মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন
১৫। মানুষ বা সৃষ্টিকে আল্লাহর মত ভয় করা
মহান আল্লাহ মানুষকে পরীক্ষার জন্য দুয়িয়াতে প্রেরণ করেছেন। দুনিয়াত তার আদেশে নিষেধ মেনে চলতে পারলে জান্নাতে তিনি স্থায়ী নিবাস করে দিবেন। তার হুকুমের বাহিরে চললে তিনি স্থায়ী আজাবে নিপতিত করবেন। যার হাতে আমার জীবন, মরণ, জান্নাত, জাহান্নাম, সুখ, শান্তি ইত্যাদি। তাকে কেমন সম্মান ও শ্রদ্ধার সাথে ভয় করা উচিত তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু তার সেই ভয়ের স্থান যদি সৃষ্টিকে স্থান দেওয়া হয় অর্থাত আল্লাহ মত তার সৃষ্টিকে ভয় করা। তাহলে আল্লাহ তার সমতুল্য ভয় করার জন্য তার বান্দাকে শিরকের গুনাহে অধিযুক্ত করবেন।
আল্লাহকে ভয় কার ফরজ আর গাইরুল্লাহকে ভয় করা শিরক-
অপরাধের জন্য আল্লাহর শাস্তি অবধারিত এ জন্য তাকে ভয় করা ফরজ। কুরআন বিভিন্ন আয়াতে এই বিষয়টি বার বার আল্লাহ তুলে ধরা হয়েছে। আল্লাহর মত অন্য কাউকে ভয় করতে নিষেধ করা হয়েছে। কোন মুসলিমকে যুদ্ধের জন্য আহবান করা হলে, সে জীবনের মায়ায় কাফিরকে আল্লাহ থেকে বেশী ভয় করে যুদ্ধ থেকে বিরত থাকে। এই ধরনের ভয়কে আল্লাহ তিরস্কার করেছেন। মহান আল্লাহ রআব্বুল আলামীন বলেন-
أَلَمۡ تَرَ إِلَى ٱلَّذِينَ قِيلَ لَهُمۡ كُفُّوٓاْ أَيۡدِيَكُمۡ وَأَقِيمُواْ ٱلصَّلَوٰةَ وَءَاتُواْ ٱلزَّكَوٰةَ فَلَمَّا كُتِبَ عَلَيۡہِمُ ٱلۡقِتَالُ إِذَا فَرِيقٌ۬ مِّنۡہُمۡ يَخۡشَوۡنَ ٱلنَّاسَ كَخَشۡيَةِ ٱللَّهِ أَوۡ أَشَدَّ خَشۡيَةً۬ۚ وَقَالُواْ رَبَّنَا لِمَ كَتَبۡتَ عَلَيۡنَا ٱلۡقِتَالَ لَوۡلَآ أَخَّرۡتَنَآ إِلَىٰٓ أَجَلٍ۬ قَرِيبٍ۬ۗ قُلۡ مَتَـٰعُ ٱلدُّنۡيَا قَلِيلٌ۬ وَٱلۡأَخِرَةُ خَيۡرٌ۬ لِّمَنِ ٱتَّقَىٰ وَلَا تُظۡلَمُونَ فَتِيلاً
তোমরা কি তাদেরকেও দেখেছো, যাদেরকে বলা হয়েছিল, তোমাদের হাত গুটিয়ে রাখো এবং নামায কায়েম করো ও যাকাত দাও? এখন তাদেরকে যুদ্ধের হুকুম দেয়ায় তাদের একটি দলের অবস্থা এই দাঁড়িয়েছে যে, তারা মানুষকে এমন ভয় করেছে যেমন আল্লাহকে ভয় করা উচিত অথবা তার চেয়েও বেশী ৷ তারা বলছে, হে আমাদের রব ! আমাদের জন্য এই যুদ্ধের হুকুমনামা কেন লিখে দিলে? আমাদের আরো কিছু সময় অবকাশ দিলে না কেন ? তাদেরকে বলো, দুনিয়ার জীবন ও সম্পদ অতি সামান্য এবং একজন আল্লাহর ভয়ে ভীত মানুষের জন্য আখেরাতই উত্তম ৷ আর তোমাদের ওপর এক চুল পরিমাণও জুলুম করা হবে না৷ সুরা নিসা : ৭৭
ইয়াহুদিগণ লোক লজ্জার ভয়ে ইসলামকে সত্য জেনেও হক গ্রহন করেত পারে নাই। আল্লাহ থেকে মানুষের ভয়কে বা দুনিয়ার স্বার্থকে বেশী গুরুত্ব দিসে। মহান আল্লাহ রআব্বুল আলামীন বলেন-
فَلَا تَخۡشَوُاْ ٱلنَّاسَ وَٱخۡشَوۡنِ وَلَا تَشۡتَرُواْ بِـَٔايَـٰتِى ثَمَنً۬ا قَلِيلاً۬ۚ وَمَن لَّمۡ يَحۡكُم بِمَآ أَنزَلَ ٱللَّهُ فَأُوْلَـٰٓٮِٕكَ هُمُ ٱلۡكَـٰفِرُونَ
কাজেই, তোমরা মানুষকে ভয় করো না বরং আমাকে ভয় করো এবং সামান্য তুচ্ছ মূল্যের বিনিময়ে আমার আয়াত বিক্রি করা পরিহার করো৷ আল্লাহর নাযিল করা আইন অনুযায়ী যারা ফায়সালা করে না তারাই কাফের৷ সুরা মায়িদা : ৪৪
রসূলুল্লাহ ﷺ কে মহান আল্লাহ তার আদেশ মানেতে লোকদের ভয় করেত নিষেধ করেছেন। তিনি আদেশ দিয়েছেন আমাকেই ভয় কর। মহান আল্লাহ রআব্বুল আলামীন বলেন-
وَمِنۡ حَيۡثُ خَرَجۡتَ فَوَلِّ وَجۡهَكَ شَطۡرَ ٱلۡمَسۡجِدِ ٱلۡحَرَامِۚ وَحَيۡثُ مَا كُنتُمۡ فَوَلُّواْ وُجُوهَڪُمۡ شَطۡرَهُ ۥ لِئَلَّا يَكُونَ لِلنَّاسِ عَلَيۡكُمۡ حُجَّةٌ إِلَّا ٱلَّذِينَ ظَلَمُواْ مِنۡہُمۡ فَلَا تَخۡشَوۡهُمۡ وَٱخۡشَوۡنِى وَلِأُتِمَّ نِعۡمَتِى عَلَيۡكُمۡ وَلَعَلَّكُمۡ تَہۡتَدُونَ (١٥٠)
আর যেখান থেকেই তুমি চল না কেন তোমার মুখ মসজিদে হারামের দিকে ফেরাও এবং যেখানেই তোমরা থাকো না কেন সে দিকেই মুখ করে সালাত আদায় কর, যাতে লোকেরা তোমাদের বিরুদ্ধে কোন প্রমাণ খাড়া করতে না পারে। তবে যারা যালেম, তাদের মুখ কোন অবস্থায়ই বন্ধ হবে না৷ কাজেই তাদেরকে ভয় করো না বরং আমাকে ভয় করো, আর এ জন্য যে, আমি তোমাদের ওপর নিজের অনুগ্রহ পূর্ণ করে দেবো এবং এই আশায় যে, আমার এই নির্দেশের আনুগত্যের ফলে তোমরা ঠিক তেমনিভাবে সাফল্যের পথ লাভ করবে। সুরা বাকারা : ১৫০
কখনো নিন্দুকের নিন্দার ভয়ে আমল ছেড়ে দিলে শির্ক হবে। কারন আল্লাহর আদেশের উপর গাইরুল্লার ভয়কে স্থান দিয়েছে। আল্লাহর ও গাইরুল্লার কে সমান করা শির্ক নয় কি? মহান আল্লাহ রআব্বুল আলামীন বলেন-
يَـٰٓأَيُّہَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ مَن يَرۡتَدَّ مِنكُمۡ عَن دِينِهِۦ فَسَوۡفَ يَأۡتِى ٱللَّهُ بِقَوۡمٍ۬ يُحِبُّہُمۡ وَيُحِبُّونَهُ ۥۤ أَذِلَّةٍ عَلَى ٱلۡمُؤۡمِنِينَ أَعِزَّةٍ عَلَى ٱلۡكَـٰفِرِينَ يُجَـٰهِدُونَ فِى سَبِيلِ ٱللَّهِ وَلَا يَخَافُونَ لَوۡمَةَ لَآٮِٕمٍ۬ۚ ذَٲلِكَ فَضۡلُ ٱللَّهِ يُؤۡتِيهِ مَن يَشَآءُۚ وَٱللَّهُ وَٲسِعٌ عَلِيمٌ (٥٤)
হে ঈমানদারগণ! তোমাদের মধ্য থেকে কেউ যদি দীন থেকে ফিরে যায়, আল্লাহ এমনিতর আরো বহু লোক সৃষ্টি করে দেবেন, যাদেরকে আল্লাহ ভালবাসেন এবং তারা আল্লাহকে ভালবাসবে, যারা মুমিনদের ব্যাপারে কোমল ও কাফেরদের ব্যাপারে কঠোর হবে, যারা আল্লাহর পথে প্রচেষ্টা ও সাধনা করে যাবে এবং কোন নিন্দুকের নিন্দার ভয় করবেনা৷ এটি আল্লাহর অনুগ্রহ, যাকে চান তাকে দান করেন৷ আল্লাহ ব্যাপক উপায় উপকরণের অধিকারী এবং তিনি সবকিছু জানেন৷ সুরা মায়িদা : ৫৪
আল্লাহ ব্যতীত মূর্তি প্রতিকৃতি, ভাস্কর্য তাগুত, অদৃশ্য জ্বিন, ভুত, মৃত কিংবা অনুপস্থিত কোনো ব্যক্তি বা বস্তুর দ্বারা ক্ষতি বা অনিষ্ট হওয়ার ভয়, আশংকা করা। ইহাদের এমন ভাবে ভয় করে যেমন আল্লাহকে ভয় করা উচিৎ। ঐ সবের প্রতি ধারনা ধারনা করা যে ইহারা ক্ষতি করতে পারে অথবা অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু ঘটাতে পারে। এরূপ ভয় ও ভীতি দ্বীনের একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ অংশ যা শুধু মাত্র আল্লাহ তা’আলার সাথে নির্দিষ্ট। এখন যদি কেউ এটিকে আল্লাহ ভিন্ন অন্য কারো দিকে সম্পর্কিত করে তাহলে সে আল্লাহর সাথে বড় শির্ক করল বলে বিবেচিত হবে। আল্লাহ রআব্বুল আলামীন বলেন-
إِنَّمَا ذَٲلِكُمُ ٱلشَّيۡطَـٰنُ يُخَوِّفُ أَوۡلِيَآءَهُ ۥ فَلَا تَخَافُوهُمۡ وَخَافُونِ إِن كُنتُم مُّؤۡمِنِينَ
এখন তোমরা জেনে ফেলেছো, সে আসলে শয়তান ছিল, তার বন্ধুদের অনর্থক ভয় দেখাচ্ছিলে৷ কাজেই আগামীতে তোমরা মানুষকে ভয় করো না, আমাকে ভয় করো, যদি তোমরা যথার্থ ঈমানদার হয়ে থাকো৷ আল ইমরান : ১৭৫
মহান আল্লাহ রআব্বুল আলামীন বলেন-
أَلَيۡسَ ٱللَّهُ بِكَافٍ عَبۡدَهُ ۥۖ وَيُخَوِّفُونَكَ بِٱلَّذِينَ مِن دُونِهِۦۚ وَمَن يُضۡلِلِ ٱللَّهُ فَمَا لَهُ ۥ مِنۡ هَادٍ۬
আল্লাহ নিজে কি তাঁর বান্দার জন্য যথেষ্ট নন? এসব লোক তাকে বাদ দিয়ে তোমাদেরকে অন্যদের ভয় দেখায়৷ অথচ আল্লাহ যাকে গোমরাহীতে নিক্ষেপ করেন তাকে কেউ পথপ্রদর্শন করতে পারে না। সুরা জুমার : ৩৬
আল্লাহ ব্যতীত যে সকল তাগুত, অদৃশ্য জ্বিন, ভুত থেকে অনিষ্ট হওয়ার ভয় করা হয় তারা নিজেরাই আল্লাহর শাস্তির ভয়ে ভীত৷ মহান আল্লাহ রআব্বুল আলামীন বলেন-
أُوْلَـٰٓٮِٕكَ ٱلَّذِينَ يَدۡعُونَ يَبۡتَغُونَ إِلَىٰ رَبِّهِمُ ٱلۡوَسِيلَةَ أَيُّہُمۡ أَقۡرَبُ وَيَرۡجُونَ رَحۡمَتَهُ ۥ وَيَخَافُونَ عَذَابَهُ ۥۤۚ إِنَّ عَذَابَ رَبِّكَ كَانَ مَحۡذُورً۬ا (٥٧)
এরা যাদেরকে ডাকে তারা তো নিজেরাই নিজেদের রবের নৈকট্যলাভের উপায় খুঁজে বেড়াচ্ছে যে, কে তাঁর নিকটতর হয়ে যাবে এবং এরা তাঁর রহমতের প্রত্যাশী এবং তাঁর শাস্তির ভয়ে ভীত৷ আসলে তোমার রবের শাস্তি ভয় করার মতো৷ সুরা বনি ইসরাঈল : ৫৭
ইলাহ, মাবুদ হিসেবে এবং তার নৈকট্য অর্জনের লক্ষ্যে ভয় করা। আর এটাই হলো ঈমানের ওয়াজিব সমূহের মধ্যে সর্বোচ্চ ওয়াজিব। মুমিন কোথাও পরম দয়ালু আল্লাহকে দেখে নাই। নিজের ইন্দ্রিসমূহ দ্বারাও তাকে অনুভব করতে পারে নাই। তা সত্ত্বেও তাঁর নাফরমানী করতে সে ভয় পেয়েছে কারন তাকে সে বিশ্বাস করেছে। প্রকাশ্যে দেখা যায় না এমন সব শক্তি ও সত্তার তুলনায় তার মনে অদেখা শক্তির ভয় অধিক প্রবল ছিল বলেই সে পাপ কাজে লিপ্ত হয় নাই। বরং সব সময়ই তাঁর অসন্তুষ্টিকে ভয় পেয়েছে । মহান আল্লাহ রআব্বুল আলামীন বলেন-
مَّنۡ خَشِىَ ٱلرَّحۡمَـٰنَ بِٱلۡغَيۡبِ وَجَآءَ بِقَلۡبٍ۬ مُّنِيبٍ (٣٣) ٱدۡخُلُوهَا بِسَلَـٰمٍ۬ۖ ذَٲلِكَ يَوۡمُ ٱلۡخُلُودِ
যে অদেখা দয়াময়কে ভয় করতো, যে অনুরক্ত হৃদয় নিয়ে এসেছে৷ বেহেশতে ঢুকে পড় শান্তির সাথে৷ সেদিন অনন্ত জীবনের দিন হবে৷ সুরা ক্বাফ : ৩৩-৩৪
মহান আল্লাহ রআব্বুল আলামীন বলেন-
يَـٰبَنِىٓ إِسۡرَٲٓءِيلَ ٱذۡكُرُواْ نِعۡمَتِىَ ٱلَّتِىٓ أَنۡعَمۡتُ عَلَيۡكُمۡ وَأَوۡفُواْ بِعَہۡدِىٓ أُوفِ بِعَهۡدِكُمۡ وَإِيَّـٰىَ فَٱرۡهَبُونِ
হে বনী ইসরাঈল ৷ আমার সেই নিয়ামতের কথা মনে করো, যা আমি তোমাদের দান করেছিলাম, আমার সাথে তোমাদের যে অংগীকার ছিল, তা পূর্ণ করো, তা হলে তোমাদের সাথে আমার যে অংগীকার ছিল ,তা আমি পূর্ণ করবো এবং তোমরা একমাত্র আমাকেই ভয় করো। সুরা বাকারা : ৪০
মহান আল্লাহ রআব্বুল আলামীন বলেন-
أَفَأَمِنُواْ مَڪۡرَ ٱللَّهِۚ فَلَا يَأۡمَنُ مَڪۡرَ ٱللَّهِ إِلَّا ٱلۡقَوۡمُ ٱلۡخَـٰسِرُونَ
এরা কি আল্লাহর কৌশলের ব্যাপারে নির্ভীক হয়ে গেছে? অথচ যে সব সম্প্রায়ের ধ্বংস অবধারিত তারা ছাড়া আল্লাহর কৌশলের ব্যাপারে আর কেউ নির্ভীক হয় না৷ সুরা আরাফ : ৯৯
হাদিসে এসেছে আল্লাহকে ভয় করার কারনে পূর্বে যুগের এক বান্দাকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়।
আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) সূত্রে নবী ﷺ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, পূর্বযুগে এক লোক তার নিজের উপর অনেক জুলুম করেছিল। যখন তার মৃত্যুকাল ঘনিয়ে এলো, সে তার পুত্রদেরকে বলল, মৃত্যুর পর আমার দেহ হাড় গোশতসহ পুড়িয়ে ছাই করে নিও এবং প্রবল বাতাসে উড়িয়ে দিও। আল্লাহর কসম! যদি আল্লাহ্ আমাকে ধরে ফেলেন, তবে তিনি আমাকে এমন কঠিনতম শাস্তি দিবেন যা অন্য কাউকেও দেননি। যখন তার মওত হল, তার সঙ্গে সে ভাবেই করা হল। অতঃপর আল্লাহ্ যমীনকে আদেশ করলেন, তোমার মাঝে ঐ ব্যক্তির যা আছে জমা করে দাও। যমীন তা করে দিল। এ ব্যক্তি তখনই দাঁড়িয়ে গেল। আল্লাহ্ তাকে জিজ্ঞেস করলেন, কিসে তোমাকে এ কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করল? সে বলল, হে, প্রতিপালক তোমার ভয়। অতঃপর তাকে ক্ষমা করা হলো। সহিহ বুখারি : ৩৪৮১, ৭৫০৬, সহিহ মুসলিম : ২৭৫৬)
২. মুমিনদের ভীতিপূর্ণ জীবন যাপন:
মুমিন দুনিয়ায় আল্লাহর ব্যাপারে ভীতি শূণ্য ও চিন্তামুক্ত জীবন যাপন করে না। যা মনে আসে তাই করে না এবং ওপরে একজন আল্লাহ আছেন তিনি জুলুম ও বাড়াবাড়ি করলে পাকড়াও করেন একথা কখনো ভুলে যায় না। বরং তাদের মন সব সময় তাঁর ভয়ে ভীত থাকে এবং তিনিই তাদেরকে খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখতে থাকেন। আল্লাহ রআব্বুল আলামীন বলেন-
إِنَّ ٱلَّذِينَ هُم مِّنۡ خَشۡيَةِ رَبِّہِم مُّشۡفِقُونَ ٥٧
আসলে কল্যাণের দিকে দৌড়ে যাওয়া ও অগ্রসর হয়ে তা অর্জনকারী লোক তো তারাই যারা নিজেদের রবের ভয়ে ভীত। সরা মুমিনুন : ৫৭
আল্লাহ রআব্বুল আলামীন বলেন-
فَٱسۡتَجَبۡنَا لَهُ ۥ وَوَهَبۡنَا لَهُ ۥ يَحۡيَىٰ وَأَصۡلَحۡنَا لَهُ ۥ زَوۡجَهُ ۥۤۚ إِنَّهُمۡ ڪَانُواْ يُسَـٰرِعُونَ فِى ٱلۡخَيۡرَٲتِ وَيَدۡعُونَنَا رَغَبً۬ا وَرَهَبً۬اۖ وَڪَانُواْ لَنَا خَـٰشِعِينَ
অর্থ: কাজেই আমি তার দোয়া কবুল করেছিলাম এবং তাকে ইয়াহ্ইয়া দান করেছিলাম, আর তার স্ত্রীকে তার জন্য যোগ্য করে দিয়েছিলাম৷ তারা সৎকাজে আপ্রাণ চেষ্টা করতো, আমাকে ডাকতো আশা ও ভীতি সহকারে এবং আমার সামনে ছিল অবনত হয়ে৷ সুরা আম্বিয়া : ৯০
আল্লাহ রআব্বুল আলামীন বলেন-
قَالُوٓاْ إِنَّا ڪُنَّا قَبۡلُ فِىٓ أَهۡلِنَا مُشۡفِقِينَ
তারা বলবে আমরা প্রথমে নিজের পরিবারের লোকদের মধ্যে ভয়ে ভয়ে জীবন যাপন করতাম৷ সুরা তুর : ২৬
আল্লাহ রআব্বুল আলামীন বলেন-
وَلَنُسۡڪِنَنَّكُمُ ٱلۡأَرۡضَ مِنۢ بَعۡدِهِمۡۚ ذَٲلِكَ لِمَنۡ خَافَ مَقَامِى وَخَافَ وَعِيدِ
এবং এদের পর পৃথিবীতে তোমাদের প্রতিষ্ঠিত করবো৷ এটা হচ্ছে তার পুরস্কার, যে আমার সামনে জবাবদিহি করার ভয় করে এবং আমার শাস্তির ভয়ে ভীত৷ সুরা ইব্রাহীম : ১৪
প্রকৃতিগত সাভাবিক ভয়:
দুশমন, শত্রু, হিংস্র জীব জনোয়ার ইত্যাদির দ্বারা আক্রান্ত হয়ে বিপদ বা ক্ষতির আশংকা থাকলে ভয় করা বৈধ। যে এ প্রকারের ভয় করবে তাকে তিরস্কার করা যাবে না। আল্লাহ রআব্বুল আলামীন বলেন-
قَالَ رَبِّ إِنِّىٓ أَخَافُ أَن يُكَذِّبُونِ (١٢) وَيَضِيقُ صَدۡرِى وَلَا يَنطَلِقُ لِسَانِى فَأَرۡسِلۡ إِلَىٰ هَـٰرُونَ
সে (মুছা) বললো, “হে আমার রব! আমার ভয় হয় তারা আমাকে মিথ্যা বলবে। আমার বক্ষ সংকুচিত হচ্ছে এবং আমার জিহ্বা সঞ্চালিত হচ্ছে না৷ আপনি হারুনের প্রতি রিসালাত পাঠান। সুরা শুয়ারা : ১২-১৩
আল্লাহ রআব্বুল আলামীন বলেন-
فَخَرَجَ مِنۡہَا خَآٮِٕفً۬ا يَتَرَقَّبُۖ قَالَ رَبِّ نَجِّنِى مِنَ ٱلۡقَوۡمِ ٱلظَّـٰلِمِينَ
এ খবর শুনতেই মূসা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে বেরিয়ে পড়লো এবং সে দোয়া করলো, “হে আমার রব! আমাকে জালেমদের হাত থেকে বাঁচাও৷ সুরা কাসাস : ২১
আল্লাহ রআব্বুল আলামীন বলেন-
قَالَ إِنِّى لَيَحۡزُنُنِىٓ أَن تَذۡهَبُواْ بِهِۦ وَأَخَافُ أَن يَأۡڪُلَهُ ٱلذِّئۡبُ وَأَنتُمۡ عَنۡهُ غَـٰفِلُونَ
বাপ বললো, “তোমরা তাকে নিয়ে যাবে, এটা আমাকে কষ্ট দেবে এবং আমরা আশংকা হয়, তোমরা তার প্রতি অমনোযোগী থাকবে এবং নেকড়ে থাকে খেয়ে ফেলবে৷ সুরা ইউসুফ : ১৩
১৬। আল্লাহ ছাড়া গাইরুল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করা
আল্লাহ উপর তাওয়াক্কুল করা ফরজঃ
সকল কাজে সর্বাবস্থায় মহান আল্লাহ তায়ার উপর তাওয়াক্কুল বা ভরসা করা মুমিন বান্দার উপর ফরজ। আল্লাহ তায়ালার উপর তাওয়াক্কুল বা ভরসা করা ঈমানের দাবি ও শীর্ষ পর্যায়ের ইবাদত।
আল্লাহ রআব্বুল আলামীন বলেন-
وَعَلَى ٱللَّهِ فَتَوَكَّلُوٓاْ إِن كُنتُم مُّؤۡمِنِينَ
এবং একমাত্র আল্লাহ তা’আলার উপরই তাওয়াক্কুল কর যদি তোমরা মুমিন হয়ে থাক। সুরা মায়েদা : ২৩
আল্লাহ রআব্বুল আলামীন বলেন-
فَإِذَا عَزَمۡتَ فَتَوَكَّلۡ عَلَى ٱللَّهِۚ إِنَّ ٱللَّهَ يُحِبُّ ٱلۡمُتَوَكِّلِينَ
তারপর যখন কোন মতের ভিত্তিতে তোমরা স্থির সংকল্প হবে তখন আল্লাহর ওপর ভরসা করো৷ আল্লাহ তাদেরকে পছন্দ করেন যারা তাঁর ওপর ভরসা করে কাজ করে৷ সুরা ইমরান : ১৫৯
আল্লাহ রআব্বুল আলামীন বলেন-
وَعَلَى ٱللَّهِ فَلۡيَتَوَكَّلِ ٱلۡمُؤۡمِنُونَ
কাজেই সাচ্চা মুমিনদের আল্লাহর ওপরই ভরসা করা উচিত। সুরা আল ইমরান : ১৬০
আল্লাহ রআব্বুল আলামীন বলেন-
وَقَالَ مُوسَىٰ يَـٰقَوۡمِ إِن كُنتُمۡ ءَامَنتُم بِٱللَّهِ فَعَلَيۡهِ تَوَكَّلُوٓاْ إِن كُنتُم مُّسۡلِمِينَ
অর্থ: মুসা তার কওমকে বললো, হে লোকেরা! যদি তোমরা সত্যিই আল্লাহর প্রতি ঈমান রেখে থাকো তাহলে তার ওপর ভরসা করো, যদি তোমরা মুসলিম ও পূর্ণ আত্মসমর্পনকারী হও। সুরা ইউনুস : ৮৪
আল্লাহ রআব্বুল আলামীন বলেন-
وَلِلَّهِ غَيۡبُ ٱلسَّمَـٰوَٲتِ وَٱلۡأَرۡضِ وَإِلَيۡهِ يُرۡجَعُ ٱلۡأَمۡرُ كُلُّهُ ۥ فَٱعۡبُدۡهُ وَتَوَڪَّلۡ عَلَيۡهِۚ وَمَا رَبُّكَ بِغَـٰفِلٍ عَمَّا تَعۡمَلُونَ
অর্থ: আকাশে ও পৃথিবীতে যাকিছু লুকিয়ে আছে সবই আল্লাহর কুদরাতের নিয়ন্ত্রণাধীন এবং সমস্ত বিষয়ে তাঁরই দিকে রুজু করা হয়৷ কাজেই হে নবী! তুমি তাঁর বন্দেহী করো এবং তাঁরই ওপর ভরসা রাখো৷ যাকিছু তোমরা করছো তা থেকে তোমার রব গাফেল নন৷ সুরা হুদ : ১২৩
আল্লাহ রআব্বুল আলামীন বলেন-
إِنَّمَا ٱلۡمُؤۡمِنُونَ ٱلَّذِينَ إِذَا ذُكِرَ ٱللَّهُ وَجِلَتۡ قُلُوبُہُمۡ وَإِذَا تُلِيَتۡ عَلَيۡہِمۡ ءَايَـٰتُهُ ۥ زَادَتۡہُمۡ إِيمَـٰنً۬ا وَعَلَىٰ رَبِّهِمۡ يَتَوَكَّلُونَ
সাচ্চা ঈমানদার তো তারাই আল্লাহকে স্মরণ করা হলে যাদের হৃদয় কেঁপে ওঠে৷ আর আল্লাহর আয়াত যখন তাদের সামনে পড়া হয়, তাদের ঈমান বেড়ে যায় এবং তারা নিজেদের রবের ওপর ভরসা করে৷ সুরা আনফাল : ২
উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত, আমি রাসূলূল্লাহ ﷺ কে বলতে শুনেছি, যদি তোমারা যথার্থই আল্লাহর উপর ভরসা করতে, তাহলে তিনি অবশ্যই তোমাদেরকে পাখির মত রিযিক দান করতেন। ভোরবেলা পাখিরা খালিপেটে বের হয়ে যায় এবং সন্ধ্যাবেলা উদর পূর্তি করে ফিরে আসে। সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪১৪৬, সুনানে তিরমিজি : ২৩৪৪
তাওয়াক্কুল বা আল্লাহর উপর ভরসা করার অর্থ হলো, দুনিয়া ও আখেরাতের যাবতীয় বিষয়ের কল্যাণ, লাভ ও ক্ষতি থেকে বাঁচার জন্য সঠিকভাবে অন্তর থেকে আল্লাহর উপর নির্ভর করা। বান্দা তার প্রতিটি বিষয় আল্লাহর উপর সোপর্দ করবে। যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর ভরসা করবে তার জন্য তিনিই যথেষ্ট হবেন। অন্তরে এই বিশ্বাস থাকবে যে, আমার উপকার বা অপকার করার একমাত্র তিনি ছাড়া আর কারো অধিকারে নেই। ইসলামে তাওয়াক্কুল হল, মানুষ কল্যাণকর বিষয় অর্জনের জন্য সাধ্যমত চেষ্টা করবে আর ফলাফলের জন্য আল্লাহর উপর ভরসা করবে এবং তাকদিরের উপর বিশ্বাস রাখবে। আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো উপাস্যের উপর তাওয়াক্কুল করা শিরক হিসেবে গণ্য হয়।
রসূলুল্লাহ ﷺ এর তাওয়াক্কুল সম্পর্ক একটি হাদিস-
জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা রসূলুল্লাহ ﷺ এর সাথে নাজদ এর দিকে একটি জিহাদে গেলাম। রসূলুল্লাহ ﷺ একটি কাটাবন যুক্ত উপত্যকায় আমাদের পেলেন। রসূলুল্লাহ ﷺ একটি গাছের তলায় অবতরণ করলেন এবং তার তলোয়ারটি সে বৃক্ষের একটি শাখায় লটকিয়ে রাখলেন। বর্ণনাকারী জাবির (রা.) বলেন, আর লোকেরা গাছের ছায়ায় আশ্রয় নেয়ার জন্য প্রান্তরে ছড়িয়ে পড়ল। পরে রসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, জনৈক লোক আমার নিকট আসলো তখন আমি ঘুমন্ত। সে তলোয়ারটি হাতে নিল। আমি জেগে উঠলাম, আর সে আমার মাথার কাছে দণ্ডায়মান। আমি কিছু বুঝে না উঠতেই উন্মুক্ত তলোয়ারটি তার হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে। অতঃপর সে আমাকে বলল, কে তোমাকে আমা হতে রক্ষা করবে? তিনি বলেন, আমি বললাম, আল্লাহ! সে দ্বিতীয় বার বলল, তোমাকে আমার হাত থেকে কে রক্ষা করবে? তিনি বলেন, আমি বললাম, আল্লাহ! রসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, সে তখন তলোয়ারটি ভিতরে ঢুকিয়ে রাখল। আর ওই যে সে বসে আছে। এরপর রসূলুল্লাহ ﷺ তাকে কিছুই বললেন না। সহিহ মুসলিম : ৮৪৩
শির্কি তাওয়াক্কুলঃ
যদি কোন ব্যক্তি এমন বিষয়ের ক্ষেত্রে গাইরুল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করল যে বিষয়ের উপর আল্লাহ তায়ালা ব্যতীত অন্য কেউ ক্ষমতা রাখে না, তাহলে সে আল্লাহর সাথে শির্ক করল। পীরবাবা, খাজাবাবা, মৃত ওলী বা অদৃশ্য ব্যক্তিবর্গের উপর তাওয়াক্কুল করলে শির্কে আকবরের অন্তর্ভূক্ত হবে। কাজ শুরু করে ভাবল, ভয় কিছু নেই অমুক ওলী, আউলিয়া, দরবেশ তো আছেই।
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-
وَلِلّٰہِ غَیۡبُ السَّمٰوٰتِ وَالۡاَرۡضِ وَاِلَیۡہِ یُرۡجَعُ الۡاَمۡرُ کُلُّہٗ فَاعۡبُدۡہُ وَتَوَکَّلۡ عَلَیۡہِ ؕ وَمَا رَبُّکَ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعۡمَلُوۡنَ
আসমানও জমীনের গায়েব আল্লাহরই এবং তাঁরই কাছে সব বিষয় প্রত্যাবর্তিত হবে। সুতরাং তুমি তাঁর ইবাদাত কর এবং তাঁর উপর তাওয়াক্কুল কর। আর তোমরা যা কিছু কর সে ব্যাপারে তোমার রব গাফেল নন। সুরা হুদ : ১২৩
যদি কোন ব্যক্তি এমন বিষয়ের ক্ষেত্রে গাইরুল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করল যে বিষয়ের উপর আল্লাহ তায়ালা ব্যতীত অন্য কেউ ক্ষমতা রাখে না, তাহলে সে আল্লাহর সাথে শির্ক করল। অনেক নারীর সন্তান হয় না, তারা সন্তানের জন্য মাজারে মানত করে বা কোন পীরের উপর ভরসা করে দান করে। মূলত সন্তান দানের একমাত্র মালিক আল্লাহ, মায়ের চিকিত্সা পাশাপাশি আল্লাহ উপর তাওয়াক্কুল করেত হবে।
যে সকল বিষয় আল্লাহ ছাড়া কেহই দান করতে পারে না, সে সকল বিষয় পীর, ওলী, আওলিয়া, খাজাবাবা, মৃত ওলি বা অদৃশ্য ব্যক্তিবর্গের উপর তাওয়াক্কুল করলে শির্কে আকবরের অন্তর্ভূক্ত হবে। কোনো কাজ শুরু করে ভাবল, ভয়ের কিছুই নেই, অমুক ওলি, আওলিয়া, দরবেশ তো আছেই। দোকালে বা বাসায় তাবিজ ঝুলিয়ে রেখে তার উপর তাওয়াক্কুল করা শির্ক বলে গন্য হবে। হাতে বা গাছে লাল সুতা বেধে তার উপর তাওয়াক্কুল করা ও শির্ক কাজ। অপর পক্ষে আমীর, উমরা, রাষ্ট্র নায়ক, সমাজপতি, ধন সম্পদের উপকরন ইত্যাদির উপর তাওয়াক্কুল করা ছোট শির্কর অন্তরভুক্ত হবে।
ছোট শির্কি তাওয়াক্কুল:
আমীর, উমরা, রাষ্ট্র নায়ক, সমাজপতি, চাকুরির বেতন, ধন সম্পদের উপকরন ইত্যাদির উপর তাওয়াক্কুল করা ছোট শির্কর অন্তরভুক্ত হবে।
জায়েয তাওয়াক্কুল:
দায়িত্ব দিয়ে প্রতিনিধির বা উকিলের উপর ভরসা করা জায়েয। তবে বলা যাবে না আমি তার উপর তাওয়াক্কুল করলাম। বলতে হবে আমি তাকে প্রতিনিধির বানালাম। দুনিয়ার কোন কার্য হাসিলের জন্য বৈধ সব পন্থা অবলম্ভন করার পরই কেবল আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল যাবে। কেননা আল্লাহ বলেন। এটা আল্লাহর বিধান যা পূর্ব থেকেই চলে আসছে৷ তুমি আল্লাহর বিধানে কোন পরিবর্তন পাবে না৷ (সুরা ফাতহা ৪৮:২৩)। আগুনে হাত দিলে পুড়বেই, বিষ খেলে তার প্রতিক্রিয়া হবেই, পানি পানে পিপাষা নিবারন হবেই। এটাই আল্লাহর বিধান। তবে চুড়ান্ত ফলাফল আল্লাহর হাতে আর এটাই তাওয়াক্কুল। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-
فَإِذَا قُضِيَتِ ٱلصَّلَوٰةُ فَٱنتَشِرُواْ فِى ٱلۡأَرۡضِ وَٱبۡتَغُواْ مِن فَضۡلِ ٱللَّهِ وَٱذۡكُرُواْ ٱللَّهَ كَثِيرً۬ا لَّعَلَّكُمۡ تُفۡلِحُونَ
অতঃপর যখন সালাত সমাপ্ত হবে তখন তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড় আর আল্লাহর অনুগ্রহ হতে অনুসন্ধান কর এবং আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ কর, যাতে তোমরা সফল হতে পার। সুরা্ জুমাহ : ১০
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-
يَـٰٓأَيُّہَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ خُذُواْ حِذۡرَڪُمۡ فَٱنفِرُواْ ثُبَاتٍ أَوِ ٱنفِرُواْ جَمِيعً۬ا
হে ঈমানদারগণ ! মোকাবিলা করার জন্য সর্বক্ষণ প্রস্তুত থাকো৷ তারপর সুযোগ পেলে পৃথক পৃথক বাহিনীতে বিভক্ত হয়ে বের হয়ে পড়ো অথবা এক সাথে৷ সুরা নিসা : ৭১
আল্লাহ তা’আলা বলেন :
وَأَعِدُّواْ لَهُم مَّا ٱسۡتَطَعۡتُم مِّن قُوَّةٍ۬ وَمِن رِّبَاطِ ٱلۡخَيۡلِ تُرۡهِبُونَ بِهِۦ عَدُوَّ ٱللَّهِ وَعَدُوَّڪُمۡ وَءَاخَرِينَ مِن دُونِهِمۡ لَا تَعۡلَمُونَهُمُ ٱللَّهُ يَعۡلَمُهُمۡۚ وَمَا تُنفِقُواْ مِن شَىۡءٍ۬ فِى سَبِيلِ ٱللَّهِ يُوَفَّ إِلَيۡكُمۡ وَأَنتُمۡ لَا تُظۡلَمُونَ
অর্থ: আর তোমরা নিজেদের সামর্থ অনুযায়ী সর্বাধিক পরিমাণ শক্তি ও সদাপ্রস্তুত ঘোড়া তাদের মোকাবিলার জন্য যোগাড় করে রাখো৷ এর মাধ্যমে তোমরা ভীতসন্ত্রস্ত করবে আল্লাহর শত্রুকে, নিজের শত্রুকে এবং অন্য এমন সব শত্রুকে যাদেরকে তোমরা চিন না৷ কিন্তু আল্লাহ চেনেন৷ আল্লাহর পথে তোমরা যা কিছু খরচ করবে তার পূর্ণ প্রতিদান তোমাদেরকে ফিরিয়ে দেয়া হবে, এবং তোমাদের প্রতি কখনো জুলুম করা হবে না৷ সুরা আনফাল : ৬০
আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন-
قَالَ رَجُلٌ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَعْقِلُهَا وَأَتَوَكَّلُ أَوْ أُطْلِقُهَا وَأَتَوَكَّلُ قَالَ “ اعْقِلْهَا وَتَوَكَّلْ
কোন একজন লোক বললো, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমি কি সেটা (উট) বেঁধে রেখে আল্লাহ তা’আলার উপর ভরসা করবো, না বাধন খুলে রেখে আল্লাহ্ তা’আলার উপর ভরসা করবো? তিনি বললেনঃ তুমি সেটা বেঁধে রেখে (আল্লাহ্ তা’আলা উপর) ভরসা করবে। সুনানে তিরমিজি : ২৫১৭
১৭। গাইরুল্লাহর একনিষ্ট অনুগত্য করাঃ
আল্লাহ ও তার দ্বীনের আনুগত্য করা প্রত্যেক মুমিনের উপর ফরজ। আনুগত্য করতে হবে আল্লাহর, তার রসূলের এবং দায়িত্ব ও ক্ষমতার অধিকারী উলামা, শাসনকর্তা, উমারাদের। কিন্তু মনে রাখতে হবে, উলামা, শাসনকর্তা, ওলী, আউলিয়া, দরবেশ, পীরদের আনুগত্যে ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি করে আল্লাহর অনুগত্যের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া থেকেই আনুগত্যের শির্কের উৎপত্তি। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-
يَـٰٓأَيُّہَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ أَطِيعُواْ ٱللَّهَ وَأَطِيعُواْ ٱلرَّسُولَ وَأُوْلِى ٱلۡأَمۡرِ مِنكُمۡۖ
হে ঈমানগারগণ ! আনুগত্য করো আল্লাহর এবং আনুগত্য করো রসূলের আর সেই সব লোকের যারা তোমাদের মধ্যে দায়িত্ব ও ক্ষমতার অধিকারী৷ সুরা নিসা : ৫৯
আনুগত্য পাঁচ প্রকার হয়ে থাকে:
আল্লাহর আনুগত্য করা ফরজঃ
আল্লাহ যখন যে কাজ যে সময় যে স্থানে করার হুকুম দিয়েছেন ঠিক সে ভাবেই তার আনুগত্য করতে হবে। অন্যভাবে বলতে হয় পুরাপুরি বিনাশর্তে তার নাজিল কৃত ওহীর আনুগত্য মেনে নেওয়া। আল্লাহর আনুগত্যে শর্থ আরপ করলে শির্ক হবে। আল্লার দ্বীনের আনুগত্যই আল্লাহর আনগত্য। আল্লাহর দ্বীন পেয়েছি রাসর সা: মাধ্যমে কাজেই যে, রসূলের আনুগত্য করলো সে আসলে আল্লাহরই আনুগত্য করলো৷ আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-
مَّن يُطِعِ ٱلرَّسُولَ فَقَدۡ أَطَاعَ ٱللَّهَۖ وَمَن تَوَلَّىٰ فَمَآ أَرۡسَلۡنَـٰكَ عَلَيۡهِمۡ حَفِيظً۬ا
যে ব্যক্তি রসূলের আনুগত্য করলো সে আসলে আল্লাহরই আনুগত্য করলো৷ আর যে ব্যক্তি মুখ ফিরিয়ে নিলো, যাই হোক, তাদের ওপর তো আমি তোমাকে পাহারাদার বানিয়ে পাঠাইনি৷ সুরা নিসা : ৮০
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-
قُلۡ أَطِيعُواْ ٱللَّهَ وَأَطِيعُواْ ٱلرَّسُولَۖ فَإِن تَوَلَّوۡاْ فَإِنَّمَا عَلَيۡهِ مَا حُمِّلَ وَعَلَيۡڪُم مَّا حُمِّلۡتُمۡۖ وَإِن تُطِيعُوهُ تَهۡتَدُواْۚ وَمَا عَلَى ٱلرَّسُولِ إِلَّا ٱلۡبَلَـٰغُ ٱلۡمُبِينُ
বলো, ‘‘ আল্লাহর অনুগত হও এবং রসূলের হুকুম মেনে চলো ৷ কিন্তু যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও৷ তাহলো ভালোভাবে জেনে রাখো, রসূলের ওপর যে দায়িত্বের বোঝা চাপিয়ে দেয়া হয়েছে সে জন্য রাসূল দায়ী এবং তোমাদের ওপর যে দায়িত্বের বোঝা চাপিয়ে দেয়া হয়েছে সে জন্য তোমরাই দায়ী ৷ তাঁর আনুগত্য করলে তোমরা নিজেরাই সৎ পথ পেয়ে যাবে, অন্যথায় পরিষ্কার ও দ্ব্যর্থহীন হুকুম শুনিয়ে দেয়া ছাড়া রসূলের আর কোন দায়িত্ব নেই ৷ সুরা নূর : ৫৪
রাসূলুল্লাহ ﷺ এর অনুগত্য করা ফরজঃ
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনুগত্য করাও ফরজ। আল্লাহর নাজিল কৃত ওহী তিনি যেভাবে বুঝেছেন ও পালন করছেন ঠিক সেভবেই মান্য করা ফরজ। এর ব্যতিক্রম হরাম। আল্লাহ ও তাঁর রসূলের পক্ষ থেকে কোন আদেশ প্রমাণিত হলে, সে বিষয়ে কোন মুসলিম ব্যক্তি, জাতি, প্রতিষ্ঠান, আদালত, পার্লামেন্ট বা রাষ্ট্রের নিজের মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা নেই। মুসলমান হবার অর্থই হচ্ছে আল্লাহ ও তাঁর রসূলের সামনে নিজের স্বাধীন ইখতিয়ার বিসর্জন দেয়া। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-
وَمَا كَانَ لِمُؤۡمِنٍ۬ وَلَا مُؤۡمِنَةٍ إِذَا قَضَى ٱللَّهُ وَرَسُولُهُ ۥۤ أَمۡرًا أَن يَكُونَ لَهُمُ ٱلۡخِيَرَةُ مِنۡ أَمۡرِهِمۡۗ وَمَن يَعۡصِ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُ ۥ فَقَدۡ ضَلَّ ضَلَـٰلاً۬ مُّبِينً۬ا
অর্থ: যখন আল্লাহ ও তাঁর রসূল কোনো বিষয়ের ফায়সালা দিয়ে দেন তখ কোনো মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীর সেই ব্যাপারে নিজে ফায়সালা করার কোনো অধিকার নেই৷ আর যে কেউ আল্লাহ ও তাঁর রসূলের নাফরমানী করে সে সুস্পষ্ট গোমরাহীতে লিপ্ত হয়৷ সুরা আহজাব : ৩৬
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিকট যে দ্বীন আল্লাহর নাজিল করেছেন। তার বিত্তিতে তিনি উম্মতকে পথপ্রদর্শন করছেন। তাই তার প্রচারিত ইসলাম চিরস্থায়ীভাবে মুসলমানদের জন্য চূড়ান্ত ফায়সালাকারী সনদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। সুতারং তার ফায়সালা মেনে আনুগত্য করলে মুমিন থাকবে, তা না হলে মুমিনের গন্ডি থেকে বের হয়ে যাবে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤۡمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيۡنَهُمۡ ثُمَّ لَا يَجِدُواْ فِىٓ أَنفُسِہِمۡ حَرَجً۬ا مِّمَّا قَضَيۡتَ وَيُسَلِّمُواْ تَسۡلِيمً۬ا
না, হে মুহাম্মদ! তোমার রবের কসম, এরা কখনো মুনিন হতে পারে না যতক্ষণ এদের পারস্পারিক মতবিরোধের ক্ষেত্রে এরা তোমাকে ফায়সালাকারী হিসেবে মেনে না নেবে, তারপর তুমি যা ফায়সালা করবে তার ব্যাপারে নিজেদের মনের মধ্য যে কোন প্রকার কুণ্ঠা ও দ্বিধার স্থান দেবে না, বরং সর্বান্তকরণে মেনে নেবে৷ সুরা নিসা : ৬৫
তাগুদের আনুগত্য করা শিরকঃ
তাগুত এমন এক বান্দাকে বলা হয়, যে বন্দেগী ও দাসত্বের সীমা অতিক্রম করে নিজেই প্রভু ও খোদা হবার দাবীদার সাজে এবং আল্লাহর বান্দাদেরকে নিজের বন্দেগী ও দাসত্বে নিযুক্ত করে। তাই তাগুত কখনো শয়তান নিজে, কখনো ভন্ডপীরের ভেসে, কখনো রাষ্ট্র নায়কের ভেসে আসে। তাগুদের আনুগত্য করা শিরক। এই কথার দলীল হচ্ছে কুরআনের এই আয়াত,
وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَّسُولًا أَنِ اعْبُدُوا اللَّهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُوتَ
“আমি প্রত্যেক উম্মতের মধ্যেই রসূল প্রেরণ করেছি এই মর্মে যে, তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর এবং তাগুত থেকে দূরে থাক। সুরা নাহল : ৩৬
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-
لَآ إِكۡرَاهَ فِى ٱلدِّينِۖ قَد تَّبَيَّنَ ٱلرُّشۡدُ مِنَ ٱلۡغَىِّۚ فَمَن يَكۡفُرۡ بِٱلطَّـٰغُوتِ وَيُؤۡمِنۢ بِٱللَّهِ فَقَدِ ٱسۡتَمۡسَكَ بِٱلۡعُرۡوَةِ ٱلۡوُثۡقَىٰ لَا ٱنفِصَامَ لَهَاۗ وَٱللَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ
দ্বীনের ব্যাপারে কোন জোর জবরদস্তি নেই। ভ্রান্ত মত ও পথ থেকে সঠিক মত ও পথকে ছাঁটাই করে আলাদা করে দেয়া হয়েছে। এখন যে কেউ তাগুতকে অস্বীকার করে আল্লাহর ওপর ঈমান আনে, সে এমন একটি মজবুত অবলম্বন আঁকড়ে ধরে, যা কখনো ছিন্ন হয় না। আর আল্লাহ সবকিছু শোনেন ও জানেন। সুরা বাকারা : ২৫৬
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-
أَلَمۡ تَرَ إِلَى ٱلَّذِينَ يَزۡعُمُونَ أَنَّهُمۡ ءَامَنُواْ بِمَآ أُنزِلَ إِلَيۡكَ وَمَآ أُنزِلَ مِن قَبۡلِكَ يُرِيدُونَ أَن يَتَحَاكَمُوٓاْ إِلَى ٱلطَّـٰغُوتِ وَقَدۡ أُمِرُوٓاْ أَن يَكۡفُرُواْ بِهِۦ وَيُرِيدُ ٱلشَّيۡطَـٰنُ أَن يُضِلَّهُمۡ ضَلَـٰلاَۢ بَعِيدً۬ا
হে নবী ! তুমি কি তাদেরকে দেখোনি, যারা এই মর্মে দাবী করে চলেছে যে, তারা ঈমান এনেছে সেই কিতাবের প্রতি যা তোমার ওপর নাযিল করা হয়েছে এবং সেই সব কিতাবের প্রতি যেগুলো তোমরা পূর্বে নাযিল করা হয়েছিল কিন্তু তারা নিজেদের বিষয়সমূহ ফায়সালা করার জন্য “তাগুতে”র দিকে ফিরতে চায়, অথচ তাদেরকে তাগুতকে অস্বীকার করার হুকুম দেয়া হয়েছিল? শয়তান তাদেরকে পথভ্রষ্ট করে সরল সোজা পথ থেকে অনেক দূরে সরিয়ে নিয়ে যেতে চায়৷ সুরা নিসা : ৬০
কাফের ও মুনাফিকদের আনুগত্য করা হারাম, আবার কখনও শিরক
মুশরিক কাফের ও মুনাফিকদের আনুগত্য করা হারাম কখনো কখনো শির্ক। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-
يَـٰٓأَيُّہَا ٱلنَّبِىُّ ٱتَّقِ ٱللَّهَ وَلَا تُطِعِ ٱلۡكَـٰفِرِينَ وَٱلۡمُنَـٰفِقِينَۗ إِنَّ ٱللَّهَ ڪَانَ عَلِيمًا حَكِيمً۬ا
হে নবী! আল্লাহকে ভয় করো এবং কাফের ও মুনাফিকদের আনুগত্য করো না৷ প্রকৃতপক্ষে আল্লাহই সর্বজ্ঞ ও মহাজ্ঞানী। সুরা আহজাব : ০১
কাফির বা মুশরিকগণ যখন তাদের শিরক কাজ করার আহবান করে তখন তাদের কাজে প্রতি অনুগত্য প্রকাশ করা বা সম্মতি প্রদান করা শিরক। তাদের সাধারণ কাজের অনুগত্য হারাম হলেও শিরকি কাজের অনুগত্য শিরক।
শর্ত সাপেক্ষে উলুল আমরদের আনুগত্য করা যাবেঃ
উলুল আমর বা কর্তৃত্বশীল ব্যাক্তি বা আমিরের অনুগত্য করা যাবে তবে তাদের অনুগত্য হবে শর্ত সাপেক্ষে। তাদের একনিষ্ঠ বা অন্ধ আনুগত্য হারাম। যদি তারা আল্লাহ কর্তৃক হারামকৃত বিষয়কে হালাল বা হালালকৃত বস্তুকে হারাম করে তখন তাদের আনুগত্য করা করা হারাম। সুতরাং যেসব লোক এসব ক্ষেত্রে তাদের আনুগত্য করল তারা মুলত আল্লাহ তা’আলার সমকক্ষ শির্কে ডুবে গেল। উলুল আমর বা কর্তৃত্বশীল ব্যাক্তি বা আমিরের অনগত্য ততক্ষণ পর্যন্ত জায়েয যতক্ষন পর্যন্ত তারা কুরআন সুন্নাহর উপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে। তাদের করা হারাম ও হালালকে বিনা দলিলে মেনে নেওয়াই হলো, তাদের ইলাহ হিসাবে মর্যাদা প্রদান করা।
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-
اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَابًا مِنْ دُونِ اللَّهِ وَالْمَسِيحَ ابْنَ مَرْيَمَ وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا إِلَهًا وَاحِدًا لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ سُبْحَانَهُ عَمَّا يُشْرِكُونَ
তারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে নিজেদের উলামা ও দরবেশদেরকে নিজেদের খোদায় পরিণত করেছে৷ এবং এভাবে মারয়াম পুত্র মসীহকেও৷ অথচ তাদের মা’বুদ ছাড়া আর কারোর বন্দেগী কারার হুকুম দেয়া হয়নি, এমন এক মাবুদ যিনি ছাড়া ইবাদত লাভের যোগ্যতা সম্পন্ন আর কেউ নেই৷ তারা যেসব মুশরিকী কথা বলে তা থেকে তিনি পাক পবিত্র৷ সুরা তওবা : ৩১
আনুগত্যের শির্ক হল, বিনা ভাবনায় শরিয়তের গ্রহণযোগ্য কোন প্রমান ছাড়াই হালাল হারাম জায়েয নাজায়েজের ব্যপারে আলেম বুজুর্গ বা উপরস্থ কারো সিদ্ধান্ত অন্ধভাবে সন্তুষ্ট চিত্তে মেনে নেয়া।
সহিহ হাদিসে বলা হয়েছে আদী ইবনে হাতেম নবী (সা) এর কাছে এসে ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন খৃস্টান। ইসলাম গ্রহণ করার সময় তিনি নবী (সা) কে কয়েকটি প্রশ্ন করেন।এর মধ্যে একটি প্রশ্ন হচ্ছে, কুরআনের এ আয়াতটিতে (সুরা তওবা- ৯:৩১) আমাদের বিরুদ্ধে উলামা ও দরবেশদেরকে খোদা বানিয়ে নেবার যে দোষারূপ করা হয়েছে তার প্রকৃত তাৎপর্য কি৷ জবাবে তিনি বলেন, তারা যেগুলোকে হারাম বলতো তোমরা সেগুলোকে হারাম বলে মেনে নিতে এবং তারা যেগুলোকে হালাল বলতো তোমরা সেগুলোকে হালাল বলে মেনে নিতে, একথা কি সত্য নয়৷ জবাবে হযরত আদী বলেন , হাঁ, একথা তো ঠিক, আমরা অবশ্যি এমনটি করতাম। রসূলুল্লাহ (সা) বলেন, ব্যাস, এটিই তো হচ্ছে তোমাদে প্রভু বানিয়ে নেয়া। আহম্মদ, তিরমিজ, তাফসিরে ইবনে কাসির
ইবনু উমার (রা.) হতে বর্ণিত। নবী ﷺ বলেছেন-
السَّمْعُ وَالطَّاعَةُ حَقٌّ مَا لَمْ يُؤْمَرْ بِالْمَعْصِيَةِ فَإِذَا أُمِرَ بِمَعْصِيَةٍ فَلَا سَمْعَ وَلَا طَاعَةَ
পাপ কাজের আদেশ না করা পর্যন্ত ইমামের কথা শোনা ও তার আদেশ মানা অপরিহার্য। তবে পাপ কাজের আদেশ করা হলে তা শোনা ও আনুগত্য করা যাবে না।’ সহিহ বুখারি :: ২৯৫৫, ৭১৪৪
আমাদের সমাজের অনেক পীর মাসায়েক এই শির্কে জড়িত। মাওলানা সৈয়দ মোহাম্মদ এছহাক সাহেব পীর সাহেব চরমোনাই এর লেখা বই “ভেদে মারেফাত বা ইয়াদে খোদা’ এ আছে ’কামেল পীরের আদেশ পাইলে,নাপাক শারাব (মদ) দ্বারাও জায়নামাজ রঙ্গিন করিয়া তাহাতে নামাজ পড়’’। মানিক গঞ্জের মো: আজহারু ইসলাম সিদ্দিকির লেখাবই “মারেফতের ভেদতত্ত্ব” এর ৩৭ পৃষ্ঠায় বলেন: “যুক্তি ছাড়া মোর্শেদের বাক্য বিনা দ্বিধায় মানতে হবে। নিজের বিবেক বুদ্ধি বিদ্যা, যুক্তি, কিতাবি ইলম সবই বিসর্জন দিতে হবে। মোর্শেদের কথায় অন্ধভাবে কাজ করে জেতে হবে। তা সামনে একটা মরা মানুষ সাজতে হবে”।
আল্লাহর কিতাবের সনদ ছাড়াই যারা মানব জীবনের জন্য জায়েয ও নাজায়েযের সীমানা নির্ধারণ করে তারা আসলে নিজেদের ধারণা মতে নিজেরাই আল্লাহর বিধান দানের মর্যাদায় সমাসীন হয়। আর যারা শরীয়াতের বিধি রচনার এ অধিকার তাদের জন্য স্বীকার করে নেয়া পরিস্কার শির্ক। “তারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে নিজেদের উলামা ও দরবেশদেরকে নিজেদের খোদায় পরিণত করেছে” মনে হচ্ছে এ আয়াতের ই প্রতিধ্বনি। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-
ٱتَّبِعُواْ مَآ أُنزِلَ إِلَيۡكُم مِّن رَّبِّكُمۡ وَلَا تَتَّبِعُواْ مِن دُونِهِۦۤ أَوۡلِيَآءَۗ قَلِيلاً۬ مَّا تَذَكَّرُونَ (٣)
হে মানব সমাজ! তোমাদের রবের পক্ষ থেকে তোমাদের ওপর যা কিছু নাযিল করা হয়েছে তার অনুসরণ করো এবং নিজেদের রবকে বাদ দিয়ে আওলিয়াদের অনুসরণ করো না৷ কিন্তু তোমরা খুব কমই উপদেশ মেনে থাকো৷ সুরা আরাফ : ৩
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-
وَلَا تَأۡڪُلُواْ مِمَّا لَمۡ يُذۡكَرِ ٱسۡمُ ٱللَّهِ عَلَيۡهِ وَإِنَّهُ ۥ لَفِسۡقٌ۬ۗ وَإِنَّ ٱلشَّيَـٰطِينَ لَيُوحُونَ إِلَىٰٓ أَوۡلِيَآٮِٕهِمۡ لِيُجَـٰدِلُوكُمۡۖ وَإِنۡ أَطَعۡتُمُوهُمۡ إِنَّكُمۡ لَمُشۡرِكُونَ (١٢١
আর যে পশুকে আল্লাহর নামে যবেই করা হয়নি তার গোশত খেয়ো না৷ এটা অবশ্যি মহাপাপ৷ শয়তানরা তাদের ঝগড়া করতে পারে৷ কিন্তু যদি তোমরা তাদের আনুগত্য করো তাহলে অবশ্যি তোমরা মুশরিক হবে৷ সুরা আনআম : ১২১
দুনিয়াতে তাদের নিষেধ করলেও আনুগত্য ছাড়বেনা। আখেরাতে ঠিকই সম্পর্ক ছিন্ন করবে। কিন্তু কোন কাজে আসবেনা। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-
إِذۡ تَبَرَّأَ ٱلَّذِينَ ٱتُّبِعُواْ مِنَ ٱلَّذِينَ ٱتَّبَعُواْ وَرَأَوُاْ ٱلۡعَذَابَ وَتَقَطَّعَتۡ بِهِمُ ٱلۡأَسۡبَابُ (١٦٦)
যখন তিনি শাস্তি দেবেন তখন এই সমস্ত নেতা ও প্রধান ব্যক্তিরা, দুনিয়ায় যাদের অনুসরণ করা হতো, তাদের অনুগামীদের সাথে সম্পর্কহীনতা প্রকাশ করতে থাকবে৷ কিন্তু শাস্তি তারা পাবেই এবং তাদের সমস্ত উপায় উপকরণের ধারা ছিন্ন হয়ে যাবে৷ সুরা বাকারা : ১৬৬
১৮। আল্লাহর অনুগ্রহ বা নেয়ামতকে গাইরুল্লাহর সাথে সম্পৃক্ত কার
পৃথিবীত ও আকাশ মন্ডলিতে যত প্রকারের নেয়ামত দেখা যায় তার সব কিছুর একছন্ন মালিক মহান রাব্বিল আলামীন। তার অনুগ্রহ বা নেয়ামত না থাকলে পৃতিবীর কোন প্রানীরই অস্তিত্ত্ব থাকতনা। এই জন্য আল্লাহ তাদেরকে ভৎর্সনা করছেন, যারা তাঁর একছন্ন নিয়ামতকে অন্যের সাথে সম্পৃক্ত করে থাকে। আল্লাহর প্রদানকৃত নিয়ামতের সাথে গাইরুল্লাহকে সম্পৃক্ত করাই মুলত শিরক। কেউ যদি বলে অমুক না থাকলে আজ মারাই জেতার। যদি অমুক ডাক্তারে নিকট চিকত্সা না নিতাম মারা যেতাম। তাকে বাচার আল্লাহ আর নেয়ামতের শুকরিয় করল অন্যের যা পরিস্কার শির্ক। মহান আল্লাহ যখন নিজ করুনায় দুরাবস্থা থেকে মুক্ত করে তার বান্দাকে সুখ স্বাচ্ছন্দ্য প্রদান করে সে তখন সে তার বাপ দাদাদের উদাহরণ দেয়। সর্বশ্রেষ্ঠ মহত্বপূর্ণ আল্লাহ বলেন-
ثُمَّ بَدَّلۡنَا مَکَانَ السَّیِّئَۃِ الۡحَسَنَۃَ حَتّٰی عَفَوۡا وَّقَالُوۡا قَدۡ مَسَّ اٰبَآءَنَا الضَّرَّآءُ وَالسَّرَّآءُ فَاَخَذۡنٰہُمۡ بَغۡتَۃً وَّہُمۡ لَا یَشۡعُرُوۡنَ
তারপর আমি মন্দ অবস্থাকে ভাল অবস্থা দ্বারা বদলে দিয়েছি। অবশেষে তারা প্রাচুর্য লাভ করেছে এবং বলেছে, ‘আমাদের বাপ-দাদাদেরকেও দুর্দশা ও আনন্দ স্পর্শ করেছে।’ অতঃপর আমি তাদেরকে হঠাৎ পাকড়াও করেছি এমনভাবে যে, তারা উপলব্ধিও করতে পারেনি। সুরা আরাফ : ৯৫
বিপদে বান্দা একনিষ্ঠভাবে আল্লাহকে স্মরণ করে কিন্তু যখন তার বিপদ কেটে যায় তখন সে আল্লাহ আল্লাহর বিরুদ্ধে কুফরি করে থাকে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-
وَاِذَا غَشِیَہُمۡ مَّوۡجٌ کَالظُّلَلِ دَعَوُا اللّٰہَ مُخۡلِصِیۡنَ لَہُ الدِّیۡنَ ۬ۚ فَلَمَّا نَجّٰہُمۡ اِلَی الۡبَرِّ فَمِنۡہُمۡ مُّقۡتَصِدٌ ؕ وَمَا یَجۡحَدُ بِاٰیٰتِنَاۤ اِلَّا کُلُّ خَتَّارٍ کَفُوۡرٍ
আর যখন ঢেউ তাদেরকে ছায়ার মত আচ্ছন্ন করে নেয়, তখন তারা একনিষ্ঠ অবস্থায় আনুগত্যভরে আল্লাহকে ডাকে। অতঃপর যখন তিনি তাদেরকে উদ্ধার করে স্থলে পৌঁছে দেন, তখন তাদের কেউ কেউ (ঈমান ও কুফরীর) মধ্যপথে থাকে। আর বিশ্বাসঘাতক ও কাফির ব্যক্তি ছাড়া কেউ আমার নিদর্শনাবলী অস্বীকার করে না। সুরা লোকমান : ৩২
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-
يَعۡرِفُونَ نِعۡمَتَ ٱللَّهِ ثُمَّ يُنكِرُونَهَا وَأَكۡثَرُهُمُ ٱلۡكَٰفِرُونَ
এরা আল্লাহর অনুগ্রহ নেয়ামত জানে, কিন্তু সেগুলো অস্বীকার করে, আর এদের মধ্যে বেশীর ভাগ লোক এমন যারা সত্যকে মেনে নিতে প্রস্তুত নয়৷ সুরা নাহল : ৮৩
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-
فَاِنۡ اَعۡرَضُوۡا فَمَاۤ اَرۡسَلۡنٰکَ عَلَیۡہِمۡ حَفِیۡظًا ؕ اِنۡ عَلَیۡکَ اِلَّا الۡبَلٰغُ ؕ وَاِنَّاۤ اِذَاۤ اَذَقۡنَا الۡاِنۡسَانَ مِنَّا رَحۡمَۃً فَرِحَ بِہَا ۚ وَاِنۡ تُصِبۡہُمۡ سَیِّئَۃٌۢ بِمَا قَدَّمَتۡ اَیۡدِیۡہِمۡ فَاِنَّ الۡاِنۡسَانَ کَفُوۡرٌ
আর যদি তারা বিমুখ হয়, তবে আমি তো তোমাকে তাদের রক্ষক হিসেবে পাঠাইনি। বাণী পৌঁছে দেয়াই তোমার দায়িত্ব। আর আমি যখন মানুষকে আমার রহমত আস্বাদন করাই তখন সে খুশি হয়। আর যখন তাদের কৃতকর্মের জন্য তাদের উপর কোন বিপদ আসে তখন মানুষ বড়ই অকৃতজ্ঞ হয়। সুরা শুরা : ৪৮
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সুর আর রহমানে তার নেয়ামতকে স্মরন করিয়ে দিয় ৩১ বার ইরশাদ করেন-
فَبِاَیِّ اٰلَآءِ رَبِّکُمَا تُکَذِّبٰنِ
সুতরাং তোমরা উভয়ে তোমাদের রবের কোন নেয়মতকে অনুগ্রহ অস্বীকার করবে?
আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের নিয়ামত অস্বীকারকারী বানী ইসরাঈলের তিনজন লোকের কাহিনি-
আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছেন, বানী ইসরাইলের মধ্যে তিনজন লোক ছিল। একজন শ্বেতরোগী, একজন মাথায় টাকওয়ালা আর একজন অন্ধ। মহান আল্লাহ তাদেরকে পরীক্ষা করতে চাইলেন। কাজেই, তিনি তাদের নিকট একজন ফেরেশতা পাঠালেন। ফেরেশতা প্রথমে শ্বেত রোগীটির নিকট আসলেন এবং তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার নিকট কোন্ জিনিস অধিক প্রিয়? সে জবাব দিল, সুন্দর রং ও সুন্দর চামড়া। কেননা, মানুষ আমাকে ঘৃণা করে। ফেরেশতা তার শরীরের উপর হাত বুলিয়ে দিলেন। ফলে তার রোগ সেরে গেল। তাকে সুন্দর রং এবং সুন্দর চামড়া দান করা হল। অতঃপর ফেরেশতা তাকে জিজ্ঞেস করলেন, কোন্ ধরনের সম্পদ তোমার নিকট অধিক প্রিয়? সে জবাব দিল, ’উট’ অথবা সে বলল, ’গরু’। এ ব্যাপারে বর্ণনাকারীর সন্দেহ রয়েছে যে শ্বেতরোগী না টাকওয়ালা দু’জনের একজন বলেছিল ’উট’ আর অপরজন বলেছিল ’গরু’। অতএব তাকে একটি দশ মাসের গর্ভবতী উটনী দেয়া হল। তখন ফিরশতা বললেন, ’’এতে তোমার জন্য বরকত হোক।’’
বর্ণনাকারী বলেন, ফেরেশতা টাকওয়ালার নিকট গেলেন এবং বললেন, তোমার নিকট কী জিনিস পছন্দনীয়? সে বলল, সুন্দর চুল এবং আমার হতে যেন এ রোগ চলে যায়। মানুষ আমাকে ঘৃণা করে। বর্ণনাকারী বলেন, ফেরেশতা তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন এবং তৎক্ষণাৎ মাথার টাক চলে গেল। তাকে সুন্দর চুল দেয়া হল। ফেরেশতা জিজ্ঞেস করলেন, কোন্ সম্পদ তোমার নিকট অধিক প্রিয়? সে জবাব দিল, ’গরু’। অতঃপর তাকে একটি গর্ভবতী গাভী দান করলেন। এবং ফেরেশতা দু’আ করলেন, এতে তোমাকে বরকত দান করা হোক। অতঃপর ফেরেশতা অন্ধের নিকট আসলেন এবং তাকে জিজ্ঞেস করলেন, কোন্ জিনিস তোমার নিকট অধিক প্রিয়? সে বলল, আল্লাহ্ যেন আমার চোখের জ্যোতি ফিরিয়ে দেন, যাতে আমি মানুষকে দেখতে পারি। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তখন ফেরেশতা তার চোখের উপর হাত ফিরিয়ে দিলেন, তৎক্ষণাৎ আল্লাহ্ তার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিলেন। ফেরেশতা জিজ্ঞেস করলেন, কোন্ সম্পদ তোমার নিকট অধিক প্রিয়? সে জবাব দিল ’ছাগল’। তখন তিনি তাকে একটি গর্ভবতী ছাগী দিলেন। উপরে উল্লেখিত লোকদের পশুগুলো বাচ্চা দিল। ফলে একজনের উটে ময়দান ভরে গেল, অপরজনের গরুতে মাঠ পূর্ণ হয়ে গেল এবং আর একজনের ছাগলে উপত্যকা ভরে গেল।
অতঃপর ঐ ফেরেশতা তাঁর পূর্ববর্তী আকৃতি প্রকৃতি ধারণ করে শ্বেতরোগীর নিকট এসে বললেন, আমি একজন নিঃস্ব ব্যক্তি। আমার সফরের সম্বল শেষ হয়ে গেছে। আজ আমার গন্তব্য স্থানে পৌঁছার আল্লাহ্ ব্যতীত কোন উপায় নেই। আমি তোমার নিকট ঐ সত্তার নামে একটি উট চাচ্ছি, যিনি তোমাকে সুন্দর রং, কোমল চামড়া এবং সম্পদ দান করেছেন। আমি এর উপর সাওয়ার হয়ে আমার গন্তব্যে পৌঁছাব। তখন লোকটি তাকে বলল, আমার উপর বহু দায়িত্ব রয়েছে। তখন ফেরেশতা তাকে বললেন, সম্ভবত আমি তোমাকে চিনি। তুমি কি এক সময় শ্বেতরোগী ছিলে না? মানুষ তোমাকে ঘৃণা করত। তুমি কি ফকীর ছিলে না? অতঃপর আল্লাহ্ তা’আলা তোমাকে দান করেছেন। তখন সে বলল, আমি তো এ সম্পদ আমার পূর্বপুরুষ হতে ওয়ারিশ সূত্রে পেয়েছি। ফেরেশতা বললেন, তুমি যদি মিথ্যাচারী হও, তবে আল্লাহ্ তোমাকে সেরূপ করে দিন, যেমন তুমি ছিলে। অতঃপর ফেরেশতা মাথায় টাকওয়ালার নিকট তাঁর সেই বেশভূষা ও আকৃতিতে গেলেন এবং তাকে ঠিক তেমনই বললেন, যেরূপ তিনি শ্বেত রোগীকে বলেছিলেন। এও তাকে ঠিক অনুরূপ জবাব দিল যেমন জবাব দিয়েছিল শ্বেতরোগী।
তখন ফেরেশতা বললেন, যদি তুমি মিথ্যাচারী হও, তবে আল্লাহ্ তোমাকে তেমন অবস্থায় করে দিন, যেমন তুমি ছিলে। শেষে ফেরেশতা অন্ধ লোকটির নিকট তাঁর আকৃতিতে আসলেন এবং বললেন, আমি একজন নিঃস্ব লোক, মুসাফির মানুষ; আমার সফরের সকল সম্বল শেষ হয়ে গেছে। আজ বাড়ি পৌঁছার ব্যাপারে আল্লাহ্ ব্যতীত কোন গতি নেই। তাই আমি তোমার নিকট সেই সত্তার নামে একটি ছাগী প্রার্থনা করছি যিনি তোমার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিয়েছেন আর আমি এ ছাগীটি নিয়ে আমার এ সফরে বাড়ি পৌঁছতে পারব। সে বলল, প্রকৃতপক্ষেই আমি অন্ধ ছিলাম। আল্লাহ্ আমার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিয়েছেন। আমি ফকীর ছিলাম। আল্লাহ্ আমাকে সম্পদশালী করেছেন। এখন তুমি যা চাও নিয়ে যাও। আল্লাহর কসম। আল্লাহর জন্য তুমি যা কিছু নিবে, তার জন্যে আজ আমি তোমার নিকট কোন প্রশংসাই দাবী করব না। তখন ফেরেশতা বললেন, তোমার সম্পদ তুমি রেখে দাও। তোমাদের তিন জনের পরীক্ষা নেয়া হল মাত্র। আল্লাহ্ তোমার উপর সন্তুষ্ট হয়েছেন আর তোমার সাথীদ্বয়ের উপর অসন্তুষ্ট হয়েছেন। সহিহ বুখারি : ৩৪৬৪, ৬৬৫৩, সহিহ মুসলিম : ২৯৬৪
১৯। আল্লাহ অপেক্ষা কাউকে উত্তম বিচারক বা ফয়সালাকারী হিসেবে মান্য করা
জাহিলিয়াতের ফয়সালা কাসনা করা আর আল্লাহ ফয়সালাকে অস্বীকার করা কুফরি কাজ। আর আল্লাহ অপেক্ষা উত্তম ফয়সালাকারী বা তার সমকক্ষ ভাবা তো একেবারে বড় শিরক। কেননা আল্লাহর ফয়সালাই কল্যান কর ও চুড়ান্ত। আল্লাহর শরীয়তে স্বীকৃত হয়নি এমন সব ফয়সালাকে বর্জন করতে হবে।
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-
اَفَغَیۡرَ اللّٰہِ اَبۡتَغِیۡ حَکَمًا وَّہُوَ الَّذِیۡۤ اَنۡزَلَ اِلَیۡکُمُ الۡکِتٰبَ مُفَصَّلًا ؕ وَالَّذِیۡنَ اٰتَیۡنٰہُمُ الۡکِتٰبَ یَعۡلَمُوۡنَ اَنَّہٗ مُنَزَّلٌ مِّنۡ رَّبِّکَ بِالۡحَقِّ فَلَا تَکُوۡنَنَّ مِنَ الۡمُمۡتَرِیۡنَ
আমি কি আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে বিচারক হিসেবে তালাশ করব? অথচ তিনিই তোমাদের নিকট বিস্তারিত কিতাব নাযিল করেছেন। আর যাদেরকে আমি কিতাব দিয়েছিলাম তারা জানত যে, তা তোমার রবের পক্ষ থেকে যথাযথভাবে নাযিলকৃত। সুতরাং তুমি কখনো সন্দেহকারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না। সুর আনাম : ১১৪
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-
أَفَحُكۡمَ ٱلۡجَٰهِلِيَّةِ يَبۡغُونَۚ وَمَنۡ أَحۡسَنُ مِنَ ٱللَّهِ حُكۡمٗا لِّقَوۡمٖ يُوقِنُونَ
তারা কি তবে জাহিলিয়াতের বিধান চায়? আর দৃঢ় বিশ্বাসী কওমের জন্য বিধান প্রদানে আল্লাহর চেয়ে কে অধিক উত্তম? সুরা মায়েদা : ৫০
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-
قُلۡ اِنِّیۡ عَلٰی بَیِّنَۃٍ مِّنۡ رَّبِّیۡ وَکَذَّبۡتُمۡ بِہٖ ؕ مَا عِنۡدِیۡ مَا تَسۡتَعۡجِلُوۡنَ بِہٖ ؕ اِنِ الۡحُکۡمُ اِلَّا لِلّٰہِ ؕ یَقُصُّ الۡحَقَّ وَہُوَ خَیۡرُ الۡفٰصِلِیۡنَ
বল, ‘নিশ্চয় আমি আমার রবের পক্ষ থেকে স্পষ্ট প্রমাণের উপর রয়েছি আর তোমরা তা অস্বীকার করছ। তোমরা যা নিয়ে তাড়াহুড়া করছ তা আমার কাছে নেই। হুকুম কেবল আল্লাহর কাছে। তিনি সত্য বর্ণনা করেন এবং তিনি সর্বোত্তম ফয়সালাকারী’। সুরা আনাম : ৫৭
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-
قُلۡ یَجۡمَعُ بَیۡنَنَا رَبُّنَا ثُمَّ یَفۡتَحُ بَیۡنَنَا بِالۡحَقِّ ؕ وَہُوَ الۡفَتَّاحُ الۡعَلِیۡمُ
বল, ‘আমাদের রব আমাদেরকে একত্র করবেন। তারপর তিনি আমাদের মধ্যে সঠিকভাবে ফয়সালা করবেন। আর তিনিই শ্রেষ্ঠ ফয়সালাকারী ও সম্যক পরিজ্ঞাত’। সুরা সাবা : ২৬
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-
وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ
যে সব লোক আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন সে অনুযায়ী ফয়সালা করে না তারাই কাফির। সুরা মায়িদাহ : ৪৪
আল্লাহ হচ্ছেন ফায়সালা করার যাবতীয় ক্ষমতার একমাত্র অধিকারী। অন্য কাউকে চুড়ান্ত ফায়সালা অধিকরী মনে করা শির্ক। সাধারনত মানুষকে কোন ফায়সালা করার ক্ষমতা দিলে আল্লাহ বিধান মতো ফায়সালা করতে হবে তখন এটাই আল্লাহর ফায়সালা বলে গন্য হবে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-
ثُمَّ رُدُّوۡۤا اِلَی اللّٰہِ مَوۡلٰىہُمُ الۡحَقِّ ؕ اَلَا لَہُ الۡحُکۡمُ ۟ وَہُوَ اَسۡرَعُ الۡحٰسِبِیۡنَ
তারপর তাদেরকে প্রত্যাবর্তিত করা হয় তাদের সত্য অভিভাবক আল্লাহর কাছে। সাবধান! বিধান প্রদানের ক্ষমতা তাঁরই। আর তিনি হচ্ছেন খুব দ্রুত হিসাবকারী। সুরা আনআম : ৬২