সন্তানের কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় জীবন : প্রথম পর্ব

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

আমাদের সন্তানরা যখন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবনে প্রবেশ করে, তখন তারা বালেগ হয়ে যায় এবং ইসলামের পূর্ণাঙ্গ দায়িত্ব তাদের উপর অর্পিত হয়। এই সময়ে বয়স, পড়াশোনার চাপ এবং জীবনের সীমিত অভিজ্ঞতার কারণে ইসলামের নির্দেশনাগুলো মেনে চলা তাদের জন্য সহজ হয় না। অনেকে মনে করে যে তারা এখন বড় হয়ে গেছে, তাই তাদের আর মা-বাবার সহযোগিতা প্রয়োজন নেই। অথচ বাস্তবতা হলো, তারা স্বাধীনতার স্বাদ পেলেও এখনো সম্পূর্ণ স্বাবলম্বী নয়। এ কারণে, মা-বাবার দায়িত্ব এখানেই শেষ হয়ে যায় না, বরং পড়াশোনা শেষ করে কর্মজীবনে প্রবেশ করা পর্যন্ত তাদেরকে সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে হয়। কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে সন্তানরা নানা প্রকার প্রতিকূলতার সম্মুখীন হয়। যেমন-

এই সময়ে ধর্মীয় আচার-আচরণের প্রতি তাদের অনীহা দেখা যায়। খারাপ সঙ্গের প্রভাবে তারা বিপদগামী হতে পারে। অতিরিক্ত স্বাধীনতা অনেক সময় অনৈতিক কাজের দিকে ঠেলে দেয়। সোশ্যাল মিডিয়া এবং ডিজিটাল ডিভাইসের কারণে তাদের সময় নষ্ট হয়। অবৈধ প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে তারা নিজেদের জীবনের লক্ষ্য থেকে দূরে সরে যায়।

এসবের ফলে তাদের চরিত্র ও ঈমান ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যেতে পারে। তাই অভিভাবকদের উচিত এই বয়সে সন্তানদের সাথে একটি বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা, তাদের সাথে খোলামেলা আলোচনা করা, সঠিক ইসলামী জ্ঞান প্রদান করা এবং বাস্তব জীবনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সহায়ক হওয়া। আমাদের উদ্দেশ্য কেবল সন্তানকে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বা কর্মকর্তা বানানো নয়, বরং তাদেরকে একজন আদর্শ মুসলিম, দ্বীনদার, সৎ ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা। এই লক্ষ্য সামনে রেখে দিকনির্দেশনা ও তদারকি চালিয়ে যেতে হবে।

এই প্রবন্ধে আমরা এমন কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা করব যা আমাদের সন্তানের কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। আমরা দেখব, তারা কোন ধরনের প্রতিকূলতার সম্মুখীন হয় এবং ইসলাম ও আধুনিক সমাজবিজ্ঞানের আলোকে সেই প্রতিকূলতা থেকে উত্তরণের উপায় কী। আমাদের মূল উদ্দেশ্য হলো এমন একটি পথ তৈরি করা, যা আমাদের সন্তানদেরকে পার্থিব জীবনে সফল করার পাশাপাশি তাদের ঈমান ও নৈতিকতাকেও শক্তিশালী করবে। আমরা আশা করি, এই আলোচনা মা-বাবাকে তাদের সন্তানদেরকে সঠিক পথে পরিচালনা করতে সহায়তা করবে এবং তাদের মধ্যে এমন মূল্যবোধ তৈরি করবে যা তাদের ইহকাল ও পরকাল উভয়কেই আলোকিত করবে। তার আগে দেখে নেই আমাদের সন্তানদের নিয়ে আমরা কি আশা করি। আমাদের উদ্দেশ্য কি?

সন্তান নিয়ে মা-বাবার উদ্দেশ্য

আমাদের সমাজে প্রায়ই শোনা যায়—“সন্তানকে মানুষ বানাতে হবে।” কিন্তু সন্তানেরা তো মানুষ হিসেবেই জন্মায়। এখানে “মানুষ বানানো” বলতে অনেকে বোঝেন, সন্তানকে ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো, তাকে বিসিএস কর্মকর্তা, ব্যাংকার, ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে গড়ে তোলা। একজন নন-মুসলিম অভিভাবকের জন্য এতটুকু হয়তো যথেষ্ট। কিন্তু একজন মুসলিমের জন্য প্রকৃত সাফল্য কেবল দুনিয়ার চাকচিক্য নয়; বরং দুনিয়া ও আখিরাত উভয় দিকেই সফলতা অর্জন।

১. সত্যিকারের মানুষ কাকে বলে?

আসলে পূর্ণাঙ্গ মানুষের সঠিক সংজ্ঞা হলো, সন্তান যেন একজন ভালো মুসলিম হওয়ার পাশাপাশি একজন ভালো প্রফেশনাল হয়, অর্থাৎ সে যেন দুনিয়া ও আখিরাত দুই দিকেই সফলতা অর্জন করে। একজন ভালো প্রফেশনাল হওয়ার পাশাপাশি একজন ভালো মুসলিম হওয়াটাই মানুষের সঠিক সংজ্ঞা। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তা’আলা বলেছেন-

وَمَا خَلَقۡتُ الۡجِنَّ وَالۡاِنۡسَ اِلَّا لِیَعۡبُدُوۡنِ

আমি সৃষ্টি করেছি জিন ও মানুষকে এ জন্য যে, তারা আমারই ইবাদাত করবে। সূরা যারিয়াত : ৫৬

এই আয়াত স্পষ্ট করে যে, মানুষের জীবনের মূল উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর ইবাদত করা। দুনিয়ার কাজগুলো (যেমন- পেশা, পরিবার) সেই ইবাদতেরই অংশ হতে পারে, যদি তা শরিয়তের নিয়ম মেনে করা হয়। তাই, পেশাগত সাফল্যকে জীবনের একমাত্র লক্ষ্য না করে, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনকে প্রাধান্য দেওয়া হলো মুসলিম জীবনের আসল উদ্দেশ্য।

২. সন্তানের শিক্ষা ও পরিবেশ:

আধুনিকতার নামে, স্বাধিনতার নামে আমরা সন্তানকে বিভিন্ন পাপাচার ও অশ্লীলতায় মধ্যে ছেড়ে দিয়েছি। এখানে থেকে বেঁচে ফিলা কঠিন। আগুনে নিকট মুম রেখে যদি বলি গলবে না, তা কেমন হয়। অশ্লীলতার   আগুনের মধ্যে ছেড়ে দিয়ে বলছি, বাবা আমার কথা শুনে না, নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এ প্রতিকূল পরিবেশ থেকে কলিজার টুকরা সন্তানকে বাঁচাতে হলে প্রয়োজন- মজবুত ঈমান ও তাকওয়া (আল্লাহভীতি)। মজবুত ঈমান ও তাকওয়া কারণে তাকে কোন পাপাচারই স্পর্শ করতে পারবে না।

এ জন্য পরিবার পারে তাকে মজবুত ঈমান ও তাকওয়া শিক্ষা দিতে। আমাদের বিদ্যালয়গুলো এমন যে ইসলাম ছাড়াতে পারলেই বাচি। যা বিদ্যালয়ের উপর ভরসা না করে, ছোট থেকেই পরিবারে ঈমান এ তাকওয়া শিক্ষা দেই। সলক সন্তান একই ফিতরাত নিয়ে জম্মগ্রহণ করে। পরিবার ও পরিবেশই তাকে বিভ্রান্ত করে।

১৩৮৫. আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেনঃ প্রত্যেক নবজাতক ফিত্রাতের উপর জন্মগ্রহণ করে। অতঃপর তার মাতাপিতা তাকে ইয়াহূদী বা নাসারা অথবা অগ্নি উপাসক করে, যেমন চতুষ্পদ জন্তু একটি পূর্ণাঙ্গ বাচ্চা জন্ম দেয়। তোমরা কি তাকে (জন্মগত) কানকাটা দেখেছ? সহিহ বুখারি : ১৩৫৮, ১৩৮৫, সহিহ মুসলিম : ২৬৫৮,

এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, সন্তানের ঈমান ও তাকওয়া গঠনের জন্য মা-বাবার ভূমিকা এবং পারিবারিক পরিবেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আপনার লেখা এই বিষয়টিকে সঠিকভাবে তুলে ধরেছে।

৩. আমাদের করণীয় :

এ অবস্থা থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় হলো—সন্তানের হৃদয়ে মজবুত ঈমান ও তাকওয়া (আল্লাহভীতি) গড়ে তোলা। আর সেটা সম্ভব হবে তখনই, যখন মা-বাবা নিজেরা ঈমান ও তাকওয়ায় উন্নত হবেন এবং ঘরে একটি সুন্দর ইসলামী পরিবেশ সৃষ্টি করবেন।

আবূ হুরাইরাহ (রা.) হতে বর্ণিত যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

“‏ إِذَا مَاتَ الإِنْسَانُ انْقَطَعَ عَنْهُ عَمَلُهُ إِلاَّ مِنْ ثَلاَثَةٍ إِلاَّ مِنْ صَدَقَةٍ جَارِيَةٍ أَوْ عِلْمٍ يُنْتَفَعُ بِهِ أَوْ وَلَدٍ صَالِحٍ يَدْعُو لَهُ ‏”‏ ‏.‏

যখন মানুষ মৃত্যুবরণ করে তখন তার সমস্ত আমল বন্ধ হয়ে যায় তিন প্রকার আমল ছাড়া।  (১) সাদাকা জারিয়াহ্ অথবা ((২) এমন ইলম যার দ্বারা উপকার হয় অথবা (৩) পুণ্যবান সন্তান যে তার জন্যে দু’আ করতে থাকে। সহিহ মুসলিম : ১৬৩১

এখানে আমাদের আলোচনার মূল বিষয় হলো নেক সন্তান রেখে যাওয়া।

৪নেক সন্তান গড়ার প্রকৃত উপায়

অনেকে মনে করেন যে, সন্তানকে বিকেলে একজন হুজুরের কাছে কায়দা বা কুরআন পড়তে পাঠালেই তাদের সব দায়িত্ব শেষ। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সেখানে কেবল তিলাওয়াত শেখানো হয়, ইসলামের পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা নয়। সন্তানকে সত্যিকারের নেক বানাতে হলে মা-বাবাকে এটিকে একটি বিশেষ দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। শুধু টাকা-পয়সা বা পার্থিব খ্যাতির পেছনে ছুটে গেলে একসময় সব হারিয়ে যাবে এবং আফসোস করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না। তাই সময় থাকতে সচেতন হওয়া অত্যন্ত জরুরি। আমাদের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত সন্তানকে এমনভাবে গড়ে তোলা, যাতে সে দুনিয়ায় একজন সফল পেশাদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে এবং আখিরাতে একজন সফল মুমিন হিসেবে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারে। এই ভারসাম্যপূর্ণ শিক্ষা ও পরিচর্যাই তাদের ইহকাল ও পরকালের জীবনে সফলতা নিশ্চিত করবে।

ভালো শিক্ষা মানেই ভালো চাকরি

আমরা অনেকেই মনে করি, সন্তানকে দেশের সেরা স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করে দিলেই মা-বাবার দায়িত্ব শেষ। এরপর আমরা কেবল সন্তানের ভালো ফলাফল এবং একটি সম্মানজনক চাকরির জন্য অপেক্ষা করি। এই একমুখী (one-way) চিন্তা আমাদের সন্তানদেরকে জীবনের এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায়। যদি আমরা কেবল পেশাগত সাফল্যের দিকেই মনোযোগ দেই, তাহলে আমাদের সন্তান একজন সফল পেশাজীবী হলেও একজন ভালো মানুষ নাও হতে পারে।

বর্তমানে অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, বিশেষ করে উচ্চশিক্ষায়, নীতি-নৈতিকতা বা মানবিক মূল্যবোধ শেখানোর কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই। এসব প্রতিষ্ঠানে কেবল পেশাগত জ্ঞান (technical knowledge) প্রদান করা হয়, যা একজন মানুষকে দক্ষ পেশাজীবী হতে সাহায্য করে, কিন্তু একজন সংবেদনশীল ও দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে না। নৈতিকতার এই ঘাটতি আমাদের সন্তানদেরকে এমন একটি সমাজে ঠেলে দেয়, যেখানে অর্থ উপার্জনই জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়।

১. সন্তানকে স্বাধীন সত্তা হিসেবে দেখুন

মা-বাবাদের আরেকটি সাধারণ ভুল ধারণা হলো, তারা মনে করেন সন্তান সবসময় তাদের কথা মেনে চলবে। এটি সব সময় ঠিক নয়। একটি সন্তান হলো একটি স্বাধীন সত্তা, যার নিজস্ব চিন্তা-ভাবনা, পছন্দ-অপছন্দ, এবং কল্পনাশক্তির স্বতন্ত্র তালিকা রয়েছে। আমরা চাইলেই সে আমাদের সব কথা মেনে নেবে—এই প্রত্যাশা করা ঠিক নয়। বরং, আমাদের নিজেদেরকেই তাদের জন্য উদাহরণ তৈরি করতে হবে।

আপনার সন্তানকে কেবল ভালো হওয়ার তত্ত্ব (theory) শিখিয়ে লাভ নেই, যদি আপনি তা বাস্তবে করে না দেখান। নৈতিকতা কোনো মুখস্থ করার বিষয় নয়, এটি জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ যা দেখে এবং অনুকরণ করে শিখতে হয়। আপনার সন্তান আপনার আচরণ থেকেই শিখবে। আপনি যখন ভালো কাজ করবেন, আপনার সন্তান তা উপলব্ধি করার সুযোগ পাবে।

উদাহরণস্বরূপ: আত্মীয়-স্বজনের প্রতি দায়িত্ব: আপনি যদি আপনার গরীব আত্মীয়-স্বজনের খোঁজখবর নেন এবং সামর্থ্য অনুযায়ী তাদের অর্থনৈতিক প্রয়োজন পূরণে সহায়তা করেন, তাহলে আপনার সন্তান এর গুরুত্ব বুঝতে পারবে। সে দেখবে যে কেবল নিজের এবং পরিবারের সুখই জীবনের সবকিছু নয়, বরং অন্যকে সাহায্য করার মধ্যেও বড় আনন্দ আছে।

ঘরে সালাম দিয়ে প্রবেশ: ঘরে প্রবেশ করার সময় আপনি নিজে যদি সালাম দিয়ে প্রবেশ করেন এবং আপনার সন্তানকে নিয়মিত সালাম দেন, তাহলে সে খুব সহজে এই অভ্যাসটি আয়ত্ত করে নেবে। এটি কেবল একটি সাধারণ সম্ভাষণ নয়, এটি একটি দোয়া। আপনি আপনার সন্তানের কল্যাণ কামনা করেন, তাই তাকে দেখা মাত্রই সালাম দেওয়া উচিত। ছোটদের কাছ থেকে সালাম আশা করা উচিত নয়। এটি একটি ভুল প্রচলন। রাসুল (সা.) বেশি বেশি সালামের প্রচলনের ওপর জোর দিয়েছেন, কারণ এটি পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় করে এবং সম্মান বৃদ্ধি করে।

২. মা-বাবার দায়িত্ব: পেশা এবং আদর্শের সমন্বয়

আমাদের সন্তানের জন্য সঠিক পথ হলো এমন একটি পথ, যেখানে সে একজন ভালো পেশাজীবী হওয়ার পাশাপাশি একজন ভালো মুসলিম এবং একজন ভালো মানুষ হতে পারবে। একজন সফল মানুষ তিনিই, যিনি দুনিয়া এবং আখিরাত উভয় ক্ষেত্রেই সফলতা অর্জন করতে পারেন।

তাই, শুধু ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করেই দায়িত্ব শেষ মনে করা উচিত নয়। আমাদের সন্তানদের মধ্যে এমন উপাদান ঢুকিয়ে দিতে হবে, যা প্রতিকূল পরিবেশেও তাকে নষ্ট হতে দেবে না। আর সেই উপাদান হলো মজবুত ঈমান এবং তাকওয়া বা আল্লাহভীতি।

সন্তানের ঈমান এবং তাকওয়া তৈরি করতে হলে মা-বাবার নিজেদেরই ঈমান ও তাকওয়ার মান উন্নত করতে হবে এবং বাসায় একটি সুন্দর ইসলামিক পরিবেশ তৈরি করতে হবে। কেবল তখনই আমরা এমন এক প্রজন্ম তৈরি করতে পারব, যারা পেশাগত জীবনে সফল হওয়ার পাশাপাশি নৈতিকতা, মানবিকতা এবং ধর্মীয় মূল্যবোধের দিক থেকেও উন্নত হবে। আর এরাই হলেন সত্যিকারের “মানুষ”।

কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের চ্যালেঞ্জসমূহ

কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে সন্তানরা এক নতুন জগতে প্রবেশ করে, যেখানে স্বাধীনতা ও নতুন অভিজ্ঞতার হাতছানি থাকে। এই সময়টি একদিকে যেমন জ্ঞানার্জনের সোনালী সুযোগ নিয়ে আসে, তেমনি অন্যদিকে তাদের জীবনে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জও তৈরি করে। একজন মুসলিম হিসেবে এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করা আরও কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। মা-বাবাদের জন্য এই সময়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল, কারণ সন্তানেরা নিজেদের বড় মনে করে এবং অনেক সময় তাদের দিকনির্দেশনা গ্রহণ করতে চায় না। অথচ এই বয়সে সঠিক পথপ্রদর্শন ছাড়া তারা ভুল পথে পা বাড়াতে পারে।

এখানে আমরা সেইসব প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব, যা কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শিক্ষার্থীরা প্রায়ই সম্মুখীন হয়। এর মধ্যে রয়েছে অশ্লীলতা ও পর্নোগ্রাফির বিস্তার, পর্দার প্রতি উদাসীনতা, ভুল বন্ধুত্বের প্রভাব, স্মার্টফোন ও সোশ্যাল মিডিয়ার আসক্তি এবং বিবাহ-পূর্ব প্রেম। আমরা দেখব কীভাবে সেক্যুলার শিক্ষা ব্যবস্থা এবং তথাকথিত আধুনিকতার ধারণা ধর্মীয় আচার-আচরণের প্রতি অনীহা তৈরি করে। আমাদের লক্ষ্য হলো এই সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা এবং ইসলাম ও আধুনিক মনস্তত্ত্বের আলোকে এর কার্যকর সমাধান দেওয়া। আমরা বিশ্বাস করি, মা-বাবার সঠিক তত্ত্বাবধান এবং সন্তানের মধ্যে আল্লাহভীতি ও নৈতিক মূল্যবোধের দৃঢ় ভিত্তি স্থাপন করার মাধ্যমে এই চ্যালেঞ্জগুলো সফলভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব। এই বিষয়গুলো মা-বাবা এবং তরুণ প্রজন্মকে একটি সুস্থ ও ভারসাম্যপূর্ণ জীবন গঠনে সহায়তা করবে বলে আমরা আশা করি।

অশ্লীলতা এবং পর্ণোগ্রাফি

ছাত্রজীবনে অশ্লীলতা ও পর্নোগ্রাফির প্রভাব অত্যন্ত ক্ষতিকর। এর ফলে শারীরিক, মানসিক, সামাজিক এবং আধ্যাত্মিক জীবনে মারাত্মক নেতিবাচক পরিবর্তন আসে। পর্নোগ্রাফি মস্তিষ্কের ডোপামিন সিস্টেমকে প্রভাবিত করে, যা এক ধরনের আসক্তি তৈরি করে। এর ফলে স্বাভাবিক জীবনে আনন্দ বা অনুপ্রেরণার ঘাটতি দেখা যায়। অশ্লীলতা ও পর্নোগ্রাফির প্রতি আসক্তি কোকেন বা অন্য কোনো মাদকের মতোই শক্তিশালী হতে পারে। এটি সম্পর্ক, প্রেম এবং যৌনতা সম্পর্কে অবাস্তব ধারণা তৈরি করে। ফলে সত্যিকারের সম্পর্কের প্রতি আগ্রহ কমে যায় এবং সঙ্গীর প্রতি সম্মান হ্রাস পায়। পর্নোগ্রাফি দেখার পর প্রায়শই অপরাধবোধ, লজ্জা এবং হতাশা সৃষ্টি হয়। এটি মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে এবং মানসিক চাপ বাড়িয়ে তোলে।

১. পড়াশোনায় ক্ষতি

অশ্লীলতা ও পর্নোগ্রাফি মস্তিষ্কের মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। এর ফলে পড়াশোনায় মনোযোগ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে, যা পরীক্ষার ফলাফলে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এটি ছাত্রদের মূল্যবান সময় নষ্ট করে এবং তাদের একাডেমিক ও ব্যক্তিগত লক্ষ্য থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। আসক্ত ব্যক্তিরা প্রায়শই নিজেদের গুটিয়ে নেয় এবং বন্ধু-বান্ধব ও পরিবারের থেকে দূরে থাকতে শুরু করে। এটি তাদের সামাজিক জীবনকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অশ্লীলতা ও পর্নোগ্রাফি সম্পর্কের প্রতি অবিশ্বাস এবং অস্বাস্থ্যকর প্রত্যাশা তৈরি করে, যা বন্ধুদের সাথে বা পরিবারের সদস্যদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে বাধা দেয়। অতিরিক্ত সময় পর্নোগ্রাফি দেখার ফলে ঘুম, খাদ্যভ্যাস এবং ব্যায়ামের মতো গুরুত্বপূর্ণ জীবনযাপন অভ্যাসে ব্যাঘাত ঘটে।

২. আধ্যাত্মিক এবং নৈতিক ক্ষতি

এটি ছাত্রদের নৈতিক মূল্যবোধকে ধ্বংস করে। ইসলাম এবং অন্যান্য ধর্মে অশ্লীলতাকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পর্নোগ্রাফি দেখার ফলে ধর্মীয় বিশ্বাস এবং আধ্যাত্মিক অনুভূতি দুর্বল হয়ে যায়।

এটি এমন সব অনৈতিক কাজকে স্বাভাবিক মনে করতে উৎসাহিত করে, যা একজন সুস্থ ও আদর্শ মানুষের চরিত্রের সঙ্গে মানানসই নয়।

এই ক্ষতিকর দিকগুলো থেকে নিজেকে রক্ষা করতে হলে সচেতনতা, পারিবারিক সহায়তা, এবং ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলা খুবই জরুরি। স্মার্টফোন এবং ইন্টারনেটের সহজলভ্যতার কারণে অশ্লীল কনটেন্ট সহজেই হাতের নাগালে চলে আসে। মা-বাবার জন্য এটি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

اِنَّ الَّذِیۡنَ یُحِبُّوۡنَ اَنۡ تَشِیۡعَ الۡفَاحِشَۃُ فِی الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا لَہُمۡ عَذَابٌ اَلِیۡمٌ ۙ فِی الدُّنۡیَا وَالۡاٰخِرَۃِ ؕ وَاللّٰہُ یَعۡلَمُ وَاَنۡتُمۡ لَا تَعۡلَمُوۡنَ

নিশ্চয় যারা এটা পছন্দ করে যে, মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়ুক, তাদের জন্য দুনিয়া ও আখেরাতে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক আযাব। আর আল্লাহ জানেন এবং তোমরা জান না। সুনা নুর : ১৯

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا لَا تَتَّبِعُوۡا خُطُوٰتِ الشَّیۡطٰنِ ؕ وَمَنۡ یَّتَّبِعۡ خُطُوٰتِ الشَّیۡطٰنِ فَاِنَّہٗ یَاۡمُرُ بِالۡفَحۡشَآءِ وَالۡمُنۡکَرِ ؕ وَلَوۡلَا فَضۡلُ اللّٰہِ عَلَیۡکُمۡ وَرَحۡمَتُہٗ مَا زَکٰی مِنۡکُمۡ مِّنۡ اَحَدٍ اَبَدًا ۙ وَّلٰکِنَّ اللّٰہَ یُزَکِّیۡ مَنۡ یَّشَآءُ ؕ وَاللّٰہُ سَمِیۡعٌ عَلِیۡمٌ

হে মু’মিনগণ! তোমরা শাইতানের পদাংক অনুসরণ করনা; কেহ শাইতানের পদাংক অনুসরণ করলে শাইতানতো অশ্লীলতা ও মন্দ কাজের নির্দেশ দেয়; আল্লাহর দয়া ও অনুগ্রহ না থাকলে তোমাদের কেহই কখনও পবিত্র হতে পারতেনা, তবে আল্লাহ যাকে ইচ্ছা পবিত্র করেন, এবং আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ। সুনা নুর : ২১

অশ্লীলতা এবং পর্ণোগ্রাফি থেকে সন্তানক বাঁচানোর উপায়  :

অশ্লীলতা ও পর্নোগ্রাফির ক্ষতিকর প্রভাব থেকে সন্তানকে রক্ষা করার জন্য মা-বাবার সচেতন থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইসলাম এই বিষয়ে কিছু কার্যকর দিকনির্দেশনা দিয়েছে। নিচে এ সম্পর্কে আলোচনা করা হলো:

১. অশ্লীলতার ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সচেতন করা

সন্তানকে কোনো কিছু থেকে বিরত রাখতে চাইলে তার পেছনের কারণগুলো স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দেওয়া জরুরি। মা-বাবার উচিত সন্তানের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করা এবং অশ্লীলতার ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে তাদের সচেতন করা।  বুঝিয়ে দিন যে পর্নোগ্রাফি মানুষের মধ্যে সম্পর্কের প্রতি অবিশ্বাস এবং অবাস্তব প্রত্যাশা তৈরি করে, যা বাস্তব জীবনে সুস্থ সম্পর্ক গড়ে তোলার পথে বাধা সৃষ্টি করে।

২. স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের ব্যবহারে নজরদারি রাখা

প্রযুক্তি আমাদের জীবনের অংশ, তবে এর সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা মা-বাবার দায়িত্ব। প্রথমত, সন্তানকে একেবারে স্মার্টফোন না দিয়ে, বরং একটি নির্দিষ্ট বয়সে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী তা দেওয়া ভালো। যদি দিতেই হয়, তবে এর ব্যবহার সীমিত রাখুন। যেমন, শুধু পড়াশোনা বা জরুরি প্রয়োজনে ব্যবহারের অনুমতি দিন।

৩. নজরদারি ও ফিল্টারিং:

সন্তানের ব্যবহৃত ডিভাইসগুলোতে প্যারেন্টাল কন্ট্রোল বা ফিল্টারিং সফটওয়্যার ব্যবহার করতে পারেন, যাতে তারা ক্ষতিকর ওয়েবসাইট বা কনটেন্ট থেকে দূরে থাকে। তবে এটি লুকানোভাবে না করে বরং তাদের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করে করা উচিত। এর মাধ্যমে তারা বুঝতে পারে যে আপনি তাদের ভালোর জন্যই এই ব্যবস্থা নিচ্ছেন।

৪. পারিবারিক চুক্তি :

পুরো পরিবারের জন্য স্মার্টফোন ব্যবহারের কিছু নিয়ম তৈরি করুন, যেমন খাবার সময় বা পারিবারিক আড্ডার সময় ফোন বন্ধ রাখা। এতে সন্তানেরা ভালো অভ্যাসের উদাহরণ দেখতে পাবে।

৫. আল্লাহভীতি ও পরকালের জবাবদিহিতা সম্পর্কে ধারণা তৈরি করা

ইসলামে আল্লাহভীতি (তাকওয়া) এবং পরকালের জবাবদিহিতা প্রতিটি মুসলিমের জন্য নৈতিকতার ভিত্তি। এই ধারণাগুলো সন্তানের মনে গেঁথে দিতে পারলে তারা নিজেরাই খারাপ কাজ থেকে দূরে থাকবে।

সন্তানকে বোঝান যে আল্লাহ সবসময় আমাদের দেখছেন। কোনো গোপনীয়তা নেই, এমনকি যখন কেউ আশেপাশে নেই, তখনও আল্লাহ আমাদের কাজগুলো জানেন। এই বিশ্বাস তাদের মধ্যে পাপের ভয় এবং আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা তৈরি করবে। পরকালে ভালো কাজের জন্য পুরস্কার (জান্নাত) এবং মন্দ কাজের জন্য শাস্তি (জাহান্নাম) রয়েছে—এই ধারণাটি তাদের মধ্যে গেঁথে দিন। যখন তারা বুঝতে পারবে যে এই জীবনের প্রতিটি কাজের জন্য তাদের আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে, তখন তারা নিজেরাই অনৈতিক কাজ থেকে বিরত থাকবে। নিয়মিত কুরআন পাঠ, হাদিসের গল্প শোনানো এবং ভালো মুসলিম হিসেবে জীবনযাপনের গুরুত্ব সম্পর্কে আলোচনা করুন। এই কৌশলগুলো ব্যবহার করে মা-বাবারা তাদের সন্তানদেরকে শুধু

পর্দার প্রতি উদাসীনতা

ছাত্রজীবনে পর্দার ব্যাপারে উদাসীনতা বা সঠিকভাবে পর্দা না মানার অনেকগুলো ক্ষতিকর দিক রয়েছে, যা একজন শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত, সামাজিক এবং আধ্যাত্মিক জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। নিচে এর কিছু প্রধান খারাপ দিক ব্যাখ্যা করা হলো:

১. মানসিক এবং আত্মিক ক্ষতি

পর্দা হলো লজ্জা ও শালীনতার প্রতীক। পর্দার উদাসীনতা একজন শিক্ষার্থীর মধ্যে লজ্জা ও শালীনতার বোধকে দুর্বল করে দেয়। এর ফলে অনৈতিক কাজ এবং অপ্রয়োজনীয় প্রদর্শনে তারা দ্বিধাবোধ করে না, যা তার নৈতিক চরিত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

যখন কোনো শিক্ষার্থী নিজেকে সঠিকভাবে ঢেকে রাখে না, তখন সে অন্যদের কাছে শুধু তার বাহ্যিক সৌন্দর্যের মাধ্যমে পরিচিত হতে চায়। এতে তার মেধা, জ্ঞান এবং ব্যক্তিত্বের চেয়ে শারীরিক সৌন্দর্যের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়, যা তার আত্মসম্মানকে হ্রাস করে।

পর্দা না মানার কারণে নিজের এবং অন্যদের মধ্যে পারস্পরিক আকর্ষণ তৈরি হতে পারে, যা পড়াশোনায় মনোযোগ নষ্ট করে। এতে শিক্ষার্থীর মূল্যবান সময় নষ্ট হয় এবং তার শিক্ষার মান কমে যায়।

২. সামাজিক ও পারিবারিক সমস্যা

পর্দা না মানা সমাজে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশার পথ খুলে দেয়, যা নৈতিক অবক্ষয় এবং অশ্লীলতার জন্ম দেয়। এর ফলে সমাজে নৈতিক বিশৃঙ্খলা দেখা দেয় এবং পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হয়। যখন একজন শিক্ষার্থী পর্দা না মেনে চলে, তখন তা তার পরিবারের নৈতিক মূল্যবোধ নিয়ে প্রশ্ন তোলে। এতে পরিবারের সম্মানহানি হতে পারে এবং পারিবারিক সম্পর্কের মধ্যে টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়।

৩. ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক ক্ষতি

আল্লাহর আদেশ অমান্য করা: ইসলামে পর্দা একটি অবশ্য পালনীয় বিধান, যা আল্লাহ তাআলা নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্য নির্ধারণ করেছেন। পর্দার ব্যাপারে উদাসীনতা সরাসরি আল্লাহর আদেশ অমান্য করার শামিল, যা একজন মুমিনের ঈমানকে দুর্বল করে দেয়। আল্লাহর আদেশ মেনে চললে জীবনে বারাকাত আসে। পর্দার উদাসীনতা জীবনের এই বারাকাতকে কমিয়ে দেয়। পর্দাহীনতা ইসলামের মূলভাবের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।

সন্তানকে পর্দার প্রতি উদাসীনতা বাচাতে করণীয়

সন্তানকে পর্দার প্রতি উদাসীনতা থেকে বাঁচাতে মা-বাবার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাদের সঠিক নির্দেশনা এবং নিজেদের জীবনযাপনের মাধ্যমে সন্তানকে প্রভাবিত করতে পারেন। জোর করে নয়, বরং ভালোবাসা ও যুক্তির মাধ্যমে এই বিষয়গুলো বোঝানো উচিত। নিচে এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

১. পর্দার গুরুত্ব তুলে ধরা

মা-বাবা হিসেবে আপনার প্রথম কাজ হলো সন্তানের মনে পর্দার গুরুত্ব প্রতিষ্ঠা করা। এটি শুধু একটি পোশাকের বিষয় নয়, বরং এটি একটি নৈতিক এবং আধ্যাত্মিক সুরক্ষা।

সন্তানকে বোঝান যে পর্দা কোনো বাঁধা নয়, বরং এটি নারীর সম্মান ও নিরাপত্তার প্রতীক। এটি তাদের অনাকাঙ্ক্ষিত দৃষ্টি এবং অনিরাপদ পরিবেশ থেকে রক্ষা করে। বুঝিয়ে দিন যে একজন মানুষের আসল সৌন্দর্য তার বাহ্যিক রূপে নয়, বরং তার চরিত্রে। পর্দা চরিত্রের এই সৌন্দর্যকে আরও বাড়িয়ে তোলে এবং ব্যক্তিকে তার জ্ঞানের কারণে পরিচিত হতে সাহায্য করে।

২. কুরআন ও হাদিসের আলোকে পর্দার আবশ্যকতা এবং উপকারিতা সম্পর্কে বোঝানো

ইসলামে পর্দার বিধান কেন এসেছে, তা সরাসরি কুরআন ও হাদিসের মাধ্যমে সন্তানকে বোঝানো উচিত। এতে তাদের মনে আল্লাহর আদেশের প্রতি সম্মান ও ভয় সৃষ্টি হবে। কুরআন ও হাদিসে পর্দার যে বিধান রয়েছে, তা তুলে ধরুন। যেমন-

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَ قُلۡ لِّلۡمُؤۡمِنٰتِ یَغۡضُضۡنَ مِنۡ اَبۡصَارِہِنَّ وَ یَحۡفَظۡنَ فُرُوۡجَہُنَّ وَ لَا یُبۡدِیۡنَ  زِیۡنَتَہُنَّ  اِلَّا مَا ظَہَرَ  مِنۡہَا وَ لۡیَضۡرِبۡنَ بِخُمُرِہِنَّ عَلٰی جُیُوۡبِہِنَّ

 হে নবি! আপনি ঈমানদার নারীদের বলে দিন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে নত রাখে ও তাদের লজ্জাস্থানের হিফাযত করে। তারা যেন যা সাধারণতঃ প্রকাশমান থাকে তা ব্যতীত তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে। তাদের গ্রীবা ও গলদেশ চাদর দ্বারা ঢেকে রাখে। সুর নূর : ৩১

আল্লাহ তাআলা বলেন-

قُلۡ لِّلۡمُؤۡمِنِیۡنَ یَغُضُّوۡا مِنۡ اَبۡصَارِہِمۡ وَیَحۡفَظُوۡا فُرُوۡجَہُمۡ ؕ ذٰلِکَ اَزۡکٰی لَہُمۡ ؕ اِنَّ اللّٰہَ خَبِیۡرٌۢ بِمَا یَصۡنَعُوۡنَ

“মুমিন পুরুষদের বলুন, তারা যেন দৃষ্টি সংযম করে এবং নিজেদের লজ্জাস্থান হেফাজত করে। এটি তাদের জন্য অধিক পবিত্র। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদের কাজ সম্পর্কে অবগত।” সুরা নুর : ৩০

পর্দার মাধ্যমে কীভাবে অনৈতিক সম্পর্ক এবং মানসিক চাপ থেকে বাঁচা যায়, তা নিয়ে আলোচনা করুন। এটি সমাজে নৈতিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে কীভাবে সাহায্য করে, সে বিষয়েও আলোকপাত করুন।

৩. মা-বাবার নিজেদের পর্দা করা ও পরিবেশ সৃষ্টি করা

সন্তানেরা তাদের মা-বাবাকে দেখে শেখে। তাই, মা-বাবার নিজেদের জীবনযাপন সন্তানের জন্য উদাহরণ হওয়া উচিত। মা-বাবার নিজেদের পর্দা করা এবং ঘরেও শালীনতা বজায় রাখা জরুরি। সন্তান যখন তাদের মা-বাবাকে পর্দার বিধান মেনে চলতে দেখবে, তখন তারা এটি নিজেদের জীবনের একটি স্বাভাবিক অংশ হিসেবে গ্রহণ করবে। বাড়িতে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করুন যেখানে আল্লাহর বিধানগুলো গুরুত্ব পায়। অনৈতিক ও অশ্লীল বিষয়গুলো থেকে দূরে থাকুন। পারিবারিক আলোচনায় ইসলাম এবং এর বিধানগুলো নিয়ে কথা বলুন।

সবশেষে, মনে রাখবেন যে জোর করে বা শাসনের মাধ্যমে কোনো কিছু চাপিয়ে দিলে তা সাময়িক হতে পারে। বরং ভালোবাসা, ধৈর্য এবং যুক্তির মাধ্যমে বোঝানো একটি স্থায়ী পরিবর্তন আনতে পারে।

বন্ধু-বান্ধব এবং সঙ্গদোষ

কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবন একজন শিক্ষার্থীর জন্য একটি নতুন অধ্যায়, যেখানে সে স্বাধীনতা এবং নতুন বন্ধুত্বের স্বাদ পায়। কিন্তু এই বন্ধু-বান্ধবদের ভুল নির্বাচন বা তাদের খারাপ প্রভাবের কারণে সন্তানের জীবনে গুরুতর খারাপ প্রভাব পড়তে পারে।

আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, মানুষ তার বন্ধুর ধ্যান-ধারণার অনুসারী হয়ে থাকে। সুতরাং তোমাদের সকলেরই খেয়াল রাখা উচিত সে কার সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করছে। সুনানে তিরমিজি : ২৩৭৮, আবু দাউদ : ৪৮৩৩, সহীহাহ : ৯২৭, মিশকাত : ৫০১৯

এ থেকে বোঝা যায়, বন্ধুর প্রভাব এমন পর্যায়ে যায় যে, বন্ধুর দ্বীনই অনেক সময় নিজের দ্বীন হয়ে যায়। নিচে এ বিষয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক আলোচনা করা হলো।

১. পড়াশোনায় উদাসীনতা

বন্ধুদের খারাপ প্রভাবের কারণে একজন শিক্ষার্থী তার পড়াশোনায় মনোযোগ হারাতে পারে। যদি বন্ধুরা পড়াশোনাকে গুরুত্ব না দেয়, আড্ডা, অপ্রয়োজনীয় ঘোরাঘুরি বা গেমিংয়ে বেশি সময় ব্যয় করে, তাহলে সেই শিক্ষার্থীও তাদের মতো আচরণ করতে শুরু করে। এর ফলে তার পরীক্ষার ফল খারাপ হয়, ক্লাসে উপস্থিতি কমে যায় এবং সামগ্রিকভাবে শিক্ষার প্রতি তার আগ্রহ নষ্ট হয়।

২. নৈতিক অবক্ষয়

খারাপ বন্ধুদের সংস্পর্শে এসে অনেক শিক্ষার্থী ধূমপান, মাদক সেবন এবং অন্যান্য অনৈতিক কার্যকলাপে জড়িয়ে পড়ে। সমবয়সীদের চাপ (peer pressure) এর কারণে তারা এমন সব কাজ করতে বাধ্য হয় যা তারা স্বাভাবিকভাবে করত না। এর ফলে তাদের নৈতিক চরিত্র দুর্বল হয় এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।

৩. আর্থিক অপচয়

কিছু বন্ধু অপ্রয়োজনীয় খরচ, যেমন দামি রেস্টুরেন্টে খাওয়া, নাইট ক্লাবে যাওয়া, বা দামি ব্র্যান্ডের পোশাক কেনার প্রতি আগ্রহী হতে পারে। যদি আপনার সন্তান এই ধরনের বন্ধুদের সাথে মেশে, তবে সেও আর্থিক অপচয়ের পথে পা বাড়াতে পারে। এতে তার পারিবারিক আর্থিক সংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং তার মধ্যে অপচয়ের অভ্যাস গড়ে উঠতে পারে।

৪. মানসিক এবং সামাজিক চাপ

যদি বন্ধুরা সর্বদা নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে বা অস্থিতিশীল মানসিকতার হয়, তবে সেই প্রভাব আপনার সন্তানের ওপরও পড়তে পারে। এর ফলে সে হতাশা, দুশ্চিন্তা বা অন্যান্য মানসিক সমস্যার শিকার হতে পারে। এছাড়া, বন্ধুদের মাঝে নিজেকে গ্রহণযোগ্য করার জন্য মিথ্যা বলা বা এমন কিছু ভান করা যা সে নয়, তা তার আত্মবিশ্বাসকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

৫. পারিবারিক দূরত্ব

যখন একজন শিক্ষার্থী তার বন্ধুদের সঙ্গে অতিরিক্ত সময় ব্যয় করে এবং তাদের ভুল মূল্যবোধ গ্রহণ করে, তখন সে পরিবার থেকে দূরে সরে যায়। সে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটাতে আগ্রহ দেখায় না, তাদের উপদেশকে গুরুত্ব দেয় না এবং তাদের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ কমে যায়। এর ফলে পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হয়।

সমস্যা থেকে প্রতিকারের উপায় :

বন্ধুবান্ধবদের ভুল নির্বাচন এবং তাদের খারাপ প্রভাবের কারণে সন্তানের জীবন কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, তা নিয়ে আমরা আলোচনা করেছি। এই সমস্যার প্রতিকার করা মা-বাবার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য প্রয়োজন সচেতনতা, সঠিক দিকনির্দেশনা এবং কার্যকর পদক্ষেপ। শুধু সমস্যাগুলো চিহ্নিত করাই যথেষ্ট নয়, বরং সেগুলো সমাধানের জন্য আমাদের বাস্তবসম্মত উপায় খুঁজে বের করতে হবে। একজন শিক্ষার্থীর জীবনকে ভুল পথে চালিত হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করার জন্য কিছু কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে, আমরা এখন এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ সমাধান নিয়ে আলোচনা করব, যা আপনার সন্তানকে সঠিক পথে চলতে সাহায্য করবে এবং তার ভবিষ্যৎকে সুরক্ষিত রাখবে।

১. বন্ধু নির্বাচনের গুরুত্ব

সন্তানের মধ্যে ছোটবেলা থেকেই ভালো বন্ধু বাছাইয়ের শিক্ষা দিতে হবে। তাকে বুঝাতে হবে, ভালো বন্ধুই প্রকৃত সম্পদ। সাহাবিদের জীবনী থেকে উদাহরণ দিয়ে দেখানো যায় কিভাবে ভালো বন্ধুরা একে অপরকে জান্নাতের পথে সাহায্য করেছে।

২. খোলামেলা আলোচনা

সন্তান কার সাথে মেলামেশা করছে তা জানতে হবে, তবে সেটা যেন জেরা করার মতো না হয়। বন্ধুত্বপূর্ণ ভঙ্গিতে তার বন্ধুদের সম্পর্কে জানতে চাইতে হবে। প্রয়োজনে সন্তানকে বুঝাতে হবে কোন বন্ধু তাকে সৎপথে টেনে নিতে পারছে আর কোন বন্ধু তার ক্ষতি করছে। পরিবারে এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে যাতে সন্তান খোলামেলা ভাবে তার বন্ধুদের বিষয়ে বলতে পারে।

৩. ধর্মীয় অনুশাসন অনুসরণ করা

সন্তানদেরকে সৎ ও ধার্মিক বন্ধু নির্বাচনের জন্য উৎসাহিত করা। ইসলামিক পরিবেশে তাদের জন্য বিকল্প বিনোদন ও সামাজিক কার্যক্রমের ব্যবস্থা করা, যেমন ইসলামিক যুব গ্রুপ বা বিভিন্ন সমাজসেবামূলক কার্যক্রমে অংশ নেওয়া। সর্বপরি ইসলাম আমাদের যে দৈনিক (সালাত) ইবাদত প্রদান করেছে, তার সাথে সম্পৃক্ত হবে, দেখবে­- খারাপ বন্ধু বান্ধবদের উতপাত কমে যাবে। সন্তানকে স্বাধীনতা দিতে হবে, তবে তার সুনির্দিষ্ট সীমারেখা থাকতে হবে। ইসলাম স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দেয়, কিন্তু সেটি আল্লাহর বিধান মেনে। তাই সন্তান কখন বাহিরে যাবে, কখন বাসায় আসবে, কার সাথে মিসবে, কার সাথে মিসবে না ইত্যাদি সব কিছু মা-বাবার কন্ট্রোলে থাকবে।

৪. অবাধ স্বাধীনতা এবং লাগামহীন জীবন

কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে অনেক সময় তরুণ-তরুণীরা “শিক্ষার নামে” অবাধ স্বাধীনতা ভোগ করতে শুরু করে। তারা রাত করে বাড়ি ফেরে, ক্লাসে অনিয়মিত হয় এবং আস্তে আস্তে ধর্মীয় অনুশাসন থেকে দূরে সরে যায়। এই লাগামহীন স্বাধীনতা তাদের চরিত্র ও দ্বীন উভয়কে নষ্ট করে দিতে পারে।

৫. পারিবারিক কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করা

সন্তানকে পরিবারের সাথে সক্রিয়ভাবে যুক্ত রাখতে হবে। যেমন—নিয়মিত জামাতে নামাজে যাওয়া, পরিবারে কুরআন পাঠের আসর করা, সমাজসেবামূলক কাজে অংশগ্রহণ করানো। এতে তারা পরিবারের প্রতি দায়বদ্ধতা অনুভব করবে এবং একাকিত্ব বা বাইরে অপ্রয়োজনীয় সময় কাটানো কমে যাবে।

বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করা :

সন্তানের সাথে সম্পর্ক যেন বন্ধুত্বপূর্ণ হয়। শুধু “না, এটা করো না” বললে তারা বিদ্রোহী হয়ে যেতে পারে। তাই ধৈর্য, ভালোবাসা ও যুক্তি দিয়ে বোঝাতে হবে কোন কাজ সঠিক আর কোনটা ক্ষতিকর।

সন্তানের কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় জীবন : দ্বিতীয় পর্ব

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

স্মার্টফোনের আসক্তি

ছাত্রজীবনে স্মার্টফোনের অতিরিক্ত ব্যবহার একটি গুরুতর সমস্যা, যা তাদের ব্যক্তিগত, শিক্ষাগত এবং সামাজিক জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এই আসক্তি পড়াশোনা থেকে শুরু করে মানসিক স্বাস্থ্য পর্যন্ত সব কিছুতেই খারাপ প্রভাব ফেলে। নিচে এর কিছু প্রধান খারাপ দিক এবং সেগুলো থেকে প্রতিকারের উপায় তুলে ধরা হলো।

স্মার্টফোনের আসক্তির খারাপ দিক

শিক্ষায় ক্ষতি: স্মার্টফোন পড়াশোনায় মনোযোগ নষ্ট করে। শিক্ষার্থীরা ক্লাসে বা বাড়িতে পড়ার সময় ঘন ঘন ফোন চেক করে, যা তাদের মনোযোগ বিঘ্নিত করে। এর ফলে পরীক্ষার ফলাফল খারাপ হয় এবং জ্ঞানের গভীরতা কমে যায়।

১. ঘুমের সমস্যা:

রাতে ঘুমানোর আগে স্মার্টফোন ব্যবহার করা ঘুমের চক্রকে ব্যাহত করে। ফোনের নীল আলো মস্তিষ্কের মেলাটোনিন হরমোন নিঃসরণে বাধা দেয়, যা ভালো ঘুমের জন্য অপরিহার্য। ঘুমের অভাবে শিক্ষার্থীরা পরের দিন ক্লান্ত থাকে এবং তাদের শেখার ক্ষমতা কমে যায়।

২. মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব:

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অন্যের জীবন দেখে নিজেদের জীবনকে তুলনা করার প্রবণতা হতাশা, উদ্বেগ এবং আত্মবিশ্বাসের অভাব তৈরি করে। এর ফলে শিক্ষার্থীরা সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং তাদের মধ্যে একাকিত্বের অনুভূতি বাড়ে।

৩. শারীরিক সমস্যা:

দীর্ঘক্ষণ স্মার্টফোন ব্যবহারের ফলে ঘাড়ে ব্যথা, পিঠে ব্যথা এবং চোখের ওপর চাপ পড়ে। এছাড়াও, শারীরিক কার্যকলাপ কমে যাওয়ার কারণে ওজন বৃদ্ধি এবং অন্যান্য স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দিতে পারে।

৪. সামাজিক সম্পর্কের অবনতি:

শিক্ষার্থীরা বাস্তব জীবনের চেয়ে ভার্চুয়াল জগতে বেশি সময় কাটায়। এর ফলে তারা বন্ধু-বান্ধব ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের আগ্রহ হারিয়ে ফেলে, যা সামাজিক দক্ষতা হ্রাস করে এবং সম্পর্কের মধ্যে দূরত্ব তৈরি করে।

প্রতিকারের উপায়

স্মার্টফোন আমাদের জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। এটি যেমন অনেক সুবিধা নিয়ে আসে, তেমনি এর অতিরিক্ত ব্যবহার আমাদের পড়াশোনা, পারিবারিক বন্ধন এবং ধর্মীয় জীবন থেকে দূরে সরিয়ে দিতে পারে। ইসলাম এই সমস্যার সমাধানে কিছু বাস্তবসম্মত পথ দেখিয়েছে। নিচে এই বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

১. ব্যবহারের নিয়ম

ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে, সবকিছুরই একটি সীমা থাকা উচিত। স্মার্টফোন ব্যবহারের ক্ষেত্রেও এই নিয়ম প্রযোজ্য। পরিবারের সবার জন্য একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিতে পারেন। যেমন, পড়াশোনার সময়, নামাজের সময় বা পারিবারিক আড্ডার সময় স্মার্টফোন ব্যবহার সম্পূর্ণভাবে বন্ধ রাখা। এর মাধ্যমে কাজের প্রতি মনোযোগ বাড়ে এবং মূল্যবান সময়গুলো সঠিকভাবে কাজে লাগানো যায়। স্মার্টফোনকে কেবল জরুরি প্রয়োজন মেটানোর মাধ্যম হিসেবে দেখতে উৎসাহিত করুন। অপ্রয়োজনীয় ব্রাউজিং, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটানো বা গেমিং থেকে বিরত থাকা উচিত। এটি আপনাকে জীবনের আসল লক্ষ্যগুলোর দিকে ফোকাস করতে সাহায্য করবে।

২. বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করা :

ইসলাম সবসময় মানুষকে উৎপাদনশীল ও কল্যাণকর কাজে উৎসাহিত করে। স্মার্টফোনের অতিরিক্ত ব্যবহারের বিকল্প হিসেবে বিভিন্ন ধরনের কাজগুলো বেছে নেওয়া যেতে পারে। যেমন- ধর্মীয় বই, জ্ঞানমূলক সাহিত্য বা ইসলামিক ইতিহাস বিষয়ক বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন। এটি একদিকে যেমন আপনার জ্ঞান বৃদ্ধি করবে, তেমনি অন্যদিকে স্মার্টফোনের আসক্তি কমাবে।

ইসলাম শারীরিক সুস্থতার ওপর অনেক জোর দেয়। নিয়মিত হাঁটা, দৌড়ানো বা অন্য কোনো খেলাধুলায় অংশ নেওয়া শারীরিক ও মানসিক উভয় সুস্থতার জন্য জরুরি। এটি আপনাকে অলসতা থেকে দূরে রাখবে। লেখালেখি, বাগান করা, বা রান্না করার মতো সৃজনশীল কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখুন। এই কাজগুলো মনকে প্রশান্ত রাখে এবং নতুন কিছু শেখার সুযোগ করে দেয়।

৩. ডিজিটাল ডিটক্স

মাঝে মাঝে ডিজিটাল জগৎ থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন থাকার অভ্যাস গড়ে তোলা একটি কার্যকরী সমাধান। সপ্তাহে বা মাসে অন্তত একদিন পুরো পরিবার মিলে এমন একটি দিন ঠিক করুন, যেদিন কেউ স্মার্টফোন বা অন্য কোনো ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার করবে না। এই সময়টিতে সবাই একসাথে গল্প করা, খেলাধুলা করা বা ধর্মীয় আলোচনায় অংশ নিতে পারেন।

স্মার্টফোন থেকে দূরে থেকে প্রকৃতির কাছাকাছি যাওয়া মনকে সতেজ করে। পরিবার বা বন্ধুদের সাথে বাইরে ঘুরতে যাওয়া বা পার্কে বসে প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করা মানসিক শান্তি এনে দেয়।

এই অভ্যাসগুলো গড়ে তোলার মাধ্যমে আমরা স্মার্টফোনের অতিরিক্ত ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করতে পারি এবং আমাদের জীবনকে আরও অর্থবহ করে তুলতে পারি, যা ইসলামী শিক্ষার সাথেও সামঞ্জস্যপূর্ণ।

মা-বাবার কথাকে মূল্য না দেওয়া

বয়ঃসন্ধি ও তারুণ্যকাল হলো জীবনের সেই সময়, যখন আবেগ প্রবল থাকে, সিদ্ধান্ত গ্রহণে অভিজ্ঞতার ঘাটতি থাকে এবং ভুল পথে যাবার সম্ভাবনা বেশি থাকে। মা-বাবার কথাকে মূল্য না দেওয়া একটি গুরুতর সমস্যা, যা একজন সন্তানের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ জীবনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ইসলামে মা-বাবার আনুগত্যকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হয়। তাদের কথা অমান্য করার ফলে সৃষ্ট প্রধান ক্ষতিগুলো নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

১. আল্লাহর অসন্তুষ্টি

কুরআন ও হাদিসে মা-বাবার আনুগত্যকে আল্লাহর আনুগত্যের সঙ্গে সম্পর্কিত করা হয়েছে। মা-বাবার অবাধ্য হওয়া আল্লাহর আদেশ অমান্য করার শামিল। আল্লাহ তাআলা বলেছেন-

 “আর তোমার রব নির্দেশ দিয়েছেন যে, তোমরা শুধু তাঁরই ইবাদত করবে এবং মা-বাবার প্রতি সদ্ব্যবহার করবে।” (সূরা ইসরা, আয়াত ২৩)। তাই তাদের কথা অমান্য করলে আল্লাহর ক্রোধ ও অসন্তুষ্টি নেমে আসতে পারে, যা দুনিয়া ও আখিরাতে ক্ষতির কারণ হয়।

২. অভিজ্ঞতার আলো থেকে বঞ্চিত হওয়া

মা-বাবার বয়স ও অভিজ্ঞতার কারণে তাদের মধ্যে সঠিক-ভুল বোঝার গভীর জ্ঞান থাকে। তারা সন্তানের কল্যাণ চেয়ে উপদেশ দেন। তাদের উপদেশ উপেক্ষা করলে সন্তান জীবনে বারবার হোঁচট খায় এবং ভুল পথে চলতে থাকে। তাদের অভিজ্ঞতার আলো থেকে বঞ্চিত হওয়ার ফলে নিজের জীবনে অনেক অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়।

৩. চরিত্রগত অবক্ষয়

মা-বাবার আদেশ অমান্য করলে সন্তানের মধ্যে জেদ, অহংকার, অবাধ্যতা ও অবিনয় গড়ে ওঠে। এই ধরনের চারিত্রিক ত্রুটি তাকে সমাজে বিচ্ছিন্ন করে তোলে এবং অন্যদের কাছে অপ্রিয় করে তোলে। একজন অবাধ্য সন্তান সমাজে সম্মান ও শ্রদ্ধা অর্জন করতে ব্যর্থ হয়।

৪. ভুল বন্ধুত্ব ও অসুস্থ সম্পর্ক

মা-বাবার নিয়ন্ত্রণ না মানলে সন্তানরা সহজেই খারাপ সঙ্গের সঙ্গে মিশে যায়। এর ফলে তারা নেশা, বেহায়াপনা, অশ্লীলতা এবং অন্যান্য খারাপ অভ্যাসে জড়িয়ে পড়ে। মা-বাবার দিকনির্দেশনা থেকে দূরে থাকার কারণে তারা সঠিক বন্ধু নির্বাচনে ব্যর্থ হয় এবং অসুস্থ সম্পর্কের জালে আবদ্ধ হয়।

৫. ভবিষ্যৎ জীবনের ব্যর্থতা

মা-বাবার দোয়া সন্তানের জন্য এক অমূল্য সম্পদ। তাদের দোয়া ছাড়া কোনো কাজে সফলতা পাওয়া কঠিন। মা-বাবার অবাধ্য হলে তারা সন্তানের প্রতি অসন্তুষ্ট হন, যার ফলে তাদের দোয়া থেকে বঞ্চিত হতে হয়। এর ফলস্বরূপ, পড়াশোনা, কর্মজীবন, বিবাহ এবং সামাজিক জীবনে স্থায়ী সুখ ও সফলতা অর্জন করা কঠিন হয়ে পড়ে।

৬. সমাজে নেতিবাচক প্রভাব

অবাধ্য সন্তানরা কেবল নিজেদেরই ক্ষতি করে না, বরং সমাজের জন্যও একটি বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। তারা সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে এবং অন্য তরুণদের জন্য খারাপ উদাহরণ হিসেবে গণ্য হয়। তাদের আচরণ সমাজের নৈতিক কাঠামোকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং বিশৃঙ্খলা বাড়ায়।

প্রতিকারের জন্য করণীয় :

মা-বাবার কথাকে মূল্য না দেওয়ার সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য কিছু কার্যকর উপায় নিচে তুলে ধরা হলো। এই উপায়গুলো অনুসরণ করে মা-বাবা সন্তানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করতে পারেন এবং তাদের সঠিক পথে পরিচালিত করতে পারেন।

১. ঈমান ও তাকওয়া শিক্ষা দেওয়া

মা-বাবার আনুগত্যকে ইসলামী শিক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে তুলে ধরা উচিত। সন্তানকে বোঝানো উচিত যে মা-বাবার কথা মেনে চলা কেবল একটি সামাজিক নিয়ম নয়, বরং এটি ঈমানের অংশ এবং আল্লাহর নির্দেশ। কিশোর বয়সে এই ধরনের শিক্ষা দিলে সন্তানের মনে আল্লাহর ভয় (তাকওয়া) সৃষ্টি হয় এবং তারা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য মা-বাবার কথা মেনে চলতে উৎসাহিত হয়।

২. সুন্দর আচরণে উপদেশ দেওয়া

কঠোর শাসন বা রাগের বদলে ভালোবাসা, বোঝানো এবং ধৈর্যের মাধ্যমে সন্তানকে উপদেশ দেওয়া উচিত। যখন মা-বাবা নরমভাবে এবং যুক্তি দিয়ে কোনো বিষয় ব্যাখ্যা করেন, তখন সন্তানরা তাদের কথা শুনতে আগ্রহী হয়। শাসনের পরিবর্তে ভালোবাসা ও সহানুভূতির মাধ্যমে সম্পর্ক স্থাপন করলে সন্তানরা নিজেদের সমস্যার কথা মা-বাবার কাছে নির্দ্বিধায় বলতে পারে।

৩. সন্তানকে বন্ধু হিসেবে পাওয়া

মা-বাবার উচিত নিজেদেরকে কেবল নিয়মনীতি আরোপকারী বা নিয়ন্ত্রক হিসেবে উপস্থাপন না করে, বরং সন্তানের সমস্যা ও অনুভূতির শ্রোতা হিসেবে ভূমিকা পালন করা। যখন সন্তানরা অনুভব করে যে তাদের মা-বাবা তাদের কথা শোনে এবং তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল, তখন তারা মা-বাবার উপদেশকে গুরুত্ব দেয় এবং তাদের সঙ্গে একটি বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলে।

৪. ভালো সঙ্গী নির্বাচন করানো

সন্তানের জীবনে বন্ধুদের প্রভাব অপরিসীম। মা-বাবার উচিত সন্তানকে নেককার ও ভালো চরিত্রের বন্ধুদের সঙ্গে চলাফেরা করতে উৎসাহিত করা। ভালো বন্ধু নির্বাচনের মাধ্যমে সন্তানের মধ্যে ইতিবাচক পরিবর্তন আসে এবং তারা খারাপ কাজ থেকে দূরে থাকে।

৫. স্পষ্টভাবে কারণ বোঝানো:

অনেক সময় মা-বাবা শুধু ‘এটা করো না’ বা ‘এটা করো’ বলে থাকেন, কিন্তু কেন তা বলেন না। যখন আপনি কোনো আদেশ বা নিষেধের পেছনের কারণটি স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করবেন, তখন সন্তান বুঝতে পারবে যে এটি তার ভালোর জন্যই বলা হচ্ছে। যেমন, ‘দেরি করে ঘুমালে সকালে নামাজে উঠতে কষ্ট হবে, তাই তাড়াতাড়ি ঘুমানো উচিত।’ এতে তারা শুধু আদেশ পালন করবে না, বরং এর পেছনের যুক্তিও উপলব্ধি করবে।

৬. ধৈর্য ধরা ও দুআ করা

এই কঠিন সময়ে ধৈর্য ধারণ করা এবং আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া একজন মুমিনের জন্য অপরিহার্য।

ইসলামে ধৈর্যকে একটি মহৎ গুণ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। সন্তানের এমন আচরণে হতাশ না হয়ে ধৈর্য ধারণ করুন। মনে রাখবেন, বয়ঃসন্ধিকাল একটি পরিবর্তনশীল সময় এবং এই চ্যালেঞ্জ সামলাতে ধৈর্যের বিকল্প নেই। সন্তানের হেদায়েতের জন্য আল্লাহর কাছে নিয়মিত দোয়া করুন। দোয়া মুমিনের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। আল্লাহ তাআলা চাইলে যেকোনো কঠিন পরিস্থিতি সহজ করে দিতে পারেন। নিয়মিত দোয়া করলে সন্তানের অন্তরে আল্লাহর ভয় এবং সঠিক পথের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি হতে পারে।

সর্বোপরি, মা-বাবার মনে রাখতে হবে যে জ্ঞান, ধৈর্য এবং ভালোবাসা এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করার জন্য অপরিহার্য। সন্তানের সঙ্গে একটি বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করা এবং তাদের মধ্যে আল্লাহভীতি তৈরি করা—এটাই হলো এই সমস্যার সবচেয়ে বড় সমাধান। কারণ, যখন সন্তানের অন্তরে আল্লাহর ভয় থাকবে, তখন তারা এমনিতেই ভালো কাজের দিকে ধাবিত হবে।

সেক্যুলার শিক্ষা ব্যবস্থার প্রভাব

আমাদের দেশের অধিকাংশ কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে যে শিক্ষা ব্যবস্থা প্রচলিত, তা মূলত পশ্চিমা সেক্যুলার দর্শনের ওপর ভিত্তি করে গঠিত। এই শিক্ষা ব্যবস্থায় ধর্ম এবং আধ্যাত্মিক বিষয়কে ব্যক্তি জীবনের বিষয় বলে মনে করা হয়, যার কারণে সন্তানেরা শিক্ষা থেকে নৈতিক ও ধর্মীয় জ্ঞান লাভের সুযোগ পায় না।

আমাদের দেশের কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রচলিত সেক্যুলার শিক্ষা ব্যবস্থা মুসলিম শিক্ষার্থীদের জীবনে বেশ কিছু নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এই শিক্ষা ব্যবস্থায় ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধের পরিবর্তে বস্তুবাদী চিন্তা এবং ধর্ম নিরপেক্ষতা প্রাধান্য পায়। এর ফলে একজন মুসলিম শিক্ষার্থী তার ধর্মীয় পরিচয় এবং আধ্যাত্মিক ভিত্তি থেকে দূরে সরে যেতে পারে। নিচে সেক্যুলার শিক্ষা ব্যবস্থার নেতিবাচক প্রভাব আলোচনা করা হলো-

১. ধর্মীয় মূল্যবোধ থেকে বিচ্যুতি:

সেক্যুলার শিক্ষাব্যবস্থায় ধর্মীয় শিক্ষার অনুপস্থিতি শিক্ষার্থীদের মধ্যে ইসলাম সম্পর্কে উদাসীনতা তৈরি করতে পারে। তারা তাদের বিশ্বাস, ইবাদত এবং ইসলামিক জীবনযাপন পদ্ধতি সম্পর্কে জ্ঞান অর্জনে ব্যর্থ হয়, যা তাদের ঈমানকে দুর্বল করে দেয়।

২. অনৈতিকতার প্রসার:

এই শিক্ষাব্যবস্থা প্রায়শই নৈতিকতার উৎস হিসেবে ধর্মকে বিবেচনা করে না। এর ফলে শিক্ষার্থীরা ভালো-মন্দের পার্থক্য করার জন্য একটি শক্তিশালী নৈতিক ভিত্তি পায় না। এর পরিবর্তে, তারা পশ্চিমা সংস্কৃতির অনৈতিক প্রভাব, যেমন অশ্লীলতা, অবাধ মেলামেশা এবং মাদকাসক্তির প্রতি আকৃষ্ট হতে পারে।

৩. পরিচয় সংকট: একজন মুসলিম শিক্ষার্থী যখন দেখে যে তার শিক্ষাব্যবস্থা তার ধর্মীয় পরিচয়কে গুরুত্ব দিচ্ছে না, তখন সে এক ধরনের পরিচয় সংকটে ভোগে। সে তার ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং প্রচলিত সমাজের আধুনিকতার মধ্যে একটি দ্বন্দ্ব অনুভব করে, যা তার মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর চাপ সৃষ্টি করে।

৪. বস্তুবাদী চিন্তাধারার প্রভাব:

সেক্যুলার শিক্ষা মানুষকে কেবল পার্থিব সাফল্য, যেমন অর্থ ও ক্ষমতা অর্জনে উৎসাহিত করে। এর ফলে শিক্ষার্থীরা তাদের জীবনের আসল উদ্দেশ্য, অর্থাৎ আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন, থেকে দূরে সরে যায়। তারা বস্তুবাদী লক্ষ্য অর্জনের জন্য যেকোনো অনৈতিক কাজ করতেও দ্বিধাবোধ করে না।

এ থেকে উত্তরণের উপায়

১. পারিবারিক ভূমিকা:

মা-বাবার উচিত সন্তানদেরকে ছোটবেলা থেকেই ইসলামের মৌলিক জ্ঞান এবং নৈতিক শিক্ষা দেওয়া। তাদের ইসলামকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে উৎসাহিত করা। নিয়মিত পারিবারিক পরিবেশে কুরআন পাঠ, হাদিস আলোচনা এবং ইসলামী গল্প শোনানোর ব্যবস্থা করা।

২. ধর্মীয় শিক্ষার সমন্বয়:

শিক্ষার্থীদেরকে সেক্যুলার শিক্ষার পাশাপাশি ধর্মীয় জ্ঞান অর্জনে উৎসাহিত করা উচিত। তারা কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাসের বাইরেও ইসলামিক কোর্স, লেকচার এবং আলোচনায় অংশ নিতে পারে। ইসলামিক ছাত্র সংগঠনগুলোতে যোগদানের মাধ্যমে তারা সমমনা বন্ধু খুঁজে পেতে পারে এবং নিজেদের ধর্মীয় বিশ্বাসকে শক্তিশালী করতে পারে।

৩. ইসলামী মূল্যবোধের অনুশীলন:

শিক্ষার্থীদের উচিত তাদের দৈনন্দিন জীবনে ইসলামী মূল্যবোধগুলো প্রয়োগ করা। নিয়মিত নামাজ আদায়, সৎ পথে চলা, অশ্লীলতা থেকে দূরে থাকা এবং হালাল-হারামের জ্ঞান অর্জন করা। এর মাধ্যমে তারা সেক্যুলার সমাজের নেতিবাচক প্রভাব থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারবে।

৩. সঠিক বন্ধু নির্বাচন: একজন মুসলিম শিক্ষার্থীর জন্য সঠিক বন্ধু নির্বাচন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এমন বন্ধুদের সঙ্গে মিশতে হবে যারা তাদের ধর্মীয় মূল্যবোধকে সম্মান করে এবং ভালো কাজে উৎসাহিত করে।

৪. আলেম ও স্কলারদের সহায়তা: শিক্ষার্থীরা তাদের ধর্মীয় জ্ঞান বৃদ্ধির জন্য নির্ভরযোগ্য আলেম ও স্কলারদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে। বিভিন্ন ইসলামিক ওয়েবসাইটে বা ইউটিউব চ্যানেলে তাদের আলোচনা শুনে জ্ঞান অর্জন করতে পারে।

এই উপায়গুলো অনুসরণ করে একজন মুসলিম শিক্ষার্থী সেক্যুলার শিক্ষাব্যবস্থার নেতিবাচক প্রভাব থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারে এবং তার দ্বীন ও দুনিয়ার জীবনে ভারসাম্য রক্ষা করতে পারে।

সোশ্যাল মিডিয়া ও ডিজিটাল ডিভাইসের প্রভাব

ছাত্রজীবনে সোশ্যাল মিডিয়া ও ডিজিটাল ডিভাইসের প্রভাব এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এর সঠিক ব্যবহার যেমন কল্যাণকর, তেমনি ভুল ব্যবহার জীবনে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। নিচে এর নেতিবাচক দিকগুলো এবং সেগুলো থেকে উত্তরণের উপায় নিয়ে আলোচনা করা হলো:

নেতিবাচক প্রভাব

১. সময় অপচয়:

শিক্ষার্থীরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক বা অন্যান্য সোশ্যাল মিডিয়ায় ডুবে থাকে। এই মূল্যবান সময় যদি পড়াশোনার পেছনে ব্যয় করা হতো, তাহলে তাদের জ্ঞান ও দক্ষতা অনেক বৃদ্ধি পেত। অযথা স্ক্রলিং করা বা ভিডিও দেখা ছাত্রজীবনের মূল্যবান সময়কে নষ্ট করে দেয়।

২. মনোযোগ ভঙ্গ: বারবার নোটিফিকেশন আসা এবং অযথা স্ক্রলিং করার কারণে শিক্ষার্থীদের মনোযোগের ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়। তারা কোনো একটি বিষয়ে গভীরভাবে মনোনিবেশ করতে পারে না। এর ফলে পড়া মনে রাখা বা কোনো জটিল বিষয় বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে।

৩. অশ্লীলতা ও নৈতিক অবক্ষয়:

অনলাইনে অশ্লীল কনটেন্ট, গেমস, মুভি এবং খারাপ বন্ধুত্বে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা বেড়েছে। এর ফলে তাদের নৈতিক মূল্যবোধ দুর্বল হয়ে যায় এবং তারা অনৈতিক কাজে উৎসাহিত হয়।

৪. মিথ্যা জগতে আসক্তি:

ভার্চুয়াল জগতে ‘লাইক’, ‘কমেন্ট’ এবং ‘ফলোয়ার’-এর পেছনে দৌড়াতে গিয়ে শিক্ষার্থীরা বাস্তব জীবন থেকে দূরে সরে যায়। তারা নিজেদের এমন একটি কাল্পনিক জগতে আটকে ফেলে, যা তাদের মানসিক স্বাস্থ্য এবং বাস্তব জীবনের সম্পর্কগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

৫. স্বাস্থ্য সমস্যা:

দীর্ঘক্ষণ মোবাইল বা ল্যাপটপ ব্যবহারের কারণে শিক্ষার্থীদের চোখে সমস্যা হয়, মাথাব্যথা বাড়ে, এবং ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে। এছাড়াও, কম শারীরিক পরিশ্রমের কারণে তাদের ওজন বৃদ্ধি পায় এবং মানসিক চাপ বাড়ে।

৬. ধর্ম থেকে দূরে যাওয়া:

কুরআন তিলাওয়াত, নামাজ ও দোয়ার মতো ইবাদত বাদ দিয়ে অধিকাংশ সময় সোশ্যাল মিডিয়া বা গেমসের পেছনে ব্যয় হয়। এর ফলে তারা ধর্মীয় জীবন থেকে দূরে সরে যায় এবং তাদের আধ্যাত্মিক সংযোগ দুর্বল হয়ে পড়ে।

উত্তরণের উপায়

১. সময় ব্যবস্থাপনা:

পড়াশোনার জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় এবং বিনোদনের জন্য একটি সীমিত সময় নির্ধারণ করে নেওয়া উচিত। এটি শিক্ষার্থীদের সময়কে কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে সাহায্য করবে।

২. সুস্থ ব্যবহার:

মোবাইল এবং ইন্টারনেটকে শুধু পড়াশোনা, গবেষণা এবং দ্বীনি জ্ঞান অর্জনের কাজে ব্যবহার করতে উৎসাহিত করা। এতে প্রযুক্তি তাদের জন্য ক্ষতিকর না হয়ে বরং একটি সহায়ক যন্ত্র হিসেবে কাজ করবে।

৩. অভিভাবকের তদারকি:

মা-বাবা এবং শিক্ষকদের উচিত সন্তানের অনলাইন কার্যক্রমে নজর রাখা। তবে এটি অবশ্যই বন্ধুত্বপূর্ণভাবে করা উচিত, যাতে তারা অনুভব না করে যে তাদের ওপর অনধিকার হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে।

৪. আত্মনিয়ন্ত্রণ:

অযথা অ্যাপস মুছে ফেলা, স্ক্রিন টাইম সীমিত করা এবং খারাপ সাইট থেকে দূরে থাকা। নিজের ইচ্ছাশক্তিকে শক্তিশালী করে এসব অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত।

৫. বিকল্প চর্চা:

শিক্ষার্থীদের খেলাধুলা, বই পড়া, সরাসরি বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেওয়া বা অন্যান্য সৃজনশীল কাজে উৎসাহিত করা উচিত। এসব বাস্তব জীবনের ইতিবাচক কাজগুলো তাদের মানসিক ও শারীরিক সুস্থতা নিশ্চিত করবে।

আল্লাহর ভয় ও দ্বীনি শিক্ষা: হৃদয়ে তাকওয়া বা আল্লাহর ভয় থাকলে হারাম কনটেন্ট থেকে দূরে থাকা সহজ হয়। যখন একজন শিক্ষার্থী বিশ্বাস করবে যে আল্লাহ তাদের প্রতিটি কাজ দেখছেন, তখন তারা নিজেদেরকে খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখবে।

বিবাহ-পূর্ব প্রেম বা অবাধ ভালোবাসা

বিবাহ-পূর্ব প্রেম বা অবাধ ভালোবাসা ছাত্রজীবনে একটি মারাত্মক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা, নৈতিকতা এবং ভবিষ্যৎ জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। আবেগপ্রবণ এই বয়সে তরুণ-তরুণীরা সহজেই এতে জড়িয়ে পড়ে এবং জীবনের লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয়। ইসলাম এই বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা দিয়েছে, যা থেকে উত্তরণের পথ খুঁজে পাওয়া যায়।

নেতিবাচক দিক

১. ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে হারাম: ইসলামে বিবাহ-পূর্ব প্রেম বা অবৈধ সম্পর্ক কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেছেন, “তোমরা যেনার (ব্যভিচার) নিকটবর্তীও হয়ো না। নিশ্চয়ই এটি অশ্লীল এবং মন্দ পথ।” (সূরা আল-ইসরা: ৩২)। প্রেম বা অবাধ মেলামেশা মানুষকে ধীরে ধীরে ব্যভিচারের দিকে ঠেলে দেয়, তাই ইসলামে এটি হারাম।

২. পড়াশোনায় ব্যাঘাত: প্রেমের সম্পর্কে জড়ালে শিক্ষার্থীদের মনোযোগ পড়াশোনা থেকে সরে যায়। সম্পর্কের উত্থান-পতন, আবেগীয় অস্থিরতা এবং ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলা বা দেখা করার কারণে মূল্যবান সময় নষ্ট হয়। এর ফলস্বরূপ, তাদের পরীক্ষার ফলাফল খারাপ হয় এবং শিক্ষাজীবনের লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থতা আসে।

৩. নৈতিক অবক্ষয়: অবৈধ সম্পর্ক প্রায়শই পর্দার বিধান লঙ্ঘন, অবাধ মেলামেশা এবং অশ্লীলতার দিকে নিয়ে যায়। এতে শিক্ষার্থীরা অনৈতিক কার্যকলাপে জড়িয়ে পড়ে, যা তাদের চরিত্রকে নষ্ট করে এবং লজ্জাবোধ কমিয়ে দেয়।

৪. মানসিক অস্থিরতা: যখন কোনো সম্পর্ক ভেঙে যায়, তখন তা তীব্র দুঃখ, হতাশা, মানসিক চাপ এবং বিষণ্ণতার কারণ হয়। অনেক সময় এই মানসিক চাপ এতটাই বেড়ে যায় যে, তা আত্মহত্যার মতো চরম সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

৫. পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতা: অবৈধ সম্পর্ক গোপন রাখতে সন্তানরা মা-বাবার কাছে মিথ্যা কথা বলে এবং তাদের অবাধ্য হয়। এতে পরিবারের সঙ্গে তাদের দূরত্ব তৈরি হয়, যা পারিবারিক বন্ধনকে দুর্বল করে দেয়।

৬. ধর্মীয় ক্ষতি: অবৈধ সম্পর্কে জড়ানো শিক্ষার্থীরা প্রায়শই নামাজ, রোজা, কুরআন তিলাওয়াত ও দোয়ার মতো ইবাদত অবহেলা করে। হারাম কাজে লিপ্ত হওয়ার কারণে তারা আল্লাহর গজব ও অসন্তুষ্টি ডেকে আনে, যা তাদের দুনিয়া ও আখিরাত উভয়কেই ক্ষতিগ্রস্ত করে।

৭. ভবিষ্যৎ জীবনে নেতিবাচক প্রভাব: বিবাহ-পূর্ব প্রেমের ফলে অনেক সময় পরবর্তী বিবাহিত জীবন অশান্ত হয়ে ওঠে। পূর্বের সম্পর্কের কারণে সঙ্গী বা সঙ্গিনীর প্রতি সন্দেহ, অবিশ্বাস এবং দাম্পত্য কলহ সৃষ্টি হয়, যা একটি সুখী দাম্পত্য জীবনের জন্য হুমকি।

প্রতিকারের করণীয়

আল্লাহভীতি ও তাকওয়া: সর্বপ্রথম এবং প্রধান উপায় হলো আল্লাহর ভয় ও তাকওয়া হৃদয়ে স্থাপন করা। শিক্ষার্থীদের বোঝাতে হবে যে, বিবাহ-পূর্ব প্রেম আল্লাহর কাছে হারাম এবং এর কঠোর পরিণতি রয়েছে। কুরআন-হাদিসের আলোকে অবৈধ সম্পর্ক থেকে দূরে থাকার গুরুত্ব সম্পর্কে জ্ঞান দেওয়া জরুরি।

পড়াশোনা ও ক্যারিয়ারে মনোযোগ: ছাত্রজীবনে প্রেমের পরিবর্তে তাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত ইলম অর্জন (জ্ঞান অর্জন) এবং নিজেদের যোগ্যতা বৃদ্ধি করা। জীবনের এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে পড়াশোনায় মনোযোগ দিলে তারা ভবিষ্যৎ জীবনে সফল হবে এবং হালাল উপার্জনের পথ খুলবে।

পর্দা রক্ষা ও লজ্জাশীলতা: ছেলে-মেয়ের অবাধ মেলামেশা বন্ধ করা অত্যন্ত জরুরি। ইসলামে নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্য পর্দার বিধান রয়েছে। এই বিধান মেনে চললে অনৈতিক সম্পর্ক গড়ে ওঠার সুযোগ কমে যায়। লজ্জাশীলতা ঈমানের অংশ, তাই এই গুণকে লালন করা উচিত।

মা-বাবার সাথে খোলামেলা সম্পর্ক: কোনো সমস্যার মুখোমুখি হলে বা আবেগের তাড়নায় ভুল পথে পা বাড়ানোর আগে সন্তানের উচিত মা-বাবাকে জানানো। মা-বাবার উচিত সন্তানের সঙ্গে এমন একটি বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা যাতে তারা নির্দ্বিধায় সবকিছু জানাতে পারে।

নেক বন্ধু নির্বাচন: শিক্ষার্থীরা যদি ধর্মীয় পরিবেশে থাকে, মসজিদে সময় কাটায় এবং নেককার বন্ধুদের সঙ্গে মেলামেশা করে, তাহলে তারা খারাপ প্রভাব থেকে দূরে থাকবে। ভালো বন্ধুরা তাদের সৎপথে থাকতে উৎসাহিত করবে।

শিগগিরই বিবাহের ব্যবস্থা করা: নবী ﷺ বলেছেন: “হে যুবসমাজ! তোমাদের মধ্যে যারা বিবাহ করার সামর্থ্য রাখে, তারা বিবাহ করুক। কারণ, এটি দৃষ্টিকে সংযত করে এবং লজ্জাস্থানকে হিফাজত করে।” (বুখারি, মুসলিম)। যখন একজন তরুণ-তরুণী বিবাহের জন্য প্রস্তুত হয়, তখন মা-বাবার উচিত হালাল পথে তাদের বিয়ের ব্যবস্থা করে দেওয়া, যাতে তারা অনৈতিক সম্পর্ক থেকে দূরে থাকে।

ধর্মীয় আচার-আচরণের প্রতি অনীহা

ছাত্রজীবনে ধর্মীয় আচার-আচরণের প্রতি অনীহা একটি বড় সমস্যা, যার পেছনে কিছু বাস্তব কারণ রয়েছে। ইসলাম এই সমস্যাগুলোকে স্বীকার করে এবং সেগুলোর সমাধানের জন্য দিকনির্দেশনা দেয়। নিচে ধর্মীয় অনীহার কারণ ও তা থেকে উত্তরণের উপায়গুলো সংক্ষেপে ব্যাখ্যা করা হলো।

ধর্মীয় আচার-আচরণের প্রতি অনীহার কারণ

১. অতিরিক্ত পড়াশোনার চাপ:

অনেক শিক্ষার্থী মনে করে, পড়ালেখা, কোচিং এবং পরীক্ষার প্রস্তুতির চাপে তাদের দ্বীনি আমলের (ধর্মীয় কাজ) জন্য সময় নেই। ইসলামে জ্ঞান অর্জনের ওপর অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, কিন্তু তা যেন দ্বীনের বিনিময়ে না হয়। কারণ, আল্লাহ তাআলা উভয় ক্ষেত্রেই ভারসাম্য বজায় রাখতে বলেছেন। কুরআন ও হাদিসে বলা আছে, জ্ঞান অর্জন করা যেমন ফরজ, তেমনি ফরজ ইবাদতগুলোও পালন করা জরুরি। নবী ﷺ বলেছেন, “জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর উপর ফরজ।” কিন্তু এটি যেন আল্লাহর ইবাদত থেকে দূরে না সরিয়ে দেয়।

২. সেক্যুলার শিক্ষা ব্যবস্থা:

আমাদের দেশের বেশিরভাগ কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে দ্বীনি শিক্ষার পরিবেশ নেই, যার ফলে ছাত্রদের মধ্যে ইসলামী সচেতনতা কমে যায়। ইসলামে দ্বীনি এবং দুনিয়াবি জ্ঞানের মধ্যে কোনো বিভাজন নেই। একজন মুসলিমের জন্য উভয় জ্ঞানই সমান গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণেই ইবনে আব্বাস (রা.) এর মতো সাহাবীরা দুনিয়াবি জ্ঞানের পাশাপাশি দ্বীনি জ্ঞানও অর্জন করতেন।

৩. সোশ্যাল মিডিয়া ও আধুনিক বিনোদন:

মোবাইল, গেমস, সিনেমা ও টিকটকের মতো আধুনিক বিনোদনগুলো ছাত্রদের মূল্যবান সময় ও মনোযোগ কেড়ে নেয়। ইসলামে সময়কে একটি মূল্যবান সম্পদ হিসেবে দেখা হয় এবং এর সঠিক ব্যবহারকে উৎসাহিত করা হয়। আল্লাহ তাআলা কুরআনে সময়ের কসম খেয়ে বলেছেন, “শপথ সময়ের, নিশ্চয়ই মানুষ ক্ষতির মধ্যে রয়েছে।” (সূরা আল-আসরা: ১-২)। তাই, মুসলিম হিসেবে আমাদের সময়কে কোনো অসার কাজে নষ্ট করা উচিত নয়।

৪. খারাপ সঙ্গ:

ধর্মহীন বন্ধু-বান্ধবের প্রভাবে নামাজ, রোজা, পর্দা ইত্যাদি অবহেলিত হয়। ইসলামে সৎসঙ্গের ওপর অনেক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, “মানুষ তার বন্ধুর ধর্মের উপর চলে, তাই তোমাদের প্রত্যেকে যেন দেখে, সে কার সাথে বন্ধুত্ব করছে।” (আবু দাউদ)। সৎ বন্ধু সৎকাজে উৎসাহিত করে, আর অসৎ বন্ধু খারাপ পথে নিয়ে যায়।

৫. ধর্মকে গৌণ ভাবা:

অনেক তরুণ ক্যারিয়ার, চাকরি ও ভোগ-বিলাসকে জীবনের আসল লক্ষ্য ভেবে দ্বীনকে অবহেলা করে। ইসলামে দুনিয়ার জীবনের পাশাপাশি আখিরাতের জীবনকে সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেছেন, “আর দুনিয়ার জীবন খেল-তামাশা ছাড়া আর কিছুই নয়। আর যারা মুত্তাকী, তাদের জন্য আখিরাতের আবাসই উত্তম।” (সূরা আন-আম: ৩২)।

৬. অভিভাবকের উদাসীনতা:

 অনেক মা-বাবা ছোটবেলা থেকেই সন্তানকে দ্বীনি চর্চায় উৎসাহিত করেন না। ইসলামে সন্তানের সঠিক লালন-পালন এবং দ্বীনি শিক্ষা দেওয়াকে মা-বাবার অন্যতম দায়িত্ব হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। নবী ﷺ বলেছেন, “কোনো পিতা তার সন্তানকে উত্তম শিক্ষা দানের চেয়ে ভালো কিছু উপহার দেয় না।”  তিরমিজি)।

উত্তরণের উপায়

১. আল্লহভীতি বা তাকওয়া সৃষ্টি করা:

ছাত্রদের হৃদয়ে আল্লাহভীতি ও আখিরাতের জবাবদিহিতার বোধ জাগ্রত করা। যখন একজন শিক্ষার্থী বিশ্বাস করবে যে আল্লাহ তাদের প্রতিটি কাজের হিসাব নেবেন, তখন তারা নিজেদেরকে মন্দ কাজ থেকে দূরে রাখবে।

২. সময়ের সঠিক ব্যবহার: পড়াশোনা এবং দ্বীনি আমল উভয়কেই সময়সূচির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা। রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর জীবন থেকে বোঝা যায় যে কীভাবে ইবাদত ও দুনিয়াবি কাজগুলোকে সমান গুরুত্ব দিয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ জীবনযাপন করা যায়।

৩. ধর্মীয় পরিবেশ তৈরি: মসজিদে নিয়মিত যাওয়া এবং ইসলামী আলোচনা সভায় অংশগ্রহণ করা। এটি মুসলিম উম্মাহর সাথে একটি শক্তিশালী বন্ধন তৈরি করবে এবং একজন শিক্ষার্থীকে তার ধর্মীয় বিশ্বাসকে শক্তিশালী করতে সাহায্য করবে।

৪. নেক বন্ধু নির্বাচন: যারা দ্বীন মানে এবং নিয়মিত নামাজ পড়ে, তাদের সাথে বন্ধুত্ব করা। ভালো বন্ধুরা খারাপ প্রভাব থেকে দূরে থাকতে এবং সৎকাজে উৎসাহিত করতে সাহায্য করে।

৫. আত্মশিক্ষা: ছাত্রদের ব্যক্তিগতভাবে কুরআন পড়া, হাদিস শোনা এবং ইসলামী বইপত্র অধ্যয়ন করা উচিত। এর মাধ্যমে তারা দ্বীনের প্রতি তাদের ভালোবাসা বৃদ্ধি করতে পারবে এবং নিজেদেরকে ইসলামী জ্ঞানে সমৃদ্ধ করতে পারবে।

৬. মা-বাবার দায়িত্ব: মা-বাবার উচিত ছোট থেকেই সন্তানকে নামাজ, রোজা, কুরআন শিক্ষা ও দ্বীনি আদব শেখানো। তাদের জীবনের উদাহরণ হওয়া উচিত এবং সন্তানের জন্য নিয়মিত দোয়া করা উচিত।

আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তিন প্রকারের দুআ অবশ্যই মঞ্জুর করা হয়, তাতে কোনরকম সন্দেহ নেই। নির্যাতিত ব্যক্তির দুআ, মুসাফিরের দু’আ এবং সন্তানের প্রতি বাবার বদ-দুআ। সুনানে তিরমিজি : ১৯০৫, সুনান ইবনে মাজাহ : ৩৮৬২

ইসলামফোবিয়া ও পশ্চিমা চিন্তাধারার প্রভাব

ছাত্রজীবনে ইসলামোফোবিয়া এবং পশ্চিমা চিন্তাধারার নেতিবাচক প্রভাব ব্যাপক। এই প্রভাবগুলো একজন মুসলিম শিক্ষার্থীর আত্মপরিচয়, বিশ্বাস এবং মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। এর ফলে তারা নিজেদের ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে বিব্রতবোধ করে এবং সমাজে নিজেদেরকে বিচ্ছিন্ন মনে করতে পারে।

নেতিবাচক প্রভাব

আত্মপরিচয় সংকট :

ইসলামোফোবিয়া এবং পশ্চিমা চিন্তাধারার প্রভাবে একজন মুসলিম শিক্ষার্থী তার নিজস্ব ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয় নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত হয়। পশ্চিমা মিডিয়া ইসলামকে প্রায়শই নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করে, যা মুসলিম শিক্ষার্থীদের মনে তাদের ধর্ম সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি করে।

ধর্মীয় আচার-আচরণের প্রতি অনীহা:

সমাজে প্রচলিত ইসলামোফোবিয়ার কারণে অনেক শিক্ষার্থী ধর্মীয় আচার-আচরণ, যেমন পর্দা, নামাজ বা হালাল খাদ্যাভ্যাস নিয়ে কুণ্ঠাবোধ করে। তারা ভয় পায় যে, এসব আচার-আচরণ তাদের সমাজে অন্যদের থেকে আলাদা করে ফেলবে।

মানসিক চাপ ও হতাশা:

ইসলামোফোবিয়ার কারণে মুসলিম শিক্ষার্থীরা বৈষম্য, বিদ্রূপ এবং হয়রানির শিকার হতে পারে। এটি তাদের মধ্যে মানসিক চাপ, হতাশা এবং উদ্বেগ সৃষ্টি করে, যা তাদের পড়াশোনা এবং সামাজিক জীবনকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

নৈতিক অবক্ষয়:

পশ্চিমা চিন্তাধারার প্রভাবে অনেক শিক্ষার্থী ভোগবাদী জীবনযাপন, অনৈতিক সম্পর্ক এবং অন্যান্য হারাম কাজে আকৃষ্ট হয়। এই চিন্তাধারা ধর্মীয় মূল্যবোধকে গৌণ করে তোলে এবং ব্যক্তিকে নৈতিকভাবে দুর্বল করে দেয়।

ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতা:

সেক্যুলার শিক্ষা ব্যবস্থা প্রায়শই ইসলামী সভ্যতা ও সংস্কৃতির অবদানকে উপেক্ষা করে। এর ফলে মুসলিম শিক্ষার্থীরা তাদের সমৃদ্ধ ইতিহাস ও ঐতিহ্য থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, যা তাদের আত্মবিশ্বাসকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

উত্তরণের উপায়

১. ইসলাম সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান অর্জন:

ইসলামোফোবিয়া থেকে উত্তরণের প্রথম উপায় হলো ইসলাম সম্পর্কে সঠিক ও গভীর জ্ঞান অর্জন করা। যখন একজন শিক্ষার্থী তার ধর্মের মৌলিক বিষয়গুলো সম্পর্কে নিশ্চিত হয়, তখন বাইরের ভুল ধারণা তাকে প্রভাবিত করতে পারে না। কুরআন, হাদিস এবং ইসলামী ইতিহাস অধ্যয়ন করে তারা নিজেদের বিশ্বাসকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।

২. ইসলামী আলোচনায় অংশগ্রহণ:

শিক্ষার্থীদের উচিত বিভিন্ন ইসলামিক লেকচার, আলোচনা সভা এবং সেমিনারে অংশগ্রহণ করা। এতে তারা সমমনা মানুষদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতে পারে এবং নিজেদের ধর্মীয় জ্ঞান বৃদ্ধি করতে পারে।

আত্মবিশ্বাসী হওয়া: শিক্ষার্থীদের বোঝানো উচিত যে ইসলাম একটি শান্তিপূর্ণ এবং প্রগতিশীল ধর্ম। নিজেদের ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে গর্ববোধ করা এবং অন্যদের কাছে ইসলামের সঠিক বার্তা তুলে ধরা উচিত।

পরিবারের সমর্থন: মা-বাবার উচিত তাদের সন্তানদের প্রতি সমর্থন এবং সহযোগিতা করা। তাদের ধর্মীয় পরিচর্যার পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যের দিকেও নজর রাখা উচিত। পরিবারের সদস্যরা একসঙ্গে সময় কাটানো এবং ধর্মীয় আলোচনায় অংশগ্রহণ করাও গুরুত্বপূর্ণ। সন্তানদেরকে ইসলামের সৌন্দর্য, যুক্তি এবং বাস্তবতার ওপর ভিত্তি করে জ্ঞান দান করা। তাদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া এবং তাদেরকে এমন জ্ঞান দেওয়া যাতে তারা পশ্চিমা প্রপাগান্ডার মুখে নিজেদের বিশ্বাসকে মজবুত রাখতে পারে।

সন্তানের মস্তিষ্কে ভালো কাজের ইনপুট দিন

সন্তানের মস্তিষ্ক আসলে এক চলমান কম্পিউটারের মতো। শিশু, কিশোর, যুবক কিংবা বৃদ্ধ—প্রত্যেক মানুষের মন-মানসিকতা সর্বদা সচেতন ও অবচেতনভাবে নানা ইনপুট গ্রহণ করছে। এই ইনপুটগুলো প্রক্রিয়াজাত হয়ে আউটপুট হিসেবে প্রকাশ পায় মানুষের চিন্তা, দৃষ্টিভঙ্গি এবং আচরণে।

তাই কেউ হয়ে ওঠে দানশীল, কেউ উদ্ধত; কেউ হয় আল্লাহর শুকরগুজার বান্দা, আবার কেউ হয়ে যায় বিপথগামী। আসলে সন্তানকে কিছু না শেখালেও সে শিখছেই—আশপাশের পরিবেশ, টেলিভিশন, রেডিও, ইন্টারনেট কিংবা মা-বাবার আচরণ—সবকিছু থেকে প্রতিনিয়ত সে ইনপুট সংগ্রহ করছে।

তাহলে কি আমাদের সচেতন হওয়া উচিত নয়? আমরা কি চাই না আমাদের সন্তানের মস্তিষ্কে ভালো উপাদানগুলো বেশি করে প্রবেশ করুক? আমরা কি চাই না সে একজন দক্ষ প্রফেশনাল হওয়ার পাশাপাশি একজন উত্তম মুসলিম হোক? এমনকি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হয়েও যেন সে কুরআন-হাদিসের উদ্ধৃতি দিয়ে দ্বীনের বাণী প্রচার করে এবং অমুসলিমদের জন্য হিদায়াতের প্রদীপ হয়ে ওঠে।

আধুনিক বিনোদনের বিপদ

আজকের প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে হলিউড, বলিউড, ঢালিউড এর তেমন প্রভাব না থাকলেও হাতের স্মার্ট ফোনটি সকল উডের মাথা।  স্মার্ট ফোনটি বিভিন্ন যোগাযগের মাধ্যামে (ফেসবুক, টুইটার, এক্স, ইউটিউব) আমাদের মন-মানসকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। শিশুদের স্বভাব অনুকরণপ্রিয় হওয়ায় তারা খুব সহজেই এসব বিনোদনের মূল বিষয়বস্তু গ্রহণ করছে। ফলে তাদের মননশীলতার উপর স্থায়ী নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

তাছাড়া এ সকল যোগাযগের মাধ্যমে শিশুদের মনে বইয়ের প্রতি আগ্রহ কমে গিয়ে বন্দুক, সহিংসতা ও ড্রাগের প্রতি আকর্ষণ বেড়ে যাচ্ছে। পরিবারের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা শিথিল হয়ে পড়ছে। এতটাই প্রভাব বিস্তার করেছে যে, খোদ পশ্চিমা বিশ্ব থেকেও এখন এসব কুরুচি ও বিকৃত সংস্কৃতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদের সুর উঠছে।

আমাদের করণীয়

তাহলে আমাদের দায়িত্ব হলো, সন্তানের মস্তিষ্কে অখাদ্য কুখাদ্যের বদলে কুরআন-হাদিস, নৈতিক গল্প, ভালো বই, ইতিবাচক আচরণ ও সুস্থ বিনোদনের ইনপুট দেওয়া। ঘরে একটি সুন্দর ইসলামী পরিবেশ সৃষ্টি করা, যাতে সে স্বাভাবিকভাবেই ভালো দিকের প্রতি আকৃষ্ট হয়।

সন্তানের অধিকার : প্রথম পর্ব

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

মা-বাবা নিকট সন্তানের অধিকার  

পরিবার হলো মানব সমাজের মূল ভিত্তি, আর সন্তান হলো মা-বাবার কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে শ্রেষ্ঠ আমানত ও নিয়ামত। এই আমানতের হক যথাযথভাবে আদায় করা প্রত্যেক অভিভাবকের জন্য একটি অপরিহার্য দ্বীনি ও নৈতিক দায়িত্ব। ইসলামে সন্তানের অধিকারকে শুধু খাদ্য, বস্ত্র বা শিক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি, বরং এর পরিধি বিস্তৃত— যা জন্ম থেকে শুরু করে তাদের চারিত্রিক, সামাজিক ও আধ্যাত্মিক পূর্ণতা পর্যন্ত বিস্তৃত।

মা-বাবার প্রধান কর্তব্য হলো তাদের সন্তানদেরকে এমনভাবে গড়ে তোলা, যাতে তারা দুনিয়ায় উত্তম মানুষ এবং আখিরাতে সফল মুমিন হিসেবে পরিচিত হতে পারে। এর জন্য প্রয়োজন উন্নত চরিত্র শিক্ষা দান, ইসলামী মূল্যবোধে তাদের মনকে আলোকিত করা এবং রাসূল (সাঃ)-এর চরিত্রকে মডেল হিসেবে তাদের সামনে তুলে ধরা।

সন্তানের অধিকার নিশ্চিত করার অর্থ হলো— তাদের জন্য একটি নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে তারা নির্ভুল জ্ঞান অর্জনের সুযোগ পাবে, পারিবারিক তালিমের মাধ্যমে দ্বীনি শিক্ষা লাভ করবে এবং সত্য-মিথ্যার পার্থক্য অনুধাবন করতে শিখবে। একইসাথে, মা-বাবাকে খেয়াল রাখতে হবে যেন সকল সন্তানের মাঝে সমতা বজায় থাকে, বিশেষ করে এতিম বা প্রতিবন্ধী সন্তানের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। সন্তানদেরকে ধনী-গরীব নির্বিশেষে সকল আত্মীয়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়া এবং ত্যাগ ও সহাবস্থানের শিক্ষা দেওয়ার মাধ্যমেই একটি সুস্থ, মানবিক ও ইসলামী সমাজ গঠন করা সম্ভব। সন্তানের প্রতি এই দায়িত্ব পালনের মাধ্যমেই মা-বাবা দুনিয়া ও আখিরাতে সফলতা লাভ করতে পারেন। নিচে এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো :

সন্তানকে উন্নত চরিত্র শিক্ষাদান

সন্তানকে উন্নত চরিত্র শিক্ষা দেওয়া পরিবার তথা মা-বাবার অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। কুরআন ও সহিহ হাদিসে এ সম্পর্কে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বর্ণিত হয়েছে। নিচে বিষয়টি সম্পর্কে তুলে ধরা হলো:

১. সন্তানকে ঈমান ও সৎকর্ম শিক্ষা দেওয়ার নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا

হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবারকে আগুন থেকে বাঁচাও। সুরা তাহরীম : ৬

ও আয়াতে ব্যাখ্যায় বলা হয়, পরিবারের দায়িত্বপ্রাপ্ত (মা-বাবা, অভিভাবক, শিক্ষক) অবশ্যই সন্তান ও অধীনস্থদের ইসলামের শিক্ষা দিবে। তাদেরকে হালাল-হারামের জ্ঞান শেখাবে, সঠিক আকিদা শিক্ষা দেবে এবং সালাতসহ ফরজ ইবাদত পালনে অভ্যস্ত করবে। তাদেরকে অশ্লীলতা, গুনাহ ও কুঅভ্যাস থেকে দূরে রাখবে।

হযরত আলী (রাঃ)-এর বলেন, “এ আয়াতের অর্থ হলো, তাদেরকে শিক্ষা দাও এবং আদব শেখাও।”

তাফসীর ইবন কাসীর

ইবন আব্বাস (রাঃ)-এর বলেন, “তাদেরকে আল্লাহকে ভয় করতে শেখাও, এতে আল্লাহ তাদেরকে আযাব থেকে রক্ষা করবেন।” তাবারী তাফসীর

২. লুকমান (আ.)-এর উপদেশ

কুরআনে বর্ণিত হয়েছে, লুকমান (আ.) তার ছেলেকে উপদেশ দিচ্ছেন—

  • আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক না করা।
  • সালাত কায়েম করা।
  • সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজ থেকে বিরত রাখা।
  • ধৈর্য ধারণ করা।
  • অহংকার ও উদ্ধত আচরণ পরিহার করা। রা লুকমান: ১৩-১৯

লুকমান (আ.)-এর উপদেগুলো আসলে একটি পূর্ণাঙ্গ চরিত্র গঠনের নীতি।

৩. সন্তানকে সুন্দর আদব শেখানো সওয়াবের কাজ

আইউব ইবনু মূসা (রহঃ) হতে পর্যায়ক্রমে তার পিতা ও দাদার সূত্রে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কোন পিতা তার সন্তানকে উত্তম শিষ্টাচার শিক্ষা দেয়ার চেয়ে বেশী উত্তম কোন জিনিস দিতে পারে না। সুনানে তিরমিজি : ১৯৫২

৪. চরিত্রবান সন্তান গড়ে তোলার ফজিলত

আয়িশাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের মাঝে সে-ই ভাল যে তার পরিবারের নিকট ভাল। আর আমি আমার পরিবারের নিকট তোমাদের চাইতে উত্তম। আর তোমাদের কোন সঙ্গী মৃত্যুবরণ করলে তার সমালোচনা পরিত্যাগ করো। সুনানে তিরমিজি : ৩৮৯৫, সহীহাহ ; ২৮৫

অর্থাৎ মা-বাবার কর্তব্য হলো পরিবারকে সুন্দর চরিত্রে গড়ে তোলা।

কুরআন-হাদিস স্পষ্ট করে বলছে, মা-বাবার অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হলো সন্তানকে শুধু দুনিয়াবি পড়াশোনা নয়, বরং ইসলামি আদর্শ ও উন্নত চরিত্র শিক্ষা দেওয়া। তাদের মধ্যে ঈমান, ইবাদত, শিষ্টাচার, বিনয়, সত্যবাদিতা, আমানতদারি ও দয়া-মমতা গড়ে তুলতে হবে। এতে তারা দুনিয়াতে সফল ও আখিরাতে মুক্তির পথ পাবে।

সামর্থ অনুসারে সন্তানে ভরন পোষন প্রদান করা

সন্তানকে সামর্থ্য অনুযায়ী ভরণ-পোষণ প্রদান করা ইসলামে একটি ফরজ দায়িত্ব। এটি শুধু পারিবারিক দায়িত্ব নয়; বরং কুরআন ও সহিহ হাদিসে একে ইবাদত হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। নিচে বিষয়টি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো:

১. ভরণ-পোষণের সাধারণ নির্দেশ

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَالۡوَالِدٰتُ یُرۡضِعۡنَ اَوۡلَادَہُنَّ حَوۡلَیۡنِ کَامِلَیۡنِ لِمَنۡ اَرَادَ اَنۡ یُّتِمَّ الرَّضَاعَۃَ ؕ وَعَلَی الۡمَوۡلُوۡدِ لَہٗ رِزۡقُہُنَّ وَکِسۡوَتُہُنَّ بِالۡمَعۡرُوۡفِ ؕ لَا تُکَلَّفُ نَفۡسٌ اِلَّا وُسۡعَہَا ۚ

আর মায়েরা তাদের সন্তানদেরকে পূর্ণ দু’বছর দুধ পান করাবে, (এটা) তার জন্য যে দুধ পান করাবার সময় পূর্ণ করতে চায়। আর পিতার উপর কর্তব্য, বিধি মোতাবেক মাদেরকে খাবার ও পোশাক প্রদান করা। সাধ্যের অতিরিক্ত কোন ব্যক্তিকে দায়িত্ব প্রদান করা হয় না। সুরা বাকারা : ২৩৩

আয়াত থেকে প্রমাণিত হলো, শিশুর লালন-পালন ও মায়ের প্রয়োজনীয় খরচ বহন করা পিতার ধর্মীয় দায়িত্ব।

২. সামর্থ্য অনুযায়ী খরচের নির্দেশ

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

لِیُنۡفِقۡ ذُوۡ سَعَۃٍ مِّنۡ سَعَتِہٖ ؕ  وَمَنۡ قُدِرَ عَلَیۡہِ رِزۡقُہٗ فَلۡیُنۡفِقۡ مِمَّاۤ اٰتٰىہُ اللّٰہُ ؕ  لَا یُکَلِّفُ اللّٰہُ نَفۡسًا اِلَّا مَاۤ اٰتٰىہَا ؕ  سَیَجۡعَلُ اللّٰہُ بَعۡدَ عُسۡرٍ یُّسۡرًا 

সামর্থ্যবান যেন নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী ব্যয় করে আর যার রিয্ক সংকীর্ণ করা হয়েছে সে যেন আল্লাহ তাকে যা দিয়েছেন তা হতে ব্যয় করে। আল্লাহ কারো ওপর বোঝা চাপাতে চান না তিনি তাকে যা দিয়েছেন তার চাইতে বেশী। আল্লাহ কঠিন অবস্থার পর সহজতা দান করবেন। সুরা তালাক : ৭

 এ আয়াত প্রমাণ করে—ভরণ-পোষণ সামর্থ্য অনুযায়ী দিতে হবে, অভাবের কারণে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নেই।

৩.  পরিবারে ব্যয় করা সর্বশ্রেষ্ঠ দান

আবূ হুরায়রাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ একটি দীনার তুমি আল্লাহর পথে ব্যয় করলে, একটি দীনার গোলাম আযাদ করার জন্য এবং একটি দীনার মিসকীনদেরকে দান করলে এবং আর একটি তোমার পরিবার-পরিজনের জন্য ব্যয় করলে। এর মধ্যে (সাওয়াবের দিক থেকে) ঐ দীনারটিই উত্তম যা তুমি তোমার পরিবারের লোকদের জন্য ব্যয় করলে। সহিহ মুসলিম : ৯৯৫

৪. ভরণ-পোষণ না দেওয়া গুনাহ

১৬৯২। ’আবদুল্লাহ ইবনু ’আমর রাযিয়াল্লাহু ’আনহু সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কেউ পাপী হওয়ার জন্য এটুকুই যথেষ্ট যে, সে তার উপর নির্ভরশীলদের রিজিক প্রদানে অবহেলা করে। সুনানে আবু দাউদ : ১৬৯২

৫. সন্তানদের জন্য উত্তরাধিকার রেখে যাওয়া

৫৩৫৪. সা’দ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ আমি মক্কায় রোগগ্রস্ত হলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার শুশ্রূষার জন্য আসেন। আমি বললাম, আমার তো মাল আছে। সেগুলো আমি ওয়াসিয়্যাত করে যাই? তিনি বললেনঃ না। আমি বললাম,  তাহলে অর্ধেক? তিনি বললেনঃ না। আমি বললামঃ তবে এক-তৃতীয়াংশ? তিনি বললেনঃ এক-তৃতীয়াংশ করতে পার। আর এক-তৃতীয়াংশই তো বেশী। মানুষের কাছে হাত পেতে পেতে ফিরবে ওয়ারিশদের এমন ফকীর অবস্থায় ছেড়ে যাওয়ার চেয়ে তাদেরকে বিত্তবান অবস্থায় রেখে যাওয়া উত্তম। আর যা-ই তুমি খরচ করবে, তা-ই তোমার জন্য সাদকাহ হবে। এমনকি যে লোকমাটি তুমি তোমার স্ত্রীর মুখে তুলে দিবে, সেটাও। সম্ভবতঃ আল্লাহ তোমাকে দীর্ঘজীবী করবেন। তোমার দ্বারা অনেক লোক উপকৃত হবে, আবার অন্যেরা কাফির সম্প্রদায়) ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সহিহ বুখারি : ৫৩৫৪

উপসংহার : পরিবারের ভরণ-পোষণ দেওয়া ফরজ দায়িত্ব। সামর্থ্য অনুযায়ী খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে হবে। এতে অবহেলা করা গুনাহ এবং ব্যয় করা হলে তা ইবাদত ও দান হিসেবে গণ্য হয়।

মা-বাবা সন্তানকে ধর্মের পথে পরিচালিত করবে

বাবা-মা হিসেবে সন্তানের জীবনে ধর্মীয় শিক্ষা ও সঠিক পথ নির্দেশনা দেওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। এটি শুধু সন্তানের ইহকালীন কল্যাণই নিশ্চিত করে না, বরং তাদের পরকালীন মুক্তির পথও সুগম করে।

মানবজীবনের লক্ষ্য শুধু ভোগ-বিলাস নয়, বরং সঠিক পথ অনুসরণ করে পরকালীন মুক্তি লাভ করা। ইসলাম হলো আল্লাহ প্রেরিত শেষ ও পরিপূর্ণ জীবনব্যবস্থা। এই পথ অনুসরণ করার গুরুত্ব কয়েকটি কারণে স্পষ্ট হয়:

১. আল্লাহর হুকুম মানা:

আমাদের স্রষ্টা আল্লাহ। তিনি আমাদের কেন সৃষ্টি করেছেন তা কুরআনে স্পষ্ট করেছেন—

﴿وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ﴾

“আমি জ্বিন ও মানুষকে কেবল আমার ইবাদতের জন্যই সৃষ্টি করেছি।” (সূরা যারিয়াত: ৫৬)

অতএব, আল্লাহর হুকুম মানা এবং তাঁর ইবাদত করা মানবজীবনের মূল উদ্দেশ্য। বাবা-মায়ের কর্তব্য হলো তাদের সন্তানদেরকে আল্লাহর পরিচয়, তাঁর প্রতি ভালোবাসা এবং তাঁর ইবাদত করার গুরুত্ব সম্পর্কে শিক্ষা দেওয়া। এই শিক্ষা শৈশব থেকেই শুরু করা উচিত, যাতে তারা আল্লাহর আদেশ-নিষেধ মেনে চলতে অভ্যস্ত হয়।

২. জীবনের সঠিক দিকনির্দেশনা:

মানুষ যখন আল্লাহ প্রদত্ত ইসলামের পথ মেনে চলে, তখন তার জীবন সুশৃঙ্খল, শান্তিপূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণ হয়। ইসলাম আমাদের প্রতিটি ক্ষেত্রে, আকিদা (বিশ্বাস), ইবাদত, নৈতিকতা, সামাজিক ও পারিবারিক জীবনে—নির্দেশনা প্রদান করে। বাবা-মায়েদের উচিত তাদের সন্তানদের ইসলামের এই সামগ্রিক রূপটি বোঝানো, যাতে তারা শুধু আনুষ্ঠানিক ইবাদত নয়, বরং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইসলামি মূল্যবোধ মেনে চলতে শেখে।

৩. পাপ থেকে সুরক্ষা:

ইসলামের বিধানগুলো মানুষকে অন্যায়, ব্যভিচার, মদ, সুদ, খুন, প্রতারণা ইত্যাদি গুনাহ থেকে রক্ষা করে। এতে ব্যক্তি ও সমাজ উভয়েরই কল্যাণ নিহিত আছে। বাবা-মা যদি সন্তানকে ছোটবেলা থেকে হালাল-হারামের জ্ঞান দেন, তাহলে তারা অন্যায় ও পাপ থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারবে। এই শিক্ষা তাদের একটি সুস্থ ও নৈতিক জীবনযাপনের ভিত্তি গড়ে দেবে।

৪. পরকালীন সফলতা:

পৃথিবীর জীবন ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু আখিরাত চিরস্থায়ী। ইসলাম অনুসরণ করলে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও জান্নাত লাভ করা যায়। কুরআনে বলা হয়েছে—

وَمَن يُطِعِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ يُدْخِلْهُ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا

যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করবে, আল্লাহ তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন, যেখানে সে চিরকাল থাকবে।” সূরা নিসা: ১৩

সন্তানদেরকে পরকালের বিশ্বাস এবং জান্নাত-জাহান্নামের ধারণা সম্পর্কে অবগত করানো বাবা-মায়ের দায়িত্ব। এর মাধ্যমে তারা দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী আরামের চেয়ে পরকালীন চিরস্থায়ী সুখের জন্য চেষ্টা করতে উদ্বুদ্ধ হবে।

৫. মানসিক প্রশান্তি ও শান্তি:

ইসলাম মানুষকে আল্লাহর ওপর নির্ভর করতে শেখায়। এতে দুঃখ-কষ্টে ধৈর্য ও সুখে কৃতজ্ঞতা জন্মায়। ফলে মানুষ প্রকৃত প্রশান্তি লাভ করে। কুরআনে বলা হয়েছে—

﴿أَلَا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ﴾

“জেনে রাখ, আল্লাহর স্মরণেই অন্তরগুলো প্রশান্ত হয়।” (সূরা আর-রাদ: ২৮)

বাবা-মায়ের উচিত সন্তানদেরকে আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল (ভরসা) করতে শেখানো। জীবনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আল্লাহর সাহায্য কামনা করার শিক্ষা তাদের মনকে শান্ত ও দৃঢ় করবে।

৬. একটি আদর্শ প্রজন্ম গঠন

বাবা-মায়ের সঠিক দিকনির্দেশনা একটি সুন্দর সমাজ এবং আদর্শ প্রজন্ম গঠনের জন্য অপরিহার্য। ইসলাম অনুসরণ করা মানে স্রষ্টার আনুগত্য করা, নিজের জীবনকে সুন্দর ও সুশৃঙ্খল রাখা, সমাজে শান্তি স্থাপন করা এবং পরকালে মুক্তি লাভ করা। তাই প্রত্যেক মুসলিমের কর্তব্য হলো ইসলামের পথে চলা এবং তার শিক্ষা অনুযায়ী নিজের সন্তানদের গড়ে তোলা। এই দায়িত্ব পালনে বাবা-মা যত বেশি যত্নশীল হবেন, সন্তানরা তত বেশি সফল ও সুসংহত জীবন পাবে।

সন্তানরে নিরাপত্তা বিধান

সন্তানের নিরাপত্তা বিধান করা বাবা-মায়ের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব। ইসলামে এই দায়িত্বকে শারীরিক, মানসিক, এবং ধর্মীয়—এই তিন প্রধান ভাগে ভাগ করা হয়েছে। কুরআন ও হাদিসের আলোকে এই বিষয়টির গুরুত্ব নিচে তুলে ধরা হলো।

১. শারীরিক নিরাপত্তা

শারীরিক নিরাপত্তা বলতে সন্তানের স্বাস্থ্য, খাদ্য, বস্ত্র ও বাসস্থানের মতো মৌলিক চাহিদা নিশ্চিত করাকে বোঝায়। ইসলাম এই বিষয়ে বাবা-মায়ের ওপর বিশেষ দায়িত্ব অর্পণ করেছে।

আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেছেন-

اَسۡکِنُوۡہُنَّ مِنۡ حَیۡثُ سَکَنۡتُمۡ مِّنۡ وُّجۡدِکُمۡ وَلَا تُضَآرُّوۡہُنَّ لِتُضَیِّقُوۡا عَلَیۡہِنَّ ؕ

তোমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী যেখানে তোমরা বসবাস কর সেখানে তাদেরকেও বাস করতে দাও, তাদেরকে সঙ্কটে ফেলার জন্য কষ্ট দিয়ো না। সূরা তালাক: ৬

এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, সন্তানের দৈহিক যত্নের দায়িত্ব বাবা-মায়ের। তাদের খাদ্য, স্বাস্থ্য এবং জীবনের ঝুঁকি থেকে রক্ষা করা অপরিহার্য।

আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেনঃ প্রত্যেক নবজাতক ফিত্রাতের উপর জন্মগ্রহণ করে। অতঃপর তার মাতাপিতা তাকে ইয়াহূদী বা নাসারা অথবা অগ্নি উপাসক করে, যেমন চতুষ্পদ জন্তু একটি পূর্ণাঙ্গ বাচ্চা জন্ম দেয়। তোমরা কি তাকে (জন্মগত) কানকাটা দেখেছ? সহিহ বুখারি : ১৩৮৫

এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, সন্তানের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করা বাবা-মায়ের দায়িত্ব, কারণ তাদের প্রভাব শিশুর ভবিষ্যৎ জীবন গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

২. মানসিক ও আবেগিক নিরাপত্তা

শারীরিক সুরক্ষার পাশাপাশি সন্তানের মানসিক ও আবেগিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও ইসলামে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্যে রয়েছে তাদের প্রতি স্নেহ, ভালোবাসা, এবং তাদের আত্মসম্মান ও মর্যাদা বজায় রাখা। স্নেহ ও দয়ার মাধ্যমে সন্তানের মানসিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। বাবা-মায়ের স্নেহ ও ভালোবাসা শিশুদের আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলে।

আমর ইবনু শুআইব (রাহঃ) হতে পর্যায়ক্রমে তার বাবা ও দাদার সূত্রে বর্ণিত আছে, তিনি (দাদা) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে লোক আমাদের শিশুদের আদর করে না এবং আমাদের বড়দের সম্মানের প্রতি খেয়াল রাখে না সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।’ সুনানে তিরমিজি : ১৯২০, মুসনাদ আহমদ : ২২৭৯৩), সুনানে আবু দাউদ : ৪৯৪৩, সহিহ ইবনে হিব্বান : ৪৪৯৩

 এই হাদিসটি বাবা-মায়ের প্রতি ইঙ্গিত করে যে, তারা তাদের সন্তানদের প্রতি দয়া ও কোমলতা প্রদর্শন করবে। শিশুদের বকাঝকা, অপমান বা শারীরিক শাস্তি দেওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত, যা তাদের মানসিক নিরাপত্তাকে বিঘ্নিত করে।

৩. ধর্মীয় ও নৈতিক নিরাপত্তা

সন্তানের সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা হলো তাদের ধর্মীয় ও নৈতিক নিরাপত্তা। বাবা-মায়ের প্রধান দায়িত্ব হলো তাদের সন্তানদের সঠিক ইসলামি শিক্ষা দেওয়া এবং নৈতিক চরিত্র গঠনে সহায়তা করা। আল্লাহ তাআলা বলেন, “হে ঈমানদারগণ, তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে সেই আগুন থেকে রক্ষা করো, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর।” সূরা তাহরিম: ৬

এই আয়াতটি পরিষ্কারভাবে নির্দেশ করে যে, বাবা-মায়ের দায়িত্ব হলো তাদের সন্তানদের জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করা, আর তা সম্ভব একমাত্র সঠিক ধর্মীয় শিক্ষা ও নৈতিকতার মাধ্যমে।

১৯৫২। আইউব ইবনু মূসা (রহঃ) হতে পর্যায়ক্রমে তার পিতা ও দাদার সূত্রে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কোন পিতা তার সন্তানকে উত্তম শিষ্টাচার শিক্ষা দেয়ার চেয়ে বেশী উত্তম কোন জিনিস দিতে পারে না। সুনানে তিরমিজি : ১৯৫২

এই হাদিস থেকে স্পষ্ট হয় যে, সবচেয়ে মূল্যবান উত্তরাধিকার হলো নৈতিক ও ধর্মীয় জ্ঞান। বাবা-মা তাদের সন্তানদের যদি ইসলামের মৌলিক শিক্ষা, যেমন—সালাত, রোজা, এবং ভালো আচরণের শিক্ষা দেন, তবে এটিই তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় সুরক্ষা হবে।

সারসংক্ষেপ : বাবা-মায়ের দায়িত্ব শুধু সন্তানের জৈবিক চাহিদা পূরণ করা নয়, বরং তাদের শারীরিক, মানসিক ও ধর্মীয়—এই তিনটি প্রধান দিক থেকে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কুরআন ও হাদিস বারবার এই দায়িত্বের ওপর জোর দিয়েছে। সন্তানের সার্বিক সুরক্ষা নিশ্চিত করে বাবা-মা তাদের প্রতি আল্লাহর দেওয়া আমানত সঠিকভাবে পালন করতে পারেন।

সন্তানের মাঝে সমতা বিধান করা

ইসলামী শরিয়তে বাবা-মায়ের জন্য সন্তানদের মধ্যে সমতা বজায় রাখা অপরিহার্য। এর মূল লক্ষ্য হলো সন্তানদের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা, শ্রদ্ধা এবং সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করা। যদি কোনো বাবা-মা এক সন্তানকে বেশি গুরুত্ব দেন বা অন্য সন্তানের তুলনায় তাকে বেশি কিছু দেন, তাহলে অপর সন্তানের মনে হিংসা, ঘৃণা এবং হতাশার জন্ম নিতে পারে। এটি শুধু পারিবারিক সম্পর্ককেই ক্ষতিগ্রস্ত করে না, বরং সামাজিক বিশৃঙ্খলাও সৃষ্টি করতে পারে।

১. ইনসাফ করা আল্লাহ নির্দেশনা:

কুরআনে সরাসরি সন্তানদের মধ্যে সমতা বিধানের বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট আয়াত নেই। তবে, কুরআন ন্যায়বিচার এবং সমতার নীতির ওপর ব্যাপক গুরুত্ব আরোপ করে। আল্লাহ তাআলা বলেছেন-

اِنَّ اللّٰہَ یَاۡمُرُ بِالۡعَدۡلِ وَالۡاِحۡسَانِ وَاِیۡتَآیِٔ ذِی الۡقُرۡبٰی وَیَنۡہٰی عَنِ الۡفَحۡشَآءِ وَالۡمُنۡکَرِ وَالۡبَغۡیِ ۚ یَعِظُکُمۡ لَعَلَّکُمۡ تَذَکَّرُوۡنَ

নিশ্চয় আল্লাহ ইনসাফ, সদাচার ও নিকট আত্মীয়দের দান করার আদেশ দেন এবং তিনি আশ্লীলতা, মন্দ কাজ ও সীমালঙ্ঘন থেকে নিষেধ করেন। তিনি তোমাদেরকে উপদেশ দেন, যাতে তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর। সূরা নাহল : ৯০

এই আয়াতটি বাবা-মায়ের জন্যও প্রযোজ্য। সন্তানদের মধ্যে ন্যায়বিচার ও সমতা বজায় রাখা এই আয়াতের নির্দেশনার একটি অংশ।

২. সন্তানদের মাঝে ইনসাফ করা

আমির (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নু‘মান ইবনু বাশীর (রাঃ)-কে মিম্বরের উপর বলতে শুনেছি যে, আমার পিতা আমাকে কিছু দান করেছিলেন। তখন (আমার মাতা) আমরা বিনতে রাওয়াহা (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে সাক্ষী রাখা ব্যতীত সম্মত নই। তখন তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট আসলেন এবং বললেন, আমরা বিনতে রাওয়াহার গর্ভজাত আমার পুত্রকে কিছু দান করেছি। হে আল্লাহর রাসূল! আপনাকে সাক্ষী রাখার জন্য সে আমাকে বলেছে। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার সব ছেলেকেই কি এ রকম করেছ? তিনি বললেন, না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তবে আল্লাহকে ভয় কর এবং আপন সন্তানদের মাঝে সমতা রক্ষা কর। নু‘মান (রাঃ) বলেন, অতঃপর তিনি ফিরে গেলেন এবং তার দান ফিরিয়ে নিলেন। সহিহ বুখারি : ২৫৮৭, সহহি মুসলিম : ১৬২৩, আহমাদ : ১৮৩৮৬

এই হাদিস থেকে স্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে, সন্তানদের প্রতি ইনসাফ বা ন্যায়বিচার করা প্রতিটি মুসলিম বাবা-মায়ের জন্য বাধ্যতামূলক। এটি আল্লাহর নির্দেশ এবং তা মেনে চলা আমাদের জন্য জরুরি।

যেসব বিষয়ে সন্তানদের সমতা সমতা আবশ্যক

১. আর্থিক বিষয়ে:

দান, উপহার, সম্পত্তি বণ্টন এবং অন্যান্য আর্থিক সুবিধা প্রদানের ক্ষেত্রে সব সন্তানের মধ্যে সমতা বজায় রাখা আবশ্যক। এক সন্তানকে বেশি দেওয়া এবং অন্যকে কম দেওয়া উচিত নয়। তবে, যদি কোনো সন্তানের বিশেষ প্রয়োজন থাকে (যেমন: চিকিৎসার খরচ), তাহলে সে ক্ষেত্রে অতিরিক্ত খরচ করা যেতে পারে।

২. ব্যবহার ও ভালোবাসায়:

শারীরিক, মানসিক এবং আবেগিক দিক থেকে সন্তানদের প্রতি সমান ভালোবাসা ও যত্ন দেওয়া বাবা-মায়ের দায়িত্ব। কাউকে বেশি ভালোবাসা, প্রশংসা করা বা কারো প্রতি বেশি মনোযোগ দেওয়া অন্য সন্তানের মনে কষ্ট দিতে পারে।

৩. শিক্ষায়:

সন্তানদের মধ্যে শিক্ষার সুযোগ প্রদানের ক্ষেত্রে সমতা বজায় রাখা উচিত। ছেলে ও মেয়ে উভয়ের জন্য সমান শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা ইসলামের নীতি।

ব্যতিক্রম

কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে সমতা না রেখেও তা জায়েজ হতে পারে। যদি কোনো সন্তানের শারীরিক বা মানসিক অসুস্থতা থাকে, তাহলে তার জন্য অতিরিক্ত খরচ করা যেতে পারে। তবে এই ধরনের বিশেষ পরিস্থিতি ব্যতীত অন্য সব ক্ষেত্রে সমানভাবে আচরণ করা আবশ্যক।

এতিম সন্তানকে প্রতিষ্ঠিত করা

এতিম বা পিতৃহীন সন্তানকে প্রতিষ্ঠিত করা বাবা-মায়ের, বিশেষ করে মায়ের, একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। ইসলামে এই দায়িত্বের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে, কারণ এতিমদের যত্ন নেওয়া এবং তাদের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা একটি মহৎ কাজ। নিচে এই দায়িত্বের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করা হলো।

১. এতিমের সম্পদ রক্ষা:

কুরআন মাজিদ এতিমদের অধিকার এবং তাদের প্রতি দায়িত্ব পালনের বিষয়ে একাধিক আয়াতে নির্দেশ দিয়েছে। আল্লাহ তাআলা এতিমদের সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণ এবং তাদের যথাযথ লালন-পালনের কথা বলেছেন। কুরআনে বলা হয়েছে:

وَآتُوا الْيَتَامَىٰ أَمْوَالَهُمْ وَلَا تَتَبَدَّلُوا الْخَبِيثَ بِالطَّيِّبِ ۖ وَلَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَهُمْ إِلَىٰ أَمْوَالِكُمْ ۚ إِنَّهُ كَانَ حُوبًا كَبِيرًا

“আর তোমরা এতিমদের তাদের ধন-সম্পদ ফিরিয়ে দাও এবং ভালো জিনিসের সাথে খারাপ জিনিসের বদল করো না। আর তোমাদের সম্পদের সাথে তাদের সম্পদ মিশিয়ে ভক্ষণ করো না। নিশ্চয়ই এটা গুরুতর অপরাধ।” সূরা নিসা: ২

এই আয়াতে আল্লাহ এতিমের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করা থেকে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। মা হিসেবে, এতিম সন্তানের সম্পদকে তার নিজের সম্পদ মনে করে সংরক্ষণ করা এবং তার কল্যাণে ব্যবহার করা দায়িত্ব।

২. এতিমের প্রতি দয়া ও সদাচরণ:

আল্লাহ তাআলা এতিমদের প্রতি দয়া ও কোমলতা প্রদর্শনের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন-

فَأَمَّا الْيَتِيمَ فَلَا تَقْهَرْ

“সুতরাং তুমি এতিমের প্রতি কঠোর হয়ো না।” সূরা আদ-দুহা: ৯

এই আয়াতে এতিম সন্তানের প্রতি ভালোবাসা, সহানুভূতি এবং সদয় আচরণের গুরুত্ব ফুটে ওঠে। বাবা-মা (বা অভিভাবক) হিসেবে সন্তানের মানসিক ও আবেগিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।

হাদিসের নির্দেশনা

১. জান্নাতে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর নৈকট্য লাভ:

নবি ﷺ এতিমদের যত্ন নেওয়াকে অনেক ফজিলতপূর্ণ কাজ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি নিজে এতিম ছিলেন, তাই তিনি এতিমদের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিতেন।

সাহল (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমি ও ইয়াতীমের প্রতিপালনকারী জান্নাতে এমনিভাবে নিকটে থাকবে। এই বলে তিনি শাহাদাত ও মধ্যমা আঙ্গুল দু’টি দ্বারা ইঙ্গিত করলেন এবং এ দু’টির মাঝে কিঞ্চিত ফাঁক রাখলেন। সহিহ বুখারি : ৫৩০৪, ৬০০৫

এই হাদিসটি এতিমের দায়িত্ব পালনের জন্য একটি বিশাল অনুপ্রেরণা। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, পিতৃহীন সন্তানকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য বাবা-মায়ের প্রচেষ্টা আল্লাহর কাছে কতটা প্রিয়।

২. এতিমের দায়িত্ব ও কর্তব্য:

আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ মুসলিমদের ঘরসমূহের মধ্যে যে ঘরে ইয়াতীম থাকে এবং তার সাথে সদয় ব্যবহার করা হয়, সেই ঘরই সর্বোত্তম। পক্ষান্তরে মুসলিমদের ঘরসমূহের মধ্যে যে ঘরে ইয়াতীম থাকে এবং তার সাথে নির্দয় ব্যবহার করা হয়, সেই ঘরই সর্বাধিক নিকৃষ্ট। সুনানে ইবন মাজাহ : ৩৬৭৯

এই হাদিসটি পরিষ্কার করে যে, পিতৃহীন সন্তানকে শারীরিক ও মানসিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করা, তাকে শিক্ষিত করা এবং জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় সকল দক্ষতা অর্জনে সহায়তা করা বাবা-মায়ের কর্তব্য।

পিতৃহীন সন্তানকে প্রতিষ্ঠিত করা একটি মহান আমানত। মা হিসেবে এই দায়িত্ব পালন করা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ ও সওয়াবের কাজ। কুরআন ও হাদিস উভয়ই এই দায়িত্বের ওপর গুরুত্বারোপ করে। এই দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে শুধু সন্তানের ইহকালীন কল্যাণই নিশ্চিত হয় না, বরং পরকালীন জীবনেও আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি ও জান্নাতের সর্বোচ্চ মর্যাদা লাভ করা সম্ভব হয়।

প্রতিবন্ধী সন্তান সাথে উত্তম ব্যবহার করা

প্রতিবন্ধী সন্তানের সাথে উত্তম ব্যবহার করা এবং তাদের যত্ন নেওয়া বাবা-মায়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। ইসলামে এই বিষয়ে বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে, কারণ এটি মানবতাকে সম্মান জানানো এবং দুর্বলদের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শনের একটি অংশ। কুরআন ও হাদিসের আলোকে এই দায়িত্বের গুরুত্ব নিচে তুলে ধরা হলো।

কুরআন মাজিদে সরাসরি প্রতিবন্ধী সন্তানের বিষয়ে নির্দিষ্ট করে কোনো আয়াত না থাকলেও, আল্লাহ তাআলা সার্বিকভাবে দুর্বল, অসহায় এবং শারীরিক বা মানসিকভাবে অক্ষম ব্যক্তিদের প্রতি দয়া ও ভালোবাসা প্রদর্শনের নির্দেশ দিয়েছেন।

১. দুর্বলদের প্রতি দয়া ও সম্মান:

আল্লাহ তাআলা মানুষকে সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে মর্যাদা দিয়েছেন এবং এই মর্যাদা সবার জন্য সমান। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরাও এই মর্যাদার অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ বলেছেন-

وَلَقَدۡ کَرَّمۡنَا بَنِیۡۤ اٰدَمَ وَحَمَلۡنٰہُمۡ فِی الۡبَرِّ وَالۡبَحۡرِ وَرَزَقۡنٰہُمۡ مِّنَ الطَّیِّبٰتِ وَفَضَّلۡنٰہُمۡ عَلٰی کَثِیۡرٍ مِّمَّنۡ خَلَقۡنَا تَفۡضِیۡلًا 

আর আমি তো আদম সন্তানদের সম্মানিত করেছি এবং আমি তাদেরকে স্থলে ও সমুদ্রে বাহন দিয়েছি এবং তাদেরকে দিয়েছি উত্তম রিয্ক। আর আমি যা সৃষ্টি করেছি তাদের থেকে অনেকের উপর আমি তাদেরকে অনেক মর্যাদা দিয়েছি। সূরা আল-ইসরা: ৭০

এই আয়াতটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, প্রত্যেক মানুষের মধ্যে আল্লাহর সম্মানিত। তাই কোনো শারীরিক বা মানসিক সীমাবদ্ধতা কাউকে অসম্মানিত করে না। বাবা-মায়ের উচিত তাদের প্রতিবন্ধী সন্তানের প্রতি ভালোবাসা, সম্মান ও দয়া প্রদর্শন করা, কারণ আল্লাহ তাদের এমন অবস্থায় রেখেছেন।

২. আল্লাহর পরীক্ষা ও ধৈর্য:

আল্লাহ তাআলা মানুষকে বিভিন্নভাবে পরীক্ষা করেন, যার মধ্যে শারীরিক বা মানসিক প্রতিবন্ধী সন্তান দান করাও একটি পরীক্ষা। আল্লাহ বলেছেন-

وَلَنَبۡلُوَنَّکُمۡ بِشَیۡءٍ مِّنَ الۡخَوۡفِ وَالۡجُوۡعِ وَنَقۡصٍ مِّنَ الۡاَمۡوَالِ وَالۡاَنۡفُسِ وَالثَّمَرٰتِ ؕ  وَبَشِّرِ الصّٰبِرِیۡنَ ۙ

আর আমি অবশ্যই তোমাদেরকে পরীক্ষা করব কিছু ভয়, ক্ষুধা এবং জান-মাল ও ফল-ফলাদির স্বল্পতার মাধ্যমে। আর তুমি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও। সূরা বাকারা: ১৫৫

প্রতিবন্ধী সন্তানের যত্ন নেওয়া ধৈর্যের একটি বড় পরীক্ষা। বাবা-মায়ের উচিত ধৈর্য ধারণ করা এবং সন্তানের প্রতি দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট থাকা। আল্লাহ ধৈর্যশীলদের জন্য মহাপুরস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

৩. প্রতিবন্ধীকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি:

আল্লাহ বলেন—

لَیۡسَ عَلَی الۡاَعۡمٰی حَرَجٌ وَّلَا عَلَی الۡاَعۡرَجِ حَرَجٌ وَّلَا عَلَی الۡمَرِیۡضِ حَرَجٌ

অন্ধের জন্য কোন দোষ নেই, পঙ্গুর জন্য কোন দোষ নেই, রোগাক্রান্তের জন্য কোন দোষ নেই এবং তোমাদের নিজদের জন্যও কোন দোষ নেই। সূরা নূর: ৬১

এখানে প্রতিবন্ধীদের প্রতি দয়া ও সহনশীলতার শিক্ষা রয়েছে।

১. দুর্বলদের জন্য দোয়া ও ভালোবাসা:

রাসুলুল্লাহ ﷺ দুর্বল ও অক্ষম মানুষের প্রতি বিশেষভাবে সহানুভূতিশীল ছিলেন। তিনি সাহাবিদেরকে সর্বদা তাদের প্রতি উত্তম আচরণ করার উপদেশ দিতেন।

জুবায়র ইবনু নুফাইল আল-হাদরামী (রহঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি আবূ দারদা (রাঃ)-কে বলতে শুনেছেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছিঃ তোমরা দুর্বল লোকদের খোঁজ করে আমার কাছে নিয়ে এসো। কেননা তোমরা তোমাদের মধ্যকার দুর্বল লোকদের ওয়াসিলায় রিযিক এবং সাহায্য প্রাপ্ত হয়ে থাকো। সুনানে আবু দাউদ : ২৫৯৪

এই হাদিসটি বাবা-মায়ের জন্য এক বার্তা যে, তাদের দুর্বল সন্তানের প্রতি যত্নশীল হওয়া তাদের দুনিয়া ও আখিরাতে কল্যাণের কারণ হবে।

২. শারীরিক আঘাত থেকে বিরত থাকা:

ইসলামে যেকোনো ধরনের শারীরিক আঘাত থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে, বিশেষ করে যারা নিজেদের রক্ষা করতে অক্ষম তাদের ক্ষেত্রে। বাবা-মায়ের উচিত তাদের প্রতিবন্ধী সন্তানকে কোনো ধরনের শারীরিক বা মানসিক আঘাত দেওয়া থেকে বিরত থাকা। প্রতিবন্ধী সন্তানরা ছোটদের মতো, তাদের প্রতি বিশেষ দয়া ও ভালোবাসার প্রয়োজন।

৩. মানসিক যত্ন ও উৎসাহ:

শারীরিক যত্নের পাশাপাশি তাদের মানসিক যত্ন নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। তাদের প্রতি কোনো ধরনের অবজ্ঞা বা তাচ্ছিল্য করা উচিত নয়। বরং তাদের দক্ষতা ও সামর্থ্যের ভিত্তিতে তাদের উৎসাহিত করা উচিত। রাসুলুল্লাহ ﷺ সর্বদাই তার আশেপাশের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রতি সহানুভূতিশীল ও শ্রদ্ধাশীল ছিলেন।

প্রতিবন্ধী সন্তানের সাথে উত্তম ব্যবহার করা বাবা-মায়ের একটি মানবিক এবং ধর্মীয় দায়িত্ব। এই দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে বাবা-মায়ের ধৈর্য, ত্যাগ এবং আল্লাহর প্রতি তাদের বিশ্বাস প্রতিফলিত হয়। কুরআন ও হাদিসের আলোকে এটা স্পষ্ট যে, প্রতিবন্ধী সন্তানরা আল্লাহর এক বিশেষ আমানত এবং তাদের যত্ন নেওয়া, তাদের ভালোবাসা ও সম্মান করা, এবং তাদের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রতিটি মুসলিম বাবা-মায়ের জন্য এক মহৎ ইবাদত।

সন্তানদেরকে ঘরের কাজকর্মে অভ্যস্ত করা

ইসলাম সন্তানদেরকে ঘরের কাজকর্মে অভ্যস্ত করার বিষয়ে উৎসাহিত করে। এটি কেবল পারিবারিক দায়িত্ববোধ তৈরি করে না, বরং এটি নৈতিক ও চারিত্রিক গুণাবলীরও অংশ। সরাসরি নির্দেশ না থাকলেও, কুরআন ও হাদিসের শিক্ষা থেকে এই অভ্যাসের গুরুত্ব বোঝা যায়।

ঘরের কাজকর্মে সন্তানদের অভ্যস্ত করার বিষয়টি মূলত নৈতিক শিক্ষা, পারস্পরিক সহযোগিতা ও বিনয়ের ইসলামী মূলনীতিগুলোর ওপর প্রতিষ্ঠিত। কুরআন ও হাদিসে সাধারণভাবে একে অপরের প্রতি সহযোগিতার গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ঘরের কাজও এর বাইরে নয়। আল্লাহ্ তা’আলা বলেন,

وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَىٰ وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ

তোমরা সৎকর্ম ও আল্লাহভীতির ব্যাপারে একে অপরের সহযোগিতা করো, এবং পাপ ও সীমালঙ্ঘনের ব্যাপারে একে অপরের সহযোগিতা করো না।” সূরা মায়েদা : ২

যদিও আয়াতটি ব্যাপক অর্থে, তবে এর একটি ক্ষুদ্র প্রয়োগ হলো পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ঘরের কাজে সহযোগিতা করা, যা একটি ‘সৎকর্ম’ (বিরর)।

আসওয়াদ (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ’আয়িশাহ (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলামঃ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ গৃহে কী কাজ করতেন? তিনি বললেনঃ তিনি পারিবারিক কাজ-কর্মে ব্যস্ত থাকতেন। যখন সালাতের সময় উপস্থিত হত, তখন উঠে সালাতে চলে যেতেন। সহিহ বুখারি : ৬৭৬, ৬০৩৯

নবীজীর এই আদর্শ (সুন্নাহ) আমাদের শেখায় যে ঘরের কাজ করা কোনো অসম্মানের কাজ নয়; বরং এটি বিনয় ও সহযোগিতার পরিচায়ক। সন্তানদের জন্য এটি একটি উত্তম উদাহরণ।

আল্লাহ্ তা’আলা মা-বাবার প্রতি সদ্ব্যবহারের (ইহসান) নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ্ বলেন-

وَقَضَىٰ رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا

আর তোমার প্রতিপালক আদেশ করেছেন যে, তোমরা তাঁকে ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করো না এবং তোমরা মা-বাবার প্রতি সদ্ব্যবহার করো।” সূরা ইসরা : ২৩

ইসলামী শিক্ষা অনুযায়ী, সন্তানদেরকে ঘরের কাজকর্মে অভ্যস্ত করা একটি গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক প্রশিক্ষণ। এর মাধ্যমে তাদের মধ্যে দায়িত্ববোধ, বিনয়, সহযোগিতা, এবং মা-বাবার প্রতি ইহসান ও সেবা করার গুণাবলী তৈরি হয়, যা তাদেরকে সমাজের একজন দায়িত্বশীল সদস্য হিসেবে গড়ে তোলে। এই অভ্যাস গড়ে তোলা রাসূল ﷺ-এর সুন্নাহ ও কুরআনের ব্যাপক শিক্ষা, বিশেষত পারস্পরিক সহযোগিতা ও মা-বাবার প্রতি সদ্ব্যবহারের নির্দেশের অন্তর্ভুক্ত।

সন্তানের অধিকার : দ্বিতীয় পর্ব

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

সন্তানকে অভিশাপ না দেয়া

সন্তানকে অভিশাপ বা বদদোয়া দেওয়া থেকে বিরত থাকা ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক শিক্ষা। কুরআন ও হাদিসে এ বিষয়ে সরাসরি নিষেধ এবং এর ক্ষতিকর দিকগুলো তুলে ধরা হয়েছে। এটি মূলত ধৈর্য, সংযম এবং আল্লাহর ওপর ভরসার নীতি থেকে এসেছে। কুরআন ও হাদিসের আলোকে সন্তানদের অভিশাপ না দেওয়ার গুরুত্ব সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে। বদদুআ না করার সবচেয়ে বড় কারণ হলো, মা-বাবার মুখ থেকে বের হওয়া বদদোয়া বা অভিশাপ আল্লাহর কাছে দ্রুত কবুল হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।  সলাম এই বিষয়ে বিশেষভাবে সতর্ক করেছে।

জাবির ইবনু ’আবদুল্লাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা নিজেদেরকে বদ্দু’আ করো না, তোমাদের সন্তানদের বদ্দু’আ করো না, তোমাদের খাদিমদের বদ্দু’আ করো না এবং তোমাদের ধন-সম্পদের উপরও বদ্দু’আ করো না। কেননা ঐ সময়টি আল্লাহর পক্ষ হতে কবুলের মুহূর্তও হতে পারে, ফলে তা কবুল হয়ে যাবে। সুনানে আবু দাউদ : ১৫৩২

এই হাদিসটি স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে, রাগের মাথায় বা হতাশাগ্রস্ত হয়ে সন্তানকে বদদোয়া দেওয়া উচিত নয়। কারণ, এমন এক সময় বা পরিস্থিতি আসতে পারে যখন আল্লাহর পক্ষ থেকে সেই দোয়া কবুল করে নেওয়া হতে পারে, ফলে সন্তানের বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে যেতে পারে।

কুরআন ও হাদিসে সন্তান প্রতিপালনের দায়িত্বকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আমানত হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। সন্তানের কল্যাণ ও সঠিক পথে পরিচালনা করাই মা-বাবার প্রধান কর্তব্য। অভিশাপ দেওয়া এই কর্তব্যের পরিপন্থী। মা-বাবার জন্য কুরআনে দোয়া করার শিক্ষা: সন্তানদের জন্য মা-বাবার উচিত সবসময় নবী-রাসূলদের (আঃ) দোয়ার অনুসরণ করা। আল্লাহ্ তা’আলা ইবরাহীম (আঃ)-এর দোয়া উল্লেখ করে বলেন-

رَبِّ اجْعَلْنِي مُقِيمَ الصَّلَاةِ وَمِن ذُرِّيَّتِي رَبَّنَا وَتَقَبَّلْ دُعَاءِ

হে আমার প্রতিপালক, আমাকে নামাজ কায়েমকারী করো এবং আমার বংশধরদের মধ্য থেকেও। হে আমাদের প্রতিপালক, আমার দোয়া কবুল করো। সূরা ইবরাহীম : ৪০

এই আয়াত শেখায় যে, সন্তানের জন্য সবসময় কল্যাণ, হেদায়েত এবং সফলতার দোয়া করা উচিত।

উপসংহার :  ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে, সন্তানকে অভিশাপ দেওয়া একটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও নিন্দনীয় কাজ। এর প্রধান কারণ হলো বদদোয়া কবুল হয়ে যাওয়ার ভয়। এর পরিবর্তে মা-বাবার উচিত রাগ, হতাশা বা কষ্টের সময় ধৈর্য ধারণ করা, আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়া এবং সন্তানের সুস্থতা, সফলতা ও হেদায়েতের জন্য দোয়া করা। কারণ, মা-বাবার দোয়া সন্তানের জীবনে সবচেয়ে বড় বরকত আনতে পারে।

সন্তানদের প্রতি আজেবাজে মন্তব্য না করা

সন্তানদের সঠিক পন্থায় শাসন করা এবং তাদের প্রতি আজেবাজে মন্তব্য বা খারাপ ভাষা ব্যবহার থেকে বিরত থাকা মা-বাবার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। ইসলাম এই ক্ষেত্রে ভারসাম্য ও কোমলতার ওপর জোর দিয়েছে। ইসলামী শিক্ষা অনুযায়ী, সন্তানের প্রতি মা-বাবার দায়িত্ব শুধু ভরণপোষণ নয়, বরং তাদের উত্তম চারিত্রিক ও নৈতিক গঠনে সহায়তা করা।

ইসলাম সবসময়ই ভালো কথা বলতে উৎসাহ দেয় এবং মন্দ কথা, গালি বা কটু মন্তব্য থেকে বিরত থাকতে নির্দেশ করে। সন্তানের ক্ষেত্রে এটি আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ মা-বাবার কথা সন্তানের মনে গভীর প্রভাব ফেলে। আল্লাহ্ তা’আলা মুমিনদেরকে সর্বদা সুন্দর ও উত্তম কথা বলার নির্দেশ দিয়েছেন-

وَقُلۡ لِّعِبَادِیۡ یَقُوۡلُوا الَّتِیۡ ہِیَ اَحۡسَنُ ؕ اِنَّ الشَّیۡطٰنَ یَنۡزَغُ بَیۡنَہُمۡ ؕ اِنَّ الشَّیۡطٰنَ کَانَ لِلۡاِنۡسَانِ عَدُوًّا مُّبِیۡنًا

আর আমার বান্দাদেরকে বল, তারা যেন এমন কথা বলে, যা অতি সুন্দর। নিশ্চয় শয়তান তাদের মধ্যে বৈরিতা সৃষ্টি করে; নিশ্চয় শয়তান মানুষের স্পষ্ট শত্রু। সূরা ইসরা : ৫৩

এই নির্দেশনা সন্তানের সাথে কথা বলার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। সন্তানের প্রতি কটু বা আজেবাজে মন্তব্য তাদের আত্মবিশ্বাস নষ্ট করে, মানসিক কষ্ট দেয় এবং মা-বাবার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ কমিয়ে দেয়।

নবী ﷺ নিজে কখনোই কাউকে গালি দেননি, কটু কথা বলেননি বা অভিশাপ দেননি। তাঁর কোমল আচরণ ও উত্তম ভাষা ছিল সর্বজনীন। তিনি শিশুদের প্রতি অত্যন্ত স্নেহশীল ছিলেন। সন্তানদের প্রতি কটূক্তি বা খারাপ মন্তব্য করা তাঁর আদর্শের সম্পূর্ণ পরিপন্থী।

সন্তানদের প্রতি আজেবাজে মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকা এবং শাসনকালে ধৈর্য ও কোমলতা অবলম্বন করা মা-বাবার জন্য একটি নৈতিক ও ঈমানী দায়িত্ব। কটু মন্তব্য সন্তানের মনে স্থায়ী ক্ষত সৃষ্টি করতে পারে। এর পরিবর্তে, মা-বাবার উচিত নবী (ﷺ)-এর আদর্শ অনুসরণ করে, স্নেহ ও হিকমতের সাথে ভুল ধরিয়ে দেওয়া এবং সবসময় তাদের জন্য কল্যাণ ও হেদায়েতের দোয়া করা।

সন্তনকে নির্ভুল জ্ঞান অর্জনে সহায়তা কর

সন্তানকে নির্ভুল জ্ঞান অর্জনে সহায়তা করা মা-বাবার অন্যতম শ্রেষ্ঠ দায়িত্ব। ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে, এই “নির্ভুল জ্ঞান” হলো সেই জ্ঞান, যা মানুষকে আল্লাহর পরিচয়, তাঁর উদ্দেশ্য এবং জীবন পরিচালনার সঠিক পদ্ধতি সম্পর্কে অবহিত করে। কুরআন ও হাদিস এই কাজের গুরুত্বকে অত্যন্ত জোরালোভাবে তুলে ধরেছে।

১. জ্ঞানের গুরুত্ব ও সন্তানের অধিকার

ইসলামে জ্ঞানার্জন একটি মৌলিক ইবাদত এবং প্রত্যেক মুসলিমের ওপর ফরয বা অবশ্য কর্তব্য। সন্তানকে নির্ভুল জ্ঞান অর্জনে সহায়তা করা এই সাধারণ নির্দেশেরই অংশ।

আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলিমের উপর ফারয। অপাত্রে জ্ঞান দানকারী শুকরের গলায় মণিমুক্তা ও সোনার হার পরানো ব্যাক্তির সমতুল্য। সুনানে ইবনে মাজাহ : ২২৪, মিশকাত : ২১৮

মা-বাবার দায়িত্ব হলো সন্তানের জন্য সেই পথ সহজ করে দেওয়া, যাতে সে এই ফরয আদায় করতে পারে।

২. নির্ভুল জ্ঞানের ভিত্তি  হলো, কুরআন ও সুন্নাহ

“নির্ভুল জ্ঞান” অর্জনে সহায়তা করার অর্থ হলো, সন্তানকে এমন উৎস থেকে জ্ঞান দিতে হবে, যা সন্দেহমুক্ত এবং সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত। এই উৎসের মূল ভিত্তি হলো কুরআন ও সুন্নাহ।

কুরআন হলো মানবজাতির জন্য সত্যের আলো এবং পথনির্দেশ। মা-বাবার প্রথম দায়িত্ব হলো সন্তানকে কুরআনের অর্থ, শিক্ষা এবং এর নৈতিক মূল্যবোধ বুঝতে সাহায্য করা। আল্লাহ্ তা’আলা বলেন-

كِتَابٌ أَنزَلْنَاهُ إِلَيْكَ مُبَارَكٌ لِّيَدَّبَّرُوا آيَاتِهِ وَلِيَتَذَكَّرَ أُولُو الْأَلْبَابِ

“এটি এক বরকতময় কিতাব, যা আমি আপনার প্রতি নাযিল করেছি, যাতে মানুষ এর আয়াতসমূহ অনুধাবন করে এবং বুদ্ধিমান লোকেরা উপদেশ গ্রহণ করে। সূরা সাদ : ২৯

রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ)-এর সুন্নাহ হলো কুরআনের ব্যবহারিক ব্যাখ্যা। নির্ভুল জ্ঞান হলো সেটাই, যা সুন্নাহর আলোকে প্রমাণিত। সন্তানকে সুন্নাহ অনুযায়ী জীবন পরিচালনার প্রশিক্ষণ দেওয়াই হলো সঠিক জ্ঞান অর্জনে সহায়তা করা।

নির্ভুল জ্ঞান অর্জনে সহায়তার অর্থ হলো, সন্তানকে এমন পরিবেশে লালন করা, যেখানে সে সততা, দায়িত্বশীলতা ও আল্লাহর ভয় নিয়ে জ্ঞান অর্জন করতে পারে। মা-বাবা সন্তানদেরকে সৎ ও জ্ঞানী লোকদের সংস্পর্শে রাখতে উৎসাহিত করবেন, যাতে তারা ভুল ধারণা বা খারাপ অভ্যাস থেকে দূরে থাকে।

সন্তান যেন এমন জ্ঞান অর্জন করে যা পরকালে কাজে লাগে, সেজন্য মা-বাবার সর্বদা দোয়া করা উচিত। ৯২৫। উম্মু সালামাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফজরের সালাত পড়ে সালাম ফিরিয়ে বলতেন-

اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ عِلْمًا نَافِعًا وَرِزْقًا طَيِّبًا وَعَمَلاً مُتَقَبَّلاً

আল্লাহ্! আমি আপনার কাছে উপকারী জ্ঞান, পবিত্র রিযিক ও এবং কবূল হওয়ার যোগ্য কর্মতৎপরতা প্রার্থনা করি। সুনানে ইবনে মাজাহ : ৯২৫, আহমাদ : ২৫৯৮২, ২৬০৬২, ২৬১৬০, ২৬১৯১

অতএব, সন্তানকে নির্ভুল জ্ঞানার্জনে সহায়তা করা হলো তাদের প্রথমত দ্বীনী জ্ঞান ও নৈতিকতার সঠিক পথ দেখানো এবং দ্বিতীয়ত, জাগতিক জ্ঞানে এমনভাবে শিক্ষিত করা যাতে তারা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারে এবং সমাজে কল্যাণকর ভূমিকা রাখতে পারে।

রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর চরিত্রকে মডেল হিসেবে তুলে ধরা

নিঃসন্দেহে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর চরিত্রকে মডেল হিসেবে গ্রহণ করে সন্তান প্রতিপালন করাই একজন মুসলিমের জন্য সবচেয়ে উত্তম ও সফল পথ। আল্লাহ তা’আলা তাঁকে আমাদের জন্য উসওয়াতুন হাসানা বা উত্তম আদর্শ হিসেবে প্রেরণ করেছেন। কুরআন ও হাদিসের আলোকে এই বিষয়টি বিস্তারিতভাবে নিচে তুলে ধরা হলো:

১. রাসূল (সাঃ)-এর আদর্শ অনুসরণের নির্দেশ

পিতা-মাতা হিসেবে আমাদের প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব হলো আল্লাহর নির্দেশ মানা। আর আল্লাহ তা’আলা তাঁর রাসূলের আদর্শ অনুসরণের স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ তা’আলা বলেন-

لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ

“নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসূলের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ। সূরা আহযাব :২১

এই আয়াতে আল্লাহ্‌র রাসূল (সাঃ)-কে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে অনুসরণীয় মডেল হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে, যার মধ্যে সন্তান প্রতিপালনও অন্তর্ভুক্ত।

আইউব ইবনু মূসা (রহঃ) হতে পর্যায়ক্রমে তার পিতা ও দাদার সূত্রে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কোন পিতা তার সন্তানকে উত্তম শিষ্টাচার শিক্ষা দেয়ার চেয়ে বেশী উত্তম কোন জিনিস দিতে পারে না। সুনানে তিরমিজি : ১৯৫২

২. সন্তানকে সুস্থভাবে বড় করার দিকনির্দেশনা

কুরআন বারবার শিক্ষা দিয়েছে—

সন্তানদেরকে নামায শিখানো (সূরা ত্বা-হা : ১৩২

সন্তানদেরকে শিরক থেকে বাঁচানো সূরা লুকমান : ১৩

আদব-আখলাক শেখানো সূরা লুকমান : ১৮-১৯

৩. সন্তান প্রতিপালনে রাসূল (সাঃ)-এর চরিত্রের মূল দিকসমূহ

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তাঁর সন্তানদের প্রতি এবং সাহাবীদের সন্তানদের প্রতি যে আচরণ করেছেন, তা ছিল স্নেহ, ধৈর্য, কোমলতা, এবং নৈতিক শিক্ষার এক অপূর্ব সমন্বয়। এই গুণাবলী অনুসরণ করে আমরা আমাদের সন্তানদের আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারি। যেমন-

সন্তানের প্রতি ভালোবাসা শুধু আবেগ নয়, বরং এটি ইবাদতের অংশ। রাসূল (সাঃ) শিশুদেরকে খুবই আদর ও স্নেহ করতেন।

আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তাঁর নাতি হাসান ইবনে আলীকে চুম্বন করেন। তখন এক ব্যক্তি বলল, ‘আমার দশটি পুত্র রয়েছে, আমি তাদের কাউকেও কোনো দিন চুম্বন করিনি।’ রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তার দিকে তাকালেন এবং বললেন, “যে দয়া করে না, সে দয়া পায় না।” সহীহ বুখারী : ৫৯৯৭

আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) বলেন, “রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর চেয়ে পরিবার-পরিজনের প্রতি অধিক দয়াশীল আমি আর কাউকে দেখিনি।” সহীহ ইবনে হিব্বান : ৫৯৫০

সন্তানদের ছোটখাটো ভুল বা দুষ্টুমি ক্ষমা করা এবং কঠোরতা পরিহার করে নম্রতার সাথে বোঝানো রাসূল (সাঃ)-এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল।

আয়িশাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী (সাঃ) বলেছেন-

إِنَّ الرِّفْقَ لَا يَكُونُ فِي شَيْءٍ إِلَّا زَانَهُ وَلَا يُنْزَعُ مِنْ شَيْءٍ إِلَّا شَانَهُ

“নিশ্চয়ই নম্রতা যে কোনো বিষয়কে সৌন্দর্যমণ্ডিত করে। আর যে কোনো বিষয় থেকে নম্রতা বিদূরিত হলে তা কলুষিত করে।” সহীহ মুসলিম : ২৫৯৪

সন্তানকে শাসন ও শিক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে কঠোরতা নয়, বরং কোমলতা ও স্নেহই ইসলামের শিক্ষা।

আনাস (রাঃ) যিনি দশ বছর রাসূল (সাঃ)-এর খেদমত করেছেন, তিনি বলেন: “তিনি কখনও আমাকে ‘উফ’ (বিরক্তিসূচক শব্দ) বলেননি এবং এ কাজ কেন করেছ বা ও কাজ কেন করনি, এমন কথাও কোনো দিন বলেননি।” সহীহ মুসলিম : ২৩০৯

৪. আদবের শিক্ষা:

২৫১৬। ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, কোন এক সময় আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর পিছনে ছিলাম। তিনি বললেনঃ হে তরুণ! আমি তোমাকে কয়েকটি কথা শিখিয়ে দিচ্ছি- তুমি আল্লাহ্ তা’আলার (বিধি-নিষেধের) রক্ষা করবে, আল্লাহ তা’আলা তোমাকে রক্ষা করবেন। তুমি আল্লাহ্ তা’আলার সন্তুষ্টির প্রতি লক্ষ্য রাখবে, আল্লাহ্ তা’আলাকে তুমি কাছে পাবে। তোমার কোন কিছু চাওয়ার প্রয়োজন হলে আল্লাহ তা’আলার নিকট চাও, আর সাহায্য প্রার্থনা করতে হলে আল্লাহ্ তা’আলার নিকটেই কর। আর জেনে রাখো, যদি সকল উন্মাতও তোমার কোন উপকারের উদ্দেশে ঐক্যবদ্ধ হয় তাহলে ততটুকু উপকারই করতে পারবে, যতটুকু আল্লাহ তা’আলা তোমার জন্যে লিখে রেখেছেন। অপরদিকে যদি সকল ক্ষতিই করতে সক্ষম হবে, যতটুকু আল্লাহ্ তা’আলা তোমার তাকদিরে লিখে রেখেছেন। কলম তুলে নেয়া হয়েছে এবং লিখিত কাগজসমূহও শুকিয়ে গেছে। সুনানে তিরমিযী : ২৫১৬, মিশকাত : ৫৩০২

এই হাদিস শিক্ষা দেয় যে, সন্তানকে ছোটবেলা থেকেই ঈমানী চেতনা ও দ্বীনের মৌলিক বিষয়গুলো হাতে-কলমে শেখাতে হবে।

৪৯৫। ’আমর ইবনু শু’আইব (রহঃ) থেকে পর্যায়ক্রমে তার পিতা ও তার দাদার সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের সন্তানদের বয়স সাত বছর হলে তাদেরকে সালাতের জন্য নির্দেশ দাও। যখন তাদের বয়স দশ বছর হয়ে যাবে তখন (সালাত আদায় না করলে) এজন্য তাদেরকে মারবে এবং তাদের ঘুমের বিছানা আলাদা করে দিবে। সুনানে আবু দাউদ : ৪৯৫, আহমাদ : ৬৬৮৯ ,৬৭৫৬,

এটি নির্দেশ করে যে, বয়স অনুযায়ী শৃঙ্খলা ও ইবাদতে অভ্যস্ত করানো রাসূল (সাঃ)-এর আদর্শের একটি অংশ।

উপসংহার : রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর চরিত্রকে মডেল হিসেবে তুলে ধরে সন্তান প্রতিপালন করতে হলে পিতা-মাতাকে প্রথমে নিজেদের জীবনে স্নেহ, কোমলতা, সত্যবাদিতা এবং ধৈর্য-এর মতো গুণাবলী প্রতিষ্ঠা করতে হবে। কারণ, শিশুরা আমাদের কথা নয়, বরং আমাদের আচরণ দেখে শেখে। আল্লাহ তা’আলা আমাদের তাঁর প্রিয় রাসূল (সাঃ)-এর আদর্শে সন্তান প্রতিপালনের তৌফিক দান করুন।

সন্তানদের সালামের অভ্যাস করানো

সন্তানদের মধ্যে ‘সালাম’ বা ইসলামী অভিবাদনের অভ্যাস করানো কেবল একটি ভালো শিক্ষা নয়, বরং মা-বাবার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও সামাজিক দায়িত্ব। সালাম হলো একটি ‘দোয়া’ এবং এটি মুসলিমদের পারস্পরিক ভালোবাসা ও শান্তির প্রতীক। আল্লাহ তা’আলা স্বয়ং সালামকে কল্যাণময় ও পবিত্র অভিবাদন হিসেবে বর্ণনা করেছেন:

১. উত্তম ও কল্যাণময় অভিবাদন

আল্লাহ তা’আলা পবিত্র কুরআনে বলেন:

فَإِذَا دَخَلْتُم بُيُوتًا فَسَلِّمُوا عَلَى أَنفُسِكُمْ تَحِيَّةً مِّنْ عِندِ اللَّهِ مُبَارَكَةً طَيِّبَةً

“যখন তোমরা গৃহে প্রবেশ করবে, তখন তোমরা তোমাদের স্বজনদের প্রতি সালাম বলবে। এটি হবে আল্লাহর নিকট থেকে কল্যাণময় ও পবিত্র অভিবাদন।” সূরা আন-নূর : ৬১

এই আয়াত প্রমাণ করে যে, সালাম মানুষের মনকে প্রশান্ত করে এবং এটি আল্লাহ প্রদত্ত বরকতপূর্ণ একটি প্রথা। এই কল্যাণময় অভ্যাসটি শিশুদের শেখানোর দায়িত্ব মা-বাবার।

২. সালামের জবাবকে উত্তম করার নির্দেশ

সালামের মাধ্যমে শিশুরা যেন অপরকে সম্মান জানাতে এবং বিনিময়ে আরো উত্তম ব্যবহার পেতে শেখে, সে বিষয়ে আল্লাহ তা’আলা নির্দেশ দেন-

وَإِذَا حُيِّيتُم بِتَحِيَّةٍ فَحَيُّوا بِأَحْسَنَ مِنْهَا أَوْ رُدُّوهَا ۗ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ حَسِيبًا

“যখন তোমাদেরকে অভিবাদন (সালাম) করা হয়, তখন তোমরাও তা অপেক্ষা উত্তম অভিবাদন করো অথবা তারই অনুরূপ জবাব দাও। নিশ্চয় আল্লাহ সব বিষয়ে পূর্ণ হিসাব গ্রহণকারী।” সূরা নিসা : ৮৬

এই আয়াতের শিক্ষা হলো— উত্তম আচরণের প্রতিদান উত্তমভাবে দেওয়া। শিশুরা সালামের মাধ্যমে এই সামাজিক শিষ্টাচার ও প্রতিদান দেওয়ার সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত হয়।

৩. সন্তানের ওপর মা-বাবার দায়িত্ব

সালাম শিক্ষা দেওয়া মা-বাবার সাধারণ দায়িত্ব অর্থাৎ সন্তানকে উত্তম আখলাক ও ধর্মীয় রীতিনীতি শেখানোর অন্তর্ভুক্ত। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) সালামকে মুমিনদের পারস্পরিক ভালোবাসা এবং জান্নাতে প্রবেশের পূর্বশর্ত হিসেবে গণ্য করেছেন। সন্তানকে এই অভ্যাস করানো মানেই তাকে ঈমান ও উত্তম সমাজ গঠনের দিকে পরিচালিত করা।

আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ঈমানদার ছাড়া কেউই জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না, আর তোমরা ঈমানদার হতে পারবে না যতক্ষণ না একে অন্যকে ভালোবাসবে। আমি কি তোমাদের তা বলে দিব না, কি করলে তোমাদের মাঝে পারস্পরিক ভালোবাসার সৃষ্টি হবে? তা হলো, তোমরা পরস্পর বেশি সালাম বিনিময় করবে।  সহিহ মুসলিম : ৫৪

৪.. উত্তম ইসলামী কাজের অন্তর্ভুক্ত

১২. ‘আবদুল্লাহ্ ইবনু ‘আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত। জনৈক ব্যক্তি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে জিজ্ঞেস করল, ইসলামের কোন্ জিনিসটি উত্তম? তিনি বললেন, তুমি খাদ্য খাওয়াবে ও চেনা অচেনা সকলকে সালাম দিবে। সহিহ বুখারি : ১২, ২৮, ৬২৩৬, সহিহ মুসলিম : ৪২, আহমাদ : ৬৭৬৫

সালাম প্রচার করা যেহেতু সর্বোত্তম ইসলামী কাজের একটি, তাই শিশুদেরকে এই কাজ শেখানো মা-বাবার অন্যতম দায়িত্ব।

৫. রাসূল (সাঃ)-এর বাস্তব শিক্ষা ও আদর্শ

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) নিজেই ছোটদেরকে সালাম দিতেন। শিশুরা যখন তাদের শিক্ষকের কাছ থেকে সরাসরি এই আচরণ দেখে, তখন তারা তা সহজে গ্রহণ করে।

আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত,

أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم مَرَّ عَلَى غِلْمَانٍ فَسَلَّمَ عَلَيْهِمْ

“রাসূলুল্লাহ (সাঃ) একবার কয়েকটি শিশুর কাছ দিয়ে যাচ্ছিলেন এবং তিনি তাদেরকে সালাম দিলেন।” সহীহ মুসলিম : ২১৬৮

রাসূল (সাঃ)-এর এই আমল মা-বাবাকে শেখায় যে, সালাম শুধু বড়দের জন্য নয়, বরং ছোট-বড় সবার প্রতি প্রযোজ্য। সন্তানেরা যখন দেখবে তাদের বাবা-মা অপরিচিত কিংবা পরিচিত সবাইকে আগে সালাম দিচ্ছে এবং নিজেরাও ছোটদেরকে সালাম দিচ্ছে, তখন তারা সহজেই এই মহৎ অভ্যাসটি গ্রহণ করবে।

৬. সন্তানের সুশিক্ষার আমানত

উমার (রাযি.) হতে বর্ণিত যে, আমি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল, আর তোমরা প্রত্যেকেই তোমাদের দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।” সহীহ বুখারী, : ৮৯৩ হদিসের অংশ বিশেষ।

সন্তান আল্লাহ্‌র পক্ষ থেকে মা-বাবার কাছে একটি আমানত। এই আমানতের হক হলো তাকে দ্বীন ও উত্তম আখলাকের শিক্ষা দেওয়া, যার মধ্যে সালামের অভ্যাস অন্যতম। সালামের মাধ্যমে তাদের চরিত্রে নম্রতা, অহংকারমুক্ত মনোভাব এবং সামাজিক সম্প্রীতির গুণাবলী তৈরি হয়।

সন্তানদের সালামের অভ্যাস করানো মা-বাবার দায়িত্ব— কারণ এটি কেবল একটি অভিবাদন নয়, বরং আল্লাহ্‌র নির্দেশিত উত্তম চরিত্র (আখলাক), পরস্পরের প্রতি দোয়া ও শান্তি কামনা, এবং মুসলিম সমাজে ভালোবাসা প্রতিষ্ঠার একটি মূল ভিত্তি। এই দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে সন্তানের ইহকাল ও পরকাল উভয়ই কল্যাণময় হয়।

সন্তানদেরকে ত্যাগের শিক্ষা দেওয়া

ত্যাগ বা কুরবানির শিক্ষা দেওয়া মা-বাবার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। ইসলামে ‘ত্যাগ’ শব্দটি কেবল অর্থনৈতিক দানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর মাধ্যমে আত্মশুদ্ধি, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং অন্যের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ পায়। কুরআন মাজীদে ত্যাগ, দানশীলতা ও আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করার মাধ্যমে আত্মিক উন্নতি লাভের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

১. আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য প্রিয় বস্তু ত্যাগ

ত্যাগ বা কুরবানি তখনই অর্থবহ হয় যখন মানুষ তার সবচেয়ে প্রিয় জিনিস আল্লাহর পথে উৎসর্গ করে। এই শিক্ষার মাধ্যমে সন্তানদের মধ্যে লোভ নয়, বরং আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা জন্মে। আল্লাহ তা’আলা বলেন-

لَن تَنَالُوا الْبِرَّ حَتَّىٰ تُنفِقُوا مِمَّا تُحِبُّونَ ۚ وَمَا تُنفِقُوا مِن شَيْءٍ فَإِنَّ اللَّهَ بِهِ عَلِيمٌ

তোমরা যা ভালোবাসো, তা থেকে ব্যয় না করা পর্যন্ত তোমরা কখনো পুণ্য লাভ করবে না। আর তোমরা যা কিছু ব্যয় করো, নিশ্চয় আল্লাহ সে সম্পর্কে সম্যক অবহিত।” সূরা আল ইমরান : ৯২

মা-বাবা যখন সন্তানকে তাদের খেলনা, প্রিয় খাবার বা জমানো অর্থ গরিবের জন্য দান করতে শেখান, তখন তারা এই আয়াতটির বাস্তব শিক্ষা দেন।

ত্যাগের সবচেয়ে বড় আদর্শিক উদাহরণ হলো নবী ইবরাহীম (আ.)-এর ঘটনা। তিনি আল্লাহর নির্দেশে তাঁর সবচেয়ে প্রিয় বস্তু, একমাত্র পুত্র ইসমাইল (আ.)-কে কুরবানি করতে প্রস্তুত ছিলেন। আল্লাহ তা’আলা ইবরাহীম (আ.)-এর এই মহৎ ত্যাগের কথা তুলে ধরে বলেন-

إِنَّ هَٰذَا لَهُوَ الْبَلَاءُ الْمُبِينُ

“নিশ্চয়ই এটি ছিল এক সুস্পষ্ট পরীক্ষা।” সূরা আস-সাফফাত : ১০৬

কুরবানির ঈদ এই ত্যাগেরই বার্ষিক প্রতীক। মা-বাবার উচিত এই ইতিহাস সন্তানদেরকে এমনভাবে শেখানো, যাতে তারা বুঝতে পারে যে আল্লাহর হুকুম পালনের চেয়ে প্রিয় আর কিছু হতে পারে না, এমনকি নিজের সবচেয়ে প্রিয় সন্তানের জীবনও নয়।

২. দানশীলতার মাধ্যমে ত্যাগের গুন অর্জন করা

দানশীলতা ত্যাগের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সন্তানদের এই অভ্যাস করালে তাদের মধ্যে কৃপণতা জন্ম নেবে না।

আবু হুরাইরাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, সাদাকা করাতে সম্পদের হ্রাস হয় না। যে ব্যক্তি ক্ষমা করে আল্লাহ তার মর্যাদা বাড়িয়ে দেন। আর কেউ আল্লাহর সম্ভষ্টি লাভে বিনীত হলে তিনি তার মর্যাদা সমুন্নত করে দেন। সহীহ মুসলিম : ২৫৮৮

এই হাদিস সন্তানদেরকে নিশ্চিত করে যে, তারা যা কিছু ত্যাগ করছে, আল্লাহ তা’আলা এর উত্তম প্রতিদান দেবেন।

৩. দুনিয়ার আরাম-আয়েশ ত্যাগ করা

ত্যাগ মূলত দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী আরাম-আয়েশ এবং ব্যক্তিগত স্বার্থকে উপেক্ষা করে আখিরাত বা পরকালের কল্যাণকে অগ্রাধিকার দেওয়ার শিক্ষা দেয়।

আবদুল্লাহ্ ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার আমার দু’ কাঁধ ধরে বললেনঃ তুমি দুনিয়াতে থাক যেন তুমি একজন প্রবাসী অথবা পথচারী।

আর ইবনু ’উমার (রাঃ) বলতেন, তুমি সন্ধ্যায় উপনীত হলে সকালের আর অপেক্ষা করো না এবং সকালে উপনীত হলে সন্ধ্যার আর অপেক্ষা করো না। তোমার সুস্থতার সময় তোমার পীড়িত অবস্থার জন্য প্রস্তুতি লও। আর তোমার জীবিত অবস্থায় তোমার মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি লও। সহীহ বুখারী, হাদিস: ৬৪১৬

মা-বাবা যদি দুনিয়ার ভোগ-বিলাসিতার চেয়ে আল্লাহর পথে সময়, অর্থ ও শ্রম ব্যয়কে গুরুত্ব দেন, তবে সন্তানেরা সেই আদর্শ দেখে ত্যাগী হতে শেখে।

গ. ত্যাগ একটি উন্নত চরিত্রিক গুনাবলী

নিজের জন্য যা পছন্দ, অন্যের জন্যও তা পছন্দ করা ত্যাগের অন্যতম একটি উদারহরণ যা মানুষের একটি উন্নত চরিত্রিক গুনাবলী হিসেবে ধরা হয়, যেখানে নিজের স্বার্থের চেয়ে অপরের প্রয়োজনকে প্রাধান্য দেওয়া হয়।

৩. আনাস (রাযি.) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-

لاَ يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى يُحِبَّ لأَخِيهِ مَا يُحِبُّ لِنَفْسِهِ

তোমাদের কেউ প্রকৃত মু‘মিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে তার ভাইয়ের জন্য সেটাই পছন্দ করবে, যা তার নিজের জন্য পছন্দ করে। সহিহ বুখারি : ১৩, সহিহ মুসলিম : ৪৫, আহমাদ : ১২৮০১, ১৩৮৭৫

সন্তানদেরকে শেখানো উচিত যে, যখন অন্য ভাই বা বন্ধু কোনো কিছুর অভাবে কষ্ট পায়, তখন নিজের প্রিয় বস্তুটি তাদের জন্য ছেড়ে দেওয়া বা বিলিয়ে দেওয়া ঈমানের দাবি। এটাই ত্যাগের ব্যবহারিক রূপ।

৩. মা-বাবার দায়িত্ব সন্তানকে ত্যাগ শিক্ষা

মা-বাবার দায়িত্ব হলো ত্যাগের এই শিক্ষাটিকে সন্তানদের জীবনে অনুশীলনমূলকভাবে প্রতিষ্ঠা করা। তারা নিজেরা আল্লাহর পথে ও গরিবদের জন্য উদারভাবে ত্যাগ করলে সন্তান তা দেখে উৎসাহিত হয়। কুরবানির সময় মাংস বিতরণ এবং এর পেছনের ইবরাহীম (আ.)-এর ত্যাগের গল্প সন্তানদেরকে বুঝিয়ে বলা। সন্তানদের জমানো অর্থ থেকে নিয়মিত একটি অংশ (তাদের পকেটমানি/ঈদ সালামি থেকে) সদকা বা দাতব্য কাজে খরচ করার অভ্যাস করানো। নিজের আরামের সময়টুকু দ্বীনের কাজ বা অসুস্থ প্রতিবেশীর সেবায় ব্যয় করার মাধ্যমে ত্যাগের বৃহত্তর ধারণা সম্পর্কে শিক্ষা দেওয়া।

ত্যাগ হলো আত্মিক উন্নতির চাবিকাঠি। মা-বাবা এই গুণটি তাদের সন্তানদের মধ্যে বপন করতে পারলে তারা ভবিষ্যতে একজন আদর্শ মুসলিম ও মানবতাবাদী নাগরিক হিসেবে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হবে।

সবার সাথে মিলেমিশে বসবাস করার মানষিকতা তৈরি করা

সন্তানদেরকে সমাজে সবার সাথে মিলেমিশে ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে বসবাস করার শিক্ষা দেওয়া মা-বাবার অন্যতম শ্রেষ্ঠ দায়িত্ব। ইসলামে মানুষের প্রতি উত্তম আচরণ এবং ভ্রাতৃত্ববোধকে ঈমানের অংশ হিসেবে গণ্য করা হয়। ইসলাম একটি সামাজিক ধর্ম। এখানে ব্যক্তিগত ইবাদতের পাশাপাশি মানুষের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখার উপর জোর দেওয়া হয়েছে।

১. উত্তম আচরণ ও সহযোগিতা

আল্লাহ তা’আলা মুমিনদেরকে সৎকাজ ও তাকওয়ার (আল্লাহভীতির) কাজে একে অপরকে সাহায্য করার নির্দেশ দিয়েছেন, যা সমাজে মিলেমিশে থাকার মূলমন্ত্র। আল্লাহ তা’আলা বলেন:

وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَىٰ ۖ وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ

“তোমরা সৎকর্ম ও আল্লাহভীতির কাজে পরস্পরকে সহযোগিতা করো এবং পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে পরস্পরকে সহযোগিতা কোরো না।” সূরা মায়িদা : :২

মা-বাবার কর্তব্য হলো সন্তানকে শেখানো যে, সমাজবদ্ধ জীবনে অন্যের প্রয়োজনে এগিয়ে যাওয়া, বিপদগ্রস্তকে সাহায্য করা এবং ন্যায়ের পথে অন্যদের সহযোগিতা করাই হলো ইসলামের শিক্ষা।

২. ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা ও ভেদাভেদ দূর করা

ইসলাম জাতি, গোত্র বা বংশের ভিত্তিতে মানুষকে বিভক্ত করে না, বরং সব মানুষকে এক পিতা-মাতা (আদম ও হাওয়া আঃ) থেকে সৃষ্টি হওয়ার কারণে বিশ্ব ভ্রাতৃত্বের শিক্ষা দেয়। মা-বাবার দায়িত্ব হলো সন্তানের মন থেকে সকল প্রকার বর্ণ, ভাষা বা আভিজাত্যের অহংকার দূর করা। আল্লাহ তা’আলা বলেন:

يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّا خَلَقْنَاكُم مِّن ذَكَرٍ وَأُنثَىٰ وَجَعَلْنَاكُمْ شُعُوبًا وَقَبَائِلَ لِتَعَارَفُوا ۚ إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِندَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ

“হে মানবজাতি! আমি তোমাদেরকে এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা পরস্পর পরিচিত হতে পারো। তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সেই অধিক মর্যাদাসম্পন্ন যে তোমাদের মধ্যে অধিক মুত্তাকী (আল্লাহভীরু)।” সূরা হুজুরাত :১৩

এই আয়াত শিক্ষা দেয় যে, সামাজিক মর্যাদা বংশ বা সম্পদ দ্বারা নির্ধারিত হয় না, বরং নির্ধারিত হয় তাকওয়া বা আল্লাহভীতির মাধ্যমে। এই শিক্ষা সন্তানদেরকে সমাজের সকল স্তরের মানুষের সাথে মিশতে অনুপ্রাণিত করে।

৩. মুমিনদের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন

মুসলমানদের জন্য একে অপরের সাথে মিলেমিশে থাকা এবং ভ্রাতৃত্বের বন্ধন মজবুত করা ফরজ। এই শিক্ষা পারিবারিক স্তর থেকেই দিতে হবে। আল্লাহ তা’আলা বলেন-

اِنَّمَا الۡمُؤۡمِنُوۡنَ اِخۡوَۃٌ فَاَصۡلِحُوۡا بَیۡنَ اَخَوَیۡکُمۡ وَاتَّقُوا اللّٰہَ لَعَلَّکُمۡ تُرۡحَمُوۡنَ 

নিশ্চয় মুমিনরা পরস্পর ভাই ভাই। কাজেই তোমরা তোমাদের ভাইদের মধ্যে আপোষ- মীমাংসা করে দাও। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, আশা করা যায় তোমরা অনুগ্রহপ্রাপ্ত হবে। সূরা হুজুরাত : ১০

২. নিজের জন্য যা পছন্দ, অন্যের জন্যও তা পছন্দ করা

সহাবস্থান এবং সম্প্রীতির মূলনীতি হলো নিজেকে অন্যের জায়গায় রেখে চিন্তা করা। এই অনুভূতি সন্তানদের মধ্যে সহানুভূতি সৃষ্টি করে।

আনাস (রাযি.) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তোমাদের কেউ প্রকৃত মু‘মিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে তার ভাইয়ের জন্য সেটাই পছন্দ করবে, যা তার নিজের জন্য পছন্দ করে। সহিহ বুখারি : ১৩, সহিহ মুসলিম : ৪৫, আহমাদ : ১২৮০১, ১৩৮৭৫

এই হাদিসটি সামাজিক আচরণের মৌলিক ভিত্তি। মা-বাবা যখন সন্তানকে শেখান যে, সে যদি কারো কাছ থেকে সম্মান আশা করে, তবে তারও উচিত অন্যকে সম্মান করা— তখনই এই শিক্ষার বাস্তবায়ন ঘটে।

৩. সমাজ হলো একটি দেহের মতো

মিলেমিশে থাকার শিক্ষাটি একটি উপমার মাধ্যমে রাসূল (সাঃ) সুস্পষ্ট করেছেন।

নু’মান ইবনু বাশীর (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ পারস্পরিক দয়া, ভালবাসা ও সহানুভূতি প্রদর্শনে তুমি মু’মিনদের একটি দেহের মত দেখবে। যখন শরীরের একটি অঙ্গ রোগে আক্রান্ত হয়, তখন শরীরের সকল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ রাত জাগে এবং জ্বরে অংশ নেয়।  সহিহ বুখারি : ৬০১১, সহিহ মুসলিম : ২৫৮৬, আহমাদ : ১৮৪০১

এই শিক্ষা সন্তানদের শেখায় যে, সমাজে কেউ কষ্টে থাকলে তা সবার কষ্ট, এবং মিলেমিশে থাকাই হলো সুস্থ সমাজের লক্ষণ।

৪. মা-বাবার পালনীয় দায়িত্ব

মা-বাবার দায়িত্ব হলো শুধু মৌখিক উপদেশ নয়, বরং নিজেদের আচরণের মাধ্যমে এই মূল্যবোধগুলো সন্তানদের সামনে তুলে ধরা।

মা-বাবা যখন প্রতিবেশীর সাথে ভালো ব্যবহার করেন বা আত্মীয়-স্বজনের খোঁজ নেন, তখন সন্তান তা দেখে শেখে। সন্তানকে সালাম আদান-প্রদান, অনুমতি নিয়ে ঘরে প্রবেশ করা, কথা বলার সময় অন্যের প্রতি মনোযোগী হওয়া, এবং নম্রভাবে কথা বলার অভ্যাস করানো। সন্তানকে সাথে নিয়ে গরিব-দুঃখীদের সাহায্য করা, বা অসুস্থ কাউকে দেখতে যাওয়া— এই ধরনের সামাজিক কাজগুলো সন্তানদের মধ্যে সহমর্মিতা ও সহযোগিতার মনোভাব তৈরি করে।

সন্তানদের ছোটবেলা হতে সত্য-মিথ্যার পার্থক্য শিক্ষা দেওয়া

সন্তানদের ছোটবেলা থেকেই সত্য (আল-হক) ও মিথ্যা (আল-বাতিল)-এর পার্থক্য শেখানো মা-বাবার একটি মৌলিক এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। কারণ, এ বয়সে তাদের হৃদয় ও মন সবচেয়ে কোমল থাকে, এবং যেটা তাদেরকে শেখানো হয় তা সহজেই গ্রহণ করে নেয়। ইসলামের নৈতিক কাঠামোর ভিত্তিই হলো সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকা। কুরআন ও হাদিসে সত্যবাদিতা এবং মিথ্যার গুরুত্ব ও ভয়াবহতা অনেকবার এসেছে।

১. সত্য-মিথ্যার পার্থক্য শিক্ষাদানের গুরুত্ব

পবিত্র কুরআন সত্যকে প্রতিষ্ঠা করা এবং মিথ্যাকে পরিহার করার জন্য বারবার নির্দেশ দিয়েছে। এই শিক্ষা সন্তানদের দিলে তাদের ঈমানী ভিত্তি মজবুত হয়। আল্লাহ তা’আলা কুরআন মাজীদে সত্য ও মিথ্যার পার্থক্যকে এমনভাবে স্পষ্ট করে দিয়েছেন, যাতে মুমিনরা পথভ্রষ্ট না হয়। সন্তানদেরকে এই মৌলিক ধারণাটি শেখানো মা-বাবার প্রথম কাজ। আল্লাহ তা’আলা বলেন:

قُلْ جَاءَ الْحَقُّ وَزَهَقَ الْبَاطِلُ ۚ إِنَّ الْبَاطِلَ كَانَ زَهُوقًا

বলো, ‘সত্য এসেছে এবং মিথ্যা বিলুপ্ত হয়েছে; নিশ্চয় মিথ্যা বিলুপ্ত হওয়ারই ছিল।” সূরা ইসরা : ৮১

এই আয়াতটি শেখায় যে, জীবনের সকল ক্ষেত্রে সত্যকে আঁকড়ে ধরতে হবে এবং মিথ্যাকে প্রত্যাখ্যান করতে হবে।

২. মিথ্যা ও জাল কথার বর্জন

মিথ্যা কথা বলা বা মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া ইসলামে মহাপাপ। সন্তানদেরকে কেবল সত্য কথা বলার অভ্যাস করাতে হবে এবং যেকোনো ধরনের মিথ্যাচার থেকে বিরত রাখতে হবে। আল্লাহ তা’আলা বলেন:

فَاجْتَنِبُوا الرِّجْسَ مِنَ الْأَوْثَانِ وَاجْتَنِبُوا قَوْلَ الزُّورِ

“সুতরাং তোমরা মূর্তিদের অপবিত্রতা থেকে বেঁচে থাকো এবং মিথ্যা কথা পরিহার করো। সূরা হাজ্জ, : ৩০

মিথ্যা কথাকে মূর্তিপূজার অপবিত্রতার সাথে তুলনা করার মাধ্যমে এর ভয়াবহতা তুলে ধরা হয়েছে। মা-বাবার দায়িত্ব হলো ছোটবেলা থেকেই সন্তানের মুখ থেকে যেন মিথ্যা কথা বের না হয়, সেদিকে নজর রাখা।

৩. হিদায়াত ও পথপ্রদর্শকের দায়িত্ব

মা-বাবা সন্তানের জন্য প্রথম পথপ্রদর্শক। তাদের উচিত সন্তানদেরকে এমন শিক্ষা দেওয়া, যা তাদের পরকালে সফলতা এনে দেবে। আল্লাহ তা’আলা লোকমান হাকিমের উদাহরণ দিয়ে বলেন, যিনি তাঁর সন্তানকে নৈতিক শিক্ষা দিয়েছিলেন। যদিও এটি সরাসরি মিথ্যা বলা নিষেধ করেনি, তবে এটি উত্তম চরিত্র ও সঠিক পথে থাকার মূল ভিত্তি। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

يَا بُنَيَّ أَقِمِ الصَّلَاةَ وَأْمُرْ بِالْمَعْرُوفِ وَانْهَ عَنِ الْمُنكَرِ وَاصْبِرْ عَلَىٰ مَا أَصَابَكَ ۖ إِنَّ ذَٰلِكَ مِنْ عَزْمِ الْأُمُورِ

“হে আমার বৎস! সালাত কায়েম করো, সৎকাজের আদেশ দাও, মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করো এবং বিপদাপদে ধৈর্য ধারণ করো। নিশ্চয়ই এটি সাহসিকতার কাজ।” সুরা লুকমান : ১৭

মিথ্যা বলা যেহেতু একটি মন্দ কাজ (মুনকার), তাই এটি থেকে নিষেধ করার দায়িত্বও মা-বাবার।

৪. সত্যবাদিতা ঈমানের প্রতীক ও জান্নাতের পথ

নবী মুহাম্মদ (সাঃ) সত্যবাদিতাকে ঈমানের প্রতীক এবং মিথ্যার পরিণাম সম্পর্কে কঠোরভাবে সতর্ক করেছেন। সন্তানদেরকে সত্য কথা বলার অভ্যাস করানো মানেই তাদেরকে জান্নাতের পথে পরিচালিত করা।

আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ সততা তো পুণ্যের কাজ; আর পুণ্যময় কাজ জান্নাতের পথ দেখিয়ে দেয়। কোন বান্দা সৎ বলার ইচ্ছা করলে অবশেষে আল্লাহর নিকট তার নাম সত্যবাদী বলে লিপিবদ্ধ হয়। আর মিথ্যা তো অপরাধ, এ অপরাধ জাহান্নামের পথপ্রদর্শন করে। আর কোন বান্দা মিথ্যা বলার চিন্তা করার কারণে অবশেষে সে মিথ্যাবাদী হিসেবে লিপিবদ্ধ হয়। সহীহ মুসলিম : ২৬০৭

এই হাদিস স্পষ্টভাবে সত্য ও মিথ্যার পার্থক্যের গুরুত্ব তুলে ধরে এবং মা-বাবাকে তাদের সন্তানদের জন্য এই দু’টি পথের পার্থক্য পরিষ্কার করে দেওয়ার দায়িত্ব দেয়।

৫. মা-বাবার আচরণের মাধ্যমে শিক্ষা

মা-বাবা যদি সন্তানের সামনে ছোট বিষয়েও মিথ্যা বলেন, তবে সন্তান সেই আচরণকে স্বাভাবিক মনে করে। তাই মা-বাবার নিজেদের আচরণে সত্যবাদী হওয়া জরুরি। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) শিশুদের সামনে মিথ্যা বলার বিষয়ে সতর্ক করেছেন:

আব্দুল্লাহ ইবনু আমির (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেছেনঃ একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের ঘরে বসা অবস্থায় আমার মা আমাকে ডেকে বললেন, এই যে, এসো! তোমাকে দিবো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে প্রশ্ন করলেনঃ তাকে কি দেয়ার ইচ্ছা করছে? তিনি বললেন, খেজুর। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেনঃ যদি তুমি তাকে কিছু না দিতে তাহলে এ কারণে তোমার আমলনামায় একটি মিথ্যার পাপ লিপিবদ্ধ হতো। সুনানে আবু দাউদ : ৪৯৯১

এই হাদিস শেখায় যে, সন্তানের সাথে সামান্য মজা করার ছলেও মিথ্যা বলা উচিত নয়, বরং মা-বাবার প্রতিটি কথা ও কাজে সত্যের প্রতিফলন থাকা উচিত।

সন্তানকে সত্য-মিথ্যার পার্থক্য শেখানো মা-বাবার একটি বৃহত্তর দায়িত্বের অংশ যা হলো সন্তানকে উত্তম শিষ্টাচার (আদাব) শিক্ষা দেওয়া। রাসূল (সাঃ)-এর মতে, উত্তম শিষ্টাচার (আদাব) হলো সন্তানের জন্য পিতার দেওয়া শ্রেষ্ঠ উপহার। সত্য বলা, আমানত রক্ষা করা এবং ওয়াদা পালন করা উত্তম শিষ্টাচারের ভিত্তি। মা-বাবা আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রাপ্ত সন্তানের আমানতের দায়িত্বে নিয়োজিত। তারা যদি সন্তানকে সত্য ও ন্যায়ের পথে পরিচালিত না করেন, তবে আমানতের খেয়ানতকারী হবেন।

মূল কথা হলো, সন্তানদেরকে ছোটবেলা থেকেই সত্য-মিথ্যার পার্থক্য শেখানোর দায়িত্ব মা-বাবার উপর ন্যস্ত। এই শিক্ষা তাদের জীবনে জান্নাতের রাস্তা সহজ করে এবং তাদেরকে সমাজে সত্যবাদী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। এই শিক্ষাদানে মা-বাবার নিজেদের আচরণও হতে হবে সত্যের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

সন্তানদের পড়ালেখায় সহায়তা করা

সন্তানদের পড়ালেখায় ভালো করার জন্য বাবা-মায়ের সহায়তা করা শুধু জাগতিক কর্তব্যই নয়, বরং ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে এটি সন্তানের প্রতি তাদের আমানত ও দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত। ইসলাম জ্ঞান অর্জনকে ফরয বা অবশ্যকরণীয় করেছে, আর এই ফরয পালনে সহযোগিতা করা মা-বাবার অন্যতম দায়িত্ব।

১. সন্তানের জ্ঞানার্জনের গুরুত্ব:

সন্তানদেরকে পড়ালেখায় সাহায্য করার দায়িত্বটি মূলত ইসলামে জ্ঞানার্জনের প্রতি দেওয়া গুরুত্ব থেকে উৎসারিত। জাগতিক ও দ্বীনি উভয় ধরনের জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য আবশ্যক। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা’আলা রাসূল (সাঃ)-কে আরও জ্ঞান লাভের জন্য দোয়া করতে বলেছেন। এই নির্দেশ সকল মুমিনদের জন্য প্রযোজ্য। আল্লাহ তা’আলা বলেন:

وَقُل رَّبِّ زِدْنِي عِلْمًا

“এবং বলো, ‘হে আমার প্রতিপালক, আমার জ্ঞান বৃদ্ধি করে দাও।'” সূরা ত্বহা : ১১৪

বাবা-মায়ের দায়িত্ব হলো, সন্তানের মধ্যে যেন এই জ্ঞান অন্বেষণের আগ্রহ তৈরি হয় এবং তারা যেন জ্ঞান অর্জনের পরিবেশ পায়, সেদিকে খেয়াল রাখা। সন্তানের শিক্ষার পথে যেকোনো বাধা দূর করতে তাদের সহায়তা করা জরুরি।

২. উত্তম শিষ্টাচার শিক্ষাদান

পড়ালেখা বা জ্ঞানার্জনের উদ্দেশ্য শুধু ডিগ্রি অর্জন নয়, বরং এর মূল লক্ষ্য হলো উত্তম মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠা এবং শিষ্টাচার শেখা। পড়ালেখায় সহায়তা করা মানে এই শিষ্টাচার অর্জনে সহযোগিতা করা।

আইউব ইবনু মূসা (রহঃ) হতে পর্যায়ক্রমে তার পিতা ও দাদার সূত্রে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

مَا نَحَلَ وَالِدٌ وَلَدًا أَفْضَلَ مِنْ أَدَبٍ حَسَنٍ

কোন পিতা তার সন্তানকে উত্তম শিষ্টাচার শিক্ষা দেয়ার চেয়ে বেশী উত্তম কোন জিনিস দিতে পারে না। সুনানে তিরমিজি : ১৯৫২

পড়ালেখা ও শিক্ষণীয় বিষয়গুলো সন্তানকে শিষ্টাচার ও নৈতিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ করে। তাই সন্তানের শিক্ষাজীবন সুগম করে দেওয়া মা-বাবার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ‘দান’।

৩. ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তৈরি

মা-বাবার প্রধান লক্ষ্য হলো এমন একটি প্রজন্ম তৈরি করা, যারা তাদের অনুপস্থিতিতেও তাদের জন্য সদকায়ে জারিয়া (অবিচ্ছিন্ন সদকা) হবে। সুশিক্ষিত সন্তানরাই এই দায়িত্ব পালনে সক্ষম হয়।

আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যখন মানুষ মৃত্যুবরণ করে তখন তার সমস্ত আমল বন্ধ হয়ে যায় তিন প্রকার আমল ছাড়া। ১. সাদাকা জারিয়াহ্ অথবা ২. এমন ইলম যার দ্বারা উপকার হয় অথবা ৩. পুণ্যবান সন্তান যে তার জন্যে দু’আ করতে থাকে।

সহীহ মুসলিম : ১৬৩১

সন্তানদেরকে ভালোভাবে পড়ালেখায় সহযোগিতা করে দ্বীনি ও দুনিয়াবি জ্ঞানে পারদর্শী করে তোলা মূলত দ্বিতীয় ও তৃতীয়টির জন্য পরিবেশ তৈরি করে। বাবা-মায়ের উচিত সন্তানের শিক্ষার মান ও পরিবেশ নিশ্চিত করতে সহায়তা করা। যার ফল সে পরকালেও  পাবে।

৪. মা-বাবার সরাসরি ভূমিকা

পড়ালেখায় সহায়তা করা মানে শুধু টাকা দেওয়া নয়, বরং এটি একটি সামগ্রিক প্রক্রিয়া। পড়ালেখার প্রতি সন্তানের আগ্রহ ধরে রাখতে অনুপ্রেরণা দেওয়া এবং মানসিক সমর্থন দেওয়া মা-বাবার দায়িত্ব। সন্তানের জন্য একটি শান্ত ও উপযোগী পড়ার পরিবেশ তৈরি করে দেওয়া, প্রয়োজনীয় বই-খাতা ও শিক্ষা উপকরণ সরবরাহ করা এবং সন্তানের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করা মা-বাবার দায়িত্ব।

সন্তানের অধিকার : তৃতীয় পর্ব

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

সন্তানদের নিয়ে পারিবারিক বৈঠক বা তালিম করা

সন্তানদের জন্য পারিবারিক বৈঠক বা ‘তালিম’ (ইসলামী শিক্ষা সভা)-এর আয়োজন করা মা-বাবার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও অপরিহার্য দায়িত্ব। ইসলাম পরিবারকে প্রথম শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে দেখে। পারিবারিক তালিমের সবচেয়ে বড় ভিত্তি হলো সন্তানদেরকে দ্বীনি জ্ঞান শিক্ষা দেওয়া, যাতে তারা পরকালের কঠিন শাস্তি থেকে রক্ষা পেতে পারে। আল্লাহ তা’আলা মা-বাবাকে তাদের পরিবারকে সঠিক শিক্ষা দিয়ে রক্ষা করার নির্দেশ দিয়েছেন-

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا

“হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করো।” সূরা তাহরীম : ৬

সাহাবীগণ এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন যে, পরিবারকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচানোর অর্থ হলো— তাদেরকে আদব-শিষ্টাচার (আদব) শেখানো এবং ইলম (জ্ঞান) শিক্ষা দেওয়া। পারিবারিক বৈঠক বা তালিম হলো এই জ্ঞান ও শিষ্টাচার দেওয়ার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

১. এটি সালফদের আদর্শ :

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা’আলা একজন নেককার পিতার উদাহরণ পেশ করেছেন, যিনি তাঁর সন্তানকে ব্যক্তিগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ উপদেশ ও নৈতিক শিক্ষা দিয়েছিলেন। এটিই পারিবারিক তালিমের কুরআনিক মডেল। পিতা লুকমান তাঁর পুত্রকে বলেন-

يَا بُنَيَّ لَا تُشْرِكْ بِاللَّهِ ۖ إِنَّ الشِّرْكَ لَظُلْمٌ عَظِيمٌ

“হে আমার বৎস! আল্লাহর সাথে অংশীদার সাব্যস্ত করো না। নিশ্চয়ই শিরক বা অংশীদারিত্ব স্থাপনকারী কাজ মহাপাপ।” সূরা লুকমান : ১৩

এরপর তিনি সালাত কায়েম, সৎকাজে আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ করার মতো মৌলিক নির্দেশ দেন। এই আয়াত প্রমাণ করে যে, পিতা-মাতার দায়িত্ব হলো সন্তানকে নিয়মিতভাবে ইসলামী বিশ্বাস ও নৈতিকতার শিক্ষা দেওয়া।

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) পারিবারিক দায়িত্ব ও সন্তানদের শিক্ষা দেওয়ার গুরুত্বকে বারবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। ইসলামে মা-বাবা তাদের পরিবারের প্রতি দায়িত্বশীল এবং তাদের জবাবদিহি করতে হবে। পারিবারিক তালিমের মাধ্যমে মা-বাবা তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেন।

উমার (রাযি.) হতে বর্ণিত যে, আমি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে বলতে শুনেছি, তোমরা সকলেই দায়িত্বশীল। লায়স ইবনু সা‘দ (রাযি.) আরো অতিরিক্ত বলেন, (পরবর্তী রাবী) ইউনুস (রহ.) বলেছেন, আমি একদা ইবনু শিহাব (রহ.)-এর সঙ্গে ওয়াদিউল কুরা নামক স্থানে ছিলাম। তখন রুযাইক (ইবনু হুকায়ম (রহ.) ইবনু শিহাব (রহ.)-এর নিকট লিখলেন, আপনি কী মনে করেন, আমি কি (এখানে) জুমু‘আহর সালাত আদায় করব? রুযায়ক (রহ.) তখন সেখানে তাঁর জমির কৃষি কাজের তত্ত্বাবধান করতেন। সেখানে একদল সুদানী ও অন্যান্য লোক বাস করত। রুযায়ক (রহ.) সে সময় আইলা শহরের (আমীর) ছিলেন। ইবনু শিহাব (রহ.) তাঁকে জুমু‘আহ কায়িম করার নির্দেশ দিয়ে লিখেছিলেন এবং আমি তাকে এ নির্দেশ দিতে শুনলাম। সালিম (রহ.) তার নিকট বর্ণনা করেছেন যে, ‘আবদুল্লাহ্ ইবনু ‘উমার (রাযি.) বলেন, আমি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে বলতে শুনেছি, তোমরা সকলেই দায়িত্বশীল এবং তোমাদের প্রত্যেককেই অধীনস্থদের (দায়িত্ব) সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করা হবে। ইমাম* একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি, তাঁকে তাঁর অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে। পুরুষ তার পরিবার বর্গের অভিভাবক, তাকে তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে। নারী তার স্বামী-গৃহের কর্ত্রী, তাকে তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে। খাদিম তার মনিবের ধন-সম্পদের রক্ষক, তাকেও তার মনিবের ধন-সম্পদ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে। ইবনু ‘উমার (রাযি.) বলেন, আমার মনে হয়, রাসূলূল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেনঃ পুত্র তার পিতার ধন-সম্পদের রক্ষক এবং এগুলো সম্পর্কে তাকে জিজ্ঞেস করা হবে। তোমরা সবাই দায়িত্বশীল এবং সবাইকে তাদের অর্পিত দায়িত্ব সম্পর্কে প্রশ্ন করা হবে। সহহি বুখারি : ৮৯৩, ২৪০৯, ২৫৫৪, ২৫৫৮, ২৭৫১, ৫১৮৮, ৫৬০০, ৭১৩৮

তালিমের মাধ্যমে মা-বাবা প্রমাণ করতে পারেন যে, তারা সন্তানের ঈমান ও নৈতিকতার বিষয়ে সচেতন ছিলেন। পারিবারিক তালিমের মাধ্যমে সন্তানদেরকে যে শিষ্টাচার শিক্ষা দেওয়া হয়, তা তাদের ভবিষ্যতের জন্য সবচেয়ে মূল্যবান উপহার। তালিমের বৈঠকগুলোতে কেবল কুরআন-হাদিসের আলোচনাই হয় না, বরং সেখানে বসার আদব, কথা বলার শিষ্টাচার এবং পারিবারিক হৃদ্যতাও তৈরি হয়।

বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর যে তিনটি জিনিস মানুষের জন্য উপকার দেয়, তার মধ্যে অন্যতম হলো সৎ সন্তান। পারিবারিক তালিমের মাধ্যমে সন্তানরা সৎ ও নেককার হিসেবে গড়ে ওঠে, ফলে সে মা-বাবার জন্য দোয়া করে এবং তা মা-বাবার জন্য সদকায়ে জারিয়া হিসেবে গণ্য হয়।

২. মা-বাবার উচিত পারিবারিক তালিমের ব্যবস্থা করা

মা-বাবার উচিত প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট সময়ে তালিমের আয়োজন করলে সন্তানেরা সেই সময়ে দ্বীনি জ্ঞান অর্জনকে গুরুত্ব দিতে শিখবে। যার ফলে, সন্তানরা তাদের মনে আসা দ্বীন ও দুনিয়ার বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্ন করার সুযোগ পায়, ফলে তাদের ভুল ধারণা দূর হয়। মা-বাবা নিজেরা যখন কুরআনের আয়াত বা হাদিসের ব্যাখ্যা দেন, তখন তারা সন্তানের কাছে ধর্মীয় আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। এটি পরিবারে এক ধরনের আধ্যাত্মিক বন্ধন তৈরি করে, যেখানে সবাই আল্লাহর জন্য একত্রিত হয়।

ধনী-গরীব সকল আত্মীয়দের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়া

সন্তানদেরকে ধনী-গরীব নির্বিশেষে সকল আত্মীয়-স্বজনের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়া এবং তাদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখার শিক্ষা দেওয়া মা-বাবার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইসলামী ও নৈতিক দায়িত্ব। ইসলামে এটিকে সিলাতুর রাহিম (রক্তের সম্পর্ক রক্ষা করা) নামে অভিহিত করা হয়েছে, যা ঈমানের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত এবং এর গুরুত্ব কুরআন ও হাদিসে বারবার উল্লিখিত হয়েছে।

১. আত্মীয়ের হক এবং আল্লাহর ভয়

পবিত্র কুরআন আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করাকে কঠোরভাবে নিষেধ করেছে এবং তা রক্ষা করার জন্য মুমিনদেরকে নির্দেশ দিয়েছে। এই নির্দেশ সকল আত্মীয়ের জন্য প্রযোজ্য, তাদের আর্থিক অবস্থা নির্বিশেষে। আল্লাহ তা’আলা মুমিনদেরকে আত্মীয়দের হক আদায় করার জন্য এবং সম্পর্ক ছিন্ন করা থেকে বিরত থাকতে নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি ইরশদ করেন-

وَاتَّقُوا اللّٰہَ الَّذِیۡ تَسَآءَلُوۡنَ بِہٖ وَالۡاَرۡحَامَ ؕ اِنَّ اللّٰہَ کَانَ عَلَیۡکُمۡ رَقِیۡبًا

আর ভয় কর রক্ত-সম্পর্কিত আত্মীয়ের ব্যাপারে। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের উপর পর্যবেক্ষক। সূরা নিসা : ১

এই আয়াতে ‘আল-আরহাম’ (আত্মীয়তা) রক্ষার বিষয়টি আল্লাহর তাকওয়ার সাথে যুক্ত করা হয়েছে। মা-বাবার দায়িত্ব হলো সন্তানদেরকে শৈশব থেকেই এই ‘আরহাম’-এর পরিচয় করিয়ে দেওয়া এবং তাদের হক আদায়ে অভ্যস্ত করা।

২. আত্মীয়দের প্রতি সদ্ব্যবহারের আদেশ

আল্লাহ তা’আলা স্পষ্টত আত্মীয়দের প্রতি সদ্ব্যবহারের (ইহসান) আদেশ দিয়েছেন, যেখানে ধনী-গরীবের কোনো ভেদাভেদ নেই। তিনি ইরশাদ করেন-

وَاعْبُدُوا اللَّهَ وَلَا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا ۖ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا وَبِذِي الْقُرْبَىٰ

“আর তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো এবং তাঁর সাথে কাউকে শরিক করো না। পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করো এবং নিকটাত্মীয়দের সাথেও। সূরা নিসা : ৩৬

এই আয়াত অনুযায়ী, নিকটাত্মীয়দের হক পিতা-মাতার পরেই এসেছে। সন্তানকে তাদের আত্মীয়দের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়া এবং তাদের প্রতি সদ্ব্যবহার শেখানো মা-বাবার ইবাদতের অংশ।

২. আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করার গুরুত্ব

হাদিসে আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করার বিপুল ফজিলত বর্ণনা করা হয়েছে এবং এর গুরুত্ব ঈমানের মানদণ্ড হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তাই এ সম্পর্কিত হাদিস উল্লেখ কর সন্তানকে শিক্ষা প্রদান করা। যেমন-

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি আল্লাহ্ ও শেষ দিনে বিশ্বাস রাখে, সে যেন তার মেহমানকে সম্মান করে। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ্ ও শেষ দিনে বিশ্বাস রাখে, সে যেন তার রক্তের সম্পর্ক বজায় রাখে। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ্ ও শেষ দিনে বিশ্বাস রাখে, সে যেন কল্যাণকর কথা বলে, অথবা চুপ থাকে। সহীহ বুখারী ৫১৮৫, ৬১৩৮

এই হাদিস অনুযায়ী, মা-বাবার দায়িত্ব হলো সন্তানদেরকে ছোটবেলা থেকেই এই সম্পর্ক রক্ষায় প্রশিক্ষণ দেওয়া, যাতে তারা পূর্ণাঙ্গ মুমিন হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। এর অর্থ হলো, কেবল ধনী বা প্রভাবশালী আত্মীয় নয়, বরং দরিদ্র ও দুর্বল আত্মীয়দের সাথেও সম্পর্ক রাখতে শেখানো।

আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি চায় যে, তার রিযক প্রশস্ত হোক এবং আয়ু বর্ধিত হোক, সে যেন তার আত্মীয়তার বন্ধন অক্ষুণ্ণ রাখে।  সহিহ বুখারি : ২০৬৭, ৫৯৮৬

মা-বাবার উচিত সন্তানকে বোঝানো যে, আত্মীয়দের সাথে সুসম্পর্ক স্থাপন আল্লাহর সন্তুষ্টি ও দুনিয়ার বরকতের চাবিকাঠি। গরিব আত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক রাখা বা তাদের সাহায্য করা এই বরকত এনে দেয়।

৩. ধনী-গরীবের পার্থক্য দূর করা

সন্তানকে সকল আত্মীয়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়া এবং মিশতে শেখানো একটি গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক শিক্ষা, যা সন্তানকে প্রকৃম মুসলিম হতে সাহায্য করে। যেনম-

অহংকার দূরীকরণ:

সন্তানকে শেখানো যে, আত্মীয়তার বন্ধন রক্তের উপর প্রতিষ্ঠিত, সম্পদের উপর নয়। ধনী আত্মীয়দের প্রতি আসক্তি এবং গরিব আত্মীয়দের প্রতি তাচ্ছিল্য অহংকার তৈরি করে, যা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।

সহানুভূতি সৃষ্টি:

গরিব আত্মীয়দের সাথে মিশলে শিশুরা সমাজে মানুষের দুঃখ-কষ্ট সম্পর্কে জানতে পারে এবং তাদের মধ্যে সহানুভূতি (দয়া) ও ত্যাগের মনোভাব সৃষ্টি হয়।

ন্যায়বিচার:

মা-বাবার উচিত, সকল আত্মীয়ের সাথে সমানভাবে যোগাযোগ রাখা এবং তাদের প্রাপ্য সম্মান দেওয়া। সন্তান যখন দেখবে যে তার মা-বাবা বিত্তহীন চাচা বা দরিদ্র খালাকে একই আন্তরিকতা ও সম্মানের সাথে গ্রহণ করছে, তখন সেও এই ন্যায়পরায়ণতা শিখবে।

সুতরাং, সন্তানদেরকে ধনী-গরীব নির্বিশেষে সকল আত্মীয়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়া এবং সম্পর্ক রক্ষা করতে শেখানো মা-বাবার ঈমানী দায়িত্ব। এটি কেবল পারিবারিক বন্ধন নয়, বরং ঈমান, তাকওয়া ও সামাজিক সাম্যের ভিত্তি স্থাপন করে।

পরিবারের সাথে সময় কাটানো

পরিবারের সাথে সময় কাটানো শুধু একটি সামাজিক রীতি নয়, বরং এটি ইসলামে মা-বাবার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বীনি দায়িত্ব হিসেবে গণ্য। ইসলামে পরিবারকে সবচেয়ে নিরাপদ ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখা হয়, আর এই বন্ধনকে মজবুত করার জন্য সময় দেওয়া অপরিহার্য। কুরআন মাজীদে পরিবারকে মানসিক শান্তি ও নির্ভরতার উৎস হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। মা-বাবা যখন সময় দেন, তখনই এই শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়।

১. মানসিক শান্তি ও ভালোবাসা সৃষ্টি

আল্লাহ তা’আলা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন, যা পারিবারিক বন্ধনের ভিত্তি। এই বন্ধন সময়ের মাধ্যমেই প্রকাশ পায় ও মজবুত হয়। আল্লাহ তা’আলা বলেন:

وَمِنْ آيَاتِهِ أَنْ خَلَقَ لَكُم مِّنْ أَنفُسِكُمْ أَزْوَاجًا لِّتَسْكُنُوا إِلَيْهَا وَجَعَلَ بَيْنَكُم مَّوَدَّةً وَرَحْمَةً

“আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে অন্যতম হলো, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকে সৃষ্টি করেছেন তোমাদের স্ত্রীদেরকে, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি লাভ করো এবং তোমাদের মধ্যে সৃষ্টি করেছেন ভালোবাসা ও দয়া।” সূরা রূম : ২১

মা-বাবার জন্য এই প্রশান্তি কেবল তখনই সম্ভব, যখন তারা পরস্পরের সাথে এবং সন্তানদের সাথে গুণগত সময় কাটান। পরিবারের সদস্যদের উপেক্ষা করে এই ‘মাদদাহ’ বা ভালোবাসা ধরে রাখা যায় না।

২. সময় দেওয়া ও ব্যয় করা ইবাদতের অংশ

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) পরিবারকে সময় দেওয়ার বিষয়টি এমনভাবে দেখিয়েছেন যে, এর মাধ্যমে কেবল সম্পর্কই মজবুত হয় না, বরং তা আল্লাহর কাছে প্রতিদানযোগ্য (সওয়াব) কাজে পরিণত হয়। রাসূল (সাঃ)-এর মতে, যারা পরিবারের জন্য সময় ও সম্পদ ব্যয় করেন, তারাই শ্রেষ্ঠ।

আয়িশাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমাদের মাঝে সে-ই ভাল যে তার পরিবারের নিকট ভাল। আর আমি আমার পরিবারের নিকট তোমাদের চাইতে উত্তম। আর তোমাদের কোন সঙ্গী মৃত্যুবরণ করলে তার সমালোচনা পরিত্যাগ করো। সুনানে তিরমিজি : ৩৮৯৫, সহীহাহ : ২৮৫

পরিবারের প্রতি উত্তম আচরণ এবং তাদের সাথে সময় কাটানো রাসূল (সাঃ)-এর সুন্নাহ। মা-বাবাকে তাদের সন্তানদের জন্য সময় বরাদ্দ করতে হবে।

২. পরিবারের জন্য খরচ, উত্তম খরচ:

পরিবারের জন্য খরচ করা অর্থকেও রাসূল (সাঃ) সর্বোত্তম সদকা হিসেবে গণ্য করেছেন।

আবূ মাস‘ঊদ (রাযি.) হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, মানুষ স্বীয় পরিবার-পরিজনের জন্য পুণ্যের আশায় যখন ব্যয় করে তখন সেটা তার জন্য সাদাকা হয়ে যায়। সহহি বুখারি : ৫৫, ৪০০৬, ৫৩৫১

৩. শিশুদের সাথে কোমল আচরণ ও খেলাধুলা

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তাঁর নাতি-নাতনিদের সাথে খেলাধুলা করে, আদর করে এবং হাসিমুখে সময় কাটাতেন। এটা দেখায় যে, শিশুদের সাথে তাদের মনমতো সময় কাটানোও মা-বাবার দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত।

৫৯৯৭. আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদা হাসান ইবনু ’আলীকে চুম্বন করেন। সে সময় তাঁর নিকট আকরা’ ইবনু হাবিস তামীমী উপবিষ্ট ছিলেন। আকরা’ ইবনু হাবিস বললেনঃ আমার দশটি পুত্র আছে, আমি তাদের কাউকেই কোন দিন চুম্বন দেইনি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর পানে তাকালেন, অতঃপর বললেনঃ যে দয়া করে না, সে দয়া পায় না। সহিহ বুখারি : ৫৯৯৭, সহিহ মুসলিম : ২৩১৮, আহমাদ : ৭২৯৩

পরিবারের সাথে সময় কাটালে এই দয়া, মমতা ও ভালোবাসা প্রকাশ পায়, যা সন্তানের মানসিক বিকাশের জন্য অত্যন্ত জরুরি।

উপসংহার : পরিবারের সাথে সময় কাটানো হলো সন্তানের প্রতি মা-বাবার আমলের একটি অংশ। এই সময় দেওয়ার মাধ্যমে মা-বাবার ঈমানী দায়িত্ব পালন করে পরিবারকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করেন। সদকায়ে জারিয়া-এর পথ প্রশস্ত করেন, কারণ সৎ সন্তান তৈরি হয় পারিবারিক শিক্ষার মাধ্যমে। 

পারিবারিক প্রশান্তি এবং ভালোবাসা (মাদদাহ ও রাহমাহ) প্রতিষ্ঠা করেন।

কাজেই মা-বাবার কর্তব্য হলো জাগতিক ব্যস্ততার মাঝেও সচেতনভাবে পরিবারের জন্য সময় বরাদ্দ করা এবং রাসূল (সাঃ)-এর আদর্শ অনুসরণ করে পরিবারের কাছে উত্তম ব্যক্তি হওয়া।

সন্তানদের নিয়ে স্কলারদের ভিডিও উপভোগ করা

পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ইসলামী স্কলারদের ভিডিও বা লেকচার উপভোগ করা মা-বাবার একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব, যা আধুনিক যুগে সন্তানদেরকে সঠিক পথে পরিচালিত করার একটি কার্যকর মাধ্যম। ইসলামের দৃষ্টিতে এর গুরুত্ব অপরিসীম, কারণ এটি সরাসরি জ্ঞানার্জন (ইলম) এবং সৎ উপদেশ (তা’লীম) প্রদানের সাথে সম্পর্কিত।

কুরআন ও হাদিসে জ্ঞান অর্জন এবং পরিবারকে নৈতিক শিক্ষা দেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। স্কলারদের ভিডিও দেখা সেই শিক্ষাদানেরই অংশ।

আধুনিক যুগে স্কলারদের ভিডিও বা লেকচার দেখা এই সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় ইসলামী জ্ঞান (ইলম) অর্জনের একটি সহজ উপায়। স্কলারদের আলোচনায় জীবন ঘনিষ্ঠ বিষয়াদি, নৈতিকতা ও শিষ্টাচার উঠে আসে, যা শিশুদের চারিত্রিক গঠনে সাহায্য করে।

মা-বাবা যখন সন্তানদের নিয়ে একসাথে কোনো দ্বীনি আলোচনা শোনেন, তখন পরিবারে একটি আধ্যাত্মিক ও আদর্শিক বন্ধন তৈরি হয়। এটি সন্তানদেরকে আধুনিক সমাজের নানা প্রলোভন থেকে দূরে থাকতে সাহায্য করে। সন্তান যদি স্কলারদের বক্তব্য শুনে নেককার হিসেবে গড়ে ওঠে এবং আমল করে, তবে তাদের মা-বাবার জন্য তা সদকায়ে জারিয়া (অবিচ্ছিন্ন সদকা) হিসেবে গণ্য হতে পারে  সহীহ মুসলিম, : ১৬৩১

১. বর্তমান জামানার বিশ্বখ্যাত ইসলামী স্কলারদের উদাহরণ

বিশ্বজুড়ে বর্তমানে অনেক স্কলার আছেন, যাদের শিক্ষামূলক আলোচনা ইউটিউব বা অন্যান্য মাধ্যমে সহজলভ্য:

ডা. জাকির নায়েক: তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব ও যুক্তিভিত্তিক আলোচনার জন্য বিখ্যাত।

ড. বিলাল ফিলিপস: ইসলামি অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য পরিচিত।

মুফতি ইসমাইল মেনক: সহজবোধ্য ভাষায় সামাজিক সমস্যা ও ব্যক্তিগত উন্নয়ন নিয়ে আলোচনার জন্য জনপ্রিয়।

শাইখ ইয়াসির ক্বাদি: ইসলামী ইতিহাস ও ফিকহ নিয়ে গভীর আলোচনার জন্য সুপরিচিত।

শাইখ আব্দুল নাসির জাংদা: তরুণদের কাছে জনপ্রিয় একজন বক্তা, যিনি আধুনিক প্রেক্ষাপটে ইসলামী জীবনযাপন নিয়ে আলোচনা করেন।

ড. ওমর সুলেইমান: সামাজিক ন্যায়বিচার ও রাসূল (সাঃ)-এর জীবনী নিয়ে আলোচনার জন্য পরিচিত।

২. বাংলাদেশের প্রখ্যাত ইসলামী স্কলারদের উদাহরণ

বাংলাদেশেও অনেক স্বনামধন্য আলেম রয়েছেন, যাদের আলোচনা পারিবারিক তালিমের জন্য উপযোগী:

প্রফেসর ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর (রহ.): তিনি ছিলেন কুরআন-হাদিসের গবেষণামূলক ও ভারসাম্যপূর্ণ আলোচনার জন্য সুপরিচিত।

ডক্টর আবু বক্কর জাকারিয়া : একজন তাফসির কারন। আকিদাও মানহান গবেষক।

শাইখ আহমাদুল্লাহ: তরুণ প্রজন্মের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং সামাজিক মাধ্যমে সক্রিয়।

ড. মুহাম্মদ সাইফুল্লাহ: সহজ ভাষায় এবং রেফারেন্সভিত্তিক আলোচনার জন্য পরিচিত।

ড. মনজুরে ইলাহী: তুলনামূলক ফিকহ ও মৌলিক ইসলামী জ্ঞান নিয়ে আলোচনা করেন।

ড. আসাদুল্লাহ আল-গালিব: আহলে হাদিস আন্দোলনের একজন উল্লেখযোগ্য স্কলার, হাদিসের ব্যাখ্যায় জোর দেন।

মাওলানা মিজানুর রহমান আযহারী: তার আলোচনা যুবসমাজের মধ্যে অত্যন্ত জনপ্রিয়।

মা-বাবার উচিত নিজেদের সন্তানের বয়স ও প্রয়োজন অনুযায়ী স্কলারদের বক্তব্য নির্বাচন করা এবং একসাথে বসে তা নিয়ে আলোচনা করা।

সন্তানদেরকে ‘ইসলামোফোবিয়া’ বা ইসলামভীতি সম্পর্কে সতর্ক করা

সন্তানদেরকে ‘ইসলামোফোবিয়া’ (Islamophobia) বা ইসলামভীতি সম্পর্কে সতর্ক করা মা-বাবার একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। এর উদ্দেশ্য হলো, যেন তারা সঠিক ইসলামী শিক্ষা ও মূল্যবোধ থেকে দূরে সরে না যায় এবং ইসলাম সম্পর্কে সমাজে প্রচলিত ভুল ধারণা বা বিদ্বেষপূর্ণ প্রচারণাকে সত্য বলে মেনে না নেয়। ইসলামের দৃষ্টিতে এই বিষয়টি কেন গুরুত্বপূর্ণ, তা নিচে আলোচনা করা হলো:

১. ঈমান ও আত্মমর্যাদা রক্ষা

ইসলামোফোবিয়া হলো ইসলাম, মুসলিম বা ইসলামী সংস্কৃতির প্রতি বিদ্যমান ভয়, ঘৃণা বা কুসংস্কার। এই বিদ্বেষ যখন সমাজে ব্যাপক হয়, তখন তা মুসলমানদের ঈমান ও আত্মমর্যাদার ওপর আঘাত করে।

ক. আল্লাহর পথে অবিচল থাকা

মা-বাবার প্রধান দায়িত্ব হলো সন্তানদেরকে তাওহীদের উপর অটল থাকতে শেখানো। ইসলামোফোবিয়া সাধারণত মুসলিমদের দুর্বলতা, পশ্চাৎপদতা বা সন্ত্রাসী হিসেবে চিত্রিত করে, যা অনেক সময় তরুণদের মধ্যে ইসলামের প্রতি দ্বিধা বা হীনমন্যতা সৃষ্টি করে।

আল্লাহ তা’আলা মুমিনদেরকে সকল পরিস্থিতিতে সত্যের উপর অবিচল থাকতে নির্দেশ দিয়েছেন-

فَاسْتَمْسِكْ بِالَّذِي أُوحِيَ إِلَيْكَ ۖ إِنَّكَ عَلَىٰ صِرَاطٍ مُّسْتَقِيمٍ

“অতএব, আপনার প্রতি যা ওহী করা হয়, তা দৃঢ়ভাবে ধরুন। নিশ্চয়ই আপনি সরল পথেই আছেন।” সূরা আয-যুখরুফ, : ৪৩

মা-বাবার উচিত সন্তানদেরকে এই বিশ্বাসে বলীয়ান করা যে, তারা যেন কোনো বহিরাগত প্রোপাগান্ডার কারণে সঠিক ইসলাম থেকে সরে না যায়।

খ. হীনমন্যতা থেকে মুক্তি

ইসলামোফোবিয়া দ্বারা প্রভাবিত হয়ে অনেক সন্তান নিজেদের ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে লজ্জিত হতে পারে বা ইসলামের কিছু বিধান (যেমন: পর্দা, হালাল-হারাম) মানতে দ্বিধাগ্রস্ত হতে পারে। মা-বাবার উচিত তাদের মধ্যে ইসলামী মূল্যবোধের প্রতি গর্ব এবং আত্মমর্যাদা তৈরি করা।

২. জ্ঞানার্জন ও অজ্ঞতা দূরীকরণ

ইসলামোফোবিয়ার মূল কারণ হলো ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞতা ও ভুল তথ্য। এর মোকাবিলায় সন্তানদেরকে গভীর ও সঠিক ইসলামী জ্ঞানের মাধ্যমে সজ্জিত করা মা-বাবার কর্তব্য।

ক. সঠিক জ্ঞান দ্বারা ভুল ধারণা প্রতিহত করা

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) জ্ঞান অর্জনকে প্রত্যেক মুসলমানের উপর ফরয করেছেন। সন্তানদেরকে যদি ইসলামের সঠিক ইতিহাস, মানবিক শিক্ষা এবং জিহাদ, নারীর অধিকার বা শান্তির প্রকৃত ধারণা সম্পর্কে শিক্ষিত করা হয়, তবে তারা ইসলামোফোবিক প্রচারণার যুক্তি দিয়ে মোকাবিলা করতে পারবে।

আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলিমের উপর ফারয। অপাত্রে জ্ঞান দানকারী শুকরের গলায় মণিমুক্তা ও সোনার হার পরানো ব্যাক্তির সমতুল্য। সুনানে ইবনে মাজাহ : ২২৪

স্কলারদের ভিডিও (যা পূর্বের উত্তরে উল্লিখিত) বা পারিবারিক তালিমের মাধ্যমে মা-বাবা সন্তানদেরকে শেখাতে পারেন যে, উগ্রবাদ বা সন্ত্রাসবাদ ইসলাম ধর্ম সমর্থন করে না, বরং এগুলো ইসলামের মূল শিক্ষার বিপরীত।

খ. মধ্যমপন্থা অবলম্বন

ইসলাম চরমপন্থাকে প্রত্যাখ্যান করে এবং মধ্যমপন্থা (আল-ওয়াসাতিয়্যাহ) অবলম্বনের নির্দেশ দেয়। ইসলামোফোবিয়া সাধারণত দুই ধরনের চরমপন্থার কারণে সৃষ্টি হয়: হয় মুসলিমদের পক্ষ থেকে আসা উগ্রবাদ, নয়তো পশ্চিমা মিডিয়ার নেতিবাচক প্রচার। মা-বাবার উচিত সন্তানকে এই দুই চরমপন্থা থেকে দূরে থেকে সহিষ্ণু ও ভারসাম্যপূর্ণ ইসলাম শেখানো।

আল্লাহ তা’আলা মুমিনদেরকে মধ্যপন্থী উম্মত হিসেবে সৃষ্টি করেছেন:

وَكَذَٰلِكَ جَعَلْنَاكُمْ أُمَّةً وَسَطًا لِّتَكُونُوا شُهَدَاءَ عَلَى النَّاسِ

“আর এভাবেই আমি তোমাদেরকে এক মধ্যপন্থী জাতি করেছি, যাতে তোমরা মানবজাতির উপর সাক্ষী হও।” সূরা বাকারা : ১৪৩

৩. উত্তম আচরণ ও দাওয়াহ

ইসলামোফোবিয়ার মোকাবিলায় সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র হলো উত্তম চরিত্র ও ব্যবহার। মা-বাবার উচিত সন্তানদেরকে এমনভাবে গড়ে তোলা, যেন তাদের আচরণই ইসলামের সৌন্দর্য তুলে ধরে।

ক. উত্তম চরিত্রের আদর্শ

ইসলামোফোবিয়ার জবাব ঘৃণার মাধ্যমে নয়, বরং নম্রতা, বিনয় এবং উত্তম ব্যবহারের মাধ্যমে দিতে শেখাতে হবে।

আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন:

إِنَّمَا بُعِثْتُ لِأُتَمِّمَ مَكَارِمَ الْأَخْلَاقِ

“নিশ্চয়ই আমি উত্তম চরিত্রের পূর্ণতা সাধনের জন্যই প্রেরিত হয়েছি।” মুসনাদে আহমাদ : ৮৯৮৫, আল-হাকিম, আল-মুস্তাদরাক :: ৪২২১,  আল-বায়হাকি, শু’আবুল ঈমান : ২০৯৫৮

মা-বাবার কর্তব্য হলো সন্তানকে সমাজের অন্য ধর্ম বা গোষ্ঠীর মানুষের সাথে উত্তম ব্যবহারের মাধ্যমে ইসলামের ইতিবাচক দিক তুলে ধরতে শেখানো। তাদের ব্যক্তিগত জীবনে যেন ইসলামোফোবিয়ার শিকার হয়ে তারা উগ্র প্রতিক্রিয়া না দেখায়, সে বিষয়ে সতর্ক করা উচিত।

গান, কবিতা, গল্প-উপন্যাস, নাটক, সিনেমা এবং বাঙালী কালচারের নামে শিরক থেকে সতর্ক করা

ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে, সন্তানদেরকে গান, কবিতা, গল্প-উপন্যাস, নাটক, সিনেমা এবং বাঙালি সংস্কৃতির নামে প্রচলিত শিরক (শিরক) ও বিদআত (বিদ’আহ) সম্পর্কে সচেতন করা মা-বাবার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঈমানী দায়িত্ব। আধুনিক সংস্কৃতিতে বহু উপাদান রয়েছে যা ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস, বিশেষ করে তাওহীদ (একত্ববাদ)-এর সাথে সাংঘর্ষিক।

কুরআন ও হাদিসের আলোকে এই বিষয়ে মা-বাবার দায়িত্ব নিচে তুলে ধরা হলো:

১. তাওহীদ রক্ষা: শিরকের ভয়াবহতা

ইসলামের মূল ভিত্তি হলো তাওহীদ বা আল্লাহর একত্ববাদ। শিরক হলো এই তাওহীদের সম্পূর্ণ বিপরীত এবং ইসলামে এটি সবচেয়ে বড় গুনাহ (পাপ)। সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এই বিশ্বাসবিরোধী উপাদানগুলো থেকে সন্তানকে রক্ষা করাই মা-বাবার প্রথম দায়িত্ব।

ক. শিরক সবচেয়ে বড় জুলুম

আল্লাহ তা’আলা শিরককে সবচেয়ে বড় জুলুম হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। সন্তানদেরকে এই মৌলিক ধারণাটি ছোটবেলা থেকেই শেখানো উচিত।

আল্লাহ তা’আলা লুকমান (আ.)-এর উপদেশ তুলে ধরে বলেন:

يَا بُنَيَّ لَا تُشْرِكْ بِاللَّهِ ۖ إِنَّ الشِّرْكَ لَظُلْمٌ عَظِيمٌ

“হে আমার বৎস! আল্লাহর সাথে অংশীদার সাব্যস্ত করো না। নিশ্চয়ই শিরক বা অংশীদারিত্ব স্থাপনকারী কাজ মহাপাপ।” (সূরা লুকমান, ৩১:১৩)

সংস্কৃতির নামে শিরকের ধারণাগুলো (যেমন: মূর্তিপূজার গুণগান, কোনো পীর বা ব্যক্তির অলৌকিক ক্ষমতা বা ভাগ্য নির্ধারণের ক্ষমতা বর্ণনা, লৌকিক দেব-দেবীকে মহিমান্বিত করা) সন্তানের মনকে বিষিয়ে তুলতে পারে।

খ. শিরক ক্ষমা হয় না

শিরকের ভয়াবহতা সম্পর্কে কুরআনে কঠোর সতর্কবাণী রয়েছে:

إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَن يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَٰلِكَ لِمَن يَشَاءُ

“নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সাথে শিরক করা ক্ষমা করেন না। এর নিম্ন পর্যায়ের পাপ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন।” (সূরা আন-নিসা, ৪:৪৮)

পারিবারিক তালিমের মাধ্যমে মা-বাবা সন্তানদেরকে সংস্কৃতি ও বিনোদনের আবরণে লুকিয়ে থাকা শিরকের সূক্ষ্ম বিষয়গুলো (যেমন: গানের মাধ্যমে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও কাছে সাহায্য চাওয়া, ভাগ্য গণনার ওপর বিশ্বাস, ইত্যাদি) চিনিয়ে দিতে পারেন।

২. সাংস্কৃতিক মাধ্যমে প্রচলিত শিরক ও বিদআতের উদাহরণ

বাঙালি সংস্কৃতিতে গান, কবিতা, গল্প-উপন্যাস, নাটক ও সিনেমায় নিম্নলিখিত রূপে শিরক বা ইসলাম-বিরোধী বিশ্বাসগুলো মিশে থাকতে পারে:

মাধ্যমশিরকের/বিদআতের ক্ষেত্রব্যাখ্যা
কবিতা/গানলৌকিক দেব-দেবী বা মাজার পূজা: আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কাছে প্রার্থনা করা বা মাজারের অলৌকিক ক্ষমতার গুণকীর্তন।এটি শিরকে আকবর-এর অন্তর্ভুক্ত, কারণ এতে ইবাদত বা প্রার্থনাকে আল্লাহ ছাড়া অন্যের দিকে নিবিষ্ট করা হয়।
গল্প/উপন্যাসভাগ্য গণনা ও কুসংস্কার: হাত দেখা, রাশিফল, অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন সাধু বা পীরের মাধ্যমে ভাগ্য পরিবর্তনের কাহিনি।এটি শিরকে আসগর (ছোট শিরক) বা কুফরের দিকে নিয়ে যেতে পারে। রাসূল (সাঃ) ভাগ্য গণনাকারীর কাছে যেতে নিষেধ করেছেন।
নাটক/সিনেমানারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা ও অশ্লীলতা: ইসলামের পর্দার বিধান লঙ্ঘন ও অনৈতিক সম্পর্ককে স্বাভাবিকভাবে উপস্থাপন।এটি সরাসরি হারাম কাজ এবং নৈতিক অবক্ষয় সৃষ্টি করে। মা-বাবার উচিত এর ক্ষতিকর দিকগুলো সন্তানকে বোঝানো।
বাঙালী কালচারইসলাম-বিরোধী উৎসব: মূর্তিপূজা সংশ্লিষ্ট উৎসব বা অনুষ্ঠানকে সরাসরি সমর্থন ও তাতে অংশগ্রহণ করা।এটি ঈমান ও তাওহীদের সাথে সাংঘর্ষিক, কারণ এতে ইসলাম-বিরোধী বিশ্বাসের প্রতি সমর্থন প্রকাশ পায়।
 

৩. মা-বাবার দায়িত্ব: সচেতনতা ও উত্তম বিকল্প

মা-বাবার দায়িত্ব শুধু শিরক থেকে নিষেধ করাই নয়, বরং উত্তম বিকল্প দিয়ে সন্তানকে সঠিক পথে বিনোদনের ব্যবস্থা করা।

ক. উত্তম আদর্শ শিক্ষা দেওয়া

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন:

الْمَرْءُ عَلَى دِينِ خَلِيلِهِ فَلْيَنْظُرْ أَحَدُكُمْ مَنْ يُخَالِلُ

“মানুষ তার বন্ধুর আদর্শে চলে; অতএব তোমাদের প্রত্যেকে যেন লক্ষ্য করে, সে কার সাথে বন্ধুত্ব করছে।” (সুনান আবূ দাউদ, হাদিস: ৪৮৩৩)

মা-বাবার উচিত সংস্কৃতির মাধ্যমে আসা খারাপ প্রভাব থেকে সন্তানকে রক্ষা করা এবং তাদের বিনোদনের জন্য ইসলামী শিক্ষামূলক কন্টেন্ট (গজল, ইসলামী ইতিহাস, জীবনমুখী কবিতা ইত্যাদি) বেছে নিতে উৎসাহিত করা।

খ. কঠোরভাবে নজরদারি

মা-বাবার দায়িত্ব হলো সন্তানের রাখাল বা রক্ষক হিসেবে তাদের বিনোদন মাধ্যম ও বন্ধুমহলের প্রতি নজর রাখা। রাসূল (সাঃ) বলেছেন: “তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং তোমরা প্রত্যেকেই তোমাদের দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে…” (সহীহ বুখারী, ৮৯৩)।

পারিবারিক তালিম ও আলোচনা সভার মাধ্যমে সন্তানদের সামনে শিরক ও বিদআতের ভয়াবহতা তুলে ধরতে হবে এবং ইসলামী সংস্কৃতির সৌন্দর্য ও পবিত্রতা সম্পর্কে তাদের অবগত করতে হবে। এতে সন্তানরা সচেতনভাবে ক্ষতিকর বিষয়গুলো পরিহার করতে শিখবে।

বিভিন্ন সোস্যাল মিডিয়া সম্পর্কে সতর্ক করা

বর্তমানে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম (যেমন: টেলিভিশন, ফেসবুক, ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম, এক্স ইত্যাদি) প্রায়শই ইসলাম বিরোধী কন্টেন্ট, অশ্লীলতা, বেহায়াপনা ও পর্দার লঙ্ঘনের মতো বিষয়বস্তুতে পূর্ণ থাকে। সন্তানদেরকে এই মাধ্যমগুলোর ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে সতর্ক করা এবং নিয়ন্ত্রণ করা মা-বাবার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঈমানী ও চারিত্রিক দায়িত্ব।

১. পরিবারকে সুরক্ষা ও বেহায়াপনা থেকে বারণ

কুরআন মাজীদে মা-বাবাকে তাদের পরিবারকে আখিরাতের শাস্তি থেকে রক্ষার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং অশ্লীলতা ও বেহায়াপনার পথ পরিহার করতে বলা হয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ার ক্ষতিকর কন্টেন্টগুলো সরাসরি এই জাহান্নামের পথের দিকে পরিচালিত করতে পারে। তাই এগুলো থেকে সন্তানদেরকে রক্ষা করা মা-বাবার প্রত্যক্ষ দায়িত্ব। তাই মা-বাবাকে সন্তানের আখিরাত রক্ষায় সোশ্যাল মিডিয়ার অশ্লীল কনটেন্ট থেকে বাঁচাতে হবে। সোশ্যাল মিডিয়ায় অশ্লীলতা ও বেহায়াপনার ব্যাপকতা নৈতিক অবক্ষয় ঘটায়। ইসলাম সকল প্রকার অশ্লীলতার নিকটবর্তী হতে নিষেধ করে। আল্লাহ তা’আলা বলেন-

وَلَا تَقْرَبُوا الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ

তোমরা প্রকাশ্যে বা গোপনে কোনো অশ্লীল কাজের কাছেও যেয়ো না।” (সূরা আল-আন’আম, ৬:১৫১)

আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন-

إِنَّمَا يَأْمُرُكُم بِالسُّوءِ وَالْفَحْشَاءِ

“শয়তান তোমাদেরকে কেবল মন্দ ও অশ্লীলতার আদেশ দেয়।” সুরা বাকারা : ২৬৯

পর্দার লঙ্ঘন, যৌন উত্তেজক কন্টেন্ট বা বেহায়াপনার দৃশ্য দেখা এই ‘ফাওয়াহিশ’ (অশ্লীল কাজ)-এর অন্তর্ভুক্ত। মা-বাবার উচিত সন্তানকে শেখানো যে, না দেখা ও না শোনাও এই আয়াতেরই অংশ।

২. দৃষ্টি সংযত রাখার নির্দেশ

সোশ্যাল মিডিয়া যখন অনবরত পর্দার লঙ্ঘন ঘটায়, তখন মা-বাবার কর্তব্য হলো সন্তানকে আল্লাহ্‌র নির্দেশ অনুযায়ী দৃষ্টি সংযত রাখতে শেখানো। আল্লাহ তা’আলা বলেন:

قُل لِّلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ ۚ ذَٰلِكَ أَزْكَىٰ لَهُمْ

“মুমিন পুরুষদেরকে বলো, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে। এটাই তাদের জন্য অধিক পবিত্র।” সূরা নূর : ৩০

পর্দার লঙ্ঘিত দৃশ্য সোশ্যাল মিডিয়াতে দেখার কারণে দৃষ্টি সংযত রাখার এই নির্দেশ অমান্য হয়।

.

৩. আমানত হিসেবে সন্তানের সুরক্ষা

মা-বাবা তাদের সন্তানের মানসিক, নৈতিক ও আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য দায়ী। সোশ্যাল মিডিয়া এই উন্নতিকে বাধাগ্রস্ত করলে মা-বাবার অবশ্যই হস্তক্ষেপ করতে হবে। কেননা মা-বাআ  তার সন্তানের প্রতি দায়িত্বশীল, আর এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। সহীহ বুখারী : ৮৯৩

সোশ্যাল মিডিয়ার অপব্যবহার সম্পর্কে মা-বাবা যদি সচেতন না হন এবং নিয়ন্ত্রণ না করেন, তবে এই দায়িত্ব পালনে তারা ব্যর্থ হবেন।

৪. ফিতনা থেকে দূরে থাকা

সোশ্যাল মিডিয়ার ইসলাম বিরোধী বা অশ্লীল কন্টেন্টগুলো হলো এক প্রকার ‘ফিতনা’ (পরীক্ষা বা ফেতনা) যা মানুষকে বিভ্রান্ত করে। রাসূল (সাঃ) ফিতনা থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দিয়েছেন।

আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ অচিরেই এমন ফিতনাহর আত্মপ্রকাশ হবে, যখন উপবিষ্ট ব্যক্তি দণ্ডায়মান ব্যক্তি হতে উত্তম থাকবে। আর দণ্ডায়মান ব্যক্তি তখন চলমান ব্যক্তি হতে উত্তম থাকবে। আর চলমান ব্যক্তি তখন দ্রুতগামী ব্যক্তি হতে ভাল থাকবে। যে ব্যক্তি সে ফিতনায় যখন জড়িয়ে পড়বে তাকে সে ফিতনাহ ধ্বংস করে দিবে। আর যে ব্যক্তি কোন আশ্রয়স্থল পাবে, তার সেটা দ্বারা আশ্রয় নেয়া বাঞ্ছনীয়। সহীহ মুসলিম : ২৮৮৯

মা-বাবার দায়িত্ব হলো সন্তানের মনোযোগকে সোশ্যাল মিডিয়ার ক্ষতিকর ফিতনা থেকে সরিয়ে উপকারী জ্ঞান, যেমন- কুরআনের তেলাওয়াত, ইসলামী স্কলারদের লেকচার বা গঠনমূলক কাজে নিয়োজিত করা।

৫. মা-বাবার করণীয়

মা-বাবার জন্য কেবল নিষেধ করাই যথেষ্ট নয়, বরং এই দায়িত্ব পালনের জন্য নিম্নলিখিত পদক্ষেপ নিতে হবে:

সচেতনতা ও আলোচনা:

সন্তানের সাথে সোশ্যাল মিডিয়ার ক্ষতিকর দিকগুলো নিয়ে খোলামেলা ও বন্ধুত্বপূর্ণ আলোচনা করা।

পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ:

সন্তানদের ইন্টারনেট ব্যবহারের সময়সূচি ও প্ল্যাটফর্মগুলোতে নজরদারি (Parental Control) রাখা।

উত্তম বিকল্প প্রদান: ক্ষ

তিকর বিনোদনের পরিবর্তে ইসলামী শিক্ষামূলক কন্টেন্ট (যেমন: পূর্বের উত্তরে উল্লিখিত স্কলারদের ভিডিও) বা স্বাস্থ্যকর বিনোদন গ্রহণে উৎসাহিত করা।

সন্তানকে সোশ্যাল মিডিয়ার খারাপ প্রভাব থেকে দূরে রাখা মা-বাবার জন্য আল্লাহর দেওয়া আমানত রক্ষারই নামান্তর।

সন্তানের অধিকার : চতুর্থ পর্ব

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

সন্তান সাইবার বুলিং-এর শিকার হলে, সান্তনা ও সাহস প্রদান করা

সন্তান যদি ইসলামের অনুশাসন মেনে চলার কারণে সাইবার বুলিং বা অনলাইন হয়রানির শিকার হয়, তবে এটি তাদের ঈমান ও মানসিকতার জন্য এক কঠিন পরীক্ষা। এই পরিস্থিতিতে সন্তানের পাশে দাঁড়ানো, তাকে সান্ত্বনা ও সাহস প্রদান করা মা-বাবার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঈমানী ও মানবিক দায়িত্ব।

১. ধৈর্য ও সহনশীলতার প্রদর্শন করা

সাইবার বুলিং হলো এক ধরনের মানসিক অত্যাচার। এর মোকাবিলায় ইসলামে ধৈর্য, ক্ষমা ও আল্লাহর উপর ভরসার মাধ্যমে সান্ত্বনা প্রদানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সন্তানকে শেখানো উচিত যে, যখন কোনো মুমিনকে তার দ্বীনের কারণে কষ্ট দেওয়া হয়, তখন আল্লাহ তার সাথে থাকেন। এই সময় আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া এবং ধৈর্য ধারণ করা উচিত। আল্লাহ তা’আলা বলেন:

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اسْتَعِينُوا بِالصَّبْرِ وَالصَّلَاةِ ۚ إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ

হে মুমিনগণ! তোমরা ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।” সূরা বাকারা : ১৫৩

মা-বাবার উচিত সন্তানকে বোঝানো যে, অন্যদের ঠাট্টা বা সমালোচনার কারণে ইসলাম ত্যাগ না করে, বরং ধৈর্য ধারণ করলে আল্লাহই তার উত্তম প্রতিদান দেবেন।

২. উত্তম পন্থায় জবাব দেওয়ার শিক্ষা

সাইবার বুলিং-এর জবাবে প্রতিশোধপরায়ণ না হয়ে, মা-বাবা সন্তানকে নম্র ও উত্তম পন্থায় জবাব দিতে বা উপেক্ষা করতে উৎসাহিত করবেন। আল্লাহ তা’আলা মন্দকে উত্তম দ্বারা প্রতিহত করার নির্দেশ দিয়েছেন:

وَلَا تَسْتَوِي الْحَسَنَةُ وَلَا السَّيِّئَةُ ۚ ادْفَعْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ

ভালো কাজ ও মন্দ কাজ সমান হতে পারে না। তুমি মন্দকে প্রতিহত করো তা দ্বারা, যা সবচেয়ে উত্তম।” সূরা হা-মীম আস-সাজদাহ : : ৩৪

মা-বাবার ভূমিকা হলো— সন্তানকে শেখানো যে, অনলাইন হয়রানিকারীর সাথে তর্ক বা ঝগড়ায় না জড়িয়ে, ভদ্রভাবে ভুল ধারণা দূর করা অথবা সম্পূর্ণ এড়িয়ে যাওয়াই ইসলামী শিষ্টাচার।

৩. মুমিনের মর্যাদা মাধ্যমে সান্ত্বনা খোজা

হাদিসে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, ইসলামের কারণে কষ্ট সহ্য করা মুমিনের মর্যাদা বৃদ্ধি করে এবং মা-বাবার জন্য সান্ত্বনা প্রদান একটি নৈতিক কর্তব্য। মা-বাবার উচিত সন্তানকে সাহস দিয়ে বোঝানো যে, সে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কষ্ট সহ্য করছে, যা তার পরকালীন মর্যাদা বৃদ্ধি করবে।

আবূ সাঈদ আল-খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নিকট গেলাম, তখন তিনি ভীষণ জ্বরে আক্রান্ত ছিলেন। আমি তাঁর উপর আমার হাত রাখলে তার গায়ের চাদরের উপর থেকেই তাঁর দেহের প্রচন্ড তাপ অনুভব করলাম। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! কত তীব্র জ্বর আপনার। তিনি বলেনঃ আমাদের (নবী-রাসূলগণের) অবস্থা এমনই হয়ে থাকে। আমাদের উপর দ্বিগুণ বিপদ আসে এবং দ্বিগুণ পুরস্কারও দেয়া হয়। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! কার উপর সর্বাধিক কঠিন বিপদ আসে? তিনি বলেনঃ নবীগণের উপর। আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! তারপর কার উপর? তিনি বলেনঃ তারপর নেককার বান্দাদের উপর। তাদের কেউ এতটা দারিদ্র পীড়িত হয় যে, শেষ পর্যন্ত তার কাছে তার পরিধানের কম্বলটি ছাড়া আর কিছুই থাকে না। তাদের কেউ বিপদে এত শান্ত ও উৎফুল্ল থাকে, যেমন তোমাদের কেউ ধন-সম্পদ প্রাপ্তিতে আনন্দিত হয়ে থাকে। সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪০৪২, সহীহাহ : ১৪৪

এই হাদিস দ্বারা মা-বাবা সন্তানকে বোঝাতে পারেন যে, সাইবার বুলিং হলো দ্বীনের উপর অবিচল থাকার একটি পরীক্ষা মাত্র। এতে সে নবী-রাসূলদের পথের পথিক হলো।

৪. উত্তম আচরণ ও সহানুভূতি প্রদর্শন

সন্তানের প্রতি মা-বাবার কোমলতা ও সহানুভূতি (রাহমাহ) প্রকাশ করা অত্যাবশ্যক। সাইবার বুলিং-এর শিকার সন্তান মানসিকভাবে বিপর্যস্ত থাকে। তাদের প্রতি সমর্থন ও ভালোবাসা দেখানো মা-বাবার মানবিক কর্তব্য।

মা-বাবার উচিত সন্তানের সাথে খোলাখুলি কথা বলা, তার কষ্টের কথা শোনা এবং তাকে নিশ্চিত করা যে, ইসলামের পথে থাকার কারণে তারা সন্তানের প্রতি গর্বিত। তাদের প্রতি অভিশাপ না দিয়ে বা হতাশ না করে, বরং তাদের জন্য দোয়া করা মা-বাবার দায়িত্ব।

৫. মা-বাবার দায়িত্ব ও ভূমিকা

সাইবার বুলিং-এর মোকাবিলায় মা-বাবাকে নিম্নলিখিত পদক্ষেপ নিতে হবে:

মানসিক সহায়তা:

সন্তানকে পর্যাপ্ত মানসিক সমর্থন দিন, তার আত্মবিশ্বাস বাড়ান এবং তাকে বোঝান যে তার দ্বীনি পরিচয় নিয়ে লজ্জিত হওয়ার কিছু নেই।

প্রযুক্তিগত সুরক্ষা:

সাইবার বুলিং-এর শিকার হলে অবিলম্বে সেই কন্টেন্ট বা প্রোফাইল ব্লক করা, রিপোর্ট করা এবং প্রয়োজনে আইনি বা প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা নেওয়া।

সঠিক জ্ঞান প্রদান:

সন্তানকে ইসলামের সঠিক শিক্ষাদান করুন, যাতে সে বুঝতে পারে যে, তার দ্বীন তাকে উদারতা, ধৈর্য এবং উত্তম আচরণই শেখায়।

শারীরিক নিরাপত্তা:

অনলাইনে পরিচয় প্রকাশ করে বুলিং হলে, সন্তানের শারীরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সতর্ক থাকুন।

মা-বাবার ভালোবাসা ও দৃঢ় সমর্থন একটি সন্তানের ঈমানকে সাইবার বুলিং-এর আঘাত থেকে রক্ষা করতে এবং তাকে দ্বীনের পথে অবিচল থাকতে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করে।

ওয়েবসাইট ভিজিট করার বিষয়ে সতর্কতা করা

সন্তানদেরকে ওয়েবসাইট ভিজিট করার বিষয়ে সতর্কতা ও নিয়ন্ত্রণ করা মা-বাবার একটি অত্যন্ত জরুরি ঈমানী, নৈতিক ও আমানত রক্ষার দায়িত্ব। আধুনিক যুগে, ইন্টারনেট ও ওয়েবসাইটগুলো যেমন জ্ঞানের বিশাল উৎস, তেমনি ইসলাম-বিরোধী, অশ্লীলতা, বেহায়াপনা, এবং মিথ্যা তথ্যেরও প্রধান মাধ্যম। কুরআন মাজীদে মা-বাবাকে তাদের পরিবারকে কেবল পার্থিব নয়, বরং আধ্যাত্মিক ও নৈতিক ক্ষতি থেকেও রক্ষা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

১. জাহান্নামের আগুন থেকে পরিবারকে রক্ষা

ওয়েবসাইটে অশ্লীল বা ইসলাম-বিরোধী কন্টেন্ট দেখার মাধ্যমে সন্তানেরা জাহান্নামের দিকে পরিচালিত হতে পারে। এই পথ থেকে সন্তানকে রক্ষা করার দায়িত্ব মা-বাবার। আল্লাহ তা’আলা বলেন:

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا

হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করো।” সূরা তাহরীম : ৬

ওয়েবসাইট ভিজিটের উপর নিয়ন্ত্রণ না রাখলে এই দায়িত্ব পালন করা অসম্ভব। কাজেই মা বাবার উচিত কঠোর নজরদারীতে রাখা।

২. অশ্লীলতার নিকটবর্তী না হওয়ার নির্দেশ

বেশিরভাগ অশ্লীল ও বেহায়াপনার কন্টেন্ট ওয়েবসাইটের মাধ্যমেই প্রচারিত হয়। ইসলামে কেবল অশ্লীল কাজ নয়, বরং এর নিকটবর্তী হওয়াকেও নিষেধ করা হয়েছে। আল্লাহ তা’আলা বলেন:

وَلَا تَقْرَبُوا الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ

তোমরা প্রকাশ্যে বা গোপনে কোনো অশ্লীল কাজের কাছেও যেয়ো না। সূরা আনআম : ১৫১

ওয়েবসাইটে পর্নোগ্রাফি, বেহায়াপনা বা অশ্লীল দৃশ্য দেখা এই নির্দেশের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। মা-বাবার দায়িত্ব হলো সন্তানকে এমন সাইটে প্রবেশ করা থেকে বিরত রাখা, যা তাদের মন ও আত্মাকে অপবিত্র করে।

৩. দৃষ্টি সংযত রাখার আবশ্যকতা

ওয়েবসাইটে দৃশ্যমান ছবি বা ভিডিওগুলো পর্দার লঙ্ঘন ঘটায়। এই পরিস্থিতিতে মা-বাবার উচিত সন্তানকে আল্লাহর নির্দেশ স্মরণ করিয়ে দেওয়া। আল্লাহ তা’আলা মুমিনদেরকে দৃষ্টি সংযত রাখার নির্দেশ দিয়ে বলেন-

قُل لِّلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ ۚ ذَٰلِكَ أَزْكَىٰ لَهُمْ

মুমিন পুরুষদেরকে বলো, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে। এটাই তাদের জন্য অধিক পবিত্র।” সূরা নূর : ৩০

অনিয়ন্ত্রিত ওয়েবসাইট ভিজিট এই পবিত্রতা নষ্ট করে। অনিয়ন্ত্রিত ওয়েবসাইট ভিজিট সন্তানের মন ও চরিত্রের পবিত্রতা কলুশিত করে। যখন কোনো মুমিন ব্যক্তি বা শিশু আল্লাহর নির্দেশ মেনে তার দৃষ্টিকে নিয়ন্ত্রণ না করে, তখন সে নৈতিক স্খলনের দিকে ঝুঁকে পড়ে। অনিয়ন্ত্রিত ওয়েবসাইট ভিজিটের মাধ্যমে পর্দার লঙ্ঘনকারী বা অশ্লীল দৃশ্য দেখার ফলে দৃষ্টির এই পবিত্রতা নষ্ট হয়। তাই মা-বাবার দায়িত্ব হলো, সন্তানকে শুধু ওয়েবসাইট ভিজিট থেকে বিরত রাখাই নয়, বরং তাদের মন ও আত্মার পবিত্রতা রক্ষার গুরুত্বও শেখানো।

৩. আমানত হিসেবে সন্তানের সুরক্ষা

সন্তানের ইন্টারনেট ব্যবহার ও অনলাইন কার্যক্রমের উপর নজর রাখা মা-বাবার আমলের একটি অংশ।

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, “তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল, আর তোমরা প্রত্যেকেই তোমাদের দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে… আর একজন পুরুষ তার পরিবারের জন্য দায়িত্বশীল, এবং সে তাদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।” সহীহ বুখারী : ৮৯৩

এই হাদিসের আলোকে, ক্ষতিকর ওয়েবসাইটগুলো থেকে সন্তানকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হলে মা-বাবা পরকালে জিজ্ঞাসিত হবেন।

৪. মিথ্যা ও ইসলাম-বিরোধী ধারণা থেকে সুরক্ষা

অনেক ওয়েবসাইটে মিথ্যা তথ্য, ইসলাম-বিরোধী প্রচার বা শিরক ও বিদআতের প্রচার করা হয়। সন্তানদেরকে এই বিভ্রান্তিকর তথ্য থেকে বাঁচানো জরুরি। মা-বাবার কর্তব্য হলো সন্তানকে এমন সাইট ভিজিট করতে উৎসাহিত করা যা সহীহ ইলম (সঠিক জ্ঞান) প্রদান করে।

৫. মা-বাবার দায়িত্ব: করণীয়

মা-বাবাকে অবশ্যই নিম্নলিখিত উপায়ে ওয়েবসাইট ভিজিটের বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে:

ক. ক্ষতিকর ওয়েবসাইট থেকে সন্তানকে দূরে রাখা।

খ. তাদের ব্রাউজিংয়ের উপর নজরদারি করা।

গ. সঠিক ও গঠনমূলক ওয়েবসাইটের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়া।

ঘ. অনলাইন ব্যবহারের জন্য সময়সীমা নির্ধারণ করা।

ঙ. খোলামেলা আলোচনার মাধ্যমে সচেতনতা সৃষ্টি করা।

চ  উত্তম বিকল্প প্রদান ওয়েবসাইট এর সন্ধান প্রদান করা।

যৌনতা, বিবাহ, মাহরাম সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান দেওয়া

ইসলামের দৃষ্টিতে যৌনতা বা সেক্স একটি মানবীয় অপরিহার্য বিষয়, যা আল্লাহ তা’আলা মানবজাতির বংশবৃদ্ধির জন্য এবং স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে শান্তি ও ভালোবাসা সৃষ্টির মাধ্যম হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। তাই বিবাহ বা নিকাহ হলো এই যৌন চাহিদা পূরণের একমাত্র পবিত্র ও বৈধ পন্থা। সন্তানদেরকে যৌনতা, বিবাহ, মাহরাম ইত্যাদি সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান দেওয়া মা-বাবার একটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বীনি দায়িত্ব।

১. বিবাহের মাধ্যমে প্রশান্তি ও পবিত্রতা

কুরআন মাজীদে বিবাহের মাধ্যমে যৌন চাহিদা পূরণকে উৎসাহিত করা হয়েছে এবং এর মাধ্যমে পরিবারে শান্তি লাভের কথা বলা হয়েছে।  সন্তানদেরকে শেখানো উচিত যে, বিবাহ শুধু একটি চুক্তি নয়, বরং এটি শারীরিক ও মানসিক প্রশান্তি লাভের একটি উপায়। আল্লাহ তা’আলা বলেন:

وَمِنْ آيَاتِهِ أَنْ خَلَقَ لَكُم مِّنْ أَنفُسِكُمْ أَزْوَاجًا لِّتَسْكُنُوا إِلَيْهَا وَجَعَلَ بَيْنَكُم مَّوَدَّةً وَرَحْمَةً

আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে অন্যতম হলো, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকে সৃষ্টি করেছেন তোমাদের স্ত্রীদেরকে, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি লাভ করো এবং তোমাদের মধ্যে সৃষ্টি করেছেন ভালোবাসা ও দয়া।” সূরা রূম : ২১

মা-বাবার দায়িত্ব হলো সন্তানের মনে বিবাহ সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা তৈরি করা এবং উপযুক্ত সময়ে বিবাহের ব্যবস্থা করা।

২.. নৈতিক স্খলন থেকে রক্ষা

বিবাহের সঠিক জ্ঞান না থাকলে সন্তান অবৈধ পন্থায় যৌন চাহিদা মেটাতে উৎসাহিত হতে পারে। আল্লাহ তা’আলা স্পষ্টত অবৈধ যৌন সম্পর্ক থেকে দূরে থাকতে নির্দেশ দিয়েছেন-

وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنَا ۖ إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاءَ سَبِيلًا

“আর তোমরা ব্যভিচারের (যিনা) নিকটবর্তীও হয়ো না। নিশ্চয়ই তা অশ্লীল কাজ এবং খুবই খারাপ পথ।” সূরা -ইসরা : ৩২

যৌনতা সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান দেওয়ার মাধ্যমে মা-বাবা সন্তানকে বোঝান যে, যিনার নিকটবর্তী হওয়া কী এবং বৈধ বিবাহের মাধ্যমে কিভাবে এই চাহিদা পূরণ করে নিজেকে পবিত্র রাখা যায়।

৩. মাহরাম ও পবিত্রতার জ্ঞান দান

হাদিসে যৌনতা, মাহরাম এবং ব্যক্তিগত পবিত্রতা (পর্দা) সম্পর্কে বিস্তারিত নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যা সন্তানদেরকে ছোটবেলা থেকেই শেখানো মা-বাবার কর্তব্য। মাহরাম হলো এমন ব্যক্তি, যাদের সাথে বিবাহ চিরতরে হারাম। এই জ্ঞান না থাকলে পারিবারিক এবং সামাজিক পবিত্রতা নষ্ট হতে পারে। কুরআনের সূরা নিসায় সরাসরি উল্লেখ করা হয়েছে যে ১৪ প্রকারের নারীকে বিবাহ করা হারাম। যেমন-

ক. মা এবং নানী-দাদী : নিজের জন্মদাত্রী মা, এবং মায়ের মা ও বাবার মা (নানী-দাদী) এর সাথে বিবাহ হারাম।

খ. মেয়ে এবং নাতনি : নিজের ঔরসের মেয়ে, ছেলের মেয়ে ও মেয়ের মেয়ে (নাতনি) এর সাথে বিবাহ হারাম।

গ. বোন : আপন বোন, সৎ বোন (পিতার বা মাতার দিক থেকে) এর সাথে বিবাহ হারাম।

ঘ. ফুফু : পিতার বোন।

ঙ. খালা : মায়ের বোন।

চ. ভাইয়ের মেয়ে (ভাতিজি) : ভাইয়ের ঔরসের মেয়ে।

ছ. বোনের মেয়ে (ভাগ্নি): বোনের ঔরসের মেয়ে।

মা-বাবার দায়িত্ব হলো সন্তানকে এই তালিকা সম্পর্কে সচেতন করা, যেন তারা পরিবারে নারী-পুরুষের মেলামেশার ক্ষেত্রে ইসলামী সীমা বজায় রাখে।

৪. যৌবনের পবিত্রতা রক্ষার নির্দেশ

যুবকদের জন্য যৌনতাকে নিয়ন্ত্রণে রেখে বিবাহের প্রতি উৎসাহিত করা হয়েছে।

’আবদুল্লাহ্ ইবনু মাস’ঊদ (রাঃ) বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে আমরা কতক যুবক ছিলাম; আর আমাদের কোন কিছু ছিল না। এই হালতে আমাদেরকে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, হে যুব সম্প্রদায় [1]! তোমাদের মধ্যে যারা বিয়ে করার সামর্থ্য রাখে, তারা যেন বিয়ে করে। কেননা, বিয়ে তার দৃষ্টিকে সংযত রাখে এবং লজ্জাস্থান হিফাযত করে এবং যার বিয়ে করার সামর্থ্য নেই, সে যেন সওম পালন করে। কেননা, সওম তার যৌনতাকে দমন করবে। সহহি বখারি :  ১৯০৫, ৫০৬৬

মা-বাবার কর্তব্য হলো সন্তানকে যৌবনের চাহিদা ও চ্যালেঞ্জগুলো সম্পর্কে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে সৎ ও বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে শিক্ষা দেওয়া এবং বিবাহের সামর্থ্য অর্জনে সহায়তা করা।

৫. শালীনতা ও অনুমতি চাওয়ার শিক্ষা

এমনকি পারিবারিক পরিসরেও শালীনতা বজায় রাখা এবং ব্যক্তিগত স্থানে প্রবেশের আগে অনুমতি চাওয়ার শিক্ষা দিতে হবে। আল্লাহ তা’আলা নির্দেশ বলেছেন-

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا لِیَسۡتَاۡذِنۡکُمُ الَّذِیۡنَ مَلَکَتۡ اَیۡمَانُکُمۡ وَالَّذِیۡنَ لَمۡ یَبۡلُغُوا الۡحُلُمَ مِنۡکُمۡ ثَلٰثَ مَرّٰتٍ ؕ مِنۡ قَبۡلِ صَلٰوۃِ الۡفَجۡرِ وَحِیۡنَ تَضَعُوۡنَ ثِیَابَکُمۡ مِّنَ الظَّہِیۡرَۃِ وَمِنۡۢ بَعۡدِ صَلٰوۃِ الۡعِشَآءِ ۟ؕ ثَلٰثُ عَوۡرٰتٍ لَّکُمۡ ؕ لَیۡسَ عَلَیۡکُمۡ وَلَا عَلَیۡہِمۡ جُنَاحٌۢ بَعۡدَہُنَّ ؕ طَوّٰفُوۡنَ عَلَیۡکُمۡ بَعۡضُکُمۡ عَلٰی بَعۡضٍ ؕ کَذٰلِکَ یُبَیِّنُ اللّٰہُ لَکُمُ الۡاٰیٰتِ ؕ وَاللّٰہُ عَلِیۡمٌ حَکِیۡمٌ

হে মুমিনগণ, তোমাদের ডানহাত যার মালিক হয়েছে এবং তোমাদের মধ্যে যারা প্রাপ্তবয়স্ক হয়নি তারা যেন অবশ্যই তিন সময়ে অনুমতি গ্রহণ করে। ফজরের সালাতের পূর্বে, দুপুরে যখন তোমরা তোমাদের পোশাক খুলে রাখ, এবং ‘ইশার সালাতের পর; এই তিনটি তোমাদের [গোপনীয়তার] সময়। এই তিন সময়ের পর তোমাদের এবং তাদের কোন দোষ নেই। তোমাদের একে অন্যের কাছে যাতায়াত করতেই হয়। এভাবে আল্লাহ তোমাদের উদ্দেশ্যে তাঁর আয়াতসমূহ বর্ণনা করেন। আল্লাহ মহাজ্ঞানী, প্রজ্ঞাময়।  সূরা নূর, ২৪:৫৮

মা-বাবার উচিত সন্তানকে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও শারীরিক শালীনতা সম্পর্কে শিক্ষা দেওয়া।

মা-বাবার দায়িত্ব

আধুনিক সমাজে মা-বাবাকে এই বিষয়ে নীরব না থেকে ইসলামের শিক্ষার আলোকে সন্তানের সাথে খোলাখুলি আলোচনা করতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন:

বৈজ্ঞানিক ও ধর্মীয় ভারসাম্য:

যৌনতা ও শারীরিক পরিবর্তনগুলো নিয়ে লজ্জা না পেয়ে, ইসলামী মূল্যবোধের ভিত্তিতে বিজ্ঞানসম্মত আলোচনা করা।

সঠিক তথ্যের উৎস:

পশ্চিমা সংস্কৃতি বা পর্নোগ্রাফির মাধ্যমে বিকৃত তথ্য পাওয়ার আগে, মা-বাবার উচিত সন্তানদেরকে এই বিষয়ে সঠিক ইসলামী জ্ঞান সরবরাহ করা।

পবিত্রতার গুরুত্ব:

সন্তানকে বোঝানো যে, ইসলামী বিধান মেনে চলাই হলো শারীরিক ও আত্মিক পবিত্রতা রক্ষার শ্রেষ্ঠ উপায়।

সন্তানকে ইভটিজিং এবং যৌন হয়রানি থেকে বাঁচাতে সাহায্য করা

সন্তানকে ইভটিজিং (Eve-teasing) এবং যৌন হয়রানি (Sexual Harassment) থেকে বাঁচাতে মা-বাবার ভূমিকা অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং জরুরি। ইসলাম নারী-পুরুষ উভয়ের পবিত্রতা ও সম্মান রক্ষাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়। কুরআন ও হাদিসের আলোকে এই ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি থেকে সন্তানকে রক্ষা করতে মা-বাবার করণীয় পদক্ষেপগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:

১. আত্মরক্ষা ও পবিত্রতার শিক্ষা

মা-বাবার প্রধান দায়িত্ব হলো সন্তানকে এমন নৈতিক শিক্ষা দেওয়া, যা তাদেরকে আত্মরক্ষায় সক্ষম করে তুলবে এবং যেকোনো প্রকার ফাহেশা থেকে দূরে রাখবে। যৌন হয়রানির মূল কারণ হলো শালীনতার অভাব এবং দৃষ্টির অবাধ বিচরণ। মা-বাবার উচিত সন্তানকে শেখানো যে, কেবল পোশাকই নয়, বরং দৃষ্টি ও আচরণের পর্দা রক্ষা করাও বাধ্যতামূলক। আল্লাহ তা’আলা মুমিন পুরুষ ও নারীকে দৃষ্টি সংযত রাখতে নির্দেশ দিয়েছেন:

قُل لِّلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ ۚ ذَٰلِكَ أَزْكَىٰ لَهُمْ

“মুমিন পুরুষদেরকে বলো, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে। এটাই তাদের জন্য অধিক পবিত্র।” সূরা নূর :৩০

আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন-

وَقُل لِّلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ

“আর মুমিন নারীদেরকে বলো, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে।” সূরা নূর  :৩১

মা-বাবা উভয়কেই ছেলেদের শেখাতে হবে যেন তারা অন্য নারীদেরকে সম্মান করে এবং মেয়েদের শেখাতে হবে যেন তারা নিজেদের সম্মান রক্ষায় পূর্ণ সতর্কতা অবলম্বন করে।

২. নির্জনতা পরিহারের শিক্ষা

যৌন হয়রানি বা আক্রমণের সুযোগ সৃষ্টি হয় যখন কোনো নারী-পুরুষ নির্জনে একত্রিত হয়। মা-বাবার উচিত সন্তানকে মাহরাম নন এমন কোনো বিপরীত লিঙ্গের সাথে একা না থাকার বিষয়ে সতর্ক করা।

ইবনে আমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী ﷺ বলেছেন:

لَا يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةٍ إِلَّا كَانَ ثَالِثَهُمَا الشَّيْطَانُ

“যখন কোনো পুরুষ (মাহরাম নয় এমন) কোনো নারীর সাথে নির্জনে থাকে, তখন তাদের তৃতীয়জন হয় শয়তান।  সুনানে তিরমিজি : ২১৬৫,  মুসনাদ আহমদ : ১৪৮০৪, তাবরানী : ১৭৪৫৮

সূলুল্লাহ (সাঃ) স্পষ্ট ভাষায় কোনো নারী ও পুরুষের নির্জনবাস থেকে সতর্ক করেছেন।

ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেনঃ মেয়েরা মাহরাম (যার সঙ্গে বিবাহ নিষিদ্ধ) ব্যতীত অন্য কারো সাথে সফর করবে না। মাহরাম কাছে নেই এমতাবস্থায় কোন পুরুষ কোন মহিলার নিকট গমন করতে পারবে না। এ সময় এক ব্যক্তি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি অমুক অমুক সেনাদলের সাথে জিহাদ করার জন্য যেতে চাচ্ছি। কিন্তু আমার স্ত্রী হাজ্জ করতে যেতে চাচ্ছে। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তুমি তার সাথেই যাও। সহহি বুখারি : ১৮৬২, ৩০০৬, ৩০৬১, ৫৩৩৩, সহহি মুসলিম : ১৩৪১, আহমাদ : ১৯৩৪

মা-বাবার পদক্ষেপ

ক. সন্তানদেরকে স্কুল, কলেজ বা কর্মস্থলে একা বা নির্জন স্থানে একত্রিত হওয়া থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেওয়া। বিশেষ করে কন্যা সন্তানকে অপরিচিত বা অবিশ্বস্ত কারও সাথে একা ভ্রমণ বা দেখা করা থেকে সতর্ক করা।

খ. মা-বাবার দেওয়া উত্তম শিক্ষাই হলো সন্তানের জন্য সবচেয়ে বড় সুরক্ষা। সন্তানকে এমন শক্তিশালী ও দৃঢ়চেতা হিসেবে গড়ে তোলা যেন তারা অনৈতিক প্রস্তাব বা হয়রানি দৃঢ়তার সাথে প্রত্যাখ্যান করতে পারে।

গ. সন্তানদেরকে শেখানো যে, হয়রানির শিকার হলে লুকিয়ে না থেকে মা-বাবা, শিক্ষক বা কর্তৃপক্ষের কাছে অবিলম্বে অভিযোগ জানাতে হবে।

৪. মা-বাবার বিশেষ পদক্ষেপ (আমল ও প্রশিক্ষণ)

মা-বাবা সন্তানের সুরক্ষার জন্য নিম্নলিখিত বাস্তব পদক্ষেপগুলো নিতে পারেন:

ক্ষেত্রপদক্ষেপকুরআন/হাদিসের ভিত্তি
১. জ্ঞান প্রদান (Awareness)যৌনতা, ভালো স্পর্শ-খারাপ স্পর্শ (Good Touch, Bad Touch), এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তার সীমা সম্পর্কে ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে সৎ ও স্পষ্ট ধারণা দেওয়া।পরিবারকে জাহন্নাম থেকে রক্ষা করা (সূরা তাহরীম, ৬৬:৬)।
২. প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণফোন, ল্যাপটপ বা অন্যান্য ডিভাইসে প্যারেন্টাল কন্ট্রোল ব্যবহার করা এবং সাইবার হয়রানি থেকে বাঁচতে সামাজিক মাধ্যমে ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা।সন্তানের প্রতি দায়িত্বশীলতা (সহীহ বুখারী, ৮৯৩)।
৩. আত্মরক্ষার প্রশিক্ষণমেয়েশিশুদের প্রয়োজনে আত্মরক্ষার প্রাথমিক কৌশল শেখানো এবং ছেলেদেরকে নৈতিক শিক্ষা দিয়ে হয়রানি করা থেকে বিরত থাকার গুরুত্ব বোঝানো।অন্যায়কে প্রতিহত করার নির্দেশ (রাসূল (সাঃ) ফিতনা থেকে বাঁচার তাগিদ দিয়েছেন)।
৪. অভিযোগের পথ খোলা রাখাসন্তানের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করা, যাতে তারা কোনো ভয় না পেয়ে হয়রানির শিকার হলে প্রথমে মা-বাবার কাছে বলতে পারে।নম্রতা ও দয়ার (রাহমাহ) মাধ্যমে সম্পর্ক স্থাপন (সহীহ বুখারী, ৫৯৯৭)।

পরিশেষে বলা যায়, ইভটিজিং ও যৌন হয়রানি থেকে সন্তানকে বাঁচানোর দায়িত্ব হলো মা-বাবার আমানত রক্ষার সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা, যার ভিত্তি হলো পর্দা, দৃষ্টির সংযম, উত্তম চরিত্র এবং সামাজিক সতর্কতা।

পর্নগ্র্যাফিতে আসক্তির কুফল সম্পর্কে সতর্ক করা

সন্তানদের পর্নোগ্রাফিতে আসক্তির সমস্যা সমাধান করা এবং এর থেকে তাদের রক্ষা করা মা-বাবার একটি অত্যন্ত জরুরি, ঈমানী ও আমানত রক্ষার দায়িত্ব। পর্নোগ্রাফি ইসলামী শিক্ষা অনুসারে একটি মারাত্মক ফাহেশা (অশ্লীলতা) এবং এটি সন্তানের চরিত্র, মানসিক স্বাস্থ্য ও ঈমানের ওপর ধ্বংসাত্মক প্রভাব ফেলে।

১. ফাহেশা বা অশ্লীলতা থেকে রক্ষা

পর্নোগ্রাফি হলো এমন একটি কাজ, যা সরাসরি ইসলামী নৈতিকতা ও পবিত্রতার মূলনীতির বিরুদ্ধে যায়। এটি থেকে সন্তানকে রক্ষা করা মা-বাবার দ্বীনি দায়িত্ব। ইসলাম কেবল অবৈধ কাজকেই নয়, বরং এর নিকটবর্তী হওয়ার সকল পথকে বন্ধ করে দিয়েছে। পর্নোগ্রাফি দেখা হলো যিনা বা ব্যভিচারের নিকটবর্তী হওয়া। আল্লাহ তা’আলা বলেন:

وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنَا ۖ إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاءَ سَبِيلًا

“আর তোমরা ব্যভিচারের (যিনা) নিকটবর্তীও হয়ো না। নিশ্চয়ই তা অশ্লীল কাজ এবং খুবই খারাপ পথ।” সূরা আল-ইসরা, : ৩২

পর্নোগ্রাফিতে আসক্তি সন্তানের মনকে অপবিত্র করে এবং তাকে বাস্তবের অশ্লীল কাজের দিকে ঠেলে দিতে পারে। মা-বাবার দায়িত্ব হলো সন্তানের ডিজিটাল জীবনে এমন নজরদারি রাখা যেন তারা এই ফাহেশার কাছে যেতে না পারে।

২. দৃষ্টি সংযত রাখার নির্দেশ অমান্য

পর্নোগ্রাফিতে আসক্তি সরাসরি কুরআনের সেই নির্দেশকে লঙ্ঘন করে, যেখানে মুমিনদেরকে দৃষ্টি সংযত রাখতে বলা হয়েছে। এই আসক্তি মানুষকে হৃদয়ের যিনা বা গুনাহে লিপ্ত করে। আল্লাহ তা’আলা বলেন:

قُل لِّلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ ۚ ذَٰلِكَ أَزْكَىٰ لَهُمْ

“মুমিন পুরুষদেরকে বলো, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে। এটাই তাদের জন্য অধিক পবিত্র।” সূরা নূর, : ৩০

মা-বাবার দায়িত্ব হলো সন্তানকে বোঝানো যে, স্ক্রিনে যা দেখা হয়, তা বাস্তব জীবনে প্রভাব ফেলে এবং আল্লাহর দৃষ্টি থেকে কিছুই গোপন থাকে না।

৩. ঈমানী চিকিৎসা ও প্রতিকার

পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত সন্তানের নিরাময়ে মা-বাবা ইসলামী শিক্ষা ও মানসিক সমর্থনের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন। মা-বাবার উচিত সন্তানকে লজ্জিত না করে, বরং গোপনে ও সহানুভূতির সাথে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়ার (তাওবা) গুরুত্ব শেখানো। ইসলামে হতাশাকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। আল্লাহ তা’আলা বলেন:

قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَىٰ أَنفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِن رَّحْمَةِ اللَّهِ ۚ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا

“বলো, ‘হে আমার বান্দারা, যারা নিজেদের ওপর বাড়াবাড়ি করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেন।'” সূরা যুমার : ৫৩

আসক্তি থেকে মুক্তি পেতে দৃঢ় সংকল্পের সাথে নিয়মিত নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত এবং আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনার গুরুত্ব মা-বাবাকেই শেখাতে হবে।

৪. বিবাহের প্রতি উৎসাহিত করা

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তরুণদেরকে পবিত্রতার পথ হিসেবে বিবাহের প্রতি উৎসাহিত করেছেন। আসক্তির সমস্যার ক্ষেত্রে মা-বাবার উচিত সন্তানকে যত দ্রুত সম্ভব বিবাহের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করে দেওয়া।

৯০৫. ‘আলকামাহ (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ‘আবদুল্লাহ (রাঃ)-এর সঙ্গে চলতে ছিলাম, তখন তিনি বললেন, আমরা আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সাথে ছিলাম, তিনি বললেনঃ যে ব্যক্তির সামর্থ্য আছে, সে যেন বিয়ে করে নেয়। কেননা বিয়ে চোখকে অবনত রাখে এবং লজ্জাস্থানকে সংযত করে। আর যার সামর্থ্য নেই, সে যেন সওম পালন করে। সওম তার প্রবৃত্তিকে দমন করে। সহিহ বুখারি : ১৯০৫, ৫০৬৫, ৫০৬৬

যদি বিবাহ সম্ভব না হয়, তবে নফল রোজা রাখা এবং শারীরিক শক্তিকে খেলাধুলা বা গঠনমূলক কাজে ব্যয় করার পরামর্শ মা-বাবাকেই দিতে হবে।

৫. প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণ ও পারিবারিক সংযোগ

পারিবারিক তালিমের মাধ্যমে মা-বাবা সন্তানের দ্বীনি মূল্যবোধকে মজবুত করবেন এবং প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের উপর কঠোর নজর রাখবেন। এই দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবে ক্ষতিকর ওয়েবসাইটগুলোকে ব্লক করা, ডিভাইস ব্যবহারের সময়সীমা নির্ধারণ করা এবং সন্তানের সাথে গুণগত সময় কাটানো অপরিহার্য।

পর্নোগ্রাফিতে আসক্তি একটি মানসিক ও আত্মিক অসুস্থতা। মা-বাবার উচিত ভালোবাসা, সহানুভূতি এবং ইসলামী শিক্ষার মাধ্যমে সন্তানকে এই আসক্তির গভীর অন্ধকার থেকে মুক্ত করে পবিত্রতার পথে ফিরিয়ে আনা।

সন্তানের ধূমপানের ব্যাপারে সজাগ দৃষ্টি রাখা

সন্তানের ধূমপানের বিষয়ে সজাগ দৃষ্টি রাখা এবং এর থেকে তাদের বিরত রাখা মা-বাবার একটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বীনি ও নৈতিক দায়িত্ব। ইসলামে মানুষের স্বাস্থ্য ও সম্পদ রক্ষা করাকে ইবাদতের অংশ হিসেবে দেখা হয়। ধূমপান যেহেতু স্বাস্থ্য ও সম্পদের জন্য ক্ষতিকর, তাই এটি মা-বাবার তত্ত্বাবধানের অধীনে আসে।

১. নিজেকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়া

ইসলামের মৌলিক নীতি হলো, যা কিছু মানবদেহ ও জীবনের জন্য ক্ষতিকর, তা পরিহার করা। ধূমপান যেহেতু একটি নিশ্চিত স্বাস্থ্যঝুঁকি, তাই এর থেকে দূরে থাকা আবশ্যক। ধূমপান মানুষকে ধীরে ধীরে স্বাস্থ্যের ক্ষতির দিকে ঠেলে দেয় এবং বিভিন্ন মারাত্মক রোগ সৃষ্টি করে। এটি প্রকারান্তরে নিজেকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাওয়ার শামিল, যা আল্লাহ তা’আলা নিষেধ করেছেন। আল্লাহ তা’আলা বলেন:

وَلَا تُلْقُوا بِأَيْدِيكُمْ إِلَى التَّهْلُكَةِ

“তোমরা নিজ হাতে নিজেদেরকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিও না।” সূরা বাকারা : ১৯৫

মা-বাবার দায়িত্ব হলো সন্তানকে বোঝানো যে, ধূমপান এই আয়াতের নির্দেশের লঙ্ঘন এবং এর মাধ্যমে তারা নিজেদের শরীরকে আল্লাহর দেওয়া আমানত হিসেবে রক্ষা করতে ব্যর্থ হচ্ছে।

২. ক্ষতিকর জিনিসকে হারাম ঘোষণা

ইসলামে মানুষের জন্য যা কিছু উত্তম ও উপকারী, তা হালাল এবং যা কিছু ক্ষতিকর ও অপবিত্র, তা হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। ধূমপান যেহেতু নিশ্চিতভাবেই শরীরের জন্য ক্ষতিকর, তাই অধিকাংশ স্কলার এটিকে হারাম বা মাকরূহ তাহরীমী (হারামের কাছাকাছি অপছন্দনীয়) ফতোয়া দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা রাসূল (সাঃ)-এর গুণাবলী বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন-

وَيُحِلُّ لَهُمُ الطَّيِّبَاتِ وَيُحَرِّمُ عَلَيْهِمُ الْخَبَائِثَ

“তিনি (নবী) তাদের জন্য পবিত্র বস্তু হালাল করেন এবং অপবিত্র বস্তু হারাম করেন।” সূরা আরাফ : ১৫৭

ধূমপানকে যেহেতু অপবিত্র ও ক্ষতিকর বস্তুর অন্তর্ভুক্ত করা যায়, তাই সন্তানদেরকে তা থেকে বিরত রাখা মা-বাবার দায়িত্ব।

৩. সম্পদের অপচয় থেকে বিরত থাকা

ধূমপান কেবল স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে না, এটি অর্থ ও সম্পদের অপচয় ঘটায়। ইসলামে সম্পদকে অপচয় করাকে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। ধূমপানের জন্য ব্যয় করা অর্থ কোনো কল্যাণকর কাজে ব্যয় হয় না, বরং তা নিজের ও পরিবেশের ক্ষতি করে। ইসলামে সম্পদ (যা আল্লাহর দেওয়া আমানত) অপচয় করাকে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে।

মুগীরাহ ইবনু শু‘বাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, আল্লাহ তা‘আলা তোমাদের উপর হারাম করেছেন মায়ের নাফরমানী, কন্যা সন্তানকে জীবন্ত কবর দেয়া, কারো প্রাপ্য না দেয়া এবং অন্যায়ভাবে কিছু নেয়া আর অপছন্দ করেছেন অনর্থক বাক্য ব্যয়, অতিরিক্ত প্রশ্ন করা, আর মাল বিনষ্ট করা। সহহি বুখারি : ৮৪৪, ২৪০৮, সহহি মুসলিম : ৫৯৩

মা-বাবার দায়িত্ব হলো সন্তানকে বোঝানো যে, ধূমপানের পিছনে অর্থ ব্যয় করা সম্পদের অপচয় এবং এটি আল্লাহর অপছন্দনীয় কাজ।

৪. মা-বাবার তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব

সন্তানের শারীরিক ও নৈতিক সুরক্ষার জন্য মা-বাবা আল্লাহ্‌র কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য। ধূমপান যেহেতু সন্তানের জীবনের জন্য ঝুঁকি, তাই এর ব্যাপারে সজাগ থাকা মা-বাবার দায়িত্ব।

ধূমপানে আসক্ত হওয়ার আগেই মা-বাবার উচিত সন্তানকে সতর্ক করা, এর ক্ষতিকর দিকগুলো বোঝানো এবং তাদের জীবনযাত্রার উপর নজরদারি রাখা।

৬. মা-বাবার করণীয়

মা-বাবাকে অবশ্যই নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো নিতে হবে:

সচেতনতা সৃষ্টি:

ধূমপানের কারণে সৃষ্ট শারীরিক ক্ষতি (ক্যান্সার, হৃদরোগ) এবং ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে এর বিধান সম্পর্কে সন্তানকে যথাযথ জ্ঞান দেওয়া।

নিজেদের আদর্শ:

মা-বাবা নিজেরা যদি ধূমপানে অভ্যস্ত হন, তবে তাদের উচিত সন্তানদের সামনে তা পরিহার করা। কারণ, মা-বাবাই সন্তানের প্রথম আদর্শ।

নেতিবাচক পরিবেশ থেকে দূরে রাখা:

ধূমপায়ী বন্ধুদের থেকে দূরে থাকা এবং ধূমপানের সুযোগ তৈরি হয় এমন স্থানে যাওয়া থেকে সন্তানকে সতর্ক করা।

অতএব, সন্তানকে ধূমপানের ক্ষতি থেকে রক্ষা করা মা-বাবার আমানত রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ, যা তাদের স্বাস্থ্য ও সম্পদ রক্ষায় সাহায্য করে।

ছেলে এবং মেয়ে পরস্পর্ক বন্ধুত্ব করা প্রতি সতর্ক থাকা

ইসলামের দৃষ্টিতে ছেলে ও মেয়েদের মধ্যে অনিয়ন্ত্রিত বা অবাধ বন্ধুত্ব (যা মাহরাম সম্পর্কের বাইরে) কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। সন্তানদেরকে এই বিষয়ে সতর্ক করা এবং তাদের চলাফেরা ও বন্ধুত্বের ক্ষেত্রে ইসলামী সীমারেখা রক্ষা করা মা-বাবার একটি মৌলিক দ্বীনি দায়িত্ব। এই সাবধানতার মূল লক্ষ্য হলো ফিতনা (পরীক্ষা বা ফেতনা) থেকে সুরক্ষা এবং নৈতিক পবিত্রতা নিশ্চিত করা।

১. ফিতনা ও অশ্লীলতা থেকে সুরক্ষা

কুরআন মাজীদে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা থেকে বিরত থাকার জন্য স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, কারণ এটি অশ্লীলতার দিকে ঠেলে দেয়। ছেলে-মেয়ের অবাধ বন্ধুত্ব প্রায়শই অবৈধ সম্পর্ক বা যৌন অপরাধের দিকে নিয়ে যায়। ইসলাম এর নিকটবর্তী হওয়ার সকল পথ বন্ধ করে দিয়েছে। আল্লাহ তা’আলা বলেন:

وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنَا ۖ إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاءَ سَبِيلًا

আর তোমরা ব্যভিচারের (যিনা) নিকটবর্তীও হয়ো না। নিশ্চয়ই তা অশ্লীল কাজ এবং খুবই খারাপ পথ।” সূরা ইসরা : ৩২

অবাধ বন্ধুত্বকে এই ‘নিকটবর্তী হওয়া’-এর অংশ হিসেবে গণ্য করা হয়। মা-বাবার দায়িত্ব হলো সন্তানকে বোঝানো যে, ইসলামী সীমারেখা না মেনে অবাধ মেলামেশা যিনার দিকে প্ররোচিত করে।

২. দৃষ্টি সংযত রাখা এবং পর্দার বিধান

অবাধ বন্ধুত্বের ফলে দৃষ্টি সংযত রাখার কুরআনিক নির্দেশ বারবার লঙ্ঘিত হয়। মা-বাবার উচিত সন্তানকে শেখানো যে, বন্ধুত্ব, হাসি-তামাশা এবং প্রয়োজন ছাড়া কথা বলা— সবকিছুতেই ইসলামী বিধান মেনে চলতে হবে।

আল্লাহ তা’আলা নারী-পুরুষ উভয়কে দৃষ্টি সংযত রাখতে নির্দেশ দিয়েছেন। সূরা নূর :৩০-৩১

 মা-বাবার কর্তব্য হলো সন্তানকে এই বিষয়ে সচেতন করা এবং তাদের বন্ধু নির্বাচন ও মেলামেশার বিষয়ে সতর্ক থাকা।

৩. শালীনতার সাথে কথা বলার নির্দেশ

আল্লাহ তা’আলা মহিলাদেরকে মাহরাম নয় এমন পুরুষের সাথে কথা বলার সময় কণ্ঠস্বরকে কোমল না করার নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে খারাপ উদ্দেশ্যযুক্ত কেউ প্রলুব্ধ না হয়। আল্লাহ তা’আলা বলেন-

فَلَا تَخْضَعْنَ بِالْقَوْلِ فَيَطْمَعَ الَّذِي فِي قَلْبِهِ مَرَضٌ وَقُلْنَ قَوْلًا مَّعْرُوفًا

“অতএব, তোমরা (নারীরা) এমনভাবে কোমল সুরে কথা বলো না যে, যার অন্তরে ব্যাধি আছে, সে প্রলুব্ধ হয়; আর তোমরা সঙ্গত ও স্বাভাবিকভাবে কথা বলো।” সূরা আহযাব  :৩২

অবাধ বন্ধুত্বের ক্ষেত্রে এই শালীনতা প্রায়শই উপেক্ষিত হয়। মা-বাবাকে তাদের ছেলে-মেয়ে উভয়কেই এই বিষয়ে সতর্ক করতে হবে।

২. হাদিস: শয়তানের প্রভাব ও ফিতনা থেকে সুরক্ষা

হাদিস নারী-পুরুষের নির্জনবাসকে সরাসরি ফিতনা বা ফেতনা সৃষ্টির কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

ক. শয়তান হলো তৃতীয় জন

অবাধ বন্ধুত্বের ক্ষেত্রে নির্জনে (খুলওয়াত) থাকার সুযোগ তৈরি হয়। মা-বাবার উচিত সন্তানকে এই বিষয়ে সতর্ক করা:

ইবনে আমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী ﷺ বলেছেন:

لَا يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةٍ إِلَّا كَانَ ثَالِثَهُمَا الشَّيْطَانُ

“যখন কোনো পুরুষ (মাহরাম নয় এমন) কোনো নারীর সাথে নির্জনে থাকে, তখন তাদের তৃতীয়জন হয় শয়তান।  সুনানে তিরমিজি : ২১৬৫,  মুসনাদ আহমদ : ১৪৮০৪, তাবরানী : ১৭৪৫৮

মা-বাবার দায়িত্ব হলো, সন্তানরা যেন তাদের বন্ধু-বান্ধবদের সাথে মেলামেশার ক্ষেত্রে কোনোক্রমেই এমন নির্জনতার সুযোগ সৃষ্টি না করে, সেদিকে খেয়াল রাখা।

৩. উত্তম বন্ধু নির্বাচন

অবাধ্য বন্ধুত্বের দিকে প্ররোচিত হওয়ার প্রধান কারণ হলো খারাপ বন্ধু নির্বাচন। মা-বাবার উচিত সন্তানকে ভালো বন্ধু নির্বাচনে সহায়তা করা।

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ মানুষ তার বন্ধুর রীতিনীতির (দ্বীন ধর্মের) অনুসারী হয়। কাজেই তোমাদের প্রত্যেকেই যেন লক্ষ্য করে, সে কার সঙ্গে বন্ধুত্ব করছে। সুনানে আবূ দাউদ : ৪৮৩৩, সুনানে তিরমিযী : ২৩৭৮, এবং আহমদ : ৮৩৯৮

মা-বাবার দায়িত্ব হলো সন্তানের বন্ধু নির্বাচনের ক্ষেত্রে সতর্ক নজর রাখা, যেন তারা এমন কারও সাথে মিশে না যায় যারা ইসলামী নৈতিকতা মানে না।

৪. মা-বাবার করণীয় :

মা-বাবাকে অবশ্যই নিম্নলিখিত উপায়ে এই দায়িত্ব পালন করতে হবে:

সচেতন আলোচনা: ছেলে ও মেয়ে উভয়কেই শালীনতা, পর্দার বিধান এবং অবৈধ বন্ধুত্বের ক্ষতিকর দিকগুলো নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করা।

পর্যবেক্ষণ: সন্তানের অনলাইন ও অফলাইন কার্যক্রমের উপর সতর্ক নজরদারি রাখা।

উত্তম পরিবেশ: পারিবারিক বন্ধন মজবুত করা, যেন সন্তানরা তাদের মানসিক চাহিদা পূরণের জন্য পরিবারের বাইরে ভুল বন্ধুত্বে না জড়িয়ে পড়ে।

সুতরাং, ছেলে-মেয়ের অবাধ বন্ধুত্ব থেকে সন্তানদেরকে রক্ষা করা মা-বাবার জন্য আল্লাহর দেওয়া আমানত রক্ষার এবং নৈতিক পবিত্রতা নিশ্চিত করার অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।

সন্তানের ক্যারিয়ার গাইড লাইন

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় ভালো ফলাফল করাটা নিঃসন্দেহে একটি বড় অর্জন এবং এটি উচ্চশিক্ষা ও ভালো ক্যারিয়ারের প্রথম ধাপ হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে, মনে রাখতে হবে যে শুধুমাত্র জিপিএ (GPA) বা গোল্ডেন এ+ (Golden A+) ভবিষ্যতের সফলতার একমাত্র মাপকাঠি নয়। বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে একাডেমিক শ্রেষ্ঠত্বের পাশাপাশি দক্ষতা (Skills), আগ্রহ (Interest) এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার (Practical Experience) সমন্বয়ই একজন শিক্ষার্থীকে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছে দিতে পারে। ভালো ফল করা সন্তানেরা প্রায়শই একটি সুনির্দিষ্ট এবং সম্মানজনক পেশার দিকে দৃষ্টি দেয়, কিন্তু সময়ের সাথে সাথে তাদের লক্ষ্য পরিবর্তন হতে পারে। তাই তাদের জন্য প্রয়োজন এমন একটি পথনির্দেশিকা, যা তাদের সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করবে।

১. সন্তানের ক্যারিয়ার গাইডলাইন:

ভালো ফল করা শিক্ষার্থীরা স্বভাবতই পরিশ্রমী এবং লক্ষ্য অর্জনে বদ্ধপরিকর হয়। তাদের এই গুণগুলোকে কাজে লাগানোর জন্য ক্যারিয়ার পরিকল্পনায় কিছু সাধারণ কিন্তু অপরিহার্য পদক্ষেপ অনুসরণ করা উচিত:

ক. আগ্রহ, দক্ষতা এবং মূল্যবোধের মূল্যায়ন

ভালো ফলাফলের পর প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলো আত্ম-মূল্যায়ন (Self-Assessment)। অনেক শিক্ষার্থী শুধুমাত্র প্রচলিত বা জনপ্রিয় পেশার দিকে আকৃষ্ট হয়, যা তাদের আগ্রহের সাথে নাও মিলতে পারে। এই ধাপে যা করতে হবে:

খ. আগ্রহ ও আবেগ চিহ্নিত করা:

কোন বিষয়ে পড়তে বা কাজ করতে তারা সবচেয়ে বেশি আনন্দ পায়? যেমন: বিজ্ঞান, ব্যবসা, মানবিক বিষয়, প্রযুক্তি, শিল্পকলা বা সমাজসেবা। যেই বিষয়টি তাদের স্বতঃস্ফূর্তভাবে আকৃষ্ট করে, সেই দিকে এগোনো উচিত।

গ. শক্তি ও দুর্বলতা বিশ্লেষণ:

তাদের কোন দক্ষতাগুলো (যেমন: সমস্যা সমাধান, যোগাযোগ, নেতৃত্ব, বিশ্লেষণী ক্ষমতা) সবচেয়ে শক্তিশালী, আর কোনগুলোতে উন্নতির প্রয়োজন?

ঘ. ক্যারিয়ার মূল্যবোধ:

ক্যারিয়ার থেকে তারা কী চায়? উচ্চ আয়, কাজের নিরাপত্তা, সামাজিক প্রভাব, না কি কাজের স্বাধীনতার মূল্য বেশি?

এই আত্ম-বিশ্লেষণ তাদের জন্য সঠিক বিভাগ ও উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠান বাছাই করতে সাহায্য করবে, যাতে তারা শুধুমাত্র ভালো ফল করার জন্য নয়, বরং আনন্দের সাথে শেখার জন্য অনুপ্রাণিত হয়।

২. একাডেমিক শ্রেষ্ঠত্বের বাইরে দক্ষতা অর্জন (Beyond Academics)

বাংলাদেশের চাকরির বাজারে ভালো রেজাল্টের পাশাপাশি অতিরিক্ত দক্ষতা (Extra Skills) একটি প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা তৈরি করে। ভালো ফল করা শিক্ষার্থীদের একাডেমিক ভিত্তিকে কাজে লাগিয়ে নিম্নলিখিত দক্ষতাগুলো অর্জন করা অপরিহার্য:

ক. যোগাযোগ ও ভাষা দক্ষতা:

শুধুমাত্র মাতৃভাষা বাংলায় নয়, আন্তর্জাতিক ভাষা হিসেবে ইংরেজিতে (বলা ও লেখায়) দক্ষতা বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি। ভালো যোগাযোগ দক্ষতা (Communication Skill) কর্মজীবনে সাফল্যের চাবিকাঠি।

খ. কম্পিউটার ও প্রযুক্তি জ্ঞান:

বর্তমান যুগে কম্পিউটার দক্ষতা (MS Office, MS Excel, PowerPoint) অপরিহার্য। পাশাপাশি, নিজেদের আগ্রহের সাথে সম্পর্কিত প্রযুক্তিগত দক্ষতা (যেমন: প্রোগ্রামিং, ডেটা বিশ্লেষণ, ডিজিটাল মার্কেটিং, গ্রাফিক্স ডিজাইন) অর্জন করা উচিত।

গ. আন্তঃব্যক্তিক ও নেতৃত্ব গুণাবলী:

বিভিন্ন সহ-শিক্ষা কার্যক্রমে (Extracurricular Activities) যেমন বিতর্ক, ক্লাব, ভলান্টিয়ারিং বা ইভেন্ট আয়োজনে যুক্ত হওয়া উচিত। এতে দলগত কাজ (Teamwork), নেতৃত্ব (Leadership) এবং দায়িত্ববোধের মতো সফট স্কিলগুলো বিকশিত হবে, যা চাকরির বাজারে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

৩. অভিজ্ঞতা সঞ্চয় ও মেন্টরশিপ গ্রহণ

সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য অভিজ্ঞতা এবং পরামর্শের বিকল্প নেই।

ইন্টার্নশিপ ও ভলান্টিয়ারিং:

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে বা পড়া শেষ হওয়ার আগেই ইন্টার্নশিপ এবং বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবামূলক (Volunteering) কাজে অংশ নিতে হবে। এতে বাস্তব কর্মজগতের সাথে পরিচিতি ঘটবে এবং তত্ত্বীয় জ্ঞানের প্রয়োগ দেখা যাবে। এই অভিজ্ঞতাগুলো পরবর্তীতে চাকরিতে প্রবেশের সময় বিশেষভাবে কাজে আসে।

পেশাদার পরামর্শ (Mentorship):

যে খাতে ক্যারিয়ার গড়তে আগ্রহী, সেই খাতের অভিজ্ঞ ও সফল ব্যক্তিদের কাছ থেকে পরামর্শ (Mentor) নেওয়া উচিত। মেন্টরশিপ কেবল অনুপ্রেরণা যোগায় না, বরং বাস্তবতার নিরিখে সঠিক পথে চলতে সাহায্য করে।

এই সাধারণ গাইডলাইনগুলো অনুসরণ করে একজন ভালো ফল করা শিক্ষার্থী বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কেবল একটি ভালো চাকরি নয়, বরং একটি সন্তুষ্টিজনক ও টেকসই (Sustainable) ক্যারিয়ার গঠনে সফল হতে পারে।

বিজ্ঞান বিভাগের একজন ভালো ছাত্রের ক্যারিয়ার গাইড লাইন

বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক শিক্ষা ব্যবস্থায় ভালো ফলাফল করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেননা ভালো ফলাফল কৃতিত্বের পরিচয় এবং তার উজ্জ্বল ভবিষ্যতের ভিত্তি স্থাপন করেছে। সন্তানের ভালো ফলাফল তাকে দেশের সেরা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে এবং সবচেয়ে চাহিদাসম্পন্ন ক্যারিয়ারের পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় তার এই ফলাফল ব্যবহার করে কোন কোন বিষয়ে কোন কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়ে তার ক্যারিয়ার গঠন করতে পারেন, সে সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য, বিষয় নির্বাচন এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার দিকগুলো গুছিয়ে তুলে ধরছি।

১. বিষয় নির্বাচনের গুরুত্ব ও প্রাথমিক বিবেচনা

আপনার সন্তানের জন্য সঠিক বিষয়টি নির্বাচন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিজ্ঞান বিভাগ থেকে সর্বোচ্চ ফলাফল পাওয়ায় তার সামনে প্রকৌশল, চিকিৎসা, মৌলিক বিজ্ঞান, কৃষি, এবং ব্যবসায় প্রশাসন (কিছু ক্ষেত্রে)—এই পাঁচটি প্রধান ধারার বিষয়গুলো উন্মুক্ত।

বিষয় নির্বাচনের সময় নিম্নলিখিত তিনটি বিষয়কে প্রাধান্য দিন:

১.  সন্তানের আগ্রহ ও ঝোঁক:

সে কোন ধরনের কাজ উপভোগ করে? সমস্যা সমাধান (প্রকৌশল), মানুষের সেবা (চিকিৎসা), গবেষণা (বিজ্ঞান), নাকি প্রযুক্তি উদ্ভাবন? আগ্রহের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ বিষয় হলে সে পড়াশোনায় ভালো করবে এবং কাজ করেও আনন্দ পাবে।

২.  ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান ও চাহিদা (Job Demand):

আগামী ২০ বছরে কোন পেশাগুলোর চাহিদা বাড়বে? যেমন: তথ্যপ্রযুক্তি, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, বায়োটেকনোলজি, এবং পরিবেশ বিজ্ঞান।

৩.  বিশ্ববিদ্যালয়ের খ্যাতি ও মান:

নির্দিষ্ট বিষয়ে কোন বিশ্ববিদ্যালয়টির খ্যাতি ও মান সবচেয়ে ভালো, সেটিতে ভর্তির চেষ্টা করা উচিত।

মূল বিষয় এবং সেরা বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ

বিজ্ঞান বিভাগের ভালো ফলাফর করা শিক্ষার্থীর জন্য বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রধানত তিন ধরনের ভর্তি প্রক্রিয়া রয়েছে। যথা-

ক) সমন্বিত/গুচ্ছ পদ্ধতিতে,

খ) একক প্রতিষ্ঠানে,

গ) বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়ে।

নিচে প্রতিটি ধারার সেরা বিষয় এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলো উল্লেখ করা হলো:

১. প্রকৌশল ও প্রযুক্তি (Engineering & Technology) 🛠️

প্রকৌশল বর্তমানে বাংলাদেশে সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও উচ্চ বেতনের একটি ক্ষেত্র।

ক্ষেত্রবিষয়সমূহ (Major Subjects)শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয় (Top Universities)ক্যারিয়ার সম্ভাবনা
কম্পিউটিং ও আইটিকম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (CSE), সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং (SWE), ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং (EEE)বুয়েট (BUET), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (DU), রুয়েট (RUET), কুয়েট (KUET), চুয়েট (CUET), ডুয়েট (DUET) (ডিপ্লোমা থাকলে), আইআইটি (IIT) ঢাবি, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (SUST)সফটওয়্যার ডেভেলপার, ডেটা সায়েন্টিস্ট, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (AI) এক্সপার্ট, সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষক।
সিভিল ও আর্কিটেকচারসিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং, আর্কিটেকচারবুয়েট, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (RU), কুয়েট, চুয়েট, রুয়েট।নির্মাণ প্রতিষ্ঠান, সরকারি পূর্ত বিভাগ, নগর পরিকল্পনাবিদ, স্থাপত্য সংস্থা।
মেকানিক্যাল ও টেক্সটাইলমেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং, কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং, টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিংবুয়েট, টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয় (BUTEX), ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি ফ্যাকাল্টি (DU)।উৎপাদন শিল্প, পোশাক শিল্প, পাওয়ার প্ল্যান্ট, অটোমোবাইল শিল্প।

গুরুত্বপূর্ণ নোট: বুয়েট, রুয়েট, কুয়েট, চুয়েট-এ ভর্তি হতে হলে আলাদা ভর্তি পরীক্ষা দিতে হয় এবং সেখানে তীব্র প্রতিযোগিতা হয়। প্রস্তুতিতে বিশেষভাবে জোর দিতে হবে গণিত, পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়নের ওপর।

২. চিকিৎসা ও জনস্বাস্থ্য (Medical & Public Health)

যারা মানবসেবায় সরাসরি যুক্ত হতে চান, এবং দীর্ঘ সময় ধরে পড়াশোনা করতে আগ্রহী, তাদের জন্য এটি সেরা পথ।

ক্ষেত্রবিষয়সমূহ (Major Subjects)শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান (Top Institutions)ক্যারিয়ার সম্ভাবনা
চিকিৎসাব্যাচেলর অব মেডিসিন, ব্যাচেলর অব সার্জারি (MBBS)ঢাকা মেডিকেল কলেজ, সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ, এবং অন্যান্য সরকারি মেডিকেল কলেজসমূহ।চিকিৎসক, সার্জন, বিশেষজ্ঞ ডাক্তার (পোস্ট-গ্র্যাজুয়েশনের পর)।
অন্যান্য স্বাস্থ্য পেশাডেন্টাল সার্জারি (BDS), নার্সিং, ফার্মেসি (Pharmacy)ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি)-এর ফার্মেসি বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (BSMMU)-এর অধিভুক্ত প্রতিষ্ঠানসমূহ।দন্ত চিকিৎসক, ক্লিনিক্যাল ফার্মাসিস্ট, ওষুধ কোম্পানিতে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা।

গুরুত্বপূর্ণ নোট: এমবিবিএস ভর্তির পরীক্ষা সমন্বিতভাবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কর্তৃক পরিচালিত হয়। এখানে জীববিজ্ঞান, রসায়ন ও পদার্থবিজ্ঞানের উপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়। এসএসসি ও এইচএসসি’র ফলাফলেরও একটি বড় অংশ যোগ হয়।

৩. মৌলিক বিজ্ঞান ও গবেষণা (Basic Science & Research)

যারা গভীর জ্ঞান অন্বেষণ ও গবেষণায় আগ্রহী, তাদের জন্য মৌলিক বিজ্ঞান শ্রেষ্ঠ। এই বিষয়ে পড়াশোনা করে বিদেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ বেশি পাওয়া যায়।

ক্ষেত্রবিষয়সমূহ (Major Subjects)শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয় (Top Universities)ক্যারিয়ার সম্ভাবনা
বায়োটেকনোলজি ও জীবন বিজ্ঞানবায়োকেমিস্ট্রি ও মলিকুলার বায়োলজি (BMB), জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি (GEB), মাইক্রোবায়োলজিঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি), রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (RU), জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (JU), শাবিপ্রবি (SUST), বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় (BRUR)।গবেষণা প্রতিষ্ঠান (BCSIR, ICDDR,B), ওষুধ কোম্পানি, ফরেনসিক ল্যাব, শিক্ষকতা।
গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানগণিত, ফলিত গণিত, পদার্থবিজ্ঞান, ফলিত পদার্থবিজ্ঞানঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি), বুয়েট (প্রকৌশল ফ্যাকাল্টি), রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (RU), জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (JU)।শিক্ষকতা, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান (কোয়ান্ট), ডেটা সায়েন্স।
পরিবেশ ও ভূ-বিজ্ঞানএনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স, ভূগোল ও পরিবেশ, ভূতত্ত্বঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি), খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় (KU), যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (JUST)।পরিবেশ সংস্থা, এনজিও, সরকারি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগ।

৪. কৃষি ও কৃষি প্রকৌশল (Agriculture & Agro-Engineering) 🌾

বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল ভিত্তি কৃষি হওয়ায় এই ক্ষেত্রে অনেক গবেষণা ও চাকরির সুযোগ রয়েছে।

ক্ষেত্রবিষয়সমূহ (Major Subjects)শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয় (Top Universities)ক্যারিয়ার সম্ভাবনা
কৃষি বিজ্ঞানকৃষি (Agriculture), ভেটেরিনারি মেডিসিনবাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (BAU), শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (SAU), বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (BSMRAU) এবং গুচ্ছ পদ্ধতির আওতাভুক্ত অন্যান্য কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ।কৃষি গবেষণা (BARI), সরকারি কৃষি কর্মকর্তা, ব্যাংক (কৃষি ঋণ বিভাগ), বীজ ও সার কোম্পানি।

গুরুত্বপূর্ণ নোট: কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও গুচ্ছ পদ্ধতিতে একটি ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়।

৫. বিশেষায়িত ও মিশ্র ক্ষেত্র (Specialized & Mixed Fields) 🏦

বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী হিসেবে আপনার সন্তান কিছু বিশেষায়িত ক্ষেত্রেও ভর্তি পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ পাবে।

ক্ষেত্রবিষয়সমূহ (Major Subjects)বিশ্ববিদ্যালয় (Universities)
ব্যবসায় প্রশাসন (BBA)অ্যাকাউন্টিং, ফিন্যান্স, ম্যানেজমেন্টঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ (IBA), বিইউপি (BUP)-এর এফবিএস, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ।
নৌ স্থাপত্যনেভাল আর্কিটেকচার অ্যান্ড মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিংবুয়েট, মেরিন ফিশারিজ ও ওশানোগ্রাফি (ঢাবি)।
অন্যান্যআইন (Law) (যদি বিজ্ঞান বিভাগের শর্ত থাকে), বিভিন্ন পাবলিক ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মিশ্র কোর্স।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (আইন বিভাগ), আইন ও বিচার বিভাগ (অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়)।

ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি কৌশল

ভালো ফলাফল ধরে রাখতে আপনার সন্তানের এখন উচিত হবে দ্রুততম সময়ে ভর্তি পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি শুরু করা।

প্রধান লক্ষ্য:

১. বুয়েট ও মেডিকেলের প্রস্তুতি:

এই দুটি পরীক্ষা বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রতিযোগিতামূলক। প্রথমে এই দুটির জন্য প্রস্তুতি নিন। এই প্রস্তুতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঢাবি, জাবি, রাবি, এবং গুচ্ছ পরীক্ষার প্রস্তুতিতেও সহায়তা করবে।

২. প্রশ্নব্যাংক বিশ্লেষণ:

বিগত বছরের প্রশ্নব্যাংক ভালোভাবে সমাধান করতে হবে এবং পরীক্ষার ধরন, বিশেষ করে গাণিতিক সমস্যা সমাধানের কৌশল রপ্ত করতে হবে।

৩. সময় ব্যবস্থাপনা:

ভর্তি পরীক্ষার সময় ব্যবস্থাপনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ওএমআর শিট পূরণ ও দ্রুত সময়ের মধ্যে বহু নির্বাচনী প্রশ্ন (MCQ) বা লিখিত প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার অভ্যাস করতে হবে।

সাধারণ জ্ঞান (G.K.) ও বাংলা-ইংরেজি: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং অন্যান্য বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু ইউনিটে সাধারণ জ্ঞান, বাংলা ও ইংরেজির প্রস্তুতি প্রয়োজন হয়। এটি উপেক্ষা করা উচিত নয়।

শেষ কথা

আপনার সন্তানের ভালো ফলাফল একটি অসাধারণ অর্জন। এই ভিত্তি তাকে সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তির সুযোগ করে দেবে। এখন প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা, বিষয় নির্বাচন ও নিরলস প্রচেষ্টা। আপনি তাকে কম্পিউটার সায়েন্স, ইইই, এমবিবিএস, অথবা বায়োকেমিস্ট্রি—এর যেকোনো একটিকে প্রাথমিকভাবে লক্ষ্য নির্ধারণ করে প্রস্তুতিতে সহায়তা করতে পারেন। তার আগ্রহ এবং ভবিষ্যতের চাহিদা, এই দুইয়ের সমন্বয়ে সঠিক সিদ্ধান্তটি নিতে তাকে সাহায্য করুন। আপনার সন্তানের জন্য রইল শুভ কামনা!

বাণিজ্য বিভাগ একজন ভালো ছাত্রের ক্যারিয়ার গাইড লাইন :

আপনার সন্তান বাণিজ্য বিভাগ থেকে ভালো ফলাফল  করতে পারলে, তার উজ্জ্বল ভবিষ্যতের একটি শক্তিশালী ভিত্তি। বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় এই ভালো ফলাফল নিয়ে বাণিজ্য বিভাগের একজন শিক্ষার্থী হিসেবে তার সামনে অনেক সম্ভাবনাময় পথ খোলা আছে। তাকে সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে এবং তার ক্যারিয়ার গঠনের জন্য উপযুক্ত বিষয় ও বিশ্ববিদ্যালয় নির্বাচনে সহায়তা করতে নিচে একটি বিস্তারিত আলোচনা দেওয়া হলো।

উচ্চশিক্ষার জন্য বিষয় নির্বাচন:

বাণিজ্য বিভাগ থেকে পাস করা শিক্ষার্থীরা মূলত ব্যবসায় শিক্ষা সংশ্লিষ্ট বিষয়েই বেশি সুযোগ পায়। তবে, কিছু কিছু ক্ষেত্রে তারা ভিন্ন বিভাগেও ভর্তির সুযোগ পেতে পারে। আপনার সন্তানের আগ্রহ, মেধা এবং বর্তমান সময়ের চাকরির বাজারের চাহিদা বিবেচনা করে কিছু গুরুত্বপূর্ণ এবং জনপ্রিয় বিষয় নিচে তুলে ধরা হলো:

১. ব্যবসায় শিক্ষা সংশ্লিষ্ট মূল বিষয়সমূহ (Business & Management)

বাণিজ্যের শিক্ষার্থীদের জন্য এগুলি হলো সবচেয়ে সাধারণ এবং সেরা পছন্দ। এই বিষয়গুলির চাহিদা কর্মক্ষেত্রে সবসময়ই বেশি থাকে।

বিষয়কেন পড়বেন?সম্ভাব্য ক্যারিয়ার পথ
BBA (Bachelor of Business Administration)এটি একটি বহুমুখী ডিগ্রি যা ব্যবসা পরিচালনার মূল ভিত্তি শেখায়। পরবর্তীতে স্পেশালাইজেশনের সুযোগ থাকে।ব্যবস্থাপক, নির্বাহী, উদ্যোক্তা, করপোরেট পেশাদার।
Accounting / হিসাববিজ্ঞানআর্থিক লেনদেন বিশ্লেষণ, রেকর্ড রাখা ও আর্থিক প্রতিবেদন তৈরির দক্ষতা তৈরি করে। সব ধরনের প্রতিষ্ঠানে হিসাবরক্ষকের চাহিদা অপরিহার্য।চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট (CA), কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্ট (CMA), অডিটর, ফিন্যান্স এক্সিকিউটিভ।
Finance / ফিন্যান্স (অর্থায়ন)মূলধন ব্যবস্থাপনা, বিনিয়োগ, আর্থিক বাজার বিশ্লেষণ এবং আর্থিক কৌশল তৈরি নিয়ে শেখানো হয়।ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকার, ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালিস্ট, পোর্টফোলিও ম্যানেজার, ট্রেজারি অফিসার।
Marketing / মার্কেটিং (বিপণন)গ্রাহকের চাহিদা বোঝা, পণ্য বা পরিষেবা প্রচার, ব্র্যান্ডিং এবং বিক্রয় কৌশল শেখায়।মার্কেটিং ম্যানেজার, ব্র্যান্ড ম্যানেজার, সেলস ডিরেক্টর, ডিজিটাল মার্কেটিং স্পেশালিস্ট।
Management Studies / ব্যবস্থাপনামানবসম্পদ, অপারেশনাল দক্ষতা এবং কৌশলগত পরিকল্পনা নিয়ে জ্ঞান দেওয়া হয়।হিউম্যান রিসোর্স (HR) ম্যানেজার, অপারেশনস ম্যানেজার, কনসালট্যান্ট।
Management Information Systems (MIS) / ব্যবস্থাপনা তথ্য ব্যবস্থাতথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার করে ব্যবসায়িক সমস্যা সমাধান শেখানো হয়, যা বর্তমান যুগে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।সিস্টেম অ্যানালিস্ট, আইটি কনসালট্যান্ট, বিজনেস ইন্টেলিজেন্স স্পেশালিস্ট।

২. আধুনিক ও আন্তঃবিভাগীয় বিষয়সমূহ (Emerging & Interdisciplinary)

বর্তমান চাকরির বাজার প্রযুক্তি এবং বিশ্লেষণের উপর নির্ভরশীল। বাণিজ্য বিভাগের শিক্ষার্থীরাও এই ধরনের কিছু আধুনিক বিষয়ে যুক্ত হয়ে নিজেদের এগিয়ে রাখতে পারে:

Economics (অর্থনীতি): সামাজিক বিজ্ঞান হলেও বাণিজ্য বিভাগের শিক্ষার্থীরা এখানে ভালো সুযোগ পায়। এটি অর্থনীতি ও নীতি বিশ্লেষণের গভীর জ্ঞান দেয়, যা ব্যাংকিং, সরকারি চাকরি ও গবেষণায় কাজে লাগে।

Data Science & Business Analytics: বর্তমানে সবচেয়ে বেশি চাহিদাপূর্ণ একটি ক্ষেত্র। এই বিষয়ে ভর্তির সুযোগ পেলে, ডেটা বিশ্লেষণ করে ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা তৈরি হয়।

Logistics and Supply Chain Management: বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রসারের সাথে সাথে পণ্য ও পরিষেবার সরবরাহ ব্যবস্থাপনা বিষয়ে দক্ষ জনবলের চাহিদা ব্যাপক হারে বাড়ছে।

Hospitality and Tourism Management: যারা সৃজনশীল এবং বহুজাতিক পরিবেশে কাজ করতে আগ্রহী, তাদের জন্য এটি একটি চমৎকার ক্ষেত্র।

৩. সাধারণ বিষয়সমূহ (Liberal Arts & Others)

যদি আপনার সন্তানের অন্য কোনো বিষয়ে আগ্রহ থাকে, তবে জিপিএ ৫.০০ থাকার কারণে সে কিছু সাধারণ বিষয়েও ভর্তির চেষ্টা করতে পারে:

Law (আইন): বাণিজ্যের শিক্ষার্থীরা সাধারণত ব্যবসায়িক আইন (Corporate Law) নিয়ে পড়ার আগ্রহ দেখায়।

Public Administration (লোক প্রশাসন): যারা সরকারি বা আন্তর্জাতিক সংস্থায় উচ্চপদে ক্যারিয়ার গড়তে চায়, তাদের জন্য এটি উপযুক্ত।

সেরা বিশ্ববিদ্যালয় নির্বাচন

বাণিজ্য বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য, বিশেষত যাদের জিপিএ ৫.০০ আছে, তাদের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত দেশের সেরা কয়েকটি পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া। এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে ডিগ্রি নিলে ক্যারিয়ারের ভিত্তি অনেক মজবুত হয়।

১. শীর্ষ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়

এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়ার খরচ কম এবং ডিগ্রির মান আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। তবে ভর্তির প্রতিযোগিতা খুবই তীব্র।

বিশ্ববিদ্যালয়ের নামপরীক্ষার বিভাগকেন সেরা?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (DU)গ-ইউনিট (বাণিজ্য) ও ঘ-ইউনিট (সমন্বিত)দেশের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়, বিশেষত IBA (Institute of Business Administration) এবং ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদ-এর জন্য। IBA এ ভর্তি হতে পারলে ক্যারিয়ারের শীর্ষ স্থানে পৌঁছানো সহজ হয়।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (CU)সি-ইউনিট (বাণিজ্য)ব্যবসায় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলির জন্য বিখ্যাত।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (RU)বি-ইউনিট (বাণিজ্য)ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদ খুবই সুপরিচিত।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (JU)ই-ইউনিট (বাণিজ্য)এখানকার ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের মান উন্নত এবং পরিবেশ শান্ত।
বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (BUP)FASS/FBS/FSCT ইত্যাদিমিলিটারি ও সরকারি পেশায় আগ্রহী শিক্ষার্থীদের জন্য খুবই উপযোগী, এখানকার ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ বেশ মানসম্পন্ন।

২. বিশেষায়িত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়

বাণিজ্য বিভাগের শিক্ষার্থীরা কিছু বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়েও ভর্তির সুযোগ পেতে পারে:

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়: কিছু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যবসায় প্রশাসন (BBA) চালু আছে, যেমন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (SUST) বা যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (JUST)।

কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়: কিছু কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়েও গ্রামীণ অর্থনীতি, কৃষি ব্যবসা (Agribusiness) এবং গ্রামীণ ব্যবস্থাপনা নিয়ে পড়ার সুযোগ থাকে।

৩. সেরা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় (Private Universities)

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ না পেলে, মানসম্পন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলি আপনার সন্তানের জন্য সেরা বিকল্প হতে পারে। এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পাঠ্যক্রম সাধারণত আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী তৈরি করা হয় এবং এখানকার প্লেসমেন্ট (Placement) রেকর্ড খুবই ভালো।

নর্থ সাউদার্ন ইউনিভার্সিটি (NSU): দেশের অন্যতম সেরা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। বিশেষত BBA এবং Economics প্রোগ্রামের জন্য পরিচিত।

ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি (BRACU): আধুনিক ও বাস্তবমুখী পাঠ্যক্রমের জন্য সুপরিচিত, যেখানে শিক্ষার্থীদের সামগ্রিক বিকাশে জোর দেওয়া হয়।

ইউনিভার্সিটি অফ লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ (ULAB): এখানকার ব্যবসায় প্রশাসন প্রোগ্রাম বেশ জনপ্রিয়।

ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ (IUB): বিভিন্ন আধুনিক বিষয়ে বিশেষায়িত কোর্স অফার করে।

আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি-বাংলাদেশ (AIUB): এখানকার BBA প্রোগ্রাম ও অবকাঠামো উন্নত।

সফল ক্যারিয়ার গঠনের জন্য করণীয়

শুধুমাত্র ভালো জিপিএ এবং ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেই সফলতা আসে না; এর জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিতে হবে:

১. ভর্তির জন্য প্রস্তুতি (Admission Preparation)

টার্গেট নির্ধারণ: প্রথমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের IBA এবং ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদ-কে প্রধান লক্ষ্য হিসেবে স্থির করতে হবে।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয়: বাণিজ্য বিভাগের ভর্তি পরীক্ষায় সাধারণত হিসাববিজ্ঞান, ব্যবসায় নীতি ও প্রয়োগ (Business Principles), বাংলা, ইংরেজি এবং সাধারণ জ্ঞান (বিশেষত অর্থনীতি ও ব্যবসায় সংক্রান্ত) বিষয়ে প্রশ্ন আসে।

ইংরেজিতে দক্ষতা: IBA এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলির ভর্তি পরীক্ষায় ইংরেজির উপর জোর দেওয়া হয়। ইংরেজির দক্ষতা বাড়াতে এখন থেকেই প্রস্তুতি শুরু করা উচিত।

২. দক্ষতা অর্জন (Skill Development)

অতিরিক্ত কোর্স: প্রথাগত ডিগ্রির পাশাপাশি ডেটা অ্যানালাইসিস (যেমন – Microsoft Excel, Tableau), ডিজিটাল মার্কেটিং বা প্রোগ্রামিং-এর মতো দক্ষতা অর্জন করা উচিত।

ইন্টার্নশিপ ও নেটওয়ার্কিং: বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকেই বিভিন্ন কোম্পানিতে ইন্টার্নশিপের মাধ্যমে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন এবং পেশাদার সম্পর্ক তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি।

যোগাযোগ দক্ষতা: কর্পোরেট জগতে সফলতার জন্য শক্তিশালী যোগাযোগ (Communication) এবং উপস্থাপনা (Presentation) দক্ষতা অপরিহার্য।

৩. দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা (Long-Term Planning)

উচ্চতর ডিগ্রি: গ্র্যাজুয়েশনের পর দেশ বা বিদেশ থেকে MBA (Master of Business Administration) বা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের পরিকল্পনা থাকা ভালো।

পেশাগত সার্টিফিকেশন: ফিন্যান্স বা অ্যাকাউন্টিংয়ে ক্যারিয়ার গড়তে চাইলে CFA (Chartered Financial Analyst), ACCA (Association of Chartered Certified Accountants), বা CMA (Certified Management Accountant)-এর মতো পেশাগত সনদ অর্জনের দিকে নজর দিতে হবে।

আপনার সন্তানের এই অসাধারণ ফলাফল তাকে বাংলাদেশের যেকোনো সেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির জন্য একটি বিশাল সুবিধা দেবে। সঠিক বিষয় নির্বাচন এবং অধ্যবসায়ের মাধ্যমে সে অবশ্যই একটি উজ্জ্বল ও সফল ক্যারিয়ার গঠন করতে পারবে। এখন থেকেই তার আগ্রহ বুঝে পথ দেখানোটাই হবে আপনার মূল কাজ।

কলা বিভাগের একজন ভালো ছাত্রের ক্যারিয়ার গাইড লাইন

আপনার সন্তান এসএসসি ও এইচএসসি উভয় পরীক্ষায় কলা বিভাগ (Arts/Humanities) থেকে খুবই ভালো ফলাফল অর্জন করেছে। এটি একটি অত্যন্ত প্রশংসনীয় সাফল্য! বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় কলা বিভাগের একজন মেধাবী শিক্ষার্থীর জন্য অসংখ্য উজ্জ্বল ক্যারিয়ারের পথ খোলা আছে, যা গতানুগতিক সরকারি চাকরির বাইরেও আধুনিক এবং সৃষ্টিশীল ক্ষেত্রে বিস্তৃত। এই অসাধারণ ফলাফলকে কাজে লাগিয়ে আপনার সন্তানের ক্যারিয়ার গঠনের জন্য উপযুক্ত বিষয়, বিশ্ববিদ্যালয় নির্বাচন এবং ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নিচে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।

উচ্চশিক্ষার জন্য উপযুক্ত বিষয় নির্বাচন:

কলা বিভাগ থেকে পাস করা শিক্ষার্থীদের জন্য বিষয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে দুটি প্রধান দিক রয়েছে: কোর হিউম্যানিটিজ বিষয় (যা গবেষণামূলক বা শিক্ষামূলক ক্যারিয়ারের জন্য সেরা) এবং এমার্জিং বা আন্তঃবিভাগীয় বিষয় (যা কর্পোরেট বা পেশাদার জগতে দ্রুত প্রবেশে সহায়ক)।

১. পেশাদার এবং আধুনিক বিষয়সমূহ (Professional & Emerging Fields)

বর্তমান চাকরির বাজারের চাহিদা বিবেচনা করে এই বিষয়গুলো নির্বাচন করা যেতে পারে, যা সরাসরি পেশাদার জীবনে প্রবেশের সুযোগ তৈরি করে।

বিষয়কেন পড়বেন?সম্ভাব্য ক্যারিয়ার পথ
Law (আইন)এই বিষয়ে পড়লে সরকারি চাকরি, বিচার বিভাগ এবং কর্পোরেট আইন বিশেষজ্ঞ হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। এটি একটি অত্যন্ত সম্মানজনক ও আর্থিকভাবে লাভজনক পেশা।আইনজীবী, বিচারক, সরকারি আইন কর্মকর্তা, কর্পোরেট লিগ্যাল অ্যাডভাইজার।
Journalism, Media & Communication (সাংবাদিকতা, গণমাধ্যম ও যোগাযোগ)আধুনিক যুগে গণমাধ্যম এবং যোগাযোগ একটি শক্তিশালী ক্ষেত্র। এটি সৃজনশীলতাকে কাজে লাগিয়ে গণমাধ্যম, বিজ্ঞাপন বা জনসংযোগে ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ দেয়।সাংবাদিক, টেলিভিশন প্রযোজক, জনসংযোগ কর্মকর্তা (PR), বিজ্ঞাপন নির্বাহী, কন্টেন্ট ক্রিয়েটর।
Economics (অর্থনীতি)কলা বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য এটি অন্যতম সেরা পছন্দ। এটি বিশ্লেষণাত্মক ক্ষমতা তৈরি করে, যা সরকারি চাকরি, ব্যাংকিং এবং আন্তর্জাতিক সংস্থায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।ব্যাংকার, অর্থনীতিবিদ, গবেষক, সরকারি নীতি নির্ধারক, ডেটা অ্যানালিস্ট।
Public Administration (লোক প্রশাসন)সরকারি প্রশাসন, এনজিও এবং আন্তর্জাতিক সংস্থায় নেতৃত্বদানকারী পদে কাজের জন্য এই বিষয়ে অধ্যয়ন অপরিহার্য। এটি সরকারি ক্যাডার সার্ভিসের জন্য সেরা বিষয়।বিসিএস (BCS) ক্যাডার, সরকারি কর্মকর্তা, নীতি বিশ্লেষক, আন্তর্জাতিক সংস্থা (UNDP, World Bank)।
English Language & Literature (ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য)এটি ভাষা, সাহিত্য এবং যোগাযোগের ক্ষেত্রে গভীর জ্ঞান তৈরি করে, যা শিক্ষকতা, অনুবাদ, প্রকাশনা এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে অপরিহার্য।শিক্ষক, অনুবাদক, কর্পোরেট প্রশিক্ষক, কন্টেন্ট এডিটর, বিদেশী দূতাবাসে কাজ।

২. কোর হিউম্যানিটিজ এবং সামাজিক বিজ্ঞান বিষয়সমূহ (Core Humanities & Social Sciences)

এই বিষয়গুলি গভীর একাডেমিক জ্ঞান তৈরি করে এবং গবেষণা, শিক্ষকতা বা সরকারি উচ্চ পদে যেতে সাহায্য করে।

Political Science & International Relations (রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক): যারা কূটনীতি, রাজনীতি বিশ্লেষণ, বৈদেশিক সম্পর্ক এবং আন্তর্জাতিক সংস্থায় কাজ করতে আগ্রহী, তাদের জন্য এটি সেরা।

Sociology (সমাজবিজ্ঞান) ও Anthropology (নৃতত্ত্ব): সামাজিক সমস্যা বিশ্লেষণ, গবেষণা এবং এনজিও বা উন্নয়নমূলক সংস্থায় কাজের জন্য এই বিষয়গুলি খুবই উপযোগী।

History (ইতিহাস): যারা গবেষণা, জাদুঘর বা আর্কাইভসে কাজের পাশাপাশি বিসিএস (BCS) পরীক্ষায় ভালো করতে চায়, তাদের জন্য এই বিষয়টি উপযুক্ত।

Philosophy (দর্শন): এটি সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা (Critical Thinking) ও যুক্তির দক্ষতা তৈরি করে, যা যেকোনো পেশায় সাফল্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

সেরা বিশ্ববিদ্যালয় নির্বাচন

কলা বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য সেরা ফলাফল মানেই দেশের শীর্ষ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তির সুযোগ। এই প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে ডিগ্রি লাভ করলে পেশাজীবনে প্রবেশের পথ অনেক সহজ হয়ে যায়।

১. শীর্ষ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় (Top Public Universities)

এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তির সুযোগ পাওয়া মানেই সেরা শিক্ষা এবং ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের নামপরীক্ষার ইউনিটকেন সেরা?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (DU)খ-ইউনিট (কলা, আইন ও সামাজিক বিজ্ঞান) ও ঘ-ইউনিট (সমন্বিত)কলা ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ, আইন অনুষদ এবং শান্তি ও সংঘর্ষ গবেষণা (PCS), আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, লোক প্রশাসন-এর মতো আধুনিক বিষয়গুলোর জন্য এটি দেশের সেরা।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (CU)বি-ইউনিট (কলা ও মানববিদ্যা)কলা ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের মান উন্নত, বিশেষ করে ইংরেজি, ইতিহাস এবং যোগাযোগ বিষয়ে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (RU)এ-ইউনিট (কলা, আইন ও সামাজিক বিজ্ঞান)গবেষণা এবং অ্যাকাডেমিক পরিবেশের জন্য সুপরিচিত, যেখানে কলা ও সামাজিক বিজ্ঞানের অনেক শক্তিশালী বিভাগ রয়েছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (JU)সি-ইউনিট (কলা ও মানববিদ্যা) এবং বি-ইউনিট (সমাজবিজ্ঞান)এখানকার নাটক ও নাট্যতত্ত্ব, জার্নালিজম, প্রত্নতত্ত্ব ইত্যাদি বিশেষায়িত বিভাগগুলো খুবই জনপ্রিয়।
বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (BUP)FASS (Faculty of Arts & Social Sciences)আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, অর্থনীতি, আইন এবং যোগাযোগ বিষয়ে মানসম্পন্ন পাঠদান ও চাকরির ভালো সুযোগ দেয়।

২. বিশেষায়িত এবং অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়

আইন (Law)-এর জন্য বিশেষ প্রতিষ্ঠান: আপনার সন্তানের যদি আইন পড়ার প্রবল আগ্রহ থাকে, তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ বা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ হলো প্রধান লক্ষ্য।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়: কিছু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে কলা বিভাগের শিক্ষার্থীরা ভর্তির সুযোগ পায়, যেমন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (SUST) সমাজবিজ্ঞান, নৃবিজ্ঞান বা ইংরেজি বিভাগ।

সেরা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়: পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ না পেলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হতে পারে চমৎকার বিকল্প। এখানকার কারিকুলাম সাধারণত আধুনিক এবং কর্মবাজার-কেন্দ্রিক।

নর্থ সাউদার্ন ইউনিভার্সিটি (NSU): অর্থনীতি, ইংরেজি ও পরিবেশ বিজ্ঞানের মতো বিষয়গুলোর জন্য পরিচিত।

ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি (BRACU): আধুনিক সমাজবিজ্ঞান, লোক প্রশাসন এবং ইংরেজি বিভাগের জন্য সুপরিচিত।

ইউনিভার্সিটি অফ লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ (ULAB): এখানকার মিডিয়া স্টাডিজ ও জার্নালিজম বিভাগটি খুবই উন্নত ও সুপরিচিত।

সফল ক্যারিয়ার গঠনের জন্য অতিরিক্ত পদক্ষেপ

শুধুমাত্র উচ্চশিক্ষা নয়, বরং একটি সুগঠিত পেশাদার জীবন নিশ্চিত করার জন্য কিছু দক্ষতা ও পরিকল্পনা থাকা আবশ্যক।

১. ভর্তির প্রস্তুতিতে করণীয় (Admission Preparation)

টার্গেট নির্ধারণ: ভর্তির প্রস্তুতিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খ-ইউনিট (কলা, আইন ও সামাজিক বিজ্ঞান) এবং ঘ-ইউনিট (সমন্বিত)-কে প্রধান লক্ষ্য করতে হবে।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয়: কলা বিভাগের ভর্তি পরীক্ষায় সাধারণত বাংলা, ইংরেজি, সাধারণ জ্ঞান (বিশেষত ইতিহাস, অর্থনীতি, সাম্প্রতিক বিশ্ব এবং রাজনীতি) বিষয়ের উপর জোর দেওয়া হয়।

ইংরেজিতে দক্ষতা: আইন, অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বা সাংবাদিকতা-এর মতো বিষয়গুলোতে ভর্তির জন্য ইংরেজিতে অত্যন্ত ভালো দক্ষতা থাকা আবশ্যক। এটি তাকে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে এবং পরবর্তীতে কর্পোরেট বা আন্তর্জাতিক সংস্থায় সফল হতে সাহায্য করবে।

২. দক্ষতা বৃদ্ধি এবং নেটওয়ার্কিং (Skill Development & Networking)

সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা (Critical Thinking): কলা বিভাগের মূল শক্তি হলো বিশ্লেষণাত্মক ক্ষমতা। এই দক্ষতা যত বাড়বে, তত সে গবেষণা বা উচ্চপদে সুবিধা পাবে।

যোগাযোগ ও উপস্থাপনা: শিক্ষকতা, সাংবাদিকতা, আইন বা কর্পোরেট—যেকোনো পেশায় সাফল্যের জন্য শক্তিশালী লিখিত ও মৌখিক যোগাযোগ (Communication) এবং উপস্থাপনা (Presentation) দক্ষতা অত্যাবশ্যক।

ডিজিটাল দক্ষতা: ঐতিহ্যগত কলা বিভাগের পাশাপাশি ডেটা বিশ্লেষণ (যেমন – SPSS), সোশ্যাল মিডিয়া ম্যানেজমেন্ট এবং অফিস সফটওয়্যারে দক্ষতা অর্জন করলে চাকরির বাজারে অনেক এগিয়ে থাকা যায়।

ইন্টার্নশিপ: স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের সময় থেকেই বিভিন্ন এনজিও, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, আইন ফার্ম বা গণমাধ্যম সংস্থায় ইন্টার্নশিপ করা উচিত, যা বাস্তব অভিজ্ঞতা দেবে এবং নেটওয়ার্কিং তৈরি করবে।

৩. দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা (Long-Term Vision)

বিসিএস ক্যাডারশিপ: কলা ও সামাজিক বিজ্ঞান বিভাগের অধিকাংশ বিষয়ই বিসিএস পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য খুবই সহায়ক। যদি সরকারি উচ্চপদে তার আগ্রহ থাকে, তবে বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকেই বিসিএস-এর প্রস্তুতি শুরু করা যেতে পারে।

উচ্চতর ডিগ্রি (Higher Studies): মাস্টার্স বা পিএইচডি-এর জন্য বিদেশে উচ্চশিক্ষা বা দেশেই মানসম্পন্ন গবেষণা ডিগ্রি অর্জনের পরিকল্পনা করা যেতে পারে, বিশেষ করে যদি সে শিক্ষকতা বা আন্তর্জাতিক সংস্থায় কাজ করতে চায়।

আপনার সন্তানের এই অসাধারণ ফলাফল তাকে বাংলাদেশের যেকোনো সেরা প্রতিষ্ঠানে তার আগ্রহের বিষয়ে পড়ার সুযোগ এনে দেবে। তাকে কেবল সঠিক পথে চালিত করা এবং তার আগ্রহ ও মেধার সঠিক সমন্বয় ঘটানোই এখন আপনার কাজ। তাকে নিরন্তর উৎসাহ দিন। শুভ কামনা রইলো!

বাংলাদেশের ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

বাংলাদেশে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান রয়েছে যা ইসলামী উচ্চশিক্ষা বা এর সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পাঠদান করে। এদের মধ্যে প্রধান হলো ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ (IU), যা একটি সাধারণ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হলেও এর একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে ইসলামিক শিক্ষামূলক অনুষদ এবং ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয় (IAU), যা বাংলাদেশের সকল ফাযিল ও কামিল মাদ্রাসার নিয়ন্ত্রক। এছাড়াও, ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি (IUT) হলো আন্তর্জাতিকভাবে পরিচালিত একটি কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয়।

এখানে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ভর্তির প্রক্রিয়া, বিষয়সমূহ এবং ক্যারিয়ার গঠন সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

১. বাংলাদেশের প্রধান ইসলামি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ

বাংলাদেশে প্রধানত তিনটি প্রতিষ্ঠানকে ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় বা ইসলামি শিক্ষা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান হিসেবে গণ্য করা হয়:

প্রতিষ্ঠানের নামধরনপ্রধান কার্যক্রম
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (IU), কুষ্টিয়াসাধারণ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় (Govt.)ধর্মতত্ত্ব, বিজ্ঞান, প্রকৌশল, মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞানের সমন্বয়ে গঠিত।
ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয় (IAU), ঢাকাঅধিভুক্তকারী বিশ্ববিদ্যালয় (Affiliating)সারা দেশের ফাযিল ও কামিল (স্নাতক/স্নাতকোত্তর) মাদ্রাসার একাডেমিক নিয়ন্ত্রণ ও পরীক্ষা পরিচালনা।
ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি (IUT)আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় (OIC পরিচালিত)প্রকৌশল ও প্রযুক্তি শিক্ষা।

২. ভর্তি প্রক্রিয়া ও করণীয়

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন।

ক. ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (IU), কুষ্টিয়া

এটি একটি পূর্ণাঙ্গ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ায়, এখানে ভর্তি হতে হলে নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলো অনুসরণ করতে হয়:

ধাপকরণীয়
১. ভর্তি পরীক্ষাসাধারণত এটি GST (General, Science & Technology) গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষার অন্তর্ভুক্ত থাকে। শিক্ষার্থীদের প্রথমে এই গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে হয়।
২. জিপিএ শর্তএসএসসি ও এইচএসসি/সমমান পরীক্ষায় নির্দিষ্ট জিপিএ থাকতে হবে (যা প্রতি বছর বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়)।
৩. ইউনিট নির্বাচনগুচ্ছ পদ্ধতির (A/B/C) যে ইউনিটে পরীক্ষা দেওয়া হয়েছে, সেই ইউনিটের বিভাগগুলোতে ভর্তির জন্য আবেদন করা যাবে। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রায়ই নিজস্ব ‘D’ ইউনিট-এও ধর্মতত্ত্ব অনুষদের জন্য স্বতন্ত্র পরীক্ষা নিতে পারে।
৪. বিভাগীয় শর্তআবেদনকারীকে উচ্চ মাধ্যমিক বা সমমান পরীক্ষায় নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে (যেমন—বিজ্ঞান অনুষদের জন্য গণিত/জীববিজ্ঞান) ন্যূনতম জিপিএ থাকতে হবে।
৫. চূড়ান্ত আবেদনগুচ্ছ পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ওয়েবসাইটে নির্দিষ্ট ইউনিটে ভর্তির জন্য চূড়ান্ত আবেদন করতে হয়।

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (IU), কুষ্টিয়ার প্রবেশ দার

খ. ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয় (IAU), ঢাকা

IAU সরাসরি কোনো শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করে না, বরং এর অধীনে থাকা ফাযিল (অনার্স) ও কামিল (স্নাতকোত্তর) মাদ্রাসাগুলোতে ভর্তির প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে।

ধাপকরণীয়
১. শিক্ষাগত যোগ্যতাফাযিল (অনার্স) কোর্সের জন্য দাখিল ও আলিম পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। কামিল কোর্সের জন্য ফাযিল পাস করতে হবে।
২. আবেদন প্রক্রিয়াবিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ভর্তি সংক্রান্ত ওয়েবসাইটের (যেমন- admission.iau.edu.bd) মাধ্যমে অনলাইনে প্রাথমিক আবেদন ফরম পূরণ করতে হয়।
৩. মেধা তালিকাফাযিল (অনার্স) ভর্তির ক্ষেত্রে সাধারণত দাখিল ও আলিম পরীক্ষার ফলাফল এবং বিষয় পছন্দের ভিত্তিতে প্রতিটি মাদ্রাসার জন্য আলাদাভাবে মেধা তালিকা প্রণয়ন করা হয়। কোনো স্বতন্ত্র ভর্তি পরীক্ষা থাকে না (তবে নীতিমালা পরিবর্তিত হতে পারে)।
৪. মাদ্রাসা নির্বাচনআবেদনকারীকে IAU-এর অধীনে থাকা নির্দিষ্ট অধিভুক্ত মাদ্রাসায় ভর্তির জন্য আবেদন করতে হয়।

ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয় (IAU), ঢাকা

৩. গুরুত্বপূর্ণ বিষয়সমূহ (সাবজেক্ট ধারণা)

এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ইসলামের মূলধারার শিক্ষার পাশাপাশি আধুনিক ও প্রযুক্তিগত বিষয়গুলোর সমন্বয় দেখা যায়:

ক. ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (IU), কুষ্টিয়া

IU-এর বিভাগগুলো মূলত চারটি মূল ধারায় বিভক্ত:

অনুষদবিভাগসমূহ (উদাহরণ)
ধর্মতত্ত্ব ও ইসলামী শিক্ষা অনুষদআল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ, আল-হাদিস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ, দাওয়াহ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ, আল-ফিকহ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি।
প্রকৌশল ও প্রযুক্তি অনুষদকম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (CSE), ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং (EEE), ইনফরমেশন অ্যান্ড কমিউনিকেশন টেকনোলজি (ICT), ফলিত রসায়ন ও কেমিকৌশল, বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং।
ফলিত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি অনুষদফলিত পুষ্টি ও খাদ্য প্রযুক্তি, বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং, ফার্মেসি, পরিবেশ বিজ্ঞান ও ভূগোল, গণিত, পরিসংখ্যান।
ব্যবসায় প্রশাসন ও আইন অনুষদফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং, অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস (AIS), আইন ও ভূমি ব্যবস্থাপনা, অর্থনীতি, লোক প্রশাসন।

খ. ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয় (IAU)-এর অধীনে মাদ্রাসাসমূহ

IAU ফাযিল (অনার্স) পর্যায়ে অধিভুক্ত মাদ্রাসাগুলোতে সাধারণত নিম্নলিখিত বিষয়গুলোতে পাঠদান করে:

  • আল-কুরআন এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ
  • আল-হাদীস এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ
  • দাওয়াহ এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ
  • ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি
  • আরবি ভাষা ও সাহিত্য
  • আল-ফিকহ্ এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ

৪. পড়াশোনা শেষ করে ক্যারিয়ার গঠন

ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করা শিক্ষার্থীদের জন্য ধর্মীয় ও সাধারণ—উভয় ক্ষেত্রেই বিস্তৃত ক্যারিয়ারের সুযোগ রয়েছে।

ক. ধর্মীয় ও ঐতিহ্যবাহী ক্যারিয়ার

যারা ধর্মতত্ত্ব ও ইসলামিক শিক্ষা (যেমন—আল-কুরআন, আল-হাদীস, দাওয়াহ, ফিকহ) বিষয়ে ডিগ্রি অর্জন করেন, তাদের জন্য প্রধান ক্যারিয়ারগুলো হলো:

  • শিক্ষকতা ও গবেষণা:
    • মাদ্রাসা শিক্ষক: ফাযিল ও কামিল মাদ্রাসায় শিক্ষক (মুদাররিস) বা অধ্যক্ষ হিসেবে যোগ দিতে পারেন।
    • বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক: ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ, আরবি ভাষা ও সাহিত্য, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগে প্রভাষক/শিক্ষক হিসেবে যোগ দেওয়া।
    • গবেষক: বিভিন্ন ইসলামিক ফাউন্ডেশন, থিঙ্ক ট্যাঙ্ক বা সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানে গবেষক হিসেবে কাজ করা।
  • ধর্মীয় নেতৃত্ব ও পরিষেবা:
    • খতিব/ইমাম: দেশ-বিদেশের বিভিন্ন মসজিদে খতিব, ইমাম বা মুয়াজ্জিন হিসেবে দায়িত্ব পালন।
    • ইসলামিক ফাউন্ডেশন: ইসলামিক ফাউন্ডেশন বা ধর্ম মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন পদে (যেমন—উপজেলা পর্যায়ে ফিল্ড অফিসার) যোগদান।
    • ইসলামি আইন বিশেষজ্ঞ: আদালতের বিচার প্রক্রিয়ায় ইসলামি আইন (শরিয়াহ) বিষয়ে বিশেষজ্ঞ মতামত বা পরামর্শক হিসেবে কাজ করা।

খ. আধুনিক ও বহুমুখী ক্যারিয়ার

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান, প্রকৌশল, ব্যবসা ও মানবিক শাখার গ্রাজুয়েটরা অন্যান্য সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করা শিক্ষার্থীদের মতোই সুযোগ লাভ করেন:

বিষয়/বিভাগক্যারিয়ার ক্ষেত্র
প্রকৌশল (CSE, EEE, ICT)সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, নেটওয়ার্ক ইঞ্জিনিয়ার, টেলিকম কোম্পানি, আইটি ফার্ম, হার্ডওয়্যার ডেভেলপার, ডেটা সায়েন্টিস্ট, সিস্টেম অ্যানালিস্ট।
ফার্মেসি ও বায়োটেকনোলজিফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি, গবেষণা ল্যাব, হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, সরকারি খাদ্য ও ওষুধ নিয়ন্ত্রণ সংস্থায় বিজ্ঞানী/কর্মকর্তা।
ব্যবসায় প্রশাসন ও অর্থনীতিব্যাংক, বীমা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি (MNC), এনজিও, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ম্যানেজমেন্ট, অ্যাকাউন্টিং, মানবসম্পদ (HR) এবং বিপণন (Marketing) পদে।
আইনআইনজীবী, বিচারক (জুডিশিয়াল সার্ভিস), সরকারি আইন কর্মকর্তা, কর্পোরেট আইন উপদেষ্টা।
বাংলা, ইংরেজি, গণিত, পরিসংখ্যানবিসিএস (BCS) প্রশাসন ও শিক্ষা ক্যাডার, অন্যান্য সরকারি চাকরি, ব্যাংক, মিডিয়া (সাংবাদিকতা), প্রকাশনা সংস্থা, অনুবাদক।

গ. বিশেষ সুযোগ (IAU/মাদ্রাসা গ্রাজুয়েটদের জন্য)

  • বিসিএস পরীক্ষা: ধর্মীয় বিষয়ে ডিগ্রিধারীরা সাধারণ শিক্ষা (মাদ্রাসা) ক্যাডারে সরকারি ফাযিল/কামিল মাদ্রাসার শিক্ষক পদে বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে যোগ দিতে পারেন। অন্যান্য জেনারেল ক্যাডারেও তারা অংশ নিতে পারেন।
  • আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান: ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (IDB), OIC-এর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থা বা মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন গবেষণা ও শিক্ষামূলক প্রতিষ্ঠানে উচ্চশিক্ষা ও চাকরির সুযোগ রয়েছে।
  • হজ ও ওমরাহ ব্যবস্থাপনা: ধর্ম মন্ত্রণালয়ের অধীনে হজ ও ওমরাহ ব্যবস্থাপনার কাজে নিয়োজিত হওয়া।

উপসংহার

বাংলাদেশে ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আধুনিক জ্ঞান ও ধর্মীয় শিক্ষার এক চমৎকার সমন্বয় ঘটিয়েছে। একজন শিক্ষার্থী তার আগ্রহের ক্ষেত্র অনুযায়ী ধর্মতত্ত্ব থেকে শুরু করে অত্যাধুনিক প্রকৌশল—যেকোনো বিষয়ে পড়াশোনা করে শিক্ষকতা, সরকারি চাকরি (BCS), প্রযুক্তি খাত, গবেষণা বা ধর্মীয় নেতৃত্বের মতো বহুমুখী ও সম্মানজনক ক্যারিয়ার গঠন করতে পারে। ভর্তির জন্য প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের নির্দিষ্ট বিজ্ঞপ্তির তারিখ ও শর্তাবলী নিয়মিত অনুসরণ করা আবশ্যক।

উচ্চশিক্ষায় বিশ্বের শীর্ষ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

ইসলামী বিষয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের লক্ষ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যান অনেকে। শিক্ষা, গবেষণা, পড়াশোনার পরিবেশ ও নানাবিধ সুযোগ-সুবিধার কারণে কিছু বিশ্ববিদ্যালয় পছন্দ তালিকার শীর্ষে থাকে। নিম্নে এমন ১০টি বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত তথ্য তুলে ধরা হলো।

১. আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় : ৯৭০ সালে প্রতিষ্ঠিত এ বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

গত শতাব্দী পর্যন্ত এখানে শুধু ইসলামী বিষয়গুলো পড়ানো হতো। ১৯২০ সাল থেকে চিকিৎসাবিজ্ঞানসহ আধুনিক অনেক শাখা এতে যুক্ত হয়। এ বিশ্ববিদ্যালয়ে  (http://www.azhar.edu.eg/) বৃত্তি নিয়ে বিশ্বের শতাধিক দেশের শিক্ষার্থীসহ প্রায় পাঁচ লাখ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করেন। ২৩টি অনুষদে প্রায় ১৫ হাজার ১৫৫ জন শিক্ষক পাঠদান করেন এবং ১৩ হাজার ৭৪ জন কর্মকর্তা শিক্ষার্থীদের জন্য কাজ করছেন।

কিং আবদুল আজিজ ইউনিভার্সিটি, সৌদি আরব

২. কিং আবদুল আজিজ ইউনিভার্সিটি : ১৯৬৭ সালে প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়টি  (https://www.kau.edu.sa/) সৌদি আরবের জেদ্দা অঞ্চলের দক্ষিণে অবস্থিত। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে তা প্রতিষ্ঠা লাভ করলেও ১৯৭৪ সালে বাদশাহ ফয়সাল এটিকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় করেন। সৌদি আরবের সর্ববৃহৎ এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৪টি অনুষদে এক লাখ ১৭ হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে। তাদের মধ্যে ছেলের সংখ্যা ৫৫ হাজার ৫৭৬ এবং মেয়ের সংখ্যা ৬১ হাজার ৫২০ জন।

টাইমস হায়ার এডুকেশনের তথ্যমতে এটি ১০১-১৫০তম স্থানে এবং আরববিশ্বে প্রথম স্থানে রয়েছে। প্রতি বছর অসংখ্য শিক্ষার্থী বৃত্তি নিয়ে এখানে পড়তে যান। ধর্মীয় বিষয়ের পাশাপাশি আধুনিক বিজ্ঞান গবেষণার জন্য এ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষ খ্যাতি রয়েছে।

কাতার ইউনিভার্সিটি, কাতার

৩. কাতার ইউনিভার্সিটি : ১৯৭৩ সালে প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়টি দোহার নর্দান এলাকায় অবস্থিত। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের (http://www.qu.edu.qa/) ১১টি অনুষদে মোট ৯৭টি বিষয় রয়েছে।

এখানে ২৩ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করেন। ইসলামী বিষয় ছাড়াও এখানে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, অর্থনীতি ও গণিত সংশ্লিষ্ট বিষয় রয়েছে। তা ছাড়া জ্ঞান-বিজ্ঞানের নানা শাখায় এর গবেষণা কার্যক্রম ব্যাপক অবদান রাখছে।

ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটি, মালয়েশিয়া

৪. ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটি মালয়েশিয়া : ১৯৮৩ সালে ইসলামী চিন্তা ধারণ করে কয়েকটি মুসলিম দেশ ও ওআইসির সহযোগিতায় বিশ্ববিদ্যালয়টি (https://www.iium.edu.my/) প্রতিষ্ঠিত হয়। মালয়েশিয়ার সেলাঙ্গরের গোম্বাক জেলায় অবস্থিত এর মূল ক্যাম্পাস। উন্নত শিক্ষাব্যবস্থা ও গবেষণার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়টি সারা বিশ্বে সমাদৃত। এর কারিকুলামকে ইসলাম ও আধুনিক শিক্ষার সমন্বয় সাধনের সর্বোত্কৃষ্ট নমুনা মনে করা হয়। এর ১৪টি অনুষদে বিশ্বের শতাধিক দেশের ৭০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করেন। তবে এখানকার বেশির ভাগ শিক্ষার্থী মালয়েশিয়ার।

ইস্তাম্বুল ইউনিভার্সিটি, তুরস্ক

৫. ইস্তাম্বুল ইউনিভার্সিটি : ১৪৫৩ সালে সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মদ আল-ফাতিহের নেতৃত্বে তা প্রতিষ্ঠিত হয়। বিশ্ববিদ্যালয়টি (https://www.istanbul.edu.tr/en/) তুরস্কের ঐতিহ্যবাহী ও প্রাচীনতম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃত। শিক্ষা ও গবেষণায় এখানকার শিক্ষার্থীদের অবদান অনস্বীকার্য। এখানকার ১৭টি অনুষদে ৬৬ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করেন। কলা, বিজ্ঞান, অর্থনীতিসহ এখানে রয়েছে থিওলজি বিভাগ। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক দুই শিক্ষার্থী আজিজ সানকার ও ওরহান পামুক নোবেল পেয়েছেন। তা ছাড়া ইসরায়েলের দীর্ঘ ১০ বছরের প্রেসিডেন্ট ইতিজাক বেন-জভি, প্রধানমন্ত্রী ডেভিড বেন গুরিওন ও মোশে শেরেট এবং তুরস্কের রাষ্ট্রপতি আবদুল্লাহ গুল ও ছয়জন প্রধানমন্ত্রীসহ খ্যাতিমান ব্যক্তিত্ব এখান বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন।

ব্রুনেই দারুসসালাম ইউনিভার্সিটি, ব্রুনেই

৬. ব্রুনেই দারুসসালাম ইউনিভার্সিটি : ব্রুনাইয়ের বন্দর সেরি বেগাওয়ানে অবস্থিত বিশ্ববিদ্যালয়টি (https://ubd.edu.bn/) ১৯৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি দেশটির সর্ববৃহৎ বিশ্ববিদ্যালয়। গবেষণার মানে সারা বিশ্বে কিউএস র‌্যাংকিংয়ে ৩২৩ তম স্থানে রয়েছে। এখানে ইসলামী শিক্ষা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, বাণিজ্যসহ মোট ৯টি অনুষদ রয়েছে। প্রতি বছর দেশটির সরকার স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি প্রোগ্রামে বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীদের শিক্ষাবৃত্তি দিয়ে থাকে। 

ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব মদিনা, সৌদি আরব

৭. ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব মদিনা : ১৯৬২ সালে সৌদি বাদশাহ সাউদ বিন আবদুল আজিজের রাজকীয় নির্দেশনায় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় মদিনা (https://iu.edu.sa/en-us) প্রতিষ্ঠিত হয়। বিশ্বের সব দেশের মুসলিমদের মধ্যে ইসলামী শিক্ষা বিস্তার এর অন্যতম লক্ষ্য। প্রথমদিকে এখানে শুধু ইসলামী বিষয় যেমন শরিয়াহ, দাওয়াহ, কোরআন, হাদিস বিভাগ থেকে স্নাতক, স্নাতকত্তোর ও পিএইচডি করা যেত। ২০০৯ সালে প্রকৌশল অনুষদ ও ২০১১ সালে কম্পিউটার সায়েন্স অনুষদ খোলা হয়। বিশ্ববিদ্যায়ের ১০টি অনুষদে বিশ্বের দেড় শতাধিক দেশ থেকে ২০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করেন। সৌদি সরকারের শিক্ষাবৃত্তি নিয়েই তারা এখানে পড়ে থাকেন। গত বছর বিশ্ববিদ্যালয়টি সর্বোচ্চসংখ্যক দেশের শিক্ষার্থীর উপস্থিতির জন্য গিনেস বুক রেকর্ড করে।

কায়রো ইউনিভার্সিটি, মিসর

৮. কায়রো ইউনিভার্সিটি : ১৯০৮ সালে প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়টি আরববিশ্বের অন্যতম প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়। তা কায়রো নগরীর জিজাহ নামক স্থানে অবস্থিত। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে ইসলাম ও আধুনিক শিক্ষার সমন্বয়ে এর বিশেষ অবস্থান রয়েছে। এ বিশ্ববিদ্যালয়ে (https://cu.edu.eg/Home) ২০টি অনুষদ ও তিনটি ইনস্টিটিউট আছে, যেখানে দেড় লাখের বেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করেন। এর সাবেক শিক্ষার্থীদের তিনজন নোবেল পুরস্কার লাভ করেছেন। তারা হলেন, মিসরীয় কূটনীতিক ও রাজনীতিবিদ মুহাম্মদ আল-বারাদায়ি, আরবি সাহিত্যিক নাজিব মাহফুজ এবং ফিলিস্তিন আন্দোলনের অন্যতম নেতা ইয়াসির আরাফাত।

ইমাম মুহাম্মদ বিন সাউদ ইসলামিক ইউনিভার্সিটি, সৌদি আরব

৯. ইমাম মুহাম্মদ ইবনে সাউদ ইসলামিক ইউনিভার্সিটি : ১৯৫৩ সালে সৌদি আরবের রিয়াদে বিশ্ববিদ্যালয়টি (https://imamu.edu.sa/en/)  প্রতিষ্ঠা লাভ করে। প্রথমদিকে তা শুধু শরিয়াহ কলেজ হিসেবে প্রসিদ্ধ ছিল। পরবর্তী সময়ে ১৯৭৪ সালে তা বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা লাভ করে। মূলত সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠাতা বাদশাহ আবদুল ইবনে আবদুর রহমান আল-সৌদের নির্দেশনায় মুহাম্মদ ইবনে ইবরাহিম আল-আলে শেখ তা প্রতিষ্ঠা করেন। এর ১৪ অনুষদ ও ৭০টি একাডেমিক ইনস্টিটিউট রয়েছে। তা ছাড়া এ বিশ্ববিদ্যালয়ের তত্ত্বাবধানে ইন্দোনেশিয়া ও জিবুতিতে দুটি ইনস্টিটিউট রয়েছে। মক্কা ও মদিনার পবিত্র মসজিদের ইমাম ও খতিবদের বেশির ভাগ এখানকার সাবেক শিক্ষার্থী।

আল-কাসিমিয়া ইউনিভার্সিটি, সংযুক্ত আরব আমিরাত

১০. আল-কাসিমিয়া ইউনিভার্সিটি : বিশ্ববিদ্যালয়টি (https://www.alqasimia.ac.ae) আমিরাতের শারজাহ এলাকায় অবস্থিত। ২০১৩ সালে শারজার গভর্নর ড. সুলতান বিন মুহাম্মদ আল-কাসিমির নির্দেশক্রমে তা প্রতিষ্ঠিত হয়। ১০ লাখ ৩৬ হাজার বর্গমিটার আয়োজনে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঁচটি অনুষদ আছে। প্রতিবছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীরা এখানে বৃত্তিসহ পড়াশোনা করতে আসেন।

ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটি ইসলামাবাদ, পাকিস্তান

১১. ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটি ইসলামাবাদ : ১৯৮০ সালে প্রতিষ্ঠিত এ বিশ্ববিদ্যালয় (https://www.iiu.edu.pk/) উচ্চশিক্ষার জন্য সর্বমহলে সমাদৃত। এখানকার ১০টি অনুষদে প্রায় ৩০ হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করেন। ইসলামী আইন, শরিয়াহসহ জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় বিশ্ববিদ্যালয়টি সাবার কাছে গ্রহণযোগ্য। এর পুরনো ক্যাম্পাসে রয়েছে বিশ্ববিখ্যাত ফয়সাল মসজিদ, যা সৌদি বাদশাহ ফয়সালের পক্ষ থেকে উপহার দেওয়া হয়েছিল।


সৌজন্যে : দেশদেশান্তর ২৪ ডেস্ক, প্রকাশ : ৩১ জুলাই ২০২৩

শিরক ও শিরকের প্রকারভেদ

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

শিরক (شِرۡکَ) একটি আরবি শব্দ যার অর্থ অংশীদার সাব্যস্ত করা, দুই বা ততোধিক শরীকের সংমিশ্রন। কাউকে অপরের অংশীদার বানানো। শাব্দিকভাবে এর দ্বারা এক বা একাধিক কোন কিছুকে সৃষ্টিকর্তারঅস্তিত্ব ও কর্তৃত্বের অংশীদার সাব্যস্ত করাকে বুঝায়। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

اَمۡ لَہُمۡ شِرۡکٌ فِی السَّمٰوٰتِ

অথবা আসমানসমূহে তাদের কোন অংশীদারিত্ব আছে কি? সুরা আহকাব : ৪।

এই আয়াতে মহান আল্লাহর সৃষ্টির কর্তৃত্বে অংশীদার বোঝাতে শিরক শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। আর কখনও দু’জনের মাঝে কোনো বস্তু বণ্টন করা হলে, এক জনকে অন্য জনের শরীক বলা হয়।আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَاَشۡرِکۡہُ فِیۡۤ اَمۡرِیۡۙ

এবং তাকে আমার কাজে অংশী করুন।সুরা ত্বহা : ৩২

এই আয়াতে মুসা (আ.) তার ভাই হারুন আ.) তার নবুয়েত অংশীদার বুঝাতে শিরক শব্দটি ব্যবহার করেছেন।

প্রকৃত পক্ষে, শিরক হলো আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকে উপাস্য হিসেবে নির্ধারিত করা বা তার উপাসনা করা। ‌ইসলামের পরিভাষায় রব ও ইলাহ হিসাবে আল্লাহর সহিত আর কাউকে শরীক সাব্যস্ত করার নামই শিরক। যেমন- 

মুর্তি বা দেবতার পুজা করা, তার সামনে মাথানত করা। আল্লাহ ব্যতীত কারো নিকট দোয়া করা, ফরিয়াদ করা, সাহায্য তলব করা, আশ্রয় প্রার্থনা করা। আল্লাহ ছাড়া অন্যের নিকট রোগ মুক্তির জন্য, বিপদ থেকে উদ্ধারের জন্য, সন্তান কামনায় জন্য নিবেদন পেশ করা।

ইসলামের খাটি অনুসারি মুসলিম হতে হলে আপনাকে অবশ্যই ঈমান আনতে হবে আল্লাহর একত্ববাদের উপর। কারণ একত্ববাদ হচ্ছে ঈমানের মূল ভিত্তি। আর শিরক হচ্ছে এই মূল ভিত্তির বিধ্বংসীকারী মরণাস্ত্র। শিরক অত্যন্ত জঘন্য অপরাধ। মুসলিম জীবনের কোনো অংশে এই শিরক অনুপ্রবেশের সুযোগ নেই। শিরক কারির কোন আমলই কবুল কবে না। কিয়ামতের কঠিন সময় মহান দয়ালু আল্লাহ তায়ালাও শিরক কারিকে পবিত্র করবেন না। শিরকের বিরুদ্ধে মহান আল্লাহর কঠোর অবস্থান তাইতো তিনি নিজেই শিরক খন্ডন করে পবিত্র কুরআনে বলেন,

لَوۡ کَانَ فِیۡہِمَاۤ اٰلِہَۃٌ اِلَّا اللّٰہُ لَفَسَدَتَا ۚ فَسُبۡحٰنَ اللّٰہِ رَبِّ الۡعَرۡشِ عَمَّا یَصِفُوۡنَ

যদি আসমান ও যমীনে আল্লাহ ছাড়া বহু ইলাহ থাকত তবে উভয়ই ধ্বংস হয়ে যেত, সুতরাং তারা যা বলে, আরশের রব আল্লাহ তা থেকে পবিত্র। সুরা আম্বিয়া : ২২

আল্লাহর যুক্তিটি খুবই সুন্দর, সহজ ও সরল  কিন্তু ইহার গভীর তাৎপর্য আছে। শিরককারি মুশরিদের যুক্তি খন্ডনের জন্য আশাকরি এই একটি মাত্র যুক্তিই যথেষ্ট। একজন সাধারন মানুষও মানতে বাধ্য সমগ্র বিশ্ব জাহানের অসংখ্য ও অগণিত সৃষ্টির মধ্যে যদি পারস্পরিক সমঝোতা ও সহযোগিতা প্রতিষ্ঠিত না থাকতো তাহলে এ ব্যবস্থাটি এক মুহূর্তের জন্যও চলতে পারতো না। আর এর জন্য প্রয়োজন হয় একক পরিচালনার ক্ষমতা। সেই কেন্দ্রিয় একক ক্ষমতার, একক মালিক, বিশ্ব জাহানে একক সৃষ্টি কর্তা মহান আল্লা্হ।

মানুষ সৃষ্টিগত ভাবে তাওহীদপন্থি থাকে। শয়তান তার মনে বিভ্রান্তি কালো রেখা একে বিভ্রান্ত করে থাকে এবং এ লক্ষে সে নানান বিভ্রাকর ফাঁদ পাতে। মানুষও তার পাতান ফাঁদে পা দেয়। সে আদম সন্তারকে সহজে ছেড়ে দিবেনা কারণ সে মহান আল্লাহর সামনে ওয়াদা করেছিল, আদম সন্তানকে সে সত্য পথ থেকে বিচ্যুত করবে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

قَالَ فَبِمَاۤ اَغۡوَیۡتَنِیۡ لَاَقۡعُدَنَّ لَہُمۡ صِرَاطَکَ الۡمُسۡتَقِیۡمَ.ثُمَّ لَاٰتِیَنَّہُمۡ مِّنۡۢ بَیۡنِ اَیۡدِیۡہِمۡ وَمِنۡ خَلۡفِہِمۡ وَعَنۡ اَیۡمَانِہِمۡ وَعَنۡ شَمَآئِلِہِمۡؕ وَلَا تَجِدُ اَکۡثَرَہُمۡ شٰکِرِیۡنَ

সে (ইবলিশ) বলল, ‘আপনি আমাকে পথভ্রষ্ট করেছেন, সে কারণে অবশ্যই আমি তাদের জন্য আপনার সোজা পথে বসে থাকব। তারপর অবশ্যই তাদের নিকট উপস্থিত হব, তাদের সামনে থেকে ও তাদের পেছন থেকে এবং তাদের ডান দিক থেকে ও তাদের বাম দিক থেকে। আর আপনি তাদের অধিকাংশকে কৃতজ্ঞ পাবেন না’। সুরা আরাফ : ১৬-১৭

শয়তান তার কুট কৌশল বাস্তবায়নের জন্য শিরককে বাচাই করে নিয়েছে। কারণ শিরক কারির সকল আমল নষ্ট হয়ে যায়।  আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

 قُلۡ هَلۡ نُنَبِّئُكُم بِٱلۡأَخۡسَرِينَ أَعۡمَـٰلاً (١٠٣) ٱلَّذِينَ ضَلَّ سَعۡيُہُمۡ فِى ٱلۡحَيَوٰةِ ٱلدُّنۡيَا وَهُمۡ يَحۡسَبُونَ أَنَّہُمۡ يُحۡسِنُونَ صُنۡعًا (١٠٤)

বল, ‘আমি কি তোমাদেরকে এমন লোকদের কথা জানাব, যারা আমলের দিক থেকে সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্ত’? দুনিয়ার জীবনে যাদের চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে গেছে, অথচ তারা মনে করছে যে, তারা ভাল কাজই করছে’! সুরা কাহফ : ১০৩-১০৪

শয়তান শিরকি আমলগুলি আদম সন্তানের নিকট এমন সুন্দরভাবে উপস্থাপন করে যে কাহারও পক্ষে পরিত্যাক করা সম্ভব হয় না। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

 وَجَدتُّهَا وَقَوۡمَهَا يَسۡجُدُونَ لِلشَّمۡسِ مِن دُونِ ٱللَّهِ وَزَيَّنَ لَهُمُ ٱلشَّيۡطَـٰنُ أَعۡمَـٰلَهُمۡ فَصَدَّهُمۡ عَنِ ٱلسَّبِيلِ فَهُمۡ لَا يَهۡتَدُونَ

আমি তাকে ও তার কওমকে দেখতে পেলাম তারা আল্লাহর পরিবর্তে সূর্যকে সিজদা করছে। আর শয়তান তাদের কার্যাবলীকে তাদের জন্য সৌন্দর্যমন্ডিত করে দিয়েছে এবং তাদেরকে সৎপথ থেকে নিবৃত করেছে, ফলে তারা হিদায়াত পায় না’।৷ সুরা নামল : ২৪

অনেক সময় আদম সন্তান জ্ঞানের অভাবে শিরকি কাজে লিপ্ত হয়। অজ্ঞতা তাকে বুঝতে দেয় না, যে সে শিরক করছে। শয়তানও শিরকি আমলগুলি সাজিয়ে গুছিয়ে সুশোভিত করে তোলে, সে মনে করে আমিতো নেক আমলই করছি। আমার বাপ দাদারা তো এমনটিই করছে। যেমন- ইসলামের দাবিদার একজন মুসলিম, সে তার মৃত পীরের কবরের নিকট সাহায্য চায়, কিয়ামতের কঠিন সময়ে পীরের সুপরিসের আশায় তার কবরে সিজদা দেয়, পীরের কবরের সম্মানের জন্য সেখান থেকে বাহির হওয়ার সময় উল্টা পায়ে বাহির হয়। এসকল শিরকি কাজ করতে নিষেধ করলে, সে শুনেনা কারণ সে এগুলো কে ইবাদাত মনে করে। এক জন কবিরা গুনাকারি পাপ করলে সে পাপকে পাপই মনে করে। আর আশা করা যায় সে হয়ত পাপ থেকে ফিরে আসবে। মহান আল্লাহর নিকট তওবা করবে। শিরকি আমল কারিতে শিরকে পাপই মনে করেনা। সে মনে করে, সে নেক আমল করছে, কাজেই তওবার প্রশ্ন উঠে না। যদি ঐ শিরকি আমল কারির শিরক সম্পর্কে জ্ঞান থাকত, তবে সে এই ক্ষমার অযোগ্য পাপ করিতে কখন সাহস দেখাত না। মনের অজান্তে শিরকি আমল করে ফেললেও সঙ্গে সঙ্গে তওবা করে তাওহীদের দিকে ফিরে আসত। তাই আসুন ক্ষমার অযোগ্য শিরক কি? কত প্রকার? কিভাবে আমাদের গ্রাস করে জানার চেষ্টা করি।

শরীয়তের পরিভাষায় শির্কঃ

আল্লাহর রুববিয়্যাহ (প্রতিপালকে) অথবা তার উলুহিয়্যাহ (ইবাদতে) অথবা আসমা ওয়াস সিফাতে (নির্ধারিত সত্ত্বাবাচক ও গুনবাচক নামে) অংশীদার বা সমকক্ষ নির্ধারণ করা কে শিরক বলে। প্রতিপালন, আইন, বিধান ও ইবাদতের ক্ষেত্রে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব ও একচ্ছত্র অধিকারে কাউকে শরীক করা বা অংশীদার বানানোই হচ্ছে শিরক।

এই সঙ্গা এভাবে ও দেয়া যায় যে, ‘‘এমন সব বিশ্বাস, কাজ, কথা ও অভ্যাসকে শির্ক বলা হয় যার দ্বারা বাহ্যত মহান আল্লাহর রুবূবিয়্যাত, উলূহিয়্যাত ও গুণাবলীতে অপর কারো অংশীদারিত্ব বা সমকক্ষতা প্রতীয়মান হয়।

এক কথায় গাইরুল্লাহকে আল্লাহ তয়ালার রুবূবিয়্যাত, উলূহিয়্যাত ও গুণাবলীর বৈশিষ্ট্যে গায়রুল্লাহকে সমকক্ষ করাকে শির্ক বলা হয়।’ যেমন-

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

قَالُواْ وَهُمۡ فِيهَا يَخۡتَصِمُونَ ٩٦ تَٱللَّهِ إِن كُنَّا لَفِي ضَلَٰلٖ مُّبِينٍ ٩٧ إِذۡ نُسَوِّيكُم بِرَبِّ ٱلۡعَٰلَمِينَ ٩٨

সেখানে (জাহান্নামে) পরস্পর ঝগড়া করতে গিয়ে তারা বলবে, আল্লাহর শপথ! আমরাতো স্পষ্ট বিভ্রান্তিতেই ছিলাম।যখন আমরা তোমাদেরকে সকল সৃষ্টির রবের সমকক্ষ বানাতাম’। সুরা শুরা : ৯৬-৯৮

এ আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, মুশরিকরা তাদের পাথর ও কাঠ ইত্যাদির মূর্তিসমূহকে আল্লাহ তা‘আলার রুবূবিয়্যাত ও উলূহিয়্যাতের বৈশিষ্ট্যে সমকক্ষ বানিয়ে নেয়ার কারণেই বিভ্রান্তিতে পতিত হয়ে মুশরিক হয়েছিল।শির্ক যখন আল্লাহ তা‘আলার রুবূবিয়্যাত, উলূহিয়্যাত ও গুণাবলীর বৈশিষ্ট্যের সাথে সম্পর্কিত, তখন সর্বাগ্রে আমাদেরকে এ তিনটি বিষয়ের বৈশিষ্ট্যসমূহ সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করতে হবে কেননা; এতে আমাদের নিকট শির্কের সম্ভাব্য ক্ষেত্রসমূহ পরিষ্কার হয়ে উঠবে।

সাধারনত তিন ক্ষেত্রে শিরক হয় :

আল্লাহর রুববিয়্যাহার (প্রতিপালকে) ক্ষেত্রে শিরক

আল্লাহর উলুহিয়্যাহার (ইবাদতে) ক্ষেত্রে শিরক

আল্লাহর সিফাতে (নির্ধারিত সত্ত্বাবাচক ও গুনবাচক নামে) ক্ষেত্রে শিরক

আল্লাহর রুববিয়্যাহার (প্রতিপালকে) ক্ষেত্রে শিরক:

আল্লাহর রুববিয়্যাহার (প্রতিপালকে) ক্ষেত্রে শিরক বলতে বুঝায়, একক ভাবে সব কিছুর মালিক, সৃষ্টি কর্তা, বিধান দাতা, রিজিক দাতা, জীবন দাতা, মুত্যু দাতা হিসেবে আল্লাহকে না মেনে এই বিষয়  অন্য ইলাহকে অংশীদার স্থাপন করা। অর্থাৎ কতৃত্বের ব্যাপারে আল্লাহর অনুরূপ, সমকক্ষ বা অংশীদার স্থির করা। গায়রুল্লাহকে আল্লাহ সমকক্ষ বা অংশীদার মনে করলে এই শিরকের অন্তভূক্ত। ইয়াহূদী ও নাসারাগণ তাদের ধর্মপন্ডিত এবং সংসার-বিরাগীদের রব বানিয়ে নিয়েছিল। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

اِتَّخَذُوۡۤا اَحۡبَارَہُمۡ وَرُہۡبَانَہُمۡ اَرۡبَابًا مِّنۡ دُوۡنِ اللّٰہِ وَالۡمَسِیۡحَ ابۡنَ مَرۡیَمَ ۚ وَمَاۤ اُمِرُوۡۤا اِلَّا لِیَعۡبُدُوۡۤا اِلٰـہًا وَّاحِدًا ۚ لَاۤ اِلٰہَ اِلَّا ہُوَ ؕ سُبۡحٰنَہٗ عَمَّا یُشۡرِکُوۡنَ

তারা আল্লাহকে ছেড়ে তাদের পন্ডিত ও সংসার-বিরাগীদের রব হিসেবে গ্রহণ করেছে এবং মারইয়ামপুত্র মাসীহকেও। অথচ তারা এক ইলাহের ইবাদত করার জন্যই আদিষ্ট হয়েছে, তিনি ছাড়া কোন ইলাহ নেই। তারা যে শরীক করে তিনি তা থেকে পবিত্র।  সুরা তাওবা : ৩১

এইভাবে কোন সৃষ্টিকে আল্লাহ সমকক্ষ ইলাহ নির্ধারণ করা শিরক। যদি কেউ আল্লাহ সমকক্ষ নির্ধারণ করে, তবে তার আবাস স্থান হবে জাহান্নামে। আল্লাহ রাব্বুল আলামনন ইরশাদ করেন-

وَجَعَلُوۡا لِلّٰہِ اَنۡدَادًا لِّیُضِلُّوۡا عَنۡ سَبِیۡلِہٖ ؕ قُلۡ تَمَتَّعُوۡا فَاِنَّ مَصِیۡرَکُمۡ اِلَی النَّارِ

আর তারা আল্লাহর জন্য সমকক্ষ নির্ধারণ করে, যেন তারা তাঁর পথ থেকে বিভ্রান্ত করতে পারে। বল, ‘তোমরা ভোগ করতে থাক। কেননা, তোমাদের গন্তব্য তো আগুনের দিকে’। সূরা ইবরাহিম : ৩০

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

فَلَا تَجۡعَلُواْ لِلَّهِ أَندَادٗا وَأَنتُمۡ تَعۡلَمُونَ  

সুতরাং তোমরা জেনে-বুঝে আল্লাহর জন্য সমকক্ষ নির্ধারণ করো না। সুরা বাকারা : ২২

আল্লাহ তাআলা অন্য আয়াতে ঘোষণা করেছেন:

وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَتَّخِذُ مِنْ دُونِ اللَّهِ أَنْدَادًا يُحِبُّونَهُمْ كَحُبِّ اللَّهِ

আর মানুষের মধ্যে এমনও আছে, যারা আল্লাহ ছাড়া অন্যকে আল্লাহর সমকক্ষরূপে গ্রহণ করে, তাদেরকে আল্লাহকে ভালবাসার মত ভালবাসে। সুরা বাকারা : ১৬৫

আবদুল্লাহ ইবনু মাসঊদ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন-

سَأَلْتُ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم أَيُّ الذَّنْبِ أَعْظَمُ عِنْدَ اللهِ قَالَ أَنْ تَجْعَلَ لِلهِ نِدًّا وَهُوَ خَلَقَكَ قُلْتُ إِنَّ ذَلِكَ لَعَظِيْمٌ قُلْتُ ثُمَّ أَيُّ قَالَ وَأَنْ تَقْتُلَ وَلَدَكَ تَخَافُ أَنْ يَطْعَمَ مَعَكَ قُلْتُ ثُمَّ أَيُّ قَالَ أَنْ تُزَانِيَ حَلِيْلَةَ جَارِك

আমি নবী সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে জিজ্ঞেস করলাম যে, কোন্ গুনাহ আল্লাহর কাছে সবচেয়ে বড়? তিনি বললেন, আল্লাহর জন্য অংশীদার দাঁড় করান। অথচ তিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন। আমি বললাম, এতো সত্যিই বড় গুনাহ। আমি বললাম, তারপর কোন্ গুনাহ? তিনি উত্তর দিলেন, তুমি তোমার সন্তানকে এই ভয়ে হত্যা করবে যে, সে তোমার সঙ্গে আহার করবে। আমি আরয করলাম, এরপর কোনটি? তিনি উত্তর দিলেন, তোমার প্রতিবেশীর স্ত্রীর সঙ্গে তোমার ব্যভিচার করা। সহিহ বুখারি : ৪৪৭৭, ৪৭৬১, ৬০০১, ৬৮১১, ৬৮৬১, ৭৫২০, ৭৫৩২, সহিহ মুসলিম : ৮৬০

আল্লাহর উলুহিয়্যাহার (ইবাদতে) ক্ষেত্রে শিরক: 

আল্লাহ ছাড়া কোন গাইরুল্লাহর ইবাদাত করলে ইবাদতে শিরক হবে। যে গায়রুল্লাহর ইবাদত করে তাকে মুশরিক বলা হয়। মুশরিত তার ইবাদাতকে সৃষ্টি কর্তার উদ্দেশ্যে পেশ না করে গাইরুল্লাহর উদ্দেশ্যে পেশ করে থাকে। অথচ বান্দার কর্ত্যব শুধু আল্লাহর উদ্দেশ্যে তার ইবাদত পেশ করা। এই জন্যই আল্লাহ কুরআনুল কারিমে বার বার আদেশ দিয়েছেন এক মাত্র তাহার ইবাদাত করার। অপর পক্ষে গাইরুল্লাহর ইবাদাত করতে নিষেধ করেছেন। যেমন-

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ

আমি জিন এবং মানব জাতিকে একমাত্র আমার ইবাদত করার জন্যই সৃষ্টি করেছি। সুরা জারিয়া : ৫৬

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَسُولًا أَنِ اُعْبُدُوا اللَّهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُوتَ

আমি প্রত্যেক উম্মতের মধ্যেই রাসূল পাঠিয়েছি। তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো, আর তাগুতকে বর্জন করো। সুরা নাহল :৩৬

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

وَقَضَى رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا:

তোমার রব এ নির্দেশ দিয়েছেন যে তাঁকে ছাড়া তোমরা আর কারো ইবাদত করো না। পিতা মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করো। করো। সুরা বনিইসরাঈল : ২৩

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

وَاعْبُدُوا اللَّهَ وَلَا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا:

তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো। আর তাঁর সাথে কাউকে শরিক করো না। সুরা নিসা : ৩৬

ইবরাহীম (আ.) তার পিতাকে গায়রুল্লাহর ইবাদাত করতে নিষেধ করেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

وَإِذۡ قَالَ إِبۡرَٲهِيمُ لِأَبِيهِ وَقَوۡمِهِۦۤ إِنَّنِى بَرَآءٌ۬ مِّمَّا تَعۡبُدُونَ

সে সময়ের কথা স্মরণ করো যখন ইবরাহীম তার পিতা ও কওমের লোকদেরকে বলেছিলেন, তোমরা যার ইবাদত করো তার সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই। আর আমার সম্পর্ক হচ্ছে কেবল মাত্র তাঁরই সাথে যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন।

করুফ- ৪৩:২৬)।

আল্লাহর সিফাতে (নির্ধারিত সত্ত্বাবাচক ও গুনবাচক নামে) ক্ষেত্রে শির:

তাওহীদ আল আসমা ওয়াস সিফাত হচ্ছে, আল্লাহর মূলসত্বা ও গুণাবলীতে বিশ্বাস করা। আল্লাহকে সেই নামেই ডাকতে হবে যে নাম তিনি নিজের জন্য নির্ধারণ করেছেন। কোন নব উদ্ভাবিত নামে তাঁকে ডাকা যাবে না। মহান আল্লাহ বলেছেন,

وَلِلهِ الْأَسْمَآءُ الْحُسْنٰى فَادْعُوهُ بِهَا

আল্লাহর রয়েছে অনেক সুন্দর সুন্দর নাম যেগুলোর মাধ্যমে তোমরা তাকে ডাকো।  (সূরা আরাফ ৭:১৮০)

সহহি হাদিসে মহান আল্লাহ ৯৯ টি নামের কথা এসেছে। যেমন-

আবূ হুরাইরাহ্ (রা.) হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল ﷺ বলেছেন, আল্লাহর নিরানব্বই অর্থাৎ এক কম একশ’টি নাম রয়েছে, যে ব্যক্তি তা মনে রাখবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। (সহিহ বুখারি : ২৭৩৬, ৬৪১০, ৭৩৯২, সহিহ মুসলিম : ২৬৭৭, সুনানে তিরমিযী : ৩৫০৬, সুনানে ইবনু মাজাহ : ৩৮৬০)

এই ৯৯ টি নাম হলোঃ

আল্লাহ, আর-রাহমান, আর-রহিম, আল-মালিক, আল-কুদ্দুস, আস-সালাম, আল-মুমিন, আল-মুহাইমিন, আল-আজীজ, আল-জাব্বার, আল-মুতাকাব্বির, আল-খালিক, আল-বারী, আল-মুছউইর, আল-গফ্ফার, আল-কাহার, আল-ওয়াহ্হাব, আর-রজ্জাক, আল-ফাত্তাহ, আল-আলীম, আল-ক্ববিদ্ব, আল-বাসিত, আল-খফিদ, আর-রফীই, আল-মুইজ, আল-মুদ্বিল্লু, আস-সামিই, আল-বাছীর, আল-হাকাম, আল-আদল, আল-লাতীফ, আল-খবীর, আল-হালীম, আল-আজীম, আল-গফুর, আশ-শাকুর, আল-আলিইউ, আল-কাবির, আল-হাফীজ, আল-মুক্বীত, আল-হাসীব, আল-জালীল, আল-কারীম, আর-রক্বীব, আল-মুজীব, আল-ওয়াসি, আল-হাকীম, আল-ওয়াদুদ, আল-মাজীদ, আল-বাইছ, আশ-শাহীদ, আল-হাক্ব, আল-ওয়াকিল, আল-মাতীন, আল-ক্বউইউ, আল-ওয়ালিইউ, আল-হামীদ, আল-মুহছী, আল-মুব্দি, আল-মুঈদ, আল-মুহয়ী, আল-মুমীত, আল-হাইয়্যু ,আল-ক্বাইয়্যুম, আল-ওয়াজিদ, আল-মাজিদ, আল-ওয়াহিদ, আছ-ছমাদ, আল-ক্বদির, আল-মুকতাদির, আল-মুক্বদ্দিম, আল-মুয়াক্খির, আল-আউয়াল, আল-আখির, আজ-জহির, আল-বাত্বিন, আল-ওয়ালি, আল-মুতাআলি, আল-বার, আত-তাওয়াব, আল-মুনতাক্বিম, আল-আ’ফঊ, আর-রউফ, মালিকুল-মুলক   যুল, জালালি-ওয়াল-ইকরাম, আল-মুক্ব্সিত, আল-জামিই, আল-গণিই, আল-মুগনিই, আল-মানিই, আয্-যর আন-নাফিই, আন-নূর, আল-হাদী, আল-বাদীই, আল-বাক্বী, আল-ওয়ারিস, আর-রাশীদ, আস-সবুর।

এই গুলো হলো মহান আল্লাহ গুনবাচক নাম। এই নামগুলো মহান আল্লাহর সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত। তাই এই নামে কোন মানুষের নাম করণ করা সম্পূর্ণ হারাম। তবে আব্দ যোগে এই সকল নাম রাখা শুধু শরিয়ত সম্মত নয় বরং ভালো। কিন্তু মনে রাখতে হবে, নামটি ডাকার সময় দুই অংশই একত্রে উচ্চারণ করতে হবে। আব্দ বাদ দিয়ে আল্লাহর মুল নামে কাউকে ডাকা বা আহবান করা হারাম। তবে কিছু নাম (রাহীম, রাশীদ, আলী, কারীম, আযীয প্রভৃতি) সরাসরি ব্যবহারের প্রমান কুরআন সুন্নাহে আছে বিধায় এই নামগুলো সরাসরি রাখা যাবে। মনে রাখাতে হবে আল্লাহর কোন গুণকে মানুষের কোন গুণের সাথে তুলনা করা যাবে না। আল্লাহর সিফাত সম্পর্কে আল কুরআনে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ وَهُوَ السَّمِيعُ البَصِي

কোন বস্তুই তাঁর সদৃশ নয়, তিনি সব শোনেন, সব দেখেন। সূরা শুরা : ১১

যদিও দেখা ও শোনা মানুষের জন্যও প্রযোজ্য। মানুষের দেখার জন্য চোখ, শোনার জন্য কানের প্রয়োজন হয়। কিন্তু আল্লাহর সত্ত্বার জন্য এসব চোখ, কান নাক ইত্যাদির প্রয়োজন হয়না। আল্লাহর জন্য নির্ধারিত কোনো গুণে তাঁরই সৃষ্ট কোনো কিছু গুণান্বিত করাও শিরকের অন্তর্ভুক্ত। যেমন- আল্লাহ ছাড়া  কাউকে চিরন্তন বা অমর বলা যাবে না। সেই প্রেক্ষিতে অগ্নিশিখাকে চিরন্তন নামকরণও বড় শিরক। যেমন-

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

كُلُّ مَنۡ عَلَيۡهَا فَانٖ ٢٦ وَيَبۡقَىٰ وَجۡهُ رَبِّكَ ذُو ٱلۡجَلَٰلِ وَٱلۡإِكۡرَامِ ٢٧

পৃথিবীর প্রতিটি জিনিসই ধ্বংসশীল এবং শুধুমাত্র তোমার মহিমাময় মহানুভব রবের সত্তাই অবশিষ্ট থাকবে। সুরা আর রহমান : ২৬-২৭

মহান আল্লাহ অনেক নাম আছে এবং তা সর্বোত্তম ও সুন্দর, অর্থাৎ তাঁর নামের চেয়ে উত্তম বা সমকক্ষ আর কিছুই নেই। আর সে সব নাম পূর্ণাংগ গুণ বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। আল্লাহ আমাদেরকে ঐ নাম ধরেই তাকে ডাকতে বা দুয়া করতে বলেছেন। তার প্রশংসাও করতে হবে ঐসব নাম ও গুণের স্বীকৃতি দিয়ে। আর বর্জন করতে হবে তাদেরকে যারা আল্লাহর নামের বিকৃতি ঘটায়। আমাদেরকে সঠিক অর্থের ব্যাপারে দৃঢ়তা অবলম্বন করতে হবে। আবার সতর্ক থাকতে যেন কুরআন সুন্নাহর বাহিরে কোন কিছু এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করে না ফেলি। কারণ মহান আল্লাহ বলেন:

 وَلِلَّهِ ٱلۡأَسۡمَآءُ ٱلۡحُسۡنَىٰ فَٱدۡعُوهُ بِهَاۖ وَذَرُواْ ٱلَّذِينَ يُلۡحِدُونَ فِيٓ أَسۡمَٰٓئِهِۦۚ سَيُجۡزَوۡنَ مَا كَانُواْ يَعۡمَلُونَ

আর আল্লাহর যে সব নাম আছে তা সর্ব সুন্দর উত্তম, অতএব সে নাম ধরেই তাকে ডাক। আর তোমরা তাদেরকে বর্জন কর যারা আল্লাহর নামসমূহের বিকৃতি করে থাকে। তারা তাদের কৃতকর্মের যথপোযুক্ত প্রতিদান শীঘ্রই পাবে’। সুরা আরাফ : ১০৮

শিরকের প্রকারভেদ :

উপরে শিরক সম্পর্কে একটা ধারনা পেয়েছি। শিরক এমন গুনাহ যা মুসলিমকে ইসলাম থেকে বাহির করে দেয়। কিন্তু কিছু শিরক এমন আছে যা করা কবিরা গুনাহ হলেও মুসলিমকে ইসলাম থেকে বের করে দেয় না। যেমন- গাইরুল্লাহর জন্য দান করা, লোক দেখান ইবাদাত করা, আল্লাহ্ ছাড়া অন্যের নামে শপথ করা, আল্লাহ ব্যতীত অন্য কিছুর উদ্দেশ্যে মান্নত করা, ব্যক্তি বা বস্তুরকে কল্যান অকল্যান ভাবা ইত্যাদি। এ থেকে ষ্পষ্ট যে শিরকেরও প্রকারভেদ আছে। সাধারণ শিরক দুই প্রকার। যথা-

ক. শিরকে আকবার বা বড় শিরক।

খ. শিরকে আসগার বা ছোট শিরক।

ক। শিরকে আকবার বা বড় শিরক

বান্দা যখন একমাত্র আল্লাহর অধিকার বা হককে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকে নিবেদন করবে তখন শিরকে আকবর হবে। অর্থাৎ তার রুবুবিয়াতের কোনো অংশ, অথবা তার উলুহিয়াতের কোনো অংশ, অথবা তার নাম ও গুণাবলির কোনো অংশকে তিনি ব্যতীত কাউকে নিবেদন করবে।

আল্লাহকে তার মখলুকের সঙ্গে তুলনা করা, অথবা আল্লাহর সাথে দ্বিতীয় কাউকে সৃষ্টিকর্তা, অথবা রিজিকদাতা, অথবা পরিকল্পনাকারী জ্ঞান করা। শিরকে আকবার যা একজন ঈমানদার মুসলিম কে মুসলিম মিল্লাত থেকে বহিস্কার করে দেয়। বান্দার সমস্ত আমল নষ্ট করে দেয়। এ ধরণের শিরকে লিপ্ত ব্যক্তি যদি তওবা ছাড়া শিরকের উপরই মৃত্যুবরণ করে, তাহলে সে চিরস্থায়ী ভাবে জাহান্নামে অবস্থান করবে। যেমন-

আল্লাহ ব্যতীত কারো নিকট দোয়া করা, ফরিয়াদ করা, সাহায্য তলব করা, আশ্রয় প্রার্থনা করা, হোক সে নবী, অথবা অলী, অথবা ফেরেশতা অথবা জিন, অথবা অন্য কোনো মখলুক। দেবদেবী বা মূর্তি পূজা করা, কবর-মাজারে সিজদা করা, গায়রুল্লাহ তথা আল্লাহ ছাড়া যে কোন ব্যক্তি, প্রাণী বা বস্তুর উদ্দেশ্যে কোন ইবাদত আদায় করা, গায়রুল্লাহর উদ্দেশে কুরবানী করা, মৃত ব্যক্তি কিংবা জ্বিন অথবা শয়তান  বা মালাকগন কারো ক্ষতি বা উপকার করতে বলে বিশ্বাস করে তাদের নিকট সাহায্য চাওয়া। আল্লাহ ছাড়া কেউ প্রয়োজন ও চাহিদা পূর্ণ করতে পারে, সুস্থ বা অসুস্থ করতে পারে, বিপদ আপদ দূর করতে পারে বলে বিশ্বাস করা তাদের নিকট সাহায্য চাওয়া। বিশ্বাস করা যে, আল্লাহর সাথে কোনো সত্তা আছে যে সৃষ্টি করে, অথবা জীবিত করে, অথবা মৃত্যু দেয়, অথবা মালিকানার হকদার, অথবা এ জগতে কর্তৃত্বের অধিকারী। অথবা এরূপ বিশ্বাস করা যে, অমুক সত্তা আল্লাহর ন্যায় নিঃশর্ত আনুগত্যের হকদার, ফলে সে কোনো বস্তু হালাল ও হারাম করার ক্ষেত্রে তার ইচ্ছার আনুগত্য করে, যদিও তা রাসূলদের আনিত দীনের বিপরীত হয়। আল্লাহ ব্যতীত কারো জন্য যবেহ করা। আল্লাহর বিধানের ন্যায় বিধান রচনা করে মানুষের উপর চাপিয়ে দেওয়া এবং তা মেনে নিতে বাধ্য করা। কাফেরদের পক্ষ নেওয়া ও মুমিনদের বিরুদ্ধে তাদেরকে সাহায্য করা।

ক. শিরকে আকবার বা বড় শিরকের সাধারনত তিনটি মাধ্যমে সংঘটিত হয়। যথা-

১। আকিদা বা বিশ্বাসের মাধ্যমে শিরক

২। ইবাদাতের মাধ্যমে শিরক

৩। সমাজে প্রচলিত ইসলামি বিরোধী কাজের মাধ্যমে শিরক

খ। শিরকে আসগার বা ছোট শিরক

যে সব শিরককে কুরআন ও সুন্নায় ছোট শিরক বলা হয়েছে তাকে  শিরকে আসগার বা ছোট শিরক বলে বিবেচনা করব। আল্লাহ তা’আলার উদ্দেশ্যে বাস্তবায়ন কৃত আমল মানুষকে দেখানোর জন্য সুন্দর করার নাম শিরকে আসগার। শিরকে আসগার মানুষকে ইসলাম থেকে বের করে দেয় না। তবে এটি আমলকে নষ্ট করে দেয়। কেননা উক্ত রিয়াকারী মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করাই তার উদ্দেশ্যে পরিণত করেছে। কখনও এমন কাজ বড় শিরকের পর্যায়ে পৌঁছতে পারে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

فَمَنْ كَانَ يَرْجُوا لِقَاءَ رَبِّهِ فَلْيَعْمَلْ عَمَلاً صَالِحًا وَلاَ يُشْرِكْ بِعِبَادَةِ رَبِّهِ أَحَدًا

সুতরাং যে ব্যক্তি তার পালনকর্তার সাক্ষাৎ কামনা করে, সে যেন সৎকর্ম সম্পাদন করে এবং তার পালনকর্তার এবাদতে কাউকে শরীক না করে। সুরা কাহফ : ১১০

লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে ও প্রসিদ্ধি অর্জনের জন্য কোন আমল করা। লোকে প্রশংসা পাওয়ার জন্য সুন্দর ভাবে সালাত আদায় করা, সদকা করা। লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে সশব্দে যিকির করা, সুকণ্ঠে তেলাওয়াত করা। নিরাপত্তার জন্য পুঁতি, তাবিজ, তাগা ও কড়ি ইত্যাদি ঝুলিয়ে রাখা। গাইরুল্লাহর নামে কসম খাওয়া। কোনো মহান বস্তু বা ব্যাক্তিকে অতিরিক্ত সম্মান দেওয়া যা আল্লাহর রুবুবিয়াতের সমান নয়। ব্যক্তি শুধু দুনিয়া অর্জনের জন্যে আজান দেয়, ইমামতি করে, শিক্ষকতা, কুরআন শিখে, শরয়ী জ্ঞান অর্জন করে, জিহাদ,  হজ্জ করে। আবার অনেক সময় ফাহেসা কথায় দ্বারাও ছোট শিরক হয়। কিন্তু এই শিরক ইসলাম থেকে বের করে দেয় না।

হুযাইফাহ ইবনুল ইয়ামান (রাঃ) থেকে বর্ণিত। এক মুসলিম ব্যক্তি স্বপ্ন দেখে যে, আহলে কিতাবের এক ব্যক্তির সাথে তার সাক্ষাত হলে সে বলল, তোমরা কতই না উত্তম জাতি, যদি তোমরা শিরক না করতে। তোমরা বলে থাকো, ’’আল্লাহ্ যা ইচ্ছা করেন এবং মুহাম্মাদ যা ইচ্ছা করেন’’। অতঃপর সে স্বপ্নের কথাটি রাসূলুল্লাহ ﷺ এর নিকট বর্ণনা করলো। তিনি বলেন-

أَمَا وَاللَّهِ إِنْ كُنْتُ لأَعْرِفُهَا لَكُمْ قُولُوا مَا شَاءَ اللَّهُ ثُمَّ شَاءَ مُحَمَّدٌ

আল্লাহর শপথ! শোনো, আমি তো তোমাদের এরূপ কিছু বলতে শিখাইনি। তোমরা বলবে, ’’আল্লাহ্ যা ইচ্ছা করেন, এরপর রসূলুল্লাহ ﷺ যা চান’’। ইবনে মাজাহ : ২১১৮

এ হাদীসটি প্রমাণ করছে যে, ইসলামের প্রারম্ভিক আমলে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সাহাবীদের মাঝে ‘আল্লাহ ও মুহাম্মদ ﷺ যা চান’, এ-জাতীয় কথা-বার্তা বলার প্রচলন ছিল। পরবর্তীতে এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁদেরকে এমন কথা বলা থেকে বারণ করেন এবং এ ধরনের কথার বদলে নিম্নোক্ত কথা বলতে শিক্ষা দেন। তোমরা বল, আল্লাহ তায়ালা এককভাবে যা চান। যেমন-

ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

إِذَا حَلَفَ أَحَدُكُمْ فَلاَ يَقُلْ مَا شَاءَ اللَّهُ وَشِئْتَ ‏.‏ وَلَكِنْ لِيَقُلْ مَا شَاءَ اللَّهُ ثُمَّ شِئْتَ ‏ ‏

তোমাদের কেউ যেন শপথ করা কালে এভাবে না বলে, ’’আল্লাহ যা চান এবং তুমি যা ইচ্ছা করো’’। বরং সে যেন বলে, ’’আল্লাহ্ যা ইচ্ছা করেন, এরপর তুমি যা ইচ্ছা করছো। ইবনে মাজাহ : ২১১৭

 শিরকে আসগার’ এর কতিপয় উদাহরণ হলো- কোনো ব্যক্তির বলল, আমার চাকরীটি  না থাকিলে সংসারের কি যে হত। আজ বিপদে আপনিই আমাকে বাচিয়েছেন। পোষা কুকুরটি না হলে আজ রাতে আমার বাড়ীতে চুরি হয়ে যেতো, ইত্যাদি ইত্যাদি।

শিরকে আকবার ও আসগারের মধ্যে পার্থক্য

১. শিরকে আকবরের কারনে শিরককারী ইসলাম ও মুসলিম থেকে বাহির হয়ে যায়। কিন্তু শিরকে আসগারের কারনে শিরককারী ইসলাম ও মুসলিম থেকে বাহির হয়ে যায় না। যেনন- মুর্তির পুজা করলে তার ইমান ভঙ্গ হয়ে যাবে ইসলাম থেকে বাহির হয়ে যাবে। কিন্তু লোক দেখান দান করলে গুনাহ হবে তবে ইসলাম থেকে বাহির হয়ে যাবে না।

২. শিরকে আকবার সব সময়ের জন্য কবিরা গুনাহ। কিন্তু শিরকে আসগার গুনাহের কারনে কখনও কবিরা আবার কখনও সগিরা গুনাহ হয়।

৩. শিরকে আকবার তওবা ছাড়া ক্ষমা পাওয়া যায় না। কিন্তু শিরকে আসগারকারীকে কখন গুনাহের জন্য তওবা হকরে হবে আমরা গুনাহে সগিরা হলে আল্লাহ তওবা ছাড়াই তার ইচ্ছাত ক্ষমা করে দিতে পারেন। 

৪. একটি শির্কে আকবার মু’মিনের অতীতের যাবতীয় নেক আমল ধ্বংস করে দেয়। শির্কে আসগার শুধু সংশ্লিষ্ট আমলকেই ধ্বংস করে। অন্য আমলকে নয়।

৫. শির্কে আকবার থেকে তওবা করতে না পারলে তা কর্তাব্যক্তিকে চিরস্থায়ী জাহান্নামের অধিবাসী করে দেয়। সে ব্যক্তি সম্পূর্ণরূপে আল্লাহ তা‘আলার ক্ষমার অযোগ্য হয়ে যায়। আর শির্কে আসগার যদি কবিরা গুনাহ পর্যায়ের হয় তবে শিরকে আকবরের মত তওবা করতে হবে। কিন্তু গুনাহ যদি সগিরা পর্যায়ের হয় তবে তা আল্লাহ তা‘আলার ক্ষমাযোগ্য অপরাধ।

৬. শির্কে আকবার থেকে তাওবা না করলে এবং নতুন করে ইসলামে প্রবেশ না করলে ইসলামী আদালতের রায় অনুযায়ী কর্তাব্যক্তির জীবন ও সম্পদের কোনো নিরাপত্তা থাকবে না। তবে শির্কে আসগারের কর্তাব্যক্তি ফাসিক মু’মিন হওয়ার কারণে ইসলামী রাষ্ট্রের কাছে তার জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা থাকবে।