্ষণীয় বিষয় হল, ইসলাম সম্পর্কে জানার ও ইসলামী শরী‘আতের উৎস হল, কুরআন ও হাদিস। কুরআন সুন্নাহর বাহিরে ইসলাম সম্পর্কে জানার আর কোন মাধ্যম বা অবকাশ নাই। কিন্তু মুসলিমরা এ দুটি বিষয়কে বাদ দিয়ে এক শ্রেণীর নাম-ধারী আলেম-ওলামা, পীর-মাশায়েখ ও তথাকথিত ইসলামী চিন্তাবিদ যারা তাদের মনগড়া, মিথ্যা, বানোয়াট ও কল্পকাহিনীকে ইসলামের নামে চালিয়ে যায়, তাদের থেকে ইসলাম শিখে। তাদের খপ্পরে পড়ে একশ্রেণীর মুসলিম প্রতিনিয়ত ইসলাম বিষয়ে প্রতারিত হচ্ছে। ফলে তারা না জেনে না বুঝে মুসলিমদের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়ায় এবং ইসলামের সত্যিকার জ্ঞান লাভ হতে বঞ্চিত হয়।এভাবেই বক্তাদের মাধ্যমে শিরকের অনুপ্রবেশ ঘটছে।

১২।   মুসরিকদের সহাবস্থান

ইসলাম আসার আগেই উপমহাদেশে মজুদ ছিল শত শত কল্পিত দেবদেবীর পুজা, সন্যাসি ধারার জীবন জাপন, হাজারো কুসংস্কার ও লোকাচার। তদুপরি যে পরিমানে লোক এক সাথে ইসলাম ধর্ম গ্রহন করেছিল, আলেমদের অভাবে এক সাথে সেই পরিমান ইসলামি জ্ঞান দান করা সম্ভব ছিল না। ফলে ইসলামের সাথে আগেকার কুসংস্কার ও লোকাচার রয়েই গেছে। এর উদাহরন সরূপ বলা যায়, আজ ও মুসলিমগন শুভ অশুভ জ্ঞান করে, ঘটি পুজা করে, হাল খাতা পালন করে, নবান্ন উৎসব পালন করে, বৈশাখী মেলার আয়জন করে, নববর্ষ পালন করে। দুর্গা মুর্তির পূজাকে সর্বজনিন বলে মুসলিমকে প্রধান অতীথি করে। হিন্দুদের পাশাপাশি মুসলিমদের পুজায় উপস্থিতি লক্ষনীয়। অনেকে আবার পুজায় নিয়মিত চাদা প্রদান করে, কারণ জিজ্ঞাসা করলে বলেন এক সাথে থাকি চাদা না দিলে খারাপ ভাববে। মনে হয় এটা একটা মামুলি ব্যাপার অথচ এই পুজার সমর্থন দানের জন্য সেও মুসরিক। পহেলা বৈশাখীতে নবর্ষের মঙ্গল সোভা যাত্রার মুর্তি, প্লেকার্ড, ফেস্টুন, মুখোস মনে হবে হিন্দুদের সোভাযাত্রা অথচ এর পিছনে শত শত মুসলিম যুবুকের ঘাম। এত বড় শিরক কররেও সে মনে করছে এটা আমার সংস্কৃতি এটা আমার অধিকার। এভাবেই সহাস্থানের দ্বারা শিরকি কাজে লিপ্ত হচ্ছি যা নিজেরাও বুঝিনা।

১৩প্রবৃত্তি পূজা ও আত্মকেন্দ্রিকতা মানুষে শিরকের দিকে ধাবিত করে

মানুষ তার প্রবৃত্তির কামনা-বাসনাকে ইলাহ বানিয়ে নেয়। অর্থাৎ ব্যক্তির নিজের ইচ্ছা আকাংখার দাস হয়ে যাওয়া। যখন সে প্রবৃত্তির দাস হয়ে যায় তখন সে হারাম হালালের তোয়াক্কা না করে প্রবুত্তির অনুসরণ করে। প্রবৃত্তির একনিষ্ট আনুগত্য করার অর্থ হলো, তার ইলাহ বা উপাস্য আল্লাহ নয় বরং প্রবৃত্তিই তার উপাস্য। এভাবে দ্বিধাহীন আনুগত্যই তার উপাস্য হওয়ার জন্য যথেষ্ট। হয়তো সে প্রকাশ্যো তার প্রবৃত্তিকে উপাস্য বলে নাই, তার ইবাদতও করে নাই কিন্তু সে তাকে যেদিকে আহবান জানায় সে সেদিকেই চলে যায়। সে এমনভাবে মানুষ অকুন্ঠভাবে প্রবৃত্তির দাসত্ব করে তাকে ইলাহ বানিয়ে নেয়। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

اَفَرَءَیۡتَ مَنِ اتَّخَذَ اِلٰـہَہٗ ہَوٰىہُ وَاَضَلَّہُ اللّٰہُ عَلٰی عِلۡمٍ

তবে তুমি কি তাকে লক্ষ্য করেছ, যে তার প্রবৃত্তিকে আপন ইলাহ বানিয়ে নিয়েছে? তার কাছে জ্ঞান আসার পর আল্লাহ তাকে পথভ্রষ্ট করেছেন। সুরা জাসিয়া : ২৩

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আরও বলেন-

اَرَءَیۡتَ مَنِ اتَّخَذَ اِلٰـہَہٗ ہَوٰىہُ ؕ  اَفَاَنۡتَ تَکُوۡنُ عَلَیۡہِ وَکِیۡلًا ۙ

তুমি কি তাকে দেখনি, যে তার প্রবৃত্তিকে নিজের ইলাহরূপে গ্রহণ করেছে? তবুও কি তুমি তার যিম্মাদার হবে? সুরা ফুরকান :৪৩

প্রবৃত্তির অনুসরণ আমাদের একটি মারাত্মক সমস্যা। প্রবৃত্তির প্রধান চাহিদা টাকা পয়সা, পদমর্যাদা ও ক্ষমতার লোভ এতই প্রকট, তারা সামান্য অর্থের বিনিময়ে ইসলামের অনুশ্বাসন বিকিয়ে দিতে বিন্দু পরিমাণও কুণ্ঠাবোধ করে না।প্রবৃত্তি তার মন্দ আমলগুলিকে চাকচিক্যময় করে দেয় তখন থেকে ভাবতে থাকে দুনিয়ার জীবনই আসল জীবন। আর তখন থেকে তার সাথে আল্লাহর সম্পর্কে অবক্ষয় ঘটে এবং সে সালাত সিয়াম  ছেড়ে দেয়। আল্লাহর স্মরণ থেকে মন গাফেল হয়ে যেতে থাকে। তার গাফলতি যতই বাড়তে তাকে ততই তার প্রবৃত্তির বেড়ে যেতে থাকে। শেষ পর্যন্ত নৈতিক চরিত্র ও ব্যবহারিক জীবনের সকল ক্ষেত্র আল্লাহর হুকুমের পরিবর্তে নিজের মনগড়া পদ্ধতির অনুসারী হয়ে শিরকি কাজে লিপ্ত হয়। আর তখন সে ইসলামের পরিবর্তে প্রবৃত্তির পূজাকে বেচে নেয়।

 আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

اَفَمَنۡ کَانَ عَلٰی بَیِّنَۃٍ مِّنۡ رَّبِّہٖ کَمَنۡ زُیِّنَ لَہٗ سُوۡٓءُ عَمَلِہٖ وَاتَّبَعُوۡۤا اَہۡوَآءَہُمۡ

যে ব্যক্তি তার রবের পক্ষ থেকে আগত সুস্পষ্ট প্রমাণের উপর প্রতিষ্ঠিত সে কি তার মত, যার মন্দ আমল তার জন্য চাকচিক্যময় করে দেয়া হয়েছে এবং যারা তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করে? সুরা মুহাম্মদ : ১৪

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

فَاِنۡ لَّمۡ یَسۡتَجِیۡبُوۡا لَکَ فَاعۡلَمۡ اَنَّمَا یَتَّبِعُوۡنَ اَہۡوَآءَہُمۡ ؕ  وَمَنۡ اَضَلُّ مِمَّنِ اتَّبَعَ ہَوٰىہُ بِغَیۡرِ ہُدًی مِّنَ اللّٰہِ ؕ  اِنَّ اللّٰہَ لَا یَہۡدِی الۡقَوۡمَ الظّٰلِمِیۡنَ 

অতঃপর তারা যদি তোমার আহবানে সাড়া না দেয়, তাহলে জেনে রাখ, তারা তো নিজদের খেয়াল খুশীর অনুসরণ করে। আর আল্লাহর দিকনির্দেশনা ছাড়া যে নিজের খেয়াল খুশীর অনুসরণ করে তার চেয়ে অধিক পথভ্রষ্ট আর কে? নিশ্চয় আল্লাহ যালিম কওমকে হিদায়াত করেন না। সুরা কাসাসন : ৫০

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

 وَأَنِ ٱحۡكُم بَيۡنَہُم بِمَآ أَنزَلَ ٱللَّهُ وَلَا تَتَّبِعۡ أَهۡوَآءَهُمۡ

কাজেই হে মুহাম্মাদ! তুমি আল্লাহর নাযিল করা আইন অনুযায়ী তাদের যাবতীয় বিষয়ের ফায়সালা করো এবং তাদের খেয়ালখুশীর অনুসরণ করো না৷  সুরা মায়েদা : ৪৯

প্রবৃত্তির অনুসরণের ভয়াবহতাঃ

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন,

فَخَلَفَ مِنۢ بَعۡدِهِمۡ خَلۡفٌ أَضَاعُواْ ٱلصَّلَوٰةَ وَٱتَّبَعُواْ ٱلشَّہَوَٲتِ‌ۖ فَسَوۡفَ يَلۡقَوۡنَ غَيًّا 

তাদের পরে আসল এমন এক অসৎ বংশধর যারা সালাত বিনষ্ট করল এবং কুপ্রবৃত্তির অনুসরণ করল। সুতরাং শীঘ্রই তারা জাহান্নামের শাস্তি প্রত্যক্ষ করবে। সুরা মারিয়াম : ৫৯

৩৫. অর্থাৎ নামায পড়া ত্যাগ করলো অথবা নামায থেকে গাফেল ও বেপরোয়া হয়ে গেলো। এটি প্রত্যেক উম্মতের পতন ও ধ্বংসের প্রথম পদক্ষেপ। নামায আল্লাহর সাথে মু’মিনের প্রথম ও প্রধানতম জীবন্ত ও কার্যকর সম্পর্ক জুড়ে রাখে। এ সম্পর্ক তাকে আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের কেন্দ্র বিন্দু থেকে বিচ্যুত হতে দেয় না। এ বাঁধন ছিন্ন হাবার সাথে সাথেই মানুষ আল্লাহ থেকে দূরে বহুদূরে চলে যায়। এমনকি কার্যকর সম্পর্ক খতম হয়েগিয়ে মানসিক সম্পর্কেও অবসান ঘটে। তাই আল্লাহ একটি সাধারণ নিয়ম হিসেবে এখানে একথাটি বর্ণনা করেছেন যে, পূর্ববর্তী সকল উম্মতের বিকৃতি শুরু হয়েছে নামায নষ্ট করার পর।

আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, ’আমার সকল উম্মাত জান্নাতে যাবে, যে অস্বীকার করবে সে ব্যতীত। জিজ্ঞেস করা হলো, কে অস্বীকার করবে? তিনি বললেন, যারা আমার আনুগত্য স্বীকার করেছে তারা জান্নাতে যাবে। আর যে ব্যক্তি আমার অবাধ্য হলো সেই অস্বীকার করলো। সহিহ বুখারি : ৭২৮০, সহিহ আল জামি : ৪৫১৩, সহিহাহ : ৩১৪১।

এই হাদিসের মূল বক্তব্য হচ্ছে, কুরআন ও সুন্নাহকে ধারণ করার মাধ্যমে যে রসূলুল্লাহ ﷺ এর আনুগত্য করবে সেই জান্নাতে প্রবেশ করবে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তিকুরআন ও সুন্নাহবাদ দিয়ে তার প্রবৃত্তির অনুসরণ করে সে সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে যাবে সেই জাহান্নামে যাবে।

মুয়াবিয়া ইবনু আবূ সুফইয়ান (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন-

الْخَيْرُ عَادَةٌ وَالشَّرُّ لَجَاجَةٌ وَمَنْ يُرِدِ اللَّهُ بِهِ خَيْرًا يُفَقِّهْهُ فِي الدِّينِ

কল্যাণ হল সুস্বভাব এবং মন্দ হল প্রবৃত্তির তাড়না থেকে উদ্ভূত। আল্লাহ যার কল্যাণ সাধন করতে চান, তাকে দ্বীনের জ্ঞান দান করেন।  ইবনে মাজাহ : ২২১

আবূ ইয়ালা শাদ্দাদ ইবনে আওস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, বুদ্ধিমান সেই ব্যক্তি যে নিজের নফসকে নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং মৃত্যুর পরবর্তী জীবনের জন্য কাজ করে। আর নির্বোধ ও অকর্মন্য সেই ব্যক্তি যে তার নফসের দাবির অনুসরণ করে এবং আল্লাহর নিকট বৃথা আশা করে। সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪২৬০, সুননে তিরমিযী : ২৪৫৯, মিশকাত : ৫২৮৯

পক্ষান্তরে যে প্রবৃত্তির অনুসরণ থেকে বিরত থাকবে তাদে জান্নাহ দেওয়া হবে।

বিষয়ে কুরআনে ইঙ্গিত করা হয়েছে,

وَ اَمَّا مَنۡ خَافَ مَقَامَ رَبِّهٖ وَ نَهَی النَّفۡسَ عَنِ الۡهَوٰی ۰ فَاِنَّ الۡجَنَّۃَ هِیَ الۡمَاۡوٰی

আর যে ব্যক্তি তার রবের অবস্থানকে ভয় করে এবং প্রবৃত্তির অনুসরণ করা থেকে বিরত থাকে তারই ঠিকানা হলো জান্নাত। সূরা নাযিয়াত : ৪০-৪১

১৪। বেরেলভী বা রিজভীদের উত্থান

উপমহদেশ শিরক বিস্তারে প্রধান ভুমিকা রাখেন এই ‘বেরেলভী বা রিজভীদের’ মতবাদ। তাদের দ্বারা কিভাবে এবং কি কি শিরক বিস্তার লাভ করল তা জানার আগে তাদের পরিচয় জানা খুবই দরকার। এই মতবাদটি প্রতিষ্ঠা করেন শাহ আহমদ রেজা খাঁন নামের এক ভারতীয়। তিনি ১৮৫৬ সাল মোতাবেগ ১২৭২ হিজরীরর ভারতের উত্তর প্রদেশের বেরেলভী শহরে সওদাগরা নামক মহল্লায় স্বনামধন্য খান পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। যেহেতু এই মতবাদের প্রতিষ্ঠাতা শাহ আহমদ রেজা খাঁন, সুতারং তার রেজা নাম থেকে রেজভী শব্দটি উত্পত্তি হয়েছে। আবার তিনি যেহেতু ‘বেরেলভী’ শহরে জন্ম গ্রহণ করেন, সুতারং তার জম্ম স্থানের নাম অনুসারে এই মতবাদটি কে বেরেলভী নামেও নাম করন করা হয়। তার অনুসারিরা তাকে ‘আলা হযরত’ হিসাবে পরিচয় দেন। বেরেলভী মতবাদের অনুসারীদের কাছে এ দলের নাম ‘আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আত’ বা সুন্নী মুসলিম। নিজেদেরকে তারা সুন্নী ইসলামের অনুসারী প্রমাণ করার জন্য এ নাম ব্যবহার করে। তবে অন্যদের কাছে দলটি ‘বেরেলভী’ নামেই সমধিক পরিচিত। বাংলদেশ তার অনুসরির সংখ্যা কম নয়, তবে পাকিস্তার ও ভারতে তার অনুসরির সংখ্যা অনেক। তাদের আকিদায় মারাত্ত্বক বিভ‌্রান্তি লক্ষ করা যায়। তারা সুফিবাদে বিশ্বাসি কাজেই সুফী দর্শণে সুফিদের আকিদায় যে ভ্রান্তিগুলি উল্লেখ করা হইয়াছে উহার সবগুলি ‘বেরেলভী’ আকিদা। এগুলি প্রমানের জন্য তাদের কোন বইয়ের রেফারেন্স দেওয়ার দরকার নেই। কারণ তারা এই আকিদাগুলি স্বীকার করে ও প্রচার করে। এই ভ্রান্তি আকিদা প্রমানের জন্য বিভিন্ন ওয়েব সাইড থেকে ঢালাও ভাবে প্রচার চালাচ্ছে। শত শত কিতাব রচনা করছে। এরাই প্রথম কুরআন হাদিদের অপব্যাখ্যা করে প্রমান করেছে, মৃত আওলীয়াদের নিকট সাহায্য চাওয়া জায়েয। রাসূলুল্লাহ ﷺ সম্পর্কে অতিরঞ্জন বা বাড়াবাড়ি’ শীরোনামে যতগুলি ভ্রান্ত উল্লেখ করা হইয়াছে উহার সবগুলি ‘বেরেলভী’ আকিদা। তারপরও বেরেলভীদের কিছু আকিদা উল্লেখ করলাম:

১। তাদের বিশ্বাস অলীগণ কবরে জীবিত

আহমেদ রেজা খান বেরেলভী লিখেছেন- আওলীয়াগন তাদের কবরে অনন্ত জীবনসহ জীবিত। তাদের জ্ঞান ও অনভুতি, শ্রবন ও দৃষ্টিশক্তি তাদের (কবরে) পূর্বের চেয়ে অনেক বেশী হয়। (বাহারে শরিয়ত,আমজাদ আলী, ১ম খন্ড পৃষ্ঠা-৫৮)।

অপর বেরেলভী লিখেছেন:

মৃতরা শুনেন এবং তাদের মৃত্যুর পর প্রিয়জনদের সাহায্য করে। (ইলমুল কুরআন আহম্মদ ইয়ার)।

অপর বেরেলভী লিখেছেন:

ইয়া আলী, ইয়া গাওস বলে ডাকা জায়েয কারণ আল্লাহর প্রিয় বান্দারা তাদের বারজাকে (কবরে) শুনতে পান।(হাকায়্যাত রিযভিয়্যাহ)

অথচ নিম্নের আয়াতটির মাধ্যমে আল্লাহ্‌ ঘোষণা করেছেন যে, মানুষ মাত্রই মরণশীল এমন কি পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ নবী হযরত মুহম্মদ ﷺ ও এর উর্দ্ধে নন।আল্লাহ্‌ সুবাহানাহুয়াতালা বলেন-

 إِنَّكَ مَيِّتٌ۬ وَإِنَّہُم مَّيِّتُونَ

নিশ্চয়ই তুমিও মারা যাবে, এবং নিশ্চয়ই তারাও মারা যাবে। সুরা যুমার : ৩০

আল্লাহ্ সুবাহানাহুয়াতালা ইরশাদ করেন-

وَمَا جَعَلۡنَا لِبَشَرٍ۬ مِّن قَبۡلِكَ ٱلۡخُلۡدَ‌ۖ أَفَإِيْن مِّتَّ فَهُمُ ٱلۡخَـٰلِدُونَ (٣٤) كُلُّ نَفۡسٍ۬ ذَآٮِٕقَةُ ٱلۡمَوۡتِ‌ۗ وَنَبۡلُوكُم بِٱلشَّرِّ وَٱلۡخَيۡرِ فِتۡنَةً۬‌ۖ وَإِلَيۡنَا تُرۡجَعُونَ (٣٥) 

আর তোমার পূর্বে কোন মানুষকে আমি স্থায়ী জীবন দান করিনি; সুতরাং তোমার মৃত্যু হলে তারা কি অনন্ত জীবনসম্পন্ন হয়ে থাকবে? জীব মাত্রই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে; আমি তোমাদেরকে মন্দ ও ভাল দ্বারা বিশেষভাবে পরীক্ষা করি এবং আমারই নিকট তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে। সুরা আম্বিয়া : ৩৪-৩৫

আরওদেখতে পারেন- সুরা আনকাবুদ : ৫৭, সুরা সাবা : ১৪, সুরা বাকারা : ১৩৩, নিসা : ৭৮

২। বেরেলভীদের বিশ্বাস রাসূলুল্লাহ অদৃশ্যের খবর রাখেন।

বেরেলভীদের মতে, রাসূলুল্লাহ ﷺ অদৃশ্যের খবর রাখেন। তাদের দাবি পঞ্চ-গায়েবের মধ্য হতে নানা শাখাগত জ্ঞান আল্লাহ তাঁকে দান করেছেন। রূহের হাক্বীক্বাত ও আল-কুরআনের মুতাশাবিহাত সম্পর্কে তিনি জ্ঞান লাভ করেছেন। ভূত-ভবিষ্যতের যতসব ঘটনা লাওহে মাহফূযে সংরক্ষিত হয়েছে এবং এ ছাড়াও অন্যান্য ঘটনা রাসূলুল্লাহ ﷺ অবহিত ছিলেন। আহমাদ রেযা খান লিখেছেন, আল্লাহ আমাদের নেতা, আমাদের অভিভাবক মুহাম্মাদ (ছাঃ) কে লওহে মাহফূযের যাবতীয় কিছু দান করেছেন। খালেছুল ইতিক্বাদ, পৃ-৩৩

এখনে কুরআনের আয়াত তুলে ধরছি যেখানে আল্লাহ তাআলা স্পষ্ঠ ভাষায় বলছেন মুহম্মাদ ﷺ কোন অবস্থায়ই অদৃশ্যর জ্ঞান সম্বন্ধে খবর লাখে না।আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

قُلۡ لَّاۤ اَمۡلِکُ لِنَفۡسِیۡ نَفۡعًا وَّلَا ضَرًّا اِلَّا مَا شَآءَ اللّٰہُ ؕ  وَلَوۡ کُنۡتُ اَعۡلَمُ الۡغَیۡبَ لَاسۡتَکۡثَرۡتُ مِنَ الۡخَیۡرِ ۚۖۛ  وَمَا مَسَّنِیَ السُّوۡٓءُ ۚۛ  اِنۡ اَنَا اِلَّا نَذِیۡرٌ وَّبَشِیۡرٌ لِّقَوۡمٍ یُّؤۡمِنُوۡنَ 

বল, ‘আমি আমার নিজের কোন উপকার ও ক্ষতির ক্ষমতা রাখি না, তবে আল্লাহ যা চান। আর আমি যদি গায়েব জানতাম তাহলে অধিক কল্যাণ লাভ করতাম এবং আমাকে কোন ক্ষতি স্পর্শ করত না। আমিতো একজন সতর্ককারী ও সুসংবাদদাতা এমন কওমের জন্য, যারা বিশ্বাস করে। সুরা আরাফ  : ১৮৮

 রাসূলুল্লাহ ﷺ গায়েব জানেন এই সম্পর্কি আর ও কিছু আয়াতের রেফারেন্স উল্লেখ করা হল- সুরা বাকারা : ৩৩, সুরা মায়িদা : ১০৯ ও ১১৬, সুরা তাওবা-: ৭৮, ৯৪ ও ১০৫, সুরা ইউনুস : ২০, সুরা হুদ-: ১২৩, সুরা ক্বাহফ: ২৬, সুরা সাবা : ৩, সুরা ফাতির : ৩৮, সুরা হুজুরাত ; ১৮ ইত্যাদি্।

মুহাম্মাদ ও আল্লাহ মাঝে পার্থক্য করে না

 হমাদ রেযা খান ভক্তির আতিশয্যে গদগদ চিত্তে লিখেছেন, ‘হে মুহাম্মাদ ﷺ! আমি আপনাকে আল্লাহ বলতে পারছি না। কিন্তু আল্লাহ ও আপনার মাঝে কোন পার্থক্যও করতে পারছি না। তাই আপনার ব্যাপারটি আমি আল্লাহর হাতেই ছেড়ে দিলাম, তিনিই আপনার ব্যাপারে সবিশেষ অবগত। হাদায়েক বখশিশ, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃ-১০৪

যা বাংলাদেশের আকবার আলী রিজভী ও তার কিতাবে লিখেছেন। যে আল্লাহ এবং রাসূলুল্লাহ ﷺ আলাদা কিছু নয় আল্লাহ্ এবং রাসুলুল্লাহ দুটিই একি সত্ত্বা। (নাউজুবিল্লাহ) ফলে এ আক্বীদার ভিত্তিতে আজকাল মসজিদে, বাসে, রিকশায় সর্বত্র ‘আল্লাহ’ ও ‘মুহাম্মাদ’ পাশাপাশি লেখার ছড়াছড়ি লক্ষ্য করা যায়।

অথচ  সূরা কাহাফে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন-

Al-Quran 18:110

قُلۡ اِنَّمَاۤ اَنَا بَشَرٌ مِّثۡلُکُمۡ یُوۡحٰۤی اِلَیَّ اَنَّمَاۤ اِلٰـہُکُمۡ اِلٰہٌ وَّاحِدٌ ۚ  فَمَنۡ کَانَ یَرۡجُوۡا لِقَآءَ رَبِّہٖ فَلۡیَعۡمَلۡ عَمَلًا صَالِحًا وَّلَا یُشۡرِکۡ بِعِبَادَۃِ رَبِّہٖۤ اَحَدًا 

বল, ‘আমি তোমাদের মতই একজন মানুষ। আমার নিকট ওহী প্রেরণ করা হয় যে, তোমাদের ইলাহই এক ইলাহ। সুতরাং যে তার রবের সাক্ষাৎ কামনা করে, সে যেন সৎকর্ম করে এবং তার রবের ইবাদাতে কাউকে শরীক না করে’। সুরা কাহাব : ১১০

৪। দুনিয়া পরিচালনার কাজে সম্পৃক্ত আল্লাহর সাথে অলী আউলীয়াদের সম্পৃক্ত করেঃ

বেরেলভীদের মতে, রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সাথে ওলী-আওলিয়ারাও দুনিয়া পরিচালনার কাজে সম্পৃক্ত রয়েছেন। আহমাদ রেযা খান লিখেছেন, ‘ হে গাওছ (আব্দুল কাদের জিলানী)! ‘কুন’-বলার ক্ষমতা লাভ করেছেন মুহাম্মাদ ﷺ তাঁর প্রভুর কাছ থেকে, আর আপনি লাভ করেছেন মুহাম্মাদ ﷺ থেকে। আপনার কাছ থেকে যাই প্রকাশিত হয়েছে তাই দুনিয়া পরিচালনায় আপনার ক্ষমতা প্রমাণ করেছে। পর্দার আড়াল থেকে আপনিই আসল কারিগর।’

এই জন্যই এদের আলেমদের কাছে কুরআন হাদিসের বহির্ভুত গাউস, কুতুব, আবদান, নবিক ইত্যাদি নামের অলীদের উপাদিতে ভূষিত করতে দেখবেন। অথচ রাসূলুল্লাহ ﷺ এর যুগে মক্কার মুশরিকরাও বিশ্বাস করত দুনিয়া পরিচালনার কাজে আল্লাহ তায়ালার ছাড়া কেউ সম্পৃক্ত নেই।আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেন-

قُلۡ مَنۡ یَّرۡزُقُکُمۡ مِّنَ السَّمَآءِ وَالۡاَرۡضِ اَمَّنۡ یَّمۡلِکُ السَّمۡعَ وَالۡاَبۡصَارَ وَمَنۡ یُّخۡرِجُ الۡحَیَّ مِنَ الۡمَیِّتِ وَیُخۡرِجُ الۡمَیِّتَ مِنَ الۡحَیِّ وَمَنۡ یُّدَبِّرُ الۡاَمۡرَ ؕ فَسَیَقُوۡلُوۡنَ اللّٰہُ ۚ فَقُلۡ اَفَلَا تَتَّقُوۡنَ

বল, ‘আসমান ও যমীন থেকে কে তোমাদের রিয্ক দেন? অথবা কে শ্রবণ ও দৃষ্টিসমূহের মালিক? আর কে মৃত থেকে জীবিতকে বের করেন আর জীবিত থেকে মৃতকে বের করেন? কে সব বিষয় পরিচালনা করেন’? তখন তারা অবশ্যই বলবে, ‘আল্লাহ’। সুতরাং, তুমি বল, ‘তারপরও কি তোমরা তাকওয়া অবলম্বন করবে না’? সুরা ইউনুস : ৩১

৫। তাদের বিশ্বাস তাদের অলীগণ নবিদের মত মাসুম :

বেরেলভীরা শীয়াদের মত মনে করে যে, অলীরা মাসুম। তাদের কোন পাপ নেই। তাই শীয়াদের ইমামদের মত তারাও তাদের আওলিয়াদের মাজার তৈরী করে। মাজারে মোমবাতি বা আলোকসজ্জা করে, কবরের উপর ফুল, নকশাদার চাদর ইত্যাদি চড়ায়। তাদের কবরকে ঘিরে তাওয়াফ করে। তারা মনে করে, আওলিয়াদের নযর-নেয়ায দেয়া এবং তাদের কাছে প্রার্থনা করা জায়েয। এমনিভাবে জানাযার ছালাতের পর হাত তুলে দো‘আ করা, ফাতেহা পাঠ করা, তীজা, চল্লিশা ও বার্ষিক ঈছালে ছাওয়াবের অনুষ্ঠান ও উৎকৃষ্ট ভোজের ব্যবস্থা করত: কুরআন খতম করা, কবরের পার্শ্বে আযান দেওয়া, মৃতের কাফনের উপরে কালেমা তাইয়েবা লেখা, শায়খ আব্দুল কাদির জিলানীর স্বরণে ফাতিহা-ইয়াযদাহমের অনুষ্ঠান করা এবং আওলিয়াদের নামে পশু পালন ইত্যাদি শিরকী-বিদ‘আতী কাজকে তারা পরম ছওয়াবের কাজ মনে করে।

৬। ঈদে মীলাদুন্নবী বেরেলভীরাদের সবচেয়ে বড়

বেরেলভীরাদের নিকট সবচেয়ে বড় ঈদ এবং বড় উৎসবের দিন হলো ঈদে মীলাদুন্নবী। এই দিন তারা মহা ধুমধামে জশনে জুলূসের আয়োজন করে এবং বিভিন্ন ভক্তিপূর্ণ গান ও আনন্দ-ফূর্তির আয়োজন করে থাকে। আর রাসূল ﷺ এর নামে মিথ্যা কাহিনী বর্ণনার জন্য এদিন তারা তথাকথিত সীরাত মাহফিলের আয়োজন করে। ওলী-আওলিয়াদের মাযারে কথিত ‘ওরস শরীফ’ পালন তাদের জন্য বিরাট আনন্দের উপলক্ষ। এ উপলক্ষে তারা বাৎসরিক বিরাট মাহফিলের আয়োজন করে এবং লক্ষ লক্ষ মানুষ সেখানে উপস্থিত হয়।

যদি তাদের আকিদা বিশ্বাসের ভ্রান্তিগুলি কেউ একত্র করে তবে বিরাট ভলিউমে বই হয়ে যাবে। বিস্তারিত জানার জন্য পড়তে পারেন, আল্লামা ইহসান এলাহী যহীর, লিখিত “বেরেলভি মতবাদ: আকিদা-বিশ্বাস ও ইতিহাস” গ্রন্থটি অনুবাদ করছেন আবু রুমাইসা মুহাম্মদ নুর আব্দুল্লাহ হাবিব, প্রকাশক আল-হুদা, পাবনা।   

বেরেলভীদের মূল আক্বীদার ভিত্তি হানাফী মাযহাবের অনুসারী। কিন্তু তাদের বিশ্বাসের মূল সৌধ নির্মিত হয়েছে শীয়া সম্প্রদায় কেন্দ্রিক। ফলে দেখা যায় তাদের আমল-আক্বীদায় শীয়া মতবাদের ব্যাপক প্রভাব। বাতিলপন্থী বেরেলভীদের নিকট আহলে সুন্নাতের প্রায় সমস্ত আলেমই কাফের। এরা বলে তাবলিগী, মওদুদি, দেওবন্দী, ওহাবী, আহলে হাদিস সকলে কাফের বলে। কেননা তাদের মতে এসব আলেমগণ রাসূল ﷺ কে যথাযথ সম্মান করেন না।

বেরেলভী সম্প্রদায়ের ব্যাপারে সৌদি লাজনা দায়েমার ফৎওয়া:  এক প্রশ্নের প্রেক্ষিতে সঊদী আরবের সর্বোচ্চ ফৎওয়া বোর্ড লাজনা দায়েমা থেকে ফৎওয়া দেয়া হয়েছে, “এ ধরনের কুফরী আক্বীদাসম্পন্ন লোকের পিছনে ছালাত আদায় করা যাবে না। যদি তারা মূর্খ হয়, তবে তাদেরকে বুঝানোর চেষ্টা করতে হবে। অন্যথায় তাদের পরিত্যাগ করে আহলে সুন্নাতের কোন মসজিদে সালাত আদায় করতে হবে”। (ফৎওয়া নং ৩০৯০, ২/৩৯৪-৩৯৬ পৃ:)।  এরা অবশ্য সৌদি আলেমদের ওহাবী বলে গালি দেয়। (তথ্যসূত্র : আল্লামা ইহসান এলাহী যহীর, বেরেলভি মতবাদ)

১৫। আধুনিক মিডিয়ার অপপ্রচার

বর্তমানে শিরক বিস্তারে মিডিয়ার ভূমিকা ব্যাপক। প্রতিটি মানুষ কোন না কোন ভাবে মিডিয়ার সাথে সম্পৃক্ত। এজন্য তাকে মিডিয়ায় কাজ করতে হবে না। যে লোকটা ইন্টারনেট কি, বুঝেনা। পেপার পত্রিকা পড়তে জানেনা, সে প্রতিদিন ২/১ ঘন্টা টিবি সেটের সামনে বসে থাকে। কাজেই ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে মিডিয়ার ভুমিকা অপরিসিম। এখন প্রশ্ন হল মিডিয়া কিভাবে শিরক বিস্তার করে? মিডিয়ার কাজই হল ভালমন্দ সমানভাবে প্রচার করা। পূর্বে শিরকি কাজগুলি অনেকটা গোপনে করা হত, এত প্রচার পেত না। এখন মিডিয়ার কল্যানে সে সকল শিরকি কাজ আমরা সরাসরি দেখি। ফলে নতুন প্রজম্ম মনে করে এই সবই আমাদের ধর্মিয় অনুষ্ঠান বা দেশপ্রেমের অংশ।কয়েকটা উদাহরন দিলে দিলে ব্যাপাটি স্পষ্ট হয়ে যাবে আশা করছি।

প্রথম উদাহরন:  বাংলা নববর্ষ বাঙ্গালী সংস্কৃতির অংশ এতে কোন সন্ধেহ নেই। যুগ যুগ ধরে বাংলা নববর্ষ পালিত হয়ে আসছে আমাদের সমাজে বিষেশ করে হিন্দুদের মধ্যে এর প্রভার ছিল লক্ষণীয়। এ উপলক্ষে ঢাকা চারুকলা ইন্সটিটিউটের উদ্যোগে ১৯৮৯ সাল থেকে শুরু হয়েছিল মঙ্গল শোভাযাত্রা। এই অনুষ্ঠানের এত বেশী কল্পিত মুর্তি বা রাহুর প্রতিকৃতি (বাঘ, হাতি, ময়ূর, ঘোড়া, কুমির) থাকে যে, আপনি আগে ভাগে অনুষ্ঠান সম্পর্কে না জানলে হয়ত ভাববেন, ইহা হিন্দুদের কোন অনুষ্ঠান।  মঙ্গল শোভাযাত্রা বাঙ্গালী সংস্কৃতির কোন অংশ নয়। কিন্তু আধুনিক মিডিয়ার প্রচার ফলে আমরা ইহাকে বাঙ্গালী সংস্কৃতির অংশ মনে করছি।  ইদানিং মিডিয়ার কল্যানে এত লোকের সমাবেশ ঘটে যা কয়েক বছর আগেও ছিল কল্পনাতীত। ছেলে মেয়েদের নাচগান দেখলে মনে হবে ইউরোপ আমেরিকান প্রভাবপুষ্ট কনসার্ট প্রোগ্রাম। বাঙ্গালী সংস্কৃতি উদযাপনের নামে অশালীন কাজে ডুবে যাচ্ছি বা শিরকের  মত  ভয়াবহ  কোন পাপে লিপ্ত হচ্ছি। 

দ্বিতীয় উদাহরন:  ইসলামি রিতী অনুসারে কেউ মারা গেলে তাকে জানাজার সালাতের মাধ্যমে দোয়া করতে হয়। কিভাবে করতে হবে, কখন করতে হবে এর ও নির্দিষ্ট নিয়ম আছে। বর্তমানে মিডিয়ার কল্যানে দেখতে পাই, কোন নামকরা বিখ্যাত ব্যক্তি মারা গেলে তাকে কয়েক বার জানাযা দিতে হয়। তার মৃত দেহ শহীদ মিনারে বা অন্য কোন স্থানে রেখে ফুলের শুভেচ্ছা জানাতে হবে। সমাজের তার অনুসরি ব্যক্তি, দল বা সংগঠন ফুলেল তোড়া নিয়ে আসবেন আর তার মৃত দেহের উপর রেখে শুভ কামনা করবেন। এখানে হিন্দু, খৃষ্টান, বৌদ্ধ বা মুসলিমের হিসাবে কোন জাতীভেদ নাই। নতুন প্রজম্ম যাদের ইসলাম সম্পর্কে জ্ঞান নেই মিডিয়ার কল্যানে লাইভ দেখে ভাববে এটাই ইসলাম, এটাই আমদের সংস্কৃতি, এটাই নিয়ম। কোন সহিহ, জঈফ বা জাল হাদিসেও নেই, কেই মারা গেলে ফুলের শুভেচ্ছা দিতে হয়।

সহিহ বুখারির এক বর্নণায় এসেছে, একজন সাহাবি রাতে মারা গেলন আর অন্য সাহাবিগন বিষয়টি রাসূলুল্লাহ ﷺ কে অবহিত না করে রাতেই তার দাফন কাফনের ব্যবস্থা করলেন। আর আমরা মৃত্যুর পর তিন চার দিন পর্যান্ত দেরি করছি।

ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক ব্যাক্তি মারা গেল। যার অসুস্থতার সময় ﷺ খোঁজ-খবর নিতেন। তাঁর মৃত্যু হয় এবং রাতেই তাঁকে দাফন করেন। সকাল হলে তাঁরা (এ বিষয়ে) নবী ﷺ কে অবহিত করেন। তিনি বললেনঃ আমাকে সংবাদ দিতে তোমাদের কিসে বাধা দিল? তারা বলল, তখন ছিল রাত এবং ঘোর অন্ধকার। তাই আপনাকে কষ্ট দেওয়া আমরা পছন্দ করিনি। তিনি ঐ ব্যাক্তির কবরের কাছে গেলেন এবং তাঁর উপর সালাতে জানাযা আদায় করলেন। সহিহ বুখারি ১২৪৭

তৃতীয় উদাহরন: যাদের ইসলাম সম্পর্কে গভির জ্ঞান নেই তারাও জানেন ইসলামে তাবিজ, কবজ, পাথরের ব্যবহার নিষিদ্ধ। অথচ ইদানিং বিভন্ন টিবি চ্যানেলে পৈন্যের বিজ্ঞাপনের মত তাবিজ, কবজ, পাথরের বিজ্ঞাপন দেওয়া হচ্ছে। সমাজের নাম করা কিছু ভন্ড প্রতারক মিথ্যুক শ্রেণীর আলেম ‌ইসলামের নামে এই প্রতারনা মুলক ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। অজ্ঞ মানুষেরা এদের ফাদে পা দেন বেশী। মিডিয়ার প্রচার না থাকলে হয়তো অনেকে জানতোই না। ইসলামে গনক বা জ্যাতীষির কাছে যাওয়া হারাম, তার কথা বিশ্বাস করা শিরক। বিভিন্ন টিবি চ্যানেলে রাশিফল নামে প্রতিদিন অনুষ্ঠার করার পাশাপাশি জ্যাতীষির নামে বিজ্ঞাপন প্রচার করছে। ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞ মানুষেরা মিডিয়ার মাধ্যমে বিজ্ঞাপন পেয়েই না বুঝে শিরকে লিপ্ত হচ্ছে।

চতুর্থ উদাহরন: বর্তমানে আকাশ সংস্কৃতির আগ্রাশন চলছে। ডিন এন্টিনার সুবাধে আজ কাল ঘরে বসেই পৃথিবীর যে কোন দেশ আর তাদের সংস্কৃতির সাথে পরিচিতি লাভ করছি। কোন সংস্কৃতির সাথে পরিচিতি লাভ করা দোষের কিছু নয়। কিন্তু তাদের শিরক মিশ্রিত সংস্কৃতি গ্রহন করা ইসলামের দৃষ্টিতে মহা অন্যায়, মহা পাপ। যেমন: ইন্দিয়ান টিবি চ্যানেলে সিলিয়ার দেখে, তাদের বিবাহের নিয়ম চালু করা, ঘরে সন্ধ্যা বাতি দেওয়া, চলার পথে শুভ অশুভ ভাবা, সকাল সন্ধ্যায় মঙ্গল কামনায় ধুপের ধোয়া দেওয়া, ভূত ফেতনিতে বিশ্বাস করা। মিডিয়ার অবাধ প্রচার না থাকলে হয়তো এই শিরকি কাজ থেকে বাচতে পারতাম।

 পঞ্চম উদাহরন:  আজ কার বিভিন্ন চ্যানেলে ইসলামি অনুষ্ঠান হয়। দেশের স্বনাম ধন্য অনেক আলেম এই সকল অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন। অনের সাধারন মানুষ দৈনন্দিন আনেক সমস্যার সমাধান এখান থেকে পেয়ে থাকেন। কিন্তু সমস্যা হল ভন্ড প্রকৃতির আলেম সমাজ, তারাও বিভিন্ন চ্যানেলে ইসলামি অনুষ্ঠানের নামে শিরকি আকিদা প্রচার করছে। সাধারন মুসলিম যাদের ভাল মন্দ বাচার সমর্থ নেই তাবা সবচেয়ে বেশী প্রতারিত হচ্ছে। আর আগের থেকে আরো বেশী শিরকি কাজে লিপ্ত হচ্ছে।

১৬ শ্বাসক শ্রেণির দ্বারা শিরকি কাজ করতে বাধ্য করা

মুসলিম প্রদান দেশে ইসলামি আইন না থাকলে, মানব রচিত আইনের কাছে অসহায় হয়ে অনেক সময় শিরক করতে বাধ্য হতে হয়। আবার অনেক সময় রাষ্ট্রের আনুগত্তের কারণেও শিরক কাজে লিপ্ত হতে হয়। একটা উদাহরন দিলে ব্যপারটি পরিস্কার হবে।

১৫৭০ সালের দিকে বাদশাহ আকবর এক নতুন ধর্মচিন্তায় নিয়া হাজির হন ভারতীয় উপমহদেশের মঞ্চে। তিনি  মুসলিম হিন্দু, ইয়াহুদি, নাসারা, জৈন, বৌদ্ধসহ সলক ধর্মের সমন্বয়ে এক নতুন ধর্ম সৃষ্টি করার চেষ্টা করেন। সর্বশেষ বিকৃতি ও বিভ্রান্তির চূড়ান্ত পর্যায়ে ১৫৮২ সালে ইসলামের মূলভিত্তিকে কুঠারাঘাত করে দ্বীন-ই-ইলাহী নামক নতুন ধর্মমতের প্রবর্তন করেন। তার এই ধর্মে সকল ধর্মের মূল সত্যগুলোকে সমন্বিত করে একটি সার্বজনীন পূর্ণাঙ্গ পদ্ধতি প্রণয়ন করা। এ পদ্ধতির নামই হল দ্বীনে-ই-ইলাহী। এই ধর্মের কয়েকটি আপত্তিকর নিয়মনীতি হল, ইসলামী বিশ্বাসের প্রধান বাণী কলেমার পরিবর্তন, মদ সুদকে হালাল ঘোষণ, আরবী শিক্ষা গ্রহণে নিষেধাজ্ঞা, অগ্নি, বৃক্ষ, সূর্য ইত্যাদির রাজদরবারেই পূজা করার বৈধতা, দাঁড়ি কামিয়ে ফেলার নির্দেশ, গরু, মহিষ ও উট যবাই নিষিদ্ধ করা, অনেক মসজিদকে মন্দিরে পরিবর্তনের হুকুম। সিয়াম পালন, হজে গমন বে-আইনী ঘোষণা, শুকর ও বাঘের মাংস ভক্ষণ বৈধ ঘোষণা ইত্যাদি। যা ছিল ইসলামের সাথে একেবারেই সাংঘশিক। তাই প্রকৃত কোন মুসলমানই এই ধর্মমত মেনে নিতে পারেনি। অনেক ভারতীয় আলেমওলামা আকবরের এই ধর্মনীতিতে খুবই অসন্তুষ্ট ছিলেন। তারা তার শ্বাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। ক্ষমতার বলে বাদশাহ আকবর এই বিদ্রোহ নিবারণে সমর্থ হন। অনেক নামধারী মুসলিম রাষ্ট্রিয় আনুগত্যের কারণে হোক আর অজ্ঞতার কারণে হোক আকবরের দ্বীনে-ই-ইলাহী মেনে নিয়ে ছিল।

আজও আমরা রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্যের কারণে শিরক করছি। অনেকেই জানেন দুই হাজার সালের প্রথম দিকে এক ইসলামি দলের দুজন মন্ত্রী নির্বাচিত হন। তাদের মধ্যে একজন আলেমও ছিলেন। দায়িত্ব পালনের এক পর্যায় তিনি সাভারের স্মৃতিসৌধে ফুল দেন। হয়ত তিনি আমরা রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্যের কারণে শিরক কাজটি করছেন। তাহলে সাধারন অজ্ঞ লোক কিভাবে রাষ্ট্রের চাপিয়ে দেওয়া শিরক থেকে বাচবে?

১৭।  পীরের আস্তানা বা খানকা মাধ্যমে শিরক

ভারত উপমহাদেশে পীরের আস্তানা বা খানকা মাধ্যমে ইসলাম প্রচারের পাশাপাশি শিরকও প্রচার লাভ করে। কিন্তু এই সকল আস্তানা বা খানকা অনেক হিন্দু মুসলিম বানালেও খাটি মুসলিম বানাতে পারে নাই। বরং বানিয়োছে মুশরিক মুসলিম। এই সকল আস্তানা বা খানকা পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন কোন না কোন সুফি তরিকার লোক। তাই এদের আমলের শিরকের পাশাপাশি আকিদার শিরক ও পরিরক্ষিত হয়। পূর্বে সুফিদের আকিদা সম্পর্কে যে আলোচনা হয়েছে তা থেকে সহজে অনুমেয় সুফিরা কি পরিমান শিরকি আকিদা পোষন করে। তারা আস্তানা বা খানকা আশ্রয় করেই এই মতবাদ প্রচার করে। তাই তো আনেক জ্ঞানী মনে করেন, ইসলাম মন্দিরে বা গির্জায় যত টুকু অসম্মান হয়েছে তার চেয়ে বেশী অসম্মান হয়েছে এই আস্তানা বা খানকা। এর সত্যতা ও পাওয়া যায় এখানকার আচার আচারন লক্ষ করলে। এই সকল আস্তানা বা খানকায় সাধারনত নিম্মের অনুষ্ঠান করা হয় ইবাদতের নামে।

* পীরের মৃত্যু বার্ষিকিকে কেন্দ্র করে ঐ সকল খানকায় বছরে একটি অথরা দুটি ঊরশ করা হয়।

* কোন কোন আস্তানায় ঊরশ নাচ, গান, জুয়া ও মদের আসর বসে। এমন কি পুরুষ ও মহিলাগন সহাবস্থান করে থাকে।

* আস্তানা বা খানকার ঊরশকে কেন্দ্র করে “মেলা” বসে। যেখানে এই সুযোগে আবাধে নারি পূরুষ মেলামেসা করে। এই সকল মেলায় জুয়া থেকে সকল প্রকারের অসামাজিক কার্য সম্পাদন হয়।

* খানকা প্রতিষ্ঠাকারী পীরের মৃত্যুর পর তার কবর পাকা করা হয়। অনেক পীরের মাজারের  উপর গম্বুজ তৈরি করা হয়।

* কবরকে নিয়মিত গোসল করান হয়। এর উপর গিলাফ দেওয়া হয়, না দিলে পীর অখুসি হবে।

* কবরের নিকট ঊরশ উপলক্ষে সিরনি, মিষ্ট, গরু, ছাগল, সবজি ইত্যাদি মান্নত করা হয়।

* আস্তানা বা খানকায় নিয়মিত মারেফাতি গানের আয়োজন করা হয়। যে খানে শিরক মিশ্রত কল্প কাহিনির মাধ্যমে শিরক কথা বার্তা প্রচার ও প্রসানর ঘটে।

* আস্তানা বা খানকায় প্রায়ই বড় বড় আওয়াজে হু হু হু হু শব্দে আল্লাহকে ডাকে। সাথে সাথে তাদের মনোনিত অলী বা পীরদেরও ডাকে।

* খানকা প্রতিষ্ঠাকারী পীরের কবরের তাওয়াফ করা হয়। কবরে অনেক সময় সিজদার স্থান বানান হয়। সেখান থেকে বাহির হয়ে আসার সময় অতিরিক্ত সম্মানের জন্য উল্টা পায়ে বা পিছ পা হয়ে বাহির হতে হয়।

* কোন কোন আস্তানা বা খানকায় ছোট ছোট বাচ্ছাদের বা যুবতি মেয়েদের উত্সর্গ করা হয় যারা ঐ আস্তানা বা খানকায় সেবাদাশ হিসাবে কাজ করবে। যেমনটি হিন্দুদের মন্দিরে প্রচলিত আছে।

এভাবেই আস্তানা বা খানকাকে কেন্দ্র করে শিরকের মহাউত্সব চলে। সমাজের ইলমহীন অজ্ঞ লোকেরা ইবাদাত মনে করে এই শিরকি কাজের সাথে আনন্দচিত্তে সামিল হয়। তাদের কষ্টার্জিত টাকা পয়সা নেকি পাবার আশায় এই সব আস্তানা বা খানকায় অকাতরে দান করতে থাকে। আর এক শ্রেণীর প্রতারক ও ভন্ড লোকের পকেট ভারি হচ্ছে।

শিরকের নিকৃষ্ট পরিণাম

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

শিরক একটি মহা কবিরা গুনাহ যা থেকে খালেস হয়ে তওবা না করা পর্যন্ত আল্লাহ ক্ষমা করবেন না। শিরক এমনই এক ভয়ারহ কাজ যা সকল ভাল আমলকে ধ্বংস করে দেয়। যায় ফলে আল্লাহর ক্রধে পড়ে মুশরিক বান্দা জাহান্নামের আগুনে স্থায়ীভাবে অবস্থান করবে। এমনকি যে বান্দা মুমরিক থাকা অবস্থায় মৃত্যুবরণ করবে তার জন্য দোয়া করাও জায়েয নাই। নিম্ম শিরককারীর পরিমান সম্পর্কে আলোকপাত করা হলো-

১। শিরককারির গুনাহ ক্ষমা করা হবে না

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

اِنَّ اللّٰہَ لَا یَغۡفِرُ اَنۡ یُّشۡرَکَ بِہٖ وَیَغۡفِرُ مَا دُوۡنَ ذٰلِکَ لِمَنۡ یَّشَآءُ ۚ وَمَنۡ یُّشۡرِکۡ بِاللّٰہِ فَقَدِ افۡتَرٰۤی اِثۡمًا عَظِیۡمًا

নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সাথে শরীক করাকে ক্ষমা করেন না। তিনি ক্ষমা করেন এ ছাড়া অন্যান্য পাপ, যার জন্য তিনি চান। আর যে আল্লাহর সাথে শরীক করে সে অবশ্যই মহাপাপ রচনা করে। সুরা নিসা : ৪৮

আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাযিঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, অন্য বর্ণনায় রাসূল ﷺ কে বলতে শুনেছি-

مَنْ مَاتَ يُشْرِكُ بِاللَّهِ شَيْئًا دَخَلَ النَّارَ ‏”‏ ‏.‏ وَقُلْتُ أَنَا وَمَنْ مَاتَ لاَ يُشْرِكُ بِاللَّهِ شَيْئًا دَخَلَ الْجَنَّةَ ‏.

যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে কোন কিছুকে শারীক করে মারা যাবে সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে। আমি বলি, যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে শারীক না করা অবস্থায় মারা যায় সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। সহিহ মুসলিম : ৯২

আনাস ইবনু মালিক (রাযিঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ কে আমি বলতে শুনেছি, বারাকাতময় আল্লাহ তা’আলা বলেন, হে আদম সন্তান! যতক্ষণ আমাকে তুমি ডাকতে থাকবে এবং আমার হতে (ক্ষমা পাওয়ার) আশায় থাকবে, তোমার গুনাহ যত অধিক হোক, তোমাকে আমি ক্ষমা করব, এতে কোন পরওয়া করব না। হে আদম সন্তান! তোমার গুনাহর পরিমাণ যদি আসমানের কিনারা বা মেঘমালা পর্যন্তও পৌছে যায়, তারপর তুমি আমার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর, আমি তোমাকে ক্ষমা করে দেব, এতে আমি পরওয়া করব না। হে আদম সন্তান! তুমি যদি সম্পূর্ণ পৃথিবী পরিমাণ গুনাহ নিয়েও আমার নিকট আস এবং আমার সঙ্গে কাউকে অংশীদার না করে থাক, তাহলে তোমার কাছে আমিও পৃথিবী পূর্ণ ক্ষমা নিয়ে হাযির হব। সুনানে তিরমিজি : ৩৫৪০, সহিহাহ : ১২৭, ১২৮ হাদিসের মান হাসান

আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, “তিনিই সেই সত্তা যাকে ভয় করা উচিত। আর তিনিই বান্দার পাপ মার্জনা করার অধিকারী, সূরা মুদাচ্ছির-৫৬। এই আয়াতের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আল্লাহ তা’আলা বলেছেন, আমিই কেবল মাত্র ভয়ের যোগ্য। সুতরাং যে ব্যক্তি আমাকে ভয় করে, আমার সাথে কাউকে অংশীদার স্থির করে না, তাকে মাফ করার যথার্থ অধিকারী আমিই। সুনানে তিরমিজি : ৩৩২৮, সুনানে ইবনু মাজাহ : ৪২৯৯ মান জঈফ

আব্দুল্লাহ ইবনু আবূ যাকারিয়া বর্ণনা করেছেন, আমি উম্মু দারদাকে বলতে শুনেছি, আমি আবূ দারদা (রাঃ)-কে বলতে শুনেছি, আমি রাসুলুল্লাহ ﷺ  কে বলতে শুনেছি, আল্লাহ সব গুনাহই ক্ষমা করবেন; কিন্তু মুশরিক অবস্থায় কেউ মারা গেলে অথবা কোনো ঈমানদার ব্যক্তি অপর কোনো ঈমানদারকে ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা করলে। সুনানে কখআবু দাউদ : ৪২৭০

শিরক কারির সকল ভাল আমলকে ধ্বংস করে দেয়া হয়

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

وَلَقَدۡ اُوۡحِیَ اِلَیۡکَ وَاِلَی الَّذِیۡنَ مِنۡ قَبۡلِکَ ۚ لَئِنۡ اَشۡرَکۡتَ لَیَحۡبَطَنَّ عَمَلُکَ وَلَتَکُوۡنَنَّ مِنَ الۡخٰسِرِیۡنَ

আর অবশ্যই তোমার কাছে এবং তোমার পূর্ববর্তীদের কাছে ওহী পাঠানো হয়েছে যে, তুমি শির্ক করলে তোমার কর্ম নিষ্ফল হবেই। আর অবশ্যই তুমি ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে। সুরা যুমার : ৬৫

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

ذٰلِکَ ہُدَی اللّٰہِ یَہۡدِیۡ بِہٖ مَنۡ یَّشَآءُ مِنۡ عِبَادِہٖ ؕ وَلَوۡ اَشۡرَکُوۡا لَحَبِطَ عَنۡہُمۡ مَّا کَانُوۡا یَعۡمَلُوۡنَ

এ হচ্ছে আল্লাহর হিদায়াত, এ দ্বারা তিনি নিজ বান্দাদের মধ্য থেকে যাকে ইচ্ছা হিদায়াত করেন। আর যদি তারা শির্‌ক করত, তবে তারা যা আমল করছিল তা অবশ্যই বরবাদ হয়ে যেত। সুরা আনাম : ৮৮

আবূ সাদ বিন আবূ ফাদালাহ আল-আনসারী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

“‏ إِذَا جَمَعَ اللَّهُ الأَوَّلِينَ وَالآخِرِينَ لِيَوْمِ الْقِيَامَةِ لِيَوْمٍ لاَ رَيْبَ فِيهِ نَادَى مُنَادٍ مَنْ كَانَ أَشْرَكَ فِي عَمَلٍ عَمَلَهُ لِلَّهِ فَلْيَطْلُبْ ثَوَابَهُ مِنْ عِنْدِ غَيْرِ اللَّهِ فَإِنَّ اللَّهَ أَغْنَى الشُّرَكَاءِ عَنِ الشِّرْكِ ‏”

আল্লাহ তাআলা যখন কিয়ামতের দিন, যে দিনের আগমনে কোন সন্দেহ নাই, পূর্বাপর সকলকে একত্র করবেন, তখন একজন ঘোষক ঘোষণা করবে, যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কাজ করতে গিয়ে এর মধ্যে কাউকে শরীক করেছে, সে যেন গাইরুল্লাহর নিকট নিজের সওয়াব চেয়ে নেয়। কেননা আল্লাহ তাআলা শরীকদের শেরেক থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪২০৩, সুনানে তিরমিজি : ৩১৫৪, আহমাদ : ১৭৪৩১, মিশকাত : ৫৩১৮

৩। মুশরিকদের কোন আমলই কবুল হবে না

মুআবিয়াহ বিন হায়দাহ বিন মুআবিয়াহ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

لاَ يَقْبَلُ اللَّهُ مِنْ مُشْرِكٍ أَشْرَكَ بَعْدَ مَا أَسْلَمَ عَمَلاً حَتَّى يُفَارِقَ الْمُشْرِكِينَ إِلَى الْمُسْلِمِينَ ‏

কোন ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করার পর মুশরিক হয়ে শিরকে লিপ্ত হলে আল্লাহ তার কোন আমলই গ্রহণ করেন না, যাবত না সে মুশরিকদের থেকে পৃথক হয়ে মুসলমানের মধ্যে প্রত্যাবর্তন করে। সুনানে ইবনে মাজাহ: ২৫৩৬, আহমাদ : ১৯৫৩৩, সহীহাহ : ৩৬৯। তাহকীক আলবানীঃ হাসান।

৪। শির্কারি বা মুশরিক জাহান্নামের আগুনে স্থায়ীভাবে থাকবে

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ وَالْمُشْرِكِينَ فِي نَارِ جَهَنَّمَ خَالِدِينَ فِيهَا أُولَئِكَ هُمْ شَرُّ الْبَرِيَّةِ

আহলে কিতাব ও মুশরিকদের মধ্যে যারা কাফের, তারা জাহান্নামের আগুনে স্থায়ীভাবে থাকবে। তারাই সৃষ্টির অধম। সুরা বাইয়েনা : ৬

৫। শির্কারির সমস্ত কৃতকর্ম ধূলোর মতো উড়িয়ে যাবে

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

وَقَدِمۡنَاۤ اِلٰی مَا عَمِلُوۡا مِنۡ عَمَلٍ فَجَعَلۡنٰہُ ہَبَآءً مَّنۡثُوۡرًا

আর তারা যে কাজ করেছে আমি সেদিকে অগ্রসর হব। অতঃপর তাকে বিক্ষিপ্ত ধূলিকণায় পরিণত করে দেব। সুরা ফুরকান : ২৩

৬। শির্কারির জন্য জান্নাত হারাম

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

 ؕ اِنَّہٗ مَنۡ یُّشۡرِکۡ بِاللّٰہِ فَقَدۡ حَرَّمَ اللّٰہُ عَلَیۡہِ الۡجَنَّۃَ وَمَاۡوٰىہُ النَّارُ ؕ وَمَا لِلظّٰلِمِیۡنَ مِنۡ اَنۡصَارٍ

নিশ্চয় যে আল্লাহর সাথে শরীক করে, তার উপর অবশ্যই আল্লাহ জান্নাত হারাম করে দিয়েছেন এবং তার ঠিকানা আগুন। আর যালিমদের কোন সাহায্যকারী নেই। সুরা মায়েদা : ৭২

দুনিয়া ভরা স্বর্ণ দ্বারাও শিরককারীর মুক্তি মিলবে না। আনাস ইবনু মালেক রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবী ﷺ বলেছেন-

يَقُولُ اللَّهُ تَعَالَى لِأَهْوَنِ أَهْلِ النَّارِ عَذَابًا يَوْمَ الْقِيَامَةِ: لَوْ أَنَّ لَكَ مَا فِي الْأَرْضِ مِنْ شَيْءٍ أَكُنْتَ تَفْتَدِي بِهِ؟ فَيَقُول:ُ نَعَمْ. فَيَقُولُ: أَرَدْتُ مِنْكَ أَهْوَنَ مِنْ هَذَا وَأَنْتَ فِي صُلْبِ آدَمَ: أَنْ لَا تُشْرِكَ بِي شَيْئًا فَأَبَيْتَ إِلَّا أَنْ تُشْرِكَ بِي

আল্লাহ তা‘আলা জাহান্নামীদের সবচেয়ে হালকা আযাবের ব্যক্তিকে কিয়ামতের দিন বলবেন: তোমার জন্য যদি দুনিয়াতে যা রয়েছে সব হয় তুমি কি তা মুক্তিপণ হিসেবে দিবে? সে বলবে: হ্যাঁ, তিনি বলবেন: আমি তোমার কাছে এরচেয়ে কম চেয়েছিলাম যখন তুমি আদমের ঔরসে ছিলে: আমার সাথে কোন বস্তুকে অংশীদার করবে না, কিন্তু তুমি আমার সাথে অংশীদার না করে ক্ষান্ত হওনি। সহিহ হাদিসে কুরসি : ৯, সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম থেকে

৭। শিরককারী গোমরাহীতে পথভ্রষ্ট

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

اِنَّ اللّٰہَ لَا یَغۡفِرُ اَنۡ یُّشۡرَکَ بِہٖ وَیَغۡفِرُ مَا دُوۡنَ ذٰلِکَ لِمَنۡ یَّشَآءُ ؕ وَمَنۡ یُّشۡرِکۡ بِاللّٰہِ فَقَدۡ ضَلَّ ضَلٰلًۢا بَعِیۡدًا

নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমা করেন না তাঁর সাথে শরীক করাকে এবং এ ছাড়া যাকে চান ক্ষমা করেন। আর যে আল্লাহর সাথে শরীক করে সে তো ঘোর পথভ্রষ্টতায় পথভ্রষ্ট হল। সুরা নিসা : ১১৬

৮। শিরককারীকে আল্লাহ মু্ল্যহীন বস্তুর সাথে তুলনা করেছেন

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

حُنَفَآءَ لِلّٰہِ غَیۡرَ مُشۡرِکِیۡنَ بِہٖ ؕ وَمَنۡ یُّشۡرِکۡ بِاللّٰہِ فَکَاَنَّمَا خَرَّ مِنَ السَّمَآءِ فَتَخۡطَفُہُ الطَّیۡرُ اَوۡ تَہۡوِیۡ بِہِ الرِّیۡحُ فِیۡ مَکَانٍ سَحِیۡقٍ

আল্লাহর জন্য একনিষ্ঠ হয়ে এবং তাঁর সাথে কাউকে শরীক না করে। আর যে আল্লাহর সাথে শরীক করে, সে যেন আকাশ থেকে পড়ল। অতঃপর পাখি তাকে ছোঁ মেরে নিয়ে গেল কিম্বা বাতাস তাকে দূরের কোন জায়গায় নিক্ষেপ করল। সুরা হজ : ৩১

৯। শিরককারী মৃত্যুর পরও মুসলিমদের দোয়া থেকে বঞ্চিত থাকবে।

সকলের হেদায়ের জন্য দোয়া করা ঈমানের দাবি। কিন্তু মুশরিক অবস্থায় কেউ মারা গেলে তার ক্ষমার জন্য দোয়া করা যাবে না। ইব্রাহীম ইব্রাহীম (আ.) তার মুশরিক পিতা আজরের  জন্য মাগফিরাতের দোয়া করতে পারেনি। এমনি প্রিয় নবী মুহম্মাদ তার পিতা মাতার জন্য মাগফিরাতের দোয়া করতে পারেনি। যখন কেউ মুশরিক অবস্থায় মারা যায় তখন সে তারা জাহান্নামেরই উপযুক্ত হয়ে যায়। মহান তায়ালা আল্লাহ বলেন:

مَا کَانَ لِلنَّبِیِّ وَالَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡۤا اَنۡ یَّسۡتَغۡفِرُوۡا لِلۡمُشۡرِکِیۡنَ وَلَوۡ کَانُوۡۤا اُولِیۡ قُرۡبٰی مِنۡۢ بَعۡدِ مَا تَبَیَّنَ لَہُمۡ اَنَّہُمۡ اَصۡحٰبُ الۡجَحِیۡمِ

নবী ও মুমিনদের জন্য উচিত নয় যে, তারা মুশরিকদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করবে। যদিও তারা আত্মীয় হয়। তাদের নিকট এটা স্পষ্ট হয়ে যাওয়ার পর যে, নিশ্চয় তারা প্রজ্বলিত আগুনের অধিবাসী। সুরা তওবা : ১১৩

১০। শিরক পরিত্যাগকারীর স্থান হবে জান্নাতে

আবূ যার (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী ﷺ বলেন-

‏ أَتَانِي جِبْرِيلُ – عَلَيْهِ السَّلاَمُ – فَبَشَّرَنِي أَنَّهُ مَنْ مَاتَ مِنْ أُمَّتِكَ لاَ يُشْرِكُ بِاللَّهِ شَيْئًا دَخَلَ الْجَنَّةَ ‏”‏ ‏.‏ قُلْتُ وَإِنْ زَنَى وَإِنْ سَرَقَ ‏.‏ قَالَ ‏”‏ وَإِنْ زَنَى وَإِنْ سَرَقَ ‏

জিবরীল (আঃ) আমার নিকট এসে সুসংবাদ দিলেন যে, আপনার উম্মাতের যে কেউ শিরক না করে মারা যাবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আমি (আবূ যার) বললাম, যদিও সে ব্যভিচার করে এবং যদিও সে চুরি করে। তিনি বললেন, যদিও সে ব্যভিচার করে ও চুরি করে। সহিহ মুসলিম: ১৭৩

জাবির (রা.) বলেন-

أَتَى النَّبِيَّ  ﷺ رَجُلٌ فَقَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ مَا الْمُوجِبَتَانِ فَقَالَ ‏ “‏ مَنْ مَاتَ لاَ يُشْرِكُ بِاللَّهِ شَيْئًا دَخَلَ الْجَنَّةَ وَمَنْ مَاتَ يُشْرِكُ بِاللَّهِ شَيْئًا دَخَلَ النَّارَ

এক ব্যক্তি নবী ﷺ এর সামনে উপস্থিত হয়ে জিজ্ঞেস করল- ইয়া রাসূলাল্লাহ! ওয়াজিবকারী (অবশ্যম্ভাবী) দুটি বিষয় কি? তিনি বললেন, আল্লাহর সাথে কোন কিছু শারীক না করে যে ব্যক্তি মারা যাবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে কোন কিছু শারীক করা অবস্থায় মারা যাবে সে জাহান্নামে যাবে। সহিহ মুসলিম : ৯৩

মুয়াজ ইবন জাবাল (রা.) থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি  বলেন, আমি এক সফরে রাসুলুল্লাহ ﷺ এর গাধা উফায়রের পিঠে তার পিছনে বসা ছিলাম।  রাসুল ﷺ বললেন, হে মুয়াজ! তুমি কি জান বান্দার উপর আল্লাহর হক কী এবং আল্লাহর উপর বান্দার হক কী ? আমি বললাম, আল্লাহ ও তাঁর রাসুল ভাল জানেন। রাসুল ﷺ বললেন, বান্দার উপর আল্লাহর হক হলো, তারা আল্লাহর ইবাদত করবে এবং তাঁর সঙ্গে কোনকিছু শরীক করবে না। আল্লাহর উপর বান্দার হক হলো, যে তাঁর সঙ্গে শরীক করবে না, তাকে তিনি শাস্তি দিবেন না। মুয়াজ (রা.) বললেন, আমি আরজ করলাম, হে আল্লাহর রাসুল! আমি কি লোকদের এ সংবাদ জানিয়ে দেব ? তিনি বললেন, না, লোকদের এ সংবাদ দিও না, দিলে এর উপরই তারা ভরসা করে থাকবে। সহিহ মুসলিম : ৩০

১১. শিরককারী এর সাফায়েত থেকে বঞ্চিত থাকবে

আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন

لِكُلِّ نَبِيٍّ دَعْوَةٌ مُسْتَجَابَةٌ فَتَعَجَّلَ كُلُّ نَبِيٍّ دَعْوَتَهُ وَإِنِّي اخْتَبَأْتُ دَعْوَتِي شَفَاعَةً لأُمَّتِي فَهِيَ نَائِلَةٌ مَنْ مَاتَ مِنْهُمْ لاَ يُشْرِكُ بِاللَّهِ شَيْئًا

প্রত্যেক নবীর জন্য একটি করে দোয়া আছে যা কবুল করা হয়। আর প্রত্যেক নবী তাঁর দু’আর ব্যাপারে তাড়াহুড়া করেছেন আর আমি আমার দু’আ আমার উম্মাতের শাফাআতের জন্য জমা রেখেছি। অতএব আমার উম্মাতের মধ্যে যারা আল্লাহর সাথে শিরক না করে মারা যাবে তারা আমার শাফাআত প্রাপ্ত হবে।সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪৩০৭

১২। শিরক একটি নিকৃষ্ট কবিরা গুনাহ

আবূ বকরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন-

أَلاَ أُخْبِرُكُمْ بِأَكْبَرِ الْكَبَائِرِ ‏”‏‏.‏ قَالُوا بَلَى يَا رَسُولَ اللَّهِ‏.‏ قَالَ ‏”‏ الإِشْرَاكُ بِاللَّهِ، وَعُقُوقُ الْوَالِدَيْنِ

আমি কি তোমাদের নিকৃষ্ট কাবীরাহ গুনাহের বর্ণনা দিব না? সকলে বললেনঃ হাঁ, হে আল্লাহর রাসূল! তখন তিনি বললেন, তা হলো, আল্লাহর সঙ্গে অন্য কোন কিছুকে শরীক করা এবং মাতা-পিতার অবাধ্যতা। সহিহ বুখারি : ৬২৭৩

আবূ বকরাহ (রা.) বলেন যে, আমরা রাসূলুল্লাহ ﷺ এর নিকট উপস্থিত ছিলাম। তখন তিনি বললেন-

أَلاَ أُنَبِّئُكُمْ بِأَكْبَرِ الْكَبَائِرِ – ثَلاَثًا – الإِشْرَاكُ بِاللَّهِ وَعُقُوقُ الْوَالِدَيْنِ وَشَهَادَةُ الزُّورِ أَوْ قَوْلُ الزُّورِ ‏”‏ ‏.‏ وَكَانَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم مُتَّكِئًا فَجَلَسَ فَمَازَالَ يُكَرِّرُهَا حَتَّى قُلْنَا لَيْتَهُ سَكَتَ

আমি কি তোমাদের কবীরাহ গুনাহ সম্পর্কে বলব না? তিনি এ কথাটি তিনবার বললেন। (তারপর বললেন) সেগুলো হলো, আল্লাহর সাথে শারীক করা, পিতামাতার অবাধ্য হওয়া, মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়া কিংবা কথা বলা। এ সময় রাসূলুল্লাহ ﷺ হেলান দিয়ে বসা ছিলেন। তিনি সোজা হয়ে বসলেন এবং (শেষোক্ত) কথাটি বারবার বলতে লাগলেন। এমন কি আমরা মনে মনে বলছিলাম, আহা তিনি যদি থামতেন। সহিহ মুসলিম : ৮৭

আবূ হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী ﷺ বলেন, ‘‘তোমরা সাত প্রকার ধ্বংসাত্মক কর্ম থেকে দূরে থাক।’’ লোকেরা বলল, ‘সেগুলো কী কী? হে আল্লাহর রসূল!’ তিনি বললেন, ‘‘আল্লাহর সাথে শিরক করা, যাদু করা, অন্যায়ভাবে এমন জীবন হত্যা করা, যাকে আল্লাহ হারাম করে দিয়েছেন, সূদ খাওয়া,  এতীমের ধন-সম্পদ ভক্ষণ করা, ধর্মযুদ্ধ কালীন সময়ে (রণক্ষেত্র) থেকে পৃষ্ঠ প্রদর্শন ক’রে পলায়ন করা ও  সতী-সাধ্বী উদাসীনা মু’মিন নারীদের চরিত্রে মিথ্যা কলঙ্ক আরোপ করা। সহিহ বুখারি :২৭৬৭, ২৭৬৬, ৫৭৬৪, ৬৮৫৭, সহিহ মুসলিম : ৮৯, সুনানে নাসায়ী : ৩৬৭১, সুনানে আবূ দাউদ : ২৮৭৪

১৩। মুশরিকদের ইলাহর কোন অস্তিস্থ নাই

মুসরিকদের ইলাহগণ কারো উপকার বা অপকার করতে পারে না, এমনকি আল্লাহ নিকট সুপারিশও করতে পারেন না।

وَیَعۡبُدُوۡنَ مِنۡ دُوۡنِ اللّٰہِ مَا لَا یَضُرُّہُمۡ وَلَا یَنۡفَعُہُمۡ وَیَقُوۡلُوۡنَ ہٰۤؤُلَآءِ شُفَعَآؤُنَا عِنۡدَ اللّٰہِ ؕ قُلۡ اَتُنَبِّـُٔوۡنَ اللّٰہَ بِمَا لَا یَعۡلَمُ فِی السَّمٰوٰتِ وَلَا فِی الۡاَرۡضِ ؕ سُبۡحٰنَہٗ وَتَعٰلٰی عَمَّا یُشۡرِکُوۡنَ

আর তারা আল্লাহ ছাড়া এমন কিছুর ইবাদত করছে, যা তাদের ক্ষতি করতে পারে না এবং উপকারও করতে পারে না। আর তারা বলে, ‘এরা আল্লাহর নিকট আমাদের সুপারিশকারী’। বল, ‘তোমরা কি আল্লাহকে আসমানসমূহ ও যমীনে থাকা এমন বিষয়ে সংবাদ দিচ্ছ যা তিনি অবগত নন? তিনি পবিত্র মহান এবং তারা যা শরীক করে, তা থেকে তিনি অনেক ঊর্ধ্বে। সুনা ইউনুস : ১৮

আকিদা বা বিশ্বাসগত শিরকে আকবর : প্রথম পর্ব (০১-১৪)

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

পূর্বের আলোচনার মাধ্যমে জেনেছি যে শিরক দ্বারা ঈমান ভঙ্গ হয়, মুসলিম ইসলাম থেকে বাহির হয়ে যায় তাকে শিরকে আকবর বা বড় শিরক বলা হয়। শিরকে আকবর কে দুটি ভাগ করে আলোচন কবর। ভাগ দুটি হলো-

ক। আকিদা বা বিশ্বাসগত শিরকে আকবর

খ। ইবাদত বা আমলগত শিরকে আকবর

মানুষ সাধারণ বিশ্বাস ও ইবাদতের মাধ্যমেই শিরক করে থাকে। এই পর্যায় শুধু যে সকল শিরকগুলো তার বিশ্বাসের সাথে জড়িত সেগুলোই আলোচনা করা হবে।

।  রাসুলুল্লাহ আমাদের মত মানব ছিলেন না

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

قُلۡ إِنَّمَآ أَنَا۟ بَشَرٌ۬ مِّثۡلُكُمۡ يُوحَىٰٓ إِلَىَّ أَنَّمَآ إِلَـٰهُكُمۡ إِلَـٰهٌ۬ وَٲحِدٌ۬‌ۖ فَمَن كَانَ يَرۡجُواْ لِقَآءَ رَبِّهِۦ فَلۡيَعۡمَلۡ عَمَلاً۬ صَـٰلِحً۬ا وَلَا يُشۡرِكۡ بِعِبَادَةِ رَبِّهِۦۤ أَحَدَۢا (١١٠)

(হে নবি) বলুন, আমি তো তোমাদেরই মত এক জন মানুষ, আমার নিকট এই মর্মে ওহি করা হয় যে, তোমাদের উপাস্য এক ও একক, অতএব যে নিজ প্রতিপালকের দিদার লাভের আশাবাদী সে যেন সৎকর্ম করে এবং নিজ প্রতিপালকের ইবাদতে অন্য কাউকে শরীক না করে। সূরা আল কাহাব : ১১০

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তায়ালা আরাও বলেন-

قُلۡ إِنَّمَآ أَنَا۟ بَشَرٌ۬ مِّثۡلُكُمۡ يُوحَىٰٓ إِلَىَّ أَنَّمَآ إِلَـٰهُكُمۡ إِلَـٰهٌ۬ وَٲحِدٌ۬ فَٱسۡتَقِيمُوٓاْ إِلَيۡهِ وَٱسۡتَغۡفِرُوهُ‌ۗ وَوَيۡلٌ۬ لِّلۡمُشۡرِكِينَ (٦)

(হে নবি) বলুন, আমি কেবল তোমাদের মত একজন মানুষ। আমার কাছে ওহি পাঠানো হয় যে, তোমাদের ইলাহ কেবলমাত্র এক ইলাহ। অতএব তোমরা তাঁর পথে দৃঢ়ভাবে অটল থাক এবং তাঁর কাছে ক্ষমা চাও। আর মুশরিকদের জন্য ধ্বংস। সুরা হা-মিম-সিজদা : ৬

উপরের আয়াতগুলোতে মহান আল্লাহর সুস্পষ্ট ঘোষনা রাসুল ﷺ আমাদের মতই একজন মানুষ ছিলেন। আল্লাহ তায়ালা মুহাম্মদ ﷺ কে নবী ও রাসুল বানিয়ে সর্বোউচ্চ সম্মান ও মর্জাদা আসনে বসিয়েছেন। রাসুলুল্লাহ ﷺ মানুষ ছিলেন না, এ কথার দ্বারা কিছু মানুষ কে আল্লাহ সমকক্ষ বা তার কাছাকাছি দাড় করাতে চান। তারা সৃষ্টি আর স্রষ্টার মাঝে যে বিশাল পার্থক্য আছে তা মুছে ফেলতে চান। যা মূলত তাকে আল্লাহর অংসীদার সাবস্ত করে। সুতারং রাসুলুল্লাহ ﷺ অতি মানব বা মানুষ ছিলেন বলা শিরকের অন্তর্ভূক্ত।

২। রাসূলুল্লাহ আল্লাহর নিজস্ব নূর থেকে সৃষ্টি

কুরআনের বহু আয়াত আল্লাহ তায়ালা বলেছেন- রাসূলুল্লাহ ﷺ একজন মানুষ ছিলেন। আল্লাহ তায়ালা মানুষের সৃষ্টিকর্তা এবং তিনিই জানেন মানুষ কে তিনি কোন উপদানে সৃষ্টি করেছেন। তিনি ইরশাদ করেন-

وَمِنۡ ءَايَـٰتِهِۦۤ أَنۡ خَلَقَكُم مِّن تُرَابٍ۬ ثُمَّ إِذَآ أَنتُم بَشَرٌ۬ تَنتَشِرُونَ 

তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে যে, তিনি তোমাদেরকে মাটি হতে সৃষ্টি করেছেন। এখন তোমরা মানুষ, সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছ। । সুরা রুম : ২০

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আরও বলেন-

وَلَقَدۡ خَلَقۡنَا ٱلۡإِنسَـٰنَ مِن سُلَـٰلَةٍ۬ مِّن طِينٍ۬

আমি মানুষকে তৈরী করেছি মাটির উপাদান থেকে। সুরা মুমিনুন : ১২

মানুষ মাটির তৈরি এ সম্পর্কিত আরও আয়াত: সুরা আল ইমরান : ৫৯, সুরা আনাম : ২, সুরা  আরাফ : ১২, সুরা সাফফাত : ১১, সুরা সোয়াদ : ৭১, ৭৫, ৭৬।

আল্লাহ তায়ালা ফিরিসতাদের সৃষ্টি করছেন নুর দিয়ে, জিনদের সৃষ্টি করেছেন আগুণের শিখা থেকে (সুরা আর রহমান : ১৫)। আর মানুষকে সৃষ্টি করছেন মাটির উপাদান থেকে। প্রত্যেক সৃষ্টির উপাদান আলাদা, তাই সৃষ্টির বৈশিষ্ট ও আলাদা। মানুষ হিসাবে তাদের কিছু মানবিয় বৈশিষ্ট ও আছে। যেমন- খাবার গ্রহন করা, পিপাসার জন্য পানি পান করা, বিবাহ করা, সন্তানের জম্ম দেওয়া, বাজারে গমন করা, দুনিয়াবি বিভিন্ন কাজে অংশ গ্রহন করা ইত্যাদি। এই মানবিয় বৈশিষ্টগুলি ও তাদের মধ্যে ছিল।

   রাসুলুল্লাহ ﷺ  নুরের তৈরি এই সম্পর্তে সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম, সুনানে তিরমিজি, সুনানে আবু দাউদ, সুনানে নাসাঈ, সুনানে ইবনে মাজাহ, মুসনাদ আবী হানীফা, মুআত্তা মালিক, মুসনাদ আহমাদ, মিশকাতসহ কোন গ্রন্থে কোন হাদিস নাই। চার ইমামসহ ইসলামের প্রথম ৫০০ বৎসরের মধ্যে কেউ কোন হাদিস গ্রন্থে নুর সম্পর্কে কোন হাদিন লিপিব্ধ করে নাই। হাদিস সংকলনের ৫০০ বছরের পর রাসূলুল্লাহ ﷺ কথা লিখবেন অথচ পূর্বের কোন কিতবের রেফারেন্স দিবেন না, তা কি করে হয়? মনে রাখবেন হাদিস সংকলনের ৫০০ বছর পর কেউ কোন কথা লিখলে বা বললে তাকে অবশ্যই কিতাবের রেফারেন্স দিতে হবে। তা না হলে সে যে কথাটি লিখল বা বলল তা অবশ্যই তার নিজস্ব মতামত বা জাল কথা।

রাসূলুল্লাহ ﷺ  কে আল্লাহর নূরে তৈরি হয়েছে এ কথাটা খুবই বিপদ জনক, ইসলামে থাকা না থাকার প্রশ্ন। রাসূলুল্লাহ আল্লাহর নূর। যদি এ অর্থে বলা হয় যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ আল্লাহর সত্ত্বাগত নূর, তাহলে তা কুরআন বিরোধী, কারণ কুরআনে তাকে মানুষ বলা হয়েছে। কুরআন ও সহিহ হাদিসে কোথাও বলা হয়নি আল্লাহর সত্তা নূর। তাহলে রাসুল ﷺ আল্লাহর সত্বাগত নূর হওয়ার তো কোন প্রশ্ন আসে না।

যদি কেউ বলে রাসুল ﷺ কে আল্লাহর সত্বাগত নূর থেকে সৃষ্টি করা হইয়াছে। তাহলে তো বলা হল রাসুল ﷺ স্বয়ং আল্লাহর সত্বা। তাহলে এর সুস্পষ্ট মর্ম দাঁড়ায় আল্লাহই রাসূল এবং রাসূলই আল্লাহ। আর এটা যে প্রকাশ্য ‍কুফর তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আর যদি বলা হয়, রাসূল আল্লাহর জাতি নূর মানে হুবহু আল্লাহর সত্ত্বা নন, বরং তাঁর সত্ত্বার অংশ বিশেষ, তাহলে এর পরিস্কার মর্ম দাড়ায় আল্লাহর সত্তায় রাসূল অংশীদার। অথচ এটা যে প্রকাশ্য শিরক।

।  আল্লাহর নবী, রাসুল, অলী. আওলীয়াগণের মৃত্যু নাই

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

 وَمَا مُحَمَّدٌ إِلَّا رَسُولٌ۬ قَدۡ خَلَتۡ مِن قَبۡلِهِ ٱلرُّسُلُ‌ۚ أَفَإِيْن مَّاتَ أَوۡ قُتِلَ ٱنقَلَبۡتُمۡ عَلَىٰٓ أَعۡقَـٰبِكُمۡ‌ۚ وَمَن يَنقَلِبۡ عَلَىٰ عَقِبَيۡهِ فَلَن يَضُرَّ ٱللَّهَ شَيۡـًٔ۬ا‌ۗ وَسَيَجۡزِى ٱللَّهُ ٱلشَّـٰڪِرِينَ

মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল ছাড়া কিছুই নন। তার পূর্বে বহু রাসূলস অতিবাহিত হয়েছেন। তিনি যদি মারা যান কিংবা নিহত হন তাহলে কি তোমরা ইসলাম থেকে ফিরে যাবে? যে ফিরে যাবে সে আল্লাহর কোন ক্ষতি করতে পারবে না। কৃতজ্ঞ লোকদের আল্লাহ যথোচিত পুরস্কার দেবেন। আলে ইমরান : ১৪৪

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আরও বলেন-

 إِنَّكَ مَيِّتٌ۬ وَإِنَّہُم مَّيِّتُونَ 

নিশ্চয়ই তুমিও মারা যাবে এবং নিশ্চয়ই তারাও মারা যাবে। সুরা জুমার : ৩০

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আরও বলেন-

وَمَا جَعَلۡنَا لِبَشَرٍ۬ مِّن قَبۡلِكَ ٱلۡخُلۡدَ‌ۖ أَفَإِيْن مِّتَّ فَهُمُ ٱلۡخَـٰلِدُونَ (٣٤) كُلُّ نَفۡسٍ۬ ذَآٮِٕقَةُ ٱلۡمَوۡتِ‌ۗ وَنَبۡلُوكُم بِٱلشَّرِّ وَٱلۡخَيۡرِ فِتۡنَةً۬‌ۖ وَإِلَيۡنَا تُرۡجَعُونَ (٣٥)

আর তোমার পূর্বে কোনো মানুষকে আমি অনন্ত জীবন দান করিনি। সুতরাং তোমার মৃত্যু হলে তারা কি চিরকাল বেঁচে থাকবে? প্রত্যেক প্রাণীকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে৷  আর আমি ভালো ও মন্দ অবস্থার মধ্যে ফেলে তোমাদের সবাইকে পরীক্ষা করছি, শেষ পর্যন্ত তোমাদের আমার দিকে ফিরে আসতে হবে৷  সুরা আম্বিয়া : ৩৪-৩৫

আল্লাহর নবী, রাসুল, অলী. আওলীয়াগর মারা গেছেন কিনা এ সম্পর্কে আর কিছু বলার প্রয়োজন আছে কি?

সুতারং যদি বিশ্বাস করি কোন মানুষকে অনন্ত জীবন দান করা হয়েছে তবে তা হবে কুরআন বিরোধী শিরকি বিশ্বাস। মৃত্যুর পরে এবং পুনূরুত্থানের পূর্বের জীবনকে বলা হয় ‘বারযাখী জীবন’। ‘‘বারযাখী হায়াত’’ সময়টাকে আমরা সকলে কবরে অবস্থানের সময় কে বুঝিয়ে থাকি। এই জীবনের নবী, শহীদ, মুসলিম, অমুসলিম সকলে জীবিত। কেননা, কবর আজাব সত্য। অপর পক্ষে নবী ও শহীদের ব্যাপারে ষ্পষ্ট ঘোষণা আছে। কিন্তু তাদের হায়াতকে ‘বারযাখী হায়াত’ না বলে, পৃথিবীর মত স্বাভাবিক জীবন আছে মনে করা কুরআন সুন্নাহ বিরোধী। কাজেই ‘বারযাখী হায়াত’ এর রেফারেন্স দিয়ে যদি বলা হয়, আল্লাহর নবী, রাসুল, অলী. আওলীয়াগর মৃত্যু নাই। তাহলে নিশ্চয়ই শিরক।

নবী, রাসুল, অলী, আওলীয়াগর অদৃশ্যের জ্ঞান রাখেন

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

 قُل لَّآ أَمۡلِكُ لِنَفۡسِى نَفۡعً۬ا وَلَا ضَرًّا إِلَّا مَا شَآءَ ٱللَّهُ‌ۚ وَلَوۡ كُنتُ أَعۡلَمُ ٱلۡغَيۡبَ لَٱسۡتَڪۡثَرۡتُ مِنَ ٱلۡخَيۡرِ وَمَا مَسَّنِىَ ٱلسُّوٓءُ‌ۚ إِنۡ أَنَا۟ إِلَّا نَذِيرٌ۬ وَبَشِيرٌ۬ لِّقَوۡمٍ۬ يُؤۡمِنُونَ 

অর্থঃ আপনি বলে দিন, আমি আমার নিজের কল্যাণ সাধনের এবং অকল্যাণ সাধনের মালিক নই, কিন্তু যা আল্লাহ চান। আর আমি যদি গায়বের কথা জেনে নিতে পারতাম, তাহলে বহু মঙ্গল অর্জন করে নিতে পারতাম, ফলে আমার কোন অমঙ্গল কখনও হতে পারত না। আমি তো শুধুমাত্র একজন ভীতি প্রদর্শক ও সুসংবাদদাতা ঈমানদারদের জন্য। সুরা আরাফ : ১৮৮

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

 قُل لَّآ أَقُولُ لَكُمۡ عِندِى خَزَآٮِٕنُ ٱللَّهِ وَلَآ أَعۡلَمُ ٱلۡغَيۡبَ وَلَآ أَقُولُ لَكُمۡ إِنِّى مَلَكٌ‌ۖ إِنۡ أَتَّبِعُ إِلَّا مَا يُوحَىٰٓ إِلَىَّ‌ۚ قُلۡ هَلۡ يَسۡتَوِى ٱلۡأَعۡمَىٰ وَٱلۡبَصِيرُ‌ۚ أَفَلَا تَتَفَكَّرُونَ (٥٠) 

অর্থ: বল, “আমি তোমাদের বলি নাই যে, আমার নিকট আল্লাহ্‌র ধনভান্ডার রয়েছে। আমি অদৃশ্য সম্বন্ধে জানি না আমি তোমাদের এ কথা বলি না যে, আমি একজন ফেরেশতা। আমার নিকট যে প্রত্যাদেশ অবতীর্ণ হয়েছে, আমি শুধু তার অনুসরণ করি। বল, অন্ধ ও চক্ষুষ্মান কি এক হতে পারে? তোমরা কি বিবেচনা করবে না? সুরা আনাম : ৫০

আল্লাহ রাব্বুল আলামীনই অদৃশ্যের জ্ঞানের অধিকারি। তার সৃষ্টজগতের কাউকে তিনি এই বিষয়ে ভাগ প্রদান করেন নাই। এই সম্পর্কিত কিছু রেফারেন্স উল্লেখ করা হল-

সুরা মায়েদা : ১১৬, ১০৯, সুরা আনাম : ৫৯ ৭৩, সুরা তওবা : ১০, ৯৫,৭৮,৪৩, সুরা নাহল- : ৭৭, সুরা ত্বহা : ১১০, সুরা জুকরুক : ৮৫, সুরা তাহরিম : ১, সুরা জিন : ২৫, সুরা সাবা : ৩, সুরা আরাফ : ১৮, সুরা আহজাব : ৬৩, সুরা আনাম : ৫৯. সুরা নামল : ৬৫, সুরা হুজুরাত : ১৮, সুরা ফাতির : ৩৮, সুরা লুকমান : ৩৪, সুরা রাদ ; ৮,৯, সুরা হুদ : ১২৩, সুরা বাকারা : ১৩৩, সুরা কাহব : ২৬।

এই সকল আয়াতেও আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তার রাসূলুল্লাহ ﷺ কে পরিস্কার ভাবে ঘোষনা দিতে বললেন যে, তুমি বল আমি অদৃশ্য সম্বন্ধে জ্ঞান রাখি না। আমাদের রাসূলুল্লাহ ﷺ যেখানে অদৃশ্য সম্বন্ধে জ্ঞান রাখে না, সেখানে সাধারন একজন অলী, আওলীয়া বা পীরের পক্ষে কিভাবে অদৃশ্য সম্বন্ধে জ্ঞান রাখবেন। অদৃশ্যের জ্ঞান রাখা আল্লাহ একক গুনের মধ্যে অন্যতম। আল্লাহর এই গুনটি কাউকে দেওয়া হয়নি, এমন কি আমাদের প্রান প্রিয় সর্বশ্রেষ্ট রাসুর মুহাম্মদ ﷺ  কেও না। অন্যান্য নবী, রাসুল, অলী, আওলীয়াগরতো অনেক দুরের কথা। কাজেই কুনআনের বিরোধী আকিদা প্রষণ করা নিশ্চয়ই শিরক।

গণক বা জ্যোতিষীগণ অদৃশ্যের খবর রাখেন

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

*عَٰلِمُ ٱلْغَيْبِ فَلَا يُظْهِرُ عَلَىٰ غَيْبِهِۦٓ أَحَدًا *

তিনি অদৃশ্যের জ্ঞানী, আর তিনি তাঁর অদৃশ্যের জ্ঞান কারো কাছে প্রকাশ করেন না। সুরা জিন : ২৬

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

قُلۡ لَّا یَعۡلَمُ مَنۡ فِی السَّمٰوٰتِ وَالۡاَرۡضِ الۡغَیۡبَ اِلَّا اللّٰہُ ؕ وَمَا یَشۡعُرُوۡنَ اَیَّانَ یُبۡعَثُوۡنَ

বল, ‘আল্লাহ ছাড়া আসমানসমূহে ও যমীনে যারা আছে তারা গায়েব জানে না। আর কখন তাদেরকে পুনরুত্থিত করা হবে তা তারা অনুভব করতে পারে না’। সুরা নামল : ৬৫

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

فَلَمَّا قَضَیۡنَا عَلَیۡہِ الۡمَوۡتَ مَا دَلَّہُمۡ عَلٰی مَوۡتِہٖۤ اِلَّا دَآبَّۃُ الۡاَرۡضِ تَاۡکُلُ مِنۡسَاَتَہٗ ۚ  فَلَمَّا خَرَّ تَبَیَّنَتِ الۡجِنُّ اَنۡ لَّوۡ کَانُوۡا یَعۡلَمُوۡنَ الۡغَیۡبَ مَا لَبِثُوۡا فِی الۡعَذَابِ الۡمُہِیۡنِ ؕ

তারপর যখন আমি সুলাইমানের মৃত্যুর ফয়সালা করলাম তখন মাটির পোকা জিনদেরকে তার মৃত্যু সম্পর্কে অবহিত করল, যা তার লাঠি খাচ্ছিল। অতঃপর যখন সে পড়ে গেল তখন জিনরা বুঝতে পারল যে, তারা যদি গায়েব জানত তাহলে তারা লাঞ্ছনাদায়ক আযাবে থাকত না। সুরা সাবা : ১৪

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, যে ব্যাক্তি ঋতুবতী স্ত্রীর সাথে সহবাস করলো অথবা স্ত্রীর মলদ্বারে সঙ্গম করলো অথবা গণকের নিকট গেলো এবং সে যা বললো তা বিশ্বাস করলো, সে অবশ্যই মুহাম্মাদ ﷺ এর উপর নাযিলকৃত জিনিসের বিরুদ্ধাচরণ করলো। সুনানে ইবনে মাজাহ : ৬৩৯, সুনানে তিরমিজি : ১৩৫, সুনানে আবূ দাঊদ ৩৯০৪,

কুরআন সুন্নাহর আলোকে বলা যায়- আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কারো কাছে গায়ের প্রকাশ করেন না, কোন নবী রাসূলও গায়েব জানে না, এমনকি কোন জিনও গায়েব জানে না। তাহলে গণক বা জ্যোতিষী অদৃশ্যের খবর রাখেন এমন বিশ্বাসের ভিত্তিতে তাদের নিকট অদৃশ্যের খবর জানতে চাওয়া নিসন্দেহে শিরক।

রাসূলুল্লাহ সর্বত্র সর্বদা হাজির নাজির

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

ذٰلِکَ مِنۡ اَنۡۢبَآءِ الۡغَیۡبِ نُوۡحِیۡہِ اِلَیۡکَ ۚ وَمَا کُنۡتَ لَدَیۡہِمۡ اِذۡ اَجۡمَعُوۡۤا اَمۡرَہُمۡ وَہُمۡ یَمۡکُرُوۡنَ

এটা অদৃশ্যলোকের সংবাদ যা তোমাকে আমি ওহি দ্বারা অবহিত করছি, ষড়যন্ত্রকালে যখন তারা মতৈক্যে পৌঁছেছিল তখন তুমি তাদের সাথে ছিলেনা। সুরা ইউসুফ : ১০২

ইউসুফ আ. এর ভাইদের ষড়যন্ত্র রাসূলুল্লাহ ﷺ  জানতেন না কেননা তিনি সেখানে ছিলেন না।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

تِلۡکَ مِنۡ اَنۡۢبَآءِ الۡغَیۡبِ نُوۡحِیۡہَاۤ اِلَیۡکَ ۚ  مَا کُنۡتَ تَعۡلَمُہَاۤ اَنۡتَ وَلَا قَوۡمُکَ مِنۡ قَبۡلِ ہٰذَا ؕۛ  فَاصۡبِرۡؕۛ  اِنَّ الۡعَاقِبَۃَ لِلۡمُتَّقِیۡنَ 

এগুলো গায়েবের সংবাদ, আমি তোমাকে ওহির মাধ্যমে তা জানাচ্ছি। ইতিপূর্বে তা না তুমি জানতে এবং না তোমার কওম। সুতরাং তুমি সবর কর। নিশ্চয় শুভ পরিণাম কেবল মুত্তাকীদের জন্য। সুরা হুদ : ৪৯

মুহাম্মদ ﷺ কে গায়েবের বিষয় ওহির মাধ্যমে জানান হত। তিনি সর্বত্র সর্বদা হাজির নাজির থাকলে ওহির জ্ঞানের প্রয়োজন ছিল না।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَمِمَّنۡ حَوۡلَکُمۡ مِّنَ الۡاَعۡرَابِ مُنٰفِقُوۡنَ ؕۛ  وَمِنۡ اَہۡلِ الۡمَدِیۡنَۃِ ۟ۛؔ  مَرَدُوۡا عَلَی النِّفَاقِ ۟  لَا تَعۡلَمُہُمۡ ؕ  نَحۡنُ نَعۡلَمُہُمۡ ؕ  سَنُعَذِّبُہُمۡ مَّرَّتَیۡنِ ثُمَّ یُرَدُّوۡنَ اِلٰی عَذَابٍ عَظِیۡمٍ ۚ

আর তোমাদের আশপাশের মরুবাসীদের মধ্যে কিছু লোক মুনাফিক এবং মদীনাবাসীদের মধ্যেও কিছু লোক অতিমাত্রায় মুনাফিকীতে লিপ্ত আছে। তুমি তাদেরকে জান না। আমি তাদেরকে জানি। অচিরে আমি তাদেরকে দু’বার আজাব দেব তারপর তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে মহা আজাবের দিকে। সুরা তাওবা : ১০১

মুহাম্মদ ﷺ এর চার পাশে অনেক মুনাফিক লোক ছিল। তিনি তাদের চিনতেন না। আল্লাহ তাকে জানিয়ে দিয়েছেন কে কে মুনাফিক ছিল। যদি তিনি সর্বত্র সর্বদা হাজির নাজির থাকতেন তবে মুনাফিকের কার্যকালাপ দেখতে পেতেন এবং আল্লাহ কর্তৃক তাকে আর অবহিত করার প্রয়োজন ছিন না।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তার ক্ষমতা, রাজত্ব, পরিচালনা, নিয়ন্ত্রণ, জ্ঞান, দৃষ্টি ইত্যাদি দ্বারা সর্বত্র সর্বদা হাজির নাজির। উপরের আয়াতগুলো প্রমান করে মুহাম্মদ ﷺ কে আল্লাহ এই গুনটি দান করেন নাই। বরং তিনি তার প্রয়োজন মাফিক ওহি করে জানিয়ে দিয়েছেন। মহান আল্লাহর এই গুনের সাথে অন্য কোন নবী, রাসুল, ওলি, আওলিয়াকে যুক্ত করলে বড় শিরক পতিত হবে।

এ কথা বিশ্বাস করা যে দুনিয়াতে স্বচক্ষে আল্লাহ কে দেখা যায়

দুনিয়াতে স্বচক্ষে জাগ্রত অবস্থায় আল্লাহকে দেখা অসম্ভব। আল্লাহকে কোন দৃষ্টিশক্তি আয়ত্ব করতে পারবেনা। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

لَّا تُدۡرِكُهُ ٱلۡأَبۡصَٰرُ وَهُوَ يُدۡرِكُ ٱلۡأَبۡصَٰرَۖ وَهُوَ ٱللَّطِيفُ ٱلۡخَبِيرُ

দৃষ্টিশক্তি তাঁকে দেখতে অক্ষম কিন্তু তিনি দৃষ্টিকে আয়ত্ব করে নেন৷ তিনি অত্যন্ত সূক্ষ্মদর্শী ও সর্বজ্ঞ৷   সূরা আনআম : ১০৩

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেছেন-

  وَلَمَّا جَآءَ مُوسَىٰ لِمِيقَـٰتِنَا وَكَلَّمَهُ ۥ رَبُّهُ ۥ قَالَ رَبِّ أَرِنِىٓ أَنظُرۡ إِلَيۡكَ‌ۚ قَالَ لَن تَرَٮٰنِى وَلَـٰكِنِ ٱنظُرۡ إِلَى ٱلۡجَبَلِ فَإِنِ ٱسۡتَقَرَّ مَڪَانَهُ ۥ فَسَو

ۡفَ تَرَٮٰنِى‌ۚ فَلَمَّا تَجَلَّىٰ رَبُّهُ ۥ لِلۡجَبَلِ جَعَلَهُ ۥ دَڪًّ۬ا وَخَرَّ مُوسَىٰ صَعِقً۬ا‌ۚ فَلَمَّآ أَفَاقَ قَالَ سُبۡحَـٰنَكَ تُبۡتُ إِلَيۡكَ وَأَنَا۟ أَوَّلُ ٱلۡمُؤۡمِنِينَ

অতপর মূসা যখন আমার নির্ধারিত সময়ে উপস্থিত হলো এবং তার রব তার সাথে কথা বললেন তখন সে আকূল আবেদন জানালো, হে প্রভু! আমাকে দর্শনের শক্তি দাও, আমি তোমাকে দেখবো৷ তিনি বললেনঃ তুমি আমাকে দেখতেপারো না৷ হাঁ সামনের পাহাড়ের দিকে তাকাও৷ সেটি যদি নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকতে পারে তাহলে অবশ্যি তুমি আমাকে দেখতে পাবে৷ কাজেই তার রব যখন পাহাড়ে জ্যোতি প্রকাশ করলেন, তখন তা তাকে চূর্ণ বিচূর্ণ করে দিল এবং মূসা সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ে গেলো৷ সংজ্ঞা ফিরে পেয়ে মূসা বললো, পাক-পবিত্র তোমার সত্তা৷ আমি তোমার কাছে তাওবা করছি এবং আমিই সর্বপ্রথম মুমিন৷ সূরা আরাফ : ১৪৩

সুস্পষ্ট আয়াতের নির্দেশনার আলোকে মুসলিম উম্মাহ একমত যে, পৃথিবীতে কেউ আল্লাহকে দেখতে পারে না। রাসূলুল্লাহ ﷺ থেকে একটি সহিহ হাদিসও বর্ণিত হয় নি, যাতে তিনি বলেছেন ‘আমি জাগ্রত অবস্থায় পৃথিবীতে বা মিরাজে চর্ম চক্ষে আল্লাহকে দেখেছি। নবী, রাসুল, ওলি. আওলিয়া, পীর, বুজুর্গ, আধ্যাতিক গুরু যে কেউই দাবি করতে পারে যে, সে দুনিয়াতে স্বচক্ষে আল্লাহ কে দেখেছেন। দাবি করা আর বাস্তবতা ভিন্ন কথা। আল্লাহ তায়ালা কে নবী মুসা (আ.) দুনিয়াতে স্বচক্ষে জাগ্রত অবস্থায় দেখতে চেয়ে ছিলেন কিন্তু পারেন নাই। তার পরও যদি কেউ দাবি করে বা বিশ্বাস করে দুনিয়ার জীবনে আল্লাহ দেখা সম্ভব তবে তার শিরকি পর্যায়ের কবিরা গুনাহ হবে। 

৮। অহেদাতুল অজুদ বা সর্বেশ্বরবাদ আকিদায় বিশ্বাস করা

ওয়াহদাতুল ওজুদ দুটি আরবি শব্দের সমন্বয়ে সৃষ্টি হয়েছে। আরবি শব্দ ওহেদ (এক) থেকে ওহেদা/ ওয়াহদাতুল, যার অর্থ এক হয়ে যাওয়া। আরবি শব্দ ওজুদ অর্থ অস্তিত্ব। ওয়াহদাতুল ওজুদ এর শাব্দিক অর্থ হলঃ সব কিছুর (সৃষ্টি ও স্রষ্টার) অস্তিত্ব এক হয়ে যাওয়া।

গ্রীস ও হিন্দুদের বিশ্বাস থেকে জানা যায়, এই পৃথিবীতে যা কিছুর অস্তিত্ব আছে, সব দেখতে ভিন্ন ভিন্ন রকন হলেও প্রকৃতপক্ষে সবকিছু অস্তিত্ব এক। তাই স্রষ্টা ও সৃষ্টির মধ্যে পার্থক্য নেই, যিনি ‘খালিক্ব’ তিনিই ‘মাখলুক’ অর্থাৎ যা সৃষ্টি তাই স্রষ্টা। এই আক্বীদাহ বা বিশ্বাস গ্রীকদের হলেও, এই আক্বীদার উপরে সবচেয়ে বেশী আমলকারী হচ্ছে হিন্দুরা। তাদের মতে পৃথিবীতে যা আছে সবই মাবুদ। অর্থাৎ সবই সৃষ্টি এবং সবই মাবুদ। এ অর্থে কুকুর, শুকর, বানর এবং অন্যান্য নাপাক সৃষ্টিও মাবুদ হতে কোন বাঁধা নেই। সুতরাং তাদের মতে যারা মূর্তি পূজা করে তারা ঈশ্বরেরই (আল্লাহরই) ইবাদত করে (নাউযুবিল্লাহ)।  তাই তারা পৃথিবীর প্রায় সবকিছুরই পূজা করে থাকে, যেমনঃ গাছ, পাথর, মাটি, সাপ-বিচ্ছু, হনুমান, হাতী, পশু, পাখি, নদ-নদী, সমুদ্র, নারী, এমনকি পরুষের লিঙ্গেরও পুজা করে। কারন তাদের বিশ্বাস সৃষ্টির মাঝে কোনো পার্থক্য নেই।

ওয়াহদাতুল ওজুদ এর বাংলা হচ্ছে  ‘সর্বেশ্বরবাদ’।  অর্থাৎ সব কিছুর মাঝেই ঈশ্বর আছেন। মুসলিমগন ঈশ্বর শব্দকে মহান আল্লাহ সমান্তারাল ব্যবহার করেনা। তাই সম্ভবত ‘সর্বেশ্বরবাদ’ শব্দটি হিন্দু ধর্ম থেকে আগত, কারন অনেক হিন্দু আছে যারা অদ্বৈতবাদে বিশ্বাসী। ওয়াহদাতুল ওজুদ এর ইংরেজি পারিভাষিক শব্দ হল: Pantheism. Pantheism দুটি শব্দের সমন্বয়ে গঠিত একটি হল- Pan, অন্যটি হল- Theo. Pan শব্দের অর্থ হল All বা সব আর Theo শব্দের অর্থ হল- God বা ঈশ্বর। Pantheism এর সঙ্গায় বলা হয়: The doctrine that the whole universe is God (যে মতবাদে বিশ্বের সবকিছুতেই ঈশ্বর)। ইসলাম আসার আগেই এই Pantheism মতবাদটি এথেন্সের দার্শনিকদের মধ্যে লক্ষ করা যায়।  এথেন্সের দার্শনিক জেনো কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত স্টোয়িক দর্শনে সর্বেশ্বরবাদ তথা Pantheism মতবাদটি ছিল বলে জানা যায়। সূত্র: “গ্রিস দর্শন প্রজ্ঞা ও প্রসার” বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত

প্রচীন কাল থেকে মানবীয় যুক্তি, বুদ্ধি, জ্ঞান বা দর্শন দ্বারা স্রষ্টা, সৃষ্টি, স্রষ্টার প্রকৃতি, সৃষ্টির প্রকৃতি ও কর্ম ইত্যাদি নিয়ে গবেষনা করছে। তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক যুক্তিতর্ক অত্যান্ত আকর্ষনীয় হলেও কোন চুড়ান্ত সত্যে পৌছাতে পারেনি। এই ধরনের যুক্তিভিত্তিক জ্ঞান চর্চাকে ইলমুল কালাম বা যুক্তিবিদ্যা বলে। ইসলামের প্রাথমিক যুগে এই ইলমুল কালাম বা যুক্তিবিদ্যা ছিল না। দ্বিতীয় হিজরি শতকে মুসলিম উম্মার মধ্যে গ্রীস, ভারতীয় ও পারসিকদের দর্শন প্রচার লাভ করে। মুরধারার তাবেয়ীগন ও তাদের অনুসারীগন গাইবী বিষয়ে, দর্শন বিতর্ক কঠিনভাবে অপছন্দ করতেন। কারন তারা বিশ্বাস করতেন, গায়বি বিষয় সব সময় অহীর উপর নির্ভর করে, যুক্তির উপর নয় অহীর আদেশ মেনে নেয়াই মুমিনের কাজ। ইমাম আবু হানিফা ও তার অনুসারীগন ইলমুল কালাম শিক্ষা করতে ঘোর আতত্তি করতেন। কারন গায়েবের প্রতি বিশ্বাসে কোন যুক্তি খাটে না। এ জন্যই চার মাযহাবের ইমামদের মধ্যে ফিকহি মাসলা মাসায়েলে মতপার্থক্য থাকলেও আকিদার ব্যাপারে তেমন কোন পার্থক্য পাওয়া যায় না। খুলাফায়ে রাশিদার পর মুসলিম উম্মার মধ্যে রাজনৈতিক দ্বন্ধের প্রভাবে মুলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে জাববিয়া, কাদরিয়া, মুরজিয়া, জাহমিয়া, মুতাজিলা ইত্যাদি দল সৃষ্টি হয়ে ছিল। এই সকল দল মানবীয় যুক্তি, বুদ্ধি, জ্ঞান বা দর্শন দ্বারা স্রষ্টা, সৃষ্টি, স্রষ্টার প্রকৃতি, সৃষ্টির প্রকৃতি বুজার চেষ্টা করে। গ্রীস, ভারতীয় ও পারসিকদের দর্শন লুফে নেয়। চতুর্থ হিজরি শতাব্দীতে আহলে সুন্নাহ ওয়ালজামাতের মুলধারা আলেমগন ইলমুল কালাম বা যুক্তিবিদ্যা চর্চা শুরু করে। এই সময়কার প্রখ্যাত ইলমুল কালামবীদ আবুল হাসান আল আশআরী ও আবু মানসুর মাতুরীদীর আবির্ভাব ঘটে। আবুল হাসান আল আশআরী প্রথমিক জীবনে মুতাজিলা মতাদর্শে বিশ্বাসি ছিল। পরবর্তিতে মুতাজিলা মতাদর্শন ত্যাগ করেন এবং মুলধারার ইলমুল কালামে অনেক অবদান রাখেন। চতুর্থ হিজরি শতাব্দীর পর ইসলাম আস্ত আস্তে সুফিবাদের দিকে ঝুকতে থাকে, সাথে সাথে যুক্তিবৃত্তিক, বুদ্ধিবৃত্তিক দর্শন প্রসার ঘটে। ষষ্ঠ হিজরি শতাব্দীতে ভারতীয়  ‘সর্বেশ্বরবাদ’ বা গ্রীসের ‘Pantheism’ মুসলিমগন “ওয়াহদাতুল ওজুদ” নামে গ্রহন করে। তার অর্থ দাড়ায় ইসলামের প্রথম পাঁচ শতাব্দীতে “ওয়াহদাতুল ওজুদ” নামে কোন আকিদা ছিল না। আবু হানিফা রহ. রচিত ফিকহুল আকবর বঙ্গানুবাদ ও ব্যাখ্যা’, ও “ইসলামী আকীদা ও ভ্রান্ত মতবাদ”

প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন মাওলানা মুহাম্মাদ হেমায়েত উদ্দনের লেখা “ইসলামী আকীদা ও ভ্রান্ত মতবাদ” যা কওমি মাদ্রাসার লেসাবভূক্ত। উক্ত বই-এ তিনি একটা অধ্যায়ের নাম দিয়েছেন ‘সর্বেশ্বরবাদ/সর্বখোদাবাদ’। ঐ অধ্যায়ের তিনি ওয়াহদাতুল ওজুদ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। তিনি বলেন, মুসলিম মনীষিদের মধ্যে সর্ব প্রথম শায়েখে আকবর ইবনুল আরাবী এই মতবাদটি উদ্ভাবন করেন এবং তার অনুসাবীগণ এটির প্রচার ও প্রসার ঘটান। ইবনে আরাবী এই মতবাদটি ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেন, সমগ্র সৃষ্টির অস্তিত্ব হবহু আল্লাহ অস্তিত্ব”।

এখানে তিনি ‘ওয়াহদাতুল ওজুদ’ তথা স্রষ্টা ও সৃষ্টির অস্তিত্বের ঐক্য ও অভেদত্বকেই বুঝিয়েছেন। ফারসি কবি ফরিদ উদ্দিন আত্তার, সাদরুদ্দি, নাবলুসি প্রমুখ তাদের লেখায় ইবনুল আরাবীর এই ‘ওয়াহদাতুল ওজুদ’ মতবাদটি তুলে ধরেছেন এবং ব্যাখ্যা করেছেন। নাবলুসি  ব্যাখ্যা করে বলেন, “আল্লাহই এক মাত্র  অস্তিত্ববান সত্বা, এই দৃষ্টি কোন থেকে যে, তিনি সার্বিক সমগ্র । অন্যের দ্বারা তিনি অস্তিত্ববান নন বরং তিনি স্বকীয় সত্তায় অস্তিত্ববান। নাবলুসি এই ‘ওয়াহদাতুল ওজুদ’ আলোকে প্রদত্ত কালিমার ব্যাখ্যাকেই বিশুদ্ধ ব্যাখ্যা বলে অভিহিত করছেন। তবে আহলে সুন্নত ওয়াল জামা’আতের উলামাগর তার এ অভিমত মেনে নেয় নি। “ইসলামী আকীদা ও ভ্রান্ত মতবাদ” প্রকাশণায়ঃ মাকতাবাতুল আবরার; পৃষ্ঠা -৫৪৭

এতক্ষনে জানতে পারলাম, যে মতবাদটি ইসলামেই নেই। কোন ইমানদার এই আকিদা প্রষণ করতে পারেনা। তবে উপমহাদেশের কিছু আলেম সৃষ্টি ও স্রষ্টার মাঝে পার্থক্য করে এই মতবাদ সঠিক বলার চেষ্টা করছেন। তাদের ব্যাখ্যা বিশ্লেষন সাধারণ মুসলিমদের  বোধ গন্য হবে না। যেহেতু ইসলামের প্রাথমিক যুগে ছিল না ছিল এবং যে অর্থে এই আকিদা ব্যবহার হয় তা কুফরি। এই আকিদাতো দুরের কথা এই ধরণের পরিভাষা ব্যবহার করাও হারাম।

হুলুলিয়্যায় বা ‘অনুপ্রবেশবাদ’  বিশ্বাস করা

ইবনে আরাবীর একটি আকিদা ছিল হুললিয়্যাহ। আরবীতে বলা হয়, হুলুলিয়্যাহ, যার বাংলা অর্থ হচ্ছে, ‘অনুপ্রবেশবাদ’। হুলুল কথাটির সাধারণ ব্যাখ্যা হচ্ছে- আল্লাহ কোনো কিছুর মধ্যে ‘হুলুল’ করে অর্থাৎ প্রবেশ করেন। এই মতবাদ প্রাচীনকাল থেকে মানুষের মাঝে বিদ্যমান, তবে বিশেষ করে খৃষ্টানদের মাঝে এই আকিদা লক্ষ্য করা যায়। খ্রীস্টানরা মনে করে আল্লাহ ঈসা (আ.) এর মধ্যে প্রবেশ করে এক হয়ে গেছেন। এই কারণে হুসাইন বিন মানসুর হাল্লাজ নামে একজন পথভ্রষ্ট সূফী যখন বলেছিল, আনাল হক্ব (আমিই আল্লাহ)। তখন এই কথাটিকে খৃষ্টানরাই বেশী পছন্দ করেছিল, কারণ এই কথার সাথে তাদের আকিদার মিল ছিলো। জালালুদ্দিন রুমিও হুলুল আকিদায় বিশ্বাসি ছিলেন। এই জন্য তিনি তার মছনবী শরীফে হুসাইন বিন মানসুর হাল্লাজ প্রসংশাসহ ঊল্লেখ করেছেন। তিনি হুলুল বা মানুষে ঐশীরুপ দেখেছেন। এবং বিশ্বাস করেছেন যে, ইলাহীয়তে বা ঐশী সত্তার বিকাশ স্ফুরন হয় মানবত্বে। তিনি আদম (আ.) কে সর্বপ্রথম আল্লাহর শারীরিক বিকাশ হিসাবে ধরেছেন। আরও বলেন, মানবীয় দৈহিক সত্তায় ঐশী সত্তার পূর্ণতম প্রকাশই আল্লাহর এক চিরন্তন রহস্য। এই ধরনের কথা উচ্চারণের কারণে তিনি লম্বা বিচারকার্যের সম্মুখীন হন এবং দীর্ঘ ১১ বছর বাগদাদ নগরে কারাবাস করেন। অবশেষে উনাকে ৯২২ খ্রিস্টাব্দের ২৬শে মার্চ জনসমক্ষে তত্কালীন সরকারি বিচারকদের নির্দেশে হত্যা করা হয়।

কিছু পথভ্রষ্ট অজ্ঞ বাতিলপন্থি সুফি ব্যতিত কোন সাধারন মুসলিম হুলুলিয়্যায় বিশ্বাস করা না। এই জন্যই সুফিরা ফানাফিল্লায় বিশ্বাস করে। আল্লাহর ধ্যান আর আরাধনার মাধ্যমে আল্লাহয় বিলিন হয়ে যাওয়া। আল্লাহয় বিলিন হতে পারলে তার আর ইবাদাত প্রয়োজন হয় না। অথচ মুহম্মাদ ﷺ ধ্যান আর আরাধনার মাধ্যমে আল্লাহয় বিলিন হতে পালেন না। তিনি মৃত্যুর পুর্বক্ষণ পর্যান্ত সালাত আদায় করছেন। এই আকিদা একটি শির্কি আকিদা। বিশ্বাসকারি মুশরিক এতে কোন সন্দেহ নেই।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ছাড়া অন্য কাউকে হিদায়েত প্রদানের মালিক মনে করা

হিদায়েতের এক মাত্র মালিক আল্লাহ রাব্বুল আলামীন। কুনআন ও সহিহ হাদিসে এই সম্পর্কে অসংখ্যা বর্ণনা এসেছে। নিচের সহিহ হাদিসটি দিকে লক্ষ করুন-

সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যাব (রহঃ) তাঁর পিতা (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আবূ তালিবের মৃত্যু ঘনিয়ে আসলে নবী ﷺ তার কাছে গেলেন। এ সময় আবূ জাহল এবং আবদুল্লাহ ইবনু আবূ উমাইয়াহও সেখানে বসা ছিল। নবী ﷺ বললেন, হে চাচা! আপনি পড়ুন ’লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ। আপনার মুক্তির জন্য আল্লাহর নিকট এটা দলিল হিসেবে পেশ করব। এ কথা শুনে আবূ জাহল ও আবদুল্লাহ ইবনু উমাইয়াহ বলল, হে আবূ তালিব! তুমি কি আবদুল মুত্তালিবের ধর্ম ত্যাগ করে দিবে? নবী ﷺ বললেন, হে চাচা! আমি আপনার জন্য আল্লাহর তরফ থেকে যতক্ষণ আমাকে নিষেধ না করা হবে ততক্ষণ ক্ষমা চাইতে থাকব। তখন এ আয়াত অবতীর্ণ হয়-

 إِنَّكَ لَا تَہۡدِى مَنۡ أَحۡبَبۡتَ وَلَـٰكِنَّ ٱللَّهَ يَہۡدِى مَن يَشَآءُ‌ۚ وَهُوَ أَعۡلَمُ بِٱلۡمُهۡتَدِينَ (٥٦) 

নবী ও মুমিনদের পক্ষে উচিত নয় যে, তারা ক্ষমা প্রার্থনা করবে মুশরিকদের জন্য যদি তারা নিকটাত্মীয়ও হয় যখন তাদের কাছে এ কথা স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, তারা জাহান্নামি, সুরা তওবা-১১৩। সহিহ বুখারি : ৪৬৭৫

উক্ত ঘটনা দ্বারা বুঝতে পারি, ব্যক্তিগত ভালবাসা ও আত্মিয়তার সম্পর্কের ভিত্তিতে যদি কোন ব্যক্তির হিদায়াত লাভ করত ততে তিনি ছিলেন আবু তালেব। কিন্তু তাকে হিদায়াত দান করার শক্তি যখন নবী ﷺ কে দিলেন না, তা হলে একথা একেবারে সুস্পষ্ট হয়ে গেলো যে, কাউকে হিদায়াত দান করা বা কাউকে হিদায়াত বঞ্চিত করা নবী ﷺ ক্ষমতার বাইরে। এবং বিষয়টি সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর হাতে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেনঃ

إِنَّكَ لَا تَهْدِي مَنْ أَحْبَبْتَ وَلَكِنَّ اللَّهَ يَهْدِي مَن يَشَاء وَهُوَ أَعْلَمُ بِالْمُهْتَدِينَ

আপনি যাকে পছন্দ করেন, তাকে সৎপথে আনতে পারবেন না, তবে আল্লাহ তা’আলাই যাকে ইচ্ছা সৎপথে আনয়ন করেন। কে সৎপথে আসবে, সে সম্পর্কে তিনিই ভাল জানেন। (সুরা কাসাস ২৮:৫৬)

যদি কেহ মনে করে তার পীর, শাইখ বা মুরব্বী তাকে হিদায়েত দেওয়ার ক্ষমতা রাখে তবে হিদায়েততো দুরের কথা তার ইমানই চলে যাবে। কেননা, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ছাড়া কেহই হিদায়েত প্রদানের মালিক নয়।

১১। কিমামতের দিন আল্লাহ ছাড়া কাউকে সুপারিশের মালিক মনে করা

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন-ই হল সাফায়েত বা সুপারিশের একমাত্র মালিক। তিনিই একচ্ছন্নভাবে সুপারিশের অধিকারি। তিনি ছাড়া কঠিন হাসরের ময়দানে কেউ সুপারিশ করতে পারবেন না। সর্ব প্রকার সুপারিশের চাবিকাঠি একমাত্র তাঁরই হাতে। কোন কারো জন্য সুপারিশ করা তো দূরের কথা নিজে জন্যই আল্লাহর দরবারে সুপারিশকারী হিসেবে আল্লাহর নিকট যাবে এমন শক্তিও করো থাকবে না।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

قُل لِّلَّهِ ٱلشَّفَـٰعَةُ جَمِيعً۬ا‌ۖ لَّهُ ۥ مُلۡكُ ٱلسَّمَـٰوَٲتِ وَٱلۡأَرۡضِ‌ۖ ثُمَّ إِلَيۡهِ تُرۡجَعُونَ (٤٤)

বলো, সুপারিশ সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর ইচ্ছাধীন।  আসমান ও যমীনের বাদশাহীর মালিক তিনিই৷ তোমাদেরকে তারই দিকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে৷ সূরা যুমার : ৪৪

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আরও বলেন-

مَا لَكُم مِّن دُونِهِۦ مِن وَلِىٍّ۬ وَلَا شَفِيعٍ‌ۚ أَفَلَا تَتَذَكَّرُونَ

তিনি ছাড়া তোমাদের কোন সাহায্যকারী নেই এবং নেই তার সামনে সুপারিশকারী, তারপরও কি তোমরা সচেতন হবে না। সূরা সাজদাহ : ৪

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আরও বলেন-

وَاَنۡذِرۡہُمۡ یَوۡمَ الۡاٰزِفَۃِ اِذِ الۡقُلُوۡبُ لَدَی الۡحَنَاجِرِ کٰظِمِیۡنَ ۬ؕ  مَا لِلظّٰلِمِیۡنَ مِنۡ حَمِیۡمٍ وَّلَا شَفِیۡعٍ یُّطَاعُ ؕ

আর তুমি তাদের আসন্ন দিন সম্পর্কে সতর্ক করে দাও। তখন তাদের প্রাণ কণ্ঠাগত হবে দুঃখ, কষ্ট সংবরণ অবস্থায়। জালিমদের জন্য নেই কোন অকৃত্রিম বন্ধু, নেই এমন কোন সুপারিশকারী যাকে গ্রাহ্য করা হবে। সুরা গাফির : ১৮

আখিরাতের সেই ভয়াবহ বিপদের মূহূর্ত মহান আল্লাহর অনুমতি ব্যতিত কেউ শাফাআত করতে পারবে না। তিনি যাকে ইচ্ছা সুপারিশের অনুমতি দেবেন। আবার ইচ্ছা করলে না ও দিতে পারেন। ইহা সম্পূর্ণরূপে তার ইখাতিয়ার ভূক্ত। এক শ্রেণীর মুশরীকেরা চিন্তা করে থাকেন যে, আল্লাহর প্রিয় ব্যক্তিবর্গ, নবীগন, রাসুলগন. ফেরেশস্তাগর বা অন্যান্য সত্তা আল্লাহর নিকট সুপারিশ করে তাদের জান্নাত দিবেন বা আল্লাহর ওখানে তাদের বিরাট প্রতিপত্তি আছে। তাই তারা আল্লাহর কাছ থেকে তারা যে কোন কার্যোদ্ধার করতে সক্ষম। তারা যে কথার ওপর অটল থাকে, তা তারা আদায় করেই ছাড়ে। এভাবেই সুপারিশের লোভে শির্কি কাজে জড়িয়ে পরে। অথচ শ্রেষ্ঠতম পয়গম্বর এবং কোন নিকটতম ফেরেশতাও এই পৃথিবী ও আকাশের মালিকের দরবারে বিনা অনুমতিতে একটি শব্দও উচ্চারণ করার সাহস রাখে না। তবে মনে রাখতে হবে সুপারিশের জন্য দুটি শর্থ আছে।

১। ঈমানদার হতে হবে (তার প্রতি আল্লাহর সন্তুষ্টি থাকা)।

২। মহান আল্লাহ তাআলার অনুমতি।

শাফাআতের জন্য ঈমানদার হতে হবে

নবীগণ, ফেরেশতাগণ, সিদ্দীকগণ, শহীদগণ, নেককার বান্দাগণ সকলেই শাফাআত করবেন কিন্তু তাদের শাফাআত প্রাপ্তির প্রধান উপকরন হল ঈমান ও কুরআন সুন্নাহ ভিত্তিক নেক আমল যা করলে তিনি সন্তুষ্টি থাকবেন। যদি মনে করে থাকি আত্মিয়তার সম্পর্ক তবে মারাত্ত্বক ভুল করবেন। একটু লক্ষ করুন, ইউসুফ (আ.) এর পিতা ইয়াকুব (আ.), ইয়াকুব (আ.) এর পিতা ইসহাক (আ.), ইসহাক (আ.) এর পিতা ইব্রাহীম (আ.)। এই চার জন জলিল কদর নবী (আ.) একত্রে মিলে তাদের পূর্ব পুরুষ ইব্রাহীম (আ.) এর পিতা আজল কে কি জান্নাতে নিতে পারবে? নিশ্চয় পারবেন না। মহান আল্লাহর প্রিয় বান্দা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চাচা আলী (রা.) এর বাবা, মা ফাতিমা (রা.)  এর শশুর, হাসান হোসেন (রা.)  এর দাদা আবু তালিবকে কি এরা সকলে মিলে কিয়ামতের কঠিন সময় সকলে মিলে শাফায়েদ করে জান্নাতে নিতে পারবে? বড় কঠিন প্রশ্ন।

মনে রাখবেন সুপারিশ প্রাপ্তির জন্য শর্থ হল ঈমান। আল্লাহর নিকট অপ্রিয় (মুসরিক) এমন কারো জন্য কোন সুপারিশ চলবে না। কুরআনে বর্ণিত আছে, মহা প্লাবনের সময় আল্লাহর প্রেরিত নবী নূহ (আ.) তার ছেলে কেনানকে আজাব হতে রক্ষা করার ব্যাপারে সুপারিশ করে ছিলেন আল্লাহ তা গ্রহণ করেননি। পিতা আজরের জন্যে ইবরাহীম (আ.) এর ক্ষমা করে দেয়ার সুপারিশ গ্রহণ করেননি। দুনিয়াতে যারা প্রকাশ্য শিরক ও কুফরীর গুনাহে লিপ্ত ছিল এবং এর উপর মৃত্যুবরণ করেছেন, কিয়ামত দিবসে তারা সুপরিশ থেকে বঞ্চিত হবেন। তাদের জন্য কোন প্রকারের সুপারিসের অনুমতি প্রদান করা হবে না। তাদের সম্পর্কে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

إِنَّ ٱلَّذِينَ كَفَرُواْ مِنۡ أَهۡلِ ٱلۡكِتَـٰبِ وَٱلۡمُشۡرِكِينَ فِى نَارِ جَهَنَّمَ خَـٰلِدِينَ فِيہَآ

আহলে কিতাবের মধ্যে যারা কাফের এবং মুশরিক, তারা জাহান্নামের আগুনে স্থায়ী ভাবে থাকবে। তারাই সৃষ্টির অধম। সূরা বায়্যিনাহ : ৬

শাফাআতের জন্য মহান আল্লাহ তাআলার অনুমতি প্রয়োজন:

মহান তাআলা বলেছেন,

مَا فِى ٱلسَّمَـٰوَٲتِ وَمَا فِى ٱلۡأَرۡضِ‌ۗ مَن ذَا ٱلَّذِى يَشۡفَعُ عِندَهُ ۥۤ إِلَّا بِإِذۡنِهِۦ‌ۚ

পৃথিবী ও আকাশে যা কিছু আছে সবই তার৷  কে আছে তাঁর অনুমতি ছাড়া তাঁর কাছে সুপারিশ করবে? সূরা বাক্বারা : ২৫৫

মহান তাআলা বলেছেন,

إِنَّ رَبَّكُمُ ٱللَّهُ ٱلَّذِى خَلَقَ ٱلسَّمَـٰوَٲتِ وَٱلۡأَرۡضَ فِى سِتَّةِ أَيَّامٍ۬ ثُمَّ ٱسۡتَوَىٰ عَلَى ٱلۡعَرۡشِ‌ۖ يُدَبِّرُ ٱلۡأَمۡرَ‌ۖ مَا مِن شَفِيعٍ إِلَّا مِنۢ بَعۡدِ إِذۡنِهِۦ‌ۚ ذَٲلِڪُمُ ٱللَّهُ رَبُّڪُمۡ فَٱعۡبُدُوهُ‌ۚ أَفَلَا تَذَكَّرُونَ (٣)

 কোন শাফায়াতকারী (সুপারিশকারী ) এমন নেই, যে তার অনুমতি ছাড়া শাফায়াত করতে পারে৷ এ আল্লাহই হচ্ছেন তোমাদের রব৷ কাজেই তোমরা তারই ইবাদত করো৷ এরপরও কি তোমাদের চৈতন্য হবে না। সুরা ইউনুস : ১০৩

এই আয়াত দ্বারা বোঝা যাচ্ছে মহান আল্লাহ সুপারিশের অনুমতি দিবেন। কিন্তু মনে রাখত হবে শুধু ইমানদার যাদের উপর তিনি সন্ত্বষ্ট তাদের সুপারিশ করার অনুমতি দিবেন। আখিরাতের সেই ভয়াবহ বিপদের মুহূর্তে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনর অনুমতি ব্যতীত কেউ সুপারিশ  করতে পারবে না। সুপারিশ স্বেচ্ছামূলক নয়, বরং তা হবে অনুমতি ক্রমে। আখিরাতে কেউ যখন সুপারিশ করার সাহস করতে পারবে না। তখন আমাদের প্রিয় বিশ্বনবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামই প্রথম শাফাআতের অনুমতি পাবেন। অতপর,  আমাদের নবীজীর সাথে অন্যান্যরা শাফাআত করবেন। যেমন, নবীগণ, ফেরেশতাগণ, সিদ্দীকগণ, শহীদগণ, নেককার বান্দাগণ, সিয়াম ও কুরআন সুপারিশ করবে বল সহিহ দ্বারা প্রমানিত। আল্লাহর অনুমতিক্রমে ইমানদারদের জন্য সুপারিশ করা হবে। সহিহ হাদিসের মাধ্যমে জানা যায়, বিশ্বনবি মুহাম্মদ ﷺ প্রথম  সুপারিশের অনুমতি পাবেন। 

আবূ হুরাইরাহ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

أَنَا سَيِّدُ وَلَدِ آدَمَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَأَوَّلُ مَنْ يَنْشَقُّ عَنْهُ الْقَبْرُ وَأَوَّلُ شَافِعٍ وَأَوَّلُ مُشَفَّعٍ

আমি কিয়ামতের দিন আদম সন্তানদের সরদার হব এবং আমিই প্রথম ব্যক্তি যার কবর খুলে যাবে এবং আমিই প্রথম সুপারিশকারী ও প্রথম সুপারিশ গৃহীত ব্যক্তি। সহিহ মুসলিম : ২২৭৮, সুনানে আবু দাউদ : ৪৬৭০

আনাস ইবনু মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন, জান্নাতে লোকদের প্রবেশ সম্পর্কে আমিই হবো সর্বপ্রথম সুপারিশকারী এবং এত অধিক সংখ্যক মানুষ আমার প্রতি ইমান এনেছে যা অন্য কোন নাবির বেলায় হবে না। নাবীদের কেউ কেউ তো এমতাবস্থায়ও আসবেন যাঁর প্রতি মাত্র এক ব্যক্তিই ইমান এনেছে। সহিহ মুসলিম : ৩৭৩

রসূলুল্লাহ এর পর অন্যান্য নবী রাসুলগণ, শহিদগণ, আল্লাহর প্রিয় বান্দাগণ, কুরআন ও সিয়াম মুমিনদের জন্য সুপারিশের অনুমতি পাবেন 

আবূ উমামাহ আল বাহিলী (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রসুলুল্লাহ ﷺ কে বলতে শুনেছি তোমরা কুরআন পাঠ কর। কারণ কিয়ামতের দিন তার পাঠকারীর জন্য সে সুপারিশকারী হিসেবে আসবে। তোমরা দুটি উজ্জ্বল সুরাহ অর্থাৎ সুরাহ আল বাকারাহ এবং সুরাহ্ আল ইমরান পড়। কিয়ামতের দিন এ দুটি সূরা এমনভাবে আসবে যেন তা দু খণ্ড মেঘ অথবা দু’টি ছায়াদানকারী অথবা দুই ঝাক উড়ন্ত পাখি যা তার পাঠকারীর পক্ষ হয়ে কথা বলবে। আর তোমরা সূরা বাকারাহ পাঠ কর। এ সূরাটিকে গ্রহণ করা বারাকাতের কাজ এবং পরিত্যাগ করা পরিতাপের কাজ। আর বাতিলের অনুসারীগণ এর মোকাবেলা করতে পারে না। সহিহ মুসলিম : ৮০৪

নিমরান ইবনু উতবাহ আয-যামারী (রহ.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা কতক ইয়াতীম উম্মুদ দারদা (রা.) এর কাছে প্রবেশ করলাম। তিনি আমাদের বললেন, তোমরা সুসংবাদ গ্রহণ করো। কেননা আমি আবূ দারদা (রাঃ) কে বলতে শুনেছি, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন শহিদ তার পরিবারের সত্তরজনের জন্য সুপারিশ করবে এবং তার সুপারিশ কবুল করা হবে। আবু দাউদ : ২৫২২

আবদুল্লাহ ইবনু ’উমার হতে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

الصِّيَامُ وَالْقُرْآنُ يَشْفَعَانِ لِلْعَبْدِ يَقُولُ الصِّيَامُ: أَيْ رَبِّ إِنِّي مَنَعْتُهُ الطَّعَامَ وَالشَّهَوَاتِ بِالنَّهَارِ فَشَفِّعْنِي فِيهِ وَيَقُولُ الْقُرْآنُ: مَنَعْتُهُ النُّوْمَ بِاللَّيْلِ فَشَفِّعْنِي فِيهِ فيشفعان . رَوَاهُ الْبَيْهَقِيّ فِي شعب الْإِيمَان

সিয়াম এবং কুরআন বান্দার জন্য শাফা’আত করবে। সিয়াম বলবে, হে রব! আমি তাকে দিনে খাবার গ্রহণ করতে ও প্রবৃত্তির তাড়না মিটাতে বাধা দিয়েছি। অতএব তার ব্যাপারে এখন আমার শাফা’আত কবূল করো। কুরআন বলবে, হে রব! আমি তাকে রাতে ঘুম থেকে বিরত রেখেছি। অতএব তার ব্যাপারে এখন আমার সুপারিশ গ্রহণ করো। অতঃপর উভয়ের সুপারিশই কবূল করা হবে। মিশকাত : ১৯৬৩, সহহি আত তারগিব : ৯৭৩, মুসতাদারাক লিল হাকিম : ২০৩৬, শুসিহহ আল জামি :৩৮৮২,

অনেক পীরকে বলতে শুনা যায়,  আখেরাতে পীর সাহেব নাকি মুরিদদের ফেলে জান্নাতে যাবে না। কেমন হাস্যক  রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বয়ং নিজের কলিজার টুকরার জিম্মাদারী নিতে পারলেন না। অথচ পীর সাহেব মুরিদদের জিম্মাদারী নিচ্ছেন। তবে নেককার মানুষ আল্লাহ অনুমতি নিয়ে সুপারিশ করবেন। যদি কেউ বলেন, অমুক অলী সুপারিশ করবে, এরূপ নিশ্চিত করা শিরকি কাজ, কেননা মনে হবে আল্লাহ নিকট তার প্রতিপত্তি আছে। তাছাড়া ইহাতে আল্লাহকে বাধ্য করা হয় যা চুড়ান্তভাবে অন্যায়। আর যদি কেউ গাইরুল্লাহ তথা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কাছে শাফাআতের দু’আ বা প্রার্থনা করে তবে দাও শির্ক হবে।

১২। মানুষকে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনর মত ভয় করা

আল্লাহ তায়ালা বলেন,

فَلَا تَخۡشَوُاْ ٱلنَّاسَ وَٱخۡشَوۡنِ وَلَا تَشۡتَرُواْ بِـَٔايَـٰتِى ثَمَنً۬ا قَلِيلاً۬‌ۚ وَمَن لَّمۡ يَحۡكُم بِمَآ أَنزَلَ ٱللَّهُ فَأُوْلَـٰٓٮِٕكَ هُمُ ٱلۡكَـٰفِرُونَ 

কাজেই (হে ইহুদী) তোমরা মানুষকে ভয় করো না বরং আমাকে ভয় করো এবং সামান্য তুচ্ছ মূল্যের বিনিময়ে আমার আয়াত বিক্রি করা পরিহার করো৷ আল্লাহর নাযিল করা আইন অনুযায়ী যারা ফায়সালা করে না তারাই কাফের৷ সুরা মায়িদা : ৪৪

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

فَلَمَّا کُتِبَ عَلَیۡہِمُ الۡقِتَالُ اِذَا فَرِیۡقٌ مِّنۡہُمۡ یَخۡشَوۡنَ النَّاسَ کَخَشۡیَۃِ اللّٰہِ اَوۡ اَشَدَّ خَشۡیَۃً ۚ وَقَالُوۡا رَبَّنَا لِمَ کَتَبۡتَ عَلَیۡنَا الۡقِتَالَ ۚ لَوۡلَاۤ اَخَّرۡتَنَاۤ اِلٰۤی اَجَلٍ قَرِیۡبٍ ؕ قُلۡ مَتَاعُ الدُّنۡیَا قَلِیۡلٌ ۚ وَالۡاٰخِرَۃُ خَیۡرٌ لِّمَنِ اتَّقٰی ۟ وَلَا تُظۡلَمُوۡنَ فَتِیۡلًا

অতঃপর তাদের উপর যখন লড়াই ফরয করা হল, তখন তাদের একদল মানুষকে ভয় করতে লাগল আল্লাহকে ভয় করার অনুরূপ অথবা তার চেয়ে কঠিন ভয়। আর বলল, ‘হে আমাদের রব, আপনি আমাদের উপর লড়াই ফরয করলেন কেন? আমাদেরকে কেন আরো কিছুকালের অবকাশ দিলেন না’? বল, ‘দুনিয়ার সুখ সামান্য। আর যে তাকওয়া অবলম্বন করে তার জন্য আখিরাত উত্তম। আর তোমাদের প্রতি সূতা পরিমাণ যুলমও করা হবে না’। সুরা নিসা : ৭৭

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

 فَلَا تَخۡشَوۡهُمۡ وَٱخۡشَوۡنِى وَلِأُتِمَّ نِعۡمَتِى عَلَيۡكُمۡ وَلَعَلَّكُمۡ تَہۡتَدُونَ 

সুতরাং তোমরা তাদেরকে ভয় করো না, আমাকে ভয় কর, আমি অবশ্যই তোমাদের উপর আমার নিয়ামত পূর্ণ করব এবং যাতে তোমরা হেদায়েত প্রাপ্ত হও। সুরা বাকারা : ১৫০

আল্লাহর ভয় একজন মুমিনের অন্যতম সম্পদ। আল্লাহ তায়ালার ভয় থাকা ঈমানের অন্যতম একটি অংশ। মানুষ আল্লাহ তায়ালাকে ভয় করে কারণ তার বিশ্বাস, তার সব কাজ আল্লাহ দেখছেন এবং একদিন আল্লাহর সামনে গিয়ে তাকে দাঁড়াতে হবে। কিন্তু যার বিশ্বাস দুর্বল, সে জীবনের মায়ায় ও পার্থিক স্বার্থের কারণে দুনিয়ার মানুষকে আল্লাহ থেকেও বেশী ভয় করে। যার প্রমান উপরের আয়াতগুলো, যেখান আল্লাহ তায়ালা এই কাজকে ইহুদীদের কাজ বলেছেন। পক্ষান্তরে যারা আল্লাহকে ভয় করে চলে তারাই হেদায়েত প্রাপ্ত।

১৩। আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ে অন্যের নিকট ধর্না দেওয়া

প্রকৃত রহমতের মালিক এক মাত্র মহান আল্লাহর। তার রহমত থেকে তো একমাত্র কাফেররাই নিরাশ হয় (ইউসুফ-৮৭)৷ কাফের আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ে উপায় উপকরনে মাধ্যমে রহমত বা সাহায্য খুজে। আর যখন স্রষ্টার রহমত সৃষ্টির মাঝে খুজতে থাকে তখনই শির্কে আকবারে লিপ্ত হয়। এই জন্য আল্লাহর রহমত থেক কাফের, পথভ্রষ্ট, কিতাব অস্বীকার এবং তার সাথে সাক্ষাত অস্বীকারকরী লোকেরাই রহমত থেকে নিরাশ হয়।  আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

 يَـٰبَنِىَّ ٱذۡهَبُواْ فَتَحَسَّسُواْ مِن يُوسُفَ وَأَخِيهِ وَلَا تَاْيۡـَٔسُواْ مِن رَّوۡحِ ٱللَّهِ‌ۖ إِنَّهُ ۥ لَا يَاْيۡـَٔسُ مِن رَّوۡحِ ٱللَّهِ إِلَّا ٱلۡقَوۡمُ ٱلۡكَـٰفِرُونَ (٨٧)

হে আমার ছেলেরা! তোমরা যাও এবং ইউসুফ ও তার ভাইয়ের ব্যাপারে কিছু অনুসন্ধান চালাও৷ আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না৷ তাঁর রহমত থেকে তো একমাত্র কাফেররাই নিরাশ হয়৷ সুরা ইউসুফ : ৮৭

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

 قَالَ وَمَن يَقۡنَطُ مِن رَّحۡمَةِ رَبِّهِۦۤ إِلَّا ٱلضَّآلُّونَ (٥٦)

ইবরাহীম বললো, পথভ্রষ্ট লোকেরাই তো তাদের রবের রহমত থেকে নিরাশ হয়৷ (সুরা হিযর ১৫:৫৬)।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَٱلَّذِينَ كَفَرُواْ بِـَٔايَـٰتِ ٱللَّهِ وَلِقَآٮِٕهِۦۤ أُوْلَـٰٓٮِٕكَ يَٮِٕسُواْ مِن رَّحۡمَتِى وَأُوْلَـٰٓٮِٕكَ لَهُمۡ عَذَابٌ أَلِيمٌ۬ (٢٣)

যারা আল্লাহর আয়াত এবং তার সাথে সাক্ষাত অস্বীকার করে, তারা আমার রহমত থেকে নিরাশ হয়ে গেছে এবং তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি৷ (আনকাবুত ২৯:২৩)

যারা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হবে না তাদের সমস্ত গোনাহ মাফ করে দিবেন।  মহান আল্লাহ বলেন,

قُلۡ يَـٰعِبَادِىَ ٱلَّذِينَ أَسۡرَفُواْ عَلَىٰٓ أَنفُسِهِمۡ لَا تَقۡنَطُواْ مِن رَّحۡمَةِ ٱللَّهِ‌ۚ إِنَّ ٱللَّهَ يَغۡفِرُ ٱلذُّنُوبَ جَمِيعًا‌ۚ إِنَّهُ ۥ هُوَ ٱلۡغَفُورُ ٱلرَّحِيمُ (٥٣)

(হে নবী,) বলে দাও, হে আমার বান্দারা যারা নিজের আত্মার ওপর জুলুম করেছো আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না৷ নিশ্চিতভাবেই আল্লাহ সমস্ত গোনাহ মাফ করে দেন৷ তিনি ক্ষমাশীল ও দয়ালু৷ (সুরা জুমার ৩৯:৫৩)।

যারা বিপদে আল্লাহ আশ্রয় খুজবে, আল্লাহ ও রসূলের হুকুম মেনে নিবে, তার কিতাবে কথাকে মেনে নিবে তারাই শুধু রহমত পাবেন।  আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

 وَأَطِيعُواْ ٱللَّهَ وَٱلرَّسُولَ لَعَلَّڪُمۡ تُرۡحَمُونَ (١٣٢) ۞

এবং আল্লাহ ও রসূলের হুকুম মেনে নাও, আশা করা যায় তোমাদের ওপর রহমত করা হবে৷  (সুরা আল ইমরান ৩:১৩২)।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

 ٱلَّذِينَ إِذَآ أَصَـٰبَتۡهُم مُّصِيبَةٌ۬ قَالُوٓاْ إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّآ إِلَيۡهِ رَٲجِعُونَ (١٥٦)أُوْلَـٰٓٮِٕكَ عَلَيۡہِمۡ صَلَوَٲتٌ۬ مِّن رَّبِّهِمۡ وَرَحۡمَةٌ۬‌ۖ وَأُوْلَـٰٓٮِٕكَ هُمُ ٱلۡمُهۡتَدُونَ (١٥٧) ۞

এবং যখনই কোন বিপদ আসে বলে, আমরা আল্লাহর জন্য এবং আল্লাহর দিকে আমাদের ফিরে যেতে হবে তাদেরকে সুসংবাদ দিয়ে দাও। তাদের রবের পক্ষ থেকে তাদের ওপর বিপুল অনুগ্রহ বর্ষিত হবে, তাঁর রহমত তাদেরকে ছায়াদান করবে এবং এই ধরণের লোকরাই হয় সত্যানুসারী ৷ (সুরা বাকারা ২:১৫৭)।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

فَأَمَّا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ بِٱللَّهِ وَٱعۡتَصَمُواْ بِهِۦ فَسَيُدۡخِلُهُمۡ فِى رَحۡمَةٍ۬ مِّنۡهُ وَفَضۡلٍ۬ وَيَہۡدِيہِمۡ إِلَيۡهِ صِرَٲطً۬ا مُّسۡتَقِيمً۬ا (١٧٥)

এখন যারা আল্লাহর কথা মেনে নেবে এবং তার আশ্রয় খুঁজবে তাদেরকে আল্লাহ নিজের রহমত, করুণা ও অনুগ্রহের মধ্যে প্রবেশ করিয়ে নেবেন এবং নিজের দিকে আসার সোজা পথ দেখিয়ে দেবেন৷ (সুরা নিসা ৪:১৭৫)।

কে রহমত পাবেন আর কে পাবেন না কেউ তা জানেন না। তাই কখনো কোন ঈমানদারদের মুখে উচ্চারিত হওয়া উচিত নয় যে অমুক রহমত পাবেনই। এ বিষয়টির ফায়সালা একমাত্র আল্লাহর ইখতিয়ারভুক্ত। আল্লাহর কিতাবরে দৃষ্টিতে বলা যাবে কে রহমতলাভের অধিকার রাখে এবং কে শাস্তিলাভের অধিকারী। কিন্তু অমুক ব্যক্তিকে শাস্তি দেয়া হবে এবং অমুককে মাফ করে দেয়া হবে, একথা বলার অধিকার কারোর নেই।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

رَّبُّكُمۡ أَعۡلَمُ بِكُمۡ‌ۖ إِن يَشَأۡ يَرۡحَمۡكُمۡ أَوۡ إِن يَشَأۡ يُعَذِّبۡكُمۡ‌ۚ وَمَآ أَرۡسَلۡنَـٰكَ عَلَيۡہِمۡ وَڪِيلاً۬ (٥٤)

 তোমাদের রব তোমাদের অবস্থা সম্পর্কে বেশী জানেন৷ তিনি চাইলে তোমাদের প্রতি দয়া করেন এবং চাইলে তোমাদের শাস্তি দেন৷  আর হে নবী! আমি তোমাকে লোকদের ওপর হাবিলদার করে পাঠাইনি৷ সুরা বনী ইসরাঈল : ৫৪

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَمَآ أَرۡسَلۡنَـٰكَ إِلَّا رَحۡمَةً۬ لِّلۡعَـٰلَمِينَ (١٠٧)

 হে মুহাম্মাদ! আমি যে তোমাকে পাঠিয়েছি, এটা আসলে দুনিয়াবাসীদের জন্য আমার রহমত৷ (আম্বিয়া ২১:১০৭)

আল্লাহ রহমতের আশা না করে কোন মাজার বা পীরের নিকট রহমত খোজকরা শিরকে আকবর। বিপাদ আপদে, অভাব অনাটনে আল্লাহর রহমতে আশা করা আমাদের কর্তব্য। আল্লাহ ছাড়া অন্য ইরাহর রহমতের আশা করাই শিরক।

১৪। মহান আল্লাহ অংহকারের চাদর দিয়ে টানাটানি করা বা স্রষ্টার মত গর্ব অহংকার করা

সত্যিকারের গর্ব অহংকার এক মাত্র মহান আল্লাহ তায়ালানই সাজে। অহংকার মহান আল্লাহ তায়ালান একটা গুন আর আল্লাহর এই গুনে গুনান্নিত হতে চায় সে নিশ্চয়ই আল্লাহ গুনা ভাগ বসাতে চায়। আল্লাহ গুনা ভাগবসাতে চাওয়া শিরকে আকবর। ইবলিশ শয়তান অহংকার করে জান্নাত থেকে বহিস্কার হয়েছে। এমনি ভাবে যেই অহংকার করবে সেই ইসলাম থেকে প্রত্যাখান হবে।    

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَإِذۡ قُلۡنَا لِلۡمَلَـٰٓٮِٕكَةِ ٱسۡجُدُواْ لِأَدَمَ فَسَجَدُوٓاْ إِلَّآ إِبۡلِيسَ أَبَىٰ وَٱسۡتَكۡبَرَ وَكَانَ مِنَ ٱلۡكَـٰفِرِينَ

তারপর যখন ফেরেশতাদের হুকুম দিলাম , আদমের সামনে নত হও, তখন সবাই অবনত হলো, কিন্তু ইবলিস  অস্বীকার করলো ৷ সে নিজের শ্রেষ্ঠত্বের অহংকারে মেতে উঠলো এবং নাফরমানদের অন্তরভুক্ত হলো। সুরা বাকারা :৩৪

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

   إِنَّہُمۡ كَانُوٓاْ إِذَا قِيلَ لَهُمۡ لَآ إِلَـٰهَ إِلَّا ٱللَّهُ يَسۡتَكۡبِرُونَ

 এরা ছিল এমন সব লোক যখন এদেরকে বলা হতো, “আল্লাহ ছাড়া আর কোন মাবুদ নেই” তখন এরা অহংকার করতো৷ সুরা সাফফাত : ৩৫

মহান আল্লাহ তায়ালান বলেন:

 وَلَا تُصَعِّرۡ خَدَّكَ لِلنَّاسِ وَلَا تَمۡشِ فِى ٱلۡأَرۡضِ مَرَحًا‌ۖ إِنَّ ٱللَّهَ لَا يُحِبُّ كُلَّ مُخۡتَالٍ۬ فَخُورٍ۬  

আর মানুষের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে কথা বলো না, পৃথিবীর বুকে চলো না উদ্ধত ভঙ্গিতে, আল্লাহ পছন্দ করেন না আত্মম্ভরী ও অহংকারীকে। সুরা লোকমন : ১৮

মহান আল্লাহ তায়ালান বলেন:

 فَٱدۡخُلُوٓاْ أَبۡوَٲبَ جَهَنَّمَ خَـٰلِدِينَ فِيہَا‌ۖ فَلَبِئۡسَ مَثۡوَى ٱلۡمُتَكَبِّرِينَ

অর্থ: এখন যাও, জাহান্নামের দরযা দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ো, ওখানেই তোমাদের থাকতে হবে চিরকাল৷ সত্য বলতে কি, অহংকারীদের এ ঠিকানা বড়ই নিকৃষ্ট। সুরা নাহাল ১৬: ২৯

অহংকারীকে আল্লাহ কিভাবে ধ্বংশ করেন তারই দুটি উদাহরন দিয়েছেন পবিত্র কুরআনে। শিক্ষা গ্রহনের জন্য ঘটনা দুটি তুলে ধরলাম।

কুরআনে বর্ণিত প্রথম ঘটনা : আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

একথা সত্য কারূণ ছিল মূসার সম্প্রদায়ের লোক, তারপর সে নিজের সম্প্রদায়ে বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হয়ে উঠলো৷ আর আমি তাকে এতটা ধনরত্ন দিয়ে রেখেছিলাম যে, তাদের চাবিগুলো বলবান লোকদের একটি দল বড় কষ্টে বহন করতে পারতো৷ একবার যখন এ সম্প্রদায়ের লোকেরা তাকে বললো, “অহংকার করো না, আল্লাহ অহংকারকারীদেরকে পছন্দ করেন না৷ আল্লাহ তোমাকে যে সম্পদ দিয়েছেন তা দিয়ে আখেরাতের ঘর তৈরি করার কথা চিন্তা করো এবং দুনিয়া থেকেও নিজের অংশ ভুলে যেয়ো না৷ অনুগ্রহ করো যেমন আল্লাহ তোমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন এবং পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করার চেস্টা করো না৷ আল্লাহ বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদেরকে পছন্দ করেন না৷” এতে সে বললো, “এসব কিছু তো আমি যে জ্ঞান লাভ করেছি তার ভিত্তিতে আমাকে দেয়া হয়েছে৷ সে কি এ কথা জানতো না যে, আল্লাহ এর পূর্বে এমন বহু লোককে ধ্বংস করে দিয়েছেন যারা এর চেয়ে বেশী বাহুবল ও জনবলের অধিকারী ছিল? অপরাধীদেরকে তো তাদের গোনাহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয় না৷ একদিন সে সম্প্রদায়ের সামনে বের হলো পূর্ণ জাঁকজমক সহকারে৷ যারা দুনিয়ার জীবনের ঐশ্বর্যের জন্য লালায়িত ছিল তারা তাকে দেখে বললো, “আহা! কারূনকে যা দেয়া হয়েছে তা যদি আমরাও পেতাম! সে তো বড়ই সৌভাগ্যবান৷ কিন্তু যাদেরকে জ্ঞান দেয়া হয়েছিল তারা বলতে লাগলো, “তোমাদের ভাবগতিক দেখে আফসোস হয়৷ আল্লাহর সওয়াব তার জন্য ভালো যে ঈমান আনে ও সৎকাজ করে, আর এ সম্পদ সবরকারীরা ছাড়া আর কেউ লাভ করে না৷ শেষ পর্যন্ত আমি তাকে ও তার গৃহকে ভূগর্ভে পুতে ফেললাম৷ তখন আল্লাহর মোকাবিলায় তাকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসার মতো সাহায্যকারীদের কোন দল ছিল না এবং সে নিজেও নিজেকে সাহায্য করতে পারলো না৷ সুরা কাসাস : ৭৬-৮১

কুরআনে বর্ণিত দ্বিতীয় ঘটনা আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

হে মুহাম্মাদ! এদের সামনে একটি দৃষ্টান্ত পেশ করে দাও৷ দু ব্যক্তি ছিল৷ তাদের একজনকে আমি দুটি আংগুর বাগান দিয়েছিলাম এবং সেগুলোর চারদিকে খেজুর গাছের বেড়া দিয়েছিলাম আর তার মাঝখানে রেখেছিলাম কৃষি ক্ষেত৷ দুটি বাগানই ভালো ফলদান করতো এবং ফল উৎপাদনের ক্ষেত্রে তারা সামান্যও ত্রুটি করতো না৷ এ বাগান দুটির মধ্যে আমি একটি নহর প্রবাহিত করেছিলাম। এবং সে খুব লাভবান হয়েছিল৷ এসব কিছু পেয়ে একদিন সে তার প্রতিবেশীর সাথে কথা প্রসংগে বললো, “আমি তোমার চেয়ে বেশী ধনশালী এবং আমার জনশক্তি তোমার চেয়ে বেশী৷” তারপর সে তার বাগানে প্রবেশ করলো এবং নিজের প্রতি জালেম হয়ে বলতে লাগলোঃ “আমি মনে করি না এ সম্পদ কোনো দিন ধ্বংস হয়ে যাবে৷ এবং আমি আশা করি না কিয়ামতের সময় কখনো আসবে৷ তবুও যদি আমাকে কখনো আমার রবের সামনে ফিরিয়ে নেয়া হয় তাহলে নিশ্চয়ই আমি এর চেয়েও বেশী জাঁকালো জায়গা পাবো৷ তার প্রতিবেশী কথাবার্তার মধ্যে তাকে বললো, “তুমি কি কুফরী করছো সেই সত্তার যিনি তোমাকে মাটি থেকে তারপর শুক্র থেকে পয়দা করেছেন এবং তোমাকে একটি পূর্ণাবয়ব মানুষ বানিয়ে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন? আর আমার ব্যাপারে বলবো, আমার রব তো সেই আল্লাহই এবং আমি তার সাথে কাউকে শরীক করি না৷  আর যখন তুমি নিজের বাগানে প্রবেশ করছিলে তখন তুমি কেন বললে না, “আল্লাহ যা চান তাই হয়, তাঁর প্রদত্ত শক্তি ছাড়া আর কোনো শক্তি নেই ? যদি তুমি সম্পদ ও সন্তানের দিক দিয়ে আমাকে তোমার চেয়ে কম পেয়ে থাকো । তাহলে অসম্ভব নয় আমার রব আমাকে তোমার বাগানের চেয়ে ভালো কিছু দেবেন এবং তোমার বাগানের ওপর আকাশ থেকে কোনো আপদ পাঠাবেন যার ফলে তা বৃক্ষলতাহীন প্রান্তরে পরিণত হবে৷  অথবা তার পানি ভূগর্ভে নেমে যাবে এবং তুমি তাকে কোনোক্রমেই উঠাতে পারবে না৷  শেষ পর্যন্ত তার সমস্ত ফসল বিনষ্ট হলো এবং সে নিজের আংগুর বাগান মাচানের ওপর লণ্ডভণ্ড হয়ে পড়ে থাকতে দেখে নিজের নিয়োজিত পুঁজির জন্য আফসোস করতে থাকলো এবং বলতে লাগলো, “হায়! যদি আমি আমার রবের সাথে কাউকে শরীক না করতাম”৷ সে সময় আল্লাহ ছাড়া তাকে সাহায্য করার মতো কোনো গোষ্ঠীও ছিল না, আর সে নিজেও এ বিপদের মুকাবিলা করতে সক্ষম ছিল না৷  তখন জানা গেলো, কর্মসম্পাদনের ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহর হাতে ন্যস্ত, যিনি সত্য৷ আর পুরষ্কার সেটাই ভালো, যা তিনি দান করেন এবং পরিণতি সেটাই শ্রেয়, যা তিনি দেখান৷ সুরা কাহাব : ৩২-৪৪

আবু সাঈদ আল খুদরী ও আবু হুরাইরাহ (রা.) থেকে বর্ণিত। তারা উভয়ে বলেন, রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

الْعِزُّ إِزَارُهُ وَالْكِبْرِيَاءُ رِدَاؤُهُ فَمَنْ يُنَازِعُنِي عَذَّبْتُهُ

ইজ্জত ও সম্মান আল্লাহর ভূষণ এবং গর্ব ও অহংকার তার চাদর। যে লোক এ ক্ষেত্রে আমার সাথে টানা-হেঁচড়া করবে আমি তাকে অবশ্যই সাজা দিব। সহিহ মুসলিম : ২৬২০

আবদুল্লাহ ইবনু মাস’উদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী ﷺ বলেছেন-

‏ لاَ يَدْخُلُ الْجَنَّةَ مَنْ كَانَ فِي قَلْبِهِ مِثْقَالُ ذَرَّةٍ مِنْ كِبْرٍ

যার অন্তরে অণু পরিমাণ অহংকার থাকবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না। সহিহ মুসলিম : ১৬৮

হারিসাহ ইবনু ওয়াহব (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, আমি নবী ﷺ কে বলতে শুনেছি, আমি কি তোমাদেরকে জান্নাতী লোকদের সম্পর্কে জানাব না? তারা হবে (দুনিয়াতে) দুর্বল, মাযলুম। তারা যদি আল্লাহর ওপর কসম করে, তবে আল্লাহ তা পূর্ণ করে দেন। আর জাহান্নামের অধিবাসী হবে অবাধ্য, ঝগড়াটে ও অহংকারীরা। সহিহ বুখারি : ৬৬৫৭

কায়স (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী (ﷺ সাল্লাম) বলেছেন, দু’টি জান্নাত এমন হবে, সেগুলোর পানপাত্র ও তার ভিতরের সব কিছুই হবে রূপার। আর দু’টি জান্নাত এমন হবে, সেগুলোর পানপাত্র ও তার ভিতরের সবকিছুই হবে সোনার। জান্নাতে আদনে তাদের ও তাদের রব্বের দর্শনের মাঝে তাঁর চেহারার উপর অহংকারের চাদর ব্যতীত আর কোন কিছু আড়াল থাকবে না। সহিহ বুখারি : ৭৪৪৪

আকিদা বা বিশ্বাসগত শিরকে আকবর : দ্বিতীয় পর্ব (১৫-১৯)

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

১৫। মানুষ বা সৃষ্টিকে আল্লাহর মত ভয় করা

মহান আল্লাহ মানুষকে পরীক্ষার জন্য দুয়িয়াতে প্রেরণ করেছেন। দুনিয়াত তার আদেশে নিষেধ মেনে চলতে পারলে জান্নাতে তিনি স্থায়ী নিবাস করে দিবেন। তার হুকুমের বাহিরে চললে তিনি স্থায়ী আজাবে নিপতিত করবেন। যার হাতে আমার জীবন, মরণ, জান্নাত, জাহান্নাম, সুখ, শান্তি ইত্যাদি। তাকে কেমন সম্মান ও শ্রদ্ধার সাথে ভয় করা উচিত তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু তার সেই ভয়ের স্থান যদি সৃষ্টিকে স্থান দেওয়া হয় অর্থাত আল্লাহ মত তার সৃষ্টিকে ভয় করা। তাহলে আল্লাহ তার সমতুল্য ভয় করার জন্য তার বান্দাকে শিরকের গুনাহে অধিযুক্ত করবেন।

আল্লাহকে ভয় কার ফরজ আর গাইরুল্লাহকে ভয় করা শিরক-

অপরাধের জন্য আল্লাহর শাস্তি অবধারিত এ জন্য তাকে ভয় করা ফরজ। কুরআন বিভিন্ন আয়াতে এই বিষয়টি বার বার আল্লাহ তুলে ধরা হয়েছে। আল্লাহর মত অন্য কাউকে ভয় করতে নিষেধ করা হয়েছে। কোন মুসলিমকে যুদ্ধের জন্য আহবান করা হলে, সে জীবনের মায়ায় কাফিরকে আল্লাহ থেকে বেশী ভয় করে যুদ্ধ থেকে বিরত থাকে। এই ধরনের ভয়কে আল্লাহ তিরস্কার করেছেন। মহান আল্লাহ রআব্বুল আলামীন বলেন-

 أَلَمۡ تَرَ إِلَى ٱلَّذِينَ قِيلَ لَهُمۡ كُفُّوٓاْ أَيۡدِيَكُمۡ وَأَقِيمُواْ ٱلصَّلَوٰةَ وَءَاتُواْ ٱلزَّكَوٰةَ فَلَمَّا كُتِبَ عَلَيۡہِمُ ٱلۡقِتَالُ إِذَا فَرِيقٌ۬ مِّنۡہُمۡ يَخۡشَوۡنَ ٱلنَّاسَ كَخَشۡيَةِ ٱللَّهِ أَوۡ أَشَدَّ خَشۡيَةً۬‌ۚ وَقَالُواْ رَبَّنَا لِمَ كَتَبۡتَ عَلَيۡنَا ٱلۡقِتَالَ لَوۡلَآ أَخَّرۡتَنَآ إِلَىٰٓ أَجَلٍ۬ قَرِيبٍ۬‌ۗ قُلۡ مَتَـٰعُ ٱلدُّنۡيَا قَلِيلٌ۬ وَٱلۡأَخِرَةُ خَيۡرٌ۬ لِّمَنِ ٱتَّقَىٰ وَلَا تُظۡلَمُونَ فَتِيلاً

তোমরা কি তাদেরকেও দেখেছো, যাদেরকে বলা হয়েছিল, তোমাদের হাত গুটিয়ে রাখো এবং নামায কায়েম করো ও যাকাত দাও? এখন তাদেরকে যুদ্ধের হুকুম দেয়ায় তাদের একটি দলের অবস্থা এই দাঁড়িয়েছে যে, তারা মানুষকে এমন ভয় করেছে যেমন আল্লাহকে ভয় করা উচিত অথবা তার চেয়েও বেশী ৷ তারা বলছে, হে আমাদের রব ! আমাদের জন্য এই যুদ্ধের হুকুমনামা কেন লিখে দিলে? আমাদের আরো কিছু সময় অবকাশ দিলে না কেন ? তাদেরকে বলো, দুনিয়ার জীবন ও সম্পদ অতি সামান্য এবং একজন আল্লাহর ভয়ে ভীত মানুষের জন্য আখেরাতই উত্তম ৷ আর তোমাদের ওপর এক চুল পরিমাণও জুলুম করা হবে না৷  সুরা নিসা : ৭৭

ইয়াহুদিগণ লোক লজ্জার ভয়ে ইসলামকে সত্য জেনেও হক গ্রহন করেত পারে নাই। আল্লাহ থেকে মানুষের ভয়কে বা দুনিয়ার স্বার্থকে বেশী গুরুত্ব দিসে। মহান আল্লাহ রআব্বুল আলামীন বলেন-

فَلَا تَخۡشَوُاْ ٱلنَّاسَ وَٱخۡشَوۡنِ وَلَا تَشۡتَرُواْ بِـَٔايَـٰتِى ثَمَنً۬ا قَلِيلاً۬‌ۚ وَمَن لَّمۡ يَحۡكُم بِمَآ أَنزَلَ ٱللَّهُ فَأُوْلَـٰٓٮِٕكَ هُمُ ٱلۡكَـٰفِرُونَ  

কাজেই, তোমরা মানুষকে ভয় করো না বরং আমাকে ভয় করো এবং সামান্য তুচ্ছ মূল্যের বিনিময়ে আমার আয়াত বিক্রি করা পরিহার করো৷ আল্লাহর নাযিল করা আইন অনুযায়ী যারা ফায়সালা করে না তারাই কাফের৷ সুরা মায়িদা : ৪৪

রসূলুল্লাহ ﷺ কে মহান আল্লাহ তার আদেশ মানেতে লোকদের ভয় করেত নিষেধ করেছেন। তিনি আদেশ দিয়েছেন আমাকেই ভয় কর। মহান আল্লাহ রআব্বুল আলামীন বলেন-

 وَمِنۡ حَيۡثُ خَرَجۡتَ فَوَلِّ وَجۡهَكَ شَطۡرَ ٱلۡمَسۡجِدِ ٱلۡحَرَامِ‌ۚ وَحَيۡثُ مَا كُنتُمۡ فَوَلُّواْ وُجُوهَڪُمۡ شَطۡرَهُ ۥ لِئَلَّا يَكُونَ لِلنَّاسِ عَلَيۡكُمۡ حُجَّةٌ إِلَّا ٱلَّذِينَ ظَلَمُواْ مِنۡہُمۡ فَلَا تَخۡشَوۡهُمۡ وَٱخۡشَوۡنِى وَلِأُتِمَّ نِعۡمَتِى عَلَيۡكُمۡ وَلَعَلَّكُمۡ تَہۡتَدُونَ (١٥٠) 

 আর যেখান থেকেই তুমি চল না কেন তোমার মুখ মসজিদে হারামের দিকে ফেরাও এবং যেখানেই তোমরা থাকো না কেন সে দিকেই মুখ করে সালাত আদায় কর, যাতে লোকেরা তোমাদের বিরুদ্ধে কোন প্রমাণ খাড়া করতে না পারে।  তবে যারা যালেম, তাদের মুখ কোন অবস্থায়ই বন্ধ হবে না৷ কাজেই তাদেরকে ভয় করো না বরং আমাকে ভয় করো, আর এ জন্য যে, আমি তোমাদের ওপর নিজের অনুগ্রহ পূর্ণ করে দেবো এবং এই আশায় যে, আমার এই নির্দেশের আনুগত্যের ফলে তোমরা ঠিক তেমনিভাবে সাফল্যের পথ লাভ করবে। সুরা বাকারা : ১৫০

কখনো নিন্দুকের নিন্দার ভয়ে আমল ছেড়ে দিলে শির্ক হবে। কারন আল্লাহর আদেশের উপর গাইরুল্লার ভয়কে স্থান দিয়েছে। আল্লাহর ও গাইরুল্লার কে সমান করা শির্ক নয় কি? মহান আল্লাহ রআব্বুল আলামীন বলেন-

يَـٰٓأَيُّہَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ مَن يَرۡتَدَّ مِنكُمۡ عَن دِينِهِۦ فَسَوۡفَ يَأۡتِى ٱللَّهُ بِقَوۡمٍ۬ يُحِبُّہُمۡ وَيُحِبُّونَهُ ۥۤ أَذِلَّةٍ عَلَى ٱلۡمُؤۡمِنِينَ أَعِزَّةٍ عَلَى ٱلۡكَـٰفِرِينَ يُجَـٰهِدُونَ فِى سَبِيلِ ٱللَّهِ وَلَا يَخَافُونَ لَوۡمَةَ لَآٮِٕمٍ۬‌ۚ ذَٲلِكَ فَضۡلُ ٱللَّهِ يُؤۡتِيهِ مَن يَشَآءُ‌ۚ وَٱللَّهُ وَٲسِعٌ عَلِيمٌ (٥٤)

 হে ঈমানদারগণ! তোমাদের মধ্য থেকে কেউ যদি দীন থেকে ফিরে যায়, আল্লাহ এমনিতর আরো বহু লোক সৃষ্টি করে দেবেন, যাদেরকে আল্লাহ ভালবাসেন এবং তারা আল্লাহকে ভালবাসবে, যারা মুমিনদের ব্যাপারে কোমল ও কাফেরদের ব্যাপারে কঠোর হবে, যারা আল্লাহর পথে প্রচেষ্টা ও সাধনা করে যাবে এবং কোন নিন্দুকের নিন্দার ভয় করবেনা৷ এটি আল্লাহর অনুগ্রহ, যাকে চান তাকে দান করেন৷ আল্লাহ ব্যাপক উপায় উপকরণের অধিকারী এবং তিনি সবকিছু জানেন৷ সুরা মায়িদা : ৫৪

আল্লাহ ব্যতীত মূর্তি প্রতিকৃতি, ভাস্কর্য তাগুত, অদৃশ্য জ্বিন, ভুত, মৃত কিংবা অনুপস্থিত কোনো ব্যক্তি বা বস্তুর দ্বারা ক্ষতি বা অনিষ্ট হওয়ার ভয়, আশংকা করা। ইহাদের এমন ভাবে ভয় করে যেমন আল্লাহকে ভয় করা উচিৎ। ঐ সবের প্রতি ধারনা ধারনা করা যে ইহারা ক্ষতি করতে পারে অথবা অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু ঘটাতে পারে। এরূপ ভয় ও ভীতি দ্বীনের একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ অংশ যা শুধু মাত্র আল্লাহ তা’আলার সাথে নির্দিষ্ট। এখন যদি কেউ এটিকে আল্লাহ ভিন্ন অন্য কারো দিকে সম্পর্কিত করে তাহলে সে আল্লাহর সাথে বড় শির্ক করল বলে বিবেচিত হবে। আল্লাহ রআব্বুল আলামীন বলেন-

 إِنَّمَا ذَٲلِكُمُ ٱلشَّيۡطَـٰنُ يُخَوِّفُ أَوۡلِيَآءَهُ ۥ فَلَا تَخَافُوهُمۡ وَخَافُونِ إِن كُنتُم مُّؤۡمِنِينَ

এখন তোমরা জেনে ফেলেছো, সে আসলে শয়তান ছিল, তার বন্ধুদের অনর্থক ভয় দেখাচ্ছিলে৷ কাজেই আগামীতে তোমরা মানুষকে ভয় করো না, আমাকে ভয় করো, যদি তোমরা যথার্থ ঈমানদার হয়ে থাকো৷ আল ইমরান : ১৭৫

মহান আল্লাহ রআব্বুল আলামীন বলেন-

أَلَيۡسَ ٱللَّهُ بِكَافٍ عَبۡدَهُ ۥ‌ۖ وَيُخَوِّفُونَكَ بِٱلَّذِينَ مِن دُونِهِۦ‌ۚ وَمَن يُضۡلِلِ ٱللَّهُ فَمَا لَهُ ۥ مِنۡ هَادٍ۬

 আল্লাহ নিজে কি তাঁর বান্দার জন্য যথেষ্ট নন? এসব লোক তাকে বাদ দিয়ে তোমাদেরকে অন্যদের ভয় দেখায়৷ অথচ আল্লাহ যাকে গোমরাহীতে নিক্ষেপ করেন তাকে কেউ পথপ্রদর্শন করতে পারে না। সুরা জুমার : ৩৬

আল্লাহ ব্যতীত যে সকল তাগুত, অদৃশ্য জ্বিন, ভুত থেকে অনিষ্ট হওয়ার ভয় করা হয় তারা নিজেরাই আল্লাহর শাস্তির ভয়ে ভীত৷ মহান আল্লাহ রআব্বুল আলামীন বলেন-

أُوْلَـٰٓٮِٕكَ ٱلَّذِينَ يَدۡعُونَ يَبۡتَغُونَ إِلَىٰ رَبِّهِمُ ٱلۡوَسِيلَةَ أَيُّہُمۡ أَقۡرَبُ وَيَرۡجُونَ رَحۡمَتَهُ ۥ وَيَخَافُونَ عَذَابَهُ ۥۤ‌ۚ إِنَّ عَذَابَ رَبِّكَ كَانَ مَحۡذُورً۬ا (٥٧)

এরা যাদেরকে ডাকে তারা তো নিজেরাই নিজেদের রবের নৈকট্যলাভের উপায় খুঁজে বেড়াচ্ছে যে, কে তাঁর নিকটতর হয়ে যাবে এবং এরা তাঁর রহমতের প্রত্যাশী এবং তাঁর শাস্তির ভয়ে ভীত৷ আসলে তোমার রবের শাস্তি ভয় করার মতো৷  সুরা বনি ইসরাঈল : ৫৭

ইলাহ, মাবুদ হিসেবে এবং তার নৈকট্য অর্জনের লক্ষ্যে ভয় করা। আর এটাই হলো ঈমানের ওয়াজিব সমূহের মধ্যে সর্বোচ্চ ওয়াজিব। মুমিন কোথাও পরম দয়ালু আল্লাহকে দেখে নাই। নিজের ইন্দ্রিসমূহ দ্বারাও তাকে অনুভব করতে পারে নাই। তা সত্ত্বেও তাঁর নাফরমানী করতে সে ভয় পেয়েছে কারন তাকে সে বিশ্বাস করেছে। প্রকাশ্যে দেখা যায় না এমন সব শক্তি ও সত্তার তুলনায় তার মনে অদেখা শক্তির ভয় অধিক প্রবল ছিল বলেই সে পাপ কাজে লিপ্ত হয় নাই। বরং সব সময়ই তাঁর অসন্তুষ্টিকে ভয় পেয়েছে । মহান আল্লাহ রআব্বুল আলামীন বলেন-

 مَّنۡ خَشِىَ ٱلرَّحۡمَـٰنَ بِٱلۡغَيۡبِ وَجَآءَ بِقَلۡبٍ۬ مُّنِيبٍ (٣٣) ٱدۡخُلُوهَا بِسَلَـٰمٍ۬‌ۖ ذَٲلِكَ يَوۡمُ ٱلۡخُلُودِ  

যে অদেখা দয়াময়কে ভয় করতো, যে অনুরক্ত হৃদয় নিয়ে এসেছে৷ বেহেশতে ঢুকে পড় শান্তির সাথে৷ সেদিন অনন্ত জীবনের দিন হবে৷ সুরা ক্বাফ : ৩৩-৩৪

মহান আল্লাহ রআব্বুল আলামীন বলেন-

يَـٰبَنِىٓ إِسۡرَٲٓءِيلَ ٱذۡكُرُواْ نِعۡمَتِىَ ٱلَّتِىٓ أَنۡعَمۡتُ عَلَيۡكُمۡ وَأَوۡفُواْ بِعَہۡدِىٓ أُوفِ بِعَهۡدِكُمۡ وَإِيَّـٰىَ فَٱرۡهَبُونِ

হে বনী ইসরাঈল ৷ আমার সেই নিয়ামতের কথা মনে করো, যা আমি তোমাদের দান করেছিলাম, আমার সাথে তোমাদের যে অংগীকার ছিল, তা পূর্ণ করো, তা হলে তোমাদের সাথে আমার যে অংগীকার ছিল ,তা আমি পূর্ণ করবো এবং তোমরা একমাত্র আমাকেই ভয় করো। সুরা বাকারা : ৪০

মহান আল্লাহ রআব্বুল আলামীন বলেন-

 أَفَأَمِنُواْ مَڪۡرَ ٱللَّهِ‌ۚ فَلَا يَأۡمَنُ مَڪۡرَ ٱللَّهِ إِلَّا ٱلۡقَوۡمُ ٱلۡخَـٰسِرُونَ

এরা কি আল্লাহর কৌশলের ব্যাপারে নির্ভীক হয়ে গেছে?   অথচ যে সব সম্প্রায়ের ধ্বংস অবধারিত তারা ছাড়া আল্লাহর কৌশলের ব্যাপারে আর কেউ নির্ভীক হয় না৷ সুরা আরাফ : ৯৯

হাদিসে এসেছে আল্লাহকে ভয় করার কারনে পূর্বে যুগের এক বান্দাকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়।

আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) সূত্রে নবী ﷺ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, পূর্বযুগে এক লোক তার নিজের উপর অনেক জুলুম করেছিল। যখন তার মৃত্যুকাল ঘনিয়ে এলো, সে তার পুত্রদেরকে বলল, মৃত্যুর পর আমার দেহ হাড় গোশতসহ পুড়িয়ে ছাই করে নিও এবং প্রবল বাতাসে উড়িয়ে দিও। আল্লাহর কসম! যদি আল্লাহ্ আমাকে ধরে ফেলেন, তবে তিনি আমাকে এমন কঠিনতম শাস্তি দিবেন যা অন্য কাউকেও দেননি। যখন তার মওত হল, তার সঙ্গে সে ভাবেই করা হল। অতঃপর আল্লাহ্ যমীনকে আদেশ করলেন, তোমার মাঝে ঐ ব্যক্তির যা আছে জমা করে দাও। যমীন তা করে দিল। এ ব্যক্তি তখনই দাঁড়িয়ে গেল। আল্লাহ্ তাকে জিজ্ঞেস করলেন, কিসে তোমাকে এ কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করল? সে বলল, হে, প্রতিপালক তোমার ভয়। অতঃপর তাকে ক্ষমা করা হলো। সহিহ বুখারি : ৩৪৮১, ৭৫০৬, সহিহ মুসলিম : ২৭৫৬)

২. মুমিনদের ভীতিপূর্ণ জীবন যাপন:

মুমিন দুনিয়ায় আল্লাহর ব্যাপারে ভীতি শূণ্য ও চিন্তামুক্ত জীবন যাপন করে না। যা মনে আসে তাই করে না এবং ওপরে একজন আল্লাহ আছেন তিনি জুলুম ও বাড়াবাড়ি করলে পাকড়াও করেন একথা কখনো ভুলে যায় না। বরং তাদের মন সব সময়  তাঁর ভয়ে ভীত থাকে এবং তিনিই তাদেরকে খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখতে থাকেন। আল্লাহ রআব্বুল আলামীন বলেন-

إِنَّ ٱلَّذِينَ هُم مِّنۡ خَشۡيَةِ رَبِّہِم مُّشۡفِقُونَ ٥٧

 আসলে কল্যাণের দিকে দৌড়ে যাওয়া ও অগ্রসর হয়ে তা অর্জনকারী লোক তো তারাই যারা নিজেদের রবের ভয়ে ভীত। সরা মুমিনুন : ৫৭

আল্লাহ রআব্বুল আলামীন বলেন-

 فَٱسۡتَجَبۡنَا لَهُ ۥ وَوَهَبۡنَا لَهُ ۥ يَحۡيَىٰ وَأَصۡلَحۡنَا لَهُ ۥ زَوۡجَهُ ۥۤ‌ۚ إِنَّهُمۡ ڪَانُواْ يُسَـٰرِعُونَ فِى ٱلۡخَيۡرَٲتِ وَيَدۡعُونَنَا رَغَبً۬ا وَرَهَبً۬ا‌ۖ وَڪَانُواْ لَنَا خَـٰشِعِينَ

অর্থ: কাজেই আমি তার দোয়া কবুল করেছিলাম এবং তাকে ইয়াহ্‌ইয়া দান করেছিলাম, আর তার স্ত্রীকে তার জন্য যোগ্য করে দিয়েছিলাম৷ তারা সৎকাজে আপ্রাণ চেষ্টা করতো, আমাকে ডাকতো আশা ও ভীতি সহকারে এবং আমার সামনে ছিল অবনত হয়ে৷ সুরা আম্বিয়া  : ৯০

আল্লাহ রআব্বুল আলামীন বলেন-

قَالُوٓاْ إِنَّا ڪُنَّا قَبۡلُ فِىٓ أَهۡلِنَا مُشۡفِقِينَ

তারা বলবে আমরা প্রথমে নিজের পরিবারের লোকদের মধ্যে ভয়ে ভয়ে জীবন যাপন করতাম৷ সুরা তুর : ২৬

আল্লাহ রআব্বুল আলামীন বলেন-

وَلَنُسۡڪِنَنَّكُمُ ٱلۡأَرۡضَ مِنۢ بَعۡدِهِمۡ‌ۚ ذَٲلِكَ لِمَنۡ خَافَ مَقَامِى وَخَافَ وَعِيدِ

এবং এদের পর পৃথিবীতে তোমাদের প্রতিষ্ঠিত করবো৷ এটা হচ্ছে তার পুরস্কার, যে আমার সামনে জবাবদিহি করার ভয় করে এবং আমার শাস্তির ভয়ে ভীত৷ সুরা ইব্রাহীম : ১৪

প্রকৃতিগত সাভাবিক ভয়:

দুশমন, শত্রু, হিংস্র জীব জনোয়ার ইত্যাদির দ্বারা আক্রান্ত হয়ে বিপদ বা ক্ষতির আশংকা থাকলে ভয় করা বৈধ। যে এ প্রকারের ভয় করবে তাকে তিরস্কার করা যাবে না। আল্লাহ রআব্বুল আলামীন বলেন-

قَالَ رَبِّ إِنِّىٓ أَخَافُ أَن يُكَذِّبُونِ (١٢) وَيَضِيقُ صَدۡرِى وَلَا يَنطَلِقُ لِسَانِى فَأَرۡسِلۡ إِلَىٰ هَـٰرُونَ

 সে (মুছা) বললো, “হে আমার রব! আমার ভয় হয় তারা আমাকে মিথ্যা বলবে। আমার বক্ষ সংকুচিত হচ্ছে এবং আমার জিহ্বা সঞ্চালিত হচ্ছে না৷ আপনি হারুনের প্রতি রিসালাত পাঠান। সুরা শুয়ারা : ১২-১৩

আল্লাহ রআব্বুল আলামীন বলেন-

 فَخَرَجَ مِنۡہَا خَآٮِٕفً۬ا يَتَرَقَّبُ‌ۖ قَالَ رَبِّ نَجِّنِى مِنَ ٱلۡقَوۡمِ ٱلظَّـٰلِمِينَ

এ খবর শুনতেই মূসা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে বেরিয়ে পড়লো এবং সে দোয়া করলো, “হে আমার রব! আমাকে জালেমদের হাত থেকে বাঁচাও৷ সুরা কাসাস : ২১

আল্লাহ রআব্বুল আলামীন বলেন-

 قَالَ إِنِّى لَيَحۡزُنُنِىٓ أَن تَذۡهَبُواْ بِهِۦ وَأَخَافُ أَن يَأۡڪُلَهُ ٱلذِّئۡبُ وَأَنتُمۡ عَنۡهُ غَـٰفِلُونَ

বাপ বললো, “তোমরা তাকে নিয়ে যাবে, এটা আমাকে কষ্ট দেবে এবং আমরা আশংকা হয়, তোমরা তার প্রতি অমনোযোগী থাকবে এবং নেকড়ে থাকে খেয়ে ফেলবে৷ সুরা ইউসুফ : ১৩

১৬। আল্লাহ ছাড়া গাইরুল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করা

আল্লাহ উপর তাওয়াক্কুল করা ফরজঃ

সকল কাজে সর্বাবস্থায় মহান আল্লাহ তায়ার উপর তাওয়াক্কুল বা ভরসা করা মুমিন বান্দার উপর ফরজ। আল্লাহ তায়ালার উপর তাওয়াক্কুল বা ভরসা করা ঈমানের দাবি ও শীর্ষ পর্যায়ের ইবাদত।

আল্লাহ রআব্বুল আলামীন বলেন-

وَعَلَى ٱللَّهِ فَتَوَكَّلُوٓاْ إِن كُنتُم مُّؤۡمِنِينَ

এবং একমাত্র আল্লাহ তা’আলার উপরই তাওয়াক্কুল কর যদি তোমরা মুমিন হয়ে থাক। সুরা মায়েদা : ২৩

আল্লাহ রআব্বুল আলামীন বলেন-

فَإِذَا عَزَمۡتَ فَتَوَكَّلۡ عَلَى ٱللَّهِ‌ۚ إِنَّ ٱللَّهَ يُحِبُّ ٱلۡمُتَوَكِّلِينَ

তারপর যখন কোন মতের ভিত্তিতে তোমরা স্থির সংকল্প হবে তখন আল্লাহর ওপর ভরসা করো৷ আল্লাহ তাদেরকে পছন্দ করেন যারা তাঁর ওপর ভরসা করে কাজ করে৷ সুরা ইমরান : ১৫৯

আল্লাহ রআব্বুল আলামীন বলেন-

وَعَلَى ٱللَّهِ فَلۡيَتَوَكَّلِ ٱلۡمُؤۡمِنُونَ

 কাজেই সাচ্চা মুমিনদের আল্লাহর ওপরই ভরসা করা উচিত। সুরা আল ইমরান : ১৬০

আল্লাহ রআব্বুল আলামীন বলেন-

 وَقَالَ مُوسَىٰ يَـٰقَوۡمِ إِن كُنتُمۡ ءَامَنتُم بِٱللَّهِ فَعَلَيۡهِ تَوَكَّلُوٓاْ إِن كُنتُم مُّسۡلِمِينَ  

অর্থ: মুসা তার কওমকে বললো, হে লোকেরা! যদি তোমরা সত্যিই আল্লাহর প্রতি ঈমান রেখে থাকো তাহলে তার ওপর ভরসা করো, যদি তোমরা মুসলিম ও পূর্ণ আত্মসমর্পনকারী হও। সুরা ইউনুস : ৮৪

আল্লাহ রআব্বুল আলামীন বলেন-

وَلِلَّهِ غَيۡبُ ٱلسَّمَـٰوَٲتِ وَٱلۡأَرۡضِ وَإِلَيۡهِ يُرۡجَعُ ٱلۡأَمۡرُ كُلُّهُ ۥ فَٱعۡبُدۡهُ وَتَوَڪَّلۡ عَلَيۡهِ‌ۚ وَمَا رَبُّكَ بِغَـٰفِلٍ عَمَّا تَعۡمَلُونَ

অর্থ: আকাশে ও পৃথিবীতে যাকিছু লুকিয়ে আছে সবই আল্লাহর কুদরাতের নিয়ন্ত্রণাধীন এবং সমস্ত বিষয়ে তাঁরই দিকে রুজু করা হয়৷ কাজেই হে নবী! তুমি তাঁর বন্দেহী করো এবং তাঁরই ওপর ভরসা রাখো৷ যাকিছু তোমরা করছো তা থেকে তোমার রব গাফেল নন৷ সুরা হুদ : ১২৩

আল্লাহ রআব্বুল আলামীন বলেন-

 إِنَّمَا ٱلۡمُؤۡمِنُونَ ٱلَّذِينَ إِذَا ذُكِرَ ٱللَّهُ وَجِلَتۡ قُلُوبُہُمۡ وَإِذَا تُلِيَتۡ عَلَيۡہِمۡ ءَايَـٰتُهُ ۥ زَادَتۡہُمۡ إِيمَـٰنً۬ا وَعَلَىٰ رَبِّهِمۡ يَتَوَكَّلُونَ

সাচ্চা ঈমানদার তো তারাই আল্লাহকে স্মরণ করা হলে যাদের হৃদয় কেঁপে ওঠে৷ আর আল্লাহর আয়াত যখন তাদের সামনে পড়া হয়, তাদের ঈমান বেড়ে যায় এবং তারা নিজেদের রবের ওপর ভরসা করে৷ সুরা আনফাল : ২

উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত, আমি রাসূলূল্লাহ ﷺ কে বলতে শুনেছি, যদি তোমারা যথার্থই আল্লাহর উপর ভরসা করতে, তাহলে তিনি অবশ্যই তোমাদেরকে পাখির মত রিযিক দান করতেন। ভোরবেলা পাখিরা খালিপেটে বের হয়ে যায় এবং সন্ধ্যাবেলা উদর পূর্তি করে ফিরে আসে। সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪১৪৬, সুনানে তিরমিজি : ২৩৪৪

তাওয়াক্কুল বা আল্লাহর উপর ভরসা করার অর্থ হলো,  দুনিয়া ও আখেরাতের যাবতীয় বিষয়ের কল্যাণ, লাভ ও ক্ষতি থেকে বাঁচার জন্য সঠিকভাবে অন্তর থেকে আল্লাহর উপর নির্ভর করা। বান্দা তার প্রতিটি বিষয় আল্লাহর উপর সোপর্দ করবে। যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর ভরসা করবে তার জন্য তিনিই যথেষ্ট হবেন। অন্তরে এই বিশ্বাস থাকবে যে, আমার উপকার বা অপকার করার একমাত্র তিনি ছাড়া আর কারো অধিকারে নেই। ইসলামে তাওয়াক্কুল হল, মানুষ কল্যাণকর বিষয় অর্জনের জন্য সাধ্যমত চেষ্টা করবে আর ফলাফলের জন্য আল্লাহর উপর ভরসা করবে এবং তাকদিরের উপর বিশ্বাস রাখবে। আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো উপাস্যের উপর তাওয়াক্কুল করা শিরক হিসেবে গণ্য হয়।

রসূলুল্লাহ ﷺ এর তাওয়াক্কুল সম্পর্ক একটি হাদিস-

জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা রসূলুল্লাহ ﷺ এর সাথে নাজদ এর দিকে একটি জিহাদে গেলাম। রসূলুল্লাহ ﷺ একটি কাটাবন যুক্ত উপত্যকায় আমাদের পেলেন। রসূলুল্লাহ ﷺ একটি গাছের তলায় অবতরণ করলেন এবং তার তলোয়ারটি সে বৃক্ষের একটি শাখায় লটকিয়ে রাখলেন। বর্ণনাকারী জাবির (রা.) বলেন, আর লোকেরা গাছের ছায়ায় আশ্রয় নেয়ার জন্য প্রান্তরে ছড়িয়ে পড়ল। পরে রসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, জনৈক লোক আমার নিকট আসলো তখন আমি ঘুমন্ত। সে তলোয়ারটি হাতে নিল। আমি জেগে উঠলাম, আর সে আমার মাথার কাছে দণ্ডায়মান। আমি কিছু বুঝে না উঠতেই উন্মুক্ত তলোয়ারটি তার হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে। অতঃপর সে আমাকে বলল, কে তোমাকে আমা হতে রক্ষা করবে? তিনি বলেন, আমি বললাম, আল্লাহ! সে দ্বিতীয় বার বলল, তোমাকে আমার হাত থেকে কে রক্ষা করবে? তিনি বলেন, আমি বললাম, আল্লাহ! রসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, সে তখন তলোয়ারটি ভিতরে ঢুকিয়ে রাখল। আর ওই যে সে বসে আছে। এরপর রসূলুল্লাহ ﷺ তাকে কিছুই বললেন না। সহিহ মুসলিম : ৮৪৩

শির্কি তাওয়াক্কুলঃ

যদি কোন ব্যক্তি এমন বিষয়ের ক্ষেত্রে গাইরুল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করল যে বিষয়ের উপর আল্লাহ তায়ালা ব্যতীত অন্য কেউ ক্ষমতা রাখে না, তাহলে সে আল্লাহর সাথে শির্ক করল। পীরবাবা, খাজাবাবা, মৃত ওলী বা অদৃশ্য ব্যক্তিবর্গের উপর তাওয়াক্কুল করলে শির্কে আকবরের অন্তর্ভূক্ত হবে। কাজ শুরু করে ভাবল, ভয় কিছু নেই অমুক ওলী, আউলিয়া, দরবেশ তো আছেই।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

وَلِلّٰہِ غَیۡبُ السَّمٰوٰتِ وَالۡاَرۡضِ وَاِلَیۡہِ یُرۡجَعُ الۡاَمۡرُ کُلُّہٗ فَاعۡبُدۡہُ وَتَوَکَّلۡ عَلَیۡہِ ؕ  وَمَا رَبُّکَ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعۡمَلُوۡنَ 

আসমানও জমীনের গায়েব আল্লাহরই এবং তাঁরই কাছে সব বিষয় প্রত্যাবর্তিত হবে। সুতরাং তুমি তাঁর ইবাদাত কর এবং তাঁর উপর তাওয়াক্কুল কর। আর তোমরা যা কিছু কর সে ব্যাপারে তোমার রব গাফেল নন। সুরা হুদ : ১২৩

যদি কোন ব্যক্তি এমন বিষয়ের ক্ষেত্রে গাইরুল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করল যে বিষয়ের উপর আল্লাহ তায়ালা ব্যতীত অন্য কেউ ক্ষমতা রাখে না, তাহলে সে আল্লাহর সাথে শির্ক করল। অনেক নারীর সন্তান হয় না, তারা সন্তানের জন্য মাজারে মানত করে বা কোন পীরের উপর ভরসা করে দান করে। মূলত সন্তান দানের একমাত্র মালিক আল্লাহ, মায়ের চিকিত্সা পাশাপাশি আল্লাহ উপর তাওয়াক্কুল করেত হবে।

যে সকল বিষয় আল্লাহ ছাড়া কেহই দান করতে পারে না, সে সকল বিষয় পীর, ওলী, আওলিয়া, খাজাবাবা, মৃত ওলি বা অদৃশ্য ব্যক্তিবর্গের উপর তাওয়াক্কুল করলে শির্কে আকবরের অন্তর্ভূক্ত হবে। কোনো কাজ শুরু করে ভাবল, ভয়ের কিছুই নেই, অমুক ওলি, আওলিয়া, দরবেশ তো আছেই। দোকালে বা বাসায় তাবিজ ঝুলিয়ে রেখে তার উপর তাওয়াক্কুল করা শির্ক বলে গন্য হবে। হাতে বা গাছে লাল সুতা বেধে তার উপর তাওয়াক্কুল করা ও শির্ক কাজ। অপর পক্ষে  আমীর, উমরা, রাষ্ট্র নায়ক, সমাজপতি, ধন সম্পদের উপকরন ইত্যাদির উপর তাওয়াক্কুল করা ছোট শির্কর অন্তরভুক্ত হবে।

ছোট শির্কি তাওয়াক্কুল:

আমীর, উমরা, রাষ্ট্র নায়ক, সমাজপতি, চাকুরির বেতন, ধন সম্পদের উপকরন ইত্যাদির উপর তাওয়াক্কুল করা ছোট শির্কর অন্তরভুক্ত হবে।

জায়েয তাওয়াক্কুল:

দায়িত্ব দিয়ে প্রতিনিধির বা উকিলের উপর ভরসা করা জায়েয। তবে বলা যাবে না আমি তার উপর তাওয়াক্কুল করলাম। বলতে হবে আমি তাকে প্রতিনিধির বানালাম। দুনিয়ার কোন কার্য হাসিলের জন্য বৈধ সব পন্থা অবলম্ভন করার পরই কেবল আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল যাবে। কেননা আল্লাহ বলেন। এটা আল্লাহর বিধান যা পূর্ব থেকেই চলে আসছে৷  তুমি আল্লাহর বিধানে কোন পরিবর্তন পাবে না৷ (সুরা ফাতহা ৪৮:২৩)। আগুনে হাত দিলে পুড়বেই, বিষ খেলে তার প্রতিক্রিয়া হবেই, পানি পানে পিপাষা নিবারন হবেই। এটাই আল্লাহর বিধান। তবে চুড়ান্ত ফলাফল আল্লাহর হাতে আর এটাই তাওয়াক্কুল। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

 فَإِذَا قُضِيَتِ ٱلصَّلَوٰةُ فَٱنتَشِرُواْ فِى ٱلۡأَرۡضِ وَٱبۡتَغُواْ مِن فَضۡلِ ٱللَّهِ وَٱذۡكُرُواْ ٱللَّهَ كَثِيرً۬ا لَّعَلَّكُمۡ تُفۡلِحُونَ  

অতঃপর যখন সালাত সমাপ্ত হবে তখন তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড় আর আল্লাহর অনুগ্রহ হতে অনুসন্ধান কর এবং আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ কর, যাতে তোমরা সফল হতে পার। সুরা্ জুমাহ : ১০

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

 يَـٰٓأَيُّہَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ خُذُواْ حِذۡرَڪُمۡ فَٱنفِرُواْ ثُبَاتٍ أَوِ ٱنفِرُواْ جَمِيعً۬ا

 হে ঈমানদারগণ ! মোকাবিলা করার জন্য সর্বক্ষণ প্রস্তুত থাকো৷ তারপর সুযোগ পেলে পৃথক পৃথক বাহিনীতে বিভক্ত হয়ে বের হয়ে পড়ো অথবা এক সাথে৷  সুরা নিসা : ৭১

আল্লাহ তা’আলা বলেন :

وَأَعِدُّواْ لَهُم مَّا ٱسۡتَطَعۡتُم مِّن قُوَّةٍ۬ وَمِن رِّبَاطِ ٱلۡخَيۡلِ تُرۡهِبُونَ بِهِۦ عَدُوَّ ٱللَّهِ وَعَدُوَّڪُمۡ وَءَاخَرِينَ مِن دُونِهِمۡ لَا تَعۡلَمُونَهُمُ ٱللَّهُ يَعۡلَمُهُمۡ‌ۚ وَمَا تُنفِقُواْ مِن شَىۡءٍ۬ فِى سَبِيلِ ٱللَّهِ يُوَفَّ إِلَيۡكُمۡ وَأَنتُمۡ لَا تُظۡلَمُونَ

অর্থ: আর তোমরা নিজেদের সামর্থ অনুযায়ী সর্বাধিক পরিমাণ শক্তি ও সদাপ্রস্তুত ঘোড়া তাদের মোকাবিলার জন্য যোগাড় করে রাখো৷  এর মাধ্যমে তোমরা ভীতসন্ত্রস্ত করবে আল্লাহর শত্রুকে, নিজের শত্রুকে এবং অন্য এমন সব শত্রুকে যাদেরকে তোমরা চিন না৷ কিন্তু আল্লাহ চেনেন৷ আল্লাহর পথে তোমরা যা কিছু খরচ করবে তার পূর্ণ প্রতিদান তোমাদেরকে ফিরিয়ে দেয়া হবে, এবং তোমাদের প্রতি কখনো জুলুম করা হবে না৷ সুরা আনফাল : ৬০

আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন-

قَالَ رَجُلٌ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَعْقِلُهَا وَأَتَوَكَّلُ أَوْ أُطْلِقُهَا وَأَتَوَكَّلُ قَالَ ‏ “‏ اعْقِلْهَا وَتَوَكَّلْ

কোন একজন লোক বললো, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমি কি সেটা (উট) বেঁধে রেখে আল্লাহ তা’আলার উপর ভরসা করবো, না বাধন খুলে রেখে আল্লাহ্ তা’আলার উপর ভরসা করবো? তিনি বললেনঃ তুমি সেটা বেঁধে রেখে (আল্লাহ্ তা’আলা উপর) ভরসা করবে। সুনানে তিরমিজি : ২৫১৭

১৭। গাইরুল্লাহর একনিষ্ট অনুগত্য করাঃ

আল্লাহ ও তার দ্বীনের আনুগত্য করা প্রত্যেক মুমিনের উপর ফরজ। আনুগত্য করতে হবে আল্লাহর, তার রসূলের এবং দায়িত্ব ও ক্ষমতার অধিকারী উলামা, শাসনকর্তা, উমারাদের। কিন্তু মনে রাখতে হবে, উলামা, শাসনকর্তা, ওলী, আউলিয়া, দরবেশ, পীরদের আনুগত্যে ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি করে আল্লাহর অনুগত্যের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া থেকেই আনুগত্যের শির্কের উৎপত্তি। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

 يَـٰٓأَيُّہَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ أَطِيعُواْ ٱللَّهَ وَأَطِيعُواْ ٱلرَّسُولَ وَأُوْلِى ٱلۡأَمۡرِ مِنكُمۡ‌ۖ

হে ঈমানগারগণ ! আনুগত্য করো আল্লাহর এবং আনুগত্য করো রসূলের আর সেই সব লোকের যারা তোমাদের মধ্যে দায়িত্ব ও ক্ষমতার অধিকারী৷ সুরা নিসা : ৫৯

আনুগত্য পাঁচ প্রকার হয়ে থাকে:

আল্লাহর আনুগত্য করা ফরজঃ

আল্লাহ যখন যে কাজ যে সময় যে স্থানে করার হুকুম দিয়েছেন ঠিক সে ভাবেই তার আনুগত্য করতে হবে। অন্যভাবে বলতে হয় পুরাপুরি বিনাশর্তে তার নাজিল কৃত ওহীর আনুগত্য মেনে নেওয়া। আল্লাহর আনুগত্যে শর্থ আরপ করলে শির্ক হবে। আল্লার দ্বীনের আনুগত্যই আল্লাহর আনগত্য। আল্লাহর দ্বীন পেয়েছি রাসর সা: মাধ্যমে কাজেই যে, রসূলের আনুগত্য করলো সে আসলে আল্লাহরই আনুগত্য করলো৷ আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

 مَّن يُطِعِ ٱلرَّسُولَ فَقَدۡ أَطَاعَ ٱللَّهَ‌ۖ وَمَن تَوَلَّىٰ فَمَآ أَرۡسَلۡنَـٰكَ عَلَيۡهِمۡ حَفِيظً۬ا

যে ব্যক্তি রসূলের আনুগত্য করলো সে আসলে আল্লাহরই আনুগত্য করলো৷ আর যে ব্যক্তি মুখ ফিরিয়ে নিলো, যাই হোক, তাদের ওপর তো আমি তোমাকে পাহারাদার বানিয়ে পাঠাইনি৷ সুরা নিসা : ৮০

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

 قُلۡ أَطِيعُواْ ٱللَّهَ وَأَطِيعُواْ ٱلرَّسُولَ‌ۖ فَإِن تَوَلَّوۡاْ فَإِنَّمَا عَلَيۡهِ مَا حُمِّلَ وَعَلَيۡڪُم مَّا حُمِّلۡتُمۡ‌ۖ وَإِن تُطِيعُوهُ تَهۡتَدُواْ‌ۚ وَمَا عَلَى ٱلرَّسُولِ إِلَّا ٱلۡبَلَـٰغُ ٱلۡمُبِينُ

 বলো, ‘‘ আল্লাহর অনুগত হও এবং রসূলের হুকুম মেনে চলো ৷ কিন্তু যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও৷ তাহলো ভালোভাবে জেনে রাখো, রসূলের ওপর যে দায়িত্বের বোঝা চাপিয়ে দেয়া হয়েছে সে জন্য রাসূল দায়ী এবং তোমাদের ওপর যে দায়িত্বের বোঝা চাপিয়ে দেয়া হয়েছে সে জন্য তোমরাই দায়ী ৷ তাঁর আনুগত্য করলে তোমরা নিজেরাই সৎ পথ পেয়ে যাবে, অন্যথায় পরিষ্কার ও দ্ব্যর্থহীন হুকুম শুনিয়ে দেয়া ছাড়া রসূলের আর কোন দায়িত্ব নেই ৷ সুরা নূর : ৫৪

রাসূলুল্লাহ এর অনুগত্য করা ফরজঃ

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনুগত্য করাও ফরজ। আল্লাহর নাজিল কৃত ওহী তিনি যেভাবে বুঝেছেন ও পালন করছেন ঠিক সেভবেই মান্য করা ফরজ। এর ব্যতিক্রম হরাম। আল্লাহ ও তাঁর রসূলের পক্ষ থেকে কোন আদেশ প্রমাণিত হলে, সে বিষয়ে কোন মুসলিম ব্যক্তি, জাতি, প্রতিষ্ঠান, আদালত, পার্লামেন্ট বা রাষ্ট্রের নিজের মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা নেই। মুসলমান হবার অর্থই হচ্ছে আল্লাহ ও তাঁর রসূলের সামনে নিজের স্বাধীন ইখতিয়ার বিসর্জন দেয়া। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

وَمَا كَانَ لِمُؤۡمِنٍ۬ وَلَا مُؤۡمِنَةٍ إِذَا قَضَى ٱللَّهُ وَرَسُولُهُ ۥۤ أَمۡرًا أَن يَكُونَ لَهُمُ ٱلۡخِيَرَةُ مِنۡ أَمۡرِهِمۡۗ وَمَن يَعۡصِ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُ ۥ فَقَدۡ ضَلَّ ضَلَـٰلاً۬ مُّبِينً۬ا

অর্থ: যখন আল্লাহ ও তাঁর রসূল কোনো বিষয়ের ফায়সালা দিয়ে দেন তখ কোনো মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীর  সেই ব্যাপারে নিজে ফায়সালা করার কোনো অধিকার নেই৷ আর যে কেউ আল্লাহ ও তাঁর রসূলের নাফরমানী করে সে সুস্পষ্ট গোমরাহীতে লিপ্ত হয়৷ সুরা আহজাব : ৩৬

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিকট যে দ্বীন আল্লাহর নাজিল করেছেন। তার বিত্তিতে তিনি উম্মতকে পথপ্রদর্শন করছেন। তাই তার প্রচারিত ইসলাম চিরস্থায়ীভাবে মুসলমানদের জন্য চূড়ান্ত ফায়সালাকারী সনদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। সুতারং তার ফায়সালা মেনে আনুগত্য করলে মুমিন থাকবে, তা না হলে মুমিনের গন্ডি থেকে বের হয়ে যাবে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤۡمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيۡنَهُمۡ ثُمَّ لَا يَجِدُواْ فِىٓ أَنفُسِہِمۡ حَرَجً۬ا مِّمَّا قَضَيۡتَ وَيُسَلِّمُواْ تَسۡلِيمً۬ا

না, হে মুহাম্মদ! তোমার রবের কসম, এরা কখনো মুনিন হতে পারে না যতক্ষণ এদের পারস্পারিক মতবিরোধের ক্ষেত্রে এরা তোমাকে ফায়সালাকারী হিসেবে মেনে না নেবে, তারপর তুমি যা ফায়সালা করবে তার ব্যাপারে নিজেদের মনের মধ্য যে কোন প্রকার কুণ্ঠা ও দ্বিধার স্থান দেবে না, বরং সর্বান্তকরণে মেনে নেবে৷ সুরা নিসা : ৬৫

তাগুদের আনুগত্য করা শিরকঃ

তাগুত এমন এক বান্দাকে বলা হয়, যে বন্দেগী ও দাসত্বের সীমা অতিক্রম করে নিজেই প্রভু ও খোদা হবার দাবীদার সাজে এবং আল্লাহর বান্দাদেরকে নিজের বন্দেগী ও দাসত্বে নিযুক্ত করে। তাই তাগুত কখনো শয়তান নিজে, কখনো ভন্ডপীরের ভেসে, কখনো রাষ্ট্র নায়কের ভেসে আসে। তাগুদের আনুগত্য করা শিরক। এই কথার দলীল হচ্ছে কুরআনের এই আয়াত,

وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَّسُولًا أَنِ اعْبُدُوا اللَّهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُوتَ

“আমি প্রত্যেক উম্মতের মধ্যেই রসূল প্রেরণ করেছি এই মর্মে যে, তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর এবং তাগুত থেকে দূরে থাক। সুরা নাহল : ৩৬

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

 لَآ إِكۡرَاهَ فِى ٱلدِّينِ‌ۖ قَد تَّبَيَّنَ ٱلرُّشۡدُ مِنَ ٱلۡغَىِّ‌ۚ فَمَن يَكۡفُرۡ بِٱلطَّـٰغُوتِ وَيُؤۡمِنۢ بِٱللَّهِ فَقَدِ ٱسۡتَمۡسَكَ بِٱلۡعُرۡوَةِ ٱلۡوُثۡقَىٰ لَا ٱنفِصَامَ لَهَا‌ۗ وَٱللَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ

দ্বীনের ব্যাপারে কোন জোর জবরদস্তি নেই।  ভ্রান্ত মত ও পথ থেকে সঠিক মত ও পথকে ছাঁটাই করে আলাদা করে দেয়া হয়েছে। এখন যে কেউ তাগুতকে অস্বীকার করে আল্লাহর ওপর ঈমান আনে, সে এমন একটি মজবুত অবলম্বন আঁকড়ে ধরে, যা কখনো ছিন্ন হয় না। আর আল্লাহ সবকিছু শোনেন ও জানেন।  সুরা বাকারা : ২৫৬

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

 أَلَمۡ تَرَ إِلَى ٱلَّذِينَ يَزۡعُمُونَ أَنَّهُمۡ ءَامَنُواْ بِمَآ أُنزِلَ إِلَيۡكَ وَمَآ أُنزِلَ مِن قَبۡلِكَ يُرِيدُونَ أَن يَتَحَاكَمُوٓاْ إِلَى ٱلطَّـٰغُوتِ وَقَدۡ أُمِرُوٓاْ أَن يَكۡفُرُواْ بِهِۦ وَيُرِيدُ ٱلشَّيۡطَـٰنُ أَن يُضِلَّهُمۡ ضَلَـٰلاَۢ بَعِيدً۬ا

হে নবী ! তুমি কি তাদেরকে দেখোনি, যারা এই মর্মে দাবী করে চলেছে যে, তারা ঈমান এনেছে সেই কিতাবের প্রতি যা তোমার ওপর নাযিল করা হয়েছে এবং সেই সব কিতাবের প্রতি যেগুলো তোমরা পূর্বে নাযিল করা হয়েছিল কিন্তু তারা নিজেদের বিষয়সমূহ ফায়সালা করার জন্য “তাগুতে”র দিকে ফিরতে চায়, অথচ তাদেরকে তাগুতকে অস্বীকার করার হুকুম দেয়া হয়েছিল?  শয়তান তাদেরকে পথভ্রষ্ট করে সরল সোজা পথ থেকে অনেক দূরে সরিয়ে নিয়ে যেতে চায়৷ সুরা  নিসা : ৬০

কাফের ও মুনাফিকদের আনুগত্য করা হারাম, আবার কখনও শিরক

মুশরিক কাফের ও মুনাফিকদের আনুগত্য করা হারাম কখনো কখনো শির্ক। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

يَـٰٓأَيُّہَا ٱلنَّبِىُّ ٱتَّقِ ٱللَّهَ وَلَا تُطِعِ ٱلۡكَـٰفِرِينَ وَٱلۡمُنَـٰفِقِينَ‌ۗ إِنَّ ٱللَّهَ ڪَانَ عَلِيمًا حَكِيمً۬ا

হে নবী! আল্লাহকে ভয় করো এবং কাফের ও মুনাফিকদের আনুগত্য করো না৷ প্রকৃতপক্ষে আল্লাহই সর্বজ্ঞ ও মহাজ্ঞানী। সুরা আহজাব : ০১

কাফির বা মুশরিকগণ যখন তাদের শিরক কাজ করার আহবান করে তখন তাদের কাজে প্রতি অনুগত্য প্রকাশ করা বা সম্মতি প্রদান করা শিরক। তাদের সাধারণ কাজের অনুগত্য হারাম হলেও শিরকি কাজের অনুগত্য শিরক।

শর্ত সাপেক্ষে উলুল আমরদের আনুগত্য করা যাবেঃ

উলুল আমর বা কর্তৃত্বশীল ব্যাক্তি বা আমিরের অনুগত্য করা যাবে তবে তাদের অনুগত্য হবে শর্ত সাপেক্ষে। তাদের একনিষ্ঠ বা অন্ধ আনুগত্য হারাম। যদি তারা আল্লাহ কর্তৃক হারামকৃত বিষয়কে হালাল বা হালালকৃত বস্তুকে হারাম করে তখন তাদের আনুগত্য করা করা হারাম। সুতরাং যেসব লোক এসব ক্ষেত্রে তাদের আনুগত্য করল তারা মুলত আল্লাহ তা’আলার সমকক্ষ শির্কে ডুবে গেল। উলুল আমর বা কর্তৃত্বশীল ব্যাক্তি বা আমিরের অনগত্য ততক্ষণ পর্যন্ত জায়েয যতক্ষন পর্যন্ত তারা কুরআন সুন্নাহর উপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে। তাদের করা হারাম ও হালালকে বিনা দলিলে মেনে নেওয়াই হলো, তাদের ইলাহ হিসাবে মর্যাদা প্রদান করা।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَابًا مِنْ دُونِ اللَّهِ وَالْمَسِيحَ ابْنَ مَرْيَمَ وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا إِلَهًا وَاحِدًا لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ سُبْحَانَهُ عَمَّا يُشْرِكُونَ

 তারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে নিজেদের উলামা ও দরবেশদেরকে নিজেদের খোদায় পরিণত করেছে৷ এবং এভাবে মারয়াম পুত্র মসীহকেও৷ অথচ তাদের মা’বুদ ছাড়া আর কারোর বন্দেগী কারার হুকুম দেয়া হয়নি, এমন এক মাবুদ যিনি ছাড়া ইবাদত লাভের যোগ্যতা সম্পন্ন আর কেউ নেই৷ তারা যেসব মুশরিকী কথা বলে তা থেকে তিনি পাক পবিত্র৷ সুরা তওবা : ৩১

আনুগত্যের শির্ক হল, বিনা ভাবনায় শরিয়তের গ্রহণযোগ্য কোন প্রমান ছাড়াই হালাল হারাম জায়েয নাজায়েজের ব্যপারে আলেম বুজুর্গ বা উপরস্থ কারো সিদ্ধান্ত অন্ধভাবে সন্তুষ্ট চিত্তে মেনে নেয়া।

সহিহ হাদিসে বলা হয়েছে আদী ইবনে হাতেম নবী (সা) এর কাছে এসে ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন খৃস্টান। ইসলাম গ্রহণ করার সময় তিনি নবী (সা) কে কয়েকটি প্রশ্ন করেন।এর মধ্যে একটি প্রশ্ন হচ্ছে, কুরআনের এ আয়াতটিতে (সুরা তওবা- ৯:৩১) আমাদের বিরুদ্ধে উলামা ও দরবেশদেরকে খোদা বানিয়ে নেবার যে দোষারূপ করা হয়েছে তার প্রকৃত তাৎপর্য কি৷ জবাবে তিনি বলেন, তারা যেগুলোকে হারাম বলতো তোমরা সেগুলোকে হারাম বলে মেনে নিতে এবং তারা যেগুলোকে হালাল বলতো তোমরা সেগুলোকে হালাল বলে মেনে নিতে, একথা কি সত্য নয়৷ জবাবে হযরত আদী বলেন , হাঁ, একথা তো ঠিক, আমরা অবশ্যি এমনটি করতাম। রসূলুল্লাহ (সা) বলেন, ব্যাস, এটিই তো হচ্ছে তোমাদে প্রভু বানিয়ে নেয়া। আহম্মদ, তিরমিজ, তাফসিরে ইবনে কাসির

ইবনু উমার (রা.) হতে বর্ণিত। নবী ﷺ বলেছেন-

السَّمْعُ وَالطَّاعَةُ حَقٌّ مَا لَمْ يُؤْمَرْ بِالْمَعْصِيَةِ فَإِذَا أُمِرَ بِمَعْصِيَةٍ فَلَا سَمْعَ وَلَا طَاعَةَ

পাপ কাজের আদেশ না করা পর্যন্ত ইমামের কথা শোনা ও তার আদেশ মানা অপরিহার্য। তবে পাপ কাজের আদেশ করা হলে তা শোনা ও আনুগত্য করা যাবে না।’ সহিহ বুখারি :: ২৯৫৫, ৭১৪৪

আমাদের সমাজের অনেক পীর মাসায়েক এই শির্কে জড়িত। মাওলানা সৈয়দ মোহাম্মদ এছহাক সাহেব পীর সাহেব চরমোনাই এর লেখা বই “ভেদে মারেফাত বা ইয়াদে খোদা’  এ আছে ’কামেল পীরের আদেশ পাইলে,নাপাক শারাব (মদ) দ্বারাও জায়নামাজ রঙ্গিন করিয়া তাহাতে নামাজ পড়’’। মানিক গঞ্জের মো: আজহারু ইসলাম সিদ্দিকির লেখাবই “মারেফতের ভেদতত্ত্ব” এর ৩৭ পৃষ্ঠায় বলেন: “যুক্তি ছাড়া মোর্শেদের বাক্য বিনা দ্বিধায় মানতে হবে। নিজের বিবেক বুদ্ধি বিদ্যা, যুক্তি, কিতাবি ইলম সবই বিসর্জন দিতে হবে। মোর্শেদের কথায় অন্ধভাবে কাজ করে জেতে হবে। তা সামনে একটা মরা মানুষ সাজতে হবে”।

আল্লাহর কিতাবের সনদ ছাড়াই যারা মানব জীবনের জন্য জায়েয ও নাজায়েযের সীমানা নির্ধারণ করে তারা আসলে নিজেদের ধারণা মতে নিজেরাই আল্লাহর বিধান দানের মর্যাদায় সমাসীন হয়। আর যারা শরীয়াতের বিধি রচনার এ অধিকার তাদের জন্য স্বীকার করে নেয়া পরিস্কার শির্ক। “তারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে নিজেদের উলামা ও দরবেশদেরকে নিজেদের খোদায় পরিণত করেছে” মনে হচ্ছে এ আয়াতের ই প্রতিধ্বনি। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

 ٱتَّبِعُواْ مَآ أُنزِلَ إِلَيۡكُم مِّن رَّبِّكُمۡ وَلَا تَتَّبِعُواْ مِن دُونِهِۦۤ أَوۡلِيَآءَ‌ۗ قَلِيلاً۬ مَّا تَذَكَّرُونَ (٣) 

হে মানব সমাজ! তোমাদের রবের পক্ষ থেকে তোমাদের ওপর যা কিছু নাযিল করা হয়েছে তার অনুসরণ করো এবং নিজেদের রবকে বাদ দিয়ে আওলিয়াদের অনুসরণ করো না৷  কিন্তু তোমরা খুব কমই উপদেশ মেনে থাকো৷ সুরা আরাফ : ৩

                                                                              
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

 وَلَا تَأۡڪُلُواْ مِمَّا لَمۡ يُذۡكَرِ ٱسۡمُ ٱللَّهِ عَلَيۡهِ وَإِنَّهُ ۥ لَفِسۡقٌ۬‌ۗ وَإِنَّ ٱلشَّيَـٰطِينَ لَيُوحُونَ إِلَىٰٓ أَوۡلِيَآٮِٕهِمۡ لِيُجَـٰدِلُوكُمۡ‌ۖ وَإِنۡ أَطَعۡتُمُوهُمۡ إِنَّكُمۡ لَمُشۡرِكُونَ (١٢١

আর যে পশুকে আল্লাহর নামে যবেই করা হয়নি তার গোশত খেয়ো না৷ এটা অবশ্যি মহাপাপ৷ শয়তানরা তাদের ঝগড়া করতে পারে৷ কিন্তু যদি তোমরা তাদের আনুগত্য করো তাহলে অবশ্যি তোমরা মুশরিক হবে৷ সুরা আনআম : ১২১

দুনিয়াতে তাদের নিষেধ করলেও আনুগত্য ছাড়বেনা। আখেরাতে ঠিকই সম্পর্ক ছিন্ন করবে। কিন্তু কোন কাজে আসবেনা। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

إِذۡ تَبَرَّأَ ٱلَّذِينَ ٱتُّبِعُواْ مِنَ ٱلَّذِينَ ٱتَّبَعُواْ وَرَأَوُاْ ٱلۡعَذَابَ وَتَقَطَّعَتۡ بِهِمُ ٱلۡأَسۡبَابُ (١٦٦) 

যখন তিনি শাস্তি দেবেন তখন এই সমস্ত নেতা ও প্রধান ব্যক্তিরা, দুনিয়ায় যাদের অনুসরণ করা হতো, তাদের অনুগামীদের সাথে সম্পর্কহীনতা প্রকাশ করতে থাকবে৷ কিন্তু শাস্তি তারা পাবেই এবং তাদের সমস্ত উপায় উপকরণের ধারা ছিন্ন হয়ে যাবে৷ সুরা  বাকারা : ১৬৬

১৮। আল্লাহর অনুগ্রহ বা নেয়ামতকে গাইরুল্লাহর সাথে সম্পৃক্ত কার

পৃথিবীত ও আকাশ মন্ডলিতে যত প্রকারের নেয়ামত দেখা যায় তার সব কিছুর একছন্ন মালিক মহান রাব্বিল আলামীন। তার অনুগ্রহ বা নেয়ামত না থাকলে পৃতিবীর কোন প্রানীরই অস্তিত্ত্ব থাকতনা। এই জন্য আল্লাহ তাদেরকে ভৎর্সনা করছেন, যারা তাঁর একছন্ন নিয়ামতকে অন্যের সাথে সম্পৃক্ত করে থাকে। আল্লাহর প্রদানকৃত নিয়ামতের সাথে গাইরুল্লাহকে সম্পৃক্ত করাই মুলত শিরক। কেউ যদি বলে অমুক না থাকলে আজ মারাই জেতার। যদি অমুক ডাক্তারে নিকট চিকত্সা না নিতাম মারা যেতাম। তাকে বাচার আল্লাহ আর নেয়ামতের শুকরিয় করল অন্যের যা পরিস্কার শির্ক। মহান আল্লাহ যখন নিজ করুনায় দুরাবস্থা থেকে মুক্ত করে তার বান্দাকে সুখ স্বাচ্ছন্দ্য প্রদান করে সে তখন সে তার বাপ দাদাদের উদাহরণ দেয়। সর্বশ্রেষ্ঠ মহত্বপূর্ণ আল্লাহ বলেন-

ثُمَّ بَدَّلۡنَا مَکَانَ السَّیِّئَۃِ الۡحَسَنَۃَ حَتّٰی عَفَوۡا وَّقَالُوۡا قَدۡ مَسَّ اٰبَآءَنَا الضَّرَّآءُ وَالسَّرَّآءُ فَاَخَذۡنٰہُمۡ بَغۡتَۃً وَّہُمۡ لَا یَشۡعُرُوۡنَ

তারপর আমি মন্দ অবস্থাকে ভাল অবস্থা দ্বারা বদলে দিয়েছি। অবশেষে তারা প্রাচুর্য লাভ করেছে এবং বলেছে, ‘আমাদের বাপ-দাদাদেরকেও দুর্দশা ও আনন্দ স্পর্শ করেছে।’ অতঃপর আমি তাদেরকে হঠাৎ পাকড়াও করেছি এমনভাবে যে, তারা উপলব্ধিও করতে পারেনি। সুরা আরাফ : ৯৫

বিপদে বান্দা একনিষ্ঠভাবে আল্লাহকে স্মরণ করে কিন্তু যখন তার বিপদ কেটে যায় তখন সে আল্লাহ আল্লাহর বিরুদ্ধে কুফরি করে থাকে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

وَاِذَا غَشِیَہُمۡ مَّوۡجٌ کَالظُّلَلِ دَعَوُا اللّٰہَ مُخۡلِصِیۡنَ لَہُ الدِّیۡنَ ۬ۚ فَلَمَّا نَجّٰہُمۡ اِلَی الۡبَرِّ فَمِنۡہُمۡ مُّقۡتَصِدٌ ؕ وَمَا یَجۡحَدُ بِاٰیٰتِنَاۤ اِلَّا کُلُّ خَتَّارٍ کَفُوۡرٍ

আর যখন ঢেউ তাদেরকে ছায়ার মত আচ্ছন্ন করে নেয়, তখন তারা একনিষ্ঠ অবস্থায় আনুগত্যভরে আল্লাহকে ডাকে। অতঃপর যখন তিনি তাদেরকে উদ্ধার করে স্থলে পৌঁছে দেন, তখন তাদের কেউ কেউ (ঈমান ও কুফরীর) মধ্যপথে থাকে। আর বিশ্বাসঘাতক ও কাফির ব্যক্তি ছাড়া কেউ আমার নিদর্শনাবলী অস্বীকার করে না। সুরা লোকমান : ৩২

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

يَعۡرِفُونَ نِعۡمَتَ ٱللَّهِ ثُمَّ يُنكِرُونَهَا وَأَكۡثَرُهُمُ ٱلۡكَٰفِرُونَ

এরা আল্লাহর অনুগ্রহ নেয়ামত জানে, কিন্তু সেগুলো অস্বীকার করে,  আর এদের মধ্যে বেশীর ভাগ লোক এমন যারা সত্যকে মেনে নিতে প্রস্তুত নয়৷ সুরা নাহল : ৮৩

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

فَاِنۡ اَعۡرَضُوۡا فَمَاۤ اَرۡسَلۡنٰکَ عَلَیۡہِمۡ حَفِیۡظًا ؕ اِنۡ عَلَیۡکَ اِلَّا الۡبَلٰغُ ؕ وَاِنَّاۤ اِذَاۤ اَذَقۡنَا الۡاِنۡسَانَ مِنَّا رَحۡمَۃً فَرِحَ بِہَا ۚ وَاِنۡ تُصِبۡہُمۡ سَیِّئَۃٌۢ بِمَا قَدَّمَتۡ اَیۡدِیۡہِمۡ فَاِنَّ الۡاِنۡسَانَ کَفُوۡرٌ

আর যদি তারা বিমুখ হয়, তবে আমি তো তোমাকে তাদের রক্ষক হিসেবে পাঠাইনি। বাণী পৌঁছে দেয়াই তোমার দায়িত্ব। আর আমি যখন মানুষকে আমার রহমত আস্বাদন করাই তখন সে খুশি হয়। আর যখন তাদের কৃতকর্মের জন্য তাদের উপর কোন বিপদ আসে তখন মানুষ বড়ই অকৃতজ্ঞ হয়। সুরা শুরা : ৪৮

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সুর আর রহমানে তার নেয়ামতকে স্মরন করিয়ে দিয় ৩১ বার ইরশাদ করেন-

فَبِاَیِّ اٰلَآءِ رَبِّکُمَا تُکَذِّبٰنِ

সুতরাং তোমরা উভয়ে তোমাদের রবের কোন নেয়মতকে অনুগ্রহ অস্বীকার করবে?

আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের নিয়ামত অস্বীকারকারী বানী ইসরাঈলের তিনজন লোকের কাহিনি-

আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছেন, বানী ইসরাইলের মধ্যে তিনজন লোক ছিল। একজন শ্বেতরোগী, একজন মাথায় টাকওয়ালা আর একজন অন্ধ। মহান আল্লাহ তাদেরকে পরীক্ষা করতে চাইলেন। কাজেই, তিনি তাদের নিকট একজন ফেরেশতা পাঠালেন। ফেরেশতা প্রথমে শ্বেত রোগীটির নিকট আসলেন এবং তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার নিকট কোন্ জিনিস অধিক প্রিয়? সে জবাব দিল, সুন্দর রং ও সুন্দর চামড়া। কেননা, মানুষ আমাকে ঘৃণা করে। ফেরেশতা তার শরীরের উপর হাত বুলিয়ে দিলেন। ফলে তার রোগ সেরে গেল। তাকে সুন্দর রং এবং সুন্দর চামড়া দান করা হল। অতঃপর ফেরেশতা তাকে জিজ্ঞেস করলেন, কোন্ ধরনের সম্পদ তোমার নিকট অধিক প্রিয়? সে জবাব দিল, ’উট’ অথবা সে বলল, ’গরু’। এ ব্যাপারে বর্ণনাকারীর সন্দেহ রয়েছে যে শ্বেতরোগী না টাকওয়ালা দু’জনের একজন বলেছিল ’উট’ আর অপরজন বলেছিল ’গরু’। অতএব তাকে একটি দশ মাসের গর্ভবতী উটনী দেয়া হল। তখন ফিরশতা বললেন, ’’এতে তোমার জন্য বরকত হোক।’’

বর্ণনাকারী বলেন, ফেরেশতা টাকওয়ালার নিকট গেলেন এবং বললেন, তোমার নিকট কী জিনিস পছন্দনীয়? সে বলল, সুন্দর চুল এবং আমার হতে যেন এ রোগ চলে যায়। মানুষ আমাকে ঘৃণা করে। বর্ণনাকারী বলেন, ফেরেশতা তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন এবং তৎক্ষণাৎ মাথার টাক চলে গেল। তাকে সুন্দর চুল দেয়া হল। ফেরেশতা জিজ্ঞেস করলেন, কোন্ সম্পদ তোমার নিকট অধিক প্রিয়? সে জবাব দিল, ’গরু’। অতঃপর তাকে একটি গর্ভবতী গাভী দান করলেন। এবং ফেরেশতা দু’আ করলেন, এতে তোমাকে বরকত দান করা হোক। অতঃপর ফেরেশতা অন্ধের নিকট আসলেন এবং তাকে জিজ্ঞেস করলেন, কোন্ জিনিস তোমার নিকট অধিক প্রিয়? সে বলল, আল্লাহ্ যেন আমার চোখের জ্যোতি ফিরিয়ে দেন, যাতে আমি মানুষকে দেখতে পারি। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তখন ফেরেশতা তার চোখের উপর হাত ফিরিয়ে দিলেন, তৎক্ষণাৎ আল্লাহ্ তার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিলেন। ফেরেশতা জিজ্ঞেস করলেন, কোন্ সম্পদ তোমার নিকট অধিক প্রিয়? সে জবাব দিল ’ছাগল’। তখন তিনি তাকে একটি গর্ভবতী ছাগী দিলেন। উপরে উল্লেখিত লোকদের পশুগুলো বাচ্চা দিল। ফলে একজনের উটে ময়দান ভরে গেল, অপরজনের গরুতে মাঠ পূর্ণ হয়ে গেল এবং আর একজনের ছাগলে উপত্যকা ভরে গেল।

অতঃপর ঐ ফেরেশতা তাঁর পূর্ববর্তী আকৃতি প্রকৃতি ধারণ করে শ্বেতরোগীর নিকট এসে বললেন, আমি একজন নিঃস্ব ব্যক্তি। আমার সফরের সম্বল শেষ হয়ে গেছে। আজ আমার গন্তব্য স্থানে পৌঁছার আল্লাহ্ ব্যতীত কোন উপায় নেই। আমি তোমার নিকট ঐ সত্তার নামে একটি উট চাচ্ছি, যিনি তোমাকে সুন্দর রং, কোমল চামড়া এবং সম্পদ দান করেছেন। আমি এর উপর সাওয়ার হয়ে আমার গন্তব্যে পৌঁছাব। তখন লোকটি তাকে বলল, আমার উপর বহু দায়িত্ব রয়েছে। তখন ফেরেশতা তাকে বললেন, সম্ভবত আমি তোমাকে চিনি। তুমি কি এক সময় শ্বেতরোগী ছিলে না? মানুষ তোমাকে ঘৃণা করত। তুমি কি ফকীর ছিলে না? অতঃপর আল্লাহ্ তা’আলা তোমাকে দান করেছেন। তখন সে বলল, আমি তো এ সম্পদ আমার পূর্বপুরুষ হতে ওয়ারিশ সূত্রে পেয়েছি। ফেরেশতা বললেন, তুমি যদি মিথ্যাচারী হও, তবে আল্লাহ্ তোমাকে সেরূপ করে দিন, যেমন তুমি ছিলে। অতঃপর ফেরেশতা মাথায় টাকওয়ালার নিকট তাঁর সেই বেশভূষা ও আকৃতিতে গেলেন এবং তাকে ঠিক তেমনই বললেন, যেরূপ তিনি শ্বেত রোগীকে বলেছিলেন। এও তাকে ঠিক অনুরূপ জবাব দিল যেমন জবাব দিয়েছিল শ্বেতরোগী।

তখন ফেরেশতা বললেন, যদি তুমি মিথ্যাচারী হও, তবে আল্লাহ্ তোমাকে তেমন অবস্থায় করে দিন, যেমন তুমি ছিলে। শেষে ফেরেশতা অন্ধ লোকটির নিকট তাঁর আকৃতিতে আসলেন এবং বললেন, আমি একজন নিঃস্ব লোক, মুসাফির মানুষ; আমার সফরের সকল সম্বল শেষ হয়ে গেছে। আজ বাড়ি পৌঁছার ব্যাপারে আল্লাহ্ ব্যতীত কোন গতি নেই। তাই আমি তোমার নিকট সেই সত্তার নামে একটি ছাগী প্রার্থনা করছি যিনি তোমার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিয়েছেন আর আমি এ ছাগীটি নিয়ে আমার এ সফরে বাড়ি পৌঁছতে পারব। সে বলল, প্রকৃতপক্ষেই আমি অন্ধ ছিলাম। আল্লাহ্ আমার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিয়েছেন। আমি ফকীর ছিলাম। আল্লাহ্ আমাকে সম্পদশালী করেছেন। এখন তুমি যা চাও নিয়ে যাও। আল্লাহর কসম। আল্লাহর জন্য তুমি যা কিছু নিবে, তার জন্যে আজ আমি তোমার নিকট কোন প্রশংসাই দাবী করব না। তখন ফেরেশতা বললেন, তোমার সম্পদ তুমি রেখে দাও। তোমাদের তিন জনের পরীক্ষা নেয়া হল মাত্র। আল্লাহ্ তোমার উপর সন্তুষ্ট হয়েছেন আর তোমার সাথীদ্বয়ের উপর অসন্তুষ্ট হয়েছেন। সহিহ বুখারি : ৩৪৬৪, ৬৬৫৩, সহিহ মুসলিম : ২৯৬৪

১৯। ‌আল্লাহ অপেক্ষা কাউকে উত্তম বিচারক বা  ফয়সালাকারী হিসেবে মান্য করা

জাহিলিয়াতের ফয়সালা কাসনা করা আর আল্লাহ ফয়সালাকে অস্বীকার করা কুফরি কাজ। আর আল্লাহ অপেক্ষা উত্তম ফয়সালাকারী বা তার সমকক্ষ ভাবা তো একেবারে বড় শিরক। কেননা আল্লাহর ফয়সালাই কল্যান কর ও চুড়ান্ত। আল্লাহর শরীয়তে স্বীকৃত হয়নি এমন সব ফয়সালাকে বর্জন করতে হবে।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

اَفَغَیۡرَ اللّٰہِ اَبۡتَغِیۡ حَکَمًا وَّہُوَ الَّذِیۡۤ اَنۡزَلَ اِلَیۡکُمُ الۡکِتٰبَ مُفَصَّلًا ؕ وَالَّذِیۡنَ اٰتَیۡنٰہُمُ الۡکِتٰبَ یَعۡلَمُوۡنَ اَنَّہٗ مُنَزَّلٌ مِّنۡ رَّبِّکَ بِالۡحَقِّ فَلَا تَکُوۡنَنَّ مِنَ الۡمُمۡتَرِیۡنَ

আমি কি আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে বিচারক হিসেবে তালাশ করব? অথচ তিনিই তোমাদের নিকট বিস্তারিত কিতাব নাযিল করেছেন। আর যাদেরকে আমি কিতাব দিয়েছিলাম তারা জানত যে, তা তোমার রবের পক্ষ থেকে যথাযথভাবে নাযিলকৃত। সুতরাং তুমি কখনো সন্দেহকারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না। সুর আনাম : ১১৪

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

أَفَحُكۡمَ ٱلۡجَٰهِلِيَّةِ يَبۡغُونَۚ وَمَنۡ أَحۡسَنُ مِنَ ٱللَّهِ حُكۡمٗا لِّقَوۡمٖ يُوقِنُونَ

তারা কি তবে জাহিলিয়াতের বিধান চায়? আর দৃঢ় বিশ্বাসী কওমের জন্য বিধান প্রদানে আল্লাহর চেয়ে কে অধিক উত্তম?  সুরা মায়েদা : ৫০

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

قُلۡ اِنِّیۡ عَلٰی بَیِّنَۃٍ مِّنۡ رَّبِّیۡ وَکَذَّبۡتُمۡ بِہٖ ؕ مَا عِنۡدِیۡ مَا تَسۡتَعۡجِلُوۡنَ بِہٖ ؕ اِنِ الۡحُکۡمُ اِلَّا لِلّٰہِ ؕ یَقُصُّ الۡحَقَّ وَہُوَ خَیۡرُ الۡفٰصِلِیۡنَ

বল, ‘নিশ্চয় আমি আমার রবের পক্ষ থেকে স্পষ্ট প্রমাণের উপর রয়েছি আর তোমরা তা অস্বীকার করছ। তোমরা যা নিয়ে তাড়াহুড়া করছ তা আমার কাছে নেই। হুকুম কেবল আল্লাহর কাছে। তিনি সত্য বর্ণনা করেন এবং তিনি সর্বোত্তম ফয়সালাকারী’। সুরা আনাম : ৫৭

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

قُلۡ یَجۡمَعُ بَیۡنَنَا رَبُّنَا ثُمَّ یَفۡتَحُ بَیۡنَنَا بِالۡحَقِّ ؕ وَہُوَ الۡفَتَّاحُ الۡعَلِیۡمُ

বল, ‘আমাদের রব আমাদেরকে একত্র করবেন। তারপর তিনি আমাদের মধ্যে সঠিকভাবে ফয়সালা করবেন। আর তিনিই শ্রেষ্ঠ ফয়সালাকারী ও সম্যক পরিজ্ঞাত’। সুরা সাবা : ২৬

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ

যে সব লোক আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন সে অনুযায়ী ফয়সালা করে না তারাই কাফির। সুরা মায়িদাহ : ৪৪

আল্লাহ হচ্ছেন ফায়সালা করার যাবতীয় ক্ষমতার একমাত্র অধিকারী। অন্য কাউকে চুড়ান্ত ফায়সালা অধিকরী মনে করা শির্ক। সাধারনত মানুষকে কোন ফায়সালা করার ক্ষমতা দিলে আল্লাহ বিধান মতো ফায়সালা করতে হবে তখন এটাই আল্লাহর ফায়সালা বলে গন্য হবে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

ثُمَّ رُدُّوۡۤا اِلَی اللّٰہِ مَوۡلٰىہُمُ الۡحَقِّ ؕ اَلَا لَہُ الۡحُکۡمُ ۟ وَہُوَ اَسۡرَعُ الۡحٰسِبِیۡنَ

তারপর তাদেরকে প্রত্যাবর্তিত করা হয় তাদের সত্য অভিভাবক আল্লাহর কাছে। সাবধান! বিধান প্রদানের ক্ষমতা তাঁরই। আর তিনি হচ্ছেন খুব দ্রুত হিসাবকারী। সুরা আনআম : ৬২

আকিদা বা বিশ্বাসগত শিরকে আকবর : তৃতীয় পর্ব (২০-৩৮)

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

২০। আল্লাহ ছাড়া কেউ রাষ্ট্র ক্ষমতা দিতে পারেন বলে বিশ্বাস করা

রাষ্ট্রিয় ক্ষমতা লাভর জন্য সবাই লালায়িত। কিন্তু কে রাষ্ট্রিয় ক্ষমতা একছন্ন মালিক, নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ। যদি কেউ মনে করে জনগন, টাকা পয়সা, সুনাম সুখ্যাতি, আত্মীয়তার সম্পর্ক তাকে রাষ্ট্রিয় ক্ষমতা দান করবের তবে শির্ক করবে। অনেক সময় উপায় উপকরন হিসাবে এগুল ব্যবহার করা যায়, কিন্তু এগুলই এক মাত্র রাষ্ট্র ক্ষমতার উত্স মনে করা বড় শির্ক। যেমন অনেকে বলে থাকেন, “জনগনই সকল ক্ষমতার উত্স”। আল্লাহরকে একমাত্র সকল ক্ষমতার উত্স মেনে নিয়ে উক্ত কথাটি বললে ছোট শির্ক হবে কিন্তু উক্ত কথাটি মনে প্রানে বিশ্বাস করলে বড় শির্ক এতে কোন সন্দেহ নেই।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَٱللَّهُ يُؤۡتِى مُلۡڪَهُ ۥ مَن يَشَآءُ‌ۚ وَٱللَّهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ۬ (٢٤٧)

আর আল্লাহ তাঁর রাজ্য যাকে ইচ্ছা দান করার ইখতিয়ার রাখেন ৷ আল্লাহ অত্যন্ত ব্যাপকতার অধিকারী এবং সবকিছুই তাঁর জ্ঞান সীমার মধ্যে রয়েছে। সুরা বাকারা : ২৪৭

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

 قُلِ ٱللَّهُمَّ مَـٰلِكَ ٱلۡمُلۡكِ تُؤۡتِى ٱلۡمُلۡكَ مَن تَشَآءُ وَتَنزِعُ ٱلۡمُلۡكَ مِمَّن تَشَآءُ وَتُعِزُّ مَن تَشَآءُ وَتُذِلُّ مَن تَشَآءُ‌ۖ بِيَدِكَ ٱلۡخَيۡرُ‌ۖ إِنَّكَ عَلَىٰ كُلِّ شَىۡءٍ۬ قَدِيرٌ۬

বল, হে আল্লাহ! বিশ্ব জাহানের মালিক! তুমি যাকে চাও রাষ্ট্রক্ষমতা দান করো এবং যার থেকে চাও রাষ্ট্রক্ষমতা ছিনিয়ে নাও৷ যাকে চাও মর্যাদা ও ইজ্জত দান করো এবং যাকে চাও লাঞ্জিত ও হেয় করো৷ কল্যাণ তোমরা হাতেই নিহিত ৷ নিসন্দেহে তুমি সবকিছুর ওপর শক্তিশালী। সুরা আল ইমরান : ২৬

মহান আল্লাহ তাআলা ওয়াদা করছেন তিনি অবশ্য দুনিয়তে রাষ্ট্রিয় ক্ষমতা দান করবেন। কিন্তু তিনি দুটি শর্থ আরোপ করছেন।

১। ঈমান আনতে হবে।

২। আমলে সালেহা করতে হবে।

নিশ্চয়ই আল্লাহ প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেনা। কাজেই বান্দাকে উক্ত দুটি কাজ করে আল্লাহর শর্থ পূরন করে রাষ্ট্রিয় ক্ষমতা অর্জনের চেষ্টা করতে হবে। যেমন নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তার একনিষ্ঠ সাহাবিগন যখন উক্ত শর্থ পূরন করলেন তখনই আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে রাষ্ট্রিয় ক্ষমতা দিলেন।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَعَدَ ٱللَّهُ ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ مِنكُمۡ وَعَمِلُواْ ٱلصَّـٰلِحَـٰتِ لَيَسۡتَخۡلِفَنَّهُمۡ فِى ٱلۡأَرۡضِ ڪَمَا ٱسۡتَخۡلَفَ ٱلَّذِينَ مِن قَبۡلِهِم 

আল্লাহ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তোমাদের মধ্য থেকে যারা ঈমান আনবে ও সৎ কাজ করবে তাদেরকে তিনি পৃথিবীতে ঠিক তেমনিভাবে খিলাফত দান করবেন যেমন তাদের পূর্বে অতিক্রান্ত লোকদেরকে দান করেছিলেন। সুরা নুর : ৫৫

২১। শরীয়াতের বিধান প্রণয়নে আল্লাহর সাথে গাইরুল্লাহকে সম্পৃক্ত করা

রাস্ট্র, সমাজ ও পরিবার চলার নিয়ম নিতী, পদ্ধতি নির্দেশনা ও বিধান প্রণয়নের অধিকার সবই একমাত্র মহান আল্লাহর জন্যই সংরক্ষিত। ইসলামের দৃষ্টিতে এ বিষয়ে অন্য কারো সামান্য অধিকার নেই। তাইতো, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

أَمۡ لَهُمۡ شُرَڪَـٰٓؤُاْ شَرَعُواْ لَهُم مِّنَ ٱلدِّينِ مَا لَمۡ يَأۡذَنۢ بِهِ ٱللَّهُ‌ۚ وَلَوۡلَا ڪَلِمَةُ ٱلۡفَصۡلِ لَقُضِىَ بَيۡنَہُمۡ‌ۗ وَإِنَّ ٱلظَّـٰلِمِينَ لَهُمۡ عَذَابٌ أَلِيمٌ۬

 এসব লোক কি আল্লাহর এমন কোন শরীকে বিশ্বাস করে যে, এদের জন্য দীনের মত এমন একটি পদ্ধতি নির্ধারিত করে দিয়েছে আল্লাহ যার অনুমোদন দেননি। যদি ফায়সালার বিষয়টি পূর্বেই মীমাংসিত হয়ে না থাকতো, তাহলে তাদের বিবাদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত দিয়ে দেয়া হতো৷এ জালেমদের জন্য নিশ্চিত কষ্টদায়ক শাস্তি রয়েছে। আশ শুয়ারা :২১

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন

أَلَا لَهُ ٱلۡخَلۡقُ وَٱلۡأَمۡرُ‌ۗ تَبَارَكَ ٱللَّهُ رَبُّ ٱلۡعَـٰلَمِينَ

জেনে রাখো, সৃষ্টি তারই এবং নির্দেশও তাঁরই৷ আল্লাহ বড়ই বরকতের অধিকারী। তিনি সমগ্র বিশ্ব জাহানের মালিক ও প্রতিপালক। সুরা আরাফ : ৫৪

আমাদের প্রিয় নবী যার মাধ্যমে আমাদের দ্বীন দান করা হইয়াছে তাকেও হালাল হারাম করার নিজেস্ব কোন ক্ষমতা দান করা হয় রাই। আল্লাহ তায়ালা বলেন,

يَـٰٓأَيُّہَا ٱلنَّبِىُّ لِمَ تُحَرِّمُ مَآ أَحَلَّ ٱللَّهُ لَكَ‌ۖ تَبۡتَغِى مَرۡضَاتَ أَزۡوَٲجِكَ‌ۚ وَٱللَّهُ غَفُورٌ۬ رَّحِيمٌ۬

হে নবী, আল্লাহ তোমার জন্য যা হালাল করেছেন তোমার স্ত্রীদের সন্তুষ্টি কামনায় তুমি কেন তা হারাম করছ? আর আল্লাহ অতীব ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। সুরা তাহরিম : ০১

তবে মনে রাখতে হবে, দ্বীনে হুকুম আহকাম ইবাদাত বন্দেগির ক্ষেতে আর কোন সংযোজন বিয়োযনের অধিকার কারে নেই। কনেনা আল্লাহ তা‘আলা স্পষ্টভাবে আল কুরআনে উল্লেখ করেছেন,

الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الإِسْلاَمَ دِيناً

আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম। আমার নিয়ামত পূর্ণরূপে তোমাদেরকে প্রদান করলাম। ইসলামকে দীন হিসাবে তোমাদের জন্য মনোনীত করলাম। সুরা সুর মায়েদা : ৩

তবে দুনিয়া সংস্লিষ্ট কিছু নতুন নতুন বিষয়ে যে গুলি এড়িয়ে দ্বীন পালন করা সম্ভব নয়। আবার সরাসরি আল্লাহ তাআলা সে বিধান গুলি স্পষ্ট বলে দেন নি। তখন কুরআন সুন্নার ভিত্ততে শরীয়ত সম্মত কোন বিধান প্রণয়ন করাতে কোনো দোষ নেই। কিন্তু মানুষ আল্লাহর বিধানকে সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাগ করে শরীয়ত বিরোধী মানুষের তৈরী বিধানকে নিয়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করছে, যা নিঃসন্দেহে শির্ক ও কুফরী। আর এইরুপ ফায়সালা করিকে আল্লাহ কাফির, জালিম ও ফাসিক বলে উল্লখ করেছেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَمَن لَّمۡ يَحۡكُم بِمَآ أَنزَلَ ٱللَّهُ فَأُوْلَـٰٓٮِٕكَ هُمُ ٱلۡكَـٰفِرُونَ

যেসব লোক আল্লাহ্ যা অবতীর্ণ করেছেন, তদনুযায়ী ফায়সালা করে না, তারাই কাফের। সুরা মায়েদা : ৪৪

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

‌ۚ وَمَن لَّمۡ يَحۡڪُم بِمَآ أَنزَلَ ٱللَّهُ فَأُوْلَـٰٓٮِٕكَ هُمُ ٱلظَّـٰلِمُونَ  

যেসব লোক আল্লাহ্ যা অবতীর্ণ করেছেন, তদনুযায়ী ফয়সালা করে না তারাই জালেম। সুরা মায়েদা : ৪৫

আল্লাহ তায়ালা বলেন,

  ۚ إِلَى ٱللَّهِ مَرۡجِعُڪُمۡ جَمِيعً۬ا فَيُنَبِّئُكُم بِمَا كُنتُمۡ فِيهِ تَخۡتَلِفُونَ  

যারা আল্লাহ্ যা অবতীর্ণ করেছেন, তদনুযায়ী ফয়সালা করে না, তারাই ফাসেক। সুরা মায়েদা : ৪৭

২২।  মানুষের নির্যাতনকে আল্লাহর আযাবের মত মনে করা

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদের দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন পরীক্ষা করার জন্য তাই অনেক সময় বিপদ আপদ আসবেই। ঈমানদারের কাজ হল সবর করা। আর যদি সে দুনিয়ার কোন মানুষ দ্বারা নির্যাতিত হয় আর সেই নির্যাতনকে আল্লাহর আযাবের মত মনে করে তবে শির্ক হবে। এই জন্য আল্লাহর দ্বীনাকে এমনভাবে বুঝে নিতে হবে যেন, আল্লাহ ও রাসুলের হুকুম পালনের সময় বিপদ আপদ আমলে ঈমানের ক্ষতি না হয়।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

 وَلَنَبۡلُوَنَّكُم بِشَىۡءٍ۬ مِّنَ ٱلۡخَوۡفِ وَٱلۡجُوعِ وَنَقۡصٍ۬ مِّنَ ٱلۡأَمۡوَٲلِ وَٱلۡأَنفُسِ وَٱلثَّمَرَٲتِ‌ۗ وَبَشِّرِ ٱلصَّـٰبِرِينَ

নিশ্চিত থেকো, আমি তোমাদের ভয়, ক্ষুধা, সম্পদ, জীবন অথবা ফলের ক্ষয়ক্ষতি দ্বারা পরীক্ষা করবো। কিন্তু যারা ধৈর্য্যের সাথে অধ্যাবসায়ীয় হয়, তাদের শুভ সংবাদ দাও। সুরা বাকারা : ১৫৫

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَمِنَ ٱلنَّاسِ مَن يَقُولُ ءَامَنَّا بِٱللَّهِ فَإِذَآ أُوذِيَ فِي ٱللَّهِ جَعَلَ فِتۡنَةَ ٱلنَّاسِ كَعَذَابِ ٱللَّهِۖ ﴾ [العنكبوت

কতক লোক বলে, আমরা আল্লাহর উপর ঈমান স্থাপন করেছি; কিন্তু আল্লাহর পথে যখন তারা নির্যাতিত হয়, তখন তারা মানুষের নির্যাতনকে আল্লাহর আযাবের মত মনে করে। সুরা আরকাবুত : ১০

২৩। পৃথিবীর সকল ধর্মই সঠিক বলে বিশ্বাস করা

আল্লাহর এক মাত্র মনোনিত দ্বীনে (ধর্ম) হল ইসলাম। যদি কেউ মনে করে সকল ধর্মই সঠিক তাহলে সে দ্বীনের বিধি বিধানের সাথে অন্য ধর্মের শিরকি বিধারকেও স্বীকৃতি দিল। শির্কি বিধারকেও স্বীকৃতি দেওয়ার ফলে সে মুশরিক বলে বিবেচিত হবে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَمَن يَبۡتَغِ غَيۡرَ ٱلۡإِسۡلَـٰمِ دِينً۬ا فَلَن يُقۡبَلَ مِنۡهُ وَهُوَ فِى ٱلۡأَخِرَةِ مِنَ ٱلۡخَـٰسِرِينَ

 ইসলাম ছাড়া যে ব্যক্তি অন্য কোন পদ্ধতি অবলম্বন করতে চায় তার সে পদ্ধতি কখনোই গ্রহণ করা হবে না এবং সে হবে আখিরাতে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভূক্ত। সুরা আল ইমরান : ৮৫

সমগ্র দুনিয়ার সকল সৃষ্টির একমাত্র দ্বীন হল ইসলাম। আকাশ ও পৃথিবীর সবকিছুই আল্লাহর আনুগত্য ও দাসত্ব। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

 أَفَغَيۡرَ دِينِ ٱللَّهِ يَبۡغُونَ وَلَهُ ۥۤ أَسۡلَمَ مَن فِى ٱلسَّمَـٰوَٲتِ وَٱلۡأَرۡضِ طَوۡعً۬ا وَڪَرۡهً۬ا وَإِلَيۡهِ يُرۡجَعُونَ

এখন কি এরা আল্লাহর আনুগত্যের পথ ত্যাগ করে অন্য কোন পথের সন্ধান করছে? অথচ আকাশ ও পৃথিবীর সবকিছুই স্বেচ্ছায় বা অনিচ্ছায় আল্লাহর হুকুমের অনুগত এবং তাঁরই দিকে সবাইকে ফিরে যেতে হবে ৷ সুরা আল ইমরান : ৮৩

তবে আমরা সকল নবী রসুলকে সমান ভাবে স্বীকার করি ও মান্য করি। তাদের আনিত দ্বীন সঠিক ছিল। তার অনুসারিরাই তাদের দ্বীনকে বিকৃতি করেছে। আমরা  দুনিয়ার যেখানেই আল্লাহর যে বান্দাই আল্লাহর পক্ষ থেকে সত্যের পয়গাম এনেছেন আমরা তার সত্যতার সাক্ষ দিচ্ছি। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

 قُلۡ ءَامَنَّا بِٱللَّهِ وَمَآ أُنزِلَ عَلَيۡنَا وَمَآ أُنزِلَ عَلَىٰٓ إِبۡرَٲهِيمَ وَإِسۡمَـٰعِيلَ وَإِسۡحَـٰقَ وَيَعۡقُوبَ وَٱلۡأَسۡبَاطِ وَمَآ أُوتِىَ مُوسَىٰ وَعِيسَىٰ وَٱلنَّبِيُّونَ مِن رَّبِّهِمۡ لَا نُفَرِّقُ بَيۡنَ أَحَدٍ۬ مِّنۡهُمۡ وَنَحۡنُ لَهُ ۥ مُسۡلِمُونَ

বল, ‘আমরা ঈমান এনেছি আল্লাহর প্রতি এবং যা নাযিল করা হয়েছে আমাদের উপর, আর যা নাযিল হয়েছে ইবরাহীম, ইসমাঈল, ইসহাক, ইয়াকূব ও তাদের সন্তানদের উপর। আর যা দেয়া হয়েছে মূসা, ঈসা ও অন্যান্য নবীকে তাদের রবের পক্ষ থেকে, আমরা তাদের কারো মধ্যে পার্থক্য করি না এবং আমরা তারই প্রতি আত্মসমর্পণকারী’। সুরা আল ইমরান : ৮৪

২৪। কথিত অলীগণ তাদের অন্তর দৃষ্টি দিয়ে অদৃশ্যের খবর রাখতে পাবে

অদৃশ্যের সব কিছু শুনতে এবং দেখতে পাওয়া মহান আল্লাহর একক গুন। এমনকি কোন নবী রসূলকে ও এই গুনদুটি দেওয়া হয় নাই। আমাদের নবী মুহম্মাদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম  যিনি নবীদের সরদার তিনিও সবকিছু শুনতে বা অন্তর দৃষ্টিদিয়ে দেখতে পারতেন না। যেমন সুরা তাহরিমের ৩ নম্বর আয়তটির শেষ অংশ লক্ষ করুন। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

 وَإِذۡ أَسَرَّ ٱلنَّبِىُّ إِلَىٰ بَعۡضِ أَزۡوَٲجِهِۦ حَدِيثً۬ا فَلَمَّا نَبَّأَتۡ بِهِۦ وَأَظۡهَرَهُ ٱللَّهُ عَلَيۡهِ عَرَّفَ بَعۡضَهُ ۥ وَأَعۡرَضَ عَنۢ بَعۡضٍ۬‌ۖ فَلَمَّا نَبَّأَهَا بِهِۦ قَالَتۡ مَنۡ أَنۢبَأَكَ هَـٰذَا‌ۖ قَالَ نَبَّأَنِىَ ٱلۡعَلِيمُ ٱلۡخَبِيرُ

আর যখন নবী তার এক স্ত্রীকে গোপনে একটি কথা বলেছিলেন; অতঃপর যখন সে (স্ত্রী) অন্যকে তা জানিয়ে দিল এবং আল্লাহ তার (নবীর) কাছে এটি প্রকাশ করে দিলেন, তখন নবী কিছুটা তার স্ত্রীকে অবহিত করল আর কিছু এড়িয়ে গেল। যখন সে তাকে বিষয়টি জানাল তখন সে বলল, ‘আপনাকে এ সংবাদ কে দিল?’ সে বলল, ‘মহাজ্ঞানী ও সর্বজ্ঞ আল্লাহ আমাকে জানিয়েছেন।’ সুরা তাহরিমের : ৩

নবী মুহম্মাদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সবকিছু শুনতে বা অন্তর দৃষ্টিদিয়ে দেখতে পারতেন না। এটাই কুরআনের ঘোষনা। তা হলে পীর বা অলী অবস্থান কোথায়?

মহান আল্লাহর ঘোষনা, তিনি পৃথিবীতে ও আকাশে যা কিছু হয়, কিছুই তার অগোচরে হয় না। এমনকি

অনু পরমানু পরিমান কোন জিনিস নেই, যা তার দৃষ্টিতে অগোচরে আছে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

 وَمَا تَكُونُ فِى شَأۡنٍ۬ وَمَا تَتۡلُواْ مِنۡهُ مِن قُرۡءَانٍ۬ وَلَا تَعۡمَلُونَ مِنۡ عَمَلٍ إِلَّا ڪُنَّا عَلَيۡكُمۡ شُہُودًا إِذۡ تُفِيضُونَ فِيهِ‌ۚ وَمَا يَعۡزُبُ عَن رَّبِّكَ مِن مِّثۡقَالِ ذَرَّةٍ۬ فِى ٱلۡأَرۡضِ وَلَا فِى ٱلسَّمَآءِ وَلَآ أَصۡغَرَ مِن ذَٲلِكَ وَلَآ أَكۡبَرَ إِلَّا فِى كِتَـٰبٍ۬ مُّبِينٍ (٦١)

হে নবী! তুমি যে অবস্থায়ই থাকো এবং কুরআন থেকে যা কিছুই শুনাতে থাকো৷ আর হে লোকরা ,তোমরাও যা কিছু করো সে সবের মধ্যে আমি তোমাদের দেখতে থাকি৷ আকাশ ও পৃথিবীর মধ্যে কোন অণুপরিমাণ বস্তুও এমন নেই, এবং তার চেয়ে ছোট বা বড় কোন জিনিস ও নেই, যা তোমাদের রবের দৃষ্টিতে অগোচরে আছে এবং যা একটি সুষ্পষ্ট কিতাবে লেখা নেই৷ সুরা ইউনুস : ৬১

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

 إِنَّ ٱللَّهَ لَا يَخۡفَىٰ عَلَيۡهِ شَىۡءٌ۬ فِى ٱلۡأَرۡضِ وَلَا فِى ٱلسَّمَآءِ (٥) 

পৃথিবী ও আকাশের কোন কিছুই আল্লাহর কাছে গোপন নেই। আল ইমরান : ৫

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

سَنُقۡرِئُكَ فَلَا تَنسَىٰٓ (٦) إِلَّا مَا شَآءَ ٱللَّهُ‌ۚ إِنَّهُ ۥ يَعۡلَمُ ٱلۡجَهۡرَ وَمَا يَخۡفَىٰ (٧) 

আমি তোমাকে পড়িয়ে দেবো, তারপর তুমি আর ভুলবে না৷ তবে আল্লাহ যা চান তা ছাড়া। তিনি জানেন প্রকাশ্য এবং যা কিছু গোপন আছে তাও৷ সুরা আলা : ৬-৭

সুতারং সমস্ত কিছে শুনতে ও দেখতে পাওয়া আল্লাহর একটি একক গুন। আর এই গুনটির সাথে তারই সৃষ্টির শরীক সাব্যস্ত করা শির্কে আকবার বা বড় শির্ক।  

২৫। এ কথা বিশ্বাস করা যে পীর বা অলীগণ মুরিদের অন্তরের খবর রাখেন

কথিত আছে, পীরের দরবারে অপরিচিত কেউ পৌছা মাত্র তার মনের কথাও বলে দেন। তাহলে প্রশ্ন হল, মহান আল্লাহ ছাড়া কেউ অন্তেরের খবর রাখেন? মহান আল্লাহ ছাড়া কেউ অন্তেরের খবর রাখেন এরূপ ধারনা রাখলে বান্দা ইসলাম থকে খারিজ হয়ে যাবে। মুমিন হিসাবে মনে রাখতে হবে দুনিয়ায় জীবন যাপনকালে আমাদের সকল কার্যাবলি যতই গোপন হোক না কেন সে সম্পর্কে অবশ্যই আল্লাহ অবগত আছেন। এমন কি আমদের মনের নিয়ত ও ধ্যান ধারণা পর্যন্ত মহান আল্লাহর অজানা নয়। আমাদের নবী মুহম্মাদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনায় ইসলাম প্রচার কালে মুনফিকদের নানা চক্রান্তের শিকার হয়েছে কিন্তু আল্লাহ অহীর সাহয্য না জানান পর্যান্ত কিছু্‌ই জাতেন না।

আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোন এক প্রয়োজনে সত্তরজন সাহাবীকে পাঠালেন, যাদের ক্বারী বলা হত। বানী সুলায়ম গোত্রের দু’টি শাখা- রিল ও যাকওয়ান বি’রে মাউনা নামক একটি কূপের নিকট তাদেরকে আক্রমণ করলে তাঁরা বললেন, আল্লাহর কসম! আমরা তোমাদের সঙ্গে লড়াই করার উদ্দেশে আসিনি। আমরা তো কেবল নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নির্দেশিত একটি কাজের জন্য এ পথ দিয়ে যাচ্ছি। তখন তারা তাদেরকে হত্যা করে ফেলল। তাই নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক মাস পর্যন্ত ফজরের সালাতে তাদের জন্য বদদু‘আ করলেন। এভাবেই কুনূত পড়া শুরু হয়। এর পূর্বে আমরা কুনূত পড়িনি। ‘আবদুল ‘আযীয (রহ.) বলেন, এক ব্যক্তি আনাস (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলেন, কুনূত কি রুকূর পর পড়তে হবে, না কিরাআত শেষ করে পড়তে হবে? উত্তরে তিনি বললেন, না বরং কিরাআত শেষ করে পড়তে হবে। সহিহ বুখারি : ৪০৮৮

নবী মুহম্মাদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি মুনাফিকদের মনের কথা জানার পরও তার প্রিয় সাহাবিদের বিশ্বাস ঘাতকদের হাতে তুলে দেন? অবশ্যই না, তিনি মনের কথা জানার পরও এমন কাজ করতে পারেন না। তাহলে বুঝা গেল নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মনের খবর জানেন না। তাহলে পীরে অবস্থা বুঝে নেন। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ কি বলেন? মহান আল্লাহর ঘোষনা তিনি ছাড়া কেউই জানেনা অন্তরের খবর। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

 وَأَسِرُّواْ قَوۡلَكُمۡ أَوِ ٱجۡهَرُواْ بِهِۦۤ‌ۖ إِنَّهُ ۥ عَلِيمُۢ بِذَاتِ ٱلصُّدُورِ (١٣) أَلَا يَعۡلَمُ مَنۡ خَلَقَ وَهُوَ ٱللَّطِيفُ ٱلۡخَبِيرُ (١٤)

আর তোমরা তোমাদের কথা গোপন কর অথবা তা প্রকাশ কর, নিশ্চয় তিনি অন্তরসমূহে যা আছে সে বিষয়ে সম্যক অবগত। যিনি সৃষ্টি করেছেন, তিনি কি জানেন না? অথচ তিনি অতি সূক্ষ্মদর্শী, পূর্ণ অবহিত। সুরা মুলক : ১৩-১৪

২৬আল্লাহ্ তাআলা ছাড়াও অন্য কেউ কারোর অন্তর পরিবর্তন ঘটাতে পারে

শাহর ইবন হাওশাব রহ. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি উম্মু সালামা রা. কে বললাম, হে উম্মুল মুমিনীন! রাসূলুল্লাহ ﷺ যখন আপনার কাছে অবস্থান করতেন তখন অধিকাংশ সময় তিনি কি দুয়া করতেন? তিনি বললেন, তাঁর অধিকাংশ দু’আ ছিল-

يَا مُقَلِّبَ الْقُلُوبِ ثَبِّتْ قَلْبِي عَلَى دِينِكَ

উচ্চারণঃ ইয়া মুকাল্লিবাল কুলূব ছাব্বিত কালবী আলা দীনিকা

অর্থঃ হে অন্তর পরিবর্তনকারি! আমার অন্তর তুমি তোমার দীনে সুদৃঢ় রাখ।

নি বলেনঃ আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি অধিকাংশ সময় এই দু’আ কেন করেন যে, ইয়া মুকাল্লিবাল কুলূব ছাব্বিত কালবী আলা দীনিকা? তিনি বললেনঃ হে উম্মু সালামা! এমন কোন মানুষ নেই যার অন্তর আল্লহ ত’আলার অঙ্গুলীসমূহের দুই অঙ্গুলের মাঝে নেই। যাকে তিনি ইচ্ছা তাকে তিনি দিনের উপর কায়েম রাখেন, যাকে ইচ্ছা তিনি সরিয়ে দেন। রাবি মুআয (রহঃ) এই আয়াতটি তিলাওয়াত করলেনঃ

ربَّنَا لاَ تُزِغْ قُلُوبَنَا بَعْدَ إِذْ هَدَيْتَنَا

হে আমাদের রব্ব! হেদায়তের পর তুমি আমাদের অন্তর বক্র করে দিও না, সুরা আল ইমরান-৮।

সুনানে তিরমিজি : ৩৫২২

আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ এই দু‘আ অধিক পাঠ করতেন-

يَا مُقَلِّبَ الْقُلُوبِ ثَبِّتْ قَلْبِي عَلَى دِينِكَ

উচ্চারণঃ ইয়া মুকাল্লিবাল কুলূব ছাব্বিত কালবী আলা দীনিকা

হে অন্তরসমূহের পরিবর্তনকারী! আমার অন্তরকে তোমার দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত  রাখো। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা ঈমান এনেছি আপনার উপর এবং আপনি যা নিয়ে এসেছেন তার উপর। আপনি আমাদের ব্যাপারে কি কোনরকম আশংকা করেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ, কেননা, আল্লাহ্ তা‘আলার আঙ্গুলসমূহের মধ্যকার দুটি আঙ্গুলের মাঝে সমস্ত অন্তরই অবস্থিত। তিনি যেভাবে ইচ্ছা তা পরিবর্তন করেন। সুনানে তিরমিজি : ২১৪০, সুনানে ইবনু মাজাহ : ৩৮৩৪)

আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী ﷺ অধিকাংশ সময় কসম করতেন এই বলে, না। তাঁর কসম, যিনি অন্তরসমূহ পরিবর্তন করে দেন। সহিহ বুখারি : ৭৩৯১

ইবনু উমার বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ ﷺ এর অধিকাংশ শপথ ছিল, না, অন্তরসমূহের পরিবর্তনকারীর শপথ। সহহি বুখারি : ৬৬১৭, ৬৬২৮, ১৫৪০ সুনানে ইবনে মাজাহ : ২০৯২, সুনানে নাসায়ী : ৩৭৬১, ৩৭৬২, সুনানে আবূ দাউদ : ৩২৬৩

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মানুষের অন্তর পরিবর্তন করার ক্ষমতা রাখেন। যার ইচ্ছা তার অন্তর পরির্তন করে থাকেন। কাজেই কেউ যদি বিশ্বাস করে কোন পীর, ফরিক মানুষের অন্তর পরিবর্তন করে দিতে পারেন তবে সে শিকরি আকিদা প্রষণ করল। সে কাফির হয়ে যাবে।

২৭। আল্লাহ বিধান বাদ দিয়ে অধিকাংশের মতামতই সত্যের মাপকাঠি বিশ্বাস করা

 দ্বীন সম্পর্কে সঠিক জ্ঞানের অভাবে অধিকাংশ লোক নির্ভুল জ্ঞানের পরিবর্তে কেবলমাত্র আন্দাজ অনুমানের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ফলে তাদের আকীদা, বিশ্বাস, দর্শন, চিন্তাধারা, জীবন যাপনের মূলনীতি ও কর্মবিধান সবকিছুই ধারণা ও অনুমানের ভিত্তিতে গড়ে। কাজেই দুনিয়ার বেশীর ভাগ লোক কোন পথে যাচ্ছে, কি বিশ্বাস করছে, কি আমল করছে, কোন তরিকা অনুসরন করছে, কোন সত্য সন্ধানীর এটা দেখা উচিত নয়। বরং আল্লাহ যে পথটি তৈরী করে দিয়েছেন তার ওপরই তার দৃঢ় পদক্ষেপে এগিয়ে চলা উচিত। এ পথে চলতে গিয়ে দুনিয়ায় যদি সে অধিকাংশের মতামত ত্যাগ করে একাকী চলতে হয়, তবে তাই করতে হবে। তাহলে দুনিয়া ও আখেরাতে সফলকাম হওয়া যাবে। এর ব্যতিক্রম করলে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করে ফেলবে৷ আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

 وَإِن تُطِعۡ أَڪۡثَرَ مَن فِى ٱلۡأَرۡضِ يُضِلُّوكَ عَن سَبِيلِ ٱللَّهِ‌ۚ إِن يَتَّبِعُونَ إِلَّا ٱلظَّنَّ وَإِنۡ هُمۡ إِلَّا يَخۡرُصُونَ (١١٦) إِنَّ رَبَّكَ هُوَ أَعۡلَمُ مَن يَضِلُّ عَن سَبِيلِهِۦ‌ۖ وَهُوَ أَعۡلَمُ بِٱلۡمُهۡتَدِينَ (١١٧)

আর হে মুহাম্মাদ! যদি তুমি দুনিয়ায় বসবাসকারী অধিকাংশ লোকের কথায় চলো তাহলে তারা তোমাকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করে ফেলবে৷ তারা তো চলে নিছক আন্দাজ-অনুমানের ভিত্তিতে এবং তারা কেবল আন্দাজ-অনুমানই করে থাকে৷ সুরা আনআম : ১১৬-১১৭

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

أَءِلَـٰهٌ۬ مَّعَ ٱللَّهِ‌ۚ بَلۡ أَڪۡثَرُهُمۡ لَا يَعۡلَمُونَ (٦١)

আল্লাহর সাথে কি অন্য কোন ইলাহ আছে? বরং তাদের অধিকাংশই জানে না। সুরা নমল : ৬১

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

 وَمَا ظَنُّ ٱلَّذِينَ يَفۡتَرُونَ عَلَى ٱللَّهِ ٱلۡڪَذِبَ يَوۡمَ ٱلۡقِيَـٰمَةِ‌ۗ إِنَّ ٱللَّهَ لَذُو فَضۡلٍ عَلَى ٱلنَّاسِ وَلَـٰكِنَّ أَكۡثَرَهُمۡ لَا يَشۡكُرُونَ

আর যারা আল্লাহর নামে মিথ্যা রটাচ্ছে, তাদের কী ধারণা, কিয়ামতের দিন সম্পর্কে? নিশ্চয় আল্লাহ মানুষের উপর অনুগ্রহশীল। কিন্তু তাদের অধিকাংশ শোকর করে না। (সুরা ইউনুস ১০:৬০

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

 إِنَّ فِى ذَٲلِكَ لَأَيَةً۬‌ۖ وَمَا كَانَ أَكۡثَرُهُم مُّؤۡمِنِينَ 

নিশ্চয়ই তার মধ্যে একটি নিদর্শন রয়েছে, কিন্তু তাদের অধিকাংশই মুমিন নয়৷  সুরা শুআরা : ১০৩

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

بَلۡ أَكۡثَرُهُمۡ لَا يَعۡلَمُونَ ٱلۡحَقَّ‌ۖ فَهُم مُّعۡرِضُونَ

কিন্তু তাদের অধিকাংশ লোকই প্রকৃত সত্য থেকে বেখবর, কাজেই মুখ ফিরিয়ে আছে৷ সুরা আম্বিয়া : ২৪

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

بَلۡ جَآءَهُم بِٱلۡحَقِّ وَأَڪۡثَرُهُمۡ لِلۡحَقِّ كَـٰرِهُونَ 

অথবা তারা কি একথা বলে যে, সে উন্মাদ?  না, বরং সে সত্য নিয়ে এসেছে এবং সত্যই তাদের অধিকাংশের কাছে অপছন্দনীয়৷  সুরা মুমিনুন ২৩:৭০

আরো দেখুন-

সুরা আরাফ : ১৩১, সুরা যুমার : ২৯, সুরা কাসাস : ১৩, সুরা আনাম : ৭৩, সুরা ফুরকান : ৫০, সুরা ইউসুফ : ৩৮, সুরা শুআরা : ৬৭, ১২১, ১৩৯, ১৫৮, ১৭৪ ও ১৯০

 সহজ কথা হলো দ্বীনের কাজ গুলো কে লোকদের উপস্থিতি দেখে পরিমাপ করা যাবে না বরং কুরআন ও সহহি হাদিস দ্বারা পরিমাপ করতে হবে। আমার অনেকেরই ধারণা করে থাকি অধিকাংশ লোক সাধারনত যা করে তাই সঠিক। তাইতো দেখা যায় কোন দ্বীনের বিষয়ে কোন  ভূল আমল সংশোধনের কথা বললে, পাল্টা প্রশ্ন করেন, অধিকাংশ মানুষ কি ভূল করছে? আবার অনকেই এও বলে থাকে এতগুলো লোক কি একসাথে ভুল করতে পারে? তাদের বিশ্বাস অধিকাংশ মানুষ অনুসরণই সঠিক। অধিকাংশ মানুষের ভুল কম হয়। তবে হ্যা, অনেক সময় অধিকাংশ লোকের মতামত সঠিক হতেও পারে। এমন আলেমবৃন্দ যাদের দ্বীনের সঠিক জ্ঞান আছে, তাদের মধ্যে অধিকাংশের মতামত, যা কুরআন সুন্নাহ ভিত্তিতে দিয়ে থাকেন। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্টতা বা অধিকাংশ লোক কখন সত্যের মাপকাঠি হতে পারে না। এক মাত্র কুরআন সুন্নাহ সত্যের (ইসলামের) মাপকাঠি। কুরআন সুন্নাহ (আল্লাহর আদেশের) বিপরীতে সংখ্যাগরিষ্টতার বা অধিকাংশের মতামতকে সত্যের মাপকাঠি মানা নিন্দেহ কবিরা গুনাহ। অপর পক্ষে অধিকাংশ লোক সত্যের মাপকাঠি বা অনুসরনীয় নয় তার কেননা উপরের আয়াতগুলিতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেছেন, সমাজের অধিকাংশ লোক হবে অজ্ঞ, ঈমানহীন, জালিম, অকৃতজ্ঞ, পাপি, পথভ্রষ্ট, মিথ্যুক, সত্য বিমুখ।

২৮অল্প সংখ্যক মানুষ কখনোও সত্যোর মাপকাঠি নয় বলে বিশ্বাস করা

সমাজ জীবনে দেখা যায় জ্ঞানী লোকের সংখ্যা খুবই কম। আপনি ভাল লোক খুজবেন পাওয়া খুবই দুস্কর। নামাজী লোক খুজবেন, পাওয়া যাবে কিন্তু সংখ্যায় খুবই নগন্য। এমনিভাবে জাগতিক বিষয় ও যদি খোজ করেন দেখবেন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ব্যবসায়ী লোকের সংখ্যা অনেক কম। তাই নির্দিধায় বলা যায় ভাল মানুষ অল্পই হয়। কুরআনে অধিকাংশে লোক যেমন খারাপ বলে উল্লেখ করেছেন ঠিক তেমনি ভাবে অল্প সংখ্যক লোক কে হক বা উত্তম আলে উল্লেখ করেছেন। কুরআন ও সহিহ হাদিসে বিরোধী বিশ্বাস করা কুফরির নামান্তর। কাজেই অল্প সংখ্যক মানুষ কখনোও সত্যোর মাপকাঠি নয় এমন ধারনা কুরআন বিরোধী। বরং কুরআন ও সহিহ হাদিসে আলোকে অল্প সংখ্যক মানুষই হকের উপর থাকবে বলে বারবার ঘোষনা প্রদান করা হইয়াছে

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَہُوَ الَّذِیۡۤ اَنۡشَاَ لَکُمُ السَّمۡعَ وَالۡاَبۡصَارَ وَالۡاَفۡـِٕدَۃَ ؕ قَلِیۡلًا مَّا تَشۡکُرُوۡنَ

আর তিনিই তোমাদের জন্য কান, চোখসমূহ ও অন্তরসমূহ সৃষ্টি করেছেন; তোমরা কমই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর। সুরা মুমিনুন : ৭৮

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَمَا یَسۡتَوِی الۡاَعۡمٰی وَالۡبَصِیۡرُ ۬ۙ وَالَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَعَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ وَلَا الۡمُسِیۡٓءُ ؕ قَلِیۡلًا مَّا تَتَذَکَّرُوۡنَ

সমান নয় অন্ধ ও চক্ষুম্মান এবং যারা ঈমান আনে ও সৎ কাজ করে আর যারা দুস্কৃতিপরায়ণ। তোমরা অল্পই উপদেশ গ্রহণ করে থাক। সুরা গাফির : ৫৮

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

 وَلَـٰكِن لَّعَنَہُمُ ٱللَّهُ بِكُفۡرِهِمۡ فَلَا يُؤۡمِنُونَ إِلَّا قَلِيلاً۬ 

কিন্তু তাদের কুফরীর কারণে আল্লাহ তাদেরকে লানত করেছেন। তাই তাদের কম সংখ্যক লোকই ঈমান আনে। সুরা নিসা : ৪৬

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَمَآ ءَامَنَ مَعَهُ ۥۤ إِلَّا قَلِيلٌ۬ (٤٠)

আর তার (নুহ আ.) সাথে অল্পসংখ্যকই ঈমান এনেছিল। সুরা হুদ : ৪০

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

 ؕ اِعۡمَلُوۡۤا اٰلَ دَاوٗدَ شُکۡرًا ؕ وَقَلِیۡلٌ مِّنۡ عِبَادِیَ الشَّکُوۡرُ

হে দাঊদ পরিবার, তোমরা কৃতজ্ঞতাস্বরূপ আমল করে যাও এবং আমার বান্দাদের মধ্যে অল্পই কৃতজ্ঞ। সুরা সাবা : ১৩

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

فَلَمَّا کُتِبَ عَلَیۡہِمُ الۡقِتَالُ تَوَلَّوۡا اِلَّا قَلِیۡلًا مِّنۡہُمۡ ؕ وَاللّٰہُ عَلِیۡمٌۢ بِالظّٰلِمِیۡنَ

অতঃপর যখন তাদের উপর লড়াই ফরজ করা হল, তখন তাদের মধ্য থেকে স্বল্প সংখ্যক ছাড়া তারা বিমুখ হল। আর আল্লাহ জলিমদের সম্পর্কে সম্যক অবগত। সুরা বাকারা : ২৪৬

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَلَقَدۡ مَکَّنّٰکُمۡ فِی الۡاَرۡضِ وَجَعَلۡنَا لَکُمۡ فِیۡہَا مَعَایِشَ ؕ  قَلِیۡلًا مَّا تَشۡکُرُوۡنَ 

আর অবশ্যই আমি তো তোমাদেরকে যমীনে প্রতিষ্ঠিত করেছি এবং তোমাদের জন্য তাতে রেখেছি জীবনোপকরণ। তোমরা অল্পই কৃতজ্ঞ হও। সুরা আরাফ : ১০

২৯আল্লাহ রব্বুল আলামীন এর আকার বা নিরাকার সাব্যস্ত করা

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَمَا قَدَرُوا اللّٰہَ حَقَّ قَدۡرِہٖ ٭ۖ وَالۡاَرۡضُ جَمِیۡعًا قَبۡضَتُہٗ یَوۡمَ الۡقِیٰمَۃِ وَالسَّمٰوٰتُ مَطۡوِیّٰتٌۢ بِیَمِیۡنِہٖ ؕ سُبۡحٰنَہٗ وَتَعٰلٰی عَمَّا یُشۡرِکُوۡنَ

তারা আল্লাহর যথোচিত সম্মান করেনা। কিয়ামাত দিবসে সমস্ত পৃথিবী থাকবে তাঁর হাতের মুষ্টিতে এবং আকাশমন্ডলী ভাঁজ করা থাকবে তাঁর ডান হাতে। পবিত্র ও মহান তিনি, তারা যাকে শরীক করে তিনি তার উর্ধ্বে। সুরা জুমার : ৬৭

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

قَالَ یٰۤاِبۡلِیۡسُ مَا مَنَعَکَ اَنۡ تَسۡجُدَ لِمَا خَلَقۡتُ بِیَدَیَّ ؕ اَسۡتَکۡبَرۡتَ اَمۡ کُنۡتَ مِنَ الۡعَالِیۡنَ

তিনি বললেন, হে ইবলীস, আমার দু’হাতে আমি যাকে সৃষ্টি করেছি তার প্রতি সিজদাবনত হতে কিসে তোমাকে বাধা দিল? তুমি কি অহঙ্কার করলে, না তুমি অধিকতর উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন?

সুরা সোয়াদ : ৭৫

আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেন-

وُجُوهٌ۬ يَوۡمَٮِٕذٍ۬ نَّاضِرَةٌ إِلَىٰ رَبِّہَا نَاظِرَةٌ۬ 

সেদিন কোন কোন মুখমন্ডল উজ্জ্বল হবে। তারা তাদের রবের দিকে তাকিয়ে থাকবে।

সুরা কিয়ামা : ২২-২৩

আল্লাহ্‌ রব্বুল আলামিন বলেন-

 يَوۡمَ يُكۡشَفُ عَن سَاقٍ۬ وَيُدۡعَوۡنَ إِلَى ٱلسُّجُودِ فَلَا يَسۡتَطِيعُونَ 

সে দিন (আল্লাহর) পায়ের গোছা উন্মোচন করা হবে। আর তাদেরকে সিজদা করার জন্য আহবান জানানো হবে, কিন্তু তারা সক্ষম হবে না। সুরা কালাম : ৪২

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী ﷺ বলেছেনঃ জান্নাত ও জাহান্নাম উভয়েই স্বীয় রবের নিকট অভিযোগ করল। জান্নাত বলল, হে আমার প্রতিপালক! আমার ব্যাপারটি কী যে তাতে শুধু নিঃস্ব ও নিম্ন শ্রেণীর লোকেরাই প্রবেশ করবে। এদিকে জাহান্নামও অভিযোগ করল অর্থাৎ আপনি শুধুমাত্র অহংকারীদেরকেই আমাতে প্রাধান্য দিলেন। আল্লাহ্ জান্নাতকে লক্ষ্য করে বললেন, তুমি আমার রহমত। জাহান্নামকে বললেন, তুমি আমার আযাব। আমি যাকে চাইব, তোমাকে দিয়ে শাস্তি পৌঁছাব। তোমাদের উভয়কেই পূর্ণ করা হবে। তবে আল্লাহ্ তাঁর সৃষ্টির কারো উপর যুলুম করবেন না। তিনি জাহান্নামের জন্য নিজ ইচ্ছানুযায়ী নতুন সৃষ্টি করবেন। তাদেরকে যখন জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে, তখন জাহান্নাম বলবে, আরো অতিরিক্ত আছে কি? জাহান্নামে আরো নিক্ষেপ করা হবে, তখনো বলবে, আরো অতিরিক্ত আছে কি? এভাবে তিনবার বলবে। অবশেষে আল্লাহ তাঁর পা জাহান্নামে প্রবেশ করিয়ে দিলে তা পরিপূর্ণ হয়ে যাবে। তখন জাহান্নামের একটি অংশ অন্য অংশকে এ উত্তর করবে- আর নয়, আর নয়, আর নয়। সহিহ বুখারি : ৭৪৪৯

কুরআন ও সহিহ হাদিসের বর্ণনাতে দেখা যায় আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এর চেহারা, হাত, পা, চক্ষু, যাত বা সত্তা, সুরাত আছে। এই ধারনা থেকে অনেক মনে করেন আল্লাহর আকার আছে। মানুষ তার কল্পনা শক্তি দ্বারা জাগতিক বিশ্বের বাহিরে কোন আকার কল্পনা করতে পারে না। তাই তারা আল্লাহকে যে কোন সৃষ্টির আকারে সাব্যস্থ করে কল্পনা করে যা মূলত কুফরি। কেননা মহান আল্লাহর ঘোষণা, মহা বিশ্বের কোন কিছুই আমার সদৃশ নয়। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

فَاطِرُ السَّمٰوٰتِ وَالۡاَرۡضِ ؕ جَعَلَ لَکُمۡ مِّنۡ اَنۡفُسِکُمۡ اَزۡوَاجًا وَّمِنَ الۡاَنۡعَامِ اَزۡوَاجًا ۚ یَذۡرَؤُکُمۡ فِیۡہِ ؕ لَیۡسَ کَمِثۡلِہٖ شَیۡءٌ ۚ وَہُوَ السَّمِیۡعُ الۡبَصِیۡرُ

তিনি আসমানসমূহ ও যমীনের স্রষ্টা। তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকে জোড়া বানিয়েছেন এবং চতুষ্পদ জন্তু থেকেও জোড়া বানিয়েছেন, তিনি তোমাদেরকে ছড়িয়ে দিয়েছেন। কোন কিছুই তাঁর সদৃশ নয়, তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা। সুরা শুয়ারা : ১১

এই আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করেছেন, সৃষ্টি জগতের কোন সৃষ্টির সদৃশ তিনি নন। কাজেই আল্লাহ তায়ালার আকার আছে বললে যে আকৃতিতে কল্পনা করবেন তাই ভুল। যেহেতু, কুরআন ও সহিহ হাদিসে আল্লাহ তাঁর নিজস্ব সত্তার হাত, পা, মুখ, দৃষ্টিশক্তি, শ্রবণ শক্তি, তাঁর সন্তুষ্টি ও ক্রোধ-ইত্যাদি উল্লেখ করা হয়েছে। মুমিনগণ কিয়ামাতের দিন তাকে দেখতে পাবে। তাই নিরাকার বলাটা তো একেবারেই অযৌক্তিক।  সুরা কিয়ামা : ২২-২৩

এ সম্পর্কে ইমাম আবু হানিফা রহ. এর উক্তিটি যথার্থ। তিনি বলেন-

আল্লাহর ইয়াদ (হাত) আছে, ওয়াজহ (মুখমণ্ডল) আছে, নফস (সত্তা) আছে, কারণ আল্লাহ কুরআনে এগুলো উল্লেখ করেছেন। কুরআনে আল্লাহ যা কিছু উল্লেখ করেছেন, যেমন- মুখমণ্ডল, হাত, নফস ইত্যাদি সবই তাঁর বিশেষণ, কোনো ‘স্বরূপ’ বা প্রকৃতি নির্ণয় ব্যতিরেকে। এ কথা বলা যাবে না যে, তাঁর হাত অর্থ তাঁর ক্ষমতা অথবা তাঁর নিয়ামত। কারণ এরূপ ব্যাখ্যা করার অর্থ আল্লাহর বিশেষণ বাতিল করা। এরূপ ব্যাখ্যা করা কাদারিয়া ও মু’তাযিলা সম্প্রদায়ের রীতি। বরং তাঁর হাত তাঁর বিশেষণ, কোনো স্বরূপ বা প্রকৃতি নির্ণয় ব্যতিরেকে। তাঁর ক্রোধ এবং তাঁর সন্তুষ্টি তাঁর দুটি বিশেষণ, আল্লাহর অন্যান্য বিশেষণের মতই, কোনো ‘কাইফ’ বা ‘কিভাবে’ প্রশ্ন করা ছাড়াই।

ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর রাহিমাহুল্লাহ এর লেখা, আল ফিকহুল আকবারের বঙ্গানুবাদ ও ব্যাখ্যা পৃ-২২৫

কাজেই আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এর কোন নির্দিষ্ট আকার দেয়া বা তাকে নিরাকার সাব্যস্ত করা, দু’টিই কবিরাগুনাহ অন্তরভুক্ত।

৩০। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সর্বত্র সবকিছুতে স্বত্বাগতভাবে বিরাজমান

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মারেফাত বা পরিচয় জানা খুবই গুরুত্বপূর্ন। তাকে নিজেস্ব জ্ঞান, বুদ্ধি আর কল্পনা দ্বারা মানব সত্বার অবস্থানের মত অবস্থান কল্পনা করা যাবে না। তিনি কোথায় সে বিষয়ে সম্যক ধারণা অর্জন আমাদের জন্য ওয়াজিব। এই সম্পর্কে কিছু বলার আগে কুরআনের কিছু আয়াত দেখেনি। আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেন-

الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى

অর্থঃ দয়াময় আল্লাহ আরশের উপর সমুন্নত হয়েছেন।  সূরা ত্বহা : ৫

আল্লাহ রব্বুল আলামিন আরও বলেন-

الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ وَمَا بَيْنَهُمَا فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ الرَّحْمَنُ فَاسْأَلْ بِهِ خَبِيرًا

যিনি আসমান জমিন ও এতদুভয়ের অন্তর্বর্তী সবকিছু ছয়দিনে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর আরশে সমুন্নত হয়েছেন। তিনি পরম দয়াময়। তাঁর সম্পর্কে যিনি অবগত, তাকে জিজ্ঞেস কর। সূরা ফুরকান : ৫৯

আল্লাহ রব্বুল আলামিন আরশের উপর সমুন্নত আছেন এ সম্পর্কিত আয়াত: সূরা সাজদা : ৪, সূরা ইউনুস : ৩, সূরা রাদ : ২, সূরা আরাফ : ৫৪, সূরা মুলক : ১৭,  সুর হাদিদ : ৪।

আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেন-

 أَلَمۡ تَرَ أَنَّ ٱللَّهَ يَعۡلَمُ مَا فِى ٱلسَّمَـٰوَٲتِ وَمَا فِى ٱلۡأَرۡضِ‌ۖ مَا يَڪُونُ مِن نَّجۡوَىٰ ثَلَـٰثَةٍ إِلَّا هُوَ رَابِعُهُمۡ وَلَا خَمۡسَةٍ إِلَّا هُوَ سَادِسُہُمۡ وَلَآ أَدۡنَىٰ مِن ذَٲلِكَ وَلَآ أَڪۡثَرَ إِلَّا هُوَ مَعَهُمۡ أَيۡنَ مَا كَانُواْ‌ۖ ثُمَّ يُنَبِّئُهُم بِمَا عَمِلُواْ يَوۡمَ ٱلۡقِيَـٰمَةِ‌ۚ إِنَّ ٱللَّهَ بِكُلِّ شَىۡءٍ عَلِيمٌ (٧) 

আল্লাহ আকাশ ও পৃথিবীর প্রতিটি জিনিস সম্পর্কে অবগত, সে ব্যাপারে তুমি কি সচেতন নও? যখনই তিন ব্যক্তির মধ্যে কোন গোপন কানাঘুষা হয়, তখন সেখানে আল্লাহ অবশ্যই চতুর্থজন হিসেবে উপস্থিত থাকেন৷ যখনই পাঁচজনের মধ্যে গোপন সলাপরামর্শ হয় তখন সেখানে ষষ্ঠ জন হিসেবে আল্লাহ অবশ্যই বিদ্যমান থাকেন৷  গোপন সলাপরামর্শকারীরা সংখ্যায় এর চেয়ে কম হোক বা বেশী হোক, এবং তারা যেখানেই থাকুক, আল্লাহ তাদের সাথে থাকেন৷ তারপর কিয়ামতের দিন তিনি তাদেরকে জানিয়ে দেবেন তারা কি কি করেছে৷ আল্লাহ সর্বজ্ঞ৷  সুরা মুজাদালা : ৭।

আল্লাহ রব্বুল আলামিন আরও বলেন-

 وَلِلَّهِ ٱلۡمَشۡرِقُ وَٱلۡمَغۡرِبُ‌ۚ فَأَيۡنَمَا تُوَلُّواْ فَثَمَّ وَجۡهُ ٱللَّهِ‌ۚ إِنَّ ٱللَّهَ وَٲسِعٌ عَلِيمٌ۬ (١١٥)

পূর্ব এবং পশ্চিম আল্লাহ তায়ালারই। সুতরাং যেদিকেই মুখ ফিরাও, সেদিকেই রয়েছেন আল্লাহ তায়ালা। নিশ্চয় আল্লাহ তায়ালা সর্বব্যাপী সর্বজ্ঞাত। সুরা বাকারা : ১১৫

ইহা ছাড়াও বহু আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেছেন, আমি আমাদের সাথে আছি,  সবরকারীদের সাথে আছি, মুত্তাকিদের সাথে আছি, মুমিনদের সাথে আছি।

প্রথম দুই আয়াতসহ অনেক আয়াতে বলা হয়েছে আল্লাহ রব্বুল আলামিন আরশের উপর সমুন্নত আছেন। পরের দুই আয়াতসহ অনেক আয়াতে বলা হয়েছে আল্লাহ রব্বুল আলামিন আমাদের সাথে আছেন। তাহলে এই আয়াতগুলোর সঠিক ব্যাখ্যা কী?

আল্লাহ রব্বুল আলামিন নিজেই এর ব্যাখ্যা দিয়েছেন, তিনি বলেন-

هُوَ الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ يَعْلَمُ مَا يَلِجُ فِي الْأَرْضِ وَمَا يَخْرُجُ مِنْهَا وَمَا يَنْزِلُ مِنَ السَّمَاءِ وَمَا يَعْرُجُ فِيهَا وَهُوَ مَعَكُمْ أَيْنَ مَا كُنْتُمْ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌ

তিনি নভোমণ্ডল ও ভূমন্ডল সৃষ্টি করেছেন ছয়দিনে, অতঃপর আরশের উপর সমুন্নত হয়েছেন। তিনি জানেন যা ভূমিতে প্রবেশ করে ও যা ভূমি থেকে নির্গত হয় এবং যা আকাশ থেকে বর্ষিত হয় ও যা আকাশে উত্থিত হয়। তিনি তোমাদের সাথে আছেন তোমরা যেখানেই থাক। তোমরা যা কর, আল্লাহ তা দেখেন। সূরা হাদীদ : ৪

ভাল করে লক্ষ করুন হাদীদের এই আয়াতের প্রথমে আল্লাহ তায়ালা বললেন, তিনি আরশের উপর সমুন্নত আছেন এবং এই আয়াতই তিনি বললেন, আমাদের সাথে আছেন। তাহলে আল্লাহ কি আত্বভোলা (নাউজুবিল্লাহ)। এ আয়াতের তাফসির আয়াতেরই শেষাংশ আর তা হল, আল্লাহ সব কিছু দেখেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁর জ্ঞান, শ্রবণ, দর্শন ও ক্ষমতার মাধ্যমে সকল সৃষ্টির সাথে আছেন। অর্থাৎ তিনি সপ্ত আসমানের উপর অবস্থিত আরশের উপর থেকেই সব কিছু দেখছেন, সব কিছু শুনছেন, সকল বিষয়ে জ্ঞাত আছেন।

সাথে থাকার অর্থ, গায়ে গায়ে লেগে থাকা নয়। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মূসা ও হারূন আ. কে ফিরাউনের নিকট যেতে বললেন, তারা ফিরাউনের অত্যাচারের আশংকা ব্যক্ত করলেন। আল্লাহ তাদের সম্বোধন করে বললেন, ‘‘তোমরা ভয় পেও না। নিশ্চয় আমি তোমাদের সাথে আছি। শুনছি এবং দেখছি। সূরা ত্বহা : ৪৬ এখানে সাথে থাকার অর্থ এটা নয় যে, মূসা আ. এর সাথে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ফিরাউনের দরবারে গিয়েছিলেন। বরং সাথে থাকার ব্যাখ্যা তিনি নিজেই করছেন এই বলে যে, ‘‘শুনছি এবং দেখছি।

আল্লাহ রব্বুল আলামিন আরশে আছেন বলেই, কুরআন পৃথিবীতে নাজিল করা হয়েছে এবং মিরাজে রাসূল ﷺ কে উর্ধাকাশে গমন করান। তিনি সত্তাগতভাবে সর্বত্র বিজান মান হলে জিবরাইল আ. এর মাধ্যমে কুরআন নাজিল করার প্রয়োজন ছিন না। মিরাজেও উর্ধাকাশের গমনেন প্রয়োজন ছিল না। অতএব আল্লাহর সাথে থাকার অর্থ হলো জ্ঞান, শ্রবণ, দর্শন ও ক্ষমতার মাধ্যমে, আর স্ব-সত্তায় তিনি আরশের উপর রয়েছেন।

তা হলে প্রশ্ন হল ‘আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সর্বত্র বিরাজমান কথাটা কি সঠিক?

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সর্বত্র বিরাজমান” বাক্যটির অর্থ যদি হয় ‘‘আল্লাহ রাব্বুল আলামীন স্ব-সত্তায় সর্বত্র বিরাজমান” তা হলে কথাটি সরাসরি বাতিল। আর যদি বলা হয়, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তার জ্ঞান, শ্রবণ, দর্শন ও ক্ষমতা দ্বারা সর্বত্র বিরাজমান তাহলে সঠিক হবে। আমরা শত শত কিলোমিটার দুর থেকে লাইভ টেলিকাষ্ট দেখি আর ভাবি এত আমার চোখের সামনেই ঘটছে। কারন আমার জ্ঞান, শ্রবন, দর্শন ঐ ঘটনার সাথে সরাসরি জড়িত।

সূরা বাকারার ১১৫ আয়াতের ব্যাখ্যায় বিশ্ববিখ্যাত তাফসীরবীদ হাফেজ ইমাদুদ্দিন ইবনু কাসীর রহ. বলেন- আল্লাহ রাব্বুল আলামীন হতে কোন জায়গা শূন্য নেই, এর ভাবার্থ যদি আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ‘ইলম’ বা অবগতি হয় তাহলে অর্থ সঠিক হবে, যে কোন স্থানেই আল্লাহ পাকের ইলম হতে শূন্য নেই। আর যদি এর ভাবার্থ হয় ‘আল্লাহ তা আল্লাহ সত্তা’ তবে এটা সঠিক হবে না। কেননা, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যে, তার সৃষ্টি জীবের মধ্য হতে কোন জিনিষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবেন তা থেকে তার পবিত্র সত্তা বহু ঊর্ধে। (তাফসিরে ইবনে কাসির প্রথম খন্ড পৃষ্ঠা ৩৭২)।

আবু মুতি আল হাকাম ইবনে আব্দুল্লাহ আল বালাখি রহ. বলেন, আমি ইমাম আবু হানিফা রহ. কে জিজ্ঞসা করেছিলাম কেউ যদি বলে, আমি জানিনা আল্লাহ্‌ কোথায় পৃথিবীতে না আসমানে,তাহলে তার সম্পর্কে আপনার অভিমত কি? প্রত্যুত্তরে তিনি বলেছেন সে কাফির। কেননা আল্লাহ বলেছেন, “পরম করুণাময় আরশের উপর সমাসীন। (সুরা ত্বহা ২০:৫)। আবু মুতি বলেছেন, অতপর আমি তাকে জিজ্ঞস করে ছিলাম যে কেউ যদি বলে, আল্লাহ উপরে অধিষ্ঠিত কিন্তু আমি জানিনা আরশ কোথায় অবস্থিত, আকাশে না পৃথিবীতে। তাহলে তার সম্পর্কে আপনার অভিমত কি? প্রত্যুত্তরে তিনি বলেছেন, সে ব্যক্তি কাফির কেননা সে এ কথা অস্বীকার করে যে, ‘পরম করুণাময় আরশের উপর সমাসীন। আল ফিকহুল আকবার: বঙ্গানুবাদ ও ব্যাখ্যা পৃষ্ঠা -২৬১; ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর রহ.

কুরআন, সহিহ হাদিস ও সালাফদের উক্ত থেকে এ কথা সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় আল্লাহ তায়ালা স্বত্বাগতভাবে সব জায়গায় বিরাজমান নন। বরং তার ক্ষমতা, রাজত্ব, পরিচালনা, নিয়ন্ত্রণ, জ্ঞান, দৃষ্টি ইত্যাদি সর্বত্র ও সব কিছুতে বিরাজমান। কিন্তু তিনি স্বত্বাগতভাবে, সাত আসমানের উপর আরশে আযীমে সমুন্নোত। আর এটাই হল বিশুদ্ধ আকীদা। আল্লাহ সম্পর্কে এর বিকল্প চিন্তা করা শির্কের মত কবিরা গুনাহ।

৩৮।  আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ছাড়াও কেউ কাউকে ধনী বা দরিদ্র বানাতে পারে

অনেক ব্যবসার উন্নতি করতে বা চাকুরির উন্নতি করেত পীর, গনক বা জ্যোতিষির নিকট যায়। তাদের ধারণা মহান ঐ সকর পীর, গনক বা জ্যোতিষতাদের তদবির দ্বারা তাদের ভাগ্যে চাকা ঘুরিয়ে দিবে। এই  কথা বিশ্বাস করাই শিরক যে আল্লাহ ছাড়া কেউ কাউকে ধনী বা দরিদ্র বানাতে পারে।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَأَنَّهُۥ هُوَ أَغْنَىٰ وَأَقْنَىٰ

তিনিই অভাবমুক্ত ও সম্পদশালী করেন। সুরা নাজম : ৪৮

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَٱللَّهُ يُضَٰعِفُ لِمَن يَشَآءُۗ وَٱللَّهُ وَٰسِعٌ عَلِيمٌ

আল্লাহ যাকে চান তার সম্পদ বহুগুণ বাড়িয়ে দেন। আল্লাহ বড় দানশীল, মহাজ্ঞানী।  (সুরা বাকারা ২:২৬১)

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَوَجَدَكَ عَآئِلًا فَأَغْنَىٰ

তিনি তোমাকে পেয়েছেন নিঃস্ব। অতঃপর তিনি সমৃদ্ধ করেছেন। সুরা দোহা : ৮

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

 قُلْ إِنَّ ٱلْفَضْلَ بِيَدِ ٱللَّهِ يُؤْتِيهِ مَن يَشَآءُۗ وَٱللَّهُ وَٰسِعٌ عَلِيمٌ

বল, ‘নিশ্চয় অনুগ্রহ আল্লাহর হাতে, তিনি যাকে চান, তা দান করেন। আর আল্লাহ প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ’। (সুরা আল ইমরান ৩:৭৩)

সমস্ত প্রাচুর্যের ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহ রাব্বুল আলামীন হাতে। যদি কেউ সমান্যও বিশ্বাস রাখে যে আল্লাহ ব্যতিত অন্য কেউ কাউকে ধনী বা গরিব বানাতে পারে তবে শির্কে আকবর হবে।

ইবাদত বা আমলগত শিরকে আকবর : প্রথম পর্ব (১-১০)

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

আকিদা বিশ্বাসের শিরক সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে। আশা করি আকিদা বিশ্বাসের শিরক সম্পর্ক একটা নুন্যতম ধারণ হয়েছে। এ পর্যায়ে আমল বা ইবাদতের মাধ্যমে আমরা যে শিরক করে থাকি সে সম্পর্ক কিছুটা আলোচনা করব। ইনশাল্লাহ

১। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এর পাশাপাশি অন্য ইলাহ স্বীকার করা

ইলাহ শব্দের অর্থ প্রত্যেক এমন সত্তা, জিনিস যাকে উপাস্যরুপে গ্রহণ করা হয়েছে। মহান আল্লাহই হলেন প্রকৃত ইলাহ বা উপাস্য এবং একমাত্র তিনিই ইবাদত পাওয়ার যোগ্য। কিন্তু আল্লাহ পাশাপাশি দ্বীন সম্পর্কে অজ্ঞ লোকের মনগড়া ইলাহ বা উপাস্য সৃষ্টি করে নিয়েছে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এর পাশাপাশি অন্য কারো ইবাদাত করা বা তাকে ইলাহ স্বীকার করাই হলো শিরকে আকবার।

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন-

وَقَالَ اللّٰہُ لَا تَتَّخِذُوۡۤا اِلٰـہَیۡنِ اثۡنَیۡنِ ۚ اِنَّمَا ہُوَ اِلٰہٌ وَّاحِدٌ ۚ فَاِیَّایَ فَارۡہَبُوۡنِ

আর আল্লাহ বলেছেন, ‘তোমরা দুই ইলাহ গ্রহণ করো না। তিনি তো কেবল এক ইলাহ। সুতরাং তোমরা আমাকেই ভয় কর। সুরা নাহল : ৫১

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন-

اَمِ اتَّخَذُوۡا مِنۡ دُوۡنِہٖۤ اٰلِہَۃً ؕ قُلۡ ہَاتُوۡا بُرۡہَانَکُمۡ ۚ

তারা কি তাঁকে ছাড়া অনেক ইলাহ গ্রহণ করেছে? বল, ‘তোমাদের প্রমাণ নিয়ে আস। সুরা আম্বিয়া : ২৪

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন-

وَاتَّخَذُوۡا مِنۡ دُوۡنِ اللّٰہِ اٰلِہَۃً لَّعَلَّہُمۡ یُنۡصَرُوۡنَ ؕ

অথচ তারা আল্লাহর পরিবর্তে অন্য সব ইলাহ গ্রহণ করেছে, এই প্রত্যাশায় যে, তারা সাহায্যপ্রাপ্ত হবে। সুরা ইয়াসিন : ৭৪

একাধিক ইলাহ যে নেই সে সম্পর্ক মহান আল্লাহ যুক্তিই সর্বোউত্তম ও অকাঠ্য তিনি বলেন-

مَا اتَّخَذَ اللّٰہُ مِنۡ وَّلَدٍ وَّمَا کَانَ مَعَہٗ مِنۡ اِلٰہٍ اِذًا لَّذَہَبَ کُلُّ اِلٰہٍۭ بِمَا خَلَقَ وَلَعَلَا بَعۡضُہُمۡ عَلٰی بَعۡضٍ ؕ  سُبۡحٰنَ اللّٰہِ عَمَّا یَصِفُوۡنَ ۙ

আল্লাহ কোন সন্তান গ্রহণ করেননি, তাঁর সাথে অন্য কোন ইলাহও নেই। (যদি থাকত) তবে প্রত্যেক ইলাহ নিজের সৃষ্টিকে নিয়ে পৃথক হয়ে যেত এবং একে অন্যের উপর প্রাধান্য বিস্তার করত; তারা যা বর্ণনা করে তা থেকে আল্লাহ কত পবিত্র! সুরা মুমিনুন : ৯১

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন-

وَاِذۡ قَالَ اِبۡرٰہِیۡمُ لِاَبِیۡہِ اٰزَرَ اَتَتَّخِذُ اَصۡنَامًا اٰلِہَۃً ۚ اِنِّیۡۤ اَرٰىکَ وَقَوۡمَکَ فِیۡ ضَلٰلٍ مُّبِیۡنٍ

আর (স্মরণ কর) যখন ইবরাহীম তার পিতা আযরকে বলেছিল, ‘তুমি কি মূর্তিগুলোকে ইলাহরূপে গ্রহণ করছ? নিশ্চয় আমি তোমাকে তোমার কওমকে স্পষ্ট গোমরাহীতে দেখছি’। সুরা আনাম : ৭৪

০২কাউকে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনর সমকক্ষ সাব্যস্ত করে ভালবাসা প্রদান করা

আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের ভালবাসা, এমনই এক ভালবাসা যার আবেদন অনেক ব্যাপক, যা পরিপূর্ণ বিনয় এবং সর্বাত্মক আনুগত্যকে অনিবার্য করে। এ ভালবাসা একেবারেই স্বতন্ত্র’ এ পর্যায়ের ভালবাসার ক্ষেত্রে আল্লাহর সাথে অন্য কেউ শরীক হতে পারে না। আল্লাহকে যেমন ভালবাসা  উচিত, যদি কোন ব্যক্তিকে এ পর্যায়ের ভালবাসি তবে তার অর্থ হচ্ছে ঐ ব্যক্তি ভালবাসা ও সম্মানের ক্ষেত্রে আল্লাহ তায়ালার শরীক ও সমকক্ষ স্থির করছে। আর এটিই শিরক।

(১) শিরকি ভালবাসা-

ভালোবাসা হচ্ছে একটা অনুভুতির নাম যা দেখা যায় না এবং স্পর্শও করা যায় না। আর এটা মহান আল্লাহর দেওয়া এক বিশেষ নেয়ামত, তাঁরই ইচ্ছায় বৃদ্ধি ঘাটতি হয়। একজন ঈমানদারের কাছে আল্লাহর সন্তুষ্টি অন্য সবার সন্তুষ্টির ওপর অগ্রাধিকার লাভ করবে এবং কোন জিনিসের প্রতি ভালোবাসা তার মনে এমন প্রভাব বিস্তার করবে না যেন আল্লাহর সমকক্ষ হয়। কোন কিছুকে এমন মর্যাদার আসনে সমাসীন করবেনা যেন আল্লাহ প্রতি ভালোবাসার কমতি দেখা যায়। আর এটাই হচ্ছে আকীদাহ বিশ্বাসের মৌলিক উপাদান ও মেরুদণ্ড। আল্লাহকে ভালবাসা ও সম্মানের ন্যায় কোনো মখলুককে ভালবাসলে ও সম্মান করলে আল্লাহর সাথে শিরক করা হয়। এ জাতীয় শিরক আল্লাহ ক্ষমা করবেন না। এ শিরকের ব্যাপারে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন-

وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَتَّخِذُ مِنْ دُونِ اللَّهِ أَنْدَادًا يُحِبُّونَهُمْ كَحُبِّ اللَّهِ وَالَّذِينَ آَمَنُوا أَشَدُّ حُبًّا لِلَّهِ

আর কিছু লোক এমনও রয়েছে যারা অন্যান্যকে আল্লাহর সমকক্ষ সাব্যস্ত করে এবং তাদের প্রতি তেমনি ভালবাসা পোষণ করে, যেমন আল্লাহর প্রতি ভালবাসা হয়ে থাকে। কিন্তু যারা আল্লাহর প্রতি ঈমানদার তাদের ভালবাসা ওদের তুলনায় বহুগুণ বেশী। সুরা বাকারা :১৬৫

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন-

قُلۡ إِن كَانَ ءَابَآؤُكُمۡ وَأَبۡنَآؤُڪُمۡ وَإِخۡوَٲنُكُمۡ وَأَزۡوَٲجُكُمۡ وَعَشِيرَتُكُمۡ وَأَمۡوَٲلٌ ٱقۡتَرَفۡتُمُوهَا وَتِجَـٰرَةٌ۬ تَخۡشَوۡنَ كَسَادَهَا وَمَسَـٰكِنُ تَرۡضَوۡنَهَآ أَحَبَّ إِلَيۡڪُم مِّنَ ٱللَّهِ وَرَسُولِهِۦ وَجِهَادٍ۬ فِى سَبِيلِهِۦ فَتَرَبَّصُواْ حَتَّىٰ يَأۡتِىَ ٱللَّهُ بِأَمۡرِهِۦ‌ۗ وَٱللَّهُ لَا يَہۡدِى ٱلۡقَوۡمَ ٱلۡفَـٰسِقِينَ

বল, ‘তোমাদের পিতা, তোমাদের সন্তান, তোমাদের স্ত্রী, তোমাদের গোত্র, তোমাদের সে সম্পদ যা তোমরা অর্জন করেছ, আর সে ব্যবসা যার মন্দা হওয়ার আশঙ্কা তোমরা করছ এবং সে বাসস্থান, যা তোমরা পছন্দ করছ, যদি তোমাদের কাছে অধিক প্রিয় হয় আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও তাঁর পথে জিহাদ করার চেয়ে, তবে তোমরা অপেক্ষা কর আল্লাহ তাঁর নির্দেশ নিয়ে আসা পর্যন্ত’। আর আল্লাহ ফাসিক সম্প্রদায়কে হিদায়াত করেন না। সুরা তাওবা : ২৪

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন-

قُلۡ إِن كُنتُمۡ تُحِبُّونَ ٱللَّهَ فَٱتَّبِعُونِى يُحۡبِبۡكُمُ ٱللَّهُ وَيَغۡفِرۡ لَكُمۡ ذُنُوبَكُمۡ‌ۗ وَٱللَّهُ غَفُورٌ۬ رَّحِيمٌ۬

হে নবী! লোকদের বলে দাও, ‘‘যদি তোমরা যথার্থই আল্লাহকে ভালোবাসো, তাহলে আমার অনুসরণ করো, আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের গোহাহ মাফ করে দেবেন ৷ তিনি বড়ই ক্ষমাশীল ও করুণাময়৷’’ সুরা আল ইমরান : ৩১

মহান আল্লাহর ও তার রসুল ﷺ কে ভালোবাসা প্রতিটি মুমিনের উপর ফজর। মুমিন বীনা দিধায় ও বিনাশর্তে আল্লাহর ও তার রসুল ﷺ কে ভালোবাসা কেননা তা ঈমানের অঙ্গ।

আবদুল্লাহ বিন হিশাম (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন আমরা নবী ﷺ এর সাথে ছিলাম। তিনি উমার বিন খাত্তাব (রাঃ) এর হাত ধরে ছিলেন। উমার (রাঃ) তাঁকে বললেন, হে আল্লাহর রসূল! আপনি আমার জীবন ছাড়া সকল জিনিস থেকে আমার নিকট প্রিয়তম। এ কথা শুনে মহানবী ﷺ বললেন, ’না। সেই সত্তার কসম, যাঁর হাতে আমার প্রাণ আছে। যতক্ষণ না আমি তোমার নিকট তোমার জীবন থেকেও প্রিয়তম হতে পেরেছি। উমার (রাঃ) বললেন, এক্ষণে আপনি আমার জীবন থেকেও প্রিয়তম। তখন তিনি বললেন, এখন (তুমি মুমিন) হে উমার! সহিহ বুখারি : ৬৬৩২

(২) সাধারন বা জায়েয ভালবাসা-

দাম্পত্য জীবনের ভালবাসা আত্মীয-স্বজনের, বন্ধু-বান্ধবদের, ছেলে সন্তান এবং একে অনন্যের প্রতি ভালবাসা জায়েয ভালবাসা। এ সব ভালবাসা দোষনীয় হবে নয় কিন্তু শর্ত হলো যে, কোনো অবস্তায়ই যেন তাদের প্রতি ভালবাসা মহান আল্লাহর ও তার রসুল ﷺ  এর সমপর্যায় না হয়।

আনাস বিন মালিক কর্তৃক বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

لاَ يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى أَكُونَ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِنْ وَلَدِهِ وَوَالِدِهِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ

তোমাদের মধ্যে কেউ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না আমি তার নিকট তার পিতা, সন্তান এবং সকল মানুষ অপেক্ষা প্রিয়তম হয়েছি। সহিহ বুখারি : ১৫, সহিহ মুসলিম : ১৭৮

তবে মুমিনগণ তাদের মাঝে পরষ্পর ভালবাসা প্রদর্শণ করাও ইমানের অংশ।

 আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

لاَ تَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ حَتَّى تُؤْمِنُوا وَلاَ تُؤْمِنُوا حَتَّى تَحَابُّوا ‏.‏ أَوَلاَ أَدُلُّكُمْ عَلَى شَىْءٍ إِذَا فَعَلْتُمُوهُ تَحَابَبْتُمْ أَفْشُوا السَّلاَمَ بَيْنَكُمْ ‏

ঈমানদার ছাড়া কেউই জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না, আর তোমরা ঈমানদার হতে পারবে না যতক্ষণ না একে অন্যকে ভালোবাসবে। আমি কি তোমাদের তা বলে দিব না, কি করলে তোমাদের মাঝে পারস্পরিক ভালোবাসার সৃষ্টি হবে? তা হলো, তোমরা পরস্পর বেশি সালাম বিনিময় করবে। সহিহ মুসলিম : ৫৪, সুনানে তিরমিযী : ২৬৮৮, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৬৮, আহমাদ : ৮৮৪১, ৯৪১৬, ২৭৩১৪, ১০২৭২।

উপরোক্ত উপায়ে মুমিন ব্যক্তি ঈমানের স্বাদ সৌন্দর্য অনুধাবন করতে সক্ষম হবে। বস্তুত প্রত্যেকের মাঝে নির্ধারিত সাধারণ ভালোবাসা এবং আল্লাহ ও তার রসুলের জন্য অত্যাবশ্যকীয় ভালবাসা এক নয়, কেননা একজন মুসলিমের সাধারণ ভালোবাসা তার সন্তানদের প্রতিও থাকবে এটাই স্বাভাবিক কিন্তু আল্লাহ থেকে গাফেল হলে চলবেনা। মহান আল্লাহ বলেন,

يَـٰٓأَيُّہَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ لَا تُلۡهِكُمۡ أَمۡوَٲلُكُمۡ وَلَآ أَوۡلَـٰدُڪُمۡ عَن ذِڪۡرِ ٱللَّهِ‌ۚ وَمَن يَفۡعَلۡ ذَٲلِكَ فَأُوْلَـٰٓٮِٕكَ هُمُ ٱلۡخَـٰسِرُونَ (٩)

হে ঈমানদারগন! তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তানাদি (ভালবাসা) যেন তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফিল করে না দেয়৷ যারা এরূপ করবে তারাই ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকবে৷ সুরা মুনাফিকুন : ৯

(৩) হারাম ভালবাসা-

তাগুদকে ভালবাসা, অমুসলিমকে ভালবাসা, বিদাতিকে ভালবাসা, ইসলাম বহির্ভুত কাজকে ভালবাসা, আল্লাহ তায়ালা ও তার রসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিরুদ্ধবাদি এবং কাফেরদেরকে  ভালবাসা হল হারাম ভালবাসা। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন-

لَّا تَجِدُ قَوۡمً۬ا يُؤۡمِنُونَ بِٱللَّهِ وَٱلۡيَوۡمِ ٱلۡأَخِرِ يُوَآدُّونَ مَنۡ حَآدَّ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُ ۥ وَلَوۡ ڪَانُوٓاْ ءَابَآءَهُمۡ أَوۡ أَبۡنَآءَهُمۡ أَوۡ إِخۡوَٲنَهُمۡ أَوۡ عَشِيرَتَہُمۡ‌ۚ أُوْلَـٰٓٮِٕكَ ڪَتَبَ فِى قُلُوبِہِمُ ٱلۡإِيمَـٰنَ وَأَيَّدَهُم بِرُوحٍ۬ مِّنۡهُ‌ۖ وَيُدۡخِلُهُمۡ جَنَّـٰتٍ۬ تَجۡرِى مِن تَحۡتِہَا ٱلۡأَنۡهَـٰرُ خَـٰلِدِينَ فِيهَا‌ۚ رَضِىَ ٱللَّهُ عَنۡہُمۡ وَرَضُواْ عَنۡهُ‌ۚ أُوْلَـٰٓٮِٕكَ حِزۡبُ ٱللَّهِ‌ۚ أَلَآ إِنَّ حِزۡبَ ٱللَّهِ هُمُ ٱلۡمُفۡلِحُون

তোমরা কখনো এমন দেখতে পারে না যে, যারা আল্লাহ ও আখেরাতের প্রতি ঈমান পোষণ করে তারা এমন লোকদের ভাল বাসছে যারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের বিরোধিতা করেছে৷ তারা তাদের পিতা, অথবা পুত্র অথবা ভাই অথবা গোষ্ঠীভুক্ত হলেও তাতে কিছু এসে যায় না৷ আল্লাহ এসব লোকদের হৃদয়-মনে ঈমান বদ্ধমুল করে দিয়েছেন এবং নিজের পক্ষ থেকে একটি ‘রূহ’ দান করে তাদের শক্তি যুগিয়েছেন৷ তিনি তাদেরকে এমন জান্নাতসমূহে প্রবেশ করাবেন যার পাদদেশ দিয়ে নহরসমূহ প্রবাহিত হতে থাকবে৷ তারা সেখানে চিরদিন অবস্থান করবে৷ আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তারাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছে৷ তারা আল্লাহর দলের লোক৷ জেনে রেখো আল্লাহর দলের লোকেরাই সফলকাম৷ সুরা মুজাদালাহ : ২২

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন-

يَـٰٓأَيُّہَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ لَا تَتَّخِذُواْ ٱلۡكَـٰفِرِينَ أَوۡلِيَآءَ مِن دُونِ ٱلۡمُؤۡمِنِينَ‌ۚ أَتُرِيدُونَ أَن تَجۡعَلُواْ لِلَّهِ عَلَيۡڪُمۡ سُلۡطَـٰنً۬ا مُّبِينًا

হে ঈমানদারগণ, মুমিনদের বাদ দিয়ে কাফেরদেরকে নিজেদের বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করো না৷ তোমরা কি নিজেদের বিরুদ্ধে আল্লাহর হাতে সুস্পষ্ট প্রমাণ তুলে দিতে চাও? সুরা নিসা : ১৪৪

৩। গাইরুল্লাহর নিকট সাহায্যের প্রার্থনা করা

মহান আল্লাহ ব্যতিত সৃষ্টি জগতের প্রতিটি সৃষ্টিই সাহায্য বা আশ্রয় প্রার্থনা করে থাকে। এই সাহয্য সাহায্য বা আশ্রয় প্রার্থনা তিন প্রকারের হয়ে থাকে। যথা-

(১) আল্লাহর নিকট সাহায্য চাওয়া ফরজ

(২) গাইরুল্লাহ নিকট যে সাহায্য প্রার্থনা করা জায়েয

(৩) গাইরুল্লাহ নিকট অবৈধ বা শিরকি সাহায্য প্রার্থনা

(১) আল্লাহর নিকট সাহায্য চাওয়া ফরজ

আল্লাহর নিকট সাহায্য চাওয়া বিপত আপদে এক মাত্র তাহার মুখপেক্ষি হওয়া সকল সৃষ্টির উপর ফরজ। খালেসভাবে আল্লাহর নিকট  চাওয়া বা ধর্ণা দেওয়া বড় ইবাদাত। আর ইহাই ঈমান ও ইসলামের মুল মর্ম কথা। ভাল মন্দ, বাচা মরা, সন্তান দান, চাকুরী পাওয়া, জান্নাত প্রাপ্তি, গোনাহ মাফ, এইসব কিছু দেওয়ার একমাত্র মালিক হচ্ছেন মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন। তিনি বলেন-

وَقَالَ رَبُّکُمُ ادۡعُوۡنِیۡۤ اَسۡتَجِبۡ لَکُمۡ ؕ  اِنَّ الَّذِیۡنَ یَسۡتَکۡبِرُوۡنَ عَنۡ عِبَادَتِیۡ سَیَدۡخُلُوۡنَ جَہَنَّمَ دٰخِرِیۡنَ 

আর তোমাদের রব বলেছেন, ‘তোমরা আমাকে ডাক, আমি তোমাদের জন্য সাড়া দেব। নিশ্চয় যারা অহঙ্কার বশতঃ আমার ইবাদাত থেকে বিমুখ থাকে, তারা অচিরেই লাঞ্ছিত অবস্থায় জাহান্নামে প্রবেশ করবে।  সুরা গাফির : ৬০

মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَاسۡتَعِیۡنُوۡا بِالصَّبۡرِ وَالصَّلٰوۃِ ؕ  وَاِنَّہَا لَکَبِیۡرَۃٌ اِلَّا عَلَی الۡخٰشِعِیۡنَ ۙ

আর তোমরা ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য চাও। নিশ্চয় তা বিনয়ী ছাড়া অন্যদের উপর কঠিন। সুরা বাকারা : ৪৫

(২) গাইরুল্লাহ নিকট যে সাহায্য প্রার্থনা করা জায়েয

জীবিত লোকের নিকট দুনিয়াবি বস্তু বা উপকরন যা তার দেওয়ার ক্ষমতা আছে, তা চাওয়া জায়েয। কিন্তু যা তার অধিন নয় তা প্রার্থনা করা শিরক। যেমন- তার নিকটি সন্তান চাওয়া, ব্যবাসার উন্নতি চাওয়া।   তবে যা তার দেওয়া ক্ষমতা আছ, তা চাওয়া জায়েয। যেমন- টাকা ধার চাওয়া বা কোন কাজে সাহায্য চওয়া। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

قَالَ رَبِّ إِنِّى قَتَلۡتُ مِنۡهُمۡ نَفۡسً۬ا فَأَخَافُ أَن يَقۡتُلُونِ (٣٣) وَأَخِى هَـٰرُونُ هُوَ أَفۡصَحُ مِنِّى لِسَانً۬ا فَأَرۡسِلۡهُ مَعِىَ رِدۡءً۬ا يُصَدِّقُنِىٓ‌ۖ إِنِّىٓ أَخَافُ أَن يُكَذِّبُونِ

মূসা নিবেদন করলো, “হে আমার প্রভু!  আমি যে তাদের একজন লোককে হত্যা করে ফেলেছি, ভয় হচ্ছে, তারা আমাকে মেরে ফেলবে৷ আর আমার ভাই হারূন আমার চেয় বেশী বাকপটু, তাকে সাহায্যকারী হিসেবে আমার সাথে পাঠাও, যাতে সে আমাকে সমর্থন দেয়, আমার ভয় হচ্ছে, তারা আমার প্রতি মিথ্যা আরোপ করবে। সুরা কাসাস : ৩৩-৩৪

(৩) গাইরুল্লাহ নিকট অবৈধ বা শিরকি সাহায্য প্রার্থনা

আল্লাহকে বাদ দিয়ে কোন গাইরুল্লার নিকট সাহায্য প্রর্থনা করা। আল্লাহ কে বাদ অন্যের নিকট দুয়া করে সাহায্য বা আশ্রয় প্রার্থনায় করা শিরক। যা এক জন মুসলিমকে ইসলাম থেকে বের করে মুশরিক বানিয়ে দেয়। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

 وَلَا تَدۡعُ مِن دُونِ ٱللَّهِ مَا لَا يَنفَعُكَ وَلَا يَضُرُّكَۖ فَإِن فَعَلۡتَ فَإِنَّكَ إِذٗا مِّنَ ٱلظَّٰلِمِينَ

আর আল্লাহকে বাদ দিয়ে এমন কোন সত্তাকে ডেকো না, যে তোমার না কোন উপকার করতে না ক্ষতি করতে পারে৷ যদি তুমি এমনিটি করো তাহলে জালেমদের দলভুক্ত হবে। সুরা ইউনুস : ১০৬

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَٱلَّذِينَ تَدۡعُونَ مِن دُونِهِۦ مَا يَمۡلِكُونَ مِن قِطۡمِيرٍ

আর আল্লাহকে ছাড়া যাদেরকে তোমরা ডাকো তারা খেজুরের আঁটির আবরণেরও মালিক নয়। সুরা ফাতির : ১৪

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

 وَمَنۡ أَضَلُّ مِمَّن يَدۡعُواْ مِن دُونِ ٱللَّهِ مَن لَّا يَسۡتَجِيبُ لَهُ ۥۤ إِلَىٰ يَوۡمِ ٱلۡقِيَـٰمَةِ وَهُمۡ عَن دُعَآٮِٕهِمۡ غَـٰفِلُونَ (٥) وَإِذَا حُشِرَ ٱلنَّاسُ كَانُواْ لَهُمۡ أَعۡدَآءً۬ وَكَانُواْ بِعِبَادَتِہِمۡ كَـٰفِرِينَ (٦)

সেই ব্যক্তির চেয়ে বেশী পথভ্রষ্ট কে যে আল্লাহকে বাদ দিয়ে এমন সব সত্তাকে ডাকে যারা কিয়ামত পর্যন্ত তার ডাকে সাড়া দিতে সক্ষম নয়৷ এমনকি আহবানকারী যে তাকে আহবান করছে সে বিষয়েও সে অজ্ঞ৷ যখন সমস্ত মানুষকে সমবেত করা হবে তখন তারা নিজেদের আহবানকারীর দুশমন হয়ে যাবে এবং ইবাদতকারীদের অস্বীকার করবে৷ সুরা আহকাফ : ৫-৬

সুতরাং সবকিছু দেওয়ার একচ্ছত্র মালিকই হচ্ছেন মহান আল্লাহ। তাকে বাদ দিয়ে অন্যের কাছে চাওয়া মূলত অহেতুক তার নির্ধারিত অধিকারে অন্যকে অংশীদার বানান। এমনকি কোনো নবী রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট ও চাওয়া শিরক।

৪। গাইরুল্লাহর নিকট ফরিয়াদ করা

নিতান্ত অসহায় অবস্থায় আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে সাহায্যের জন্য আহবান করাকে ফরিয়াদের শিরক বলা হয়। অনেক অজ্ঞ মানুষ বিপদ আপদে, রোগ শোকে জর্জরিত হয়ে গাইরুল্লার কাছে ফরিয়াদ করে। আগেকার কাফিরগণও কোন বিপদের সম্মুখিন হলে তাদের বানান বহু উপাস্যর নিকট ফরিয়াদ না করে মহান আল্লাহর নিকট ফরিয়াদ যানাত। বিপদ মুক্তির পরই আবার বহু উপাস্যর উপসনা করে। কারন মনের গভীরে অন্য উপাস্যদের ক্ষমতা আছে বলে বিশ্বাস করার সাথে সাথে আল্লাহর ক্ষমতার প্রতি ও বিশ্বাস ছিল।  আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

فَإِذَا رَڪِبُواْ فِى ٱلۡفُلۡكِ دَعَوُاْ ٱللَّهَ مُخۡلِصِينَ لَهُ ٱلدِّينَ فَلَمَّا نَجَّٮٰهُمۡ إِلَى ٱلۡبَرِّ إِذَا هُمۡ يُشۡرِكُونَ

যখন তারা নৌযানে আরোহণ করে তখন নিজেদের দ্বীনকে একমাত্র আল্লাহর জন্য নির্ধারিত করে নিয়ে তার কাছে ফরিয়াদ করে৷ তারপর যখন তিনি তাদেরকে উদ্ধার করে স্থলে ভিড়িয়ে দেন তখন সহসা তারা শিরক করতে থাকে। সুরা আনকাবুত : ৬৫

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

 إِذۡ تَسۡتَغِيثُونَ رَبَّكُمۡ فَٱسۡتَجَابَ لَڪُمۡ أَنِّى مُمِدُّكُم بِأَلۡفٍ۬ مِّنَ ٱلۡمَلَـٰٓٮِٕكَةِ مُرۡدِفِينَ

আর সেই সময়ের কথা স্মরণ করো যখন তোমরা তোমাদের রবের কাছে ফরিয়াদ করছিলে৷ জবাবে তিনি বললেন, তোমাদের সাহায্য করার জন্য আমি একের পর এক, এক হাজার ফেরেশতা পাঠাচ্ছি৷ সূরা আনফাল : ৯

বর্তমান সমাজের অনেক কে দেখা যায় বিপদ আপদে আল্লাহর পরিবর্তে পীর বা বুজুর্গের কবরের নিকট গিয়ে ফরিয়াদ কর৷ এটা মুশরিকদের একটি গুন তারা বিভিন্ন দেব দেবির কাছে ফরিয়াদ জানায়।

৫। গাইরুল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রর্থনা করা

কোন ক্ষতিকর ব্যক্তি বা বস্তু ক্ষতি হতে বাঁচার জন্য আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করা বা বা সরনাপন্ন হওয়া শিরকে আকবর। আল্লাহ ব্যতীত অদৃশ্য জ্বিন, ভুত, মৃত কিংবা অনুপস্থিত কোনো ব্যক্তি বা বস্তুর নিকট আশ্রয় চাওয়া শিরক। এমন ভাবাও ঠিক নয় যে, অদৃশ্য জ্বিন, ভুত,  মৃত কিংবা অনুপস্থিত কোনো ব্যক্তির নিকট আশ্রয় চাইলে অদৃশ্য ভাবে সাহায্য করবে।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَأَنَّهُ ۥ كَانَ رِجَالٌ۬ مِّنَ ٱلۡإِنسِ يَعُوذُونَ بِرِجَالٍ۬ مِّنَ ٱلۡجِنِّ فَزَادُوهُمۡ رَهَقً۬ا

আর মানুষের মধ্য থেকে কিছু লোক জিনদের কিছু লোকের কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করতো৷ এভাবে তারা জিনদের অহংকার আরো বাড়িয়ে দিয়েছে৷ সুরা জিন : ০৬

এই আয়াতের ব্যাখ্যায় তাফহিমুল কুরআনে বলা হয়েছে, ইবনে আব্বাস বলেন, জাহেলী যুগে আরবরা যখন কোন জনহীন প্রান্তরে রাত্রি যাপন করতো তখন উচ্চস্বরে বলতো, “আমরা এ প্রান্তরের অধিপতি জিনের আশ্রয় প্রার্থনা করছি। জাহেলী যুগের অন্যান্য বর্ণনাতেও এ বিষয়টির বহুল উল্লেখ দেখা যায়। উদাহরণ স্বরূপ , কোন জায়গায় পানি এবং ঘাস ফুরিয়ে গেলে মুরুচারী যাযাবর বেদুঈনরা তাদের একজন লোককে এমন আরেকটি জায়গা খুঁজে বের করতে পাঠাতো যেখানে পানি এবং ঘাস পাওয়া যেতে পারে। অতপর উক্ত ব্যক্তির নির্দেশনা মুতাবিক এসব লোক নতুন জায়গায় পৌছলে সেখানে অবস্থান নেয়ার আগে চিৎকার করে বলতোঃ আমরা এ প্রান্তরের মালিকের আশ্রয় প্রার্থনা করছি, যাতে আমরা এখনে সব রকম বিপদ থেকে নিরাপদে থাকতে পারি। তাদের বিশ্বাস ছিল, প্রত্যেক জনমনবহীন জায়গা কোন না কোন জিনের দখলে আছে। তার আশ্রয় প্রার্থনা ছাড়াই কেউ যদি সেখানে অবস্থান করে তাহলে সে জিন হয় নিজেই তাদের উত্যক্ত করে কিংবা অন্য জিনদের উত্যক্ত করার জন্য লেলিয়ে দেয়। ঈমান আনয়নকারী এ জিনরা এ বিষয়টির প্রতিই ইংগিত করেছে। তাদের কথার অর্থ হলো এ পৃথিবীর খলিফা বা প্রতিনিধি মানুষ। তারাই যখন উল্টা আমাদের ভয় করতে শুরু করেছে এবং আল্লাহকে বাদ দিয়ে আমাদের আশ্রয় প্রার্থনা করতে শুরু করেছে তখন আমাদের জাতির লোকদের মস্তিষ্ক বিকৃতি আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। তাদের গর্ব, অহংকার এবং কুফরী ও জুলুম অত্যাচারের মাত্রা অত্যাধিক বেড়ে গিয়েছে এবং গোমরাহীর ক্ষেত্রে তারা আরো বেপরোয়া হয়ে গিয়েছে।

যুগ যুগ ধরে চলে আশা মিথ্যা বিশ্বাস ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে ইসলামের ঘোষনা খু্বই ষ্পষ্ট। ইসলাম এসে মানবতাকে শিখাল আল্লাহই এক মাত্র আশ্রয়দাতা। সুতারং তার নিকটই আশ্রয় চাইতে হবে।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَإِمَّا يَنزَغَنَّكَ مِنَ ٱلشَّيۡطَـٰنِ نَزۡغٌ۬ فَٱسۡتَعِذۡ بِٱللَّهِ‌ۖ إِنَّهُ ۥ هُوَ ٱلسَّمِيعُ ٱلۡعَلِيمُ

যদি তোমরা শয়তানের পক্ষ থেকে কোন প্ররোচনা আঁচ করতে পার তাহলে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা কর। তিনি সব কিছু শোনেন এবং জানেন৷ সুরা হা-মিম-সাজদাহ : ৩৬

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

 وَقُل رَّبِّ أَعُوذُ بِكَ مِنۡ هَمَزَٲتِ ٱلشَّيَـٰطِينِ  وَأَعُوذُ بِكَ رَبِّ أَن يَحۡضُرُونِ

আর দোয়া করো, ‘‘হে আমার রব! আমি শয়তানদের উস্কানি থেকে তোমার আশ্রয় চাই৷ হে! রব, সে আমার কাছে আসুক এ থেকেও তো আমি তোমার আশ্রয় চাই। সূরা মুমিনুন : ৯৭-৯৮

আল্লাহ তাআলা বলেন:

قُلۡ أَعُوذُ بِرَبِّ ٱلۡفَلَقِ (١) مِن شَرِّ مَا خَلَقَ (٢) وَمِن شَرِّ غَاسِقٍ إِذَا وَقَبَ (٣) وَمِن شَرِّ ٱلنَّفَّـٰثَـٰتِ فِى ٱلۡعُقَدِ (٤) وَمِن شَرِّ حَاسِدٍ إِذَا حَسَدَ (٥)

বল, ‘আমি আশ্রয় প্রার্থনা করছি ঊষার রবের কাছে, তিনি যা সৃষ্টি করেছেন তার অনিষ্ট থেকে,  আর রাতের অন্ধকারের অনিষ্ট থেকে যখন তা গভীর হয়,  আর গিরায় ফুঁ-দানকারী নারীদের অনিষ্ট থেকে, আর হিংসুকের অনিষ্ট থেকে যখন সে হিংসা করে’। সূরা ফালাক : ১-৫

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

قُلۡ أَعُوذُ بِرَبِّ ٱلنَّاسِ (١) مَلِكِ النَّاسِ (٢) إِلَـٰهِ ٱلنَّاسِ (٣) مِن شَرِّ ٱلۡوَسۡوَاسِ ٱلۡخَنَّاسِ (٤) ٱلَّذِى يُوَسۡوِسُ فِى صُدُورِ ٱلنَّاسِ (٥) مِنَ ٱلۡجِنَّةِ وَٱلنَّاسِ (٦)

অর্থ: বল, আমি আশ্রয় চাই মানুষের রব, মানুষের অধিপতি, মানুষের ইলাহ-এর কাছে, কুমন্ত্রণাদাতার অনিষ্ট থেকে, যে দ্রুত আত্মগোপন করে। যে মানুষের মনে কুমন্ত্রণা দেয়। জিন ও মানুষ থেকে।  (সূরা নাস : ১-৬

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

 إِنَّ ٱلَّذِينَ يُجَـٰدِلُونَ فِىٓ ءَايَـٰتِ ٱللَّهِ بِغَيۡرِ سُلۡطَـٰنٍ أَتَٮٰهُمۡۙ إِن فِى صُدُورِهِمۡ إِلَّا ڪِبۡرٌ۬ مَّا هُم بِبَـٰلِغِيهِۚ فَٱسۡتَعِذۡ بِٱللَّهِۖ إِنَّهُ ۥ هُوَ ٱلسَّمِيعُ ٱلۡبَصِيرُ (٥٦)

অর্থ: এবং সকাল সন্ধ্যা নিজের রবের প্রশংসার সাথে সাথে তাঁর পবিত্রতা বর্ণনা করতে থাকো৷ প্রকৃত ব্যাপার হচ্ছে, যারা তাদের কাছে আসা যুক্তি-প্রমাণ ছাড়া আল্লাহর নিদর্শনসমূহের ব্যাপারে ঝগড়া করছে তাদের মন অহংকারে ভরা কিন্তু তারা যে বড়ত্বের অহংকার করে তারা তার ধারেও ঘেঁষতে পারবে না৷ তাই আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করো তিনি সবকিছু দেখেন এবং শোনেন৷ (সুরা মুমিন ৪০:৫৬)।

রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সব সময় আল্লাহর আশ্রয় চাইতেন,

আবূ আহমাদ শাকাল ইবনু হুমাইদ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রসূল! আমাকে একটি দু’আ শিক্ষা দিন। তিনি বললেনঃ তুমি বলোঃ ’’হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে কানের অশ্লীল শ্রবণ, চোখের কুদৃষ্টি, জিহ্বার কুবাক্য, অন্তরের কপটতা ও কামনার অনিষ্টতা হতে আশ্রয় চাই।’ সুনানে আবু দাউদ : ১৫৫১

আবুল ইয়াসার (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরূপ দু’আ করতেনঃ ’’হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে চাপা পড়ে মৃত্যুবরণ হতে আশ্রয় চাই, আশ্রয় চাই গহ্বরে পতিত হয়ে মৃত্যুবরণ হতে, আমি আপনার নিকট হতে আশ্রয় চাই পানিতে ডুবে ও আগুনে পুড়ে মৃত্যুবরণ হতে এবং অতি বার্ধক্য হতে। আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই মৃত্যুকালে শয়তানের প্রভাব হতে, আমি আশ্রয় চাই আপনার পথে জিহাদ থেকে পলায়নপর অবস্থায় মৃত্যুবরণ করা হতে এবং আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই বিষাক্ত প্রাণীর দংশনে মৃত্যুবরণ হতে।’’ সুনানে আবু দাউদ : ১৫৫২

৬। বিপদে গাইরুল্লাহকে আহবান করা

আহ্বানের শিরক বলতে মানুষের ক্ষমতার বাইরে এমন কোন পার্থিব লাভের আশায় অথবা কোন পার্থিব ক্ষতি হতে রক্ষা পাবার উদ্দেশে আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে আহবান করা বুঝায়। আহবান করা মানে নিজের অভাব পূরণের উদ্দেশ্যে সাহায্যের জন্য ডাকা। তবে ঈমানের দাবি হল বিপদ বা সংকটমুক্ত এবং অভাব বা প্রয়োজন পূর্ণ করার সব ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহর হাতেই নিহীত আছৈ। তাই একমাত্র তার কাছেই প্রর্থনা করা সঠিক ও যথার্থ সত্য বলে বিবেচিত। অন্যকে অভাব পূরণের উদ্দেশ্যে সাহায্যের জন্য আহবান করা পরিস্কার শিরক। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَأَنَّ ٱلۡمَسَـٰجِدَ لِلَّهِ فَلَا تَدۡعُواْ مَعَ ٱللَّهِ أَحَدً۬ا  

আর মসজিদসমূহ আল্লাহর জন্য৷ তাই তোমরা আল্লাহর সাথে আর কাউকে আহবান করিও না। সূরা জিন : ১৮

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

. َأَعۡتَزِلُكُمۡ وَمَا تَدۡعُونَ مِن دُونِ ٱللَّهِ وَأَدۡعُواْ رَبِّى عَسَىٰٓ أَلَّآ أَكُونَ بِدُعَآءِ رَبِّى شَقِيًّ۬ا

আমি আপনাদেরকে ত্যাগ করছি এবং আপনারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে যাদেরকে আহবান করেন তাদেরকেও। আমি তো আমার রবকেই আহবান করব৷ আশা করি আমি নিজের রবকে আহবান করে ব্যর্থ হবো না। সুরা মারিয়াম : ৪৮

মানুষের ওপর যখন কোন বিপদ আসে তখন সে গাইরুল্লাহ নিকট সাহায্য কামনা করে তাকে আহবান করে। কিন্তু  সে অন্তরে অন্তরে বিশ্বাস রাখে যে, লাভ ও ক্ষতি করার আসল ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহরই হাতে রয়েছে। তাইতো বিপদের কোথাও থেকে সাহায্য না পেয়ে, সত্যিকার সাহায্য পাওয়ার আশায় সে শুধু এক আল্লাহকেই আহবান করে।আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

 ۞ وَإِذَا مَسَّ ٱلۡإِنسَـٰنَ ضُرٌّ۬ دَعَا رَبَّهُ ۥ مُنِيبًا إِلَيۡهِ ثُمَّ إِذَا خَوَّلَهُ ۥ نِعۡمَةً۬ مِّنۡهُ نَسِىَ مَا كَانَ يَدۡعُوٓاْ إِلَيۡهِ مِن قَبۡلُ وَجَعَلَ لِلَّهِ أَندَادً۬ا لِّيُضِلَّ عَن سَبِيلِهِۦ‌ۚ قُلۡ تَمَتَّعۡ بِكُفۡرِكَ قَلِيلاً‌ۖ إِنَّكَ مِنۡ أَصۡحَـٰبِ ٱلنَّارِ (٨) 

মানুষের ওপর যখন কোন বিপদ আসে তখন সে তার রবের দিকে ফিরে যায় এবং তাঁকে ডাকে৷ কিন্তু যখন তার রব তাকে নিয়ামত দান করেন তখন সে ইতিপূর্বে যে বিপদে পড়ে তাঁকে ডাকছিলো তা ভুলে যায় এবং অন্যদেরকে আল্লাহর সমক্ষ মনে করতে থাকে,  যাতে তারা আল্লাহর পথ থেকে তাকে গোমরাহ করে৷ তাকে বলো, তোমার কুফরী দ্বারা অল্প কিছুদিন মজা করে নাও৷ নিশ্চিতভাবেই তুমি দোযখে যাবে৷  সুরা যুমার : ৮

কাজেই বিপদে ডাকতে হবে একমাত্র আল্লাহকে কেননা তিনি ছাড়া কেহ বিপদ দুর করতে পারবে না। আর যাদের বিপদ উদ্ধারকারী মনে করছে ডাকছে, তারা নিজেরাই নিজেদের রবের নৈকট্যলাভের উপায় খুঁজে বেড়াচ্ছে।  আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

قُلِ ٱدۡعُواْ ٱلَّذِينَ زَعَمۡتُم مِّن دُونِهِۦ فَلَا يَمۡلِكُونَ كَشۡفَ ٱلضُّرِّ عَنكُمۡ وَلَا تَحۡوِيلاً

বল, ‘তাদেরকে ডাক, আল্লাহ ছাড়া তোমরা যাদেরকে (উপাস্য) মনে কর। তারা তো তোমাদের দুঃখ-দুর্দশা দূর করার ও পরিবর্তন করার ক্ষমতা রাখে না’। সুরা বনী ইসরাঈল : ৫৬

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

أُوْلَـٰٓٮِٕكَ ٱلَّذِينَ يَدۡعُونَ يَبۡتَغُونَ إِلَىٰ رَبِّهِمُ ٱلۡوَسِيلَةَ أَيُّہُمۡ أَقۡرَبُ وَيَرۡجُونَ رَحۡمَتَهُ ۥ وَيَخَافُونَ عَذَابَهُ ۥۤ‌ۚ إِنَّ عَذَابَ رَبِّكَ كَانَ مَحۡذُورً۬ا

এরা যাদেরকে ডাকে তারা তো নিজেরাই নিজেদের রবের নৈকট্যলাভের উপায় খুঁজে বেড়াচ্ছে যে, কে তাঁর নিকটতর হয়ে যাবে এবং এরা তাঁর রহমতের প্রত্যাশী এবং তাঁর শাস্তির ভয়ে ভীত। আসলে তোমার রবের শাস্তি ভয় করার মতো৷ সুরা বনী ইসরাঈল : ৫৭

৭। মূর্তি কেন্দ্রেরিক যে কোন আমল জঘন্য শিরকের অংশ

এই পৃথিবীতে শিরকের সুচনা হয়েছিল মূর্তির মাধ্যমে। শিরকের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ এ সম্পর্কে  আলোচনা করা কয়েছে। মূর্তি যে নামেই হোক, যে উদ্দেশ্যেই হোক তা জঘন্য শিরকেরই অংশ। কোনো বিখ্যাত ব্যক্তির সৃম্মি ধরে রাখার জন্য বা অন্য যে কোনো উপলক্ষেই মূর্তি হোক না কেন, এটি জাজ্বল্যমান শিরক। ইসলাম মূর্তি সংস্কৃতির সাথে কখনো আপোষ করেনি।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡۤا اِنَّمَا الۡخَمۡرُ وَالۡمَیۡسِرُ وَالۡاَنۡصَابُ وَالۡاَزۡلَامُ رِجۡسٌ مِّنۡ عَمَلِ الشَّیۡطٰنِ فَاجۡتَنِبُوۡہُ لَعَلَّکُمۡ تُفۡلِحُوۡنَ

হে মুমিনগণ! নিশ্চয়ই মদ, জুয়া, মূর্তি ইত্যাদি এবং লটারীর তীর, এ সব গর্হিত বিষয়, শাইতানী কাজ ছাড়া আর কিছুই নয়। সুতরাং এ থেকে সম্পূর্ণ রূপে দূরে থাক, যেন তোমাদের কল্যাণ হয়। সুরা মায়েদা : ৯০

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

إِنَّمَا تَعۡبُدُونَ مِن دُونِ ٱللَّهِ أَوۡثَـٰنً۬ا وَتَخۡلُقُونَ إِفۡكًا‌ۚ إِنَّ ٱلَّذِينَ تَعۡبُدُونَ مِن دُونِ ٱللَّهِ لَا يَمۡلِكُونَ لَكُمۡ رِزۡقً۬ا فَٱبۡتَغُواْ عِندَ ٱللَّهِ ٱلرِّزۡقَ وَٱعۡبُدُوهُ وَٱشۡكُرُواْ لَهُ ۥۤ‌ۖ إِلَيۡهِ تُرۡجَعُونَ

তোমরা আল্লাহকে বাদ দিয়ে যাদেরকে পূজা করছো তারাতো নিছক মূর্তি আর তোমরা একটি মিথ্যা তৈরি করছো৷  আসলে আল্লাহকে বাদ দিয়ে যাদেরকে তোমরা পূজা করো তারা তোমাদের কোন রিযিকও দেবার ক্ষমতা রাখে না, আল্লাহর কাছে রিযিক চাও, তাঁরই বন্দেগী করো এবং তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো, তারই দিকে তোমাদের ফিরে যেতে হবে৷ সুরা আকাবুত : ১৭

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

 أَفَرَءَيۡتُمُ ٱللَّـٰتَ وَٱلۡعُزَّىٰ (١٩) وَمَنَوٰةَ ٱلثَّالِثَةَ ٱلۡأُخۡرَىٰٓ  

এখন একটু বলতো, তোমরা কি কখনো এ লাত, এ উযযা এবং তৃতীয় আরো একজন দেবতা মানাতের প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে গভীর ভাবে চিন্তা-ভাবনা করে দেখেছো? সৃরা নাজম : ১৯-২০

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَلَقَدۡ ءَاتَيۡنَآ إِبۡرَٲهِيمَ رُشۡدَهُ ۥ مِن قَبۡلُ وَكُنَّا بِهِۦ عَـٰلِمِينَ (٥١) إِذۡ قَالَ لِأَبِيهِ وَقَوۡمِهِۦ مَا هَـٰذِهِ ٱلتَّمَاثِيلُ ٱلَّتِىٓ أَنتُمۡ لَهَا عَـٰكِفُونَ (٥٢) قَالُواْ وَجَدۡنَآ ءَابَآءَنَا لَهَا عَـٰبِدِينَ (٥٣) قَالَ لَقَدۡ كُنتُمۡ أَنتُمۡ وَءَابَآؤُڪُمۡ فِى ضَلَـٰلٍ۬ مُّبِينٍ۬  

আমি এর পূর্বে ইবরাহীমকে সৎ পথের জ্ঞান দিয়েছিলাম এবং আমি তার সম্বন্ধে ছিলাম সম্যক অবগত। যখন সে তার পিতা ও তার সম্প্রদায়কে বললঃ এই মূর্তিগুলি কি, যাদের পূজায় তোমরা রত রয়েছ? তারা বললঃ আমরা আমাদের পিতৃপুরুষদেরকে এদের পূজা করতে দেখেছি। সে বলল, ‘তোমরা নিজেরা এবং তোমাদের পূর্বপুরুষরা সবাই রয়েছ স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে। সুরা আম্বিয়া : ৫১-৫৪

নবী এর আগমনেন অন্যতম উদ্দেশ্য তাওহীদ প্রতিষ্ঠা ও মুর্তি ধ্বংশ-

ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী যখন মক্কা এলেন, তখন কাবা ঘরে প্রবেশ করতে অস্বীকৃতি জানান। কেননা কাবা ঘরের ভিতর মূর্তি ছিল। তিনি নির্দেশ দিলেন এবং মূর্তিগুলো বের করে ফেলা হল। ইবরাহীম ও ইসমাইল (আঃ) এর প্রতিকৃতি বের করে আনা হয়। তাদের উভয়ের হাতে জুয়া খেলার তীর ছিল। তখন নবী ﷺ বললেনঃ আল্লাহ! ধ্বংস করুন। আল্লাহর কসম! অবশ্যই তারা জানে যে, (ইব্রাহীম ও ইসমাঈল আ.) তীর দিয়ে অংশ নির্ধারণের ভাগ্য পরীক্ষা কখনো করেন নি। এরপর নবী ﷺ কাবা ঘরে প্রবেশ করেন এবং ঘরের চারদিকে তাকবীর বলেন। কিন্তু ঘরের ভিতরে সালাত আদায় করেন নি। সহিহ বুখারি : ১৬০১

আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী ﷺ যখন মক্কায় প্রবেশ করেন, তখন কা’বা শরীফের চারপাশে তিনশ ষাটটি মূর্তি ছিল। নবী ﷺ নিজের হাতের লাঠি দিয়ে মূর্তিগুলোকে আঘাত করতে থাকেন আর বলতে থাকেন-

  وَقُلۡ جَآءَ ٱلۡحَقُّ وَزَهَقَ ٱلۡبَـٰطِلُ‌ۚ إِنَّ ٱلۡبَـٰطِلَ كَانَ زَهُوقً۬ا    

সত্য এসে গেছে এবং মিথ্যা বিলুপ্ত হয়ে গেছে, মিথ্যার তো বিলুপ্ত হবারই কথা। (সূরা বনী ইসরাঈল ১৭:৮১)। সহিহ বুখারি : ২৪৭৮

আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৩০২০

জারীর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমাকে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, তুমি কি আমাকে যিলখালাসার ব্যাপারে শাস্তি দিবে না? খাশআম গোত্রে একটি মূর্তি ঘর ছিল। যাকে ইয়ামানের কাবা নামে আখ্যায়িত করা হত। জারীর (রাঃ) বলেন, তখন আমি আহমাসের দেড়শ’ আশ্বরোহী সাথে নিয়ে রওনা করলাম। তারা নিপুন অশ্বারোহী ছিল। জারীর (রাঃ) বলেন, আর আমি অশ্বের উপর স্থির থাকতে পারতাম না। রাসূলুল্লাহ ﷺ আমার বুকে এমনভাবে আঘাত করলেন যে, আমি আমার বুকে তাঁর আঙ্গুলীর চিহৃ দেখতে পেলাম এবং তিনি আমার জন্য এ দোয়া করলেন যে, ’হে আল্লাহ! তাকে স্থির রাখুন এবং হেদায়েত প্রাপ্ত, পথ প্রদর্শনকারী করুন। তারপর জারীর (রাঃ) সেখানে গমন করেন এবং যুলখালাসা মন্দির ভেঙ্গে ফেলে ও জ্বালিয়ে দেন। তারপর রাসূল ﷺ কে এ সংবাদ নিয়ে এক ব্যাক্তিকে তাঁর নিকট প্রেরণ করেন। তখন জারীর (রাঃ) এর দূত বলতে লাগল, কসম সে মহান আল্লাহ তা’আলার! যিনি আপনাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন, আমি আপনার নিকট তখনই এসেছি যখনই যুলখালাসাকে আমরা ধ্বংস করে দিয়েছি। জারীর (রাঃ) বলেন, তারপর রাসূল ﷺ আহমাসের অশ্ব ও অশ্বারোহীদের জন্য পাচঁবার বরকতের দু’আ করেন। সহিহ বুখারি : ২৮১১

বাসা বাড়ির শোকেস গুলোতেও বিভিন্ন মুর্তি শোভা পায় যা মুর্তির প্রতি ভালবাসা বহি:প্রকাশ, যা মূলত: হারাম এবং শিরকেরই মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত।

৮। খোদাই করা ভাষ্কর্যের সামনে সম্মান প্রদর্শন করা

আমাদের সমাজে আজকাল সরাসরি মুর্তি তৈরি না করে বিভিন্ন দেয়ালে মুর্তি খোদাই করে তার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করার সংস্কৃতি চালু হয়েছে। নমরুদের সময় ইব্রাহীম (আ.) যখন মূর্তিগুল ভেঙেছিলেন। তখন তারা চারদিকে জিজ্ঞাসা করে বুঝতে পারল, ইবরাহীম নামের এক যুবক মূর্তি পূজার বিরুদ্ধে নানান কথা বলে বেড়ায়। হয়ত সেই এই কাজ করছে। সে অনুসারে একটি দল দৌড়ে তাঁর কাছে এলো এবং তাঁকে সমবেত জনতার সামনে হাজির করলো। তাকে যখন জিজ্ঞাসা করা হল কে এই মূর্তিগুল ভেঙ্গেছে? ইব্রাহীম (আ.) বললেন, (কুরআনের ভাষায়)।

 قَالَ أَتَعۡبُدُونَ مَا تَنۡحِتُونَ (٩٥) وَٱللَّهُ خَلَقَكُمۡ وَمَا تَعۡمَلُونَ  

সে বললো, “তোমরা কি নিজেদেরই খোদাই করা জিনিসের পূজা করো? অথচ আল্লাহই তোমাদেরকেও সৃষ্টি করেছেন এবং তোমরা যে জিনিসগুলো তৈরি করো তাদেরকেও (সৃষ্টি করেছেন)৷ (সুরা সাফফাত :৯৫-৯৬

আলী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন-

أمرني رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم أَنْ لاَ أَدَعَ قَبْرًا مُشْرِفًا إِلاَّ سَوَّيْتُهُ , وَلاَ تِمْثَالاً إِلاَّ طَمَسْتُهُ

আমাকে রাসূলুল্লাহ ﷺ নির্দেশ দিয়েছেন যে, আমি যাতে সকল উঁচু কবরকে ভেঙ্গে দেই এবং সকল ভাষ্কর্যকে বিলুপ্ত করি”। সহিহ মুসলিম : ৯৬৯

নেককার মানুষের মূর্তিপূজা বানিয়ে সম্মান প্রদর্শন ও পরে পুজা করাই পৃথিবীর প্রাচীনতম শিরক। আজও সেই শিরক সমাজে চালু আছে, তবে মুর্তির সাথে যোগ হয়েছে স্থান, কবর, মাজার, ছবি, প্রতিকৃতি, মিনার, স্মৃতিসৌধে ও ভাষ্কর্য। কবর, ছবি, প্রতিকৃতি, মিনার ও ভাষ্কর্য এগুলো মুর্তি না হলেও বলা যায় মুর্তির আধুনিক সংস্করণ। তাই স্মৃতিসৌধে ফুলদান, তার সামনে শ্রদ্ধা প্রদর্শনের জন্য দাড়িয়ে থাকাও স্পষ্ট শিরক। কেননা এ দ্বারা এমন সম্মানের বহি:প্রকাশ ঘটে, যা শুধুমাত্র আল্লাহর জন্যই হওয়া বাঞ্ছনীয়। ইসলামে কেউ মারা গেলে বা শহীদ হলে তার কবর জিয়ারত করে তার জন্য দু‘আ করা ব্যতীত তাকে শ্রদ্ধা জানানো বা তার স্মৃতি ধরে রাখার জন্য কোনো কিছু করার সুযোগ নেই। এমনকি প্রতিকৃতিও ইসলামে বৈধ নয়। সুতরাং, বাংলাদেশে মূর্তি, প্রতিকৃতি ও স্মৃতিসৌধ প্রভৃতি শিরকের অন্যতম বাহন।  বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে দেখলেই এ বিষয়ে পরিষ্কার হয় যে, আমাদের এই জাতি বিভিন্ন নামে কিভাবে দেয়ালে ভাষ্কর্য খোদাই করে রেখেছে। এটি মূলত: হিন্দুদের সংস্কৃতির স্পষ্ট প্রভাব।

৯। আল্লাহর পরিবর্তে জ্বিনের আশ্রয় চাওয়া

জাহেলীযুগের আরাবের লোকেরা জ্বিনের আশ্রয় চাইত। জ্বিন মানুষের ক্ষতি করতে পারে এমন বিশ্বাস নিয়ে তারা জ্বিনকে ভয় করার মাধ্যমে শিরকের মত পাপাচারে লিপ্ত হত। আল্লাহ ব্যতীত অন্য কিছুর আশ্রয় ও সাহায্য প্রার্থনা করা শির্কে আকবর। আর সেই কাজটি জাহেলীযুগের আরাবের লোকেরা করত। বর্তমানে অনেক মুসলিম জ্বিনের ক্ষমতাকে বিশ্বাস করছে এবং তাদের আশ্রয় বিপদ আপদ থেকে বাচার ব্যর্থ চেষ্টা করছে। এমনকি জ্বিন বাবা নাম দিয়ে ব্যবসা করছে। আর অজ্ঞ লোকেরা হুমড়ু খেয়ে টাকা পয়াসা নিয়ে জ্বিন বাবার পায়ে লুটিয়ে পড়ছে। এভাবে জ্বিনের আশ্রয় বিপদ আপদ থেকে বাচার ব্যর্থ চেষ্টা করা বড় শিরক। আল্লাহ রাব্বুল আলামীণ বলেন-

 وَأَنَّهُ ۥ كَانَ رِجَالٌ۬ مِّنَ ٱلۡإِنسِ يَعُوذُونَ بِرِجَالٍ۬ مِّنَ ٱلۡجِنِّ فَزَادُوهُمۡ رَهَقً۬ا

‘মানুষের মধ্য থেকে কতিপয় লোক জ্বিন সম্প্রদায়ের মধ্যস্থিত কিছু জ্বিনের আশ্রয় নিতো। ফলে ঐ মানুষগুলো জ্বিনদের মান মর্যাদা আত্মন্তরিতা বাড়িয়ে দিতো’’। সুররা জ্বিন : ৬

জ্বিনের আশ্রয়ের পাশাপাশি অনেকে আবার তাদের পূজা করতে শুরু করে। আর অনুমানের সাহায্যে জ্বিনের নামে তারা দেবদেবীদের একটি পূর্ণাঙ্গ বংশ তালিকা তৈরী করে ফেলেছে। অথচ আল্লাহ বলেন, জিন ও মানুষকে আমি শুধু এ জন্যই সৃষ্টি করেছি যে, তারা আমার দাসত্ব করবে, (জারিয়াত-৫৬)৷ আল্লাহর সাথে জ্বিনের পুজা করার আর একটি কারন এও ছিল, তারা বিশ্বাস করত দুনিয়া পরিচালনা এবং মানুষের ভাগ্যের নির্ধারনে আল্লাহর সাথে তাদের শরীকানা আছে। তাইতো তারা এক একজন জ্বিনকে এক একটি ক্ষমতার অধিকারী ভাবতে থাকে। তাদের মধ্যে কেউ বৃষ্টির দেবতা, কেউ ফসল উৎপাদনের দেবতা, কেউ ধন-দৌলতের দেবী, কেউ রোগের দেবী এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে এ ধরনের আরো বিভিন্ন দেবদেবী স্বীকার করে তাদের পূজা শুরু করে। আর আল্লাহর জন্য পুত্র ও কন্যা সন্তান সাব্যস্ত করে। অথচ আল্লাহ তাদের এই ধারনা থেকে অনেক পবিত্র। আজও পৃথিবীর বিভিন্ন মুসরিক জাতীর মধ্যে এই সকল ধারনা প্রচলিত আছে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীণ বলেন-

وَجَعَلُواْ لِلَّهِ شُرَكَآءَ ٱلۡجِنَّ وَخَلَقَهُمۡ‌ۖ وَخَرَقُواْ لَهُ ۥ بَنِينَ وَبَنَـٰتِۭ بِغَيۡرِ عِلۡمٍ۬‌ۚ سُبۡحَـٰنَهُ ۥ وَتَعَـٰلَىٰ عَمَّا يَصِفُونَ

এসব সত্ত্বেও লোকেরা জ্বিনদেরকে আল্লাহর সাথে শরীক করলো,  অথচ তিনি তাদের সৃষ্টিকর্তা৷ আর তারা না জেনে বুঝে তাঁর জন্য পুত্র ও কন্যা তৈরী করে ফেললো, অথচ এরা যেসব কথা বলে তা থেকে তিনি পবিত্র এবং তার উর্ধে৷ সুরা আনআম : ১০০

১০। আগুনকে চিরন্তন বিশ্বাস করে পুজা করা

প্রাচীন কাল থেকে মুশরীকগন আগুনের পুজা করত। আগুনের দায্য ক্ষমতার নিকট আত্মসমর্পণ করত। অগ্নীপূজকগন তাই আগুন কে মহান আল্লাহর সমক্ষ দাড় করিয়েছে। আব্দুল ওয়াহাব নাজদী আততামীমীর “মুখতাছিরু সীরাতির রাসূল” বইয়ের একটি বর্ণনায় পাওয়া যায় রাসূলুল্লাহ ﷺ এর জম্মলাভের সময় পৃথিবীতে যে পরিবর্তন সাধিত হয় সে স্পর্কে বলা হয়: ‘‘অগ্নি উপাসকরা যে আগুনকে পূজা করত তা নিভে যায়।’’ অর্থাৎ অগ্নীপূজকগন এই আগুন দীর্ঘদিন ধরে অবিরত প্রজ্জ্বলিত রেখে তার পূজা করাত।

আমাদের দেশে ‘শিখা চিরন্তন’ ‘শিখা অনির্বাণ’ নামে দুটি শিখা প্রজ্জ্বলিত আছে। ইহা মূলত অগ্নি উপাসকদের মত উপসনা করা। উল্লেখ্য যে, ‘চিরন্তন’ শব্দটিও শুধুমাত্র মহান আল্লাহর ক্ষেত্রেই ব্যবহার হতে পারে। ইসলামের দৃষ্টিতে মহান আল্লাহই চিরন্তন, অন্যকিছু কক্ষনো চিরন্তন নয়। আল্লাহ রাব্বুল আলামীণ বলেন-

كُلُّ مَنۡ عَلَيۡهَا فَانٖ ٢٦ وَيَبۡقَىٰ وَجۡهُ رَبِّكَ ذُو ٱلۡجَلَٰلِ وَٱلۡإِكۡرَامِ

পৃথিবীর প্রতিটি জিনিসই ধ্বংসশীল এবং শুধুমাত্র তোমার মহিমাময় মহানুভব রবের সত্তাই অবশিষ্ট থাকবে। সূরা আর রহমান : ২৬-২৭

আল্লাহ রাব্বুল আলামীণ বলেন-

اَللّٰہُ لَاۤ اِلٰہَ اِلَّا ہُوَ ۚ اَلۡحَیُّ الۡقَیُّوۡمُ 

আল্লাহ, তিনি ছাড়া কোন ইলাহ নেই, তিনি চিরঞ্জীব, চিরন্তনের ধারক। সুরা বাকারা : ২৫৫

সৃষ্টি জগতের সবই নশ্বর। কোন কিছুরই স্থায়ত্ব নাই। একমাত্র মহান আল্লাহই চিরঞ্জীব, চিরন্তনের ধারক। আগুনকে চিরন্তন বলে তার গুনের সমকক্ষ দাড় করান অজ্ঞারই পরিচায়ক। শিখা অনির্বাণ বা শিখা চিরন্তনের মাধ্যমে মহান আল্লাহকে বাদ দিয়ে মূলত শিরকের দিকেই মানুষকে নিয়ে যাচ্ছে। আল্লাহর নিজস্ব গুনবাচক কোন নামে তাঁরই সৃষ্ট কোনো কিছুকে গুণান্বিত করা শিরকের অন্তর্ভুক্ত। তাই প্রজ্জ্বলিত আগুন কে চিরন্তন বা অনির্বান নামকরণও প্রকাশ্য শিরক অন্তর্ভূক্ত।

ইবাদত বা আমলগত শিরকে আকবর : দ্বিতীয় পর্ব (১১-২২)

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

১১। ঈসা (আ.) কে মহান আল্লাহর সাথে তুলনা করা

সাধারনত খৃষ্টান ধর্মের অনুসারিগন ঈসা (আ.) কে মহান আল্লাহর সাথে তুলনা করে থাকে। তারাই এই শিরকের প্রবক্তা, অনুসারী এবং প্রচার কারি। খৃষ্টানদের অপপ্রচারে কারণে কিছু শিক্ষিত কিন্তু ইসলামি জ্ঞানে অজ্ঞ নামধারি মুসলিম লোকেরাও বিভ্রান্ত হচ্ছে। এই শিরক থেকে বাচতে চাইলে প্রথমে চাই এ সম্পর্কে পরিস্কার ধারনা। মহান আল্লাহই এ ব্যাপারটি পরিস্কান করে দিয়েছেন। তিনি পবিত্র কুরআনে আল্লাহ রাব্বুল আলামীণ বলেন-

 لَقَدۡ ڪَفَرَ ٱلَّذِينَ قَالُوٓاْ إِنَّ ٱللَّهَ هُوَ ٱلۡمَسِيحُ ٱبۡنُ مَرۡيَمَ‌ۖ وَقَالَ ٱلۡمَسِيحُ يَـٰبَنِىٓ إِسۡرَٲٓءِيلَ ٱعۡبُدُواْ ٱللَّهَ رَبِّى وَرَبَّڪُمۡ‌ۖ إِنَّهُ ۥ مَن يُشۡرِكۡ بِٱللَّهِ فَقَدۡ حَرَّمَ ٱللَّهُ عَلَيۡهِ ٱلۡجَنَّةَ وَمَأۡوَٮٰهُ ٱلنَّارُ‌ۖ وَمَا لِلظَّـٰلِمِينَ مِنۡ أَنصَارٍ۬  

নিসন্দেহে তারা কুফরী করেছে যারা বলেছে, মারয়াম পুত্র মসীহ্‌ই আল্লাহ৷ অথচ মসীহ্‌ বলেছেন, হে নবী ইসরাঈল! আল্লাহর বন্দেগী করো, যিনি আমার রব এবং তোমাদেরও রব ! যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করেছে তার ওপর আল্লাহ জান্নাত হারাম করে দিয়েছেন এবং তার আবাস জাহান্নাম ৷ আর এ ধরনের জালেমদের কোন সাহায্যকারী নেই৷ সুরা মায়েদা : ৭২

আল্লাহ রাব্বুল আলামীণ বলেন-

لَّقَدۡ ڪَفَرَ ٱلَّذِينَ قَالُوٓاْ إِنَّ ٱللَّهَ ثَالِثُ ثَلَـٰثَةٍ۬‌ۘ وَمَا مِنۡ إِلَـٰهٍ إِلَّآ إِلَـٰهٌ۬ وَٲحِدٌ۬‌ۚ وَإِن لَّمۡ يَنتَهُواْ عَمَّا يَقُولُونَ لَيَمَسَّنَّ ٱلَّذِينَ كَفَرُواْ مِنۡهُمۡ عَذَابٌ أَلِيمٌ (٧٣)

অর্থ: নিসন্দেহে তারা কুফরী করেছে যারা বলেছে, আল্লাহ তিন জনের মধ্যে একজন৷ অথচ এক ইলাহ্‌ ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই যদি তারা নিজেদের এই সব কথা থেকে বিরত না হয়, তাহলে তাদের মধ্য থেকে যারা কুফরী করেছে তাদেরকে যন্ত্রণা দায়ক শাস্তি দেয়া হবে৷  সুরা মায়েদা : ৭৩

আল্লাহ রাব্বুল আলামীণ বলেন-

 مَّا ٱلۡمَسِيحُ ٱبۡنُ مَرۡيَمَ إِلَّا رَسُولٌ۬ قَدۡ خَلَتۡ مِن قَبۡلِهِ ٱلرُّسُلُ وَأُمُّهُ ۥ صِدِّيقَةٌ۬‌ۖ ڪَانَا يَأۡڪُلَانِ ٱلطَّعَامَ‌ۗ ٱنظُرۡ ڪَيۡفَ نُبَيِّنُ لَهُمُ ٱلۡأَيَـٰتِ ثُمَّ ٱنظُرۡ أَنَّىٰ يُؤۡفَكُونَ (٧٥) 

অর্থ: মারয়াম পুত্র মসীহ্‌ তো একজন রসূল ছাড়া আর কিছুই ছিল না?  তার পূর্বেও আরো অনেক রসূল অতিক্রান্ত হয়েছিল৷ তার মা ছিল একজন সত্যনিষ্ঠ মহিলা৷ তারা দুজনই খাবার খেতো৷ দেখো কিভাবে তাদের সামনে সত্যের নিদর্শনগুলো সুস্পষ্ট করি৷ তারপর দেখো তারা কিভাবে উল্টো দিকে ফিরে যাচ্ছে৷ সুরা মায়েদা : ৭৫

উপরের তিনটি আয়াতের দ্ব্যর্থহীনভাবে খৃষ্টীয় আকীদার সুস্পষ্ট প্রতিবাদ করা হয়েছে। যদি কেই প্রশ্ন করে হযরত ঈসা (আ.) কি ছিলেন? তিনি সম্পূর্ণ সন্দেহাতীভাবে একজন মানুষ ছিলেন। তিনি আল্লাহর একজন প্রিয় বান্দা ও রাসুল ছিলেন। মানুষের হেদায়েতের পৃথিবীতে অনেক নবী রাসূল এসেছিল, তিনি তাদের মধ্যে একজন। তিনি নিজে কখন বলে নাই, আমিই আল্লাহ, আমিই রব বা এমন ও দাবি করে নাই যে, আমি আল্লাহর সন্তান (নাউজুবিল্লহ)। তিনি নিজে আল্লাহ বা আল্লাহর কাজে তাঁর সাথে শরীক ও তাঁর সমকক্ষ করতেন না।  তিনি যে এক জন সত্যিকারের মানুষ তার প্রমান, তার জন্ম এক মহিলার গর্ভে, যার একটি বংশ তালিকা আছে, যিনি মানবিক দেহের অধিকারী ছিলেন, তিনি ঘুমাতেন, খেতেন, ঠাণ্ডা-গরম অনুভব করতেন।আসলে যে ঈসা (আ.) এর আবির্ভাব বাস্তবে ঘটেছিল, যিনি রাসুল ছিলেন তার আনিত ধর্ম থেকে খৃষ্টানগন আজ বহুদুরে। সত্যিকার ঈসা আলাইহিস সালামকে তারা মানে না। বরং তারা মানে নিজেদের কল্পিত  ঈসা মসিহ কে।

১২। সৃষ্টি ও ইবাদতে মহান আল্লাহর সাথে ফিরিস্তাদের সম্পৃক্ত করা

জাহেলীযুগের আবরের মূর্খ লোকরা ফিরিস্তাদের আল্লাহর মেয়ে কল্পনা করত এবং এর তারা আল্লাহর সৃষ্ট মাকলুক ফিরিস্তাদেরকে কাল্পনিকভাবে আল্লাহর সমকক্ষ দাড় করিয়েছে। এমনকি তারা কাল্পনিকভাবে আল্লাহর বংশ তালিকাও তৈরি করে তা আল্লাহর বংশধারা চালিয়ে দিয়েছে। তারা ফিরিস্তাদেরকে বিভিন্ন দেবীদের নামে নামকরণ করে পুজা করত যা স্পষ্ট শিরকি কাজ৷  আর এসব তারা করত শুধু অনুমানের ভিত্তিতে, কোন প্রমান ছাড়াই।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীণ বলেন-

 إِنَّ ٱلَّذِينَ لَا يُؤۡمِنُونَ بِٱلۡأَخِرَةِ لَيُسَمُّونَ ٱلۡمَلَـٰٓٮِٕكَةَ تَسۡمِيَةَ ٱلۡأُنثَىٰ (٢٧) وَمَا لَهُم بِهِۦ مِنۡ عِلۡمٍ‌ۖ إِن يَتَّبِعُونَ إِلَّا ٱلظَّنَّ‌ۖ وَإِنَّ ٱلظَّنَّ لَا يُغۡنِى مِنَ ٱلۡحَقِّ شَيۡـًٔ۬ا (٢٨) 

কিন্তু যারা আখেরাত মানে না তারা ফিরিস্তাদেরকে দেবীদের নামে নামকরণ করে৷  অথচ এ ব্যাপারে তাদের কোন জ্ঞানই নেই৷ তারা কেবলই বদ্ধমূল ধারণার অনুসরণ করছে৷  আর ধারণা কখনো জ্ঞানের প্রয়োজন পূরণে কোন কাজে আসতে পারে না৷ সুরা নাজম : ২৭-২৮

জাহেলী যুগের মুশরিকেরা দু’টি কারণে ফেরেশতাদেরকে মাবুদে পরিণত করে তাদের পুজা করত।  প্রথমত, তারা বিশ্বাস করত ফিরিস্থাগন আল্লাহর সন্তান। দ্বিতীয়ত, পরকালের কঠিন সময় তারা আল্লাহর কাছে তাদের শাফায়াতকারীতে (সুপারিশকারী) পরিণত হবে। তার দলিল কুরআনের নিচের আয়াত। আল্লাহ রাব্বুল আলামীণ বলেন-

 لَا يَسۡبِقُونَهُ ۥ بِٱلۡقَوۡلِ وَهُم بِأَمۡرِهِۦ يَعۡمَلُونَ (٢٧) يَعۡلَمُ مَا بَيۡنَ أَيۡدِيہِمۡ وَمَا خَلۡفَهُمۡ وَلَا يَشۡفَعُونَ إِلَّا لِمَنِ ٱرۡتَضَىٰ وَهُم مِّنۡ خَشۡيَتِهِۦ مُشۡفِقُونَ (٢٨)

 এরা বলে, করুণাময় সন্তান গ্রহণ করেন৷ সুবহানাল্লাহ! তারা তো মর্যাদাশালী বান্দা৷তারা তাঁর সামনে অগ্রবর্তী হয়ে কথা বলে না এবং শুধুমাত্র তাঁর হুকুমে কাজ করে৷যাকিছু তাদের সামনে আছে এবং যাকিছু আছে তাদের অগোচরে সবই তিনি জানেন৷ যাদের পক্ষে সুপারিশ শুনতে আল্লাহ সম্মত তাদের পক্ষে ছাড়া আর কারো সুপারিশ তারা করে না এবং তারা তাঁর ভয়ে ভীত৷ সুরা আম্বিয়া : ২৭-২৮

ফিরিস্থাগন আল্লাহর সন্তান, তাদের এই দাবির আসারনত প্রমান করে. আল্লাহ রাব্বুল আলামীণ বলেন-

 وَجَعَلُواْ ٱلۡمَلَـٰٓٮِٕكَةَ ٱلَّذِينَ هُمۡ عِبَـٰدُ ٱلرَّحۡمَـٰنِ إِنَـٰثًا‌ۚ أَشَهِدُواْ خَلۡقَهُمۡ‌ۚ سَتُكۡتَبُ شَهَـٰدَتُہُمۡ وَيُسۡـَٔلُونَ (١٩) وَقَالُواْ لَوۡ شَآءَ ٱلرَّحۡمَـٰنُ مَا عَبَدۡنَـٰهُم‌ۗ مَّا لَهُم بِذَٲلِكَ مِنۡ عِلۡمٍ‌ۖ إِنۡ هُمۡ إِلَّا يَخۡرُصُونَ (٢٠)

এরা দয়াময় আল্লাহর খাস বান্দা ফিরিস্থাগনকে স্ত্রীলোক গন্য করেছে। এরা কি তাদের দৈহিক গঠন দেখেছে? এদের সাক্ষ্য লিপিবদ্ধ করে নেয়া হবে এবং সে জন্য এদেরকে জবাবদিহি করতে হবে৷ এরা বলে, দয়াময় আল্লাহ যদি চাইতেন তাহলে আমরা কখনো পূজা করতাম না। এ বিষয়ে প্রকৃত সত্য এরা আদৌ জানে না, কেবলই অনুমানে কথা বলে৷ সুরা জুকরুক : ১৯-২০

পরকালের কঠিন সময় আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কেহই সুপারিশকারী করতে পারবে না। ফেরেশতা, নবী সৎলোক প্রত্যেকের সুপারিশ করার এখতিয়ার আল্লাহর অনুমতি সাপেক্ষ। আল্লাহ তাদের কাউকে কোন ব্যক্তির পক্ষে শাফায়াত করার অনুমতি দিলে তবেই তারা তার পক্ষে শাফায়াত করতে পারবেন। নিজে পক্ষ থেকে তারা কোন ব্যক্তির জন্য সুপারিশ করতে পারেন না। আর  সুপারিশ শোনা বা না শোনা এবং তা কবুল করা বা না করা সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল। কাজেই এসব মনগড়া উপাস্যদের সুপারিশ উপকারে আসা তো দূরের কথা, সমস্ত ফেরেশতা মিলেও যদি কারো জন্য সুপারিশ করে তথাপিও তা তার কাজে আসবে না। প্রভুত্বের এখতিয়ারসমূহ সবই পুরোপুরি আল্লাহর হাতে।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীণ বলেন-

وَكَم مِّن مَّلَكٍ۬ فِى ٱلسَّمَـٰوَٲتِ لَا تُغۡنِى شَفَـٰعَتُہُمۡ شَيۡـًٔا إِلَّا مِنۢ بَعۡدِ أَن يَأۡذَنَ ٱللَّهُ لِمَن يَشَآءُ وَيَرۡضَىٰٓ

 আসমানে তো কত ফেরেশতা আছে যাদের সুপারিশও কোন কাজে আসতে পারে না যতক্ষণ না আল্লাহ নিজ ইচ্ছায় যাকে খুশী তার জন্য সুপারিশ করার অনুমতি দান করেন৷  সুরা নাজম :  ২৬

কাজেই এ ধরনের ক্ষমতাহীন সুপারিশকারীর সামনে মাথা নোয়ানো এবং প্রার্থনার করা বড় শিরক। কোন জিনিসের আল্লাহর জ্ঞানের অন্তরভুক্ত না হওয়ার মানেই হচ্ছে এই যে, সেটির আদতে কোন অস্তিত্বই নেই। কারণ, যা কিছুর অস্তিত্ব আছে সবই আল্লাহর জ্ঞানের অন্তরভুক্ত। আকাশে ও পৃথিবীতে আল্লাহর কাছে সুপারিশকারী আছে অথচ স্বয়ং আল্লাহই জানেন না। আল্লাহ রাব্বুল আলামীণ বলেন-

وَيَعۡبُدُونَ مِن دُونِ ٱللَّهِ مَا لَا يَضُرُّهُمۡ وَلَا يَنفَعُهُمۡ وَيَقُولُونَ هَـٰٓؤُلَآءِ شُفَعَـٰٓؤُنَا عِندَ ٱللَّهِ‌ۚ قُلۡ أَتُنَبِّـُٔونَ ٱللَّهَ بِمَا لَا يَعۡلَمُ فِى ٱلسَّمَـٰوَٲتِ وَلَا فِى ٱلۡأَرۡضِ‌ۚ سُبۡحَـٰنَهُ ۥ وَتَعَـٰلَىٰ عَمَّا يُشۡرِكُونَ

এ লোকেরা আল্লাহকে বাদ দিয়ে যাদের ইবাদত করছে তারা তাদের ক্ষতিও করতে পারে না, উপকারও করতে পারে না৷ আর তারা বলে এরা আল্লাহর কাছে আমাদের সুপারিশকারী৷ হে মুহাম্মাদ! ওদেরকে বলে দাও, “তোমরা কি আল্লাহকে এমন বিষয়ের খবর দিচ্ছো যার অস্তিত্বের কথা তিনি আকাশেও জানেন না এবং যমিনেও না! তারা যে শিরক করে তা থেকে তিনি পাক-পবিত্র এবং তার উর্ধে৷  সুরা ইউনুস : ১৮

২২। আল্লাহকে বাদ দিয়ে শয়তানের উপসনা করা

সৃষ্টিকর্তা হিসাবে মহান আল্লাহই এক মাত্র উপসনার যোগ্য। তাকে বাদে যারই ইবাদাত করা হোক না কেন বড় শিরকের অন্তভূক্ত হবে। তাইতো মহান আল্লাহ শয়তানের ইবাদাত করতে নিষেধ করছেন। এবং শুধু তারই ইবাদাত করতে নির্দেষ প্রদান করছেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামীণ বলেন-

أَلَمۡ أَعۡهَدۡ إِلَيۡكُمۡ يَـٰبَنِىٓ ءَادَمَ أَن لَّا تَعۡبُدُواْ ٱلشَّيۡطَـٰنَ‌ۖ إِنَّهُ ۥ لَكُمۡ عَدُوٌّ۬ مُّبِينٌ۬ (٦٠) وَأَنِ ٱعۡبُدُونِى‌ۚ هَـٰذَا صِرَٲطٌ۬ مُّسۡتَقِيمٌ۬ (٦١) وَلَقَدۡ أَضَلَّ مِنكُمۡ جِبِلاًّ۬ كَثِيرًا‌ۖ أَفَلَمۡ تَكُونُواْ تَعۡقِلُونَ (٦٢)  

হে আদম সন্তানেরা! আমি কি তোমাদের এ মর্মে হিদায়াত করিনি যে, শয়তানের ইবাদাত করো না, সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু। এবং আমারই ইবাদাত করো, এটিই সরল-সঠিক পথ। কিন্তু এ সত্ত্বেও সে তোমাদের মধ্য থেকে বিপুল সংখ্যককে গোমরাহ করে দিয়েছে, তোমাদের কি বুদ্ধি-জ্ঞান নেই? সুরা ইয়াসিন : ৬০-৬২

শয়তানের ইবাদাত কো দুরের কথা কোন অবস্থায় শয়তানের আনুগত্য প্রকাশ করা যাবে। কুরআনের অনেক স্থানে আল্লাহ বলেন, “ হে ঈমানগারগণ! আনুগত্য করো আল্লাহর এবং আনুগত্য করো রসূলের”। আমরা কেবলমাত্র রসূলের আনুগত্য করার পথেই আল্লাহর আনুগত্য করতে পারি। রসূলের সনদ ও প্রমাণপত্র ছাড়া আল্লাহর কোন আনুগত্য গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। অপর পক্ষে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, “‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍স্রষ্টার নাফরমানি করে কোন সৃষ্টির আনুগত্য করা যাবে না”। এ থেকে বুঝা যায় আল্লাহর এবং রসূলের আনুগত্য বাদ দিয়ো শয়তানের অনুসরণ করা শিরক।   

আল্লাহ রাব্বুল আলামীণ বলেন-

يَـٰٓأَيُّہَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ لَا تَتَّبِعُواْ خُطُوَٲتِ ٱلشَّيۡطَـٰنِ‌ۚ وَمَن يَتَّبِعۡ خُطُوَٲتِ ٱلشَّيۡطَـٰنِ فَإِنَّهُ ۥ يَأۡمُرُ بِٱلۡفَحۡشَآءِ وَٱلۡمُنكَرِ‌ۚ

হে ঈমানদানগণ! শয়তানের পদাংক অনুসরণ করে চলো না ৷ যে কেউ তার অনুসরণ করবে তাকে সে অশ্লীলতা ও খারাপ কাজ করার হুকুম দেবে৷ সুরা নূর : ২১

১৩ দুনিয়া পরিচালনের ক্ষেত্র আল্লাহ সাথে গাইরুল্লাহকে সম্পৃক্ত করা

মহান আল্লাহ আকাশ থেকে পৃথিবী পর্যন্ত দুনিয়ার যাবতীয় বিষয় পরিচালনা করেন। এই কাজ করতে তিনি কখন ক্লান্ত হন না। “আল্লাহ এমন এক চিরঞ্জীব ও চিরন্তন সত্তা যিনি সমগ্র বিশ্ব-জাহানের দায়িত্বভার বহন করছেন, তিনি ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই ৷ তিনি ঘুমান না এবং তন্দ্রাও তাঁকে স্পর্শ করে না, পৃথিবী ও আকাশে যা কিছু আছে সবই তাঁর” (বাকারা:২৫৫)।  তার কোন সাহায্যকারিও দরকার হয় না। তিনি একক ক্ষমতার অধিকারী, তিনি কারো মুখাপেক্ষি নন (ইখলাস)। যদি কেউ বিশ্বাস করে মহান আল্লাহ দুনিয়ার যাবতীয় বিষয় পরিচালনা করার জন্য অন্যের সাহায্য দরকার তবে সে নিসন্দেহে মুশরিক। আল্লাহ রাব্বুল আলামীণ বলেন-

 يُدَبِّرُ ٱلۡأَمۡرَ مِنَ ٱلسَّمَآءِ إِلَى ٱلۡأَرۡضِ ثُمَّ يَعۡرُجُ إِلَيۡهِ فِى يَوۡمٍ۬ كَانَ مِقۡدَارُهُ ۥۤ أَلۡفَ سَنَةٍ۬ مِّمَّا تَعُدُّونَ (٥)

তিনি আকাশ থেকে পৃথিবী পর্যন্ত দুনিয়ার যাবতীয় বিষয় পরিচালনা করেন এবং এ পরিচালনার বৃত্তান্ত ওপরে তার কাছে যায় এমন একদিনে যার পরিমাপ তোমাদের গণনায় এক হাজার বছর ৷ সুরা সাজদা : ৫

আল্লাহ রাব্বুল আলামীণ বলেন-

قُلۡ مَن يَرۡزُقُكُم مِّنَ ٱلسَّمَآءِ وَٱلۡأَرۡضِ أَمَّن يَمۡلِكُ ٱلسَّمۡعَ وَٱلۡأَبۡصَـٰرَ وَمَن يُخۡرِجُ ٱلۡحَىَّ مِنَ ٱلۡمَيِّتِ وَيُخۡرِجُ ٱلۡمَيِّتَ مِنَ ٱلۡحَىِّ وَمَن يُدَبِّرُ ٱلۡأَمۡرَ‌ۚ فَسَيَقُولُونَ ٱللَّهُ‌ۚ فَقُلۡ أَفَلَا تَتَّقُونَ  

তাদেরকে জিজ্ঞেস করো, কে তোমাদের আকাশ ও পৃথিবী থেকে রিযিক দেয়? এই শুনার ও দেখার শক্তি কার কর্তৃত্বে আছে? কে প্রাণহীন থেকে সজীবকে এবং সজীব থেকে প্রাণহীনকে বের করে? কে চালাচ্ছে এই বিশ্ব ব্যবস্থাপনা”? তারা নিশ্চয়ই বলবে, আল্লাহ৷ বলো, তবুও কি তোমরা সতর্ক হচ্ছো না? সুরা ইউনুস : ৩১

কিন্তু খুবই পরিতাপের বিষয় আমাদের সমাজের কিছু নামধারী মুসলিমের বিশ্বাস, আল্লাহ যেহেতু একা, সেহেতু একাই তার পক্ষে পুরো বিশ্বজগত পরিচালনা করা সম্ভব নয় (নাউজুবিল্লাহ)। ফলে তিনি তাঁর বিশ্ব পরিচালনা কাজের সুবিধার্থে আরশে মু‘আল্লায় একটি পার্লামেন্ট কায়েম করেছেন। সেই পার্লামেন্টের সদস্য সংখ্যা মোট ৪৪১ জন। আল্লাহ তাদের স্ব-স্ব কাজ বুঝিয়ে দিয়েছেন। তন্মধ্যে নাজীর ৩১৯ জন, নাকীব ৭০ জন, আওতাদ ৭ জন, কুতুব ৫ জন, আবদাল ৪০ জন এবং একজন হলেন গাউসুল আযম যিনি মক্কায় থাকেন। উম্মতের মধ্যে আবদাল ৪০ জন আল্লাহ তা‘আলার মধ্যস্থতায় পৃথিবীবাসীর বিপদাপদ দূরীভূত করে থাকেন। আর আওলিয়া দ্বারা সৃষ্ট জীবের হায়াত, রুযী, বৃষ্টি, বৃক্ষ জন্মান ও মুছীবত বিদূরণের কার্য সম্পাদন করেন। মৃতগণ কবরে শ্রবণ, দর্শন ও উপলদ্ধি করে থাকেন। তাদের শ্রবণ ও দর্শন যদিও সব সময় থাকে, কিন্তু জুম‘আর দিনে তা বাড়িয়ে দেয়া হয় এবং সাধারণ মৃত ব্যক্তিরাও কোনরূপ ব্যতিক্রম ছাড়া যিয়ারাতকারীদের সাথে কথা বলে। অথচ আল্লাহ রাব্বুল আলামীণ বলেন-

ٱللَّهُ ٱلَّذِى رَفَعَ ٱلسَّمَـٰوَٲتِ بِغَيۡرِ عَمَدٍ۬ تَرَوۡنَہَا‌ۖ ثُمَّ ٱسۡتَوَىٰ عَلَى ٱلۡعَرۡشِ‌ۖ وَسَخَّرَ ٱلشَّمۡسَ وَٱلۡقَمَرَ‌ۖ كُلٌّ۬ يَجۡرِى لِأَجَلٍ۬ مُّسَمًّ۬ى‌ۚ يُدَبِّرُ ٱلۡأَمۡرَ يُفَصِّلُ ٱلۡأَيَـٰتِ لَعَلَّكُم بِلِقَآءِ رَبِّكُمۡ تُوقِنُونَ (٢) 

আল্লাহই স্তম্ভ ছাড়াই আকাশমন্ডলীকে ঊর্ধ্বে তুলে রেখেছেন, যা তোমরা দেখছ, অতঃপর তিনি আরশে সমুন্নত হয়েছেন। তিনিই সূর্য ও চন্দ্রকে নিয়মের বন্ধনে বশীভূত রেখেছেন। প্রত্যেকেই নির্দিষ্ট সময়ের জন্য গতিশীল আছে। যাবতীয় বিষয় তিনিই নিয়ন্ত্রণ করেন, তিনি নিদর্শনসমূহ বিশদভাবে বর্ণনা করেন যাতে তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের সঙ্গে সাক্ষাতের ব্যাপারে দৃঢ় বিশ্বাসী হতে পার। সুরা রাদ : ২

১৪। তাগুতের  অনুসরন করা

তাগুদ বলতে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো সন্তষ্টির জন্য ইবাদাত করা এবং সে (তগুত) তার ইবাদাতে সস্তষ্টু থাকে। অথবা আল্লাহ বা তার রাসুল ব্যতিত অন্য যার আনুগত্য করা হয়, তাকে তাগুত বলা হয়। যেমন: শয়তান, অত্যাচারি শ্বাসক, আল্লাহর আইন ভঙ্গকারী শ্বাসক, ভন্ড পীর যে ইসলাম বিরোধী কাজের আহবানকরে। ইবাদাতের এক মাত্র অধিকারী মহান আল্লাহ। মানুষ যখন সেই ইবাদত আল্লাহর জন্য না করে তাগুতের জন্য করে তখন শিরক হয়।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীণ বলেন-

 وَلَقَدۡ بَعَثۡنَا فِى ڪُلِّ أُمَّةٍ۬ رَّسُولاً أَنِ ٱعۡبُدُواْ ٱللَّهَ وَٱجۡتَنِبُواْ ٱلطَّـٰغُوتَ‌ۖ فَمِنۡهُم مَّنۡ هَدَى ٱللَّهُ وَمِنۡهُم مَّنۡ حَقَّتۡ عَلَيۡهِ ٱلضَّلَـٰلَةُ‌ۚ فَسِيرُواْ فِى ٱلۡأَرۡضِ فَٱنظُرُواْ كَيۡفَ كَانَ عَـٰقِبَةُ ٱلۡمُكَذِّبِينَ

প্রত্যেক জাতির মধ্যে আমি একজন রসূল পাঠিয়েছি এবং তার মাধ্যমে সবাইকে জানিয়ে দিয়েছি যে, আল্লাহর বন্দেগী করো এবং তাগূতের বন্দেগী পরিহার করো৷ সুরা নাহল : ৩৬

আল্লাহ রাব্বুল আলামীণ বলেন-

اَللّٰہُ وَلِیُّ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا ۙ  یُخۡرِجُہُمۡ مِّنَ الظُّلُمٰتِ اِلَی النُّوۡرِ ۬ؕ  وَالَّذِیۡنَ کَفَرُوۡۤا اَوۡلِیٰٓـُٔہُمُ الطَّاغُوۡتُ ۙ  یُخۡرِجُوۡنَہُمۡ مِّنَ النُّوۡرِ اِلَی الظُّلُمٰتِ ؕ  اُولٰٓئِکَ اَصۡحٰبُ النَّارِ ۚ  ہُمۡ فِیۡہَا خٰلِدُوۡنَ 

আল্লাহই হচ্ছেন মু’মিনদের অভিভাবক। তিনি তাদেরকে অন্ধকার হতে আলোর দিকে নিয়ে যান; আর যারা অবিশ্বাস করেছে তাগুত তাদের পৃষ্ঠপোষক, সে তাদেরকে আলো হতে অন্ধকারের দিকে নিয়ে যায়, তারাই জাহান্নামের অধিবাসী, ওখানে তারা চিরকাল অবস্থান করবে। সুরা বাকারা : ২৭৭

আল্লাহ রাব্বুল আলামীণ বলেন-

 أَلَمۡ تَرَ إِلَى ٱلَّذِينَ يَزۡعُمُونَ أَنَّهُمۡ ءَامَنُواْ بِمَآ أُنزِلَ إِلَيۡكَ وَمَآ أُنزِلَ مِن قَبۡلِكَ يُرِيدُونَ أَن يَتَحَاكَمُوٓاْ إِلَى ٱلطَّـٰغُوتِ وَقَدۡ أُمِرُوٓاْ أَن يَكۡفُرُواْ بِهِۦ وَيُرِيدُ ٱلشَّيۡطَـٰنُ أَن يُضِلَّهُمۡ ضَلَـٰلاَۢ بَعِيدً۬ا

হে নবী! তুমি কি তাদেরকে দেখোনি, যারা এই মর্মে দাবী করে চলেছে যে, তারা ঈমান এনেছে সেই কিতাবের প্রতি যা তোমার ওপর নাযিল করা হয়েছে এবং সেই সব কিতাবের প্রতি যেগুলো তোমরা পূর্বে নাযিল করা হয়েছিল কিন্তু তারা নিজেদের বিষয়সমূহ ফায়সালা করার জন্য “তাগুতে”র দিকে ফিরতে চায়, অথচ তাদেরকে তাগুতকে অস্বীকার করার হুকুম দেয়া হয়েছিল?  শয়তান তাদেরকে পথভ্রষ্ট করে সরল সোজা পথ থেকে অনেক দূরে সরিয়ে নিয়ে যেতে চায়৷ সুরা নিসা : ৬০ 

এই আয়াতে ‘তাগুত’ বলতে ঐ সকল শ্বাসকদের বুঝানো হয়েছ আল্লাহর আইন বাদ দিয়ে মানুষের তৈরি আইন অনুযায়ী ফালসালা কাজেই যে আদালত তাগুতের ভূমিকা পালন করছে অর্থাৎ মানুষের তৈরি আইন দ্বারা নিজেদের বিভিন্ন বিষয়ের ফায়সালা করে। আর আল্লাহ ও তাঁর কিতাবের ওপর ঈমান আনার অপহিহার্য দাবি হল এ ধরনের আদালতকে অবৈধ মনে করা। কুরআনের দৃষ্টিতে আল্লাহর প্রতি ঈমান আনা ও তাগুতকে অস্বীকার করা, এ দু’টি বিষয় পরস্পরের সাথে অংঙ্গাঅঙ্গীকারভাবে সংযুক্ত এবং এদের একটি অন্যটির অনিবার্য পরিণতি। আল্লাহ ও তাগুত উভয়ের সামনে একই সাথে মাথা নত করাই হচ্ছে সুস্পষ্ট শিরকে আকবর।

১৫ কবর কেন্দ্রিক মাজার নির্মাণ করে সিজদার স্থানে পরিণত করা

সুফিগন কবর কেন্দ্রিক মাজার তৈরি করে অনেক বিদআত ও শির্ক কাজ করে চলছে। অথচ নবী ﷺ কবর নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে উম্মাতকে সতর্ক করেছেন।

আয়িশাহ ও আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাযি.) বলেছেন, নবী ﷺ এর মৃত্যু পীড়া শুরু হলে তিনি তাঁর একটা চাদরে নিজ মুখমণ্ডল আবৃত করতে লাগলেন। যখন শ্বাস বন্ধ হবার উপক্রম হলো, তখন মুখ হতে চাদর সরিয়ে দিলেন। এমতাবস্থায় তিনি বললেন-

‏ لَعْنَةُ اللَّهِ عَلَى الْيَهُودِ وَالنَّصَارَى اتَّخَذُوا قُبُورَ أَنْبِيَائِهِمْ مَسَاجِدَ ‏”‏‏.‏ يُحَذِّرُ مَا صَنَعُوا‏.‏

ইয়াহুদী ও নাসারাদের প্রতি আল্লাহর অভিশাপ, তারা তাদের নবীদের কবরকে মসজিদে পরিণত করেছে। তারা যে কার্যকলাপ করত তা হতে তিনি সতর্ক করেছিলেন। সহিহ বুখারি : ৪৩৫, ৪৩৬, ১৩৩০, ১৩৯০, ৩৪৫৩, ৩৪৫৪, ৪৪৪১, ৪৪৪৩, ৪৪৪৪, ৫৮১৫, ৫৮১৬, সহিহ মুসলিম : ৫৩১

আবূ হুরায়রা (রাঃ) বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

قَاتَلَ اللَّهُ الْيَهُودَ اتَّخَذُوا قُبُورَ أَنْبِيَائِهِمْ مَسَاجِدَ ‏‏

আল্লাহ ইয়াহুদীদেরকে ধ্বংস করুক, তারা তাদের নবীদের কবরগুলোকে মসজিদ বানিয়ে নিয়েছে। সহিহ মুসলিম : ১০৬৮ ইফাঃ

আয়িশাহ (রা.) হতে বর্ণিত যে, উম্মু হাবীবা ও উম্মু সালামা (রা.) হাবশায় তাঁদের দেখা একটা গির্জার কথা বলেছিলেন, যাতে বেশ কিছু মূর্তি ছিল। তাঁরা উভয়ে বিষয়টি নবী ﷺ এর নিকট বর্ণনা করলেন। তিনি ইরশাদ করলেন, তাদের অবস্থা ছিল এমন যে, কোন সৎ লোক মারা গেলে তারা তার কবরের উপর মাসজিদ বানাতো। আর তার ভিতরে ঐ লোকের মূর্তি তৈরি করে রাখতো। কিয়ামত দিবসে তারাই আল্লাহর নিকট সবচাইতে নিকৃষ্ট সৃষ্টজীব বলে পরিগণিত হবে। সহিহ বুখঅরি : ৪২৭, ৪৩৪, ১৩৪১, ৩৭৩, সহিহ মুসলিম : ৫২৮

জুনদুব (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ ﷺ এর মৃত্যুর পাঁচদিন পূর্বে তাকে বলতে শুনেছি যে, তোমাদের মধ্যে থেকে আমার কোন খলীল বা একান্ত বন্ধু থাকার ব্যাপারে আমি আল্লাহর কাছে মুক্ত। কারণ মহান আল্লাহ ইবরাহীমকে যেমন খলীল বা একান্ত বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করেছেন, সে রকমভাবে আমাকেও খলীল বা একান্ত বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করেছেন। আমি আমার উম্মাতের মধ্য থেকে কাউকে খলীল বা একান্ত বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করতে চাইলে আবূ বকরকেই তা করতাম। সাবধান থেকো তোমাদের পূর্বের যুগের লোকেরা তাদের নবী ও নেককার লোকদের কবরসমূহকে মাসজিদ (সাজদার স্থান) হিসেবে গ্রহণ করত। সাবধান তোমরা কবরসমূহকে সাজদার স্থান বানাবে না। আমি এরূপ করতে তোমাদেরকে নিষেধ করে যাচ্ছি। সহিহ মুসলিম : ৫৩২

আবূল হায়াজ আসাদী রহ. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আলী (রা.) আমাকে বললেন, আমি কি তোমাকে ঐ কাজে পাঠাব যে কাজে রাসুলুল্লাহ ﷺ আমাকে পাঠিয়ে ছিলেন? কাজটা হল সকল মূর্তিকে বিলুপ্ত এবং উচু কবরকে ভেঙ্গে দিবে। সহিহ মুসলিম : ২১১৫ ইফঃ

এমনিভাবে নবী ﷺনিষেধ করেছেন, কবর পাকা করতে, চুনকাম করতে, তার উপর বসতে নিষেধ করেছেন।

জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ কবরের উপর চুনা লাগানো, তার উপর বসা, কবরের উপর গৃহনির্মাণ বা পাকা করতে নিষেধ করেছেন। সহিহ মুসলিম : ২১১৭ ইফঃ

এই হাদিসগুলোর আলোকে বুঝা যায় কথিত পীর আলি আউলিয়াদের নামে মাজার নির্মান করা হারাম ও কবিরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত। এই পর্যন্ত করলে কবিরা গুনাহ দ্বারা ইসলাম থেকে বহিস্কার কবে না কিন্তু যখন এই মাজরের মৃত্যু ব্যক্তির নিকট ফরিয়াদ করা হবে, তার নিকট আশ্রায় চাওয়া হবে, তাকে হিদায়েত প্রদানকারী গন্য করা হবে, তার অলৌকিক ক্ষমতা আছে বিশ্বাস করা হবে, এমনি তাকে সিজদার হকদার মনে করে মাজারে সিজদা করা হবে তখন আর কবিরা গুনাহে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এই কবিরা গুনাহটি তখন শিরকে পরিনত হয়ে ঐ মাজার পুজারীকে ইসলাম থেকে বহিস্কার করে দিবে।

** একটি সংশয়ের নিরষনঃ নবী এর কবর মসজিদে নব্বীর মধ্যে কেন?

মসজিদে নব্বী নির্মিত হয়েছে নবী ﷺ এর জীবদ্দশায়। মসজিদটি সম্প্রসারনের কারনে মনে হয় মসজিদটি কবরের উপর নির্মিত। রাসূল ﷺ কে মূলত, আয়েশা (রা.) এর কামরায় দাফন করা হয়েছিল। আশেয়া (রাঃ) এর ঘরটি নবী ﷺ এর মসজিদের মিম্বর থেকে মাত্র ৫০/৬০ মিটার দুরে। কাজেই যখন মসজিদটি সম্প্রসারনের সিদ্ধান্ত হয় তখন দেখা যায় আশেয়া (রাঃ) এর ঘরটি মসজিদের ভিতরে পড়ে যায়। দাফনের পর ৮৪ বছরেরও বেশী সময় পর্যন্ত রাসূল ﷺ এর কবর মসজিদের বাইরেই ছিল। ৯৪ হিজরী সনে মসজিদ সম্প্রসারণ কালে একজন উমাইয়া খলীফা মসজিদে নববী সম্প্রসারণ করলে আয়েশা (রা.) এর কামরা মসজিদের ভেতরে পড়ে যায়। উল্লেখ্য যে, তৎকালীন আলেমগণ কর্তৃক উক্ত কামরা মসজিদের ভেতরে প্রবেশ করানোর বিরোধিতা খলীফা গ্রাহ্য করেন নি। তাই বলা যায় নবী ﷺ কবরটি মসজিদের ভিতরে প্রবেশ করানো সাহাবীদের ইজমার আলোক সিদ্ধান্তে হয়নি বরং তাদের অধিকাংশের মৃত্যুর পর হয়েছে। এই সম্প্রসারণের কাজে বহু সাহাবী ও তাবেয়ী দ্বিমতও পোষণ করেছিলেন এবং বাধা দিয়েছিলেন। তাবেঈনদের মধ্যে সাঈদ বিন মুসাইয়েব তাদের অন্যতম।

যারা হজ্জে গিয়ে নবী ﷺ এর কবর জিয়ারত করেছেন তারা দেখেছেন যে, কবরটি মুল মসজিদের এক পাশে পড়েছে তাই কবরটি মসজিদের ভিতরে নেই। কারণ উহা মসজিদ হতে সম্পূর্ণ পৃথক রুমে রয়েছে। এই স্থানটিকে তিনটি প্রাচীর দ্বারা সংরক্ষিত ও বেষ্টিত করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রাচীরকে এমন একটি দিকে রাখা হয়েছে যা কিবলা হতে বিপরীত পার্শে রয়েছে এবং উহার এক সাইড উল্টা দিকে রয়েছে, যাতে করে কোন সানুষ নামায পড়া কালীন উহাকে সম্মুখীন না করতে পারে কারণ উহা কিবলা হতে এক পার্শে রয়েছে। এছাড়া কবরটি বাহির থেকে সরাসরি দেখা যায় না। মনে হবে চার দেয়ালের মাঝে একটি রুম। যারা নবী ﷺ এর কবর মসজিদের ভিতরে বলে দলীল প্রদান করেন তাদের জন্য উপরের বক্তব্য টুকু যথেষ্ঠ। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেনঃ

إِنَّمَا يَعْمُرُ مَسَاجِدَ اللهِ مَنْ آمَنَ بِاللهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ

একমাত্র তারাই আল্লাহর মাসজিদসমূহ আবাদ করবে, যারা আল্লাহ ও শেষ দিবসের প্রতি ঈমান রাখে। (সূরা তাওবা ৯:১৮)

১৬  পীরের মৃত্যু বার্ষিকীতে উরশ উৎযাপন করা

সবার ধারনা সুফিগন তাদের শাইখদের করবকে কেন্দ্রকরে প্রতিবছর মৃত্যু বার্ষিকীতে উরশ উৎযাপন করে তার মূরত বিদআত। আসলে এই সম্পর্কে জানতে পাবরে আপনার চক্ষু আকাশে চলে যাবে। সত্যি কথা বলতে কি উরশ উৎযাপন করা বিদআত নয় বরং শিরক।   

আশরাফ আলি থালভী রহ. একটি প্রশ্নের উত্তর থেকে উরশের সজ্ঞা জেনে নেই। তিনি বলেন, মানুষ বর্তমানে বুযুর্গেদের নামে উরসের যে পন্থা অবলম্বন করেছে এটা শরীয়ত সিদ্ধ নয় এবং সীমালংঘনের শামিল। মূলত উরসের আভিধানিক অর্থ আনন্দ ও খুসি, প্রেমীক-প্রেমাস্পদের মিলনের যা অর্জিত হয় থাকে। ওফাতের মাধ্যমে যেহেতু প্রেমাস্পদের সাথে তাদের মিলন সাধিত হয়, কাজেই তাদের মৃত্যু দিবসকে ইয়াওমুল উরস বলা হয়।  আশরাফুল জওয়ার, প্রথম খন্ড, পৃ-১০৫

সুফিগন আল্লাহর সাথে প্রেম বা ইশক করার দাবি করে। তারা মারা গেলে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সাথে তাদের বিরহ ব্যাথার সমাপ্তি ঘটে তাই তাদরে মৃত্যু বার্ষিকীতে উরশ নামক উৎসব পালণ করে থাকে। দেখুন আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের সাথে কতবড় বেয়াদবী। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَمَا قَدَرُوا اللّٰہَ حَقَّ قَدۡرِہٖ 

আর তারা আল্লাহকে যথাযোগ্য মর্যাদা দেয়নি। সুরা যুমার : ৬৭

অপর পক্ষে কবর কে কেন্দ্র করে যে কোন ধরনের উত্সব করতে রাসূলুল্লাহ ﷺ নিষেধ করেছেন। তার নিষেধ উপক্ষা করে কুফরি ধারন নিয়ে বিদআতি উরশ নামক উৎসব পালণ করা হয়। 

আবূ হুরাইরাহ (রা.) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

لَا تَجْعَلُوا بُيُوتَكُمْ قُبُورًا، وَلَا تَجْعَلُوا قَبْرِي عِيدًا، وَصَلُّوا عَلَيَّ فَإِنَّ صَلَاتَكُمْ تَبْلُغُنِي حَيْثُ كُنْتُمْ

তোমরা তোমাদের ঘরগুলোকে কবরস্থানে পরিণত করো না এবং আমার কবরকে উৎসবের স্থানে পরিণত করো না। তোমরা আমার উপর দরূদ পাঠ করো। তোমরা যেখানেই থাকো না কেন তোমাদের দরূদ আমার কাছে পৌঁছানো হবে। সুনানে আবু দাউদ : ২০২৪

কবরকে উৎসবের স্থানে পরিণত করে তারা বিদআতের সুচনা করে আর উরশের মাধ্যমে প্রেমিক প্রেমাস্পদের মিলন হয় এই ধারনা করে কুফরি কাজ করেছে। এই ধরনের কাজ আল্লাহ রাব্বুল আলামীন চরম ক্রোধের কাজ। তাই এই সকল শিরকি বিদআত পরিহার করে সুন্নাহ সম্মত জীবন গড়ি।

১৭ ইবাদতের জন্য মাজারের চার পাশে তাওয়াফ করা

তাওয়াফের শির্ক বলতে একমাত্র বাইতুল্লাহ ছাড়া অন্য কোন বস্ত্তর তাওয়াফ করাকে বুঝানো হয়। ইদানিং দেখা যাচ্ছে অনেকে বাইতুল্লাহর অনুকরণে ঘর বানিয়ে তাওয়াফ করছে। এটি একটি গর্হিত অপরাদ। বাইতুল্লাহ ব্যতিত অন্য কোন বস্তুর তাওয়াফ করাও শিরক। অনেকে মাজারের তাওয়াফ করছেন যা শিরকের পাশাপাশি আল্লাহর আদেশের সাথে চরম বেয়াদবি। আল্লাহ আদেশ মত একমাত্র ক্বাবা ঘরেরই তাওয়াফ করতে হবে। যেহতু কাবা ঘর তাওয়াফ একটি ইবাদত। সুতারং আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো সন্ত্বষ্টির জন্য বাইতুল্লাহর তাওয়াফ করা যাবে না। এই ইবাদাতটি করার জন্য তিনি নিজেই কুরআনের কারিমে আদেশ দান করেছেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন,

وَإِذْ جَعَلْنَا ٱلْبَيْتَ مَثَابَةً لِّلنَّاسِ وَأَمْنًا وَٱتَّخِذُوا۟ مِن مَّقَامِ إِبْرَٰهِۦمَ مُصَلًّىۖ وَعَهِدْنَآ إِلَىٰٓ إِبْرَٰهِۦمَ وَإِسْمَٰعِيلَ أَن طَهِّرَا بَيْتِىَ لِلطَّآئِفِينَ وَٱلْعَٰكِفِينَ وَٱلرُّكَّعِ ٱلسُّجُودِ

আর স্মরণ কর, যখন আমি কাবাকে মানুষের জন্য মিলনকেন্দ্র ও নিরাপদ স্থান বানালাম এবং তোমরা মাকামে ইবরাহীমকে সালাতের স্থানরূপে গ্রহণ কর। আর আমি ইবরাহীম ও ইসমাঈলকে দায়িত্ব দিয়েছিলাম যে, ‘তোমরা আমার গৃহকে তাওয়াফকারী, ‘ইতিকাফকারী ও রুকূকারী-সিজদাকারীদের জন্য পবিত্র কর। সুরা বাকারা : ১২৫

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَإِذْ بَوَّأْنَا لِإِبْرَٰهِيمَ مَكَانَ ٱلْبَيْتِ أَن لَّا تُشْرِكْ بِى شَيْـًٔا وَطَهِّرْ بَيْتِىَ لِلطَّآئِفِينَ وَٱلْقَآئِمِينَ وَٱلرُّكَّعِ ٱلسُّجُودِ

আর স্মরণ কর, যখন আমি ইবরাহীমকে সে ঘরের (বাইতুল্লাহ) স্থান নির্ধারণ করে দিয়েছিলাম এবং বলেছিলাম, ‘আমার সাথে কাউকে শরীক করবে না এবং আমার ঘরকে পাক সাফ রাখবে তাওয়াফকারী, রুকূ-সিজদা ও দাঁড়িয়ে সালাত আদায়কারীর জন্য।  সুরা হজ্জ : ২৬

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

ثُمَّ لْيَقْضُوا۟ تَفَثَهُمْ وَلْيُوفُوا۟ نُذُورَهُمْ وَلْيَطَّوَّفُوا۟ بِٱلْبَيْتِ ٱلْعَتِيقِ

তারপর তারা যেন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হয়, তাদের মানতসমূহ পূরণ করে এবং প্রাচীন ঘরের তাওয়াফ করে। সুরা হজ্জ : ২৬

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

 ثُمَّ لْيَقْضُوا تَفَثَهُمْ وَلْيُوفُوا نُذُورَهُمْ وَلْيَطَّوَّفُوا بِالْبَيْتِ الْعَتِيقِ

এরপর তারা যেন দৈহিক ময়লা দূর করে দেয়, তাদের মানত পূর্ণ করে এবং এই সুসংরক্ষিত গৃহের তাওয়াফ করে। (সুরা হাজ্জ্ব ২২:২৯)

কাবা ঘর বা বাইতুল্লাহ তাওয়াফ করা সম্পর্ক আল্লাহ রাব্বুল আলামীন নির্দেশ উল্লেখ করলাম। হজ্জ্ব ও উমরাকারীদের একটি ফরজ আমল হলো কাবা ঘর তাওয়াফ করা। এই সম্পর্ক শত শত হাদসি আছে। এখানে হাদিস উল্লেখ করলাম না। কেউ যদি আল্লাহ রাব্বুল আলামীন নির্দেশ উপেক্ষা করে অন্য কোন ঘরের তাওয়াফ করে, তাহলে সে আল্লাহ হুকুমকে অবমাননা করল।  সকল মুসলিমের কাছে অতি সুস্পষ্ট যে তাওয়াফ এমন একটি ইবাদত, যা কাবা ঘরের চতুর পার্শ্বে এবং একমাত্র আল্লাহর জন্যই করতে হবে। কিন্তু মিশরে সায়্যেদ বদভীর কবরের চতুর্দিকে সুফীরা কাবা ঘরের তাওয়াফের ন্যায় তাওয়াফ করে থাকে। সুফিদের শাইখদের মাজারের চার পাশের এই তাওয়াফ সম্পুর্ণভাবে হারাম এবং ইবাদাতে তার সাথে শির্ক কাজ। এই শিরকি কাজটি বুঝতে আর কাউকে আলেম হতে হবে না।

আবু হুরাইরাহ্ (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন:

لاَ تَقُوْمُ السَّاعَةُ حَتَّى تَضْطَرِبَ أَلَيَاتُ نِسَاءِ دَوْسٍ حَوْلَ ذِيْ الْـخَلَصَةِ

কিয়ামত সংঘটিত হবেনা যতক্ষণ না দাউস্ গোত্রের মহিলারা পাছা নাচিয়ে যুল্খালাসা নামক মূর্তির তাওয়াফ করবে। সহিহ বুখারি : ৭১১৬, সহিহ মুসলিম : ২৯০৬, ইবনু হিব্বান : ৬৭১৪, আব্দুর রাযযাক : ২০৭৯৫

১৭। মৃতব্যক্তি, ওলী, পীর, মুরুব্বি, খাজা, প্রমুখ ব্যক্তিদের নিকট সাহায্য চাওয়া

যে কোন বস্তু  চাইতে হবে জীবিত বা উপস্থিত ব্যক্তির নিকট। মৃত ব্যক্তির নিকট নয় নিছু চাওয়া শিকরে আকবর। একে তো চাওয়া শিরক তার উপর মৃত ব্যক্তিকে চিরঞ্জিব করা হয় যা মহান আল্লাহর একক গুন।  সুরা মুহাম্মদে জীবিত মু’মিন নারী ও পুরুষদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে বলছেন-

 فَٱعۡلَمۡ أَنَّهُ ۥ لَآ إِلَـٰهَ إِلَّا ٱللَّهُ وَٱسۡتَغۡفِرۡ لِذَنۢبِكَ وَلِلۡمُؤۡمِنِينَ وَٱلۡمُؤۡمِنَـٰتِ

অতএব, হে নবী! ভাল করে জেনে নাও, আল্লাহ ছাড়া আর কেউ ইবাদাতের যোগ্য নয়৷ নিজের ত্রুটির জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করো৷ এবং মুমিন নারী ও পুরুষদের জন্যও৷ সুরা মুহাম্মদ : ১৯)

জীবিত কারো কাছে দোয়া চাওয়া বা সাহায্য চাওয়া জায়েয বা বৈধ কিন্তু আমাদের দেশে মৃতব্যক্তি, ওলী, পীর, মুরুব্বি, খাজা, প্রমুখ ব্যক্তিদের কাছে চাওয়ার যে প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়, তা স্পষ্ট শিরকেরই অন্তর্ভুক্ত। এ কাজ তারা দুটি শিরকি আকিদা থেকে করে থাকে। প্রথমত তাদের ধারনা অলীগণ কবরে জীবিত। দ্বিতীয়ত মৃত্যুঅলী মৃত্যুর পর এমন কিছু ক্ষমার অধিকারি হয়েছে যা জীবিতদের নাই।

অথচ আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَمَا يَسۡتَوِى ٱلۡأَحۡيَآءُ وَلَا ٱلۡأَمۡوَٲتُۚ إِنَّ ٱللَّهَ يُسۡمِعُ مَن يَشَآءُۖ وَمَآ أَنتَ بِمُسۡمِعٍ۬ مَّن فِى ٱلۡقُبُورِ

আর জীবিতরা ও মৃতরা এক নয়, নিশ্চয় আল্লাহ যাকে ইচ্ছা শুনাতে পারেন, কিন্তু যে ব্যক্তি কবরে আছে তাকে তুমি শুনাতে পারবে না।  সুরা ফাতির : ২২

কাজেই কোনো মৃতব্যক্তি, ওলী, পীর, মুরুব্বি, খাজা, প্রমুখ ব্যক্তিদের কাছে দুয়া চাওয়া শিরক।  

১৮। আল্লাহ তাআলা ছাড়াও অন্য কেউ কারোর অন্তরের খবর রাখেন

একমাত্র মহান আ্ল্লাহই মানুষের অন্তরের খবর জানেন। কিছু ভন্ড পীর বা আল্লাহর ওলি বাদিদার কিছু প্রতারক দাবি করে যে সেও মানুষের অন্তরের খবর রাখেন। অনেক অজ্ঞ মানুষ ভন্ডদের কথা বিশ্বাস করে। এই দুই শ্রেণীর লোকই কাফির। কেননা তারা উভয়ই আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সমকক্ষ দাড় করিয়েছে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

أُو۟لَٰٓئِكَ ٱلَّذِينَ يَعْلَمُ ٱللَّهُ مَا فِى قُلُوبِهِمْ فَأَعْرِضْ عَنْهُمْ وَعِظْهُمْ وَقُل لَّهُمْ فِىٓ أَنفُسِهِمْ قَوْلًۢا بَلِيغًا

ওরা তো তারাই যাদের অন্তরের কথা আল্লাহ জানেন। তাই তুমি তাদেরকে উপেক্ষা করো, আর কিছু উপদেশ দাও এবং তাদের মনে প্রভাব ফেলতে পারে এমন কিছু কথা বল। সুরা নিসা : ৬৩

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

يَعْلَمُ خَآئِنَةَ ٱلْأَعْيُنِ وَمَا تُخْفِى ٱلصُّدُورُ

চক্ষুসমূহের খেয়ানত এবং অন্তরসমূহ যা গোপন রাখে তিনি তা জানেন। (সুরা গাফির ৪০:১৯)

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন,

أَوَلَيْسَ ٱللَّهُ بِأَعْلَمَ بِمَا فِى صُدُورِ ٱلْعَٰلَمِينَ

আল্লাহ কি বিশ্ববাসীর অন্তরের কথা সম্যক অবগত নন?  সুরা আনকাবুত : ১০

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

إِنَّ ٱللَّهَ عَلِيمٌۢ بِذَاتِ ٱلصُّدُورِ

আল্লাহ অন্তরের খবর ভাল করেই জানেন।  সুরা লোকমান : ২৩

১৯। আল্লাহ তাআলা ছাড়াও কেউ কাউকে সন্তান-সন্ততি দিতে পারে

আল্লাহ তায়ালা ছাড়াও কেউ কাউকে সন্তান-সন্ততি দিতে পারে না। অনেক অজ্ঞ মুসলিমকে দেখা যায় সন্তান লাভের আশায় মাজারে মাজরে ঘুরে। এমনাকি অনেক ভন্ড প্রতারক ফকিরের খপ্পরে পড়ে নি:শ্ব হয়েছেন। অথচ তার উচিত ছিল শরিয়ত সম্মত চিকত্সার পাশাপাশি মহান আল্লাহ উপর তাওয়াক্বুল করে তার নিকটই সাহায্য চাওয়া।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

لِّلَّهِ مُلْكُ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلْأَرْضِۚ يَخْلُقُ مَا يَشَآءُۚ يَهَبُ لِمَن يَشَآءُ إِنَٰثًا وَيَهَبُ لِمَن يَشَآءُ ٱلذُّكُورَ

আসমানসমূহ ও যমীনের রাজত্ব আল্লাহরই। তিনি যা চান সৃষ্টি করেন। তিনি যাকে ইচ্ছা কন্যা সন্তান দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা পুত্র সন্তান দান করেন। সুরা শুরা : ৪৯

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

رَبِّ هَبْ لِى مِنَ ٱلصَّٰلِحِينَ

হে প্রভু! আমাকে সৎ সন্তান দান কর।”(সুরা সাফফাত : ১০০

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَٱلَّذِينَ يَقُولُونَ رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَٰجِنَا وَذُرِّيَّٰتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَٱجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا

আর যারা বলে, ‘হে আমাদের রব, আপনি আমাদেরকে এমন স্ত্রী ও সন্তানাদি দান করুন যারা আমাদের চক্ষু শীতল করবে। আর আপনি আমাদেরকে মুত্তাকীদের নেতা বানিয়ে দিন’। সুরা ফুরকান : ৭৪

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

فَأَرَدْنَآ أَن يُبْدِلَهُمَا رَبُّهُمَا خَيْرًا مِّنْهُ زَكَوٰةً وَأَقْرَبَ رُحْمًا

 তাই আমরা চাইলাম, তাদের প্রভু তাদেরকে ঐ ছেলের পরিবর্তে পবিত্রতায় শ্রেয়তর ও মায়া-মমতায় নিকটতর একটি ছেলে দান করুক।  সুরা কাহাব : ৮১

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন,

هُنَالِكَ دَعَا زَكَرِيَّا رَبَّهُۥۖ قَالَ رَبِّ هَبْ لِى مِن لَّدُنكَ ذُرِّيَّةً طَيِّبَةًۖ إِنَّكَ سَمِيعُ ٱلدُّعَآءِ

সেখানে যাকারিয়া তার প্রভুর কাছে দোয়া করে। সে বলে, “হে আমার প্রভু! আমাকে তোমার পক্ষ থেকে (তোমার বিশেষ কৃপায়) ভাল সন্তান দান কর। অবশ্যই তুমি দোয়া শ্রবণকারী।”  (সুরা আল ইমরান ৩:৩৮)

২০। গাইরুল্লাহর জন্য ইবাদাত

আমাদের সালাত, সিয়াম, হজ, জাকাত, কুরবানি, জিকির, দান, সদগা, তিলওয়াত, আচার, আচরণ ইত্যাদি সব ইবাদাত পাওয়ার একমাত্র যোগ হক ইলাহ হলো মহান আল্লাহ। কিন্তু কোন ইবাদাত যদি মহান আল্লাহর জন্য না করে গাইরুল্লাহ জন্য করা হয় তবে শির্ক হবে। ইবাদতের ধরনের উপর নির্ভর করে অনেক সময় শিরকে আকবর আবার কখনও শিরকে আজগর হয়।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

قُلْ أَتَعْبُدُونَ مِن دُونِ ٱللَّهِ مَا لَا يَمْلِكُ لَكُمْ ضَرًّا وَلَا نَفْعًاۚ وَٱللَّهُ هُوَ ٱلسَّمِيعُ ٱلْعَلِيمُ

বল, ‘তোমরা কি আল্লাহ ছাড়া এমন কিছুর ইবাদাত করবে, যা তোমাদের জন্য কোন ক্ষতি ও উপকারের ক্ষমতা রাখে না? আর আল্লাহ, তিনিই সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ’সুরা মায়েদা : ৭৬

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَإِذْ أَخَذْنَا مِيثَٰقَ بَنِىٓ إِسْرَٰٓءِيلَ لَا تَعْبُدُونَ إِلَّا ٱللَّهَ وَبِٱلْوَٰلِدَيْنِ إِحْسَانًا وَذِى ٱلْقُرْبَىٰ وَٱلْيَتَٰمَىٰ وَٱلْمَسَٰكِينِ

যখন আমি বনী ইসরাঈলের অঙ্গীকার গ্রহণ করলাম যে তোমরা আল্লাহ ছাড়া কারো ইবাদাত করবে না এবং সদাচার করবে পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন, ইয়াতীম ও মিসকীনদের সাথে। সুরা বাকারা : ৮৩

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

لَا تَجۡعَلۡ مَعَ اللّٰہِ اِلٰـہًا اٰخَرَ فَتَقۡعُدَ مَذۡمُوۡمًا مَّخۡذُوۡلًا

আল্লাহর সাথে অপর কোন ইলাহ নির্ধারণ করো না। তাহলে তুমি নিন্দিত ও লাঞ্ছিত হয়ে বসে পড়বে। সুরা বনী ইসরাইল : ২২

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

أَن لَّا تَعْبُدُوٓا۟ إِلَّا ٱللَّهَۖ إِنِّىٓ أَخَافُ عَلَيْكُمْ عَذَابَ يَوْمٍ أَلِيمٍ

তোমরা আল্লাহ ছাড়া আর কারও ইবাদাত করনা। আমি তোমাদের উপর এক ভীষণ যন্ত্রণাদায়ক দিনের শাস্তির আশংকা করছি। সুরা হুদ : ২৬

এই সম্পর্কিত আরও জানতে দেখুন- সুরা বাকারা : ১৩৩, সুরা ইউনুস : ২৮, ১০৪, সুরা হুদ : ২, সুরা আম্বিয়া : ৬৬, ৬৭, ৯৮)

২১। গাইরুল্লার জন্য রুকু, সিজদাহ করা বা তার সামনে বিনম্রভাবে দাঁড়ানো

রুকু, সিজদাহ করা বা তার সামনে বিনম্রভাবে দাঁড়ানো মহান আল্লাহ প্রদত্ত একটি ইবাদত। আল্লাহ প্রদত্ত পদ্ধতিতে যে কোন কাজ করাই ইবাদত। সালাত আদায়ে মহান আল্লাহর কোন লাভ বা ক্ষতি নাই। তিনি দেখতে চান কে তার প্রদত্ত আদেশ নিষেধ মেনে চলেন। আর এই সালাতেই দুটি ফজর রুকণ হলো  রুকু ও সিজদাহ সঠিকভাবে আদায় করা। যে পদ্ধতি মহান আল্লাহ তার ইবাদত করার হুকুম দিয়েছেন সেই পদ্ধতি কোন গাইরুল্লাহ ইবাদত করলে তাকে আল্লাহর সমকক্ষ দাড় করা হয়। তাই বলা যায়,  গাইরুল্লার জন্য রুকু, সিজদাহ করা বা তার সামনে বিনম্রভাবে দাঁড়ানো শিরক হবে। 

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَمَا خَلَقْتُ ٱلْجِنَّ وَٱلْإِنسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ

জ্বিন ও মানুষকে আমি আমার ইবাদত করার জন্যই সৃষ্টি করেছি। সুরা জারিয়াত : ৫৬

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইবাদতের সুন্দরতম মাধ্যম হলো, তাকে সিজদাহ করা, রুকু করা তার সমানে বিনম্রভাবে দাড়ান। এই সম্পর্কে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

يَٰمَرْيَمُ ٱقْنُتِى لِرَبِّكِ وَٱسْجُدِى وَٱرْكَعِى مَعَ ٱلرَّٰكِعِينَ

হে মারইয়াম, তোমার রবের জন্য অনুগত হও। আর সিজদা কর এবং রুকূকারীদের সাথে রুকূ কর। সুরা আল ইমরান : ৪৩

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

فَسَبِّحْ بِحَمْدِ رَبِّكَ وَكُن مِّنَ ٱلسَّٰجِدِينَ

সুতরাং তুমি তোমার প্রভুর সপ্রশংস পবিত্রতা বর্ণনা করো এবং সেজদাকারীদের অন্তর্ভুক্ত হও। সুরা হিজর : ৯৮

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَلِلَّهِ يَسْجُدُ مَا فِى ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَمَا فِى ٱلْأَرْضِ مِن دَآبَّةٍ وَٱلْمَلَٰٓئِكَةُ وَهُمْ لَا يَسْتَكْبِرُونَ

আসমানে যা কিছু আছে ও জমিনে যে সব জীবজন্ত আছে তারা সবাই আল্লাহকে সেজদা করে; ফেরেশতারাও; তারা অহংকার করে না। সুরা নাহল : ৪৯

ইহা ছাড়া কুরআনে অনেকগুলো সিজদাহ আয়াতে আছে যেখানে আল্লাহ রব্বুল আলামিন আমাদেরকে সিজদাহ করার নির্দেশ প্রদান করেছেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ ও মহান আল্লাহ ছাড়া কাউকে সিজদা দিতে নিষেধ করেছেন।

আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

لَوْ كُنْتُ آمِرًا أَحَدًا أَنْ يَسْجُدَ لأَحَدٍ لأَمَرْتُ الْمَرْأَةَ أَنْ تَسْجُدَ لِزَوْجِهَا

আমি যদি কোনো মানবকে সিজদা করার নির্দেশ দিতাম, তবে স্ত্রীকে তার স্বামীর জন্য সিজদা করার নির্দেশ দিতাম। সুনানে তিরমিজি : ১১৫৯ মিশকাত : ৩২৫৫

আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল ﷺ অন্তিম রোগশয্যায় বলেন, ইয়াহুদী ও নাসারাদের প্রতি আল্লাহর অভিসম্পাত বর্ষিত হোক। কারণ, তারা তাদের নবী গণের কবরকে সিজদার স্থানে পরিণত করেছে। এরূপ আশঙ্কা না থাকলে রাসূলূল্লাহ ﷺ এর কবরকে খোলা রাখা হতো। কিন্তু তিনি ﷺ আশংকা করেন পরবর্তীতে একে মসজিদে (সিজদার স্থানে) পরিণত করা হবে। সহিহ বুখারি : ১৩৯০

কায়িস ইবনু সাদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আল-হীরা শহরে এসে দেখি, সেখানকার লোকেরা তাদের নেতাকে সিজদা করছে। আমি ভাবলাম, রাসূলুল্লাহ ﷺ ই সিজদার অধিক হকদার। অতঃপর আমি নবী ﷺ এর খেদমতে এসে বলি যে, আমি আল-হীরা শহরে গিয়ে দেখে এসেছি, সেখানকার লোকেরা তাদের নেতাকে সিজদা করে। সুতরাং হে আল্লাহর রাসূল! ﷺ আপনিই তো এর অধিক হকদার যে, আমরা আপনাকে সিজদা করি? তিনি বললেন, যদি (মৃত্যুর পর) তুমি আমার কবরের পাশ দিয়ে যাও তখন কি তুমি সেটাকে সিজদা করবে? আমি বললাম, না। তিনি বললেন, সাবধান! তোমরা এরূপ করবে না। আমি যদি কোন মানুষকে সিজদা করার অনুমতি দিতাম, তবে স্ত্রীদেরকে নির্দেশ দিতাম তাদের স্বামীদেরকে সিজদা করতে। কেননা আল্লাহ স্ত্রীদের উপর স্বামীদের অধিকার দিয়েছেন। সুনানে ইবনে মাজাহ : ২১৪০, মিশকাত : ৩২৬৬)

২২। গাইরুল্লাহকে অভিভাবক হিসাবে গ্রহন করা

মুমিনের একমাত্র অভিভাবক হবে মহান আল্লাহ। আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে অভিভাবক গ্রহন করলে আল্লাহ প্রদত্ত সোজা পথ থেকে বাহির হয়ে গোমরাহীতে নিমজ্জিত হবে। এবং আল্লাহ শয়তানদেরকেই তার অভিভাবক বা বন্ধু করে দিবেন।  কারন সে আল্লাহকে বাদ দিয়ে শয়তানদেরকে নিজেদের অভিভাবকে (বন্ধুরূপে) পরিণত করেছে। এভাবে আল্লাহ মুকাবেলায় শয়তানের বন্ধুকে সমকক্ষ দাড় করাল, যা নিকৃস্ট মানের শিরকি কাজ।  আল্লাহ রাব্বুল আলামীণ বলেন-

 فَرِيقًا هَدَىٰ وَفَرِيقًا حَقَّ عَلَيۡہِمُ ٱلضَّلَـٰلَةُ‌ۗ إِنَّهُمُ ٱتَّخَذُواْ ٱلشَّيَـٰطِينَ أَوۡلِيَآءَ مِن دُونِ ٱللَّهِ وَيَحۡسَبُونَ أَنَّہُم مُّهۡتَدُونَ (٣٠)

একটি দলকে তিনি সোজা পথ দেখিয়ে দিয়েছেন কিন্তু অন্য দলটির ওপর গোমরাহী সত্য হয়ে চেপেই বসেছে৷ কারণ তারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে শয়তানদেরকে নিজেদের অভিভাবকে পরিণত করেছে এবং তারা মনে করছে, আমরা সঠিক পথেই আছি৷ সুরা আরাফ : ৩০

আল্লাহ রাব্বুল আলামীণ বলেন-

إِنَّا جَعَلۡنَا ٱلشَّيَـٰطِينَ أَوۡلِيَآءَ لِلَّذِينَ لَا يُؤۡمِنُونَ (٢٧)

অর্থ: যারা ঈমান আনে না, আমি এ শয়তানদেরকে তাদের অভিভাবক করে দিয়েছি৷ সুরা আরাফ ৭:২৭

মুমিনের একমাত্র বন্ধু (অবিভাবক) হবে মহান আল্লাহ। তিনি ছাড়া কোন বন্ধু ও সাহায্যকারী নেই। যারা তাকওয়ার নীতি অবলম্বন করেছে এবং সঠিক কর্মপদ্ধতি গ্রহণ করেছে, তারাই আল্লাহর বন্ধু। দুনীয়া আখেরাতে তারাই বিজয় লাভ করবে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীণ বলেন-

 أَلَمۡ تَعۡلَمۡ أَنَّ ٱللَّهَ لَهُ ۥ مُلۡكُ ٱلسَّمَـٰوَٲتِ وَٱلۡأَرۡضِ‌ۗ وَمَا لَڪُم مِّن دُونِ ٱللَّهِ مِن وَلِىٍّ۬ وَلَا نَصِيرٍ (١٠٧)

তুমি কি জানো না, আল্লাহ সব জিনিসের ওপর ক্ষমতাশালী? তুমি কি জানো না, পৃথিবী ও আকাশের শাসন কর্তৃত্ব একমাত্র আল্লাহর? আর তিনি ছাড়া তোমাদের আর কোন অভিভাবক (বন্ধু) ও সাহায্যকারী নেই। (সুরা বাকারা : ১০৭

শিরকে আসগর বা রিয়া

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

শিরকে আসগর

শিরকে আসগর এর অর্থ হলো ছোট শিরক। ছোট শিরক বলতে এমন শিরকি কথা, কাজ ও ইবাদতকে বুঝানো হয় যা বললে বা করলে ইসলামি শরিয়ত কোন মুসলিমকে ইসলাম থেকে বহিস্কার না। কিন্তু তার ঐ কর্মটি কবিরা গুনাহ থেকে নিকৃষ্ট হতে পারে এবং তাকে কাফির না বলে ফাসিক বা পাপিষ্ঠ বলা হয়।

ছোট শিরক শ্রেণী বিভাগ

অনেক গবেষক আলেম ছোট শিরক সহজ করে বুঝাতে শ্রণী বিভাগ করে আলোচনা করেছেন। তারা ছোট শিরক প্রকাশ্য ছোট শিরক, গোপনীয় ছোট শিরক, নিয়তে ছোট শিরক, আমলে ছোট শিরক ইত্যাদি বিভিন্ন শ্রেণী বিভাগ করে আলোচনা করছেন। সাধারণ মানুষ বিভীন্ন কারনে, বিভিন্নভাবে ছোট শিরক করে থাকে। ইসলামি শরীয়তের মুল ভিত্তি হলে বিশ্বাস এবং সেই বিশ্বাসকে কথা ও কাজ দ্বারা প্রতিফলিত করে থাকে। বিশ্বাসের চুড়ান্ত পর্যায় হলো আল্লাহ প্রদত্ত কিছু নিয়ম সম্বলিত ইবাদত।  এই বিশ্বাস, কথা, কর্ম ও ইবাদতের উপর ভিত্তি করে সাধারনত চারটি পদ্দতিতে ছোট শিরক সম্পাদিত হয়। যেহেতু চারটি পদ্ধতিতে ছোট শিরক হয় তাই চারটি ভাগে বিভক্ত করে ছেট শিরা আলোচনা কবর। চার প্রকারের ছোট শিরক হলো-

(১) বিশ্বাসের দ্বারা ছোট শিরক

(২) কথার দ্বারা ছোট শিরক

(৩) কর্মের দ্বারা ছোট শিরক

(৪) ইবাদতের ছোট শিরক বা রিয়া

(১) বিশ্বাসের দ্বারা ছোট শিরক

আল্লাহর উপর পরিপূর্ণ বিশ্বাস থাকার পরও যদি কেউ কোনো বস্তু সম্পর্কে বিশ্বাস করল যে, তা উপকার হাসিল ও অনিষ্ট দূরীকরণের উপায়, অথচ আল্লাহ ইহাকে উপকার হাসিল ও অনিষ্ট দূরীকরণের উপায় সাবস্ত করেনি। আল্লাহর উপর পরিপূর্ণ বিশ্বাস থাকার পরও যদি শয়তানের হাত আছে তবে ছোট শিরক হবে। যেমন-

আবুল মালীহ (রহঃ) হতে এক ব্যক্তির সুত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি জন্তুযানে নবী ﷺ এর পিছনে বসা ছিলাম। হঠাৎ তাঁর সাওয়ারী হোঁচট খেলে আমি বললাম, শয়তান ধ্বংস হয়েছে। তিনি বললেন, একথা বলো না যে, শয়তান ধ্বংস হয়েছে। কেননা তুমি একথা বললে সে অহংকারে ঘরের মতো বড় আকৃতির হয়ে যাবে এবং সে বলবে, আমার ক্ষমতায় হয়েছে। অতএব বলো, (بِسْمِ اللَّهِ) আল্লাহর নামে। যখন তুমি ’আল্লাহর নামে’ বলবে তখন শয়তান হ্রাসপ্রাপ্ত হয়ে মাছির মত হয়ে যাবে। আবু দাউদ : ৪৯৮২

তবে পরিপূর্ণ বিশ্বাস না করে, আল্লাহ ছাড়া অন্যের সন্তুষ্টির জন্য আমল করে থাকলে তার পরিণতি শিরকে আকবর। সে সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَقَدِمۡنَآ إِلَىٰ مَا عَمِلُواْ مِنۡ عَمَلٍ۬ فَجَعَلۡنَـٰهُ هَبَآءً۬ مَّنثُورًا 

আর তারা যে কাজ করেছে আমি সেদিকে অগ্রসর হব। অতঃপর তাকে বিক্ষিপ্ত ধূলিকণায় পরিণত করে দেব। সুরা ফুরকান : ২৩

অন্তরে সঠিক বিশ্বাস থাকার পরও যদি ব্যক্তি বা বস্তুর দ্বারা উপকার বা অপকারের উপায় সাবস্ত করে তাদের খুশির জন্য আমল ছোট শিকর। তবে মনে রাখতে হবে আপনার অন্তরের খবর আল্লাহ জানানে।

আবু হুরাইরাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

إِنَّ اللَّهَ لاَ يَنْظُرُ إِلَى صُوَرِكُمْ وَأَمْوَالِكُمْ وَلَكِنْ يَنْظُرُ إِلَى قُلُوبِكُمْ وَأَعْمَالِكُمْ ‏

নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের বাহ্যিক চাল-চলন ও বিত্ত-বৈভবের প্রতি দৃষ্টিপাত করেন না বরং তিনি দৃষ্টি দিয়ে থাকেন তোমাদের অন্তর ও আমলের প্রতি। সহিহ মুসলিম : ২৫৬৪

(২) কথার দ্বারা ছোট শিরক

আল্লাহর উপর পরিপূর্ণ বিশ্বাস থাকার পরও কেউ এমন কথা বলে যা আল্লাহর সাথে অংশিদার সাব্যস্থ করে, তবে সে কথার দ্বারা ছোট শিরক করল, যদিও গাইরুল্লাহকে সম্মান করার ক্ষেত্রে আল্লাহর সমকক্ষ উদ্দেশ্য না হয়। আল্লাহর উপর পরিপূর্ণ বিশ্বাস রেখে কেউ বলল, আল্লাহর সাথে ইল্লাহও লাগে, যা আল্লাহ চেয়েছেন এবং আপনি চেয়েছেন, পীরের অসিলায় ভাল আছি, বিপদে আপনি না থাকলে যে কি হত, ভাগ্যিস চাকুরিটা ছিল অথবা কেউ গায়রুল্লাহর নামে কসম করল। যেমন-

হুযাইফাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। নবী ﷺ বলেছেন-

لَا تَقُولُوا مَا شَاءَ اللَّهُ، وَشَاءَ فُلَانٌ، وَلَكِنْ قُولُوا مَا شَاءَ اللَّهُ ثُمَّ شَاءَ فُلَانٌ

তোমরা বলো না যে, আল্লাহ যা চান এবং অমুক লোক যা চায়। সুতরাং তোমরা বলো, আল্লাহ যা চান, অতঃপর অমুক যা চায়। সুনানে আবু দাউদ : ৪৯৮০, সহিহাহ : ১৩৯

কেউ যদি এভাবে বলা যে-

যদি আল্লাহ এবং আপনি না থাকতেন! তাহলে আমার বিপদ হত। আমার তো শুধু আল্লাহ এবং আপনি ছাড়া আর কেউ নেই কিংবা আমি আল্লাহ এবং আপনার আশ্রয় গ্রহণ করছি, ইত্যাদি। তাহলে কথার দ্বারা ছোট শিরক।

(৩) কর্মের দ্বারা ছোট শিরক

যদি কেউ একই সাথে আল্লাহর এবং মানুষের সন্তস্টি অর্জনের জন্য কর্ম সম্পাদন করে যে কর্ম মহান আল্লাহ নির্ধারন করেনি তাহলে কর্মের দ্বারা ছোট শিরক হবে। কর্মের ছোট শিরক দ্বারা মানুষ গুনাহগার হবে, কর্মের কোন প্রতিদান পাবেনা এবং আমল প্রত্যাখ্যাত হবে। যেমন-

মসজিদের দরজাসমূহ চুমু খাওয়া, কবর স্পর্শ করা, কবরের গিলাপ ধরে দোয়া করা। কবর, মসজিদ বা আলীদের স্মৃতি বিজরিত স্থানের মাটির বরকতের নেশায় বা রোগ মুক্তি কামনায় করা বা গায়ে মাখা। রোগ মুক্তি আশায় তাবিজ লটকালো, অথবা আংটি কিংবা তাগা পরিধান করল, ইত্যাদি কর্মসমূহ ছোট শিরক। যেমন-

নবী ﷺ বলেন,  (مَنْ تَعَلَّقَ تَمِيمَةً فَقَدْ أَشْرَكَ)   যে ব্যক্তি তাবীজ লটকালো সে শিরক করল। সিলসিলায়ে সহিহাহ : ৮০৯, মুসনাদে আহমাদ, চতুর্খ খণ্ড, হাদিস : ১৫৬

(৪) ইবাদতের ছোট শিরক বা রিয়া

মহান আল্লাহ মানুষকে তাঁর ইবাদতের জন্যই সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহকে রাজি খুশি কারর জন্য ইবাদত করলে মানুষের ইহকালীন জীবন যেমন সুন্দর হয়, পরকালীন জীবনও তেমনি মঙ্গলময় হবে। ইবাদতের প্রধান উদ্দেশ্য হলো, আল্লাহ রাব্বুল আলামীনকে সন্ত্বষ্ট করা। কিন্তু যখন সে ইবাদত মহান আল্লাহর উদ্দেশ্যে না হয়ে গাইরুল্লাহ বা লোক দেখানোর জন্য সুন্দর করা হয় তখন তাকে রিয়া বলা হয়। এক কথায়, লোক দেখানো আমল কে রিয়া বলা হয়।

রিয়া (رِئَآءَ) অর্থ প্রদর্শন করা বা প্রদর্শনেচ্ছা। আল্লাহর জন্য করণীয় ইবাদত পালনের মধ্যে মানুষের দর্শন, প্রশংসা বা বাহবা পাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করাকে রিয়া বলে। কোন নেক ইবাদাত শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত শুধুমাত্র গায়রুল্লাহকে দেখানোর উদ্দেশ্যে বা মানুষের প্রশংসা লাভের উদ্দেশ্যে করা হয় অথচ তার ইবাদতটি দেখে মানুষে যেন আল্লাহর ইবাদাত বলেই মনে করে। যদিও সে ইবাদতে আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে শরিক বা সমান করা উদ্দেশ্য না হয়ে থাকে তথাপি এ জাতীয় ইবাদাত হলো ছোট শিরক বা রিয়া। এ ধরনের ‘ইবাদাত আল্লাহ্‌র নিকট আদৌ গ্রহণযোগ্য নয়। কোন সত্যিকারের কোন মুমিন বান্দা এরূপ রিয়া করতে পারে না।  এই রিয়া বা ছোট শিকর থেকেই বড় শিরকে পরিনত হয়। অর্থাৎ বান্দা যদি তার ইবাদাতে গায়রুল্লাহকে আল্লাহর প্রাপ্য ও অধিকারে শামিল বা অংশীদার করা উদ্দেশ্য হয়, কিংবা মুল কাজটাই যদি আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো উদ্দেশ্যে নিবেদন করা হয়, তাহলে তা শিরকে আকবার (বড় শিরক) বলে গণ্য হবে।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

  فَمَنۡ کَانَ یَرۡجُوۡا لِقَآءَ رَبِّہٖ فَلۡیَعۡمَلۡ عَمَلًا صَالِحًا وَّلَا یُشۡرِکۡ بِعِبَادَۃِ رَبِّہٖۤ اَحَدًا 

সুতরাং যে তার রবের সাক্ষাৎ কামনা করে, সে যেন সৎকর্ম করে এবং তার রবের ইবাদাতে কাউকে শরীক না করে। সুরা কাহাফ : ১১০

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

 إِنَّ ٱلۡمُنَـٰفِقِينَ يُخَـٰدِعُونَ ٱللَّهَ وَهُوَ خَـٰدِعُهُمۡ وَإِذَا قَامُوٓاْ إِلَى ٱلصَّلَوٰةِ قَامُواْ كُسَالَىٰ يُرَآءُونَ ٱلنَّاسَ وَلَا يَذۡكُرُونَ ٱللَّهَ إِلَّا قَلِيلاً۬

নিশ্চয় মুনাফিকরা আল্লাহকে ধোঁকা দেয়। আর তিনি তাদেরকে ধোঁকায় ফেলেন। আর যখন তারা সালাতে দাঁড়ায় তখন অলসভাবে দাঁড়ায়, তারা লোকদেরকে দেখায় এবং তারা আল্লাহকে কমই স্মরণ করে। সুরা নিসা : ১৪২

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا لَا تُبۡطِلُوۡا صَدَقٰتِکُمۡ بِالۡمَنِّ وَالۡاَذٰی ۙ کَالَّذِیۡ یُنۡفِقُ مَالَہٗ رِئَآءَ النَّاسِ وَلَا یُؤۡمِنُ بِاللّٰہِ وَالۡیَوۡمِ الۡاٰخِرِ ؕ فَمَثَلُہٗ کَمَثَلِ صَفۡوَانٍ عَلَیۡہِ تُرَابٌ فَاَصَابَہٗ وَابِلٌ فَتَرَکَہٗ صَلۡدًا ؕ لَا یَقۡدِرُوۡنَ عَلٰی شَیۡءٍ مِّمَّا کَسَبُوۡا ؕ وَاللّٰہُ لَا یَہۡدِی الۡقَوۡمَ الۡکٰفِرِیۡنَ

হে মুমিনগণ, তোমরা খোঁটা ও কষ্ট দেয়ার মাধ্যমে তোমাদের সদাকা বাতিল করো না। সে ব্যক্তির মত, যে তার সম্পদ ব্যয় করে লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে এবং বিশ্বাস করে না আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি। অতএব তার উপমা এমন একটি মসৃণ পাথর, যার উপর রয়েছে মাটি। অতঃপর তাতে প্রবল বৃষ্টি পড়ল, ফলে তাকে একেবারে পরিষ্কার করে ফেলল। তারা যা অর্জন করেছে তার মাধ্যমে তারা কোন কিছু করার ক্ষমতা রাখে না। আর আল্লাহ কাফির জাতিকে হিদায়াত দেন না। সুরা বাকারা : ২৬৪

রিয়াকারিগর সৎকাজ আন্তরিক সংকল্প সহকারে আল্লাহর জন্য করে না। বরং যা কিছু করে অন্যদের দেখাবার জন্য করে। এভাবে তারা নিজেদের প্রশংসা শুনাতে চায়। তারা চায়, লোকেরা তাদের সৎ লোক মনে করুক, তাদের সৎকাজের সুনাম করুক। এর মাধ্যমে তারা কোন না কোনভাবে দুনিয়ার স্বার্থ উদ্ধার করবে। অর্থাৎ তারা লোক দেখানো কাজ করে। সাধারনত মুনফিকদের শ্রেণীর মুসলিমগন মানুষের সামনে লজ্জায় পড়ে নেক আমল করে, মানুষ জন না থাকলে আমল ত্যাগ করে। এই সকল কারনে লোক দেখান আমল কবিরা গুনাহের অন্তরভূক্ত।

মাহমূদ ইবনু লাবীদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

إِنَّ أَخْوَفَ مَا أَخَافُ عَلَيْكُمْ الشِّرْكُ الْأَصْغَرُ: الرِّيَاءُ

তোমাদের ব্যাপারে আমার সর্বাপেক্ষা ভয়ের বস্তু যা আমি ভয় পাচ্ছি তা হচ্ছে ছোট শির্ক বা রিয়া (লোক দেখানো ইবাদাত)। বুলুগুল মারাম : ১৪৮৪, আহমাদ : ২৩১১৯, ২৭৭৪২

আবূ সাঈদ খুদরী (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, আমি কি তোমাদেরকে এমন বিষয়ের সংবাদ দিব না, যে বিষয়টি আমার কাছে মাসীহ দাজ্জালের চাইতেও ভয়ঙ্কর? সাহাবীগণ বললেন, হ্যাঁ। তিনি বললেন, তা হচ্ছে গোপন শিরক। একজন মানুষ দাঁড়িয়ে শুধু এ জন্যই তার সালাতকে খুব সুন্দরভাবে আদায় করে যে, কোন মানুষ তার সালাত দেখছে। সুনানে ইবনু মাজাহ : ৪২০৪

রিয়া (ছোট শিরক) বা লোক দেখানো ইবাদত বুঝাতে নিচের একটি হাদিসই যথেষ্ট। বিয়া কি? এর পরিমান কি? সবই পাবের তিরমিজির নিম্মের হাদিসটিতে।

শুফাই আল-আসবাহী (রহ.) হতে বর্ণিত আছে, কোন একদিন তিনি মদীনায় পৌছে দেখতে পেলেন যে, একজন লোককে ঘিরে জনতার ভিড় লেগে আছে। তিনি প্রশ্ন করেন, ইনি কে? উপস্থিত লোকেরা তাকে বলল, ইনি আবূ হুরাইরা (রা.) (শুফাই বলেন), আমি কাছে গিয়ে তার সামনে বসলাম। তখন লোকদের তিনি হাদীস শুনাচ্ছিলেন। তারপর তিনি যখন নীরব ও একাকী হলেন, আমি তাকে বললাম, আমি সত্যিকারভাবে আপনার নিকট এই আবেদন করছি যে, আপনি আমাকে এমন একটি হাদীস শুনাবেন, যা আপনি সরাসরি রাসূলুল্লাহ ﷺ এর নিকট শুনেছেন, ভালোভাবে বুঝেছেন এবং জেনেছেন।

আবূ হুরাইরা (রা.) বললেন, আমি তাই করব, আমি এমন একটি হাদীস তোমার কাছে বর্ণনা করব যা সরাসরি রাসূলুল্লাহ ﷺ আমার নিকট বর্ণনা করেছেন এবং আমি তা বুঝেছি ও জেনেছি। আবূ হুরাইরা (রা.) একথা বলার পর কেমন যেন তন্ময়গ্রস্ত হয়ে পড়েন। অল্প সময় এভাবে থাকলেন। তারপর তন্ময়ভাব চলে গেলে তিনি বললেন, আমি এমন একটি হাদীস তোমার কাছে বর্ণনা করব যা রাসূলুল্লাহ ﷺ এই ঘরের মধ্যে আমার নিকট বর্ণনা করেছেন। তখন আমি ও তিনি ব্যতীত আমাদের সাথে আর কেউ ছিল না। আবূ হুরাইরা (রা.) পুনরায় আরো গভীরভাবে তন্ময়গ্রস্ত হয়ে পড়েন। তিনি চেতনা ফিরে পেয়ে মুখমণ্ডল মুছলেন, তারপর বললেন, আমি তোমার নিকট অবশ্যই এরূপ হাদীস বর্ণনা করব যা রাসূলুল্লাহ ﷺ আমার নিকট বর্ণনা করেছেন। তখন এই ঘরে তিনি ও আমি ব্যতীত আমাদের সাথে আর কেউ ছিল না। আবূ হুরাইরা আবার বেহুশ হয়ে গেলেন; তিনি পুনরায় হুশে ফিরে এসে তার মুখমণ্ডল মুছলেন এবং বললেন, আমি তা করব। আমি অবশ্যই তোমার নিকট এরূপ হাদীস বর্ণনা করব যাহা তিনি আমাকে বর্ণনা করেছেন।

আমি তখন তার সাথে এই ঘরে ছিলাম। আমি আর তিনি ব্যতীত তখন আর কেউ ছিলনা। আবূ হুরাইরা (রা.) পুনরায় আরো গভীরভাবে তন্ময়াভিভূত হয়ে পড়েন এবং বেহুশ হয়ে উপুড় হয়ে পড়ে যাচ্ছিলেন। আমি অনেকক্ষণ তাকে ঠেস দিয়ে রাখলাম। তারপর হুশ ফিরে এলে তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, আল্লাহ তা’আলা বান্দাদের মাঝে ফায়সালা করার জন্য কিয়ামত দিবসে তাদের সামনে হাযির হবেন। সকল উন্মাতই তখন নতজানু অবস্থায় থাকবে।

তারপর হিসাব-নিকাশের জন্য সর্বপ্রথম যে ব্যক্তিদের ডাকা হবে তারা হলো কুরআনের হাফিয, আল্লাহ্ তা’আলার পথের শহীদ এবং প্রচুর ধনৈশ্বর্যের মালিক।

সেই কারী (কুরআন পাঠক)-কে আল্লাহ তা’আলা প্রশ্ন করবেন, আমি আমার রাসূলের নিকট যা প্রেরণ করেছি তা কি তোমাকে শিখাইনি? সে বলবে, হে রব! হ্যাঁ, শিখিয়েছেন। তিনি বলবেন, তুমি যা শিখেছ সে অনুযায়ী কোন কোন আমল করেছ? সে বলবে, আমি রাত-দিন তা তিলাওয়াত করেছি। তখন আল্লাহ তা’আলা বলবেন, তুমি মিথ্যা বলেছ, ফেরেশতারাও বলবে, তুমি মিথ্যা বলেছ। আল্লাহ তা’আলা তাকে আরো বলবেন, বরং তুমি ইচ্ছাপোষণ করেছিলে যে, তোমাকে বড় কারী (হাফিয) ডাকা হোক। আর তা তো ডাকা হয়েছে।

তারপর সম্পদওয়ালা ব্যক্তিকে হাযির করা হবে। অতঃপর আল্লাহ তাকে বলবেন, আমি কি তোমাকে সম্পদশালী বানাইনি? এমনকি তুমি কারো মুখাপেক্ষী ছিলেনা? সে বলবে, হে রব! হ্যাঁ, তা বানিয়েছেন। তিনি বলবেন, আমার দেয়া সম্পদ হতে তুমি কোন কোন (সৎ) আমল করেছ? সে বলবে, আমি এর দ্বারা আত্মীয়তার সম্পর্ক বহাল রেখেছি এবং দান-খাইরাত করেছি। আল্লাহ বলবেন, তুমি মিথ্যা বলেছ, ফেরেশতারাও বলবে, তুমি মিথ্যাবাদী। আল্লাহ তা’আলা আরো বলবেন, তুমি ইচ্ছাপোষণ করেছিলে যে, মানুষের নিকট তোমার দানশীল-দানবীর নামের প্রসার হোক, আর এরূপ তো হয়েছেই।

তারপর যে লোক আল্লাহ্ তা’আলার রাস্তায় শাহাদাৎ বরণ করেছে তাকে হাযির করা হবে। আল্লাহ তা’আলা তাকে প্রশ্ন করবেন, তুমি কিভাবে নিহত হয়েছ? সে বলবে, আমি তো আপনার পথে জিহাদ করতে আদিষ্ট ছিলাম। কাজেই আমি জিহাদ করতে করতে শাহাদাৎ বরণ করেছি। আল্লাহ তা’আলা বলবেন, তুমি মিথ্যা বলেছ, আর ফেরেশতারাও তাকে বলবে তুমি মিথ্যাবাদী। আল্লাহ তা’আলা আরো বলবেন, তুমি ইচ্ছাপোষণ করেছিলে লোকমুখে একথা প্রচার হোক যে, অমুক ব্যক্তি খুব সাহসী বীর। আর তাতো বলাই হয়েছে।

তারপর রাসূলুল্লাহ ﷺ আমার হাটুতে হাত মেরে বললেন, হে আবূ হুরাইরা কিয়ামত দিবসে আল্লাহ্ তা’আলার সৃষ্টির মধ্য হতে এ তিনজন দ্বারাই প্রথমে জাহান্নামের আগুন প্রজ্বলিত করা হবে।

ওয়ালীদ অর্থাৎ আবূ উসমান আল-মাদাইনী বলেন, উকবা ইবনু আমাকে বলেছেন যে, উক্ত শুফাই (শাফী) এ হাদীসটি মুয়াবিয়া (রা.)-এর নিকট গিয়ে বর্ণনা করেন। আবূ উসমান আরো বলেন, আলা ইবনু আবূ হাকীম আমার নিকট বর্ণনা করেছেন যে, সে (শাফী) ছিল মুয়াবিয়া (রা.) এর তলোয়ার বাহক।

সে বলেছে যে, জনৈক ব্যক্তি মুয়াবিয়া (রা.) এর নিকট এসে উক্ত হাদীসটি আবূ হুরাইরা (রা.) এর সূত্রে বর্ণনা করেন। তখন মুয়াবিয়া (রা.) বলেন, যদি তাদের সাথে এমনটি করা হয় তাহলে অন্যসব লোকের কি অবস্থা হবে? তারপর মুআবিয়া (রা.) খুব বেশি কান্না করলেন। এমনকি আমরা ধারণা করলাম যে, তিনি কাঁদতে কাঁদতে মারা যাবেন। আমরা বলাবলি করতে লাগলাম, এই লোকটিই আমাদের এখানে অনিষ্ট নিয়ে এসেছে (অর্থাৎ সে এই হাদীসটি বর্ণনা না করলে এ দুর্ঘটনা ঘটত না)। ইতিমধ্যে মুয়াবিয়া (রা.) হুশ ফিরে পেলেন এবং তার চেহারা মুছলেন, তারপর বললেন, আল্লাহ ও তার রাসূল ﷺ সত্যই বলেছেন। (এই বলে তিনি নিম্নোক্ত আয়াত তিলাওয়াত করেন)

যে ব্যক্তি দুনিয়ার জীবন ও তার জৌলুস কামনা করে, আমি সেখানে তাদেরকে তাদের আমলের ফল পুরোপুরি দিয়ে দেই এবং সেখানে তাদেরকে কম দেয়া হবে না। এরাই তারা, আখিরাতে যাদের জন্য আগুন ছাড়া আর কিছুই নেই এবং তারা সেখানে যা করে তা বরবাদ হয়ে যাবে আর তারা যা করত, তা সম্পূর্ণ বাতিল, সুরা হুদ: ১৫-১৬। সুনানে তিরমিজি : ২৩৮২, তালিক আলা ইবনে খুজাইমাহ : ২৪৮২, সহিহ তারীকুর রাগিব, প্রথম খণ্ড, পৃ-২৯-৩০, হাদসের মান সহিহ

২। শিরকে আকবার (বড় শিরক) ও শিরকে আসগার (ছোট শিরক) এর মধ্যে পার্থক্য

(১) শিরকে আকবার নিঃসন্দেহে কবিরা গুনাহ কিন্তু শিরকে আসগর কবিরা বা সগিরা গুনাহ হতে পারে।

শিরকে আকবার সবচেয়ে বড় অন্যায় ও অপরাধ বা কবিরা গুনাহ। মহান আল্লাহ বলেন-

وَاِذۡ قَالَ لُقۡمٰنُ لِابۡنِہٖ وَہُوَ یَعِظُہٗ یٰبُنَیَّ لَا تُشۡرِکۡ بِاللّٰہِ ؕؔ اِنَّ الشِّرۡکَ لَظُلۡمٌ عَظِیۡمٌ

আর স্মরণ কর, যখন লুকমান তার পুত্রকে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেছিল, ‘প্রিয় বৎস, আল্লাহর সাথে শিরক করো না; নিশ্চয় শিরক হল বড় জুলুম। সুরা লুকমান :১৩

আবূ বকরাহ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন-

أَلاَ أُخْبِرُكُمْ بِأَكْبَرِ الْكَبَائِرِ ‏”‏‏.‏ قَالُوا بَلَى يَا رَسُولَ اللَّهِ‏.‏ قَالَ ‏”‏ الإِشْرَاكُ بِاللَّهِ، وَعُقُوقُ الْوَالِدَيْنِ

আমি কি তোমাদের নিকৃষ্ট কাবীরাহ গুনাহের বর্ণনা দিব না? সকলে বললেনঃ হাঁ, হে আল্লাহর রাসূল! তখন তিনি বললেন, তা হলো, আল্লাহর সঙ্গে অন্য কোন কিছুকে শরীক করা এবং মাতা-পিতার অবাধ্যতা। সহিহ বুখারি : ৬২৭৩

(২) শিরকে আকবর তাওবা ছাড়া ক্ষমা করা হবে না কিন্তু শিরকে আসগর তাওবা ছাড়াও ক্ষমা করা হতে পারে।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

اِنَّ اللّٰہَ لَا یَغۡفِرُ اَنۡ یُّشۡرَکَ بِہٖ وَیَغۡفِرُ مَا دُوۡنَ ذٰلِکَ لِمَنۡ یَّشَآءُ ۚ وَمَنۡ یُّشۡرِکۡ بِاللّٰہِ فَقَدِ افۡتَرٰۤی اِثۡمًا عَظِیۡمًا

নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সাথে শরীক করাকে ক্ষমা করেন না। তিনি ক্ষমা করেন এ ছাড়া অন্যান্য পাপ, যার জন্য তিনি চান। আর যে আল্লাহর সাথে শরীক করে সে অবশ্যই মহাপাপ রচনা করে। সুরা নিসা : ৪৮

অপর পক্ষে শিরকে আসগর যখন সগিরা গুনাহ হবে তখন আল্লাহ তাওবা ছাড়াই ক্ষমা করেত পারেন। মহান আল্লাহ বলেন-

اَلَّذِیۡنَ یَجۡتَنِبُوۡنَ کَبٰٓئِرَ الۡاِثۡمِ وَالۡفَوَاحِشَ اِلَّا اللَّمَمَ ؕ  اِنَّ رَبَّکَ وَاسِعُ الۡمَغۡفِرَۃِ ؕ 

যারা ছোট খাট দোষ-ত্রুটি ছাড়া বড় বড় পাপ ও অশ্লীল কার্যকলাপ থেকে বিরত থাকে, নিশ্চয় তোমার রব ক্ষমার ব্যাপারে উদার। সুরা নাজম : ৩২

(৩) শিরকে আকবর সকল আমলকে ধ্বংস করে দেয় কিন্ত শিরকে আসগর শুধু আমল সংশ্লিষ্ট নেকী নষ্ট করে দেয়

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

وَلَقَدۡ اُوۡحِیَ اِلَیۡکَ وَاِلَی الَّذِیۡنَ مِنۡ قَبۡلِکَ ۚ لَئِنۡ اَشۡرَکۡتَ لَیَحۡبَطَنَّ عَمَلُکَ وَلَتَکُوۡنَنَّ مِنَ الۡخٰسِرِیۡنَ

আর অবশ্যই তোমার কাছে এবং তোমার পূর্ববর্তীদের কাছে ওহী পাঠানো হয়েছে যে, তুমি শির্ক করলে তোমার কর্ম নিষ্ফল হবেই। আর অবশ্যই তুমি ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে। সুরা যুমার : ৬৫

কিন্তু শিরকে আসগর শুধু আমল সংশ্লিষ্ট নেকী নষ্ট করে দেয়। যদি কেউ লোক দেখানোর জন্য দান  করে, সিয়াম আদায় করে বা হজ আদায় করে তখন তার দান, সিয়াম বা হজ সংশ্লিষ্টি সকল নেকী বাদ হয়ে যাবে।

(৪) শিরকে আকবরের কারনে জাহান্নামের আগুনে স্থায়ীভাবে থাকবে কিন্তু শিরকে আসগরের কারনে জাহান্নামী স্থায়ী হবে না।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ وَالْمُشْرِكِينَ فِي نَارِ جَهَنَّمَ خَالِدِينَ فِيهَا أُولَئِكَ هُمْ شَرُّ الْبَرِيَّةِ

‘আহলে কিতাব ও মুশরিকদের মধ্যে যারা কাফের, তারা জাহান্নামের আগুনে স্থায়ীভাবে থাকবে। তারাই সৃষ্টির অধম। সুরা বাইয়েনা : ৬

পক্ষান্তরে শিরকে আসগরের কারনে জাহান্নামী স্থায়ী হবে না। নির্দিষ্ট শান্তি ভোগের পর তাকে জান্নাতে প্রবেশ করান হবে। মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন-

إِن تَجْتَنِبُواْ كَبَآئِرَ مَا تُنْهَوْنَ عَنْهُ نُكَفِّرْ عَنكُمْ سَيِّئَاتِكُمْ وَنُدْخِلْكُم مُّدْخَلاً كَرِيمًا

যেগুলো সম্পর্কে তোমাদের নিষেধ করা হয়েছে যদি তোমরা সে সব বড় গোনাহ গুলো থেকে বেঁচে থাকতে পার। তবে আমি তোমাদের ক্রটি-বিচ্যুতিগুলো ক্ষমা করে দেব এবং সম্মান জনক স্থানে তোমাদের প্রবেশ করার। সুরা নিসা :৩১

শিরকে আসগর সর্বেচ্চ কবিরা গুনাহ হয়। আর কবিরা গুনাহকারী ইমানের কারনে আল্লাহ ক্ষমার আশা রাখে কাজেই সে জাহান্নামে স্থায়ী হবে না।  

আবূ যার (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী ﷺ বলেন-

‏ أَتَانِي جِبْرِيلُ – عَلَيْهِ السَّلاَمُ – فَبَشَّرَنِي أَنَّهُ مَنْ مَاتَ مِنْ أُمَّتِكَ لاَ يُشْرِكُ بِاللَّهِ شَيْئًا دَخَلَ الْجَنَّةَ ‏”‏ ‏.‏ قُلْتُ وَإِنْ زَنَى وَإِنْ سَرَقَ ‏.‏ قَالَ ‏”‏ وَإِنْ زَنَى وَإِنْ سَرَقَ ‏

জিবরীল (আঃ) আমার নিকট এসে সুসংবাদ দিলেন যে, আপনার উম্মাতের যে কেউ শিরক না করে মারা যাবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আমি (আবূ যার) বললাম, যদিও সে ব্যভিচার করে এবং যদিও সে চুরি করে। তিনি বললেন, যদিও সে ব্যভিচার করে ও চুরি করে। সহিহ মুসলিম: ১৭৩

(৫) শিরকে আকবর ইসলাম থেকে বের করে দিলেও আসগর বের করে দেয় না।

শিরকে আকবরে লিপ্ত ব্যক্তিকে ইসলামের গন্ডী থেকে সম্পূর্ণরূপে বের করে দেয়। এর বিপরীতে শিরকে আসগরের কারনে ইসলাম থেকে বহিস্কৃত হয় না। মহান আল্লাহ বলেন-

وَیَقُوۡلُوۡنَ اٰمَنَّا بِاللّٰہِ وَبِالرَّسُوۡلِ وَاَطَعۡنَا ثُمَّ یَتَوَلّٰی فَرِیۡقٌ مِّنۡہُمۡ مِّنۡۢ بَعۡدِ ذٰلِکَ ؕ وَمَاۤ اُولٰٓئِکَ بِالۡمُؤۡمِنِیۡنَ

তারা বলে, ‘আমরা আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি ঈমান এনেছি এবং আমরা আনুগত্য করেছি’, তারপর তাদের একটি দল এর পরে মুখ ফিরিয়ে নেয়। আর তারা মুমিন নয়। সুরা নুর : ৪৭

পক্ষান্তরে শিরকে আসগার মুসলমানকে ইসলাম থেকে বহিস্কার করে দেয় না। অর্থাৎ শিরকে আসগার করার কারণে কোন মুসলিম, কাফির-মুশরিকে পরিণত হয় না।

(৬) শিরকে আকরকরে লিপ্ত ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ এর সাফায়েত থেকে বঞ্চিত থাকবে

আবূ হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন

لِكُلِّ نَبِيٍّ دَعْوَةٌ مُسْتَجَابَةٌ فَتَعَجَّلَ كُلُّ نَبِيٍّ دَعْوَتَهُ وَإِنِّي اخْتَبَأْتُ دَعْوَتِي شَفَاعَةً لأُمَّتِي فَهِيَ نَائِلَةٌ مَنْ مَاتَ مِنْهُمْ لاَ يُشْرِكُ بِاللَّهِ شَيْئًا

প্রত্যেক নবীর জন্য একটি করে দোয়া আছে যা কবুল করা হয়। আর প্রত্যেক নবী তাঁর দু’আর ব্যাপারে তাড়াহুড়া করেছেন আর আমি আমার দু’আ আমার উম্মাতের শাফাআতের জন্য জমা রেখেছি। অতএব আমার উম্মাতের মধ্যে যারা আল্লাহর সাথে শিরক না করে মারা যাবে তারা আমার শাফাআত প্রাপ্ত হবে।সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪৩০৭

শিরকে আকরকরে লিপ্ত ব্যক্তি কাফির আর কাফিরের জন্য রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সুপারিশ থাকবে না। পক্ষান্তরে শিরকে আসগন ব্যক্তি ফাসিক তার জন্য এর সুপারিশ তাকবে। ইনশাল্লাহ

(৭) মুসলিম প্রকাশ্যে শিরকে আকবরের ঘোষনা দিলে তার জাল মালের নিরাপত্তা নাই।

যে মুসলিম প্রকাশ্যে শিরকে আকবরের ঘোষনা দিবে, তাকে তাওবা করে নতুন করে ইসলাম গ্রহণ না করেলে শারীয়াতের দৃষ্টিতে তার জান ও মালের কোন নিরাপত্তা নেই। শারীয়াতের দৃষ্টিতে সে মৃত্যুদন্ডের যোগ্য এবং তার সম্পদ বাজেয়াপ্তযোগ্য। মহান আল্লাহ বলেন-

فَاِذَا انۡسَلَخَ الۡاَشۡہُرُ الۡحُرُمُ فَاقۡتُلُوا الۡمُشۡرِکِیۡنَ حَیۡثُ وَجَدۡتُّمُوۡہُمۡ وَخُذُوۡہُمۡ وَاحۡصُرُوۡہُمۡ وَاقۡعُدُوۡا لَہُمۡ کُلَّ مَرۡصَدٍ ۚ فَاِنۡ تَابُوۡا وَاَقَامُوا الصَّلٰوۃَ وَاٰتَوُا الزَّکٰوۃَ فَخَلُّوۡا سَبِیۡلَہُمۡ ؕ اِنَّ اللّٰہَ غَفُوۡرٌ رَّحِیۡمٌ

অতঃপর যখন নিষিদ্ধ মাসগুলো অতিবাহিত হয়ে যাবে, তখন তোমরা মুশরিকদেরকে যেখানেই পাও হত্যা কর এবং তাদেরকে পাকড়াও কর, তাদেরকে অবরোধ কর এবং তাদের জন্য প্রতিটি ঘাঁটিতে বসে থাক। তবে যদি তারা তাওবা করে এবং সালাত কায়েম করে, আর যাকাত দেয়, তাহলে তাদের পথ ছেড়ে দাও। নিশ্চয় আল্লাহ বড়ই ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। সুরা তাওবা : ০৫

পক্ষান্তরে শিরকে আসগারকারী যদিও ফাসিক, তথাপি মুমিন হওয়ার কারণে শারী‘য়াতের দৃষ্টিতে ইসলামী রাষ্ট্রের কাছে তার জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা রয়েছে। সে মৃত্যুদন্ড যোগ্য নয় এবং তার সম্পদও বাজেয়াপ্তযোগ্য নয়।