লিআন এর বিধান

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

লিআন (لعان) শব্দটি আরবি ‘লা’ন’ (لعن) শব্দ থেকে এসেছে, যার অর্থ ‘আল্লাহর অভিশাপ’। ইসলামী শরিয়াহ অনুযায়ী, লি’আন হলো স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার একটি বিশেষ শপথ ও অভিশাপের প্রক্রিয়া, যা কোনো স্বামী তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে ব্যভিচারের অভিযোগ আনলে কিংবা স্ত্রীর গর্ভের সন্তানকে নিজের সন্তান হিসেবে অস্বীকার করলে অনুষ্ঠিত হয়।

ইসলামের প্রথম যুগে, যদি কোনো ব্যক্তি তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে ব্যভিচারের অভিযোগ আনত এবং তা প্রমাণের জন্য চারজন সাক্ষী উপস্থিত করতে না পারত, তাহলে তাকে ‘ক্বযফ’ (মিথ্যা অপবাদ) এর শাস্তি হিসেবে আশিটি বেত্রাঘাত করা হতো। কিন্তু এতে একটি গুরুতর সমস্যা সৃষ্টি হয়েছিল: স্বামী যদি সত্যিই তার স্ত্রীর ব্যভিচার দেখেও প্রমাণ করতে না পারত, তাহলে তাকে হয় মিথ্যা অপবাদের শাস্তি ভোগ করতে হতো, নয়তো চুপ করে থাকতে হতো, যা তার জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক ছিল। এই সমস্যার সমাধানেই আল্লাহ তাআলা নতুন বিধান নাজিল করেন।

ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, হিলাল বিন উমাইয়্যা (রাঃ) তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর নিকট শরীক বিন সাহমার সাথে যেনায় লিপ্ত হওয়ার অভিযোগ দায়ের করেন। নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, প্রমাণ পেশ করো অন্যথায় তোমার পিঠে হদ্দ কার্যকর হবে। হেলাল বিন উমাইয়্যা (রাঃ) বলেন, সেই সত্তার শপথ, যিনি আপনাকে সত্য দীনসহ পাঠিয়েছেন। আমি অবশ্যই সত্যবাদী এবং আল্লাহ্‌ আমার অভিযোগের ব্যাপারে এমন বিধান নাযিল করবেন, যা আমার পিঠকে হদ্দ থেকে রক্ষা করবে। তখন এই আয়াত নাযিল হলো-

﴾  وَ الَّذِیْنَ یَرْمُوْنَ اَزْوَاجَهُمْ وَ لَمْ  یَکُنْ لَّهُمْ شُهَدَآءُ  اِلَّاۤ  اَنْفُسُهُمْ فَشَهَادَۃُ اَحَدِهِمْ  اَرْبَعُ شَهٰدٰتٍۭ بِاللّٰهِ ۙ اِنَّہٗ  لَمِنَ الصّٰدِقِیْنَ ﴿۶﴾  وَ الْخَامِسَۃُ اَنَّ لَعْنَتَ اللّٰهِ عَلَیْهِ  اِنْ كَانَ مِنَ  الْکٰذِبِیْنَ ﴿۷﴾

আর যারা নিজদের স্ত্রীর প্রতি অপবাদ আরোপ করে, অথচ নিজেরা ছাড়া তাদের আর কোন সাক্ষী নেই, তাহলে তাদের প্রত্যেকের সাক্ষ্য হবে আল্লাহর নামে চারবার সাক্ষ্য দেবে যে, সে নিশ্চয়ই সত্যবাদীদের অন্তর্ভুক্ত। আর পঞ্চমবারে সাক্ষ্য দেবে যে, সে যদি মিথ্যাবাদী হয়, তবে নিশ্চয় তার উপর আল্লাহর লা‘নত। সূরা নূর : ৬-৭।

নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মুখ ফিরিয়ে তাদের দু’জনকে ডেকে পাঠান। তারা উপস্থিত হলে প্রথমে হেলাল বিন উমাইয়্যা (রাঃ) দাড়িয়ে শপথ করেন এবং নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, আল্লাহ অবশ্যই জানেন যে, তোমাদের মধ্যে একজন মিথ্যাবাদী। অতএব কেও তওবা করবে কি? অতঃপর স্ত্রীলোক দাঁড়িয়ে সাক্ষ্য দিলো। পঞ্চমবারে সে যখন বলতে যাচ্ছিল যে, সে (স্বামী) সত্যবাদী হলে তার নিজের উপর আল্লাহ্‌র গযব পতিত হোক, তখন লোকেরা তাকে বলল, এটি কিন্তু অবধারিতকারী বাক্য। বিন আব্বাস (রাঃ) বলেন, সেই নারী তখন আর কিছু না বলে থেমে গিয়ে পিছনে হটে গেলো। শেষে আমরা মনে করলাম সে হয়তো ফিরে যাবে (বিরত থাকবে)। কিন্তু সে বললো, আল্লাহ্‌র শপথ! আমি আমার সম্প্রদায়কে চিরদিনের জন্য কালিমালিপ্ত করতে পারি না। নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, তোমরা তার প্রতি লক্ষ্য রেখো। সে যদি সুরমাদীপ্ত চোখ, মাংসল নিতম্ব ও মাংসল পদযুগলবিশিষ্ট সন্তান প্রসব করে তবে এটি শরীক বিন সাহমার। অতঃপর সে এই ধরণের সন্তানই প্রসব করলো। তখন নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, আল্লাহ্‌র কিতাবে আগেই যদি (লিআনকারীর) বিধান না দেয়া থাকতো, তাহলে তার ও আমার মধ্যে কিছু একটা ঘটে যেতো (তাকে শাস্তি দিতাম)। সহিহ বুখারী ২৬৭১, ৪৭৪৭, ৫৩০৭,সুনানে ইবনে মাজাহ : ২০৬৭, সুনানে তিরমিযী : ৩১৭৯, সুনানে আবূ দাউদ : ২২৫৪, ২২৫৫, ২২৫৬, আহমাদ : ২৪৬৪, ইরওয়াহ : ২০৯৮, হাদিসটি ইবনে মাজাহ থেকে সংকলন করা হয়েছে।

লিআনের বিধান সম্পর্ক সুরা নুরের আয়াতগুলো হলো-

وَ الَّذِیْنَ یَرْمُوْنَ الْمُحْصَنٰتِ ثُمَّ لَمْ یَاْتُوْا بِاَرْبَعَۃِ  شُهَدَآءَ فَاجْلِدُوْهُمْ ثَمٰنِیْنَ جَلْدَۃً  وَّ لَا تَقْبَلُوْا لَهُمْ شَهَادَۃً  اَبَدًا ۚ وَ اُولٰٓئِكَ هُمُ  الْفٰسِقُوْنَ ۙ﴿۴﴾ اِلَّا الَّذِیْنَ تَابُوْا مِنْۢ بَعْدِ ذٰلِكَ وَ اَصْلَحُوْا ۚ فَاِنَّ  اللّٰهَ  غَفُوْرٌ  رَّحِیْمٌ ﴿۵﴾  وَ الَّذِیْنَ یَرْمُوْنَ اَزْوَاجَهُمْ وَ لَمْ  یَکُنْ لَّهُمْ شُهَدَآءُ  اِلَّاۤ  اَنْفُسُهُمْ فَشَهَادَۃُ اَحَدِهِمْ  اَرْبَعُ شَهٰدٰتٍۭ بِاللّٰهِ ۙ اِنَّہٗ  لَمِنَ الصّٰدِقِیْنَ ﴿۶﴾  وَ الْخَامِسَۃُ اَنَّ لَعْنَتَ اللّٰهِ عَلَیْهِ  اِنْ كَانَ مِنَ  الْکٰذِبِیْنَ ﴿۷﴾  وَ یَدْرَؤُا  عَنْهَا الْعَذَابَ اَنْ تَشْهَدَ اَرْبَعَ شَهٰدٰتٍۭ بِاللّٰهِ ۙ اِنَّہٗ لَمِنَ الْکٰذِبِیْنَ ۙ﴿۸﴾  وَ الْخَامِسَۃَ  اَنَّ غَضَبَ اللّٰهِ عَلَیْهَاۤ  اِنْ  كَانَ مِنَ  الصّٰدِقِیْنَ ﴿۹﴾

আর যারা সচ্চরিত্র নারীর প্রতি অপবাদ আরোপ করে, তারপর তারা চারজন সাক্ষী নিয়ে আসে না, তবে তাদেরকে আশিটি বেত্রাঘাত কর এবং তোমরা কখনই তাদের সাক্ষ্য গ্রহণ করো না। আর এরাই হলো ফাসিক। তবে যারা এরপরে তাওবা করে এবং নিজদের সংশোধন করে, তাহলে নিশ্চয় আল্লাহ বড়ই ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। আর যারা নিজদের স্ত্রীর প্রতি অপবাদ আরোপ করে, অথচ নিজেরা ছাড়া তাদের আর কোন সাক্ষী নেই, তাহলে তাদের প্রত্যেকের সাক্ষ্য হবে আল্লাহর নামে চারবার সাক্ষ্য দেবে যে, সে নিশ্চয়ই সত্যবাদীদের অন্তর্ভুক্ত। আর পঞ্চমবারে সাক্ষ্য দেবে যে, সে যদি মিথ্যাবাদী হয়, তবে নিশ্চয় তার উপর আল্লাহর লা‘নত। আর তারা স্ত্রীলোকটি থেকে শাস্তি রহিত করবে, যদি সে আল্লাহর নামে চারবার সাক্ষ্য দেয় যে, নিশ্চয় তার স্বামী মিথ্যাবাদীদের অন্তর্ভুক্ত। আর পঞ্চমবারে সাক্ষ্য দেবে যে, যদি তার স্বামী সত্যবাদী হয়, তবে নিশ্চয় তার উপর আল্লাহর গযব। সুরা নুর : ৪-৯

এই আয়াতগুলোতে আল্লাহ তাআলা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার এই ধরনের সমস্যার সমাধানের জন্য লি’আন (لعان)-এর বিধান প্রবর্তন করেন। লি’আনের মাধ্যমে স্বামী চারবার আল্লাহর নামে শপথ করে তার অভিযোগের সত্যতা প্রমাণ করবে এবং পঞ্চমবারে মিথ্যা হলে তার ওপর আল্লাহর অভিশাপ কামনা করবে। একইভাবে, স্ত্রীও যদি নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে চায়, তাহলে তাকেও চারবার শপথ করে স্বামীর অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণ করতে হবে এবং পঞ্চমবারে সত্য হলে তার ওপর আল্লাহর ক্রোধ কামনা করবে। এভাবে, আল্লাহ তাআলা এই আয়াতগুলোর মাধ্যমে এমন একটি সমস্যার সমাধান দিয়েছেন, যা সমাজ ও পরিবারের মধ্যে সংঘাত সৃষ্টি করত। একই সাথে, এটি মিথ্যা অপবাদ থেকে নারীকে সুরক্ষা দিয়েছে এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করেছে।

কুরআন সুন্নাহর আলোকে লিআন (لعان) এর বিধান

লি’আন একটি গুরুতর বিষয়, যা সরাসরি দাম্পত্য সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলে। কুরআন ও হাদিসের আলোকে মুজতাহীদ আলেমগণ নিআনের বিস্তরিত ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন। তাদের মতে নিআন সাধারণত দুটি কারণে সংঘটিত হয়:

১. স্বামী যদি স্ত্রীর বিরুদ্ধে ব্যভিচারের অভিযোগ আনে।

২. স্বামী যদি স্ত্রীর গর্ভের সন্তানকে নিজের সন্তান হিসেবে অস্বীকার করে।

এই ধরনের পরিস্থিতিতে, যদি স্বামীর কাছে তার অভিযোগ প্রমাণের জন্য চারজন সাক্ষী না থাকে, তবে স্বামী-স্ত্রী দু’জনকেই বিচারকের সামনে লি’আন করতে হয়। লি’আনের প্রক্রিয়াটি নিম্নরূপ:

ক. স্বামীর শপথ :

স্ত্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগকারী স্বামী চারবার আল্লাহর নামে শপথ মাধ্যমে দাবি করবে যে তিনি যে অভিযোন এনেছেন তা সত্য। এ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন-

وَ الَّذِیْنَ یَرْمُوْنَ اَزْوَاجَهُمْ وَ لَمْ  یَکُنْ لَّهُمْ شُهَدَآءُ  اِلَّاۤ  اَنْفُسُهُمْ فَشَهَادَۃُ اَحَدِهِمْ  اَرْبَعُ شَهٰدٰتٍۭ بِاللّٰهِ ۙ اِنَّہٗ  لَمِنَ الصّٰدِقِیْنَ ﴿۶﴾  وَ الْخَامِسَۃُ اَنَّ لَعْنَتَ اللّٰهِ عَلَیْهِ  اِنْ كَانَ مِنَ  الْکٰذِبِیْنَ ﴿۷﴾

আর যারা নিজদের স্ত্রীর প্রতি অপবাদ আরোপ করে, অথচ নিজেরা ছাড়া তাদের আর কোন সাক্ষী নেই, তাহলে তাদের প্রত্যেকের সাক্ষ্য হবে আল্লাহর নামে চারবার সাক্ষ্য দেবে যে, সে নিশ্চয়ই সত্যবাদীদের অন্তর্ভুক্ত। আর পঞ্চম বারে বলবে যে, সে যদি মিথ্যাবাদী হয় তাহলে তার উপর নেমে আসবে আল্লাহর লা’নত। সুরা নুর : ৬-৭

খ. স্ত্রীর শপথ:

স্বামীর শপথ শেষ হওয়ার পর স্ত্রী চারবার আল্লাহর নামে শপথ করে বলবে যে স্বামী তার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ এনেসে তা মিথ্যা। এ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন-

وَ یَدْرَؤُا  عَنْهَا الْعَذَابَ اَنْ تَشْهَدَ اَرْبَعَ شَهٰدٰتٍۭ بِاللّٰهِ ۙ اِنَّہٗ لَمِنَ الْکٰذِبِیْنَ ۙ﴿۸﴾ وَ الْخَامِسَۃَ  اَنَّ غَضَبَ اللّٰهِ عَلَیْهَاۤ  اِنْ  كَانَ مِنَ  الصّٰدِقِیْنَ ﴿۹﴾

আর তারা স্ত্রীলোকটি থেকে শাস্তি রহিত করবে, যদি সে আল্লাহর নামে চারবার সাক্ষ্য দেয় যে, নিশ্চয় তার স্বামী মিথ্যাবাদীদের অন্তর্ভুক্ত। আর পঞ্চমবারে সাক্ষ্য দেবে যে, যদি তার স্বামী সত্যবাদী হয়, তবে নিশ্চয় তার উপর আল্লাহর গযব। সুরা নুর : ৮-৯

এই আয়াতে আল্লাহর গজবের কথা উল্লেখ করার মাধ্যমে বোঝা যায় যে, এখানে শুধু একটি অভিযোগের সমাধান করা হচ্ছে না, বরং এটি একটি চূড়ান্ত পদক্ষেপ, যা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার সম্পর্কের পবিত্রতা ও বিশ্বাসকে চিরতরে ভেঙে দেয়। এই শপথের পর, স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক চূড়ান্তভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

লি’আনের ফলাফল

লি’আনের পর নিম্নলিখিত ফলাফলগুলো কার্যকর হয়:

১. চিরস্থায়ী বিচ্ছেদ :

লি’আনের মাধ্যমে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে চিরস্থায়ী বিচ্ছেদ ঘটে। এরপর তারা আর কোনো দিন বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারবে না। এটি সাধারণ তালাকের মতো নয়, যেখানে পুনরায় বিবাহ সম্ভব।

ইবনে কুদামা আল-মাকদিসি বলেন-

লি’আনের মাধ্যমে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে যে চিরস্থায়ী বিচ্ছেদ ঘটে, এ বিষয়ে প্রায় সব ফিকহ কিতাবই একমত। এই বিচ্ছেদ এমন যে, তারা আর কোনো দিন পুনরায় বিবাহ করতে পারবে না, এমনকি যদি তারা তওবাও করে। এটি ইমাম শাফেঈ, ইমাম মালিক এবং অন্যান্য অধিকাংশ ফিকহবিদের মত। কিতাব: আল-মুগনি, নবম খণ্ড, পৃ.-৯৮

২. ব্যভিচারের অভিযোগ বাতিল:

স্বামীর করা ব্যভিচারের অভিযোগটি বাতিল হয়ে যায় এবং স্ত্রীর ওপর কোনো শরঈ শাস্তি (যেমন রজম) কার্যকর হয় না। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَیَدۡرَؤُا عَنۡہَا الۡعَذَابَ اَنۡ تَشۡہَدَ اَرۡبَعَ شَہٰدٰتٍۭ بِاللّٰہِ ۙ  اِنَّہٗ لَمِنَ الۡکٰذِبِیۡنَ ۙ

আর তারা স্ত্রীলোকটি থেকে শাস্তি রহিত করবে, যদি সে আল্লাহর নামে চারবার সাক্ষ্য দেয় যে, নিশ্চয় তার স্বামী মিথ্যাবাদীদের অন্তর্ভুক্ত। সুরা নুর : ৮

আলাউদ্দিন আল-কাসানী বলেন-

লি’আনের পর স্ত্রীর বিরুদ্ধে স্বামীর ব্যভিচারের অভিযোগটি বাতিল হয়ে যায় এবং স্ত্রীর ওপর কোনো শরঈ শাস্তি (যেমন রজম বা বেত্রাঘাত) কার্যকর হয় না। এটি তার শপথের ফলেই ঘটে। কিতাব: বাদাই’উস সানাই, পঞ্চম খণ্ড, পৃ.-৩০৯

৩. সন্তানের বংশ বাতিল :

যদি লি’আন সন্তানের বংশ নিয়ে হয়, তবে সেই সন্তানকে আর স্বামীর বংশের বলে গণ্য করা হয় না। সন্তানের পরিচয়ের ক্ষেত্রে মায়ের দিকটিই প্রাধান্য পায়।

ইবনু উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি তার স্ত্রীকে লিআন করায় এবং তার গর্ভের সন্তানকে অস্বীকার করে। রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাদের দু’জনের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে দেন এবং সন্তানটি উক্ত নারীর সাথে যুক্ত করেন। সহিহ বুখারী ৪৭৪৮, ৫৩০৬, ৫৩১১, ৫৩১২, ৫৩১৩, ৫৩১৪, ৫৩১৫, ৫৩৪৯, ৬৭৪৮, সহিহ মুসলিম ১৪৯৩, ১৪৯৪, সুনানে ইবনে মাজাহ : ২০৬৯ সুনানে তিরমিযী : ১২০৩, সুনানে নাসায়ী : ৩৪৭৩, ৩৪৭৪, ৩৪৭৫, ৩৪৭৬, ৩৪৭৭, সুনানে আবূ দাউদ : ২২৫৮, ২২৫৯, হাদিসটি ইবনে মাজাহ থেকে সংকলন করা হয়েছে।

সাহল ইবনু সা’দ আস্ সা’ইদী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, উওয়াইমির আল আজলানী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে বললেন, হে আল্লাহর রসূল! কোনো ব্যক্তি যদি স্বীয় স্ত্রীর সাথে অপর পুরুষকে দেখতে পায় এবং সে যদি তাকে হত্যা করে বসে, তবে কি নিহতের আত্মীয়স্বজন তাকে হত্যা করবে? তবে সে (স্বামী) কি করবে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমার এবং তোমার স্ত্রীর ব্যাপারে ওয়াহী নাযিল হয়েছে, ’যাও তোমার স্ত্রীকে নিয়ে আসো’। বর্ণনাকারী সাহল বলেন, অতঃপর তারা উভয়ে মসজিদে এসে লি’আন করল, আমিও অন্যান্য লোকের সাথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকটে উপস্থিত থেকে ঘটনা প্রত্যক্ষ করছিলাম।

অতঃপর উভয়ে যখন লি’আন শেষ করল, তখন ’উওয়াইমির বলল, আমি যদি তাকে আমার বিবাহের বন্ধনে রাখি, তাহলে আমি তার ওপর মিথ্যারোপ করেছি, এটা বলে সে তাকে তিন তালাক প্রদান করল। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যদি স্ত্রী লোকটি কালো রংয়ের এবং কালো চক্ষুবিশিষ্ট, বড় বড় নিতম্ব, মোটা মোটা পা-বিশিষ্ট সন্তান প্রসব করে, তবে মনে করতে হবে ’উওয়াইমির তার সম্পর্কে সত্য বলেছেন। আর যদি রক্তিম বর্ণের ক্ষুদ্রাকৃতির কীটের ন্যায় সন্তান প্রসব করে, তবে মনে করব ’উওয়ামির মিথ্যা অপবাদ দিয়েছে। বর্ণনাকারী বলেন, অতঃপর স্ত্রীলোক এমন বর্ণের সন্তান প্রসব করল যেরূপ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বর্ণনা দিয়েছিলেন- সে সেরূপ সন্তানই প্রসব করল।’ এর দ্বারা ’উয়াইমির-এর দাবির সত্যতার ধারণা জন্মে, অতঃপর সন্তানটিকে (পিতার পরিবর্তে) মায়ের পরিচয়ে ডাকা হতো। সহিহ বুখারি : ৪২৩, ৪৭৪৫, সহিহ মুসলিম : ১৪৯২, সুনানে নাসায়ী : ৩৪০২, দারিমী : ২২৭৫।

আবু ইসহাক আশ-শিরাজি বলেছেন-

যদি লি’আন সন্তানের বংশ নিয়ে হয়, তাহলে সেই সন্তানকে আর স্বামীর বংশের বলে গণ্য করা হয় না। এর ফলে সন্তানের বংশপরিচয় তার মায়ের দিক থেকেই নির্ধারিত হয়। আল-মুহাজ্জাব, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃ.-১৫৫

৪. লি‘আনকারিণীর মোহর ফেরত দিতে হবে না

সা’ঈদ ইবনু যুবায়র (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ইবনু উমারকে জিজ্ঞেস করলাম, এক লোক তার স্ত্রীকে অপবাদ দিল (বিধান কী?), তিনি বললেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বনূ ’আজলানের স্বামী-স্ত্রীর দু’জনকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিলেন এবং তিনি বলেছিলেন, আল্লাহ তা’আলা জানেন তোমাদের একজন অবশ্যই মিথ্যাচারী। কাজেই তোমাদের কেউ তওবা করতে রাযী আছ কি? তারা দু’জনেই অস্বীকার করল। তিনি পুনরায় বললেনঃ আল্লাহ তা’আলা অবহিত আছেন তোমাদের একজন মিথ্যাচারী, সুতরাং কেউ তওবা করতে প্রস্তুত আছ কি? তারা আবারও অস্বীকার করল। তিনি পুনরায় বললেনঃ আল্লাহ তা’আলা অবহিত আছেন তোমাদের একজন মিথ্যাচারী সুতরাং কেউ তওবা করতে প্রস্তুত আছ কি? তারা আবারও অস্বীকার করল।

এরপর তিনি তাদেরকে পৃথক করে দেন। আইয়ুব বলেন, আমাকে আমর ইবনু দ্বীনার (রহ.) বললেন, এ হাদীসে আরও কিছু কথা আছে, তোমাকে তা বর্ণনা করতে দেখছি না কেন? তিনি বলেন, লোকটি বলল, আমার (দেয়া) মালের কী হবে? তাকে বলা হল, তোমার মাল ফিরে পাবে না। যদি তুমি সত্যবাদী হও, (তবুও পাবে না)। (কেননা) তুমি তার সঙ্গে সহবাস করেছ। আর যদি তুমি মিথ্যাচারী হও, তবে তা পাওয়া তো বহু দূরের ব্যাপার। সহিহ বুখারি : ৫৩১১, ৫৩১২, ৫৩৪৯, ৫৩৫০, সহহি মুসলিম : ১৪৯৩, মিশকাত : ৩৩০৬, সুনানে আবূ দাঊদ : ২২৫৭, সুনানে  নাসায়ী : ৩৪৭৬, আহমাদ : ৪৫৮৭, সহীহ ইবনু হিব্বান : ৪২৮৭।

৫. স্ত্রীক অন্য পুরুষের সাথে দেখলে হত্যা করা যাবে না

মুগীরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, সা’দ ইবনু ’উবাদাহ (রাঃ) বললেন, আমি আমার স্ত্রীর সঙ্গে অন্য কোন পুরুষকে যদি দেখি, তাকে সরাসরি তরবারি দিয়ে হত্যা করব। এ কথা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে পৌঁছলে তিনি বললেন, তোমরা কি সাদের আত্মমর্যাদাবোধ দেখে বিস্মিত হচ্ছ? আল্লাহর শপথ! আমি তার চেয়েও অধিক আত্মমর্যাদাসম্পন্ন। আর আল্লাহ্ আমার চেয়েও অধিক আত্মমর্যাদাসম্পন্ন। আল্লাহ্ আত্মমর্যাদাবোধ সম্পন্ন হবার কারণে প্রকাশ্য ও গোপনীয় (যাবতীয়) অশ্লীলতাকে হারাম করে দিয়েছেন। অক্ষমতা প্রকাশকে আল্লাহর চেয়ে অধিক পছন্দ করেন এমন কেউই নেই। আর এজন্য তিনি ভীতি প্রদর্শনকারী ও সুসংবাদদাতাদেরকে পাঠিয়েছেন। আত্মপ্রশংসা আল্লাহর চেয়ে অধিক কারো কাছে প্রিয় নয়। তাই তিনি জান্নাতের ওয়াদা দিয়েছেন। সহিহ বুখারি : ৬৮৪৬, ৭৪১৬, সহিহ  মুসলিম : ১৪৯৯, মিশকাত : ৩৩০৯, আহমাদ : ১৮১৬৮, সহীহ ইবনু হিব্বান : ৫৭৭৩

৬. সন্দেহের কারনে সন্তানের পিতৃপরিচয় অস্বীকরা করা যাবে না

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, এক বেদুঈন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে বলল, আমার স্ত্রী একটি কালো সন্তান জন্ম দিয়েছে। আর আমি তাকে (আমার সন্তান হিসাবে) অস্বীকার করছি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমার কি উট আছে? সে বলল, হ্যাঁ আছে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন,সেগুলোর কী রঙ? সে বলল, লাল। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, সেগুলোর মাঝে সাদা কালো মিশ্রিত রঙের কোন উট আছে কি? সে বলল, হ্যাঁ, সাদা কালো মোশানো রঙের অনেকগুলো আছে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন এ রং কিভাবে এল বলে তুমি মনে কর? সে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! বংশ সূত্রের প্রভাবে এমন হয়েছে। তিনি বললেনঃ সম্ভবত তোমার সন্তানও বংশ সূত্রের প্রভাবে (পূর্বপুরুষের কেউ কালো ছিল বলে) এমন হয়েছে। এবং তিনি এ সন্তানটিকে অস্বীকার করার অনুমতি লোকটিকে দিলেন না। সহিহ বুখারি : ৫৩০৫, ৭৩১৪, মুসলিম ১৫০০, আবূ দাঊদ ২২৬২, নাসায়ী ৩৪৭৮, তিরমিযী ২১২৮, ইবনু মাজাহ ২০০২, আহমাদ ৭২৬৪

লি’আনের বিধানটি ইসলামে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি মিথ্যা অভিযোগের হাত থেকে স্ত্রীকে সুরক্ষা দেয় এবং একই সাথে সন্তানের বংশপরিচয় নিয়ে সৃষ্ট জটিলতা নিরসন করে। এটি একটি গুরুতর পদক্ষেপ, যা কেবল চরম পরিস্থিতিতেই শরঈ বিচারকের তত্ত্বাবধানে নেওয়া হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *