মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন
আল্লাহ তাআলা বলেন-
اَوۡ کَظُلُمٰتٍ فِیۡ بَحۡرٍ لُّجِّیٍّ یَّغۡشٰہُ مَوۡجٌ مِّنۡ فَوۡقِہٖ مَوۡجٌ مِّنۡ فَوۡقِہٖ سَحَابٌ ؕ ظُلُمٰتٌۢ بَعۡضُہَا فَوۡقَ بَعۡضٍ ؕ اِذَاۤ اَخۡرَجَ یَدَہٗ لَمۡ یَکَدۡ یَرٰىہَا ؕ وَمَنۡ لَّمۡ یَجۡعَلِ اللّٰہُ لَہٗ نُوۡرًا فَمَا لَہٗ مِنۡ نُّوۡرٍ
অথবা (তাদের আমলসমূহ) গভীর সমূদ্রে ঘনিভূত অন্ধকারের মত, যাকে আচ্ছন্ন করে ঢেউয়ের উপরে ঢেউ, তার উপরে মেঘমালা। অনেক অন্ধকার; এক স্তরের উপর অপর স্তর। কেউ হাত বের করলে আদৌ তা দেখতে পায় না। আর আল্লাহ যাকে নূর দেন না তার জন্য কোন নূর নেই। সুরা নুর : ৪০
পবিত্র কুরআনের এ আয়াতটি সমুদ্রবিজ্ঞানের (Oceanography) এক বিস্ময়কর অধ্যায়। এই আয়াতে গভীর সমুদ্রের অন্ধকার এবং ঢেউয়ের স্তরীভূত অবস্থা সম্পর্কে এমন কিছু তথ্য দেওয়া হয়েছে, যা আধুনিক বিজ্ঞান কেবল গত শতাব্দীতে সাবমেরিন ও উন্নত সেন্সর আবিষ্কারের পর জানতে পেরেছে।
১. গভীর সমুদ্রের অন্ধকার (Darkness in the Deep Sea)
সমুদ্রের উপরিভাগ আলোকিত মনে হলেও গভীরতা বাড়ার সাথে সাথে আলো দ্রুত হারিয়ে যায়। একে আলোক বর্ণালীর শোষণ (Absorption of Spectrum) বলা হয়। সূর্যালোক যখন সমুদ্রে প্রবেশ করে, তখন পানির অণুগুলো আলোর সাতটি রঙকে (বেনীআসহকলা) ক্রমান্বয়ে শোষণ করে নেয়:
- প্রথম ১০-১৫ মিটারের মধ্যে লাল রঙ শোষিত হয়।
- এরপর একে একে কমলা, হলুদ এবং সবুজ রঙ হারিয়ে যায়।
- ২০০ মিটার গভীরতার পর নীল আলোও প্রায় নিঃশেষ হয়ে আসে। একে বলা হয় ‘ইউফোটিক জোন’ (Euphotic Zone)-এর সমাপ্তি।
- ১০০০ মিটার গভীরতার পর সমুদ্র হয়ে পড়ে ঘুটঘুটে অন্ধকার বা ‘অ্যাফোটিক জোন’ (Aphotic Zone)।
কুরআনের বর্ণনা— “হাত বের করলে দেখা যায় না”—এটি গভীর সমুদ্রের সেই তীব্র অন্ধকারের নিখুঁত চিত্রায়ন, যা আধুনিক ওশেনোগ্রাফি দ্বারা প্রমাণিত।

উপরের চিত্রে : সূর্যালোকের ৩ থেকে ৩০ শতাংশ সমুদ্রপৃষ্ঠে প্রতিফলিত হয়। এরপর প্রথম ২০০ মিটারের মধ্যেই আলোক-বর্ণালির সাতটি রঙের প্রায় সবগুলো একে একে শোষিত হয়ে যায়, নীল রঙের আলো ব্যতীত। Oceans, Elder and Pernetta, পৃষ্ঠা ২৭)
২. তরঙ্গের ওপর তরঙ্গ: অভ্যন্তরীণ তরঙ্গের রহস্য
আয়াতের সবচেয়ে বিস্ময়কর অংশ হলো: “যাকে আচ্ছন্ন করে ঢেউয়ের উপরে ঢেউ (مَوْجٌ مِنْ فَوْقِهِ مَوْجٌ)।” সাধারণ মানুষ জানে যে ঢেউ কেবল সমুদ্রের উপরিভাগেই থাকে। কিন্তু কুরআন এখানে দুই স্তরের ঢেউ বা তরঙ্গের কথা বলছে।
বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার (Internal Waves):
সমুদ্রবিজ্ঞানীরা গত কয়েক দশকে আবিষ্কার করেছেন যে, সমুদ্রের গভীরেও বিশাল বিশাল ঢেউ খেলে যায়, যাদের বলা হয় ‘অভ্যন্তরীণ তরঙ্গ’ (Internal Waves)।
- কেন এই তরঙ্গ তৈরি হয়? সমুদ্রের ওপরের স্তরের পানির ঘনত্ব কম এবং তাপমাত্রা বেশি থাকে। কিন্তু নিচের স্তরের পানির ঘনত্ব বেশি এবং তাপমাত্রা কম থাকে। এই দুই ভিন্ন ঘনত্বের স্তরের মিলনস্থলে (Pycnocline) অভ্যন্তরীণ ঢেউ সৃষ্টি হয়।
- বিশালতা: এই অভ্যন্তরীণ ঢেউগুলো কখনও কখনও কয়েকশো ফুট উঁচু হতে পারে, যা সমুদ্রপৃষ্ঠের ঢেউয়ের চেয়েও বড়।
- অদৃশ্যতা: এই ঢেউগুলো সমুদ্রের ওপর থেকে দেখা যায় না। এগুলো কেবল তাপমাত্রা, লবণাক্ততা বা সাবমেরিনের গতিবিধি পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে শনাক্ত করা যায়।
- কুরআন যখন বলে “ঢেউয়ের ওপর ঢেউ”, তখন এটি স্পষ্টত সমুদ্রের তলদেশের সেই অদৃশ্য অভ্যন্তরীণ তরঙ্গ এবং তার ওপরের স্তরের পৃষ্ঠতরঙ্গের (Surface Waves) কথা বলছে।

উপরের চিত্রে : ভিন্ন ঘনত্বের দুটি পানির স্তরের মধ্যবর্তী সংযোগস্থলে সৃষ্ট অভ্যন্তরীণ তরঙ্গ। একটি স্তর অধিক ঘন (নিচেরটি), অপরটি কম ঘন (উপরেরটি)। Oceanography, Gross, পৃষ্ঠা ২০৪
৩. মেঘমালা ও বায়ুমণ্ডলীয় প্রভাব
আয়াতে আরও বলা হয়েছে: “তার উপরে মেঘমালা (مِنْ فَوْقِهِ سَحَابٌ)।” এটি পরিবেশের একটি পূর্ণাঙ্গ স্তরবিন্যাস প্রকাশ করে। সমুদ্রের গভীরে অন্ধকার, তার ওপর অভ্যন্তরীণ ঢেউ, তার ওপর উপরিভাগের ঢেউ এবং তার ওপর মেঘাচ্ছন্ন আকাশ। মেঘ সূর্যালোককে প্রতিফলিত ও শোষণ করে অন্ধকারের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেয়।
৪. সমুদ্রের গভীরতা ও মানুষের সীমাবদ্ধতা
আয়াতে সমুদ্রকে ‘বাহরিন লুজ্জিয়িন’ (بَحْرٍ لُجِّيٍّ) বা ‘তলহীন গভীর সমুদ্র’ বলা হয়েছে।
- প্রাচীনকালে মানুষ কেবল অগভীর সমুদ্রে মাছ ধরত বা মুক্তা সংগ্রহ করত। কোনো মানুষের পক্ষেই সরঞ্জাম ছাড়া ৪০-৫০ মিটারের নিচে যাওয়া সম্ভব নয়।
- ২০০ মিটারের নিচে অক্সিজেন এবং আলো অত্যন্ত কমে যায় এবং পানির চাপ বহুগুণ বেড়ে যায়।
- অথচ কুরআন ১৪০০ বছর আগে ১০০০ মিটারের নিচের সেই অন্ধকারের কথা বলছে, যা দেখার জন্য আধুনিক সাবমেরিন ও আলোর যন্ত্র প্রয়োজন।
৫. অন্যান্য প্রাসঙ্গিক আয়াত ও সমুদ্রবিজ্ঞান
কুরআনের অন্য স্থানেও সমুদ্রের রহস্য নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। যেমন-
“তিনি দুই সমুদ্রকে প্রবাহিত করেন যারা একে অপরের সাথে মিলিত হয়, কিন্তু তাদের মাঝে রয়েছে এক অন্তরাল (Barzakh) যা তারা অতিক্রম করতে পারে না।” (সূরা আর-রহমান: ১৯-২০)
এটি সমুদ্রের পানি ভিন্ন ঘনত্ব, লবণাক্ততা এবং তাপমাত্রার কারণে মিশ্রিত না হওয়ার বিস্ময়কর বৈজ্ঞানিক সত্যকে তুলে ধরে, যা গভীর সমুদ্রের অন্ধকার ও অভ্যন্তরীণ তরঙ্গের স্তরীভূত অবস্থার সঙ্গেও সম্পর্কিত।
উপসংহার
সূরা নূরের এই আয়াতটি কোনো বিজ্ঞান বিষয়ক প্রবন্ধ নয়, বরং একটি উপমা। তবে এই উপমায় ব্যবহৃত প্রতিটি শব্দ বৈজ্ঞানিকভাবে কতটা নির্ভুল, তা আজ বিজ্ঞানীরা অবাক হয়ে লক্ষ্য করছেন। মরুভূমির পরিবেশে থাকা একজন মানুষের পক্ষে সমুদ্রের তলদেশের অদৃশ্য তরঙ্গ বা আলোক বর্ণালীর শোষণ সম্পর্কে জানা অসম্ভব ছিল। এটি প্রমাণ করে যে, কুরআন এমন এক সত্তার বাণী, যিনি মহাবিশ্বের প্রতিটি স্তরের স্রষ্টা এবং এর গূঢ় রহস্য সম্পর্কে সম্যক অবগত।
সমুদ্রের এই অন্ধকার যেমন আলোহীন, তেমনি হিদায়াতহীন জীবনও অন্ধকারের স্তূপ। আয়াতে শেষ করা হয়েছে এই বলে— “আল্লাহ যাকে নূর দান করেন না, তার জন্য কোন নূর নেই।” অর্থাৎ জ্ঞান ও বিজ্ঞানের আলো থাকলেও হৃদয়ে আল্লাহ্র হিদায়াত না থাকলে মানুষ প্রকৃত সত্যের সন্ধান পায় না।