সন্তানের অধিকার : প্রথম পর্ব

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

মা-বাবা নিকট সন্তানের অধিকার  

পরিবার হলো মানব সমাজের মূল ভিত্তি, আর সন্তান হলো মা-বাবার কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে শ্রেষ্ঠ আমানত ও নিয়ামত। এই আমানতের হক যথাযথভাবে আদায় করা প্রত্যেক অভিভাবকের জন্য একটি অপরিহার্য দ্বীনি ও নৈতিক দায়িত্ব। ইসলামে সন্তানের অধিকারকে শুধু খাদ্য, বস্ত্র বা শিক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি, বরং এর পরিধি বিস্তৃত— যা জন্ম থেকে শুরু করে তাদের চারিত্রিক, সামাজিক ও আধ্যাত্মিক পূর্ণতা পর্যন্ত বিস্তৃত।

মা-বাবার প্রধান কর্তব্য হলো তাদের সন্তানদেরকে এমনভাবে গড়ে তোলা, যাতে তারা দুনিয়ায় উত্তম মানুষ এবং আখিরাতে সফল মুমিন হিসেবে পরিচিত হতে পারে। এর জন্য প্রয়োজন উন্নত চরিত্র শিক্ষা দান, ইসলামী মূল্যবোধে তাদের মনকে আলোকিত করা এবং রাসূল (সাঃ)-এর চরিত্রকে মডেল হিসেবে তাদের সামনে তুলে ধরা।

সন্তানের অধিকার নিশ্চিত করার অর্থ হলো— তাদের জন্য একটি নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে তারা নির্ভুল জ্ঞান অর্জনের সুযোগ পাবে, পারিবারিক তালিমের মাধ্যমে দ্বীনি শিক্ষা লাভ করবে এবং সত্য-মিথ্যার পার্থক্য অনুধাবন করতে শিখবে। একইসাথে, মা-বাবাকে খেয়াল রাখতে হবে যেন সকল সন্তানের মাঝে সমতা বজায় থাকে, বিশেষ করে এতিম বা প্রতিবন্ধী সন্তানের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। সন্তানদেরকে ধনী-গরীব নির্বিশেষে সকল আত্মীয়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়া এবং ত্যাগ ও সহাবস্থানের শিক্ষা দেওয়ার মাধ্যমেই একটি সুস্থ, মানবিক ও ইসলামী সমাজ গঠন করা সম্ভব। সন্তানের প্রতি এই দায়িত্ব পালনের মাধ্যমেই মা-বাবা দুনিয়া ও আখিরাতে সফলতা লাভ করতে পারেন। নিচে এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো :

সন্তানকে উন্নত চরিত্র শিক্ষাদান

সন্তানকে উন্নত চরিত্র শিক্ষা দেওয়া পরিবার তথা মা-বাবার অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। কুরআন ও সহিহ হাদিসে এ সম্পর্কে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বর্ণিত হয়েছে। নিচে বিষয়টি সম্পর্কে তুলে ধরা হলো:

১. সন্তানকে ঈমান ও সৎকর্ম শিক্ষা দেওয়ার নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا

হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবারকে আগুন থেকে বাঁচাও। সুরা তাহরীম : ৬

ও আয়াতে ব্যাখ্যায় বলা হয়, পরিবারের দায়িত্বপ্রাপ্ত (মা-বাবা, অভিভাবক, শিক্ষক) অবশ্যই সন্তান ও অধীনস্থদের ইসলামের শিক্ষা দিবে। তাদেরকে হালাল-হারামের জ্ঞান শেখাবে, সঠিক আকিদা শিক্ষা দেবে এবং সালাতসহ ফরজ ইবাদত পালনে অভ্যস্ত করবে। তাদেরকে অশ্লীলতা, গুনাহ ও কুঅভ্যাস থেকে দূরে রাখবে।

হযরত আলী (রাঃ)-এর বলেন, “এ আয়াতের অর্থ হলো, তাদেরকে শিক্ষা দাও এবং আদব শেখাও।”

তাফসীর ইবন কাসীর

ইবন আব্বাস (রাঃ)-এর বলেন, “তাদেরকে আল্লাহকে ভয় করতে শেখাও, এতে আল্লাহ তাদেরকে আযাব থেকে রক্ষা করবেন।” তাবারী তাফসীর

২. লুকমান (আ.)-এর উপদেশ

কুরআনে বর্ণিত হয়েছে, লুকমান (আ.) তার ছেলেকে উপদেশ দিচ্ছেন—

  • আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক না করা।
  • সালাত কায়েম করা।
  • সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজ থেকে বিরত রাখা।
  • ধৈর্য ধারণ করা।
  • অহংকার ও উদ্ধত আচরণ পরিহার করা। রা লুকমান: ১৩-১৯

লুকমান (আ.)-এর উপদেগুলো আসলে একটি পূর্ণাঙ্গ চরিত্র গঠনের নীতি।

৩. সন্তানকে সুন্দর আদব শেখানো সওয়াবের কাজ

আইউব ইবনু মূসা (রহঃ) হতে পর্যায়ক্রমে তার পিতা ও দাদার সূত্রে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কোন পিতা তার সন্তানকে উত্তম শিষ্টাচার শিক্ষা দেয়ার চেয়ে বেশী উত্তম কোন জিনিস দিতে পারে না। সুনানে তিরমিজি : ১৯৫২

৪. চরিত্রবান সন্তান গড়ে তোলার ফজিলত

আয়িশাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের মাঝে সে-ই ভাল যে তার পরিবারের নিকট ভাল। আর আমি আমার পরিবারের নিকট তোমাদের চাইতে উত্তম। আর তোমাদের কোন সঙ্গী মৃত্যুবরণ করলে তার সমালোচনা পরিত্যাগ করো। সুনানে তিরমিজি : ৩৮৯৫, সহীহাহ ; ২৮৫

অর্থাৎ মা-বাবার কর্তব্য হলো পরিবারকে সুন্দর চরিত্রে গড়ে তোলা।

কুরআন-হাদিস স্পষ্ট করে বলছে, মা-বাবার অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হলো সন্তানকে শুধু দুনিয়াবি পড়াশোনা নয়, বরং ইসলামি আদর্শ ও উন্নত চরিত্র শিক্ষা দেওয়া। তাদের মধ্যে ঈমান, ইবাদত, শিষ্টাচার, বিনয়, সত্যবাদিতা, আমানতদারি ও দয়া-মমতা গড়ে তুলতে হবে। এতে তারা দুনিয়াতে সফল ও আখিরাতে মুক্তির পথ পাবে।

সামর্থ অনুসারে সন্তানে ভরন পোষন প্রদান করা

সন্তানকে সামর্থ্য অনুযায়ী ভরণ-পোষণ প্রদান করা ইসলামে একটি ফরজ দায়িত্ব। এটি শুধু পারিবারিক দায়িত্ব নয়; বরং কুরআন ও সহিহ হাদিসে একে ইবাদত হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। নিচে বিষয়টি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো:

১. ভরণ-পোষণের সাধারণ নির্দেশ

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَالۡوَالِدٰتُ یُرۡضِعۡنَ اَوۡلَادَہُنَّ حَوۡلَیۡنِ کَامِلَیۡنِ لِمَنۡ اَرَادَ اَنۡ یُّتِمَّ الرَّضَاعَۃَ ؕ وَعَلَی الۡمَوۡلُوۡدِ لَہٗ رِزۡقُہُنَّ وَکِسۡوَتُہُنَّ بِالۡمَعۡرُوۡفِ ؕ لَا تُکَلَّفُ نَفۡسٌ اِلَّا وُسۡعَہَا ۚ

আর মায়েরা তাদের সন্তানদেরকে পূর্ণ দু’বছর দুধ পান করাবে, (এটা) তার জন্য যে দুধ পান করাবার সময় পূর্ণ করতে চায়। আর পিতার উপর কর্তব্য, বিধি মোতাবেক মাদেরকে খাবার ও পোশাক প্রদান করা। সাধ্যের অতিরিক্ত কোন ব্যক্তিকে দায়িত্ব প্রদান করা হয় না। সুরা বাকারা : ২৩৩

আয়াত থেকে প্রমাণিত হলো, শিশুর লালন-পালন ও মায়ের প্রয়োজনীয় খরচ বহন করা পিতার ধর্মীয় দায়িত্ব।

২. সামর্থ্য অনুযায়ী খরচের নির্দেশ

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

لِیُنۡفِقۡ ذُوۡ سَعَۃٍ مِّنۡ سَعَتِہٖ ؕ  وَمَنۡ قُدِرَ عَلَیۡہِ رِزۡقُہٗ فَلۡیُنۡفِقۡ مِمَّاۤ اٰتٰىہُ اللّٰہُ ؕ  لَا یُکَلِّفُ اللّٰہُ نَفۡسًا اِلَّا مَاۤ اٰتٰىہَا ؕ  سَیَجۡعَلُ اللّٰہُ بَعۡدَ عُسۡرٍ یُّسۡرًا 

সামর্থ্যবান যেন নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী ব্যয় করে আর যার রিয্ক সংকীর্ণ করা হয়েছে সে যেন আল্লাহ তাকে যা দিয়েছেন তা হতে ব্যয় করে। আল্লাহ কারো ওপর বোঝা চাপাতে চান না তিনি তাকে যা দিয়েছেন তার চাইতে বেশী। আল্লাহ কঠিন অবস্থার পর সহজতা দান করবেন। সুরা তালাক : ৭

 এ আয়াত প্রমাণ করে—ভরণ-পোষণ সামর্থ্য অনুযায়ী দিতে হবে, অভাবের কারণে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নেই।

৩.  পরিবারে ব্যয় করা সর্বশ্রেষ্ঠ দান

আবূ হুরায়রাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ একটি দীনার তুমি আল্লাহর পথে ব্যয় করলে, একটি দীনার গোলাম আযাদ করার জন্য এবং একটি দীনার মিসকীনদেরকে দান করলে এবং আর একটি তোমার পরিবার-পরিজনের জন্য ব্যয় করলে। এর মধ্যে (সাওয়াবের দিক থেকে) ঐ দীনারটিই উত্তম যা তুমি তোমার পরিবারের লোকদের জন্য ব্যয় করলে। সহিহ মুসলিম : ৯৯৫

৪. ভরণ-পোষণ না দেওয়া গুনাহ

১৬৯২। ’আবদুল্লাহ ইবনু ’আমর রাযিয়াল্লাহু ’আনহু সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কেউ পাপী হওয়ার জন্য এটুকুই যথেষ্ট যে, সে তার উপর নির্ভরশীলদের রিজিক প্রদানে অবহেলা করে। সুনানে আবু দাউদ : ১৬৯২

৫. সন্তানদের জন্য উত্তরাধিকার রেখে যাওয়া

৫৩৫৪. সা’দ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ আমি মক্কায় রোগগ্রস্ত হলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার শুশ্রূষার জন্য আসেন। আমি বললাম, আমার তো মাল আছে। সেগুলো আমি ওয়াসিয়্যাত করে যাই? তিনি বললেনঃ না। আমি বললাম,  তাহলে অর্ধেক? তিনি বললেনঃ না। আমি বললামঃ তবে এক-তৃতীয়াংশ? তিনি বললেনঃ এক-তৃতীয়াংশ করতে পার। আর এক-তৃতীয়াংশই তো বেশী। মানুষের কাছে হাত পেতে পেতে ফিরবে ওয়ারিশদের এমন ফকীর অবস্থায় ছেড়ে যাওয়ার চেয়ে তাদেরকে বিত্তবান অবস্থায় রেখে যাওয়া উত্তম। আর যা-ই তুমি খরচ করবে, তা-ই তোমার জন্য সাদকাহ হবে। এমনকি যে লোকমাটি তুমি তোমার স্ত্রীর মুখে তুলে দিবে, সেটাও। সম্ভবতঃ আল্লাহ তোমাকে দীর্ঘজীবী করবেন। তোমার দ্বারা অনেক লোক উপকৃত হবে, আবার অন্যেরা কাফির সম্প্রদায়) ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সহিহ বুখারি : ৫৩৫৪

উপসংহার : পরিবারের ভরণ-পোষণ দেওয়া ফরজ দায়িত্ব। সামর্থ্য অনুযায়ী খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে হবে। এতে অবহেলা করা গুনাহ এবং ব্যয় করা হলে তা ইবাদত ও দান হিসেবে গণ্য হয়।

মা-বাবা সন্তানকে ধর্মের পথে পরিচালিত করবে

বাবা-মা হিসেবে সন্তানের জীবনে ধর্মীয় শিক্ষা ও সঠিক পথ নির্দেশনা দেওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। এটি শুধু সন্তানের ইহকালীন কল্যাণই নিশ্চিত করে না, বরং তাদের পরকালীন মুক্তির পথও সুগম করে।

মানবজীবনের লক্ষ্য শুধু ভোগ-বিলাস নয়, বরং সঠিক পথ অনুসরণ করে পরকালীন মুক্তি লাভ করা। ইসলাম হলো আল্লাহ প্রেরিত শেষ ও পরিপূর্ণ জীবনব্যবস্থা। এই পথ অনুসরণ করার গুরুত্ব কয়েকটি কারণে স্পষ্ট হয়:

১. আল্লাহর হুকুম মানা:

আমাদের স্রষ্টা আল্লাহ। তিনি আমাদের কেন সৃষ্টি করেছেন তা কুরআনে স্পষ্ট করেছেন—

﴿وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ﴾

“আমি জ্বিন ও মানুষকে কেবল আমার ইবাদতের জন্যই সৃষ্টি করেছি।” (সূরা যারিয়াত: ৫৬)

অতএব, আল্লাহর হুকুম মানা এবং তাঁর ইবাদত করা মানবজীবনের মূল উদ্দেশ্য। বাবা-মায়ের কর্তব্য হলো তাদের সন্তানদেরকে আল্লাহর পরিচয়, তাঁর প্রতি ভালোবাসা এবং তাঁর ইবাদত করার গুরুত্ব সম্পর্কে শিক্ষা দেওয়া। এই শিক্ষা শৈশব থেকেই শুরু করা উচিত, যাতে তারা আল্লাহর আদেশ-নিষেধ মেনে চলতে অভ্যস্ত হয়।

২. জীবনের সঠিক দিকনির্দেশনা:

মানুষ যখন আল্লাহ প্রদত্ত ইসলামের পথ মেনে চলে, তখন তার জীবন সুশৃঙ্খল, শান্তিপূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণ হয়। ইসলাম আমাদের প্রতিটি ক্ষেত্রে, আকিদা (বিশ্বাস), ইবাদত, নৈতিকতা, সামাজিক ও পারিবারিক জীবনে—নির্দেশনা প্রদান করে। বাবা-মায়েদের উচিত তাদের সন্তানদের ইসলামের এই সামগ্রিক রূপটি বোঝানো, যাতে তারা শুধু আনুষ্ঠানিক ইবাদত নয়, বরং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইসলামি মূল্যবোধ মেনে চলতে শেখে।

৩. পাপ থেকে সুরক্ষা:

ইসলামের বিধানগুলো মানুষকে অন্যায়, ব্যভিচার, মদ, সুদ, খুন, প্রতারণা ইত্যাদি গুনাহ থেকে রক্ষা করে। এতে ব্যক্তি ও সমাজ উভয়েরই কল্যাণ নিহিত আছে। বাবা-মা যদি সন্তানকে ছোটবেলা থেকে হালাল-হারামের জ্ঞান দেন, তাহলে তারা অন্যায় ও পাপ থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারবে। এই শিক্ষা তাদের একটি সুস্থ ও নৈতিক জীবনযাপনের ভিত্তি গড়ে দেবে।

৪. পরকালীন সফলতা:

পৃথিবীর জীবন ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু আখিরাত চিরস্থায়ী। ইসলাম অনুসরণ করলে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও জান্নাত লাভ করা যায়। কুরআনে বলা হয়েছে—

وَمَن يُطِعِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ يُدْخِلْهُ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا

যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করবে, আল্লাহ তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন, যেখানে সে চিরকাল থাকবে।” সূরা নিসা: ১৩

সন্তানদেরকে পরকালের বিশ্বাস এবং জান্নাত-জাহান্নামের ধারণা সম্পর্কে অবগত করানো বাবা-মায়ের দায়িত্ব। এর মাধ্যমে তারা দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী আরামের চেয়ে পরকালীন চিরস্থায়ী সুখের জন্য চেষ্টা করতে উদ্বুদ্ধ হবে।

৫. মানসিক প্রশান্তি ও শান্তি:

ইসলাম মানুষকে আল্লাহর ওপর নির্ভর করতে শেখায়। এতে দুঃখ-কষ্টে ধৈর্য ও সুখে কৃতজ্ঞতা জন্মায়। ফলে মানুষ প্রকৃত প্রশান্তি লাভ করে। কুরআনে বলা হয়েছে—

﴿أَلَا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ﴾

“জেনে রাখ, আল্লাহর স্মরণেই অন্তরগুলো প্রশান্ত হয়।” (সূরা আর-রাদ: ২৮)

বাবা-মায়ের উচিত সন্তানদেরকে আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল (ভরসা) করতে শেখানো। জীবনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আল্লাহর সাহায্য কামনা করার শিক্ষা তাদের মনকে শান্ত ও দৃঢ় করবে।

৬. একটি আদর্শ প্রজন্ম গঠন

বাবা-মায়ের সঠিক দিকনির্দেশনা একটি সুন্দর সমাজ এবং আদর্শ প্রজন্ম গঠনের জন্য অপরিহার্য। ইসলাম অনুসরণ করা মানে স্রষ্টার আনুগত্য করা, নিজের জীবনকে সুন্দর ও সুশৃঙ্খল রাখা, সমাজে শান্তি স্থাপন করা এবং পরকালে মুক্তি লাভ করা। তাই প্রত্যেক মুসলিমের কর্তব্য হলো ইসলামের পথে চলা এবং তার শিক্ষা অনুযায়ী নিজের সন্তানদের গড়ে তোলা। এই দায়িত্ব পালনে বাবা-মা যত বেশি যত্নশীল হবেন, সন্তানরা তত বেশি সফল ও সুসংহত জীবন পাবে।

সন্তানরে নিরাপত্তা বিধান

সন্তানের নিরাপত্তা বিধান করা বাবা-মায়ের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব। ইসলামে এই দায়িত্বকে শারীরিক, মানসিক, এবং ধর্মীয়—এই তিন প্রধান ভাগে ভাগ করা হয়েছে। কুরআন ও হাদিসের আলোকে এই বিষয়টির গুরুত্ব নিচে তুলে ধরা হলো।

১. শারীরিক নিরাপত্তা

শারীরিক নিরাপত্তা বলতে সন্তানের স্বাস্থ্য, খাদ্য, বস্ত্র ও বাসস্থানের মতো মৌলিক চাহিদা নিশ্চিত করাকে বোঝায়। ইসলাম এই বিষয়ে বাবা-মায়ের ওপর বিশেষ দায়িত্ব অর্পণ করেছে।

আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেছেন-

اَسۡکِنُوۡہُنَّ مِنۡ حَیۡثُ سَکَنۡتُمۡ مِّنۡ وُّجۡدِکُمۡ وَلَا تُضَآرُّوۡہُنَّ لِتُضَیِّقُوۡا عَلَیۡہِنَّ ؕ

তোমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী যেখানে তোমরা বসবাস কর সেখানে তাদেরকেও বাস করতে দাও, তাদেরকে সঙ্কটে ফেলার জন্য কষ্ট দিয়ো না। সূরা তালাক: ৬

এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, সন্তানের দৈহিক যত্নের দায়িত্ব বাবা-মায়ের। তাদের খাদ্য, স্বাস্থ্য এবং জীবনের ঝুঁকি থেকে রক্ষা করা অপরিহার্য।

আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেনঃ প্রত্যেক নবজাতক ফিত্রাতের উপর জন্মগ্রহণ করে। অতঃপর তার মাতাপিতা তাকে ইয়াহূদী বা নাসারা অথবা অগ্নি উপাসক করে, যেমন চতুষ্পদ জন্তু একটি পূর্ণাঙ্গ বাচ্চা জন্ম দেয়। তোমরা কি তাকে (জন্মগত) কানকাটা দেখেছ? সহিহ বুখারি : ১৩৮৫

এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, সন্তানের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করা বাবা-মায়ের দায়িত্ব, কারণ তাদের প্রভাব শিশুর ভবিষ্যৎ জীবন গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

২. মানসিক ও আবেগিক নিরাপত্তা

শারীরিক সুরক্ষার পাশাপাশি সন্তানের মানসিক ও আবেগিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও ইসলামে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্যে রয়েছে তাদের প্রতি স্নেহ, ভালোবাসা, এবং তাদের আত্মসম্মান ও মর্যাদা বজায় রাখা। স্নেহ ও দয়ার মাধ্যমে সন্তানের মানসিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। বাবা-মায়ের স্নেহ ও ভালোবাসা শিশুদের আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলে।

আমর ইবনু শুআইব (রাহঃ) হতে পর্যায়ক্রমে তার বাবা ও দাদার সূত্রে বর্ণিত আছে, তিনি (দাদা) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে লোক আমাদের শিশুদের আদর করে না এবং আমাদের বড়দের সম্মানের প্রতি খেয়াল রাখে না সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।’ সুনানে তিরমিজি : ১৯২০, মুসনাদ আহমদ : ২২৭৯৩), সুনানে আবু দাউদ : ৪৯৪৩, সহিহ ইবনে হিব্বান : ৪৪৯৩

 এই হাদিসটি বাবা-মায়ের প্রতি ইঙ্গিত করে যে, তারা তাদের সন্তানদের প্রতি দয়া ও কোমলতা প্রদর্শন করবে। শিশুদের বকাঝকা, অপমান বা শারীরিক শাস্তি দেওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত, যা তাদের মানসিক নিরাপত্তাকে বিঘ্নিত করে।

৩. ধর্মীয় ও নৈতিক নিরাপত্তা

সন্তানের সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা হলো তাদের ধর্মীয় ও নৈতিক নিরাপত্তা। বাবা-মায়ের প্রধান দায়িত্ব হলো তাদের সন্তানদের সঠিক ইসলামি শিক্ষা দেওয়া এবং নৈতিক চরিত্র গঠনে সহায়তা করা। আল্লাহ তাআলা বলেন, “হে ঈমানদারগণ, তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে সেই আগুন থেকে রক্ষা করো, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর।” সূরা তাহরিম: ৬

এই আয়াতটি পরিষ্কারভাবে নির্দেশ করে যে, বাবা-মায়ের দায়িত্ব হলো তাদের সন্তানদের জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করা, আর তা সম্ভব একমাত্র সঠিক ধর্মীয় শিক্ষা ও নৈতিকতার মাধ্যমে।

১৯৫২। আইউব ইবনু মূসা (রহঃ) হতে পর্যায়ক্রমে তার পিতা ও দাদার সূত্রে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কোন পিতা তার সন্তানকে উত্তম শিষ্টাচার শিক্ষা দেয়ার চেয়ে বেশী উত্তম কোন জিনিস দিতে পারে না। সুনানে তিরমিজি : ১৯৫২

এই হাদিস থেকে স্পষ্ট হয় যে, সবচেয়ে মূল্যবান উত্তরাধিকার হলো নৈতিক ও ধর্মীয় জ্ঞান। বাবা-মা তাদের সন্তানদের যদি ইসলামের মৌলিক শিক্ষা, যেমন—সালাত, রোজা, এবং ভালো আচরণের শিক্ষা দেন, তবে এটিই তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় সুরক্ষা হবে।

সারসংক্ষেপ : বাবা-মায়ের দায়িত্ব শুধু সন্তানের জৈবিক চাহিদা পূরণ করা নয়, বরং তাদের শারীরিক, মানসিক ও ধর্মীয়—এই তিনটি প্রধান দিক থেকে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কুরআন ও হাদিস বারবার এই দায়িত্বের ওপর জোর দিয়েছে। সন্তানের সার্বিক সুরক্ষা নিশ্চিত করে বাবা-মা তাদের প্রতি আল্লাহর দেওয়া আমানত সঠিকভাবে পালন করতে পারেন।

সন্তানের মাঝে সমতা বিধান করা

ইসলামী শরিয়তে বাবা-মায়ের জন্য সন্তানদের মধ্যে সমতা বজায় রাখা অপরিহার্য। এর মূল লক্ষ্য হলো সন্তানদের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা, শ্রদ্ধা এবং সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করা। যদি কোনো বাবা-মা এক সন্তানকে বেশি গুরুত্ব দেন বা অন্য সন্তানের তুলনায় তাকে বেশি কিছু দেন, তাহলে অপর সন্তানের মনে হিংসা, ঘৃণা এবং হতাশার জন্ম নিতে পারে। এটি শুধু পারিবারিক সম্পর্ককেই ক্ষতিগ্রস্ত করে না, বরং সামাজিক বিশৃঙ্খলাও সৃষ্টি করতে পারে।

১. ইনসাফ করা আল্লাহ নির্দেশনা:

কুরআনে সরাসরি সন্তানদের মধ্যে সমতা বিধানের বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট আয়াত নেই। তবে, কুরআন ন্যায়বিচার এবং সমতার নীতির ওপর ব্যাপক গুরুত্ব আরোপ করে। আল্লাহ তাআলা বলেছেন-

اِنَّ اللّٰہَ یَاۡمُرُ بِالۡعَدۡلِ وَالۡاِحۡسَانِ وَاِیۡتَآیِٔ ذِی الۡقُرۡبٰی وَیَنۡہٰی عَنِ الۡفَحۡشَآءِ وَالۡمُنۡکَرِ وَالۡبَغۡیِ ۚ یَعِظُکُمۡ لَعَلَّکُمۡ تَذَکَّرُوۡنَ

নিশ্চয় আল্লাহ ইনসাফ, সদাচার ও নিকট আত্মীয়দের দান করার আদেশ দেন এবং তিনি আশ্লীলতা, মন্দ কাজ ও সীমালঙ্ঘন থেকে নিষেধ করেন। তিনি তোমাদেরকে উপদেশ দেন, যাতে তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর। সূরা নাহল : ৯০

এই আয়াতটি বাবা-মায়ের জন্যও প্রযোজ্য। সন্তানদের মধ্যে ন্যায়বিচার ও সমতা বজায় রাখা এই আয়াতের নির্দেশনার একটি অংশ।

২. সন্তানদের মাঝে ইনসাফ করা

আমির (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নু‘মান ইবনু বাশীর (রাঃ)-কে মিম্বরের উপর বলতে শুনেছি যে, আমার পিতা আমাকে কিছু দান করেছিলেন। তখন (আমার মাতা) আমরা বিনতে রাওয়াহা (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে সাক্ষী রাখা ব্যতীত সম্মত নই। তখন তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট আসলেন এবং বললেন, আমরা বিনতে রাওয়াহার গর্ভজাত আমার পুত্রকে কিছু দান করেছি। হে আল্লাহর রাসূল! আপনাকে সাক্ষী রাখার জন্য সে আমাকে বলেছে। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার সব ছেলেকেই কি এ রকম করেছ? তিনি বললেন, না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তবে আল্লাহকে ভয় কর এবং আপন সন্তানদের মাঝে সমতা রক্ষা কর। নু‘মান (রাঃ) বলেন, অতঃপর তিনি ফিরে গেলেন এবং তার দান ফিরিয়ে নিলেন। সহিহ বুখারি : ২৫৮৭, সহহি মুসলিম : ১৬২৩, আহমাদ : ১৮৩৮৬

এই হাদিস থেকে স্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে, সন্তানদের প্রতি ইনসাফ বা ন্যায়বিচার করা প্রতিটি মুসলিম বাবা-মায়ের জন্য বাধ্যতামূলক। এটি আল্লাহর নির্দেশ এবং তা মেনে চলা আমাদের জন্য জরুরি।

যেসব বিষয়ে সন্তানদের সমতা সমতা আবশ্যক

১. আর্থিক বিষয়ে:

দান, উপহার, সম্পত্তি বণ্টন এবং অন্যান্য আর্থিক সুবিধা প্রদানের ক্ষেত্রে সব সন্তানের মধ্যে সমতা বজায় রাখা আবশ্যক। এক সন্তানকে বেশি দেওয়া এবং অন্যকে কম দেওয়া উচিত নয়। তবে, যদি কোনো সন্তানের বিশেষ প্রয়োজন থাকে (যেমন: চিকিৎসার খরচ), তাহলে সে ক্ষেত্রে অতিরিক্ত খরচ করা যেতে পারে।

২. ব্যবহার ও ভালোবাসায়:

শারীরিক, মানসিক এবং আবেগিক দিক থেকে সন্তানদের প্রতি সমান ভালোবাসা ও যত্ন দেওয়া বাবা-মায়ের দায়িত্ব। কাউকে বেশি ভালোবাসা, প্রশংসা করা বা কারো প্রতি বেশি মনোযোগ দেওয়া অন্য সন্তানের মনে কষ্ট দিতে পারে।

৩. শিক্ষায়:

সন্তানদের মধ্যে শিক্ষার সুযোগ প্রদানের ক্ষেত্রে সমতা বজায় রাখা উচিত। ছেলে ও মেয়ে উভয়ের জন্য সমান শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা ইসলামের নীতি।

ব্যতিক্রম

কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে সমতা না রেখেও তা জায়েজ হতে পারে। যদি কোনো সন্তানের শারীরিক বা মানসিক অসুস্থতা থাকে, তাহলে তার জন্য অতিরিক্ত খরচ করা যেতে পারে। তবে এই ধরনের বিশেষ পরিস্থিতি ব্যতীত অন্য সব ক্ষেত্রে সমানভাবে আচরণ করা আবশ্যক।

এতিম সন্তানকে প্রতিষ্ঠিত করা

এতিম বা পিতৃহীন সন্তানকে প্রতিষ্ঠিত করা বাবা-মায়ের, বিশেষ করে মায়ের, একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। ইসলামে এই দায়িত্বের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে, কারণ এতিমদের যত্ন নেওয়া এবং তাদের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা একটি মহৎ কাজ। নিচে এই দায়িত্বের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করা হলো।

১. এতিমের সম্পদ রক্ষা:

কুরআন মাজিদ এতিমদের অধিকার এবং তাদের প্রতি দায়িত্ব পালনের বিষয়ে একাধিক আয়াতে নির্দেশ দিয়েছে। আল্লাহ তাআলা এতিমদের সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণ এবং তাদের যথাযথ লালন-পালনের কথা বলেছেন। কুরআনে বলা হয়েছে:

وَآتُوا الْيَتَامَىٰ أَمْوَالَهُمْ وَلَا تَتَبَدَّلُوا الْخَبِيثَ بِالطَّيِّبِ ۖ وَلَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَهُمْ إِلَىٰ أَمْوَالِكُمْ ۚ إِنَّهُ كَانَ حُوبًا كَبِيرًا

“আর তোমরা এতিমদের তাদের ধন-সম্পদ ফিরিয়ে দাও এবং ভালো জিনিসের সাথে খারাপ জিনিসের বদল করো না। আর তোমাদের সম্পদের সাথে তাদের সম্পদ মিশিয়ে ভক্ষণ করো না। নিশ্চয়ই এটা গুরুতর অপরাধ।” সূরা নিসা: ২

এই আয়াতে আল্লাহ এতিমের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করা থেকে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। মা হিসেবে, এতিম সন্তানের সম্পদকে তার নিজের সম্পদ মনে করে সংরক্ষণ করা এবং তার কল্যাণে ব্যবহার করা দায়িত্ব।

২. এতিমের প্রতি দয়া ও সদাচরণ:

আল্লাহ তাআলা এতিমদের প্রতি দয়া ও কোমলতা প্রদর্শনের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন-

فَأَمَّا الْيَتِيمَ فَلَا تَقْهَرْ

“সুতরাং তুমি এতিমের প্রতি কঠোর হয়ো না।” সূরা আদ-দুহা: ৯

এই আয়াতে এতিম সন্তানের প্রতি ভালোবাসা, সহানুভূতি এবং সদয় আচরণের গুরুত্ব ফুটে ওঠে। বাবা-মা (বা অভিভাবক) হিসেবে সন্তানের মানসিক ও আবেগিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।

হাদিসের নির্দেশনা

১. জান্নাতে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর নৈকট্য লাভ:

নবি ﷺ এতিমদের যত্ন নেওয়াকে অনেক ফজিলতপূর্ণ কাজ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি নিজে এতিম ছিলেন, তাই তিনি এতিমদের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিতেন।

সাহল (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমি ও ইয়াতীমের প্রতিপালনকারী জান্নাতে এমনিভাবে নিকটে থাকবে। এই বলে তিনি শাহাদাত ও মধ্যমা আঙ্গুল দু’টি দ্বারা ইঙ্গিত করলেন এবং এ দু’টির মাঝে কিঞ্চিত ফাঁক রাখলেন। সহিহ বুখারি : ৫৩০৪, ৬০০৫

এই হাদিসটি এতিমের দায়িত্ব পালনের জন্য একটি বিশাল অনুপ্রেরণা। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, পিতৃহীন সন্তানকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য বাবা-মায়ের প্রচেষ্টা আল্লাহর কাছে কতটা প্রিয়।

২. এতিমের দায়িত্ব ও কর্তব্য:

আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ মুসলিমদের ঘরসমূহের মধ্যে যে ঘরে ইয়াতীম থাকে এবং তার সাথে সদয় ব্যবহার করা হয়, সেই ঘরই সর্বোত্তম। পক্ষান্তরে মুসলিমদের ঘরসমূহের মধ্যে যে ঘরে ইয়াতীম থাকে এবং তার সাথে নির্দয় ব্যবহার করা হয়, সেই ঘরই সর্বাধিক নিকৃষ্ট। সুনানে ইবন মাজাহ : ৩৬৭৯

এই হাদিসটি পরিষ্কার করে যে, পিতৃহীন সন্তানকে শারীরিক ও মানসিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করা, তাকে শিক্ষিত করা এবং জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় সকল দক্ষতা অর্জনে সহায়তা করা বাবা-মায়ের কর্তব্য।

পিতৃহীন সন্তানকে প্রতিষ্ঠিত করা একটি মহান আমানত। মা হিসেবে এই দায়িত্ব পালন করা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ ও সওয়াবের কাজ। কুরআন ও হাদিস উভয়ই এই দায়িত্বের ওপর গুরুত্বারোপ করে। এই দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে শুধু সন্তানের ইহকালীন কল্যাণই নিশ্চিত হয় না, বরং পরকালীন জীবনেও আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি ও জান্নাতের সর্বোচ্চ মর্যাদা লাভ করা সম্ভব হয়।

প্রতিবন্ধী সন্তান সাথে উত্তম ব্যবহার করা

প্রতিবন্ধী সন্তানের সাথে উত্তম ব্যবহার করা এবং তাদের যত্ন নেওয়া বাবা-মায়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। ইসলামে এই বিষয়ে বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে, কারণ এটি মানবতাকে সম্মান জানানো এবং দুর্বলদের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শনের একটি অংশ। কুরআন ও হাদিসের আলোকে এই দায়িত্বের গুরুত্ব নিচে তুলে ধরা হলো।

কুরআন মাজিদে সরাসরি প্রতিবন্ধী সন্তানের বিষয়ে নির্দিষ্ট করে কোনো আয়াত না থাকলেও, আল্লাহ তাআলা সার্বিকভাবে দুর্বল, অসহায় এবং শারীরিক বা মানসিকভাবে অক্ষম ব্যক্তিদের প্রতি দয়া ও ভালোবাসা প্রদর্শনের নির্দেশ দিয়েছেন।

১. দুর্বলদের প্রতি দয়া ও সম্মান:

আল্লাহ তাআলা মানুষকে সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে মর্যাদা দিয়েছেন এবং এই মর্যাদা সবার জন্য সমান। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরাও এই মর্যাদার অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ বলেছেন-

وَلَقَدۡ کَرَّمۡنَا بَنِیۡۤ اٰدَمَ وَحَمَلۡنٰہُمۡ فِی الۡبَرِّ وَالۡبَحۡرِ وَرَزَقۡنٰہُمۡ مِّنَ الطَّیِّبٰتِ وَفَضَّلۡنٰہُمۡ عَلٰی کَثِیۡرٍ مِّمَّنۡ خَلَقۡنَا تَفۡضِیۡلًا 

আর আমি তো আদম সন্তানদের সম্মানিত করেছি এবং আমি তাদেরকে স্থলে ও সমুদ্রে বাহন দিয়েছি এবং তাদেরকে দিয়েছি উত্তম রিয্ক। আর আমি যা সৃষ্টি করেছি তাদের থেকে অনেকের উপর আমি তাদেরকে অনেক মর্যাদা দিয়েছি। সূরা আল-ইসরা: ৭০

এই আয়াতটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, প্রত্যেক মানুষের মধ্যে আল্লাহর সম্মানিত। তাই কোনো শারীরিক বা মানসিক সীমাবদ্ধতা কাউকে অসম্মানিত করে না। বাবা-মায়ের উচিত তাদের প্রতিবন্ধী সন্তানের প্রতি ভালোবাসা, সম্মান ও দয়া প্রদর্শন করা, কারণ আল্লাহ তাদের এমন অবস্থায় রেখেছেন।

২. আল্লাহর পরীক্ষা ও ধৈর্য:

আল্লাহ তাআলা মানুষকে বিভিন্নভাবে পরীক্ষা করেন, যার মধ্যে শারীরিক বা মানসিক প্রতিবন্ধী সন্তান দান করাও একটি পরীক্ষা। আল্লাহ বলেছেন-

وَلَنَبۡلُوَنَّکُمۡ بِشَیۡءٍ مِّنَ الۡخَوۡفِ وَالۡجُوۡعِ وَنَقۡصٍ مِّنَ الۡاَمۡوَالِ وَالۡاَنۡفُسِ وَالثَّمَرٰتِ ؕ  وَبَشِّرِ الصّٰبِرِیۡنَ ۙ

আর আমি অবশ্যই তোমাদেরকে পরীক্ষা করব কিছু ভয়, ক্ষুধা এবং জান-মাল ও ফল-ফলাদির স্বল্পতার মাধ্যমে। আর তুমি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও। সূরা বাকারা: ১৫৫

প্রতিবন্ধী সন্তানের যত্ন নেওয়া ধৈর্যের একটি বড় পরীক্ষা। বাবা-মায়ের উচিত ধৈর্য ধারণ করা এবং সন্তানের প্রতি দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট থাকা। আল্লাহ ধৈর্যশীলদের জন্য মহাপুরস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

৩. প্রতিবন্ধীকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি:

আল্লাহ বলেন—

لَیۡسَ عَلَی الۡاَعۡمٰی حَرَجٌ وَّلَا عَلَی الۡاَعۡرَجِ حَرَجٌ وَّلَا عَلَی الۡمَرِیۡضِ حَرَجٌ

অন্ধের জন্য কোন দোষ নেই, পঙ্গুর জন্য কোন দোষ নেই, রোগাক্রান্তের জন্য কোন দোষ নেই এবং তোমাদের নিজদের জন্যও কোন দোষ নেই। সূরা নূর: ৬১

এখানে প্রতিবন্ধীদের প্রতি দয়া ও সহনশীলতার শিক্ষা রয়েছে।

১. দুর্বলদের জন্য দোয়া ও ভালোবাসা:

রাসুলুল্লাহ ﷺ দুর্বল ও অক্ষম মানুষের প্রতি বিশেষভাবে সহানুভূতিশীল ছিলেন। তিনি সাহাবিদেরকে সর্বদা তাদের প্রতি উত্তম আচরণ করার উপদেশ দিতেন।

জুবায়র ইবনু নুফাইল আল-হাদরামী (রহঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি আবূ দারদা (রাঃ)-কে বলতে শুনেছেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছিঃ তোমরা দুর্বল লোকদের খোঁজ করে আমার কাছে নিয়ে এসো। কেননা তোমরা তোমাদের মধ্যকার দুর্বল লোকদের ওয়াসিলায় রিযিক এবং সাহায্য প্রাপ্ত হয়ে থাকো। সুনানে আবু দাউদ : ২৫৯৪

এই হাদিসটি বাবা-মায়ের জন্য এক বার্তা যে, তাদের দুর্বল সন্তানের প্রতি যত্নশীল হওয়া তাদের দুনিয়া ও আখিরাতে কল্যাণের কারণ হবে।

২. শারীরিক আঘাত থেকে বিরত থাকা:

ইসলামে যেকোনো ধরনের শারীরিক আঘাত থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে, বিশেষ করে যারা নিজেদের রক্ষা করতে অক্ষম তাদের ক্ষেত্রে। বাবা-মায়ের উচিত তাদের প্রতিবন্ধী সন্তানকে কোনো ধরনের শারীরিক বা মানসিক আঘাত দেওয়া থেকে বিরত থাকা। প্রতিবন্ধী সন্তানরা ছোটদের মতো, তাদের প্রতি বিশেষ দয়া ও ভালোবাসার প্রয়োজন।

৩. মানসিক যত্ন ও উৎসাহ:

শারীরিক যত্নের পাশাপাশি তাদের মানসিক যত্ন নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। তাদের প্রতি কোনো ধরনের অবজ্ঞা বা তাচ্ছিল্য করা উচিত নয়। বরং তাদের দক্ষতা ও সামর্থ্যের ভিত্তিতে তাদের উৎসাহিত করা উচিত। রাসুলুল্লাহ ﷺ সর্বদাই তার আশেপাশের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রতি সহানুভূতিশীল ও শ্রদ্ধাশীল ছিলেন।

প্রতিবন্ধী সন্তানের সাথে উত্তম ব্যবহার করা বাবা-মায়ের একটি মানবিক এবং ধর্মীয় দায়িত্ব। এই দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে বাবা-মায়ের ধৈর্য, ত্যাগ এবং আল্লাহর প্রতি তাদের বিশ্বাস প্রতিফলিত হয়। কুরআন ও হাদিসের আলোকে এটা স্পষ্ট যে, প্রতিবন্ধী সন্তানরা আল্লাহর এক বিশেষ আমানত এবং তাদের যত্ন নেওয়া, তাদের ভালোবাসা ও সম্মান করা, এবং তাদের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রতিটি মুসলিম বাবা-মায়ের জন্য এক মহৎ ইবাদত।

সন্তানদেরকে ঘরের কাজকর্মে অভ্যস্ত করা

ইসলাম সন্তানদেরকে ঘরের কাজকর্মে অভ্যস্ত করার বিষয়ে উৎসাহিত করে। এটি কেবল পারিবারিক দায়িত্ববোধ তৈরি করে না, বরং এটি নৈতিক ও চারিত্রিক গুণাবলীরও অংশ। সরাসরি নির্দেশ না থাকলেও, কুরআন ও হাদিসের শিক্ষা থেকে এই অভ্যাসের গুরুত্ব বোঝা যায়।

ঘরের কাজকর্মে সন্তানদের অভ্যস্ত করার বিষয়টি মূলত নৈতিক শিক্ষা, পারস্পরিক সহযোগিতা ও বিনয়ের ইসলামী মূলনীতিগুলোর ওপর প্রতিষ্ঠিত। কুরআন ও হাদিসে সাধারণভাবে একে অপরের প্রতি সহযোগিতার গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ঘরের কাজও এর বাইরে নয়। আল্লাহ্ তা’আলা বলেন,

وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَىٰ وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ

তোমরা সৎকর্ম ও আল্লাহভীতির ব্যাপারে একে অপরের সহযোগিতা করো, এবং পাপ ও সীমালঙ্ঘনের ব্যাপারে একে অপরের সহযোগিতা করো না।” সূরা মায়েদা : ২

যদিও আয়াতটি ব্যাপক অর্থে, তবে এর একটি ক্ষুদ্র প্রয়োগ হলো পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ঘরের কাজে সহযোগিতা করা, যা একটি ‘সৎকর্ম’ (বিরর)।

আসওয়াদ (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ’আয়িশাহ (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলামঃ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ গৃহে কী কাজ করতেন? তিনি বললেনঃ তিনি পারিবারিক কাজ-কর্মে ব্যস্ত থাকতেন। যখন সালাতের সময় উপস্থিত হত, তখন উঠে সালাতে চলে যেতেন। সহিহ বুখারি : ৬৭৬, ৬০৩৯

নবীজীর এই আদর্শ (সুন্নাহ) আমাদের শেখায় যে ঘরের কাজ করা কোনো অসম্মানের কাজ নয়; বরং এটি বিনয় ও সহযোগিতার পরিচায়ক। সন্তানদের জন্য এটি একটি উত্তম উদাহরণ।

আল্লাহ্ তা’আলা মা-বাবার প্রতি সদ্ব্যবহারের (ইহসান) নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ্ বলেন-

وَقَضَىٰ رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا

আর তোমার প্রতিপালক আদেশ করেছেন যে, তোমরা তাঁকে ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করো না এবং তোমরা মা-বাবার প্রতি সদ্ব্যবহার করো।” সূরা ইসরা : ২৩

ইসলামী শিক্ষা অনুযায়ী, সন্তানদেরকে ঘরের কাজকর্মে অভ্যস্ত করা একটি গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক প্রশিক্ষণ। এর মাধ্যমে তাদের মধ্যে দায়িত্ববোধ, বিনয়, সহযোগিতা, এবং মা-বাবার প্রতি ইহসান ও সেবা করার গুণাবলী তৈরি হয়, যা তাদেরকে সমাজের একজন দায়িত্বশীল সদস্য হিসেবে গড়ে তোলে। এই অভ্যাস গড়ে তোলা রাসূল ﷺ-এর সুন্নাহ ও কুরআনের ব্যাপক শিক্ষা, বিশেষত পারস্পরিক সহযোগিতা ও মা-বাবার প্রতি সদ্ব্যবহারের নির্দেশের অন্তর্ভুক্ত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *