শিরক ও শিরকের প্রকারভেদ

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

শিরক (شِرۡکَ) একটি আরবি শব্দ যার অর্থ অংশীদার সাব্যস্ত করা, দুই বা ততোধিক শরীকের সংমিশ্রন। কাউকে অপরের অংশীদার বানানো। শাব্দিকভাবে এর দ্বারা এক বা একাধিক কোন কিছুকে সৃষ্টিকর্তারঅস্তিত্ব ও কর্তৃত্বের অংশীদার সাব্যস্ত করাকে বুঝায়। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

اَمۡ لَہُمۡ شِرۡکٌ فِی السَّمٰوٰتِ

অথবা আসমানসমূহে তাদের কোন অংশীদারিত্ব আছে কি? সুরা আহকাব : ৪।

এই আয়াতে মহান আল্লাহর সৃষ্টির কর্তৃত্বে অংশীদার বোঝাতে শিরক শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। আর কখনও দু’জনের মাঝে কোনো বস্তু বণ্টন করা হলে, এক জনকে অন্য জনের শরীক বলা হয়।আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَاَشۡرِکۡہُ فِیۡۤ اَمۡرِیۡۙ

এবং তাকে আমার কাজে অংশী করুন।সুরা ত্বহা : ৩২

এই আয়াতে মুসা (আ.) তার ভাই হারুন আ.) তার নবুয়েত অংশীদার বুঝাতে শিরক শব্দটি ব্যবহার করেছেন।

প্রকৃত পক্ষে, শিরক হলো আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকে উপাস্য হিসেবে নির্ধারিত করা বা তার উপাসনা করা। ‌ইসলামের পরিভাষায় রব ও ইলাহ হিসাবে আল্লাহর সহিত আর কাউকে শরীক সাব্যস্ত করার নামই শিরক। যেমন- 

মুর্তি বা দেবতার পুজা করা, তার সামনে মাথানত করা। আল্লাহ ব্যতীত কারো নিকট দোয়া করা, ফরিয়াদ করা, সাহায্য তলব করা, আশ্রয় প্রার্থনা করা। আল্লাহ ছাড়া অন্যের নিকট রোগ মুক্তির জন্য, বিপদ থেকে উদ্ধারের জন্য, সন্তান কামনায় জন্য নিবেদন পেশ করা।

ইসলামের খাটি অনুসারি মুসলিম হতে হলে আপনাকে অবশ্যই ঈমান আনতে হবে আল্লাহর একত্ববাদের উপর। কারণ একত্ববাদ হচ্ছে ঈমানের মূল ভিত্তি। আর শিরক হচ্ছে এই মূল ভিত্তির বিধ্বংসীকারী মরণাস্ত্র। শিরক অত্যন্ত জঘন্য অপরাধ। মুসলিম জীবনের কোনো অংশে এই শিরক অনুপ্রবেশের সুযোগ নেই। শিরক কারির কোন আমলই কবুল কবে না। কিয়ামতের কঠিন সময় মহান দয়ালু আল্লাহ তায়ালাও শিরক কারিকে পবিত্র করবেন না। শিরকের বিরুদ্ধে মহান আল্লাহর কঠোর অবস্থান তাইতো তিনি নিজেই শিরক খন্ডন করে পবিত্র কুরআনে বলেন,

لَوۡ کَانَ فِیۡہِمَاۤ اٰلِہَۃٌ اِلَّا اللّٰہُ لَفَسَدَتَا ۚ فَسُبۡحٰنَ اللّٰہِ رَبِّ الۡعَرۡشِ عَمَّا یَصِفُوۡنَ

যদি আসমান ও যমীনে আল্লাহ ছাড়া বহু ইলাহ থাকত তবে উভয়ই ধ্বংস হয়ে যেত, সুতরাং তারা যা বলে, আরশের রব আল্লাহ তা থেকে পবিত্র। সুরা আম্বিয়া : ২২

আল্লাহর যুক্তিটি খুবই সুন্দর, সহজ ও সরল  কিন্তু ইহার গভীর তাৎপর্য আছে। শিরককারি মুশরিদের যুক্তি খন্ডনের জন্য আশাকরি এই একটি মাত্র যুক্তিই যথেষ্ট। একজন সাধারন মানুষও মানতে বাধ্য সমগ্র বিশ্ব জাহানের অসংখ্য ও অগণিত সৃষ্টির মধ্যে যদি পারস্পরিক সমঝোতা ও সহযোগিতা প্রতিষ্ঠিত না থাকতো তাহলে এ ব্যবস্থাটি এক মুহূর্তের জন্যও চলতে পারতো না। আর এর জন্য প্রয়োজন হয় একক পরিচালনার ক্ষমতা। সেই কেন্দ্রিয় একক ক্ষমতার, একক মালিক, বিশ্ব জাহানে একক সৃষ্টি কর্তা মহান আল্লা্হ।

মানুষ সৃষ্টিগত ভাবে তাওহীদপন্থি থাকে। শয়তান তার মনে বিভ্রান্তি কালো রেখা একে বিভ্রান্ত করে থাকে এবং এ লক্ষে সে নানান বিভ্রাকর ফাঁদ পাতে। মানুষও তার পাতান ফাঁদে পা দেয়। সে আদম সন্তারকে সহজে ছেড়ে দিবেনা কারণ সে মহান আল্লাহর সামনে ওয়াদা করেছিল, আদম সন্তানকে সে সত্য পথ থেকে বিচ্যুত করবে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

قَالَ فَبِمَاۤ اَغۡوَیۡتَنِیۡ لَاَقۡعُدَنَّ لَہُمۡ صِرَاطَکَ الۡمُسۡتَقِیۡمَ.ثُمَّ لَاٰتِیَنَّہُمۡ مِّنۡۢ بَیۡنِ اَیۡدِیۡہِمۡ وَمِنۡ خَلۡفِہِمۡ وَعَنۡ اَیۡمَانِہِمۡ وَعَنۡ شَمَآئِلِہِمۡؕ وَلَا تَجِدُ اَکۡثَرَہُمۡ شٰکِرِیۡنَ

সে (ইবলিশ) বলল, ‘আপনি আমাকে পথভ্রষ্ট করেছেন, সে কারণে অবশ্যই আমি তাদের জন্য আপনার সোজা পথে বসে থাকব। তারপর অবশ্যই তাদের নিকট উপস্থিত হব, তাদের সামনে থেকে ও তাদের পেছন থেকে এবং তাদের ডান দিক থেকে ও তাদের বাম দিক থেকে। আর আপনি তাদের অধিকাংশকে কৃতজ্ঞ পাবেন না’। সুরা আরাফ : ১৬-১৭

শয়তান তার কুট কৌশল বাস্তবায়নের জন্য শিরককে বাচাই করে নিয়েছে। কারণ শিরক কারির সকল আমল নষ্ট হয়ে যায়।  আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

 قُلۡ هَلۡ نُنَبِّئُكُم بِٱلۡأَخۡسَرِينَ أَعۡمَـٰلاً (١٠٣) ٱلَّذِينَ ضَلَّ سَعۡيُہُمۡ فِى ٱلۡحَيَوٰةِ ٱلدُّنۡيَا وَهُمۡ يَحۡسَبُونَ أَنَّہُمۡ يُحۡسِنُونَ صُنۡعًا (١٠٤)

বল, ‘আমি কি তোমাদেরকে এমন লোকদের কথা জানাব, যারা আমলের দিক থেকে সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্ত’? দুনিয়ার জীবনে যাদের চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে গেছে, অথচ তারা মনে করছে যে, তারা ভাল কাজই করছে’! সুরা কাহফ : ১০৩-১০৪

শয়তান শিরকি আমলগুলি আদম সন্তানের নিকট এমন সুন্দরভাবে উপস্থাপন করে যে কাহারও পক্ষে পরিত্যাক করা সম্ভব হয় না। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

 وَجَدتُّهَا وَقَوۡمَهَا يَسۡجُدُونَ لِلشَّمۡسِ مِن دُونِ ٱللَّهِ وَزَيَّنَ لَهُمُ ٱلشَّيۡطَـٰنُ أَعۡمَـٰلَهُمۡ فَصَدَّهُمۡ عَنِ ٱلسَّبِيلِ فَهُمۡ لَا يَهۡتَدُونَ

আমি তাকে ও তার কওমকে দেখতে পেলাম তারা আল্লাহর পরিবর্তে সূর্যকে সিজদা করছে। আর শয়তান তাদের কার্যাবলীকে তাদের জন্য সৌন্দর্যমন্ডিত করে দিয়েছে এবং তাদেরকে সৎপথ থেকে নিবৃত করেছে, ফলে তারা হিদায়াত পায় না’।৷ সুরা নামল : ২৪

অনেক সময় আদম সন্তান জ্ঞানের অভাবে শিরকি কাজে লিপ্ত হয়। অজ্ঞতা তাকে বুঝতে দেয় না, যে সে শিরক করছে। শয়তানও শিরকি আমলগুলি সাজিয়ে গুছিয়ে সুশোভিত করে তোলে, সে মনে করে আমিতো নেক আমলই করছি। আমার বাপ দাদারা তো এমনটিই করছে। যেমন- ইসলামের দাবিদার একজন মুসলিম, সে তার মৃত পীরের কবরের নিকট সাহায্য চায়, কিয়ামতের কঠিন সময়ে পীরের সুপরিসের আশায় তার কবরে সিজদা দেয়, পীরের কবরের সম্মানের জন্য সেখান থেকে বাহির হওয়ার সময় উল্টা পায়ে বাহির হয়। এসকল শিরকি কাজ করতে নিষেধ করলে, সে শুনেনা কারণ সে এগুলো কে ইবাদাত মনে করে। এক জন কবিরা গুনাকারি পাপ করলে সে পাপকে পাপই মনে করে। আর আশা করা যায় সে হয়ত পাপ থেকে ফিরে আসবে। মহান আল্লাহর নিকট তওবা করবে। শিরকি আমল কারিতে শিরকে পাপই মনে করেনা। সে মনে করে, সে নেক আমল করছে, কাজেই তওবার প্রশ্ন উঠে না। যদি ঐ শিরকি আমল কারির শিরক সম্পর্কে জ্ঞান থাকত, তবে সে এই ক্ষমার অযোগ্য পাপ করিতে কখন সাহস দেখাত না। মনের অজান্তে শিরকি আমল করে ফেললেও সঙ্গে সঙ্গে তওবা করে তাওহীদের দিকে ফিরে আসত। তাই আসুন ক্ষমার অযোগ্য শিরক কি? কত প্রকার? কিভাবে আমাদের গ্রাস করে জানার চেষ্টা করি।

শরীয়তের পরিভাষায় শির্কঃ

আল্লাহর রুববিয়্যাহ (প্রতিপালকে) অথবা তার উলুহিয়্যাহ (ইবাদতে) অথবা আসমা ওয়াস সিফাতে (নির্ধারিত সত্ত্বাবাচক ও গুনবাচক নামে) অংশীদার বা সমকক্ষ নির্ধারণ করা কে শিরক বলে। প্রতিপালন, আইন, বিধান ও ইবাদতের ক্ষেত্রে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব ও একচ্ছত্র অধিকারে কাউকে শরীক করা বা অংশীদার বানানোই হচ্ছে শিরক।

এই সঙ্গা এভাবে ও দেয়া যায় যে, ‘‘এমন সব বিশ্বাস, কাজ, কথা ও অভ্যাসকে শির্ক বলা হয় যার দ্বারা বাহ্যত মহান আল্লাহর রুবূবিয়্যাত, উলূহিয়্যাত ও গুণাবলীতে অপর কারো অংশীদারিত্ব বা সমকক্ষতা প্রতীয়মান হয়।

এক কথায় গাইরুল্লাহকে আল্লাহ তয়ালার রুবূবিয়্যাত, উলূহিয়্যাত ও গুণাবলীর বৈশিষ্ট্যে গায়রুল্লাহকে সমকক্ষ করাকে শির্ক বলা হয়।’ যেমন-

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

قَالُواْ وَهُمۡ فِيهَا يَخۡتَصِمُونَ ٩٦ تَٱللَّهِ إِن كُنَّا لَفِي ضَلَٰلٖ مُّبِينٍ ٩٧ إِذۡ نُسَوِّيكُم بِرَبِّ ٱلۡعَٰلَمِينَ ٩٨

সেখানে (জাহান্নামে) পরস্পর ঝগড়া করতে গিয়ে তারা বলবে, আল্লাহর শপথ! আমরাতো স্পষ্ট বিভ্রান্তিতেই ছিলাম।যখন আমরা তোমাদেরকে সকল সৃষ্টির রবের সমকক্ষ বানাতাম’। সুরা শুরা : ৯৬-৯৮

এ আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, মুশরিকরা তাদের পাথর ও কাঠ ইত্যাদির মূর্তিসমূহকে আল্লাহ তা‘আলার রুবূবিয়্যাত ও উলূহিয়্যাতের বৈশিষ্ট্যে সমকক্ষ বানিয়ে নেয়ার কারণেই বিভ্রান্তিতে পতিত হয়ে মুশরিক হয়েছিল।শির্ক যখন আল্লাহ তা‘আলার রুবূবিয়্যাত, উলূহিয়্যাত ও গুণাবলীর বৈশিষ্ট্যের সাথে সম্পর্কিত, তখন সর্বাগ্রে আমাদেরকে এ তিনটি বিষয়ের বৈশিষ্ট্যসমূহ সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করতে হবে কেননা; এতে আমাদের নিকট শির্কের সম্ভাব্য ক্ষেত্রসমূহ পরিষ্কার হয়ে উঠবে।

সাধারনত তিন ক্ষেত্রে শিরক হয় :

আল্লাহর রুববিয়্যাহার (প্রতিপালকে) ক্ষেত্রে শিরক

আল্লাহর উলুহিয়্যাহার (ইবাদতে) ক্ষেত্রে শিরক

আল্লাহর সিফাতে (নির্ধারিত সত্ত্বাবাচক ও গুনবাচক নামে) ক্ষেত্রে শিরক

আল্লাহর রুববিয়্যাহার (প্রতিপালকে) ক্ষেত্রে শিরক:

আল্লাহর রুববিয়্যাহার (প্রতিপালকে) ক্ষেত্রে শিরক বলতে বুঝায়, একক ভাবে সব কিছুর মালিক, সৃষ্টি কর্তা, বিধান দাতা, রিজিক দাতা, জীবন দাতা, মুত্যু দাতা হিসেবে আল্লাহকে না মেনে এই বিষয়  অন্য ইলাহকে অংশীদার স্থাপন করা। অর্থাৎ কতৃত্বের ব্যাপারে আল্লাহর অনুরূপ, সমকক্ষ বা অংশীদার স্থির করা। গায়রুল্লাহকে আল্লাহ সমকক্ষ বা অংশীদার মনে করলে এই শিরকের অন্তভূক্ত। ইয়াহূদী ও নাসারাগণ তাদের ধর্মপন্ডিত এবং সংসার-বিরাগীদের রব বানিয়ে নিয়েছিল। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

اِتَّخَذُوۡۤا اَحۡبَارَہُمۡ وَرُہۡبَانَہُمۡ اَرۡبَابًا مِّنۡ دُوۡنِ اللّٰہِ وَالۡمَسِیۡحَ ابۡنَ مَرۡیَمَ ۚ وَمَاۤ اُمِرُوۡۤا اِلَّا لِیَعۡبُدُوۡۤا اِلٰـہًا وَّاحِدًا ۚ لَاۤ اِلٰہَ اِلَّا ہُوَ ؕ سُبۡحٰنَہٗ عَمَّا یُشۡرِکُوۡنَ

তারা আল্লাহকে ছেড়ে তাদের পন্ডিত ও সংসার-বিরাগীদের রব হিসেবে গ্রহণ করেছে এবং মারইয়ামপুত্র মাসীহকেও। অথচ তারা এক ইলাহের ইবাদত করার জন্যই আদিষ্ট হয়েছে, তিনি ছাড়া কোন ইলাহ নেই। তারা যে শরীক করে তিনি তা থেকে পবিত্র।  সুরা তাওবা : ৩১

এইভাবে কোন সৃষ্টিকে আল্লাহ সমকক্ষ ইলাহ নির্ধারণ করা শিরক। যদি কেউ আল্লাহ সমকক্ষ নির্ধারণ করে, তবে তার আবাস স্থান হবে জাহান্নামে। আল্লাহ রাব্বুল আলামনন ইরশাদ করেন-

وَجَعَلُوۡا لِلّٰہِ اَنۡدَادًا لِّیُضِلُّوۡا عَنۡ سَبِیۡلِہٖ ؕ قُلۡ تَمَتَّعُوۡا فَاِنَّ مَصِیۡرَکُمۡ اِلَی النَّارِ

আর তারা আল্লাহর জন্য সমকক্ষ নির্ধারণ করে, যেন তারা তাঁর পথ থেকে বিভ্রান্ত করতে পারে। বল, ‘তোমরা ভোগ করতে থাক। কেননা, তোমাদের গন্তব্য তো আগুনের দিকে’। সূরা ইবরাহিম : ৩০

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

فَلَا تَجۡعَلُواْ لِلَّهِ أَندَادٗا وَأَنتُمۡ تَعۡلَمُونَ  

সুতরাং তোমরা জেনে-বুঝে আল্লাহর জন্য সমকক্ষ নির্ধারণ করো না। সুরা বাকারা : ২২

আল্লাহ তাআলা অন্য আয়াতে ঘোষণা করেছেন:

وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَتَّخِذُ مِنْ دُونِ اللَّهِ أَنْدَادًا يُحِبُّونَهُمْ كَحُبِّ اللَّهِ

আর মানুষের মধ্যে এমনও আছে, যারা আল্লাহ ছাড়া অন্যকে আল্লাহর সমকক্ষরূপে গ্রহণ করে, তাদেরকে আল্লাহকে ভালবাসার মত ভালবাসে। সুরা বাকারা : ১৬৫

আবদুল্লাহ ইবনু মাসঊদ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন-

سَأَلْتُ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم أَيُّ الذَّنْبِ أَعْظَمُ عِنْدَ اللهِ قَالَ أَنْ تَجْعَلَ لِلهِ نِدًّا وَهُوَ خَلَقَكَ قُلْتُ إِنَّ ذَلِكَ لَعَظِيْمٌ قُلْتُ ثُمَّ أَيُّ قَالَ وَأَنْ تَقْتُلَ وَلَدَكَ تَخَافُ أَنْ يَطْعَمَ مَعَكَ قُلْتُ ثُمَّ أَيُّ قَالَ أَنْ تُزَانِيَ حَلِيْلَةَ جَارِك

আমি নবী সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে জিজ্ঞেস করলাম যে, কোন্ গুনাহ আল্লাহর কাছে সবচেয়ে বড়? তিনি বললেন, আল্লাহর জন্য অংশীদার দাঁড় করান। অথচ তিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন। আমি বললাম, এতো সত্যিই বড় গুনাহ। আমি বললাম, তারপর কোন্ গুনাহ? তিনি উত্তর দিলেন, তুমি তোমার সন্তানকে এই ভয়ে হত্যা করবে যে, সে তোমার সঙ্গে আহার করবে। আমি আরয করলাম, এরপর কোনটি? তিনি উত্তর দিলেন, তোমার প্রতিবেশীর স্ত্রীর সঙ্গে তোমার ব্যভিচার করা। সহিহ বুখারি : ৪৪৭৭, ৪৭৬১, ৬০০১, ৬৮১১, ৬৮৬১, ৭৫২০, ৭৫৩২, সহিহ মুসলিম : ৮৬০

আল্লাহর উলুহিয়্যাহার (ইবাদতে) ক্ষেত্রে শিরক: 

আল্লাহ ছাড়া কোন গাইরুল্লাহর ইবাদাত করলে ইবাদতে শিরক হবে। যে গায়রুল্লাহর ইবাদত করে তাকে মুশরিক বলা হয়। মুশরিত তার ইবাদাতকে সৃষ্টি কর্তার উদ্দেশ্যে পেশ না করে গাইরুল্লাহর উদ্দেশ্যে পেশ করে থাকে। অথচ বান্দার কর্ত্যব শুধু আল্লাহর উদ্দেশ্যে তার ইবাদত পেশ করা। এই জন্যই আল্লাহ কুরআনুল কারিমে বার বার আদেশ দিয়েছেন এক মাত্র তাহার ইবাদাত করার। অপর পক্ষে গাইরুল্লাহর ইবাদাত করতে নিষেধ করেছেন। যেমন-

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ

আমি জিন এবং মানব জাতিকে একমাত্র আমার ইবাদত করার জন্যই সৃষ্টি করেছি। সুরা জারিয়া : ৫৬

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَسُولًا أَنِ اُعْبُدُوا اللَّهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُوتَ

আমি প্রত্যেক উম্মতের মধ্যেই রাসূল পাঠিয়েছি। তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো, আর তাগুতকে বর্জন করো। সুরা নাহল :৩৬

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

وَقَضَى رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا:

তোমার রব এ নির্দেশ দিয়েছেন যে তাঁকে ছাড়া তোমরা আর কারো ইবাদত করো না। পিতা মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করো। করো। সুরা বনিইসরাঈল : ২৩

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

وَاعْبُدُوا اللَّهَ وَلَا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا:

তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো। আর তাঁর সাথে কাউকে শরিক করো না। সুরা নিসা : ৩৬

ইবরাহীম (আ.) তার পিতাকে গায়রুল্লাহর ইবাদাত করতে নিষেধ করেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

وَإِذۡ قَالَ إِبۡرَٲهِيمُ لِأَبِيهِ وَقَوۡمِهِۦۤ إِنَّنِى بَرَآءٌ۬ مِّمَّا تَعۡبُدُونَ

সে সময়ের কথা স্মরণ করো যখন ইবরাহীম তার পিতা ও কওমের লোকদেরকে বলেছিলেন, তোমরা যার ইবাদত করো তার সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই। আর আমার সম্পর্ক হচ্ছে কেবল মাত্র তাঁরই সাথে যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন।

করুফ- ৪৩:২৬)।

আল্লাহর সিফাতে (নির্ধারিত সত্ত্বাবাচক ও গুনবাচক নামে) ক্ষেত্রে শির:

তাওহীদ আল আসমা ওয়াস সিফাত হচ্ছে, আল্লাহর মূলসত্বা ও গুণাবলীতে বিশ্বাস করা। আল্লাহকে সেই নামেই ডাকতে হবে যে নাম তিনি নিজের জন্য নির্ধারণ করেছেন। কোন নব উদ্ভাবিত নামে তাঁকে ডাকা যাবে না। মহান আল্লাহ বলেছেন,

وَلِلهِ الْأَسْمَآءُ الْحُسْنٰى فَادْعُوهُ بِهَا

আল্লাহর রয়েছে অনেক সুন্দর সুন্দর নাম যেগুলোর মাধ্যমে তোমরা তাকে ডাকো।  (সূরা আরাফ ৭:১৮০)

সহহি হাদিসে মহান আল্লাহ ৯৯ টি নামের কথা এসেছে। যেমন-

আবূ হুরাইরাহ্ (রা.) হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল ﷺ বলেছেন, আল্লাহর নিরানব্বই অর্থাৎ এক কম একশ’টি নাম রয়েছে, যে ব্যক্তি তা মনে রাখবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। (সহিহ বুখারি : ২৭৩৬, ৬৪১০, ৭৩৯২, সহিহ মুসলিম : ২৬৭৭, সুনানে তিরমিযী : ৩৫০৬, সুনানে ইবনু মাজাহ : ৩৮৬০)

এই ৯৯ টি নাম হলোঃ

আল্লাহ, আর-রাহমান, আর-রহিম, আল-মালিক, আল-কুদ্দুস, আস-সালাম, আল-মুমিন, আল-মুহাইমিন, আল-আজীজ, আল-জাব্বার, আল-মুতাকাব্বির, আল-খালিক, আল-বারী, আল-মুছউইর, আল-গফ্ফার, আল-কাহার, আল-ওয়াহ্হাব, আর-রজ্জাক, আল-ফাত্তাহ, আল-আলীম, আল-ক্ববিদ্ব, আল-বাসিত, আল-খফিদ, আর-রফীই, আল-মুইজ, আল-মুদ্বিল্লু, আস-সামিই, আল-বাছীর, আল-হাকাম, আল-আদল, আল-লাতীফ, আল-খবীর, আল-হালীম, আল-আজীম, আল-গফুর, আশ-শাকুর, আল-আলিইউ, আল-কাবির, আল-হাফীজ, আল-মুক্বীত, আল-হাসীব, আল-জালীল, আল-কারীম, আর-রক্বীব, আল-মুজীব, আল-ওয়াসি, আল-হাকীম, আল-ওয়াদুদ, আল-মাজীদ, আল-বাইছ, আশ-শাহীদ, আল-হাক্ব, আল-ওয়াকিল, আল-মাতীন, আল-ক্বউইউ, আল-ওয়ালিইউ, আল-হামীদ, আল-মুহছী, আল-মুব্দি, আল-মুঈদ, আল-মুহয়ী, আল-মুমীত, আল-হাইয়্যু ,আল-ক্বাইয়্যুম, আল-ওয়াজিদ, আল-মাজিদ, আল-ওয়াহিদ, আছ-ছমাদ, আল-ক্বদির, আল-মুকতাদির, আল-মুক্বদ্দিম, আল-মুয়াক্খির, আল-আউয়াল, আল-আখির, আজ-জহির, আল-বাত্বিন, আল-ওয়ালি, আল-মুতাআলি, আল-বার, আত-তাওয়াব, আল-মুনতাক্বিম, আল-আ’ফঊ, আর-রউফ, মালিকুল-মুলক   যুল, জালালি-ওয়াল-ইকরাম, আল-মুক্ব্সিত, আল-জামিই, আল-গণিই, আল-মুগনিই, আল-মানিই, আয্-যর আন-নাফিই, আন-নূর, আল-হাদী, আল-বাদীই, আল-বাক্বী, আল-ওয়ারিস, আর-রাশীদ, আস-সবুর।

এই গুলো হলো মহান আল্লাহ গুনবাচক নাম। এই নামগুলো মহান আল্লাহর সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত। তাই এই নামে কোন মানুষের নাম করণ করা সম্পূর্ণ হারাম। তবে আব্দ যোগে এই সকল নাম রাখা শুধু শরিয়ত সম্মত নয় বরং ভালো। কিন্তু মনে রাখতে হবে, নামটি ডাকার সময় দুই অংশই একত্রে উচ্চারণ করতে হবে। আব্দ বাদ দিয়ে আল্লাহর মুল নামে কাউকে ডাকা বা আহবান করা হারাম। তবে কিছু নাম (রাহীম, রাশীদ, আলী, কারীম, আযীয প্রভৃতি) সরাসরি ব্যবহারের প্রমান কুরআন সুন্নাহে আছে বিধায় এই নামগুলো সরাসরি রাখা যাবে। মনে রাখাতে হবে আল্লাহর কোন গুণকে মানুষের কোন গুণের সাথে তুলনা করা যাবে না। আল্লাহর সিফাত সম্পর্কে আল কুরআনে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ وَهُوَ السَّمِيعُ البَصِي

কোন বস্তুই তাঁর সদৃশ নয়, তিনি সব শোনেন, সব দেখেন। সূরা শুরা : ১১

যদিও দেখা ও শোনা মানুষের জন্যও প্রযোজ্য। মানুষের দেখার জন্য চোখ, শোনার জন্য কানের প্রয়োজন হয়। কিন্তু আল্লাহর সত্ত্বার জন্য এসব চোখ, কান নাক ইত্যাদির প্রয়োজন হয়না। আল্লাহর জন্য নির্ধারিত কোনো গুণে তাঁরই সৃষ্ট কোনো কিছু গুণান্বিত করাও শিরকের অন্তর্ভুক্ত। যেমন- আল্লাহ ছাড়া  কাউকে চিরন্তন বা অমর বলা যাবে না। সেই প্রেক্ষিতে অগ্নিশিখাকে চিরন্তন নামকরণও বড় শিরক। যেমন-

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

كُلُّ مَنۡ عَلَيۡهَا فَانٖ ٢٦ وَيَبۡقَىٰ وَجۡهُ رَبِّكَ ذُو ٱلۡجَلَٰلِ وَٱلۡإِكۡرَامِ ٢٧

পৃথিবীর প্রতিটি জিনিসই ধ্বংসশীল এবং শুধুমাত্র তোমার মহিমাময় মহানুভব রবের সত্তাই অবশিষ্ট থাকবে। সুরা আর রহমান : ২৬-২৭

মহান আল্লাহ অনেক নাম আছে এবং তা সর্বোত্তম ও সুন্দর, অর্থাৎ তাঁর নামের চেয়ে উত্তম বা সমকক্ষ আর কিছুই নেই। আর সে সব নাম পূর্ণাংগ গুণ বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। আল্লাহ আমাদেরকে ঐ নাম ধরেই তাকে ডাকতে বা দুয়া করতে বলেছেন। তার প্রশংসাও করতে হবে ঐসব নাম ও গুণের স্বীকৃতি দিয়ে। আর বর্জন করতে হবে তাদেরকে যারা আল্লাহর নামের বিকৃতি ঘটায়। আমাদেরকে সঠিক অর্থের ব্যাপারে দৃঢ়তা অবলম্বন করতে হবে। আবার সতর্ক থাকতে যেন কুরআন সুন্নাহর বাহিরে কোন কিছু এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করে না ফেলি। কারণ মহান আল্লাহ বলেন:

 وَلِلَّهِ ٱلۡأَسۡمَآءُ ٱلۡحُسۡنَىٰ فَٱدۡعُوهُ بِهَاۖ وَذَرُواْ ٱلَّذِينَ يُلۡحِدُونَ فِيٓ أَسۡمَٰٓئِهِۦۚ سَيُجۡزَوۡنَ مَا كَانُواْ يَعۡمَلُونَ

আর আল্লাহর যে সব নাম আছে তা সর্ব সুন্দর উত্তম, অতএব সে নাম ধরেই তাকে ডাক। আর তোমরা তাদেরকে বর্জন কর যারা আল্লাহর নামসমূহের বিকৃতি করে থাকে। তারা তাদের কৃতকর্মের যথপোযুক্ত প্রতিদান শীঘ্রই পাবে’। সুরা আরাফ : ১০৮

শিরকের প্রকারভেদ :

উপরে শিরক সম্পর্কে একটা ধারনা পেয়েছি। শিরক এমন গুনাহ যা মুসলিমকে ইসলাম থেকে বাহির করে দেয়। কিন্তু কিছু শিরক এমন আছে যা করা কবিরা গুনাহ হলেও মুসলিমকে ইসলাম থেকে বের করে দেয় না। যেমন- গাইরুল্লাহর জন্য দান করা, লোক দেখান ইবাদাত করা, আল্লাহ্ ছাড়া অন্যের নামে শপথ করা, আল্লাহ ব্যতীত অন্য কিছুর উদ্দেশ্যে মান্নত করা, ব্যক্তি বা বস্তুরকে কল্যান অকল্যান ভাবা ইত্যাদি। এ থেকে ষ্পষ্ট যে শিরকেরও প্রকারভেদ আছে। সাধারণ শিরক দুই প্রকার। যথা-

ক. শিরকে আকবার বা বড় শিরক।

খ. শিরকে আসগার বা ছোট শিরক।

ক। শিরকে আকবার বা বড় শিরক

বান্দা যখন একমাত্র আল্লাহর অধিকার বা হককে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকে নিবেদন করবে তখন শিরকে আকবর হবে। অর্থাৎ তার রুবুবিয়াতের কোনো অংশ, অথবা তার উলুহিয়াতের কোনো অংশ, অথবা তার নাম ও গুণাবলির কোনো অংশকে তিনি ব্যতীত কাউকে নিবেদন করবে।

আল্লাহকে তার মখলুকের সঙ্গে তুলনা করা, অথবা আল্লাহর সাথে দ্বিতীয় কাউকে সৃষ্টিকর্তা, অথবা রিজিকদাতা, অথবা পরিকল্পনাকারী জ্ঞান করা। শিরকে আকবার যা একজন ঈমানদার মুসলিম কে মুসলিম মিল্লাত থেকে বহিস্কার করে দেয়। বান্দার সমস্ত আমল নষ্ট করে দেয়। এ ধরণের শিরকে লিপ্ত ব্যক্তি যদি তওবা ছাড়া শিরকের উপরই মৃত্যুবরণ করে, তাহলে সে চিরস্থায়ী ভাবে জাহান্নামে অবস্থান করবে। যেমন-

আল্লাহ ব্যতীত কারো নিকট দোয়া করা, ফরিয়াদ করা, সাহায্য তলব করা, আশ্রয় প্রার্থনা করা, হোক সে নবী, অথবা অলী, অথবা ফেরেশতা অথবা জিন, অথবা অন্য কোনো মখলুক। দেবদেবী বা মূর্তি পূজা করা, কবর-মাজারে সিজদা করা, গায়রুল্লাহ তথা আল্লাহ ছাড়া যে কোন ব্যক্তি, প্রাণী বা বস্তুর উদ্দেশ্যে কোন ইবাদত আদায় করা, গায়রুল্লাহর উদ্দেশে কুরবানী করা, মৃত ব্যক্তি কিংবা জ্বিন অথবা শয়তান  বা মালাকগন কারো ক্ষতি বা উপকার করতে বলে বিশ্বাস করে তাদের নিকট সাহায্য চাওয়া। আল্লাহ ছাড়া কেউ প্রয়োজন ও চাহিদা পূর্ণ করতে পারে, সুস্থ বা অসুস্থ করতে পারে, বিপদ আপদ দূর করতে পারে বলে বিশ্বাস করা তাদের নিকট সাহায্য চাওয়া। বিশ্বাস করা যে, আল্লাহর সাথে কোনো সত্তা আছে যে সৃষ্টি করে, অথবা জীবিত করে, অথবা মৃত্যু দেয়, অথবা মালিকানার হকদার, অথবা এ জগতে কর্তৃত্বের অধিকারী। অথবা এরূপ বিশ্বাস করা যে, অমুক সত্তা আল্লাহর ন্যায় নিঃশর্ত আনুগত্যের হকদার, ফলে সে কোনো বস্তু হালাল ও হারাম করার ক্ষেত্রে তার ইচ্ছার আনুগত্য করে, যদিও তা রাসূলদের আনিত দীনের বিপরীত হয়। আল্লাহ ব্যতীত কারো জন্য যবেহ করা। আল্লাহর বিধানের ন্যায় বিধান রচনা করে মানুষের উপর চাপিয়ে দেওয়া এবং তা মেনে নিতে বাধ্য করা। কাফেরদের পক্ষ নেওয়া ও মুমিনদের বিরুদ্ধে তাদেরকে সাহায্য করা।

ক. শিরকে আকবার বা বড় শিরকের সাধারনত তিনটি মাধ্যমে সংঘটিত হয়। যথা-

১। আকিদা বা বিশ্বাসের মাধ্যমে শিরক

২। ইবাদাতের মাধ্যমে শিরক

৩। সমাজে প্রচলিত ইসলামি বিরোধী কাজের মাধ্যমে শিরক

খ। শিরকে আসগার বা ছোট শিরক

যে সব শিরককে কুরআন ও সুন্নায় ছোট শিরক বলা হয়েছে তাকে  শিরকে আসগার বা ছোট শিরক বলে বিবেচনা করব। আল্লাহ তা’আলার উদ্দেশ্যে বাস্তবায়ন কৃত আমল মানুষকে দেখানোর জন্য সুন্দর করার নাম শিরকে আসগার। শিরকে আসগার মানুষকে ইসলাম থেকে বের করে দেয় না। তবে এটি আমলকে নষ্ট করে দেয়। কেননা উক্ত রিয়াকারী মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করাই তার উদ্দেশ্যে পরিণত করেছে। কখনও এমন কাজ বড় শিরকের পর্যায়ে পৌঁছতে পারে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

فَمَنْ كَانَ يَرْجُوا لِقَاءَ رَبِّهِ فَلْيَعْمَلْ عَمَلاً صَالِحًا وَلاَ يُشْرِكْ بِعِبَادَةِ رَبِّهِ أَحَدًا

সুতরাং যে ব্যক্তি তার পালনকর্তার সাক্ষাৎ কামনা করে, সে যেন সৎকর্ম সম্পাদন করে এবং তার পালনকর্তার এবাদতে কাউকে শরীক না করে। সুরা কাহফ : ১১০

লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে ও প্রসিদ্ধি অর্জনের জন্য কোন আমল করা। লোকে প্রশংসা পাওয়ার জন্য সুন্দর ভাবে সালাত আদায় করা, সদকা করা। লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে সশব্দে যিকির করা, সুকণ্ঠে তেলাওয়াত করা। নিরাপত্তার জন্য পুঁতি, তাবিজ, তাগা ও কড়ি ইত্যাদি ঝুলিয়ে রাখা। গাইরুল্লাহর নামে কসম খাওয়া। কোনো মহান বস্তু বা ব্যাক্তিকে অতিরিক্ত সম্মান দেওয়া যা আল্লাহর রুবুবিয়াতের সমান নয়। ব্যক্তি শুধু দুনিয়া অর্জনের জন্যে আজান দেয়, ইমামতি করে, শিক্ষকতা, কুরআন শিখে, শরয়ী জ্ঞান অর্জন করে, জিহাদ,  হজ্জ করে। আবার অনেক সময় ফাহেসা কথায় দ্বারাও ছোট শিরক হয়। কিন্তু এই শিরক ইসলাম থেকে বের করে দেয় না।

হুযাইফাহ ইবনুল ইয়ামান (রাঃ) থেকে বর্ণিত। এক মুসলিম ব্যক্তি স্বপ্ন দেখে যে, আহলে কিতাবের এক ব্যক্তির সাথে তার সাক্ষাত হলে সে বলল, তোমরা কতই না উত্তম জাতি, যদি তোমরা শিরক না করতে। তোমরা বলে থাকো, ’’আল্লাহ্ যা ইচ্ছা করেন এবং মুহাম্মাদ যা ইচ্ছা করেন’’। অতঃপর সে স্বপ্নের কথাটি রাসূলুল্লাহ ﷺ এর নিকট বর্ণনা করলো। তিনি বলেন-

أَمَا وَاللَّهِ إِنْ كُنْتُ لأَعْرِفُهَا لَكُمْ قُولُوا مَا شَاءَ اللَّهُ ثُمَّ شَاءَ مُحَمَّدٌ

আল্লাহর শপথ! শোনো, আমি তো তোমাদের এরূপ কিছু বলতে শিখাইনি। তোমরা বলবে, ’’আল্লাহ্ যা ইচ্ছা করেন, এরপর রসূলুল্লাহ ﷺ যা চান’’। ইবনে মাজাহ : ২১১৮

এ হাদীসটি প্রমাণ করছে যে, ইসলামের প্রারম্ভিক আমলে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সাহাবীদের মাঝে ‘আল্লাহ ও মুহাম্মদ ﷺ যা চান’, এ-জাতীয় কথা-বার্তা বলার প্রচলন ছিল। পরবর্তীতে এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁদেরকে এমন কথা বলা থেকে বারণ করেন এবং এ ধরনের কথার বদলে নিম্নোক্ত কথা বলতে শিক্ষা দেন। তোমরা বল, আল্লাহ তায়ালা এককভাবে যা চান। যেমন-

ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

إِذَا حَلَفَ أَحَدُكُمْ فَلاَ يَقُلْ مَا شَاءَ اللَّهُ وَشِئْتَ ‏.‏ وَلَكِنْ لِيَقُلْ مَا شَاءَ اللَّهُ ثُمَّ شِئْتَ ‏ ‏

তোমাদের কেউ যেন শপথ করা কালে এভাবে না বলে, ’’আল্লাহ যা চান এবং তুমি যা ইচ্ছা করো’’। বরং সে যেন বলে, ’’আল্লাহ্ যা ইচ্ছা করেন, এরপর তুমি যা ইচ্ছা করছো। ইবনে মাজাহ : ২১১৭

 শিরকে আসগার’ এর কতিপয় উদাহরণ হলো- কোনো ব্যক্তির বলল, আমার চাকরীটি  না থাকিলে সংসারের কি যে হত। আজ বিপদে আপনিই আমাকে বাচিয়েছেন। পোষা কুকুরটি না হলে আজ রাতে আমার বাড়ীতে চুরি হয়ে যেতো, ইত্যাদি ইত্যাদি।

শিরকে আকবার ও আসগারের মধ্যে পার্থক্য

১. শিরকে আকবরের কারনে শিরককারী ইসলাম ও মুসলিম থেকে বাহির হয়ে যায়। কিন্তু শিরকে আসগারের কারনে শিরককারী ইসলাম ও মুসলিম থেকে বাহির হয়ে যায় না। যেনন- মুর্তির পুজা করলে তার ইমান ভঙ্গ হয়ে যাবে ইসলাম থেকে বাহির হয়ে যাবে। কিন্তু লোক দেখান দান করলে গুনাহ হবে তবে ইসলাম থেকে বাহির হয়ে যাবে না।

২. শিরকে আকবার সব সময়ের জন্য কবিরা গুনাহ। কিন্তু শিরকে আসগার গুনাহের কারনে কখনও কবিরা আবার কখনও সগিরা গুনাহ হয়।

৩. শিরকে আকবার তওবা ছাড়া ক্ষমা পাওয়া যায় না। কিন্তু শিরকে আসগারকারীকে কখন গুনাহের জন্য তওবা হকরে হবে আমরা গুনাহে সগিরা হলে আল্লাহ তওবা ছাড়াই তার ইচ্ছাত ক্ষমা করে দিতে পারেন। 

৪. একটি শির্কে আকবার মু’মিনের অতীতের যাবতীয় নেক আমল ধ্বংস করে দেয়। শির্কে আসগার শুধু সংশ্লিষ্ট আমলকেই ধ্বংস করে। অন্য আমলকে নয়।

৫. শির্কে আকবার থেকে তওবা করতে না পারলে তা কর্তাব্যক্তিকে চিরস্থায়ী জাহান্নামের অধিবাসী করে দেয়। সে ব্যক্তি সম্পূর্ণরূপে আল্লাহ তা‘আলার ক্ষমার অযোগ্য হয়ে যায়। আর শির্কে আসগার যদি কবিরা গুনাহ পর্যায়ের হয় তবে শিরকে আকবরের মত তওবা করতে হবে। কিন্তু গুনাহ যদি সগিরা পর্যায়ের হয় তবে তা আল্লাহ তা‘আলার ক্ষমাযোগ্য অপরাধ।

৬. শির্কে আকবার থেকে তাওবা না করলে এবং নতুন করে ইসলামে প্রবেশ না করলে ইসলামী আদালতের রায় অনুযায়ী কর্তাব্যক্তির জীবন ও সম্পদের কোনো নিরাপত্তা থাকবে না। তবে শির্কে আসগারের কর্তাব্যক্তি ফাসিক মু’মিন হওয়ার কারণে ইসলামী রাষ্ট্রের কাছে তার জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা থাকবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *