বিজ্ঞানময় কুরআন – পর্ব আট :: চামড়ায় ব্যথার অনুভূতি ও কুরআন

চামড়ায় ব্যথার অনুভূতি ও কুরআন

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

পবিত্র কুরআন কেবল একটি ধর্মগ্রন্থ নয়, বরং এটি মানবজাতির জন্য এক পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানের অফুরন্ত উৎস। আজ থেকে প্রায় দেড় হাজার বছর আগে যখন চিকিৎসা বিজ্ঞানের কোনো অস্তিত্ব ছিল না, তখন কুরআন এমন কিছু বৈজ্ঞানিক সত্য উন্মোচন করেছে যা বর্তমান যুগের বিজ্ঞানীরা দীর্ঘ গবেষণার পর আবিষ্কার করছেন। বর্তমান চিকিৎসা বিজ্ঞান (Dermatology) অনুযায়ী, ব্যথার অনুভূতি মস্তিষ্কে পৌঁছায় চামড়ায় থাকা পেইন রিসেপ্টর (Pain Receptors) বা স্নায়ুপ্রান্তের মাধ্যমে। চামড়া পুরোপুরি পুড়ে গেলে মানুষ আর ব্যথা অনুভব করে না। সুবহানাল্লাহ! দেড় হাজার বছর আগে কুরআন ঘোষণা করেছে যে, শাস্তি অব্যাহত রাখতে চামড়া বারবার পরিবর্তন করা হবে। এটিই পরকালীন বিচারের সেই নিখুঁত পদ্ধতি যা পৃথিবীতে অসম্ভব।

দীর্ঘকাল ধরে চিকিৎসা বিজ্ঞান এবং জীববিজ্ঞানের ধারণা ছিল যে, মানুষের শরীরের যাবতীয় অনুভূতি বা সংবেদনশীলতার একমাত্র কেন্দ্র হলো মস্তিষ্ক (Brain)। কিন্তু বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে এসে বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেন যে, ব্যথার অনুভূতির জন্য চামড়ায় থাকা বিশেষ স্নায়ুপ্রান্ত বা Pain Receptors দায়ী।

থাইল্যান্ডের চিয়াং মাই বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যানাটমি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডক্টর তেগাতাত তেগাশন (Dr. Tejatat Tejasen) ব্যথার অনুভূতি নিয়ে দীর্ঘ গবেষণা করেন। তিনি প্রমাণ করেন যে, মানুষের শরীরের চামড়া বা ত্বকই হলো ব্যথার মূল সংবেদক। যদি কোনো কারণে শরীরের চামড়া সম্পূর্ণ পুড়ে যায়, তবে ব্যক্তি আর কোনো ব্যথা অনুভব করতে পারে না, কারণ ব্যথার সংকেত বহনকারী টিস্যুগুলো নষ্ট হয়ে যায়।

ত্বকের গঠন ও চিকিৎসা পদ্ধতি

মানুষের দেহের বৃহত্তম অঙ্গ হলো ত্বক বা চামড়া। এটি কেবল আমাদের দেহকে আবৃত করে রাখে না, বরং বাইরের জীবাণু ও আঘাত থেকে আমাদের সুরক্ষা দেয়। চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে ত্বকের গঠন অত্যন্ত জটিল এবং পোড়া রোগীদের ক্ষেত্রে এর চিকিৎসা পদ্ধতি সুনির্দিষ্ট কিছু ধাপ অনুসরণ করে। নিচে ত্বকের গঠন ও চিকিৎসা পদ্ধতি বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

১. ত্বকের গঠন (Anatomy of Skin)

চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় ত্বক প্রধানত দুটি স্তরে বিভক্ত:

ক. এপিডার্মিস (Epidermis)

এটি ত্বকের একদম বাইরের স্তর। এই স্তরটি আমাদের জলরোধী সুরক্ষা দেয় এবং গায়ের রঙ নির্ধারণ করে। এপিডার্মিসে কোনো রক্তনালী থাকে না, তাই সামান্য আঁচড় লাগলে সাধারণত রক্ত বের হয় না। এটি নিয়মিত কোষ বিভাজনের মাধ্যমে নতুন চামড়া তৈরি করে।

খ. ডার্মিস (Dermis)

এপিডার্মিসের ঠিক নিচেই থাকে ডার্মিস নামক পুরু স্তর। এটি ত্বকের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ কারণ এখানে থাকে:

রক্তনালী: যা ত্বকে পুষ্টি ও অক্সিজেন সরবরাহ করে।

স্নায়ুপ্রান্ত (Nerve Endings): যা আমাদের স্পর্শ, তাপ এবং ব্যথার অনুভূতি দেয়।

ঘর্মগ্রন্থি ও তৈলগ্রন্থি: যা শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে।

চামড়ায় ব্যাথ্যা অনুভুবের উদাহরণ :

আগুনে পোড়া রোগীর চামড়ার ক্ষতি গ্রন্থ হয় তাই কোনো ব্যক্তি অগ্নিদগ্ধ হন, তখন চিকিৎসকরা ত্বকের কতটুকু ক্ষতি হয়েছে তা বোঝার জন্য পরীক্ষা করেন। যেমন-

চিকিৎসকরা প্রথমে একটি পরিষ্কার তুলা দিয়ে পোড়া স্থানে আলতো করে স্পর্শ করেন। রোগী যদি স্পর্শ অনুভব করতে পারেন, তবে বুঝতে হবে পোড়াটি কেবল ওপরের স্তরে (Superficial Burn) সীমাবদ্ধ। এক্ষেত্রে সাধারণত ডার্মিস স্তরটি ক্ষতিগ্রস্ত হয় না এবং সঠিক পরিচর্যায় দ্রুত সেরে ওঠে।  আর যদি যদি স্পর্শ পরীক্ষায় রোগী কোনো সাড়া না দেন, তবে চিকিৎসকরা পিন ফুটিয়ে পরীক্ষা করেন। পিন ফোটানোর পর রোগী যদি ব্যথা অনুভব করেন, তবে বোঝা যায় ডার্মিস স্তরটি এখনো জীবিত আছে। একে ‘সেকেন্ড ডিগ্রি বার্ন’ বলা হয়। যদি পিন ফোটানোর পরও রোগী কোনো ব্যথা অনুভব না করেন, তবে এটি একটি আশঙ্কাজনক পরিস্থিতি। এর অর্থ হলো চামড়ার গভীর স্তরসহ ব্যথার অনুভূতি সৃষ্টিকারী স্নায়ুগুলো সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে।

পবিত্র কুরআনের অলৌকিকত্ব:

রিয়াদে অনুষ্ঠিত এক মেডিকেল কনফারেন্সে ডক্টর তেগাশন যখন তার এই আবিষ্কার উপস্থাপন করেন, তখন উপস্থিত মুসলিম পণ্ডিতরা তাকে পবিত্র কুরআনের একটি আয়াতের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। আয়াতটি হলো:

إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا بِآيَاتِنَا سَوْفَ نُصْلِيهِمْ نَارًا كُلَّمَا نَضِجَتْ جُلُودُهُم بَدَّلْنَاهُمْ جُلُودًا غَيْرَهَا لِيَذُوقُوا الْعَذَابَ ۗ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَزِيزًا حَكِيمًا

“যাহারা আমার আয়াতকে প্রত্যাখ্যান করে তাহাদিগকে অগ্নিতে দগ্ধ করিবই; যখনই তাহাদের চামড়া দগ্ধ (পুড়ে গলে) হইবে তখনই উহার স্থলে নূতন চামড়া সৃষ্টি করিব, যাহাতে তাহারা শাস্তি ভোগ করে। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।” সূরা নিসা : ৫৬

এই আয়াতটি শুনে ডক্টর তেগাশন বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে পড়েন। তিনি বুঝতে পারেন যে, দেড় হাজার বছর আগে মরুভূমির বুকে একজন মানুষের পক্ষে ত্বকের এই বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কথা জানা কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না। আয়াতে স্পষ্ট বলা হয়েছে— ‘যাতে তারা শাস্তি ভোগ করে’, অর্থাৎ ব্যথার অনুভূতি বজায় রাখার জন্য আল্লাহ বারবার চামড়া পরিবর্তন করে দেবেন। যদি ব্যথার কেন্দ্র কেবল মস্তিষ্ক হতো, তবে চামড়া পরিবর্তনের কথা আলাদাভাবে উল্লেখ করার প্রয়োজন ছিল না। এই ঘটনার পর ডক্টর তেগাশন ইসলাম গ্রহণ করেন এবং ঘোষণা করেন, “কুরআন অবশ্যই আল্লাহর বাণী।”

কেন অন্য অঙ্গের কথা বলা হয়নি?

জাহান্নামের শাস্তির বর্ণনায় আল্লাহ হাড়, কলিজা বা অন্যান্য অঙ্গের পরিবর্তে চামড়া বারবার পরিবর্তনের কথা কেন বললেন? আধুনিক অ্যানাটমি এর ব্যাখ্যা দেয়। মানুষের অভ্যন্তরীণ অঙ্গগুলোতে (যেমন- লিভার বা হাড়) ব্যথার স্নায়ু ত্বকের তুলনায় অনেক কম থাকে। ত্বকের প্রতিটি বর্গ ইঞ্চিতে হাজার হাজার ব্যথার সংগ্রাহক (Sensory receptors) থাকে যা তাৎক্ষণিক মস্তিষ্কে ব্যথার বার্তা পাঠায়। চামড়া পুড়ে গেলে এই বার্তা পাঠানোর মাধ্যমটি নষ্ট হয়ে যায়। তাই শাস্তির ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হলে নতুন চামড়া অপরিহার্য। এটি কুরআনের একটি বিস্ময়কর বৈজ্ঞানিক নির্ভুলতা।

মহান আল্লাহর নিদর্শন ও আমাদের শিক্ষা

মহান আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বিভিন্ন স্থানে মানুষকে তাঁর নিদর্শাবলী নিয়ে চিন্তা করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন-

وَیُرِیۡکُمۡ اٰیٰتِہٖ ٭ۖ فَاَیَّ اٰیٰتِ اللّٰہِ تُنۡکِرُوۡنَ

আর তিনি তোমাদেরকে তাঁর নিদর্শনাবলী দেখান। অতএব তোমরা আল্লাহর কোন্ কোন্ নিদর্শনকে অস্বীকার করবে? সুরা গাফির : ৮১

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَمَا مِنۡ غَآئِبَۃٍ فِی السَّمَآءِ وَالۡاَرۡضِ اِلَّا فِیۡ کِتٰبٍ مُّبِیۡنٍ

আর আসমান ও যমীনে এমন কোন গোপন বিষয় নেই যা সুস্পষ্ট কিতাবে লিপিবদ্ধ নেই। সূরা নামল : ৭৫

এই আয়াতগুলো প্রমাণ করে যে, বিজ্ঞান যত উন্নত হবে, কুরআনের গূঢ় রহস্যগুলো মানুষের সামনে তত বেশি উন্মোচিত হবে। যারা কোনো জ্ঞান ছাড়াই আল্লাহর আয়াত নিয়ে বিতর্ক করে, তাদের জন্য এটি একটি বড় সতর্কবার্তা।

উপসংহার : জাহান্নামের জ্বালানি এবং শাস্তির স্বরূপ নিয়ে আল্লাহ যে বর্ণনা দিয়েছেন, তা কোনো কাল্পনিক রূপকথা নয়, বরং এক কঠোর বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা। চামড়ার ব্যথার অনুভূতি সংক্রান্ত এই আবিষ্কার প্রমাণ করে যে, কুরআন সেই সত্তার বাণী যিনি এই মানবদেহ এবং মহাবিশ্ব সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহর এই নিদর্শন দেখার পরও কি আমাদের অন্তরগুলো বিগলিত হবে না? আমাদের উচিত তাঁর প্রদর্শিত পথে ফিরে আসা এবং পরকালের সেই ভয়াবহ আজাব থেকে রক্ষা পাওয়ার চেষ্টা করা।আমীন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *