যিহারের বিধান

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

আরবি ‘যিহার’ (ظِهار) শব্দটি এসেছে ‘যাহর’ (ظَهْر) থেকে, যার অর্থ ‘পিঠ’। ইসলামী শরীয়াহতে এর অর্থ হলো, কোনো স্বামী যদি তার স্ত্রীকে এমনভাবে তুলনা করে যা তাকে তার জন্য হারাম করে দেয়। যেমন, কোনো পুরুষ তার স্ত্রীকে বলে, “তুমি আমার কাছে আমার মায়ের পিঠের মতো”। এর মাধ্যমে সে স্ত্রীকে তার মায়ের মতো সম্মানের আসনে বসাতে চায়, কিন্তু একই সাথে তাদের মধ্যকার বৈবাহিক সম্পর্ককে হারাম করে দেয়।

যিহারকারী ব্যক্তি যতক্ষণ পর্যন্ত কাফফারা আদায় না করবে, ততক্ষণ তার জন্য স্ত্রীর সাথে সহবাস করা সম্পূর্ণ হারাম। যদি সে কাফফারা আদায়ের আগে সহবাস করে, তাহলে তাকে পুনরায় কাফফারা আদায় করতে হবে। তবে, স্বাভাবিক দাম্পত্য জীবনযাপন (যেমন একসাথে থাকা, কথা বলা, ইত্যাদি) নিষিদ্ধ নয়, শুধু শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করা নিষিদ্ধ।

ইসলামপূর্ব যুগে আরবে যিহার

ইসলামপূর্ব যুগে আরবে যিহার (ظِهار) প্রথাটি প্রচলিত ছিল। এটি ছিল তালাকের একটি রূপ, যা দিয়ে স্বামী তার স্ত্রীকে চিরতরে হারাম করে দিত। ওই সময়ে কোনো স্বামী যদি তার স্ত্রীকে বলত, “তুমি আমার কাছে আমার মায়ের পিঠের মতো,” তবে এর মাধ্যমে সে স্ত্রীকে তার মায়ের মর্যাদায় উন্নীত করত এবং এর ফলে স্ত্রী তার জন্য চিরতরে হারাম হয়ে যেত। এর পরিণতি ছিল খুবই ভয়াবহ। স্ত্রীরা তাদের স্বামীর কাছ থেকে তালাকও পেত না, আবার স্ত্রী হিসেবেও বিবেচিত হতো না। ফলে তাদের জীবন এক কঠিন অনিশ্চয়তায় ডুবে যেত। তারা না পারত অন্য কোথাও বিয়ে করতে, না পারত স্বাভাবিক দাম্পত্য জীবনযাপন করতে।

ইসলামের আগমনের পর এই প্রথাটি রহিত করা হয়। মহানবী (সা.)-এর সময়ে এক সাহাবি, আওস ইবনে সামিত তার স্ত্রী খাওলা বিনতে সালাবা-কে যিহার করেন। হাদিসে এসেছে-

’আয়িশাহ্ (রাঃ) বলেছেন, বরকতময় সেই সত্তা যাঁর শরবণশক্তি সব কিছুতে পরিব্যাপ্ত হয়ে আছে। আমি সালাবার কন্যা খাওলা (রাঃ)-এর কিছু কথা শুনলাম এবং কিছু কথা আমার অজ্ঞাত থেকে যায়। তিনি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট তার স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ পেশ করেন। তিনি বলেন, হে আল্লাহর রসূল! সে আমার যৌবন উপভোগ করেছে এবং আমি আমার পেট থেকে তাকে অনেক সন্তান উপহার দিয়েছি। অবশেষে আমি যখন বার্ধক্যে উপনীত হলাম এবং সন্তানদানে অক্ষম হলাম, তখন সে আমার সাথে যিহার করেছে। হে আল্লাহ্! আমি তোমার নিকটে আমার অভিযোগ পেশ করছি। অতঃপর বেশি সময়ে অতিবাহিত না হতেই জিবরীল (আঃ) এ আয়াতগুলো নিয়ে অবতরণ করলেন-

قَدْ سَمِعَ  اللّٰهُ  قَوْلَ  الَّتِیْ تُجَادِلُكَ فِیْ زَوْجِهَا وَ تَشْتَكِیْۤ  اِلَی اللّٰهِ ٭ۖ وَ اللّٰهُ یَسْمَعُ  تَحَاوُرَکُمَا………..

’আল্লাহ্ অবশ্যই শুনেছেন সেই নারীর কথা, যে নিজের স্বামীর বিষয়ে তোমার সাথে বাদানুবাদ করছে এবং আল্লাহর নিকটও ফরিয়াদ করছে……’’। সূরা মুজাদালা : ১-৪। সুনানে ইবনে মাজাহ : ২০৬৩, সুনানে নাসায়ী : ৩৪৬০ হাদিসের মান সহিহ

এ হাদিসে দেখা যায়, আওস ইবনে সামিত (রা.) যিকার করার কারনে খাওলা বিনতে খাওলা এতে হতাশ হয়ে রাসূল (সা.)-এর কাছে এর প্রতিকার চেয়ে বিচার দেন। তার এই করুণ আর্তি আল্লাহ তা’আলা শোনেন। ফলস্বরূপ, আল্লাহ তায়ালা যিহার প্রথাকে সম্পূর্ণরূপে বাতিল করে পবিত্র কুরআনের সূরা মুজাদালাহ-এর প্রথম কয়েকটি আয়াত নাযিল করেন। কুরআনে নাজিল হলো-

قَدْ سَمِعَ  اللّٰهُ  قَوْلَ  الَّتِیْ تُجَادِلُكَ فِیْ زَوْجِهَا وَ تَشْتَكِیْۤ  اِلَی اللّٰهِ ٭ۖ وَ اللّٰهُ یَسْمَعُ  تَحَاوُرَکُمَا ؕ اِنَّ اللّٰهَ  سَمِیْعٌۢ بَصِیْرٌ ﴿۱﴾  اَلَّذِیْنَ یُظٰهِرُوْنَ مِنْکُمْ مِّنْ  نِّسَآئِهِمْ مَّا هُنَّ  اُمَّهٰتِهِمْ ؕ اِنْ  اُمَّهٰتُهُمْ  اِلَّا الِّٰٓیْٔ وَلَدْنَهُمْ ؕ وَ اِنَّهُمْ  لَیَقُوْلُوْنَ مُنْكَرًا مِّنَ الْقَوْلِ وَ زُوْرًا ؕ وَ اِنَّ اللّٰهَ لَعَفُوٌّ غَفُوْرٌ ﴿۲﴾ وَ الَّذِیْنَ یُظٰهِرُوْنَ مِنْ نِّسَآئِهِمْ ثُمَّ یَعُوْدُوْنَ لِمَا قَالُوْا فَتَحْرِیْرُ  رَقَبَۃٍ  مِّنْ قَبْلِ  اَنْ یَّتَمَآسَّا ؕ ذٰلِکُمْ تُوْعَظُوْنَ بِہٖ ؕ وَ اللّٰهُ  بِمَا تَعْمَلُوْنَ  خَبِیْرٌ ﴿۳﴾  فَمَنْ  لَّمْ یَجِدْ فَصِیَامُ شَہْرَیْنِ مُتَتَابِعَیْنِ مِنْ قَبْلِ اَنْ یَّتَمَآسَّا ۚ فَمَنْ لَّمْ  یَسْتَطِعْ  فَاِطْعَامُ سِتِّیْنَ مِسْكِیْنًا ؕ ذٰلِكَ لِتُؤْمِنُوْا بِاللّٰهِ وَ رَسُوْلِہٖ ؕ  وَ تِلْكَ حُدُوْدُ اللّٰهِ ؕ وَ لِلْکٰفِرِیْنَ  عَذَابٌ  اَلِیْمٌ ﴿۴﴾

তোমাদের মধ্যে যারা তাদের স্ত্রীদের সাথে যিহার* করে, তাদের স্ত্রীগণ তাদের মাতা নয়। তাদের মাতা তো কেবল তারাই যারা তাদেরকে জন্ম দিয়েছে। আর তারা অবশ্যই অসঙ্গত ও অসত্য কথা বলে। আর নিশ্চয় আল্লাহ অধিক পাপ মোচনকারী, বড়ই ক্ষমাশীল। আর যারা তাদের স্ত্রীদের সাথে ‘যিহার’ করে অতঃপর তারা যা বলেছে তা থেকে ফিরে আসে, তবে একে অপরকে স্পর্শ করার পূর্বে একটি দাস মুক্ত করবে। এর মাধ্যমে তোমাদেরকে উপদেশ দেয়া হচ্ছে। আর তোমরা যা কর, সে সম্পর্কে আল্লাহ সম্যক অবহিত। কিন্তু যে তা পাবে না, সে লাগাতার দু’মাস সিয়াম পালন করবে, একে অপরকে স্পর্শ করার পূর্বে। আর যে (এরূপ করার) সামর্থ্য রাখে না সে ষাটজন মিসকীনকে খাবার খাওয়াবে। এ বিধান এ জন্য যে, তোমরা যাতে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আন। আর এগুলো আল্লাহর (নির্ধারিত) সীমা এবং কাফিরদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক আযাব। সুরা মুজাদালা : ১-৪

এই আয়াতগুলোতে যিহারকে একটি গর্হিত কাজ হিসেবে ঘোষণা করা হয় এবং এর কাফফারা (প্রায়শ্চিত্ত) নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে, আল্লাহ ইসলামপূর্ব যুগের এই কঠোর ও অন্যায় প্রথাকে সংশোধন করে স্ত্রীর অধিকার ও মর্যাদা রক্ষা করেন।

যিহারের বিধান করা একটি গর্হিত কাজ

প্রাচীন আরব সমাজে স্ত্রী সাথে যিহারের মাধ্যমে বৈবাহিক সম্পর্ক ছিন্ন করা হত। ইসলাম এসে এ বিধান বাতিল করে। তাই যিহারের মাধ্যামে সরাসরি বৈবাহিক সম্পর্ক ছিন্ন হয় না। তবে অসঙ্গত কথা বলার কারণে কাফ্ফারা দিতে হয়। ইসলামের দৃষ্টিতে এটি একটি গর্হিত ও মিথ্যা কথা। আল্লাহ তা’আলা বলেন-

اَلَّذِیۡنَ یُظٰہِرُوۡنَ مِنۡکُمۡ مِّنۡ نِّسَآئِہِمۡ مَّا ہُنَّ اُمَّہٰتِہِمۡ ؕ اِنۡ اُمَّہٰتُہُمۡ اِلَّا الّٰٓیِٴۡ وَلَدۡنَہُمۡ ؕ وَاِنَّہُمۡ لَیَقُوۡلُوۡنَ مُنۡکَرًا مِّنَ الۡقَوۡلِ وَزُوۡرًا ؕ وَاِنَّ اللّٰہَ لَعَفُوٌّ غَفُوۡرٌ

তোমাদের মধ্যে যারা তাদের স্ত্রীদের সাথে যিহার করে, তাদের স্ত্রীগণ তাদের মাতা নয়। তাদের মাতা তো কেবল তারাই যারা তাদেরকে জন্ম দিয়েছে। আর তারা অবশ্যই অসঙ্গত ও অসত্য কথা বলে। আর নিশ্চয় আল্লাহ অধিক পাপ মোচনকারী, বড়ই ক্ষমাশীল। সূরা মুজাদালা : ২

এই আয়াত থেকে স্পষ্ট হয় যে, যিহার একটি মিথ্যা ও অন্যায় কাজ, যা আল্লাহ ঘৃণা করেন।

যিহারের কাফফারা বা  প্রায়শ্চিত্ত :

যদি কোনো ব্যক্তি যিহার করে ফেলে, তাহলে তার জন্য তার স্ত্রীর সাথে পুনরায় সম্পর্ক স্থাপন করা হারাম হয়ে যায় যতক্ষণ না সে নির্দিষ্ট কাফফারা আদায় করে। আল্লাহ তা’আলা এই কাফফারাকে পর্যায়ক্রমে তিনটি ভাগে বিভক্ত করেছেন। ইসলামি শরীয়তের আলোকে যিহারের কারনে যে কাফফারা আদায় করা ওয়াজিব হয় তান নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

ক. একজন দাস মুক্ত করা:

যিহারের কাফফারার প্রথম ধাপ হলো একজন দাস মুক্ত করা। এটি সবচেয়ে সহজ ও উত্তম পদ্ধতি। যদি কোনো ব্যক্তি একজন দাস মুক্ত করার সামর্থ্য রাখে, তবে তাকে এটাই করতে হবে। আল্লাহ তা’আলা বলেন-

وَالَّذِیۡنَ یُظٰہِرُوۡنَ مِنۡ نِّسَآئِہِمۡ ثُمَّ یَعُوۡدُوۡنَ لِمَا قَالُوۡا فَتَحۡرِیۡرُ رَقَبَۃٍ مِّنۡ قَبۡلِ اَنۡ یَّتَمَآسَّا ؕ ذٰلِکُمۡ تُوۡعَظُوۡنَ بِہٖ ؕ وَاللّٰہُ بِمَا تَعۡمَلُوۡنَ خَبِیۡرٌ

আর যারা তাদের স্ত্রীদের সাথে ‘যিহার’ করে অতঃপর তারা যা বলেছে তা থেকে ফিরে আসে, তবে একে অপরকে স্পর্শ করার পূর্বে একটি দাস মুক্ত করবে। এর মাধ্যমে তোমাদেরকে উপদেশ দেয়া হচ্ছে। আর তোমরা যা কর, সে সম্পর্কে আল্লাহ সম্যক অবহিত। সূরা মুজাদালা : ৩

এই আয়াত অনুযায়ী, স্বামী-স্ত্রীর পুনরায় মিলিত হওয়ার আগেই দাস মুক্ত করতে হবে। বর্তমানে দাস প্রথা বিলুপ্ত হওয়ায় যিহারের কাফফারা (প্রায়শ্চিত্ত) আদায়ের ক্ষেত্রে দাস মুক্ত করার বিধানটি এখন আর প্রযোজ্য নয়। এর কারণ, এই বিধানের মূল উদ্দেশ্য ছিল দাসদের মুক্তির পথ প্রশস্ত করা এবং সামাজিক কুপ্রথা দূর করা। ইসলামের এ প্রসস্ত বিধানে কারনেই পৃথিবীতে বর্তমানে দাস প্রথা ও তার বিধান অকার্যকর হয়েছে।

ইসলামী শরীয়তের বিধান অনুসারে, যদি কোনো বিধানের প্রথম ধাপটি পালন করা সম্ভব না হয়, তাহলে পরবর্তী ধাপে যেতে হবে। এটি ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি, যা মানুষের জন্য বিধানকে সহজ ও বাস্তবসম্মত করে তোলে।

খ. ষাট দিন একটানা রোজা রাখা:

যদি কোনো ব্যক্তি দাস মুক্ত করার সামর্থ্য না রাখে, তাহলে তাকে একটানা ষাট দিন রোজা রাখতে হবে। এই রোজা রাখতে কোনো প্রকার বিরতি দেওয়া যাবে না। যদি কোনো কারণে একটি রোজাও ছুটে যায়, তাহলে আবার প্রথম থেকে ষাট দিন রোজা শুরু করতে হবে। আল্লাহ তা’আলা বলেন-

فَمَنۡ لَّمۡ یَجِدۡ فَصِیَامُ شَہۡرَیۡنِ مُتَتَابِعَیۡنِ مِنۡ قَبۡلِ اَنۡ یَّتَمَآسَّا ۚ

কিন্তু যে তা পাবে না, সে লাগাতার দু’মাস সিয়াম পালন করবে, একে অপরকে স্পর্শ করার পূর্বে। সূরা মুজাদালা, : ৪

এই বিধান অত্যন্ত কঠোর, কারণ এর মাধ্যমে ব্যক্তিকে তার ভুলের জন্য অনুতপ্ত হওয়ার এবং কষ্ট স্বীকার করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।

গ. ষাটজন মিসকিনকে খাওয়ানো:

যদি কোনো ব্যক্তি অসুস্থতা, দুর্বলতা বা অন্য কোনো কারণে একটানা ষাট দিন রোজা রাখতে সক্ষম না হয়, তাহলে তাকে ষাটজন মিসকিনকে খাদ্য দান করতে হবে।

আল্লাহ তা’আলা বলেন-

فَمَنۡ لَّمۡ یَسۡتَطِعۡ فَاِطۡعَامُ سِتِّیۡنَ مِسۡکِیۡنًا ؕ ذٰلِکَ لِتُؤۡمِنُوۡا بِاللّٰہِ وَرَسُوۡلِہٖ ؕ وَتِلۡکَ حُدُوۡدُ اللّٰہِ ؕ

 আর যে (এরূপ করার) সামর্থ্য রাখে না সে ষাটজন মিসকীনকে খাবার খাওয়াবে। এ বিধান এ জন্য যে, তোমরা যাতে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আন। আর এগুলো আল্লাহর নির্ধারিত সীমা। সূরা মুজাদালা, : ৪

এই তিনটি ধাপের কাফফারা একটির পর আরেকটি অনুসরণ করতে হয়। অর্থাৎ, যদি প্রথমটি সম্ভব না হয়, তবে দ্বিতীয়টি এবং দ্বিতীয়টি সম্ভব না হলে তৃতীয়টি। এর মাধ্যমে আল্লাহ তা’আলা মানুষের সামর্থ্যের দিকে লক্ষ্য রেখেছেন এবং বিধানকে সহজ করেছেন।

হাদিসে যিহারের কাফফারা

হাদিসে যিহারের কাফফারার ধারাবাহিকতা ও এর প্রয়োগকে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করে। যেমন-

সালামা ইবনু সাখর আল-বায়াদী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নারীদের প্রতি অধিক আসক্ত ছিলাম। অন্য পুরুষের তুলনায় আমি তাদের সাথে বেশি সহবাসে লিপ্ত হতাম। রমযান মাস শুরু হলে আমি আমার স্ত্রীর সাথে যিহার করলাম। রমযান মাস প্রায় শেষ হতে যাচ্ছে। একদা রাতের বেলা সে আমার সাথে কথাবার্তা বলছিল। তখন তার দেহের একটি অংশ আমার সামনে উন্মুক্ত হয়ে গেলো। আমি তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়লাম এবং তার সাথে সহবাস করলাম। ভোর হলে আমি সকাল সকাল আমার সম্প্রদায়ের লোকেদের নিকট উপস্থিত হয়ে তাদেরকে আমার ঘটনাটি জানালাম।

আমি তাদের বললাম, তোমরা আমার ব্যাপারে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করো। তারা বললো, আমরা তা করতে পারবো না। হয়ত বা আল্লাহ্ আমাদের সম্পর্কে কিতাব (কুরআনের আয়াত) নাযিল করবেন অথবা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের এমন কিছু বলবেন, যা আমাদের জন্য লজ্জার কারণ হয়ে থাকবে। বরং আমরা তোমার অপরাধসহ তোমাকে সোপর্দ করবো। তুমি নিজেই গিয়ে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট তোমার ঘটনাটি বলো।

রাবী বলেন, আমি রওয়ানা হয়ে তাঁর নিকট উপস্থিত হয়ে আমার বিষয়টি তাঁকে জানালাম। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তুমি এটা করেছো? আমি বললাম, আমিই এটা করেছি। আমি এখানে আছি হে আল্লাহর রসূল! আমার প্রতি আল্লাহর যে হুকুম হয় তাতে আমি ধৈর্য ধারণ করবো তিনি বলেন, একটি গোলামকে দাসত্বমুক্ত করো। আমি বললাম, সেই সত্তার শপথ, যিনি আপনাকে সত্যসহ পাঠিয়েছেন! আমি আমার দেহটি ছাড়া আর কিছুর মালিক নই। তিনি বলেন, তাহলে একাধারে দু’ মাস রোযা রাখো।

আমি বললাম, ইয়া রাসূলুল্লাহ্! আমার উপর যে বিপদ এসেছে, তা তো এই রোযার কারণেই। তিনি বলেন, তাহলে দান-খয়রাত করো অথবা ষাটজন মিসকীনকে আহার করাও। রাবী বলেন, আমি বললাম, সেই সত্তার শপথ, যিনি আপনাকে সত্যসহ পাঠিয়েছেন! আমরা এ রাতটি নিরন্ন অবস্থায় অতিবাহিত করেছি। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তুমি বনু যুরাইক-এর যাকাত বণ্টনকারীর নিকট যাও এবং তাকে বলো, সে যেন তোমাকে যাকাতের কিছু মাল দান করে। তা দিয়ে তুমি ষাটজন মিসকীনকে আহার করাও এবং অবশিষ্ট যা থাকে তা নিজের উপকারে লাগাও। সুনানে ইবনু মাজাহ : ২০৬২, সুনানে তিরমিযী : ১১৯৮, ১২০০, ৩২৯৯, সুনানে আবূ দাউদ : ২২১৩, মিশকাত : ৩২৯৯, আহমাদ : ৩১৮৮, দারেমী : ২২৭৩, ইরওয়াহ : ২০৯১

উপসংহার

যিহার একটি গুরুতর বিষয়, যা স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ককে নষ্ট করে দেয়। ইসলাম এর জন্য কঠিন কাফফারা নির্ধারণ করে এর ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতন করেছে। একইসাথে, কাফফারার তিনটি ধাপ নির্ধারণ করে আল্লাহ তা’আলা এই বিধানকে মানুষের জন্য সহজ করে দিয়েছেন, যাতে তারা তাদের ভুল থেকে ফিরে আসতে পারে এবং তাদের দাম্পত্য সম্পর্ক পুনরায় স্থাপন করতে পারে।

লিআন এর বিধান

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

লিআন (لعان) শব্দটি আরবি ‘লা’ন’ (لعن) শব্দ থেকে এসেছে, যার অর্থ ‘আল্লাহর অভিশাপ’। ইসলামী শরিয়াহ অনুযায়ী, লি’আন হলো স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার একটি বিশেষ শপথ ও অভিশাপের প্রক্রিয়া, যা কোনো স্বামী তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে ব্যভিচারের অভিযোগ আনলে কিংবা স্ত্রীর গর্ভের সন্তানকে নিজের সন্তান হিসেবে অস্বীকার করলে অনুষ্ঠিত হয়।

ইসলামের প্রথম যুগে, যদি কোনো ব্যক্তি তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে ব্যভিচারের অভিযোগ আনত এবং তা প্রমাণের জন্য চারজন সাক্ষী উপস্থিত করতে না পারত, তাহলে তাকে ‘ক্বযফ’ (মিথ্যা অপবাদ) এর শাস্তি হিসেবে আশিটি বেত্রাঘাত করা হতো। কিন্তু এতে একটি গুরুতর সমস্যা সৃষ্টি হয়েছিল: স্বামী যদি সত্যিই তার স্ত্রীর ব্যভিচার দেখেও প্রমাণ করতে না পারত, তাহলে তাকে হয় মিথ্যা অপবাদের শাস্তি ভোগ করতে হতো, নয়তো চুপ করে থাকতে হতো, যা তার জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক ছিল। এই সমস্যার সমাধানেই আল্লাহ তাআলা নতুন বিধান নাজিল করেন।

ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, হিলাল বিন উমাইয়্যা (রাঃ) তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর নিকট শরীক বিন সাহমার সাথে যেনায় লিপ্ত হওয়ার অভিযোগ দায়ের করেন। নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, প্রমাণ পেশ করো অন্যথায় তোমার পিঠে হদ্দ কার্যকর হবে। হেলাল বিন উমাইয়্যা (রাঃ) বলেন, সেই সত্তার শপথ, যিনি আপনাকে সত্য দীনসহ পাঠিয়েছেন। আমি অবশ্যই সত্যবাদী এবং আল্লাহ্‌ আমার অভিযোগের ব্যাপারে এমন বিধান নাযিল করবেন, যা আমার পিঠকে হদ্দ থেকে রক্ষা করবে। তখন এই আয়াত নাযিল হলো-

﴾  وَ الَّذِیْنَ یَرْمُوْنَ اَزْوَاجَهُمْ وَ لَمْ  یَکُنْ لَّهُمْ شُهَدَآءُ  اِلَّاۤ  اَنْفُسُهُمْ فَشَهَادَۃُ اَحَدِهِمْ  اَرْبَعُ شَهٰدٰتٍۭ بِاللّٰهِ ۙ اِنَّہٗ  لَمِنَ الصّٰدِقِیْنَ ﴿۶﴾  وَ الْخَامِسَۃُ اَنَّ لَعْنَتَ اللّٰهِ عَلَیْهِ  اِنْ كَانَ مِنَ  الْکٰذِبِیْنَ ﴿۷﴾

আর যারা নিজদের স্ত্রীর প্রতি অপবাদ আরোপ করে, অথচ নিজেরা ছাড়া তাদের আর কোন সাক্ষী নেই, তাহলে তাদের প্রত্যেকের সাক্ষ্য হবে আল্লাহর নামে চারবার সাক্ষ্য দেবে যে, সে নিশ্চয়ই সত্যবাদীদের অন্তর্ভুক্ত। আর পঞ্চমবারে সাক্ষ্য দেবে যে, সে যদি মিথ্যাবাদী হয়, তবে নিশ্চয় তার উপর আল্লাহর লা‘নত। সূরা নূর : ৬-৭।

নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মুখ ফিরিয়ে তাদের দু’জনকে ডেকে পাঠান। তারা উপস্থিত হলে প্রথমে হেলাল বিন উমাইয়্যা (রাঃ) দাড়িয়ে শপথ করেন এবং নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, আল্লাহ অবশ্যই জানেন যে, তোমাদের মধ্যে একজন মিথ্যাবাদী। অতএব কেও তওবা করবে কি? অতঃপর স্ত্রীলোক দাঁড়িয়ে সাক্ষ্য দিলো। পঞ্চমবারে সে যখন বলতে যাচ্ছিল যে, সে (স্বামী) সত্যবাদী হলে তার নিজের উপর আল্লাহ্‌র গযব পতিত হোক, তখন লোকেরা তাকে বলল, এটি কিন্তু অবধারিতকারী বাক্য। বিন আব্বাস (রাঃ) বলেন, সেই নারী তখন আর কিছু না বলে থেমে গিয়ে পিছনে হটে গেলো। শেষে আমরা মনে করলাম সে হয়তো ফিরে যাবে (বিরত থাকবে)। কিন্তু সে বললো, আল্লাহ্‌র শপথ! আমি আমার সম্প্রদায়কে চিরদিনের জন্য কালিমালিপ্ত করতে পারি না। নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, তোমরা তার প্রতি লক্ষ্য রেখো। সে যদি সুরমাদীপ্ত চোখ, মাংসল নিতম্ব ও মাংসল পদযুগলবিশিষ্ট সন্তান প্রসব করে তবে এটি শরীক বিন সাহমার। অতঃপর সে এই ধরণের সন্তানই প্রসব করলো। তখন নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, আল্লাহ্‌র কিতাবে আগেই যদি (লিআনকারীর) বিধান না দেয়া থাকতো, তাহলে তার ও আমার মধ্যে কিছু একটা ঘটে যেতো (তাকে শাস্তি দিতাম)। সহিহ বুখারী ২৬৭১, ৪৭৪৭, ৫৩০৭,সুনানে ইবনে মাজাহ : ২০৬৭, সুনানে তিরমিযী : ৩১৭৯, সুনানে আবূ দাউদ : ২২৫৪, ২২৫৫, ২২৫৬, আহমাদ : ২৪৬৪, ইরওয়াহ : ২০৯৮, হাদিসটি ইবনে মাজাহ থেকে সংকলন করা হয়েছে।

লিআনের বিধান সম্পর্ক সুরা নুরের আয়াতগুলো হলো-

وَ الَّذِیْنَ یَرْمُوْنَ الْمُحْصَنٰتِ ثُمَّ لَمْ یَاْتُوْا بِاَرْبَعَۃِ  شُهَدَآءَ فَاجْلِدُوْهُمْ ثَمٰنِیْنَ جَلْدَۃً  وَّ لَا تَقْبَلُوْا لَهُمْ شَهَادَۃً  اَبَدًا ۚ وَ اُولٰٓئِكَ هُمُ  الْفٰسِقُوْنَ ۙ﴿۴﴾ اِلَّا الَّذِیْنَ تَابُوْا مِنْۢ بَعْدِ ذٰلِكَ وَ اَصْلَحُوْا ۚ فَاِنَّ  اللّٰهَ  غَفُوْرٌ  رَّحِیْمٌ ﴿۵﴾  وَ الَّذِیْنَ یَرْمُوْنَ اَزْوَاجَهُمْ وَ لَمْ  یَکُنْ لَّهُمْ شُهَدَآءُ  اِلَّاۤ  اَنْفُسُهُمْ فَشَهَادَۃُ اَحَدِهِمْ  اَرْبَعُ شَهٰدٰتٍۭ بِاللّٰهِ ۙ اِنَّہٗ  لَمِنَ الصّٰدِقِیْنَ ﴿۶﴾  وَ الْخَامِسَۃُ اَنَّ لَعْنَتَ اللّٰهِ عَلَیْهِ  اِنْ كَانَ مِنَ  الْکٰذِبِیْنَ ﴿۷﴾  وَ یَدْرَؤُا  عَنْهَا الْعَذَابَ اَنْ تَشْهَدَ اَرْبَعَ شَهٰدٰتٍۭ بِاللّٰهِ ۙ اِنَّہٗ لَمِنَ الْکٰذِبِیْنَ ۙ﴿۸﴾  وَ الْخَامِسَۃَ  اَنَّ غَضَبَ اللّٰهِ عَلَیْهَاۤ  اِنْ  كَانَ مِنَ  الصّٰدِقِیْنَ ﴿۹﴾

আর যারা সচ্চরিত্র নারীর প্রতি অপবাদ আরোপ করে, তারপর তারা চারজন সাক্ষী নিয়ে আসে না, তবে তাদেরকে আশিটি বেত্রাঘাত কর এবং তোমরা কখনই তাদের সাক্ষ্য গ্রহণ করো না। আর এরাই হলো ফাসিক। তবে যারা এরপরে তাওবা করে এবং নিজদের সংশোধন করে, তাহলে নিশ্চয় আল্লাহ বড়ই ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। আর যারা নিজদের স্ত্রীর প্রতি অপবাদ আরোপ করে, অথচ নিজেরা ছাড়া তাদের আর কোন সাক্ষী নেই, তাহলে তাদের প্রত্যেকের সাক্ষ্য হবে আল্লাহর নামে চারবার সাক্ষ্য দেবে যে, সে নিশ্চয়ই সত্যবাদীদের অন্তর্ভুক্ত। আর পঞ্চমবারে সাক্ষ্য দেবে যে, সে যদি মিথ্যাবাদী হয়, তবে নিশ্চয় তার উপর আল্লাহর লা‘নত। আর তারা স্ত্রীলোকটি থেকে শাস্তি রহিত করবে, যদি সে আল্লাহর নামে চারবার সাক্ষ্য দেয় যে, নিশ্চয় তার স্বামী মিথ্যাবাদীদের অন্তর্ভুক্ত। আর পঞ্চমবারে সাক্ষ্য দেবে যে, যদি তার স্বামী সত্যবাদী হয়, তবে নিশ্চয় তার উপর আল্লাহর গযব। সুরা নুর : ৪-৯

এই আয়াতগুলোতে আল্লাহ তাআলা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার এই ধরনের সমস্যার সমাধানের জন্য লি’আন (لعان)-এর বিধান প্রবর্তন করেন। লি’আনের মাধ্যমে স্বামী চারবার আল্লাহর নামে শপথ করে তার অভিযোগের সত্যতা প্রমাণ করবে এবং পঞ্চমবারে মিথ্যা হলে তার ওপর আল্লাহর অভিশাপ কামনা করবে। একইভাবে, স্ত্রীও যদি নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে চায়, তাহলে তাকেও চারবার শপথ করে স্বামীর অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণ করতে হবে এবং পঞ্চমবারে সত্য হলে তার ওপর আল্লাহর ক্রোধ কামনা করবে। এভাবে, আল্লাহ তাআলা এই আয়াতগুলোর মাধ্যমে এমন একটি সমস্যার সমাধান দিয়েছেন, যা সমাজ ও পরিবারের মধ্যে সংঘাত সৃষ্টি করত। একই সাথে, এটি মিথ্যা অপবাদ থেকে নারীকে সুরক্ষা দিয়েছে এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করেছে।

কুরআন সুন্নাহর আলোকে লিআন (لعان) এর বিধান

লি’আন একটি গুরুতর বিষয়, যা সরাসরি দাম্পত্য সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলে। কুরআন ও হাদিসের আলোকে মুজতাহীদ আলেমগণ নিআনের বিস্তরিত ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন। তাদের মতে নিআন সাধারণত দুটি কারণে সংঘটিত হয়:

১. স্বামী যদি স্ত্রীর বিরুদ্ধে ব্যভিচারের অভিযোগ আনে।

২. স্বামী যদি স্ত্রীর গর্ভের সন্তানকে নিজের সন্তান হিসেবে অস্বীকার করে।

এই ধরনের পরিস্থিতিতে, যদি স্বামীর কাছে তার অভিযোগ প্রমাণের জন্য চারজন সাক্ষী না থাকে, তবে স্বামী-স্ত্রী দু’জনকেই বিচারকের সামনে লি’আন করতে হয়। লি’আনের প্রক্রিয়াটি নিম্নরূপ:

ক. স্বামীর শপথ :

স্ত্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগকারী স্বামী চারবার আল্লাহর নামে শপথ মাধ্যমে দাবি করবে যে তিনি যে অভিযোন এনেছেন তা সত্য। এ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন-

وَ الَّذِیْنَ یَرْمُوْنَ اَزْوَاجَهُمْ وَ لَمْ  یَکُنْ لَّهُمْ شُهَدَآءُ  اِلَّاۤ  اَنْفُسُهُمْ فَشَهَادَۃُ اَحَدِهِمْ  اَرْبَعُ شَهٰدٰتٍۭ بِاللّٰهِ ۙ اِنَّہٗ  لَمِنَ الصّٰدِقِیْنَ ﴿۶﴾  وَ الْخَامِسَۃُ اَنَّ لَعْنَتَ اللّٰهِ عَلَیْهِ  اِنْ كَانَ مِنَ  الْکٰذِبِیْنَ ﴿۷﴾

আর যারা নিজদের স্ত্রীর প্রতি অপবাদ আরোপ করে, অথচ নিজেরা ছাড়া তাদের আর কোন সাক্ষী নেই, তাহলে তাদের প্রত্যেকের সাক্ষ্য হবে আল্লাহর নামে চারবার সাক্ষ্য দেবে যে, সে নিশ্চয়ই সত্যবাদীদের অন্তর্ভুক্ত। আর পঞ্চম বারে বলবে যে, সে যদি মিথ্যাবাদী হয় তাহলে তার উপর নেমে আসবে আল্লাহর লা’নত। সুরা নুর : ৬-৭

খ. স্ত্রীর শপথ:

স্বামীর শপথ শেষ হওয়ার পর স্ত্রী চারবার আল্লাহর নামে শপথ করে বলবে যে স্বামী তার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ এনেসে তা মিথ্যা। এ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন-

وَ یَدْرَؤُا  عَنْهَا الْعَذَابَ اَنْ تَشْهَدَ اَرْبَعَ شَهٰدٰتٍۭ بِاللّٰهِ ۙ اِنَّہٗ لَمِنَ الْکٰذِبِیْنَ ۙ﴿۸﴾ وَ الْخَامِسَۃَ  اَنَّ غَضَبَ اللّٰهِ عَلَیْهَاۤ  اِنْ  كَانَ مِنَ  الصّٰدِقِیْنَ ﴿۹﴾

আর তারা স্ত্রীলোকটি থেকে শাস্তি রহিত করবে, যদি সে আল্লাহর নামে চারবার সাক্ষ্য দেয় যে, নিশ্চয় তার স্বামী মিথ্যাবাদীদের অন্তর্ভুক্ত। আর পঞ্চমবারে সাক্ষ্য দেবে যে, যদি তার স্বামী সত্যবাদী হয়, তবে নিশ্চয় তার উপর আল্লাহর গযব। সুরা নুর : ৮-৯

এই আয়াতে আল্লাহর গজবের কথা উল্লেখ করার মাধ্যমে বোঝা যায় যে, এখানে শুধু একটি অভিযোগের সমাধান করা হচ্ছে না, বরং এটি একটি চূড়ান্ত পদক্ষেপ, যা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার সম্পর্কের পবিত্রতা ও বিশ্বাসকে চিরতরে ভেঙে দেয়। এই শপথের পর, স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক চূড়ান্তভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

লি’আনের ফলাফল

লি’আনের পর নিম্নলিখিত ফলাফলগুলো কার্যকর হয়:

১. চিরস্থায়ী বিচ্ছেদ :

লি’আনের মাধ্যমে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে চিরস্থায়ী বিচ্ছেদ ঘটে। এরপর তারা আর কোনো দিন বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারবে না। এটি সাধারণ তালাকের মতো নয়, যেখানে পুনরায় বিবাহ সম্ভব।

ইবনে কুদামা আল-মাকদিসি বলেন-

লি’আনের মাধ্যমে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে যে চিরস্থায়ী বিচ্ছেদ ঘটে, এ বিষয়ে প্রায় সব ফিকহ কিতাবই একমত। এই বিচ্ছেদ এমন যে, তারা আর কোনো দিন পুনরায় বিবাহ করতে পারবে না, এমনকি যদি তারা তওবাও করে। এটি ইমাম শাফেঈ, ইমাম মালিক এবং অন্যান্য অধিকাংশ ফিকহবিদের মত। কিতাব: আল-মুগনি, নবম খণ্ড, পৃ.-৯৮

২. ব্যভিচারের অভিযোগ বাতিল:

স্বামীর করা ব্যভিচারের অভিযোগটি বাতিল হয়ে যায় এবং স্ত্রীর ওপর কোনো শরঈ শাস্তি (যেমন রজম) কার্যকর হয় না। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَیَدۡرَؤُا عَنۡہَا الۡعَذَابَ اَنۡ تَشۡہَدَ اَرۡبَعَ شَہٰدٰتٍۭ بِاللّٰہِ ۙ  اِنَّہٗ لَمِنَ الۡکٰذِبِیۡنَ ۙ

আর তারা স্ত্রীলোকটি থেকে শাস্তি রহিত করবে, যদি সে আল্লাহর নামে চারবার সাক্ষ্য দেয় যে, নিশ্চয় তার স্বামী মিথ্যাবাদীদের অন্তর্ভুক্ত। সুরা নুর : ৮

আলাউদ্দিন আল-কাসানী বলেন-

লি’আনের পর স্ত্রীর বিরুদ্ধে স্বামীর ব্যভিচারের অভিযোগটি বাতিল হয়ে যায় এবং স্ত্রীর ওপর কোনো শরঈ শাস্তি (যেমন রজম বা বেত্রাঘাত) কার্যকর হয় না। এটি তার শপথের ফলেই ঘটে। কিতাব: বাদাই’উস সানাই, পঞ্চম খণ্ড, পৃ.-৩০৯

৩. সন্তানের বংশ বাতিল :

যদি লি’আন সন্তানের বংশ নিয়ে হয়, তবে সেই সন্তানকে আর স্বামীর বংশের বলে গণ্য করা হয় না। সন্তানের পরিচয়ের ক্ষেত্রে মায়ের দিকটিই প্রাধান্য পায়।

ইবনু উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি তার স্ত্রীকে লিআন করায় এবং তার গর্ভের সন্তানকে অস্বীকার করে। রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাদের দু’জনের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে দেন এবং সন্তানটি উক্ত নারীর সাথে যুক্ত করেন। সহিহ বুখারী ৪৭৪৮, ৫৩০৬, ৫৩১১, ৫৩১২, ৫৩১৩, ৫৩১৪, ৫৩১৫, ৫৩৪৯, ৬৭৪৮, সহিহ মুসলিম ১৪৯৩, ১৪৯৪, সুনানে ইবনে মাজাহ : ২০৬৯ সুনানে তিরমিযী : ১২০৩, সুনানে নাসায়ী : ৩৪৭৩, ৩৪৭৪, ৩৪৭৫, ৩৪৭৬, ৩৪৭৭, সুনানে আবূ দাউদ : ২২৫৮, ২২৫৯, হাদিসটি ইবনে মাজাহ থেকে সংকলন করা হয়েছে।

সাহল ইবনু সা’দ আস্ সা’ইদী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, উওয়াইমির আল আজলানী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে বললেন, হে আল্লাহর রসূল! কোনো ব্যক্তি যদি স্বীয় স্ত্রীর সাথে অপর পুরুষকে দেখতে পায় এবং সে যদি তাকে হত্যা করে বসে, তবে কি নিহতের আত্মীয়স্বজন তাকে হত্যা করবে? তবে সে (স্বামী) কি করবে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমার এবং তোমার স্ত্রীর ব্যাপারে ওয়াহী নাযিল হয়েছে, ’যাও তোমার স্ত্রীকে নিয়ে আসো’। বর্ণনাকারী সাহল বলেন, অতঃপর তারা উভয়ে মসজিদে এসে লি’আন করল, আমিও অন্যান্য লোকের সাথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকটে উপস্থিত থেকে ঘটনা প্রত্যক্ষ করছিলাম।

অতঃপর উভয়ে যখন লি’আন শেষ করল, তখন ’উওয়াইমির বলল, আমি যদি তাকে আমার বিবাহের বন্ধনে রাখি, তাহলে আমি তার ওপর মিথ্যারোপ করেছি, এটা বলে সে তাকে তিন তালাক প্রদান করল। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যদি স্ত্রী লোকটি কালো রংয়ের এবং কালো চক্ষুবিশিষ্ট, বড় বড় নিতম্ব, মোটা মোটা পা-বিশিষ্ট সন্তান প্রসব করে, তবে মনে করতে হবে ’উওয়াইমির তার সম্পর্কে সত্য বলেছেন। আর যদি রক্তিম বর্ণের ক্ষুদ্রাকৃতির কীটের ন্যায় সন্তান প্রসব করে, তবে মনে করব ’উওয়ামির মিথ্যা অপবাদ দিয়েছে। বর্ণনাকারী বলেন, অতঃপর স্ত্রীলোক এমন বর্ণের সন্তান প্রসব করল যেরূপ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বর্ণনা দিয়েছিলেন- সে সেরূপ সন্তানই প্রসব করল।’ এর দ্বারা ’উয়াইমির-এর দাবির সত্যতার ধারণা জন্মে, অতঃপর সন্তানটিকে (পিতার পরিবর্তে) মায়ের পরিচয়ে ডাকা হতো। সহিহ বুখারি : ৪২৩, ৪৭৪৫, সহিহ মুসলিম : ১৪৯২, সুনানে নাসায়ী : ৩৪০২, দারিমী : ২২৭৫।

আবু ইসহাক আশ-শিরাজি বলেছেন-

যদি লি’আন সন্তানের বংশ নিয়ে হয়, তাহলে সেই সন্তানকে আর স্বামীর বংশের বলে গণ্য করা হয় না। এর ফলে সন্তানের বংশপরিচয় তার মায়ের দিক থেকেই নির্ধারিত হয়। আল-মুহাজ্জাব, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃ.-১৫৫

৪. লি‘আনকারিণীর মোহর ফেরত দিতে হবে না

সা’ঈদ ইবনু যুবায়র (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ইবনু উমারকে জিজ্ঞেস করলাম, এক লোক তার স্ত্রীকে অপবাদ দিল (বিধান কী?), তিনি বললেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বনূ ’আজলানের স্বামী-স্ত্রীর দু’জনকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিলেন এবং তিনি বলেছিলেন, আল্লাহ তা’আলা জানেন তোমাদের একজন অবশ্যই মিথ্যাচারী। কাজেই তোমাদের কেউ তওবা করতে রাযী আছ কি? তারা দু’জনেই অস্বীকার করল। তিনি পুনরায় বললেনঃ আল্লাহ তা’আলা অবহিত আছেন তোমাদের একজন মিথ্যাচারী, সুতরাং কেউ তওবা করতে প্রস্তুত আছ কি? তারা আবারও অস্বীকার করল। তিনি পুনরায় বললেনঃ আল্লাহ তা’আলা অবহিত আছেন তোমাদের একজন মিথ্যাচারী সুতরাং কেউ তওবা করতে প্রস্তুত আছ কি? তারা আবারও অস্বীকার করল।

এরপর তিনি তাদেরকে পৃথক করে দেন। আইয়ুব বলেন, আমাকে আমর ইবনু দ্বীনার (রহ.) বললেন, এ হাদীসে আরও কিছু কথা আছে, তোমাকে তা বর্ণনা করতে দেখছি না কেন? তিনি বলেন, লোকটি বলল, আমার (দেয়া) মালের কী হবে? তাকে বলা হল, তোমার মাল ফিরে পাবে না। যদি তুমি সত্যবাদী হও, (তবুও পাবে না)। (কেননা) তুমি তার সঙ্গে সহবাস করেছ। আর যদি তুমি মিথ্যাচারী হও, তবে তা পাওয়া তো বহু দূরের ব্যাপার। সহিহ বুখারি : ৫৩১১, ৫৩১২, ৫৩৪৯, ৫৩৫০, সহহি মুসলিম : ১৪৯৩, মিশকাত : ৩৩০৬, সুনানে আবূ দাঊদ : ২২৫৭, সুনানে  নাসায়ী : ৩৪৭৬, আহমাদ : ৪৫৮৭, সহীহ ইবনু হিব্বান : ৪২৮৭।

৫. স্ত্রীক অন্য পুরুষের সাথে দেখলে হত্যা করা যাবে না

মুগীরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, সা’দ ইবনু ’উবাদাহ (রাঃ) বললেন, আমি আমার স্ত্রীর সঙ্গে অন্য কোন পুরুষকে যদি দেখি, তাকে সরাসরি তরবারি দিয়ে হত্যা করব। এ কথা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে পৌঁছলে তিনি বললেন, তোমরা কি সাদের আত্মমর্যাদাবোধ দেখে বিস্মিত হচ্ছ? আল্লাহর শপথ! আমি তার চেয়েও অধিক আত্মমর্যাদাসম্পন্ন। আর আল্লাহ্ আমার চেয়েও অধিক আত্মমর্যাদাসম্পন্ন। আল্লাহ্ আত্মমর্যাদাবোধ সম্পন্ন হবার কারণে প্রকাশ্য ও গোপনীয় (যাবতীয়) অশ্লীলতাকে হারাম করে দিয়েছেন। অক্ষমতা প্রকাশকে আল্লাহর চেয়ে অধিক পছন্দ করেন এমন কেউই নেই। আর এজন্য তিনি ভীতি প্রদর্শনকারী ও সুসংবাদদাতাদেরকে পাঠিয়েছেন। আত্মপ্রশংসা আল্লাহর চেয়ে অধিক কারো কাছে প্রিয় নয়। তাই তিনি জান্নাতের ওয়াদা দিয়েছেন। সহিহ বুখারি : ৬৮৪৬, ৭৪১৬, সহিহ  মুসলিম : ১৪৯৯, মিশকাত : ৩৩০৯, আহমাদ : ১৮১৬৮, সহীহ ইবনু হিব্বান : ৫৭৭৩

৬. সন্দেহের কারনে সন্তানের পিতৃপরিচয় অস্বীকরা করা যাবে না

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, এক বেদুঈন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে বলল, আমার স্ত্রী একটি কালো সন্তান জন্ম দিয়েছে। আর আমি তাকে (আমার সন্তান হিসাবে) অস্বীকার করছি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমার কি উট আছে? সে বলল, হ্যাঁ আছে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন,সেগুলোর কী রঙ? সে বলল, লাল। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, সেগুলোর মাঝে সাদা কালো মিশ্রিত রঙের কোন উট আছে কি? সে বলল, হ্যাঁ, সাদা কালো মোশানো রঙের অনেকগুলো আছে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন এ রং কিভাবে এল বলে তুমি মনে কর? সে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! বংশ সূত্রের প্রভাবে এমন হয়েছে। তিনি বললেনঃ সম্ভবত তোমার সন্তানও বংশ সূত্রের প্রভাবে (পূর্বপুরুষের কেউ কালো ছিল বলে) এমন হয়েছে। এবং তিনি এ সন্তানটিকে অস্বীকার করার অনুমতি লোকটিকে দিলেন না। সহিহ বুখারি : ৫৩০৫, ৭৩১৪, মুসলিম ১৫০০, আবূ দাঊদ ২২৬২, নাসায়ী ৩৪৭৮, তিরমিযী ২১২৮, ইবনু মাজাহ ২০০২, আহমাদ ৭২৬৪

লি’আনের বিধানটি ইসলামে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি মিথ্যা অভিযোগের হাত থেকে স্ত্রীকে সুরক্ষা দেয় এবং একই সাথে সন্তানের বংশপরিচয় নিয়ে সৃষ্ট জটিলতা নিরসন করে। এটি একটি গুরুতর পদক্ষেপ, যা কেবল চরম পরিস্থিতিতেই শরঈ বিচারকের তত্ত্বাবধানে নেওয়া হয়।

ঈলার বিধান

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

ইসলামী শরীয়তে ঈলা (الإيلاء) একটি বিশেষ পরিভাষা, যা আরবি আল্‌ই (أَلْي) শব্দ থেকে এসেছে, যার মূল অর্থ শপথ করা। মহাগ্রন্থ কুরআনে (یُؤۡلُوۡنَ) ইউলুনা হিসেবে এসেছে। যার অর্থ শপথ (সম্পর্ক না রাখার) করে।

শরীয়তের পরিভাষায়, ঈলা হলো এমন একটি শপথ, যেখানে কোনো স্বামী তার স্ত্রীর সঙ্গে চার মাস বা তার বেশি সময় ধরে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন না করার প্রতিজ্ঞা করে। এই ধরনের শপথের ক্ষেত্রে, স্বামী যদি চার মাসের মধ্যে তার স্ত্রীর কাছে ফিরে আসে এবং শপথ ভঙ্গ করে, তাহলে তাদের দাম্পত্য সম্পর্ক বহাল থাকবে। তবে শপথ ভঙ্গের জন্য তাকে কাফফারা (প্রায়শ্চিত্ত) দিতে হবে। যদি চার মাস পার হয়ে যায় এবং স্বামী ফিরে না আসে, তাহলে স্বামী স্ত্রীর মাঝে তালাক হয়ে যাবে। অবশ্য কোন কোন মুজতাহিদ আলেম তালাক না হওয়ার পক্ষেও মতামত দিয়েছেন।

উম্মু সালামাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর কতক স্ত্রীর সংস্পর্শে না আসার জন্য এক মাসের ঈলা করেছিলেন। উনতিরিশ দিন অতিবাহিত হওয়ার পর বিকালে অথবা সকালে তিনি (স্ত্রীদের নিকট) আসেন। বলা হলো, হে আল্লাহ্‌র রসূল! ঊনতিরিশ দিন তো অতিবাহিত হয়েছে? তিনি বললেন, মাস ঊনতিরিশ দিনেও হয়। সহীহুল বুখারী ১৯১০, সহিহ মুসলিম : ১০৮৫, সুনানে ইবনে মাজাহ : ২০৬১, আহমাদ : ২৬১৪৩

আয়িশা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই মর্মে শপথ করেন, একমাস যাবত তার স্ত্রীদের সংস্পর্শে যাবেন না। তিনি একাধারে উনত্রিশ দিন এভাবে কাটিয়ে দিলেন। অবশেষে তিরিশ দিনের সন্ধ্যা হলে তিনি আমার নিকট আসেন। আমি বললাম, আপনি তো শপথ করেছিলেন যে, আপনি একমাস আমাদের সংস্পর্শে আসবেন না। তিনি বলেন, মাস এভাবেও হয়। তিনি তাঁর দু’হাতের আঙ্গুলসমূহ তিনবার সম্পূর্ণ উন্মুক্ত রেখে ইশারায় বলেন, মাস এভাবেও হয়, তিনি পুনরায় (দু’বার পূর্বোক্ত নিয়মে দেখান) কিন্তু তিনি তৃতীয় বারে তিনি একটি আঙ্গুল মুষ্টিবদ্ধ রাখেন (অর্থাৎ মাস উনতিরিশ দিনেও হয়)। সহিহ বুখারি : ৫২৬৯, ৫২৯৯, ১৯১১, সহিহ মুসলিম : ১৪৫৬ সুনানে ইবনে মাজাহ : ২০৫৯,  আহমাদ : ২৩৫৩০, হাদিসটি ইবনে মাজাহ থেকে নেওয়া হয়েছে।

ঈলার বিধান

স্বামী যদি তার স্ত্রীর সাথে ঈলা (অর্থাৎ, সহবাস না করার শপথ) করে, তবে স্ত্রীকে চার মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। এই সময়কালে স্ত্রী তার স্বামীর ফিরে আসার বা শপথ ভাঙার জন্য অপেক্ষা করে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

لِلَّذِیۡنَ یُؤۡلُوۡنَ مِنۡ نِّسَآئِہِمۡ تَرَبُّصُ اَرۡبَعَۃِ اَشۡہُرٍ ۚ فَاِنۡ فَآءُوۡ فَاِنَّ اللّٰہَ غَفُوۡرٌ رَّحِیۡمٌ

যারা তাদের স্ত্রীদের সাথে মিলিত না হওয়ার শপথ করবে তারা চার মাস অপেক্ষা করবে। অতঃপর তারা যদি ফিরিয়ে নেয়, তবে নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। সুরা বাকারা : ২২৬

এই আয়াতে মূলত ‘ঈলা’র বিধান বর্ণনা করা হয়েছে। ‘ঈলা’ হলো এমন একটি শপথ, যেখানে একজন স্বামী তার স্ত্রীর সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করবে না বলে কসম খায়। জাহিলিয়াতের যুগে এমন শপথ অনির্দিষ্টকালের জন্য করা হতো, যার ফলে স্ত্রীরা এক প্রকার অনিশ্চিত ও কষ্টকর অবস্থায় জীবনযাপন করত। ইসলাম এই প্রথার অবসান ঘটিয়ে এর একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে।

১. ঈলার সময়সীমা:

আল্লাহ তা’আলা এমন শপথের জন্য চার মাসের একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন। এর অর্থ হলো, যদি কোনো স্বামী তার স্ত্রীর সাথে মিলিত না হওয়ার শপথ করে, তবে এই শপথ সর্বোচ্চ চার মাস পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। এই সময়ের মধ্যে স্ত্রীর অধিকার খর্ব করা হয় না, বরং তাকে এই সময়ের মধ্যে ফিরে আসার বা সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়।

২. চার মাসের মধ্যে ফিরে আসা

চার মাসের সময়সীমার মধ্যে যদি স্বামী তার শপথ থেকে ফিরে আসে, অর্থাৎ স্ত্রীর সাথে সম্পর্ক স্থাপন করে, তাহলে আল্লাহ তা’আলা তাকে ক্ষমা করে দেবেন। কারণ এই ধরনের শপথ একটি অন্যায় কাজ এবং এর থেকে ফিরে আসাই সঠিক কাজ। যদি কোনো স্বামী চার মাস পূর্ণ হওয়ার আগেই তার শপথ ভঙ্গ

জকরে স্ত্রীর সাথে সম্পর্ক স্থাপন করে, তবে শপথ ভাঙার জন্য তাকে কাফফারা দিতে হবে। কসমের কাফফারা সম্পর্কে ইসলামি শরীয়তেন স্পষ্ট বিধান আছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

لَا یُؤَاخِذُکُمُ اللّٰہُ بِاللَّغۡوِ فِیۡۤ اَیۡمَانِکُمۡ وَلٰکِنۡ یُّؤَاخِذُکُمۡ بِمَا عَقَّدۡتُّمُ الۡاَیۡمَانَ ۚ فَکَفَّارَتُہٗۤ اِطۡعَامُ عَشَرَۃِ مَسٰکِیۡنَ مِنۡ اَوۡسَطِ مَا تُطۡعِمُوۡنَ اَہۡلِیۡکُمۡ اَوۡ کِسۡوَتُہُمۡ اَوۡ تَحۡرِیۡرُ رَقَبَۃٍ ؕ فَمَنۡ لَّمۡ یَجِدۡ فَصِیَامُ ثَلٰثَۃِ اَیَّامٍ ؕ ذٰلِکَ کَفَّارَۃُ اَیۡمَانِکُمۡ اِذَا حَلَفۡتُمۡ ؕ وَاحۡفَظُوۡۤا اَیۡمَانَکُمۡ ؕ کَذٰلِکَ یُبَیِّنُ اللّٰہُ لَکُمۡ اٰیٰتِہٖ لَعَلَّکُمۡ تَشۡکُرُوۡنَ

আল্লাহ তোমাদেরকে পাকড়াও করেন না তোমাদের অর্থহীন কসমের ব্যাপারে, কিন্তু যে কসম তোমরা দৃঢ়ভাবে কর সে কসমের জন্য তোমাদেরকে পাকড়াও করেন। সুতরাং এর কাফফারা হল দশ জন মিসকীনকে খাবার দান করা, মধ্যম ধরনের খাবার, যা তোমরা স্বীয় পরিবারকে খাইয়ে থাক, অথবা তাদের বস্ত্র দান, কিংবা একজন দাস-দাসী মুক্ত করা। অতঃপর যে সামর্থ্য রাখে না তবে তিন দিন সিয়াম পালন করা। এটা তোমাদের কসমের কাফ্ফারা, যদি তোমরা কসম কর, আর তোমরা তোমাদের কসম হেফাযত কর। এমনিভাবে আল্লাহ তোমাদের জন্য তাঁর আয়াতসমূহ বর্ণনা করেন যাতে তোমরা শোকর আদায় কর।

সুরা মায়েদা : ৮৯

৩. শপথের সীমা চার মাস অতিক্রম করলে

যদি চার মাস পার হয়ে যায় এবং স্বামী তার শপথ না ভাঙে, তবে স্ত্রী বিচারকের কাছে বিবাহবিচ্ছেদের জন্য আবেদন করতে পারেন। হাদিসে বর্ণিত সাহাবিদের পরামর্শ অনুযায়ী, বিচারক তখন স্বামীকে দুটি বিকল্পের মধ্যে যেকোনো একটি বেছে নিতে বলবেন:

ক. শপথ ভেঙে স্ত্রীর সঙ্গে দাম্পত্য জীবন পুনরায় শুরু করা।

খ. স্ত্রীকে তালাক দিয়ে সম্পূর্ণরূপে সম্পর্ক ছিন্ন করা।

৪. ঈলা চার মাস পূর্ণ হলে কি স্ত্রী তালাক হয়ে যাবে?

যদি চার মাস পার হয়ে যায় এবং স্বামী ফিরে না আসে বা শপথ ভঙ্গ না করে, তাহলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তালাক হয়ে যাবে কি না, এ বিষয়ে ইমামদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।

ক. হানাফি, মালিকি ও হাম্বলি মাযহাব:

এই তিনটি মাযহাব অনুযায়ী, চার মাস পূর্ণ হওয়ার পর যদি স্বামী স্ত্রীর কাছে ফিরে না আসে, তাহলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি তালাকে বায়েন (অপ্রত্যাবর্তনীয় তালাক) পতিত হয়। এই তালাকের জন্য আদালতের হস্তক্ষেপের প্রয়োজন নেই।

হানাফি মাযহাব :

আল-জাসসাস তার বিখ্যাত গ্রন্থ আহকামুল কুরআন-এ বলেছেন, “যদি চার মাস অতিবাহিত হয় এবং সে ফিরে না আসে, তবে তালাক হয়ে যাবে।” আহকামুল কুরআন, প্রথম খণ্ড,পৃ. ৩৫৫-৩৫৬

মালিকি মাযহাব :

ইমাম মালিক তার আল-মুয়াত্তা-এ বলেছেন, “যদি চার মাস পূর্ণ হয় এবং স্বামী ফিরে না আসে, তবে তা তালাক।” ইমাম মালিক ইবনে আনাস, আল-মুয়াত্তা, তালাক অধ্যায় হাদিস : ১১৭২

হাম্বলি মাযহাব :

ইবনে কুদামা তার আল-মুগনি-তে উল্লেখ করেছেন, “ঈলাকারী যদি চার মাস পার হওয়ার পরও ফিরে না আসে, তাহলে তালাক পতিত হবে।” ইবনে কুদামা আল-মাকদিসি, আল-মুগনি, খণ্ড ৯, পৃ.-১৮৮-১৯১

খ. শাফেয়ি মাযহাব:

শাফেয়ি মাযহাবের মতে, চার মাস পার হওয়ার পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে তালাক হয় না। বরং স্ত্রী চাইলে বিচারকের কাছে অভিযোগ করবে এবং বিচারক তাকে ফিরে আসার নির্দেশ দেবেন। যদি সে ফিরে না আসে, তবে বিচারকই তালাক কার্যকর করবেন।

ইমাম শাফেয়ি তার কিতাবুল উম্ম-এ এই মত তুলে ধরেছেন। সেখানে তিনি বলেন, “চার মাস পূর্ণ হলে বিচারক তাকে (স্বামী) ডেকে বলবেন, হয় ফিরে আসো, অথবা তালাক দাও। যদি সে কোনোটিই না করে, তবে বিচারকই তালাক কার্যকর করবেন।” ইমাম শাফেয়ি, কিতাবুল উম্ম, পঞ্চম খণ্ড, পৃ.- ১৫২-১৫৪

এই মতভেদের মূল কারণ হলো সূরা বাকারার ২২৭ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যা, যেখানে বলা হয়েছে, “আর যদি তারা তালাকের সংকল্প করে, তবে আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।”

 শাফেয়ি মাযহাবের আলেমরা মনে করেন, ‘সংকল্প’ কথাটি তালাকের জন্য ইচ্ছাকৃত পদক্ষেপের ইঙ্গিত দেয়, যা আদালতের হস্তক্ষেপের মাধ্যমে কার্যকর হয়।

ইদ্দতের বিধান

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

ইদ্দত’ (عدة) হলো ইসলামী শরীয়াহ অনুযায়ী একটি নির্দিষ্ট সময়, যা কোনো নারী তার স্বামী থেকে তালাক বা মৃত্যু পর পালন করে। এর প্রধান উদ্দেশ্য হলো নারীর গর্ভাশয়ের পবিত্রতা নিশ্চিত করা, যাতে তার বংশপরিচয় নিয়ে কোনো সংশয় না থাকে।

ইদ্দত হলো এমন একটি সময়সীমা, যা তালাকপ্রাপ্ত বা বিধবা নারীকে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত পালন করতে হয়। ইদ্দতের মাধ্যমে ইসলাম নারীর মর্যাদা ও অধিকার রক্ষা করে, পারিবারিক ও সামাজিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করে এবং বংশের পবিত্রতা রক্ষায় ভূমিকা রাখে। ইদ্দতেত প্রধান প্রধান উপকারি দিক হলো—

১. ইদ্দত নারীর মর্যাদা ও অধিকার রক্ষা করে

মানসিক প্রশান্তি : তালাক বা স্বামীর মৃত্যুর পর নারীদের জন্য ইদ্দত একটি মানসিক প্রশান্তির সুযোগ দেয়। এই সময়টুকুতে তারা শোক কাটাতে পারে এবং জীবনের নতুন অধ্যায়ের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত হতে পারে। জোর করে দ্রুত নতুন সম্পর্কে জড়ানো থেকে এটি নারীকে রক্ষা করে।

ভরণপোষণ : তালাকপ্রাপ্তা নারী ইদ্দতকালীন সময়ে তার স্বামীর ঘরেই থাকবে এবং তার ভরণপোষণ স্বামীকেই বহন করতে হবে। এটি নারীর অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। কারণ এই সময়ে সে হয়তো মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে এবং জীবিকা অর্জনের জন্য প্রস্তুত নয়।

শোভনতা ও সম্মান : বিধবা নারীর জন্য ইদ্দত পালন করা তার স্বামীর প্রতি সম্মান ও ভালোবাসা প্রকাশের একটি উপায়। এটি সমাজে তাকে একটি সম্মানজনক অবস্থান দেয় এবং তার দুঃখের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করে।

২. পারিবারিক ও সামাজিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করে

সমঝোতার সুযোগ : তালাকপ্রাপ্তা নারীর ইদ্দতকাল সাধারণত তিন মাসিক। এই সময় স্বামী-স্ত্রী উভয়েই তাদের সিদ্ধান্ত নিয়ে পুনরায় চিন্তা করার সুযোগ পায়। যদি তারা ইদ্দতের মধ্যে আবার সম্পর্ক ফিরিয়ে নিতে চায়, তাহলে তা সহজেই করতে পারে। এটি অনেক সময় ভেঙে যাওয়া সংসারকে নতুন করে জোড়া লাগাতে সাহায্য করে।

নতুন সম্পর্কের প্রস্তুতি : ইদ্দত শেষ হওয়ার পর নারী নতুন করে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারে। এটি সমাজে এক ধরনের শৃঙ্খলা নিয়ে আসে। নতুন সম্পর্কের আগে একটি নির্দিষ্ট সময় অপেক্ষা করা নারী ও তার সম্ভাব্য নতুন পরিবারের জন্য একটি সুস্থ ও স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।

৩. বংশের পবিত্রতা রক্ষায় ভূমিকা রাখে

গর্ভধারণ নিশ্চিত করা: ইদ্দতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এটি নিশ্চিত করে যে তালাকপ্রাপ্তা বা বিধবা নারী গর্ভবতী কি না। যদি কোনো নারীর গর্ভে তার প্রাক্তন স্বামীর সন্তান থাকে, তাহলে ইদ্দত শেষ হওয়ার আগে সে অন্য কোথাও বিবাহ করতে পারে না।

ইদ্দতের কারণে বংশের পরিচয় নিয়ে কোনো সন্দেহ থাকে না। যদি নারীটি ইদ্দত শেষ হওয়ার আগেই নতুন বিবাহ করে এবং গর্ভবতী হয়, তাহলে কার সন্তান তা নিয়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে। ইদ্দত এই ধরনের জটিলতা দূর করে এবং সন্তানের পিতৃত্ব সঠিকভাবে নির্ণয় করতে সাহায্য করে। এটি সন্তানের অধিকার ও সামাজিক মর্যাদা রক্ষা করে।

সুতরাং, ইদ্দতকে শুধু একটি ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা হিসেবে না দেখে, এটি নারী, পরিবার এবং সমাজের জন্য কল্যাণকর একটি ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। এটি ইসলামে নারীর অধিকার ও মর্যাদা রক্ষার এক অনন্য উদাহরণ।

ইদ্দত পালনের বিধান

ইদ্দত পালন করা প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম নারীর জন্য ফরজ। তালাকপ্রাপ্তা নারীর জন্য ইদ্দত হলো তিনটি পূর্ণ মাসিক ঋতুস্রাব, যদি তার মাসিক হয়। যাদের মাসিক হয় না, তাদের জন্য এই সময়কাল তিন মাস। গর্ভবতী নারীর জন্য ইদ্দত হলো সন্তান প্রসব পর্যন্ত। অন্যদিকে, স্বামীর মৃত্যুর পর কোনো নারীর জন্য ইদ্দত হলো চার মাস দশ দিন। তবে, যদি তিনি গর্ভবতী হন, তবে তার ইদ্দতকালও সন্তান প্রসব পর্যন্ত। ইদ্দতের এই সময়কালে নারী অন্য কোনো পুরুষকে বিবাহ করতে পারবে না। ইদ্দতের সময়কাল বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভিন্ন হয়। নিচে সে সম্পর্কে আলোচনা করা হলো–

১. তালাকের ইদ্দত

তালাকের ক্ষেত্রে ইদ্দতকাল নির্ভর করে নারীর শারীরিক অবস্থার উপর।

ক. মাসিক হয় এমন নারীর জন্য :

তালাকপ্রাপ্তা নারীর জন্য ইদ্দত হলো তিনটি পূর্ণ মাসিক ঋতুস্রাব। এই সময়ের মধ্যে যদি তার তিনবার মাসিক হয়, তাহলে তার ইদ্দত পূর্ণ হবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَالۡمُطَلَّقٰتُ یَتَرَبَّصۡنَ بِاَنۡفُسِہِنَّ ثَلٰثَۃَ قُرُوۡٓءٍ ؕ 

এবং তালাক প্রাপ্তাগণ তিন ঋতু পর্যন্ত অপেক্ষা করবে। সুরা বাকারা : ২২৮

খ. মাসিক হয় না এমন নারীর জন্য :

যে সকল নারীর মাসিক হয় না (বয়সের কারণে বা অন্য কোনো শারীরিক সমস্যার কারণে), তাদের জন্য ইদ্দত হলো তিন মাস। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

  وَالّٰٓیِٴۡ یَئِسۡنَ مِنَ الۡمَحِیۡضِ مِنۡ نِّسَآئِکُمۡ اِنِ ارۡتَبۡتُمۡ فَعِدَّتُہُنَّ ثَلٰثَۃُ اَشۡہُرٍ ۙ وَّالّٰٓیِٴۡ لَمۡ یَحِضۡنَ ؕ

তোমাদের স্ত্রীদের মধ্যে যারা ঋতুবর্তী হওয়ার কাল অতিক্রম করে গেছে, তাদের ইদ্দত সম্পর্কে তোমরা যদি সংশয়ে থাক এবং যারা এখনও ঋতুর বয়সে পৌঁছেনি তাদের ইদ্দতকালও হবে তিন মাস। সুরা তালাক : ৪

গ. গর্ভবতী নারীর জন্য :

গর্ভবতী নারীর জন্য ইদ্দত হলো সন্তান প্রসব পর্যন্ত। সন্তান প্রসবের পর পরই তার ইদ্দত শেষ হয়ে যায়, এমনকি যদি তা তালাকের এক মুহূর্ত পরেই হয়।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَاُولَاتُ الۡاَحۡمَالِ اَجَلُہُنَّ اَنۡ یَّضَعۡنَ حَمۡلَہُنَّ ؕ وَمَنۡ یَّتَّقِ اللّٰہَ یَجۡعَلۡ لَّہٗ مِنۡ اَمۡرِہٖ یُسۡرًا

 আর গর্ভধারিনীদের ইদ্দতকাল সন্তান প্রসব পর্যন্ত। যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য তার কাজকে সহজ করে দেন। সুরা তালাক : ৪

২. স্বামীর মৃত্যুর পর ইদ্দত

যদি কোনো নারীর স্বামী মারা যায়, তবে তার ইদ্দতকাল হলো:

ক. সাধারণ নারীর জন্য :

স্বামীর মৃত্যুর পর ইদ্দত হলো চার মাস দশ দিন। এই সময়কালে তাকে শোক পালন করতে হয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَالَّذِیۡنَ یُتَوَفَّوۡنَ مِنۡکُمۡ وَیَذَرُوۡنَ اَزۡوَاجًا یَّتَرَبَّصۡنَ بِاَنۡفُسِہِنَّ اَرۡبَعَۃَ اَشۡہُرٍ وَّعَشۡرًا ۚ فَاِذَا بَلَغۡنَ اَجَلَہُنَّ فَلَا جُنَاحَ عَلَیۡکُمۡ فِیۡمَا فَعَلۡنَ فِیۡۤ اَنۡفُسِہِنَّ بِالۡمَعۡرُوۡفِ ؕ وَاللّٰہُ بِمَا تَعۡمَلُوۡنَ خَبِیۡرٌ

আর তোমাদের মধ্য থেকে যারা মারা যাবে এবং স্ত্রীদেরকে রেখে যাবে, তাদের স্ত্রীগণ চার মাস দশ দিন অপেক্ষায় থাকবে। অতঃপর যখন তারা ইদ্দতকাল পূর্ণ করবে, তখন তারা নিজদের ব্যাপারে বিধি মোতাবেক যা করবে, সে ব্যাপারে তোমাদের কোন পাপ নেই। আর তোমরা যা কর, সে ব্যাপারে আল্লাহ সম্যক অবগত। সূরা বাকারা : ২৩৪

যায়নাব বিনতু আবূ সালামা (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সহধর্মিণী হাবীবাহ (রাযিঃ) এর কাছে তার পিতা আবূ সুফইয়ানের ইনতিকালের খবর পৌঁছল তখন তৃতীয় দিনে তিনি হলুদ বর্ণের সুগন্ধি চেয়ে পাঠালেন এবং তার দু’হাতে গায়ে ভাল করে তা মেখে নিলেন। আর বললেন, আমার এর কোন প্রয়োজন ছিল না। তবে আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি যে, যে মহিলা আল্লাহ ও আখিরাতে বিশ্বাস রাখে তার পক্ষে কারো মৃত্যুতে তিন দিনের বেশি শোক পালন করা হালাল নয়। তবে স্বামীর মৃত্যুর ব্যাপারটি স্বতন্ত্র। কেননা সে তার স্বামীর মৃত্যুতে চারমাস দশদিন শোক পালন করবে। সহিহ বুখারি : ৫৩৩৪, সহিহ মুসলিম : ১৪৮৬, সুনানে আবু দাউদ : ২৩১৯, সুনানে নাসায়ী : ৩৫২৭, আহমাদ : ২৬৭৫৪, সহীহ আত্ তারগীব : ৩৫৩৭।

খ. গর্ভবতী নারীর জন্য:

যদি কোনো নারী তার স্বামীর মৃত্যুর সময় গর্ভবতী থাকে, তাহলে তার ইদ্দত হলো সন্তান প্রসব পর্যন্ত, ঠিক তালাকপ্রাপ্তা গর্ভবতী নারীর মতোই। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَاُولَاتُ الۡاَحۡمَالِ اَجَلُہُنَّ اَنۡ یَّضَعۡنَ حَمۡلَہُنَّ ؕ وَمَنۡ یَّتَّقِ اللّٰہَ یَجۡعَلۡ لَّہٗ مِنۡ اَمۡرِہٖ یُسۡرًا

আর গর্ভধারিনীদের ইদ্দতকাল সন্তান প্রসব পর্যন্ত। যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য তার কাজকে সহজ করে দেন। সুরা তালাক : ৪

মিসওয়ার ইবনু মাখরামাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, সুবায়’আ আসলামীয়া তার স্বামীর মৃত্যুর কয়েকদিন পর সন্তান প্রসব করে। এরপর সে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে বিয়ে করার অনুমতি প্রার্থনা করে, তিনি তাকে অনুমতি দেন। তখন সে বিয়ে করে।সহিহ বুখারি : ৫৩২০, মিশকাত : ৩৩২৮, সুনানে নাসায়ী : ৩৫০৬

আবূ সালামাহ (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) ইবনু ’আব্বাস (রাঃ)-এর কাছে ছিলেন, এমন সময় এক ব্যক্তি ইবনু ’আব্বাস (রাঃ)-এর কাছে এলেন এবং বললেন, এক মহিলা তাঁর স্বামীর মৃত্যুর চল্লিশ দিন পর বাচ্চা প্রসব করেছে। সে এখন কীভাবে ইদ্দত পালন করবে, এ বিষয়ে আমাকে ফতোয়া দিন। ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) বললেন, ইদ্দত সম্পর্কিত হুকুম্ দু’টির যেটি দীর্ঘ, তাকে সেটি পালন করতে হবে। আবূ সালামাহ (রহ.) বলেন, আমি বললাম, আল্লাহর হুকুম তো হলঃ গর্ভবতী নারীদের ইদ্দতকাল সন্তান প্রসব পর্যন্ত। আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) বলেন, আমি আমার ভ্রাতুষ্পুত্র অর্থাৎ আবূ সালামাহর সঙ্গে আছি। তখন ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) তাঁর ক্রীতদাস কুরায়বকে বিষয়টি জিজ্ঞেস করার জন্য উম্মু সালামাহ (রাঃ)-এর কাছে পাঠালেন। তিনি বললেন, সুবায়’আ আসলামিয়া (রাঃ)-এর স্বামীকে হত্যা করা হল, তিনি তখন গর্ভবতী ছিলেন। স্বামীর মৃত্যুর চল্লিশ দিন পর তিনি সন্তান প্রসব করলেন। এরপরই তার কাছে বিয়ের প্রস্তাব পাঠানো হল। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বিয়ে করিয়ে দিলেন। যারা তাকে বিয়ে করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন আবুস্ সানাবিল তাদের মধ্যে একজন। সহিহ বুখারি : ৪৯০৯, ৫৩১৮, সহিহ মুসলিম : ১৪৮৪

নোট : ইদ্দত পালন করা আল্লাহর স্পষ্ট হুকুম, তাই এটি প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম নারীর জন্য ফরজ। এক কথায় বলেতে গেলে -তালাকের ক্ষেত্রে ইদ্দত ৩ হায়েজ/৩ মাস। স্বামী মারা গেলে ইদ্দত ৪ মাস ১০ দিন কিন্তু গর্ভবতী হলে ইদ্দত সন্তান জন্ম দেওয়া পর্যন্ত।

ইদ্দত পালনের সময় করণীয়

ইদ্দত পালনকারী নারীকে কিছু নিয়ম মেনে চলতে হয়:

১. বাড়িতে অবস্থান:

ইদ্দতকালীন সময়ে নারীকে তার স্বামীর বাড়ি বা যেখানে বিচ্ছেদ হয়েছে, সেখানেই অবস্থান করতে হবে এবং প্রয়োজন ছাড়া বাইরে যাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।

২০৩১। ফুরাইআ বিনতে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমার স্বামী তার (পলাতক) গোলামের খোঁজে রওয়ানা হয়ে কাদূম নামক স্থানে তাদের ধরে ফেলেন। তারা আমার স্বামীকে হত্যা করে। যখন আমার স্বামীর মৃত্যুসংবাদ আসে, তখন আমি আমার পরিবার-পরিজন থেকে অনেক দূরে আনসারদের বসতিতে অবস্থান করছিলাম। আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট এসে বললাম, হে আল্লাহর রসূল! যখন আমার স্বামীর মৃত্যুর সংবাদ এলো তখন আমি আমার পরিজন ও ভাইদের বাড়ি থেকে দূরে বসবাস করছিলাম। তিনি আমার ভরণপোষণের জন্য কোন মাল রেখে যাননি এবং তার এমন কোন মালও নেই, আমি যার ওয়ারিস হতে পারি, এমনকি তার মালিকানাভুক্ত কোন ঘরও নাই। আপনি আমাকে অনুমতি দিলে আমি আমার পরিবার ও ভাইদের বাড়িতে গিয়ে উঠতে পারি। আর এটা আমার জন্য অধিক প্রিয় এবং বিভিন্ন দিক দিয়ে সুবিধাজনকও। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তুমি চাইলে তা করতে পারো। মহিলাটি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মুখে আমার জন্য আল্লাহর এই ফায়সালা শুনে খুশি মনে ফিরে যেতে লাগলাম।আমি মসজিদে অথবা তাঁর কোন এক হুজরার নিকটে পৌঁছতেই, তিনি আমাকে ডেকে বলেন, তুমি জানি কী বলেছিলে? মহিলাটি বললো, আমি পুনরায় তাকে আমার বিবরণ শুনালাম। তিনি বলেনঃ তুমি ঐ ঘরেই অবস্থান করো, যেখানে তোমার স্বামীর মৃত্যু সংবাদ পেয়েছো, যতক্ষণ না তোমার ইদ্দাত পূর্ণ হয়। ফুরাইআ (রাঃ) বলেন, এরপর আমি সেখানেই চার মাস দশ দিন ইদ্দাত পালন করলাম। সুনানে ইবনে মাজাহ : ২০৩১, সুনানে তিরমিযী : ১২০৪, সুনানে নাসায়ী : ৩৫২৮, ৩৫২৯, ৩৫৩০, ৩৫৩২, সুনানে আবূ দাউদ : ২৩০০, আহমাদ : ২৬৫৪৭, ২৬৮১৭, মুয়াত্তা মালেক : ১২৫৪, দারেমী : ২২৮৭, ইরওয়াহ : ২১৩১।

তবে জরুরি প্রয়োজনে ইদ্দাত পালনকালে দিনের বেলায় ঘরের বাইরে যাওয়া জায়িয। যেমন সহিহ হাদিস এসেছে-

উরওয়া (রহ.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি মারওয়ানের নিকট প্রবেশ করে তাকে বললাম, আপনার পরিবারের এক মহিলাকে তালাক দেয়া হয়েছে। আমি তার ওখান দিয়ে যাওয়ার সময় দেখলাম যে, সে বাড়ি ছেড়ে যাচ্ছে। সে বললো, ফাতেমাহ বিনতে কায়েস (রাঃ) আমাদের এরূপ নির্দেশ দিয়েছেন এবং তিনি আমাদের বলেছেন যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে (ইদ্দত পালনকালে) স্থানান্তরের অনুমতি দিয়েছেন। মারওয়ান বলেন, ফাতেমাহ বিনতে কায়েস (রাঃ) তাদের এরূপ নির্দেশ দিয়েছেন। উরওয়া (রাঃ) বলেন, আমি বললাম, আল্লাহর শপথ! ’আয়িশাহ্ (রাঃ) তা আপত্তিকর বলেছেন। ’আয়িশাহ (রাঃ) বলেন, ফাতেমাহ হিংস্র পশুর উৎপাতের এলাকায় বাস করতেন বলে তার জানমালের ক্ষতির আশঙ্কা ছিল। আর এ কারণেই রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার বেলায় এরূপ অনুমতি দিয়েছিলেন। সুনানে [MIH1] ২০৩২

জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমার খালা ত্বলাক (তালাক) প্রাপ্ত হন। এরপর তিনি তার (খেজুর বাগানের) খেজুর পাড়ার ইচ্ছা করলেন। এক ব্যক্তি তাকে বাইরে যেতে বাধা দিলেন। তখন তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে এলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হ্যাঁ তুমি তোমার বাগানের খেজুর পাড়ার জন্য বাইরে যেতে পার। কারণ সম্ভবত তা থেকে অন্যদের সাদাকা করবে অথবা অন্য কোন ভাল কাজ করবে। সহিহ মুসলিম : ১৪৮৩, সুনানে আবূ দাঊদ : ২২৯৭, সুনানে নাসায়ী : ৩৫৫০, সুনানে ইবনু মাজাহ : ২০৩৪, দারিমী : ২৩৩৪, ইরওয়া : ২১৩৪।

২. সাজসজ্জা ত্যাগ করা :

স্বামীর মৃত্যুর ইদ্দতের সময় নারীকে কোনো ধরনের সাজসজ্জা, সুগন্ধি, রঙিন পোশাক এবং অলঙ্কার পরিধান থেকে বিরত থাকতে হয়। এটি শোক প্রকাশের অংশ।

যাইনাব (রাঃ) বলেনঃ আমি উম্মু সালামাহকে বলতে শুনেছি: এক নারী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে বললঃ হে আল্লাহর রাসূল! আমার মেয়ের স্বামী মারা গেছে। তার চোখে অসুখ। তার চোখে কি সুরমা লাগাতে পারবে? তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দু’ অথবা তিন বার বললেন, না। তিনি আরও বললেনঃ এতো মাত্র চার মাস দশ দিনের ব্যাপার। অথচ জাহিলী যুগে এক মহিলা এক বছরের মাথায় বিষ্ঠা নিক্ষেপ করত। সহিহ বুখারি : ৫৩৩৬, ৫৩৩৮, ৫৭০৬, সহিহ মুসলিম : ১৪৮৮, সুনানে আবূ দাঊদ : ২২৯৯, সুনানে তিরমিযী : ১১৯৭, সুনানে নাসায়ী : ৩৫৩৩

উম্মু সালামা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে রমণীর স্বামী মারা গেছে, সে (’ইদ্দতকালে লাল বা) হলুদ রংয়ের কাপড় এবং গেরুয়া রঙের কাপড় পরবে না, অলঙ্কার পরবে না, চুলে বা হাতে মেহেদী লাগাবে না এবং চোখে সুরমা লাগাবে না। মিশকাত : ৩৩৩৪, সুনানে আবূ দাঊদ : ২৩০৪, সুনানে নাসায়ী : ৩৫৩৫, আহমাদ : ২৬৫৮১, সহীহ আল জামি : ৬৬৭৭।

উম্মু আতিয়্যাহ ( হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবীসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাসী কোন মহিলার জন্য স্বামী ব্যতীত অন্য কারো মৃত্যুতে তিন দিনের বেশী শোক পালন করা হালাল হবে না।। সুরমা ও রঙিন কাপড়ও ব্যবহার করতে পারবে না। তবে সূতাগুলো একত্রে বেঁধে হালকা রং লাগিয়ে তা দিয়ে কাপড় বুনলে তা ব্যবহার করা যাবে। সহিহ বুখারি : ১৩১৩, ৫৩৪২, সহিহ মুসলিম ৯৩৮, সুনানে আবূ দাঊদ ২৩০২, সুনানে নাসায়ী : ৩৫৩৪, সুনানে ইবনু মাজাহ : ২০৮৭, ইরওয়া : ২০১৪, সহীহ আল জামি : ৭৬৪৯

৩. অন্য পুরুষের সাথে বিবাহ নিষিদ্ধ:

ইদ্দত চলাকালীন সময়ে কোনো নারী অন্য কোনো পুরুষকে বিবাহ করতে পারবে না।

ইদ্দতের এই বিধানগুলো পবিত্র কুরআন এবং হাদিসের মাধ্যমে সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারিত হয়েছে, যার মাধ্যমে নারীর মর্যাদা ও বংশের পবিত্রতা নিশ্চিত করা হয়েছে।

তালাকপ্রাপ্তা নারীর ভরণ-পোষণের বিধান

তালাকপ্রাপ্তা নারীর ভরণ-পোষণ একটি গুরুত্বপূর্ণ ইসলামী বিধান। ইসলামে তালাকের পর নারীর ভরণ-পোষণ এবং অধিকার নিশ্চিত করার জন্য সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। এই বিধানগুলো নারীর নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষার পাশাপাশি পারিবারিক ও সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সাহায্য করে।

১. ইদ্দতকালীন ভরণ-পোষণ:

ইদ্দত হলো সেই নির্দিষ্ট সময়, যা একজন তালাকপ্রাপ্তা নারীকে দ্বিতীয় বিবাহ করার আগে অবশ্যই পালন করতে হয়। এই ইদ্দতকালীন সময়ে স্বামীর দায়িত্ব হলো তার স্ত্রীকে স্বাভাবিক ভরণ-পোষণ প্রদান করা।

১. তালাকে রজঈ (প্রত্যাবর্তনীয় তালাক)

যদি কোনো নারীকে তালাকে রজঈ (অর্থাৎ এক বা দুই তালাক) দেওয়া হয় এবং সে ইদ্দত পালন করে, তবে ইদ্দত চলাকালীন সময়ে তার স্বামী তার ভরণ-পোষণ দিতে বাধ্য। ইদ্দতকালীন সময়ে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয় না, বরং স্বামী ইচ্ছা করলে স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিতে পারে। তাই, এই সময়ে নারীর খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান এবং চিকিৎসা খরচ স্বামীর ওপরই থাকে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

اَسۡکِنُوۡہُنَّ مِنۡ حَیۡثُ سَکَنۡتُمۡ مِّنۡ وُّجۡدِکُمۡ وَلَا تُضَآرُّوۡہُنَّ لِتُضَیِّقُوۡا عَلَیۡہِنَّ ؕ 

তোমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী যেখানে তোমরা বসবাস কর সেখানে তাদেরকেও বাস করতে দাও, তাদেরকে সঙ্কটে ফেলার জন্য কষ্ট দিয়ো না। সুরা তালাক : ০৬

আয়াতে গর্ভবতী তালাকপ্রাপ্তা নারীর ভরণ-পোষণের বিধান নিশ্চিত করা হয়েছে।

২. তালাকে বায়িন (অপ্রত্যাবর্তনীয় তালাক)

যদি তালাকপ্রাপ্তা নারী গর্ভবতী হয়, তবে সন্তান প্রসব পর্যন্ত তার স্বামী তার ভরণ-পোষণের খরচ বহন করতে বাধ্য। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

 وَاِنۡ کُنَّ اُولَاتِ حَمۡلٍ فَاَنۡفِقُوۡا عَلَیۡہِنَّ حَتّٰی یَضَعۡنَ حَمۡلَہُنَّ ۚ  فَاِنۡ اَرۡضَعۡنَ لَکُمۡ فَاٰتُوۡہُنَّ اُجُوۡرَہُنَّ ۚ

আর তারা গর্ভবতী হলে তাদের সন্তান প্রসব করা পর্যন্ত তাদের জন্য তোমরা ব্যয় কর। আর তারা তোমাদের জন্য সন্তানকে দুধ পান করালে তাদের পাওনা তাদেরকে দিয়ে দাও। সুরা তালাক : ০৬

আর যদি যদি নারী গর্ভবতী না হয় তবে বায়িন তালাক এর ক্ষেত্রে এই বিধানটি কিছুটা জটিল। বেশিরভাগ ফিকাহবিদ ইদ্দতকালীন ভরণ-পোষণের সাধারণ বিধানের পক্ষে রায় দিয়েছেন। কিছু ফিকহবিদদের মতে, তালাকে বায়িনের পর নারীকে কেবল বাসস্থান দেওয়া হবে, তবে তার খাদ্য, বস্ত্র বা অন্যান্য খরচ স্বামীর ওপর বর্তায় না। কারণ এই তালাকের মাধ্যমে সম্পর্ক সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তাদের পক্ষের দলিল হলো-

আবূ বকর বিন আবী জাহম বিন সুখাইর আদাবী (রহঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি ফাতেমাহ্ বিনতে কায়েস (রাঃ)-কে বলতে শুনেছি যে, তার স্বামী তাকে তিন তালাক দিলে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার জন্য বাসস্থান ও খোরপোষের নির্দেশ দেননি। সুনানে ইবনে মাজাহ :২০৩৫, ২০৩৬, সহিহ মুসলিম ১৪৮০, আবী দাউদ : ১৯৭৬-১৯৮০

ফাতেমা বিনতে কায়েস (রাঃ) এর ঘটনাটি ছিল এমন যে, তার স্বামী তাকে তিন তালাক দিয়েছিলেন। তিন তালাকপ্রাপ্তা হওয়ার কারণে তিনি তার স্বামীর ঘরে ইদ্দত পালন করবেন কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। রাসুলুল্লাহ (সাঃ) তাকে তার স্বামীর বাড়িতে ইদ্দত পালন করতে এবং খোরপোষ পাওয়ার অধিকার দেননি।

বিষয়টি ব্যতিক্রমের কারণ- তালাকে বাইন। যদি স্বামী স্ত্রীকে তিন তালাক দেন, তাহলে সম্পর্কটি তাৎক্ষণিকভাবে ও সম্পূর্ণরূপে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এই তালাকের পর স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে আর কোনো সম্পর্ক থাকে না। তাই, ইসলামী আইন অনুযায়ী, এই ধরনের তালাকের ক্ষেত্রে স্ত্রীর আর স্বামীর বাড়িতে ইদ্দত পালন করার বা খোরপোষ পাওয়ার অধিকার থাকে না।

ফাতেমা বিনতে কায়েস (রাঃ) এর ঘটনাটি ছিল তিন তালাকের। যেহেতু এটি একটি তালাকে বাইন ছিল, তাই রাসুলুল্লাহ (সাঃ) তাকে স্বামীর বাড়িতে ইদ্দত পালন করতে এবং খোরপোষ পাওয়ার নির্দেশ দেননি। এই হাদীসটি প্রমাণ করে যে, তিন তালাকপ্রাপ্তা নারী তার স্বামীর থেকে কোনো খোরপোষ বা বাসস্থান পাবেন না।

বিশেষজ্ঞদের মতামত : এই হাদীসটি নিয়ে কিছু সাহাবা এবং ফকীহদের মধ্যে ভিন্নমত ছিল। যেমন, উমর (রাঃ) এবং উসমান (রাঃ) এর মতো কিছু সাহাবা মনে করতেন যে, স্ত্রী রাজঈ তালাকপ্রাপ্তা হোক বা বাইন তালাকপ্রাপ্তা হোক, উভয় ক্ষেত্রেই তার খোরপোষের অধিকার রয়েছে। তবে, অনেক সাহাবা এবং ফকীহ এই হাদীসটিকে সমর্থন করেছেন এবং তালাকে বাইনের ক্ষেত্রে স্ত্রীর খোরপোষ ও বাসস্থানের অধিকার না থাকার পক্ষে মত দিয়েছেন।

২. ইদ্দত-পরবর্তী ভরণ-পোষণ

ইদ্দত শেষ হওয়ার পর তালাকপ্রাপ্তা নারীর ভরণ-পোষণ দেওয়া স্বামীর জন্য বাধ্যতামূলক নয়, তবে এটি একটি উত্তম ও মানবিক কাজ। এই ভরণ-পোষণকে ‘মুতা’আ’ বলা হয়। মুতা’আ হলো এমন একটি উপহার বা আর্থিক সহায়তা, যা স্বামী তার তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীকে দেবে, যা তার আর্থিক সামর্থ্য এবং স্ত্রীর সামাজিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে। এটি তালাকের কারণে সৃষ্ট মানসিক ও আর্থিক ক্ষতিপূরণের একটি রূপ। আল্লাহ তা’আলা বলেন-

وَلِلۡمُطَلَّقٰتِ مَتَاعٌۢ بِالۡمَعۡرُوۡفِ ؕ حَقًّا عَلَی الۡمُتَّقِیۡنَ

আর তালাকপ্রাপ্তা নারীদের জন্য থাকবে বিধি মোতাবেক ভরণ-পোষণ। মুত্তাকীদের উপর আবশ্যক। সূরা বাকারা : ২৪১

/২০৩৭। ’আয়িশাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। জাওন-কন্যা ’আমরাকে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট পেশ করা হলে সে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে (আল্লাহর) আশরয় প্রার্থনা করে। তিনি বলেনঃ তুমি এক মহান সত্তার নিকটই আশ্রয় প্রার্থনা করেছো। অতঃপর তিনি তাকে তালাক দিলেন এবং উসামাহ অথবা আনাস (রাঃ)-কে নির্দেশ দিলে তদনুযায়ী তিনি তাকে (উপঢৌকনস্বরূপ) তিনখানা সাদা লম্বা কাপড় দেন।

সহীহুল বুখারী ৫২৫৪, নাসায়ী ৩৪১৭, বায়হাকী ৭/৩১৮, ইরওয়াহ ৭/১৪৬।

মুতা’আর মূল উদ্দেশ্য হলো তালাকের পর নারীর প্রতি সহানুভূতি ও মানবিকতা প্রদর্শন করা। এটি স্বামীর পক্ষ থেকে একটি সদয় কাজ, যা তালাকের তিক্ততা কমিয়ে দেয়।

বাংলাদেশে তালাকপ্রাপ্তা নারীর ভরণ-পোষণ

বাংলাদেশের আইনও এই ইসলামী বিধানকে সমর্থন করে। মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১ অনুযায়ী, তালাকের পর একজন নারী ইদ্দতকালীন সময়ে তার প্রাক্তন স্বামীর কাছ থেকে ভরণ-পোষণ পাওয়ার অধিকারী। এই আইন অনুসারে, ইদ্দতকাল হলো তিন মাস।

২০১১ সালে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট একটি যুগান্তকারী রায় দেয়, যেখানে বলা হয় যে একজন তালাকপ্রাপ্তা নারী তার প্রাক্তন স্বামীর কাছ থেকে ইদ্দতকালের পরেও ভরণ-পোষণ দাবি করতে পারে, যদি সে জীবিকা নির্বাহে অক্ষম হয়। এই রায়টি ইসলামী বিধানের ‘মুতা’আ’র নীতির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ এবং নারীর অধিকার রক্ষায় একটি বড় পদক্ষেপ।

ইদ্দতকালীন ভরণ-পোষণ প্রদান করা স্বামীর ওপর বাধ্যতামূলক। ইদ্দত-পরবর্তী ভরণ-পোষণ যা ‘মুতা’আ’ নামে পরিচিত। এটি বাধ্যতামূলক না হলেও একটি উত্তম ও মানবিক কাজ। এটি স্বামীর সামর্থ্য অনুযায়ী একটি আর্থিক সহায়তা বা উপহার হিসেবে গণ্য হবে।


 [MIH1]

শিয়া ফির্কার উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

“শিয়া” (الشيعة) শব্দটি আরবি “شايَعَ – يُشايِعُ” ধাতু থেকে এসেছে। এর মৌলিক অর্থ হলো- অনুসরণ করা, সমর্থন করা, কোনো দলের পক্ষে হওয়া, ‘শিয়াতু ফুলান’ মানে: “অমুক ব্যক্তির দল বা অনুসারীরা”।

 ইবন মানজুর বলেন-

الشِّيعةُ: الأَتْباعُ والأَنصارُ

“শিয়া মানে অনুসারী ও সাহায্যকারী।

কুরআনে ‘শিয়া’ শব্দের ব্যবহার: কুরআনে “শিয়া” শব্দটি একাধিকবার এসেছে, তবে সবক্ষেত্রে ‘দল’, ‘উপদল’ বা ‘অনুসারী’ অর্থে, কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় ফিরকা বোঝাতে নয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

إِنَّ الَّذِينَ فَرَّقُوا دِينَهُمْ وَكَانُوا شِيَعًا لَّسْتَ مِنْهُمْ فِي شَيْءٍ

“নিশ্চয়ই যারা তাদের দ্বীনকে খণ্ডবিখণ্ড করেছে এবং বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়েছে, তাদের সাথে আপনার কোনো সম্পর্ক নেই।” সূরা আনআম :১৫৯

 এখানে “شِيَعًا” শব্দটি এসেছে “দল বা উপদল” অর্থে। এটা ফির্কাবাজির নিন্দা হিসাবে এসেছে।

فَوَجَدَ فِيهَا رَجُلَيْنِ يَقْتَتِلَانِ هَذَا مِن شِيعَتِهِ وَهَذَا مِنْ عَدُوِّهِ

তিনি (মূসা (আ.)) সেখানে দুই ব্যক্তিকে যুদ্ধরত দেখতে পেলেন। এক জন ছিল তাঁর শিয়া (অনুসারী), আর অন্যজন ছিল তাঁর শত্রুদের অন্তর্ভুক্ত।” সূরা কাসাস :১৫

এখানে শিয়া মানে: “নিজ দলের লোক” বা “সহযোগী”।

আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন-

وَإِنَّ مِن شِيعَتِهِ لَإِبْرَاهِيمَ

নিশ্চয়ই ইব্রাহীম ((আ.)) ছিলেন তাঁর (নূহ (আ.)) শিয়াদের অন্তর্ভুক্ত।” সূরা সাফফাত : ৮৩

এখানে “শিয়া” মানে: নূহ (আ.)-এর অনুসারী বা তাঁর পথের লোক।

“শিয়া” শব্দটি কুরআনে এসেছে মূলত নিরপেক্ষ অর্থে “দল বা অনুসারী”। তবে পরবর্তীতে এটি ‘আলি (রা.) এর অনুসারী একটি ধর্মীয় মতবাদ’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে যার সাথে কুরআনে এ শিয়া শব্দের কোন সম্পর্ক নাই।

শিয়াদের উৎত্তির সময় ও প্রাক্ষাপট :

উমার (রা.) এর আমলে মুসলিমরা পারস্য (ইরান) জয় করে । তখন পারস্য বাহিনীর কমান্ডার ছিলেন হরমুজান। হরমুজানকে বন্দী করে মদিনা নিয়ে আসা হয় এবং মৃত্যুদণ্ড প্রদানের হুকুম দান করা হয়। মৃত্যুদণ্ড প্রদানের আগে তার শেষ ইচ্ছ্ জানতে চাওয়া হয়। সে তার মৃত্যুদণ্ড এড়াতে একটি ছলনার আশ্রয় নেয়। পানি চেয়ে বলে এটাই তাঁর শেষ ইচ্ছা যে, এ পানি পান না করা পর্যন্ত তাঁকে হত্যা করা হবে না। খলিফার তরফ থেকে প্রতিশ্রুতি পেয়ে সে পানি পান না করে ফেলে দেয়। এ কারণে উমার (রা) তাকে আর হত্যা করেন নাই। হরমুজান, উমর (রা.) প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন ও তার মহানুভবতার জন্য ইসলাম গ্রহণ করে। কিন্তু অতি দুঃখের বিষয় এটা ছিল তার লোক দেখানো সে অন্তরে ছিল চরম প্রতিশোধ নেয়ার নিয়ত করে। 

মুক্তি পেয়ে হরমুজান মদিনাতেই বসবাস করতে থাকে এবং উমার (রা.) কে হত্যা করার পরিকল্পনা সাজাতে থাকে। এ কাজে তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী হয় জাফিনা আল খালিল (খ্রিষ্টান) এবং সাবা ইবনে শামুন (ইহুদি)। তারা একসাথে মিলে ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের পরিকল্পনা সাজাতে থাকে। কারণ, হরমুজাখানের পারস্য বাহিনী এবং  জাফিনার রোমান বাহিনীকে মুসলিমরা পরাজিত করে সমূলে উৎখাত করেছে। অপর পক্ষে সাবার ইহুদি গোষ্ঠীকে মদিনা থেকে বহিষ্কার করেছে মুসলিমরা। সকলের একটাই লক্ষ মুসলমানদের বিরুদ্ধ প্রতিশোধ।

খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) এর শাসনামলে মুসলিম সাম্রাজ্য অভূতপূর্ব বিস্তার লাভ করে। পারস্যের সাসানীয় সাম্রাজ্য এবং বাইজান্টাইনদের বিশাল অংশ মুসলিমদের আয়ত্তে চলে আসে। তাঁর প্রশাসনিক দক্ষতা, বিচারের কঠোরতা ও ইনসাফের জন্য তিনি মুসলিম ও অমুসলিম উভয়ের নিকটেই প্রিয় ছিলেন। তবে এই সাফল্যে কিছু পরাজিত মানুষের মাঝে বিদ্বেষের জন্ম নেয়। তার শাসনের অধীনে বিপুল সংখ্যক বিজিত অমুসলিমদের প্রবেশ এবং তাদের একাংশের অন্তর্নিহিত বিদ্বেষ। এই সকল অঞ্চলের বন্দী ও দাসেরা আরব ভূমিতে এনে রাখা হতো। এদের অনেকেই ছিল যুদ্ধবন্দি, পরাজিত জাতির সদস্য, যারা ইসলামের প্রতি হিংসা লালন করত। তাদের মধ্যে একজন ছিল আবু লুলু ফিরোজ নামে একজন পারস্যবাসী, যিনি একজন অগ্নিপূজক মাজুসি ছিলেন। সে ছিল একজন দক্ষ কারিগর এবং কাঠ ও ধাতব কাজ জানত। আবু লুলু ফিরোজ মদিনায় অবস্থান করছিল এক সাহাবি, মুগীরাহ ইবনু শু’বা (রা.)-এর অধীন দাস হিসেবে। সে পারস্যের পতনের জন্য সে উমর (রা.) কে দায়ী করত। অনেক ঐতিহাসিকের মতে, এই হত্যাকাণ্ড ছিল একটি বৃহত্তর বিদ্বেষপ্রসূত পরিকল্পনার অংশ, যার পেছনে কিছু ফারসি (ইরানি) জাতীয়তাবাদী মনোভাব কাজ করছিল। মুসলিম খেলাফতের শক্তি ও উমর (রা.) এর নেতৃত্ব দুর্বল করার উদ্দেশ্যও এতে জড়িত ছিল। 

অনেক ঐতিহাসিকের মতে হরমুজান, জাফিনা আল খালিল (খ্রিষ্টান) এবং সাবা ইবনে শামুন (ইহুদি) এ তিন জনের ষড়যন্ত্রের কারণে ২৩ হিজরি (৬৪৪ খ্রিষ্টাব্দে) সালের মুহাররম মাসে, ফজরের সালাতের সময় মসজিদে নববীতে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। উমর (রা.) ইমাম হিসেবে দাঁড়িয়ে নামাজ শুরু করেন। ঠিক সেই সময়, আবু লুলু ফিরোজ একটি দ্বি-ধারী বিষাক্ত ছুরি নিয়ে পেছন থেকে তাঁর উপর আক্রমণ করে। সে একাধিকবার ছুরিকাঘাত করে এবং আশেপাশে থাকা আরও কয়েকজন মুসল্লিকেও আহত করে। আবু লুলু ফিরোজ হামলার পর পালাতে গেলে মুসল্লিরা তাকে ধাওয়া করে। ধরা পড়ার আগেই সে নিজেই আত্মহত্যা করে ফেলে। আঘাত এতটাই গুরুতর ছিল যে উমর (রা.) অচেতন হয়ে পড়েন এবং পরে তাঁকে তাঁর ঘরে নিয়ে যাওয়া হয়। তিন দিন তিনি জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে ছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত শাহাদাত বরণ করেন। এ হত্যাকাণ্ড শুধু উমর (রা.) এর জীবনাবসানই নয়, বরং একটি স্থিতিশীল ইসলামি রাষ্ট্রকে গভীর রাজনৈতিক উত্তেজনার মুখোমুখি করে তোলে। মৃত্যুর পূর্বে তিনি তাঁর খলিফার দায়িত্ব বিষয়ে পরামর্শ করেন এবং উসমান (রা.), আলি (রা.), তালহা (রা.), যুবায়র (রা.), সাদ (রা.) এবং আবদুর রহমান ইবনু আউফ (রা.) এই ছয়জনকে পরামর্শ দিয়ে পরবর্তী খলিফা নির্ধারণের দায়িত্ব অর্পণ করেন। সবার পরামর্শে উসমান উসমান (রা.) কে খলিফা নির্বাচিত করা হয়।

উমর (রা.) এর হত্যা কাণ্ডের বিচার :

এই হত্যা কাণ্ডের পর পরই উমার (রা) এর ছেলে উবাইদুল্লাহ হরমুজান ও জাফিনাকে হত্যা করেন। কিন্তু প্রতারণ ইহুদি সাবা বেঁচে যায়। সাবা আড়ালে থেকে প্রতারণা মাধ্য তার কাজ চালিয়ে জেতে থাকে। এত পর্যায় উমর পুত্র উবাইদুল্লাহকে হরমুজ খান ও জাফিনাকে হত্যা মামলায় অভিযুক্ত করা হয়। তাঁর বিচারের দাবিতে নবনিযুক্ত খলিফা উসমান (রা) এর সামনে উপস্থিত করা হয়। আলি (রা) বললেন, উবাইদুল্লাহ বিনা প্রমাণে তৎক্ষণাৎ হত্যা করেছে, যেটা ইসলাম মানে না। কারণ হরমুজান, জাফিনা আল খালিল যে উমর (রা.) এর হত্যা ষড়যন্ত্রে জড়িত তার প্রমাণ তাৎক্ষণিকভাবে কেউ দিতে পারে নাই। তাই আলি (রা) বলেন, এটা তাঁর করা উচিত হয়নি। আলি (রা) এর পক্ষে মদিনার অনেকেই সমর্থন দেন। আবার উবাইদুল্লার প্রতিও অনেকে সমর্থন দেন। তখন তারা দুই ভাগ হয়ে যান। অপঃপর, উসমান (রা) উবাইদুল্লাহ এর পক্ষ হতে কিসাস আদায় করেন।

উসমান (রা.) বিরুদ্ধে আব্দুল্লাহ ইবনে সাবার ষড়যন্ত্র :

উমর (রা.) কে হত্যার করার মাধ্যমে ইহুদি পরিকল্পনা সফল হতে শুরু করেছে। ইহুদি সাবা পরিকল্পনা করে তাঁর ছেলে আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা কে বললেন, মুসলিমদের দেখিয়ে ইসলাম গ্রহণ করান। তার উদ্দেশ্য ছিল যেন এরপর থেকে সহজেই মুসলিমদের গোপন খবর পেতে পারে। ভিতর থেকে মুনাফিকি করে বিভেদ সৃষ্টি করতে পারে এমন একজনের খুবই দরকার।

ঐতিহাসিকের মতে, ইসলাম ধর্মে বিভক্তি আর ধ্বংসের প্রত্যয় মুসলিম বিশ্বের তৃতীয় খলিফার উসমান (রা.) খেলাফতকালে ইয়েমেনের অধিবাসী ইয়াহুদি সাবা, তার সন্তান আব্দুল্লাহ ইবনে সাবাকে নিয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন। ইসলাম গ্রহণের ভান করে সে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। প্রথমে সে মদিনায় কিছু দিন ষড়যন্ত্র করে সফল না হয়ে বসরা যান। এক সময় সিরিয়াও গিয়ে ছিল। এই সব জায়গা পরিকল্পনা অনুসারে কাজ করতে না পেরে অবশেষে মিশর গমন করেন। এখানে সে তার দুরভিসন্ধি বাস্তবায়নের জন্য কিছু সাহায্য কারি পেয়ে যায়।  এরই সুযোগে সে প্রচার করে যে, মুসলানদের প্রতি আমার আশ্চর্য লাগে, যারা পৃথিবীতে ঈসা ((আ.)) এর পুনরায় আগমনের কথা বিশ্বাস করে বিন্তু  মুহম্মদ রাসুলুল্লাহ ﷺ এর পুনরায় আগমনের কথা বিশ্বাস করে না। অথচ মুহম্মদ রাসুলুল্লাহ ﷺ  ঈসা ((আ.))  এর চেয়ে শ্রেষ্ঠ। তার এই কথা অনেক অজ্ঞলোক মেনে নেয়। অতঃপর সে খলিফা উসমান ইবন আফফান (রা.) বিরুদ্ধে মানুষদের মিথ্যা প্রচারণ মাধ্যমে ক্ষেপিয়ে তুলে। উসমান ইবনে আফফান (রা.) এর বিরুদ্ধে আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা ও তার অনুসারীদের উত্থাপিত মিথ্যা অভিযোগগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:

১। আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা প্রচার করে, আলি (রা.) খলিফা হওয়ার অধিক হকদার কারণ তিনি ছিলেন রাসূল ﷺ এর প্রকৃত উত্তরাধিকারী। উসমান রা. খিলাফতের উপযুক্ত নন। তিনি নবি ﷺ এর পরিবারের লোকদের (আহলুল বাইত) খিলাফতের অধিকারের প্রতি অবিচার হয়েছে।

২. উসমান (রা.) সরকারি কোশাগার থেকে নিজের পরিবার ও বন্ধু-স্বজনদের অত্যধিক সম্পদ বিতরণ করেছেন। প্রকৃত সত্য হলো খিলাফতের পূর্বেও উসমান (রা.) একজন দাতা ছিলেন।  সরকারি কোশাগার থেকে সম্পদ প্রদান করা একটি মিথ্যা অভিযোগ মাত্র।

৩। আত্মীয় প্রীতির অভিযোগ এনে আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা প্রচার করে উসমান (রা) তার আত্মীয়দের, বিশেষত বনু উমাইয়ার সদস্যকে প্রাদেশিক গভর্নর নিযুক্ত করেন।

৪। উসমান (রা.) শাসনে কুরআন পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে। বাস্তবতা ছিল কোন কোন অঞ্চলে কুরআনের কিছু নকল করা অংশ ভুল পেলে তিনি তা পুড়িয়ে ফেলে। মূল কুরআন যা আবু বক্করের শাসনামলে একত্র করা হয়ে ছিল, তা সম্পাদনা করে সাতটি কপি করে, সাতটি প্রদেশে প্রেরণ করা হয়। কিন্তু সাবা এ ঘটনা বিকৃতি বলে অপপ্রচার চালায়।

৫। উসমান (রা.) বিরুদ্ধে অভিযোগ হলো, তিনি সাহাবিদের (রা.) প্রতি অবিচার করছে। বাস্তবতা ছিল উমর (রা.) শাসনামলে সময় মসজিদে নববী সম্প্রসারণের জন্য কিছু জমি অধিগ্রনের সিদ্ধান্ত হয়। উমর (রা.) এর কঠোরতার কারনে কেউ কিছু বলার সাহস পায় নি। কিন্তু উসমান (রা.) সময় জমি অধিগ্রনের বাধা প্রদান করে। উসমান (রা.) বাধা উপেক্ষা করে উমর (রা.) এর নেয়া সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করে। ইবনে সারাহ এ ঘটনাকে সাহাবিদের উপর জুলুম বলে মিথ্যা প্রচারণা চালায়।

৬। উসমান (রা.) বিরুদ্ধে কিছু ধর্মীয় বিধান লঙ্ঘন অভিযোগ এনে ইবনে সাবা প্রচারণ চালায় যে, তিনি নবির সুন্নাহ পরিবর্তন করেছেন যেমন- জুমার নামাজে দ্বিতীয় আজান প্রচলন করেছেন, তিনি তামাত্তু হজ্জ আদায় করেছেন, তিনি হজে মিনায় সালাত কসর করেন নাই ইত্যাদি।

৭। মিসরের গভর্নর আব্দুল্লাহ ইবনে সাদ (রা.) এবং কিছু প্রাদেশিক গভর্নরদের উপর জনগণের অভিযোগ সত্ত্বেও উসমান (রা.) তাদের অপসারণ করেননি বলে মিথ্যা প্রচার করা হয়। বাস্তবতা ছিল,  উসমান (রা.) গোপন সংবাদের ভিত্তিতে জানতে পারেন যে ঐ সকল প্রাদেশিক গভর্নরদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ মিথ্যা ও ষড়যন্ত্রমূলক।

এই অভিযোগগুলো ছিল সম্পূর্ণ মিথ্যা ও অতিরঞ্জিত। উসমান (রা.) ছিলেন অত্যন্ত ধার্মিক ও ন্যায়পরায়ণ খলিফা। তাঁর শাসনামলে ইসলামি রাষ্ট্র ব্যাপক সম্প্রসারিত হয়, এবং তিনি কুরআনের সংকলনের মতো মহান কাজ সম্পন্ন করেন। বিদ্রোহীদের অপপ্রচার ও রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের কারণে তিনি শহিদ হন। ইতিহাসবিদরা (যেমন—তাবারী, ইবনে কাসির) লিখেছেন যে, ইবনে সাবা একটি বিভ্রান্তিকর গোষ্ঠী তৈরি করে উসমান (রা.) এর বিরুদ্ধে জনমত গঠন করেছিল, যা পরবর্তীতে তাঁর শাহাদাতের কারণ হয়।

আব্দুল্লাহ ইবনে সাবার মিথ্যা প্রচারণায় ইসলামি খিলাফতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ :

আব্দুল্লাহ ইবনে সাবার মিথ্যা প্রচারণার প্রভাবে অজ্ঞ ও সদ্য ইসলামগ্রহণকারী কিছু লোক অসন্তুষ্টি প্রকাশ করে এবং তাদের মধ্যে  মূলত তিনটি প্রধান গোষ্ঠী উসমান (রা.) এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহে অংশ নেয় এবং শেষে মদিনায় তাঁর বাড়ি অবরোধ করে। এ তিনটি গোষ্ঠী হলো-

ক. মিসরীয় বিদ্রোহী দল :

মিশর থেকে প্রায় ১,০০০ জনের একটি দল মদিনায় আসে। তাদের নেতৃত্বে ছিলেন আল-গাফিকি ইবনে হারব আল-কিন্দি ও কিনানা ইবনে বিশর। তারা দাবি করেছিল যে উসমান (রা.) মিসরের গভর্নর আব্দুল্লাহ ইবনে সা‘দকে অপসারণের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছেন।

খ. কুফার বিদ্রোহী দল :

কুফা থেকে একটি দল আমর ইবনে আল-আস (পরবর্তীতে তাঁর ভূমিকা পরিবর্তন হয়) ও অন্যান্যদের প্ররোচনায় এসেছিল।

গ. বসরার বিদ্রোহী দল :

বসরা থেকেও কিছু লোক যোগ দেয়, যদিও তাদের সংখ্যা তুলনামূলক কম ছিল।

এই দলগুলো ইবনে সাবার প্রভাবিত কিছু চরমপন্থি দ্বারা নেতৃত্ব পেয়েছিল, যারা উসমান (রা.) কে সরিয়ে আলি (রা.) কে খলিফা বানানোর লক্ষ্যে কাজ করছিল।

অবরোধের আগে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ইসলামি ইতিহাসে বর্ণিত হয়েছে:

বিদ্রোহীরা মদিনায় পৌঁছে উসমান (রা.) এর কাছে তাদের অভিযোগ পেশ করে। তিনি তাদের শান্ত করার চেষ্টা করেন এবং মিসরীয় দলকে উসমান (রা.) বুঝিয়ে শান্ত করেন। এ তারা বিদ্রোহ ত্যাগ করে ফিরে জেতে সম্মত হন।

মিসরীয়রা ফেরার পথে একটি ঘোড় সওয়ার দেখে তাকে আটকায়। তার কাছ থেকে তারা একটি সীলমোহরযুক্ত চিঠি পায়, যা উসমান (রা.) এর পক্ষ থেকে মিসরের গভর্নরের কাছে লেখা বলে দাবি করা হয়। চিঠিতে নির্দেশ দেওয়া ছিল যে, মিসরীয় বিদ্রোহীদের ফিরে আসার পর যেন তাদের শাস্তি দেওয়া হয়। তারা বুঝতে পারে এ পত্রের মাধ্যমে তাদের শান্তি প্রদানের কথা উল্লেখ আছে। তাই তারা মিসরে ফিরে না গিয়ে মদিনায় ফিরে আসে।  তারা মদিনায় ফিরে চিঠিটি উসমান (রা.)-কে দেখায়। তিনি আশ্চর্য হয়ে যান এবং শপথ করে বলেন যে এটি তিনি লেখেননি বা সীলমোহর ব্যবহার করেননি।

কোন কোন ঐতিহাসিকের মনে, উসমান (রা.) এর সচিব মারওয়ান ইবনে আল-হাকাম এর সাথে জড়িত ছিল কিন্তু উসমান (রা.) এতে সম্পূর্ণ অজ্ঞ ছিলেন। আবার কিছু বর্ণনায় বলা হয়, এটি ইবনে সাবার ষড়যন্ত্র ছিল, যাতে বিদ্রোহীরা উসমান (রা.) এর বিরুদ্ধে ক্ষিপ্ত হয়। (এই ঘটনাটি তাবারী, ইবনে কাসির, ও আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া তে উল্লিখিত হয়েছে। তবে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ আছে যে চিঠিটি কে লিখেছিল—মারওয়ান নাকি ইবনে সাবার অনুসারীরা)

উসমান (রা.) এর ধৈর্য ও রক্তপাত এড়ানোর নীতি:

খলিফা উসমান ইবন আফফান (রা.) বিদ্রোহের সময় পরিস্থিতি খুব সহজেই সামরিক শক্তি ব্যবহার করে দমন করতে পারতেন। মদিনার চারপাশে ও অন্যান্য প্রদেশে তার আনুগত্যশীল অনেক সাহাবি, যোদ্ধা ও সেনাপতি ছিলেন। তবে তিনি কয়েকটি কারণে সশস্ত্র প্রতিরোধ না করে ধৈর্য ধারণ করেন এবং রক্তপাত এড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন। ঐতিহাসিক দলিল ও বর্ণনা থেকে প্রমাণ:

ক. রক্তপাত এড়ানোর আকাঙ্ক্ষা :

উসমান (রা.) বলেন, ❝আমি চাই না আমার হাতে মুসলিমদের মধ্যে প্রথম রক্তপাত ঘটুক।❞ ইবন কাসীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, খণ্ড ৭

খ. সাহাবাদের প্রতিরোধের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান :

মদিনার যুবক সাহাবিগণ (যেমন আলি রা.-এর পুত্র হাসান ও হুসাইন, আবদুল্লাহ ইবনে জুবাইর প্রমুখ) বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রস্তাব দেন। কিন্তু উসমান রা. বলেন, ❝যে ব্যক্তি আমার জন্য যুদ্ধ করবে, তার জন্য আমি আল্লাহর কাছে কোনো সাওয়াব আশা করি না।❞ [ইবন সাদ, আল-তাবাকাত আল-কুবরা

গ. আলি (রা.)-এর মাধ্যমে সাহায্য আসা সত্ত্বেও সাড়া না দেওয়া :

আলি (রা.) তার পুত্র হাসান (রা.)-কে উসমান (রা.)-এর রক্ষার জন্য প্রেরণ করেন। কিন্তু উসমান (রা.) হাসান রাঃ-সহ অন্য সাহাবাদের বলেন, “আমি আপনাদের জান-মালের জন্য দায়ী নই; আপনারা চলে যান। আমি চাই না আমার কারণে কারও রক্তপাত হোক।”

উসমান (রা.) হত্যার ঘটনা :

বিদ্রোহীরা উসমান (রা.)-এর বাড়ি ঘেরাও করে তার ঘরের পানি বন্ধ করে দেয়। উসমান (রা.) ও তাঁর পরিবার তৃষ্ণায় কাতর হয়ে পড়েন। সাহাবি আবু হুরায়রা (রা.) ও অন্যান্যরা গোপনে পানির মশক পৌঁছে দিতে চাইলে বিদ্রোহীরা বাধা দেয়। তাঁকে মসজিদে যেতে দেওয়া হয়নি, ফলে তিনি বাড়িতেই জামাত আদায় করেন।

আলি (রা.), তালহা (রা.) ও যুবাইর (রা.) বিদ্রোহীদের সাথে আলোচনা করেও ব্যর্থ হন। এ সকল সাহাবি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগের চেষ্টা করলেও উসমান (রা.) অনুমিত প্রদান করে নাই। এতে তালহা (রা.) ও যুবাইর (রা.) খুবই মনোখুন্ন হন।

যুল-হুজ্জা ১৮, ৩৫ হিজরি ভোরে বিদ্রোহীরা বাড়িতে ঢোকার সুযোগ খুঁজতে থাকে। প্রথমে কিছু বিদ্রোহী দরজা ভেঙে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করে, কিন্তু উসমান (রা.)-এর স্ত্রী নায়লা (রা.) ও অন্যান্য পরিবার সদস্যরা বাধা দেন। পরবর্তীতে কিনানা ইবনে বিশর আল-মিসরি ও আমর ইবনে হামিক নেতৃত্বে একদল সশস্ত্র লোক বাড়িতে ঢুকে পড়ে। উসমান (রা.) তখন কুরআন তিলাওয়াত করছিলেন। হত্যারাকারীরা তাঁর হাতের কুরআনটি ছিনিয়ে নিয়ে তরবারি দিয়ে আঘাত করে। প্রথমে কিনানা ইবনে বিশর উসমান (রা.)-এর মাথায় আঘাত করে। সুদান ইবনে হামরান নামক এক ব্যক্তি লোহার রড বা তরবারি দিয়ে তাঁর বুকে আঘাত করে। রক্তে ভেসে যায় কুরআনের পাতাগুলো এবং মুসলিম জাহানের তৃতীয় খলিফা উসমান (রা.)  ৮২ বছর বয়সে শাহাদাত বরণ করেন।

উসমান (রা.) এর লাশ ৩ দিন অবহেলিত থাকে, কারণ বিদ্রোহীরা দাফনে বাধা দেয়। শেষে জুবাইর ইবনে আওয়াম (রা.) ও কয়েকজন সাহাবি গোপনে রাতে জান্নাতুল বাকিতে তাঁকে দাফন করেন। এই হত্যাকাণ্ড ইসলামি উম্মাহর প্রথম ফিতনা (গৃহযুদ্ধ)-এর সূচনা করে, যা জামাল ও সিফফিনের যুদ্ধে রূপ নেয়।

ঐতিহাসিক সূত্র এই ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা পাওয়া যায়: ইবনে সাদের “আত-তাবাকাত আল-কুবরা”, অষ্টম খণ্ড. পৃ.-২৩-৩১, তাবারির “তারিখ আল-উমাম ওয়াল মুলুক” চতুর্থ খণ্ড, পৃ.-৩৯০-৪০৫, ইবনে কাসিরের “আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, সপ্তম খণ্ড, পৃ.-১৮০-১৯০

আলি (রা.) কে খলিফা নির্বাচিত করা :

উসমান (রা.) এর শাহাদাতের পর মদীনার সাহাবিগণ ব্যাপকভাবে আলি (রা.) কে খলিফা হিসেবে মনোনয়ন দেন। আলি (রা.) প্রথমে কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন এবং সাহাবিদের এ প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন। যার কারণে লোকজন সাদ (রা.), তালহা (রা.), জুবায়ের (রা.) প্রমুখের নিকট গিয়ে খলিফা হবার প্রস্তাব দেন। কিন্তু তারাও রাজি হলেন না। অতঃপর আলি (রা.) বললেন, সবাই তাঁকে মানলেই তিনি খলিফা হবেন। মানুষের চাপ ও পরিস্থিতির বিবেচনায় শেষ পর্যন্ত খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণে সম্মত হন। খলিফা নির্বাচিত সভায় সাহাবিগণ তাদের সাথে বিশিষ্ট সাহাবি তালহা (রা.) ও জুবায়ের (রা.) কে হাজির করেন। তাদেরকে জিজ্ঞেস করা হল, আপনারা আলি (রা.) কে খলিফা হিসেবে মানবেন কিনা? তারা নীরব রইলেন এবং পরবর্তীতে তারা দুজন শর্তসাপেক্ষে বাইয়াতে গ্রহণ করেন। ফলে মদীনাবাসী অনেক বদরী সাহাবি, আনসার সাহাবি ও সাধারণ মুসলিমদের একটি বড় অংশ আলি (রা.) কে খলিফা হিসেবে সমর্থন করেছিলেন। ইবনে আব্বাস (রা.), আবু আইয়ুব আনসারি (রা.), আম্মার ইবনে ইয়াসির (রা.), আবু জার আল-গিফারী (রা.), সালমান আল-ফারিসী (রা.), মিকদাদ ইবনে আসওয়াদ (রা.) প্রমুখ নামকরা সাহাবিরা তাঁর পক্ষে বাইয়াত গ্রহণ করেন।

আয়িশা (রা.) ও আলি (রা.) মাঝে যুদ্ধ ছিল মুনাফিক আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা এর ষড়যন্ত্রের ফল :

উসমান (রা.)-এর শাহাদাতের পর মুসলিম উম্মাহ চরম অস্থিরতা ও বিভ্রান্তির মধ্যে পড়ে। উনার হত্যাকারীরা সংগঠিতভাবে মদিনায় অবস্থান করে এবং নতুন খলিফা নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার করে। অবশেষে আলি (রা.) খলিফা নিযুক্ত হন, তবে উনার শাসন দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগেই, আয়িশা (রা.), তালহা (রা.) ও যুবায়ের (রা.) উসমান (রা.) এর হত্যার ন্যায়বিচার ও প্রতিশোধ দাবি করে আন্দোলনে নামেন। এই সময় আয়িশা হজ পালনের জন্য মক্বা অবস্থান করছিলেন। হজ পালন শেষে আয়িশা (রা.) মক্কায় ফেরার পথে উসমান (রা.)-এর হত্যার খবর শুনে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানান এবং বিক্ষোভে নেতৃত্ব দেন। তালহা ও যুবায়ের (রা.) তাঁর সঙ্গে একত্র হয়ে বসরার উদ্দেশ্যে রওনা হন। তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল, খুনিদের বিচারের জন্য জনগণকে সংগঠিত করা এবং খলিফা আলি (রা.)-এর উপর চাপ সৃষ্টি করা যেন তিনি দ্রুত বিচার কার্য সম্পন্ন করেন। আলি (রা.) নিজেও বিচারের পক্ষে ছিলেন, তবে রাজনৈতিক পরিস্থিতি, খুনি দলগুলোর ছদ্মবেশ এবং প্রশাসনিক অস্থিরতা বিচারে বিলম্ব ঘটায়।

এমতাবস্থায়, ৩৬ হিজরিতে বসরা শহরে আলি (রা.) ও আয়িশা, তালহা ও যুবায়ের (রা.)-এর নেতৃত্বাধীন পক্ষের মধ্যে প্রথমে যুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি হলেও, উভয় পক্ষ মুসলিম রক্তপাত এড়াতে সমঝোতার সিদ্ধান্তে উপনীত হন এবং একটি চুক্তি পৌছাতের সম্মত হন। চুক্তির বিষয়বস্তু ছিল:

ক. উসমান (রা.)-এর হত্যাকারীদের বিচারের ব্যবস্থা করা হবে।

খ. উভয় পক্ষ শান্তিপূর্ণভাবে বসরা শহর ছেড়ে চলে যাবে। কোন প্রকার রক্তপাত বা যুদ্ধ হবে না।

আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা ও তার অনুসারীরা (সাবাঈয়্যা) তারা আলির বাহিনীতে ও প্রতিপক্ষের বাহিনীতেও নিজেদের লোক ঢুকিয়ে রেখেছিল। তারা জানত, চুক্তি বাস্তবায়িত হলে মুসলিমদের মধ্যে ঐক্য ফিরে আসবে এবং তারা মুখোশহীন হয়ে যাবে এবং খলিফা উসমান হত্যায় তারা অভিযুক্ত হয়ে বিচারের সম্মুখীন হবে। তাই তারা রাতে দুই পক্ষের উপর গোপনে হামলা করে, যেন উভয় পক্ষ একে অপরকে বিশ্বাসঘাতক ভাবে। ফলে, পরদিন সকালে দুই পক্ষের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয়। উভয়েই ধারণা করে প্রতিপক্ষ রাতের আক্রমণের জন্য দায়ী। এ থেকেই শুরু হয় জামালের যুদ্ধ, যা ছিল এক মর্মান্তিক ও অনাকাঙ্ক্ষিত সংঘর্ষ। এ কথার দলিল ও ঐতিহাসিক সূত্র উল্লেখ করছি :

ক. ইবনে কাসির (রহ.) বলেন, “আলি (রা.) ও আয়িশা (রা.) সহ সাহাবারা শান্তিচুক্তিতে উপনীত হন। কিন্তু যাদের হাতে উসমান (রা.)-এর রক্ত লেগে আছে, তারা দুই পক্ষের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি করে, এবং যুদ্ধ বাধিয়ে দেয়।” ইবন কাসীর আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ২৩৫–২৪০

খ. ইবন আবী শাইবা (রহ.) বলেন, “আলি ও তালহা-যুবায়ের (রা.) উভয়েই সন্ধির বিষয়ে সম্মত হয়েছিলেন। কিন্তু রাতের আঁধারে অজ্ঞাতনামা একদল সেনা দুই শিবিরে হামলা চালায়।”  মুসান্নাফ ইবন আবী শাইবা, খণ্ড ৭

গ. তাবারী (আল-তাবারী) লিখেন, “সাবাঈয়্যাহ গোপনে উভয় বাহিনীতে প্রবেশ করে। তারা জানত, যদি মুসলমানরা ঐক্যবদ্ধ হয়, তবে তাদের ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হবে। তাই তারা যুদ্ধ বাধানোর জন্য পরিকল্পিত হামলা করে।” তারীখ আল-তাবারী, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ৪৩৬

সারকথা হলো : আলি (রা.) ও আয়িশা (রা.)-এর মধ্যে চুক্তি হয়েছিল, উভয়েই রক্তপাত এড়াতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা ও তার দল ইসলামি সমাজে গৃহযুদ্ধ লাগিয়ে উম্মাহকে দুর্বল করতে সচেষ্ট ছিল। তাদের গোপন ষড়যন্ত্রে ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি হয় এবং জামালের যুদ্ধ সংঘটিত হয়।

যুদ্ধ হল এবং যুদ্ধ চলার এক পর্যায়ে আলি (রা) জুবায়ের (রা) এর কাছে গিয়ে বললেন, “মনে আছে? একদিন রাসুল বলেছিলেন তুমি ভবিষ্যতে অন্যায়ভাবে আলির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে?” জুবায়ের বললেন, “ও! হ্যাঁ! তাই তো!” সাথে সাথে জুবায়ের (রা) যুদ্ধ ক্ষেত্র থেকে চলে গেলেন। ইবনে সাবার এক লোক জুবায়েরের পিছু নেয়। পরে জুবায়ের (রা) জোহোর এর নামাজ শুরু করতেই তাঁকে খুন করল। আনন্দের সাথে আলি (রা) এর কাছে এল খুনি, এরপর জুবায়েরের (রা) তরবারি, বর্ম পেশ করল। আলি (রা) তাঁকে জাহান্নামের সুসংবাদ দিলেন। সাথে সাথে, সেই লোক পেটে তরবারি ঢুকিয়ে আত্মহত্যা করল। অন্যদিকে তালহা (রা) যুদ্ধক্ষেত্র ত্যাগ করার সময় একটি তীরের আঘাতে মারা যান। আলি (রা) এ উভয়ের মৃত্যুর কথা শুনে মনবেদনায় কাতর হয়ে পড়লেন।

আলি (রা) বুঝতে পারলেন, যুদ্ধ সহজে শেষ হবে না। যতক্ষণ আয়িশা (রা) উটের উপর থেকে উৎসাহ দিবেন, ততক্ষণ চলবে যুদ্ধ। দশ হাজার মুসলিম মারা যাবার পর আলির (রা) বাহিনীর একজন উট পর্যন্ত পৌঁছে পা কেটে ফেলেন। ফলে উট বসে পড়ল। আর আয়িশার (রা) বাহিনীর মন ভেঙ্গে গেল। পরে, আলি (রা) আয়িশার (রা) হাওদাটি অদূরে নিয়ে গিয়ে পর্দা দিয়ে ঘিরে দেয়ার ব্যবস্থা করলেন। এরপর সেখানে ঢুকে কুশল জিজ্ঞেস করলেন। তারা পরস্পরের কাছে ক্ষমা চাইলেন। যুদ্ধ বন্ধ হল। এ যুদ্ধ জামাল (উট) যুদ্ধ নামে পরিচিত। কারণ, আয়িশা (রা) উটের উপর থেকে উৎসাহ দিচ্ছিলেন। মুসলিমদের যতই ক্ষতি হোক, লাভ হল ইসলামের শত্রুদের। এ যুদ্ধ সংঘটিত হয় ৩৬ হিজরী সনের জুমাদাল উখরা মাসে। এই ঘটনা বিস্তারি জানান জন্য ইসলামি ফাইন্ডেসনের প্রকাশিত, ইবনে কাসির রহ. লিখিত “আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়ার ৭ম খণ্ড” দেখার অনুরোধ রইল

সিফফিন যুদ্ধের পটভূমি ও ষড়যন্ত্রকারীদের ভূমিকা :

উসমান (রা.)-এর শাহাদাতের পর মুসলিম উম্মাহ ভয়াবহ রাজনৈতিক অস্থিরতার মুখে পড়ে। আলি (রা.) খলিফা নিযুক্ত হলে, মুসলিম বিশ্বের বড় একটি অংশ তাঁর নেতৃত্ব মেনে নেয়, কিন্তু সিরিয়ার গভর্নর আমিরে মুয়াবিয়া (রা.) যিনি উসমান (রা.)-এর আত্মীয়ও ছিলেন, তিনি খিলাফতের বিরোধিতা করেন না, তবে উসমান (রা.)-এর হত্যাকারীদের দ্রুত বিচার দাবি করেন। ইবনে কাসির বলেন-

মুয়াবিয়া (রা.) খিলাফতের দাবিদার ছিলেন না, বরং উসমান (রা.)-এর হত্যার বদলা ও বিচার দাবি করছিলেন। তিনি আলি (রা.)-কে চিঠিতে লিখেন, ‘তুমি খলিফা হও বা না হও, আগে খুনিদের বিচার হওয়া চাই।’ ইবন কাসীর, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, সপ্তম খণ্ড, পৃ.-২৪৮-২৫০

আলি (রা.) পরিস্থিতির বাস্তবতা বিবেচনায় সময় নিয়ে ন্যায়বিচার করতে চাইলেও, মুয়াবিয়া (রা.) মনে করতেন অপরাধীদের দেরিতে বিচার হলে তা জুলুমের সমান। এই ভিন্নমত থেকেই ৩৭ হিজরিতে সিরিয়ার সীমানায় ‘সিফফিন’ নামক স্থানে দুই পক্ষ মুখোমুখি হয়। আলি (রা.) এই সংঘাত এড়াতে প্রথমে সংলাপের চেষ্টা করেন, কিন্তু ষড়যন্ত্রকারীরা (বিশেষত উসমান (রা.)-এর খুনিরা) দুই পক্ষের সংঘর্ষ বাধিয়ে দিতে উঠেপড়ে লাগে।

আবু বকর মুহাম্মাদ ইবনুল ওয়ালিদ আল-মাকদিসী বলেন, সাবাঈয়্যাহ দল আলির (রা.) বাহিনীতে গোপনে প্রবেশ করে এবং যুদ্ধ বাধিয়ে উম্মাহকে বিভক্ত করার চক্রান্ত করে। আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, সপ্তম খণ্ড

এই ষড়যন্ত্রে অন্যতম ভূমিকা রাখে আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা ও তার অনুসারীরা, যারা একদিকে আলির বাহিনীতে ঢুকে পড়ে, অন্যদিকে সিরিয়ার পক্ষেও বিভ্রান্তি ছড়ায়। তাদের উদ্দেশ্য ছিল, মুসলিম নেতৃত্বে স্থায়ী ফাটল সৃষ্টি করা, যাতে ইসলামি রাষ্ট্র দুর্বল হয়ে পড়ে। অন্যদিকে, মারওয়ান ইবনে হাকাম, যিনি উসমান (রা.)-এর আত্মীয় ছিলেন, তিনি মুয়াবিয়া (রা.)-কে প্রতিশোধে আরও উৎসাহী করেন। মারওয়ান যুদ্ধ চেয়েছিলেন, কারণ এতে উসমান (রা.)-এর খুনিদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য প্রতিক্রিয়া দেখানো সম্ভব হবে বলে তিনি মনে করতেন। ফলে, ধীরে ধীরে রাজনৈতিক বিরোধ সশস্ত্র সংঘর্ষে রূপ নেয়।

সিফফিন যুদ্ধ ছিল মূলত দৃষ্টিভঙ্গিগত পার্থক্যের দ্বন্দ্ব, কিন্তু তা ষড়যন্ত্রকারীদের কারণে রক্তক্ষয়ী রূপ নেয়। পরে এই যুদ্ধ তাহকীম বা সালিসির মাধ্যমে নিষ্পত্তির চেষ্টায় রূপান্তরিত হয়, কিন্তু তা-ও নতুনভাবে ফিতনার জন্ম দেয়, যার ফলে খারিজি মতবাদের উৎপত্তি ঘটে।

৩৭ হিজরিতে সিফফিন যুদ্ধে আলি (রা.) ও  মুয়াবিয়া (রা.) এর বাহিনী মুখোমুখি হলে দীর্ঘ যুদ্ধের পর মুসলিম রক্তপাত বন্ধ করতে তাহকীম বা সালিসির প্রস্তাব আসে মুয়াবিয়ার পক্ষ থেকে। যুদ্ধ চলাকালে, হঠাৎ মুয়াবিয়ার সেনারা কুরআনের পৃষ্ঠা বর্শার মাথায় তুলে সালিসির আবেদন জানায়  “আসুন কুরআনের নির্দেশে সিদ্ধান্ত নিই।”আলি (রা.) প্রথমে বলেন-

الْكِتَابُ أَنَا نَاطِقُهُ

“আমি তো কুরআনের ভাষ্যকার (অর্থাৎ আমি নিজেই কুরআনের নির্দেশ মেনে চলছি)।

তাঁর সেনাবাহিনীর একটি অংশ চাপ দিলে তিনি তাহকীম মেনে নিতে সম্মত হন, তখন তাঁর সেনাবাহিনীর একটি উগ্রপন্থী গোষ্ঠী তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। তারা বলে-

لا حُكْمَ إِلَّا لِلَّهِ

“হুকুম কেবলমাত্র আল্লাহরই, কোনো মানুষের নয়।”

এ থেকেই খারিজি দল গঠিত হয়, অর্থাৎ যারা মূল শরিয়া ভিত্তিক জামাআত থেকে ‘বেরিয়ে যায়’। খারিজিদের দাবি ছিল, আলি (রা.) ও মুয়াবিয়া (রা.) উভয়েই ‘তাহকীম’ মেনে ভুল করেছেন, তাই তারা কাফির! যে কেউ বড় গোনাহ (সালিসি) করে, সে ইসলাম থেকে বের হয়ে যায়।

ইবন কাসীর আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া গ্রন্থে বলেন-

“তাহকীমের বিরোধিতা থেকে একদল লোক আলির (রা.) বাহিনী ছেড়ে বেরিয়ে যায়। তারা এতটাই চরম ছিল যে, মুসলিমদের বিরুদ্ধে তলোয়ার ধরে।  আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া,সপ্তম, পৃ.-২৮৫

এ সম্পর্কে সহিহ মুসলিমে একটি হাদিস এসেছে-

সুওয়াইদ ইবনু গাফালাহ্ (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আলি (রা.) বলেছেন, আমি কোন কথা রসুলুল্লাহ ﷺ এর পক্ষ থেকে বানিয়ে বলার চেয়ে- আমার আকাশ থেকে পড়ে যাওয়াকে শ্রেয় মনে করি। আর যখন আমি আমার ও তোমাদের মধ্যকার ব্যাপার নিয়ে কথা বলি তখন মনে রাখবে যে, যুদ্ধে কৌশল ও চাতুরতার আশ্রয় নেয়া বৈধ। আমি রসুলুল্লাহ ﷺ কে বলতে শুনিঃ সে যুগে (অর্থাৎ কিয়ামতের পূর্বে) এমন এক সম্প্রদায়ের আবির্ভাব ঘটবে যারা অল্প বয়স্ক ও স্বল্প বুদ্ধি-সম্পন্ন হবে। তারা সৃষ্টি জগতের চেয়ে ভাল ভাল কথা বলবে, তারা কুরআন মাজীদ পাঠ করবে কিন্তু তা তাদের গলার নীচে যাবে না। তীর যেভাবে শিকার থেকে বেরিয়ে যায় তারাও অনুরূপভাবে বেরিয়ে যাবে। অতএব, তোমরা তাদের সাথে মুখোমুখি হলে তাদের হত্যা করে ফেলবে। কেননা তাদেরকে যারা হত্যা করবে তারা কিয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে সাওয়াব পাবে। সহিহ মুসলিম : ১০৬৬

তাহকীমের (সালিসির) পর আলি (রা.) ও মুয়াবিয়া (রা.) এর মধ্যকার সম্পর্ক আরও জটিল হয়, যা মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের জন্য চরম সংকট ডেকে আনে। উভয় পক্ষের সম্পর্ক আরও তিক্ত হয়ে যায়

আলি (রা.) তাহকীমে সম্মতি দেয়ায় খারিজিরা তাঁকে ‘কাফির’ বলে ঘোষণা করে এবং বিদ্রোহ করে।

ইতিমধ্যে মুয়াবিয়া (রা.) নিজেকে “আমীরুল মুমিনীন” বলে ঘোষণা করেন এবং শাম অঞ্চলে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন।  মুয়াবিয়া (রা.)-এর রাজনৈতিক শক্তি বাড়ার কারনে শাম, মিশর, ও অন্যান্য প্রদেশ ধীরে ধীরে তাঁর আনুগত্য স্বীকার করে। মিসরের গভর্নর মুহাম্মদ ইবনু আবি বকর (আলি রা. এর নিয়োজিত) নিহত হন এবং মিসর মুয়াবিয়ার নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।

আলি (রা.) এর সেনাবাহিনী খারিজি বিদ্রোহ দমনে ব্যস্ত হয়ে পড়ে এবং তার অবস্থান কিছুটি দুর্বল হয়ে পড়ে। তিনি অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ, অন্যদিকে মুয়াবিয়ার প্রভাব, দুই দিক থেকেই চাপ বাড়ে। ৪০ হিজরিতে (৬৬১ খ্রিষ্টাব্দে) এক খারিজি বিদ্রোহী আবদুর রহমান ইবনু মুলজিম আলি (রা.)-কে ফজরের নামাজে ছুরি দিয়ে হত্যা করে। আলি (রা.) শাহাদাত বরণ করলে তাঁর ছেলে হাসান (রা.) খলিফা নিযুক্ত হন। পরের বছর ৪১ হিজরিতে হাসান (রা.) ও মুয়াবিয়া (রা.)-এর সন্ধি হয়। যার কারণে এ বছরকে বলা হয়,  আামুল জামায়া (ঐক্যের বছর)। মুসলিম রক্তপাত বন্ধের জন্য হাসান (রা.) নিজে স্বেচ্ছায় খিলাফত থেকে সরে গিয়ে মুয়াবিয়া (রা.) কে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। ফলে উম্মাহর মধ্যে আবার একতা প্রতিষ্ঠিত হয়। ইবন কাসীর, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া লিখেন-

“তাহকীমের পর উভয় পক্ষের মধ্যে আস্থাহীনতা চরমে পৌঁছে। আলি (রা.)-এর শাহাদাতের পর হাসান (রা.) মুয়াবিয়াকে ক্ষমতা হস্তান্তর করে উম্মাহর ঐক্য রক্ষা করেন।  আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, অষ্টম খণ্ড, পৃ.-১৩১–১৪৫

উসমান (রা.) কে হত্যার পর শিয়াদের আনুষ্ঠানিক ষড়যন্ত্র :

উসমান (রা.) কে হত্যার পর। যখন মদিনার অধিকাংশ সাবাবি ও মুসলিমদের বাইয়াতের মাধ্যমে আলি রা, খলীফা নির্বাচিত হয়ে তখন মদিনার সাহাবিদের পাশাপাশি উসমান (রা.) এর হত্যা ষড়যন্ত্রে জড়িত ক্ষুদ্র একটি মুনাফিক দল শিয়া জামাতের প্রতিষ্ঠিত আব্দুল্লাহ ইবনে সাবার নেতৃত্বেও আলি (রা.) কে সমর্থন দেয়। তারা মুনাফিকির নিয়তে আলি (রা.) পক্ষে যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করে। এই ক্ষুদ্র দলটি পরবর্তীতে আলি ও আহলে বাইয়াত নিয়ে চরম বাড়াবাড়ি করে। যেহেতু তারা আলি (রা.) এর পক্ষে বাড়াবাড়ি করে এবং তার অনুসারী দাবি করে। তাই তাদেরকে ‘শিয়ায়ে আলি’ বা আলির অনুসারী বলা হত। তখন থেকে ‘শিয়া’ বলতে আলি (রা.) এর অনুসারীদের বুঝান হত। বর্তমানে শিয়া বলা হয় এমন ব্যক্তিদের যারা ইমামতে বিশ্বাসী, আলি (রা.) ও আহলে বাইয়াত সম্পর্কে বিশেষ আকিদা বিশ্বাসীউসমান (রা.) কে হত্যার পর শিয়াদের আনুষ্ঠানিক ষড়যন্ত্র :

উসমান (রা.) কে হত্যার পর। যখন মদিনার অধিকাংশ সাবাবি ও মুসলিমদের বাইয়াতের মাধ্যমে আলি রা, খলীফা নির্বাচিত হয়ে তখন মদিনার সাহাবিদের পাশাপাশি উসমান (রা.) এর হত্যা ষড়যন্ত্রে জড়িত ক্ষুদ্র একটি মুনাফিক দল শিয়া জামাতের প্রতিষ্ঠাতা আব্দুল্লাহ ইবনে সাবার নেতৃত্বেও আলি (রা.) কে সমর্থন দেয়। তারা মুনাফিকির নিয়তে আলি (রা.) পক্ষে যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করে। এই ক্ষুদ্র দলটি পরবর্তীতে আলি ও আহলে বাইয়াত নিয়ে চরম বাড়াবাড়ি করে। যেহেতু তারা আলি (রা.) এর পক্ষে বাড়াবাড়ি করে এবং তার অনুসারী দাবি করে। তাই তাদেরকে ‘শিয়ায়ে আলি’ বা আলির অনুসারী বলা হত। তখন থেকে ‘শিয়া’ বলতে আলি (রা.) এর অনুসারীদের বুঝান হত। বর্তমানে শিয়া বলা হয় এমন ব্যক্তিদের যারা ইমামতে বিশ্বাসী, আলি (রা.) ও আহলে বাইয়াত সম্পর্কে বিশেষ আকিদা পোষণ করে। তাদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো সাহাবিদের গালি দেয়া এবং আলি (রা.) কে আবু বকর (রা.) ও উমর (রা.) চেয়ে অধিকতর মর্যাদা অধিকারী মনে করে। তারা বিশ্বাস করে রাসুলুল্লাহ ﷺ এর মৃত্যুর আগে “গাদির খুম” নামক স্থানে আলি (রা.) কে নিজের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় প্রতিনিধি এবং খলিফা নির্ধারণ করে যান। অথচ রাসুলুল্লাহ ﷺ এর মৃত্যুর পর সাহাবিগণ আবুবকর (রা.) এর নিকট সর্বসম্মতিতে বাইয়াত গ্রহণ করেন, আলি (রা.) কিংবা কেউ তাতে বিরোধিতা করেন নি।

আলি (রা.) এর যুগে শিয়াদের ফির্কা

ড. সফর ই়বনে আব্দুর রহমান আল-হাওয়ালি বলেন- আলি (রা.) এর যুগে যখন শিয়াদের উন্মেষ ঘটে তখন তারা তিন ভাগে বিভক্ত ছিল।

১। মুফাদ্দালাহ (প্রাধান্য দানকারী): তারা আলি (রা.) কে আবু বকর ও ওমর (রা.)মের উপর প্রাধান্য দিত।

২. সাব্বাবাহ (গালমন্দকারী): তারা আলি (রা.) কে প্রাধান্য দেওয়ার ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি করে, এমন কি আবুবকর ও ওমরকে পর্যন্ত গালমন্দ করে।

৩। গুলাত (সীমালঙ্ঘনকারী): তারা আলি (রা.) কে ইলাহ (উপাস্য) জানে, অর্থাৎ তারা বিশ্বাস করে তিনি ইলাহ, অথবা তার মাঝে ইলাহের কোনো অংশ প্রবেশ করেছে, যেমন খ্রিস্টানরা ঈসা আলাইহিস সালাম সম্পর্কে বিশ্বাস করে। তারা যিন্দিক। তাদেরকে যিন্দিক বলার কারণ তারা প্রকাশ্যে ইসলামের ঘোষণা দেয়, কিন্তু অন্তরে কুফর গোপন করে। উত্স : ড. সফর ই়বনে আব্দুর রহমান আল-হাওয়ালি, “বিভিন্ন ফের্কা, ধর্ম ও মতবাদের মূলনীতি”  প্রকাশক ইসলাম হাউজ, সৌদিআরব।

এই তিন প্রকার শিয়াদের ব্যাপারে আলি (রা.) এর ফয়সালা :

১। মুফাদদালাহ : মুফাদদালাহদেন আলি (রা.) তাদেরকে প্রত্যাখ্যান করতেন এবং ঘোষণা দিতেন যে রাসুলুল্লাহ ﷺ এর পর সর্বোত্তম উম্মত আবুবকর ও উমর (রা.)। যেমন- সহিহ বুখারিতে তার সূত্রে বর্ণিত আছে। সহিহ সূত্রে তার থেকে আরো প্রমাণিত, আলি (রা.) বলেছেন, “আবুবকর ও ওমরের উপর আমাকে প্রাধান্য দানকারী ব্যক্তিকে যদি আমার নিকট উপস্থিত করা হয় আমি অবশ্যই তাকে মিথ্যা অপবাদের শাস্তি আশিটি বেত্রাঘাত করবো”।

২। সাব্বাবাহ : সাব্বাবাহ সম্পর্কে আলি (রা.) এর ফয়সালা ছিল যে, তাদেরকে হত্যা করতে হবে। তার দলের কতক লোক আবুবকর ও ওমরকে গালমন্দ করে, এরূপ কথা তার নিকট পৌঁছলে তিনি তাদেরকে হত্যার জন্য তলব করেন, কিন্তু তারা পলায়ন করে।

৩. গুলাত (যিন্দিক) : গুলাতদের ব্যাপারে তার সিদ্ধান্ত ছিল আগুনে পোড়ানো, তিনি পুড়িয়েছেনও। যা সহিহ বুখারি দ্বারা প্রমাণিত।

ইবনে আব্বাস (রা.) তাদেরকে পোড়ানো নিয়ে আপত্তি করেন, কারণ আগুন দিয়ে পোড়ানোর ক্ষেত্রে নবি রাসুলুল্লাহ ﷺ এর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, তাই তাদেরকে তিনি তলোয়ার দিয়ে হত্যা করতে বলেন।

উত্স : ড. সফর ই়বনে আব্দুর রহমান আল-হাওয়ালি, “বিভিন্ন ফের্কা, ধর্ম ও মতবাদের মূলনীতি”  প্রকাশক ইসলাম হাউজ, সৌদিআরব।

আলি (রা.) খিলাফতের সময় আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা ইসলাম ধর্মে চরম বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে। সে ও তার অনুসারিগণ আলি (রা.) এর ব্যাপারে চরম সীমালঙ্ঘন করে, যার কিছু নমুনা তুলে ধরা হল :

১। আলি (রা.) এর উলুহিয়াত মতবাদ প্রকাশ করে :

আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা তার অনুসারীদের মাঝে ছড়িয়ে দেয় যে আলি (রা.) এর মাঝে উলুহিয়াত ক্ষমতা আছে।  ইবনে সাবার একদল অনুসারী আলি (রা.) এর দরজায় এসে বলে, “আপনিই সে?” তিনি বলেন, “সে মানে? তারা বলল, “আপনি আল্লাহ”। তিনি তাদেরকে তিন দিন সময় দেন, অতঃপর তাদেরকে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মারেন।

ইবন হাজর আল‑আসকলানি ফাথহুল বারি-তে বর্ণনাকারী ইকরিমাহ থেকে বর্ণিত। “আলি (রা.) কিছু ‘জানার্দি’ (যেকোনও ব্যক্তি যিনি আলিকে ইলাহ বলছিল) বংশকে আগুনে পুড়িয়ে দেন। আল-ইবন আব্বাস (রা.) এই হত্যাকে অস্বীকার করেন না, তবে তিনি বলেন, ‘যদি আমি হইতাম, তবে আমি তাদের পোড়াতাম না, কারণ নবি (সা.) বলেছেন,’’ لَا تُعَذِّبُوا بِعَذَابِ اللَّهِ”  (‘আল্লাহর শাস্তি দিয়ে অন্যকে শাস্তি দিও না’)  বরং আমি তাদের হত্যা করতাম ঠিক যার মতো নবি নির্দেশ দিয়েছেন, “যে ধর্ম পরিবর্তন করে, তাকে হত্যা করতে হবে। ইবন হাজর আল‑আসকলানি ফাথ্‌হুল বারি

২। আলি (রা.) ছাড়া কেউ কুরআন জমা করতে পারেনি :

আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা দাবি করে বর্তমান কুরআন প্রকৃত কুরআনের এক নবমাংশ, আলি ব্যতীত কেউ পূর্ণ কুরআন জমা করতে সক্ষম হয়নি। আলি ও তার পরিবারকে নবি রাসুলুল্লাহ ﷺ বাতেনি ইলম দ্বারা ভূষিত করেছেন। আলি (রা.) আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা এ মতবাদ প্রত্যাখ্যান করে বলেন, নবি ﷺ আমাকে কোনো ইলম দ্বারা খাস করেন নি।

তিনি ইবনে সাবাকে ডেকে পাঠান এবং বলেন, “আল্লাহর কসম তিনি অর্থাৎ নবি রাসুলুল্লাহ ﷺ আমাকে একান্তে কিছু প্রদান করেন নি যা অন্যান্য মানুষ থেকে গোপন করেছেন। আমি তাকে বলতে শুনেছি। কিয়ামতের পূর্বে ত্রিশ জন মিথ্যাবাদী হবে, তুমি অবশ্যই তাদের একজন”।

৩। শিয়াগণ আবু বকর (রা.) ও ওমর (রা.) কে গালমন্দ করত

ইবনে সাবা আবু বকর ও উমর (রা.) কে গালমন্দ করার উক্তি প্রকাশ করে, সে ধারণা করে আলি (রা.) তাদের সাথে শত্রুতা পোষণ করেন। যখন আলি (রা.) পর্যন্ত এ কথা পৌঁছে, তিনি বলেন, “আমার সাথে ও এ কালো খবিসের সম্পর্ক কি? আল্লাহর নিকট পানাহ চাই, তাদের ব্যাপারে ভালো ব্যতীত খারাপ কিছু গোপন করা থেকে”।

অতঃপর আব্দুল্লাহ ইবনে সাবাকে মাদায়েন নির্বাসনে পাঠানোর নির্দেশ দেন এবং বলেন: “আমার সাথে এক শহরে সে কখনো থাকতে পারে না”। অতঃপর তিনি মিম্বারে দাঁড়ান, যখন মানুষেরা জড়ো হল, তিনি আবু বকর ও উমরের অনেক প্রশংসা করেন, এবং জনগণকে শাসিয়ে তিনি এ বলে ভাষণ সমাপ্ত করেন। “জেনে রেখো, যার এ সম্পর্কে পৌঁছবে যে, সে আমাকে তাদের (আবু বক্কর ও উমর রা.) উপর প্রাধান্য দেয় আমি অবশ্যই তাকে অপবাদের দোররা মারব”।

সৌদি আলেম ডঃ সফর ই়বনে আব্দুর রহমান আল-হাওয়ালি, “বিভিন্ন ফের্কা, ধর্ম ও মতবাদের মূলনীতি” নামক গ্রন্থ থেকে নেওয়া হয়েছে। অন লাইলে প্রকাশ করেছে ইসলামহাইজ.কম

আব্দুল্লাহ ইবনে সাবাহ পারস্যে নির্বাসন

এই সব কার্যকলাপের দরুন আলি (রা.) ইবনে সাবাকে হত্যা করার ইচ্ছা করেন। কিন্তু তিনি ফিতনা ও বিদ্রোহের আশঙ্কায় সরাসরি পদক্ষেপ নেননি। কারণ, ইবন সাবার অনুসারীরা সংখ্যায় কম ছিল না এবং তারা নিজেদেরকে ‘আলির সমর্থক’ বলে দাবি করত। এদেরকে প্রকাশ্যে দমন করলে, তারা “আলি নিজেই নবির পরিবার ও আহলুল বাইতের বিরুদ্ধাচরণ করছেন” এমন অপবাদ ছড়াতে পারত। এই আশঙ্কায় তিনি কৌশলগত ধৈর্য অবলম্বন করেন এবং আব্দুল্লাহ ইবনে সাবাকে নির্বাসনে পারস্যরা নিক্ষেপ করেন।

আব্দুল্লাহ ইবনে সাবাকে পারস্যে নির্বাসনে পাঠাল আলি (রা.) সাময়িক স্বস্ত্বি পেলেও, ইবনে সাবাহ পেয়ে যান তার মতলব হাসিলের সূবর্ণ সুযোগ। চতুর আব্দুল্লাহ ইবনে সাবাহ সুযোগের সৎব্যবহারের কোন কমতি করেনি। ইবনে সাবার ভ্রান্ত আকিদা প্রচারের সূযোগসমুহ হল :

ক. নতুন ইসলাম দেশ :

পারস্যে ছিল ইসলামে প্রবেশকারী নতুন অনারব দেশ। তাদের ইসলাম গ্রহণের বয়স দশ/বার বছর। উমর সময়ে পারস্য বিজয় হয়। তাতে বসবাসকারী সাধারণ লোকদের অন্তর সাবেক আকিদার ভ্রান্তি থেকে তখনো পুরোপুরি মুক্ত হয়নি, তারা যে কোনো দাওয়াত গ্রহণ করার জন্য উৎসুক ছিল। তারা ইবনে সাবার দাওয়াত কে আসল ইসলাম মনে করে অকপটে গ্রহণ করে। ইবনে সাবার তার ভ্রান্ত বিশ্বাস ছড়ানোর জন্য সুবর্ণ সুযোগ পেয়ে যায়।

খ. ক্ষমতাধরদের ইসলাম অপছন্দ :

পারস্যের ক্ষমতাধর লোকেরা ইসলাম ও তার অনুসারীদের অপছন্দ করত। কারণ ইসলাম তাদের রাজতন্ত্রের পতন ঘটিয়েছে, তাদের ঐতিহ্য ধ্বংস করেছে ও তাদের অগ্নিপূজার ধর্ম নিশ্চিহ্ন করেছে। 

গ. অগ্নিপূজারী ধর্মগুরুরা নাখোশ :

 অগ্নিপূজারী ধর্মগুরুরা ইসলামের প্রতি নাখোশ ছিল। তারাও ইসলাম ধর্মের বিরুদ্ধে যে কোন কাজের সহযোগী ছিল। ইবনে সাবা ধর্মগুরুরা সাথে তাল মিলিয়ে ইসলাম বিকৃতিতে অংশ গ্রহণ কনে।

ঘ. পারস্যের জনগণের পুরান বিশ্বাস :

পারস্যের জনগণের স্বভাব ছিল শাসক পরিবারকে নিষ্পাপ জানা, প্রভুর স্তরে তাদের আনুগত্য প্রদান করা, শাসক পরিবার থেকে পরম্পরায় রাজত্বের মালিক বানানো, এমন কি তাতে পুরুষ সদস্য না থাকলে নারীই রাজত্বের মালিক হত। এই বিশ্বাসের পালে হাওয়া দিয়ে আব্দুল্লাহ ইবনে সাবাহ  প্রচার করে আলি (রা.) নিষ্পাপ, ইলাহ ও রাজত্বের একক মালিক।

ঙ. ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞতা :

 ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞতা ও অগ্নিপূজকদের পুরান বিশ্বাসের সূত্র ধরে। আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা ‘হুলুল’ আকিদা আলি (রা.) সম্পর্কে রচনা করে তার ব্যাপক প্রচার করে। এমন কি যখন তার নিকট আলি (রা.) এর হত্যার সংবাদ পৌঁছে, সে বলল, “যদি তোমরা একটি থলিতে তার মগজ নিয়ে আস আমি তার মৃত্যু বিশ্বাস করব না”। সে আরো বলে: “হত্যাকৃত ব্যক্তি আলি নয় বরং শয়তান তার আকৃতি ধারণ করেছে, আলি আসমানে উঠে গেছে, সে মেঘে হাঁটে, বিদ্যুৎ চমক তার দোররা, মেঘের গর্জন তার আওয়াজ। অতিসত্বর সে জমিনে ফিরে আসবে, অতঃপর তা ইনসাফ দ্বারা ভরে দিবে, যেমন তা ফ্যাসাদ দ্বারা পূর্ণ হয়ে গেছে”।

চ. অগ্নিপূজকদের হিংসা :

অগ্নিপূজকদের হিংসাকে পুঁজি করে ইবনে সাবা তার অনুসারী পারস্যদের মাঝে সাহাবিদের বিদ্বেষ ও গালমন্দ করার বীজ বপন করতে সক্ষম হয়, বিশেষ করে আমিরুল মুমেনিন উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) সম্পর্কে, যার মুজাহিদ বাহিনী তাদের দেশ জয় ও তাদের রাজত্ব ধ্বংস করেছে। তাদের এক অগ্নিপূজক আবু লুলু ফিরোজ উমর (রা.) কে অতর্কিত হামলা করে শহীদ করে, যা সবার জানা। যেমনি ভাবে ইবনে সাবা  উসমান (রা.), তালহা (রা.), যুবায়ের (রা.) ও অনেক সাহাবিকে হত্যার ষড়যন্ত্রে ছিল, ঠিক তেমনি ভারে প্রকাশ্যভাবে তাদের উপর লানত করত। সবচেয়ে অবাক কাণ্ড, অগ্নিপূজক আবু লুলু ফিরোজের কর্মে গর্ব করে ও সম্মান দেখায় এবং তাকে বীর-বাহাদুর উপাধি দেয়।

এভাবে মূল ইসলামকে পাশ কাটিয়ে আলি (রা.) জামানায় তার সম্পর্কে যে ভ্রান্ত আকিদা সৃষ্টি হয় যা স্বয়ং আলি (রা.) ও অপছন্দ করতেন, পরবর্তীতে আরও অনেক রঙ লাগিয়ে ভ্রান্ত আকিদার পাহাড় রচনা করা হয়, আর এই ভ্রান্ত আকিদার পাহাড়ের উপর দাঁড়িয়ে যে দলটি প্রতিষ্ঠিত হয় তার নাম হল “শিয়া” মতবাদ।

উমাইয়া খিলাফতের সময় ইবনে সাবা ও তার অনুসারীদের অবস্থা ও অবস্থান :

উমাইয়া খিলাফত শুরু হয় ৪১ হিজরিতে আলি (রা.)-এর শাহাদাতের পরে, যার প্রথম খলিফা ছিলেন মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান (রা.)। অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন, তিনি আলি (রা.) এর যুগেই দগ্ধ হয়ে মারা যান, ফলে উমাইয়া যুগে সরাসরি তাঁর অস্তিত্ব ছিল না। তবে তার অনুসারীরা বেঁচে ছিল এবং ছড়িয়ে পড়েছিল। তার মূল অনুসারীরা সক্রিয় ছিল কুফা, বসরা, ও ইয়ামানের এলাকাগুলোতে। উমাইয়া শাসকরা বিশেষ করে মুয়াবিয়া (রা.) ও পরে হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফ কড়া হস্তে চরমপন্থি গোষ্ঠী দমন করেন। কুফা ছিল শিয়া মতবাদের মূল ঘাঁটি, তাই সেখানে গুপ্তচর নিয়োগ, বক্তৃতা নিষেধাজ্ঞা এবং কখনো কখনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফ (মৃত্যু: ৯৫ হি.) এর সময় বহু চরমপন্থি (গুলাত ও সাব্বাহ) কে হত্যা করা হয়। তাবারী, বালাধুরি, ইবনে আসাকির

আব্বাসি খিলাফতের শিয়াদের অবস্থা :

ইতিহাসবিদদের বর্ণনা অনুযায়ী আব্বাসি খিলাফতের সূচনা ঘটে ১৩২ হিজরিতে (৭৫০ খ্রিষ্টাব্দ) বিপ্লবের সূচনালগ্নে শিয়ারা কিছুটা রাজনৈতিক প্রভাব ও আশা নিয়ে এই আন্দোলনের অংশ হয় কিন্তু আব্বাসিরা খিলাফত গ্রহণের পর নিজেদের আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব (নবির চাচা)-এর বংশধর হিসেবে পরিচয় দেয়। তারা আলি (রা.) এর বংশধর না করে দেয় এবং শিয়াদের প্রত্যাশা ভেঙে যায়। আব্বাসি শাসকেরা শিয়ারা বিপদের আশঙ্কা করত বিধায় তারা শাসনের শুরুর দিক থেকেই তাদের উপর নজরদারি শুরু করে এবং কারণে অনকারনে তাদের নির্যাতন করে। এই নির্যাতন ও রাজনৈতিক প্রান্তিকতার সময় শিয়ারা আধ্যাত্মিক নেতৃত্বে বেশি গুরুত্ব দিতে শুরু করে। ইমামতবাদী শিয়ারা ইমামদেরকে শুধুমাত্র রাজনৈতিক নেতা নয় বরং আধ্যাত্মিক ও গোপন জ্ঞানের অধিকারী মনে করতে থাকে। শিয়াদের মধ্যে ইসমাইলিয়া, জাফরিয়া (ইমামিয়া), ও অন্যান্য উপদল গঠিত হয়। শিয়াদের মধ্যে গায়ব (ইমামের আত্মগোপন) বিশ্বাসও এই সময়েই প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে। যদিও শিয়াদের দমন করা হতো, তবুও কেউ কেউ আব্বাসি দরবারে উচ্চপদে ছিলেন,  বিশেষ করে তারা যারা প্রকাশ্যে শিয়া মতাদর্শ প্রকাশ করতেন না। এ সময় শিয়া মতবাদের ভিত আরও সুদৃঢ় হলেও রাজনৈতিকভাবে তারা কোণঠাসা ছিল।

আব্বাসি খিলাফতের (১৩২-৬৫৬ হিজরি/৭৫০-১২৫৮ খ্রিষ্টাব্দ ) প্রায় ৫০০ বছরের দীর্ঘ সময় ধরে মুসলিম উম্মাহ শাসন করে।  এ সময় শিয়া ও সুন্নিদের মধ্যে সরাসরি “বড় যুদ্ধ” খুব বেশি হয়নি, কারণ শিয়ারা দীর্ঘ সময় ধরে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বাইরে ও রাজনৈতিকভাবে নিপীড়িত ছিল। তবে কুফা, মদিনা, বাহরাইন, সিরিয়া, ইরান, ইয়েমেন কুফা, বাগদাদ, তাবারিস্তান ইত্যাদি অঞ্চলে সাতটির বড় বিদ্রোহ ও অসংখ্য ছোট সংঘর্ষ হয়েছে। এসব ঘটনাই পরবর্তীতে শিয়া-সুন্নি মতবিরোধকে আরও গভীর ও রাজনৈতিক রূপ দেয়।

শিয়াদের প্রথম রাষ্ট্র গঠন :

শিয়া তথা ফাতিমি খেলাফতের উত্থান (সাল: ২৯৭ হিজরি / ৯০৯ খ্রিষ্টাব্দ) ইসলামি ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, যা ইসলামি বিশ্বে শিয়া নেতৃত্বাধীন প্রথম ও সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক ক্ষমতা হিসেবে বিবেচিত। এটি ইসমাইলি শিয়াদের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং প্রায় ২৭০ বছর ধরে উত্তর আফ্রিকা, মিশর, সিরিয়ায়, ও হিজাজের একটি বিশাল অংশে শাসন বিস্তার করে। ‘ফাতিমি’ শব্দটি এসেছে ফাতিমা আয-যাহরা (রা.), নবি মুহাম্মদ ﷺ এর কন্যার নাম থেকে। ফাতিমিদের দাবি ছিল, তারা নবি পরিবারের বংশধর এবং আলি ও ফাতিমা (রা.)-এর মাধ্যমে ইমাম হাসান ও হুসাইন (রা.) এর বংশে সম্পর্কিত। তাদের প্রতিষ্ঠাতা ইসমাইলি শিয়া মতবাদের অনুসারী, যারা ৭ম ইমাম ইসমাইল ইবনে জাফরের পর বংশধরদেরই ইমাম মানে।

আব্বাসি খেলাফত সুন্নি মতবাদে শাসন করছিল এবং আহলে বাইতের কিছু বংশধরদের দমন করত। ইসমাইলি শিয়ারা গোপনে দাওয়াহ চালিয়ে যাচ্ছিল নানা অঞ্চলে, খোরাসান, ইয়েমেন, উত্তর আফ্রিকা, মিশর ও সিরিয়ায়। উত্তর আফ্রিকার কায়রাওয়ান, ইফরীকিয়া (আজকের তিউনিশিয়া ও আলজেরিয়া) অঞ্চলে। তাদের ও দাওয়াতে কারণেই ফাতিমি খিলাফত প্রথিষ্ঠা হয়। প্রতিষ্ঠা ও প্রথম খলিফা ছিল উবাইদুল্লাহ আল-মাহদি বিল্লাহ তিনি নিজেকে আহলে বাইতের একজন বলে দাবি করেন এবং ইমাম মাহদি হিসেবে পরিচিতি দেন।

ফাতিমি খেলাফত ৩৫৮ হিজরিতে (৯৬৯ খ্রি.) মিশর বিজয় করেন। নতুন রাজধানী কায়রো প্রতিষ্ঠা করেন এবং এটিকে খেলাফতের কেন্দ্র বানান। বিখ্যাত আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় (৩৬১ হি.) প্রতিষ্ঠা হয় মূলত শিয়া দাওয়াহর কেন্দ্র হিসেবে।

ইমামদের মধ্যে উত্তরাধিকার নিয়ে দ্বন্দ্ব শুরু হয়, গোপন ইমামত ও রাজনৈতিক ইমামতের ফারাক নিয়ে মতভেদ, ক্রুসেডারদের আগমন, তুর্কি সালজুকদের উত্থান ফলে তারা দুর্বল হয়ে পড়ে এবং মিসরের সেনাপতি সালাহউদ্দিন আইউবি ৫৬৭ হিজরিতে (১১৭১ খ্রি.) ফাতিমিদের শাসনের অবসান ঘটান। সালাহউদ্দিন ফাতিমি খেলাফতের অবসান ঘটিয়ে মিশরে সুন্নি শাফেয়ি মাজহাব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন এবং আয়ুবি সালতানাত শুরু করেন।

ফাতিমি খেলাফতের উত্থান ছিল রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিকভাবে একটি বিপ্লবাত্মক ধারা। এটি সুন্নি-প্রধান ইসলামি ভূখণ্ডে শিয়া চিন্তার প্রথম সফল রাষ্ট্রীয় রূপ, যা প্রায় তিন শতাব্দী ধরে টিকে ছিল এবং বর্তমান মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাস ও মতাদর্শের উপর গভীর প্রভাব রেখেছে।

উত্স : আহমাদ ইবনে আলি আল মাকরিযী (মৃত্যু: ৮৪৫ হি./১৪৪২ খ্রি:), আল-মাকরিযী, আল-খিত্ত।

আলি ইবনে আবিল করীম ইবনুল আসীর (মৃত্যু: ৬৩০ হি./১২৩৩ খ্রি:, আল-কামিল ফিত্তারীখ।

ইমাম মুহাম্মদ ইবনে জারীর আত-তাবারী (মৃত্যু: ৩১০ হি./৯২৩ খ্রি:), তারীখুল উমাম ওয়াল মুলূক।

আব্বাসি খেলাফতের পতনে শিয়াদের ভূমিকা :

আব্বাসি খেলাফতের পতনের সময় (৬৫৬ হিজরি / ১২৫৮ খ্রিস্টাব্দে) তাতার বা মঙ্গোল বাহিনীর হাতে বাগদাদের ধ্বংস একটি ভয়াবহ ঐতিহাসিক বিপর্যয় ছিল। তৎকালীন মুসলিম বিশ্বের জ্ঞান, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় নেতৃত্বের কেন্দ্র ছিল এই শহর। হালাকু খান, চেঙ্গিস খানের বংশধর, বিশাল বাহিনী নিয়ে আব্বাসি খেলাফতের রাজধানী বাগদাদ অবরোধ করেন এবং প্রায় ৪০ দিন ধরে চলা অভিযানে শহরটি সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেন। এ আক্রমণে প্রায় দশ লক্ষেরও বেশি মুসলমান নিহত হন। আব্বাসি খলিফা আল-মুস্তাসিম বিল্লাহকে অপমানজনকভাবে পদদলিত করে হত্যা করা হয়। এছাড়া মুসলিম সভ্যতার অমূল্য সম্পদ – হাজারো কুরআন, হাদিস ও অন্যান্য জ্ঞানের গ্রন্থ পানিতে ডুবিয়ে দেওয়া হয় কিংবা পুড়িয়ে দেওয়া হয়, যা জ্ঞানের অন্ধকার যুগের সূচনা করে।

এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে শিয়াদের ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক ও ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ চলমান রয়েছে। অনেক সুন্নি ঐতিহাসিকের মতে, আব্বাসি খলিফার প্রধান মন্ত্রী ইবনে আল-আলকামী, যিনি শিয়া মাজহাবের অনুসারী ছিলেন, এই পতনে বড় ধরনের ভূমিকা পালন করেন। বলা হয়, তিনি গোপনে হালাকু খানের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করেন এবং খেলাফতের সৈন্য সংখ্যা ইচ্ছাকৃতভাবে কমিয়ে দেখিয়ে প্রতিরোধ পরিকল্পনা ব্যাহত করেন। এমনকি হালাকুর আগমনের সময় তিনি আত্মসমর্পণের পরামর্শ দিয়ে খেলাফতকে কার্যত রক্ষাহীন করে দেন। ইবন কাসীর তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া-তে, আর ইবনে তাইমিয়া মিনহাজুস সুন্নাহ-তে এই অভিযোগ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন। তাদের মতে, ইবনে আল-আলকামী শুধু বিশ্বাসঘাতকতাই করেননি, বরং মুসলিম বিশ্বের ধ্বংসে পরোক্ষ হাতও বাড়িয়ে দেন।

তবে বিষয়টি নিয়ে শিয়া ইতিহাসবিদদের মধ্যে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। তাদের মতে, ইবনে আল-আলকামী হয়তো আত্মরক্ষার কৌশল হিসেবে মঙ্গোলদের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন, কারণ শাসকগোষ্ঠীর নিপীড়নে বহু বছর ধরে শিয়ারা নিগৃহীত ছিলেন। তাই অনেকে একে আত্মরক্ষামূলক রাজনীতির অংশ হিসেবে দেখেন। বিশেষ করে তৎকালীন ইসমাইলি, বতাইনিয়া ও অন্যান্য শিয়া উপদলসমূহ তাতারদের সুন্নি শাসকদের বিরুদ্ধে একটি সম্ভাব্য শক্তি হিসেবে দেখেছিল এবং তাদের কেউ কেউ পরোক্ষ সমর্থনও দিয়েছিল।

পরবর্তী সময়ে হালাকুর বংশধররা ইসলাম গ্রহণ করে। যদিও তাদের কেউ সুন্নি ধারায় প্রবেশ করে, কেউবা শিয়া ঘরানার ইমামিয়াদের প্রতি সহনশীলতা দেখায়। এ থেকে বোঝা যায়, তাতারদের সঙ্গে কিছু শিয়া গোষ্ঠীর পূর্ব থেকেই কৌশলগত সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল। তবে সব শিয়াকে একযোগে এই পতনের জন্য দায়ী করা ঐতিহাসিক নিরপেক্ষতার পরিপন্থি। এটি ছিল একাধারে রাজনৈতিক, সামরিক ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার ফল, যার মাঝে মাজহাবীয় মতভেদ একটি মাত্র উপাদান হিসেবে ভূমিকা রেখেছিল।

শিয়াদের দল উপদল

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

বর্তমান যুগের শিয়াদের দল উপদল

বর্তমানেও শিয়ারা বিভিন্ন দলে বিভক্ত। তাদের দলের সংখ্যা যেহেতু সঠিকভাবে নিরূপণ করা যায় না। তাছাড়া প্রাথমিক যুগের শিয়াদের সাথে বর্তমান যুগের শিয়াদের অনেক পার্থক্য আছে আবার মিল ও আছে। বর্তমান যুগের শিয়া দাবিকৃত দলগুলির  সাথে প্রথমিক যুগের শিয়ার কোন সম্পর্ক নেই যদিও আকিদায় অনেক মিল খুঁজে পাওয়া যায়। প্রাথমিক যুগের শিয়াদের আকিদাকে আরও ফুলিয়ে ফাপিয়ে, রংঙ লাগিয়ে, বিকৃত করা হইয়াছে। ‘ইসলামি আকিদা ও ভ্রান্ত মতবাদ’ গ্রন্থে বলা হয়েছে। সাবইয়্যা শিয়ারা ৩৯ টি উপদলে বিভক্ত। আর গুলাত বা চরমপন্থি শিয়ারা ২৪ টি উপদলে বিভক্ত। যাদের একটি দল হল ইমামিয়া। এই ইমামিয়া শিয়ারাই, শিয়াদের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল। তাদের প্রধান ও সংখ্যাগরিষ্ঠচরমপন্থি

১। ইসনা আশারিয়া (إثنا عشرية) বা বার ইমামপন্থী শিয়া

২। ইসমাঈলিয়্যাহ (الإسماعيلية) শিয়া

৩। জায়েদিয়্যাহ (الزيدية) শিয়া

১। ইসনা আশারিয়া (إثنا عشرية) বা বার ইমামপন্থী শিয়া

ইসনা আশারিয়া (إثنا عشرية) বা বার ইমামপন্থী শিয়া মুসলিম জগতে শিয়াদের সবচেয়ে বড় ও প্রভাবশালী উপদল। এরা ১২ জন ইমামকে অপরিহার্যভাবে মানে বলে এদের নাম হয়েছে ইসনা আশারিয়া (إثنا عشرية – অর্থ: বারোজন)। তাদের ইমামিয়া শিয়া, বার ইমামি, জাফরিয়া শিয়া হিসেবে ও পরিচিতি আছে।

ক. ইসনা আশারিয়া শিয়াদের মূল আকিদাগুলি হলো

ইসনা আশারিয়া শিয়াদের বিশ্বাস করে যে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর পরে আলি ইবনে আবি তালিব (রা.) থেকে শুরু করে মোট ১২ জন ইমাম আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত, যাদের প্রত্যেকেই একে অপরের বৈধ উত্তরসূরি এবং ইলাহি জ্ঞান ও মাসুমিয়াত (নিরাপরাধিতা) দ্বারা পূর্ণ।

বারো ইমামের তালিকা :

ক্র : নংনামমৃত্যু সন
১মআলি ইবনে আবি তালিব৪০ হিজরি
২য়হাসান ইবনে আলি৫০ হিজরি
৩য়হুসাইন ইবনে আলি৬১ হিজরি
৪র্থআলি ইবনে হুসাইন (যাইনুল আবিদিন)৯৫ হিজরি
৫মমুহাম্মাদ আল-বা‌কির১১৪ হিজরি
৬ষ্ঠজাফর আস-সাদিক১৪৮ হিজরি
৭মমূসা আল-কারিম১৮৩ হিজরি
৮মআলি আল-রিদা২০৩ হিজরি
৯মমুহাম্মাদ আল-তাকি২২০ হিজরি
১০মআলি আল-নাকি২৫৪ হিজরি
১১তমহাসান আল-আসকারী২৬০ হিজরি
১২তমমুহাম্মাদ আল-মাহদী (গায়েব/অদৃশ্য)২৬০ হিজরি থেকে গায়েব

বারতম ইমাম সম্পর্কে শিয়ারা বিশ্বাস করে যে, তিনি হবেন ইমাম মাহদী। তিনি এখন গায়েব (অদৃশ্য) অবস্থায় আছেন এবং কিয়ামতের আগে ফিরে এসে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করবেন। বার ইমামের বিশ্বাস ছাড়াও

তাদের আকিদাগুলি হলো:

ইমামত : নবুয়তের পর ইমামত হলো দ্বীনের মূল স্তম্ভ। ইমামগণ আল্লাহ কর্তৃক নিযুক্ত, নির্ভুল  এবং তাদের কথা শোনাও ফরজ।

তাওয়াসসুল ও শাফা‘আত কী?

শিয়াদের বিশ্বাস অনুযায়ী, তাওয়াসসুল এবং শাফা’আত দুটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা, যা আল্লাহ’র নৈকট্য লাভের এবং তাঁর কাছে কোনো আবেদন পেশ করার মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। এই দুটি ধারণার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন নবী-রাসূলগণ এবং তাঁদের পবিত্র বংশধর ইমামগণ।

তাওয়াসসুল :

তাওয়াসসুল শব্দের অর্থ হলো মাধ্যম বা উপায়। শিয়া বিশ্বাসে, তাওয়াসসুল হলো আল্লাহ’র কাছে কিছু চাইতে বা তাঁর নৈকট্য লাভের জন্য কোনো পবিত্র সত্তা (যেমন: নবী মুহাম্মাদ (সা.) বা তাঁর বংশধর ইমামগণ) কে মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করা। এর মাধ্যমে সরাসরি আল্লাহ’র কাছে আবেদন করা হয়, তবে সেই আবেদনের শক্তি বা গুরুত্ব বৃদ্ধি করার জন্য আল্লাহর প্রিয়পাত্রদের নাম ব্যবহার করা হয়। শিয়াদের মতে, এর উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর রহমত ও অনুগ্রহের দিকে মনোযোগ আকর্ষণ করা। এটি কোনোভাবেই সেই পবিত্র সত্তাকে আল্লাহর সমকক্ষ মনে করা নয়, বরং আল্লাহর প্রতি বিনয় প্রকাশ এবং তাঁর প্রিয়পাত্রদের মর্যাদা স্বীকার করা।

শাফাআত :

শাফা’আত শব্দের অর্থ হলো সুপারিশ। শিয়া বিশ্বাসে, শাফা’আত হলো পরকালে, কেয়ামতের দিনে, কোনো বিশেষ ব্যক্তি (যেমন: নবী মুহাম্মাদ (সা.) এবং তাঁর বংশধর ইমামগণ) কর্তৃক পাপী মুমিনদের জন্য আল্লাহ’র কাছে ক্ষমা ও করুণার সুপারিশ করা। শাফা’আতের মূল ভিত্তি হলো আল্লাহর অনুমতি এবং সেই সুপারিশ করার অধিকার শুধু তারাই পাবেন, যাদেরকে আল্লাহ এই ক্ষমতা দিয়েছেন। শিয়াদের মতে, নবী ও ইমামগণ তাঁদের মর্যাদা ও পুণ্যের কারণে এই অধিকার লাভ করেছেন, এবং এর মাধ্যমে তারা মুসলিম উম্মাহকে জাহান্নামের কঠিন শাস্তি থেকে রক্ষা করতে পারবেন।

তাওসুল ও শাফায়াৎ : ইমামদের মাধ্যমে আল্লাহর কাছে উসিলা চাওয়াকে তারা বৈধ মনে করে।

শাফায়াৎ : বিপদে পড়লে বিশ্বাস গোপন করাকে তারা জায়েয মনে করে।

আশুরা ও কারবালার স্মরণ : ইমাম হুসাইন (রা.)-এর শাহাদত স্মরণে মাতম, নওহা, তাজিয়া, শোকানুষ্ঠান পালন করে।

ফিকহ : ইসনা আশারিয়ারা নিজেদের জন্য জাফরি ফিকহ অনুসরণ করে যা মূলত ইমাম জাফর আস-সাদিক (রহ.) এর শিক্ষার ওপর ভিত্তি করে গঠিত।

খ. বর্তমান অবস্থান ও দেশভিত্তিক জনসংখ্যা

ইসনা আশারিয়া শিয়ারা বর্তমানে নিম্নোক্ত দেশগুলিতে বাস করে:

দেশআনুমানিক শতাংশমন্তব্য
ইরান৯০–৯৫%রাষ্ট্রীয় ধর্ম, শিয়া আলেমদের শাসনব্যবস্থা
ইরাক৬০–৭০%কূফা, কারবালা, নাজাফ, সামাররার মতো গুরুত্বপূর্ণ শহর আছে
আজারবাইজান৮০–৮৫%ধর্মীয়ভাবে ইরানের ঘনিষ্ঠ
বাহরাইন৬৫–৭০%জনসংখ্যার অধিকাংশ শিয়া, কিন্তু শাসক সুন্নি
ইয়েমেন৩৫%-৬৫%শিয়ারা মূলত জায়েদি, তবে ইসমাইলি ও ইসনা আশারিয়াদের হুতিরা মুলত জায়েদি শিয়া।
লেবানন৩০–৪০%হিজবুল্লাহসহ শক্তিশালী ইসনা আশারিয়া সংগঠন
পাকিস্তান১০–১৫%“শিয়া হাজারা” জনগোষ্ঠী উল্লেখযোগ্য
ভারত৮–১০%লক্ষ্ণৌ ও কাশ্মীরে শক্তিশালী উপস্থিতি
আফগানিস্তান১০–১৫%বিশেষত “হাজারা” জনগোষ্ঠী ইসনা আশারিয়া, হেরাত প্রদেশে।
সিরিয়া১০% এর কমআলাওয়ি সম্প্রদায়, পতিত স্বৈরশাসক আসাদ পন্থী

বৈশিষ্ট্য ও চিহ্ন : ইমাম হুসাইনের শাহাদত (১০ মহররম) সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন হিসেবে পালন করে। কারবালার ঘটনাকে ধর্ম ও রাজনীতির কেন্দ্রীয় স্তম্ভ মনে করে। ইমামবাড়া, হোসেনিয়াহ, তাজিয়া, মাতম ইত্যাদি ধর্মীয় সংস্কৃতির অংশ বহন করে।

২। ইসমাঈলিয়্যাহ (الإسماعيلية) শিয়া

ইসমাঈলিয়্যাহ শিয়া (الإسماعيلية) শিয়াদের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও পুরাতন উপদল। তারা বার ইমামি শিয়াদের মতোই প্রথম ছয়জন ইমামকে মানে, কিন্তু সপ্তম ইমাম হিসেবে তারা ইমাম জাফর আস-সাদিক এর পুত্র ইসমাঈল ইবনে জাফর-কে মানে এখান থেকেই তাদের নাম “ইসমাঈলিয়াহ”।

ক. ইসমাঈলিয়াহ শিয়াদের সংক্ষিপ্ত পরিচয়:

ইমামত বিশ্বাস ইমাম জাফর আস-সাদিক (৬ষ্ঠ ইমাম) এর পুত্র ইসমাঈল ও তার বংশধররাই প্রকৃত ইমাম। মতবাদের শাখাগুলো হলো-

১. নিজারী ইসমাঈলিয়াহ ইমাম নিজারকে মানে, আগা খান ফির্কা।

২. মুস্তালীয় বা বোহরা, আল-মুতলাকের নেতৃত্বে মেনে চলে।

৩. দুরুজ, ফাতিমি খলিফা হাকিম বিল্লাহকে ইলাহ মনে করে, আলাদা ধর্ম হিসেবে বিবেচিত

৪. আখবারি বা বাতিনি গোষ্ঠী, মূলত গোপন ব্যাখ্যা নির্ভর দল।

খ. ইসমাঈলিয়াহ শিয়াদের মূল আকিদা ও বিশ্বাস

ইমামত : তাদের বিশ্বাস ইমামগণ অলৌকিক, গায়েবি জ্ঞানসম্পন্ন, আল্লাহর হুকুমের প্রতিনিধি।

বাতিনী ব্যাখ্যা : কুরআন ও শরিয়তের বাইরের গোপন ব্যাখ্যা থাকে যা তাদের ইমামগণ জানেন।

তাকইয়াহ : বিপদে বা অন্য কোন কারণে নিজেদের পরিচয় গোপন রাখা জায়েয ও কৌশল।

ইমাম মাহদী : ইমাম জীবিত আছেন এবং ফিরবেন কিন্তু কে তিনি, তা গোষ্ঠীভেদে ভিন্ন হবে।

গ. ইসমাঈলিয়াহ শিয়াদের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ:

সময়ঘটনা
২য় হিজরিইমাম জাফর আস-সাদিক (রহ.)-এর ইন্তিকালের পর বিভাজন
২৯৭ হিজরিফাতিমি খেলাফত প্রতিষ্ঠা (উত্তর আফ্রিকা, ইজিপ্ট)
৩৬২ হিজরিকায়রোতে আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা (শুরুতে শিয়া ঘাঁটি)
৪৮৭ হিজরিসেলজুক সুন্নি শক্তি ও নুরউদ্দীন জঙ্গী কর্তৃক পতন
১২শ শতাব্দী“হাসান সাব্বাহ” কর্তৃক আলমুত দুর্গে ইসমাঈলিয়া ঘাঁটি
১৯–২০ শতাব্দীআগা খান গোষ্ঠীর পুনরুত্থান, উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ

. বর্তমানে ইসমাঈলিয়ারা কোথায় বাস করে?

দেশশাখাজনসংখ্যা (আনুমানিক)
পাকিস্তানআগা খানি (নিজারী)৫–৭ লাখ
ভারত (গুজরাট, মহারাষ্ট্র)দাওদি বোহরা১০–১৫ লাখ
ইরানবিক্ষিপ্ত, অনেক গোপনীয়হাজারখানেক
সিরিয়াদুরুজ, নুসায়রি (আলাওয়ি সংশ্লিষ্ট)লক্ষাধিক
লেবাননদুরুজ ও কিছু বোহরা-নিজারী৪–৫ লাখ
তানজানিয়া, কেনিয়া, উগান্ডাআগা খানি (নিজারী)২–৩ লাখ
কানাডা, ইউকে, ইউএসএআগা খান অনুসারী প্রবাসীবিস্তর সম্প্রদায়

ঙ. খুব পরিচিত আগা খানি ইসমাঈলিয়ারা:

বর্তমানে নিজারী ইসমাঈলিয়া শিয়াদের ইমাম হচ্ছেন  প্রিন্স কারিম আগা খান চতুর্থ। তিনি “ইমাম” হিসেবে সম্মানিত এবং তাঁর ছবি ঘরে টাঙানো, দান করা, ব্যাখ্যা চাওয়া প্রভৃতি চর্চা চালু আছে। আগা খানি সম্প্রদায় আধুনিক শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও উন্নয়নমূলক কাজে সক্রিয়। অনেক সময় তাদের ধর্মবিশ্বাস খুবই “বাতিনী” ও সাধারণ ইসলামিক শারিয়তের বাইরে চলে যায়।

সারকথা : ইসমাঈলিয়া শিয়া মতবাদ একটি অত্যন্ত পুরাতন ও দার্শনিকভাবে জটিল শাখা। বর্তমানে তারা আগা খানি, দাওদি বোহরা ও দুরুজ নামক উপশাখায় বিভক্ত। তারা আফ্রিকা, ভারত, পাকিস্তান, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপ-আমেরিকায় ছড়িয়ে আছে। তবে ধর্মীয়ভাবে তারা মূলধারার ইসলাম থেকে বহু দূরে অবস্থান করছে বলে অনেক মুসলিম চিন্তাবিদ মনে করেন।

৩। জায়েদিয়্যাহ (الزيدية) শিয়া :

জায়েদিয়্যাহ (الزيدية) শিয়া মুসলিমদের একটি প্রাচীন ও তুলনামূলকভাবে মডারেট উপধারা। জায়েদিয়্যাহ (الزيدية) শিয়াদের নাম এসেছে ইমাম যায়দ ইবনে আলি (৭৯ হি./৬৯৮ খ্রিঃ – ১২২ হি./৭৩৯ খ্রিঃ) থেকে, যিনি ইমাম জয়নুল আবেদীনের পুত্র এবং হুসাইন (রা.)-এর প্রপৌত্র। তারা অন্যান্য শিয়াদের থেকে অনেকটা আলাদা। তারা জায়েদ বিন আলি বিন হুসাইন আল জয়নাল আবেদীনের অনুসারী। তারা মনে করেন, অত্যাচারী বাদশার বিপক্ষে যুদ্ধ করা ইমামদের দায়িত্ব। ১২১ হিজরীতে হিসামের বিপক্ষে যুদ্ধে, যারা যায়েদ বিন আলির সৈন্যবাহিনীর অংশ হয়ে যুদ্ধ করে তাদেরকে জায়েদি বলা হয়। যারা তাকে ফেলে চলে যায় তাদেরকে রাফিদি বলা হয়। আর এই রাফিদিরাই আবু বকর সিদ্দিকী (রা.) এবং উমর (রা.) এর প্রতি বিদ্দেষ ছড়ায়। কিন্তু জায়েদি শিয়ারা আবু বকর (রা.) এবং উমর (রা.) কেও ভালোবাসে। শুধু মাত্র আলি (রা.) কে অন্যান্য সাহাবিদের থেকে উপরে স্থান দেয়।

ক. আকিদা ও বিশ্বাসে মধ্যপন্থা :

জায়েদিরা প্রথম চার ইমামকে মানে তারা হলেন, আলি (রা.), হাসান (রা.), হুসাইন (রা.), যায়দ ইবনে আলি। তারা বিশ্বাস করে যে, যিনি আল্লাহর জন্য জিহাদ ও বিদ্রোহের মাধ্যমে নেতৃত্ব দাবি করেন, তাকেই ইমাম হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করতে হয়। তাই ইমাম নির্ধারণে “বিদ্রোহী” মনোভাব গুরুত্বপূর্ণ। তারা অনেকাংশে সুন্নি মতবাদ বিশেষত হানাফি বা মুতাজিলা মতের কাছাকাছি। তারা সাহাবায়ে কেরামের ব্যাপারে সুন্নিদের মতোই সম্মানজনক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে। তাদের মাঝে “তাকইয়াহ”, “গায়ব ইমাম”, “বাতিনী ব্যাখ্যা” এসব বিশ্বাস নেই। তারা ফিকহে স্বতন্ত্র মাযহাব গড়ে তুলেছে: জায়েদি মাযহাব, যা ইয়েমেনে প্রচলিত।

খ. জায়েদি বনাম ইসনা আশারিয়া শিয়াদে মাঝে বিশ্বাসগত পার্থক্য:

বিষয়জায়েদি শিয়াইসনা আশারিয়া (বার ইমামি)
ইমাম সংখ্যাসীমাহীন (বিদ্রোহ ও যোগ্যতার ভিত্তিতে)১২ জন নির্দিষ্ট
ইমামত ধারাগোপন নয়, যোগ্যতা নির্ভরনির্ধারিত উত্তরাধিকার
তাকইয়াহস্বীকার করে নামৌলিক আকিদা
গায়েব ইমামঅস্বীকার করেবিশ্বাস করে (মাহদী গায়েব)
সাহাবা মতসম্মানজনক (বিশেষত আবু বকর, উমর)অধিকাংশ সাহাবাকে প্রত্যাখ্যান করে
শরিয়াহনিজস্ব মাজহাব (জায়েদি)জাফরি মাজহাব

গ. জায়েদি শিয়াদের আবাস :

বর্তমানে তাদের মূল আবাস ইয়েমেন। তাদের রাজনৈতিক দলের নাম হুথি আন্দোলন (আনসারুল্লাহ)।  বর্তমানে ইয়েমেনের উত্তরাংশে প্রভাবশালী, ইরান দ্বারা আংশিক সমর্থিত। ২০০৪ সাল থেকে হুথি আন্দোলন শুরু হয়, যারা নিজেকে “জায়েদি শিয়া” বলে দাবি করে। তারা ইয়েমেনে সরকারবিরোধী সশস্ত্র বিদ্রোহে লিপ্ত হয়ে ২০১৪ রাজধানী সানা দখল করে নেয়। ফিলস্তানী মুজাহিদ হামাসের সমর্থে দখনদার ইসরাইলিদের বিরুদ্ধে ২০২৪-২০২৫ সালে যুদ্ধ করে মুসলিম উম্মার মন জয় করে নিয়েছিল। যদিও হুতিরা নামে জায়েদি, অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, তারা ইরানি শিয়াবাদের (ইসনা আশারিয়া) দিকে দার্শনিকভাবে ধাবিত হয়েছে।

ঘ. জায়েদি শিয়াদের প্রতিষ্ঠাতা যায়দ ইবন আলির একটি সাক্ষাৎকার :

জায়েদি ফির্কা প্রতিষ্ঠিত সেই যায়দ ইবন আলির নিকট গিয়ে শিয়াদের একটি দল প্রশ্ন করে এবং তিনি তার উত্তর প্রদান করেন। এ প্রশ্ন উত্তর তার আকিদা বিশ্বাস ফুটে উঠেছে। সাক্ষাৎকারটি হলো:

শিয়াদের প্রশ্ন : মহান আল্লাহ আপনার উপর রহম করুন৷ আবু বাকর (রা.) ও উমর (রা.) এর ব্যাপারে আপন র অভিমত কী?

যায়দ ইবন আলির উত্তর : মহান আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। আমি আমার পরিবারের কাউকে তাদের থেকে নিঃসম্পর্ক হতে শুনিনি৷ আর আমিও তাদের সম্পর্কে ভাল ছাড়া বলছি না ৷

শিয়াদের প্রশ্ন : তাহলে আপনি নবি পরিবারের রক্ত প্রত্যাশা করছেন কেন?

যায়দ ইবন আলির উত্তর : তার কারণ এ বিষয়টির (ক্ষমতার) আমরা অধিকতর হকদার৷ অথচ, মানুষ সে ক্ষেত্রে আমাদের উপর প্রভাব বিস্তার করে রেখেছে এবং আমাদেরকে তা হতে সরিয়ে রেখেছে৷ তবে আমাদের মতে তারা কুফরে উপনীত হয়নি৷ ক্ষমতাপ্রাপ্ত হয়ে তারা ন্যায়বিচার করেছে এবং কুরআন ও সুন্নাহ্ অনুযায়ী আমল করেছে।

শিয়াদের প্রশ্ন : তাহলে আপনি এদের সঙ্গে যুদ্ধ করছেন কেন?

যায়দ ইবন আলির উত্তর : এরা তো ওদের মত নয়৷ এরা জনগণের উপর এবং নিজেদের উপর জুলুম করেছে। আর আমি মহান আল্লাহর কিতাব, মহান আল্লাহর নবির সুন্নাহ জীবতিকরণ  ও বিদ্আত নির্মুলকরণের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি৷ কাজেই তোমরা যদি আমার কথা মান্য কর, তবে তা তোমাদের জন্যও মঙ্গল হবে, আমার জন্যও৷ আর যদি অস্বীকার কর, তাহলে আমি তোমাদের কোন জিম্মাদার নই৷

কিন্তু তারা তার বায়আত ভঙ্গ করে তাকে ত্যাগ করে চলে যায়৷ এ কারণেই সেদিন হতে তাদেরকে রাফেযী (ত্যাগকারী) নাম দেওয়া হয়। পক্ষান্তরে, যারা যায়দ ইবন আলির অনুসরণ করেছে, তারা আখ্যায়িত হয় যায়দিয়াহ্ নামে৷ কুফাবাসীদের অধিকাংশই রাফেযী আর আজ অবধি পবিত্র মক্কাবাসীগণের বেশির ভাগ মানুষ যায়দিয়্যাহ মতবাদের অনুসারী তাদের মতাদর্শের একটি সভা আছে তা হলো, আবুবকর (রা.) ও উমর (রা.) উভয়কে সত্যপন্থী বলে বিশ্বাস করা৷

আবার একটি ভ্রান্তিও আছে। তা হলো, আবু বকর (রা.) ও উমর (রা.) এর উপর আলি (রা.) কে প্রাধান্য দেওয়া। অথচ, আলি (রা.) তাদের চেয়ে উপরে নন। এমনকি আহলুসৃ-সুন্নাহর সুপ্ৰতিষ্ঠিত অভিমত ও সাহাবিগণের থেকে বর্ণিত সঠিক বর্ণনা অনুপাতে উছমানও (রা.) তাদের উপর অপ্রগণ্য নন৷

শিয়াদের ভ্রান্ত আকিদাসমূহ-১ : শিয়াদের ইমাম সম্পর্কে আকিদা।


মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন
ইসলাম একটি পরিপূর্ণ জীবনবিধান, যার মৌলিক ভিত্তি হলো কুরআন, সহিহ সুন্নাহ ও সাহাবায়ে কেরামের সর্বসম্মত বুঝ। নবি করিম ﷺ এর ইন্তেকালের পর বিভিন্ন রাজনৈতিক ও চিন্তাগত বিভ্রান্তির ফলে মুসলিম সমাজে কিছু গোষ্ঠীর উদ্ভব হয়, যারা ইসলামি আকিদা ও শরিয়াহর মূল নীতিমালার ব্যাপারে বিচ্যুত হয়। এসব ফিরকার মধ্যে শিয়া মতবাদ সবচেয়ে বেশি বিভ্রান্তিমূলক ও বিপজ্জনক, কারণ তারা নিজেদের মুসলিম পরিচয়ে উপস্থাপন করলেও মূলধারার ইসলাম থেকে অনেক মৌলিক বিষয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। শিয়ারা ইমামতকে দ্বীনের রুকন মনে করে, সাহাবায়ে কেরামের প্রতি প্রকাশ্যে অবমাননা করে, কুরআনের বিকৃতি বিশ্বাস করে, তাকইয়াহ ও গায়েবি ইমামতকে ঈমানের অংশ বানায় এবং এমন অনেক আকিদা গ্রহণ করে যা কুরআন ও সহিহ হাদিসের সরাসরি বিরোধী। অতএব, ইসলামি উম্মাহর দায়িত্ব হলো—শিয়াবাদের এসব ভ্রান্ত বিশ্বাসকে বিশ্লেষণ ও খণ্ডনের মাধ্যমে সাধারণ মুসলিমদের সামনে স্পষ্ট করে তুলে ধরা, যাতে কেউ অজ্ঞতাবশত বিভ্রান্তিতে না পড়ে। আমরা উপরের আলোচনতা শিয়াদের বিভিন্ন ভাগ দেখেছি। লক্ষ করেছি, তাদের বিভিন্ন ভাগের আকিদা বিশ্বাসও ভিন্ন ভিন্ন। নিচের আলোচনা শিয়াদের কোন ভাগকে আলাদা না করে, তাদের সকলের মাঝে যে ভ্রান্ত আকিদ বিশ্বাস আছে, আলোচনার শার্তে আলাদা না করে একই সাথে তুলে ধরছি। এ পর্যায়ে আমরা শিয়াদের এসব ভ্রান্ত আকিদার পর্যালোচনা করে এবং কুরআন-সুন্নাহর আলোকে খণ্ডন করব, ইনশাআল্লাহ।

শিয়াদের ইমাম সম্পর্কে আকিদা :

ইমামদের সম্পর্কে শিয়াদের অনেক ভ্রান্ত কুফরি আদিকা আছে। তাদের শুধু এই একটি আকিদা আলোচনা করতেই একটি গ্রন্থ হয়ে যাবে। তাই খুবইসংক্ষেপে তাদের ইমামত আকিদা সম্পর্কে তুলে ধরা হল :

১. শিয়াদের বিশ্বাস মানব জাতির হেদায়াতের জন্য বার ইমাম মনোনীত করা হয়েছে :
শিয়াদের প্রধান আকিদা হল ইমামত সংক্রান্ত আকিদা। আল্লাহ তায়ালা মানুষ জাতির জাতির জন্য সর্বশেষ রাসূল মুহম্মদ ﷺ প্রেরণ করেন। তার মৃত্যুর পর যেহেতু আর কোন নবি বা রাসূল আসবেন না, তাই মানুষ জাতির হেদায়াতের জন্য ইমাম মনোনীত করবেন। আর শিয়াদের মতে আল্লাহ তায়ালা বার জন ইমাম নিযুক্ত করছেন। কিয়ামত পর্যন্ত তারাই পৃথিবীবাসির হেদায়াতের জন্য কাজ করবেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ এর পরে আলি (রা.) থেকে শুরু করে মোট ১২ জন ইমাম আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত, যাদের প্রত্যেকেই একে অপরের বৈধ উত্তরসূরি এবং ইলাহি জ্ঞান ও মাসুমিয়াত (নিরাপরাধিতা) দ্বারা পূর্ণ। পূর্বের ইসনা আশারিয়া শিয়াদের আলোচনায় এ ১২ জন ইমামের নাম উল্লেখ করেছি।
বারতম ইমামের নাম হবে ইমাম মাহদী। তিনি এখন গায়েব (অদৃশ্য) অবস্থায় আছেন। শিয়া আকিদা অনুযায়ী এখন থেকে প্রায় বার শত বছর আগে ২৫৫ অথবা ২৫৬ হিজরিতে জম্ম গ্রহণ করে ৪/৫ বছর বয়সে অলৌকিকভাবে লোক চক্ষুর অন্তরালে চলে যান এবং ‘সুররা মান রায়া’ নামক একটি গুহায় আত্মগোপন করে আছেন। শেষ জামানায় কিয়ামতের আগে তিনি ফিরে এসে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করবেন এবং তার উপরই পৃথিবীতে কিয়ামত হবে। শিয়া মতবাদে বারতম ইমাম বা ইমাম মাহদীর গায়েব (অদৃশ্য) থাকা এবং ভবিষ্যতে তাঁর আবির্ভাব নিয়ে আকিদা সম্পর্কে তাদের বহু মৌলিক কিতাবে বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে। নিচে কিছু গুরুত্বপূর্ণ শিয়া কিতাবের রেফারেন্স উল্লেখ করা হলো:

ক। আবূ আব্দিল্লাহ (আঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-

إِنَّ لِلْقَائِمِ (ع) غَيْبَتَيْنِ، إِحْدَاهُمَا تَطُولُ حَتَّى يَقُولَ بَعْضُهُمْ: مَاتَ، وَبَعْضُهُمْ: قُتِلَ، وَبَعْضُهُمْ: ذَهَبَ، وَلَا يَطَّلِعُ عَلَى مَوْضِعِهِ أَحَدٌ مِنْ وُلْدِهِ وَلَا غَيْرُهُ، إِلَّا الْمَوْلَى الَّذِي يَلِي أَمْرَهُ.
“নিশ্চয়ই কায়েম (ইমাম মাহদী) এর দু’টি গায়বাত (অদৃশ্য থাকা) রয়েছে। তাদের একটিকে দীর্ঘায়িত করা হবে—এমনকি কেউ বলবে: তিনি মারা গেছেন; কেউ বলবে: তাঁকে হত্যা করা হয়েছে; আবার কেউ বলবে: তিনি অদৃশ্য হয়ে গেছেন। আর তাঁর অবস্থান সম্পর্কে তাঁর সন্তানদের কেউও জানবে না, অন্যরাও না—শুধু সেই বিশেষ প্রতিনিধি ছাড়া, যিনি তাঁর দায়িত্ব সামলাবেন।” ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইয়াকুব আল-কুলায়নী, উসুলুল কাফী, প্রথম খণ্ড, পৃ.-৩৪০, হাদিস নম্বর : ৬

খ। শিয়াদের একজন প্রখ্যাত মুহাদ্দিস (হাদিস বিশারদ) ও আলেম। তিনি শিয়াদের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও শ্রদ্ধেয় চার মুহাদ্দিসের (الثقات الأربعة) একজন হিসেবে বিবেচিত। আবু জাফর মুহাম্মাদ ইবন আলি ইবন হুসাইন ইবন বাবুয়াইহ আল-কুম্মী যিনি শেখ সাদুক নামে পরিচিত তিনি তার গ্রন্থে লিখেন-
وُلِدَ القَائِمُ (عليه السلام) بَعْدَ نِصْفِ شَعْبَانَ سَنَةَ خَمْسٍ وَخَمْسِينَ وَمِائَتَيْنِ (٢٥٥هـ)…وَغَابَ عَنْ أَعْيُنِ النَّاسِ، وَلَا يَرَاهُ أَحَدٌ حَتَّى يَأْذَنَ اللهُ عَزَّ وَجَلَّ لَهُ أَنْ يَظْهَرَ…
“কায়েম (ইমাম মাহদী আলাইহিস সালাম) জন্মগ্রহণ করেন ২৫৫ হিজরির শা’বান মাসের মধ্যরাতের পর।
এরপর তিনি মানুষের দৃষ্টির আড়ালে চলে যান। তাঁকে কেউই দেখতে পাবে না, যতক্ষণ না আল্লাহ তায়ালা তাঁকে প্রকাশের অনুমতি দেন।” : শেখ সাদুক, কমালুদ্দীন ও আতমামুন্নিমাহ, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃ. ০৯–৪১০

গ। মুহাম্মাদ ইবনে নুমান আল নুবাখতি বলেন-
إِنَّ صَاحِبَ هَذَا الأَمْرِ لَهُ غَيْبَةٌ، الْمُتَمَسِّكُ فِيهَا بِدِينِهِ كَالْخَارِطِ لِلْقَتَادِ، ثُمَّ قَالَ: لَهُ غَيْبَةٌ يَطُولُ أَمَدُهَا.
“নিশ্চয়ই এ বিষয়ের (ইমামত) অধিকারী (ইমাম মাহদী) এর একটি গায়বাত (অদৃশ্য থাকা) থাকবে। সে সময় তার দ্বীনের ওপর দৃঢ়ভাবে টিকে থাকা হবে যেন কাঁটার ঝোপে (কাঁটাযুক্ত গাছ) হাত চালানোর মতো কষ্টকর। অতঃপর তিনি বলেন, তাঁর এই গায়বাত দীর্ঘ সময় ধরে চলবে।” মুহাম্মাদ ইবনে নুমান আল নুবাখতি, গায়বা, পৃ.- ১৬৪, হাদিস : ১০.

ঘ। আবু মুহাম্মাদ আল-হাসান ইবনে ইয়াকুব আল-কুলায়নী যিনি শেখ মুফিদ নামেও খ্যাত। তিনি বলেন-
وَلِدَ (عليه السلام) فِي النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ سَنَةَ خَمْسٍ وَخَمْسِينَ وَمِائَتَيْنِ، وَغَابَ عَنْ أَعْيُنِ النَّاسِ، وَهُوَ الْقَائِمُ الْمُنْتَظَرُ.
তিনি (আলাইহিস সালাম) ২৫৫ হিজরির শা’বান মাসের মধ্যরাতে জন্মগ্রহণ করেন এবং মানুষের দৃষ্টির আড়ালে চলে যান। তিনিই হলেন প্রতীক্ষিত কায়েম (ইমাম মাহদী)। শেখ মুফীদ, আল-ইরশাদ, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃ.-৩৩৯

এ সম্পর্কে সঠিক আকিদা :
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
اِنَّ اللّٰہَ اصۡطَفٰۤی اٰدَمَ وَنُوۡحًا وَّاٰلَ اِبۡرٰہِیۡمَ وَاٰلَ عِمۡرٰنَ عَلَی الۡعٰلَمِیۡنَ ۙ
নিশ্চয়ই আল্লাহ আদম, নূহ ও ইবরাহীমের পরিবারকে এবং ইমরানের পরিবারকে সৃষ্টিজগতের উপর মনোনীত করেছেন। সুরা আল ইমরান : ৩৩
আল্লাহ তায়ালা পৃথিবীর জন্য নবি রসূল মনোনীত করেছেন। তিনি কোন ইমম মনোনীত করেন নাই। তবে সহিহ হাদিসের মাধ্যমে জানা যায় ইমাম মাহদী নামে একজন ইমমা আসবেন।
আবূ সাঈদ আল-খুদরী (রা.) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমরা ভয় পাচ্ছিলাম যে, আমাদের রাসূল ﷺ ্এর পরে নতুন কোন দুর্ঘটনা ঘটবে। সুতরাং আমরা এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহ ﷺ কে প্রশ্ন করলাম। তিনি বললেন, আমার উম্মাতের মাঝে মাহদীর আগমন ঘটবে, সে পাঁচ অথবা সাত অথবা নয় বৎসর পর্যন্ত বেঁচে থাকবে (যাইদ সন্দেহে পতিত হয়েছেন যে, ঊর্ধ্বতন বর্ণনাকারী কোন সংখ্যাটি বলেছেন)। বর্ণনাকারী বলেন, আমরা প্রশ্ন করলাম, এই সংখ্যায় কি বুঝায়? তিনি বললেন বছর। মানুষ তার নিকট এসে বলবে, হে মাহদী। আমাকে কিছু দান করুন, আমাকে কিছু দান করুন। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, তারপর সে তার কাপড় বা থলেতে যেটুকু পরিমাণ বহন করে নিতে পারবে তিনি তাকে সেটুকু পরিমাণ দান করবেন। সুনানে তিরমিজি : ২২৩২, সুনানে ইবনু মাজাহ : ৪০৮৩
শিয়াদের এই ১২ ইমাম সংক্রান্ত আকিদা কুরআন সুন্নুহ বিরোধী। মানুষ জাতির হেদায়াতের জন্য ১২ জন ইমাম মনোনীত করার প্রমাণ কুরআন ও হাদিসে পাওয়া যায় না। বরং এটা মনগড়া শিয়াদের তৈরি করা আকিদা মাত্র। এ সম্পরই বিস্তরিত পাবেন শিয়াদের নিকট সবচেয়ে বিশুদ্ধ হাদিসের গ্রন্থ “উসুলুল কাফি”-তে। (১) (১) শিয়াদের অন্যতম শ্রেষ্ঠ হাদিস বিশারদ ও মুহাদ্দিস ছিলেন মুহাম্মাদ ইবনে ইয়াকুব আল-কুলায়নী (মৃত্যু: ৩২৯ হিজরি)। তিনি ‘উসুলুল কাফী’ বইটি সংকলন করেন। এ বইটি শিয়া মুসলিমদের নিকট হাদিস সাহিত্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ, যা সুন্নিদের সহিহ বুখারির সমতুল্য মর্যাদা বহন করে। এই গ্রন্থটি সংকলন করেন, যাতে ১৬,১৯৯টি হাদিস স্থান পেয়েছে। যার মধ্যে বহু সংখ্যক হাদিসের সনদ ও বক্তব্য সুন্নি মানদণ্ডে দুর্বল, এমনকি শিয়াদের মধ্যেও বিতর্কিত। তবুও শিয়ারা আকিদা ও আমলের প্রধান উৎস হিসেবে একে অত্যন্ত মর্যাদাসম্পন্ন গ্রন্থরূপে গণ্য করে। উসুলুল কাফী তিনটি প্রধান ভাগে বিভক্ত: উসুল (মৌলিক বিশ্বাস), ফুরু (ব্যবহারিক ফিকহ) এবং রাওযা (বিবিধ শিক্ষা)। এতে তাওহীদ, নবুয়ত, ইমামত, আখিরাত ও নৈতিকতার মতো বিষয়গুলো আলোচিত হয়েছে। আমরা শিয়াদের ভ্রান্ত আকিদা প্রমাণের ক্ষেত্রে তাদের অধিকাংশ আকিদার কথা উসুলুল কাফী গ্রন্থে রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করব বিধায় আপনাদের নিকট এ বইটির সামান্য পরিচয় তুলে ধরলাম।

২. শিয়াদের নির্বাচিত ইমামগণ নিষ্পাপ :

ক। ইমাম ইবনে মূসা (আঃ) এর প্রসঙ্গ বিষয়ে উসুলুল কাফির মধ্যে একটি দীর্ঘ খুতবা (খুৎবাহ) রয়েছে। এতে বারবার ইমামদের শ্রেষ্ঠত্ব এবং তাদের ইস্মাত বা নিষ্পাপত্বের ব্যাপারে বিস্তৃত বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। এই খুৎবাহটি “ হুজ্জত অধ্যায়, ইমামগণই পৃথিবীর স্তম্ভ” পরিচ্ছেদ অংশে স্থান পেয়ে থাকে। কয়েকটি মূল বাণী নিচে উপস্থিত করা হলো:
ثُمَّ ذَكَرَ الْحَدِيثَ الْأَوَّلَ…وَكَذَلِكَ يَجْرِي الْأَئِمَّةُ الْهُدَى وَاحِداً بَعْدَ وَاحِدٍ جَعَلَهُمُ اللَّهُ أَرْكَانَ الْأَرْضِ أَنْ تَمِيدَ بِأَهْلِهَا وَحُجَّتَهُ الْبَالِغَةُ عَلَى مَنْ فَوْقَ الأَرْضِ وَمَنْ تَحْتَ الثَّرَى…وَمَا جَاءَ بِهِ عَلِيٌّ ع آخُذُ بِهِ…وَمَا نَهَى عَنْهُ أَنْتَهِي عَنْهُ…جَرَى لَهُ مِنَ الْفَضْلِ مِثْلُ مَا جَرَى لِمُحَمَّدٍ ص…
অর্থ : এমনভাবেই ইমামগণ হিদায়াতের ধারক, পরপর একের পর একজন; আল্লাহ তাদেরকে পৃথিবীর স্তম্ভ বানিয়েছেন যেন তা নড়ে না। তারা আসমান-জমিন উভয়ের ওপর সামনে প্রমাণ (হুজ্জাহ) হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।” এবং “যে আইন আলি (রা.) প্রতিষ্ঠা করেছেন আমি (ওই আইন) গ্রহণ করি, ও যে কিছু তিনি নিষেধ করেছেন আমি তা থেকে বিরত থাকি; তার জন্য তার সম্মান এবং মর্যাদা এমন যা মুহাম্মাদ ﷺ এর সাথেও তুলনীয়।” এছাড়া, দ্বিতীয় সূত্র হিসেবে উল্লিখিত যে, উসুলুল কাফির সেই অংশেও ইমাম আল-রেজা (আঃ) নিজেই বলেছেন-
“الْإِمَامُ خَالٍ مِنَ الذَّنْبِ وَطَاهِرٌ مِنْ كُلِّ عَيْبٍ … لاَ يُدْانَى عِلْمُهُ وَلاَ يُنَالُ دَرَجَتُهُ”
অর্থ : “ইমাম সম্পূর্ণরূপে পাপমুক্ত, প্রতিটি দোষ থেকে নির্মল… তার জ্ঞান অনুপম এবং কেউই তার উচ্চ মর্যাদায় উপনীত হতে পারে না।” ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইয়াকুব আল-কুলায়নী, উসুলুল কাফী, প্রথম খণ্ড, পৃ.-৬৪-৬৫

এ সম্পর্কে সঠিক আকিদা :
নিষ্পাপ হওয়া শুধু নবি রাসূরদের গুন। কোন মানুষের জন্য এমনগুন মানায় না। ইসলামে নবি ﷺ ছাড়া কারো আনুগত্য বাধ্যতামূলক করা হারাম। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
اِنَّ اللّٰہَ عِنۡدَہٗ عِلۡمُ السَّاعَۃِ ۚ  وَیُنَزِّلُ الۡغَیۡثَ ۚ  وَیَعۡلَمُ مَا فِی الۡاَرۡحَامِ ؕ  وَمَا تَدۡرِیۡ نَفۡسٌ مَّاذَا تَکۡسِبُ غَدًا ؕ  وَمَا تَدۡرِیۡ نَفۡسٌۢ بِاَیِّ اَرۡضٍ تَمُوۡتُ ؕ  اِنَّ اللّٰہَ عَلِیۡمٌ خَبِیۡرٌ 
কিয়ামাতের জ্ঞান শুধু আল্লাহর নিকট রয়েছে, তিনিই বৃষ্টি বর্ষণ করেন এবং তিনিই জানেন যা জরায়ুতে রয়েছে। কেহ জানেনা আগামীকাল সে কী অর্জন করবে এবং কেহ জানেনা কোন্ স্থানে তার মৃত্যু ঘটবে। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সর্ব বিষয়ে অবহিত। সুরা লোকমান : ৩৪
কাজেই ইমামদের সম্মানে দাবি করা হয়েছে যে, তারা গায়েবের খবর রাখেন তা ষ্পষ্টই শির্ক। কেউই জানেনা তার মৃত্য কখন হবে এবং কোথায় হবে, এমন দাবি অমুল ও শিরক। শিয়া ইমামদের এমন জ্ঞান রাখার ক্ষমতা আছে বিশ্বাস করা শিরক। কেননা এর মাধ্যমে জ্ঞানের ক্ষেত্রে তারা আল্লাহর সমকক্ষ হয় যাবে। এহেন গঘন্য আকিদা থেকে মহান আল্লাহকে তাদের ও আমাদের পবিত্র রাখুক।

৩. শিয়াদের ইমমাগণ পৃথিবীতে হুজ্জত বা পরিপূর্ণ দলিল

এ সম্পর্কে শিয়াদের উসুলুল কাফীর একটি হাদিসে ইমাম জাফার আস-সাদিক (আ.) নিজেকে “অল্লাহর জ্ঞান ও নির্দেশনার খজানা (খাজানা), অনুবাদক, এবং আসমান-জমিনের উপর মানুষের জন্য আল্লাহর সর্বশ্রেষ্ঠ হুজ্জত” হিসেবে উল্লিখিত করছেন। আবু সুদাইর হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, ইমাম আবু জাফর (আঃ) বলেছেন-
:نَحْنُ خُزَّانُ عِلْمِ اللَّهِ، وَنَحْنُ تَرْجَمَةُ وَحْيِ اللَّهِ، وَنَحْنُ الحُجَّةُ البَالِغَةُ عَلَى مَنْ دُونَ السَّمَاءِ وَمِنْ فَوْقِ الأَرْضِ
“আমরাই আল্লাহর জ্ঞানের ভাণ্ডার, আমরাই আল্লাহর ওহির অনুবাদক, এবং আমরাই আসমানের নিচে ও জমিনের ওপর যাদের উপরে রয়েছে, তাদের জন্য আল্লাহর পরিপূর্ণ দলিল।” ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইয়াকুব আল-কুলায়নী, উসুলুল কাফী, প্রথম খণ্ড, পৃ.-১৯২

এ সম্পর্কে সঠিক আকিদা : ইসলাম ধর্মের হুজ্জত বা দলিল হলো কুরআন সুন্নাহ। মানুষ হিসেবে হুজ্জত হলো রাসুলুল্লাহ সা.। কোন ইমাম হুজ্জত হবে এ সম্পর্কে কুরআন হাদিসে কোন বর্ণনা পাওয়া যায় না। রাসুলুল্লাহ সা. হুজ্জত বা দলিল তার প্রমাণ, আল্লাহ তায়ালা বলেন-
  وَمَا نَہٰىکُمۡ عَنۡہُ فَانۡتَہُوۡا ۚ  وَاتَّقُوا اللّٰہَ ؕ  اِنَّ اللّٰہَ شَدِیۡدُ الۡعِقَابِ ۘ
রাসূল তোমাদের যা দেয় তা গ্রহণ কর, আর যা থেকে সে তোমাদের নিষেধ করে তা থেকে বিরত হও এবং আল্লাহকেই ভয় কর, নিশ্চয় আল্লাহ শাস্তি প্রদানে কঠোর। সুরা হাশর : ৭

৪. শিয়াদের আকিদা জগত পরিচালনার দায়িত্ব ইমামদের

জগতের একমাত্র পরিচালক মহান আল্লাহ তায়ালাতার এ গুনের সমকক্ষ জ্ঞান করা শির্কের অন্তরভূক্ত। অথচ শিয়াগণ মহান আল্লাহর এই একক গুনের সাথে তাদের ইমামদের সম্পৃক্ত করে চরমভাবে তাওহীদের উপর আঘাত করছে। তবে বিষয়টি ইমামদের আধ্যাত্মিক কর্তৃত্ব ও বিশ্বব্যাপী নেতৃত্ব সম্পর্কে শিয়া ধর্মতত্ত্বের মূল ধারণাকে প্রতিফলিত করে।
ক। ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইয়াকুব আল-কুলায়নী তার গ্রন্থে বলেন-
“الأئمة خلفاء الله في أرضه، الخليفة السلطان الأعظم…
“ইমামগণ হলেন আল্লাহর নিদর্শন, তাঁর খলিফা এবং সমগ্র সৃষ্টিজগতের কর্তৃত্ব তাদের হাতে। ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইয়াকুব আল-কুলায়নী, উসুলুল কাফী, কিতাবুল হুজ্জাহ, প্রথম খণ্ড
খ। আবু মুহাম্মাদ আল-হাসান ইবনে ইয়াকুব আল-কুলায়নী যিনি শেখ মুফিদ নামেও খ্যাত। তিনি বলেন-
الإمامُ خَلِيفَةُ اللهِ، وَهُوَ الْمُتَوَلِّي عَلَى جَمِيعِ أُمُورِ الْعَالَمِ، وَأَمْرُهُ وَنَهْيُهُ فَوْقَ الطَّبِيعَةِ.
অর্থ: “ইমাম হলেন আল্লাহর প্রতিনিধি, যিনি জগতের সমস্ত বিষয়ের তত্ত্বাবধান করেন। তাঁর আদেশ ও নিষেধ প্রকৃতিরও ঊর্ধ্বে।” শেখ মুফীদ, আল-ইরশাদ, ইমামতের প্রকৃতি ও ইমামদের গুণাবলী অধ্যায়,
পৃ.-৩৪৫

গ। ইমামদের সর্বোচ্চ মর্যাদা ও বিশ্ব পরিচালনায় তাদের ভূমিকা সম্পর্কে শিয়া আলিম মুহাম্মাদ বাকির আল-মাজলিসী বলেন, “ইমামগণ হচ্ছেন আল্লাহর নিকটবর্তী ফেরেশতাদের চেয়েও উচ্চ মর্যাদাশীল। সমগ্র সৃষ্টি তাদের আনুগত্যের অধীন।” মুহাম্মাদ বাকির আল-মাজলিসী, বিহারুল আনওয়ার, খণ্ড: ২৬, পৃষ্ঠা: ২৯৮
ঘ। আল্লামা মুহাম্মদ হোসাইন তাবাতাবাই ছিলেন বিশিষ্ট শিয়া, দার্শনিক, মুহাদ্দিস এবং ঐতিহাসিক, যিনি শিয়া চিন্তাধারায় এক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। তিনি বলেন-
ইমামত একটি ঐশী পদমর্যাদা, যা নবুয়তের চেয়েও উচ্চ। ইমামই বিশ্বব্যবস্থার কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রক।
শিয়া আলিম আল্লামা তাবাতাবাই, তাফসীর আল-মীযান, ভলিউম ১, পৃ.-২৭৩, সূরা বাকারার ১২৪ নম্বর আয়াতের তাফসির।

এ সম্পর্কে সঠিক আকিদা :
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-
وَسَخَّرَ ٱلشَّمۡسَ وَٱلۡقَمَرَ‌ۖ كُلٌّ۬ يَجۡرِى لِأَجَلٍ۬ مُّسَمًّ۬ى‌ۚ يُدَبِّرُ ٱلۡأَمۡرَ يُفَصِّلُ ٱلۡأَيَـٰتِ لَعَلَّكُم بِلِقَآءِ رَبِّكُمۡ تُوقِنُونَ
এবং সূর্য ও চন্দ্রকে কর্মে নিয়োজিত করেছেন। প্রত্যেকে নির্দিষ্ট সময় মোতাবেক আবর্তন করে। তিনি সকল বিষয় পরিচালনা করেন, নিদর্শনসমূহ প্রকাশ করেন, যাতে তোমরা স্বীয় পালনকর্তার সাথে সাক্ষাৎ সম্বন্ধে নিশ্চিত বিশ্বাসী হও। সুরা রাদ : ২
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-
تَبٰرَکَ الَّذِیۡ بِیَدِہِ الۡمُلۡکُ ۫  وَہُوَ عَلٰی کُلِّ شَیۡءٍ قَدِیۡرُۨ ۙ
রকতময় তিনি যার হাতে সর্বময় কর্তৃত্ব। আর তিনি সব কিছুর উপর সর্বশক্তিমান। সূরা -মুলক ৬৭:১
আল্লাহ তায়ালা ছাড়া এই বিশ্বজগৎ কেউ পরিচালনা করতে পারে না। ইমাম সম্পর্কে এমন আকিদা রাখা কুফরি। এই বিশ্বজগৎ পরিচালনার এক মাত্র দাবিদার আল্লাহ তায়ালা। চরমপনথী গুলাত শিয়া ছাড়া কেউ এমন আকিদা রাখে না। এমনিক গুনাত ছাড়া অন্য শিয়ারা এমন আকিদা রাখে না। মক্কার মুসরিকগণ ও বিশ্বাস করত বিশ্বজগৎ আল্লাহ ছাড়া কেউ পরিচালনা করতে পারেন। আল্লাহ তায়ালা তাঁর সুস্পষ্ট আয়াতে বলেন-
إِنَّ ٱلۡأَرۡضَ لِلَّهِ يُورِثُهَا مَن يَشَآءُ
অর্থ: “নিশ্চয়ই পৃথিবী আল্লাহর, তিনি যাকে ইচ্ছা তা উত্তরাধিকার স্বরূপ দান করেন।”। সূরা আরাফ : ১২৮
وَلِلَّهِ مُلۡكُ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضِ
অর্থ : “আসমান ও যমীনের সার্বভৌম ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহরই”। সূরা আলে ইমরান : ১৮৯
فَلِلَّهِ ٱلۡأٓخِرَةُ وَٱلۡأُولَىٰ
অর্থ : “বস্তুত ইহকাল ও পরকাল আল্লাহরই”। সূরা নাজম : ২৫
لَهُ مُلۡكُ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضِ
অর্থ : আসমান ও যমীনের সার্বভৌম ক্ষমতা একমাত্র তারই”। সূরা আল- হাদীদ: ২
تَبَٰرَكَ ٱلَّذِي بِيَدِهِ ٱلۡمُلۡكُ وَهُوَ عَلَىٰ كُلِّ شَيۡءٖ قَدِيرٌ
অর্থ : মহামহিমান্বিত তিনি, সর্বময় কর্তৃত্ব যাঁর নিয়ন্ত্রণে, তিনি সর্ববিষয়ে ক্ষমতাবান। সূরা মুলক : ৩০
এ সম্পর্কে একটি বিষয় এখানে উল্লেখ না করলেই নয়। খুবই পরিতাপের বিষয় আমাদের সমাজের কিছু নামধারী মুসলিমের শিয়াদের মত বিশ্বাস করে যে, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যেহেতু একা সেহেতু তার একার পক্ষে পুরো বিশ্বজগত পরিচালনা করা সম্ভব নয় (নাউজুবিল্লাহ)। ফলে তিনি তাঁর বিশ্ব পরিচালনা কাজের সুবিধার্থে আরশে মুআল্লায় একটি পার্লামেন্ট কায়েম করেছেন। সেই পার্লামেন্টের সদস্য সংখ্যা মোট ৪৪১ জন। আল্লাহ তাদের স্ব-স্ব কাজ বুঝিয়ে দিয়েছেন। তন্মধ্যে নাজীর ৩১৯ জন, নাকীব ৭০ জন, আওতাদ ৭ জন, কুতুব ৫ জন, আবদাল ৪০ জন এবং একজন হলেন গাওছুল আযম যিনি মক্কায় থাকেন। উম্মতের মধ্যে আবদাল ৪০ জন আল্লাহ তাযালার মধ্যস্থতায় পৃথিবীবাসীর বিপদাপদ দূরীভূত করে থাকেন।
সতর্কতা : শিয়াদের কিছু গ্রন্থে ইমামদের অলৌকিক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, যা গুরুত্বপূর্ণ সীমালঙ্ঘন (غلو) হিসেবে বিবেচিত হয়। আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামায়াতএগুলোকে শিরকি আকিদা বলে বিশ্বাস করে।

৫. শিয়াগণ আলি (রা.) কে আল্লাহ তায়ালার মত উলুহিয়াতের মর্যাদা প্রদান করে থাকে
আলি (রা.) কে আল্লাহ তায়ালার মত উলুহিয়াতের মর্যাদা প্রদান করার দাবিটি মারাত্মক কুফরি যা চরম শিয়া গুলাত ফির্কার একটি আকিদা। এই ধরনের আকিদা মূলধারার শিয়ারা (ইমামিয়া বা জায়েদি) সাধারণত গ্রহণ করে না। এটি গুলাত শিয়া যারা ইমামদেরকে আল্লাহর মর্যাদায় উন্নীত করে তাদের বক্তব্য।
ক। মোল্লা মুহসিন ফায়েজ কাশানী (মৃত্যু: ১০৯১ হিজরি) তিনি বলেন-
“أن عليا هو الله”
আলিই আল্লাহ পাক। মোল্লা মুহসিন ফায়েজ কাশানী, জিলাউল আইয়ুন, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃ.-৬৬

খ। রিজালু কাশী গ্রন্থে শিয়া আলিম আবু আমর মুহাম্মদ ইবন উমর ইবন আব্দুল আজিজ আল-কাশশী (মৃত্যু: ৩৪০ হিজরি) তার গ্রন্থে লিখেন, আলি বলেন-
أَنَا ٱلَّذِي أُحْيِي وَأُمِيتُ، أَنَا ٱلْأَوَّلُ وَٱلْآخِرُ، وَٱلظَّاهِرُ وَٱلْبَاطِنُ…
“আমি সেই ব্যক্তি, যে জীবন দান করি ও মৃত্যু ঘটাই; আমিই প্রথম এবং শেষ; আমিই প্রকাশ্য এবং অদৃশ্য…” । আব্দুল আজিজ আল-কাশশী, রিজালু কাশী, পৃ.-১৩৮।
উক্ত আরবি বাক্যটি আক্ষরিকভাবে আল্লাহর গুণবাচক শব্দসমূহ হুবহু ব্যবহার করে গঠিত। কেউ যদি তা নিজের দিকে সম্বন্ধ করে (যেমন শিয়াদের কিছু চরমপন্থি ফিরকা বলে থাকে আলি বলেছে), তবে তা ইসলামের মৌল আকিদার বিরোধী এবং তা কুফর ও গুলু (অতিরঞ্জন) হিসেবে গণ্য হবে। এই আকিদা থেকে আলি (রা.) পবিত্র ও মুক্ত। তিনি এই ধরনের জঘন্য মিথ্যা কথা বলতেই পারেন না। আলি (রা.) নামে এসব কথা শিয়ারা বানিয়ে নিয়েছেন। এই বাক্যটি মূলত আল্লাহর গুণাবলি প্রকাশকারী আয়াত ও হাদিসসমূহের অনুরূপ। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন-
ہُوَ الۡاَوَّلُ وَالۡاٰخِرُ وَالظَّاہِرُ وَالۡبَاطِنُ ۚ وَہُوَ بِکُلِّ شَیۡءٍ عَلِیۡمٌ
অর্থ : তিনিই আদি, তিনিই অন্ত, তিনিই ব্যক্ত, তিনিই গুপ্ত এবং তিনি সর্ব বিষয়ে সম্যক অবহিত। সুরা হাদিদ : ৩

৬. শিয়াদের বিশ্বাস তাদের ইমামগণ গায়েবের খবর রাখেন :
ক। ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইয়াকুব আল-কুলায়নীর মতে ইমামগণ যা হয়েছে এবং যা হবে, তার জ্ঞান রাখেন। আর তাদের নিকট কোন কিছুই গোপন নেই। আবূ আবদিল্লাহ (আ.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-
হরকতসহ আরবি:
إِنِّي لَأَعْلَمُ مَا فِي ٱلسَّمَاوَاتِ وَمَا فِي ٱلْأَرْضِ، وَأَعْلَمُ مَا فِي ٱلْجَنَّةِ وَمَا فِي ٱلنَّارِ، وَأَعْلَمُ مَا كَانَ وَمَا يَكُونُ.
“আমি জানি আসমানে ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে, এবং আমি জানি জান্নাত ও জাহান্নামে যা কিছু আছে, এবং আমি জানি যা হয়েছে এবং যা হবে।”
“আমি অবশ্যই আসমান ও যমিনে যা কিছু আছে, তা জানি এবং আমি আরও জানি জান্নাত ও জাহান্নামে যা কিছু আছে। আর যা হয়েছে এবং যা হবে, তাও আমি জানি। ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইয়াকুব আল-কুলায়নী, উসুলুল কাফী, প্রথম খণ্ড, পৃ.-১৬১

আবূ আবদিল্লাহ বা ইমাম জাফর সাদিক (আ.) থেকে বর্ণিত, আমীরুল মুমিনীন (আ). বেশি বেশি বলতেন, “জান্নাত ও জাহান্নামের মধ্যে আমি আল্লাহর পক্ষ থেকে বণ্টনকারী … আমাকে এমন কতগুলো বৈশিষ্ট্য দেয়া হয়েছে, যা আমার পূর্বে আর কাউকে দেয়া হয়নি। আমি জানি মৃত্যু, বালা-মুসিবত, বংশ এবং বক্তৃতা-বিবৃতির ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ সম্পর্কে। সুতরাং আমার পূর্বেকার কোন বিষয় আমার জানা থেকে বাদ পড়েনি এবং আমার নিকট থেকে যা অদৃশ্য, তাও আমার কাছ থেকে অজানা থাকে না। ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইয়াকুব আল-কুলায়নী, উসুলুল কাফী, প্রথম খণ্ড, পৃ.-১১৭

গ. ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইয়াকুব আল-কুলায়নী বলেন, “ইমামগণ জানেন যে, তারা কখন মারা যাবেন। আর তারা তাদের ইচ্ছা অনুযায়ী মারা যাবেন। আবূ আবদিল্লাহ (আ.) বলেন: কোন ইমাম যদি তার উপর আপতিত বিপদাপদ ও তার পরিণতি সম্পর্কে না জানে। তবে সে ইমাম আল্লাহর সৃষ্টির ব্যাপারে দলিল (হিসেবে গ্রহণযোগ্য) নয়। ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইয়াকুব আল-কুলায়নী, উসুলুল কাফী, প্রথম খণ্ড, পৃ.-২৭৮

এ সম্পর্কে সঠিক আকিদা :
আল্লাহ তায়ালা ছাড়া এই বিশ্ব জাহানের কারো নিকট অদৃশ্যের জ্ঞান নেই। এমনটি আমাদের প্রিয় রাসূল ﷺ ও এই অদৃশ্য জ্ঞানের অধিকারী শিয়াদের দাবি তাদের ইমামগণ এমন ইলম সম্পর্কেও অবহিত যা কোন নবি, রাসুল বা ফিরেশতাগণও জানেনা। এই ধরনের আকিদা পোষণ কারী কোন মুসলীম হবে পারে না। সে অবশ্যই মুশরিক। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
قُل لَّآ أَقُولُ لَكُمۡ عِندِى خَزَآٮِٕنُ ٱللَّهِ وَلَآ أَعۡلَمُ ٱلۡغَيۡبَ وَلَآ أَقُولُ لَكُمۡ إِنِّى مَلَكٌ‌ۖ إِنۡ أَتَّبِعُ إِلَّا مَا يُوحَىٰٓ إِلَىَّ‌ۚ قُلۡ هَلۡ يَسۡتَوِى ٱلۡأَعۡمَىٰ وَٱلۡبَصِيرُ‌ۚ أَفَلَا تَتَفَكَّرُونَ
অর্থ : বল, আমি তোমাদের বলি নাই যে, আমার নিকট আল্লাহ্‌র ধনভাণ্ডার রয়েছে। আমি অদৃশ্য সম্বন্ধে জানি না। আমি তোমাদের এ কথা বলি না যে, আমি একজন ফেরেশতা। আমার নিকট যে প্রত্যাদেশ অবতীর্ণ হয়েছে, আমি শুধু তার অনুসরণ করি। বল, অন্ধ ও চক্ষুষ্মান কি এক হতে পারে? তোমরা কি বিবেচনা করবে না? সুরা আনাম : ৫০
এ আয়াতে ও আল্লাহ তায়ালা তার রাসূলুল্লাহ ﷺ কে পরিষ্কার ভাবে ঘোষণা দিতে বললেন যে, আমি অদৃশ্য সম্বন্ধে জানি না।
আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন-
يَسۡـَٔلُكَ ٱلنَّاسُ عَنِ ٱلسَّاعَةِۖ قُلۡ إِنَّمَا عِلۡمُهَا عِندَ ٱللَّهِۚ وَمَا يُدۡرِيكَ لَعَلَّ ٱلسَّاعَةَ تَكُونُ قَرِيبًا
অর্থ : লোকে তোমাকে (কেয়ামতের) সময় সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করে। বল, ইহার জ্ঞান কেবল আল্লাহরই আছে। এবং তুমি তা কি ভাবে বুঝবে? সম্ভবত, সময় নিকটবর্তী। সুরা আহজাব :৬৩
উক্ত আয়াতে আল্লাহ্‌র ঘোষণা “কিয়ামতের সময় সম্বন্ধে জ্ঞান কেবল আল্লাহ্‌র। যেহেতু রাসূল ﷺ এর অদৃশ্যের সম্বন্ধে জ্ঞান নাই আল্লাহর প্রশ্ন “এবং তুমি তা কি ভাবে বুঝবে? আল্লাহ তায়ালা বলেন-
قُل لَّا يَعۡلَمُ مَن فِى ٱلسَّمَـٰوَٲتِ وَٱلۡأَرۡضِ ٱلۡغَيۡبَ إِلَّا ٱللَّهُ‌ۚ وَمَا يَشۡعُرُونَ أَيَّانَ يُبۡعَثُونَ
অর্থ : তাদেরকে বল, আল্লাহ ছাড়া পৃথিবীতে ও আকাশে কেউ অদৃশ্যের জ্ঞান রাখে না৷ এবং তারা জানেনা কবে তাদেরকে উঠিয়ে নেয়া হবে। সুরা নামল : ৬৫
আল্লাহ তায়ালা বলেন:
إِنَّ ٱللَّهَ يَعۡلَمُ غَيۡبَ ٱلسَّمَـٰوَٲتِ وَٱلۡأَرۡضِ‌ۚ وَٱللَّهُ بَصِيرُۢ بِمَا تَعۡمَلُونَ
অর্থ : নিশ্চয় আল্লাহ আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সমস্ত গুপ্ত বিষয় জানেন। এবং তোমরা যা কর আল্লাহ তা অবশ্য দেখেন। সুরা হুজুরাত : ১৮
কিন্তু শিয়াগণ তাদের ইমামদেরকে অদৃশ্যের জ্ঞানের ব্যাপারে আল্লাহর সাথে শরিক করে। লক্ষ্য করুন, তারা তাদের ইমামদেরকে তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী ফেরেশতা, নবি ও রাসুলগণের চেয়ে বেশি জ্ঞানী মনে করে। আর জ্ঞানের ক্ষেত্রে তারা তাদেরকে আল্লাহ তায়ালার অংশীদার মনে করে। এই সবগুলোই মিথ্যা, বানোয়াট ও কুফরি।

৭. শিয়াদের বিশ্বাস তাদের ইমামগণ হালাল ও হারাম করার ক্ষমতা রাখেন।
শিয়াদের মতে, ইমামগণকে আল্লাহ কর্তৃক এমন একটি ক্ষমতা ‘উলয়া’ দান করা হয়েছে, যার মাধ্যমে তারা ধর্মীয় আইন প্রয়োগ ও বিধি-নির্ধারণ করতে পারেন, তবে সেই সব বিধি সর্বদা কুরআন ও বাইরের মহান আল্লাহর নির্দেশের অন্তর্গত:
…وَصَارُوا يُشَرِّعُونَ التَّشْرِيعَ بِمَا أُوتُوا مِنْ عِلْمٍ وَدَلِيلٍ، وَلَيْسَ فِيهِمْ مُعَارِضٌ لِمَا فِي كِتَابِ اللهِ وَسُنَّةِ رَسُولِهِ…
“তারা নিজেরা [ধর্মীয়] আইন প্রণয়ন করেন—তবে যে-সব বিষয় উপর তারা প্রজ্ঞা ও দলিল পেয়েছেন, এবং যা কখনোই কুরআন ও নবির শরীয়তের বিপরীতে নয়। ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইয়াকুব আল-কুলায়নী, উসুলুল কাফী, প্রথম খণ্ড, পৃ.- ২৭৮

এ সম্পর্কে সঠিক আকিদা হলো ;
আল্লাহ তায়ালা তাঁর রাসুলকে উদ্দেশ্য করে বলেন-
یٰۤاَیُّہَا النَّبِیُّ لِمَ تُحَرِّمُ مَاۤ اَحَلَّ اللّٰہُ لَکَ ۚ تَبۡتَغِیۡ مَرۡضَاتَ اَزۡوَاجِکَ ؕ
হে নবি, আল্লাহ তোমার জন্য যা হালাল করেছেন তোমার স্ত্রীদের সন্তুষ্টি কামনায় তুমি কেন তা হারাম করছ? সুরা তাহরীম :১
সুতরাং আল্লাহ যখন তাঁর রাসূল ﷺ কে হালাল জিনিসকে হারাম করার কারণে সতর্ক করে দিয়েছেন, তখন নবি ﷺ ব্যতীত অন্যের দ্বারা তা কি করে সম্ভব হতে পারে?

৮. ইমামদের আনুগত্য ফরজ :
আবূ সাবাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আবূ আব্দিল্লাহ (আলাইহিস সালাম)-কে বলতে শুনেছি-
“أَشْهَدُ أَنَّ عَلِيًّا إِمَامٌ، فَرَضَ اللَّهُ طَاعَتَهُ، وَأَنَّ الْحَسَنَ إِمَامٌ، فَرَضَ اللَّهُ طَاعَتَهُ، وَأَنَّ الْحُسَيْنَ إِمَامٌ، فَرَضَ اللَّهُ طَاعَتَهُ…”
“আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আলি (আ.) একজন ইমাম; আল্লাহ তার আনুগত্য করাকে ফরজ করেছেন।
আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, হাসান (আ.) একজন ইমাম; আল্লাহ তার আনুগত্য করাকে ফরজ করেছেন।
আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, হোসাইন (আ.) একজন ইমাম; আল্লাহ তার আনুগত্য করাকে ফরজ করেছেন…..। মুহাম্মদ ইবনে ইয়াকুব আল-কুলায়নী, উসুলুল কাফী, প্রথম খণ্ড, পৃ.-১৮৬-১৮৭

মুহাম্মদ ইবনে ইয়াকুব আল-কুলায়নী আরও উল্লেখ করেন, ইমাম মুহাম্মদ বাকের বলেন-
আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে কদরের রাতসমূহে নবি এবং অসীদের (ইমামদের) নিকট নির্দেশ আসত যে, এটা কর; আর এই নির্দেশটি তারা ভালোভাবেই শিখেছিল, কীভাবে তারা তা কার্যে পরিণত করবে। মুহাম্মদ ইবনে ইয়াকুব আল-কুলায়নী, উসুলুল কাফী, প্রথম খণ্ড, পৃ.-১০৯

এ সম্পর্কে সঠিক আকিদা হলো :
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡۤا اَطِیۡعُوا اللّٰہَ وَاَطِیۡعُوا الرَّسُوۡلَ وَاُولِی الۡاَمۡرِ مِنۡکُمۡ ۚ  فَاِنۡ تَنَازَعۡتُمۡ فِیۡ شَیۡءٍ فَرُدُّوۡہُ اِلَی اللّٰہِ وَالرَّسُوۡلِ اِنۡ کُنۡتُمۡ تُؤۡمِنُوۡنَ بِاللّٰہِ وَالۡیَوۡمِ الۡاٰخِرِ ؕ  ذٰلِکَ خَیۡرٌ وَّاَحۡسَنُ تَاۡوِیۡلًا 
হে মুমিনগণ, তোমরা আনুগত্য কর আল্লাহর ও আনুগত্য কর রাসুলের এবং তোমাদের মধ্য থেকে কর্তৃত্বের অধিকারীদের। অতঃপর কোন বিষয়ে যদি তোমরা মতবিরোধ কর তাহলে তা আল্লাহ ও রাসুলের দিকে প্রত্যর্পণ করাও- যদি তোমরা আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান রাখ। এটি উত্তম এবং পরিণামে উৎকৃষ্টতর। সুরা নিসা : ৫৯

আল্লাহ তায়ালা বলেন-
مَّن يُطِعِ ٱلرَّسُولَ فَقَدۡ أَطَاعَ ٱللَّهَ
“কেউ রাসূলের আনুগত্য করলে সে তো আল্লাহরই আনুগত্য করল”। সূরা আন-নিসা: ৮০

আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَمَن يُشَاقِقِ ٱلرَّسُولَ مِنۢ بَعۡدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُ ٱلۡهُدَىٰ وَيَتَّبِعۡ غَيۡرَ سَبِيلِ ٱلۡمُؤۡمِنِينَ نُوَلِّهِۦ مَا تَوَلَّىٰ وَنُصۡلِهِۦ جَهَنَّمَۖ وَسَآءَتۡ مَصِيرًا
“কারো নিকট সৎপথ প্রকাশ হওয়ার পর সে যদি রাসুলের বিরুদ্ধাচরণ করে এবং মুমিনদের পথ ব্যতীত অন্য পথ অনুসরণ করে, তবে যে দিকে সে ফিরে যায় সে দিকেই তাকে ফিরায়ে দেব এবং জাহান্নামে তাকে দগ্ধ করব; আর তা কত মন্দ আবাস!”সূরা আন-নিসা: ১১৫

৯. শিয়াদের বিশ্বাস ইমামগণের গর্ভ ও জন্ম হয় অদ্ভুত প্রক্রিয়ায়।
মুহাম্মাদ বাকির ইবনে মুহাম্মদ তাকী আল-মাজলিসী বলেন-
. نورُ الأئمّةِ لا يَسْتَقِرُّ في الرَّحِمِ
ইমামদের নূর (আলো) জরায়ুতে স্থির হয় না। মুহাম্মাদ বাকির ইবনে মুহাম্মদ তাকী আল-মাজলিসী, বিহারুল আনওয়ার, ভলিউম : ২৭।
অর্থাৎ, তাদের জন্ম পদ্ধতি সাধারণ মানুষের মতো নয় বরং তাদের নূর (আলোক প্রকাশ) জগতে সরাসরি প্রকাশ ঘটে। এটি শিয়াদের তানজীহ’ আকিদার অংশ, যেখানে তারা ইমামদের সমস্ত অপবিত্র বস্তু ও প্রক্রিয়া থেকে পবিত্র মনে করে।
আল্লামা মুহাম্মদ বাকির ইবনে মুহাম্মদ তাকী আল-মাজলিসী বলেন-
একাদশতম ইমাম হাসান আসকারী থেকে রেওয়াত করেছেন যে, আমাদের ইমামগণের গর্ভ মায়ের পেটে বা জরায়ুতে স্থির হয় না। বরং পার্শ্বে থাকে আমরা জরায়ু থেকে বাইরে আসি না। বরং জননীর উরু থেকে জম্ম গ্রহণ করি। কেননা আমরা আল্লাহর নুর। তাই আমাদের নোংরামি আবর্জনা থেকে দূরে রাখা হয়। আল্লামা মুহাম্মদ বাকির ইবনে মুহাম্মদ তাকী আল-মাজলিসী, ‘হাক্কুল ইয়াকীন’ পৃ.-১২৬, মাওলানা হেমায়েত উদ্দিন, ইসলামি আকিদা ও ভ্রান্ত মতবাদ, পৃ-২৫৩

এ সম্পর্কে সঠিক আকিদা :
এ সকর কথার কোন শরীয়ি ভিত্তি নাই। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
قُلۡ اِنَّمَاۤ اَنَا بَشَرٌ مِّثۡلُکُمۡ یُوۡحٰۤی اِلَیَّ اَنَّمَاۤ اِلٰـہُکُمۡ اِلٰہٌ وَّاحِدٌ ۚ  فَمَنۡ کَانَ یَرۡجُوۡا لِقَآءَ رَبِّہٖ فَلۡیَعۡمَلۡ عَمَلًا صَالِحًا وَّلَا یُشۡرِکۡ بِعِبَادَۃِ رَبِّہٖۤ اَحَدًا 
বল, ‘আমি তোমাদের মতই একজন মানুষ। আমার নিকট ওহি প্রেরণ করা হয় যে, তোমাদের ইলাহই এক ইলাহ। সুতরাং যে তার রবের সাক্ষাৎ কামনা করে, সে যেন সৎকর্ম করে এবং তার রবের ইবাদাতে কাউকে শরীক না করে’। সুরা কাহাফ : ১১০
রাসুলুল্লাহ ﷺ এর জন্মের সময় সিরিয়ার রাজপ্রাসাদগুলোকে আলোকিত :
উম্মে সালামা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-
حَدَّثَنَا يَحْيَى بْنُ بُكَيْرٍ، قَالَ: حَدَّثَنَا اللَّيْثُ بْنُ سَعْدٍ، عَنْ عُقَيْلٍ، عَنِ ابْنِ شِهَابٍ، عَنْ عُرْوَةَ بْنِ الزُّبَيْرِ، عَنْ أُمِّ سَلَمَةَ، قَالَتْ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: “رَأَتْ أُمِّي حِينَ وَضَعَتْنِي نُورًا خَرَجَ مِنْهَا أَضَاءَتْ لَهُ قُصُورُ الشَّامِ.”
“আমার মা যখন আমাকে জন্ম দিলেন, তখন তিনি এক নূর দেখতে পেলেন, যা সিরিয়ার জপ্রাসাদগুলোকে আলোকিত করেছিল।” মুসনাদ আহমাদ : ১৭৫৫০
কুরআন ও সুন্নাহ প্রমাণ করে যে আমাদের রাসূলুল্লাহ ﷺ স্বাভাবিকভাবেই জম্মগ্রহণ করে। সেখনা শিয়াদে বাদি এর বংশধরেরা বা আহলে বাইয়াত কেন অলৌকিকভাবে জম্ম গ্রহণ করবে?

১০. শিয়াদের বিশ্বাস নবি মুহাম্মাদ ﷺ ব্যতীত সকল নবির চেয়ে তাদের ইমামগণ উত্তম।
আল্লামা মুহাম্মদ বাকির ইবনে মুহাম্মদ তাকী আল-মাজলিসী বলেন-
يَجِبُ أَنْ يُعْتَقَدَ أَنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ لَمْ يَخْلُقْ خَلْقًا أَفْضَلَ مِنْ مُحَمَّدٍ (صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَآلِهِ) وَالْأَئِمَّةِ (عَلَيْهِمُ السَّلَامُ)، وَأَنَّهُمْ أَحَبُّ الْخَلْقِ إِلَى اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ وَأَكْرَمُهُمْ…
আকিদা রাখা আবশ্যক যে, আল্লাহ তায়ালা মুহাম্মাদ (সা,) ও ইমামগণের (আ.) চেয়ে উত্তম কোনো সৃষ্টি সৃষ্টি করেননি, এবং তারা হলেন আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয় এবং সবচেয়ে সম্মানিত সৃষ্টিসমূহ। আল্লামা মুহাম্মাদ বাকির আল-মাজলিসী, বিহারুল আনওয়ার, ভলিউম ২৬, পৃ.- ২৯৭

আল্লামা মুহাম্মাদ বাকির আল-মাজলিসী বলেন-
بَلِ الضَّرُورَةُ مِنْ قَوْلِ الْإِمَامِيَّةِ عَلَى أَنَّهُ (عَلَيْهِ السَّلَامُ) أَفْضَلُ بَعْدَ رَسُولِ اللَّهِ (صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَآلِهِ) مِنْ جَمِيعِ الْأَنْبِيَاءِ…
বরং এটা শিয়া ইমামিয়াদের মাঝে জরুরি ও পরিষ্কার আকিদা যে, (ইমাম) রাসূলুল্লাহ (সা.) এর পর সকল নবির চেয়ে শ্রেষ্ঠ। আল্লামা মুহাম্মাদ বাকির আল-মাজলিসী, বিহারুল আনওয়ার, ভলিউম ২৬, পৃ.- ২৯৭
এ সম্পর্কে সঠিক আকিদা :
আবদুল্লাহ (রা.) হতে বর্ণিত যে, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আমার উম্মাতের সর্বোত্তম মানুষ আমার যুগের মানুষ (সাহাবিগণ)। অতঃপর তৎপরবর্তী (তাবেয়ি) যুগ। অতঃপর তৎপরবর্তী (তাবে তাবেয়ী) যুগ। অতঃপর এমন লোকদের আগমন হবে যাদের কেউ সাক্ষ্য দানের পূর্বে কসম এবং কসমের পূর্বে সাক্ষ্য দান করবে। সহিহ বুখারি : ৩৬৫১, ২৫০৮, ৬৪২৯, সহিহ মুসলিম ২৫৩৩, সুনানে তিরমিজি : ৩৮৫৯, আহমদ : ১২৯০৮
কুরআন ও সহিহ হাদিসে ইমমাত সম্পর্কিত আকিদাই নাই। অথচ শিয়ার তাদের মান সম্মান নবিদের উপর স্থান প্রদান করে, যা মূলত ইসলামের সাথে উপহাস করার সমান।

শিয়াদের ভ্রান্ত আকিদাসমূহ-২ : বর্তমান কুরআন ও ইমাম মাহদি (আ.) সম্পর্কে শিয়াদের ভ্রান্ত বিশ্বাস।


মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

১. শিয়াদের আকিদা কুরআনে তাহরীফ বা পরিবর্তন করা হয়েছে :
শিয়াদের মধ্যে বিভিন্ন কিতাবে এমন বিশ্বাস প্রকাশ পাওয়া যায় যে, কুরআনে তাহরীফ (تحريف) বা পরিবর্তন, সংযোজন বা বিয়োজন ঘটেছে, বিশেষ করে আহলে বাইতের ফজিলত সংক্রান্ত আয়াতগুলো মুছে ফেলা হয়েছে, এমন আকিদা তারা পোষণ করে থাকে।

ক। ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইয়াকুব আল-কুলায়নী শিয়াদের অন্যতম প্রধান মুহাদ্দিস, যিনি “আল-কাফি” গ্রন্থ সংকলন করেন। এই কিতাব শিয়াদের কাছে “সহিহ বুখারি” এর সমতুল্য। এই গ্রন্থে অনেক রেওয়ায়েত রয়েছে, যেগুলো কুরআনে তাহরীফ বা পরিবর্তন ঘটেছে এমন বিশ্বাসকে সমর্থন করে। যেমন-
عن أبي عبد الله قال: «إِنَّ القُرْآنَ الَّذِي جَاءَ بِهِ جِبْرَائِيلُ إِلَى مُحَمَّدٍ ﷺ سَبْعَةَ عَشَرَ أَلْفَ آيَةٍ»
আবু ইবনে আব্দুল্লাহ (ইমাম জাফর আস-সাদিক) বলেন, “নিশ্চয়ই কুরআন, যা জিবরাইল মুহাম্মদ ﷺ এর কাছে নিয়ে এসেছিলেন, তাতে ছিল সতেরো হাজার আয়াত। আল-কুলায়নীর “আল-কাফী”, কিতাব ফাদ্লুল কুরআন, অধ্যায় হাদিস : ০১

খ। নিমাতুল্লাহ আল-জাযায়েরি (মৃত্যু: ১১১২ হিজরি), তিনি স্পষ্টভাবে বলেন-
إِنَّ الأَحَادِيثَ الدَّالَّةَ عَلَى وُقُوعِ التَّحْرِيفِ فِي القُرْآنِ، قَدْ تَجَاوَزَتْ حَدَّ التَّوَاتُرِ۔
“কুরআনে তাহরীফ বা পরিবর্তন সংঘটিত হয়েছে এ মর্মে প্রমাণদাতা হাদিসসমূহ তাওতারের (মিথ্যা হওয়ার) সীমা অতিক্রম করেছে। আল-আনওয়ার আন-নুমানিযয়াহ, দ্বিতীয় খণ্ড,পৃ.-৪৭৫

গ। আল-নূরী আত-তাবরসী (মৃত্যু: ১৩২০ হিজরি) তার লিখিত বই “ফাসলুল খিতাব ফি ইসবাত তাহরিফে কিতাবে রাব্বিল আরবাব” অর্থাৎ “প্রভুর কিতাবে তাহরীফ প্রমাণ করার বিষয়ে সিদ্ধান্তমূলক কথা”। এই বইতে লেখক দাবি করেন যে, কুরআনে সাহাবাগণ পরিবর্তন এনেছে এবং আহলে বাইতের প্রশংসাসমূহ বাদ দিয়েছে।

২. শিয়াদের আকিদা আউসিয়া (أوصياء)” বা অসীয়তকৃতগণ ছাড়া কারো নিকট সম্পূর্ণ কুরআন নাই :
শিয়া সম্প্রদায়ের চরমপন্থি দলিল ও বিশ্বাস অনুযায়ী, “আউসিয়া (أوصياء)” অর্থাৎ ইমামগণ ব্যতীত অন্য কারো নিকট সম্পূর্ণ ও যথাযথ কুরআন নেই। এই বিশ্বাস মূলত শিয়া ইসেনে আশারী বা ইমামিয়া দ্বাদশী ফির্কার একটি মূল আকিদার অংশ, যেখানে তারা মনে করে, রাসূলুল্লাহ ﷺ ইন্তেকালের আগে আলি (রা.) কে অসী বা আউলিয়া আমর হিসেবে মনোনীত করে গেছেন, এবং পরে তাঁর বংশের ১২ জন ইমাম যারা ‘আহলে বাইতের’ অন্তর্ভুক্ত তারা একে একে কুরআনের আসল ও গভীর জ্ঞান ও তাফসিরের উত্তরাধিকারী হয়েছেন। এমন বক্তব্য তাদের প্রাথমিক হাদিস গ্রন্থে পাওয়া যায়।
মুহাম্মদ ইবনে ইয়াকুব আল-কুলায়নী বলেন-
: أنّهُ لَم يَجمَعِ القُرآنَ كُلَّهُ إِلّا الأئِمَّةُ
নিশ্চয়ই কুরআনের পূর্ণসংকলন কেউ করেনি/পারে না, শুধুমাত্র ইমামগণ ব্যতীত।” আল-কুলায়নীর “আল-কাফী”, কিতাব ফাদ্লুল কুরআন, অধ্যায় হাদিস : ০১
❝ٱلْقُرْآنُ ٱلَّذِي أُنْزِلَ عَلَىٰ مُحَمَّدٍ ﷺ سَبْعَةَ عَشَرَ أَلْفَ آيَةٍ، مَا جَمَعَهُ إِلَّا ٱلْأَوْصِيَاءُ❞
“যে কুরআন মুহাম্মদ ﷺ-এর উপর নাজিল করা হয়েছে, তাতে ছিল সতেরো হাজার আয়াত; একমাত্র ওসীয়্যতপ্রাপ্তগণ (অর্থাৎ ইমামগণ) ব্যতীত কেউ তা সংকলন করেনি। আল-কুলায়নীর “আল-কাফী”, কিতাব ফাদ্লুল কুরআন, অধ্যায় হাদিস : ৩

৩. কুরআনে আহলে বাইত বা ইমামদের নাম ছিল তা বাদ দেওয়া হয়েছে:
শিয়াদের বিশ্বাস কুরআনের কিছু আয়াতে আলি (রা.) ও ইমামদের নাম ছিল, সাহাবারা তা মুছে দিয়েছে। মুহাম্মাদ ইবনে নুমান আল নুবাখতি বলেন-
“وَلَوْلَا أَنَّهُ زِيدَ فِي كِتَابِ اللّٰهِ وَنُقِصَ مِنْهُ، مَا خُفِيَ حَقُّنَا عَلَى ذِي حِجَى.”
অর্থ : তিনি বললেন, “যদি আল্লাহর কিতাবের (কুরআনের) মধ্যে কিছু যোগ না করা হতো এবং কিছু বাদ না দেওয়া হতো, তাহলে আমাদের (আহলুল বয়াতের) অধিকার ধামাচাপা পড়ত না।” মুহাম্মাদ ইবনে নুমান আল নুবাখতি, গায়বা, পৃ.- ১০০

৪. আসল কুরআন ইমাম মাহদির সাথে আছে :
শিয়াদের আকিদা অনুসারে, সাহাবারা কুরআন থেকে কিছু আয়াত বাদ দিয়েছে বা পরিবর্তন করেছে, আর কুরআনের আসল ও পূর্ণ রূপ কেবলমাত্র ইমাম মাহদী (আল-মাহদী) ও তাঁর পূর্ববর্তী ইমামগণের কাছে সংরক্ষিত আছে। তিনি বিশ্ব শেষ সময় ফিরে এসে পুরো কুরআন পুনরুদ্ধার করবেন। তিনি ফিরে এসে তা প্রকাশ করবেন এবং প্রকৃত ধর্ম প্রতিষ্ঠা করবেন।
মুহাম্মদ ইবনে নূমান আল-নূমানী বলেন-
“كَأَنِّي أَنْظُرُ إِلَيْهِ بَيْنَ الرُّكْنِ وَالْمَقَامِ، يُبَايِعُ النَّاسَ عَلَى كِتَابٍ جَدِيدٍ، عَلَى الْعَرَبِ شَدِيدٍ.”
“আমি যেন তাকে (ইমাম মাহদিকে) দেখছি কুফা ও মাকামের মাঝে দাঁড়িয়ে, মানুষের সঙ্গে নতুন একটি কিতাবের ওপর বায়াত নিচ্ছে, যা আরবদের প্রতি কঠোর।” মুহাম্মদ ইবনে নূমান আল-নূমানী, আল-গায়বা, পৃ.- ১৫৭
তারা একটি ইমাম মাহদির মাধ্যমে একটি “নতুন কুরআনের” আগমনের বিশ্বাসে বিশ্বাসী।
ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইয়াকুব আল-কুলায়নী তার কিতাব লিখেন, আবু আবদুল্লাহ (আ) বলেছেন-
“مَا ادَّعَى أَحَدٌ مِنَ النَّاسِ أَنَّهُ جَمَعَ الْقُرْآنَ كُلَّهُ كَمَا أُنْزِلَ إِلَّا كَذَّابٌ، وَمَا جَمَعَهُ وَحَفِظَهُ كَمَا أُنْزِلَ إِلَّا عَلِيٌّ بْنُ أَبِي طَالِبٍ وَالْأَئِمَّةُ مِنْ بَعْدِهِ.”
যে ব্যক্তি দাবি করে যে মহান আল্লাহ তায়ালা তিনি পূর্ণ কুরআন যেভাবে নাজিল করেছেন, অনুরূপ সে তা একত্র করেছেন, তাহলে সে মিথ্যাবাদী। প্রকৃতপক্ষে মহান আল্লাহ পাক তিনি যেভাবে কুরআন নাজিল করেছেন, আলি (রা.) এবং উনার পরবর্তী ইমামগণ ছাড়া কেউই তা হুবহু একত্র ও সংরক্ষণ করতে সক্ষম হননি।” ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইয়াকুব আল-কুলায়নী, উসুলুল কাফী, প্রথম খণ্ড, পৃ.-২২৭
সঠিক আকিদা :
আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামায়াতের আকিদ এর সম্পূর্ণ বিপরীত। আবু বকর (রা.)-এর খিলাফতের সময়, ইয়ামামার যুদ্ধে বহু হাফিজ সাহাবির শাহাদতের কারণে কুরআন সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তখন উমর (রা.)-এর পরামর্শে আবু বকর (রা.) কুরআন সংকলনের নির্দেশ দেন। এই মহান দায়িত্ব অর্পিত হয় সাহাবি জায়েদ ইবনে সাবিত (রা.)-এর উপর, যিনি ওহি লিখতেন এবং নির্ভরযোগ্য হাফিজ ছিলেন। তিনি সতর্কতা ও ঈমানদারির সাথে কুরআনের আয়াতসমূহ সাহাবিদের নিকট থেকে দুজন সাক্ষীর ভিত্তিতে গ্রহণ করেন। তিনি তা খাতা আকারে সংকলন করেন, যা পরে উমর (রা.) এবং উমরের মৃত্যুর পর হাফসা (রা.)-এর কাছে সংরক্ষিত থাকে। এই সংকলনই পরবর্তীতে উসমান (রা.)-এর সময় একটি মানক মুসহাফ আকারে ছাপিয়ে সর্বত্র প্রেরণ করা হয়। এই উদ্যোগ ইসলামের ইতিহাসে কুরআন সংরক্ষণের এক ঐতিহাসিক মাইলফলক। আহলুস সুন্নাহর সর্বসম্মত বিশ্বাস হলো, কুরআনে কোনো রকম পরিবর্তন হয়নি। কুরআন আজও অবিকৃত অবস্থায় রয়েছে, যেমনটি রাসূল ﷺ-এর যুগে অবতীর্ণ হয়েছিল। তাছাড়া কুরআন হিফাজতের দায়িত্ব স্বয়ং আল্লাহ তায়ারা নিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন:
إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ
“আমরাই এই জিকির (কুরআন) নাজিল করেছি, এবং আমরাই এর সংরক্ষণকারী।” সূরা হিজর : ৯

রাসূলুল্লাহ ﷺ ইমাম মাহদির নিকট বাইয়াত নিবেন
১. রাসূলুল্লাহ ﷺ ইমাম মাহদির নিকট বাইয়াত নিবেন ও তিনি উলঙ্গ হয়ে আত্মপ্রকাশ করবেন :
ইমাম মাহদির আত্মপ্রকাশের সময় প্রথম বাই‘আত গ্রহণকারী হবেন মুহাম্মাদ ﷺ ও তারপর আলি (রা.)
এটি শিয়াদের একটি রহস্যময় ও তাত্ত্বিক বিশ্বাসের অংশ। তারা মনে করে, নবি মুহাম্মাদ ﷺ ও ইমাম আলি (আ.) রূহানিয়ভাবে বা অন্যভাবে ইমাম মাহদির প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করবেন। মুহাম্মদ বাকের (আ.) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন-
الرِّوَايَةُ: “فَأَوَّلُ مَنْ يُبَايِعُهُ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَآلِهِ.”
অর্থ : সর্বপ্রথম যিনি তাঁর (ইমাম মাহদির) প্রতি বাই‘আত করবেন, তিনি হলেন রাসূলুল্লাহ ﷺ।”
শায়খ আল-নুমানী, আল-গায়বা, কিয়ামাতের আলামত অধ্যায়, প্রথম খণ্ড, পৃ.-৩২৬
শায়খ তুসী, মুহাম্মদ বাকের (আ.) থেকে বর্ণনা করেন-
تَذْكُرُ فِيهِ أَنَّ النَّبِيَّ (ص) وَعَلِيًّا (ع) هُمَا أَوَّلُ مَنْ يُبَايِعُ الْقَائِمَ عِنْدَ ظُهُورِهِ۔
অর্থ : এতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, নবি (সা.) এবং আলি (আ.)—তাঁরা উভয়ে কায়েম (ইমাম মাহদী)-এর আত্মপ্রকাশের সময় প্রথম তাঁর কাছে বা্ইয়াত করবেন। শায়খ তুসী, আল-গায়বা, প্রথম খণ্ড, পৃ. ৪৭৪–৪৭৫

৩. ইমাম মাহদির বিবস্ত্র অবস্থায় আত্মপ্রকাশ করবেন
সূর্যের গোলকের সামনে ইমাম মাহদির বিবস্ত্র অবস্থায় আত্মপ্রকাশ করবেন। এটি শিয়াদের একটি জঘন্য ও মিথ্যা আকিদা। শায়খ তুসী ও নুমানি ইমাম রেজা বর্ণনা করেন। তিনি বলেন-
يَخْرُجُ الْقَائِمُ عُرْيَانًا أَمَامَ الشَّمْسِ…
অর্থ : কায়েম (ইমাম মাহদি) সূর্যের সামনে বিবস্ত্র অবস্থায় আত্মপ্রকাশ করবেন। আল্লামা মুহাম্মদ বাকের আল-মজলিসী, ভলিউম ৫২, পৃ. ২৮৬-২৮৮
সঠিক আকিদা :
এই সকল মতবাদ ও বর্ণনা সুন্নি আকিদা এবং সহিহ হাদিসসমূহের পরিপন্থী। আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামায়াতের বিশ্বাস অনুযায়ী, রাসূল ﷺ তো সকল নবিদের শেষ এবং সবার নেতা, তার পক্ষ থেকে কোনো “বাই‘আত” গ্রহণের কথা একেবারে অকল্পনীয় ও বাতিল। তেমনি, ইমাম মাহদির বিবস্ত্র হয়ে আত্মপ্রকাশের মত ধারণা শরিয়ত, লজ্জাশীলতা ও নবি পরিচিত আদর্শবিরোধী।

শিয়াদের ভ্রান্ত আকিদাসমূহ-৩ : রাসূলুল্লাহ ﷺ এর পরিবার সম্পর্কে তাদের জঘন্যতম বিশ্বাস।


মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

১. উম্মুল জননী আয়িশা (রা.) ও হাফসা (রা.) এর প্রতি মিথ্যা আপাবাদ :
শিয়ারা বিশেষ করে রাফিদি গোষ্ঠী উম্মুল মুমিনীনগণের প্রতি অনেক মিথ্যা ও অশ্লীল অপবাদ আরোপ করেছে, বিশেষত আয়িশা (রা.) ও হাফসা (রা.)-কে লক্ষ্য করে। এগুলোর পেছনে তাদের নিজস্ব আকিদা ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য কাজ করেছে, যা আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামায়াতের সাথে সাংঘর্ষিক। শিয়াদের কিছু গ্রন্থ ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব তাকে বিভিন্নভাবে দোষারোপ করে থাকেন, যদিও শিয়াদের মধ্যেও এ নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে। নিচে কিছু প্রসিদ্ধ শিয়া গ্রন্থ থেকে দলিলসহ তাদের অপবাদ তুলে ধরা হলো-

২. আয়িশা (রা.) আলি (রা.) এর বিরোধিতা করেছিলেন :
শিয়াদের কিছু মতে, আলি (রা.)-এর শাসনকালে তার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন এবং তালহা ও যুবাইর (রা.)-কে নিয়ে যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, যা শিয়াদের কাছে একটি গুরুতর পাপ হিসেবে বিবেচিত। তাদের দাবি আয়িশা (রা.) নবি ﷺ এর পরে ধর্মদ্রোহিতা করেছিলেন। তাদের কিতাবে উল্লেখ আছে-
إِنَّ عَائِشَةَ ارْتَدَّتْ بَعْدَ النَّبِيِّ، وَخَرَجَتْ تُقَاتِلُ وَصِيَّهُ عَلِيًّا…
“নিশ্চয় আয়িশা নবি (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর ওফাতের পর ধর্মত্যাগ করে এবং তাঁর ওসী আলি (আ.) এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে বের হয়। ক্বাযী নু‘মান আল-মাগরিবী, শরহুল আখবার ফি ফাযায়িলিল আহলিল বায়ত, তৃতীয় খণ্ড, পৃ.-১০৯।

৩. নবিজি (সা.) এর জীবনে অশান্তি সৃষ্টি :
শিয়াদের কিছু বর্ণনা অনুযায়ী, আয়িশা (রা.) নবিজি (সা.)-এর পরিবারে বিবাদ সৃষ্টি করেছিলেন এবং বিশেষত হাফসা (রা.)-এর সাথে মিলে নবিজির ব্যক্তিগত জীবনে হস্তক্ষেপ করেছিলেন। নবি ﷺ তাকে তালাক দিয়েছিলেন (নাউযুবিল্লাহ)। তাদের লেখা গ্রন্থে এমনই আছেঅ
إِنَّ النَّبِيَّ أَمَرَ أَبَا بَكْرٍ وَعُمَرَ أَنْ يُطَلِّقَا ابْنَتَيْهِمَا مِنْ بَعْدِهِ.
নবি ﷺ আবু বকর ও উমরকে আদেশ করেছিলেন যেন তারা তাঁর মৃত্যুর পর তাদের কন্যাদ্বয়কে (আয়িশা ও হাফসা) তালাক দেয়। মুহাম্মাদ বাকির আল-মাজলিসী, বিহারুল আনওয়ার, খণ্ড: ২২, পৃষ্ঠা: ২৪১

৪. উম্মুল মুমিনীন হওয়া নিয়ে সন্দেহ:
কিছু চরমপন্থী শিয়া মতবাদে (যেমন কিছু গুলাত শিয়া) আয়িশা (রা.)-কে “উম্মুল মুমিনীন” হিসেবে স্বীকার করে না এবং তাকে নেতিবাচক চরিত্র হিসেবে উপস্থাপন করে। উম্মুল মুমিনীন আয়িশা (রা.) কে তারা কাফির বলে অপবাদ প্রদান করেন শিয়া আলিম নূরী তাবরসী বলেন-
إِنَّ عَائِشَةَ كَانَتْ مِنْ أَعْدَاءِ أَهْلِ الْبَيْتِ، وَهِيَ كَافِرَةٌ بِذَلِكَ
“নিশ্চয়ই আয়িশা ছিল আহলুল বাইতের শত্রুদের অন্তর্ভুক্ত, এবং এ কারণেই সে কাফির। নূরী তাবরসী, আল-আনওয়ার আন-নুমানিয়া, প্রথম খণ্ড, পৃ.-২৫৯

৫. উম্মুল মুমিনীন হাফসা (রা.) ও আয়িশা (রা.) কে মুনাফিক অপবাদ প্রদান :
সূরা আত-তাহরীম তিন নম্বর আয়াতে রাসূল ﷺ এর একটি গোপন কথা স্ত্রীদের মধ্যে ফাঁস করে দেওয়ার আলোচনা রয়েছে তার ব্যাখ্যায় এ মিথ্যা অপবাদ প্রদান কর শিয়া আলেম মুহাম্মাদ ইবনু মাসআদাহ আল-আইয়াশি লিখেন-
إِنَّ حَفْصَةَ وَعَائِشَةَ تَظَاهَرَتَا عَلَى رَسُولِ اللَّهِ، وَكُنَّ مُنَافِقَاتٍ.
“নিশ্চয় হাফসা ও আয়িশা রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে বিরুদ্ধে একত্র হয়েছিল, এবং তারা ছিল মুনাফিক।” মুহাম্মাদ ইবনু মাসআদাহ আল-আইয়াশি, তাফসীরুল আ’ইয়াশি, তাফসীর আল-আইয়াশি, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃ.-১৩৪।

৬. মৃত্যু পরবর্তী শাস্তির মিথ্যা ভবিষ্যদ্বাণী:
শিয়াদের কিছু হাদিসে দাবি করা হয় যে, নবিজি (সা.) বা ইমাম আলি (আ.) আয়িশা (রা.) এর ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন এবং তাকে জাহান্নামের ভয় দেখানো হয়েছিল। এসব হাদিস শিয়াদের বানান জাল হাদিস।

৭. মিথ্যা ব্যভিচার অভিযোগে সম্পৃক্ততা :
আয়িশা (রা.) সম্পর্কে মিথ্যাও কাল্পনিক ব্যভিচারের অভিযোগ উঠলে মহান আল্লাহ তায়ালা তার পরিত্রতার পক্ষে কুরআন নাজিল করে। কিন্তু বিভ্রান্ত শিয়ারা প্রচার করে কুরআনের এ আয়াত হয়তো অন্যান্য নারী (যেমন মারিয়া কিবতীয়া) এর জন্য নাজিল হয়েছে; সুতরাং আয়শার নির্দোষিতা নিয়ে তারা দ্বিধাগ্রস্ত।

এ সম্পর্কে সঠিক আকিদা :
আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামায়াত আয়িশা (রা.) কে ‘উম্মুল মুমিনীন’, হাদিসের প্রধান বর্ণনাকারী এবং নবিজি (সা.) এর প্রিয় স্ত্রী হিসেবে সম্মান করে। তারা জামালের যুদ্ধকে একটি ফিতনা (বিভ্রান্তি) হিসেবে দেখে, যেখানে সাহাবিদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি হয়েছিল, কিন্তু আয়িশা (রা.) এর ইচ্ছা ভালো ছিল বলে বিশ্বাস করে। যা এই বইয়ের বর্ণিত ঐতিহাসিক ঘটনা থেকেও জানতে পেরেছেন। অপর পক্ষে আয়িশা (রা.) বিরুদ্ধে মিথ্যাও কাল্পনিক ব্যভিচারের অভিযোগের উত্তরে মহান আল্লাহ তায়ালা তার পবিত্রতা ও পরিপূর্ণতার ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা সূরা নূরের ১১ থেকে ২০, এই ১০ আয়াত নাজিল করেছেন। আল্লাহ তায়ালা আয়িশা সিদ্দীকা (রা.) প্রতি অপবাদকারীদের উদ্দেশ্যে বলেন-
اِنَّ الَّذِیۡنَ جَآءُوۡ بِالۡاِفۡکِ عُصۡبَۃٌ مِّنۡکُمۡ ؕ لَا تَحۡسَبُوۡہُ شَرًّا لَّکُمۡ ؕ بَلۡ ہُوَ خَیۡرٌ لَّکُمۡ ؕ لِکُلِّ امۡرِیًٴ مِّنۡہُمۡ مَّا اکۡتَسَبَ مِنَ الۡاِثۡمِ ۚ وَالَّذِیۡ تَوَلّٰی کِبۡرَہٗ مِنۡہُمۡ لَہٗ عَذَابٌ عَظِیۡمٌ
নিশ্চয়ই যারা এ (আয়িশা রা.)অপবাদ রটনা করেছে, তারা তোমাদেরই একটি দল। এটাকে তোমরা তোমাদের জন্য অকল্যাণকর মনে করো না, বরং এটা তোমাদের জন্য কল্যাণকর। তাদের থেকে প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য রয়েছে, যতটুকু পাপ সে অর্জন করেছে। আর তাদের থেকে যে ব্যক্তি এ ব্যাপারে প্রধান ভূমিকা পালন করেছে, তার জন্য রয়েছে মহাআযাব। সূরা আন-নূর: ১১
আল্লাহ তায়ালা সুস্পষ্ট বলে দিয়েছে মিথ্যা অপবাদ যারা দেয় তারা কখনো মুমিন নয় বরং সে ব্যক্তি মুনাফিক গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত।
আল্লাহ তায়ালা সূরার শেষ অংশে বলেন,
﴿يَعِظُكُمُ ٱللَّهُ أَن تَعُودُواْ لِمِثۡلِهِۦٓ أَبَدًا إِن كُنتُم مُّؤۡمِنِينَ ١٧﴾
অর্থ : “আল্লাহ তোমাদেরকে উপদেশ দিচ্ছেন, ‘তোমরা যদি মুমিন হও, তবে কখনও অনুরূপ আচরণের পূনরাবৃত্তি করো না।” সূরা আন-নূর: ১৭
তাহলে বলুন কেমন দুঃসাহস দেখান সাহাবিদের দুশমন শিয়াগণ। আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের প্রতি তাদের কোন সম্মানবোধ নেই বলেই শিয়ারা রাসূলুল্লাহ ﷺ এর প্রিয় স্ত্রী আয়িশা সিদ্দীকা (রা.) কে অপবাদ দেয়। অথচ তিনি আল্লাহ তায়ালা কর্তৃক সনদ প্রাপ্ত জান্নাতি।

উম্মুল জননী বা নবি ﷺ এর স্ত্রীদেরকে অপমান করা :
আল্লামা মুহাম্মদ বাকের আল-মজলিসী (মৃত্যু ১১১০ হিজরি) একজন প্রভাবশালী শিয়া আলেম বলেন, দায়মুক্তির ব্যাপারে আমাদের (শিয়াদের) আকিদা ও বিশ্বাস হল, আমরা আবূ বকর (রা.), উমর (রা.), উসমান (রা.) ও মুয়াবিয়া (রা.) এর মত চার মূর্তি থেকে মুক্ত। আমরা আরও মুক্ত আয়িশা (রা.), হাফসা (রা.), হিন্দা (রা.) ও উম্মুল হাকিম (রা.) এর মত চার নারী এবং তাদের অনুসারী ও তাদের বিভিন্ন দল-গোষ্ঠী থেকে। আর তারা হল পৃথিবীর বুকে আল্লাহর নিকৃষ্ট সৃষ্টি। আর তাদের শত্রুদের থেকে মুক্ত হওয়ার পরেই শুধু আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও ইমামদের প্রতি ঈমান পরিপূর্ণতা লাভ করবে। ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইয়াকুব আল-কুলায়নী, উসুলুল কাফী, তৃতীয় খণ্ড, পৃ.-৩৪২, আল্লামা মুহাম্মদ বাকের আল-মজলিসী, ভলিউম ৮৫, ছায়া অধ্যায় ।

উম্মুল মুমিনীন বিরুদ্ধে শিয়াদের মিথ্যা ও অশ্লীল অভিযোগ
ইমাম জাফর সাদিক (আ.) বলেন:
إِنَّ نِسَاءَ النَّبِيِّ (ص) خَانُوهُ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ”
অর্থ : নবিজির স্ত্রীরা দুনিয়া ও আখিরাতে তাঁর সাথে খিয়ানত করেছেন। মুহাম্মাদ ইবনে উমার আল-কাশশি, রিজাল আল-কাশশি, পৃ.-৫৭

এ সম্পর্কে সঠিক আকিদা :
নবি ﷺ এর স্ত্রীদের ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
اَلنَّبِیُّ اَوۡلٰی بِالۡمُؤۡمِنِیۡنَ مِنۡ اَنۡفُسِہِمۡ
অর্থ : নবি মু’মিনদের নিকট তাদের নিজেদের অপেক্ষা ঘনিষ্টতর এবং তার স্ত্রীরা তাদের মা। সূরা আহযাব : ৬
আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন-
یٰنِسَآءَ النَّبِیِّ لَسۡتُنَّ کَاَحَدٍ مِّنَ النِّسَآءِ اِنِ اتَّقَیۡتُنَّ فَلَا تَخۡضَعۡنَ بِالۡقَوۡلِ فَیَطۡمَعَ الَّذِیۡ فِیۡ قَلۡبِہٖ مَرَضٌ وَّقُلۡنَ قَوۡلًا مَّعۡرُوۡفًا ۚ
হে নবি-পত্নিগণ, তোমরা অন্য কোন নারীর মত নও। যদি তোমরা তাকওয়া অবলম্বন কর, তবে (পরপুরুষের সাথে) কোমল কণ্ঠে কথা বলো না, তাহলে যার অন্তরে ব্যাধি রয়েছে সে প্রলুব্ধ হয়। আর তোমরা ন্যায়সংগত কথা বলবে। সূরা আল-আহযাব ৩২
উম্মুহাতুল মুমেনীনদের সম্পর্কে আয়াত নাজিল হয় :
إِنَّمَا يُرِيدُ ٱللَّهُ لِيُذۡهِبَ عَنكُمُ ٱلرِّجۡسَ أَهۡلَ ٱلۡبَيۡتِ وَيُطَهِّرَكُمۡ تَطۡهِيرٗ
অর্থ : হে নবি-পরিবার! আল্লাহ তো শুধু চান তোমাদের থেকে অপবিত্রতা দূর করতে এবং তোমাদেরকে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র করতে। সূরা আল-আহযাব -৩৩

নবি ﷺ এর কন্যাদের অপমান দেওয়া :
দক্ষিণ এশিয়ার (ভারত–পাকিস্তান) শিয়া সম্প্রদায় মনে করে যে নবি ﷺ এর একমাত্র জৈবিক কন্যা ছিলেন সাইয়্যেদা ফাতেমা (রা.)। বাকী তিন জন সাইয়্যেদা যাযনব (রা.), রুকাইয়া (রা.) ও উম্মে কুলসুম (রা.) কে তারা জীবিক বা দত্তক কন্যা হিসেবে অভিহিত করে। এই আকীদার ভিত্তি হিসেবে তারা কিছু শিয়া ও মুসলিম গবেষণা গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃতি কাজ করে। আল্লামা সাইয়্যেদ জাফর মুরতাজা, যিনি একজন সমকালীন রাফিদি শিয়া ইতিহাসবিদ ও লেখক, যিনি শিয়া দৃষ্টিকোণ থেকে সিরাতুন্নবী, সাহাবা ও আহলে বাইত সম্পর্কিত বহু গ্রন্থ রচনা করেছেন। তিনি নবির চার কন্যার মধ্যে চারজনই জৈবিক ছিলেন কি নাতা নিয়ে আলোচনা ও প্রমাণ উপস্থাপন করে। এক পর্যায় ফাতিমা (রা.) ছাড়া বাকি তিন জন সম্পর্কে প্রশ্ন তুলে লিখেন-
بَناتُ النَّبِيِّ أَمْ رَبَائِبُهُ؟
“নবিজির কন্যারা, না কি তাঁর দত্তক কন্যারা?” আল্লামা সাইয়্যেদ জাফর মুরতাজা, গ্রন্থের নাম আল-আমেলি।
সঠিক আকিদা : আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের সকল অনুসারী কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে ঐক্যমত পোষণ করেছেন যে, নবি ﷺ এর কন্যাদের সংখ্যা চারজন। সাইয়্যেদা যাযনব (রা.), রুকাইয়া (রা.) ও উম্মে কুলসুম (রা.) আও ফাতিমা (রা.)। আর অনুরূপ মত পোষণ করে সাধারণ শিয়াগণও। তবে ভারত ও পাকিস্তানের শিয়াগণ তিন কন্যাকে অস্বীকার করে। তারা আল্লাহ তায়ালার বিধানের স্পষ্ট বিরোধিতা করেছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
﴿ ٱدۡعُوهُمۡ لِأٓبَآئِهِمۡ هُوَ أَقۡسَطُ عِندَ ٱللَّهِ﴾
অর্থ : তোমরা তাদেরকে তাদের পিতার পরিচয়ে ডাক। আল্লাহর দৃষ্টিতে এটাই অধিক ন্যায়সংগত। সূরা আহযাব: ৫
তাদের এই মত প্রকাশের একমাত্র কারণ হল ওসমান (রা.) এর সাথে শত্রুতা করা, যাতে তাঁর উচ্চ মর্যাদা স্বীকৃত না হয়। কারণ, নবি ﷺ তাঁর নিকট প্রথমে সাইয়্যেদা রুকাইয়া (রা.) কে বিয়ে দেন। অতঃপর যখন তিনি (রুকাইয়া) ইন্তিকাল করেন, তখন তাঁর নিকট নবি ﷺ উম্মে কুলসুম (রা.) কে বিয়ে দেন। আর এ জন্য তাকে ‘যূন্নুরাইন’ নামে ডাকা হত। আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন-
﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّبِيُّ قُل لِّأَزۡوَٰجِكَ وَبَنَاتِكَ وَنِسَآءِ ٱلۡمُؤۡمِنِينَ يُدۡنِينَ عَلَيۡهِنَّ مِن جَلَٰبِيبِهِنَّ ﴾
অর্থ : হে নবি! তুমি তোমার স্ত্রীগণকে, কন্যাগণকে ও মুমিনদের নারীগণকে বল, তারা যেন তাদের চাদরের কিয়দংশ নিজেদের উপর টেনে দেয়।” সূরা আল-আহযাব: ৫৯

ফাতিমা (রা.) কে স্বংয় আল্লাহ তায়ালা আলি (রব.) সাথে বিবাহ দেন :
ফুরুউল-কাফীতে (আল-কুলাইনি) উল্লেখিত হাদিসটি বর্ণনা করেনীভ
لَمَّا زَوَّجَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ عَلِيًّا فَاطِمَةَ عَلَيْهُمَا السَّلَامُ دَخَلَ عَلَيْهَا وَهِيَ تَبْكِي، فَقَالَ لَهَا: “مَا يُبْكِيكِ؟ وَاللَّهِ لَوْ كَانَ فِي أَهْلِ بَيْتِي، قَدْرُ مَنْ هُوَ خَيْرٌ مِنْ عَلِيٍّ، لَزَوَّجْتُكِ بِهِ، وَلَمْ أُزَوِّجْكِ بِهِ. بَلْ اللَّهُ هُوَ الَّذِي زَوَّجَكِ بِهِ.”
“যখন রাসূলুল্লাহ ﷺ আলি (আ.)-কে সাইয়্যেদা ফাতেমা (রা.) এর নিকট বিয়ে দেন, তিনি তাঁর কাছে উপস্থিত হন এবং দেখেন তিনি কাঁদছেন। তখন তিনি বললেন, ‘তোমার কাঁদার কারণ কী? আমি আল্লাহর নামে শপথ করছি—যদি আমার পরিবারে এমন কেউ থাকত, যার যোগ্যতা আলির চেয়ে শ্রেষ্ঠ, তবে আমি তোমাকে তাকে বিয়ে দিতাম; কিন্তু আমি তোমাকে আলির নিকট বিয়ে দেইনি। বরং আল্লাহ তোমাকে আলির নিকট বিয়ে দিয়েছেন।’” মুহাম্মদ ইবনু ইয়াকুব আল-কুলাইনি, ফুরুউল-কাফী, দ্বিতীয় খণ্ড, বিবাহ অধ্যায়, পৃ.-১৫৭

আল-কুলাইনী আরও উল্লেখ করেন, “আবূ আবদিল্লাহ (আ.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ফাতেমা (আ.) রাসূলুল্লাহ ﷺ কে বলল, “আপনি আমাকে তুচ্ছ মোহরের বিনিময়ে বিয়ে দিয়েছেন? তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ তাকে উদ্দেশ্য করে বলেন, আমি তো তোমাকে বিয়ে দেইনি। বরং আল্লাহই তোমাকে আকাশ থেকে বিয়ে দিয়েছেন। মুহাম্মদ ইবনু ইয়াকুব আল-কুলাইনি, ফুরুউল-কাফী, দ্বিতীয় খণ্ড, বিবাহ অধ্যায়, পৃ.-১৫৭

শিয়াদের ভ্রান্ত আকিদাসমূহ-৪ : সাহাবি (রা.) সম্পর্কে শিয়াদের জঘন্য ভ্রান্ত আকিদা।


মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

শিয়া ইসলামের কিছু চরমপন্থী গ্রন্থে সাহাবায়ে কেরাম (রা.) সম্পর্কে অত্যন্ত জঘন্য ও ভিত্তিহীন আকিদা বিদ্যমান, যা ইসলামের মৌলিক শিক্ষার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। নিম্নে শিয়া গ্রন্থ থেকে সরাসরি উদ্ধৃতি সহ তাদের ভ্রান্ত আকিদা উপস্থাপন করা হলো:
১. প্রথম তিন খলিফা (আবু বকর, উমর, উসমান রা.) সম্পর্কে কুফরি অপবাদ :
মুহাম্মাদ বাকির আল-মাজলিসী তার কিতাবে লিখেন-
“وَلَعَنَ اللهُ الْخِلَافَةَ الْغَاصِبَةَ وَمَنْ تَوَلَّاهَا مِنَ الصَّحَابَةِ”
অর্থ: “আল্লাহ ঐ সকল খিলাফত দখলকারী ও তাদের সমর্থনকারী সাহাবাদের উপর লানত বর্ষণ করুন। মুহাম্মাদ বাকির আল-মাজলিসী, বিহারুল আনওয়ার, খণ্ড: ২২, পৃষ্ঠা: ২৪৮
ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইয়াকুব আল-কুলায়নী,
“إِنَّ أَبَا بَكْرٍ وَعُمَرَ كَانَا كَافِرَيْنِ”
অর্থ: “নিশ্চয় আবু বকর ও উমর কাফির ছিলেন।” ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইয়াকুব আল-কুলায়নী, উসুলুল কাফী, রওজা অধ্যায়, শেষ খণ্ড, পৃ.-৬৪-৬৫
আবু বকর ও উমর (রা.) ইসলাম ধ্বংসকারী
শিয়াদের বিশিষ্ট তাফসির কারণ আবু নাদর মুহাম্মাদ ইবনু মাসআদা ইবনু ইসহাক আল-আয়াশি বলেন-
“إِنَّ أَبَا بَكْرٍ وَعُمَرَ أَضَلَّا الْأُمَّةَ عَنِ الْحَقِّ”
অর্থ: আবু বকর ও উমর উম্মতকে সত্য থেকে বিচ্যুত করেছেন। আবু নাদর মুহাম্মাদ ইবনু মাসআদা ইবনু ইসহাক আল-আয়াশি , তাফসীর আল-আয়াশি, প্রথম খণ্ড, পৃ.-৩৫৬

আল্লামা মুহাম্মদ বাকের আল-মাজলিসী উল্লেখ করেন, নিশ্চয় আবূ বকর এবং ওমর উভয় হলেন, ফেরাউন ও হামান। আল্লামা মুহাম্মদ বাকের আল-মজলিসী, হক্কুল ইয়াকীন পৃ.-৩৬৭

. তিন জন সাহাবি (রা.) বাদে সকলেই ঈমান ত্যাগকরে মুরতাদ হয়েছিল :
রিজাল আল-কাশশি (رجال الكشي) একটি শিয়া রিজাল (ব্যক্তিত্ব-বিশ্লেষণ) গ্রন্থ, যা শিয়া লেখক আবু আমর মুহাম্মদ ইবনে উমর ইবনে আব্দুল আজীজ আল-কাশশি (মৃত্যু: ৩৪০ হিজরি) রচনা করেছেন। এটি শিয়া ইসলামের প্রাথমিক যুগের হাদিস বর্ণনাকারীদের গ্রহণযোগ্যতা ও জীবনী নিয়ে রচিত। এই গ্রন্থে কিছু স্থানে সাহাবায়ে কেরাম (রা.) এর বিরুদ্ধে কঠোর সমালোচনা পাওয়া যায়। শিয়াদের একটি অংশ এ ধরনের বর্ণনাকে ব্যবহার করে সাহাবাদের (রা.) মর্যাদাহানি করার চেষ্টা করে। উক্ত কিতাবে মুহাম্মাদ ইবনু উমার আল-কাশশি তার কিতাবে লিখেন-
مَا بَقِيَ مَعَ أَمِيرِ الْمُؤْمِنِينَ إِلَّا ثَلَاثَةٌ، وَالْبَقِيَّةُ انْقَلَبُوا عَلَى أَعْقَابِهِمْ حَتَّى نِسَاءُ النَّبِيِّ…
আমিরুল মুমিনীন (আলি) এর সঙ্গে কেবল তিনজনই থেকে গিয়েছিল, আর বাকি সবাই তাদের পেছন ফিরে গিয়েছিল, এমনকি নবির স্ত্রীরাও…”। মুহাম্মাদ বাকির আল-মাজলিসী, বিহারুল আনওয়ার, খণ্ড: ২২, পৃষ্ঠা: ৩৩৩, মুহাম্মাদ ইবনে উমার আল-কাশশি, রিজাল আল-কাশশি, পৃ.-৩,

মুহাম্মাদ ইবনে উমার আল-কাশশি কিতাবে লিখেন। ইমাম জাফর সাদিক (আ.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন-
“لَمَّا قُبِضَ رَسُولُ اللَّهِ (ص) ارْتَدَّ النَّاسُ إِلَّا ثَلَاثَةً: الْمِقْدَادُ وَأَبُو ذَرٍّ وَسَلْمَانُ، ثُمَّ إِنَّ النَّاسَ عَادُوا فِي الْإِسْلَامِ…”
অর্থ: “রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাতের পর মানুষ মুরতাদ হয়ে গিয়েছিল, মাত্র তিনজন (মিকদাদ, আবু যর ও সালমান) ছাড়া। পরে তারা ফিরে এসে ইসলামে প্রবেশ করে…”। মুহাম্মাদ ইবনে উমার আল-কাশশি, রিজাল আল-কাশশি, পৃ.-৩, ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইয়াকুব আল-কুলায়নী, উসুলুল কাফী, অষ্টম খণ্ড, পৃ.-২৪৫।
শিয়াদের এই বর্ণনায় বলা হয়েছে যে নবি (সা.)-এর পর অধিকাংশ সাহাবা (রা.) ঈমান ত্যাগ করেছিলেন, শুধু আলি (আ.), সালমান ফারসি (রা.), আবু যর গিফারী (রা.) ও মিকদাদ ইবনে আসওয়াদ (রা.) অবিচল ছিলেন।
মুহাম্মাদ ইবনু উমার আল-কাশশি আরও লিখেন-
“مَا أَسْلَمَ الْقَوْمُ وَلَكِنِ اسْتَسْلَمُوا”
অর্থ: “সাহাবাগণ ঈমান আনেননি, বরং তারা আত্মসমর্পণ করেছিলেন।” মুহাম্মাদ ইবনু উমার আল-কাশশি, রিজালুল কাশশি, পৃ.-১২

৩. সাহাবাদেরকে নবিজির হত্যাকারী হিসেবে অভিযুক্ত করা :
আল-সাইয়্যিদ ইবনে তাউস ছিলেন একজন প্রখ্যাত শিয়া ইমামিয়া আলেম, মুহাদ্দিস এবং সুফিবাদী লেখক। তিনি লিখেন-
“إِنَّ الصَّحَابَةَ سَمُّوا النَّبِيَّ (ص)”
অর্থ: “নিশ্চয় সাহাবাগণ নবি (সা.) কে বিষ প্রয়োগ করেছিলেন। সৈয়দ ইবনে তাউস, ইকবাল আল-আমাল, পৃষ্ঠা ৪৫৬

৪. আলি (রা.) ছাড়া সকল সাহাবাকে মুনাফিক হয়ে ছিল :
আবু মনসুর আহমদ ইবন আলি ইবন আবী তালিব আল-তাবরিসি ছিলেন শিয়াদের বিখ্যাত তাফসীর ‘ফদল ইবন হাসান আল-তাবরিসি’। তিনি বলেন-
“إِنَّمَا كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ عَلِيٌّ وَسَلْمَانُ وَأَبُو ذَرٍّ وَالْمِقْدَادُ”
অর্থ: “আলি, সালমান, আবু জর ও মিকদাদ ছাড়া কেউ আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রতি ঈমান আনেননি।” আবু মনসুর আহমদ ইবন আলি ইবন আবী তালিব তাবরিসি, আল-ইহতিজাজ, প্রথম খণ্ড, পৃ.-১৫২

ইমাম জাফর সাদিক (আ.) বলেন:
أَنَّهُ قَالَ: لَمَّا قُبِضَ النَّبِيُّ (ص) ارْتَدَّ النَّاسُ إِلَّا ثَلَاثَةً”
অর্থ: নবি (সা.)-এর ওফাতের পর মানুষ মুরতাদ হয়ে ছিল, মাত্র তিনজন ব্যতীত। আল-কাফি, কিতাবুর রুদা, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃ.-২৪৪
নোট : এই হাদিস দ্বারা শিয়ারা দাবি করে যে অধিকাংশ সাহাবাই ঈমান ত্যাগ করেছিলেন, যা কুরআনের সূরা ফাতহ ৪৮:২৯-এর সরাসরি খণ্ডন। এই বক্তব্য কুরআনের সূরা আত-তাওবাহ ৯:১০০-এর বিপরীত, যেখানে আল্লাহ প্রথম মুহাজির-আনসারদের প্রশংসা করেছেন।

৫. সাহাবারা কুরআন বিকৃত করেছে”
আল-হাজ মির্জা হোসাইন নূরী তাবরসী, (মৃত্যু: ১৩২০ হিজরি) ছিলেন একজন প্রখ্যাত ইমামিয়া শিয়া আলেম এবং মুহাদ্দিস। নূরী তাবরসী এই গ্রন্থে দাবি করেন, কুরআন শরীফে সাহাবারা ইচ্ছাকৃতভাবে তাহরীফ (বদলানো, সংযোজন বা বিয়োজন) করেছেন। যেমন- ফাসলুল খিতাব ফি ইসকাত তাহরিফিল কিতাবে শিয়া আলেম নূরী তাবরিসি বলেন-
“إِنَّ الصَّحَابَةَ حَرَّفُوا القُرْآنَ بَعْدَ النَّبِيِّ ﷺ”
অর্থ: সাহাবাগণ নবি ﷺ এর পর কুরআন বিকৃত করেছেন। আল-হাজ মিরজা হোসাইন নূরী তাবরসী, ফাসলুল খিতাব ফি ইসকাত তাহরিফিল কিতাব।
শিয়া মতে, রাসূল ﷺ-পরবর্তী সময়ে সাহাবাদের বিশাল অংশ (এবং এমনকি নবির স্ত্রীগণও) সত্য থেকে বিচ্যুত হয়ে গিয়েছিলেন — যা আহলুস সুন্নাহর দৃষ্টিতে চরম বিদ্বেষপূর্ণ ও বিভ্রান্তিকর আকিদা।

এ সম্পর্কে সঠিক আকিদা :
আল-কুরআন সাহাবি (রা.) কে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে জান্নাত, ক্ষমা ও সন্তুষ্টির সনদ দিয়েছে। আল্লাহ যাদের প্রতি তার ক্ষমা ও সন্তুষ্টির ঘোষণা প্রদান করতে নিন্দকদের নিন্দার ফলে তাতে সামান্যতম ও ক্ষতি হবেনা। বরং নিন্দুরেরাই লাঞ্ছিত অপমানিত হবে। সাহাবিদের (রা.) জান্নাত, ক্ষমা ও সন্তুষ্টির সনদের প্রমাণ মহান আল্লাহর ঘোষণা। মহান আল্লাহ তায়ালা তাদের ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে বলেন,
وَالسَّابِقُونَ الأَوَّلُونَ مِنَ الْمُهَاجِرِينَ وَالأَنصَارِ وَالَّذِينَ اتَّبَعُوهُم بِإِحْسَانٍ رَّضِيَ اللّهُ عَنْهُمْ وَرَضُواْ عَنْهُ وَأَعَدَّ لَهُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي تَحْتَهَا الأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا أَبَدًا ذَلِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ
অর্থ : আর যারা সর্বপ্রথম হিজরতকারী ও আনসারদের মাঝে পুরাতন, এবং যারা তাদের অনুসরণ করেছে, আল্লাহ সে সমস্ত লোকদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছে। আর তাদের জন্য প্রস্তুত রেখেছেন কানন-কুঞ্জ, যার তলদেশ দিয়ে প্রবাহিত প্রস্রবণসমূহ। সেখানে তারা থাকবে চিরকাল। এটাই হল মহান কৃতকার্যতা। সুরা তাওবা : ১০০
আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন-
اُولٰٓئِکَ ہُمُ الۡمُؤۡمِنُوۡنَ حَقًّا ؕ  لَہُمۡ دَرَجٰتٌ عِنۡدَ رَبِّہِمۡ وَمَغۡفِرَۃٌ وَّرِزۡقٌ کَرِیۡمٌ ۚ

এরাই সত্যিকারের ঈমানদার, এদের জন্য রয়েছে তাদের রবের সন্নিধানে উচ্চ পদসমূহ, আরও রয়েছে ক্ষমা ও সম্মানজনক জীবিকা। সূরা আনফাল : ৪
আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন-
وَاَلۡزَمَہُمۡ کَلِمَۃَ التَّقۡوٰی وَکَانُوۡۤا اَحَقَّ بِہَا وَاَہۡلَہَا ؕ  وَکَانَ اللّٰہُ بِکُلِّ شَیۡءٍ عَلِیۡمًا 
এবং তাকওয়ার বাণী তাদের জন্য অপরিহার্য করলেন, আর তারাই ছিল এর সর্বাধিক উপযুক্ত ও এর অধিকারী। আর আল্লাহ হলেন প্রত্যেক বিষয়ে সর্বজ্ঞ। সূরা আল-ফাতহ: ২৬
আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন-
وَلٰکِنَّ اللّٰہَ حَبَّبَ اِلَیۡکُمُ الۡاِیۡمَانَ وَزَیَّنَہٗ فِیۡ قُلُوۡبِکُمۡ وَکَرَّہَ اِلَیۡکُمُ الۡکُفۡرَ وَالۡفُسُوۡقَ وَالۡعِصۡیَانَ ؕ  اُولٰٓئِکَ ہُمُ الرّٰشِدُوۡنَ ۙ
কিন্তু আল্লাহ তোমাদের কাছে ঈমানকে প্রিয় করে দিয়েছেন এবং তা তোমাদের অন্তরে সুশোভিত করেছেন। আর তোমাদের কাছে কুফরি, পাপাচার ও অবাধ্যতাকে অপছন্দনীয় করে দিয়েছেন। তারাই তো সত্য পথপ্রাপ্ত। সূরা হুজুরাত : ৭

সাহাবিদের (রা.) অনুসারী দলটি সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে :
আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, বনী ইসরাঈল যে অবস্থায় পতিত হয়েছিল, নিঃসন্দেহে আমার উম্মাতও সেই অবস্থার সম্মুখীন হবে, যেমন একজোড়া জুতার একটি আরেকটির মতো হয়ে থাকে। এমনকি তাদের মধ্যে কেউ যদি প্রকাশ্যে তার মায়ের সাথে ব্যভিচার করে থাকে, তবে আমার উন্মাতের মধ্যেও কেউ তাই করবে। আর বনী ইসরাঈল ৭২ দলে বিভক্ত হয়েছিল। আমার উন্মাত ৭৩ দলে বিভক্ত হবে। শুধু একটি দল ছাড়া তাদের সবাই জাহান্নামি হবে। সাহাবিগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! সে দল কোনটি? তিনি বললেন, আমি ও আমার সাহাবিগণ যার উপর প্রতিষ্ঠিত। সুনানে তিরমিজ : ২৬৪১, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৩৯৯২ মিশকাত : ১৭১, সহীহাহ : ১৩৪৮
এ ছাড়াও বহু আয়াতে সাহাবিদের মর্যাদা বর্ণিত হয়েছে। রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সাহাবিগণ ছিলেন আল-কুরআন, নবুওয়াত ও সুন্নাতের বাস্তব সাক্ষী। সুতরাং সাহাবিদের উপর মিথ্যারোপ করার অর্থই হল ইসলাম ও মুসলিমের সাথে শত্রুতা করা। সাহাবিদের কুৎসা রটনা করা মানেই আল-কুরআন, নবুওয়াত ও সুন্নাতের কুৎসা রটনা করা। উপরের দিকে থুথু নিক্ষেপ করার সমিল।