চন্দ্রের নিজস্ব কোন আলো নেই
মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন
মহাবিশ্বের সৃষ্টিরহস্য নিয়ে মানুষ আবহমান কাল ধরে চিন্তা-গবেষণা করে আসছে। একটা সময় ছিল যখন মানুষের ধারণা ছিল, আকাশের বুকে জ্বলজ্বল করা সূর্য এবং চাঁদ উভয়েই হয়তো নিজস্ব আলোয় আলোকিত। খালি চোখে দেখলে মনে হওয়াই স্বাভাবিক যে, চাঁদ ও সূর্য দুটিই স্বয়ংপ্রভ বা নিজেদের আলো আছে। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান এবং পবিত্র কুরআনের আয়াতের দিকে তাকালে আমরা এক বিস্ময়কর সত্যের মুখোমুখি হই। আজ থেকে চৌদ্দশ বছর আগে, যখন বিজ্ঞানের কোনো আধুনিক যন্ত্রপাতি ছিল না, তখন পবিত্র কুরআন সূর্য ও চন্দ্রের আলোর প্রকৃতির যে সূক্ষ্ম পার্থক্য তুলে ধরেছে, তা সত্যিই মহান আল্লাহর অসীম কুদরতের প্রমাণ।
১. আধুনিক বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে সূর্য ও চন্দ্রের আলো
আজকের আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান আমাদের নিশ্চিত করেছে যে, সূর্য এবং চন্দ্রের আলো এক প্রকৃতির নয়। সূর্য (The Sun) একটি নক্ষত্র। এর ভেতরে প্রতিনিয়ত ফিউশন বিক্রিয়া (Nuclear Fusion) চলছে, যার ফলে এটি নিজেই প্রচণ্ড তাপ ও আলো উৎপন্ন করে। অর্থাৎ, সূর্য হলো আলোর একটি ‘উৎস’ বা Source। বিজ্ঞান একে বলে ‘Luminous’ বা স্বয়ংপ্রভ।
অন্যদিকে চন্দ্র (The Moon) পৃথিবীর একটি উপগ্রহ এবং এটি কোনো নক্ষত্র নয়। চাঁদের নিজস্ব কোনো আলো বা তাপ নেই। এটি একটি নিরেট ও অন্ধকার মহাজাগতিক বস্তু। আমরা যে চাঁদকে উজ্জ্বল দেখি, তা মূলত সূর্যের আলো চাঁদের পিঠে পড়ে প্রতিফলিত হওয়ার ফল। বিজ্ঞান একে বলে ‘Non-luminous’ বা ‘Reflector’ (প্রতিফলক)।
২. পবিত্র কুরআনে আলোর শ্রেণিবিন্যাস
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা মহাজাগতিক বস্তুসমূহের বর্ণনা দিতে গিয়ে অত্যন্ত সতর্ক এবং সুনির্দিষ্ট শব্দচয়ন করেছেন। কুরআনের কোথাও সূর্য এবং চাঁদের আলোকে গুলিয়ে ফেলা হয়নি বা এক শব্দ দিয়ে উভয়কে বোঝানো হয়নি। কুরআনে সূর্য এবং চাঁদের বর্ণনা দিতে গিয়ে যে শব্দগুলো ব্যবহার করা হয়েছে, তা একইসাথে ভাষাগত দিক থেকে সমৃদ্ধ এবং বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিস্ময়কর।
ক. সূর্যের জন্য ব্যবহৃত শব্দসমূহ
সূর্যের জন্য সিরাজ (سِرَاجًا) শব্দের ব্যবহার :
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَّجَعَلَ الۡقَمَرَ فِیۡہِنَّ نُوۡرًا وَّجَعَلَ الشَّمۡسَ سِرَاجًا
এবং সেখানে চাঁদকে স্থাপন করেছেন আলোক রূপে ও সূর্যকে স্থাপন করেছেন প্রদীপ রূপে। সূরা নূহ : ১৬
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
تَبٰرَکَ الَّذِیۡ جَعَلَ فِی السَّمَآءِ بُرُوۡجًا وَّجَعَلَ فِیۡہَا سِرٰجًا وَّقَمَرًا مُّنِیۡرًا
বরকতময় সে সত্তা যিনি আসমানে সৃষ্টি করেছেন বিশালকায় গ্রহসমূহ। আর তাতে প্রদীপ ও আলো বিকিরণকারী চাঁদ সৃষ্টি করেছেন। সূরা ফুরকান ; ৬১
এ দুই আয়াতে সূর্যকে বলেছেন ‘সিরাজ’ (প্রদীপ) হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আরবি ভাষায় ‘সিরাজ’ বলতে এমন একটি প্রদীপ বা মশালকে বোঝায় যা নিজে জ্বলে এবং চারপাশকে আলোকিত করে। কুরআনে সূর্যকে ‘সিরাজ’ বলার তাৎপর্য হলো, সূর্য একটি জ্বলন্ত নক্ষত্র যা নিজস্ব জ্বালানি (Hydrogen and Helium) পুড়িয়ে তাপ ও আলো উৎপন্ন করে। এটি মহাকাশে একটি বিশালাকার প্রাকৃতিক জ্বলন্ত বাতির মতো কাজ করে, যার দহন ক্ষমতা নিজস্ব।
সূর্যের জন্য ওয়াহ্হাজ (وَهَّاجًا) শব্দের ব্যবহার :
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَّجَعَلۡنَا سِرَاجًا وَّہَّاجًا ۪ۙ
আর আমি সৃষ্টি করেছি উজ্জ্বল একটি প্রদীপ। সুরা নাবা : ১৩
ওয়াহ্হাজ (وَهَّاجًا) ‘ওয়াহ্হাজ’ শব্দটি তীব্র দহন, প্রচণ্ড উত্তাপ এবং অত্যধিক উজ্জ্বলতা বা চাকচিক্য প্রকাশ করে। কুরআনে সূরা আন-নাবায় সূর্যকে ‘সিরাজান ওয়াহ্হাজা’ (উজ্জ্বল প্রদীপ) বলা হয়েছে। এর দ্বারা বুঝানো হয় যে সূর্যের আলো কোনো সাধারণ স্নিগ্ধ আলো নয়; বরং এটি অত্যন্ত শক্তিশালী দহন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সৃষ্ট তীব্র তাপ ও চোখ ধাঁধানো উজ্জ্বল শক্তিসম্পন্ন রশ্মি, যা পৃথিবীকে শক্তি। সূর্য যে কেবল আলো দেয় তা নয়, বরং এটি যে একটি বিশাল শক্তির উৎস যা অনবরত দহনের মাধ্যমে প্রচণ্ড তাপ ও শক্তি উৎপাদন করে। সূর্যকে ‘সিরাজান ওয়াহ্হাজা’ বলার অর্থ হলো এটি কেবল একটি সাধারণ বাতি নয়, বরং এটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও দহনকারী একটি আগুনের উৎস।
সূর্যের জন্য দ্বিয়া (ضِيَاءً) শব্দের ব্যবহার :
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
ہُوَ الَّذِیۡ جَعَلَ الشَّمۡسَ ضِیَآءً وَّالۡقَمَرَ نُوۡرًا وَّقَدَّرَہٗ مَنَازِلَ لِتَعۡلَمُوۡا عَدَدَ السِّنِیۡنَ وَالۡحِسَابَ ؕ مَا خَلَقَ اللّٰہُ ذٰلِکَ اِلَّا بِالۡحَقِّ ۚ یُفَصِّلُ الۡاٰیٰتِ لِقَوۡمٍ یَّعۡلَمُوۡنَ
তিনিই সূর্যকে করেছেন দীপ্তিময় এবং চাঁদকে আলোময় আর তার জন্য নির্ধারণ করেছেন বিভিন্ন মনযিল, যাতে তোমরা জানতে পার বছরের গণনা এবং (সময়ের) হিসাব। আল্লাহ এগুলো অবশ্যই যথার্থভাবে সৃষ্টি করেছেন। জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্য তিনি আয়াতসমূহ বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেন। সূরা ইউনুস : ৫
এই আয়াতে সূর্যের আলোকে ‘দ্বিয়া’ বা তেজস্কর বলা হয়েছে, যা তাপ ও শক্তির উৎস। অন্যদিকে চাঁদের আলোকে শুধুই ‘নূর’ বা জ্যোতি বলা হয়েছে যা তাপহীন এবং স্নিগ্ধ।
‘দ্বিয়া’ হলো সেই তেজদীপ্ত আলো যা কোনো মূল উৎস থেকে সরাসরি বিচ্ছুরিত হয়। এটি অত্যন্ত তীব্র এবং প্রখর প্রকৃতির আলো। কুরআনে সূর্যের ক্ষেত্রে এই শব্দটি ব্যবহার করে বোঝানো হয়েছে যে, সূর্য আলোর একটি মৌলিক উৎস (Original Source)। এটি অন্য কোনো গ্রহ বা নক্ষত্র থেকে আলো ধার করে না, বরং নিজেই আলোর আধার হিসেবে কাজ করে।
খ. চাঁদের জন্য ব্যবহৃত শব্দসমূহ
চাঁদের জন্য নূর (نُورًا) শব্দের ব্যবহার :
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَّجَعَلَ الۡقَمَرَ فِیۡہِنَّ نُوۡرًا وَّجَعَلَ الشَّمۡسَ سِرَاجًا
এবং সেখানে চাঁদকে স্থাপন করেছেন আলোক রূপে ও সূর্যকে স্থাপন করেছেন প্রদীপ রূপে। সূরা নূহ : ১৬
নূর (نُورًا) ‘নূর’ শব্দটি দ্বারা এমন স্নিগ্ধ, কোমল ও তাপহীন জ্যোতিকে বোঝানো হয় যা চোখের জন্য আরামদায়ক। এখানে আল্লাহ চাঁদকে বলেছেন ‘নূর’ (স্নিগ্ধ আলো) কারন চাঁদ সেই প্রদীপের আলোয় আলোকিত হয় মাত্র। চাঁদকে ‘নূর’ বলার মাধ্যমে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, এর আলো নিজস্ব কোনো আগুনের ফলাফল নয়, বরং এটি একটি প্রতিফলিত স্নিগ্ধ আভা যা রাতের অন্ধকার দূর করে প্রশান্তি দেয়। কুরআনে চাঁদকে দহনকারী ‘সিরাজ’ না বলে ‘নূর’ বলা হয়েছে। এটি বৈজ্ঞানিকভাবে নির্দেশ করে যে, চাঁদের আলো তার নিজস্ব দহন বা ফিউশন থেকে সৃষ্ট নয়। বরং এটি সূর্যের তীব্র আলো প্রতিফলিত করে রাতে পৃথিবীকে আলোকিত করে, যা শান্ত ও মনোরম প্রকৃতির হয়।
চাঁদের জন্য মুনীর (مُّنِيرًا) শব্দের ব্যবহার :
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
تَبٰرَکَ الَّذِیۡ جَعَلَ فِی السَّمَآءِ بُرُوۡجًا وَّجَعَلَ فِیۡہَا سِرٰجًا وَّقَمَرًا مُّنِیۡرًا
বরকতময় সে সত্তা যিনি আসমানে সৃষ্টি করেছেন বিশালকায় গ্রহসমূহ। আর তাতে প্রদীপ ও আলো বিকিরণকারী চাঁদ সৃষ্টি করেছেন। সূরা ফুরকান ; ৬১
মুনীর (مُّنِيرًا) ‘মুনীর’ শব্দটি এমন বস্তুর ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয় যা অন্ধকার দূর করে এবং যা নিজে আলোর উৎস না হয়েও অন্যের আলোয় আলোকিত হয়ে দীপ্তি ছড়ায়। চাঁদকে ‘কামারান মুনীরা’ বলার মাধ্যমে কুরআনে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, চাঁদ কোনো নক্ষত্র নয় এবং এর নিজস্ব আলো নেই। এটি সূর্যের আলো গ্রহণ করে এবং সেই ধার করা আলোয় (Reflected Light) আলোকিত হয়ে রাতের আকাশকে উজ্জ্বল করে তোলে। চাঁদকে ‘মুনীর’ বলার বৈজ্ঞানিক বিস্ময় হলো—চাঁদ আসলে একটি অন্ধকার উপগ্রহ, যা সূর্যের আলো প্রতিফলিত করে উজ্জ্বল দেখায়। অর্থাৎ চাঁদ নিজে জ্বলে না, বরং সূর্যের আলোয় “আলোকিত” হয়ে আমাদের আলো প্রদান করে।
৩. ভাষাগত সংযোগ: সিরাজ, চেরাগ ও দিয়াশলাই
আপনার পর্যবেক্ষণটি অত্যন্ত চমৎকার এবং চিন্তাশীল। শব্দের ব্যুৎপত্তি বা Etymology নিয়ে ভাবলে দেখা যায়, আরবি শব্দের প্রভাব আমাদের বাংলা ও আঞ্চলিক ভাষায় কত গভীরভাবে মিশে আছে।
সিরাজ থেকে চেরাগ: আরবি ‘সিরাজ’ (প্রদীপ) শব্দটি ফারসি ও উর্দু হয়ে আমাদের ভাষায় ‘চেরাগ’ হিসেবে এসেছে। প্রাচীন বাতি বা প্রদীপকে আমরা চেরাগ বলি। আর আপনি যেমন বলেছেন, মিশরের উপভাষায় ‘জিম’ বর্ণটি ‘গাইন’ বা ‘গ’-এর মতো উচ্চারিত হয় (যেমন: জামাল কে গামাল বলা), সেই হিসেবে ‘সিরাজ’ থেকে ‘সেরাগ’ বা ‘চেরাগ’ রূপান্তরটি অত্যন্ত যৌক্তিক।
দ্বিয়া থেকে দিয়াশলাই: ‘দ্বিয়া’ অর্থ আলো বা প্রদীপ। আমাদের দেশে ‘দিয়াশলাই’ বা ‘দিয়া’ শব্দটি আগুনের উৎসের সাথে সম্পর্কিত। ‘দিয়া’ (বাতি) জ্বালায় যে শলাই বা কাঠি, তাই দিয়াশলাই। অর্থাৎ, সূর্যের নাম ‘দ্বিয়া’ রাখা হয়েছে কারণ তা আগুনের উৎস, আর আমাদের ভাষার ‘দিয়া’ শব্দটিও আগুনের উৎসের সাথে মিলে যায়।
৪. এক অকাট্য প্রমাণ
১৪৫০ বছর আগে মরুভূমির বুকে নাযিল হওয়া এই মহাগ্রন্থে কীভাবে জানা সম্ভব ছিল যে, সূর্য একটি জ্বলন্ত প্রদীপ (নিউক্লিয়ার রিয়্যাক্টর) আর চাঁদ নিছক একটি দর্পণ বা প্রতিফলক? তৎকালীন যুগে মানুষ চাঁদকেও দেবতার আসনে বসাত এবং ভাবত এর নিজস্ব শক্তি আছে। কিন্তু কুরআন সেই ভুল ধারণা ভেঙে দিয়েছে।
পবিত্র কুরআনে একবারের জন্যও সূর্যকে ‘নূর’ বলা হয়নি কিংবা চাঁদকে ‘সিরাজ’ বলা হয়নি। এই নির্ভুল শব্দচয়ন প্রমাণ করে যে, কুরআন কোনো মানবলব্ধ জ্ঞান নয়। এটি মহান স্রষ্টা আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের বাণী, যিনি সূর্য ও চন্দ্রের স্রষ্টা এবং তিনি জানেন কোনটি প্রদীপ আর কোনটি আয়না।
আল্লাহ সত্যই বলেছেন:
سَنُرِیۡہِمۡ اٰیٰتِنَا فِی الۡاٰفَاقِ وَفِیۡۤ اَنۡفُسِہِمۡ حَتّٰی یَتَبَیَّنَ لَہُمۡ اَنَّہُ الۡحَقُّ ؕ اَوَلَمۡ یَکۡفِ بِرَبِّکَ اَنَّہٗ عَلٰی کُلِّ شَیۡءٍ شَہِیۡدٌ
শ্বজগতে ও তাদের নিজদের মধ্যে আমি তাদেরকে আমার নিদর্শনাবলী দেখাব যাতে তাদের কাছে সুস্পষ্ট হয় যে, এটি (কুরআন) সত্য; তোমার রবের জন্য এটাই যথেষ্ট নয় কি যে, তিনি সকল বিষয়ে সাক্ষী? সূরা ফুসসিলাত : ৫৩
সুবহানাল্লাহ! মহাবিশ্বের এই নিখুঁত ব্যবস্থাপনা এবং কুরআনের এই বৈজ্ঞানিক সত্য আমাদের ঈমানকে আরও মজবুত করে।