তালাকের বিধান

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

তালাক (اَلْطَّلَاقُ) এর বিধান

তালাক (اَلْطَّلَاقُ) একটি আরবি শব্দ, যার আক্ষরিক অর্থ হলো ‘ছেড়ে দেওয়া’ বা ‘বিচ্ছিন্ন করা’। ইসলাম ধর্মানুসারে, এটি হলো স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে বিবাহ বিচ্ছেদ বা সম্পর্ক ছিন্ন করার একটি পদ্ধতি।

ইসলামে তালাক একটি অত্যন্ত গুরুতর ও অপছন্দনীয় কাজ। যদিও এটি শরীয়তসম্মত, তবে আল্লাহ তায়ালার কাছে এটি সবচেয়ে নিকৃষ্ট হালাল কাজ হিসেবে বিবেচিত। ইসলামে বিবাহ একটি পবিত্র ও শক্তিশালী বন্ধন, যা যথাসম্ভব টিকিয়ে রাখার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। কোরআন ও হাদিসে তালাকের সুনির্দিষ্ট নিয়ম-কানুন ও সতর্কবাণী রয়েছে। কারণ, তালাক শুধু স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক ছিন্ন করে না, বরং এটি পরিবার ও সমাজের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তাই, চূড়ান্ত সমাধান হিসেবে তালাককে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে এবং শান্তিপূর্ণভাবে দাম্পত্য জীবন বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

আবদুল্লাহ্ ইবনু উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

أَبْغَضُ الْحَلَالِ إِلَى اللهِ الطَّلَاقُ

আল্লাহর নিকট সর্বাধিক ঘৃণ্য বৈধ কাজ হচ্ছে তালাক। সুনানে ইবনে মাজাহ : ২০১৮, সুনানে আবূ দাউদ : ২১৭৮, ইরওয়া : ২০৪০

দাম্পত্য সুখের জন্য তালাকের বিধান : ইসলামের প্রজ্ঞা ও দর্শন

ইসলামে তালাক (বিবাহবিচ্ছেদ) কেবল একটি আইনি প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি একটি গভীর প্রজ্ঞা ও দর্শনের ওপর প্রতিষ্ঠিত। আল্লাহ তা’আলা দাম্পত্য জীবনকে পারস্পরিক ভালোবাসা, সম্মান এবং বোঝাপড়ার ভিত্তিতে গড়ে তোলার নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু যখন সেই সম্পর্ক অসহনীয় হয়ে ওঠে এবং আর কোনোভাবেই এর সংস্কার সম্ভব হয় না, তখন তালাকের বিধান কার্যকর হয়। এর উদ্দেশ্য কোনো সম্পর্ককে ভেঙে দেওয়া নয়, বরং একটি অস্থিতিশীল ও যন্ত্রণাদায়ক অবস্থা থেকে দম্পতিকে মুক্তি দেওয়া এবং তাদের জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু করার সুযোগ করে দেওয়া। তালাকের এই বিধানের পেছনে ইসলামে যে প্রজ্ঞা ও দর্শন কাজ করে, তা নিচে তুলে ধরা হলো:

ক. অসহনীয় সম্পর্ক থেকে মুক্তি:

তালাকের মূল উদ্দেশ্য হলো দম্পতিকে এমন একটি সম্পর্ক থেকে মুক্তি দেওয়া, যা তাদের জন্য মানসিক ও শারীরিক কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যখন স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভালোবাসা, সহনশীলতা এবং পারস্পরিক বোঝাপড়া সম্পূর্ণভাবে বিলীন হয়ে যায়, তখন সেই সম্পর্ক কেবল একটি বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। এমন পরিস্থিতিতে জোর করে সেই সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা উভয়কে দীর্ঘমেয়াদি হতাশা, দুঃখ এবং মানসিক যন্ত্রণার দিকে ঠেলে দেয়। ইসলাম মানুষের ওপর কোনো অসহনীয় বোঝা চাপিয়ে দেয় না। তাই, তালাকের মাধ্যমে আল্লাহ তা’আলা এই ধরনের বিষাক্ত সম্পর্ক থেকে মুক্তি দিয়ে তাদের উভয়কে নতুন করে, শান্তিপূর্ণ জীবন শুরু করার সুযোগ দিয়েছেন।

২. সামাজিক বিশৃঙ্খলা রোধ:

 যখন কোনো দম্পতির মধ্যে লাগাতার ঝগড়া, বিবাদ ও ঘৃণা চলতে থাকে, তখন এর নেতিবাচক প্রভাব কেবল তাদের দুজনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। বরং তা তাদের সন্তান-সন্ততি, পরিবার এবং পুরো সমাজকে প্রভাবিত করে। সন্তানের মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয় এবং তারা সমাজে এক ধরনের বিশৃঙ্খল পরিবেশে বড় হয়। তালাকের বিধান এই ধরনের বিশৃঙ্খলাকে একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে রেখে উভয়কে নিজ নিজ পথে ভালো থাকার সুযোগ করে দেয়। এর ফলে সমাজে নতুন করে স্থিতিশীলতা ফিরে আসে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম একটি সুস্থ পরিবেশে বেড়ে ওঠার সুযোগ পায়।

৩. নারী-পুরুষ উভয়ের অধিকার রক্ষা:

 ইসলামে তালাকের বিধান কেবল পুরুষের জন্যই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি নারীর অধিকারও নিশ্চিত করে। একজন পুরুষ যেমন নির্দিষ্ট কিছু কারণে তার স্ত্রীকে তালাক দিতে পারে, তেমনি একজন নারীও যদি তার স্বামীর সঙ্গে থাকা অসম্ভব মনে করে, তাহলে তার অধিকার আছে তালাক চাওয়ার। এই অধিকারকে ‘খোলা’ বলা হয়। যদি কোনো নারী তালাক না পায়, তাহলে সে কাজি বা অভিভাবকের মাধ্যমে আদালতের শরণাপন্ন হতে পারে। ইসলাম নারীর সম্মান ও মর্যাদাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। তাই, নারীরা যাতে কোনোভাবেই তাদের স্বামীর অধীনে নিপীড়িত না হয়, তা নিশ্চিত করার জন্যই এই অধিকার দেওয়া হয়েছে।

তালাক যাতে না হয় তার জন্য করণীয় কাজ :

তালাক ইসলামে একটি অপছন্দনীয় হালাল কাজ হলেও, এটি যাতে সংঘটিত না হয়, সেজন্য কুরআন ও হাদিসে সুস্পষ্ট নির্দেশনা ও কৌশল রয়েছে। সূরা নিসায় কিছু সুন্দর দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। যেখানে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিলে তা সমাধানের জন্য কয়েকটি পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে। এই পদক্ষেপগুলো প্রমাণ করে যে, ইসলামে তালাক কোনো সহজ বা দ্রুত সমাধান নয়, বরং সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার জন্য সব ধরনের চেষ্টা করার পরেই কেবল এটি সর্বশেষ উপায় হিসেবে বিবেচিত।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

اَلرِّجَالُ قَوّٰمُوْنَ عَلَی النِّسَآءِ بِمَا فَضَّلَ اللّٰهُ بَعْضَهُمْ عَلٰی بَعْضٍ وَّ بِمَاۤ اَنْفَقُوْا مِنْ اَمْوَالِهِمْ ؕ فَالصّٰلِحٰتُ قٰنِتٰتٌ حٰفِظٰتٌ لِّلْغَیْبِ بِمَا حَفِظَ اللّٰهُ ؕ وَ الّٰتِیْ تَخَافُوْنَ نُشُوْزَهُنَّ فَعِظُوْهُنَّ وَ اهْجُرُوْهُنَّ فِی الْمَضَاجِعِ وَ اضْرِبُوْهُنَّ ۚ فَاِنْ اَطَعْنَکُمْ فَلَا تَبْغُوْا عَلَیْهِنَّ سَبِیْلًا ؕ اِنَّ اللّٰهَ كَانَ عَلِیًّا كَبِیْرًا ﴿۳۴﴾  وَ اِنْ خِفْتُمْ شِقَاقَ بَیْنِهِمَا فَابْعَثُوْا حَكَمًا مِّنْ اَهْلِہٖ وَ حَكَمًا مِّنْ اَهْلِهَا ۚ اِنْ یُّرِیْدَاۤ  اِصْلَاحًا یُّوَفِّقِ اللّٰهُ بَیْنَهُمَا ؕ اِنَّ اللّٰهَ كَانَ عَلِیْمًا خَبِیْرًا ﴿۳۵﴾

পুরুষরা নারীদের তত্ত্বাবধায়ক, এ কারণে যে, আল্লাহ তাদের একের উপর অন্যকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন এবং যেহেতু তারা নিজদের সম্পদ থেকে ব্যয় করে। সুতরাং পুণ্যবতী নারীরা অনুগত, তারা লোকচক্ষুর অন্তরালে হিফাযাতকারিনী ঐ বিষয়ের যা আল্লাহ হিফাযাত করেছেনে। আর তোমরা যাদের অবাধ্যতার আশঙ্কা কর তাদেরকে সদুপদেশ দাও, বিছানায় তাদেরকে ত্যাগ কর এবং তাদেরকে (মৃদু) প্রহার কর। এরপর যদি তারা তোমাদের আনুগত্য করে তাহলে তাদের বিরুদ্ধে কোন পথ অনুসন্ধান করো না। নিশ্চয় আল্লাহ সমুন্নত মহান। আর যদি তোমরা তাদের উভয়ের মধ্যে বিচ্ছেদের আশঙ্কা কর তাহলে স্বামীর পরিবার থেকে একজন বিচারক এবং স্ত্রীর পরিবার থেকে একজন বিচারক পাঠাও। যদি তারা মীমাংসা চায় তাহলে আল্লাহ উভয়ের মধ্যে মিল করে দেবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞানী, সম্যক অবগত। সুরা নিসা : ৩৪-৩৫

সূরা নিসার এই দুটি আয়াত স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের ভিত্তি, স্বামীর দায়িত্ব এবং তালাকের আগে পারস্পরিক সমস্যা সমাধানের পদ্ধতি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দেয়। এখানে আল্লাহ তাআলা পুরুষদেরকে নারীর তত্ত্বাবধায়ক বা অভিভাবক হিসেবে ঘোষণা করেছেন। এর কারণ হিসেবে দুটি বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে:

১. আল্লাহ তাআলা পুরুষকে শারীরিক ও মানসিক দিক থেকে কিছু ক্ষেত্রে নারীর চেয়ে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন, যাতে তারা পরিবারের নেতৃত্ব দিতে পারে।

২. পুরুষ তার সম্পদ দিয়ে পরিবারের ভরণপোষণ বহন করে।

এই আয়াতে আরও বলা হয়েছে যে, সৎ ও নেককার স্ত্রীরা স্বামীর অনুগত হয় এবং আল্লাহ প্রদত্ত পবিত্রতা ও সম্মান রক্ষা করে।

তালাকের আগে করণীয় পদক্ষেপ:

আয়াতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো, স্বামী-স্ত্রীর মাঝে যখন মতবিরোধ বা অবাধ্যতা দেখা দেয়, তখন ইসলাম তালাকের মতো চরম পদক্ষেপ নেওয়ার আগে কয়েকটি ধাপে সমস্যা সমাধানের নির্দেশ দেয়।

ক. প্রথম ধাপ: সদুপদেশ দেওয়া:

স্বামী যদি স্ত্রীর অবাধ্যতা বা খারাপ আচরণ লক্ষ্য করে, তাহলে প্রথমে তাকে কোমল ভাষায়, ভালোবাসা ও ধৈর্যের সাথে বোঝানো উচিত।

খ. দ্বিতীয় ধাপ: বিছানা আলাদা করা:

যদি প্রথম ধাপে সমস্যার সমাধান না হয়, তবে দ্বিতীয় ধাপে স্বামী স্ত্রীর সাথে একই বিছানায় শয়ন ত্যাগ করতে পারে। এর উদ্দেশ্য হলো স্ত্রীকে মানসিকভাবে সতর্ক করা এবং তার ভুল উপলব্ধি করতে সাহায্য করা।

গ. তৃতীয় ধাপ: মৃদু প্রহার:

যদি উপরের দুটি পদ্ধতি ব্যর্থ হয়, তবে আয়াতে মৃদু প্রহারের কথা বলা হয়েছে। এই প্রহারের ব্যাপারে আলেমগণ কঠোর শর্তারোপ করেছেন, যেমন- মুখে আঘাত না করা, কোনো চিহ্ন না রাখা, আঘাত যেন কষ্টদায়ক না হয় এবং এর উদ্দেশ্য যেন শুধুই সতর্ক করা হয়। এটি কোনোভাবেই নির্যাতন বা শারীরিক আঘাতের উদ্দেশ্যে নয়, বরং এটি একটি প্রতীকী বা মনস্তাত্ত্বিক পদক্ষেপ। যদি এই প্রহার নির্যাতন বা কষ্টদায়ক হয়, তবে তা হারাম।

এই তিনটি ধাপের কোনো একটিতে যদি স্ত্রী তার ভুল বুঝতে পেরে স্বামীর আনুগত্য করে, তবে স্বামীর উচিত তার বিরুদ্ধে আর কোনো পদক্ষেপ না নেওয়া।

ঘ. চতুর্থ ধাপ : তালাকের পরিবর্তে মীমাংসার চেষ্টা:

যদি তাদের মধ্যে বিচ্ছেদের আশঙ্কা দেখা দেয়, অর্থাৎ উপরের সব ধাপ ব্যর্থ হয়, তখন আয়াতটি আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপের নির্দেশ দেয়। এই ধাপে স্বামী-স্ত্রীর উভয় পক্ষ থেকে একজন করে বিচারক বা সালিস নিযুক্ত করতে বলা হয়েছে। এই বিচারকদের দায়িত্ব হলো, নিরপেক্ষভাবে তাদের সমস্যা পর্যালোচনা করা এবং উভয়কে পুনরায় একত্র করার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করা। যদি এই বিচারকগণ আন্তরিকভাবে মীমাংসা চান, তাহলে আল্লাহ তাআলা তাদের মধ্যে সমঝোতা করে দেবেন।

এই আয়াতগুলো স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, ইসলামে তালাক কোনো সহজ বা হালকা বিষয় নয়। এটি এমন একটি চূড়ান্ত পদক্ষেপ যা গ্রহণ করার আগে অনেকগুলো স্তর পার করতে হয় এবং সর্বাত্মকভাবে সম্পর্ক রক্ষার চেষ্টা করতে হয়। এই নিয়মগুলো অনুসরণ করা হলে অনেক ক্ষেত্রে তালাক এড়ানো সম্ভব হয় এবং স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক টিকে থাকে।

বিশেষ পরিস্থিতিতে তালাত প্রদানে হুকুম

যখন কো অবস্থায় দুজনে মাঝে মিলেমিসে থাকা সম্ভব হয় না। তখন চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত তালাকের মত অপছন্দণীয় কাজটি বেছে নিতে হয়। তালাকের বিধান মূলত একটি চূড়ান্ত সমাধান, যা কেবল তখনই প্রয়োগ করা হয় যখন আপস-মীমাংসার আর কোনো উপায় থাকে না। আল্লাহ তা’আলা তালাকের অনুমতি দিয়েছেন যাতে দম্পতিরা একে অপরের প্রতি বিদ্বেষ এবং ঘৃণা নিয়ে জীবন ধারণ না করে বরং শান্তি ও স্বস্তির সাথে তাদের জীবন পরিচালনা করতে পারে। এ কারনে মানুষের ভালোর জন্য আল্লাহ এ বিধান রেখেছেন। নিচে সরাসরি কুরআনের আলোকে তালাকের কিছু বিধান উল্লখ কররাম।

১. স্বামী তালাক দিতে পার আর স্ত্রী নিজেকে মুক্ত করতে পারে

আল্লাহ তা’আলা কু্রআনে তালাকের বিধান সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন। একজন পুরুষ তার স্ত্রীকে সর্বোচ্চ দুইবার তালাক দিতে পারে। এই দুই তালাকের পর স্বামী ইচ্ছা করলে স্ত্রীকে ইদ্দত চলাকালীন সময়ে (সাধারণত তিন মাসিক চক্র) ফিরিয়ে নিতে পারে, অথবা ইদ্দত শেষ হওয়ার পর সুন্দরভাবে (যেকোনো ধরনের ক্ষতি বা হয়রানি ছাড়া) ছেড়ে দিতে পারে। তালাকের বিনিময়ে স্ত্রীকে দেওয়া মোহর বা অন্য কোনো উপহার ফিরিয়ে নেওয়া স্বামীর জন্য বৈধ নয়। তবে যদি স্বামী-স্ত্রী উভয়ই আশঙ্কা করে যে তারা আল্লাহর নির্ধারিত সীমা বা বিধান মেনে চলতে পারবে না, তাহলে স্ত্রী স্বামীকে কিছু সম্পদ দিয়ে বিবাহ-বিচ্ছেদ ঘটাতে পারবে, যাকে ‘খোলা’ বলা হয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

اَلطَّلَاقُ مَرَّتٰنِ ۪ فَاِمۡسَاکٌۢ بِمَعۡرُوۡفٍ اَوۡ تَسۡرِیۡحٌۢ بِاِحۡسَانٍ ؕ وَلَا یَحِلُّ لَکُمۡ اَنۡ تَاۡخُذُوۡا مِمَّاۤ اٰتَیۡتُمُوۡہُنَّ شَیۡئًا اِلَّاۤ اَنۡ یَّخَافَاۤ اَلَّا یُقِیۡمَا حُدُوۡدَ اللّٰہِ ؕ فَاِنۡ خِفۡتُمۡ اَلَّا یُقِیۡمَا حُدُوۡدَ اللّٰہِ ۙ فَلَا جُنَاحَ عَلَیۡہِمَا فِیۡمَا افۡتَدَتۡ بِہٖ ؕ تِلۡکَ حُدُوۡدُ اللّٰہِ فَلَا تَعۡتَدُوۡہَا ۚ وَمَنۡ یَّتَعَدَّ حُدُوۡدَ اللّٰہِ فَاُولٰٓئِکَ ہُمُ الظّٰلِمُوۡنَ

তালাক দু’বার। অতঃপর বিধি মোতাবেক রেখে দেবে কিংবা সুন্দরভাবে ছেড়ে দেবে। আর তোমাদের জন্য হালাল নয় যে, তোমরা তাদেরকে যা দিয়েছ, তা থেকে কিছু নিয়ে নেবে। তবে উভয়ে যদি আশঙ্কা করে যে, আল্লাহর সীমারেখায় তারা অবস্থান করতে পারবে না। সুতরাং তোমরা যদি আশঙ্কা কর যে, তারা আল্লাহর সীমারেখা কায়েম রাখতে পারবে না তাহলে স্ত্রী যা দিয়ে নিজকে মুক্ত করে নেবে তাতে কোন সমস্যা নেই। এটা আল্লাহর সীমারেখা। সুতরাং তোমরা তা লঙ্ঘন করো না। আর যে আল্লাহর সীমারেখাসমূহ লঙ্ঘন করে, বস্তুত তারাই যালিম। সুরা বাকারা : ২২৯

২. একবার তালাক দিলে আর ফিরে আসা যায় না

অত:পর আল্লাহ আরও বিধান বর্ণনা করেন। কোনো পুরুষ যদি তার স্ত্রীকে তিনবার তালাক দেয়, তবে সে স্ত্রী তার জন্য ততক্ষণ পর্যন্ত হালাল হবে না, যতক্ষণ না সে অন্য কোনো পুরুষকে বিবাহ করে এবং সেই স্বামীর সাথে তার শারীরিক সম্পর্ক হয়। এরপর সেই দ্বিতীয় স্বামী যদি কোনো কারণে তাকে তালাক দেয় বা মারা যায়, তবেই প্রথম স্বামীর জন্য তাকে আবার বিবাহ করা বৈধ হবে। যদি তারা উভয়ে আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখা মেনে চলতে পারবে বলে দৃঢ় বিশ্বাস পোষণ করে, তবে তাদের পুনরায় বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে কোনো পাপ হবে না। এই বিধানটি আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত একটি সীমারেখা। আল্লাহ এই বিধানটি তাদের জন্য স্পষ্ট করে দিয়েছেন, যারা জ্ঞান রাখে এবং তাঁর নির্দেশনা বুঝতে চায়। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

فَاِنۡ طَلَّقَہَا فَلَا تَحِلُّ لَہٗ مِنۡۢ بَعۡدُ حَتّٰی تَنۡکِحَ زَوۡجًا غَیۡرَہٗ ؕ فَاِنۡ طَلَّقَہَا فَلَا جُنَاحَ عَلَیۡہِمَاۤ اَنۡ یَّتَرَاجَعَاۤ اِنۡ ظَنَّاۤ اَنۡ یُّقِیۡمَا حُدُوۡدَ اللّٰہِ ؕ وَتِلۡکَ حُدُوۡدُ اللّٰہِ یُبَیِّنُہَا لِقَوۡمٍ یَّعۡلَمُوۡنَ

অতএব যদি সে তাকে তালাক দেয় তাহলে সে পুরুষের জন্য হালাল হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত ভিন্ন একজন স্বামী সে গ্রহণ না করে। অতঃপর সে (স্বামী) যদি তাকে তালাক দেয়, তাহলে তাদের উভয়ের অপরাধ হবে না যে, তারা একে অপরের নিকট ফিরে আসবে, যদি দৃঢ় ধারণা রাখে যে, তারা আল্লাহর সীমারেখা কায়েম রাখতে পারবে। আর এটা আল্লাহর সীমারেখা, তিনি তা এমন সম্প্রদায়ের জন্য স্পষ্ট করে দেন, যারা জানে। সুরা বাকারা : ২৩০

৩. ইদ্দত গণনা করে তালাক দেওয়া

আল্লাহ তা’আলা তালাকের সঠিক পদ্ধতি ও এর সাথে সম্পর্কিত বিধানাবলী বর্ণনা করেছেন। যখন কোনো মুসলমান তার স্ত্রীকে তালাক দিতে চায়, তখন তাকে অবশ্যই ‘ইদ্দত’-এর প্রতি লক্ষ্য রেখে তালাক দিতে হবে। ইদ্দত হলো সেই নির্দিষ্ট সময়কাল, যা তালাকের পর স্ত্রীকে অতিবাহিত করতে হয়। তালাক দেওয়ার সর্বোত্তম সময় হলো যখন স্ত্রী মাসিক ঋতুস্রাব থেকে পবিত্র থাকে এবং তার সাথে সহবাস করা হয়নি। এই সময় তালাক দিলে ইদ্দতের হিসাব রাখা সহজ হয়। আল্লাহকে ভয় করে এই বিধান মেনে চলতে বলা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

یٰۤاَیُّہَا النَّبِیُّ اِذَا طَلَّقۡتُمُ النِّسَآءَ فَطَلِّقُوۡہُنَّ لِعِدَّتِہِنَّ وَاَحۡصُوا الۡعِدَّۃَ ۚ وَاتَّقُوا اللّٰہَ رَبَّکُمۡ ۚ لَا تُخۡرِجُوۡہُنَّ مِنۡۢ بُیُوۡتِہِنَّ وَلَا یَخۡرُجۡنَ اِلَّاۤ اَنۡ یَّاۡتِیۡنَ بِفَاحِشَۃٍ مُّبَیِّنَۃٍ ؕ وَتِلۡکَ حُدُوۡدُ اللّٰہِ ؕ وَمَنۡ یَّتَعَدَّ حُدُوۡدَ اللّٰہِ فَقَدۡ ظَلَمَ نَفۡسَہٗ ؕ لَا تَدۡرِیۡ لَعَلَّ اللّٰہَ یُحۡدِثُ بَعۡدَ ذٰلِکَ اَمۡرًا

হে নাবী! তোমরা যদি তোমাদের স্ত্রীদেরকে তালাক দিতে ইচ্ছা কর তাহলে তাদেরকে তালাক দিও ইদ্দাতের প্রতি লক্ষ্য রেখে, ইদ্দাতের হিসাব রেখ এবং তোমাদের রাব্ব আল্লাহকে ভয় কর; তোমরা তাদেরকে তাদের বাসগৃহ হতে বহিস্কার করনা এবং তারাও যেন বের না হয়, যদি না তারা লিপ্ত হয় স্পষ্ট অশ্লীলতায়; এগুলি আল্লাহর বিধান। যে আল্লাহর বিধান লংঘন করে সে নিজেরই উপর অত্যাচার করে। তুমি জাননা, হয়তো আল্লাহ এরপর কোন উপায় করে দিবেন। সুরা তালাক : ০১

৪. ইদ্দত ও তালাকের কিছু বিধান

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

فَاِذَا بَلَغۡنَ اَجَلَہُنَّ فَاَمۡسِکُوۡہُنَّ بِمَعۡرُوۡفٍ اَوۡ فَارِقُوۡہُنَّ بِمَعۡرُوۡفٍ وَّاَشۡہِدُوۡا ذَوَیۡ عَدۡلٍ مِّنۡکُمۡ وَاَقِیۡمُوا الشَّہَادَۃَ لِلّٰہِ ؕ  ذٰلِکُمۡ یُوۡعَظُ بِہٖ مَنۡ کَانَ یُؤۡمِنُ بِاللّٰہِ وَالۡیَوۡمِ الۡاٰخِرِ ۬ؕ  وَمَنۡ یَّتَّقِ اللّٰہَ یَجۡعَلۡ لَّہٗ مَخۡرَجًا ۙ

অতঃপর যখন তারা তাদের ইদ্দতের শেষ সীমায় পৌঁছবে, তখন তোমরা তাদের ন্যায়ানুগ প‎ন্থায় রেখে দেবে অথবা ন্যায়ানুগ প‎ন্থায় তাদের পরিত্যাগ করবে এবং তোমাদের মধ্য থেকে ন্যায়পরায়ণ দুইজনকে সাক্ষী বানাবে। আর আল্লাহর জন্য সঠিক সাক্ষ্য দেবে। তোমাদের মধ্যে যে আল্লাহ ও আখিরাত দিবসের প্রতি ঈমান আনে এটি দ্বারা তাকে উপদেশ দেয়া হচ্ছে। যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য উত্তরণের পথ তৈরী করে দেন। সুরা তালাক : ০২

আল্লাহ তাআলা তালাক পরবর্তী সময়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দিয়েছেন। যখন একজন স্ত্রী ইদ্দত (তালাকের পর নির্দিষ্ট সময়) শেষ করার কাছাকাছি পৌঁছায়, তখন স্বামীকে দুটি বিকল্পের মধ্যে থেকে একটি বেছে নিতে বলা হয়েছে:

১. ন্যায়ানুগ পন্থায় রেখে দেওয়া:

স্বামী যদি তার স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিতে চায়, তবে তাকে অবশ্যই ন্যায় ও সদ্ব্যবহারের সাথে ফিরিয়ে নিতে হবে। এটি কোনো প্রকার ক্ষতি বা হয়রানির উদ্দেশ্যে করা যাবে না।

২. ন্যায়ানুগ পন্থায় ছেড়ে দেওয়া:

যদি স্বামী স্ত্রীকে ফিরিয়ে না নিতে চায়, তবে তাকে অবশ্যই সুন্দর ও যথাযথভাবে ছেড়ে দিতে হবে। এর মানে হলো, স্ত্রীকে তার প্রাপ্য অধিকার (যেমন: মোহর বা ভরণপোষণ) থেকে বঞ্চিত করা যাবে না এবং তার সাথে কোনো ধরনের খারাপ আচরণ করা যাবে না।

এই দুটি কাজের যেকোনো একটি করার সময়, আল্লাহ তাআলা দুইজন ন্যায়পরায়ণ মুসলিমকে সাক্ষী রাখতে নির্দেশ দিয়েছেন। এই সাক্ষ্য কেবল আইনগত বৈধতার জন্য নয়, বরং আল্লাহর জন্য সঠিক ও সত্য সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য। এই আয়াতে আরও বলা হয়েছে যে, এই বিধানগুলো তাদের জন্য উপদেশ, যারা আল্লাহ এবং আখিরাতের প্রতি বিশ্বাস রাখে।

আয়াতের শেষে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেওয়া হয়েছে: “যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য উত্তরণের পথ তৈরী করে দেন।” এর অর্থ হলো, যে ব্যক্তি তালাকের মতো কঠিন পরিস্থিতিতে আল্লাহর বিধান মেনে চলে, আল্লাহ তাকে তার সমস্যার সমাধান ও উত্তরণের পথ সহজ করে দেন। এটি একদিকে যেমন আল্লাহর প্রতি তাওয়াক্কুলের (ভরসার) শিক্ষা দেয়, তেমনি এর মাধ্যমে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার ও দায়িত্বশীলতার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *