কানের ফাটলের কারণে শ্রবণশক্তি হ্রাস পায়
মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন
কানের পর্দা ফেটে যাওয়ার কারণে শ্রবণশক্তির হ্রাস পায় এ সম্পর্কে কুরআনে উল্লেখিত হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَمِنۡہُمۡ مَّنۡ یَّسۡتَمِعُ اِلَیۡکَ ۚ وَجَعَلۡنَا عَلٰی قُلُوۡبِہِمۡ اَکِنَّۃً اَنۡ یَّفۡقَہُوۡہُ وَفِیۡۤ اٰذَانِہِمۡ وَقۡرًا ؕ وَاِنۡ یَّرَوۡا کُلَّ اٰیَۃٍ لَّا یُؤۡمِنُوۡا بِہَا ؕ حَتّٰۤی اِذَا جَآءُوۡکَ یُجَادِلُوۡنَکَ یَقُوۡلُ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡۤا اِنۡ ہٰذَاۤ اِلَّاۤ اَسَاطِیۡرُ الۡاَوَّلِیۡنَ
অর্থ: আর তাদের কিছু লোক তোমার কথা কান পেতে শোনে, কিন্তু আমরা তাদের অন্তরের ওপর রেখে দিয়েছি আবরণ, যেন তারা বুঝতে না পারে, আর তাদের কানে দিয়েছি বধিরতা (ছেদ, ফাটল)। আর যদি তারা প্রতিটি আয়াতও (প্রমাণ, সাক্ষ্য, শিক্ষা, ঐশী বাণী ইত্যাদি) দেখে, তবুও তারা তা বিশ্বাস করবে না; এমনকি যখন তারা তোমার কাছে এসে বির্তকে লিপ্ত হয়, তখন এই কাফিররা বলে, ‘এটা পূর্ববর্তীদের কল্পকাহিনি ছাড়া কিছুই নয়। সুরা আনআম : ২৫
কুরআনের শব্দচয়ন যে কতটা গভীর এবং বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিতে কতটা নির্ভুল, তা কুরআনের উপরের আয়াতে ব্যবহৃত ‘ওয়াকর’ (وَقْر) শব্দটি বিশ্লেষণ করলে স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। এ আয়াতটি আধ্যাত্মিক উপমার পাশাপাশি শ্রবণবিজ্ঞানের (Otology) এক চমৎকার প্রতিফলন।
আরবি ভাষায় ‘ওয়াকর’ (وَقْر)শব্দের মূল অর্থ হলো— ভার, বোঝা, ছিদ্র, ফাটল বা কোনো কিছুর মধ্যে ছেদ পড়া। কুরআনের আয়াতে যখন বলা হয়েছে, “ওয়া ফী আ-যা-নিহিম ওয়াকরা” (وَفِي آذَانِهِمْ وَقْرًا), তখন এর প্রচলিত অনুবাদ করা হয় “তাদের কান বধির করে দিয়েছি”। কিন্তু শব্দটির মূল ব্যুৎপত্তিগত অর্থ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি কানের এমন এক অবস্থার কথা বলছে যেখানে কোনো ফাটল বা ছিদ্রের কারণে শ্রবণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে শ্রবণশক্তি হ্রাসের অন্যতম প্রধান কারণ হলো ‘পারফোরেটেড ইয়ারড্রাম’ (Perforated Eardrum) বা কানের পর্দায় ফাটল বা ছিদ্র।

চিত্র : কানের পর্দায় ফাটল বা ছিদ্র বা পারফোরেটেড ইয়ারড্রাম।
২. কানের গঠন ও শব্দপ্রক্রিয়া
মানুষের কান তিনটি প্রধান অংশে বিভক্ত: বহিকর্ণ, মধ্যকর্ণ এবং অন্তকর্ণ। আমাদের কানের ছিদ্রের শেষে একটি অত্যন্ত পাতলা ঝিল্লি বা পর্দা থাকে, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় ‘টিমপ্যানিক মেমব্রেন’ (Tympanic Membrane) বলা হয়।
কম্পন ও শ্রবণ: শব্দ তরঙ্গ যখন কানে প্রবেশ করে, তখন এই পাতলা পর্দাটিতে কম্পন সৃষ্টি হয়। এই কম্পনই পরবর্তীতে স্নায়ুর মাধ্যমে মস্তিষ্কে পৌঁছায় এবং আমরা শব্দ শুনতে পাই।
ফাটলের প্রভাব: যদি কোনো কারণে এই পর্দায় সামান্যতম ছিদ্র বা ফাটল (ওয়াকর) তৈরি হয়, তবে শব্দ তরঙ্গ সেখানে সঠিক কম্পন সৃষ্টি করতে পারে না। ফলে শ্রবণশক্তি আংশিক বা পুরোপুরি হ্রাস পায়।
৩. আয়াতের প্রেক্ষাপট: শারীরিক ও আত্মিক বধিরতা
সুরা আল-আনআমের এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা কাফিরদের সত্যবিমুখতার কথা বলছেন। তিনি বলছেন, তাদের অন্তরে যেমন আবরণ (আকিনন্নাহ) আছে, তেমনি তাদের কানে রয়েছে ‘ওয়াকর’ বা ফাটল। এখানে একটি সূক্ষ্ম বিষয় হলো, আল্লাহ শব্দ শুনতে না পারার জন্য সরাসরি ‘বধির’ (Sammun) শব্দটি ব্যবহার না করে ‘ওয়াকর’ কেন ব্যবহার করলেন? এর কারণ হতে পারে:
শারীরিক সত্য: কানের পর্দার ফাটল বা ছিদ্রই হলো শ্রবণের প্রধান প্রতিবন্ধকতা।
উপমার গভীরতা: যেভাবে কানের পর্দার ফাটল শব্দকে মস্তিষ্কে পৌঁছাতে বাধা দেয়, তেমনি সত্যবিমুখদের হৃদয়ের “শ্রবণ ক্ষমতা” এমনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যে আল্লাহর বাণী তাদের অন্তরে কোনো কম্পন বা প্রভাব সৃষ্টি করতে পারছে না।

চিত্র : একটি কানের ভীতরের পূর্ণাঙ্গ ছবি।
৪. ১৪৫০ বছর আগের জ্ঞান বনাম বর্তমান বিজ্ঞান
সপ্তম শতাব্দীতে মানুষের ধারণা ছিল শ্রবণশক্তি হারানো মানেই হলো কানের ভেতরে কোনো অদৃশ্য বাধা সৃষ্টি হওয়া। কানের ভেতরে যে একটি অতি পাতলা পর্দা আছে এবং সেই পর্দায় সামান্য ফাটল বা ছিদ্র হলে মানুষ শুনতে পায় না, এই তথ্যটি তখনকার সময়ে কারো পক্ষেই জানা সম্ভব ছিল না। কারণ:
- অণুবীক্ষণ যন্ত্রের অনুপস্থিতি: কানের পর্দা এতই সূক্ষ্ম যে তা খালি চোখে দেখা বা এর কার্যকারিতা বোঝা কঠিন।
- অটোলজি (Otology) বিদ্যার অনুপস্থিতি: কানের রোগ ও প্রতিকার নিয়ে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের বিকাশ ঘটেছে মাত্র গত কয়েক শতাব্দীতে।
কিন্তু কুরআন এমন একটি শব্দ (ওয়াকর) ব্যবহার করেছে যা সরাসরি কানের গাঠনিক ত্রুটি বা ছিদ্রকে নির্দেশ করে। এটি নিঃসন্দেহে প্রমাণ করে যে, এই বাণী সেই সত্তার পক্ষ থেকে এসেছে যিনি মানবদেহের প্রতিটি কোষ ও ঝিল্লির স্রষ্টা।
৫. চিন্তার খোরাক ও একটি অলৌকিক সামঞ্জস্য
কুরআনের এই আয়াতটি আমাদের দুটি বিষয় শিক্ষা দেয়:
প্রথমত, মানুষের শ্রবণশক্তির জটিলতা এবং এর সুরক্ষার গুরুত্ব। কানের পর্দা ফেটে গেলে যেমন সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে এবং শ্রবণশক্তি কমে যায়, তেমনি মানুষের সত্য শোনার মানসিকতা নষ্ট হলে সে আধ্যাত্মিকভাবে দেউলিয়া হয়ে যায়।
দ্বিতীয়ত, কুরআনের শব্দ চয়ন। আরবরা এই শব্দটি ব্যবহার করত ভারী বোঝার ক্ষেত্রেও, যা কানের ওপর একটি মানসিক ও শারীরিক চাপকে বোঝায়। বর্তমান বিজ্ঞান বলে, কানের ভেতরের বায়ুচাপ (Air Pressure) যদি পর্দার দুই পাশে সমান না থাকে বা পর্দায় ছিদ্র থাকে, তবে কানের ওপর একটি অস্বস্তিকর চাপ অনুভূত হয়।
সুরা আল-আলাকের ‘নাসিয়াহ’ (কপাল) এবং সুরা আল-আনআমের ‘ওয়াকর’ (কানের ফাটল)—এই শব্দগুলো প্রমাণ করে যে কুরআন কেবল উপদেশের কিতাব নয়, বরং এতে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য বৈজ্ঞানিক সত্য। একজন উম্মি বা নিরক্ষর নবীর পক্ষে মানুষের অ্যানাটমি বা ব্যবচ্ছেদ বিদ্যা না জেনে এমন নিখুঁত পরিভাষা ব্যবহার করা অসম্ভব। এটিই কুরআনের অলৌকিকতা (Miracle of the Quran)।