বিজ্ঞানময় কুরআন – পর্ব সাত :: জাহান্নামের জ্বালানি মানুষ, মুর্তি ও পাথর

জাহান্নামের জ্বালানি মানুষ, মুর্তি ও পাথর

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

সৃষ্টিজগতের পালনকর্তা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা পরকালের যে বিচার ব্যবস্থার কথা পবিত্র কুরআনে বর্ণনা করেছেন, তা পৃথিবীর যে কোনো বিচার ব্যবস্থার চেয়ে গুণগত এবং পরিমাণগতভাবে ভিন্ন। পৃথিবীর আদালতে অপরাধের গুরুত্ব অনুযায়ী অনেক সময় উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না। একজন মানুষ যদি শত শত মানুষকে হত্যা করে, তবে পার্থিব আইনে তাকে বড়জোর একবারই মৃত্যুদণ্ড দেওয়া সম্ভব। কিন্তু তার অবশিষ্টাংশ অপরাধের বিচার এখানে অপূর্ণই থেকে যায়। পরকালে মহান আল্লাহ প্রতিটি অণু পরিমাণ কর্মের হিসাব গ্রহণ করবেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন:

وَنَضَعُ الْمَوَازِينَ الْقِسْطَ لِيَوْمِ الْقِيَامَةِ فَلَا تُظْلَمُ نَفْسٌ شَيْئًا ۖ وَإِن كَانَ مِثْقَالَ حَبَّةٍ مِّنْ خَرْدَلٍ أَتَيْنَا بِهَا ۗ وَكَفَىٰ بِنَا حَاسِبِينَ

“এবং কিয়ামত দিবসে আমি স্থাপন করিব ন্যায় বিচারের মানদণ্ড। সুতরাং কাহারও প্রতি কোন অবিচার করা হইবে না এবং কর্ম যদি তিল পরিমাণও ওজনের হয় তবু উহা আমি উপস্থিত করিব। হিসাব গ্রহণকারীরূপে আমিই যথেষ্ট।” সূরা আম্বিয়া, ২১:৪৭

জাহান্নামের আগুনের তীব্রতা বুঝাতে পবিত্র কুরআনে জ্বালানি হিসেবে মানুষ ও পাথরের কথা বারংবার উল্লেখ করা হয়েছে। বর্তমান বিজ্ঞানের আলোকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, কাঠ বা কয়লার চেয়ে পাথর এবং আণবিক শক্তির উৎসগুলো অনেক গুণ বেশি তাপ উৎপাদন করতে সক্ষম।

জাহান্নামের জ্বালানি সংক্রান্ত কুরআনী ঘোষণা

পবিত্র কুরআনে জাহান্নামের আগুনের জ্বালানি হিসেবে সুনির্দিষ্টভাবে তিনটি জিনিসের কথা বলা হয়েছে: মানুষ, পাথর এবং পাপিষ্ঠদের উপাস্য মূর্তি। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন:

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا وَقُودُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَةُ عَلَيْهَا مَلَائِكَةٌ غِلَاظٌ شِدَادٌ لَّا يَعْصُونَ اللَّهَ مَا أَمَرَهُمْ وَيَفْعَلُونَ مَا يُؤْمَرُونَ

“হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে রক্ষা করো আগুন হতে, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর; যাতে নিয়োজিত আছে নির্মম হৃদয়, কঠোর স্বভাব ফেরেশতাগণ; যারা অমান্য করে না যা আল্লাহ তাদেরকে আদেশ করেন এবং তারা যা করতে আদিষ্ট হয় তা-ই করে।” সূরা তাহরীম : ০৬

অন্য স্থানে কাফিরদের সতর্ক করে বলা হয়েছে:

فَإِن لَّمْ تَفْعَلُوا وَلَن تَفْعَلُوا فَاتَّقُوا النَّارَ الَّتِي وَقُودُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَةُ ۖ أُعِدَّتْ لِلْكَافِرِينَ

“তবে সেই আগুনকে ভয় কর, মানুষ ও পাথর হইবে যাহার ইন্ধন, কাফিরদের জন্য যাহা প্রস্তুত করিয়া রাখা হইয়াছে।” সূরা বাকারা, ২:২৪

মূর্তি পূজারীদের পরিণাম সম্পর্কে বলা হয়েছে:

إِنَّكُمْ وَمَا تَعْبُدُونَ مِن دُونِ اللَّهِ حَصَبُ جَهَنَّمَ أَنتُمْ لَهَا وَارِدُونَ

“নিশ্চয়ই তোমরা এবং আল্লাহর পরিবর্তে তোমরা যেসব প্রতিমার পূজা কর, তোমরা সকলে দোযখের ইন্ধন হইবে, তোমরা সকলে উহার মধ্যে প্রবেশ করিবে।” (সূরা আম্বিয়া, ২১:৯৮)

পাথর কেন জ্বালানি? বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ

কুরআন যখন নাযিল হয়েছিল, তখন মানুষ জ্বালানি হিসেবে সাধারণত শুকনা কাঠ বা গোবর ব্যবহার করত। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা এমন এক জ্বালানির কথা বললেন যা তৎকালীন আরবের মানুষের কাছে ছিল বিস্ময়কর। বর্তমানে বিজ্ঞানের অগ্রগতির সাথে সাথে আমরা বুঝতে পারি যে, পাথরের মধ্যে লুকায়িত শক্তির পরিমাণ অকল্পনীয়।

১. আণবিক শক্তি ও ইউরেনিয়াম (Nuclear Energy)

পাথরের একটি অন্যতম উপাদান হলো খনিজ পদার্থ। তেজস্ক্রিয় পাথর যেমন ইউরেনিয়াম (Uranium) থেকে যে পরিমাণ শক্তি উৎপন্ন হয়, তা সাধারণ কাঠ বা কয়লার তুলনায় কোটি গুণ বেশি। আণবিক বোমার মূল উপাদান এই পাথর থেকেই সংগৃহীত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে যে ধ্বংসযজ্ঞ চলেছিল, তার মূলে ছিল পরমাণু বিভাজন বা ‘ফিশন’ প্রক্রিয়া। একটি ক্ষুদ্র পাথরের টুকরা সমপরিমাণ ইউরেনিয়াম থেকে যে তাপ উৎপন্ন হয়, তা দিয়ে বিশাল শহর ভস্মীভূত করা সম্ভব।

২. উচ্চ তাপমাত্রার উপাদান (High Melting Point)

সাধারণ আগুন কাঠ পুড়িয়ে কয়েকশ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা তৈরি করে। কিন্তু লোহা বা পাথর গলাতে কয়েক হাজার ডিগ্রি তাপমাত্রার প্রয়োজন। গবেষণায় দেখা যায়, অক্সিজেনের সাথে অ্যাসিটিলিন (Acetylene) গ্যাস ব্যবহার করলে প্রায় ৩০০০°C থেকে ৩৩০০°C তাপমাত্রা তৈরি হয়, যা ওয়েল্ডিং কাজে পাথর বা লোহা গলানোর জন্য ব্যবহৃত হয়। জাহান্নামের আগুনের তীব্রতা এত বেশি হবে যে সেখানে সাধারণ কাঠ কয়েক সেকেন্ডেই নিঃশেষ হয়ে যাবে। কিন্তু পাথর তার নিজস্ব রাসায়নিক ও আণবিক গঠনের কারণে দীর্ঘ সময় ধরে প্রচণ্ড উত্তাপ ধরে রাখতে এবং ছড়াতে সক্ষম।

৩. ঘনত্ব ও স্থায়িত্ব (Density and Stability)

মাটি বা অন্য পদার্থের চেয়ে পাথরের অণুগুলো অত্যন্ত ঘনসন্নিবিষ্ট (Compact) থাকে। এক টুকরা পাথরের মধ্যে যে পরিমাণ ভর থাকে, সমপরিমাণ মাটি বা কাঠের ভর তার চেয়ে অনেক কম। আইনস্টাইনের বিখ্যাত সমীকরণ $E=mc^2$ অনুযায়ী, কোনো বস্তুর ভর যত বেশি, তা থেকে রূপান্তরিত শক্তি বা তাপের পরিমাণও তত বেশি। পাথরের উচ্চ ঘনত্বের কারণে এটি এক অবিনশ্বর এবং ভয়ংকর তাপ উৎপাদনকারী জ্বালানি হিসেবে কাজ করবে।

মানুষ ও মূর্তির জ্বালানি হওয়ার যৌক্তিকতা

জাহান্নামের জ্বালানি হিসেবে মানুষ ও মূর্তির ব্যবহার কেবল শাস্তির জন্য নয়, বরং এর পেছনে গভীর কার্যকারণ রয়েছে।

মূর্তি ও পাথরের অভিন্নতা: প্রাচীনকালে এবং বর্তমানেও অধিকাংশ মূর্তি পাথর বা মাটি দিয়ে তৈরি করা হয়। রাসায়নিকভাবে মানুষের শরীর এবং মাটি/পাথরের উপাদানে অনেক সাদৃশ্য রয়েছে। মানুষও মাটির সারাংশ থেকে তৈরি। তাই জৈব এবং অজৈব পদার্থের এই সংমিশ্রণ আগুনের দহন প্রক্রিয়াকে ভিন্ন এক মাত্রা দান করবে।

মানসিক যন্ত্রণা: মুশরিকরা যেসব মূর্তিকে খোদা মনে করে পূজা করত, পরকালে সেই মূর্তিগুলোকেই যখন দাউ দাউ করে জ্বলতে দেখবে, তখন তাদের আফসোসের সীমা থাকবে না। এটি হবে তাদের জন্য একই সাথে শারীরিক ও মানসিক আজাব।

জাহান্নামের আগুনের বৈশিষ্ট্য :

হাদিসে এসেছে, জাহান্নামের আগুন দুনিয়ার আগুনের চেয়ে সত্তর গুণ বেশি উত্তপ্ত।

আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমাদের আগুন জাহান্নামের আগুনের সত্তর ভাগের একভাগ মাত্র। বলা হল, ‘হে আল্লাহর রাসূল! জাহান্নামীদেরকে শাস্তি দেয়ার জন্য দুনিয়ার আগুনই তো যথেষ্ট ছিল।’ তিনি বললেন, ‘দুনিয়ার আগুনের উপর জাহান্নামের আগুনের তাপ আরো ঊনসত্তর গুণ বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে, প্রত্যেক অংশে তার সম পরিমাণ উত্তাপ রয়েছে। সহিহ বুখারি : ৩২৬৫, সহিহ মুসলিম : ২৮৪৩

আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ জাহান্নামের আগুন এক হাজার বছর জ্বালানোর পর তা লাল বর্ণ ধারণ করে। আবার এক হাজার বছর জ্বালানোর পর তা সাদা রং ধারণ করে। আবার এক হাজার বছর জ্বালানোর পর তা কালো বর্ণ হয়ে যায়। সুতরাং তা এখন ঘোর কালো বর্ণে অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে আছে। সুনানে তিরমিজি : ২৫৯১, সুনানে ইবনে ইবনু মাজাহ : ৪৩২০

আল্লাহ তায়ালা জাহান্নামের আগুন সম্পর্কে বলেন:

كُلَّمَا خَبَتْ زِدْنَاهُمْ سَعِيرًا

“যখনই উহা স্তিমিত হইবে তখনই আমি উহাদের জন্য অগ্নিশিখা বৃদ্ধি করিয়া দিব।” সূরা বনী-ইসরাঈল, ১৭:৯৭

বিজ্ঞানের ভাষায়, জ্বালানি যত বেশি ‘রিফাইন’ বা উচ্চ ঘনত্বের হয়, তার শিখা তত বেশি নীল বা কালো বর্ণ ধারণ করে। হাদিস অনুযায়ী, জাহান্নামের আগুন হাজার বছর জ্বালানোর পর তা এখন কৃষ্ণবর্ণ ধারণ করেছে। কালো আগুন (Black Fire) বা অদৃশ্যপ্রায় অত্যন্ত শক্তিশালী তাপীয় বিকিরণ (Infrared Radiation) বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে সাধারণ লাল আগুনের চেয়ে অনেক বেশি ধ্বংসাত্মক।

জ্বিন জাতির শাস্তি ও আগুনের প্রকৃতি :

একটি প্রশ্ন প্রায়ই উত্থাপিত হয়: জ্বিনেরা তো আগুনের তৈরি, তবে তারা আগুনে কষ্ট পাবে কেন? আল্লাহ বলেন:

وَخَلَقَ الْجَانَّ مِن مَّارِجٍ مِّن نَّارٍ

“আর জ্বিনকে ধোঁয়া ছাড়া অগ্নিশিখা হইতে সৃষ্টি করিয়াছেন। সূরা রহমান : ১৫

এর উত্তর অত্যন্ত সহজ। মানুষের সৃষ্টি মাটি থেকে, কিন্তু আমাদের শরীরের ওপর এক টুকরা শক্ত মাটি ছুড়ে মারলে বা মাটির নিচে চাপা দিলে আমরা ব্যথা পাই এবং মারা যাই। কারণ সৃষ্টির উপাদান এবং বর্তমান কাঠামোর মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। তেমনিভাবে জ্বিনেরা আগুনের তৈরি হলেও তাদের বর্তমান সত্তা এবং জাহান্নামের আগুনের তীব্রতার মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য থাকবে। মানুষের শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা ৯৮.৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট। এই তাপমাত্রার চেয়ে সামান্য কয়েক ডিগ্রি বেশি হলেই আমরা জ্বরে কাতরাই। সুতরাং জাহান্নামের অকল্পনীয় উচ্চ তাপমাত্রায় জ্বিনদের দহন অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক হবে।

আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন:

وَلَقَدْ ذَرَأْنَا لِجَهَنَّمَ كَثِيرًا مِّنَ الْجِنِّ وَالْإِنسِ ۖ لَهُمْ قُلُوبٌ لَّا يَفْقَهُونَ بِهَا وَلَهُمْ أَعْيُنٌ لَّا يُبْصِرُونَ بِهَا وَلَهُمْ آذَانٌ لَّا يَسْمَعُونَ بِهَا ۚ أُولَٰئِكَ كَالْأَنْعَامِ بَلْ هُمْ أَضَلُّ ۚ أُولَٰئِكَ هُمُ الْغَافِلُونَ1

“আর আ2মি এমন অনেক জ্বিন ও মানুষকে সৃষ্টি করিয়াছি দোযখের জন্য যাদের অন্তর আছে কিন্তু তাহা দিয়া তাহারা উপলব্ধি করে না, তাহাদের চক্ষু আছে তাহা দিয়া দেখে না এবং তাহাদের কর্ণ আছে কিন্তু তাহা দিয়া শ্রবণ করে না; ইহারা পশুর ন্যায় বরং উহারা (তদপেক্ষা) অধিক বিভ্রান্ত। ইহারাই গাফিল।” সূরা আরাফ, : ১৭৯

জাহান্নামের জ্বালানি হিসেবে মানুষ ও পাথরের ব্যবহার কোনো রূপক কথা নয়, বরং এটি এক চরম ও কঠিন সত্য। আধুনিক বিজ্ঞান আমাদের শিখিয়েছে যে, পাথরের ভেতরেই লুকিয়ে আছে মহাজাগতিক শক্তির আধার। ইউরেনিয়াম, থোরিয়াম বা অন্যান্য তেজস্ক্রিয় পাথরের সামান্য কণা যে ধ্বংসলীলা চালাতে পারে, তা আমরা দেখেছি। আল্লাহ তায়ালা সৃষ্টির সেরা জীব মানুষকে সতর্ক করেছেন যাতে তারা সেই ভয়াবহ আগুন থেকে বাঁচতে পারে। কুরআনের প্রতিটি আয়াত বৈজ্ঞানিক ও যৌক্তিকভাবে সত্য। পাথরকে জ্বালানি হিসেবে উল্লেখ করা এটিই প্রমাণ করে যে, পরকালের আগুন কোনো সাধারণ রাসায়নিক দহন নয়, বরং তা এক মহাজাগতিক ও আণবিক স্তরের প্রচণ্ড আজাব। আল্লাহ আমাদের সকলকে সেই ভয়াবহ আগুন থেকে রক্ষা করুন। আমীন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *