মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন
“শিয়া” (الشيعة) শব্দটি আরবি “شايَعَ – يُشايِعُ” ধাতু থেকে এসেছে। এর মৌলিক অর্থ হলো- অনুসরণ করা, সমর্থন করা, কোনো দলের পক্ষে হওয়া, ‘শিয়াতু ফুলান’ মানে: “অমুক ব্যক্তির দল বা অনুসারীরা”।
ইবন মানজুর বলেন-
الشِّيعةُ: الأَتْباعُ والأَنصارُ
“শিয়া মানে অনুসারী ও সাহায্যকারী।
কুরআনে ‘শিয়া’ শব্দের ব্যবহার: কুরআনে “শিয়া” শব্দটি একাধিকবার এসেছে, তবে সবক্ষেত্রে ‘দল’, ‘উপদল’ বা ‘অনুসারী’ অর্থে, কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় ফিরকা বোঝাতে নয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
إِنَّ الَّذِينَ فَرَّقُوا دِينَهُمْ وَكَانُوا شِيَعًا لَّسْتَ مِنْهُمْ فِي شَيْءٍ
“নিশ্চয়ই যারা তাদের দ্বীনকে খণ্ডবিখণ্ড করেছে এবং বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়েছে, তাদের সাথে আপনার কোনো সম্পর্ক নেই।” সূরা আনআম :১৫৯
এখানে “شِيَعًا” শব্দটি এসেছে “দল বা উপদল” অর্থে। এটা ফির্কাবাজির নিন্দা হিসাবে এসেছে।
فَوَجَدَ فِيهَا رَجُلَيْنِ يَقْتَتِلَانِ هَذَا مِن شِيعَتِهِ وَهَذَا مِنْ عَدُوِّهِ
তিনি (মূসা (আ.)) সেখানে দুই ব্যক্তিকে যুদ্ধরত দেখতে পেলেন। এক জন ছিল তাঁর শিয়া (অনুসারী), আর অন্যজন ছিল তাঁর শত্রুদের অন্তর্ভুক্ত।” সূরা কাসাস :১৫
এখানে শিয়া মানে: “নিজ দলের লোক” বা “সহযোগী”।
আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন-
وَإِنَّ مِن شِيعَتِهِ لَإِبْرَاهِيمَ
নিশ্চয়ই ইব্রাহীম ((আ.)) ছিলেন তাঁর (নূহ (আ.)) শিয়াদের অন্তর্ভুক্ত।” সূরা সাফফাত : ৮৩
এখানে “শিয়া” মানে: নূহ (আ.)-এর অনুসারী বা তাঁর পথের লোক।
“শিয়া” শব্দটি কুরআনে এসেছে মূলত নিরপেক্ষ অর্থে “দল বা অনুসারী”। তবে পরবর্তীতে এটি ‘আলি (রা.) এর অনুসারী একটি ধর্মীয় মতবাদ’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে যার সাথে কুরআনে এ শিয়া শব্দের কোন সম্পর্ক নাই।
শিয়াদের উৎত্তির সময় ও প্রাক্ষাপট :
উমার (রা.) এর আমলে মুসলিমরা পারস্য (ইরান) জয় করে । তখন পারস্য বাহিনীর কমান্ডার ছিলেন হরমুজান। হরমুজানকে বন্দী করে মদিনা নিয়ে আসা হয় এবং মৃত্যুদণ্ড প্রদানের হুকুম দান করা হয়। মৃত্যুদণ্ড প্রদানের আগে তার শেষ ইচ্ছ্ জানতে চাওয়া হয়। সে তার মৃত্যুদণ্ড এড়াতে একটি ছলনার আশ্রয় নেয়। পানি চেয়ে বলে এটাই তাঁর শেষ ইচ্ছা যে, এ পানি পান না করা পর্যন্ত তাঁকে হত্যা করা হবে না। খলিফার তরফ থেকে প্রতিশ্রুতি পেয়ে সে পানি পান না করে ফেলে দেয়। এ কারণে উমার (রা) তাকে আর হত্যা করেন নাই। হরমুজান, উমর (রা.) প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন ও তার মহানুভবতার জন্য ইসলাম গ্রহণ করে। কিন্তু অতি দুঃখের বিষয় এটা ছিল তার লোক দেখানো সে অন্তরে ছিল চরম প্রতিশোধ নেয়ার নিয়ত করে।
মুক্তি পেয়ে হরমুজান মদিনাতেই বসবাস করতে থাকে এবং উমার (রা.) কে হত্যা করার পরিকল্পনা সাজাতে থাকে। এ কাজে তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী হয় জাফিনা আল খালিল (খ্রিষ্টান) এবং সাবা ইবনে শামুন (ইহুদি)। তারা একসাথে মিলে ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের পরিকল্পনা সাজাতে থাকে। কারণ, হরমুজাখানের পারস্য বাহিনী এবং জাফিনার রোমান বাহিনীকে মুসলিমরা পরাজিত করে সমূলে উৎখাত করেছে। অপর পক্ষে সাবার ইহুদি গোষ্ঠীকে মদিনা থেকে বহিষ্কার করেছে মুসলিমরা। সকলের একটাই লক্ষ মুসলমানদের বিরুদ্ধ প্রতিশোধ।
খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) এর শাসনামলে মুসলিম সাম্রাজ্য অভূতপূর্ব বিস্তার লাভ করে। পারস্যের সাসানীয় সাম্রাজ্য এবং বাইজান্টাইনদের বিশাল অংশ মুসলিমদের আয়ত্তে চলে আসে। তাঁর প্রশাসনিক দক্ষতা, বিচারের কঠোরতা ও ইনসাফের জন্য তিনি মুসলিম ও অমুসলিম উভয়ের নিকটেই প্রিয় ছিলেন। তবে এই সাফল্যে কিছু পরাজিত মানুষের মাঝে বিদ্বেষের জন্ম নেয়। তার শাসনের অধীনে বিপুল সংখ্যক বিজিত অমুসলিমদের প্রবেশ এবং তাদের একাংশের অন্তর্নিহিত বিদ্বেষ। এই সকল অঞ্চলের বন্দী ও দাসেরা আরব ভূমিতে এনে রাখা হতো। এদের অনেকেই ছিল যুদ্ধবন্দি, পরাজিত জাতির সদস্য, যারা ইসলামের প্রতি হিংসা লালন করত। তাদের মধ্যে একজন ছিল আবু লুলু ফিরোজ নামে একজন পারস্যবাসী, যিনি একজন অগ্নিপূজক মাজুসি ছিলেন। সে ছিল একজন দক্ষ কারিগর এবং কাঠ ও ধাতব কাজ জানত। আবু লুলু ফিরোজ মদিনায় অবস্থান করছিল এক সাহাবি, মুগীরাহ ইবনু শু’বা (রা.)-এর অধীন দাস হিসেবে। সে পারস্যের পতনের জন্য সে উমর (রা.) কে দায়ী করত। অনেক ঐতিহাসিকের মতে, এই হত্যাকাণ্ড ছিল একটি বৃহত্তর বিদ্বেষপ্রসূত পরিকল্পনার অংশ, যার পেছনে কিছু ফারসি (ইরানি) জাতীয়তাবাদী মনোভাব কাজ করছিল। মুসলিম খেলাফতের শক্তি ও উমর (রা.) এর নেতৃত্ব দুর্বল করার উদ্দেশ্যও এতে জড়িত ছিল।
অনেক ঐতিহাসিকের মতে হরমুজান, জাফিনা আল খালিল (খ্রিষ্টান) এবং সাবা ইবনে শামুন (ইহুদি) এ তিন জনের ষড়যন্ত্রের কারণে ২৩ হিজরি (৬৪৪ খ্রিষ্টাব্দে) সালের মুহাররম মাসে, ফজরের সালাতের সময় মসজিদে নববীতে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। উমর (রা.) ইমাম হিসেবে দাঁড়িয়ে নামাজ শুরু করেন। ঠিক সেই সময়, আবু লুলু ফিরোজ একটি দ্বি-ধারী বিষাক্ত ছুরি নিয়ে পেছন থেকে তাঁর উপর আক্রমণ করে। সে একাধিকবার ছুরিকাঘাত করে এবং আশেপাশে থাকা আরও কয়েকজন মুসল্লিকেও আহত করে। আবু লুলু ফিরোজ হামলার পর পালাতে গেলে মুসল্লিরা তাকে ধাওয়া করে। ধরা পড়ার আগেই সে নিজেই আত্মহত্যা করে ফেলে। আঘাত এতটাই গুরুতর ছিল যে উমর (রা.) অচেতন হয়ে পড়েন এবং পরে তাঁকে তাঁর ঘরে নিয়ে যাওয়া হয়। তিন দিন তিনি জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে ছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত শাহাদাত বরণ করেন। এ হত্যাকাণ্ড শুধু উমর (রা.) এর জীবনাবসানই নয়, বরং একটি স্থিতিশীল ইসলামি রাষ্ট্রকে গভীর রাজনৈতিক উত্তেজনার মুখোমুখি করে তোলে। মৃত্যুর পূর্বে তিনি তাঁর খলিফার দায়িত্ব বিষয়ে পরামর্শ করেন এবং উসমান (রা.), আলি (রা.), তালহা (রা.), যুবায়র (রা.), সাদ (রা.) এবং আবদুর রহমান ইবনু আউফ (রা.) এই ছয়জনকে পরামর্শ দিয়ে পরবর্তী খলিফা নির্ধারণের দায়িত্ব অর্পণ করেন। সবার পরামর্শে উসমান উসমান (রা.) কে খলিফা নির্বাচিত করা হয়।
উমর (রা.) এর হত্যা কাণ্ডের বিচার :
এই হত্যা কাণ্ডের পর পরই উমার (রা) এর ছেলে উবাইদুল্লাহ হরমুজান ও জাফিনাকে হত্যা করেন। কিন্তু প্রতারণ ইহুদি সাবা বেঁচে যায়। সাবা আড়ালে থেকে প্রতারণা মাধ্য তার কাজ চালিয়ে জেতে থাকে। এত পর্যায় উমর পুত্র উবাইদুল্লাহকে হরমুজ খান ও জাফিনাকে হত্যা মামলায় অভিযুক্ত করা হয়। তাঁর বিচারের দাবিতে নবনিযুক্ত খলিফা উসমান (রা) এর সামনে উপস্থিত করা হয়। আলি (রা) বললেন, উবাইদুল্লাহ বিনা প্রমাণে তৎক্ষণাৎ হত্যা করেছে, যেটা ইসলাম মানে না। কারণ হরমুজান, জাফিনা আল খালিল যে উমর (রা.) এর হত্যা ষড়যন্ত্রে জড়িত তার প্রমাণ তাৎক্ষণিকভাবে কেউ দিতে পারে নাই। তাই আলি (রা) বলেন, এটা তাঁর করা উচিত হয়নি। আলি (রা) এর পক্ষে মদিনার অনেকেই সমর্থন দেন। আবার উবাইদুল্লার প্রতিও অনেকে সমর্থন দেন। তখন তারা দুই ভাগ হয়ে যান। অপঃপর, উসমান (রা) উবাইদুল্লাহ এর পক্ষ হতে কিসাস আদায় করেন।
উসমান (রা.) বিরুদ্ধে আব্দুল্লাহ ইবনে সাবার ষড়যন্ত্র :
উমর (রা.) কে হত্যার করার মাধ্যমে ইহুদি পরিকল্পনা সফল হতে শুরু করেছে। ইহুদি সাবা পরিকল্পনা করে তাঁর ছেলে আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা কে বললেন, মুসলিমদের দেখিয়ে ইসলাম গ্রহণ করান। তার উদ্দেশ্য ছিল যেন এরপর থেকে সহজেই মুসলিমদের গোপন খবর পেতে পারে। ভিতর থেকে মুনাফিকি করে বিভেদ সৃষ্টি করতে পারে এমন একজনের খুবই দরকার।
ঐতিহাসিকের মতে, ইসলাম ধর্মে বিভক্তি আর ধ্বংসের প্রত্যয় মুসলিম বিশ্বের তৃতীয় খলিফার উসমান (রা.) খেলাফতকালে ইয়েমেনের অধিবাসী ইয়াহুদি সাবা, তার সন্তান আব্দুল্লাহ ইবনে সাবাকে নিয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন। ইসলাম গ্রহণের ভান করে সে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। প্রথমে সে মদিনায় কিছু দিন ষড়যন্ত্র করে সফল না হয়ে বসরা যান। এক সময় সিরিয়াও গিয়ে ছিল। এই সব জায়গা পরিকল্পনা অনুসারে কাজ করতে না পেরে অবশেষে মিশর গমন করেন। এখানে সে তার দুরভিসন্ধি বাস্তবায়নের জন্য কিছু সাহায্য কারি পেয়ে যায়। এরই সুযোগে সে প্রচার করে যে, মুসলানদের প্রতি আমার আশ্চর্য লাগে, যারা পৃথিবীতে ঈসা ((আ.)) এর পুনরায় আগমনের কথা বিশ্বাস করে বিন্তু মুহম্মদ রাসুলুল্লাহ ﷺ এর পুনরায় আগমনের কথা বিশ্বাস করে না। অথচ মুহম্মদ রাসুলুল্লাহ ﷺ ঈসা ((আ.)) এর চেয়ে শ্রেষ্ঠ। তার এই কথা অনেক অজ্ঞলোক মেনে নেয়। অতঃপর সে খলিফা উসমান ইবন আফফান (রা.) বিরুদ্ধে মানুষদের মিথ্যা প্রচারণ মাধ্যমে ক্ষেপিয়ে তুলে। উসমান ইবনে আফফান (রা.) এর বিরুদ্ধে আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা ও তার অনুসারীদের উত্থাপিত মিথ্যা অভিযোগগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
১। আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা প্রচার করে, আলি (রা.) খলিফা হওয়ার অধিক হকদার কারণ তিনি ছিলেন রাসূল ﷺ এর প্রকৃত উত্তরাধিকারী। উসমান রা. খিলাফতের উপযুক্ত নন। তিনি নবি ﷺ এর পরিবারের লোকদের (আহলুল বাইত) খিলাফতের অধিকারের প্রতি অবিচার হয়েছে।
২. উসমান (রা.) সরকারি কোশাগার থেকে নিজের পরিবার ও বন্ধু-স্বজনদের অত্যধিক সম্পদ বিতরণ করেছেন। প্রকৃত সত্য হলো খিলাফতের পূর্বেও উসমান (রা.) একজন দাতা ছিলেন। সরকারি কোশাগার থেকে সম্পদ প্রদান করা একটি মিথ্যা অভিযোগ মাত্র।
৩। আত্মীয় প্রীতির অভিযোগ এনে আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা প্রচার করে উসমান (রা) তার আত্মীয়দের, বিশেষত বনু উমাইয়ার সদস্যকে প্রাদেশিক গভর্নর নিযুক্ত করেন।
৪। উসমান (রা.) শাসনে কুরআন পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে। বাস্তবতা ছিল কোন কোন অঞ্চলে কুরআনের কিছু নকল করা অংশ ভুল পেলে তিনি তা পুড়িয়ে ফেলে। মূল কুরআন যা আবু বক্করের শাসনামলে একত্র করা হয়ে ছিল, তা সম্পাদনা করে সাতটি কপি করে, সাতটি প্রদেশে প্রেরণ করা হয়। কিন্তু সাবা এ ঘটনা বিকৃতি বলে অপপ্রচার চালায়।
৫। উসমান (রা.) বিরুদ্ধে অভিযোগ হলো, তিনি সাহাবিদের (রা.) প্রতি অবিচার করছে। বাস্তবতা ছিল উমর (রা.) শাসনামলে সময় মসজিদে নববী সম্প্রসারণের জন্য কিছু জমি অধিগ্রনের সিদ্ধান্ত হয়। উমর (রা.) এর কঠোরতার কারনে কেউ কিছু বলার সাহস পায় নি। কিন্তু উসমান (রা.) সময় জমি অধিগ্রনের বাধা প্রদান করে। উসমান (রা.) বাধা উপেক্ষা করে উমর (রা.) এর নেয়া সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করে। ইবনে সারাহ এ ঘটনাকে সাহাবিদের উপর জুলুম বলে মিথ্যা প্রচারণা চালায়।
৬। উসমান (রা.) বিরুদ্ধে কিছু ধর্মীয় বিধান লঙ্ঘন অভিযোগ এনে ইবনে সাবা প্রচারণ চালায় যে, তিনি নবির সুন্নাহ পরিবর্তন করেছেন যেমন- জুমার নামাজে দ্বিতীয় আজান প্রচলন করেছেন, তিনি তামাত্তু হজ্জ আদায় করেছেন, তিনি হজে মিনায় সালাত কসর করেন নাই ইত্যাদি।
৭। মিসরের গভর্নর আব্দুল্লাহ ইবনে সাদ (রা.) এবং কিছু প্রাদেশিক গভর্নরদের উপর জনগণের অভিযোগ সত্ত্বেও উসমান (রা.) তাদের অপসারণ করেননি বলে মিথ্যা প্রচার করা হয়। বাস্তবতা ছিল, উসমান (রা.) গোপন সংবাদের ভিত্তিতে জানতে পারেন যে ঐ সকল প্রাদেশিক গভর্নরদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ মিথ্যা ও ষড়যন্ত্রমূলক।
এই অভিযোগগুলো ছিল সম্পূর্ণ মিথ্যা ও অতিরঞ্জিত। উসমান (রা.) ছিলেন অত্যন্ত ধার্মিক ও ন্যায়পরায়ণ খলিফা। তাঁর শাসনামলে ইসলামি রাষ্ট্র ব্যাপক সম্প্রসারিত হয়, এবং তিনি কুরআনের সংকলনের মতো মহান কাজ সম্পন্ন করেন। বিদ্রোহীদের অপপ্রচার ও রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের কারণে তিনি শহিদ হন। ইতিহাসবিদরা (যেমন—তাবারী, ইবনে কাসির) লিখেছেন যে, ইবনে সাবা একটি বিভ্রান্তিকর গোষ্ঠী তৈরি করে উসমান (রা.) এর বিরুদ্ধে জনমত গঠন করেছিল, যা পরবর্তীতে তাঁর শাহাদাতের কারণ হয়।
আব্দুল্লাহ ইবনে সাবার মিথ্যা প্রচারণায় ইসলামি খিলাফতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ :
আব্দুল্লাহ ইবনে সাবার মিথ্যা প্রচারণার প্রভাবে অজ্ঞ ও সদ্য ইসলামগ্রহণকারী কিছু লোক অসন্তুষ্টি প্রকাশ করে এবং তাদের মধ্যে মূলত তিনটি প্রধান গোষ্ঠী উসমান (রা.) এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহে অংশ নেয় এবং শেষে মদিনায় তাঁর বাড়ি অবরোধ করে। এ তিনটি গোষ্ঠী হলো-
ক. মিসরীয় বিদ্রোহী দল :
মিশর থেকে প্রায় ১,০০০ জনের একটি দল মদিনায় আসে। তাদের নেতৃত্বে ছিলেন আল-গাফিকি ইবনে হারব আল-কিন্দি ও কিনানা ইবনে বিশর। তারা দাবি করেছিল যে উসমান (রা.) মিসরের গভর্নর আব্দুল্লাহ ইবনে সা‘দকে অপসারণের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছেন।
খ. কুফার বিদ্রোহী দল :
কুফা থেকে একটি দল আমর ইবনে আল-আস (পরবর্তীতে তাঁর ভূমিকা পরিবর্তন হয়) ও অন্যান্যদের প্ররোচনায় এসেছিল।
গ. বসরার বিদ্রোহী দল :
বসরা থেকেও কিছু লোক যোগ দেয়, যদিও তাদের সংখ্যা তুলনামূলক কম ছিল।
এই দলগুলো ইবনে সাবার প্রভাবিত কিছু চরমপন্থি দ্বারা নেতৃত্ব পেয়েছিল, যারা উসমান (রা.) কে সরিয়ে আলি (রা.) কে খলিফা বানানোর লক্ষ্যে কাজ করছিল।
অবরোধের আগে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ইসলামি ইতিহাসে বর্ণিত হয়েছে:
বিদ্রোহীরা মদিনায় পৌঁছে উসমান (রা.) এর কাছে তাদের অভিযোগ পেশ করে। তিনি তাদের শান্ত করার চেষ্টা করেন এবং মিসরীয় দলকে উসমান (রা.) বুঝিয়ে শান্ত করেন। এ তারা বিদ্রোহ ত্যাগ করে ফিরে জেতে সম্মত হন।
মিসরীয়রা ফেরার পথে একটি ঘোড় সওয়ার দেখে তাকে আটকায়। তার কাছ থেকে তারা একটি সীলমোহরযুক্ত চিঠি পায়, যা উসমান (রা.) এর পক্ষ থেকে মিসরের গভর্নরের কাছে লেখা বলে দাবি করা হয়। চিঠিতে নির্দেশ দেওয়া ছিল যে, মিসরীয় বিদ্রোহীদের ফিরে আসার পর যেন তাদের শাস্তি দেওয়া হয়। তারা বুঝতে পারে এ পত্রের মাধ্যমে তাদের শান্তি প্রদানের কথা উল্লেখ আছে। তাই তারা মিসরে ফিরে না গিয়ে মদিনায় ফিরে আসে। তারা মদিনায় ফিরে চিঠিটি উসমান (রা.)-কে দেখায়। তিনি আশ্চর্য হয়ে যান এবং শপথ করে বলেন যে এটি তিনি লেখেননি বা সীলমোহর ব্যবহার করেননি।
কোন কোন ঐতিহাসিকের মনে, উসমান (রা.) এর সচিব মারওয়ান ইবনে আল-হাকাম এর সাথে জড়িত ছিল কিন্তু উসমান (রা.) এতে সম্পূর্ণ অজ্ঞ ছিলেন। আবার কিছু বর্ণনায় বলা হয়, এটি ইবনে সাবার ষড়যন্ত্র ছিল, যাতে বিদ্রোহীরা উসমান (রা.) এর বিরুদ্ধে ক্ষিপ্ত হয়। (এই ঘটনাটি তাবারী, ইবনে কাসির, ও আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া তে উল্লিখিত হয়েছে। তবে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ আছে যে চিঠিটি কে লিখেছিল—মারওয়ান নাকি ইবনে সাবার অনুসারীরা)
উসমান (রা.) এর ধৈর্য ও রক্তপাত এড়ানোর নীতি:
খলিফা উসমান ইবন আফফান (রা.) বিদ্রোহের সময় পরিস্থিতি খুব সহজেই সামরিক শক্তি ব্যবহার করে দমন করতে পারতেন। মদিনার চারপাশে ও অন্যান্য প্রদেশে তার আনুগত্যশীল অনেক সাহাবি, যোদ্ধা ও সেনাপতি ছিলেন। তবে তিনি কয়েকটি কারণে সশস্ত্র প্রতিরোধ না করে ধৈর্য ধারণ করেন এবং রক্তপাত এড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন। ঐতিহাসিক দলিল ও বর্ণনা থেকে প্রমাণ:
ক. রক্তপাত এড়ানোর আকাঙ্ক্ষা :
উসমান (রা.) বলেন, ❝আমি চাই না আমার হাতে মুসলিমদের মধ্যে প্রথম রক্তপাত ঘটুক।❞ ইবন কাসীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, খণ্ড ৭
খ. সাহাবাদের প্রতিরোধের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান :
মদিনার যুবক সাহাবিগণ (যেমন আলি রা.-এর পুত্র হাসান ও হুসাইন, আবদুল্লাহ ইবনে জুবাইর প্রমুখ) বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রস্তাব দেন। কিন্তু উসমান রা. বলেন, ❝যে ব্যক্তি আমার জন্য যুদ্ধ করবে, তার জন্য আমি আল্লাহর কাছে কোনো সাওয়াব আশা করি না।❞ [ইবন সাদ, আল-তাবাকাত আল-কুবরা
গ. আলি (রা.)-এর মাধ্যমে সাহায্য আসা সত্ত্বেও সাড়া না দেওয়া :
আলি (রা.) তার পুত্র হাসান (রা.)-কে উসমান (রা.)-এর রক্ষার জন্য প্রেরণ করেন। কিন্তু উসমান (রা.) হাসান রাঃ-সহ অন্য সাহাবাদের বলেন, “আমি আপনাদের জান-মালের জন্য দায়ী নই; আপনারা চলে যান। আমি চাই না আমার কারণে কারও রক্তপাত হোক।”
উসমান (রা.) হত্যার ঘটনা :
বিদ্রোহীরা উসমান (রা.)-এর বাড়ি ঘেরাও করে তার ঘরের পানি বন্ধ করে দেয়। উসমান (রা.) ও তাঁর পরিবার তৃষ্ণায় কাতর হয়ে পড়েন। সাহাবি আবু হুরায়রা (রা.) ও অন্যান্যরা গোপনে পানির মশক পৌঁছে দিতে চাইলে বিদ্রোহীরা বাধা দেয়। তাঁকে মসজিদে যেতে দেওয়া হয়নি, ফলে তিনি বাড়িতেই জামাত আদায় করেন।
আলি (রা.), তালহা (রা.) ও যুবাইর (রা.) বিদ্রোহীদের সাথে আলোচনা করেও ব্যর্থ হন। এ সকল সাহাবি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগের চেষ্টা করলেও উসমান (রা.) অনুমিত প্রদান করে নাই। এতে তালহা (রা.) ও যুবাইর (রা.) খুবই মনোখুন্ন হন।
যুল-হুজ্জা ১৮, ৩৫ হিজরি ভোরে বিদ্রোহীরা বাড়িতে ঢোকার সুযোগ খুঁজতে থাকে। প্রথমে কিছু বিদ্রোহী দরজা ভেঙে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করে, কিন্তু উসমান (রা.)-এর স্ত্রী নায়লা (রা.) ও অন্যান্য পরিবার সদস্যরা বাধা দেন। পরবর্তীতে কিনানা ইবনে বিশর আল-মিসরি ও আমর ইবনে হামিক নেতৃত্বে একদল সশস্ত্র লোক বাড়িতে ঢুকে পড়ে। উসমান (রা.) তখন কুরআন তিলাওয়াত করছিলেন। হত্যারাকারীরা তাঁর হাতের কুরআনটি ছিনিয়ে নিয়ে তরবারি দিয়ে আঘাত করে। প্রথমে কিনানা ইবনে বিশর উসমান (রা.)-এর মাথায় আঘাত করে। সুদান ইবনে হামরান নামক এক ব্যক্তি লোহার রড বা তরবারি দিয়ে তাঁর বুকে আঘাত করে। রক্তে ভেসে যায় কুরআনের পাতাগুলো এবং মুসলিম জাহানের তৃতীয় খলিফা উসমান (রা.) ৮২ বছর বয়সে শাহাদাত বরণ করেন।
উসমান (রা.) এর লাশ ৩ দিন অবহেলিত থাকে, কারণ বিদ্রোহীরা দাফনে বাধা দেয়। শেষে জুবাইর ইবনে আওয়াম (রা.) ও কয়েকজন সাহাবি গোপনে রাতে জান্নাতুল বাকিতে তাঁকে দাফন করেন। এই হত্যাকাণ্ড ইসলামি উম্মাহর প্রথম ফিতনা (গৃহযুদ্ধ)-এর সূচনা করে, যা জামাল ও সিফফিনের যুদ্ধে রূপ নেয়।
ঐতিহাসিক সূত্র এই ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা পাওয়া যায়: ইবনে সাদের “আত-তাবাকাত আল-কুবরা”, অষ্টম খণ্ড. পৃ.-২৩-৩১, তাবারির “তারিখ আল-উমাম ওয়াল মুলুক” চতুর্থ খণ্ড, পৃ.-৩৯০-৪০৫, ইবনে কাসিরের “আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, সপ্তম খণ্ড, পৃ.-১৮০-১৯০
আলি (রা.) কে খলিফা নির্বাচিত করা :
উসমান (রা.) এর শাহাদাতের পর মদীনার সাহাবিগণ ব্যাপকভাবে আলি (রা.) কে খলিফা হিসেবে মনোনয়ন দেন। আলি (রা.) প্রথমে কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন এবং সাহাবিদের এ প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন। যার কারণে লোকজন সাদ (রা.), তালহা (রা.), জুবায়ের (রা.) প্রমুখের নিকট গিয়ে খলিফা হবার প্রস্তাব দেন। কিন্তু তারাও রাজি হলেন না। অতঃপর আলি (রা.) বললেন, সবাই তাঁকে মানলেই তিনি খলিফা হবেন। মানুষের চাপ ও পরিস্থিতির বিবেচনায় শেষ পর্যন্ত খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণে সম্মত হন। খলিফা নির্বাচিত সভায় সাহাবিগণ তাদের সাথে বিশিষ্ট সাহাবি তালহা (রা.) ও জুবায়ের (রা.) কে হাজির করেন। তাদেরকে জিজ্ঞেস করা হল, আপনারা আলি (রা.) কে খলিফা হিসেবে মানবেন কিনা? তারা নীরব রইলেন এবং পরবর্তীতে তারা দুজন শর্তসাপেক্ষে বাইয়াতে গ্রহণ করেন। ফলে মদীনাবাসী অনেক বদরী সাহাবি, আনসার সাহাবি ও সাধারণ মুসলিমদের একটি বড় অংশ আলি (রা.) কে খলিফা হিসেবে সমর্থন করেছিলেন। ইবনে আব্বাস (রা.), আবু আইয়ুব আনসারি (রা.), আম্মার ইবনে ইয়াসির (রা.), আবু জার আল-গিফারী (রা.), সালমান আল-ফারিসী (রা.), মিকদাদ ইবনে আসওয়াদ (রা.) প্রমুখ নামকরা সাহাবিরা তাঁর পক্ষে বাইয়াত গ্রহণ করেন।
আয়িশা (রা.) ও আলি (রা.) মাঝে যুদ্ধ ছিল মুনাফিক আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা এর ষড়যন্ত্রের ফল :
উসমান (রা.)-এর শাহাদাতের পর মুসলিম উম্মাহ চরম অস্থিরতা ও বিভ্রান্তির মধ্যে পড়ে। উনার হত্যাকারীরা সংগঠিতভাবে মদিনায় অবস্থান করে এবং নতুন খলিফা নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার করে। অবশেষে আলি (রা.) খলিফা নিযুক্ত হন, তবে উনার শাসন দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগেই, আয়িশা (রা.), তালহা (রা.) ও যুবায়ের (রা.) উসমান (রা.) এর হত্যার ন্যায়বিচার ও প্রতিশোধ দাবি করে আন্দোলনে নামেন। এই সময় আয়িশা হজ পালনের জন্য মক্বা অবস্থান করছিলেন। হজ পালন শেষে আয়িশা (রা.) মক্কায় ফেরার পথে উসমান (রা.)-এর হত্যার খবর শুনে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানান এবং বিক্ষোভে নেতৃত্ব দেন। তালহা ও যুবায়ের (রা.) তাঁর সঙ্গে একত্র হয়ে বসরার উদ্দেশ্যে রওনা হন। তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল, খুনিদের বিচারের জন্য জনগণকে সংগঠিত করা এবং খলিফা আলি (রা.)-এর উপর চাপ সৃষ্টি করা যেন তিনি দ্রুত বিচার কার্য সম্পন্ন করেন। আলি (রা.) নিজেও বিচারের পক্ষে ছিলেন, তবে রাজনৈতিক পরিস্থিতি, খুনি দলগুলোর ছদ্মবেশ এবং প্রশাসনিক অস্থিরতা বিচারে বিলম্ব ঘটায়।
এমতাবস্থায়, ৩৬ হিজরিতে বসরা শহরে আলি (রা.) ও আয়িশা, তালহা ও যুবায়ের (রা.)-এর নেতৃত্বাধীন পক্ষের মধ্যে প্রথমে যুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি হলেও, উভয় পক্ষ মুসলিম রক্তপাত এড়াতে সমঝোতার সিদ্ধান্তে উপনীত হন এবং একটি চুক্তি পৌছাতের সম্মত হন। চুক্তির বিষয়বস্তু ছিল:
ক. উসমান (রা.)-এর হত্যাকারীদের বিচারের ব্যবস্থা করা হবে।
খ. উভয় পক্ষ শান্তিপূর্ণভাবে বসরা শহর ছেড়ে চলে যাবে। কোন প্রকার রক্তপাত বা যুদ্ধ হবে না।
আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা ও তার অনুসারীরা (সাবাঈয়্যা) তারা আলির বাহিনীতে ও প্রতিপক্ষের বাহিনীতেও নিজেদের লোক ঢুকিয়ে রেখেছিল। তারা জানত, চুক্তি বাস্তবায়িত হলে মুসলিমদের মধ্যে ঐক্য ফিরে আসবে এবং তারা মুখোশহীন হয়ে যাবে এবং খলিফা উসমান হত্যায় তারা অভিযুক্ত হয়ে বিচারের সম্মুখীন হবে। তাই তারা রাতে দুই পক্ষের উপর গোপনে হামলা করে, যেন উভয় পক্ষ একে অপরকে বিশ্বাসঘাতক ভাবে। ফলে, পরদিন সকালে দুই পক্ষের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয়। উভয়েই ধারণা করে প্রতিপক্ষ রাতের আক্রমণের জন্য দায়ী। এ থেকেই শুরু হয় জামালের যুদ্ধ, যা ছিল এক মর্মান্তিক ও অনাকাঙ্ক্ষিত সংঘর্ষ। এ কথার দলিল ও ঐতিহাসিক সূত্র উল্লেখ করছি :
ক. ইবনে কাসির (রহ.) বলেন, “আলি (রা.) ও আয়িশা (রা.) সহ সাহাবারা শান্তিচুক্তিতে উপনীত হন। কিন্তু যাদের হাতে উসমান (রা.)-এর রক্ত লেগে আছে, তারা দুই পক্ষের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি করে, এবং যুদ্ধ বাধিয়ে দেয়।” ইবন কাসীর আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ২৩৫–২৪০
খ. ইবন আবী শাইবা (রহ.) বলেন, “আলি ও তালহা-যুবায়ের (রা.) উভয়েই সন্ধির বিষয়ে সম্মত হয়েছিলেন। কিন্তু রাতের আঁধারে অজ্ঞাতনামা একদল সেনা দুই শিবিরে হামলা চালায়।” মুসান্নাফ ইবন আবী শাইবা, খণ্ড ৭
গ. তাবারী (আল-তাবারী) লিখেন, “সাবাঈয়্যাহ গোপনে উভয় বাহিনীতে প্রবেশ করে। তারা জানত, যদি মুসলমানরা ঐক্যবদ্ধ হয়, তবে তাদের ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হবে। তাই তারা যুদ্ধ বাধানোর জন্য পরিকল্পিত হামলা করে।” তারীখ আল-তাবারী, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ৪৩৬
সারকথা হলো : আলি (রা.) ও আয়িশা (রা.)-এর মধ্যে চুক্তি হয়েছিল, উভয়েই রক্তপাত এড়াতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা ও তার দল ইসলামি সমাজে গৃহযুদ্ধ লাগিয়ে উম্মাহকে দুর্বল করতে সচেষ্ট ছিল। তাদের গোপন ষড়যন্ত্রে ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি হয় এবং জামালের যুদ্ধ সংঘটিত হয়।
যুদ্ধ হল এবং যুদ্ধ চলার এক পর্যায়ে আলি (রা) জুবায়ের (রা) এর কাছে গিয়ে বললেন, “মনে আছে? একদিন রাসুল বলেছিলেন তুমি ভবিষ্যতে অন্যায়ভাবে আলির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে?” জুবায়ের বললেন, “ও! হ্যাঁ! তাই তো!” সাথে সাথে জুবায়ের (রা) যুদ্ধ ক্ষেত্র থেকে চলে গেলেন। ইবনে সাবার এক লোক জুবায়েরের পিছু নেয়। পরে জুবায়ের (রা) জোহোর এর নামাজ শুরু করতেই তাঁকে খুন করল। আনন্দের সাথে আলি (রা) এর কাছে এল খুনি, এরপর জুবায়েরের (রা) তরবারি, বর্ম পেশ করল। আলি (রা) তাঁকে জাহান্নামের সুসংবাদ দিলেন। সাথে সাথে, সেই লোক পেটে তরবারি ঢুকিয়ে আত্মহত্যা করল। অন্যদিকে তালহা (রা) যুদ্ধক্ষেত্র ত্যাগ করার সময় একটি তীরের আঘাতে মারা যান। আলি (রা) এ উভয়ের মৃত্যুর কথা শুনে মনবেদনায় কাতর হয়ে পড়লেন।
আলি (রা) বুঝতে পারলেন, যুদ্ধ সহজে শেষ হবে না। যতক্ষণ আয়িশা (রা) উটের উপর থেকে উৎসাহ দিবেন, ততক্ষণ চলবে যুদ্ধ। দশ হাজার মুসলিম মারা যাবার পর আলির (রা) বাহিনীর একজন উট পর্যন্ত পৌঁছে পা কেটে ফেলেন। ফলে উট বসে পড়ল। আর আয়িশার (রা) বাহিনীর মন ভেঙ্গে গেল। পরে, আলি (রা) আয়িশার (রা) হাওদাটি অদূরে নিয়ে গিয়ে পর্দা দিয়ে ঘিরে দেয়ার ব্যবস্থা করলেন। এরপর সেখানে ঢুকে কুশল জিজ্ঞেস করলেন। তারা পরস্পরের কাছে ক্ষমা চাইলেন। যুদ্ধ বন্ধ হল। এ যুদ্ধ জামাল (উট) যুদ্ধ নামে পরিচিত। কারণ, আয়িশা (রা) উটের উপর থেকে উৎসাহ দিচ্ছিলেন। মুসলিমদের যতই ক্ষতি হোক, লাভ হল ইসলামের শত্রুদের। এ যুদ্ধ সংঘটিত হয় ৩৬ হিজরী সনের জুমাদাল উখরা মাসে। এই ঘটনা বিস্তারি জানান জন্য ইসলামি ফাইন্ডেসনের প্রকাশিত, ইবনে কাসির রহ. লিখিত “আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়ার ৭ম খণ্ড” দেখার অনুরোধ রইল
সিফফিন যুদ্ধের পটভূমি ও ষড়যন্ত্রকারীদের ভূমিকা :
উসমান (রা.)-এর শাহাদাতের পর মুসলিম উম্মাহ ভয়াবহ রাজনৈতিক অস্থিরতার মুখে পড়ে। আলি (রা.) খলিফা নিযুক্ত হলে, মুসলিম বিশ্বের বড় একটি অংশ তাঁর নেতৃত্ব মেনে নেয়, কিন্তু সিরিয়ার গভর্নর আমিরে মুয়াবিয়া (রা.) যিনি উসমান (রা.)-এর আত্মীয়ও ছিলেন, তিনি খিলাফতের বিরোধিতা করেন না, তবে উসমান (রা.)-এর হত্যাকারীদের দ্রুত বিচার দাবি করেন। ইবনে কাসির বলেন-
মুয়াবিয়া (রা.) খিলাফতের দাবিদার ছিলেন না, বরং উসমান (রা.)-এর হত্যার বদলা ও বিচার দাবি করছিলেন। তিনি আলি (রা.)-কে চিঠিতে লিখেন, ‘তুমি খলিফা হও বা না হও, আগে খুনিদের বিচার হওয়া চাই।’ ইবন কাসীর, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, সপ্তম খণ্ড, পৃ.-২৪৮-২৫০
আলি (রা.) পরিস্থিতির বাস্তবতা বিবেচনায় সময় নিয়ে ন্যায়বিচার করতে চাইলেও, মুয়াবিয়া (রা.) মনে করতেন অপরাধীদের দেরিতে বিচার হলে তা জুলুমের সমান। এই ভিন্নমত থেকেই ৩৭ হিজরিতে সিরিয়ার সীমানায় ‘সিফফিন’ নামক স্থানে দুই পক্ষ মুখোমুখি হয়। আলি (রা.) এই সংঘাত এড়াতে প্রথমে সংলাপের চেষ্টা করেন, কিন্তু ষড়যন্ত্রকারীরা (বিশেষত উসমান (রা.)-এর খুনিরা) দুই পক্ষের সংঘর্ষ বাধিয়ে দিতে উঠেপড়ে লাগে।
আবু বকর মুহাম্মাদ ইবনুল ওয়ালিদ আল-মাকদিসী বলেন, সাবাঈয়্যাহ দল আলির (রা.) বাহিনীতে গোপনে প্রবেশ করে এবং যুদ্ধ বাধিয়ে উম্মাহকে বিভক্ত করার চক্রান্ত করে। আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, সপ্তম খণ্ড
এই ষড়যন্ত্রে অন্যতম ভূমিকা রাখে আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা ও তার অনুসারীরা, যারা একদিকে আলির বাহিনীতে ঢুকে পড়ে, অন্যদিকে সিরিয়ার পক্ষেও বিভ্রান্তি ছড়ায়। তাদের উদ্দেশ্য ছিল, মুসলিম নেতৃত্বে স্থায়ী ফাটল সৃষ্টি করা, যাতে ইসলামি রাষ্ট্র দুর্বল হয়ে পড়ে। অন্যদিকে, মারওয়ান ইবনে হাকাম, যিনি উসমান (রা.)-এর আত্মীয় ছিলেন, তিনি মুয়াবিয়া (রা.)-কে প্রতিশোধে আরও উৎসাহী করেন। মারওয়ান যুদ্ধ চেয়েছিলেন, কারণ এতে উসমান (রা.)-এর খুনিদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য প্রতিক্রিয়া দেখানো সম্ভব হবে বলে তিনি মনে করতেন। ফলে, ধীরে ধীরে রাজনৈতিক বিরোধ সশস্ত্র সংঘর্ষে রূপ নেয়।
সিফফিন যুদ্ধ ছিল মূলত দৃষ্টিভঙ্গিগত পার্থক্যের দ্বন্দ্ব, কিন্তু তা ষড়যন্ত্রকারীদের কারণে রক্তক্ষয়ী রূপ নেয়। পরে এই যুদ্ধ তাহকীম বা সালিসির মাধ্যমে নিষ্পত্তির চেষ্টায় রূপান্তরিত হয়, কিন্তু তা-ও নতুনভাবে ফিতনার জন্ম দেয়, যার ফলে খারিজি মতবাদের উৎপত্তি ঘটে।
৩৭ হিজরিতে সিফফিন যুদ্ধে আলি (রা.) ও মুয়াবিয়া (রা.) এর বাহিনী মুখোমুখি হলে দীর্ঘ যুদ্ধের পর মুসলিম রক্তপাত বন্ধ করতে তাহকীম বা সালিসির প্রস্তাব আসে মুয়াবিয়ার পক্ষ থেকে। যুদ্ধ চলাকালে, হঠাৎ মুয়াবিয়ার সেনারা কুরআনের পৃষ্ঠা বর্শার মাথায় তুলে সালিসির আবেদন জানায় “আসুন কুরআনের নির্দেশে সিদ্ধান্ত নিই।”আলি (রা.) প্রথমে বলেন-
الْكِتَابُ أَنَا نَاطِقُهُ
“আমি তো কুরআনের ভাষ্যকার (অর্থাৎ আমি নিজেই কুরআনের নির্দেশ মেনে চলছি)।
তাঁর সেনাবাহিনীর একটি অংশ চাপ দিলে তিনি তাহকীম মেনে নিতে সম্মত হন, তখন তাঁর সেনাবাহিনীর একটি উগ্রপন্থী গোষ্ঠী তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। তারা বলে-
لا حُكْمَ إِلَّا لِلَّهِ
“হুকুম কেবলমাত্র আল্লাহরই, কোনো মানুষের নয়।”
এ থেকেই খারিজি দল গঠিত হয়, অর্থাৎ যারা মূল শরিয়া ভিত্তিক জামাআত থেকে ‘বেরিয়ে যায়’। খারিজিদের দাবি ছিল, আলি (রা.) ও মুয়াবিয়া (রা.) উভয়েই ‘তাহকীম’ মেনে ভুল করেছেন, তাই তারা কাফির! যে কেউ বড় গোনাহ (সালিসি) করে, সে ইসলাম থেকে বের হয়ে যায়।
ইবন কাসীর আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া গ্রন্থে বলেন-
“তাহকীমের বিরোধিতা থেকে একদল লোক আলির (রা.) বাহিনী ছেড়ে বেরিয়ে যায়। তারা এতটাই চরম ছিল যে, মুসলিমদের বিরুদ্ধে তলোয়ার ধরে। আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া,সপ্তম, পৃ.-২৮৫
এ সম্পর্কে সহিহ মুসলিমে একটি হাদিস এসেছে-
সুওয়াইদ ইবনু গাফালাহ্ (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আলি (রা.) বলেছেন, আমি কোন কথা রসুলুল্লাহ ﷺ এর পক্ষ থেকে বানিয়ে বলার চেয়ে- আমার আকাশ থেকে পড়ে যাওয়াকে শ্রেয় মনে করি। আর যখন আমি আমার ও তোমাদের মধ্যকার ব্যাপার নিয়ে কথা বলি তখন মনে রাখবে যে, যুদ্ধে কৌশল ও চাতুরতার আশ্রয় নেয়া বৈধ। আমি রসুলুল্লাহ ﷺ কে বলতে শুনিঃ সে যুগে (অর্থাৎ কিয়ামতের পূর্বে) এমন এক সম্প্রদায়ের আবির্ভাব ঘটবে যারা অল্প বয়স্ক ও স্বল্প বুদ্ধি-সম্পন্ন হবে। তারা সৃষ্টি জগতের চেয়ে ভাল ভাল কথা বলবে, তারা কুরআন মাজীদ পাঠ করবে কিন্তু তা তাদের গলার নীচে যাবে না। তীর যেভাবে শিকার থেকে বেরিয়ে যায় তারাও অনুরূপভাবে বেরিয়ে যাবে। অতএব, তোমরা তাদের সাথে মুখোমুখি হলে তাদের হত্যা করে ফেলবে। কেননা তাদেরকে যারা হত্যা করবে তারা কিয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে সাওয়াব পাবে। সহিহ মুসলিম : ১০৬৬
তাহকীমের (সালিসির) পর আলি (রা.) ও মুয়াবিয়া (রা.) এর মধ্যকার সম্পর্ক আরও জটিল হয়, যা মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের জন্য চরম সংকট ডেকে আনে। উভয় পক্ষের সম্পর্ক আরও তিক্ত হয়ে যায়
আলি (রা.) তাহকীমে সম্মতি দেয়ায় খারিজিরা তাঁকে ‘কাফির’ বলে ঘোষণা করে এবং বিদ্রোহ করে।
ইতিমধ্যে মুয়াবিয়া (রা.) নিজেকে “আমীরুল মুমিনীন” বলে ঘোষণা করেন এবং শাম অঞ্চলে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন। মুয়াবিয়া (রা.)-এর রাজনৈতিক শক্তি বাড়ার কারনে শাম, মিশর, ও অন্যান্য প্রদেশ ধীরে ধীরে তাঁর আনুগত্য স্বীকার করে। মিসরের গভর্নর মুহাম্মদ ইবনু আবি বকর (আলি রা. এর নিয়োজিত) নিহত হন এবং মিসর মুয়াবিয়ার নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।
আলি (রা.) এর সেনাবাহিনী খারিজি বিদ্রোহ দমনে ব্যস্ত হয়ে পড়ে এবং তার অবস্থান কিছুটি দুর্বল হয়ে পড়ে। তিনি অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ, অন্যদিকে মুয়াবিয়ার প্রভাব, দুই দিক থেকেই চাপ বাড়ে। ৪০ হিজরিতে (৬৬১ খ্রিষ্টাব্দে) এক খারিজি বিদ্রোহী আবদুর রহমান ইবনু মুলজিম আলি (রা.)-কে ফজরের নামাজে ছুরি দিয়ে হত্যা করে। আলি (রা.) শাহাদাত বরণ করলে তাঁর ছেলে হাসান (রা.) খলিফা নিযুক্ত হন। পরের বছর ৪১ হিজরিতে হাসান (রা.) ও মুয়াবিয়া (রা.)-এর সন্ধি হয়। যার কারণে এ বছরকে বলা হয়, আামুল জামায়া (ঐক্যের বছর)। মুসলিম রক্তপাত বন্ধের জন্য হাসান (রা.) নিজে স্বেচ্ছায় খিলাফত থেকে সরে গিয়ে মুয়াবিয়া (রা.) কে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। ফলে উম্মাহর মধ্যে আবার একতা প্রতিষ্ঠিত হয়। ইবন কাসীর, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া লিখেন-
“তাহকীমের পর উভয় পক্ষের মধ্যে আস্থাহীনতা চরমে পৌঁছে। আলি (রা.)-এর শাহাদাতের পর হাসান (রা.) মুয়াবিয়াকে ক্ষমতা হস্তান্তর করে উম্মাহর ঐক্য রক্ষা করেন। আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, অষ্টম খণ্ড, পৃ.-১৩১–১৪৫
উসমান (রা.) কে হত্যার পর শিয়াদের আনুষ্ঠানিক ষড়যন্ত্র :
উসমান (রা.) কে হত্যার পর। যখন মদিনার অধিকাংশ সাবাবি ও মুসলিমদের বাইয়াতের মাধ্যমে আলি রা, খলীফা নির্বাচিত হয়ে তখন মদিনার সাহাবিদের পাশাপাশি উসমান (রা.) এর হত্যা ষড়যন্ত্রে জড়িত ক্ষুদ্র একটি মুনাফিক দল শিয়া জামাতের প্রতিষ্ঠিত আব্দুল্লাহ ইবনে সাবার নেতৃত্বেও আলি (রা.) কে সমর্থন দেয়। তারা মুনাফিকির নিয়তে আলি (রা.) পক্ষে যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করে। এই ক্ষুদ্র দলটি পরবর্তীতে আলি ও আহলে বাইয়াত নিয়ে চরম বাড়াবাড়ি করে। যেহেতু তারা আলি (রা.) এর পক্ষে বাড়াবাড়ি করে এবং তার অনুসারী দাবি করে। তাই তাদেরকে ‘শিয়ায়ে আলি’ বা আলির অনুসারী বলা হত। তখন থেকে ‘শিয়া’ বলতে আলি (রা.) এর অনুসারীদের বুঝান হত। বর্তমানে শিয়া বলা হয় এমন ব্যক্তিদের যারা ইমামতে বিশ্বাসী, আলি (রা.) ও আহলে বাইয়াত সম্পর্কে বিশেষ আকিদা বিশ্বাসীউসমান (রা.) কে হত্যার পর শিয়াদের আনুষ্ঠানিক ষড়যন্ত্র :
উসমান (রা.) কে হত্যার পর। যখন মদিনার অধিকাংশ সাবাবি ও মুসলিমদের বাইয়াতের মাধ্যমে আলি রা, খলীফা নির্বাচিত হয়ে তখন মদিনার সাহাবিদের পাশাপাশি উসমান (রা.) এর হত্যা ষড়যন্ত্রে জড়িত ক্ষুদ্র একটি মুনাফিক দল শিয়া জামাতের প্রতিষ্ঠাতা আব্দুল্লাহ ইবনে সাবার নেতৃত্বেও আলি (রা.) কে সমর্থন দেয়। তারা মুনাফিকির নিয়তে আলি (রা.) পক্ষে যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করে। এই ক্ষুদ্র দলটি পরবর্তীতে আলি ও আহলে বাইয়াত নিয়ে চরম বাড়াবাড়ি করে। যেহেতু তারা আলি (রা.) এর পক্ষে বাড়াবাড়ি করে এবং তার অনুসারী দাবি করে। তাই তাদেরকে ‘শিয়ায়ে আলি’ বা আলির অনুসারী বলা হত। তখন থেকে ‘শিয়া’ বলতে আলি (রা.) এর অনুসারীদের বুঝান হত। বর্তমানে শিয়া বলা হয় এমন ব্যক্তিদের যারা ইমামতে বিশ্বাসী, আলি (রা.) ও আহলে বাইয়াত সম্পর্কে বিশেষ আকিদা পোষণ করে। তাদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো সাহাবিদের গালি দেয়া এবং আলি (রা.) কে আবু বকর (রা.) ও উমর (রা.) চেয়ে অধিকতর মর্যাদা অধিকারী মনে করে। তারা বিশ্বাস করে রাসুলুল্লাহ ﷺ এর মৃত্যুর আগে “গাদির খুম” নামক স্থানে আলি (রা.) কে নিজের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় প্রতিনিধি এবং খলিফা নির্ধারণ করে যান। অথচ রাসুলুল্লাহ ﷺ এর মৃত্যুর পর সাহাবিগণ আবুবকর (রা.) এর নিকট সর্বসম্মতিতে বাইয়াত গ্রহণ করেন, আলি (রা.) কিংবা কেউ তাতে বিরোধিতা করেন নি।
আলি (রা.) এর যুগে শিয়াদের ফির্কা
ড. সফর ই়বনে আব্দুর রহমান আল-হাওয়ালি বলেন- আলি (রা.) এর যুগে যখন শিয়াদের উন্মেষ ঘটে তখন তারা তিন ভাগে বিভক্ত ছিল।
১। মুফাদ্দালাহ (প্রাধান্য দানকারী): তারা আলি (রা.) কে আবু বকর ও ওমর (রা.)মের উপর প্রাধান্য দিত।
২. সাব্বাবাহ (গালমন্দকারী): তারা আলি (রা.) কে প্রাধান্য দেওয়ার ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি করে, এমন কি আবুবকর ও ওমরকে পর্যন্ত গালমন্দ করে।
৩। গুলাত (সীমালঙ্ঘনকারী): তারা আলি (রা.) কে ইলাহ (উপাস্য) জানে, অর্থাৎ তারা বিশ্বাস করে তিনি ইলাহ, অথবা তার মাঝে ইলাহের কোনো অংশ প্রবেশ করেছে, যেমন খ্রিস্টানরা ঈসা আলাইহিস সালাম সম্পর্কে বিশ্বাস করে। তারা যিন্দিক। তাদেরকে যিন্দিক বলার কারণ তারা প্রকাশ্যে ইসলামের ঘোষণা দেয়, কিন্তু অন্তরে কুফর গোপন করে। উত্স : ড. সফর ই়বনে আব্দুর রহমান আল-হাওয়ালি, “বিভিন্ন ফের্কা, ধর্ম ও মতবাদের মূলনীতি” প্রকাশক ইসলাম হাউজ, সৌদিআরব।
এই তিন প্রকার শিয়াদের ব্যাপারে আলি (রা.) এর ফয়সালা :
১। মুফাদদালাহ : মুফাদদালাহদেন আলি (রা.) তাদেরকে প্রত্যাখ্যান করতেন এবং ঘোষণা দিতেন যে রাসুলুল্লাহ ﷺ এর পর সর্বোত্তম উম্মত আবুবকর ও উমর (রা.)। যেমন- সহিহ বুখারিতে তার সূত্রে বর্ণিত আছে। সহিহ সূত্রে তার থেকে আরো প্রমাণিত, আলি (রা.) বলেছেন, “আবুবকর ও ওমরের উপর আমাকে প্রাধান্য দানকারী ব্যক্তিকে যদি আমার নিকট উপস্থিত করা হয় আমি অবশ্যই তাকে মিথ্যা অপবাদের শাস্তি আশিটি বেত্রাঘাত করবো”।
২। সাব্বাবাহ : সাব্বাবাহ সম্পর্কে আলি (রা.) এর ফয়সালা ছিল যে, তাদেরকে হত্যা করতে হবে। তার দলের কতক লোক আবুবকর ও ওমরকে গালমন্দ করে, এরূপ কথা তার নিকট পৌঁছলে তিনি তাদেরকে হত্যার জন্য তলব করেন, কিন্তু তারা পলায়ন করে।
৩. গুলাত (যিন্দিক) : গুলাতদের ব্যাপারে তার সিদ্ধান্ত ছিল আগুনে পোড়ানো, তিনি পুড়িয়েছেনও। যা সহিহ বুখারি দ্বারা প্রমাণিত।
ইবনে আব্বাস (রা.) তাদেরকে পোড়ানো নিয়ে আপত্তি করেন, কারণ আগুন দিয়ে পোড়ানোর ক্ষেত্রে নবি রাসুলুল্লাহ ﷺ এর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, তাই তাদেরকে তিনি তলোয়ার দিয়ে হত্যা করতে বলেন।
উত্স : ড. সফর ই়বনে আব্দুর রহমান আল-হাওয়ালি, “বিভিন্ন ফের্কা, ধর্ম ও মতবাদের মূলনীতি” প্রকাশক ইসলাম হাউজ, সৌদিআরব।
আলি (রা.) খিলাফতের সময় আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা ইসলাম ধর্মে চরম বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে। সে ও তার অনুসারিগণ আলি (রা.) এর ব্যাপারে চরম সীমালঙ্ঘন করে, যার কিছু নমুনা তুলে ধরা হল :
১। আলি (রা.) এর উলুহিয়াত মতবাদ প্রকাশ করে :
আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা তার অনুসারীদের মাঝে ছড়িয়ে দেয় যে আলি (রা.) এর মাঝে উলুহিয়াত ক্ষমতা আছে। ইবনে সাবার একদল অনুসারী আলি (রা.) এর দরজায় এসে বলে, “আপনিই সে?” তিনি বলেন, “সে মানে? তারা বলল, “আপনি আল্লাহ”। তিনি তাদেরকে তিন দিন সময় দেন, অতঃপর তাদেরকে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মারেন।
ইবন হাজর আল‑আসকলানি ফাথহুল বারি-তে বর্ণনাকারী ইকরিমাহ থেকে বর্ণিত। “আলি (রা.) কিছু ‘জানার্দি’ (যেকোনও ব্যক্তি যিনি আলিকে ইলাহ বলছিল) বংশকে আগুনে পুড়িয়ে দেন। আল-ইবন আব্বাস (রা.) এই হত্যাকে অস্বীকার করেন না, তবে তিনি বলেন, ‘যদি আমি হইতাম, তবে আমি তাদের পোড়াতাম না, কারণ নবি (সা.) বলেছেন,’’ لَا تُعَذِّبُوا بِعَذَابِ اللَّهِ” (‘আল্লাহর শাস্তি দিয়ে অন্যকে শাস্তি দিও না’) বরং আমি তাদের হত্যা করতাম ঠিক যার মতো নবি নির্দেশ দিয়েছেন, “যে ধর্ম পরিবর্তন করে, তাকে হত্যা করতে হবে। ইবন হাজর আল‑আসকলানি ফাথ্হুল বারি
২। আলি (রা.) ছাড়া কেউ কুরআন জমা করতে পারেনি :
আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা দাবি করে বর্তমান কুরআন প্রকৃত কুরআনের এক নবমাংশ, আলি ব্যতীত কেউ পূর্ণ কুরআন জমা করতে সক্ষম হয়নি। আলি ও তার পরিবারকে নবি রাসুলুল্লাহ ﷺ বাতেনি ইলম দ্বারা ভূষিত করেছেন। আলি (রা.) আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা এ মতবাদ প্রত্যাখ্যান করে বলেন, নবি ﷺ আমাকে কোনো ইলম দ্বারা খাস করেন নি।
তিনি ইবনে সাবাকে ডেকে পাঠান এবং বলেন, “আল্লাহর কসম তিনি অর্থাৎ নবি রাসুলুল্লাহ ﷺ আমাকে একান্তে কিছু প্রদান করেন নি যা অন্যান্য মানুষ থেকে গোপন করেছেন। আমি তাকে বলতে শুনেছি। কিয়ামতের পূর্বে ত্রিশ জন মিথ্যাবাদী হবে, তুমি অবশ্যই তাদের একজন”।
৩। শিয়াগণ আবু বকর (রা.) ও ওমর (রা.) কে গালমন্দ করত
ইবনে সাবা আবু বকর ও উমর (রা.) কে গালমন্দ করার উক্তি প্রকাশ করে, সে ধারণা করে আলি (রা.) তাদের সাথে শত্রুতা পোষণ করেন। যখন আলি (রা.) পর্যন্ত এ কথা পৌঁছে, তিনি বলেন, “আমার সাথে ও এ কালো খবিসের সম্পর্ক কি? আল্লাহর নিকট পানাহ চাই, তাদের ব্যাপারে ভালো ব্যতীত খারাপ কিছু গোপন করা থেকে”।
অতঃপর আব্দুল্লাহ ইবনে সাবাকে মাদায়েন নির্বাসনে পাঠানোর নির্দেশ দেন এবং বলেন: “আমার সাথে এক শহরে সে কখনো থাকতে পারে না”। অতঃপর তিনি মিম্বারে দাঁড়ান, যখন মানুষেরা জড়ো হল, তিনি আবু বকর ও উমরের অনেক প্রশংসা করেন, এবং জনগণকে শাসিয়ে তিনি এ বলে ভাষণ সমাপ্ত করেন। “জেনে রেখো, যার এ সম্পর্কে পৌঁছবে যে, সে আমাকে তাদের (আবু বক্কর ও উমর রা.) উপর প্রাধান্য দেয় আমি অবশ্যই তাকে অপবাদের দোররা মারব”।
সৌদি আলেম ডঃ সফর ই়বনে আব্দুর রহমান আল-হাওয়ালি, “বিভিন্ন ফের্কা, ধর্ম ও মতবাদের মূলনীতি” নামক গ্রন্থ থেকে নেওয়া হয়েছে। অন লাইলে প্রকাশ করেছে ইসলামহাইজ.কম
আব্দুল্লাহ ইবনে সাবাহ পারস্যে নির্বাসন
এই সব কার্যকলাপের দরুন আলি (রা.) ইবনে সাবাকে হত্যা করার ইচ্ছা করেন। কিন্তু তিনি ফিতনা ও বিদ্রোহের আশঙ্কায় সরাসরি পদক্ষেপ নেননি। কারণ, ইবন সাবার অনুসারীরা সংখ্যায় কম ছিল না এবং তারা নিজেদেরকে ‘আলির সমর্থক’ বলে দাবি করত। এদেরকে প্রকাশ্যে দমন করলে, তারা “আলি নিজেই নবির পরিবার ও আহলুল বাইতের বিরুদ্ধাচরণ করছেন” এমন অপবাদ ছড়াতে পারত। এই আশঙ্কায় তিনি কৌশলগত ধৈর্য অবলম্বন করেন এবং আব্দুল্লাহ ইবনে সাবাকে নির্বাসনে পারস্যরা নিক্ষেপ করেন।
আব্দুল্লাহ ইবনে সাবাকে পারস্যে নির্বাসনে পাঠাল আলি (রা.) সাময়িক স্বস্ত্বি পেলেও, ইবনে সাবাহ পেয়ে যান তার মতলব হাসিলের সূবর্ণ সুযোগ। চতুর আব্দুল্লাহ ইবনে সাবাহ সুযোগের সৎব্যবহারের কোন কমতি করেনি। ইবনে সাবার ভ্রান্ত আকিদা প্রচারের সূযোগসমুহ হল :
ক. নতুন ইসলাম দেশ :
পারস্যে ছিল ইসলামে প্রবেশকারী নতুন অনারব দেশ। তাদের ইসলাম গ্রহণের বয়স দশ/বার বছর। উমর সময়ে পারস্য বিজয় হয়। তাতে বসবাসকারী সাধারণ লোকদের অন্তর সাবেক আকিদার ভ্রান্তি থেকে তখনো পুরোপুরি মুক্ত হয়নি, তারা যে কোনো দাওয়াত গ্রহণ করার জন্য উৎসুক ছিল। তারা ইবনে সাবার দাওয়াত কে আসল ইসলাম মনে করে অকপটে গ্রহণ করে। ইবনে সাবার তার ভ্রান্ত বিশ্বাস ছড়ানোর জন্য সুবর্ণ সুযোগ পেয়ে যায়।
খ. ক্ষমতাধরদের ইসলাম অপছন্দ :
পারস্যের ক্ষমতাধর লোকেরা ইসলাম ও তার অনুসারীদের অপছন্দ করত। কারণ ইসলাম তাদের রাজতন্ত্রের পতন ঘটিয়েছে, তাদের ঐতিহ্য ধ্বংস করেছে ও তাদের অগ্নিপূজার ধর্ম নিশ্চিহ্ন করেছে।
গ. অগ্নিপূজারী ধর্মগুরুরা নাখোশ :
অগ্নিপূজারী ধর্মগুরুরা ইসলামের প্রতি নাখোশ ছিল। তারাও ইসলাম ধর্মের বিরুদ্ধে যে কোন কাজের সহযোগী ছিল। ইবনে সাবা ধর্মগুরুরা সাথে তাল মিলিয়ে ইসলাম বিকৃতিতে অংশ গ্রহণ কনে।
ঘ. পারস্যের জনগণের পুরান বিশ্বাস :
পারস্যের জনগণের স্বভাব ছিল শাসক পরিবারকে নিষ্পাপ জানা, প্রভুর স্তরে তাদের আনুগত্য প্রদান করা, শাসক পরিবার থেকে পরম্পরায় রাজত্বের মালিক বানানো, এমন কি তাতে পুরুষ সদস্য না থাকলে নারীই রাজত্বের মালিক হত। এই বিশ্বাসের পালে হাওয়া দিয়ে আব্দুল্লাহ ইবনে সাবাহ প্রচার করে আলি (রা.) নিষ্পাপ, ইলাহ ও রাজত্বের একক মালিক।
ঙ. ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞতা :
ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞতা ও অগ্নিপূজকদের পুরান বিশ্বাসের সূত্র ধরে। আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা ‘হুলুল’ আকিদা আলি (রা.) সম্পর্কে রচনা করে তার ব্যাপক প্রচার করে। এমন কি যখন তার নিকট আলি (রা.) এর হত্যার সংবাদ পৌঁছে, সে বলল, “যদি তোমরা একটি থলিতে তার মগজ নিয়ে আস আমি তার মৃত্যু বিশ্বাস করব না”। সে আরো বলে: “হত্যাকৃত ব্যক্তি আলি নয় বরং শয়তান তার আকৃতি ধারণ করেছে, আলি আসমানে উঠে গেছে, সে মেঘে হাঁটে, বিদ্যুৎ চমক তার দোররা, মেঘের গর্জন তার আওয়াজ। অতিসত্বর সে জমিনে ফিরে আসবে, অতঃপর তা ইনসাফ দ্বারা ভরে দিবে, যেমন তা ফ্যাসাদ দ্বারা পূর্ণ হয়ে গেছে”।
চ. অগ্নিপূজকদের হিংসা :
অগ্নিপূজকদের হিংসাকে পুঁজি করে ইবনে সাবা তার অনুসারী পারস্যদের মাঝে সাহাবিদের বিদ্বেষ ও গালমন্দ করার বীজ বপন করতে সক্ষম হয়, বিশেষ করে আমিরুল মুমেনিন উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) সম্পর্কে, যার মুজাহিদ বাহিনী তাদের দেশ জয় ও তাদের রাজত্ব ধ্বংস করেছে। তাদের এক অগ্নিপূজক আবু লুলু ফিরোজ উমর (রা.) কে অতর্কিত হামলা করে শহীদ করে, যা সবার জানা। যেমনি ভাবে ইবনে সাবা উসমান (রা.), তালহা (রা.), যুবায়ের (রা.) ও অনেক সাহাবিকে হত্যার ষড়যন্ত্রে ছিল, ঠিক তেমনি ভারে প্রকাশ্যভাবে তাদের উপর লানত করত। সবচেয়ে অবাক কাণ্ড, অগ্নিপূজক আবু লুলু ফিরোজের কর্মে গর্ব করে ও সম্মান দেখায় এবং তাকে বীর-বাহাদুর উপাধি দেয়।
এভাবে মূল ইসলামকে পাশ কাটিয়ে আলি (রা.) জামানায় তার সম্পর্কে যে ভ্রান্ত আকিদা সৃষ্টি হয় যা স্বয়ং আলি (রা.) ও অপছন্দ করতেন, পরবর্তীতে আরও অনেক রঙ লাগিয়ে ভ্রান্ত আকিদার পাহাড় রচনা করা হয়, আর এই ভ্রান্ত আকিদার পাহাড়ের উপর দাঁড়িয়ে যে দলটি প্রতিষ্ঠিত হয় তার নাম হল “শিয়া” মতবাদ।
উমাইয়া খিলাফতের সময় ইবনে সাবা ও তার অনুসারীদের অবস্থা ও অবস্থান :
উমাইয়া খিলাফত শুরু হয় ৪১ হিজরিতে আলি (রা.)-এর শাহাদাতের পরে, যার প্রথম খলিফা ছিলেন মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান (রা.)। অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন, তিনি আলি (রা.) এর যুগেই দগ্ধ হয়ে মারা যান, ফলে উমাইয়া যুগে সরাসরি তাঁর অস্তিত্ব ছিল না। তবে তার অনুসারীরা বেঁচে ছিল এবং ছড়িয়ে পড়েছিল। তার মূল অনুসারীরা সক্রিয় ছিল কুফা, বসরা, ও ইয়ামানের এলাকাগুলোতে। উমাইয়া শাসকরা বিশেষ করে মুয়াবিয়া (রা.) ও পরে হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফ কড়া হস্তে চরমপন্থি গোষ্ঠী দমন করেন। কুফা ছিল শিয়া মতবাদের মূল ঘাঁটি, তাই সেখানে গুপ্তচর নিয়োগ, বক্তৃতা নিষেধাজ্ঞা এবং কখনো কখনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফ (মৃত্যু: ৯৫ হি.) এর সময় বহু চরমপন্থি (গুলাত ও সাব্বাহ) কে হত্যা করা হয়। তাবারী, বালাধুরি, ইবনে আসাকির
আব্বাসি খিলাফতের শিয়াদের অবস্থা :
ইতিহাসবিদদের বর্ণনা অনুযায়ী আব্বাসি খিলাফতের সূচনা ঘটে ১৩২ হিজরিতে (৭৫০ খ্রিষ্টাব্দ) বিপ্লবের সূচনালগ্নে শিয়ারা কিছুটা রাজনৈতিক প্রভাব ও আশা নিয়ে এই আন্দোলনের অংশ হয় কিন্তু আব্বাসিরা খিলাফত গ্রহণের পর নিজেদের আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব (নবির চাচা)-এর বংশধর হিসেবে পরিচয় দেয়। তারা আলি (রা.) এর বংশধর না করে দেয় এবং শিয়াদের প্রত্যাশা ভেঙে যায়। আব্বাসি শাসকেরা শিয়ারা বিপদের আশঙ্কা করত বিধায় তারা শাসনের শুরুর দিক থেকেই তাদের উপর নজরদারি শুরু করে এবং কারণে অনকারনে তাদের নির্যাতন করে। এই নির্যাতন ও রাজনৈতিক প্রান্তিকতার সময় শিয়ারা আধ্যাত্মিক নেতৃত্বে বেশি গুরুত্ব দিতে শুরু করে। ইমামতবাদী শিয়ারা ইমামদেরকে শুধুমাত্র রাজনৈতিক নেতা নয় বরং আধ্যাত্মিক ও গোপন জ্ঞানের অধিকারী মনে করতে থাকে। শিয়াদের মধ্যে ইসমাইলিয়া, জাফরিয়া (ইমামিয়া), ও অন্যান্য উপদল গঠিত হয়। শিয়াদের মধ্যে গায়ব (ইমামের আত্মগোপন) বিশ্বাসও এই সময়েই প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে। যদিও শিয়াদের দমন করা হতো, তবুও কেউ কেউ আব্বাসি দরবারে উচ্চপদে ছিলেন, বিশেষ করে তারা যারা প্রকাশ্যে শিয়া মতাদর্শ প্রকাশ করতেন না। এ সময় শিয়া মতবাদের ভিত আরও সুদৃঢ় হলেও রাজনৈতিকভাবে তারা কোণঠাসা ছিল।
আব্বাসি খিলাফতের (১৩২-৬৫৬ হিজরি/৭৫০-১২৫৮ খ্রিষ্টাব্দ ) প্রায় ৫০০ বছরের দীর্ঘ সময় ধরে মুসলিম উম্মাহ শাসন করে। এ সময় শিয়া ও সুন্নিদের মধ্যে সরাসরি “বড় যুদ্ধ” খুব বেশি হয়নি, কারণ শিয়ারা দীর্ঘ সময় ধরে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বাইরে ও রাজনৈতিকভাবে নিপীড়িত ছিল। তবে কুফা, মদিনা, বাহরাইন, সিরিয়া, ইরান, ইয়েমেন কুফা, বাগদাদ, তাবারিস্তান ইত্যাদি অঞ্চলে সাতটির বড় বিদ্রোহ ও অসংখ্য ছোট সংঘর্ষ হয়েছে। এসব ঘটনাই পরবর্তীতে শিয়া-সুন্নি মতবিরোধকে আরও গভীর ও রাজনৈতিক রূপ দেয়।
শিয়াদের প্রথম রাষ্ট্র গঠন :
শিয়া তথা ফাতিমি খেলাফতের উত্থান (সাল: ২৯৭ হিজরি / ৯০৯ খ্রিষ্টাব্দ) ইসলামি ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, যা ইসলামি বিশ্বে শিয়া নেতৃত্বাধীন প্রথম ও সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক ক্ষমতা হিসেবে বিবেচিত। এটি ইসমাইলি শিয়াদের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং প্রায় ২৭০ বছর ধরে উত্তর আফ্রিকা, মিশর, সিরিয়ায়, ও হিজাজের একটি বিশাল অংশে শাসন বিস্তার করে। ‘ফাতিমি’ শব্দটি এসেছে ফাতিমা আয-যাহরা (রা.), নবি মুহাম্মদ ﷺ এর কন্যার নাম থেকে। ফাতিমিদের দাবি ছিল, তারা নবি পরিবারের বংশধর এবং আলি ও ফাতিমা (রা.)-এর মাধ্যমে ইমাম হাসান ও হুসাইন (রা.) এর বংশে সম্পর্কিত। তাদের প্রতিষ্ঠাতা ইসমাইলি শিয়া মতবাদের অনুসারী, যারা ৭ম ইমাম ইসমাইল ইবনে জাফরের পর বংশধরদেরই ইমাম মানে।
আব্বাসি খেলাফত সুন্নি মতবাদে শাসন করছিল এবং আহলে বাইতের কিছু বংশধরদের দমন করত। ইসমাইলি শিয়ারা গোপনে দাওয়াহ চালিয়ে যাচ্ছিল নানা অঞ্চলে, খোরাসান, ইয়েমেন, উত্তর আফ্রিকা, মিশর ও সিরিয়ায়। উত্তর আফ্রিকার কায়রাওয়ান, ইফরীকিয়া (আজকের তিউনিশিয়া ও আলজেরিয়া) অঞ্চলে। তাদের ও দাওয়াতে কারণেই ফাতিমি খিলাফত প্রথিষ্ঠা হয়। প্রতিষ্ঠা ও প্রথম খলিফা ছিল উবাইদুল্লাহ আল-মাহদি বিল্লাহ তিনি নিজেকে আহলে বাইতের একজন বলে দাবি করেন এবং ইমাম মাহদি হিসেবে পরিচিতি দেন।
ফাতিমি খেলাফত ৩৫৮ হিজরিতে (৯৬৯ খ্রি.) মিশর বিজয় করেন। নতুন রাজধানী কায়রো প্রতিষ্ঠা করেন এবং এটিকে খেলাফতের কেন্দ্র বানান। বিখ্যাত আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় (৩৬১ হি.) প্রতিষ্ঠা হয় মূলত শিয়া দাওয়াহর কেন্দ্র হিসেবে।
ইমামদের মধ্যে উত্তরাধিকার নিয়ে দ্বন্দ্ব শুরু হয়, গোপন ইমামত ও রাজনৈতিক ইমামতের ফারাক নিয়ে মতভেদ, ক্রুসেডারদের আগমন, তুর্কি সালজুকদের উত্থান ফলে তারা দুর্বল হয়ে পড়ে এবং মিসরের সেনাপতি সালাহউদ্দিন আইউবি ৫৬৭ হিজরিতে (১১৭১ খ্রি.) ফাতিমিদের শাসনের অবসান ঘটান। সালাহউদ্দিন ফাতিমি খেলাফতের অবসান ঘটিয়ে মিশরে সুন্নি শাফেয়ি মাজহাব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন এবং আয়ুবি সালতানাত শুরু করেন।
ফাতিমি খেলাফতের উত্থান ছিল রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিকভাবে একটি বিপ্লবাত্মক ধারা। এটি সুন্নি-প্রধান ইসলামি ভূখণ্ডে শিয়া চিন্তার প্রথম সফল রাষ্ট্রীয় রূপ, যা প্রায় তিন শতাব্দী ধরে টিকে ছিল এবং বর্তমান মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাস ও মতাদর্শের উপর গভীর প্রভাব রেখেছে।
উত্স : আহমাদ ইবনে আলি আল মাকরিযী (মৃত্যু: ৮৪৫ হি./১৪৪২ খ্রি:), আল-মাকরিযী, আল-খিত্ত।
আলি ইবনে আবিল করীম ইবনুল আসীর (মৃত্যু: ৬৩০ হি./১২৩৩ খ্রি:, আল-কামিল ফিত্তারীখ।
ইমাম মুহাম্মদ ইবনে জারীর আত-তাবারী (মৃত্যু: ৩১০ হি./৯২৩ খ্রি:), তারীখুল উমাম ওয়াল মুলূক।
আব্বাসি খেলাফতের পতনে শিয়াদের ভূমিকা :
আব্বাসি খেলাফতের পতনের সময় (৬৫৬ হিজরি / ১২৫৮ খ্রিস্টাব্দে) তাতার বা মঙ্গোল বাহিনীর হাতে বাগদাদের ধ্বংস একটি ভয়াবহ ঐতিহাসিক বিপর্যয় ছিল। তৎকালীন মুসলিম বিশ্বের জ্ঞান, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় নেতৃত্বের কেন্দ্র ছিল এই শহর। হালাকু খান, চেঙ্গিস খানের বংশধর, বিশাল বাহিনী নিয়ে আব্বাসি খেলাফতের রাজধানী বাগদাদ অবরোধ করেন এবং প্রায় ৪০ দিন ধরে চলা অভিযানে শহরটি সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেন। এ আক্রমণে প্রায় দশ লক্ষেরও বেশি মুসলমান নিহত হন। আব্বাসি খলিফা আল-মুস্তাসিম বিল্লাহকে অপমানজনকভাবে পদদলিত করে হত্যা করা হয়। এছাড়া মুসলিম সভ্যতার অমূল্য সম্পদ – হাজারো কুরআন, হাদিস ও অন্যান্য জ্ঞানের গ্রন্থ পানিতে ডুবিয়ে দেওয়া হয় কিংবা পুড়িয়ে দেওয়া হয়, যা জ্ঞানের অন্ধকার যুগের সূচনা করে।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে শিয়াদের ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক ও ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ চলমান রয়েছে। অনেক সুন্নি ঐতিহাসিকের মতে, আব্বাসি খলিফার প্রধান মন্ত্রী ইবনে আল-আলকামী, যিনি শিয়া মাজহাবের অনুসারী ছিলেন, এই পতনে বড় ধরনের ভূমিকা পালন করেন। বলা হয়, তিনি গোপনে হালাকু খানের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করেন এবং খেলাফতের সৈন্য সংখ্যা ইচ্ছাকৃতভাবে কমিয়ে দেখিয়ে প্রতিরোধ পরিকল্পনা ব্যাহত করেন। এমনকি হালাকুর আগমনের সময় তিনি আত্মসমর্পণের পরামর্শ দিয়ে খেলাফতকে কার্যত রক্ষাহীন করে দেন। ইবন কাসীর তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া-তে, আর ইবনে তাইমিয়া মিনহাজুস সুন্নাহ-তে এই অভিযোগ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন। তাদের মতে, ইবনে আল-আলকামী শুধু বিশ্বাসঘাতকতাই করেননি, বরং মুসলিম বিশ্বের ধ্বংসে পরোক্ষ হাতও বাড়িয়ে দেন।
তবে বিষয়টি নিয়ে শিয়া ইতিহাসবিদদের মধ্যে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। তাদের মতে, ইবনে আল-আলকামী হয়তো আত্মরক্ষার কৌশল হিসেবে মঙ্গোলদের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন, কারণ শাসকগোষ্ঠীর নিপীড়নে বহু বছর ধরে শিয়ারা নিগৃহীত ছিলেন। তাই অনেকে একে আত্মরক্ষামূলক রাজনীতির অংশ হিসেবে দেখেন। বিশেষ করে তৎকালীন ইসমাইলি, বতাইনিয়া ও অন্যান্য শিয়া উপদলসমূহ তাতারদের সুন্নি শাসকদের বিরুদ্ধে একটি সম্ভাব্য শক্তি হিসেবে দেখেছিল এবং তাদের কেউ কেউ পরোক্ষ সমর্থনও দিয়েছিল।
পরবর্তী সময়ে হালাকুর বংশধররা ইসলাম গ্রহণ করে। যদিও তাদের কেউ সুন্নি ধারায় প্রবেশ করে, কেউবা শিয়া ঘরানার ইমামিয়াদের প্রতি সহনশীলতা দেখায়। এ থেকে বোঝা যায়, তাতারদের সঙ্গে কিছু শিয়া গোষ্ঠীর পূর্ব থেকেই কৌশলগত সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল। তবে সব শিয়াকে একযোগে এই পতনের জন্য দায়ী করা ঐতিহাসিক নিরপেক্ষতার পরিপন্থি। এটি ছিল একাধারে রাজনৈতিক, সামরিক ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার ফল, যার মাঝে মাজহাবীয় মতভেদ একটি মাত্র উপাদান হিসেবে ভূমিকা রেখেছিল।