অতিরিক্ত আহারের নিষেধাজ্ঞা
মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন
অতিরিক্ত আহার করা কেবল ইসলামের দৃষ্টিতেই অপছন্দনীয় নয়, বরং আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এটি শরীরের জন্য এক নীরব ঘাতক। দেড় হাজার বছর আগে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পরিমিত আহারের যে বৈজ্ঞানিক ফর্মুলা প্রদান করেছেন, আজকের পুষ্টিবিজ্ঞানীরা তাকেই দীর্ঘায়ু ও সুস্থতার চাবিকাঠি হিসেবে দেখছেন।
শরীর পরিচালনার জন্য জ্বালানি হিসেবে খাদ্যের প্রয়োজন অনস্বীকার্য। ইসলাম সুস্বাদু ও পবিত্র খাদ্য গ্রহণে উৎসাহিত করেছে, কিন্তু সীমানালঙ্ঘন বা অতিরিক্ত ভোজনকে কঠোরভাবে নিষেধ করেছে।
১. পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহর নির্দেশনা
আল্লাহ তা‘আলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন-
یٰبَنِیۡۤ اٰدَمَ خُذُوۡا زِیۡنَتَکُمۡ عِنۡدَ کُلِّ مَسۡجِدٍ وَّکُلُوۡا وَاشۡرَبُوۡا وَلَا تُسۡرِفُوۡا ۚ اِنَّہٗ لَا یُحِبُّ الۡمُسۡرِفِیۡنَ
হে বনী আদম, তোমরা প্রতি সালাতে তোমাদের বেশ-ভূষা গ্রহণ কর এবং খাও, পান কর ও অপচয় করো না। নিশ্চয় তিনি অপচয়কারীদেরকে পছন্দ করেন না। সূরা আরাফ :৩১
মিকদাম ইবনে মাদীকারিব (রাঃ) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছিঃ মানুষ পেটের চেয়ে নিকৃষ্ট কোন পাত্র ভর্তি করে না। (যতটুকু খাদ্য গ্রহণ করলে পেট ভরে পাত্র থেকে ততটুকু খাদ্য উঠানো কোন ব্যক্তির জন্য দূষণীয় নয়)। যতটুকু আহার করলে মেরুদন্ড সোজা রাখা সম্ভব, ততটুকু খাদ্যই কোন ব্যক্তির জন্য যথেষ্ট। এরপরও যদি কোন ব্যক্তির উপর তার নফস (প্রবৃত্তি) জয়যুক্ত হয়, তবে সে তার পেটের এক-তৃতীয়াংশ আহারের জন্য, এক-তৃতীয়াংশ পানির জন্য এবং এক তৃতীয়াংশ শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য রাখবে। সুনানে ইবনে মাজাহ : ৩৩৪৮, সুনানে তিরমিযী : ২৩৮০, ইরওয়া : ২৩৮০, সহীহাহ : ২২৬৫
অর্থাৎ অতিরিক্ত ভোজন মানুষের চরিত্র ও শরীর—উভয়কেই কলুষিত করে।
২. আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে অতিরিক্ত আহারের কুফল
খাদ্য বিশেষজ্ঞরা একমত যে, মানুষের অধিকাংশ রোগ ব্যাধি (প্রায় ৮০%) তার খাদ্যাভ্যাসের সাথে জড়িত। অতিরিক্ত আহার শরীরের অভ্যন্তরীণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলোকে অতিরিক্ত চাপে ফেলে দেয়।
ক) ডায়াবেটিস ও অগ্ন্যাশয়ের ক্ষতি:
অতিরিক্ত আহারের ফলে রক্তের গ্লুকোজ লেভেল বেড়ে যায়। একে নিয়ন্ত্রণে রাখতে আমাদের প্যানক্রিয়াস বা অগ্ন্যাশয়কে অতিরিক্ত ইনসুলিন নিঃসরণ করতে হয়। নিয়মিত অতিরিক্ত খাওয়ার ফলে অগ্ন্যাশয় ক্লান্ত হয়ে পড়ে এবং ইনসুলিন উৎপাদন কমিয়ে দেয়, যার চূড়ান্ত ফল হলো ডায়াবেটিস।
খ) উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগ:
অতিরিক্ত খাদ্য গ্রহণের ফলে শরীরে মেদ জমা হয় এবং রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা বেড়ে যায়। এতে রক্তবাহী শিরা ও ধমনীগুলো সংকীর্ণ হয়ে পড়ে (Atherosclerosis)। শিরা সংকীর্ণ হওয়ার কারণে রক্ত চলাচলে বাধা সৃষ্টি হয়, যা উচ্চ রক্তচাপের প্রধান কারণ। যখন হৃদপিণ্ডের করোনারি ধমনীগুলো সংকুচিত হয়, তখন হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
গ) প্যারালাইসিস ও মস্তিষ্কের ব্যাধি:
শিরা সংকীর্ণ হওয়ার ফলে মস্তিষ্কে রক্ত সঞ্চালন বাধাগ্রস্ত হলে মানুষ প্যারালাইসিস বা অর্ধাঙ্গ রোগে আক্রান্ত হতে পারে। মস্তিষ্কের সূক্ষ্ম শিরা ছিঁড়ে গিয়ে স্ট্রোক হওয়ার পেছনেও অতিরিক্ত ভোজন এবং এর ফলে সৃষ্ট উচ্চ রক্তচাপ দায়ী।
ঘ) অকাল বার্ধক্য ও স্থূলতা:
বেশি খেলে শরীরের কোষগুলো দ্রুত ক্ষয়প্রাপ্ত হয় এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো তাদের স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। ফলে মানুষ নির্দিষ্ট সময়ের আগেই দুর্বল হয়ে পড়ে এবং তাকে বয়সের তুলনায় বৃদ্ধ দেখায়। এছাড়া স্থূলতার কারণে হাঁটু ও কোমরে প্রচণ্ড ব্যথা (Joint Pain) এবং অস্থি মজ্জার জটিলতা তৈরি হয়।
৩. প্রফেসর রিচার্ড বার্ডের গবেষণা
বিখ্যাত চিকিৎসা বিজ্ঞানী প্রফেসর রিচার্ড বার্ড তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, অতিভোজ কেবল পেটের সমস্যা নয়, বরং এটি সারা শরীরের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনে। তাঁর মতে, অতিরিক্ত আহারের ফলে মস্তিস্ক, চক্ষু, জিহ্বা, গলা, বক্ষ, ফুসফুস, যকৃত ও পিত্তথলির মারাত্মক রোগ হতে পারে। এমনকি দুশ্চিন্তা ও মনস্তাত্ত্বিক রোগের সাথেও খাদ্যাভ্যাসের গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
৪. শহর বনাম গ্রাম: একটি তুলনামূলক চিত্র
সাধারণত শহরবাসীদের মধ্যে অতিভোজ ও বিলাসিতার প্রবণতা বেশি দেখা যায়। ফলে শহর অঞ্চলে ডায়াবেটিস, ব্লাড প্রেসার ও হৃদরোগীর সংখ্যা অনেক বেশি। অপরদিকে গ্রামবাংলার মানুষ যারা স্বাভাবিক ও স্বল্প আহারে অভ্যস্ত এবং কায়িক শ্রম করে, তারা দীর্ঘকাল সুস্থ ও সবল থাকে। তাদের শরীরে কোলেস্টেরলের আধিক্য থাকে না এবং তাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো পরিমিত কাজের মাধ্যমে সচল থাকে।
৫. ইসলামের ফর্মুলা: “ক্ষুধা না লাগলে না খাওয়া”
মুসলিম জাতির একটি ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য হলো, তারা ক্ষুধা না লাগলে খায় না এবং যখন খায় তখন পেট পূর্ণ করে খায় না। এটি কেবল একটি অভ্যাস নয়, এটি একটি প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা (Preventive Medicine)। নবীজি (সা.) বলেছেন, মুমিন এক আঁতে খায় আর কাফির সাত আঁতে খায়। এর অর্থ হলো মুমিন তার প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং পরিমিত আহারে তুষ্ট থাকে।
৬. পরিমিত আহারের মানসিক ও আধ্যাত্মিক উপকারিতা
বেশি খেলে মানুষের মধ্যে অলসতা ও তন্দ্রাচ্ছন্নতা তৈরি হয়, যা ইবাদত ও কাজে বিঘ্ন ঘটায়। কম আহারে মানুষের মেধা ও চিন্তাশক্তি তীক্ষ্ণ হয়। রাসূল (সা.)-এর বাতলে দেওয়া ‘পেটের তিন ভাগের এক ভাগ’ নিয়মটি অনুসরণ করলে পাকস্থলী সহজে খাদ্য হজম করতে পারে এবং মানুষ গ্যাস্ট্রিক ও আলসার থেকে মুক্তি পায়।
বর্তমান স্বাস্থ্য বিজ্ঞানের স্লোগান হলো— “কম আহার করুন, বেশি দিন বাঁচুন।” অথচ এই সত্যটি ইসলাম দেড় হাজার বছর আগেই আমাদের দিয়ে রেখেছে। অতিরিক্ত আহার কেবল শরীরের ওজন বাড়ায় না, বরং এটি মানুষের আয়ু কমিয়ে দেয় এবং নানাবিধ যন্ত্রণাদায়ক রোগের জন্ম দেয়। সুস্থ থাকতে হলে এবং দীর্ঘজীবন লাভ করতে হলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দেওয়া পানাহারের সুশৃঙ্খল পদ্ধতি অনুসরণ করার কোনো বিকল্প নেই। নবীজি (সা.)-এর প্রতিটি নির্দেশনা যে মানবজাতির জন্য পরম কল্যাণকর, তা আধুনিক বিজ্ঞান আজ নতমস্তকে স্বীকার করে নিচ্ছে।