তালাক প্রদানের ক্ষমতা কার?

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

ইসলামে তালাক বা বিবাহবিচ্ছেদ একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়। তালাকের অধিকার এবং নিয়মকানুন কুরআন ও হাদিসে সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। তালাকের চূড়ান্ত ক্ষমতা মূলত স্বামীর হাতেই থাকে। সে ইচ্ছে করলে যে কোনো সময় তালাক দিতে পারে, তবে নারীদেরও নির্দিষ্ট কিছু পরিস্থিতিতে তাকাল প্রদানে অধিকার দেওয়া হয়েছে।  

১. তালাক প্রদানের ক্ষমতা পুরুষ

পুরুষের তালাক প্রদানের অধিকারের বিষয়টি কুরআনে একাধিক স্থানে উল্লিখ করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন-

اَلطَّلَاقُ مَرَّتٰنِ ۪ فَاِمۡسَاکٌۢ بِمَعۡرُوۡفٍ اَوۡ تَسۡرِیۡحٌۢ بِاِحۡسَانٍ ؕ

তালাক (ফেরতযোগ্য) দু’বার। তারপর (ইচ্ছা করলে) সুন্দরভাবে স্ত্রীকে রেখে দেওয়া অথবা সুন্দরভাবে ছেড়ে দেওয়া যাবে। সূরা বাকারা : ২২৯

কুরআনের এ আয়াতে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, “তালাক দুইবার। অতঃপর হয় স্ত্রীকে বিধি মোতাবেক রেখে দেবে অথবা সদ্ব্যবহারসহ তাকে বিদায় দেবে।” এই আয়াতটি সরাসরি পুরুষকে সম্বোধন করছে, কারণ তালাক প্রদানের ক্ষমতা তার হাতেই ন্যস্ত। তালাকের পর স্ত্রীকে ইদ্দতকালীন সময়ে ফিরিয়ে নেওয়ার বা চূড়ান্তভাবে ছেড়ে দেওয়ার উভয় সিদ্ধান্তই পুরুষ গ্রহণ করে, যা প্রমাণ করে যে বিবাহবিচ্ছেদ সংক্রান্ত এই গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা পুরুষেরই। এই বিধান ইসলামে পুরুষের দায়িত্ব ও অধিকারের ভারসাম্যকে তুলে ধরে।

আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন-

وَاِذَا طَلَّقۡتُمُ النِّسَآءَ فَبَلَغۡنَ اَجَلَہُنَّ فَاَمۡسِکُوۡہُنَّ بِمَعۡرُوۡفٍ اَوۡ سَرِّحُوۡہُنَّ بِمَعۡرُوۡفٍ ۪  وَلَا تُمۡسِکُوۡہُنَّ ضِرَارًا لِّتَعۡتَدُوۡا ۚ  وَمَنۡ یَّفۡعَلۡ ذٰلِکَ فَقَدۡ ظَلَمَ نَفۡسَہٗ ؕ

আর যখন তোমরা (স্বামীরা) স্ত্রীদেরকে তালাক দেবে অতঃপর তারা তাদের ইদ্দতে পৌঁছে যাবে তখন হয়তো বিধি মোতাবেক তাদেরকে রেখে দেবে অথবা বিধি মোতাবেক তাদেরকে ছেড়ে দেবে। তবে তাদেরকে কষ্ট দিয়ে সীমালঙ্ঘনের উদ্দেশ্যে তাদেরকে আটকে রেখো না। সূরা বাকারা : ২৩১

এ আয়াতে সরাসরি পুরুষদেরকে সম্বোধন করা হয়েছে, যা নির্দেশ করে যে তালাক প্রদানের ক্ষমতা তাদেরই। আয়াতের পরের অংশে তালাকের পর স্বামীর দুটি বিকল্পের কথা বলা হয়েছে। “বিধি মোতাবেক তাদেরকে রেখে দেবে”: স্বামী চাইলে ইদ্দত (তালাকের পর নির্দিষ্ট সময়কাল) শেষ হওয়ার আগেই স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিতে পারেন। এটি দ্বারা বোঝা যায়, তালাকের পর স্ত্রীকে পুনর্বার গ্রহণ করার সিদ্ধান্তটি স্বামীর ওপর নির্ভরশীল। “বিধি মোতাবেক তাদেরকে ছেড়ে দেবে”: যদি স্বামী স্ত্রীকে ফিরিয়ে না নিতে চান, তাহলে ইদ্দত শেষ হওয়ার পর তাদের বিবাহ সম্পূর্ণভাবে বাতিল হয়ে যাবে। এই সিদ্ধান্তও স্বামীরই।

কুরআন পুরুষের তালাক প্রদানে ক্ষমতা দিয়ে আরও বলা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَاِنۡ عَزَمُوا الطَّلَاقَ فَاِنَّ اللّٰہَ سَمِیۡعٌ عَلِیۡمٌ

আর যদি তারা (স্বামীরা) তালাকের দৃঢ় ইচ্ছা করে নেয় তবে নিশ্চয় আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ। সূরা বাকারা : ২২৭

২. নারীর তালাক প্রদানের অধিকার

যদিও তালাকের প্রধান ক্ষমতা পুরুষের, ইসলামে নারীর জন্যও সম্মানজনকভাবে বিবাহবিচ্ছেদ লাভ করার পথ খোলা আছে। নারীর তালাকের অধিকার মূলত তিন ধরনের:

ক. স্ত্রী অর্থিক ক্ষতিপূরণ দিয়ে তালাক নিবে

যদি কোনো স্ত্রী তার স্বামীর সাথে থাকতে না চায় এবং তাদের মধ্যে বনিবনা না হয়, তবে সে স্বামীকে অর্থিক ক্ষতিপূরণ দিয়ে তালাক চাইতে পারে যে তালাকে খুলা তালাক বলা হয়। খুলা হলো স্বামীর কাছ থেকে কিছু আর্থিক ক্ষতিপূরণের বিনিময়ে স্ত্রী কর্তৃক বিবাহবিচ্ছেদ লাভ করা। এই ক্ষতিপূরণ মোহরানার অংশ হতে পারে বা অন্য কোনো সম্পত্তি হতে পারে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

 فَاِنۡ خِفۡتُمۡ اَلَّا یُقِیۡمَا حُدُوۡدَ اللّٰہِ ۙ فَلَا جُنَاحَ عَلَیۡہِمَا فِیۡمَا افۡتَدَتۡ بِہٖ ؕ تِلۡکَ حُدُوۡدُ اللّٰہِ فَلَا تَعۡتَدُوۡہَا ۚ وَمَنۡ یَّتَعَدَّ حُدُوۡدَ اللّٰہِ فَاُولٰٓئِکَ ہُمُ الظّٰلِمُوۡنَ

সুতরাং তোমরা যদি আশঙ্কা কর যে, তারা আল্লাহর সীমারেখা কায়েম রাখতে পারবে না তাহলে স্ত্রী যা দিয়ে নিজকে মুক্ত করে নেবে তাতে কোন সমস্যা নেই। এটা আল্লাহর সীমারেখা। সুতরাং তোমরা তা লঙ্ঘন করো না। আর যে আল্লাহর সীমারেখাসমূহ লঙ্ঘন করে, বস্তুত তারাই যালিম। সুরা বাকারা : ২২৯

ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, সাবিত ইবনু কায়স এর স্ত্রী নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! চরিত্রগত বা দ্বীনী বিষয়ে সাবিত ইবনু কায়সের উপর আমি দোষারোপ করছি না। তবে আমি ইসলামের ভিতরে থেকে কুফরী করা (অর্থাৎ স্বামীর সঙ্গে অমিল) পছন্দ করছি না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি কি তার বাগানটি ফিরিয়ে দেবে? সে বললঃ হ্যাঁ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি বাগানটি গ্রহণ কর এবং মহিলাকে এক তালাক দিয়ে দাও। সহিহ বুখারি : ৫২৭৩, ৫২৭৪, ৫২৭৫, ৫২৭৬, ৫২৭৭, সুনানে ইবনে মাজাহ : ২০৫৬. ২০৫৭, সুনানে নাসায়ী : ৩৪৬৩, ইরওয়াহ : ২০৩৬

আবদুল্লাহ বিন আমর ইবনুল আস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, সাহল কন্যা হাবীবা (রাঃ) সাবিত বিন কায়স বিন সামমাস (রাঃ) এর স্ত্রী ছিলেন। সাবিত (রাঃ) ছিলেন কুৎসিত চেহারাবিশিষ্ট। হাবিবা (রাঃ) বলেন, হে আল্লাহ্‌র রসুল! আল্লাহ্‌র শপথ! আল্লাহর ভয় না থাকলে সাবিত যখন আমার নিকট আসে তখন অবশ্যই আমি তার মুখে থুথু নিক্ষেপ করতাম। রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ তুমি কি তার বাগানটি ফেরত দিতে রাজি আছো? তিনি বলেন, হাঁ। রাবী বলেন, তিনি তার বাগানটি তাকে ফেরত দিলেন। অতঃপর রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাদের দু’জনকে পৃথক করে দিলেন। সুনানে ইবনে মাজাহ : ২০৫৭, সহিহ আবু দাউদ : ১৯২৯, ইরওয়াহ : ২০৩৭।

খ. তালাকের ক্ষমতা স্ত্রীকে অর্পণ করা।

তালাকের ক্ষমতা স্ত্রীকে অর্পণ করাকে তাফভীজে তালাক । বিয়ের সময় বা বিয়ের পরে স্বামী যদি স্ত্রীকে এই অধিকার দেয় যে, সে যখন ইচ্ছা নিজেকে তালাক দিতে পারবে, তবে স্ত্রী এই ক্ষমতা ব্যবহার করতে পারে। এই অধিকারকে ‘তালাকে তাফভীয’ বলা হয়।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

یٰۤاَیُّهَا النَّبِیُّ  قُلْ  لِّاَزْوَاجِكَ اِنْ  کُنْـتُنَّ تُرِدْنَ  الْحَیٰوۃَ  الدُّنْیَا وَ زِیْنَتَهَا فَتَعَالَیْنَ اُمَتِّعْکُنَّ وَ اُسَرِّحْکُنَّ سَرَاحًا جَمِیْلًا ﴿۲۸﴾ وَ اِنْ کُنْـتُنَّ تُرِدْنَ اللّٰهَ  وَ رَسُوْلَہٗ وَ الدَّارَ الْاٰخِرَۃَ  فَاِنَّ اللّٰهَ  اَعَدَّ لِلْمُحْسِنٰتِ مِنْکُنَّ  اَجْرًا عَظِیْمًا ﴿۲۹﴾

হে নবী, তুমি তোমার স্ত্রীদেরকে বল, ‘যদি তোমরা দুনিয়ার জীবন ও তার চাকচিক্য কামনা কর তবে আস, আমি তোমাদের ভোগ-বিলাসের ব্যবস্থা করে দেই এবং উত্তম পন্থায় তোমাদের বিদায় করে দেই’।  আর যদি তোমরা আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও পরকালীন নিবাস কামনা কর, তবে তোমাদের মধ্য থেকে সৎকর্মশীলদের জন্য আল্লাহ অবশ্যই মহান প্রতিদান প্রস্তুত করে রেখেছেন’। সুরা আহযাব : ২৮-২৯

এই আয়াতে রাসূল (সা.)-কে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তাঁর স্ত্রীদেরকে তাদের ইচ্ছা অনুযায়ী বিচ্ছেদের সুযোগ দেওয়ার জন্য। এটি প্রমাণ করে যে, স্ত্রী যদি বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেয় এবং স্বামী তাতে সম্মত হয়, তবে তা শরীয়তসম্মত। ফিকহবিদগণ এই আয়াতকে তাফউইয-এর একটি মৌলিক ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করেন।

আয়িশাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে দুনিয়ার সুখ শান্তি বা পরকালীন সুখ শান্তি বেছে নেয়ার) ইখতিয়ার দিলে আমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকেই গ্রহণ করলাম। আর এতে আমাদের প্রতি কিছুই অর্থাৎ ত্বলাক (তালাক)) সাব্যস্ত হয়নি। সহিহ বুখারি : ৫২৬২, ৫২৬৩, সহহি মুসলিম : ১৪৭৭

আয়িশা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন এ আয়াতটি নাযিল হলো, যদি তোমার আল্লাহ্‌ ও তার রসূলের সন্তুষ্টি চাও। সূরা আহযাব : ২৯। তখন রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমার নিকট প্রবেশ করে বলেন, হে আয়িশা! আমি তোমাকে একটি কথা জিজ্ঞেস করবো। তুমি তোমার পিতা-মাতার সাথে পরামর্শ না করে সে সম্পর্কে তাড়াহুড়া করে কিছু বলবে না। আয়িশা (রাঃ) বলেন, আল্লাহ্‌র শপথ! তিনি জানতেন যে, নিশ্চয় আমার পিতা-মাতা কখনো তাঁর থেকে আমার বিচ্ছেদের পক্ষে মত দিবেন না। আয়িশা (রাঃ) বলেন, এরপর তিনি আমাকে এ আয়াতটি পড়ে শুনান-

یٰۤاَیُّہَا النَّبِیُّ قُلۡ لِّاَزۡوَاجِکَ اِنۡ کُنۡـتُنَّ تُرِدۡنَ الۡحَیٰوۃَ الدُّنۡیَا وَزِیۡنَتَہَا فَتَعَالَیۡنَ اُمَتِّعۡکُنَّ وَاُسَرِّحۡکُنَّ سَرَاحًا جَمِیۡلًا

হে নবী, তুমি তোমার স্ত্রীদেরকে বল, ‘যদি তোমরা দুনিয়ার জীবন ও তার চাকচিক্য কামনা কর তবে আস, আমি তোমাদের ভোগ-বিলাসের ব্যবস্থা করে দেই এবং উত্তম পন্থায় তোমাদের বিদায় করে দেই’। সূরা আহযাব : ২৮

তখন আমি বললাম, এ সম্পর্কে আমার পিতা-মাতার সাথে আমি আর কী পরামর্শ করবো! আমি আল্লাহ্‌ ও তার রসূলকেই গ্রহণ করলাম। সহিহ বুখারি :  ৪৭৮৬,৫২৬২, ৫২৬৪, সহিহ মুসলিম : ১৪৭৫, ১৪৭৭, সুনানে ইবনে মাজাহ : ২০৫২,  সুনানে তিরমিযী : ১১৭৯, ৩২০৪, সুনানে নাসায়ী : ৩২০১, ৩২০২, ৩২০৩, ৩৪৩৯, ৩৪৪১, ৩৪৪২, ৩৪৪৩, ৩৪৪৪, ৩৪৪৫, সুনানে আবূ দাউদ : ২২০৩

ফিকহ কিতাবের দলিল

ইসলামী ফিকহের প্রায় সব মাযহাবের (হানাফি, শাফেঈ, মালিকি, হাম্বলি) কিতাবেই তাফউইযের বিধান নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে এবং এর বৈধতা সম্পর্কে সবাই একমত।

বাদাইউস সানাই : হানাফি ফিকহের এই প্রসিদ্ধ গ্রন্থে বলা হয়েছে, স্বামী যদি স্ত্রীকে তালাকের ক্ষমতা দেয় এবং স্ত্রী সেই ক্ষমতা ব্যবহার করে, তাহলে তালাক হয়ে যাবে। আলাউদ্দিন আল-কাসানী, বাদাইউস সানাই তৃতীয় খণ্ড, পৃ.-১২৩

আল-মুগনি : হাম্বলি ফিকহের এই গ্রন্থেও উল্লেখ আছে যে, স্বামী তার স্ত্রীকে তালাকের ক্ষমতা অর্পণ করতে পারে এবং স্ত্রী সেই ক্ষমতা ব্যবহার করে নিজেকে তালাক দিতে পারে। ইবনে কুদামা আল-মাকদিসি, আল-মুগনি, দশম খণ্ড, পৃ.-৩২০

এই সকল দলিল প্রমাণ করে যে, ‘তালাক-ই-তাফউইয’ শরীয়তসম্মত এবং এটি একটি বৈধ প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে নারী নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে তালাকের অধিকার পায়।

গ. পারস্পরিক সম্মতিতে তালাক

স্বামী-স্ত্রী উভয়ের সম্মতিতে সংঘটিত যে তালাক সংঘটিত হয় তাকে তালাকে মোবারত বলা হয়। এখানে উভয় পক্ষই বিবাহ সম্পর্ক থেকে মুক্তি চায়।

এই ধরনের তালাক সংঘটিত হয় যখন স্বামী এবং স্ত্রী উভয়ই একে অপরের প্রতি অসন্তুষ্ট হন এবং সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয় বলে মনে করেন। উভয় পক্ষ আলোচনার মাধ্যমে পারস্পরিক সম্মতিতে তালাকের সিদ্ধান্ত নেন। এই ক্ষেত্রে স্ত্রী কোনো আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেন না, বরং উভয়ের সম্মতিতে তালাক হয়।

এটি মূলত খোলা তালাকের মতোই, তবে খোলা তালাকের মতো এখানে স্ত্রী একাই ক্ষতিপূরণ দেন না, বরং উভয়ের মধ্যে বোঝাপড়ার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত হয়। এর ভিত্তিও হলো খোলা তালাকের দলিল। যেমন সূরা আল-বাক্বারাহ, আয়াত ২২৯, যেখানে বলা হয়েছে, “…যদি তোমরা আশঙ্কা করো যে, তারা আল্লাহর সীমারেখা রক্ষা করতে পারবে না, তবে তাদের উভয়ের জন্য তাতে কোনো দোষ নেই যে, স্ত্রী কিছু বিনিময় দিয়ে তার স্বামীকে মুক্ত করে নেবে।” এই আয়াতটি পারস্পরিক সম্মতিতে বিচ্ছেদের একটি পথ উন্মুক্ত করে, যা মোবারতকেও সমর্থন করে।

৩. বিচারকের মাধ্যমে তালাক:

বিচারকের মাধ্যমে তালাক বা ফাসখ (فسخ) এর বিধান ইসলামে স্বীকৃত। যদি স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে একত্রে বসবাস করা অসম্ভব হয়ে পড়ে, এবং স্বামী তালাক দিতে বা খোলা করতে রাজি না হয়, তখন স্ত্রী বিচারকের কাছে বিবাহ বিচ্ছেদের জন্য আবেদন করতে পারে। ইসলামী শরিয়াহ আদালত বা বিচারক উভয় পক্ষের অবস্থা বিবেচনা করে বিবাহ বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত দিতে পারেন। এই ধরনের বিচ্ছেদকে ফিকহের পরিভাষায় ‘ফাসখ’ বলা হয়।

পবিত্র কুরআনের এই ধরনের পরিস্থিতিতে বিচারকের হস্তক্ষেপের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। আল্লাহ তা’আলা বলেন:

وَاِنۡ خِفۡتُمۡ شِقَاقَ بَیۡنِہِمَا فَابۡعَثُوۡا حَکَمًا مِّنۡ اَہۡلِہٖ وَحَکَمًا مِّنۡ اَہۡلِہَا ۚ اِنۡ یُّرِیۡدَاۤ اِصۡلَاحًا یُّوَفِّقِ اللّٰہُ بَیۡنَہُمَا ؕ اِنَّ اللّٰہَ کَانَ عَلِیۡمًا خَبِیۡرًا

আর যদি তোমরা তাদের উভয়ের মধ্যে বিচ্ছেদের আশঙ্কা কর তাহলে স্বামীর পরিবার থেকে একজন বিচারক এবং স্ত্রীর পরিবার থেকে একজন বিচারক পাঠাও। যদি তারা মীমাংসা চায় তাহলে আল্লাহ উভয়ের মধ্যে মিল করে দেবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞানী, সম্যক অবগত। সুরা নিসা : ৩৫

এই আয়াতে যদিও সরাসরি ফাসখের কথা বলা হয়নি, তবে এটি পারিবারিক বিরোধ নিরসনের জন্য বিচারিক প্রক্রিয়ার গুরুত্ব প্রমাণ করে। যদি সালিস বা মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমেও সমস্যার সমাধান না হয়, তবে বিচারকের হস্তক্ষেপের মাধ্যমে বিচ্ছেদ ঘটানোই একমাত্র উপায় হয়ে দাঁড়ায়।

ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, সাবিত ইবনু কায়স এর স্ত্রী নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! চরিত্রগত বা দ্বীনী বিষয়ে সাবিত ইবনু কায়সের উপর আমি দোষারোপ করছি না। তবে আমি ইসলামের ভিতরে থেকে কুফরী করা (অর্থাৎ স্বামীর সঙ্গে অমিল) পছন্দ করছি না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি কি তার বাগানটি ফিরিয়ে দেবে? সে বললঃ হ্যাঁ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি বাগানটি গ্রহণ কর এবং মহিলাকে এক তালাক দিয়ে দাও। সহিহ বুখারি : ৫২৭৩, ৫২৭৪, ৫২৭৫, ৫২৭৬, ৫২৭৭

এই হাদিস থেকে প্রমাণিত হয় যে, যদি স্ত্রী স্বামীর প্রতি ঘৃণা পোষণ করে এবং একত্রে থাকা সম্ভব না হয়, তবে বিচারক (এক্ষেত্রে রাসূল সা.) এর হস্তক্ষেপে বিবাহ বিচ্ছেদ বৈধ।

প্রায় সব মাযহাবের ফিকহবিদগণ বিচারকের মাধ্যমে তালাক বা ফাসখের বৈধতা সম্পর্কে একমত।

বাদাই’উস সানাই : হানাফি ফিকহের এই গ্রন্থেও বলা হয়েছে যে, স্বামী যদি দীর্ঘ সময় নিখোঁজ থাকে এবং স্ত্রীর কোনো ভরণ-পোষণের ব্যবস্থা না করে, তাহলে বিচারকের নির্দেশে বিবাহ বিচ্ছেদ কার্যকর করা যায়। আলাউদ্দিন আল-কাসানী, বাদাই’উস সানাই, তৃতীয় খণ্ড, পৃ.-৩৩৮

আল-মুগনি : হাম্বলি ফিকহের এই গ্রন্থে বলা হয়েছে, যদি স্বামীর কোনো গুরুতর ত্রুটি থাকে (যেমন: দীর্ঘ সময় নিখোঁজ থাকা, ভরণ-পোষণ দিতে ব্যর্থ হওয়া, গুরুতর শারীরিক সমস্যা ইত্যাদি), যার ফলে স্ত্রীর জন্য জীবনযাপন অসম্ভব হয়ে পড়ে, তবে বিচারক তাদের মধ্যে বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটাতে পারেন। ইবনে কুদামা আল-মাকদিসি, আল-মুগনি, দশম খণ্ড, পৃ.-৬৪৫

এই দলিলগুলো প্রমাণ করে যে, যদি স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক এমন তিক্ত হয়ে যায় যে একত্রে থাকা অসম্ভব, তবে বিচারকের মাধ্যমে বিবাহ বিচ্ছেদ একটি বৈধ এবং ইসলামসম্মত সমাধান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *