মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন
বিদআতি তালাক
বিদআত শব্দটি আরবী (البدع) শব্দ থেকে গৃহীত হয়েছে। বিদআত (البدع) এর আবিধানিক অর্থ হল, নব আবিস্কৃত ও নব উদ্ভাবন। বিদআত এর অর্থ এমন করেও বলা যায়, পূর্বের কোন দৃষ্টান্ত ও নমুনা ছাড়াই কোন কিছু সৃষ্টি ও উদ্ভাবন করা। পারিভাষিক অর্থে দ্বীনের মধ্যে নতুন কোন কিছু সংযোজন করার নাম বিদআত। আর শরীয়তের পরিভাষায়, আল্লাহর দ্বীনের মধ্যে নতুন করে যার প্রচলন করা হয়েছে এবং এর পক্ষে শরীয়তের কোন ব্যাপক ও সাধারণ কিংবা খাস ও সুনির্দিষ্ট দলীল নেই। কাওয়ায়েদ মা’রিফাতিল বিদআহ, পৃ-২৪
তালাকের ক্ষেত্রে, বিদআতি তালাক বলতে এমন পদ্ধতিকে বোঝানো হয়, যা শরিয়ত অনুমোদন করে না। এর মধ্যে প্রধানত তিনটি বিষয় অন্তর্ভুক্ত:
১. ঋতুকালীন অবস্থায় তালাক দেওয়া।
২. পবিত্র অবস্থায় সহবাসের পর তালাক দেওয়া
৩. একসাথে তিন তালাক দেওয়া।
১. মাসিক চলাকালীন সময়ে তালাক :
কোনো স্বামী যদি তার স্ত্রীকে মাসিক চলাকালীন সময়ে তালাক দেয়, তবে সেটিও বিদ‘আতী তালাক। এই তালাকও কার্যকর হয়, তবে এটি শরীয়তের দৃষ্টিতে অপছন্দনীয়। বিদ‘আতী তালাক কার্যকর হলেও এটি আল্লাহর কাছে অত্যন্ত অপছন্দনীয় কাজ।
নাফি’ (রহ.) হতে বর্ণিত যে, ইবনু ’উমার (রাঃ) তাঁর স্ত্রীকে ঋতুমতী অবস্থায় এক তালাক দেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে আদেশ দিলেন, তিনি যেন তার স্ত্রীকে ফিরিয়ে আনেন এবং মহিলা পবিত্র হয়ে আবার ঋতুমতী হয়ে পরবর্তী পবিত্রা অবস্থা আসা পর্যন্ত তাকে নিজের কাছে রাখেন। পবিত্র অবস্থায় যদি তাকে তালাক দিতে চায় তবে সঙ্গমের পূর্বে তালাক দিতে হবে। এটাই ইদ্দাত, যে সময় স্ত্রীদেরকে তালাক দেয়ার জন্য আল্লাহ আদেশ দিয়েছেন। ’আবদুল্লাহকে এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি তাদের বলেনঃ তুমি যদি তাকে তিন তালাক দিয়ে দাও, তবে স্ত্রীলোকটি অন্য স্বামী গ্রহণ না করা পর্যন্ত তোমার জন্য হারাম হয়ে যাবে। অন্য বর্ণনায় ইবন ’উমার (রাঃ) বলতেন, ’তুমি যদি এক বা দু’ তালাক দিতে’, কারণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে এরকমই নির্দেশ দিয়েছেন।
সহিহ বুখারি : ৫৩৩২, ৬০৩৩, ৭১৬০, সহহি মুসলিম : ১৪৭১, সুনানে ইবনে মাজাহ : ২০১৯, সুনানে তিরমিযী : ১১৭৫, ১১৭৬, সুনানে আবূ দাউদ : ২১৭৯, ২১৮১, ২১৮২, ২১৮৪, ২১৮৫
২. পবিত্র অবস্থায় সহবাসের পর তালাক দেওয়া:
যখন কোনো স্বামী তার স্ত্রীর সাথে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করেন, তখন সেই পবিত্র অবস্থায় তালাক দেওয়া বিদ‘আতী তালাক হিসেবে গণ্য হয়। এর কারণ হলো, শারীরিক সম্পর্কের ফলে গর্ভধারণের সম্ভাবনা থাকে। যদি স্ত্রী গর্ভবতী হয়ে থাকেন, তাহলে ইদ্দতকাল গণনা করা জটিল হয়ে পড়ে। এছাড়া, সহবাসের পর তালাক দিলে তা পারিবারিক সম্পর্ককে আরও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তাই, এই ধরনের তালাক দেওয়া শরীয়তসম্মত নয়।
ইবনু ’উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি তার স্ত্রীকে তার হায়য অবস্থায় তালাক দিয়েছিলেন। ’উমার (রাঃ) বিষয়টি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট উত্থাপন করলে তিনি বলেনঃ তাকে বলো, সে যেন তার স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেয়, এরপর সে চাইলে তাকে তুহর অথবা গর্ভবতী অবস্থায় তালাক দেয়। সহিহ মুসলিম : ১৪৭১, সুনানে ইবনে মাজাহ : ২০২৩, সুনানে তিরমিযী : ১১৭৫, ১১৭৬, সুনানে নাসায়ী ৩৩৮৯, ৩৩৯০, সুনানে আবূ দাউদ : ২১৭৯, ২১৮১, ২১৮২,
এই হাদিসটি থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় যে, ঋতুকালীন অবস্থায় এবং শারীরিক সম্পর্কের পর তালাক দেওয়া ইসলামে অনুমোদিত নয়। এটি তালাকের সুন্নাতসম্মত পদ্ধতির পরিপন্থী।
৩. একসাথে তিন তালাক দেওয়া
একসাথে তিন তালাক দেওয়া একটি বিদআতী ও হারাম কাজ। এই বিষয়ে উম্মাহর আলেমদের মধ্যে ইজমা বা ঐকমত্য রয়েছে যে, এটি ইসলামের বিধানসম্মত পদ্ধতি নয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যদি কোনো ব্যক্তি এই হারাম কাজটি করেই ফেলে, তাহলে তার হুকুম কী হবে? এই বিষয়ে আমাদের উপমহাদেশের আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। ইসলামী শরীয়তে মতভেদের প্রধান কারণগুলো হলো: কোনো বিষয়ে সরাসরি দলিল না থাকা, একাধিক সঠিক দলিল বিদ্যমান থাকা, অথবা একই দলিলের ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা। দলিল বুঝার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতাও মতভেদের একটি কারণ হতে পারে। এই কারণে মতভেদ করা ইসলামে জায়েজ। রাসূল (সা.)-এর যুগেও সাহাবিদের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে মতভেদ ছিল, কিন্তু তিনি তা দূর করে দিতেন। শুধু সাহাবিরা নন, তাবেয়ী এবং তাবে-তাবেয়ীদের মাঝেও ফিকহি মাসআলা-মাসায়েলে মতভেদ ছিল। তবে, তাদের সবার মূল লক্ষ্য ছিল কুরআন ও সুন্নাহর প্রতি মাথা নত করা। যখন তারা প্রকৃত দলিল জানতে পারতেন, তখন তাদের মধ্যকার মতভেদ বিলীন হয়ে যেত। ইমামদের মাঝেও ফিকহি বিষয়ে হাজার হাজার মতভেদ থাকলেও তাদের মধ্যে মতবিরোধ ছিল না। কারণ, যার কাছে যে দলিল ছিল, তার আলোকে তিনি বিশুদ্ধ অভিমত প্রদান করেছেন এবং অন্যদের মতামতের প্রতিও সম্মান দেখিয়েছেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রেখে তারা ইসলামের মূল উৎস কুরআন ও হাদিসের একনিষ্ঠ অনুসারী ছিলেন।
একদল মুজতাহিদ বলেন, একসাথে তিন তালাক দিলে তালাক কার্যকর হবে না। দ্বিতীয় দলের মতে, একসাথে তিন তালাক দিলে নারীদের ওপর তিন তালাক বর্তাবে, তবে সহবাসহীন নারীদের ওপর এক তালাক। তৃতীয় দলের মতে, একসাথে তিন তালাক দিলে তা তালাকে বাইন কবীর হিসেবে গণ্য হবে, যদিও তালাকদাতা গুনাহগার হবেন। চতুর্থ দল বলেন, এটি এক তালাক-এ-রজয়ি হবে।
একথা বললে অন্যায় হবে না যে আমাদর উপমহাদেশের অধিকংশ লোকই হানাফি মাজহাবের অনুসারী। অর্থাৎ তারা ফিকহি মাসায়েলে একদল হানাফি আলেমদের অনুসরণ করে থাকে। দ্বিতীয় বড় হলো আহলে হাদিস বা সালাফি। উপরে বর্ণনি চারটি মতামতের মাঝে হানাফি মাজহাবের আলেমদের মতে, এক সাথে তিন তালাক দিলে, তালাকে বায়িন কবির হয়ে যাবে, তবে তালাক দাতা গুনাহগার হবেন। অপর পক্ষে আহলে হাদিস বা সালাফি আলেমদের মতে, এক সাথে তিন তালাক দিলে, এক তালাক রাজয়ি হবে। দেখা যায় তালাকের মাসায়ের উপমহাদের দুটি বৃহত দল, হানাফি ও সালাফিদের (আহলে হাদিস) মাঝে বিরাট মতভেদ। কাজেই আমি এ চারটি মতমত থেকে দুটি মতামত তুলে ধরছি। আশা করি আল্লাহ রহমতে বইটিতে নিরপেক্ষভাবে দুই দলের দলিল উপস্থাপন কবর যাতে জ্ঞানীগণ সঠিক মতামত বুঝে আমল করেত পারে।
এক সাথে তিন তালাক দিলে, তালাকে বায়িন কবির হয়ে যাবে।
আমাদের উপমহাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমদের প্রতিনিধিত্বকারী হানাফি আলেমদের মতে, একসাথে তিন তালাক দেওয়া বিদআত বা হারাম হলেও তা কার্যকর হয়। তাদের মতে, এমন তালাক উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে চূড়ান্ত বিচ্ছেদ হিসেবে গণ্য হয় এবং স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ইদ্দতকালীন সময়েও কোনো ধরনের পুনর্মিলনের সুযোগ থাকে না, যা এক বা দুই তালাকের ক্ষেত্রে সম্ভব। এই মতটি তালাকের বিধানকে কঠিন করে তোলে যাতে মানুষ এর গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন হয়। এই মতের স্বপক্ষে যে প্রধান দলিলগুলো তারা পেশ করে, তা নিচে দেওয়া হল-
১. এ কথার সমর্থনে কুরআনের দলিল :
হানাফি মাজহাবের ফকিহগণ তালাকের বিধান সম্পর্কিত কুরআনের আয়াতগুলোর সমন্বিত ব্যাখ্যা প্রদান করেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
اَلطَّلَاقُ مَرَّتٰنِ ۪ فَاِمۡسَاکٌۢ بِمَعۡرُوۡفٍ اَوۡ تَسۡرِیۡحٌۢ بِاِحۡسَانٍ ؕ وَلَا یَحِلُّ لَکُمۡ اَنۡ تَاۡخُذُوۡا مِمَّاۤ اٰتَیۡتُمُوۡہُنَّ شَیۡئًا اِلَّاۤ اَنۡ یَّخَافَاۤ اَلَّا یُقِیۡمَا حُدُوۡدَ اللّٰہِ ؕ فَاِنۡ خِفۡتُمۡ اَلَّا یُقِیۡمَا حُدُوۡدَ اللّٰہِ ۙ فَلَا جُنَاحَ عَلَیۡہِمَا فِیۡمَا افۡتَدَتۡ بِہٖ ؕ تِلۡکَ حُدُوۡدُ اللّٰہِ فَلَا تَعۡتَدُوۡہَا ۚ وَمَنۡ یَّتَعَدَّ حُدُوۡدَ اللّٰہِ فَاُولٰٓئِکَ ہُمُ الظّٰلِمُوۡنَ
তালাক দু’বার। অতঃপর বিধি মোতাবেক রেখে দেবে কিংবা সুন্দরভাবে ছেড়ে দেবে। আর তোমাদের জন্য হালাল নয় যে, তোমরা তাদেরকে যা দিয়েছ, তা থেকে কিছু নিয়ে নেবে। তবে উভয়ে যদি আশঙ্কা করে যে, আল্লাহর সীমারেখায় তারা অবস্থান করতে পারবে না। সুতরাং তোমরা যদি আশঙ্কা কর যে, তারা আল্লাহর সীমারেখা কায়েম রাখতে পারবে না তাহলে স্ত্রী যা দিয়ে নিজকে মুক্ত করে নেবে তাতে কোন সমস্যা নেই। এটা আল্লাহর সীমারেখা। সুতরাং তোমরা তা লঙ্ঘন করো না। আর যে আল্লাহর সীমারেখাসমূহ লঙ্ঘন করে, বস্তুত তারাই যালিম। সুরা বাকারা : ২২৯
এইতো গেল দুই তালাকের বিধান। এরপর আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তিন তালাক প্রদানের বিধান ঘোষণা করে ইরশাদ করেন-
فَاِنۡ طَلَّقَہَا فَلَا تَحِلُّ لَہٗ مِنۡۢ بَعۡدُ حَتّٰی تَنۡکِحَ زَوۡجًا غَیۡرَہٗ ؕ فَاِنۡ طَلَّقَہَا فَلَا جُنَاحَ عَلَیۡہِمَاۤ اَنۡ یَّتَرَاجَعَاۤ اِنۡ ظَنَّاۤ اَنۡ یُّقِیۡمَا حُدُوۡدَ اللّٰہِ ؕ وَتِلۡکَ حُدُوۡدُ اللّٰہِ یُبَیِّنُہَا لِقَوۡمٍ یَّعۡلَمُوۡنَ
অতএব যদি সে তাকে তালাক দেয় তাহলে সে পুরুষের জন্য হালাল হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত ভিন্ন একজন স্বামী সে গ্রহণ না করে। অতঃপর সে (স্বামী) যদি তাকে তালাক দেয়, তাহলে তাদের উভয়ের অপরাধ হবে না যে, তারা একে অপরের নিকট ফিরে আসবে, যদি দৃঢ় ধারণা রাখে যে, তারা আল্লাহর সীমারেখা কায়েম রাখতে পারবে। আর এটা আল্লাহর সীমারেখা, তিনি তা এমন সম্প্রদায়ের জন্য স্পষ্ট করে দেন, যারা জানে। সুরা বাকারা : ২৩০
পবিত্র কুরআনের উক্ত আয়াতের দ্বারা পরিস্কার প্রমণিত হয় যে, তিন তালাক প্রদান করলে তিন তালাকই পতিত হবে। প্রথম দুই তালাকের পর স্বামী ফিরিয়ে নিতে পারেন, কিন্তু তৃতীয়বার তালাক দিলে (তা যেই পদ্ধতিতেই হোক না কেন) তালাকে বাইন কবীর কার্যকর হয়। একবারে তিন তালাক দেওয়া যদিও শরিয়তসম্মত পদ্ধতি নয়, কিন্তু তা উচ্চারিত হলে কুরআনের এই আয়াত অনুযায়ী তা কার্যকর হবে। কারণ, আল্লাহ তালাকের সংখ্যাকে দুইবারে সীমাবদ্ধ করেছেন, কিন্তু তিন তালাকের ফলাফলকে সুনির্দিষ্ট করে দিয়েছেন।
২. সাহাবিদের (রা.) ইজমা
ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) এর সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন-
كَانَ الطَّلاَقُ عَلَى عَهْدِ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وَأَبِي بَكْرٍ وَسَنَتَيْنِ مِنْ خِلاَفَةِ عُمَرَ طَلاَقُ الثَّلاَثِ وَاحِدَةً فَقَالَ عُمَرُ بْنُ الْخَطَّابِ إِنَّ النَّاسَ قَدِ اسْتَعْجَلُوا فِي أَمْرٍ قَدْ كَانَتْ لَهُمْ فِيهِ أَنَاةٌ فَلَوْ أَمْضَيْنَاهُ عَلَيْهِمْ . فَأَمْضَاهُ عَلَيْهِمْ .
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগে এবং আবূ বকর (রাঃ)-এর যুগে ও উমার (রাঃ)-এর খিলাফতের প্রথম দুই বছর পর্যন্ত তিন তালাক এক তালাক হিসেবে গণ্য হতো। অতঃপর উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) বললেন, ‘লোকেরা এমন এক বিষয়ে তাড়াতাড়ি করছে, যাতে তাদের জন্য ধৈর্যের অবকাশ ছিল। যদি আমরা এটি তাদের উপর কার্যকর করে দেই (তাহলে কেমন হয়)?’ এরপর তিনি তা তাদের উপর (একসাথে তিন তালাককে তিন তালাক) কার্যকর করে দিলেন। সহি মুসলিম : ১৪৭২
উমার (রাঃ) যখন এক সাথে তিন তালাককে কার্যকর বা তিন তালাক হিসেবেই গণ্য করার সিদ্ধান্ত নিলেন, তখন তা সাহাবায়ে কেরামের ইজমা (ঐকমত্য) দ্বারা সমর্থিত হয়। এই ইজমা ইসলামের একটি মৌলিক বিধান হিসেবে বিবেচিত। যদিও রাসূল (সাঃ)-এর যুগে এবং আবু বকর (রাঃ)-এর খিলাফতে এক সঙ্গে তিন তালাককে এক তালাক ধরা হতো, উমার (রাঃ)-এর এই সিদ্ধান্তের পেছনে মুসলিম উম্মাহর কল্যাণ (মাসলাহা) ছিল।
হানাফি আলেমদের দাবি- এই হাদিসটি প্রমাণ করে যে, সাহাবীদের ইজমা শরীয়তের একটি শক্তিশালী ভিত্তি। যদিও মূল নীতি এক ছিল, কিন্তু পরিস্থিতি ও জনগণের প্রয়োজন অনুযায়ী বিধানের প্রয়োগ ভিন্ন হতে পারে। উমার (রাঃ)-এর এই সিদ্ধান্তকে তাকয়ীদে হুকুম (বিধানকে সীমাবদ্ধ করা) হিসেবে দেখা হয়, যা একটি বিশেষ পরিস্থিতিতে প্রয়োগ করা হয়েছিল এবং যা মুসলিম উম্মাহর সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত দ্বারা প্রতিষ্ঠিত। তাই, হানাফি ফিকহ মোতাবেক, একসঙ্গে তিন তালাক উচ্চারণ করলে তা তিন তালাক হিসেবেই কার্যকর হবে এবং স্ত্রী স্বামীর জন্য হারাম হয়ে যাবে।
৩. একত্র তিন তালাক শুনে ইবনু আব্বাস (রা.) চুপ হয়ে যান
মুজাহিদ (রহ.) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ইবনু আব্বাস (রা.)-এর কাছে অবস্থান করছিলাম এমন সময় এক ব্যক্তি এসে বললো যে, সে তার স্ত্রীকে তিন তালাক দিয়েছে। বর্ণনাকারী বলেন, তিনি এ কথা শুনে চুপ রইলেন। তখন আমার মনে হলো, সম্ভবতঃ তিনি মহিলাটিকে পুনরায় গ্রহণের নির্দেশ দিবেন। অতঃপর তিনি বললেন, তোমাদের কেউ আহম্মকের মতো কাজ করে এবং এসে বলে, হে ইবনু ’আব্বাস! হে ইবনু ’আব্বাস! অথচ আল্লাহ বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য একটা সমাধানের পথ দেখিয়ে দিবেন’’। সূরা তালাক : ২। আর তুমি তো (তালাকের বিষয়ে) আল্লাহকে ভয় করোনি। সুতরাং আমি তোমার জন্য কোনো পথ দেখছি না। তুমি তোমার প্রতিপালকের নাফরমানী করেছো এবং স্ত্রীকেও হারিয়েছো। মহান আল্লাহ তো বলেছেনঃ ’’হে নবী! যখন তোমরা তোমাদের স্ত্রীদের তালাক দিবে তখন তাদের ইদ্দাতকালের প্রতি লক্ষ্য রেখে তালাক দিবে।’’ সুরা তালাক : ০১
ইমাম আবূ দাঊদ (রহ.) বলেন, এ হাদীসটি হুমাইদ, আ’রাজ ও অন্যরা মুজাহিদ থেকে ইবনু ’আব্বাস সূত্রে বর্ণনা করেছেন। এছাড়াও শু’বাহ, আইয়ূব, ইবনু জুরাইজ আ’মাশ প্রমুখ বর্ণনাকারীগণ সকলেই ইবনু ’আব্বাস সূত্রে হাদীস বর্ণনা করে বলেছেন যে, ইবনু আব্বাস (রাযি.) একে একসাথে তিন তালাক হিসেবে গণ্য করেছেন। তাই তিনি বলেছেন, ’তুমি তোমার স্ত্রীকে হারালে।
ইমাম আবূ দাঊদ (রহ.) বলেন, হাম্মাদ ইবনু যায়িদ আইয়ূব থেকে ইকরিমার মাধ্যমে ইবনু ’’আব্বাস (রাযি.) সূত্রে বর্ণনা করেছেন, ’’যদি কোনো ব্যক্তি তার স্ত্রীকে একত্রে তিন তালাক দেয়, তা এক তালাক গণ্য হবে।’’ ইসমাঈল ইবনু ইবরাহীম (রহ.) আইউব থেকে ইকরিমাহ (রহ.) সূত্রে বর্ণনা করেন, উক্ত কথাটি ইবনু আব্বাসের নয়, বরং ইকরিমাহর কথা। তিনি ইবনু ’আব্বাস (রাযি.)-এর উল্লেখ করেননি এবং একে ইকরিমাহ (রহ.)-এর অভিমত গণ্য করেছেন। সহীহ। সুনানে আবু দাউদ : ২১৯৭, সুনানে বায়হাকী কুবরা ; -১৪৭২০, সুনানে দারা কুতনী : ১৪৩
নোট : এ হাদিসে এ সাথে তিন তালাত গন্য হয়েছে বিধায় ইবনু আব্বাস (রা.) চুপ হয়ে গেলেন এবং বললেন তুমি স্ত্রীকে হারালে।
৪. রিফায়া (রা.) তার স্ত্রী তিন তালাক ছিয়েছিল
আয়িশা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রিফায়া আল কুরাযী নামে এক সাহাবীর স্ত্রী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে বলল, আমি রিফায়ার বিবাহিতা স্ত্রী ছিলাম, সে আমাকে তিন তালাক দিয়ে সম্পূর্ণ সম্পর্ক নিঃশেষ করে দিয়েছে। অতঃপর আব্দুর রহমান ইবনে যাবীর -এর সাথে আমার বিবাহ হয়, কিন্তু তাঁর কাছে এই কাপড়ের আঁচলের মতো ছাড়া আর কিছুই নেই। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি রিফায়ার নিকট ফিরে যেতে চাও? সে বলল, জি, হ্যাঁ। তিনি বললেন, না, যে পর্যন্ত না তুমি তার স্বাদ আস্বাদন (সহবাস) কর এবং সে তোমার স্বাদ আস্বাদন করে। সহিহ বুখারী : ২৬৩৯, সহিহ মুসলিম : ১৪৩৩, সুনানে নাসায়ী : ৩২৮৩, সুনানে তিরমিযী : ১১১৮, সুনানে ইবনু মাজাহ “ ১৯৩২, আহমাদ : ২৪০৯৮, ইরওয়া : ১৮৮৭, মিশকাত : ৩২৯৫, হাদিসটি মিশকাত থেকে সংকলন করা হয়েছে।
সালাফিদের দাবি : এ হাদিসে এক মজলিসে তিন তালাকের কথা নেই। বরং সে তাকে স্বাভাবিক নিয়মে তিন তুহরে তিন তালাক দিয়েছিল বলেই বুঝতে হবে। কেননা রাসূলের যামানায় ‘বায়েন তালাক’ বলতে তিন তুহরে তালাকই বুঝাতো।
৫. একই মজলিসে তিন তালাক
আমের আশশাবী (রহ.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ফাতেমাহ বিনতে কায়েস (রাঃ)-কে বললাম, আপনার তালাকের ঘটনাটি আমাকে বলুন। তিনি বলেন-
طَلَّقَنِي زَوْجِي ثَلَاثًا وَهُوَ خَارِجٌ إِلَى الْيَمَنِ فَأَجَازَ ذَلِكَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم
আমার স্বামী ইয়ামনে থাকা অবস্থায় আমাকে তিন তালাক দেয়। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এটাকে জায়েয গণ্য করেন। সুনানে ইবনে মাজাহ : ২০২৪, আহমাদ : ২৭৩২৭, সহীহ ইবনু হিব্বান : ৪০৪৯, মিশকাত : ৩৩২৪
ফাতিমা বিনতু কায়স (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবূ আমর ইবনু হাফস্ (রা.) (তার স্বামী) অনুপস্থিতিতে তাকে বায়িন তালাক দেন। এরপর সামান্য পরিমাণ যবসহ উকীলকে তার কাছে পাঠিয়ে দেন। এতে তিনি ফাতিমা (রা.) তার উপর ভীষণভাবে অসন্তুষ্ট হন। সে বলল, আল্লাহর কসম! তোমাকে (খোরপোষরূপে) কোন কিছু দেয়া আমাদের দায়িত্ব নয়। তখন তিনি ফাতিমা বিনত কায়স (রা.) রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে উপস্থিত হয়ে তার নিকট সব খুলে বললেন। তিনি বললেন, তোমার জন্য তার তোমার স্বামী আবূ আমর ইবনু হাফস্ (রা.) এর দায়িত্বে কোন খোরপোষ নেই। এরপর তিনি তাকে উম্মু শারীক এর ঘরে গিয়ে ইদ্দাত পালনের নির্দেশ দিলেন। অতঃপর তিনি এও বললেন, সে মহিলা (উম্মু শারীক) এমন একজন স্ত্রীলোক যার কাছে আমার সাহাবীগণ ভীড় করে থাকেন। তুমি বরং ইবনু উম্মু মাকতুম (রা.) এর বাড়িতে গিয়ে ইদ্দাত পালন করতে থাক। কেননা সে একজন অন্ধ মানুষ। সেখানে প্রয়োজনবোধে তুমি তোমার পরিধানের বস্তু খুলে রাখতে পারবে। ইদ্দাত পূর্ণ হলে তুমি আমাকে জানাবে। তিনি বলেন, যখন আমার ইদ্দাত পূর্ণ হল তখন আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে জানালাম যে, মু’আবিয়াহ ইবনু আবূ সুফইয়ান (রা.) ও আবূ জাহম (রা.) আমাকে বিবাহের পায়গাম পাঠিয়েছেন। তখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ আবূ জাহম এমন লোক যে, তার কাঁধ থেকে লাঠি নামিয়ে রাখে না। আর মু’আবিয়াহ তো কপৰ্দকহীন গরীব মানুষ। তুমি উসামাহ ইবনু যায়দের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হও। কিন্তু আমি তাকে পছন্দ করলাম না। পরে তিনি আবার বললেন, তুমি উসামাকে বিয়ে কর। তখন আমি তার সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলাম। আল্লাহ এতে (তার ঘরে) আমাকে বিরাট কল্যাণ দান করলেন। আর আমি ঈর্ষার পাত্রে পরিণত হলাম। সহিহ মুসলিম : ১৪৮০, সুনানে আবূ দাঊদ : ২২৮৪, সুনানে নাসায়ী : ৩২৪৫ হাদিসটি আবু দাউদ থেকে সংকরন করা হয়েছে।
হানাফি আলেমদের দাবি এ হাদিস দ্বারা বুঝা যায় ফাতিমা বিনতু কায়স (রা.) এক সঙ্গে তিন তালাকের কথা জানতে পারেন। আগে তিনি এক বা দুই তালাকের কথা জানতেন না। তাই তিনি ভরণ পোষনের জন্য এর নিকট অভিযোগ করেছেন। এক বা দু্ই তালাত দিলে স্বামী নিশ্চয়ই ভরন পোষন দিতে বাধ্য থাকত। ইবন মাজাহ এ হাদিসের শিরোনাম দিয়েছেন : যে ব্যক্তি একই মজলিসে তিন তালাক দেয়।
৬. স্ত্রীকে তিন তালাক দিলে হারাম হয়ে যায়
লায়স (রহ.) নাফি থেকে বর্ণনা করেছেন-
كَانَ ابْنُ عُمَرَ إِذَا سُئِلَ عَمَّنْ طَلَّقَ ثَلاَثًا قَالَ لَوْ طَلَّقْتَ مَرَّةً أَوْ مَرَّتَيْنِ فَإِنَّ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم أَمَرَنِي بِهٰذَا فَإِنْ طَلَّقْتَهَا ثَلاَثًا حَرُمَتْ حَتّٰى تَنْكِحَ زَوْجًا غَيْرَكَ.
ইবনু উমার (রাঃ)-কে তিন তালাক প্রদানকারী সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলতেন, যদি তুমি একবার বা দু’বার দিতে! কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে এরূপ করার নির্দেশ দিয়েছেন। তাই স্ত্রীকে তিন তালাক দিলে সে হারাম হয়ে যাবে, যতক্ষণ না সে স্ত্রী তোমাকে ছাড়া অন্য স্বামীকে বিয়ে করে। সহিহ বুখারি : ৫২৬৪
নোট : এ হাদিসটি অনেক হানাফি আলেরম একসাথে তিন তালাকের দলিল হিসেবে উল্লেখ করে। তখন তারা হদিসের অনুবাদে সামান্য বিকৃতি কবে। তাদের একটি ভুল বা বুকৃত অনুবাদ হলো-
নাফে (রহ.) বলেন, যখন ইবনে উমর রাঃ এর কাছে এক সাথে তিন তালাক দিলে তিন তালাক পতিত হওয়া না হওয়া’ (রুজু‘করা যাবে কিনা) বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হলো, তখন তিনি বলেন-“যদি তুমি এক বা দুই তালাক দিয়ে থাকো তাহলে ‘রুজু’ [তথা স্ত্রীকে বিবাহ করা ছাড়াই ফিরিয়ে আনা] করতে পার। কারণ, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে এরকম অবস্থায় ‘রুজু’ করার আদেশ দিয়েছিলেন। যদি তিন তালাক দিয়ে দাও তাহলে স্ত্রী হারাম হয়ে যাবে, সে তোমাকে ছাড়া অন্য স্বামী গ্রহণ করা পর্যন্ত।
নোট : এ বিষয়টি সাধারণ তিন তালাত বায়িনের মাসায়েল। শুধু একসাত তিন তালাক কথাটি অতিরিক্ত যোগ করে দলিল নিজের পক্ষে নিয়েছে। মুফতি রাশেদুল ইসলাম, মুসলিম বাংলা ওয়বসাইড, প্রশ্ন নম্বর-২৬২৫৪ এর উত্তরে।
৭. জেনার কারনে এক সাথে তিন তালাক প্রদান
সাহল ইবনু সা’দ আস্ সা’ইদী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ’উওয়াইমির আল আজলানী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে বললেন, হে আল্লাহর রসূল! কোনো ব্যক্তি যদি স্বীয় স্ত্রীর সাথে অপর পুরুষকে (ব্যভিচারে) দেখতে পায় এবং সে যদি (ক্রোধান্বিত হয়ে) তাকে হত্যা করে বসে, তবে কি নিহতের আত্মীয়স্বজন তাকে হত্যা করবে? (আর এরূপ যদি না করে) তবে সে (স্বামী) কি করবে (অর্থাৎ- এই ব্যভিচারের কারণে তার করণীয় কি)? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমার এবং তোমার স্ত্রীর ব্যাপারে ওয়াহী নাযিল হয়েছে, ’যাও তোমার স্ত্রীকে নিয়ে আসো’। বর্ণনাকারী সাহল বলেন, অতঃপর তারা উভয়ে মসজিদে এসে লি’আন করল, আমিও অন্যান্য লোকের সাথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকটে উপস্থিত থেকে ঘটনা প্রত্যক্ষ করছিলাম। অতঃপর উভয়ে যখন লি’আন শেষ করল, তখন ’উওয়াইমির বলল, আমি যদি তাকে আমার বিবাহের বন্ধনে রাখি, তাহলে আমি তার ওপর মিথ্যারোপ করেছি, এটা বলে সে তাকে তিন তালাক প্রদান করল। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যদি স্ত্রী লোকটি কালো রংয়ের এবং কালো চক্ষুবিশিষ্ট, বড় বড় নিতম্ব, মোটা মোটা পা-বিশিষ্ট সন্তান প্রসব করে, তবে মনে করতে হবে ’উওয়াইমির তার সম্পর্কে সত্য বলেছেন। আর যদি রক্তিম বর্ণের ক্ষুদ্রাকৃতির কীটের ন্যায় সন্তান প্রসব করে, তবে মনে করব ’উওয়ামির মিথ্যা অপবাদ দিয়েছে। বর্ণনাকারী বলেন, অতঃপর স্ত্রীলোক এমন বর্ণের সন্তান প্রসব করল যেরূপ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বর্ণনা দিয়েছিলেন- সে সেরূপ সন্তানই প্রসব করল।’ এর দ্বারা ’উয়াইমির-এর দাবির সত্যতার ধারণা জন্মে, অতঃপর সন্তানটিকে (পিতার পরিবর্তে) মায়ের পরিচয়ে ডাকা হতো। সহিহ বুখারি : ৪৭৪৫, ৪৭৪৬, সহিহ মুসলিম : ১৪৯২, সুনানে নাসায়ী : ৩৪০২, দারিমী : ২২৭৫, মিশকাত : ৩৩০৪। হাদিসটি মিশকাত থেকে সংকলন করা হয়েছে।
নোট : এ হাদিসের আলোকে তারা দাবি করের থাকেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) একসাথে তিন তালাক দেওয়াটা স্বীকার করে নিয়েছেন। কিন্তু এখানে স্বামীর পক্ষ থেকে স্ত্রীর বিরুদ্ধে যেনার অভিযোগ ছিল এবং লিআনের ঘটনা ছিল। লিআনের কারণে উভয়পক্ষের বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে যায়। তাই পৃথকভাবে তালাক দেওয়ায় কোন প্রয়োজন হয় না। কাজেই এ হাদিস দ্বারা একসাথে তিন তালাকের হুকুর জারি করা যাবে না।
৮. একসাথে একশত তালাক প্রদান করা
মালিক (রহ.) হতে বর্ণিত। তাঁর নিকট খবর এসেছে যে, জনৈক ব্যক্তি আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করল, আমি স্বীয় স্ত্রীকে একশ’ তালাক দিয়েছি, এ সম্পর্কে আমার প্রতি আপনার অভিমত কি? উত্তরে তিনি বললেন, তিনটির মাধ্যমেই তোমার স্ত্রী তালাকপ্রাপ্ত হয়েছে, বাকি সাতানব্বইটি দ্বারা তুমি আল্লাহর আয়াত (শারীআতের বিধান)-এর সাথে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করেছ। মিশকাত : ৩২৯৩, মুয়াত্তা মালিক : ১১৯৫, হাদিসের মান হাসান।
উবাদাহ বিন ছামিত (রাঃ) বলেন, আমার দাদা তার স্ত্রীকে একসঙ্গে ১০০০ তালাক দেন। তখন আমার আববা রাসূল (ছাঃ)-এর দরবারে গেলেন। রাসূল (ছাঃ) তাকে বললেন, তোমার দাদা তালাক দেওয়ার সময় আল্লাহকে ভয় করেনি। তার অধিকারে মাত্র তিনটি। বাকী ৯৯৭টি বাড়াবাড়ি ও যুলম হয়েছে। আল্লাহ চাইলে তাকে আযাব দিবেন, চাইলে ক্ষমা করবেন’। সুনানে দারা কুতনী : ৪৬১০, মুসান্নাফ ইবনু আবি শাইবাহ : ১৭৮৮৯, মুসান্নাফ আবদুর রাযযাক : ১১৭৫৩, কানজুল উম্মাল : ২৮৪২৩, হাদিসটি মান কেউ জঈফ আবার কেউ জাল বলেছেন।
নোট : এ দুটি হাদিসের প্রথমটি সহিহ হাদিস। এখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, তিনটি তালাকের মাধ্যমেই তোমার স্ত্রী তালাকপ্রাপ্ত হয়েছে। এখানে কিন্তু তিন তালাক একসাথে দেওয়া হয়েছে বলে আনুমেয়। ,
০৯. হানাফি মাজহাবের ফিকহি দলিল
হানাফি ফকিহগণ বলেন, ইসলামে তালাক দেওয়ার সুন্নতি পদ্ধতি হলো এক তালাক দেওয়া। কিন্তু যদি কোনো স্বামী এই পদ্ধতি না মেনে একসাথে তিন তালাক দেন, তাহলে এর জন্য তাকে গুনাহগার হতে হবে, কিন্তু তার তালাক কার্যকর হবে। কারণ, যদি একসাথে দেওয়া তিন তালাককে অকার্যকর ধরা হয়, তবে মানুষ শরিয়তের বিধানকে অবহেলা করবে এবং দায়িত্বহীনভাবে তালাক দেবে। তাই, শাস্তি হিসেবে হলেও এই তালাককে কার্যকর করা উচিত, যাতে মানুষ সতর্ক হয়। এই মতের পক্ষে তাদের ফিকহি গ্রন্থগুলোতে বিভিন্ন দলিল উল্লেখ করেছেন। নিচে কয়েকটি প্রসিদ্ধ ফিকহি গ্রন্থ থেকে এর কিছু উদাহরণ দেওয়া হলো:
১. ফতোয়ায়ে আলমগীরি (ফাতাওয়া-ই-হিন্দিয়া) গ্রন্থে বলা হয়েছে যে, যদি কোনো ব্যক্তি তার স্ত্রীকে একসাথে তিন তালাক দেয়, তবে তিন তালাকই কার্যকর হবে, যদিও এটি বিদ’আতী (শরিয়ত-বিরুদ্ধ) পদ্ধতি। তারা এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন যে, রাসূল (সা.)-এর সময়কাল থেকে এটি একটি প্রতিষ্ঠিত রীতি ছিল যে, একসাথে তিন তালাক দিলে তা তিন তালাক হিসেবেই গণ্য হবে। ফতোয়ায়ে আলমগীরি (ফাতাওয়া-ই-হিন্দিয়া), প্রথম খণ্ড, পৃ.-৩৭৩-৩৭৪
২. বুরহানুদ্দীন আল-মারগীনানী (রহ.) বলেন, যদি কোনো ব্যক্তি তার স্ত্রীকে একসাথে তিন তালাক দেয়, তবে তার স্ত্রী তার জন্য হারাম হয়ে যাবে, যতক্ষণ না সে অন্য কোনো স্বামীকে বিবাহ করে। এই বিধানটি একবারে তিন তালাক দেওয়ার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। গ্রন্থটিতে বিশেষভাবে বলা হয়েছে যে, তিন তালাক মুখে উচ্চারণ করা হলে তা কার্যকর হবে, কারণ তালাকের বিষয়টি নির্ভর করে উচ্চারণের ওপর, নিয়তের ওপর নয়। আল-হিদায়া, প্রথম খণ্ড, পৃ.-২২৭
৩. ইমাম আলাউদ্দীন আবু বকর ইবনে মাসউদ কাসানী হানাফী (রহ.) বলেছেন, এক সাথে তিন তালাক কার্যকর হওয়ার কারণ হিসেবে উমর (রা.)-এর আমলের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ফিকাহবিদগণ বলেন যে, উমর (রা.) যখন দেখলেন যে মানুষ এ বিষয়ে খেলাধুলা করছে, তখন তিনি সাহাবিদের উপস্থিতিতে এটিকে কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নেন। এই সিদ্ধান্ত সাহাবিদের ঐকমত্যের (ইজমা’) ভিত্তিতে নেওয়া হয়েছিল। তাই, এটি শরিয়তের একটি প্রতিষ্ঠিত বিধান হিসেবে গণ্য। বাদাই’উস সানাই, তৃতীয় খণ্ড, পৃ.-৯৬
৪. মুহাম্মদ আমীন ইবনে আবেদীন (রহ.) বলেছেন, যদি কেউ তার স্ত্রীকে বলে, “আমি তোমাকে তিন তালাক দিলাম,” তবে তা কার্যকর হবে। এতে কোনো সন্দেহ নেই। গ্রন্থটিতে আরও ব্যাখ্যা করা হয়েছে যে, এই ধরনের তালাক যদিও হারাম, কারণ এটি শরিয়তের নির্ধারিত পদ্ধতির পরিপন্থী, তবুও এটি কার্যকর হবে। ফতোয়ায়ে শামী (রদ্দুল মুহতার), তৃতীয় খণ্ড, পৃ.-২৫৩
এক সাথে তিন তালাক দিলে, এক তালাক রজয়ি হবে
একসাথে তিন তালাক দিলে তা এক তালাক হিসেবে গণ্য হবে—এই মতটি সালাফি ও আহলে হাদিস আলেমগণ দিয়ে থাকেন। তারা তাদের মতের সপক্ষে কুরআন, সুন্নাহ এবং সাহাবিদের আমল থেকে বেশ কিছু শক্তিশালী দলিল পেশ করেন।
ক. কুরআন থেকে দলিল
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
یٰۤاَیُّہَا النَّبِیُّ اِذَا طَلَّقۡتُمُ النِّسَآءَ فَطَلِّقُوۡہُنَّ لِعِدَّتِہِنَّ وَاَحۡصُوا الۡعِدَّۃَ ۚ وَاتَّقُوا اللّٰہَ رَبَّکُمۡ ۚ لَا تُخۡرِجُوۡہُنَّ مِنۡۢ بُیُوۡتِہِنَّ وَلَا یَخۡرُجۡنَ اِلَّاۤ اَنۡ یَّاۡتِیۡنَ بِفَاحِشَۃٍ مُّبَیِّنَۃٍ ؕ وَتِلۡکَ حُدُوۡدُ اللّٰہِ ؕ وَمَنۡ یَّتَعَدَّ حُدُوۡدَ اللّٰہِ فَقَدۡ ظَلَمَ نَفۡسَہٗ ؕ لَا تَدۡرِیۡ لَعَلَّ اللّٰہَ یُحۡدِثُ بَعۡدَ ذٰلِکَ اَمۡرًا
হে নবী, (বল), তোমরা যখন স্ত্রীদেরকে তালাক দেবে, তখন তাদের ইদ্দত অনুসারে তাদের তালাক দাও এবং ‘ইদ্দত হিসাব করে রাখবে এবং তোমাদের রব আল্লাহকে ভয় করবে। তোমরা তাদেরকে তোমাদের বাড়ী-ঘর থেকে বের করে দিয়ো না এবং তারাও বের হবে না। যদি না তারা কোন স্পষ্ট অশ্লীলতায় লিপ্ত হয়। আর এগুলো আল্লাহর সীমারেখা। আর যে আল্লাহর (নির্ধারিত) সীমারেখাসমূহ অতিক্রম করে সে অবশ্যই তার নিজের ওপর যুলম করে। তুমি জান না, হয়তো এর পর আল্লাহ, (ফিরে আসার) কোন পথ তৈরী করে দিবেন। সুরা তালাক : ০১
এই আয়াতটি তালাকের সঠিক পদ্ধতি সম্পর্কে নির্দেশনা দেয়, যা হলো ইদ্দতকাল অনুযায়ী ধাপে ধাপে তালাক দেওয়া। একসাথে তিন তালাক দিলে এই বিধান লঙ্ঘিত হয়। সালাফি আলেমদের মতে, যেহেতু এই পদ্ধতি কুরআনের নির্দেশের বিরোধী, তাই তা শরিয়তসম্মত নয় এবং তা এক তালাক হিসেবেই কার্যকর হবে।
সহিহ হাদিস থেকে দলিল
১. একসাথে তিন তালাকের পর স্ত্রীকে পুনঃগ্রহণ করা যায়
ইবনু আব্বাস (রাযি.) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রুকানার পিতা আবদু ইয়াযীদ ও তার ভ্রাতৃগোষ্ঠী উম্মু রুকানাকে তালাক দেন এবং মুযাইনাহ গোত্রের এক মহিলাকে বিয়ে করেন। একদা ঐ মহিলা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে বললো, তার স্বামী সহবাসে অক্ষম। যেমন আমার মাথার চুল অন্য কোনো চুলের কোনো উপকারে আসে না। সুতরাং আপনি আমার ও তার মাঝে বিচ্ছেদ করিয়ে দিন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এতে অসন্তুষ্ট হন এবং রুকানা ও তার ভ্রাতৃগোষ্ঠীকে ডেকে আনেন। এরপর তিনি সেখানে উপস্থিত সকল লোকজনকে বলেন, তোমরা কি লক্ষ করেছো যে, এদের মধ্যে অমুক অমুকের অঙ্গের মিল রয়েছে? তারা বললো, হ্যাঁ।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ’আবদু ইয়াযীদকে বলেন, তুমি তাকে তালাক দাও। সুতরাং তিনি তাকে তালাক দিলেন। তিনি বলেন, তুমি রুকানার মা ও তার ভ্রাতৃগোষ্ঠীকে পুনরায় গ্রহণ করো। তিনি বলেন, আমি তো তাকে তিন তালাক দিয়েছি, হে আল্লাহর রাসূল! তিনি বলেন, আমি তা জানি, তুমি তাকে গ্রহণ করো। এরপর তিনি তিলাওয়াত করলেন, ’’হে নবী! যখন তোমরা তোমাদের স্ত্রীদের তালাক দিবে তখন তাদের ইদ্দাতকালের প্রতি লক্ষ্য রেখে তালাক দিবে’’। সূরা তালাক : ০১
ইমাম আবূ দাঊদ (রহ.) বলেন, নাফি ইবনু উজাইর ও আব্দুল্লাহ ইবনু ’আলী ইবনু ইয়াযীদ ইবনু রুকানা থেকে তার পিতা ও তার দাদার সূত্রে বর্ণিত হাদীসে রয়েছে, রুকানা তার স্ত্রীকে তালাক দিলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে পুনরায় ঐ স্ত্রীকে গ্রহণ করতে আদেশ দেন। এটা অধিকতর সঠিক।
সুনানে আবু দাউদ : ২১৯৬
নোট : এ হাদিস থেকে জানা যায় যে, রুকানা (রাঃ) তাঁর স্ত্রীকে একসঙ্গে তিন তালাক দিয়েছিলেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এটিকে এক তালাক হিসেবে গণ্য করে তাঁকে স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেওয়ার আদেশ দেন। সাধারণত, তিন তালাক দিলে তালাকটি বাইন (সম্পূর্ণ বিচ্ছেদ) হয়ে যায় এবং স্ত্রীকে আর ফিরিয়ে নেওয়া যায় না, কেবল দ্বিতীয় বিয়ের পরই তা সম্ভব। কিন্তু এই হাদিস থেকে স্পষ্ট হয় যে, রাসূল (সাঃ)-এর নির্দেশ অনুযায়ী একসঙ্গে দেওয়া তিন তালাক এক তালাক হিসেবেই কার্যকর হয়েছিল, যা রাজ’ঈ (ফেরতযোগ্য) তালাক। এটি প্রমাণ করে যে, একসঙ্গে তিন তালাক দিলে তা এক তালাকেই পরিণত হয়।
২. এক সাথে তিন তালাক দিলে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভীষন রাগ করেছিল
মাহমুদ ইবনু লাবীদ (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে কোন লোক সম্বন্ধে সংবাদ দেয়া হলো যে, লোকটি তার স্ত্রীকে একই সাথে তিন তালাক দিয়ে ফেলেছে। (এরূপ শুনে) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাগাম্বিত হয়ে উঠে দাঁড়ালেন, অতঃপর বললেন-
«أَيُلْعَبُ بِكِتَابِ اللَّهِ تَعَالَى, وَأَنَا بَيْنَ أَظْهُرِكُمْ». حَتَّى قَامَ رَجُلٌ, فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ! أَلَا أَقْتُلُهُ رَوَاهُ النَّسَائِيُّ وَرُوَاتُهُ مُوَثَّقُونَ
তোমাদের মধ্যে আমি বিদ্যমান থাকা অবস্থাতেই কুরআন নিয়ে কি খেলা করা হচ্ছে? এমনকি এক ব্যক্তি (সাহাবী) দাঁড়িয়ে গিয়ে বললেন, হে আল্লাহর রসূল! আমি কি তাকে হত্যা করব না? বুলূগুল মারাম : ১০৭২, সুনানে নাসাই : ৩৪০১, গায়াতুল মারাম : ২৬১
নোট : রাসূল (সা.)-এর এই তীব্র প্রতিক্রিয়া থেকে বোঝা যায় যে, একসাথে তিন তালাক দেওয়া ইসলামের বিধানের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। এই কাজটি এতটাই গুরুতর যে নবী (সা.) এটিকে আল্লাহর কিতাবের সাথে ঠাট্টা-বিদ্রূপ হিসেবে তুলনা করেছেন।
৩. রাসূলুল্লাহ ﷺ এবং আবু বকর (রাঃ)-এর যুগে তিন তালাককে এক তালাক গন্য করা হতো
তাওস (রহ.) থেকে বর্ণিতখ। আবু সহবা ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে বললেন-
هَاتِ مِنْ هَنَاتِكَ أَلَمْ يَكُنِ الطَّلاَقُ الثَّلاَثُ عَلَى عَهْدِ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وَأَبِي بَكْرٍ وَاحِدَةً فَقَالَ قَدْ كَانَ ذَلِكَ فَلَمَّا كَانَ فِي عَهْدِ عُمَرَ تَتَايَعَ النَّاسُ فِي الطَّلاَقِ فَأَجَازَهُ عَلَيْهِمْ .
“তোমার কিছু বক্তব্য আমাদের শুনাও। রাসূলুল্লাহ ﷺ এর যুগে এবং আবু বকর (রাঃ)-এর যুগে কি তিন তালাক (একসাথে দিলে) এক তালাক হিসেবে গণ্য করা হতো না?” তিনি (ইবনে আব্বাস রাঃ) বললেন,
“হ্যাঁ, তা-ই ছিল। কিন্তু যখন উমর (রাঃ)-এর খেলাফতের যুগ এলো, মানুষ তালাকের ব্যাপারে ধারাবাহিকভাবে (অতিরিক্তভাবে) লিপ্ত হতে লাগল, তখন তিনি (উমর রাঃ) তা তাদের ওপর কার্যকর করে দিলেন (অর্থাৎ তিনকে তিন হিসেবেই গণ্য করলেন)।” সহিহ মুসলিম : ১৪৭২
রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর যুগে, আবূ বকর (রাঃ)-এর খিলাফতে এবং উমার (রাঃ)-এর খিলাফতের প্রথম দুই বছর পর্যন্ত একসঙ্গে তিন তালাক দেওয়া হলে তা এক তালাক হিসেবেই গণ্য করা হতো। এই হাদিসটি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, ইসলামের প্রাথমিক যুগে সাহাবীগণ একসাথে তিন তালাককে এক তালাকই গন্য করতেন, যা ছিল শরীয়তের মূল বিধান।
পরবর্তীতে, উমার (রাঃ) যখন দেখলেন যে মানুষেরা তালাকের ব্যাপারে হেলাফেলা করছে এবং ঘন ঘন একসাথে তিন তালাক দিয়ে দিচ্ছে, তখন তিনি একটি কঠোর প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। তিনি একসঙ্গে তিন তালাককে তিন তালাক হিসেবেই কার্যকর করার নির্দেশ দেন। তাঁর এই সিদ্ধান্তের উদ্দেশ্য ছিল মানুষকে তালাকের ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করা এবং তালাকের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে খেল-তামাশায় পরিণত হওয়া থেকে রক্ষা করা। এটি কোনো শরয়ী বিধানের পরিবর্তন ছিল না, বরং একটি শিক্ষামূলক পদক্ষেপ ছিল, যা মানুষের অসাবধানতা ও বাড়াবাড়ি বন্ধ করার জন্য নেওয়া হয়েছিল।
এই হাদিসটি এ মতের সবচেয়ে শক্তিশালী দলিল হিসেবে বিবেচিত হয় যে, একসঙ্গে তিন তালাক দেওয়া হলে তা মূলত এক তালাক হিসেবেই গণ্য হওয়া উচিত। উমার (রাঃ)-এর সিদ্ধান্তটি ছিল একটি বিশেষ পরিস্থিতি মোকাবিলায় নেওয়া পদক্ষেপ। যদি বাংলাদেশের মতো মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোতে একসাথে তিন তালাক দেওয়ার প্রবণতা থাকে, তবে তার পেছনে সামাজিক, মানসিক এবং শিক্ষাগত কারণগুলো গভীরভাবে অনুধাবন করা প্রয়োজন। কোরআন ও হাদিসের মূল শিক্ষা অনুযায়ী, তালাক একটি চূড়ান্ত পদক্ষেপ এবং এটি ধীরে ধীরে, সুন্নাহর নিয়ম মেনে হওয়া উচিত। একসঙ্গে তিন তালাক দেওয়ার যে প্রবণতা, তা কোরআন ও হাদিসের সুস্পষ্ট বিধানের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।
বাংলাদেশে একসাথে তিন তালাক দেওয়ার কারণ
একসাথে তিন তালাক দেওয়া শরিয়তসম্মত নয়, বরং বিদ’আত ও হারাম। এতদসত্ত্বেও আমাদের সমাজে এর ব্যাপক প্রচলন রয়েছে। এর মূল কারণগুলো হলো:
ক. পূর্বপুরুষের অনুসরণ :
আমাদের সমাজে বহু যুগ ধরে এমন একটি ভুল ধারণা প্রচলিত আছে যে, তালাক মানেই একবারে তিন তালাক। এর চেয়ে কম তালাক দিলে তা কার্যকর হয় না। এই বিশ্বাস এতটাই গভীর যে মানুষ সঠিক ধর্মীয় বিধান জানার পরও তা মানতে চায় না। বাপ-দাদার এই ভুল প্রথা অনুসরণ করে মানুষ সহজে একসাথে তিন তালাক দিয়ে বসে।
খ. ধর্মিয় জ্ঞানের অভাব :
প্রতিটি মুসলিমের ধর্মিয় প্রয়োজনীয় পরিমান জ্ঞান অর্জন ফরজ। কাজেই যিনি তালাক দিবেন তার তালাক সম্পর্কি সকল জ্ঞান অর্জন করা ফরজ। কিন্তু তালাকের সঠিক পদ্ধতি সম্পর্কে আমাদের সমাজের বেশিরভাগ মানুষ অজ্ঞ। তারা জানে না যে, ইসলামে তালাকের একটি সুন্নাহসম্মত পদ্ধতি রয়েছে, যা অনুসরণ করলে সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পরও তা ফিরিয়ে আনার সুযোগ থাকে। অজ্ঞতার কারণে তারা একসাথে তিন তালাক দিয়ে পারিবারিক জীবনকে আরও জটিল করে তোলে।
গ. হঠাৎ রাগ ও আবেগ :
তালাকের ঘটনা সাধারণত স্বামী-স্ত্রীর তীব্র ঝগড়া, রাগ এবং মানসিক চাপের কারণে ঘটে। চরম রাগের মুহূর্তে স্বামী তার রাগের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে একবারে তিন তালাক উচ্চারণ করে সম্পর্ক ছিন্ন করতে চায়। এই মুহূর্তে কী বলা হচ্ছে এবং তার পরিণতি কী হবে, সে বিষয়ে তার কোনো হুঁশ থাকে না।
ঘ. পারিবারিক চাপ :
অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের পক্ষ থেকে ছেলে বা মেয়ের ওপর বিয়ের সম্পর্ক ভেঙে দেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হয়, বিশেষ করে যদি তারা নিজেরা বিবাহ করে থাকে বা পরিবার সম্পর্কটি মেনে নিতে না পারে। এই চাপের মুখে অনেক সময় স্বামী-স্ত্রী একসাথে তিন তালাক দিয়ে সম্পর্ককে চূড়ান্তভাবে শেষ করে দেয়। অনেক সময় বউ শাশুরি এক অপরকে মেন নিতে পারেনা বিধায় পারিবারিক তিব্র কলহের কারনে কোন কোন স্বামী এক সাথে তালাক দিতে বাধ্য হয়।
ঙ. সামাজিক চাপ ও মর্যাদা :
অজ্ঞতার কারণে অনেক সময় পরিবার বা সমাজ মনে করে যে, তালাক একটি দুর্বল সিদ্ধান্ত। যদি স্বামী শুধুমাত্র এক তালাক দেন, তবে তার সম্মান কমে যাবে বলে মনে করা হয়। তাই, তারা সম্পর্ক সম্পূর্ণভাবে ছিন্ন করার জন্য একবারে তিন তালাক দিয়ে থাকে। তাদের কাছে এটি যেন একটি চূড়ান্ত পদক্ষেপ, যা তাদের সিদ্ধান্তের দৃঢ়তা প্রকাশ করে।
চ. প্রক্রিয়াগত অজ্ঞতা :
অধিকাংশ মানুষ তালাকের আইনি ও শরীয়তসম্মত পদ্ধতি সম্পর্কে জানে না। তারা মনে করে, একবার মুখে তিনটি তালাক উচ্চারণ করলেই সব ঝামেলা মিটে যাবে। তারা জানে না যে, তালাকের নির্দিষ্ট সময় এবং পদ্ধতি রয়েছে। এই অজ্ঞতার কারণে তারা তালাকের সঠিক নিয়ম-কানুন মেনে চলে না এবং একবারে তিন তালাক দেয়।
ছ. দ্রুত সমাধান :
অনেকে মনে করে, সম্পর্ক যখন খারাপ হয়ে যায়, তখন দ্রুত এবং স্থায়ীভাবে তা শেষ করাই ভালো। তারা ভাবে, ধীরে ধীরে এক বা দুই তালাক দিলে ঝামেলা বাড়তে পারে বা সম্পর্ক ফিরে আসার সম্ভাবনা থাকে। তাই, সব সমস্যা একবারে শেষ করতে তারা একবারে তিন তালাক দেয়।
জ. যৌতুক :
যৌতুক একটি মারাত্মক সামাজিক ব্যাধি। যদি বিয়ের পর শর্তকৃত যৌতুক না দেওয়া হয়, তখন স্বামী এবং তার পরিবার স্ত্রীর ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালায়। এই নির্যাতনের চরম পর্যায়ে একবারে তিন তালাকের ঘটনা ঘটে।
আপনার এই আলোচনাটি থেকে বোঝা যায় যে, একসাথে তিন তালাক দেওয়া ইসলামের বিধানের পরিপন্থী হলেও সামাজিক ও মানসিক কারণে এর প্রচলন রয়েছে। এই বিষয়ে আরও কিছু জানতে চাইলে আমরা আলোচনা চালিয়ে যেতে পারি।