দাম্পত্য জীবনের বিধান ও যোগ্যতা

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

দাম্পত্য জীবন হলো একজন পুরুষ এবং একজন নারীর মধ্যে একটি পবিত্র এবং আইনসম্মত বন্ধন, যা ইসলামে বিবাহ (নিকাহ) নামে পরিচিত। এই সম্পর্ক কেবল একটি চুক্তি নয়, বরং এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে এক মহান নেয়ামত এবং পারস্পরিক ভালোবাসা, শান্তি ও নিরাপত্তার উৎস। ইসলামে দাম্পত্য জীবনকে শুধুমাত্র সামাজিক সম্পর্ক বা শারীরিক চাহিদা পূরণের মাধ্যম হিসেবে দেখা হয়নি; বরং এটিকে একটি ইবাদত, রহমত ও আধ্যাত্মিক প্রশান্তির উৎস হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। কুরআন মাজিদে আল্লাহ তা’আলা দাম্পত্য জীবনের মূল উদ্দেশ্য ও সৌন্দর্য তুলে ধরেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَمِنۡ اٰیٰتِہٖۤ اَنۡ خَلَقَ لَکُمۡ مِّنۡ اَنۡفُسِکُمۡ اَزۡوَاجًا لِّتَسۡکُنُوۡۤا اِلَیۡہَا وَجَعَلَ بَیۡنَکُمۡ مَّوَدَّۃً وَّرَحۡمَۃً ؕ اِنَّ فِیۡ ذٰلِکَ لَاٰیٰتٍ لِّقَوۡمٍ یَّتَفَکَّرُوۡنَ

আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের থেকেই স্ত্রীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি পাও। আর তিনি তোমাদের মধ্যে ভালবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। নিশ্চয় এর মধ্যে নিদর্শনাবলী রয়েছে সে কওমের জন্য, যারা চিন্তা করে। সুরা রূম : ২১

এই আয়াত থেকে বোঝা যায় যে, দাম্পানত্য জীবনের প্রধান লক্ষ্য হলো প্রশান্তি ও শান্তি অর্জন।  স্বামী-স্ত্রী একে অপরের জন্য মানসিক আশ্রয়স্থল এবং ভরসার জায়গা। আল্লাহ এই সম্পর্কের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া এমনভাবে স্থাপন করেছেন, যা দুনিয়ার অন্য কোনো সম্পর্কে পাওয়া যায় না।

বিবাহের বিধান

ইসলামে বিবাহের হুকুম (আহকাম) ভিন্ন ভিন্ন অবস্থার কারণে পরিবর্তিত হয়। আলেমগণ কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। নিচে সংক্ষেপে প্রতিটি হুকুম, তার প্রমাণ ও ব্যাখ্যা তুলে ধরছি—

১. বিবাহ করা ওয়াজিব

যখন কোনো ব্যক্তি জৈবিক চাহিদা দমন করতে অক্ষম হয় এবং সে আশঙ্কা করে যে ব্যভিচার (যিনা) করে ফেলবে, তখন তার জন্য বিবাহ ওয়াজিব।

আল্লাহ বলেন—

وَاَنۡکِحُوا الۡاَیَامٰی مِنۡکُمۡ وَالصّٰلِحِیۡنَ مِنۡ عِبَادِکُمۡ وَاِمَآئِکُمۡ ؕ اِنۡ یَّکُوۡنُوۡا فُقَرَآءَ یُغۡنِہِمُ اللّٰہُ مِنۡ فَضۡلِہٖ ؕ وَاللّٰہُ وَاسِعٌ عَلِیۡمٌ

আর তোমরা তোমাদের মধ্যকার অবিবাহিত নারী-পুরুষ ও সৎকর্মশীল দাস দাসীদের বিবাহ দাও। তারা অভাবী হলে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে অভাবমুক্ত করে দেবেন। আল্লাহ প্রাচুর্যময় ও মহাজ্ঞানী। সূরা আন-নূর ২৪:৩২

আয়াতে আল্লাহ অবিবাহিত নারী-পুরুষ এবং সৎ দাস-দাসীদের বিবাহ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। এটি প্রমাণ করে যে ইসলামে বিবাহকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত ও সামাজিক দায়িত্ব হিসেবে দেখা হয়। বিবাহ শুধু জৈবিক চাহিদা পূরণের মাধ্যম নয়, বরং এটি একটি পবিত্র বন্ধন যা মুসলিম সমাজে নৈতিকতা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখে। কাজেউ যারা জৈবিক চাহিদা দমন করতে অক্ষম তাদের বিবাহ কার ওয়াজিব বলা হয়েছে।

আল্লাহ বলেন-

وَلۡیَسۡتَعۡفِفِ الَّذِیۡنَ لَا یَجِدُوۡنَ نِکَاحًا حَتّٰی یُغۡنِیَہُمُ اللّٰہُ مِنۡ فَضۡلِہٖ ؕ

আর যাদের বিবাহের সামর্থ্য নেই আল্লাহ তাদেরকে নিজ অনুগ্রহে অভাবমুক্ত না করা পর্যন্ত তারা যেন সংযম অবলম্বন করে। সুরা নূর : ৩৩

আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, “তারা যেন সংযম অবলম্বন করে।” এখানে সংযম বলতে শুধুমাত্র শারীরিক সম্পর্ক থেকে বিরত থাকাই বোঝানো হয়নি, বরং এর দ্বারা দৃষ্টি নিয়ন্ত্রণ, চারিত্রিক পবিত্রতা এবং মনকে খারাপ চিন্তা থেকে দূরে রাখাও বোঝানো হয়েছে। এটি একটি মুসলিমের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। কারণ, ইসলামে কেবল বাহ্যিক আমলই নয়, বরং মনের পবিত্রতাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। যাদের আর্থিক সামর্থ্য নেই, তাদের জন্য এই সংযম অবলম্বন করা ফরজ, যাতে তারা কোনোভাবেই যিনা বা ব্যভিচারের মতো গুরুতর পাপে জড়িয়ে না পড়ে।

আলকামাহ (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ‘আবদুল্লাহ (রাঃ)-এর সঙ্গে চলতে ছিলাম, তখন তিনি বললেন, আমরা আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সাথে ছিলাম, তিনি বললেনঃ যে ব্যক্তির সামর্থ্য আছে, সে যেন বিয়ে করে নেয়। কেননা বিয়ে চোখকে অবনত রাখে এবং লজ্জাস্থানকে সংযত করে। আর যার সামর্থ্য নেই, সে যেন সওম পালন করে। সওম তার প্রবৃত্তিকে দমন করে। সহিহ বুখারি : ১৯০৫, ৫০৬৫, ৫০৬৬,  সহিহ মুসলিম : ১৪০০, সুনানে নাসায়ী ৩২১০, সুনানে তিরমিযী : ১০৮১, আহমাদ : ৪০২৩, ইরওয়া : ১৭৮১, সহীহ আল জামি : ৭৯৭৫।

ব্যাখ্যা : এখানে নবী ﷺ স্পষ্ট করেছেন, যদি দৃষ্টি ও লজ্জাস্থান সংরক্ষণ করা না যায় তবে বিয়ে করা অপরিহার্য।

২. বিবাহ করা সুন্নাহ

যখন কোনো ব্যক্তি বিবাহের সামর্থ্য রাখে, কিন্তু ব্যভিচারের আশঙ্কা নেই—তাহলে তার জন্য বিবাহ করা সুন্নাহ বা মু’আক্কাদাহ সুন্নাহ।

আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, তিন জনের একটি দল নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ’ইবাদাত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করার জন্য নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্ত্রীদের বাড়িতে আসল। যখন তাঁদেরকে এ সম্পর্কে জানানো হলো, তখন তারা ’ইবাদাতের পরিমাণ কম মনে করল এবং বলল, নবীসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে আমাদের তুলনা হতে পারে না। কারণ, তাঁর আগের ও পরের সকল গুনাহ্ ক্ষমা ক’রে দেয়া হয়েছে। এমন সময় তাদের মধ্য থেকে একজন বলল, আমি সারা জীবন রাতভর সালাত আদায় করতে থাকব। অপর একজন বলল, আমি সব সময় সওম পালন করব এবং কক্ষনো বাদ দিব না। অপরজন বলল, আমি নারী সংসর্গ ত্যাগ করব, কখনও বিয়ে করব না। এরপর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের নিকট এলেন এবং বললেন, ’’তোমরা কি ঐ সব লোক যারা এমন এমন কথাবার্তা বলেছ? আল্লাহর কসম! আমি আল্লাহকে তোমাদের চেয়ে বেশি ভয় করি এবং তোমাদের চেয়ে তাঁর প্রতি বেশিঅনুগত; অথচ আমি সওম পালন করি, আবার তা থেকে বিরতও থাকি। সালাত আদায় করি এবং নিদ্রা যাই ও মেয়েদেরকে বিয়েও করি। সুতরাং যারা আমার সুন্নাতের প্রতি বিরাগ পোষণ করবে, তারা আমার দলভুক্ত নয়। সহিহ বুখারি : ৫০৬৩, সহিহ মুসলিম : ১৪০১, আহমাদ : ১৩৫৩৪

নবী ﷺ বিবাহকে নিজের সুন্নাহ বলেছেন, তাই সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যদি ব্যভিচারের ভয় না থাকে তবে এটি সুন্নাহ।

৩. বিবাহ মুস্তাহাব

যখন কেউ ব্যভিচারের ভয় পায় না, আবার বিবাহ না করলে কোনো ক্ষতির শঙ্কাও নেই, তবে বিবাহ করলে দ্বীন পালন, আত্মীয়তার বন্ধন ও সন্তান উৎপাদনের সুযোগ হয়। এ ক্ষেত্রে বিবাহ মুস্তাহাব।

মা’কিল ইবনু ইয়াসার (রাযি.) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খিদমাতে উপস্থিত হয়ে বললো, আমি এক সুন্দরী ও মর্যাদা সম্পন্ন নারীর সন্ধান পেয়েছি। কিন্তু সে বন্ধ্যা। আমি কি তাকে বিয়ে করবো? তিনি বললেনঃ না। অতঃপর লোকটি দ্বিতীয়বার এসেও তাঁকে জিজ্ঞেস করলে তিনি তাকে নিষেধ করলেন। লোকটি তৃতীয়বার তাঁর নিকট এলে তিনি তাকে বললেনঃ এমন নারীকে বিয়ে করো, যে প্রেমময়ী এবং অধিক সন্তান প্রসবকারী। কেননা আমি অন্যান্য উম্মাতের কাছে তোমাদের সংখ্যাধিক্যের কারণে গর্ব করবো। সুনানে আবু দাউদ : ২০৫০, সহিহ ইবন হিব্বান : ৪০৩১

এখানে সন্তান উৎপাদনকে উৎসাহিত করা হয়েছে। তাই কেউ যদি ব্যভিচারের আশঙ্কা না রেখেও বিবাহ করে, তবে এটি মুস্তাহাব। যার শক্তি-সামর্থ্য রয়েছে এবং নিজেকে হারাম কাজে লিপ্ত হওয়া থেকে নিরাপদ রাখার ক্ষমতা আছে, তার জন্য বিবাহ করা মুস্তাহাব। তবে একাকী জীবন-যাপনের চেয়ে বিবাহ করা উত্তম। কেননা ইসলামে সন্ন্যাসব্রত বা বৈরাগ্য নেই।

৪. বিবাহ করা হারাম

যখন কোনো ব্যক্তি জানে যে, সে স্ত্রীর হক আদায় করতে পারবে না বা স্ত্রীকে অন্যায়ভাবে ক্ষতি করবে, অথবা বিবাহের উদ্দেশ্য হারাম কাজে ব্যবহার করা (তালাক দিয়ে কষ্ট দেয়া, ধোঁকা দেয়া) তাহলে তার জন্য বিবাহ হারাম।

যার দৈহিক মিলনের সক্ষমতা ও স্ত্রীর ভরণ-পোষণের সামর্থ্য নেই তার জন্য বিবাহ করা হারাম। ফিক্বহুস সুন্নাহ, তৃতীয় খণ্ড, পৃ.-১৩১

অনুরূপভাবে যিনি যুদ্ধের ময়দানে বা কাফির-মুশরিক দেশে যুদ্ধরত থাকেন তার জন্য বিবাহ হারাম। কেননা সেখানে তার পরিবারের নিরাপত্তা থাকে না। তদ্রূপ কোন ব্যক্তির স্ত্রী থাকলে এবং অন্য স্ত্রীর মাঝে ইনছাফ করতে না পারার আশংকা করলে দ্বিতীয় বিবাহ করা যাবে না।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

 فَاِنۡ خِفۡتُمۡ اَلَّا یُقِیۡمَا حُدُوۡدَ اللّٰہِ ۙ فَلَا جُنَاحَ عَلَیۡہِمَا فِیۡمَا افۡتَدَتۡ بِہٖ ؕ تِلۡکَ حُدُوۡدُ اللّٰہِ فَلَا تَعۡتَدُوۡہَا ۚ

আর যদি তোমরা আশঙ্কা করো যে, তারা উভয়ে আল্লাহর সীমারেখা রক্ষা করতে পারবে না, তাহলে স্ত্রী যা বিনিময় দেবে তার মাধ্যমে তারা উভয়ে মুক্ত হয়ে গেলে তাতে কোনো পাপ নেই। এগুলো আল্লাহর সীমারেখা, সুতরাং তোমরা তা লঙ্ঘন করো না। সূরা বাকারা : ২২৯

খায়সামাহ্ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা আমি আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রাযিঃ) এর সাথে বসা ছিলাম, এমন সময় তার কোষাধ্যক্ষ আসলেন। তিনি বললেন, তুমি কি গোলামদের খাবারের ব্যবস্থা করেছো? তিনি বললেন, না! অতঃপর তিনি বলেন, তুমি গিয়ে তাদের খাবার দিয়ে আসো। বর্ণনাকার বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যাদের ভরণ-পোষণ করা, ব্যয়ভার বহন করা কর্তব্য তা না করে আটকে রাখাই কোন ব্যক্তির গুনাহগার হওয়ার জন্য যথেষ্ট। সহিহ মুসলিম : ৯৯৬

 যে ব্যক্তি স্ত্রীর হক আদায় করতে পারবে না, তার বিয়ে করা হারাম, কারণ এটি জুলুম ও গুনাহর কারণ।

দাম্পত্য জীবন শুরু যোগ্যতা

আমর ইবনুল আহ্ওয়াস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বিদায় হাজ্জে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সাথে উপস্থিত ছিলেন। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর প্রশংসা ও গুণগান করেন এবং ওয়াজ-নসীহত করেন। এরপর তিনি বলেনঃ তোমরা নারীদের সাথে উত্তম ব্যবহারের উপদেশ শুনে নাও। কেননা তারা তোমাদের নিকট আবদ্ধ আছে। এর অধিক তাদের উপর তোমাদের কর্তৃত্ব নাই যে, তারা যদি প্রকাশ্য অশ্লীলতায় লিপ্ত হয়, সত্যিই যদি তারা তাই করে, তবে তোমরা তাদেরকে পৃথক বিছানায় রাখবে এবং আহত হয় না এরূপ হালকা মারধর করবে। অতঃপর তারা তোমাদের অনুগত হয়ে গেলে তাদের উপর আর বাড়াবাড়ি করো না। স্ত্রীদের উপর তোমাদের যেমন অধিকার রয়েছে, তোমাদের উপরও তাদের অধিকার আছে। তোমাদের স্ত্রীদের উপর তোমাদের অধিকার এই যে, তারা তোমাদের শয্যা তোমাদের অপছন্দনীয় লোকেদের দ্বারা মাড়াবে না এবং তোমাদের অপছন্দনীয় লোকেদেরকে তোমাদের ঘরে প্রবেশানুমতি দিবে না। সাবধান! তোমাদের উপর তাদের অধিকার এই যে, তাদের ভরণপোষণ, পোশাক-পরিচ্ছদ ও সজ্জার ব্যাপারে তোমরা তাদের প্রতি শোভনীয় আচরণ করবে। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৫১, সুনানে তিরমিযী : ১১৬৩, ৩০৮৭, ইরওয়াহ : ১৯৯৭-২০২০

সুতরাং, ইসলামে দাম্পত্য জীবন হলো একটি পবিত্র বন্ধন, যা পারস্পরিক ভালোবাসা, সম্মান, সহানুভূতি এবং দায়িত্ববোধের ওপর প্রতিষ্ঠিত। এর মাধ্যমে একটি সুস্থ পরিবার গঠিত হয় এবং সমাজ নৈতিকভাবে শক্তিশালী হয়। যেমন-

ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি উত্তম যে নিজের পরিবারের কাছে উত্তম। আর আমি তোমাদের চেয়ে আমার পরিবারের কাছে অধিক উত্তম। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৯৭৭, সহীহাহ : ২৮৫

দাম্পত্য জীবন শুরু করার শর্ত :

ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে দাম্পত্য জীবন শুরু করার জন্য কোনো নির্দিষ্ট শর্ত বা সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়নি। বরং এটি ব্যক্তির শারীরিক, মানসিক, আর্থসামাজিক এবং ধর্মীয় প্রস্তুতির ওপর নির্ভরশীল। ইসলামে বিয়ের প্রধান উদ্দেশ্য হলো ঈমানকে পূর্ণতা দেওয়া, চারিত্রিক পবিত্রতা রক্ষা করা এবং একটি সুস্থ ও শান্তিময় পরিবার গঠন করা। তাই যখন কোনো ব্যক্তি এসব উদ্দেশ্য পূরণের জন্য নিজেকে উপযুক্ত মনে করে, তখনই তার জন্য বিয়ে করা উত্তম। পবিত্র কুরআন ও হাদিসের আলোকে এই বিষয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ শর্ত বা দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। দাম্পত্য জীবন শুরু করার উপযুক্ত হওয়ার কিছু শর্ত আলোচনা করা হলো-

১. শারীরিক ও মানসিক পরিপক্কতা :

বিয়ের জন্য শারীরিক ও মানসিক পরিপক্কতা অত্যন্ত জরুরি। আল্লাহ তাআলা বলেন-

وَابۡتَلُوا الۡیَتٰمٰی حَتّٰۤی اِذَا بَلَغُوا النِّکَاحَ ۚ فَاِنۡ اٰنَسۡتُمۡ مِّنۡہُمۡ رُشۡدًا فَادۡفَعُوۡۤا اِلَیۡہِمۡ اَمۡوَالَہُمۡ ۚ

আর তোমরা ইয়াতীমদেরকে পরীক্ষা কর যতক্ষণ না তারা বিবাহের বয়সে পৌঁছে। সুতরাং যদি তোমরা তাদের মধ্যে বিবেকের পরিপক্কতা দেখতে পাও, তবে তাদের ধন-সম্পদ তাদেরকে দিয়ে দাও। সুরা নিসা : ৬

আল্লাহ তাআলা এ আয়াতে বিয়ের জন্য শুধু শারীরিক নয়, মানসিক পরিপক্কতা বা বুদ্ধিমত্তার ওপর বিশেষ জোর দিয়েছেন। এই আয়াতে বলা হয়েছে যে, পিতৃহীন শিশুদের সম্পদ তাদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার আগে তাদের পরীক্ষা করতে হবে। পরীক্ষা করতে হবে যে তারা বিবাহের উপযুক্ত হয়েছে কিনা এবং তাদের মধ্যে বিবেকের পরিপক্কতা এসেছে কিনা। এটি কেবল বয়সের ওপর নির্ভরশীল নয়, বরং এটি তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা, দায়িত্ববোধ এবং সম্পদ ব্যবস্থাপনার দক্ষতা যাচাই করার নির্দেশ। এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে, বিয়ে একটি গুরুতর দায়িত্ব, যার জন্য শুধুমাত্র শারীরিক বৃদ্ধিই যথেষ্ট নয়, বরং জীবনের সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও প্রজ্ঞা থাকা আবশ্যক। তাই ইসলামে বিয়ের জন্য বয়স নয়, বরং মানসিক প্রস্তুতি ও পরিপক্কতাকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়। এই পরিপক্কতা অর্জনের পর একজন ব্যক্তি একটি সুখী ও শান্তিপূর্ণ দাম্পত্য জীবন শুরু করতে পারে।

২. বালেগ বা প্রপ্ত বয়স হওয়া

ইসলামি শরীয়ত অনুযায়ী, শারীরিক ও মানসিক পরিপক্কতার অন্যতম লক্ষণ হলো বালেগ (প্রাপ্তবয়স্ক) হওয়া। বালেগ হওয়ার বিষয়টি ব্যক্তির জন্য শরিয়তের সকল বিধিবিধান সালাত, সাওম, হজ, যাকাত ইত্যাদি আবশ্যিক করে তোলে। বালেগ হওয়ার জন্য সুনির্দিষ্ট কিছু লক্ষণ রয়েছে, যা ছেলে ও মেয়ে উভয়ের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। শরীয়তের দৃষ্টিতে বালেগ হওয়ার কয়েকটি সুস্পষ্ট লক্ষণ রয়েছে। বালেগ হওয়ার শারীরিক লক্ষণগুলো হলো-

ক. সস্বপ্নদোষ হওয়া

ছেলে ও মেয়ে উভয়ের জন্যই বয়ঃপ্রাপ্তির অন্যতম লক্ষণ হলো স্বপ্নদোষ। ঘুমের মধ্যে এটি হলে ব্যক্তি প্রাপ্তবয়স্ক হয়েছে বলে ধরা হয়। স্বপ্নদোষ নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যই বালেগ হওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক।

আয়িশাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তিন ধরণের লোকের উপর থেকে কলম উঠিয়ে নেয়া হয়েছেঃ (১) নিদ্রিত ব্যক্তি, যতক্ষণ না জাগ্রত হয়, (২) অসুস্থ (পাগল) ব্যক্তি, যতক্ষণ না আরোগ্য লাভ করে এবং (৩) অপ্রাপ্ত বয়স্ক বালক, যতক্ষণ না বালেগ হয়। সুনানে আবু দাউদ : ৪৩৯৮

খ. মাসিক স্রাব হওয়া

মেয়েদের ঋতুস্রাব বা মাসিক শুরু হওয়া প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার একটি সুস্পষ্ট লক্ষণ। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, একজন নারী শারীরিকভাবে সন্তান ধারণের জন্য সক্ষম হয়েছেন এবং তিনি বয়ঃপ্রাপ্ত।

আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেনঃ ফাতিমা বিনতু আবূ হুবায়শ (রাঃ) আল্লাহ্‌র রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে জিজ্ঞেস করলেনঃ হে আল্লাহ্‌র রাসূল! আমি কখনও পবিত্র হই না। এমতাবস্থায় আমি কি সালাত ছেড়ে দেব? আল্লাহ্‌র রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ এ হলো এক ধরনের বিশেষ রক্ত, হায়েযের রক্ত নয়। যখন তোমার হায়েয শুরু হয় তখন তুমি সালাত ছেড়ে দাও। আর হায়েয শেষ হলে রক্ত ধুয়ে সালাত আদায় কর। সহিহ বুখারি : ৩০৬

গ. সন্তান ধারণের সক্ষমতা :

একজন নারীর যখন সন্তান জন্মদানের ক্ষমতা তৈরি হয়, তখন তিনি প্রাপ্তবয়স্ক বা বালেগ হিসেবে গণ্য হন। সাধারণত ঋতুস্রাব বা মাসিক শুরু হওয়ার মধ্য দিয়ে এই সক্ষমতা প্রকাশ পায়। এটি বয়ঃপ্রাপ্তির একটি প্রধান শারীরিক লক্ষণ।

আয়িশাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন তাঁকে বিয়ে করেন তখন তাঁর বয়স ছিল ৬ বছর এবং নয় বছর বয়সে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সঙ্গে বাসর ঘর করেন এবং তিনি তাঁর সান্নিধ্যে নয় বছরকাল ছিলেন। সহিহ বুখারি : ৫১৩৩

ঘ. শুক্লসদৃশ আঠালো পদার্থ নির্গত হওয়া :

পুরুষদের ক্ষেত্রে, উত্তেজনার ফলে বীর্যপাত হলে তাকে প্রাপ্তবয়স্ক বা বালেগ হওয়ার একটি লক্ষণ হিসেবে ধরা হয়। এটি একজন পুরুষের শারীরিক ও যৌন পরিপক্কতার একটি সুস্পষ্ট ইঙ্গিত।

উম্মু সালামাহ (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নিকট উম্মু সুলায়ম (রাযি.) এসে বললেনঃ হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ্ হক কথা প্রকাশ করতে লজ্জাবোধ করেন না। মহিলাদের স্বপ্নদোষ হলে কি গোসল করতে হবে? নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ ’হ্যাঁ, যখন সে বীর্য দেখতে পাবে।’ তখন উম্মু সালামাহ (লজ্জায়) তার মুখ ঢেকে নিয়ে বললেন, ’হে আল্লাহর রাসূল! মহিলাদেরও স্বপ্নদোষ হয় কি?’ তিনি বললেন, ’হ্যাঁ, তোমার ডান হাতে মাটি পড়ুক! (তা না হলে) তাদের সন্তান তাদের আকৃতি পায় কীভাবে? সহিহ বুখারি : ১৩০, ২৮২, ৩৩২৮, ৬০৯১, ৬১২১; মুসলিম : ৩১৩, আহমাদ : ২৬৬৭৫

ঙ. গোপনাঙ্গের আশেপাশে চুল বৃদ্ধি পাওয়া

গোপনাঙ্গের আশেপাশে চুল গজানো বালেগ হওয়ার শরিয়ত নির্ধারিত চিহ্ন। রাসূল ﷺ খাইবার যুদ্ধের বন্দীদের মধ্যে ছোট ছেলে-মেয়ে আলাদা করার সময় নির্দেশ দিয়ে অপ্রাপ্তবয়স্কদের চিহিৃত করেন। ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন –

ـ أَنَّ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم قَالَ فِي بَنِي قُرَيْظَةَ ‏”‏ لاَ يُقْتَلُ مِنْهُم مَنْ لَمْ يُنْبِتْ ‏”‏ ‏.‏ فَاسْتَحْيَا النَّاسُ حَتَّى بَعَثُوا إِلَيْهِ، فَنَظَرَ إِلَى الْعَانَةِ فَتَرَكَهُ، وَمَنْ أَنْبَتَ قَتَلَهُ ‏.‏

 নবী ﷺ বনু কুরাইজা সম্পর্কে বলেন, ‘তাদের মধ্যে থেকে তাকে হত্যা করা হবে না, যার (জননাঙ্গে) চুল গজায়নি।’ তখন লোকজন লজ্জাবোধ করল, এমনকি তারা তার (সাদ ইবনে মু’আযের) কাছে লোক পাঠাল। অতঃপর তিনি তার লজ্জাস্থান দেখলেন এবং তাকে ছেড়ে দিলেন। আর যার (চুল) গজায়নি, তাকে হত্যা করলেন। সহিহব বুখারি : ২৫৪১

এই হাদিসটি বনু কুরাইজা গোত্রের ঘটনা সম্পর্কিত। যুদ্ধের পর তাদের বিচার করা হয়। রাসূল ﷺ নির্দেশ দেন যে, অপ্রাপ্তবয়স্ক (যাদের জননাঙ্গে লোম গজায়নি) ছেলেদের হত্যা করা হবে না, শুধুমাত্র প্রাপ্তবয়স্কদের (যাদের লোম গজিয়েছে) হত্যা করা হবে। এই হাদিসটি ইসলামী আইনে বালক বালেগ হওয়ার একটি অন্যতম প্রধান শারীরিক লক্ষণ হিসেবে জননাঙ্গে লোম গজানোকে প্রমাণ করে। এটি নির্ধারণ করে যে, একজন ব্যক্তি কখন প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে আইনের আওতায় আসবে।

চ. বয়সের ভিত্তিতে বালেগ নির্ধারণ

যদি কোনো ব্যক্তির মধ্যে উপরের কোনো লক্ষণই প্রকাশ না পায়, তাহলে বয়সের ভিত্তিতে বালেগ হওয়ার সময়সীমা নির্ধারিত হবে। অধিকাংশ ফিকহবিদদের মতে, ১৫ বছর বয়সে উপনীত হলে ছেলে ও মেয়ে উভয়কেই বালেগ হিসেবে ধরে নেওয়া হয়, যদি এর আগে কোনো লক্ষণ প্রকাশ না পায়। এই মতের পক্ষে দলিল হলো ইবনে উমর (রা.)-এর হাদিস।

ইবনু ‘উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। উহুদ যুদ্ধের দিন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর নিকট তাকে (ইবনু উমরকে) পেশ করলেন, তখন তিনি চৌদ্দ বছরের বালক। (ইবনু ‘উমার বলেন) তখন তিনি আমাকে (যুদ্ধে গমনের) অনুমতি দেননি। পরে খন্দকের যুদ্ধে তিনি আমাকে পেশ করলেন এবং অনুমতি দিলেন। তখন আমি পনের বছরের যুবক। নাফি‘ (রহ.) বলেন, আমি খলীফা ‘উমার ইবনু ‘আবদুল ‘আযীযের নিকট গিয়ে এ হাদীস শুনালাম। তিনি বললেন, এটাই হচ্ছে প্রাপ্ত ও অপ্রাপ্ত বয়সের সীমারেখা। অতঃপর তিনি তাঁর গভর্নরদেরকে লিখিত নির্দেশ পাঠালেন যে, (সেনাবাহিনীতে) যাদের বয়স পনের হয়েছে তাদের জন্য যেন ভাতা নির্দিষ্ট করেন। সহিহ বুখারি : ২৬৬৪, ৪০৯৭, সহিহ মুসলিম : ১৮৬৮

এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, সাহাবীদের মধ্যে যারা ১৫ বছর বয়সে উপনীত হতেন, তাদের প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে গণ্য করা হতো। ইসলামী শরীয়তে বালেগ হওয়ার জন্য প্রথমে শারীরিক লক্ষণগুলোকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। যদি সেগুলো প্রকাশ পায়, তাহলে সে বয়সেই ব্যক্তি বালেগ হিসেবে গণ্য হবে। আর যদি কোনো লক্ষণ প্রকাশ না পায়, তাহলে সর্বসম্মত মত অনুযায়ী ১৫ বছর বয়সে উপনীত হলে তাকে প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে ধরে নেওয়া হয়। এই বয়সের পর থেকে সকল ইসলামী বিধান পালন করা তার ওপর বাধ্যতামূলক হয়ে যায়।

৩. আর্থিক সক্ষমতা :

ইসলামে বিয়ে শুধু একটি ধর্মীয় চুক্তি নয়, এটি একটি সামাজিক এবং অর্থনৈতিক বন্ধনও। যদিও ইসলামে বিয়ের জন্য বিশাল ধন-সম্পদের শর্ত নেই, তবে জীবনধারণের জন্য ন্যূনতম আর্থিক সক্ষমতা থাকা বাঞ্ছনীয়। একজন পুরুষের জন্য বিয়ের আগে এমন আর্থিক সক্ষমতা অর্জন করা উচিত যাতে সে তার স্ত্রী এবং ভবিষ্যতের সন্তানদের মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, এবং শিক্ষা। আর্থিক সক্ষমতা না থাকলে পরিবারে অশান্তি সৃষ্টি হতে পারে, যা একটি সুখী দাম্পত্য জীবনের জন্য বাধা। তাই, বিয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আর্থিক সক্ষমতার বিষয়টি বিবেচনা করা অপরিহার্য কারণ এটি একটি স্থিতিশীল ও শান্তিপূর্ণ পরিবারের ভিত্তি স্থাপন করে।

আবদুল্লাহ ইবনু মাসঊদ (রাঃ) বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে আমরা কতক যুবক ছিলাম; আর আমাদের কোন কিছু ছিল না। এই হালতে আমাদেরকে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, হে যুব সম্প্রদায়! তোমাদের মধ্যে যারা বিয়ে করার সামর্থ্য রাখে, তারা যেন বিয়ে করে। কেননা, বিয়ে তার দৃষ্টিকে সংযত রাখে এবং লজ্জাস্থান হিফাযত করে এবং যার বিয়ে করার সামর্থ্য নেই, সে যেন সওম পালন করে। কেননা, সওম তার যৌনতাকে দমন করবে। সহিহ বুখারি : ৫০৬৬, সহিহ মুসলিম : ১৪০০, সুনানে নাসায়ী ৩২১০, সুনানে তিরমিযী : ১০৮১, আহমাদ : ৪০২৩, ইরওয়া : ১৭৮১, সহীহ আল জামি : ৭৯৭৫

তবে মোটামুটি ভরন পোষণের ব্যবস্থা থাকলে আল্লাহ উপর ভরষা করে বিবাহ করলে তিনি প্রাচুর্যে ভবে দিবেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَاَنۡکِحُوا الۡاَیَامٰی مِنۡکُمۡ وَالصّٰلِحِیۡنَ مِنۡ عِبَادِکُمۡ وَاِمَآئِکُمۡ ؕ اِنۡ یَّکُوۡنُوۡا فُقَرَآءَ یُغۡنِہِمُ اللّٰہُ مِنۡ فَضۡلِہٖ ؕ وَاللّٰہُ وَاسِعٌ عَلِیۡمٌ

আর তোমরা তোমাদের মধ্যকার অবিবাহিত নারী-পুরুষ ও সৎকর্মশীল দাস দাসীদের বিবাহ দাও। তারা অভাবী হলে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে অভাবমুক্ত করে দেবেন। আল্লাহ প্রাচুর্যময় ও মহাজ্ঞানী। সুরা নুর : ৩২

৪. বিবাহ সম্পর্কে ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা অর্জন করা :

স্বামী-স্ত্রী উভয়েরই ইসলামি জ্ঞান অর্জন করা এবং নিজেদের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন থাকা অপরিহার্য। এর মাধ্যমে একটি পরিবারকে ইসলামের পথে পরিচালনা করা সহজ হয় এবং দাম্পত্য জীবন সুখময় হয়। ইসলামে বিবাহকে শুধু জৈবিক চাহিদা পূরণের মাধ্যম হিসেবে দেখা হয় না, বরং এটি একটি দ্বীনি দায়িত্ব। বিবাহের মূল উদ্দেশ্য হিসেবে প্রশান্তি এবং পরস্পরের ভালোবাসা। এই প্রশান্তি ও ভালোবাসা তখনই অর্জন করা সম্ভব, যখন স্বামী-স্ত্রী উভয়েই তাদের পারস্পরিক অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন থাকবে। আর এই সচেতনতা আসে ধর্মীয় জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে। একজন মুসলিম হিসেবে স্বামী-স্ত্রী উভয়েরই উচিত এই অধিকার ও দায়িত্বগুলো সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা। যেমন-

আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তোমাদের মধ্যে ঈমানে পরিপূর্ণ মুসলমান হচ্ছে সর্বোত্তম চরিত্রের অধিকারী ব্যক্তি। যেসব লোক নিজেদের স্ত্রীদের নিকট উত্তম তারাই তোমাদের মধ্যে অতি উত্তম। সুনানে তিরমিজি : ১১৬২, সহীহাহ : ২৮৪

এই হাদিসটি একজন মুসলিম পুরুষের জন্য স্ত্রীর প্রতি উত্তম আচরণ করার গুরুত্ব তুলে ধরে। উত্তম আচরণ তখনই করা সম্ভব, যখন সে তার ধর্মীয় দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন থাকবে। একইভাবে, স্ত্রীরও তার স্বামীর প্রতি আনুগত্য ও সম্মান দেখানো উচিত।

বিবাহিত জীবনের প্রধান লক্ষ্যগুলোর মধ্যে একটি হলো একটি প্রজন্মকে ইসলামের পথে পরিচালনা করা। সন্তান জন্মদানের পর তাদের সঠিক শিক্ষা ও লালন-পালনের দায়িত্ব স্বামী-স্ত্রীর উপর বর্তায়। যদি দম্পতি ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞ হয় তাহলে সন্তান কিভাবে ইসলামের জ্ঞান পাবে। সুতরাং, বিবাহকে সফল ও অর্থবহ করতে হলে ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা অর্জন করা অপরিহার্য। এটি কেবল ব্যক্তিগত সম্পর্ককে শক্তিশালী করে না, বরং একটি আদর্শ মুসলিম পরিবার গঠনেও সাহায্য করে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *