শিয়াদের দল উপদল

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

বর্তমান যুগের শিয়াদের দল উপদল

বর্তমানেও শিয়ারা বিভিন্ন দলে বিভক্ত। তাদের দলের সংখ্যা যেহেতু সঠিকভাবে নিরূপণ করা যায় না। তাছাড়া প্রাথমিক যুগের শিয়াদের সাথে বর্তমান যুগের শিয়াদের অনেক পার্থক্য আছে আবার মিল ও আছে। বর্তমান যুগের শিয়া দাবিকৃত দলগুলির  সাথে প্রথমিক যুগের শিয়ার কোন সম্পর্ক নেই যদিও আকিদায় অনেক মিল খুঁজে পাওয়া যায়। প্রাথমিক যুগের শিয়াদের আকিদাকে আরও ফুলিয়ে ফাপিয়ে, রংঙ লাগিয়ে, বিকৃত করা হইয়াছে। ‘ইসলামি আকিদা ও ভ্রান্ত মতবাদ’ গ্রন্থে বলা হয়েছে। সাবইয়্যা শিয়ারা ৩৯ টি উপদলে বিভক্ত। আর গুলাত বা চরমপন্থি শিয়ারা ২৪ টি উপদলে বিভক্ত। যাদের একটি দল হল ইমামিয়া। এই ইমামিয়া শিয়ারাই, শিয়াদের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল। তাদের প্রধান ও সংখ্যাগরিষ্ঠচরমপন্থি

১। ইসনা আশারিয়া (إثنا عشرية) বা বার ইমামপন্থী শিয়া

২। ইসমাঈলিয়্যাহ (الإسماعيلية) শিয়া

৩। জায়েদিয়্যাহ (الزيدية) শিয়া

১। ইসনা আশারিয়া (إثنا عشرية) বা বার ইমামপন্থী শিয়া

ইসনা আশারিয়া (إثنا عشرية) বা বার ইমামপন্থী শিয়া মুসলিম জগতে শিয়াদের সবচেয়ে বড় ও প্রভাবশালী উপদল। এরা ১২ জন ইমামকে অপরিহার্যভাবে মানে বলে এদের নাম হয়েছে ইসনা আশারিয়া (إثنا عشرية – অর্থ: বারোজন)। তাদের ইমামিয়া শিয়া, বার ইমামি, জাফরিয়া শিয়া হিসেবে ও পরিচিতি আছে।

ক. ইসনা আশারিয়া শিয়াদের মূল আকিদাগুলি হলো

ইসনা আশারিয়া শিয়াদের বিশ্বাস করে যে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর পরে আলি ইবনে আবি তালিব (রা.) থেকে শুরু করে মোট ১২ জন ইমাম আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত, যাদের প্রত্যেকেই একে অপরের বৈধ উত্তরসূরি এবং ইলাহি জ্ঞান ও মাসুমিয়াত (নিরাপরাধিতা) দ্বারা পূর্ণ।

বারো ইমামের তালিকা :

ক্র : নংনামমৃত্যু সন
১মআলি ইবনে আবি তালিব৪০ হিজরি
২য়হাসান ইবনে আলি৫০ হিজরি
৩য়হুসাইন ইবনে আলি৬১ হিজরি
৪র্থআলি ইবনে হুসাইন (যাইনুল আবিদিন)৯৫ হিজরি
৫মমুহাম্মাদ আল-বা‌কির১১৪ হিজরি
৬ষ্ঠজাফর আস-সাদিক১৪৮ হিজরি
৭মমূসা আল-কারিম১৮৩ হিজরি
৮মআলি আল-রিদা২০৩ হিজরি
৯মমুহাম্মাদ আল-তাকি২২০ হিজরি
১০মআলি আল-নাকি২৫৪ হিজরি
১১তমহাসান আল-আসকারী২৬০ হিজরি
১২তমমুহাম্মাদ আল-মাহদী (গায়েব/অদৃশ্য)২৬০ হিজরি থেকে গায়েব

বারতম ইমাম সম্পর্কে শিয়ারা বিশ্বাস করে যে, তিনি হবেন ইমাম মাহদী। তিনি এখন গায়েব (অদৃশ্য) অবস্থায় আছেন এবং কিয়ামতের আগে ফিরে এসে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করবেন। বার ইমামের বিশ্বাস ছাড়াও

তাদের আকিদাগুলি হলো:

ইমামত : নবুয়তের পর ইমামত হলো দ্বীনের মূল স্তম্ভ। ইমামগণ আল্লাহ কর্তৃক নিযুক্ত, নির্ভুল  এবং তাদের কথা শোনাও ফরজ।

তাওয়াসসুল ও শাফা‘আত কী?

শিয়াদের বিশ্বাস অনুযায়ী, তাওয়াসসুল এবং শাফা’আত দুটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা, যা আল্লাহ’র নৈকট্য লাভের এবং তাঁর কাছে কোনো আবেদন পেশ করার মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। এই দুটি ধারণার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন নবী-রাসূলগণ এবং তাঁদের পবিত্র বংশধর ইমামগণ।

তাওয়াসসুল :

তাওয়াসসুল শব্দের অর্থ হলো মাধ্যম বা উপায়। শিয়া বিশ্বাসে, তাওয়াসসুল হলো আল্লাহ’র কাছে কিছু চাইতে বা তাঁর নৈকট্য লাভের জন্য কোনো পবিত্র সত্তা (যেমন: নবী মুহাম্মাদ (সা.) বা তাঁর বংশধর ইমামগণ) কে মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করা। এর মাধ্যমে সরাসরি আল্লাহ’র কাছে আবেদন করা হয়, তবে সেই আবেদনের শক্তি বা গুরুত্ব বৃদ্ধি করার জন্য আল্লাহর প্রিয়পাত্রদের নাম ব্যবহার করা হয়। শিয়াদের মতে, এর উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর রহমত ও অনুগ্রহের দিকে মনোযোগ আকর্ষণ করা। এটি কোনোভাবেই সেই পবিত্র সত্তাকে আল্লাহর সমকক্ষ মনে করা নয়, বরং আল্লাহর প্রতি বিনয় প্রকাশ এবং তাঁর প্রিয়পাত্রদের মর্যাদা স্বীকার করা।

শাফাআত :

শাফা’আত শব্দের অর্থ হলো সুপারিশ। শিয়া বিশ্বাসে, শাফা’আত হলো পরকালে, কেয়ামতের দিনে, কোনো বিশেষ ব্যক্তি (যেমন: নবী মুহাম্মাদ (সা.) এবং তাঁর বংশধর ইমামগণ) কর্তৃক পাপী মুমিনদের জন্য আল্লাহ’র কাছে ক্ষমা ও করুণার সুপারিশ করা। শাফা’আতের মূল ভিত্তি হলো আল্লাহর অনুমতি এবং সেই সুপারিশ করার অধিকার শুধু তারাই পাবেন, যাদেরকে আল্লাহ এই ক্ষমতা দিয়েছেন। শিয়াদের মতে, নবী ও ইমামগণ তাঁদের মর্যাদা ও পুণ্যের কারণে এই অধিকার লাভ করেছেন, এবং এর মাধ্যমে তারা মুসলিম উম্মাহকে জাহান্নামের কঠিন শাস্তি থেকে রক্ষা করতে পারবেন।

তাওসুল ও শাফায়াৎ : ইমামদের মাধ্যমে আল্লাহর কাছে উসিলা চাওয়াকে তারা বৈধ মনে করে।

শাফায়াৎ : বিপদে পড়লে বিশ্বাস গোপন করাকে তারা জায়েয মনে করে।

আশুরা ও কারবালার স্মরণ : ইমাম হুসাইন (রা.)-এর শাহাদত স্মরণে মাতম, নওহা, তাজিয়া, শোকানুষ্ঠান পালন করে।

ফিকহ : ইসনা আশারিয়ারা নিজেদের জন্য জাফরি ফিকহ অনুসরণ করে যা মূলত ইমাম জাফর আস-সাদিক (রহ.) এর শিক্ষার ওপর ভিত্তি করে গঠিত।

খ. বর্তমান অবস্থান ও দেশভিত্তিক জনসংখ্যা

ইসনা আশারিয়া শিয়ারা বর্তমানে নিম্নোক্ত দেশগুলিতে বাস করে:

দেশআনুমানিক শতাংশমন্তব্য
ইরান৯০–৯৫%রাষ্ট্রীয় ধর্ম, শিয়া আলেমদের শাসনব্যবস্থা
ইরাক৬০–৭০%কূফা, কারবালা, নাজাফ, সামাররার মতো গুরুত্বপূর্ণ শহর আছে
আজারবাইজান৮০–৮৫%ধর্মীয়ভাবে ইরানের ঘনিষ্ঠ
বাহরাইন৬৫–৭০%জনসংখ্যার অধিকাংশ শিয়া, কিন্তু শাসক সুন্নি
ইয়েমেন৩৫%-৬৫%শিয়ারা মূলত জায়েদি, তবে ইসমাইলি ও ইসনা আশারিয়াদের হুতিরা মুলত জায়েদি শিয়া।
লেবানন৩০–৪০%হিজবুল্লাহসহ শক্তিশালী ইসনা আশারিয়া সংগঠন
পাকিস্তান১০–১৫%“শিয়া হাজারা” জনগোষ্ঠী উল্লেখযোগ্য
ভারত৮–১০%লক্ষ্ণৌ ও কাশ্মীরে শক্তিশালী উপস্থিতি
আফগানিস্তান১০–১৫%বিশেষত “হাজারা” জনগোষ্ঠী ইসনা আশারিয়া, হেরাত প্রদেশে।
সিরিয়া১০% এর কমআলাওয়ি সম্প্রদায়, পতিত স্বৈরশাসক আসাদ পন্থী

বৈশিষ্ট্য ও চিহ্ন : ইমাম হুসাইনের শাহাদত (১০ মহররম) সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন হিসেবে পালন করে। কারবালার ঘটনাকে ধর্ম ও রাজনীতির কেন্দ্রীয় স্তম্ভ মনে করে। ইমামবাড়া, হোসেনিয়াহ, তাজিয়া, মাতম ইত্যাদি ধর্মীয় সংস্কৃতির অংশ বহন করে।

২। ইসমাঈলিয়্যাহ (الإسماعيلية) শিয়া

ইসমাঈলিয়্যাহ শিয়া (الإسماعيلية) শিয়াদের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও পুরাতন উপদল। তারা বার ইমামি শিয়াদের মতোই প্রথম ছয়জন ইমামকে মানে, কিন্তু সপ্তম ইমাম হিসেবে তারা ইমাম জাফর আস-সাদিক এর পুত্র ইসমাঈল ইবনে জাফর-কে মানে এখান থেকেই তাদের নাম “ইসমাঈলিয়াহ”।

ক. ইসমাঈলিয়াহ শিয়াদের সংক্ষিপ্ত পরিচয়:

ইমামত বিশ্বাস ইমাম জাফর আস-সাদিক (৬ষ্ঠ ইমাম) এর পুত্র ইসমাঈল ও তার বংশধররাই প্রকৃত ইমাম। মতবাদের শাখাগুলো হলো-

১. নিজারী ইসমাঈলিয়াহ ইমাম নিজারকে মানে, আগা খান ফির্কা।

২. মুস্তালীয় বা বোহরা, আল-মুতলাকের নেতৃত্বে মেনে চলে।

৩. দুরুজ, ফাতিমি খলিফা হাকিম বিল্লাহকে ইলাহ মনে করে, আলাদা ধর্ম হিসেবে বিবেচিত

৪. আখবারি বা বাতিনি গোষ্ঠী, মূলত গোপন ব্যাখ্যা নির্ভর দল।

খ. ইসমাঈলিয়াহ শিয়াদের মূল আকিদা ও বিশ্বাস

ইমামত : তাদের বিশ্বাস ইমামগণ অলৌকিক, গায়েবি জ্ঞানসম্পন্ন, আল্লাহর হুকুমের প্রতিনিধি।

বাতিনী ব্যাখ্যা : কুরআন ও শরিয়তের বাইরের গোপন ব্যাখ্যা থাকে যা তাদের ইমামগণ জানেন।

তাকইয়াহ : বিপদে বা অন্য কোন কারণে নিজেদের পরিচয় গোপন রাখা জায়েয ও কৌশল।

ইমাম মাহদী : ইমাম জীবিত আছেন এবং ফিরবেন কিন্তু কে তিনি, তা গোষ্ঠীভেদে ভিন্ন হবে।

গ. ইসমাঈলিয়াহ শিয়াদের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ:

সময়ঘটনা
২য় হিজরিইমাম জাফর আস-সাদিক (রহ.)-এর ইন্তিকালের পর বিভাজন
২৯৭ হিজরিফাতিমি খেলাফত প্রতিষ্ঠা (উত্তর আফ্রিকা, ইজিপ্ট)
৩৬২ হিজরিকায়রোতে আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা (শুরুতে শিয়া ঘাঁটি)
৪৮৭ হিজরিসেলজুক সুন্নি শক্তি ও নুরউদ্দীন জঙ্গী কর্তৃক পতন
১২শ শতাব্দী“হাসান সাব্বাহ” কর্তৃক আলমুত দুর্গে ইসমাঈলিয়া ঘাঁটি
১৯–২০ শতাব্দীআগা খান গোষ্ঠীর পুনরুত্থান, উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ

. বর্তমানে ইসমাঈলিয়ারা কোথায় বাস করে?

দেশশাখাজনসংখ্যা (আনুমানিক)
পাকিস্তানআগা খানি (নিজারী)৫–৭ লাখ
ভারত (গুজরাট, মহারাষ্ট্র)দাওদি বোহরা১০–১৫ লাখ
ইরানবিক্ষিপ্ত, অনেক গোপনীয়হাজারখানেক
সিরিয়াদুরুজ, নুসায়রি (আলাওয়ি সংশ্লিষ্ট)লক্ষাধিক
লেবাননদুরুজ ও কিছু বোহরা-নিজারী৪–৫ লাখ
তানজানিয়া, কেনিয়া, উগান্ডাআগা খানি (নিজারী)২–৩ লাখ
কানাডা, ইউকে, ইউএসএআগা খান অনুসারী প্রবাসীবিস্তর সম্প্রদায়

ঙ. খুব পরিচিত আগা খানি ইসমাঈলিয়ারা:

বর্তমানে নিজারী ইসমাঈলিয়া শিয়াদের ইমাম হচ্ছেন  প্রিন্স কারিম আগা খান চতুর্থ। তিনি “ইমাম” হিসেবে সম্মানিত এবং তাঁর ছবি ঘরে টাঙানো, দান করা, ব্যাখ্যা চাওয়া প্রভৃতি চর্চা চালু আছে। আগা খানি সম্প্রদায় আধুনিক শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও উন্নয়নমূলক কাজে সক্রিয়। অনেক সময় তাদের ধর্মবিশ্বাস খুবই “বাতিনী” ও সাধারণ ইসলামিক শারিয়তের বাইরে চলে যায়।

সারকথা : ইসমাঈলিয়া শিয়া মতবাদ একটি অত্যন্ত পুরাতন ও দার্শনিকভাবে জটিল শাখা। বর্তমানে তারা আগা খানি, দাওদি বোহরা ও দুরুজ নামক উপশাখায় বিভক্ত। তারা আফ্রিকা, ভারত, পাকিস্তান, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপ-আমেরিকায় ছড়িয়ে আছে। তবে ধর্মীয়ভাবে তারা মূলধারার ইসলাম থেকে বহু দূরে অবস্থান করছে বলে অনেক মুসলিম চিন্তাবিদ মনে করেন।

৩। জায়েদিয়্যাহ (الزيدية) শিয়া :

জায়েদিয়্যাহ (الزيدية) শিয়া মুসলিমদের একটি প্রাচীন ও তুলনামূলকভাবে মডারেট উপধারা। জায়েদিয়্যাহ (الزيدية) শিয়াদের নাম এসেছে ইমাম যায়দ ইবনে আলি (৭৯ হি./৬৯৮ খ্রিঃ – ১২২ হি./৭৩৯ খ্রিঃ) থেকে, যিনি ইমাম জয়নুল আবেদীনের পুত্র এবং হুসাইন (রা.)-এর প্রপৌত্র। তারা অন্যান্য শিয়াদের থেকে অনেকটা আলাদা। তারা জায়েদ বিন আলি বিন হুসাইন আল জয়নাল আবেদীনের অনুসারী। তারা মনে করেন, অত্যাচারী বাদশার বিপক্ষে যুদ্ধ করা ইমামদের দায়িত্ব। ১২১ হিজরীতে হিসামের বিপক্ষে যুদ্ধে, যারা যায়েদ বিন আলির সৈন্যবাহিনীর অংশ হয়ে যুদ্ধ করে তাদেরকে জায়েদি বলা হয়। যারা তাকে ফেলে চলে যায় তাদেরকে রাফিদি বলা হয়। আর এই রাফিদিরাই আবু বকর সিদ্দিকী (রা.) এবং উমর (রা.) এর প্রতি বিদ্দেষ ছড়ায়। কিন্তু জায়েদি শিয়ারা আবু বকর (রা.) এবং উমর (রা.) কেও ভালোবাসে। শুধু মাত্র আলি (রা.) কে অন্যান্য সাহাবিদের থেকে উপরে স্থান দেয়।

ক. আকিদা ও বিশ্বাসে মধ্যপন্থা :

জায়েদিরা প্রথম চার ইমামকে মানে তারা হলেন, আলি (রা.), হাসান (রা.), হুসাইন (রা.), যায়দ ইবনে আলি। তারা বিশ্বাস করে যে, যিনি আল্লাহর জন্য জিহাদ ও বিদ্রোহের মাধ্যমে নেতৃত্ব দাবি করেন, তাকেই ইমাম হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করতে হয়। তাই ইমাম নির্ধারণে “বিদ্রোহী” মনোভাব গুরুত্বপূর্ণ। তারা অনেকাংশে সুন্নি মতবাদ বিশেষত হানাফি বা মুতাজিলা মতের কাছাকাছি। তারা সাহাবায়ে কেরামের ব্যাপারে সুন্নিদের মতোই সম্মানজনক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে। তাদের মাঝে “তাকইয়াহ”, “গায়ব ইমাম”, “বাতিনী ব্যাখ্যা” এসব বিশ্বাস নেই। তারা ফিকহে স্বতন্ত্র মাযহাব গড়ে তুলেছে: জায়েদি মাযহাব, যা ইয়েমেনে প্রচলিত।

খ. জায়েদি বনাম ইসনা আশারিয়া শিয়াদে মাঝে বিশ্বাসগত পার্থক্য:

বিষয়জায়েদি শিয়াইসনা আশারিয়া (বার ইমামি)
ইমাম সংখ্যাসীমাহীন (বিদ্রোহ ও যোগ্যতার ভিত্তিতে)১২ জন নির্দিষ্ট
ইমামত ধারাগোপন নয়, যোগ্যতা নির্ভরনির্ধারিত উত্তরাধিকার
তাকইয়াহস্বীকার করে নামৌলিক আকিদা
গায়েব ইমামঅস্বীকার করেবিশ্বাস করে (মাহদী গায়েব)
সাহাবা মতসম্মানজনক (বিশেষত আবু বকর, উমর)অধিকাংশ সাহাবাকে প্রত্যাখ্যান করে
শরিয়াহনিজস্ব মাজহাব (জায়েদি)জাফরি মাজহাব

গ. জায়েদি শিয়াদের আবাস :

বর্তমানে তাদের মূল আবাস ইয়েমেন। তাদের রাজনৈতিক দলের নাম হুথি আন্দোলন (আনসারুল্লাহ)।  বর্তমানে ইয়েমেনের উত্তরাংশে প্রভাবশালী, ইরান দ্বারা আংশিক সমর্থিত। ২০০৪ সাল থেকে হুথি আন্দোলন শুরু হয়, যারা নিজেকে “জায়েদি শিয়া” বলে দাবি করে। তারা ইয়েমেনে সরকারবিরোধী সশস্ত্র বিদ্রোহে লিপ্ত হয়ে ২০১৪ রাজধানী সানা দখল করে নেয়। ফিলস্তানী মুজাহিদ হামাসের সমর্থে দখনদার ইসরাইলিদের বিরুদ্ধে ২০২৪-২০২৫ সালে যুদ্ধ করে মুসলিম উম্মার মন জয় করে নিয়েছিল। যদিও হুতিরা নামে জায়েদি, অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, তারা ইরানি শিয়াবাদের (ইসনা আশারিয়া) দিকে দার্শনিকভাবে ধাবিত হয়েছে।

ঘ. জায়েদি শিয়াদের প্রতিষ্ঠাতা যায়দ ইবন আলির একটি সাক্ষাৎকার :

জায়েদি ফির্কা প্রতিষ্ঠিত সেই যায়দ ইবন আলির নিকট গিয়ে শিয়াদের একটি দল প্রশ্ন করে এবং তিনি তার উত্তর প্রদান করেন। এ প্রশ্ন উত্তর তার আকিদা বিশ্বাস ফুটে উঠেছে। সাক্ষাৎকারটি হলো:

শিয়াদের প্রশ্ন : মহান আল্লাহ আপনার উপর রহম করুন৷ আবু বাকর (রা.) ও উমর (রা.) এর ব্যাপারে আপন র অভিমত কী?

যায়দ ইবন আলির উত্তর : মহান আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। আমি আমার পরিবারের কাউকে তাদের থেকে নিঃসম্পর্ক হতে শুনিনি৷ আর আমিও তাদের সম্পর্কে ভাল ছাড়া বলছি না ৷

শিয়াদের প্রশ্ন : তাহলে আপনি নবি পরিবারের রক্ত প্রত্যাশা করছেন কেন?

যায়দ ইবন আলির উত্তর : তার কারণ এ বিষয়টির (ক্ষমতার) আমরা অধিকতর হকদার৷ অথচ, মানুষ সে ক্ষেত্রে আমাদের উপর প্রভাব বিস্তার করে রেখেছে এবং আমাদেরকে তা হতে সরিয়ে রেখেছে৷ তবে আমাদের মতে তারা কুফরে উপনীত হয়নি৷ ক্ষমতাপ্রাপ্ত হয়ে তারা ন্যায়বিচার করেছে এবং কুরআন ও সুন্নাহ্ অনুযায়ী আমল করেছে।

শিয়াদের প্রশ্ন : তাহলে আপনি এদের সঙ্গে যুদ্ধ করছেন কেন?

যায়দ ইবন আলির উত্তর : এরা তো ওদের মত নয়৷ এরা জনগণের উপর এবং নিজেদের উপর জুলুম করেছে। আর আমি মহান আল্লাহর কিতাব, মহান আল্লাহর নবির সুন্নাহ জীবতিকরণ  ও বিদ্আত নির্মুলকরণের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি৷ কাজেই তোমরা যদি আমার কথা মান্য কর, তবে তা তোমাদের জন্যও মঙ্গল হবে, আমার জন্যও৷ আর যদি অস্বীকার কর, তাহলে আমি তোমাদের কোন জিম্মাদার নই৷

কিন্তু তারা তার বায়আত ভঙ্গ করে তাকে ত্যাগ করে চলে যায়৷ এ কারণেই সেদিন হতে তাদেরকে রাফেযী (ত্যাগকারী) নাম দেওয়া হয়। পক্ষান্তরে, যারা যায়দ ইবন আলির অনুসরণ করেছে, তারা আখ্যায়িত হয় যায়দিয়াহ্ নামে৷ কুফাবাসীদের অধিকাংশই রাফেযী আর আজ অবধি পবিত্র মক্কাবাসীগণের বেশির ভাগ মানুষ যায়দিয়্যাহ মতবাদের অনুসারী তাদের মতাদর্শের একটি সভা আছে তা হলো, আবুবকর (রা.) ও উমর (রা.) উভয়কে সত্যপন্থী বলে বিশ্বাস করা৷

আবার একটি ভ্রান্তিও আছে। তা হলো, আবু বকর (রা.) ও উমর (রা.) এর উপর আলি (রা.) কে প্রাধান্য দেওয়া। অথচ, আলি (রা.) তাদের চেয়ে উপরে নন। এমনকি আহলুসৃ-সুন্নাহর সুপ্ৰতিষ্ঠিত অভিমত ও সাহাবিগণের থেকে বর্ণিত সঠিক বর্ণনা অনুপাতে উছমানও (রা.) তাদের উপর অপ্রগণ্য নন৷

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *