মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন
মহান আল্লাহ পৃথীবিতে তার দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য যুগে যুগে অসংখ্যা নবী রাসূল পাঠিয়েছেন। তারা দাওয়াত ও জিহাদের মাধ্যমে দ্বীনের প্রচার ও প্রসার ঘটিয়ে তাওহীদ প্রতিষ্ঠা করেছেন। অধিকাংশ নবী রাসূল শুধু দ্বীনের দাওয়াত দ্বারা দ্বীন প্রতিষ্ঠা করেছেন। আবার কোন কোন নবী রাসূল দাওয়াতের পাশাপাশি জিহাদও করেছেন। তারা দাওয়াতের মাধ্যমে দ্বীনের প্রসার ঘটিয়েছে আর জিহাদের মাধ্যমে দ্বীন সুরক্ষা করেছেন। এমন কি জিহাদের মাধ্যমেও দ্বীনের বিস্তার ঘটিয়েছেন। মহান আল্লাহ মনোনিত সর্বশেষ একমাত্র দ্বীন যা তিনি তার প্রিয় হাবিব মুহাম্মাদ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রতিষ্ঠা করেছেন। এই চুড়ান্ত ও সর্বশেষ মনোনিত একমাত্র দ্বীন প্রতিষ্ঠা জন্য মহান আল্লাহ দাওয়াত ও জিহাদ এই দুটি মাধ্যম দ্বারা সাফল্য মন্ডিত করছেন। তিনি দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য দাওয়াত দিয়েছিলেন এতে মুসলিম ও অমুসলিম কেউ দ্বিমত প্রষণ করে না। তিনি মক্কায় দীর্ঘ ১৩ বছর শুধু দাওয়াতের মাধ্যমেই ইসলামের প্রসার ঘটিয়েছেন। অপর পক্ষে তার জীবন দসায় কাফিরদের সাথে প্রায় অর্ধশত যুদ্ধ সংঘটিত হয়, যার অনেকগুলিতে তিনি নিজে নেতৃত্ব প্রদান করেন। যারা সত্যিকারের আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআত অনুসারী মুসলিম তারা দাওয়াত ও জিহাদের মাধ্যমে ইসমলাম প্রতিষ্ঠার জন্য চেষ্টা চালাবে। অপর পক্ষে বাতিল পন্থীদল একাংশকে স্বীকার করবে অপর অংশে অস্বীকার করবে। কাজেই যারা শুধু দাওয়াত মাধ্যমে ইসলমের প্রচার ও প্রসার ঘটাতে চেষ্টা করে কিন্ত কিতাল বা যুদ্ধকে অস্বীকার করে তারা সঠিক পন্থীদল হতে পারেনা। অপর পক্ষে যারা যুদ্ধ বিগ্রহ বা জিহাদের দ্বারা দ্বীর প্রতিষ্ঠা চেষ্টা করে কিন্তু দ্বীনের দাওয়াত দানের পদ্ধতিকে অস্বীকার করে তারাও সঠিক পন্থীদল হতে পারেনা। ইসলামি দ্বীনের কিছু স্বীকার করা আর কিছুকে অস্বীকার করা, ইসলামকে অস্বীকার করারই নামান্তর। মহান আল্লাহ বলেন,
أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ فَمَا جَزَاء مَن يَفْعَلُ ذَلِكَ مِنكُمْ إِلاَّ خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَى أَشَدِّ الْعَذَابِ وَمَا اللّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ
অর্থঃ তবে কি তোমরা গ্রন্থের কিয়দংশ বিশ্বাস কর এবং কিয়দংশ অবিশ্বাস কর? যারা এরূপ করে পার্থিব জীবনে দূগর্তি ছাড়া তাদের আর কোনই পথ নেই। কিয়ামতের দিন তাদের কঠোরতম শাস্তির দিকে পৌঁছে দেয়া হবে। আল্লাহ তোমাদের কাজ-কর্ম সম্পর্কে বে-খবর নন। সুরা বাকারা : ৮৫
বর্তমান ফিতনার যুগে যদি একজন ইমানদার মুসলিম দ্বীর প্রচার, প্রসার বা প্রতিষ্ঠার জন্য যে কোন একটা মাধ্যম গ্রহন করে, হোক সেটা দাওয়াত (ধর্মীয় শিক্ষকতা, লেখক, মসজিদের ইমাম, প্রচলিত শির্কমু্ক্ত যে কোন পন্থা) অথবা জিহাদ (ইসলামি সংগঠন, রাজনৈতিক বা অরাজনৈতিক সংগঠন) তবে সে কি আংশিক দ্বীনের অনুসারী না সম্পূর্ণ দ্বীনের অনুসারী হিসাবে পরিগনিত হবে?
এখানে একটা কথা স্মরণ রাখতে হবে, একক ব্যক্তির পক্ষে অনেক সময় সর্বক্ষেত্রে অংশ গ্রহন সম্ভব নাও হতে পারে। যেমন একজন মাদ্রাস শিক্ষকের পক্ষে ইসলাম প্রচারের মাধ্যম হল দ্বীনে সঠিক জ্ঞান তার ছাত্রদের মাঝে তুলে ধরা। এ কারনে সে যদি জিহাদের মত কোন কাজে অংশ গ্রহন না করতে পারে তবে দুষনীয় নয়, তার অন্তরে এর প্রতি ভালাবাসা আছে, আছে অকুন্ট সমর্থণ। কিন্তু যে যদি জিহার করাকে অস্বীকার করে তবে মহান আল্লাহ প্রদত্ত বিধান মোতাবেগ শাস্তির যোগ্য হয়ে যাবে। অনুরূপ ভাবে ইসলামি সংগঠনের (রাজনৈতিক বা অরাজনৈতিক) সাথে যুক্ত কেউ যদি দাওয়াতের কাজও ইসলামের অংশ মনে করে এর প্রতি ভালবাসা দেখায়। এই কাজে অংশগ্রহণ করতে না পারায় নিজে নিজে অনুসুচনা করে। সে কিন্তু সঠিক পথেই আছে। অপর পক্ষে জিহাদ সমর্থিত ভাই যদি নিজের কাজকেই হক মনে করে আর দাওয়াতে মহান কাজকে অনর্থক মনে করে আস্বীকার করে তবে সেও মহান আল্লাহ প্রদত্ত বিধান মোতাবেগ শাস্তির যোগ্য হয়ে যাবে।
সত্য পন্থী দলের দ্বারা জিহাদ ও দাওয়াতের সীমা কিভাবে নির্ধারণ হবে, এ সম্পর্কে সামান্য আলোচনা করব। আশা করি ব্যাপারটি সকলে সহজেই বুঝে আমল করতে পাবর। দাওয়াতের দুটি অংশ একটি হল ভাল কাজের আদেশ আর অপরটি হল অন্যায় কাজের নিষেধ করা। সাধারণত ভাল কাজের আদেশ কে আমরা তাবলীগ বা দাওয়াত হিসাবে ধরে থাকি আর অন্যায় কাজের নিষেধ বা বাধা প্রদান কে জিহাদ বলে থাকি। আমাদের সমাজে আমরা দুটি কাজকে আলাদা করে ফেলেছি মহান আল্লাহ কিন্তু দুটি কাজ একত্রেই উল্লেখ করেছেন। যেমন তিনি বলেন,
كُنتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ وَتُؤْمِنُونَ بِاللّهِ
অর্থঃ তোমরাই শ্রেষ্ঠ জাতি, মানবজাতির (কল্যাণের) জন্য তোমাদের আবির্ভাব হয়েছে। তোমরা ন্যায়কার্যে আদেশ এবং অন্যায় কার্যে নিষেধ কর এবং আল্লাহতে বিশ্বাস কর। সূরা আল ইমরান : ১১০
প্রকৃত মুমিনের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করে আল্লাহ বলেনঃ
يُؤْمِنُونَ بِاللّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ وَيَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ وَيُسَارِعُونَ فِي الْخَيْرَاتِ وَأُوْلَـئِكَ مِنَ الصَّالِحِينَ
অর্থঃ তারা আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান রাখে এবং তারা ভাল কাজের আদেশ দেয় ও মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করে। আর তারা কল্যাণকর কাজে দ্রুত ধাবিত হয় এবং তারা নেককারদের অন্তর্ভুক্ত। (সূরা আল ইমরান : ১১৪
وَالْمُؤْمِنُونَ وَالْمُؤْمِنَاتُ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاء بَعْضٍ يَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ وَيُقِيمُونَ الصَّلاَةَ وَيُؤْتُونَ الزَّكَاةَ وَيُطِيعُونَ اللّهَ وَرَسُولَهُ أُوْلَـئِكَ سَيَرْحَمُهُمُ اللّهُ إِنَّ اللّهَ عَزِيزٌ حَكِيمٌ
অর্থঃ আর মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীরা একে অপরের বন্ধু, তারা ভাল কাজের আদেশ দেয় আর অন্যায় কাজ থেকে নিষেধ করে, আর তারা সালাত কায়েম করে, জাকাত প্রদান করে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে। এদেরকে আল্লাহ শীঘ্রই দয়া করবেন, নিশ্চয় আল্লাহ পরক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। সূরা তাওবা : ৭১
আল্লাহ তাবারকা ওয়াতাআলা আরও বলেনঃ
الَّذِينَ يَتَّبِعُونَ الرَّسُولَ النَّبِيَّ الأُمِّيَّ الَّذِي يَجِدُونَهُ مَكْتُوبًا عِندَهُمْ فِي التَّوْرَاةِ وَالإِنْجِيلِ يَأْمُرُهُم بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَاهُمْ عَنِ الْمُنكَرِ
অর্থঃ সে সমস্ত লোক, যারা আনুগত্য অবলম্বন করে এ রসূলের, যিনি উম্মী নবী, যাঁর সম্পর্কে তারা নিজেদের কাছে রক্ষিত তওরাত ও ইঞ্জিলে লেখা দেখতে পায়, তিনি তাদেরকে নির্দেশ দেন সৎকর্মের, বারণ করেন অসৎকর্ম থেকে। (সুরা আরাফ ৭:১৫৭)।
সূরা তাওবার ১১২ আয়াতে, সূরা হজ্জের ৪১ আয়াতে, সূরা লুকমানের ১৭ আয়াতে ও অন্যান্য স্থানেও উল্লেখ করা হয়েছে যে, আল্লাহর প্রকৃত মুমিন বান্দাদের অন্যতম বৈশিষ্ট হলো সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ।
দ্বীন প্রচার প্রসারের জন্য দাওয়াত সতেষ্ট থাকবে-
দ্বীন প্রচার প্রসারে দাওয়াতের হুকুম–
আল্লাহর পথে আহবান করতেই নবী–রাসূলগণের পৃথিবীতে আগমন। মুমিনের জীবনের আন্যতম দায়িত্ব এই দাওয়াত। কোরআনুল কারিমে এ দায়িত্বকে কখনো দাওয়াত, কখনো সৎকার্যে আদেশ ও অসৎকার্যে নিষেধ, কখনো প্রচার, কখনো নসিহত ও কখনো দীন প্রতিষ্ঠা বলে অভিহিত করা হয়েছে। কোরআন ও হাদিসের বহু স্থানে এ কাজের গুরুত্ব, বিধান, পুরস্কার এবং এ দায়িত্ব পালনে অবহেলার শাস্তি আলোচিত হয়েছে। এই মহান কাজ করা মহান আল্লাহর নির্দেশ। এই মহান কাজের আনজাম প্রদানের জন্যই মহান আল্লাহ পৃথিবীতে অসংখ্যা নবী রসূল আলাইহিস সালাম প্রেরণ করেছেন। আল কুরআনে এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ ঘোষণা করেছেঃ
لَقَدْ أَرْسَلْنَا نُوحًا إِلَى قَوْمِهِ فَقَالَ يَا قَوْمِ اعْبُدُوا اللَّهَ مَا لَكُمْ مِنْ إِلَهٍ غَيْرُهُ إِنِّي أَخَافُ عَلَيْكُمْ عَذَابَ يَوْمٍ عَظِيمٍ
অর্থঃ আমি নূহ (আঃ) কে তার কওমের নিকট পাঠিয়েছিলাম। তিনি তাঁর কওমকে ডাক দিয়ে বললেন, হে আমার কওম! তোমরা আল্লাহর দাসত্ব কর- আল্লাহ ছাড়া তোমাদের আর কোন ইলাহ বা প্রভু নেই। (আল আ’রাফা ৭:৫৯)।
আল্লাহ তাবারকা ওয়াতাআলা আরও বলেনঃ
وَإِلَى عَادٍ أَخَاهُمْ هُودًا قَالَ يَا قَوْمِ اعْبُدُوا اللَّهَ مَا لَكُمْ مِنْ إِلَهٍ غَيْرُهُ أَفَلَا تَتَّقُونَ
অর্থঃ এবং আদ জাতির প্রতি আমি তাদের ভাই হুদ (আঃ) কে পাঠিয়েছিলাম। তিনি বললেন, হে আমার দেশবাসী ! তোমরা আল্লাহর দাসত্ব কর। তিনি ছাড়া তোমাদের কোন ইলাহ নেই। (আল আ’রাফা ৭:৬৪)।
وَإِلَى ثَمُودَ أَخَاهُمْ صَالِحًا قَالَ يَا قَوْمِ اعْبُدُوا اللَّهَ مَا لَكُمْ مِنْ إِلَهٍ غَيْرُهُ
অর্থঃ এবং সামুদ জাতির প্রতি তাদের ভাই সালেহ (আঃ) কে পাঠিয়েছিরাম। তিনি তাঁর দেশবাসীকে ডাক দিয়ে বললেন, হে আমার কওমের লোকেরা! তোমরা আল্লাহর দসত্ব কবুল কর। তিনি ছাড়া কোন ইলাহ নেই। (আল আ’রাফ ৭:৭৩)
وَإِلَى مَدْيَنَ أَخَاهُمْ شُعَيْبًا قَالَ يَا قَوْمِ اعْبُدُوا اللَّهَ مَا لَكُمْ مِنْ إِلَهٍ غَيْرُهُ
অর্থঃ এবং মাদইয়ানবাসীর প্রতি তাদেরই ভাই শোয়ায়েব আ. কে পাঠিয়েছিলাম। তিনি তার কওমকে ডাক দিয়ে বললেন, হে আমার কওম। তোমরা আল্লাহর দাসত্ব কবুল কর। তিনি ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই। (আল আ’রাফ ৭:৮৫)
সূরায়ে আহযাবে ৪৫-৪৬ আয়াতে বলা হয়েছে:
يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ إِنَّا أَرْسَلْنَاكَ شَاهِدًا وَمُبَشِّرًا وَنَذِيرًا (45) وَدَاعِيًا إِلَى اللَّهِ بِإِذْنِهِ وَسِرَاجًا مُنِيرًا
অর্থঃ হে নবী! আমরা তোমাকে পাঠিয়েছি সাক্ষীরূপে, সুসংবাদদাতা ও ভীতি প্রদর্শকরূপে এবং খোদার নির্দেশে তাঁর প্রতি আহ্বানকারী ও উজ্জ্বল প্রদীপরূপে। আবার কোথাও এসেছে এই কাজের প্রশংসা বর্ণনা হিসেবে। (সুরা আহযাব ৩৩: ৪৫ ও ৪৬)
নূহ আলাইহিস সালামের এর জবানিতে মহান আল্লাহ বলেনঃ
أُبَلِّغُكُمْ رِسَالاَتِ رَبِّي وَأَنصَحُ لَكُمْ وَأَعْلَمُ مِنَ اللّهِ مَا لاَ تَعْلَمُونَ
অর্থঃ তোমাদেরকে প্রতিপালকের পয়গাম পৌঁছাই এবং তোমাদেরকে সদুপদেশ দেই। আমি আল্লাহর পক্ষ থেকে এমনসব বিষয় জানি, যেগুলো তোমরা জান না। [ সুরা আরাফ ৭:৬২ ]
মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লা কে দাওয়াত দিতে নির্দেশ-
আমাদের রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লা কে দাওয়াত দিতে নির্দেশ প্রদাণ করা হয়েছে। মহান আল্লাহ তাকে নির্দেশ প্রদান করে বলেনঃ
يَا أَيُّهَا الرَّسُولُ بَلِّغْ مَا أُنزِلَ إِلَيْكَ مِن رَّبِّكَ وَإِن لَّمْ تَفْعَلْ فَمَا بَلَّغْتَ رِسَالَتَهُ وَاللّهُ يَعْصِمُكَ مِنَ النَّاسِ إِنَّ اللّهَ لاَ يَهْدِي الْقَوْمَ الْكَافِرِينَ
অর্থঃ হে রসূল, পৌছে দিন আপনার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে আপনার প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে। আর যদি আপনি এরূপ না করেন, তবে আপনি তাঁর পয়গাম কিছুই পৌছালেন না। আল্লাহ আপনাকে মানুষের কাছ থেকে রক্ষা করবেন। নিশ্চয় আল্লাহ কাফেরদেরকে পথ প্রদর্শন করেন না। সুরা মায়েদা : ৬৭
মহান আল্লাহ এই আয়াতের মাধ্যমে আমাদের রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লা কে আহীর পৌছে দানের জনস্য নির্দেশ প্রদান করেন। কোরআনুল কারিমে বারবার বলা হয়েছে যে, প্রচার বা পোঁছানোই রাসূলগণের একমাত্র দায়িত্ব। নিচের আয়াতে বলা হয়েছেঃ
فَهَلْ عَلَى الرُّسُلِ إِلاَّ الْبَلاغُ الْمُبِينُ
অর্থঃ রাসূলের দায়িত্ব তো শুধুমাত্র সুস্পষ্ট বাণী পৌছিয়ে দেয়া। (সুরা নাহল ১৬:৩৫)।
উম্মতে মুহাম্মাদকে দাওয়াত দিতে নির্দেশ-
এই মহান দাওয়াতের কাজ মহান আল্লাহ তার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লা কে দায়িত্ব দিয়েই ছেড়ে দেননি তার উম্মতে মুহাম্মাদকেও এই একই নির্দেশ প্রদান করেছেন। যেমন- মহান আল্লাহ বলেনঃ
قُلْ هَـذِهِ سَبِيلِي أَدْعُو إِلَى اللّهِ عَلَى بَصِيرَةٍ أَنَاْ وَمَنِ اتَّبَعَنِي وَسُبْحَانَ اللّهِ وَمَا أَنَاْ مِنَ الْمُشْرِكِينَ
অর্থঃ বলে দিন, এটাই আমার পথ। আমি আল্লাহর দিকে বুঝে সুঝে দাওয়াত দেই আমি এবং যে আমার অনুসারী সেও। আল্লাহ পবিত্র। আমি (আল্লাহ) অংশীবাদীদের অন্তর্ভুক্ত নই। (সুরা ইউসুফ ১২:১০৮)।
মহান আল্লাহ আরও বলেনঃ
وَلْتَكُن مِّنكُمْ أُمَّةٌ يَدْعُونَ إِلَى الْخَيْرِ وَيَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ وَأُوْلَـئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ
অর্থঃ আর তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল থাকা দরকার, যারা কল্যাণের প্রতি আহবান করবে, ভাল কাজের আদেশ দেবে এবং মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করবে। আর তারাই সফলকাম। (সূরা আল ইমরান ৩:১০৪)।
এই দায়িত্বপালনকারী মুমিনকেই সর্বোত্তম বলে ঘোষণা করা হয়েছে পবিত্র কোরআনে। মহান আল্লাহ বলেনঃ
وَمَنْ أَحْسَنُ قَوْلًا مِّمَّن دَعَا إِلَى اللَّهِ وَعَمِلَ صَالِحًا وَقَالَ إِنَّنِي مِنَ الْمُسْلِمِينَ
অর্থঃ ঐ ব্যক্তি অপেক্ষা কথায় কে উত্তম যে আল্লাহর প্রতি মানুষকে আহবান করে, সৎকর্ম করে এবং বলে, আমি তো মুসলিমদের একজন।” (সুরা হা-মীম ৪১:৩৩)
মন্তব্যঃ উপরের আয়াতগুলি দ্বারা বুঝা যায় মুমিনদের অন্যতম দায়িত্ব হল দ্বীনের দাওয়াত দেয়া। কাজেই সত্য পন্থীদলের অন্যতম বৈশিষ্ট হল তারা দাওয়াতের কাজে সর্বসময় নিজেকে নিয়োজিত রাখবে। যে সত্য পন্থীদল বলে দাবী করবে তার দাঈ হিসাবে অনেক গুন থাকার আবাশ্যক। তবে নিম্মের গুন সম্পন্ন দায়ি হলেও চলবে।
দাওয়াত দানকারি দাঈয়ের গুনাবলী-
সৌদী আরবের বিশিষ্ট আলেমে দ্বীন মুহাম্মাদ ইবন সালেহ আল উসাইমীন (রহ:) জেদ্দায় এক সম্মেলনে বলেন, ইসলাম প্রচার কারি দায়ীদের ছয়টি গুন থাকতে হবে। যথা
১। আল্লাহ পথের দা‘য়ীরা যে দিকে মানুষকে ডাকবে সে সম্পর্কে ইলম তথা জ্ঞান থাকা
২। দাওয়াতের ক্ষেত্রে ধৈর্যধারণ করতে হবে।
৩। হিকমত বা প্রজ্ঞা
৪। দা‘য়ীকে উত্তম চরিত্রে চরিত্রবান হতে হবে।
৫। দা‘য়ীকে জড়তা ও প্রতিবন্ধকতা পরিহার করা।
৬। দা‘য়ীর অন্তর বিরোধীদের প্রতি উদার হতে হবে।
দাওয়াত প্রদানের পদ্ধতিঃ
একজন দাঈ মানুষকে ইসলামের দিকে ডাকার জন্য বিভিন্ন পদ্ধতিতে কাজ করতে পারে। দাওয়াতের আসল মাকসাদ হল, যে কোন পন্থা বা পদ্ধতিতে ইসলামকে সত্য নিষ্ঠভাবে পৌছান। সমাজে এখন নতুন নতুন মাধ্যম সৃষ্টি হয়েছে, যার মাধ্যমে দ্বীনের প্রচার প্রসার করা খুবই সহজ। একটু সদইচ্ছা থাকলে সামান্যও বিশাল বিশাল কাজ করা সম্ভব। সকলের সুবিধান জন্য কয়েকটি পদ্ধতি উল্লেখ করছি।
০১। প্রতিদিন অন্তত এক বার পরিবারের সবার আমলের খোজ খবর নেয়া। যেমনঃ সকলে নিয়মিত সালাত, সাওম আদায় করছে কিনা। নিয়মিত কুরআন ও হাদিস চর্চা করছে কিনা। পরিবারের জ্ঞান চর্চার জন্য লাইব্রেরী গড়ে তুলতে পারি।
০২। মসজিদ ভিত্তিক ইসলামিক আলোচনা সভা, ওয়াজ মাহফিল, দরসের আসর বসান। মসজিদ ভিত্তিক লাইব্রেরী তৈরি করা। মসজিদ কমিটির মাধ্যমে দাওয়াত পরিচালনা করা।
০৩। এলাকার মসজিদ, মাদ্রাসা, ক্লাব, স্কুল ইত্যাদি কেন্দ্র করে কুরআন হাদিসের আলোকে দেয়াল পত্রিকা প্রকাশ করা যেতে পারে।
০৪। নামাযের ক্যালেন্ডার বের করা। রমজান সাথে সিয়ামের সময় সম্বলিত ক্যালেন্ডার বের করা।
০৫। প্রিন্ট মিডিয়ার মাধ্যমে দ্বীন প্রচার করা। প্রিন্ট মিডিয়া বলতে পত্রিকা বুঝান হয়ে থাকে। সামর্থ থাকলে ইসমামি ভাব ধারার মাসিক, সাপ্তাহিক বা দৈনিক পত্রিকা চালু করে ইসলামা প্রচার করা। এমনটি প্রকাশনি প্রতিষ্ঠা করেও ইসলামি বই ছাপিয়ে দাওয়াতে কাজ করা। কুরআন ও সহিহ সুন্নাহ ভিত্তিক প্রকাশিত কোন ইসলামী পত্রিকার গ্রাহক সংখ্যা বৃদ্ধির চেষ্টা করা। প্রয়োজনাতিরিক্ত ইসলামি ম্যাগাজিন, ইসলামী বই প্রভৃতি সংগ্রহ করে তা বিতরণ করা।
০৬। সমাজে প্রচলিত খারাপ ক্যাসেট, খারাপ ম্যাগাজিন, মানুষের কাছ থেকে উদ্ধার করে তার পরিবর্তে ভালমানের বক্তৃতার ক্যাসেট, ইসলামী ম্যাগাজিন প্রদান করা।
৭। বর্তমানে মোবাইলের যুগে মোবাইলের মাধ্যমে সামান্য অর্থ খরচ করে দাওয়তী কাজ করা যায়। যেমনঃ একটি মেমোরী কার্ডে কিনে ইসলামি আলোচনার অডিও বা ভিডিও উপহার দিলেও দাওয়াতি কাজ হবে।
৮। কম্পিউটারের মাধ্যমে দাওয়তি করা করা যায়। বিভিন্না আলেমদের ওয়াজের সিডি করে অন্যকে প্রদান করা। প্রয়োজনে পেইন ড্রাই বা মেমোরী কার্ডে ইসলামি আলোচনার ভিডিও বা অডিও কপি করে প্রদান করা।
০৯। বই মেলা বা বানিজ্য মেলায় ইসলামী বই, ক্যাসেট, সিডি, দাওয়াতী উপকরণ, ইসলামি নিদর্শন ইত্যাদি প্রদর্শনীর আয়োজন করা।
১০। প্রসিদ্ধ দাওয়া সেন্টার, ইসলামি লাইব্রেরী, ইসলামী রেকর্ডিং সেন্টার, বড় বড় জামে মসজিদ, প্রসিদ্ধ আলেমদের নাম ঠিকানা, তাদের লিখত বই, তাদের পরিচালিত ওয়েব সাইড এর নাম, ইসলামি সাময়িকি, ইসমামি পত্রিকা, ইসলামী রেকর্ডিং সেন্টার, ইসলামিক ওয়েব সাইট এর নাম সমূহর বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশ করা।
১১। ব্যাপক লোক সমাগমের স্থানে পরিবেশ অনুযায়ী মানুষকে বই, ক্যাসেট, লিফলেট ইত্যাদি বিনামূল্যে বিতরণ করবে বা বিক্রয় করবে।
১২। ইন্টারনেটের মাধ্যমে দ্বীন প্রচার করা। আমাদের দেশে প্রায় সকল মানুষ ইন্টারনেটের সাথে কোন না কোন ভাবে জড়িত। এর মধ্যে একটা অংশ আছে যারা ইন্টারনেট ছাড়া এক মুহুর্তও চলতে পারে না। মজার ব্যাপার হল এরা প্রায় সকলেই শিক্ষিত জ্ঞান সম্পন্ন লোক। কাজের এদের কাছে দ্বীন পৌছান ও দ্বীন বুঝান খুবই সহজ। ইন্টারনেটের প্রায় নব্বইভাগই অশ্লীলতায় ভরা। কাজের এদের মাঝে দ্বীন প্রচার করে সচেতন করা খুবই জরুরী। খারাপ বলে দুরে থাকলে আরও খারাপ হবে। তবে যার খারাপ সওয়াম সম্ভাবনা আছে বা যে অশ্লীলত থেকে বাচতে পারে না, তার জন্য ইন্টারনেটের মাধ্যমে দ্বীন প্রচার করা বৈধ হবে না, বৈধ হবে না। এখন আসুন কিভাবে আধুনিক এই মাধ্যম ব্যবহার করে দ্বীন প্রচার করা যায়।
সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমেঃ বর্তমানে ইন্টারনেটে অনেক গুলি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সক্রিয় যেমনঃ ফেসবুক, টুইটার, জিমেইল, পথ, লিংকডিন, ইনোস্ট্রগ্রাম, রেডিট ইত্যাদি। বর্তমানে আমাদের দেশে প্রায় সব বয়সের মানুষ ফেসবুক ব্যবহার করে থাকেন। ইউরোপের মানুষসহ বহির্বিশ্বের অধিকাংশ মানুষ টুইটার ব্যবহার করে থাকে। ভাল মানের চাকুরীজীরিগন লিংকইন ব্যবহার করে থাকে। আবার সেলিব্রাটিগণ ইনোস্ট্রগ্রাম ব্যবহার করে। কাজের এই সকল সামাজিক যোগাযোগ মাধামে ব্যবহার করে সকল শ্রেণীর মানুষের নিকট দ্বীন পৌছান খুবই সহজ। ইসলামিক লেখা পোস্ট করে, পেজ খুলে এবং গ্রুপ খুলে সে গ্রুপে ইসলামি লেখা পোস্ট করার মাধ্যমে অনেক মানুষের মাঝে দাওয়াত প্রচার করা যায়।
আবার ইমো, ম্যাসেনজান, ভাইভার, ইমেইল ইত্যাদির মাধ্যমে অসংখ্য মানুষের কাছে ইসলামের বাণী মুহূর্তেই পৌঁছানো যায়।
ইউটিউবঃ সারা বিশ্বে বহুল ব্যবহৃত একটি সাইট হচ্ছে ইউটিউব। বিশ্বের এমন কোন দেশ নেই যে দেশে ইউটিউবের ব্যবহার নেই। ইউটিউবে একাউন্ট খুলে দ্বীন প্রচার করা যায়। ইউটিউবে টিভি চ্যানেল তৈরি করেও দ্বীন প্রচার করা যায়। এই মাধ্যমে বিভিন্ন ওয়াজ, তাফসিরুল কুরআনের ও হাদিসের আলোচনা আপলোড করা। বিভিন্ন মাসায়ালা মাসায়েলের প্রশ্ন উত্তরের ভিডিও আপলোড করে সমগ্র পৃথিবীতে ছড়িয়ে দেয়া যায়।
বিভিন্ন সাইট খুলে দ্বীন প্রচারঃ বিভিন্ন ওয়েব সাইট খুলে তাতে ইসলামিক বয়ান, ঐতিহাসিক নিদর্শন, ইসলামিক ফটোগ্রাফি, নবীদের জীবনী, সাহাবাদের জীবনী, বুজুর্গদের ত্যাগ ইত্যাদি তুলে ধরার মাধ্যমে ইসলামি দাওয়াতের কাজ করা যায়। বিভিন্ন ব্লগে ইসলামের লেখা লিখে দাওয়াতি কাজ করা যায়। আবার নিজস্ব ইসলামি ব্লগও প্রতিষ্ঠার করা যায়। বর্তমানে অনলাইনে ওয়েব পোর্টালের ছড়াছড়ি। এসব পোর্টালগুলোতে অপ্রয়োজনীয় নিউজ বেশি প্রচার করা হয়। তাই এসব পোর্টাল গুলোতে ইসলামি লেখা বেশি বেশি লিখে দ্বীন প্রচার করা যায়।
অনলাইনে ফ্রি বই আপলোড করেঃ অনলাইনে ফ্রি বই প্রকাশ করার সুযোগ দিয়ে থাকে অনেক প্রকাশনী। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ইসলামি বইগুলো আপলোড করে প্রচার করা। নিজস্ব ইসলামি বই বা পত্রিকা স্ক্যানিং করে অনলাইনে আপলোড করে দেওয়া। যেন মানুষ হাতের নাগালেই ইসলামি বই ও পত্রিকা পেয়ে যায়। তবে অন্যের বই বা পত্রিকা অনুমতি ছাড়া স্ক্যানিং না করা।
ইলেকট্রনিক্স মিডিয়াঃ ইলেকট্রনিক্স মিডিয়া বলতে টিভি, ইন্টারনেটের মাধ্যমে ওয়েব পোর্টাল বা ব্লগ, রেডিও ইত্যাদিসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক্স মিডিয়ায় বুঝায়। সামর্থ থাকলে এই সকল মাধ্যম তৈরি করে ইসলাম প্রচার করা যায়।
হক পন্থীদল কেন দাওয়াত দিবে? তাদের দওয়াত দানের পদ্ধতি কেমন হবে? এ সকল আলোচনা, এ জন্যই করা হল যাতে হক পন্থীদলদের সবার থেকে আলাদা করে বেছে নেয়া যায়। দাওয়াতে পর এবার আলোচনা করব হক পন্থীদলদের অন্যতম বৈশিষ্ট জিহাদ সম্পর্কে।