মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন
মহাবিশ্বের উৎস, গঠন এবং পরিণতি নিয়ে মানুষের কৌতূহল চিরন্তন। আধুনিক বিজ্ঞান বর্তমানে যে তত্ত্বগুলির মাধ্যমে এই রহস্য উদঘাটনের চেষ্টা করছে, তার মধ্যে বিগ ব্যাং (Big Bang) তত্ত্ব এবং মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের ধারণা সবচেয়ে সুপ্রতিষ্ঠিত। আশ্চর্যজনকভাবে, প্রায় ১৪৫০ বছর পূর্বে অবতীর্ণ আল-কুরআনের বেশ কিছু আয়াতে এমন সব বৈজ্ঞানিক তথ্যের ইঙ্গিত পাওয়া যায়, যা তৎকালীন মানুষের জ্ঞানসীমার বাইরে ছিল।
এই প্রবন্ধে, আমরা আল-কুরআনের আয়াত এবং বিশেষত সূরা আয-যারিয়াতের একটি আয়াতের আলোকে মহাবিশ্বের চলমান সম্প্রসারণ, বিগ ব্যাং তত্ত্বের মূল ধারণা এবং মহাবিশ্বের ভবিষ্যৎ পরিণতি (যেমন: বিগ ক্রাঞ্চ) নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব। এছাড়াও, মহাবিশ্বের আদি অবস্থা এবং ‘ধোঁয়া’ (Dukhan) ও ‘সংযুক্ত সত্তা’ (Ratq) থেকে সৃষ্টি হওয়ার কুরআনিক বর্ণনাগুলি কীভাবে আধুনিক কসমোলজির সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ, তা বিশদভাবে তুলে ধরা হবে।
মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ ও কুরআনের সুস্পষ্ট ঘোষণা
আধুনিক কসমোলজির এক অপরিহার্য ভিত্তি হলো মহাবিশ্ব স্থির নয়, বরং গতিশীল এবং প্রতিনিয়ত সম্প্রসারিত হচ্ছে। এই ধারণাটি প্রতিষ্ঠা পায় বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে, কিন্তু কুরআন এটিকে বহু পূর্বেই ঘোষণা করেছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَالسَّمَآءَ بَنَیۡنٰہَا بِاَیۡىدٍ وَّاِنَّا لَمُوۡسِعُوۡنَ
আমি আকাশ নির্মাণ করেছি আমার ক্ষমতা বলে এবং আমি অবশ্যই মহাসম্প্রসারণকারী। সুরা জারিয়াত : ৪৭
এই আয়াতে ব্যবহৃত আরবি শব্দ “لَمُوۡسِعُوۡنَ” (লামুসিঊন) একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ শব্দ। ব্যাকরণগত বিশ্লেষণ বলা হয়, শব্দটি (ل) জোর প্রদানকারী (Laam al-Tawkeed) এবং (مُوسِعُونَ – মুসিঊন) সম্প্রসারণকারী শব্দের বহুবচন। এর অর্থ হলো, আল্লাহ শুধু ‘সম্প্রসারণকারী’ নন, বরং ‘নিশ্চয়ই, আমরা হলাম মহাসম্প্রসারণকারী’ বা ‘বিস্তৃতকারী’। এটি একটি চলমান এবং সক্রিয় প্রক্রিয়াকে নির্দেশ করে।
ঐতিহ্যবাহী ব্যাখ্যা: প্রথাগতভাবে, মধ্যযুগের মুফাসসিরগণ এই শব্দটির অর্থ করতেন আল্লাহর ক্ষমতা, প্রাচুর্য বা সৃষ্টির বিশালতা বোঝাতে। অর্থাৎ, আল্লাহ তাঁর সৃষ্টির পরিসরকে সব সময় প্রশস্ত করছেন।
আধুনিক ব্যাখ্যা : আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের জ্ঞান লাভের পর বহু মুফাসসির এবং গবেষক এই আয়াতকে সরাসরি মহাবিশ্বের স্থানিক (Spatial) সম্প্রসারণ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। এই ব্যাখ্যাটি বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের সাথে সরাসরি মিলে যায়। আল্লাহ মহাবিশ্বকে শুধুমাত্র সৃষ্টিই করেননি, বরং তিনি নিজেই এর সম্প্রসারণ প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করছেন।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: এই আয়াতটি যখন অবতীর্ণ হয়, তখন প্রভাবশালী গ্রিক দর্শনের প্রভাবে মহাবিশ্বকে স্থির (Static) এবং চিরস্থায়ী মনে করা হতো। এমন একটি সময়ে কুরআনের এই ঘোষণা ছিল সম্পূর্ণ বৈপ্লবিক। এটি কুরআনের ঐশ্বরিক উৎসের প্রতি একটি জোরালো যুক্তি উপস্থাপন করে।
মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ ও এডউইন হাবলের বৈপ্লবিক পর্যবেক্ষণ
বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকেও বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল যে আমাদের এই মহাবিশ্ব স্থির এবং অপরিবর্তনীয়। কিন্তু ১৯২৯ সালে জ্যোতির্বিজ্ঞানী এডউইন হাবল (Edwin Hubble) তার শক্তিশালী পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে এই চিরন্তন ধারণাকে বদলে দেন। তিনি প্রমাণ করেন যে মহাবিশ্ব স্থির নয়, বরং এটি প্রতিনিয়ত প্রসারিত হচ্ছে। আধুনিক বিশ্বতত্ত্ব বা কসমোলজির ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল হাবলের তিনটি প্রধান বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার ওপর ভিত্তি করে।
১. লাল সরণ (Redshift) মহাকাশের সংকেত
হাবলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার ছিল দূরবর্তী ছায়াপথগুলোর আলোতে লাল সরণ (Redshift) পর্যবেক্ষণ করা। তিনি যখন মাউন্ট উইলসন অবজারভেটরির শক্তিশালী টেলিস্কোপ ব্যবহার করে দূরবর্তী গ্যালাক্সিগুলো থেকে আসা আলোর বর্ণালী (Spectrum) বিশ্লেষণ করেন, তখন একটি অদ্ভুত বিষয় লক্ষ করেন।
গ্যালাক্সিগুলো থেকে আসা আলোর নির্দিষ্ট রেখাগুলো তাদের স্বাভাবিক অবস্থান থেকে বর্ণালীর লাল প্রান্তের দিকে সরে গিয়েছিল। পদার্থবিজ্ঞানের ভাষায়, যখন কোনো আলোক উৎস পর্যবেক্ষক থেকে দূরে সরে যায়, তখন তার তরঙ্গদৈর্ঘ্য বেড়ে যায় এবং বর্ণালীতে তাকে লাল দেখায়। হাবলের এই পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করে যে, মহাকাশের প্রায় প্রতিটি গ্যালাক্সি আমাদের মিল্কিওয়ে থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। এটিই ছিল মহাবিশ্ব যে গতিশীল, তার প্রথম অকাট্য প্রমাণ।
২. ডপলার প্রভাব (Doppler Effect) গতির বিজ্ঞান
হাবল তার পর্যবেক্ষণকে ব্যাখ্যা করার জন্য পদার্থবিজ্ঞানের সুপরিচিত ডপলার প্রভাব (Doppler Effect) ব্যবহার করেন। আমরা যেমন দেখি যে, একটি দ্রুতগতির অ্যাম্বুলেন্স আমাদের দিকে এগিয়ে এলে তার শব্দের তীক্ষ্ণতা বেড়ে যায় এবং দূরে চলে গেলে শব্দের তীক্ষ্ণতা কমে যায়, আলোর ক্ষেত্রেও ঠিক তাই ঘটে।
যদি কোনো গ্যালাক্সি আমাদের দিকে আসত, তবে তার আলোতে ‘নীল সরণ’ (Blueshift) দেখা যেত। কিন্তু হাবল দেখলেন প্রায় সব গ্যালাক্সিতেই ‘লাল সরণ’ ঘটছে। যেহেতু মহাকাশের সব দিক থেকেই এই লাল সরণ দেখা যাচ্ছিল, এর অর্থ দাঁড়ায় মহাবিশ্বের স্থান (Space) নিজেই প্রসারিত হচ্ছে। এটি কোনো নির্দিষ্ট কেন্দ্রের দিকে নয়, বরং সব বস্তু একে অপরের থেকে দূরে সরে যাওয়ার এক নিরন্তর প্রক্রিয়া।
৩. হাবলের সূত্র (Hubble’s Law): সম্প্রসারণের গাণিতিক রূপ
হাবলের সবচেয়ে বড় অবদান হলো তার গাণিতিক সূত্র, যা হাবলের সূত্র (Hubble’s Law) নামে পরিচিত। তিনি লক্ষ্য করেন যে, কোনো ছায়াপথ আমাদের থেকে যত বেশি দূরে অবস্থিত, তার দূরে সরে যাওয়ার গতিও তত বেশি। গাণিতিক সমীকরণটি হলো:
u = H0 X d
এখানে u হলো গ্যালাক্সির পিছু হটার গতি, d হলো দূরত্ব এবং H0 হলো হাবল ধ্রুবক।
এই সূত্রটি প্রমাণ করে যে মহাবিশ্বের প্রসারণ অভিন্ন এবং সুশৃঙ্খল। হাবল একটি বেলুনের উদাহরণ দিয়ে এটি বোঝাতেন—একটি ফোলা বেলুনের গায়ে কিছু বিন্দু এঁকে দিলে এবং বেলুনটি আরও ফোলালে যেমন প্রতিটি বিন্দু প্রতিটি বিন্দু থেকে দূরে সরে যায়, মহাবিশ্বের গ্যালাক্সিগুলোও সেভাবেই স্থান-কালের প্রসারণের কারণে দূরে সরে যাচ্ছে।
এডউইন হাবলের এই পর্যবেক্ষণগুলো বিজ্ঞান জগতে এক মহাবিপ্লব নিয়ে আসে। তার এই কাজের মাধ্যমেই বিগ ব্যাং (Big Bang) তত্ত্বের ভিত্তি স্থাপিত হয়। কারণ, মহাবিশ্ব যদি আজ প্রসারিত হতে থাকে, তবে অতীতে নিশ্চয়ই এটি একটি বিন্দুতে ছিল। হাবলের সূত্রই আধুনিক বিশ্বতত্ত্বে বিগ ব্যাং তত্ত্বের ভিত্তি স্থাপন করে এবং স্থির মহাবিশ্বের ধারণাকে সম্পূর্ণভাবে বাতিল করে দেয়। এই সূত্রের মাধ্যমেই প্রথমবারের মতো মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ একটি পরিমাপযোগ্য ও পরীক্ষণযোগ্য বৈজ্ঞানিক সত্যে পরিণত হয়। হাবল (১৯২৯ খৃ:), প্রসিডিংস অব দ্য ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্সেস, খণ্ড ১৫, সংখ্যা ৩, পৃষ্ঠা ১৬৮–১৭৩।

নোট : কুরআনের “আমরা অবশ্যই মহাসম্প্রসারণকারী” ঘোষণাটি আধুনিক বিজ্ঞানের এই পর্যবেক্ষণমূলক প্রমাণের সঙ্গে নিখুঁতভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের ধারণাটি বিগ ব্যাং তত্ত্বের মূল ভিত্তি। এটি কেবল মহাবিশ্বের চলমান অবস্থাই নয়, বরং এর উৎসের বর্ণনা দেয়। বিগ ব্যাং (Big Bang) তত্ত্ব আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের সবচেয়ে গৃহীত বিশ্বতাত্ত্বিক মডেল। বিগ ব্যাং তত্ত্বের মূলনীতি তিনটি। যথা-
১. একক বিন্দু (Singularity) থেকে শুরু :
বিগ ব্যাং তত্ত্বের যাত্রা শুরু হয় আনুমানিক ১৩.৮ বিলিয়ন বছর আগে, যখন মহাবিশ্বের সকল বস্তু, শক্তি এবং স্থান-কাল (spacetime) একটি অত্যন্ত ক্ষুদ্র, অসীম ঘন এবং উত্তপ্ত অবস্থায় ঘনীভূত ছিল, যাকে একক বিন্দু (Singularity) বলা হয়। এটি এমন একটি অবস্থা যেখানে পদার্থবিজ্ঞানের পরিচিত সূত্রগুলি ভেঙে পড়ে। কল্পনা করুন, আজকের বিশাল মহাবিশ্ব তার সমস্ত উপাদান নিয়ে একটি পিনহেডের চেয়েও ছোট স্থানে আবদ্ধ ছিল। এই একক বিন্দুর উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, মহাবিশ্বের একটি সুনির্দিষ্ট সূচনা ছিল।
২. মহাবিস্ফোরণ ও প্রসারণ (Expansion) :
একক বিন্দু থেকে মহাবিশ্ব হঠাৎ করেই এক অতি-দ্রুত প্রসারণ বা মহাবিস্ফোরণের মাধ্যমে যাত্রা শুরু করে। তবে এটি প্রচলিত অর্থে কোনো শূন্যস্থানের মধ্যে বিস্ফোরণ নয়, বরং স্থান (Space) নিজেই প্রসারিত হতে শুরু করে। বিস্ফোরণের প্রথম সেকেন্ডের ভগ্নাংশেই এই প্রসারণ অবিশ্বাস্য গতিতে ঘটে (যাকে মহাজাগতিক স্ফীতি বা Inflation বলা হয়)। প্রসারণের সাথে সাথে মহাবিশ্ব শীতল হতে থাকে এবং এর শক্তি পদার্থে রূপান্তরিত হতে শুরু করে। প্রথম কয়েক মিনিটের মধ্যেই কোয়ার্ক ও ইলেকট্রন থেকে হাইড্রোজেন (H) এবং হিলিয়ামের (He) মতো মৌলিক উপাদানগুলির নিউক্লিয়াস তৈরি হয়, যা ছিল মহাবিশ্বের আদিম উপাদান।
৩. কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড (CMB) প্রমাণ :
বিগ ব্যাং তত্ত্বের সবচেয়ে জোরালো এবং পর্যবেক্ষণমূলক প্রমাণ হলো কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড (CMB) বিকিরণ। মহাবিস্ফোরণের প্রায় ৩,৮০,০০০ বছর পর মহাবিশ্ব যখন যথেষ্ট শীতল হয়ে 3000 K-এর নিচে নেমে আসে, তখন ইলেকট্রনগুলি নিউক্লিয়াসের সাথে যুক্ত হয়ে নিরপেক্ষ পরমাণু গঠন করে। এই ঘটনাটিকে ডিকাপলিং (Decoupling) বলা হয়, যার ফলে মহাবিশ্ব প্রথমবারের মতো স্বচ্ছ হয়ে ওঠে এবং ফোটন বা আলো মুক্তভাবে ভ্রমণ করতে শুরু করে। এই মুক্ত হওয়া আলোই হলো CMB, যা আজ আমরা মহাবিশ্বের সবদিকে একটি অত্যন্ত শীতল (বর্তমানে প্রায় 2.725 K) মাইক্রোওয়েভ বিকিরণ হিসেবে দেখতে পাই। এটি বিগ ব্যাং-এর অবশিষ্ট তাপের ‘ফসিল প্রমাণ’ হিসেবে কাজ করে।

এই তিনটি নীতি একত্রে বিগ ব্যাং তত্ত্বকে প্রতিষ্ঠিত করে, যা মহাবিশ্বের সৃষ্টির একটি যৌক্তিক ও পর্যবেক্ষণ-ভিত্তিক ব্যাখ্যা প্রদান করে।
মহাবিশ্বের উৎস সম্পর্কে কুরআনের আলোকপাত :
কুরআন মাজীদের মহাবিশ্বের সৃষ্টির একটি মৌলিক ধাপের প্রতি ইঙ্গিত করে, যা আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের বিগ ব্যাং (Big Bang) তত্ত্বের প্রথম ধারণার সাথে মিলে যায়। এই আয়াতটি সেই সময়ের কথা বলছে যখন আকাশমণ্ডল (আসমানসমূহ) এবং পৃথিবী ওতপ্রোতভাবে মিশে একটি একক সত্তা হিসেবে ছিল, এবং এরপর আল্লাহ সেগুলোকে পৃথক করে দেন। এই দুটি ধারণা, অর্থাৎ ‘একত্রিত থাকা’ এবং ‘বিদীর্ণ করা’, কসমোলজির দুটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপে আলোকপাত করে। এই বৈজ্ঞানিক সত্যের ইঙ্গিত এমন এক সময়ে দেওয়া হয়েছিল, যখন মানুষের কাছে এই জ্ঞান লাভের কোনো উপায় ছিল না, যা কুরআনের ঐশী উৎসের প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত। কুরআনের অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে ইঙ্গিত করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
اَوَلَمۡ یَرَ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡۤا اَنَّ السَّمٰوٰتِ وَالۡاَرۡضَ کَانَتَا رَتۡقًا فَفَتَقۡنٰہُمَا ؕ وَجَعَلۡنَا مِنَ الۡمَآءِ کُلَّ شَیۡءٍ حَیٍّ ؕ اَفَلَا یُؤۡمِنُوۡنَ
যারা কুফরী করে তারা কি ভেবে দেখে না যে, আসমানসমূহ ও যমীন ওতপ্রোতভাবে মিশে ছিল, অতঃপর আমি উভয়কে পৃথক করে দিলাম, আর আমি সকল প্রাণবান জিনিসকে পানি থেকে সৃষ্টি করলাম। তবুও কি তারা ঈমান আনবে না? সুরা আম্বিয়া : ৩০
রতক (رَتْقًا) : একত্রে মিশে থাকা আদি সত্তা
কুরআনের আয়াতে ব্যবহৃত শব্দ “রতক্বান” (رَتْقًا)-এর অর্থ হলো একত্রিত, সেলাই করা, সংমিশ্রিত, বা ওতপ্রোতভাবে মিশে থাকা (Merged)। এই শব্দটির ব্যবহার মহাবিশ্বের উৎপত্তির প্রথম মুহূর্তের এক গভীর চিত্র তুলে ধরে:
মহাজাগতিক একক বিন্দু : আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান অনুসারে, বিগ ব্যাং-এর পূর্বে সমগ্র মহাবিশ্বের সকল পদার্থ, শক্তি এবং স্থান-কাল একটি অসীম ঘন ও উত্তপ্ত একক বিন্দুতে (Singularity) ঘনীভূত ছিল। এই একক বিন্দুতে কোনো পৃথকীকৃত বস্তু বা কাঠামো ছিল না; সবকিছু ছিল একটি সমজাতীয় এবং সংযুক্ত সংমিশ্রণ। কুরআন এই অবস্থাকেই “আসমানসমূহ ও যমীন ওতপ্রোতভাবে মিশে ছিল” (‘কানাতা রতক্বান’) বাক্যাংশের মাধ্যমে বর্ণনা করে। ২. সমজাতীয় আদি অবস্থা: এই আয়াতটি ইঙ্গিত দেয় যে পৃথিবী (এবং এর উপাদান) এবং আকাশ (গ্যালাক্সি, নক্ষত্র, গ্রহ) সৃষ্টির আগে একটি একক, অ-পৃথকীকৃত উপাদান বা সত্তা থেকে উদ্ভূত হয়েছিল। এটি আধুনিক বিজ্ঞানের সেই ধারণাকে সমর্থন করে যে, সকল মহাজাগতিক বস্তুর উৎপত্তিস্থল একটিই – আদিম ঘন সংমিশ্রণ। এই জ্ঞান চৌদ্দশো বছর আগে কোনো মানুষের পক্ষে নিজস্ব পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে অর্জন করা অসম্ভব ছিল, যা ড. আলফ্রেড ক্রনারের মতো শীর্ষ বিজ্ঞানীর মন্তব্যকে সমর্থন করে। ৩. বিগ ব্যাং-এর পূর্বের অবস্থা: এই ধারণাটি বিগ ব্যাং মডেলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত, অর্থাৎ মহাবিশ্বের একটি সুনির্দিষ্ট শুরু ছিল। সমস্ত পদার্থ ও শক্তি যখন “রতক্বান” অবস্থায় ছিল, তখন মহাবিশ্ব তার বর্তমান পরিচিত রূপে আসতে পারেনি। এই অবস্থাটি সেই সময়ের প্রতি ইঙ্গিত করে যখন স্থান-কাল ধারণাটিও তার জন্মলগ্নে ছিল।
ফাতক (فَتَقْنَا) : বিদীর্ণকরণ ও মহাবিশ্বের সৃষ্টি
আয়াতের দ্বিতীয় অংশটি হলো “ফা-ফাতাক্বনা-হুমা” (فَفَتَقْنٰهُمَا), যেখানে “ফাতক্ব” (فَتَقْنَا) শব্দের অর্থ হলো বিদীর্ণ করা, পৃথক করা বা বিচ্ছিন্ন করা (Separated, Split)। এই শব্দটি মহাজাগতিক ইতিহাসের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও গতিশীল প্রক্রিয়াকে নির্দেশ করে:
বিগ ব্যাং-এর সূচনা: “বিদীর্ণ করে দেওয়া” শব্দটি সরাসরি বিগ ব্যাং নামক মহাবিস্ফোরণের প্রক্রিয়ার প্রতি ইঙ্গিত করে। এটি একটি মুহূর্তের প্রক্রিয়া যেখানে সেই ‘একত্রিত সত্তা’ (রতক্বান) হঠাৎ করে প্রচণ্ড প্রসারণের মাধ্যমে পৃথকীকৃত হতে শুরু করে। এটি কোনো সাধারণ বিস্ফোরণ ছিল না, বরং স্থান (Space) নিজেই প্রসারিত হওয়া শুরু করেছিল, যার ফলে আদিম উপাদানগুলি একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
আকাশ ও পৃথিবীর পৃথকীকরণ: এই ‘ফাতক’ প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই মহাবিশ্বের উপাদানগুলি পৃথক হতে শুরু করে। আদিম গ্যাস ও প্লাজমা শীতল ও ঘনীভূত হয়ে নক্ষত্র, গ্যালাক্সি এবং অবশেষে পৃথিবী গঠিত হয়। অর্থাৎ, যে একক উপাদান থেকে সবকিছুর উৎপত্তি, সেটি বিদীর্ণ হওয়ার ফলেই আকাশমণ্ডল (আসমানসমূহ) এবং পৃথিবী তার বর্তমান রূপে আলাদা আলাদা কাঠামো হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এই বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাটি কুরআনের এই আয়াতের সাথে গভীরভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
মহাবিশ্বের বিবর্তন: এই ‘বিদীর্ণকরণ’ প্রক্রিয়াটি কেবল সৃষ্টির সূচনা নয়, বরং এটি সেই প্রক্রিয়া যা মহাবিশ্বকে তার বর্তমান বিবর্তিত অবস্থায় আসতে সাহায্য করেছে। এই বিদীর্ণকরণই আদিম উপাদানগুলিকে একত্রিত হওয়ার সুযোগ করে দেয়, যার ফলে হাইড্রোজেন, হিলিয়াম এবং অন্যান্য ভারী উপাদান সৃষ্টি হয়ে তারা ও গ্রহের জন্ম হয়। কুরআনের এই বর্ণনাটি মহাবিশ্বের উৎস সম্পর্কে এমন একটি সত্য তুলে ধরে, যা পর্যবেক্ষণমূলক জ্যোতির্বিজ্ঞান বহু শতক পরে আবিষ্কার করেছে।
ড. আলফ্রেড ক্রনারের মতো শীর্ষ ভূতত্ত্ববিদদের মন্তব্য, যেখানে তিনি বলেন: “চৌদ্দশো বছর আগে যিনি পারমাণবিক পদার্থবিদ্যা সম্পর্কে কিছু জানতেন না, তিনি আমার মনে হয়, নিজের মন থেকে এটা বের করতে পারার মতো অবস্থানে ছিলেন না, উদাহরণস্বরূপ, যে পৃথিবী এবং আকাশের উৎপত্তি একই ছিল,” এই আয়াতে বর্ণিত বৈজ্ঞানিক নির্ভুলতাকেই তুলে ধরে।

ডার্ক ম্যাটার (Dark Matter) এবং ডার্ক এনার্জি (Dark Energy) মহাবিশ্বের স্তম্ভহীন ভারসাম্যে
ডার্ক ম্যাটার (Dark Matter) এবং ডার্ক এনার্জি (Dark Energy) হলো মহাবিশ্বের রহস্যময় উপাদান যা এর প্রায় ৯৫% গঠন করে, তবুও এগুলো অদৃশ্য এবং এখনো খুব সামান্যই বোঝা সম্ভব হয়েছে; ডার্ক ম্যাটার গ্যালাক্সিগুলোর জন্য মহাকর্ষীয় কাঠামো প্রদান করে (তাদের একত্রে ধরে রাখে), অন্যদিকে ডার্ক এনার্জি একটি বিকর্ষণমূলক শক্তি প্রয়োগ করে যা মহাবিশ্বের প্রসারণকে ত্বরান্বিত করছে। এরা মহাজাগতিক বিপরীত শক্তি হিসেবে কাজ করে মহাবিশ্বের পরিণতি নির্ধারণ করছে। দৃশ্যমান পদার্থ, যেমন নক্ষত্র এবং গ্রহ, মহাবিশ্বের মাত্র ৫% গঠন করে।
ডার্ক ম্যাটার (Dark Matter)
ডার্ক ম্যাটার (Dark Matter) একটি অদৃশ্য বস্তু যা মহাকর্ষীয়ভাবে মিথস্ক্রিয়া করে কিন্তু আলো নির্গত, শোষণ বা প্রতিফলন করে না। ডার্ক ম্যাটার একটি “অদৃশ্য আঠা” হিসেবে কাজ করে, যা গ্যালাক্সি এবং গ্যালাক্সি গুচ্ছগুলোকে একত্রে ধরে রাখার জন্য অতিরিক্ত মহাকর্ষ বল প্রদান করে; এটি ব্যাখ্যা করে যে কেন গ্যালাক্সিগুলো কেবল দৃশ্যমান পদার্থের অনুমিত গতির চেয়েও দ্রুত ঘোরে। এটি মহাবিশ্বের মোট ভর-শক্তির প্রায় ২৭%।
ডার্ক এনার্জি (Dark Energy)
ডার্ক এনার্জি (Dark Energy) একটি রহস্যময় শক্তি বা শক্তি ক্ষেত্র যা মহাকাশের সর্বত্র ব্যাপ্ত। এটি মহাবিশ্বের ত্বরান্বিত প্রসারণকে চালিত করে, গ্যালাক্সিগুলোকে একে অপরের থেকে দূরে ঠেলে দেয়। এটি মহাবিশ্বের মোট ভর-শক্তির প্রায় ৬৮%।
ডার্ক ম্যাটার এবং ডার্ক এনার্জি সম্পর্কে কুরআন :
বিশাল এই মহাবিশ্ব কীভাবে কোনো দৃশ্যমান খুঁটি বা স্তম্ভ ছাড়াই টিকে আছে, তা মানবজাতির জন্য চিরকালই এক বিস্ময়ের বিষয়। আধুনিক বিজ্ঞান যখন মহাবিশ্বের গঠন উপাদান নিয়ে গবেষণা শুরু করে, তখন তারা এমন এক রহস্যময় শক্তির সন্ধান পায় যা খালি চোখে দেখা যায় না, কিন্তু সমগ্র মহাজাগতিক কাঠামোকে ধরে রেখেছে। এই অদৃশ্য শক্তি এবং এর ভারসাম্য রক্ষাকারী ভূমিকা নিয়ে পবিত্র কুরআনে চৌদ্দশ বছর আগেই অত্যন্ত সুনিপুণ ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
দৃশ্যমান স্তম্ভহীন আসমান ও মহাজাগতিক ভারসাম্য
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
اَللّٰہُ الَّذِیۡ رَفَعَ السَّمٰوٰتِ بِغَیۡرِ عَمَدٍ تَرَوۡنَہَا ثُمَّ اسۡتَوٰی عَلَی الۡعَرۡشِ وَسَخَّرَ الشَّمۡسَ وَالۡقَمَرَ ؕ کُلٌّ یَّجۡرِیۡ لِاَجَلٍ مُّسَمًّی ؕ یُدَبِّرُ الۡاَمۡرَ یُفَصِّلُ الۡاٰیٰتِ لَعَلَّکُمۡ بِلِقَآءِ رَبِّکُمۡ تُوۡقِنُوۡنَ
আল্লাহ, যিনি খুঁটি ছাড়া আসমানসমূহ উঁচু করেছেন যা তোমরা দেখছ। অতঃপর তিনি আরশে উঠেছেন এবং সূর্য ও চাঁদকে নিয়োজিত করেছেন। এর প্রত্যেকটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত চলবে। তিনি সবকিছু পরিচালনা করেন। আয়াতসমূহ বিস্তারিত বর্ণনা করেন, যাতে তোমাদের রবের সাক্ষাতের ব্যাপারে তোমরা দৃঢ়বিশ্বাসী হতে পার। সুরা রাদ : ১৩
সাধারণত কোনো বিশাল ছাদ বা কাঠামোকে ধরে রাখতে হলে মজবুত স্তম্ভ বা খুঁটির প্রয়োজন হয়। কিন্তু মহাবিশ্বের কোটি কোটি গ্যালাক্সি ও নক্ষত্রপুঞ্জ কোনো দৃশ্যমান খুঁটি ছাড়াই মহাশূন্যে ভাসমান অবস্থায় আছে। বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, এই “অদৃশ্য খুঁটি” হলো মহাজাগতিক বল বা শক্তির ভারসাম্য। মহাকর্ষ বল (Gravity) মহাবিশ্বের বস্তুগুলোকে একে অপরের দিকে টেনে আনে। যদি কেবল এই আকর্ষণ বলই কাজ করত, তবে মহাবিশ্বের সবকিছু সংকুচিত হয়ে এক জায়গায় দলা পাকিয়ে যেত। কিন্তু তা হচ্ছে না, কারণ এর বিপরীতে কাজ করছে এক বিশাল অদৃশ্য বিকর্ষণ শক্তি।
২. আধুনিক বিজ্ঞান ও কুরআনে সমস্বয়
জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মতে, মহাবিশ্বের মাত্র ৫% সাধারণ পদার্থ যা আমরা দেখতে পাই। বাকি ৯৫% হলো ডার্ক ম্যাটার (Dark Matter) এবং ডার্ক এনার্জি (Dark Energy)। ডার্ক ম্যাটার অদৃশ্য হলেও এর মহাকর্ষীয় প্রভাব রয়েছে যা গ্যালাক্সিগুলোকে তাদের কক্ষপথে ধরে রাখে। অন্যদিকে, ডার্ক এনার্জি বা অদৃশ্য শক্তি মহাবিশ্বকে বাইরের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, যা মহাকর্ষ বলের বিপরীত কাজ করে।
এখানেই কুরআনের সেই “খুঁটি ছাড়া আসমান” ধারণার চমৎকার প্রতিফলন ঘটে। স্তম্ভ যেমন ছাদকে নিচের দিকে পড়তে দেয় না, তেমনি এই অদৃশ্য শক্তিগুলো মহাবিশ্বের উপাদানগুলোকে একে অপরের ওপর আছড়ে পড়তে দেয় না কিংবা ভারসাম্যহীনভাবে হারিয়ে যেতে দেয় না। মহাকর্ষ বল কাছে টানে, আর এই অদৃশ্য শক্তি দূরত্ব বজায় রাখে—এই টানাপোড়েনের ফলেই সৃষ্টি হয়েছে এক নিখুঁত ভারসাম্য।
আসমান ও জমিনের স্থানচ্যুতি রোধ
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
اِنَّ اللّٰہَ یُمۡسِکُ السَّمٰوٰتِ وَالۡاَرۡضَ اَنۡ تَزُوۡلَا ۬ۚ وَلَئِنۡ زَالَتَاۤ اِنۡ اَمۡسَکَہُمَا مِنۡ اَحَدٍ مِّنۡۢ بَعۡدِہٖ ؕ اِنَّہٗ کَانَ حَلِیۡمًا غَفُوۡرًا
নিশ্চয় আল্লাহ আসমানসমূহ ও যমীনকে ধরে রাখেন যাতে এগুলো স্থানচ্যুত না হয়। আর যদি এগুলো স্থানচ্যুত হয়, তাহলে তিনি ছাড়া আর কে আছে, যে এগুলোকে ধরে রাখবে? নিশ্চয় তিনি পরম সহনশীল, অতিশয় ক্ষমাপরায়ণ। সূরা ফাতির : ৪১
এই ‘ধরে রাখা’ বা ‘স্থানচ্যুত না হওয়া’ বিষয়টি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। মহাবিশ্বের প্রতিটি গ্যালাক্সি অত্যন্ত দ্রুতগতিতে একে অপরের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। কিন্তু এই সরে যাওয়ার হার যদি সুশৃঙ্খল না হতো, তবে মহাবিশ্ব ছিন্নভিন্ন হয়ে যেত। ডার্ক ম্যাটার এখানে একটি আঠার মতো কাজ করে যা গ্যালাক্সিগুলোকে তাদের সীমানার মধ্যে ধরে রাখে, আবার ডার্ক এনার্জি মহাবিশ্বকে স্থবির হতে দেয় না। আল্লাহ তাআলার এই অদৃশ্য ব্যবস্থাপনাই মূলত মহাবিশ্বকে তার নির্ধারিত গন্তব্যের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।
মাধ্যাকর্ষণ শক্তি এবং অদৃশ্য বিকর্ষণ শক্তির এই বিপরীতমুখী অবস্থানই মহাবিশ্বের স্থায়িত্বের মূল রহস্য। ডার্ক ম্যাটার বা ডার্ক এনার্জি যদি না থাকত, তবে মহাবিশ্বের বর্তমান ভারসাম্য রক্ষা করা সম্ভব হতো না। ঠিক যেভাবে একটি অট্টালিকা তার স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, মহাবিশ্বও তেমনি এই অদৃশ্য শক্তিগুলোর ওপর ভিত্তি করে টিকে আছে। কুরআনে “বিগাইরি আমাদিন” (খুঁটি ছাড়া) শব্দটির ব্যবহারের মাধ্যমে এই অদৃশ্য পারমাণবিক ও মহাজাগতিক শক্তিগুলোর দিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে, যা মানুষের চর্মচক্ষে ধরা পড়ে না কিন্তু যার অস্তিত্ব আজ বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত।