নাজাত প্রপ্ত দলের বৈশিষ্ট্য-১৩ ::  আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের অনুসারী সংখ্যায় কর হবে।

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

এই হকপন্থী মুক্তিপ্রাপ্ত দলের নিদর্শনসমূহ হল তারা সংখ্যায় কম হবে। সমাজ জীবনে দেখা যায় জ্ঞানী লোকের সংখ্যা খুবই কম। আপনি ভাল লোক খুজবেন পাওয়া খুবই দুস্কর। নামাজী লোক খুজবেন, পাওয়া যাবে কিন্ত সংখ্যায় খুবই নগন্য। এমনিভাবে জাগতিক বিষয় ও যদি খোজ করেন দেখবেন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ব্যবসায়ী লোকের সংখ্যা অনেক কম। তাই নির্দিধায় বলা যায় ভাল মানুষ অল্পই হয়। কুরআনে অধিকাংশে লোক যেমন খারাপ বলে উল্লেখ করেছেন ঠিক তেমনি ভাবে অল্প সংখ্যক লোককে হক বা উত্তম আলে উল্লেখ করেছেন। অল্প সংখ্যক মানুষ কখনোও সত্যোর মাপকাঠি নয় এমন ধারনা কুরআন বিরোধী। বরং কুরআন ও সহিহ হাদিসে আলোকে অল্প সংখ্যক মানুষই হকের উপর থাকবে বলে বারবার ঘোষনা প্রদান করা হইয়াছে।

১. আল্লাহর ঘোষণা অল্প সংখ্যাক লোকই সত্যের উপর থাকবে-   

মহান আল্লাহ বলেন-

وَأَقۡوَمَ وَلَـٰكِن لَّعَنَہُمُ ٱللَّهُ بِكُفۡرِهِمۡ فَلَا يُؤۡمِنُونَ إِلَّا قَلِيلاً۬ (٤٦)

অর্থঃ কিন্তু তাদের বাতিল পরস্তির কারণে তাদের ওপর আল্লাহর অভিশাপ পড়েছে৷ তাই তারা খুব কমই ঈমান এনে থাকে৷  সুরা নিসা : ৪৬ ও ১৫৫

মহান আল্লাহ বলেন,

وَمَآ ءَامَنَ مَعَهُ ۥۤ إِلَّا قَلِيلٌ۬ (٤٠)

অর্থঃ তবে সামান্য সংখ্যক লোকই নূহের সাথে ঈমান এনেছিল৷ সুরা হুদ : ৪০ ও ১১৬

মহান আল্লাহ আরও বলেন,

 يَعۡمَلُونَ لَهُ ۥ مَا يَشَآءُ مِن مَّحَـٰرِيبَ وَتَمَـٰثِيلَ وَجِفَانٍ۬ كَٱلۡجَوَابِ وَقُدُورٍ۬ رَّاسِيَـٰتٍۚ ٱعۡمَلُوٓاْ ءَالَ دَاوُ ۥدَ شُكۡرً۬اۚ وَقَلِيلٌ۬ مِّنۡ عِبَادِىَ ٱلشَّكُورُ (١٣)

অর্থঃ তারা তার জন্য তৈরি করতো যা কিছু সে চাইতো, উঁচু উঁচু ইমারত, ছবি, বড় বড় পুকুর সদৃশ থালা এবং অনড় বৃহদাকার ডেগসমূহ৷ হে দাউদের পরিবার! কাজ করো কৃতজ্ঞতার পদ্ধতিতে৷ আমার বান্দাদের মধ্যে অল্পই কৃতজ্ঞ৷ সুরা সাবা : ১৩

অধিকাংশে বান্দা পাপী হোয়ার কারনে মাত্র সামান্য কজনই আল্লাহর আজাবের হাত থেকে নিস্তার পাবে৷  মহান আল্লাহ আরও বলেন,

 قَالَ أَرَءَيۡتَكَ هَـٰذَا ٱلَّذِى ڪَرَّمۡتَ عَلَىَّ لَٮِٕنۡ أَخَّرۡتَنِ إِلَىٰ يَوۡمِ ٱلۡقِيَـٰمَةِ لَأَحۡتَنِكَنَّ ذُرِّيَّتَهُ ۥۤ إِلَّا قَلِيلاً۬ (٦٢)

অর্থঃ তারপর সে বললো, দেখোতো ভালো করে, তুমি যে একে আমার ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছো, এ কি এর যোগ্য ছিল ? যদি তুমি আমাকে কিয়ামতের দিন পর্যন্ত অবকাশ দাও তাহলে আমি তার সমস্ত সন্তান সন্ততির মূলোচ্ছেদ করে দেবো, মাত্র সামান্য কজনই আমার হাত থেকে নিস্তার পাবে৷  সুরা বনি ইসরাইল : ৬২

মহান আল্লাহ আরও বলেন,

وَكُنْتُمْ أَزْوَاجًا ثَلاثَةً فَأَصْحَابُ الْمَيْمَنَةِ مَا أَصْحَابُ الْمَيْمَنَةِ وَأَصْحَابُ الْمَشْأَمَةِ مَا أَصْحَابُ الْمَشْأَمَةِ وَالسَّابِقُونَ السَّابِقُونَ أُولَئِكَ الْمُقَرَّبُونَ فِي جَنَّاتِ النَّعِيمِ ثُلَّةٌ مِنَ الأوَّلِينَ وَقَلِيلٌ مِنَ الآخِرِينَ

আর তোমরা তিনটি দলে বিভক্ত হয়ে পড়বে। ডান পার্শ্বের দল, ডান পার্শ্বের দলটি কত সৌভাগ্যবান! আর বাম পার্শ্বের দল, বাম পার্শ্বের দলটি কত হতভাগ্য! আর অগ্রবর্তীগণই অগ্রবর্তী। তারাই নৈকট্যপ্রাপ্ত। তারা থাকবে নিয়ামতপূর্ণ জান্নাতে। পূর্ববর্তীদের মধ্য থেকে হবে বহু সংখ্যক, আর পরবর্তীদের মধ্য থেকে হবে অল্প সংখ্যক। আল-ওয়াকিয়া : ৭-১৪

২। জান্নাতের বাসীর সংখ্যা কমই হবে-

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَتَمَّتۡ کَلِمَۃُ رَبِّکَ لَاَمۡلَـَٔنَّ جَہَنَّمَ مِنَ الۡجِنَّۃِ وَالنَّاسِ اَجۡمَعِیۡنَ

এবং তোমার রবের এই বাণীও পূর্ণ হবে যে, আমি জিন ও মানব সকলের দ্বারা জাহান্নামকে পূর্ণ করবই। সুরা হুদ : ১১৯

আবূ সা‘ঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, মহান আল্লাহ ডাকবেন, হে আদম (আঃ)! তখন তিনি জবাব দিবেন, আমি হাযির, আমি সৌভাগ্যবান এবং সকল কল্যাণ আপনার হতেই। তখন আল্লাহ বলবেন, জাহান্নামীদেরকে বের করে দাও। আদম (আঃ) বলবেন, জাহান্নামী কারা? আল্লাহ বলবেন, প্রতি হাজারে নয়শত নিরানব্বই জন। এ সময় ছোটরা বুড়ো হয়ে যাবে। প্রত্যেক গর্ভবতী তার গর্ভপাত করে ফেলবে। মানুষকে দেখবে নেশাগ্রস্তের মত যদিও তারা নেশাগ্রস্ত নয়। বস্তুতঃ আল্লাহর শাস্তি কঠিন- (হাজ্জঃ ২)। সাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের মধ্যে সেই একজন কে? তিনি বললেন, তোমরা সুসংবাদ গ্রহণ কর। কেননা তোমাদের মধ্য হতে একজন আর এক হাজারের অবশিষ্ট ইয়াজুজ-মাজুজ হবে।

অতঃপর তিনি বললেন, যাঁর হাতে আমার প্রাণ, তাঁর কসম। আমি আশা করি, তোমরা সমস্ত জান্নাতবাসীর এক তৃতীয়াংশ হবে। (রাবি বলেন) আমরা এ সংবাদ শুনে আবার আল্লাহু আকবার বলে তাকবীর দিলাম। তিনি আবার বললেন, আমি আশা করি তোমরা সমস্ত জান্নাতীদের অর্ধেক হবে। এ কথা শুনে আমরা আবারও আল্লাহু আকবার বলে তাকবীর দিলাম। তিনি বললেন, তোমরা তো অন্যান্য মানুষের তুলনায় এমন, যেমন সাদা ষাঁড়ের দেহে কয়েকটি কালো পশম অথবা কালো ষাঁড়ের শরীরে কয়েকটি সাদা পশম। সহিহ বুখারি : ৩৩৪৮, ৪৭৪১

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম আদম (আঃ)-কে ডাকা হবে। তিনি তাঁর সন্তানদেরকে দেখতে পাবেন। তখন তাদেরকে বলা হবে, ইনি তোমাদের পিতা আদম (আঃ)। তখন তারা বলবে لَبَّيْكَ وَسَعْدَيْكَ আমরা তোমার খিদমাতে হাযির! এরপর তাঁকে আল্লাহ্ বলবেন, তোমার জাহান্নামী বংশধরকে বের কর। তখন আদম (আঃ) বলবেন, হে আমার প্রতিপালক! কী পরিমাণ বের করব? আল্লাহ্ বলবেনঃ প্রতি একশ’ তে নিরানব্বই জনকে বের কর। তখন সাহাবাগণ বলে উঠলেন, হে আল্লাহর রাসূল! প্রতি একশ’ থেকে যখন নিরানব্বই জনকে বের করা হবে তখন আর আমাদের কে বাকী থাকবে? তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ নিশ্চয়ই অন্যান্য সকল উম্মাতের তুলনায় আমার উম্মাত হল কাল ষাঁড়ের গায়ে একটি সাদা চুলের মত। সহিহ বুখারি : ৬৫২৯

৩। সমাজের অধিকাংশ লোকই হবে অজ্ঞ-

অনেকে সংখ্যাধিক্যকে গুরুত্ব দিয়ে বলেন, আমার অনেকেরই ধারণা করে থাকি অধিকাংশ লোক সাধারনত যা করে তাই সঠিক। তাইতো দেখা যায় কোন দ্বীনের বিষয়ে কোন  ভূল আমল সংশোধনের কথা বললে, পাল্টা প্রশ্ন করেন, অধিকাংশ মানুষ কি ভূল করছে? “এত মানুষ করে, তারা কি ভুল করে?” অধিক সংখ্য মানুষ করলেই যেন দলীল হয়ে যায়। তাদের বিশ্বাস অধিকাংশ মানুষ অনুসরণই সঠিক। সংখ্যাগরিষ্টতা বা অধিকাংশ লোক কখন সত্যের মাপকাঠি হতে পারে না। এক মাত্র কুরআন সুন্নাহই ইসলামের মাপকাঠি। কুরআন সুন্নাহ (আল্লাহর আদেশের) বিপরীতে অধিকাংশের মতামতকে সত্যের মাপকাঠি মানা যাবে না। অপর পক্ষে অধিকাংশ লোক সত্যের মাপকাঠি বা অনুসরনীয় নয় তার কারন হল, সমাজের অধিকাংশ লোক হবে অজ্ঞ, ঈমানহীন, জালিম, অকৃতজ্ঞ, পাপি, পথভ্রষ্ট, মিথ্যুক, সত্য বিমুখ। এ কথার প্রমান আল্লাহর ঘোষনা। তিনি পবিত্র কুরআনে বলেন,

মহান আল্লাহ বলেন,

أَءِلَـٰهٌ۬ مَّعَ ٱللَّهِ‌ۚ بَلۡ أَڪۡثَرُهُمۡ لَا يَعۡلَمُونَ (٦١)

অর্থ: আল্লাহর সাথে (এসব কাজের শরিক)  অন্য কোন ইলাহ আছে কি? না, বরং এদের অধিকাংশই অজ্ঞ৷ (সুরা নমল ২৭:৬১)। আরো দেখুন:  (সুরা ইউসুফ ১২:৫৫);  (সুরা আরাফ ৭:১৩১); (সুরা যুমার ৩৯:২৯); (সুরা কাসাস ২৮:১৩)।

  মহান আল্লাহ বলেন,

 وَمَا ظَنُّ ٱلَّذِينَ يَفۡتَرُونَ عَلَى ٱللَّهِ ٱلۡڪَذِبَ يَوۡمَ ٱلۡقِيَـٰمَةِ‌ۗ إِنَّ ٱللَّهَ لَذُو فَضۡلٍ عَلَى ٱلنَّاسِ وَلَـٰكِنَّ أَكۡثَرَهُمۡ لَا يَشۡكُرُونَ (٦٠)

অর্থ: যারা আল্লাহর প্রতি মিথ্যা আরোপ করছে, তারা কি মনে করে, কিয়ামতের দিন তাদের সাথে কেমন ব্যবহার করা হবে? আল্লাহ তো লোকদের প্রতি অনুগ্রহ পরায়ণ কিন্তু অধিকাংশ মানুষ অকৃতজ্ঞ৷ (সুরা ইউনুস ১০:৬০)। আরো দেখুন: (সুরা আনাম ৬:৭৩, সুরা ফুরকান ২৫:৫০, সুরা ইউসুফ ১২:৩৮)।

  মহান আল্লাহ বলেন,

 إِنَّ فِى ذَٲلِكَ لَأَيَةً۬‌ۖ وَمَا كَانَ أَكۡثَرُهُم مُّؤۡمِنِينَ (١٠٣)

অর্থ: নিশ্চয়ই তার মধ্যে একটি নিদর্শন রয়েছে, কিন্তু তাদের অধিকাংশই মু‘মিন নয়৷  (সুরা শুআরা ২৬:১০৩)। আরো দেখুন: (সুরা শুআরা ২৬:৬৭, ১২১, ১৩৯, ১৫৮, ১৭৪ ও ১৯০।

  মহান আল্লাহ বলেন,

بَلۡ أَكۡثَرُهُمۡ لَا يَعۡلَمُونَ ٱلۡحَقَّ‌ۖ فَهُم مُّعۡرِضُونَ (٢٤)

অর্থ: কিন্তু তাদের অধিকাংশ লোকই প্রকৃত সত্য থেকে বেখবর, কাজেই মুখ ফিরিয়ে আছে৷ (সুরা আম্বিয়া ২১:২৪)।

সমাজের অধিকাংশ লোক হবে অজ্ঞ, ঈমানহীন, জালিম, অকৃতজ্ঞ, পাপি, পথভ্রষ্ট, মিথ্যুক, সত্য বিমুখ  এবং তাদের পরিচালক হবেন স্বয়ং ইবলিশ শয়তান। সে তাদের পথ ভ্রষ্ট করার প্রচেষ্টা কেয়ামত পর্যন্ত অব্যাহত রাখবে, যাতে সমাজের অধিকাংশ মানুষ তার দলে থাকে এবং পথভ্রষ্ট হয়। সঠিক দ্বীন বা কুরআন ও সহিহ সুন্নাহ অনুসরণ করলেই পরকালে মুক্তি পাওয়া যাবে, তবে এই অনুসারীর সংখ্যা হবে অল্প। কিন্তু দ্বীন সম্পর্কে সঠিক জ্ঞানের অভাবে অধিকাংশ লোক নির্ভুল জ্ঞানের পরিবর্তে কেবলমাত্র আন্দাজ অনুমানের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ফলে তাদের আকীদা, বিশ্বাস, দর্শন, চিন্তাধারা, জীবন যাপনের মূলনীতি ও কর্মবিধান সবকিছুই ধারণা ও অনুমানের ভিত্তিতে গড়ে। দুনিয়ার বেশীর ভাগ লোক কোন পথে যাচ্ছে, কি বিশ্বাস করছে, কি আমল করছে, কোন তরিকা অনুসরন করছে, কোন সত্য সন্ধানীর এটা দেখা উচিত নয়। বরং আল্লাহ যে পথটি তৈরী করে দিয়েছেন তার ওপরই তার দৃঢ় পদক্ষেপে এগিয়ে চলা উচিত। এ পথে চলতে গিয়ে দুনিয়ায় যদি সে অধিকাংশের মতামত ত্যাগ করতে হয়, তবে তাই করতে হবে। তাহলে দুনিয়া ও আখেরাতে সফলকাম হওয়া যাবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *