মহাবিশ্বের আদি উৎস সম্পর্কে কুরআন

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

মহাবিশ্বের অস্তিত্ব ও কুরআন

অনন্ত নক্ষত্ররাজি, অগণিত গ্যালাক্সি এবং সীমাহীন শূন্যতায় ঘেরা এই মহাবিশ্ব মানবজাতির জন্য সবসময়ই এক পরম বিস্ময়ের নাম। মানুষ অনাদিকাল থেকে মহাবিশ্বের জন্ম, এর গঠন এবং এর ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা-গবেষণা করে আসছে। বিংশ শতাব্দীতে এসে আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান মহাবিশ্বের রহস্য উন্মোচনে যে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে, তার অনেকগুলোই পবিত্র কুরআনুল কারীমে আজ থেকে চৌদ্দশত বছর আগেই ইঙ্গিত করা হয়েছিল। ‘মহাবিশ্বের অস্তিত্ব ও কুরআন’ বিষয়টি মূলত স্রষ্টার অস্তিত্ব ও তাঁর অসীম ক্ষমতার এক জলজ্যান্ত প্রমাণ।

আধুনিক বিজ্ঞানের সবচেয়ে স্বীকৃত তত্ত্ব ‘বিগ ব্যাং’ বা মহাবিস্ফোরণ। বিজ্ঞানীরা বলছেন, মহাবিশ্ব এক সময় একটি বিন্দুতে পুঞ্জীভূত ছিল, যা পরে এক বিস্ফোরণের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। পবিত্র কুরআন এই সত্যটিই তুলে ধরেছে—আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী একসাথে মিশে ছিল, অতঃপর আল্লাহ তাদের পৃথক করে দিলেন। শুধু তাই নয়, বিজ্ঞানী এডুইন হাবল ১৯২৯ সালে প্রমাণ করেন যে মহাবিশ্ব প্রতিনিয়ত সম্প্রসারিত হচ্ছে। অথচ কুরআন সূরা যারিয়াতের ৪৭ নম্বর আয়াতে বহু আগেই ঘোষণা করেছে, *“আমি আকাশ নির্মাণ করিয়াছি আমার ক্ষমতা বলে এবং আমিই ইহাকে ক্রমাগত সম্প্রসারিত করিতেছি।”*

মহাবিশ্বের স্তম্ভহীন ভারসাম্য রক্ষায় ডার্ক ম্যাটার এবং ডার্ক এনার্জির ভূমিকা আজ বিজ্ঞানীদের প্রধান আলোচনার বিষয়। কুরআন বলছে, আকাশমণ্ডলকে আল্লাহ কোনো দৃশ্যমান স্তম্ভ ছাড়াই উচ্চে স্থাপন করেছেন। আবার পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল যে আমাদের জন্য এক সুরক্ষিত ছাদ হিসেবে কাজ করে এবং মহাজাগতিক ক্ষতিকর রশ্মি থেকে রক্ষা করে, সেই বৈজ্ঞানিক ধ্রুব সত্যটি সূরা আম্বিয়ায় ‘সুরক্ষিত ছাদ’ (Roof Protected) হিসেবে বর্ণিত হয়েছে। এমনকি বায়ুমণ্ডলের উচ্চতা বাড়লে যে অক্সিজেনের চাপ কমে যায় এবং মানুষের বুক সংকুচিত হয়ে আসে, সেই মনস্তাত্ত্বিক ও শারীরিক পরিবর্তনের কথা কুরআনে চমৎকারভাবে রূপক অর্থে বর্ণিত হয়েছে।

বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন বিংশ শতাব্দীতে ‘থিওরি অফ রিলেটিভিটি’র মাধ্যমে সময়ের আপেক্ষিকতা বুঝিয়েছিলেন। অথচ কুরআনে আল্লাহর একদিন মানুষের হাজার বছরের সমান কিংবা ফেরেশতাদের চলাচলের গতিতে সময়ের ভিন্নতার কথা বলে এই আপেক্ষিকতার ধারণা আগেই দিয়ে রেখেছে। মহাবিশ্বের প্রতিটি নক্ষত্র ও গ্রহ যে নিজ নিজ কক্ষপথে সাঁতার কাটছে (সূরা ইয়াসিন), এই কক্ষপথের ধারণা তৎকালীন আরব সমাজের মানুষের কাছে ছিল অকল্পনীয়। পৃথিবীর গোলাকৃতি এবং দিন-রাত্রির পর্যায়ক্রমিক আবর্তনকে ‘প্যাঁচানো’ বা ‘গুটিয়ে নেওয়া’র (কুরআনের ভাষায় ‘ইউকাওবিরু’) মাধ্যমে বর্ণনা করা হয়েছে, যা কেবল একটি গোল বস্তুর ক্ষেত্রেই সম্ভব।

মহাবিশ্বের অস্তিত্ব নিয়ে কুরআনের এই উপস্থাপনাগুলো কোনো সাধারণ তথ্য নয়, বরং এটি মানুষের বিবেক ও বুদ্ধিকে নাড়া দেওয়ার একটি ঐশ্বরিক পদ্ধতি। আধুনিক বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রা যত বেগবান হচ্ছে, কুরআনের আয়াতগুলোর গভীরতা তত বেশি স্পষ্ট হয়ে ধরা দিচ্ছে। কুরআন ও আধুনিক বিজ্ঞানের এই বিস্ময়কর সামঞ্জস্য এটাই প্রমাণ করে যে, এই মহাবিশ্বের একজন মহান পরিকল্পনাকারী আছেন এবং কুরআন তাঁরই অভ্রান্ত বাণী। এই বৈজ্ঞানিক নিদর্শনগুলো মানুষকে অন্ধবিশ্বাস থেকে মুক্ত করে যুক্তিনির্ভর ঈমানের পথে পরিচালিত করে।

মহাবিশ্বের আদি উৎস সম্পর্কে কুরআন

মহাবিশ্বের উৎস ও তার আদিম অবস্থা সম্পর্কে আল-কুরআনে যে বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, তা আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের পর্যবেক্ষণের সাথে এক বিস্ময়কর সাদৃশ্য বহন করে। আধুনিক কসমোলজির প্রমিত মডেল (Standard Cosmological Model) দৃঢ়ভাবে নির্দেশ করে যে, আমাদের এই বিশাল মহাবিশ্ব একসময় একটি অত্যন্ত ঘন, উত্তপ্ত, এবং অস্বচ্ছ গ্যাসীয় সংমিশ্রণ ছাড়া আর কিছুই ছিল না। আল-কুরআন এই আদিম অবস্থাকেই আরবি শব্দ “দুখান” (دُخَانٌ) বা ধূম্রপুঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

১. দুখান (Dukhan): কুরআনে বর্ণিত আদিম অবস্থা

সূরা ফুসসিলাতের আল্লাহ তাআলা মহাবিশ্বের সৃষ্টি প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ তুলে ধরেছেন। আল্লাহ্ কুরআনে বলেছেন:

ثُمَّ اسۡتَوٰۤی اِلَی السَّمَآءِ وَہِیَ دُخَانٌ فَقَالَ لَہَا وَلِلۡاَرۡضِ ائۡتِیَا طَوۡعًا اَوۡ کَرۡہًا ؕ قَالَتَاۤ اَتَیۡنَا طَآئِعِیۡنَ

অতঃপর তিনি আকাশের দিকে মনোনিবেশ করেন যা ছিল ধূম্রপুঞ্জ বিশেষ। অতঃপর তিনি ওটাকে এবং পৃথিবীকে বললেনঃ তোমরা উভয়ে এসো স্বেচ্ছায় অথবা অনিচ্ছায়। তারা বললঃ আমরা এলাম অনুগত হয়ে। সুরা ফুসসিলাত : ১১

আয়াতে ব্যবহৃত “দুখান” (دُخَانٌ) শব্দটি ধূম্র, ধোঁয়া, বা বাষ্পকে বোঝায়। এই বর্ণনাটি মহাবিশ্বের সেই প্রাথমিক অবস্থা বা প্রাইমরডিয়াল কসমিক সোপ (Primordial Cosmic Soup)-এর প্রতি ইঙ্গিত করে, যা বিগ ব্যাং-এর পরে এবং নক্ষত্র ও গ্যালাক্সি গঠিত হওয়ার আগে বিদ্যমান ছিল।

 এটি কোনো সাধারণ ঘরের ধোঁয়া নয়, বরং হাইড্রোজেন, হিলিয়াম, প্লাজমা এবং আদিম কণাগুলির একটি অত্যন্ত উত্তপ্ত, অস্বচ্ছ এবং গ্যাসীয় মিশ্রণকে নির্দেশ করে। এই আদিম গ্যাসীয় অবস্থা মহাবিশ্বের সৃষ্টির এক অনস্বীকার্য ধাপ।

মহাবিশ্ব আদিতে ধূম্রপুঞ্জ বা গ্যাসীয় অবস্থায় ছিল। আধুনিক বিশ্বতত্ত্বের বিজ্ঞান, পর্যবেক্ষণমূলক এবং তাত্ত্বিক উভয়ই, স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে, একসময় সমগ্র মহাবিশ্ব ‘ধোঁয়া’ (অর্থাৎ একটি অস্বচ্ছ, অত্যন্ত ঘন এবং উত্তপ্ত গ্যাসীয় সংমিশ্রণ) ছাড়া আর কিছুই ছিল না। এটি আধুনিক প্রমিত বিশ্বতত্ত্বের একটি অনস্বীকার্য নীতি। বিজ্ঞানীরা এখন সেই ‘ধোঁয়া’র অবশিষ্ট অংশ থেকে নতুন তারা গঠিত হতে দেখতে পান।

রাতে আমরা যে উজ্জ্বল তারাগুলি দেখি, সেগুলি ঠিক যেমন সমগ্র মহাবিশ্ব ছিল, সেই ‘ধোঁয়া’ উপাদানের মধ্যে ছিল।

২. আধুনিক বিশ্বতত্ত্বের অনস্বীকার্য নীতি

আধুনিক বিজ্ঞান, পর্যবেক্ষণমূলক প্রমাণ (যেমন কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড বা CMB) এবং তাত্ত্বিক মডেল উভয়ের মাধ্যমেই নিশ্চিত করেছে যে, একসময় সমগ্র মহাবিশ্ব একটি আদিম গ্যাসীয় অবস্থায় ছিল।

আদিম প্লাজমা:

বিগ ব্যাং-এর প্রাথমিক সম্প্রসারণের পর মহাবিশ্ব যখন শীতল হচ্ছিল, তখন এটি ছিল একটি উত্তপ্ত প্লাজমা (Plasma)-এর সমুদ্র যেখানে নিউক্লিয়াস ও ইলেকট্রনগুলি মুক্ত অবস্থায় ছিল। এই অবস্থাটি ছিল অস্বচ্ছ, ঠিক যেন ঘন ধোঁয়া। প্রায় ৩,৮০,০০০ বছর পরে এই প্লাজমা শীতল হয়ে নিরপেক্ষ পরমাণু গঠন করে, এবং মহাবিশ্ব স্বচ্ছ হয়। এই আদিম প্লাজমা অবস্থাটিই কুরআনে বর্ণিত ‘ধূম্রপুঞ্জ’ বা দুখ Nunn-এর সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ।

নক্ষত্র গঠনের উৎস :

বিজ্ঞানীরা পর্যবেক্ষণ করেন যে, রাতের আকাশে আমরা যে উজ্জ্বল নক্ষত্র, গ্রহ এবং গ্যালাক্সি দেখি, সেগুলি সবই এই আদিম ধূম্রপুঞ্জের অবশিষ্ট অংশ থেকেই গঠিত হয়েছে। মহাকর্ষীয় আকর্ষণের প্রভাবে এই আদিম গ্যাসীয় মেঘ বা নেবুলা (Nebulae) ঘনীভূত হতে শুরু করে, ফলে নক্ষত্রের জন্ম হয়। নতুন তারা বা স্টার সিস্টেম গঠনের প্রক্রিয়া আজও মহাজাগতিক গ্যাস ও ধূলিকণার মেঘের মধ্যে ঘটছে।

পৃথিবী ও আকাশের অভিন্ন উৎস :

মহান আল্লাত তায়ালা বলেন-

اَوَلَمۡ یَرَ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡۤا اَنَّ السَّمٰوٰتِ وَالۡاَرۡضَ کَانَتَا رَتۡقًا فَفَتَقۡنٰہُمَا ؕ وَجَعَلۡنَا مِنَ الۡمَآءِ کُلَّ شَیۡءٍ حَیٍّ ؕ اَفَلَا یُؤۡمِنُوۡنَ

যারা কুফরী করে তারা কি ভেবে দেখে না যে, আসমানসমূহ ও যমীন ওতপ্রোতভাবে মিশে ছিল, অতঃপর আমি উভয়কে পৃথক করে দিলাম, আর আমি সকল প্রাণবান জিনিসকে পানি থেকে সৃষ্টি করলাম। তবুও কি তারা ঈমান আনবে না? সুরা আম্বিয়া : ৩০

আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মতে আদিতে আকাশ, সূর্য, নক্ষত্র ও পৃথিবী ইত্যাদি পৃথক সত্তায় ছিল না; বরং সবকিছুই ওতপ্রোতভাবে মিশে ছিল। তখন মহাবিশ্ব ছিল অসংখ্য গ্যাসীয় কণার সমষ্টি। পরবর্তীকালে মহাবিস্ফোরণের মাধ্যমে নক্ষত্র, সূর্য, পৃথিবী ও গ্রহসমূহ সৃষ্টি হয়। আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানও স্বীকার করে যে, পৃথিবীসহ সৌরজগতের সকল উপাদান মহাজাগতিক ধূলিকণা ও গ্যাসের একটি আদিম মেঘ (Solar Nebula) থেকে ঘনীভূত হয়ে সৃষ্টি হয়েছে। এই অভিন্ন উৎসই প্রমাণ করে যে, পৃথিবী এবং আকাশের উপাদানগুলি মূলত একই আদিম পদার্থ থেকে এসেছে।

এই বৈজ্ঞানিক জ্ঞান যে মহাবিশ্ব আদিতে একটি গ্যাসীয় বা ধূম্রপুঞ্জ অবস্থা থেকে শুরু হয়েছিল— তা মানুষের কাছে ছিল সম্পূর্ণ অজ্ঞাত। এটি কেবল বিংশ শতাব্দীর উন্নত প্রযুক্তিগত পর্যবেক্ষণ এবং জটিল গাণিতিক হিসাবের মাধ্যমে জানা সম্ভব হয়েছে। এমন একটি সময়ে কুরআনের এই নির্ভুল ঘোষণা মহাবিশ্বের উৎস সম্পর্কে কুরআনের গভীর এবং ঐশ্বরিক জ্ঞানের এক শক্তিশালী প্রমাণ হিসেবে কাজ করে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *