শিয়াদের ভ্রান্ত আকিদাসমূহ-৮ : তাকিয়া (التَّقِيَّةُ) বা ধর্মীয় স্বার্থে কোনো কিছুকে অন্যদের থেকে গোপন করা জায়েয।

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন
আরবি শব্দ “التَّقِيَّةُ” (তাকিয়াহ) এসেছে “وَقَىٰ – يَقِي” ধাতু থেকে, যার অর্থ হ চ্ছে আত্মরক্ষা, বাঁচানো বা নিরাপদ রাখা। তাই تَقِيَّةٌ শব্দের আভিধানিক অর্থ: আত্মরক্ষার্থে বিশ্বাস বা চিন্তা গোপন করা। পারিভাষিক অর্থে তাকিয়া হলো এমন একটি ধারণা, যেখানে কেউ জীবন, সম্মান বা সম্পদ রক্ষার উদ্দেশ্যে নিজের প্রকৃত ধর্মীয় বিশ্বাস গোপন করে। এটি মূলত চরম বিপদের সময় আত্মরক্ষার কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তাকিয়া (التَّقِيَّةُ) এটি শিয়া মতবাদের অন্যতম মৌলিক বিশ্বাস, যার দ্বারা তারা পরিস্থিতির কারণে নিজেদের প্রকৃত বিশ্বাস গোপন করতে বৈধ মনে করে। শিয়া কিতাবসমূহে তাকিয়াকে তাদের ধর্মীয় দায়িত্ব হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। নিচে তাদের স্বনামধন্য কিতাব থেকে কিছু উদাহরণ তুলে ধরা হলো।

ক। ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইয়াকুব আল-কুলায়নী তার গ্রন্থে উল্লেখ করেন। ইমাম আবু আব্দুল্লাহ (আ.) বলেন-
«التَّقِيَّةُ دِينِي وَدِينُ آبَائِي، وَلَا دِينَ لِمَن لَا تَقِيَّةَ لَهُ»
অর্থ : “তাকিয়াহ হলো আমার ধর্ম এবং আমার পিতৃপুরুষদের ধর্ম; যার মধ্যে তাকিয়া নেই, তার কোনো ধর্ম নেই।” ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইয়াকুব আল-কুলায়নী, উসুলুল কাফি, দ্বিতীয় খণ্ড. পৃ.-২১৭, হাদিস নং ৩

খ। আলি ইবনে ইব্রাহিম আল-কুম্মির (মৃত্যু: ৩০৭ হি.) লিখিত একটি বিখ্যাত তাফসির ‘তাফসীরুল কুম্মি; (تفسير القميّ) শিয়াদের অন্যতম প্রাচীন ও গুরুত্বপূর্ণ তাফসীরগ্রন্থ। এটি ইমামিয়া শিয়াদের আকিদা, ফিকহ ও ইমামত বিষয়ক দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতে লেখা একটি ব্যাখ্যামূলক কুরআন তাফসীর। উক্ত তাফসিরে সুরা আল ইমরানের ২৮ নম্বর আয়াতের তাফসির তিনি বলেন-
فِي قَولِهِ تَعَالَى: ﴿إِلَّا أَن تَتَّقُوا مِنْهُمْ تُقَاةً﴾ قَالَ: «التَّقِيَّةُ فِي الدِّينِ حَتَّى يَأْتِيَ القَائِمُ»
অর্থ : আয়াতে “তাদের থেকে তাকওয়া অবলম্বন করো” (আলে ইমরান: ২৮) এর ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, “তাকিয়া থাকবে দ্বীনের মধ্যে, যতক্ষণ না কায়েম (ইমাম মাহদি) আগমন করেন। তাফসীরুল কুম্মি, প্রথম খণ্ড, পৃ.-৮৮।

গ। শিয়া আলিম ইবনে শোবা আল-হারানী (ابن شُعْبَة الحَرَّانِيّ) তাঁর রচিত কিতাব “তুহফাতুল উকূল” (تحف العقول) শিয়া আকিদাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে আছে। এ গ্রন্থে তিনি লিখেন। ইমাম আবু আব্দুল্লাহ (আ.) বলেন-
«التَّقِيَّةُ تُقَى وَالتَّقِيَّةُ حِصْنُ المُؤْمِنِ»
“তাকিয়া হচ্ছে সতর্কতা, আর তাকিয়া হলো মুমিনের জন্য ঢাল।” ইবনে শোবা আল-হারানী, তুহফাতুল উকূল, পৃ.-১০৩

ঘ। মুহাম্মাদ বাকির আল-মাজলিসী (মৃত্যু: ১১১১ হি.) তার গ্রন্থে উল্লেখ করেন। শিয়াদের ষষ্ঠ ইমাম জাফর আস-সাদিক থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন-
«التَّقِيَّةُ وِقَايَةٌ، وَلَا دِينَ لِمَنْ لَا تَقِيَّةَ لَهُ»
অর্থ: “তাকিয়া হলো আত্মরক্ষার উপায়, আর যার মধ্যে তাকিয়া নেই, তার কোনো দ্বীন নেই।”
মুহাম্মাদ বাকির আল-মাজলিসী, বিহারুল আনওয়ার, খণ্ড: ২৭, পৃ.-৩৪০

ঙ। আবু জা‘ফর মুহাম্মাদ ইবনে আলি ইবনে বাবওয়াইহ আল-কুম্মী যিনি ইমাম শেখ সাদূক নামে বেশী পরিচয়। তিনি তার শিয়া ইমামি মাযহাবের মৌলিক বিশ্বাসগুলো সুসংগঠিতভাবে উপস্থাপ করে “আল-ইতিকাদ” নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেছেন। তিনি উক্ত গ্রন্থে বলেন-
«اعْتِقَادُنَا فِي التَّقِيَّةِ أَنَّهَا وَاجِبَةٌ، مَنْ تَرَكَهَا كَالمَنْكِرِ لِلصَّلَاةِ»
“তাকিয়া সম্পর্কে আমাদের বিশ্বাস হলো, এটি ওয়াজিব (আবশ্যক)। যে এটি পরিত্যাগ করল, সে যেন সালাত অস্বীকার করল।” শেখ সাদূক, আল-ইতকাদ, পৃ.-১১৪

চ। ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইয়াকুব আল-কুলায়নী তার গ্রন্থে উল্লেখ করেন। ইমাম আবু আব্দুল্লাহ (আ.) বলেন-
«التَّقِيَّةُ فِي كُلِّ شَيْءٍ يُضْطَرُّ إِلَيْهِ ابْنُ آدَمَ، فَقَدْ أَحَلَّهُ اللَّهُ لَهُ»
অর্থ: “তাকিয়া মানুষের জন্য প্রতিটি এমন বিষয়ের ক্ষেত্রে বৈধ, যেখানে সে বাধ্য হয়। নিশ্চয়ই আল্লাহ তা তার জন্য হালাল করে দিয়েছেন।” ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইয়াকুব আল-কুলায়নী, উসুলুল কাফি, পঞ্চম খণ্ড. পৃ.-২০, হাদিস নং ৩

ছ। নাহজুল বালাগা (نهج البلاغة) শিয়া মতাদর্শে অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি গ্রন্থ, যা আলি ইবনে আবি তালিব (রা.) এর বিভিন্ন খুতবা, পত্র এবং সংক্ষিপ্ত বাণীর সংকলন করা হয়েছে। উক্ত গ্রন্থে উল্লেখ আছে। “আলি (আ.) বলেছেন-
«التَّقِيَّةُ مِنْ دِينِ اللَّهِ، وَدِينِ آبَائِي، وَلَا إِيمَانَ لِمَنْ لَا تَقِيَّةَ لَهُ»
অর্থ: “তাকিয়া হলো আল্লাহর দ্বীনের অংশ, এটি আমার পিতৃপুরুষদের দ্বীনের অংশ; যার মধ্যে তাকিয়া নেই, তার কোনো ঈমান নেই।” আল-শরীফ আর-রাদী, নাহজুল বালাগা, পৃ.-৪৮৯
উপরের দলিল থেকে স্পষ্ট বুঝা যায় যে, শিয়ারা তাকিয়াকে ঈমান, দ্বীন ও দায়িত্বের অংশ মনে করে। এমনকি কোনো বিপদ ছাড়াও তাকিয়া চালিয়ে যাওয়াকে বৈধ মনে করে। এটি ইসলামি আকিদা ও সাহাবায়ে কিরামের আদর্শের সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক।

শিয়াগণ বিশেষ বিশেষ ব্যক্তির ক্ষেত্রে রাজ‘আ বা পুনর্জন্মের বিশ্বাসী
শিয়াগণ রাজ‘আ (পুনর্জীবন) সম্পর্কে বেশ কিছু প্রখ্যাত আলেম তাদের গ্রন্থে আলোচনা করেছেন। এখানে কয়েক জন শিয়া লেখক ও তাদের গ্রন্থ থেকে দলিল উপস্থাপন করা হলো, আরবি উদ্ধৃতি সহ:
ক। আল্লামা মুহাম্মদ বাকির আল-মাজলিসী তার গ্রন্থে উল্লেখ করেন-
“وَ الرَّجْعَةُ حَقٌّ، وَ هِيَ قَوْلُ جَمِيعِ الْإِمَامِيَّةِ إِلَّا مَنْ شَذَّ مِنْهُمْ، وَ هِيَ رُجُوعُ أَقْوَامٍ مِنَ الْمَوْتَى إِلَى الدُّنْيَا قَبْلَ الْقِيَامَةِ.”
“রাজ‘আ সত্য, এবং এটি সকল ইমামিয়া (শিয়া) এর মত, অবশ্য কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া। এটি হলো কিয়ামতের আগে কিছু মৃত ব্যক্তির দুনিয়ায় ফিরে আসা।” আল্লামা মুহাম্মদ বাকির আল-মাজলিসী, হক্কুল ইয়াকীন, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃ.-৫২০

খ। শায়খ আব্বাস আল-কুমী তার গ্রন্থে উল্লেখ করেন-
“إِنَّ الرَّجْعَةَ مِنَ الْمُعْتَقَدَاتِ الَّتِي تُوجِبُ الْإِيمَانَ بِهَا، وَ قَدْ نَصَّ الْأَئِمَّةُ (ع) عَلَى وُقُوعِهَا لِأَصْحَابِ الْقِيَامِ بِالْقِسْطِ.”
রাজ‘আ এমন একটি বিশ্বাস যা মান্য করা আবশ্যক। ইমামগণ (আ.) সুস্পষ্টভাবে এর সংঘটনের কথা বলেছেন, বিশেষত ন্যায় প্রতিষ্ঠাকারীদের জন্য।” শায়খ আব্বাস আল-কুমী, মুন্তাহাল আমাল, তৃতীয় খণ্ড, পৃ.-১১৭, বৈরুত, ৩য় সংস্করণ

গ। শায়খ সাদুক তার গ্রন্থে উল্লেখ করেন-
“الرَّجْعَةُ لَيْسَتْ بِعَامَّةٍ، بَلْ هِيَ خَاصَّةٌ بِالْمُؤْمِنِينَ الْخَالِصِينَ وَ الْكَافِرِينَ الْخَالِصِينَ.”
রাজ‘আ সবার জন্য নয়, বরং তা খাঁটি মুমিন ও চরম কাফিরদের জন্য সীমাবদ্ধ। শায়খ সাদুক, আল-ই‘তিকাদাত, পৃ.-৬৩

ঘ। সাইয়েদ নেয়ামতুল্লাহ আল-জাজাইরি তার গ্রন্থে উল্লেখ করেন-
“إِنَّ اللَّهَ تَعَالَى يُعِيدُ قَوْمًا بَعْدَ مَوْتِهِمْ لِيَنْتَصِرَ لِلْأَئِمَّةِ (ع) وَ يُظْهِرَ الْحَقَّ.”
আল্লাহ তাআলা কিছু লোককে মৃত্যুর পর পুনরায় জীবিত করবেন, যাতে তারা ইমামগণের (আ.) জন্য বিজয় অর্জন করতে পারে এবং সত্য প্রতিষ্ঠা করতে পারে। সাইয়েদ নেয়ামতুল্লাহ আল-জাজাইরি, আল-আনওয়ার আন-নু‘মানিয়া, চতুর্থ খণ্ড, পৃ.-৩০২

ঙ। আল্লামা তাবাতাবাই তার গ্রন্থে উল্লেখ করেন-
“الرَّجْعَةُ مِنَ الْعَقَائِدِ الْمَثْبُتَةِ عِنْدَنَا، وَ قَدْ دَلَّتْ عَلَيْهَا الرِّوَايَاتُ الْمُتَوَاتِرَةُ.”
রাজ‘আ আমাদের (শিয়া) নিকট প্রতিষ্ঠিত আকীদা, এবং এ বিষয়ে বহু সহিহ হাদিস বর্ণিত হয়েছে।” আল্লামা তাবাতাবাই (রহ আল-মীযান ফী তাফসিরুল কুরআন আল্লামা তাবাতাবাই, আল-মীযান ফী তাফসিরুল কুরআন, খণ্ড ১৭, পৃ.-২৩৫
আস-সাদিক (আ.) বলেন-

চ। যে ব্যক্তি আমাদের পুনর্জন্মে বিশ্বাস করে না এবং মুত‘আ বিয়ের বৈধতাকে স্বীকৃতি দেয় না, সে ব্যক্তি আমাদের দলভুক্ত নয়। শায়খ আব্বাস আল-কুমী, মুন্তাহাল আমাল, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃ.-৩৪১

ছ। ইমাম মুহাম্মদ বাকের (আ.) বলেন, যখন ইমাম মাহাদী আত্মপ্রকাশ করবে, তখন তিনি অতিসত্বর আয়িশাকে জীবিত করবেন এবং তার উপর শাস্তির বিধান (হদ) কায়েম করবেন। আল্লামা মুহাম্মদ বাকের আল-মজলিসী, হক্কুল ইয়াকীন, পৃ.-৩৪৭
নোট : পুনর্জন্ম বা মৃত্যুর পর দুনিয়াতে পুনরায় ফিরে আসার বিশ্বাস মূলত হিন্দু, বৌদ্ধ ও অন্যান্য কুফরি ধর্মে প্রচলিত একটি ধারণা। শিয়ারা তাদের পূর্বপুরুষ অগ্লীপূজারীদের থেকে এ আকিদা গ্রহণ করছে। ইসলামে এমন বিশ্বাসের কোনো স্থান নেই। আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আত সুস্পষ্টভাবে বিশ্বাস করেন, মানুষ মৃত্যুর পর বরযখে অবস্থান করবে এবং পুনরুত্থান কেবল কিয়ামতের দিনই হবে। কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে এটি একটি পরিপূর্ণ ও চূড়ান্ত আকিদা। যারা কিয়ামতের আগেই মৃতদের দুনিয়ায় ফিরে আসার ধারণা পোষণ করে, তারা ভ্রান্ত বিশ্বাসে লিপ্ত এবং ইসলামের মৌলিক আকিদা থেকে বিচ্যুত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *