বাতিল তালাক বা অশুদ্ধ তালাক

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে, বাতিল তালাক হলো এমন ধরনের বিচ্ছেদ, যা কোনোভাবেই কার্যকর হয় না। এই তালাক সেসব ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয়, যারা শরীয়তের বিধিবিধান পালনের জন্য উপযুক্ত নয়। এদের মধ্যে রয়েছে নাবালেগ (অপ্রাপ্তবয়স্ক), পাগল বা মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তি, যার জ্ঞান সম্পূর্ণরূপে লোপ পেয়েছে। এছাড়াও, যে ব্যক্তি ঘুমের ঘোরে থাকে অথবা কোনো কারণে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে, তাদের দেওয়া তালাকও বাতিল বলে গণ্য হয়। এর কারণ হলো, শরীয়ত এমন ব্যক্তির ওপর কোনো বিধান কার্যকর করে না, যার পূর্ণ জ্ঞান বা বিচার-বুদ্ধি নেই। এ ধরনের ব্যক্তিদের কাজকে স্বেচ্ছাপ্রণোদিত কাজ হিসেবে ধরা হয় না, তাই তাদের তালাকও বাতিল হয়ে যায় এবং দাম্পত্য সম্পর্ক অক্ষুণ্ন থাকে। এটি ইসলামে ন্যায়বিচার ও মানবিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক, যা অক্ষম ব্যক্তিদের অধিকার সুরক্ষিত করে।

১. পাগল, মাতাল বা অপ্রকৃতিস্থ অবস্থায় তালাক

২. জবরদস্তি তালাক (ভয়-ভীতি বা বল প্রয়োগ)

৩. ক্রোধান্ধ অবস্থায় তালাক

১. পাগল, মাতাল বা অপ্রকৃতিস্থ অবস্থায় তালাক

ইসলামী শরীয়ত অনুসারে, পাগল বা অপ্রকৃতিস্থ ব্যক্তির ওপর কোনো ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা নেই। যেহেতু তালাক একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আইনি ও ধর্মীয় চুক্তি, তাই এর জন্য সুস্থ মস্তিষ্কের প্রয়োজন।

আয়িশা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, তিন ব্যক্তি থেকে কলম উঠিয়ে রাখা হয়েছে। ঘুমন্ত ব্যক্তি যতক্ষন না সে জাগ্রত হয়, নাবালেগ যতক্ষন না সে বালেগ হয় এবং পাগল, যতক্ষন না সে জ্ঞান ফিরে পায় বা সুস্থ হয়। অধস্তন রাবী আবূ বাকর (রহঃ) এর বর্ণনায় আছে, বেহুঁশ ব্যক্তি যতক্ষণ না সে হুঁশ ফিরে পায়। সুনানে ইবনে মাজাহ : ২০৪১, সুনানে নাসায়ী ৩৪৩২, আবূ দাউদ ৪৩৯৮, আহমাদ ২৪১৭৩, ২৪১৮২, ২৪৫৯০, দারেমী ২২৯৬, ইরওয়াহ ২৯৭, মিশকাত ৩২৮৭-৩২৮৮।

আলী বিন আবূ তালিব (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, নাবালেগ, পাগল ও ঘুমন্ত ব্যক্তি থেকে কলম তুলে নেয়া হয়েছে। সুনানে ইবনে মাজাহ : ২০৪২, সুনানে তিরমিযী ১৪২৩, মিশকাত : ৩২৮৭, সুনানে আবূ দাঊদ : ৪৪০৩, ইরওয়া ; ২৯৭,

এই হাদিসের আলোকে, একজন পাগল বা অপ্রকৃতিস্থ ব্যক্তির তালাক কার্যকর হবে না। মাতাল ব্যক্তির তালাকের বিষয়ে কিছুটা মতভেদ আছে।

হানাফী মাজহাবের ভিন্নমত :

হানাফি আলেমদের মতে, পাগল ব্যক্তির তালাক কার্যকর না হলেও মাতাল ব্যক্তির তালাক কার্যকর হবে।

তদের এ মতের প্রধান ভিত্তি হলো, ইসলামে যেকোনো কাজ, যা পাপের মাধ্যমে সংঘটিত হয়, তা তার ফল বহন করে। মাতাল হওয়া ইসলামে হারাম এবং একটি গুরুতর পাপ। যখন কোনো ব্যক্তি জেনে-বুঝে এই হারাম কাজটি করে, তখন তার পরবর্তী কর্মকাণ্ডের দায়ভার তাকেই বহন করতে হয়। এই মতের সমর্থনে সরাসরি কোরআন বা হাদিসের কোনো নির্দিষ্ট আয়াত বা হাদিস নেই। তবে, ফিকাহবিদরা কিছু সাধারণ মূলনীতি (উসুল) থেকে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। তাদের দুক্তি হলো-

ক. মাতাল অবস্থায় একজন ব্যক্তি স্বেচ্ছায় তার জ্ঞান ও চেতনার ওপর নিয়ন্ত্রণ হারায়। যেহেতু এই অবস্থাটি সে নিজেই তৈরি করেছে, তাই এর ফলস্বরূপ তার দ্বারা উচ্চারিত তালাকের দায়িত্বও তারই। যদি এই তালাককে বাতিল বলে ধরা হয়, তাহলে একজন ব্যক্তি তালাক থেকে বাঁচার জন্য ইচ্ছে করে মাতাল হওয়ার অজুহাত দিতে পারে, যা শরিয়তের বিধানকে দুর্বল করে দেবে।

খ. হানাফি মাজহাবের ফিকাহবিদগণ আরও মনে করেন যে, যদি মাতাল অবস্থায় তালাক কার্যকর না হয়, তবে এটি অপরাধীদের জন্য একটি সুবিধা হয়ে দাঁড়াবে, যা শরিয়তের মূল উদ্দেশ্যের পরিপন্থী। এই কারণে, তারা মাতাল ব্যক্তির তালাককে কার্যকর বলে রায় দেন।

২. জবরদস্তি তালাক (ভয়-ভীতি বা বল প্রয়োগ)

জবরদস্তি বা বল প্রয়োগ করে নেওয়া তালাক অধিকাংশ আলেমের মতে বাতিল, কারণ ইসলামে কোনো কাজ জোর করে করার অনুমতি নেই। বিবাহের মতো তালাকের জন্যও স্বামীর স্বাধীন ইচ্ছা থাকতে হবে।

আল্লাহ তা’আলা বলেন-

لَاۤ اِکۡرَاہَ فِی الدِّیۡنِ ۟ۙ قَدۡ تَّبَیَّنَ الرُّشۡدُ مِنَ الۡغَیِّ ۚ

দ্বীন গ্রহণের ব্যাপারে কোন জবরদস্তি নেই। নিশ্চয় হিদায়াত স্পষ্ট হয়েছে ভ্রষ্টতা থেকে। সূরাবাক্বারা : ২৫৬

এই আয়াতটি থেকে বোঝা যায়, কোনো ধর্মীয় বা ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত জোর করে চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়।

আয়িশাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-

لَا طَلَاقَ وَلَا عَتَاقَ فِي إِغْلَاقٍ

জোরপূর্বক আদায়কৃত তালাক ও দাসমুক্তি কার্যকর হবে না। সুনানে ইবনে মাজাহ : ২০৪৬

ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ আল্লাহ্ আমার উম্মাতকে ভুল, বিস্মৃতি ও জোরপূর্বক কৃত কাজের দায় থেকে অব্যাহতি দিয়েছেন। সুনানে ইবনে মাজাহ : ২০৪৫

এই দুটি সহিহ হাদিসের ভিত্তিতে জমহুর আলেমগণ মনে করেন যে, জবরদস্তিমূলকভাবে দেওয়া তালাক কার্যকর হবে না।

আবূ যার আল-গিফারী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ আল্লাহ আমার উম্মাতের ভুল , বিস্মৃতি ও বলপূর্বক যা করিয়ে নেয়া হয় তা ক্ষমা করে দিয়েছেন। সুনানে ইবনে মাজাহ : ২০৪৩, মিশকাত : ৬২৮৪, ইরওয়া : ৮২

হানাফি মাজহাবে ভিন্নমত :

হানাফি মাজহাব অনুযায়ী, জবরদস্তি বা বল প্রয়োগ করে নেওয়া তালাক কার্যকর হবে। এই মতবাদের মূল ভিত্তি হলো কয়েকটি হাদিস ও ফিকাহ শাস্ত্রের ব্যাখ্যা, যা তালাকের মতো সংবেদনশীল বিষয়কে ঠাট্টা বা অনিচ্ছাকৃত বলে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ দেয় না।

হানাফি মাজহাবের অনুসারীদের প্রধান দলিল হলো একটি হাদিস। হাদিসটি হলো-

আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

“‏ ثَلاَثٌ جِدُّهُنَّ جِدٌّ وَهَزْلُهُنَّ جِدٌّ النِّكَاحُ وَالطَّلاَقُ وَالرَّجْعَةُ

তিনটি বিষয়ে প্রকৃতপক্ষে বললেও এবং ঠাট্টাচ্ছলে বললেও যথার্থ বলে বিবেচিত হবেঃ বিয়ে, তালাক ও রাজআত (তালাক প্রত্যাহার)। সুননে তিরমিজি : ১১৮৪, সুনানে ইবনে মাজাহ :২০৩৯, বায়হাকী : ৩১৮, ইরওয়াহ : ১৮২৬, মিশকাত : ৩২৮৪

এই হাদিসটি থেকে হানাফি ফকিহগণ এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, তালাকের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে শুধুমাত্র মৌখিক উচ্চারণই যথেষ্ট। এখানে ব্যক্তির উদ্দেশ্য বা ভেতরের ইচ্ছার চেয়ে তার বাহ্যিক উচ্চারণকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। তাই, যদি একজন ব্যক্তি রাগের বশে বা জোরপূর্বকও তালাক উচ্চারণ করে, তবে তা কার্যকর বলে গণ্য হবে।

হানাফি মাজহাবের এই মতের পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দুটি যুক্তি রয়েছে। যেমন-

ক. ভ্রান্তি নিরসন :

যদি জোরপূর্বক তালাক দেওয়াকে বাতিল বলে ঘোষণা করা হয়, তাহলে অনেক স্বামী-ই পরবর্তীতে দাবি করতে পারেন যে, তিনি চাপে পড়ে বা অনিচ্ছাকৃতভাবে তালাক দিয়েছেন। এতে তালাকের বিধানটি দুর্বল হয়ে পড়বে এবং নারীরা তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হতে পারেন।

খ. তালাকের মর্যাদা :

হানাফি ফকিহগণ মনে করেন যে, তালাক একটি খেলা বা ঠাট্টার বিষয় নয়। এটি এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যা ঠাট্টা বা জোর করেও উচ্চারণ করলে তা বাস্তব রূপ ধারণ করে।

হানাফি মাজহাব জবরদস্তি তালাককে কার্যকর বলে গণ্য করে কারণ, তারা বাহ্যিক উচ্চারণের ওপর গুরুত্ব দেয় এবং মনে করে যে, তালাকের মতো বিষয়কে তুচ্ছ বা ঠাট্টার বিষয় হিসেবে দেখা উচিত নয়

২. ক্রোধান্ধ অবস্থায় তালাক

ক্রোধান্ধ অবস্থায় তালাক সম্পর্কে ইসলামী শরীয়তের দুটি ভিন্ন মত রয়েছে। একদল আলেম মনে করেন, যখন কোনো ব্যক্তি চরম রাগের কারণে তার হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলে এবং কী বলছে তা বুঝতে পারে না, তখন তার তালাক কার্যকর হবে না। এর কারণ হলো, তালাকের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য সুস্থ মস্তিষ্কের থাকা আবশ্যক।

আয়িশাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

لَا طَلَاقَ، وَلَا عَتَاقَ فِي غِلَاقٍ، قَالَ أَبُو دَاوُدَ: الْغِلَاقُ: أَظُنُّهُ فِي الْغَضَبِ

রাগের অবস্থায় কোনো তালাক হয় না এবং দাসত্বমুক্ত করা যায় না। ইমাম আবূ দাঊদ (রহ.) বলেন, আমার মতে ’আল-গিলাক’ অর্থ রাগ। সুনানে আবু দাউদ : ২১৯৩, আহমাদ : ২৫৮২৮, ইরওয়াহ : ২০৪৭,

এই হাদিসটি অনুযায়ী, যখন একজন ব্যক্তি তার স্বাভাবিক বোধশক্তি হারিয়ে ফেলে, তখন তার দ্বারা উচ্চারিত কোনো তালাক কার্যকর হয় না। তবে, যদি রাগ স্বাভাবিক সীমার মধ্যে থাকে এবং ব্যক্তি তার কথার অর্থ বুঝতে পারে, তবে তালাক কার্যকর হবে।

হানাফি মাজহাবে ফতোয়া :

হানাফি মাজহাবের আলেমদের মতে ক্রোধান্ধ অবস্থায় তালাক দিলে তালাক কার্যকর হবে। এই মতের মূল ভিত্তি হলো ইজতিহাদ ও কিছু হাদিসের ভিন্ন ব্যাখ্যা।

আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

“‏ ثَلاَثٌ جِدُّهُنَّ جِدٌّ وَهَزْلُهُنَّ جِدٌّ النِّكَاحُ وَالطَّلاَقُ وَالرَّجْعَةُ

তিনটি কাজ এমন যা বাস্তবে বা ঠাট্টাচ্ছলে করলেও তা বাস্তবিকই ধর্তব্য। তা হলো- বিবাহ, তালাক ও স্ত্রীকে ফিরিয়ে আনা। সুনানে আবূ দাঊদ : ২১৯৪, সুনানে তিরমিযী : ১১৮৪, সুনানে ইবনু মাজাহ : ২০৩৯, মিশকাত : ৩২৮৪, ইরওয়া : ১৮২৬, সহীহ আল জামি : ৩০২৭

এই হাদিসের ওপর ভিত্তি করে হানাফি ফকিহগণ যুক্তি দেন যে, তালাকের মতো একটি গুরুতর বিষয়ে ব্যক্তির ভেতরের উদ্দেশ্য বা অনিচ্ছাকে প্রাধান্য দেওয়া হয় না, বরং তার বাহ্যিক উচ্চারণই যথেষ্ট। যদি ঠাট্টা করে বলা তালাক কার্যকর হয়, তবে রাগের মাথায় দেওয়া তালাকও কার্যকর হবে।

ক্রোধান্ধ অবস্থার প্রকারভেদ : হানাফি মাজহাবে ক্রোধান্ধ অবস্থাকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করে দেখা হয়। যেমন-

১.  ক্রোধের প্রথম পর্যায়:

যখন ক্রোধ স্বাভাবিক থাকে এবং ব্যক্তি কী বলছে তা বুঝতে পারে। এই অবস্থায় তালাক দিলে তা সর্বসম্মতিক্রমে কার্যকর হবে।

২.  ক্রোধের মধ্যম পর্যায়:

যখন ক্রোধ এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, ব্যক্তি তার কথার অর্থ বুঝতে পারে, কিন্তু তার মানসিক নিয়ন্ত্রণ কিছুটা কমে যায়। এই অবস্থায়ও তালাক কার্যকর হয়।

৩.  ক্রোধের চরম পর্যায়:

যখন রাগ এতটাই প্রবল হয় যে, ব্যক্তি তার জ্ঞান ও চেতনা হারিয়ে ফেলে এবং কী বলছে বা করছে তা সম্পর্কে সম্পূর্ণ অসতর্ক থাকে। এই ধরনের তালাক কার্যকর হবে না। তবে, হানাফি মাজহাবের অধিকাংশ ফকিহ মনে করেন, এই চরম পর্যায়টি খুব কমই ঘটে। সাধারণত মানুষ রাগের সময়েও তার কথার অর্থ বুঝতে পারে। 

এ সম্পর্কিত একটি প্রশ্ন উত্তর

প্রশ্ন : আমি একটি ঘটনা সংশ্লিষ্ট প্রশ্ন করতে চাই। সেটা হচ্ছে– এক মুসলিম ভাই তার স্ত্রীকে বলেছেন যে, তিনি তাকে তিন তালাক দিয়েছেন। কিন্তু কয়েক ঘণ্টা পরে তিনি মত পরিবর্তন করে বলেন যে, তিনি সেটা রাগের মাথায় বলেছেন। ইয়া শাইখ, আমার প্রশ্ন হচ্ছে– এই ভাই কি তার স্ত্রীকে ফেরত নেয়ার অধিকার আছে? আমি শরিয়তের দলিল সমৃদ্ধ সিদ্ধান্ত চাই। উল্লেখ্য, আমরা এ মাসয়ালায় একাধিক দৃষ্টিভঙ্গির মতামত শুনেছি; কিন্তু কোন দলিল-প্রমাণ ছাড়া।

উত্তর : সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, দুরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক আল্লাহর রাসূলের প্রতি। পর সমাচার:

রাগের তিনটি অবস্থা হতে পারে:

প্রথম অবস্থা:

এত তীব্র রাগ উঠা যে, ব্যক্তি তার অনুভুতি হারিয়ে ফেলা। পাগল বা উন্মাদের মত হয়ে যাওয়া। সকল আলেমের মতে, এ লোকের তালাক কার্যকর হবে না। কেননা সে বিবেকহীন পাগল বা উন্মাদের পর্যায়ভুক্ত।

দ্বিতীয় অবস্থা:

রাগ তীব্র আকার ধারণ করা। কিন্তু সে যা বলছে সেটা সে বুঝতেছে এবং বিবেক দিয়ে করতেছে। তবে তার তীব্র রাগ উঠেছে এবং দীর্ঘক্ষণ ঝগড়া, গালি-গালাজ বা মারামারির কারণে সে নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারেনি। এগুলোর কারণেই তার রাগ তীব্র আকার ধারণ করেছে। এ লোকের তালাকের ব্যাপারে আলেমদের মাঝে মতভেদ রয়েছে। অগ্রগণ্য মতানুযায়ী, এ লোকের তালাকও কার্যকর হবে না। কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “ইগলাক এর অবস্থায় তালাক কিংবা দাস আযাদ নেই”। সুনানে ইবনে মাজাহ ; ২০৪৬, শাইখ আলবানী ‘ইরওয়াউল গালিল’ কিতাবে হাদিসটিকে ‘সহিহ’ আখ্যায়িত করেছেন] ইগলাক শব্দের অর্থে আলেমগণ বলেছেন: জবরদস্থি কিংবা কঠিন রাগ।

তৃতীয় অবস্থা:

হালকা রাগ। স্ত্রীর কোন কাজ অপছন্দ করা কিংবা মনোমালিন্য থেকে স্বামীর এই রাগের উদ্রেক হয়। কিন্তু এত তীব্র আকার ধারণ করে না যে, এতে বিবেক-বুদ্ধি হারিয়ে ফেলে কিংবা নিজের ভাল-মন্দের বিবেচনা করতে পারে না। বরং এটি হালকা রাগ। আলেমগণের সর্বসম্মতিক্রমে এ রাগের অবস্থায় তালাক কার্যকর হবে।

রাগাম্বিত ব্যক্তির তালাকের মাসয়ালায় বিস্তারিত ব্যাখ্যামূলক এটাই সঠিক অভিমত। ইবনে তাইমিয়া ও ইবনুল কাইয়্যেম এভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। আল্লাহ্‌ই সর্বজ্ঞ। আমাদের নবী মুহাম্মদ এর উপর আল্লাহ্‌র রহমত ও শান্তি বর্ষিত হোক। শাইখ বিন বায এর ‘ফাতাওয়াত তালাক’ পৃষ্ঠা: ১৫-২। ইসলাম জিজ্ঞাসা ও জবাবের প্রশ্ন নম্বর : ২২০৩৪

সহবাসে পূর্বেই স্ত্রীকে তালাক প্রদান

সহবাস বা নির্জনবাসের পূর্বেই স্ত্রীকে তালাক দেওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ ফিকহি মাসআলা। কুরআন ও হাদিসে এ বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। ইসলামের বিধান অনুযায়ী, সহবাসের আগে তালাক দিলে সেই তালাকের কিছু বিশেষ নিয়ম রয়েছে।

০১. সহবাসে পূর্বেই স্ত্রীকে তালাক দিলে মহর অর্ধেক হবে

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَاِنۡ طَلَّقۡتُمُوۡہُنَّ مِنۡ قَبۡلِ اَنۡ تَمَسُّوۡہُنَّ وَقَدۡ فَرَضۡتُمۡ لَہُنَّ فَرِیۡضَۃً فَنِصۡفُ مَا فَرَضۡتُمۡ اِلَّاۤ اَنۡ یَّعۡفُوۡنَ اَوۡ یَعۡفُوَا الَّذِیۡ بِیَدِہٖ عُقۡدَۃُ النِّکَاحِ ؕ وَاَنۡ تَعۡفُوۡۤا اَقۡرَبُ لِلتَّقۡوٰی ؕ وَلَا تَنۡسَوُا الۡفَضۡلَ بَیۡنَکُمۡ ؕ اِنَّ اللّٰہَ بِمَا تَعۡمَلُوۡنَ بَصِیۡرٌ

আর যদি তোমরা তাদেরকে তালাক দাও, তাদেরকে স্পর্শ করার পূর্বে এবং তাদের জন্য কিছু মোহর নির্ধারণ করে থাক, তাহলে যা নির্ধারণ করেছ, তার অর্ধেক (দিয়ে দাও)। তবে স্ত্রীরা যদি মাফ করে দেয়, কিংবা যার হাতে বিবাহের বন্ধন সে যদি মাফ করে দেয়। আর তোমাদের মাফ করে দেয়া তাকওয়ার অধিক নিকটতর। আর তোমরা পরস্পরের মধ্যে অনুগ্রহ ভুলে যেয়ো না। তোমরা যা কর, নিশ্চয় আল্লাহ সে সম্পর্কে সম্যক দ্রষ্টা। সুরা বাকারা : ২৩৭

অর্থাৎ, সহবাস বা বৈধ নির্জনবাসের আগে তালাক দিলে অর্ধেক মহর দিতে হবে।

২. মহর নির্ধারণই না করে সহবাসের আগে তালাক

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

لَا جُنَاحَ عَلَیۡکُمۡ اِنۡ طَلَّقۡتُمُ النِّسَآءَ مَا لَمۡ تَمَسُّوۡہُنَّ اَوۡ تَفۡرِضُوۡا لَہُنَّ فَرِیۡضَۃً ۚۖ وَّمَتِّعُوۡہُنَّ ۚ عَلَی الۡمُوۡسِعِ قَدَرُہٗ وَعَلَی الۡمُقۡتِرِ قَدَرُہٗ ۚ مَتَاعًۢا بِالۡمَعۡرُوۡفِ ۚ حَقًّا عَلَی الۡمُحۡسِنِیۡنَ

তোমাদের কোন অপরাধ নেই যদি তোমরা স্ত্রীদেরকে তালাক দাও এমন অবস্থায় যে, তোমরা তাদেরকে স্পর্শ করনি কিংবা তাদের জন্য কোন মোহর নির্ধারণ করনি। আর উত্তমভাবে তাদেরকে ভোগ-উপকরণ দিয়ে দাও, ধনীর উপর তার সাধ্যানুসারে এবং সংকটাপন্নের উপর তার সাধ্যানুসারে। সুকর্মশীলদের উপর এটি আবশ্যক। সুরা বাকারাহ : ২৩৬

এ ক্ষেত্রে কোনো মহর দিতে হবে না। তবে সামর্থ্য অনুযায়ী কিছু উপহার/মাল দিতে হবে যাকে কুরআনে মাতাআন বিল-মা‘রূফ বা উত্তম পন্থায় উপকরণ, ভোগ্য বস্তু, উপহার প্রদান করা।

৩. সহবাসে পূর্বেই স্ত্রীকে তালাক দিলে কোন ইদ্দত নাই

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡۤا اِذَا نَکَحۡتُمُ الۡمُؤۡمِنٰتِ ثُمَّ طَلَّقۡتُمُوۡہُنَّ مِنۡ قَبۡلِ اَنۡ تَمَسُّوۡہُنَّ فَمَا لَکُمۡ عَلَیۡہِنَّ مِنۡ عِدَّۃٍ تَعۡتَدُّوۡنَہَا ۚ فَمَتِّعُوۡہُنَّ وَسَرِّحُوۡہُنَّ سَرَاحًا جَمِیۡلًا

হে মুমিনগণ, যখন তোমরা মুমিন নারীদেরকে বিবাহ করবে অতঃপর তাদেরকে স্পর্শ করার পূর্বেই* তালাক দিয়ে দেবে তবে তোমাদের জন্য তাদের কোন ইদ্দত নেই যা তোমরা গণনা করবে। সুতরাং তাদেরকে কিছু উপহার সামগ্রী প্রদান কর এবং সুন্দরভাবে তাদেরকে বিদায় দাও। সুরা আহযাব : ৪৯

অর্থাৎ, সহবাস বা বৈধ নির্জনবাস হওয়ার আগে তালাক দিলে স্ত্রীকে ইদ্দত পালন করতে হবে না।

ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। একজন পুরুষ তার স্ত্রীকে তালাক দিল এবং সহবাস করার আগেই তাকে পৃথক করে দিল। তখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন, ‘তাদের মধ্যে কোন ইদ্দত নেই, কেবল তাকে কিছু দিয়ে বিদায় করে দাও।’ সুনানে আবূ দাউদ : ২২১৮

এ তালাকের কিছু বিধান :

উল্লিখিত কুরআন ও হাদিসের ভিত্তিতে ইসলামিক ফিকহবিদগণ একমত হয়েছেন যে, সহবাস বা নির্জনবাসের আগে স্ত্রীকে তালাক দিলে তা এক তালাক-এ-বায়িন হিসেবে গণ্য হবে। তালাক দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক সম্পূর্ণভাবে ছিন্ন হয়ে যায়। যেহেতু এটি এক তালাক-এ-বাইন, তাই স্বামী ইদ্দতের মধ্যে স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিতে পারে না।

ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রুকানা ইবনু ইয়াযিদ (রাঃ) তার স্ত্রীকে এক তালাক দেন, যখন তিনি তার সঙ্গে সহবাস করেননি। তখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তাকে বলেন, ‘তুমি তাকে ফিরিয়ে নাও, যদি তুমি চাও।’ সুনানে ইবনু মাজাহ : ২০৬২

যদি তারা আবার বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে চায়, তাহলে নতুন করে মোহর ও শর্ত সাপেক্ষে বিবাহ করতে হবে। এর জন্য স্ত্রীর অন্য কোনো পুরুষকে বিবাহ করা এবং তার সাথে সহবাস করার কোনো প্রয়োজন নেই।

নোট : সহবাস না হলেও, বৈধ নির্জনবাস অবস্থান করে তালে স্ত্রী পূর্ণ মহরের অধিকারী হবে। তালাক দিলে ইদ্দত পালন করতে হবে। কারণ নির্জনবাসের মাধ্যমে সহবাসের সম্ভাবনা নিশ্চিত হয়ে যায়।

মাসিক হয়নি কিংবা মাসিক বন্ধ হয়ে গেছে এমন স্ত্রীকে তালাক প্রদান

মাসিক হয়নি বা মাসিক বন্ধ হয়ে গেছে এমন স্ত্রীকে তালাক দেওয়া সংক্রান্ত ইসলামি বিধান কুরআন ও হাদিসের সুস্পষ্ট নির্দেশনা দ্বারা নির্ধারিত। এই বিধানটি মূলত তালাকের সময় নির্ধারণ এবং ইদ্দত গণনার সঙ্গে সম্পর্কিত।

আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে বলেছেন:

وَالّٰٓیِٴۡ یَئِسۡنَ مِنَ الۡمَحِیۡضِ مِنۡ نِّسَآئِکُمۡ اِنِ ارۡتَبۡتُمۡ فَعِدَّتُہُنَّ ثَلٰثَۃُ اَشۡہُرٍ ۙ وَّالّٰٓیِٴۡ لَمۡ یَحِضۡنَ

তোমাদের স্ত্রীদের মধ্যে যারা ঋতুবর্তী হওয়ার কাল অতিক্রম করে গেছে, তাদের ইদ্দত সম্পর্কে তোমরা যদি সংশয়ে থাক এবং যারা এখনও ঋতুর বয়সে পৌঁছেনি তাদের ইদ্দতকালও হবে তিন মাস।

এই আয়াত থেকে দুটি প্রধান বিধান পাওয়া যায়:

১. মাসিক বন্ধ হয়ে গেছে: যেসব নারীর বয়স বেশি হওয়ার কারণে মাসিক বন্ধ হয়ে গেছে, তাদের ইদ্দতকাল হলো তিন মাস। এই তিন মাস চন্দ্র মাস হিসাবে গণনা করা হবে।

২. মাসিক হয়নি: যেসব নারীর বয়স কম হওয়ার কারণে এখনো মাসিক শুরু হয়নি, তাদেরও ইদ্দতকাল হলো তিন মাস।

এ তালাকের শরীয়তি বিধান

একজন স্বামী যদি তার এমন স্ত্রীকে তালাক দেয়, যার মাসিক বন্ধ হয়ে গেছে, তবে তার ইদ্দত হবে তিন চন্দ্র মাস। এই তিন মাস পর তালাক কার্যকর হবে এবং স্ত্রী পুনর্বিবাহের জন্য যোগ্য হবে। যেসব কিশোরীর এখনও মাসিক শুরু হয়নি, তাদেরও তালাকের ইদ্দতকাল তিন মাস।

তালাক দেওয়ার সঠিক পদ্ধতি:

মাসিক বন্ধ হয়ে যাওয়া বা মাসিক শুরু না হওয়া স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার জন্য নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা নেই। যেহেতু তাদের ক্ষেত্রে মাসিকের চক্র নেই, তাই যে কোনো সময় তালাক দেওয়া যেতে পারে। তবে, উত্তম হলো একবারে একটি তালাক দেওয়া এবং ইদ্দত শেষ হওয়ার জন্য অপেক্ষা করা। এই এক তালাক রজ’ঈ তালাক (ফেরতযোগ্য তালাক) হিসেবে গণ্য হবে। যদি স্বামী ইদ্দতের মধ্যে স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেয়, তাহলে তাদের সম্পর্ক বহাল থাকবে। ইদ্দত শেষ হলে যদি ফিরিয়ে না নেয়, তাহলে সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যাবে, তবে নতুন করে বিবাহের মাধ্যমে আবার একসাথে থাকার সুযোগ থাকবে।

এই বিধানগুলোর মূল উদ্দেশ্য হলো, তালাকের মতো একটি স্পর্শকাতর বিষয়ে যেন কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা বা ভুল বোঝাবুঝি না হয়। আল্লাহ তাআলা প্রতিটি বিধানের মাধ্যমে মানব জীবনের সব দিক বিবেচনা করেছেন, যাতে ন্যায় ও সুবিচার প্রতিষ্ঠিত থাকে।

গর্ভবতী স্ত্রীর তালাক:

ইসলামে তালাক একটি স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তালাক দেওয়ার ক্ষেত্রে কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম-কানুন ও শর্ত রয়েছে, যা কুরআন ও হাদিসে সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়েছে।

১. গর্ভবতী স্ত্রীর তালাকের বিধান:

ইসলামী শরীয়ত অনুযায়ী, একজন পুরুষ তার গর্ভবতী স্ত্রীকে তালাক দিতে পারে। এটি বৈধ এবং শরীয়তসম্মত। তালাক দেওয়ার ক্ষেত্রে গর্ভকালীন সময়ের কোনো বাধা নেই।

যুবাইর ইবনুল আওয়াম (রাঃ) থেকে বর্ণিত। উম্মু কুলসুম বিনতে উকবা (রাঃ) ছিলেন তার স্ত্রী। তিনি তার গর্ভাবস্থায় যুবাইর (রাঃ)-কে বলেন, আমাকে এক তালাক দিয়ে সন্তুষ্ট করুন। তিনি তাকে এক তালাক দিলেন, অতঃপর সালাত পড়তে চলে গেলেন। তিনি ফিরে এসে দেখেন যে, তার স্ত্রী একটি সন্তান প্রসব করেছে। যুবাইর (রাঃ) বললেন, সে কেন আমাকে প্রতারিত করলো! আল্লাহ্ যেন তাকেও প্রতারিত করেন। এরপর তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট উপস্থিত হলে তিনি বলেন : আল্লাহর কিতাবে বর্ণিত তার ইদ্দাত পূর্ণ হয়ে গেছে। তাকে বিবাহের প্রস্তাব দাও। সুনানে ইবনে মাজাহ : ২০২৬,  ইরওয়াহ : ২১১৭

ইবনু উমার (রাঃ) হতে বর্ণিতঅ তিনি তার স্ত্রীকে হায়য অবস্থায় তালাক দিয়েছিলেন। উমার (রাঃ) বিষয়টি নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর নিকট উত্থাপন করলে তিনি বলেনঃ তাকে বলো, সে যেন তার স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেয়, এরপর সে চাইলে তাকে তুহর অথবা গর্ভবতী অবস্থায় তালাক দেয়। সুনানে ইবনে মাজাহ : ২০২৩, সুনানে তিরমিযী : ১১৭৫, ১১৭৬, সুনানে নাসায়ী : ৩৩৮৯, সুনানে আবূ দাউদ : ২১৭৯, ২১৮১,

এক্ষেত্রে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিবেচনায় রাখতে হয়:

ক. ইদ্দত (অপেক্ষাকাল) গণনা :

একজন গর্ভবতী স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার পর তার ইদ্দতকাল হলো সন্তান প্রসব করা পর্যন্ত। অর্থাৎ, যখনই সে সন্তান প্রসব করবে, তখনই তার ইদ্দতকাল শেষ হয়ে যাবে। এটি আল্লাহ তা’আলা পবিত্র কুরআনে সুস্পষ্টভাবে বলে দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে বলেছেন:

 ؕ وَاُولَاتُ الۡاَحۡمَالِ اَجَلُہُنَّ اَنۡ یَّضَعۡنَ حَمۡلَہُنَّ ؕ وَمَنۡ یَّتَّقِ اللّٰہَ یَجۡعَلۡ لَّہٗ مِنۡ اَمۡرِہٖ یُسۡرًا

 আর গর্ভধারিনীদের ইদ্দতকাল সন্তান প্রসব পর্যন্ত। যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য তার কাজকে সহজ করে দেন। সূরা তালাক : ৪

এই আয়াতে আল্লাহ তা’আলা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে, গর্ভবতী মহিলার তালাকের পর ইদ্দত হলো সন্তান প্রসব করা পর্যন্ত। সন্তান প্রসবের পরই সে ইদ্দত থেকে মুক্ত হবে এবং চাইলে অন্য কোথাও বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারবে।

আবূস সানাবিল (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আসলাম গোত্রের হারিসের কন্যা সুবাইআ তার স্বামীর মৃত্যুর বিশাধিক দিন পর একটি সন্তান প্রসব করেন। তিনি নিফাস (সন্তান প্রসবজনিত ঋতু) হওয়ার পর নতুন পরিচ্ছদ পরতে লাগলেন (অর্থাৎ সাজগোজ করতে লাগলেন)। এতে তার প্রতি দোষারোপ হতে থাকলে বিষয়টি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে অবহিত হয়। তিনি বলেনঃ সে তা করতে পারে, কারণ তার ইদ্দাতকাল পূর্ণ হয়েছে। সুনানে ইবনে মাজাহ : ২০২৭, ২০২৮, ২০২৯, সুনানে তিরমিযী : ১১৯৩, আহমাদ : ১৮২৩৮, ১৮২৩৯, দারেমী : ২২৮১

খ. গর্ভবতী স্ত্রী ও সন্তানের ভরণপোষণ :

তালাকের পর ওই সন্তানের ভরণপোষণ এবং লালন-পালনের দায়িত্ব পিতাকেই নিতে হবে। যদি স্ত্রী অন্য কোথাও বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ না হয় এবং শিশুটির পরিচর্যা করে, তাহলে ভরণপোষণের দায়িত্বও পিতার উপরই থাকবে।

আল্লাহ তাআলা বলেন-

اَسۡکِنُوۡہُنَّ مِنۡ حَیۡثُ سَکَنۡتُمۡ مِّنۡ وُّجۡدِکُمۡ وَلَا تُضَآرُّوۡہُنَّ لِتُضَیِّقُوۡا عَلَیۡہِنَّ ؕ  وَاِنۡ کُنَّ اُولَاتِ حَمۡلٍ فَاَنۡفِقُوۡا عَلَیۡہِنَّ حَتّٰی یَضَعۡنَ حَمۡلَہُنَّ ۚ  فَاِنۡ اَرۡضَعۡنَ لَکُمۡ فَاٰتُوۡہُنَّ اُجُوۡرَہُنَّ ۚ  وَاۡتَمِرُوۡا بَیۡنَکُمۡ بِمَعۡرُوۡفٍ ۚ  وَاِنۡ تَعَاسَرۡتُمۡ فَسَتُرۡضِعُ لَہٗۤ اُخۡرٰی ؕ

তোমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী যেখানে তোমরা বসবাস কর সেখানে তাদেরকেও বাস করতে দাও, তাদেরকে সঙ্কটে ফেলার জন্য কষ্ট দিয়ো না। আর তারা গর্ভবতী হলে তাদের সন্তান প্রসব করা পর্যন্ত তাদের জন্য তোমরা ব্যয় কর; আর তারা তোমাদের জন্য সন্তানকে দুধ পান করালে তাদের পাওনা তাদেরকে দিয়ে দাও এবং (সন্তানের কল্যাণের জন্য) সংগতভাবে তোমাদের মাঝে পরস্পর পরামর্শ কর। আর যদি তোমরা পরস্পর কঠোর হও তবে পিতার পক্ষে অন্য কোন নারী দুধপান করাবে। সুরা তালাক : ০৬

৩. ইসলামে তালাকের কিছু গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম:

ইসলামে তালাক একটি ঘৃণিত কাজ হলেও প্রয়োজনের সময় এর অনুমতি রয়েছে। তবে তালাক দেওয়ার ক্ষেত্রে কিছু সুনির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলতে হয়:

স্ত্রীকে এক তালাক দিয়ে তালাকের প্রক্রিয়া শুরু করা। এক তালাক দেওয়ার পর যদি স্বামী-স্ত্রী আবার একত্রে থাকতে চান, তাহলে ইদ্দতকালীন সময়ে তারা আবার একত্রে থাকতে পারবেন। এক্ষেত্রে নতুন করে বিবাহ করার প্রয়োজন নেই। তালাক দেওয়ার পর ইদ্দতকাল হলো তিন মাসিকের সমপরিমাণ সময় (যদি স্ত্রী গর্ভবতী না হয়)। গর্ভবতীর ক্ষেত্রে ইদ্দতকাল হলো সন্তান প্রসব করা পর্যন্ত। ইদ্দতকালীন সময়ে স্ত্রীকে ঘর থেকে বের করে দেওয়া উচিত নয়, বরং তাকে স্বামীর ঘরেই থাকতে দেওয়া উচিত।

গর্ভবতী স্ত্রীকে তালাক দেওয়া ইসলামের দৃষ্টিতে জায়েয। তবে, একজন মুসলিমের জন্য তালাক একটি অত্যন্ত অপছন্দনীয় কাজ।

ইবনু ‘উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ মহান আল্লাহর নিকট সবচেয়ে ঘৃণিত হালাল হচ্ছে তালাক। সুনানে আবু দাউদ : ২১৭৮, সুনানে ইবনু মাজাহ : ২০১৮, ইরওয়া : ২০৪০, মিশকাত : ৩২৮০

স্ত্রী গর্ভবতী হ’লেও তাকে তালাক দেয়া বৈধ। তাকেও সুন্নাত মোতাবেক এক তালাক দিতে হবে। গর্ভবতী মহিলার ইদ্দত সন্তান প্রসবকাল পর্যন্ত। প্রসবের সাথে সাথেই তার ইদ্দত শেষ হয়ে যাবে। এবার সে নতুন করে অন্যত্র বিয়ে করতে পারবে। আর নিয়ম মাফিক এক কিংবা দুই তালাক দেওয়া থাকলে প্রথম স্বামীকেও বিয়ে করতে পারবে।

ঋতুবতী স্ত্রীর তালাক :

ইসলামে ঋতুবতী স্ত্রীকে তালাক দেওয়া হারাম এবং শরীয়তসম্মত নয়। এ ধরনের তালাক শরীয়তের বিধান অনুসারে ‘তালাক-ই-বিদআত’ হিসেবে গণ্য হয়। এই বিধানের মূল উদ্দেশ্য হলো, তালাকের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নারীকে তার স্বাভাবিক ও পবিত্র অবস্থায় থাকা নিশ্চিত করা, যাতে আবেগপ্রবণ হয়ে কোনো ভুল সিদ্ধান্ত না নেওয়া হয়।

আল্লাত তায়াল বলেন-

یٰۤاَیُّہَا النَّبِیُّ اِذَا طَلَّقۡتُمُ النِّسَآءَ فَطَلِّقُوۡہُنَّ لِعِدَّتِہِنَّ وَاَحۡصُوا الۡعِدَّۃَ ۚ وَاتَّقُوا اللّٰہَ رَبَّکُمۡ ۚ

হে নবী, (বল), তোমরা যখন স্ত্রীদেরকে তালাক দেবে, তখন তাদের ইদ্দত অনুসারে তাদের তালাক দাও এবং ‘ইদ্দত হিসাব করে রাখবে এবং তোমাদের রব আল্লাহকে ভয় কর। সুরা তালাক : ০১

এই আয়াত অনুসারে, তালাক এমন সময়ে দিতে হবে যখন ইদ্দত গণনা সম্ভব হয়। মাসিকের সময় যেহেতু ইদ্দত গণনা শুরু করা যায় না, তাই এ সময় তালাক দেওয়া অনুচিত।

নাফি (রহ.) হতে বর্ণিত যে, ইবনু ’উমার (রাঃ) তাঁর স্ত্রীকে ঋতুমতী অবস্থায় এক তালাক দেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে আদেশ দিলেন, তিনি যেন তার স্ত্রীকে ফিরিয়ে আনেন এবং মহিলা পবিত্র হয়ে আবার ঋতুমতী হয়ে পরবর্তী পবিত্রা অবস্থা আসা পর্যন্ত তাকে নিজের কাছে রাখেন। পবিত্র অবস্থায় যদি তাকে তালাক দিতে চায় তবে সঙ্গমের পূর্বে তালাক দিতে হবে। এটাই ইদ্দাত, যে সময় স্ত্রীদেরকে তালাক দেয়ার জন্য আল্লাহ আদেশ দিয়েছেন। ’আবদুল্লাহকে এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি তাদের বলেনঃ তুমি যদি তাকে তিন তালাক দিয়ে দাও, তবে স্ত্রীলোকটি অন্য স্বামী গ্রহণ না করা পর্যন্ত তোমার জন্য হারাম হয়ে যাবে। অন্য বর্ণনায় ইবন ’উমার (রাঃ) বলতেন, ’তুমি যদি এক বা দু’ তালাক দিতে’, কারণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে এরকমই নির্দেশ দিয়েছেন।

সহিহ বুখারি : ৫৩৩২, ৬০৩৩, ৭১৬০, সহহি মুসলিম : ১৪৭১, সুনানে ইবনে মাজাহ : ২০১৯, সুনানে তিরমিযী : ১১৭৫, ১১৭৬, সুনানে আবূ দাউদ : ২১৭৯, ২১৮১, ২১৮২, ২১৮৪, ২১৮৫

এই হাদিস থেকে স্পষ্ট হয় যে, ঋতু অবস্থায় তালাক দেওয়া ইসলামের বিধানের পরিপন্থী। নবী (সা.) এর নির্দেশে ইবনে ওমর (রা.) তার স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিয়েছিলেন এবং পবিত্র অবস্থায় তালাক দেওয়ার জন্য অপেক্ষা করেছিলেন।

ঋতু অবস্থায় তালাকের বিধান:

ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায় ঋতু অবস্থায় বা নেফাস অবস্থায় তালাক দেওয়াকে বিদআতি তালাক বলা হয।  যদিও বেশিরভাগ ইমামের মতে এ ধরনের তালাক কার্যকর হয়ে যায়, তবে এটি একটি গুনাহের কাজ এবং সুন্নাহর পরিপন্থী। যদি কেউ ভুল করে ঋতু অবস্থায় স্ত্রীকে তালাক দিয়ে ফেলে, তাহলে তার জন্য সুন্নাহ হলো স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেওয়া এবং পবিত্র হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা। স্ত্রী পবিত্র হলে, যদি তালাক দেওয়ার ইচ্ছা থাকে, তাহলে সহবাসের পূর্বে তাকে তালাক দেওয়া যাবে।

সঠিক পদ্ধতিতে তালাক দেওয়ার নিয়ম:

ঋতু অবস্থায় স্ত্রীকে তালাক দেওয়া হারাম এবং গুনাহের কাজ। এটি শয়তানের কুমন্ত্রণা এবং আবেগের বশে নেওয়া একটি ভুল সিদ্ধান্ত। ইসলামে তালাকের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর বিষয়কে সঠিক নিয়ম মেনে সম্পন্ন করার জন্য সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। মুসলমানদের উচিত, এই বিধানগুলো অনুসরণ করা এবং যেকোনো সমস্যা সমাধানের জন্য প্রথমেই তালাকের মতো চূড়ান্ত পদক্ষেপ না নিয়ে বরং ধৈর্য, সমঝোতা এবং পারস্পরিক সম্মানের সাথে সমাধানের চেষ্টা করা।

তালাক প্রদানের সময় সাক্ষী বাখার বিধান

ইসলামি শরীয়তের বিধান অনুযায়ী, স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার জন্য সাক্ষী রাখা আবশ্যক নয়। অর্থাৎ, সাক্ষী না থাকলেও তালাক কার্যকর হয়ে যায়। তবে, কিছু পরিস্থিতিতে সাক্ষী রাখা সুন্নাহ। যদি ভবিষ্যতে তালাক কার্যকর হয়েছে কিনা, তা নিয়ে কোনো বিতর্ক সৃষ্টি হয়, সেক্ষেত্রে সাক্ষী থাকলে তা প্রমাণ করা সহজ হয়।

সাক্ষী উপস্থিত থাকলে স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে তালাকের শর্তাবলী বা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করতে সুবিধা হয়। সাক্ষী থাকলে তালাকের পর স্বামী বা স্ত্রীর পক্ষ থেকে কোনো মিথ্যা অভিযোগ আসার সম্ভাবনা কমে যায়।

আল্লাত তায়ালা বলেন-

فَاِذَا بَلَغۡنَ اَجَلَہُنَّ فَاَمۡسِکُوۡہُنَّ بِمَعۡرُوۡفٍ اَوۡ فَارِقُوۡہُنَّ بِمَعۡرُوۡفٍ وَّاَشۡہِدُوۡا ذَوَیۡ عَدۡلٍ مِّنۡکُمۡ وَاَقِیۡمُوا الشَّہَادَۃَ لِلّٰہِ ؕ 

অতঃপর যখন তারা তাদের ইদ্দতের শেষ সীমায় পৌঁছবে, তখন তোমরা তাদের ন্যায়ানুগ প‎ন্থায় রেখে দেবে অথবা ন্যায়ানুগ প‎ন্থায় তাদের পরিত্যাগ করবে এবং তোমাদের মধ্য থেকে ন্যায়পরায়ণ দুইজনকে সাক্ষী বানাবে। আর আল্লাহর জন্য সঠিক সাক্ষ্য দেবে। সুরা তালাক : ২

এ আয়াতে তালাকের ক্ষেত্রে সাক্ষী রাখার কথা বলা হয়েছে। অধিকাংশ ইসলামিক স্কলার এই আয়াতকে বাধ্যতামূলক বিধান হিসেবে না দেখে বরং একটি উত্তম পরামর্শ হিসেবেই ব্যাখ্যা করেছেন। তালাকের ইসলামী শরীয়তে তালাকের মূল উদ্দেশ্য হলো স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসার একটি বৈধ পন্থা। এই সম্পর্কটি মূলত পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সম্মতির ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে, যেখানে সাক্ষী রাখা বাধ্যতামূলক নয়।

ইমরান ইবনু হুসাইন (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তাকে এক ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলো যে তার স্ত্রীকে তালাক দেয়ার পর তার সাথে সহবাস করেছে, কিন্তু তাকে তালাক দেয়া এবং ফিরিয়ে নেয়ার বিষয়ে কোন সাক্ষী রাখেনি। ইমরান (রাঃ) বলেন, তুমি সুন্নাত নিয়মের বহির্ভূত তালাক দিয়েছো এবং সুন্নাত নিয়ম বহির্ভূতভাবে ফিরিয়ে নিয়েছো। তুমি তাকে তালাক দেয়া ও ফিরিয়ে নেয়ার বিষয়ে সাক্ষী রাখো। সুনানে ইবনে মাজাহ : ২০২৫, সুনানে আবূ দাউদ : ২১৮৬, ইরওয়াহ : ২০৭৮

ফকীহ বা ইসলামী আইনবিদগণের মধ্যে এই বিষয়ে প্রায় ঐক্যমত্য (ইজমা) রয়েছে যে, স্বামী যদি নির্জনে বা সাক্ষী ছাড়াই তালাক দেন, তাহলেও তা কার্যকর হবে। স্ত্রীকে তালাকের কথা জানানো বা তার উপস্থিত থাকাটাও তালাকের জন্য শর্ত নয় বরং বড় জোল সুন্নাহ। অনেকে ঐচ্ছিক বা মুস্তাহাব বলেছেন।

সাক্ষী রাখা উত্তম :

তালাকের পর যদি কোনো বিতর্ক সৃষ্টি হয়, যেমন ইদ্দত পালন, মোহরানা, অথবা পুনরায় বিয়ে করার ক্ষেত্রে, তখন সাক্ষী থাকলে তা প্রমাণ করা সহজ হয়। এজন্য সাক্ষী রাখা মুস্তাহাব (উত্তম) বা পরামর্শ হিসেবে গণ্য হয়, যা উভয় পক্ষকে অহেতুক অভিযোগ এবং জটিলতা থেকে রক্ষা করে।

আয়াতে শুধু সাক্ষী রাখার কথা বলা হয়নি, বরং ‘আল্লাহর জন্য সঠিক সাক্ষ্য দেবে’—এই বাক্যটিও যুক্ত করা হয়েছে। এর দ্বারা বোঝা যায়, সাক্ষ্য মূলত কোনো বিবাদ বা প্রয়োজনে সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য রাখা হয়। সুতরাং, তালাকের জন্য সাক্ষী রাখা আবশ্যকীয় শর্ত না হলেও, ইসলামের সৌন্দর্য ও নৈতিকতার দিক থেকে এটি একটি পরামর্শ এবং উত্তম পদ্ধতি।

মুখে কিছু না বলে শুধু মনে মনে তালাক দিলে তালাক কার্যকর হবে না

আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

إِنَّ اللهَ تَجَاوَزَ لِي عَنْ أُمَّتِي مَا وَسْوَسَتْ بِهِ صُدُورُهَا مَا لَمْ تَعْمَلْ أَوْ تَكَلَّمْ

নিশ্চয় আল্লাহ্ আমার উম্মাতের মনের মন্দ কল্পনা, যতক্ষণ না সে তা কার্যকর করে অথবা মুখে উচ্চারণ করে এবং তার উপর বলপ্রয়োগে কৃত কর্ম উপেক্ষা করেছেন। সহিহ বুখারি : ২৫২৮, ৬৬৬৪, ৫২৬৯, সহিহ মুসলিম :  ১২৭, সুনানে ইবনে মাজাহ : ২০৪৪,

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ্ আমার উম্মাতের মনে মনে বলা কথা উপেক্ষা (ক্ষমা) করেছেন, যাবত না সে তদনুযায়ী কাজ করে অথবা মুখে উচ্চারণ করে। সুনান ইবনে মাজাহ : ২০৪০, সুনানে তিরমিযী : ১১৮৩, সুনানে নাসায়ী : ৩৪৩৩, ৩৪৩৪, ৩৪৩৫, সুনানে আবূ দাউদ : ২২০৯, আহমাদ : ৮৮৬৪, ৯২১৪, ৯৭৮৬, ৯৮৭৮, ৯৯৯০,

এই হাদীসের আলোকে, মনের মধ্যে কোনো কিছু চিন্তা করা, এমনকি তা যদি তালাকের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও হয়, যতক্ষণ পর্যন্ত তা মুখে উচ্চারণ করা না হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত তা কার্যকর হয় না। ইসলামী শরীয়তের মূলনীতি হলো, কোনো কাজ বা সিদ্ধান্ত বাস্তবে কার্যকর হওয়ার জন্য তার বাহ্যিক প্রকাশ (যেমন মুখে বলা বা কাজ করা) জরুরি।

তালাক ও এর শর্ত

ইসলামী আইন অনুযায়ী, তালাক কার্যকর হওয়ার জন্য তিনটি মৌলিক শর্ত রয়েছে:

১. স্পষ্ট ঘোষণা বা মুখে বলা :

তালাক অবশ্যই স্পষ্টভাবে মুখে উচ্চারণ করতে হবে। শুধু মনে মনে তালাক দেওয়ার ইচ্ছা পোষণ করলে তা তালাক হিসেবে গণ্য হবে না।

২. কাজের মাধ্যমে ইঙ্গিত :

অনেক ক্ষেত্রে, যদি কোনো ব্যক্তি স্পষ্ট করে মুখে তালাক না দেন, কিন্তু এমন কোনো কাজ করেন যা তালাকের ইঙ্গিত দেয় (যেমন তালাকনামা লেখা), তাহলে তা তালাক হিসেবে গণ্য হতে পারে। তবে, শুধু মনে মনে চিন্তা করলে তা এই শর্তের আওতায় আসে না।

৩. সাক্ষীর উপস্থিতি :

যদিও সাক্ষী রাখা বাধ্যতামূলক নয়, তবে যদি কোনো বিতর্ক সৃষ্টি হয়, সেক্ষেত্রে সাক্ষী থাকলে তা প্রমাণ করা সহজ হয়।

উপরোক্ত হাদীস এবং ইসলামী শরীয়তের মূলনীতি অনুসারে, শুধু মনে মনে তালাকের চিন্তা করলে বা ইচ্ছা পোষণ করলে তালাক হবে না। তালাক কার্যকর হওয়ার জন্য তা মুখে উচ্চারণ করা আবশ্যক।

বিবাহের পূর্বে কোন তালাক নেই

আমর ইবনু শু’আইব (রহ.) থেকে পর্যায়ক্রমে তার পিতা ও দাদার সূত্রে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তালাক দেয়ার অধিকার জন্মানোর আগে প্রদত্ত তালাক কার্যকর হয় না। সুনানে ইবনে মাজাহ : ২০৪৭, সুনানে তিরমিযী : ১১৮১, সুনানে আবূ দাউদ : ২১৯০, ইরওয়াহ : ১৭৫১, ২০৬৯

মিসওয়ার বিন মাখ্‌মারাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিন বলেন, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, বিবাহের আগে তালাক নাই এবং মালিকানা লাভের আগে দাসমুক্তি নাই। সুনানে ইবনে মাজাহ : ২০৪৮, বায়হাকী : ৭/৩১৪, সহীহ ইরওয়াহ : ৭/১৫২

আলী বিন আবূ তালিব (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, বিবাহের পূর্বে তালাক নাই। সুনানে ইবনে মাজাহ : ২০৪৯,

ইসলামে তালাক হলো একটি আনুষ্ঠানিক ও আইনি প্রক্রিয়া, যা শুধুমাত্র স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। এই হাদীসটি এই ধারণাকেই দৃঢ়ভাবে সমর্থন করে। এর অর্থ হলো, যদি কোনো ব্যক্তি কোনো নারীকে বিবাহের আগে তালাক দেওয়ার কথা বলেন, অথবা কোনো চুক্তির অংশ হিসেবে তালাক দেন, তাহলে সেই তালাক কার্যকর হবে না। কারণ, তালাক সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করার জন্য দেওয়া হয়, এবং সম্পর্ক না থাকলে তা বিচ্ছিন্ন করার প্রশ্নই ওঠে না।

এই হাদীসের একটি ব্যবহারিক উদাহরণ হলো, যদি কেউ কোনো নারীকে বিবাহের প্রস্তাব দেওয়ার সময় বলেন, “যদি তুমি আমাকে বিয়ে করো, তাহলে তোমাকে তালাক দিলাম,” তবে এই ধরনের কথা তালাক হিসেবে গণ্য হবে না।

ইমাম তিরমিযী (রহ.) এর মন্তব্য: সুনানে তিরমিযীতে ইমাম তিরমিযী (রহ.) এই হাদীসের উপর মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন যে, অধিকাংশ আলেম এই হাদীসের উপর আমল করেন। তারা মনে করেন, “তালাক তখনই কার্যকর হবে, যখন তা বিয়ের পর দেওয়া হবে।”

ইমাম শাফেঈ (রহ.) এর মত: ইমাম শাফেঈ (রহ.) বলেন, “তালাকের মালিকানা বিবাহের মাধ্যমে অর্জিত হয়, তাই বিবাহের আগে তালাক কার্যকর হয় না।”

এই সমস্ত দলীল এই বিষয়ে ইসলামী পণ্ডিতদের ঐক্যমত্যকে প্রমাণ করে। এটি একটি অত্যন্ত যুক্তিসঙ্গত নীতি। কারণ, তালাক হলো বিবাহিত জীবনের একটি অংশ, যা শুধুমাত্র বিবাহ বন্ধন বিদ্যমান থাকলেই প্রাসঙ্গিক হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *