শিয়াদের ভ্রান্ত আকিদাসমূহ-৫ : মুতআ বিয়ে বা চুক্তি ভিত্তিক সাময়িক বিয়ে সম্পর্কে শিয়াদের আকিদা।


মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন
মুত‘আ বিয়ে বা চুক্তি ভিত্তিক সাময়িক বিয়ে জায়েয মনে করা। শিয়াদের নিজস্ব প্রসিদ্ধ কিতাবসমূহ থেকে মুতআ (مُتْعَة) বা সাময়িক বিবাহ সম্পর্কে কিছু দলিলসহ উদ্ধৃতি পেশ করা হলো।

ক. ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইয়াকুব আল-কুলায়নী তার গ্রন্থে উল্লেখ করেন-
عَنْ أَبِي عَبْدِ اللّٰهِ (عَلَيْهِ السَّلَامُ) قَالَ: لَيْسَ مِنَّا مَنْ لَمْ يُؤْمِنْ بِرَجْعَتِنَا، وَيَسْتَحِلُّ مُتْعَتَنَا، وَيُؤْمِنُ بِوَلَايَتِنَا.
ইমাম আবু আব্দুল্লাহ (আ.) বলেন, যে ব্যক্তি আমাদের রজআ (পুনরাগমন) এ বিশ্বাস রাখে না, মুতআকে হালাল মনে করে না এবং আমাদের ওলায়াত (নেতৃত্ব) এ ঈমান আনে না, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়। ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইয়াকুব আল-কুলায়নী, উসুলুল কাফী, পঞ্চম খণ্ড, পৃ.-৪৫২
খ. মুহাম্মদ ইবন মাসউদ আল-আইয়াশী তার গ্রন্থে উল্লেখ করেন-
قَالَ أَبُو جَعْفَرٍ (ع): الْمُتْعَةُ نَزَلَ بِهَا الْقُرْآنُ وَجَرَى بِهَا السُّنَّةُ مِنْ رَسُولِ اللّٰهِ (ص)، وَهِيَ حَلَالٌ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ.
ইমাম আবু জাফর (আ.) বলেন: মুতআ সম্পর্কে কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে এবং রাসূল (সা.) এর সুন্নাহর মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে। এটি কিয়ামত পর্যন্ত হালাল। মুহাম্মদ ইবন মাসউদ আল-আইয়াশী. তাফসীর আল-আইয়াশী, প্রথম খণ্ড, পৃ.-৪৬৮, সূরা আন-নিসা ২৪ নম্বর আয়াতের তাফসীর

গ. তাহযীবুল আহকাম গ্রন্থে আবূ জাফর মুহাম্মদ ইবন হাসান আত-তুসী উল্লেখ করেন। ইমাম আবু আব্দুল্লাহ (আ.) বলেন-
إِنَّ الْمُتْعَةَ دِينِي وَدِينُ آبَائِي، وَمَنْ عَمِلَ بِهَا عَمِلَ بِدِينِنَا، وَمَنْ أَنْكَرَهَا أَنْكَرَ دِينَنَا، وَاعْتَقَدَ بِغَيْرِ دِينِنَا.
নিশ্চয় মুতআ আমার দ্বীন এবং আমার পিতৃপুরুষদের দ্বীন। যে মুতআ অনুযায়ী আমল করে সে আমাদের দ্বীন অনুযায়ী আমল করে, আর যে মুতআ অস্বীকার করে, সে আমাদের দ্বীন অস্বীকার করে এবং ভিন্ন দ্বীনে বিশ্বাস করে। আবূ জাফর মুহাম্মদ ইবন হাসান আত-তুসী, আত-তাহযীব, সপ্তম খণ্ড, পৃষ্ঠা-২৫১, হাদিস : ১০৫৩

ঘ. তাহযীবুল আহকাম গ্রন্থে আবূ জাফর মুহাম্মদ ইবন হাসান আত-তুসী উল্লেখ করেন। ইমাম আবু আব্দুল্লাহ (আ.) বলেন-
قَالَ أَبُو عَبْدِ اللّٰهِ (ع): مَا اسْتُحِلَّتِ الْمُتْعَةُ إِلَّا لِيَعْلَمَ مَنْ يَتَّقِي اللّٰهَ مِمَّنْ يَعْصِيهِ.
মুতআ হালাল করা হয়েছে এজন্যই, যাতে বোঝা যায় কে আল্লাহকে ভয় করে এবং কে তাঁকে অমান্য করে। আবূ জাফর মুহাম্মদ ইবন হাসান আত-তুসী, আল-ইস্তিবসার, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা-১৪২

ঙ. আবু জাফর মুহাম্মাদ ইবন আলি ইবন হুসাইন ইবন বাবুয়াইহ আল-কুম্মী যিনি শেখ সাদুক নামে পরিচিত তিনি তার গ্রন্থে লিখেন। ইমাম জাফর সাদিক (আ.) বলেন-
مَا مِنْ رَجُلٍ تَمَتَّعَ ثُمَّ اغْتَسَلَ إِلَّا خَلَقَ اللّٰهُ مِنْ ذَلِكَ الْمَاءِ سَبْعِينَ مَلَكاً يَسْتَغْفِرُونَ لَهُ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ.
কোন ব্যক্তি মুতআ করলে এবং তারপর গোসল করলে, আল্লাহ তার বীর্য থেকে ৭০ জন ফেরেশতা সৃষ্টি করেন, যারা কিয়ামত পর্যন্ত তার জন্য মাগফিরাত চায়। শেখ সাদূক, মান লা ইয়াহযুরুহুল ফকিহ, তৃতীয় খণ্ড, পৃ.- ৪৬৩

চ. ইমাম আবু আব্দুল্লাহ (আ.) বলেন-
عَنْ أَبِي عَبْدِ اللّٰهِ (عَلَيْهِ السَّلَامُ) قَالَ: أُحِبُّ لِلرَّجُلِ أَنْ لَا يَخْرُجَ مِنَ الدُّنْيَا حَتَّى يَتَزَوَّجَ الْمُتْعَةَ، وَإِنْ مَرَّةً.
আমি পছন্দ করি যেন কোনো পুরুষ দুনিয়া থেকে যাওয়ার আগেই অন্তত একবার মুতআ করে নেয়। ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইয়াকুব আল-কুলায়নী, উসুলুল কাফী, পঞ্চম খণ্ড, পৃ.-৪৫৮

ছ. শিয়াদের অষ্টম ইমাম আলি ইবন মূসা আল-রিদা থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন-
وَالْمُتْعَةُ سُنَّةٌ نَزَلَ بِهَا الْقُرْآنُ، وَجَرَى بِهَا الْعَمَلُ مِنْ قِبَلِ رَسُولِ اللّٰهِ (ص)، وَهِيَ حَلَالٌ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ.
মুতআ একটি সুন্নাত, যা কুরআনের দ্বারা এসেছে এবং রাসূলুল্লাহ (সা.) এর আমল দ্বারা তা কার্যকর হয়েছে। এটি কিয়ামত পর্যন্ত হালাল। ইমাম আলি ইবন মূসা আল-রিদা (৮ম ইমাম), ফিকহুর রিদা, পৃ-৩৫৭

জ. আবু জাফর মুহাম্মাদ ইবন আলি ইবন হুসাইন ইবন বাবুয়াইহ আল-কুম্মী যিনি শেখ সাদুক নামে পরিচিত তিনি তার গ্রন্থে লিখেন। ইমাম আবু আব্দুল্লাহ (আ.) বলেন-
قَالَ أَبُو عَبْدِ اللّٰهِ (ع): إِنَّ النَّاصِبَ لَوْ مَتَّعَ ثُمَّ اغْتَسَلَ، خَلَقَ اللّٰهُ مِنْ ذَلِكَ الْمَاءِ سَبْعِينَ مَلَكاً يَسْتَغْفِرُونَ لَهُ.
যদি কোনো নাসিবী (আহলুল বায়তের শত্রু) মুতআ করে এবং তারপর গোসল করে, আল্লাহ তার বীর্য থেকে ৭০ জন ফেরেশতা সৃষ্টি করেন, যারা তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে। শেখ সাদূক, আল-ইলাল, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃ.-৫৩৫

ঝ. আল-কুলাইনী তার ‘আল-কাফী’ নামক গ্রন্থে উল্লেখ করেন
আবূ আবদিল্লাহ (আ.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, জনৈক মহিলা উমরের নিকট আগমন করল, অতঃপর বলল, আমি ব্যভিচার করেছি, সুতরাং আপনি আমাকে পবিত্র করুন। অতঃপর তিনি (উমর) তাকে পাথর মেরে হত্যার নির্দেশ দিলেন। অতঃপর আমীরুল মুমিনীন (আ.) কে এই ব্যাপারে সংবাদ দেয়া হলে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: তুমি কীভাবে ব্যভিচার (জিনা) করেছ? তখন সে বলল: আমি মরুভূমিতে পথ অতিক্রম করেছি, অতঃপর আমাকে প্রচণ্ড পানির তৃষ্ণায় পেল, আমি এক বেদুইনের নিকট পানি প্রার্থনা করলাম, কিন্তু সে আমাকে পানি পান করাতে অস্বীকার করল যতক্ষণ না আমি তাকে আমার উপর ক্ষমতা প্রয়োগের সুযোগ দেই। অতঃপর পিপাসা যখন আমাকে ক্লান্ত করে ফেলল এবং আমি আমার জীবন নিয়ে আশঙ্কাবোধ করলাম, তখন সে আমাকে পানি পান করাল; আর আমিও আমার নিজের উপর তাকে ক্ষমতাবান করে দিলাম। এ কথা শুনে আমীরুল মুমিনীন (আ.) বললেন: কাবার মালিকের শপথ, এটা তো বিবাহ।” ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইয়াকুব আল-কুলায়নী, ফুরুউল কাফী, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃ.-১৯৮
উপর শিয়াদের গ্রন্থ থেকে মাত্র কয়েকটি দলিল পেশ করেছি যা থেকে বুঝা যায় শিয়াদের নিকট মু্তআ বিবাহ করা শুধু জায়েয নয় বরং নেকির কাজ। তাদের রচিত গ্রন্থসমূহে এমন শত শত দলিল আছে। তারচেয়েও বড় কথা কোন দলিল প্রমাণের দরকার নাই কারণ তারা এ কথা স্বীকার করে ও তাদের আমলও চলমান।

মুতআ বিবাহ ইসলামি শরীয়তের হারাম :
শিয়ারা ধ্বংস হোক কেননা, তারা রাসূল ﷺ ও আমীরুল মুমিনীন আলি ইবন আবি তালিব (রা.) সাথে এই ধরনের মিথ্যাসমূহের সম্পর্কযুক্ত করেছে। কোন মুসলিম এমন দাবি করতে পারে না যা ঐসব শিয়া নামের খবিসগণ যা দাবি করে থাকে। আল্লাহ তায়ালার বলেন০
﴿ قَدۡ أَفۡلَحَ ٱلۡمُؤۡمِنُونَ ١ ٱلَّذِينَ هُمۡ فِي صَلَاتِهِمۡ خَٰشِعُونَ ٢ وَٱلَّذِينَ هُمۡ عَنِ ٱللَّغۡوِ مُعۡرِضُونَ ٣ وَٱلَّذِينَ هُمۡ لِلزَّكَوٰةِ فَٰعِلُونَ ٤ وَٱلَّذِينَ هُمۡ لِفُرُوجِهِمۡ حَٰفِظُونَ ٥ إِلَّا عَلَىٰٓ أَزۡوَٰجِهِمۡ أَوۡ مَا مَلَكَتۡ أَيۡمَٰنُهُمۡ فَإِنَّهُمۡ غَيۡرُ مَلُومِينَ ٦ فَمَنِ ٱبۡتَغَىٰ وَرَآءَ ذَٰلِكَ فَأُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلۡعَادُونَ ٧ ﴾
অর্থ : “অবশ্যই সফলকাম হয়েছে মুমিনগণ, যারা বিনয়-নম্র নিজেদের সালাতে, যারা ক্রিয়াকলাপ থেকে বিরত থাকে, যারা যাকাত দানে সক্রিয়, যারা নিজেদের যৌন অঙ্গকে সংযত রাখে নিজেদের স্ত্রী অথবা অধিকারভূক্ত দাসীগণ ব্যতীত, এতে তারা নিন্দনীয় হবে না, আর কেউ এদের ছাড়া অন্যকে কামনা করলে তার হবে সীমালঙ্ঘনকারী। সূরা আল-মুমিনুন ১-৭
সুতরাং এই আয়াতসমূহ দ্বারা প্রমাণিত হল যে, পুরুষ ব্যক্তির জন্য তার স্ত্রী ও অধিকারভূক্ত দাসীগণ ব্যতীত অন্য কোন নারী বৈধ নয়। অতএব এর বাইরে কোন নারীকে ব্যবহারের পথ খুঁজলে, সে হবে সীমালঙ্ঘনকারীদের অন্তর্ভুক্ত। অনুরূপভাবে আল্লাহ তায়ালার বাণী:
فَإِنۡ خِفۡتُمۡ أَلَّا تَعۡدِلُواْ فَوَٰحِدَةً أَوۡ مَا مَلَكَتۡ أَيۡمَٰنُكُمۡ
অর্থ : আর যদি আশঙ্কা কর যে, সুবিচার করতে পারবে না, তবে একজনকে অথবা তোমাদের অধিকারভূক্ত দাসীকে। সূরা আন-নিসা : ৩
সুতরাং যে ব্যক্তি অন্যায়ের আশঙ্কা করবে, সে যেন একজন স্ত্রী অথবা তার অধিকারভূক্ত দাসীকে যথেষ্ট মনে করে। সুতরাং কোথায় মুত‘আ বিয়ে? অতএব যদি তা হালাল হত, তবে তিনি (আল্লাহ) তা উল্লেখ করতেন। কারণ, প্রয়োজনের সময় আলোচনা বিলম্বিত করা বৈধ নয়। অনুরূপভাবে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَمَنۡ لَّمۡ یَسۡتَطِعۡ مِنۡکُمۡ طَوۡلًا اَنۡ یَّنۡکِحَ الۡمُحۡصَنٰتِ الۡمُؤۡمِنٰتِ فَمِنۡ مَّا مَلَکَتۡ اَیۡمَانُکُمۡ مِّنۡ فَتَیٰتِکُمُ الۡمُؤۡمِنٰتِ ؕ  وَاللّٰہُ اَعۡلَمُ بِاِیۡمَانِکُمۡ ؕ  بَعۡضُکُمۡ مِّنۡۢ بَعۡضٍ ۚ  فَانۡکِحُوۡہُنَّ بِاِذۡنِ اَہۡلِہِنَّ وَاٰتُوۡہُنَّ اُجُوۡرَہُنَّ بِالۡمَعۡرُوۡفِ مُحۡصَنٰتٍ غَیۡرَ مُسٰفِحٰتٍ وَّلَا مُتَّخِذٰتِ اَخۡدَانٍ ۚ  فَاِذَاۤ اُحۡصِنَّ فَاِنۡ اَتَیۡنَ بِفَاحِشَۃٍ فَعَلَیۡہِنَّ نِصۡفُ مَا عَلَی الۡمُحۡصَنٰتِ مِنَ الۡعَذَابِ ؕ  ذٰلِکَ لِمَنۡ خَشِیَ الۡعَنَتَ مِنۡکُمۡ ؕ  وَاَنۡ تَصۡبِرُوۡا خَیۡرٌ لَّکُمۡ ؕ  وَاللّٰہُ غَفُوۡرٌ رَّحِیۡمٌ 
আর তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি স্বাধীন-মুমিন নারীদেরকে বিবাহ করার সামর্থ্য রাখে না, সে (বিবাহ করবে) তোমাদের মুমিন যুবতীদের মধ্য থেকে, তোমাদের হাত যাদের মালিক হয়েছে তাদের কাউকে। আর আল্লাহ তোমাদের ঈমান সম্পর্কে অধিক জ্ঞাত। তোমরা একে অন্যের থেকে (এসেছ)। সুতরাং তোমরা তাদেরকে তাদের মালিকদের অনুমতিক্রমে বিবাহ কর এবং ন্যায়সঙ্গতভাবে তাদেরকে তাদের মোহর দিয়ে দাও এমতাবস্থায় যে, তারা হবে সতী-সাধ্বী, ব্যভিচারিণী কিংবা গোপন যৌনসঙ্গী গ্রহণকারিণী নয়। অতঃপর যখন তারা বিবাহিত হবে তখন যদি ব্যভিচারে লিপ্ত হয় তাহলে তাদের উপর স্বাধীন নারীর অর্ধেক আজাব হবে। এটা তাদের জন্য, তোমাদের মধ্যে যারা ব্যভিচারের ভয় করে এবং ধৈর্যধারণ করা তোমাদের জন্য উত্তম। আর আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। সূরা নিসা : ২৫
সুতরাং যদি মুত‘আ বিয়ে হালাল হত, তবে তিনি (আল্লাহ) তা উল্লেখ করতেন। বিশেষ করে তিনি উল্লেখ করেছেন ﴿ مَنۡ خَشِيَ ٱلۡعَنَتَ ﴾ অর্থাৎ- ‘যারা ব্যভিচারকে ভয় করে’। আর (যদি মুতআ বিয়ে হালাল হত) তিনি তা উল্লেখ করতেন না। সুতরাং এটাই প্রমাণ হয় যে, নিঃসন্দেহ তা (মুত‘আ বিয়ে) হারাম।
অনুরূপভাবে আল্লাহ তায়ালার বাণী:
وَلۡيَسۡتَعۡفِفِ ٱلَّذِينَ لَا يَجِدُونَ نِكَاحًا حَتَّىٰ يُغۡنِيَهُمُ ٱللَّهُ مِن فَضۡلِهِۦ
অর্থ : যাদের বিয়ের সামর্থ্য নেই, আল্লাহ তাদেরকে নিজ অনুগ্রহে অভাবমুক্ত না করা পর্যন্ত তারা যেন সংযম অবলম্বন করে। সূরা আন-নূর : ৩৩
শিয়াগণ মুতআ বিয়ের বৈধতার ব্যাপারে আমাদের নিকট বিশুদ্ধ গ্রন্থসমূহে বর্ণিত কিছু সংখ্যক হাদিস দ্বারা দলিল পেশ করে; তার জওয়াব হল- ঐসব হাদিস মানসুখ (রহিত) হয়ে গেছে। তাদের পক্ষে তার মুতআ বিয়ের বৈধতার ব্যাপারে কোন দলিল নেই। বরং মু্তআ বিবাহ হারাম হওয়া দলিল আছে। যেমন-
আলি ইবনু আবূ তালিব (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন-
أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ صلى الله عليه وسلم نَهَى عَنْ مُتْعَةِ النِّسَاءِ يَوْمَ خَيْبَرَ وَعَنْ أَكْلِ لُحُوْمِ الْحُمُرِ الإِنْسِيَّةِ.
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম খাইবার যুদ্ধের দিন মহিলাদের মুতআ করা থেকে এবং গৃহপালিত গাধার মাংস খেতে নিষেধ করেছেন। সহিহ বুখারি : ৪২১৬, ৫১১৫, ৫৫২৩, ৬৯৬১, সহিহ মুসলিম : ১৪০৭, সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৯৬১, সুনানে তিরমিযী ১১২১, ১৭৯৪, সুনানে নাসায়ী ৩৩৬৫, ৩৩৬৬, আহমাদ ৫৯৩, ৮১৪, ১২০৭, মুয়াত্তা মালেক : ১১৫১, দারেমী : ১৯৯০, ২১৯৭।

রাবী ইবনু সাবুরাহ (রহ.) থেকে তার পিতার সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন-
أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ حَرَّمَ مُتْعَةَ النِّسَاءِ
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নারীদের সাথে মুত’আহ বিয়ে হারাম করেছেন। সুনান আবু দাউদ : ২০৭৩

আয়াশ ইবনু সালামা (রহ.) থেকে তার পিতার সুত্রে বর্ণিত। তিনি (পিতা) বলেন-
رَخَّصَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم عَامَ أَوْطَاسٍ فِي الْمُتْعَةِ ثَلاَثًا ثُمَّ نَهَى عَنْهَا ‏
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আওতাস যুদ্ধের বছর তিন দিনের জন্য মুতআ বিবাহের অনুমতি দিয়েছিলেন। তারপর তিনি তা নিষিদ্ধ করেন। সহিহ মুসলিম : ৩২৮৮ ইফা.

সাবরাহ (রহ.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সাথে বিদায় হাজ্জে রওয়ানা হলাম। সাহাবিগণ বললেন, হে আল্লাহর রসূল! স্ত্রীহীন অবস্থায় থাকা আমাদের জন্য কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন : তাহলে তোমরা এসব মহিলার সাথে মুত’আ করো (সাময়িকভাবে উপকৃত হও)। অতএব আমরা তাদের সান্নিধ্যে পৌঁছলাম, কিন্তু তারা আমাদের এবং তাদের মাঝে নির্দিষ্ট মেয়াদ নির্ধারণ ব্যতীত আমাদের সঙ্গে বিবাহ বসতে অস্বীকার করলো। সাহাবিগণ বিষয়টি রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট উল্লেখ করলে তিনি বলেন, তাহলে তোমাদের ও তাদের মাঝে মেয়াদ নির্দিষ্ট করে নাও।
অতএব আমি ও আমার এক চাচাতো ভাই (এই উদ্দেশে) বের হলাম। তার সাথে ছিল একটি চাদর এবং আমার সাথেও ছিল একটি চাদর। তার চাদরটি ছিল আমার চাদর থেকে বেশি সুন্দর। আর আমি ছিলাম তার চাইতে অধিক যুবক। আমরা দু’জন এক নারীর নিকট আসলাম। সে বললো, চাদর দু’টি তো একই মানের। অতঃপর আমি তাকে বিবাহ করলাম এবং তার কাছেই ঐ রাত কাটালাম। ভোরে আমি ফিরে এলাম, তখন রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কা’বা ঘরের দরজা ও রুকনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে বলছিলেন : হে লোকসকল! আমি তোমাদের মুত’আ বিবাহের অনুমতি দিয়েছিলাম। এখন তোমরা শুনে নাও যে, আল্লাহ্ কিয়ামত পর্যন্ত এই প্রকার বিবাহ হারাম করেছেন। অতএব তোমাদের কারো কাছে এ ধরনের কোন নারী থাকলে সে যেন তাকে ছেড়ে দেয় এবং তোমরা তাদেরকে যা কিছু দিয়েছো তা থেকে কিছুই ফেরত নিও না। সহিহ মুসলিম : ১৪০৬, সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৯৬২, সুনানে নাসায়ী ৩৩৬৮, সুনানে আবূ দাউদ ২০৭২, ২০৭৩, সহীহাহ ৩৮১ আহমাদ ১৪৯১৩, ১৪৯২১, দারেমী ২১৯৫, ২১৯৬, ইরওয়াহ ১৯০১, ১৯০২।

নোট : আবুল হুসাইন মুসলিম ইবনে আল-হাজ্জাজ ইবনে মুসলিম আল-কুশাইরি তার গ্রন্থ সহিহ মুসলিম মুতআ বিবাহ অধ্যায়ের শিরোনাম করেন “মুতআ বিবাহ বৈধ ছিল, পরে তা বাতিল করা হয়, অতঃপর বৈধ করা হয়, আবার বাতিল করা হয় এবং তা কিয়ামত পর্যন্ত স্থির থাকবে।”
উপরে কয়েকটি সহিহ হাদিস এ কথার প্রমাণ বহন করে। সহিহ মুসলিমেও মুতআ বিবাহ করার অনুমিত সংক্রান্ত করেকটি হাদিস এসেছে যেগুলো প্রমন বহন করে এক সময় জায়েয ছিল। কাজেই ঐ সকল হাদিস দেখে শিয়াদের মত ধোঁকা খাওয়া যাবে না।
ইবনু উমার (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, উমার ইবনুল খাত্তাব (রা.) খলীফা নির্বাচিত হওয়ার পর লোকেদের উদ্দেশে ভাষণ দিতে গিয়ে বলেন, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে মাত্র তিন দিন মুত’আ বিবাহের অনুমতি দিয়েছিলেন। এরপর তিনি তা হারাম ঘোষণা করেন। আল্লাহর শপথ! আমি যদি কোন বিবাহিত পুরুষের ব্যাপারে জানতে পারি যে, সে মুত’আ বিবাহ করে তবে আমি প্রস্তরাঘাতে তাকে মৃত্যুদণ্ড দিবো। তবে সে যদি আমার সামনে চারজন সাক্ষী উপস্থিত করতে পারে, যারা সাক্ষ্য দিবে যে, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুত’আ বিবাহ হারাম ঘোষণার পর আবার তা হালাল করেছেন। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৯৬৩
এমনকি শিয়াদের কিতাবসমূহের মধ্যেও মুতাআ বিবাহ নিষিদ্ধের প্রমাণ পাওয়া যায়। যেমন-
আলি (আ.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-
أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ صلى الله عليه وسلم نَهَى عَنْ مُتْعَةِ يَوْمَ خَيْبَرَ وَعَنْ أَكْلِ لُحُوْمِ الْحُمُرِ الإِنْسِيَّةِ.
রাসূলুল্লাহ ﷺ খায়বরের যুদ্ধের দিন গৃহপালিত গাদার গোশত ও মুতআ বিয়ে নিষিদ্ধ করেছেন। আবূ জাফর মুহাম্মদ ইবন হাসান আত-তুসী, আত-তাহযীব, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা-১৮৬, আবূ জাফর মুহাম্মদ ইবন হাসান আত-তুসী, আল-ইস্তিবসার, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা-১৪২

শিয়াদের ভ্রান্ত আকিদাসমূহ-৬ : গুপ্তাঙ্গ ধার করার (বেশ্যাবৃত্তি) বৈধতার আকিদা।


মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

আবূ জাফর মুহাম্মদ ইবনুল হাসান আত-তুসী শিয়াদের অন্যতম প্রধান ও প্রভাবশালী ফকিহ ও মুহাদ্দিস। তিনি “শায়খ আত-তুসী” নামে অধিক পরিচিত। তার সময়কাল ছিল চতুর্থ ও পঞ্চম হিজরি শতাব্দীতে। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘আল-ইসতিবসার। এটি শিয়াদের চারটি প্রাথমিক হাদিসগ্রন্থের একটি। শিয়ারা তাদের এ গ্রন্থগুলোকে ‘আল-কুতুবুল আরবাআ’ (الكتب الأربعة) বলে থাকে। শিয়া হাদিসচর্চায় ‘আল-ইসতিবসার’ চারটি মূল হাদিসগ্রন্থের একটি, যেগুলো হলো:
১. আল-কাফি, আল-কলিনীর
২. মান লা ইয়াহদুরুহুল ফকীহ, ইবনে বাবুয়াইহ আল-কুম্মীর
৩. তাহযীবুল আহকাম, শায়খ আত-তুসী
৪. আল-ইসতিবসার, শায়খ আত-তুসী


আল-ইসতিবসার গ্রন্থটি মূলত এমন হাদিসসমূহ সংকলন করেছে, যেগুলোর মাঝে পরস্পরবিরোধী অর্থ বা অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব রয়েছে। আত-তুসী নিজে এগুলোর মধ্যে সমন্বয় সাধন বা ফিকহি ব্যাখ্যা দিয়ে তা সমাধানের চেষ্টা করেছেন। সংকলনে তিনি প্রায় ৫,৫০০ হাদিস লিপিবদ্ধ করেছেন। শিয়া হাদিসসমূহে যে সব পরস্পর বিরোধিতা দেখা যায়, সেগুলোর মধ্যকার সামঞ্জস্য ব্যাখ্যা করা। ৮। গুপ্তাঙ্গ ধার করা বা বেশ্যাবৃত্তি বৈধতার সম্পর্ক শিয়াদের এ মুল চারটি মধ্য থেকে শুধু আল-ইসতিবসার কয়েকটি দলিলসহ উদাহরণ দিচ্ছি।
ক। আবূ জাফর মুহাম্মদ ইবন হাসান আত-তুসী ‘আল-ইসতিবসার’ নামক গ্রন্থে বর্ণনা করেন-
عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ مُسْلِمٍ، عَنْ أَبِي جَعْفَرٍ (عَلَيْهِ السَّلَامُ) قَالَ:قُلْتُ لَهُ: الرَّجُلُ يَحِلُّ لِأَخِيهِ فَرْجَ جَارِيَتِهِ؟ قَالَ: نَعَمْ، لَا بَأْسَ بِهِ لَهُ مَا أَحَلَّ لَهُ مِنْهَا.
মুহাম্মদ ইবন মুসলিম থেকে বর্ণিত, তিনি আবূ জাফর (আলাইহিস সালাম)-এর কাছে জানতে চান, “এক ব্যক্তি কি তার ভাইয়ের জন্য তাঁর দাসী (গৃহকর্মী)–এর গোপনাঙ্গ বৈধ (হালাল) করে দিতে পারে?” এতে আবূ জাফর বলেছেন, “হ্যাঁ, এতে কোনো সমস্যা নেই যতটুকু তিনি (মালিক) তাকে (আপনার ভাইকে) তার মধ্যে থেকে বৈধ করেছেন।” আবূ জাফর মুহাম্মদ ইবন হাসান আত-তুসী ‘আল-ইসতিবসার, তৃতীয় খণ্ড, পৃ.-১৩৬

খ। মালিক থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন-
لَا بَأْسَ بِأَنْ يُحِلَّ الرَّجُلُ جَارِيَتَهُ لِأَخِيهِ۔
কোনো ব্যক্তির জন্য তার দাসীকে তার ভাইয়ের জন্য হালাল করে দেওয়া কোনো দোষের নয়।
আবূ জাফর মুহাম্মদ ইবন হাসান আত-তুসী ‘আল-ইসতিবসার, তৃতীয় খণ্ড, পৃ.-১৩৬

গ। জাফর ইবন মুহাম্মাদ ইবন হাকীম, কাররাম ইবন আমর, মুহাম্মাদ ইবন মুসলিম-এর মাধ্যমে আবু জাফর (আলাইহিস সালাম) থেকে বর্ণিত—
قَالَ: قُلْتُ لَهُ… قَالَ: نَعَمْ، لَا بَأْسَ بِهِ، لَهُ مَا أَحَلَّ لَهُ مِنْهَا.
তিনি বলেন: আমি তাঁকে বললাম…, তিনি বললেন: হ্যাঁ, এতে কোনো দোষ নেই; সে তার (মালিকের) পক্ষ থেকে যা হালাল করা হয়েছে, তা উপভোগ করতে পারবে। আবূ জাফর মুহাম্মদ ইবন হাসান আত-তুসী ‘আল-ইসতিবসার, তৃতীয় খণ্ড, পৃ.-১৩৬

ঘ. মুহাম্মদ ইবন মরাদাব থেকে বর্ণনা: আবু আবদুল্লাহ (আ.) আমাকে বললেন—
يَا مُحَمَّدُ، خُذْ هَذِهِ الْجَارِيَةَ تَخْدِمُكَ وَتُصِيبُ مِنْهَا، فَإِذَا خَرَجْتَ فَرُدَّهَا إِلَيْنَا۔
‘হে মুহাম্মাদ! এই দাসীটি নিয়ে নাও—সে তোমার সেবা করবে এবং তুমি তার সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করতে পারবে। আর যখন (তোমার কাজ শেষে) বের হয়ে যাবে, তখন তাকে আমাদের কাছে ফিরিয়ে দেবে।’ আবূ জাফর মুহাম্মদ ইবন হাসান আত-তুসী ‘আল-ইসতিবসার, তৃতীয় খণ্ড, পৃ.-১৩৬

ঙ। ইবনু মাহবূব, ইবনু রিআব-এর সূত্রে, আবু বাসীর বর্ণনা করেন, তিনি বলেন-
: سَأَلْتُ أَبَا عَبْدِ اللَّهِ (عَلَيْهِ السَّلَامُ) عَنْ ٱمْرَأَةٍ أَحَلَّتْ لِٱبْنِهَا فَرْجَ جَارِيَتِهَا، قَالَ: هُوَ لَهُ حَلَالٌ، قُلْتُ: أَفَيَحِلُّ لَهُ ثَمَنُهَا؟ قَالَ: لَا، إِنَّمَا يَحِلُّ لَهُ مَا أَحَلَّتْ لَهُ۔
আমি আবু আবদিল্লাহ (আলাইহিস সালাম)-কে জিজ্ঞাসা করলাম, এক নারী তার ছেলেকে তার (নিজের) দাসীর যৌনাঙ্গ হালাল করে দিয়েছে, এ বিষয়ে কী হুকুম? তিনি বললেন: এটা তার (ছেলের) জন্য হালাল।
আমি জিজ্ঞেস করলাম: তাহলে কি তার (দাসীর) মূল্যও (ছেলের জন্য) হালাল হবে? তিনি বললেন: না, তার জন্য কেবলমাত্র তাই হালাল, যা তার মা তার জন্য হালাল করেছেন। আবূ জাফর মুহাম্মদ ইবন হাসান আত-তুসী ‘আল-ইসতিবসার, তৃতীয় খণ্ড, পৃ.-১৩৬
নোট : এই বর্ণনা দ্বারা স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে যে শিয়া আইনে কোন ব্যক্তি তার ভাইয়ের দাসীর “গুপ্তাঙ্গ” বৈধ এর অনুমতি পেতে পারেন, বন্দোবস্ত মালিকের ইচ্ছার উপর নির্ভর করে। একাধিক বার উদ্ধৃত একই মত বিভিন্ন রিওয়ায়েতে পুনরায় নিশ্চিত করা হয়েছে (যেমন, ভাই, পিতা, বিভিন্ন শায়খ) খালি “অবস্থান” নয়, “ব্যবহার-ভিত্তিক অনুমতি” মূলমন্ত্র হলো “যতটুকু বৈধ করেছেন, ততটুকুই বৈধ।” আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাতের নিকট সম্পূর্ণভাবে অস্বীকৃত ও অবৈধ। এ কাজ পরিষ্কার জিনা-ব্যভিচার ও হদ যোগ্য অপরাধ।

ছ. ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইয়াকুব আল-কুলায়নী বর্ণনা করেন, ইবনু উমাইর আল-আজামী থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমাকে আবূ আবদিল্লাহ (আ.) বলেন-
হে আবূ উমর! নিশ্চয় দীনের দশ ভাগের নয় ভাগ ‘তাকীয়ার’ মধ্যে; যার ‘তাকীয়া’ নেই, তার ধর্ম নেই। আর মদ ও মোজার উপর মাসেহ ব্যতীত সকল বস্তুর মধ্যে ‘তাকীয়া’ আছে। আল-কুলায়নী, উসুলুল কাফী, প্রথম খণ্ড, পৃ.-৪৮২

এ সম্পর্কে সঠিক আকিদা :
আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের দৃষ্টিকোণ হলো জীবনরক্ষা বা চরম বিপদের সময় সীমিত সময়ের জন্য তাকিয়া করা জায়েয। আহলে সুন্নাহ মনে করে, চরম নির্যাতনের মুখে একজন মুসলমান যদি কুফরি কথা বা বিশ্বাস মুখে বলে নিজের প্রাণ বাঁচায়, অথচ অন্তরে ঈমান অটুট রাখে, তবে তা আল্লাহর অনুমোদিত। অর্থাত কাউকে নির্যাতনের মাধ্যা বাধ্য করা হলে সে গুনাহগার হবে না।
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
مَنۡ کَفَرَ بِاللّٰہِ مِنۡۢ بَعۡدِ اِیۡمَانِہٖۤ اِلَّا مَنۡ اُکۡرِہَ وَقَلۡبُہٗ مُطۡمَئِنٌّۢ بِالۡاِیۡمَانِ وَلٰکِنۡ مَّنۡ شَرَحَ بِالۡکُفۡرِ صَدۡرًا فَعَلَیۡہِمۡ غَضَبٌ مِّنَ اللّٰہِ ۚ وَلَہُمۡ عَذَابٌ عَظِیۡمٌ
যে ঈমান আনার পর আল্লাহর সাথে কুফরি করেছে এবং যারা তাদের অন্তর কুফরি দ্বারা উন্মুক্ত করেছে, তাদের উপরই আল্লাহর ক্রোধ এবং তাদের জন্য রয়েছে মহাআযাব। ঐ ব্যক্তি ছাড়া যাকে বাধ্য করা হয় (কুফরি করতে) অথচ তার অন্তর থাকে ঈমানে পরিতৃপ্ত। সূরা নাহল : ১০৬
এই আয়াত থেকে ইমাম শাফিঈ, ইমাম মালিক, ইমাম আহমদ ও অন্যান্য আহলে সুন্নাহ ইমামরা বলেন, প্রাণনাশ বা চরম নির্যাতনের আশঙ্কায় বিশ্বাস লুকানো (তাকিয়া) বৈধ হতে পারে, কিন্তু তা মৌলনীতি নয়, বরং ব্যতিক্রম। ইসলামি শরিয়তের তাকিয়া মূলনীতি নয় বরং ব্যতিক্রম। এটি চরম বাধ্যবাধকতার নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বৈধ, স্থায়ী আচরণ নয়। তাকিয়া কেবল শত্রু ও প্রাণহানির আশঙ্কায় বৈধ হতে পারে;
সাধারণ অবস্থায় তা মুনাফিকির কাছাকাছি বিবেচিত হয়। ইসলামের দাওয়াত, সাক্ষ্য, ও সত্য প্রকাশে সাহস ও স্পষ্টবাদিতা হলো আহলে সুন্নাহর আদর্শ।
সার কথা : আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের মতে, তাকিয়া ইসলামে স্থায়ী কোনো বৈধতা নয়। এটি কেবল জরুরি পরিস্থিতিতে, প্রাণরক্ষার প্রয়োজনে সীমিত অনুমোদন পায়। ইসলাম মূলত সত্য প্রকাশ, স্পষ্টতা ও দৃঢ়তা শিক্ষা দেয়। অতএব, নিয়মিতভাবে বিশ্বাস লুকানো, দ্বিমুখিতা বা মতাদর্শ ঢেকে রাখা সুন্নি আকিদার পরিপন্থী।

শিয়াদের ভ্রান্ত আকিদাসমূহ-৭ : নারীদের সাথে তার পিছনের পথে সংগমে মিলিত হওয়াকে বৈধ মনে করে।


মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

আবূ জাফর মুহাম্মদ ইবন হাসান আত-তুসী ‘আল-ইসতিবসার’ নামক গ্রন্থে বর্ণনা করেন
আবদুল্লাহ ইবন আবি ইয়াফুর থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আবূ আবদিল্লাহ (আ.) কে জিজ্ঞাসা করলাম ঐ পুরুষ ব্যক্তি সম্পর্কে, যে তার স্ত্রীর সাথে তার পিছনের পথে সংগমে মিলিত হয়। তখন তিনি বললেন, সে রাজি থাকলে কোন অসুবিধা নেই। আমি বললাম, তাহলে আল্লাহ তায়ালার বাণী-
فَأۡتُوهُنَّ مِنۡ حَيۡثُ أَمَرَكُمُ ٱللَّهُ
অর্থ : তখন তাদের নিকট ঠিক সেভাবে গমন করবে, যেভাবে আল্লাহ তোমাদেরকে আদেশ দিয়েছেন।
এর বাস্তবতা কোথায়?
তখন তিনি বললেন, এই আয়াতের বিধান সন্তান কামনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। সুতরাং তোমরা সন্তান অনুসন্ধান কর, আল্লাহ যেভাবে তোমাদেরকে আদেশ দিয়েছেন। নিশ্চয় আল্লাহ তায়ালা বলেন-
نِسَآؤُكُمۡ حَرۡثٞ لَّكُمۡ فَأۡتُواْ حَرۡثَكُمۡ أَنَّىٰ شِئۡتُمۡ
অর্থ : তোমাদের স্ত্রীগণ তোমাদের ক্ষেত্র। অতএব তোমরা তোমাদের ক্ষেত্রে যেভাবে ইচ্ছা গমন কর। সূরা বাকারা : ২২৩। আবূ জাফর মুহাম্মদ ইবন হাসান আত-তুসী, আল-ইসতিবসার, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা নম্বর ২৪৩

তিনি ‘আল-ইসতিবসার’ (الاستبصار) নামক গ্রন্থে আরও বর্ণনা করেন-
মূসা ইবন আবদিল মুলক থেকে বর্ণিত, তিনি জনৈক ব্যক্তি থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমি আবুল হাসান রেজা (আ.) কে জিজ্ঞাসা করলাম পুরুষ ব্যক্তি কর্তৃক তার স্ত্রীর পিছনের পথে সংগমে মিলিত হওয়ার বিষয়ে। তখন তিনি বললেন, আল্লাহ তায়ালার কিতাবের একটি আয়াত তা বৈধ করে দিয়েছে, লুত (আ.) এর উক্তি। আল্লাহ বলেন-
قَالَ یٰقَوۡمِ ہٰۤؤُلَآءِ بَنَاتِیۡ ہُنَّ اَطۡہَرُ لَکُمۡ فَاتَّقُوا اللّٰہَ
অর্থ : সে বলল, ‘হে আমার কওম, এরা আমার মেয়ে, তারা তোমাদের জন্য পবিত্র। সুতরাং তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। সুরা হুদ : ৭৮।
কারণ, তিনি জানতেন যে, তারা সম্মুখস্থ গুপ্তাঙ্গের প্রত্যাশী ছিল না। আবূ জাফর মুহাম্মদ ইবন হাসান আত-তুসী, আল-ইসতিবসার, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা নম্বর ২৪৩

এ সম্পর্কে সঠিক কথা হলো :
আল-কুরআন ও সুন্নাহ থেকে নারীদের সাথে সমকামিতা অবৈধতার প্রমাণ পাওয়া যায়। আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ
نِسَآؤُكُمۡ حَرۡثٞ لَّكُمۡ فَأۡتُواْ حَرۡثَكُمۡ أَنَّىٰ شِئۡتُمۡ
অর্থ : তোমাদের স্ত্রীগণ তোমাদের শস্যক্ষেত্র। অতএব তোমরা তোমাদের শস্যক্ষেত্রে যেভাবে ইচ্ছা গমন কর।”সূরা বাকারা : ২২৩
নিশ্চয় আল্লাহ তায়ালা চাষের জায়গায় আসার অনুমতি দিয়েছেন আর তা হল লজ্জাস্থান। আর তিনি পায়ূ পথে গমনের অনুমতি দেননি আর তা হল পিছনের রাস্তা।
অসংখ্যা সহিহ হাদিসে পায়ুপথে বা পিছনের রাস্থায় সংগম করা নিষেধ করেছেন। যেমন-১
আবূ হুরাইরাহ (রাযি.) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন-
مَلْعُونٌ مَنْ أَتَى امْرَأَتَهُ فِي دُبُرِهَا
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি তার স্ত্রীর সাথে গুহ্যদ্বারে সংগম করে সে অভিশপ্ত। সুনানে আবু দাউদ “ ২১৬২
আবূ হুরাইরাহ (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
‏ مَنْ أَتَى حَائِضًا أَوِ امْرَأَةً فِي دُبُرِهَا أَوْ كَاهِنًا فَصَدَّقَهُ بِمَا يَقُولُ فَقَدْ كَفَرَ بِمَا أُنْزِلَ عَلَى مُحَمَّدٍ ‏.
যে ব্যক্তি ঋতুমতী স্ত্রীর সাথে সহবাস করলো অথবা স্ত্রীর মলদ্বারে সংগম করলো অথবা গণকের নিকট গেলো এবং সে যা বললো তা বিশ্বাস করলো, সে অবশ্যই মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উপর নাযিলকৃত জিনিসের (আল্লাহর কিতাবের) বিরুদ্ধাচরণ করলো। সুনানে ইবনে মাজাহ : ৬৩৯, সুনানে তিরমিযী : ১৩৫, সুনানে আবূ দাঊদ : ৩৯০৪, আহমাদ ৯০৩৫, ৯৮১১; দারিমী ১১৩৬, মিশকাত : ৫৫১।

তলাক বিন আলি রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “যখন তোমাদের কেউ সালাতে বায়ু ত্যাগ করবে, সে যেন সালাত ছেড়ে চলে যায় তারপর ওযূ করে সালাত পুনরায় আদায় করে। আর তোমরা স্ত্রীদের পায়ুপথে মিলন করবে না। সহিহ ইবেন হিব্বান : ২২৩৪, সুনানে তিরমিযী: ১১৬৪, মিশকাত : ৩১৪, ১০০৬, দারাকুতনী : ১৫৩, শারহুস সুন্নাহ : ৭৫২

আমরা ইবন খুযাইমা ইবন সাবিত তাঁর পিতা থেকে, আর তিনি খুযাইমা ইবন সাবিত (রা.) থেকে বর্ণনা করেন-
سَأَلَ رَجُلٌ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ أَنَ يَأْتِيَ النِّسَاءَ فِي أَدْبَارِهِنَّ، فَقَالَ ﷺ: “إِنَّ اللَّهَ لا يَسْتَحْيِي مِنَ الْحَقِّ، لا تَأْتُوا النِّسَاءَ فِي أَدْبَارِهِنَّ.”
এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ ﷺ–কে জিজ্ঞাসা করলো, “স্ত্রীদের পায়ুপথে সহবাস করা যাবে কি?” তিনি ﷺ বললেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ্‌ হক কথা বলতে লজ্জা করেন না। তোমরা স্ত্রীদের পায়ুপথে সহবাস করো না। সহীহুল জামে : ১৮৫২

শিয়াদের ভ্রান্ত আকিদাসমূহ-৮ : তাকিয়া (التَّقِيَّةُ) বা ধর্মীয় স্বার্থে কোনো কিছুকে অন্যদের থেকে গোপন করা জায়েয।

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন
আরবি শব্দ “التَّقِيَّةُ” (তাকিয়াহ) এসেছে “وَقَىٰ – يَقِي” ধাতু থেকে, যার অর্থ হ চ্ছে আত্মরক্ষা, বাঁচানো বা নিরাপদ রাখা। তাই تَقِيَّةٌ শব্দের আভিধানিক অর্থ: আত্মরক্ষার্থে বিশ্বাস বা চিন্তা গোপন করা। পারিভাষিক অর্থে তাকিয়া হলো এমন একটি ধারণা, যেখানে কেউ জীবন, সম্মান বা সম্পদ রক্ষার উদ্দেশ্যে নিজের প্রকৃত ধর্মীয় বিশ্বাস গোপন করে। এটি মূলত চরম বিপদের সময় আত্মরক্ষার কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তাকিয়া (التَّقِيَّةُ) এটি শিয়া মতবাদের অন্যতম মৌলিক বিশ্বাস, যার দ্বারা তারা পরিস্থিতির কারণে নিজেদের প্রকৃত বিশ্বাস গোপন করতে বৈধ মনে করে। শিয়া কিতাবসমূহে তাকিয়াকে তাদের ধর্মীয় দায়িত্ব হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। নিচে তাদের স্বনামধন্য কিতাব থেকে কিছু উদাহরণ তুলে ধরা হলো।

ক। ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইয়াকুব আল-কুলায়নী তার গ্রন্থে উল্লেখ করেন। ইমাম আবু আব্দুল্লাহ (আ.) বলেন-
«التَّقِيَّةُ دِينِي وَدِينُ آبَائِي، وَلَا دِينَ لِمَن لَا تَقِيَّةَ لَهُ»
অর্থ : “তাকিয়াহ হলো আমার ধর্ম এবং আমার পিতৃপুরুষদের ধর্ম; যার মধ্যে তাকিয়া নেই, তার কোনো ধর্ম নেই।” ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইয়াকুব আল-কুলায়নী, উসুলুল কাফি, দ্বিতীয় খণ্ড. পৃ.-২১৭, হাদিস নং ৩

খ। আলি ইবনে ইব্রাহিম আল-কুম্মির (মৃত্যু: ৩০৭ হি.) লিখিত একটি বিখ্যাত তাফসির ‘তাফসীরুল কুম্মি; (تفسير القميّ) শিয়াদের অন্যতম প্রাচীন ও গুরুত্বপূর্ণ তাফসীরগ্রন্থ। এটি ইমামিয়া শিয়াদের আকিদা, ফিকহ ও ইমামত বিষয়ক দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতে লেখা একটি ব্যাখ্যামূলক কুরআন তাফসীর। উক্ত তাফসিরে সুরা আল ইমরানের ২৮ নম্বর আয়াতের তাফসির তিনি বলেন-
فِي قَولِهِ تَعَالَى: ﴿إِلَّا أَن تَتَّقُوا مِنْهُمْ تُقَاةً﴾ قَالَ: «التَّقِيَّةُ فِي الدِّينِ حَتَّى يَأْتِيَ القَائِمُ»
অর্থ : আয়াতে “তাদের থেকে তাকওয়া অবলম্বন করো” (আলে ইমরান: ২৮) এর ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, “তাকিয়া থাকবে দ্বীনের মধ্যে, যতক্ষণ না কায়েম (ইমাম মাহদি) আগমন করেন। তাফসীরুল কুম্মি, প্রথম খণ্ড, পৃ.-৮৮।

গ। শিয়া আলিম ইবনে শোবা আল-হারানী (ابن شُعْبَة الحَرَّانِيّ) তাঁর রচিত কিতাব “তুহফাতুল উকূল” (تحف العقول) শিয়া আকিদাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে আছে। এ গ্রন্থে তিনি লিখেন। ইমাম আবু আব্দুল্লাহ (আ.) বলেন-
«التَّقِيَّةُ تُقَى وَالتَّقِيَّةُ حِصْنُ المُؤْمِنِ»
“তাকিয়া হচ্ছে সতর্কতা, আর তাকিয়া হলো মুমিনের জন্য ঢাল।” ইবনে শোবা আল-হারানী, তুহফাতুল উকূল, পৃ.-১০৩

ঘ। মুহাম্মাদ বাকির আল-মাজলিসী (মৃত্যু: ১১১১ হি.) তার গ্রন্থে উল্লেখ করেন। শিয়াদের ষষ্ঠ ইমাম জাফর আস-সাদিক থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন-
«التَّقِيَّةُ وِقَايَةٌ، وَلَا دِينَ لِمَنْ لَا تَقِيَّةَ لَهُ»
অর্থ: “তাকিয়া হলো আত্মরক্ষার উপায়, আর যার মধ্যে তাকিয়া নেই, তার কোনো দ্বীন নেই।”
মুহাম্মাদ বাকির আল-মাজলিসী, বিহারুল আনওয়ার, খণ্ড: ২৭, পৃ.-৩৪০

ঙ। আবু জা‘ফর মুহাম্মাদ ইবনে আলি ইবনে বাবওয়াইহ আল-কুম্মী যিনি ইমাম শেখ সাদূক নামে বেশী পরিচয়। তিনি তার শিয়া ইমামি মাযহাবের মৌলিক বিশ্বাসগুলো সুসংগঠিতভাবে উপস্থাপ করে “আল-ইতিকাদ” নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেছেন। তিনি উক্ত গ্রন্থে বলেন-
«اعْتِقَادُنَا فِي التَّقِيَّةِ أَنَّهَا وَاجِبَةٌ، مَنْ تَرَكَهَا كَالمَنْكِرِ لِلصَّلَاةِ»
“তাকিয়া সম্পর্কে আমাদের বিশ্বাস হলো, এটি ওয়াজিব (আবশ্যক)। যে এটি পরিত্যাগ করল, সে যেন সালাত অস্বীকার করল।” শেখ সাদূক, আল-ইতকাদ, পৃ.-১১৪

চ। ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইয়াকুব আল-কুলায়নী তার গ্রন্থে উল্লেখ করেন। ইমাম আবু আব্দুল্লাহ (আ.) বলেন-
«التَّقِيَّةُ فِي كُلِّ شَيْءٍ يُضْطَرُّ إِلَيْهِ ابْنُ آدَمَ، فَقَدْ أَحَلَّهُ اللَّهُ لَهُ»
অর্থ: “তাকিয়া মানুষের জন্য প্রতিটি এমন বিষয়ের ক্ষেত্রে বৈধ, যেখানে সে বাধ্য হয়। নিশ্চয়ই আল্লাহ তা তার জন্য হালাল করে দিয়েছেন।” ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইয়াকুব আল-কুলায়নী, উসুলুল কাফি, পঞ্চম খণ্ড. পৃ.-২০, হাদিস নং ৩

ছ। নাহজুল বালাগা (نهج البلاغة) শিয়া মতাদর্শে অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি গ্রন্থ, যা আলি ইবনে আবি তালিব (রা.) এর বিভিন্ন খুতবা, পত্র এবং সংক্ষিপ্ত বাণীর সংকলন করা হয়েছে। উক্ত গ্রন্থে উল্লেখ আছে। “আলি (আ.) বলেছেন-
«التَّقِيَّةُ مِنْ دِينِ اللَّهِ، وَدِينِ آبَائِي، وَلَا إِيمَانَ لِمَنْ لَا تَقِيَّةَ لَهُ»
অর্থ: “তাকিয়া হলো আল্লাহর দ্বীনের অংশ, এটি আমার পিতৃপুরুষদের দ্বীনের অংশ; যার মধ্যে তাকিয়া নেই, তার কোনো ঈমান নেই।” আল-শরীফ আর-রাদী, নাহজুল বালাগা, পৃ.-৪৮৯
উপরের দলিল থেকে স্পষ্ট বুঝা যায় যে, শিয়ারা তাকিয়াকে ঈমান, দ্বীন ও দায়িত্বের অংশ মনে করে। এমনকি কোনো বিপদ ছাড়াও তাকিয়া চালিয়ে যাওয়াকে বৈধ মনে করে। এটি ইসলামি আকিদা ও সাহাবায়ে কিরামের আদর্শের সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক।

শিয়াগণ বিশেষ বিশেষ ব্যক্তির ক্ষেত্রে রাজ‘আ বা পুনর্জন্মের বিশ্বাসী
শিয়াগণ রাজ‘আ (পুনর্জীবন) সম্পর্কে বেশ কিছু প্রখ্যাত আলেম তাদের গ্রন্থে আলোচনা করেছেন। এখানে কয়েক জন শিয়া লেখক ও তাদের গ্রন্থ থেকে দলিল উপস্থাপন করা হলো, আরবি উদ্ধৃতি সহ:
ক। আল্লামা মুহাম্মদ বাকির আল-মাজলিসী তার গ্রন্থে উল্লেখ করেন-
“وَ الرَّجْعَةُ حَقٌّ، وَ هِيَ قَوْلُ جَمِيعِ الْإِمَامِيَّةِ إِلَّا مَنْ شَذَّ مِنْهُمْ، وَ هِيَ رُجُوعُ أَقْوَامٍ مِنَ الْمَوْتَى إِلَى الدُّنْيَا قَبْلَ الْقِيَامَةِ.”
“রাজ‘আ সত্য, এবং এটি সকল ইমামিয়া (শিয়া) এর মত, অবশ্য কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া। এটি হলো কিয়ামতের আগে কিছু মৃত ব্যক্তির দুনিয়ায় ফিরে আসা।” আল্লামা মুহাম্মদ বাকির আল-মাজলিসী, হক্কুল ইয়াকীন, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃ.-৫২০

খ। শায়খ আব্বাস আল-কুমী তার গ্রন্থে উল্লেখ করেন-
“إِنَّ الرَّجْعَةَ مِنَ الْمُعْتَقَدَاتِ الَّتِي تُوجِبُ الْإِيمَانَ بِهَا، وَ قَدْ نَصَّ الْأَئِمَّةُ (ع) عَلَى وُقُوعِهَا لِأَصْحَابِ الْقِيَامِ بِالْقِسْطِ.”
রাজ‘আ এমন একটি বিশ্বাস যা মান্য করা আবশ্যক। ইমামগণ (আ.) সুস্পষ্টভাবে এর সংঘটনের কথা বলেছেন, বিশেষত ন্যায় প্রতিষ্ঠাকারীদের জন্য।” শায়খ আব্বাস আল-কুমী, মুন্তাহাল আমাল, তৃতীয় খণ্ড, পৃ.-১১৭, বৈরুত, ৩য় সংস্করণ

গ। শায়খ সাদুক তার গ্রন্থে উল্লেখ করেন-
“الرَّجْعَةُ لَيْسَتْ بِعَامَّةٍ، بَلْ هِيَ خَاصَّةٌ بِالْمُؤْمِنِينَ الْخَالِصِينَ وَ الْكَافِرِينَ الْخَالِصِينَ.”
রাজ‘আ সবার জন্য নয়, বরং তা খাঁটি মুমিন ও চরম কাফিরদের জন্য সীমাবদ্ধ। শায়খ সাদুক, আল-ই‘তিকাদাত, পৃ.-৬৩

ঘ। সাইয়েদ নেয়ামতুল্লাহ আল-জাজাইরি তার গ্রন্থে উল্লেখ করেন-
“إِنَّ اللَّهَ تَعَالَى يُعِيدُ قَوْمًا بَعْدَ مَوْتِهِمْ لِيَنْتَصِرَ لِلْأَئِمَّةِ (ع) وَ يُظْهِرَ الْحَقَّ.”
আল্লাহ তাআলা কিছু লোককে মৃত্যুর পর পুনরায় জীবিত করবেন, যাতে তারা ইমামগণের (আ.) জন্য বিজয় অর্জন করতে পারে এবং সত্য প্রতিষ্ঠা করতে পারে। সাইয়েদ নেয়ামতুল্লাহ আল-জাজাইরি, আল-আনওয়ার আন-নু‘মানিয়া, চতুর্থ খণ্ড, পৃ.-৩০২

ঙ। আল্লামা তাবাতাবাই তার গ্রন্থে উল্লেখ করেন-
“الرَّجْعَةُ مِنَ الْعَقَائِدِ الْمَثْبُتَةِ عِنْدَنَا، وَ قَدْ دَلَّتْ عَلَيْهَا الرِّوَايَاتُ الْمُتَوَاتِرَةُ.”
রাজ‘আ আমাদের (শিয়া) নিকট প্রতিষ্ঠিত আকীদা, এবং এ বিষয়ে বহু সহিহ হাদিস বর্ণিত হয়েছে।” আল্লামা তাবাতাবাই (রহ আল-মীযান ফী তাফসিরুল কুরআন আল্লামা তাবাতাবাই, আল-মীযান ফী তাফসিরুল কুরআন, খণ্ড ১৭, পৃ.-২৩৫
আস-সাদিক (আ.) বলেন-

চ। যে ব্যক্তি আমাদের পুনর্জন্মে বিশ্বাস করে না এবং মুত‘আ বিয়ের বৈধতাকে স্বীকৃতি দেয় না, সে ব্যক্তি আমাদের দলভুক্ত নয়। শায়খ আব্বাস আল-কুমী, মুন্তাহাল আমাল, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃ.-৩৪১

ছ। ইমাম মুহাম্মদ বাকের (আ.) বলেন, যখন ইমাম মাহাদী আত্মপ্রকাশ করবে, তখন তিনি অতিসত্বর আয়িশাকে জীবিত করবেন এবং তার উপর শাস্তির বিধান (হদ) কায়েম করবেন। আল্লামা মুহাম্মদ বাকের আল-মজলিসী, হক্কুল ইয়াকীন, পৃ.-৩৪৭
নোট : পুনর্জন্ম বা মৃত্যুর পর দুনিয়াতে পুনরায় ফিরে আসার বিশ্বাস মূলত হিন্দু, বৌদ্ধ ও অন্যান্য কুফরি ধর্মে প্রচলিত একটি ধারণা। শিয়ারা তাদের পূর্বপুরুষ অগ্লীপূজারীদের থেকে এ আকিদা গ্রহণ করছে। ইসলামে এমন বিশ্বাসের কোনো স্থান নেই। আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আত সুস্পষ্টভাবে বিশ্বাস করেন, মানুষ মৃত্যুর পর বরযখে অবস্থান করবে এবং পুনরুত্থান কেবল কিয়ামতের দিনই হবে। কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে এটি একটি পরিপূর্ণ ও চূড়ান্ত আকিদা। যারা কিয়ামতের আগেই মৃতদের দুনিয়ায় ফিরে আসার ধারণা পোষণ করে, তারা ভ্রান্ত বিশ্বাসে লিপ্ত এবং ইসলামের মৌলিক আকিদা থেকে বিচ্যুত।

শিয়াদের ভ্রান্ত আকিদাসমূহ-৯ : গাদিরে খামের ঘটনা সম্পর্কে শিয়াদের ভ্রান্ত আকিদা

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

গাদীর খুম একটি কূপের নাম বা স্থানের নামও বলা জেতে পারে, যেখানে মহানবি ﷺ এর তাঁর জীবনের শেষ হজ শেষে ফিরবার পথে ১৮ই জিলহজ্জ্ব তারিখে মক্কা থেকে মদীনা যাওয়ার পথে বিশ্রাম নিয়ে ছিলেন এবং সাহাবিদের কিছু নসিয়ত করে ছিলেন। এ সম্পর্কিত কিছু হাদিস বিভিন্ন হাদিস গ্রন্থে সহিহ সনদে বর্ণিত আছে। গাদীরে খুম অবস্থান কালের কিছু সহিহ হাদিস এর বিকৃত উপস্থাপনাই হল শিয়া বিশ্বাসের অন্যতম ভিত্তি। শিয়া আকিদায় বিশ্বাসী যে কোন লোক কে গাদিরে খুম সম্পর্ক জিজ্ঞাসা করলেই বুঝতে পারবেন, এ সম্পর্কে তাদের আকিদা কত ভ্রান্ত। তারা ‘গাদীর খুম’ এর প্রতি এই আবেগ প্রবন যে, তারা এই ঘটনার দিনক্ষণ বের করে প্রতি চন্দ্র বছরের ১৮ই জিলহজ্জ্ব দিনটিকে ঈদের দিন হিসাবে পালন করে, যার নাম ‘ঈদে গাদির’। অসংখ্য শিয়া বিদ’আতের ভেতর ঈদে গাদিরও একটি বিদআত। আপনি শিয়া না হলে আপনি হয়ত ‘গাদীর খুম’ বা ‘ঈদে গাদির’ সম্পর্কে কিছুই জানেন না। রাসূল ﷺ এর কথার বিকৃতি ঘটিয়ে তারা নাটকের নতুন দৃশ্য দোওয়ার চেষ্টা করছে।
গাদীর খুম হলো সহিহ বুখারী, সহিহ মুসলিম ও অন্যান্য কয়েকটি হাদিস গ্রন্থে উল্লেখিত একটি কুপ বা কুয়ার নাম। এখানে রাসুলুল্লাহ (সাঃ) আলি (রা.) এর ব্যাপারে কিছু কথা বলেছিলেন। অনেকে গাদিরে খুমের আসল হাদিসটি না জানার জন্য, শিয়া আকিদায় বিশ্বাসিগণ অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে মিথ্যা তথ্য দিয়ে সাধারণ মুসলিমকে বিভ্রান্ত করে থাকে এবং বিকৃত করে এমনভাবে গাদির খামের হাদিস শুনিয়ে দিবে, যদি আপনার হাদিটি জানা না থাকে তবে ভুল ধরার কোন সুযোগই পাবেন না। তাই গাদিরে খুম সম্পর্কিত হাদিসগুলো পাঠকের সামনে প্রকাশ করার পূর্বে জানা দরকার এই স্থানে রাসূলুল্লাহ ﷺ কেন গিয়েছেল? সেখানে তিনি কি বলেছিলেন? এই হাদিসের পূর্বকার প্রেক্ষাপট কি ছিল?

গাদীরে খুম হাদিসের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট :
রাসূলুল্লাহ ﷺ হিজরতের দশম বর্ষে আলি ইবনে আবি তালিব (রা.) কে ইয়েমনে একটি অভিযান পরিচালনার দায়িত্ব দেন। আলি (রা.) সেখানে সফলভাবে অভিযান চালিয়ে যুদ্ধলব্ধ মাল ও গনিমত নিয়ে ফিরেন। তিনি খুমুস বা যুদ্ধলব্ধ সম্পদের এক-পঞ্চমাংশ সংরক্ষণ করেন, যার মধ্যে মূল্যবান লিলেন কাপড়ও ছিল। কিছু সাহাবি তা ব্যবহার করতে চাইলে আলি (রা.) তা দিতে অস্বীকার করেন এবং সরাসরি রাসূল ﷺ এর কাছে তা হস্তান্তরের ইচ্ছা পোষণ করেন। অতঃপরে আলি (রা.) বাহিনীর দায়িত্ব খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ (রা.) এর হাতে সোপর্দ করেন হজে অংশ নিতে মক্কার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। মক্কা পৌঁছে তিনি রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সাথে হজ সমাপন করেন। খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ (রা.), আলি (রা.) এর অনুপস্থিতিতে সৈন্যদেরকে সাময়িকভাবে সেই কাপড় ব্যবহারের অনুমতি দেন।
হজ শেষে রাসূলুল্লাহ ﷺ ও আলি (রা.) পুরো দলের সঙ্গে গাদিরে খুম নামক স্থানে মিলিত হয়। কিন্তু আলি (রা.) তাদের পরনে সেই লিনেন কাপড় পড়তে দেখে অবাক হয় এবং সৈন্য দলকে কাপড় খুলে ফেলার কড়া নির্দেশ প্রদান করেন। এতে সৈন্যদের একাংশ, বিশেষ করে বুরাইদা (রা.) আলির আচরণে অসন্তুষ্ট হন এবং রাসূলুল্লাহ ﷺ এর নিকট অভিযোগ করেন। রাসূল ﷺ তাদের উদ্দেশ্যে এ স্থানে একটি বক্তব্য প্রদান করেন। এই ঘটনা গাদীরে খুম নামক স্থানে ঘটেছিল বিধায় স্থানটি বিখ্যাত হয়ে যায়। এ স্থানের এ বক্তব্য নিয়েই মতবিরোধ, শিয়াদের দাবি সেখানে রাসূলুল্লাহ ﷺ জনসমক্ষে আলির (রা.) কে পরবর্তী ইমাম বা খলিফার জন্য নির্বাচিত করেন। অপর পক্ষে আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামায়াতের দাবি করে, এ বক্তব্যে আলি (রা.) এর মর্যাদা ও সম্মাদের কথা বললেও তাকে খলিফা বা ইমাম নির্বাচনের মত কোন বিষয় এখানে ছিল না। এ সম্পর্কিত কিছু সহিহ হাদিস-

বুরাইদা (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ আলিকে ইয়েমেনে পাঠান এবং আমিও তাঁর সাথে ছিলাম। পরে সাহাবিরা তাঁকে কিছু উট ব্যবহারের অনুরোধ করেন, আলি (রা.) অনুমতি দেন। যখন হজ শেষ করে আমরা মদিনায় ফিরলাম, রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাকে জিজ্ঞেস করলেন
يَا بُرَيْدَةُ! أَبْغَضْتَ عَلِيًّا؟ قُلْتُ: نَعَمْ، قَالَ: لَا تُبْغِضْهُ، فَإِنَّهُ مِنِّي وَأَنَا مِنْهُ، وَهُوَ وَلِيُّكُمْ بَعْدِي.
“বুরাইদা! তুমি কি আলিকে অপছন্দ করো?” আমি বললাম: “হ্যাঁ।” তখন তিনি বললেন: “তাকে ঘৃণা কোরো না, সে আমারই অংশ, আমিও তার অংশ, সে আমার পরে তোমাদের অভিভাবক।” মুসনাদ আহমদ : ২৯৯৬২

বুরাইদাহ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবি সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘আলি (রা.) কে গানীমাতের এক-পঞ্চমাংশ নিয়ে আসার জন্য খালিদ (রা.) এর কাছে পাঠালেন। আমি (রাবি) আলি (রা.) এর প্রতি অসন্তুষ্ট, আর তিনি গোসলও করেছেন। তাই আমি খালিদ (রা.) কে বললাম, আপনি কি তার দিকে দেখছেন না? এরপর আমরা নবি ﷺ এর কাছে ফিরে আসলে আমি তাঁর কাছে বিষয়টি জানালাম। তখন তিনি বললেন, হে বুরাইদাহ! তুমি কি ‘আলির প্রতি অসন্তুষ্ট? আমি বললাম, জ্বী, হ্যাঁ। তিনি বললেন, তার উপর অসন্তুষ্ট থেকে না। কারণ খুমুসে তার প্রাপ্য এর চেয়েও অধিক আছে। সহিহ বুখারি : ৪৩৫০
আবূ সারীহাহ অথবা যাইদ ইবনু আরকাম (রা.) হতে বর্ণিত আছে যে, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
“‏ مَنْ كُنْتُ مَوْلاَهُ فَعَلِيٌّ مَوْلاَهُ ‏”
আমি যার মাওলা (সাথী, অবিভাবক), আলিও তার মাওলা (সাথি, অভিভাবক)। সুনানে তিরমিজি : ৩৭১৩, সহিহাহ : ১৭৫০, মিশকাত : ৬০৮২, হাদিসের মান সহিহ

আলি (রা.) খোলা ময়দানে দাঁড়িয়ে জনগণকে উদ্দেশ্য করে বললেন, যে ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ ﷺ এর গাদিরে খুমের ভাষণ শুনেছে সে যেন উঠে দাঁড়ায়। এ কথা শুনে সাঈদের পক্ষ থেকে ছয় জন এবং জায়িদের পক্ষ থেকে ছয়জন উঠে দাঁড়ালো। তারা সাক্ষ্য দিল যে, তারা গাদিরে খুমে আলি (রা.) কে উদ্দেশ্য করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছে, আল্লাহ কি মুমিনদের জন্য অধিকতর আপনজন নন? সবাই বললো, অবশ্যই। তিনি বললেন-
রাসূল ﷺ গাদীরে খুমে উপস্থিত মুসলিমদের উদ্দেশ্য করে বলেন-
مَنْ كُنْتُ مَوْلَاهُ فَهَذَا عَلِيٌّ مَوْلَاهُ، اللَّهُمَّ وَالِ مَنْ وَالَاهُ، وَعَادِ مَنْ عَادَاهُ، وَانْصُرْ مَنْ نَصَرَهُ، وَاخْذُلْ مَنْ خَذَلَهُ۔
“আমি যার বন্ধু, আলিও তার বন্ধু । হে আল্লাহ! যিনি আলিকে বন্ধু, মনে করে, তুমি তার বন্ধু হও; আর যিনি তার বিরুদ্ধে, তুমি তার বিরুদ্ধে হও; যিনি তার সাহায্য করে, তুমি তাকে সাহায্য করো; আর যে তাকে পরিত্যাগ করে, তুমি তাকে অপদস্থ করো। মুসনদে আহমদ : ৯৫০, ৯৬১, ৮৬৪

যায়দ বিন আরকাম বলেন, একদিন মক্কা-মদিনার মধ্যপথে ‘খুম’ নামক জলাশয়ের ধারে রাসূলুল্লাহ ﷺ ভাষণ দিতে দাঁড়ালেন। সুতরাং তিনি আল্লাহর প্রশংসা ও স্তুতি বর্ণনা করে ওয়ায-নসিহত করার পর বললেন, ‘‘অতঃপর হে লোক সকল! শোনো, আমি একজন মানুষ মাত্র, শীঘ্রই (আমার নিকট) আমার প্রতিপালকের দূত আসবেন এবং আমি (আল্লাহর নিকট যাওয়ার জন্য) তাঁর ডাকে সাড়া দেব। আমি তোমাদের মাঝে দু’টি ভারী (গুরুত্বপূর্ণ) বস্তু ছেড়ে যাচ্ছি। তার মধ্যে একটি আল্লাহর কিতাব, যাতে হিদায়াত ও আলো রয়েছে। সুতরাং তোমরা আল্লাহর কিতাবকে গ্রহণ কর এবং তা মজবুত ক’রে ধারণ কর।’। সহিহ মুসলিম : ৬৩৭৮; হাদিস সম্ভার : ১৫০৯

ইয়াযীদ ইবনু হায়্যান (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি, হুসায়ন ইবনু সাবুরা এবং উমার ইবনু মুসলিম, আমরা যায়দ ইবনু আরকাম (রা.) এর নিকট গেলাম। আমরা যখন তার কাছে বসি, তখন হুসায়ন বললেন, হে যায়দ! আপনি তো বহু কল্যাণ প্রত্যক্ষ করেছেন, আল্লাহর রাসুল ﷺ কে দেখেছেন, তাঁর হাদিস শুনেছেন, তার পাশে থেকে যুদ্ধ করেছেন এবং তাঁর পেছনে সালাত আদায় করেছেন। আপনি বহু কল্যাণ লাভ করেছেন, হে যায়দ! আপনি রাসুলুল্লাহ ﷺ থেকে যা শুনেছেন, তা আমাদের বলুন না। যায়দ (রা.) বললেন, ভ্রাতূষ্পূত্র! আমার বয়স হয়েছে, আমি পুরানো যুগের মানুষ। সুতরাং রাসুলুল্লাহ ﷺ এর কাছ থেকে যা আমি সংরক্ষণ করোছিলাম, এর কিছু অংশ ভুলে গিয়েছি। তাই আমি যা বলি, তা কবুল কর আর আমি যা না বলি, সে ব্যাপারে আমাকে কষ্ট দিও না।
তারপর তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ একদিন মক্কা ও মদিনার মধ্যবর্তী “খুম্ম” নামক স্থানে দাঁড়িয়ে আমাদের সামনে ভাষণ দিলেন। আল্লাহর প্রশংসা ও সানা বর্ণনা শেষে ওয়াজ-নসিহত করলেন। তারপর বললেন, সাবধান, হে লোক সকল! আমি একজন মানুষ, আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত ফিরিশতা আসবে, আর আমিও তাঁর ডাকে সাড়া দেব। আমি তোমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ দুটো জিনিস রেখে যাচ্ছি। এর প্রথমটি হলো আল্লাহর কিতাব। এতে হিদায়াত এবং নূর রয়েছে। সুতরাং তোমরা আল্লাহর কিতাবকে অবলম্বন কর, একে শক্ত করে ধরে রাখো। এরপর কুরআনের প্রতি আগ্রহ ও অনুপ্রেরণা দিলেন। তারপর বললেন, আর হলো আমার আহলে বাইত। আর আমি আহলে বাইতের ব্যাপারে তোমাদের আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি, আহলে বাইতের ব্যাপারে তোমাদের আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি, আহলে বাইতের ব্যাপারে তোমাদের আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি। হুসায়ন বললেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ এর ‘আহলে বাইত’ কারা, হে যায়দ? রাসুলুল্লাহ ﷺ এর বিবিগণ কি আহলে বাইতের অন্তর্ভুক্ত নন?
যায়দ (রা.) বললেন, বিবিগণও আহলে বাইতের অন্তর্ভুক্ত; তবে আহলে বাইত তাঁরাই, যাদের উপর যাকাত গ্রহণ হারাম। হুসায়ন বললেন, এ সব লোক কারা? যায়দ (রা.) বললেন, এরা আলি, আকীল, জাফের ও আব্বাস (রা.) এর পরিবার-পরিজন। হুসায়ন বললেন, এদের সবার জন্য যাকাত হারাম? যায়দ (রা.) বললেন, হ্যাঁ। সহিহ মুসলিম : ২৪০৮, আহমাদ ১৮৭৮০, ১৮৮২৬, দারেমী ৩৩১৬

গাদীরে খুম সম্পর্কে শিয়াদের বর্ণিত হাদিস হল :
শিয়া ইসলামের বিশ্বাস অনুযায়ী, গাদিরে খুমের ঘটনা ইসলামের ইতিহাসে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, যেখানে রাসূলুল্লাহ (স.) আলি (রা.)-কে তার পরবর্তী স্থলাভিষিক্ত (ইমাম ও খলিফা) হিসেবে ঘোষণা দিয়েছিলেন। শিয়া সূত্রে এই দাবির সমর্থনে বেশ কিছু তারা পেশ করে। নিচে তাদের প্রসিদ্ধ কয়েকটি গ্রন্থের রেফারেন্স সহ হাদিসগুলো উল্লেখ করা হলো:

শিয়াদের গ্রন্থের হাদিস -১
“قَالَ رَسُولُ اللَّهِ (ص): مَنْ كُنْتُ مَوْلَاهُ فَعَلِيٌّ مَوْلَاهُ، اللَّهُمَّ وَالِ مَنْ وَالَاهُ وَعَادِ مَنْ عَادَاهُ.”
রাসূলুল্লাহ (স.) বলেছেন: ‘যার আমি মাওলা (নেতা), আলিও তার মাওলা। হে আল্লাহ! যে আলিকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করবে, তুমিও তাকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করো এবং যে আলির শত্রুতা করবে, তুমিও তার শত্রুতা করো। শায়খ তুসী, আল-ইহতিজাজ, খণ্ড: ১, পৃ.-৫৮-৬২

শিয়াদের গ্রন্থের হাদিস -২
রাসূলুল্লাহ (স.) বলেছেন-৩
“يَا أَيُّهَا النَّاسُ، أَلَسْتُمْ تَعْلَمُونَ أَنِّي أَوْلَى بِالْمُؤْمِنِينَ مِنْ أَنْفُسِهِمْ؟ قَالُوا: بَلَى. قَالَ: فَمَنْ كُنْتُ مَوْلَاهُ فَعَلِيٌّ مَوْلَاهُ.”
হে লোকসকল! তোমরা কি এ কথা স্বীকার করো না যে, মুমিনদের উপর তাদের নিজেদের চেয়ে আমার অধিকার বেশি? তারা বলল, হ্যাঁ, তিনি বললেন: ‘তাহলে যার আমি মাওলা, আলিও তার মাওলা। আল্লামা আমিনী, আল-গাদীর, খণ্ড: ১, পৃ.-১৪-২০

শিয়াদের গ্রন্থের হাদিস -৪
إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ (ص) قَالَ فِي غَدِيرِ خُمٍّ: مَنْ كُنْتُ مَوْلَاهُ فَعَلِيٌّ مَوْلَاهُ، اللَّهُمَّ وَالِ مَنْ وَالَاهُ وَعَادِ مَنْ عَادَاهُ.
রাসূলুল্লাহ (স.) গাদিরে খুমে বলেছেন, যার আমি মাওলা, আলিও তার মাওলা। হে আল্লাহ! যে আলিকে ভালোবাসে, তুমিও তাকে ভালোবাসো এবং যে আলির শত্রুতা করে, তুমিও তার শত্রুতা করো।
আল্লামা মাজলিসী (র.) বিহারুল আনোয়ার, খণ্ড: ৩৭,পৃষ্ঠা: ১১০-১৩০

শিয়াদের গ্রন্থের হাদিস -৫
রাসূলুল্লাহ (স.) বলেছেন-

“عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ (ص) بِغَدِيرِ خُمٍّ: أَلَا إِنَّ عَلِيًّا مِنِّي وَأَنَا مِنْهُ، وَهُوَ وَلِيُّ كُلِّ مُؤْمِنٍ بَعْدِي.”
ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ (স.) গাদিরে খুমে বলেছেন, জেনে রাখো, আলি আমার থেকে এবং আমি তার থেকে। সে আমার পর প্রত্যেক মুমিনের অভিভাবক (ওয়ালী)। শায়খ সাদুক (র.) কামালুদ্দীন ওয়া তামামুন নিআম, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ২৭০-২৭৫

শিয়াদের গ্রন্থের হাদিস -৬
عَنِ النَّبِيِّ (ص) أَنَّهُ قَالَ: مَنْ كُنْتُ مَوْلَاهُ فَعَلِيٌّ مَوْلَاهُ، اللَّهُمَّ وَالِ مَنْ وَالَاهُ وَعَادِ مَنْ عَادَاهُ
নবি (স.) বলেছেন: ‘যার আমি মাওলা, আলিও তার মাওলা। হে আল্লাহ! যে আলিকে ভালোবাসে, তুমিও তাকে ভালোবাসো এবং যে আলির শত্রুতা করে, তুমিও তার শত্রুতা করো। আল-কুন্দুজী আল-হানাফী ইয়ানাবিউল মাওয়াদ্দাহ, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ৪২

আব্দুল হুসাইন আল-আমিনী ও তার গ্রন্থ আল-গাদীরের ভাষ্য :
শিয়া আলিমগণ এ ঐতিহাসিক ঘটনা সম্পর্কে বেশ কিছুসংখ্যক মূল্যবান গ্রন্থ রচনা করেছেন। এসব গ্রন্থের মধ্যে ঐতিহাসিক ‘আল গাদীর’ গ্রন্থ সামগ্রিক ও পূর্ণাঙ্গ, যা বিখ্যাত শিয়া লেখক আব্দুল হুসাইন আল‑আমিনী (১৪০০ হি.) বিশাল ২০ খণ্ডে সমাপ্ত করেছেন। তিনি তার গ্রন্থে গাদীরে খুমের দিন ঘটেছে এবং এটি আলির (রা.) ইমামত ও নেতৃত্ব ঘোষণার সাথে সম্পর্কিত বিষয়টি বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। আল‑আমিনী বলেন, যখন রাসূলুল্লাহ ﷺ বিদায় শেষ করে ১০ হিজরির ১৮ জিলহজ নয়মাসে গাদীর‑খুম নামক স্থানে অবস্থান করেন, তখন জিব্রাঈল (আ.) তাঁর কাছে নিম্নলিখিত বার্তা নিয়ে আসে। আল্লাহ বানী-
یٰۤاَیُّہَا الرَّسُوۡلُ بَلِّغۡ مَاۤ اُنۡزِلَ اِلَیۡکَ مِنۡ رَّبِّکَ ؕ وَاِنۡ لَّمۡ تَفۡعَلۡ فَمَا بَلَّغۡتَ رِسَالَتَہٗ ؕ
হে রাসূল, তোমার রবের পক্ষ থেকে তোমার নিকট যা নাজিল করা হয়েছে, তা পৌঁছে দাও আর যদি তুমি না কর তবে তুমি তাঁর রিসালাত পৌঁছালে না। সুরা মায়েদা : ৬৭
এরপর নিজে মঞ্চে উঠে তাকবীর-ধ্বনি উচ্চারণ করেন, অতঃপর তিনি বললেন, “মহান আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি যে, তিনি তাঁর দ্বীনকে পূর্ণতা প্রদান করেছেন এবং তাঁর নেয়ামত চূড়ান্ত করেছেন এবং আমার পর আলির ওয়াসায়াত এবং বেলায়েতের এবং ইমামতের ব্যাপারে সন্তুষ্ট হয়েছেন ” এরপর মহানবি ﷺ উঁচু স্থান থেকে নিচে নেমে এসে আলি (আঃ) কে একটি তাঁবুর নীচে বসার জন্য বললেন, যাতে মুসলিম নেতৃবৃন্দ ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ তাঁর সাথে মুসাফাহা করে তাঁকে অভিনন্দন জানান।
সবার আগে আবু বকর ও উমর আলিকে অভিনন্দন জ্ঞাপন করেন এবং শুভেচ্ছা জানান এবং তাঁকে তাঁদের ‘মাওলা’ (নেতা) বলে অভিহিত করেন। হাসসান ইবনে সাবিত এ সুযোগের সদ্ব্যবহার করে মহানবি ﷺ এর কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে তৎক্ষণাৎ একটি কবিতা রচনা করেন এবং তা মহানবি ﷺ এর সামনে আবৃত্তি করেন। আমরা এখানে এ কবিতার মাত্র দু’টি পঙ্ক্তির উদ্ধৃতি দিচ্ছি- “অতঃপর তিনি তাঁকে বললেন, হে আলি ! উঠে দাঁড়াও।
কারণ আমি তোমাকে আমার পরে ইমাম (নেতা) ও পথপ্রদর্শক মনোনীত করেছি।
অতএব, আমি যার মাওলা (অভিভাবক), সেও তার ওয়ালী ।
তাই তোমরা সবাই তার সত্যিকার সমর্থক ও অনুসারী হয়ে যাও।”

আল‑আমিনী আরও লিখেন, এ হাদিস সকল যুগে ও সবসময় মহানবি ﷺ এর সকল সাহাবির ওপর মাওলা আলি (আঃ) এর শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদার সবচেয়ে বড় দলিল। এমনকি আমীরুল মুমিনীন আলি (আঃ) দ্বিতীয় খলীফার ইন্তেকালের পর নতুন খলীফা নিযুক্তকারী পরামর্শ বা শুরা সভার অধিবেশনে, উসমানের খিলাফতকালে এবং তাঁর নিজের খিলাফতকালে এ হাদিসের দ্বারা খিলাফত সংক্রান্ত তাঁর দাবী উত্থাপন এবং এ সংক্রান্ত যুক্তি পেশ করেছিলেন। এছাড়াও বড় বড় মুসলিম মনীষী, আলি (আঃ) এর রিরোধী ও খিলাফত সংক্রান্ত তাঁর অধিকার অস্বীকারকারীদের বিপক্ষে এ হাদিসের মাধ্যমে যুক্তি-প্রমাণ পেশ করেছেন। (‘চিরভাস্বর মহানবি ﷺ দ্বিতীয় খণ্ড ।

তারা এর সাথে আরও একটি জাল হাদিস বেশ ঘটা করে প্রচার করে যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ বিদায় হজ্জ থেকে ফেরার সময় গাদিরে খুম নাম স্থানে এক লক্ষও অধিক সাহাবি সামনে আলি (রা.) কে খেলাফত দান করেন। (এই জাল হাদিস সম্পর্কে নাসির উদ্দির আলবানি বলেন, এই হাদিস টি এক লক্ষেরও অধিক সাহাবি সামনে বলা হয়েছে অথচ বর্ণনা কারি ঐ একজন সাহাবি ছাড়া আর কেহই হাদিসটি বর্ণনা করে নাই। যঈফ ও মওজু হাদিসের সংকলন, পৃষ্ঠা ৩৮

গাদিরে খুম সম্পর্কে শিয়াদের দাবি
শিয়াদের দাবি গাদিরে খুমের ভাষণে মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ ﷺ মুসলিম উম্মাহর জন্য গুরুত্বপূর্ণ দিক নির্দেশনা ছিল। তার মাঝে প্রথমটি ছিল ‘কুরআন ও আহলে বাইতের’ অনুসরণের আদেশ। দ্বিতীয়টি ছিল আলি (রা.) এর ‘অভিষেক’, অর্থাৎ আলি (রা.) কে মুসলিম জাতির মওলা (অভিভাবক) ঘোষণা করা। তাই রাসূলুল্লাহ ﷺ এর ওফতের পর মুসলিম উম্মার খেলাফতের এক মাত্র উত্তারাধীকারি আলি (রা.)। তাদের বিশ্বাস আলি (রা.) এর আগের তিনজন মুসলীম খলীফাগণ অবৈধ এবং অন্যায়ভাবে ক্ষমতা দখল করেছে। (নাউজুবিল্লাহ)

তাদের দাবির যৌক্তিকতা :
উপরদের আলোচিত সহিহ হাদিসগুলো থেকে এ কথা সত্য যে রাসূলুল্লাহ ﷺ বিদায় হজ্জ থেকে ফেরার পথে গাদীরে খুম নামক স্থানে ভাষণ দিয়েছিলেন এবং যা সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম, মসনদে আহম্মদ সহ অনেক হাদিস গ্রন্থে সহিহ সনদে বর্ণিত হয়েছে। উক্ত হাদিস দ্বারা আহলে বাইত তথা আলি (রা.) মর্যাদা প্রমাণিত এবং কুরআন ও আহলে বাইতের অনুসরণ করতে বলা হয়েছে। হাদিসগুলো মন দিয়ে অধ্যায় করলে দেখা যাবে সহিহ বুখারী ও সহিহ মুসলিমের বর্ণিত অন্যান্য হাদিসের মাঝে সামান্য পার্খক্য আছে। সহিহ বুখারী ও সহিহ মুসলিমের হাদিসটির মাঝে অতিরিক্ত অংশ টুকু নেই যা অন্য হাদিস গ্রন্থে এসেছে। এই হাদিসগুলো অনেক মুহাদ্দিস সহিহ বলে রায় প্রদান করছেন। যদিও ইবন তাইমিয়াহ সহ কিছু প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস এর বাইরের কোন বর্ণনাকে সহিহ বলেননি। অপর পক্ষে শিয়া আলেমদের বর্ণিত প্রথম হাদিটিতে অনেক মনগড়া কথা ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে। হাদিসগুলোর শেষের দিকে অতিরিক্ত কথাকে ফুলিয়ে ফাপিয়ে বলে আলি (রা.) এর মর্যাদা বর্ণনা করা হয়েছে।

যদি আলোচনার স্বার্থে আমরা উপরের হাদিসের অতিরিক্ত বর্ণনাকে সহিহ ধরে নেই, তা হলে তাদের বক্তব্য সার কথা হবে- আমি যার মাওলা, আলিও তার মাওলা। এই কথাটুকু সহিহ বুখারি ও মুসলিম বাদে অন্য হাদিসের উল্লেখ আছে। তাদের হাদিসে দেখতে পেয়েছি এই অতিরিক্ত বর্ণনার বাইরেও আরো অনেক বাড়তি বর্ণনা রয়েছে যার সবই শিয়াদের তৈরি বা জাল করা। অধিকাংশ শিয়া স্কলার রেফারেন্স হিসাবে এই দুই বর্ণনার অতিরিক্ত অতিরঞ্জিত বর্ণনাগুলো বলেন না। তবে দুঃখজনক বিষয় হলো যে, গাদির খুমের হাদিসটি বর্ণনার ক্ষেত্রে তারা বুখারী ও মুসলিমের রেফারেন্স উল্লেখ করলেও প্রায় সকল ক্ষেত্রে অতিরিক্ত বর্ণনাগুলি একই সাথে চালিয়ে দেয় যদিও সেগুলো বুখারী-মুসলিমে নেই।
শিয়া আলেমগণ প্রায়ই বলে থাকে, গাদিরে খুমের এ মহান ঐতিহাসিক ঘটনা রাসূলুল্লাহ ﷺ এর ১১০ জন সাহাবি বর্ণনা করেছেন। তাবেয়ীগণের যুগেও ৮৯ জন তাবেয়ী এ হাদিস বর্ণনা করেছেন। পরবর্তী শতকসমূহে হাদিসে গাদীরের রাবিগণ সবাই আহলে সুন্নাতের আলেম। তাঁদের মধ্য থেকে ৩৬০ জন এ হাদিস তাঁদের নিজ নিজ গ্রন্থে সংকলন ও উল্লেখ করেছেন। হিজরী তৃতীয় শতকে ৯২ জন আলেম, চতুর্থ শতকে ৪৩ জন, পঞ্চম শতকে ২৪ জন, ষষ্ঠ শতকে ২০ জন, সপ্তম শতকে ২১ জন, অষ্টম শতকে ১৮ জন, নবম শতকে ১৬ জন, দশম শতকে ১৪ জন, একাদশ শতকে ১২ জন, দ্বাদশ শতকে ১৩ জন, ত্রয়োদশ শতকে ১২ জন এবং চতুর্দশ শতকে ২০ জন আলেম এ হাদিস বর্ণনা করেছেন।
মজার ব্যাপার হল তাদের এই কথা সত্য হলেও এর মাঝে সূক্ষ্ম কারচুপি আছে। সাহাবি বা মুহাদ্দিসগনের বর্ণিত সকল হাদিসের মূল কথাগুলো এই গ্রন্থের উপরে বর্ণিত হাদিসের মত। কিন্তু শিয়া আলেমগণ প্রতিটি হাদিসে অতিরিক্ত অংশ যোগ করে আলি (রা.) কে খেলাফতের উত্তারাধীকারি প্রমাণের ব্যর্থ চেষ্টা করেছে।
যাহোক আলি (রা.) এর খেলাফতের উত্তারাধীকারি অংশ টুকু মিথ্যা হলেও তাদের এ (আমি যার মাওলা, আলিও তার মাওলা) কথাটি আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের অনেক মুহাদ্দস উল্লখ করছেন। এখান হাদিসে রাসূলুল্লাহ ﷺ মাওলা শব্দটি ব্যবহার করছেন।
‘মাওলা’ একটা আরবি শব্দটি। মাওলা শব্দটি মহান আল্লাহ কুরআনে কয়েক স্থানে উল্লেখ করেছে। যেমন সুরা বাকারার ২৮৫ নম্বর আয়াতে তিনি (আল্লাহ) নিজে মাওলা বা প্রভু হিসেবে উল্লেখ করেছেন। আরবি ভাষায় অনেক শব্দেরই একাধিক অর্থ থাকে ঠিক তেমনি মাওলা শব্দটিরও একাধিক অর্থ আছে। আর এই বহু অর্থেরই সুযোগ গ্রহণ করেছে শিয়ারা অন্যায়ভাবে। যেমন ‘মাওলা’ এর অর্থ হতে পারে কর্তা, মালিক, বন্ধু, অভিভাবক, ভালোবাসার মানুষ, আযাদকৃত দাস, দাস, কাজিন ইত্যাদি। মাওলা দিয়ে যেমন বন্ধু বুঝায় একই শব্দ দিয়ে এমনকি আল্লাহকেও বুঝায় বাক্যের গতি অনুসারে। এখানে মাওলা শব্দের অর্থ ‘ভালোবাসার মানুষ’ হিসাবে রাসুলুল্লাহ ﷺ ব্যবহার করেছেন, যা শিয়ারা না মেনে বরং ‘ইমাম’, ‘খলিফা’ কিংবা ‘ক্ষমতার উত্তরাধিকারী’ হিসাবে এর অর্থ করে।
গাদির খুমের হাদিস নিয়ে শিয়া বাড়া বাড়ির ভয়াবহতা সত্য থেকে তাদের অনেক দূরে ঠেলে দিয়েছে। খিলাফতের উত্তরাধিকারের মতো সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ একটি ব্যাপার রাসুলুল্লাহ ﷺ এমন কুয়াশাচ্ছন্ন কথা দিয়ে মুড়িয়ে রাখবেন তা হতে পারে না এবং তা রাসুল ﷺ এর ব্যক্তিত্বের সাথে যায় না। গাদির খুমের ঘটনাটি যখন ঘটেছে তখন সেখানে ছিল মদীনাবাসী সাহাবাগণ। এর সামান্য কিছুদিন আগে বিদায় হজে তিনি মক্কা, মদীনা নির্বিশেষে সকল সাহাবাকে কাছে পেয়েছেন। সে হিসাবে এমন গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণার জন্য বিদায় হজ্জের ভাষণ ছিল সেরা সময়, কিন্তু তিনি তখন এ ব্যাপারে কিছুই বলেননি। এই সময়ের আগে কিংবা পরে অসংখ্যবার মুহাজির ও আনসার শীর্ষস্থানীয় সাহাবগণ রাসুলের সাথে বিভিন্ন সময় বসেছেন এবং পরামর্শ করেছেন। আলি (রা.) এর খলিফা হওয়ার মতো এমন গুরুত্বপূর্ণ কথা রাসুল ﷺ কাউকে বলেননি।
গাদির খুমের ঘটনায় রাসুল ﷺ আলি সম্পর্কে যেভাবে বলেছেন, একইভাবে কিংবা এর চেয়ে জোরালোভাবে তিনি অন্য সাহাবাদের প্রসঙ্গেও অনেকবার বলেছেন। আবু বকরের কথা সরাসরি কুরআনে এসেছে। উমার প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, “আল্লাহর শপথ উমার, তুমি যে পথে হাঁটো, শয়তান সে পথে আসেনা” (বুখারী)। উমার (রা.) প্রসঙ্গে তিনি আরো বলেছেন, “আমার পর যদি কোন নবি হতো তা হতো উমার।। তিনি আরো বলেছেন, “উমারের সাথে যদি কেউ রাগান্বিত হলো সে যেন আমার উপর রাগান্বিত হলো এবং উমারকে যে ভালোবাসলো, সে যেনো আমাকেই ভালোবাসলো। উমার (রা.) এই হাদিসগুলো জানার পরও এগুলোকে তার প্রথম খলিফা হিসাবে মনোনয়নের জন্য ব্যবহার করেননি বা করতে দেননি।
আবু উবাইদাহ ইবনুল জাররাহ প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, “প্রত্যেক নবির উম্মাহর মধ্যে একজন থাকে যে হয় ওই উম্মাহর সবচেয়ে বিশ্বস্ত। আমার উম্মাতের ভেতর সেই লোকটি হলো আবুউবাইদাহ। মুয়াজ ইবন জাবাল (রা.) কে তিনি বলেছেন, “ওহে মুয়াজ, তুমি হলে আমার ভালোবাসার একজন। আবু জর আল গিফারী (রা.) প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, “আকাশের নিচে এবং মাটির উপর আবু জরের চেয়ে সত্যবাদী আর কেউ নেই।
এভাবে সাহাবিদের মর্যাদা সম্পর্কে অসংখ্য উদাহরণ দেয়া যাবে। তাই বলে কি, তাদের নামে আলাদা আলাদা দল গঠন করতে হবে। সকল সাহাবি আল্লাহ এবং তার রাসুল ﷺ এর নিকট প্রিয়। কারও প্রশংসা করতে গিয়ে অন্য জন কে ছোট করা হারাম কাজ। এই কাজটিই করেছে শিয়ারা। ইসলামের অন্যতম খাদেম ও খলীফা আলি (রা.) এর মর্জানা বাড়াতে গিয়ে প্রথম তিন খলীফাসহ সকল সাহাবি (রা.) এর উপর মুনাফিকের মত টাইটেল লাগিয়ে দিয়েছেন। যা তাদের ইসলাম থেকে বের করে দিয়েছে। আলি (রা.) রাসুল ﷺ এর আপন চাচার ছেলে, তার কলিজার টুকরা ফাতিমা (রা.) স্বামী, তার আদরের দুলাল হাসান, হুসাইলের পিতা সর্বপুরী তিনি আহলে বাইয়াত এর অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং তার মর্জানাকে ছোট করার সাহস কোন মুসলীম দেখাবে না। কিন্তু তাকে অন্যের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিতে কেন অন্য সাহাবিদের প্রতি মিথ্যা দুর্নাম দিব? শিয়াদের এই কাজ ইসলামের একনিষ্ঠ অনুসারী সাহাবিদের সাথে চরম বেয়াদবি ছাড়া কিছু নয়। মহান আল্লাহই ভাল জানেন।

শরীয়তের দৃষ্টিতে আশুর ও শিয়াদের উদ্‌যাপন

শরীয়তের দৃষ্টিতে আশুর ও শিয়াদের উদ্‌যাপন
মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

ইসলামি শরীয়তের কিছু পর্ব বা দিবস আছে, যা মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কতৃর্ক নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। এই সকল দিনে সুন্নাহ মোতাবেক আমল করলে বহু নেকি পাওয়া যায়। এমনি একটা দিবসের নাম আশুরা। হিজরী সনের প্রথম মাস মহররমের দশ তারিখ আশুরা নামে পরিচিত। মুসলিম উম্মাহর দ্বারে কড়া নাড়ে প্রতি বছর। এ মাস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় আমাদের প্রিয় নবি মুহাম্মাদ ﷺ-এর হিজরত ও তার দাওয়াতী জিন্দেগি শুরু ও ইসলাম প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের কথা। এ মাসে রয়েছে এমন একটি দিন, দীর্ঘ সংগ্রাম শেষে যে দিনে নবি মুসা (আ.) এর বিজয় হয়েছিল। পতন হয়েছিল তখনকার সবচেয়ে শক্তিশালী জালেম সম্রাট ফেরাউন ও তার সম্রাজ্যের। সে দিনটিই হল আশুরা বা মুহাররম মাসের দশ তারিখ। আশুরা একটি আরবি শব্দ। আবরী যে কোন মাসের দশ তারিখের বিশেষণকে আরবিতে বলা হয় আশুরা। আরবিতে আশারা মানে হল দশ। এই আশারা থেকে আশুরা বুঝায়। কিন্তু অনারবদের অধিকাংশের নিকট আশুরা মানে মহররমের দশ তারিখ। মহররম মাসের দশ তারিখকে নির্দিষ্ট করে বলা হয় ‘আশুরায়ে মহররম’। কিছু বিশেষ কারণে এ দিনটি আল্লাহর কাছে খুব প্রিয়, তাই তিনি এ দিনে রোজা পালন ও নফল ইবাদত করায় সওয়াব প্রদান করে থাকেন বহুগুণে।

আশুরার পটভূমি এবং সিয়ামের ফজিলত
আশুরার বৈশিষ্ট্য ও তার সিয়ামের ফজিলাত সম্পর্কে বিশেষ কিছু লেখার প্রয়োজন নাই, সহিহ হাদিসগুলি অধ্যায় করলেই মোটামুটি একটা ধারণা হবে। তাই এ সম্পর্কিত কিছু হাদিস তুলে ধরব শিরোনামসহ উল্লেখ করছি।

১. আশুরার সিয়ামের পটভূমি সম্পর্কিত হাদিস
আবূ মূসা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-
كَانَ يَوْمُ عَاشُورَاءَ تَعُدُّهُ الْيَهُودُ عِيدًا، قَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم ‏ “‏ فَصُومُوهُ أَنْتُمْ‏
আশুরার দিনকে ইয়াহুদীগণ ঈদ মনে করত। নবি ﷺ বললেন, তোমরাও এ দিনে সিয়াম পালন কর। সহিহ বুখারি : ২০০৫

ইবনু ‘আব্বাস হতে বর্ণিত-
قَدِمَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم الْمَدِينَةَ، فَرَأَى الْيَهُودَ تَصُومُ يَوْمَ عَاشُورَاءَ، فَقَالَ ‏”‏ مَا هَذَا ‏”‏‏.‏ قَالُوا هَذَا يَوْمٌ صَالِحٌ، هَذَا يَوْمٌ نَجَّى اللَّهُ بَنِي إِسْرَائِيلَ مِنْ عَدُوِّهِمْ، فَصَامَهُ مُوسَى‏.‏ قَالَ ‏”‏ فَأَنَا أَحَقُّ بِمُوسَى مِنْكُمْ ‏”‏‏.‏ فَصَامَهُ وَأَمَرَ بِصِيَامِهِ‏.‏
তিনি বলেন, রসুলুল্লাহ ﷺ মাদীনায় গমন করার পর দেখলেন ইহুদিরা ‘আশুরার দিন সিয়াম রাখে। রসুলুল্লাহ ﷺ তাদের জিজ্ঞেস করলেন, এ দিনটার বৈশিষ্ট্য কি যে, তোমরা সিয়াম রাখো? তারা বলল, এটা একটি গুরুত্ববহ দিন। এ দিনে আল্লাহ তা‘আলা মূসা (আ.) ও তাঁর জাতিকে মুক্তি দিয়েছেন। আর ফিরাউন ও তার জাতিকে (সমুদ্রে) ডুবিয়েছেন। মূসা (আ.) শুকরিয়া হিসেবে এ দিন সিয়াম রেখেছেন। অতএব তাঁর অনুসরণে আমরাও রাখি। এ কথা শুনে রসুলুল্লাহ ﷺ বললেন, দীনের দিক দিয়ে আমরা মূসার বেশী নিকটে আর তার তরফ থেকে শুকরিয়া আদায়ের ব্যাপারে তোমাদের চেয়ে আমরা বেশী হকদার। বস্তুত ‘আশুরার দিন রসুলুল্লাহ ﷺ নিজেও সিয়াম রেখেছেন অন্যদেরকেও রাখার হুকুম দিয়েছেন। সহিহ বুখারি : ২০০৪, সহহি মুসলিম : ১১৩০, সুনানে ইবনু মাজাহ : ১৭৩৪, মিশকাত : ২০৬৭, আহমাদ ৩১১২

২. আশুরার সিয়ামের গুরুত্ব
রমজানের সিয়াম ফরজ হওয়ার পূর্বে রাসূলুল্লাহ ﷺ আশুরার আশুরার সিয়াম রাখতে আদেশ করেছেন। কিন্তু রমজানের সিয়াম ফরজ হওয়ার পর তিনি তার উম্মতের ইচ্ছার উপর ছেড়ে দিয়েছেন।
আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-
كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم أَمَرَ بِصِيَامِ يَوْمِ عَاشُورَاءَ، فَلَمَّا فُرِضَ رَمَضَانُ كَانَ مَنْ شَاءَ صَامَ، وَمَنْ شَاءَ أَفْطَرَ‏.‏
রাসূলুল্লাহ ﷺ প্রথমে আশুরার পালনের নির্দেশ দিয়েছিলেন, পরে যখন রমযানের সিয়াম সিয়াম ফরজ করা হল তখন যার ইচ্ছা আশুরার সিয়াম পালন করত আর যার ইচ্ছা করত না। সহিহ বুখারি : ২০০১

৩. আশুরার দিনের সিয়ামের ফজিলত
হুরায়রাহ্ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-
‏ أَفْضَلُ الصِّيَامِ بَعْدَ رَمَضَانَ شَهْرُ اللَّهِ الْمُحَرَّمُ وَأَفْضَلُ الصَّلاَةِ بَعْدَ الْفَرِيضَةِ صَلاَةُ اللَّيْلِ
রমজানের সিয়ামের পর সর্বোত্তম সওম হচ্ছে আল্লাহর মাস মুহাররমের সওম এবং ফারজ সালাতের পর সর্বোত্তম সালাত হচ্ছে রাতের সালাত। সহিহ মুসলিম : ১১৬৩, সুনানে আবূ দাঊদ : ২৪২৯, সুনানে তিরমিযী : ৪৩৮, সুনানে নাসায়ী : ১৬১৩, মিশকাত : ২০৩৯

আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি কখনো নবি ﷺ কে সিয়াম পালনের ক্ষেত্রে ‘আশুরার দিনের সিয়াম ছাড়া অন্য কোন দিনের সিয়ামকে এবং এ মাস অর্থাৎ রমাযান ছাড়া অন্য কোন মাসের সিয়ামকে অধিক মর্যাদা দিতে দেখিনি। সহিহ বুখারী : ২০০৬, সহিহ মুসলিম : ১১৩২, মিশকাত : ২০৪০

৪. আশুরার সিয়াম বিগত এক বছরের গুনাহ মাপ করে
আবূ কাতাদাহ আল-আনসারী (রা.) হতে বর্ণিত-

  • أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ – صلى الله عليه وسلم – سُئِلَ عَنْ صَوْمِ يَوْمِ عَرَفَةَ، قَالَ: «يُكَفِّرُ السَّنَةَ المَاضِيَةَ وَالبَاقِيَةَ» وَسُئِلَ عَنْ صِيَامِ يَوْمِ عَاشُورَاءَ، فَقَالَ: «يُكَفِّرُ السَّنَةَ المَاضِيَةَ» وَسُئِلَ عَنْ صَوْمِ يَوْمِ الاثْنَيْنِ، قَالَ: «ذَاكَ يَوْمٌ وُلِدْتُ فِيهِ، وَبُعِثْتُ فِيهِ، أَوْ أُنْزِلَ عَلَيَّ فِيهِ» رَوَاهُ مُسْلِمٌ
    রাসুলুল্লাহ (ﷺ) ‘আরাফাহর দিনে সওম সম্বন্ধে জিজ্ঞাসিত হয়ে বললেন-এর দ্বারা বিগত ও আগত এক বছরের গুনাহ মোচন হয়। আশুরাহর দিনের সিয়াম পালন সম্বন্ধে জিজ্ঞাসিত হয়ে বললেন-বিগত এক বছরের পাপ মোচন হয়। সোমবারের দিনে সওম পালন সম্বন্ধে জিজ্ঞাসিত হয়ে বললেন, এটা সেদিন যেদিন আমি জন্মেছি এবং নুবুওয়াত লাভ করেছি আর আমার উপর (কুরআন) অবতীর্ণ হয়েছে।” সহিহ মুসলিম : ১১৬২, সুনানে তিরমিযী : ৬৭৬, সুনানে নাসায়ী : ২৩৮২, সুনানে আবু দাউদ : ২৪২৫, সুনানে ইবনু মাজাহ : ১৭১৩, আহমাদ : ২২০২৪

৫. আশুরার দিনে দুটি সিয়াম রেখে ইহুদিদের বিরোধিতা করা
ইবনে আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন-
«لَئِنْ بَقِيتُ إِلَى قَابِلٍ لأَصُومَنَّ التَّاسِعَ»
“আগামী বছর যদি আমি বেঁচে থাকি, তাহলে মুহাররম মাসের নবম তারিখে অবশ্যই রোযা রাখব। সহিহ মুসলিম : ১১৩৪
আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ যখন আশুরার দিন সিয়াম পালন করেন এবং লোকদেরকে সিয়াম পাননের নির্দেশ দেন তখন সাহাবিগণ বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! ইহুদি এবং নাসারা এ দিনের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে থাকে। এ কথা শুনে রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন, ইনশাআল্লাহ আগামী বছর আমরা নবম তারিখেও সিয়াম পালন করব। বর্ণনাকারী বলেন, এখনো আগামী বছর আসেনি, এমতাবস্থায় রাসুলুল্লাহ ﷺ এর ইন্তেকাল হয়ে যায়। সহিহ মুসলীম : ২৫৩৭ ইফকাঃ

আব্দুল্লাহ ইবনু ’আব্বাস (রাযি.) বলেন, নবি ﷺ যখন নিজে আশুরার দিন সওম রাখলেন এবং আমাদেরকেও এ সওম পালনের নির্দেশ দেন, তখন লোকেরা বললো, হে আল্লাহর রাসূল! ইহুদি ও খ্রিস্টানরা এ দিনটিকে সম্মান করে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, আগামী বছর এলে আমরা নবম দিন সওম পালন করবো। কিন্তু আগামী বছর না আসতেই রাসূলুল্লাহ ইন্তেকাল করেন। আবূ দাউদ : ২৪৪৫, আহমাদ : ২১০৭, ২৬৩৯, সুনানে দারেমী : ১৭৫৯

ভাবে বহু হদিস দ্বারা আশুরার সিয়ামের হুকুম ও ফজিলত প্রমাণিত। চান্দ্রমাস মুহাররমের দশ তারিখ কে আশুরার দিন বলা হয়। তবে হাদিসের আলোকে বলা যায় এই মাসের ৯ ও ১০ তারিখ এ দু’দিন রাখা উত্তম। অথবা ১০ ও ১১ তারিখেও রাখা যায়। শুধুমাত্র ১০ তারিখে সিয়াম রাখাকে উলামায়ে কিরাম মাকরুহ বলেছেন। এই দিনের সিয়াম পালনের সাথে ইমাম হুসাইন (রা.) এর শহীদ হওয়ার কোন সম্পর্ক নেই। এই সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা পরে আসবে। আশুরার এ দিনটি পূর্ববর্তী যামানার নাবীদের সময় থেকেই অতীব গুরুত্বপূর্ণ ও ফযীলতপূণ দিন হিসেবে গণ্য হয়ে আসছে। এ দিনে মূসা (আ.) কে ফিরআউনের হাত থেকে আল্লাহ রক্ষা করেছিলেন। তবে এ দিনের অনেক কাহিনি শোনা যায় যার কিছু হল দুর্বল, আর বেশির ভাগই তথ্য নির্ভর নয়। এরপরও এ দিনটি আল্লাহর কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও মর্যাদা সম্পন্ন।

আশুরা সম্পর্কিত জাল বর্ণনাসমূহ :
কিন্তু খুবই দুঃখের বিষয় জালিয়াতগন এ সম্পর্কেও বহু জাল হাদিস রচনা করেছে। আশুরা সম্পর্কে কয়েকটি জাল হাদিস তুল ধরছি।

১. মুহাররম বা আশুরার সিয়ামের ফজিলত।
রাসূলুল্লাহ (সা.) এর নামে এই সম্পর্কে জাল হাদিসগুলি হলো :


ক. যে ব্যক্তি আশুরার দিন রোজা রাখে, তা তার চল্লিশ বছরের গোনাহের কাফ্ফারা হয়ে যায়।


খ. মহররম মাসে ইবাদতকারী ব্যক্তি যেন ক্বদরের রাত্রির ইবাদতের ফযীলত লাভ করিল।


গ. আশুরার তারিখে রোজা আদায়কারীর আমলনামার সাত আসমান-জমিনের অধিবাসীদের সওয়াব লিখে দেওয়া হয়।


ঘ. হাদিসে আছে, যে ব্যক্তি মহররমের মাসে রোযা রাখিবে, আল্লাহ তা‘আলা তাহাকে প্রত্যেক রোযার পরিবর্তে ৩০ দিন রোযা রাখার সমান সওয়াব দিবেন।
ঙ. মহররমের ১০ তারিখে রোজা রাখা আদম (আ.) ও অন্যান্য নবিদের উপর ফরজ ছিল। এই দিবসে ২০০০ নবি জন্মগ্রহণ করিয়াছেন এবং ২০০০ নবির দোয়া কবুল করা হইয়াছে।


চ. আরও হাদিসে আছে, যে ব্যক্তি আশুরার দিন একটি রোযা রাখিবে সে দশ হাজার ফেরেশতার, দশ হাজার শহীদের ও দশ হাজার হাজীর সওয়াব পাইবে।


ছ. আরও হাদিসে আছে, যে ব্যক্তি আশুরার তারিখে স্নেহ-পরবশ হইয়া কোন এতিমের মাথায় হাত ঘুরাইবে, আল্লাহতাআলা ঐ এতিমের মাথার প্রত্যেক চুলের পরিবর্তে তাহাকে বেহেশতের এক একটি ‘দরজা’ প্রদান করিবেন। আর যে ব্যক্তি উক্ত তারিখের সন্ধ্যায় রোযাদারকে খানা খাওয়াইবে বা ইফতার করাইবে, সে ব্যক্তি সমস্ত উম্মতে মোহাম্মদীকে খানা খাওয়াইবার ও ইফতার করাইবার ন্যায় সওয়াব পাইবে।


জ. নবি (সা.) বলিলেন, যে ব্যক্তি আশুরার তারিখে রোযা রাখিবে, সে ৬০ বৎসর রোযা সালাত করার সমতুল্য সওয়াব পাইবে। যে ব্যক্তি ঐ তারিখে বিমার পোরছী করিবে, সে সমস্ত আওলাদে আদমের বিমার-পোরছী করার সমতুল্য সওয়াব পাইবে।… তাহার পরিবারের ফারাগতি অবস্থা হইবে। ৪০ বৎসরের গুনাহর কাফ্ফারা হইয়া যাইবে।


ঝ. রাসূলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করিয়াছেন, যে ব্যক্তি মহররম মাসের প্রথম ১০ দিন রোজা রাখিবে, সে ব্যক্তি যেন ১০ হাজার বৎসর যাবত দিনের বেলা রোজা রাখিল এবং রাত্রিবেলা ইবাদতে জাগরিত থাকিল। … মহররম মাসে ইবাদতকারী ব্যক্তি যেন ক্বদরের রাত্রির ইবাদতের ফযীলত লাভ করিল।… তোমরা আল্লাহ তা‘আলার পছন্দনীয় মাস মহররমের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করিও। যেই ব্যক্তি মহররম মাসের সম্মান করিবে, আল্লাহ তাআলা তাহাকে জান্নাতের মধ্যে সম্মানিত করিবেন এবং জাহান্নামের আজাব হইতে বাঁচাইয়া রাখিবেন… মহররমের ১০ তারিখে রোজা রাখা আদম (আ.) ও অন্যান্য নবিদের উপর ফরজ ছিল। এই দিবসে ২০০০ নবি জন্মগ্রহণ করিয়াছেন এবং ২০০০ নবির দোয়া কবুল করা হইয়াছে। এই জাল কথাগুলি পাবেন।


মাওলানা গোলাম রহমান, মকছুদোল মো’মেনীন, পৃষ্ঠা-৪৩০-৪৩১; মুফতী হাবীব ছামদানী, বার চান্দের ফযীলত, পৃষ্ঠা-১৩; অধ্যাপিকা কামরুন নেসা দুলাল, পৃষ্ঠা-২৯৮-৩০০।

হাদিস জাল বলেছেন-
ইবনুল জাওযী (৫৯৭ হি.), আল-মাউদআত, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা-১১২-১১৩; শামছুদ্দীন আয-যাহাবী (৭৪৮ হি.), মিজানুল ইতিদাল, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা-৪৫১-৪৫২; ইমাম হাসান আস-সাগানী (৬৫০ হি.), আল-মাউদুআত, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা-৫৬৮-৫৭২; ইবনে হাজার আসকালানী (৮৫২ হি.), লিসানুল মিজান, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা-৫৪৬-৫৪৮; ইমাম জালালুদ্দিন সুয়ুতী (৯১১ হি.), আল-লাআলি, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা-১০৮-১০৯ ।
ইমাম শাওকানী (১২৫০ হি.), আল ফাওয়ায়েদুল মাজমুয়াহ, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা-১২৯-১৩০; ইবনে আররাক (৯৩২ হি.), তানযীহুশ শরিয়াহ, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা-১৪৯-১৫১; আব্দুল হাই লাখনবি (১৩০৪ হি.), আল আসার, পৃষ্ঠা-৯৪-৯৫; মোল্লা আলি কারী (১০১৪ হি.), আল আসরারুল মারফুআহ, পৃষ্ঠা-৯৪-৯৬; হাদিসের নামে জালিয়াতি, অষ্টম পরিচ্ছেদ, পৃষ্ঠা নম্বর-৫০৯; এসব হাদিস, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা-১১৯।

২. আশুরার সম্পর্কে সমাজে বহুল প্রচলিত মিথ্যা ঘটনাবলি।
আমাদের সমাজে ব্যাপকভাবে এই জাল কাথাগুলি বলা হয়
দশই মহাররম বা আশুরার দিন আল্লাহ আসমান ও জমিন, পাহাড়, পর্বত, নদনদী, কলম, লাওহে মাহফুজ, আরশ, কুরসি, জান্নাত, জাহান্নাম, ফিরিশতাগণ, আদম (আ.) কে সৃষ্টি করেছেন। এই দিনে তিনি আদম (আ.) কে জান্নাতে প্রবেশ করিয়েছেন, ইদরীসকে (আ.) আসমানে উঠিয়ে নেন, নূহ (আ.) কে নৌকা থেকে বের করেন, দাউদ (আ.) তাওবা কবুল করেছেন, সুলাইমান (আ.) কে রাজত্ব প্রদান করেছেন, আইঊব (আ.)-এর বিপদ-মসিবত দূর করেন, তাওরাত নাজিল করেন, ইবরাহীম (আ.) জন্মগ্রহণ করেন, তিনি খলীল উপাধি লাভ করেন, ইবরাহীম (আ.) নমরূদের অগ্নিকুন্ডু থেকে রক্ষা পান, ইসমাঈল (আ.) কে কুরবানি করা হয়েছিল, ইউনূস (আ.) মাছের পেট থেকে বাহির হয়, ইউসূফকে (আ.) জেলখানা থেকে বের করেন, এ দিনে ইয়াকুব (আ.) দৃষ্টি শক্তি ফিরে পান, ইয়াকূব (আ.) ইউসূফের (আ.) সাথে সম্মিলিত হন, মুহাম্মাদ ﷺ জন্মগ্রহণ করেছেন।
আদম (আ.) এর তাওবা কবুল, নূহ (আ.) এর নৌকা জুদী পর্বতের উপর থামা ও ঈসা (আ.) জন্মগ্রহণ সম্পর্কে অনির্ভরযোগ্য সূত্রে কোনো কোনো সাহাবি-তাবিয়ী থেকে বর্ণিত।

কথাগুলিকে জাল হাদিস বলেছেন,
ইবনুল জাওযী (৫৯৭ হি.), আল-মাউদআত, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা-১১২-১১৭; শামছুদ্দীন আয-যাহাবী (৭৪৮ হি.), মিজানুল ইতিদাল, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা-১৯০; মুহাম্মাদ ইবনুস সাইয়িদ দরবেশ হূত (১২৭৬ হি), ‘আসনাল মাতালিব, পৃষ্ঠা-২৭৭-২৭৮; ইবনে হাজার আসকালানী (৮৫২ হি.), লিসানুল মিজান, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা-১৬৯; ইমাম জালালুদ্দিন সুয়ুতী (৯১১ হি.), আল-লাআলি, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা-১০৮-১০৯; ইবনুল কাইয়িম, আল-মানার, পৃষ্ঠা-৫২; আল-আজলূনী (১১৬২ হি.), কাশফুল খাফা, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা-৫৫৭; আব্দুল হাই লাখনবি (১৩০৪ হি.), আল আসার, পৃষ্ঠা-৯৪-৯৭; মোল্লা আলি কারী (১০১৪ হি.), আল আসরারুল মারফুআহ, পৃষ্ঠা-৯৪-৯৬; ইবনে আররাক (৯৩২ হি.), তানযীহ, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা-১৪৯।ইবনুল কাইয়িম, আল-মানার, পৃষ্ঠা-৫২; হাদিসের নামে জালিয়াতী, অষ্টম পরিচ্ছেদ, পৃষ্ঠা নম্বর-৫১০; এসব হাদিস, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা-১২০।

এই সম্পর্কে একটি সহিহ হাদিস হলো-
ইবনু ‘আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) মাদীনায় গমন করার পর দেখলেন ইহুদিরা আশুরার দিন সওম রাখে। রাসূল (সা.) জিজ্ঞেস করলেন, এ দিনটার বৈশিষ্ট্য কি যে, তোমরা সিয়াম রাখো? তারা বলল, এটা একটি গুরুত্ববহ দিন। এ দিনে আল্লাহ মূসা (আ.) ও তাঁর জাতিকে মুক্তি দিয়েছেন। আর ফিরাউন ও তার জাতিকে ডুবিয়েছেন। মূসা (আ.) শুকরিয়া হিসেবে এ দিন সওম রেখেছেন। অতএব তাঁর অনুসরণে আমরাও রাখি। এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, দীনের দিক দিয়ে আমরা মূসার বেশী নিকটে আর তার তরফ থেকে শুকরিয়া আদায়ের ব্যাপারে তোমাদের চেয়ে আমরা বেশী হকদার। বস্তুত ‘আশুরার দিন রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজেও সিয়াম রেখেছেন অন্যদেরকেও রাখার হুকুম দিয়েছেন। সহিহ বুখারী : ২০০৪, সহিহ মুসলিম : ১১৩০, মিশকাত : ২০৬৭
এই দিনে আল্লাহ তায়ালা মূসা (আ.) ও তাঁর সম্প্রদায়কে মুক্তি দিয়েছেন এবং ফিরাউন ও তার
কওমকে ডুবিয়ে দিয়েছেন। এই বর্ণনাটি সত্য হলেও বাকি সব জাল।

৩. দশই মুহাররম আশুরার দিন কিয়ামত হবে।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, দশই মুহাররম ব আশুরার দিন কিয়ামত হবে।
হাদিসটি জাল বলেছেন,
আল্লামা আবুল ফরজ ইবনুল জাওযী (রহ.) মন্তব্য করেন এটা নিঃসন্দেহে মাওযু বা বানোয়াট; শায়খ আলবানি জাল বলেছেন। কিতাবুল মওযূয়াত, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা-২০২; জালালুদ্দীন আস-সুয়ূতী, আল লায়ালিল মাসনূআহ, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা-১০৯; মুহাম্মদ ইব্‌ন আলি আল-কিনানী, তানযীহুশ শরীআতিল মারফুআহ, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা-১৪৯; মাউযূ হাদিস বা প্রচলিত জাল হাদিস, হাদিস নং-১০৬।

আশুরা উপলক্ষ্যে আমরা কি করছি

আশুরা উপলক্ষ্যে আমরা কি করছি
মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

ইসলাম একটি পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থা। শরীয়তের ঈমান, আকিদা ও ইবাদাতে কোন প্রকার কমতি রাখা হয় নাই। ইবাদতের বিষয়টিকে আরও বেশী কড়াকড়ি করা হয়েছে। কাজ কীভাবে করলে ইবাদাত হবে তা রাসূলুল্লাহ ﷺ ছাড়া কেউ বলতে পারবেনা। এখন তিনি নাই, তাই কুরআন সুন্নাহর বাইরে গিয়ে কোন আমল করা যাবে না। কারণ সেই আমলের পদ্ধতি কি হবে? কখন করতে হবে? মহান আল্লাহ কতটুকু খুশি হবেন, এ সব বিষয় অহির উপর নির্ভর করা ছাড়া কোন উপায় নাই। অথচ অহির দরজা বন্ধ তাই কুরআন ও সহিহ হাদিসই একমাত্র অবলম্বন। কিন্তু আশুরার আমলে আমরা মুসলিম জাতিকে পরিষ্কার তিনটি দলে ভাগ হয়ে ইবাদত করতে দেখি। সকলে দাবি করছে আমরাই সঠিক পদ্ধতিতে আমল করছি। তিনটি দল হল-
১. সালাফি, দেওবন্দী ও আহলে হাদিস (সুন্নী মুসলিম)
২. ব্রেলভী বা পীর, মুরিদী ও মাজার কেন্দ্রিক আমলে বিশ্বাসী (সুন্নী সুমলিম)
৩. শীয়া সম্প্রদায়ের মুসলিম

১. সালাফি, দেওবন্দী ও আহলে হাদিসগণের আশুরার আমল :
উপরের আশুরা কেন্দ্রিক সহিহ হাদিসের যে বর্ণনাগুলি তুলে ধরছি আমার জানা মতে সালাফি, দেওবন্দী ও আহলে হাদিস অনুসারীগণ ঠিক ঐভাবেই আমর করে থাকে। তারা এই দিনকে হাদিসের আলোকে বিচার বিবেচনা করে মহররম মাসের দশ তারিখের সাথে মিলিয়ে দুটি সিয়াম পালন করে। তাদের কেউ কেউ নয় ও দশ তারিখ সিয়াম পালন করে আবার কেউ কেউ দশ ও এগারো তারিখ সিয়াম পান করে। তবে তারা নয় ও দশ তারিখ সিয়াম পালন মুস্তাহাব মনে করে। এদের সমজিদগুলিতে মহররমের প্রথম জুমার খুতবায় এই সম্পর্ক বিস্তারিত আলোচনা করে। এই আলোচনায় সিয়াম পালন সম্পর্কে গুরুত্ব প্রদান করা হয় এবং আশুরায় শীয়া ও ব্রেলভী বা পীর, মুরিদী ও মাজার কেন্দ্রিক আমলে বিশ্বাসীদের সম্পর্কে কঠিন সতর্ক বাণী উচ্চরণ করা হয়।
তারপরও কোন কোন অতি উৎসাহী আলেমকে আশুরার দিনে মসজিদে ওয়াজ মাহফিলের আয়োজন করতে দেখা যায়। কেউ কেউ মাহফিরের পর মিলাদ পড়ে ও মিষ্টি বিতরণ করে যদিও এদের মাঝে এই সংখ্যা কম। ইলম চর্চার ফলে সালাফি ও আহলে হাদিসদের মাঝে এই কাজ প্রায় শূন্যের কোটায়। দেওবন্দী ঘরানার আলেমগণও আস্তে আস্তে মিলাদ মহফিল থেকে বের হয়ে আসছে। কিন্তু দেওবন্দী ঘরানার অনেক আলেমকে আশুরা সম্পর্কে একটি যঈফ হাদিসে উপর আমল করার জন্য উৎসাহ প্রদান করতে দেখা যায়। যেমন-
আবু সাঈদ খুদরী (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল ﷺ ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি আশুরার দিন তার পরিবারের উপর সচ্ছলতা দেখাবে, আল্লাহ তাআলা তার জন্য উক্ত বছরকে সচ্ছল করে দিবেন। মুজামে ইবনুল আরাবী : ২২৫, আলমুজামুল আওসাত : ৯৩০২, আল মুজামুল কাবীর : ১০০০৭, শুয়াবুল ঈমান – : ৩৫১৩, ৩৫১৫, ৩৫১৬
এই হাদিসটি যারা জাল বা বানোয়াট বলেছেন,
ইবনুল জাওযী (৫৯৭ হি.), আল-মাউদআত, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃ-১১৩-১১৭; ইমাম জালালুদ্দিন সুয়ুতী (৯১১ হি.), আল-লাআলি, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃ-১০৯-২১১; মোল্লা আলি কারী (১০১৪ হি.), আল আসরার পৃষ্ঠা-২২৪,

  • ইবনে আররাক (৯৩২ হি.), তানযীহ, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা-১৫০; ইমাম শাওকানী (১২৫০ হি.), আল ফাওয়ায়েদুল মাজমুয়াহ, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা-১৩২-১৩৩; আব্দুল হাই লাখনবি (১৩০৪ হি.), আল আসার, পৃষ্ঠা-১০০-১০২; হাদিসের নামে জালিয়াতী বইয়ের অস্টম পরিচ্ছেদ, পৃষ্ঠা নম্বর-৫০৮।

দেওবন্দী আলেমগনও জানের হাদিসটি যঈফ কিন্তু তারা বলেন, ফাজায়েলের ক্ষেত্রে যঈফ হাদিসও গ্রহণ যোগ্য। তাই এই হাদিসের উপর আমল করলে কোন অসুবিধা নাই। তবে এক্ষেত্রে লক্ষ্যণীয় হল, পরিবারের উপর সাধ্যানুপাতে খরচ করা জায়েজ আছে। বা খরচ করা উচিত। কিন্তু এদিন সম্মিলিতভাবে খিচুরী পাকানো, বিশাল খাবারের আয়োজন করে বিলানো, এসবই খারেজীদের সাথে মিলে যায়। যা সম্পূর্ণ পরিত্যাজ্য ও নাজায়েজ। মুফতি লুৎফুর রহমান ফরায়েজী, পরিচালক, তালীমুল ইসলাম ইনষ্টিটিউট এন্ড রিসার্চ সেন্টার, ঢাকা।

অপর পক্ষে এই হাদিস সম্পর্কে ডঃ আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীল বলেন, হাদিসটি কয়েকটি সনদে বর্ণিত হয়েছে। প্রত্যেকটি সনদই অত্যন্ত দুর্বল। বিভিন্ন সনদের কারণে বাইহাকী, ইরাকি, সুয়ূতী প্রমুখ মুহাদ্দিস এ হাদিসটিকে ‘জাল’ হিসেবে গণ্য না করে ‘দুর্বল’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। ইবনু হাজার হাদিসটিকে ‘অত্যন্ত আপত্তিকর ও খুবই দুর্বল’ বলেছেন। অপরদিকে ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বাল, ইবনু তাইমিয়া প্রমুখ মুহাদ্দিস একে জাল ও বানোয়াট বলে গণ্য করেছেন। তাঁরা বলেন যে, প্রত্যেক সনদই অত্যন্ত দুর্বল হওয়ার ফলে একাধিক সনদে এর গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পায় না। বর্ণিত হাদিসটি রসূল ﷺ থেকে বর্ণিত সহিহ হাদিসের বিরোধী। সহীহ হাদিসে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ইহূদীরা আশুররা দিনে উৎসব আনন্দ করে। তোমরা তাদের বিরোধিতা করবে, এ দিনে সিয়াম পালন করবে এবং উৎসব বা আনন্দ করবে না।
আবূ মূসা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-
كَانَ يَوْمُ عَاشُورَاءَ تَعُدُّهُ الْيَهُودُ عِيدًا، قَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم ‏ “‏ فَصُومُوهُ أَنْتُمْ‏
আশূরার দিনকে ইয়াহুদীগণ ঈদ মনে করত। নবি ﷺ বললেন, তোমরাও এ দিনে সিয়াম পালন কর। সহিহ বুখারি : ২০০৫
কাজেই আশুরার দিনে সিয়াম পালন করতে হবে ইয়াহুদিদের মত আনন্দ করা যাবে না। যদি এ দিনে ভাল খাবার-দাবারের আয়োজন করা হয় তবে তা ইহুদীদের সাথে সাদৃশ্য আচরণ বলে গণ্য হবে।

২. ব্রেলভী বা পীর, মুরিদী ও মাজার কেন্দ্রিক আমলে বিশ্বাসীদের আশুরার আমল :
মূলত ব্রেলভী বা পীর, মুরিদী ও মাজার কেন্দ্রিক আমলে বিশ্বাসিগণই হল উপমহাদেশে বিদআতি আমলের পাওয়ার হাউজ। এই সকল মুসলিম জনসাধারণের দিকে তাকালে আপনি দেখবেন যে, তারা এ আশুরাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ধরনের কাজ-কর্মে লিপ্ত হয়ে পড়ে। এবং এ কাজগুলো তারা আশুরার আমল মনে করেই করে থাকে। যেমন-
ক। আশুরার রাত্রি জাগরণ করে ইবাদাত করে
খ। বিভিন্ন প্রকার উন্নত খাবারের ব্যবস্থা করে
গ। ওয়াজ মাহফিল ও আলোচনা সভা করে
ঘ। মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করে
ঙ। কেউ কেউ পশু জবেহ
চ। কেউ কেউ শীয়দের অনুকরণে ইমাম হুসাইন (রা.) এর শাহাদাতের স্মরণে প্রতিকৃতি বানায়
ছ। অনেকে শোক প্রকাশের জন্য শিয়াদের মত তাযিয়া মিছিল বের করে
কষ্টের ব্যাপার হল, এগুলো বিভ্রান্ত শিয়া ও রাফেজীদের কাজ হলেও দুঃখজনক ভাবে এই বিদআতগুলি আজ সুন্নী নামের কিছু মুসলিম ভাইদের মাঝে ছড়িয়ে পড়েছে। তাই আমাদের জেনে নিতে হবে কোনটা আশুরা সম্পর্কিত আমল আর কোনটা ভেজাল বা বিদআত। যদি আমাদের আমলগুলো শরীয়ত সম্মত হয় তা হলে তা দ্বারা আমরা আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য ও সওয়াব লাভ করতে পারব। আর যদি আমলগুলো শরীয়ত সমর্থিত না হয়, বিদ’আত হয়, তাহলে তা পালন করার কারণে আমরা গুনাহগার হবো। আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের পরিবর্তে তার থেকে দূরে সরে পড়ব। বর্তমানে এই তরিকার মুসলিমদের মাঝে অনেক আলেম দাবি করে। তারা মাজার কেন্দ্রিক বড় বড় মাদ্রাসও প্রতিষ্ঠা করছে। আমরা আশা করি এরা কুরআন হাদিস নিয়ে প্রতিটি আমলের চুরচেরা বিশ্লেষণ করবে এবং কুরআন সুন্নাহ ভিত্তিক আমল করবে। তারা নিজেরাও বিদআতি কাজ থেকে বিরত থাকবে এবং তাদের অনুসারী মুসলিমদেরও বিরত রাখবে।

৩. শীয়া সম্প্রদায়ের আশুরার বিদআতি আমল
শীয়া সম্প্রদায়ের লোকদের এই দিনটি খুবই পবিত্র মনে করে। তাদের বিশ্বাস আশুরার দিনে তাদের প্রাণ প্রিয় ইমাম হুসাইন রাদিয়াল্লাহ আনহু (প্রাণ তাদের ইমাম (আ.) কে বলে) এই দিনে কারবালাতে যুদ্ধ করে শহীদ হন। তারা এ সম্পর্কে এমন সব উদ্ভট আকিদা রাখেন যার সমর্থনে কুরআন বা সহিহ হাদিসের কোন প্রমাণ নেই। তাদের বক্তব্য শুনে মনে হবে বিশ্বের সকল গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এ আশুরাতে ঘটিয়েছেন ও আগত ভবিষ্যতের সকল গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা এ আশুরাতে ঘটাবেন। পৃথিবীর সৃষ্টি ও ধ্বংস সবই নাকি এ দিনে হয়েছে ও হবে। এমন সব উদ্ভট আকিদা তারা রাখে যার প্রমান কোন সহিহ হাদিসে পাওয়া যায় না। তাদের প্রচার প্রসারের ফলে সুন্নী অজ্ঞ মুসলিমও আজ মনে প্রাণে এই সকল ভ্রান্ত আকিদা বিশ্বাস করতে শুরু করছে। যদি কোন আলেম এ সম্পর্কে সঠিক ধারণা প্রদান করে তবে তাকে বিভিন্ন ভাবে ভৎষোনা করা হয়।
শিয়ারা ভ্রান্ত আকিদা ও বিদআতি কর্মের সাথে ইমাম হুসাইন (রা.) এর শাহাদাতের কথা যোগ করে থাকে। তারা দাবি করে এই সকল ঘটনার সাথে আশুরার দিনের যেমন সম্পর্ক আছে। ইমাম হুসাইন (রা.) শাহাদাতেরও তেমনি সম্পর্ক আছে। তাই শীয়া সম্প্রদায়ের লোকেরা আশুরা মানে শুধু শুধুমাত্র কারবালাল হৃদয় বিদারক ঘটনাকেই বুঝে তাকে। তাদের সাথে মিডিয়ার প্রচারের ফলে বর্তমানে আমরা দেখছি প্রায় সর্ব মহল থেকে আশুরার মূল বিষয় বলে কারবালার ঘটনাকেই বুঝানো হচ্ছে। কিন্তু কুরআন ও সুন্নাহর দৃষ্টিকোণ থেকে এটা সঠিক নয়। ইসলামের আগমনের পূর্বে আশুরা ছিল। যেমন আমরা হাদিস দ্বারা জানতে পেরেছি। তখন মক্কার মুশরিকরা যেমন আশুরার সিয়াম পালন করত তেমনি ইহুদিরা মুছা (আ.) এর বিজয়ের স্মরণে আশুরার সিয়াম পালন করত। আল্লাহর রসূল ﷺ আশুরার সিয়াম পালন করেছেন জীবনের প্রতিটি বছর। তার ইন্তেকালের পর তার সাহাবায়ে কেরাম (রা.) আশুরা পালন করেছেন।

কারবালার ঘটনার সাথে আশুরার সম্পর্ক কি?
কারবালায় ইমাম হুসাইন (রা.) শাহাদাত বরণের সাথে আশুরার কোন সম্পর্ক নেই। আমরা হাদিসের আলোকে যে আশুরার করা বলেছি উহা রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওফাতের আগের ঘটনা। তিনি নিজে আশুরার ফজিলত ও গুরুত্ব সাহাবিদের সামনে তুলে ধরেছেন। মুছা আলাইহিস সালামে বিজয়ের শুকরিয়া স্বরূপ সিয়াম পালন করেছে। যেমন হাদিসে এসেছে,
ইবনু আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসুলুল্লাহ ﷺ মাদীনায় গমন করার পর দেখলেন ইহুদিরা ‘আশুরার দিন সিয়াম রাখে। রসুলুল্লাহ ﷺ তাদের জিজ্ঞেস করলেন, এ দিনটার বৈশিষ্ট্য কি যে, তোমরা সিয়াম রাখো? তারা বলল, এটা একটি গুরুত্ববহ দিন। এ দিনে আল্লাহ তা‘আলা মূসা (আ.) ও তাঁর জাতিকে মুক্তি দিয়েছেন। আর ফিরাউন ও তার জাতিকে (সমুদ্রে) ডুবিয়েছেন। মূসা (আ.) শুকরিয়া হিসেবে এ দিন সিয়াম রেখেছেন। অতএব তাঁর অনুসরণে আমরাও রাখি। এ কথা শুনে রসুলুল্লাহ ﷺ বললেন, দীনের দিক দিয়ে আমরা মূসার বেশী নিকটে আর তার তরফ থেকে শুকরিয়া আদায়ের ব্যাপারে তোমাদের চেয়ে আমরা বেশী হকদার। বস্তুত ‘আশুরার দিন রসুলুল্লাহ ﷺ নিজেও সিয়াম রেখেছেন অন্যদেরকেও রাখার হুকুম দিয়েছেন। সহিহ বুখারী : ২০০৪, সহিহ মুসলিম : ১১৩০, ইবনু মাজাহ : ১৭৩৪, মিশকাত : ২০৬৭, আহমাদ : ৩১১২
অপর পক্ষ, শিয়ারা যে আশুরা কথা গুরুত্ব দিয়ে বলে থাকে তা এক নয়। রসুলুল্লাহ ﷺ এর ইন্তেকালের প্রায় পঞ্চাশ বছর পর হিজরী ৬১ সালে কারবালার ময়দানে জান্নাতী যুবকদের নেতা, রসুলুল্লাহ ﷺএর প্রিয় নাতি সাইয়েদুনা হুসাইন (রা.) শাহাদাত বরণ করেন। ইসলামের ইতিহাসে মুসলিম উম্মাহর জন্য এটা একটা হৃদয় বিদারক ঘটনা। ঘটনাক্রমে এ মর্মান্তিক ইতিহাস এ আশুরার দিনে সংঘটিত হয়েছিল। এটি ছিল উম্মতের ওপর নেমে আসা সবচেয়ে বড় বিপদগুলোর একটি।
আল্লামা ইবনু তাইমিয়া (রহ.) বলেন হুসাইনের রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু শাহাদতের ঘটনাটি মহা বিপদগুলোর একটি। কারণ, হুসাইন রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা ‘আনহু এবং তাঁর আগে উসমান রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা ‘আনহু-এর শহীদ হওয়ার ঘটনার মধ্য দিয়েই পরবর্তীতে উম্মতের ওপর নেমে এসেছে অনেক মহা দুর্যোগ। আর তাঁদের শহীদ করেছে আল্লাহর নিকৃষ্ট বান্দারা। মাজমু ফাতাওয়া, তৃতীয় খণ্ড. পৃ-৪১১

মুসলিমদের প্রতিটি আমল হতে হবে কুরআন সুন্নাহ মোতাবেক। আশুরাকে কেন্দ্র করে যদি কোন আমল করতে হয়। তা হলে কুনআন সুন্নাহ থেকে দলিল নিতে হবে। কাজেই আমরা যে আশুরার কথা বললাম তার দলিল এ দিলাম। সহিহ হাদিসের এমন কোন গ্রন্থ নেই যেখানে আশুরার সিয়ামের কথা নেই। যদিও এই সিয়াম উম্মতের জন্য সুন্নাহ বা নফল কিন্তু কোন মুহাক্কিক আলেমই তার হাদিসের গ্রন্থে আশুরার বিষয়টি এড়িয়ে যান নাই। কিন্তু শীয়া সম্প্রদায় যে আশুরার কথা বলে তা সংঘটিত হয়েছে, রসুলুল্লাহ ﷺ এর ইন্তেকালের প্রায় পঞ্চাশ বছর পর হিজরী ৬১ সালে। রসুলুল্লাহ ﷺ এই পৃথিবীতে নাই। তাহলে আমলের হাদিসতো থাকার কথা নয়। যার কথায় বিনা বাক্যে ইবাদত করা যায় তিনি তো নেই। কারবালার এ দুঃখজনক ঘটনা সংঘটিত হওয়ার পর আল্লাহর রসূল ﷺ এর সাহাবাদের মধ্যে আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস (রা.), আব্দুল্লাহ বিন উমার (রা.), আব্দুল্লাহ বিন আমর (রা.), আনাস বিন মালেক (রা.), আবু সাঈদ খুদরী (রা.), জাবের বিন আব্দুল্লাহ (রা.), সাহল বিন সায়াদ (রা.), যায়েদ বিন আরকাম (রা.), সালামাতা ইবনুল আওকা (রা.), সহ বহু সংখ্যক সাহাবায়ে কেরাম জীবিত ছিলেন। তারা তাদের পরবর্তী লোকদের চেয়ে রসুলুল্লাহ সﷺ ও তার পরিবারবর্গকে অনেক বেশী ভালোবাসতেন। তারা আশুরার দিনে কারবালার ঘটনার স্নরণে কোন কিছুর প্রচলন করেননি। আমরা যে আশুরাকে সম্মান করি, যে আশুরায় সিয়াম পালন করি তারা কথা আল্লাহর রসূল সﷺ বলে গিয়েছেন। এবং তার সাহাবায়ে কেরাম যে আশুরার সিয়াম পালনের মাধ্যমে উৎজাপন করেছেন। আল্লাহর রসূল সﷺযে আশুরার আমল উম্মতে মুহাম্মদীর জন্য রেখে গেছেন তার সাথে কারবালার ঘটনার কোন ভূমিকা ছিল না।

আশুরার উপলক্ষ্যে শিয়াদের বিদআতি আমলসমূহ :


মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

উপরের আলোচনার মাধ্যমে আশা করি আশুরা সম্পর্কে একটা স্পষ্ট ধারণা হয়েছে। নিজে নিজেই আশুরার বা মুহাররম মাসের দশ তারিখের সুন্নাহ সম্মত আমল পালন করতে পাওয়ার। এখান আশুরার উপলক্ষ্যে শিয়া সমাজে প্রচলিত কিছু বিদআতি আমল আলোচনা করছি।

১. আশুরার দিনে মাতম করা
বর্তমানে আশুরার দিনে হুসাইন (রা.) এর নামে যে অনুষ্ঠান, মাতম, বুক ও গাল থাপড়ানো, উচ্চ স্বরে ক্রন্দন এবং বিলাপ করে থাকে তার কোনো ভিত্তি নেই। এমন কি আহলে বাইতের নামে প্রচলিত মাজহাবেও তার কোনো দলিল নেই এবং সর্বোপরি ইসলামি আকীদার সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই। এই নিকৃষ্ট বিদআত আস্তে আস্তে তাদের মধ্য প্রসার ঘটে। শিয়াগণ সঠিকভাবে কখন এর দলিল দিতে পারবেনা। হুসাইন (রা.)র বহু সাহাবি শহীদ হয়েছেন। এমন কি মুসলিম জাহানের শ্রেষ্ঠ খলিফা উসমান (রা.) উমর (রা.) ও আলি (রা.) শহীদ হয়েছেন। তারা আলি (রা.) বাদে সকল সাহাবিদের শাহাদত বরণে শোক তো দূরের কথা, বরং আনন্দ দিবসে পরিণত হয়। আববাসীয় খলীফা মুত্বী বিন মুক্বতাদিরের সময়ে (৩৩৪-৩৬৩হি.) তাঁর কট্টর শীয়া আমির আহমাদ বিন বূইয়া দায়লামি ওরফে মুইযযুদ্দৌলা ৩৫১ হিজরির ১৮ই জিলহজ তারিখে বাগদাদে উছমান (রা.) এর শাহাদত বরণের তারিখকে তাদের হিসাবে খুশির দিন মনে করে ‘ঈদের দিন’ হিসাবে ঘোষণা করেন। শিয়াদের নিকটে এই দিনটি পরবর্তীতে ঈদুল আযহার চাইতেও গুরুত্ব পায়। অতঃপর ৩৫২ হিজরির শুরুতে ১০ই মুহাররমকে তিনি হুসাইন (রা.) এর শাহাদত বরণের ‘শোক দিবস’ ঘোষণা করেন এবং সকল দোকানপাট, ব্যবসা-বাণিজ্য, অফিস-আদালত বন্ধ করে দেন এবং মহিলাদেরকে শোকে চুল ছিঁড়তে, চেহারা কালো করতে, রাস্তায় নেমে শোকগাথা গেয়ে চলতে বাধ্য করেন। শহর ও গ্রামের সর্বত্র সকলকে শোক মিছিলে যোগদান করতে নির্দেশ দেন। আল্লাহর বান্দা ও রাসুলের সাহাবিদেরকে গালাগালি করাকে আল্লাহর সম্মানিত নিদর্শন মনে করেই করে থাকেন। এর চেয়ে অধিক মূর্খতা আর কি হতে পারে? আবার দেখুন, মাতম করার পর তারা তারা মানুষের মাঝে গোশত, খাদ্য-পানীয় এবং অন্যান্য বস্তু বিতরণ করে। কারবালা সম্পর্কিত বিভিন্ন শিরকি কবিতা আবৃতি করে রাত পার করে।
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত হুসাইন (রা.) ্এর শাহাদতের ঘটনায় খুবই মর্মাহত কিন্তু শোক প্রকাশেএ ইসলামি শরীয়তের সীমা লঙ্ঘন করে না। হুসাইন রা.) অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে শহীদ হয়েছেন তাকেও আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত অস্বীকার করে না। কিন্তু অজ্ঞ শিয়াদের মত গালে ছুরি চালানো, বুকে চাপড়ানো এবং নিজেকে ক্ষত-আহত করার মত গর্হিত কাজ করে না। ইদানীং আশুরাকে কেন্দ্র করে সমাজে যে সকল জাহেলি কাজ শুরু হয়ে তা সকলের জানা। মিডিয়ার কল্যাণে আজ সবাই এ সকল ভ্রান্তি দেখে দেখে মূল শিক্ষা আমল থেকে দুরে সরে যাচ্ছে। শিয়াদের এই সকল গর্হিত কাজ সম্পূর্ণ হারাম। ইসলামি শরীয়তে মৃত্যুর জন্য শোক পালন যা করণীয় সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা আছে। কাজেই ভুল করার সুযোগ নাই।
আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা ‘আনহু থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন-
لَيْسَ مِنَّا مَنْ لَطَمَ الْخُدُودَ وَشَقَّ الْجُيُوبَ وَدَعَا بِدَعْوَى الْجَاهِلِيَّةِ
সে আমাদের উম্মতভুক্ত নয় যে গালে আঘাত করে, বুকের কাপড় ছেঁড়ে এবং জাহেলি কথাবার্তা বলে। সহিহ বুখারী : ১২৯৪, ১২৯৮, ৩৫১৯, সহিহ মুসলিম : ১০৩
আবূ মূসা আশআরী রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা ‘আনহু থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, ‘আমি তাদের থেকে মুক্ত রাসূলুল্লাহ ﷺ যাদের থেকে মুক্ত। আর সাল্লাল্লাহু ﷺ (শোকে) মাথা মুণ্ডনকারিণী, বিলাপকারিণী এবং বুক বিদীর্ণকারিণী থেকে মুক্ত। সহিহ বুখারী : ১২৩৪, সহিহ মুসলিম : ১০৪
তেমনি আবূ মালেক আশআরী (রব) থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, ‘আমার উম্মত জাহেলি যুগের চারটি স্বভাব সহজে ছাড়তে পারবে না। বংশ নিয়ে গর্ব, বংশ তুলে গালি দেয়া, তারকা দেখে বৃষ্টি চাওয়া এবং মৃত ব্যক্তির ওপর বিলাপ করা। তিনি বলেন, বিলাপকারিণী যদি মৃত্যুর আগে তওবা না করে তাহলে কেয়ামতের দিন তাকে এমনভাবে উঠানো হবে যে, তার সর্বাঙ্গ খোস-পাঁচড়া ও আলকাতরায় ভরা থাকবে। সহিহ মুসলিম : ৯৩৪

২. শাহাদতে হুসাইনের শোক পালনের উদ্দেশ্যে সিয়াম পালন করা
আলোচনার প্রথমে আশুরার সম্পর্কে হাদিসের আলোকো সুন্নাহ সম্মত সিয়াম পালনের কথা বলা হয়েছে। আমরা দেখেছি আশুরার সিয়াম একটি সুন্নাহ সম্মত ইবাদাত। আশুরার চেতনা হল, অত্যাচারী শাসক ফেরাউনের কবল থেকে মূসা (আ.) এর নাজাতের শুকরিয়া স্বরূপ ৯ ও ১০ই মুহাররম অথবা ১০ ও ১১ই মুহাররম সিয়াম পালন করা। বর্তমান সুন্নী মুসলিম সমাজে উক্ত দু’টি সিয়াম পালনের প্রচলন রয়েছে। কিন্তু শীয়া ও তাদের পাশাপাশি সামান্য কিছু সুফি তরিকার লোক শাহাদতে হুসাইনের শোক পালনের উদ্দেশ্যেই বিভিন্ন শরিয়ত বিরোধী কাজে লিপ্ত থাকে এবং এর পাশাপাশি তারা শাহাদতে হুসাইনের শোক পালনের উদ্দেশ্যে সিয়াম পালন করে থাকে, যা সম্পূর্ণরূপে সহিহ হাদিস বিরোধী এবং স্পষ্ট বিদ‘আত। কেননা এই সিয়ামের সূচনা হয়েছে মূসা (আ.) এর সময় থেকে। রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর জীবদ্দশাতেই মুহাররমের সিয়াম পালন করেছেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ আশুরার সিয়াম পালন করেছিলেন অত্যাচারী শাসক ফেরাউনের কবল থেকে মূসা (আ.)-এর নাজাতের আনন্দে আল্লাহর শুকরিয়া স্বরূপ। পক্ষান্তরে আমরা আজ তা পালন করছি হুসাইন (রা.)-এর শাহাদতের শোক স্বরূপ। অথচ ওমর (রা.), ওছমান (রা.) সহ আরো অনেক সাহাবি শাহাদত বরণ করেছেন। আমরা তাঁদের স্মরণে কিছুই করি না। যদি হুসাইন (রা.)-এর শাহাদতের কারণে শোক দিবস পালন করা হয়, তাহ’লে ওমর ও ওছমান (রা.)-এর শোক দিবস পালনের অধিক হক রাখে।

৩. ১০ ই মুহাররমকে আনন্দ উৎসবে পরিণত করা
শীয়াদের একটি দল হুসাইন (রা.) এর শাহাদতের শোক স্বরূপ শোক দিবস পালন করে। পক্ষান্তরে একটি গোষ্ঠী রাফেযীদের বিরোধিতা করার লক্ষ্যে এ দিনটিকে আনন্দ উৎসবে পরিণত করে। এ দিনে রাফেযীদের শোক দিবস যেমন বিদ‘আত; তেমনি তাদের বিরোধিতার লক্ষ্যে এ দিনে আনন্দ উৎসব করাও বিদ‘আত। এটা যেন বিদ‘আত দিয়ে বিদ‘আত এবং মিথ্যা দিয়ে মিথ্যা প্রতিহত করার চেষ্টা। অথচ উচিত ছিল সুন্নাত দিয়ে বিদ‘আত প্রতিহত করা। সত্য দিয়ে মিথ্যা প্রতিহত করা। রাসূল ﷺ ও ছাহাবায়ে কেরাম এ দিনটিকে শোক দিবস হিসাবেও পালন করেননি। আবার আনন্দ উৎসবেও পরিণত করেননি। তাঁরা শুধুমাত্র ফেরাউনের কবল থেকে মূসা (আ.) এর নাজাতের শুকরিয়া স্বরূপ ছিয়াম পালন করেছেন।

৪. তাজিয়া মিছিল বাহির করা
পূর্বের আলোচনায় উল্লেখ করেছি, কট্টর শীয়া আমির আহমাদ বিন বূইয়া দায়লামি ওরফে মুইযযুদ্দৌলা ৩৫২ হিজরির শুরুতে ১০ই মুহাররমকে তিনি হুসাইন (রা.) এর শাহাদত বরণের ‘শোক দিবস’ ঘোষণা করেন এবং সকল দোকানপাট, ব্যবসা-বাণিজ্য, অফিস-আদালত বন্ধ করে দেন এবং মহিলাদেরকে শোকে চুল ছিঁড়তে, চেহারা কালো করতে, রাস্তায় নেমে শোকগাথা গেয়ে চলতে বাধ্য করেন। শহর ও গ্রামের সর্বত্র সকলকে শোক মিছিলে যোগদান করতে নির্দেশ দেন। শীয়ারা খুশী মনে এই নির্দেশ পালন করে। তার চালু করা বিদআত আজও শীয়ারা পালন করে আসছে। অথচ এই সকল কাজ শরিয়ত সম্মত নয়।
আবদুল্লাহ ইবনু মাস‘ঊদ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নাবি ﷺ ইরশাদ করেছেন-
لَيْسَ مِنَّا مَنْ ضَرَبَ الْخُدُودَ، وَشَقَّ الْجُيُوبَ، وَدَعَا بِدَعْوَى الْجَاهِلِيَّةِ ‏
যারা শোকে গালে চপেটাঘাত করে, জামার বক্ষ ছিন্ন করে ও জাহিলী যুগের মত চিৎকার দেয়, তারা আমাদের দলভুক্ত নয়। সহিহ বুখারী : ১২৯৬
আবূ মূসা (রা.) কঠিন রোগে আক্রান্ত হয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। তাঁর মাথা তাঁর পরিবারের এক মহিলার কোলে ছিল। সে মহিলা চিৎকার করে উঠলো। তিনি তাকে তা থেকে বাধা দিতে পারেননি। যখন তাঁর জ্ঞান ফিরলো তখন বললেন, আমি তার থেকে সম্পর্কহীন, যার থেকে রসুলুল্লাহ ﷺ সম্পর্কচ্ছেদ করেছেন। যে ব্যক্তি (মৃতের শোকে) উচ্চৈঃস্বরে কান্নাকাটি করে, মাথার চুল ছিঁড়ে ফেলে, রসুলুল্লাহ ﷺ তার থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করেছেন। সহিহ মুসলিম : ১০৪

মিডিয়ার কারণে ব্যাপক প্রচার প্রসার ঘটে এখন সকলে মনে করে, আশুরা তাজিয়া মিছিল। তাজিয়া অর্থ বিপদে সান্ত্বনা দেওয়া। যেটা বর্তমানে শাহাদাতে হোসাইনের শোক মিছিলে রূপ নিয়েছে। অথচ ইসলামে কারো মৃত্যুতে তিন দিনের অধিক শোক পালন করা নিষেধ।
যায়নাব বিন্‌তু আবূ সালামা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবি ﷺ এর সহধর্মিণী উম্মু হাবীবা (রা.) এর নিকটে গেলাম। তখন তিনি বললেন-
سَمِعْتُ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم يَقُولُ لاَ يَحِلُّ لِامْرَأَةٍ تُؤْمِنُ بِاللهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ تُحِدُّ عَلَى مَيِّتٍ فَوْقَ ثَلاَثٍ إِلاَّ عَلَى زَوْجٍ أَرْبَعَةَ أَشْهُرٍ وَعَشْرًا
আল্লাহর রসূল ﷺ কে বলতে শুনেছি, যে স্ত্রীলোক আল্লাহ্‌ এবং কিয়ামত দিবসের প্রতি ঈমান রাখে তার পক্ষে কোন মৃত ব্যক্তির জন্য তিন দিনের বেশী শোক পালন করা বৈধ নয়। তবে স্বামীর জন্য চার মাস দশ দিন (বৈধ)। সহিহ বুখারী : ১২৮১
অথচ শীয়ারা এর শোক যুগের পর যুগ চালিয়ৈ যাচ্ছে। শিয়াদের উদ্ভাবিত এই বেদাতি প্রথার অনুসরণেই বাংলাদেশের বিদআতিরা ১০ই মুহাররমে মিছিল বের করে থাকে। প্রত্যেক আল্লাহভীরু মুসলমানের এই সব বিদ‘আত হ’তে দূরে থাকা আবশ্যক।

৫. ১০ই মুহাররমে চোখে সুরমা লাগানোঃ
অনেকেই আশুরার দিন বা ১০ই মুহাররমে বিশেষ ফযীলতের আশায় চোখে সুরমা লাগিয়ে থাকে; যা সুস্পষ্ট বিদ‘আত। কেননা রাসূলুল্লাহ ﷺ ও ছাহাবায়ে কেরাম আশূরার দিনে চোখে সুরমা লাগাননি এবং এর কোন ফযীলত বর্ণনা করেননি। এই সম্পর্কিত জাল হাদিসটি হলো-
রাসূলুল্লাহ (সা.) এর নামে জাল কথাটি হলোঃ রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
مَنِ اكْتَحَلَ يَوْمَ عَاشُوْرَاءَ بِالإِثْمِدِ، لَمْ تَرْمُدْ عَيْنُهُ أَبَداً
যে ব্যক্তি আশূরার দিনে চোখে ‘ইসমিদ’ সুরমা ব্যবহার করবে কখনোই তার চোখ উঠবে না।
হাদিসটি জাল বলেছন- ইবনুল জাওযী (৫৯৭ হি.), আল-মাউদআত, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা-১১৬; ইমাম জালালুদ্দিন সুয়ুতী (৯১১ হি.), আল-লাআলি, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা-২১১; মোল্লা আলি কারী (১০১৪ হি.), আল আসরার পৃষ্ঠা-২২২, মাসনূ, পৃষ্ঠা- ১৪১; ইবনে আররাক (৯৩২ হি.), তানযীহ, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা-১৫৭; ইমাম শাওকানী (১২৫০ হি.), আল ফাওয়ায়েদুল মাজমুয়াহ, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা-১৩১-১৩২; আব্দুল হাই লাখনবি (১৩০৪ হি.), আল আসার, পৃষ্ঠা-১০০-১০২; হাদিসের নামে জালিয়াতী বইয়ের অষ্টম পরিচ্ছেদ, পৃষ্ঠা নম্বর-৫০৮।
ইসমিদ’ সুরমা ব্যবহার করার ফলে চোখের উপকার হয় এই মর্মে সহহি হাদিস বিদ্যমান :
আবদুল্লাহ বিন উমার (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, তোমরা অবশ্যই ইসমিদ সুরমা ব্যবহার করবে। কেননা তা চোখের ময়লা দূর করে, দৃষ্টিশক্তি বাড়ায় এবং চোখের পাতায় লোম গজায়। সুনানে ইবনে মাজাহ : ৩৪৯৫
ইবনু আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, তোমরা সাদা কাপড় পরিধান করো এবং তা দিয়ে তোমাদের মৃতদের কাফন পরাও। কেননা তা তোমাদের উত্তম পোশাক। আর তোমাদের জন্য উত্তম সুরমা হলো ‘ইসমিদ’ সুরমা, কারণ তা দৃষ্টিশক্তি বাড়ায় এবং চোখের পাতার চুল গজায়। সুনানে আবু দাউদ : ৩৮৭৮, ৪১৬১
রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা ‘আনহুর

৬. ১০ই মুহাররমে বিশেষ পদ্ধতিতে সালাত আদায় করা
শিয়াগণ ১০ই মুহাররমে বিশেষ ফজিলতের আশায় বিশেষ পদ্ধতিতে সালাত আদায় করা হয়ে থাকে। যা সুস্পষ্ট বিদ‘আত। কেননা রাসূলুল্লাহ ﷺ ও ছাহাবায়ে কেরাম এ দিনে বিশেষ কোন সালাত আদায় করেছেন মর্মে কোন সহিহ দলিল পাওয়া যায় না। এ সম্পর্কে যা পাওয়া যায় তার সবগুলিই জাল বা বানোয়াট। যেমন-
ক। আবু হুরায়রা (রা.) হ’তে বর্ণিত, রাসূল ﷺ বলেছেন, ‘আশুরার দিনে যে ব্যক্তি চার র‍্যাক‘আত সালাত আদায় করবে এবং প্রত্যেক র‍্যাক‘আতে একবার সূরা ফাতিহা ও পঞ্চাশবার সূরা ইখলাছ তেলাওয়াত করবে, আল্লাহ তা‘আলা তার অতীতের পঞ্চাশ বছরের গুনাহ এবং ভবিষ্যতের পঞ্চাশ বছরের গুনাহ ক্ষমা করে দিবেন’। উল্লিখিত হাদিছটি জাল বা বানোয়াট। (ইবনুল জাওযী, আল-মাওযূআত, দ্বিতীয় খণ্ড. পৃ-১২২
খ। রাসূল ﷺ বলেছেন, যে ব্যক্তি আশুরার দিনে যোহর ও আছরের সালাতের মাঝখানে চল্লিশ র‍্যাক‘আত সালাত আদায় করবে। প্রত্যেক রাক‘আতে একবার সূরা ফাতিহা, দশবার আয়াতুল কুরসি, দশবার সূরা ইখলাছ, পাঁচবার সূরা ফালাক এবং পাঁচবার সূরা নাস তেলাওয়াত করবে আল্লাহ তা‘আলা তাকে জান্নাতুল ফিরদাউস দান করবেন’। অত্র হাদীছটিও জাল বা বানোয়াট। ইবনুল জাওযী, আল-মাওযূআত, দ্বিতীয় খণ্ড. পৃ-১২২-১২৩; শাওকানী, আল-ফাওয়াইদুল মাজমু‘আহ, পৃ-৪৮

৭. তাবেঈ ইয়াযীদ বিন মুয়াবিয়াকে ‘মালাউন’ বা অভিশপ্ত বলে গালি দেওয়া
ইয়াযীদ বিন মুয়াবিয়াকে ‘মালাউন’ বা অভিশপ্ত বলে গালি দেওয়া আদৌ ঠিক নয়। এই বিষয়টি খুবই স্পর্শ কাতর একদিকে আমাদের নয়ন মনি নবি এর ﷺ দহিত্র। অপর পক্ষে একজন তাবেয়ী ইসলামি রাষ্ট্রের খলিফা যে সরাসরি এই কাজে অংশগ্রহণ করেনি। এই ইতিহাস সঠিকভাবে লেখা হয়নি। শীয়াগণ হত্যার জন্য তাবেঈ ইয়াযীদ বিন মুয়াবিয়াকে ‘মালাউন’ বা অভিশপ্ত বলে গালি দেয়। তারা তাকে কাফির ও ফাসিক বলেই মনে করে। আবার অনেকে আছে যারা তাকে প্রসংশা করতে করতে এই হত্যা কাণ্ড থেকে মুক্ত ঘোষণা করে। কিন্তু বিষয় যেহেতু আমাদের নিকট অস্পষ্ট তাই কাউকে গালি বা অভিশাপ না দিয়ে বিচারের ভার মহান আল্লাহ উপর ছেড়ে দেই। যারা সরাসরি এই কিলিং মিশনে ছিল দুনিয়াতেই তাদের কিছু শাস্তি হয়েছে। যেমন পরবর্তীতে আল-আশতার নাখ‘য়ীর হাতে উবাইদুল্লাহ ইবন যিয়াদ নির্মমভাবে নিহত হন। যখন নিহত হলেন তখন তার মাথা দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে মসজিদে রাখা হল। তখন দেখা গেল একটি সাপ এসে মাথার চারপাশে ঘুরছে। পরিশেষে উবাইদুল্লাহ ইবন যিয়াদের নাকের ছিদ্র দিয়ে প্রবেশ করে মুখ দিয়ে বের হল। ফের মুখ দিয়ে প্রবেশ করে নাকের ছিদ্র দিয়ে তিনবার বের হতে দেখা গেল। তিরমিযী, ইয়াকুব ইবন সুফিয়ান
আলহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাতের ইতিহাস ও জীবনীর কিতাবগুলোতে দেখা যায় সালাফে সালেহীনের নিকট গ্রহণযোগ্য এবং অনুকরণীয় কোনো ইমামের কিতাবে ইয়াযীদের উপর লানত করা বৈধ হওয়ার কথা আজ পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া যায় নি। কেউ তার নামের শেষে (রহ.) বা লা‘আনা হুল্লাহ- এ দু’টি বাক্যের কোনোটিই উল্লেখ করেন নি। সুতরাং তিনি যেহেতু তার আমল নিয়ে চলে গেছেন, তাই তার ব্যাপারে আমাদের জবান দরাজ করা ঠিক নয়। তাকে গালাগালি করাতে আমাদের ক্ষতি ছাড়া আর কিছু অর্জিত হবে না। তার আমল নিয়ে তিনি চলে গেছেন। আমাদের আমলের হিসাব আমাদেরকেই দিতে হবে। তার ভাল মন্দ আমলের হিসাব তিনিই দিবেন।
ইমাম যাহাবী (রহ.) ইয়াজিদ সম্পর্কে বলেন-
আমরা তাকে গালি দিবো না এবং ভালোও বাসবো না। মদ পান করা, বানর নিয়ে খেলা করা, ফাহেশা কাজ করা এবং আরও যে সমস্ত পাপ কাজের অপবাদ ইয়াযীদের প্রতি দেওয়া হয়, তা সহিহ সূত্রে প্রমাণিত নয়। তবে তাঁর চেয়ে হুসাইন যে বহু গুণে শ্রেষ্ঠ ছিলেন, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আমাদের বিশ্বাস হবে ইয়াযীদ মুসলিম ছিলেন। আমরা তাকে গালি দিবো না এবং ভালোও বাসবো না। তার নামের শেষে (রহ.) বলে দোয়া করবনা। আবার লাআনা হুল্লাহ বলে অভিশাপ দিব না। তার জীবনের শেষ মুহূর্তে আমরা যেহেতু উপস্থিত ছিলাম না, তাই তার ব্যাপারটি আল্লাহর উপর ছেড়ে দেয়াই অধিক নিরাপদ।

৮. হোসাইনের কফিন বহন তার এই দিন কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সারিবদ্ধভাবে কাঠ বা অনুরূপ বস্তু দ্বারা নির্মিত হোসাইনের কফিন বহন করে শোভাযাত্রা বাহির করে এবং সকল প্রকার সৌন্দর্য ও অলংকার দ্বারা সুসজ্জিত ঘোড়া পরিচালিত করে। আর এর দ্বারা তারা কারবালার ময়দানে হোসাইনের ঘোড়া ও তার দলবলের সেই দিনের অবস্থার অভিনয় করে।
৯. সাহাবি গাল দেয় এই দিনে তারা রসুলুল্লাহ ﷺ এর সাহাবি বিশেষ করে আবূ বকর, ওমর ও ওসমানের মত খলিফাদের থেকে নিজেদেরকে মুক্ত মনে করে এবং গালি দেয়, নিন্দা করে।

ইসলামের শরীয়তে যে কোন শোকে কান্নাকাটি বা হা-হুতাশ করা, বক্ষ বিদীর্ণকরণ ও গালে আঘাত করাকে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছ। তাই কারবালার ইতিহাস স্মরণের নামে যে সকল মাতম, মর্সিয়া, তাযিয়া মিছিল, শরীর রক্তাক্ত করাসহ যা কিছু করা হয় এর সাথে ইসলামের কোন সম্পর্ক নেই। ইসলাম এ সকল কার্যকলাপের অনুমোদন দেয় না। এগুলো সন্দেহাতীতভাবে বিদআত। আর যদি এই সব কর্মকাণ্ডকে ইসলামি শরিয়ত মনে করি, তবে ইসলাম অস্বীকার করার মত পাপে আক্রান্ত হবে। তাই হোসাইন (রা.)র শাহাদাতের স্মরণে শোকের মাতম করা থেকে বিরত থেকে আল-কুরআনের আদেশ মতধৈর্য ধারণ করব। কারণ মহান আল্লাহর তার সিদ্ধান্তের প্রতি সন্তুষ্ট থাকার উপদেশ দিয়েছে। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন,
﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ ٱسۡتَعِينُواْ بِٱلصَّبۡرِ وَٱلصَّلَوٰةِۚ إِنَّ ٱللَّهَ مَعَ ٱلصَّٰبِرِينَ ١٥٣ ﴾
অর্থ : “হে মুমিনগণ! ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে তোমরা সাহায্য প্রার্থনা কর। নিশ্চয় আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।” (সূরা আল-বাকারা: ১৫৩)।
আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন:
﴿ وَبَشِّرِ ٱلصَّٰبِرِينَ ١٥٥ ٱلَّذِينَ إِذَآ أَصَٰبَتۡهُم مُّصِيبَةٞ قَالُوٓاْ إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّآ إِلَيۡهِ رَٰجِعُونَ ١٥٦﴾
অর্থ : তুমি শুভ সংবাদ দাও ধৈর্যশীলগণকে, যারা তাদের উপর বিপদ আপতিত হলে বলে, ‘আমরা তো আল্লাহরই এবং নিশ্চিতভোবে আমরা তাঁর দিকেই প্রত্যাবর্তনকারী।” সূরা আল-বাকারা: ১৫৫-১৫৬)
আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন:
﴿ وَتَوَاصَوۡاْ بِٱلۡحَقِّ وَتَوَاصَوۡاْ بِٱلصَّبۡرِ ٣ ﴾
অর্থ : এবং তারা পরস্পরকে সত্যের উপদেশ দেয় ও পরস্পরকে ধৈর্যের উপদেশ দেয়।” (সূরা আসর-৩)।
আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন:
﴿ وَتَوَاصَوۡاْ بِٱلصَّبۡرِ وَتَوَاصَوۡاْ بِٱلۡمَرۡحَمَةِ ١٧ ﴾
অর্থ : এবং যারা পরস্পরকে উপদেশ দেয় ধৈর্য ধারণের ও দয়া-দাক্ষিণ্যের।”( সূরা আল-বালাদ: ১৭)
আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন,
وَٱلصَّٰبِرِينَ فِي ٱلۡبَأۡسَآءِ وَٱلضَّرَّآءِ وَحِينَ ٱلۡبَأۡسِۗ أُوْلَٰٓئِكَ ٱلَّذِينَ صَدَقُواْۖ وَأُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلۡمُتَّقُونَ ١٧٧﴾
অর্থ : অর্থ-সংকটে, দুঃখ-ক্লেশে ও সংগ্রাম-সংকটে ধৈর্য ধারণ করলে। এরাই তারা যারা সত্যপরায়ণ এবং এরাই মুত্তাকী। (সূরা আল-বাকারা ২:১৭৭)
তাছাড়া হাদিস সমূহে শোক পালনের জন্য নিষধ করা হইয়াছে। উম্মে আতিয়্যা রাদিয়াল্লাহু আনহা কর্তৃক বর্ণিত হাদিসে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, ‘‘মৃত ব্যক্তির জন্য আমাদেরকে তিনদিনের বেশি শোক করতে নিষেধ করা হয়েছে শুধুমাত্র স্বামী মারা গেলে স্ত্রীদের জন্য চার মাস দশদিন শোক পালন করতে হয়।’’ সহিহ বুখারী : ৫৩৪১
সুতরাং হুসাইন (রা.) এর মৃত্যু হয়েছে চৌদ্দশত বছর পূর্বে কাজেই এতবছর পরও শোক পালন করা রাসূলুল্লাহ ﷺ এর নির্দেশ অমান্য করার নামান্তর।
রাসূলুল্লাহ ﷺ আরও বলেছেন, আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহ আনহু হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন : ‘‘যে ব্যক্তি গালের উপর চপেটাঘাত করল, বক্ষদেশ বিদীর্ণ করল এবং জাহিলিয়াতের ডাকের অনুসরণ করে আহ্বান করল সে আমাদের (মুসলমানদের) অন্তর্ভুক্ত নয়।’’ সহিহ বুখারী : ১২৩৬ ও সহিহ মুসলিম : ২৯৬
অপর বর্ণনায় এভাবে এসেছে- উম্মে আতিয়্যা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ বাইয়াত গ্রহণকালে আমাদের থেকে অঙ্গীকার নিয়েছেন যেন আমরা মৃত ব্যক্তির জন্য শোক প্রকাশার্থে উচ্চশব্দে আনুষ্ঠানিকভাবে কান্নাকাটি না করি। সহিহ বুখারী : ১৩০৬ ও সহিহ মুসলিম : ২০৮৮
আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন যে, রসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, ‘‘দুটি বিষয় এমন যা মানুষের মধ্যে কুফরি বলে গণ্য হয়। বংশধারাকে কলঙ্কিত করা ও মৃত ব্যক্তির জন্য শোক প্রকাশার্থে উচ্চশব্দে কান্নাকাটি করা।’’ সহিহ মুসলিম : ১২১

নওরোজ ও শিয়া আকিদা

নওরোজ ও শিয়া আকিদা

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

নওরোজ একটি ফার্সি শব্দ যার বাংলা অর্থ ‘নতুন দিন’। ইরানি সৌর বর্ষপঞ্জী অনুসারে পালিত ইরানি নববর্ষ। ইহাকে ‘পারস্য নববর্ষ’ ও বলা হয়।  ইরানি শীয়া মতের অনুসরীগন এই উৎসবকে পালন করে থাকে। নওরোজ বিশ্বের প্রাচীনতম উৎসবগুলোর মধ্যে অন্যতম। ঠিক কবে এবং কে প্রথম নওরোজ উৎসব চালু করেছিলেন তা স্পষ্ট নয়।

নওরোজের ইতিহাস

কবি ফেরদৌসির অমর কাব্য শাহনামা ও ঐতিহাসিক তাবারির বর্ণনা অনুযায়ী ইরানের প্রাচীন কিংবদন্তীতে উল্লেখিত বাদশাহ জামশিদ ছিলেন এ উৎসবের প্রথম আয়োজক। কেউ কেউ বলেন, ইরানের হাখামানেশীয় সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা সম্রাট দ্বিতীয় সাইরাস বা কুরুশ বাবেল বা ব্যাবিলন জয়ের বছর তথা খ্রিষ্টপূর্ব ৫৩৮ সালে সর্বপ্রথম নওরোজকে জাতীয় উৎসব হিসেবে ঘোষণা ও পালন করেন।

আবু রায়হান আল বেরুনি তাঁর বিখ্যাত বই অসারুল বাকিয়্যাহ গ্রন্থে এ বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরেছেন। বিখ্যাত পারস্য লেখক তাকি যাদেহ মাদ রাজত্বকালে (৭০৮ খ্রিষ্টপূর্ব-৫৫০-৫২৯ খ্রিষ্টপূর্ব) বাবেল বা বর্তমান ইরাক, তুরস্ক, আজারবাইজান, আফগানিস্তান ও বর্তমান ইরানসহ এতদঞ্চলে তিনটি ঈদ পালনের ইতিহাস তুলে ধরেছেন। ঈদে নওসারদ (নওরোজ উৎসব), তার ইয়াসকাই (তিরগান বা গ্রীষ্মকালীন উৎসব) ও মেহরানকাই (হেমন্তকালীন উৎসব)। তবে নওরোজ উৎসবটি অভিজাত, জাঁকজমকপূর্ণ ও চাকচিক্যময় আকার ধারণ করে হাখামানশি রাজত্বকালে (৫৫০ খ্রিষ্টপূর্ব-৩৩০-৩২৭ খ্রিষ্টপূর্ব)।

 আবার অনেক ঐতিহাসিকগনের মতে প্রাচীন পারস্যের পরাক্রমশালী সম্রাট জমশীদ খ্রিষ্টপূর্ব ৮০০ সালে এই নওরোজের প্রবর্তন করেছিলো। (ইসলামি বিশ্বকোষ, ইসলামি ফাউন্ডেশন)

নওরোজ উপলক্ষ্যে কি কি উৎসব রীতিনীত প্রচলিত :

নওরোজকে কেন্দ্র করে বর্তমান ইরানে বেশ কিছু বিদআতি উৎসব ও শিরকি রীতিনীত প্রচলিত আছে। নওরোজ পালনের উৎস পারস্যের অগ্নি উপাসক তথা মজুসিদের থেকেই প্রচলিত হয়েছে। সেই হতে যুগে যুগে নওরোজ উদ্‌যাপিত হইতেছে। এ ধারাবাহিকতা এখনো পারস্য তথা ইরানে নওরোজ ঐতিহ্যগত নববর্ষের জাতীয় উংসব। পারসিক কালচারে সমৃদ্ধ কাট্টা শিয়া রাষ্ট্র ইরানে এখনো ইহা জাতীয় দিবস এবং দেশের সকল অধিবাসীর মহা আনন্দ উৎসবের সঙ্গে উদ্‌যাপন করিয়া থাকে। সাধারণত বিশ বা একুশে মার্চ ফার্সি নববর্ষ শুরু হয়। এই দিন সমগ্র ইরানে ঈদ-ই নওরোজের রাষ্ট্রীয় ছুটি থাকে। বর্তমানে আফগানিস্তান, তাজিকিস্তান, আজারবাইজান, তুর্কমেনিস্তান, উজবেকিস্তান, তুরস্ক, ইরাক, জর্জিয়া, পাকিস্তান ও ভারতেও কম বেশী নওরোজের উৎসব পালিত হয়।

নওরোজ উপলক্ষ্যে কি কি উৎসব রীতিনীত প্রচলিত তার জানার ইচ্ছা সকলের। তাদের এই উৎসব রীতিনীত জানতে পারলে খুব সহজেই আপনি বুঝতে পারবের ইহার সাথে ইসলামি শরীয়তের সম্পর্ক কতটুকু।

১. নওরোজ হলো শিয়াদের ঈদ

পারস্যের অগ্নি উপাসক তথা মজুসিদের নওরোজ হল শিয়াদের ঈদের দিন তারা এই দিনটি ঈদের চেয়েও বেশী মর্যাদা প্রদান করে থাকে। ইরানি শিয়াগণ এই উৎসবকে সবচেয়ে বড় ঈদ বলেও মনে করে। নববর্ষের প্রথম দিন থেকে ১৩ দিন পর্যন্ত তারা এই উৎসব পালন করে থাকে। রাষ্ট্রীয়ভাবেও এই উৎসবের জন্য দেশটিতে অন্য যেকোনো জাতীয় উৎসবের বেশী দিন সরকারি ছুটি ঘোষণা করে থাকে। প্রায় ১৫ দিন সরকারি ছুটি থাকে এবং দেশটির স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে ছুটি থাকে প্রায় দীর্ঘ এক মাস। জাতিসংঘের সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো নওরোজ উৎসবকে বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে।

অথচ মুসলিমদের ঈদ অর্থ হলো আল্লাহ প্রদত্ত খুশি যা ইসলামি শরিয়ত মত উদ্‌যাপন করা হয়। যার ফলে দুনিয়া ও আখেরত কল্যাণ লাভ হয়। মুসলিম এমন ঈদ দুটি, তৃতীয় কোন ঈদ নাই।

আনাস ইব্‌ন মালিক (রা.) হতে বর্ণিত,

كَانَ لَكُمْ يَوْمَانِ تَلْعَبُونَ فِيهِمَا وَقَدْ أَبْدَلَكُمُ اللَّهُ بِهِمَا خَيْرًا مِنْهُمَا: يَوْمَ الْفِطْرِ، وَيَوْمَ الْأَضْحَى

তিনি বলেন, জাহিলিয়াত যুগের অধিবাসীদের জন্য প্রত্যেক বৎসরে দু’টি দিন ছিল, যাতে তারা খেল-তামাশা করত। যখন নবি (ﷺ) মদিনায় আগমন করলেন তখন তিনি বললেন, তোমাদের জন্য দু’টি দিন ছিল, যাতে তোমরা খেল-তামাশা করতে। এখন আল্লাহ তা‘আলা তোমাদের জন্য উক্ত দু’দিনের পরিবর্তে তার চেয়েও অধিকতর উত্তম দু’টি দিন নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন, ঈদুল ফিত্‌রের দিন এবং কুরবানির দিন। সুনানে নাসায়ী : ১৫৫৬

এই হাদিস থেকে এ কথা স্পষ্ট যে, ইসলামি শরীয়তে মুসলিমদের পালনীয় ঈদ হল দুটি, ঈদুল আযহা ও ঈদুল ফিতর। এই দুটি ঈদ ব্যতিরেকে মুসলিমদের তৃতীয় কোন ঈদ নেই বা ঈদের নাম দিয়ে কোন উৎসব পালন করার সুযোগ নেই। অথচ শিয়ারা নওরোজে তৃতীয় ঈদ হিসেবে উদযাবন করেছে।

২. হাজি ফিরুজ ও আমু নওরোজ

ঘরে ঘরে নওরোজের শুভেচ্ছা পৌঁছে দিতে উৎসব শুরুর ১৫ দিন আগে থেকেই এক ব্যক্তি অলিগলিতে ঘুরে ঘুরে নতুন দিনের জয়গান গায়। পরনে থাকে লাল জামা ও লাল টুপি এবং মুখমণ্ডল কৃষ্ণকায়। এই ব্যক্তি কে হাজি ফিরুজ হিসাবে নাম করন করা হয়। এই ব্যক্তিই হলো, আনন্দ, উৎসব ও নতুনের আগমনি প্রতীক। হাজি ফিরুজের পাশাপাশি আমু নওরোজ বা নববর্ষ চাচাও সমান জনপ্রিয়। আমু নওরোজ ঈদের রাতগুলোতে বাচ্চাদের জন্য উপহার নিয়ে আসেন। আমু নওরোজের পোশাকের রং হচ্ছে সাদার ওপরে বিভিন্ন কারুকার্য করা পোশাক, সাদা দাঁড়ি ও গোঁফ, মাথায় সাদা টুপি। আমু নওরোজের উৎস সন্ধানে দেখা যায় চমৎকার এক প্রেমকাহিনি। আমু নওরোজ এখনো তার প্রেমিকার অপেক্ষায় আছে এবং সে বিশ্বাস করে তার প্রেমিকার সঙ্গেই তার বিয়ে হবে।

এই সকলই পারসিক অগ্নীপুজকদের রুসম রেওয়াজ ইসলামের সাথে এর ন্যূনতম সম্পর্ক নাই। হাজি ফিরুজ ও আমু নওরোজ অনেকটা খ্রিষ্টানদের ফাদারের মত

নওরোজ উদ্‌যাপনের প্রস্ততি

নওরোজের আগেই ইরানিরা ঘরদোর পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন করেন। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজে তারা পাড়াপড়শি ও আপনজনদের সহায়তা করেন। অনেকে আগেই পুরোনো আসবাবপত্র বা জরাজীর্ণ জিনিস ফেলে দিয়ে তারা নতুন জিনিস কেনেন। আমাদের দেশের ঈদুল ফিতরের মত নতুন জামা, কাপড়, জুতা প্রভৃতি কেনার হিড়িক পড়ে যায়। নওরোজের মেহমানদারির জন্য তারা ব্যাপক পরিমাণ ফল, মিষ্টি ও অন্যান্য খাদ্যসামগ্রী কিনে থাকেন। এ সময় স্থায়ী বাজার ছাড়াও অনেক অস্থায়ী বাজার বা মেলার আসর জমজমাট হয়ে ওঠে

ইসলামে সাথে সম্পর্ক :

যদিও শিয়াদের দাবি নওরোজ উৎসব পালনের জায়েয। আসলে ইসলামের সাথে এই উৎসবের কোন সম্পর্ক নাই। তারা এর সাথে শত শত বিদআত সৃষ্টি করে ইসলামের পোশাক দ্বারা আবৃত করছে মাত্র।  ইরানি জাতির নওরোজ উৎসব পালনের ইতিহাস অনেক প্রাচীন হলেও ইসলামের আবির্ভাবের পর ইরানে নওরোজ উৎসবের রীতিতে পরিবর্তন দেখা দেয়। ইসলামি আচার অনুষ্ঠান যুক্ত হয় এ উৎসবের সাথে। নওরোজের প্রথম সেকেন্ডেই সবাই এ দোয়া পাঠ করেন। এ সময় তাদের সামনে টেবিলে বা দস্তরখানে থাকে পবিত্র কোরআন, তসবিহ এবং “হাফতসিন” নামে খ্যাত সাতটি বিশেষ সামগ্রীসহ আরো কিছু সামগ্রী

হাফত সিন বা শিন

হাফত সিন বা সাতটি জিনিস হল নওরোজের প্রধান আকর্ষণ। এটি ছাড়া নওরোজ কল্পনাও করা যায় না।

হাফত সিন হল একটি সুসজ্জিত টেবিল যাতে সাত প্রকার খাদ্য থাকবে যাদের প্রতিটির প্রথম অক্ষর ফারসি অক্ষর সিন (س) দ্বারা গঠিত। নওরোজ শুরুর দিন কয়েক দিন আগে থেকে ইরানের পথেঘাটে বেরোলেই চোখে পড়বে হাফত সিনের যাবতীয় জিনিসপত্র বিক্রয়ের দৃশ্য। নওরোজকালীন সময়ে এটি প্রায় প্রতিটি বাড়ির অভ্যর্থনা কক্ষ বা অফিস-আদালতে অপরিহার্য একটি অংশ।

যেমন : একটি টেবিলে শাম, শারাব, শিরিন, শাহদ, শামশাদ, শারবাত ও শাকায়েক রাখা হল। এই টেবিলটিই হল হাফত সিন বা শিন। এই দ্রব্যগুলিম নাম ফার্সিতে এর অর্থ হলো শাম অর্থ মোমবাতি, শারাব অর্থ মদ, শিরিন অর্থ মিষ্টিজাতীয় দ্রব্য, শাহদ অর্থ মধু, শামশাদ অর্থ বৃক্ষ বিশেষ, শারবাত অর্থ  শরবত ও শাকায়েক অর্থ  লাল রঙের টিউলিপ জাতীয় ফুল গাছ বিশেষ।

ইসলাম আগমনের আগে নওরোজের টেবিলে সজ্জিতকরণে এগুলো ছিল অপরিহার্য উপাদান। ইসলাম আগমন করার পর লোকজন চেষ্টা করলেন প্রাচীন রীতিনীতিগুলোকে সংরক্ষণ করবেন এবং নওরোজের মত উসবকে টিকিয়ে রাখবেন। যেহেতু ইসলামে শরাব বা মদ হারাম তাই শরাবের স্থলে সেরকে নির্বাচিত করলেন। আর এভাবেই ধীরে ধীরে শিন দ্বারা লিখিত ও সজ্জিত সাতটি বস্তুর বদলে সিন দ্বারা প্রচলিত সাতটি বস্তু নির্বাচন করলেন।

ইসলাম আগমনের পর বা বর্তমান হাফত সিনের মূল উপাদ্য হচ্ছে, সিব, সেরকে, সামানু, সোমাক, সির, সেঞ্জেদ, সাবযেহ, সেক্কে ও সঙ্গে একটি পবিত্র কোরআন।

এই দ্রব্যগুলিম নাম ফার্সিতে এর অর্থ হলো : সিব অর্থ আপেল, সেরকে অর্থ সিরকা, সামানু অর্থ অঙ্কুরিত গম, বালি বা অন্যান্য শস্যদানা আর আটা দিয়ে তৈরি মিষ্টান্ন বা হালুয়া বিশেষ, সোমাক অর্থ মধ্যমাকারের গাছ বিশেষ যার ফল দেখতে মসুরের ডালের মতো, তবে সামান্য বড় ও টক, সির অর্থ রসুন, সেঞ্জেদ  অর্থ দেখতে বরইয়ের মতো ফল, সাবযেহ অর্থ সবজি। সেক্কে অর্থ ধাতব কয়েন ও সঙ্গে একটি পবিত্র কোরআন। এ ছাড়া ডিম, মাছের উপস্থিতিও হাফত সিনে দেখা যায়।

যারা নওরোজ উদ্‌যাপন করে তাদের বিশ্বাস এগুলোর প্রত্যেকটির অভ্যন্তরে এক একটি পারিভাষিক অর্থ বিরাজমান রয়েছে, যেমন পরিপূর্ণ জীবন, সুস্থতা, বরকত, আরোগ্য লাভ ইত্যাদির প্রতীকী চিত্র। প্রথমত বুঝতেই পারছেন এর সাথে ইসলামের কোন সম্পর্ক নেই। এটি কোন ধর্মীয় বিষয় নয়। যদি কেউ এর সাথে ইসলামি শরীয়তের কোন সম্পর্ক দাড় করায় তবে এই কাজ করা বিদআত। কিন্তু এ সম্পর্কে আকিদা রাখে যে, এইগুলি পরিপূর্ণ জীবন, সুস্থতা, বরকত, আরোগ্য লাভ ইত্যাদির প্রতীকী তাহলে আর বিদআত থাকবে না। এটি কুফরি কাজ হবে। কাজেই মুসলিম হিসাবে এমন কাজ করা থেকে বিরত থাকতে হবে। ইরানের শিয়াগন এই আমলের সাথে ধর্মকে যোগ করে শির্ক ও বিদআতেমত কাজ কাজ করছে।

চাহার শাম্বে সূরি বা অগ্নি প্রজ্বলন উৎসব

ইসলাম আগমনের আগে পারশ্যবাসীর (ইরান) অধিকাংশ লোক অগ্নি পুজক ছিল। অপর পক্ষে নওরোজও তাদের বহু পুরা সংস্কৃতি। তাই অগ্নীপুজকগণ নওরোজকে স্বাগতম জানাতে চাহার শাম্বে সূরি বা অগ্নি প্রজ্বলন উৎসব উদ্‌যাপন করে থাকে। ফারসি সাহিত্যে প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী আগুন হচ্ছে ঔজ্জ্বল্য, পবিত্রতা, আনন্দ ও উৎফুল্ল এবং জীবন ও সুস্থতার প্রতীক। প্রাচীন ইরানের জনগণ চাহার শাম্বে সূরিতে হলুদাভ বিবর্ণতা, অপবিত্রতা, নোংরা, দূষিত ও যাবতীয় রোগ-শোককে অগ্নিতে বিসর্জন দেন। ফলশ্রুতিতে রক্তিমতা, প্রফুল্লতা, বর্ণিলতা, সুস্থতা ও কর্মনিষ্ঠতা অগ্নি থেকে গ্রহণ করেন। আনন্দদায়ক এই অগ্নি উৎসবে রংবেরঙের বিস্ফোরকদ্রব্য ও আতশবাজি এবং শত শত ফানুস রাতের ইরানকে আলোকিত করে।

মন্তব্য : এই ধরনের কুফরি আকিদা নিয়ে অগ্নীপুজকদের চাহার শাম্বে সূরি বা অগ্নি প্রজ্বলন উৎসব করা একজন মুসলিমের পক্ষে কীভাবে সম্ভব! ইসলাম সম্পর্কে যাদের সাধারণ ধারণা আছে তারাও বিষয়টি বুঝতে পারবে আশা করি।

সিজদাহ বেদার বা প্রকৃতির দিন

প্রাচীন ইরানে নওরোজ উৎসব পালনের পর ফারভারদিন মাসের ত্রয়োদশতম দিনে বৃষ্টির জন্য স্রষ্টার কাছে প্রার্থনায় নত হতেন। এই দিনটি কে বলা হয়ঃ সিজদাহ বেদার বা রুযে তাবিয়াত বা প্রকৃতির দিন। বর্তমান ইরানীরা এই দিনে মরুভূমি, উন্মুক্ত প্রান্তর, ঝরনার প্রান্ত, পার্ক বা বিনোদন কেন্দ্রে অবস্থান করেন এবং অত্যন্ত আনন্দ-উৎফুল্লতা এবং হর্ষধ্বনিতে মেতে উঠতেন। সঙ্গে বৃষ্টির জন্য স্রষ্টার কাছে প্রার্থনায় নত হয়। আবার কোনো কোনো গবেষক ফারভারদিন মাসের ত্রয়োদশতম দিনকে বছরের প্রথম কৃষিকার্যের সূচনা দিন হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

নওরোজ উপলক্ষ্যে ভ্রমণ :

এই উৎসব নববর্ষের প্রথম তারিখ থেকে শুরু হয় এক টানা  ১৩ দিন চলে। ১৩ তম দিনে ইরানিদের  কেউই ঘরে থাকে না। তারা সেদিন ঘরের বাইরে বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান ও মনোরম প্রাকৃতিক স্পটে সময় কাটান। বিশেষ করে উদ্যান, ঝর্ণা, পাহাড়, পার্ক- এসব স্থানে তারা চাদর বিছিয়ে বা তাঁবু খাটিয়ে খোশগল্প করে এবং মজাদার খাবার খেয়ে সময় কাটান। আগেই উল্লেখ করেছি, নওরোচ উপলক্ষ্যে রাষ্ট্রীয়ভাবে ইরানে ১৫ দিন সরকারি ছুটি থাকে এবং দেশটির স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে ছুটি থাকে এক মাস। এই সুযোগে ইরানিরা দেশের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান সফর করেন এবং কেউ কেউ বিদেশেও যান। অনেক ইরানি নওরোজের প্রথম প্রহর বা প্রথম দিনটি পবিত্র কোনো স্থানে কাটাতে পছন্দ করেন। অনেকে এ উপলক্ষ্যে পবিত্র কোম শহরে তাদের ইমাম রেজার বোন মাসুমার মাজারে যান, কেউবা ইরাকে ইমাম হোসাইনর মাজারে বা আহলে বাইতের অন্য কোনো সদস্যের মাজারে নববর্ষ শুরু করেন।

উপহার বা বখশিশের প্রচলন

নওরোজের দিন অনেকেই একে-অপরকে উপহার বা বখশিশ দিয়ে থাকেন। ছোট শিশুরা বড়দের কাছ থেকে বখশিশ পেয়ে খুব খুশি হয়।

উপরের আলোচনা থেকে এ কথা স্পষ্ট যে বাংলা নববর্ষ যেমন বাঙালি হিন্দুদের উৎসব, ইংরেজি নববর্ষ যেমন খ্রিষ্টানদের উৎসব ঠিক তেমনি নওরোজ হল প্রাচীর পারস্যের অগ্নীপুজকদের উৎসব। ইরানের ইসলামি নামধারী শিয়ারা যতই ইসলামের লেবাস লাগিয়ে নওরোজ উদ্‌যাপন করুক না কেন কোন অবস্থায়ই ইসলামি শরীয়ত সমর্থন করবে না।

কাজেই শিয়াদের এই সকল ভ্রান্ত আকিদাসমুহ নিজে জানার পর অপর কে জানান, যাতে করে সকল মুসলিম আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের আকিদা-বিশ্বাসের উপর সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকতে পারে। এবং শিয়াদের মিথ্যা বর্ণনাসমূহ, আকিদা, বিশ্বাস এবং তাদের পথভ্রষ্টতা থেকে মুসলিম সম্প্রদায়ক হেফাজত থাকতে পারে। হে মহান আল্লাহ, এই সামান্য খেদমত টুকু কবুল করে আমাদের সকল কে নাজাত দান করুন। আমিন