বিজ্ঞানময় কুরআন -পর্ব পাঁচ :: মহাবিশ্বে সকলেই তার কক্ষপথে ঘুরছে

মহাবিশ্বে সকলেই তার কক্ষপথে ঘুরছে

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

পবিত্র কুরআনের মহাজাগতিক সত্যগুলো কেবল আধ্যাত্মিক দিকনির্দেশনাই নয়, বরং আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের এক বিস্ময়কর প্রতিফলন।কুরআন মহাবিশ্বকে কখনোই স্থির বা বিশৃঙ্খল কোনো বাস্তবতা হিসেবে উপস্থাপন করেনি। বরং কুরআনের ভাষায় পুরো মহাবিশ্ব একটি সুশৃঙ্খল, নিয়মতান্ত্রিক ও গতিশীল ব্যবস্থা, যেখানে প্রতিটি সৃষ্ট বস্তু আল্লাহ নির্ধারিত নিয়মে অনেক আয়াতে এ সম্পর্কে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত অথচ গভীর ভাষায় তুলে ধরেছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَہُوَ الَّذِیۡ خَلَقَ الَّیۡلَ وَالنَّہَارَ وَالشَّمۡسَ وَالۡقَمَرَ ؕ کُلٌّ فِیۡ فَلَکٍ یَّسۡبَحُوۡنَ

আর তিনিই রাত ও দিন এবং সূর্য ও চাঁদ সৃষ্টি করেছেন; সবাই নিজ নিজ কক্ষপথে বিচরণ করে। সুরা আম্বিয়া : ৩৩

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

لَا الشَّمۡسُ یَنۡۢبَغِیۡ لَہَاۤ اَنۡ تُدۡرِکَ الۡقَمَرَ وَلَا الَّیۡلُ سَابِقُ النَّہَارِ ؕ وَکُلٌّ فِیۡ فَلَکٍ یَّسۡبَحُوۡنَ

সূর্যের জন্য সম্ভব নয় চাঁদের নাগাল পাওয়া, আর রাতের জন্য সম্ভব নয় দিনকে অতিক্রম করা, আর প্রত্যেকেই কক্ষ পথে ভেসে বেড়ায়। সুরা ইয়াসিন : ৪০

১. আয়াত দুটির প্রেক্ষাপট ও মূল তাৎপর্য

১. “كُلٌّ فِي فَلَكٍ يَسْبَحُونَ” — শব্দের তাৎপর্য

  • كُلٌّ (কুল্লুন) : প্রত্যেকেই, সবাই
  • فَلَكٍ (ফালাক) : বৃত্তাকার কক্ষপথ, ঘূর্ণায়মান পথ
  • يَسْبَحُونَ (ইয়াসবাহূন) : সাঁতার কাটছে, ভেসে চলছে, ধারাবাহিকভাবে গতিশীল

ইমাম ইবনু কাসীর (রহ.) বলেন, “ফালাক বলতে আকাশে নির্ধারিত সেই পথকে বোঝানো হয়েছে, যেখানে নক্ষত্র, সূর্য ও চন্দ্র নিয়মতান্ত্রিকভাবে আবর্তিত হয়।”

এখানে ‘ইয়াসবাহূন’ শব্দটি বিশেষভাবে লক্ষণীয়। আরবিতে এটি সাধারণ হাঁটা নয়; বরং তরল মাধ্যমে সাঁতারের মতো প্রতিবন্ধকতাহীন, নিরবচ্ছিন্ন ও নিয়ন্ত্রিত গতি বোঝায়।

কুরআনুল কারীমের এই দুটি আয়াতে আল্লাহ তায়ালা মহাবিশ্বের শৃঙ্খলা এবং গ্রহ-নক্ষত্রের গতিবিধি সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন।

সূরা আল-আম্বিয়ার ৩৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলছেন যে, রাত, দিন, সূর্য এবং চাঁদ—সবই তাঁর সৃষ্টি এবং প্রত্যেকেই একটি নির্দিষ্ট কক্ষপথে ‘সাতার কাটছে’ বা ‘বিচরণ করছে’। এখানে আরবি শব্দ ‘ইয়াসবাহুন’ (يَسْبَحُونَ) ব্যবহৃত হয়েছে, যা মূলত তরল পদার্থে সাতার কাটা বা মসৃণ গতিতে চলা বোঝায়।

সূরা ইয়াসিনের ৪০ নম্বর আয়াতে মহাজাগতিক শৃঙ্খলার এক চরম সত্য ফুটে উঠেছে। এখানে বলা হয়েছে, সূর্য এবং চাঁদের কক্ষপথ ভিন্ন, তাই তাদের মধ্যে সংঘর্ষের কোনো সম্ভাবনা নেই। দিন এবং রাতের পর্যায়ক্রমিক আবর্তনও মহান আল্লাহর এক সুনিপুণ পরিকল্পনা।

২. কক্ষপথসাতার কাটার ব্যাখ্যা

ঐতিহাসিকভাবে, প্রাচীন তাফসিরবিদগণ এই আয়াতগুলোর ব্যাখ্যায় বলেছিলেন যে, আকাশমন্ডলে গ্রহ-নক্ষত্রগুলো এমনভাবে চলে যেমনটি পানিতে মাছ সাতার কাটে। তৎকালীন সময়ে মানুষের ধারণা ছিল পৃথিবী স্থির, কিন্তু কুরআন স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয় যে সূর্য এবং চাঁদ কেবল স্থির নয়, বরং তারা একটি নির্দিষ্ট গতিতে চলমান।

ফালাক (فَلَكٍ): এর অর্থ গোলাকার পথ বা কক্ষপথ। কুরআন আজ থেকে ১৪০০ বছর আগে ‘ফালাক’ শব্দটি ব্যবহার করে এটি স্পষ্ট করেছে যে, মহাকাশের প্রতিটি বস্তুর একটি নির্দিষ্ট গাণিতিক পথ রয়েছে।

সাতার কাটা: শূন্যস্থানে গ্রহগুলোর গতিকে সাতার কাটার সাথে তুলনা করা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ মহাকাশে কোনো ঘর্ষণ নেই, গ্রহগুলো যেন এক অদৃশ্য সুতোয় (মহাকর্ষ বল) বাধা হয়ে ভেসে বেড়াচ্ছে।

৩. আধুনিক বিজ্ঞানের সাথে সমন্বয়

আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান (Astronomy) এবং মহাকাশ পদার্থবিজ্ঞান (Astrophysics) এই আয়াত দুটির সত্যতা ধাপে ধাপে প্রমাণ করেছে:

ক) সূর্যের গতিশীলতা (Solar Apex)

দীর্ঘদিন ধরে মানুষ মনে করত সূর্য স্থির এবং পৃথিবী তার চারদিকে ঘোরে। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান বলছে, সূর্যও স্থির নয়। সূর্য তার পুরো সৌরজগতকে নিয়ে মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির কেন্দ্রে অবস্থিত কৃষ্ণগহ্বরকে কেন্দ্র করে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ২২০ কিলোমিটার বেগে ঘুরছে। কুরআনের “প্রত্যেকেই নিজ নিজ কক্ষপথে বিচরণ করে” কথাটি সূর্যের এই গ্যালাকটিক গতিকে (Galactic Motion) নির্দেশ করে। আগে মানুষ সূর্যকে স্থির মনে করত। কিন্তু আজ বিজ্ঞান বলছে—

  • সূর্য নিজ অক্ষের উপর ঘোরে
  • সূর্য পুরো সৌরজগতকে সঙ্গে নিয়ে মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির কেন্দ্রের চারপাশে কক্ষপথে আবর্তিত হয়
  • একবার প্রদক্ষিণ করতে সময় লাগে প্রায় ২২৫ মিলিয়ন বছর।
  •  

খ) কক্ষপথের ভিন্নতা ও সংঘর্ষহীনতা

সূরা ইয়াসিনে বলা হয়েছে, সূর্যের পক্ষে চাঁদকে ধরা সম্ভব নয়। বিজ্ঞান আমাদের জানায়, সূর্য থেকে পৃথিবীর দূরত্ব প্রায় ১৫ কোটি কিলোমিটার, আর চাঁদ থেকে পৃথিবীর দূরত্ব মাত্র ৩.৮৪ লক্ষ কিলোমিটার। তাদের কক্ষপথ এবং মহাকর্ষীয় অবস্থান এতটাই আলাদা যে, কোটি কোটি বছর ধরে তারা নিজ নিজ পথে চলছে, কেউ কারো পথে বাধা সৃষ্টি করছে না।

গ) তরল পদার্থের মতো গতি

মহাকাশকে একসময় শূন্য মনে করা হতো, কিন্তু আধুনিক ‘ফ্যাব্রিক অফ স্পেস-টাইম’ থিওরি অনুযায়ী, মহাকাশ এক প্রকারের ক্ষেত্র বা মাধ্যম। গ্রহগুলো যখন এতে ঘোরে, তখন তারা অনেকটা ঢেউয়ের মতো বা সাতার কাটার মতো করেই এগিয়ে যায়। ‘ইয়াসবাহুন’ শব্দটি এই বৈজ্ঞানিক সূক্ষ্মতাকে চমৎকারভাবে ধারণ করেছে।

ঘ. চাঁদের কক্ষপথ

চাঁদ পৃথিবীর চারদিকে ঘোরে। একই সঙ্গে পৃথিবীর সঙ্গে সূর্যের চারদিকে ঘোরে এটাই তার কক্ষপথ উপবৃত্তাকার (Elliptical)। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَالۡقَمَرَ قَدَّرۡنٰہُ مَنَازِلَ حَتّٰی عَادَ کَالۡعُرۡجُوۡنِ الۡقَدِیۡمِ

আর চাঁদের জন্য আমি নির্ধারণ করেছি কক্ষপথসমূহ (মানযিলসমূহ), অবশেষে সেটি খেজুরের শুষ্ক পুরাতন শাখার মত হয়ে যায়। সুরা ইয়াসিন : ৩৯

৪. ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও বিশ্বাসের সমন্বয়

ঐতিহাসিকভাবে যখন এই আয়াতগুলো নাজিল হয়েছিল, তখন গ্রিক জ্যোতির্বিজ্ঞানী টলেমির (Ptolemy) ‘ভূ-কেন্দ্রিক’ মতবাদ প্রচলিত ছিল, যেখানে পৃথিবীকে স্থির মনে করা হতো। কিন্তু কুরআন কোনো প্রচলিত ভুল তত্ত্বকে গ্রহণ না করে এক চিরন্তন সত্য প্রকাশ করেছে।

ইউরোপীয় বিজ্ঞানীরা যেমন কোপার্নিকাস বা গ্যালিলিও যখন এই সত্যগুলো আবিষ্কার করতে শুরু করেন, তখন তাদের চার্চের বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। অথচ ইসলামি সভ্যতায় এই আয়াতগুলো বিজ্ঞানীদের মহাকাশ গবেষণায় উৎসাহিত করেছিল। আল-বিরুনি বা ইবনে আল-হাইসামের মতো মুসলিম বিজ্ঞানীরা এই কুরআনিক দর্শনের ওপর ভিত্তি করেই জ্যোতির্বিজ্ঞানে অসামান্য অবদান রেখেছিলেন।

মহাবিশ্বের এই বিশালতা এবং নিখুঁত শৃঙ্খলা কোনো আকস্মিক ঘটনা হতে পারে না। সূরা আল-আম্বিয়া ও সূরা ইয়াসিনের এই আয়াতগুলো প্রমাণ করে যে:

  • মহাবিশ্বের প্রতিটি বস্তু গতিশীল।
  • তাদের প্রত্যেকের নিজস্ব এবং সুনির্দিষ্ট কক্ষপথ রয়েছে।
  • এই গতির মধ্যে কোনো বিশৃঙ্খলা নেই, বরং এটি একটি মহাজাগতিক আইনের অধীন।

আধুনিক টেলিস্কোপ এবং মহাকাশযান আজ যা দেখছে, কুরআন তা শত শত বছর আগেই অত্যন্ত কাব্যিক ও বৈজ্ঞানিক ভাষায় বর্ণনা করেছে। এটি আমাদের বিশ্বাসের ভিতকে আরও মজবুত করে এবং প্রমাণ করে যে কুরআন সত্যিই এক মহান স্রষ্টার বাণী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *