নাজাত প্রপ্ত দলের বৈশিষ্ট্য-০৬ ::  আল্লাহর ইবাদতে গাইরুল্লাহকে সম্পৃক্ত না করা

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

আল্লাহর ইবাদতে গাইরুল্লাহকে (আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে) সম্পৃক্ত করা অত্যন্ত মারাত্মক পাপ, যা শিরক হিসেবে চিহ্নিত। ইসলাম একেশ্বরবাদে বিশ্বাস স্থাপন করে এবং আল্লাহর সঙ্গে কোনো অংশীদারিত্বকে সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করেছে। তারপরও মানুষ প্রবৃত্তির তাড়নায় কল্পিত গাইরুল্লাহর ইবাদত করে। প্রকৃদ পক্ষে গাইরুল্লাহর কোর অস্তিস্থ নাই। গাইরুল্লা হলো মানুষের কল্পিত ইলাহ। মুশরিকদের ইলাহর কোন অস্তিস্থ নাই। মুসরিকদের ইলাহগণ কারো উপকার বা অপকার করতে পারে না, এমনকি আল্লাহ নিকট সুপারিশও করতে পারেন না।

আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেন-

وَیَعۡبُدُوۡنَ مِنۡ دُوۡنِ اللّٰہِ مَا لَا یَضُرُّہُمۡ وَلَا یَنۡفَعُہُمۡ وَیَقُوۡلُوۡنَ ہٰۤؤُلَآءِ شُفَعَآؤُنَا عِنۡدَ اللّٰہِ ؕ قُلۡ اَتُنَبِّـُٔوۡنَ اللّٰہَ بِمَا لَا یَعۡلَمُ فِی السَّمٰوٰتِ وَلَا فِی الۡاَرۡضِ ؕ سُبۡحٰنَہٗ وَتَعٰلٰی عَمَّا یُشۡرِکُوۡنَ

আর তারা আল্লাহ ছাড়া এমন কিছুর ইবাদত করছে, যা তাদের ক্ষতি করতে পারে না এবং উপকারও করতে পারে না। আর তারা বলে, এরা আল্লাহর নিকট আমাদের সুপারিশকারী’। বল, ‘তোমরা কি আল্লাহকে আসমানসমূহ ও যমীনে থাকা এমন বিষয়ে সংবাদ দিচ্ছ যা তিনি অবগত নন? তিনি পবিত্র মহান এবং তারা যা শরীক করে, তা থেকে তিনি অনেক ঊর্ধ্বে। সুনা ইউনুস : ১৮

মহান আল্লাহই হলেন প্রকৃত ইলাহ বা উপাস্য এবং একমাত্র তিনিই ইবাদত পাওয়ার যোগ্য। কিন্তু আল্লাহ পাশাপাশি দ্বীন সম্পর্কে অজ্ঞ লোকের মনগড়া ইলাহ বা উপাস্য সৃষ্টি করে নিয়েছে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এর পাশাপাশি গাইরুল্লাহর ইবাদাত করা বা অন্য কাউকে ইলাহ স্বীকার করাই হলো শিরকে আকবার। যা বান্দাকে ইসলাম ও মুসলিম থেকে বাহির করে দেয়।

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন-

وَقَالَ اللّٰہُ لَا تَتَّخِذُوۡۤا اِلٰـہَیۡنِ اثۡنَیۡنِ ۚ اِنَّمَا ہُوَ اِلٰہٌ وَّاحِدٌ ۚ فَاِیَّایَ فَارۡہَبُوۡنِ

আর আল্লাহ বলেছেন, ‘তোমরা দুই ইলাহ গ্রহণ করো না। তিনি তো কেবল এক ইলাহ। সুতরাং তোমরা আমাকেই ভয় কর। সুরা নাহল : ৫১

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন-

اَمِ اتَّخَذُوۡا مِنۡ دُوۡنِہٖۤ اٰلِہَۃً ؕ قُلۡ ہَاتُوۡا بُرۡہَانَکُمۡ ۚ

তারা কি তাঁকে ছাড়া অনেক ইলাহ গ্রহণ করেছে? বল, ‘তোমাদের প্রমাণ নিয়ে আস। সুরা আম্বিয়া : ২৪

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন-

وَاتَّخَذُوۡا مِنۡ دُوۡنِ اللّٰہِ اٰلِہَۃً لَّعَلَّہُمۡ یُنۡصَرُوۡنَ ؕ

অথচ তারা আল্লাহর পরিবর্তে অন্য সব ইলাহ গ্রহণ করেছে, এই প্রত্যাশায় যে, তারা সাহায্যপ্রাপ্ত হবে। সুরা ইয়াসিন : ৭৪

একাধিক ইলাহ যে নেই সে সম্পর্ক মহান আল্লাহ যুক্তিই সর্বোউত্তম ও অকাঠ্য তিনি বলেন-

مَا اتَّخَذَ اللّٰہُ مِنۡ وَّلَدٍ وَّمَا کَانَ مَعَہٗ مِنۡ اِلٰہٍ اِذًا لَّذَہَبَ کُلُّ اِلٰہٍۭ بِمَا خَلَقَ وَلَعَلَا بَعۡضُہُمۡ عَلٰی بَعۡضٍ ؕ  سُبۡحٰنَ اللّٰہِ عَمَّا یَصِفُوۡنَ ۙ

আল্লাহ কোন সন্তান গ্রহণ করেননি, তাঁর সাথে অন্য কোন ইলাহও নেই। (যদি থাকত) তবে প্রত্যেক ইলাহ নিজের সৃষ্টিকে নিয়ে পৃথক হয়ে যেত এবং একে অন্যের উপর প্রাধান্য বিস্তার করত; তারা যা বর্ণনা করে তা থেকে আল্লাহ কত পবিত্র! সুরা মুমিনুন : ৯১

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন-

وَاِذۡ قَالَ اِبۡرٰہِیۡمُ لِاَبِیۡہِ اٰزَرَ اَتَتَّخِذُ اَصۡنَامًا اٰلِہَۃً ۚ اِنِّیۡۤ اَرٰىکَ وَقَوۡمَکَ فِیۡ ضَلٰلٍ مُّبِیۡنٍ

আর (স্মরণ কর) যখন ইবরাহীম তার পিতা আযরকে বলেছিল, ‘তুমি কি মূর্তিগুলোকে ইলাহরূপে গ্রহণ করছ? নিশ্চয় আমি তোমাকে তোমার কওমকে স্পষ্ট গোমরাহীতে দেখছি’। সুরা আনাম : ৭৪

কুরআন ও হাদিসে এ বিষয়ে স্পষ্টভাবে নির্দেশনা দিয়ে ইহার অসারতা ও ক্ষতিকর দিক বিস্তারিত তুলে ধরেছেন। নিম্মে তার কিছু উদারহণ প্রদান করা হলো-

(১) গাইরুল্লাহর ইবাদতের গুনাহ ক্ষমা করা হবে না

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

اِنَّ اللّٰہَ لَا یَغۡفِرُ اَنۡ یُّشۡرَکَ بِہٖ وَیَغۡفِرُ مَا دُوۡنَ ذٰلِکَ لِمَنۡ یَّشَآءُ ۚ وَمَنۡ یُّشۡرِکۡ بِاللّٰہِ فَقَدِ افۡتَرٰۤی اِثۡمًا عَظِیۡمًا

নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সাথে শরীক করাকে ক্ষমা করেন না। তিনি ক্ষমা করেন এ ছাড়া অন্যান্য পাপ, যার জন্য তিনি চান। আর যে আল্লাহর সাথে শরীক করে সে অবশ্যই মহাপাপ রচনা করে। সুরা নিসা : ৪৮

আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাযিঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, অন্য বর্ণনায় রাসূল ﷺ কে বলতে শুনেছি-

مَنْ مَاتَ يُشْرِكُ بِاللَّهِ شَيْئًا دَخَلَ النَّارَ ‏”‏ ‏.‏ وَقُلْتُ أَنَا وَمَنْ مَاتَ لاَ يُشْرِكُ بِاللَّهِ شَيْئًا دَخَلَ الْجَنَّةَ ‏.

যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে কোন কিছুকে শারীক করে মারা যাবে সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে। আমি বলি, যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে শারীক না করা অবস্থায় মারা যায় সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। সহিহ মুসলিম : ৯২

(২)  গাইরুল্লাহর ইবাদত ভাল আমলকে ধ্বংস করে দেয়া হয়

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

وَلَقَدۡ اُوۡحِیَ اِلَیۡکَ وَاِلَی الَّذِیۡنَ مِنۡ قَبۡلِکَ ۚ لَئِنۡ اَشۡرَکۡتَ لَیَحۡبَطَنَّ عَمَلُکَ وَلَتَکُوۡنَنَّ مِنَ الۡخٰسِرِیۡنَ

আর অবশ্যই তোমার কাছে এবং তোমার পূর্ববর্তীদের কাছে ওহী পাঠানো হয়েছে যে, তুমি শির্ক করলে তোমার কর্ম নিষ্ফল হবেই। আর অবশ্যই তুমি ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে। সুরা যুমার : ৬৫

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

ذٰلِکَ ہُدَی اللّٰہِ یَہۡدِیۡ بِہٖ مَنۡ یَّشَآءُ مِنۡ عِبَادِہٖ ؕ وَلَوۡ اَشۡرَکُوۡا لَحَبِطَ عَنۡہُمۡ مَّا کَانُوۡا یَعۡمَلُوۡنَ

এ হচ্ছে আল্লাহর হিদায়াত, এ দ্বারা তিনি নিজ বান্দাদের মধ্য থেকে যাকে ইচ্ছা হিদায়াত করেন। আর যদি তারা শির্‌ক করত, তবে তারা যা আমল করছিল তা অবশ্যই বরবাদ হয়ে যেত। সুরা আনাম : ৮৮

আবূ সাদ বিন আবূ ফাদালাহ আল-আনসারী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

“‏ إِذَا جَمَعَ اللَّهُ الأَوَّلِينَ وَالآخِرِينَ لِيَوْمِ الْقِيَامَةِ لِيَوْمٍ لاَ رَيْبَ فِيهِ نَادَى مُنَادٍ مَنْ كَانَ أَشْرَكَ فِي عَمَلٍ عَمَلَهُ لِلَّهِ فَلْيَطْلُبْ ثَوَابَهُ مِنْ عِنْدِ غَيْرِ اللَّهِ فَإِنَّ اللَّهَ أَغْنَى الشُّرَكَاءِ عَنِ الشِّرْكِ ‏”

আল্লাহ তাআলা যখন কিয়ামতের দিন, যে দিনের আগমনে কোন সন্দেহ নাই, পূর্বাপর সকলকে একত্র করবেন, তখন একজন ঘোষক ঘোষণা করবে, যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কাজ করতে গিয়ে এর মধ্যে কাউকে শরীক করেছে, সে যেন গাইরুল্লাহর নিকট নিজের সওয়াব চেয়ে নেয়। কেননা আল্লাহ তাআলা শরীকদের শেরেক থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪২০৩, সুনানে তিরমিজি : ৩১৫৪, আহমাদ : ১৭৪৩১, মিশকাত : ৫৩১৮

(৩) মুশরিক বা গাইরুল্লাহর ইবাদতকারীর কোন আমলই কবুল হবে না

মুআবিয়াহ বিন হায়দাহ বিন মুআবিয়াহ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

لاَ يَقْبَلُ اللَّهُ مِنْ مُشْرِكٍ أَشْرَكَ بَعْدَ مَا أَسْلَمَ عَمَلاً حَتَّى يُفَارِقَ الْمُشْرِكِينَ إِلَى الْمُسْلِمِينَ ‏

কোন ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করার পর মুশরিক হয়ে শিরকে লিপ্ত হলে আল্লাহ তার কোন আমলই গ্রহণ করেন না, যাবত না সে মুশরিকদের থেকে পৃথক হয়ে মুসলমানের মধ্যে প্রত্যাবর্তন করে। সুনানে ইবনে মাজাহ: ২৫৩৬, আহমাদ : ১৯৫৩৩, সহীহাহ : ৩৬৯। তাহকীক আলবানীঃ হাসান।

(৪) মুশরিক বা গাইরুল্লাহর ইবাদতকারী জাহান্নামের আগুনে স্থায়ীভাবে থাকবে

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ وَالْمُشْرِكِينَ فِي نَارِ جَهَنَّمَ خَالِدِينَ فِيهَا أُولَئِكَ هُمْ شَرُّ الْبَرِيَّةِ

আহলে কিতাব ও মুশরিকদের মধ্যে যারা কাফের, তারা জাহান্নামের আগুনে স্থায়ীভাবে থাকবে। তারাই সৃষ্টির অধম। সুরা বাইয়েনা : ৬

(৫) গাইরুল্লাহর ইবাদতকারীর সমস্ত কৃতকর্ম ধূলোর মতো উড়িয়ে যাবে

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

وَقَدِمۡنَاۤ اِلٰی مَا عَمِلُوۡا مِنۡ عَمَلٍ فَجَعَلۡنٰہُ ہَبَآءً مَّنۡثُوۡرًا

আর তারা যে কাজ করেছে আমি সেদিকে অগ্রসর হব। অতঃপর তাকে বিক্ষিপ্ত ধূলিকণায় পরিণত করে দেব। সুরা ফুরকান : ২৩

(৬) গাইরুল্লাহর ইবাদতকারীর জন্য জান্নাত হারাম

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

 ؕ اِنَّہٗ مَنۡ یُّشۡرِکۡ بِاللّٰہِ فَقَدۡ حَرَّمَ اللّٰہُ عَلَیۡہِ الۡجَنَّۃَ وَمَاۡوٰىہُ النَّارُ ؕ وَمَا لِلظّٰلِمِیۡنَ مِنۡ اَنۡصَارٍ

নিশ্চয় যে আল্লাহর সাথে শরীক করে, তার উপর অবশ্যই আল্লাহ জান্নাত হারাম করে দিয়েছেন এবং তার ঠিকানা আগুন। আর যালিমদের কোন সাহায্যকারী নেই। সুরা মায়েদা : ৭২

(৭) শিরককারী গোমরাহীতে পথভ্রষ্ট

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

اِنَّ اللّٰہَ لَا یَغۡفِرُ اَنۡ یُّشۡرَکَ بِہٖ وَیَغۡفِرُ مَا دُوۡنَ ذٰلِکَ لِمَنۡ یَّشَآءُ ؕ وَمَنۡ یُّشۡرِکۡ بِاللّٰہِ فَقَدۡ ضَلَّ ضَلٰلًۢا بَعِیۡدًا

নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমা করেন না তাঁর সাথে শরীক করাকে এবং এ ছাড়া যাকে চান ক্ষমা করেন। আর যে আল্লাহর সাথে শরীক করে সে তো ঘোর পথভ্রষ্টতায় পথভ্রষ্ট হল। সুরা নিসা : ১১৬

(৮) শিরককারীকে আল্লাহ মু্ল্যহীন বস্তুর সাথে তুলনা করেছেন

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

حُنَفَآءَ لِلّٰہِ غَیۡرَ مُشۡرِکِیۡنَ بِہٖ ؕ وَمَنۡ یُّشۡرِکۡ بِاللّٰہِ فَکَاَنَّمَا خَرَّ مِنَ السَّمَآءِ فَتَخۡطَفُہُ الطَّیۡرُ اَوۡ تَہۡوِیۡ بِہِ الرِّیۡحُ فِیۡ مَکَانٍ سَحِیۡقٍ

আল্লাহর জন্য একনিষ্ঠ হয়ে এবং তাঁর সাথে কাউকে শরীক না করে। আর যে আল্লাহর সাথে শরীক করে, সে যেন আকাশ থেকে পড়ল। অতঃপর পাখি তাকে ছোঁ মেরে নিয়ে গেল কিম্বা বাতাস তাকে দূরের কোন জায়গায় নিক্ষেপ করল। সুরা হজ : ৩১

(৯) গাইরুল্লাহর ইবাদতকারী সাফায়েত থেকে বঞ্চিত থাকবে

আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন

لِكُلِّ نَبِيٍّ دَعْوَةٌ مُسْتَجَابَةٌ فَتَعَجَّلَ كُلُّ نَبِيٍّ دَعْوَتَهُ وَإِنِّي اخْتَبَأْتُ دَعْوَتِي شَفَاعَةً لأُمَّتِي فَهِيَ نَائِلَةٌ مَنْ مَاتَ مِنْهُمْ لاَ يُشْرِكُ بِاللَّهِ شَيْئًا

প্রত্যেক নবীর জন্য একটি করে দোয়া আছে যা কবুল করা হয়। আর প্রত্যেক নবী তাঁর দু’আর ব্যাপারে তাড়াহুড়া করেছেন আর আমি আমার দু’আ আমার উম্মাতের শাফাআতের জন্য জমা রেখেছি। অতএব আমার উম্মাতের মধ্যে যারা আল্লাহর সাথে শিরক না করে মারা যাবে তারা আমার শাফাআত প্রাপ্ত হবে।সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪৩০৭

(১০) আল্লাহর সঙ্গে কাউকে অংশীদার করা হারাম

আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেন-

إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَن يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَٰلِكَ لِمَن يَشَاءُ ۚ وَمَن يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدِ افْتَرَىٰ إِثْمًا عَظِيمًا

অর্থ: নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁকে শরিক করার পাপ ক্ষমা করেন না এবং এর বাইরে যা কিছু রয়েছে তা তিনি যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন। আর যে কেউ আল্লাহর সঙ্গে শরিক করে, সে অবশ্যই এক মহাপাপ রচনা করেছে। সূরা নিসা : ৪৮

(১১) গাইরুল্লাহর ইবাদত একটি নিকৃষ্ট কবিরা গুনাহ

আবূ বকরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন-

أَلاَ أُخْبِرُكُمْ بِأَكْبَرِ الْكَبَائِرِ ‏”‏‏.‏ قَالُوا بَلَى يَا رَسُولَ اللَّهِ‏.‏ قَالَ ‏”‏ الإِشْرَاكُ بِاللَّهِ، وَعُقُوقُ الْوَالِدَيْنِ

আমি কি তোমাদের নিকৃষ্ট কাবীরাহ গুনাহের বর্ণনা দিব না? সকলে বললেনঃ হাঁ, হে আল্লাহর রাসূল! তখন তিনি বললেন, তা হলো, আল্লাহর সঙ্গে অন্য কোন কিছুকে শরীক করা এবং মাতা-পিতার অবাধ্যতা। সহিহ বুখারি : ৬২৭৩

আবূ বকরাহ (রা.) বলেন যে, আমরা রাসূলুল্লাহ ﷺ এর নিকট উপস্থিত ছিলাম। তখন তিনি বললেন-

أَلاَ أُنَبِّئُكُمْ بِأَكْبَرِ الْكَبَائِرِ – ثَلاَثًا – الإِشْرَاكُ بِاللَّهِ وَعُقُوقُ الْوَالِدَيْنِ وَشَهَادَةُ الزُّورِ أَوْ قَوْلُ الزُّورِ ‏”‏ ‏.‏ وَكَانَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم مُتَّكِئًا فَجَلَسَ فَمَازَالَ يُكَرِّرُهَا حَتَّى قُلْنَا لَيْتَهُ سَكَتَ

আমি কি তোমাদের কবীরাহ গুনাহ সম্পর্কে বলব না? তিনি এ কথাটি তিনবার বললেন। (তারপর বললেন) সেগুলো হলো, আল্লাহর সাথে শারীক করা, পিতামাতার অবাধ্য হওয়া, মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়া কিংবা কথা বলা। এ সময় রাসূলুল্লাহ ﷺ হেলান দিয়ে বসা ছিলেন। তিনি সোজা হয়ে বসলেন এবং (শেষোক্ত) কথাটি বারবার বলতে লাগলেন। এমন কি আমরা মনে মনে বলছিলাম, আহা তিনি যদি থামতেন। সহিহ মুসলিম : ৮৭

২। গাইরুল্লাহর জন্য করা হয় এমন কিছু ইবাদত-

আমাদের সমাজে অনেক ইবাদত প্রচলিত আছে যা একান্তভাবেই গাইরুল্লাহর বা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো জন্য করা হয়। এই ইবাদত মূলত শিরকের অন্তর্ভুক্ত, যা ইসলামের মৌলিক বিশ্বাসের পরিপন্থী। আল্লাহর ইবাদতে গাইরুল্লাহকে শরিক করা মারাত্মক গুনাহ। নিচে গাইরুল্লাহর ইবাদতের সম্পর্কে কিছু উদাহরণ তুলে ধরা হলো।

(১) গাইরুল্লাহর নিকট সাহায্যের প্রার্থনা করা

আল্লাহকে বাদ দিয়ে কোন গাইরুল্লার নিকট সাহায্য প্রর্থনা করা। আল্লাহ কে বাদ অন্যের নিকট দুয়া করে সাহায্য বা আশ্রয় প্রার্থনায় করা শিরক। যা এক জন মুসলিমকে ইসলাম থেকে বের করে মুশরিক বানিয়ে দেয়। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন-

 وَلَا تَدۡعُ مِن دُونِ ٱللَّهِ مَا لَا يَنفَعُكَ وَلَا يَضُرُّكَۖ فَإِن فَعَلۡتَ فَإِنَّكَ إِذٗا مِّنَ ٱلظَّٰلِمِينَ

আর আল্লাহকে বাদ দিয়ে এমন কোন সত্তাকে ডেকো না, যে তোমার না কোন উপকার করতে না ক্ষতি করতে পারে৷ যদি তুমি এমনিটি করো তাহলে জালেমদের দলভুক্ত হবে। সুরা ইউনুস : ১০৬

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَٱلَّذِينَ تَدۡعُونَ مِن دُونِهِۦ مَا يَمۡلِكُونَ مِن قِطۡمِيرٍ

আর আল্লাহকে ছাড়া যাদেরকে তোমরা ডাকো তারা খেজুরের আঁটির আবরণেরও মালিক নয়। সুরা ফাতির : ১৪

(২)  গাইরুল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রর্থনা করা

কোন ক্ষতিকর ব্যক্তি বা বস্তু ক্ষতি হতে বাঁচার জন্য আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করা বা বা সরনাপন্ন হওয়া শিরকে আকবর। আল্লাহ ব্যতীত অদৃশ্য জ্বিন, ভুত, মৃত কিংবা অনুপস্থিত কোনো ব্যক্তি বা বস্তুর নিকট আশ্রয় চাওয়া শিরক। এমন ভাবাও ঠিক নয় যে, অদৃশ্য জ্বিন, ভুত,  মৃত কিংবা অনুপস্থিত কোনো ব্যক্তির নিকট আশ্রয় চাইলে অদৃশ্য ভাবে সাহায্য করবে।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَأَنَّهُ ۥ كَانَ رِجَالٌ۬ مِّنَ ٱلۡإِنسِ يَعُوذُونَ بِرِجَالٍ۬ مِّنَ ٱلۡجِنِّ فَزَادُوهُمۡ رَهَقً۬ا

আর মানুষের মধ্য থেকে কিছু লোক জিনদের কিছু লোকের কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করতো৷ এভাবে তারা জিনদের অহংকার আরো বাড়িয়ে দিয়েছে৷ সুরা জিন : ০৬

গাইরুল্লাহ নয়, আল্লাহর নিকট আশ্রয় চাওয়া ফরজ-

যুগ যুগ ধরে চলে আশা মিথ্যা বিশ্বাস ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে ইসলামের ঘোষনা খু্বই ষ্পষ্ট। ইসলাম এসে মানবতাকে শিখাল আল্লাহই এক মাত্র আশ্রয়দাতা। সুতারং তার নিকটই আশ্রয় চাইতে হবে।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَإِمَّا يَنزَغَنَّكَ مِنَ ٱلشَّيۡطَـٰنِ نَزۡغٌ۬ فَٱسۡتَعِذۡ بِٱللَّهِ‌ۖ إِنَّهُ ۥ هُوَ ٱلسَّمِيعُ ٱلۡعَلِيمُ

যদি তোমরা শয়তানের পক্ষ থেকে কোন প্ররোচনা আঁচ করতে পার তাহলে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা কর। তিনি সব কিছু শোনেন এবং জানেন৷ সুরা হা-মিম-সাজদাহ : ৩৬

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

 وَقُل رَّبِّ أَعُوذُ بِكَ مِنۡ هَمَزَٲتِ ٱلشَّيَـٰطِينِ  وَأَعُوذُ بِكَ رَبِّ أَن يَحۡضُرُونِ

আর দোয়া করো, ‘‘হে আমার রব! আমি শয়তানদের উস্কানি থেকে তোমার আশ্রয় চাই৷ হে! রব, সে আমার কাছে আসুক এ থেকেও তো আমি তোমার আশ্রয় চাই। সূরা মুমিনুন : ৯৭-৯৮

আবূ আহমাদ শাকাল ইবনু হুমাইদ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রসূল! আমাকে একটি দু’আ শিক্ষা দিন। তিনি বললেনঃ তুমি বলোঃ ’’হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে কানের অশ্লীল শ্রবণ, চোখের কুদৃষ্টি, জিহ্বার কুবাক্য, অন্তরের কপটতা ও কামনার অনিষ্টতা হতে আশ্রয় চাই।’ সুনানে আবু দাউদ : ১৫৫১

(৩) বিপদে গাইরুল্লাহকে আহবান করা

আহবান করা মানে নিজের অভাব পূরণের উদ্দেশ্যে সাহায্যের জন্য ডাকা। তবে ঈমানের দাবি হল বিপদ বা সংকটমুক্ত এবং অভাব বা প্রয়োজন পূর্ণ করার সব ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহর হাতেই নিহীত আছৈ। তাই একমাত্র তার কাছেই প্রর্থনা করা সঠিক ও যথার্থ সত্য বলে বিবেচিত। অন্যকে অভাব পূরণের উদ্দেশ্যে গাইরুল্লাহকে সাহায্যের জন্য আহবান করা পরিস্কার শিরক।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

. َأَعۡتَزِلُكُمۡ وَمَا تَدۡعُونَ مِن دُونِ ٱللَّهِ وَأَدۡعُواْ رَبِّى عَسَىٰٓ أَلَّآ أَكُونَ بِدُعَآءِ رَبِّى شَقِيًّ۬ا

আমি আপনাদেরকে ত্যাগ করছি এবং আপনারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে যাদেরকে আহবান করেন তাদেরকেও। আমি তো আমার রবকেই আহবান করব৷ আশা করি আমি নিজের রবকে আহবান করে ব্যর্থ হবো না। সুরা মারিয়াম : ৪৮

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

قُلِ ٱدۡعُواْ ٱلَّذِينَ زَعَمۡتُم مِّن دُونِهِۦ فَلَا يَمۡلِكُونَ كَشۡفَ ٱلضُّرِّ عَنكُمۡ وَلَا تَحۡوِيلاً

বল, ‘তাদেরকে ডাক, আল্লাহ ছাড়া তোমরা যাদেরকে (উপাস্য) মনে কর। তারা তো তোমাদের দুঃখ-দুর্দশা দূর করার ও পরিবর্তন করার ক্ষমতা রাখে না’। সুরা বনী ইসরাঈল : ৫৬

(৪) গাইরুল্লাহর তৈরি করে উপসনা করা-

আল্লাহর পরিবর্তে গাইরুল্লাহর মূর্তি তৈরি করে তার উপসনা করা। ইসলাম মূর্তি সংস্কৃতির সাথে কখনো আপোষ করেনি। ইসলামে যদ শিরকি কাজে আছে তার মধ্যে মূর্তির পূজাকে সবচেয়ে জঘন্য শিরক হিসেবে গন্য করা হয়।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡۤا اِنَّمَا الۡخَمۡرُ وَالۡمَیۡسِرُ وَالۡاَنۡصَابُ وَالۡاَزۡلَامُ رِجۡسٌ مِّنۡ عَمَلِ الشَّیۡطٰنِ فَاجۡتَنِبُوۡہُ لَعَلَّکُمۡ تُفۡلِحُوۡنَ

হে মুমিনগণ! নিশ্চয়ই মদ, জুয়া, মূর্তি ইত্যাদি এবং লটারীর তীর, এ সব গর্হিত বিষয়, শাইতানী কাজ ছাড়া আর কিছুই নয়। সুতরাং এ থেকে সম্পূর্ণ রূপে দূরে থাক, যেন তোমাদের কল্যাণ হয়। সুরা মায়েদা : ৯০

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

إِنَّمَا تَعۡبُدُونَ مِن دُونِ ٱللَّهِ أَوۡثَـٰنً۬ا وَتَخۡلُقُونَ إِفۡكًا‌ۚ إِنَّ ٱلَّذِينَ تَعۡبُدُونَ مِن دُونِ ٱللَّهِ لَا يَمۡلِكُونَ لَكُمۡ رِزۡقً۬ا فَٱبۡتَغُواْ عِندَ ٱللَّهِ ٱلرِّزۡقَ وَٱعۡبُدُوهُ وَٱشۡكُرُواْ لَهُ ۥۤ‌ۖ إِلَيۡهِ تُرۡجَعُونَ

তোমরা আল্লাহকে বাদ দিয়ে যাদেরকে পূজা করছো তারাতো নিছক মূর্তি আর তোমরা একটি মিথ্যা তৈরি করছো৷  আসলে আল্লাহকে বাদ দিয়ে যাদেরকে তোমরা পূজা করো তারা তোমাদের কোন রিযিকও দেবার ক্ষমতা রাখে না, আল্লাহর কাছে রিযিক চাও, তাঁরই বন্দেগী করো এবং তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো, তারই দিকে তোমাদের ফিরে যেতে হবে৷ সুরা আকাবুত : ১৭

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

 أَفَرَءَيۡتُمُ ٱللَّـٰتَ وَٱلۡعُزَّىٰ (١٩) وَمَنَوٰةَ ٱلثَّالِثَةَ ٱلۡأُخۡرَىٰٓ  

এখন একটু বলতো, তোমরা কি কখনো এ লাত, এ উযযা এবং তৃতীয় আরো একজন দেবতা মানাতের প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে গভীর ভাবে চিন্তা-ভাবনা করে দেখেছো? সৃরা নাজম : ১৯-২০

আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী ﷺ যখন মক্কায় প্রবেশ করেন, তখন কা’বা শরীফের চারপাশে তিনশ ষাটটি মূর্তি ছিল। নবী ﷺ নিজের হাতের লাঠি দিয়ে মূর্তিগুলোকে আঘাত করতে থাকেন আর বলতে থাকেন-

  وَقُلۡ جَآءَ ٱلۡحَقُّ وَزَهَقَ ٱلۡبَـٰطِلُ‌ۚ إِنَّ ٱلۡبَـٰطِلَ كَانَ زَهُوقً۬ا    

সত্য এসে গেছে এবং মিথ্যা বিলুপ্ত হয়ে গেছে, মিথ্যার তো বিলুপ্ত হবারই কথা। (সূরা বনী ইসরাঈল ১৭:৮১)। সহিহ বুখারি : ২৪৭৮

(৫) গাইরুল্লাহর ভাষ্কর্যের সামনে সম্মান প্রদর্শন করা

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

 قَالَ أَتَعۡبُدُونَ مَا تَنۡحِتُونَ (٩٥) وَٱللَّهُ خَلَقَكُمۡ وَمَا تَعۡمَلُونَ  

সে বললো, “তোমরা কি নিজেদেরই খোদাই করা জিনিসের পূজা করো? অথচ আল্লাহই তোমাদেরকেও সৃষ্টি করেছেন এবং তোমরা যে জিনিসগুলো তৈরি করো তাদেরকেও (সৃষ্টি করেছেন)৷ (সুরা সাফফাত :৯৫-৯৬

আলী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন-

أمرني رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم أَنْ لاَ أَدَعَ قَبْرًا مُشْرِفًا إِلاَّ سَوَّيْتُهُ , وَلاَ تِمْثَالاً إِلاَّ طَمَسْتُهُ

আমাকে রাসূলুল্লাহ ﷺ নির্দেশ দিয়েছেন যে, আমি যাতে সকল উঁচু কবরকে ভেঙ্গে দেই এবং সকল ভাষ্কর্যকে বিলুপ্ত করি”। সহিহ মুসলিম : ৯৬৯

(৬) আল্লাহর পরিবর্তে জ্বিনের আশ্রয় চাওয়া

জাহেলীযুগের আরাবের লোকেরা জ্বিনের আশ্রয় চাইত। জ্বিন মানুষের ক্ষতি করতে পারে এমন বিশ্বাস নিয়ে তারা জ্বিনকে ভয় করার মাধ্যমে শিরকের মত পাপাচারে লিপ্ত হত। আল্লাহ ব্যতীত অন্য কিছুর আশ্রয় ও সাহায্য প্রার্থনা করা শির্কে আকবর। আর সেই কাজটি জাহেলীযুগের আরাবের লোকেরা করত। বর্তমানে অনেক মুসলিম জ্বিনের ক্ষমতাকে বিশ্বাস করছে এবং তাদের আশ্রয় বিপদ আপদ থেকে বাচার ব্যর্থ চেষ্টা করছে। এমনকি জ্বিন বাবা নাম দিয়ে ব্যবসা করছে। আর অজ্ঞ লোকেরা হুমড়ু খেয়ে টাকা পয়াসা নিয়ে জ্বিন বাবার পায়ে লুটিয়ে পড়ছে। এভাবে জ্বিনের আশ্রয় বিপদ আপদ থেকে বাচার ব্যর্থ চেষ্টা করা বড় শিরক। আল্লাহ রাব্বুল আলামীণ বলেন-

 وَأَنَّهُ ۥ كَانَ رِجَالٌ۬ مِّنَ ٱلۡإِنسِ يَعُوذُونَ بِرِجَالٍ۬ مِّنَ ٱلۡجِنِّ فَزَادُوهُمۡ رَهَقً۬ا

‘মানুষের মধ্য থেকে কতিপয় লোক জ্বিন সম্প্রদায়ের মধ্যস্থিত কিছু জ্বিনের আশ্রয় নিতো। ফলে ঐ মানুষগুলো জ্বিনদের মান মর্যাদা আত্মন্তরিতা বাড়িয়ে দিতো’’। সুররা জ্বিন : ৬

আল্লাহ রাব্বুল আলামীণ বলেন-

وَجَعَلُواْ لِلَّهِ شُرَكَآءَ ٱلۡجِنَّ وَخَلَقَهُمۡ‌ۖ وَخَرَقُواْ لَهُ ۥ بَنِينَ وَبَنَـٰتِۭ بِغَيۡرِ عِلۡمٍ۬‌ۚ سُبۡحَـٰنَهُ ۥ وَتَعَـٰلَىٰ عَمَّا يَصِفُونَ

এসব সত্ত্বেও লোকেরা জ্বিনদেরকে আল্লাহর সাথে শরীক করলো,  অথচ তিনি তাদের সৃষ্টিকর্তা৷ আর তারা না জেনে বুঝে তাঁর জন্য পুত্র ও কন্যা তৈরী করে ফেললো, অথচ এরা যেসব কথা বলে তা থেকে তিনি পবিত্র এবং তার উর্ধে৷ সুরা আনআম : ১০০

(৭) ঈসা (আ.) কে মহান আল্লাহর সাথে তুলনা করা

সাধারনত খৃষ্টান ধর্মের অনুসারিগন ঈসা (আ.) কে মহান আল্লাহর সাথে তুলনা করে থাকে। তারাই এই শিরকের প্রবক্তা, অনুসারী এবং প্রচার কারি। খৃষ্টানদের অপপ্রচারে কারণে কিছু শিক্ষিত কিন্তু ইসলামি জ্ঞানে অজ্ঞ নামধারি মুসলিম লোকেরাও বিভ্রান্ত হচ্ছে। এই শিরক থেকে বাচতে চাইলে প্রথমে চাই এ সম্পর্কে পরিস্কার ধারনা। মহান আল্লাহই এ ব্যাপারটি পরিস্কান করে দিয়েছেন। তিনি পবিত্র কুরআনে আল্লাহ রাব্বুল আলামীণ বলেন-

 لَقَدۡ ڪَفَرَ ٱلَّذِينَ قَالُوٓاْ إِنَّ ٱللَّهَ هُوَ ٱلۡمَسِيحُ ٱبۡنُ مَرۡيَمَ‌ۖ وَقَالَ ٱلۡمَسِيحُ يَـٰبَنِىٓ إِسۡرَٲٓءِيلَ ٱعۡبُدُواْ ٱللَّهَ رَبِّى وَرَبَّڪُمۡ‌ۖ إِنَّهُ ۥ مَن يُشۡرِكۡ بِٱللَّهِ فَقَدۡ حَرَّمَ ٱللَّهُ عَلَيۡهِ ٱلۡجَنَّةَ وَمَأۡوَٮٰهُ ٱلنَّارُ‌ۖ وَمَا لِلظَّـٰلِمِينَ مِنۡ أَنصَارٍ۬  

নিসন্দেহে তারা কুফরী করেছে যারা বলেছে, মারয়াম পুত্র মসীহ্‌ই আল্লাহ৷ অথচ মসীহ্‌ বলেছেন, হে নবী ইসরাঈল! আল্লাহর বন্দেগী করো, যিনি আমার রব এবং তোমাদেরও রব ! যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করেছে তার ওপর আল্লাহ জান্নাত হারাম করে দিয়েছেন এবং তার আবাস জাহান্নাম ৷ আর এ ধরনের জালেমদের কোন সাহায্যকারী নেই৷ সুরা মায়েদা : ৭২

আল্লাহ রাব্বুল আলামীণ বলেন-

لَّقَدۡ ڪَفَرَ ٱلَّذِينَ قَالُوٓاْ إِنَّ ٱللَّهَ ثَالِثُ ثَلَـٰثَةٍ۬‌ۘ وَمَا مِنۡ إِلَـٰهٍ إِلَّآ إِلَـٰهٌ۬ وَٲحِدٌ۬‌ۚ وَإِن لَّمۡ يَنتَهُواْ عَمَّا يَقُولُونَ لَيَمَسَّنَّ ٱلَّذِينَ كَفَرُواْ مِنۡهُمۡ عَذَابٌ أَلِيمٌ (٧٣)

অর্থ: নিসন্দেহে তারা কুফরী করেছে যারা বলেছে, আল্লাহ তিন জনের মধ্যে একজন৷ অথচ এক ইলাহ্‌ ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই যদি তারা নিজেদের এই সব কথা থেকে বিরত না হয়, তাহলে তাদের মধ্য থেকে যারা কুফরী করেছে তাদেরকে যন্ত্রণা দায়ক শাস্তি দেয়া হবে৷  সুরা মায়েদা : ৭৩

আল্লাহ রাব্বুল আলামীণ বলেন-

 مَّا ٱلۡمَسِيحُ ٱبۡنُ مَرۡيَمَ إِلَّا رَسُولٌ۬ قَدۡ خَلَتۡ مِن قَبۡلِهِ ٱلرُّسُلُ وَأُمُّهُ ۥ صِدِّيقَةٌ۬‌ۖ ڪَانَا يَأۡڪُلَانِ ٱلطَّعَامَ‌ۗ ٱنظُرۡ ڪَيۡفَ نُبَيِّنُ لَهُمُ ٱلۡأَيَـٰتِ ثُمَّ ٱنظُرۡ أَنَّىٰ يُؤۡفَكُونَ (٧٥) 

অর্থ: মারয়াম পুত্র মসীহ্‌ তো একজন রসূল ছাড়া আর কিছুই ছিল না?  তার পূর্বেও আরো অনেক রসূল অতিক্রান্ত হয়েছিল৷ তার মা ছিল একজন সত্যনিষ্ঠ মহিলা৷ তারা দুজনই খাবার খেতো৷ দেখো কিভাবে তাদের সামনে সত্যের নিদর্শনগুলো সুস্পষ্ট করি৷ তারপর দেখো তারা কিভাবে উল্টো দিকে ফিরে যাচ্ছে৷ সুরা মায়েদা : ৭৫

উপরের তিনটি আয়াতের দ্ব্যর্থহীনভাবে খৃষ্টীয় আকীদার সুস্পষ্ট প্রতিবাদ করা হয়েছে। যদি কেই প্রশ্ন করে হযরত ঈসা (আ.) কি ছিলেন? তিনি সম্পূর্ণ সন্দেহাতীভাবে একজন মানুষ ছিলেন। তিনি আল্লাহর একজন প্রিয় বান্দা ও রাসুল ছিলেন। মানুষের হেদায়েতের পৃথিবীতে অনেক নবী রাসূল এসেছিল, তিনি তাদের মধ্যে একজন। তিনি নিজে কখন বলে নাই, আমিই আল্লাহ, আমিই রব বা এমন ও দাবি করে নাই যে, আমি আল্লাহর সন্তান (নাউজুবিল্লহ)। তিনি নিজে আল্লাহ বা আল্লাহর কাজে তাঁর সাথে শরীক ও তাঁর সমকক্ষ করতেন না।  তিনি যে এক জন সত্যিকারের মানুষ তার প্রমান, তার জন্ম এক মহিলার গর্ভে, যার একটি বংশ তালিকা আছে, যিনি মানবিক দেহের অধিকারী ছিলেন, তিনি ঘুমাতেন, খেতেন, ঠাণ্ডা-গরম অনুভব করতেন।আসলে যে ঈসা (আ.) এর আবির্ভাব বাস্তবে ঘটেছিল, যিনি রাসুল ছিলেন তার আনিত ধর্ম থেকে খৃষ্টানগন আজ বহুদুরে। সত্যিকার ঈসা আলাইহিস সালামকে তারা মানে না। বরং তারা মানে নিজেদের কল্পিত  ঈসা মসিহ কে।

(৮) সৃষ্টি ও ইবাদতে মহান আল্লাহর সাথে ফিরিস্তাদের সম্পৃক্ত করা-

জাহেলীযুগের আবরের মূর্খ লোকরা ফিরিস্তাদের আল্লাহর মেয়ে কল্পনা করত এবং এর তারা আল্লাহর সৃষ্ট মাকলুক ফিরিস্তাদেরকে কাল্পনিকভাবে আল্লাহর সমকক্ষ দাড় করিয়েছে। এমনকি তারা কাল্পনিকভাবে আল্লাহর বংশ তালিকাও তৈরি করে তা আল্লাহর বংশধারা চালিয়ে দিয়েছে। তারা ফিরিস্তাদেরকে বিভিন্ন দেবীদের নামে নামকরণ করে পুজা করত যা স্পষ্ট শিরকি কাজ৷  আর এসব তারা করত শুধু অনুমানের ভিত্তিতে, কোন প্রমান ছাড়াই।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীণ বলেন-

 إِنَّ ٱلَّذِينَ لَا يُؤۡمِنُونَ بِٱلۡأَخِرَةِ لَيُسَمُّونَ ٱلۡمَلَـٰٓٮِٕكَةَ تَسۡمِيَةَ ٱلۡأُنثَىٰ (٢٧) وَمَا لَهُم بِهِۦ مِنۡ عِلۡمٍ‌ۖ إِن يَتَّبِعُونَ إِلَّا ٱلظَّنَّ‌ۖ وَإِنَّ ٱلظَّنَّ لَا يُغۡنِى مِنَ ٱلۡحَقِّ شَيۡـًٔ۬ا (٢٨) 

কিন্তু যারা আখেরাত মানে না তারা ফিরিস্তাদেরকে দেবীদের নামে নামকরণ করে৷  অথচ এ ব্যাপারে তাদের কোন জ্ঞানই নেই৷ তারা কেবলই বদ্ধমূল ধারণার অনুসরণ করছে৷  আর ধারণা কখনো জ্ঞানের প্রয়োজন পূরণে কোন কাজে আসতে পারে না৷ সুরা নাজম : ২৭-২৮

আল্লাহ রাব্বুল আলামীণ বলেন-

 وَجَعَلُواْ ٱلۡمَلَـٰٓٮِٕكَةَ ٱلَّذِينَ هُمۡ عِبَـٰدُ ٱلرَّحۡمَـٰنِ إِنَـٰثًا‌ۚ أَشَهِدُواْ خَلۡقَهُمۡ‌ۚ سَتُكۡتَبُ شَهَـٰدَتُہُمۡ وَيُسۡـَٔلُونَ (١٩) وَقَالُواْ لَوۡ شَآءَ ٱلرَّحۡمَـٰنُ مَا عَبَدۡنَـٰهُم‌ۗ مَّا لَهُم بِذَٲلِكَ مِنۡ عِلۡمٍ‌ۖ إِنۡ هُمۡ إِلَّا يَخۡرُصُونَ (٢٠)

এরা দয়াময় আল্লাহর খাস বান্দা ফিরিস্থাগনকে স্ত্রীলোক গন্য করেছে। এরা কি তাদের দৈহিক গঠন দেখেছে? এদের সাক্ষ্য লিপিবদ্ধ করে নেয়া হবে এবং সে জন্য এদেরকে জবাবদিহি করতে হবে৷ এরা বলে, দয়াময় আল্লাহ যদি চাইতেন তাহলে আমরা কখনো পূজা করতাম না। এ বিষয়ে প্রকৃত সত্য এরা আদৌ জানে না, কেবলই অনুমানে কথা বলে৷ সুরা জুকরুক : ১৯-২০

(৯) আল্লাহকে বাদ দিয়ে শয়তানের উপসনা করা

সৃষ্টিকর্তা হিসাবে মহান আল্লাহই এক মাত্র উপসনার যোগ্য। তাকে বাদে যারই ইবাদাত করা হোক না কেন বড় শিরকের অন্তভূক্ত হবে। তাইতো মহান আল্লাহ শয়তানের ইবাদাত করতে নিষেধ করছেন। এবং শুধু তারই ইবাদাত করতে নির্দেষ প্রদান করছেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামীণ বলেন-

أَلَمۡ أَعۡهَدۡ إِلَيۡكُمۡ يَـٰبَنِىٓ ءَادَمَ أَن لَّا تَعۡبُدُواْ ٱلشَّيۡطَـٰنَ‌ۖ إِنَّهُ ۥ لَكُمۡ عَدُوٌّ۬ مُّبِينٌ۬ (٦٠) وَأَنِ ٱعۡبُدُونِى‌ۚ هَـٰذَا صِرَٲطٌ۬ مُّسۡتَقِيمٌ۬ (٦١) وَلَقَدۡ أَضَلَّ مِنكُمۡ جِبِلاًّ۬ كَثِيرًا‌ۖ أَفَلَمۡ تَكُونُواْ تَعۡقِلُونَ (٦٢)  

হে আদম সন্তানেরা! আমি কি তোমাদের এ মর্মে হিদায়াত করিনি যে, শয়তানের ইবাদাত করো না, সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু। এবং আমারই ইবাদাত করো, এটিই সরল-সঠিক পথ। কিন্তু এ সত্ত্বেও সে তোমাদের মধ্য থেকে বিপুল সংখ্যককে গোমরাহ করে দিয়েছে, তোমাদের কি বুদ্ধি-জ্ঞান নেই? সুরা ইয়াসিন : ৬০-৬২

(১০) দুনিয়া পরিচালনের ক্ষেত্র আল্লাহ সাথে গাইরুল্লাহকে সম্পৃক্ত করা

মহান আল্লাহ আকাশ থেকে পৃথিবী পর্যন্ত দুনিয়ার যাবতীয় বিষয় পরিচালনা করেন। এই কাজ করতে তিনি কখন ক্লান্ত হন না। তার কোন সাহায্যকারিও দরকার হয় না। তিনি একক ক্ষমতার অধিকারী, তিনি কারো মুখাপেক্ষি নন। যদি কেউ বিশ্বাস করে মহান আল্লাহ দুনিয়ার যাবতীয় বিষয় পরিচালনা করার জন্য অন্যের সাহায্য দরকার তবে সে নিসন্দেহে মুশরিক। আল্লাহ রাব্বুল আলামীণ বলেন-

 يُدَبِّرُ ٱلۡأَمۡرَ مِنَ ٱلسَّمَآءِ إِلَى ٱلۡأَرۡضِ ثُمَّ يَعۡرُجُ إِلَيۡهِ فِى يَوۡمٍ۬ كَانَ مِقۡدَارُهُ ۥۤ أَلۡفَ سَنَةٍ۬ مِّمَّا تَعُدُّونَ (٥)

তিনি আকাশ থেকে পৃথিবী পর্যন্ত দুনিয়ার যাবতীয় বিষয় পরিচালনা করেন এবং এ পরিচালনার বৃত্তান্ত ওপরে তার কাছে যায় এমন একদিনে যার পরিমাপ তোমাদের গণনায় এক হাজার বছর ৷ সুরা সাজদা : ৫

আল্লাহ রাব্বুল আলামীণ বলেন-

قُلۡ مَن يَرۡزُقُكُم مِّنَ ٱلسَّمَآءِ وَٱلۡأَرۡضِ أَمَّن يَمۡلِكُ ٱلسَّمۡعَ وَٱلۡأَبۡصَـٰرَ وَمَن يُخۡرِجُ ٱلۡحَىَّ مِنَ ٱلۡمَيِّتِ وَيُخۡرِجُ ٱلۡمَيِّتَ مِنَ ٱلۡحَىِّ وَمَن يُدَبِّرُ ٱلۡأَمۡرَ‌ۚ فَسَيَقُولُونَ ٱللَّهُ‌ۚ فَقُلۡ أَفَلَا تَتَّقُونَ  

তাদেরকে জিজ্ঞেস করো, কে তোমাদের আকাশ ও পৃথিবী থেকে রিযিক দেয়? এই শুনার ও দেখার শক্তি কার কর্তৃত্বে আছে? কে প্রাণহীন থেকে সজীবকে এবং সজীব থেকে প্রাণহীনকে বের করে? কে চালাচ্ছে এই বিশ্ব ব্যবস্থাপনা”? তারা নিশ্চয়ই বলবে, আল্লাহ৷ বলো, তবুও কি তোমরা সতর্ক হচ্ছো না? সুরা ইউনুস : ৩১

খুবই পরিতাপের বিষয় আমাদের সমাজের কিছু নামধারী মুসলিমের বিশ্বাস, আল্লাহ যেহেতু একা, সেহেতু একাই তার পক্ষে পুরো বিশ্বজগত পরিচালনা করা সম্ভব নয় (নাউজুবিল্লাহ)। ফলে তিনি তাঁর বিশ্ব পরিচালনা কাজের সুবিধার্থে আরশে মু‘আল্লায় একটি পার্লামেন্ট কায়েম করেছেন। সেই পার্লামেন্টের সদস্য সংখ্যা মোট ৪৪১ জন। আল্লাহ তাদের স্ব-স্ব কাজ বুঝিয়ে দিয়েছেন। তন্মধ্যে নাজীর ৩১৯ জন, নাকীব ৭০ জন, আওতাদ ৭ জন, কুতুব ৫ জন, আবদাল ৪০ জন এবং একজন হলেন গাউসুল আযম যিনি মক্কায় থাকেন। উম্মতের মধ্যে আবদাল ৪০ জন আল্লাহ তা‘আলার মধ্যস্থতায় পৃথিবীবাসীর বিপদাপদ দূরীভূত করে থাকেন। আর আওলিয়া দ্বারা সৃষ্ট জীবের হায়াত, রুযী, বৃষ্টি, বৃক্ষ জন্মান ও মুছীবত বিদূরণের কার্য সম্পাদন করেন। মৃতগণ কবরে শ্রবণ, দর্শন ও উপলদ্ধি করে থাকেন। তাদের শ্রবণ ও দর্শন যদিও সব সময় থাকে, কিন্তু জুম‘আর দিনে তা বাড়িয়ে দেয়া হয় এবং সাধারণ মৃত ব্যক্তিরাও কোনরূপ ব্যতিক্রম ছাড়া যিয়ারাতকারীদের সাথে কথা বলে। এই সকর কথাই কল্পনা প্রসু।

(১১) কবর কেন্দ্রিক মাজার নির্মাণ করে সিজদার স্থানে পরিণত করা

আয়িশাহ ও আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাযি.) বলেছেন, নবী ﷺ এর মৃত্যু পীড়া শুরু হলে তিনি তাঁর একটা চাদরে নিজ মুখমণ্ডল আবৃত করতে লাগলেন। যখন শ্বাস বন্ধ হবার উপক্রম হলো, তখন মুখ হতে চাদর সরিয়ে দিলেন। এমতাবস্থায় তিনি বললেন-

‏ لَعْنَةُ اللَّهِ عَلَى الْيَهُودِ وَالنَّصَارَى اتَّخَذُوا قُبُورَ أَنْبِيَائِهِمْ مَسَاجِدَ ‏”‏‏.‏ يُحَذِّرُ مَا صَنَعُوا‏.‏

ইয়াহুদী ও নাসারাদের প্রতি আল্লাহর অভিশাপ, তারা তাদের নবীদের কবরকে মসজিদে পরিণত করেছে। তারা যে কার্যকলাপ করত তা হতে তিনি সতর্ক করেছিলেন। সহিহ বুখারি : ৪৩৫, ৪৩৬, ১৩৩০, ১৩৯০, ৩৪৫৩, ৩৪৫৪, ৪৪৪১, ৪৪৪৩, ৪৪৪৪, ৫৮১৫, ৫৮১৬, সহিহ মুসলিম : ৫৩১

আবূ হুরায়রা (রাঃ) বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

قَاتَلَ اللَّهُ الْيَهُودَ اتَّخَذُوا قُبُورَ أَنْبِيَائِهِمْ مَسَاجِدَ ‏‏

আল্লাহ ইয়াহুদীদেরকে ধ্বংস করুক, তারা তাদের নবীদের কবরগুলোকে মসজিদ বানিয়ে নিয়েছে। সহিহ মুসলিম : ১০৬৮ ইফাঃ

আয়িশাহ (রা.) হতে বর্ণিত যে, উম্মু হাবীবা ও উম্মু সালামা (রা.) হাবশায় তাঁদের দেখা একটা গির্জার কথা বলেছিলেন, যাতে বেশ কিছু মূর্তি ছিল। তাঁরা উভয়ে বিষয়টি নবী ﷺ এর নিকট বর্ণনা করলেন। তিনি ইরশাদ করলেন, তাদের অবস্থা ছিল এমন যে, কোন সৎ লোক মারা গেলে তারা তার কবরের উপর মাসজিদ বানাতো। আর তার ভিতরে ঐ লোকের মূর্তি তৈরি করে রাখতো। কিয়ামত দিবসে তারাই আল্লাহর নিকট সবচাইতে নিকৃষ্ট সৃষ্টজীব বলে পরিগণিত হবে। সহিহ বুখঅরি : ৪২৭, ৪৩৪, ১৩৪১, ৩৭৩, সহিহ মুসলিম : ৫২৮

 (১২) মৃতব্যক্তি, ওলী, পীর, মুরুব্বি, খাজা, প্রমুখ ব্যক্তিদের নিকট সাহায্য চাওয়া

জীবিত কারো কাছে দোয়া চাওয়া বা সাহায্য চাওয়া জায়েয কিন্তু আমাদের দেশে মৃতব্যক্তি, ওলী, পীর, মুরুব্বি, খাজা, প্রমুখ ব্যক্তিদের কাছে চাওয়ার যে প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়, তা স্পষ্ট শিরকেরই অন্তর্ভুক্ত। এ কাজ তারা দুটি শিরকি আকিদা থেকে করে থাকে। প্রথমত তাদের ধারনা অলীগণ কবরে জীবিত। দ্বিতীয়ত মৃত্যুঅলী মৃত্যুর পর এমন কিছু ক্ষমার অধিকারি হয়েছে যা জীবিতদের নাই।

অথচ আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَمَا يَسۡتَوِى ٱلۡأَحۡيَآءُ وَلَا ٱلۡأَمۡوَٲتُۚ إِنَّ ٱللَّهَ يُسۡمِعُ مَن يَشَآءُۖ وَمَآ أَنتَ بِمُسۡمِعٍ۬ مَّن فِى ٱلۡقُبُورِ

আর জীবিতরা ও মৃতরা এক নয়, নিশ্চয় আল্লাহ যাকে ইচ্ছা শুনাতে পারেন, কিন্তু যে ব্যক্তি কবরে আছে তাকে তুমি শুনাতে পারবে না।  সুরা ফাতির : ২২

কাজেই কোনো মৃতব্যক্তি, ওলী, পীর, মুরুব্বি, খাজা, প্রমুখ ব্যক্তিদের কাছে দুয়া চাওয়া শিরক।  

(১৩) আল্লাহ তাআলা ছাড়াও অন্য কেউ কারোর অন্তরের খবর রাখেন

একমাত্র মহান আ্ল্লাহই মানুষের অন্তরের খবর জানেন। কিছু ভন্ড পীর বা আল্লাহর ওলি বাদিদার কিছু প্রতারক দাবি করে যে সেও মানুষের অন্তরের খবর রাখেন। অনেক অজ্ঞ মানুষ ভন্ডদের কথা বিশ্বাস করে। এই দুই শ্রেণীর লোকই কাফির। কেননা তারা উভয়ই আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সমকক্ষ দাড় করিয়েছে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

أُو۟لَٰٓئِكَ ٱلَّذِينَ يَعْلَمُ ٱللَّهُ مَا فِى قُلُوبِهِمْ فَأَعْرِضْ عَنْهُمْ وَعِظْهُمْ وَقُل لَّهُمْ فِىٓ أَنفُسِهِمْ قَوْلًۢا بَلِيغًا

ওরা তো তারাই যাদের অন্তরের কথা আল্লাহ জানেন। তাই তুমি তাদেরকে উপেক্ষা করো, আর কিছু উপদেশ দাও এবং তাদের মনে প্রভাব ফেলতে পারে এমন কিছু কথা বল। সুরা নিসা : ৬৩

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

يَعْلَمُ خَآئِنَةَ ٱلْأَعْيُنِ وَمَا تُخْفِى ٱلصُّدُورُ

চক্ষুসমূহের খেয়ানত এবং অন্তরসমূহ যা গোপন রাখে তিনি তা জানেন। (সুরা গাফির ৪০:১৯)

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন,

أَوَلَيْسَ ٱللَّهُ بِأَعْلَمَ بِمَا فِى صُدُورِ ٱلْعَٰلَمِينَ

আল্লাহ কি বিশ্ববাসীর অন্তরের কথা সম্যক অবগত নন?  সুরা আনকাবুত : ১০

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

إِنَّ ٱللَّهَ عَلِيمٌۢ بِذَاتِ ٱلصُّدُورِ

আল্লাহ অন্তরের খবর ভাল করেই জানেন।  সুরা লোকমান : ২৩

(১৪) আল্লাহ তাআলা ছাড়াও কেউ কাউকে সন্তান-সন্ততি দিতে পারে

আল্লাহ তায়ালা ছাড়াও কেউ কাউকে সন্তান-সন্ততি দিতে পারে না। অনেক অজ্ঞ মুসলিমকে দেখা যায় সন্তান লাভের আশায় মাজারে মাজরে ঘুরে। এমনাকি অনেক ভন্ড প্রতারক ফকিরের খপ্পরে পড়ে নি:শ্ব হয়েছেন। অথচ তার উচিত ছিল শরিয়ত সম্মত চিকত্সার পাশাপাশি মহান আল্লাহ উপর তাওয়াক্বুল করে তার নিকটই সাহায্য চাওয়া।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

لِّلَّهِ مُلْكُ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلْأَرْضِۚ يَخْلُقُ مَا يَشَآءُۚ يَهَبُ لِمَن يَشَآءُ إِنَٰثًا وَيَهَبُ لِمَن يَشَآءُ ٱلذُّكُورَ

আসমানসমূহ ও যমীনের রাজত্ব আল্লাহরই। তিনি যা চান সৃষ্টি করেন। তিনি যাকে ইচ্ছা কন্যা সন্তান দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা পুত্র সন্তান দান করেন। সুরা শুরা : ৪৯

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَٱلَّذِينَ يَقُولُونَ رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَٰجِنَا وَذُرِّيَّٰتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَٱجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا

আর যারা বলে, ‘হে আমাদের রব, আপনি আমাদেরকে এমন স্ত্রী ও সন্তানাদি দান করুন যারা আমাদের চক্ষু শীতল করবে। আর আপনি আমাদেরকে মুত্তাকীদের নেতা বানিয়ে দিন’। সুরা ফুরকান : ৭৪

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন,

هُنَالِكَ دَعَا زَكَرِيَّا رَبَّهُۥۖ قَالَ رَبِّ هَبْ لِى مِن لَّدُنكَ ذُرِّيَّةً طَيِّبَةًۖ إِنَّكَ سَمِيعُ ٱلدُّعَآءِ

সেখানে যাকারিয়া তার প্রভুর কাছে দোয়া করে। সে বলে, “হে আমার প্রভু! আমাকে তোমার পক্ষ থেকে (তোমার বিশেষ কৃপায়) ভাল সন্তান দান কর। অবশ্যই তুমি দোয়া শ্রবণকারী।  (সুরা আল ইমরান ৩:৩৮)

(১৫) গাইরুল্লাহর জন্য সরাসরি ইবাদাত নিবেদন করা-

আমাদের সালাত, সিয়াম, হজ, জাকাত, কুরবানি, জিকির, দান, সদগা, তিলওয়াত, আচার, আচরণ ইত্যাদি সব ইবাদাত পাওয়ার একমাত্র যোগ হক ইলাহ হলো মহান আল্লাহ। কিন্তু কোন ইবাদাত যদি মহান আল্লাহর জন্য না করে গাইরুল্লাহ জন্য করা হয় তবে শির্ক

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

قُلْ أَتَعْبُدُونَ مِن دُونِ ٱللَّهِ مَا لَا يَمْلِكُ لَكُمْ ضَرًّا وَلَا نَفْعًاۚ وَٱللَّهُ هُوَ ٱلسَّمِيعُ ٱلْعَلِيمُ

বল, তোমরা কি আল্লাহ ছাড়া এমন কিছুর ইবাদাত করবে, যা তোমাদের জন্য কোন ক্ষতি ও উপকারের ক্ষমতা রাখে না? আর আল্লাহ, তিনিই সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ’সুরা মায়েদা : ৭৬

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَإِذْ أَخَذْنَا مِيثَٰقَ بَنِىٓ إِسْرَٰٓءِيلَ لَا تَعْبُدُونَ إِلَّا ٱللَّهَ وَبِٱلْوَٰلِدَيْنِ إِحْسَانًا وَذِى ٱلْقُرْبَىٰ وَٱلْيَتَٰمَىٰ وَٱلْمَسَٰكِينِ

যখন আমি বনী ইসরাঈলের অঙ্গীকার গ্রহণ করলাম যে তোমরা আল্লাহ ছাড়া কারো ইবাদাত করবে না এবং সদাচার করবে পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন, ইয়াতীম ও মিসকীনদের সাথে। সুরা বাকারা : ৮৩

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

أَن لَّا تَعْبُدُوٓا۟ إِلَّا ٱللَّهَۖ إِنِّىٓ أَخَافُ عَلَيْكُمْ عَذَابَ يَوْمٍ أَلِيمٍ

তোমরা আল্লাহ ছাড়া আর কারও ইবাদাত করনা। আমি তোমাদের উপর এক ভীষণ যন্ত্রণাদায়ক দিনের শাস্তির আশংকা করছি। সুরা হুদ : ২৬

(১৬) একাধীক উপাস্য বা দেব-দেবীর পূজা করা

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَقَالَ اللّٰہُ لَا تَتَّخِذُوۡۤا اِلٰـہَیۡنِ اثۡنَیۡنِ ۚ اِنَّمَا ہُوَ اِلٰہٌ وَّاحِدٌ ۚ فَاِیَّایَ فَارۡہَبُوۡنِ

আর আল্লাহ বলেছেন, ‘তোমরা দুই ইলাহ গ্রহণ করো না। তিনি তো কেবল এক ইলাহ। সুতরাং তোমরা আমাকেই ভয় কর। সুরা নাহল : ৫১

(১৭) লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে ইবাদত করা

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

  فَمَنۡ کَانَ یَرۡجُوۡا لِقَآءَ رَبِّہٖ فَلۡیَعۡمَلۡ عَمَلًا صَالِحًا وَّلَا یُشۡرِکۡ بِعِبَادَۃِ رَبِّہٖۤ اَحَدًا 

সুতরাং যে তার রবের সাক্ষাৎ কামনা করে, সে যেন সৎকর্ম করে এবং তার রবের ইবাদাতে কাউকে শরীক না করে। সুরা কাহাফ : ১১০

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

 إِنَّ ٱلۡمُنَـٰفِقِينَ يُخَـٰدِعُونَ ٱللَّهَ وَهُوَ خَـٰدِعُهُمۡ وَإِذَا قَامُوٓاْ إِلَى ٱلصَّلَوٰةِ قَامُواْ كُسَالَىٰ يُرَآءُونَ ٱلنَّاسَ وَلَا يَذۡكُرُونَ ٱللَّهَ إِلَّا قَلِيلاً۬

নিশ্চয় মুনাফিকরা আল্লাহকে ধোঁকা দেয়। আর তিনি তাদেরকে ধোঁকায় ফেলেন। আর যখন তারা সালাতে দাঁড়ায় তখন অলসভাবে দাঁড়ায়, তারা লোকদেরকে দেখায় এবং তারা আল্লাহকে কমই স্মরণ করে। সুরা নিসা : ১৪২

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا لَا تُبۡطِلُوۡا صَدَقٰتِکُمۡ بِالۡمَنِّ وَالۡاَذٰی ۙ کَالَّذِیۡ یُنۡفِقُ مَالَہٗ رِئَآءَ النَّاسِ وَلَا یُؤۡمِنُ بِاللّٰہِ وَالۡیَوۡمِ الۡاٰخِرِ ؕ فَمَثَلُہٗ کَمَثَلِ صَفۡوَانٍ عَلَیۡہِ تُرَابٌ فَاَصَابَہٗ وَابِلٌ فَتَرَکَہٗ صَلۡدًا ؕ لَا یَقۡدِرُوۡنَ عَلٰی شَیۡءٍ مِّمَّا کَسَبُوۡا ؕ وَاللّٰہُ لَا یَہۡدِی الۡقَوۡمَ الۡکٰفِرِیۡنَ

হে মুমিনগণ, তোমরা খোঁটা ও কষ্ট দেয়ার মাধ্যমে তোমাদের সদাকা বাতিল করো না। সে ব্যক্তির মত, যে তার সম্পদ ব্যয় করে লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে এবং বিশ্বাস করে না আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি। অতএব তার উপমা এমন একটি মসৃণ পাথর, যার উপর রয়েছে মাটি। অতঃপর তাতে প্রবল বৃষ্টি পড়ল, ফলে তাকে একেবারে পরিষ্কার করে ফেলল। তারা যা অর্জন করেছে তার মাধ্যমে তারা কোন কিছু করার ক্ষমতা রাখে না। আর আল্লাহ কাফির জাতিকে হিদায়াত দেন না। সুরা বাকারা : ২৬৪

(১৮) কোন গাইরুল্লাহকে আল্লাহর সমান মনে করা।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

اِتَّخَذُوۡۤا اَحۡبَارَہُمۡ وَرُہۡبَانَہُمۡ اَرۡبَابًا مِّنۡ دُوۡنِ اللّٰہِ وَالۡمَسِیۡحَ ابۡنَ مَرۡیَمَ ۚ وَمَاۤ اُمِرُوۡۤا اِلَّا لِیَعۡبُدُوۡۤا اِلٰـہًا وَّاحِدًا ۚ لَاۤ اِلٰہَ اِلَّا ہُوَ ؕ سُبۡحٰنَہٗ عَمَّا یُشۡرِکُوۡنَ

তারা আল্লাহকে ছেড়ে তাদের পন্ডিত ও সংসার-বিরাগীদের* রব হিসেবে গ্রহণ করেছে এবং মারইয়ামপুত্র মাসীহকেও। অথচ তারা এক ইলাহের ইবাদত করার জন্যই আদিষ্ট হয়েছে, তিনি ছাড়া কোন (হক) ইলাহ নেই। তারা যে শরীক করে তিনি তা থেকে পবিত্র। তাওবা : ৩১

(১৯) গাইরুল্লাহকে কল্যান অকল্যায় মালিক বিশ্বাস করা-

মহান আল্লাহ বলেন-

فَاِذَا جَآءَتۡہُمُ الۡحَسَنَۃُ قَالُوۡا لَنَا ہٰذِہٖ ۚ وَاِنۡ تُصِبۡہُمۡ سَیِّئَۃٌ یَّطَّیَّرُوۡا بِمُوۡسٰی وَمَنۡ مَّعَہٗ ؕ اَلَاۤ اِنَّمَا طٰٓئِرُہُمۡ عِنۡدَ اللّٰہِ وَلٰکِنَّ اَکۡثَرَہُمۡ لَا یَعۡلَمُوۡنَ

অতঃপর যখন তাদের কাছে কল্যাণ আসত, তখন তারা বলত, ‘এটা আমাদের জন্য।’ আর যখন তাদের কাছে অকল্যাণ পৌঁছত তখন তারা মূসা ও তার সঙ্গীদেরকে অশুভলক্ষণে মনে করত। তাদের কল্যাণ-অকল্যাণ তো আল্লাহর কাছে। কিন্তু তাদের অধিকাংশ জানে না। সুরা আরাফ : ১৩১

সামূদ জাতিও তাদের নবীকে অমঙ্গল মনে করত। এই সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন-

) قَالُواْ ٱطَّيَّرۡنَا بِكَ وَبِمَن مَّعَكَ‌ۚ قَالَ طَـٰٓٮِٕرُكُمۡ عِندَ ٱللَّهِ‌ۖ بَلۡ أَنتُمۡ قَوۡمٌ۬ تُفۡتَنُونَ

তারা বলল, আমরা তো তোমাদেরকে ও তোমার সাথীদেরকে অমঙ্গলের নিদর্শন হিসেবে পেয়েছি৷ সালেহ জবাব দিল, “তোমাদের মঙ্গল অমঙ্গলের উৎস তো আল্লাহর হাতে নিবদ্ধ, আসলে তোমাদের পরীক্ষা করা হচ্ছে৷ সুরা নমল : ৪৭

পূর্বের নবি রাসূলগন অমঙ্গল মনে করার আগেকটি প্রমান হলো। মহান আল্লাহ আরও বলেন-

قَالُوْا إِنَّا تَطَيَّرْنَا بِكُمْ، لَئِنْ لَمْ تَنْتَهُوْا لَنَرْجُمَنَّكُمْ وَلَيَمَسَّنَّكُمْ مِنَّا عَذَابٌ أَلِيْمٌ، قَالُوْا طَائِرُكُمْ مَعَكُمْ، أَئِنْ ذُكِّرْتُمْ، بَلْ أَنْتُمْ قَوْمٌ مُسْرِفُوْنَ

তারা বলল, ‘আমরা তো তোমাদেরকে অমঙ্গলের কারণ মনে করি। তোমরা যদি বিরত না হও তাহলে আমরা অবশ্যই তোমাদেরকে পাথর মেরে হত্যা করব এবং আমাদের পক্ষ থেকে তোমাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক আযাব স্পর্শ করবে’। সুরা ইয়াসিন : ১৮

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

لاَ عَدْو‘ى وَلاَ طِيَرَةَ وَلاَ هَامَةَ وَلاَ صَفَرَ وَفِرَّ مِنَ الْمَجْذُومِ كَمَا تَفِرُّ مِنْ الأَسَدِ.

রোগের কোন সংক্রমণ নেই, কুলক্ষণ বলে কিছু নেই, পেঁচা অশুভের লক্ষণ নয়, সফর মাসের কোন অশুভ নেই। কুষ্ঠ রোগী থেকে দূরে থাক, যেভাবে তুমি বাঘ থেকে দূরে থাক। সহিহ বুখারি : ৫৭০৭,

আবু হুরাইরাহ্ (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন-

لاَ عَدْوَى وَلاَ طِيَرَةَ وَلاَ هَامَةَ وَلاَ صَفَرَ وَلاَ نَوْءَ وَلاَ غُوْلَ، فَقَالَ أَعْرَابِيٌّ: يَا رَسُوْلَ اللهِ! فَمَا بَالُ الإِبِلِ تَكُوْنُ فِيْ الرَّمْلِ كَأَنَّهَا الظِّبَاءُ، فَيَجِيْءُ الْبَعِيْرُ الأَجْرَبُ فَيَدْخُلُ فِيْهَا، فَيُجْرِبُهَا كُلَّهَا، قَالَ: فَمَنْ أَعْدَى الْأَوَّلَ؟

ছোঁয়াচে রোগ বলতে কিছুই নেই। কুলক্ষণ বলতেই তা একান্ত অমূলক। হুতোম পেঁচা, সফর মাস, রাশি-তারকা অথবা পথ ভুলানো ভূত কারোর কোন ক্ষতি করতে পারে না। তখন এক গ্রাম্য ব্যক্তি বললো, হে আল্লাহ্’র রাসূল! কখনো এমন হয় যে, মরুভূমির মধ্যে শায়িত কিছু উট। দেখতে যেমন হরিণ। অতঃপর দেখা যাচ্ছে, চর্ম রোগী একটি উট এসে এগুলোর সাথে মিশে গেলো। তাতে করে সবগুলো উট চর্ম রোগী হয়ে গেলো। তখন রাসূল (সা.) বললেন: বলো তো: প্রথমটির চর্ম রোগ কোথা থেকে এসেছে? সহিহ বুখারি : ৫৭১৭, ৫৭৭০, ৫৭৭৩, সহিহ মুসলিম : ২২২০

(২০) গাইরুল্লাহর প্রভাবে বৃষ্টি হয়ে থাকে বিশ্বাস করা।

যায়দ ইবনু খালিদ জুহানী (রা.) হতে বর্ণিত যে, তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল ﷺ রাতে বৃষ্টি হবার পর হুদায়বিয়াতে আমাদের নিয়ে ফজরের সালাত আদায় করলেন। সালাত শেষ করে তিনি লোকদের দিকে ফিরে বললেন, তোমরা কি জান, তোমাদের পরাক্রমশালী ও মহিমাময় প্রতিপালক কি বলেছেন? তাঁরা বললেন, আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলই বেশি জানেন। আল্লাহর রাসূল ﷺ বললেন, (রব) বলেন, আমার বান্দাদের মধ্য কেউ আমার প্রতি মু’মিন হয়ে গেল এবং কেউ কাফির। যে বলেছে, আল্লাহর করুণা ও রহমতে আমরা বৃষ্টি লাভ করেছি, সে হল আমার প্রতি বিশ্বাসী এবং নক্ষত্রের প্রতি অবিশ্বাসী। আর যে বলেছে, অমুক অমুক নক্ষত্রের প্রভাবে আমাদের উপর বৃষ্টিপাত হয়েছে, সে আমার প্রতি অবিশ্বাসী হয়েছে এবং নক্ষত্রের প্রতি বিশ্বাসী হয়েছে। সহিহ বুখারি ৮৪৬, ১০৩৮, ৪১৪৭, সহিহ মুসলিম : ৭১,

তারকারাজী মহান আল্লাহ এক বিশ্বয়কর সৃষ্টি ছাড়া আর কিছুই নয়। বিশ্বয়কর সৃষ্টি দেখে সৃষ্টিকর্তা মনে করা অজ্ঞ আদম সন্তারের খুব পুরান অভ্যাস। কাজেই তারকারাজী ব্যাপারটিও এর ব্যাতিক্রম হয়নি। তারকারাজী মানুষের ভাগ্য বা অন্য কোন ব্যাপারে বিশেষ কোন ক্ষমতা রাখে বিশ্বাস করা শিরক। আমাদের উপমহাদেশে অনেক হিন্দুদের চাঁদের প্রতি এই রূপ ধারনা করেত দেখা যায়। তারা চাঁদের তারিখ অনুযায়ী শুভ অশুভ বিশ্বাস করে নিশিপালন ও উপবাস করে থাকে। এই শুভ অশুভ উপর ভিত্তি করে তারা বিভিন্ন শুভ কাজ আরম্ভ করে থাকে। তাদের দেখা দেখি উপমহাদেশের অনেক অজ্ঞ মুসলিমও শুভ অশুভ দিন তারিখ দেখ কাজকর্ম করে থাকে যা ছোট শিরকের আওতাভূক্ত।

(২১) গাউরুল্লাহর নামে নামে শপথ করা

আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী ﷺ বলেছেন-

مَنْ كَانَ حَالِفًا فَلْيَحْلِفْ بِاللهِ أَوْ لِيَصْمُت

কারও হলফ করতে হলে সে যেন আল্লাহর নামেই হলফ করে, নতুবা চুপ করে থাকে। সহহি বুখারি : ২৬৭৯, ৩৮৩৬, ৬১০৮, ৬৬৪৬, ৬৬৪৮

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

ا تَحْلِفُوا بِآبَائِكُمْ، وَلَا بِأُمَّهَاتِكُمْ، وَلَا بِالْأَنْدَادِ، وَلَا تَحْلِفُوا إِلَّا بِاللَّهِ، وَلَا تَحْلِفُوا بِاللَّهِ إِلَّا وَأَنْتُمْ صَادِقُونَ

তোমরা নিজেদের পিতা-মাতা কিংবা দেবদেবীর নামে শপথ করবে না। তোমরা শুধুমাত্র আল্লাহর নামে শপথ করবে। আর তোমরা আল্লাহর নামে কেবল সে বিষয়েই শপথ করবে যে বিষয়ে তোমরা সত্যবাদী। আবু দাউদ : ৩২৪৮, সুনানে নাসায়ী : ২৭৯৬

সা’দ ইবনু উবাইদা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, ইবনু উমার (রাঃ) একজন লোককে বলতে শুনলেন, না, কাবার শপথ! ইবনু উমার (রাঃ) বললেন, আল্লাহ তা’আলার নাম ব্যতীত অন্য কিছুর নামে শপথ করা যাবে না। কেননা রাসূলুল্লাহ ﷺকে আমি বলতে শুনেছি, আল্লাহ তা’আলার নাম ব্যতীত অন্য কিছুর নামে যে লোক শপথ করল সে যেন কুফরী করল অথবা শিরক করল। সুনানে তিরমিজি : ১৫৩৫, সহিহাহ : ২০৪২

আবদুল্লাহ্ ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। একবার রাসূলুল্লাহ্ ﷺ ’উমার ইবনু খাত্তাব (রাঃ)-কে বাহনে চলা অবস্থায় পেলেন যখন তিনি তাঁর পিতার নামে কসম করছিলেন। তিনি বললেনঃ সাবধান! আল্লাহ্ তোমাদেরকে তোমাদের বাপ-দাদার নামে কসম করতে নিষেধ করেছেন। কেউ কসম করতে চাইলে সে যেন আল্লাহর নামে কসম করে, নইলে যেন চুপ থাকে। সহিহ বুখরি : ৬৬৪৬, সহিহ মুসলিম : ১৪৪৬, সুনানে তিরমিজি : ১৫৩৩, ১৫৩৮, ১৫৩৫, সুনানে নাসায়ী ৩৭৬৬, ৩৭৬৭, সুনানে আবূ দাউদ : ৩২৪৯

(২২) গাইরুল্লাহ মনে করে মহাকালেকে গালি দেওয়া

মহাকাল বলতে দিবারাত্রির আবর্তন-বিবর্তনকে বুঝানো হয়েছে। রাত্রি উপনীত হলে অন্ধকার ছেয়ে যায়। আর দিন প্রকাশ পেতেই সমস্ত জিনিস উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। এই দিবারাত্রি অতিবাহিত হওয়ার নামই হল কাল, যুগ বা সময়। যা আল্লাহর কুদরত ও কারিগরি ক্ষমতা প্রমাণ করে। অন্ধকার যুগে আরবরা যখন কঠিন বিপদে পড়ত তখই মহকাল বা সময়কে গালি দিত। তারা ভাবত মহাকালই তাদের বিপদের কারন। মহাকালকে গালি প্রদানকারীর হুকুমের দুটি পর্যায়, হয়ত সে আল্লাহকে গালি দিচ্ছে অথবা আল্লাহর সাথে মহাকালকে শরীক করছে। যদি কেউ মনে করে মহাকাল এবং আল্লাহ যৌথভাবে বিপদ সংঘটিত করেন তাহলে শিরকে আকবর হয়ে যাবে।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَقَالُوۡا مَا ہِیَ اِلَّا حَیَاتُنَا الدُّنۡیَا نَمُوۡتُ وَنَحۡیَا وَمَا یُہۡلِکُنَاۤ اِلَّا الدَّہۡرُ ۚ وَمَا لَہُمۡ بِذٰلِکَ مِنۡ عِلۡمٍ ۚ اِنۡ ہُمۡ اِلَّا یَظُنُّوۡنَ

আর তারা বলে, ‘দুনিয়ার জীবনই আমাদের একমাত্র জীবন। আমরা মরি ও বাঁচি এখানেই। আর মহাকাল-ই কেবল আমাদেরকে ধ্বংস করে।’ বস্তুত এ বিষয়ে তাদের কোন জ্ঞান নেই। তারা শুধু ধারণাই করে। সুরা জাসিয়া : ২৪

আবূ হুরায়রাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

اللهُ عَزَّ وَجَلَّ يُؤْذِيْنِي ابْنُ آدَمَ يَسُبُّ الدَّهْرَ وَأَنَا الدَّهْرُ بِيَدِي الْأَمْرُ أُقَلِّبُ اللَّيْلَ وَالنَّهَارَ.

আল্লাহ তায়ালা বলেন, আদাম সন্তান আমাকে কষ্ট দিয়ে থাকে, তারা যুগ বা কালকে গালি দেয়, অথচ আমিই জামানা অর্থাৎ যুগ বা কাল। আমার হাতেই ক্ষমতা, দিন-রাত্রির পরিবর্তন আমিই করে থাকি। সহিহ বুখারি : ৪৮২৬, ৮১৬১, সহিহ মুসলিম : ২২৪৬, সুনানে আবূ দাঊদ : ৫২৭৪, আহমাদ : ৭২৪৫

আবূ হুরাইরাহ্‌ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ ﷺ কে আমি বলতে শুনেছি, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন, আদাম সন্তান সময় ও কালকে গালি-গালাজ করে, অথচ আমিই সময়, আমার হাতেই রাত্রি ও দিবস। সহিহ মুসলিম : ৫৭৫৫

(২৩) কুফরি কথা ব্যবহার করে ঝাড়-ফুঁক করা

চোখ লাগা, জাদু, মানসিক ও শারীরিক অসুখ বিসুখ দূরীকরণে জন্য ঝাড় ফুঁক ফলপ্রসূ। নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে যেমন ঝাড় ফুঁক করেছেন, তেমনি তিনি ঝাড়-ফুঁক নিয়েছেন। সহিহ হাদিসের আলোকে জানা যায়, ঝাড়-ফুঁকের জন্য পবিত্র কুরআনের আয়াতুল কুরসী, সূরা ফালাক্ব, সূরা নাস, সূরা এখলাছ, সূরা কাফেরূন, সূরা বাক্বারা ও বাক্বারার শেষ দুই আয়াত পড়া ফলপ্রসূ। ঝাড়-ফুঁক শরীয়াত সম্মত হলেও অনেক সময় প্রয়োগকারী ও ব্যবহার কারির প্রয়োগ ও ব্যবহারের জন্য শিরক হয়। যদি কেউ ঝাড়-ফুঁক করার সময়  শির্কী ও কুফরী শব্দ ব্যবহারের করে, এমন শব্দের মাধ্যমে ঝাড়-ফুঁক করে যার অর্থ বোধগম্য নয় বা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নামে মাধ্যমে ঝাড়-ফুঁক করা ছোট শিরকের অন্তরভূক্ত হবে। কিন্তু ঝাড়-ফুঁক নিজস্ব কোনো প্রভাব এবং ক্ষমতা আছে এ কথা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করলে শিরকে আকবর হবে। জ্যোতিষ, গনক ও জাদুকরগন সাধারনত কুফরি বাক্য দ্বরা ঝাড়-ফুঁক করে থাকে যা মুলত শিরক। এদের পরিত্যাগ করা জরুরী।

আওফ ইবনু মালিক আশজাই (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন-

كُنَّا نَرْقِي فِي الْجَاهِلِيَّةِ فَقُلْنَا يَا رَسُولَ اللَّهِ كَيْفَ تَرَى فِي ذَلِكَ فَقَالَ ‏ “‏ اعْرِضُوا عَلَىَّ رُقَاكُمْ لاَ بَأْسَ بِالرُّقَى مَا لَمْ يَكُنْ فِيهِ شِرْكٌ ‏

আমরা জাহিলী যুগে মন্ত্র দিয়ে ঝাড়ফুঁক করতাম। এ জন্যে আমরা রসূলুল্লাহ ﷺ এর নিকট আবেদন করলাম, হে আল্লাহর রসূল! এক্ষেত্রে আপনার মতামত কি? তিনি বললেন, তোমাদের মন্ত্রগুলো আমার নিকট উপস্থাপন করো, ঝাড়ফুঁকে কোন দোষ নেই, যদি তাতে কোন শিরক (জাতীয় কথা) না থাকে। সহিহ মুসলীম : ২০০

(২৪) গাইরুল্লাহর উদ্দেশ্য মানত করা

আল্লাহ নিকট ইবাদতের নিমিত্তে মানত করা মাকরুহ পর্যায়ের জায়েয হলে তা পুরন করা ওয়াজিব। একটুকু ঠিকই আছে কিন্ত মানত যখন গাইরুল্লাহ বা কোনো পীর, অলী, আওলীয়া, বুযুর্গ, নবী রাসূলদের নামে করা হবে তখন তা ছোট শিরক হয়ে যাবে। শুধু গাইরুল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য মানত করা শিরকে আকবর। আর যদি মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ঐ সকল লোকদের সুপারিশের জন্য বা কোন না কোন ভাবে উপকার পাবার জন্য করে থাকে তবে তা ছোট শিরক হবে।

মহান আল্লাহ তায়ালান বলেন-

 وَعَلَى ٱلَّذِينَ هَادُواْ حَرَّمۡنَا ڪُلَّ ذِى ظُفُرٍ۬‌ۖ وَمِنَ ٱلۡبَقَرِ وَٱلۡغَنَمِ حَرَّمۡنَا عَلَيۡهِمۡ شُحُومَهُمَآ إِلَّا مَا حَمَلَتۡ ظُهُورُهُمَآ أَوِ ٱلۡحَوَايَآ أَوۡ مَا ٱخۡتَلَطَ بِعَظۡمٍ۬‌ۚ ذَٲلِكَ جَزَيۡنَـٰهُم بِبَغۡيِہِمۡ‌ۖ وَإِنَّا لَصَـٰدِقُونَ

আর আল্লাহ যে সব শস্য ও পশু সৃষ্টি করেছেন, তারা (মুশরিকরা) ওর একটি অংশ আল্লাহর জন্য নির্ধারণ করে থাকে। অতঃপর নিজেদের ধারণা মতে তারা বলে যে, এই অংশ আল্লাহর জন্য এবং এই অংশ আমাদের শরীকদের জন্য। কিন্তু যা তাদের শরীকদের জন্য নির্ধারিত হয়ে থাকে, তাতো আল্লাহর দিকে পৌঁছেনা, পক্ষান্তরে যা আল্লাহর জন্য নির্ধারণ করা হয়েছিল তা তাদের শরীকদের কাছে পৌঁছে থাকে। এই লোকদের ফাইসালা ও বন্টন নীতি কতই না নিকৃষ্ট! সুরা আনাম : ১৩৬

মানতকারী যদি এ বিশ্বাস রাখে যে, অলী ভাল মন্দ করার ক্ষমতা রাখেন না। তার দোয়া বা নেক নজর পাওয়ার নিয়তও করে না। কিংবা শাফাআত বা অসীলাও আমার উদ্দেশ্য নয়। শুধু এতটুকু ভাবে যে, তিনি আল্লাহর অলী, তাকে সম্মান করা সওয়াবের কাজ এ জন্য আমি মাজারে মান্নত করি। তাহলেও ছোট শিরক হবে। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হল, এখন মুসলমানেরা শুধু মৃত পীর, অলী, আওলীয়া, বুযুর্গ, নবী রাসূলদের নামে মান্নত করে তৃপ্ত নয়, বরং তাদের মাজারের কচ্ছপ, কুমির, মাছের নামেও মান্নত করে থাকে। কতবড় নিকৃষ্ট শিরকের দিকে আমাদের জাতি ধাবিত হচ্ছে।

(২৫) গাইরুল্লাহ নামে পশু জবেহ করা

পশুকে যবেহ একটি ইবাদাত। এই জন্য আল্লাহ পশুকে যবেহ করার নীতিমালা ঘোষনা করছেন। গাইরুল্লাহর নামে পশু জবেহ করল শিরক হবে কেননা আল্লাহ নিজের নামে কুরবানী করার হুকুম দিয়েছেন। যে সকল লোক আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে পশু জবেহ করে তারা মুশরিক। তাই মুমিনের ফরজ দায়িত্ব হল আল্লাহর নামে জবেহ করা যার কোন শরিক নাই। এ কথাই আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেছেন,  (فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ) তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে সালাত আদায় কর ও পশু কোরবানি কর। সুরা কাওসার : ২

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

قُلۡ إِنَّ صَلَاتِى وَنُسُكِى وَمَحۡيَاىَ وَمَمَاتِى لِلَّهِ رَبِّ ٱلۡعَـٰلَمِينَ

বলো, আমার নামায, আমার ইবাদাতের সমস্ত অনুষ্ঠান (কুরবানী), আমার জীবন ও মৃত্যু সবকিছু আল্লাহ রব্বুল আলামীনের জন্য। সুরা আনআম : ১৬২

আল্লাহ তাআলা বলেন:

 وَلَا تَأۡڪُلُواْ مِمَّا لَمۡ يُذۡكَرِ ٱسۡمُ ٱللَّهِ عَلَيۡهِ وَإِنَّهُ ۥ لَفِسۡقٌ۬‌ۗ وَإِنَّ ٱلشَّيَـٰطِينَ لَيُوحُونَ إِلَىٰٓ أَوۡلِيَآٮِٕهِمۡ لِيُجَـٰدِلُوكُمۡ‌ۖ وَإِنۡ أَطَعۡتُمُوهُمۡ إِنَّكُمۡ لَمُشۡرِكُونَ

 আর যে পশুকে আল্লাহর নামে যবেই করা হয়নি তার গোশ্ খেয়ো না৷ এটা অবশ্যি মহাপাপ৷ শয়তানরা তাদের ঝগড়া করতে পারে৷  কিন্তু যদি তোমরা তাদের আনুগত্য করো তাহলে অবশ্যি তোমরা মুশরিক হবে৷ সুরা আনআম : ১২১

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

 فَكُلُواْ مِمَّا ذُكِرَ ٱسۡمُ ٱللَّهِ عَلَيۡهِ إِن كُنتُم بِـَٔايَـٰتِهِۦ مُؤۡمِنِينَ

এখন যদি তোমরা আল্লাহর আয়াতসমূহ বিশ্বাস করে থাকো, তাহলে যে পশুর ওপর আল্লাহর নাম নেয়া হয়েছে তার গোশ্ খাও৷ সুরা আনআম : ১১৮

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

إِنَّمَا حَرَّمَ عَلَيۡڪُمُ ٱلۡمَيۡتَةَ وَٱلدَّمَ وَلَحۡمَ ٱلۡخِنزِيرِ وَمَآ أُهِلَّ بِهِۦ لِغَيۡرِ ٱللَّهِ‌ۖ

আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমাদের ওপর যদি কোন নিষেধাজ্ঞা থেকে থাকে তাহলে তা হচ্ছে এই যে, মৃতদেহ খেয়ো না, রক্ত ও শূকরের গোশত থেকে দূরে থাকো। আর এমন কোন জিনিস খেয়ো না যার ওপর আল্লাহ ছাড়া আর কারোর নাম নেয়া হয়েছে। সুরা বাকারা : ১৭৩

(২৬) গাইরুল্লাহকে খুশি করার উদ্দেশ্যে কোন কিছু পেশ করা

মুসলিমের প্রতিটি কাজই ইবাদাত। আর ইবাদাতের মুল উদ্দেশ্য হল মহান আল্লাহর সন্তষ্টি অর্জন। মাজার, মুর্তি, দেবতার পুজা করা শিরকে আকবর তাতে কোন সন্দেহ নাই কিন্তু তাদের পুজা না করে ভালো কর্ম মনের করে কিছু পেশ করাও শিরকের অন্তর্ভুক্ত হবে। এর মাধ্যম গাইরুল্লাহ ইবাদতে সহযোগীতা করা হয়। কোন অবস্থায়ই মাজার, মুর্তি, দেতার উদ্দেশ্যে কোন কিছু পেশ করা যাবে না। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

حُرِّمَتۡ عَلَيۡكُمُ ٱلۡمَيۡتَةُ وَٱلدَّمُ وَلَحۡمُ ٱلۡخِنزِيرِ وَمَآ أُهِلَّ لِغَيۡرِ ٱللَّهِ بِهِۦ وَٱلۡمُنۡخَنِقَةُ وَٱلۡمَوۡقُوذَةُ وَٱلۡمُتَرَدِّيَةُ وَٱلنَّطِيحَةُ وَمَآ أَكَلَ ٱلسَّبُعُ إِلَّا مَا ذَكَّيۡتُمۡ وَمَا ذُبِحَ عَلَى ٱلنُّصُبِ وَأَن تَسۡتَقۡسِمُواْ بِٱلۡأَزۡلَـٰمِ

তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে মৃত প্রাণী, রক্ত ও শূকরের গোশত এবং যা আল্লাহ ভিন্ন কারো নামে যবেহ করা হয়েছে; গলা চিপে মারা জন্তু, প্রহারে মরা জন্তু, উঁচু থেকে পড়ে মরা জন্তু অন্য প্রাণীর শিঙের আঘাতে মরা জন্তু এবং যে জন্তুকে হিংস্র প্রাণী খেয়েছে, তবে যা তোমরা যবেহ করে নিয়েছ তা ছাড়া, আর যা মূর্তি পূঁজার বেদিতে বলি দেয়া হয়েছে সুরা মায়েদা : ৩

তারিক বিন শিহাব হতে বর্ণিত হাদীছে রাসূল ﷺ বলেন, এক ব্যক্তি একটি মাছির কারণে জান্নাতে প্রবেশ করেছে। আর এক ব্যক্তি একটি মাছির কারণে জাহান্নামে গিয়েছে। সাহাবীগণ বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এটি কিভাবে হলো? তিনি বললেনঃ দু’জন লোক এমন একটি গোত্রের নিকট দিয়ে যাচ্ছিল, যাদের একটি মূর্তি ছিল। উক্ত মূর্তির জন্য কোন কিছু উৎসর্গ না করে কেউ সে স্থান অতিক্রম করতে পারতোনা। উক্ত কওমের লোকেরা দু’জনের একজনকে বললো, ‘মূর্তির জন্য তুমি কিছু কুরবানী করো’। সে বললো, কুরবানী দেয়ার মত আমার কিছুই নেই। তারা বলল, অন্ততঃ একটি মাছি হলেও কুরবানী দিয়ে যাও’। অতঃপর সে একটা মাছি মূর্তির জন্য কুরবানী দিল। তারা লোকটির পথ ছেড়ে দিল। এর ফলে সে জাহান্নামে গেল। অপর ব্যক্তিকে তারা বললো, মূর্তিকে তুমিও কিছু কুরবানী করো। সে বললঃ একমাত্র আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও নৈকট্য লাভের জন্য আমি কারো জন্য কুরবানী দেইনা। এর ফলে তারা তার গর্দান উড়িয়ে দিল। এতে সে জান্নাতে প্রবেশ করল’’। বায়হাকি, শু‘আবুল ঈমান : ৭৩৪৩, ইবনু আবী শায়বাহ : ৩৩০৩৮, ইমাম আহমাদ, আয-যুহুদ, প্রথম খণ্ড, পৃ-১৫

(২৭) উপকাররের আশায তাবীজ, রিং, তাগা, আংটা লাগানো, সুতা, পুঁতি ব্যবহার করা

ঈসা ইবনু আবদুর রাহমান ইবনু আবূ লাইলা (রহঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমি আবদুল্লাহ ইবনু উকাইম আবূ মা’বাদ আল-জুহানীর অসুস্থ অবস্থায় তাকে দেখতে গেলাম। তিনি বিষাক্ত ফোঁড়ায় আক্রান্ত ছিলেন। আমি বললাম, কিছু  ঝুলিয়ে রাখছেন না কেন? তিনি বললেন, মৃত্যু তো এর চেয়েও নিকটে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

مَنْ تَعَلَّقَ شَيْئًا وُكِلَ إِلَيْهِ

যে লোক কোনকিছু ঝুলিয়ে রাখে তাকে তার উপরই সোপর্দ করা হয়। সুনানে তিরমিজি : ২০৭২ মান সহিহ

আবূ বাশীর আল-আনসারী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, কোন এক সফরে তিনি আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সঙ্গে ছিলেন। রাবী ‘আবদুল্লাহ্‌ বলেন, আমার মনে হয়, তিনি (আবূ বাশীর আনসারী) বলেছেন যে, মানুষ শয্যায় ছিল। তখন আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একজন সংবাদ বহনকারী পাঠালেন যে, কোন উটের গলায় যেন ধনুকের রশির মালা কিংবা মালা না

আব্দুল্লাহ (রা.) এর স্ত্রী যাইনাব (রাঃ) আব্দুল্লাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি-

إِنَّ الرُّقَى، وَالتَّمَائِمَ، وَالتِّوَلَةَ شِرْكٌ قَالَتْ

যাদু, তাবীজ ও অবৈধ, প্রেম ঘটানোর মন্ত্র শির্ক-এর অন্তর্ভুক্ত। সুনানে আবু দাউদ : ৩৮৮৩ আংশিক

উকবা বিন আমের রা. হতে একটি ‘‘মারফু’’ হাদীসে বর্ণিত আছে, যে ব্যক্তি তাবিজ ঝুলায় আল্লাহ যেন তার আশা পূরণ না করেন। যে ব্যক্তি কড়ি, শঙ্খ বা শামুক ঝুলায় তাকে যেন আল্লাহ রক্ষা না করেন।’’ অপর একটি বর্ণনায় আছে, যে ব্যক্তি তাবিজ ঝুলালো সে শিরক করলো। সিলসিলায়ে সহীহা : ৮০৯, মুসনাদে আহমাদ : ৪/১৫৬, কিতাবুত তাওহীদ, সপ্তম অধ্যায়, মুহাম্মদ বিন আব্দুল ওহহাব রহ.

নাজাত প্রপ্ত দলের বৈশিষ্ট্য-০৭ ::  বিদআত মুক্ত আমল করবে।

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

এই জামাআতের অন্যতম আরেকটি বৈশিষ্ট্য হল তাদের আমল হবে বিদআত মুক্ত। আমাদের সমাজে বিদআদের এত বেশী প্রচলন যে কোনটি ইবাদাত আর কোন কোনটি বিদআত তা চিহিৃত করাই কঠিন।  সমাজে অজ্ঞ মুসলিমদের মাঝে বিদআতে প্রচলন খুব বেশী। এর জন্য দায়ি সমাজের কিছু বিদআতী আলেম যারা তাদের নিজেদের স্বার্থের জন্য বিদআত চালু রেখেছে। কিন্তু বিদআতে ভয়াবহতা বুঝতে পারলে ইহা থেকে বাচার কঠোর চেষ্টা করত। ইসলাম মহান আল্লাহ মনোনীত একমাত্র পরিপূর্ণ ধর্ম যেখানে কোন সংযোজন বা বিয়োজনের কোন স্থান নাই। কিন্তু সমাজের অজ্ঞ মুসলিম এ সত্য না জানার ফলে বিদআতি আলেদের খপ্পরে পরে বিদআদকে ইবাদাত মনে করে সংযোজন করেছে। বিদআত সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করে চিহিৃত করেত পারলে, এর ভয়াবহ পরিণত থেকে রক্ষা পাওয়া সহজ হবে। এই জন্য বিদআত সম্পর্কে জানার সাথে সাথে আমাদের ব্যক্তগত আমল যাচাই বাছাই করে নেয়া উচিত। কারণ হতে পারে বহু আমল আমার, আপনার জীবনের সাথে জড়িয়ে আছে যেগুলো দুর্বল বা বানোয়াট হাদিসের উপর নির্ভরশীল। রাসূলুল্লাহ ﷺ এর নিম্নোক্ত বাণী কোন ব্যক্তির ভুলে যাওয়া ঠিক হবে না।

আয়িশাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী ﷺ বলেছেন-

مَنْ أَحْدَثَ فِيْ أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ فِيْهِ فَهُوَ رَدٌّ

কেউ আমাদের এ শরী‘আতে নাই এমন কিছুর অনুপ্রবেশ ঘটালে তা প্রত্যাখ্যাত। সহিহ বুখারি : ২৬৯৭, সহিহ মুসলিম : ৩২৪২

অতএব, আমাদের উচিত হবে বিদআত সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করে সমাজে থেকে বিদআত দুর করার চেষ্টা করা। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রের সার্বিক কল্যাণ একমাত্র রাসূলুল্লাহ ﷺ এর আদর্শের মধ্যেই আমাদেরকে খুঁজে নিতে হবে এবং বিদআতে পরিহার করতে হবে। সুন্নাহ সম্মত আমল না করে মনগড়া বিদআতি আমল আবিস্কার করার প্রতি কুরআন কঠোরভাবে সতর্ক করা হয়েছে। বিদআত না করে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর অনুসরনের নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে এবং বিদআতের ভয়বহ পরিনতি সম্পর্কে কুনআন হাদিসে ভীতি প্রদর্শন করা হয়েছে।

মহান আল্লাহ বলেন,

وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانتَهُوا وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ

রসূল তোমাদেরকে যা দেন, তা গ্রহণ কর এবং যা নিষেধ করেন, তা থেকে বিরত থাক এবং আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ কঠোর শাস্তিদাতা। সুরা হাশর : ৭

মহান আল্লাহ আরও বলেন,

لَا تَجْعَلُوا دُعَاء الرَّسُولِ بَيْنَكُمْ كَدُعَاء بَعْضِكُم بَعْضًا قَدْ يَعْلَمُ اللَّهُ الَّذِينَ يَتَسَلَّلُونَ مِنكُمْ لِوَاذًا فَلْيَحْذَرِ الَّذِينَ يُخَالِفُونَ عَنْ أَمْرِهِ أَن تُصِيبَهُمْ فِتْنَةٌ أَوْ يُصِيبَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ

রসূলের আহবানকে তোমরা তোমাদের একে অপরকে আহ্বানের মত গণ্য করো না। আল্লাহ তাদেরকে জানেন, যারা তোমাদের মধ্যে চুপিসারে সরে পড়ে। অতএব যারা তাঁর আদেশের বিরুদ্ধাচরণ করে, তারা এ বিষয়ে সতর্ক হোক যে, বিপর্যয় তাদেরকে স্পর্শ করবে অথবা যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি তাদেরকে গ্রাস করবে। সুরা নুর : ৬৩

মহান আল্লাহ আরও বলেন,

وَمَن يَقْنُتْ مِنكُنَّ لِلَّهِ وَرَسُولِهِ وَتَعْمَلْ صَالِحًا نُّؤْتِهَا أَجْرَهَا مَرَّتَيْنِ وَأَعْتَدْنَا لَهَا رِزْقًا كَرِيمًا

তোমাদের মধ্যে যে কেউ আল্লাহ ও তাঁর রসূলের অনুগত হবে এবং সৎকর্ম করবে, আমি তাকে দুবার পুরস্কার দেব এবং তার জন্য আমি সম্মান জনক রিযিক প্রস্তুত রেখেছি। সুরা আহযাব : ৩১

১। নিম্মে বিদআতের ভয়াবহতা বর্ণনা করা হলো-

(১) বিদআত মানুষকে পথভ্রষ্ট করে

ইরবায ইবনু সারিয়াহ (রাঃ) বলেন, একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের মাঝে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত মর্মস্পর্শী ভাষায় আমাদের নাসীহাত করেন, যাতে অন্তরসমূহ ভীত হল এবং চোখগুলো অশ্রু বর্ষণ করলো। তাঁকে বলা হল, হে আল্লাহ্‌র রাসূল! আপনি তো বিদায় গ্রহণকারীর উপদেশ দিলেন। অতএব আমাদের নিকট থেকে একটি প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করুন (একটি সুনির্দিষ্ট আদেশ দিন)। তিনি বলেনঃ তোমরা আল্লাহ্ভীতি অবলম্বন করো, শ্রবণ করো ও আনুগত্য করো (নেতৃ-আদেশ), যদিও সে কাফরী গোলাম হয়। আমার পরে অচিরেই তোমরা মারাত্নক মতভেদ লক্ষ্য করবে। তখন তোমরা আমার সুন্নাত ও হিদায়াতপ্রাপ্ত খুলাফায়ে রাশিদ্বীনের সুন্নাত অবশ্যই অবলম্বন করবে, তা দাঁত দিয়ে শক্তভাবে কামড়ে ধরবে। অবশ্যই তোমরা বিদআত কাজ পরিহার করবে। কারণ প্রতিটি বিদআতই ভ্রষ্টতা। ইবনে মাজাহ : ৪২,  সুনানে তিরমিজি : ২৬৭৬, আবূ দাঊদ ৪৬০৭, আহমাদ ১৬৬৯২, দারিমী ৯৫।

(২) বিদআত সহিহ সুন্নাহকে বিতাড়িত করে তার স্থলাভিষিক্ত হয়

হাসসান ইবনু আতিয়্যাহ্) (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন-

مَا ابْتَدَعَ قَوْمٌ بِدْعَةً فِي دِينِهِمْ إِلَّا نَزَعَ اللَّهُ مِنْ سُنَّتِهِمْ مِثْلَهَا ثُمَّ لَا يُعِيدُهَا إِلَيْهِمْ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَة.

কোন জাতি যখন দীনের মধ্যে কোন বিদআত সৃষ্টি করে, তখনই আল্লাহ তা’আলা তাদের থেকে সে পরিমাণ সুন্নাত উঠিয়ে নেন। ক্বিয়ামাত (কিয়ামত) পর্যন্ত এ সুন্নাত আর তাদেরকে ফিরিয়ে দেয়া হয় না।

মিশকাত : ১৮৮, সুনানুদ দারেমী : ৯৮

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন-

إِنَّهُ سَيَلِيْ أَمْرَكُمْ مِنْ بَعْدِيْ رِجَالٌ يُطْفِئُوْنَ السُّنَّةَ وَيُحْدِثُوْنَ بِدْعَةً وَيُؤَخِّرُوْنَ الصَّلاَةَ عَنْ مَوَاقِيْتِهَا. قَالَ ابْنُ مَسْعُوْدٍ يَا رَسُوْلَ اللهِ كَيْفَ بِيْ إِذَا أَدْرَكْتُهُمْ قَالَ لَيْسَ طَاعَةٌ لِمَنْ عَصَى اللهَ قَالَهَا ثَلاَثَ مَرَّاتٍ-

নিশ্চয়ই তোমরা আমার (মৃত্যুর) পরে তোমাদের শরী‘আতকে এমন অবস্থায় পাবে- যখন মানুষ সুন্নাতকে বিলুপ্ত করবে, বিদ‘আত সৃষ্টি করবে এবং ছালাতের সময় ছালাত আদায় না করে দেরী করে আদায় করবে। তখন ইবনু মাসউদ (রাঃ) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! আমি যদি তাদেরকে পাই তাহ’লে আমি কি করব? তখন রাসূল (ছাঃ) বললেন, আল্লাহর অবাধ্যদের কোন আনুগত্য নেই। এ কথা তিনি তিনবার বললেন। মুসনাদে আহমাদ : ৩৭৯০; সিলসিলা ছহীহা হ: ২৮৬৪।

(৩)  বিদআত সবচেয়ে নিকৃষ্ট আমল

আবদুল্লাহ্ ইবনু মাসুদ (রাঃ) হতে বর্ণিত-

إِنَّ أَحْسَنَ الْحَدِيثِ كِتَابُ اللهِ وَأَحْسَنَ الْهَدْيِ هَدْيُ مُحَمَّدٍ صلى الله عليه وسلم وَشَرَّ الأُمُورِ مُحْدَثَاتُهَا وَ (إِنَّ مَا تُوعَدُونَ لاَتٍ وَمَا أَنْتُمْ بِمُعْجِزِينَ)

সর্বোত্তম কালাম হল আল্লাহর কিতাব, আর সর্বোত্তম পথ নির্দেশনা হল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পথ নির্দেশনা। আর সবচেয়ে নিকৃষ্ট বিষয় হল নতুনভাবে উদ্ভাবিত পন্থাসমূহ। ’’তোমাদের কাছে যার ও’য়াদা দেয়া হচ্ছে তা ঘটবেই, তোমরা ব্যর্থ করতে পারবে না’’- (সূরাহ আনাম-১৩৪)। সহিহ বুখারি : ৭২৭৭,

জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন ভাষণ দিতেন তখন তাঁর চোখ দুটি লাল হয়ে যেতো, কন্ঠস্বর জোরালো হতো, তাঁর ক্রোধ বৃদ্ধি পেতো, যেন তিনি কোন সেনাবাহিনীকে সতর্ক করছেন। তিনি বলতেনঃ তোমরা সকাল ও সন্ধ্যায় আক্রান্ত হতে পারো (অথবা তোমাদের সকাল-সন্ধ্যা কল্যাণময় হোক)। তিনি আরো বলতেনঃ আমার প্রেরণ ও ক্বিয়ামাত (কিয়ামত) এ দুটি আঙ্গুলের অবস্থানের মত পরস্পর নিকটবর্তী। তিনি তাঁর তর্জনী ও মধ্যমা আঙ্গুল মিলিয়ে দেখান। অতঃপর তিনি বলেনঃ সবচেয়ে উত্তম নির্দেশ হল আল্লাহ্‌র কিতাব এবং সর্বোত্তম পথ হল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রদর্শিত পথ। দ্বীনের মধ্যে নতুন কিছু উদ্ভাবন সর্বাপেক্ষা নিকৃষ্ট কাজ। প্রতিটি বিদআতই ভ্রষ্টতা। তিনি আরো বলেনঃ কোন ব্যাক্তি ধন-সম্পদ রেখে (মারা) গেলে তা তার পরিবারবর্গের এবং কোন ব্যাক্তি দেনা অথবা অসহায় সন্তান রেখে (মারা) গেলে তার ঋণ পরিশোধের দায়িত্ব আমার এবং তার সন্তানের লালন-পালনের দায়িত্বভারও আমার যিম্মায়। সহিহ মুসলিম : ৮৬৭, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪৫, সুনানে নাসায়ী : ১৫৭৮, ১৯৬২, সুনানে আবূ দাঊদ : ২৯৫৪, আহমাদ : ১৩৭৪৪, ১৩৯২৪, ১৪০২২, ১৪২১৯, ১৪৫৬৬; সুনানে দারিমী : ২০৬

(৪) বিদআতির আম কবুল হয়নাঃ

আলী (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

الْمَدِينَةُ حَرَمٌ مَا بَيْنَ عَيْرٍ إِلَى ثَوْرٍ فَمَنْ أَحْدَثَ فِيهَا حَدَثًا أَوْ آوَى مُحْدِثًا فَعَلَيْهِ لَعْنَةُ اللهِ وَالْمَلاَئِكَةِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ لاَ يَقْبَلُ اللهُ مِنْهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ صَرْفًا وَلاَ عَدْلاً

আইর থেকে সওর পর্যন্ত মদীনার হারাম-সীমা। এখানে যে ব্যক্তি অভিনব কিছু (বিদআত) রচনা করবে বা বিদআতীকে আশ্রয় দেবে, তার উপর আল্লাহ, ফিরিশতাদল এবং সকল মানুষের অভিশাপ। কিয়ামতের দিন আল্লাহ তার কোন ফরয ও নফল ইবাদত কবুল করবেন না। হাদিস সম্ভার : ২৯১৩, সহিহ মুসলিম : ৩৩৯৩

ইবরাহীম ইবনু তাইমী (রহঃ) এর পিতা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আলী (রাঃ) আমাদের সামনে ভাষণ দিলেন এবং বললেন, আমাদের কাছে আল্লাহর কিতাব ও এই সাহীফায় যা আছে, তা ছাড়া অন্য কোন কিতাব নেই, যা আমরা পাঠ করে থাকি। তিনি বলেন, এ সাহীফায় রয়েছে, যখমসমূহের দন্ড বিধান, উটের বয়সের বিবরণ, এবং আইর পর্বত থেকে সত্তার পর্যন্ত মদিনা হারাম হওয়ার বিধান। যে ব্যাক্তি এর মধ্যে বিদআত উদ্ভাবন করে কিংবা বিদআতীকে আশ্রয় দেয়, তার উপর আল্লাহ, ফিরিশতা ও সকল মানুষের লানত। আল্লাহ তাঁর কোন নফল ও ফরয ইবাদত কবূল করেন না। আর যে নিজ মাওলা (প্রভু) ব্যতীত অন্যকে (প্রভু) মাওলা রূপে গ্রহণ করে, তার উপর অনুরূপ লানত। আর নিরাপত্তা দানে সর্বস্তরের মুসলিমগণ একই স্তরের এবং যে ব্যাক্তি কোন মুসলিমের চুক্তি ভঙ্গ করে তার উপরও অনুরূপ লা’নত। সহিহ বুখারি : ৩১৭২, ৬৭৫৫

(৫) বিদআতির তওবা কবুল হয়না

বিদআতকে বর্জন না করা পর্যন্ত তার তওবা কবুল হবে না।

আনাস (রাঃ) হতেই বর্ণিত, আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলে-

إِنَّ اللَّهَ حَجَبَ التَّوْبَةَ عَن كُلِّ صَاحِبِ بِدْعَةٍ حَتَّى يَدَع َبِدْعَتَهُ

আল্লাহ প্রত্যেক বিদআতীর তওবা ততক্ষণ পর্যন্ত স্থগিত রাখেন (গ্রহণ করেন না), যতক্ষণ পর্যন্ত সে তার বিদআত বর্জন না করেছে। হাদিস সম্ভার : ১৪৬, ত্বাবারানীর আওসাত : ৪২০২, বাইহাক্বীর শুআবুল ঈমান : ৯৪৫৭, সহিহ আত তারগিব : ৫৪

(৬) বিদআত সৃষ্টিকারীর প্রতি ফেরেশতা এবং সব লোকের অভিশাপ হয়ে থাকে-

ইবরাহীম আত-তাইমী (রহঃ) হতে তার বাবার সূত্রে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আলী (রাঃ) আমাদের সামনে খুতবাহ দেন এবং বলেন, যে ব্যক্তি ধারণা করে যে, আমাদের নিকট আল্লাহ্ তা’আলার গ্রন্থ এবং এই পুস্তিকা যার মধ্যে উটের বয়সের বিবরণী ও জখমের ক্ষতিপূরণের বিধান রয়েছে তা ব্যতীত আরো কোন গ্রন্থ আছে সে মিথ্যাবাদী।

তিনি তার খুৎবায় আরো বলেন, এই গ্রন্থে আরো আছেঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মদীনার হেরেমের সীমানা হচ্ছে আইর পাহাড় হতে সাওর পর্বত পর্যন্ত। যদি কেউ এতে কোন প্রকার বিদ”আতের প্রচলন ঘটায় অথবা কোন বিদ’আতীকে আশ্রয় দেয় তাহলে তার উপর আল্লাহ, ফিরিশতাগণ ও সকল মানুষের অভিসম্পাত। কিয়ামত দিবসে তার কোন ফরয বা নাফল ইবাদাতই আল্লাহ তা’আলা কুবুল করবেন না।

যে লোক তার বাবাকে পরিত্যাগ করে অন্য কাউকে বাবা বলে দাবি করে (নিজের বংশপরিচয় গোপন করে অন্য বংশের পরিচয় দেয়) অথবা তার মনিবকে ছেড়ে দিয়ে অন্য মনিবের নিকট পালিয়ে যায় তার উপর আল্লাহ, ফিরিশতাগণ এবং সকল মানুষের অভিশাপ। তার ফরয বা নাফল কোন ইবাদাতই গ্রহণ করা হবে না। সুনানে তিরিমিজ : ২১২৭, বায়হাক্বী : ৯৯৫১, সহিহ আল জামি : ৬৬৮৩, সহিহ আত তারগীব : ১৯৮৬।

(৭)  কিয়ামতের দিন হাউজে কাওসার পানি থেকে বঞ্চিত হবে-

আনাস ইবনু মালিক (রা.) থেকে বর্ণনা করেন যে, নাবী ﷺ বলেছেন-

لَيَرِدَنَّ عَلَىَّ الْحَوْضَ رِجَالٌ مِمَّنْ صَاحَبَنِي حَتَّى إِذَا رَأَيْتُهُمْ وَرُفِعُوا إِلَىَّ اخْتُلِجُوا دُونِي فَلأَقُولَنَّ أَىْ رَبِّ أُصَيْحَابِي أُصَيْحَابِي ‏.‏ فَلَيُقَالَنَّ لِي إِنَّكَ لاَ تَدْرِي مَا أَحْدَثُوا بَعْدَكَ ‏”

অবশ্যই হাউযের পাড়ে এমন কিছু লোক আসবে যারা দুনিয়াতে আমার সাহচর্য লাভ করেছিল। এমন কি যখন আমি তাদের দেখতে পাব এবং তাদেরকে আমার সম্মুখে নিয়ে আনা হবে, তখন আমার নিকট আসতে তাদের বাধা দেওয়া হবে। তারপর আমি বলব, আয় রব্ব! এরা আমার সাথী, এরা আমার সাথী। তখন আমাকে বলা হবে, অবশ্য আপনি জানেন না, আপনার পর এরা কি উদ্ভাবন (কিরূপ বিদ’আত) করেছে। সহিহ মুসলিম ৫৭৯২ ইফাঃ

রাসুলুল্লাহ ﷺ এর স্ত্রী উম্মু সালমা (রা.) থেকে বর্ণিত। বলেন, আমি হাওয (কাওসার) সম্পর্কে লোকদের আলোচনা করতে শুনতাম। কিন্তু আমি (নিজে) রাসুলুল্লাহ ﷺ থেকে এ সম্বন্ধে কিছু শুনিনি। পরে যখন একদিন ঐ বিষয়ের আলোচনা এল, এ সময় একটি মেয়ে আমার চুল আচড়িয়ে দিচ্ছিল, তখন আমি রাসুলুল্লাহ ﷺ সম্বোধন করতে শুনলামঃ হে লোক সকল! তখন মেয়েটিকে আমি বললাম, তুমি আমার থেকে দুরে সরে যাও। সে বলল, তিনি তো পুরুষদের ডাক দিয়েছেন এবং স্ত্রীলোকদের ডাকেননি। আমি বললাম, আমিও তো লোকদের একজন। এরপর রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেনঃ আমি তোমাদের জন্য ‘হাওয’ এর কাছে অগ্রগামী হবো। তাই সাবধান! আমার কাছে তোমাদের এমন কেউ যেন না আসে, যাকে আমার কাছ থেকে দুরে সরিয়ে দেওয়া হবে, যেমন হারানো উটকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। আর আমি বলতে থাকব, কেন তাদের তাড়ানো হচ্ছে? তখন বলা হবে, আপনি তো জানেন না, তারা আপনার পরে কী নতুন বিষয়ের (বিদ’আত) উদ্ভাবন করেছে? তখন আমিও বলব, দুর হও! সহিহ মুসলিম : ৫৭৭২ ইফাঃ

(৮)  বিদআতের ফলে আল্লাহর দ্বীন বিকৃত হয়-

মহান আল্লাহ এরশাদ করেনঃ

وَرَهْبَانِيَّةً ابْتَدَعُوهَا مَا كَتَبْنَاهَا عَلَيْهِمْ إِلَّا ابْتِغَاء رِضْوَانِ اللَّهِ فَمَا رَعَوْهَا حَقَّ رِعَايَتِهَا فَآتَيْنَا الَّذِينَ آمَنُوا مِنْهُمْ أَجْرَهُمْ وَكَثِيرٌ مِّنْهُمْ فَاسِقُونَ

আর বৈরাগ্য, সে তো তারা (ঈসা আঃ এর অনুসারীগণ) নিজেরাই উদ্ভাবন করেছে; আমি এটা তাদের উপর ফরজ করিনি। তারা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় তারা নিজেরাই এ বিদআত বানিয়ে নিয়েছে। তারপর সেটি যেভাবে মেনে চলা দরকার, সেভাবে মেনেও চলেনি।  তাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছিল, তাদের প্রতিদান আমি দিয়েছি৷ তবে তাদের অধিকাংশই পাপী৷  সুরা হাদীদ ৫৭:২৭

সুফিবাদের বিদআত প্রথম খৃষ্টানেরাই আবিস্কার করে। মহান আল্লাহ সাক্ষ্য দিচ্ছেন তারা এই ভাল উদ্দেশ্যে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করেছিল। কিন্তু ভাল উদ্দেশ্য নিয়ে নিজেদের ইচ্ছামত যে কোন কাজ করলেই তা গ্রহণযোগ্য হয় না। ইয়াহুদী ও খৃষ্টানেরা তাদের ধর্মে অন্য জাতির রসম-রেওয়াজ ও বিদআত প্রচলন করে ধর্মকে এমন বিকৃত করেছে। এমনিভাবে আমাদের মুসলিম সমাজে শিয়া রাফেজী, খারেজী, উপমহাদেশের মাজার পুজারী ব্রেলভীগনও বিদআতের প্রচলন করে দ্বীন ইসলামকে বিকৃত করেছে।

(১০) বিদ‘আতের দিকে আহবানকারী অন্যের পাপের অংশীদার হবে

 যারা মানুষকে বিদ‘আতের দিকে আহবান করে ক্বিয়ামত পর্যন্ত তারা অন্যের পাপের অংশীদার হবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন-

لِیَحۡمِلُوۡۤا اَوۡزَارَہُمۡ کَامِلَۃً یَّوۡمَ الۡقِیٰمَۃِ ۙ  وَمِنۡ اَوۡزَارِ الَّذِیۡنَ یُضِلُّوۡنَہُمۡ بِغَیۡرِ عِلۡمٍ ؕ  اَلَا سَآءَ مَا یَزِرُوۡنَ 

এতে করে তারা কিয়ামতের দিনে নিজদের পাপের বোঝা পুরোটাই বহন করবে এবং তাদের পাপের বোঝাও যাদেরকে তারা অজ্ঞতা হেতু পথভ্রষ্ট করে। তারা যা বহন করবে, তা কতই না নিকৃষ্ট! সুনা নাহল : ২৫

আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

مَنْ دَعَا إِلَى هُدًى كَانَ لَهُ مِنَ الْأَجْرِ مِثْلُ أُجُورِ مَنْ تَبِعَهُ لَا يَنْقُصُ ذَلِكَ مِنْ أُجُورِهِمْ شَيْئًا وَمَنْ دَعَا إِلَى ضَلَالَةٍ كَانَ عَلَيْهِ مِنَ الْإِثْمِ مِثْلُ آثَامِ مَنْ تَبِعَهُ لَا يَنْقُصُ ذَلِكَ مِنْ آثَامِهِمْ شَيْئا»

যে ব্যক্তি কোন লোককে সৎ কাজের দিকে আহবান করবে, তার জন্যও সে পরিমাণ সাওয়াব রয়েছে যা তার অনুসারীদের জন্য রয়েছে, অথচ তাদের সাওয়াবের কোন অংশ একটুও কমবে না। অনুরূপ যে ব্যক্তি কাউকে গোমরাহীর দিকে আহবান করে তারও সে পরিমাণ গুনাহ হবে, যতটুকু গুনাহ তার অনুসারীদের জন্য হবে। অথচ এটা অনুসারীদের গুনাহকে একটুও কমাবে না। সহিহ মুসলিম : ২৬৭৪, মিশকাত : ১৫৮

(১১) বিদআতি সালাম না দেওয়া-

নাফি (রহঃ) থেকে বর্ণিত-

أَنَّ ابْنَ عُمَرَ، جَاءَهُ رَجُلٌ فَقَالَ إِنَّ فُلاَنًا يَقْرَأُ عَلَيْكَ السَّلاَمَ ‏.‏ فَقَالَ لَهُ إِنَّهُ بَلَغَنِي أَنَّهُ قَدْ أَحْدَثَ فَإِنْ كَانَ قَدْ أَحْدَثَ فَلاَ تُقْرِئْهُ مِنِّي السَّلاَمَ فَإِنِّي سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَقُولُ ‏ “‏ يَكُونُ فِي هَذِهِ الأُمَّةِ أَوْ فِي أُمَّتِي الشَّكُّ مِنْهُ خَسْفٌ أَوْ مَسْخٌ أَوْ قَذْفٌ فِي أَهْلِ الْقَدَرِ

ইবন উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে এক ব্যক্তি এসে বললঃ অমুক ব্যক্তি আপনাকে সালাম পাঠিয়েছেন তিনি বললেনঃ আমি খবর পেয়েছি যে, সে ব্যক্তি বেদআতী। সে যদি বেদআতী হয়ে থাকে তবে আমার পক্ষ থেকে তাকে সালাম দিবে না। কেননা, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে বলতে শুনেছি, আমার এ উম্মাতের কাদরিয়্যা আকীদা পোষণকারীদের মধ্যে ঘটবে ভূমি ধ্বস বা চেহারা বিকৃতি বা প্রস্তর নিক্ষেপ। সুনানে তিরমিজী : ২১৫২, সুনানে ইবনু মাজাহ : ৪০৬১

২। কিভাবে বুঝবেন আপনার আমলটি বিদআত

বিদআত থেকে মুক্ত থাকতে গেলে আগে বিদআতকে সঠিকভাবে চিনতে হবে। শত্রুকে চিনতে পারলে যেমন তার থেকে শর্তক থাকা যায়, বিদআতকে চিনতে পারলেও তার থেকে শর্তক থাকা যাবে। এ পরিচ্ছেদে বিদআত বুঝার জন্য বিস্তারিত আলোচনা করা হবে। বিদআত চিনতে ও চুঝতে নিন্মের মানদন্ড মনোযোগ সহকালে অধ্যায়ন করা খুবই জরুরী।

১। কুরআন ও সহিহ হাদিসে বহির্ভুত আমলই বিদআত-

আবূ হুরাইরা কর্তৃক বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

تَرَكْتُ فيكُمْ شَيْئَيْنِ لَنْ تَضِلُّوا بَعْدَهُما كِتابَ الله وسُنَّتي وَلَنْ يَتَفَرَّقا حَتَّى يَرِدا عَلَيَّ الحَوْضَ

আমি তোমাদের মাঝে দুটি জিনিস রেখে যাচ্ছি, যা অবলম্বন করলে তোমরা কখনই পথভ্রষ্ট হবে না। তা হল আল্লাহর কিতাব এবং আমার সুন্নাহ। ’হওয’ (কাওসারে) আমার নিকট অবতরণ না করা পর্যন্ত তা বিচ্ছিন্ন হবে না। হাদিস সম্বার ১৫০০, হাকেম : ৩১৯ হাদিসের মান সহিহ

মালিক ইবনু আনাস (রা.) (রহঃ) হতে মুরসালরূপে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

تَرَكْتُ فِيكُمْ أَمْرَيْنِ لَنْ تَضِلُّوا مَا تَمَسَّكْتُمْ بِهِمَا: كِتَابَ اللَّهِ وَسُنَّةَ رَسُولِهِ

আমি তোমাদের মধ্যে দু’টি জিনিস রেখে যাচ্ছি। যতক্ষণ তোমরা সে দু’টি জিনিস আঁকড়ে ধরে থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত পথভ্রষ্ট হবে না আল্লাহর কিতাব ও তাঁর রসূলের হাদীস। মিশকাত : ১৮৬, মুয়াত্ত্বা মালিক : ১৫৯৪

২। যে সলাম আমলের কোন দলিল নাই তাই বিদআত-

ইসলামি শরীয়তের প্রতিটি আমলের সুনির্দিষ্ট দলিল আছে। ইসলামি শরীয়তের মুল আমলগুলির মধ্য সালাত, সাওম, হজ্জ, যাকাত, তাবলীগ, জিহাদ, আত্মশুদ্ধি ইত্যাদি আমলের সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি আছে। এই সকল আমল কুরআন সুন্নাহ দ্বারা প্রমনিত। এই আমলগুলি গুরুত্বসহকারে আদায় করলে যেমন ফজিলত বর্ণিত হয়েছে, তেমনি অবজ্ঞা বা অপহেলা করে আদায় না করলেও শাস্তির ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। যখন দেখা যাবে আমলের পক্ষে কুরআন ও সহিহ হাদিসের কোন দলীল পাওয়া যায় না তখন মনে করতে হবে আমলটি বিদআত। সারকথা হলো, কুরআন ও সহিহ হাদিসের বাহিরে কোন আমলই গ্রহন যোগ্য নয়। আমল থাকবে তো দলীল থাকবে, দলীল নেইতো আমলটি নির্দিধায় বিদআত।

যদি কেউ কোন কাজ বা আমলকে ইসলামি শরীয়তের ইবাদত বলে প্রচার করে বা আদায় করার আহবান জানায় তবে তাকে অবশ্যই কুরআন হাদিস থেকে দলীল পেশ করতে হবে। কুরআন হাদিস দলীলের ভীত্তিতে আমলটি ইবাদত হবে আর দলীলের বাহিরের ইবাদতটি বিদআত হবে।

৩। ইসলামী শরীয়ত সম্মত আমল নিয়ে বাড়াবাড়ি-

মহান আল্লাহ বলেন,

قُلْ يَا أَهْلَ الْكِتَابِ لاَ تَغْلُواْ فِي دِينِكُمْ غَيْرَ الْحَقِّ

বল, হে আহলি কিতাব! নিজেদের দীনের ব্যাপারে অন্যায় বাড়াবাড়ী করো না। সুরা মায়েদা : ৭৭

আবূ হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী ﷺ বলেছেন-

إِنَّ الدِّينَ يُسْرٌ، وَلَنْ يُشَادَّ الدِّينَ أَحَدٌ إِلاَّ غَلَبَهُ، فَسَدِّدُوا وَقَارِبُوا وَأَبْشِرُوا، وَاسْتَعِينُوا بِالْغَدْوَةِ وَالرَّوْحَةِ وَشَىْءٍ مِنَ الدُّلْجَةِ ‏

নিশ্চয়ই দ্বীন সহজ। দ্বীন নিয়ে যে বাড়াবাড়ি করে দ্বীন তার উপর জয়ী হয়। কাজেই তোমরা মধ্যপন্থা অবলম্বন কর এবং নিকটে থাক, আশান্বিত থাক এবং সকাল-সন্ধ্যায় ও রাতের কিছু অংশে সাহায্য চাও। সহিহ বুখারী : ৩৯

ইবনু আববাস (রা.) হ’তে বর্ণিত, রাসূল ﷺ বলেন, তোমরা দ্বীনের মধ্যে বাড়াবাড়ি করা থেকে বিরত থেকো। কেননা তোমাদের পূর্ববর্তী লোকেরা দ্বীনের ব্যাপারে সীমালংঘনের কারণেই ধ্বংস হয়েছে। সুনানে নাসাঈ : ৩০৫৭; ইবনু মাজাহ : ৩০২৯

আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিতঃ একদা নবী ﷺ তাঁর নিকট গেলেন, তখন এক মহিলা তাঁর কাছে (বসে) ছিল। তিনি বললেন, ‘‘এটি কে?’’ আয়েশা (রা.) বললেন, ‘অমুক মহিলা, যে প্রচুর সালাত পড়ে।’ তিনি বললেন, ‘‘থামো! তোমরা সাধ্যমত আমল কর। আল্লাহর কসম! আল্লাহ ক্লান্ত  হন না, যতক্ষণ না তোমরা ক্লান্ত হয়ে পড়।’’ আর সেই আমল তাঁর নিকট প্রিয়তম ছিল, যেটা তার আমলকারী নিয়মিত করে থাকে। সহিহ বুখারী : ৪৩, সহিহ মুসলিম : ৭৪১, ৭৮২, সুনানে আবূ দাউদ : ১৩১৭

আনাস (রা.) থেকে বর্ণিতঃ একদা নবী ﷺ মসজিদে প্রবেশ করলেন। হঠাৎ দেখলেন যে, একটি দড়ি দুই স্তম্ভের মাঝে লম্বা করে বাঁধা রয়েছে। তারপর তিনি বললেন, এই দড়িটা কি জন্য’? লোকেরা বলল, ‘এটি যয়নাবের দড়ি। যখন তিনি (সালাত পড়তে পড়তে) ক্লান্ত হয়ে পড়েন, তখন এটার সঙ্গে ঝুলে যান। নবী ﷺ বললেন, ‘‘এটিকে খুলে ফেল। তোমাদের মধ্যে (যে সালাত পড়বে) তার উচিত, সে যেন মনে স্ফূর্তি থাকা কালে সালাত পড়ে। তারপর সে যখন ক্লান্ত হয়ে পড়বে, তখন সে যেন শুয়ে যায়। (সহিহ বুখারী : ১১৫০, সহিহ মুসলিম : ৭৮৪, সুনানে নাসায়ী : ১৬৪৩, সুনানে আবূ দাউদ : ১৩১২, সুনানে ইবনু মাজাহ : ১৩৭১

আবূ হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিতঃ আল্লাহর রাসুল ﷺ বলেছেন, তোমদের কেউ যখন লোকেদের নিয়ে সালাত আদায়করে, তখন যেন সে সংক্ষেপ করে। কেননা, তাদের মধ্যে ছোট, বড়, দুর্বল ও কর্মব্যস্তরা রয়েছে। আর যদি কেউ একাকী সালত আদায় করে, তখন ইচ্ছামত দীর্ঘ করতে পারে। (সহিহ বুখারী : ৭০৩, সহিহ মুসলিম : ৪৬৭, সুনানে তিরমিযী : ২৩৬, সুনানে নাসায়ী : ৮২৩, সুনানে আবূ দাঊদ : ৭৯৪

সহিহ হাদিসগুলির সারমর্ম হল ইবাদতে বাড়াবাড়ি করা যাবে না। নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর দেখান পদ্ধতিতেই আমল করতে হবে। যদি ইবাদাতে বাড়াবাড়ি করতে থাকি তবে সুন্নাহ সম্মত আমল বিদআতে পরিনত হবে। কাজেই সকল আমলের পদ্ধতিতে সুন্নাহ অনুসরণ করি। অল্প আমলে করে অধিক সওয়াব অর্জণ করি।

৪। ইসলামি শরিয়ত সম্মত কোন বিষয়ে বৃদ্ধিঃ

ইসলাম পরিপূর্ণ ও আল্লাহ্‌র নিকট একমাত্র মনোনীত দ্বীন। এ দ্বীনকে পরিপূর্ণ করার ঘোষণাও আল্লাহ্ আল-কুরআনে দিয়েছেন, তিনি বলেন,

*﴿ٱلۡيَوۡمَ أَكۡمَلۡتُ لَكُمۡ دِينَكُمۡ وَأَتۡمَمۡتُ عَلَيۡكُمۡ نِعۡمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ ٱلۡإِسۡلَٰمَ دِينٗاۚ * 

আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে মনোনীত করলাম। সূরা আল মায়িদা : ৩

ইসলাম যেহেতু পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থা তাই শরীয়তের কোন সংযোজন বা বৃদ্ধি করার কোন অধিকার নাই। সাধারণ চারটি উপায় মুসলীমগণ বৃদ্ধি করে বিদআতের সৃষ্ট করে। যেমন-

(১) ইবাদতে বৃদ্ধি করাঃ

মহান আল্লাহ বলেন-

*وَرَهْبَانِيَّةً ابْتَدَعُوهَا مَا كَتَبْنَاهَا عَلَيْهِمْ إِلَّا ابْتِغَاء رِضْوَانِ اللَّهِ فَمَا رَعَوْهَا حَقَّ رِعَايَتِهَا *

আর বৈরাগ্য, সে তো তারা নিজেরাই উদ্ভাবন করেছে; আমি এটা তাদের উপর ফরজ করিনি। কিন্তু তারা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্যে এটা অবলম্বন করেছে। অতঃপর তারা যথাযথভাবে তা পালন করেনি। সুরা হাদীদ : ২৭

(২) আকিদায় বৃদ্ধি করাঃ

ইহুদি ও খৃষ্টানগণ আকিদা ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি করে করে মুশরিক হয়েছে। ইহুদীগণ “উজাইর আল্লাহর পুত্র আর খৃষ্টানগণ ঈসা (আ.) কে সৃষ্টিকর্তা বা সৃষ্টিকর্তার পুত্র সাব্যস্ত করে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَقَالَتِ الْيَهُودُ عُزَيْرٌ ابْنُ اللَّهِ وَقَالَتِ النَّصَارَى الْمَسِيحُ ابْنُ اللَّهِ ۖ ذَٰلِكَ قَوْلُهُم بِأَفْوَاهِهِمْ ۖ يُضَاهِئُونَ قَوْلَ الَّذِينَ كَفَرُوا مِن قَبْلُ ۚ قَاتَلَهُمُ اللَّهُ ۚ أَنَّىٰ يُؤْفَكُونَ

ইহুদীরা বলে “উজাইর আল্লাহর পুত্র” এবং খ্রিষ্টানরা বলে “মাসীহ (ঈসা আঃ) আল্লাহর পুত্র”। এ হচ্ছে তাদের মুখের কথা। ওরা তো তাদের মতই কথা বলে যারা তাদের পূর্বে কাফির হয়েছে। আল্লাহ এদের ধ্বংস করুন, এরা কোন উল্টো পথে চলে যাচ্ছে। সুরা তাওবাহ : ৩০

(৩) রাসূল সম্পর্কে বৃদ্ধিকরা-

ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি ‘উমার (রা.)-কে মিম্বারের ওপর দাঁড়িয়ে বলতে শুনেছেন যে, আমি নবী ﷺ কে বলতে শুনেছি-

لَا تُطْرُونِيْ كَمَا أَطْرَتْ النَّصَارَى ابْنَ مَرْيَمَ فَإِنَّمَا أَنَا عَبْدُهُ فَقُوْلُوْا عَبْدُ اللهِ وَرَسُوْلُهُ

তোমরা আমার প্রশংসা করতে গিয়ে বাড়াবাড়ি করো না, যেমন ‘ঈসা মারইয়াম (আঃ) সম্পর্কে খ্রিস্টানরা বাড়াবাড়ি করেছিল। আমি তাঁর বান্দা, তাই তোমরা বলবে, আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল। সহিহ বুখারি : ৩৪৪৫,

আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

هَلَكَ الْمُتَنَطِّعُونَ ‏‏.‏ قَالَهَا ثَلاَثًا ‏.‏

অতিরিক্ত চাটুকারীরা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে গেছে। তিনি এ কথাটি তিনবার বলেছেন। সহিহ মুসলিম : ২৬৭০

বিদআতিগন নবী ﷺ এর সম্পর্কে বাড়িয়ে বলেন- নবী ﷺ গায়েবের খবর রাখেন, তিনি আল্লাহর জাতি নুর থেকে সৃষ্টি, তিনি সব স্থানে হাজির নাজির, তিনি মৃত্যু বরণ করেন নাই ইত্যাদি ইত্যাদি।

(৪) অলী আওলীয়া সম্পর্কে বৃদ্ধিকরা-

আয়িশাহ (রা.) থেকে বর্ণিত। উম্মু হাবীবাহ ও উম্মু সালামা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে এমন একটি গীর্জার বর্ণনা দিলো যার মধ্যে মূর্তি বা ছবি যা তারা হাবশায় দেখেছিলেন। তাদের কথা শুনে রসূলুল্লাহ ﷺ বললেন-

“‏ إِنَّ أُولَئِكِ إِذَا كَانَ فِيهِمُ الرَّجُلُ الصَّالِحُ فَمَاتَ بَنَوْا عَلَى قَبْرِهِ مَسْجِدًا وَصَوَّرُوا فِيهِ تِلْكَ الصُّوَرَ أُولَئِكِ شِرَارُ الْخَلْقِ عِنْدَ اللَّهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ

তারা এরূপই করে থাকে। তাদের মধ্যেকার কোন নেক লোক মারা গেলে তারা তার কবরের উপর মাসজিদ নির্মাণ করে এবং তার মধ্যে ছবি বা মূর্তি স্থাপন করে। কিয়ামতের দিন এরা হবে আল্লাহর কাছে সর্বাপেক্ষা নিকৃষ্ট সৃষ্টি। সহিহ মুসলিম : ৫২৮, সুনানে নাসায়ী : ৭০৪

৫। ইসলামি শরিয়ত সম্মত কোন ইবাদতে হ্রাস করা-

আমারা প্রতিদিন প্রতি সালাতের পর হাত তুলে সম্মিলিত দুয়া করি। রাসূলুল্লাহ তার জীবন দসায় কখনও এইভাবে সালাতের পর সম্মিলিতভাবে হাত তুলে দুয়া করেন নাই। অথচ সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমানিত প্রতি ওয়াক্ত ফরজ সালাত শেষে দুআ কবুল হয়। আসলে পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের পর দুআ নিয়ে বিতর্ক নয়, বিতর্ক হল এর পদ্ধতি নিয়ে  এই পদ্ধতিতে রাসূলুল্লাহ ﷺ বা তাঁর সাহাবায়ে কেরাম দুআ করেন নাই। পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ সালাত আদায়ের পর প্রচলিত মুনাজাত যদি রাসূলুল্লাহ ﷺ না করে থাকেন, তবে তিনি কি আমল করেছেন। সহিহ বুখারী এ সহিহ মুসলীমসহ বহু হাদিস গ্রন্থে সালাতের পর যিকির-আযকার অধ্যায়ে বিভিন্ন যিকিরের কথা সহিহ সনদে বর্ণিত আছে, যা আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তার সাহাবায়ে কেরাম (রাজিঃ) আমল করেছেন।

৬। ইবাদতকে স্থানের সাথে নির্দিষ্ট করা-

আবূ সাঈদ আল-খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, তিনটি মসজিদ ছাড়া অন্য কোথাও (নেকির আশায়) সফর করা যায় না। এ মসজিদগুলো হল, মাসজিদুল হারাম, আমার এই মসজিদ এবং মাসজিদুল আকসা। সহিহ বুখারি : ১১৮৯, সহিহ মুসলিম : ১৩৯১, সুনানে নাসায়ী ৭০০, সুনানে  আবূ দাঊদ ২০৩৩, ইবনু মাজাহ : ১৪০৯

কিন্তু আমরা বিভিন্ন মাজারে মাজারে নেকির আশায়, মুক্তির আশায়, সন্তানের আশায় সফর করছি।

৭। ইবাদতকে সময়ের সাথে নির্দিষ্ট করা

নির্দিষ্ট সময় সালাত আদায়. রমাজান মাসে সিয়াম পালন করা, বছরে একাবার জাকাত আদায় করা, ঈদের সালাতের পরই কুরবানী করা, সপ্তাহে একদিন জুমুআর সালাত, জিল হজ মাসে হজ করা প্রত্যেক মুসলিমের উপর ফরজ করা হয়েছে। ইসলামের মুল স্তম্বের প্রতিটি আমল সময়ের সাথে আয়াদ করা ফরজ করা হয়েছে। নির্দষ্ট সময়ের আগে পরে করলে ফরজ আদায় হবে না। প্রতিটি ইবাদাত যদি সময়ের সাথে সংশ্লিষ্ট থাকে তা হলে ইবাদতকে সময়ের সাথে নির্দিষ্ট করলে বিদআত হবে কেন?

প্রশ্নের উত্তর খুবই সহজ। ইবাদতকে সময়ের সাথে নির্দিষ্ট করার ক্ষমতা কার? এক কথায় উত্তর মহান আল্লাহ। হ্যা, উপরের প্রতিটি ইবাদের সময় স্বয়ং আল্লাহ নির্ধারণ করেছেন। মহান আল্লাহ নির্ধারণ করে তার রাসূল কে অহি মারফত জানিয়ে দিয়েছেন। তিনি তার হুকুম বাস্তবায়ণ করেছেন। মহান আল্লাহ এই হুকুম বাস্তবায়ণই হল ইবাদাত। যদি কেউ তার দেয়া সময়ের আগে বা পরে সময় নির্ধারণ করে ইবাদাত করে, তবে তা হবে চরম অন্যায়। কেউ ঈদের দিন সিয়াম পালন করলে গুনাহগার হবে। আবার ঈদের একদিন আগে (রমজান মাসে) ঈদ পালন করলেও গুনাহগার হবেন। অর্থাৎ সময় নির্ধারণ করার কোন ক্ষমতা বান্দার নেই। সে শুধু মহান আল্লাহর হুকুম পালনের গোলাম। ইবাদতকে সময়ের সাথে নির্দিষ্ট করলেই বিদআত হবে না। মহান আল্লাহ হুকুম বা কুরআন সুন্নার বাহিরে গিয়ে বান্দা যখন নিজেই ইবাদতকে সময়ের সাথে নির্দিষ্ট করে, তখন আর ইবাদাত থাকে না। তখন হয়ে যার বিদআত।

যেমন- জম্ম দিন পালন করা, মৃত্যু বার্ষিকী পালন করা, উরশ উৎজাপন করা, চল্লিশা পালন করা, কুলখানী করা, ঈদে মিলাদুন্নবী পালন করা ইত্যাদি।

৮। ইবাদতকে সংখ্যার সাথে নির্দষ্ট করা-

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলূল্লাহ ﷺ বলেছেন, যে ব্যাক্তি প্রত্যেক সালাতের পর সুবহানাল্লাহ তেত্রিশবার, আলহামদুলিল্লাহ তেত্রিশবার ও আল্লাহু আকবার তেত্রিশবার বলবে এই হল নিরানব্বই-আর একশত পূর্ণ করার জন্য বলবেঃ

لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَحْدَهُ لاَ شَرِيكَ لَهُ لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَىْءٍ قَدِيرٌ

তার পাপ সমুহ মাফ হয়ে যাবে, যদিও তা সমুদ্রের ফেনার মত হয়। সহিহ মুসলীম : ১২৩০ ইফাঃ

আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

مَنْ قَالَ سُبْحَانَ اللَّهِ وَبِحَمْدِهِ‏.‏ فِي يَوْمٍ مِائَةَ مَرَّةٍ حُطَّتْ خَطَايَاهُ، وَإِنْ كَانَتْ مِثْلَ زَبَدِ الْبَحْرِ ‏”‏‏.‏

যে ব্যাক্তি প্রত্যহ একশত বার সুবাহানআল্লাহি ওয়া বিহামদিহি বলবে তার গুনাহগুলি মাফ করে দেওয়া হবে তা সমুদ্রের ফেনা পরিমান হলেও। সহিহ বুখারি : ৬৪০৫

অনুরূপভাবে সহিহ হাদিসে যদি কোন সংখ্যা উল্লেখ করে তার ফিজরত বর্ণনা করা হয় তবে সে সংখ্যা যথাযত অনুসরণ করে আমল করলেই কাংখিত ফজিলত পাওয়া যাবে। ইচ্ছ কর কম বেশী করলে ফজিলত হবে তবে হাদিসে বর্ণনি ফজিলত থেকে বঞ্চিত হতে হবে। হাদিসে এসেছে প্রত্যেক সালাতের পর সুবহানাল্লাহ তেত্রিশবার, আলহামদুলিল্লাহ তেত্রিশবার ও আল্লাহু আকবার তেত্রিশবার বলবে কিন্তু যদি কেউ ইচ্ছা করে কম বেশী বার বলে তবে সে হাদিসে বর্ণিত ফজিলত থেকে বঞ্চিত হবে। হাদিসে নেই অথচ নিজে নিজে সংখ্যা নির্ধারণ করে ফজিলতও বর্ণনা করে দিল। এই কাজটি বিদআতের পাশাপাশি আল্লাহ বিধানের সাথে বিয়াদবি। সংখ্যা নির্ধারণ বিদআত আর ফজিলত বর্ণনা করা ওহির উপর নির্ভর করে। যেমন-

খতমে শিফাঃ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, এই পবিত্র কালেমা একলক্ষ পঁচিশ হাজার বার পাঠ করা কে খতমে শিফা বলে।

‘‘খতমে তাসমিয়া: বিসমিল্লাহির রাহমানির রহিম একলক্ষ পঁচিশ হাজার বার পাঠ করাকে ‘‘খতমে তাসমিয়া’’ বলে।

কোন সংখ্যা নির্দিষ্ট করে তাসবিহ আদায় করলেই বিদআত হবে না। নির্দষ্ট সংখ্যার ফজিলত আছে এবং এ সংখ্যার কমবেশী করা যাবে না। আর্থাত নির্দিষ্ট সংখ্যা নিজের উপর ওয়াজিব করে নিলেই বিদআত হবে।

১০। যে আমলটির করার প্রমান আমাদের সালাফে সালেহীনদের যুগে পাওয়া যায় না-

আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-

خَيْرُ النَّاسِ قَرْنِيْ ثُمَّ الَّذِيْنَ يَلُوْنَهُمْ ثُمَّ الَّذِيْنَ يَلُوْنَهُمْ ثُمَّ يَجِيءُ

আমার উম্মাতের সর্বোত্তম মানুষ আমার যুগের মানুষ (সাহাবীগণ)। অতঃপর তৎপরবর্তী যুগ। অতঃপর তৎপরবর্তী  যুগ। সহিহস বুখারি : ৩৬৫১, সহিহ মুসলিম : ২৫৩৩

উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, নবী ﷺ বলেছেন-

خَيْرُ الشُّهَدَاءِ الَّذِي يَأْتِي بِشَهَادَتِهِ قَبْلَ أَنْ يُسْأَلَهَا ‏.‏ هُوَ عِنْدَنَا إِذَا أُشْهِدَ الرَّجُلُ عَلَى الشَّىْءِ أَنْ يُؤَدِّيَ شَهَادَتَهُ

আমার যুগ হচ্ছে সর্বোত্তম যুগ, তারপর তাদের পরবর্তী যুগ, তারপর তাদের পরবর্তী যুগ। তারপর এরূপভাবে মিথ্যার প্রসার ঘটবে যে, কারো নিকট সাক্ষ্য তলব না করা হলেও সে সাক্ষ্য দিবে, শপথ করতে বলা না হলেও শপথ করবে”। সুনানে তিরমিজি : ২৩০৩

১১। শরীয়তের বাহিরে সম্পূর্ণ নতুন কোন পদ্ধতি আবিস্কার করে ইবাদত করা-

ইসলামি শরীয়ত যেহেতু স্বয়ং সম্পূর্ণ এখানে আর নতুন কিছু প্রবেশের সুযোগ নাই। মহান আল্লাহ প্রদত্ত চুড়ান্ত শরীয়াত হল ইসলাম। এখান কোন ইবাদতের পদ্ধতি প্রবেশ করানোর সুযোগ নেই। এমনকি ভবিশ্যাতে কোন নবী আসবেন না। তাই কিয়ামত পর্য়ান্ত এটাই চুড়ান্ত শরীয়ত। এই শরীয়তের বাহিবে মহান আল্লাহকে খুশি করা যাবে না। আল-কুরআনে মহান আল্লাহ বলেন,

* وَمَن يَبۡتَغِ غَيۡرَ ٱلۡإِسۡلَٰمِ دِينٗا فَلَن يُقۡبَلَ مِنۡهُ *

ব্যক্তি ইসলাম ছাড়া অন্য কোন দ্বীন অনুসন্ধান করে, তা কখনোই তার কাছ থেকে গ্রহণ করা হবে না। সূরা আলে-ইমরান : ৮৫

হাম্মাম ইবনু মুনাব্বিহ্ (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এ হলো সে সব হাদীস, যা আবূ হুরাইরাহ্ (রাযিঃ) রসূলুল্লাহ ﷺ হতে আমাদের নিকট উল্লেখ করেছেন। তারপর তিনি কয়েকটি হাদীস বর্ণনা করেন। তার একটি হলো, আবূল কাসিম ﷺ বলেছেন, আমার দৃষ্টান্ত ও আমার পূর্বেকার নবীগণের দৃষ্টান্ত সে লোকের উপমার মতো, যে কতকগুলো গৃহ বানালো, তা সুন্দর করল ও সুদৃশ্য করল এবং পূর্ণাঙ্গ করল; কিন্তু তার কোন একটির কোণে একটি ইটের স্থান ছাড়া (খালি রাখল)। লোকেরা সে ঘরগুলোর চারদিকে চক্কর দিতে লাগল আর সে ঘরগুলো তাদের মুগ্ধ করতে লাগল। পরিশেষে তারা বলতে লাগল, এখানে একখানি ইট লাগালেন না কেন? তাহলে তো আপনার অট্টালিকা পূর্ণাঙ্গ হত। অতঃপর মুহাম্মাদ ﷺ বলেন যে, আমি-ই হলাম সে ইটখানি। সহিহ মুসলিম : ৫৮৫৪

কোন উম্মত কোন পদ্ধতিতে, কি ইবাদাত করবেন, তা শুধু ঐ উম্মতের জন্য নির্দিষ্ট নবীই বলতে পারবেন। আমাদের জন্য এবং কিয়ামত পর্যান্ত যত মানব জাতি আসবে, সবার জন্যই একমাত্র আমাদের মুহাম্মাদ ﷺ এর দেখান পদ্ধিতে আমল করতে হবে। এর বাহিরে কোন পদ্ধতিই গ্রহনীয় নয়। কাজেই ইসলামি শরীয়তের বাহিরে কোন প্রকার আমলের পদ্ধতি দেখলেই বিদআত হবে এতে কোন সন্দেহ নেই।

১২। ইসলাম বিরোধী হারাম কাজকে ইবাদত মনে করে বিদআত করা-

বর্তমান যুগে অনেক ইসলাম বিরোধী কাজ চলেছে অথচ অজ্ঞ মুসলিম ইহাকে ইবাদাত মনে করছে। যেমন একটি  উদাহরণ দেই। কোন কোন নামধারী অলীর মাজার কে কেন্দ্র করে বার্ষিক উরশ মাহফিলের আয়োজন করা হয়। এই সকল উরশ মাহফিলে সাধারণত, মুরিদদের মানত করা পশু জবাই করে খাওয়ান হয়। নারী পুরুষ এক সাথে গান গায় এবং ঢোল বা বাদ্যের সাথে সাথে তাল মিলিয়ে নাচে। মানতের নামে মাজাবের সেবকগন টাকা উত্তলন করে। কোথাও কোথাও ইসলাম বিরোধী গাজার আসর বসে। এমনকি জুয়ার আসরও বসে। এই উরশ কে কেন্দ্র করে যতগুলি কাজ হয়, তার সবই  ইসলাম বিরোধী হারাম কাজ অথচ জাহেল বা অজ্ঞ মুসলিম ইহাকে ইবাদাত মনে করে আমল করছে। এই সকল ইসলাম বিরোধী কাজ কে বিদআত বললে কমই হবে। এই সকল কাজ সম্পূর্ণ হারাম, হারাম। যেহেতু এর উপর আমল কারীগণ ইহাকে ইবাদত মনে করে তাই ইহাকে বিদআতও বলা হয়।

আমাদের সমাজে এমনই অনেক শত শত হারাম কাজকে ইসলামি কাজ বলে চালিয়ে যাচ্ছে। আর অজ্ঞ মুসলিম ইহাকে ইবাদাত মনে করে অর্থ ও সময় ব্যয় করে যাচ্ছে। কাজেই ইসলামি শরীয়ত বিরোধী কোন কাজ যদি ইসলামি কাজ হিসাবে দেখা যায় তবে তাকেও আমরা বিদআত বলেত পারি।     

১৩। বিদআতের সম্পর্ক দ্বীনের সাথে দুনিয়ার সাথে নয়-

বিদআতের সম্পর্ক ইসলামি শরীয়ার ইবাদতের সাথে, পার্থির কোন বিষয় বা কাজের সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই। পার্থিব বিষয়ে বিদআতের অপর নাম নতুন আবিষ্কৃত বিষয়। এ প্রকার বিদআত বৈধ। কেননা দুয়িয়ার সাথে সম্পর্কশীল সকল বিষয়ের ব্যাপারে মূলনীতি হল তা বৈধ। তবে শর্ত হল তাতে শরঈ কোন নিষেধ না থাকা। শরীয়তের নিষেধ থাকলে তা করা বিদআত নয় বরং হারাম। দ্বীনের ক্ষেত্রে বিদআত তথা নতুন কিছু উদ্ভাবন করা হারাম। কারণ দ্বীনের ব্যাপারে মূলনীতি হল তা অহীর উপর নির্ভরশীল। অর্থাৎ দ্বীনের সমস্ত বিধান কুরআন ও সুন্নাহ থেকে গ্রহণ করতে হবে। 

আয়িশাহ রাদিয়াল্লাহ তায়ালা আনহুমা থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ বলেছেন-

مَنْ أَحْدَثَ فِيْ أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ فِيْهِ فَهُوَ رَدٌّ

যদি কেউ আমাদের এই দ্বীনে কিছু উদ্ভাবন করে যা তাতে নেই, তা প্রত্যাখ্যাত। সহিহ বুখারী : ২৬৯৭, সহিহ মুসলিম : ১৭১৮, সুনানে আবূ দাঊদ : ৪৬০৬, আহমাদ : ২৩৯২৯

১৪। ইবাদতের উপকরন বিদআত নয়-

বিদআতে আলোচনা দ্বারা এ কথা বুঝেছি যে, আমলের পদ্ধতি বা নিয়ম কানুন সরাসরি আল্লাহ প্রদত্ত ও রসূলুল্লাহ এর দেখান। কিন্তু কিছু কিছু্ ইবাদাত পালনের জন্য কিছু উপকরণের প্রয়োজন হয় যা তিনি নির্দিষ্ট করেন নাই। যেমনঃ জামাতে সালাত আদায়ের জন্য মসজিদ একটি উপকরণ।

কুরআন তিনওয়া করার নেকীর কাজ। কুরআনের প্রতি হবরফের জন্য দশটি নেকী পাওয়ার ঘোষণা সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমানিত। উমাইয়া যুগে ইরাকের শাসনকর্তা হাজ্জাজ বিন ইউসুফ অনারব ভাষী মানুষের জন্য কুরআন তিলওয়াত সহজ করার জন্য কুরআনে হরকত অর্থাৎ জের, জবর, পেশ সংযুক্ত করেন। তার এই হরকত সংযুক্ত হওয়ার পর কোন মুসলিম মনে করে না যে, কুরআনের প্রতি হবরফের জন্য দশটি বেশী নেকী পাওয়া  যায়। এই হরকত হল উপকরণ, এর ফলে কুনআন তিলওয়াত সহজ হয়েছে মাত্র। এই উপকরণ দ্বারা ইবাদাত করা সহজ হয়, কিন্তু ইবাদাতের কোন পদ্ধতি আবিস্কার হয় না বিধায় উপকরণে বিদআত হয় না।

এমনিভাবে মুসলিমদের অন্যতম ফরজ ইবাদাত হল হজ্জ্ব। যার জন্য সৌদির আরবের মক্কায় সফর করা ফরজ। এই সফরে বাহন খুবই গুরুত্বপূর্ণ উপদান। কিন্তু মহান আল্লাহ সফরের এই গুরুত্বপূর্ণ উপকরণটি নির্দষ্ট করে নাই। রসূলুল্লাহ এর জামানায় মানুষ পায় হেঁটে বা উট বা গাধার পিঠে চড়ে হজ্জের সফর করত। যদি উপকরণটি নির্দিষ্ট থাকতো তবে অনেকের জন্যই হজ্জ করা কষ্ট সাধ্য হয়ে যেত। কিন্তু হজ্জ যাত্রার বাহন নির্দিষ্ট করে ফরজ করে নাই। তাই আপনি আধুনিক যুগের যে কোন সুযোগ সুবিধা নিয়ে হজ্জে গমন করতে পারেন। কেউ এ কথা বিশ্বাস করে না যে বিমানে হজ্জ গমনে কষ্ট কম হয় তাই নেকীর পরিমানও কম হবে। কারন উপকরণের সাথে মুল ইবাদতের কোন সম্পর্ক নেই।

আশা করি ইবাদাত ও উপকরণে সাথে কি সম্পর্ক তা বুঝতে পেরেছি। এই জন্য বিজ্ঞ আলেমগন একমত যে ইবাদাতের উপকরণে কখনও বিদআত হবে না। বিদআত চিহিৃত করারা জন্য এই মান দন্ডটি খুবই গুরুত্ব পূর্ণ। কারণ বিদআতগন এই উপকরণের উদাহরণ দিয়ে, বিদআতী ইবাদতের পদ্ধতিকেও বিদআত বলতে নারাজ। কুরআন সুন্নাহ স্বীকৃত তার সহজে করার জন্য কোন উপকরণ ব্যবহার করা বিদআত নয়। যদি তার দ্বারা বেশী সওয়াব হবে আশা করা হয় তবে বিদআত হয়ে যাবে।

১৫। অমুসলিমদের অনুষ্ঠান, ইবাদাত ও প্রথার অনুসরণ করা বিদআত-

অমুসলিমদের অনুষ্ঠান, ইবাদাত ও প্রথার অনুসরণ করা কোন মুসলীমের কাজ নয়। অথচ অনেক মুসলিম তাদের অনুষ্ঠান, ইবাদাত ও প্রথার অনুসকণে অনুষ্ঠান করে থাকে। যদি কোন মুসলিম তাদের এই যে কোন খাস অনুষ্ঠান, প্রথা ও ইবাদাত অনুকরনে কোন ইবাদাত চালু করে তবে তার বিদআত হবে। এই ধরনের বিদআত কখন কখন কুফরিও হবে পারে। যা একজন মুসলিম কে ইসলাম থেকে বাহির করে দিতে পারে।

যেমন- কাফিরদের উৎসব ও পর্ব অনুষ্ঠানের অনুকরণে উৎসব ও পর্ব পালন করা। খৃষ্টানদের বড় দিন ও হিন্দুদের জম্মাষ্টামীর আলোকে ঈদে মিলাদুন্নবী পালল করা। তাদের অনুসকনে মৃত্যু বার্ষিকী, বিবাহ বার্ষিকী, জন্ম দিন, ভালবাসা দিবস ইত্যাদি পালন করা।

১৬। কোন সমাজের প্রথাকে ইবাদাত মনে করে ধরে রাখা

আবেদ শ্রেণীর কেউ কেউ সমাজের প্রথাকেও ভাল কাজ মনে করে মনগড়া ইবাদত চালু করে থাকে। প্রথা ও মুআমালাত বিষয়ক কোনো কাজের মাধ্যমে যদি শরীয়তের সুস্পষ্ট নির্দেশনা ছাড়াই আল্লাহর কাছে সাওয়াব লাভের আশা করা হয় তাহলে তা হবে বিদআত।

যেমন- পশমী কাপড়, চট, ছেঁড়া ও তালি এবং ময়লাযুক্ত কাপড় কিংবা নির্দিষ্ট রঙের পোষাক পরিধান করাকে ইবাদাত ও আল্লাহর প্রিয় পাত্র হওয়ার পন্থা মনে করে তবে এই পরাও বিদআত হবে।

কাজটি নতুন আবিস্কার অথচ বিদআত নয়-

১। আধুনিক আবিস্কার যা দ্বীনের কোন অংশ মনে করে কেউ ব্যবহার করে না।

যেমন- মোবাইল, ইন্টারনেট, টিভি, ফ্রিজ, কম্পিউটার ইত্যাদি। এই সকর বস্তু দ্বীনে কোন অংশ না। নেকির জন্য ব্যবহার করা হয়। এই বস্তু ব্যবহার করা হয় হালার না হয় হারাম। এই বস্তুর সম্পর্ক হালাল হারামের সাথে বিদআতে সাথে এর কোন সম্পর্ক নাই।

২। যে আমলেন দ্বারা নতুন কোন ইবাদতে পদ্ধতি আবিস্কার করে না।

যেমন-মসজিদ পাকা করা, আজানে মাইক ব্যবহার করা, তারাবির সালাত আদায় করা ইত্যাদি।

৩। যে আমল কেউ অতিরিক্ত নেকীর উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে না।

হজে গমন করা নেকীর কাজে কিন্তু হজের সফরে বিমান ব্যবহার করা অতিরিক্ত নেকীর কাজ মনে করে না।

৪। ইবাদতের পদ্ধতি আবিস্কার না করলে ইবাদতে জন্য শুধু উপকরণের ব্যবহার বিদআত হবে না।

৫। যে আমলেটি খোলাফায়ে রাশেদা থেকে প্রমানি তা বিদআত হবে না।

জুমুআনত দ্বিতিীয় আজান, তারাবির সালাত, শাসন কার্য পরিচালনার জন্য প্রশাসনিক ভাগে বিভক্ত করে শাসন করা ইত্যাদি।

৬। ইবাদাতের পদ্ধতি নয় কিন্তু খুব ভাল কাজ যে সম্পর্কে সাহাবীদের ইজমা আছে।

৭। ইবাদাতের পদ্ধতি নয় কিন্তু খুব ভাল কাজ যা সম্পর্কে সালাফে সালেহীনদের সমর্থন আছে।

৩। আমাদের সমাজে প্রচলিত কিছু বিদআত

বর্তমান বাংলার মুসলিম সমাজের বিদআত বাদ দিলে দ্বীন খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। এখন আমাদের সমাজের বহুল প্রচলিত কিছু বিআদতের উদাহরণ দিব। এই বিদআতগুলি যে বিদআতি আমল এ সম্পর্কে কোন সন্দেহ নাই। আমার লিখিত “বিদআতের ভয়াবহ পরিণতি” নামে বইটিতে প্রতিটি বিদআত নিয়ে আলাদা আলাদা শিরোনামে উল্লেখ করেছি। বিস্তারিত জানতে বইটি পাঠ করে নিতে পারেন। এখান শুধু বিদআতি আমলের শিরোনাম তুলে ধরলাম।

১। অজু, আজান, সারাম, সিয়াম ও জাকাত সম্পর্কিত বিদআত

(১) অজুর সময় প্রতি অঙ্গের জন্য বিশেষ দোয়া করা, (২) আজানের পূর্বে উচ্চস্বরে দরুদ ও তাসবীহ পড়া,  (৩) আজানের শুরুতে বিসমিল্লাহ বলা, (৫) আজানের বর্ণিত শব্দাবলি কম বেশি করা, (৬) আজানর পর আবার আহ্বান করা, (৭) আজানের সমাপ্তের পর হাত তুলে দুয়া করা, (৮) আজান ইকামতে রাসুলুল্লাহ ﷺ এর নাম শুনেই বৃদ্ধাঙ্গুলি দ্বারা চোখ মাসেহ করা, (৯) জায়নামাজে দাঁড়িয়ে প্রচলিত দোয়াটি পাঠ করা বিদআত, (১০) সালাত শুরুর সময় মুখে নিয়ত উচ্চারণ করা বিদআত, (১১) জামাতে সালাত শেষে সম্মিলিতভাবে হাত তুলে দুয়া করা, (১২) সালাম ফেরানোর পর দু’পাশের মুসল্লিকে সালাম দিয়ে মুসাফাহা করা , (১৩) নিজ দেশের মানুষের সঙ্গে একই সাথে সিয়াম শুরু ও শেষ না করা, (১৪) তারাবিতে দ্রুত কুরআন তিলওয়াত করে সালাত আদায় করা, (১৫) রাতের প্রথম ভাগে সাহরী খাওয়া একটি বিদআতি প্রচলন, (১৬) সেহরীর সময় জানানোর উদ্দেশ্যে রাতে ঢোল বাজান, তোপ দাগা বা মাইকে ডাকা, (১৭) ইফতারের পূর্বে সম্মিলিত মুনাজাত, (১৮) ইফতারির জন্য পার্টির আয়োজন করা, (১৯) মৃত্যু মাতাপিতার জন্য ইফতারির আয়োজন করা, (২০) একটি বিদআতি বিশ্বাস, সিয়ামের খাবারে কোনো  হিসাব হবে না, (২১) মসজিদ ছাড়া আর কোথাও ইতিকাফ করা, (২২) লাইলাতুল কদরের ১০০ বা ১০০০ রাকআত সালাত পড়া, (২৩) ঈদের সালাতের পর মুয়ানাকা বা কোলাকুলি করা, (২৪) ঈদের রাতে সালাত  আদায় করা, (২৫) জুমাতুল বিদা, (২৬) শাড়ি লুঙ্গি দ্বারা যাকাত প্রদানঅ

 

২। কুরআন ও জিকির কেন্দ্রিক বিদআত

(১) কুরআন খতম করা, (২) কুরআনের আয়াত দ্বারা তাবিজ কবজ ব্যবহার করা, (৩) কুরআন খতম করার পর কারো মাধ্যমে বখশে দেওয়া, (৪) কুরআন তিলওয়াত শেষে সাদাকাল্লাহুল আযীম বলা, (৫) জিকির সম্পর্কিত বিদআত, (৬) উচ্চ শব্দে বা জোরে জোরে জিকির করা, (৭) শুধু “আল্লাহ, আল্লাহ” জিকির করা একটি বিদআত, (৮) শুধু “ইল্লাল্লাহ, ইল্লাল্লাহ” জিকির করা একটি বিদআত, (৯) সম্মিলিত জিকির করা, (১০) শুধু হু হু হু করে জিকির করা, (১১) জিকিরের সময় শায়েখ বা পীরের ধ্যান করা, (১২) নারী পুরুষ এক সাথে জিকির করা, (১৩) জিকির গণনার মাধ্যম হিসাবে ‘তসবীহ এর ছড়া দ্বারা জিকির করা জায়েয কেন?, (১৪) অঙ্গ ভঙ্গি করে জিকির করা, (১৫) সুফিদের লতিফার জিকির। যেমন-কলব লতিফা, রুহ লতিফা, শিররুন লতিফা, খফি লতিফা, আকফা লতিফা, নাফস লতিফা,  আব লতিফ, আতস লতিফা, খাক লতিফা, বাদ লতিফা।

 

৩। বিভিন্ন প্রকারের খতম কেদ্রিক বিদআত

(১) মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে কুরআন খতম করান, (২) কুরআন পাঠ করে সওয়াব বেশি দেওয়া, (৩) সমাজের নতুন আবিষ্কার খতমে বুখারির অনুষ্ঠান, (৪) মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে খতমে ইউনুস এর আমল করা, (৫) মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে খতমে নারী এর আমল করা, (৬) মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে খতমে শিফা এর আমল করা, (৭) মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে খতমে তাহলিল এর আমল করা, (৮) মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে খতমে তাসমিয়া এর আমল করা, (৯) মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে খতমে খাজেগান, (১০) মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে খতমে জালালী এর আমল করা, (১১) মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে খতমে দুরুদে মাহি এর আমল করা, (১২) মুমূর্ষু ব্যক্তির পাশে কুরআন পাঠ করা বা সূরা ইয়াসীন পড়া।

 

৪। বিভিন্ন দিবস সম্পর্কিত বিদআত

(১) শবে বরাত সম্পর্কে ভ্রান্ত আকিদা, (শবে-বরাতের রাতে আল্লাহ্ দুনিয়ার আকাশে নেমে আসেন,  শবে-বরাতের রাতে আল্লাহ্ মানুষের ভাগ্য লিপিবদ্ধ করেন, সৌভাগ্য রজনী হিসাবে বিশ্বাস করা, মৃতদের আত্মার দুনিয়াতে পূণরাগমনের বিশ্বাস করা), (২) মধ্য শাবানের রাতে একশত রাকআত সালাত আদায়ের ফজিলত, (৩) পনের শাবানের দিনে সিয়াম পালন, (৪) শবে বরাতে রাত্রিতে গোসল করার ফজিলত, (৫) শবে বরাত উপলক্ষে মধ্য শাবানের দিনে সিয়াম পালন, (৬) এই রাত উপলক্ষে বিশেষ নিয়মে সালাত আদায় করা, (৭) হালুয়া-রুটি খাওয়া, (৮) এই রাতে বিশেষ মীলাদ মাহফিলের আয়োজন করা, (৯) মসজিদে সম্মিলিতভাবে খাওয়ার আয়োজন করা, (১০) এই রাতে ইসলামি বিষয় আলোচনা ও জিকির করা, (১১) এই রাতে সম্মিলিতভাবে কবর জিয়ারত করা, (১২) এই রাতে আলোক সজ্জা করা এবং আতশবাজী করা, (১৩) লাইলাতুল মিরাজ উদযাপন করা, (১৪) আশুরার রাত্রি জাগরণ করে ইবাদাত করে (১৫) বিভিন্ন প্রকার উন্নত খাবারের ব্যবস্থা করে, (১৪) ওয়াজ মাহফিল ও আলোচনা সভা করে, (১৫) আশুরার দিনে মাতম করা, (১৬)  ১০ ই মুহাররমকে আনন্দ উৎসবে পরিণত করা, (১৭) তাযিয়া মিছিল বাহির করা, (১৮) ১০ই মুহাররমে চোখে সুরমা লাগানো, (১৯) ১০ই মুহাররমে বিশেষ পদ্ধতিতে সালাত আদায় করা, (২০) তাবেঈ ইয়াযীদ বিন মুয়াবিয়াকে ‘মালঊন’ বা অভিশপ্ত বলে গালি দেওয়া, (২১) ঈদে মীলাদুন্নবী বা নবী রাসূলুল্লাহ ﷺ এর জম্ম উৎসব পালন করা, (২২) মধ্য শাবানের রাতে একশত রাকআত সালাত আদায় করা, (২৩) পনের শাবানের দিনে সিয়াম পালন, (২৪) শবে বরাতে রাত্রিতে গোসল করার ফজিলত, (২৫) শবে বরাত উপলক্ষে মধ্য শাবানের দিনে সিয়াম পালন, (২৬) এই রাত উপলক্ষে বিশেষ নিয়মে সালাত আদায় করা, (২৭) শবে বরাতে হালুয়া-রুটি খাওয়া, (২৮) শবে বরাতে রাতে বিশেষ মীলাদ মাহফিলের আয়োজন করা, (২৯) শবে বরাতে মসজিদে সম্মিলিতভাবে খাওয়ার আয়োজন করা, (৩০) শবে বরাতে রাতে ইসলামি বিষয় আলোচনা ও জিকির করা, (৩১) শবে বরাতে রাতে সম্মিলিতভাবে কবর জিয়ারত করা, (৩২) শবে বরাতে রাতে আলোক সজ্জা করা এবং আতশবাজী করা (৩৩) আখেরি চাহার শোম্বা পালন করা, (৩৪) ফাতিহা–ই-ইয়াজদাহাম পালন করা।

 

৫। মৃত্যু, করব ও মাজার সম্পর্কিত বিদআদসমূহ

(১) মাইয়াতের জন্য উচ্চস্বরে কান্না করা যাবে না, (২) মৃতদের জন্য বিলাপ করা, (৩) স্ত্রী ব্যতীত অন্যদের তিন দিনের বেশী শোক পালন, (৪) মৃত ব্যক্তির শোকগাথা বর্ণনা করা, (৫) মসজিদের মাইকে মৃত্যু সংবাদ প্রচার করা, (৬) মসজিদের মাইক ব্যবহার করে কি মৃতের ঘোষনা দেয়া যাবে? (৭) লাশের পাশে আগরবাতী জ্বালানো বা আতর-সুগন্ধি ব্যবহার জরুরী মনে করা, (৮) কাফনের কাপড়ে কালিমা আয়াত লেখা, (৯) মাইয়াতের কাফনে বা কবরে পানি ছিটান, (১০) জানাযার পিছে পিছে উচ্চৈঃস্বরে যিকর করা, (১১) জানাযা বহনের সময় বিশ্রাম নেওয়া, (১২)। মৃত লাশকে সামনে রেখে প্রশ্ন করা লোকটি কেমন ছিল, (১৩) বীনা কারণে জানাযা ও দাফনে দেরী করা (১৪) কফিনে ফুল দেয়া বা পুষ্পস্তবক অর্পণ করা, (১৫) এক মিনিট নীরবতা পালন করা, (১৬) মহিলাদের কবর স্থানে যাওয়া ও দাফন কাজে অংশ করা, (১৭)  বীনা কারণে এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় লাশ নিয়ে দাফন করা, (১৭) কবরে উপর বসা, (১৮) গোরস্থানে জুতা বা সেন্ডেল পায়ে হাঁটা, (১৯) মৃতকে কবরে রাখার সময় বা পরে আযান দেওয়া, (২০) চার কুল পড়তে পড়তে খেজুরের তাজা ডাল পুতে দেয়া, (২১) মৃত্যুর পরপরই মাইয়াতের বাড়ীতে বা কবরস্থানে সাদাকা প্রদান কর, (২২) মৃতের কাজা সালাতের জন্য কাফ্ফারা আদায় করা, (২৩) কবর জিয়াতের জন্য দিন ক্ষন নির্দিষ্ট করা, (২৯) মৃত্যু-দিবস পালন, (২৪)  মৃতের জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী মাইক বাজান, (২৫ মৃতের ঘরে চল্লিশ দিন যাবৎ বিশেষ লৌহজাত দ্রব্য রাখা, (২৬) কাফির, মুশরিক ও মুনাফিকদের জন্য দো‘আ করা (২৭) মাটিয়াল খাওয়ান, (২৮) মসজিদের পাশে কবর দেয়ায় অতিরিক্ত সুবিধা পাবে বিশ্বাস করা, (২৯) জানাযার সময় স্ত্রীর নিকট দেনমোহর মাপ চাওয়া,  (৩০)  ঘন ঘন কবর জিয়ারত করা, (৩১)। কবর কেন্দ্রিক মাজান নির্মাণ করা, (৩২)। মাজারকে কেন্দ্র করে উরশ উৎযাপন করা, (৩৩) মাজারের চার পাশে তাওয়াফ করে, (৩৪) মাযারকে ঘিরে বাতি প্রজ্বলন করে ও চাদর চড়ায়, (৩৫) কবর পাকা করে, কবরের উপর গম্বুজ নির্মান করে, (৩৬)। কবর বা মাজারে মানত পেশ করা, (৩৭) কবর বা মাজারে জন্তু জবেহ করা, (৩৮) কবরকে অতিরিক্ত ভক্তি করা, (৩৯) কবরে ধূপ, আগরবাতি ও মোমবাতি জ্বালানো, (৪০) মৃত্যুর আগেই কবর তৈরী করা, (৪০) কবরের গায়ে মৃতের নাম ও মৃত্যুর তারিখ লেখা, (৪১) কবরের উপর ঘর তৈরি করে বসবাস করা, (৪২)  কবর কেন্দ্রিক মসজিদ নির্মান করা, (৪৩) কবর জিয়ারতের উদ্দেশ্যে সফর করা, (৪৪) কবরের উপর জুতা হাটা, ও (৪৫) মহিলাগণ কবর জিয়ারত করা।

নাজাত প্রপ্ত দলের বৈশিষ্ট্য-৮ (১) ::  দ্বীন প্রচার প্রসারের জন্য দাওয়াত ও জিহাদে সতেষ্ট থাকবে

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

মহান আল্লাহ পৃথীবিতে তার দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য যুগে যুগে অসংখ্যা নবী রাসূল পাঠিয়েছেন। তারা দাওয়াত ও জিহাদের মাধ্যমে দ্বীনের প্রচার ও প্রসার ঘটিয়ে তাওহীদ প্রতিষ্ঠা করেছেন। অধিকাংশ নবী রাসূল শুধু দ্বীনের দাওয়াত দ্বারা দ্বীন প্রতিষ্ঠা করেছেন। আবার কোন কোন নবী রাসূল দাওয়াতের পাশাপাশি জিহাদও করেছেন। তারা দাওয়াতের মাধ্যমে দ্বীনের প্রসার ঘটিয়েছে আর জিহাদের মাধ্যমে দ্বীন সুরক্ষা করেছেন। এমন কি জিহাদের মাধ্যমেও দ্বীনের বিস্তার ঘটিয়েছেন। মহান আল্লাহ মনোনিত সর্বশেষ একমাত্র দ্বীন যা তিনি তার প্রিয় হাবিব মুহাম্মাদ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রতিষ্ঠা করেছেন। এই চুড়ান্ত ও সর্বশেষ মনোনিত একমাত্র দ্বীন প্রতিষ্ঠা জন্য মহান আল্লাহ দাওয়াত ও জিহাদ এই দুটি মাধ্যম দ্বারা সাফল্য মন্ডিত করছেন। তিনি দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য দাওয়াত দিয়েছিলেন এতে মুসলিম ও অমুসলিম কেউ দ্বিমত প্রষণ করে না। তিনি মক্কায় দীর্ঘ ১৩ বছর শুধু দাওয়াতের মাধ্যমেই ইসলামের প্রসার ঘটিয়েছেন। অপর পক্ষে তার জীবন দসায় কাফিরদের সাথে প্রায় অর্ধশত যুদ্ধ সংঘটিত হয়, যার অনেকগুলিতে তিনি নিজে নেতৃত্ব প্রদান করেন। যারা সত্যিকারের আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআত অনুসারী মুসলিম তারা দাওয়াত ও জিহাদের মাধ্যমে ইসমলাম প্রতিষ্ঠার জন্য চেষ্টা চালাবে। অপর পক্ষে বাতিল পন্থীদল একাংশকে স্বীকার করবে অপর অংশে অস্বীকার করবে। কাজেই যারা শুধু দাওয়াত মাধ্যমে ইসলমের প্রচার ও প্রসার ঘটাতে চেষ্টা করে কিন্ত কিতাল বা যুদ্ধকে অস্বীকার করে তারা সঠিক পন্থীদল হতে পারেনা। অপর পক্ষে যারা যুদ্ধ বিগ্রহ বা জিহাদের দ্বারা দ্বীর প্রতিষ্ঠা চেষ্টা করে কিন্তু দ্বীনের দাওয়াত দানের পদ্ধতিকে অস্বীকার করে তারাও সঠিক পন্থীদল হতে পারেনা। ইসলামি দ্বীনের কিছু স্বীকার করা আর কিছুকে অস্বীকার করা, ইসলামকে অস্বীকার করারই নামান্তর। মহান আল্লাহ বলেন,

 أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ فَمَا جَزَاء مَن يَفْعَلُ ذَلِكَ مِنكُمْ إِلاَّ خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَى أَشَدِّ الْعَذَابِ وَمَا اللّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ

অর্থঃ তবে কি তোমরা গ্রন্থের কিয়দংশ বিশ্বাস কর এবং কিয়দংশ অবিশ্বাস কর? যারা এরূপ করে পার্থিব জীবনে দূগর্তি ছাড়া তাদের আর কোনই পথ নেই। কিয়ামতের দিন তাদের কঠোরতম শাস্তির দিকে পৌঁছে দেয়া হবে। আল্লাহ তোমাদের কাজ-কর্ম সম্পর্কে বে-খবর নন। সুরা বাকারা : ৮৫

বর্তমান ফিতনার যুগে যদি একজন ইমানদার মুসলিম দ্বীর প্রচার, প্রসার বা প্রতিষ্ঠার জন্য যে কোন একটা মাধ্যম গ্রহন করে, হোক সেটা দাওয়াত (ধর্মীয় শিক্ষকতা, লেখক, মসজিদের ইমাম, প্রচলিত শির্কমু্ক্ত যে কোন পন্থা) অথবা জিহাদ (ইসলামি সংগঠন, রাজনৈতিক বা অরাজনৈতিক সংগঠন) তবে সে কি আংশিক দ্বীনের অনুসারী না সম্পূর্ণ দ্বীনের অনুসারী হিসাবে পরিগনিত হবে? 

এখানে একটা কথা স্মরণ রাখতে হবে, একক ব্যক্তির পক্ষে অনেক সময় সর্বক্ষেত্রে অংশ গ্রহন সম্ভব নাও হতে পারে। যেমন একজন মাদ্রাস শিক্ষকের পক্ষে ইসলাম প্রচারের মাধ্যম হল দ্বীনে সঠিক জ্ঞান তার ছাত্রদের মাঝে তুলে ধরা। এ কারনে সে যদি জিহাদের মত কোন কাজে অংশ গ্রহন না করতে পারে তবে দুষনীয় নয়, তার অন্তরে এর প্রতি ভালাবাসা আছে, আছে অকুন্ট সমর্থণ। কিন্তু যে যদি জিহার করাকে অস্বীকার করে তবে মহান আল্লাহ প্রদত্ত বিধান মোতাবেগ শাস্তির যোগ্য হয়ে যাবে। অনুরূপ ভাবে ইসলামি সংগঠনের (রাজনৈতিক বা অরাজনৈতিক) সাথে  যুক্ত কেউ যদি দাওয়াতের কাজও ইসলামের অংশ মনে করে এর প্রতি ভালবাসা দেখায়। এই কাজে অংশগ্রহণ করতে না পারায় নিজে নিজে অনুসুচনা করে। সে কিন্তু সঠিক পথেই আছে। অপর পক্ষে জিহাদ সমর্থিত ভাই যদি নিজের কাজকেই হক মনে করে আর দাওয়াতে মহান কাজকে অনর্থক মনে করে আস্বীকার করে তবে সেও মহান  আল্লাহ প্রদত্ত বিধান মোতাবেগ শাস্তির যোগ্য হয়ে যাবে।

সত্য পন্থী দলের দ্বারা জিহাদ ও দাওয়াতের সীমা কিভাবে নির্ধারণ হবে, এ সম্পর্কে সামান্য আলোচনা করব। আশা করি ব্যাপারটি সকলে সহজেই বুঝে আমল করতে পাবর। দাওয়াতের দুটি অংশ একটি হল ভাল কাজের আদেশ আর অপরটি হল অন্যায় কাজের নিষেধ করা। সাধারণত ভাল কাজের আদেশ কে আমরা তাবলীগ বা দাওয়াত হিসাবে ধরে থাকি আর অন্যায় কাজের নিষেধ বা বাধা প্রদান কে জিহাদ বলে থাকি। আমাদের সমাজে আমরা দুটি কাজকে আলাদা করে ফেলেছি মহান আল্লাহ কিন্তু দুটি কাজ একত্রেই উল্লেখ করেছেন। যেমন তিনি বলেন,

كُنتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ وَتُؤْمِنُونَ بِاللّهِ

অর্থঃ তোমরাই শ্রেষ্ঠ জাতি, মানবজাতির (কল্যাণের) জন্য তোমাদের আবির্ভাব হয়েছে। তোমরা ন্যায়কার্যে আদেশ এবং অন্যায় কার্যে নিষেধ কর এবং আল্লাহতে বিশ্বাস কর। সূরা আল ইমরান : ১১০

প্রকৃত মুমিনের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করে আল্লাহ বলেনঃ

يُؤْمِنُونَ بِاللّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ وَيَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ وَيُسَارِعُونَ فِي الْخَيْرَاتِ وَأُوْلَـئِكَ مِنَ الصَّالِحِينَ

অর্থঃ তারা আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান রাখে এবং তারা ভাল কাজের আদেশ দেয় ও মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করে। আর তারা কল্যাণকর কাজে দ্রুত ধাবিত হয় এবং তারা নেককারদের অন্তর্ভুক্ত। (সূরা আল ইমরান : ১১৪

وَالْمُؤْمِنُونَ وَالْمُؤْمِنَاتُ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاء بَعْضٍ يَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ وَيُقِيمُونَ الصَّلاَةَ وَيُؤْتُونَ الزَّكَاةَ وَيُطِيعُونَ اللّهَ وَرَسُولَهُ أُوْلَـئِكَ سَيَرْحَمُهُمُ اللّهُ إِنَّ اللّهَ عَزِيزٌ حَكِيمٌ

অর্থঃ আর মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীরা একে অপরের বন্ধু, তারা ভাল কাজের আদেশ দেয় আর অন্যায় কাজ থেকে নিষেধ করে, আর তারা সালাত কায়েম করে, জাকাত প্রদান করে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে। এদেরকে আল্লাহ শীঘ্রই দয়া করবেন, নিশ্চয় আল্লাহ পরক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। সূরা তাওবা : ৭১

আল্লাহ তাবারকা ওয়াতাআলা আরও বলেনঃ

الَّذِينَ يَتَّبِعُونَ الرَّسُولَ النَّبِيَّ الأُمِّيَّ الَّذِي يَجِدُونَهُ مَكْتُوبًا عِندَهُمْ فِي التَّوْرَاةِ وَالإِنْجِيلِ يَأْمُرُهُم بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَاهُمْ عَنِ الْمُنكَرِ

অর্থঃ সে সমস্ত লোক, যারা আনুগত্য অবলম্বন করে এ রসূলের, যিনি উম্মী নবী, যাঁর সম্পর্কে তারা নিজেদের কাছে রক্ষিত তওরাত ও ইঞ্জিলে লেখা দেখতে পায়, তিনি তাদেরকে নির্দেশ দেন সৎকর্মের, বারণ করেন অসৎকর্ম থেকে। (সুরা আরাফ ৭:১৫৭)।

সূরা তাওবার ১১২ আয়াতে, সূরা হজ্জের ৪১ আয়াতে, সূরা লুকমানের ১৭ আয়াতে ও অন্যান্য স্থানেও উল্লেখ করা হয়েছে যে, আল্লাহর প্রকৃত মুমিন বান্দাদের অন্যতম বৈশিষ্ট হলো সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ।

দ্বীন প্রচার প্রসারের জন্য দাওয়াত সতেষ্ট থাকবে-

দ্বীন প্রচার প্রসারে দাওয়াতের  হুকুম

আল্লাহর পথে আহবান করতেই নবী–রাসূলগণের পৃথিবীতে আগমন। মুমিনের জীবনের আন্যতম দায়িত্ব এই দাওয়াত। কোরআনুল কারিমে এ দায়িত্বকে কখনো দাওয়াত, কখনো সৎকার্যে আদেশ ও অসৎকার্যে নিষেধ, কখনো প্রচার, কখনো নসিহত ও কখনো দীন প্রতিষ্ঠা বলে অভিহিত করা হয়েছে। কোরআন ও হাদিসের বহু স্থানে এ কাজের গুরুত্ব, বিধান, পুরস্কার এবং এ দায়িত্ব পালনে অবহেলার শাস্তি আলোচিত হয়েছে। এই মহান কাজ করা মহান আল্লাহর নির্দেশ। এই মহান কাজের আনজাম প্রদানের জন্যই মহান আল্লাহ পৃথিবীতে অসংখ্যা নবী রসূল আলাইহিস সালাম প্রেরণ করেছেন। আল কুরআনে এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ ঘোষণা করেছেঃ

 لَقَدْ أَرْسَلْنَا نُوحًا إِلَى قَوْمِهِ فَقَالَ يَا قَوْمِ اعْبُدُوا اللَّهَ مَا لَكُمْ مِنْ إِلَهٍ غَيْرُهُ إِنِّي أَخَافُ عَلَيْكُمْ عَذَابَ يَوْمٍ عَظِيمٍ

অর্থঃ আমি নূহ (আঃ) কে তার কওমের নিকট পাঠিয়েছিলাম। তিনি তাঁর কওমকে ডাক দিয়ে বললেন, হে আমার কওম! তোমরা আল্লাহর দাসত্ব কর- আল্লাহ ছাড়া তোমাদের আর কোন ইলাহ বা প্রভু নেই। (আল আ’রাফা ৭:৫৯)।

আল্লাহ তাবারকা ওয়াতাআলা আরও বলেনঃ

وَإِلَى عَادٍ أَخَاهُمْ هُودًا قَالَ يَا قَوْمِ اعْبُدُوا اللَّهَ مَا لَكُمْ مِنْ إِلَهٍ غَيْرُهُ أَفَلَا تَتَّقُونَ

অর্থঃ এবং আদ জাতির প্রতি আমি তাদের ভাই হুদ (আঃ) কে পাঠিয়েছিলাম। তিনি বললেন, হে আমার দেশবাসী ! তোমরা আল্লাহর দাসত্ব কর। তিনি ছাড়া তোমাদের কোন ইলাহ নেই। (আল আ’রাফা ৭:৬৪)।

وَإِلَى ثَمُودَ أَخَاهُمْ صَالِحًا قَالَ يَا قَوْمِ اعْبُدُوا اللَّهَ مَا لَكُمْ مِنْ إِلَهٍ غَيْرُهُ

অর্থঃ এবং সামুদ জাতির প্রতি তাদের ভাই সালেহ (আঃ) কে পাঠিয়েছিরাম। তিনি তাঁর দেশবাসীকে ডাক দিয়ে বললেন, হে আমার কওমের লোকেরা! তোমরা আল্লাহর দসত্ব কবুল কর। তিনি ছাড়া কোন ইলাহ নেই। (আল আ’রাফ ৭:৭৩)

وَإِلَى مَدْيَنَ أَخَاهُمْ شُعَيْبًا قَالَ يَا قَوْمِ اعْبُدُوا اللَّهَ مَا لَكُمْ مِنْ إِلَهٍ غَيْرُهُ

অর্থঃ এবং মাদইয়ানবাসীর প্রতি তাদেরই ভাই শোয়ায়েব আ. কে পাঠিয়েছিলাম। তিনি তার কওমকে ডাক দিয়ে বললেন, হে আমার কওম। তোমরা আল্লাহর দাসত্ব কবুল কর। তিনি ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই। (আল আ’রাফ ৭:৮৫)

 সূরায়ে আহযাবে ৪৫-৪৬ আয়াতে বলা হয়েছে: 

يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ إِنَّا أَرْسَلْنَاكَ شَاهِدًا وَمُبَشِّرًا وَنَذِيرًا (45) وَدَاعِيًا إِلَى اللَّهِ بِإِذْنِهِ وَسِرَاجًا مُنِيرًا 

অর্থঃ হে নবী! আমরা তোমাকে পাঠিয়েছি সাক্ষীরূপে, সুসংবাদদাতা ও ভীতি প্রদর্শকরূপে এবং খোদার নির্দেশে তাঁর প্রতি আহ্বানকারী ও উজ্জ্বল প্রদীপরূপে। আবার কোথাও এসেছে এই কাজের প্রশংসা বর্ণনা হিসেবে। (সুরা আহযাব ৩৩: ৪৫ ও ৪৬)

 নূহ আলাইহিস সালামের এর জবানিতে মহান আল্লাহ বলেনঃ

أُبَلِّغُكُمْ رِسَالاَتِ رَبِّي وَأَنصَحُ لَكُمْ وَأَعْلَمُ مِنَ اللّهِ مَا لاَ تَعْلَمُونَ

অর্থঃ তোমাদেরকে প্রতিপালকের পয়গাম পৌঁছাই এবং তোমাদেরকে সদুপদেশ দেই। আমি আল্লাহর পক্ষ থেকে এমনসব বিষয় জানি, যেগুলো তোমরা জান না। [ সুরা আরাফ ৭:৬২ ]

মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লা কে দাওয়াত দিতে নির্দেশ-

আমাদের রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লা কে দাওয়াত দিতে নির্দেশ প্রদাণ করা হয়েছে। মহান আল্লাহ তাকে নির্দেশ প্রদান করে বলেনঃ

يَا أَيُّهَا الرَّسُولُ بَلِّغْ مَا أُنزِلَ إِلَيْكَ مِن رَّبِّكَ وَإِن لَّمْ تَفْعَلْ فَمَا بَلَّغْتَ رِسَالَتَهُ وَاللّهُ يَعْصِمُكَ مِنَ النَّاسِ إِنَّ اللّهَ لاَ يَهْدِي الْقَوْمَ الْكَافِرِينَ

অর্থঃ হে রসূল, পৌছে দিন আপনার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে আপনার প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে। আর যদি আপনি এরূপ না করেন, তবে আপনি তাঁর পয়গাম কিছুই পৌছালেন না। আল্লাহ আপনাকে মানুষের কাছ থেকে রক্ষা করবেন। নিশ্চয় আল্লাহ কাফেরদেরকে পথ প্রদর্শন করেন না।  সুরা মায়েদা : ৬৭ 

মহান আল্লাহ এই আয়াতের মাধ্যমে আমাদের রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লা কে আহীর পৌছে দানের জনস্য নির্দেশ প্রদান করেন। কোরআনুল কারিমে বারবার বলা হয়েছে যে, প্রচার বা পোঁছানোই রাসূলগণের একমাত্র দায়িত্ব। নিচের আয়াতে বলা হয়েছেঃ

 فَهَلْ عَلَى الرُّسُلِ إِلاَّ الْبَلاغُ الْمُبِينُ

অর্থঃ রাসূলের দায়িত্ব তো শুধুমাত্র সুস্পষ্ট বাণী পৌছিয়ে দেয়া। (সুরা নাহল ১৬:৩৫)।

উম্মতে মুহাম্মাদকে দাওয়াত দিতে নির্দেশ-

এই মহান দাওয়াতের কাজ মহান আল্লাহ তার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লা কে দায়িত্ব দিয়েই ছেড়ে দেননি তার উম্মতে মুহাম্মাদকেও এই একই নির্দেশ প্রদান করেছেন। যেমন- মহান আল্লাহ বলেনঃ

قُلْ هَـذِهِ سَبِيلِي أَدْعُو إِلَى اللّهِ عَلَى بَصِيرَةٍ أَنَاْ وَمَنِ اتَّبَعَنِي وَسُبْحَانَ اللّهِ وَمَا أَنَاْ مِنَ الْمُشْرِكِينَ

অর্থঃ বলে দিন, এটাই আমার পথ। আমি আল্লাহর দিকে বুঝে সুঝে দাওয়াত দেই আমি এবং যে আমার অনুসারী সেও। আল্লাহ পবিত্র। আমি (আল্লাহ) অংশীবাদীদের অন্তর্ভুক্ত নই। (সুরা ইউসুফ ১২:১০৮)।

মহান আল্লাহ আরও বলেনঃ

وَلْتَكُن مِّنكُمْ أُمَّةٌ يَدْعُونَ إِلَى الْخَيْرِ وَيَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ وَأُوْلَـئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ

অর্থঃ আর তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল থাকা দরকার, যারা কল্যাণের প্রতি আহবান করবে, ভাল কাজের আদেশ দেবে এবং মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করবে। আর তারাই সফলকাম। (সূরা আল ইমরান ৩:১০৪)।

এই দায়িত্বপালনকারী মুমিনকেই সর্বোত্তম বলে ঘোষণা করা হয়েছে পবিত্র কোরআনে। মহান আল্লাহ বলেনঃ

وَمَنْ أَحْسَنُ قَوْلًا مِّمَّن دَعَا إِلَى اللَّهِ وَعَمِلَ صَالِحًا وَقَالَ إِنَّنِي مِنَ الْمُسْلِمِينَ

অর্থঃ ঐ ব্যক্তি অপেক্ষা কথায় কে উত্তম যে আল্লাহর প্রতি মানুষকে আহবান করে, সৎকর্ম করে এবং বলে, আমি তো মুসলিমদের একজন।” (সুরা হা-মীম ৪১:৩৩)

মন্তব্যঃ উপরের আয়াতগুলি দ্বারা বুঝা যায় মুমিনদের অন্যতম দায়িত্ব হল দ্বীনের দাওয়াত দেয়া। কাজেই সত্য পন্থীদলের অন্যতম বৈশিষ্ট হল তারা দাওয়াতের কাজে সর্বসময় নিজেকে নিয়োজিত রাখবে। যে সত্য পন্থীদল বলে দাবী করবে তার দাঈ হিসাবে অনেক গুন থাকার আবাশ্যক। তবে নিম্মের গুন সম্পন্ন দায়ি হলেও চলবে।

দাওয়াত দানকারি দাঈয়ের গুনাবলী-

সৌদী আরবের বিশিষ্ট আলেমে দ্বীন মুহাম্মাদ ইবন সালেহ আল উসাইমীন (রহ:) জেদ্দায় এক সম্মেলনে বলেন, ইসলাম প্রচার কারি দায়ীদের ছয়টি গুন থাকতে হবে। যথা

১।  আল্লাহ পথের দা‘য়ীরা যে দিকে মানুষকে ডাকবে সে সম্পর্কে ইলম তথা জ্ঞান থাকা

২।  দাওয়াতের ক্ষেত্রে ধৈর্যধারণ করতে হবে।

৩।  হিকমত বা প্রজ্ঞা

৪।  দা‘য়ীকে উত্তম চরিত্রে চরিত্রবান হতে হবে।

৫।  দা‘য়ীকে জড়তা ও প্রতিবন্ধকতা পরিহার করা।

৬।  দা‘য়ীর অন্তর বিরোধীদের প্রতি উদার হতে হবে।

দাওয়াত প্রদানের পদ্ধতিঃ

একজন দাঈ মানুষকে ইসলামের দিকে ডাকার জন্য বিভিন্ন পদ্ধতিতে কাজ করতে পারে। দাওয়াতের আসল মাকসাদ হল, যে কোন পন্থা বা পদ্ধতিতে ইসলামকে সত্য নিষ্ঠভাবে পৌছান। সমাজে এখন নতুন নতুন মাধ্যম সৃষ্টি হয়েছে, যার মাধ্যমে দ্বীনের প্রচার প্রসার করা খুবই সহজ। একটু সদইচ্ছা থাকলে সামান্যও বিশাল বিশাল কাজ করা সম্ভব। সকলের সুবিধান জন্য কয়েকটি পদ্ধতি উল্লেখ করছি।

০১। প্রতিদিন অন্তত এক বার পরিবারের সবার আমলের খোজ খবর নেয়া। যেমনঃ সকলে নিয়মিত সালাত, সাওম আদায় করছে কিনা। নিয়মিত কুরআন ও হাদিস চর্চা করছে কিনা। পরিবারের জ্ঞান চর্চার জন্য লাইব্রেরী গড়ে তুলতে পারি।

০২।  মসজিদ ভিত্তিক ইসলামিক আলোচনা সভা, ওয়াজ মাহফিল, দরসের আসর বসান। মসজিদ ভিত্তিক লাইব্রেরী তৈরি করা। মসজিদ কমিটির মাধ্যমে দাওয়াত পরিচালনা করা।

০৩। এলাকার মসজিদ, মাদ্রাসা, ক্লাব, স্কুল ইত্যাদি কেন্দ্র করে কুরআন হাদিসের আলোকে দেয়াল পত্রিকা প্রকাশ করা যেতে পারে।

০৪। নামাযের ক্যালেন্ডার বের করা। রমজান সাথে সিয়ামের সময় সম্বলিত ক্যালেন্ডার বের করা। 
০৫। প্রিন্ট মিডিয়ার মাধ্যমে দ্বীন প্রচার করা। প্রিন্ট মিডিয়া বলতে পত্রিকা বুঝান হয়ে থাকে। সামর্থ থাকলে ইসমামি ভাব ধারার মাসিক, সাপ্তাহিক বা দৈনিক পত্রিকা চালু করে ইসলামা প্রচার করা। এমনটি প্রকাশনি প্রতিষ্ঠা করেও ইসলামি বই ছাপিয়ে দাওয়াতে কাজ করা। কুরআন ও সহিহ সুন্নাহ ভিত্তিক প্রকাশিত কোন ইসলামী পত্রিকার গ্রাহক সংখ্যা বৃদ্ধির চেষ্টা করা। প্রয়োজনাতিরিক্ত ইসলামি ম্যাগাজিন, ইসলামী বই প্রভৃতি সংগ্রহ করে তা বিতরণ করা।

০৬। সমাজে প্রচলিত খারাপ ক্যাসেট, খারাপ ম্যাগাজিন, মানুষের কাছ থেকে উদ্ধার করে তার পরিবর্তে ভালমানের বক্তৃতার ক্যাসেট, ইসলামী ম্যাগাজিন প্রদান করা।

৭। বর্তমানে মোবাইলের যুগে মোবাইলের মাধ্যমে সামান্য অর্থ খরচ করে দাওয়তী কাজ করা যায়। যেমনঃ একটি মেমোরী কার্ডে কিনে ইসলামি আলোচনার অডিও বা ভিডিও উপহার দিলেও দাওয়াতি কাজ হবে।

৮। কম্পিউটারের মাধ্যমে দাওয়তি করা করা যায়। বিভিন্না আলেমদের ওয়াজের সিডি করে অন্যকে প্রদান করা। প্রয়োজনে পেইন ড্রাই বা মেমোরী কার্ডে ইসলামি আলোচনার ভিডিও বা অডিও কপি করে প্রদান করা।

০৯। বই মেলা বা বানিজ্য মেলায় ইসলামী বই, ক্যাসেট, সিডি, দাওয়াতী উপকরণ, ইসলামি নিদর্শন ইত্যাদি প্রদর্শনীর আয়োজন করা।

১০। প্রসিদ্ধ দাওয়া সেন্টার, ইসলামি লাইব্রেরী, ইসলামী রেকর্ডিং সেন্টার, বড় বড় জামে মসজিদ, প্রসিদ্ধ আলেমদের নাম ঠিকানা, তাদের লিখত বই, তাদের পরিচালিত ওয়েব সাইড এর নাম, ইসলামি সাময়িকি, ইসমামি পত্রিকা, ইসলামী রেকর্ডিং সেন্টার, ইসলামিক ওয়েব সাইট এর নাম সমূহর বিভিন্ন  মাধ্যমে প্রকাশ করা।

১১। ব্যাপক লোক সমাগমের স্থানে পরিবেশ অনুযায়ী মানুষকে বই, ক্যাসেট, লিফলেট ইত্যাদি বিনামূল্যে বিতরণ করবে বা বিক্রয় করবে।

১২। ইন্টারনেটের মাধ্যমে দ্বীন প্রচার করা। আমাদের দেশে প্রায় সকল মানুষ ইন্টারনেটের সাথে কোন না কোন ভাবে জড়িত। এর মধ্যে একটা অংশ আছে যারা ইন্টারনেট ছাড়া এক মুহুর্তও চলতে পারে না। মজার ব্যাপার হল এরা প্রায় সকলেই শিক্ষিত জ্ঞান সম্পন্ন লোক। কাজের এদের কাছে দ্বীন পৌছান ও দ্বীন বুঝান খুবই সহজ। ইন্টারনেটের প্রায় নব্বইভাগই অশ্লীলতায় ভরা। কাজের এদের মাঝে দ্বীন প্রচার করে সচেতন করা খুবই জরুরী। খারাপ বলে দুরে থাকলে আরও খারাপ হবে। তবে যার খারাপ সওয়াম সম্ভাবনা আছে বা যে অশ্লীলত থেকে বাচতে পারে না, তার জন্য ইন্টারনেটের মাধ্যমে দ্বীন প্রচার করা বৈধ হবে না, বৈধ হবে না। এখন আসুন কিভাবে আধুনিক এই মাধ্যম ব্যবহার করে দ্বীন প্রচার করা যায়।

সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমেঃ বর্তমানে ইন্টারনেটে অনেক গুলি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সক্রিয় যেমনঃ ফেসবুক, টুইটার, জিমেইল, পথ, লিংকডিন, ইনোস্ট্রগ্রাম, রেডিট ইত্যাদি। বর্তমানে আমাদের দেশে প্রায় সব বয়সের মানুষ ফেসবুক ব্যবহার করে থাকেন। ইউরোপের মানুষসহ বহির্বিশ্বের অধিকাংশ মানুষ টুইটার ব্যবহার করে থাকে। ভাল মানের চাকুরীজীরিগন লিংকইন ব্যবহার করে থাকে। আবার সেলিব্রাটিগণ ইনোস্ট্রগ্রাম ব্যবহার করে। কাজের এই সকল সামাজিক যোগাযোগ মাধামে ব্যবহার করে সকল শ্রেণীর মানুষের নিকট দ্বীন পৌছান খুবই সহজ। ইসলামিক লেখা পোস্ট করে, পেজ খুলে এবং গ্রুপ খুলে সে গ্রুপে ইসলামি লেখা পোস্ট করার মাধ্যমে অনেক মানুষের মাঝে দাওয়াত প্রচার করা যায়।

আবার ইমো, ম্যাসেনজান, ভাইভার, ইমেইল ইত্যাদির মাধ্যমে অসংখ্য মানুষের কাছে ইসলামের বাণী মুহূর্তেই পৌঁছানো যায়।

ইউটিউবঃ সারা বিশ্বে বহুল ব্যবহৃত একটি সাইট হচ্ছে ইউটিউব। বিশ্বের এমন কোন দেশ নেই যে দেশে ইউটিউবের ব্যবহার নেই। ইউটিউবে একাউন্ট খুলে দ্বীন প্রচার করা যায়। ইউটিউবে টিভি চ্যানেল তৈরি করেও দ্বীন প্রচার করা যায়। এই মাধ্যমে বিভিন্ন ওয়াজ, তাফসিরুল কুরআনের ও হাদিসের আলোচনা আপলোড করা। বিভিন্ন মাসায়ালা মাসায়েলের প্রশ্ন উত্তরের ভিডিও আপলোড করে সমগ্র পৃথিবীতে ছড়িয়ে দেয়া যায়। 

বিভিন্ন সাইট খুলে দ্বীন প্রচারঃ বিভিন্ন ওয়েব সাইট খুলে তাতে ইসলামিক বয়ান, ঐতিহাসিক নিদর্শন, ইসলামিক ফটোগ্রাফি, নবীদের জীবনী, সাহাবাদের জীবনী, বুজুর্গদের ত্যাগ ইত্যাদি তুলে ধরার মাধ্যমে ইসলামি দাওয়াতের কাজ করা যায়। বিভিন্ন ব্লগে ইসলামের লেখা লিখে দাওয়াতি কাজ করা যায়। আবার নিজস্ব ইসলামি ব্লগও প্রতিষ্ঠার করা যায়। বর্তমানে অনলাইনে ওয়েব পোর্টালের ছড়াছড়ি। এসব পোর্টালগুলোতে অপ্রয়োজনীয় নিউজ বেশি প্রচার করা হয়। তাই এসব পোর্টাল গুলোতে ইসলামি লেখা বেশি বেশি লিখে দ্বীন প্রচার করা যায়।

অনলাইনে ফ্রি বই আপলোড করেঃ অনলাইনে ফ্রি বই প্রকাশ করার সুযোগ দিয়ে থাকে অনেক প্রকাশনী। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ইসলামি বইগুলো আপলোড করে প্রচার করা। নিজস্ব ইসলামি বই বা পত্রিকা স্ক্যানিং করে অনলাইনে আপলোড করে দেওয়া। যেন মানুষ হাতের নাগালেই ইসলামি বই ও পত্রিকা পেয়ে যায়। তবে অন্যের বই বা পত্রিকা অনুমতি ছাড়া স্ক্যানিং না করা।

ইলেকট্রনিক্স মিডিয়াঃ  ইলেকট্রনিক্স মিডিয়া বলতে টিভি, ইন্টারনেটের মাধ্যমে ওয়েব পোর্টাল বা ব্লগ,  রেডিও ইত্যাদিসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক্স মিডিয়ায় বুঝায়। সামর্থ থাকলে এই সকল মাধ্যম তৈরি করে ইসলাম প্রচার করা যায়।

হক পন্থীদল কেন দাওয়াত দিবে? তাদের দওয়াত দানের পদ্ধতি কেমন হবে? এ সকল আলোচনা, এ জন্যই করা হল যাতে হক পন্থীদলদের সবার থেকে আলাদা করে বেছে নেয়া যায়। দাওয়াতে পর এবার আলোচনা করব হক পন্থীদলদের অন্যতম বৈশিষ্ট জিহাদ সম্পর্কে।

নাজাত প্রপ্ত দলের বৈশিষ্ট্য-৮ (২) ::  দ্বীন প্রচার প্রসারের জন্য দাওয়াত ও জিহাদে সতেষ্ট থাকবে

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

দ্বীন প্রচার প্রসারে জিহাদের হুকুম

জিহাদের হুকুমঃ

জিহাদ (جهاد‎‎‎) একটি আবরী শব্দ যার অর্থ সংগ্রাম। কোনো নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য লাভের জন্য সমগ্র শক্তি প্রয়োগ করে কাজ করাকে জিহাদ বলা হয়। সাধারণত ইসলামি প্রচার প্রসারের কাজে সমগ্র শক্তি প্রয়োগ করার অর্থে ‘জিহাদ’ কথাটি ব্যবহৃত হয়ে থাকে। কুরআনে জিহাদের কথা ৪১ বার উল্লেখ করা হয়েছে যেখানে “আল্লাহের পথে সংগ্রাম করা” অর্থে ‘জিহাদ’ কথাটি ব্যবহৃত হয়েছে। সমগ্র মানবজাতির কল্যাণ সাধনের উদ্দেশ্যে ইসলাম তার অনুসারীদেরকে চেষ্টা ও সংগ্রাম চালিয়ে যেতে বলে। এই ব্যাপক চেষ্টা, সংগ্রাম ও শক্তি প্রয়োগের সমষ্টিগত নামই হচ্ছে ‘জিহাদ। কখন কখন তরবারি (সমরশক্তি) ব্যবহার করে অনৈসলামিক সমাজ ব্যবস্থা নির্মূল করে নতুন ইসলামী সমাজ ব্যবস্থা’ প্রতিষ্ঠা করাও জিহাদ। এ পথে মেধা, অর্থ-সম্পদ, শারীরিক শক্তি সামর্থ নিয়োগ করাও জিহাদ। কিন্তু জিহাদ কখন কার সাথে করতে হবে। এ সম্পর্ক কুরআন হাদিসের স্পষ্ট ব্যাখ্যা থাকা স্বত্বেও কিছু বিপদগামী মুসলিম ইহার ভুল ব্যাখ্যা এবং ভুল প্রয়োগ করে থাকে। আশা করি এই আলোচনার মাধ্যমে বুঝতে পারব, আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের আকিদা বিশ্বাস অনুসারে জিহাদের ধরণ কেমন হবে? তারা এর ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ কিভাবে করে?

ইসলাম প্রচার ও প্রশারে এই সকল জিহাদের ভুমিকা অপরিসীম। কুরআন ও সহিহ হাদিসে এই সকল প্রকারের জিহাদের প্রতি যেমনি তাগিদ দিয়েছেন ঠিক তেমনি উত্সাহও প্রদাণ করছেন। জিহাদকে মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হিসাবে গণ্য করা হয়। জিহাদ সব সময় সকলের উপর ফরজ হয় না। কখন ফরজে আইন আবার কখনো ফরজে কিফায়। বিষয়টি নির্ভর করে ইসলামি রাষ্ট্রের খলিফা, আমির বা রাষ্ট্র প্রধানের জরুরতের উপর। নিচে জিহাদের ফজিলত সম্পর্কে কিছু কুরআনের আয়াত ও সহিহ হাদিস তুলে ধরা হলো-

(১) জান মাল দিয়ে জিহাদকারীর জন্য কল্যাণের ওয়াদা-

আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেন-

لاَّ يَسْتَوِي الْقَاعِدُونَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ غَيْرُ أُوْلِي الضَّرَرِ وَالْمُجَاهِدُونَ فِي سَبِيلِ اللّهِ بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنفُسِهِمْ فَضَّلَ اللّهُ الْمُجَاهِدِينَ بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنفُسِهِمْ عَلَى الْقَاعِدِينَ دَرَجَةً وَكُـلاًّ وَعَدَ اللّهُ الْحُسْنَى وَفَضَّلَ اللّهُ الْمُجَاهِدِينَ عَلَى الْقَاعِدِينَ أَجْرًا عَظِيمًا

অর্থঃ গৃহে উপবিষ্ট মুসলমান-যাদের কোন সঙ্গত ওযর নেই এবং ঐ মুসলমান যারা জান ও মাল দ্বারা আল্লাহর পথে জিহাদ করে, সমান নয়। যারা জান ও মাল দ্বারা জিহাদ করে, আল্লাহ তাদের পদমর্যাদা বাড়িয়ে দিয়েছেন গৃহে উপবিষ্টদের তুলনায় এবং প্রত্যেকের সাথেই আল্লাহ কল্যাণের ওয়াদা করেছেন। আল্লাহ মুজাহেদীনকে উপবিষ্টদের উপর মহান প্রতিদানে শ্রেষ্ঠ করেছেন। সুরা নিসা : ৯৫

মহান আল্লাহ আরও বলেন,

كُتِبَ عَلَيْكُمُ الْقِتَالُ وَهُوَ كُرْهٌ لَّكُمْ وَعَسَى أَن تَكْرَهُواْ شَيْئًا وَهُوَ خَيْرٌ لَّكُمْ وَعَسَى أَن تُحِبُّواْ شَيْئًا وَهُوَ شَرٌّ لَّكُمْ وَاللّهُ يَعْلَمُ وَأَنتُمْ لاَ تَعْلَمُونَ

অর্থঃ তোমাদের উপর যুদ্ধ ফরয করা হয়েছে, অথচ তা তোমাদের কাছে অপছন্দনীয়। পক্ষান্তরে তোমাদের কাছে হয়তো কোন একটা বিষয় পছন্দসই নয়, অথচ তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর। আর হয়তোবা কোন একটি বিষয় তোমাদের কাছে পছন্দনীয় অথচ তোমাদের জন্যে অকল্যাণকর। বস্তুতঃ আল্লাহই জানেন, তোমরা জান না। সূরা বাকারা : ২১৬

(২) শহীদের কর্মফল বিনষ্ট হয় না-

মহান আল্লাহ আরও বলেন,

فَإِذا لَقِيتُمُ الَّذِينَ كَفَرُوا فَضَرْبَ الرِّقَابِ حَتَّى إِذَا أَثْخَنتُمُوهُمْ فَشُدُّوا الْوَثَاقَ فَإِمَّا مَنًّا بَعْدُ وَإِمَّا فِدَاء حَتَّى تَضَعَ الْحَرْبُ أَوْزَارَهَا ذَلِكَ وَلَوْ يَشَاء اللَّهُ لَانتَصَرَ مِنْهُمْ وَلَكِن لِّيَبْلُوَ بَعْضَكُم بِبَعْضٍ وَالَّذِينَ قُتِلُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَلَن يُضِلَّ أَعْمَالَهُمْ

অর্থঃ অতঃপর যখন তোমরা কাফেরদের সাথে যুদ্ধে অবতীর্ণ হও, তখন তাদের গর্দার মার, অবশেষে যখন তাদের কে পূর্ণরূপে পরাভূত কর তখন তাদেরকে শক্ত করে বেধে ফেল। অতঃপর হয় তাদের প্রতি অনুগ্রহ কর, না হয় তাদের নিকট হতে মুক্তিপণ লও। তোমরা যুদ্ধ চালিয়ে যাবে যে পর্যন্ত না শত্রুপক্ষ অস্ত্র সমর্পণ করবে! একথা শুনলে। আল্লাহ ইচ্ছা করলে তাদের কাছ থেকে প্রতিশোধ নিতে পারতেন। কিন্তু তিনি তোমাদের কতককে কতকের দ্বারা পরীক্ষা করতে চান। যারা আল্লাহর পথে শহীদ হয়, আল্লাহ কখনই তাদের কর্ম বিনষ্ট করবেন না। সুরা মুহাম্মাদ : ৪

(৩) প্রয়োজনে ইসলাম বিস্তারে জিহাদ করার হুকুম-

মহান আল্লাহ আরও বলেন,

قَاتِلُواْ الَّذِينَ لاَ يُؤْمِنُونَ بِاللّهِ وَلاَ بِالْيَوْمِ الآخِرِ وَلاَ يُحَرِّمُونَ مَا حَرَّمَ اللّهُ وَرَسُولُهُ وَلاَ يَدِينُونَ دِينَ الْحَقِّ مِنَ الَّذِينَ أُوتُواْ الْكِتَابَ حَتَّى يُعْطُواْ الْجِزْيَةَ عَن يَدٍ وَهُمْ صَاغِرُونَ

অর্থঃ তোমরা যুদ্ধ কর আহলে-কিতাবে র ঐ লোকদের সাথে, যারা আল্লাহ ও রোজ হাশরে ঈমান রাখে না, আল্লাহ ও তাঁর রসূল যা হারাম করে দিয়েছেন তা হারাম করে না এবং গ্রহণ করে না সত্য ধর্ম, যতক্ষণ না করজোড়ে তারা জিযিয়া প্রদান করে। (সুরা তাওবা ৯:২৯)।

মহান আল্লাহ আরও বলেন,

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُواْ قَاتِلُواْ الَّذِينَ يَلُونَكُم مِّنَ الْكُفَّارِ وَلِيَجِدُواْ فِيكُمْ غِلْظَةً وَاعْلَمُواْ أَنَّ اللّهَ مَعَ الْمُتَّقِينَ

অর্থঃ হে ঈমানদারগণ, তোমাদের নিকটবর্তী কাফেরদের সাথে যুদ্ধ চালিয়ে যাও এবং তারা তোমাদের মধ্যে কঠোরতা অনুভব করুক আর জেনে রাখ, আল্লাহ মুত্তাকীদের সাথে রয়েছেন।  সুরা তাওবা : ১২৩

মহান আল্লাহ আরও বলেন,

إِنَّ اللّهَ اشْتَرَى مِنَ الْمُؤْمِنِينَ أَنفُسَهُمْ وَأَمْوَالَهُم بِأَنَّ لَهُمُ الجَنَّةَ يُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِ اللّهِ فَيَقْتُلُونَ وَيُقْتَلُونَ وَعْدًا عَلَيْهِ حَقًّا فِي التَّوْرَاةِ وَالإِنجِيلِ وَالْقُرْآنِ وَمَنْ أَوْفَى بِعَهْدِهِ مِنَ اللّهِ فَاسْتَبْشِرُواْ بِبَيْعِكُمُ الَّذِي بَايَعْتُم بِهِ وَذَلِكَ هُوَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ

অর্থঃ আল্লাহ ক্রয় করে নিয়েছেন মুসলমানদের থেকে তাদের জান ও মাল এই মূল্যে যে, তাদের জন্য রয়েছে জান্নাত। তারা যুদ্ধ করে আল্লাহর রাহেঃ অতঃপর মারে ও মরে। তওরাত, ইঞ্জিল ও কোরআনে তিনি এ সত্য প্রতিশ্রুতিতে অবিচল। আর আল্লাহর চেয়ে প্রতিশ্রুতি রক্ষায় কে অধিক? সুতরাং তোমরা আনন্দিত হও সে লেন-দেনের উপর, যা তোমরা করছ তাঁর সাথে। আর এ হল মহান সাফল্য। ( সুরা তাওবা : ১১১

জিহাদ সম্পর্কিত হাদিস সমূহ

সহিহ বুখারী, সহিহ মুসলিমসহ বহু হাদিসের কিতব আজ বাংলায় অনুদিত। প্রতিটি কিতাবে জিহাদ নামে একটা করে বিশাল অধ্যায় আছে। জিহাদ সম্পর্কে বিস্তারিত জানার আগ্রহ থাকলে ঐ সকল হাদিসের কিতাবগুলি দেখা নেয়ার অনুরোধ রইল। একখে নমুনা সরূপ কয়েটি হাদিস উল্লেখ করছি মাত্র।

এই সম্পর্কে একটি সহহি হাদিস হলো-

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، أَنَّ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم قَالَ ‏ “‏ لاَ يَجْتَمِعُ غُبَارٌ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَدُخَانُ جَهَنَّمَ فِي جَوْفِ عَبْدٍ مُسْلِمٍ

আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আল্লাহর পথে ধুলা এবং জাহান্নামের ধোঁয়া কোনো মুসলিম বান্দার পেটে একত্র হতে পারবে না। সুনানে ইবনে মাজাহ : ২৭৭৪, সুনানে তিরমিজি : ১২৩৩, সুনানে নাসায়ী : ৩১০৭-৩১১৫, ইবনু হিব্বান : ৩২৫১

সাহল ইবনে হুনাইফ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-

‏ مَنْ سَأَلَ اللَّهَ الشَّهَادَةَ بِصِدْقٍ مِنْ قَلْبِهِ بَلَّغَهُ اللَّهُ مَنَازِلَ الشُّهَدَاءِ وَإِنْ مَاتَ عَلَى فِرَاشِهِ ‏

যে ব্যক্তি সর্বান্তঃকরণে সত্যিকারভাবে আল্লাহর নিকট শাহাদাত কামনা করবে, আল্লাহ তাকে শহীদদের মর্যাদা দান করবেন, যদিও সে তার বিছানায় মারা যায়। সহিহ মুসলিম ১৯০৯, সুনানে ইবনে মাজাহ : ২৭৯৭, সুনানে তিরমিযী ১৬৫৩, সুনানে নাসায়ী ৩১৬২, সুনানে আবূ দাউদ ১৫২০, দারেমী ২৪০৭, ইবনু হিব্বান ৩১৯২

সাহল ইবনে সাদ আস সাইদী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

غَدْوَةٌ أَوْ رَوْحَةٌ فِي سَبِيلِ اللَّهِ خَيْرٌ مِنَ الدُّنْيَا وَمَا فِيهَا

আল্লাহর রাস্তায় একটি সকাল অথবা একটি বিকাল অতিবাহিত করা দুনিয়া ও তার মধ্যকার সবকিছু থেকে উত্তম। সহিহ বুখারি : ২৭৯৪, ২৮৯২, ৬৪১৫, সহিহ মুসলিম : ১৮৮১, ১৮৮২, সুনানে তিরমিযী : ১৬৪৮, সুনানে নাসায়ী : ৩১১৮, সুনানে ইবনে মাজাহ : ২৭৫৬

সাওবান (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

أَفْضَلُ دِينَارٍ يُنْفِقُهُ الرَّجُلُ دِينَارٌ يُنْفِقُهُ عَلَى عِيَالِهِ وَدِينَارٌ يُنْفِقُهُ عَلَى فَرَسٍ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَدِينَارٌ يُنْفِقُهُ الرَّجُلُ عَلَى أَصْحَابِهِ فِي سَبِيلِ اللَّهِ ‏

লোকে যে দীনারগুলো (অর্থ-সম্পদ) খরচ করে তার মধ্যে সবচেয়ে উত্তম দীনার হলো- যা সে তার পরিবার-পরিজনের জন্য ব্যয় করে, যা সে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের ঘোড়া প্রতিপালনে ব্যয় করে এবং যা সে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদকারী তার সহ-যোদ্ধাদের জন্য খরচ করে। সহিহ মুসলিম ৯৯৪, ১৯৬৬, সুনানে ইবনে মাজাহ : ২৭৬০, আহমাদ : ২১৮৭৫, ২১৯০০, ২১৯৪৭, সহহি ইবনু হিব্বান : ৪২৪২, ৪৬৪৬

আবদুল্লাহ ইবনুয যুবাইর (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, উসমান ইবনে আফফান (রাঃ) লোকেদের উদ্দেশে ভাষণ দিলেন। তিনি বলেন, হে জনগণ! আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট একটি হাদীস শুনেছি। সেটি তোমাদের নিকট বর্ণনা করা থেকে আমাকে বিরত রেখেছে তোমাদের সাহচর্যের প্রতি আমার কৃপণতা। অতএব কেউ চাইলে তা নিজের জন্য গ্রহণ করতে পারে অথবা পরিহারও করতে পারে। আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছিঃ যে ব্যক্তি আল্লাহ তা’আলার রাস্তায় এক রাত সীমান্ত অঞ্চলে পাহারা দেয়, তা এক হাজার দিন রোযা রাখা এবং এক হাজার রাত জেগে নামায পড়ার সমতুল্য। ইবনে মাজাহ : ২৭৬৬, সুনানে তিরমিযী : ১৬৬৭, সুনানে নাসায়ী : ৩১৬৯, ৩১৬০, সুনানে দারেমী : ২৪২৪

উপরে বর্ণিত কুরআন হাদিসের আলোক বলা যায়, ইসলামি শরীয়তে জিহাদের করা একটা ইবাদাত। এই জিহাদ অস্বীকার করলে সে মুসলিম থাকবে না। কুরআন ও হাদীসের অধিকাংশ জায়গাতেই জিহাদ শব্দটি ধর্মযুদ্ধ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। মুসলমানদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ আল কুরআনে জিহাদকে মুসলমানদের জন্য একটি ফরজ কাজ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অনেক স্থানে যুদ্ধ শব্দ ব্যবহার না করে জিহাদ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। হাদিস গ্রন্থের যুদ্ধের অধ্যায়গুলেও জিহাদ হিসাবে অনুবাদ করা হয়েছে। ইসলাম ধর্মে জিহাদ শব্দটি ব্যাপক অর্থ বহন করে। সংক্ষেপে বলা যায়, সমগ্র মানবজাতির সমাজ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন সাধন করে ইসলামের নিজস্ব মতাদর্শ অনুসারে নতুন করে ঢেলে সাজানোর লক্ষ্যে চেষ্টা, সংগ্রাম ও চূড়ান্ত শক্তি প্রয়োগের নামই হলো জিহাদ।

জিহাদের প্রকারভেদ-

অত্র লেখায় সামান্য পরিষরে জিহাদের প্রকারভেদ ও কখন ফরজ হয় এবং কার উপর ফরজ হয় আলোচনার চেষ্টা করব, ইনশাআল্লাহ। জিহাদ বললেই অস্ত্র ব্যবহার করা বুঝায় না। জিহাদ বলতে সর্ব শক্তি নিয়োগ করে উদ্দিষ্ট লক্ষে পৌছানোর চেষ্টা করা। জিহাদের বেশ কিছু প্রকার ও স্তর রয়েছে। জগত বিখ্যাত মুহাদ্দিস ইমাম ইবনে কাইয়্যিম রাহিমাহুল্লাহ তার লিখিত যাদুল মাআদ গ্রন্থ জিহাদের কয়েকটি প্রকারভেদ ও স্তর সম্পর্কে উল্লেখ করেছেন। উক্ত গ্রন্থ তিনি জিহাদের চারটি প্রকার এবং ১৩ টি স্তর উল্লেখ করেছেন। নিম্মে তার বর্ণিত  প্রকার ও স্তর উল্লেখ করছি।

চার প্রকারের জিহাদ হলঃ

 ১. নফস বা প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে জিহাদ।

২. শয়তানের বিরুদ্ধে জিহাদ।

৩. কাফের ও মুনাফিকদের বিরুদ্ধে জিহাদ।

৪. অত্যাচারী যালিম ও অবাধ্যদের বিরুদ্ধে জিহাদ।

এই চার প্রকারের জিহাদকে আবার তিনি বিভিন্ন স্তরে বিভক্ত করেছেন। যেমনঃ

১। প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে জিহাদের স্তর চারটি। সেগুলো হল

(১) ইলম, দ্বীনে হক ও হিদায়েত তালাশ করা। দ্বীনে হকের জ্ঞান ছাড়া সাফল্যের সুযোগ নেই।

(২) ইলম অর্জনের পর তা নিজের জীবনে আমলে পরিনত করা। কেননা আমর ছাড়া ইলম কোন উপকারে আসবেনা।

(৩) ইলম ও আমলের প্রতি মানুষ কে আহবান করবে। কেননা, দ্বীনের কোন কিছুকে গোপণ করলে আল্লাহ তায়ালার আযাব থেকে সে নিজেকে বাঁচাতে পারবেনা।

(৪) ইসলামের বিধানকে তুলে ধরতে গিয়ে কোন বিপদ আসলে ধৈর্যধারণ করা ও কষ্ট স্বীকার করা।

২। শয়তানের বিরুদ্ধে জিহাদের রয়েছে দুটি স্তর

(১) শয়তান ইমান নষ্টের জন্য অন্তরে যে সংশয় সৃষ্টি করে তা দূরর জন্য জিহাদ করা

(২) শয়তার পাপ কাজের জন্য অন্তরে যে আসক্তি সৃষ্টি করে তা প্রতিহদ করার জন্য জিহাদ করা।

৩। কাফের ও মুনাফিকদের বিরুদ্ধে জিহাদের স্তর চারটি।

(১) অন্তর দিয়ে কাজটাকে ঘৃণা করা,

(২) মুখের কথা দ্বারা তা প্রতিরোধ করা,

(৩) এ পথে সম্পদ ব্যয় করা ও

(৪) নিজের জীবন আল্লাহর রাস্তায় উৎসর্গ করা।

৪। অত্যাচারী জালিম ও অবাধ্যদের বিরুদ্ধে জিহাদের স্তর তিনটি।

(১) সক্ষম হলে (ক্ষমতাবান) শক্তি প্রয়োগ করে তা রুখে দেয়া।

(২) শক্তি প্রয়োগে অক্ষম হলে মুখের কথা দিয়ে তা রুখবে।

(৩) তাতেও সক্ষম না হলে অন্তর দিয়ে তাকে (কাজকে) ঘৃণা করবে এবং তা প্রতিহত করার চিন্তায় ব্যাপৃত থাকবে।

(মুখতাসার জাদুল মাআদ, প্রকাশনায় ওয়াহিদা লাইব্রারী ঢাকা, পৃষ্ঠ নম্বর-১৯৩)।

উপরের প্রকারভেদ ও স্তর থেকেই জিহাদ সম্পর্ক একটা ষ্পষ্ট ধারনা হয়েছে নিশ্চয়। কিন্ত অধিকাংশ ইসলামি পন্ডিত জিহাদকে তিন প্রকার বলে উল্লেখ করেছেন। কুরআন ও হাদীসের ব্যাখ্যা অনুযায়ী স্থানভেদে জিহাদ তিন প্রকার হতে পারে।

ক। স্বীয় নফস বা কৃপ্রবৃত্তির বিরূদ্ধে সংগ্রাম (জিহাদ),

খ। মুসলিম সমাজে সংঘটিত অন্যায়ের প্রতিবাদ এবং

গ। অমুসলিমদের সাথে যুদ্ধক্ষেত্রে লড়াই করা

এই তিন প্রকার জিহাদ সম্পর্কই অত্র লেখান সামান্য আলোকপাত করা হলঃ

ক। স্বীয় নফস বা কৃপ্রবৃত্তির বিরূদ্ধে সংগ্রাম (জিহাদ):

যুগ যুগ ধনে মানুষ শুনে আসছে শয়তান তাকে নফসের মাধ্যমে ধোকা দেয়। শয়তান তার মনে কুমন্ত্রা দিয়ে খারাপ কাজ করতে উদ্ভদ্য করে থাকে। তাই সকল যুগের মনিষিগণ নফসের বিরুদ্ধে সকল কে সতর্ক করে আসছে। বর্তমানে স্বীয় নফস বা কৃপ্রবৃত্তির বিরূদ্ধে সংগ্রাম করা খুবই জরুরী হয়ে দাড়িয়েছে। বর্তমানে এমন লোক খুজে পাওয়া ভার যে ইন্টারনেট ব্যবহার করেনা। প্রায় সকলেই কোন না কোন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম (ফেসবুক, টুইটার, জিমেইল, পথ, লিংকডিন, ইনোস্ট্রগ্রাম, রেডিট ইত্যাদি) ব্যবহার করে। এই সকল সামাজিক যোগাযোগ মাধামে ব্যবহার করে সকল শ্রেণীর মানুষের নিকট দ্বীন পৌছান খুবই সহজ হলেও এর শতকরা ৯৯% ই ব্যবহার হয় অনইসলামিক কাজে। দ্বীন প্রচার করতে গিয়ে যদি কেই এই সকল অনইসলামিক কাজে থেকে নিজেক হিফাজত না করতে পারে তবে তার জন্য এই মাধ্যমে দ্বীন প্রচার করা বা শিক্ষা করা কোনটাই জায়েয নেই। এখান আপনাকে স্বীয় নফস বা কৃপ্রবৃত্তির বিরূদ্ধে সংগ্রাম করে নিজেকে হিফাজত করতে হবে।

বর্তমানে আমাদের চার পাশে বিভিন্ন ক্লাব, সংগঠন, সমিতি, বিদআতী দল নানাভাবে আমাদের বিভিন্ন শির্কি, বিদআতী ও অনইসলামিক অনুষ্ঠান পালন করছে। এই অনুষ্ঠান খুই আকর্ষণীয় ইহা থেকে হিফাজত করা খুবই দুরহ কাজ। যে তার নফসের সাথে সংগ্রাম করে জয়ী হবে সেই এ থেকে হিফাজত থাকবে। কুরআন ও সহিহ হাদিসের কোথাও নফসের সাথে জিহাদ করতে হবে বলে উল্লেক পাওয়া যায়না। প্রবৃত্তির অনুসরণ না করার জন্য বহু আয়াত ও সহিহ হাদিস বিদ্যমান।

মহান আল্লাহ বলেন,

وَاصْبِرْ نَفْسَكَ مَعَ الَّذِينَ يَدْعُونَ رَبَّهُم بِالْغَدَاةِ وَالْعَشِيِّ يُرِيدُونَ وَجْهَهُ وَلَا تَعْدُ عَيْنَاكَ عَنْهُمْ تُرِيدُ زِينَةَ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَلَا تُطِعْ مَنْ أَغْفَلْنَا قَلْبَهُ عَن ذِكْرِنَا وَاتَّبَعَ هَوَاهُ وَكَانَ أَمْرُهُ فُرُطًا

অর্থঃ আপনি নিজেকে তাদের সংসর্গে আবদ্ধ রাখুন যারা সকাল ও সন্ধ্যায় তাদের পালনকর্তাকে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে আহবান করে এবং আপনি পার্থিব জীবনের সৌন্দর্য কামনা করে তাদের থেকে নিজের দৃষ্টি ফিরিয়ে নেবেন না। যার মনকে আমার স্মরণ থেকে গাফেল করে দিয়েছি, যে, নিজের প্রবৃত্তির অনুসরণ করে এবং যার কার্য কলাপ হচ্ছে সীমা অতিক্রম করা, আপনি তার অনুগত্য করবেন না। সুরা কাহফ : ২৮

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আরও বলেন,

أَفَرَأَيْتَ مَنِ اتَّخَذَ إِلَهَهُ هَوَاهُ وَأَضَلَّهُ اللَّهُ عَلَى عِلْمٍ وَخَتَمَ عَلَى سَمْعِهِ وَقَلْبِهِ وَجَعَلَ عَلَى بَصَرِهِ غِشَاوَةً فَمَنْ يَهْدِيهِ مِنْ بَعْدِ اللَّهِ أَفَلَا تَذَكَّرُونَ(23)

অর্থঃ তুমি কি কখনো সেই ব্যক্তির অবস্থা ভেবে দেখেছো যে তার প্রবৃত্তির কামনা বাসনাকে ইলাহ বানিয়ে নিয়েছে আর জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও আল্লাহ তাকে গোমরাহীর মধ্যে নিক্ষেপ করেছেন, তার দিলে ও কানে মোহর মেরে দিয়েছেন এবং চোখে আবরণ সৃষ্টি করেছেন৷  আল্লাহ ছাড়া আর কে আছে যে তাকে হিদায়াত দান করতে পারে? তোমরা কি কোন শিক্ষা গ্রহণ করো না? সুরা জাসিয়া : ২৩

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আরও বলেন,

 وَقَدِمۡنَآ إِلَىٰ مَا عَمِلُواْ مِنۡ عَمَلٍ۬ فَجَعَلۡنَـٰهُ هَبَآءً۬ مَّنثُورًا (٢٣)

অর্থঃ কখনো কি তুমি সেই ব্যক্তির অবস্থা ভেবে দেখেছো, যে তার নিজের প্রবৃত্তির কামনাকে প্রভু রূপে গ্রহণ করেছে?  তুমি কি এহেন ব্যক্তিকে সঠিক পথে নিয়ে আসার দায়িত্ব নিতে পার৷  সুরা ফুরকান : ২৩

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন,

وَمَا قَدَرُواْ ٱللَّهَ حَقَّ قَدۡرِهِۦ وَٱلۡأَرۡضُ جَمِيعً۬ا قَبۡضَتُهُ ۥ يَوۡمَ ٱلۡقِيَـٰمَةِ وَٱلسَّمَـٰوَٲتُ مَطۡوِيَّـٰتُۢ بِيَمِينِهِۦ‌ۚ سُبۡحَـٰنَهُ ۥ وَتَعَـٰلَىٰ عَمَّا يُشۡرِكُونَ (٦٧) 

অর্থঃ যে ব্যক্তি তার রবের পক্ষ থেকে আগত সুস্পষ্ট প্রমাণের উপর প্রতিষ্ঠিত সে কি তার মত, যার মন্দ আমল তার জন্য চাকচিক্যময় করে দেয়া হয়েছে এবং যারা তাদের খেয়াল খুশীর অনুসরণ করে? (সূরা যুমার : ৬৭

এই সম্পর্কিত কিছু হাদিস-

ফাযালা ইবনু উবাইদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

أَنَّهُ قَالَ ‏”‏ كُلُّ مَيِّتٍ يُخْتَمُ عَلَى عَمَلِهِ إِلاَّ الَّذِي مَاتَ مُرَابِطًا فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَإِنَّهُ يُنْمَى لَهُ عَمَلُهُ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ وَيَأْمَنُ مِنْ فِتْنَةِ الْقَبْرِ ‏”‏ ‏.‏ وَسَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَقُولُ ‏”‏ الْمُجَاهِدُ مَنْ جَاهَدَ نَفْسَهُ ‏

প্রত্যেক মৃত ব্যক্তির সকল প্রকার কাজের উপর সীলমোহর করে দেওয়া হয় (কাজের পরিসমাপ্তি ঘটে)। কিন্তু আল্লাহ্ তা’আলার রাস্তায় পাহারাদানরত অবস্থায় যে লোক মৃত্যুবরণ করে কিয়ামত পর্যন্ত তার কর্মের সাওয়াব বাড়ানো হতে থাকে এবং তিনি কবরের সকল ফিতনা হতে নিরাপদে থাকেন। আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছিঃ যে লোক নিজের প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে জিহাদ করে সে-ই আসল মুজাহিদ। সুনানে তিরমিজি : ১৬২১, সহিহাহ : ৫৪৯

মুয়াবিয়া বিন আবু সুফিয়ান (রাঃ) হতে বর্ণিতরসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন

الْخَيْرُ عَادَةٌ وَالشَّرُّ لَجَاجَةٌ وَمَنْ يُرِدِ اللَّهُ بِهِ خَيْرًا يُفَقِّهْهُ فِي الدِّينِ ‏ ‏

কল্যান’ হলো সুস্বভাব এবং ‘মন্দ’ হলো প্রবৃত্তির তাড়না থেকে উদ্ভূত। আল্লাহ্‌ যার কল্যাণ সাধন করতে চান, তাকে দ্বীনের জ্ঞান দান করেন। সহিহ বুখারি : ৭১, ৩১১৬, ৭৩১২, সহিহ মুসলিম : ১০৩৭,

শাদ্দাদ ইবনু আওস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-

الْكَيِّسُ مَنْ دَانَ نَفْسَهُ وَعَمِلَ لِمَا بَعْدَ الْمَوْتِ وَالْعَاجِزُ مَنْ أَتْبَعَ نَفْسَهُ هَوَاهَا وَتَمَنَّى عَلَى اللَّهِ ‏

সেই ব্যক্তি বুদ্ধিমান যে নিজের নাফসকে নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং মৃত্যুর পরবর্তী সময়ের জন্য কাজ করে। আর সেই ব্যক্তি নির্বোধ ও অক্ষম যে তার নাফসের দাবির অনুসরণ করে আর আল্লাহ্ তা’আলার নিকটে বৃথা আশা পোষণ করে। সুনানে তিরমিজি : ২৪৫৯, সুনানে ইবনু মাজাহ : ৪২৬০ মান জঈফ

যিয়াদ ইবনু ইলাকাহ (রহঃ) হতে তার চাচার সনদে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতেন-

اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ مُنْكَرَاتِ الأَخْلاَقِ وَالأَعْمَالِ وَالأَهْوَاءِ

“হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকটে গৰ্হিত চরিত্র, গৰ্হিত কাজ ও কু-প্রবৃত্তি হতে আশ্রয় চাই”। সুনানে তিরমিজি : ৩৫৯১

স্বীয় নফস বা কৃপ্রবৃত্তির বিরূদ্ধে সংগ্রাম করা খুবই জরুরী। প্রবৃত্তি যে অন্যায় বা পাপ কাজ করতে আমাদের আহবান করে তা থেকে বেচে থাকা ফরজ। কিন্তু ইহাকে জিহাদ বলা যাবে কিনা তা নিয়ে আলেমদের মাঝে মতভেদ আছে। যেহেতু আমাদের সমাজে প্রজচিত আছে, নফস বা কৃপ্রবৃত্তির বিরূদ্ধে জিহাদ কথাটি খুবই প্রচলিত শব্দ, তাই জিহাদের বর্ণনায় এ বিষয়টি উল্লেখ করলাম। যাতে কেউ বিভ্রান্ত করার সুযোগ না পায়।

মুসলিম সমাজে সংঘটিত অন্যায়ের প্রতিবাদঃ

মুসলিম সমাজে সংঘটিত অন্যায়ের প্রতিবাদ করা ক্ষমতা ও যোগ্যতা অনুসারে ফরজ হয়ে থাকে। ক্ষমতা ও যোগ্যতা অনুসারে মন্দ ও অসৎ কাজে বাধা প্রদানের পদক্ষেপ নিতে হবে। নিজের হাদিসটি লক্ষ করুন

তারিক ইবনু শিহাব (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, ঈদের সালাত এর পুর্বে মারওয়ান ইবনু হাকাম সর্বপ্রথম খুতবা প্রদান আরম্ভ করেন। তখন এক ব্যাক্তি দাঁড়িয়ে বললেন, খুতবার আগে হবে সালাত। মারওয়ান বললেন, এ নিয়ম রহিত করা হয়েছে। এতে আবূ সাঈদ (রাঃ) বললেন, ‘এ ব্যাক্তি তো কর্তব্য পালন করেছে’। আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি-

 مَنْ رَأَى مِنْكُمْ مُنْكَرًا فَلْيُغَيِّرْهُ بِيَدِهِ فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِلِسَانِهِ فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِقَلْبِهِ وَذَلِكَ أَضْعَفُ الإِيمَانِ ‏

তোমাদের কেউ যদি অন্যায় কাজ দেখে, তাহলে সে যেন হাত দ্বারা এর সংশোধন করে দেয়। যদি এর ক্ষমতা না থাকে, তাহলে মুখের দ্বারা, যদি তাও সম্ভব না হয়, তাহলে অন্তর দ্বারা (উক্ত কাজকে ঘূণা করবে), আর এটাই ঈমানের নিম্নতম স্তর। সহিহ মুসলিম : ৪৯

এক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে যে, সহজ পন্থা ও পদ্ধতিতে কাজ সম্ভব হলে কঠোর পদ্ধতি অবলম্বনের প্রয়োজন নেই। কোন মন্দ কাজ আদেশ নিষেধের মাধ্যমে সমাধান করা গেলে প্রতিবাদ করা প্রয়োজন নেই। আবার প্রতিবাদের মাধ্যমে দূর করা সম্ভব হলে শক্তি প্রয়োগ করে প্রতিহত করার দরকার নেই। আদেশ, নিষেধ এবং প্রতিবাদের জন্য স্বভাবতই ক্ষমতা ও যোগ্যতার প্রয়োজন। সমাজে ও রাষ্ট্রের ক্ষমতা সম্পন্ন লোক জন্যই আদেশ, নিষেধ এবং প্রতিবাদের জন্য দায় বদ্ধ থাকে। সবার ক্ষমতা ও যোগ্যতার সমান নয়। তাই সবাইকে আমভাবে মহান আল্লাহ নিকট জবাব দীহি করতে হবে না। একটি উদাহরণ দিলে আশা করি ব্যাপরটি পরিস্কার হবে।

প্রতিটি সমাজে কিছু কর্তৃত্বশীল লোক থাকে যাদের আমরা সমাজপতি বা সমাজের নেতা বা সমাজের মুরুব্বী হিসাবে জানি।  উক্ত সমাজের অধিকাংশ লোক তাদের আদেশ নিষেধ মেনে চলে। কোন অন্যায় দেখা দিলে, তারা সবাই মুখের দ্বারা নিষেধ করতে পারেন। আশা করা যায় সমাজে সকলে তাদের নিষেধ মেনে চলবে, মেনে না চললেও সমাজ তাকে যে ক্ষমতা প্রদান করেছে, তার জন্য ঐ আইন অমান্য কারিও তার কোন ক্ষতি করতে পাবরেনা। সমাজপতিগণ যদি কোন অন্যায় কাজ করে তবে সমাজের একজন সাধারন লোক মুখের দ্বারা এর প্রতিবাদ করলে তার প্রতি জুলুম চলে আসতে পারে। তাই সে সমাজপতিদের ঐ অন্যায় কাজের প্রতিবাদ মুখে না করে অন্তরে ঘৃনা করবে। অপর পক্ষে রাষ্ট্রের নিকট এমন ক্ষমতা আছে যার দ্বারা রাষ্ট্র সমাজপতি ও সাধারণ দুজনেরই বিচার করতে পাবরেন। এ জন্য যারা সমাজে ও রাষ্ট্রে দায়িত্ব ও ক্ষমতার অধিকরী তাদের সকলের উপর ফরজ হল, বল প্রয়োগে ঐ অন্যায় কারের প্রতিকার করা। কারন তাদের জন্য এ দায়িত্ব পালন করা অধিকাংশ ক্ষেত্রে ফরজে আইন। দায়িত্ব ও ক্ষমতা যত বেশি, আদেশ ও নিষেধের দায়িত্বও তত বেশি। আল্লাহর কাছে জবাবদিহিতার ভয়ও তাদের তত বেশি। কারন আল্লাহ বলেন-

الَّذِينَ إِن مَّكَّنَّاهُمْ فِي الْأَرْضِ أَقَامُوا الصَّلَاةَ وَآتَوُا الزَّكَاةَ وَأَمَرُوا بِالْمَعْرُوفِ وَنَهَوْا عَنِ الْمُنكَرِ وَلِلَّهِ عَاقِبَةُ الْأُمُورِ

অর্থঃ যাদেরকে আমি পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা দান করলে বা ক্ষমতাবান করলে তারা সালাত কায়েম করে, জাকাত দেয়, সৎকার্যে নির্দেশ দেয় এবং অসৎকার্যে নিষেধ করে। আর সকল কর্মের পরিণাম আল্লাহর এখতিয়ারে। সূরা হজ্জ ২২:৪১

এ জন্য এ বিষয়ে শাসকগোষ্ঠী, প্রশাসনের সাথে জড়িত ব্যক্তিবর্গ, আঞ্চলিক প্রশাসকবর্গ, বিচারকবর্গ, আলিমগণ, বুদ্ধিজীবিবর্গ ও সমাজের অন্যান্য প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গের দায়িত্ব অন্যদের চেয়ে বেশি, তাদের জন্য আশংকাও বেশি। তাদের মধ্যে কেউ যদি দায়িত্ব পালন না করে নিশ্চুপ থাকেন তবে তার পরিণতি হবে কঠিন ও ভয়াবহ। অনুরূপভাবে নিজের পরিবার, নিজের অধীনস্থ মানুষগণ ও নিজের প্রভাবাধীন মানুষদের আদেশ-নিষেধ করা গৃহকর্তা বা কর্মকর্তার জন্য ফরজে আইন। কারণ আল্লাহ তাকে এদের উপর ক্ষমতাবান ও দায়িত্বশীল করেছেন এবং তিনি তাকে এদের বিষয়ে জিজ্ঞাসা করবেন।

ইবনু উমার (রাযিঃ) এর সূত্রে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বর্ণিত। তিনি বলেন-

أَلاَ كُلُّكُمْ رَاعٍ وَكُلُّكُمْ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ فَالأَمِيرُ الَّذِي عَلَى النَّاسِ رَاعٍ وَهُوَ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ وَالرَّجُلُ رَاعٍ عَلَى أَهْلِ بَيْتِهِ وَهُوَ مَسْئُولٌ عَنْهُمْ وَالْمَرْأَةُ رَاعِيَةٌ عَلَى بَيْتِ بَعْلِهَا وَوَلَدِهِ وَهِيَ مَسْئُولَةٌ عَنْهُمْ وَالْعَبْدُ رَاعٍ عَلَى مَالِ سَيِّدِهِ وَهُوَ مَسْئُولٌ عَنْهُ أَلاَ فَكُلُّكُمْ رَاعٍ وَكُلُّكُمْ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ ‏

তোমাদের প্রত্যেকেই এক একজন দায়িত্ববান এবং প্রত্যেকেই তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। আমীর বা নেতা তার অধীনস্থ লোকদের উপর দায়িত্ববান এবং সে তাদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। প্রত্যেক ব্যক্তি তার পরিবারের লোকদের উপর দায়িত্বশীল, সে তা সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। স্ত্রী স্বীয় স্বামীর বাড়ী ও সন্তানের উপর দায়িত্ববান, সে সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। গোলাম তার মুনিবের মাল-সম্পদের উপর দায়িত্ববান, সে সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। ওহে! তোমাদের প্রত্যেকেই (স্ব-স্ব স্থানে) একজন দায়িত্ববান এবং তোমাদের প্রত্যেকেই তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। সহিহ মুসলিম : ১৮২৯

অন্যায় বা গর্হিত কর্ম দেখবেন তার উপরেই দায়িত্ব হয়ে যাবে সাধ্য ও সুযোগমত তার সংশোধন বা প্রতিকার করা। সমাজের কোন দায়িত্ব সম্পন্ন লোক না হলেও যদি অন্যায় কাজের বাধা প্রদান করার ক্ষমাতা থাকে তবে ঐ টুকু ক্ষমাতাই প্রয়োগ করতে হবে। যদি সমাজে কোন মুমিনের অবন্থা এমন হয় যে, অন্যায় ও অসৎকর্মের প্রতিবাদ করলে তার উপর জুলুম হতে পারে, হবে সে ঐ অন্যায় ও অসৎকর্মের করবে না। কিন্ত মনে রাখতে হবে ঐ অন্যায় ও অসৎ কর্ম সে ঘৃনার চোখে দেখবে। মুমিনের এ সাধ্যাতীত কাজের জন্য মহান আল্লাহর নিকট জবাব দিহী করতে হবে না। কারন তিনি কাউকে তার সাধ্যাতীত কোন কাজের ভার দেন না। মহান আল্লাহ বলেন,

لاَ يُكَلِّفُ اللّهُ نَفْسًا إِلاَّ وُسْعَهَا لَهَا مَا كَسَبَتْ وَعَلَيْهَا مَا اكْتَسَبَتْ

অর্থঃ আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যাতীত কোন কাজের ভার দেন না, সে তাই পায় যা সে উপার্জন করে এবং তাই তার উপর বর্তায় যা সে করে। (সুরা বাকারা ২:২৮৬)।

সার কথা হলঃ প্রত্যেক মুমিনেরই দায়িত্ব হলো, অন্যায় দেখতে পেলে সাধ্য ও সুযোগ মত তার প্রদিবাদ করা। যদি হাত বা মুখের দ্বারা প্রতিবাদ, পরিবর্তন বা সংশোধন করতে না পারে তবে সে এই অন্যায়কে অন্তর থেকে ঘৃণা করবে। অন্তরের ঘৃনার মাধ্যমে এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করা প্রত্যেক মুমিনের উপরেই ফরজ। অন্যায়ের প্রতি হৃদয়ের বিরক্তি ও ঘৃণা না থাকা ঈমান হারানোর লক্ষণ। আমরা অগণিত পাপ, কুফর, হারাম ও নিষিদ্ধ কর্মের সয়লাবের মধ্যে বাস করি। বারংবার দেখতে দেখতে আমাদের মনের বিরক্তি ও আপত্তি কমে যায়। তখন মনে হতে থাকে, এ তো স্বাভাবিক বা এ তো হতেই পারে। পাপকে অন্তর থেকে মেনে নেওয়ার এ অবস্থাই হলো ঈমান হারানোর অবস্থা। তবে অন্তরে ঘৃনা প্রকাশের একটি লক্ষন হলঃ যে অন্যায় কাজটি হতে দেখল তা হাত বা মুখ দিয়ে বাধা না দিতে পেরে এর বিরুদ্ধে জনমত সৃষ্টি করার চেষ্টা চালাচ্ছে। তাই আমারা যদি কোন অন্যায় কাজ হাত বা মুখ দিয়ে বাধা না দিতে পারি তবে এর বিরুদ্ধে জনমত সৃষ্টি করার চেষ্টা চালাব চাই তা গোপনে হোক বা প্রকাশ্যে হোক।

যুদ্ধক্ষেত্রে সংগ্রাম

জিহাদ ফরজ তথা আবশ্যক হওয়ার বহু কারন আছে। কুরআন ও হাদিসের আলোকে এ সম্পর্কে সামান্য আলোকপাত করব। অধিকাংশ ইসলামিক স্কলারের মতে চারটি কারনে জিহাদ জিহাদ ফরজ হয়।

১।  শত্রুবাহিনী কোন মুসলিম সম্প্রদায়ের উপর বিনা কারনে যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়।

২। যখন মুসলিম ও অমুসলিম শুধু ধর্মীয় কারনে যুদ্ধ করে।

৩। কোন মুসলিম শ্বাসক যদি দেশ বা ধর্ম রক্ষার জন্য যুদ্ধের আহবান করে।

৪। শর্ত সাপেক্ষে শ্বাসকের বিরুদ্ধে ধর্ম রক্ষার জন্য যুদ্ধের করা।

১।  শত্রুবাহিনী কোন মুসলিম সম্প্রদায়ের উপর বিনা কারনে যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়ঃ

অনেক সময় শত্রুবাহিনী কোন মুসলিম সম্প্রদায়ের উপর বিনা কারনে বিনা উস্কানিতে যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়। যুদ্ধ করা ইচ্ছা শক্তি বা সমার্থ কোনটাই নাই তধাপিও কখনও কখনও যুদ্ধ করতে বাধ্য হতে হয়। অর্থৎ যুদ্ধ বা মৃত্যু ছাড়া আর বিকল্প থাকেনা তখন ঐ মজলুম জন পথের সকলের উপর মহান আল্লাহর উপর ভরসা করে যুদ্ধ করা ফরজ। ইসলামের সুচনা লগ্নে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কাতে থাকা অবস্থায় মুসলমানদের উপর জিহাদ করা নিষেধ ছিল। তাদেরকে হাত গুটিয়ে বসে থাকার আদেশ দেয়া হয়েছিল। এমনিভাবে নবুওয়াতের পর তেরোটি বছর চলে গেল। আপন গোত্রের লোকদের হাতে নির্যাতিত হয়েও আল্লাহর দ্বীনের প্রতি মানুষকে আহবান করতে থাকলেন। সে সময় জিহাদ থেকে বিরত থাকার আদেশ দেয়ার কারণ এই যে, তখন মুসলমানগণ ছিল দুর্বল। এ অবস্থায় তাদেরকে সস্বস্ত্র জিহাদের আদেশ দেয়া হলে কাফেরেরা সহজেই তাদের বিরুদ্ধে জয়লাভ করতো এবং তাদেরকে নির্মূল করে ফেলত। ফলে অঙ্কুরেই দ্বীনের দাওয়াত মিটে যেত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাফিদের অত্যাচার নিজ ভুমি মক্কা থেকে মদিনা হিজরত করলেন। কিন্তু কাফিরগণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হিজরতের পর পরই মক্কার কাফিরগণ মদীনা আক্রমনের পরিকল্পনা করে। সত্য ভুমিষ্ট ইসলামি সমাজ কে দুনিয়া থেকে চীরতর নিঃশেষ করা নিমিত্তে। তখন মুসলিমদের পক্ষে যুদ্ধ করাত দুরের কথা মদীনায় ইহুদীদের সাথে তাল মিলিয়ে চলাই কষ্টকর। যাহোক মক্কার মুসরিকগণ এই সময়কে উপযুক্ত মনে করে মদীনার মুসলিমদের উপর যুদ্ধ চাপিয়ে দিল। যার ফলোশ্রুতিতে মাত্র ৩১৩ জন সাহাবী নিয়ে হাজার খানেক কাফিরের সাথে বদর প্রান্তে যুদ্ধ করতে বাধ্য হল। যুদ্ধের করার মত সামর্থ না থাকা সত্বেও যুদ্ধ করতে বাধ্য হয়। মহান আল্লাহ তাদের যুদ্ধ করা অনুমতি প্রদান করেন এবং সাহায্য করেন। আল্লাহ তা’লা বলেনঃ

أُذِنَ لِلَّذِينَ يُقَاتَلُونَ بِأَنَّهُمْ ظُلِمُوا وَإِنَّ اللَّهَ عَلَى نَصْرِهِمْ لَقَدِيرٌ

অর্থঃ যুদ্ধের অনুমতি দেয়া হল তাদেরকে, যাদের সাথে কাফেরেরা যুদ্ধ করে। কারণ তাদের প্রতি অত্যাচার করা হয়েছে। আল্লাহ তাদেরকে সাহায্য করতে অবশ্যই সক্ষম”। সূরা হজ্জ : ৩৯

একটু লক্ষ করলেই বুঝতে পারা যায যে, এই আয়াতে শুধুমাত্র জেহাদের অনুমতি দেয়া হয়েছে। অথচ ইতিপূর্বে জিহাদ করা নিষিদ্ধ ছিল। অতঃপর ঐসমস্ত কাফেরদের বিরুদ্ধে জিহাদের আদেশ দেয়া হয়েছে যারা তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে নিষেধ করা হয়েছে যারা যুদ্ধ করেনা। আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ

وَقَاتِلُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ الَّذِينَ يُقَاتِلُونَكُمْ وَلَا تَعْتَدُوا إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْمُعْتَدِينَ

অর্থঃ আর লড়াই কর আল্লাহর রাস্তায় তাদের সাথে যারা লড়াই করে তোমাদের সাথে। অবশ্য কারো প্রতি বাড়াবাড়ি কর না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীদেরকে পছন্দ করেন না”। সূরা বাকারা: ১৯০

এখানে শুধু মাত্র আক্রমণকারী শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার আদেশ দেয়া হয়েছে। মজলুম তথা অত্যাচারিতদেরকে সাহায্য করা। আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ

وَمَا لَكُمْ لاَ تُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِ اللّهِ وَالْمُسْتَضْعَفِينَ مِنَ الرِّجَالِ وَالنِّسَاء وَالْوِلْدَانِ الَّذِينَ يَقُولُونَ رَبَّنَا أَخْرِجْنَا مِنْ هَـذِهِ الْقَرْيَةِ الظَّالِمِ أَهْلُهَا وَاجْعَل لَّنَا مِن لَّدُنكَ وَلِيًّا وَاجْعَل لَّنَا مِن لَّدُنكَ نَصِيرًا

অর্থঃ আর তোমাদের কি হল যে, তেমারা আল্লাহর রাহে লড়াই করছ না? দুর্বল সেই পুরুষ, নারী ও শিশুদের পক্ষে, যারা বলে, হে আমাদের পালনকর্তা! আমাদিগকে এই জনপদ থেকে নিষ্কৃতি দান কর। এখানকার অধিবাসীরা যে, অত্যাচারী! আর তোমার পক্ষ থেকে আমাদের জন্য পক্ষালম্বনকারী নির্ধারণ করে দাও এবং তোমার পক্ষ থেকে আমাদের জন্য সাহায্যকারী নির্ধারণ করে দাও। সুরা নিসা : ৭৫

২। যখন মুসলিম ও অমুসলিম শুধু ধর্মীয় কারনে যুদ্ধ করে।

সাধারণত অমুসলিমদের সাথে বিনা কারনে যুদ্ধ করার আদেশ প্রদান করা হয় না। প্রত্যেক মুসলিমের কাজ হল ইসলাম পালনের পাশাপাশি দ্বীনের প্রচার ও প্রসারের জন্য প্রানপণ চেষ্টা করা। দ্বীন পালনে বাধা প্রদান করলে কিংবা দ্বীনের প্রচার ও প্রসারের কাজে বাধা প্রদান করলে অমুসলিমদের সাথে যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে দেখা দেয়। মদিনায় ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সাথে সাথে পৃথিবীর সকল স্থান ইসলামে দাওয়াত পৌছে গেল। বিভিন্ন মাধ্যমে তাদের ইসলামের প্রতি ঈমান আনার আহবান জানান হল। অনেক ইসলাম গ্রহন করে ধন্য হল, আবার অনেকে এর বিরুদ্ধ ষড়যন্ত্র শুরু করে। শুধু ষড়যন্ত্র নয় মদীনা আক্রমন করে বসে যার ফলে বদর ও অহুদের প্রান্ত কাফিরদের সাথে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়। এই সকল যৃদ্ধের পূর্বেই মহান আল্লাহ কাফিদের সাথে যুদ্ধের অনুমতি প্রদান করেন। প্রত্যেক মুসলিমের উপর ফরজ হল শত্রুদেরকে প্রতিরোধ করে তাদের হাত থেকে ইসলাম ও মুসলমানদেরকে হেফাজত করা। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

أُذِنَ لِلَّذِينَ يُقَـٰتَلُونَ بِأَنَّهُمۡ ظُلِمُواْ‌ۚ وَإِنَّ ٱللَّهَ عَلَىٰ نَصۡرِهِمۡ لَقَدِيرٌ (٣٩) ٱلَّذِينَ أُخۡرِجُواْ مِن دِيَـٰرِهِم بِغَيۡرِ حَقٍّ إِلَّآ أَن يَقُولُواْ رَبُّنَا ٱللَّهُ‌ۗ وَلَوۡلَا دَفۡعُ ٱللَّهِ ٱلنَّاسَ بَعۡضَہُم بِبَعۡضٍ۬ لَّهُدِّمَتۡ صَوَٲمِعُ وَبِيَعٌ۬ وَصَلَوَٲتٌ۬ وَمَسَـٰجِدُ يُذۡڪَرُ فِيہَا ٱسۡمُ ٱللَّهِ ڪَثِيرً۬ا‌ۗ وَلَيَنصُرَنَّ ٱللَّهُ مَن يَنصُرُهُ ۥۤ‌ۗ إِنَّ ٱللَّهَ لَقَوِىٌّ عَزِيزٌ (٤٠) 

অর্থঃ যুদ্ধে অনুমতি দেয়া হল তাদেরকে যাদের সাথে কাফেররা যুদ্ধ করে; কারণ তাদের প্রতি অত্যাচার করা হয়েছে। আল্লাহ তাদেরকে সাহায্য করতে অবশ্যই সক্ষম। যাদেরকে তাদের ঘর-বাড়ী থেকে অন্যায়ভাবে বহিস্কার করা হয়েছে শুধু এই অপরাধে যে, তারা বলে আমাদের পালনকর্তা আল্লাহ। আল্লাহ যদি মানবজাতির একদলকে অপর দল দ্বারা প্রতিহত না করতেন, তবে (খ্রীষ্টানদ ের) নির্ঝন গির্জা, এবাদত খানা, (ইহুদীদের) উপাসনালয় এবং মসজিদসমূহ বিধ্বস্ত হয়ে যেত, যেগুলাতে আল্লাহর নাম অধিক স্মরণ করা হয়। আল্লাহ নিশ্চয়ই তাদেরকে সাহায্য করবেন, যারা আল্লাহর সাহায্য করে। নিশ্চয়ই আল্লাহ পরাক্রমশালী শক্তিধর।  সুরা হাজ : ৩৯-৪০ 

অসুলিম চুক্তির মাধ্যামে মুসলিমদের সাথে সুসম্পর্কে রেখে নিরাপত্তা পেয়ে বাস করতে পারে। কিন্তু চুক্তি ভংগ করলে তাদের সাথে চুক্তি ভংগ করবে যুদ্ধ করা যায়। মহান আল্লাহ বলেন-

 وَأَذَٲنٌ۬ مِّنَ ٱللَّهِ وَرَسُولِهِۦۤ إِلَى ٱلنَّاسِ يَوۡمَ ٱلۡحَجِّ ٱلۡأَڪۡبَرِ أَنَّ ٱللَّهَ بَرِىٓءٌ۬ مِّنَ ٱلۡمُشۡرِكِينَ‌ۙ وَرَسُولُهُ ۥ‌ۚ فَإِن تُبۡتُمۡ فَهُوَ خَيۡرٌ۬ لَّڪُمۡ‌ۖ وَإِن تَوَلَّيۡتُمۡ فَٱعۡلَمُوٓاْ أَنَّكُمۡ غَيۡرُ مُعۡجِزِى ٱللَّهِ‌ۗ وَبَشِّرِ ٱلَّذِينَ كَفَرُواْ بِعَذَابٍ أَلِيمٍ (٣) إِلَّا ٱلَّذِينَ عَـٰهَدتُّم مِّنَ ٱلۡمُشۡرِكِينَ ثُمَّ لَمۡ يَنقُصُوكُمۡ شَيۡـًٔ۬ا وَلَمۡ يُظَـٰهِرُواْ عَلَيۡكُمۡ أَحَدً۬ا فَأَتِمُّوٓاْ إِلَيۡهِمۡ عَهۡدَهُمۡ إِلَىٰ مُدَّتِہِمۡ‌ۚ إِنَّ ٱللَّهَ يُحِبُّ ٱلۡمُتَّقِينَ (٤) 

অর্থঃ তবে যে মুশরিকদের সাথে তোমরা চুক্তি বদ্ধ, অতপরঃ যারা তোমাদের ব্যাপারে কোন ত্রুটি করেনি এবং তোমাদের বিরুদ্ধে কাউকে সাহায্যও করেনি, তাদের সাথে কৃত চুক্তিকে তাদের দেয়া মেয়াদ পর্যন্ত পূরণ কর। অবশ্যই আল্লাহ সাবধানীদের পছন্দ করেন। অতঃপর নিষিদ্ধ মাস অতিবাহিত হলে মুশরিকদের হত্যা কর যেখানে তাদের পাও, তাদের বন্দী কর এবং অবরোধ কর। আর প্রত্যেক ঘাঁটিতে তাদের সন্ধানে ওঁৎ পেতে বসে থাক। কিন্তু যদি তারা তওবা করে, নামায কায়েম করে, যাকাত আদায় করে, তবে তাদের পথ ছেড়ে দাও। নিশ্চয় আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। (সুরা তাওবা ৯:৪-৫)।

মুসলমান না হওয়া পর্যন্ত কাফেরদের বিরুদ্ধে জিহাদ করার আদেশ দেয়া হয়েছে। কারণ এ জন্যই তথা আল্লাহর ইবাদতের জন্য আল্লাহ তা’আলা তাদেরকে সৃষ্টি করেছেন এবং রিযিকের ব্যবস্থা করেছেন। সুতরাং আল্লাহ ছাড়া অন্যের এবাদত উচ্ছেদ করে পৃথিবীতে আল্লাহর এবাদত প্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশ্যেই আল্লাহ জিহাদ ফরজ করেছেন। এজন্যই যারা তাওবা করবে, ঈমান আনয়ন করবে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা হবেনা। কাফেরদেরকে যদি বিনা যুদ্ধে ছেড়ে দেয়া হয় তবে মুসলমানদের উপর তাদের অত্যাচার বেড়ে যাবে। কেননা তারা চায়না যে, পৃথিবীতে কোন মুসলমান অবশিষ্ট থাকুক। তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ না করা হলে তারা মুসলমানদেরকে হত্যা করবে, বাড়ি-ঘর থেকে বের করে দিবে এবং বিভিন্ন প্রকার কষ্ট দিবে। মুসলমানগণ যখন থেকে জিহাদ ছেড়ে দিয়েছে তখন থেকে তাদের উপর বিপদ-মুসীবত নেমে এসেছে। এই ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে মুসলিমদের রুখ দাড়াতে বলা হল এবং আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠা করার জন্য সকল প্রকার কাফেরের বিরুদ্ধে জিহাদ করার জন্য সাধারণ আদেশ দেয়া হল। আল্লাহ তা’আলা বলেন-

الشَّهْرُ الْحَرَامُ بِالشَّهْرِ الْحَرَامِ وَالْحُرُمَاتُ قِصَاصٌ فَمَنِ اعْتَدَى عَلَيْكُمْ فَاعْتَدُواْ عَلَيْهِ بِمِثْلِ مَا اعْتَدَى عَلَيْكُمْ وَاتَّقُواْ اللّهَ وَاعْلَمُواْ أَنَّ اللّهَ مَعَ الْمُتَّقِينَ

অর্থঃ সম্মানিত মাসই সম্মানিত মাসের বদলা। আর সম্মান রক্ষা করারও বদলা রয়েছে। বস্তুতঃ যারা তোমাদের উপর জবর দস্তি করেছে, তোমরা তাদের উপর জবরদস্তি কর, যেমন জবরদস্তি তারা করেছে তোমাদের উপর। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং জেনে রাখ, যারা পরহেযগার, আল্লাহ তাদের সাথে রয়েছেন।  সুরা বাকারা : ১৯৪

নিহত না হলেও তারা ছাওয়াব, গণীমতের মাল, দুনিয়া ও আখেরাতের সম্মান নিয়ে ফেরত আসবে। যখন মুসলিম ও অমুসলিম শুধু ধর্মীয় কারনে পরস্পর যুদ্ধে লিপ্ত হয় এবং যুদ্ধ ছাড়া আর কোন শান্তিপূর্ণ পথ খোলা থাকে না। এই সময় কোন মুসলিমের উপর জিহাদ করা ফরজ হয় এবং তখন উপস্থিত সক্ষম কোন মুসলিমের সেখান থেকে পলায়ন করা বৈধ নয়। তখন উপস্থিত প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য আবশ্যক হয়ে যায় দৃঢ়পদ ও অবিচল থেকে অমুসলিমদের সাথে যুদ্ধ করা।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُواْ إِذَا لَقِيتُمْ فِئَةً فَاثْبُتُواْ وَاذْكُرُواْ اللّهَ كَثِيراً لَّعَلَّكُمْ تُفْلَحُونَ

অর্থঃ হে ঈমানদারগণ, তোমরা যখন কোন বাহিনীর সাথে সংঘাতে লিপ্ত হও, তখন সুদৃঢ় থাক এবং আল্লাহকে অধিক পরিমাণে স্মরণ কর যাতে তোমরা উদ্দেশ্যে কৃতকার্য হতে পার। সুরা আনফাল : ৪৫

আল্লাহ তায়ালা আরও বলেনঃ

الَّذِينَ آمَنُواْ يُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِ اللّهِ وَالَّذِينَ كَفَرُواْ يُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِ الطَّاغُوتِ فَقَاتِلُواْ أَوْلِيَاء الشَّيْطَانِ إِنَّ كَيْدَ الشَّيْطَانِ كَانَ ضَعِيفًا

অর্থঃ যারা ঈমানদার তারা যে, জিহাদ করে আল্লাহর রাহেই। পক্ষান্তরে যারা কাফের তারা লড়াই করে শয়তানের পক্ষে সুতরাং তোমরা জিহাদ করতে থাক শয়তানের পক্ষালম্বনকারীদের বিরুদ্ধে, (দেখবে) শয়তানের চক্রান্ত একান্তই দুর্বল। সুরা নিসা : ৭৬

যখন শত্রুবাহিনী কোন মুসলিম সম্প্রদায়ের উপর আকস্মিক আক্রমণ করে তখন নারী পুরুষ নির্বিশেষে সকলের উপর আবশ্যক হয়ে যাবে তাদের গতিরোধ করা। তারা যদি সক্ষম না হয় তাহলে, তাদের পার্শ্ববর্তী লোকদের উপর পর্যায়ক্রমে জিহাদ ফরজ হবে।

সর্বোপুরি কথা হল জিহাদ করতে হবে আল্লাহর দ্বীনকে বলুন্দ করার জন্যে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে জিজ্ঞাসা করা হলঃ এক ব্যক্তি জিহাদ করে নীজের গোত্রকে সাহায্য করার জন্যে, অন্য একজন জিহাদ করে বীরত্ব প্রদর্শন করার জন্যে আবার কেউ বা করে গণীমতের সম্পদ হাসিল করার জন্যে। এদের মধ্যে হতে কে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করে থাকে? নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনঃ যে ব্যক্তি জিহাদ করবে আল্লাহর বাণীকে বলুন্দ করার জন্যে তার জিহাদ হবে আল্লাহর পথে। এছাড়া অন্য উদ্দেশ্যে যে ব্যক্তি জিহাদ করবে তার জিহাদ কখনই আল্লাহর পথে জিহাদ হিসাবে গণ্য হবেনা। যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে জিহাদ করতে গিয়ে নিহত হবে তাকে শহীদ হিসেবে গণ্য করা হবে। যদি নিহত না হয় তবে সে সাওয়াব ও গণিমত থেকে বঞ্চিত হবে না।

মুসলিমদের সাথে মুসলিমদের মারামারি বা যুদ্ধ করা জিহাদ নয়ঃ

তবে মুসলিমদের সাথে মুসলিমদের মারামারি বা যুদ্ধ হলে মিমাংসা করে দিতে হবে। কোন পক্ষে অবলম্ভব করা যাবে না। আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ

وَإِن طَائِفَتَانِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ اقْتَتَلُوا فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا فَإِن بَغَتْ إِحْدَاهُمَا عَلَى الْأُخْرَى فَقَاتِلُوا الَّتِي تَبْغِي حَتَّى تَفِيءَ إِلَى أَمْرِ اللَّهِ فَإِن فَاءتْ فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا بِالْعَدْلِ وَأَقْسِطُوا إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ

অর্থঃ যদি মুমিনদের দুই দল যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে পড়ে, তবে তোমরা তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দিবে। অতঃপর যদি তাদের একদল অপর দলের উপর চড়াও হয়, তবে তোমরা আক্রমণকারী দলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে; যে পর্যন্ত না তারা আল্লাহর নির্দেশের দিকে ফিরে আসে। যদি ফিরে আসে, তবে তোমরা তাদের মধ্যে ন্যায়ানুগ পন্থায় মীমাংসা করে দিবে এবং ইনছাফ করবে। নিশ্চয় আল্লাহ ইনছাফকারীদেরকে পছন্দ করেন।  সুরা হুজুরাত : ৯ 

 একটি হাদীসে এসেছে, আরফাজা (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন-

سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ، يَقُولُ : ” إِنَّهُ سَتَكُونُ هَنَاتٌ وَهَنَاتٌ ، فَمَنْ أَرَادَ أَنْ يُفَرِّقَ أَمْرَ هَذِهِ الْأُمَّةِ وَهِيَ جَمِيعٌ ، فَاضْرِبُوهُ بِالسَّيْفِ كَائِنًا مَنْ كَانَ “

রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে আমি বলতে শুনেছি, অচিরেই নানা প্রকার ফিৎনা-ফাসাদের উদ্ভব হবে। যে ব্যক্তি ঐক্যবদ্ধ উম্মাতের মধ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির প্রয়াস চালাবে, তোমরা তরবারি দিয়ে তার গর্দান উড়িয়ে দেবে, সে যে কেউ হোক না কেন।। সহিহ মুসলিম : ১৮৫২

এই হাদিসের ব্যাখ্যায় ইসলামিক স্কলাররা বলেন- যদি কেউ ইসলামী রাষ্ট্রের মুসলমানদের ভিতর ফাটল ধরানোর ষড়যন্ত্র করে তাকে এ কাজ থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিতে হবে। যদি সে বিভিন্নভাবে সতর্ক করার পরেও ক্ষান্ত না হয় তাহলে, তাকে প্রয়োজনে তরবারী দ্বারা শাস্তি দেবে। তবে, এটা রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্বের আওতায় পড়ে। সরকারের কোন সবুজ সংকেত ছাড়া এটা সাধারণ মানুষ কর্তৃক বাস্তবায়নযোগ্য নয়। অপর পক্ষে মহান আল্লাহর ঘোষনা এরূপ করলে মুসলিমগন কাপুরুষ হয়ে যাবে। যেমন তিনি ইরশাদ করেন-

وَأَطِيعُواْ اللّهَ وَرَسُولَهُ وَلاَ تَنَازَعُواْ فَتَفْشَلُواْ وَتَذْهَبَ رِيحُكُمْ وَاصْبِرُواْ إِنَّ اللّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ

অর্থঃ আর আল্লাহ তায়ালার নির্দেশ মান্য কর এবং তাঁর রসূলের। তাছাড়া তোমরা পরস্পরে বিবাদে লিপ্ত হইও না। যদি তা কর, তবে তোমরা কাপুরুষ হয়ে পড়বে এবং তোমাদের প্রভাব চলে যাবে। আর তোমরা ধৈর্য্যধারণ কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ তা’আলা রয়েছেন ধৈর্য্যশীলদের সাথে। সুরা আনফাল : ৪৬

 ৩। কোন মুসলিম শ্বাসক যদি দেশ বা ধর্ম রক্ষার জন্য যুদ্ধের আহবান করে।

পৃথিবীতে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য এবং শির্কের পতন ঘটানোর জন্য আল্লাহ তা’আলা কাফেরদের বিরুদ্ধে অস্ত্রের মাধ্যমে জিহাদ করা এই উম্মতের উপর ফরজ করেছেন। তবে কোন ব্যাক্তির ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় জিহাদ ফরজ হয় না। এমন কি কোন ব্যাক্তি জিহাদ আহবান করতে পারে না। জিহাদ আহবানের একমাত্র অধিকার রাখে মুসলিম রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধান। যখন রাষ্ট্রপ্রধান কোন  সম্প্রদায়কে রাষ্ট্র বা ধর্ম রক্ষার জন্য জিহাদের নির্দেশ প্রদান করবেন, তখন সকলের জন্য জিহাদে অংশ গ্রহন ফরজ হয়ে যাবে। সাধারনত কোন রাষ্ট্রের সাথে অন্য রাষ্ট্রের যুদ্ধ বাধলে সকলে জন্য সেই যুদ্ধে অংশ ফরযে কিফায়া হয়ে থাকে। অর্থাৎ যদি কিছু লোক জিহাদ করতে থাকে তাহলে বাদ বাকি লোকদের ওপর থেকে ঐ ফরয রহিত হয়ে যাবে। কিন্তু যখন মুসলমানদের শাসকের পক্ষ থেকে মুসলমানদেরকে সর্বাত্মক জিহাদের জন্য আহবান জানানো হবে অথবা কোন বিশেষ দলকে বা বিশেষ এলাকার অধিবাসীদেরকে ডাকা হবে তখন যাদেরকে ডাকা হয়েছে তাদের ওপর জিহাদ ফরযে আইন হয়ে যাবে এমনকি যে ব্যক্তি কোন যথার্থ অসুবিধা বা ওযর ছাড়া জিহাদে অংশগ্রহণ করবে না তার ঈমানই গ্রহণযোগ্য হবে না। তবে, কারও কোন ওজর থাকলে ভিন্ন কথা।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَقَاتِلُوهُمْ حَتَّى لَا تَكُونَ فِتْنَةٌ وَيَكُونَ الدِّينُ كُلُّهُ لِلَّهِ فَإِنِ انْتَهَوْا فَإِنَّ اللَّهَ بِمَا يَعْمَلُونَ بَصِيرٌ 

অর্থঃ আর এ কাফেরদের সাথে এমন যুদ্ধ করো যেন গোমরাহী ও বিশৃংখলা নির্মূল হয়ে যায় এবং দ্বীন পুরোপুরি আল্লাহ তায়ালার জন্য নির্দিষ্ট হয়ে যায়। তারপর যদি তারা ফিতনা থেকে বিরত হয় তাহলে আল্লাহই তাদের কার্যকলাপ দেখবেন। সুরা আনফাল : ৩৯

 আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন-

 يَـٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ مَا لَكُمۡ إِذَا قِيلَ لَكُمُ ٱنفِرُواْ فِى سَبِيلِ ٱللَّهِ ٱثَّاقَلۡتُمۡ إِلَى ٱلۡأَرۡضِ‌ۚ أَرَضِيتُم بِٱلۡحَيَوٰةِ ٱلدُّنۡيَا مِنَ ٱلۡأَخِرَةِ‌ۚ فَمَا مَتَـٰعُ ٱلۡحَيَوٰةِ ٱلدُّنۡيَا فِى ٱلۡأَخِرَةِ إِلَّا قَلِيلٌ (٣٨) إِلَّا تَنفِرُواْ يُعَذِّبۡڪُمۡ عَذَابًا أَلِيمً۬ا وَيَسۡتَبۡدِلۡ قَوۡمًا غَيۡرَڪُمۡ وَلَا تَضُرُّوهُ شَيۡـًٔ۬ا‌ۗ وَٱللَّهُ عَلَىٰ ڪُلِّ شَىۡءٍ۬ قَدِيرٌ (٣٩)

অর্থঃ হে ঈমানদারগণ! তোমাদের কী হলো, যখনই তোমাদের আল্লাহর পথে জিহাদে বের হতে বলা হয়, তখনি তোমরা মাটি কামড়ে পড়ে থাক? তোমরা কি আখেরাতের মোকাবিলায় দুনিয়ার জীবনকে বেশী পছন্দ করে নিয়েছ? যদি তাই হয় তাহলে তোমরা মনে রেখ, দুনিয়ার জীবনের এমন সাজ সরঞ্জাম আখেরাতে খুবই সামান্য বলে প্রমাণিত হবে। তোমরা যদি না বের হও তাহলে আল্লাহ তোমাদেরকে যন্ত্রতাদায়ক শাস্তি দেবেন এবং তোমাদের জায়গায় আরেকটি দলকে নিয়ে আসবেন, তখন তোমরা আল্লাহ তায়ালার কোন ক্ষতি করতে পারবে না। তিনি সব বিষয়ের ওপর ক্ষমতাবান। (সুরা তাওবা  : ৩৮-৩৯

 সবচেয়ে বড় ও আসল ব্যাপার হল রাষ্ট্রপ্রধানের পক্ষ থেকে অনুমতিগ্রহণ করা। অনেকেই এটাতে ভুল করে বসেন। আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) এর সূত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণিত। তিনি বলেন-

‏ إِنَّمَا الإِمَامُ جُنَّةٌ يُقَاتَلُ مِنْ وَرَائِهِ وَيُتَّقَى بِهِ فَإِنْ أَمَرَ بِتَقْوَى اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ وَعَدَلَ كَانَ لَهُ بِذَلِكَ أَجْرٌ وَإِنْ يَأْمُرْ بِغَيْرِهِ كَانَ عَلَيْهِ مِنْهُ

ইমাম বা শাসক ঢাল স্বরূপ। তার নেতৃত্বে যুদ্ধ করা হয় এবং শত্রুর ক্ষতি থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া যায়। সে যদি তাকওয়া বা আল্লাহভীতি ও ন্যায় বিচারের ভিত্তিতে শাসনকার্য পরিচালনা করে, তবে তার জন্য সে পুরস্কৃত হবে। আর যদি ন্যায় ব্যতীত অন্য কিছু আদেশ করে তবে সে পাপের জন্য দায়ী হবে।

সহিহ মুসলিম : ১৮৪১

রাষ্ট্রপ্রধানের অনুমতি থাকলে আর কেউ এটা নিয়ে কোন কথা বলতে পারবে না। এটা তখন বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্যশীল বলেই গণ্য হবে।

আল্লামা ইবনে কুদামাহ (রহঃ) বলেন-

إِنَّ أَمْرَ الْجِهَادِ مَوْكُولٌ إِلَى الإِمَامِ وَاجْتِهَادِهِ، وَيَلْزَمُ الرَّعِيَّةَ طَاعَتُهُ فِيمَا يَرَاهُ مِنْ ذَلِكَ. وَلَا يَجُوزُ لِلْجُنْدِ أَنْ يَخْرُجُوا مِنْ الْعَسْكَرِ إِلَّا بِإِذْنِ أَمِيرِهِمْ.

অর্থ: “জিহাদের বিষয়টি ইমাম তথা রাষ্ট্রপ্রধানের সিদ্ধান্ত ও বিচার-বিবেচনার উপর নির্ভরশীল। এ বিষয়ে তার নির্দেশ মেনে চলা প্রজাদের জন্য আবশ্যক। সেনাদলের সদস্যরা তাদের তাবু বা শিবির থেকে আমীরের অনুমতি ছাড়া বের হতে পারবে না। আল-মুগনী, খণ্ড-১০, পৃ-৩৭৪

এই বক্তব্যে ইবনে কুদামাহ (রহ.) রাষ্ট্র এবং তার অধিনস্থ বাহিনীর মধ্যে শৃঙ্খলা রক্ষার গুরুত্ব এবং আমীরের অনুমতির বাধ্যবাধকতা সম্পর্কে স্পষ্ট নির্দেশনা প্রদান করেছেন। কেননা, শত্রুর গতিবিধি তিনিই ভালো করে জানেন। অনুমতি ছাড়া বের হলে উক্ত ব্যক্তি শত্রুদলের শিকারে পরিণত হতে পারে।

উপরোক্ত আলোচনা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, মুসলিম শাসক যদিও মহাপাপী তবুও তার অনুমতি ছাড়া জিহাদে বের হওয়া যাবে না। রাষ্ট্রপ্রধানের অনুমতি ব্যতিত কোন ব্যক্তির জন্য বৈধ নয় জিহাদের ডাক দেয়া কিংবা তাতে শরীক হওয়া। কেননা, তাতে ফিতনা ফাসাদ ও বিপদের আশংকা রয়েছে।

অন্যান্য অমুসলিমদের সাথে শর্তসাপেক্ষে (রাষ্ট্রপ্রধানের পক্ষ থেকে নির্দেশ ইত্যাদি) জিহাদকে আবশ্যক করা হয়েছে। সেটাও হতে হবে যৌক্তিক কারণে। কেউ অমুসলিম  হলেই যে, তার সাথে যুদ্ধ করা যাবে এটা ঠিক নয়। কেননা, আমরা ইতিহাসে দেখতে পাই- রাসুল (সাঃ) এর মদীনাতে অনেক অমুসলিম বসবাস করতেন। তাদের সাথে তিনি সু সম্পর্ক বজায় রেখে চলতেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন:

وَقَاتِلُوا الْمُشْرِكِينَ كَافَّةً كَمَا يُقَاتِلُونَكُمْ كَافَّةً وَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ مَعَ الْمُتَّقِينَ 

অর্থঃ আর মুশরিকদের সাথে সবাই মিলে লড়াই কর, যেমন তারা সবাই মিলে তোমাদের সাথে লড়াই করে। আর জেনে রাখ! আল্লাহ তায়ালা মুত্তাকীদের সাথেই আছেন। সুরা তাওবা : ৩৬

 উল্লেখ্য যে, এখানে যাদের সাথে যুদ্ধ করা হচ্ছে শুধুমাত্র তাদের সাথেই যুদ্ধের নির্দেশ দেয়া হচ্ছে। যাদের সাথে যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছেনা তাদের ক্ষেত্রে এ নির্দেশ নয়। ফিকহুল জিহাদ দ্রষ্টব্য

৪। শর্ত সাপেক্ষে শ্বাসকের বিরুদ্ধে ধর্ম রক্ষার জন্য যুদ্ধের করা।

মুসলিম কোন শ্বাসকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষনা করা যাবে না। কুরআন সুন্নাহ দ্বারা পরিচালিত কোন ইসলামি রাষ্ট্রের শ্বাসকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষনা করা যাবে না, তাই সে যতবড় জুলুমবাজ হোকনা কেন। কিন্ত সে যদি ইসলামি কোন ফরজ হুকুর পালন না করতে আদেশ প্রদান করে অথবা বাধা প্রদান করে। সহিহ হাদিস এসেছে-

عَنْ أُمِّ سَلَمَةَ، قَالَتْ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: ‏”‏ سَتَكُونُ أُمَرَاءُ، فَتَعْرِفُونَ وَتُنْكِرُونَ، فَمَنْ أَنْكَرَ فَقَدْ بَرِئَ، وَمَنْ كَرِهَ فَقَدْ سَلِمَ، وَلَكِنْ مَنْ رَضِيَ وَتَابَعَ ‏”‏‏.‏ قَالُوا: يَا رَسُولَ اللَّهِ، أَفَلاَ نُقَاتِلُهُمْ قَالَ: ‏”‏ لاَ، مَا صَلَّوْا ‏”‏‏.‏

অর্থ: উম্মে সালামা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, “অচিরেই তোমাদের ওপর এমন নেতা নিযুক্ত হবে, যাদের কাজের মধ্যে তোমরা ভালো ও মন্দ উভয়ই দেখতে পাবে। যে ব্যক্তি তাদের মন্দ কাজের প্রতিবাদ করবে, সে দায়িত্বমুক্ত। যে ব্যক্তি তাদের কাজকে অপছন্দ করবে, সে নিরাপদ থাকবে। কিন্তু যে ব্যক্তি তাদের কাজে সন্তুষ্টি প্রকাশ করবে এবং তাদের অনুসরণ করবে, সে পাপে নিমজ্জিত হবে। সাহাবারা বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল! আমরা কি তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব না?” তিনি বললেন, “না, যতক্ষণ তারা সালাত আদায় করে।” সহিহ মুসলিম : ১৮৫৪

এ হাদিস থেকে বোঝা যায় যে মুসলিম নেতাদের মন্দ কাজের প্রতিবাদ করা এবং অন্যায়কে খারাপ জানার দায়িত্ব রয়েছে। তবে তাদের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ বা বিদ্রোহের অনুমতি নেই, যদি তারা সালাতের মতো ইসলামের মৌলিক বিধানগুলো পালন করে।

 রাষ্ট্র প্রদানের আদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে হবে যদি তিনি ন্যায়ের আদেশ দেন তাহলে। আর যদি তিনি অন্যায়ের বা পাপের কাজে নির্দেশ দেন তাহলে তার কথা মান্য করা যাবে না। যদি তিনি প্রকাশ্য কুফুরী বা শিরকী কাজে জড়িয়ে পড়েন তাহলে তার আনুগত্য করা বৈধ হবে না। তখন তার আনুগত্য থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিতে হবে। যদিও আমরা বর্তমান সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে পাপের কাজেও স্বীয় দল বা নেতার আদেশ মান্য করি। মনে রাখতে হবে। ফরজ হুকুমের বিরোধীতার কারনে সে আর মুসলীম থাকেনা, তখন দ্বীনদার আলেমেদের ফতোয়া মোতাবেক শ্বাসকদের সাথে জিহাদ করা ফরজ হয়ে যায়। অর্থাৎ যুদ্ধ ছাড়া ইসলামি শরীয়ত পালনের আর বিকল্প পথ থাকেনা তখনই বাধ্য হয়ে দেশের শীর্ষ স্থানীয় দ্বীনদার আলিমেদের ফতোয়া মোতাবেক জিহাদের চুড়ান্ত স্তর সশস্ত্র যুদ্ধের মত কঠিন সিদ্ধান্ত  নেয়ার অনুমতি দিবেন।

পূর্বের আলোচনায় দেখেছি জিহাদ আহবানের একমাত্র অধিকার রাখে মুসলিম রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধান। যখন রাষ্ট্রপ্রধান কোন সম্প্রদায়কে রাষ্ট্র বা ধর্ম রক্ষার জন্য জিহাদের নির্দেশ প্রদান করবেন, তখন সকলের জন্য জিহাদে অংশ গ্রহন ফরজ হয়ে যাবে। তাহলে আলেম সমাজ কেন ও কিভাবে জিহাদের ডাক দিবন?

কথা হলো রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রপ্রধান জুলুমবাজ হলেও জিহাদ করা যাবে না কিন্তু রাষ্ট্র যখন ইসলামি ফরজ হুকুম মানতে বাধা প্রধান করে তখন আলেমগণ জিহাদ বাধ্যতামূলক হবার ব্যাপারে ফতোয়া দিতে পারেনযেমন

) তাতারদের বিরুদ্ধে শায়খুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহর রাহিমাহুল্লাহ ফতোয়া যেখানে তিনি তাতারদের বিরুদ্ধে কতালকে ওয়াজিব বলেছেনমুসলিমদের নিকট থেকে তাতারগণ ক্ষমাতা নিয়ে মুসলিমদের উপর শুধু জুলুম করে তাদের ইসলম ধর্মের হুকুম মানতেও বাধা দিয়েছিল। ঠিক তখই শায়খুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহসহ (রাহিমাহুল্লাহ) বহু আলেম তাদের সাথে জিহাদ করাকে ওয়াজিব বলে মত দেন।

) ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে শাহ আবদুল আযিয মুহাদ্দিস দেহলভির রাহিমাহুল্লাহ ফতোয়া, যেখানে তিনি হিন্দুস্তানকে দারুল হারব ঘোষণা করেছেন

গ) রাশিয়ান হানাদার এবং কমিউনিসমের দ্বারা প্রভাবিত ও কমিউনিসম অনুযায়ী জীবনযাপন করা আফগান মুরতাদদের বিরুদ্ধে আফগান মুসলিম জনতার প্রতিরোধ ও যুদ্ধকে শরীয়ত সম্মত জিহাদ বলে ঘোষনা। রাবেতা আল-আলাম ইসলামি এর (ফিক্বহ কাউন্সিল ১৪০৮ হিজরির ২৪-২৮শে সফর) দশম অধিবেশনে আফগান যুদ্ধকে স্বাগত জানিয়েছিল এবং এই কাউন্সিলের সদস্যরা সর্বসম্মতিক্রমে মুসলিম বিশ্বের সাধারন জনতা ও সরকারগুলোর প্রতি নৈতিক, আর্থিক, রাজনৈতিক ও বস্তুগত সম্ভাব্য সব উপায়ে আফগান জিহাদকে সমর্থন করার আহবান জানানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

ঘ) সন্ত্রাসী রাষ্ট্র ইসরাইলের বিরুদ্ধ ফিলিস্তিনী মুসলিম ভাইদের প্রতিরোধ জিহাদ হিসাবে সকল মুসলিম আলেমদের নিকট স্বীকৃত। তাদের দেশ দখল করার পর সরকার না থাকা সত্বেও জিহাদ চালিয়েছিল। এখন হয়ত তাদের নিয়মতান্ত্রিক সরকার আছে। অর্থৎ রাষ্ট্র যখন ইসলাম বিরোধী কাজ করে এবং জনগনও মানতে বাধ্য করে ঠিক কখই আলেমের ফতোয়া মোতাবেগ কাজ করা উচিত। নিজে নিজে জিহাদ মনে করে মারামারি, হত্যা, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা যাবে না। রাষ্ট্র, সমাজ, ইসলাম এবং মুসলিমদের কথা মাথায় রেখে জিহাদ করতে হবে। এর পবিত্র লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষার সর্বশেষ চেষ্টা হিসেবে বৈধ করেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ

وَقَاتِلُوهُمْ حَتَّى لاَ تَكُونَ فِتْنَةٌ وَيَكُونَ الدِّينُ لِلّهِ فَإِنِ انتَهَواْ فَلاَ عُدْوَانَ إِلاَّ عَلَى الظَّالِمِينَ

অর্থঃ আর তোমরা তাদের সাথে লড়াই কর, যে পর্যন্ত না ফেতনার অবসান হয় এবং আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠিত হয়। অতঃপর যদি তারা নিবৃত হয়ে যায় তাহলে কারো প্রতি কোন জবরদস্তি নেই, কিন্তু যারা যালেম (তাদের ব্যাপারে আলাদা)। (রা বাকারা : ১৯৩

বিরত হওয়ার অর্থ কাফেরদের নিজেদের কুফরী ও শির্‌ক থেকে বিরত হওয়া নয়। বরং ফিতনা সৃষ্টি করা থেকে বিরত হওয়া। কাফের, মুশরিক, নাস্তিক প্রত্যেকের নিজেদের ইচ্ছামত আকীদা-বিশ্বাস পোষণ করার অধিকার আছে। তারা যার ইচ্ছে তার ইবাদাত-উপাসনা করতে পারে। অথবা চাইলে কারোর ইবাদাত নাও করতে পারে। তাদেরকে এই গোমরাহী ও ভ্রষ্টতা থেকে বের করে আনার জন্য উপদেশ দিতে হবে, অনুরোধ করতে হবে। কিন্তু এ জন্য তাদের সাথে যুদ্ধ করা যাবে না। তবে আল্লাহর যমীনে আল্লহর আইন ছাড়া তাদের বাতিল আইন কানুন জারীর করার এবং আল্লাহর বান্দাদেরকে আল্লাহ ছাড়া আর কারোর বান্দায় পরিণত করার অধিকার তাদের নেই। এই ফিতনা নির্মূল করার জন্য প্রয়োজন ও সুযোগ মতো মৌখিক প্রচারণা ও অস্ত্র উভয়টিই ব্যবহার করা হবে। আর কাফের ও মুশরিকরা এই ফিতনা থেকে বিরত না হওয়া পর্যন্ত মু’মিন তার সংগ্রাম থেকে নিশ্চেষ্ট ও নিবৃত্ত হবে না। আর ”যদি তারা বিরত হয় তাহলে জেনে রাখো জালেমদের ছাড়া আর কারোর ওপর হস্তক্ষেপ বৈধ হবে না।”  একথা থেকে এই ইংগিত পাওয়া যায় যে, বাতিল জীবন ব্যবস্থার পরিবর্তে সত্য জীবন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবার পর সাধারণ লোকদের মাফ করে দেয়া হবে। কিন্তু নিজেদের শাসনামলে যারা সত্যের পথ রধ করার জন্য চূড়ান্ত পর্যায়ে জুলুম-নির্যাতন চালিয়েছিল সত্যপন্থীরা তাদেরকে অবশ্যি শাস্তিদান করতে পারবে। যদিও এ ব্যাপারে ক্ষমতা করে দেয়া এবং বিজয় লাভ করার পর জালেমদের থেকে প্রতিশোধ না নেয়াই সৎকর্মশীল মু’মিনদের জন্য শোভনীয় তবুও যাদের অপরাধের তালিকা অনেক বেশী কালিমা লিপ্ত তাদেরকে শাস্তি দান করার একান্তই বৈধ। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেও এই সুযোগ গ্রহণ করেছেন। অথচ তাঁর চেয়ে বেশী ক্ষমতা ও উদারতা আর কে প্রদর্শন করতে পারে৷ তাই দেখা যায়, বদরের যুদ্ধের বন্দীদের মধ্য থেকে উকবাহ ইবনে আবী মূঈত ও নযর ইবনে হারিসকে তিনি হত্যার নির্দেশ দিয়েছেন। মক্কা বিজয়ের পর সতের জন লোককে সাধারণ ক্ষমার বাইরে রেখেছেন এবং তাদের মধ্য থেকে চারজনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। উপরোল্লিখিত অনুমতির ভিত্তিতে তিনি এই পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করেছেন। তাফহীমূল কুরআন, সুরা বাকারার ১৯৩ আয়তের ব্যাখ্যা দেখুন

নিজ দেশে মুসলিম শ্বাসকের বিরুদ্ধে ধর্ম রক্ষার জন্য যুদ্ধের করা একটি স্পর্স কাতর বিষয় তাই এ ব্যাপার মুহাক্কিক আলেম বা যারা দেশের শীর্ষ স্থানীয় আলেম তাদরে সকলের পরামর্শের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহন করতে হবে। একা একা ফতোয়া জানি করে মুসলিমদের জাল মাল হালাল করার ফতোয়া জারি করা হারাম।

ইবনু উমার (রাযি.) হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ আমি লোকদের সাথে যুদ্ধ চালিয়ে যাবার জন্য নির্দেশিত হয়েছি, যতক্ষণ না তারা সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ্ ব্যতীত প্রকৃত কোন উপাস্য নেই ও মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসূল, আর সালাত প্রতিষ্ঠা করে ও যাকাত আদায় করে। তারা যদি এগুলো করে, তবে আমার পক্ষ হতে তাদের জান ও মালের ব্যাপারে নিরাপত্তা লাভ করলো; অবশ্য ইসলামের বিধান অনুযায়ী যদি কোন কারণ থাকে, তাহলে স্বতন্ত্র কথা। আর তাদের হিসাবের ভার আল্লাহর উপর অর্পিত। সহিহ বুখারি  : ২৫, সহিহ মুসলিম : ২২

উসামাহ্ ইবনু যায়দ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে এক জিহাদ অভিযানে পাঠালে আমরা প্রত্যুষে জুহাইনার” (একটি শাখা গোত্র) আলহুরাকায় গিয়ে পৌছলাম। এ সময়ে আমি এক ব্যক্তির পশ্চাদ্ধাবন করে তাকে ধরে ফেলি। অবস্থা বেগতিক দেখে সে বললো, লা- ইলা-হা ইল্লাল্লা-হ’ কিন্তু আমি তাকে বর্শা দিয়ে আঘাত করে তাকে হত্যা করে ফেললাম। কালিমা পড়ার পর আমি তাকে হত্যা করেছি বিধায়, আমার মনে সংশয়ের উদ্রেক হলো। তাই ঘটনাটি আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট উল্লেখ করলাম। তিনি বললেন, তুমি কি তাকে “লা-ইলা-হা ইল্লাল্লা-হ’ বলার পর হত্যা করেছো। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! সে অস্ত্রের ভয়ে জান বাঁচানোর জন্যেই এরূপ বলেছে। তিনি রাগাম্বিত হয়ে বললেন, তুমি তার অন্তর চিড়ে দেখেছো, যাতে তুমি জানতে পারলে যে, সে এ কথাটি ভয়ে বলেছিল?

(রাবী বলেন), তিনি এ কথাটি বারবার আবূত্তি করতে থাকলেন। আর আমি মনে মনে অনুশোচনা করতে থাকলাম, হায়! যদি আমি আজই ইসলাম গ্রহণ করতাম। বর্ণনাকারী বলেন, এ সময় সা’দ ইবনু আবূ ওয়াক্কাস (রাযিঃ) বলেন, আল্লাহর কসম! আমি কখনো কোন মুসলিমকে হত্যা করব না, যেভাবে এ ভুড়িওয়ালা (উসামাহ) মুসলিমকে হত্যা করেছে। রাবী বলেন, তখন জনৈক ব্যক্তি বললো, আল্লাহ তা’আলা কি এ কথা বলেননি যে, “তোমরা তাদের (কাফিরদের) বিরুদ্ধে জিহাদ করো, যে পর্যন্ত ফিৎনা দূরীভূত না হয়, আর আল্লাহর দীন পরিপূর্ণ না হয়ে যায়? এর জবাবে সাদ (রাযিঃ) বললেন, আমরা জিহাদ করি, যাতে ফিৎনা না থাকে, কিন্তু তুমি আর তোমার সঙ্গীগণ এ উদ্দেশে যুদ্ধ কর, যেন ফিৎনা সৃষ্টি হয়। সহিহ মুসলিম : ৯৬

জিহাদ শুরু হলে তাতে অংশ গ্রহন করার বিধানঃ

জিহাদ ইসলামি বিধানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সালাত, সিয়াম, হজ্জ্ব, জাকাত ইত্যাদি আমলের মত জিহাদ একটি ফরজ ইবাদাত। সালাত যেমন প্রতি দিন আদায় করতে হয়। সিয়াম যেমন বছরে একবার এক মাস ব্যাপিয় আদায় করেত হয়। যাকাত যেমন নিসাবের মালিক মুসলিমকে বছরে একবার আদায় করতে হয়। হ্জ্জ্ব যেমন সমগ্র জীবনে এক বার আদায় করতে হবে। জিহাদ কিন্তু এমন নির্দিষ্ট করা নেই যে, দিনে একবার. মাসে একবার, বছরে একবার, জীবনে একবার। জিহাদ করতে হবে ইসলামের প্রয়োজনে। দিন, মাস আর বছরগুনে জিহাদ হয়না। জিহাদ দ্বারা কার জীবন শেষ হয়ে যায়। কাউ কাউকে বছরের পর বছর জিহাদ করা লাগতে পাবে। আবার এমনও জীবনে কখনও জিহাদ করার প্রয়োজনই নেই। জিহাদে বিশ্বাস না থাকে, জিহাদ সম্পর্কে খারাপ বা নেতি বাচক ধারন থাকে তবে সে কিন্তু মুসলিম হিসাবে গন্য হবে না। কখনও জিহাদ করলেন না, বা জীননে কখনও জিহাদের ডাক আসেনি তাতে কোন ক্ষতি নেই, যদি কিনা আপনার অন্তরে জিহাদে বিশ্বাস  ও ভালবাসা থাকে। অধিকাংশ ইসলামিক স্কলারের মতে চারটি কারনে জিহাদ জিহাদ ফরজ হয়।

১।  শত্রুবাহিনী কোন মুসলিম সম্প্রদায়ের উপর বিনা কারনে যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়।

২। যখন মুসলিম ও অমুসলিম শুধু ধর্মীয় কারনে যুদ্ধ করে।

৩। কোন মুসলিম শ্বাসক যদি দেশ বা ধর্ম রক্ষার জন্য যুদ্ধের আহবান করে।

৪। শর্ত সাপেক্ষে শ্বাসকের বিরুদ্ধে ধর্ম রক্ষার জন্য যুদ্ধের করা।

এই সকল যুদ্ধের অংশ গ্রহনের হুকুমও দুই প্রকার হয়ে থাকেঃ

১। ফরজে আইন

২। ফরজে কিফায়া  

১। ফরজে আইনঃ

ইসলামে শত্রু কাফিরগন যদি কোনো মুসলিম রাষ্ট্রকে আক্রমন করে বা মুসলিম ও অমুসলিম শুধু ধর্মীয় কারনে যুদ্ধ বাধে আর মুসলিম শ্বাসক যদি দেশ বা ধর্ম রক্ষার জন্য সকল নাগরিককে যুদ্ধের আহবান করে তখন সকলের উপর ফরজে আইন হয়ে যাবে। যেমন টি রাসূল (সাঃ) এর জীবন দসায় বদর, ওহুদ ও তাবুকের যুদ্ধের জন্য হুকুম জারি করা হয়েছিল। তাবুক যুদ্ধ সম্পর্ক মহান আল্লাহ এরশাদ করেন-

انْفِرُواْ خِفَافًا وَثِقَالاً وَجَاهِدُواْ بِأَمْوَالِكُمْ وَأَنفُسِكُمْ فِي سَبِيلِ اللّهِ ذَلِكُمْ خَيْرٌ لَّكُمْ إِن كُنتُمْ تَعْلَمُونَ

অর্থঃ তোমরা হালকা ও ভারী উভয় অবস্থায় যুদ্ধে বের হও এবং তোমাদের মাল ও জান নিয়ে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ কর। এটা তোমাদের জন্য উত্তম, যদি তোমরা জানতে। সুরা তাওবা : ৪১

এই আয়াত নাজিলের পর নারী ও শিশু ব্যতিত সকর সামর্থবান পুরুষের জন্য তাবুকের যুদ্ধ অংশ গ্রহন ফরজে আইন হয়ে যায়। মাত্র তিন জন সাহাবি বিনা ওজরে এই যুদ্ধ যাননি বলে তারা মহান আল্লার পক্ষ থেকে দুয়িয়াতেই শাস্তি পেয়েছেন এবং পরে দুনিয়াতেই তাদের ক্ষমার ঘোষনা আসে। এমনি ইসলামের প্রয়োজনে যখনই রাষ্ট্র প্রধান দেশ বা ধর্ম রক্ষার জন্য সকল নাগরিককে যুদ্ধের আহবান করবে তখন সকলের উপর ফরজে আইন হয়ে যাবে।

বর্তমান সময়ে একটি উদাহরন হল ফিলিস্তীন মুসলিম ভাইদের জিহাদ। মুসলিলদের ভুমি ফিলিস্তীন যা আজ ইহুদিরা জোর করে দখল করে আছে।  এদেরকে সেখান থেকে বিতাড়িত করে মাসজিদুল আকসাকে মুক্ত করার জন্য জান-মাল দিয়ে অব্যহত প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া সামর্থবান সকল মুসলমানের উপর ফরজে আইন।

২। ফরজে কিফায়াঃ  

বর্তমান প্রায় সকল দেশে নিয়মিত সেনাবাহিনী আছে যারা দেশ রক্ষার জন্য নিয়োজিত। যখন কোন দেশের সাথে দেশ বা ধর্ম রক্ষার জন্য যুদ্ধের শুরু হয় তখন নিয়মিত সেনাবাহিনী সরাসরি অংশ গ্রহন করে। দেশের বাকি সকলে প্রয়োজন অনুসারে জিহাদের জন্য তৈরী থাকবে। যদি তাদের আহবান করা হয় সাথে সাথে যুদ্ধের ময়দানে ঝাপিয়ে পড়বে। যুদ্ধের সাজ সরমজানের জন্য প্রচুর অর্থের প্রয়োজন হয তাই যারা সরাসরি যুদ্ধের অংশ গ্রহন করতে পারবেনা তাদের নিকট আর্থিক সাহায্য চাইলে তাদের উচিত সমর্থ অনুসারে আর্থিক সাহায্য করা। তাই বলা যায় যুদ্ধ করা ফরজে আইনা না কি ফরজে কিফায়া এটা নির্ভর করে যুদ্ধের প্রয়োজনীতার উপর। অর্থাৎ কিছু সংখ্যাক মুজাহিদ অংশগ্রহনে যদি জয় লাভ করা যায় তবে বাকিদের উপর ফরজে কিফায়া হয়ে যায়। আর যদি সকলের অংশ গ্রহন ছাড়া জয় সম্ভব নয় তখন সকলেরই অংশ গ্রহন ফরজে আইন হয়ে যায়।

মহান আল্লাহ রশাদ করেন

وَمَا كَانَ الْمُؤْمِنُونَ لِيَنفِرُواْ كَآفَّةً فَلَوْلاَ نَفَرَ مِن كُلِّ فِرْقَةٍ مِّنْهُمْ طَآئِفَةٌ لِّيَتَفَقَّهُواْ فِي الدِّينِ وَلِيُنذِرُواْ قَوْمَهُمْ إِذَا رَجَعُواْ إِلَيْهِمْ لَعَلَّهُمْ يَحْذَرُونَ

অর্থঃ আর মুমিনদের জন্য সংগত নয় যে, তারা সকলে একসঙ্গে অভিযানে বের হবে অতঃপর তাদের প্রতিটি দল থেকে কিছু লোক কেন বের হয় না, যাতে তারা দীনের গভীর জ্ঞান আহরণ করতে পারে এবং আপন সম্প্রদায় যখন তাদের নিকট প্রত্যাবর্তন করবে, তখন তাদেরকে সতর্ক করতে পারে, যাতে তারা (গুনাহ থেকে) বেঁচে থাকে। সুরা তাওবা : ১২২

যুদ্ধে অংশ গ্রহন ফরজে আইন নাকি কিফায়া উহা নির্ভর করে যুদ্ধের প্রয়োজনীয়তা উপর। উপরে বর্নতি সুরা তাওয়ার ৪১ আয়াতে নাজিল হলে সকলে মনে করল এখান থেকে নারী আর শিশু বাদে সকলের জন্য সর্বস্থায় যুদ্ধ করা ফরজে আইন। কিন্তু যখন তাওবার ১২২ আয়াত নাজিল হয় ঘোষনা করা হল- আর মুমিনদের জন্য সংগত নয় যে, তারা সকলে একসঙ্গে অভিযানে বের হবে তখন উপরের ৪১ নং আয়াতে হুকুর রহিত হয়ে যায়। আসলে দুটি আয়াতে হুকুম সব সময়ের জন্য আলাদ আলাদাভাবে থাকবে।  অর্থাৎ যুদ্ধের প্রয়োজনে সকলকে বা একটি দলকে অংশ গ্রহন করতে হবে। যুদ্ধের সময় ইসলামি রাষ্ট্র বা তার নির্বাচিত আমির থেকে যার উপর যে হুকুম আসবে তার তা মান্য করা ফরজ হবে।

ননাজাত প্রপ্ত দলের বৈশিষ্ট্য-০৯ ::  সমাজ ও রাষ্ট্রিয় ক্ষেত্রে কুরআন সুন্নাহ আইন প্রতিষ্ঠার করার চরম প্রচেষ্টা চালাবে।

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

১। সমাজ ও রাষ্ট্রে দ্বীন প্রতিষ্ঠার হুকুম-

সমাজ ও রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে কুরআন ও সুন্নাহর আইন বাস্তবায়ন করা ফরজ। এটি ইসলামের মৌলিক নির্দেশনার অংশ এবং মুসলিম উম্মাহর উপর আল্লাহর পক্ষ থেকে আরোপিত একটি দায়িত্ব। যদি কোনো মুসলিম শাসক বা রাষ্ট্র এই ফরজ দায়িত্ব পালন না করে, তবে তারা আল্লাহর নিকট কঠিন জবাবদিহির সম্মুখীন হবে। ইসলামী আইন বাস্তবায়নের মাধ্যমে সমাজে ন্যায়বিচার, শান্তি এবং কল্যাণ নিশ্চিত করা হয়। এর প্রতি নির্দেশনা সরাসরি কুরআন ও হাদিসে এসেছে।

 ক। আল্লাহর বিধান অনুযায়ী বিচার করা ফরজ-

মহান আল্লাহ বলেন-

وَمَنۡ لَّمۡ یَحۡکُمۡ بِمَاۤ اَنۡزَلَ اللّٰہُ فَاُولٰٓئِکَ ہُمُ الۡکٰفِرُوۡنَ

আর যারা আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে ফয়সালা করে না, তারাই কাফির। সূরা  মায়েদা : ৪৪

আল্লাহ তায়ালা বলেন,

‌ۚ وَمَن لَّمۡ يَحۡڪُم بِمَآ أَنزَلَ ٱللَّهُ فَأُوْلَـٰٓٮِٕكَ هُمُ ٱلظَّـٰلِمُونَ

অর্থঃ যেসব লোক আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন, তদনুযায়ী ফয়সালা করে না, তারাই জালেম। সুরা মায়েদা : ৪৫

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

  ۚ إِلَى ٱللَّهِ مَرۡجِعُڪُمۡ جَمِيعً۬ا فَيُنَبِّئُكُم بِمَا كُنتُمۡ فِيهِ تَخۡتَلِفُونَ

অর্থঃ যারা আল্লাহ্ যা অবতীর্ণ করেছেন, তদনুযায়ী ফয়সালা করে না, তারাই ফাসেক। সুরা মায়েদা : ৪৭

এখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, আল্লাহর আইন অনুযায়ী বিচার না করলে এটি বড় পাপ এবং তা কাফিরত্বের পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে। তাই যখনই কোন দল কে আল্লাহ প্রদত্ত কুরআন সুন্নাহ অনুসারে বিচার ফয়সালা করতে দেখবেন, তখন মনে করবের এরাই হকের উপর আছে, এরাই আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের অনুসরী সত্য পন্থী বা হক দল। অপর পক্ষে বাতিল ফির্কা হল, যারা আল্লাহ প্রদত্ত কুরআন সুন্নাহ অনুসারে বিচার ফয়সালা করে না বরং এরা আল্লাহ প্রদত্ত কুরআন সুন্নাহর বিচারের বিরোধীতা করে করে।

খ। ইসলামি রাষ্ট্র সর্বাস্থায় শরীয়ত মত বিচার আল্লাহর নির্দেশ-

উবাদা ইবনুস সামিত (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

‏ أَقِيمُوا حُدُودَ اللَّهِ فِي الْقَرِيبِ وَالْبَعِيدِ وَلاَ تَأْخُذْكُمْ فِي اللَّهِ لَوْمَةُ لاَئِمٍ

তোমরা কাছের ও দূরের সকলের উপর আল্লাহ নির্ধারিত হদ্দ কার্যকর করো। আল্লাহর কাজে কোন সমালোচকের সমালোচনা যেন তোমাদেরকে বিব্রত না করে। ইবনে মাজাহ : ২৫৪০, মিশকাত : ৩৫৮৭, সহিহাহ : ৬৭০, ১৯৪২।

আয়িশাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। মাখযুমী গোত্রের এক মহিলার ব্যাপারে কুরাইশ বংশের লোকদের খুব দুশ্চিন্তায় ফেলে দিয়েছিল যে চুরি করেছিল। সাহাবাগণ বললেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে কে কথা বলতে পারবে? আর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রিয় জন উসামাহ (রাঃ) ছাড়া এটা কেউ করতে পারবে না। তখন উসামাহ (রাঃ) রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে কথা বললেন। এতে তিনি বললেনঃ তুমি আল্লাহর শাস্তির বিধানের ব্যাপারে সুপারিশ করছ? এরপর তিনি দাঁড়িয়ে খুৎবাহ দিলেন এবং বললেনঃ হে মানবমন্ডলী! নিশ্চয়ই তোমাদের আগের লোকেরা গুমরাহ হয়ে গিয়েছে। কারণ, কোন সম্মানী ব্যক্তি যখন চুরি করত তখন তারা তাকে ছেড়ে দিত। আর যখন কোন দুর্বল লোক চুরি করত তখন তার উপর শরীয়াতের শাস্তি কায়েম করত। আল্লাহর কসম! মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কন্যা ফাতিমাও যদি চুরি করে তবে অবশ্যই মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর হাত কেটে দেবে। সহিহ বুখারি : ৬৭৮৮

(৩) শরিয়াতের বিধান প্রণয়নে আল্লাহর সাথে গাইরুল্লাহকে সম্পৃক্ত করা শিরকি কাজ-

রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবার চলার নিয়ম নীতি, পদ্ধতি নির্দেশনা ও বিধান প্রণয়নের অধিকার সবই একমাত্র মহান আল্লাহর জন্যই সংরক্ষিত। ইসলামের দৃষ্টিতে এ বিষয়ে অন্য কারো সামান্য অধিকার নেই।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

أَمۡ لَهُمۡ شُرَڪَـٰٓؤُاْ شَرَعُواْ لَهُم مِّنَ ٱلدِّينِ مَا لَمۡ يَأۡذَنۢ بِهِ ٱللَّهُ‌ۚ وَلَوۡلَا ڪَلِمَةُ ٱلۡفَصۡلِ لَقُضِىَ بَيۡنَہُمۡ‌ۗ وَإِنَّ ٱلظَّـٰلِمِينَ لَهُمۡ عَذَابٌ أَلِيمٌ۬

তাদের কি এমন কতকগুলি দেবতা আছে যারা তাদের জন্য বিধান দিয়েছে, এমন দীনের যার অনুমতি আল্লাহ দেননি? ফাইসালার ঘোষণা না থাকলে, তাদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েই যেত। নিশ্চয়ই যালিমদের জন্য রয়েছে বেদনাদায়ক শাস্তি। সুরা শুরা : ২১

তবে দুনিয়া সংস্লিষ্ট কিছু নতুন নতুন বিষয়ে যে গুলি এড়িয়ে দ্বীন পালন করা সম্ভব নয়। আবার সরাসরি আল্লাহ তাআলা সে বিধান গুলি স্পষ্ট বলে দেননি। তখন কুরআন সুন্নাহর ভিত্তিতে শরীয়ত সম্মত কোনো বিধান প্রণয়ন করাতে কোনো দোষ নেই। কিন্তু মানুষ আল্লাহর বিধানকে সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাগ করে মনগড় বিধার রচনা করে এবং তা দিয়েই বাষ্ট্র পরিচালনা করে তবে তা হারাম কাজ হবে।  

২। সমাজ ও রাষ্ট্রে দ্বীন প্রতিষ্ঠার গুরুত্ব-

সমাজ ও রাষ্ট্রে দ্বীন (ইসলামিক জীবনব্যবস্থা) প্রতিষ্ঠার গুরুত্ব অত্যন্ত ব্যাপক ও গভীর। ইসলাম কেবল একটি ব্যক্তিগত ধর্মই নয়, বরং এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা যা ব্যক্তিগত, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সঠিক দিশা দেখায়। ইসলামের বিধান ও শরীআহ অনুযায়ী সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনা করলে সমাজে শান্তি, ন্যায়, এবং কল্যাণ প্রতিষ্ঠিত হয়। ইসলামে দ্বীনের প্রতিষ্ঠা কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা কুরআন ও হাদিসের বিভিন্ন দৃষ্টান্তে পাওয়া যায়। নিচে সমাজ ও রাষ্ট্রে দ্বীন প্রতিষ্ঠার কিছু গুরুত্ব তুলে ধরা হলো-

(১) সমাজ ও রাষ্ট্রে দ্বীন প্রতিষ্ঠা হলে, রাষ্ট্রই আল্লাহর হুকম বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করবে-

মহান আল্লাহ বলেন-

اَلَّذِیۡنَ اِنۡ مَّکَّنّٰہُمۡ فِی الۡاَرۡضِ اَقَامُوا الصَّلٰوۃَ وَاٰتَوُا الزَّکٰوۃَ وَاَمَرُوۡا بِالۡمَعۡرُوۡفِ وَنَہَوۡا عَنِ الۡمُنۡکَرِ ؕ وَلِلّٰہِ عَاقِبَۃُ الۡاُمُوۡرِ

তারা এমন যাদেরকে আমি যমীনে ক্ষমতা দান করলে তারা সালাত কায়েম করবে, যাকাত দেবে এবং সৎকাজের আদেশ দেবে ও অসৎকাজ থেকে নিষেধ করবে; আর সব কাজের পরিণাম আল্লাহরই অধিকারে। সুরা হজ : ৪১

(২) সমাজ ও রাষ্ট্রে ইনসাফ প্রতিষ্ঠিত হবে-

মহান আল্লাহ বলেন-

ؕ فَاِنۡ جَآءُوۡکَ فَاحۡکُمۡ بَیۡنَہُمۡ اَوۡ اَعۡرِضۡ عَنۡہُمۡ ۚ وَاِنۡ تُعۡرِضۡ عَنۡہُمۡ فَلَنۡ یَّضُرُّوۡکَ شَیۡئًا ؕ وَاِنۡ حَکَمۡتَ فَاحۡکُمۡ بَیۡنَہُمۡ بِالۡقِسۡطِ ؕ اِنَّ اللّٰہَ یُحِبُّ الۡمُقۡسِطِیۡنَ

সুতরাং যদি তারা তোমার কাছে আসে, তবে তাদের মধ্যে ফয়সালা কর অথবা তাদেরকে উপেক্ষা কর আর যদি তাদেরকে উপেক্ষা কর, তবে তারা তোমার কিছু ক্ষতি করতে পারবে না, আর যদি তুমি ফয়সালা কর, তবে তাদের মধ্যে ফয়সালা কর ন্যয়ভিত্তিক। নিশ্চয় আল্লাহ ন্যয়পরায়ণদেরকে ভালবাসেন। সূরা মায়েদা : ৪২

মহান আল্লাহ বলেন-

 ۙ وَاِذَا حَکَمۡتُمۡ بَیۡنَ النَّاسِ اَنۡ تَحۡکُمُوۡا بِالۡعَدۡلِ ؕ اِنَّ اللّٰہَ نِعِمَّا یَعِظُکُمۡ بِہٖ ؕ اِنَّ اللّٰہَ کَانَ سَمِیۡعًۢا بَصِیۡرًا

এবং যখন তোমরা লোকদের মধ্যে বিচার মীমাংসা কর তখন ন্যায় বিচার কর; অবশ্যই আল্লাহ তোমাদেরকে উত্তম উপদেশ দান করছেন; নিশ্চয়ই আল্লাহ শ্রবণকারী, পরিদর্শক। সুনা নিসা : ৫৮

মহান আল্লাহ বলেন-

ثُمَّ جَعَلۡنٰکَ عَلٰی شَرِیۡعَۃٍ مِّنَ الۡاَمۡرِ فَاتَّبِعۡہَا وَلَا تَتَّبِعۡ اَہۡوَآءَ الَّذِیۡنَ لَا یَعۡلَمُوۡنَ

তারপর আমি তোমাকে দীনের এক বিশেষ বিধানের উপর প্রতিষ্ঠিত করেছি। সুতরাং তুমি তার অনুসরণ কর এবং যারা জানে না তাদের খেয়াল খুশীর অনুসরণ করো না। সূরা -জাসিয়া : ১৮

(৩) মাবন রচিত শরীয়ত পরিপন্থী কুরফি বিচার বিতারিত হবে-

হক পন্থীদলটির অন্যতম বৈশিষ্ট হল, তারা শরীয়ত পরিপন্থী মানব রচিত আইন ও বিচারের বিরোধিতা করে। তারা সর্বক্ষেত্রে মানব জাতিকে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের দেয়া বিধান অনুযায়ী বিচার কায়েম করার প্রতি আহ্বান করে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

أَلَا لَهُ ٱلۡخَلۡقُ وَٱلۡأَمۡرُ‌ۗ تَبَارَكَ ٱللَّهُ رَبُّ ٱلۡعَـٰلَمِينَ

অর্থঃ জেনে রাখো, সৃষ্টি তারই এবং নির্দেশও তাঁরই৷ আল্লাহ বড়ই বরকতের অধিকারী। তিনি সমগ্র বিশ্ব জাহানের মালিক ও প্রতিপালক। সুরা আরাফ : ৫৪

আমাদের প্রিয় নবী যার মাধ্যমে আমাদের দ্বীন দান করা হয়েছে তাকেও হালাল হারাম করার নিজেস্ব কোন ক্ষমতা দান করা হয় রাই। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

يَـٰٓأَيُّہَا ٱلنَّبِىُّ لِمَ تُحَرِّمُ مَآ أَحَلَّ ٱللَّهُ لَكَ‌ۖ تَبۡتَغِى مَرۡضَاتَ أَزۡوَٲجِكَ‌ۚ وَٱللَّهُ غَفُورٌ۬ رَّحِيمٌ۬ (١)

অর্থঃ হে নবী, আল্লাহ তোমার জন্য যা হালাল করেছেন তোমার স্ত্রীদের সন্তুষ্টি কামনায় তুমি কেন তা হারাম করছ? আর আল্লাহ অতীব ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। (সুরা তাহরিম  : ১

(৪) বিচারের সঠিক বাস্তবায়ন হবে।

(৫) ভ্রাতৃত্ব ও ঐক্য প্রতিষ্ঠা হবে।

(৬) অনৈতিকতা ও দুর্নীতির প্রতিরোধ হবে।

(৭) বিশ্বস্ত রাষ্ট্রের সৃষ্টি হবে।

(৮) পরকালের নাজাত পাবে।

(৯) সমাজে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা হবে।

২। সমাজ ও রাষ্ট্রে দ্বীন প্রতিষ্ঠায় করণীয়-

সমাজ ও রাষ্ট্রে দ্বীন প্রতিষ্ঠা করার জন্য কুরআন ও সুন্নাহর নির্দেশনা অনুযায়ী চেষ্টা চালাতে হবে। দ্বীন প্রতিষ্ঠার চেষ্টার ফলে, মুনিদের দুনিয়া ও আখিরাতে সফলতা অর্জন করবে। এই জন্য তাকে নিচের কাজগুলো করতে হবে।

(১) রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা প্রদানে আল্লাহ দুটি শর্ত দিয়েছেন-

মহান আল্লাহ তাআলা ওয়াদা করছেন তিনি অবশ্য দুনিয়াতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দান করবেন। কিন্তু তিনি দুটি শর্ত আরোপ করছেন।

১। ঈমান আনতে হবে।

২। আমলে সালেহা করতে হবে।

নিশ্চয়ই আল্লাহ প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেন। কাজেই বান্দাকে উক্ত দুটি কাজ করে আল্লাহর শর্ত পূরণ করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা অর্জনের চেষ্টা করতে হবে। যেমন নবি (সা.) এবং তার একনিষ্ঠ সাহাবিগন যখন উক্ত শর্ত পূরণ করলেন তখনই আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দিলেন।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَعَدَ ٱللَّهُ ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ مِنكُمۡ وَعَمِلُواْ ٱلصَّـٰلِحَـٰتِ لَيَسۡتَخۡلِفَنَّهُمۡ فِى ٱلۡأَرۡضِ ڪَمَا ٱسۡتَخۡلَفَ ٱلَّذِينَ مِن قَبۡلِهِم

আল্লাহ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তোমাদের মধ্য থেকে যারা ঈমান আনবে ও সৎ কাজ করবে তাদেরকে তিনি পৃথিবীতে ঠিক তেমনিভাবে খিলাফত দান করবেন যেমন তাদের পূর্বে অতিক্রান্ত লোকদেরকে দান করেছিলেন। সুরা নুর : ৫৫

(২) দ্বীন প্রতিষ্ঠায় ক্ষমতা অনুসারে চেষ্টা চালাবে-

ইবনু উমার (রাযিঃ) এর সূত্রে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বর্ণিত। তিনি বলেন-

أَلاَ كُلُّكُمْ رَاعٍ وَكُلُّكُمْ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ فَالأَمِيرُ الَّذِي عَلَى النَّاسِ رَاعٍ وَهُوَ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ وَالرَّجُلُ رَاعٍ عَلَى أَهْلِ بَيْتِهِ وَهُوَ مَسْئُولٌ عَنْهُمْ وَالْمَرْأَةُ رَاعِيَةٌ عَلَى بَيْتِ بَعْلِهَا وَوَلَدِهِ وَهِيَ مَسْئُولَةٌ عَنْهُمْ وَالْعَبْدُ رَاعٍ عَلَى مَالِ سَيِّدِهِ وَهُوَ مَسْئُولٌ عَنْهُ أَلاَ فَكُلُّكُمْ رَاعٍ وَكُلُّكُمْ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ ‏

তোমাদের প্রত্যেকেই এক একজন দায়িত্ববান এবং প্রত্যেকেই তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। আমীর বা নেতা তার অধীনস্থ লোকদের উপর দায়িত্ববান এবং সে তাদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। প্রত্যেক ব্যক্তি তার পরিবারের লোকদের উপর দায়িত্বশীল, সে তা সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। স্ত্রী স্বীয় স্বামীর বাড়ী ও সন্তানের উপর দায়িত্ববান, সে সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। গোলাম তার মুনিবের মাল-সম্পদের উপর দায়িত্ববান, সে সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। ওহে! তোমাদের প্রত্যেকেই (স্ব-স্ব স্থানে) একজন দায়িত্ববান এবং তোমাদের প্রত্যেকেই তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। সহিহ মুসলিম : ১৮২৯

তারিক ইবনু শিহাব (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, ঈদের সালাত এর পুর্বে মারওয়ান ইবনু হাকাম সর্বপ্রথম খুতবা প্রদান আরম্ভ করেন। তখন এক ব্যাক্তি দাঁড়িয়ে বললেন, খুতবার আগে হবে সালাত। মারওয়ান বললেন, এ নিয়ম রহিত করা হয়েছে। এতে আবূ সাঈদ (রাঃ) বললেন, ‘এ ব্যাক্তি তো কর্তব্য পালন করেছে’। আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি-

 مَنْ رَأَى مِنْكُمْ مُنْكَرًا فَلْيُغَيِّرْهُ بِيَدِهِ فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِلِسَانِهِ فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِقَلْبِهِ وَذَلِكَ أَضْعَفُ الإِيمَانِ ‏

তোমাদের কেউ যদি অন্যায় কাজ দেখে, তাহলে সে যেন হাত দ্বারা এর সংশোধন করে দেয়। যদি এর ক্ষমতা না থাকে, তাহলে মুখের দ্বারা, যদি তাও সম্ভব না হয়, তাহলে অন্তর দ্বারা (উক্ত কাজকে ঘূণা করবে), আর এটাই ঈমানের নিম্নতম স্তর। সহিহ মুসলিম : ৪৯

(৩) আল্লাহই একমাত্র রাষ্ট্র ক্ষমতা দিতে পারেন বিধান দোয়া করা-

রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা লাভর জন্য সবাই লালায়িত। কিন্তু কে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা একছন্ন মালিক, নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ। অনেকে বলে থাকেন, “জনগণই সকল ক্ষমতার উত্স”। আল্লাহকে একমাত্র সকল ক্ষমতার উত্স মেনে নিয়ে উক্ত কথাটি বললে ছোট শির্ক হবে কিন্তু উক্ত কথাটি মনে প্রাণে বিশ্বাস করলে বড় শির্ক এতে কোন সন্দেহ নেই।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَٱللَّهُ يُؤۡتِى مُلۡڪَهُ ۥ مَن يَشَآءُ‌ۚ وَٱللَّهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ۬

আর আল্লাহ তাঁর রাজ্য যাকে ইচ্ছা দান করার ইখতিয়ার রাখেন ৷ আল্লাহ অত্যন্ত ব্যাপকতার অধিকারী এবং সবকিছুই তাঁর জ্ঞান সীমার মধ্যে রয়েছে। সুরা বাকারা : ২৪৭

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

 قُلِ ٱللَّهُمَّ مَـٰلِكَ ٱلۡمُلۡكِ تُؤۡتِى ٱلۡمُلۡكَ مَن تَشَآءُ وَتَنزِعُ ٱلۡمُلۡكَ مِمَّن تَشَآءُ وَتُعِزُّ مَن تَشَآءُ وَتُذِلُّ مَن تَشَآءُ‌ۖ بِيَدِكَ ٱلۡخَيۡرُ‌ۖ إِنَّكَ عَلَىٰ كُلِّ شَىۡءٍ۬ قَدِيرٌ۬

বল, হে আল্লাহ! বিশ্ব জাহানের মালিক! তুমি যাকে চাও রাষ্ট্রক্ষমতা দান করো এবং যার থেকে চাও রাষ্ট্রক্ষমতা ছিনিয়ে নাও৷ যাকে চাও মর্যাদা ও ইজ্জত দান করো এবং যাকে চাও লাঞ্ছিত ও হেয় করো৷ কল্যাণ তোমরা হাতেই নিহিত ৷ নিঃসন্দেহে তুমি সবকিছুর ওপর শক্তিশালী। সুরা আল ইমরান : ২৬

যেহেতু তিনিই একমাত্র ক্ষমতা প্রদানে মালিক তাই চরম প্রচেষ্টার পাশাপাশি আল্লাহর নিকট সাহায্য চাইতে হবে। মহান আল্লাহ চাইলে আমাদের চেষ্টার ফলে বা আমাদের চেষ্টা ছাড়াও দ্বীন প্রতিষ্ঠা করে দিতে পারেন।

নাজাত প্রপ্ত দলের বৈশিষ্ট্য-১০ ::  দ্বীন পালনে মধ্যপন্থা অবলম্বন করবে।

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

ইসলাম ধর্মে মধ্যপন্থা (وَسَطِيَّةُ) পালনে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এটি ব্যক্তিগত জীবন, ইবাদত, সামাজিক আচরণ এবং অর্থনৈতিক কার্যক্রমসহ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। পৃথিবীর একমাত্র হক বা সত্য দ্বীন ইসলাম মানুষকে চরমপন্থা পরিহার করে মধ্যপন্থা করার ব্যাপারে জোড় তাগিদ দিয়েছে। আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাতের অন্যতম ভাল বৈশিষ্ট হল ইসলামের সকল ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা অবলম্বন করা। পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ইত্যাদি সকল ক্ষেত্রেই ইসলাম যে মধ্যপন্থা অবলম্বনের জন্য শিক্ষা দেয় এবং এর আলোকে তাদের জীবন সাজায়। ইসলাম কোন ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি যেমন পছন্দ করে না, ঠিক তেমনি ইসলামের বিধি-বিধান পালনে ছাড়াছাড়িও সমর্থন করে না। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অপচয়কে নিরুত্সাহ প্রদান করে আবার কৃপনের শাস্তি প্রদানের কথা বলে। একজন সাধারন মুসলিমকেও জীবনযাপনের ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা অবলম্বনের শিক্ষা দেয়। এমনকি বন্ধুত্বের ক্ষেত্রেও মধ্যপন্থা অবলম্বন অবলম্বনের শিক্ষা দেয়। ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, মানুষ কোনো ক্ষেত্রে সীমালঙ্ঘন না করে সর্বক্ষেত্রে ভারসম্য রক্ষা করে চলবে। আল্লাহ তায়ালা এই উম্মতকে মধ্যপন্থী উম্মত বানিয়েছেন। কুরআন এবং হাদিসের আলোকে মধ্যপন্থার গুরুত্ব ও প্রয়োগ নিম্নে আলোচনা করা হলো-

১. কুরআনে মধ্যপন্থার নির্দেশনা-

আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে মধ্যপন্থা অবলম্বনের আদেশ দিয়েছেন। মহান আল্লাহ বলেন-

وَکَذٰلِکَ جَعَلۡنٰکُمۡ اُمَّۃً وَّسَطًا لِّتَکُوۡنُوۡا شُہَدَآءَ عَلَی النَّاسِ وَیَکُوۡنَ الرَّسُوۡلُ عَلَیۡکُمۡ شَہِیۡدًا ؕ

আর এভাবেই আমি তোমাদেরকে মধ্যপন্থী উম্মত বানিয়েছি, যাতে তোমরা মানুষের উপর সাক্ষী হও এবং রাসূল সাক্ষী হন তোমাদের উপর। সূরা বাকারাহ : ১৪৩

মহান আল্লাহ বলেন-

وَالَّذِیۡنَ اِذَاۤ اَنۡفَقُوۡا لَمۡ یُسۡرِفُوۡا وَلَمۡ یَقۡتُرُوۡا وَکَانَ بَیۡنَ ذٰلِکَ قَوَامًا

আর যখন তারা ব্যয় করে তখন তারা অপব্যয় করেনা এবং কার্পন্যও করেনা; বরং তারা আছে এতদুভয়ের মাঝে মধ্যম পন্থায়। সুরা ফুরকান : ৬৭

২. হাদিসে মধ্যপন্থার নির্দেশনা

আবূ হুরাইরাহ (রাযি.) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

إِنَّ الدِّينَ يُسْرٌ، وَلَنْ يُشَادَّ الدِّينَ أَحَدٌ إِلاَّ غَلَبَهُ، فَسَدِّدُوا وَقَارِبُوا وَأَبْشِرُوا، وَاسْتَعِينُوا بِالْغَدْوَةِ وَالرَّوْحَةِ وَشَىْءٍ مِنَ الدُّلْجَةِ

নিশ্চয়ই দ্বীন সহজ। দ্বীন নিয়ে যে বাড়াবাড়ি করে দ্বীন তার উপর জয়ী হয়। কাজেই তোমরা মধ্যপন্থা অবলম্বন কর এবং (মধ্যপন্থার) নিকটে থাক, আশান্বিত থাক এবং সকাল-সন্ধ্যায় ও রাতের কিছু অংশে (’ইবাদাত সহযোগে) সাহায্য চাও। সহিহ বুখারি : ৩৯, ৭২৩৫

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছিঃ তোমাদের কোন ব্যক্তিকে তার নেক ’আমল জান্নাতে প্রবেশ করাতে পারবে না। লোকজন প্রশ্ন করলঃ হে আল্লাহর রাসূল! আপনাকেও নয়? তিনি বললেনঃ আমাকেও নয়, যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ আমাকে তাঁর করুণা ও দয়া দিয়ে আবৃত না করেন। কাজেই মধ্যমপন্থা গ্রহণ কর এবং নৈকট্য লাভের চেষ্টা চালিয়ে যাও। আর তোমাদের মধ্যে কেউ যেন মৃত্যু কামনা না করে। কেননা, সে ভাল লোক হলে (বয়স দ্বারা) তার নেক ’আমল বৃদ্ধি হতে পারে। আর খারাপ লোক হলে সে তওবা করার সুযোগ পাবে। সহিহ বুখারি :  ৫৬৭৩

আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কিয়ামতের দিন নূহ আলাইহিস সালাম কে (আল্লাহর সমীপে) হাযির করে জিজ্ঞাসা করা হবে, তুমি কি (দ্বীনের দাওয়াত) পৌছে দিয়েছ? তখন তিনি বলবেন, হ্যাঁ। হে আমার পরওয়ারদিগার। এরপর তাঁর উম্মতকে জিজ্ঞাসা করা হবে, তোমাদের কাছে নূহ (দাওয়াত) পৌছিয়েছে কি? তারা সবাই বলে উঠবে, আমাদের কাছে কোন ভীতি প্রদর্শকই (নাবী ও রাসুল) আসেনি। তখন নূহ আলাইহিস সালাম কে বলা হবে, তোমার (দাবির পক্ষে) কোন সাক্ষী আছে কি? তিনি বলবেন, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর উম্মতগণই আমার সাক্ষী। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তোমাদেরকে তখন নিসে আসা হবে এবং তোমরা নূহ আলাইহিস সালাম এর পক্ষে সাক্ষ্য দেবে। এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ পাকের নিম্নোক্ত বাণী পাঠ করলেন-

وَكَذَلِكَ جَعَلْنَاكُمْ أُمَّةً وَسَطًا لِّتَكُونُواْ شُهَدَاء عَلَى النَّاسِ وَيَكُونَ الرَّسُولُ عَلَيْكُمْ شَهِيدًا

এভাবে আল্লাহ তোমাদেরকে মধ্যমপন্থী উম্মাতে নির্ধারণ করেছেন, (বাকারা-১৪৩)। তাহলে তোমরা মানব জাতির জন্য সাক্ষী হতে পারবে আর রাসুল তোমাদের জন্য সাক্ষী হবেন। সহিহ বুখারি : ৭৩৪৯

৩. মধ্যপন্থার বিভিন্ন ক্ষেত্র-

মধ্যপন্থা (وَسَطِيَّةُ) ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি, যা ভারসাম্যপূর্ণ জীবনযাপনের মাধ্যমে চরমপন্থা থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দেয়। ইসলাম প্রতিটি ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা অবলম্বন করার আহ্বান জানিয়েছে। এটি জীবনের সকল ক্ষেত্রেই ভারসাম্য ও ন্যায় বজায় রাখতে সহায়ক। কুরআন ও হাদিসে বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে মধ্যপন্থার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। নিচে কুরআন ও হাদিসের আলোকে মধ্যপন্থার বিভিন্ন ক্ষেত্র তুলে ধরা হলো:

(১) ইবাদতে মধ্যপন্থা অবলম্বন করা-

ইসলাম ইবাদতে ভারসাম্য রাখতে নির্দেশ দেয়। ইবাদত করতে গিয়ে পার্থিব দায়িত্ব বা নিজের স্বাস্থ্যের ক্ষতি করা নিষেধ। ভারসাম্য রেখে সালাত সিয়াম আদায় করার নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে।

ক। সালাত সিয়াম ও বিবাহে মধ্যপন্থা-

আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, তিন জনের একটি দল নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ’ইবাদাত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করার জন্য নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্ত্রীদের বাড়িতে আসল। যখন তাঁদেরকে এ সম্পর্কে জানানো হলো, তখন তারা ’ইবাদাতের পরিমাণ কম মনে করল এবং বলল, নবীসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে আমাদের তুলনা হতে পারে না। কারণ, তাঁর আগের ও পরের সকল গুনাহ্ ক্ষমা ক’রে দেয়া হয়েছে। এমন সময় তাদের মধ্য থেকে একজন বলল, আমি সারা জীবন রাতভর সালাত আদায় করতে থাকব। অপর একজন বলল, আমি সব সময় সওম পালন করব এবং কক্ষনো বাদ দিব না।

অপরজন বলল, আমি নারী সংসর্গ ত্যাগ করব, কখনও বিয়ে করব না। এরপর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের নিকট এলেন এবং বললেন, ’’তোমরা কি ঐ সব লোক যারা এমন এমন কথাবার্তা বলেছ? আল্লাহর কসম! আমি আল্লাহকে তোমাদের চেয়ে বেশি ভয় করি এবং তোমাদের চেয়ে তাঁর প্রতি বেশিঅনুগত; অথচ আমি সওম পালন করি, আবার তা থেকে বিরতও থাকি। সালাত আদায় করি এবং নিদ্রা যাই ও মেয়েদেরকে বিয়েও করি। সুতরাং যারা আমার সুন্নাতের প্রতি বিরাগ পোষণ করবে, তারা আমার দলভুক্ত নয়। সহিহ বুখারি : ৫০৬৩, সহিহ মুসলিম : ১৪০১

খ। সফরের সময় সিয়ামে মধ্যপন্থা-

মহান আল্লাহ প্রতিটি ইবাদতে মধ্যপন্থা জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। এমনি ভাবে অসুস্থ ও সফরে থাকা কালীন সময় সিয়াম ছেড়ে দিতে নির্দেশ প্রদান করেছেন। সুস্থ হলে বা সফর শেষ হলে সুবিধা মহ আদয়া করে নিতে বলেছেন। তিনি ইরশাদ করেনঃ যেমনঃ মহান আল্লাহ বলেন,

أَيَّامًا مَّعْدُودَاتٍ فَمَن كَانَ مِنكُم مَّرِيضًا أَوْ عَلَى سَفَرٍ فَعِدَّةٌ مِّنْ أَيَّامٍ أُخَرَ وَعَلَى الَّذِينَ يُطِيقُونَهُ فِدْيَةٌ طَعَامُ مِسْكِينٍ فَمَن تَطَوَّعَ خَيْرًا فَهُوَ خَيْرٌ لَّهُ وَأَن تَصُومُواْ خَيْرٌ لَّكُمْ إِن كُنتُمْ تَعْلَمُونَ

অর্থঃ গণনার কয়েকটি দিনের জন্য অতঃপর তোমাদের মধ্যে যে, অসুখ থাকবে অথবা সফরে থাকবে, তার পক্ষে অন্য সময়ে সে রোজা পূরণ করে নিতে হবে। আর এটি যাদের জন্য অত্যন্ত কষ্ট দায়ক হয়, তারা এর পরিবর্তে একজন মিসকীনকে খাদ্যদান করবে। যে ব্যক্তি খুশীর সাথে সৎকর্ম করে, তা তার জন্য কল্যাণ কর হয়। আর যদি রোজা রাখ, তবে তোমাদের জন্যে বিশেষ কল্যাণকর, যদি তোমরা তা বুঝতে পার। সুরা বাকারা :১৮৪

মহান আল্লাহ তায়ালার পক্ষ, অসুস্থ ব্যক্তি, সফরে থাকা ব্যক্তি বা মুসাফির, হায়েজ-নেফাস আক্রান্ত নারী, গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী নারী, এবং দুর্ঘটনায় পতিত বা বিপদগ্রস্ত লোককে উদ্ধারকাজে নিয়োজিক ব্যক্তি উপর সিয়াম পালন করা সাময়িকভাবে স্থগিত রেখেছেন। এখনে মহান আল্লাহ আমাদের জন্য তার হুকুম সিথিল করে মধ্যপন্থায় সমাধান দিয়েছেন।

জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, মক্কা বিজয়ের বছর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কার উদ্দেশ্যে রাওয়ানা হন। তিনি রোযা রাখেন এবং লোকেরাও তার সাথে রোযা রাখে। কুরাউল গামীমে পৌছানোর পর তাকে বলা হল, রোযা রাখা লোকদের জন্য কষ্টকর হয়ে পড়েছে। আপনি কি করেন তারা সেই অপেক্ষায় আছে। আসরের নামায আদায়ের পর তিনি এক পেয়ালা পানি চেয়ে আনালেন এবং তা পান করলেন। তখন লোকেরা তার দিকে তাকিয়ে দেখছিল। ফলে তাদের মধ্যেকার কিছু লোক রোযা ভাঙ্গলো এবং কিছু লোক রোযা থাকল। তখনও কিছু লোক রোযা অবস্থায় আছে এ কথা তার নিকটে পৌছলে তিনি বললেনঃ এরী হচ্ছে অবাধ্য নাফরমান। সুনানে তিরমিজি : ৭১০

আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাকে বলেন- হে আবদুল্লাহ! আমি শুনেছি যে, তুমি দিনভর রোযা রাখ এবং সারা রাত সালাত আদায় কর। আমি বললাম, ঠিক তাই, ইয়া রাসূলুল্লাহ। তিনি বললেন, তা করো না। রোযা রাখ এবং ভাঙ, রাতের সালাত পড় এবং ঘুমাও। কারণ তোমার শরীরের তোমার ওপর হক রয়েছে, তোমার চোখের হক রয়েছে, তোমার স্ত্রীর হক রয়েছে এবং তোমার অতিথির হক রয়েছে। তোমার জন্য যথেষ্ট যে, তুমি প্রতি মাসে তিন দিন রোযা রাখো। এটি পুরো বছরের জন্য রোযার সমান।”

আমি বললাম, “ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমি আরও বেশি করতে পারি।”

তিনি বললেন, “তবে দাউদ (আঃ)-এর রোযা পালন কর, যা হলো এক দিন রোযা রাখা এবং এক দিন না রাখা। এর চেয়ে উত্তম কিছু নেই।”

(আবদুল্লাহ বলেন) বৃদ্ধ বয়সে তিনি বলতেন, “হায়! আমি যদি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) প্রদত্ত সহজতর বিধান গ্রহণ করতাম। সহীহ বুখারি : ১৯৭৫, ৩৯৬২, সহীহ মুসলিম : ১১৫৯

এই হাদিস থেকে ভারসাম্যপূর্ণ জীবনযাপন এবং ইবাদতের ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা অবলম্বনের গুরুত্ব স্পষ্ট হয়।

গ। জিকির ক্ষেত্রও মধ্যপন্থা অবলম্বন করতে হবেঃ

আজ কাল জিকির দেখলে মনে হয় সার্কাজ চলছে। এমন সার্কাজ সাহাবি, তাবেয়ী, তাবে-তাবেয়ীদের যুগে ছিন না। তাদের মধ্য এমন হাল হতনা। আমরা বিষয় হল ইবাদতের মধ্যপন্থা। জিকির মহান আল্লাহ একটি ইবাদাত কাজেই এর ও মধ্যপন্থা আছে। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ

وَاذْكُر رَّبَّكَ فِي نَفْسِكَ تَضَرُّعاً وَخِيفَةً وَدُونَ الْجَهْرِ مِنَ الْقَوْلِ بِالْغُدُوِّ وَالآصَالِ وَلاَ تَكُن مِّنَ الْغَافِلِينَ

অর্থঃ আর স্মরণ করতে থাক স্বীয় পালনকর্তাকে আপন মনে ক্রন্দনরত ও ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায় এবং এমন স্বরে যা চিৎকার করে বলা অপেক্ষা কম, সকালে ও সন্ধ্যায়। আর বে-খবর থেকো না। সুরা আরাফ : ২০৫

কিন্তু আমরা আজ নাচার তালে তালে, উচ্চ স্বরে জিকির করছি। কেউতো রিতিমত গান গেয়ে ঢোল পিটিয়ে জিকির করতে। এগুলো চরম বাড়াবাড়ি বিদআত।

ঘ। সালাত আদায়ে মধ্যপন্থা-

জাবির বিন আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এক খন্ড পাথরের উপর নামাযরত এক ব্যক্তিকে অতিক্রম করে চলে গেলেন। তিনি মক্কার এক প্রান্তে পৌঁছে সেখানে কিছুক্ষণ কাটালেন। অতঃপর তিনি ফেরার পথে ঐ লোকটিকে পূর্বাবস্থায় নামাযরত দেখতে পেলেন। তিনি দাঁড়িয়ে গেলেন এবং তাঁর দু’ হাত একত্র করে বলেনঃ হে লোকসকল! তোমরা মধ্যপন্থা অবলম্বন করো। কথাটা তিনি তিনবার বলেন। কেননা তোমরা অবসাদগ্রস্ত না হওয়া পর্যন্ত আল্লাহ প্রতিদান দিতে ক্ষান্ত হন না। সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪২৪১, সহিহহা : ১৭৬০

আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ্‌ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন-

اعْتَدِلُوا فِي السُّجُودِ، وَلَا يَبْسُطْ أَحَدُكُمْ ذِرَاعَيْهِ انْبِسَاطَ الْكَلْبِ»

তোমরা সিজদায় মধ্যপন্থা অবলম্বন কর। তোমাদের কেউ যেন, তার বাহুদ্বয় কুকুরের ন্যায় বিছিয়ে না রাখে। সুনানে : ১১১০

ইব্‌ন আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উচ্চস্বরে কুরআন পাঠ করতেন। আর মুশরিকরা যখন তাঁর আওয়াজ শ্রবণ করত তখন কুরআনকে এবং যিনি তা আনয়ন করেছেন তাঁকে গালি দিত। তখন নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিম্নস্বরে কুরআন পড়তে আরম্ভ করলেন যা সাহাবায়ে কিরাম শুনতে পেতেন না। তখন আল্লাহ তা’আলা নাযিল করলেন-

 وَلَا تَجۡہَرۡ بِصَلَاتِکَ وَلَا تُخَافِتۡ بِہَا وَابۡتَغِ بَیۡنَ ذٰلِکَ سَبِیۡلًا

‘আপনি আপনার সালাত উচ্চৈঃস্বরে পড়বেন না, আবার একেবারে নীরবেও পড়বেন না, বরং এতদুভয়ের মধ্যপন্থা অবলম্বন করুন’, সুরা ইসরা-১১০। সুনানে নাসায়ি : ১০১২

(২) ব্যয় ও অর্থনীতিতে মধ্যপন্থা:

ইসলামের শিক্ষা হলো জীবনে ব্যয়ের ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা অবলম্বন করা। অতিরিক্ত অপচয় ও কৃপণতা উভয়ই পরিত্যাজ্য। এই ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি ব্যক্তিগত সুখ-শান্তি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য।

মহান আল্লাহ বলেন-

وَالَّذِیۡنَ اِذَاۤ اَنۡفَقُوۡا لَمۡ یُسۡرِفُوۡا وَلَمۡ یَقۡتُرُوۡا وَکَانَ بَیۡنَ ذٰلِکَ قَوَامًا

আর যখন তারা ব্যয় করে তখন তারা অপব্যয় করেনা এবং কার্পন্যও করেনা; বরং তারা আছে এতদুভয়ের মাঝে মধ্যম পন্থায়। সুরা ফুরকান : ৬৭

মহান আল্লাহ বলেন-

وَلَا تَجۡعَلۡ یَدَکَ مَغۡلُوۡلَۃً اِلٰی عُنُقِکَ وَلَا تَبۡسُطۡہَا کُلَّ الۡبَسۡطِ فَتَقۡعُدَ مَلُوۡمًا مَّحۡسُوۡرًا

“তোমার হাতকে গলায় আটকে রেখো না (কৃপণতায় লিপ্ত হয়ো না), এবং সেটিকে পুরোপুরি খুলেও দিও না (অর্থাৎ অপচয়ে লিপ্ত হয়ো না), ফলে তুমি নিন্দিত ও হতাশ হয়ে পড়তে পারো। সুরা ইসরা : ২৯

এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে, যা কৃপণতা ও অপচয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার নির্দেশনা দেয়।

মধ্যপন্থার দুটি সীমারেখা। একটি হল অপচয় অপরটি হল কৃপনা। অপচয় এবং কৃপনা মাঝেই আয় ব্যয়ের মধ্যপন্থা নিহীত আছে। তাই আসুন দেখি এই অপচয় এবং কৃপনা সম্পর্কে ইসলাম কি বল?

ক। সম্পদের অপচয় করা-

অপচয় সম্পর্কে কুরআনে মহান আল্লাহ বলেন,

وَءَاتِ ذَا ٱلۡقُرۡبَىٰ حَقَّهُ ۥ وَٱلۡمِسۡكِينَ وَٱبۡنَ ٱلسَّبِيلِ وَلَا تُبَذِّرۡ تَبۡذِيرًا (٢٦) إِنَّ ٱلۡمُبَذِّرِينَ كَانُوٓاْ إِخۡوَٲنَ ٱلشَّيَـٰطِينِ‌ۖ وَكَانَ ٱلشَّيۡطَـٰنُ لِرَبِّهِۦ كَفُورً۬ا (٢٧)

অর্থঃ আত্নীয়-স্বজনকে তার হক দান কর এবং অভাবগ্রস্ত ও মুসাফিরকেও। এবং কিছুতেই অপব্যয় করো না। নিশ্চয় অপব্যয়কারীরা শয়তানের ভাই। শয়তান স্বীয় পালনকর্তার প্রতি অতিশয় অকৃতজ্ঞ। সুরা বনী-ইসরাঈল : ২৬-২৭

মহান আল্লাহ বলেন,

 كُلُواْ مِن ثَمَرِهِ إِذَا أَثْمَرَ وَآتُواْ حَقَّهُ يَوْمَ حَصَادِهِ وَلاَ تُسْرِفُواْ إِنَّهُ لاَ يُحِبُّ الْمُسْرِفِينَ

অর্থঃ এগুলোর ফল খাও, যখন ফলন্ত হয় এবং হক দান কর কর্তনের সময়ে এবং অপব্যয় করো না। নিশ্চয় তিনি অপব্যয়ীদেরকে পছন্দ করেন না।  সুরা আনয়াম :১৪১

মহান আল্লাহ বলেন,

*يَا بَنِي آدَمَ خُذُواْ زِينَتَكُمْ عِندَ كُلِّ مَسْجِدٍ وكُلُواْ وَاشْرَبُواْ وَلاَ تُسْرِفُواْ إِنَّهُ لاَ يُحِبُّ الْمُسْرِفِينَ*

অর্থঃ হে বনী-আদম! তোমরা প্রত্যেক নামাযের সময় সাজসজ্জা পরিধান করে নাও, খাও ও পান কর এবং অপব্যয় করো না। তিনি অপব্যয়ীদেরকে পছন্দ করেন না। সুরা আরাফ : ৩১

উপরে কুরআন কিছু আয়াত তুলে ধরলাম এ সম্পর্ক বহু সহিহ হাদিস আছে। কলরব বৃদ্ধির করানে সেগুলো উল্লেখ করলাম না।  শুধু কুরআন থেকেই আমরা সহজেই অপচয়ের খারাপ দিকটা বিঝতে পারলাম। এবার আসুন এর সম্পূর্ণ বিপরীত কৃপনতার দিকটাও জেনে নেই।

খ। সম্পদ ব্যয়ে কৃপনতা করা-

 কৃপণতার ভয়াবহতা উল্লেখ করে আল কোরআনে ইরশাদ হয়েছে-

وَلاَ يَحْسَبَنَّ الَّذِينَ يَبْخَلُونَ بِمَا آتَاهُمُ اللّهُ مِن فَضْلِهِ هُوَ خَيْرًا لَّهُمْ بَلْ هُوَ شَرٌّ لَّهُمْ سَيُطَوَّقُونَ مَا بَخِلُواْ بِهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَلِلّهِ مِيرَاثُ السَّمَاوَاتِ وَالأَرْضِ وَاللّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرٌ

অর্থঃ আল্লাহ তাদেরকে নিজের অনুগ্রহে যা দান করেছেন তাতে যারা কৃপণতা করে এই কার্পন্য তাদের জন্য মঙ্গলকর হবে বলে তারা যেন ধারণা না করে। বরং এটা তাদের পক্ষে একান্তই ক্ষতিকর প্রতিপন্ন হবে। যাতে তারা কার্পন্য করে সে সমস্ত ধন-সম্পদকে কিয়ামতের দিন তাদের গলায় বেড়ী বানিয়ে পরানো হবে। আর আল্লাহ হচ্ছেন আসমান ও যমীনের পরম সত্ত্বাধিকারী। আর যা কিছু তোমরা কর; আল্লাহ সে সম্পর্কে জানেন। ( সুরা ইমরান : ১৮০

মহান আল্লাহ আরও বলেন,

الَّذِينَ يَبْخَلُونَ وَيَأْمُرُونَ النَّاسَ بِالْبُخْلِ وَيَكْتُمُونَ مَا آتَاهُمُ اللّهُ مِن فَضْلِهِ وَأَعْتَدْنَا لِلْكَافِرِينَ عَذَابًا مُّهِينًا

অর্থঃ আর আল্লাহ এমন লোকদেরকেও পছন্দ করেন না, যারা কৃপণতা করে, অন্যদেরকেও কৃপণতা করার নির্দেশ দেয় এবং আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে যা কিছু দিয়েছেন সেগুলো গোপন করে৷ এই ধরনের অনুগ্রহ অস্বীকারকারী লোকদের জন্য আমি লাঞ্ছনাপূর্ণ শাস্তির ব্যবস্তা করে রেখেছি৷ সুরা নিসা : ৩৭

মহান আল্লাহ আরও বলেন,

هَاأَنتُمْ هَؤُلَاء تُدْعَوْنَ لِتُنفِقُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَمِنكُم مَّن يَبْخَلُ وَمَن يَبْخَلْ فَإِنَّمَا يَبْخَلُ عَن نَّفْسِهِ وَاللَّهُ الْغَنِيُّ وَأَنتُمُ الْفُقَرَاء وَإِن تَتَوَلَّوْا يَسْتَبْدِلْ قَوْمًا غَيْرَكُمْ ثُمَّ لَا يَكُونُوا أَمْثَالَكُمْ

অর্থঃ শুন, তোমরাই তো তারা, যাদেরকে আল্লাহর পথে ব্যয় করার আহবান জানানো হচ্ছে, অতঃপর তোমাদের কেউ কেউ কৃপণতা করছে। যারা কৃপণতা করছে, তারা নিজেদের প্রতিই কৃপণতা করছে। আল্লাহ অভাবমুক্ত এবং তোমরা অভাবগ্রস্থ। যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও, তবে তিনি তোমাদের পরিবর্তে অন্য জাতিকে প্রতিষ্ঠিত করবেন, এরপর তারা তোমাদের মত হবে না। সুরা মুহাম্মাদ : ৩৮

মহান আল্লাহ আরও বলেন,

لَّذِينَ يَبْخَلُونَ وَيَأْمُرُونَ النَّاسَ بِالْبُخْلِ وَمَن يَتَوَلَّ فَإِنَّ اللَّهَ هُوَ الْغَنِيُّ الْحَمِيدُ

অর্থঃ যারা কৃপণতা করে এবং মানুষকে কৃপণতার প্রতি উৎসাহ দেয়, যে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তার জানা উচিত যে, আল্লাহ অভাবমুক্ত, প্রশংসিত। সুরা হাদীদ :২৪

অপচয়ের পর কৃপনতার সম্পর্কেও কুরআনের কিছু আয়াত তুলে ধরলাম যাতে সহজেই কৃপনাতার কুফল সম্পর্কে একটা ধারনা পাওয়া যায়। এ বিষয়টি সহজেই অনুমেয় যে, এই দুটি বিষয়ই ইসলামে হারাম করা হয়েছে। এ জন্য মহান আল্লাহ নিকট জবাবদিহী করতে হবে কিন্তু যদি কেউ এই দুটির মাঝামাঝিতে অবস্থান করে অর্থাৎ মধ্যপন্থা অবলম্বন করে তাহলে সে মহান আল্লাহ নিকট পুরস্কৃত হবে। তাই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে মধ্যপন্থা অবলম্বন ছাড়া বিকল্প নেই।

(৩) দাওয়াহ ও ধর্ম প্রচারে মধ্যপন্থা:

ইসলাম দাওয়াহ কার্যক্রমে সহনশীলতা এবং উত্তম আচরণের নির্দেশ দেয়। মহান আল্লাহ বলেন-

اُدۡعُ اِلٰی سَبِیۡلِ رَبِّکَ بِالۡحِکۡمَۃِ وَالۡمَوۡعِظَۃِ الۡحَسَنَۃِ وَجَادِلۡہُمۡ بِالَّتِیۡ ہِیَ اَحۡسَنُ ؕ اِنَّ رَبَّکَ ہُوَ اَعۡلَمُ بِمَنۡ ضَلَّ عَنۡ سَبِیۡلِہٖ وَہُوَ اَعۡلَمُ بِالۡمُہۡتَدِیۡنَ

তুমি তোমরা রবের পথে হিকমত ও সুন্দর উপদেশের মাধ্যমে আহবান কর এবং সুন্দরতম পন্থায় তাদের সাথে বিতর্ক কর। নিশ্চয় একমাত্র তোমার রবই জানেন কে তার পথ থেকে ভ্রষ্ট হয়েছে এবং হিদায়াতপ্রাপ্তদের তিনি খুব ভাল করেই জানেন। সূরা নাহল : ১২৫

এখানে দাওয়াহ ও বিতর্কেও সুন্দরভাবে এবং মধ্যপন্থা বজায় রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

একটি সহিহ হাদিসে এসেছে-

عَنْ ابْنِ مَسْعُودٍ قَالَ كَانَ النَّبِيُّ يَتَخَوَّلُنَا بِالْمَوْعِظَةِ فِي الْأَيَّامِ كَرَاهَةَ السَّآمَةِ عَلَيْنَا.

ইবনু মাস’ঊদ (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের অবস্থার প্রতি লক্ষ্য রেখে নির্দিষ্ট দিনে নাসীহাত করতেন, আমরা যাতে বিরক্ত বোধ না করি। সহিহ বুখারি : ৬৮, ৬৪১১, সহিহ মুসলিম : ২৮২১

আনাস (রাযি.) থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

‏ “‏ يَسِّرُوا وَلاَ تُعَسِّرُوا، وَبَشِّرُوا وَلاَ تُنَفِّرُوا ‏

তোমরা সহজ পন্থা অবলম্বন কর, কঠিন পন্থা অবলম্বন করো না, মানুষকে সুসংবাদ দাও, বিরক্তি সৃষ্টি করো না। সহিহ বুখারি : ৬৯, ৬১২৫. সহিহ মুসলিম : ১৭৩৪

আবূ ওয়াইল (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন- ইবনু মাস‘ঊদ (রাযি.) প্রতি বৃহস্পতিবার লোকদের নাসীহাত করতেন। তাঁকে একজন বলল, ‘হে আবূ ‘আবদুর রহমান! আমার ইচ্ছা জাগে, যেন আপনি প্রতিদিন আমাদের নাসীহাত করেন। তিনি বললেনঃ এ কাজ থেকে আমাকে যা বাধা দেয় তা হচ্ছে, আমি তোমাদেরকে ক্লান্ত করতে পছন্দ করি না। আর আমি নাসীহাত করার ব্যাপারে তোমাদের (অবস্থার) প্রতি খেয়াল রাখি, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ক্লান্তির আশংকায় আমাদের প্রতি যেমন লক্ষ্য রাখতেন। সহিহ বুখারি  :৭০

দাওয়াতে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সব সময় মধ্যপন্থা অনুসরণ করছেন। তিনি কাউকে জোর করে ইসলাম গ্রহনে বাধ্য করেনি আবার কেউ মুসরিক আবস্থায় মারা যাক তাও তিনি চাননি। মহান আল্লাহ বলেন,

نَحْنُ أَعْلَمُ بِمَا يَقُولُونَ وَمَا أَنتَ عَلَيْهِم بِجَبَّارٍ فَذَكِّرْ بِالْقُرْآنِ مَن يَخَافُ وَعِيدِ

অর্থঃ তারা যা বলে, তা আমি সম্যক অবগত আছি। আপনি তাদের উপর জোর জবরকারী নন। অতএব, যে আমার শাস্তিকে ভয় করে, তাকে কোরআনের মাধ্যমে উপদেশ দান করুন। সুরা কাহফ : ৪৫

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মানুষদের কে খুব আন্তরিকতার সাথে ইসলাম গ্রহনে আহবান জানাতেন। নবী রাসূল প্রেরণ করে ভাবসাম্য রক্ষা করে মধ্যপন্থায় দাওয়াত দিতে বলেছেন। কুরআনের মাধ্যমে পরকালে ভয় প্রদর্শন করে উপদেশ দিতে হবে। আহবানে সাড়া না দিলে খুব কষ্ট পেতেন তখন আল্লাহ বলতেন,

فَإِنْ أَعْرَضُوا فَمَا أَرْسَلْنَاكَ عَلَيْهِمْ حَفِيظًا إِنْ عَلَيْكَ إِلَّا الْبَلَاغُ

অর্থঃ এখন যদি এরা মুখ ফিরিয়ে নেয়, তাহলে হে নবী, আমি তো আপনাকে তাদের জন্য রক্ষক হিসেবে পাঠাইনি৷ কথা পৌছিয়ে দেয়াই কেবল তোমার দায়িত্ব৷ সুরা শূরা : ৪৮

মহান আল্লাহ এখানে মানুষকে তার কথা না শুনার জন্য কঠোরতা প্রদর্শণ করেনি। আবার সতর্ক করতেও কার্পন্য করেনি। একটি ভারসাম্য পূর্ণ কাজই হলো মধ্যপন্থা। কাজেই যারা হকপন্থী তারা ব্যক্তিগত, সমাজিক, অর্থনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ধর্মীয় গোঁড়ামি, উগ্র মনোভাব, চরমপন্থা ও বাড়াবাড়ির মতো নেতিবাচক দিকগুলো পরিহার করে চলার চেষ্টা করবে। তাই এক কথায় বলা যায় যারা সকল ক্ষেত্রে  মধ্যপন্থা তারাই প্রকৃত হকপন্থী।

(৪) সামাজিক জীবনে মধ্যপন্থা:

সামাজিক আচার ব্যবহার কথা বার্তা লেন দেন সর্বক্ষেত্র মধ্যপন্থা অবলম্বন করতে হবে। এটাই ইসলামি রীতি। এটাই সুন্নাহ।

আবূ জাবীরা (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ একদা আমর ইবন আস একজন দীর্ঘ বক্তৃতা দানকারী ব্যক্তি সম্পর্কে বলেনঃ যদি সে মধ্যম ধরনের বক্তৃতা দিত, তবে খুবই ভাল করতো। কেননা, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি-

لَقَدْ رَأَيْتُ أَوْ أُمِرْتُ أَنْ أَتَجَوَّزَ فِي الْقَوْلِ فَإِنَّ الْجَوَازَ هُوَ خَيْرٌ ‏

আমি এটা ভাল মনে করি এবং আমাকে এরূপ নির্দেশ দেয়া হয়েছে যে, আমি যেন বক্তৃতা দেয়ার সময় মধ্যপন্থা অবলম্বন করি। কেননা, মধ্যম-পন্থাই হলো উত্তমপন্থা।

আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, (মুহাম্মাদ ইবনু সীরীন বলেন) আমার অনুমান যে, তিনি এটা মারফুভাবে বর্ণনা করেছেন (অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী স্বরূপ বর্ণনা করেছেন)। তিনি বলেছেনঃ নিজের বন্ধুর সাথে ভালবাসার আধিক্য প্রদর্শন করবে না। হয়ত সে একদিন তোমার শত্রু হয়ে যাবে। তোমার শত্রুর সাথেও শত্রুতার চরম সীমা প্রদর্শন করবে না। হয়ত সে একদিন তোমার বন্ধু হয়ে যাবে। সুনানে তিরমিজি : ১৯৯৭

(৫) আল্লাহর রহমতের আশা ও শাস্তির ভয়ে মধ্যপন্থা-

ইসলামে আশা ও ভয় উভয়ই মুমিনের ঈমানের জন্য অপরিহার্য। আশা আল্লাহর রহমতের প্রতি বিশ্বাস এনে মুমিনকে ইবাদতে উৎসাহিত করে। ভয় আল্লাহর শাস্তি থেকে বাঁচতে আমাদের গুনাহ থেকে বিরত রাখে। একজন মুমিনের উচিত উভয়টির ভারসাম্য রক্ষা করা। যেমন, জীবনকালীন ইবাদতে ভয় বেশি রাখতে হবে, আর মৃত্যুর কাছাকাছি সময়ে আল্লাহর রহমতের প্রতি বেশি আশা রাখতে হবে। ।

মহান আল্লাহ বলেন-

نَبِّیٴۡ عِبَادِیۡۤ اَنِّیۡۤ اَنَا الۡغَفُوۡرُ الرَّحِیۡمُ. وَاَنَّ عَذَابِیۡ ہُوَ الۡعَذَابُ الۡاَلِیۡمُ

আমার বান্দাদের জানিয়ে দাও যে, আমি নিশ্চয় ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। আর আমার আযাবই যন্ত্রণাদায়ক আযাব। সুরা হিজর : ৪৯-৫০

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

لَنْ يُنَجِّيَ أَحَدًا مِنْكُمْ عَمَلُهُ قَالُوا وَلاَ أَنْتَ يَا رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ وَلاَ أَنَا إِلاَّ أَنْ يَتَغَمَّدَنِي اللهُ بِرَحْمَةٍ سَدِّدُوا وَقَارِبُوا وَاغْدُوا وَرُوحُوا وَشَيْءٌ مِنْ الدُّلْجَةِ وَالْقَصْدَ الْقَصْدُ تَبْلُغُوا.

কস্মিনকালেও তোমাদের কাউকে তার নিজের ’আমল কক্ষনো নাজাত দিবে না। তাঁরা বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনাকেও না? তিনি বললেনঃ আমাকেও না। তবে আল্লাহ্ আমাকে তাঁর রহমত দিয়ে আবৃত রেখেছেন। তোমরা যথারীতি ’আমল করে নৈকট্য লাভ কর। তোমরা সকালে, বিকালে এবং রাতের শেষভাগে আল্লাহর ইবাদাত কর। মধ্য পন্থা অবলম্বন কর। মধ্য পন্থা তোমাদেরকে লক্ষ্যে পৌঁছাবে। সহিহ বুখারি : ৬৪৬৩, সহিহ মুসলিম : ২৮১৬

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি। আল্লাহ্ যেদিন রহমত সৃষ্টি করেন সেদিন একশটি রহমত সৃষ্টি করেছেন। নিরানব্বইটি তাঁর কাছে রেখে দিয়েছেন এবং একটি রহমত সমস্ত সৃষ্টির মধ্যে পাঠিয়ে দিয়েছেন। যদি কাফির আল্লাহর কাছে সুরক্ষিত রহমত সম্পর্কে জানে তাহলে সে জান্নাত লাভে নিরাশ হবে না। আর মু’মিন যদি আল্লাহর কাছে যে শাস্তি আছে সে সম্পর্কে জানে তা হলে সে জাহান্নাম থেকে নিজেকে নিরাপদ মনে করবে না। সহিহ বুখারি : ৬৪৬৯, ৬০০০

(৬) দুনিয়া ও আখিরাতের প্রচেষ্টায় মধ্যপন্থা অবলম্বন-

মানুষকে দুনিয়ায় পাঠানে হয়েছে পরীক্ষার জন্য। তাকে দুনিয়া থেকেই আখিরাতের সম্বল অর্জণ করতে হবে। শুধু দুনিয়া অর্জণ যেমন আখিরাত নষ্ট করে দিতে পারে ঠিক তেমনি দুনিয়া ছেড়ে শুধু আখেরাত মুখি হওয়াও অসম্বব। এই ইসলাম দুনিয়া ও আখিরাতের মধ্যপন্থা অবলম্বন করতে নির্দেষ প্রদান করে। শুধু দুনিয়ার পিছনে লেগে থাকলে আখিরাত যে নষ্ট হবে তা সকলেই বুঝে। কিন্তু আখিরাত পাওয়ার জন্য দুনিয়া সম্পূর্ণ ত্যাগ করে বনে জঙ্গলে কাটালেও আখিরাত কিভাবে নষ্ট হবে, তা বুঝে আসে না। ধরুন আখিরাতের লোভে আপনি সংসার ছেড়ে, পরিবার ছেড়ে, সমাজ ছেড়ে বনে জঙ্গলে কালাতি পাত করছেন। তাহলে আপনার উপর আপনার সংসার, পরিবার ও সমাজ যে দায়িত্ব মহান আল্লাহ দিয়েছেন তা আদায় করবে কে? এই মহান আল্লাহ কোন নবী বা রাসূল সংসার বিরাগি জীবন যাপন করেনি। তারা ইবাদাতে পাশাপাশি দুনিয়ার সকলের সাথে মিলেমিসে মানুষদের আখিরাতের প্রতি আহবান করছেন। এই হল দুনিয়া ও আখিরাতের একটি ভারসাম্য নীতি বা মধ্যপন্থা। মহান আল্লাহ দুনিয়া আখিরাতের উভয়ের কল্যানের জন্য দুয়া করতে বলেছেন। তিনি ইরশাদ করেন,

رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ

অর্থঃ আর তাদের মধ্যে কেউ কেউ বলে-হে পরওয়ারদেগার! আমাদিগকে দুনয়াতেও কল্যাণ দান কর এবং আখেরাতেও কল্যাণ দান কর এবং আমাদিগকে দোযখের আযাব থেকে রক্ষা কর। সুরা বাকারা : ২০১

মহান আল্লাহ আয় করার হুকুম করছেন তাই হালাল উপার্জণ ফরজ। কিন্তু সেই সাথে তিনি আখিরাতকে না ভোলার নির্দেষ প্রদান করা হয়েছে। ইসলাম অর্থোপার্জন ও খরচের ব্যাপারেও মধ্যপন্থা অবলম্বনের শিক্ষা দিয়েছে। অর্থোপার্জনের ক্ষেত্রে একদিকে আদেশ করা হয়েছে, মহান আল্লাহ বলেন,

فَإِذَا قُضِيَتِ الصَّلَاةُ فَانتَشِرُوا فِي الْأَرْضِ وَابْتَغُوا مِن فَضْلِ اللَّهِ وَاذْكُرُوا اللَّهَ كَثِيراً لَّعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ

অর্থঃ অতঃপর নামায সমাপ্ত হলে তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড় এবং আল্লাহর অনুগ্রহ তালাশ কর ও আল্লাহকে অধিক স্মরণ কর, যাতে তোমরা সফলকাম হও। সুরা জুমুআ : ১০

দুনিয়ার কোন হালাল কাজের জন্য শরীআতের কোনো হুকুম পালনে উদাসীন হলে ঐ কাজটি আবার হারাম হয়ে যাবে। অর্থাৎ আয় উপার্জণেও ভারসাম্য রাখতে হবে। মহান আল্লাহ একদিকে উপার্জনের নির্দেশ অন্যদিকে সাবধান করেছেন যেন আখিরাতকে ভুলে না যাই। মহান আল্লাহ বলেন-

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تُلْهِكُمْ أَمْوَالُكُمْ وَلَا أَوْلَادُكُمْ عَن ذِكْرِ اللَّهِ وَمَن يَفْعَلْ ذَلِكَ فَأُوْلَئِكَ هُمُ الْخَاسِرُونَ

অর্থঃ মুমিনগণ! তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ত তি যেন তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল না করে। যারা এ কারণে গাফেল হয়, তারাই তো ক্ষতিগ্রস্ত। (সুরা মুনাফিক্বুন ৬৩:৯)।

উপার্জনের ক্ষেত্রে কোন প্রকার এমন অবহেলা ও শিথিলতা করা যাবে না, যার ফলে নিজের ও যাদের উপর ভরোন পোশন ফরজ তারা বঞ্চিত হয়। আবার এমন বাড়াবাড়ি ও লোভ-লালসার করা যাবেনা যার ফলে হালাল-হারামের সীমারেখা লংঘিত হয় অথরা ফরজ ইবাদাতে (সালাত, সিয়াম, হজ্জ) অবহেলা প্রদর্শন করা হয়। বরং আল্লাহ তাআলার হুকুম-আহকাম পালনের পর বৈধতার সীমারেখার মধ্যে থেকে যতটুকু চেষ্টা সম্ভব ততটুকুতেই ক্ষান্ত থাকবে এবং তাতে যে উপার্জন হয় তাতে পরিতুষ্ট থাকবে। এটিই উপার্জন চেষ্টার মধ্যপন্থা

হাদীসে এরই শিক্ষাদান করা হয়েছে এবং বলা হয়েছে, তোমরা দুনিয়া সন্ধানে মধ্যপন্থা অবলম্বন কর। মনে রেখ প্রত্যেকের জন্য তা থেকে যা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, সে কেবল তাই পাবে। (মুসতাদরাকে হাকেম -২১৩৩; মুসনাদে বাযযার – ১৬০২)।

আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ ঐশ্বর্যের প্রাচুর্য থাকলেই মানুষ ধনী হয় না। মনের ঐশ্বর্যই প্রকৃত ঐশ্বর্য। সহিহ মুসলিম ২৩১০, ইফাঃ ২২৮৮, সহিহ বুখারী,  তিরমিযী, আবু দাউদ, আদাবুল মুফরাদ-২৭৬)।

৪. মধ্যপন্থার উপকারিতা-

মধ্যপন্থা বজায় রাখা ব্যক্তিগত, সামাজিক এবং ধর্মীয় জীবনে বহু উপকার বয়ে আনে। এটি একজন মানুষকে পরিমিতিবোধ, স্থিতিশীলতা এবং সফলতার পথে পরিচালিত করে। নিচে মধ্যপন্থার গুরুত্বপূর্ণ উপকারিতা তুলে ধরা হলো। এই পন্থা জীবনকে সহজ ও ভারসাম্যময় করে তুলে।

সহিহ হাদিসে এসেছে-

عَنْ عَائِشَةَ أَنَّهَا قَالَتْ سُئِلَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم أَيُّ الأَعْمَالِ أَحَبُّ إِلَى اللهِ قَالَ أَدْوَمُهَا وَإِنْ قَلَّ وَقَالَ اكْلَفُوا مِنْ الأَعْمَالِ مَا تُطِيقُونَ.

আয়িশাহ (রাঃ) বর্ণনা করেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করা হলো, আল্লাহর কাছে সর্বাধিক প্রিয় ’আমল কী? তিনি বললেনঃ যে ’আমল সদাসর্বদা নিয়মিত করা হয়। যদিও তা অল্প হয়। তিনি আরও বললেন, তোমরা সাধ্যের অতীত কাজ নিজের উপর চাপিয়ে নিও না।  সহিহ বুখারি : ৬৪৬৫

আলক্বামাহ (রহ.) বর্ণনা করেন। আমি উম্মুল মু’মিনীন ’আয়িশাহ (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলাম, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ’আমল কেমন ছিল? তিনি কি কোন ইবাদাতের জন্য কোন দিন নির্দিষ্ট করতেন? তিনি বললেন, না। তাঁর ’আমল ছিল সার্বক্ষণিক ও নিয়মিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা করতে পারতেন, তোমাদের মধ্যে এমন কে আছে যে তা করতে পারবে? সহিহ বুখারি : ৬৪৬৬

৫। যুগে যুগে দ্বীনে মধ্যপন্থা অবলম্বন না করার ক্ষতি-

দ্বীনে মধ্যপন্থা বিপরীত হলো বাড়াবাড়ি করা অথবা দ্বীন ছেড়ে কুফরি অবলম্বন করা। দ্বীন পুরোপুরি ছেড়ে দিলে যে ক্ষতি হবে তা আর ব্যাখ্যা করে বোঝাতে হবে না। কিন্তু দ্বীন নিয়ে বাড়াবাড়ি করলে যে ক্ষতি হয় সে সম্পর্কে একটু আলোচনা দরকার। কেননা এর মাধ্যমেই মধ্যমপন্থা অতিক্রম করা হয়। দ্বীনের ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি ব্যক্তি ও সমাজের জন্য ক্ষতিকর। এটি ইবাদতে স্থায়িত্ব নষ্ট করে, মানসিক ও শারীরিক অস্বস্তি সৃষ্টি করে এবং ইসলামের সৌন্দর্যকে ম্লান করে। ইসলামের শিক্ষার মূল লক্ষ্য হলো সহজতা, ভারসাম্য, মধ্যপন্থা এবং মানবকল্যাণ। তাই মুসলিমদের উচিত, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা অবলম্বন করা এবং বাড়াবাড়ি থেকে বিরত থাকা। দ্বীনে এই বাড়াবাড়ি যুগ যুগ ধরে মানুষ জাতীর মধ্যে চলে আসছে এবং আজও আমাদের শরীয়তে নামে চলছে।

আব্দুল্লাহ বিন আববাস্ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন:

يَا أَيُّهَا النَّاسُ! إِيَّاكُمْ وَالْغُلُوَّ فِيْ الدِّيْنِ ، فَإِنَّهُ أَهْلَكَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ الْغُلُوُّ فِيْ الدِّيْنِ

হে মানুষ সকল! তোমরা ধর্মীয় ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করো না। কারণ, তোমাদের পূর্বেকার সকল উম্মাত শুধু এ কারণেই ধ্বংস হয়ে গিয়েছে’। সহিহ মুসলিম : ২৬৭০, সুনানে আবু দাউদ : ৪৬০৮

(১) নূহ (আ.) এর কওমের বাড়াবাড়ি-

প্রতিটি যুগে মানুষ নবী, রসূল ও নেককার মানুষদের নিয়ে বাড়াবাড়ির সাথে সম্পৃক্ত ছিল। নূহ আলাইহিসের কওমের বাড়াবাড়ি দ্বারাই প্রথম মুর্তি পুজার শির্ক শুরু হয়। তাদের সময়ের প্রসিদ্ধ ও সম্মানিত ব্যক্তিদের স্মরণার্থে তাদেরই প্রতিকৃতি বা মূর্তি স্থাপন করে। প্রথমত: এগুলোকে তারা এমনিতেই তৈরী করেছিল। তারা এগুলোকে সম্মানও দেখাত না, পূজাও করত না। কিছুদিন পর শুরু হয় এগুলোর প্রতি মাত্রাতিরিক্ত সম্মান প্রদর্শন, যার অনিবার্য পরিণতিতে কিছুদিনের মধ্যে এগুলো পূজার বস্তুতে পরিণত হয়। এ প্রসংগে মহান আল্লাহ বলেনঃ

﴿ وَقَالُواْ لَا تَذَرُنَّ ءَالِهَتَكُمۡ وَلَا تَذَرُنَّ وَدّٗا وَلَا سُوَاعٗا وَلَا يَغُوثَ وَيَعُوقَ وَنَسۡرٗا  ﴾

অর্থঃ তারা বলেছে, তোমরা নিজেদের দেব-দেবীদের কোন অবস্থায় পরিত্যাগ করো না৷ আর ওয়াদ, সুওয়া’আ, ইয়াগুস, ইয়াউক এবং নাসরকেও পরিত্যাগ করো না।  সুরা নুহ : ২৩

ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যে প্রতিমার পূজা নূহ আলাইহিস সালাম এর জাতির মাঝে প্রচলিত ছিল, পরবর্তী সময়ে আরবদের মাঝেও তার পূজা প্রচলিত হয়েছিল। ওয়াদ ‘দুমাতুল জান্দাল’ নামক স্থানে অবস্থিত কালব গোত্রের একটি দেবমূর্তি, সূওয়া’আ হল হুযাইল গোত্রের একটি দেবমূর্তি এবং ইয়াগুস ছিল মুরাদ গোত্রের, অবশ্য পরে তা গাতীফ গোত্রের হয়ে যায়। এর আস্তানা ছিল কওমে সাবার নিকটে ‘জাওফ’ নামক স্থানে। ইয়াউক ছিল হামাদান গোত্রের দেবমূর্তি, নাসর ছিল যুলকালা গোত্রের হিমযায় শাখারদের মূর্তি। নূহ আলাইহিস সালাম এর জাতির কতিপয় নেক লোকের নাম নাসর ছিল। তারা মারা গেলে, শয়তান তাদের জাতির লোকদের হৃদয়ে এই কথা ঢুকিয়ে দিল যে, তারা যেখানে বসে মজলিস করত, সেখানে তোমরা কিছু মূর্তি স্থাপন কর এবং ঐ সকল নেক লোকের নামানুসারেই এগুলোর নামকরণ কর। সুতরাং তারা তাই করল, কিন্তু তখনও ঐসব মূর্তির পূজা করা হত না। তবে মূর্তি স্থাপনকারী লোকগুলো মারা গেলে এবং মূর্তিগুলো সম্পর্কে সত্যিকারের জ্ঞান বিলুপ্ত হলে লোকজন তাদের পূজা করতে শুরু করে দেয়।  সহিহ বুখারি হাদিস : ৪৫৫৫

(২) দ্বীনে ক্ষেত্রে ইহুদি ও খৃষ্টানদের বাড়াবাড়ি-

আল্লাহ তায়ালা তার বান্দাদেরকে দ্বীনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করতে করতে নিষেধ করেছেন। তারা সীমার বাহিরে বাড়াবড়ি কারনে অনেক সময় শাস্তি ভোগ করেছে। ইহুদি ও খ্রীষ্টানদের বাড়াবাড়ি সম্পর্কে কুরআন ও হাদিসের বহু স্থানে উল্লেখ করা হয়েছে।

وَقَالَتِ الۡیَہُوۡدُ عُزَیۡرُۨ ابۡنُ اللّٰہِ وَقَالَتِ النَّصٰرَی الۡمَسِیۡحُ ابۡنُ اللّٰہِ ؕ ذٰلِکَ قَوۡلُہُمۡ بِاَفۡوَاہِہِمۡ ۚ یُضَاہِـُٔوۡنَ قَوۡلَ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا مِنۡ قَبۡلُ ؕ قٰتَلَہُمُ اللّٰہُ ۚ۫ اَنّٰی یُؤۡفَکُوۡنَ

আর ইয়াহূদীরা বলে, উযাইর আল্লাহর পুত্র এবং নাসারারা বলে, মাসীহ আল্লাহর পুত্র। এটা তাদের মুখের কথা, তারা সেসব লোকের কথার অনুরূপ বলছে যারা ইতঃপূর্বে কুফরী করেছে। আল্লাহ তাদেরকে ধ্বংস করুন, কোথায় ফেরানো হচ্ছে এদেরকে? সুরা তাওবা : ৩০

ইহুদি ও খৃষ্টানগণ বাড়াবাড়ির সকল সীমা অতিক্রম করেছে। তারা তাদের নবীাকে আল্লাহর পুত্র হিসাবে নির্ধারণ করেছে।

আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন-

*يَا أَهْلَ الْكِتَابِ لَا تَغْلُوْا فِيْ دِيْنِكُمْ *

অর্থঃ হে আহলে কিতাবগণ! তোমরা তোমাদের দ্বীনের মধ্যে বাড়াবাড়ি করো না। সুরা নিসা : ১৭

মহান আল্লাহ বলেন-

*يَا أَهْلَ الْكِتَابِ لاَ تَغْلُواْ فِي دِينِكُمْ وَلاَ تَقُولُواْ عَلَى اللّهِ إِلاَّ الْحَقِّ إِنَّمَا الْمَسِيحُ عِيسَى ابْنُ مَرْيَمَ رَسُولُ اللّهِ وَكَلِمَتُهُ أَلْقَاهَا إِلَى مَرْيَمَ وَرُوحٌ مِّنْهُ فَآمِنُواْ بِاللّهِ وَرُسُلِهِ وَلاَ تَقُولُواْ ثَلاَثَةٌ انتَهُواْ خَيْرًا لَّكُمْ إِنَّمَا اللّهُ إِلَـهٌ وَاحِدٌ سُبْحَانَهُ أَن يَكُونَ لَهُ وَلَدٌ لَّهُ مَا فِي السَّمَاوَات وَمَا فِي الأَرْضِ وَكَفَى بِاللّهِ وَكِيلاً*

অর্থঃ হে আহলে-কিতাবগণ! তোমরা দ্বীনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করো না এবং আল্লাহর শানে নিতান্ত সঙ্গত বিষয় ছাড়া কোন কথা বলো না। নিঃসন্দেহে মরিয়ম পুত্র মসীহ ঈসা আল্লাহর রসূল এবং তাঁর বাণী যা তিনি প্রেরণ করেছেন মরিয়মের নিকট এবং রূহ-তাঁরই কাছ থেকে আগত। অতএব, তোমরা আল্লাহকে এবং তার রসূলগণকে মান্য কর। আর একথা বলো না যে, আল্লাহ তিনের এক, একথা পরিহার কর, তোমাদের মঙ্গল হবে। নিঃসন্দেহে আল্লাহ একক উপাস্য। সন্তান-সন্ততি হওয়াটা তাঁর যোগ্য বিষয় নয়। যা কিছু আসমান সমূহ ও যমীনে রয়েছে সবই তার। আর কর্মবিধানে আল্লাহই যথেষ্ট। সুরা নিসা : ১৭১

(৩) উম্মতে মুহাম্মদীকে ও বাড়াবাড়ি করতে নিষেধ করেছেন-

আল্লাহ তা‘আলা উম্মতে মুহাম্মাদীকেও সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। তার সীমা অতিক্রম করে বাড়াবাড়ি আমাদের জন্য শাস্তির কারন হয় দাড়াবে। তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে উদ্দেশ্য করে বলেন,

فَاسْتَقِمْ كَمَا أُمِرْتَ وَمَن تَابَ مَعَكَ وَلاَ تَطْغَوْاْ إِنَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌ

অর্থঃ অতএব, তুমি এবং তোমার সাথে যারা তওবা করেছে সবাই সোজা পথে চলে যাও, যেমন তোমায় হুকুম দেয়া হয়েছে। আর তোমরা সীমালংঘন করো না। নিশ্চয়ই তিনি তোমাদের সকল কার্যকলাপ প্রত্যক্ষ করেন। সুরা হুদ : ১১২

আব্দুল্লাহ্ বিন্ মাসঊদ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন-

هَلَكَ الـْمُتَنَطِّعُوْنَ ، هَلَكَ الْـمُتَنَطِّعُوْنَ ، هَلَكَ الْـمُتَنَطِّعُوْن

‘সীমা লঙ্ঘনকারীরা ধ্বংস হোক! রাসূল (সা.) এ বাক্যটি তিন বার উচ্চারণ করেন’’। সুনানে ইবনু মাজাহ্ : ৩০৮৫, সুনানে ইবনু হিববান : ১০১১

ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জামরাতুল ’আকাবার ভোরে তাঁর উষ্ট্রীর পিঠে আরোহিত অবস্থায় বলেন-

غَدَاةَ الْعَقَبَةِ وَهُوَ عَلَى نَاقَتِهِ ‏”‏ الْقُطْ لِي حَصًى ‏”‏ ‏.‏ فَلَقَطْتُ لَهُ سَبْعَ حَصَيَاتٍ هُنَّ حَصَى الْخَذْفِ فَجَعَلَ يَنْفُضُهُنَّ فِي كَفِّهِ وَيَقُولُ ‏”‏ أَمْثَالَ هَؤُلاَءِ فَارْمُوا ‏”‏ ‏.‏ ثُمَّ قَالَ ‏”‏ يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِيَّاكُمْ وَالْغُلُوَّ فِي الدِّينِ فَإِنَّمَا أَهْلَكَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمُ الْغُلُوُّ فِي الدِّينِ ‏

আমার জন্য কংকর সংগ্রহ করে লও। আমি তাঁর জন্য সাতটি কংকর সংগ্রহ করলাম। তা ছিল আকারে ক্ষুদ্র। তিনি তা নিজের হাতের তালুতে নাড়াচাড়া করতে করতে বলেন, এই আকারের ক্ষুদ্র কংকর নিক্ষেপ করবে। তিনি পুনরায় বলেন, দীনের বিষয়ে বাড়াবাড়ি করা থেকে তোমরা সাবধান থাকো। কেননা তোমাদের পূর্বেকার লোকেদেরকে দীনের ব্যাপারে তাদের বাড়াবাড়ি ধ্বংস করেছে। সুনানে ইবনু মাজাহ : ৩০২৯, সুনানে নাসায়ি : ৩০৫৯, আহমাদ : ১৮৫৪, সহীহাহ : ১২৮৩,

(৪) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে নিয়ে বাড়াবাড়ি-

কাউকে সম্মান করার ক্ষেত্রে অতিরঞ্জিত করতে নিষেধ করেছেন। আমাদের রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কেও মুসলিম সমাজে অতিরঞ্জন বা বাড়াবাড়ি লক্ষ করা যায়। অতিরঞ্জন বা বাড়াবাড়ি করে স্রষ্টা ও সৃস্টি মধ্যে পার্থক্য না করাই বড় শির্ক। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে শ্রদ্ধা করার অর্থ হল, তার আদেশ, নিষেধ মেনে চলা। তার আনিত দ্বীনের পরিপূর্ণ অনুসরণ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রসংশা করতে হবে সেইভাবে, যেভাবে আল্লাহ তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রসংশা করেছেন। মহান আল্লাহ সৃষ্টিকর্তা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সর্বশ্রেষ্ট সৃস্টি। আল্লাহ রাব্বূল আলামীন তাকে অনেক অনেক সম্মান দান করে বলেন-

لَّقَدۡ كَانَ لَكُمۡ فِى رَسُولِ ٱللَّهِ أُسۡوَةٌ حَسَنَةٌ۬ لِّمَن كَانَ يَرۡجُواْ ٱللَّهَ وَٱلۡيَوۡمَ ٱلۡأَخِرَ وَذَكَرَ ٱللَّهَ كَثِيرً۬ا

অর্থঃ আসলে তোমাদের জন্য আল্লাহর রসূলের মধ্যে ছিল একটি উত্তম আদর্শ এমন প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য যে আল্লাহ ও শেষ দিনের আকাঙ্ক্ষী এবং বেশী করে আল্লাহকে স্মরণ করে। সুরা আহজাব : ২১

মহান আল্লাহ আরও বলেন,

* وَإِنَّكَ لَعَلَىٰ خُلُقٍ عَظِيمٖ ٤  *

অর্থঃ “আর নিশ্চয় আপনি মহান চরিত্রের উপর রয়েছেন। সুরা কলম : ৪

মহান আল্লাহ বলেন,

إِنَّكَ لَمِنَ ٱلۡمُرۡسَلِينَ (٣) عَلَىٰ صِرَٲطٍ۬ مُّسۡتَقِيمٍ۬

অর্থঃ তুমি নিসন্দেহে রসূলদের অন্তরভুক্ত, সরল-সোজা, পথ অবলম্বনকারী। সুরা ইয়াসিন : ২-৩

এ ছাড়াও মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সমস্ত বিশ্বজাহানের রহমত স্বরূপ তাকে প্রেরণ করা হইয়াছে। তিনি মাক্বামে মাহমূদের অধিকারী করেছেন। তিনি সমস্ত আদম জাতীর সর্দার বানিয়েছেন। তাকে আল্লাহর খলীল বা অন্তরঙ্গ বন্ধু হিসাবে গ্রহন করেছেন। তিনি আল্লাহর অনুমতি সাপেক্ষে হাশরের মাঠে মহান শাফাআতের অধিকারী। তিনি সর্ব প্রথম জান্নাতে প্রবেশকারী হিসাবে আল্লাহ মর্জাদা পেয়েছেন। তিনি সর্বাধিক মুত্তাক্বী ও পরহেজগারদের হিসাবে পরিগনিত। তিনি নবীকুল শিরোমণী।

এত সম্মান ও মর্জাদা থাকা সত্বেও কিছু অতি পন্ডিত জ্ঞান পাপি তার সম্পর্কে বাড়াবাড়ি ও অতিরঞ্জিত করে।  রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে অতিরঞ্জন বা বাড়াবাড়ির অর্থ হচ্ছে তাঁকে নবুওয়াত ও রিসালাতের উর্ধ্বে স্থান দেয়া। পৃথিবীতে রিসালাতের উর্ধ্বে কোন মানুষের মর্জাদা আছে বলে কেউ স্বীকার করবে না। কারণ এটাই পৃথিবীর সর্বচ্চো ডিগ্রি, সর্বচ্চেো সম্মান। কিন্তু সুফিরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কে মহান আল্লাহ কাছাকাছি তুলনা করতে দিধা করেনি। যেমন- তিনি অদৃশ্যের জ্ঞান রাখেন, সর্বদা হাজির নাজির, আল্লাহর স্বত্বাগত নূর থেকে সৃষ্টি, মানুষের ভাল মন্দের ক্ষমতা রাখেন, তিনি করবে দুনিয়ার জীবনের মত জীবন জাপন করছেন ইত্যাদি। অথচ এই ধরণের বাড়াবাড়ি শিরকি ও কুফরি পর্যায়ের। ইসলাম ধর্মে এই ধরনের বাড়াবাড়ি হারাম।

ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি উমার (রাঃ)-কে মিম্বারের ওপর দাঁড়িয়ে বলতে শুনেছেন যে-

سَمِعْتُ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم يَقُوْلُ لَا تُطْرُونِيْ كَمَا أَطْرَتْ النَّصَارَى ابْنَ مَرْيَمَ فَإِنَّمَا أَنَا عَبْدُهُ فَقُوْلُوْا عَبْدُ اللهِ وَرَسُوْلُهُ

আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, তোমরা আমার প্রশংসা করতে গিয়ে বাড়াবাড়ি করো না, যেমন ‘ঈসা মারইয়াম (আঃ) সম্পর্কে খ্রিস্টানরা বাড়াবাড়ি করেছিল। আমি তাঁর বান্দা, তাই তোমরা বলবে, আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল। সহিহ বুখারি ৩৪৪৫, মিশকাত : ৪৮৯৭

’আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, অতিরিক্ত চাটুকারীরা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে গেছে। তিনি এ কথাটি তিনবার বলেছেন। সহিহ বুখারি : ২৬৭০

এই সকল বাড়াবাড়ি পরিহার করে মধ্যপন্থা অবলম্বন করতে হবে। সৃষ্টি ও স্রষ্টা মাঝে পার্থক্য করে যার যার যথাযথ মর্জাদা তাকেই দিতে হবে। ধর্মের মানে বাড়াবাড়ি যুগে যুগে মানুষকে শির্ক কাজ করতে বাধ্য করছে। উম্মাতে মুহাম্মাদীর মাঝে বিরাট একটা অংশ এই বাড়াবাড়ি লিপ্ত। তাদের উচিৎ হবে এই ধরনের বাড়াবাড়ি পরিহার করে মধ্যপন্থা অবলম্বন করা।

মহান আল্লাহ প্রদত্ত এত সুন্দর মধ্যপন্থী ধর্মের যারা কঠোরতা খুজে পায় তাদের ব্যাপারে শুধু একটা কথাই বলব। তাহলো তাদের জ্ঞানের সল্পতা। ইসলামকে জানি এর সৌন্দর্জ উপভোগ করি আর মহান আল্লাহকে সন্ত্বষ্ট করি। তারপর ও যদি ভূলে যাই বা ভুল করি তাও মহান আল্লাহ মাপ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আর আমদের সাধ্যের অতিরিক্তের জন্য কোন জবাব দিহীতা তার নিকট করতে হবে না। কারন তিনি ইরশাদ করেনঃ

لاَ يُكَلِّفُ اللّهُ نَفْسًا إِلاَّ وُسْعَهَا لَهَا مَا كَسَبَتْ وَعَلَيْهَا مَا اكْتَسَبَتْ رَبَّنَا لاَ تُؤَاخِذْنَا إِن نَّسِينَا أَوْ أَخْطَأْنَا

অর্থঃ আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যাতীত কোন কাজের ভার দেন না। সে তাই পায় যা সে উপার্জন করে এবং তাই তার উপর বর্তায় যা সে করে। হে আমাদের পালনকর্তা, যদি আমরা ভুলে যাই কিংবা ভুল করি, তবে আমাদেরকে অপরাধী করো না। সুরা বাকারা : ২৮৬

কুরআন সুন্নাহর আলোকে যাদের মাঝে এই মধ্যন্থার গুনটি পাবেন তাদের আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের অন্তুর্ভূ্ক্ত মনে করতে পারেন। অন্যগুনগুলোর মাঝে তাদের এইগুনটিকে লক্ষ করবেন।

নাজাত প্রপ্ত দলের বৈশিষ্ট্য-১১ ::  জামাআত বদ্ধ থাকা।

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

জামাআত” (جماعة) শব্দটি আরবি ভাষার একটি শব্দ, যার অর্থ হলো গোষ্ঠী, দল, সমাজ, বা একত্রিত লোকদের সমাবেশ। মূল শব্দ: جمع (জামাআ), যার অর্থ একত্রিত করা বা জড়ো হওয়া।  কিছু সংখ্যক মানুষ যখন নির্দিষ্ট কোন লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য একজন আমিরের অধীনে এক দেহ এক মন হয়ে সুশৃংখলভাবে কাজ করে তখন তাকে জামায়াত বল।

সত্য পন্থী দল আলহে সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো জামায়াতবদ্ধ জীবন যাপন করা। মহান আল্লাহ মানুষকে পরীক্ষার জন্য দুনিয়াতে পাঠিয়েছে এবং তাকে দুনিয়াতে চলার মতা দিকনির্দেশনা প্রদান করেছেন। সে কিভাবে সমাজে জামায়াতবদ্ধ হয়ে মিলেমিসে জীবন যাপন করবে তা সরাসরি শিক্ষা দেয়ার জন্য যুগে যুগে নবী রসূল পাঠিয়েছেন। কিন্তু মানুষ পথভ্রষ্ট হয়ে জামায়াতবদ্ধ জীবন যাপন ছেড়ে দিয়ে ফির্কাবন্দী জীবন যাপন করে থাকে। ফির্কার মাধ্যমে বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে আজ মারামারি হানাহানিতে ব্যস্ত। ইসলামের মুল শিক্ষা থেকে দুরে অবস্থান করছে। জামাতের বিপরীত হলো ফির্কা। জামাআত বুঝতে হলে ফির্কা সম্পর্কে একটু ধারনা থাকতে হবে। তাই আলোচনার শুরুতে জামাআত ও ফির্তার পার্থক্য সম্পর্কে একটি আলোক পাত করা হলো।

ফির্কা শব্দটি আরবি “فِرْقَة” (ফির্কাহ) থেকে এসেছে, যার অর্থ বিভক্তি বা গোষ্ঠী। ইসলামের পরিভাষায়, ফিরকা বলতে সেই দল বা গোষ্ঠীকে বোঝানো হয় যারা ইসলামের মূল শিক্ষাগুলো থেকে বিচ্যুত হয়ে নিজেদের মতবাদ, চিন্তাধারা বা বিশ্বাসের ভিত্তিতে আলাদা হয়ে যায়। এ ধরনের বিভক্তি সাধারণত কুরআন ও সুন্নাহর স্পষ্ট নির্দেশনার পরিপন্থি এবং মুসলিম উম্মাহর মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে।

ইসলামের দৃষ্টিতে জামাআত এবং ফির্কা দুটো বিপরীত মুখি ভিন্ন বিষয়। জামাআত সাধারণত ইসলামের মূল আদর্শে ঐক্যবদ্ধ একটি গোষ্ঠীকে বোঝায়, যা কুরআন ও সুন্নাহর অনুসরণে পরিচালিত হয়। অন্যদিকে, ফিরকা বলতে বিভক্ত গোষ্ঠী বা মতবাদের দলকে বোঝায়, যারা কোনো বিশেষ মতবাদ বা দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতে আলাদা হয়ে যায়। এদের মধ্যে ১০টি মূল পার্থক্য নিচে উল্লেখ করা হলো:

১. ঐক্য বনাম বিভাজন

জামাত: ইসলামের মূলনীতির উপর ভিত্তি করে ঐক্য বজায় রাখে।

ফিরকা: ভিন্ন মতবাদ ও দৃষ্টিভঙ্গির কারণে বিভাজন সৃষ্টি করে।

২. আদর্শের ভিত্তি

জামাত: কুরআন ও সহিহ হাদিসকে তাদের মূল আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করে।

ফিরকা: তাদের নিজস্ব মতবাদ, ইজতিহাদ, বা দার্শনিক চিন্তাধারার উপর নির্ভর করে।

৩. ইসলামের মূল শিক্ষার প্রতি দৃষ্টি

জামাত: ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে ধারণ ও প্রচার করার চেষ্টা করে।

ফিরকা: কোনো নির্দিষ্ট বিষয় বা মতবাদে অধিক জোর দেয়।

৪. আন্তর্জাতিকতা বনাম আঞ্চলিকতা

জামাত: জাতি, বর্ণ, ও অঞ্চলভেদে সকল মুসলিমকে এক প্ল্যাটফর্মে আনতে চায়।

ফিরকা: নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে।

৫. ধর্মীয় নেতৃত্ব

জামাত: নেতৃত্ব নির্বাচনে ইসলামি নীতিমালা মেনে চলে।

ফিরকা: নিজেদের মতবাদ প্রচারে কোনো ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে।

৬. বিধানের প্রয়োগ

জামাত: ইসলামের শারী‘আহর পূর্ণাঙ্গ প্রয়োগ চায়।

ফিরকা: শারী‘আহর নির্দিষ্ট অংশের উপর জোর দেয়।

৭. সাম্প্রদায়িকতা

জামাত: সামগ্রিক মুসলিম উম্মাহর কল্যাণকে প্রাধান্য দেয়।

ফিরকা: নিজেদের গোষ্ঠী বা মতবাদকে প্রাধান্য দেয়।

৮. মতভেদের প্রতি মনোভাব

জামাত: মতভেদের ক্ষেত্রে কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে সমাধান খোঁজে।

ফিরকা: নিজেদের মতবাদ সঠিক প্রমাণে জেদ ধরে।

৯. প্রভাব ও প্রসার

জামাত: ইসলামের প্রকৃত বার্তা সর্বস্তরে ছড়িয়ে দিতে চায়।

ফিরকা: নিজেদের মতবাদ বা চিন্তাধারা ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে।

১০. ইসলামের সাথে সামঞ্জস্যতা

জামাত: ইসলামের মৌলিক নীতির সাথে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ।

ফিরকা: ইসলামের মৌলিক শিক্ষার সাথে কখনো কখনো অসামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে পড়ে।

১। জামাআতবন্ধ থাকার সুফল-

ইসলামে জামাআবদ্ধ থাকার গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি, কারণ এটি কেবল ব্যক্তিগত ইবাদতের উন্নতি নয়, বরং মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে ঐক্য, ভ্রাতৃত্ব এবং সহযোগিতার মানসিকতা গড়ে তোলে।  জামাআতে থাকার কিছু উপকারিতা নিচে তুলে ধরা হলো:

(১) জামায়াতবদ্ধ জীবন যাপনের করা ফরজ-

মহান আল্লাহ ও তার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জামায়াত বদ্ধ জীবন যাপনের গুরুত্ব প্রদান করেছেন। অপর পক্ষে জামায়াতের বিপরীত ফির্কাবদ্ধী হওয়াকে হারাম করেছেন। ফির্কাবদ্ধী লোকদের জাহান্নাম প্রদানের ঘোষনা দিয়েছেন। পবিত্র কুরআনে জামায়াতবদ্ধ জীবন যাপনের গুরুত্ব করে মহান আল্লাহ এরশাদ করেনঃ

وَاعْتَصِمُواْ بِحَبْلِ اللّهِ جَمِيعًا وَلاَ تَفَرَّقُواْ وَاذْكُرُواْ نِعْمَتَ اللّهِ عَلَيْكُمْ إِذْ كُنتُمْ أَعْدَاء فَأَلَّفَ بَيْنَ قُلُوبِكُمْ فَأَصْبَحْتُم بِنِعْمَتِهِ إِخْوَانًا وَكُنتُمْ عَلَىَ شَفَا حُفْرَةٍ مِّنَ النَّارِ فَأَنقَذَكُم مِّنْهَا كَذَلِكَ يُبَيِّنُ اللّهُ لَكُمْ آيَاتِهِ لَعَلَّكُمْ تَهْتَدُونَ

অর্থঃ আর তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জুকে সুদৃঢ় হস্তে ধারণ কর। পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না। আর তোমরা সে নেয়ামতের কথা স্মরণ কর, যা আল্লাহ তোমাদিগকে দান করেছেন। তোমরা পরস্পর শত্রু ছিলে। অতঃপর আল্লাহ তোমাদের মনে সম্প্রীতি দান করেছেন। ফলে, এখন তোমরা তাঁর অনুগ্রহের কারণে পরস্পর ভাই ভাই হয়েছ। তোমরা এক অগ্নিকুন্ডের পাড়ে অবস্থান করছিলে। অতঃপর তা থেকে তিনি তোমাদেরকে মুক্তি দিয়েছেন। এভাবেই আল্লাহ নিজের নিদর্শনসমুহ প্রকাশ করেন, যাতে তোমরা হেদায়েত প্রাপ্ত হতে পার। সুরা ইমরান : ১০৩

এই আয়াতে মহান আল্লাহ তার রজ্জু (ইসলাম/কুরআন) আকড়ে ধরা এবং আমাদের মাঝে ঐক্য বজায় রাখা ফরয করে দিয়েছেন। এই গুনাগুন সাহাবিদের মাঝে ছিল বলে তিনি তাদের আগুন থেকে মুক্তি দিয়ে হেদায়েত প্রাপ্তদের অন্তরভূক্ত করে ছিলেন।

হারিস আল আশআরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

آمُرُكُمْ بِخَمْسٍ: بِالْجَمَاعَةِ وَالسَّمْعِ وَالطَّاعَةِ وَالْهِجْرَةِ وَالْجِهَادِ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَإِنَّهُ مَنْ خَرَجَ مِنَ الْجَمَاعَةِ قِيدَ شِبْرٍ فَقَدْ خَلَعَ رِبْقَةَ الْإِسْلَامِ مِنْ عُنُقِهِ إِلَّا أَنْ يُرَاجِعَ وَمَنْ دَعَا بِدَعْوَى الْجَاهِلِيَّةِ فَهُوَ مِنْ جُثَى جَهَنَّمَ وَإِنْ صَامَ وَصَلَّى وَزَعَمَ أَنَّهُ مُسْلِمٌ . رَوَاهُ أَحْمد وَالتِّرْمِذِيّ

আমি তোমাদেরকে পাঁচটি কাজের নির্দেশ করছি। যথা- (১) সর্বদা মুসলিম জামা’আতের সাথে থাকো, (২) আমীরের (শাসকদের) আদেশ-নিষেধ মান্য করো, (৩) আমীরের (শাসকদের) আনুগত্য করো, (৪) হিজরত করো, (৫) আল্লাহর পথে জিহাদ করো। আর যে ব্যক্তি মুসলিম জামা’আত থেকে এক বিঘত পরিমাণ দূরে সরে যায়, সে যেন তার গর্দান থেকে ইসলামের রশি খুলে ফেলল, যতক্ষণ না সে প্রত্যাবর্তন করে। আর যে ব্যক্তি জাহিলী যুগের রসম-রিওয়াজের দিকে আহবান করে, সে জাহান্নামীদের অন্তর্ভুক্ত। যদিও সে সওম পালন করে, সালাত আদায় করে এবং নিজেকে মুসলিম বলে দাবী করে। মিশকাত : ৩৬৯৪, সুনানে তিরমিজি : ২৮৬৩, আহমাদ ১৭১৭০, সহীহ আল জামি : ১৭২৪

(২) জামাতের উপর আল্লাহর রহমত থাকে-

ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

‏‏ يَدُ اللَّهِ مَعَ الْجَمَاعَة

জামাআতের উপর আল্লাহ্ তায়ালার হাত (রহমত) থাকে। সুনানে তিরমিজি : ২১৬৬, মিশকাত : ১৭৩

এই সম্পর্কে একটি সহিহ হাদিস-

عَنِ النُّعْمَانِ بْنِ بَشِيرٍ أَنّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ خَطَبَ فَقَالَ الْجَمَاعَةُ رَحْمَةٌ وَالْفُرْقَةُ عَذَابٌ

নুমান বিন বাশীর (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুতবায় বলেছেন, জামআত (ঐক্য) হল রহমত এবং বিচ্ছিন্নতা (মতবিরোধ) হল আজাব। হাদিস সম্ভার : ১৮৪৪, সহীহাহ-৬৬৭; সহিহুল জামে-৩১০৯, তাবারানি, আল-মুজামুল কাবীর : ৭৬৭৮, সহিহুল জামে : ৩১০৯,

(৩) এই উম্মাত কখনও পথভ্রষ্টতার উপর একত্রিত হবে না-

ইবনু উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

إِنَّ اللَّهَ لَا يَجْمَعُ أُمَّتِي أَوْ قَالَ: أُمَّةَ مُحَمَّدٍ عَلَى ضَلَالَةٍ وَيَدُ اللَّهِ عَلَى الْجَمَاعَةِ وَمَنْ شَذَّ شَذَّ فِي النَّار

আল্লাহ তা’আলা আমার গোটা উম্মাতকে; অপর বর্ণনাতে তিনি বলেছেন, উম্মাতে মুহাম্মাদিকে কখনও পথভ্রষ্টতার উপর একত্রিত করবেন না। আল্লাহ তা’আলার হাত (রহমত ও সাহায্য) জামা’আতের উপর রয়েছে। যে ব্যক্তি জামা’আত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে, সে বিচ্ছিন্ন হয়ে (অবশেষে) জাহান্নামে যাবে। সুনানে তিরমিজি : ২১৬৭, মিশকাত : ১৭৩

আনাস ইবনে মালেক (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি-

إِنَّ أُمَّتِي لَنْ تَجْتَمِعَ عَلَى ضَلاَلَةٍ فَإِذَا رَأَيْتُمُ اخْتِلاَفًا فَعَلَيْكُمْ بِالسَّوَادِ الأَعْظَمِ ‏

আমার উম্মাত পথভ্রষ্টতার উপর ঐক্যবদ্ধ হবে না। তোমরা মতভেদ দেখতে পেলে অবশ্যই সর্ববৃহৎ দলের সাথে থাকবে। ইবনে মাজাহ : ৩৬৫০,

(৪) জামাআতবদ্ধ থাকা আল্লাহ তায়ার পছন্দ

এই সম্পর্কে হাদিসে এসেছে-

إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْجَمَاعَةَ وَيَكْرَهُ الْفُرْقَةَ.” عَنْ أَبِي الدَّرْدَاءِ رضي الله عنه، أَنَّ النَّبِيَّ ﷺ قَالَ

আবু দারদা (রা.) হতে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) বলেছেন, “আল্লাহ ঐক্যকে পছন্দ করেন এবং বিভেদকে অপছন্দ করেন। মুসনাদ আহমদ : ২১৭২১

আমাদের প্রিয় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও আল্লাহর রজ্জু শক্তভাবে ধারণ করে ঐক্য হওয়াকে খুব পছন্দ করেছেন।

আবূ হুরাইরাহ্ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

‏ إِنَّ اللَّهَ يَرْضَى لَكُمْ ثَلاَثًا وَيَكْرَهُ لَكُمْ ثَلاَثًا فَيَرْضَى لَكُمْ أَنْ تَعْبُدُوهُ وَلاَ تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا وَأَنْ تَعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلاَ تَفَرَّقُوا وَيَكْرَهُ لَكُمْ قِيلَ وَقَالَ وَكَثْرَةَ السُّؤَالِ وَإِضَاعَةَ الْمَالِ ‏

আল্লাহ তা’আলা তিনটি কাজ পছন্দ করেন এবং তিনটি কাজ অপছন্দ করেন। তোমাদের জন্য তিনি যা পছন্দ করেন, তা হল- (১) তোমরা তারই ইবাদাত করবে, (২) তার সঙ্গে কিছুই শারীক করবে না এবং (৩) তোমরা সম্মিলিতভাবে আল্লাহর রজ্জু মজবুতভাবে ধারণ করবে ও পরস্পর বিচ্ছিন্ন হবে না। আর যে সকল বিষয় তিনি তোমাদের জন্য অপছন্দ করেন- (১) নিরর্থক কথাবার্তা বলা, (২) অধিক প্রশ্ন করা এবং (৩) সম্পদ বিনষ্ট করা। সহিহ মুসলিম : ১৭১৫, আদাবুল মুফরাদ ৪৪৪, মুসনদে আহমদ : ৭১৬৩

(৫) মুসলিম উম্মাহকে ঐক্যবদ্ধ থাকার নির্দেশ-

ইসলাম সকল মুসলমানকে একত্রে “উম্মাহ” হিসেবে পরিচিত করে। মাযহাবের নামে দলবাজি উম্মাহর ঐক্য বিনষ্ট করে এবং শত্রুরা এই বিভাজন কাজে লাগায়।

আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেন-

وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا ۚ

তোমরা সবাই আল্লাহর রশি দৃঢ়ভাবে ধারণ করো এবং বিচ্ছিন্ন হয়ো না। সুরা আলে ইমরান : ১০৩

মাযহাবের নামে পরিচিতি অনেক সময় মুসলিমদের মধ্যে বিভাজনের জন্ম দেয়। একে অপরকে ভুল বা ত্রুটিপূর্ণ মনে করার মানসিকতা গড়ে ওঠে। ইসলাম একমাত্র পরিচয় হওয়ার পরিবর্তে মাযহাবকে বড় করে দেখা হয়। ফলে উম্মার মাঝে বিভক্তির সৃষ্ট হয় ও ঐক্য নষ্ট হয়। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

أَلاَ لاَ يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةٍ إِلاَّ كَانَ ثَالِثَهُمَا الشَّيْطَانُ عَلَيْكُمْ بِالْجَمَاعَةِ وَإِيَّاكُمْ وَالْفُرْقَةَ فَإِنَّ الشَّيْطَانَ مَعَ الْوَاحِدِ وَهُوَ مِنَ الاِثْنَيْنِ أَبْعَدُ مَنْ أَرَادَ بُحْبُوحَةَ الْجَنَّةِ فَلْيَلْزَمِ الْجَمَاعَةَ مَنْ سَرَّتْهُ حَسَنَتُهُ وَسَاءَتْهُ سَيِّئَتُهُ فَذَلِكَ الْمُؤْمِنُ

সাবধান! কোন পুরুষ কোন মহিলার সাথে নির্জনে মিলিত হলে সেখানে অবশ্যই তৃতীয়জন হিসাবে শাইতান অবস্থান করে। তোমরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে বসবাস কর। বিচ্ছিন্নতা হতে সাবধান থেকো। কেননা, শাইতান বিচ্ছিন্নজনের সাথে থাকে এবং সে দুজন হতে অনেক দূরে অবস্থা করে। যে লোক জান্নাতের মধ্যে সবচাইতে উত্তম জায়গার ইচ্ছা পোষণ করে সে যেন ঐক্যবদ্ধ হয়ে থাকে (মুসলিম সমাজে)। যার সৎ আমল তাকে আনন্দিত করে এবং বদ্‌ আমল কষ্ট দেয় সেই হলো প্রকৃত ঈমানদার। সুনানে তিরমিজি : ২১৬৫

৬.

২। জামায়াদবদ্ধ জীবন যাপন না করা ক্ষতিঃ

জামায়াদবদ্ধ জীবন যাপন না করলে মুসলিম জাতীকে ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখিন হতে হবে। আর আমরা মুসলিম জাতীর যে খারাপ পরিনাম লক্ষ করেছি, তার পিছনে তাদের অনৈক্যই প্রধান কারন। সকল মুসলিম জামায়াতবদ্ধ জীবন যাপন করলে কোন কাফির বা কাফির রাষ্ট্র তাকে চোখ রাঙ্গিয়ে কথা বলতে পারত না। আমাদের প্রিয় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও এ সম্পর্কে উম্মতকে সতর্ক করে গেছেন। নিম্ম এ সম্পর্কিত কিছু হাদিস উল্লেখ করছি।

(১) ফির্কাতে বিভক্তকারীদের জন্য রাসূর (সা.) এর দায়বদ্ধতা নাই-

আল্লাহ রব্বুল আলামিন আরও বলেন-

إِنَّ الَّذِينَ فَرَّقُوا دِينَهُمْ وَكَانُوا شِيَعًا لَسْتَ مِنْهُمْ فِي شَيْءٍ إِنَّمَا أَمْرُهُمْ إِلَى اللَّهِ ثُمَّ يُنَبِّئُهُمْ بِمَا كَانُوا يَفْعَلُونَ

অর্থঃ নিশ্চয় যারা তাদের দীনকে বিচ্ছিন্ন করেছে এবং দল-উপদলে বিভক্ত হয়েছে, তাদের কোন ব্যাপারে তোমার দায়িত্ব নেই। তাদের বিষয়টি তো আল্লাহর নিকট। অতঃপর তারা যা করত, তিনি তাদেরকে সে বিষয়ে অবগত করবেন।৷  সূরা আনআম : ১৫৯

(২) ফির্কাতে বিভক্ত হতে আল্লাহ নিষধ করেছেন-

আল্লাহ রব্বুল আলামিন আরও বলেন-

وَلَا تَکُوۡنُوۡا کَالَّذِیۡنَ تَفَرَّقُوۡا وَاخۡتَلَفُوۡا مِنۡۢ بَعۡدِ مَا جَآءَہُمُ الۡبَیِّنٰتُ ؕ  وَاُولٰٓئِکَ لَہُمۡ عَذَابٌ عَظِیۡمٌ ۙ

আর তোমরা তাদের মত হয়ো না, যারা বিভক্ত হয়েছে এবং মতবিরোধ করেছে তাদের নিকট স্পষ্ট নিদর্শনসমূহ আসার পর। আর তাদের জন্যই রয়েছে কঠোর আযাব। সুরা আল ইমরান : ১০৫

(৩) জামায়াত ত্যাগ কারী জাহান্নামী-

আব্দুল্লাহ ইবনু ওমর (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

‏ إِنَّ اللَّهَ لاَ يَجْمَعُ أُمَّتِي – أَوْ قَالَ أُمَّةَ مُحَمَّدٍ صلى الله عليه وسلم – عَلَى ضَلاَلَةٍ وَيَدُ اللَّهِ مَعَ الْجَمَاعَةِ وَمَنْ شَذَّ شَذَّ إِلَى النَّارِ

আল্লাহ তা’আলা আমার উম্মাতকে অথবা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উন্মাতকে কখনোও গোমরাহীর উপর সমবেত করবেন না। আর জামা’আতের উপর আল্লাহ তা’আলার হাত (সাহায্য) প্রসারিত। যে লোক (মুসলিম সমাজ হতে) আলাদা হয়ে গেছে, সে বিচ্ছিন্নভাবেই জাহান্নামে যাবে। সুনানে তিরমিযী : ২১৬৭, সুনানে ইবনু মাজাহ :৩৯৫০; মিশকাত :১৭৩

(৪) ঐক্যে ফাটল সৃষ্টিকারীকে হত্যার আদেশ-

আরফাযা ইবন রায়হ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

إِنَّهَا سَتَكُونُ بَعْدِي هَنَاتٌ وَهَنَاتٌ وَهَنَاتٌ وَرَفَعَ يَدَيْهِ فَمَنْ رَأَيْتُمُوهُ يُرِيدُ تَفْرِيقَ أَمْرِ أُمَّةِ مُحَمَّدٍ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَهُمْ جَمِيعٌ فَاقْتُلُوهُ كَائِنًا مَنْ كَانَ مِنْ النَّاسِ

আমার পরে নিশ্চয়ই অনেক ফিতনা-ফাসাদ হবে। এরপর তিনি তাঁর হাত উঠিয়ে বললেন, তখন তোমরা যাকে দেখবে, উম্মতে মুহাম্মদীর মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির ইচ্ছা করছে, অথচ তারা একতাবদ্ধ; তখন তোমরা তাকে হত্যা করবে, সে যে-ই হোক না কেন। সুনানে নাসায়ি : ৪০২১, সহিহুল জামে : ৩৬২২

আরফাজাহ্ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে আমি বলতে শুনেছি, অচিরেই নানা প্রকার ফিৎনা-ফাসাদের উদ্ভব হবে। যে ব্যক্তি ঐক্যবদ্ধ উম্মাতের মধ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির প্রয়াস চালাবে, তোমরা তরবারি দিয়ে তার গর্দান উড়িয়ে দেবে, সে যে কেউ হোক না কেন। সহিহ মুসলিম : ১৮৫২, মিশকাত : -৩৬৭৭

৩। জামায়াদবদ্ধ সঠিক দল না পেলে কি করবে?

জামায়াদবদ্ধ থাকার নির্দষ প্রদান সত্বেও শত শত ফির্কার আবির্ভাব হবে। যার ভবিশ্যৎ বাণী স্বয়ং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম করেছেন। মনে রাখবেন তিনি ভবিশ্যৎ বাণী করছের উম্মত ফির্কা বন্দী হবে। তিনি কিন্তু ফির্কা বন্দী হতে বলেন নি।

আবূ ইদরীস খাওলানী (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি হুযাইফা ইবনু ইয়ামান (রাযিঃ) কে বলতে শুনেছি যে, লোকজন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট কল্যাণের বিষয়ে প্রশ্ন করতো আর আমি তার নিকট প্রশ্ন করতাম অকল্যাণ সম্পর্কে এ ভয়ে যে, পরে না তা আমাকে পেয়ে বসে। তাই আমি (কোন এক সময়) প্রশ্ন করলাম, হে আল্লাহর রসূল! আমরা ছিলাম অজ্ঞতা ও অমঙ্গলের মধ্যে। তারপর আল্লাহ আমাদের জন্য এ কল্যাণ প্রদান করলেন। এ কল্যাণের পরও কি কোন অকল্যাণ আছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। তারপর আমি বললাম, ঐ অকল্যাণের পর কি আবার কল্যাণ আছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ, তবে তাতে ধুম্ৰতা আছে। আমি বললাম, কী সে ধুম্ৰতা? তিনি বললেন, তখন এমন একদল লোকের উদ্ভব হবে যারা আমার প্রবর্তিত পদ্ধতি ছাড়া অন্য পদ্ধতি অবলম্বন করবে, আমার প্রদর্শিত হিদায়াতের পথ ছেড়ে অন্যত্র হিদায়াত তুমি খুঁজবে। দেখবে তাদের মধ্যে ভাল মন্দ উভয়টাই।

তখন আমি আরয করলাম, এ কল্যাণের পর কি কোন অকল্যাণ আছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ, জাহান্নামের দরজার দিকে আহ্বানকারীদের উদ্ভব হবে। যারা তাদের ডাকে সাড়া দেবে তারা তাদেরকে তাতে নিক্ষেপ করবে। আমি তখন বললাম, হে আল্লাহর রসূল! তাদের পরিচয় ব্যক্ত করুন। তিনি বললেন, হ্যাঁ, তাদের বর্ণ হবে আমাদেরই মতো এবং তারা আমাদেরই ভাষায় কথা বলবে। তখন আমি বললাম, হে আল্লাহর রসূল! যদি আমরা সে পরিস্থিতির সম্মুখীন হই তবে আমাদেরকে আপনি কী করতে বলেন? তিনি বললেন, তোমরা মুসলিমদের জামাআত ও ইমামের সাথে আঁকড়ে থাকবে। আমি বললাম, যদি তাদের কোন জামা’আত বা ইমাম না থাকে? তিনি বললেন, তা হলে সে সব বিচ্ছিন্নতাবাদ থেকে তুমি আলাদা থাকবে- যদিও তুমি একটি বৃক্ষমূল দাত দিয়ে আঁকড়ে থাক এবং এ অবস্থায়ই মৃত্যু তোমার নাগাল পায়। সহিহ মুসলিম : ১৮৪৭, সহিহাহ : ২৭৩৯; মিশকাত :  ৫৩৮২

একক জামাআত বা ইমামের সন্ধান পেলে হাদিস মোতাবেক বিভক্তি থেকে নিজেকে আলাদ রাখার আপ্রান চেষ্টা করেত হবে তবু বিচ্ছিন্নতাবাদ কোন দলকে সাহায্য করা যাবে না। তারপর নিজের হাদিসের আলোকে অনুসন্ধা চালিয়ে যামাবে।

আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ বনী ইসরাঈল যে অবস্থায় পতিত হয়েছিল, নিঃসন্দেহে আমার উম্মাতও সেই অবস্থার সম্মুখীন হবে, যেমন একজোড়া জুতার একটি আরেকটির মতো হয়ে থাকে। এমনকি তাদের মধ্যে কেউ যদি প্রকাশ্যে তার মায়ের সাথে ব্যভিচার করে থাকে, তবে আমার উন্মাতের মধ্যেও কেউ তাই করবে। আর বনী ইসরাঈল ৭২ দলে বিভক্ত হয়েছিল। আমার উন্মাত ৭৩ দলে বিভক্ত হবে। শুধু একটি দল ছাড়া তাদের সবাই জাহান্নামী হবে। সাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! সে দল কোনটি? তিনি বললেনঃ আমি ও আমার সাহাবীগণ যার উপর প্রতিষ্ঠিত।  সুনানে তিরমিজি : ২৬৪১

মুয়াবিয়া (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, আমার উম্মাতের একটি দল সর্বদা আল্লাহর দ্বীনের উপর অটল থাকবে। তাদেরকে যারা অপমান করতে চাইবে অথবা তাদের বিরোধিতা করবে, তারা তাদের কোন ক্ষতি করতে পারবে না। এমনকি কিয়ামত আসা পর্যন্ত তাঁরা এই অবস্থার উপর থাকবে। ‘উমাইর ইবনু হানী (রহ.) মালিক ইবনু ইউখামিরের (রহ.) বরাত দিয়ে বলেন, মু‘আয (রাঃ) বলেছেন, ঐ দলটি সিরিয়ায় অবস্থান করবে। মু‘আবিয়াহ (রহ.) বলেন, মালিক (রহ.)-এর ধারণা যে ঐ দলটি সিরিয়ায় অবস্থান করবে বলে মু‘আয (রাঃ) বলেছেন। সহিহ বুখারী : ৩৬৪১, সহিহ মুসলিম : ১৯২০; সহীহাহ : ১৯৫, সুনানে ইবনু মাজাহ : ৬, সুনানে তিরমিজি : ২১৯২, মিশকাত : ৬২৭৬।

ইরবায ইবনু সারিয়াহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন ফজরের নামযের পর আমাদেরকে মর্মস্পশী ওয়াজ শুনালেন, যাতে (আমাদের) সকলের চোখে পানি এলো এবং অন্তর কেঁপে উঠলো। কোন একজন বলল, এ তো বিদায়ী ব্যক্তির নাসীহাতের মতো। হে আল্লাহর রাসূল! এখন আপনি আমাদেরকে কি উপদেশ দিচ্ছেন? তিনি বললেনঃ আমি তোমাদেরকে আল্লাহ তা’আলাকে ভয় করার এবং (নেতৃআদেশ) শ্রবণ ও মান্য করার উপদেশ দিচ্ছি, যদিও সে (নেতা) হাবশী ক্রীতদাস হয়ে থাকে। তোমাদের মধ্যে যারা বেঁচে থাকবে, তারা বহু বিভেদ-বিসম্বাদ প্রত্যক্ষ করবে। তোমরা নতুন নতুন বিষয় আবিষ্কার করা হতে দূরে থাকবে। কেননা তা গুমরাহী। তোমাদের মধ্যে কেউ সে যুগ পেলে সে যেন আমার সুন্নাতে ও সৎপথপ্রাপ্ত খুলাফায়ে রাশিদীনের সুন্নাতে দৃঢ়ভাবে অবিচল থাকে। তোমরা এসব সুন্নাতকে চোয়ালের দাঁতের সাহায্যে শক্তভাবে আঁকড়ে ধর। সুনানে তিরমিজি : ২৬৭৬, সুনানে  ইবনু মাজাহ : ৪২

উপরের আলোচনায় বুঝতে পারলাম, মুসলিম জাতিকে জামায়াতবদ্ধ জীবন যাপনের নির্দেশ দিয়ে মহান রাব্বুল আলামীন বেশ কিছু আয়াতও নাযিল করেছেন। সহিহ হাদিসেও জামায়াতবদ্ধ জীবন যাপনের অনেক গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তার কথা বর্ণিত হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তাঁর ছাহাবীগণ এ পদ্ধতির সফল বাস্তবায়ন করেছেন। জামায়াতবদ্ধ জীবন যাপন করা তাদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল যা বিশ্ববাসীদের নিকট আজও অনুকরনীয় দৃষ্টান্ত। আজ মুসলিম উম্মাহ সাহাবীদের এই বৈশিষ্ট ত্যাগ করার জন্য খুবই দূরাবস্থার মধ্য আছে। এখান থেকে মুক্তি পেতে হলে তাদের মধ্য ঐক্যের প্রয়োজন।

নাজাত প্রপ্ত দলের বৈশিষ্ট্য-১২ ::  এই দলের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো তারা নিজেদের মুসলিম হিসেবে পরিচয় দিবে।

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

উপরের আলোচনায় সত্যপন্থী আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের বৈশিষষ্ট্যসমূহ বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।আশা করি উক্ত বৈশিষ্টসমূহ আলোকে হক বা সত্যপন্থী দল খুজে বের করতে কারো কোন কষ্ট হবে না। আমরাই পৃথিবীর প্রথম ওহী নির্ভর ধর্মের অনুসারী নই। আমাদের পূর্বে অসংখ্যা নবী রাসূল অতিবাহিত হয়েছে। তাদের সকলের ধর্ম ওহী নির্ভর ছিল। তারাও তাদের কোন না কোন নামে পরিচয় দিত। তাই প্রথমে জানার চেষ্টা করব মহান আল্লাহ মনোনীত ঐষি ধর্মের অনুসারীদের নাম কি ছিল। পৃথিবীতে নাম ছাড়া কোন জাতীর সৃষ্টি হয় হয় নি। মহান আল্লাহ যুগে যুগে মানব জাতীর হিদায়েতের জন্য যেমন নবী রাসূল পাঠিয়েছেন, ঠিক তেমন তাদের অনুসারিদেরও নাম তিনি নিজে রেখেছেন। তাই ঐষি ধর্মের অনুসারীদের নিজের নেই নামেই পরিচয় দিতে হবে। তাই কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে মহান আল্লাহ মনোনীত ঐষি ধর্মের অনুসারীদের নাম অনুসদ্ধাণ করি এবং আমাদের সঠিক পরিচয় জেনে নেই।

১। সৃষ্টির শুরুর আমাদের নাম কি ছিল?

মহান আল্লাহ মানুষ জাতীকে পৃথিবীতে প্রেরণ করে তাদের একটি নাম উপস্থাপন করে। তিনি তাদের নাম দিলেন মুসলিম বা আত্মসমর্পণকারী অর্থাৎ মুসলিম বলা হবে ঐ ব্যক্তিকে যে মহান আল্লাহ হুকুমের সামনে নিজেক আত্মসমর্পণ করবে। তাই আদম সন্তানের জাতীয় নাম রাখেন “মুসলিম”। শুধু তাই নয় তার পরবর্তী যত নবী এসে তারা সকলেই তাদেম উম্মতের নাম রাখেন মুসলীম। কুনআনে অনেক প্রসিদ্ধ নবীদের কথা ও কাজ আমাদের উপদেশ গ্রহণের জন্য মহান আল্লাহ তুলে ধরেছেন। তিনি প্রায় ২৫ জন নবী রাসুলদের নাম উল্লখ করছেন এবং ঘোষনা করছেন এরা সকলেই মুসলিম ছিল। এদের উম্মত বা জাতীর যারাই ইসলাম গ্রহন করছে তাদের নাম রাখা হয়েছে মুসলিম। মহান আল্লাহ বলেন,

وَجَـٰهِدُواْ فِى ٱللَّهِ حَقَّ جِهَادِهِۦ‌ۚ هُوَ ٱجۡتَبَٮٰكُمۡ وَمَا جَعَلَ عَلَيۡكُمۡ فِى ٱلدِّينِ مِنۡ حَرَجٍ۬‌ۚ مِّلَّةَ أَبِيكُمۡ إِبۡرَٲهِيمَ‌ۚ هُوَ سَمَّٮٰكُمُ ٱلۡمُسۡلِمِينَ مِن قَبۡلُ وَفِى هَـٰذَا

অর্থঃ এবং জিহাদ কর আল্লাহর পথে যেভাবে জিহাদ করা উচিত। তিনি তোমাদিগকে মনোনিত  করিয়াছেন। তিনি দীনের ব্যাপারে তোমাদের উপর কোন কঠোরতা আরোপ করেন নাই। ইহা তোমাদের পিতা ইব্রাহীমের মিল্লাত। তিনি (আল্লাহ) পূর্বে তোমাদের নামকরণ করিয়াছেন ‘মুসলিম’ এবং এই কিতাবেও” সূরা হাজ্জ : ৭৮

মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনুসারীদেরকে কুরআনে ইব্রাহীমের মিল্লাতের ওপর প্রতিষ্ঠিত বলা হয়েছে। যদিও ইসলামকে ইবরাহীমের মিল্লাতের ন্যায় নূহের মিল্লাত, মূসার মিল্লাত ও ঈসার মিল্লাত বলা যেতে পারে কিন্তু কুরআন মজীদে বার বার একে ইব্রাহীমের মিল্লাত বলা হয়েছে কারন কুরআনের বক্তব্যের প্রথম লক্ষ ছিল আরবরা, আর তারা ইব‌্রাহীমের সাথে যেভাবে পরিচিত ছিল তেমনটি আর কারো সাথে ছিল না। তাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও আকীদা-বিশ্বাস যার ব্যক্তিত্বের প্রভাব সর্বব্যাপী ছিল, তিনি ছিলেন হযরত ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম। হযরত ইব্রাহীমই এমন এক ব্যক্তি ছিলেন যার উন্নত চরিত্রের ব্যাপারে ইহুদী, খৃষ্টান, মুসলমান, আরবীয় মুশরিক ও মধ্যপ্রাচ্যের সাবেয়ী তথা নক্ষত্রপূজারীরা সবাই একমত ছিল। নবীদের মধ্যে দ্বিতীয় এমন কেউ ছিলেন না এবং নেই যার ব্যাপারে সবাই একমত হতে পারে।

‌উপরের আয়াতে পরিস্কারভাবে বলা হয়েছে আমরা ইব্রাহীমের মিল্লাতের ওপর প্রতিষ্ঠিত হলেও ইহার পূর্বে স্বয়ং আল্লাহ আমদের নাম রেখেছেন মুসলিম। অর্থাৎ ইব্রাহীম আলাইহিস সালামের নবুয়তের সময় নয়। বরং মানব ইতিহাসের সূচনা লগ্ন থেকেই যারা তাওহীদ, আখেরাত, রিসালাত ও আসমানী কিতাবের প্রতি বিশ্বাস স্থাপনকারী দলভুক্ত থেকেছে তাদের সবাইকেই এখানে সম্বোধন করা হয়েছে। এখানে মূল বক্তব্য হচ্ছে, এ সত্য মিল্লাতের অনুসারীদেরকে কোনদিন ‘নূহী’ ‘ইবরাহিমী’, ‘মুসাবী’ ইত্যাদি বলা হয়নি বরং তাদের নাম ‘মুসলিম’ (আল্লাহর ফরমানের অনুগত) ছিল। অপর পক্ষে মহান আল্লাহ ইহুদী ও খৃষ্টান না হয়ে সরাসরি ইব্রাহীম আলাইহিস সালামের মিল্লাতের অনুসরণ করতে বলা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন,

 وَقَالُواْ ڪُونُواْ هُودًا أَوۡ نَصَـٰرَىٰ تَہۡتَدُواْ‌ۗ قُلۡ بَلۡ مِلَّةَ إِبۡرَٲهِـۧمَ حَنِيفً۬ا‌ۖ وَمَا كَانَ مِنَ ٱلۡمُشۡرِكِينَ

অর্থঃ ইহুদিরা বলে, “ইহুদি হয়ে যাও, তাহলে সঠিক পথ পেয়ে যাবে৷” খৃস্টানরা বলে, “খৃস্টান হয়ে যাও, তা হলে হিদায়াত লাভ করতে পারবে৷ ওদেরকে বলে দাও, “না, তা নয়; বরং এ সবকিছু ছেড়ে একমাত্র ইব্রাহীমের পদ্ধতি অবলম্বন করো৷ আর ইব‌্রাহীম মুশরিকদের অন্তরভুক্ত ছিল না। সূরা বাকারা : ১৩৫

যারা তাওহীদ, আখেরাত, রিসালাত ও আসমানী কিতাবের প্রতি বিশ্বাস স্থাপনকারী দলভুক্ত থেকেছে তাদের সবাইকেই নিজেদের মুসলীম হিসাবে পরিচয় দিন। মহান আল্লাহ বলেন,

وَإِذَا يُتْلَى عَلَيْهِمْ قَالُوا آمَنَّا بِهِ إِنَّهُ الْحَقُّ مِن رَّبِّنَا إِنَّا كُنَّا مِن قَبْلِهِ مُسْلِمِينَ

অর্থঃ আর যখন তাদেরকে এটা শুনানো হয়, তারা বলো, “আমরা এর প্রতি ঈমান এনেছি, এটি যথার্থই সত্য আমাদের রবের পক্ষ থেকে, আমরা তো আগে থেকেই মুসলিম৷ সুরা কাসাস : ৫৩

এই আয়াতটি থেকে বুঝা যায় মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে দ্বীনের দাওয়াত দিয়েছেন কেবলমাত্র তার নামই ইসলাম নয় বরং যুগে যুগে যত নবী রাসূল এসেছে তাদের প্রত্যেকের অনুসারীগণ মুসলমানই ছিলেন। কাজেই “মুসলিম” পরিভাষাটি শুধুমাত্র নবী করীমের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অনুসারীগণ পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয়। যারাই ঐষি বাণীর অনুসারী তাদের সকলের নাম পূর্বেও যেমন মুসলমান ছিল, পরেও তেমনি মুসলিম থাকবে।

মন্তব্যঃ কুরআনুল কারিমের আলোকে বলা যায় সৃষ্টির শুরুর আমাদের নাম ছিল মুসলিম।  

২। কুরআনে বহু আয়াতে অন্যান্য নবীগণের পরিচয় কি ছিল?

পুর্বের আলোচনার মাধ্যমে বুঝতে পেরেছি, সৃষ্টির আদিতে মহান আল্লাহ আমাদের নাম দিয়েছিলেন মুসলিম। অর্থাৎ আদম আলাইহিস সালামের সময় আমাদের নাম ছিল মুসলিম। মহান আল্লাহ মানুষ জাতীর হিদায়াতের জন্য যুগে যুগে যে সকল নবী ও রাসূল প্রেরণ করছেন, তারা সকলে মুসলিম ছিল এবং তাদের উম্মতদেরও নাম ছিল মুসলিম। আসুন কুরআনের মাধ্যমে দেখি অন্যন্যা নবী রাসূলগণ ও তাদের উম্মতদের নাম ছিল।

(১) নূহ আলাইহিস সালাম এর উম্মত মুসলিম ছিল-

মহান আল্লাহ সুরা ইউনুস এর ৭১ আয়াতে বলেন, “আর তাদেরকে শুনিয়ে দাও নূহের অবস্থা যখন সে স্বীয় সম্প্রদায়কে বলল, হে আমার সম্প্রদায়, যদি তোমাদের মাঝে আমার অবস্থিতি এবং আল্লাহর আয়াতসমূহের মাধ্যমে নসীহত করা ভারী বলে মনে হয়ে থাকে, তবে আমি আল্লাহর উপর ভরসা করছি। এখন তোমরা সবাই মিলে নিজেরদের কর্ম সাব্যস্ত কর এবং এতে তোমাদের শরীকদেরকে সমবেত করে নাও, যাতে তোমাদের মাঝে নিজেদের কাজের ব্যাপারে কোন সন্দেহ-সংশয় না থাকে। অতঃপর আমার সম্পর্কে যা কিছু করার করে ফেল এবং আমাকে অব্যাহতি দিও না”। নূহ আলাইহিস সালাম তার জালিম উম্মতদের এভাবে নসীয়ত করতে থাকে এবং এক পর্যায তিনে বলেন, (কুরআনের ভাষায়)।

فَإِن تَوَلَّيْتُمْ فَمَا سَأَلْتُكُم مِّنْ أَجْرٍ إِنْ أَجْرِيَ إِلاَّ عَلَى اللّهِ وَأُمِرْتُ أَنْ أَكُونَ مِنَ الْمُسْلِمِينَ

অর্থঃ তোমরা আমার নসীহত থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছো৷ আমি তোমাদের কাছে কোন প্রতিদান চাইনি৷ আমার প্রতিদান তো আল্লাহর কাছে৷ আমাকে হুকুম দেয়া হয়েছে, আমি যেন মুসলিম হিসেবে থাকি৷ সুরা ইউনুস : ৭২

(২) ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম মুসলিম ছিলঃ

কুরআনে ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম সম্পর্কে কুরআনে স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করা হয়েছে। তিনি মুসলিম ছিলেন। মহান আল্লাহ বলেন-

مَا كَانَ إِبْرَاهِيمُ يَهُودِيًّا وَلاَ نَصْرَانِيًّا وَلَكِن كَانَ حَنِيفًا مُّسْلِمًا وَمَا كَانَ مِنَ الْمُشْرِكِينَ

অর্থঃ ইবরাহীম ইহুদী ছিল না, খৃষ্টানও ছিল না বরং একনিষ্ট মুসলিম এবং তিনি মুশরিক ছিলেন না। সুরা ইমরান : ৬৭

হযরত ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম আমাদের এই উম্মতের জন্য দোয়া করছেন।

رَبَّنَا وَاجْعَلْنَا مُسْلِمَيْنِ لَكَ وَمِن ذُرِّيَّتِنَا أُمَّةً مُّسْلِمَةً

অর্থঃ হে আমাদের রব! আমাকে তোমরা মুসলিম (অনুগত) করো এবং আমাদের বংশ থেকে একটি উম্মত সৃষ্টি করো যে হবে তোমার মুসলিম। সুরা বাকারাঃ : ১২৮

(৩) লূত আলাইহিস সালাম এর উম্মত মুসলিম ছিল-

ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম এর সমসাময়িক একজন নবী ছিলেন লূত আলাইহিস সালাম। তিনিও মুসলিম ছিল। তার উম্মতের কাহিনী বর্ণনা করে কুরআনে বলা হয়েছে।

فَمَا وَجَدْنَا فِيهَا غَيْرَ بَيْتٍ مِّنَ الْمُسْلِمِينَ

অর্থঃ এবং সেখানে একটি গৃহ ব্যতীত কোন মুসলমান আমি পাইনি। সুরা যারিয়াত : ৩৬

(৪) ইয়াকুব আলাইহিস সালাম এর উম্মত মুসলিম ছিল-

হযরত ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম সন্তান ইসহাক আলাইহিস সালামের ছেলে হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালামও তার সন্তানদেরকেও মুসলিম হিসাবে মৃত্যুবরণ করার জন্য নসিহত করেছেন।  মহান আল্লাহ বলেন,

 أَمۡ كُنتُمۡ شُہَدَآءَ إِذۡ حَضَرَ يَعۡقُوبَ ٱلۡمَوۡتُ إِذۡ قَالَ لِبَنِيهِ مَا تَعۡبُدُونَ مِنۢ بَعۡدِى قَالُواْ نَعۡبُدُ إِلَـٰهَكَ وَإِلَـٰهَ ءَابَآٮِٕكَ إِبۡرَٲهِـۧمَ وَإِسۡمَـٰعِيلَ وَإِسۡحَـٰقَ إِلَـٰهً۬ا وَٲحِدً۬ا وَنَحۡنُ لَهُ ۥ مُسۡلِمُونَ

অর্থঃ তোমরা কি তখন সেখানে উপস্থিত ছিলে, যখন ইয়াকুব এই পৃথিবী থেকে বিদায় নিচ্ছিল? মৃত্যুকালে সে তার সন্তানদের জিজ্ঞেস করলো, আমার পর তোমরা কার বন্দেগী করবে? তারা সবাই জবাব দিল, আমরা সেই এক আল্লাহর বন্দেগী করবো, যাকে আপনি এবং আপনার পূর্বপুরুষ ইবরাহীম, ইসমাঈল ও ইসহাক ইলাহ হিসেবে মেনে এসেছেন আর আমরা তাঁরই অনুগত মুসলিম৷ সূরা বাকারা : ১৩৩

মহান আল্লাহ আরও বলেন,

وَوَصَّىٰ بِہَآ إِبۡرَٲهِـۧمُ بَنِيهِ وَيَعۡقُوبُ يَـٰبَنِىَّ إِنَّ ٱللَّهَ ٱصۡطَفَىٰ لَكُمُ ٱلدِّينَ فَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسۡلِمُونَ

অর্থঃ ঐ একই পথে চলার জন্য সে তার সন্তানদের উপদেশ দিয়েছিল এবং এই উপদেশ দিয়েছিল ইয়াকুবও তার সন্তানদেরকে৷  সে বলেছিল, “আমার সন্তানেরা! আল্লাহ তোমাদের জন্য এই দীনটিই পছন্দ করেছেন। কাজেই আমৃত্যু তোমরা মুসলিম থেকো৷ সূরা বাকারা : ১৩২

(৫) ইউসুফ আলাইহিস সালাম এর উম্মত মুসলীম ছিল-

নবী রাসূলগণ নিজেরা মুসলিম হিসাবে মৃত্যু বরণ করার আকাংখা প্রকাশ করেছেন। যেমন ইউসুফ আলাইহিস সালাম দুয়া করেন। (কুরআনের ভাষায়),

رَبِّ قَدۡ ءَاتَيۡتَنِى مِنَ ٱلۡمُلۡكِ وَعَلَّمۡتَنِى مِن تَأۡوِيلِ ٱلۡأَحَادِيثِ‌ۚ فَاطِرَ ٱلسَّمَـٰوَٲتِ وَٱلۡأَرۡضِ أَنتَ وَلِىِّۦ فِى ٱلدُّنۡيَا وَٱلۡأَخِرَةِ‌ۖ تَوَفَّنِى مُسۡلِمً۬ا وَأَلۡحِقۡنِى بِٱلصَّـٰلِحِينَ

অর্থঃ হে আমার প্রতিপালক! তুমি আমাকে রাজ্য দান করিয়াছ এবং স্বপ্নের ব্যাখ্যা শিক্ষা দিয়াছ। হে আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর স্রষ্টা! তুমিই ইহলোক ও পরলোকে আমার অভিভাবক। তুমি আমাকে মুসলিম হিসাবে মৃত্যু দাও এবং আমাকে সৎকর্মপরায়ণদের আর্ন্তভুক্ত কর। সূরা ইউসুফ : ১০১

(৬) মূসা আলাইহিস সালাম এর উম্মত মুসলিম ছিলঃ

ফিরাউনের দরবারে আগত জাদুকরেরা পরাজয় বরণ করে মুছা আলাইহিস সালামের আনিত দীনের প্রতি ঈমান আনেন।  ফিরাউন তাদের শাস্তি প্রদান করলে তারা মহান আল্লাহ ধৈর্য্য প্রদাণ এবং মুসলিম হিসাবে মৃত্যুর জন্য দুয়া করে। এ থেকে প্রমান করে মুছা আলাইহিস সালামের উম্মত মুসলিম ছিল। মহান আল্লাহ বলেন,

 وَمَا تَنقِمُ مِنَّآ إِلَّآ أَنۡ ءَامَنَّا بِـَٔايَـٰتِ رَبِّنَا لَمَّا جَآءَتۡنَا‌ۚ رَبَّنَآ أَفۡرِغۡ عَلَيۡنَا صَبۡرً۬ا وَتَوَفَّنَا مُسۡلِمِينَ

অর্থ: (যাদুকরগন ফিরআউনকে বলিল) তুমি তো আমাদিগকে শাস্তি দিতেছ শুধু এইজন্য যে, আমরা আমাদের প্রতিপালকের নির্দেশে ঈমান আনিয়াছি, যখন নিদর্শসমূহ আমাদের নিকট আসিয়াছে। হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদিগকে ধৈর্য্য দান কর এবং মুসলমানরূপে আমাদের মৃত্যু দাও”। সূরা আরাফ : ১২৬

হযরত মূসা আলাইহিস সালাম ও তার নিজের জাতিকে মুসলিম থাকতে বলেছেন। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ

وَقَالَ مُوسَى يَا قَوْمِ إِن كُنتُمْ آمَنتُم بِاللّهِ فَعَلَيْهِ تَوَكَّلُواْ إِن كُنتُم مُّسْلِمِينَ

অর্থঃ আর মূসা বলল, হে আমার জাতি! যদি তোমরা আল্লাহর প্রতি ঈমান এনে থাকো, তাহলে তাঁরই ওপর ভরসা করো, যদি তোমরা মুসলিম হয়ে থাকো। সুরা ইউনুস : ৮৪

(৬) ফিরাউন ও মৃত্যুর সময় মুসলিম হতে চেয়েছিলঃ

মুসা  দোয়া করলো, হে আমাদের রব! তুমি ফেরাউন ও তার সরদারদেরকে দুনিয়ার জীবনের শোভা -সৌন্দর্য ও ধন-সম্পদ দান করেছো৷ হে আমাদের রব! একি এ জন্য যে, তারা মনুষকে তোমার পথ থেকে বিপথে সরিয়ে দেবে? হে আমাদের রব! এদের ধন-সম্পদ ধ্বংস করে দাও এবং এদের অন্তরে এমনভাবে মোহর মেরে দাও যাতে মর্মন্তুদ শাস্তি ভোগ না করা পর্যন্ত যেন এরা ঈমান না আনে। আল্লাহ জবাবে বললেন, ,তোমাদের দুজনের দোয়া কবূল করা হলো৷ তোমরা দুজন অবিচল থাকো এবং মুর্খতাদের পথ কখনো অনুসরণ করো না৷ আর আমি বনী ইসরাঈলকে সাগর পার করে নিয়ে গেলাম৷ তারপর ফেরাউন ও তার সেনাদল জুলূম নির্যতন ও সীমালংঘন করার উদ্দেশ্য তাদের পেছনে চললো৷ অবশেষে যখন ফেরাউন ডুবতে থাকলো তখন বলে উঠলো, আমি মেনে নিলাম, নবী ইসরাঈল যার উপর ঈমান এনেছে তিনি ছাড়া আর কোন প্রকৃত ইলাহ নেই, এবং আমিও আনুগত্যের শির নতকারীদের অন্তরভুক্ত৷ সুরা ইউনুছ : ৮৮-৯০

এই আয়াতের আলোকে বলা যায়, বনী ইসরাইলের আসল ধর্ম ইহুদীবাদ নয় বরং ইসলাম ছিল, তাদেরও নাম ছিল মুসলিম। কাজেই যখন ফেরাউন সাগরে ডুবে যাচ্ছিল সে সাথে সাথে মহান আল্লাহ প্রতি ইমান আনল এবং মুসলিম হওয়ার দাবি করল। মহান আল্লাহ ভাষায়ঃ তিনি বলেনঃ

قَالَ آمَنتُ أَنَّهُ لا إِلِـهَ إِلاَّ الَّذِي آمَنَتْ بِهِ بَنُو إِسْرَائِيلَ وَأَنَاْ مِنَ الْمُسْلِمِينَ

অর্থঃ (ফেরাউন) বলল, নবী ইসরাঈল যার উপর ঈমান এনেছে, তিনি ছাড়া আর কোন প্রকৃত ইলাহ নেই, এবং আমিও মুসলিমদের অন্তরভুক্ত৷ সুরা ইউনুস : ৯০

(৬) ঈসা আলাইহিস সালামের উম্মত মুসলীম ছিলঃ

 ঈসা আলাইহিস সালামের উম্মত হাওয়ারীগণ মুসলীম বলে নিজেদে ঘোষনা প্রদান করেছেন। মহান আল্লাহ বলেন,

فَلَمَّآ أَحَسَّ عِيسَىٰ مِنۡہُمُ ٱلۡكُفۡرَ قَالَ مَنۡ أَنصَارِىٓ إِلَى ٱللَّهِ‌ۖ قَالَ ٱلۡحَوَارِيُّونَ نَحۡنُ أَنصَارُ ٱللَّهِ ءَامَنَّا بِٱللَّهِ وَٱشۡهَدۡ بِأَنَّا مُسۡلِمُونَ (٥٢)

অর্থঃ যখন ঈসা অনুভব করলো, ইসরাঈল কুফরী ও অস্বীকার করতে উদ্যেগী হয়েছে, সে বললো, ‘‘কে হবে আল্লাহর পথে আমার সাহায্যকারী? হাওয়ারীগণবলল, আমরা আল্লাহর সাহায্যকারী৷ আমরা আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছি৷ সাক্ষী থাকো, আমরা মুসলিম। সূরা আল ইমরান : ৫২

মহান আল্লাহ বলেন-

وَإِذْ أَوْحَيْتُ إِلَى الْحَوَارِيِّينَ أَنْ آمِنُواْ بِي وَبِرَسُولِي قَالُوَاْ آمَنَّا وَاشْهَدْ بِأَنَّنَا مُسْلِمُونَ

অর্থঃ আর যখন আমি হাওয়ারীদের মনে জাগ্রত করলাম যে, আমার প্রতি এবং আমার রসূলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর, তখন তারা বলতে লাগল, আমরা বিশ্বাস স্থাপন করলাম এবং আপনি সাক্ষী থাকুন যে, আমরা অনুগত্যশীল। সুরা মায়েদা : ১১১

৪। উম্মতে মুহাম্মাদির পরিচয়ঃ

সর্বশেষ নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উম্মতদের মুসলিম ছাড়া আর কি আর কি কোন পরিচয় আছে?

সকল ঐশি গ্রন্থের প্রচারকারী নবীগণ তাদের উম্মতদের একটিই পরিচয়ে পরিচিত করেছেন। তারা সকলে একনিষ্ঠভাবে তাওহীদ, আখেরাত ও রিসালাতের বাণী প্রচার করেছেন এবং সেই সাথে সকল উম্মতের নাম ও রেখেছেন অভিন্ন। অন্য নবীদের মত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও একনিষ্ঠভাবে তাওহীদ, আখেরাত ও রিসালাতের বাণী প্রচার করেছেন কাজেই তার ও তার উম্মতের পরিচয় মুসলিম হওয়াই যুক্তি যুক্ত। কুরআনেও মহান আল্লাহ বিষয়টি পরিস্কার করে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তার অনুসারীদের পরিচয় হবে মুসলীম। শুধু তাই নয় মহান আল্লাহ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উম্মতদের মুসলিম না হইয়া কোন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করিতে আদেশ প্রদান করেছেন। যেমনঃ আল্লাহ বলেন,

  يَـٰٓأَيُّہَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ ٱتَّقُواْ ٱللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِۦ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسۡلِمُونَ (١٠٢)

অর্থ: হে ঈমানদারগণ! তোমরা যথাযথভাবে আল্লাহকে ভয় করো৷ এবং তোমরা মুসলিম না হইয়া কোন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করিও না”। সূরা ইমরান : ১০২

মহান আল্লাহ আহলে কিতাব ধারী ইহুদী ও খৃষ্টানদের ইমান এনে ইসলাম ধর্ম গ্রহনের দাওয়াত দিতে বলেছেন। তারা আমাদের দাওয়াত গ্রহণ না করে, তবে মুসলিম হিসাবে আমাদের পরিচয় জানিয়ে দিতে আল্লাহ নির্দেশ প্রদান করছেন। মহান আল্লাহ বলেন,

 قُلۡ يَـٰٓأَهۡلَ ٱلۡكِتَـٰبِ تَعَالَوۡاْ إِلَىٰ ڪَلِمَةٍ۬ سَوَآءِۭ بَيۡنَنَا وَبَيۡنَكُمۡ أَلَّا نَعۡبُدَ إِلَّا ٱللَّهَ وَلَا نُشۡرِكَ بِهِۦ شَيۡـًٔ۬ا وَلَا يَتَّخِذَ بَعۡضُنَا بَعۡضًا أَرۡبَابً۬ا مِّن دُونِ ٱللَّهِ‌ۚ فَإِن تَوَلَّوۡاْ فَقُولُواْ ٱشۡهَدُواْ بِأَنَّا مُسۡلِمُونَ

অর্থঃ বলঃ হে আহলি কিতাব! এসো এমন একটি কথার দিকে, যা আমাদের ও তোমাদের মধ্যে একই ধরনের ৷ তা হচ্ছেঃ আমরা আল্লাহ ছাড়া কারোর বন্দেগী ও দাসত্ব করবো না৷ তাঁর সাথে কাউকে শরীক করবো না৷ আর আমাদের কেউ আল্লাহ ছাড়া আর কাউকেও নিজের রব হিসেবে গ্রহন করবে না।  যদি তারা এ দাওয়াত গ্রহণ করতে প্রস্তুত না হয়, তাহলে পরিষ্কার বলে দাও, ‘‘তোমরাসাক্ষীথাকো, আমরাঅবশ্যিমুসলিম”। সূরা আল ইমরান : ৬৪

এই উম্মতকে মহান আল্লাহ বার বার মুসলিম পরিচয় দিতে বলছেন এমনই কিছু আয়াত তুল ধরা হলঃ

মহান আল্লাহ বলেন,

قُولُواْ آمَنَّا بِاللّهِ وَمَا أُنزِلَ إِلَيْنَا وَمَا أُنزِلَ إِلَى إِبْرَاهِيمَ وَإِسْمَاعِيلَ وَإِسْحَاقَ وَيَعْقُوبَ وَالأسْبَاطِ وَمَا أُوتِيَ مُوسَى وَعِيسَى وَمَا أُوتِيَ النَّبِيُّونَ مِن رَّبِّهِمْ لاَ نُفَرِّقُ بَيْنَ أَحَدٍ مِّنْهُمْ وَنَحْنُ لَهُ مُسْلِمُونَ

অর্থঃ তোমরা বলো, আমরা ঈমান এনেছি আল্লাহর প্রতি, যে হিদায়াত আমাদের জন্য নাযিল হয়েছে তার প্রতি এবং যা ইবরাহীম, ইসমাঈল, ইসহাক, ইয়াকুব ও ইয়াকুবের সন্তানদের তাদের রবের পক্ষ থেকে দেয়া হয়েছিল তার প্রতি। তাদের করোর মধ্যে আমরা কোন পার্থক্য করি না৷  আমরা সবাই আল্লাহর অনুগত মুসলিম ৷ সুরা বাকারা : ১৩৬

মহান আল্লাহ বলেন,

قُلْ آمَنَّا بِاللّهِ وَمَا أُنزِلَ عَلَيْنَا وَمَا أُنزِلَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَإِسْمَاعِيلَ وَإِسْحَاقَ وَيَعْقُوبَ وَالأَسْبَاطِ وَمَا أُوتِيَ مُوسَى وَعِيسَى وَالنَّبِيُّونَ مِن رَّبِّهِمْ لاَ نُفَرِّقُ بَيْنَ أَحَدٍ مِّنْهُمْ وَنَحْنُ لَهُ مُسْلِمُونَ

অর্থঃ বলুন, আমরা ঈমান এনেছি আল্লাহর উপর এবং যা কিছু অবতীর্ণ হয়েছে আমাদের উপর, ইব্রাহীম, ইসমাঈল, ইসহাক, ইয়াকুব এবং তাঁদের সন্তানবর্গের উপর আর যা কিছু পেয়েছেন মূসা ও ঈসা এবং অন্যান্য নবী রসূলগণ তাঁদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে। আমরা তাঁদের কারো মধ্যে পার্থক্য করি না। আর আমরা তাঁরই অনুগত। সুরা ইমরান : ৮৪

প্রত্যেক মুলমানকে তাকওয়াও অবলম্বন করতে হবে। আল্লাহ দেয়া আদেশ পালন  করতে হবে। তার দেয়া নিষেধ মানতে হবে। এবং তার ও আগে নিজেকে মুসলিম হাসাবে ঘোষনা দিতে হবে।

 قُلۡ إِنِّىٓ أُمِرۡتُ أَنۡ أَعۡبُدَ ٱللَّهَ مُخۡلِصً۬ا لَّهُ ٱلدِّينَ (١١) وَأُمِرۡتُ لِأَنۡ أَكُونَ أَوَّلَ ٱلۡمُسۡلِمِينَ

অর্থঃ বলুন, আমি নিষ্ঠার সাথে আল্লাহর এবাদত করতে আদিষ্ট হয়েছি। আমাকে এ আদেশও দেয়া হয়েছে যেন আমি সবার আগে মুসলমান হই৷ সুরা যুমার : ১১-১২

মহান আল্লাহ আরও বলেন,

قُلۡ إِنَّ صَلَاتِى وَنُسُكِى وَمَحۡيَاىَ وَمَمَاتِى لِلَّهِ رَبِّ ٱلۡعَـٰلَمِينَ (١٦٢) لَا شَرِيكَ لَهُ ۥ‌ۖ وَبِذَٲلِكَ أُمِرۡتُ وَأَنَا۟ أَوَّلُ ٱلۡمُسۡلِمِينَ

অর্থঃ বল, আমার নামায, আমার ইবাদাতের সমস্ত অনুষ্ঠান, আমার জীবন ও মৃত্যু সবকিছু আল্লাহ রব্বুল আলামীনের জন্য, তাঁহার কোন শরীক নাই এবং আমি ইহারই জন্য আদিষ্ট হইয়াছি এবং আমি প্রথম মুসলিম”। সূরা আনাম : ১৬২-১৬৩

মহান আল্লাহ বলেন,

وَلَا تُجَـٰدِلُوٓاْ أَهۡلَ ٱلۡڪِتَـٰبِ إِلَّا بِٱلَّتِى هِىَ أَحۡسَنُ إِلَّا ٱلَّذِينَ ظَلَمُواْ مِنۡهُمۡ‌ۖ وَقُولُوٓاْ ءَامَنَّا بِٱلَّذِىٓ أُنزِلَ إِلَيۡنَا وَأُنزِلَ إِلَيۡڪُمۡ وَإِلَـٰهُنَا وَإِلَـٰهُكُمۡ وَٲحِدٌ۬ وَنَحۡنُ لَهُ ۥ مُسۡلِمُونَ (٤٦)

অর্থ: আর  উত্তম পদ্ধতিতে ছাড়া আহলে কিতাবের সাথে বিতর্ক করো না, তবে তাদের মধ্যে যারা জালেম তাদেরকে বলে, “আমরা ঈমান এনেছি আমাদের প্রতি যা পাঠানো হয়েছে তার প্রতি এবং তোমাদের প্রতি যা পাঠানো হয়েছিল তার প্রতিও, আমাদের ইলাহ ও তোমাদের ইলাহ একজনই এবং আমরা মুসলিম”। সূরা আনকাবূত : ৪৬

মহান আল্লাহ বলেন,

 وَمَنۡ أَحۡسَنُ قَوۡلاً۬ مِّمَّن دَعَآ إِلَى ٱللَّهِ وَعَمِلَ صَـٰلِحً۬ا وَقَالَ إِنَّنِى مِنَ ٱلۡمُسۡلِمِينَ (٣٣)

অর্থঃ সেই ব্যক্তির কথার চেয়ে আর কার কথা উত্তম হবে যে আল্লাহর দিকে ডাকলো, সৎ কাজ করলো এবং ঘোষণা করলো আমি মুসলমান৷ সুরা হা মীম সিজদা :৩৩

উপরের আয়াতসমূহের দ্বারা কি এটাই দ্ব্যার্থহীনভাবে প্রমাণিত নয়, যে ইসলামের অনুসারীদের একটিই পরিচয় সেটি হচ্ছে ‘মুসলিম’। এমন কি পরকালে কাফিরগণও মুসলিম হওয়ার জন্য আফসস করবে।যেমন মহান আল্লাহ বলেন,

رُّبَمَا يَوَدُّ الَّذِينَ كَفَرُواْ لَوْ كَانُواْ مُسْلِمِينَ

অর্থঃ কোন সময় কাফেররা আকাঙ্ক্ষা করবে যে, কি চমৎকার হত, যদি তারা মুসলিম হত। সুরা হিজর : ২

প্রশ্নঃ এই আলোচনার মাধ্যমে বোঝা গেল আমাদের পরিচয় হবে মুসলিম। তবে কি আমারা আমাদের পরিচয় সালাফি, আহলে হাদিস, আহলে কুর্‌আন, সুন্নী, হানাফি, দেওবন্দী, মাইজভান্ডারী ইত্যাদি দিতে পারব?

উত্তরঃ মহান আল্লাহ প্রদত্ত নাম মুসলিম বলে পরিচয় দেয়াই সকলের জন্য ফরজ। কিন্তু মুসলিম আজ বিভিন্ন ফির্কা বন্দী। তারা মুসলিম থেকে তাদের ফির্কাকে পরিচয় দিতে বেশী ভালোবাসে। কিছু উপধী আছে যা ফির্কা বা ধর্মীয় বিভাজন সৃষ্টি করে না। তেমন কোন পরিচয় দেওয়া ক্ষতির কিছু নেই। এর যুগে কিছু সাহাবী মিজাহির আর কিছু সাহাবীকে আনসার বলা হত। এত সাহাবিদের গুন বা কর্ম ফল হিসাবে চিহিৃত করার জন্য উপাধি হিসাবে ব্যবহার করেছেন। এর মাধ্যামে ইসলাম ধর্মের নতুন কোন ফির্কা তৈরি হয় নাই, যাদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও ইবাদত আলাদা।

অপর পক্ষে দেখুন শিয়া, খারেজী, মু’তাযেলী, জাহমী, আশআরী, মাতুরীদী ফির্কা তৈরি হয়েছে তাদের আকিদা ও আমল ভিন্নতার করানে। আকিদা ও আমল ভিন্ন হওয়ার অর্থই হলো তারা দুটি ধর্ম মতের অনুসারী। মূল ইসালামের কুরআন ও সহিহ সুন্নাহর বাইরে গিয়ে যখন অন্য কেউ তাদের আকিদা ও আমল সাজাতে থাকে তখন সঠিক পথ চলা মুসলিমদে সাথে সংঘর্স বাধা অবধারীত। এভাবে একটি  বাতিল ফির্কা সৃ্ষ্টির হওয়ার পর মূল ধারার মুসলিমগণও তাদের পরিচয় প্রদানের জন্য একটি নাম প্রদান করে। যেমন- বাতিল শীয়াদের বিপরীতে মূল ধারার মুসলিমগণ নিজের সুন্নী মুসলিম হিসেবে পরিচয় প্রদান করে। এইভাবে নিজের পরিচয়কে সঠিকভাবে তুলে ধরার জন্য নাম করণে কোন অসুবিধা নাই বলে অধিকাংশ আ্লেম  মতামত দিয়েছেন। তবে বাতিল থেকে পৃথক করার জন্য না হয়ে যত্রতত্র সামাস্য মতবিরোধের কারনে নতুন নতুন ফির্তা সৃ্ষ্টি করা হারাম।

মুসলিম উম্মাহর মাঝে অনৈক্য ও বিচ্ছিন্নতা বহু পুরান ধারা। যা এখনও চলমান। তবে অন্যদের থেকে আলাদ নাম করণে অনেক সময় কেউ মুসলিম নাম থেকে বের হয়ে যায় না। অন্য নাম নিলেও মুসলিম ইসলাম থেকে বের হয়ে যায় না।

কেউ যদি নিজেকে ‘বাংলাদেশী’ বা ভারতী বলে, সে কি আল্লাহর দেওয়া নাম ‘মুসলিম’ থেকে বের হয়ে যায়? না যায় না। সে ভারতী মুসলিম। আপনার বাড়ি টাঙ্গাইল জেলা মির্জাপুর থানায়। আপনি অন্য থাকায় গেলে বলেবেন আমার বাড়ি মির্জাপুর। অন্য জেলায় গেলে বলবেন, আমার বাড়ি টাঙ্গাইল। আবার অন্যদেশে গেলে বলবেন আমার বাড়ি বাংলাদেশে। ঠিক তেমনি আপনি যখন শিয়াদের সাথে পরিচয় দিবেন তখন বললেন আমি সুন্নী মুসলিম। যখন  মাজার পুজারী বিদআতিদের সাথে পরিচয় দিবেন তখন বললেন আমি সালাফি বা দেওবন্দী। এই সকল পরিচয় হলো বাতিল থেকে সঠিত মানহাজ আলাদা করার জন্য। কিন্তু ভ্রান্তি আকিদা ধারণ করে কেউ নিজেকে মুসলিম নাম দিলেও সে ইসলাম থেকে বাহির হয়ে যাবে।

নতুন ফির্কার নাম করনের শর্ত :

(১) ফির্কার এমন নাম করণ বৈধ নয়, যার ফলে মুসলিম উম্মাহর ঐক্যে বিঘ্ন সৃষ্টি করে।

(২) বাতিল ফির্কা থেকে সঠিক ফির্কা আলাদা করার জন্য। যেমন- শিয়াদের বিপরীত সুন্নী নাম ধারন করা।

(৩) মুসলিদের আলাদা কর্মফল বা গুনের করনে নাম করা যেতে পারে। যেমন- আনসার সাহাবি ও মুজাহীর সাহাবি (রা.)

(৪) বিশেষ কোনো ইজতিহাদি বা গবেষণাধর্মী মাসায়েলের দিককে আলাদা করে চিহ্নিত করতে। যেমন- হানাফি মাজহাব, শাফেয়ি মাজহাব, হাম্মলী মাজহাব, মালেকি মাজহাব, সালাফি, আহলে হাদিস।

(৫) কুরআন ও হাদিসের বিশুদ্ধ চর্চা বা পদ্ধতির ওপর জোর দেওয়া হয়। যেমন- দেওবন্দী, সালাফি

(৬) ভ্রান্ত আকিদা থেকে সহিহ আকিদা পৃথক করতে নাম করণ করা যায়। যেমন- ভ্রান্ত আকিদা গ্রহণকারী কাদিয়ানী, ব্রেরভী, রেজভীদের থেকে আদালা বুঝাতে আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআত বোঝান হয়।

(৭) নতুন নামকরণ পেছনে উদ্দেশ্য হতে হবে কুরআন ও সুন্নাহর ভিত্তিতে মুসলিমদের জীবনের উন্নতি এবং বিশুদ্ধ দীন প্রচার এবং তাকে আলাদ কোন ফির্কা মনে হবে না।

(৮) কোনো ব্যক্তিকে বা গোষ্ঠীকে শ্রেষ্ঠত্ব দেওয়া কারণে অন্য মুসলিমদের থেকে আলাদা নাম করণ করা যাবে না।  

(৯) কুরআন ও সুন্নাহর বাহিরে গিয়ে কোন আমল আকিদা ধারন করে নতুন ফির্কা করা যাবে।

(১০) শরিয়তে বিদআত বা নতুন কিছু সংযোজন করে নতুন ফির্কা তৈরি করা যাবে না।

(১১) নতুন নাম বা পরিচয় এমন হতে হবে না যা ইসলামের মৌলিক বার্তা থেকে দূরে সরিয়ে না দেয়।

(১২) নতুন নাম বা দল মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে না পারে তার জন্য স্পষ্টভাবে লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য সবাই জানাতে হবে।

(১৩) দলের বা ফির্কার নাম যাই হোক, সেটি কুরআন ও সুন্নাহর শিক্ষা থেকে বিচ্যুত হওয়া যাবে না।

নতুন ফির্কা বা নামকরণ করা হলে তা শুধুমাত্র বিশুদ্ধ ইসলামি শিক্ষার প্রচার এবং ভুল ধারণা দূর করার জন্য হতে পারে। তবে এতে অবশ্যই উম্মাহর ঐক্য, শৃঙ্খলা এবং পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব বজায় রাখতে হবে। বিভেদ সৃষ্টি করা বা ইসলামের মৌলিক নীতিমালা লঙ্ঘন করা কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়।

নাজাত প্রপ্ত দলের বৈশিষ্ট্য-১৩ ::  আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের অনুসারী সংখ্যায় কর হবে।

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

এই হকপন্থী মুক্তিপ্রাপ্ত দলের নিদর্শনসমূহ হল তারা সংখ্যায় কম হবে। সমাজ জীবনে দেখা যায় জ্ঞানী লোকের সংখ্যা খুবই কম। আপনি ভাল লোক খুজবেন পাওয়া খুবই দুস্কর। নামাজী লোক খুজবেন, পাওয়া যাবে কিন্ত সংখ্যায় খুবই নগন্য। এমনিভাবে জাগতিক বিষয় ও যদি খোজ করেন দেখবেন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ব্যবসায়ী লোকের সংখ্যা অনেক কম। তাই নির্দিধায় বলা যায় ভাল মানুষ অল্পই হয়। কুরআনে অধিকাংশে লোক যেমন খারাপ বলে উল্লেখ করেছেন ঠিক তেমনি ভাবে অল্প সংখ্যক লোককে হক বা উত্তম আলে উল্লেখ করেছেন। অল্প সংখ্যক মানুষ কখনোও সত্যোর মাপকাঠি নয় এমন ধারনা কুরআন বিরোধী। বরং কুরআন ও সহিহ হাদিসে আলোকে অল্প সংখ্যক মানুষই হকের উপর থাকবে বলে বারবার ঘোষনা প্রদান করা হইয়াছে।

১. আল্লাহর ঘোষণা অল্প সংখ্যাক লোকই সত্যের উপর থাকবে-   

মহান আল্লাহ বলেন-

وَأَقۡوَمَ وَلَـٰكِن لَّعَنَہُمُ ٱللَّهُ بِكُفۡرِهِمۡ فَلَا يُؤۡمِنُونَ إِلَّا قَلِيلاً۬ (٤٦)

অর্থঃ কিন্তু তাদের বাতিল পরস্তির কারণে তাদের ওপর আল্লাহর অভিশাপ পড়েছে৷ তাই তারা খুব কমই ঈমান এনে থাকে৷  সুরা নিসা : ৪৬ ও ১৫৫

মহান আল্লাহ বলেন,

وَمَآ ءَامَنَ مَعَهُ ۥۤ إِلَّا قَلِيلٌ۬ (٤٠)

অর্থঃ তবে সামান্য সংখ্যক লোকই নূহের সাথে ঈমান এনেছিল৷ সুরা হুদ : ৪০ ও ১১৬

মহান আল্লাহ আরও বলেন,

 يَعۡمَلُونَ لَهُ ۥ مَا يَشَآءُ مِن مَّحَـٰرِيبَ وَتَمَـٰثِيلَ وَجِفَانٍ۬ كَٱلۡجَوَابِ وَقُدُورٍ۬ رَّاسِيَـٰتٍۚ ٱعۡمَلُوٓاْ ءَالَ دَاوُ ۥدَ شُكۡرً۬اۚ وَقَلِيلٌ۬ مِّنۡ عِبَادِىَ ٱلشَّكُورُ (١٣)

অর্থঃ তারা তার জন্য তৈরি করতো যা কিছু সে চাইতো, উঁচু উঁচু ইমারত, ছবি, বড় বড় পুকুর সদৃশ থালা এবং অনড় বৃহদাকার ডেগসমূহ৷ হে দাউদের পরিবার! কাজ করো কৃতজ্ঞতার পদ্ধতিতে৷ আমার বান্দাদের মধ্যে অল্পই কৃতজ্ঞ৷ সুরা সাবা : ১৩

অধিকাংশে বান্দা পাপী হোয়ার কারনে মাত্র সামান্য কজনই আল্লাহর আজাবের হাত থেকে নিস্তার পাবে৷  মহান আল্লাহ আরও বলেন,

 قَالَ أَرَءَيۡتَكَ هَـٰذَا ٱلَّذِى ڪَرَّمۡتَ عَلَىَّ لَٮِٕنۡ أَخَّرۡتَنِ إِلَىٰ يَوۡمِ ٱلۡقِيَـٰمَةِ لَأَحۡتَنِكَنَّ ذُرِّيَّتَهُ ۥۤ إِلَّا قَلِيلاً۬ (٦٢)

অর্থঃ তারপর সে বললো, দেখোতো ভালো করে, তুমি যে একে আমার ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছো, এ কি এর যোগ্য ছিল ? যদি তুমি আমাকে কিয়ামতের দিন পর্যন্ত অবকাশ দাও তাহলে আমি তার সমস্ত সন্তান সন্ততির মূলোচ্ছেদ করে দেবো, মাত্র সামান্য কজনই আমার হাত থেকে নিস্তার পাবে৷  সুরা বনি ইসরাইল : ৬২

মহান আল্লাহ আরও বলেন,

وَكُنْتُمْ أَزْوَاجًا ثَلاثَةً فَأَصْحَابُ الْمَيْمَنَةِ مَا أَصْحَابُ الْمَيْمَنَةِ وَأَصْحَابُ الْمَشْأَمَةِ مَا أَصْحَابُ الْمَشْأَمَةِ وَالسَّابِقُونَ السَّابِقُونَ أُولَئِكَ الْمُقَرَّبُونَ فِي جَنَّاتِ النَّعِيمِ ثُلَّةٌ مِنَ الأوَّلِينَ وَقَلِيلٌ مِنَ الآخِرِينَ

আর তোমরা তিনটি দলে বিভক্ত হয়ে পড়বে। ডান পার্শ্বের দল, ডান পার্শ্বের দলটি কত সৌভাগ্যবান! আর বাম পার্শ্বের দল, বাম পার্শ্বের দলটি কত হতভাগ্য! আর অগ্রবর্তীগণই অগ্রবর্তী। তারাই নৈকট্যপ্রাপ্ত। তারা থাকবে নিয়ামতপূর্ণ জান্নাতে। পূর্ববর্তীদের মধ্য থেকে হবে বহু সংখ্যক, আর পরবর্তীদের মধ্য থেকে হবে অল্প সংখ্যক। আল-ওয়াকিয়া : ৭-১৪

২। জান্নাতের বাসীর সংখ্যা কমই হবে-

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَتَمَّتۡ کَلِمَۃُ رَبِّکَ لَاَمۡلَـَٔنَّ جَہَنَّمَ مِنَ الۡجِنَّۃِ وَالنَّاسِ اَجۡمَعِیۡنَ

এবং তোমার রবের এই বাণীও পূর্ণ হবে যে, আমি জিন ও মানব সকলের দ্বারা জাহান্নামকে পূর্ণ করবই। সুরা হুদ : ১১৯

আবূ সা‘ঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, মহান আল্লাহ ডাকবেন, হে আদম (আঃ)! তখন তিনি জবাব দিবেন, আমি হাযির, আমি সৌভাগ্যবান এবং সকল কল্যাণ আপনার হতেই। তখন আল্লাহ বলবেন, জাহান্নামীদেরকে বের করে দাও। আদম (আঃ) বলবেন, জাহান্নামী কারা? আল্লাহ বলবেন, প্রতি হাজারে নয়শত নিরানব্বই জন। এ সময় ছোটরা বুড়ো হয়ে যাবে। প্রত্যেক গর্ভবতী তার গর্ভপাত করে ফেলবে। মানুষকে দেখবে নেশাগ্রস্তের মত যদিও তারা নেশাগ্রস্ত নয়। বস্তুতঃ আল্লাহর শাস্তি কঠিন- (হাজ্জঃ ২)। সাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের মধ্যে সেই একজন কে? তিনি বললেন, তোমরা সুসংবাদ গ্রহণ কর। কেননা তোমাদের মধ্য হতে একজন আর এক হাজারের অবশিষ্ট ইয়াজুজ-মাজুজ হবে।

অতঃপর তিনি বললেন, যাঁর হাতে আমার প্রাণ, তাঁর কসম। আমি আশা করি, তোমরা সমস্ত জান্নাতবাসীর এক তৃতীয়াংশ হবে। (রাবি বলেন) আমরা এ সংবাদ শুনে আবার আল্লাহু আকবার বলে তাকবীর দিলাম। তিনি আবার বললেন, আমি আশা করি তোমরা সমস্ত জান্নাতীদের অর্ধেক হবে। এ কথা শুনে আমরা আবারও আল্লাহু আকবার বলে তাকবীর দিলাম। তিনি বললেন, তোমরা তো অন্যান্য মানুষের তুলনায় এমন, যেমন সাদা ষাঁড়ের দেহে কয়েকটি কালো পশম অথবা কালো ষাঁড়ের শরীরে কয়েকটি সাদা পশম। সহিহ বুখারি : ৩৩৪৮, ৪৭৪১

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম আদম (আঃ)-কে ডাকা হবে। তিনি তাঁর সন্তানদেরকে দেখতে পাবেন। তখন তাদেরকে বলা হবে, ইনি তোমাদের পিতা আদম (আঃ)। তখন তারা বলবে لَبَّيْكَ وَسَعْدَيْكَ আমরা তোমার খিদমাতে হাযির! এরপর তাঁকে আল্লাহ্ বলবেন, তোমার জাহান্নামী বংশধরকে বের কর। তখন আদম (আঃ) বলবেন, হে আমার প্রতিপালক! কী পরিমাণ বের করব? আল্লাহ্ বলবেনঃ প্রতি একশ’ তে নিরানব্বই জনকে বের কর। তখন সাহাবাগণ বলে উঠলেন, হে আল্লাহর রাসূল! প্রতি একশ’ থেকে যখন নিরানব্বই জনকে বের করা হবে তখন আর আমাদের কে বাকী থাকবে? তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ নিশ্চয়ই অন্যান্য সকল উম্মাতের তুলনায় আমার উম্মাত হল কাল ষাঁড়ের গায়ে একটি সাদা চুলের মত। সহিহ বুখারি : ৬৫২৯

৩। সমাজের অধিকাংশ লোকই হবে অজ্ঞ-

অনেকে সংখ্যাধিক্যকে গুরুত্ব দিয়ে বলেন, আমার অনেকেরই ধারণা করে থাকি অধিকাংশ লোক সাধারনত যা করে তাই সঠিক। তাইতো দেখা যায় কোন দ্বীনের বিষয়ে কোন  ভূল আমল সংশোধনের কথা বললে, পাল্টা প্রশ্ন করেন, অধিকাংশ মানুষ কি ভূল করছে? “এত মানুষ করে, তারা কি ভুল করে?” অধিক সংখ্য মানুষ করলেই যেন দলীল হয়ে যায়। তাদের বিশ্বাস অধিকাংশ মানুষ অনুসরণই সঠিক। সংখ্যাগরিষ্টতা বা অধিকাংশ লোক কখন সত্যের মাপকাঠি হতে পারে না। এক মাত্র কুরআন সুন্নাহই ইসলামের মাপকাঠি। কুরআন সুন্নাহ (আল্লাহর আদেশের) বিপরীতে অধিকাংশের মতামতকে সত্যের মাপকাঠি মানা যাবে না। অপর পক্ষে অধিকাংশ লোক সত্যের মাপকাঠি বা অনুসরনীয় নয় তার কারন হল, সমাজের অধিকাংশ লোক হবে অজ্ঞ, ঈমানহীন, জালিম, অকৃতজ্ঞ, পাপি, পথভ্রষ্ট, মিথ্যুক, সত্য বিমুখ। এ কথার প্রমান আল্লাহর ঘোষনা। তিনি পবিত্র কুরআনে বলেন,

মহান আল্লাহ বলেন,

أَءِلَـٰهٌ۬ مَّعَ ٱللَّهِ‌ۚ بَلۡ أَڪۡثَرُهُمۡ لَا يَعۡلَمُونَ (٦١)

অর্থ: আল্লাহর সাথে (এসব কাজের শরিক)  অন্য কোন ইলাহ আছে কি? না, বরং এদের অধিকাংশই অজ্ঞ৷ (সুরা নমল ২৭:৬১)। আরো দেখুন:  (সুরা ইউসুফ ১২:৫৫);  (সুরা আরাফ ৭:১৩১); (সুরা যুমার ৩৯:২৯); (সুরা কাসাস ২৮:১৩)।

  মহান আল্লাহ বলেন,

 وَمَا ظَنُّ ٱلَّذِينَ يَفۡتَرُونَ عَلَى ٱللَّهِ ٱلۡڪَذِبَ يَوۡمَ ٱلۡقِيَـٰمَةِ‌ۗ إِنَّ ٱللَّهَ لَذُو فَضۡلٍ عَلَى ٱلنَّاسِ وَلَـٰكِنَّ أَكۡثَرَهُمۡ لَا يَشۡكُرُونَ (٦٠)

অর্থ: যারা আল্লাহর প্রতি মিথ্যা আরোপ করছে, তারা কি মনে করে, কিয়ামতের দিন তাদের সাথে কেমন ব্যবহার করা হবে? আল্লাহ তো লোকদের প্রতি অনুগ্রহ পরায়ণ কিন্তু অধিকাংশ মানুষ অকৃতজ্ঞ৷ (সুরা ইউনুস ১০:৬০)। আরো দেখুন: (সুরা আনাম ৬:৭৩, সুরা ফুরকান ২৫:৫০, সুরা ইউসুফ ১২:৩৮)।

  মহান আল্লাহ বলেন,

 إِنَّ فِى ذَٲلِكَ لَأَيَةً۬‌ۖ وَمَا كَانَ أَكۡثَرُهُم مُّؤۡمِنِينَ (١٠٣)

অর্থ: নিশ্চয়ই তার মধ্যে একটি নিদর্শন রয়েছে, কিন্তু তাদের অধিকাংশই মু‘মিন নয়৷  (সুরা শুআরা ২৬:১০৩)। আরো দেখুন: (সুরা শুআরা ২৬:৬৭, ১২১, ১৩৯, ১৫৮, ১৭৪ ও ১৯০।

  মহান আল্লাহ বলেন,

بَلۡ أَكۡثَرُهُمۡ لَا يَعۡلَمُونَ ٱلۡحَقَّ‌ۖ فَهُم مُّعۡرِضُونَ (٢٤)

অর্থ: কিন্তু তাদের অধিকাংশ লোকই প্রকৃত সত্য থেকে বেখবর, কাজেই মুখ ফিরিয়ে আছে৷ (সুরা আম্বিয়া ২১:২৪)।

সমাজের অধিকাংশ লোক হবে অজ্ঞ, ঈমানহীন, জালিম, অকৃতজ্ঞ, পাপি, পথভ্রষ্ট, মিথ্যুক, সত্য বিমুখ  এবং তাদের পরিচালক হবেন স্বয়ং ইবলিশ শয়তান। সে তাদের পথ ভ্রষ্ট করার প্রচেষ্টা কেয়ামত পর্যন্ত অব্যাহত রাখবে, যাতে সমাজের অধিকাংশ মানুষ তার দলে থাকে এবং পথভ্রষ্ট হয়। সঠিক দ্বীন বা কুরআন ও সহিহ সুন্নাহ অনুসরণ করলেই পরকালে মুক্তি পাওয়া যাবে, তবে এই অনুসারীর সংখ্যা হবে অল্প। কিন্তু দ্বীন সম্পর্কে সঠিক জ্ঞানের অভাবে অধিকাংশ লোক নির্ভুল জ্ঞানের পরিবর্তে কেবলমাত্র আন্দাজ অনুমানের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ফলে তাদের আকীদা, বিশ্বাস, দর্শন, চিন্তাধারা, জীবন যাপনের মূলনীতি ও কর্মবিধান সবকিছুই ধারণা ও অনুমানের ভিত্তিতে গড়ে। দুনিয়ার বেশীর ভাগ লোক কোন পথে যাচ্ছে, কি বিশ্বাস করছে, কি আমল করছে, কোন তরিকা অনুসরন করছে, কোন সত্য সন্ধানীর এটা দেখা উচিত নয়। বরং আল্লাহ যে পথটি তৈরী করে দিয়েছেন তার ওপরই তার দৃঢ় পদক্ষেপে এগিয়ে চলা উচিত। এ পথে চলতে গিয়ে দুনিয়ায় যদি সে অধিকাংশের মতামত ত্যাগ করতে হয়, তবে তাই করতে হবে। তাহলে দুনিয়া ও আখেরাতে সফলকাম হওয়া যাবে।

মহাবিশ্বের আদি উৎস সম্পর্কে কুরআন

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

মহাবিশ্বের অস্তিত্ব ও কুরআন

অনন্ত নক্ষত্ররাজি, অগণিত গ্যালাক্সি এবং সীমাহীন শূন্যতায় ঘেরা এই মহাবিশ্ব মানবজাতির জন্য সবসময়ই এক পরম বিস্ময়ের নাম। মানুষ অনাদিকাল থেকে মহাবিশ্বের জন্ম, এর গঠন এবং এর ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা-গবেষণা করে আসছে। বিংশ শতাব্দীতে এসে আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান মহাবিশ্বের রহস্য উন্মোচনে যে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে, তার অনেকগুলোই পবিত্র কুরআনুল কারীমে আজ থেকে চৌদ্দশত বছর আগেই ইঙ্গিত করা হয়েছিল। ‘মহাবিশ্বের অস্তিত্ব ও কুরআন’ বিষয়টি মূলত স্রষ্টার অস্তিত্ব ও তাঁর অসীম ক্ষমতার এক জলজ্যান্ত প্রমাণ।

আধুনিক বিজ্ঞানের সবচেয়ে স্বীকৃত তত্ত্ব ‘বিগ ব্যাং’ বা মহাবিস্ফোরণ। বিজ্ঞানীরা বলছেন, মহাবিশ্ব এক সময় একটি বিন্দুতে পুঞ্জীভূত ছিল, যা পরে এক বিস্ফোরণের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। পবিত্র কুরআন এই সত্যটিই তুলে ধরেছে—আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী একসাথে মিশে ছিল, অতঃপর আল্লাহ তাদের পৃথক করে দিলেন। শুধু তাই নয়, বিজ্ঞানী এডুইন হাবল ১৯২৯ সালে প্রমাণ করেন যে মহাবিশ্ব প্রতিনিয়ত সম্প্রসারিত হচ্ছে। অথচ কুরআন সূরা যারিয়াতের ৪৭ নম্বর আয়াতে বহু আগেই ঘোষণা করেছে, *“আমি আকাশ নির্মাণ করিয়াছি আমার ক্ষমতা বলে এবং আমিই ইহাকে ক্রমাগত সম্প্রসারিত করিতেছি।”*

মহাবিশ্বের স্তম্ভহীন ভারসাম্য রক্ষায় ডার্ক ম্যাটার এবং ডার্ক এনার্জির ভূমিকা আজ বিজ্ঞানীদের প্রধান আলোচনার বিষয়। কুরআন বলছে, আকাশমণ্ডলকে আল্লাহ কোনো দৃশ্যমান স্তম্ভ ছাড়াই উচ্চে স্থাপন করেছেন। আবার পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল যে আমাদের জন্য এক সুরক্ষিত ছাদ হিসেবে কাজ করে এবং মহাজাগতিক ক্ষতিকর রশ্মি থেকে রক্ষা করে, সেই বৈজ্ঞানিক ধ্রুব সত্যটি সূরা আম্বিয়ায় ‘সুরক্ষিত ছাদ’ (Roof Protected) হিসেবে বর্ণিত হয়েছে। এমনকি বায়ুমণ্ডলের উচ্চতা বাড়লে যে অক্সিজেনের চাপ কমে যায় এবং মানুষের বুক সংকুচিত হয়ে আসে, সেই মনস্তাত্ত্বিক ও শারীরিক পরিবর্তনের কথা কুরআনে চমৎকারভাবে রূপক অর্থে বর্ণিত হয়েছে।

বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন বিংশ শতাব্দীতে ‘থিওরি অফ রিলেটিভিটি’র মাধ্যমে সময়ের আপেক্ষিকতা বুঝিয়েছিলেন। অথচ কুরআনে আল্লাহর একদিন মানুষের হাজার বছরের সমান কিংবা ফেরেশতাদের চলাচলের গতিতে সময়ের ভিন্নতার কথা বলে এই আপেক্ষিকতার ধারণা আগেই দিয়ে রেখেছে। মহাবিশ্বের প্রতিটি নক্ষত্র ও গ্রহ যে নিজ নিজ কক্ষপথে সাঁতার কাটছে (সূরা ইয়াসিন), এই কক্ষপথের ধারণা তৎকালীন আরব সমাজের মানুষের কাছে ছিল অকল্পনীয়। পৃথিবীর গোলাকৃতি এবং দিন-রাত্রির পর্যায়ক্রমিক আবর্তনকে ‘প্যাঁচানো’ বা ‘গুটিয়ে নেওয়া’র (কুরআনের ভাষায় ‘ইউকাওবিরু’) মাধ্যমে বর্ণনা করা হয়েছে, যা কেবল একটি গোল বস্তুর ক্ষেত্রেই সম্ভব।

মহাবিশ্বের অস্তিত্ব নিয়ে কুরআনের এই উপস্থাপনাগুলো কোনো সাধারণ তথ্য নয়, বরং এটি মানুষের বিবেক ও বুদ্ধিকে নাড়া দেওয়ার একটি ঐশ্বরিক পদ্ধতি। আধুনিক বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রা যত বেগবান হচ্ছে, কুরআনের আয়াতগুলোর গভীরতা তত বেশি স্পষ্ট হয়ে ধরা দিচ্ছে। কুরআন ও আধুনিক বিজ্ঞানের এই বিস্ময়কর সামঞ্জস্য এটাই প্রমাণ করে যে, এই মহাবিশ্বের একজন মহান পরিকল্পনাকারী আছেন এবং কুরআন তাঁরই অভ্রান্ত বাণী। এই বৈজ্ঞানিক নিদর্শনগুলো মানুষকে অন্ধবিশ্বাস থেকে মুক্ত করে যুক্তিনির্ভর ঈমানের পথে পরিচালিত করে।

মহাবিশ্বের আদি উৎস সম্পর্কে কুরআন

মহাবিশ্বের উৎস ও তার আদিম অবস্থা সম্পর্কে আল-কুরআনে যে বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, তা আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের পর্যবেক্ষণের সাথে এক বিস্ময়কর সাদৃশ্য বহন করে। আধুনিক কসমোলজির প্রমিত মডেল (Standard Cosmological Model) দৃঢ়ভাবে নির্দেশ করে যে, আমাদের এই বিশাল মহাবিশ্ব একসময় একটি অত্যন্ত ঘন, উত্তপ্ত, এবং অস্বচ্ছ গ্যাসীয় সংমিশ্রণ ছাড়া আর কিছুই ছিল না। আল-কুরআন এই আদিম অবস্থাকেই আরবি শব্দ “দুখান” (دُخَانٌ) বা ধূম্রপুঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

১. দুখান (Dukhan): কুরআনে বর্ণিত আদিম অবস্থা

সূরা ফুসসিলাতের আল্লাহ তাআলা মহাবিশ্বের সৃষ্টি প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ তুলে ধরেছেন। আল্লাহ্ কুরআনে বলেছেন:

ثُمَّ اسۡتَوٰۤی اِلَی السَّمَآءِ وَہِیَ دُخَانٌ فَقَالَ لَہَا وَلِلۡاَرۡضِ ائۡتِیَا طَوۡعًا اَوۡ کَرۡہًا ؕ قَالَتَاۤ اَتَیۡنَا طَآئِعِیۡنَ

অতঃপর তিনি আকাশের দিকে মনোনিবেশ করেন যা ছিল ধূম্রপুঞ্জ বিশেষ। অতঃপর তিনি ওটাকে এবং পৃথিবীকে বললেনঃ তোমরা উভয়ে এসো স্বেচ্ছায় অথবা অনিচ্ছায়। তারা বললঃ আমরা এলাম অনুগত হয়ে। সুরা ফুসসিলাত : ১১

আয়াতে ব্যবহৃত “দুখান” (دُخَانٌ) শব্দটি ধূম্র, ধোঁয়া, বা বাষ্পকে বোঝায়। এই বর্ণনাটি মহাবিশ্বের সেই প্রাথমিক অবস্থা বা প্রাইমরডিয়াল কসমিক সোপ (Primordial Cosmic Soup)-এর প্রতি ইঙ্গিত করে, যা বিগ ব্যাং-এর পরে এবং নক্ষত্র ও গ্যালাক্সি গঠিত হওয়ার আগে বিদ্যমান ছিল।

 এটি কোনো সাধারণ ঘরের ধোঁয়া নয়, বরং হাইড্রোজেন, হিলিয়াম, প্লাজমা এবং আদিম কণাগুলির একটি অত্যন্ত উত্তপ্ত, অস্বচ্ছ এবং গ্যাসীয় মিশ্রণকে নির্দেশ করে। এই আদিম গ্যাসীয় অবস্থা মহাবিশ্বের সৃষ্টির এক অনস্বীকার্য ধাপ।

মহাবিশ্ব আদিতে ধূম্রপুঞ্জ বা গ্যাসীয় অবস্থায় ছিল। আধুনিক বিশ্বতত্ত্বের বিজ্ঞান, পর্যবেক্ষণমূলক এবং তাত্ত্বিক উভয়ই, স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে, একসময় সমগ্র মহাবিশ্ব ‘ধোঁয়া’ (অর্থাৎ একটি অস্বচ্ছ, অত্যন্ত ঘন এবং উত্তপ্ত গ্যাসীয় সংমিশ্রণ) ছাড়া আর কিছুই ছিল না। এটি আধুনিক প্রমিত বিশ্বতত্ত্বের একটি অনস্বীকার্য নীতি। বিজ্ঞানীরা এখন সেই ‘ধোঁয়া’র অবশিষ্ট অংশ থেকে নতুন তারা গঠিত হতে দেখতে পান।

রাতে আমরা যে উজ্জ্বল তারাগুলি দেখি, সেগুলি ঠিক যেমন সমগ্র মহাবিশ্ব ছিল, সেই ‘ধোঁয়া’ উপাদানের মধ্যে ছিল।

২. আধুনিক বিশ্বতত্ত্বের অনস্বীকার্য নীতি

আধুনিক বিজ্ঞান, পর্যবেক্ষণমূলক প্রমাণ (যেমন কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড বা CMB) এবং তাত্ত্বিক মডেল উভয়ের মাধ্যমেই নিশ্চিত করেছে যে, একসময় সমগ্র মহাবিশ্ব একটি আদিম গ্যাসীয় অবস্থায় ছিল।

আদিম প্লাজমা:

বিগ ব্যাং-এর প্রাথমিক সম্প্রসারণের পর মহাবিশ্ব যখন শীতল হচ্ছিল, তখন এটি ছিল একটি উত্তপ্ত প্লাজমা (Plasma)-এর সমুদ্র যেখানে নিউক্লিয়াস ও ইলেকট্রনগুলি মুক্ত অবস্থায় ছিল। এই অবস্থাটি ছিল অস্বচ্ছ, ঠিক যেন ঘন ধোঁয়া। প্রায় ৩,৮০,০০০ বছর পরে এই প্লাজমা শীতল হয়ে নিরপেক্ষ পরমাণু গঠন করে, এবং মহাবিশ্ব স্বচ্ছ হয়। এই আদিম প্লাজমা অবস্থাটিই কুরআনে বর্ণিত ‘ধূম্রপুঞ্জ’ বা দুখ Nunn-এর সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ।

নক্ষত্র গঠনের উৎস :

বিজ্ঞানীরা পর্যবেক্ষণ করেন যে, রাতের আকাশে আমরা যে উজ্জ্বল নক্ষত্র, গ্রহ এবং গ্যালাক্সি দেখি, সেগুলি সবই এই আদিম ধূম্রপুঞ্জের অবশিষ্ট অংশ থেকেই গঠিত হয়েছে। মহাকর্ষীয় আকর্ষণের প্রভাবে এই আদিম গ্যাসীয় মেঘ বা নেবুলা (Nebulae) ঘনীভূত হতে শুরু করে, ফলে নক্ষত্রের জন্ম হয়। নতুন তারা বা স্টার সিস্টেম গঠনের প্রক্রিয়া আজও মহাজাগতিক গ্যাস ও ধূলিকণার মেঘের মধ্যে ঘটছে।

পৃথিবী ও আকাশের অভিন্ন উৎস :

মহান আল্লাত তায়ালা বলেন-

اَوَلَمۡ یَرَ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡۤا اَنَّ السَّمٰوٰتِ وَالۡاَرۡضَ کَانَتَا رَتۡقًا فَفَتَقۡنٰہُمَا ؕ وَجَعَلۡنَا مِنَ الۡمَآءِ کُلَّ شَیۡءٍ حَیٍّ ؕ اَفَلَا یُؤۡمِنُوۡنَ

যারা কুফরী করে তারা কি ভেবে দেখে না যে, আসমানসমূহ ও যমীন ওতপ্রোতভাবে মিশে ছিল, অতঃপর আমি উভয়কে পৃথক করে দিলাম, আর আমি সকল প্রাণবান জিনিসকে পানি থেকে সৃষ্টি করলাম। তবুও কি তারা ঈমান আনবে না? সুরা আম্বিয়া : ৩০

আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মতে আদিতে আকাশ, সূর্য, নক্ষত্র ও পৃথিবী ইত্যাদি পৃথক সত্তায় ছিল না; বরং সবকিছুই ওতপ্রোতভাবে মিশে ছিল। তখন মহাবিশ্ব ছিল অসংখ্য গ্যাসীয় কণার সমষ্টি। পরবর্তীকালে মহাবিস্ফোরণের মাধ্যমে নক্ষত্র, সূর্য, পৃথিবী ও গ্রহসমূহ সৃষ্টি হয়। আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানও স্বীকার করে যে, পৃথিবীসহ সৌরজগতের সকল উপাদান মহাজাগতিক ধূলিকণা ও গ্যাসের একটি আদিম মেঘ (Solar Nebula) থেকে ঘনীভূত হয়ে সৃষ্টি হয়েছে। এই অভিন্ন উৎসই প্রমাণ করে যে, পৃথিবী এবং আকাশের উপাদানগুলি মূলত একই আদিম পদার্থ থেকে এসেছে।

এই বৈজ্ঞানিক জ্ঞান যে মহাবিশ্ব আদিতে একটি গ্যাসীয় বা ধূম্রপুঞ্জ অবস্থা থেকে শুরু হয়েছিল— তা মানুষের কাছে ছিল সম্পূর্ণ অজ্ঞাত। এটি কেবল বিংশ শতাব্দীর উন্নত প্রযুক্তিগত পর্যবেক্ষণ এবং জটিল গাণিতিক হিসাবের মাধ্যমে জানা সম্ভব হয়েছে। এমন একটি সময়ে কুরআনের এই নির্ভুল ঘোষণা মহাবিশ্বের উৎস সম্পর্কে কুরআনের গভীর এবং ঐশ্বরিক জ্ঞানের এক শক্তিশালী প্রমাণ হিসেবে কাজ করে।