প্রাকৃতিক বিজ্ঞান ও কুরআন : কুরআন ও পানিচক্র

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

পানিচক্র হলো সেই প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে পৃথিবীর জলীয় বাষ্প, তরল ও কঠিন অবস্থায় ক্রমাগত স্থান পরিবর্তন করে এবং এক ভাণ্ডার থেকে অন্য ভাণ্ডারে আবর্তিত হতে থাকে। এই প্রক্রিয়াটি প্রধানত চারটি ধাপে সম্পন্ন হয়,  বাষ্পীভবন (Evaporation), যেখানে সূর্যের তাপের ফলে সমুদ্র, নদী, হ্রদ এবং মাটি থেকে জল বাষ্পীভূত হয়ে বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে। ঘনীভবন (Condensation), যেখানে বায়ুমণ্ডলের শীতলতা ও উচ্চতার কারণে জলীয় বাষ্প ঘনীভূত হয়ে মেঘ তৈরি করে; অধঃক্ষেপণ (Precipitation), যেখানে মেঘের মধ্যে জমা হওয়া জলের কণাগুলি বৃষ্টি, বরফ বা শিলারূপে পৃথিবীতে পতিত হয়; এবং সংগ্রহ (Collection) বা প্রবাহ (Flow), যেখানে ভূপৃষ্ঠে পতিত হওয়া জল নদী, নালা ও ভূগর্ভস্থ জল হিসেবে পুনরায় সমুদ্রে ফিরে যায় অথবা ভূগর্ভে সংরক্ষিত হয়। এই অবিরাম চক্রটি পৃথিবীর জলবায়ু এবং জীবজগতের ভারসাম্য রক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

পবিত্র কুরআনে পানিচক্র (Water Cycle) বা জলচক্রের বিভিন্ন ধাপ সম্পর্কে একাধিক আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও “পানিচক্র” শব্দটি সরাসরি ব্যবহার করা হয়নি, তবে মেঘের সৃষ্টি, বৃষ্টি বর্ষণ, এবং সেই পানি মাটির অভ্যন্তরে সংরক্ষণ ও প্রবাহিত হওয়ার বর্ণনা পাওয়া যায়। এখানে পানিচক্র সম্পর্কিত কিছু গুরুত্বপূর্ণ আয়াত এবং সেগুলির সারসংক্ষেপ দেওয়া হলো :

বৃষ্টি বর্ষণ এবং বায়ুর ভূমিকা

পানিচক্রের এই ধাপে জলীয় বাষ্পের মেঘে পরিণত হওয়া এবং বাতাস কীভাবে এতে সাহায্য করে তার বর্ণনা আছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَاَرۡسَلۡنَا الرِّیٰحَ لَوَاقِحَ فَاَنۡزَلۡنَا مِنَ السَّمَآءِ مَآءً فَاَسۡقَیۡنٰکُمُوۡہُ ۚ وَمَاۤ اَنۡتُمۡ لَہٗ بِخٰزِنِیۡنَ

আর আমি বায়ুকে ঊর্বরকারীরূপে প্রেরণ করি অতঃপর আসমান থেকে বৃষ্টি বর্ষণ করি এবং তা তোমাদের পান করাই। তবে তোমরা তার সংরক্ষণকারী নও। সূরা হিজর : ২২

এই আয়াতে বলা হয়েছে যে আল্লাহই বাতাসকে চালনা করেন যা বৃষ্টির কারণ (বাষ্প ও মেঘকে বহন করে) এবং আকাশ থেকে পরিমিত পরিমাণে পানি বর্ষণ করে, যার ভান্ডার মানুষের কাছে নেই।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

اَللّٰہُ الَّذِیۡ یُرۡسِلُ الرِّیٰحَ فَتُثِیۡرُ سَحَابًا فَیَبۡسُطُہٗ فِی السَّمَآءِ کَیۡفَ یَشَآءُ وَیَجۡعَلُہٗ کِسَفًا فَتَرَی الۡوَدۡقَ یَخۡرُجُ مِنۡ خِلٰلِہٖ ۚ  فَاِذَاۤ اَصَابَ بِہٖ مَنۡ یَّشَآءُ مِنۡ عِبَادِہٖۤ اِذَا ہُمۡ یَسۡتَبۡشِرُوۡنَ ۚ

আল্লাহ, যিনি বাতাস প্রেরণ করেন ফলে তা মেঘমালাকে ধাওয়া করে; অতঃপর তিনি মেঘমালাকে যেমন ইচ্ছা আকাশে ছড়িয়ে দেন এবং তাকে খন্ড- বিখন্ড করে দেন, ফলে তুমি দেখতে পাও, তার মধ্য থেকে নির্গত হয় বারিধারা। অতঃপর যখন তিনি তাঁর বান্দাদের মধ্যে যাদের উপর ইচ্ছা বারি বর্ষণ করেন, তখন তারা হয় আনন্দিত। সূরা রূম : ৪৮

মেঘ তৈরি, সেটির সঞ্চালন এবং বৃষ্টিপাতের প্রক্রিয়াকে এখানে বর্ণনা করা হয়েছে।

মাটির অভ্যন্তরে সংরক্ষণ ও ঝর্ণার সৃষ্টি

বৃষ্টির পানি পৃথিবীতে আসার পর তা কীভাবে সংরক্ষিত হয়, সেই ধাপের বর্ণনা। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَاَنۡزَلۡنَا مِنَ السَّمَآءِ مَآءًۢ بِقَدَرٍ فَاَسۡکَنّٰہُ فِی الۡاَرۡضِ ٭ۖ  وَاِنَّا عَلٰی ذَہَابٍۭ بِہٖ لَقٰدِرُوۡنَ ۚ

আর আমি আকাশ থেকে পরিমিতভাবে পানি বর্ষণ করেছি। অতঃপর আমি তা যমীনে সংরক্ষণ করেছি। আর অবশ্যই আমি সেটাকে অপসারণ করতেও সক্ষম। সূরা মুমিনূন : ১৮

এতে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ এবং সেই পানি ভূগর্ভে (যেমন ভূগর্ভস্থ জল বা জলাধার হিসেবে) সংরক্ষিত হওয়ার কথা বলা হয়েছে, যা মাটির গভীরে প্রবেশ করে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

اَلَمۡ تَرَ اَنَّ اللّٰہَ اَنۡزَلَ مِنَ السَّمَآءِ مَآءً فَسَلَکَہٗ یَنَابِیۡعَ فِی الۡاَرۡضِ ثُمَّ یُخۡرِجُ بِہٖ زَرۡعًا مُّخۡتَلِفًا اَلۡوَانُہٗ ثُمَّ یَہِیۡجُ فَتَرٰىہُ مُصۡفَرًّا ثُمَّ یَجۡعَلُہٗ حُطَامًا ؕ  اِنَّ فِیۡ ذٰلِکَ لَذِکۡرٰی لِاُولِی الۡاَلۡبَابِ 

তুমি কি দেখ না, আল্লাহ আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেন, অতঃপর যমীনে তা প্রস্রবন হিসেবে প্রবাহিত করেন তারপর তা দিয়ে নানা বর্ণের ফসল উৎপন্ন করেন, তারপর তা শুকিয়ে যায়। ফলে তোমরা তা দেখতে পাও হলুদ বর্ণের তারপর তিনি তা খড়-খুটায় পরিণত করেন। এতে অবশ্যই উপদেশ রয়েছে বুদ্ধিমানদের জন্য। সূরা যুমার : ২১

এই আয়াতে বৃষ্টির পানি মাটির অভ্যন্তরে প্রবেশ করে ঝর্ণা বা স্রোতের মাধ্যমে আবার ভূপৃষ্ঠে বেরিয়ে আসার প্রক্রিয়াকে তুলে ধরা হয়েছে।

উপসংহার : এই আয়াতগুলো এবং আরও অনেক আয়াতে জলচক্রের গুরুত্বপূর্ণ ধাপ— বাষ্পীভবন (Evaporation) (যা মেঘ তৈরির কারণ), ঘনীভবন (Condensation) (মেঘ সৃষ্টি), অধঃক্ষেপণ (Precipitation) (বৃষ্টি বর্ষণ), এবং সঞ্চালন ও প্রবাহ (Collection & Flow) (ভূমিতে সংরক্ষণ ও ঝর্ণা সৃষ্টি) সম্পর্কে ইঙ্গিত দেয়।

প্রাকৃতিক বিজ্ঞান ও কুরআন : কুরআন ও মেঘমালা

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

পবিত্র কুরআন মহাবিশ্বের স্রষ্টার পক্ষ থেকে প্রেরিত এক চিরন্তন বাণী। এটি কোনো বিজ্ঞানের কিতাব না হলেও, এতে প্রকৃতির এমন সব সূক্ষ্ম প্রক্রিয়ার বর্ণনা দেওয়া হয়েছে যা আধুনিক বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রার সাথে সাথে আরও স্পষ্টভাবে আমাদের সামনে উন্মোচিত হচ্ছে। আবহাওয়াবিদ্যা বা মেটিওরোলজি (Meteorology) এমন একটি ক্ষেত্র যেখানে কুরআনের বর্ণনা এবং আধুনিক গবেষণার এক অভাবনীয় মেলবন্ধন দেখা যায়। বিশেষ করে মেঘের গঠন, বৃষ্টিপাত এবং বজ্রপাতের বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়াগুলো কুরআনের আয়াতে যেভাবে বর্ণিত হয়েছে, বহু বছর আগের কোনো মানুষের পক্ষে জানা অসম্ভব ছিল। এই প্রবন্ধে আমরা সূরা নূরের ৪৩ নম্বর আয়াতের আলোকে মেঘমালার গঠনপ্রক্রিয়া এবং বজ্রবিদ্যুৎ উৎপাদনের আধুনিক বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা বিস্তারিতভাবে আলোচনা করব।

মেঘের বৈজ্ঞানিক শ্রেণিবিন্যাস ও কিউমুলোনিম্বাস মেঘ

পবিত্র কুরআনের আল্লাহ তাআলা মেঘমালা গঠন এবং বৃষ্টি হওয়ার যে পর্যায়ক্রমিক বর্ণনা দিয়েছেন, তা আধুনিক আবহাওয়া বিজ্ঞানের (Meteorology) দৃষ্টিতে অত্যন্ত বিস্ময়কর। আধুনিক আবহাওয়া বিজ্ঞান অনুযায়ী, বৃষ্টির মেঘ বিশেষ করে কিউমুলোনিম্বাস (Cumulonimbus) মেঘ তৈরি হওয়ার জন্য সুনির্দিষ্ট কিছু ধাপ রয়েছে। কুরআন মাজিদ এই ধাপগুলোকে অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে বর্ণনা করেছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

اَلَمۡ تَرَ اَنَّ اللّٰہَ یُزۡجِیۡ سَحَابًا ثُمَّ یُؤَلِّفُ بَیۡنَہٗ ثُمَّ یَجۡعَلُہٗ رُکَامًا فَتَرَی الۡوَدۡقَ یَخۡرُجُ مِنۡ خِلٰلِہٖ ۚ  وَیُنَزِّلُ مِنَ السَّمَآءِ مِنۡ جِبَالٍ فِیۡہَا مِنۡۢ بَرَدٍ فَیُصِیۡبُ بِہٖ مَنۡ یَّشَآءُ وَیَصۡرِفُہٗ عَنۡ مَّنۡ یَّشَآءُ ؕ  یَکَادُ سَنَا بَرۡقِہٖ یَذۡہَبُ بِالۡاَبۡصَارِ ؕ

তুমি কি দেখনি যে, আল্লাহ মেঘমালাকে পরিচালিত করেন, তারপর তিনি সেগুলোকে একত্রে জুড়ে দেন, তারপর সেগুলো স্তুপীকৃত করেন, তারপর তুমি দেখতে পাও তার মধ্য থেকে বৃষ্টির বের হয়। আর তিনি আকাশে স্থিত মেঘমালার পাহাড় থেকে শিলা বর্ষণ করেন। তারপর তা দ্বারা যাকে ইচ্ছা আঘাত করেন। আর যার কাছ থেকে ইচ্ছা তা সরিয়ে দেন। এর বিদ্যুতের ঝলক দৃষ্টিশক্তি প্রায় কেড়ে নেয়। সূরা নূর: ৪৩

এই একটি আয়াতে আধুনিক বিজ্ঞানের তিনটি প্রধান ধাপের প্রতি ইঙ্গিত রয়েছে। আর বিজ্ঞানীরাও মেঘকে তাদের আকৃতি, উচ্চতা ও গঠনগত বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—সিরাস (Cirrus), স্ট্রাটাস (Stratus), কিউমুলাস (Cumulus) এবং কিউমুলোনিম্বাস (Cumulonimbus) মেঘ। বৃষ্টির মেঘ হিসেবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো কিউমুলোনিম্বাস মেঘ। এই মেঘ থেকেই প্রবল বৃষ্টি, শিলাবৃষ্টি, বজ্রপাত এবং কখনো কখনো ঘূর্ণিঝড়ের সৃষ্টি হয়। আবহাওয়াবিদরা বহু বছর ধরে গবেষণা করে দেখেছেন যে, কিউমুলোনিম্বাস মেঘ হঠাৎ সৃষ্টি হয় না, বরং এটি একটি নির্দিষ্ট ও ধাপে ধাপে সংঘটিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গঠিত হয়। কিউমুলোনিম্বাস মেঘ গঠনের ধাপসমূহ-

১. বায়ুপ্রবাহ ও মেঘের সঞ্চালন (Driving the Clouds)

কুরআনের ভাষায়: “তুমি কি দেখনি যে, আল্লাহ মেঘমালাকে চালনা করেন…”

যেকোনো বৃষ্টিবাহী মেঘ গঠনের প্রাথমিক শর্ত হলো বায়ুপ্রবাহ। বিজ্ঞানের ভাষায়, কিউমুলোনিম্বাস মেঘ সরাসরি আকাশে তৈরি হয় না। প্রথমে বাতাসের তোড়ে জলীয় বাষ্পপূর্ণ ছোট ছোট কিউমুলাস (Cumulus) মেঘ এক জায়গায় হতে থাকে। বাতাস এখানে ‘ড্রাইভার’ বা চালকের ভূমিকা পালন করে। এই বাতাস না থাকলে বিচ্ছিন্ন মেঘগুলো কখনো একটি নির্দিষ্ট স্থানে জমা হয়ে ঘনীভূত হতে পারত না। আধুনিক স্যাটেলাইট ইমেজিংয়েও দেখা যায়, বায়ুমণ্ডলের নিম্নস্তরের বায়ুপ্রবাহই মেঘের প্রাথমিক দিকনির্দেশক হিসেবে কাজ করে।

২. মেঘের সংযুক্তি বা মিলন (Joining Together)

কুরআনের ভাষায়: “…তারপর তিনি সেগুলোকে একত্রে জুড়ে দেন…”

যখন বাতাস ছোট ছোট মেঘখণ্ডগুলোকে কাছাকাছি নিয়ে আসে, তখন সেগুলো একে অপরের সাথে মিশে বড় আকার ধারণ করে। বিজ্ঞানের ভাষায় এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় Coalescence। এই ধাপে ছোট ছোট মেঘের কণাগুলো একে অপরের সাথে ধাক্কা খেয়ে সংযুক্ত হয়। আয়াতে ব্যবহৃত আরবি শব্দ ‘ইউআল্লিফু’ (یُؤَلِّفُ) এর অর্থ হলো প্রেম বা মায়ার সাথে জুড়ে দেওয়া বা একত্রিত করা। বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, এই পর্যায়ে মেঘের ভেতরের জলকণাগুলো বৈদ্যুতিক চার্জ এবং চাপের পার্থক্যের কারণে একে অপরের সাথে স্থায়ীভাবে মিশে যায় এবং একটি বিশাল মেঘের ভিত্তি তৈরি করে।

৩. স্তূপীকরণ ও উলম্ব বৃদ্ধি (Stacking and Vertical Growth)

কুরআনের ভাষায়: “…তারপর সেগুলোকে স্তূপীকৃত করেন এবং তুমি দেখতে পাও তার মধ্য থেকে বৃষ্টি নির্গত হয়।”

এটি মেঘ গঠনের সবচেয়ে জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়। ছোট ছোট মেঘগুলো যুক্ত হওয়ার পর মেঘের ভেতরে এক ধরনের শক্তিশালী উর্ধ্বমুখী বায়ুপ্রবাহ বা Updraft তৈরি হয়। এই বাতাসের চাপে মেঘটি আর ডানে-বামে না বেড়ে স্তরে স্তরে উপর দিকে উঠতে থাকে। আয়াতে বর্ণিত ‘রুকামান’ (رُکَامًا) শব্দটির অর্থ হলো একটির ওপর একটি সাজানো স্তূপ।

বিজ্ঞানীরা বলেন, যখন এই মেঘটি উলম্বভাবে (Vertically) বৃদ্ধি পায়, তখন এটি বায়ুমণ্ডলের অত্যন্ত শীতল স্তরে পৌঁছে যায়। সেখানে জলকণাগুলো ঘনীভূত হয়ে বড় ফোঁটায় পরিণত হয় এবং মহাকর্ষ বলের টানে বৃষ্টি হিসেবে নিচে পড়তে থাকে। কুরআনের বর্ণনায় ঠিক এই ‘স্তূপীকৃত’ হওয়ার পরেই বৃষ্টির কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যা আধুনিক বিজ্ঞানের সাথে হুবহু মিলে যায়।

৪. পাহাড়ের মতো বিশাল আকৃতি (The Mountains in the Sky)

আয়াতের পরের অংশে বলা হয়েছে, “তিনি আকাশস্থিত পাহাড়সদৃশ মেঘমালা থেকে শিলা বর্ষণ করেন।”

আবহাওয়াবিজ্ঞানীরা যখন রাডার বা বিমান থেকে কিউমুলোনিম্বাস মেঘ দেখেন, তখন তা দেখতে ঠিক বিশাল হিমালয় পাহাড়ের মতো মনে হয়। এই মেঘগুলো ভূমি থেকে প্রায় ২৫,০০০ থেকে ৩০,০০০ ফুট পর্যন্ত উঁচুতে উঠতে পারে। এই বিশাল উচ্চতার কারণেই মেঘের উপরিভাগ অত্যন্ত শীতল থাকে এবং সেখানে বরফ বা শিলা (Hail) তৈরি হয়। কুরআন এখানে মেঘের উচ্চতা বোঝাতে ‘জিবাল’ (جِبَالٍ) বা পাহাড় শব্দটি ব্যবহার করেছে, যা এর বিশালতা ও গঠনের একটি নিখুঁত জ্যামিতিক বর্ণনা।

উপসংহার : আজ থেকে ১৪৫০ বছর আগে যখন মানুষের কাছে কোনো স্যাটেলাইট, রাডার বা বায়ুমণ্ডলের স্তরবিন্যাস মাপার কোনো যন্ত্র ছিল না, তখন মেঘ গঠনের এই পর্যায়ক্রমিক (চালনা → সংযুক্তি → স্তূপীকরণ → বৃষ্টি/শিলা) বর্ণনা দেওয়া একমাত্র সৃষ্টিকর্তার পক্ষেই সম্ভব। এটি প্রমাণ করে যে, কুরআন কেবল একটি ধর্মীয় গ্রন্থ নয়, বরং এটি মহাবিশ্বের সত্যতা ও বিজ্ঞানের এক জীবন্ত নিদর্শন।

আপনি কি এই বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে সূরা আন-নূরের সেই নির্দিষ্ট আয়াতের পূর্ণাঙ্গ তাফসির বা অন্য কোনো বৈজ্ঞানিক অলৌকিকত্ব সম্পর্কে জানতে চান?

মঘমালার পর্যায়ক্রমিক চিত্র : চালনা সংযুক্তি ও স্তূপীকরণ বৃষ্টি/শিলা)

বৃষ্টির অনুপাত ও জলচক্রের ভারসাম্য

পৃথিবীর অস্তিত্ব এবং প্রাণকুলের টিকে থাকার জন্য পানি অপরিহার্য উপাদান। প্রকৃতির এই অপার বিস্ময়—বৃষ্টিপাত—কেবল একটি সাধারণ আবহাওয়াগত ঘটনা নয়, বরং এটি অত্যন্ত নিখুঁত এবং গাণিতিক হিসাবের ওপর প্রতিষ্ঠিত একটি ব্যবস্থা। আধুনিক জলবিজ্ঞান বৃষ্টির এই সুনির্দিষ্ট অনুপাত সম্পর্কে যে তথ্য দিচ্ছে, তা আজ থেকে ১৪০০ বছর আগে আল-কোরআনে অত্যন্ত চমৎকারভাবে বর্ণিত হয়েছে।

১. আল-কোরআনে বৃষ্টির সুনির্দিষ্ট মাপের বর্ণনা

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَالَّذِیۡ نَزَّلَ مِنَ السَّمَآءِ مَآءًۢ بِقَدَرٍ ۚ فَاَنۡشَرۡنَا بِہٖ بَلۡدَۃً مَّیۡتًا ۚ کَذٰلِکَ تُخۡرَجُوۡنَ

আর যিনি আসমান থেকে পরিমিতভাবে পানি বর্ষণ করেন। অতঃপর আমি তা দ্বারা মৃত জনপদকে সঞ্জীবিত করি। এভাবেই তোমাদেরকে বের করা হবে। সূরা যুখরুফের : ১১

এই আয়াতে ‘নির্দিষ্ট মাপে’ (بِقَدَرٍ – বি-কাদারিন) শব্দবন্ধটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এটি নির্দেশ করে যে, বৃষ্টিপাত কোনো এলোমেলো ঘটনা নয়, বরং এর পেছনে একটি সুনির্দিষ্ট পরিমাণ, গতিবেগ এবং অনুপাত কাজ করে। আধুনিক বিজ্ঞান এই ‘মাপ’ বা ‘পরিমাণ’ শব্দটির গভীরতা আজ উন্মোচন করছে।

২. আধুনিক বিজ্ঞানের তথ্য ও উপাত্ত: জলচক্রের ধ্রুবক

আধুনিক বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, পৃথিবীতে প্রতি বছর যে পরিমাণ পানি বাষ্পীভূত হয় এবং ঠিক যে পরিমাণ পানি বৃষ্টি হিসেবে ফিরে আসে, তার মধ্যে একটি বিস্ময়কর গাণিতিক ধ্রুবক কাজ করে। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী-

সেকেন্ড প্রতি বাষ্পীভবন:

পৃথিবী থেকে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ১৬ মিলিয়ন টন পানি বাষ্পীভূত হয়ে বায়ুমণ্ডলে মিশে যায়।

বার্ষিক মোট হিসাব:

এই প্রক্রিয়াটি ২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্নভাবে চলতে থাকে, যার ফলে এক বছরে পৃথিবী থেকে বাষ্পীভূত হওয়া মোট পানির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৫১৩ ট্রিলিয়ন টন।

সমতার বিস্ময়:

অবাক করার মতো বিষয় হলো, প্রতি বছর এই সমপরিমাণ পানিই অর্থাৎ ৫১৩ ট্রিলিয়ন টন পানিই বৃষ্টি, তুষার বা শিশির আকারে পৃথিবীতে আবার ফিরে আসে।

এর অর্থ হলো, পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে পানির যে ভারসাম্য (Global Water Budget), তা অত্যন্ত কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত। যদি ৫১৩ ট্রিলিয়ন টনের বদলে ৫১৪ ট্রিলিয়ন টন পানি ফিরে আসত, তবে পৃথিবী ধীরে ধীরে মহাপ্লাবনে তলিয়ে যেত। আবার যদি পরিমাণে সামান্য কম আসত, তবে পৃথিবী ধীরে ধীরে শুকিয়ে মরুভূমিতে পরিণত হতো।

৩. বৃষ্টিপাতের গতিবেগ ও উচ্চতার “মাপ”

কোরআনের ‘নির্দিষ্ট মাপে’ কথাটি কেবল মোট পরিমাণের ক্ষেত্রেই নয়, বরং বৃষ্টির পতনের গতিবেগের ক্ষেত্রেও সত্য।

পতনের গতিবেগ:

বৃষ্টির ফোঁটাগুলো যদি সাধারণ মাধ্যাকর্ষণ সূত্র মেনে অতি উচ্চতা (মেঘের উচ্চতা সাধারণত ১২০০ থেকে ১০,০০০ মিটার হয়) থেকে পড়ত, তবে সেগুলো বুলেট বা কামানের গোলার মতো গতিপ্রাপ্ত হতো। কিন্তু বায়ুর ঘর্ষণ এবং বৃষ্টির ফোঁটার বিশেষ গঠনের কারণে একটি ‘টার্মিনাল ভেলোসিটি’ বা প্রান্তিক বেগ তৈরি হয়। যার ফলে বৃষ্টির ফোঁটাগুলো পৃথিবীতে এমন এক শান্ত ও পরিমিত গতিতে (৮-১০ কিমি/ঘণ্টা) পতিত হয়, যা ফসলের ক্ষতি করে না বরং সেচ দেয়।

উচ্চতার প্রভাব:

বৃষ্টি কতটুকু উচ্চতা থেকে পড়বে এবং তার ঘনত্ব কেমন হবে, তাও প্রকৃতির এক সুনিপুণ মাপে নির্ধারিত।

৪. পরিবেশগত ভারসাম্যে এই অনুপাতের গুরুত্ব

বৃষ্টির এই সুনির্দিষ্ট পরিমাণ বজায় থাকা কেন জীবনের জন্য অপরিহার্য, তার কিছু গুরত্বপূর্ণ দিক নিচে আলোচনা করা হলো:

লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণ:

সমুদ্র থেকে যে পানি বাষ্পীভূত হয়, তা বিশুদ্ধ ও লবণমুক্ত। এই পানি যখন বৃষ্টি হিসেবে পতিত হয়, তখন তা নদীর মাধ্যমে প্রবাহিত হয়ে সমুদ্রের লবণাক্ততা বজায় রাখে। এই ভারসাম্য নষ্ট হলে সমুদ্রের জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হয়ে যেত।

মৃত ভূমিকে পুনরুজ্জীবন:

কোরআনে বলা হয়েছে, “যার দ্বারা আমরা একটি মৃত ভূমিকে আবার জীবিত করে তুলি।” বিজ্ঞান আজ জানে যে, বৃষ্টির পানিতে নাইট্রোজেন ও বিভিন্ন খনিজ উপাদান মিশে থাকে যা মাটির জন্য প্রাকৃতিক সারের কাজ করে। এটি উদ্ভিদের বৃদ্ধির জন্য অত্যাবশ্যক।

তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ:

পৃথিবীর জলচক্র একটি বিশাল এয়ার কন্ডিশনারের মতো কাজ করে। ৫১৩ ট্রিলিয়ন টন পানির এই সঞ্চালন না থাকলে পৃথিবীর তাপমাত্রা মেরু অঞ্চলে হিমাঙ্কের অনেক নিচে এবং নিরক্ষীয় অঞ্চলে উত্তপ্ত অগ্নিপিণ্ডে পরিণত হতো।

৫. মানুষের সীমাবদ্ধতা ও কোরআনের অলৌকিকতা

বর্তমান বিশ্বের অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করেও মানুষ কৃত্রিমভাবে এই বিশাল জলচক্রের পুনরুৎপাদন করতে সক্ষম নয়। আমরা ছোট পরিসরে ‘ক্লাউড সিডিং’ (Cloud Seeding) এর মাধ্যমে কৃত্রিম বৃষ্টিপাত ঘটাতে পারলেও, বিশ্বব্যাপী ৫১৩ ট্রিলিয়ন টনের এই বিশাল গাণিতিক চক্র বজায় রাখা মানুষের সাধ্যের অতীত।

কোরআনের এই ঐশী বাণীতে এই “নির্দিষ্ট মাপে” পানি নাযিলের কথাটি এমন এক যুগে বলা হয়েছে যখন মানুষের কাছে হাইড্রোলজি বা জলবিদ্যার কোনো জ্ঞান ছিল না। প্রাচীনকালে মানুষ মনে করত বৃষ্টিপাত দেব-দেবীর ইচ্ছায় বা কোনো জাদুর প্রভাবে হয়। কিন্তু কোরআন স্পষ্টভাবে একে একটি ‘হিসাব’ বা ‘মাপে’র অধীন বলে ঘোষণা করেছে।

৬. জলবায়ু পরিবর্তন ও সতর্কবার্তা

বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বৃষ্টির এই ‘সুনির্দিষ্ট মাপে’র ভারসাম্য কিছুটা বিঘ্নিত হচ্ছে। কোথাও অতিবৃষ্টি আবার কোথাও দীর্ঘ অনাবৃষ্টি দেখা দিচ্ছে। এটি প্রমাণ করে যে, স্রষ্টা প্রদত্ত সেই ‘মাপ’ যখন মানুষের কৃতকর্মের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তখন পৃথিবীতে বিশৃঙ্খলা বা ফাসাদ ছড়িয়ে পড়ে। এটি আমাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা যে আমরা যেন প্রকৃতির এই মহান ভারসাম্যকে রক্ষা করি।

উপসংহার : বৃষ্টির এই সুনির্দিষ্ট অনুপাত এবং ৫১৩ ট্রিলিয়ন টনের এই গাণিতিক হিসাব প্রমাণ করে যে, মহাবিশ্বের প্রতিটি ধূলিকণা এক মহান পরিকল্পনাকারীর (Master Designer) নির্দেশনায় পরিচালিত। কোরআনের এই বৈজ্ঞানিক নির্ভুলতা নির্দেশ করে যে, এটি কোনো মানুষের কল্পনা নয়, বরং এটি সেই মহান সত্তার বাণী যিনি এই মহাবিশ্বের স্রষ্টা। আজ থেকে ১৪০০ বছর আগে মরুভূমির বুকে বৃষ্টির এই গাণিতিক রহস্যের ঘোষণা দেওয়া নিঃসন্দেহে এক বড় মোজেজা বা অলৌকিক নিদর্শণ।

প্রাকৃতিক বিজ্ঞান ও কুরআন : কুরআনে নদী ও সাগর

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

আল-কুরআন, যা প্রায় চৌদ্দশত বছর আগে নাজিল হয়েছিল, তাতে এমন কিছু বৈজ্ঞানিক তথ্য রয়েছে যা কেবল আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যেই সম্প্রতি আবিষ্কার করা সম্ভব হয়েছে। এর মধ্যে সমুদ্র, নদী এবং তাদের মিলনস্থলের বর্ণনা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আধুনিক সমুদ্রবিজ্ঞান (Oceanography) যে তথ্যগুলো প্রদান করে, কোরআনের আয়াতগুলো তার সাথে এক গভীর সাদৃশ্য বহন করে।

১. দুটি সমুদ্রের মিলনস্থল : অদৃশ্য অন্তরায় (Barrier)

আধুনিক বিজ্ঞান আবিষ্কার করেছে যে যখন দুটি ভিন্ন সমুদ্রের জলরাশি মিলিত হয়, তখন তারা তাৎক্ষণিকভাবে মিশে যায় না। তাদের মাঝে একটি অদৃশ্য কিন্তু কার্যকর ‘বাধা’ (Barrier) বিদ্যমান থাকে, যা দুটি জলরাশিকে পৃথক রাখে। এই বাধার কারণে, প্রতিটি সমুদ্রের জলরাশি তার নিজস্ব স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য বজায় রাখে:

তাপমাত্রা (Temperature): এক সমুদ্রের জল অন্যটির চেয়ে উষ্ণ বা শীতল হতে পারে।

লবণাক্ততা (Salinity): লবণাক্ততার মাত্রা ভিন্ন হয়।

ঘনত্ব (Density): ঘনত্বে পার্থক্য থাকে, যা জলরাশির স্তরবিন্যাসে ভূমিকা রাখে।

ভূমধ্যসাগরের জল আটলান্টিক মহাসাগরের জলের তুলনায় উষ্ণ, অধিক লবণাক্ত এবং তুলনামূলকভাবে কম ঘনত্বের। যখন ভূমধ্যসাগরের জল জিব্রাল্টার প্রণালীর নিচে অবস্থিত জিব্রাল্টার সিল (Gibraltar Sill)-এর উপর দিয়ে আটলান্টিকে প্রবেশ করে, তখন এটি তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য নিয়ে প্রায় ১০০০ মিটার গভীরতায় বহুদূর পর্যন্ত প্রবাহিত হয়। এই জলরাশি এই গভীরতায় এমনভাবে স্থিতিশীল হয় যে এটি তার বৈশিষ্ট্য হারাতে প্রায় কয়েকশ কিলোমিটার অতিক্রম করে।

এই দুটি সমুদ্রের মিলনস্থলে প্রতিনিয়ত বড় তরঙ্গ, শক্তিশালী স্রোত এবং জোয়ার-ভাটা বিরাজ করা সত্ত্বেও, তারা এই অদৃশ্য বাধাকে লঙ্ঘন করে না এবং দ্রুত মিশ্রিত হয়ে যায় না। জলরাশি ধীরে ধীরে মিশ্রিত হলেও, এই বাধা একটি সুস্পষ্ট বিভাজন রেখা বা সীমান্ত হিসেবে কাজ করে। এই বৈজ্ঞানিক সত্যের বর্ণনা আল-কুরআনে স্পষ্টভাবে এসেছে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

مَرَجَ  الْبَحْرَیْنِ یَلْتَقِیٰنِ ﴿ۙ۱۹﴾ بَیْنَهُمَا بَرْزَخٌ  لَّا  یَبْغِیٰنِ ﴿ۚ۲۰﴾ فَبِاَیِّ  اٰلَآءِ  رَبِّکُمَا تُكَذِّبٰنِ ﴿۲۱﴾

তিনি দুই সমুদ্রকে প্রবাহিত করেন, যারা পরস্পর মিলিত হয়। উভয়ের মাঝখানে রয়েছে এক আড়াল, যা তারা অতিক্রম করতে পারে না। অতএব (হে মানব ও জ্বীন) তোমরা উভয়ে তোমাদের রবের কোন কোন নিয়ামতকে অস্বীকার করবে? সরা আর রহমান : ১৯-২১

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

اَمَّنۡ جَعَلَ الۡاَرۡضَ قَرَارًا وَّجَعَلَ خِلٰلَہَاۤ اَنۡہٰرًا وَّجَعَلَ لَہَا رَوَاسِیَ وَجَعَلَ بَیۡنَ الۡبَحۡرَیۡنِ حَاجِزًا ؕ  ءَاِلٰہٌ مَّعَ اللّٰہِ ؕ  بَلۡ اَکۡثَرُہُمۡ لَا یَعۡلَمُوۡنَ ؕ

বরং তিনি, যিনি যমীনকে আবাসযোগ্য করেছেন এবং তার মধ্যে প্রবাহিত করেছেন নদী-নালা। আর তাতে স্থাপন করেছেন সুদৃঢ় পর্বতমালা এবং দুই সমুদ্রের মধ্যখানে অন্তরায় সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহর সাথে কি অন্য কোন ইলাহ আছে? বরং তাদের অধিকাংশই জানে না।  সুরা নামল : ৬১

কুরআনের এই আয়াতে “অন্তরায়’ (আরবিতে ‘বারযাখ’) শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে, যা দুটি সমুদ্রের জলরাশিকে পৃথক রাখার প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াকে নির্দেশ করে। এটি এমন এক বৈজ্ঞানিক তথ্য যা আধুনিক সমুদ্রবিজ্ঞান আবিষ্কারের বহু শতাব্দী আগেই কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে। তৎকালীন সময়ে এই প্রাকৃতিক ঘটনা খালি চোখে দেখা বা বোঝা প্রায় অসম্ভব ছিল।

২. মোহনা এবং মিষ্টি ও নোনা জলের মিলনস্থল: দৃঢ় বিভাজন (Forbidding Partition)

যখন কোরআন সমুদ্রের মতো দুটি লবণাক্ত জলের মিলনের কথা বলে, তখন কেবল ‘বাধা’ (Barrier) বা ‘অন্তরায়’-এর উল্লেখ করে। কিন্তু যখন মিষ্টি (সুস্বাদু) জল (যেমন নদী বা ভূগর্ভস্থ জল) ও নোনা জলের (যেমন সমুদ্রের জল) মিলনের কথা বলে, তখন বর্ণনাটি আরও বিস্তারিত হয়। কোরআন এই ক্ষেত্রে বাধার (barrier) পাশাপাশি একটি “দৃঢ় বিভাজন” (forbidding partition)-এর উপস্থিতির কথাও উল্লেখ করে।

আল্লাহ কোরআনে বলেছেন-

وَہُوَ الَّذِیۡ مَرَجَ الۡبَحۡرَیۡنِ ہٰذَا عَذۡبٌ فُرَاتٌ وَّہٰذَا مِلۡحٌ اُجَاجٌ ۚ وَجَعَلَ بَیۡنَہُمَا بَرۡزَخًا وَّحِجۡرًا مَّحۡجُوۡرًا

আর তিনিই দু’টো সাগরকে একসাথে প্রবাহিত করেছেন। একটি সুপেয় সুস্বাদু, অপরটি লবণাক্ত ক্ষারবিশিষ্ট এবং তিনি এতদোভয়ের মাঝখানে একটি অন্তরায় ও একটি অনতিক্রম্য সীমানা স্থাপন করেছেন। সূরা ফুরকান : ৫৩

এখানে প্রশ্ন জাগে: কেন দুটি সমুদ্রের মিলনে শুধু ‘ অন্তরায় ‘ এবং মিষ্টি ও নোনা জলের মিলনে ‘বাধা’র সঙ্গে অতিরিক্ত ‘দৃঢ় বিভাজন’-এর কথা বলা হয়েছে? এর উত্তরও লুকিয়ে আছে আধুনিক বিজ্ঞানের আবিষ্কারে। এই ব্যবধানের  অন্যতম একটি প্রধান কারন হচ্ছে দুই সমুদ্রের পানির লবণাক্ততা বা Salinity এর মধ্যে পার্থক্য। যাকে ইংরেজীতে বলা হয় Halocline। দেখা গেছে লবণাক্ততার পার্থ্যকের জন্য দুই সমুদ্রের পানির ঘনত্বও আলাদা হয়ে যায়। ফলে পাশাপাশি প্রবাহিত হলেও একটা লাইন বরাবর পানি আলাদা থাকে। আর এই লাইনটিকেই ইংরেজীতে Halocline বলা হয়। বিস্ময়করভাবে উপরের আয়াতের শুরুতেই পাশাপাশি প্রবাহিত  সাগরের পানির লবণাক্ততা বা Salinity এর পার্থক্যের কথা বলা হয়েছে- ” একটি সুপেয় সুস্বাদু, অপরটি লবণাক্ত ক্ষারবিশিষ্ট”  এ ব্যাপারটি বৈজ্ঞানিক গবেষণার সাথে পুরোপুরি মিলা যায়।

আটলান্টিক আর প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্যে স্পস্ট ব্যবধান চোখে পড়ে। গবেষণায় দেখা যায় এই দুই সাগরের পানির মধ্যে ঘণত্ব, লবণাক্ততা আর উষ্ণতার পার্থক্যের কারনে একটির পানি অন্যটির সাথে মিশতে পারে না। ভূমধ্যসাগর আর আটলান্টিক সাগরের পানির মধ্যেও এরকম পার্থক্য দেখা যায়।

 ১৪০০ বছর আগে নবী মুহাম্মদ (সা) এর পক্ষে এ ধরনের তথ্য যানা থাকা সম্ভব নয়। তাছাড়া এ ধরনের স্রোত শুধু আরব উপদ্বীপের চারপাশেই সম্পূর্ণ অনুপস্থিত নয় বরং ভূমধ্যসাগরীয় ও ভারতীয় অঞ্চলসমূহেও এ স্রোতের দেখা পাওয়া যায় না। সর্বপথম এ প্রকারের স্রোতধারা আবিষ্কৃত হয় ১৯৪২ সালে। বর্তমানে সেগুলিকে কৃত্রিম satellite- এর মাধ্যমে চিহ্নিত করা হয়েছে। নীচের চার্টে বিভিন্ন সমুদ্রের পানির লবণাক্ততার পার্থক্য দেখান হয়েছে। ল্যান্ডলক্ড বা আংশিকভাবে আবদ্ধ সাগরের লবণাক্ততা।

সংখ্যানামধরনগড় লবণাক্ততা ()প্রধান লবণাক্ততার কারণঅবস্থান ও গুরুত্ব
 মৃত সাগর (Dead Sea)ল্যান্ডলক্ড হ্রদ (Lake)340-342‰উচ্চ বাষ্পীভবন, খুব কম জল সরবরাহ, বদ্ধ অববাহিকা।জর্ডান এবং ইসরায়েলের সীমান্তে অবস্থিত, পৃথিবীর গভীরতম হাইপারস্যালাইন হ্রদ।
 লোহিত সাগর (Red Sea)আংশিকভাবে আবদ্ধ সাগর40-41‰উচ্চ বাষ্পীভবন, নিম্ন বৃষ্টিপাত, সীমিত জল বিনিময়।আফ্রিকা ও এশিয়ার মাঝে অবস্থিত। বিশ্বের উষ্ণতম এবং সবচেয়ে লবণাক্ত সাগরগুলোর মধ্যে একটি।
 পারস্য উপসাগর  (Persian Gulf)আংশিকভাবে আবদ্ধ সাগর40-45‰উচ্চ বাষ্পীভবন, কম বৃষ্টিপাত, সীমিত জল বিনিময় (হরমুজ প্রণালী দিয়ে)।মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত, তেল পরিবহনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
 ভূমধ্যসাগর (Mediterranean Sea)আংশিকভাবে আবদ্ধ সাগর38-39‰উচ্চ বাষ্পীভবন, কম বৃষ্টিপাত, সীমিত জল বিনিময় (জিব্রাল্টার প্রণালী দিয়ে)।ইউরোপ, আফ্রিকা ও এশিয়ার মধ্যে অবস্থিত, ঐতিহাসিক ও বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
 গ্রেট সল্ট লেক (Great Salt Lake)ল্যান্ডলক্ড হ্রদ (Lake)50-280‰ (অংশের ভিত্তিতে)উচ্চ বাষ্পীভবন, জল নিষ্কাশনের পথ নেই, মরুভূমি জলবায়ু।মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উটাহ রাজ্যে অবস্থিত। পশ্চিম গোলার্ধের বৃহত্তম লবণাক্ত হ্রদ।
 কাস্পিয়ান সাগর (Caspian Sea)ল্যান্ডলক্ড হ্রদ (Lake)12-14‰ (উত্তর অংশ কম)মূলত একটি হ্রদ, যদিও ‘সাগর’ নামে পরিচিত। উচ্চ লবণাক্ততা শুধুমাত্র দক্ষিণ-পূর্ব অংশে দেখা যায়।ইউরোপ ও এশিয়ার সীমান্তে অবস্থিত, বিশ্বের বৃহত্তম হ্রদ।
 বাল্টিক সাগর (Baltic Sea)আংশিকভাবে আবদ্ধ সাগর3-15‰উচ্চ পরিমাণ নদীর মিষ্টি জলের প্রবাহ, সীমিত জল বিনিময় (ডেনিশ প্রণালী দিয়ে), নিম্ন বাষ্পীভবন।উত্তর ইউরোপে অবস্থিত। পৃথিবীর বৃহত্তম ব্র্যাকিশ (Brackish) জলের অববাহিকা।
 ব্ল্যাক সি (Black Sea)আংশিকভাবে আবদ্ধ সাগর17-18‰ (উপরে), 30‰ (গভীরে)উচ্চ নদীর জলের প্রবাহ, সীমিত জল বিনিময় (বসফরাস প্রণালী দিয়ে)।ইউরোপ ও এশিয়ার মাঝে অবস্থিত। এর গভীর স্তরে প্রায় কোনো অক্সিজেন নেই।
 আরাল সাগর (Aral Sea)ল্যান্ডলক্ড হ্রদ (Lake)100-200‰ (বর্তমান অবশিষ্টাংশ)নদী থেকে জল প্রত্যাহারের কারণে আয়তন হ্রাস পেয়েছে এবং লবণাক্ততা মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।কাজাখস্তান ও উজবেকিস্তানে অবস্থিত। পরিবেশগত বিপর্যয়ের প্রতীক।
 অ্যাজোফ সাগর (Sea of Azov)আংশিকভাবে আবদ্ধ সাগর10-15‰প্রচুর নদীর জলের প্রবাহ, ছোট আকার, স্বল্প গভীরতা।কৃষ্ণ সাগরের উত্তরে অবস্থিত। পৃথিবীর সবচেয়ে অগভীর সাগর।

এই বৈজ্ঞানিক তথ্যগুলো দুটি সমুদ্রের মধ্যে শুধু বাধা এবং মিষ্টি ও নোনা জলের মিলনস্থলে বাধা ও দৃঢ় বিভাজন সম্প্রতি উন্নত সরঞ্জাম ব্যবহার করে যেমন তাপমাত্রা, লবণাক্ততা এবং ঘনত্ব পরিমাপের মাধ্যমে আবিষ্কৃত হয়েছে। সাধারণ মানুষের পক্ষে খালি চোখে দুটি সমুদ্রের মিলনস্থলকে বা মোহনার ত্রিমাত্রিক স্তরবিন্যাসকে পৃথকভাবে দেখা অসম্ভব।

৩. পিকনোক্লাইন জোন (Pycnocline Zone) :

আধুনিক বিজ্ঞান আবিষ্কার করেছে যে মোহনাগুলিতে (Estuaries), যেখানে নদী এবং সমুদ্রের জল মিলিত হয়, সেখানে পরিস্থিতি দুটি সমুদ্রের মিলনের চেয়ে ভিন্ন। মোহনার ক্ষেত্রে, মিষ্টি জল এবং নোনা জলের মাঝে একটি সুস্পষ্ট এবং কার্যকর পৃথকীকরণ অঞ্চল (Zone of Separation) তৈরি হয়। এই অঞ্চলটিকে সমুদ্রবিজ্ঞানের পরিভাষায় “পিকনোক্লাইন জোন (Pycnocline Zone)” বলা হয়।

এই পিকনোক্লাইন জোনের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো:

ক. ঘনত্বের সুস্পষ্ট বিচ্ছিন্নতা (Marked Density Discontinuity): এটি একটি মধ্যবর্তী স্তর, যেখানে জলের ঘনত্বে দ্রুত পরিবর্তন ঘটে।

খ. ভিন্ন লবণাক্ততা: এই বিভাজন অঞ্চলের লবণাক্ততা মিষ্টি জল এবং মূল নোনা জল—উভয় থেকে আলাদা হয়। এটি মূলত মিষ্টি জল এবং নোনা জলের ধীরে ধীরে মিশ্রিত হওয়ার ফলস্বরূপ সৃষ্ট একটি সংমিশ্রণ স্তর।

গ. কার্যকরী বিভাজন: এই ঘনত্বের পার্থক্য দুটি জলস্তরকে (উপরে হালকা মিষ্টি জল এবং নিচে ভারী নোনা জল) কার্যকরভাবে পৃথক করে রাখে, যা কোরআনে বর্ণিত ‘দৃঢ় বিভাজন’ (forbidding partition)-এর ধারণাকে সমর্থন করে। এই স্তরটি মিষ্টি জলকে নোনা জলের সাথে দ্রুত মিশ্রিত হতে বাধা দেয়।

কুরআনের এই বর্ণনাগুলো কেবল তার ঐশ্বরিক উৎসেরই প্রমাণ বহন করে না, বরং এটি প্রমাণ করে যে কোরআন এমন জ্ঞান ধারণ করে যা এর নাজিলের সময়ের মানুষের অভিজ্ঞতার বাইরে ছিল। এটি কুরআনের একটি অলৌকিক দিক যা বিজ্ঞান ও ধর্মগ্রন্থের মধ্যে এক অভূতপূর্ব সমন্বয় তুলে ধরে।

প্রাকৃতিক বিজ্ঞান ও কুরআন : গভীর সমুদ্র এবং অভ্যন্তরীণ তরঙ্গ

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

আল্লাহ তাআলা বলেন-

اَوۡ کَظُلُمٰتٍ فِیۡ بَحۡرٍ لُّجِّیٍّ یَّغۡشٰہُ مَوۡجٌ مِّنۡ فَوۡقِہٖ مَوۡجٌ مِّنۡ فَوۡقِہٖ سَحَابٌ ؕ  ظُلُمٰتٌۢ بَعۡضُہَا فَوۡقَ بَعۡضٍ ؕ  اِذَاۤ اَخۡرَجَ یَدَہٗ لَمۡ یَکَدۡ یَرٰىہَا ؕ  وَمَنۡ لَّمۡ یَجۡعَلِ اللّٰہُ لَہٗ نُوۡرًا فَمَا لَہٗ مِنۡ نُّوۡرٍ 

অথবা (তাদের আমলসমূহ) গভীর সমূদ্রে ঘনিভূত অন্ধকারের মত, যাকে আচ্ছন্ন করে ঢেউয়ের উপরে ঢেউ, তার উপরে মেঘমালা। অনেক অন্ধকার; এক স্তরের উপর অপর স্তর। কেউ হাত বের করলে আদৌ তা দেখতে পায় না। আর আল্লাহ যাকে নূর দেন না তার জন্য কোন নূর নেই। সুরা নুর : ৪০

পবিত্র কুরআনের এ আয়াতটি সমুদ্রবিজ্ঞানের (Oceanography) এক বিস্ময়কর অধ্যায়। এই আয়াতে গভীর সমুদ্রের অন্ধকার এবং ঢেউয়ের স্তরীভূত অবস্থা সম্পর্কে এমন কিছু তথ্য দেওয়া হয়েছে, যা আধুনিক বিজ্ঞান কেবল গত শতাব্দীতে সাবমেরিন ও উন্নত সেন্সর আবিষ্কারের পর জানতে পেরেছে।

১. গভীর সমুদ্রের অন্ধকার (Darkness in the Deep Sea)

সমুদ্রের উপরিভাগ আলোকিত মনে হলেও গভীরতা বাড়ার সাথে সাথে আলো দ্রুত হারিয়ে যায়। একে আলোক বর্ণালীর শোষণ (Absorption of Spectrum) বলা হয়। সূর্যালোক যখন সমুদ্রে প্রবেশ করে, তখন পানির অণুগুলো আলোর সাতটি রঙকে (বেনীআসহকলা) ক্রমান্বয়ে শোষণ করে নেয়:

  • প্রথম ১০-১৫ মিটারের মধ্যে লাল রঙ শোষিত হয়।
  • এরপর একে একে কমলা, হলুদ এবং সবুজ রঙ হারিয়ে যায়।
  • ২০০ মিটার গভীরতার পর নীল আলোও প্রায় নিঃশেষ হয়ে আসে। একে বলা হয় ‘ইউফোটিক জোন’ (Euphotic Zone)-এর সমাপ্তি।
  • ১০০০ মিটার গভীরতার পর সমুদ্র হয়ে পড়ে ঘুটঘুটে অন্ধকার বা ‘অ্যাফোটিক জোন’ (Aphotic Zone)।

কুরআনের বর্ণনা— “হাত বের করলে দেখা যায় না”—এটি গভীর সমুদ্রের সেই তীব্র অন্ধকারের নিখুঁত চিত্রায়ন, যা আধুনিক ওশেনোগ্রাফি দ্বারা প্রমাণিত।

উপরের চিত্রে : সূর্যালোকের ৩ থেকে ৩০ শতাংশ সমুদ্রপৃষ্ঠে প্রতিফলিত হয়। এরপর প্রথম ২০০ মিটারের মধ্যেই আলোক-বর্ণালির সাতটি রঙের প্রায় সবগুলো একে একে শোষিত হয়ে যায়, নীল রঙের আলো ব্যতীত। Oceans, Elder and Pernetta, পৃষ্ঠা ২৭)

২. তরঙ্গের ওপর তরঙ্গ: অভ্যন্তরীণ তরঙ্গের রহস্য

আয়াতের সবচেয়ে বিস্ময়কর অংশ হলো: “যাকে আচ্ছন্ন করে ঢেউয়ের উপরে ঢেউ (مَوْجٌ مِنْ فَوْقِهِ مَوْجٌ)।” সাধারণ মানুষ জানে যে ঢেউ কেবল সমুদ্রের উপরিভাগেই থাকে। কিন্তু কুরআন এখানে দুই স্তরের ঢেউ বা তরঙ্গের কথা বলছে।

বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার (Internal Waves):

সমুদ্রবিজ্ঞানীরা গত কয়েক দশকে আবিষ্কার করেছেন যে, সমুদ্রের গভীরেও বিশাল বিশাল ঢেউ খেলে যায়, যাদের বলা হয় ‘অভ্যন্তরীণ তরঙ্গ’ (Internal Waves)।

  • কেন এই তরঙ্গ তৈরি হয়? সমুদ্রের ওপরের স্তরের পানির ঘনত্ব কম এবং তাপমাত্রা বেশি থাকে। কিন্তু নিচের স্তরের পানির ঘনত্ব বেশি এবং তাপমাত্রা কম থাকে। এই দুই ভিন্ন ঘনত্বের স্তরের মিলনস্থলে (Pycnocline) অভ্যন্তরীণ ঢেউ সৃষ্টি হয়।
  • বিশালতা: এই অভ্যন্তরীণ ঢেউগুলো কখনও কখনও কয়েকশো ফুট উঁচু হতে পারে, যা সমুদ্রপৃষ্ঠের ঢেউয়ের চেয়েও বড়।
  • অদৃশ্যতা: এই ঢেউগুলো সমুদ্রের ওপর থেকে দেখা যায় না। এগুলো কেবল তাপমাত্রা, লবণাক্ততা বা সাবমেরিনের গতিবিধি পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে শনাক্ত করা যায়।
  • কুরআন যখন বলে “ঢেউয়ের ওপর ঢেউ”, তখন এটি স্পষ্টত সমুদ্রের তলদেশের সেই অদৃশ্য অভ্যন্তরীণ তরঙ্গ এবং তার ওপরের স্তরের পৃষ্ঠতরঙ্গের (Surface Waves) কথা বলছে।

উপরের চিত্রে : ভিন্ন ঘনত্বের দুটি পানির স্তরের মধ্যবর্তী সংযোগস্থলে সৃষ্ট অভ্যন্তরীণ তরঙ্গ। একটি স্তর অধিক ঘন (নিচেরটি), অপরটি কম ঘন (উপরেরটি)। Oceanography, Gross, পৃষ্ঠা ২০৪

৩. মেঘমালা ও বায়ুমণ্ডলীয় প্রভাব

আয়াতে আরও বলা হয়েছে: “তার উপরে মেঘমালা (مِنْ فَوْقِهِ سَحَابٌ)।” এটি পরিবেশের একটি পূর্ণাঙ্গ স্তরবিন্যাস প্রকাশ করে। সমুদ্রের গভীরে অন্ধকার, তার ওপর অভ্যন্তরীণ ঢেউ, তার ওপর উপরিভাগের ঢেউ এবং তার ওপর মেঘাচ্ছন্ন আকাশ। মেঘ সূর্যালোককে প্রতিফলিত ও শোষণ করে অন্ধকারের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেয়।

৪. সমুদ্রের গভীরতা ও মানুষের সীমাবদ্ধতা

আয়াতে সমুদ্রকে ‘বাহরিন লুজ্জিয়িন’ (بَحْرٍ لُجِّيٍّ) বা ‘তলহীন গভীর সমুদ্র’ বলা হয়েছে।

  • প্রাচীনকালে মানুষ কেবল অগভীর সমুদ্রে মাছ ধরত বা মুক্তা সংগ্রহ করত। কোনো মানুষের পক্ষেই সরঞ্জাম ছাড়া ৪০-৫০ মিটারের নিচে যাওয়া সম্ভব নয়।
  • ২০০ মিটারের নিচে অক্সিজেন এবং আলো অত্যন্ত কমে যায় এবং পানির চাপ বহুগুণ বেড়ে যায়।
  • অথচ কুরআন ১৪০০ বছর আগে ১০০০ মিটারের নিচের সেই অন্ধকারের কথা বলছে, যা দেখার জন্য আধুনিক সাবমেরিন ও আলোর যন্ত্র প্রয়োজন।

৫. অন্যান্য প্রাসঙ্গিক আয়াত ও সমুদ্রবিজ্ঞান

কুরআনের অন্য স্থানেও সমুদ্রের রহস্য নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। যেমন-

“তিনি দুই সমুদ্রকে প্রবাহিত করেন যারা একে অপরের সাথে মিলিত হয়, কিন্তু তাদের মাঝে রয়েছে এক অন্তরাল (Barzakh) যা তারা অতিক্রম করতে পারে না।” (সূরা আর-রহমান: ১৯-২০)

এটি সমুদ্রের পানি ভিন্ন ঘনত্ব, লবণাক্ততা এবং তাপমাত্রার কারণে মিশ্রিত না হওয়ার বিস্ময়কর বৈজ্ঞানিক সত্যকে তুলে ধরে, যা গভীর সমুদ্রের অন্ধকার ও অভ্যন্তরীণ তরঙ্গের স্তরীভূত অবস্থার সঙ্গেও সম্পর্কিত।

উপসংহার

সূরা নূরের এই আয়াতটি কোনো বিজ্ঞান বিষয়ক প্রবন্ধ নয়, বরং একটি উপমা। তবে এই উপমায় ব্যবহৃত প্রতিটি শব্দ বৈজ্ঞানিকভাবে কতটা নির্ভুল, তা আজ বিজ্ঞানীরা অবাক হয়ে লক্ষ্য করছেন। মরুভূমির পরিবেশে থাকা একজন মানুষের পক্ষে সমুদ্রের তলদেশের অদৃশ্য তরঙ্গ বা আলোক বর্ণালীর শোষণ সম্পর্কে জানা অসম্ভব ছিল। এটি প্রমাণ করে যে, কুরআন এমন এক সত্তার বাণী, যিনি মহাবিশ্বের প্রতিটি স্তরের স্রষ্টা এবং এর গূঢ় রহস্য সম্পর্কে সম্যক অবগত।

সমুদ্রের এই অন্ধকার যেমন আলোহীন, তেমনি হিদায়াতহীন জীবনও অন্ধকারের স্তূপ। আয়াতে শেষ করা হয়েছে এই বলে— “আল্লাহ যাকে নূর দান করেন না, তার জন্য কোন নূর নেই।” অর্থাৎ জ্ঞান ও বিজ্ঞানের আলো থাকলেও হৃদয়ে আল্লাহ্‌র হিদায়াত না থাকলে মানুষ প্রকৃত সত্যের সন্ধান পায় না।

প্রাকৃতিক বিজ্ঞান ও কুরআন : পৃথিবীর পানি উত্স দুটি

প্রাকৃতিক বিজ্ঞান ও কুরআন : পৃথিবীর পানি উত্স দুটি

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

বিগ ব্যাং-এর ঠিক পরে (প্রায় ১৩.৮ বিলিয়ন বছর আগে) মহাবিশ্বে প্রধানত হাইড্রোজেন এবং হিলিয়াম গ্যাস তৈরি হয়। অক্সিজেন, যা পানির জন্য অপরিহার্য, তৈরি হয় তারকাদের অভ্যন্তরে। প্রথম তারকারা বিগ ব্যাং-এর ১০০-২০০ মিলিয়ন বছর পরে গঠিত হয় এবং তাদের জীবনকাল শেষে সুপারনোভা বিস্ফোরণে অক্সিজেনসহ ভারী উপাদান ছড়িয়ে দেয়। এই অক্সিজেন হাইড্রোজেনের সাথে মিশে প্রথম পানির অণু তৈরি করে, যা গ্যাসীয় ক্লাউডসে ছিল। এই পানি মহাবিশ্বের প্রথম দিকের তারকা-গঠন প্রক্রিয়ার অংশ, এবং এটি জুপিটারের মতো বড় ক্লাউডস বা পৃথিবীর মতো ছোট পরিমাণে তৈরি হয়।

পৃথিবীতে পানির আগমন

পৃথিবী গঠিত হয় সৌরজগতের প্রোটোপ্ল্যানেটারি ডিস্ক থেকে, প্রায় ৪.৫ বিলিয়ন বছর আগে। তখন পৃথিবী ছিল গরম এবং শুষ্ক, কারণ সূর্যের কাছাকাছি অঞ্চলে পানি বাষ্পীভূত হয়ে যায়। পানি পৃথিবীতে আসে মূলত দুটি উপায়ে:

বাংলায় Comet (কমেট) এবং Asteroid (অ্যাস্টেরয়েড) এর অর্থ হলো:

ধূমকেতু ও গ্রহাণু  থেকে:

সৌরজগতের বাইরের অংশ থেকে বরফ-সমৃদ্ধ কমেটস এবং অ্যাস্টারয়েডস পৃথিবীতে আঘাত করে পানি নিয়ে আসে। এই প্রক্রিয়া “লেট হেভি বম্বার্ডমেন্ট” নামে পরিচিত, যা পৃথিবীর গঠনের পরে ঘটে। লেট হেভি বম্বার্ডমেন্ট হলো সৌরজগতের শুরুর দিকে, প্রায় ৪ থেকে ৩.৮ বিলিয়ন বছর আগে, অভ্যন্তরীণ সৌরজগতে গ্রহাণু ও ধূমকেতুর ব্যাপক সংঘর্ষের একটি তত্ত্ব, যা চাঁদ ও অন্যান্য পাথুরে গ্রহের পৃষ্ঠে প্রচুর খাদ (crater) তৈরি করে এবং মহাদেশীয় ও মহাসাগরীয় গঠনসহ গ্রহের বিবর্তনকে প্রভাবিত করে। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, বিশাল গ্রহগুলোর কক্ষপথের পরিবর্তনের কারণে গ্রহাণু বেল্ট থেকে প্রচুর ধ্বংসাবশেষ অভ্যন্তরীণ গ্রহগুলিতে আছড়ে পড়েছিল এবং এই সময়কালে পৃথিবীতে পানি ও জৈব পদার্থ পৌঁছানো বা জীবনের উত্থানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল বলে মনে করা হয়।

চিত্র : মহাকাশে ধূমকেতু ও গ্রহাণু।

পৃথিবীর অভ্যন্তর থেকে: কিছু পানি পৃথিবীর গঠনের সময় তার অভ্যন্তরে আটকে থাকে এবং পরে ভলক্যানিক অ্যাকটিভিটি দিয়ে বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ে, যা পরে বৃষ্টির মাধ্যমে মহাসাগর তৈরি করে। কিছু পানি পাথরের মধ্যে থেকে পৃথিবীতে বাহির হয়ে আসে।

আধুনিক বিজ্ঞানের অনেক তত্ত্ব অনুযায়ী, পৃথিবীর উৎপত্তির শুরুর দিকে পানি ছিল না। উপরের এ দুটি পদ্ধতিতে পৃথিবীতে বিপুল পরিমাণ পানি জমা হয়েছে। কুরআনেও এ দুটি পদ্ধতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

১. আকাশ থেকে পানি বর্ষিত হয় :

পবিত্র কুরআনের বেশ কিছু আয়াতে আকাশ বা মহাকাশ থেকে পানি বর্ষণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

وَاَنۡزَلۡنَا مِنَ السَّمَآءِ مَآءًۢ بِقَدَرٍ فَاَسۡکَنّٰہُ فِی الۡاَرۡضِ ٭ۖ  وَاِنَّا عَلٰی ذَہَابٍۭ بِہٖ لَقٰدِرُوۡنَ ۚ

আর আমি আকাশ থেকে পরিমিতভাবে পানি বর্ষণ করেছি। অতঃপর আমি তা যমীনে সংরক্ষণ করেছি। আর অবশ্যই আমি সেটাকে অপসারণ করতেও সক্ষম। সুরা মুমিনুন :১ ৮

আরও কিছু প্রাসঙ্গিক আয়াত। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَالَّذِیۡ نَزَّلَ مِنَ السَّمَآءِ مَآءًۢ بِقَدَرٍ ۚ فَاَنۡشَرۡنَا بِہٖ بَلۡدَۃً مَّیۡتًا ۚ کَذٰلِکَ تُخۡرَجُوۡنَ

আর যিনি আসমান থেকে পরিমিতভাবে পানি বর্ষণ করেন। অতঃপর আমি তা দ্বারা মৃত জনপদকে সঞ্জীবিত করি। এভাবেই তোমাদেরকে বের করা হবে। সুরা যুখরুফ : ১১

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

اَنۡزَلَ مِنَ السَّمَآءِ مَآءً فَسَالَتۡ اَوۡدِیَۃٌۢ بِقَدَرِہَا فَاحۡتَمَلَ السَّیۡلُ زَبَدًا رَّابِیًا ؕ 

তিনি আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষণ করেন, এতে উপত্যকাগুলো তাদের পরিমাণ অনুসারে প্লাবিত হয়, ফলে প্লাবন উপরস্থিত ফেনা বহন করে নিয়ে যায়। সুরা আর-রাদ :

১৭

২. পাথর ফেঁটে পানি বাহির হয় :

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

ثُمَّ قَسَتۡ قُلُوۡبُکُمۡ مِّنۡۢ بَعۡدِ ذٰلِکَ فَہِیَ کَالۡحِجَارَۃِ اَوۡ اَشَدُّ قَسۡوَۃً ؕ وَاِنَّ مِنَ الۡحِجَارَۃِ لَمَا یَتَفَجَّرُ مِنۡہُ الۡاَنۡہٰرُ ؕ وَاِنَّ مِنۡہَا لَمَا یَشَّقَّقُ فَیَخۡرُجُ مِنۡہُ الۡمَآءُ ؕ وَاِنَّ مِنۡہَا لَمَا یَہۡبِطُ مِنۡ خَشۡیَۃِ اللّٰہِ ؕ وَ مَا اللّٰہُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعۡمَلُوۡنَ

অতঃপর তোমাদের অন্তরসমূহ এর পরে কঠিন হয়ে গেল যেন তা পাথরের মত কিংবা তার চেয়েও শক্ত। আর নিশ্চয় পাথরের মধ্যে কিছু আছে, যা থেকে নহর উৎসারিত হয়। আর নিশ্চয় তার মধ্যে কিছু আছে যা চূর্ণ হয়। ফলে তা থেকে পানি বের হয়। আর নিশ্চয় তার মধ্যে কিছু আছে যা আল্লাহর ভয়ে ধ্বসে পড়ে। আর আল্লাহ তোমরা যা কর, সে সম্পর্কে গাফেল নন। সুরা বাকারা : ৭৪

চিত্র : পাথর ফেঁটে পানি বাহির হয়ে ঝর্ণা সৃষ্টি হয়।