সন্তানের অধিকার : তৃতীয় পর্ব

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

সন্তানদের নিয়ে পারিবারিক বৈঠক বা তালিম করা

সন্তানদের জন্য পারিবারিক বৈঠক বা ‘তালিম’ (ইসলামী শিক্ষা সভা)-এর আয়োজন করা মা-বাবার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও অপরিহার্য দায়িত্ব। ইসলাম পরিবারকে প্রথম শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে দেখে। পারিবারিক তালিমের সবচেয়ে বড় ভিত্তি হলো সন্তানদেরকে দ্বীনি জ্ঞান শিক্ষা দেওয়া, যাতে তারা পরকালের কঠিন শাস্তি থেকে রক্ষা পেতে পারে। আল্লাহ তা’আলা মা-বাবাকে তাদের পরিবারকে সঠিক শিক্ষা দিয়ে রক্ষা করার নির্দেশ দিয়েছেন-

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا

“হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করো।” সূরা তাহরীম : ৬

সাহাবীগণ এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন যে, পরিবারকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচানোর অর্থ হলো— তাদেরকে আদব-শিষ্টাচার (আদব) শেখানো এবং ইলম (জ্ঞান) শিক্ষা দেওয়া। পারিবারিক বৈঠক বা তালিম হলো এই জ্ঞান ও শিষ্টাচার দেওয়ার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

১. এটি সালফদের আদর্শ :

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা’আলা একজন নেককার পিতার উদাহরণ পেশ করেছেন, যিনি তাঁর সন্তানকে ব্যক্তিগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ উপদেশ ও নৈতিক শিক্ষা দিয়েছিলেন। এটিই পারিবারিক তালিমের কুরআনিক মডেল। পিতা লুকমান তাঁর পুত্রকে বলেন-

يَا بُنَيَّ لَا تُشْرِكْ بِاللَّهِ ۖ إِنَّ الشِّرْكَ لَظُلْمٌ عَظِيمٌ

“হে আমার বৎস! আল্লাহর সাথে অংশীদার সাব্যস্ত করো না। নিশ্চয়ই শিরক বা অংশীদারিত্ব স্থাপনকারী কাজ মহাপাপ।” সূরা লুকমান : ১৩

এরপর তিনি সালাত কায়েম, সৎকাজে আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ করার মতো মৌলিক নির্দেশ দেন। এই আয়াত প্রমাণ করে যে, পিতা-মাতার দায়িত্ব হলো সন্তানকে নিয়মিতভাবে ইসলামী বিশ্বাস ও নৈতিকতার শিক্ষা দেওয়া।

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) পারিবারিক দায়িত্ব ও সন্তানদের শিক্ষা দেওয়ার গুরুত্বকে বারবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। ইসলামে মা-বাবা তাদের পরিবারের প্রতি দায়িত্বশীল এবং তাদের জবাবদিহি করতে হবে। পারিবারিক তালিমের মাধ্যমে মা-বাবা তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেন।

উমার (রাযি.) হতে বর্ণিত যে, আমি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে বলতে শুনেছি, তোমরা সকলেই দায়িত্বশীল। লায়স ইবনু সা‘দ (রাযি.) আরো অতিরিক্ত বলেন, (পরবর্তী রাবী) ইউনুস (রহ.) বলেছেন, আমি একদা ইবনু শিহাব (রহ.)-এর সঙ্গে ওয়াদিউল কুরা নামক স্থানে ছিলাম। তখন রুযাইক (ইবনু হুকায়ম (রহ.) ইবনু শিহাব (রহ.)-এর নিকট লিখলেন, আপনি কী মনে করেন, আমি কি (এখানে) জুমু‘আহর সালাত আদায় করব? রুযায়ক (রহ.) তখন সেখানে তাঁর জমির কৃষি কাজের তত্ত্বাবধান করতেন। সেখানে একদল সুদানী ও অন্যান্য লোক বাস করত। রুযায়ক (রহ.) সে সময় আইলা শহরের (আমীর) ছিলেন। ইবনু শিহাব (রহ.) তাঁকে জুমু‘আহ কায়িম করার নির্দেশ দিয়ে লিখেছিলেন এবং আমি তাকে এ নির্দেশ দিতে শুনলাম। সালিম (রহ.) তার নিকট বর্ণনা করেছেন যে, ‘আবদুল্লাহ্ ইবনু ‘উমার (রাযি.) বলেন, আমি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে বলতে শুনেছি, তোমরা সকলেই দায়িত্বশীল এবং তোমাদের প্রত্যেককেই অধীনস্থদের (দায়িত্ব) সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করা হবে। ইমাম* একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি, তাঁকে তাঁর অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে। পুরুষ তার পরিবার বর্গের অভিভাবক, তাকে তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে। নারী তার স্বামী-গৃহের কর্ত্রী, তাকে তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে। খাদিম তার মনিবের ধন-সম্পদের রক্ষক, তাকেও তার মনিবের ধন-সম্পদ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে। ইবনু ‘উমার (রাযি.) বলেন, আমার মনে হয়, রাসূলূল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেনঃ পুত্র তার পিতার ধন-সম্পদের রক্ষক এবং এগুলো সম্পর্কে তাকে জিজ্ঞেস করা হবে। তোমরা সবাই দায়িত্বশীল এবং সবাইকে তাদের অর্পিত দায়িত্ব সম্পর্কে প্রশ্ন করা হবে। সহহি বুখারি : ৮৯৩, ২৪০৯, ২৫৫৪, ২৫৫৮, ২৭৫১, ৫১৮৮, ৫৬০০, ৭১৩৮

তালিমের মাধ্যমে মা-বাবা প্রমাণ করতে পারেন যে, তারা সন্তানের ঈমান ও নৈতিকতার বিষয়ে সচেতন ছিলেন। পারিবারিক তালিমের মাধ্যমে সন্তানদেরকে যে শিষ্টাচার শিক্ষা দেওয়া হয়, তা তাদের ভবিষ্যতের জন্য সবচেয়ে মূল্যবান উপহার। তালিমের বৈঠকগুলোতে কেবল কুরআন-হাদিসের আলোচনাই হয় না, বরং সেখানে বসার আদব, কথা বলার শিষ্টাচার এবং পারিবারিক হৃদ্যতাও তৈরি হয়।

বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর যে তিনটি জিনিস মানুষের জন্য উপকার দেয়, তার মধ্যে অন্যতম হলো সৎ সন্তান। পারিবারিক তালিমের মাধ্যমে সন্তানরা সৎ ও নেককার হিসেবে গড়ে ওঠে, ফলে সে মা-বাবার জন্য দোয়া করে এবং তা মা-বাবার জন্য সদকায়ে জারিয়া হিসেবে গণ্য হয়।

২. মা-বাবার উচিত পারিবারিক তালিমের ব্যবস্থা করা

মা-বাবার উচিত প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট সময়ে তালিমের আয়োজন করলে সন্তানেরা সেই সময়ে দ্বীনি জ্ঞান অর্জনকে গুরুত্ব দিতে শিখবে। যার ফলে, সন্তানরা তাদের মনে আসা দ্বীন ও দুনিয়ার বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্ন করার সুযোগ পায়, ফলে তাদের ভুল ধারণা দূর হয়। মা-বাবা নিজেরা যখন কুরআনের আয়াত বা হাদিসের ব্যাখ্যা দেন, তখন তারা সন্তানের কাছে ধর্মীয় আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। এটি পরিবারে এক ধরনের আধ্যাত্মিক বন্ধন তৈরি করে, যেখানে সবাই আল্লাহর জন্য একত্রিত হয়।

ধনী-গরীব সকল আত্মীয়দের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়া

সন্তানদেরকে ধনী-গরীব নির্বিশেষে সকল আত্মীয়-স্বজনের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়া এবং তাদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখার শিক্ষা দেওয়া মা-বাবার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইসলামী ও নৈতিক দায়িত্ব। ইসলামে এটিকে সিলাতুর রাহিম (রক্তের সম্পর্ক রক্ষা করা) নামে অভিহিত করা হয়েছে, যা ঈমানের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত এবং এর গুরুত্ব কুরআন ও হাদিসে বারবার উল্লিখিত হয়েছে।

১. আত্মীয়ের হক এবং আল্লাহর ভয়

পবিত্র কুরআন আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করাকে কঠোরভাবে নিষেধ করেছে এবং তা রক্ষা করার জন্য মুমিনদেরকে নির্দেশ দিয়েছে। এই নির্দেশ সকল আত্মীয়ের জন্য প্রযোজ্য, তাদের আর্থিক অবস্থা নির্বিশেষে। আল্লাহ তা’আলা মুমিনদেরকে আত্মীয়দের হক আদায় করার জন্য এবং সম্পর্ক ছিন্ন করা থেকে বিরত থাকতে নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি ইরশদ করেন-

وَاتَّقُوا اللّٰہَ الَّذِیۡ تَسَآءَلُوۡنَ بِہٖ وَالۡاَرۡحَامَ ؕ اِنَّ اللّٰہَ کَانَ عَلَیۡکُمۡ رَقِیۡبًا

আর ভয় কর রক্ত-সম্পর্কিত আত্মীয়ের ব্যাপারে। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের উপর পর্যবেক্ষক। সূরা নিসা : ১

এই আয়াতে ‘আল-আরহাম’ (আত্মীয়তা) রক্ষার বিষয়টি আল্লাহর তাকওয়ার সাথে যুক্ত করা হয়েছে। মা-বাবার দায়িত্ব হলো সন্তানদেরকে শৈশব থেকেই এই ‘আরহাম’-এর পরিচয় করিয়ে দেওয়া এবং তাদের হক আদায়ে অভ্যস্ত করা।

২. আত্মীয়দের প্রতি সদ্ব্যবহারের আদেশ

আল্লাহ তা’আলা স্পষ্টত আত্মীয়দের প্রতি সদ্ব্যবহারের (ইহসান) আদেশ দিয়েছেন, যেখানে ধনী-গরীবের কোনো ভেদাভেদ নেই। তিনি ইরশাদ করেন-

وَاعْبُدُوا اللَّهَ وَلَا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا ۖ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا وَبِذِي الْقُرْبَىٰ

“আর তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো এবং তাঁর সাথে কাউকে শরিক করো না। পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করো এবং নিকটাত্মীয়দের সাথেও। সূরা নিসা : ৩৬

এই আয়াত অনুযায়ী, নিকটাত্মীয়দের হক পিতা-মাতার পরেই এসেছে। সন্তানকে তাদের আত্মীয়দের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়া এবং তাদের প্রতি সদ্ব্যবহার শেখানো মা-বাবার ইবাদতের অংশ।

২. আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করার গুরুত্ব

হাদিসে আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করার বিপুল ফজিলত বর্ণনা করা হয়েছে এবং এর গুরুত্ব ঈমানের মানদণ্ড হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তাই এ সম্পর্কিত হাদিস উল্লেখ কর সন্তানকে শিক্ষা প্রদান করা। যেমন-

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি আল্লাহ্ ও শেষ দিনে বিশ্বাস রাখে, সে যেন তার মেহমানকে সম্মান করে। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ্ ও শেষ দিনে বিশ্বাস রাখে, সে যেন তার রক্তের সম্পর্ক বজায় রাখে। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ্ ও শেষ দিনে বিশ্বাস রাখে, সে যেন কল্যাণকর কথা বলে, অথবা চুপ থাকে। সহীহ বুখারী ৫১৮৫, ৬১৩৮

এই হাদিস অনুযায়ী, মা-বাবার দায়িত্ব হলো সন্তানদেরকে ছোটবেলা থেকেই এই সম্পর্ক রক্ষায় প্রশিক্ষণ দেওয়া, যাতে তারা পূর্ণাঙ্গ মুমিন হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। এর অর্থ হলো, কেবল ধনী বা প্রভাবশালী আত্মীয় নয়, বরং দরিদ্র ও দুর্বল আত্মীয়দের সাথেও সম্পর্ক রাখতে শেখানো।

আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি চায় যে, তার রিযক প্রশস্ত হোক এবং আয়ু বর্ধিত হোক, সে যেন তার আত্মীয়তার বন্ধন অক্ষুণ্ণ রাখে।  সহিহ বুখারি : ২০৬৭, ৫৯৮৬

মা-বাবার উচিত সন্তানকে বোঝানো যে, আত্মীয়দের সাথে সুসম্পর্ক স্থাপন আল্লাহর সন্তুষ্টি ও দুনিয়ার বরকতের চাবিকাঠি। গরিব আত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক রাখা বা তাদের সাহায্য করা এই বরকত এনে দেয়।

৩. ধনী-গরীবের পার্থক্য দূর করা

সন্তানকে সকল আত্মীয়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়া এবং মিশতে শেখানো একটি গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক শিক্ষা, যা সন্তানকে প্রকৃম মুসলিম হতে সাহায্য করে। যেনম-

অহংকার দূরীকরণ:

সন্তানকে শেখানো যে, আত্মীয়তার বন্ধন রক্তের উপর প্রতিষ্ঠিত, সম্পদের উপর নয়। ধনী আত্মীয়দের প্রতি আসক্তি এবং গরিব আত্মীয়দের প্রতি তাচ্ছিল্য অহংকার তৈরি করে, যা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।

সহানুভূতি সৃষ্টি:

গরিব আত্মীয়দের সাথে মিশলে শিশুরা সমাজে মানুষের দুঃখ-কষ্ট সম্পর্কে জানতে পারে এবং তাদের মধ্যে সহানুভূতি (দয়া) ও ত্যাগের মনোভাব সৃষ্টি হয়।

ন্যায়বিচার:

মা-বাবার উচিত, সকল আত্মীয়ের সাথে সমানভাবে যোগাযোগ রাখা এবং তাদের প্রাপ্য সম্মান দেওয়া। সন্তান যখন দেখবে যে তার মা-বাবা বিত্তহীন চাচা বা দরিদ্র খালাকে একই আন্তরিকতা ও সম্মানের সাথে গ্রহণ করছে, তখন সেও এই ন্যায়পরায়ণতা শিখবে।

সুতরাং, সন্তানদেরকে ধনী-গরীব নির্বিশেষে সকল আত্মীয়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়া এবং সম্পর্ক রক্ষা করতে শেখানো মা-বাবার ঈমানী দায়িত্ব। এটি কেবল পারিবারিক বন্ধন নয়, বরং ঈমান, তাকওয়া ও সামাজিক সাম্যের ভিত্তি স্থাপন করে।

পরিবারের সাথে সময় কাটানো

পরিবারের সাথে সময় কাটানো শুধু একটি সামাজিক রীতি নয়, বরং এটি ইসলামে মা-বাবার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বীনি দায়িত্ব হিসেবে গণ্য। ইসলামে পরিবারকে সবচেয়ে নিরাপদ ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখা হয়, আর এই বন্ধনকে মজবুত করার জন্য সময় দেওয়া অপরিহার্য। কুরআন মাজীদে পরিবারকে মানসিক শান্তি ও নির্ভরতার উৎস হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। মা-বাবা যখন সময় দেন, তখনই এই শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়।

১. মানসিক শান্তি ও ভালোবাসা সৃষ্টি

আল্লাহ তা’আলা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন, যা পারিবারিক বন্ধনের ভিত্তি। এই বন্ধন সময়ের মাধ্যমেই প্রকাশ পায় ও মজবুত হয়। আল্লাহ তা’আলা বলেন:

وَمِنْ آيَاتِهِ أَنْ خَلَقَ لَكُم مِّنْ أَنفُسِكُمْ أَزْوَاجًا لِّتَسْكُنُوا إِلَيْهَا وَجَعَلَ بَيْنَكُم مَّوَدَّةً وَرَحْمَةً

“আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে অন্যতম হলো, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকে সৃষ্টি করেছেন তোমাদের স্ত্রীদেরকে, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি লাভ করো এবং তোমাদের মধ্যে সৃষ্টি করেছেন ভালোবাসা ও দয়া।” সূরা রূম : ২১

মা-বাবার জন্য এই প্রশান্তি কেবল তখনই সম্ভব, যখন তারা পরস্পরের সাথে এবং সন্তানদের সাথে গুণগত সময় কাটান। পরিবারের সদস্যদের উপেক্ষা করে এই ‘মাদদাহ’ বা ভালোবাসা ধরে রাখা যায় না।

২. সময় দেওয়া ও ব্যয় করা ইবাদতের অংশ

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) পরিবারকে সময় দেওয়ার বিষয়টি এমনভাবে দেখিয়েছেন যে, এর মাধ্যমে কেবল সম্পর্কই মজবুত হয় না, বরং তা আল্লাহর কাছে প্রতিদানযোগ্য (সওয়াব) কাজে পরিণত হয়। রাসূল (সাঃ)-এর মতে, যারা পরিবারের জন্য সময় ও সম্পদ ব্যয় করেন, তারাই শ্রেষ্ঠ।

আয়িশাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমাদের মাঝে সে-ই ভাল যে তার পরিবারের নিকট ভাল। আর আমি আমার পরিবারের নিকট তোমাদের চাইতে উত্তম। আর তোমাদের কোন সঙ্গী মৃত্যুবরণ করলে তার সমালোচনা পরিত্যাগ করো। সুনানে তিরমিজি : ৩৮৯৫, সহীহাহ : ২৮৫

পরিবারের প্রতি উত্তম আচরণ এবং তাদের সাথে সময় কাটানো রাসূল (সাঃ)-এর সুন্নাহ। মা-বাবাকে তাদের সন্তানদের জন্য সময় বরাদ্দ করতে হবে।

২. পরিবারের জন্য খরচ, উত্তম খরচ:

পরিবারের জন্য খরচ করা অর্থকেও রাসূল (সাঃ) সর্বোত্তম সদকা হিসেবে গণ্য করেছেন।

আবূ মাস‘ঊদ (রাযি.) হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, মানুষ স্বীয় পরিবার-পরিজনের জন্য পুণ্যের আশায় যখন ব্যয় করে তখন সেটা তার জন্য সাদাকা হয়ে যায়। সহহি বুখারি : ৫৫, ৪০০৬, ৫৩৫১

৩. শিশুদের সাথে কোমল আচরণ ও খেলাধুলা

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তাঁর নাতি-নাতনিদের সাথে খেলাধুলা করে, আদর করে এবং হাসিমুখে সময় কাটাতেন। এটা দেখায় যে, শিশুদের সাথে তাদের মনমতো সময় কাটানোও মা-বাবার দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত।

৫৯৯৭. আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদা হাসান ইবনু ’আলীকে চুম্বন করেন। সে সময় তাঁর নিকট আকরা’ ইবনু হাবিস তামীমী উপবিষ্ট ছিলেন। আকরা’ ইবনু হাবিস বললেনঃ আমার দশটি পুত্র আছে, আমি তাদের কাউকেই কোন দিন চুম্বন দেইনি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর পানে তাকালেন, অতঃপর বললেনঃ যে দয়া করে না, সে দয়া পায় না। সহিহ বুখারি : ৫৯৯৭, সহিহ মুসলিম : ২৩১৮, আহমাদ : ৭২৯৩

পরিবারের সাথে সময় কাটালে এই দয়া, মমতা ও ভালোবাসা প্রকাশ পায়, যা সন্তানের মানসিক বিকাশের জন্য অত্যন্ত জরুরি।

উপসংহার : পরিবারের সাথে সময় কাটানো হলো সন্তানের প্রতি মা-বাবার আমলের একটি অংশ। এই সময় দেওয়ার মাধ্যমে মা-বাবার ঈমানী দায়িত্ব পালন করে পরিবারকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করেন। সদকায়ে জারিয়া-এর পথ প্রশস্ত করেন, কারণ সৎ সন্তান তৈরি হয় পারিবারিক শিক্ষার মাধ্যমে। 

পারিবারিক প্রশান্তি এবং ভালোবাসা (মাদদাহ ও রাহমাহ) প্রতিষ্ঠা করেন।

কাজেই মা-বাবার কর্তব্য হলো জাগতিক ব্যস্ততার মাঝেও সচেতনভাবে পরিবারের জন্য সময় বরাদ্দ করা এবং রাসূল (সাঃ)-এর আদর্শ অনুসরণ করে পরিবারের কাছে উত্তম ব্যক্তি হওয়া।

সন্তানদের নিয়ে স্কলারদের ভিডিও উপভোগ করা

পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ইসলামী স্কলারদের ভিডিও বা লেকচার উপভোগ করা মা-বাবার একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব, যা আধুনিক যুগে সন্তানদেরকে সঠিক পথে পরিচালিত করার একটি কার্যকর মাধ্যম। ইসলামের দৃষ্টিতে এর গুরুত্ব অপরিসীম, কারণ এটি সরাসরি জ্ঞানার্জন (ইলম) এবং সৎ উপদেশ (তা’লীম) প্রদানের সাথে সম্পর্কিত।

কুরআন ও হাদিসে জ্ঞান অর্জন এবং পরিবারকে নৈতিক শিক্ষা দেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। স্কলারদের ভিডিও দেখা সেই শিক্ষাদানেরই অংশ।

আধুনিক যুগে স্কলারদের ভিডিও বা লেকচার দেখা এই সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় ইসলামী জ্ঞান (ইলম) অর্জনের একটি সহজ উপায়। স্কলারদের আলোচনায় জীবন ঘনিষ্ঠ বিষয়াদি, নৈতিকতা ও শিষ্টাচার উঠে আসে, যা শিশুদের চারিত্রিক গঠনে সাহায্য করে।

মা-বাবা যখন সন্তানদের নিয়ে একসাথে কোনো দ্বীনি আলোচনা শোনেন, তখন পরিবারে একটি আধ্যাত্মিক ও আদর্শিক বন্ধন তৈরি হয়। এটি সন্তানদেরকে আধুনিক সমাজের নানা প্রলোভন থেকে দূরে থাকতে সাহায্য করে। সন্তান যদি স্কলারদের বক্তব্য শুনে নেককার হিসেবে গড়ে ওঠে এবং আমল করে, তবে তাদের মা-বাবার জন্য তা সদকায়ে জারিয়া (অবিচ্ছিন্ন সদকা) হিসেবে গণ্য হতে পারে  সহীহ মুসলিম, : ১৬৩১

১. বর্তমান জামানার বিশ্বখ্যাত ইসলামী স্কলারদের উদাহরণ

বিশ্বজুড়ে বর্তমানে অনেক স্কলার আছেন, যাদের শিক্ষামূলক আলোচনা ইউটিউব বা অন্যান্য মাধ্যমে সহজলভ্য:

ডা. জাকির নায়েক: তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব ও যুক্তিভিত্তিক আলোচনার জন্য বিখ্যাত।

ড. বিলাল ফিলিপস: ইসলামি অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য পরিচিত।

মুফতি ইসমাইল মেনক: সহজবোধ্য ভাষায় সামাজিক সমস্যা ও ব্যক্তিগত উন্নয়ন নিয়ে আলোচনার জন্য জনপ্রিয়।

শাইখ ইয়াসির ক্বাদি: ইসলামী ইতিহাস ও ফিকহ নিয়ে গভীর আলোচনার জন্য সুপরিচিত।

শাইখ আব্দুল নাসির জাংদা: তরুণদের কাছে জনপ্রিয় একজন বক্তা, যিনি আধুনিক প্রেক্ষাপটে ইসলামী জীবনযাপন নিয়ে আলোচনা করেন।

ড. ওমর সুলেইমান: সামাজিক ন্যায়বিচার ও রাসূল (সাঃ)-এর জীবনী নিয়ে আলোচনার জন্য পরিচিত।

২. বাংলাদেশের প্রখ্যাত ইসলামী স্কলারদের উদাহরণ

বাংলাদেশেও অনেক স্বনামধন্য আলেম রয়েছেন, যাদের আলোচনা পারিবারিক তালিমের জন্য উপযোগী:

প্রফেসর ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর (রহ.): তিনি ছিলেন কুরআন-হাদিসের গবেষণামূলক ও ভারসাম্যপূর্ণ আলোচনার জন্য সুপরিচিত।

ডক্টর আবু বক্কর জাকারিয়া : একজন তাফসির কারন। আকিদাও মানহান গবেষক।

শাইখ আহমাদুল্লাহ: তরুণ প্রজন্মের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং সামাজিক মাধ্যমে সক্রিয়।

ড. মুহাম্মদ সাইফুল্লাহ: সহজ ভাষায় এবং রেফারেন্সভিত্তিক আলোচনার জন্য পরিচিত।

ড. মনজুরে ইলাহী: তুলনামূলক ফিকহ ও মৌলিক ইসলামী জ্ঞান নিয়ে আলোচনা করেন।

ড. আসাদুল্লাহ আল-গালিব: আহলে হাদিস আন্দোলনের একজন উল্লেখযোগ্য স্কলার, হাদিসের ব্যাখ্যায় জোর দেন।

মাওলানা মিজানুর রহমান আযহারী: তার আলোচনা যুবসমাজের মধ্যে অত্যন্ত জনপ্রিয়।

মা-বাবার উচিত নিজেদের সন্তানের বয়স ও প্রয়োজন অনুযায়ী স্কলারদের বক্তব্য নির্বাচন করা এবং একসাথে বসে তা নিয়ে আলোচনা করা।

সন্তানদেরকে ‘ইসলামোফোবিয়া’ বা ইসলামভীতি সম্পর্কে সতর্ক করা

সন্তানদেরকে ‘ইসলামোফোবিয়া’ (Islamophobia) বা ইসলামভীতি সম্পর্কে সতর্ক করা মা-বাবার একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। এর উদ্দেশ্য হলো, যেন তারা সঠিক ইসলামী শিক্ষা ও মূল্যবোধ থেকে দূরে সরে না যায় এবং ইসলাম সম্পর্কে সমাজে প্রচলিত ভুল ধারণা বা বিদ্বেষপূর্ণ প্রচারণাকে সত্য বলে মেনে না নেয়। ইসলামের দৃষ্টিতে এই বিষয়টি কেন গুরুত্বপূর্ণ, তা নিচে আলোচনা করা হলো:

১. ঈমান ও আত্মমর্যাদা রক্ষা

ইসলামোফোবিয়া হলো ইসলাম, মুসলিম বা ইসলামী সংস্কৃতির প্রতি বিদ্যমান ভয়, ঘৃণা বা কুসংস্কার। এই বিদ্বেষ যখন সমাজে ব্যাপক হয়, তখন তা মুসলমানদের ঈমান ও আত্মমর্যাদার ওপর আঘাত করে।

ক. আল্লাহর পথে অবিচল থাকা

মা-বাবার প্রধান দায়িত্ব হলো সন্তানদেরকে তাওহীদের উপর অটল থাকতে শেখানো। ইসলামোফোবিয়া সাধারণত মুসলিমদের দুর্বলতা, পশ্চাৎপদতা বা সন্ত্রাসী হিসেবে চিত্রিত করে, যা অনেক সময় তরুণদের মধ্যে ইসলামের প্রতি দ্বিধা বা হীনমন্যতা সৃষ্টি করে।

আল্লাহ তা’আলা মুমিনদেরকে সকল পরিস্থিতিতে সত্যের উপর অবিচল থাকতে নির্দেশ দিয়েছেন-

فَاسْتَمْسِكْ بِالَّذِي أُوحِيَ إِلَيْكَ ۖ إِنَّكَ عَلَىٰ صِرَاطٍ مُّسْتَقِيمٍ

“অতএব, আপনার প্রতি যা ওহী করা হয়, তা দৃঢ়ভাবে ধরুন। নিশ্চয়ই আপনি সরল পথেই আছেন।” সূরা আয-যুখরুফ, : ৪৩

মা-বাবার উচিত সন্তানদেরকে এই বিশ্বাসে বলীয়ান করা যে, তারা যেন কোনো বহিরাগত প্রোপাগান্ডার কারণে সঠিক ইসলাম থেকে সরে না যায়।

খ. হীনমন্যতা থেকে মুক্তি

ইসলামোফোবিয়া দ্বারা প্রভাবিত হয়ে অনেক সন্তান নিজেদের ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে লজ্জিত হতে পারে বা ইসলামের কিছু বিধান (যেমন: পর্দা, হালাল-হারাম) মানতে দ্বিধাগ্রস্ত হতে পারে। মা-বাবার উচিত তাদের মধ্যে ইসলামী মূল্যবোধের প্রতি গর্ব এবং আত্মমর্যাদা তৈরি করা।

২. জ্ঞানার্জন ও অজ্ঞতা দূরীকরণ

ইসলামোফোবিয়ার মূল কারণ হলো ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞতা ও ভুল তথ্য। এর মোকাবিলায় সন্তানদেরকে গভীর ও সঠিক ইসলামী জ্ঞানের মাধ্যমে সজ্জিত করা মা-বাবার কর্তব্য।

ক. সঠিক জ্ঞান দ্বারা ভুল ধারণা প্রতিহত করা

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) জ্ঞান অর্জনকে প্রত্যেক মুসলমানের উপর ফরয করেছেন। সন্তানদেরকে যদি ইসলামের সঠিক ইতিহাস, মানবিক শিক্ষা এবং জিহাদ, নারীর অধিকার বা শান্তির প্রকৃত ধারণা সম্পর্কে শিক্ষিত করা হয়, তবে তারা ইসলামোফোবিক প্রচারণার যুক্তি দিয়ে মোকাবিলা করতে পারবে।

আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলিমের উপর ফারয। অপাত্রে জ্ঞান দানকারী শুকরের গলায় মণিমুক্তা ও সোনার হার পরানো ব্যাক্তির সমতুল্য। সুনানে ইবনে মাজাহ : ২২৪

স্কলারদের ভিডিও (যা পূর্বের উত্তরে উল্লিখিত) বা পারিবারিক তালিমের মাধ্যমে মা-বাবা সন্তানদেরকে শেখাতে পারেন যে, উগ্রবাদ বা সন্ত্রাসবাদ ইসলাম ধর্ম সমর্থন করে না, বরং এগুলো ইসলামের মূল শিক্ষার বিপরীত।

খ. মধ্যমপন্থা অবলম্বন

ইসলাম চরমপন্থাকে প্রত্যাখ্যান করে এবং মধ্যমপন্থা (আল-ওয়াসাতিয়্যাহ) অবলম্বনের নির্দেশ দেয়। ইসলামোফোবিয়া সাধারণত দুই ধরনের চরমপন্থার কারণে সৃষ্টি হয়: হয় মুসলিমদের পক্ষ থেকে আসা উগ্রবাদ, নয়তো পশ্চিমা মিডিয়ার নেতিবাচক প্রচার। মা-বাবার উচিত সন্তানকে এই দুই চরমপন্থা থেকে দূরে থেকে সহিষ্ণু ও ভারসাম্যপূর্ণ ইসলাম শেখানো।

আল্লাহ তা’আলা মুমিনদেরকে মধ্যপন্থী উম্মত হিসেবে সৃষ্টি করেছেন:

وَكَذَٰلِكَ جَعَلْنَاكُمْ أُمَّةً وَسَطًا لِّتَكُونُوا شُهَدَاءَ عَلَى النَّاسِ

“আর এভাবেই আমি তোমাদেরকে এক মধ্যপন্থী জাতি করেছি, যাতে তোমরা মানবজাতির উপর সাক্ষী হও।” সূরা বাকারা : ১৪৩

৩. উত্তম আচরণ ও দাওয়াহ

ইসলামোফোবিয়ার মোকাবিলায় সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র হলো উত্তম চরিত্র ও ব্যবহার। মা-বাবার উচিত সন্তানদেরকে এমনভাবে গড়ে তোলা, যেন তাদের আচরণই ইসলামের সৌন্দর্য তুলে ধরে।

ক. উত্তম চরিত্রের আদর্শ

ইসলামোফোবিয়ার জবাব ঘৃণার মাধ্যমে নয়, বরং নম্রতা, বিনয় এবং উত্তম ব্যবহারের মাধ্যমে দিতে শেখাতে হবে।

আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন:

إِنَّمَا بُعِثْتُ لِأُتَمِّمَ مَكَارِمَ الْأَخْلَاقِ

“নিশ্চয়ই আমি উত্তম চরিত্রের পূর্ণতা সাধনের জন্যই প্রেরিত হয়েছি।” মুসনাদে আহমাদ : ৮৯৮৫, আল-হাকিম, আল-মুস্তাদরাক :: ৪২২১,  আল-বায়হাকি, শু’আবুল ঈমান : ২০৯৫৮

মা-বাবার কর্তব্য হলো সন্তানকে সমাজের অন্য ধর্ম বা গোষ্ঠীর মানুষের সাথে উত্তম ব্যবহারের মাধ্যমে ইসলামের ইতিবাচক দিক তুলে ধরতে শেখানো। তাদের ব্যক্তিগত জীবনে যেন ইসলামোফোবিয়ার শিকার হয়ে তারা উগ্র প্রতিক্রিয়া না দেখায়, সে বিষয়ে সতর্ক করা উচিত।

গান, কবিতা, গল্প-উপন্যাস, নাটক, সিনেমা এবং বাঙালী কালচারের নামে শিরক থেকে সতর্ক করা

ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে, সন্তানদেরকে গান, কবিতা, গল্প-উপন্যাস, নাটক, সিনেমা এবং বাঙালি সংস্কৃতির নামে প্রচলিত শিরক (শিরক) ও বিদআত (বিদ’আহ) সম্পর্কে সচেতন করা মা-বাবার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঈমানী দায়িত্ব। আধুনিক সংস্কৃতিতে বহু উপাদান রয়েছে যা ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস, বিশেষ করে তাওহীদ (একত্ববাদ)-এর সাথে সাংঘর্ষিক।

কুরআন ও হাদিসের আলোকে এই বিষয়ে মা-বাবার দায়িত্ব নিচে তুলে ধরা হলো:

১. তাওহীদ রক্ষা: শিরকের ভয়াবহতা

ইসলামের মূল ভিত্তি হলো তাওহীদ বা আল্লাহর একত্ববাদ। শিরক হলো এই তাওহীদের সম্পূর্ণ বিপরীত এবং ইসলামে এটি সবচেয়ে বড় গুনাহ (পাপ)। সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এই বিশ্বাসবিরোধী উপাদানগুলো থেকে সন্তানকে রক্ষা করাই মা-বাবার প্রথম দায়িত্ব।

ক. শিরক সবচেয়ে বড় জুলুম

আল্লাহ তা’আলা শিরককে সবচেয়ে বড় জুলুম হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। সন্তানদেরকে এই মৌলিক ধারণাটি ছোটবেলা থেকেই শেখানো উচিত।

আল্লাহ তা’আলা লুকমান (আ.)-এর উপদেশ তুলে ধরে বলেন:

يَا بُنَيَّ لَا تُشْرِكْ بِاللَّهِ ۖ إِنَّ الشِّرْكَ لَظُلْمٌ عَظِيمٌ

“হে আমার বৎস! আল্লাহর সাথে অংশীদার সাব্যস্ত করো না। নিশ্চয়ই শিরক বা অংশীদারিত্ব স্থাপনকারী কাজ মহাপাপ।” (সূরা লুকমান, ৩১:১৩)

সংস্কৃতির নামে শিরকের ধারণাগুলো (যেমন: মূর্তিপূজার গুণগান, কোনো পীর বা ব্যক্তির অলৌকিক ক্ষমতা বা ভাগ্য নির্ধারণের ক্ষমতা বর্ণনা, লৌকিক দেব-দেবীকে মহিমান্বিত করা) সন্তানের মনকে বিষিয়ে তুলতে পারে।

খ. শিরক ক্ষমা হয় না

শিরকের ভয়াবহতা সম্পর্কে কুরআনে কঠোর সতর্কবাণী রয়েছে:

إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَن يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَٰلِكَ لِمَن يَشَاءُ

“নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সাথে শিরক করা ক্ষমা করেন না। এর নিম্ন পর্যায়ের পাপ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন।” (সূরা আন-নিসা, ৪:৪৮)

পারিবারিক তালিমের মাধ্যমে মা-বাবা সন্তানদেরকে সংস্কৃতি ও বিনোদনের আবরণে লুকিয়ে থাকা শিরকের সূক্ষ্ম বিষয়গুলো (যেমন: গানের মাধ্যমে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও কাছে সাহায্য চাওয়া, ভাগ্য গণনার ওপর বিশ্বাস, ইত্যাদি) চিনিয়ে দিতে পারেন।

২. সাংস্কৃতিক মাধ্যমে প্রচলিত শিরক ও বিদআতের উদাহরণ

বাঙালি সংস্কৃতিতে গান, কবিতা, গল্প-উপন্যাস, নাটক ও সিনেমায় নিম্নলিখিত রূপে শিরক বা ইসলাম-বিরোধী বিশ্বাসগুলো মিশে থাকতে পারে:

মাধ্যমশিরকের/বিদআতের ক্ষেত্রব্যাখ্যা
কবিতা/গানলৌকিক দেব-দেবী বা মাজার পূজা: আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কাছে প্রার্থনা করা বা মাজারের অলৌকিক ক্ষমতার গুণকীর্তন।এটি শিরকে আকবর-এর অন্তর্ভুক্ত, কারণ এতে ইবাদত বা প্রার্থনাকে আল্লাহ ছাড়া অন্যের দিকে নিবিষ্ট করা হয়।
গল্প/উপন্যাসভাগ্য গণনা ও কুসংস্কার: হাত দেখা, রাশিফল, অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন সাধু বা পীরের মাধ্যমে ভাগ্য পরিবর্তনের কাহিনি।এটি শিরকে আসগর (ছোট শিরক) বা কুফরের দিকে নিয়ে যেতে পারে। রাসূল (সাঃ) ভাগ্য গণনাকারীর কাছে যেতে নিষেধ করেছেন।
নাটক/সিনেমানারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা ও অশ্লীলতা: ইসলামের পর্দার বিধান লঙ্ঘন ও অনৈতিক সম্পর্ককে স্বাভাবিকভাবে উপস্থাপন।এটি সরাসরি হারাম কাজ এবং নৈতিক অবক্ষয় সৃষ্টি করে। মা-বাবার উচিত এর ক্ষতিকর দিকগুলো সন্তানকে বোঝানো।
বাঙালী কালচারইসলাম-বিরোধী উৎসব: মূর্তিপূজা সংশ্লিষ্ট উৎসব বা অনুষ্ঠানকে সরাসরি সমর্থন ও তাতে অংশগ্রহণ করা।এটি ঈমান ও তাওহীদের সাথে সাংঘর্ষিক, কারণ এতে ইসলাম-বিরোধী বিশ্বাসের প্রতি সমর্থন প্রকাশ পায়।
 

৩. মা-বাবার দায়িত্ব: সচেতনতা ও উত্তম বিকল্প

মা-বাবার দায়িত্ব শুধু শিরক থেকে নিষেধ করাই নয়, বরং উত্তম বিকল্প দিয়ে সন্তানকে সঠিক পথে বিনোদনের ব্যবস্থা করা।

ক. উত্তম আদর্শ শিক্ষা দেওয়া

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন:

الْمَرْءُ عَلَى دِينِ خَلِيلِهِ فَلْيَنْظُرْ أَحَدُكُمْ مَنْ يُخَالِلُ

“মানুষ তার বন্ধুর আদর্শে চলে; অতএব তোমাদের প্রত্যেকে যেন লক্ষ্য করে, সে কার সাথে বন্ধুত্ব করছে।” (সুনান আবূ দাউদ, হাদিস: ৪৮৩৩)

মা-বাবার উচিত সংস্কৃতির মাধ্যমে আসা খারাপ প্রভাব থেকে সন্তানকে রক্ষা করা এবং তাদের বিনোদনের জন্য ইসলামী শিক্ষামূলক কন্টেন্ট (গজল, ইসলামী ইতিহাস, জীবনমুখী কবিতা ইত্যাদি) বেছে নিতে উৎসাহিত করা।

খ. কঠোরভাবে নজরদারি

মা-বাবার দায়িত্ব হলো সন্তানের রাখাল বা রক্ষক হিসেবে তাদের বিনোদন মাধ্যম ও বন্ধুমহলের প্রতি নজর রাখা। রাসূল (সাঃ) বলেছেন: “তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং তোমরা প্রত্যেকেই তোমাদের দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে…” (সহীহ বুখারী, ৮৯৩)।

পারিবারিক তালিম ও আলোচনা সভার মাধ্যমে সন্তানদের সামনে শিরক ও বিদআতের ভয়াবহতা তুলে ধরতে হবে এবং ইসলামী সংস্কৃতির সৌন্দর্য ও পবিত্রতা সম্পর্কে তাদের অবগত করতে হবে। এতে সন্তানরা সচেতনভাবে ক্ষতিকর বিষয়গুলো পরিহার করতে শিখবে।

বিভিন্ন সোস্যাল মিডিয়া সম্পর্কে সতর্ক করা

বর্তমানে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম (যেমন: টেলিভিশন, ফেসবুক, ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম, এক্স ইত্যাদি) প্রায়শই ইসলাম বিরোধী কন্টেন্ট, অশ্লীলতা, বেহায়াপনা ও পর্দার লঙ্ঘনের মতো বিষয়বস্তুতে পূর্ণ থাকে। সন্তানদেরকে এই মাধ্যমগুলোর ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে সতর্ক করা এবং নিয়ন্ত্রণ করা মা-বাবার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঈমানী ও চারিত্রিক দায়িত্ব।

১. পরিবারকে সুরক্ষা ও বেহায়াপনা থেকে বারণ

কুরআন মাজীদে মা-বাবাকে তাদের পরিবারকে আখিরাতের শাস্তি থেকে রক্ষার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং অশ্লীলতা ও বেহায়াপনার পথ পরিহার করতে বলা হয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ার ক্ষতিকর কন্টেন্টগুলো সরাসরি এই জাহান্নামের পথের দিকে পরিচালিত করতে পারে। তাই এগুলো থেকে সন্তানদেরকে রক্ষা করা মা-বাবার প্রত্যক্ষ দায়িত্ব। তাই মা-বাবাকে সন্তানের আখিরাত রক্ষায় সোশ্যাল মিডিয়ার অশ্লীল কনটেন্ট থেকে বাঁচাতে হবে। সোশ্যাল মিডিয়ায় অশ্লীলতা ও বেহায়াপনার ব্যাপকতা নৈতিক অবক্ষয় ঘটায়। ইসলাম সকল প্রকার অশ্লীলতার নিকটবর্তী হতে নিষেধ করে। আল্লাহ তা’আলা বলেন-

وَلَا تَقْرَبُوا الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ

তোমরা প্রকাশ্যে বা গোপনে কোনো অশ্লীল কাজের কাছেও যেয়ো না।” (সূরা আল-আন’আম, ৬:১৫১)

আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন-

إِنَّمَا يَأْمُرُكُم بِالسُّوءِ وَالْفَحْشَاءِ

“শয়তান তোমাদেরকে কেবল মন্দ ও অশ্লীলতার আদেশ দেয়।” সুরা বাকারা : ২৬৯

পর্দার লঙ্ঘন, যৌন উত্তেজক কন্টেন্ট বা বেহায়াপনার দৃশ্য দেখা এই ‘ফাওয়াহিশ’ (অশ্লীল কাজ)-এর অন্তর্ভুক্ত। মা-বাবার উচিত সন্তানকে শেখানো যে, না দেখা ও না শোনাও এই আয়াতেরই অংশ।

২. দৃষ্টি সংযত রাখার নির্দেশ

সোশ্যাল মিডিয়া যখন অনবরত পর্দার লঙ্ঘন ঘটায়, তখন মা-বাবার কর্তব্য হলো সন্তানকে আল্লাহ্‌র নির্দেশ অনুযায়ী দৃষ্টি সংযত রাখতে শেখানো। আল্লাহ তা’আলা বলেন:

قُل لِّلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ ۚ ذَٰلِكَ أَزْكَىٰ لَهُمْ

“মুমিন পুরুষদেরকে বলো, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে। এটাই তাদের জন্য অধিক পবিত্র।” সূরা নূর : ৩০

পর্দার লঙ্ঘিত দৃশ্য সোশ্যাল মিডিয়াতে দেখার কারণে দৃষ্টি সংযত রাখার এই নির্দেশ অমান্য হয়।

.

৩. আমানত হিসেবে সন্তানের সুরক্ষা

মা-বাবা তাদের সন্তানের মানসিক, নৈতিক ও আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য দায়ী। সোশ্যাল মিডিয়া এই উন্নতিকে বাধাগ্রস্ত করলে মা-বাবার অবশ্যই হস্তক্ষেপ করতে হবে। কেননা মা-বাআ  তার সন্তানের প্রতি দায়িত্বশীল, আর এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। সহীহ বুখারী : ৮৯৩

সোশ্যাল মিডিয়ার অপব্যবহার সম্পর্কে মা-বাবা যদি সচেতন না হন এবং নিয়ন্ত্রণ না করেন, তবে এই দায়িত্ব পালনে তারা ব্যর্থ হবেন।

৪. ফিতনা থেকে দূরে থাকা

সোশ্যাল মিডিয়ার ইসলাম বিরোধী বা অশ্লীল কন্টেন্টগুলো হলো এক প্রকার ‘ফিতনা’ (পরীক্ষা বা ফেতনা) যা মানুষকে বিভ্রান্ত করে। রাসূল (সাঃ) ফিতনা থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দিয়েছেন।

আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ অচিরেই এমন ফিতনাহর আত্মপ্রকাশ হবে, যখন উপবিষ্ট ব্যক্তি দণ্ডায়মান ব্যক্তি হতে উত্তম থাকবে। আর দণ্ডায়মান ব্যক্তি তখন চলমান ব্যক্তি হতে উত্তম থাকবে। আর চলমান ব্যক্তি তখন দ্রুতগামী ব্যক্তি হতে ভাল থাকবে। যে ব্যক্তি সে ফিতনায় যখন জড়িয়ে পড়বে তাকে সে ফিতনাহ ধ্বংস করে দিবে। আর যে ব্যক্তি কোন আশ্রয়স্থল পাবে, তার সেটা দ্বারা আশ্রয় নেয়া বাঞ্ছনীয়। সহীহ মুসলিম : ২৮৮৯

মা-বাবার দায়িত্ব হলো সন্তানের মনোযোগকে সোশ্যাল মিডিয়ার ক্ষতিকর ফিতনা থেকে সরিয়ে উপকারী জ্ঞান, যেমন- কুরআনের তেলাওয়াত, ইসলামী স্কলারদের লেকচার বা গঠনমূলক কাজে নিয়োজিত করা।

৫. মা-বাবার করণীয়

মা-বাবার জন্য কেবল নিষেধ করাই যথেষ্ট নয়, বরং এই দায়িত্ব পালনের জন্য নিম্নলিখিত পদক্ষেপ নিতে হবে:

সচেতনতা ও আলোচনা:

সন্তানের সাথে সোশ্যাল মিডিয়ার ক্ষতিকর দিকগুলো নিয়ে খোলামেলা ও বন্ধুত্বপূর্ণ আলোচনা করা।

পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ:

সন্তানদের ইন্টারনেট ব্যবহারের সময়সূচি ও প্ল্যাটফর্মগুলোতে নজরদারি (Parental Control) রাখা।

উত্তম বিকল্প প্রদান: ক্ষ

তিকর বিনোদনের পরিবর্তে ইসলামী শিক্ষামূলক কন্টেন্ট (যেমন: পূর্বের উত্তরে উল্লিখিত স্কলারদের ভিডিও) বা স্বাস্থ্যকর বিনোদন গ্রহণে উৎসাহিত করা।

সন্তানকে সোশ্যাল মিডিয়ার খারাপ প্রভাব থেকে দূরে রাখা মা-বাবার জন্য আল্লাহর দেওয়া আমানত রক্ষারই নামান্তর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *