মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন
ইসলামী শরীয়তে ঈলা (الإيلاء) একটি বিশেষ পরিভাষা, যা আরবি আল্ই (أَلْي) শব্দ থেকে এসেছে, যার মূল অর্থ শপথ করা। মহাগ্রন্থ কুরআনে (یُؤۡلُوۡنَ) ইউলুনা হিসেবে এসেছে। যার অর্থ শপথ (সম্পর্ক না রাখার) করে।
শরীয়তের পরিভাষায়, ঈলা হলো এমন একটি শপথ, যেখানে কোনো স্বামী তার স্ত্রীর সঙ্গে চার মাস বা তার বেশি সময় ধরে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন না করার প্রতিজ্ঞা করে। এই ধরনের শপথের ক্ষেত্রে, স্বামী যদি চার মাসের মধ্যে তার স্ত্রীর কাছে ফিরে আসে এবং শপথ ভঙ্গ করে, তাহলে তাদের দাম্পত্য সম্পর্ক বহাল থাকবে। তবে শপথ ভঙ্গের জন্য তাকে কাফফারা (প্রায়শ্চিত্ত) দিতে হবে। যদি চার মাস পার হয়ে যায় এবং স্বামী ফিরে না আসে, তাহলে স্বামী স্ত্রীর মাঝে তালাক হয়ে যাবে। অবশ্য কোন কোন মুজতাহিদ আলেম তালাক না হওয়ার পক্ষেও মতামত দিয়েছেন।
উম্মু সালামাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর কতক স্ত্রীর সংস্পর্শে না আসার জন্য এক মাসের ঈলা করেছিলেন। উনতিরিশ দিন অতিবাহিত হওয়ার পর বিকালে অথবা সকালে তিনি (স্ত্রীদের নিকট) আসেন। বলা হলো, হে আল্লাহ্র রসূল! ঊনতিরিশ দিন তো অতিবাহিত হয়েছে? তিনি বললেন, মাস ঊনতিরিশ দিনেও হয়। সহীহুল বুখারী ১৯১০, সহিহ মুসলিম : ১০৮৫, সুনানে ইবনে মাজাহ : ২০৬১, আহমাদ : ২৬১৪৩
আয়িশা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই মর্মে শপথ করেন, একমাস যাবত তার স্ত্রীদের সংস্পর্শে যাবেন না। তিনি একাধারে উনত্রিশ দিন এভাবে কাটিয়ে দিলেন। অবশেষে তিরিশ দিনের সন্ধ্যা হলে তিনি আমার নিকট আসেন। আমি বললাম, আপনি তো শপথ করেছিলেন যে, আপনি একমাস আমাদের সংস্পর্শে আসবেন না। তিনি বলেন, মাস এভাবেও হয়। তিনি তাঁর দু’হাতের আঙ্গুলসমূহ তিনবার সম্পূর্ণ উন্মুক্ত রেখে ইশারায় বলেন, মাস এভাবেও হয়, তিনি পুনরায় (দু’বার পূর্বোক্ত নিয়মে দেখান) কিন্তু তিনি তৃতীয় বারে তিনি একটি আঙ্গুল মুষ্টিবদ্ধ রাখেন (অর্থাৎ মাস উনতিরিশ দিনেও হয়)। সহিহ বুখারি : ৫২৬৯, ৫২৯৯, ১৯১১, সহিহ মুসলিম : ১৪৫৬ সুনানে ইবনে মাজাহ : ২০৫৯, আহমাদ : ২৩৫৩০, হাদিসটি ইবনে মাজাহ থেকে নেওয়া হয়েছে।
ঈলার বিধান
স্বামী যদি তার স্ত্রীর সাথে ঈলা (অর্থাৎ, সহবাস না করার শপথ) করে, তবে স্ত্রীকে চার মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। এই সময়কালে স্ত্রী তার স্বামীর ফিরে আসার বা শপথ ভাঙার জন্য অপেক্ষা করে।
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
لِلَّذِیۡنَ یُؤۡلُوۡنَ مِنۡ نِّسَآئِہِمۡ تَرَبُّصُ اَرۡبَعَۃِ اَشۡہُرٍ ۚ فَاِنۡ فَآءُوۡ فَاِنَّ اللّٰہَ غَفُوۡرٌ رَّحِیۡمٌ
যারা তাদের স্ত্রীদের সাথে মিলিত না হওয়ার শপথ করবে তারা চার মাস অপেক্ষা করবে। অতঃপর তারা যদি ফিরিয়ে নেয়, তবে নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। সুরা বাকারা : ২২৬
এই আয়াতে মূলত ‘ঈলা’র বিধান বর্ণনা করা হয়েছে। ‘ঈলা’ হলো এমন একটি শপথ, যেখানে একজন স্বামী তার স্ত্রীর সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করবে না বলে কসম খায়। জাহিলিয়াতের যুগে এমন শপথ অনির্দিষ্টকালের জন্য করা হতো, যার ফলে স্ত্রীরা এক প্রকার অনিশ্চিত ও কষ্টকর অবস্থায় জীবনযাপন করত। ইসলাম এই প্রথার অবসান ঘটিয়ে এর একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে।
১. ঈলার সময়সীমা:
আল্লাহ তা’আলা এমন শপথের জন্য চার মাসের একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন। এর অর্থ হলো, যদি কোনো স্বামী তার স্ত্রীর সাথে মিলিত না হওয়ার শপথ করে, তবে এই শপথ সর্বোচ্চ চার মাস পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। এই সময়ের মধ্যে স্ত্রীর অধিকার খর্ব করা হয় না, বরং তাকে এই সময়ের মধ্যে ফিরে আসার বা সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়।
২. চার মাসের মধ্যে ফিরে আসা
চার মাসের সময়সীমার মধ্যে যদি স্বামী তার শপথ থেকে ফিরে আসে, অর্থাৎ স্ত্রীর সাথে সম্পর্ক স্থাপন করে, তাহলে আল্লাহ তা’আলা তাকে ক্ষমা করে দেবেন। কারণ এই ধরনের শপথ একটি অন্যায় কাজ এবং এর থেকে ফিরে আসাই সঠিক কাজ। যদি কোনো স্বামী চার মাস পূর্ণ হওয়ার আগেই তার শপথ ভঙ্গ
জকরে স্ত্রীর সাথে সম্পর্ক স্থাপন করে, তবে শপথ ভাঙার জন্য তাকে কাফফারা দিতে হবে। কসমের কাফফারা সম্পর্কে ইসলামি শরীয়তেন স্পষ্ট বিধান আছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
لَا یُؤَاخِذُکُمُ اللّٰہُ بِاللَّغۡوِ فِیۡۤ اَیۡمَانِکُمۡ وَلٰکِنۡ یُّؤَاخِذُکُمۡ بِمَا عَقَّدۡتُّمُ الۡاَیۡمَانَ ۚ فَکَفَّارَتُہٗۤ اِطۡعَامُ عَشَرَۃِ مَسٰکِیۡنَ مِنۡ اَوۡسَطِ مَا تُطۡعِمُوۡنَ اَہۡلِیۡکُمۡ اَوۡ کِسۡوَتُہُمۡ اَوۡ تَحۡرِیۡرُ رَقَبَۃٍ ؕ فَمَنۡ لَّمۡ یَجِدۡ فَصِیَامُ ثَلٰثَۃِ اَیَّامٍ ؕ ذٰلِکَ کَفَّارَۃُ اَیۡمَانِکُمۡ اِذَا حَلَفۡتُمۡ ؕ وَاحۡفَظُوۡۤا اَیۡمَانَکُمۡ ؕ کَذٰلِکَ یُبَیِّنُ اللّٰہُ لَکُمۡ اٰیٰتِہٖ لَعَلَّکُمۡ تَشۡکُرُوۡنَ
আল্লাহ তোমাদেরকে পাকড়াও করেন না তোমাদের অর্থহীন কসমের ব্যাপারে, কিন্তু যে কসম তোমরা দৃঢ়ভাবে কর সে কসমের জন্য তোমাদেরকে পাকড়াও করেন। সুতরাং এর কাফফারা হল দশ জন মিসকীনকে খাবার দান করা, মধ্যম ধরনের খাবার, যা তোমরা স্বীয় পরিবারকে খাইয়ে থাক, অথবা তাদের বস্ত্র দান, কিংবা একজন দাস-দাসী মুক্ত করা। অতঃপর যে সামর্থ্য রাখে না তবে তিন দিন সিয়াম পালন করা। এটা তোমাদের কসমের কাফ্ফারা, যদি তোমরা কসম কর, আর তোমরা তোমাদের কসম হেফাযত কর। এমনিভাবে আল্লাহ তোমাদের জন্য তাঁর আয়াতসমূহ বর্ণনা করেন যাতে তোমরা শোকর আদায় কর।
সুরা মায়েদা : ৮৯
৩. শপথের সীমা চার মাস অতিক্রম করলে
যদি চার মাস পার হয়ে যায় এবং স্বামী তার শপথ না ভাঙে, তবে স্ত্রী বিচারকের কাছে বিবাহবিচ্ছেদের জন্য আবেদন করতে পারেন। হাদিসে বর্ণিত সাহাবিদের পরামর্শ অনুযায়ী, বিচারক তখন স্বামীকে দুটি বিকল্পের মধ্যে যেকোনো একটি বেছে নিতে বলবেন:
ক. শপথ ভেঙে স্ত্রীর সঙ্গে দাম্পত্য জীবন পুনরায় শুরু করা।
খ. স্ত্রীকে তালাক দিয়ে সম্পূর্ণরূপে সম্পর্ক ছিন্ন করা।
৪. ঈলা চার মাস পূর্ণ হলে কি স্ত্রী তালাক হয়ে যাবে?
যদি চার মাস পার হয়ে যায় এবং স্বামী ফিরে না আসে বা শপথ ভঙ্গ না করে, তাহলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তালাক হয়ে যাবে কি না, এ বিষয়ে ইমামদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
ক. হানাফি, মালিকি ও হাম্বলি মাযহাব:
এই তিনটি মাযহাব অনুযায়ী, চার মাস পূর্ণ হওয়ার পর যদি স্বামী স্ত্রীর কাছে ফিরে না আসে, তাহলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি তালাকে বায়েন (অপ্রত্যাবর্তনীয় তালাক) পতিত হয়। এই তালাকের জন্য আদালতের হস্তক্ষেপের প্রয়োজন নেই।
হানাফি মাযহাব :
আল-জাসসাস তার বিখ্যাত গ্রন্থ আহকামুল কুরআন-এ বলেছেন, “যদি চার মাস অতিবাহিত হয় এবং সে ফিরে না আসে, তবে তালাক হয়ে যাবে।” আহকামুল কুরআন, প্রথম খণ্ড,পৃ. ৩৫৫-৩৫৬
মালিকি মাযহাব :
ইমাম মালিক তার আল-মুয়াত্তা-এ বলেছেন, “যদি চার মাস পূর্ণ হয় এবং স্বামী ফিরে না আসে, তবে তা তালাক।” ইমাম মালিক ইবনে আনাস, আল-মুয়াত্তা, তালাক অধ্যায় হাদিস : ১১৭২
হাম্বলি মাযহাব :
ইবনে কুদামা তার আল-মুগনি-তে উল্লেখ করেছেন, “ঈলাকারী যদি চার মাস পার হওয়ার পরও ফিরে না আসে, তাহলে তালাক পতিত হবে।” ইবনে কুদামা আল-মাকদিসি, আল-মুগনি, খণ্ড ৯, পৃ.-১৮৮-১৯১
খ. শাফেয়ি মাযহাব:
শাফেয়ি মাযহাবের মতে, চার মাস পার হওয়ার পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে তালাক হয় না। বরং স্ত্রী চাইলে বিচারকের কাছে অভিযোগ করবে এবং বিচারক তাকে ফিরে আসার নির্দেশ দেবেন। যদি সে ফিরে না আসে, তবে বিচারকই তালাক কার্যকর করবেন।
ইমাম শাফেয়ি তার কিতাবুল উম্ম-এ এই মত তুলে ধরেছেন। সেখানে তিনি বলেন, “চার মাস পূর্ণ হলে বিচারক তাকে (স্বামী) ডেকে বলবেন, হয় ফিরে আসো, অথবা তালাক দাও। যদি সে কোনোটিই না করে, তবে বিচারকই তালাক কার্যকর করবেন।” ইমাম শাফেয়ি, কিতাবুল উম্ম, পঞ্চম খণ্ড, পৃ.- ১৫২-১৫৪
এই মতভেদের মূল কারণ হলো সূরা বাকারার ২২৭ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যা, যেখানে বলা হয়েছে, “আর যদি তারা তালাকের সংকল্প করে, তবে আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।”
শাফেয়ি মাযহাবের আলেমরা মনে করেন, ‘সংকল্প’ কথাটি তালাকের জন্য ইচ্ছাকৃত পদক্ষেপের ইঙ্গিত দেয়, যা আদালতের হস্তক্ষেপের মাধ্যমে কার্যকর হয়।