শরীয়তের দৃষ্টিতে আশুর ও শিয়াদের উদ্‌যাপন

শরীয়তের দৃষ্টিতে আশুর ও শিয়াদের উদ্‌যাপন
মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

ইসলামি শরীয়তের কিছু পর্ব বা দিবস আছে, যা মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কতৃর্ক নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। এই সকল দিনে সুন্নাহ মোতাবেক আমল করলে বহু নেকি পাওয়া যায়। এমনি একটা দিবসের নাম আশুরা। হিজরী সনের প্রথম মাস মহররমের দশ তারিখ আশুরা নামে পরিচিত। মুসলিম উম্মাহর দ্বারে কড়া নাড়ে প্রতি বছর। এ মাস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় আমাদের প্রিয় নবি মুহাম্মাদ ﷺ-এর হিজরত ও তার দাওয়াতী জিন্দেগি শুরু ও ইসলাম প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের কথা। এ মাসে রয়েছে এমন একটি দিন, দীর্ঘ সংগ্রাম শেষে যে দিনে নবি মুসা (আ.) এর বিজয় হয়েছিল। পতন হয়েছিল তখনকার সবচেয়ে শক্তিশালী জালেম সম্রাট ফেরাউন ও তার সম্রাজ্যের। সে দিনটিই হল আশুরা বা মুহাররম মাসের দশ তারিখ। আশুরা একটি আরবি শব্দ। আবরী যে কোন মাসের দশ তারিখের বিশেষণকে আরবিতে বলা হয় আশুরা। আরবিতে আশারা মানে হল দশ। এই আশারা থেকে আশুরা বুঝায়। কিন্তু অনারবদের অধিকাংশের নিকট আশুরা মানে মহররমের দশ তারিখ। মহররম মাসের দশ তারিখকে নির্দিষ্ট করে বলা হয় ‘আশুরায়ে মহররম’। কিছু বিশেষ কারণে এ দিনটি আল্লাহর কাছে খুব প্রিয়, তাই তিনি এ দিনে রোজা পালন ও নফল ইবাদত করায় সওয়াব প্রদান করে থাকেন বহুগুণে।

আশুরার পটভূমি এবং সিয়ামের ফজিলত
আশুরার বৈশিষ্ট্য ও তার সিয়ামের ফজিলাত সম্পর্কে বিশেষ কিছু লেখার প্রয়োজন নাই, সহিহ হাদিসগুলি অধ্যায় করলেই মোটামুটি একটা ধারণা হবে। তাই এ সম্পর্কিত কিছু হাদিস তুলে ধরব শিরোনামসহ উল্লেখ করছি।

১. আশুরার সিয়ামের পটভূমি সম্পর্কিত হাদিস
আবূ মূসা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-
كَانَ يَوْمُ عَاشُورَاءَ تَعُدُّهُ الْيَهُودُ عِيدًا، قَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم ‏ “‏ فَصُومُوهُ أَنْتُمْ‏
আশুরার দিনকে ইয়াহুদীগণ ঈদ মনে করত। নবি ﷺ বললেন, তোমরাও এ দিনে সিয়াম পালন কর। সহিহ বুখারি : ২০০৫

ইবনু ‘আব্বাস হতে বর্ণিত-
قَدِمَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم الْمَدِينَةَ، فَرَأَى الْيَهُودَ تَصُومُ يَوْمَ عَاشُورَاءَ، فَقَالَ ‏”‏ مَا هَذَا ‏”‏‏.‏ قَالُوا هَذَا يَوْمٌ صَالِحٌ، هَذَا يَوْمٌ نَجَّى اللَّهُ بَنِي إِسْرَائِيلَ مِنْ عَدُوِّهِمْ، فَصَامَهُ مُوسَى‏.‏ قَالَ ‏”‏ فَأَنَا أَحَقُّ بِمُوسَى مِنْكُمْ ‏”‏‏.‏ فَصَامَهُ وَأَمَرَ بِصِيَامِهِ‏.‏
তিনি বলেন, রসুলুল্লাহ ﷺ মাদীনায় গমন করার পর দেখলেন ইহুদিরা ‘আশুরার দিন সিয়াম রাখে। রসুলুল্লাহ ﷺ তাদের জিজ্ঞেস করলেন, এ দিনটার বৈশিষ্ট্য কি যে, তোমরা সিয়াম রাখো? তারা বলল, এটা একটি গুরুত্ববহ দিন। এ দিনে আল্লাহ তা‘আলা মূসা (আ.) ও তাঁর জাতিকে মুক্তি দিয়েছেন। আর ফিরাউন ও তার জাতিকে (সমুদ্রে) ডুবিয়েছেন। মূসা (আ.) শুকরিয়া হিসেবে এ দিন সিয়াম রেখেছেন। অতএব তাঁর অনুসরণে আমরাও রাখি। এ কথা শুনে রসুলুল্লাহ ﷺ বললেন, দীনের দিক দিয়ে আমরা মূসার বেশী নিকটে আর তার তরফ থেকে শুকরিয়া আদায়ের ব্যাপারে তোমাদের চেয়ে আমরা বেশী হকদার। বস্তুত ‘আশুরার দিন রসুলুল্লাহ ﷺ নিজেও সিয়াম রেখেছেন অন্যদেরকেও রাখার হুকুম দিয়েছেন। সহিহ বুখারি : ২০০৪, সহহি মুসলিম : ১১৩০, সুনানে ইবনু মাজাহ : ১৭৩৪, মিশকাত : ২০৬৭, আহমাদ ৩১১২

২. আশুরার সিয়ামের গুরুত্ব
রমজানের সিয়াম ফরজ হওয়ার পূর্বে রাসূলুল্লাহ ﷺ আশুরার আশুরার সিয়াম রাখতে আদেশ করেছেন। কিন্তু রমজানের সিয়াম ফরজ হওয়ার পর তিনি তার উম্মতের ইচ্ছার উপর ছেড়ে দিয়েছেন।
আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-
كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم أَمَرَ بِصِيَامِ يَوْمِ عَاشُورَاءَ، فَلَمَّا فُرِضَ رَمَضَانُ كَانَ مَنْ شَاءَ صَامَ، وَمَنْ شَاءَ أَفْطَرَ‏.‏
রাসূলুল্লাহ ﷺ প্রথমে আশুরার পালনের নির্দেশ দিয়েছিলেন, পরে যখন রমযানের সিয়াম সিয়াম ফরজ করা হল তখন যার ইচ্ছা আশুরার সিয়াম পালন করত আর যার ইচ্ছা করত না। সহিহ বুখারি : ২০০১

৩. আশুরার দিনের সিয়ামের ফজিলত
হুরায়রাহ্ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-
‏ أَفْضَلُ الصِّيَامِ بَعْدَ رَمَضَانَ شَهْرُ اللَّهِ الْمُحَرَّمُ وَأَفْضَلُ الصَّلاَةِ بَعْدَ الْفَرِيضَةِ صَلاَةُ اللَّيْلِ
রমজানের সিয়ামের পর সর্বোত্তম সওম হচ্ছে আল্লাহর মাস মুহাররমের সওম এবং ফারজ সালাতের পর সর্বোত্তম সালাত হচ্ছে রাতের সালাত। সহিহ মুসলিম : ১১৬৩, সুনানে আবূ দাঊদ : ২৪২৯, সুনানে তিরমিযী : ৪৩৮, সুনানে নাসায়ী : ১৬১৩, মিশকাত : ২০৩৯

আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি কখনো নবি ﷺ কে সিয়াম পালনের ক্ষেত্রে ‘আশুরার দিনের সিয়াম ছাড়া অন্য কোন দিনের সিয়ামকে এবং এ মাস অর্থাৎ রমাযান ছাড়া অন্য কোন মাসের সিয়ামকে অধিক মর্যাদা দিতে দেখিনি। সহিহ বুখারী : ২০০৬, সহিহ মুসলিম : ১১৩২, মিশকাত : ২০৪০

৪. আশুরার সিয়াম বিগত এক বছরের গুনাহ মাপ করে
আবূ কাতাদাহ আল-আনসারী (রা.) হতে বর্ণিত-

  • أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ – صلى الله عليه وسلم – سُئِلَ عَنْ صَوْمِ يَوْمِ عَرَفَةَ، قَالَ: «يُكَفِّرُ السَّنَةَ المَاضِيَةَ وَالبَاقِيَةَ» وَسُئِلَ عَنْ صِيَامِ يَوْمِ عَاشُورَاءَ، فَقَالَ: «يُكَفِّرُ السَّنَةَ المَاضِيَةَ» وَسُئِلَ عَنْ صَوْمِ يَوْمِ الاثْنَيْنِ، قَالَ: «ذَاكَ يَوْمٌ وُلِدْتُ فِيهِ، وَبُعِثْتُ فِيهِ، أَوْ أُنْزِلَ عَلَيَّ فِيهِ» رَوَاهُ مُسْلِمٌ
    রাসুলুল্লাহ (ﷺ) ‘আরাফাহর দিনে সওম সম্বন্ধে জিজ্ঞাসিত হয়ে বললেন-এর দ্বারা বিগত ও আগত এক বছরের গুনাহ মোচন হয়। আশুরাহর দিনের সিয়াম পালন সম্বন্ধে জিজ্ঞাসিত হয়ে বললেন-বিগত এক বছরের পাপ মোচন হয়। সোমবারের দিনে সওম পালন সম্বন্ধে জিজ্ঞাসিত হয়ে বললেন, এটা সেদিন যেদিন আমি জন্মেছি এবং নুবুওয়াত লাভ করেছি আর আমার উপর (কুরআন) অবতীর্ণ হয়েছে।” সহিহ মুসলিম : ১১৬২, সুনানে তিরমিযী : ৬৭৬, সুনানে নাসায়ী : ২৩৮২, সুনানে আবু দাউদ : ২৪২৫, সুনানে ইবনু মাজাহ : ১৭১৩, আহমাদ : ২২০২৪

৫. আশুরার দিনে দুটি সিয়াম রেখে ইহুদিদের বিরোধিতা করা
ইবনে আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন-
«لَئِنْ بَقِيتُ إِلَى قَابِلٍ لأَصُومَنَّ التَّاسِعَ»
“আগামী বছর যদি আমি বেঁচে থাকি, তাহলে মুহাররম মাসের নবম তারিখে অবশ্যই রোযা রাখব। সহিহ মুসলিম : ১১৩৪
আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ যখন আশুরার দিন সিয়াম পালন করেন এবং লোকদেরকে সিয়াম পাননের নির্দেশ দেন তখন সাহাবিগণ বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! ইহুদি এবং নাসারা এ দিনের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে থাকে। এ কথা শুনে রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন, ইনশাআল্লাহ আগামী বছর আমরা নবম তারিখেও সিয়াম পালন করব। বর্ণনাকারী বলেন, এখনো আগামী বছর আসেনি, এমতাবস্থায় রাসুলুল্লাহ ﷺ এর ইন্তেকাল হয়ে যায়। সহিহ মুসলীম : ২৫৩৭ ইফকাঃ

আব্দুল্লাহ ইবনু ’আব্বাস (রাযি.) বলেন, নবি ﷺ যখন নিজে আশুরার দিন সওম রাখলেন এবং আমাদেরকেও এ সওম পালনের নির্দেশ দেন, তখন লোকেরা বললো, হে আল্লাহর রাসূল! ইহুদি ও খ্রিস্টানরা এ দিনটিকে সম্মান করে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, আগামী বছর এলে আমরা নবম দিন সওম পালন করবো। কিন্তু আগামী বছর না আসতেই রাসূলুল্লাহ ইন্তেকাল করেন। আবূ দাউদ : ২৪৪৫, আহমাদ : ২১০৭, ২৬৩৯, সুনানে দারেমী : ১৭৫৯

ভাবে বহু হদিস দ্বারা আশুরার সিয়ামের হুকুম ও ফজিলত প্রমাণিত। চান্দ্রমাস মুহাররমের দশ তারিখ কে আশুরার দিন বলা হয়। তবে হাদিসের আলোকে বলা যায় এই মাসের ৯ ও ১০ তারিখ এ দু’দিন রাখা উত্তম। অথবা ১০ ও ১১ তারিখেও রাখা যায়। শুধুমাত্র ১০ তারিখে সিয়াম রাখাকে উলামায়ে কিরাম মাকরুহ বলেছেন। এই দিনের সিয়াম পালনের সাথে ইমাম হুসাইন (রা.) এর শহীদ হওয়ার কোন সম্পর্ক নেই। এই সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা পরে আসবে। আশুরার এ দিনটি পূর্ববর্তী যামানার নাবীদের সময় থেকেই অতীব গুরুত্বপূর্ণ ও ফযীলতপূণ দিন হিসেবে গণ্য হয়ে আসছে। এ দিনে মূসা (আ.) কে ফিরআউনের হাত থেকে আল্লাহ রক্ষা করেছিলেন। তবে এ দিনের অনেক কাহিনি শোনা যায় যার কিছু হল দুর্বল, আর বেশির ভাগই তথ্য নির্ভর নয়। এরপরও এ দিনটি আল্লাহর কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও মর্যাদা সম্পন্ন।

আশুরা সম্পর্কিত জাল বর্ণনাসমূহ :
কিন্তু খুবই দুঃখের বিষয় জালিয়াতগন এ সম্পর্কেও বহু জাল হাদিস রচনা করেছে। আশুরা সম্পর্কে কয়েকটি জাল হাদিস তুল ধরছি।

১. মুহাররম বা আশুরার সিয়ামের ফজিলত।
রাসূলুল্লাহ (সা.) এর নামে এই সম্পর্কে জাল হাদিসগুলি হলো :


ক. যে ব্যক্তি আশুরার দিন রোজা রাখে, তা তার চল্লিশ বছরের গোনাহের কাফ্ফারা হয়ে যায়।


খ. মহররম মাসে ইবাদতকারী ব্যক্তি যেন ক্বদরের রাত্রির ইবাদতের ফযীলত লাভ করিল।


গ. আশুরার তারিখে রোজা আদায়কারীর আমলনামার সাত আসমান-জমিনের অধিবাসীদের সওয়াব লিখে দেওয়া হয়।


ঘ. হাদিসে আছে, যে ব্যক্তি মহররমের মাসে রোযা রাখিবে, আল্লাহ তা‘আলা তাহাকে প্রত্যেক রোযার পরিবর্তে ৩০ দিন রোযা রাখার সমান সওয়াব দিবেন।
ঙ. মহররমের ১০ তারিখে রোজা রাখা আদম (আ.) ও অন্যান্য নবিদের উপর ফরজ ছিল। এই দিবসে ২০০০ নবি জন্মগ্রহণ করিয়াছেন এবং ২০০০ নবির দোয়া কবুল করা হইয়াছে।


চ. আরও হাদিসে আছে, যে ব্যক্তি আশুরার দিন একটি রোযা রাখিবে সে দশ হাজার ফেরেশতার, দশ হাজার শহীদের ও দশ হাজার হাজীর সওয়াব পাইবে।


ছ. আরও হাদিসে আছে, যে ব্যক্তি আশুরার তারিখে স্নেহ-পরবশ হইয়া কোন এতিমের মাথায় হাত ঘুরাইবে, আল্লাহতাআলা ঐ এতিমের মাথার প্রত্যেক চুলের পরিবর্তে তাহাকে বেহেশতের এক একটি ‘দরজা’ প্রদান করিবেন। আর যে ব্যক্তি উক্ত তারিখের সন্ধ্যায় রোযাদারকে খানা খাওয়াইবে বা ইফতার করাইবে, সে ব্যক্তি সমস্ত উম্মতে মোহাম্মদীকে খানা খাওয়াইবার ও ইফতার করাইবার ন্যায় সওয়াব পাইবে।


জ. নবি (সা.) বলিলেন, যে ব্যক্তি আশুরার তারিখে রোযা রাখিবে, সে ৬০ বৎসর রোযা সালাত করার সমতুল্য সওয়াব পাইবে। যে ব্যক্তি ঐ তারিখে বিমার পোরছী করিবে, সে সমস্ত আওলাদে আদমের বিমার-পোরছী করার সমতুল্য সওয়াব পাইবে।… তাহার পরিবারের ফারাগতি অবস্থা হইবে। ৪০ বৎসরের গুনাহর কাফ্ফারা হইয়া যাইবে।


ঝ. রাসূলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করিয়াছেন, যে ব্যক্তি মহররম মাসের প্রথম ১০ দিন রোজা রাখিবে, সে ব্যক্তি যেন ১০ হাজার বৎসর যাবত দিনের বেলা রোজা রাখিল এবং রাত্রিবেলা ইবাদতে জাগরিত থাকিল। … মহররম মাসে ইবাদতকারী ব্যক্তি যেন ক্বদরের রাত্রির ইবাদতের ফযীলত লাভ করিল।… তোমরা আল্লাহ তা‘আলার পছন্দনীয় মাস মহররমের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করিও। যেই ব্যক্তি মহররম মাসের সম্মান করিবে, আল্লাহ তাআলা তাহাকে জান্নাতের মধ্যে সম্মানিত করিবেন এবং জাহান্নামের আজাব হইতে বাঁচাইয়া রাখিবেন… মহররমের ১০ তারিখে রোজা রাখা আদম (আ.) ও অন্যান্য নবিদের উপর ফরজ ছিল। এই দিবসে ২০০০ নবি জন্মগ্রহণ করিয়াছেন এবং ২০০০ নবির দোয়া কবুল করা হইয়াছে। এই জাল কথাগুলি পাবেন।


মাওলানা গোলাম রহমান, মকছুদোল মো’মেনীন, পৃষ্ঠা-৪৩০-৪৩১; মুফতী হাবীব ছামদানী, বার চান্দের ফযীলত, পৃষ্ঠা-১৩; অধ্যাপিকা কামরুন নেসা দুলাল, পৃষ্ঠা-২৯৮-৩০০।

হাদিস জাল বলেছেন-
ইবনুল জাওযী (৫৯৭ হি.), আল-মাউদআত, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা-১১২-১১৩; শামছুদ্দীন আয-যাহাবী (৭৪৮ হি.), মিজানুল ইতিদাল, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা-৪৫১-৪৫২; ইমাম হাসান আস-সাগানী (৬৫০ হি.), আল-মাউদুআত, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা-৫৬৮-৫৭২; ইবনে হাজার আসকালানী (৮৫২ হি.), লিসানুল মিজান, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা-৫৪৬-৫৪৮; ইমাম জালালুদ্দিন সুয়ুতী (৯১১ হি.), আল-লাআলি, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা-১০৮-১০৯ ।
ইমাম শাওকানী (১২৫০ হি.), আল ফাওয়ায়েদুল মাজমুয়াহ, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা-১২৯-১৩০; ইবনে আররাক (৯৩২ হি.), তানযীহুশ শরিয়াহ, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা-১৪৯-১৫১; আব্দুল হাই লাখনবি (১৩০৪ হি.), আল আসার, পৃষ্ঠা-৯৪-৯৫; মোল্লা আলি কারী (১০১৪ হি.), আল আসরারুল মারফুআহ, পৃষ্ঠা-৯৪-৯৬; হাদিসের নামে জালিয়াতি, অষ্টম পরিচ্ছেদ, পৃষ্ঠা নম্বর-৫০৯; এসব হাদিস, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা-১১৯।

২. আশুরার সম্পর্কে সমাজে বহুল প্রচলিত মিথ্যা ঘটনাবলি।
আমাদের সমাজে ব্যাপকভাবে এই জাল কাথাগুলি বলা হয়
দশই মহাররম বা আশুরার দিন আল্লাহ আসমান ও জমিন, পাহাড়, পর্বত, নদনদী, কলম, লাওহে মাহফুজ, আরশ, কুরসি, জান্নাত, জাহান্নাম, ফিরিশতাগণ, আদম (আ.) কে সৃষ্টি করেছেন। এই দিনে তিনি আদম (আ.) কে জান্নাতে প্রবেশ করিয়েছেন, ইদরীসকে (আ.) আসমানে উঠিয়ে নেন, নূহ (আ.) কে নৌকা থেকে বের করেন, দাউদ (আ.) তাওবা কবুল করেছেন, সুলাইমান (আ.) কে রাজত্ব প্রদান করেছেন, আইঊব (আ.)-এর বিপদ-মসিবত দূর করেন, তাওরাত নাজিল করেন, ইবরাহীম (আ.) জন্মগ্রহণ করেন, তিনি খলীল উপাধি লাভ করেন, ইবরাহীম (আ.) নমরূদের অগ্নিকুন্ডু থেকে রক্ষা পান, ইসমাঈল (আ.) কে কুরবানি করা হয়েছিল, ইউনূস (আ.) মাছের পেট থেকে বাহির হয়, ইউসূফকে (আ.) জেলখানা থেকে বের করেন, এ দিনে ইয়াকুব (আ.) দৃষ্টি শক্তি ফিরে পান, ইয়াকূব (আ.) ইউসূফের (আ.) সাথে সম্মিলিত হন, মুহাম্মাদ ﷺ জন্মগ্রহণ করেছেন।
আদম (আ.) এর তাওবা কবুল, নূহ (আ.) এর নৌকা জুদী পর্বতের উপর থামা ও ঈসা (আ.) জন্মগ্রহণ সম্পর্কে অনির্ভরযোগ্য সূত্রে কোনো কোনো সাহাবি-তাবিয়ী থেকে বর্ণিত।

কথাগুলিকে জাল হাদিস বলেছেন,
ইবনুল জাওযী (৫৯৭ হি.), আল-মাউদআত, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা-১১২-১১৭; শামছুদ্দীন আয-যাহাবী (৭৪৮ হি.), মিজানুল ইতিদাল, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা-১৯০; মুহাম্মাদ ইবনুস সাইয়িদ দরবেশ হূত (১২৭৬ হি), ‘আসনাল মাতালিব, পৃষ্ঠা-২৭৭-২৭৮; ইবনে হাজার আসকালানী (৮৫২ হি.), লিসানুল মিজান, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা-১৬৯; ইমাম জালালুদ্দিন সুয়ুতী (৯১১ হি.), আল-লাআলি, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা-১০৮-১০৯; ইবনুল কাইয়িম, আল-মানার, পৃষ্ঠা-৫২; আল-আজলূনী (১১৬২ হি.), কাশফুল খাফা, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা-৫৫৭; আব্দুল হাই লাখনবি (১৩০৪ হি.), আল আসার, পৃষ্ঠা-৯৪-৯৭; মোল্লা আলি কারী (১০১৪ হি.), আল আসরারুল মারফুআহ, পৃষ্ঠা-৯৪-৯৬; ইবনে আররাক (৯৩২ হি.), তানযীহ, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা-১৪৯।ইবনুল কাইয়িম, আল-মানার, পৃষ্ঠা-৫২; হাদিসের নামে জালিয়াতী, অষ্টম পরিচ্ছেদ, পৃষ্ঠা নম্বর-৫১০; এসব হাদিস, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা-১২০।

এই সম্পর্কে একটি সহিহ হাদিস হলো-
ইবনু ‘আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) মাদীনায় গমন করার পর দেখলেন ইহুদিরা আশুরার দিন সওম রাখে। রাসূল (সা.) জিজ্ঞেস করলেন, এ দিনটার বৈশিষ্ট্য কি যে, তোমরা সিয়াম রাখো? তারা বলল, এটা একটি গুরুত্ববহ দিন। এ দিনে আল্লাহ মূসা (আ.) ও তাঁর জাতিকে মুক্তি দিয়েছেন। আর ফিরাউন ও তার জাতিকে ডুবিয়েছেন। মূসা (আ.) শুকরিয়া হিসেবে এ দিন সওম রেখেছেন। অতএব তাঁর অনুসরণে আমরাও রাখি। এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, দীনের দিক দিয়ে আমরা মূসার বেশী নিকটে আর তার তরফ থেকে শুকরিয়া আদায়ের ব্যাপারে তোমাদের চেয়ে আমরা বেশী হকদার। বস্তুত ‘আশুরার দিন রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজেও সিয়াম রেখেছেন অন্যদেরকেও রাখার হুকুম দিয়েছেন। সহিহ বুখারী : ২০০৪, সহিহ মুসলিম : ১১৩০, মিশকাত : ২০৬৭
এই দিনে আল্লাহ তায়ালা মূসা (আ.) ও তাঁর সম্প্রদায়কে মুক্তি দিয়েছেন এবং ফিরাউন ও তার
কওমকে ডুবিয়ে দিয়েছেন। এই বর্ণনাটি সত্য হলেও বাকি সব জাল।

৩. দশই মুহাররম আশুরার দিন কিয়ামত হবে।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, দশই মুহাররম ব আশুরার দিন কিয়ামত হবে।
হাদিসটি জাল বলেছেন,
আল্লামা আবুল ফরজ ইবনুল জাওযী (রহ.) মন্তব্য করেন এটা নিঃসন্দেহে মাওযু বা বানোয়াট; শায়খ আলবানি জাল বলেছেন। কিতাবুল মওযূয়াত, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা-২০২; জালালুদ্দীন আস-সুয়ূতী, আল লায়ালিল মাসনূআহ, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা-১০৯; মুহাম্মদ ইব্‌ন আলি আল-কিনানী, তানযীহুশ শরীআতিল মারফুআহ, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা-১৪৯; মাউযূ হাদিস বা প্রচলিত জাল হাদিস, হাদিস নং-১০৬।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *