মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন
আমাদের সন্তানরা যখন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবনে প্রবেশ করে, তখন তারা বালেগ হয়ে যায় এবং ইসলামের পূর্ণাঙ্গ দায়িত্ব তাদের উপর অর্পিত হয়। এই সময়ে বয়স, পড়াশোনার চাপ এবং জীবনের সীমিত অভিজ্ঞতার কারণে ইসলামের নির্দেশনাগুলো মেনে চলা তাদের জন্য সহজ হয় না। অনেকে মনে করে যে তারা এখন বড় হয়ে গেছে, তাই তাদের আর মা-বাবার সহযোগিতা প্রয়োজন নেই। অথচ বাস্তবতা হলো, তারা স্বাধীনতার স্বাদ পেলেও এখনো সম্পূর্ণ স্বাবলম্বী নয়। এ কারণে, মা-বাবার দায়িত্ব এখানেই শেষ হয়ে যায় না, বরং পড়াশোনা শেষ করে কর্মজীবনে প্রবেশ করা পর্যন্ত তাদেরকে সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে হয়। কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে সন্তানরা নানা প্রকার প্রতিকূলতার সম্মুখীন হয়। যেমন-
এই সময়ে ধর্মীয় আচার-আচরণের প্রতি তাদের অনীহা দেখা যায়। খারাপ সঙ্গের প্রভাবে তারা বিপদগামী হতে পারে। অতিরিক্ত স্বাধীনতা অনেক সময় অনৈতিক কাজের দিকে ঠেলে দেয়। সোশ্যাল মিডিয়া এবং ডিজিটাল ডিভাইসের কারণে তাদের সময় নষ্ট হয়। অবৈধ প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে তারা নিজেদের জীবনের লক্ষ্য থেকে দূরে সরে যায়।
এসবের ফলে তাদের চরিত্র ও ঈমান ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যেতে পারে। তাই অভিভাবকদের উচিত এই বয়সে সন্তানদের সাথে একটি বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা, তাদের সাথে খোলামেলা আলোচনা করা, সঠিক ইসলামী জ্ঞান প্রদান করা এবং বাস্তব জীবনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সহায়ক হওয়া। আমাদের উদ্দেশ্য কেবল সন্তানকে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বা কর্মকর্তা বানানো নয়, বরং তাদেরকে একজন আদর্শ মুসলিম, দ্বীনদার, সৎ ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা। এই লক্ষ্য সামনে রেখে দিকনির্দেশনা ও তদারকি চালিয়ে যেতে হবে।
এই প্রবন্ধে আমরা এমন কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা করব যা আমাদের সন্তানের কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। আমরা দেখব, তারা কোন ধরনের প্রতিকূলতার সম্মুখীন হয় এবং ইসলাম ও আধুনিক সমাজবিজ্ঞানের আলোকে সেই প্রতিকূলতা থেকে উত্তরণের উপায় কী। আমাদের মূল উদ্দেশ্য হলো এমন একটি পথ তৈরি করা, যা আমাদের সন্তানদেরকে পার্থিব জীবনে সফল করার পাশাপাশি তাদের ঈমান ও নৈতিকতাকেও শক্তিশালী করবে। আমরা আশা করি, এই আলোচনা মা-বাবাকে তাদের সন্তানদেরকে সঠিক পথে পরিচালনা করতে সহায়তা করবে এবং তাদের মধ্যে এমন মূল্যবোধ তৈরি করবে যা তাদের ইহকাল ও পরকাল উভয়কেই আলোকিত করবে। তার আগে দেখে নেই আমাদের সন্তানদের নিয়ে আমরা কি আশা করি। আমাদের উদ্দেশ্য কি?
সন্তান নিয়ে মা-বাবার উদ্দেশ্য
আমাদের সমাজে প্রায়ই শোনা যায়—“সন্তানকে মানুষ বানাতে হবে।” কিন্তু সন্তানেরা তো মানুষ হিসেবেই জন্মায়। এখানে “মানুষ বানানো” বলতে অনেকে বোঝেন, সন্তানকে ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো, তাকে বিসিএস কর্মকর্তা, ব্যাংকার, ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে গড়ে তোলা। একজন নন-মুসলিম অভিভাবকের জন্য এতটুকু হয়তো যথেষ্ট। কিন্তু একজন মুসলিমের জন্য প্রকৃত সাফল্য কেবল দুনিয়ার চাকচিক্য নয়; বরং দুনিয়া ও আখিরাত উভয় দিকেই সফলতা অর্জন।
১. সত্যিকারের মানুষ কাকে বলে?
আসলে পূর্ণাঙ্গ মানুষের সঠিক সংজ্ঞা হলো, সন্তান যেন একজন ভালো মুসলিম হওয়ার পাশাপাশি একজন ভালো প্রফেশনাল হয়, অর্থাৎ সে যেন দুনিয়া ও আখিরাত দুই দিকেই সফলতা অর্জন করে। একজন ভালো প্রফেশনাল হওয়ার পাশাপাশি একজন ভালো মুসলিম হওয়াটাই মানুষের সঠিক সংজ্ঞা। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তা’আলা বলেছেন-
وَمَا خَلَقۡتُ الۡجِنَّ وَالۡاِنۡسَ اِلَّا لِیَعۡبُدُوۡنِ
আমি সৃষ্টি করেছি জিন ও মানুষকে এ জন্য যে, তারা আমারই ইবাদাত করবে। সূরা যারিয়াত : ৫৬
এই আয়াত স্পষ্ট করে যে, মানুষের জীবনের মূল উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর ইবাদত করা। দুনিয়ার কাজগুলো (যেমন- পেশা, পরিবার) সেই ইবাদতেরই অংশ হতে পারে, যদি তা শরিয়তের নিয়ম মেনে করা হয়। তাই, পেশাগত সাফল্যকে জীবনের একমাত্র লক্ষ্য না করে, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনকে প্রাধান্য দেওয়া হলো মুসলিম জীবনের আসল উদ্দেশ্য।
২. সন্তানের শিক্ষা ও পরিবেশ:
আধুনিকতার নামে, স্বাধিনতার নামে আমরা সন্তানকে বিভিন্ন পাপাচার ও অশ্লীলতায় মধ্যে ছেড়ে দিয়েছি। এখানে থেকে বেঁচে ফিলা কঠিন। আগুনে নিকট মুম রেখে যদি বলি গলবে না, তা কেমন হয়। অশ্লীলতার আগুনের মধ্যে ছেড়ে দিয়ে বলছি, বাবা আমার কথা শুনে না, নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এ প্রতিকূল পরিবেশ থেকে কলিজার টুকরা সন্তানকে বাঁচাতে হলে প্রয়োজন- মজবুত ঈমান ও তাকওয়া (আল্লাহভীতি)। মজবুত ঈমান ও তাকওয়া কারণে তাকে কোন পাপাচারই স্পর্শ করতে পারবে না।
এ জন্য পরিবার পারে তাকে মজবুত ঈমান ও তাকওয়া শিক্ষা দিতে। আমাদের বিদ্যালয়গুলো এমন যে ইসলাম ছাড়াতে পারলেই বাচি। যা বিদ্যালয়ের উপর ভরসা না করে, ছোট থেকেই পরিবারে ঈমান এ তাকওয়া শিক্ষা দেই। সলক সন্তান একই ফিতরাত নিয়ে জম্মগ্রহণ করে। পরিবার ও পরিবেশই তাকে বিভ্রান্ত করে।
১৩৮৫. আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেনঃ প্রত্যেক নবজাতক ফিত্রাতের উপর জন্মগ্রহণ করে। অতঃপর তার মাতাপিতা তাকে ইয়াহূদী বা নাসারা অথবা অগ্নি উপাসক করে, যেমন চতুষ্পদ জন্তু একটি পূর্ণাঙ্গ বাচ্চা জন্ম দেয়। তোমরা কি তাকে (জন্মগত) কানকাটা দেখেছ? সহিহ বুখারি : ১৩৫৮, ১৩৮৫, সহিহ মুসলিম : ২৬৫৮,
এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, সন্তানের ঈমান ও তাকওয়া গঠনের জন্য মা-বাবার ভূমিকা এবং পারিবারিক পরিবেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আপনার লেখা এই বিষয়টিকে সঠিকভাবে তুলে ধরেছে।
৩. আমাদের করণীয় :
এ অবস্থা থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় হলো—সন্তানের হৃদয়ে মজবুত ঈমান ও তাকওয়া (আল্লাহভীতি) গড়ে তোলা। আর সেটা সম্ভব হবে তখনই, যখন মা-বাবা নিজেরা ঈমান ও তাকওয়ায় উন্নত হবেন এবং ঘরে একটি সুন্দর ইসলামী পরিবেশ সৃষ্টি করবেন।
আবূ হুরাইরাহ (রা.) হতে বর্ণিত যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
“ إِذَا مَاتَ الإِنْسَانُ انْقَطَعَ عَنْهُ عَمَلُهُ إِلاَّ مِنْ ثَلاَثَةٍ إِلاَّ مِنْ صَدَقَةٍ جَارِيَةٍ أَوْ عِلْمٍ يُنْتَفَعُ بِهِ أَوْ وَلَدٍ صَالِحٍ يَدْعُو لَهُ ” .
যখন মানুষ মৃত্যুবরণ করে তখন তার সমস্ত আমল বন্ধ হয়ে যায় তিন প্রকার আমল ছাড়া। (১) সাদাকা জারিয়াহ্ অথবা ((২) এমন ইলম যার দ্বারা উপকার হয় অথবা (৩) পুণ্যবান সন্তান যে তার জন্যে দু’আ করতে থাকে। সহিহ মুসলিম : ১৬৩১
এখানে আমাদের আলোচনার মূল বিষয় হলো নেক সন্তান রেখে যাওয়া।
৪নেক সন্তান গড়ার প্রকৃত উপায়
অনেকে মনে করেন যে, সন্তানকে বিকেলে একজন হুজুরের কাছে কায়দা বা কুরআন পড়তে পাঠালেই তাদের সব দায়িত্ব শেষ। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সেখানে কেবল তিলাওয়াত শেখানো হয়, ইসলামের পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা নয়। সন্তানকে সত্যিকারের নেক বানাতে হলে মা-বাবাকে এটিকে একটি বিশেষ দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। শুধু টাকা-পয়সা বা পার্থিব খ্যাতির পেছনে ছুটে গেলে একসময় সব হারিয়ে যাবে এবং আফসোস করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না। তাই সময় থাকতে সচেতন হওয়া অত্যন্ত জরুরি। আমাদের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত সন্তানকে এমনভাবে গড়ে তোলা, যাতে সে দুনিয়ায় একজন সফল পেশাদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে এবং আখিরাতে একজন সফল মুমিন হিসেবে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারে। এই ভারসাম্যপূর্ণ শিক্ষা ও পরিচর্যাই তাদের ইহকাল ও পরকালের জীবনে সফলতা নিশ্চিত করবে।
ভালো শিক্ষা মানেই ভালো চাকরি
আমরা অনেকেই মনে করি, সন্তানকে দেশের সেরা স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করে দিলেই মা-বাবার দায়িত্ব শেষ। এরপর আমরা কেবল সন্তানের ভালো ফলাফল এবং একটি সম্মানজনক চাকরির জন্য অপেক্ষা করি। এই একমুখী (one-way) চিন্তা আমাদের সন্তানদেরকে জীবনের এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায়। যদি আমরা কেবল পেশাগত সাফল্যের দিকেই মনোযোগ দেই, তাহলে আমাদের সন্তান একজন সফল পেশাজীবী হলেও একজন ভালো মানুষ নাও হতে পারে।
বর্তমানে অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, বিশেষ করে উচ্চশিক্ষায়, নীতি-নৈতিকতা বা মানবিক মূল্যবোধ শেখানোর কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই। এসব প্রতিষ্ঠানে কেবল পেশাগত জ্ঞান (technical knowledge) প্রদান করা হয়, যা একজন মানুষকে দক্ষ পেশাজীবী হতে সাহায্য করে, কিন্তু একজন সংবেদনশীল ও দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে না। নৈতিকতার এই ঘাটতি আমাদের সন্তানদেরকে এমন একটি সমাজে ঠেলে দেয়, যেখানে অর্থ উপার্জনই জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়।
১. সন্তানকে স্বাধীন সত্তা হিসেবে দেখুন
মা-বাবাদের আরেকটি সাধারণ ভুল ধারণা হলো, তারা মনে করেন সন্তান সবসময় তাদের কথা মেনে চলবে। এটি সব সময় ঠিক নয়। একটি সন্তান হলো একটি স্বাধীন সত্তা, যার নিজস্ব চিন্তা-ভাবনা, পছন্দ-অপছন্দ, এবং কল্পনাশক্তির স্বতন্ত্র তালিকা রয়েছে। আমরা চাইলেই সে আমাদের সব কথা মেনে নেবে—এই প্রত্যাশা করা ঠিক নয়। বরং, আমাদের নিজেদেরকেই তাদের জন্য উদাহরণ তৈরি করতে হবে।
আপনার সন্তানকে কেবল ভালো হওয়ার তত্ত্ব (theory) শিখিয়ে লাভ নেই, যদি আপনি তা বাস্তবে করে না দেখান। নৈতিকতা কোনো মুখস্থ করার বিষয় নয়, এটি জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ যা দেখে এবং অনুকরণ করে শিখতে হয়। আপনার সন্তান আপনার আচরণ থেকেই শিখবে। আপনি যখন ভালো কাজ করবেন, আপনার সন্তান তা উপলব্ধি করার সুযোগ পাবে।
উদাহরণস্বরূপ: আত্মীয়-স্বজনের প্রতি দায়িত্ব: আপনি যদি আপনার গরীব আত্মীয়-স্বজনের খোঁজখবর নেন এবং সামর্থ্য অনুযায়ী তাদের অর্থনৈতিক প্রয়োজন পূরণে সহায়তা করেন, তাহলে আপনার সন্তান এর গুরুত্ব বুঝতে পারবে। সে দেখবে যে কেবল নিজের এবং পরিবারের সুখই জীবনের সবকিছু নয়, বরং অন্যকে সাহায্য করার মধ্যেও বড় আনন্দ আছে।
ঘরে সালাম দিয়ে প্রবেশ: ঘরে প্রবেশ করার সময় আপনি নিজে যদি সালাম দিয়ে প্রবেশ করেন এবং আপনার সন্তানকে নিয়মিত সালাম দেন, তাহলে সে খুব সহজে এই অভ্যাসটি আয়ত্ত করে নেবে। এটি কেবল একটি সাধারণ সম্ভাষণ নয়, এটি একটি দোয়া। আপনি আপনার সন্তানের কল্যাণ কামনা করেন, তাই তাকে দেখা মাত্রই সালাম দেওয়া উচিত। ছোটদের কাছ থেকে সালাম আশা করা উচিত নয়। এটি একটি ভুল প্রচলন। রাসুল (সা.) বেশি বেশি সালামের প্রচলনের ওপর জোর দিয়েছেন, কারণ এটি পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় করে এবং সম্মান বৃদ্ধি করে।
২. মা-বাবার দায়িত্ব: পেশা এবং আদর্শের সমন্বয়
আমাদের সন্তানের জন্য সঠিক পথ হলো এমন একটি পথ, যেখানে সে একজন ভালো পেশাজীবী হওয়ার পাশাপাশি একজন ভালো মুসলিম এবং একজন ভালো মানুষ হতে পারবে। একজন সফল মানুষ তিনিই, যিনি দুনিয়া এবং আখিরাত উভয় ক্ষেত্রেই সফলতা অর্জন করতে পারেন।
তাই, শুধু ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করেই দায়িত্ব শেষ মনে করা উচিত নয়। আমাদের সন্তানদের মধ্যে এমন উপাদান ঢুকিয়ে দিতে হবে, যা প্রতিকূল পরিবেশেও তাকে নষ্ট হতে দেবে না। আর সেই উপাদান হলো মজবুত ঈমান এবং তাকওয়া বা আল্লাহভীতি।
সন্তানের ঈমান এবং তাকওয়া তৈরি করতে হলে মা-বাবার নিজেদেরই ঈমান ও তাকওয়ার মান উন্নত করতে হবে এবং বাসায় একটি সুন্দর ইসলামিক পরিবেশ তৈরি করতে হবে। কেবল তখনই আমরা এমন এক প্রজন্ম তৈরি করতে পারব, যারা পেশাগত জীবনে সফল হওয়ার পাশাপাশি নৈতিকতা, মানবিকতা এবং ধর্মীয় মূল্যবোধের দিক থেকেও উন্নত হবে। আর এরাই হলেন সত্যিকারের “মানুষ”।
কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের চ্যালেঞ্জসমূহ
কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে সন্তানরা এক নতুন জগতে প্রবেশ করে, যেখানে স্বাধীনতা ও নতুন অভিজ্ঞতার হাতছানি থাকে। এই সময়টি একদিকে যেমন জ্ঞানার্জনের সোনালী সুযোগ নিয়ে আসে, তেমনি অন্যদিকে তাদের জীবনে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জও তৈরি করে। একজন মুসলিম হিসেবে এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করা আরও কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। মা-বাবাদের জন্য এই সময়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল, কারণ সন্তানেরা নিজেদের বড় মনে করে এবং অনেক সময় তাদের দিকনির্দেশনা গ্রহণ করতে চায় না। অথচ এই বয়সে সঠিক পথপ্রদর্শন ছাড়া তারা ভুল পথে পা বাড়াতে পারে।
এখানে আমরা সেইসব প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব, যা কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শিক্ষার্থীরা প্রায়ই সম্মুখীন হয়। এর মধ্যে রয়েছে অশ্লীলতা ও পর্নোগ্রাফির বিস্তার, পর্দার প্রতি উদাসীনতা, ভুল বন্ধুত্বের প্রভাব, স্মার্টফোন ও সোশ্যাল মিডিয়ার আসক্তি এবং বিবাহ-পূর্ব প্রেম। আমরা দেখব কীভাবে সেক্যুলার শিক্ষা ব্যবস্থা এবং তথাকথিত আধুনিকতার ধারণা ধর্মীয় আচার-আচরণের প্রতি অনীহা তৈরি করে। আমাদের লক্ষ্য হলো এই সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা এবং ইসলাম ও আধুনিক মনস্তত্ত্বের আলোকে এর কার্যকর সমাধান দেওয়া। আমরা বিশ্বাস করি, মা-বাবার সঠিক তত্ত্বাবধান এবং সন্তানের মধ্যে আল্লাহভীতি ও নৈতিক মূল্যবোধের দৃঢ় ভিত্তি স্থাপন করার মাধ্যমে এই চ্যালেঞ্জগুলো সফলভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব। এই বিষয়গুলো মা-বাবা এবং তরুণ প্রজন্মকে একটি সুস্থ ও ভারসাম্যপূর্ণ জীবন গঠনে সহায়তা করবে বলে আমরা আশা করি।
অশ্লীলতা এবং পর্ণোগ্রাফি
ছাত্রজীবনে অশ্লীলতা ও পর্নোগ্রাফির প্রভাব অত্যন্ত ক্ষতিকর। এর ফলে শারীরিক, মানসিক, সামাজিক এবং আধ্যাত্মিক জীবনে মারাত্মক নেতিবাচক পরিবর্তন আসে। পর্নোগ্রাফি মস্তিষ্কের ডোপামিন সিস্টেমকে প্রভাবিত করে, যা এক ধরনের আসক্তি তৈরি করে। এর ফলে স্বাভাবিক জীবনে আনন্দ বা অনুপ্রেরণার ঘাটতি দেখা যায়। অশ্লীলতা ও পর্নোগ্রাফির প্রতি আসক্তি কোকেন বা অন্য কোনো মাদকের মতোই শক্তিশালী হতে পারে। এটি সম্পর্ক, প্রেম এবং যৌনতা সম্পর্কে অবাস্তব ধারণা তৈরি করে। ফলে সত্যিকারের সম্পর্কের প্রতি আগ্রহ কমে যায় এবং সঙ্গীর প্রতি সম্মান হ্রাস পায়। পর্নোগ্রাফি দেখার পর প্রায়শই অপরাধবোধ, লজ্জা এবং হতাশা সৃষ্টি হয়। এটি মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে এবং মানসিক চাপ বাড়িয়ে তোলে।
১. পড়াশোনায় ক্ষতি
অশ্লীলতা ও পর্নোগ্রাফি মস্তিষ্কের মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। এর ফলে পড়াশোনায় মনোযোগ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে, যা পরীক্ষার ফলাফলে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এটি ছাত্রদের মূল্যবান সময় নষ্ট করে এবং তাদের একাডেমিক ও ব্যক্তিগত লক্ষ্য থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। আসক্ত ব্যক্তিরা প্রায়শই নিজেদের গুটিয়ে নেয় এবং বন্ধু-বান্ধব ও পরিবারের থেকে দূরে থাকতে শুরু করে। এটি তাদের সামাজিক জীবনকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অশ্লীলতা ও পর্নোগ্রাফি সম্পর্কের প্রতি অবিশ্বাস এবং অস্বাস্থ্যকর প্রত্যাশা তৈরি করে, যা বন্ধুদের সাথে বা পরিবারের সদস্যদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে বাধা দেয়। অতিরিক্ত সময় পর্নোগ্রাফি দেখার ফলে ঘুম, খাদ্যভ্যাস এবং ব্যায়ামের মতো গুরুত্বপূর্ণ জীবনযাপন অভ্যাসে ব্যাঘাত ঘটে।
২. আধ্যাত্মিক এবং নৈতিক ক্ষতি
এটি ছাত্রদের নৈতিক মূল্যবোধকে ধ্বংস করে। ইসলাম এবং অন্যান্য ধর্মে অশ্লীলতাকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পর্নোগ্রাফি দেখার ফলে ধর্মীয় বিশ্বাস এবং আধ্যাত্মিক অনুভূতি দুর্বল হয়ে যায়।
এটি এমন সব অনৈতিক কাজকে স্বাভাবিক মনে করতে উৎসাহিত করে, যা একজন সুস্থ ও আদর্শ মানুষের চরিত্রের সঙ্গে মানানসই নয়।
এই ক্ষতিকর দিকগুলো থেকে নিজেকে রক্ষা করতে হলে সচেতনতা, পারিবারিক সহায়তা, এবং ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলা খুবই জরুরি। স্মার্টফোন এবং ইন্টারনেটের সহজলভ্যতার কারণে অশ্লীল কনটেন্ট সহজেই হাতের নাগালে চলে আসে। মা-বাবার জন্য এটি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
اِنَّ الَّذِیۡنَ یُحِبُّوۡنَ اَنۡ تَشِیۡعَ الۡفَاحِشَۃُ فِی الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا لَہُمۡ عَذَابٌ اَلِیۡمٌ ۙ فِی الدُّنۡیَا وَالۡاٰخِرَۃِ ؕ وَاللّٰہُ یَعۡلَمُ وَاَنۡتُمۡ لَا تَعۡلَمُوۡنَ
নিশ্চয় যারা এটা পছন্দ করে যে, মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়ুক, তাদের জন্য দুনিয়া ও আখেরাতে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক আযাব। আর আল্লাহ জানেন এবং তোমরা জান না। সুনা নুর : ১৯
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا لَا تَتَّبِعُوۡا خُطُوٰتِ الشَّیۡطٰنِ ؕ وَمَنۡ یَّتَّبِعۡ خُطُوٰتِ الشَّیۡطٰنِ فَاِنَّہٗ یَاۡمُرُ بِالۡفَحۡشَآءِ وَالۡمُنۡکَرِ ؕ وَلَوۡلَا فَضۡلُ اللّٰہِ عَلَیۡکُمۡ وَرَحۡمَتُہٗ مَا زَکٰی مِنۡکُمۡ مِّنۡ اَحَدٍ اَبَدًا ۙ وَّلٰکِنَّ اللّٰہَ یُزَکِّیۡ مَنۡ یَّشَآءُ ؕ وَاللّٰہُ سَمِیۡعٌ عَلِیۡمٌ
হে মু’মিনগণ! তোমরা শাইতানের পদাংক অনুসরণ করনা; কেহ শাইতানের পদাংক অনুসরণ করলে শাইতানতো অশ্লীলতা ও মন্দ কাজের নির্দেশ দেয়; আল্লাহর দয়া ও অনুগ্রহ না থাকলে তোমাদের কেহই কখনও পবিত্র হতে পারতেনা, তবে আল্লাহ যাকে ইচ্ছা পবিত্র করেন, এবং আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ। সুনা নুর : ২১
অশ্লীলতা এবং পর্ণোগ্রাফি থেকে সন্তানক বাঁচানোর উপায় :
অশ্লীলতা ও পর্নোগ্রাফির ক্ষতিকর প্রভাব থেকে সন্তানকে রক্ষা করার জন্য মা-বাবার সচেতন থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইসলাম এই বিষয়ে কিছু কার্যকর দিকনির্দেশনা দিয়েছে। নিচে এ সম্পর্কে আলোচনা করা হলো:
১. অশ্লীলতার ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সচেতন করা
সন্তানকে কোনো কিছু থেকে বিরত রাখতে চাইলে তার পেছনের কারণগুলো স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দেওয়া জরুরি। মা-বাবার উচিত সন্তানের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করা এবং অশ্লীলতার ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে তাদের সচেতন করা। বুঝিয়ে দিন যে পর্নোগ্রাফি মানুষের মধ্যে সম্পর্কের প্রতি অবিশ্বাস এবং অবাস্তব প্রত্যাশা তৈরি করে, যা বাস্তব জীবনে সুস্থ সম্পর্ক গড়ে তোলার পথে বাধা সৃষ্টি করে।
২. স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের ব্যবহারে নজরদারি রাখা
প্রযুক্তি আমাদের জীবনের অংশ, তবে এর সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা মা-বাবার দায়িত্ব। প্রথমত, সন্তানকে একেবারে স্মার্টফোন না দিয়ে, বরং একটি নির্দিষ্ট বয়সে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী তা দেওয়া ভালো। যদি দিতেই হয়, তবে এর ব্যবহার সীমিত রাখুন। যেমন, শুধু পড়াশোনা বা জরুরি প্রয়োজনে ব্যবহারের অনুমতি দিন।
৩. নজরদারি ও ফিল্টারিং:
সন্তানের ব্যবহৃত ডিভাইসগুলোতে প্যারেন্টাল কন্ট্রোল বা ফিল্টারিং সফটওয়্যার ব্যবহার করতে পারেন, যাতে তারা ক্ষতিকর ওয়েবসাইট বা কনটেন্ট থেকে দূরে থাকে। তবে এটি লুকানোভাবে না করে বরং তাদের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করে করা উচিত। এর মাধ্যমে তারা বুঝতে পারে যে আপনি তাদের ভালোর জন্যই এই ব্যবস্থা নিচ্ছেন।
৪. পারিবারিক চুক্তি :
পুরো পরিবারের জন্য স্মার্টফোন ব্যবহারের কিছু নিয়ম তৈরি করুন, যেমন খাবার সময় বা পারিবারিক আড্ডার সময় ফোন বন্ধ রাখা। এতে সন্তানেরা ভালো অভ্যাসের উদাহরণ দেখতে পাবে।
৫. আল্লাহভীতি ও পরকালের জবাবদিহিতা সম্পর্কে ধারণা তৈরি করা
ইসলামে আল্লাহভীতি (তাকওয়া) এবং পরকালের জবাবদিহিতা প্রতিটি মুসলিমের জন্য নৈতিকতার ভিত্তি। এই ধারণাগুলো সন্তানের মনে গেঁথে দিতে পারলে তারা নিজেরাই খারাপ কাজ থেকে দূরে থাকবে।
সন্তানকে বোঝান যে আল্লাহ সবসময় আমাদের দেখছেন। কোনো গোপনীয়তা নেই, এমনকি যখন কেউ আশেপাশে নেই, তখনও আল্লাহ আমাদের কাজগুলো জানেন। এই বিশ্বাস তাদের মধ্যে পাপের ভয় এবং আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা তৈরি করবে। পরকালে ভালো কাজের জন্য পুরস্কার (জান্নাত) এবং মন্দ কাজের জন্য শাস্তি (জাহান্নাম) রয়েছে—এই ধারণাটি তাদের মধ্যে গেঁথে দিন। যখন তারা বুঝতে পারবে যে এই জীবনের প্রতিটি কাজের জন্য তাদের আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে, তখন তারা নিজেরাই অনৈতিক কাজ থেকে বিরত থাকবে। নিয়মিত কুরআন পাঠ, হাদিসের গল্প শোনানো এবং ভালো মুসলিম হিসেবে জীবনযাপনের গুরুত্ব সম্পর্কে আলোচনা করুন। এই কৌশলগুলো ব্যবহার করে মা-বাবারা তাদের সন্তানদেরকে শুধু
পর্দার প্রতি উদাসীনতা
ছাত্রজীবনে পর্দার ব্যাপারে উদাসীনতা বা সঠিকভাবে পর্দা না মানার অনেকগুলো ক্ষতিকর দিক রয়েছে, যা একজন শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত, সামাজিক এবং আধ্যাত্মিক জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। নিচে এর কিছু প্রধান খারাপ দিক ব্যাখ্যা করা হলো:
১. মানসিক এবং আত্মিক ক্ষতি
পর্দা হলো লজ্জা ও শালীনতার প্রতীক। পর্দার উদাসীনতা একজন শিক্ষার্থীর মধ্যে লজ্জা ও শালীনতার বোধকে দুর্বল করে দেয়। এর ফলে অনৈতিক কাজ এবং অপ্রয়োজনীয় প্রদর্শনে তারা দ্বিধাবোধ করে না, যা তার নৈতিক চরিত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
যখন কোনো শিক্ষার্থী নিজেকে সঠিকভাবে ঢেকে রাখে না, তখন সে অন্যদের কাছে শুধু তার বাহ্যিক সৌন্দর্যের মাধ্যমে পরিচিত হতে চায়। এতে তার মেধা, জ্ঞান এবং ব্যক্তিত্বের চেয়ে শারীরিক সৌন্দর্যের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়, যা তার আত্মসম্মানকে হ্রাস করে।
পর্দা না মানার কারণে নিজের এবং অন্যদের মধ্যে পারস্পরিক আকর্ষণ তৈরি হতে পারে, যা পড়াশোনায় মনোযোগ নষ্ট করে। এতে শিক্ষার্থীর মূল্যবান সময় নষ্ট হয় এবং তার শিক্ষার মান কমে যায়।
২. সামাজিক ও পারিবারিক সমস্যা
পর্দা না মানা সমাজে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশার পথ খুলে দেয়, যা নৈতিক অবক্ষয় এবং অশ্লীলতার জন্ম দেয়। এর ফলে সমাজে নৈতিক বিশৃঙ্খলা দেখা দেয় এবং পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হয়। যখন একজন শিক্ষার্থী পর্দা না মেনে চলে, তখন তা তার পরিবারের নৈতিক মূল্যবোধ নিয়ে প্রশ্ন তোলে। এতে পরিবারের সম্মানহানি হতে পারে এবং পারিবারিক সম্পর্কের মধ্যে টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়।
৩. ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক ক্ষতি
আল্লাহর আদেশ অমান্য করা: ইসলামে পর্দা একটি অবশ্য পালনীয় বিধান, যা আল্লাহ তাআলা নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্য নির্ধারণ করেছেন। পর্দার ব্যাপারে উদাসীনতা সরাসরি আল্লাহর আদেশ অমান্য করার শামিল, যা একজন মুমিনের ঈমানকে দুর্বল করে দেয়। আল্লাহর আদেশ মেনে চললে জীবনে বারাকাত আসে। পর্দার উদাসীনতা জীবনের এই বারাকাতকে কমিয়ে দেয়। পর্দাহীনতা ইসলামের মূলভাবের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
সন্তানকে পর্দার প্রতি উদাসীনতা বাচাতে করণীয়
সন্তানকে পর্দার প্রতি উদাসীনতা থেকে বাঁচাতে মা-বাবার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাদের সঠিক নির্দেশনা এবং নিজেদের জীবনযাপনের মাধ্যমে সন্তানকে প্রভাবিত করতে পারেন। জোর করে নয়, বরং ভালোবাসা ও যুক্তির মাধ্যমে এই বিষয়গুলো বোঝানো উচিত। নিচে এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. পর্দার গুরুত্ব তুলে ধরা
মা-বাবা হিসেবে আপনার প্রথম কাজ হলো সন্তানের মনে পর্দার গুরুত্ব প্রতিষ্ঠা করা। এটি শুধু একটি পোশাকের বিষয় নয়, বরং এটি একটি নৈতিক এবং আধ্যাত্মিক সুরক্ষা।
সন্তানকে বোঝান যে পর্দা কোনো বাঁধা নয়, বরং এটি নারীর সম্মান ও নিরাপত্তার প্রতীক। এটি তাদের অনাকাঙ্ক্ষিত দৃষ্টি এবং অনিরাপদ পরিবেশ থেকে রক্ষা করে। বুঝিয়ে দিন যে একজন মানুষের আসল সৌন্দর্য তার বাহ্যিক রূপে নয়, বরং তার চরিত্রে। পর্দা চরিত্রের এই সৌন্দর্যকে আরও বাড়িয়ে তোলে এবং ব্যক্তিকে তার জ্ঞানের কারণে পরিচিত হতে সাহায্য করে।
২. কুরআন ও হাদিসের আলোকে পর্দার আবশ্যকতা এবং উপকারিতা সম্পর্কে বোঝানো
ইসলামে পর্দার বিধান কেন এসেছে, তা সরাসরি কুরআন ও হাদিসের মাধ্যমে সন্তানকে বোঝানো উচিত। এতে তাদের মনে আল্লাহর আদেশের প্রতি সম্মান ও ভয় সৃষ্টি হবে। কুরআন ও হাদিসে পর্দার যে বিধান রয়েছে, তা তুলে ধরুন। যেমন-
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَ قُلۡ لِّلۡمُؤۡمِنٰتِ یَغۡضُضۡنَ مِنۡ اَبۡصَارِہِنَّ وَ یَحۡفَظۡنَ فُرُوۡجَہُنَّ وَ لَا یُبۡدِیۡنَ زِیۡنَتَہُنَّ اِلَّا مَا ظَہَرَ مِنۡہَا وَ لۡیَضۡرِبۡنَ بِخُمُرِہِنَّ عَلٰی جُیُوۡبِہِنَّ
হে নবি! আপনি ঈমানদার নারীদের বলে দিন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে নত রাখে ও তাদের লজ্জাস্থানের হিফাযত করে। তারা যেন যা সাধারণতঃ প্রকাশমান থাকে তা ব্যতীত তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে। তাদের গ্রীবা ও গলদেশ চাদর দ্বারা ঢেকে রাখে। সুর নূর : ৩১
আল্লাহ তাআলা বলেন-
قُلۡ لِّلۡمُؤۡمِنِیۡنَ یَغُضُّوۡا مِنۡ اَبۡصَارِہِمۡ وَیَحۡفَظُوۡا فُرُوۡجَہُمۡ ؕ ذٰلِکَ اَزۡکٰی لَہُمۡ ؕ اِنَّ اللّٰہَ خَبِیۡرٌۢ بِمَا یَصۡنَعُوۡنَ
“মুমিন পুরুষদের বলুন, তারা যেন দৃষ্টি সংযম করে এবং নিজেদের লজ্জাস্থান হেফাজত করে। এটি তাদের জন্য অধিক পবিত্র। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদের কাজ সম্পর্কে অবগত।” সুরা নুর : ৩০
পর্দার মাধ্যমে কীভাবে অনৈতিক সম্পর্ক এবং মানসিক চাপ থেকে বাঁচা যায়, তা নিয়ে আলোচনা করুন। এটি সমাজে নৈতিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে কীভাবে সাহায্য করে, সে বিষয়েও আলোকপাত করুন।
৩. মা-বাবার নিজেদের পর্দা করা ও পরিবেশ সৃষ্টি করা
সন্তানেরা তাদের মা-বাবাকে দেখে শেখে। তাই, মা-বাবার নিজেদের জীবনযাপন সন্তানের জন্য উদাহরণ হওয়া উচিত। মা-বাবার নিজেদের পর্দা করা এবং ঘরেও শালীনতা বজায় রাখা জরুরি। সন্তান যখন তাদের মা-বাবাকে পর্দার বিধান মেনে চলতে দেখবে, তখন তারা এটি নিজেদের জীবনের একটি স্বাভাবিক অংশ হিসেবে গ্রহণ করবে। বাড়িতে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করুন যেখানে আল্লাহর বিধানগুলো গুরুত্ব পায়। অনৈতিক ও অশ্লীল বিষয়গুলো থেকে দূরে থাকুন। পারিবারিক আলোচনায় ইসলাম এবং এর বিধানগুলো নিয়ে কথা বলুন।
সবশেষে, মনে রাখবেন যে জোর করে বা শাসনের মাধ্যমে কোনো কিছু চাপিয়ে দিলে তা সাময়িক হতে পারে। বরং ভালোবাসা, ধৈর্য এবং যুক্তির মাধ্যমে বোঝানো একটি স্থায়ী পরিবর্তন আনতে পারে।
বন্ধু-বান্ধব এবং সঙ্গদোষ
কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবন একজন শিক্ষার্থীর জন্য একটি নতুন অধ্যায়, যেখানে সে স্বাধীনতা এবং নতুন বন্ধুত্বের স্বাদ পায়। কিন্তু এই বন্ধু-বান্ধবদের ভুল নির্বাচন বা তাদের খারাপ প্রভাবের কারণে সন্তানের জীবনে গুরুতর খারাপ প্রভাব পড়তে পারে।
আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, মানুষ তার বন্ধুর ধ্যান-ধারণার অনুসারী হয়ে থাকে। সুতরাং তোমাদের সকলেরই খেয়াল রাখা উচিত সে কার সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করছে। সুনানে তিরমিজি : ২৩৭৮, আবু দাউদ : ৪৮৩৩, সহীহাহ : ৯২৭, মিশকাত : ৫০১৯
এ থেকে বোঝা যায়, বন্ধুর প্রভাব এমন পর্যায়ে যায় যে, বন্ধুর দ্বীনই অনেক সময় নিজের দ্বীন হয়ে যায়। নিচে এ বিষয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক আলোচনা করা হলো।
১. পড়াশোনায় উদাসীনতা
বন্ধুদের খারাপ প্রভাবের কারণে একজন শিক্ষার্থী তার পড়াশোনায় মনোযোগ হারাতে পারে। যদি বন্ধুরা পড়াশোনাকে গুরুত্ব না দেয়, আড্ডা, অপ্রয়োজনীয় ঘোরাঘুরি বা গেমিংয়ে বেশি সময় ব্যয় করে, তাহলে সেই শিক্ষার্থীও তাদের মতো আচরণ করতে শুরু করে। এর ফলে তার পরীক্ষার ফল খারাপ হয়, ক্লাসে উপস্থিতি কমে যায় এবং সামগ্রিকভাবে শিক্ষার প্রতি তার আগ্রহ নষ্ট হয়।
২. নৈতিক অবক্ষয়
খারাপ বন্ধুদের সংস্পর্শে এসে অনেক শিক্ষার্থী ধূমপান, মাদক সেবন এবং অন্যান্য অনৈতিক কার্যকলাপে জড়িয়ে পড়ে। সমবয়সীদের চাপ (peer pressure) এর কারণে তারা এমন সব কাজ করতে বাধ্য হয় যা তারা স্বাভাবিকভাবে করত না। এর ফলে তাদের নৈতিক চরিত্র দুর্বল হয় এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
৩. আর্থিক অপচয়
কিছু বন্ধু অপ্রয়োজনীয় খরচ, যেমন দামি রেস্টুরেন্টে খাওয়া, নাইট ক্লাবে যাওয়া, বা দামি ব্র্যান্ডের পোশাক কেনার প্রতি আগ্রহী হতে পারে। যদি আপনার সন্তান এই ধরনের বন্ধুদের সাথে মেশে, তবে সেও আর্থিক অপচয়ের পথে পা বাড়াতে পারে। এতে তার পারিবারিক আর্থিক সংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং তার মধ্যে অপচয়ের অভ্যাস গড়ে উঠতে পারে।
৪. মানসিক এবং সামাজিক চাপ
যদি বন্ধুরা সর্বদা নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে বা অস্থিতিশীল মানসিকতার হয়, তবে সেই প্রভাব আপনার সন্তানের ওপরও পড়তে পারে। এর ফলে সে হতাশা, দুশ্চিন্তা বা অন্যান্য মানসিক সমস্যার শিকার হতে পারে। এছাড়া, বন্ধুদের মাঝে নিজেকে গ্রহণযোগ্য করার জন্য মিথ্যা বলা বা এমন কিছু ভান করা যা সে নয়, তা তার আত্মবিশ্বাসকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
৫. পারিবারিক দূরত্ব
যখন একজন শিক্ষার্থী তার বন্ধুদের সঙ্গে অতিরিক্ত সময় ব্যয় করে এবং তাদের ভুল মূল্যবোধ গ্রহণ করে, তখন সে পরিবার থেকে দূরে সরে যায়। সে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটাতে আগ্রহ দেখায় না, তাদের উপদেশকে গুরুত্ব দেয় না এবং তাদের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ কমে যায়। এর ফলে পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হয়।
সমস্যা থেকে প্রতিকারের উপায় :
বন্ধুবান্ধবদের ভুল নির্বাচন এবং তাদের খারাপ প্রভাবের কারণে সন্তানের জীবন কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, তা নিয়ে আমরা আলোচনা করেছি। এই সমস্যার প্রতিকার করা মা-বাবার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য প্রয়োজন সচেতনতা, সঠিক দিকনির্দেশনা এবং কার্যকর পদক্ষেপ। শুধু সমস্যাগুলো চিহ্নিত করাই যথেষ্ট নয়, বরং সেগুলো সমাধানের জন্য আমাদের বাস্তবসম্মত উপায় খুঁজে বের করতে হবে। একজন শিক্ষার্থীর জীবনকে ভুল পথে চালিত হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করার জন্য কিছু কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে, আমরা এখন এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ সমাধান নিয়ে আলোচনা করব, যা আপনার সন্তানকে সঠিক পথে চলতে সাহায্য করবে এবং তার ভবিষ্যৎকে সুরক্ষিত রাখবে।
১. বন্ধু নির্বাচনের গুরুত্ব
সন্তানের মধ্যে ছোটবেলা থেকেই ভালো বন্ধু বাছাইয়ের শিক্ষা দিতে হবে। তাকে বুঝাতে হবে, ভালো বন্ধুই প্রকৃত সম্পদ। সাহাবিদের জীবনী থেকে উদাহরণ দিয়ে দেখানো যায় কিভাবে ভালো বন্ধুরা একে অপরকে জান্নাতের পথে সাহায্য করেছে।
২. খোলামেলা আলোচনা
সন্তান কার সাথে মেলামেশা করছে তা জানতে হবে, তবে সেটা যেন জেরা করার মতো না হয়। বন্ধুত্বপূর্ণ ভঙ্গিতে তার বন্ধুদের সম্পর্কে জানতে চাইতে হবে। প্রয়োজনে সন্তানকে বুঝাতে হবে কোন বন্ধু তাকে সৎপথে টেনে নিতে পারছে আর কোন বন্ধু তার ক্ষতি করছে। পরিবারে এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে যাতে সন্তান খোলামেলা ভাবে তার বন্ধুদের বিষয়ে বলতে পারে।
৩. ধর্মীয় অনুশাসন অনুসরণ করা
সন্তানদেরকে সৎ ও ধার্মিক বন্ধু নির্বাচনের জন্য উৎসাহিত করা। ইসলামিক পরিবেশে তাদের জন্য বিকল্প বিনোদন ও সামাজিক কার্যক্রমের ব্যবস্থা করা, যেমন ইসলামিক যুব গ্রুপ বা বিভিন্ন সমাজসেবামূলক কার্যক্রমে অংশ নেওয়া। সর্বপরি ইসলাম আমাদের যে দৈনিক (সালাত) ইবাদত প্রদান করেছে, তার সাথে সম্পৃক্ত হবে, দেখবে- খারাপ বন্ধু বান্ধবদের উতপাত কমে যাবে। সন্তানকে স্বাধীনতা দিতে হবে, তবে তার সুনির্দিষ্ট সীমারেখা থাকতে হবে। ইসলাম স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দেয়, কিন্তু সেটি আল্লাহর বিধান মেনে। তাই সন্তান কখন বাহিরে যাবে, কখন বাসায় আসবে, কার সাথে মিসবে, কার সাথে মিসবে না ইত্যাদি সব কিছু মা-বাবার কন্ট্রোলে থাকবে।
৪. অবাধ স্বাধীনতা এবং লাগামহীন জীবন
কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে অনেক সময় তরুণ-তরুণীরা “শিক্ষার নামে” অবাধ স্বাধীনতা ভোগ করতে শুরু করে। তারা রাত করে বাড়ি ফেরে, ক্লাসে অনিয়মিত হয় এবং আস্তে আস্তে ধর্মীয় অনুশাসন থেকে দূরে সরে যায়। এই লাগামহীন স্বাধীনতা তাদের চরিত্র ও দ্বীন উভয়কে নষ্ট করে দিতে পারে।
৫. পারিবারিক কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করা
সন্তানকে পরিবারের সাথে সক্রিয়ভাবে যুক্ত রাখতে হবে। যেমন—নিয়মিত জামাতে নামাজে যাওয়া, পরিবারে কুরআন পাঠের আসর করা, সমাজসেবামূলক কাজে অংশগ্রহণ করানো। এতে তারা পরিবারের প্রতি দায়বদ্ধতা অনুভব করবে এবং একাকিত্ব বা বাইরে অপ্রয়োজনীয় সময় কাটানো কমে যাবে।
বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করা :
সন্তানের সাথে সম্পর্ক যেন বন্ধুত্বপূর্ণ হয়। শুধু “না, এটা করো না” বললে তারা বিদ্রোহী হয়ে যেতে পারে। তাই ধৈর্য, ভালোবাসা ও যুক্তি দিয়ে বোঝাতে হবে কোন কাজ সঠিক আর কোনটা ক্ষতিকর।











