এক দেহে দুই হৃদপিণ্ড নেই
মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন
মহাগ্রন্থ আল কুরআন কেবল একটি ধর্মীয় বিধিবিধানের সংকলন নয়, বরং এটি জ্ঞান-বিজ্ঞানের এক অতলস্পর্শী মহাসমুদ্র। দেড় হাজার বছর পূর্বে যখন পৃথিবী অজ্ঞানতার অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিল, তখন মরুভূমির তপ্ত বালুকারাশিতে অবতীর্ণ এই কিতাব মহাবিশ্বের এমন সব গূঢ় রহস্য উন্মোচন করেছে, যা আধুনিক বিজ্ঞান মাত্র গত কয়েক দশকে আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা এই কুরআনকে ‘হাকীম’ বা প্রজ্ঞাপূর্ণ ও বিজ্ঞানময় হিসেবে অভিহিত করেছেন। এর প্রতিটি আয়াত মানবজাতিকে অজানাকে জানার, সৃষ্টিজগতকে পর্যবেক্ষণ করার এবং বিবেক-বুদ্ধি খাটিয়ে গবেষণার উদাত্ত আহ্বান জানায়। মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَالۡقُرۡاٰنِ الۡحَکِیۡمِ ۙ
বিজ্ঞানময় কুরআনের শপথ। সুরা ইয়াসিন : ২
আল্লাহ তাআলা প্রজ্ঞাময় বা বিজ্ঞানময় কুরআনের শপথ করে এর সত্যতা ও গুরুত্বের ওপর জোর দিয়েছেন, যা প্রকৃতির অগণিত বৈজ্ঞানিক নিদর্শন এবং জীবনের গভীর সত্যের প্রতি ইঙ্গিত করে, যেমন বৃষ্টির মাধ্যমে মৃত ধরিত্রীতে প্রাণের সঞ্চার ও পুনরুত্থানের উদাহরণ, যা কুরআনের ঐশ্বরিক উৎসের প্রমাণ বহন করে।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, দীর্ঘ এই সময়ে বিজ্ঞানের অনেক তত্ত্ব পরিবর্তন বা বাতিল হলেও কুরআনের একটি দাবিকেও আধুনিক বিজ্ঞান আজ অবধি ভুল প্রমাণ করতে পারেনি। বরং বিজ্ঞানের প্রতিটি নতুন আবিষ্কার কুরআনের সত্যতাকেই বারবার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করছে। মূলত, বিজ্ঞান যেখানে সত্যের সন্ধান থামিয়ে দেয়, সেখান থেকেই কুরআনের আধ্যাত্মিক ও বৈজ্ঞানিক প্রজ্ঞার যাত্রা শুরু হয়। তাই কুরআন ও বিজ্ঞান একে অপরের প্রতিপক্ষ নয়, বরং কুরআন হলো বিজ্ঞানের পথপ্রদর্শক এবং প্রকৃত সত্যের আলোকবর্তিকা।
কুরআন মানবজাতির জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান, যা বৈজ্ঞানিক সত্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সঠিক পথ নির্দেশনা প্রদান করে। পূর্বের আলোচনায় দেখেছি, মহাবিশ্বের সৃষ্টিতত্ত্ব, ভ্রূণবিদ্যার ক্রমবিকাশ, সমুদ্রতত্ত্ব, ভূ-তত্ত্ব কিংবা মহাকাশ বিজ্ঞানের মতো জটিল বিষয়গুলো কুরআনে অত্যন্ত নিখুঁত ও অলৌকিকভাবে বর্ণিত হয়েছে। এ অধ্যায়ে কুরআনে বর্নিত আরও কিছু বৈজ্ঞানিক নিদর্শন সম্পর্কে আলোচনা করব। ইনশাআল্লাহ।
এক দেহে দুই হৃদপিণ্ড নেই
সৃষ্টিজগতের প্রতিটি অণু-পরমাণু মহান স্রষ্টা আল্লাহ তাআলার নিপুণ কারুকার্য এবং একত্বের সাক্ষ্য দেয়। পবিত্র কুরআনে মানুষের সৃষ্টি এবং শারীরবৃত্তীয় গঠন নিয়ে এমন কিছু অকাট্য সত্য বর্ণিত হয়েছে, যা আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের যুগে এসেও বিস্ময় সৃষ্টি করে। সূরা আহযাবের ৪ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ ঘোষণা করেছেন-
مَا جَعَلَ اللّٰہُ لِرَجُلٍ مِّنۡ قَلۡبَیۡنِ فِیۡ جَوۡفِہٖ
“আল্লাহ কোন মানুষের অভ্যন্তরে দু’টি হৃদয় সৃষ্টি করেন নাই। সূরা আহযাব : ৪
এই ছোট্ট একটি বাক্যের ভেতরে লুকিয়ে আছে গভীর বৈজ্ঞানিক সত্য, চারিত্রিক শিক্ষা এবং তৎকালীন কুসংস্কারের মূলে কুঠারাঘাত।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও তাফসীর :
এই আয়াতটি নাজিলের পেছনে যেমন সুনির্দিষ্ট প্রেক্ষাপট রয়েছে, তেমনি রয়েছে এর রূপক ও আত্মিক ব্যাখ্যা।
১. মিথ্যা অহমিকার খণ্ডন:
তৎকালীন আরবে ‘জামিল ইবন মুআম্মার আল ফাহরী’ নামক এক ব্যক্তি ছিল যার স্মৃতিশক্তি ছিল অত্যন্ত প্রখর। সে দাবি করত, তার শরীরের ভেতর দুটি হৃদপিণ্ড রয়েছে, যার কারণে সে সাধারণ মানুষের চেয়ে বেশি মেধাবী। এই আয়াতে মহান আল্লাহ তার সেই মিথ্যা দাবিকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন। ইমাম ইবন কাসীর (মৃত্যু ৭৭৪ হি.), সূরা আহযাবের এ আয়াতের ব্যাখ্যায়
২. মুনাফিকীর স্থান নেই:
তাফহীমুল কুরআনের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, মানুষের বক্ষদেশে যেমন দুটি হৃদপিণ্ড থাকা সম্ভব নয়, তেমনি একজনের হৃদয়ে একই সঙ্গে পূর্ণ ঈমান এবং পূর্ণ কুফর বা নেফাক (মুনাফিকী) অবস্থান করতে পারে না। সত্য ও মিথ্যা, আলো ও অন্ধকার যেমন এক নয়, মুমিনের হৃদয়ও তেমন একমুখী—যা কেবল আল্লাহর ইবাদতের জন্য নিবেদিত।
৩. সামাজিক কুসংস্কার দূরীকরণ:
প্রাচীন আরবে ‘জিহার’ (স্ত্রীকে মায়ের সাথে তুলনা করা) এবং পালক পুত্রকে আপন পুত্রের মর্যাদা দেওয়ার প্রথা প্রচলিত ছিল। আল্লাহ এই আয়াতের মাধ্যমে স্পষ্ট করেছেন যে, যেমন শারীরিকভাবে দুই হৃদপিণ্ড থাকা অসম্ভব, তেমনি একজন স্ত্রী কখনো মা হতে পারে না এবং পালক পুত্র কখনো রক্তের উত্তরাধিকারী হতে পারে না।
আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান ও কুরআনের সত্যতা
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে লক্ষ লক্ষ বিকলাঙ্গ বা ব্যতিক্রমী শিশু জন্মের উদাহরণ রয়েছে। আমরা প্রায়ই সংবাদমাধ্যমে দেখি জোড়া লাগানো শিশু, যাদের দুটি মাথা বা চারটি হাত-পা রয়েছে। কিন্তু অত্যন্ত বিস্ময়কর বিষয় হলো, আজ পর্যন্ত চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে এমন কোনো একক মানুষের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি যার শরীরে প্রাকৃতিকভাবে দুটি কার্যক্ষম হৃদপিণ্ড রয়েছে। আজকের আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান লক্ষ লক্ষ মানুষের জন্মগত ত্রুটি (Congenital abnormalities) নিয়ে গবেষণা করেছে। দেখা যায়—
- কারো হৃদপিণ্ড ডান পাশে অবস্থান করতে পার।
- কারো হৃদপিণ্ড বিকৃত হতে পারে,
- এমনকি কারো হৃদপিণ্ডই গঠিত না হতে পারে, যদিও সে শিশু জীবিত থাকে না।
কিন্তু ইতিহাসের কোনো যুগেই এমন কোনো মানুষের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি, যার দুটি পূর্ণ হৃদপিণ্ড রয়েছে। হাজারো ব্যতিক্রম থাকা সত্ত্বেও এই একটি বিষয় কখনোই ব্যতিক্রম হয়নি। এটি কুরআনের ঘোষণার এক বিস্ময়কর বাস্তব প্রমাণ।
Dextrocardia : কারও হৃদপিণ্ড বাম পাশের পরিবর্তে ডান পাশে থাকতে পারে, যাকে ডেক্সট্রোকার্ডিয়া বলা হয়।
•Acardia : গর্ভস্থ ভ্রূণে অনেক সময় হৃদপিণ্ড গঠিত হয় না, যাকে একার্ডিয়া বলা হয় (এসব শিশু সাধারণত বাঁচে না)।
কিন্তু ‘দুই হৃদপিণ্ড’ বা ‘Two Hearts’ বিশিষ্ট কোনো মানুষের জন্ম আজ অবধি অসম্ভবই রয়ে গেছে। এটি প্রমাণ করে যে, মানুষের দৈহিক কাঠামোর যে ব্লু-প্রিন্ট মহান আল্লাহ নির্ধারণ করেছেন, তার কোনো পরিবর্তন নেই।

ফিতরাত ও সৃষ্টির অপরিবর্তনীয়তা :
আল্লাহ তায়ালা সূরা রূমে বলেন—
﴿لَا تَبْدِيلَ لِخَلْقِ اللَّهِ﴾
“আল্লাহর সৃষ্টিতে কোনো পরিবর্তন নেই। সূরা রূম: ৩০
এখানে ফিতরাতুল্লাহ বলতে বোঝানো হয়েছে—আল্লাহ মানুষকে যে সহজাত প্রকৃতির উপর সৃষ্টি করেছেন, যা মূলত তাওহীদ ও ইসলামের প্রতি ঝোঁক। যেমন মানুষের শরীরগত গঠন নির্দিষ্ট নিয়মে অপরিবর্তনীয়, তেমনি আত্মিক ও নৈতিক কাঠামোরও একটি নির্ধারিত সত্য রয়েছে।
“কারো দুটি হৃদপিণ্ড নাই”—এই কুরআনিক ঘোষণা কেবল একটি শারীরিক সত্য নয়; বরং এটি মানুষের আকীদা, চরিত্র, নৈতিকতা ও সমাজব্যবস্থার এক মৌলিক নীতির ঘোষণা। কুরআন মানুষের ভেতরের ও বাহিরের উভয় জগতকে একই সঙ্গে সম্বোধন করে। আধুনিক বিজ্ঞান যত অগ্রসর হচ্ছে, ততই কুরআনের এসব ঘোষণার সত্যতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَ فِی الْاَرْضِ اٰیٰتٌ لِّلْمُوْقِنِیْنَ ﴿ۙ۲۰﴾ وَ فِیْۤ اَنْفُسِکُمْ ؕ اَفَلَا تُبْصِرُوْنَ ﴿۲۱﴾
“সুনিশ্চিত বিশ্বাসীদের জন্য যমীনে বহু নিদর্শন রয়েছে, এবং তোমাদের নিজেদের মধ্যেও। তোমরা কি চক্ষুষ্মান হবে না?” সূরা জারিয়াত: ২০–২১
সুবহানাল্লাহ! আল্লাহর বাণীর কোনো পরিবর্তন নেই—অতীতেও না, বর্তমানেও না, ভবিষ্যতেও না।